Wednesday, 13 June 2018

'সী-বেইস' যেভাবে বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা দিতে পারে

১৩ই জুন ২০১৮

পারস্য উপসাগরে মার্কিন ‘মোবাইল সী-বেইস’ 
  
পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর মোবাইল সী-বেস 'হারকিউলিস'-এর উপরে স্পেশাল ফোর্সের Mark-III patrol boat এবং Black Hawk হেলিকপ্টার দেখা যাচ্ছে। একটা বেসামরিক বার্জ থেকে অত্যন্ত দ্রুত সময়ের মাঝে সামরিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়, যা কিনা সাগরের মাঝে যেকোন স্থানে বসানো যায়। মেশিন গান, বিমান-বিধ্বংসী কামান, মর্টার এবং এন্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল দিয়ে সাজানো হয় এই প্ল্যাটফর্ম। তবে এর সবচাইতে শক্তিশালী অস্ত্র ছিল এর এটাক হেলিকপ্টার এবং আর্মড প্যাট্রোল বোটগুলি। 
 

১৯৮৭ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় মার্কিন সরকার পারস্য উপসাগরে তেলের জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার ছুতোয় সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে। Operation Earnest Will and Operation Prime Chance নামের দু’টা অপারেশনের মাধ্যমে এই সামরিক অবস্থানের কাজ চলে। পারস্য উপসাগরের পানিতে ইরানের ভাসিয়ে দেয়া মাইন থেকে জাহাজগুলিকে রক্ষা করতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের কমান্ডার জেনারেল জর্জ ক্রিস্ট এক নতুন ধরনের পরিকল্পনা দেন। মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ দিয়ে তেলের জাহাজ রক্ষা করা ছাড়াও তিনি আলাদাভাবে পারস্য উপসাগরে হেলিকপ্টার, ছোট বোট এবং স্পেশাল ফোর্সের সেনাদের মোতায়েন করেন। ইরানের ছোট ছোট বোট থেকে জাহাজগুলিকে রক্ষা করতে বড় যুদ্ধজাহাজের চাইতে এই ছোট ফোর্সগুলিই বেশি কার্যকর হবে বলে তিনি মনে করেছিলেন। রাজনৈতিক বিবেচনায় সৌদি আরব এবং কুয়েত উভয় দেশেই মার্কিন সৈন্যদের না রাখার সিদ্ধান্ত নেয় যুক্তরাষ্ট্র। তাহলে এই ছোট ফোর্স কোথায় থাকবে? এই সুযোগখানা করে দেয় মার্কিন বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি Brown & Root (বর্তমানে Kellogg Brown & Root)। ১৯৬২ সালে Haliburton নামের আরেক কোম্পানি Brown & Root-কে কিনে ফেলে এবং ২০০৬ সাল পর্যন্ত কোম্পানিটি Haliburton নামেই সকলের কাছে পরিচিত ছিল। ২০০৭ সালে কোম্পানি দু’টি আলাদা হয়ে যায়। যাইহোক, এই কোম্পানিটি মার্কিন সরকারকে যুদ্ধের সহায়তা হিসেবে পারস্য উপসাগরে তাদের ব্যবহার করা দু’টা কন্সট্রাকশন বার্জ লিজ দিয়ে দেয়। Hercules এবং Wimbrown VII নামের বার্জ দু’টিকে মার্কিনীরা সমুদ্রের মাঝখানে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে। বার্জদু’টিতে লম্বা সময়ের জন্যে মানুষ বসবাসের সুবিধা ছিল। একই সাথে সেখানে হেলিকপ্টার ডেক ছিল এবং যন্ত্রপাতি মেরামতের যথেষ্ট সুবিধা ছিল। Hercules-এর আকৃতি (৪০০ ফুট লম্বা এবং ১৪০ফুট প্রস্থ) ছিল সামরিক ব্যবহারের জন্যে বেশ উপযোগী। Wimbrown VII ছিল একটু ছোট (২৫০ ফুট লম্বা এবং ৭০ ফুট প্রশস্ত)। Wimbrown VII-কে কার্যকর করে তুলতে অবশ্য বেশকিছু কনভার্সন কাজ করতে হয়েছিল। দু’টি বার্জে যথাক্রমে ১৭৭ জন এবং ১৩২ জন সেনার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। দু’টা বার্জ মিলে মোটামুটি ১৬০ কিঃমিঃ ব্যাসের একটা এলাকা টহল দেবার পরিকল্পনা করা হয়; একেকটা ৮০ কিঃমিঃ করে পাহাড়া দেবে। বার্জগুলি থেকে মোটামুটি ৮০ কিঃমিঃ ব্যাসার্থের মাঝে কাজ করবে হেলিকপ্টার এবং ছোট বোটগুলি। যেহেতু রাত দিন ২৪ ঘন্টাই টহল দিতে হবে, তাই বার্জগুলিকে সমুদ্র পরিবহণের রুটের উপরে রাখা হলো – যাতে দরকার হলে অত্যন্ত তাড়াতাড়ি হস্তক্ষেপ করা যায়। আর রাতের বেলায় টহল দেবার ব্যবস্থাও করতে হলো। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ে ব্যবহৃত রিভারাইন প্যাট্রোল বোট (PBR) নিয়ে আসা হলো এবং মার্কিন সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্সের AH-6 ছোট এটাক হেলিকপ্টার বসানো হলো এতে। নৌবাহিনীর স্পেশাল ফোর্স Navy SEALS-এর সাথে ম্যারিন ফোর্সের একটা প্লাটুনও মোতায়েন করা হলো। বার্জগুলিকে ইরানি হামলা থেকে রক্ষা করতে মেটাল প্লেট এবং বালুর বস্তা দিয়ে পরিখার মতো দেয়াল তৈরি করা হলো। Hercules-এর উপরে ব্যবহার করা হয়েছিল ২০ হাজার বালুর বস্তা। এগুলির ভারে নিচু হয়ে যাওয়া বার্জের ডেকের উপরে সমুদ্রের ঢেউএর ঝাপটা লাগতে থাকে। বার্জের ডেকের উপরে সৈন্যদের হাতে দেয়া হলো ১২.৭ মিঃমিঃ মেশিন গান, ৪০মিঃমিঃ MK-19 গ্রেনেড লঞ্চার, TOW ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী মিসাইল, ৮১ মিঃমিঃ মর্টার এবং বিমান বিধ্বংসী Stinger মিসাইল। ২৫মিঃমিঃ চেইন গান এবং ২০মিঃমিঃ বিমান-বিধ্বংসী কামানও বসানো হয়েছিল বার্জগুলিতে। জাহাজ-ধ্বংসী মিসাইল থেকে বাঁচতে এন্টি-মিসাইল রাডার রিফ্লেক্টরও স্থাপন করা হয়েছিল। Explosive Ordnance Disposal (EOD) Team-এর কিছু সদস্য ছাড়াও ম্যারিন কোরের একটা কমিউনিকেশন ডিটাচমেন্ট ছিল বার্জগুলিতে, যাদের কাজ ছিল ঐ এলাকায় সকল পক্ষের যোগাযোগের উপর নজরদারি করা।
  
