Saturday, 7 July 2018

ব্রিটেন যেভাবে ব্রাজিলের জন্ম দিয়েছিল


ব্রাজিলের প্রথম পতাকা - ১৮২২ সাল। রাজা পেদ্রোর অধীনে ব্রাজিলের এই পতাকার সবুজ এবং হলুদ রঙ রাজা এবং রানীর পর্তুগীজ এবং অস্ট্রিয়ান রাজবংশের রঙ থেকে নেয়া। ব্রাজিলের আজকের পতাকাতেও এই রঙ চলছে। 
 
৭ই জুলাই ২০১৮

ব্রাজিল বিশ্ব মানচিত্রের বড় একটি দেশ। আমাজন নদী এবং আমাজন জঙ্গলের দেশ ব্রাজিল। ৮৫ লক্ষ বর্গ কিঃমিঃ-এর চেয়েও বড় ব্রাজিলের এলাকা, যা প্রায় ৫৮টা বাংলাদেশের সমান! ২১ কোটির মতো এর জনসংখ্যা, যা পৃথিবীর ষষ্ঠ বৃহত্তম জনবহুল দেশ। ২,১৪০ বিলিয়ন ডলারের এর অর্থনীতি, যা পৃথিবীর অষ্টম বৃহত্তম। তবে ১০,২২৪ মার্কিন ডলারের মাথাপিছু আয় অনেক দেশের চাইতেই কম। ৫ কোটিরও বেশি মানুষ সেখানে দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে। তবুও ব্রাজিল প্রযুক্তিগত দিক থেকে বেশ এগিয়ে। দেশটি পৃথিবীর নবম বৃহত্তম গাড়ি প্রস্তুতকারী দেশ। এর প্রতিরক্ষা ইন্ডাস্ট্রির খ্যাতি রয়েছে বিশ্বব্যাপী। ব্রাজিল পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম হাল্কা অস্ত্র রপ্তানিকারক। ব্রাজিলের বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এমব্রায়ার বিমান তৈরি করে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার আয় করে। ব্রাজিলের সামরিক বাহিনীর সদস্যসংখ্যা ৩ লাখের কিছু বেশি। তবে রিজার্ভ ১৩ লাখেরও বেশি। ২৯ বিলিয়ন ডলারের সামরিক বাজেট পৃথিবীর ১১ বৃহত্তম। ৬০ হাজার নাবিকের ব্রাজিলিয়ান নৌবাহিনী পৃথবীর সবচাইতে বড় নৌবাহিনীগুলির একটি। ফ্রিগেট-কর্ভেট-ওপিভি মিলিয়ে এসকর্ট জাহাজ রয়েছে ১৪টা, সাবমেরিন ৫টা, বড় আকারের উভচর যুদ্ধজাহাজ ৫টা। ৭৭ হাজার সেনার বিশাল বিমান বাহিনীতে স্বল্প ক্ষমতার ৯০টা হাল্কা ফাইটার এবং ৩১টা প্রপেলার কাউন্টার ইন্সারজেন্সি বিমান ছাড়া বাকিটা মূলত ১৩০টা পরিবহণ বিমান, ৯৪টা হেলিকপ্টার এবং ১৭৫টা প্রশিক্ষণ বিমান।

এতবড় দেশ; এতবড় অর্থনীতি; প্রযুক্তিগত দিক থেকে উন্নত হওয়া সত্ত্বেও বিশ্ব রাজনীতিতে ব্রাজিলের নাম এতো কম শোনা যায় কেন? হ্যাঁ, ‘ব্রিকস’ নিয়ে কিছুদিন বেশ হৈচৈ হলেও সেটা এখন ফাইলবন্দীই বলা চলে। ব্রাজিলের এই বাস্তবতা বুঝতে ব্রাজিলের জন্মের দিকে তাকাতে হবে। তার জন্মই বলে দেয় যে ব্রাজিল কি করবে। ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকায় অবতরণের পর থেকে ইউরোপিয়রা আমেরিকায় নিজেদের দখলদারিত্ব কায়েমের যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিল, তার মাঝে অগ্রগামী ছিল পর্তুগীজরা। তারা দক্ষিণ আমেরিকায় বর্তমান ব্রাজিলের উপকূলে উপনিবেশ স্থাপন করেছিল। ১৮০৭ সাল পর্যন্ত ব্রাজিল পর্তুগালের একটা বড় উপনিবেশের ভূমিকাই পালন করেছে। তবে হিসেব পাল্টে যায় রাজা ষষ্ঠ জনের সময়কালে।

ষষ্ঠ জন (ষষ্ঠ জোয়াও) পর্তুগাল এবং ব্রাজিলের অধিকর্তা হন বটে, তবে ন্যাপোলিয়নের আবির্ভাবে তার ভাগ্যে উত্থান-পতন চলতে থাকে। ফরাসী-স্প্যানিসরা পর্তুগাল আক্রমণ করলে ব্রিটিশদের নিরাপত্তায় জন ব্রাজিলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। 
  

পর্তুগালের রাজা, নাকি ব্রাজিলের রাজা?

পর্তুগালের প্রিন্স ষষ্ঠ জন (ষষ্ঠ জোয়াও)-এর জন্ম ১৭৬৭ সালে। দেশ চালাচ্ছিলেন তার মা প্রথম মারিয়া। তবে ১৭৮৬ সাল থেকে রানী মারিয়ার মানসিক সমস্যা সকলের সামনে দৃশ্যমান হতে থাকে। সেই একই বছর তিনি তার স্বামী তৃতীয় পিটারকে হারান। ১৭৮৮ সালে মারিয়ার বড় ছেলে হোজে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলে জন হয়ে যায় সিংহাসনের পরবর্তী প্রার্থী। ১৭৯২ সালে পর্তুগীজ রাষ্ট্রীয় লোকজনের সিদ্ধান্তে ১৭ জন ডাক্তার একত্রে রানীকে রাজ্য চালানোর জন্যে মানসিকভাবে অযোগ্য ঘোষণা করেন। তারা জনকে ক্ষমতা নিতে বলে। ২৫ বছর বয়সে জন পর্তুগালের ‘প্রিন্স রিজেন্ট’ বা নায়েব উপাধি নিয়ে দেশ শাসন শুরু করেন।

তখন ফরাসী বিপ্লবের পরপর ইউরোপ অস্থির। ব্রিটেন ইউরোপে রাজতন্ত্রের পূনপ্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধ পরিকর; পর্তুগাল ও স্পেন তার সাথে রয়েছে। চতুর্দিকে যুদ্ধ চালাচ্ছে ফ্রান্সের রেভোলিউশনারি সরকার। ফ্রান্স-স্পেনের সীমান্তে তখন চলছে যুদ্ধ। ১৭৯৫ সালে স্পেন ফ্রান্সের সাথে যুদ্ধে হেরে গেলে ভূরাজনীতিতে বড়সড় পরিবর্তন হয়। স্পেন ফ্রান্সের সাথে শান্তি চুক্তি করে ফ্রান্সের দলে ভিড়ে গেলেও ব্রিটেনের সাথে সম্পর্ক খারাপ হতে পারে বলে পর্তুগাল চুক্তি করেনি; তারা ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের মাঝে নিরপেক্ষ থাকার নীতি নেয়। এই নীতি পর্তুগালকে বাঁচাতে পারেনি। ১৭৯৯ সালে ন্যাপোলিয়ন ফ্রান্সে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা নিলে পর্তুগালের উপর কালো ছায়া নেমে আসে। ন্যাপোলিয়ন স্পেনকে বাধ্য করেন পর্তুগালকে আল্টিমেটাম দিতে, যাতে পর্তুগালের ব্রিটেনের সংগ পরিত্যাগ করে। ১৮০১ সালে ফ্রান্সের সমর্থনে স্পেন পর্তুগাল আক্রমন করে আলোচনার টেবিলে বসাতে বাধ্য করে।

জন সকল দিক থেকে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। তার স্ত্রী কারলোটা জোয়াকিনা ছিলেন স্প্যানিস রাজবংশের। তিনি চাইছিলেন তার স্বামী জনকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজে সিংহাসন নিয়ে নিতে। ফ্রান্স এবং স্পেনের চাপের মুখে জন ব্রিটেনের সাথে গোপনে চুক্তি করেন। চুক্তি মোতাবেক ফ্রান্স-স্পেন যদি পর্তুগালে হামলা করে বসে, তাহলে ব্রিটিশরা পর্তুগালের রাজপরিবারকে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে ব্রাজিলে চলে যেতে সহায়তা করবে। ১৮০৭ সালের অক্টোবরে খবর আসে যে ফরাসী সেনাবাহিনী পর্তুগালের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ১৬ই নভেম্বর ব্রিটিশ রয়াল নেভির একটা স্কোয়াড্রন সাত হাজার সৈন্য নিয়ে লিসবন বন্দরে এসে পৌঁছায়। ফরাসী জেনারেল জঁ-আন্দোশে জুনো ৩০শে নভেম্বর লিসবন পৌঁছে দেখেন যে পর্তুগীজ রাজপরিবার তল্পিতল্পাসহ জাহাজে উঠে পালিয়েছে। পর্তুগীজ জনগণ এটা মেনে নিতে পারেনি যে তাদের নেতা এভাবে তাদের ছেড়ে যাবেন। ১৫টা জাহাজে বেশ কয়েক হাজার মানুষ গাদাগাদি করে উঠে রওয়ানা দেয়। এই সংখ্যা কত ছিল সেটা কেউ সঠিক বলতে না পারলেও সেটা ১৫ হাজার পর্যন্ত হতে পারে।

ষষ্ঠ জন-এর কোর্ট, রিও ডি জানেইরো, ব্রাজিল। জন তল্পিতল্পা সহ ব্রাজিলে পালিয়ে যাবার পর রাষ্ট্র পরিচালনার সকলকিছু ব্রাজিলের মাটিতে তৈরি করতে হয়েছিল। ১৩ বছর রিও থেকে শাসন করার পরে জন পর্তুগালে চলে গেলেও নতুন রাষ্ট্র ব্রাজিলের ভিত ততদিনে তৈরি হয়ে গিয়েছে।
  

ব্রাজিল – নতুন রাষ্ট্র তৈরির ভিত যেভাবে হলো

ব্রাজিল তখন ছিল পর্তুগীজ উপনিবেশ। এর মূল শহর রিও ডি-জানেইরো, যার জনসংখ্যা ছিল ৭০ হাজারের মতো। সেখানে রাজপরিবারসহ পুরো সরকারের সংকুলান হবার কোন অবস্থাই ছিল না। রাতারাতি শহরের বিরাট সংখ্যক বাড়িঘর দখল নিয়ে নেয়া হয়। রাজপরিবার এবং সম্ভ্রান্ত লোকজনের থাকার ব্যবস্থা করা হয় কোনরকমে। বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়ে রিও-তে। বহু অফিস, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাজার, ক্যান্টনমেন্ট ছাড়াও মিলিটারি একাডেমি, অপেরা হাউজ, মেডিক্যাল স্কুল, অস্ত্র কারখানা, প্রিন্টিং প্রেস, ইত্যাদি গড়ে উঠে। হঠাত উচ্চবংশীয় মানুষের ঢল আসায় দ্রব্যমূল্য বাড়তে থাকে হু-হু করে। তবে সবচাইতে বড় যে ব্যাপারটি হয় তা হলো, রিও যেখানে ছিল একটা ঔপনিবেশিক শহর, সেটা মুহুর্তের মাঝে হয়ে যায় একটা রাষ্ট্রের রাজধানী শহর। রিও-তে রাজধানী স্থানান্তর হওয়ায় সেখানে প্রায় সোয়া তিন লাখেরও বেশি ক্রীতদাসের আগমণ ঘটে। জন রিও-তে নেমেই ব্রাজিলের বন্দরগুলিকে ‘ওপেন’ ঘোষণা দেন, যার মাধ্যমে ব্রাজিলে ব্রিটিশ জাহাজের অবতরণ সহজ হয়ে যায়। রিও-তে জন-এর অবতরণের কারণেই ব্রাজিল পর্তুগাল থেকে আলাদা হবার জন্যে প্রস্তুত হয়। নতুন দেশের নামকরণ করা হয় ‘ইউনাইটেড কিংডম অব পর্তুগাল, ব্রাজিল এবং এলগার্ভেস’। বলাই বাহুল্য যে দেশের নামকরণ ব্রিটিশদের দ্বারা প্রভাবিত ছিল।


  
১৮০৭ সালে ন্যাপোলিয়নের ফ্রান্সের আক্রমণ থেকে রাজপরিবারকে রক্ষা করতে রাজা ষষ্ঠ জন তল্পিতল্পাসহ পর্তুগাল থেকে পালিয়ে যান। তাদের সহাহতা দেয় ব্রিটিশ রয়াল নেভি। ব্রাজিলের মাটিতে নেমেই জন ব্রিটেনকে বাণিজ্যিক এবং সামরিক সুবিধা দিতে থাকেন। একারণেই দক্ষিণ আমেরিকার স্প্যানিস উপনিবেশ ব্রিটিশরা ভেঙ্গে টুকরা টুকরা করলেও ব্রাজিলকে ভাঙ্গেনি। তবে ব্রাজিলকে পর্তুগাল থেকে আলাদা করে দক্ষিণ আমেরিকার সবচাইতে বড় রাষ্ট্র হিসেবে তৈরি করেছে।  


ব্রিটিশরা যেভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলো

একই সময়ে ব্রিটিশরা তখন আর্জেন্টিনাসহ দক্ষিণ আমেরিকায় বাকি স্প্যানিস উপনিবেশগুলিকে স্পেন থেকে আলাদা করার প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছিল। জন-এর স্প্যানিস স্ত্রী কারলোটা এবার আর্জেন্টিনায় স্প্যানিস উপনিবেশ নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু করেন এবং জনকে বাধ্য করেন উরুগুয়েতে যুদ্ধে (১৮১৭-১৮২১) অংশ নিতে। ব্রিটিশরা এসময়ে ব্রাজিলের সামরিক শক্তিকে ব্যবহার করে গায়ানার উপকূলের কিছু এলাকা দখল করে নেয় এবং ব্রাজিলের সাথে অযাচিত পদ্ধতিতে একচেটিয়া বাণিজ্য করে।

১৮১৫ সালে ন্যাপোলিয়নের পতন এবং ১৮১৬ সালে পর্তুগীজ রানী মারিয়ার মৃত্যুর পরে পর্তুগীজ রাষ্ট্রীয় লোকজন জনকে পর্তুগালে ফেরত আসার জন্যে চাপ দেয়। ১৮২১ সালের জুলাই মাসে জন ব্রাজিল থেকে লিসবনে এসে পৌঁছান। তিনি প্রায় ১৩ বছর ব্রাজিলে কাটান। তিনি এখন পর্তুগালের রাজা। ব্রাজিল ত্যাগের আগেই পর্তুগাল এবং ব্রাজিলে লিবারাল গোষ্ঠী ব্যাপক ক্ষমতা অর্জন করে এবং রাজার ক্ষমতা ব্যাপকভাবে কর্তন করে। সেসময় পর্তুগালের শাসনভার ন্যাস্ত ছিল ব্রিটিশ সামরিক অফিসার মার্শাল উইলিয়াম কার বেরেসফোর্ড। জন পর্তুগালে ফেরত যাবার পর প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশদের ছায়াতলেই তাকে থাকতে হয়েছে।

ব্রাজিলের রাজা পেদ্রোর অভিষেক অনুষ্ঠান, ১৮২২ সাল। পর্তুগালের সংবিধানের উপরে শপথ নিতে পেদ্রোকে বাধ্য করা হয়। পর্তুগালের সাথে ব্রাজিলের সম্পর্কও কর্তন হয়ে যায়নি অত সহজে। পেদ্রোর কন্যা পরবর্তীতে পর্তুগালের রানীও হন। তাদের সূত্রেই ১৯১০ সাল পর্যন্ত পর্তুগালের শেষ রাজার শাসন চলেছিল।
 

ব্রাজিল – নতুন দেশ, নতুন রাজা, নতুন পতাকা

জন তার ছেলে পেদ্রোকে রিও-তে রেখে আসেন এবং বলে আসেন যে, পেদ্রো যেন ব্রাজিলের রাজা হয়ে যান; নাহলে অন্য কেউ পেদ্রোর স্থান নিয়ে নেবে। ব্রাজিলের জনগণ এতদিন রাষ্ট্রের মূলে থাকার সুবিধা পেয়েছে। এখন তারা রাজার পর্তুগালে চলে যাওয়াটা ভালোভাবে দেখেনি। ব্রাজিলে সামরিক অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা মূলত সেনাবাহিনীর হাতে চলে যায়। তারা পেদ্রোকে রাজা হিসেবে রেখে ১৮২২ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর ব্রাজিলের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। পর্তুগালের সংবিধানের উপরে শপথ নিতে পেদ্রোকে বাধ্য করা হয়।

