Tuesday, 15 August 2017

একুশ শতকে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির গুরুত্ব

১৬ই অগাস্ট ২০১৭

বাংলাদেশের সীমানা থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে দু’টা রাষ্ট্রের জোর সামরিক কর্মকান্ড চললেও এদেশের মানুষ মুভি দেখার মতো করে তাকিয়ে আছে! এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমিকাটা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা তারা অনুধাবনই করতে পারছে না! অথচ বাংলাদেশের ইতিহাসেই ভূরাজনীতির কিছু চমৎকার উদাহরণ রয়েছে, যা উল্লেখ করার মতো। বঙ্গবন্ধুর নাম এসে যায় সেসব ভূরাজনীতির আলোকে।



বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনীতি ও ঘুমন্ত জনতা

কিছুদিন আগেই জুলাই মাসে বঙ্গোপসাগরে পরাশক্তি এবং তার দোসর ভারত আয়োজন করেছিল সামরিক মহড়া “মালাবার-২০১৭”। বাংলাদেশ বাণিজ্য-নির্ভর দেশ; দেশটার ৯০ শতাংশের উপরে বণিজ্য হয় সমুদ্রপথে। এই সমুদ্রপথ গিয়েছে বঙ্গোপসাগরের মাঝ দিয়ে, যেকারণে বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের অস্তিত্বের সাথে ওঁতপ্রোঁতভাবে জড়িত। আর বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্যে এতটা গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথের উপরে পরাশক্তি এবং তার দোসরেরা যখন অস্ত্রের ঝনঝনানি নিয়ে মেতেছে, তখন এদেশের মানুষ নিশ্চিন্ত থাকবে – এটা কোন যুক্তির কথা হতে পারে না! ‘আমার উঠানে ডাকাতের সরদার মদের আসর বসালেও আমি নিশ্চিন্ত থাকবো’ –এটা কোন ধরনের মানসিকতা? বিশ্বরাজনীতি সম্পর্কে উদাসীনতা এদেশের জনগণের জন্যে বিপদ ডেকে নিয়ে আসছে।

চীন-ভারত সীমান্তে উত্তেজনার ব্যাপারটাও সেরকমই।[1] বাংলাদেশের সীমানা থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে দু’টা রাষ্ট্রের জোর সামরিক কর্মকান্ড চলছে, আর এদেশের মানুষ মুভি দেখার মতো করে তাকিয়ে আছে! এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমিকাটা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা তারা অনুধাবনই করতে পারছে না! বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় বেশিরভাগ মানুষই ঐদাসীন্যের চরম উদাহরণ রেখে চলেছেন এবং আমজনতার মতোই নির্বোধ চিত্তে ঘটনা দেখছেন। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাসেই ভূরাজনীতির কিছু চমৎকার উদাহরণ রয়েছে, যা উল্লেখ করার মতো। সেই আলোচনায় যাবার আগে কিছু ঘটনার পর্যালোচনা জরুরি।

বঙ্গবন্ধু ১৯৫২ সালে এবং ১৯৫৭ সালে চীনে যান। চীনের সাথে বঙ্গবন্ধুর সুসম্পর্কে ভাটা ফেলার চেষ্টা চলেছে ১৯৭১ পরবর্তী সময়ে। মার্কিনীরা চেয়েছিল বাংলাদেশের সাথে চীনের সম্পর্ককে তারাই নিয়ন্ত্রণ করবে। আবার ভারত চেয়েছিল বাংলাদেশ চীন থেকে দূরে থাকুক। যেকারণে শুধু ১৯৭৫ পরবর্তী সময়েই বাংলাদেশের সাথে চীনের সম্পর্ককে এগুতে দেখা যায়। প্রকৃতপক্ষে এখানকার রাষ্ট্র এবং জনগণ চীনকে কখনোই প্রত্যাখ্যান করেনি; ওয়াশিংটনের ছলচাতুরি এবং ভারতের বারংবার হস্তক্ষেপের কারণেই চীনের সাথে বাংলাদেশের দূরত্ব রয়ে গিয়েছিল।


বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের অগ্রগতি

২০১৬-এর জানুয়ারীতে বাংলাদেশে চীনের সাবেক রাষ্ট্রদূত চাই জি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে দেখা করে বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইয়ের চীনা ভাষায় অনূদিত একটা কপি প্রদান করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন যে বঙ্গবন্ধুর চীন সফর নিয়ে একটা বই প্রকাশ করা হবে, সেটারও চীনা ভাষায় অনূবাদের দরকার হবে। বঙ্গবন্ধু ১৯৫২ সালে এবং ১৯৫৭ সালে চীনে যান। বঙ্গবন্ধুর চীন সফরকে পাকিস্তান সরকার তখন ভালো চোখে দেখেনি, কারণ তখন চীন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বৈরী। তিনি লেখেন, “আমার পাসপোর্টের জন্য দরখাস্ত করলাম, পাওয়ার আশা আমাদের খুবই কম। কারণ, সরকার ও তার দলীয় সভ্যরা তো ক্ষেপে অস্থির। কমিউনিস্ট না হলে কমিউনিস্ট চীনে যেতে চায়? শান্তি সন্মেলন তো না, কমিউনিস্ট পার্টির সভা, এমনি নানা কথা শুরু করে দিল”। [2] ভূরাজনীতি যে পরিবর্তিত হয়, সেটা খুব সহজেই বোঝা যায় চীনের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক থেকে। যেখানে ১৯৫০-এর দশকে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে চীনে যেতে দেবে কিনা, সেটাতে সন্দেহ ছিল, সেখানে ১৯৭১ সালেই চীনের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক বেশ গাড় হয়ে যায়। ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের জের ধরেই পাকিস্তানের সাথে চীনের সম্পর্কোন্নয়ন হতে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সম্পর্ক ওঠা-নামার ব্যাতিক্রম হয়নি।

চীনের সাথে বঙ্গবন্ধুর এই সম্পর্কে ভাটা ফেলার চেষ্টা চলেছে ১৯৭১ পরবর্তী সময়ে। মার্কিনীরা চেয়েছিল বাংলাদেশের সাথে চীনের সম্পর্ককে তারাই নিয়ন্ত্রণ করবে। আবার ভারত চেয়েছিল বাংলাদেশ চীন থেকে দূরে থাকুক। যেকারণে শুধু ১৯৭৫ পরবর্তী সময়েই বাংলাদেশের সাথে চীনের সম্পর্ককে এগুতে দেখা যায়। প্রকৃতপক্ষে এখানকার রাষ্ট্র এবং জনগণ চীনকে কখনোই প্রত্যাখ্যান করেনি; ওয়াশিংটনের ছলচাতুরি এবং ভারতের বারংবার হস্তক্ষেপের কারণেই চীনের সাথে বাংলাদেশের দূরত্ব রয়ে গিয়েছিল। তবে এই ছলচাতুরি পেরিয়ে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে এসেছে। এবং ২০১৬ সালে এসে চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদের বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী অনূবাদ এই বার্তাই বহণ করে। চীন বাংলাদেশের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ সহযোগী। এবং একইসাথে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর একটা বড় অংশ চীনাদের যুদ্ধাস্ত্রে সজ্জিত। অন্যভাবে বলতে গেলে, ১৯৭১ পরবর্তী সময়ে চীনের সহায়তাতেই বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা উল্টে যায়। ১৯৭০-এর দশকে ভারত যেমন মনে করতো যে তারা যেকোন সময় ‘সিকিম-স্টাইলে’ বাংলাদেশে সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পারবে, সেটা চীনা সহায়তাতেই উল্টে যায়। ভারত অনেক আগেই বুঝে গেছে যে বাংলাদেশ এখন আর ভারতের গিলে ফেলার মতো অবস্থায় নেই (Too big to swallow); বাস্তবতা পাল্টে গেছে। তবে এখনও কেউ কেউ বাংলাদেশের অসহায়ত্বের কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করে পালে হাওয়া লাগাবার একটা বৃথা চেষ্টা করছেন।
 
আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট হাউয়ারি বোরেমেদ্দিন এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে বঙ্গবন্ধু (১৯৭৪)। ১৯৭১-পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু মুসলিম রাষ্ট্রগুলির সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন, সেটা ভারত তার স্বার্থবিরোধী হিসেবে দেখেছিল। কারণ বাংলাদেশের মানুষের ইসলামিক চেতনার উত্থানকে ভারত ভূরাজনৈতিক দিক থেকে তার জন্যে বিপজ্জনক হিসেবে দেখেছে। একারণেই এদেশে ভারতের লবি গ্রুপগুলি বঙ্গবন্ধুর মুসলিম দেশগুলির সাথে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টাকে প্রতিহত করার যারপরনাই চেষ্টা করেছে।


ইসলামিক চেতনার ভূরাজনীতি

বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের মাঝেই চীনের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে যেতে না পারলেও আরও কিছু কাজ করে গিয়েছেন, যা কিনা ভূরাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে আরও শক্তিশালী করেছিল। ১৯৭১ সালে ঠান্ডা যুদ্ধ চরমে। তখন কিছু মুসলিম দেশের সরকার আমেরিকাপন্থী, আর কিছু দেশের সরকার সোভিয়েতপন্থী। তবে সেসব দেশের মুসলিম জনগণ সর্বদাই ছিল শাসকদের থেকে বিচ্ছিন্ন। ইসলামের বিশ্বাসের চেতনার কারণেই মুসলিমদের মাঝে বিভেদকে তারা পছন্দ করেনি; এবং বিভাজনের রাজনীতিকে পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই দেখেছে। বঙ্গবন্ধু চীনে গিয়েও ইসলামকে খুঁজে পেয়েছেন; লিখেছেন, “চীনে কনফুসিয়ান ধর্মের লোকেরা সংখ্যায় বেশি। তারপর বৌদ্ধ, মুসলমানের সংখ্যাও কম না, কিছু খ্রিস্টানও আছে। একটা মসজিদে গিয়েছিলাম, তারা বললেন, ধর্ম কর্মে বাধা দেয় না এবং সাহায্যও করে না”। [2] কিন্তু মাওলানা ভাসানীর সাথে যে মানুষটা জেলের ভেতরে জামাতে নামাজ পড়তো এবং নিয়মিত কুরআন পাঠ করতো [2], তাকে কেন ইসলাম-বিদ্বেষী তকমা নিতে হয়েছে?

১৯৭১-পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু মুসলিম রাষ্ট্রগুলির সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন, সেটা ভারত তার স্বার্থবিরোধী হিসেবে দেখেছিল। কারণ বাংলাদেশের মানুষের ইসলামিক চেতনার উত্থানকে ভারত ভূরাজনৈতিক দিক থেকে তার জন্যে বিপজ্জনক হিসেবে দেখেছে। একারণেই এদেশে ভারতের লবি গ্রুপগুলি বঙ্গবন্ধুর মুসলিম দেশগুলির সাথে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টাকে প্রতিহত করার যারপরনাই চেষ্টা করেছে। মুসলিম রাষ্ট্রগুলি একইসাথে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পিছনে কাজ করেছে। লাহোরে ইসলামিক সামিট কনফারেন্সে বাংলাদেশকে যুক্ত করতে ইন্দোনেশিয়া অনেক চেষ্টা করেছে। [3] ১৯৭৪-এর ফেব্রুয়ারী মাসে বাংলাদেশ সফরে আসেন মিশরের উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং সৌদি সরকারের একজন প্রতিনিধি। কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ জাবের আল-আহমেদ আল-সাবাহ-ও ঢাকা সফরে আসেন আলজেরিয়া, লেবানন, সেনেগাল, সোমালিয়া এবং প্যালেস্টাইনের প্রতিনিধিদের সাথে নিয়ে। এখানে যুক্তরাষ্ট্র কলকাঠি নাড়লেও মুসলিম ভাইদের একে অপরের সাথে মিলিত হবার বাসনা কখনোই দমে যায়নি। যেকারণে প্যালেস্টাইন, সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়ার নির্যাতিত মানুষের সাথে এদেশের মানুষ সর্বদাই সুর মিলিয়েছে।

ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে ভারতের ভয় ছিল যেকারণে

বঙ্গবন্ধুর আরও একটা দিক অনেকেই হিসেব করেনা, তা হলো, তার সন্মোহনী ক্ষমতা। আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের কংগ্রেস পার্টির দহরম মহরম ছিল বেশি। আর ভারতে চার দশকের বেশি সময় কংগ্রেস পার্টি ক্ষমতায় থাকায় আওয়ামী লীগকে তথা বঙ্গবন্ধুকে ভারত-ঘেঁষা তকমাই নিতে হয়েছে। অথচ সকলেই ভুলে যায় যে মহত্মা গান্ধীর খুনের পেছনে কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের সরাসরি ইন্ধন ছিল।[4] অর্থাৎ কংগ্রেসের মাঝে বিভিন্ন গ্রুপ ছিল। এই গ্রুপগুলি সবসময়ই হিসেব কষেছে কংগ্রেসের সামনের দিনগুলিতে নেতৃত্ব কে দেবে। ইন্দিরা গান্ধীর পর কংগ্রেসে যে তেমন কোন বড় নেতৃত্ব আসবে না, সেটা মোটামুটি বুঝে গিয়েছিল অনেকেই। আর বাংলাদেশের সাথে ভারতের, বিশেষতঃ পশ্চিমবঙ্গের বাঙ্গালীদের সুসম্পর্কের কারণে ঐ গ্রুপগুলি বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের, বিশেষ করে শেখ পরিবারের দিকে দৃষ্টি রেখেছিল সবসময়। তারা শেখ মুজিবের ব্যক্তিত্বকে আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে দেখেছে। ১৯৭০-এর নির্বাচনের পরে বঙ্গবন্ধু যখন পুরো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছিলেন, তখন ভারতের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছিল! পাকিস্তানে বাঙ্গালী (অবশ্যই মুসলিম) প্রধানমন্ত্রী? তা-ও আবার শেখ মুজিবুর রহমান? পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বাঙ্গালী হলে ভারতের বাঙ্গালীদের কি হবে? ভারতের মুসলিমদেরই বা কি হবে? সেই গ্রুপগুলি শেখ মুজিবের মাঝে ভারতের অস্তিত্ব বিপন্ন হবার ভয় দেখেছিল। তারা জানতো যে পশ্চিম পাকিস্তানে এমন কোন নেতা নেই যে কিনা ভারতের জনগণের বড় একটা অংশের সমর্থন আদায় করতে পারবে; কিন্তু বঙ্গবন্ধুর বেলায় ব্যাপারটা কিন্তু তা ছিল না। ১৯৪৭ সালে কোলকাতা পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ায় বঙ্গবন্ধু কতটা ব্যাথিত হয়েছিলেন [2], সেটা দেখলেই বোঝা যায় যে বঙ্গবন্ধুর মানুষের প্রতি ভালোবাসা র‍্যাডক্লিফ-মাউন্টব্যাটেনের কৃত্রিম সীমানা ছাপিয়ে গিয়েছিল। ১৯৪৬ সালের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সময় আল্লাহাবাদে বঙ্গবন্ধু মুসলিমদের রক্ষায় যে ভূমিকা [2] রেখেছিলেন, সেটা ঐ গ্রুপগুলি জানতো। তারা বঙ্গবন্ধুর মাঝে পুরো ভারতের মুসলিমদের নেতৃত্ব দেবার সক্ষমতা দেখতে পেয়েছিল। বাংলার সুলতানদের ইতিহাস তারা ভোলেনি; তাই বঙ্গবন্ধুকেও তারা শত্রু হিসেবেই দেখেছে।
 
জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে বঙ্গবন্ধু (১৯৭৪)। বাংলাদেশে ভারতপন্থীরা আল্ট্রা-সেকুলাররা এবং পাকিস্তানের জামাত-ই-ইসলামী একইসাথে বঙ্গবন্ধুর লাহোর গমনের বিরোধিতা করেছে এবং বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কোন্নয়নে বাধা দিয়েছে। বলাই বাহুল্য যে এরা দু’পক্ষই ভারতের স্বার্থ রক্ষা করেছে। ভারতকে টিকিয়ে রাখার পরাশক্তির এই চেষ্টাকে এখনও জিইয়ে রেখে চলেছে জামাত-ই-ইসলামী। উপমহাদেশে মুসলিম উত্থান ঠেকাবার পরাশক্তির শেষ সম্বল এরা।


বঙ্গবন্ধুর পাকিস্তান রাজনীতির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ভারতকে যেভাবে ব্যালান্স করেছিলেন, সেটা দিল্লীতে অনেকেই গিলতে পারেননি। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর বাংলাদেশ সরকারের সাথে ভারত ভালো সম্পর্কই রেখেছিল। ১৯৭৫ অগাস্ট-পরবর্তী সরকারের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশে তার অবস্থানকে পাকাপোক্ত রাখতে চেয়েছিল। পরবর্তী সামরিক অভ্যুত্থানগুলিতে থেকেও ভারতকে আলাদা করা যাবে না। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারীতে বঙ্গবন্ধুর লাহোর গমন করেন, যা পাকিস্তানে অনেকেই অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখছিলেন। সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিরোধিতা করেছিল পাকিস্তানের ‘জামাত-ই-ইসলামী’ এবং ‘তেহরিক-ই-ইস্তিকলাল’। বিরোধীদলীয় পত্রিকা ‘নাওয়াই-ই-ওয়াক্ত’ একই সুরে কথা বলেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশে ভারতপন্থীরা আল্ট্রা-সেকুলাররা এবং পাকিস্তানের জামাত-ই-ইসলামী একইসাথে বঙ্গবন্ধুর লাহোর গমনের বিরোধিতা করেছে এবং বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কোন্নয়নে বাধা দিয়েছে। বলাই বাহুল্য যে এরা দু’পক্ষই ভারতের স্বার্থ রক্ষা করেছে। ভারতকে টিকিয়ে রাখার পরাশক্তির এই চেষ্টাকে এখনও জিইয়ে রেখে চলেছে জামাত-ই-ইসলামী। উপমহাদেশে মুসলিম উত্থান ঠেকাবার পরাশক্তির শেষ সম্বল এরা।

বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন যে একটা নতুন রাষ্ট্রকে দাঁড় করাতে হলে প্রচন্ড পরিশ্রমের গত্যন্তর নেই, কিন্তু একইসাথে ভারতের পেটে ঢুকে গেলে সকল চেষ্টাই ব্যর্থ হবে। এই লক্ষ্যেই তিনি ভারতকে সর্বদা ব্যালান্স করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রকে তিনি পছন্দ করতেন না এবং জানতেন যে সকলকিছুর মূলেই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কলকাঠি; তারপরেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক রেখেছিলেন ভারত আর সোভিয়েত ইউনিয়নকে ব্যালান্স করার জন্যে। তবে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কোন্নয়নকে ভারত একেবারেই মেনে নিতে পারেনি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মের পিছনে ভারতের ইন্ধন দেবার মূল আগ্রহটা ছিল পাকিস্তানকে ভেঙ্গে ফেলার সুযোগের কারণে। সেখানে ভারতের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলি গুরুত্বপূর্ণ হলেও পাকিস্তানকে ভেঙ্গে ফেলার সুযোগ না আসলে ভারত হয়তো অতটা ঝুঁকি নিতো না, যতটা তারা নিয়েছিল।

পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ আলাদা হবার ফলে ভারত যে স্বস্তি পেয়েছিল, সেটারই উল্টোটা তৈরি হয় যখন বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন শুরু করেন। বস্তুতঃ ১৯৭৪ সালেই ভারত বুঝে যায় যে বঙ্গবন্ধু ভারতের জন্যে হুমকি হতে চলেছেন। এসময়েই ভারতের ঐ গ্রুপগুলি শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে ওঠে।


 
পারমাণবিক অস্ত্র ছাড়াও পাকিস্তান তৈরি করছে (অনেক ক্ষেত্রেই চীনের সহায়তায়) নিজস্ব ফাইটার বিমান JF-17, ট্রেইনার বিমান Super Mushshak, ট্যাঙ্ক Al-Khalid, ব্যালিস্টিক মিসাইল, ক্রুজ মিসাইল, ইত্যাদি। পাকিস্তান তার এই সক্ষমতা তৈরিতে বাংলাদেশের অবদানকে অস্বীকার করতে পারে না কোনভাবেই। একুশ শতকে এসে বাংলাদেশের উচিত তার হিস্যা দাবি করা। এই হিস্যা হওয়া উচিত সেই দিকগুলিতে, যেখানে পাকিস্তান বাংলাদেশের চাইতে ভালো করেছে - যেমন সামরিক ইন্ডাস্ট্রিতে।


একুশ শতকে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির উদাহরণ

বাংলাদেশের ভূরাজনীতি এখন সেই স্থানেই এসেছে, যেখানে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কর্মকান্ডগুলি খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। বঙ্গোপসাগরে একটা শক্তিশালী রাষ্ট্রের উত্থান ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত যখন একযোগে কাজ করছে, তখন বাংলাদেশের একটা শক্ত ভূরাজনৈতিক অবস্থান জরুরি হয়ে পড়েছে। চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ; একইসাথে মুসলিম বিশ্বের সাথেও বাংলাদেশের সম্পর্ক গভীর হওয়াটা জরুরি। এমতাবস্থায় পরাশক্তি এবং তার দোসর ভারতের ইন্ধনপ্রাপ্তদের সাথে সুর মিলিয়ে ভারতের স্বার্থ বাস্তবায়নের দিন শেষ। ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের সাথে বঙ্গবন্ধুর দরকষাকষির মূলে ছিল পাকিস্তানের সম্পদের ন্যায্য হিস্যা। বঙ্গবন্ধু জনসংখ্যার অনুপাতে বাংলাদেশের জন্যে পাকিস্তানের ৫৬% সম্পদ চেয়েছিলেন। পাকিস্তানের উন্নয়নে বাংলাদেশের বিরাট ভূমিকা রয়েছে, যা কিনা পরাশক্তির ইন্ধনপুষ্ট পাকিস্তানের নেতৃত্ব বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে। এভাবে পাকিস্তানের উন্নয়নে বাংলাদেশের মানুষের যে হক রয়েছে, তা আদায় করা হয়নি কখনোই। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এখন পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু পাকিস্তান এমন একটা জিনিস পেরেছে, যা বাংলাদেশ পারেনি ৪৬ বছরে – সামরিক সক্ষমতা। পাকিস্তানের সাথে থাকার সময়ে পূর্ব বাংলার মানুষের যে দাবিগুলি ছিল, তার মাঝে একটা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন। পাকিস্তানের পশ্চিমাপুষ্ট নেতৃত্ব পূর্ব বাংলার মানুষকে সর্বদাই ঠকিয়েছে; প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রেও তা-ই। বিভাজনের পরে বাংলাদেশ সামরিক দিক থেকে উন্নতি করতে না পারলেও পাকিস্তান প্রভূত উন্নতি করেছে সামরিক ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলার দিক থেকে। পারমাণবিক অস্ত্র ছাড়াও পাকিস্তান তৈরি করছে (অনেক ক্ষেত্রেই চীনের সহায়তায়) নিজস্ব ফাইটার বিমান JF-17, ট্রেইনার বিমান Super Mushshak, ট্যাঙ্ক Al-Khalid, ব্যালিস্টিক মিসাইল, ক্রুজ মিসাইল, ইত্যাদি। পাকিস্তান তার এই সক্ষমতা তৈরিতে বাংলাদেশের অবদানকে অস্বীকার করতে পারে না কোনভাবেই। একুশ শতকে এসে বাংলাদেশের উচিত তার হিস্যা দাবি করা। এই হিস্যা হওয়া উচিত সেই দিকগুলিতে, যেখানে পাকিস্তান বাংলাদেশের চাইতে ভালো করেছে। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে দেয়নি; তাই বলে বাংলাদেশের জনগণ কি সেটা ভুলে গেছে? মার্কিনপন্থী জামাত-ই-ইসলামীর এবং ভারতপন্থী আল্ট্রা-সেকুলারদের বঙ্গবন্ধুকে “ভারতের দালাল” হিসেবে প্রচার করার মাঝে বঙ্গবন্ধুর সেই প্রধানমন্ত্রীত্বের দাবি কি ঢাকা পড়ে যায়? নাকি তাঁর ভারতের বাঙ্গালীদের বিপ্লবী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হবার সম্ভাবনাকে ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’র চেষ্টা করে? অথবা তাঁর পুরো পাকিস্তান ছাড়াও ভারতের কোটি কোটি নির্যাতিত মুসলিমদের অবিসংবাদিত নেতা হবার মতো মহাবিপদ থেকে ভারতকে রক্ষা করে? নাকি ভারতের সাড়ে পাঁচশ’ বছরের মুসলিম শাসনের কথা মনে করিয়ে দেয়?

পৃথিবীর একমাত্র পারমাণবিক বোমা হামলা হয়েছে জাপানের উপরে; যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা। লাখো মানুষের করুণ মৃত্যু ঘটেছে এতে। ১৯৪৫-পরবর্তী সময়ে জাপান যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা নিতে বাধ্য ছিল। তবে একুশ শতকে এসে যখন জাপানের সামরিক শক্তির পুণরুত্থান দেখা যাচ্ছে, তখন অস্বীকার করার উপায় নেই যে জাপান তার এই সামরিক সক্ষমতা তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সামরিক প্রযুক্তি নিয়েই। জাপান এখন সামরিক ইন্ডাস্ট্রির ‘পাওয়ারহাউজ’। বাংলাদেশকেও জাপানকে অনুসরণ করতে হবে সামরিক প্রযুক্তি এগিয়ে নিতে। পাকিস্তানের কাছ থেকে সামরিক প্রযুক্তি আমদানি একদিকে যেমন ভারতকে ব্যালান্স করার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ, একইসাথে বাংলাদেশের মানুষের হক আদায়ের জন্যে জরুরি। জামাত-ই-ইসলামীর মত পরাশক্তির দালালেরা চাইবেই বিভাজনের রাজনীতি বহাল থাকুক। কিন্তু তাই বলে এই অঞ্চলের মুসলিমদের হক আদায় হবে না – এটা তো হতে পারে না।

------------------------

[1] ‘আঞ্চলিক যোগাযোগের ভূরাজনীতি – হিমালয়ে ভারত-চীন দ্বন্দ্ব’, সাম্প্রতিক দেশকাল, ১০ অগাস্ট ২০১৭

[2] ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ – শেখ মুজিবুর রহমান

[3] ‘The Bangladesh Military Coup and the CIA Link’ – B. Z. Khasru

[4] ‘ভারত স্বাধীন হল’ – মৌলানা আবুল কালাম আজাদ

Sunday, 30 July 2017

যুদ্ধজাহাজের সংজ্ঞা কি? (পর্ব ৩ - মাঝসমুদ্রে বিমান)

৩০শে জুলাই ২০১৭

ফরাসী নৌবাহিনীর সীপ্লেন টেন্ডার Foudre থেকে ক্রেনের সাহায্যে বিমান পানিতে নামানো হচ্ছে। সীপ্লেন সমুদ্রে যুদ্ধজাহাজের ক্যাপ্টেনের জন্যে আকাশে ওড়া চক্ষুর কাজ করে। এছাড়াও শত্রু জাহাজ এবং সাবমেরিনের উপরে হামলা করে বিমানগুলি যুদ্ধজাহাজের সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি করেছিল। 


সী-প্লেন থেকে শুরু…

প্রথমবার আকাছে ওড়ার পর থেকেই গবেষণা শুরু হয়ে যায় যে পানি থেকে কি করে বিমান উড্ডয়ন করা সম্ভব। সেসময় বিমানের উড্ডয়ন এবং অবতরণের জন্যে আলাদা সমতল ভূমির দরকারের প্রেক্ষিতেই এই চিন্তা শুরু হয়। আর পৃথিবীর উপরের বেশিরভাগটাই যেখানে পানি, সেখানে পানিতে বিমান ওঠানামা করাবার চেষ্টাটা স্বাভাবিকই বটে। ১৯১০ সালে সাফল্যের সাথে পানি থেকে বিমান উড্ডয়ের পদ্ধতি আবিষ্কারের পরে শুরু হয়ে যায় সমুদ্রে জাহাজ থেকে কি করে বিমান উড্ডয়ন করানো যায়, সেটা নিয়ে গবেষণা। ফরাসীরা এগিয়ে থাকে এক্ষেত্রে, কারণ তারাই “সী-প্লেন"-এর চিন্তাটাকে প্রথম বাস্তবায়িত করেছিল। ১৯১০ সালের এপ্রিলে ফরাসী নৌমন্ত্রী ভাইস এডমিরাল Auguste Boué de Lapeyrère-এর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয় গবেষণার জন্যে যে নৌবাহিনীতে কিরে বেলুন এবং বিমানের ব্যবহার করা যায়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯১১ সালে ফরাসীরা Foudre নামের নৌবাহিনীর একটি টর্পেডো বোট টেন্ডারকে রূপান্তরিত করে সীপ্লেন টেন্ডার বানিয়ে নেয়। এর আগে জাহাজটির কাজ ছিল তার ডেকের উপরে ছোট টর্পেডো বোট বহণ করে সমুদ্রে নিয়ে যায় এবং গভীর সমুদ্রে টর্পেডো বোটের মতো ছোট বোটের অপারেশন সম্ভব করা। রূপান্তরের ফলে টর্পেডো বোটের সাপোর্ট জাহাজ থেকে এটা হয়ে যায় সীপ্লেনের সাপোর্ট জাহাজ। জাহাজটি ৪টা সীপ্লেন বহণ করতে পারতো। প্লেনগুলি ক্রেনের সাহায্যে পানিতে নামানো হতো। এরপর সীপ্লেন পানি থেকে উড্ডয়ন করতো। ল্যান্ডিং হতো পানিতে, এবং ল্যান্ডিং-এর পরে আবারও ক্রেনের সাহায্যে প্লেনটাকে জাহাজে তুলে নেয়া হতো। ১৯১৩ সালে জাহাজের ডেকের উপর থেকেই সীপ্লেনের উড্ডয়নের ব্যবস্থা করা হয়। Foudre-এর মতো জাহাজ অন্যন্য দেশও তৈরি করতে থাকে। মূলতঃ পুরনো কোন জাহাজকে রূপান্তর করেই এই ব্যবস্থা করা হয়। এগুলিকে বলা হতে থাকে “সীপ্লেন টেন্ডার”। জাহাজগুলিতে বিমানের জ্বালানি বহণ করা হয়, পাইলটদের থাকার কোয়ার্টার দেয়া হয়, বিভিন্ন রকমের মেইনটেন্যান্স এবং মেরামতের ব্যবস্থা করা হয়।
 
মার্কিন নৌবাহিনীর সীপ্লেন টেন্ডার USS Timbalier-এর পাশে ভাসমান অবস্থায় দেখা যাচ্ছে দু'টা ফ্লাইং বোটকে। এই জাহাজগুলি মহাসমুদ্রে বিমানের পাল্লা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল। ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান ভূমি থেকে ওঠানামা শুরু করার পর থেকে সমুদ্রে জাহাজের সহায়তায় বিমানের পাল্লা বাড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।

সীপ্লেন টেন্ডার…

সীপ্লেন বহণ করার ফলে নৌবাহিনীর জাহাজে কি পরিবর্তন এলো? ১৯১৪ সালেই শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এই যুদ্ধে ব্যাপক হারে বিমানের ব্যবহার শুরু হয়। নৌবাহিনীগুলিও পিছিয়ে থাকে না। আকাশ থেকে শত্রুর গতিবিধি লক্ষ্য করার গুরুত্ব বাড়তে থাকে। শত্রুর যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিনের গতিবিধি আকাশ থেকে লক্ষ্য করাটা একটা ট্যাকটিক্যাল এডভান্টেজে রূপ নেয়। আর বিশ্বযুদ্ধের মাঝেই বিমান যখন অস্ত্র বহণ করতে থাকে, তখন সমুদ্রেও সীপ্লেন হয়ে ওঠে আক্রমণকারী বিমান, বিশেষ করে সাবমেরিনের বিরুদ্ধে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এই প্রযুক্তিগুলির ব্যাপক উন্নতি হতে থাকে। সীপ্লেনের আকৃতি ছিল ছোট; এর পাল্লাও ছিল কম (১ হাজার থেকে ২ হাজার কিঃমিঃ)। কাজেই দূরপাল্লার (৩ হাজার থেকে ৭ হাজার কিঃমিঃ পাল্লার) বিমানের ব্যাপারটাও চলে এলো আলোচনায়। নিজের পেটের উপরে উড্ডয়ন-অবতরণ করা বড় এই বিমানগুলিকে “ফ্লাইং বোট” বলা হতে থাকে। এগুলি জাহাজের উপরে বহণ করার জন্যে অনেক বেশি বড়। তবে এই ফ্লাইং বোটগুলিকে সাপোর্ট দেয়ার জন্যেও তৈরি করা হতে থাকে সীপ্লেন টেন্ডার। বিমানগুলি উপকূল থেকে অপারেট করতো, তবে গভীর সমুদ্রে গিয়ে সীপ্লেন টেন্ডারের সাপোর্ট পেয়ে এর পাল্লা আরও বহুগুণে বেড়ে যেত। বিমানটা জাহাজের পাশে ভিড়ে তেল নিয়ে, ক্রু পরিবর্তন করে, অথবা কিছু মেইনটেন্যান্সের কাজ করে আবারও উড়ে যেত। এভাবে একটা বিমান প্রায় অনির্দিষ্টকালের জন্যে উপকূল থেকে হাজারো মাইল দূরে থাকতে পারতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে এধরনের ফ্লাইং বোটের ব্যবহার ব্যাপক আকারে বেড়ে যায়। শত্রুপক্ষের ফ্লীটের গতিবিধি অবলোকন করার লক্ষ্যে এই বিমানগুলি সর্বদা আকাশে থাকতো; আর সেগুলিকে সাপোর্ট দেয়া জন্যে সীপ্লেন টেন্ডারগুলিও এগিয়ে থাকতো। বিশ্বযুদ্ধের সময়ে মার্কিন, জাপানি, জার্মান এবং ব্রিটিশ অনেক ফ্লাইং বোট ব্যবহৃত হয়েছিল। ছোট সীপ্লেনও ব্যবহৃত হয়েছে অনেক। ছোট বিমানগুলি বহণ করা হতো ব্যাটলশিপ এবং ক্রুজারের উপরে – জাহাজের ক্যাপ্টেনকে আকাশ থেকে একটা চোখ দেবার জন্যে। শত্রুর সাবমেরিনের বিরুদ্ধেও এই বিমানগুলি আক্রমণ চালাতো। বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ততদিনে শক্তিশালী জাহাজ হয়ে গেছে। কিন্তু বিমান ওড়ার জন্যে তো জায়গা লাগে; সব জাহাজে তো জায়গা নেই। ব্যাটলশিপ বা ক্রুজারের উপরে নেবার মতো বিমান থাকেই ঐ সীপ্লেন। তবে জার্মানরা জাহাজের উপর থেকে বিমান অপারেশনকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জার্মান যুদ্ধজাহাজের ছোট্ট জায়গায় অবতরণ করছে হেলিকপ্টার Flettner Fl-282 Kolibri । জাহাজের উপরে সীপ্লেনের স্থান নিয়েছে হেলিকপ্টার। হেলিকপ্টারের সক্ষমতা কিছু জাহাজকে সক্ষম করেছে; বানিয়েছে যুদ্ধজাহাজ। 


সীপ্লেন থেকে হেলিকপ্টার…

১৯৪০ সালের আগ থেকেই জার্মান ইঞ্জিনিয়ার এন্টন ফ্লেটনার (Anton Flettner) হেলিকপ্টার নিয়ে গবেষণা চালিয়ে আসছিলেন। সেবছরের জুলাই মাসে ফ্লেটনার তৈরি করেন নতুন এক হেলিকপ্টার - Fl 282 Kolibri । জার্মান নৌবাহিনী এই হেলিকপ্টারের ডিজাইনে খুবই খুশি হয় এবং ১৫টা বিমান অর্ডার করে ফেলে (যার পরে তৈরি হবে আরও ৩০টা); এর মূল মিশন হয় সাবমেরিন খুঁজে বের করা। ভূমধ্যসাগরের পরিষ্কার পানিতে ১৩০ ফিট গভীর পানিতে থাকার পরেও সাবমেরিন দেখা যায় আকাশ থেকে! বিমানগুলির পাল্লা মাত্র ১৭০ কিঃমিঃ হলেও যেকোন স্থানে নামতে পারাটা ছিল বিরাট সুবিধা। বাজে আবহাওয়ায় অপারেশন চালাতে পারাটাও ছিল এই বিমানের একটা বিরাট গুণ। জার্মান নৌবাহিনীর বেশিরভাগ জাহাজই ছিল ছোট। সেসব ছোট জাহাজে নামার মতো কোন বিমান তখনও তৈরি হয়নি। জাহাজের উপরে মাত্র ৫ মিটার X ৫ মিটার আকারের স্থানে এই হেলিকপ্টার ওঠা-নামা করতে পারতো। মিত্রবাহিনীর বোমা হামলায় ফ্লেটনার এবং বিএমডব্লিউ-এর ফ্যাক্টরি গুড়িয়ে গেলে যুদ্ধ শেষ হবার আগে ব্যাপক হারে এই হেলিকপ্টার তৈরি করা যায়নি। তবে জার্মানরাই জাহাজের উপর থেকে হেলিকপ্টার অপারেশনের পথ দেখিয়ে দেয়। বিশ্বযুদ্ধ থেকে মাত্র ৩টা ফ্লেটনার হেলিকপ্টার বেঁচে থাকে, যার একটা যায় মার্কিনীদের হাতে; একটা ব্রিটিশদের হাতে, আর আরেকটা সোভিয়েতদের হাতে। জার্মানদের অন্য সকল প্রযুক্তির মতো হেলিকপ্টারের প্রযুক্তিটাও মিত্রবাহিনী ভাগ করে নেয়। যুদ্ধের পর বিজয়ী শক্তিরা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজেদের সামরিক উন্নতি ঘটায়। আজ পৃথিবীর এতো জাহাজে হেলিকপ্টার ওঠানামা করলেও এটা যে এন্টন ফ্লেটনারের ডেভেলপ করা যুদ্ধপ্রযুক্তি ছিল, সেটা আজ কেউ মনে করে না।