পারস্য উপসাগরে মার্কিন মোবাইল সী-বেইস Wimbrown VIII-এর পাশে স্পেশাল ফোর্সের Mark-III patrol boat দেখা যাচ্ছে। ডান পাশে সী-বেইসের বালুর বস্তার পরিখার মাঝে মেশিন গান, ৮১মিঃমিঃ মর্টার এবং ৪০মিঃমিঃ গ্রেনেড লঞ্চার দেখা যাচ্ছে।


কিছুদিন পরপরই বার্জগুলির স্থান পরিবর্তন করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ৮০কিঃমিঃ ব্যাসার্ধের এলাকায় হেলিকপ্টারগুলি আক্রমণ চালাবে। Mark III প্যাট্রোল বোটগুলি কাজ করবে এই ব্যাসার্ধের মাঝে। আর ৮ কিঃমিঃ ব্যাসার্ধের এলাকায় টহল দেবে Seafox এবং PBR ছোটবোটগুলি। ১৯৮৭ সালের অগাস্টের মাঝেই এই যুদ্ধের কনসেপ্ট দাঁড় করিয়ে ফেলা হয় এবং ওয়াশিংটনে উর্ধতন কর্মকর্তাদের সামনে তুলে ধরা হয়। এবং এগুলির নামকরণ করা হয় Mobile Sea Base (MSB)। বেশিরভাগ কর্মকর্তাই এই কনসেপ্টকে নিতে পারেননি। তারা যুক্তি দিলেন যে, এই ঘাঁটিগুলি ইরানি নৌ এবং বিমানবাহিনীর টার্গেটে পরিণত হবে এবং এর উপরে থাকা বিভিন্ন বাহিনীর সেনাদের মাঝে একত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা না থাকায় বিশৃংখলার সৃষ্টি হবে। তবে এদের অনেকেই হিসেব করেননি যে, ইরানের বিমান এবং সেনাবাহিনীর বেশিরভাগই সেসময় ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত অবস্থায় রয়েছে, এবং এদেরকে এই বার্জগুলির বিরুদ্ধে মোতায়েন সম্ভব হবে না। আর সেসময় ইরানের কাছে জাহাজ-ধ্বংসী মিসাইল তেমন একটা ছিল না। জেনারেল ক্রিস্টের হিসেব ছিল যে, ইরানিরা এই বার্জগুলির বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে চলবে। আর এই বার্জের পক্ষে সবচাইতে বড় যুক্তি ছিল টাকার অংকটা। দু’টা বার্জ হারানো অবশ্যই বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধজাহাজ হারানোর মতো হবে না। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ অফিসার চেয়ারম্যান জয়েন্ট চীফ আব-স্টাফ এডমিরাল উইলিয়াম ক্রো এই প্রকল্পে সমর্থন দেয়াতে এটা এগিয়ে যায়। এলুমিনিয়ামের তৈরি স্পেশাল ওয়ারফেয়ারের ৬৫ফুট Mark III প্যাট্রোল বোটগুলির ড্রাফট ছিল মাত্র সাড়ে ৫ ফুট; যেকারণে সমুদ্রে অপারেট করতে গিয়ে বেশ সমস্যায় পড়েছিল। কিন্তু মার্কিনীদের কিছু করার ছিল না। কারণ এর কোন বিকল্পও তখন তাদের কাছে ছিল না। এই বোটগুলিকে ৪০মিঃমিঃ কামান, ১২.৭মিঃমিঃ মেশিন গান এবং ৪০মিঃমিঃ গ্রেনেড লঞ্চারে সজ্জিত করার পর ইরানি বোটগুলির বিরুদ্ধে অত্যন্ত শক্তিশালী একটা প্ল্যাটফর্ম দাঁড়িয়ে যায়। যদিও গতি কমিয়ে ২৫ নটিক্যাল মাইলে আনতে হয়েছিল, তথাপি অস্ত্রের শক্তি বেশি থাকায় সেটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছিল তারা। মার্কিন সেনাবাহিনীর ১৬০তম স্পেশাল অপারেশনস এভিয়েশন রেজিমেন্টকে দায়িত্ব দেয়া হয় বার্জগুলিতে হেলিকপ্টার দেবার। রাতের বেলায় অপারেট করার জন্যে হেলিকপ্টারগুলিকে নাইট ভিশন গগলস এবং ফরওয়ার্ড লুকিং ইনফ্রারেড দ্বারা সজ্জিত করা হয়। একেকটা বার্জে ৩টা করে হেলিকপ্টার রাখার ব্যবস্থা করা হয়। মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ প্রায় ৩৫ কিঃমিঃ দক্ষিণে অবস্থান নিয়ে বার্জগুলির নিরাপত্তায় সহায়তা করে।
   