ব্রাজিলের জন্যে নতুন পতাকা নির্ধারিত হয়। পতাকার সবুজ জমিন এসেছে রাজা পেদ্রোর ব্রাগাঞ্জা বংশ (হাউজ অব ব্রাগাঞ্জা) থেকে আর হলুদ রঙ এসেছে পেদ্রোর স্ত্রী অস্ট্রিয়ার প্রিন্সেস মারিয়া লিওপোলডিনা-এর হ্যাপসবার্গ বংশ থেকে। ১৮৮৯ সালে ব্রাজিলিয়ান রিপাবলিক ঘোষণার আগ পর্যন্ত ব্রাজিলের এই পতাকাই থাকে। তবে ১৮৭০ সালে পতাকার মাঝের ১৯টি তারা থেকে ২০টি তারা করা হয় ব্রাজিলের রাজ্যের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে। ব্রাজিল রিপাবলিকের পতাকায় ২১টি তারা স্থান পায়, যা ১৯৬০ সাল পর্যন্ত একই থাকে। তবে ১৮৮৯ সালের নভেম্বরে কয়েকদিনের জন্যে আরেকটা পতাকার ডিজাইন আনা হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার আদলে তৈরি করা হয়েছিল। ‘ইউনাইটেড স্টেটস অব ব্রাজিল’এর সেই পতাকা প্রতিযোগিতায় টেকেনি; বরং সেই পুরোনো ব্রাজিল রাজের পতাকাকেই পরিবর্তন করে নিয়ে নতুন পতাকা আঁকা হয়। ব্রাজিলের জনগণের মূল এখনও সেই পর্তুগাল এবং অস্ট্রিয়া-সহ ইউরোপের বাকি দেশগুলি। ঊনিশ এবং বিংশ শতকে ইউরোপ থেকে বহু মানুষ ব্রাজিলে এসে বসবাস শুরু করেছে। তাদের আকর্ষণ করেছে ব্রাজিলের ইউরোপিয়ান ভিত। তাদের কাছে ব্রাজিল হয়ে ওঠে বিষুবীয় অঞ্চলের ইউরোপ। ব্রাজিলের পতাকায় কেউ কেউ মানচিত্র বসাতে চেয়েছিল। সেটা সফল না হলেও পতাকায় ‘সাউদার্ন ক্রস’ তারকামন্ডলী এঁকে দিয়ে বলে দেয়া হয়েছে যে, ব্রাজিলের উপস্থিতি শুধুমাত্র দক্ষিণ গোলার্ধেই থাকবে।

ব্রাজিল রিপাবলিকের পতাকা (১৮৮৯-১৯৬০ সাল)। এই পতাকায় তারার সংখ্যা ছিল ২১টি। পরবর্তীতে আরও দুইবার পতাকাতে পরিবর্তন আনা হয় ২২তম এবং ২৩তম প্রদেশের কারণে। তবে সবুজ এবং হলুদ বহাল রাখা হয়, যা ব্রাজিল রাজের রাজবংশের প্রতিনিধিত্ব করে। 
 

ব্রিটেন যেভাবে ব্রাজিল তৈরি করেছে

পর্তুগাল এবং অস্ট্রিয়া উভয়েই বেশিরভাগ সময়ে ব্রিটেনের সাথে থেকেছে। তারা হয় ফ্রান্স বা রাশিয়া বা জার্মান আক্রমণ থেকে নিজেদের বাঁচাতে ব্রিটেনের সাথে থেকেছে। ব্রিটেন ইউরোপে তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রান্সকে নিয়ন্ত্রণ করতে পর্তুগাল এবং অস্ট্রিয়াকে ব্যবহার করেছে। পরবর্তীতে জার্মানিকে নিয়ন্ত্রণ করতেও একই কাজ করেছে। ব্রাজিলের পর্তুগাল থেকে আলাদা হওয়াটা ব্রিটেনকেই সুবিধা দিয়েছে সবচাইতে বেশি। ন্যাপোলিয়ন ব্রিটেনের সাথে সারা বিশ্বে যুদ্ধে জড়িয়েছেন ঠিকই; তবে ব্রিটেনই এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পেরেছিল। ন্যাপোলিয়নের উত্থান ছিল এক ব্যক্তির উত্থান। স্পেনের সাথে যুদ্ধের সুবাদে পুরো ল্যাটিন আমেরিকার বাণিজ্যই ব্রিটেন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে। পর্তুগালের রাজাকে রিও-তে বসিয়ে আলাদা রাষ্ট্রের ভিত তৈরি করা, আর্জেন্টিনায় ব্রিটিশ সৈন্য নামিয়ে পুরো স্প্যানিস দক্ষিণ আমেরিকায় বিদ্রোহ উস্কে দেয়া, অস্ট্রিয়ার হ্যাপসবার্গ প্রিন্সেসের সাথে ব্রাজিলের হবু রাজা পেদ্রোর বিয়ের ব্যবস্থা করে ব্রিটেনের বন্ধু অস্ট্রিয়ার জনগণকে দক্ষিণ আমেরিকায় আসতে আগ্রহী করে তোলা – এগুলি সকলই ছিল সুপারপাওয়ার হিসেবে ব্রিটেনের কর্মকান্ড। ব্রাজিলে পর্তুগালের রাজা, স্পেনে জন্ম নেয়া পর্তুগালের রানী এবং অস্ট্রিয়ার প্রিন্সেসের আগমনের ফলে ব্রাজিলের জনসংখ্যা বাকি ল্যাটিন আমেরিকার চাইতে অনেক বেড়ে যায়। আরও এসেছে ইতালি এবং জার্মানি থেকে। ১৮৮০ থেকে ১৯৬৯-এর মাঝে মোটামুটি ৯০ বছরে পর্তুগাল, স্পেন, ইতালি এবং জার্মানি থেকে ৪১ লাখেরও বেশি লোক ব্রাজিলে এসেছে। এছাড়াও অন্যান্য দেশ থেকে এসেছিল সাড়ে ১০ লাখ মানুষ। ব্রাজিল হয়ে ওঠে ল্যাটিন আমেরিকার সবচাইতে জনবহুল দেশ। ব্রাজিল কোনভাবে ভেঙ্গে ছোটও হয়নি। অন্যদিকে স্প্যানিসদের অধীনে থাকা অঞ্চলগুলি অনেকগুলি দেশে বিভক্ত হয়ে যাওয়ায় সেগুলি অপেক্ষাকৃত ছোট দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়। আবার পর্তুগালের সাথে ব্রাজিলের সম্পর্কও কর্তন হয়ে যায়নি অত সহজে। পেদ্রোর কন্যা পরবর্তীতে পর্তুগালের রানীও হন। তাদের সূত্রেই ১৯১০ সাল পর্যন্ত পর্তুগালের শেষ রাজার শাসন চলেছিল।


১৮৮৯ সালের নভেম্বরে কয়েক দিনের জন্যে 'ইউনাইটেড স্টেটস অব ব্রাজিল'এর পতাকা। বলাই বাহুল্য যে এই পতাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার আদলে তৈরি করা। এই পতাকা ব্রাজিলকে নিয়ে ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ।


ল্যাটিন আমেরিকায় ব্রিটিশ-মার্কিন দ্বন্দ্ব

ল্যাটিন আমেরিকায় এই কর্মকান্ডের মাঝে ব্রিটেনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হতে থাকে ব্রিটেনের কাছ থেকে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কলম্বিয়া, পেরু, বলিভিয়া এবং ব্রাজিলে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট হতে থাকে, যা তাকে ব্রিটেনের সামনে দাঁড় করায়। পানামকে যুক্তরাষ্ট্র নিজ হাতে তৈরি করেছে পানাম খাল তৈরি করার নিমিত্তে। এই খালের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব এবং পশ্চিম উপকূলের মাঝে সামুদ্রিক যোগাযোগ স্থাপিত হয়। অন্যদিকে ব্রিটেন ক্যারিবিয়ান সাগরে কিছু দ্বীপ দখলে রেখে এই অঞ্চলের সমুদ্র বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে চেয়েছে। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিজেদের হাতে রেখে ম্যাজেলান প্রণালীর সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। চিলিকে নিজেদের অধীনে রেখে পুরো ল্যাটিন আমেরিকার উপরেই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা করেছে।



ব্রাজিলের জন্ম ব্রিটেনের নীতির মাঝ দিয়ে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তার বেশিরভাগ শক্তি হারিয়েছে বটে, তবে একেবারে মৃত হয়ে যায়নি। এখনও ব্রিটিশরা প্রভাবের জন্যে মার্কিনীদের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। ল্যাটিন আমেরিকার বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে ব্রিটিশ-মার্কিনীরা। ব্রাজিল আকারে বড় হলেও সুপারপাওয়ারের রাজনীতির শিকার। কারণ সুপারপাওয়ারের হাতেই তার জন্ম হয়েছিল প্রায় দু'শ বছর আগে। কিন্তু দু'শ বছর পরেও ব্রাজিল সুপারপাওয়ারের দিকেই চেয়ে থাকে। বিশ্বরাজনীতিতে ব্রাজিলের পদচারণা সুপারপাওয়ারের ইচ্ছার ব্যাতিরেকে নয়। 


আরও পড়ুনঃ
ভেনিজুয়েলা-কলম্বিয়া-ইকুয়েডরের পতাকা একইরকম কেন?
আর্জেন্টিনা কি পারবে?

Wednesday, 4 July 2018

ভেনিজুয়েলা-কলম্বিয়া-ইকুয়েডরের পতাকা একইরকম কেন?

ঊনিশ শতকে গ্র্যান কলম্বিয়া তৈরি হয় স্পেন থেকে আলাদা হয়ে। এরপরে গ্র্যান কলম্বিয়া ভেঙ্গে তৈরি হয় ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া এবং ইকুয়েডর। দেশগুলির পতাকায় মিল এতটাই যে, এদের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন আসাটা স্বাভাবিক। 


 ০৫ জুলাই ২০১৮
 
দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলি একসময় ছিল স্প্যানিস এবং পর্তুগীজ উপনিবেশ। পঞ্চদশ শতকের শেষে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের অভিযানের পর থেকে ঐ এলাকার মানুষগুলিকে প্রায় নির্মূল করে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকেরা সেখানে বসতি গড়ে। জনসংখ্যার পুরোটাই প্রকৃতপক্ষে ইউরোপিয়ান বংশোদ্ভূত। এদের ভাষা এবং সংস্কৃতি একই। তবুও অনেকগুলি দেশে বিভক্ত এই মহাদেশ। অনেকগুলি পতাকা; জাতীয় সঙ্গীত; জাতীয় প্রতীক। এই বিভক্তির কারণ খুঁজতে যেতে হবে অষ্টম শতাব্দীতে, যখন ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলি আলাদা হবার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
  
স্প্যানিস সামরিক অফিসার ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা ব্রিটিশদের সহায়তায় স্পেনের কাছ থেকে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলিকে আলাদা করার ব্যবস্থা করেন। তার কর্মকান্ডের মাধ্যমে সবচাইতে বেশি লাভবান হয়েছে তৎকালীন সুপারপাওয়ার ব্রিটেন। স্প্যানিসরা ফ্রাঞ্চিসকোকে ব্রিটিশ গুপ্তচর সন্দেহ করতো।


ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা – যিনি দক্ষিণ আমেরিকাকে স্পেন থেকে আলাদা করেন

১৭৫০ সালে ভেনিজুয়েলাতে জন্ম নেয়া স্প্যানিস সামরিক অফিসার ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা বহু দেশের বহু যুদ্ধে অংশ নেন। মার্কিন স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় স্প্যানিসরা সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্রিটিশদের কিছু উপনিবেশ বাগিয়ে নিতে চায়। ১৭৮১ থেকে ১৭৮৪ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এবং ক্যারিবিয় দ্বীপপুঞ্জে স্প্যানিস বাহিনীর অধীনে যুদ্ধে করেন ফ্রাঞ্চিসকো। ১৭৮১ সালে ফ্রাঞ্চিসকোকে ব্রিটিশ উপনিবেশ জামাইকাতে গোয়েন্দাগিরি করতে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি তার কর্মসম্পাদনের মাঝে ব্রিটিশ ব্যবসায়ী ফিলিপ অলউডের সাথে এক চুক্তিও করে ফেলেন। চুক্তি মোতাবেক ব্রিটিশদেরকে তিনি স্পেনের সাথে বাণিজ্যের আড়ালে স্পেনে যাবার একটা চ্যানেল খুলে দেন। স্প্যানিসরা পরবর্তীতে ফ্রাঞ্চিসকোকে গুপ্তচর আখ্যা দেয় এবং অবিশ্বাস করতে থাকে। ফ্রাঞ্চিসকো স্পেন এবং ফ্রান্সের এক যৌথ অপারেশনে অংশ নেন, যার উদ্দেশ্য ছিল ক্যারিবিয়ানে ব্রিটিশদের সবচাইতে শক্ত ঘাঁটি জামাইকাকে দখল করা। পুরো দলের মাঝে ফ্রাঞ্চিসকোরই ব্রিটিশদের সম্পর্কে সবচাইতে ভালো ধারণা ছিল, কারণ তাকে ব্রিটিশদের উপরে গোয়ান্দাগিরিতে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু এই অভিযান চলার মাঝেই কিভাবে যেন ব্রিটশরা আগেভাগে পরিকল্পনা জেনে ফেলে এবং আগেই আক্রমণ করে বসে; ভেস্তে যায় অভিযান। জামাইকা ব্রিটিশদের হাতেই থাকে। আভিযান ব্যর্থ হবার পর ফ্রাঞ্চিসকোর বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ আবারও গভীর হয়। ফ্রাঞ্চিসকো ১৭৮৩ সালের জুলাই মাসে স্প্যানিস কিউবা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান, এবং পরের বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করেন। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে তিনি জর্জ ওয়াশিংটন, হেনরি নক্স, থমাস পেইন, আলেক্সান্ডার হ্যামিল্টন, স্যামুয়েল এডামস এবং থমাস জেফারসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন।

ফ্রাঞ্চিসকো কি ব্রিটিশ গুপ্তচর ছিলেন?

১৭৮৫ সালে ফ্রাঞ্চিসকো লন্ডনে আসেন। সেখান থেকে মার্কিন দূতাবাসের এক সামরিক কূটনীতিবিদ কর্নেল উইলিয়াম স্টিফেন স্মিথের সাথে তিনি প্রুশিয়া যান সামরিক মহড়া দেখতে। পুরো ইউরোপ ঘুরে তিনি অনেকের সাথে বন্ধুত্ব করেন।স্প্যানিয়ার্ডরা সবসময়েই তার উপরে নজর রাখছিল। তারা ফ্রাঞ্চিসকোকে গ্রপ্তার করার চেষ্টাও করেছিল, কিন্তু শক্তিশালী বন্ধুরা ফ্রাঞ্চিসকোকে রক্ষা করে। ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা অনেকদিন থেকেই দক্ষিণ আমেরিকায় স্পেনের উপনিবেশের একটা বড় অংশের দায়িত্বে থাকা ‘ক্যাপ্টেন্সি জেনারেল অব ভেনেজুয়েলা’র কর্তৃত্ব নিতে এক পরিকল্পনা করেন। এই ক্যাপ্টেন্সির অধীনে বর্তমান ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া, পানামা, ইকুয়েডর এবং পেরুর বিরাট অঞ্চল ছিল। তিনি ১৭৯০ সালে প্রথম ব্রিটিশ রাজনীতিবিদের সাথে দক্ষিণ আমেরিকায় আলাদা রাষ্ট্র গঠনের চিন্তাটা আলোচনা করেন। তখন ব্রিটিশদের সাথে স্প্যানিয়ার্ডদের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিলো না। তবে দু’দেশের সম্পর্কে বসন্ত এসে গেলে এই প্রকল্পে ব্রিটিশরা আগ্রহ হারায়।

১৭৯১ থেকে ১৭৯৭ পর্যন্ত সময় ফ্রাঞ্চিসকো ফ্রান্সে কাটান এবং সেখানকার ফরাসী বিপ্লবে সরাসরি অংশ নেন। তিনি ফরাসি বিপ্লবের বিপক্ষে রাজতন্ত্রকামীদের সাথে থাকেন। একাধিকবার বিপ্লবীদের হাতে গ্রেপ্তার হবার পরেও তাকে নিয়ে কি করা হবে, সেটা ঠিক করতে না পেরে তাকে বারংবার ছেড়ে দেয়া হয়। ছাড়া পাবার পরেও তিনি তার কর্মকান্ড অব্যহত রাখেন এবং ১৭৯৬-৯৭ সালের মাঝে দু’দু’বার রাজতন্ত্রপন্থীদের পক্ষে অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেন। অবশেষে সকল চেষ্টা ভেস্তে গেলে ১৭৯৮ সালে গোপনে ব্রিটেনে পালিয়ে যান, যেখানে সবসময়ই তার নিরাপদ আশ্রয় আপেক্ষা করছিল। ব্রিটেন সবসময়েই ফরাসী বিপ্লবের বিরুদ্ধে রাজতন্ত্রীদের সহায়তা দিয়েছিল। আর ১৭৯৯ সাল থেকে ফরাসী বিপ্লব থেকে উত্থিত ন্যাপোলিয়ন আবির্ভূত হন ব্রিটেনের বিশাল শত্রু হিসেবে।