মার্কিন ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান Lockheed P-3 Orion । বিমানটি যথেষ্ট সক্ষম হলেও আগের ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান থেকে সবচাইতে আলাদা ব্যাপারটা ছিল যে এটা ভূমি থেকে ওঠানামা করে। এই বিমানের ডিজাইনের সাথে সাথে সমুদ্রের জাহাজের পাশে ভিড়তে পারার গুরুত্বকে মার্কিনীরা বাতিল ঘোষণা করেছে। 


সমুদ্র থেকে ভূমিতে…

তবে উপরের আলোচনায় এটা পরিষ্কার যে সীপ্লেনের ডেভেলপমেন্ট থেকেই হেলিকপ্টারের দিকে গিয়েছে প্রযুক্তি। আকাশ থেকে শত্রুর গতিবিধি লক্ষ্য করাই ছিল এখানে প্রধানতম লক্ষ্য। একসময় এটা করেছে সীপ্লেন; এখন করছে হেলিকপ্টার। আর এই বাইরে রয়েছে দূরপাল্লার ফ্লাইং বোট, যা কিনা ছোট সীপ্লেনের পাল্লার বাইরে শত্রুর গতিবিধি লক্ষ্য করতে পারে। বিশ্বযুদ্ধের পরে কথা এলো যে সারা বিশ্বে বহু এয়ারপোর্ট তৈরি হয়ে গিয়েছে বিশ্বযুদ্ধের সময়ে; এখন তো আর বিমানের ওঠানামার স্থানের অভাব নেই। কাজেই এখন তো সীপ্লেন বা ফ্লাইং বোটের প্রয়োজন তেমন একটা নেই। ভূমি থেকেই ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান ওঠানামা করতে শুরু করলো। মার্কিনীরা ডেভেলপ করলো Lockheed P-3 Orion ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান, যা কিনা বেশিরভাগ ফ্লাইং বোটকে সরিয়ে ফেললো। কাজেই সীপ্লেন টেন্ডারের দরকার রইলো না। এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিনীদের দুনিয়ার কোথাও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারে বাধা রইলো না। তাই পৃথিবীর সকল স্থানেই তারা পেয়ে গেল ভূমি, যেখান থেকে তারা P-3 Orion ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান অপারেট করতে পারলো। আরও একটা ব্যাপার হলো, বিশ্বযুদ্ধের পর কোন বড় ম্যারিটাইম শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না থাকা। সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রচুর সাবমেরিন তৈরি করলেও পৃথিবীর সকল মহাসমুদ্রে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে সাগর নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা তারা করেনি, যা কিনা কোন ম্যারিটাইম শক্তি করতে চাইতো। তাই P-3 Orion ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমানের ৩,০০০ কিঃমিঃ পাল্লা সোভিয়েত সাবমেরিনের জন্যে ছিল যথেষ্ট। অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জাপান চেয়েছিল পুরো প্রশান্ত মহাসাগরের বিশাল জলরাশিকে নিয়ন্ত্রণ করতে। সেই মহাসাগরের ছোট ছোট দ্বীপগুলি একেকটি থেকে হাজারো মাইল দূরে। তাই জাপানের বিমান এবং নৌবাহিনীর যেকোন বিমানের পাল্লা ছিল বিশাল। ফ্লাইং বোটগুলির পাল্লা ছিল ৬,৫০০ থেকে ৭,০০০ কিঃমিঃ। ছোট সীপ্লেনগুলির পাল্লাও ছিল ২,০০০ কিঃমিঃ-এর মতো।

ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জাহাজ RFA Argu-কে কেউ কেউ যুদ্ধজাহাজই বলতে যেন চান না। জাহাজটাকে কেউ কেউ "হসপিটাল শিপ" বলতেও চাইছেন। কিন্তু জাহাজটা যখন তার ডেকের উপরে এপাচি হেলিকপ্টার বহণ করে, তখন জাহাজটা তার সত্যিকারের সক্ষমতার পরিচয় দেয়। হেলিকপ্টারগুলির সক্ষমতাই এই জাহাজের সক্ষমতা। 


বর্তমান যুগের সীপ্লেন টেন্ডার...

যে জাহাজগুলি ফ্লাইং বোট বা সীপ্লেনগুলিকে সাপোর্ট দিয়ে হাজারো মাইলের সমুদ্রকে নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করেছে, সেগুলিকে কি ধরনের জাহাজ বলা যাবে? সামরিক কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় সেগুলি নিঃসন্দেহে সামরিক জাহাজ। যেহেতু যুদ্ধের জন্যে তৈরি করা সামরিক বিমানের সক্ষমতাকে এই জাহাজ বাড়িয়ে দিচ্ছে, তাই এগুলিকেও যুদ্ধজাহাজই বলতে হবে; এদের ডেকের উপরে তেমন কোন অস্ত্র না থাকলেও। খুব স্বাভাবিকভাবেই বলা যায় যে, যে ছয়টি বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ১৯৪১ সালে পার্ল হারবারে হামলা করেছিল, সেগুলির শক্তি কেন্দ্রীভূত ছিল বহনকৃত যুদ্ধবিমানগুলিতে; ডেকের উপরের কামানগুলিতে নয়। প্রকৃতপক্ষে এই জাহাজগুলিতে কতগুলি কামান ছিল, তার ব্যাপারে খুব আগ্রহই ছিল মানুষের। অর্থাৎ বিমানের শক্তিতেই শক্তিশালী হয়েছে বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ। ঠিক একইভাবে ফ্লাইং বোট এবং সীপ্লেনের শক্তিতে শক্তিশালী হয়েছে সীপ্লেন টেন্ডারগুলি। আর তাহলে এই সীপ্লেন টেন্ডারের মডার্ন যুগের উদাহরণ কোনগুলি? উপরের আলোচনায় উঠে এসেছে যে সীপ্লেনের স্থান নিয়েছে হেলিকপ্টার। শত্রুর ফ্লিটকে খুঁজে বের করতে সহায়তা করা, জাহাজের অস্ত্রকে টার্গেট খোঁজায় সহায়তা, সাবমেরিন খুঁজে ধ্বংস করা, সমুদ্রে উদ্ধার অভিযান চালানো, উপকূলের সাথে যোগাযোগ স্থাপন, এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে মালামাল আনা-নেওয়া, ইত্যাদি মিশনে হেলিকপ্টার স্থান নিয়েছে সীপ্লেনের। বহু জাহাজ হেলিকপ্টার বহণ করে নিজের সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। আবার কিছু জাহাজ বহণ করেছে বেশ কয়েকটি হেলিকপ্টার – একেকটা একেক ধরনের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। এই জাহাজগুলিই মডার্ন যুগে সীপ্লেন টেন্ডারের কাজ করছে – সীপ্লেনের স্থানে হেলিকপ্টারের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে।

অর্থাৎ আজকের যুগে অন্য কোন অস্ত্র বহণ না করেই যে জাহাজ হেলিকপ্টার বহণ করছে, সে আসলে হয়ে যাচ্ছে যুদ্ধজাহাজ। হেলিকপ্টারের মাধ্যমে আরেক জাহাজের উপরে সৈন্য নামিয়ে সেই জাহাজ দখল করে নেয়া হচ্ছে। সোমালিয়ার উপকূলে মালয়েশিয়ার একটি জাহাজ থেকে হেলিকপ্টার দিয়ে সেই কাজটাই করা হয়েছে। হেলিকপ্টার থেকে ডেপথ চার্জ বা টর্পেডো ফেলে সাবমেরিন ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। হেলিকপ্টার থেকে মিসাইল ছুঁড়ে শ্ত্রুর জাহাজও ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড যুদ্ধে এবং ১৯৯১ সালের ইরাক যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জাহাজে বহনকৃত হেলিকপ্টারগুলি বেশ কিছু ছোট জাহাজকে ধ্বংস করেছে, ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, বা ডূবিয়ে দিয়েছে। আর এছাড়া ফ্লীটের চক্ষু হিসেবে তো হেলিকপ্টারই কাজ করেছে। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর ছোট বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজগুলিতে বিশেষ ধরনের রাডার বহনকারী হেলিকপ্টারও ছিল, যা বহু দূর থেকে শত্রুর আগমণের খবর দিতে পারতো। তবে কিছু জাহাজ তেমন একটা বড় নাম না করলেও সমুদ্রের মাঝে হেলিকপ্টারের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর RFA Argus এর সবচাইতে চমৎকার উদাহরণ। এই জাহাজটি ছিল একটি কনটেইনার জাহাজ। ১৯৮১ সালে তৈরি করা এই জাহাজটি ব্রিটিশ সরকার কিনে নেয় এবং ১৯৮৮ সালে সামরিক জাহাজে রূপান্তর করে। ডেকের উপরে খালি জায়গায় বেশ কয়েকটি হেলিকপ্টার বহণ করা ছাড়াও এর ডেকের নিচে হ্যাঙ্গারও রয়েছে। জাহাজটি যাতে সামনের দিনে এপাচি এটাক হেলিকপ্টার বহণ করতে পারে, সেই ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। অর্থাৎ হেলিকপ্টারের শক্তিতে এর শক্তি বাড়ছে।

ব্রিটিশ নৌবাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে ছোঁড়া হচ্ছে জাহাজ-ধ্বংসী 'সী স্কুয়া' মিসাইল। ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড যুদ্ধে এবং ১৯৯১ সালের ইরাক যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জাহাজে বহনকৃত হেলিকপ্টারগুলি বেশ কিছু ছোট জাহাজকে ধ্বংস করেছিল, ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল, বা ডূবিয়ে দিয়েছিল। হেলিকপ্টার একটা সাধারণ জাহাজকে যুদ্ধজাহাজের মর্যাদা দিতে পারে।


হেলিকপ্টারের কারণে যুদ্ধজাহাজ......

সীপ্লেন বা হেলিকপ্টার যা-ই বলা হোক না কেন, এগুলিকে সহায়তাকারী জাহাজগুলি এদের পাল্লাকে অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত করেছে। একটা হেলিকপ্টার বড়জোড় কয়েক’শ কিঃমিঃ উড়তে পারে। কিন্তু একটা জাহাজে উঠে গেলে এটি হাজারো মাইল পাড়ি দিতে পারছে। জাহাজগুলি কাজ করছে হেলিকপ্টারের পা হিসেবে! ফ্লাইং বোট না থাকায় ভূমি থেকে অপারেট করা বিমানগুলিই ম্যারিটাইম প্যাট্রোলের কাজ করছে। এক্ষেত্রে সহায়তাকারী জাহাজের মাধ্যমে এর পাল্লা বাড়ানো যাচ্ছে না; কারণ এই বিমানগুলি তো পানিতে নেমে জাহাজের পাশে ভিড়তে পারছে না।

সীপ্লেন, ফ্লাইং বোট এবং হেলিকপ্টারের নিজস্ব ক্ষমতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। আর সেই সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়েছে এর সহায়তাকারী জাহাজগুলি। এই জাহাজগুলি কোন অস্ত্র বহণ না করলেও সীপ্লেন এবং হেলিকপ্টারের সামরিক সক্ষমতায় এদের সক্ষমতা বেড়েছে। সীপ্লেন এবং হেলিকপ্টারের যুদ্ধক্ষমতা এই জাহাজগুলিকে দিয়েছে যুদ্ধক্ষমতা। অর্থাৎ আপাতঃদৃষ্টিতে কোন অস্ত্র বহণ না করলেও সীপ্লেন বা হেলিকপ্টার বহণ করে এই জাহাজগুলি প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধজাহাজে পরিণত হয়েছে! এভাবে একটা পরিবহণ জাহাজকে হেলিকপ্টার বহণের জন্যে উপযুক্ত করে সেটিকে যুদ্ধজাহাজ বানিয়ে ফেলা হয়েছে। এরকম জাহাজগুলিকে যুদ্ধজাহাজ বলতে যাদের মনে শংকা জাগবে, তারা খুব সম্ভবতঃ যুদ্ধজাহাজের পশ্চিমাদের সংজ্ঞা মুখস্থ করতেই বেশি পারঙ্গম। সামনের দিনগুলিতে ঘটতে যাওয়া অনেক কিছুই তারা ঠাহর করে উঠতে ব্যর্থ হবেন।

Sunday, 16 July 2017

যুদ্ধজাহাজের সংজ্ঞা কি? (পর্ব ২ - স্থলযুদ্ধের অস্ত্র জলযুদ্ধে)

১৭ই জুলাই ২০১৭


Image result for israeli ballistic missile ship test cargo
২০১৭-এর জুন মাসে ইস্রাইল সমুদ্রে একটা কনটেইনার জাহাজের ডেক থেকে সফলভাবে একটা ব্যালিস্টিক মিসাইল উৎক্ষেপণ করে। ইস্রাইলের পরীক্ষায় দেখা গেছে যে মিসাইলটি আসলে ফায়ার করা হয়েছে একটি মোবাইল মিসাইল-ক্যারিয়ার বা মিসাইলের গাড়ি থেকে। গাড়িটাকে জাহাজে উঠিয়ে ডেকের সাথে শক্ত করে সেঁটে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ স্থলভাগে ব্যবহার করা একটা অস্ত্রকে সমুদ্রের জাহাজে সেঁটে দিয়ে জাহাজটাকে যুদ্ধজাহাজে রূপান্তর করে ফেলা হয়েছে।
ইস্রাইলের জাহাজের উপরে ব্যালিস্টিক মিসাইলের গাড়ি।


২০১৭-এর জুন মাসে ইস্রাইল সমুদ্রে একটা কনটেইনার জাহাজের ডেক থেকে সফলভাবে একটা ব্যালিস্টিক মিসাইল উৎক্ষেপণ করে। এর মাধ্যমে ইস্রাইল আবারও পুরোনো সেই চিন্তাকে সামনে এনে দিল – যেকোন জাহাজই আসলে যুদ্ধজাহাজ হতে পারে। ইস্রাইলের এই পরীক্ষামূলক কাজের দু’টি বিশ্লেষণ করা যায়। এক হলো, একটা কনটেইনার জাহাজে মিসাইল লুকিয়ে রাখা সম্ভব। এর অনেক আগে থেকেই রাশিয়ানরা কনটেইনার থেকে ফায়ার করার মতো মিসাইল ডেভেলপ করে চলেছে। তবে রুশদের ফোকাস ছিল মূলতঃ লুকিয়ে রাখা কনটেইনার থেকে ক্রুজ মিসাইল ফায়ার করার বিষয়ে। এই ক্রুজ মিসাইল যেকোন জাহাজে যেমন হামলা করতে পারে, তেমনি স্থলভাগেও আঘাত হানতে সক্ষম। তবে এটি ক্রুজ মিসাইল, অর্থাৎ এটি মূলতঃ একটা সুইসাইড বিমানের মতো উড়ে গিয়ে আঘাত করবে। তবে এক্ষেত্রে ব্যালিস্টিক মিসাইল অন্য এক ডিমেনশন দেয় এখানে। ইস্রাইলের পরীক্ষাটা এজন্যে গুরুত্বপূর্ণ। ক্রুজ মিসাইলের চাইতে ব্যালিস্টিক মিসাইলের কৌশলগত গুরুত্ব বেশি। দ্বিতীয় দিকটি হলো, ইস্রাইলের পরীক্ষায় দেখা গেছে যে মিসাইলটি আসলে ফায়ার করা হয়েছে একটি মোবাইল মিসাইল-ক্যারিয়ার বা মিসাইলের গাড়ি থেকে। গাড়িটাকে জাহাজে উঠিয়ে ডেকের সাথে শক্ত করে সেঁটে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ স্থলভাগে ব্যবহার করা একটা অস্ত্রকে সমুদ্রের জাহাজে সেঁটে দিয়ে জাহাজটাকে যুদ্ধজাহাজে রূপান্তর করে ফেলা হয়েছে। এক্ষেত্রে গাড়িটা কিন্তু তার মূল মিশন হারিয়ে ফেলেনি। অর্থাৎ গাড়িটাকে স্থলভাগে নামিয়ে দিলে সে আবারও তার মূল মিশন পালন করতে পারবে। অন্যভাবে দেখলে, এরকম একটা জাহাজের সক্ষমতা থাকছে ব্যালিস্টিক মিসাইল বহণ করে সমুদ্র থেকে ফায়ার করার। আবার এক বন্দর থেকে মিসাইল নিয়ে অন্য বন্দরে নামিয়ে দিয়ে মিসাইলের রেঞ্জ বহুগুণে বাড়িয়ে দেবার।



এই দ্বিতীয় ব্যাপারটা হাজার বছরের পুরোনো যুদ্ধকৌশলকে সামনে নিয়ে আসে। এই কৌশলটি হলো একটি জাহাজ যা বহণ করবে, তার সক্ষমতা সেই বহণকৃত জিনিসের সমান। একটা জাহাজে স্থায়ীভাবে অস্ত্র বসাবার চিন্তাটা কিন্তু খুব বেশি পুরোনো নয় – মাত্র কয়েক’শ বছরের। অন্যদিকে জাহাজ থেকে অস্ত্র স্থলভাগে নামিয়ে স্থলযুদ্ধে ব্যবহার করে সেগুলিকে আবারও জাহাজে উঠিয়ে নিয়ে অন্যত্র ব্যবহার করার ইতিহাস হাজার বছরের। এই হাজার বছরের ইতিহাস আজকে দেখতে পাওয়া যাবে উভচর যুদ্ধের জন্যে তৈরি করা জাহাজগুলিতে। এই জাহাজগুলি বিপুল পরিমাণ সৈন্য এবং রসদ পরিবহণ করে, যা স্থলভাগে নামিয়ে দিয়ে একটা বিরাট এলাকাকেই দখলে নিয়ে নেয়া যায়। একসময় এই ব্যাপারটা সকল যুদ্ধজাহাজের জন্যেই স্বাভাবিক ছিল; শুধু উভচর যুদ্ধের জন্যে আলাদাভাবে তৈরি জাহাজের জন্যে নয়। আসলে উভচর যুদ্ধের জন্যে আলাদা করে জাহাজ ডিজানই করা হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে। এর আগে জাহাজ উপকূলে ওঠালে কোর্ট মার্শাল করা হতো!