 
পারস্য উপসাগরের মাঝে মোবাইল সী-বেইসে মার্কিন সেনাবাহিনীর OH-58 এটাক হেলিকপ্টার। এন্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল সজ্জিত এই হেলিকপ্টারগুলি ছিল সী-বেইসের প্রধানতম অস্ত্র। 


AH-6 এটাক হেলিকপ্টার-এর স্থলে পরবর্তীতে মার্কিন সেনাবাহিনীর OH-58 হেলিকপ্টার আনা হয়েছিল। এই হেলিকপ্টারগুলি আরও বড় এবং রাতে চলার জন্যে আরও ভালো ইলেকট্রনিক্স ছিল এতে; অস্ত্রের দিক থেকেও ছিল আরও শক্তিশালী। Hellfire এন্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল বহন করতো এগুলি। এছাড়াও মার্কিন নৌবাহিনীর ফ্রিগেটগুলি থেকে ওড়া Sea Hawk হেলিকপ্টারগুলির রাডার খুব ভালো থাকায় এগুলি হেলিকপ্টার এবং বোট অপারেশনে বেশ সাহায্য করেছিল। মার্কিন বাহিনীর হাতে ইরানের নৌশক্তির একটা অংশব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৮৮ সালে ইরাক-ইরান যুদ্ধের অবসানের পর থেকে সহিংসতা কমতে থাকে, এবং বার্জগুলি ১৯৮৮-এর ডিসেম্বর এবং ১৯৮৯-এর জুলাই-এ Brown & Root –এর কাছে ফেরত দেয়া হয়। এই অপারেশনে নতুন কিছু ব্যাপার নিয়ে আসা হয়; যেমন-

১) Mobile Sea Base (MSB) নামের প্ল্যাটফর্মের কনসেপ্ট নতুন ছিল। মার্কিনীরা ‘ব্রাউন ওয়াটার নেভি’এর কনসেপ্ট-এ অভ্যস্ত হয় ভিয়েতনামে, যেখানে তারা ব্যাপকভাবে ছোট বোট, হেলিকপ্টার এবং মোবাইল বেইজ ব্যবহার করেছিল। সে হিসেবে এই প্ল্যাটফর্ম নতুন কিছু নয়। তবে ভিয়েতনাম যুদ্ধে ব্যবহার করা মোবাইল বেইজগুলি তৈরি হয়েছিল নৌবাহিনীর ল্যান্ডিং শিপ-কে কনভার্ট করে। আর এবারে প্রাইভেট কোম্পানির বার্জ ব্যবহার করা হয় মার্কিন সরকারি কাজে।

২) নৌবাহিনীর প্ল্যাটফর্মে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারও অপারেট করেনি কখনও। অন্যাদিকে ম্যারিন কোরের হ্যারিয়ার বিমান এবং হেলিকপ্টার সর্বদাই ব্যবহার করা হয় নৌবাহিনীর জাহাজ থেকে।

৩) সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার হলেও সেগুলি ব্যবহার করা হয়েছিল পুরোপুরি ম্যারিটাইম কাজে। মেশিন গান, কামান, রকেট এবং হেলফায়ার মিসাইল ব্যবহার করা হয় শত্রুপক্ষের নৌবাহিনীকে আক্রমণ করতে। 



মালয়েশিয়ার নৌবাহিনীর মোবাইল সী-বেইস Tun Azizan । ১০২ মিটার লম্বা এই জাহাজ প্যাট্রোল বোট এবং ওপিভির মতো অনান্য যুদ্ধজাহাজের কমান্ড শিপ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে ৯৯ জনের থাকার ব্যবস্থা ছাড়াও এর সাপ্লাই, লজিস্টিকস এবং হেলিকপ্টার ফ্যাসিলিটি অন্যান্য ছোট যুদ্ধজাহাজের সক্ষমতাকে বৃদ্ধি করেছে। 


মালয়েশিয়ার ‘সীবেইস’