ল্যাটিন আমেরিকায় ফ্রাঞ্চিসকোর প্রথম অভিযান - যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা


তার দক্ষিণ আমেরিকার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ১৮০১ সালে ব্রিটিশদের সহায়তা চান ফ্রাঞ্চিসকো। স্পেন তখন ব্রিটেনের শত্রু দেশ, কেননা ১৭৯৬ থেকে ফ্রান্সের সাথে স্পেন হাত মিলিয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম পিট দ্যা ইয়াংগার ১৮০৫ সালে রিয়ার এডমিরাল হোম রিগস পপহ্যামকে দায়িত্ব দেন ফ্রাঞ্চিসকোর পরিকল্পনাটি খতিয়ে দেখার জন্যে। পপহ্যাম ব্রিটিশ নেতৃত্বকে বোঝান যে, দক্ষিণ আমেরিকায় স্প্যানিস উপনিবেশকে স্পেন থেকে আলাদা করতে গেলে ভেনিজুয়েলা নয়, বরং বর্তমান আর্জেন্টিনার বুয়েনস আয়ার্সের ফলাফল বয়ে আনার সম্ভাবনা বেশি। সেখানে ব্রিটিশ হামলা হলে স্প্যানিস নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ উস্কে দেয়া যাবে অপেক্ষাকৃত সহজে।

ফ্রাঞ্চিসকো এতে মনোক্ষুন্ন হলেন। তিনি তার পরিকল্পনা পাল্টে ১৮০৫-এর নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সরণাপন্ন হলেন। ফ্রাঞ্চিসকো মার্কিন প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন এবং পররাষ্ট্র সচিব জেমস ম্যাডিসনের সাথেও একান্ত বৈঠক করেন। যুক্তরাষ্ট্র ফ্রাঞ্চিসকোকে সরাসরি সহায়তা করতে অস্বীকৃতি জানান, কারণ ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তখনও পক্ষ নেয়নি। ফ্রাঞ্চিসকো থেমে যাননি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অর্থ এবং জনবল যোগাড় করায় মনোনিবেশ করেন, যা ব্যবহার করে তিনি ভেনিজুয়েলাতে সামরিক অপারেশনে যাবেন। দু’শ-এর মতো ভাড়াটে সৈন্য এ অভিযানে যেতে রাজি হয়। তার সাথে থাকে ফ্রাঞ্চিসকোর পুরোনো বন্ধু মার্কিন কর্নেল উইলিয়াম স্টিফেন স্মিথ। মার্কিন ব্যবসায়ী স্যামুয়েল ওগডেনের কাছ থেকে তিনি ২০টি কামানের একটা জাহাজ ভাড়া নেন; নাম দেন ‘লিয়্যান্ডার’। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ থেকে ফ্রাঞ্চিসকো আরও দু’টা জাহাজ সাথে নেন। এই সময়েই তিনি ভেনিজুয়েলার পতাকার ডিজাইন করে ১২ই মার্চ উত্তোলন করেন। পতাকাটা ছিল তিনটি রঙের সমান্তরাল দাগ – হলুদ, নীল এবং লাল। তবে ফ্রাঞ্চিসকোর মিশন সফল হলো না। ১৮০৬ সালের ২৮শে এপ্রিল ভেনিজুয়েলার উপকূলে অবতরণ করতে গিয়ে ফ্রাঞ্চিসকো স্প্যানিশ নৌবাহিনীর কাছে তার ক্যারিবিয়ান থেকে সংগৃহীত দু’টি জাহাজই হারান। ৬০ জন নাবিক বন্দী হয়, যাদের বিচারের পরে ১০ জনের মৃত্যুদন্ড দিয়ে মরদেহ কয়েক খন্ড করে ঝুলিয়ে রাখা হয়। ফ্রাঞ্চিসকো অবশ্য লিয়্যান্ডার-এ চড়ে প্রাণ নিয়ে পালান। তাকে পলায়নে সহায়তা দেয় ব্রিটিশ রয়াল নেভির যুদ্ধজাহাজ ‘লিলি’। ব্রিটিশরা ফ্রাঞ্চিসকোকে ব্রিটিশ উপনিবেশ বার্বাডোসে নিয়ে যায়, এবং ফাঞ্চিসকোকে আরেকবার সামরিক অভিযানে সহায়তা দিতে আগ্রহী হয়।

ফ্রাঞ্চিসকোর দ্বিতীয় অভিযান - যুক্তরাষ্ট্রের স্থানে ব্রিটেন

১৮০৬ সালের ২৪শে জুলাই ত্রিনিদাদের পোর্ট অব স্পেন থেকে ফ্রাঞ্চিসকোর নতুন অভিযানের শুরু হয়। তার যুদ্ধজাহাজ লিয়্যান্ডার-এর সাথে রয়েছে রয়াল নেভির ৪টা যুদ্ধজাহাজ। ফ্রাঞ্চিসকোর ভাড়াটে সেনারা এবং ব্রিটিশ নৌবাহিনীর নাবিকেরা উপকূলে নেমে কিছুদিন তাদের দখলের চেষ্টা চালিয়ে যান। কিন্তু স্প্যানিশ সৈন্যদের সংখ্যাধিক্যের কারণে অগাস্টের মাঝেই তিনি তার অভিযান গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন। এই ব্যর্থ অভিযানের পর যুক্তরাষ্ট্র সরকার ফ্রাঞ্চিসকোকে সহায়তা করার জন্যে কর্নেল উইলিয়াম স্মিথ এবং ব্যবসায়ী স্যামুয়েল ওগডেনের বিরুদ্ধে মামলা করে। অভিযোগ ছিল যে, তারা দস্যুতা করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরপেক্ষতাকে নষ্ট করেছেন। আদালতে হাজির হয়ে কর্নেল স্মিথ বীরদর্পে বলেন যে, তিনি এই অপারেশনে গিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন এবং পররাষ্ট্র সচিব জেমস ম্যাডিসনের নির্দেশে। এই রাজনীতিবিদেরা উভয়েই আদালতে যেতে অস্বীকৃতি জানান এবং ফলশ্রুতিতে স্মিথ এবং ওগডেন উভয়কেই নির্দোষ ঘোষণা করা হয়। আসলে এই অপারেশনটা প্রথমে ছিল মার্কিন। এরপর প্রথম ব্যর্থতার পর ব্রিটিশরা সেটার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলাতেই যতো বিপত্তির সৃষ্টি হয়। ভেনিজুয়েলাকে স্পেন থেকে আলাদা করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন উভয়েই সেটার নিয়ন্ত্রণ চাইছিল।


  
আর্জেন্টিনার প্রতিষ্ঠাতা হোজে ডে স্যান মার্টিন এবং চিলির প্রতিষ্ঠাতা বার্নার্ডো ও'হিগিন্স আন্দিজ পর্বত পাড়ি দিচ্ছেন চিলির উদ্দেশ্যে। ব্রিটিশরা আর্জেন্টিনায় অভিযান চালানোর পর পুরো ল্যাটিন আমেরিকা স্প্যানিস শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে। আপাতদৃষ্টিতে ব্রিটিশ অপারেশনকে ব্যর্থ মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে ল্যাটিন আমেরিকাকে স্পেন থেকে আলাদা করাই ছিল ব্রিটিশ পরিকল্পনা। আর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্বাধীনতাকামী নেতারা বিরাট ভূমিকা পালন করে। 


ব্রিটিশরা কি দক্ষিণ আমেরিকায় ব্যার্থ হয়েছিল?

এর মাঝেই ১৮০৬-০৭ সালের মাঝে ব্রিটিশ সরকার বর্তমান আর্জেন্টিনার বুয়েনস আয়ার্সে একটা সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। স্প্যানিসদের বেশিরভাগ সামরিক শক্তি কেন্দ্রীভূত ছিল ভেনিজুয়েলাতে; আর্জেন্টিনার আশেপাশে শক্তি ছিল খুবই কম; যেকারণেই ব্রিটিশরা সেখানে অপারেশনে যায়। এরপরেও সরাসরি সাফল্য না পেয়ে ব্রিটিশরা সেখান থেকে চলে আসে। ফ্রাঞ্চিসকো এবার লন্ডন যান এবং নতুন করে ভেনিজুয়েলা আভিযানের জন্যে ব্রিটিশ সহায়তা চাইতে থাকেন। কিন্তু ঠিক সেসময় বিরাট এক রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়ে যায়। ১৮০৫ সালে ফরাসী-স্প্যানিস নৌবহর ব্রিটিশদের হাতে ত্রাফালগার-এর যুদ্ধে পরাজিত হলে পর্তুগীজরা আত্মায় শক্তি পায় এবং ব্রিটিশদের পক্ষে চলে যায়। এতে ন্যাপোলিয়ন ক্ষেপে গিয়ে স্পেন এবং পর্তুগালে সৈন্য পাঠান। এভাবে স্পেন হয়ে যায় ব্রিটিশ বন্ধু; এবং দক্ষিণ আমেরিকায় স্প্যানিস উপনিবেশকে স্পেন থেকে আলাদা করার পরিকল্পনা মুলতুবি করা হয়। কিন্তু ততদিনে যা হবার, তা হয়ে গেছে। ব্রিটিশ আক্রমণের ফলশ্রুতিতে ভেনিজুয়েলা এবং আর্জেন্টিনায় বিদ্রোহ শুরু হয়ে গেছে। ১৮১০ সালের মে মাসে আর্জেন্টিনায় বিদ্রোহীরা স্প্যানিস নেতৃত্বের কাছ থেকে ক্ষমতা দখল করে নেয়। আর্জেন্টিনার বিদ্রোহীরা হোজে ডে স্যান মার্টিনের নেতৃত্বে এরপর চিলি এবং পেরুকে স্পেন থেকে আলাদা করে ফেলে।

প্রায় তিন’শ বছর ধরে ব্রিটিশরা দক্ষিণ আমেরিকায় বড় কোন অপারেশনে যায়নি। ন্যাপোলিয়নের অভিযানকে উপজীব্য করে ব্রিটিশরা স্পেনের উপনিবেশগুলিকে স্পেন থেকে আলাদা করার প্রক্রিয়া শুরু করে। সেই প্রক্রিয়াতে ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা সহায়তা করেছিলেন শুধু। মিরান্ডার আঁকা পতাকাকেই পরবর্তীতে ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া এবং ইকুয়েডর নিজেদের জাতীয়তার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দেয়। ১৮১০ সালের ১৯শে এপ্রিল ভেনিজুয়েলার কারাকাসে বিদ্রোহীরা স্প্যানিস নেতৃত্বকে বন্দী করে ফেলে। সিমন বলিভার এবং আন্দ্রেস বেলোর নেতৃত্বে তারা লন্ডনে প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে ব্রিটিশদের কাছ থেকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি চায় এবং সরাসরি ব্রিটিশদের হস্তক্ষেপ কামনা করে। তারা ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডাকেও তাদের সাথে ভেনিজুয়েলাতে নিয়ে আসে। ১৮১১ সালের জুলাই মাসে স্বাধীন ভেনিজুয়েলার ঘোষণা দেয়া এবং ফ্রাঞ্চিসকোর ব্যবহার করা তিন রঙের ভেনিজুয়েলার পতাকাকে অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু ১৮১২ সালে এক প্রতিবিপ্লবের মাঝ দিয়ে স্পেনপন্থীরা আবারও ক্ষমতা দখল করে নেয়। ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা স্প্যানিসদের সাথে চুক্তি করতে গেলে সিমন বলিভার এতে নাখোশ হন। বলিভারের হিসবে সেটা ছিল রাষ্ট্রদ্রোহিতার সামিল। ফ্রাঞ্চিসকোকে তারা স্প্যানিস নেতৃত্বের হাতে তুলে দেয়, আর এর বিনিয়মে চুক্তি মোতাবেক সিমন বলিভারকে নিরাপদে স্পেনে ভ্রমণ করার অনুমতি দেয় স্প্যানিয়ার্ডরা। ১৮১৬ সালের ১৪ই জুলাই ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা বিচারাধীন অবস্থায়ই স্পেনে মৃত্যুবরণ করেন এবং তার লাশ গণকবরে দাফন করা হয়, যাতে কোনটা তার কবর, সেটা যেন খুঁজে পাওয়া না যায়।
  

জার্মান দার্শনিক উলফগ্যাং ফন গোথে ভেনিজুয়েলার পতাকার রংগুলি বেছে নিতে সহায়তা করেছিলেন। পতাকার ডিজাইন করেছিলেন ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা। পরবর্তীতে এই তিন রঙের পতাকাই ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া এবং ইকুয়েডরের পতাকায় স্থান পায়। উৎস একই বলে ল্যাটিন আমেরিকার এই দেশগুলির মাঝে পার্থক্য করা কঠিন।

যেভাবে তিন দেশের পতাকা আঁকা হলো

ফ্রাঞ্চিসকো ভেনিজুয়েলার পতাকার ধারণাকে আকারে রূপ দিতে কথা বলেছিলেন জার্মান দার্শনিক জোহান উলফগ্যাং ফন গোথে এবং রুশ কূটনীতিবিদ সাইমন রোমানোভিচ ভরনজফের সাথে। গোথের সাথে ফ্রাঞ্চিসকোর পতাকা নিয়ে কথা হয় ১৭৮৫ সালে। গোথে তাকে বলেন যে, তিনটা মূল রঙ থেকেই আলোর সৃষ্টি হয় – হলুদ, নীল এবং লাল। এই তিনটা রঙ আলাদাভাবে শুরু হলেও শেষ হয় এক লক্ষ্যে। ফ্রাঞ্চিসকোরও তাই এরকমই এক লক্ষ্যে এক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা উচিৎ। ফ্রাঞ্চিসকো চাইছিলেন আমেরিকাতে পুরো স্প্যানিস উপনিবেশ মিলিয়ে বিশাল এক রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা। একেবারে বর্তমানের যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম এবং মধ্যাংশ থেকে শুরু করে মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা, কিউবা সহ, দক্ষিণ আমেরিকার বর্তমান ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর মিলে সেই রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন ফ্রাঞ্চিসকো। ব্রিটিশদের কাছে উপস্থাপিত তার পরিকল্পনা তেমনই ছিল। মূলতঃ স্পেন থেকে আলাদা হবার কাজটাই তিনি করেছিলেন। বিশেষ বিশেষ সময়ে বিশেষ বিশেষ স্থানে উপস্থিত থাকায় স্পেন তাকে ব্রিটিশ গুপ্তচর হিসেবে মনে করতো। ফরাসী বিপ্লবের সময়ে বিপ্লবের বিপক্ষের রাজতন্ত্রকামীদের (যাদেরকে ব্রিটিশরা সহায়তা করতো) পক্ষে একাধিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা তার স্প্যানিস দোষারোপকে মুছে ফেলতে সহায়তা করে না। স্পেন ন্যাপোলিয়নের পক্ষে থাকার সময় তিনি ব্রিটিশদের সহায়তায় ল্যাটিন আমেরিকার বিদ্রোহ উস্কে দেন। এরপর স্পেন ব্রিটিশদের পক্ষে গেলেও তার কর্মকান্ড চালিয়ে যান, এবং স্পেন থেকে তার সকল ল্যাটিন আমেরিকার উপনিবেশ আলাদা করে ফেলেন। তিনি স্থিতিশীল কোন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে যেতে পারেননি; যে কাজটা পরে সিমন বলিভার করেছিলেন।
 

ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো সিমন বলিভারের ছবির সামনে কথা বলছেন। সিমন বলিভার ল্যাটিন আমেরিকার জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে স্বীকৃত হলেও তিনি আসলে কয়েকটা দেশের জন্মদাতা। ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা যেখানে ল্যাটিন আমেরিকাকে স্পেন থেকে আলাদা করেছিলেন, বলিভার সেই আলাদা হওয়া ল্যাটিন আমেরিকাকে টুকরো টুকরো করায় অংশ নিয়েছেন।