মিশরের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটা ভিডিওতে দেখানো হয় যে মিস্ত্রাল-ক্লাসের একটা জাহাজের ডেকে বসানো হয়েছে তিনটা ‘এভেঞ্জার’ শর্ট-রেঞ্জ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম। এভেঞ্জার হলো স্থল বাহিনীর জন্যে তৈরি একটা এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম, যা কিনা ‘হামভি’ গাড়ির উপরে বসানো হয়েছে। ঐ ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে যে এভেঞ্জার সিস্টেম একেবারে গাড়িসুদ্ধ জাহাজের ডেকে সেঁটে দেয়া হয়েছে! অর্থাৎ অন্যভাবে চিন্তা করলে বলা যায় যে এভাবে প্রায় যেকোন জাহাজেই এয়ার ডিফেন্স বসানো সম্ভব, যা করতে দুই মিনিট সময়ও লাগবে না! শুধু একটা মোবাইল এয়ার ডিফেন্স ইউনিট জাহাজে তুলে দিলেই হলো; ব্যাস, যুদ্ধজাহাজ তৈরি!
  

স্থলযুদ্ধের অস্ত্র জলযুদ্ধে



স্থলযুদ্ধের অস্ত্র জাহাজে পরিবহণ করে এবং সেগুলিকে সমুদ্রের মাঝে ব্যবহারের উপযোগী করে সেই পুরোনো যুদ্ধকৌশলকেই আবার সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে। আর একইসাথে গত এক’শ বছরে যুদ্ধজাহাজের যেসকল সংজ্ঞ্রা তৈরি করা হয়েছে, সেগুলি ধ্বসে যাচ্ছে। আরও একটা উদাহরণের দিকে দেখা যেতে পারে। মিশরের নৌবাহিনী ফ্রান্স থেকে দু’টি মিস্ত্রাল-ক্লাসের উভচর যুদ্ধের উপযোগী যুদ্ধজাহাজ কিনেছে, যা কিনা প্রথমতঃ রাশিয়ার জন্যে তৈরি করা হয়েছিল। কিছুদিন আগে মিশরের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটা ভিডিওতে দেখানো হয় যে মিস্ত্রাল-ক্লাসের একটা জাহাজের ডেকে বসানো হয়েছে তিনটা ‘এভেঞ্জার’ শর্ট-রেঞ্জ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম। এভেঞ্জার হলো স্থল বাহিনীর জন্যে তৈরি একটা এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম, যা কিনা ‘হামভি’ গাড়ির উপরে বসানো হয়েছে। ঐ ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে যে এভেঞ্জার সিস্টেম একেবারে গাড়িসুদ্ধ জাহাজের ডেকে সেঁটে দেয়া হয়েছে! অর্থাৎ অন্যভাবে চিন্তা করলে বলা যায় যে এভাবে প্রায় যেকোন জাহাজেই এয়ার ডিফেন্স বসানো সম্ভব, যা করতে দুই মিনিট সময়ও লাগবে না! শুধু একটা মোবাইল এয়ার ডিফেন্স ইউনিট জাহাজে তুলে দিলেই হলো; ব্যাস, যুদ্ধজাহাজ তৈরি!



স্থলযুদ্ধের জন্যে তৈরি করা ক্রুজ মিসাইল, ব্যালিস্টিক মিসাইল বা এয়ার ডিফেন্স মিসাইলের এরকম ব্যবহার যেকোন জাহাজকেই যুদ্ধজাহাজে রূপান্তর করতে সক্ষম; তাও আবার স্বল্প সময়ের মাঝেই; তেমন কোন প্রস্তুতি ছাড়াই। এরকম যুদ্ধজাহাজ সমুদ্রে যেমন দুর্ধর্ষ হয়ে উঠতে পারে, তেমনি তার অস্ত্রগুলি স্থলভাগে নামিয়ে দিয়ে স্থলযুদ্ধের হিসেবনিকেশও পরিবর্তন করে দিতে সক্ষম। একটা জাহাজ কতটুকু শক্তিশালী হবে, তা যেন নির্ভর করবে সেই জাহাজের ডেকের উপরে অস্ত্র বহণের সক্ষমতার উপর। অর্থাৎ যে জাহাজের ডেকের উপরে যত বেশি খোলা জায়গা থাকবে, সেই জাহাজের তত বেশি সক্ষমতা থাকবে সসস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণের। দু’দিন আগেও যে জাহাজটা ছিল কার্গো জাহাজ, দু’দিন পরে সেই জাহাজটাই হয়ে যাবে যুদ্ধজাহাজ। তবে এরকম ক্ষেত্রে নীতিগত বেশকিছু পরিবর্তন আসবে, যা কিনা গত কয়েক’শ বছরের নীতির গোড়ায় ধাক্কা দেবে। যেমন কোন জাহাজটা আসলে যুদ্ধজাহাজ আর কোনটা বেসামরিক জাহাজ? এই প্রশ্নের উদ্রেক এর আগে বহুবার হয়েছিল। যেহেতু জাহাজের শক্তির মাপকাঠিই ছিল সেই জাহাজ কত সৈন্য বা অস্ত্র বহণ করে, সেক্ষেত্রে সেই অস্ত্র বহণ না করলে ঐ জাহাজকে তো যুদ্ধজাহাজই বলা কঠিন হয়ে যাচ্ছে! এখন ব্যাপারটা আরও জটিল আকার ধারণ করে যদি যুদ্ধকালীন সময়ে কোন জাহাজ গোপনে অস্ত্র বহণ করে, কিন্তু সবার সামনে বেসামরিক জাহাজের মতো চেহারা উপস্থাপন করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জার্মান যুদ্ধজাহাজ KMS Widder । জাহাজটাকে সাধারণ কার্গো জাহাজের মতো দেখা গেলেও এর ডেকের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল কামান এবং টর্পেডো।  এই জাহাজগুলির লুকিয়ে রাখা অস্ত্রের সাথে বর্তমানে রাশিয়ানদের ডেভেলপ করা কনটেইনার-বেজড ক্রুজ মিসাইলের মিল উল্লেখ্য। একটা কনটেইনার জাহাজের উপরে কয়েক’শ কনটেইনারের মাঝে দু’টি কনটেইনারের মাঝে যদি ক্রুজ মিসাইল এবং এর কন্ট্রোল সিস্টেম লুকিয়ে রাখা হয়, তাহলে সেই জাহাজটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জার্মান নৌবাহিনীর  এধরনের জাহাজের সাথে তুলনা করা যেতে পারে।


লুকিয়ে রাখা অস্ত্র



দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জার্মানি এধরণের জাহাজ ব্যবহার করেছে। এগুলিকে বলা হতো Merchant raider। এই জাহাজগুলি সাধারণ বাণিজ্য জাহাজের মতো সমুদ্রে ঘুরে বেড়াতো। এগুলির ডেকের নিচে বেশ কয়েকটি কামান এবং টর্পেডো লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। কাছাকাছি শত্রুপক্ষের কোন বাণিজ্য জাহাজ দেখলে এরা কাছাকাছি গিয়ে কামান এবং টর্পেডোর সহায়তায় ঐ জাহাজকে ডুবিয়ে দিতো। জার্মান নৌবাহিনীর রকম কয়েকটি জাহাজ ব্যাপক সাফল্য পেয়েছিল। মোট ৯টা বাণিজ্যিক জাহাজকে পরিবর্তিত করে যুদ্ধজাহাজ বানানো হয়েছিল – KMS Atlantis, KMS Pinguin, KMS Kormoran, KMS Widder, KMS Thor, KMS Orion, KMS Stier, KMS Komet, KMS Michel । এই জাহাজগুলির লুকিয়ে রাখা অস্ত্রের সাথে বর্তমানে রাশিয়ানদের ডেভেলপ করা কনটেইনার-বেজড ক্রুজ মিসাইলের মিল উল্লেখ্য। একটা কনটেইনার জাহাজের উপরে কয়েক’শ কনটেইনারের মাঝে দু’টি কনটেইনারের মাঝে যদি ক্রুজ মিসাইল এবং এর কন্ট্রোল সিস্টেম লুকিয়ে রাখা হয়, তাহলে সেই জাহাজটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জার্মান নৌবাহিনীর ‘আটলান্টিস’ জাহাজের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। আবার এই কন্টেইনারের মাঝে যদি ব্যালিস্টিক মিসাইল থাকে, তাহলে তো সেটা স্ট্র্যাটেজিক ডিটারেন্ট হিসেবেও কাজ করবে। কোন জাহাজে সমুদ্রের কোথায় মিসাইল ঘুরে বেড়াচ্ছে, সেটা ধরা খুবই কষ্টকর হবে। মোট কথা যুদ্ধের হিসেবই পরিবর্তিত হয়ে যাবে।



কৌশল আগে না ডিজাইন আগে?



এধরণের অস্ত্র ডেভেলপ করার কারণে অনেক কিছুই পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে। একটা পরিবর্তন যেমন বলা যেতে পারে যুদ্ধজাহাজের ডিজাইনের ব্যাপারে। আজকাল যুদ্ধজাহাজের সারভাইভাবিলিটি বাড়াতে একটা জাহাজে যে পরিমাণ ইলেকট্রনিক্স এবং অস্ত্র ভরে দেয়া হচ্ছে যে জাহাজ হয়ে যাচ্ছে ভীষণ জটিল, বিশাল এবং ব্যয়বহুল। এর ফলশ্রুতিতে জাহাজের মিশনের পরিধি কমিয়ে ফেলা হচ্ছে, কারণ বেশি সংখ্যক জাহাজ তৈরি করা যাচ্ছে না। এর আগে ১০টা জাহাজ যে পরিমাণ সমুদ্র পাহাড়া দিতো, এখন ৩টা থেকে ৫টা জাহাজের পক্ষে সেটা করা সম্ভব নয়। কাজেই কতটা সমুদ্র সে নিয়ন্ত্রণ করবে, সেটার পরিধি কমিয়ে দেয়া হচ্ছে; মিশন রিডিজাইন করে ফেলা হচ্ছে। সমুদ্রের বিপুল জলরাশি পড়ে যাচ্ছে সেই মিশনের বাইরে। একটা জাহাজের পক্ষে তো একই সময়ে দুই জায়গায় থাকা সম্ভব নয়। উপরে আলোচিত নতুন ধরণের যুদ্ধচিন্তা জটিল এবং ব্যয়বহুল জাহাজের ডিজাইনকে চ্যালেঞ্জ করবে এবং কৌশলগত চিন্তাকে আবারও জাহাজের ডিজাইন এবং প্রযুক্তির উপরে স্থান দেবে।

Thursday, 6 July 2017

যুদ্ধজাহাজের সংজ্ঞা কি? (পর্ব ১ - মাঝ সমুদ্রের সেনাবাহিনী)

০৬ জুলাই ২০১৭


মালয়েশিয়ার নৌবাহিনীর জাহাজ (MV Bunga Mas Lima)‘বুঙ্গা মাস লিমা’। জাহাজটি ছিল একটি ‘বেসামরিক’ কনটেইনারবাহী জাহাজ। ২০১১ সালে জাহাজটি থেকে স্পেশাল ফোর্সের সদস্যরা হেলিকপ্টার ও দ্রুতগামী ছোট বোটের মাধ্যমে জলদস্যু-আক্রান্ত জাহাজে উঠে সেটার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। যা নিয়ে আলোচনা হয়নি তা হলো, এরকম একটি জাহাজের সক্ষমতা রয়েছে শত্রুর নিয়ন্ত্রিত একটি জাহাজের দখল নেয়ার 'যুদ্ধকৌশল' বাস্তবায়ন করার। কাজেই এটি একটি সক্ষম যুদ্ধ জাহাজই বটে!

সোমালিয়ার উপকূলে... 


২২শে জানুয়ারী ২০১১। সোমালিয়ার উপকূলে মালয়েশিয়ার একটি কেমিক্যালবাহী জাহাজ ‘বুঙ্গা লরেল’ সোমালিয়ার জলদস্যুদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। জাহাজটির নিরাপত্তা দিচ্ছিল কাছাকাছি থাকা মালয়েশিয়ার নৌবাহিনীর জাহাজ (MV Bunga Mas Lima)‘বুঙ্গা মাস লিমা’। আসলে ‘বুঙ্গা মাস লিমা’ জাহাজাটি ছিল একটি ‘বেসামরিক’ কনটেইনারবাহী জাহাজ, যা কিনা ‘অপারেশন ফজর’ নামের মিশনে সোমালিয়ার উপকূলে টহল দিচ্ছিল। জাহাজটি মালয়েশিয়ার সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বহণ করছিল। এই সামরিক সদস্যদেরকে হেলিকপ্টার ও দ্রুতগামী ছোট বোটের মাধ্যমে জলদস্যু-আক্রান্ত জাহাজে ওঠার ব্যবস্থা করা হয়, এবং তারা জাহাজে উঠে জলদস্যুদের পরাজিত করে জাহাজ এবং ২৩ জন ক্রুকে উদ্ধার করে। ২০০৯ সালে মালয়েশিয়ার সরকার জাহাজটিতে কিছু পরিবর্তন করে মালয়েশিয়ার সামরিক বাহিনীর কাজের জন্যে প্রস্তুত করে। ৯,০০০ টনের এবং ১৩৩ মিটার লম্বা এই জাহাজটির উপরে বড় দু’টি ক্রেন ছিল, যার একটি সরিয়ে দিয়ে সেখানে হেলিকপ্টার ল্যান্ডিং স্পটসহ একটি হেলিকপ্টার হ্যাঙ্গার তৈরি করা হয়, ডেকের উপর কয়েকটি ছোট বোট পরিবহণ করার ব্যবস্থা করা হয়, এবং স্পেশাল ফোর্সের সদস্যদের বহণ করার ব্যবস্থা করা হয়। ২০১১ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত তিন বছর জাহাজটি সোমালিয়ার উপকূলে অপারেট করে। ২০১১ সালেই মিশরে আরব বসন্তের সময় সেদেশে থাকা মিশরীয় ছাত্রদেরকে এই জাহাজটি উদ্ধার করে। ২০১৪ সালে জাহাজটিকে মালয়েশিয়ার সাবাহ রাজ্যের উপকূলে তেলের রিগগুলিকে রক্ষা করার দায়িত্ব দেয়া হয়। সমুদ্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ রক্ষা করার এই চিন্তাটি আরও জাহাজ কনভার্ট করার কাজে ব্যবহার করা হয়। এই জাহাজগুলিকে বলা হচ্ছে ‘Mobile Sea Base’। ‘টুন আজিজান’ নামের একটি কার্গো জাহাজকে পরিবর্তন করে ৯৯ জন মানুষের লম্বা সময়ের জন্যে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। এই জাহাজটিও বুঙ্গা মাস লিমা জাহাজটির মতো নিরাপত্তা-বিষয়ক অপারেশন চালাতে সক্ষম হবে।

বেসামরিক জাহাজকে কিছু পরিবর্তন করে সামরিক কাজে ব্যবহার করার চিন্তাটা নতুন কিছু নয়। তবে যে ব্যাপারটা নিয়ে তেমন কথা হচ্ছে না তা হলো এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে সেনা মোতায়েন করে জাহাজ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়া। এই কাজটিকে এতোটাই স্বাভাবিক ব্যাপার বলে আলোচনা করা হচ্ছে যে, জাহাজ থেকে জাহাজে সেনা পাঠানোর চিন্তাটা কোথা থেকে এলো, সেটাই এখন আলোচনাতে নেই! অথচ এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, কারণ এই আলোচনাতে আসা উচিত কোন কোন কাজ করলে একটা জাহাজকে যুদ্ধজাহাজ বলা হবে। এই আলোচনার শুরুতে যুদ্ধজাহাজের ইতিহাসের দিকে তাকালে আলোচনায় সুবিধা হতে পারে।

  
রোমানরা ছিল স্থলশক্তি; অন্যদিকে কার্থেজরা ছিল নৌশক্তি। কার্থেজদের শক্তিশালী নৌবহরকে মোকাবিলা করার জন্যে রোমানরা বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল বিপক্ষের জাহাজে অবতরণ (Boarding) করায়। রোমানরা প্রচুর সৈন্য বহণ করতো তাদের জাহাজে, যাতে তারা শত্রু জাহাজে উঠে পড়ে সেই জাহাজ দখল (Seizure) করে নিতে পারে।

রোমানদের সমুদ্রের সেনাবাহিনী… 

রোম আর কার্থেজের মাঝে প্রথম পুনিক যুদ্ধ হয় খ্রীষ্টপূর্ব ২৬৪ থেকে খ্রীষ্টপূর্ব ২৪১ পর্যন্ত। এই যুদ্ধে নৌ-সংঘাতের গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। রোমানরা তখন পর্যন্ত ছিল স্থলশক্তি; অন্যদিকে কার্থেজরা ছিল নৌশক্তি। এর প্রধান কারণ ছিল – রোমানরা যেখানে তাদের স্থলসীমানা রক্ষা করতেই বেশি ব্যস্ত ছিল, কার্থেজরা ব্যস্ত ছিল তাদের নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। কার্থেজরা ছিল ভূমধ্যসাগরের প্রধান ব্যবসায়ী; তাই নৌশক্তি তৈরি করাটা তাদের জন্যে স্বাভাবিক ছিল। কার্থেজদের শক্তিশালী নৌবহরকে মোকাবিলা করার জন্যে রোমানরা বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল বিপক্ষের জাহাজে অবতরণ (Boarding) করায়। রোমানরা প্রচুর সৈন্য বহণ করতো তাদের জাহাজে, যাতে তারা শত্রু জাহাজে উঠে পড়ে সেই জাহাজ দখল (Seizure) করে নিতে পারে। দখল করতে না পারলে সেই জাহাজটিকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে অচল করার চেষ্টা করতো তারা। আর যেহেতু রোমানরা স্থলযুদ্ধে ভালো ছিল, তাই তাদের সেনারা শত্রু জাহাজে উঠে দিয়ে জাহাজের উপরে একটা ছোটখাটো স্থলযুদ্ধই করে ফেলতেন। অর্থাৎ সমুদ্রে যুদ্ধ হলেও যুদ্ধের ধরণটা এসেছিল স্থলযুদ্ধ থেকে। এধরনের নৌযুদ্ধের চল ছিল বহুকাল। পালতোলা জাহাজে কামান বসানোর পরেও শত্রু জাহাজ দখল করা চলতো। পরবর্তীতে অর্থনৈতিক অবরোধ দেবার চিন্তা থেকে জাহাজ দখলের চিন্তাটা আরও শক্ত ভিত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত হয়। ঠিক এই যুদ্ধের ধরণটাই বর্তমানকালে চলছে প্রতিনিয়ত, যদিও খুব কম লোকই এই ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করেছে।