মালয়েশিয়া সরকার কিছুটা একইরকম কনসেপ্ট নিয়ে কাজ করছে কয়েক বছর ধরে। ২০১৫-এর জুলাই মাসে Tun Sharifah Rodziah নামের একটা অয়েল রিগ প্ল্যাটফর্মকে নৌবাহিনীর বেইজ হিসেবে প্রস্তুত করা হয়। বাতিল হয়ে যাওয়া এই প্ল্যাটফর্মটি ছিল মালয়েশিয়ার তেল কোম্পানি পেট্রোনাস-এর। এর আগে একই বছরের মে মাসে Tun Azizan নামের একটি জাহাজকে কনভার্ট করে ফরওয়ার্ড বেইজ হিসেবে প্রস্তুত করা হয়। পেট্রোনাস মালয়েশিয়ার আশেপাশের সমুদ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই কর্মকান্ডগুলির অর্থায়ন করে। মালয়েশিয়ার তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী দাতুক সেরি হিসামুদ্দিন হুসেইন ২০১৩ সালে মালয়েশিয়ার সাবাহ প্রদেশের পূর্বে সুলু সাগরে জঙ্গী তৎপরতার পর এই ‘সী বেইজিং’এর প্রস্তাব করেন। Tun Azizan নামের জাহাজটি ছিল মালয়েশিয়ার শিপিং কোম্পানি Malaysia International Shipping Corporation Berhad (MISC)-এর একটি কার্গো জাহাজ। পেট্রোনাসের অর্থায়নে জাহাজটি Malaysia Marine and Heavy Engineering (MMHE)-এর সহায়তায় কনভার্ট করা হয়। ১০২ মিটার লম্বা জাহাজটিতে ৯৯ জনের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একইসাথে পানি, তেল, গোলাবারুদ এবং অনান্য সাপ্লাই-এর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে একটা হেলিকপ্টার ডেক এবং হ্যাঙ্গারও রয়েছে; কমান্ড এবং কমিউনিকেশন যন্ত্রপাতিও রয়েছে। যেসব জাহাজে হেলিকপ্টার নেই, সেগুলি এই জাহাজ থেকে হেলিকপ্টার সাপোর্ট পায়। আবার ফ্লাইট ডেক থাকা ৯১ মিটার লম্বা Kedah-class ওপিভি-গুলি এই জাহাজের হেলিকপ্টারের সাথে কাজ করে হেলিকপ্টারের সক্ষমতা বাড়ায়। ছোট প্যাট্রোলবোটগুলি একে কেন্দ্র করে অপারেট করতে পারে। এই ছোট বোটগুলি Tun Azizan থেকে লজিস্টিক সাপোর্ট পায় সমুদ্রে বেশি সময় থাকার জন্যে। এগুলির কমান্ড ও হয় বড় জাহাজটি থেকে। এই জাহাজটি থেকে কিছুটা আলাদা হলো Bunga Mas Lima(BM5) এবং Bunga Mas Enam (BM6)। ১৩৩ মিটারের ৯ হাজার টনের এই দু’টি জাহাজকে ২০০৯ সালে ডেভেলপ করা হয় মালয়েশিয়ার উপকূল থেকে দূরে গভীর সমুদ্রে অপারেট করার জন্য। ৭০০ কন্টেইনার বহন ক্ষমতার এই শিপগুলিকে কনভার্ট করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, যখন ২০০৮ সালে সোমালিয়ার উপকূলে মালয়েশিয়ার জাহাজ হাইজ্যাক হবার পর সমুদ্রেপথের নিরাপত্তা দিতে মালয়েশিয়ার নৌবাহিনীর জাহাজ পাঠানো শুরু হয়। জাহাজগুলিতে অতিরিক্ত সেনা বহনের ব্যবস্থা করা ছাড়াও rigid hull inflatable boat এবং হেলিকপ্টার অপারেট করার ব্যবস্থা করা হয়। জাহাজগুলি বেসামরিক লোকেরা চালান; তবে এর মূল শক্তি হলো মালয়েশিয়ান স্পেশাল ফোর্স এবং এর হেলিকপ্টার। সোমালিয়ার উপকূলে KD Sri Inderasakti, KD Mahawangsa এবং KD Sri Inderapura জাহাজগুলি পাঠানো হয়েছিল বিভিন্ন সময়ে। ১৯৮৩ সালে জার্মানি থেকে কেনা KD Sri Inderasakti, KD Mahawangsa জাহজদু’টি ১০০ মিটার লম্বা ৪,৩০০ টনের লজিস্টিক সাপোর্ট জাহাজ, যেগুলি সর্বোচ্চ ৬০০ সৈন্য নিতে পারে, ১০টা কন্টেইনার নিতে পারে এবং বেশকিছু গাড়িও বহন করতে পারে। আর KD Sri Inderapura জাহাজটি মার্কিন নৌবাহিনীর উভচর Newport-class LST জাহাজ ছিল, যা ২০০৯ সালে আগুনে পুরে বাতিল হয়ে যায়। মেইনটেন্যান্স এবং অনান্য মিশনের চাপে জাহাজ সংকটে Bunga Mas Lima (BM5) এবং Bunga Mas Enam (BM6) জাহাজকে কনভার্ট করা হয়।তাছাড়া উপরে তিনটি জাহাজের একটাতেও হেলিকপ্টার হ্যাঙ্গার নেই, যা ছাড়া বাজে আবহাওয়ায় হেলিকপ্টার মেইন্টেন্যান্স সম্ভব নয়। তাই নতুন কনভার্ট করা জাহাজগুলিতে হ্যাঙ্গার স্থাপন করা হয়। বর্তমানে মালয়েশিয়ার নৌবাহিনীতে লজিস্টিক সাপোর্ট দেবার মতো পাঁচটা জাহাজ আছে, যেগুলির প্রত্যেকটিরই যুদ্ধ করার সক্ষমতা রয়েছে - KD Sri Inderasakti, KD Mahawangsa, Bunga Mas Lima (BM5), Bunga Mas Enam (BM6) এবং Tun Azizan ।এই প্রত্যেকটা জাহাজই হেলিকপ্টার সাপোর্ট করতে পারে।প্রত্যেকটা জাহাজেই কমান্ড-কন্ট্রোলের ফ্যাসিলিটি রয়েছে এবং এগুলিকে কেন্দ্র করে অনান্য যুদ্ধজাহাজ অপারেট করতে পারে। এগুলি মোবাইল সী-বেইস হিসেবে কাজ করছে।
 
মালয়েশিয়ার সী-বেইস Tun Sharifah Rodziah নতুন এক চিন্তার ফসল। পেট্রোনাসের পুরোনো অয়েল রিগ প্ল্যাটফর্ম এখন হেলিকপ্টার, প্যাট্রোল বোট এবং সৈন্যদের ঘাঁটি। গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটের নিরাপত্তা দিতে এধরনের প্ল্যাটফর্ম নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।