 
সিমন বলিভার এবং ল্যাটিন আমেরিকার বিভক্তি

সিমন বলিভার ল্যাটিন আমেরিকার স্প্যানিস অঞ্চলগুলিকে টুকরো টুকরো করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৮১৯ সালে রিপাবলিক অব কলম্বিয়া তৈরি করে নিজে প্রেসিডেন্ট হন, এবং দুই জন ভাইস প্রেসিডেন্টের অধীনে দেশটাকে দুই ভাগ করেন। একটার নাম দেয়া হয় ভেনিজুয়েলা, আর আরেকটা নিউ গ্রানাডা (পরবর্তীতে কলম্বিয়া)। তবে দেশগুলি যে একই উৎস থেকে এসেছিল, তা ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া এবং ইকুয়েডরের পতাকা দেখলেই বোঝা যায়। তিন দেশের পতাকাতেই একই রঙ ব্যবহার করা হয়েছে, যা কিনা ফ্রাঞ্চিসকোর আঁকা। বলিভার এবং ফ্রাঞ্চিসকোর চিন্তাধারায় কিছুটা দ্বিমত ছিল। যেখানে ফ্রাঞ্চিসকো ছিলেন ব্রিটিশপন্থী, বলিভার ছিলেন সমাজতন্ত্রী। বলিভারের সমাজন্তন্ত্রী চিন্তাধারা তার শিক্ষক ডন সিমন রদ্রিগেজ দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিল। তারা দু’জনে মিলে ইউরোপ ভ্রমণে বের হয়েছিলেন এবং ১৮০৫ সালে মিলানে ইতালির রাজা হিসেবে ন্যাপোলিয়নের রাজকীয় অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। রদ্রিগেজ ১৭৯৭ সালেই স্প্যানিস শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে জড়িত থাকার অপরাধে ভেনিজুয়েলা ছেড়েছিলেন। বলিভার ১৮২১ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের নামানুসারে ‘গ্র্যান কলম্বিয়া’ নামে আরেকটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন, যার মাঝে ছিল বর্তমানের ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া, পানামা, ইকুয়েডর। আর্জেন্টিনার জেনারেল হোজে ডে স্যান মার্টিন-এর সাথে একত্রিত হয়ে বলিভার পেরু এবং ইকুয়েডরকে আলাদা করেন। সকলের কাছে এই কাজটি ছিল স্পেন থেকে মুক্ত করার কাজ। প্রকৃতপক্ষে তারা আলাদা কয়েকটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন, যাদের মাঝে আলাদা হবার কোন কারণই ছিল না। আলাদা আলাদা নেতৃত্ব দেয়া হয় এসব স্থানে, যারা খুব শিগগিরই নিজেদের আখের গোছাতে আলাদা রাষ্ট্র চাইতে থাকেন। ১৮২৫ সালের ৬ই অগাস্ট নতুন আরেকটি দেশের জন্ম দেয়া হয়; যার নামকরণ করা হয় সিমন বলিভারের নামে – বলিভিয়া। এই সবগুলিই তখন ছিল গ্র্যান কলম্বিয়ার অধীনে, যার একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন বলিভার। কিন্তু ১৮৩০ সালের মাঝেই গ্র্যান কলম্বিয়া ভেঙ্গে ভেনিজুয়েলা, নিউ গ্রানাডা (কলম্বিয়া) এবং ইকুয়েডর তৈরি হয়; প্রত্যেকটির একচ্ছত্র অধিপতি হন বলিভারেরই সমালোচকেরা, যারা একসময় বলিভারের একনায়কোচিত কার্যকলাপের বিরোধী ছিলেন।
  
খুব অল্প সময়ের মাঝেই ল্যাটিন আমেরিকার পুরো এলাকা স্প্যানিসদের হাতছাড়া তো হয়ই, তদুপরি অনেকগুলি দেশে বিভক্ত হয়ে যায়। সুপারপাওয়ার ব্রিটেন ল্যাটিন আমেরিকাকে একত্রিত দেখতে চায়নি।


ব্রিটেন – সুপারপাওয়ারের রাজনীতিই সবকিছু

ন্যাপোলিয়নের আবির্ভাবের আগ পর্যন্ত ব্রিটিশরা দক্ষিণ আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপন করেনি। গায়ানা উপকূলের অল্প কিছু অঞ্চল ডাচ এবং ফ্রেঞ্চদের অধীনে ছাড়া এর প্রায় পুরোটাই ছিল পর্তুগাল এবং স্পেনের অধীনে। ১৮৩০ সাল নাগাদ পর্তুগীজদের অধীনে ব্রাজিল ছাড়াও সৃষ্টি হয় রিও ডে লা প্লাটা (আর্জেন্টিনা), উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে, চিলি, বলিভিয়া, পেরু, ইকুয়েডর, কলম্বিয়া এবং ভেনিজুয়েলা। ব্রিটিশরাও গায়ানা উপকূলে একটা উপনিবেশ করে ফেলে। স্প্যানিস উপনিবেশিক এলাকাটা কেটে টুকরা টুকরা করে ৯টা দেশ তৈরি হলেও ব্রাজিল একত্রেই থাকে; কেউ একে ভাঙ্গেনি। কারণ ব্রাজিল ছিল ব্রিটিশদের বন্ধু পর্তুগালের উপনিবেশ। ব্রিটিশরা চায়নি ব্রাজিল ভেঙ্গে যাক।

ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলি স্বপ্নে পাওয়া জাতীয়তার উপরে প্রতিষ্ঠিত। নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা নিজেদের মাঝে ক্ষমতার ভাগাভাগি করতে গিয়ে দেশগুলিকে টুকরো টুকরো করেছে। আলাদা করে জাতীয় পতাকা ডিজাইন করার সময় রয়েছে কার? ফ্রাঞ্চিসকো তো কষ্ট করে ডিজাইন করেই দিয়ে গেছেন; তাই ওটার উপরেই কেটে-চিরে দাঁড়িয়ে আছে আজকের পতাকাগুলি। এই পতাকাকে ঘিরেই কতনা আবেগ; উচ্ছ্বাস! কেউ চিন্তাও করেনি যে ৯টা পতাকা মানে ৯টা আলাদা জাতিরাষ্ট্রে বিভক্ত তারা; যদিও তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, আকৃতি, সকলকিছুই এক! এদের সকলেই একবাক্যে ফ্রাঞ্চিসকো, বলিভার, স্যান মার্টিন-এর মতো কয়েক ব্যক্তিকেই স্মরণ করে; কারণ তাদের সকলেরই জন্ম এদের হাতে। আর এরা আবার কাজটা সম্পাদন করেছে তৎকালীন সুপারপাওয়ার ব্রিটিশদের হাত ধরে। ব্রিটিশরা স্পেন থেকে ল্যাটিন আমেরিকার অঞ্চলকে আলাদা করলেও এদেরকে একত্রে বিরাট এক দেশ হিসেবে দেখতে চায়নি। ছোট ছোট দেশে বিভক্ত হয়ে তারা একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করে নিজেদের মাঝে ব্যাস্ত থেকেছে। জাতীয় পতাকা, সঙ্গীত এবং প্রতীকগুলি তাদের সেই ইন্ধন যুগিয়েছে। হাল্কা বিষয়গুলি তাদের আবেগকে নাড়া দিয়েছে এবং আবেগ হয়েছে তাদের চালিকাশক্তি। ফ্রাঞ্চিসকো, বলিভার, স্যান মার্টিন-এর সৃষ্ট দেশগুলি ভূরাজনীতিতে তাই শিশুই রয়ে গিয়েছে।

আরও পড়ুনঃ
আর্জেন্টিনা কি পারবে?

Tuesday, 26 June 2018

আর্জেন্টিনা কি পারবে?

২৬শে জুন ২০১৮
আর্জেন্টিনা কি পারবে? কি পারবে? বাংলাদেশের মানুষকে এই প্রশ্ন করলে তাদের বেশিরভাগের চিন্তায় থাকবে – আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হতে পারবে কি না। যারা এধরনের চিন্তা করছেন, তারা হয়তো ভুলে যাচ্ছেন যে আর্জেন্টিনা একটা দেশের নাম; ফুটবল টিমের নাম নয়।


কি পারবে আর্জেন্টিনা?


আর্জেন্টিনা কি পারবে? কি পারবে? বাংলাদেশের মানুষকে এই প্রশ্ন করলে তাদের বেশিরভাগের চিন্তায় থাকবে – আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হতে পারবে কি না। যারা এধরনের চিন্তা করছেন, তারা হয়তো ভুলে যাচ্ছেন যে আর্জেন্টিনা একটা দেশের নাম; ফুটবল টিমের নাম নয়। আর্জেন্টিনার ভূমি রয়েছে প্রায় ২৮ লক্ষ বর্গকিঃমিঃ-এর মতো, যা বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ১৯ গুণ বড়। তবে জনসংখ্যা ৪ কোটি ৪০ লাখের মতো, যা বাংলাদেশের প্রায় ৪ ভাগের ১ ভাগ। এর অর্থনীতি আকার প্রায় ৬২৬ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির দ্বিগুণেরও বেশি। ১৪,০০০ ডলারের মাথাপিছু আয় থাকার পরেও দেশের অর্থনীতি এতটা খারাপ অবস্থায় রয়েছে যে, তাদের সামরিক বাহিনী টিকিয়ে রাখাই দায় হয়ে গিয়েছে। ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ দারিদ্রের শিকার, এবং ৬ দশমিক ২ শতাংশ সবচাইতে খারাপ দারিদ্রের মাঝে রয়েছে। ২০১০ সালে ৫৩০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি থেকে ২০১৬-তে মাত্র ৫৪৬ বিলিয়নে পৌঁছায়। এর মাঝে দুই বছর অর্থনৈতি প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক।

তাহলে আর্জেন্টিনার এই ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতি নিয়ে কি পারার কথা হচ্ছে? আর্জেন্টিনার উপকূলের অদূরে রয়েছে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ, যা আর্জেন্টিনার নয়; ব্রিটেনের। ব্যাপারটা বোঝানোর জন্যে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যদি বলা হয় যে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ভারতের অধীনে, তাহলে সেটা বাংলাদেশের মানুষের কাছে কেমন লাগতে পারে? ঠিক তেমনটাই আবেগ রয়েছে আর্জেন্টিনার। কিন্তু আর্জেন্টিনা কি পারবে ব্রিটেনের কাছ থেকে এই দ্বীপকে বাগিয়ে নিতে?
  
 
অক্টোবর ২০১৬। আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনোস আয়ার্সে উগ্রপন্থী জাতীয়তাবাদীরা ব্রিটিশ পতাকা পোড়াচ্ছে। ব্রিটিশরা ফকল্যান্ডে সামরিক মহড়া দেবে - এই ঘোষণার প্রতিবাদ এটি। ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা ঠিকই ফকল্যন্ড দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু সেটা যে তারা ধরে রাখতে পারবে না, তা শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলি আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল।


ফুটবল বিশ্বকাপ নয়, ফকল্যান্ড নিজের দখলে নিতে পারবে আর্জেন্টিনা?

১৯৮২ সাল। আর্জেন্টিনা তার উপকূলে ব্রিটিশ উপনিবেশ ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ দখল করে নিয়েছে। ব্রিটিশরা তাদের উপনিবেশিক রাজত্বের বেশিরভাগটাই ততদিনে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হারিয়েছে। তবুও ব্রিটিশ ইজ্জত বলে কথা। ব্রিটিশরা স্বল্প সময়ের মাঝে তাদের যতটুকু সামরিক সক্ষমতা রয়েছে, ততটাই কাজে লাগিয়ে দ্বীপগুলি পুনর্দখল করতে সচেষ্ট হয়। কিন্তু প্রায় ১৪ হাজার কিঃমিঃ দূরে পুরো আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আসা ব্রিটিশদের সক্ষমতা ছিল সীমিত। তাই তারা তাদের সকল ধরনের ক্ষমতার প্রয়োগে উদ্যোগী হয়। এর মাঝে একটা ছিল ল্যাটিন আমেরিকায় ব্রিটিশদের জন্যে একটা বন্ধু খোঁজা, যে কিনা গুরুত্বপূর্ণ কিছু সহায়তা দিয়ে ব্রিটিশদের সক্ষমতায় ফাঁকফোকড়গুলিকে বন্ধ করতে পারবে। আরেকটি উদ্যোগ ছিল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে নিজের পক্ষে কাজ করানো।

বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা মূলতঃ মার্কিনীদের তৈরি। তারা ব্রিটিশদের ব্যবস্থাগুলিকে নিজেদের মতো করে তৈরি করিয়ে নিয়েছে। দুর্বল দেশগুলি অস্ত্রের জন্যে অন্যের উপরে নির্ভরশীল থাকবে– এটা অবশ্য ব্রিটিশ সময়ের চিন্তা হলেও মার্কিনীরা এটা অব্যহত রেখেছে। ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময় আর্জেন্টিনার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ছিল ফ্রান্সের তৈরি ‘এক্সোসেট’ জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। এই ক্ষেপণাস্ত্রের বিমান থেকে লঞ্চ করা ভার্সনেরই আর্জেন্টিনা সবচাইতে বড় ব্যবহার করেছিল। আর্জেন্টিনার বিমান বাহিনীর ছোঁড়া দু’টি এক্সোসেট ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে দু’টি ব্রিটিশ জাহাজ ধ্বংস হয়। এমতাবস্থায় ব্রিটিশ রাষ্ট্রের কিছু লোক চাইছিলো আর্জেন্টিনা পর্যন্ত এই এক্সোসেট ক্ষেপণাস্ত্রের চালান বন্ধ করে দিতে। এই চালানগুলি আসতো বিমানে। চার্লস হিউসডন নামের এক ব্রিটিশ এয়ার ফ্রেইটের ব্যবসা করতেন, যিনি ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ এটর্নি জেনারেল মাইকেল হাভার্স-এর বন্ধু। হিউসডন এয়ার ফ্রেইটের আদি-নক্ষত্র জানতেন। তিনি এক্সোসেট ক্ষেপণাস্ত্রের চালান বন্ধ করার একটা পরিকল্পনা এটর্নি জেনারেলকে বলার পরে সেটা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার পর্যন্ত যায়।
 
 
আর্জেন্টিনার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ছিল ফ্রান্সে নির্মিত 'এক্সোসেট' ক্ষেপণস্ত্র। ফ্রান্সের সরবরাহকৃত 'সুপার এটেনডার্ড' বিমান থেকে এই ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হয়। মাত্র ৫টা ক্ষেপণাস্ত্র ব্রিটিশদের মাঝে যে ত্রাসের সৃষ্টি করেছিল, দুই ডজন কি করতে পারতো, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু ফ্রান্স ৫টার বাইরে একটাও সরবরাহ করেনি। এমনকি ৫টার মাঝে প্রথমে কাজ করেছে মাত্র ২টা; বাকি ৩টা কাজ করাতে অনেক কষ্ট করতে (সময় ক্ষেপণ) হয়েছে ফরাসিদের। 


ফ্রান্স কি ব্রিটেনের পক্ষে ছিল, নাকি আর্জেন্টিনার?