  
পারস্য উপসাগরে মহড়া দিচ্ছে মার্কিন কোস্ট গার্ডের সদস্যরা। ১৯৯০ সাল থেকে ইরাকের উপর অর্থনৈতিক অবরোধের ক্ষেত্রেও Visit, Board, Search & Seizure (VBSS) অপারেশন  অনুসরণ করা হয়েছে। অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে শত্রুদেশের সাধারণ জনগণকে না খাইয়ে মারার যুদ্ধকৌশলখানা বহু প্রাচীন। অথচ ২১ শতকে এসে অর্থনৈতিক অবরোধ দিতে ব্যবহৃত ছোট বোটগুলিকে যুদ্ধজাহাজের ক্যাটাগরিতেই ফেলা হচ্ছে না।


২১ শতকে শত্রুজাহাজ দখল… 

Visit, Board, Search & Seizure (VBSS) অপারেশনগুলি এখন খুব সাধারণ একটি ব্যাপার। একটি জাহাজ থেকে সৈন্যরা (প্রধানতঃ স্পেশাল ফোর্সের সদস্যরা) অন্য একটি জাহাজের কাছাকাছি যাচ্ছে, উঠে চড়ে বসছে, খোঁজাখুঁজি করছে, বা পুরো জাহাজই দখল করে নিচ্ছে। উপরে মালয়েশিয়ার যে দু’টি জাহাজের উদাহরণ দেয়া হয়েছে, সেগুলির বেশিরভাগ ক্রু কিন্তু বেসামরিক। অর্থাৎ একটি “বেসামরিক” জাহাজেরও সক্ষমতা থাকতে পারে সৈন্য মোতায়েন করে একটি শত্রু জাহাজ দখল করে নেয়া। আবার গভীর সমুদ্রে VBSS মিশনগুলি চলবে উপরে যেভাবে মালয়েশিয়ার মিশনের কথা বলা হয়েছে সেভাবেই; তবে উপকূলের কাছাকাছি বা নদী-বদ্বীপ অঞ্চলে বড় জাহাজের স্থানে থাকবে ছোট বোট। ১৯৬০-এর দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ে মার্কিনীরা প্রচুর ছোট ছোট বোট তৈরি করেছিল দক্ষিণ ভিয়েতনামের সায়গন বন্দরকে চালু রাখতে এবং বিদ্রোহীদের ধ্বংস করতে। মার্কিন কোস্ট গার্ড অংশ নিয়েছিল ভিয়েতনামের কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধে। পরবর্তীতে ১৯৯০ সাল থেকে ইরাকের উপর অর্থনৈতিক অবরোধের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে শত্রুদেশের সাধারণ জনগণকে না খাইয়ে মারার যুদ্ধকৌশলখানা বহু প্রাচীন। অথচ ২১ শতকে এসে অর্থনৈতিক অবরোধ দিতে ব্যবহৃত এই ছোট বোটগুলিকে যুদ্ধজাহাজের ক্যাটাগরিতেই ফেলা হচ্ছে না। আবার সোমালিয়ার উপকূলে মালয়েশিয়ার ব্যবহৃত জাহাজকেও অনেকেই যুদ্ধজাহাজ বলবেন না; বলবেন অক্সিলারি জাহাজ; যদিও সেই জাহাজের সক্ষমতা আছে বিপক্ষের আরেকটি জাহাজ দখল করে নেবার। এক্ষেত্রে বুঝতে হবে যে শত্রুর একটি কার্গো জাহাজ দখল করা, আর বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ দখল করাটা এক নয়। কাজেই কোন জাহাজ কতো বড় জাহাজ দখল করতে পারবে, সেটা এখানকার আলোচনার বিষয়বস্তুই নয়।


সমুদ্রে সেনাবাহিনী ব্যবহারের মাধ্যমে বিপক্ষের নৌজাহাজ দখল করে নেয়াটা হাজারো বছরের পুরোনো যুদ্ধকৌশল। বড় যুদ্ধের মাঝে এধরনের কর্মকান্ডকে যুদ্ধের অংশ হিসেবে ধরা হলেও বড় যুদ্ধ ছাড়া এগুলিকে সকলে এতোটাই স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নিয়েছে যে জাহাজ দখল করাকে যুদ্ধের কর্মকান্ড বলাটা অনেকের কাছেই পাগলের প্রলাপ ঠেকবে। অথচ হাজারো বছরের ইতিহাসে এটা ছিল যুদ্ধের কারণ, এবং যুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যুদ্ধাস্ত্র ঘোষিত না হয়েও বহু জাহাজ যুদ্ধাস্ত্ররূপে কাজ করছে আজ; কারণ তাদের কর্মকান্ডগুলিকে এখন মানুষ আর যুদ্ধ বলে মনে করার ক্ষমতা হারিয়েছে। একটি চলমান যুদ্ধকে মেনে নেয়া এবং এর বিরুদ্ধাচরণ না করার প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ এটি। যুদ্ধের সংজ্ঞাই তো পাল্টে ফেলা হয়েছে। যে চায় সর্বদা যুদ্ধ করবে, কিন্তু কেউ তাকে কিছু বলবে না, সে সর্বদাই চাইবে যুদ্ধের সংজ্ঞা যেন মানুষ তার কাছ থেকেই নেয়। তাতে মানুষ প্রতিনিয়ত যুদ্ধের মাঝে থেকেই মনে করবে শান্তির সময় পার করছে। পরিশেষে বলা যায় যে, যুদ্ধের সংজ্ঞা পরিবর্তন করা হয়েছে বলেই যুদ্ধাস্ত্র এবং যুদ্ধজাহাজের সংজ্ঞা মানুষের কাছে আজ এতো কঠিন ঠেকছে। ১০ হাজার টনের এজিস রাডার ও ভার্টিক্যাল লঞ্চ মিসাইল সজ্জিত না হলে নাকি যুদ্ধজাহাজই হয় না! এরকম জাহাজ বানাবার সক্ষমতা তো শুধু অল্প কয়েকটি “ধনী” দেশের রয়েছে। তাহলে বাকিরা কি যুদ্ধজাহাজই রাখতে পারবে না? যুদ্ধ করার সক্ষমতা এবং “অধিকার” কি শুধু ঐ ধনী দেশগুলিরই? বিভ্রান্তিকর সংজ্ঞা পরিত্যাগেই মাঝেই রয়েছে যুদ্ধজাহাজের আসল সংজ্ঞা। মাঝ সমুদ্রে সেনা পাঠিয়ে শত্রুজাহাজ দখল করে নেবার যুদ্ধকৌশল বাস্তবায়নকারী জাহাজ হলো একধরনের যুদ্ধজাহাজ। সমুদ্রপথে টহল দিয়ে শত্রুদেশের জনগণের উপরে অর্থনৈতিক অবরোধের যুদ্ধকৌশল বাস্তবায়নকারী জাহাজগুলিও যুদ্ধজাহাজ।      

Saturday, 24 June 2017

জার্মানি এবং বাংলায় বিভাজনের ভূরাজনীতি

২৪শে জুন ২০১৭



ভারত জন্মের পর থেকেই একটি দুর্বল রাষ্ট্র, কারণ ব্রিটিশরা সেভাবেই ভারতকে তৈরি করেছে। আর ভারত টিকে আছে যে “মিরাক্কেল”-এর জন্যে, সেটিই হচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে অনেকের মাঝেই প্রচলিত আছে যে আসলে ভারত একটা শক্তিশালী রাষ্ট্র। এই কথাটাকে ভিত্তি দেয়া হয়েছে একটা মিথ্যা কথাকে বারংবার প্রচার করার মাধ্যমে। যারা এই মিথ্যাটিকে প্রচার করেছে, তারা কিন্তু ঠিকই জানেন যে ভারত কতটা দুর্বল একটা রাষ্ট্র। আর তারা এই দুর্বলতার ভিত্তি সম্পর্কেও যথেষ্টই ওয়াকিবহাল। তবে একটা রাষ্ট্রকে দুর্বল করে তখনই তৈরি করা হবে যখন দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর জন্যে একটা গভীর ভীতিকে ব্যবহার করা যাবে; নাহলে এই দুর্বলতাটা যারা তৈরি করেছে (পরাশক্তিরা), তাদের কোন কাজে আসবে না। তথাপি এখানে পরাশক্তিদের দুশ্চিন্তার একটা কারণ রয়ে যায় – যদি সেই দুর্বলতাকে সত্যিকার অর্থেই কেউ কাজে লাগিয়ে ফেলে? সেটা কিন্তু হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত দুর্বলের দুর্বলতার “গোপন” কাহিনী কেউ না জানে। এই কাহিনী গোপন করার নিমিত্তেই ভারতকে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। এই “গোপন” কাহিনীর গোড়ার কিছু কথা আলোচনায় আসলে অবশ্য “শক্তিশালী” বলার ভিত্তিটাই থাকবে না। এই আলোচনাতে কয়েক হাজার মাইল দূরে ইউরোপের এক উদাহরণ টেনে আনাটা প্রসঙ্গতঃ – জার্মানির বিভাজনের কাহিনী। এর আগের একটি পোস্টে ঊনিশ শতকে জার্মানির একত্রীকরণের কাহিনী পাওয়া যাবে। আর আজকের আলোচনাটি হলো এর পরের বিভাজনের কাহিনী নিয়ে। এই কাহিনীর মাধ্যমে দুর্বল করার ফর্মূলাটা পাঠক পেয়ে যাবেন বলে আশা করা যায়।

জার্মান রাষ্ট্র একত্রীকরণে নেতৃত্ব দিয়েছিল জার্মানদের মাঝে সবচাইতে বড় রাজ্য প্রুশিয়া। বাকি ইউরোপ এই প্রুশিয়াকেই ‘জার্মান প্রবলেম’-এর মূল বলে ধরে নিয়েছিল। তাই প্রুশিয়ার বিরুদ্ধেই পরাশক্তিদের ছিল যতো ক্ষোভ।


জার্মানি আর পোল্যান্ড…



একটা জাতিকে রাজনৈতিকভাবে কি করে ভাঙ্গা যায়, তার সবচাইতে বড় উদাহরণ হচ্ছে জার্মানির বিভক্তি। এই বিভক্তি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে শুরু হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেই মূল বিভক্তি হয়েছিল। আজকের যে পোল্যান্ডকে সকলে চেনে, সেটা কতটুকু আসলে পোল্যান্ড আর কতটুকু জার্মানি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কিছুটা ইতিহাসচর্চা করতে হবে। জার্মান রাষ্ট্র একত্রীকরণে নেতৃত্ব দিয়েছিল জার্মানদের মাঝে সবচাইতে বড় রাজ্য প্রুশিয়া। বাকি ইউরোপ এই প্রুশিয়াকেই ‘জার্মান প্রবলেম’-এর মূল বলে ধরে নিয়েছিল। তাই প্রুশিয়ার বিরুদ্ধেই পরাশক্তিদের ছিল যতো ক্ষোভ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পরে জার্মানি থেকে কিছু অংশ কেটে নিয়ে পোল্যান্ডকে দিয়ে দেয়া হয়। এই অংশটুকু ছিল প্রুশিয়ার কিছু অংশ। এভাবে পূর্ব প্রুশিয়া নামে একটা ছিটমহলের জন্ম দেয়া হয়, যা মূল জার্মানি থেকে আলাদা করে রাখা হয় ‘ডানজিগ করিডোর’ নামে একটা ভূখন্ড দ্বারা। এই ভূখন্ড দেয়া হয় পোল্যান্ডের কাছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে আগে হিটলার পোল্যান্ডের কাছ থেকে ওই করিডোরখানা দাবি করে বসেন। তার দাবি না মানায় তিনি পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে প্রায় পুরো পোল্যান্ডই দখল করে নেন। যখন জার্মানরা পোল্যান্ড দখল করছিল, তখন সোভিয়েতরা ওই সুযোগে পোল্যান্ডের পুর্বের কিছু অংশ দখল করে নেয়। এই দখলীকৃত অংশের বিনিময়ে দ্বিতীয় বিশযুদ্ধ শেষের পরে জার্মানি থেকে ভূখন্ড কেটে পোল্যান্ডকে দেয়া হয়। এতে একে জার্মান জাতিকে কয়েক টুকরা করা হয়, আবার পোল্যান্ডের পূর্বংশ পাওয়ার কারণে রাশিয়ার strategic depth বৃদ্ধি পায়।

১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বরে লন্ডন প্রোটোকলের আওতায় ঠিক করা হয় যে জার্মানিকে ভেঙ্গে কোন কোন অংশে ভাগ করা হবে। তাই ১৯৪৫ সালে জার্মানির আত্মসমর্পনের সময়ে যদিও দেখা যায় যে আমেরিকানরা পূর্ব-সম্মতিক্রমে আঁকা বাউন্ডারি অতিক্রম করে ফেলেছে, তবু সমস্যা হয়নি। মার্কিনীরা চুক্তি মোতাবেক তাদের কিছু জায়গা সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে ছেড়ে দেয়। উপরের মানচিত্রের নীল অংশটুকু মার্কিনীরা সোভিয়েতদের কাছে ছেড়ে দিয়েছিল।


প্রুশিয়ার ব্যাপারে পরাশক্তিরা একমত…..



১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বরে লন্ডন প্রোটোকলের আওতায় ঠিক করা হয় যে জার্মানিকে ভেঙ্গে কোন কোন অংশে ভাগ করা হবে। তাই ১৯৪৫ সালে জার্মানির আত্মসমর্পনের সময়ে যদিও দেখা যায় যে আমেরিকানরা পূর্ব-সম্মতিক্রমে আঁকা বাউন্ডারি অতিক্রম করে ফেলেছে, তবু সমস্যা হয়নি। মার্কিনীরা চুক্তি মোতাবেক তাদের কিছু জায়গা সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে ছেড়ে দেয়। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে কোন ভিত্তির উপরে লন্ডন প্রোটোকলের মানচিত্র তৈরি করা হয়েছিল? জার্মানির বর্তমান মানচিত্রের উপরে প্রুশিয়ার মানচিত্র superimpose করলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যায়। প্রুশিয়ার মূল অংশের পশ্চিম বাউন্ডারিকেই পূর্ব জার্মানির পশ্চিম বাউন্ডারি করে বাকি জার্মানি থেকে আলাদা করা হয়। এই বাউন্ডারিটা মানতেই মার্কিনীরা ১৯৪৫ সালে বেশ কিছু অঞ্চল থেকে তাদের সৈন্য সরিয়ে নেয়। সাবেক প্রুশিয়ার মূল অংশ আলাদা করার ফলে এর পশ্চিমাংশ পড়লো পশ্চিম জার্মানিতে। আর বাকি অংশ? সেটা আরও জটিলভাবে ভাগ করা হলো।



জার্মানির পূর্বাংশ, যা একসময় প্রুশিয়ার অন্তর্গত ছিল, তার বেশিভাগই পোল্যান্ডকে দিয়ে দেয়া হয়। এর মাঝে ছিল সাইলেসিয়া, পমেরানিয়া, পোজেন, পশ্চিম প্রুশিয়া, পূর্ব প্রুশিয়া এবং ব্র্যান্ডেনবার্গের বেশ কিছুটা। শুধু অল্প কিছু অংশ (পূর্ব প্রুশিয়ার উত্তর অংশ) রাশিয়া কেটে নেয়, যা এখনও Kaliningrad exclave নামে রাশিয়ার অন্তর্গত রয়েছে। এসবকিছুর বিনিময়ে পোল্যান্ডের পূর্ব থেকে কিছু অংশ কেটে নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে যুক্ত করা হয়। মজার ব্যাপার হলো, ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরেও পোল্যান্ডের সীমানা ওটাই আছে; অর্থাৎ status quo বজায় রাখা হয়েছে। পোল্যান্ড হচ্ছে রাশিয়ার সাথে বাকি ইউরোপের বাফার জোন; তাই পোল্যান্ডকে সবসময়েই কাটাছেঁড়ার মাঝে পড়তে হয়েছে। প্রুশিয়ার জন্মের পর (আঠারো শতকের শুরুতে) থেকে পোল্যান্ডের সমুদ্রের সাথে সরাসরি কোন যোগাযোগ ছিল না। ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয়ের পরে ডানজিগ করিডোর জার্মানি থেকে কেটে পোল্যান্ডকে দিয়ে দেয়া হলে পোল্যান্ডের সাথে সমুদ্রের যোগাযোগ স্থাপিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে জার্মানিকে কমপক্ষে তিন ভাগে ভাগ করা হয়; আসলে প্রাক্তন প্রুশিয়াকে ভাগ করা হয় তিন ভাগে। এর পশ্চিমাংশ পড়ে পশ্চিম জার্মানিতে; মধ্যাঞ্চল পড়ে পূর্ব জার্মানিতে; আর পূর্বাংশ পরে পোল্যান্ডে। এভাবে জার্মানির একত্রীকরণে মূল ভূমিকা রাখা প্রুশিয়ানদেরকে তিন ভাগে ভাগ করা হয় যাতে ভবিষ্যতে প্রুশিয়ানরা একত্রিত হয়ে আবার নতুন করে শক্তিশালী জার্মান জাতি গঠন করতে না পারে। ১৯৮৯ সালে জার্মান পূণ-একত্রীকরণের পরে যদিও অনেকেই মনে করতে পারেন যে জার্মানরা আবারও একত্রিত হয়ে গিয়েছে, আসলে ব্যাপারটা অতটা সহজ নয়। কারণ বর্তমান পোল্যান্ডের প্রায় অর্ধেকই আসলে একসময় জার্মানি তথা প্রুশিয়ার অধীনে ছিল।

১৯৮৯ সাল। ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে বার্লিন ওয়াল। জার্মান জাতীয়তায় ঠিকমতো উস্কানি যে-ই দিতে পেরেছে, সে-ই জার্মানদের একত্রিত করে ফেলতে পেরেছে। তবে এটা হয়েছে জার্মানির আশেপাশে আগ্রাসী শক্তিগুলির কারণেই। প্রুশিয়াকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলা সত্ত্বেও জার্মানরা আবারও একত্রিত হয়ে শক্তিশালী হতে পারে কিনা, সেটা দেখার বিষয়।


গোঁয়াড় জাতির উত্থান ঠেকানো….