তবে Tun Sharifah Rodziah নামের প্ল্যাটফর্মটা সত্যিই আলাদা। পারস্য উপসাগরে মার্কিন অপারেশনের সাথে এই প্ল্যাটফর্মের কিছু মিল রয়েছে। এটাকে তার স্থান থেকে সরানো যায় ঠিকই, তবে এর নিজের চলার ক্ষমতা নেই। একে মোটামুটিভাবে অস্থায়ী বেইস হিসবে ব্যবহার করা যায়; যা উপকূল থেকে দূরে গুরুত্বপূর্ণ শিপিং রুট বা স্ট্র্যাটেজিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা দিতে পারে। এতে সেনাদের থাকার ব্যবস্থা ছাড়াও কমান্ড-কন্ট্রোল, কমিউনিকেন্স, সার্ভেইল্যান্স এবং লজিস্টিক্যাল সাপোর্টের ব্যবস্থা রয়েছে। মালয়েশিয়ার সেনাবাহিনী, কোস্ট গার্ড, ম্যারিন পুলিশ-সহ বিভিন্ন এজেন্সি এই ঘাঁটি ব্যবহার করে। ২৪ ঘন্টা সার্ভেইল্যান্সের মাধ্যমে সমুদ্রে নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে। কিছু ইন্টারসেপ্টর বোট এই বেইস-এ থাকে, যেগুলি যেকোন সময় দরকারমতো পাঠানো হয়। গভীর সমুদ্রে এরকম বেইস ছাড়া এই ছোট বোটগুলি মোতায়েন করা কঠিন। মালয়েশিয়ান নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল দাতুক সেরি আহমাদ কামরুলজামান আহমাদ বদরুদ্দিন এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে, চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করতে গিয়েই সুযোগ হাজির হয়েছে, যা তারা কাজে লাগিয়েছেন। সুলু সাগরে জঙ্গি সংগঠনের আবির্ভাব না হলে মালয়েশিয়ার নৌবাহিনী হয়তো এমন প্ল্যাটফর্মের দিকে যেতো না। তবে এখন সমুদ্র অনেক নিরাপদ করা যাচ্ছে।
  

বাংলাদেশের উপকূলে জেগে উঠছে নতুন নতুন অনেক দ্বীপ। এসব দ্বীপকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে যাচ্ছে নতুন এক অর্থনীতি। এসব দ্বীপ ছাড়াও বঙ্গোপসাগরের মাঝে স্ট্র্যাটেজিক স্থাপনা, মাছের ক্ষেত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটগুলির নিরাপত্তা এখন অতি গুরুত্বপূর্ণ। মালয়েশিয়ার সী-বেইসগুলি বাংলাদেশের সমুদ্র নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।




বাংলাদেশ তার সমুদ্র সম্পদকে রক্ষায় যা করতে পারে…

পারস্য উপসাগরে মার্কিন অভিজ্ঞতা এবং মালয়েশিয়ার সুলু সাগরের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যে চমৎকার উদাহরণ হতে পারে। এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে সী-বেইস-এর অবতারণা করতে পারে। এর সপক্ষে কিছু শক্তিশালী দিক রয়েছে।

প্রথমতঃ বঙ্গোপসাগরে নতুন নতুন দ্বীপের আবির্ভাব হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এই দ্বীপগুলির নিরাপত্তা খুব শিগগিরই ব্যবস্থা করা জরুরি। নৌবাহিনী এবং কোস্ট গার্ডের প্যাট্রোল বোটগুলিকে সমুদ্রে বেশি সময়ের জন্য অপারেট করার একটা পদ্ধতি হতে পারে এ ধরনের প্ল্যাটফর্মগুলি।

দ্বিতীয়তঃ বঙ্গোপসাগরে অতি গুরুত্বপূর্ণ কুতুবদিয়া আউটার এঙ্করেজ ছাড়াও নতুন নতুন অনেক স্ট্র্যাটেজিক স্থাপনা বসানো হচ্ছে, যেমন – মাতারবাড়ি ডীপ সী পোর্ট, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং টার্মিনাল, এলএনজি টার্মিনাল, ইত্যাদি। এর বাইরেও বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস আহরণের জন্যে চেষ্টা চলছে, যেগুলির সাথে বিভিন্ন স্থায়ী স্থাপনা লাগবে। সী-বেইসের মাধ্যমে মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের এই স্থাপনাগুলির ২৪ ঘন্টা নিরাপত্তা দেয়া সহজ হবে।

তৃতীয়তঃ বাংলাদেশের বাণিজ্যের ৯০%-এর বেশি সমুদ্রপথে হয়ে থাকে। বাংলাদেশের সমুদ্র সীমানার ভেতরে সী-বেইস স্থাপনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র রুটের ২৪ ঘন্টা নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব হতে পারে।

চতুর্থতঃ বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার নিরাপত্তা প্রদানে সক্ষমতা বাড়াতে সী-বেইস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। বিপদে পড়া মাছ ধরার ট্রলারগুলিকেও সহায়তা দেয়া সহজ হতে পারে।



মে ২০১৭ - বাংলাদেশ নৌবাহিনী যুদ্ধজাহাজ বিএনএস স্বাধীনতা মালয়েশিয়ার লুমুত নৌঘাঁটিতে। মালয়েশিয়ার সাথে বাংলাদেশের সামরিক সহযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে বঙ্গোপসাগর এবং মালয়েশিয়ার পূর্বের সুলু সাগরের নৌ-নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা যায়। বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার কাছে প্রস্তাব রাখতে পারে, যাতে মালয়েশিয়ার সী-বেইস প্ল্যাটফর্মের সাথে বাংলাদেশের নৌবাহিনীর একজন অফিসার, অথবা একটা নাবিকের গ্রুপ, অথবা একটা ছোট যুদ্ধজাহাজ, অথবা একাধিক যুদ্ধজাহাজ এটাচ করা যায়। শেষোক্ত (যুদ্ধজাহাজ) ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার পূর্বের সুলু সাগরে নিরাপত্তা দেবার জন্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর এসেট অফার করতে পারে। এতে সুলু সাগরের নিরাপত্তা যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অভিজ্ঞতার নতুন দুয়ার খুলে যাবে। একইসাথে মালয়েশিয়া এবং বাংলাদেশের সামরিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা নতুন এক মাত্রা পাবে।