পরিকল্পনাটা ছিল এরকম। নিজেদের অনুগত একটা কোম্পানি এক্সোসেট ক্ষেপণাস্ত্র শিপমেন্ট করার জন্যে টেন্ডারে অংশগ্রহণ করবে। এটা এমন একটা সময় যখন নিজেদের “নিরপেক্ষ” দেখাতে ফরাসিরা নিজেদের বিমানে আর্জেন্টিনায় এই ক্ষেপণাস্ত্র পাঠাবে না। লোডমাস্টারের যোগসাজসে বিমানটার কোর্স পরিবর্তন করে ট্রানজিটে বার্মুদা বা অন্য কোন স্থানে নামানো হবে। থ্যাচার ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাসোঁয়া মিতেরাঁর কাছে এক গোপন চিঠি লিখে দক্ষিণ আমেরিকায় এক্সোসেট ক্ষেপণাস্ত্রের চালান দেরি করানোর অনুরোধ করেন। ফ্রান্স যাতে পেরুর কাছে এই অস্ত্র বিক্রি না করে, সেটার অনুরোধ করেন থ্যাচার। কারণ পেরু থেকে এই ক্ষেপণাস্ত্র নিশ্চিতভাবেই আর্জেন্টিনায় যাবে। যুদ্ধের আগে ফ্রান্স আর্জেন্টিনার কাছে ৫টি এক্সোসেট ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি করেছিল, যা কেউ তেমন গুরুত্ব সহকারে নেয়নি। যখন ১৯৮২-এর মে মাসে এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে আর্জেন্টিনা ২টি ব্রিটিশ জাহাজ ধ্বংস করে ফেলে, তখন সকলে নড়েচড়ে বসে। ফ্রান্স ঘোষণা দেয় যে তারা আর্জেন্টিনার কাছে কোন অস্ত্র বিক্রি করবে না। একইসাথে ফ্রান্স ব্রিটেনের কাছে তথ্য দেয় যে তারা আর্জেন্টিনার কাছে কি কি ধরনের অস্ত্র বিক্রি করেছিল। পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলে ফরাসি সামরিক স্থাপনাগুলিকেও ফ্রান্স ব্রিটেনের ব্যবহার জন্যে উন্মুক্ত করে দেয়। তবে ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় কিছু লোকজন মনেপ্রাণে ব্রিটেনের বিপক্ষে ছিলেন।

ফরাসি সরকারের অজানা ছিল না যে একটা ফরাসি সরকারি কোম্পানির (৫১ শতাংশ শেয়ার) একটা টেকনিক্যাল দল আর্জেন্টিনাকে সহায়তা দেবার উদ্দেশ্যে যুদ্ধের পুরো সময় আর্জেন্টিনাতে অবস্থান করে। দলটি এক্সোসেট ক্ষেপণাস্ত্রের কিছু সমস্যা দূর করে অস্ত্রটিকে বিমান থেকে লঞ্চ করার জন্যে কর্মক্ষম করে তোলে। ফরাসি সরকারি কর্মকর্তারা অবশ্য এগুলি জানতো না বলে দাবি করে। তবে মাত্র ৫টি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আর্জেন্টিনা যে কিছু করতে পারবে না, তা ব্রিটিশরা জানতো। তাই তাদের মূল ফোকাস ছিল কিভাবে আর্জেন্টিনাকে নতুন করে এক্সোসেট ক্ষেপণাস্ত্র পাওয়া থেকে দূরে রাখা যায়। ফরাসিরা যে দুই পক্ষকে খুশি রাখছে, সেটা ব্রিটিশরা জানতো; তারপরেও ফরাসিদের সাথে তাদের নতুন করে কোন শত্রুতা হয়নি। ফরাসিরা থ্যাচারের সাথে দরকষাকষিতে এগিয়ে ছিল। তারা আর্জেন্টিনার কাছে নতুন করে আর এক্সোসেট বিক্রি করেনি। আবার পুরোনো এক্সোসেটগুলিকে কর্মক্ষম করার মাধ্যমে তারা আর্জেন্টিনারও পক্ষেও থাকার ভান করেছে। তারা আর্জেন্টিনাকে এমন কোন সহায়তা দেয়া থেকে বিরত থাকে, যা কিনা যুদ্ধের মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে ফেলতে পারতো। আরও দুই ডজন এক্সোসেট ক্ষেপণাস্ত্র হয়তো রয়াল নেভির বারোটা বাজাতে পারতো। কিন্তু সেটা মিতেরাঁ-থ্যাচারের দরকষাকষিতেই ব্যবহৃত হয়েছিল কেবল।
 
  
ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর 'নিমরড' গোয়েন্দা বিমান। ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময় এরকম একটা বিমান আর্জেন্টিনার প্রতিবেশী দেশ চিলির প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ স্যান ফেলিক্সে মোতায়েন করা হয়। চিলির সহায়তায় ব্রিটিশরা আগে থেকেই আর্জেন্টিনার বিমান হামলার ওয়ার্নিং পেয়ে যেতো। চিলির এই সহায়তা ছাড়া ব্রিটিশদের পক্ষে যুদ্ধ জেতা কঠিন হয়ে যেতো। 


দক্ষিণ আমেরিকায় ব্রিটেনের শক্ত ঘাঁটি – চিলি

পুরো যুদ্ধের সময় চিলি ছিল ব্রিটেনের খুব কাছে বন্ধু। তবে সন্মুখে চিলি ল্যাটিন আমেরিকার সাথে একাত্মতা প্রকাশ করার কথা বলে ব্রিটেন-আর্জেন্টিনার যুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকে। যুদ্ধের শুরুতেই সিডনি এডওয়ার্ডস নামের ব্রিটিশ রয়াল এয়ার ফোর্সের এক অফিসারকে গোপনে চিলিতে প্রেরণ করা হয়। তিনি চিলির বিমান বাহিনীর প্রধান জেনারেল ফার্নান্দো মাত্থেই-এর সাথে সাক্ষাৎ করে সহায়তা চান। চিলির প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের কাছাকাছি স্যান ফেলিক্স দ্বীপে ব্রিটিশ রয়াল এয়ার ফোর্সের একটা ‘নিমরড’ গোয়েন্দা বিমান মোতায়েন করা হয়। সিডনি এডওয়ার্ডস-এর গোয়েন্দা রিপোর্টগুলি ছিল অত্যন্ত গোপনীয় এবং খুব কম লোকই জানতো এর ব্যাপারে। এই রিপোর্টগুলি পরিচিত ছিল “সিডগ্রামস” নামে। এই বার্তাগুলিতে আর্জেন্টিনার দক্ষিণের উশুয়াইয়া, রিও গালেগোস, রিও গ্রান্দে এবং কমোডোরো রিভাদাভিয়া বিমান ঘাঁটিগুলিতে আর্জেন্টিনার বিমান বাহিনীর কর্মকান্ড রিপোর্ট করা হতো। বিশেষতঃ এই ঘাঁটিগুলি থেকে যুদ্ধবিমান উড়লেই সেই ওয়ার্নিং চলে যেতো ফকল্যান্ডস-এর অদূরে অবস্থান নেয়া রয়াল নেভির কাছে। রয়াল নেভির বিমান প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ছিল হাতে গোনা ২৮টি সী হ্যারিয়ার বিমানের হাতে। বিপক্ষে ছিল আর্জেন্টিনার বিমান এবং নৌবাহিনীর মোটামুটি ১১৫টির মতো ফাইটার বিমান। সংখ্যায় অল্প হওয়ায় রয়াল নেভির পক্ষে সম্ভব ছিল না যে সারাক্ষণ এই বিমানগুলি আকাশে টহল দেবে। কারণ আকাশে উড়লে সেগুলি নামার পরে মেইনটান্সের কারণে কয়েকটা বিমান রেডি থাকবে না। ঐ সময়ে আর্জেন্টিনার বিমান হামলা হলে সবগুলি বিমান ইন্টারসেপ্ট করার লক্ষ্যে উড়তে পারবে না। অর্থাৎ তাদের ফ্লিটকে রক্ষা করা সক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে। তাই ব্রিটিশরা পরিকল্পনা করে কি করে আগেভাগে আর্জেন্টিনার বিমান হামলার খবর পাওয়া যায়। তখন সে অনুযায়ী হ্যারিয়ার বিমান জাহাজ থেকে ওড়ানো যাবে। আর্জেন্টিনার উপকূল থেকে ফকল্যান্ডের দূরত্ব কমপক্ষে ৩৫০ কিঃমিঃ। অর্থাৎ একটা ফাইটার বিমানের ফকল্যান্ডের কাছাকাছি ব্রিটিশ নৌবাহিনীকে হামলা করতে কমপক্ষে ২০ মিনিট সময় লাগবে। আগেভাগে জানতে পারলে এটা বিমান প্রতিরক্ষাকে প্রস্তুত করার জন্যে মোটামুটি যথেষ্ট। চিলি ব্রিটিশদেরকে এই সহায়তাটাই করেছিল। শুধু তা-ই নয়, ব্রিটিশ স্পেশাল এয়ার সার্ভিস (এসএএস) কমান্ডোদের অবতরণ করিয়ে আর্জেন্টিনার দক্ষিণের রিও গ্রান্দে বিমান ঘাঁটিতে অবস্থিত এক্সোসেট ক্ষেপণাস্ত্র বহণকারীসুপার এটেনডার্ড ফাইটার বিমান ধ্বংস করার জন্যে অত্যন্ত সাহসী একটা মিশন পরিকল্পনা করে ব্রিটিশরা। মিশনটির আগে তথ্য সংগ্রহ করার একটা অপারেশন চালানো হয়, যা সফল হয়নি। কমান্ডোরাসীমান্ত অতিক্রম করে চিলিতে ঢুকে যায় এবং তখন চিলি সরকার তা আলাদা কিছু নয় বলে ব্যাপারটিকে ধামাচাপা দিয়ে দেয়। চিলির নৌবাহিনীর জন্যে ব্রিটিশ নৌবাহিনী থেকে কেনা রিফুয়েলিং ট্যাঙ্কার ‘টাইডপুল’ চিলি সরকার – কিছুদিন পরে ডেলিভারি দিলেও চলবে, এই হিসেবে – ব্রিটিশদের আরও কিছুদিন ব্যবহার করার অনুমতি দেয়। জাহাজটি ফকল্যান্ড যুদ্ধে ব্যবহার করে ব্রিটিশ রয়াল নেভি।


 

কৌশলগত ম্যাজেলান প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আর্জেন্টিনার সাথে চিলির রয়েছে দ্বন্দ্ব। ব্রিটেন চিলির পক্ষে থাকায় চিলি এই দ্বন্দ্বে শক্তি পায়। ম্যাজেলান প্রণালী থেকে পূর্বেই রয়েছে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ, যা ব্রিটিশদের হাতে রয়েছে। ম্যাজেলানের আরও দক্ষিণের ড্রেইক প্যাসেজ দিয়েও জাহাজ যেতে পারে। তবে সেখানে আবহাওয়া আরও খারাপ থাকে।


ফকল্যান্ড আর্জেন্টিনার হাতে গেলে কি হতো?

চিলি এবং ফ্রান্সের সাথে ফকল্যন্ড যুদ্ধের সময়ে ব্রিটেনের সম্পর্ক কিছু আলোচনাকে সামনে নিয়ে আসে। প্রথমতঃ দক্ষিণ আমেরিকাতে ব্রিটিশ প্রভাব ধরে রাখতে চিলি ব্রিটেনকে সহায়তা করছে। চিলি ১৮৭৯-৮৩ সালে সংঘটিত ‘ওয়ার অব দ্যা প্যাসিফিক’এ পেরু এবং বলিভিয়ার সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। যুদ্ধে চিলি তার ব্রিটেনে নির্মিত অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজগুলি ব্যবহার করে পেরুর পুরো নৌবাহিনীকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দেয়। উভয় দেশ একত্রে চিলির কাছে সামরিক পরাজয় বরণ করে এবং এর ফলশ্রুতিতে চিলি বলিভিয়া এবং পেরুর কাছ থেকে আতাকামা মরুভূমির বিশাল অঞ্চল দখল করে নেয়। ঐ অঞ্চল ছিল বলিভিয়ার জন্যে সমুদ্রে পৌঁছানোর একমাত্র উপায়। একইসাথে সেখানে গুরুত্বপূর্ণ খণিজ সম্পদ ছিল, যা পুরোটাই চিলির হস্তগত হয়। বলিভিয়া এবং পেরুর পক্ষ নেয় যুক্তরাষ্ট্র। সেসময় থেকেই পেরুকে ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্র তার বলয়ে নিয়ে আসতে থাকে। পেরুকে অস্ত্রসস্ত্র সরবরাহ করে ব্রিটিশদের বন্ধু চিলির বিরুদ্ধে ব্যালান্স তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্র।
 

বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপথগুলির মাঝে দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণের সমুদ্রপথের বাণিজ্যিক গুরুত্ব তেমন একটা নেই। কিন্তু এর কারণ কিন্তু মধ্য আমেরিকার পানামা খাল, যা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। ইউরোপিয়রা সর্বদাই আটলান্টিক হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের যাবার জন্যে পানামা খালের একটা বিকল্প রাখতে চাইবে।


চিলির সাথে ইউরোপের যোগাযোগ ছিল দক্ষিণ আমেরিকার সর্বদক্ষিণের ম্যাজেলান প্রণালী এবং এরও দক্ষিণের ড্রেইক প্যাসেজ হয়ে, যার নিয়ন্ত্রণ ছিল মুলতঃ চিলি এবং কিছুটা আর্জেন্টিনার হাতে। আর ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ হলো সেই সমুদ্রপথের পূর্ব প্রান্তে। অন্যদিকে পেরুর সাথে ইউরোপের যোগাযোগ বর্তমানে পানামা খাল-এর মাধ্যমে, যা ১৯১৪ সালের আগ পর্যন্ত ছিল না। ১৮৭৯-৮৩-এর যুদ্ধে পেরুর জন্যে অস্ত্র পানামা যোজকের ভূমি পার হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে এসে জাহাজে উঠতো। পানামা খাল তৈরি হবার আগ পর্যন্ত পেরুকে অনেক ক্ষেত্রেই চিলির নিয়ন্ত্রণে থাকা ম্যাজেলান প্রণালি ব্যবহার করতে হতো। ইউরোপ থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের সাথে সরাসরি যোগাযোগের পথ হলো পানামা খাল হয়ে, যা যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে। তবে ম্যাজেলান প্রণালি যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে না। বরং সেখানে চিলির সহায়তায় ফকল্যান্ড থেকে ব্রিটিশরা ম্যাজেলানকে নিয়ন্ত্রণ করে। ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা ফকল্যান্ড নিজেদের দখলে রাখতে পারলে ব্রিটশরাও প্রশান্ত মহাসাগরে পৌঁছাতে মার্কিন-নিয়ন্ত্রিত পানামা খালের উপরে নির্ভরশীল হয়ে যেতো। আর পানামা খালে কোন ধরনের সমস্যা হলে সকল জাহাজকে ম্যাজেলান প্রণালি হয়ে যাতায়াত করতে হবে। সেই ঘটনা ঘটার আগে বেশিরভাগ মানুষের কাছেই ম্যাজেলানের গুরুত্ব থাকবে না; এটাই স্বাভাবিক।

ম্যাজেলান প্রণালির সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আর্জেন্টিনার সাথে চিলির বিবাদ রয়েছে। আর্জেন্টিনা যদি ফকল্যান্ড দখলে রাখতে পারতো, তাহলে চিলিও পরবর্তীতে টার্গেট হতো আর্জেন্টিনার; যার সুবাদে ম্যাজেলান প্রণালির নিয়ন্ত্রণ চিলির কাছ থেকে আর্জেন্টিনার কাছে চলে যেতো। আবার ফকল্যান্ড আর্জেন্টিনার হওয়া মানে মানচিত্রের পরিবর্তন, যা কিনা বলিভিয়া এবং পেরুকে ১৮৭৯-৮৩-এর প্যাসিফিক যুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দিতো এবং চিলিকে চাপের মুখে ফেলতো। প্যাসিফিকের যুদ্ধে আর্জেন্টিনাও গোপনে বলিভিয়া এবং পেরুর সাথে কথা বলেছিলো। তবে চিলি ব্যাপক সামরিক সাফল্য পাওয়ায় আর্জেন্টিনা পিছু হটে যায়। ফকল্যান্ড যুদ্ধে আর্জেন্টিনার পক্ষে গেলে আতাকামা নিয়ে বিবাদে আর্জেন্টিনা নিশ্চিতভাবেই পেরু এবং বলিভিয়ার পক্ষ নিতো। আবার এসব সংঘাত চলার সময় আর্জেন্টিনাকে অনেক শক্তিশালী এবং আগ্রাসী হতে দেখে এই এলাকার সবচাইতে বড় দেশ ব্রাজিলও বসে থাকতো না। ব্রিটেন কোনভাবেই এভাবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটা সমুদ্রপথকে ছেড়ে দিতো না।
  
নভেম্বর ২০১৫। কৌশলগত ম্যাজেলান প্রণালী অতিক্রম করছে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ 'জর্জ ওয়াশিংটন। ফকল্যান্ড এবং চিলির মাধ্যমে এই প্রণালীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ব্রিটেন। আর ফ্রান্স আর্জেন্টিনাকে 'কোনরকম' সহায়তার মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়েছে যে ফকল্যান্ড ব্রিটেনের হাতে থাকলে ফ্রান্স এর বিরোধিতা করবে না। 

 

অন্যদিকে ফ্রান্সের প্রশান্ত মহাসাগরে বেশকিছু উপনিবেশ রয়েছে। ফরাসীরাও ফকল্যন্ড ব্রিটিশদের হাতে থাকায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে যে পানামা খাল ছাড়াও ফ্রান্স থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে পৌঁছার আরেকটা পথ ইউরোপীয়দের হাতেই রইলো। যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু ম্যাজেলান প্রণালিকে ভুলে যায়নি। মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলি তেমন কোন কারণ ছাড়াই এই প্রণালি দিয়ে আটলান্টিক এবং প্যাসিফিকের মাঝে যাতায়াত করে; যদিও পানামা খাল দিয়ে যাওয়াটা তাদের জন্যে হাজার গুণ সহজ হতো। ২০১৭-এর ডিসেম্বরেও মার্কিন উভচর যুদ্ধজাহাজ ‘ওয়াসপ’ ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ থেকে প্যাসিফিকে যেতে পানামা খাল ব্যবহার না করে ম্যাজেলান প্রণালি ব্যবহার করে। ২০১৫-এর অক্টোবর-নভেম্বরে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘জর্জ ওয়াশিংটন’ (CVN 73) তার পুরো ব্যাটলগ্রুপ-সহ ম্যাজেলান প্রণালি পার হয়। ২০০৪ সালে আরেক বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘রোনাল্ড রেগ্যান’ (CVN 76) এই প্রণালি পার হয়। ২০১৪-এর অগাস্টে উভচর যুদ্ধজাহাজ ‘আমেরিকা’ (LHA 6) ম্যাজেলান প্রণালি পারি দেয়। যুক্তরাষ্ট্র একা নয়, ২০১৩ সালের অক্টোবরে চীনা নৌবাহিনীর তিনটি যুদ্ধজাহাজের একটা গ্রুপ ম্যাজেলান প্রণালি পারি দেয়। ম্যাজেলানের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বোঝাটা খুব কঠিন নয়।