এখানে নেতৃত্ব দেবার ক্ষেত্রে প্রুশিয়ার কথা বার বার এলেও সবচাইতে অদ্ভূত ব্যাপার হলো, হিটলারের জন্ম ছিল অস্ট্রিয়াতে। একজন অস্ট্রিয়ান বংশোদ্ভূত জার্মানও পেরেছিল জার্মানদের একত্রিত করে ফেলতে। অর্থাৎ জার্মান জাতীয়তায় ঠিকমতো উস্কানি যে-ই দিতে পেরেছে, সে-ই জার্মানদের একত্রিত করে ফেলতে পেরেছে। তবে এটা হয়েছে জার্মানির আশেপাশে আগ্রাসী শক্তিগুলির কারণেই। তারা যদি নিজেদের দ্বন্দ্বে জার্মানদেরকে বলির পাঠা হিসেবে ব্যবহার না করতো, তাহলে হয়তো কেউ জার্মান জাতীয়তাকে উস্কে দিতে পারতো না অতো সহজে। ইউরোপীয় শক্তিরা বহু বছর জার্মানদের বিভক্ত করে রেখে তাদের নিজেদের কাজে ব্যবহার করেছিল। তাই দাসত্বের কুফল তাদেরকে বোঝাতে খুব একটা কষ্ট হয়নি। তবে যা-ই হোক, কোন একটা উদ্ভট কারণে জার্মানরা একত্রিত অবস্থায় অন্য যেকোন জাতির থেকে বেশি মনযোগ দিয়ে কাজ করে। প্রুশিয়াকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলা সত্ত্বেও জার্মানরা আবারও একত্রিত হয়ে শক্তিশালী হতে পারে কিনা, সেটা দেখার বিষয়।



ঊনিশ শতকে উত্থান এবং প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করার কারণে জার্মানিকে তথা প্রুশিয়াকে ভেঙ্গে ফেলা হয়। ইউরোপের শক্তিশালী দেশগুলি মধ্য ইউরোপে শক্তিশালী কোন জাতির উত্থান পছন্দ করেনি। এই জার্মানরাই ইউরোপের শক্তির সমতা পুরোপুরি পালটে দেয়। এখন জার্মানদেরকে হিসেবের বাইরে রেখে কিছুই করা যায় না। বাকি ইউরোপ একভাবে চিন্তা করলে জার্মানরা আবার সেটা নিজেরদের ‘জার্মান পাল্লা’য় মেপে দেখে। যদি সেটা তাদের স্বার্থের পরিপন্থী হয়, তাহলে সেটা তারা মেনে নেয়না একেবারেই। এসব কারণে একুশ শতকে এসেও জার্মানি পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে একটা সমস্যা। মার্কিনীরা পুরো ইউরোপকে তাদের দিকে নিয়ে আসতে পারলেও জার্মানিকে পারে না অনেকক্ষেত্রেই, যদিও আজও জার্মানিতে মার্কিন সামরিক ঘঁটি রয়েছে। মার্কিনীরা পশ্চিমের আদর্শিক শক্তি সেটা মেনে নিয়েই পশ্চিমারা আমেরিকার পিছনে গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু জার্মানরা ঠিকই ‘জার্মান পাল্লা’য় মেপে নেয় সেটা। অর্থাৎ আদর্শিক কারণও তাদের জাতীয় স্বার্থের নিচে স্থান নেয়। অবশ্য সেটা জার্মানির জন্যেই তো শুধু প্রযোজ্য নয়; যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যেমন নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্যে যুক্তরাষ্ট্র কেন মিশরের হোসনী মোবারক, ইয়েমেনের আলী আব্দুল্লাহ সালেহ, সৌদি বাদশাহ, জর্দানের বাদশা আবদুল্লাহ, ওমানের সুলতান কাবুস, এবং আরও অনেক অগণতান্ত্রিক নেতাদের সমর্থন করে যাচ্ছে, তা বেশ সুন্দরভাবেই প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব হিলারি ক্লিনটন ব্যাখ্যা করেছেন তার “Hard Choices” বইতে। কিন্তু নিজেদের জন্যে আলাদা নিয়ম তৈরি করে নেয়া তো পরাশক্তির চিন্তা। জার্মানি কেন এমন আচরণ করবে? তারা কেন মার্কিন স্বার্থকে নিজেদের স্বার্থের নিচে স্থান দেবে? সেখানেই অন্তর্নিহিত সেই গোঁয়াড়, যাকে দুইটা বিশ্বযুদ্ধের পরে তিন ভাগে ভাগ করেও পুরোপুরি ঠিক করা যায়নি। গোঁয়াড় জাতিকে বশে আনাটা কঠিন, কিন্তু জরুরী। এদের সমস্যা হলো ঠিক নেতৃত্ব দেখতে পেলে এদের গোঁয়াড়তমি কমে না, বরং বাড়ে। এই গোঁয়াড়ের উদাহরণ বাকি বিশ্বেও রয়েছে।

১৮৫৭ সালের ভারতের মানচিত্রে দেখা যায় যে বোম্বে এবং মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে শুধু অল্প কিছু ভূখন্ড তারা নিয়ন্ত্রণ করেছিল, কারণ সেখানে উপকূলীয় সমুদ্রবন্দরগুলির নিয়ন্ত্রণই তাদের কাছে মূল বিষয় ছিল। অন্যদিকে বাংলা প্রেসিডেন্সিতেই ছিল তাদের পুরো ভূখন্ড। এই এলাকাটাই ছিল সবচাইতে সম্পদশালী, আর সেকারণেই ব্রিটিশরা সকল শক্তি নিয়োজিত করেছিল বাংলাকে নিয়ন্ত্রণে নিতে। বাকি ভারত নিয়ন্ত্রণে নেয়াটা তাদের কাছে ছিল অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ, আর সেকারণেই পশ্চিম ভারত এবং বর্তমাদের পাকিস্তানের ভূখন্ডের অধীন ভারতের অংশগুলি ব্রিটিশরা বহু পরে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল।


ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশ - বাংলাতেই কেন হতে হবে?




ভারতীয় উপমহাদেশে এসে ব্রিটিশরা এখানে কি দেখেছিল? ব্রিটিশরা ভারতে যে স্থানগুলিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিল, সেখানেই বড় ভূখন্ড নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছিল। এই নীতির ফলাফল দেখা যায় ১৮৫৭ সালের ভারতের মানচিত্রে। বোম্বে এবং মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে শুধু অল্প কিছু ভূখন্ড তারা নিয়ন্ত্রণ করেছিল, কারণ সেখানে উপকূলীয় সমুদ্রবন্দরগুলির নিয়ন্ত্রণই তাদের কাছে মূল বিষয় ছিল। অন্যদিকে বাংলা প্রেসিডেন্সিতেই ছিল তাদের পুরো ভূখন্ড। এই এলাকাটাই ছিল সবচাইতে সম্পদশালী, আর সেকারণেই ব্রিটিশরা সকল শক্তি নিয়োজিত করেছিল বাংলাকে নিয়ন্ত্রণে নিতে। বাকি ভারত নিয়ন্ত্রণে নেয়াটা তাদের কাছে ছিল অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ, আর সেকারণেই পশ্চিম ভারত এবং বর্তমাদের পাকিস্তানের ভূখন্ডের অধীন ভারতের অংশগুলি ব্রিটিশরা বহু পরে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল। কিছু জায়গা তারা আবার পুরোপুরি দখলে নেয়ার দরকারই মনে করেনি; যেমন – হায়দ্রাবাদ, যা কিনা ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা আলাদা রাজ্য হিসেবেই রেখে গিয়েছিল। অর্থাৎ ভারত নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই এলাকাগুলির নিয়ন্ত্রণ ব্রিটিশদের কাছে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তাহলে বাংলা কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ ছিল?



ব্রিটিশরা বাংলায় অবতরণ করেই এখানকার তিনটি বিশাল নদীর অববাহিকায় অবস্থিত বাংলার শক্তি অনুধাবন করতে পেরেছিল। আদর্শিক চিন্তার মাঝে থাকার কারণে তারা এক স্থানে সকল বৃষ্টি এবং এক স্থানে সকল নদনদীর জমাট পাকানোটার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছিল; বাংলাকে তারা ধরে নিয়েছিল শক্তির কেন্দ্র। তারা ভারতের ইতিহাস থেকেও শিক্ষা নিয়েছিল এবং বুঝেছিল যে বাংলাতে একবার কেউ জেঁকে বসলে তাকে এখান থেকে উতখাত করা খুবই কঠিন হয়ে যায়। এই এলাকার কৃষিজ সম্পদের প্রাচুর্য্য, মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে ব্যাপক বৃষ্টিপাত, তিনটি বিশাল নদীর সঙ্গমস্থল, সমুদ্রবন্দরের আধিক্য, পানি-কেন্দ্রিক সংস্কৃতি ছাড়াও এখানকার ভূ-কৌশলগত অবস্থান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে ব্রিটিশরা বুঝেছিল যে যারা বাংলার নিয়ন্ত্রণ করবে, তারাই ভারতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলবে। তাদের প্রথম কাজটাই পরবর্তীতে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হয়েছিল – কোলকাতায় একটি বন্দর প্রতিষ্ঠা। এর মাধ্যমে পরবর্তীতে তারা বাংলার শক্তিকে দুই ভাগ করে ফেলতে পেরেছিল। তারা নিজেরা হতে চেয়েছিল এই ভূখন্ডের নিয়ন্ত্রণকারী; অন্য কাউকে সেটা দেবার ইচ্ছে তাদের ছিল না। তারা হিসেব কষে বুঝেছিল যে, যেহেতু এই এলাকার মুসলিমদের হাতে ব্রিটিশরা আগমণের আগ পর্যন্ত একনাগারে ৫৫১ বছর ক্ষমতা ছিল, তাই তারাই ছিল তাদের মূল ভীতি। আর ভূ-কৌশলগতভাবে অতীব গুরুত্বপূর্ণ বাংলাতেই মুসলিমদের সবচাইতে বড় অংশটুকু বাস করতো। এই অঞ্চলের মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্রিটিশরা হিমসিম খেয়েছিল। প্রায় নিয়মিতভাবেই ব্রিটিশদের এই অঞ্চলে বিদ্রোহ দমন করতে হয়েছিল, যার সবচাইতে বড়টি ছিল ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লব, যখন ৫৭ হাজার সৈন্যের পুরো বেঙ্গল আর্মি বিদ্রোহ করে বসেছিল। বাকি ভারত থেকে সৈন্য এনে এই বিদ্রোহ দমন করতে হয়েছিল তাদের। তবে তারা যে ভয় পেয়েছিল এই বিদ্রোহের মাধ্যমে, সেই ভয় থেকে তারা বের হতে পারেনি কখনোই। তারা বুঝে গেছিল যে আজ হোক, কাল হোক, এই উপমহাদেশ তাদের ছাড়তেই হবে; আর সেটা হবে এই বাংলার সমস্যার কারণেই। বাংলার মানুষ বহু আগ থেকেই রাজনৈতিকভাবে বাকি ভারত থেকে বেশি সচেতন ছিল; তাই এরা যেমন নেতৃত্ব দিয়েছিল, তেমনি দখলের সময়ে এরাই ছিল সকলের দুশ্চিন্তা।

বাংলার অবশিষ্টাংশকে দুই ভাগ করে দুইটি দেশের কাছে দিয়ে দেয়া হয়। এমন এক পদ্ধতি করা হয়, যাতে ভারত-পাকিস্তানের মাঝে শত বৈরিতা সত্ত্বেও একটি বিষয়ে যেন একাত্বতা থাকে – বাংলাকে কখনোই এক হতে দেয়া যাবে না। এখানকার মানুষ বাংলায় কথা বলতো সেকারণে নয় (আসলে বাংলা ছাড়াও এখানে আরও ভাষা ছিল), বরং ভূ-কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকায় আদর্শিকভাবে শক্তি ধরে রাখার এবং সেই শক্তিকে ব্যবহার করার উদাহরণ ইতিহাসে রয়েছে – সেই কারণে।


বাংলার বিষয়ে ভারত-পাকিস্তানের ঐক্য



বাংলাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ডিভাইড-এন্ড-রুল পদ্ধতির অনুসরণ করেছিল ব্রিটিশরা। অমুসলিমদেরকে শক্তিশালী করে মুসলিমদেরকে দুর্বল করার চেষ্টায় ছিল তারা। যার ফলশ্রুতিতে উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার মতো ঘটনার জন্মও তারা দিতে সক্ষম হয়েছিল। এই দাঙ্গার জন্ম তারা দিতে পেরেছিল ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ চেষ্টার মাধ্যমে। (এর আগেই বিহার ও উড়িষ্যাকে বাংলা থেকে আলাদা করে ফেলা হয়েছিল। আসামকে পুরোপুরি আলাদা করা হয় ১৯৪৭ সালে) যদিও বঙ্গভঙ্গ এরপরে রদ করা হয়েছিল, আসল ব্যাপারে ব্রিটিশরা হয়েছিল সফল। তারা হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার এমন একটা বীজ বপন করে দিয়েছিল, যা কিনা শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭ সালের মানচিন্ত্র তৈরিতে ব্যাপক সাহায্য করেছিল। ভূ-কৌশলগত দিক থেকে অতীব গুরুত্বপূর্ণ এবং রাজনৈতিকভাবে সবচাইতে শক্তিশালী বাংলার অবশিষ্টাংশকে (বিহার ও উড়িষ্যাকে আগেই আলাদা করা হয়েছিল) তারা দুই ভাগ করে দুইটি দেশের কাছে দিয়ে দেয়। শুধু তা-ই নয়, এমন এক পদ্ধতি তারা করে দিয়ে যায়, যাতে দু’টি দেশের মাঝে শত বৈরিতা সত্ত্বেও একটি বিষয়ে যেন একাত্বতা থাকে – বাংলাকে কখনোই এক হতে দেয়া যাবে না। পরাশক্তিদের নীতি অনুসরণ করে ১৯৪৭ পরবর্তী উভয় দেশই বাংলার মানুষের শক্তিকে খর্ব করেছিল, যদিও ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ভারতের প্রায় পুরো রাজনৈতিক কর্মকান্ডই ছিল বাংলা-কেন্দ্রিক। ১৯০৯ সাল পর্যন্ত কোলকাতাই ছিল ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমানের মতো রাজনীতিকদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়ে উঠেছিল কোলকাতায়। কোলকাতা ভারতকে দিয়ে দেয়া দেবার কারণে বঙ্গবন্ধুর কতটা কষ্ট হয়েছিল, সেটা তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই থেকে জানা যায়। ১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত পাকিস্তানের কয়েকজন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বাঙ্গালী – এগুলি কোন দুর্ঘটনা নয়; সেটাই স্বাভাবিক ছিল। অর্থনৈতিক দিক থেকেও বাংলার থাকার কথা উপরে; কিন্তু বিভাজনের মাধ্যমে সেটাকে করা হয়েছে দুর্বল। কারখানা করা হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে, অথচ কারখানার কাঁচামাল আসতো পূর্ববাংলা থেকে। এদেরকে আলাদা করে ফেললে কেউই তো শক্তিশালী থাকে না। (এক্ষেত্রে তিন প্রধান নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহের উল্টোদিকে কোলকাতাকে পশ্চিমবঙ্গে মূল শহর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কারণে বিভাগ অনেক সহজ হয়েছে।) জার্মানির বিভাগের কাহিনীর সাথে প্রচুর মিল রয়েছে বাংলার কাহিনীর। যেভাবে প্রুশিয়াকে কয়েক টুকরো করে বিলিয়ে দেয়া হয়েছিল কয়েকটি দেশের মাঝে, ঠিক সেভাবেই বাংলাকে কয়েক টুকরো করে ভাগ-বাটোয়ারা করে ফেলা হয়েছিল। এরা বাংলায় কথা বলতো সেকারণে নয় (আসলে বাংলা ছাড়াও এখানে আরও ভাষা ছিল), বরং ভূ-কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকায় আদর্শিকভাবে শক্তি ধরে রাখার এবং সেই শক্তিকে ব্যবহার করার উদাহরণ ইতিহাসে রয়েছে – সেই কারণে।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমানের মতো রাজনীতিকদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়ে উঠেছিল কোলকাতায়। যেহেতু বরাবরই বাংলা রাজনৈতিকভাবে এবং অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে ছিল, তাই এখানকার মানুষের মাঝেও রাজনৈতিক চিন্তা বেশি দেখা যেত। এই রাজনৈতিক সচেতনতাকে আদর্শিক শক্তিরা কাজে লাগাতে পারে। যেখানে কোন ধরনের রাজনৈতিক সচেতনতা নেই, সেখানে আদর্শিক রাজনীতিতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করাটা কঠিন, কারণ এই রাজনীতির ধরণটা বেশ কিছুটা sophisticated, যেখানে চিন্তা করার ক্ষমতার অগ্রাধিকার থাকে। বাংলার মানুষ চিন্তার দিক থেকে এগিয়ে ছিল; তাই বাংলার বিভাজনটা পরাশক্তিদের কাছে ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।