বাংলাদেশের কাছে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হবে; কারণ এই মুহুর্তে মালয়েশিয়া বিভিন্ন প্রকারের সী-বেইস অপারেট করছে। তারা কার্গো শিপ থেকে কনভার্ট করা লজিস্টিক জাহাজ যেমন অপারেট করছে, তেমনি অয়েল রিগ থেকে কনভার্ট করা প্ল্যাটফর্মও অপারেট করছে। বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার কাছে প্রস্তাব রাখতে পারে, যাতে এই জাহাজ এবং প্ল্যাটফর্মের সাথে বাংলাদেশের নৌবাহিনীর কিছু এলিমেন্টকে এটাচ করা যায়। এই এলিমেন্ট হতে পারে একজন অফিসার, একটা নাবিকের গ্রুপ, একটা ছোট যুদ্ধজাহাজ, অথবা একাধিক যুদ্ধজাহাজ। শেষোক্ত (যুদ্ধজাহাজ) ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার পূর্বের সুলু সাগরে নিরাপত্তা দেবার জন্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর এসেট অফার করতে পারে। এতে সুলু সাগরের নিরাপত্তা যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অভিজ্ঞতার নতুন দুয়ার খুলে যাবে। একইসাথে মালয়েশিয়া এবং বাংলাদেশের সামরিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা নতুন এক মাত্রা পাবে।


আরও পড়ুনঃ
"সী-বেইসিং" - সমুদ্রেই ঘাঁটি!

Monday, 25 December 2017

মুসলিম সামরিক বাহিনীগুলির একত্রে কাজ করাটা আসলে কতটা কঠিন?


রো-রো জাহাজের পেট থেকে বের হয়ে আসছে ট্যাংক। পোর্ট সুদান, সুদান; ডিসেম্বর ২০১৭।



২৫শে ডিসেম্বর ২০১৭

২০১৭ সালের ৬ই ডিসেম্বর। লোহিত সাগরের উপকূলে সুদানের পোর্ট সুদান বন্দরে ভিড়লো সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসা একটা জাহাজ। জাহাজটা হলো রো-রো ফেরি ‘জাবাল আলী-৫’। বন্দরের জেটিতে ভিড়তেই এর পেছনের ভেহিকল র‍্যাম্প বেয়ে নেমে এলো সামরিক ট্যাঙ্ক এবং আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার।


জাহাজটা 'বেসামরিক'; 'জাবাল আলী-৫'। কিন্তু এর কার্গো সামরিক।


আসল ব্যাপারটা হলো, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সৈন্যরা এসেছে সুদানে সামরিক মহড়া “কোস্ট হিরোজ-১”-এ অংশগ্রহণ করার জন্যে। দু’দেশের মাঝে এটা ছিল প্রথম যৌথ সামরিক মহড়া। এতে দেশদু’টার কূটনৈতিক সম্পর্কের মাঝেও উন্নতি হবে হয়তো। তবে তাদের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সংস্থাগুলির মাঝে যোগাযোগ এবং সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পাবে, তা নিশ্চিত। যদিও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ মূলত পশ্চিমা সামরিক অফিসাররাই করে থাকে, তথাপি এরকম সামরিক মহড়ার মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের সামরিক বাহিনীগুলির পরস্পরের সাথে কাজ করার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।


আমিরাতের সেনারা সুদানের রাজধানী খার্তুমে এসে অবতরণ করেছে। তারা এসেছে সামরিক পরিবহণ বিমানে করে। দু'টা দেশের মাঝে রাজনৈতিক ঐক্য থাকলে সেনা মোতায়েন এতটাই সহজ। রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলির মাঝে সৌহার্দ্য মুসলিম বিশ্বের পূণঃ-একত্রীকরণের একটা গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। মার্কিন সেনারা এভাবে এসে মুসলিম দেশগুলিতে অবতরণ করে; কিন্তু মুসলিম সেনারা মুসলিম দেশে অবতরণ করেনা! 


এই সামরিক মহড়া একদিকে যেমন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রভাব বিস্তারকে সামনে আনে, তেমনিভাবে মুসলিম বিশ্বের সামরিক বাহিনীগুলির মাঝে সহযোগিতা বৃদ্ধির কিছু পদ্ধতিও দেখিয়ে দেয়। যে জাহাজটাতে করে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা পোর্ট সুদানে এসেছিল, সেটাকে যেকেউ বর্তমান বিশ্বের সংজ্ঞায় বেসামরিক জাহাজই বলবে। দুবাই-এর নাইফ ম্যারিন সার্ভিসেস নামের জাহাজ কোম্পানির জাহাজ রয়েছে চারটা। তার মাঝে একটা জাহাজ হচ্ছে ‘জাবাল আলী-৫’, যেটাতে চড়ে আমিরাতের ট্যাঙ্ক এবং আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ারগুলি সুদানে এসে অবতরণ করেছে। (সেনারা এসেছে মূলত বিমানে চড়ে) ১৯৭৯ সালে জাপানে তৈরি ৮ হাজার টনের এই জাহাজ কনটেইনার বহণ করতে পারে, আবার জাহাজের খোলের মাঝে গাড়িও বহণ করতে পারে। আমিরাতিরা ইয়েমেন যুদ্ধের সময়েও এরকম জাহাজ ব্যবহার করেছে সেনা এবং রসদ আনা-নেয়ার কাজে। ইরিত্রিয়ার আসাব বন্দরে আমিরাত সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে, যেখানে এরকম বড় জাহাজগুলি মালামাল নিয়ে আসে; আর ল্যান্ডিং ক্রাফটের মাধ্যমে ইরিত্রিয়া থেকে কাছাকাছি ইয়েমেনের যেকোন স্থানে পাঠায়। ল্যান্ডিং ক্রাফটে করে পাঠালে ভালো কোন বন্দর লাগে না; তাই বেশ সুবিধা। এক্ষেত্রে আমিরাতিরা দূরবর্তী স্থানে রসদ পাঠাতে ব্যবহার করেছে বড় বড় বেসামরিক জাহাজ; আর কাছাকাছি পরিবহণে ব্যবহার করেছে ল্যান্ডিং ক্রাফট। এরকম ল্যান্ডিং ক্রাফট কিছুদিন আগেই বাংলাদেশও তৈরি করেছে আরব আমিরাতের জন্যে।