১৯৮৬ বিশ্বকাপ ফূটবল। আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড। ম্যারাডোনার 'হ্যান্ড অব গড' গোল। আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডের সাথে জিতেছিল ফুটবলে; কিন্তু ফকল্যান্ড যুদ্ধে নয়! আর্জেন্টিনা বাকি বিশ্বের কাছে একটা ফুটবল দল। ভূরাজনীতিতে আর্জেন্টিনার অংশগ্রহণ ততটুকুই, যতটুকু সুপারপাওয়ার তাকে করতে দেবে। ফুটবলের কাপ আর্জেন্টিনার হাতে দেয়া যেতে পারে; কিন্তু ভূরাজনীতির কাপ দেয়া যাবে না! আর্জেন্টিনা আসলে কি পারবে, এই প্রশ্নটা একটা ভূরাজনৈতিক প্রশ্ন। আর্জেন্টিনাকে দিয়ে সেটাই পারানো হবে, যেটা সুপারপাওয়ার চায়। বিশ্বের আমজনতার কাছে তাই আর্জেন্টিনা একটা ফুটবল দলই থাকবে। একটা শক্তিশালী রাষ্ট্র ভূরাজনীতি বুঝবে – এটাই স্বাভাবিক। ফুটবল খেলা নয়, বরং ভূরাজনীতির খেলায় কাকে কি ধরনের চরিত্র দেয়া হয়েছে, সেটা বোঝাটা ভূরাজনীতি বোঝার অংশ।


আর্জেন্টিনা পশ্চিমা আদর্শিক শক্তিগুলির হাতে বন্দী। যে তাকে অস্ত্র সরবরাহ করবে, সে-ও তাকে এমনভাবে সরবরাহ করবে, যেন সে যুদ্ধে জিততে না পারে। যে সুপারপাওয়ার তাকে সহায়তা করবে, সে তাকে ততটাই সহায়তা করবে, যতটা করলে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ শক্তির কাছ থেকে যথেষ্ট দরকষাকষির সুযোগ পাওয়া যায়। আর্জেন্টিনাকে কেউ জেতাবে না; ব্যবহার করবে। ভূরাজনীতিতে আর্জেন্টিনার অংশগ্রহণ ততটুকুই, যতটুকু সুপারপাওয়ার তাকে করতে দেবে। ফুটবলের কাপ আর্জেন্টিনার হাতে দেয়া যেতে পারে; কিন্তু ভূরাজনীতির কাপ দেয়া যাবে না! আর্জেন্টিনা আসলে কি পারবে, এই প্রশ্নটা একটা ভূরাজনৈতিক প্রশ্ন। আর্জেন্টিনাকে দিয়ে সেটাই পারানো হবে, যেটা সুপারপাওয়ার চায়। বিশ্বের আমজনতার কাছে তাই আর্জেন্টিনা একটা ফুটবল দলই থাকবে। একটা শক্তিশালী রাষ্ট্র ভূরাজনীতি বুঝবে – এটাই স্বাভাবিক। ফুটবল খেলা নয়, বরং ভূরাজনীতির খেলায় কাকে কি ধরনের চরিত্র দেয়া হয়েছে, সেটা বোঝাটা ভূরাজনীতি বোঝার অংশ।

Thursday, 21 June 2018

‘এয়ারক্রাফট ফেরি’ আসলে কি জিনিস?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিশ্বব্যাপী এক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছিল, যার মাধ্যমে ফ্যাক্টরি থেকে যুদ্ধবিমান উড়িয়ে যুদ্ধক্ষেত্র পর্যন্ত নেয়া হয়। এই নেটওয়ার্ক সমুদ্রপথের বিপদগুলিকে এড়িয়ে চলে এবং একইসাথে দ্রুততম সময়ের মাঝে যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক সরঞ্জাম পৌঁছে দেয়।

২১শে জুন ২০১৮


বিশ্বযুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধবিমান পরিবহন


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। উত্তর আমেরিকার বিমান কারখানাগুলি থেকে ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা এবং এশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রগুলি পর্যন্ত বিমানগুলি কিভাবে নেয়া হবে? জার্মান সাবমেরিন, যুদ্ধজাহাজ এবং লং-রেঞ্জ ম্যারিটাইম বোমারু বিমানগুলি ব্রিটেনকে অবরোধ দিয়ে রেখেছে। যেকোন জাহাজ ব্রিটেনের কাছে ঘেঁষতে গেলেই ডুবিয়ে দিচ্ছে জার্মানরা। এমতাবস্থায় যুদ্ধবিমানের মতো সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ পণ্য কি জাহাজে পরিবহণ ঠিক হবে? এই চিন্তা থেকেই যুদ্ধবিমানগুলিকে উত্তর আমেরিকা থেকে উড়িয়ে ইউরোপ, আফ্রিকা এবং এশিয়া পর্যন্ত আনার ব্যবস্থা করা হয়। একটি রুট ছিল কানাডা-গ্রিনল্যান্ড-আইসল্যান্ড-স্কটল্যান্ড, যার মাধ্যমে বিমানগুলিকে ব্রিটেনে পাঠানো হতো। আরেকটা ছিল মার্কিন পশ্চিম উপকূল থেকে হাওয়াই দ্বীপ হয়ে প্যাসিফিকের আরও কিছু দ্বীপ হয়ে নিউজিল্যান্ড-আস্ট্রেলিয়া, যা কিনা সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের যুদ্ধে ব্যবহার হয়েছে। আরও দু’টা রুট ছিল আফ্রিকা হয়ে, যা কিনা উত্তর আফ্রিকা এবং এশিয়ার যুদ্ধের জন্যে। আরও দু’টা রুট ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্যে। এর একটা ছিল আলাস্কা থেকে বেরিং প্রণালি পার হয়ে সাইবেরিয়া হয়ে মস্কো। আরেকটা ছিল মধ্যপ্রাচ্য-ইরান হয়ে ককেশাস দিয়ে বাকু-স্টালিনগ্রাদ। আফ্রিকা পর্যন্ত যেতে আটলান্টিক পাড়ি দেয়া হতো দু’টা রুটে, যার একটা ১৯৪১ থেকেই চালু হয়েছিল। এই রুটটা যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ হয়ে ব্রাজিল হয়ে দক্ষিণ আটলান্টিক পাড়ি দেয়। আটলান্টিক পাড়ি দিতে এসেনশন দ্বীপ হয়ে লাইবেরিয়ায় নামতো বিমানগুলি। সেখান থেকে আফ্রিকার মাঝ দিয়ে অনেকগুলি বিমান ঘাঁটি হয়ে উত্তর আফ্রিকা, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভারত এবং চীনে যেত বিমানগুলি।
    

দক্ষিণ আটলান্টিকের এয়ার রুটখানা ব্রাজিল এবং পশ্চিম আফ্রিকার মাঝে যোগাযোগ স্থাপন করে। ব্রাজিল যুদ্ধে প্রথমদিকে নিরপেক্ষা থাকলেও যুদ্ধে যোগদানের আগেই যুক্তরাষ্ট্রের চাপে পড়ে নিজ দেশের মাটিতে মার্কিন সামরিক বিমান ঘাঁটি মেনে নেয়। যুদ্ধের শুরুতে মার্কিন সেনাবাহিনীর দক্ষ লোকের ব্যাপক অভাব থাকায় প্রাইভেট কোম্পানি 'প্যান আমেরিকান' ব্রাজিল এবং আফ্রিকায় বিমানবন্দর তৈরি করা ছাড়াও বিমান 'ফেরি' করার এই নেটওয়ার্ক ম্যানেজ করে।



ফ্লোরিডা থেকে ব্রাজিল

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে বিমানগুলির আসল যাত্রা শুরু হতো। ফ্লোরিডা থেকে ব্রাজিল পর্যন্ত দূরত্ব বিশাল। সেসময়ের বেশিরভাগ বিমানের পক্ষে অতদূর উড়ে যাওয়া কঠিন ছিল। অতটা দূর কভার করার লক্ষ্যে মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবিয় দ্বীপপুঞ্জে বেশকিছু বিমান ঘাঁটি তৈরি করা হয়। পুয়ের্তো রিকো, এন্টিগা, ত্রিনিদাদ এবং ব্রিটিশ গায়ানাতে (বর্তমানে গায়ানা) চারটা বিমান ঘাঁটি তৈরি করে মার্কিনীরা। এর মধ্যে প্রথমটি ছাড়া বাকি তিনটি ১৯৪০ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে ১৯১৭-১৯২২ সালের মাঝে তৈরি ৫০টি পুরোনো ডেস্ট্রয়ার দেবার বদলে পায় আমেরিকানরা। ফ্লোরিডা থেকে পুয়ের্তো রিকোর দূরত্ব ১,৫৭১ কিঃমিঃ; পুয়ের্তো রিকো এন্টিগা থেকে ৫৮৪ কিঃমিঃ দূরে। ত্রিনিদাদ পুয়ের্তো রিকো থেকে ১,০৮৫ কিঃমিঃ দূরে; আর ব্রিটিশ গায়ানা ১,৬৪৩ কিঃমিঃ দূরে। অর্থাৎ মোটামুটিভাবে ১ হাজার থেকে ১,৬০০ কিঃমিঃ দূরত্বের ভেতরে একটি করে বিমান ঘাঁটি তৈরি করা হয়েছিল। বিমানগুলি একটা ঘাঁটি থেকে অন্য ঘাঁটিতে ব্যাঙএর মতো লাফিয়ে লাফিয়ে চলতো; তেল ফুড়িয়ে গেলে তেল নিতো; পাইলট বদল করতো; কোন মেইনটেন্যান্স ইস্যু তৈরি হলে সেগুলি সমাধান করে নিতো।

ব্রাজিল যেকারণে যুদ্ধে যেতে বাধ্য হলো

উপরে উল্লিখিত ঘাঁটিগুলি মার্কিন এবং ব্রিটিশ উপনিবেশে অবস্থিত ছিল। কিন্তু ব্রাজিল তো সেসময় স্বাধীন দেশ। ব্রাজিল যুদ্ধে কোন পক্ষে থাকবে, তা নিয়ে প্রচুর বাদানুবাদ হয়েছিল খোদ ব্রাজিলেই। শেষ পর্যন্ত ১৯৪২ সালের ২২শে অগাস্ট মার্কিন-ব্রিটিশ চাপের মুখে ব্রাজিল জার্মানি-ইতালির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু যুদ্ধ ঘোষণা করার আগেই ১৯৪১ সালের মাঝে উত্তর ব্রাজিলে মার্কিনীরা ৫টি সামরিক বিমান ঘাঁটি তৈরি করে ফেলে। এই কাজটা মূলতঃ সম্পাদন করে মার্কিন প্রাইভেট বিমান কোম্পানি ‘প্যান আমেরিকান’ বা ‘প্যাম-এম’। প্যান-এম-এর ব্রাজিলিয়ান সাবসিডিয়ারি কোম্পানি ‘প্যানএয়ার দো ব্রাজিল’ মার্কিন সরকারের ১৯৪০ সালের ‘এয়ারপোর্ট ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম বা এডিপি’-এর অধীনে এই ঘাঁটিগুলি তৈরি করে অপারেট করে। সেসময় যুদ্ধে মার্কিন সেনাবাহিনী জনবল দিতে হিমশিম খাচ্ছিলো; তাই তাদের পক্ষে এই প্রোগ্রামে জনবল দেয়া একেবারেই সম্ভব ছিল না। তাই প্রাইভেট কোম্পানি এই কাজগুলি সম্পাদন করে রাষ্ট্রীয় সংস্থার কাজ করে। আমাপা, বেলেম, সাও লুইস, ফোর্তালেজা, নাতাল, রেসিফ এবং ফার্নান্দো দে নোরোনিয়া দ্বীপে ১৯৪১ থেকে ১৯৪৪-এর ভেতরে মোট ৭টি ঘাঁটি তৈরি করা হয় এয়ারক্রাফট ফেরি করার লক্ষ্যে।
 
 

১৯৪৩ সাল। ব্রাজিলের বেলেম-এ Val de Cans বিমান ঘাঁটিতে রিফুয়েলিং করার জন্যে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বি-২৫ এবং বি-২৪ বোমারু বিমান। বিমানগুলি ফুয়েল নিয়ে আরও দক্ষিণে ব্রাজিলের অন্য ঘাঁটিগুলিতে যাবে; তারপর এসেনশন দ্বীপ হয়ে এগুলি আফ্রিকার পথে পাড়ি জমাবে। ব্রাজিলের এই সহায়তা না পেলে ব্রিটিশদের উত্তর আফ্রিকায় জেনারেল রমেলকে হারানো আরও কঠিন হতো।


আফ্রিকা মহাদেশ পাড়ি

আফ্রিকার ফরাসি উপনিবেশগুলি ব্রিটেনের পক্ষে যাবে কিনা, তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আফ্রিকার বিটিশ উপনিবেশগুলিকেই মূলত ব্যবহার করা হয়েছিল বিমান পরিবহণের জন্যে। লাইবেরিয়া, সিয়েরা লিওন, ঘানা, নাইজেরিয়া, সুদান হয়ে বিমানগুলি মিশরে পৌঁছাতো। ব্রাজিলের উপকূল থেকে লাইবেরিয়ার দূরত্ব ৩,০৭৯ কিঃমিঃ। এ-দুয়ের মাঝে ছিল এসেনশন দ্বীপ, যা ব্রাজিলের উপকূল থেকে ২,২৬১ কিঃমিঃ দূরত্বে। সিঙ্গেল ইঞ্জিন ফাইটার এবং দুই ইঞ্জিনের বিমানগুলি এসেনশন দ্বীপ হয়ে আটলান্টিক পাড়ি দিত। লাইবেরিয়া থেকে ঘানা আক্রা ১,১৩০ কিঃমিঃ; ঘানার আক্রা থেকে নাইজেরিয়ার কানো ১,২৪২ কিঃমিঃ এবং মাইদুগুরি ১,৬১৩ কিঃমিঃ। সুদানের তিনটি ঘাঁটি নাইজেরিয়ার কানো থেকে ১,৫০০-২,৬০০ কিঃমিঃ দূরত্বে। সুদান থেকে ইথিওপিয়া, মিশর, জেদ্দা, ইয়েমেন যেতো বিমানগুলি। এসব ঘাঁটি থেকে প্যালেস্টাইন, ইরাক, ইরান, বাহরাইন, ওমান, করাচি হয়ে ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চীন যেতো বিমান। করাচি থেকে দিল্লী, আগ্রা, কোলকাতা হয়ে আসাম, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম যেতো বার্মা ফ্রন্টের যুদ্ধে যোগদানের জন্যে। আর আসাম থেকে অরুণাচল হয়ে চীনের কুনমিং যেতো চীন ফ্রন্টে যুদ্ধ করার জন্যে।
 

তাকোরাদি এয়ার রুট বলে পরিচিত এই রুটটা আফ্রিকার মাঝ দিয়ে কয়েক হাজার মাইল গিয়েছিল। এই নেটওয়ার্ক জিইয়ে রাখা বেশ কষ্টসাধ্য কাজ ছিল। সবগুলি ঘাঁটিতে রিফুয়েলিং, মেইনটেন্যান্স ছাড়াও পাইলটদের থাকার ব্যবস্থা করতে হয়েছিল।
 

আকাশে বিমান পরিবহনই আসলে বিমান ফেরি

এভাবে একস্থান থেকে অন্যস্থানে বিমান পাঠানোর পদ্ধতিকেই ‘ফেরি’ বলা হয়। প্রতিটা যুদ্ধবিমানের স্পেসিফিকেশনের মাঝে একটা প্যারামিটার থাকে ‘ফেরি রেঞ্জ’। এর অর্থ হলো অবতরণ না করে একটা বিমান কতদূর যেতে পারে। ফেরি করার সময় বিমানগুলিকে সর্বোচ্চ পরিমাণ তেল ভর্তি করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহার করা ফাইটার বিমানগুলির চাইতে এখনকার ফাইটার বিমানগুলির ফেরি রেঞ্জ অনেক বেশি। রেঞ্জ বাড়ানোর লক্ষ্যে অতিরিক্ত ফুয়েল ট্যাঙ্ক ব্যবহার করা হতো বিশ্বযুদ্ধের সময়; যা এখনও করা হয়। আর এখন রেঞ্জ বাড়াতে এয়ার-টু-এয়ার রিফুয়েলিং করা হয়। তবে মূল ব্যাপারটা একই রয়েছে; আর তা হলো – ফ্যাক্টরি থেকে বিমানগুলি যুদ্ধক্ষেত্র পর্যন্ত কিভাবে পৌঁছাবে। যেসব স্থান দিয়ে উড়বে বিমানগুলি, সেসব স্থান নিজেদের অনুকূলে হতে হবে, অর্থাৎ সেসব স্থানে নিজেদের বন্ধু থাকতে হবে। বিভিন্ন স্থানে বিমানবন্দরগুলিতে নিজেদের বিমান ওঠা-নামার ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিশ্বযুদ্ধের সময়ে হাজার হাজার বিমান ফেরি করতে হয়েছিল। আর তাই ফেরি রুটগুলিতে স্থাপিত ঘাঁটিগুলিতে পাইলটের স্কোয়াড্রন রাখা হতো। বিমান ল্যান্ডিং-এর পরে পাইলট পরিবর্তন হয়ে আরেক স্কোয়াড্রন বুঝে নিতো বিমান। তারাই পরের ঘাঁটি পর্যন্ত উড়িয়ে নিয়ে যেত; আর সেখান থেকে পরিবহণ বিমানে করে পাইলটরা নিজেদের ঘাঁটিতে ফেরত আসতো। এভাবে প্রতি ঘাঁটিতে পাইলটদের থাকার ব্যবস্থা ছাড়াও তেল ভরা এবং অন্যান্য সার্ভিসিং-এর ব্যবস্থা রাখা হতো। এই ঘাঁটিগুলিতে তেল সরবরাহ করাটা আবার আরেক লজিস্টিক্যাল চ্যালেঞ্জ। সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বপূর্বে সাইবেরিয়ার ঘাঁটিগুলিতে তেল সরবরাহ ছিল বিরাট চ্যালেঞ্জ; বিশেষ করে শীতকালে, যখন সমুদ্র বরফে ছেয়ে যেতো। পুরো রুটে এয়ার ট্রাফিল কন্ট্রোল এবং কমিউনিকেশন স্থাপনও ছিল জরুরি।