শরীর থেকে মাথা আলাদা করা হলে আত্মা পালিয়ে যায়…




প্রুশিয়ার তথা জার্মান বিভাগ ইউরোপে একটা শক্তিশালী জাতির উত্থান প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। বাংলার বিভাগও বঙ্গোপসাগরে ভবিষ্যতে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের উত্থান প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। এই দুই বিভাজনে ব্যাপক মিল থাকলেও একটি জায়গায় দু’টি বিভাগের মাঝে অমিল রয়েছে। জার্মানি পশ্চিমা আদর্শকে তাদের জাতীয়তার নিচে স্থান দেয়ায় ইউরোপের আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক হয়েছে; যে কারণে জার্মান জাতীয়তাবাদকে দমন করার চেষ্টা করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলায় পশ্চিমা আদর্শের বিপরীত কোন আদর্শ যাতে গেঁড়ে বসতে না পারে, সেজন্য সেখানে জাতীয়তাবাদের প্রশ্রয় দেয়া হয়েছে এমনভাবে, যাতে তা শক্তিশালী একটি রাষ্ট্রের জন্ম দিতে না পারে। একটি উদাহরণ দেয়া যাক। ১৯৭১ সালে ভারত পূর্ব বাংলা (বাংলাদেশ) থেকে কোটিখানেক শরণার্থী নিয়ে মহাবিপদে পড়ে। হ্যাঁ, সেটা অর্থনৈতিক দিক থেকে বিরাট সমস্যা তৈরি করেছিল; ভারতের অভ্যন্তরীণ হিন্দু-মুসলিম সমস্যাকে জাগিয়ে দেবার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল; ভারতের বাঙ্গালীদের ‘বাঙ্গালীত্ব’কে জাগিয়ে দিয়েছিল ‘ভারতীয় জাতীয়তাবোধ’ উপেক্ষা করে; ভারতের পূর্বাংশের আদর্শিক আন্দোলনকে (তখনকার আদর্শিক আন্দোলন ছিল কমিউনিজম) পূর্ব বাংলার আদর্শিক আন্দোলনের সাথে মিলিয়ে ফেলার উপক্রম করেছিল। [1] কিন্তু আসল সমস্যা কি ছিল? আসল সমস্যা ছিল এই যে শরণার্থী প্রবাহের সাথে সৃষ্ট উপরোল্লিখিত সমস্যাগুলি এখানকার রাষ্ট্রব্যবস্থার মূলে থাকা মানচিত্রকেই ভূলুন্ঠিত করেছিল! এটা ছিল পরাশক্তিদের বেঁধে দেয়া নিয়মের প্রচন্ড বরখেলাপ! ব্রিটিশরা যে নিয়ম ১৯৪৭ সালে রেখে গিয়েছিল, মার্কিনীরা সেটা বজায় রেখেছিল ১৯৭১ সালে। বাংলায় একটা আদর্শিক উত্থানই কেবল এই নিয়মকে ভেঙ্গে ফেলার পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলতে পারতো। আর বাংলার শক্তিশালী ভূ-কৌশলগত অবস্থান তাদের হস্তগত হতো ঐ মুহুর্তেই; তখন এই প্রতিদ্বন্দ্বী আদর্শিক শক্তিকে মোকাবিলা করা পরাশক্তিদের জন্যে অত্যন্ত কঠিন হয়ে যেত। তাই পরাশক্তিরা এই এলাকায় আবারও একটি আদর্শিক শক্তির উত্থান চায় না।



যেহেতু বরাবরই এই এলাকা রাজনৈতিকভাবে এবং অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে ছিল, তাই এখানকার মানুষের মাঝেও রাজনৈতিক চিন্তা বেশি দেখা যেত। এই রাজনৈতিক সচেতনতাকে আদর্শিক শক্তিরা কাজে লাগাতে পারে। যেখানে কোন ধরনের রাজনৈতিক সচেতনতা নেই, সেখানে আদর্শিক রাজনীতিতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করাটা কঠিন, কারণ এই রাজনীতির ধরণটা বেশ কিছুটা sophisticated, যেখানে চিন্তা করার ক্ষমতার অগ্রাধিকার থাকে। বাংলার মানুষ চিন্তার দিক থেকে এগিয়ে ছিল; তাই বিভাজনটা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটা মানুষের দেহ থেকে হাত-পা এমনকি যৌনঙ্গ আলাদা করে ফেললেও তার বেঁচে থাকার ক্ষমতা রয়ে যায়। কিন্তু মাথা যদি দেহ থেকে আলাদা করে ফেলা হয়, তাহলে তার দেহ থেকে আত্মা চলে যায়। বাংলা ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের মাথা। এটা ছাড়া অন্য যেসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থাকবে, সেগুলিকে অন্য কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে খুব সহজেই – কারণ চিন্তা করার মাথাখানা তো কয়েক ভাগ করে ফেলা হয়েছে।



দুই পরমাণু হাইড্রোজেনকে ধরে রাখে এক পরমাণু অক্সিজেন



বাংলার ব্যাপারটাকে রসায়নে পানির অণুকে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, সেভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। পানির এক অণুতে অক্সিজেনের একটি পরমাণুর সাথে দু’টি হাইড্রোজেন পরমাণু থাকে। অক্সিজেন পরমাণুটি ছাড়া হাইড্রোজেন পরমাণুদু’টি কিছুই করতে পারে না। অক্সিজেন পরমাণুটিই হলো হাইড্রোজেনগুলির যোগসূত্র। এই হাইড্রোজেনের একটি পরমাণু হলো বাংলার ভূ-কৌশলগত অবস্থান আর আরেকটি হলো এর বিশাল জনগোষ্ঠী – এদেরকে আগলে রেখে একত্রিত করে অক্সিজেনের পরমাণু, অর্থাৎ আদর্শিক শক্তি। এরা আলাদা থাকলে পানি কখনোই তৈরি হয় না; আর পানি তৈরি হবার আগে হাইড্রোজেন পরমাণুদু’টি কখনোই বোঝে না যে এরা একত্রিত হলে পানি তৈরি হয়। বরং অক্সিজেনের অভাবে হাইড্রোজেনের পরমাণুগুলিকে অন্য যৌগরা তাদের নিজেদের কাজে ব্যবহার করে; তারা শুধু ব্যবহৃতই হয়ে যেতে থাকে।



বাংলায় পশ্চিমাদের (ব্রিটিশদের পরে মার্কিনীরা এই দায়িত্ব নিয়েছে) এই ব্যবস্থার রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে হিন্দু-মুসলিম বিভেদ। ব্রিটিশরা আসলে এখানে কি করেছিল? তারা শুধু বাংলার মানুষের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল যে “সমাজব্যবস্থা” মূল আলোচ্য বিষয় হওয়া উচিত নয়; মূল আলোচ্য বিষয় হওয়া উচিত “আমার গোষ্ঠী”র স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে কি-না। এভাবে ব্রিটিশরা বাংলার মানুষের জন্যে খেলার মাঠ তৈরি করে দিয়ে গেছে। এখানকার মানুষ সেই মাঠের নিয়মের ভেতরে চলে; আর মাঠে নেমে নিজেদের জাতি-গোত্র নিয়ে মারামারি করে। জার্মানির জন্যে প্রুশিয়া আর ভারতীয় উপমহাদেশের জন্যে বাংলা – উভয়টিই ডিভাইড এন্ড রুল-এর প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ। তবে যেটা একেবারে শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে – এই খেলাটা চলতে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত দুর্বলের দুর্বলতা প্রকাশ না পায়, আর শক্তিশালী তার শক্তির উতসকে খুঁজে না পায়।



[1] পড়ুন – ‘Myths and Facts: Bangladesh Liberation War’ by B.Z. Khasru (2010)

এবং ‘Blood Telegram: India’s Secret War in East Pakistan’ by Gary J Bass (2013)

Friday, 23 June 2017

হলিউডের ভবিষ্যৎ কোন দিকে?

২৪শে জুন ২০১৭



হলিউড হলো মার্কিন রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মার্কিন জনগণকে পথ দেখিয়ে যাবার কাজটা অনেক ক্ষেত্রেই হলিউড করেছে। ১৯৮০-এর দশকে ঠান্ডা যুদ্ধের শেষাংশের চাইতে অন্য কোন সময় সম্ভবত এই কাজ অতটা গুরুত্ব বহন করেনি। ১৯৯০-এও সেব্যাপারটা কিছুটা চলেছিল। সেসময়ের মার্কিন মুভি এবং টিভি সিরিয়ালগুলির দিকে তাকালে দেখা যায় যে হলিউড তখন সকলের কথাই চিন্তা করেছে। টম ক্রুজ এগিয়ে থাকা মার্কিন তরুণদের রক্তে আগুন দিয়েছিলেন তার Top Gun মুভির মধ্য দিয়ে। আরনল্ড শোয়ার্জনেগার ছিলেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল হিরো; সিলভেস্টার স্ট্যালোন, কার্ট রাসেল এবং ভ্যান ড্যামরাও ছিলেন ঐ ধাঁচেরই। ব্রুস উইলিস, মেল গিবসন আকর্ষণ করেছিলেন সমাজের ঐ লোকগুলিকে, যারা কিনা নিজেকে সমাজের জন্যে সপে দিচ্ছেন নিজে কিছু না পেয়েও, যেমন পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, সিকিউরিটি গার্ড – এধরনের লোকজন। এডি মার্ফি আকর্ষণ করেছিলেন কালোদের ঐ অংশটাকে, যারা কিনা কালোদের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণ নিয়ে ছিলেন সন্দিহান। আবার ডেনজেল ওয়াশিংটন এবং ওয়েসলি স্নাইপস কালো-সাদা দন্দ্ব কমাতে চেষ্টা করেছেন; তবে এরা আকর্ষণ করেছিলেন শহুরে sophisticated মানুষগুলিকে। পুলিশ নিয়ে অনেকগুলি মুভি তৈরি হয়েছিল; সামরিক বাহিনী নিয়ে মুভিগুলি ছিল কিছুটা নেগেটিভ – ভিয়েতনাম যুদ্ধের কালো ছায়াটা সমাজকে ঘিরে রেখেছিল তখন। সামরিক সার্ভিস নিয়ে ঐ নেগেটিভ মাইন্ডসেট থেকে উতড়ানোর চেষ্টা তারা করেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে তৈরি মুভিগুলি দিয়ে; এর মাঝে Saving Private Ryan-এর নাম হয়তো সর্বপ্রথমে আসবে। Forrest Gump-এর মাধ্যমে গ্রামাঞ্চল এবং ছোট শহরের পিছিয়ে থাকা মানুষদেরকে রাষ্ট্রের সাথে একত্রিত করার চেষ্টা করা হয়; আশা দেয়া হয় তাদেরকে। কেভিন কস্টনারের মুভিগুলিও ছিল সেরকমই। Hawaii Five-O তৈরি করা হয়েছিল হাওয়াই-এর জন্যে; Miami Vice তৈরি করা হয়েছিল মায়ামির জন্যে। ডেট্রয়েট এবং শিকাগোর জন্যেও তৈরি হয়েছিল মুভি এবং টিভি সিরিজ। মোট কথা, রাষ্ট্র সকলের কথাই চিন্তা করতো তখন। সেসময় মার্কিন চিন্তাচেতনা দুনিয়াকে নেতৃত্ব দিয়েছে একাই। রাষ্ট্রের চিন্তার সাথে জনগণের চিন্তা যাতে সাংঘর্ষিক না হয়, তার চেষ্টা তারা করতেন মোটামুটিভাবে। কারণ এক্ষেত্রে অমিল রাষ্ট্রকে দুর্বল করবে।

   

যেটা দেখার ব্যাপার হবে তা হলো, ২১ শতকে এসে হলিউড কি তৈরি করছে? হলিউডের মুভিগুলি এখন যতটা না আমেরিকান, তাই চাইতে বেশি গ্লোবাল। ব্রুস উইলিসের মুভি দেখলে বোঝা যায় যে মার্কিন রাষ্ট্রের জন্যে নিজেকে সঁপে দেবার মানুষদেরও বয়স বেড়ে গেছে। টম ক্রুজ এখনও চেষ্টা করে যাচ্ছেন শহুরে এগিয়ে থাকা মানুষগুলিকে সাথে রাখতে; তবে তাদেরও বয়স বাড়ছে। এখন এডভেঞ্চার-সুপার হিরো-টেকনো ফ্লিকগুলি যুক্তরাষ্ট্রের মানুষকে নিয়ে ভাবে না। একসময় মার্কিন জীবনযাত্রাকে দুনিয়ার কাছে নিয়ে গিয়েছিল হলিউড। তখন তাদের চিন্তাধারার ধার ছিল বলেই দুনিয়ার মানুষের অন্তরে মার্কিন মুল্লুকের জন্যে একটা আকর্ষণ তৈরি করতে পেরেছিল তারা। কিন্তু এখন মার্কিন যুদ্ধবাজিকে দুনিয়ার সামনে নিয়ে যায় হলিউড, যখন মার্কিন বোমার আঘাতে সারা দুনিয়া ক্ষতবিক্ষত। বাকি দুনিয়ার কাছেও হলিউডের এই অফারগুলি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে নিজ দেশে, অর্থাৎ খোদ যুক্তরাষ্ট্রে Forrest Gump-এর মতো মানুষগুলি এখন কি করবে? সে কি সুপার হিরো হতে পারবে কখনো? নাকি টম ক্রুজের মুভির মতো sophisticated চিন্তার অধিকারী?



মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য এখন এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে বারংবার চেষ্টা করেও হলিউড বোঝাতে পারছে না যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন যুদ্ধের মাঝে রয়েছে, যার জন্যে মার্কিন জনগণকে রাষ্ট্রের সাথে থাকতে হবে। যখন জনগণের বিরাট অংশের মাঝে চিন্তা ঢুকে গেছে যে তারা রাষ্ট্র দ্বারা অবহেলিত, তখন সেখানে কোন বার্তাই যে কানে যাবে না, এটাই তো স্বাভাবিক। উইল স্মিথ তার The Pursuit of Happiness মুভির মাধ্যমে দেশের পিছিয়ে থাকা জনগণকে আশা দেবার যে চেষ্টাটা করেছেন, তা এখন প্রতারণা হিসেবেই দেখবে বেশিরভাগ মানুষ। Rush Hour মুভিতে ক্রিস টাকারকে জ্যাকি চ্যানের সাথে ব্যবহার করা হয়েছে চীনের সাথে সম্পর্কোন্নয়নকে মাথায় রেখে; কালোদের জন্যে আলাদাভাবে কিছু করার জন্যে নয়। বরং এই মুভিতে কালোদেরকে মাথামোটা দেখিয়ে ছোটই করা হয়েছে।


মার্কিন চিন্তার চাকা এখন আর নিজে নিজে ঘুরছে না; ঠেলে নিতে হচ্ছে। হলিউডের অবস্থাও তা-ই। হলিউডে এখন টেকনলজি আছে; চিন্তা নেই। হলিউডে গ্লোব আছে; আমেরিকা নেই। বাকি বিশ্বের মানুষ এখন হলিউডের মাঝে যুদ্ধ দেখতে পাচ্ছে; মার্কিন জনগণ কোথাও যুদ্ধ দেখতে পাচ্ছে না। “We are 99”-এর কোন প্রত্যুত্তর হলিউডের কাছে নেই। বাকি বিশ্বকে জোর করে সন্ত্রাসী বানিয়ে যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরার চেষ্টাটা এখন হাস্যকরই বটে। নিজেদের দ্বন্দ্বকে [১] ধামাচাপা দেয়াটাই যে এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। হলিউড এখন কি দেখাবে সেটা এখন প্রশ্নবোধক চিহ্ন। কারণ মার্কিনীরা এখন আর জানে না যে আগামীকাল কি হবে। বোঝা যাচ্ছে যে চাবির গোছার মালিক পরিবর্তন হতে চলেছে। 



[১] ‘প্রশ্নের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা’, সাম্প্রতিক দেশকাল, ১লা সেপ্টেম্বর ২০১৬

‘ওবামার যুদ্ধগুলো লড়বে কে?’, সাম্প্রতিক দেশকাল, ১৯ জানুয়ারী ২০১৭

‘যুক্তরাষ্ট্র কি নিজের যঙ্গেই যুদ্ধরত?’, সাম্প্রতিক দেশকাল, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৭

Thursday, 27 April 2017

বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ওভারসীজ ট্রেনিং কমান্ড গড়ার সময় এসেছে

২৭শে এপ্রিল ২০১৭

বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের সৈন্যদের শান্তিরক্ষী মিশনে অংশগ্রহণের মাঝে দিয়ে বেশকিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়েছে বটে, তবে সেই অপারেশনগুলি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সীমিত অবদানই রাখবে। কারণ শান্তিরক্ষী মিশনের লক্ষ্য বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর প্রভাব বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রভাব বৃদ্ধিতে বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষী মিশনে অংশগ্রহণ বড় ভূমিকা রাখবে না। সত্যিকার অর্থে, এধরনের প্রভাব বৃদ্ধি যাতে না হয়, জাতিসংঘ সেটা লক্ষ্য রাখে। কাজেই বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে শান্তিরক্ষী মিশনের বাইরেও অপশন খুঁজতে হবে।


বাংলাদেশের অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক সক্ষমতার বৃদ্ধির সাথে সাথে বিশ্বের কাছে বাড়ছে বাংলাদেশের সন্মান, প্রতিপত্তি, প্রভাব। এর মাঝে যে ব্যাপারটি বড় একটি ভূমিকা রাখে তা হলো সামরিক সক্ষমতা। এই সক্ষমতা বৃদ্ধিতে রাষ্ট্রের বর্তমান প্রচেষ্টা দৃশ্যমান। বাংলাদেশের সাবমেরিন ক্রয়ের সাথে সাথে সক্ষমতা তৈরির নীতির জানান দেয়া হয়েছে মাত্র। তবে সাবমেরিনের এই উপাখ্যান দরকার ছিল পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশের নামকে জাহির করার। যদিও এই জাহির করার মাঝে একটি কালো দাগ পড়েছে ভারতের সাথে সামরিক সমঝোতা করার মাঝ দিয়ে। তথাপি সক্ষমতা বৃদ্ধির এই প্রচেষ্টা রাষ্ট্রের চিন্তাশীল মহল অব্যাহতই রাখতে চান, এবং একইসাথে ভারতের প্রভাবকে নিষ্ক্রিয় দেখার ইচ্ছাই এক্ষেত্রে প্রবল। ভারতের প্রভাবকে নিষ্ক্রিয় করার ক্ষেত্রে একটি প্রধান চিন্তা হবে বাংলাদেশের প্রভাবকে বৃদ্ধি করা। এই প্রভাব বৃদ্ধি ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে জাকার্তায় আইওআরএ শীর্ষ বৈঠকে, ঢাকায় আইপিইউ সন্মেলনে, কসোভোকে স্বীকৃতির মাঝ দিয়ে, এবং এশিয়া-আফ্রিকা-দক্ষিণ আমেরিকায় কূটনৈতিক এবং বাণিজ্যিক কর্মকান্ডকে ভিন্ন উচ্চতায় নেবার মাধ্যমে। এখান এই প্রভাবের মাঝে সামরিক সক্ষমতাকে ‘ফিট’ করার পালা।

বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের সৈন্যদের শান্তিরক্ষী মিশনে অংশগ্রহণের মাঝে দিয়ে বেশকিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়েছে বটে, তবে সেই অপারেশনগুলি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সীমিত অবদানই রাখবে। কারণ শান্তিরক্ষী মিশনের লক্ষ্য বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর প্রভাব বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রভাব বৃদ্ধিতে বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষী মিশনে অংশগ্রহণ বড় ভূমিকা রাখবে না। সত্যিকার অর্থে, এধরনের প্রভাব বৃদ্ধি যাতে না হয়, জাতিসংঘ সেটা লক্ষ্য রাখে। কাজেই বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে শান্তিরক্ষী মিশনের বাইরেও অপশন খুঁজতে হবে।
   