নাইফ ম্যারিটাইম সার্ভিসেস-এর জাহাজ 'জাবাল আলী-৫'-এর আগের ছবি। জাহাজটা বেসকারি মালিকানায় হলেও সামরিক রসদপাতি বহণ করে জানান দিল যে এগুলির রাষ্ট্রের অংশ।



মুসলিম বিশ্বের সামরিক বাহিনীগুলির মাঝে যোগাযোগ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একমাত্র বাধা হচ্ছে দেশগুলির পশ্চিমা রাজনৈতিক ধ্যানধারণা; যা ডিভাইড এন্ড রুল-এর প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ। যে সুযোগে জেরুজালেম যেমন ইস্রাইলের রাজধানী হিসেবে ঘোষিত হলো, তেমনি মিয়ানমারের মুসলিমরা, কাশ্মিরের মুসলিমরা, আফগানিস্তান, উইঘুর, ইরাক, সিরিয়ার মুসলিমরা নিধনের শিকার হয়েছে। এক দেশ থেকে অন্য দেশে সৈন্য পাঠানো আসলে কতটা সহজ, সেটা অন্ততঃ এই উদাহরণগুলিতেই চলে আসে। এটা সহজ হয়ে যায় যদি সৈন্যদের দেশ আর অবতরণের দেশের মাঝে রাজনৈতিক ধ্যানধারণায় পার্থক্য না থাকে। ঠিক যেমনটা ছিল ১৯৯০ সালে ইরাকের কুয়েত আক্রমণের সময়ে। সৌদি সরকার মার্কিন সেনাদের ডেকে নিয়ে এসেছিল। তাই মার্কিন সেনারাও বন্ধুর বেশে আরবের মাটিতে অবতরণ করেছিল। মার্কিন সেনারা হরহামেশা মুসলিম দেশে অবতরণ করেছে; অথচ এরকম অবতরণের পদ্ধতি মুসলিম দেশগুলির নিজেদের মাঝে দেখা যায় না। মার্কিন সেনাদের অধীনে মুসলিম সেনারা জীবন দিয়েছে; কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব না থাকায় মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষায় তারা কিছুই করতে পারেনি। মুসলিম সেনারা একক নেতৃত্বের অধীনে থাকলে মুসলিমদের গায়ে হাত দেয়ার সাহস কেউ দেখাতো না। 

আরও পড়ুনঃ
বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ওভারসীজ ট্রেনিং কমান্ড গড়ার সময় এসেছে

Saturday, 21 October 2017

কি ঘটলে বাংলাদেশ তার ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলবে?


সুদানের আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার (tracked) with ATGM 'Khatim 4' ডিস্প্লে করা হচ্ছে
মধ্যপ্রাচ্যের সবচাইতে বড় প্রতিরক্ষা এক্সিবিটে (IDEX-2017)-এ। সুদানের মতো একটা দেশ তার ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপ করে ফেলতে পারলো, আর বাংলাদেশ এখনো মনে করছে যে বিশ্বের সবচাইতে উন্নতমানের আন্ডারওয়্যার তৈরি করতে পারলে সবচাইতে বেশি ডলার আয় করা যাবে, কারণ সেখানে ভ্যালু এডিশন বেশি!


২১শে অক্টোবর ২০১৭

সুদানের ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি...

আড়াই বছর আগে মধ্যপ্রাচ্যের সবচাইতে বড় প্রতিরক্ষা এক্সিবিটে (IDEX-2015) নিজেদের তৈরি করা সমরাস্ত্র নিয়ে আসে সুদান। ২০১৭ সালের ইভেন্টেও সুদান অংশগ্রহণ করে। সুদানের মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রি কর্পোরেশন (MIC)-এর তৈরি করা যেসব অস্ত্র ডিস্প্লে করা হয়, তার মাঝে রয়েছে -

১। 122 মিমি সেলফ-প্রপেল্ড হাউইটজার 'Khalifa & Khalifa-2'
২। 4x4 আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার 'Amir'
৩। 120 মিমি সেলফ-প্রপেল্ড মর্টার (tracked)
৪। 107mmx12 মাল্টিপল রকেট লঞ্চার (4x4) 'Taka'
৫। 4x4 আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার 'Sarsar & Sarsar-2'
৬। 4x4 Nissan লাইট ট্রাক (technical) with 12.7mm HMG
৭। 4x4 লাইট ট্রাক (technical) with 122mm MRL 'Zataka-2'
৮। আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার (tracked) with ATGM 'Khatim-3 & 4'
৯। ফাস্ট প্যাট্রোল বোট






এর বাইরেও সুদান যেসব সমরাস্ত্র তৈরি করে থাকে তার মাঝে রয়েছে -
১। Sub-machine gun 'Tihraga'
২। Type 80 7.62mm machine gun 'Mokhtar'
৩। Type 85 12.7mm heavy machine gun 'Khawad'
৪। MG3 7.62mm machine gun 'Karar'
৫। RPG-7 antitank weapon 'Sinar'
৬। 100mm ফিল্ড গান 'Nijoumi'
৭। 122mm howitzer 'Mahdi'
এবং আরও অনেক কিছু। লিস্ট অনেক বড়!