ব্রাজিলের মাটিতে বিমান ঘাঁটি তৈরি করা হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। ব্রাজিল ছিল মিত্রবাহিনীর যুদ্ধবিমানের সাপ্লাই চেইন-এর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটা শক্তিশালী রাষ্ট্র তার কৌশলগত সরঞ্জামের সাপ্লাই চেইন ম্যানেজ করা জানে। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাটেরিয়ালের সাপ্লাই নিশ্চিত করতে এই পুরো সাপ্লাই চেইন-এরই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ফ্যাক্টরি থেকে শুরু করে ওভারফ্লাইট, বেইসিং রাইটস, রিফুয়েলিং ফ্যাসিলিটি, মেইনটেন্যান্সসহ এই পুরো নেটওয়ার্ক নিজেদের পক্ষে থাকতে হবে। নাহলে দামি দামি খেলনাগুলি শোকেসে স্থান পাবে; কাজে লাগবে না।


যুদ্ধবিমানের সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট

বিমান ফেরি করাটা এক ধরনের সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট। একটা শক্তিশালী রাষ্ট্র তার কৌশলগত সরঞ্জামের সাপ্লাই চেইন ম্যানেজ করা জানে। তার সাপ্লাই চেইন অন্য শক্তির হাতে জিম্মি থাকলে সে কখনোই শক্তিশালী হতে পারে না। রাষ্ট্রের জনগণকে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাটেরিয়াল আনা-নেওয়ার সাপ্লাই চেইন ম্যানেজ করা শিখতে হবে। জানতে হবে কোথা থেকে ম্যাটেরিয়াল আসছে; কে পৌঁছে দিচ্ছে; কিভাবে পৌঁছে দিচ্ছে; কোন রুটে সেগুলি আসছে; কোন এলাকার উপর দিয়ে উড়ে আসছে সেগুলি; কোথায় অবতরণ করছে; কোথায় রিফুয়েলিং করছে; কোথায় সার্ভিসিং করছে। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাটেরিয়ালের সাপ্লাই নিশ্চিত করতে এই পুরো সাপ্লাই চেইন-এরই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ফ্যাক্টরি থেকে শুরু করে ওভারফ্লাইট, বেইসিং রাইটস, রিফুয়েলিং ফ্যাসিলিটি, মেইনটেন্যান্সসহ এই পুরো নেটওয়ার্ক নিজেদের পক্ষে থাকতে হবে। নাহলে দামি দামি খেলনাগুলি শোকেসে স্থান পাবে; কাজে লাগবে না।

Wednesday, 13 June 2018

'সী-বেইস' যেভাবে বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা দিতে পারে

১৩ই জুন ২০১৮

পারস্য উপসাগরে মার্কিন ‘মোবাইল সী-বেইস’ 
  
পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর মোবাইল সী-বেস 'হারকিউলিস'-এর উপরে স্পেশাল ফোর্সের Mark-III patrol boat এবং Black Hawk হেলিকপ্টার দেখা যাচ্ছে। একটা বেসামরিক বার্জ থেকে অত্যন্ত দ্রুত সময়ের মাঝে সামরিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়, যা কিনা সাগরের মাঝে যেকোন স্থানে বসানো যায়। মেশিন গান, বিমান-বিধ্বংসী কামান, মর্টার এবং এন্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল দিয়ে সাজানো হয় এই প্ল্যাটফর্ম। তবে এর সবচাইতে শক্তিশালী অস্ত্র ছিল এর এটাক হেলিকপ্টার এবং আর্মড প্যাট্রোল বোটগুলি। 
 

১৯৮৭ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় মার্কিন সরকার পারস্য উপসাগরে তেলের জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার ছুতোয় সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে। Operation Earnest Will and Operation Prime Chance নামের দু’টা অপারেশনের মাধ্যমে এই সামরিক অবস্থানের কাজ চলে। পারস্য উপসাগরের পানিতে ইরানের ভাসিয়ে দেয়া মাইন থেকে জাহাজগুলিকে রক্ষা করতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের কমান্ডার জেনারেল জর্জ ক্রিস্ট এক নতুন ধরনের পরিকল্পনা দেন। মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ দিয়ে তেলের জাহাজ রক্ষা করা ছাড়াও তিনি আলাদাভাবে পারস্য উপসাগরে হেলিকপ্টার, ছোট বোট এবং স্পেশাল ফোর্সের সেনাদের মোতায়েন করেন। ইরানের ছোট ছোট বোট থেকে জাহাজগুলিকে রক্ষা করতে বড় যুদ্ধজাহাজের চাইতে এই ছোট ফোর্সগুলিই বেশি কার্যকর হবে বলে তিনি মনে করেছিলেন। রাজনৈতিক বিবেচনায় সৌদি আরব এবং কুয়েত উভয় দেশেই মার্কিন সৈন্যদের না রাখার সিদ্ধান্ত নেয় যুক্তরাষ্ট্র। তাহলে এই ছোট ফোর্স কোথায় থাকবে? এই সুযোগখানা করে দেয় মার্কিন বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি Brown & Root (বর্তমানে Kellogg Brown & Root)। ১৯৬২ সালে Haliburton নামের আরেক কোম্পানি Brown & Root-কে কিনে ফেলে এবং ২০০৬ সাল পর্যন্ত কোম্পানিটি Haliburton নামেই সকলের কাছে পরিচিত ছিল। ২০০৭ সালে কোম্পানি দু’টি আলাদা হয়ে যায়। যাইহোক, এই কোম্পানিটি মার্কিন সরকারকে যুদ্ধের সহায়তা হিসেবে পারস্য উপসাগরে তাদের ব্যবহার করা দু’টা কন্সট্রাকশন বার্জ লিজ দিয়ে দেয়। Hercules এবং Wimbrown VII নামের বার্জ দু’টিকে মার্কিনীরা সমুদ্রের মাঝখানে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে। বার্জদু’টিতে লম্বা সময়ের জন্যে মানুষ বসবাসের সুবিধা ছিল। একই সাথে সেখানে হেলিকপ্টার ডেক ছিল এবং যন্ত্রপাতি মেরামতের যথেষ্ট সুবিধা ছিল। Hercules-এর আকৃতি (৪০০ ফুট লম্বা এবং ১৪০ফুট প্রস্থ) ছিল সামরিক ব্যবহারের জন্যে বেশ উপযোগী। Wimbrown VII ছিল একটু ছোট (২৫০ ফুট লম্বা এবং ৭০ ফুট প্রশস্ত)। Wimbrown VII-কে কার্যকর করে তুলতে অবশ্য বেশকিছু কনভার্সন কাজ করতে হয়েছিল। দু’টি বার্জে যথাক্রমে ১৭৭ জন এবং ১৩২ জন সেনার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। দু’টা বার্জ মিলে মোটামুটি ১৬০ কিঃমিঃ ব্যাসের একটা এলাকা টহল দেবার পরিকল্পনা করা হয়; একেকটা ৮০ কিঃমিঃ করে পাহাড়া দেবে। বার্জগুলি থেকে মোটামুটি ৮০ কিঃমিঃ ব্যাসার্থের মাঝে কাজ করবে হেলিকপ্টার এবং ছোট বোটগুলি। যেহেতু রাত দিন ২৪ ঘন্টাই টহল দিতে হবে, তাই বার্জগুলিকে সমুদ্র পরিবহণের রুটের উপরে রাখা হলো – যাতে দরকার হলে অত্যন্ত তাড়াতাড়ি হস্তক্ষেপ করা যায়। আর রাতের বেলায় টহল দেবার ব্যবস্থাও করতে হলো। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ে ব্যবহৃত রিভারাইন প্যাট্রোল বোট (PBR) নিয়ে আসা হলো এবং মার্কিন সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্সের AH-6 ছোট এটাক হেলিকপ্টার বসানো হলো এতে। নৌবাহিনীর স্পেশাল ফোর্স Navy SEALS-এর সাথে ম্যারিন ফোর্সের একটা প্লাটুনও মোতায়েন করা হলো। বার্জগুলিকে ইরানি হামলা থেকে রক্ষা করতে মেটাল প্লেট এবং বালুর বস্তা দিয়ে পরিখার মতো দেয়াল তৈরি করা হলো। Hercules-এর উপরে ব্যবহার করা হয়েছিল ২০ হাজার বালুর বস্তা। এগুলির ভারে নিচু হয়ে যাওয়া বার্জের ডেকের উপরে সমুদ্রের ঢেউএর ঝাপটা লাগতে থাকে। বার্জের ডেকের উপরে সৈন্যদের হাতে দেয়া হলো ১২.৭ মিঃমিঃ মেশিন গান, ৪০মিঃমিঃ MK-19 গ্রেনেড লঞ্চার, TOW ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী মিসাইল, ৮১ মিঃমিঃ মর্টার এবং বিমান বিধ্বংসী Stinger মিসাইল। ২৫মিঃমিঃ চেইন গান এবং ২০মিঃমিঃ বিমান-বিধ্বংসী কামানও বসানো হয়েছিল বার্জগুলিতে। জাহাজ-ধ্বংসী মিসাইল থেকে বাঁচতে এন্টি-মিসাইল রাডার রিফ্লেক্টরও স্থাপন করা হয়েছিল। Explosive Ordnance Disposal (EOD) Team-এর কিছু সদস্য ছাড়াও ম্যারিন কোরের একটা কমিউনিকেশন ডিটাচমেন্ট ছিল বার্জগুলিতে, যাদের কাজ ছিল ঐ এলাকায় সকল পক্ষের যোগাযোগের উপর নজরদারি করা।
  
পারস্য উপসাগরে মার্কিন মোবাইল সী-বেইস Wimbrown VIII-এর পাশে স্পেশাল ফোর্সের Mark-III patrol boat দেখা যাচ্ছে। ডান পাশে সী-বেইসের বালুর বস্তার পরিখার মাঝে মেশিন গান, ৮১মিঃমিঃ মর্টার এবং ৪০মিঃমিঃ গ্রেনেড লঞ্চার দেখা যাচ্ছে।


কিছুদিন পরপরই বার্জগুলির স্থান পরিবর্তন করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ৮০কিঃমিঃ ব্যাসার্ধের এলাকায় হেলিকপ্টারগুলি আক্রমণ চালাবে। Mark III প্যাট্রোল বোটগুলি কাজ করবে এই ব্যাসার্ধের মাঝে। আর ৮ কিঃমিঃ ব্যাসার্ধের এলাকায় টহল দেবে Seafox এবং PBR ছোটবোটগুলি। ১৯৮৭ সালের অগাস্টের মাঝেই এই যুদ্ধের কনসেপ্ট দাঁড় করিয়ে ফেলা হয় এবং ওয়াশিংটনে উর্ধতন কর্মকর্তাদের সামনে তুলে ধরা হয়। এবং এগুলির নামকরণ করা হয় Mobile Sea Base (MSB)। বেশিরভাগ কর্মকর্তাই এই কনসেপ্টকে নিতে পারেননি। তারা যুক্তি দিলেন যে, এই ঘাঁটিগুলি ইরানি নৌ এবং বিমানবাহিনীর টার্গেটে পরিণত হবে এবং এর উপরে থাকা বিভিন্ন বাহিনীর সেনাদের মাঝে একত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা না থাকায় বিশৃংখলার সৃষ্টি হবে। তবে এদের অনেকেই হিসেব করেননি যে, ইরানের বিমান এবং সেনাবাহিনীর বেশিরভাগই সেসময় ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত অবস্থায় রয়েছে, এবং এদেরকে এই বার্জগুলির বিরুদ্ধে মোতায়েন সম্ভব হবে না। আর সেসময় ইরানের কাছে জাহাজ-ধ্বংসী মিসাইল তেমন একটা ছিল না। জেনারেল ক্রিস্টের হিসেব ছিল যে, ইরানিরা এই বার্জগুলির বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে চলবে। আর এই বার্জের পক্ষে সবচাইতে বড় যুক্তি ছিল টাকার অংকটা। দু’টা বার্জ হারানো অবশ্যই বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধজাহাজ হারানোর মতো হবে না। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ অফিসার চেয়ারম্যান জয়েন্ট চীফ আব-স্টাফ এডমিরাল উইলিয়াম ক্রো এই প্রকল্পে সমর্থন দেয়াতে এটা এগিয়ে যায়। এলুমিনিয়ামের তৈরি স্পেশাল ওয়ারফেয়ারের ৬৫ফুট Mark III প্যাট্রোল বোটগুলির ড্রাফট ছিল মাত্র সাড়ে ৫ ফুট; যেকারণে সমুদ্রে অপারেট করতে গিয়ে বেশ সমস্যায় পড়েছিল। কিন্তু মার্কিনীদের কিছু করার ছিল না। কারণ এর কোন বিকল্পও তখন তাদের কাছে ছিল না। এই বোটগুলিকে ৪০মিঃমিঃ কামান, ১২.৭মিঃমিঃ মেশিন গান এবং ৪০মিঃমিঃ গ্রেনেড লঞ্চারে সজ্জিত করার পর ইরানি বোটগুলির বিরুদ্ধে অত্যন্ত শক্তিশালী একটা প্ল্যাটফর্ম দাঁড়িয়ে যায়। যদিও গতি কমিয়ে ২৫ নটিক্যাল মাইলে আনতে হয়েছিল, তথাপি অস্ত্রের শক্তি বেশি থাকায় সেটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছিল তারা। মার্কিন সেনাবাহিনীর ১৬০তম স্পেশাল অপারেশনস এভিয়েশন রেজিমেন্টকে দায়িত্ব দেয়া হয় বার্জগুলিতে হেলিকপ্টার দেবার। রাতের বেলায় অপারেট করার জন্যে হেলিকপ্টারগুলিকে নাইট ভিশন গগলস এবং ফরওয়ার্ড লুকিং ইনফ্রারেড দ্বারা সজ্জিত করা হয়। একেকটা বার্জে ৩টা করে হেলিকপ্টার রাখার ব্যবস্থা করা হয়। মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ প্রায় ৩৫ কিঃমিঃ দক্ষিণে অবস্থান নিয়ে বার্জগুলির নিরাপত্তায় সহায়তা করে।
   
 
পারস্য উপসাগরের মাঝে মোবাইল সী-বেইসে মার্কিন সেনাবাহিনীর OH-58 এটাক হেলিকপ্টার। এন্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল সজ্জিত এই হেলিকপ্টারগুলি ছিল সী-বেইসের প্রধানতম অস্ত্র। 


AH-6 এটাক হেলিকপ্টার-এর স্থলে পরবর্তীতে মার্কিন সেনাবাহিনীর OH-58 হেলিকপ্টার আনা হয়েছিল। এই হেলিকপ্টারগুলি আরও বড় এবং রাতে চলার জন্যে আরও ভালো ইলেকট্রনিক্স ছিল এতে; অস্ত্রের দিক থেকেও ছিল আরও শক্তিশালী। Hellfire এন্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল বহন করতো এগুলি। এছাড়াও মার্কিন নৌবাহিনীর ফ্রিগেটগুলি থেকে ওড়া Sea Hawk হেলিকপ্টারগুলির রাডার খুব ভালো থাকায় এগুলি হেলিকপ্টার এবং বোট অপারেশনে বেশ সাহায্য করেছিল। মার্কিন বাহিনীর হাতে ইরানের নৌশক্তির একটা অংশব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৮৮ সালে ইরাক-ইরান যুদ্ধের অবসানের পর থেকে সহিংসতা কমতে থাকে, এবং বার্জগুলি ১৯৮৮-এর ডিসেম্বর এবং ১৯৮৯-এর জুলাই-এ Brown & Root –এর কাছে ফেরত দেয়া হয়। এই অপারেশনে নতুন কিছু ব্যাপার নিয়ে আসা হয়; যেমন-