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল নাইজেরিয়া সফরের ছবি। বাংলাদেশ পৃথিবীতে বন্ধু খোঁজে। আর সেকারণেই আফ্রিকার বহু দেশে বাংলাদেশের বন্ধু তৈরি হয়েছে, যেখানে অনান্য অনেক দেশ নির্যাতকের তকমা নিয়ে আফ্রিকা ছাড়ছে। বাংলাদেশের বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক এবং সামরিক সক্ষমতা গড়াটা রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা গড়ার সাথে সম্পর্কিত। আর এখানেই আবারও আসছে সামরিক প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞতার কথা। বাংলাদেশের বন্ধুত্বের নীতির সাথে এর সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। বন্ধুর সাথে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অভিজ্ঞতার বিনিময় – এটাই হতে পারে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মূলমন্ত্র।


বন্ধুর সাথে প্রশিক্ষণ – নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সহযোগিতার উত্তম ক্ষেত্র


বাংলাদেশ পৃথিবীতে বন্ধু খোঁজে। আর সেকারণেই আফ্রিকার বহু দেশে বাংলাদেশের বন্ধু তৈরি হয়েছে, যেখানে অনান্য অনেক দেশ নির্যাতকের তকমা নিয়ে আফ্রিকা ছাড়ছে। বন্ধু বন্ধুর বাড়িতে ঢোকে দরজা দিয়ে; কারণ বন্ধু বন্ধুর জন্যেই দরজা খুলে দেয়। চোর বা ডাকাত বাড়িতে ঢোকে সিঁদ কেটে। চোরের তাই দরকার হয় সিঁদ কাটা যন্ত্রপাতির। বাংলাদেশের সেধরণের যন্ত্রপাতির দরকার নেই। বরং বন্ধুত্ব প্রগাঢ় হয়, এমন জিনিসই বাংলাদেশ সাথে নেবে। বন্ধুর কাছ থেকে বন্ধু কিছু পায়; চোরের কাছ থেকে নয়। বরং চোর মানুষের কাছ থেকে জিনিস কেড়ে নেয়। বাংলাদেশের বন্ধুরাও বাংলাদেশের কাছ থেকে কিছু পাবে; তাই তারাও বাংলাদেশের বন্ধু হতে চাইবে। বাংলাদেশ সামরিক দিক থেকে প্রশিক্ষণকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যা সারা বিশ্বের কাছে একটি উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর প্রফেশনালিজম বাকি দুনিয়ার মানুষ দেখেছে বিভিন্ন সময়ে। আর সেকারণেই পৃথিবীর বহু দেশের সামরিক অফিসাররা এখানে আসে প্রশিক্ষণের জন্যে। এই একই ইমেজটা বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী ধরে রেখেছে বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষী মিশনে। তবে এখন এই শান্তিরক্ষী মিশনের মাঝে আটকে না থেকে অভিজ্ঞতা এবং প্রফেশনালিজমকে পুঁজি করে বাকি বিশ্বের কাছে বন্ধুত্বের বাণী পৌঁছে দিতে হবে। আর এক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ হবে উত্তম একটি সহযোগিতার ক্ষেত্র। বিশ্ব পরিসরে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতার প্রভাবকে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে গেলে যে বিষয়গুলি বেশি গুরুত্ব পাবে, তার মাঝে থাকবে প্রশিক্ষণ।

বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী নিজ দেশে অন্য দেশের সেনাদের প্রশিক্ষণ দেয়। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় দেশের মাটিতে নিজেকে আটকে রাখাটা দূরদর্শিতার পরিচায়ক নয়। বাংলাদেশের নিরাপত্তা এখন শুধু ১৯৪৭-এ ব্রিটিশদের নির্ধারণ করে দেয়া ১ লক্ষ ৪৪ হাজার বর্গ কিলোমিটারের মাঝে নয়। যখন প্রায় কোটিখানেক বাংলাদেশী দুনিয়ার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে, তখন এদেশের সশস্ত্র বাহিনীর দেশে বসে বসে ভাববার সময় নেই। বাংলাদেশের হাজারো সৈন্য এখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে; বিশেষ করে আফ্রিকায়। সুতরাং নিরাপত্তার সংজ্ঞা নিয়ে ভাববার সময় এখন এসেছে; নিরাপত্তা-সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞতা নিয়েও ভাববার সময় এসেছে। বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ের নিরাপত্তা দেবার মতো সক্ষমতা বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর থাকতে হবে। নাহলে রাজনৈতিক-কূটনৈতিক বুলি ফাঁপা ঠেকবে। ইয়েমেনে যুদ্ধ শুরুর পর সেই দেশ থেকে বাংলাদেশীদের সরিয়ে আনার জন্যে ভারতের (যাকে কিনা শত্রু রাষ্ট্র জ্ঞান করে দেশের বেশিরভাগ জনগণ) দ্বারে ধর্ণা দিতে হয়েছে, যা কিনা বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে উন্নত করেনি, বরং আরেকটি রাষ্ট্রের কাছে ঋণগ্রস্ত করে কূটনৈতিকভাবে দেশকে দুর্বল করেছে। কাজেই বাংলাদেশের বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক এবং সামরিক সক্ষমতা গড়াটা রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা গড়ার সাথে সম্পর্কিত। আর এখানেই আবারও আসছে প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞতার কথা। বাংলাদেশের বন্ধুত্বের নীতির সাথে এর সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। বন্ধুর সাথে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অভিজ্ঞতার বিনিময় – এটাই হতে পারে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মূলমন্ত্র।

বন্ধু রাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের বাইরে প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পদ্ধতি নিয়ে সক্ষমতা-বিষয়ক কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। যেমন বাংলাদেশের বাইরে এই প্রশিক্ষণ কর্মকান্ড পরিচালনা করার মতো সক্ষমতা কি বাংলাদেশের আছে? উত্তরে বলতে হবে যে অবশ্যই আছে। তবে একইসাথে এটাও বলতে হবে যে এই সক্ষমতা যথেষ্ট নয়। এই সক্ষমতাকে পরবর্তী উচ্চতায় নিতে কিছু সাংগঠনিক পরিবর্তন দরকার। যেমন, বাংলাদেশের বাইরে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্দেশ্যে কিছু ইউনিট গঠন করে সেগুলিতে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের পোস্টিং দেয়া যেতে পারে। এধরণের একটি ইউনিট সব বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত হতে পারে। একটি ‘ওভারসীজ ট্রেনিং কমান্ড’এর অধীনে নিম্নোক্ত কিছু ইউনিট গঠন করা যেতে পারে –
  
সেনাবাহিনীর একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ইউনিট থাকা উচিত, যা কিনা একত্রে বাংলাদেশের বাইরে মোতায়েন করা যাবে। আর বেশ কিছুদিনের জন্যে মোতায়েনও থাকতে পারবে। এর মূল ইউনিটটি একটি ব্যাটালিয়ন হলেও এর সাথে বেশকিছু অনান্য ইউনিট থাকা উচিত, যা কিনা একে কমপক্ষে ব্রিগেড পর্যায়ের মর্যাদা দেবে। আর ইউনিটটির একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হবে এর মোবিলিটি। এর সকল কিছুই হবে হাইলি মোবাইল। তবে মোতায়েনের এলাকার উপর ভিত্তি করে এর কম্পোজিশন পরিবর্তিত করা যেতে পারে।

সেনা ইউনিটঃ

সেনাবাহিনীর একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ইউনিট থাকা উচিত, যা কিনা একত্রে বাংলাদেশের বাইরে মোতায়েন করা যাবে। আর বেশ কিছুদিনের জন্যে মোতায়েনও থাকতে পারবে। এর মূল ইউনিটটি একটি ব্যাটালিয়ন হলেও এর সাথে বেশকিছু অনান্য ইউনিট থাকা উচিত, যা কিনা একে কমপক্ষে ব্রিগেড পর্যায়ের মর্যাদা দেবে। আর ইউনিটটির একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হবে এর মোবিলিটি। এর সকল কিছুই হবে হাইলি মোবাইল। তবে মোতায়েনের এলাকার উপর ভিত্তি করে এর কম্পোজিশন পরিবর্তিত করা যেতে পারে। এখানে ইউনিটের সংখ্যা সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

এই ইউনিটে থাকতে পারে -

১। একটি পদাতিক ব্যাটালিয়ন

২। মেকানাইজড ইউনিট (বিটিআর-৮০ এপিসি – ২০টি এবং অতোকার কোবরা এপিসি – ১২টি)

৩। আর্টিলারি ইউনিট (ডব্লিউএস-২২ রকেট লঞ্চার – ৪টি, নোরা বি-৫২ হাউইটজার – ৬টি এবং এসএলসি-২ রাডার – ১টি)

৪। এয়ার ডিফেন্স ইউনিট (একটি এফএম-৯০ ইউনিট)

৫। ট্রান্সপোর্ট ইউনিট (২০টি ট্রাক, ২০টি টেকনিক্যাল। সাথে এটিজিম থাকা উচিত।)

৬। ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিট (সাথে মাইন ক্লিয়ারেন্স এবং রিভার ক্রসিং ইকুইপমেন্ট থাকতে পারে)

৭। সিগনালস ইউনিট (স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন সহ)

৮। মেডিক্যাল ইউনিট

৯। মেইনটেন্যান্স ইউনিট

১০। প্যারাকমান্ডোদের একটি ডিটাচমেন্ট

১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময়ের ছবিতে ব্রিটিশ রয়েল নেভির কনটেইনার জাহাজ 'এটলান্টিক কনভেয়র'এর ডেকের উপরে বিমানের সারি দেখা যাচ্ছে। এরকম জাহাজ ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম অনেক দূরে পরিবহণ করা সম্ভব।

  নৌ ইউনিটঃ

এর প্রধান কাজ হবে সেনা এবং বিমান ইউনিটসমূহকে পরিবহণ করা এবং পরিবহণ করার ও বাংলাদেশের বাইরে অবস্থানের সময় সমুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একইসাথে বন্ধুদেশের নৌবাহিনী এবং কোস্টগার্ডের সাথে প্রশিক্ষণে অংশ নেয়া। এখানে সাতটি জাহাজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই ইউনিট এর চাইতে ছোট বা বড় হতে পারে। যে জাহাজগুলি এখনও বাংলাদেশের নেই, সেগুলি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেয়া হয়েছে কিছু উদাহরণের মাধ্যমে। এখানে এই নৌ ইউনিটটি বন্ধু দেশের বন্দরের উপরে নির্ভর করবে; অর্থাৎ বন্ধুর বাড়িতে ঢোকার পথ হলো বন্ধুই দরজা খুলবে। এখানে এমন কোন ইউনিট থাকবে না, যা কিনা বন্ধুর বাড়ির জানালার সিঁদ কেটে ঢোকার মতো মনে হয়।

এই ইউনিটে থাকতে পারে -

১। একটি ফ্রিগেট (সাথে একটি হেলিকপ্টার থাকলে সবচাইতে ভালো; না থাকলে অন্য কোন ইউনিটে হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করতে হবে)

২। একটি এলপিসি (দুর্জয়-ক্লাস)

৩। একটি ওপিভি (কোস্ট গার্ডের সাদা রঙের একটি জাহাজ এখানে বেশি মূল্যবান হবে)

৪। একটি ট্রুপ শিপ (১,০০০ ধারণক্ষমতা সম্পন্ন একটি জাহাজ, যা বাণিজ্যিকভাবে কিনে নিজেদের প্রয়োজনে পরিবর্তন করে নেয়া যেতে পারে। এতে অবশ্যই ১,০০০ মানুষের কমপক্ষে তিন সপ্তাহ থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। হেলিপ্যাড এবং স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন অতি দরকারী ব্যাপার হবে। উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রাক্তন জাহাজ বিএনএস শহীদ সালাহউদ্দিন-এর নাম বলা যেতে পারে, যদিও এখন এর চাইতে আরও আপডেটেড জাহাজ দরকার হবে।)

৫। একটি কনটেইনার শিপ (১৬০ থেকে ১৮০ মিটারের মাঝে, যা কিনা চট্টগ্রাম বন্দরে ঢুকতে পারে এবং আফ্রিকার বেশিরভাগ বন্দরে ঢুকতে পারবে। এটিকে বিমান এবং অনান্য সরঞ্জামাদি পরিবহণে ব্যবহার করা হবে। বাণিজ্যিকভাবে কিনে এটাকে এমনভাবে পরিবর্তন করতে হবে যাতে ডেকের উপরে বিমান বহণ করা যায়। মোটামুটি ১৪-১৫টা বিমান বহণ করার মতো সক্ষমতা থাকলে এটা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। কিছু অংশ হেলিপ্যাডের জন্যে খোলা রাখতে হবে। এক্ষেত্রে উদাহরণ হবে ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময়ে ব্রিটিশ রয়াল নেভির ব্যবহৃত ২১২ মিটার লম্বা এবং ১৫,০০০ টনের ‘আটলান্টিক কনভেয়র’ এবং ‘আটলান্টিক কজওয়ে’, যেগুলির ডেকের উপরে করে ২৪ থেকে ২৮টি বিমান নেয়া হয়েছিল ফকল্যান্ডে।)

ব্রিটিশ রয়েল নেভির 'পয়েন্ট-ক্লাস'-এর রো-রো ফেরি, যা কিনা বেশ কয়েক'শ গাড়ি বহনে সক্ষম। এরকম জাহাজে একটি সামরিক ইউনিটের প্রায় সকল গাড়িই বহুদূর পর্যন্ত বহন করা সম্ভব।

 ৬। একটি রো-রো ফেরি (বাণিজ্যিকভাবে কিনে এটাকে নিজেদের প্রয়োজনে পরিবর্তন করে নেয়া যাবে। সামরিক গাড়ি এবং সরঞ্জাম এই ফেরি বহণ করবে। এটার আকারও ১৬০ থেকে ১৮০ মিটারের মতো হওয়া উচিত বন্দর সুবিধা নেবার জন্যে। উদাহরণস্বরূপ রয়াল নেভির ‘পয়েন্ট-ক্লাস’এর কথা বলা যেতে পারে। ১৯৩ মিটার এবং ২৩,০০০ টনের এই জাহাজগুলি ১৩০টি সাঁজোয়া যান এবং ৬০টি ট্রাক বহণ করতে পারে।)

৭। একটি সাপ্লাই জাহাজ (পথে জ্বালানি বা অন্য কোনকিছুর সরবরাহের ঘাটতি পূরণ করতে পারার মতো। তবে পুরো পথের সরবরাহ নিশ্চিতের দরকার নেই। বাংলাদেশের জাহাজ পৃথিবীর বেশিরভাগ বন্দরেই “ওয়েলকাম”)

৮। স্পেশাল ফোর্স সোয়াডস-এর একটি ডিটাচমেন্ট (সাথে হাই-স্পিড বোট থাকা উচিত।)


আফ্রিকার কঙ্গোতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সি-১৩০ পরিবহণ বিমান। বাংলাদেশের বাইরে প্রশিক্ষণ মিশনে বিমান থাকাটা অবশ্য দরকারি।


বিমান ইউনিটঃ

বিমান ইউনিটের মাঝে সব ধরনের বিমানই রাখা হয়েছে। প্রশিক্ষণ সকল ক্ষেত্রেই দরকার; তাই বিমানের ধরনের ক্ষেত্রেও তা-ই হওয়া উচিৎ। সংখ্যার দিক থেকে একটা ধারণা এখানে দেয়া হয়েছে। মনে রাখতে হবে যে এখানে যে সংখ্যা বলা হবে, তা কিন্তু পরিবহণও করতে হবে।

এই ইউনিটে থাকতে পারে -

১। একটি ফাইটার ইউনিট (এফ-৭বিজি – ৪টি এবং এফ-৭বিজিআই ৪টি)

২। একটি ট্রান্সপোর্ট ইউনিট (এলইটি-৪১০ – একটি। এটি নিজ শক্তিতে উড়ে গন্তব্যে যাবে, যদিও বাকিরা যাবে জাহাজে।)

৩। হেলিকপ্টার ইউনিট (এমআই-১৭১ – ৪টি এবং আগুস্টা এ-১০৯ – ২টি)

৪। ড্রোন ইউনিট (অবজারভেশন মিশনের জন্যে একটি ড্রোন ইউনিট অবশ্যই থাকা উচিত)

৫। রাডার ইউনিট (একটি এয়ার সার্চ রাডার গ্রাউন্ডে বসানোর জন্যে এই কমান্ডে থাকা উচিত)

৬। মেইনটেন্যান্স ইউনিট

৭। এয়ারবেইস ইউনিট (এরকম ইউনিট বাংলাদেশ আফ্রিকার একাধিক দেশে মোতায়েন করেছে। এরকমই আরেকটি ইউনিট এই কমান্ডে থাকতে পারে।)


কোস্ট গার্ডের সাদা রঙের একটি জাহাজ ওভারসীজ ট্রেনিং-এ খুবই মূল্যবান হবে। ‘ওভারসীজ ট্রেনিং কমান্ড’এর মাধ্যমে এরকম মিশনে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা এবং প্রফেশনালিজম যেমন আরও উন্নত হবে, তেমনি বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের বন্ধুর সংখ্যা বাড়বে। একইসাথে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির উন্নয়ন হবে এবং বিশ্বব্যাপী প্রভাবও বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। শক্তিশালী বাংলাদেশ শুধু কাগজে-কলমে থাকলেই হবে না, বাস্তব জীবনে দেখাতে হবে। আর সেক্ষেত্রে সামরিক সক্ষমতা একটি অপরিহার্য প্রয়োজন।


উদাহরণ হিসেবে কয়েকটি রাষ্ট্রের কথা বলা যেতে পারে, যাদের সাথে বন্ধুপ্রতীম প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞতা আদান-প্রদান হতে পারে; যেমন – শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, তাঞ্জানিয়া, কেনিয়া, সোমালিয়া, মোজাম্বিক, নাইজেরিয়া, সিয়েরা লিওন, ইত্যাদি। দূরত্ব হিসেবে এধরনের প্রশিক্ষণ মিশনের দৈর্ঘ্য নির্ধারিত হতে পারে। ‘ওভারসীজ ট্রেনিং কমান্ড’এর মাধ্যমে এরকম মিশনে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা এবং প্রফেশনালিজম যেমন আরও উন্নত হবে, তেমনি বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের বন্ধুর সংখ্যা বাড়বে। একইসাথে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির উন্নয়ন হবে এবং বিশ্বব্যাপী প্রভাবও বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। শক্তিশালী বাংলাদেশ শুধু কাগজে-কলমে থাকলেই হবে না, বাস্তব জীবনে দেখাতে হবে। আর সেক্ষেত্রে সামরিক সক্ষমতা একটি অপরিহার্য প্রয়োজন।