১) Mobile Sea Base (MSB) নামের প্ল্যাটফর্মের কনসেপ্ট নতুন ছিল। মার্কিনীরা ‘ব্রাউন ওয়াটার নেভি’এর কনসেপ্ট-এ অভ্যস্ত হয় ভিয়েতনামে, যেখানে তারা ব্যাপকভাবে ছোট বোট, হেলিকপ্টার এবং মোবাইল বেইজ ব্যবহার করেছিল। সে হিসেবে এই প্ল্যাটফর্ম নতুন কিছু নয়। তবে ভিয়েতনাম যুদ্ধে ব্যবহার করা মোবাইল বেইজগুলি তৈরি হয়েছিল নৌবাহিনীর ল্যান্ডিং শিপ-কে কনভার্ট করে। আর এবারে প্রাইভেট কোম্পানির বার্জ ব্যবহার করা হয় মার্কিন সরকারি কাজে।

২) নৌবাহিনীর প্ল্যাটফর্মে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারও অপারেট করেনি কখনও। অন্যাদিকে ম্যারিন কোরের হ্যারিয়ার বিমান এবং হেলিকপ্টার সর্বদাই ব্যবহার করা হয় নৌবাহিনীর জাহাজ থেকে।

৩) সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার হলেও সেগুলি ব্যবহার করা হয়েছিল পুরোপুরি ম্যারিটাইম কাজে। মেশিন গান, কামান, রকেট এবং হেলফায়ার মিসাইল ব্যবহার করা হয় শত্রুপক্ষের নৌবাহিনীকে আক্রমণ করতে। 



মালয়েশিয়ার নৌবাহিনীর মোবাইল সী-বেইস Tun Azizan । ১০২ মিটার লম্বা এই জাহাজ প্যাট্রোল বোট এবং ওপিভির মতো অনান্য যুদ্ধজাহাজের কমান্ড শিপ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে ৯৯ জনের থাকার ব্যবস্থা ছাড়াও এর সাপ্লাই, লজিস্টিকস এবং হেলিকপ্টার ফ্যাসিলিটি অন্যান্য ছোট যুদ্ধজাহাজের সক্ষমতাকে বৃদ্ধি করেছে। 


মালয়েশিয়ার ‘সীবেইস’

মালয়েশিয়া সরকার কিছুটা একইরকম কনসেপ্ট নিয়ে কাজ করছে কয়েক বছর ধরে। ২০১৫-এর জুলাই মাসে Tun Sharifah Rodziah নামের একটা অয়েল রিগ প্ল্যাটফর্মকে নৌবাহিনীর বেইজ হিসেবে প্রস্তুত করা হয়। বাতিল হয়ে যাওয়া এই প্ল্যাটফর্মটি ছিল মালয়েশিয়ার তেল কোম্পানি পেট্রোনাস-এর। এর আগে একই বছরের মে মাসে Tun Azizan নামের একটি জাহাজকে কনভার্ট করে ফরওয়ার্ড বেইজ হিসেবে প্রস্তুত করা হয়। পেট্রোনাস মালয়েশিয়ার আশেপাশের সমুদ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই কর্মকান্ডগুলির অর্থায়ন করে। মালয়েশিয়ার তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী দাতুক সেরি হিসামুদ্দিন হুসেইন ২০১৩ সালে মালয়েশিয়ার সাবাহ প্রদেশের পূর্বে সুলু সাগরে জঙ্গী তৎপরতার পর এই ‘সী বেইজিং’এর প্রস্তাব করেন। Tun Azizan নামের জাহাজটি ছিল মালয়েশিয়ার শিপিং কোম্পানি Malaysia International Shipping Corporation Berhad (MISC)-এর একটি কার্গো জাহাজ। পেট্রোনাসের অর্থায়নে জাহাজটি Malaysia Marine and Heavy Engineering (MMHE)-এর সহায়তায় কনভার্ট করা হয়। ১০২ মিটার লম্বা জাহাজটিতে ৯৯ জনের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একইসাথে পানি, তেল, গোলাবারুদ এবং অনান্য সাপ্লাই-এর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে একটা হেলিকপ্টার ডেক এবং হ্যাঙ্গারও রয়েছে; কমান্ড এবং কমিউনিকেশন যন্ত্রপাতিও রয়েছে। যেসব জাহাজে হেলিকপ্টার নেই, সেগুলি এই জাহাজ থেকে হেলিকপ্টার সাপোর্ট পায়। আবার ফ্লাইট ডেক থাকা ৯১ মিটার লম্বা Kedah-class ওপিভি-গুলি এই জাহাজের হেলিকপ্টারের সাথে কাজ করে হেলিকপ্টারের সক্ষমতা বাড়ায়। ছোট প্যাট্রোলবোটগুলি একে কেন্দ্র করে অপারেট করতে পারে। এই ছোট বোটগুলি Tun Azizan থেকে লজিস্টিক সাপোর্ট পায় সমুদ্রে বেশি সময় থাকার জন্যে। এগুলির কমান্ড ও হয় বড় জাহাজটি থেকে। এই জাহাজটি থেকে কিছুটা আলাদা হলো Bunga Mas Lima(BM5) এবং Bunga Mas Enam (BM6)। ১৩৩ মিটারের ৯ হাজার টনের এই দু’টি জাহাজকে ২০০৯ সালে ডেভেলপ করা হয় মালয়েশিয়ার উপকূল থেকে দূরে গভীর সমুদ্রে অপারেট করার জন্য। ৭০০ কন্টেইনার বহন ক্ষমতার এই শিপগুলিকে কনভার্ট করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, যখন ২০০৮ সালে সোমালিয়ার উপকূলে মালয়েশিয়ার জাহাজ হাইজ্যাক হবার পর সমুদ্রেপথের নিরাপত্তা দিতে মালয়েশিয়ার নৌবাহিনীর জাহাজ পাঠানো শুরু হয়। জাহাজগুলিতে অতিরিক্ত সেনা বহনের ব্যবস্থা করা ছাড়াও rigid hull inflatable boat এবং হেলিকপ্টার অপারেট করার ব্যবস্থা করা হয়। জাহাজগুলি বেসামরিক লোকেরা চালান; তবে এর মূল শক্তি হলো মালয়েশিয়ান স্পেশাল ফোর্স এবং এর হেলিকপ্টার। সোমালিয়ার উপকূলে KD Sri Inderasakti, KD Mahawangsa এবং KD Sri Inderapura জাহাজগুলি পাঠানো হয়েছিল বিভিন্ন সময়ে। ১৯৮৩ সালে জার্মানি থেকে কেনা KD Sri Inderasakti, KD Mahawangsa জাহজদু’টি ১০০ মিটার লম্বা ৪,৩০০ টনের লজিস্টিক সাপোর্ট জাহাজ, যেগুলি সর্বোচ্চ ৬০০ সৈন্য নিতে পারে, ১০টা কন্টেইনার নিতে পারে এবং বেশকিছু গাড়িও বহন করতে পারে। আর KD Sri Inderapura জাহাজটি মার্কিন নৌবাহিনীর উভচর Newport-class LST জাহাজ ছিল, যা ২০০৯ সালে আগুনে পুরে বাতিল হয়ে যায়। মেইনটেন্যান্স এবং অনান্য মিশনের চাপে জাহাজ সংকটে Bunga Mas Lima (BM5) এবং Bunga Mas Enam (BM6) জাহাজকে কনভার্ট করা হয়।তাছাড়া উপরে তিনটি জাহাজের একটাতেও হেলিকপ্টার হ্যাঙ্গার নেই, যা ছাড়া বাজে আবহাওয়ায় হেলিকপ্টার মেইন্টেন্যান্স সম্ভব নয়। তাই নতুন কনভার্ট করা জাহাজগুলিতে হ্যাঙ্গার স্থাপন করা হয়। বর্তমানে মালয়েশিয়ার নৌবাহিনীতে লজিস্টিক সাপোর্ট দেবার মতো পাঁচটা জাহাজ আছে, যেগুলির প্রত্যেকটিরই যুদ্ধ করার সক্ষমতা রয়েছে - KD Sri Inderasakti, KD Mahawangsa, Bunga Mas Lima (BM5), Bunga Mas Enam (BM6) এবং Tun Azizan ।এই প্রত্যেকটা জাহাজই হেলিকপ্টার সাপোর্ট করতে পারে।প্রত্যেকটা জাহাজেই কমান্ড-কন্ট্রোলের ফ্যাসিলিটি রয়েছে এবং এগুলিকে কেন্দ্র করে অনান্য যুদ্ধজাহাজ অপারেট করতে পারে। এগুলি মোবাইল সী-বেইস হিসেবে কাজ করছে।
 
মালয়েশিয়ার সী-বেইস Tun Sharifah Rodziah নতুন এক চিন্তার ফসল। পেট্রোনাসের পুরোনো অয়েল রিগ প্ল্যাটফর্ম এখন হেলিকপ্টার, প্যাট্রোল বোট এবং সৈন্যদের ঘাঁটি। গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটের নিরাপত্তা দিতে এধরনের প্ল্যাটফর্ম নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।


তবে Tun Sharifah Rodziah নামের প্ল্যাটফর্মটা সত্যিই আলাদা। পারস্য উপসাগরে মার্কিন অপারেশনের সাথে এই প্ল্যাটফর্মের কিছু মিল রয়েছে। এটাকে তার স্থান থেকে সরানো যায় ঠিকই, তবে এর নিজের চলার ক্ষমতা নেই। একে মোটামুটিভাবে অস্থায়ী বেইস হিসবে ব্যবহার করা যায়; যা উপকূল থেকে দূরে গুরুত্বপূর্ণ শিপিং রুট বা স্ট্র্যাটেজিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা দিতে পারে। এতে সেনাদের থাকার ব্যবস্থা ছাড়াও কমান্ড-কন্ট্রোল, কমিউনিকেন্স, সার্ভেইল্যান্স এবং লজিস্টিক্যাল সাপোর্টের ব্যবস্থা রয়েছে। মালয়েশিয়ার সেনাবাহিনী, কোস্ট গার্ড, ম্যারিন পুলিশ-সহ বিভিন্ন এজেন্সি এই ঘাঁটি ব্যবহার করে। ২৪ ঘন্টা সার্ভেইল্যান্সের মাধ্যমে সমুদ্রে নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে। কিছু ইন্টারসেপ্টর বোট এই বেইস-এ থাকে, যেগুলি যেকোন সময় দরকারমতো পাঠানো হয়। গভীর সমুদ্রে এরকম বেইস ছাড়া এই ছোট বোটগুলি মোতায়েন করা কঠিন। মালয়েশিয়ান নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল দাতুক সেরি আহমাদ কামরুলজামান আহমাদ বদরুদ্দিন এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে, চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করতে গিয়েই সুযোগ হাজির হয়েছে, যা তারা কাজে লাগিয়েছেন। সুলু সাগরে জঙ্গি সংগঠনের আবির্ভাব না হলে মালয়েশিয়ার নৌবাহিনী হয়তো এমন প্ল্যাটফর্মের দিকে যেতো না। তবে এখন সমুদ্র অনেক নিরাপদ করা যাচ্ছে।
  

বাংলাদেশের উপকূলে জেগে উঠছে নতুন নতুন অনেক দ্বীপ। এসব দ্বীপকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে যাচ্ছে নতুন এক অর্থনীতি। এসব দ্বীপ ছাড়াও বঙ্গোপসাগরের মাঝে স্ট্র্যাটেজিক স্থাপনা, মাছের ক্ষেত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটগুলির নিরাপত্তা এখন অতি গুরুত্বপূর্ণ। মালয়েশিয়ার সী-বেইসগুলি বাংলাদেশের সমুদ্র নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।




বাংলাদেশ তার সমুদ্র সম্পদকে রক্ষায় যা করতে পারে…

পারস্য উপসাগরে মার্কিন অভিজ্ঞতা এবং মালয়েশিয়ার সুলু সাগরের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যে চমৎকার উদাহরণ হতে পারে। এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে সী-বেইস-এর অবতারণা করতে পারে। এর সপক্ষে কিছু শক্তিশালী দিক রয়েছে।

প্রথমতঃ বঙ্গোপসাগরে নতুন নতুন দ্বীপের আবির্ভাব হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এই দ্বীপগুলির নিরাপত্তা খুব শিগগিরই ব্যবস্থা করা জরুরি। নৌবাহিনী এবং কোস্ট গার্ডের প্যাট্রোল বোটগুলিকে সমুদ্রে বেশি সময়ের জন্য অপারেট করার একটা পদ্ধতি হতে পারে এ ধরনের প্ল্যাটফর্মগুলি।

দ্বিতীয়তঃ বঙ্গোপসাগরে অতি গুরুত্বপূর্ণ কুতুবদিয়া আউটার এঙ্করেজ ছাড়াও নতুন নতুন অনেক স্ট্র্যাটেজিক স্থাপনা বসানো হচ্ছে, যেমন – মাতারবাড়ি ডীপ সী পোর্ট, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং টার্মিনাল, এলএনজি টার্মিনাল, ইত্যাদি। এর বাইরেও বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস আহরণের জন্যে চেষ্টা চলছে, যেগুলির সাথে বিভিন্ন স্থায়ী স্থাপনা লাগবে। সী-বেইসের মাধ্যমে মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের এই স্থাপনাগুলির ২৪ ঘন্টা নিরাপত্তা দেয়া সহজ হবে।

তৃতীয়তঃ বাংলাদেশের বাণিজ্যের ৯০%-এর বেশি সমুদ্রপথে হয়ে থাকে। বাংলাদেশের সমুদ্র সীমানার ভেতরে সী-বেইস স্থাপনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র রুটের ২৪ ঘন্টা নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব হতে পারে।

চতুর্থতঃ বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার নিরাপত্তা প্রদানে সক্ষমতা বাড়াতে সী-বেইস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। বিপদে পড়া মাছ ধরার ট্রলারগুলিকেও সহায়তা দেয়া সহজ হতে পারে।



মে ২০১৭ - বাংলাদেশ নৌবাহিনী যুদ্ধজাহাজ বিএনএস স্বাধীনতা মালয়েশিয়ার লুমুত নৌঘাঁটিতে। মালয়েশিয়ার সাথে বাংলাদেশের সামরিক সহযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে বঙ্গোপসাগর এবং মালয়েশিয়ার পূর্বের সুলু সাগরের নৌ-নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা যায়। বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার কাছে প্রস্তাব রাখতে পারে, যাতে মালয়েশিয়ার সী-বেইস প্ল্যাটফর্মের সাথে বাংলাদেশের নৌবাহিনীর একজন অফিসার, অথবা একটা নাবিকের গ্রুপ, অথবা একটা ছোট যুদ্ধজাহাজ, অথবা একাধিক যুদ্ধজাহাজ এটাচ করা যায়। শেষোক্ত (যুদ্ধজাহাজ) ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার পূর্বের সুলু সাগরে নিরাপত্তা দেবার জন্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর এসেট অফার করতে পারে। এতে সুলু সাগরের নিরাপত্তা যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অভিজ্ঞতার নতুন দুয়ার খুলে যাবে। একইসাথে মালয়েশিয়া এবং বাংলাদেশের সামরিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা নতুন এক মাত্রা পাবে।


বাংলাদেশের কাছে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হবে; কারণ এই মুহুর্তে মালয়েশিয়া বিভিন্ন প্রকারের সী-বেইস অপারেট করছে। তারা কার্গো শিপ থেকে কনভার্ট করা লজিস্টিক জাহাজ যেমন অপারেট করছে, তেমনি অয়েল রিগ থেকে কনভার্ট করা প্ল্যাটফর্মও অপারেট করছে। বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার কাছে প্রস্তাব রাখতে পারে, যাতে এই জাহাজ এবং প্ল্যাটফর্মের সাথে বাংলাদেশের নৌবাহিনীর কিছু এলিমেন্টকে এটাচ করা যায়। এই এলিমেন্ট হতে পারে একজন অফিসার, একটা নাবিকের গ্রুপ, একটা ছোট যুদ্ধজাহাজ, অথবা একাধিক যুদ্ধজাহাজ। শেষোক্ত (যুদ্ধজাহাজ) ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার পূর্বের সুলু সাগরে নিরাপত্তা দেবার জন্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর এসেট অফার করতে পারে। এতে সুলু সাগরের নিরাপত্তা যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অভিজ্ঞতার নতুন দুয়ার খুলে যাবে। একইসাথে মালয়েশিয়া এবং বাংলাদেশের সামরিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা নতুন এক মাত্রা পাবে।


আরও পড়ুনঃ
"সী-বেইসিং" - সমুদ্রেই ঘাঁটি!