এবার একটু সমালোচনা করা যাক। সুদানের সমরাস্ত্রের অনেক কিছুই পুরোনো অস্ত্রের কপি। বাকিগুলি লাইসেন্স নিয়ে তৈরি করা অথবা লাইসেন্স ছাড়াই তৈরি করা। সুদান এগুলি তৈরি করতে পেরেছে সুদানের উপরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে। প্রকৃতপক্ষে বাধ্য হয়েছে নিজেরা তৈরি করতে। তবে একটু খেয়াল করলেই বোঝা যাবে যে এখানে রাশিয়া, ইউক্রেন, চীন, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং আরও অনেকে সুদানকে টেকনিক্যাল সহায়তা দিয়েছে। সকলেই ব্যবসা করে নিয়েছে সেখানে। অর্থাৎ সামরিক প্রযুক্তি সুদান পেয়েছে - সহজেই হোক অথবা কষ্ট করেই হোক। 
 
সুদানের 4x4 আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার 'Sarsar-2'। বাংলাদেশ কি সুদানের সমালোচনা করবে, নাকি তাদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের মান-ইজ্জত বাঁচাবে (যা কিনা এখন মিয়ানমারের হাতে হারাতে বসেছে)?
 
 
সুদান থেকে বাংলাদেশ শিখবে, নাকি সমালোচনাই করবে?

কিন্তু আলোচনার বিষয় হচ্ছে সুদানের মতো একটা দেশ তার ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপ করে ফেলতে পারলো, আর বাংলাদেশ এখনো মনে করছে যে বিশ্বের সবচাইতে উন্নতমানের আন্ডারওয়্যার তৈরি করতে পারলে সবচাইতে বেশি ডলার আয় করা যাবে, কারণ সেখানে ভ্যালু এডিশন বেশি! সুদানের জিডিপি ১১৬ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশের অর্ধেকের মতো। জনসংখ্যা ৪ কোটির কিছু কম, অর্থাৎ বাংলাদেশের চার ভাগের এক ভাগও নয়। তবে এটা কি ঠিক নয় যে, বাংলাদেশের কাছে যদি সুদানের মতো একটা ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি থাকতো, তাহলে মিয়ানমার বাংলাদেশকে কিছুটা হলেও বেশি ভয় করতো?

রোহিঙ্গা সমস্যা দেখিয়ে দিচ্ছে যে কলোনিয়াল চিন্তা থেকে বের হতে কতটা কষ্ট করতে হচ্ছে বাংলাদেশের। এই দেশের সকল রাস্তা তৈরি করা হয়েছিল এমন একটা চিন্তা করে যে - এই জাতি কোনদিনও দাঁড়াতে পারবে না, তাই এদের চওড়া রাস্তা দেবার দরকার নেই; রিক্সার রাস্তা হলেই হবে। এদের ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রির দরকার নেই; বাইরের দেশের উপরে নির্ভর করলেই চলবে। যখন কোন নিরাপত্তা ইস্যু হবে, তখন সে দৌড়ে যাবে বড় দেশগুলির কাছে; দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করবে সাহায্যের জন্যে।

পশ্চিমারা যখন সুদানকে ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা শুরু করে, তখনই সুদানের ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপ করা শুরু হয়। ১৯৯৩ সালে সুদানের মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রি কর্পোরেশন (MIC)-এর জন্ম। বাংলাদেশের ঘোর কবে ভাংবে? রোহিঙ্গা সমস্যা কি কিছু শেখায়নি বাংলাদেশকে? নাকি এর চাইতেও বড় কোন ঘটনার জন্যে বসে রয়েছে সবাই?

Saturday, 30 September 2017

বাংলাদেশের হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার কোথায়?


৩০শে সেপ্টেম্বর ২০১৭

ব্রিটিশ রয়াল নেভির হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার HMS Ocean-এর উপরে ওয়াইল্ডক্যাট, এপাচি এবং চিনুক হেলিকপ্টার দেখা যাচ্ছে। ২০১৮ সালে জাহাজটা ব্রিটিশরা রিটায়ার করিয়ে দিচ্ছে অর্থ সংকুলান না হওয়ায়। ৮০ মিলিয়ন পাউন্ডে ব্রাজিলের কাছে অফার করা হলেও ব্রাজিল সরকার তার বর্তমান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে তা কিনতে সক্ষম হবে কিনা, সেটা প্রশ্নবিদ্ধ।


নিয়ম ভঙ্গের ইতিহাস

জাহাজের উপরে হেলিকপ্টার দেখলে কেউ এখন আশ্চর্যান্বিত হন না। কিন্তু কয়জন চিন্তা করে দেখেছেন যে প্রথমবার জাহাজের উপরে হেলিকপ্টার নামানোটা কতটা সহজ বা কঠিন কাজ ছিল? জার্মানরা প্রথম জাহাজের উপরে হেলিকপ্টার অপারেশন চালিয়েছিল – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। সেসময় আটলান্টিকের ওপাড়েও আমেরিকাতেও হেলিকপ্টার নিয়ে অনেক কর্মযজ্ঞ চলছিল। জার্মান নৌবাহিনীতে হেলিকপ্টারের ব্যবহার খুব গুরুত্ববহ কিছু বয়ে আনেনি, কারণ জার্মান নৌবাহিনীর সার্ফেস ফ্লিট তেমন বড় ছিল না। অন্যদিকে মার্কিন আর ব্রিটিশ নৌবাহিনীর বিশাল সার্ফেস ফ্লিটের জন্যে হেলিকপ্টার নিয়ে গবেষণা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল। জাহাজের উপরে প্রথমবারের মতো হেলিকপ্টার নামানোর ব্যাপারটা ছিল নিয়ম ভঙ্গ করা এবং নতুন নিয়মের জন্ম দেয়ার একটা উদাহরণ। নতুন কিছুর জন্ম দিতে হলে নিয়ম ভঙ্গ করাটা জরুরি। আর একারণেই নিয়ম ভঙ্গ করার ইতিহাস জানাটা জরুরি।
  

 
১৯৪৩ সালের মে মাসে ‘বাংকার হিল’ নামের একটা মার্কিন তেলবাহী জাহাজের উপরে কাঠের প্ল্যাটফর্মের উপরে হেলিকপ্টার অবতরণ করে দেখানো হয় যে জাহাজের উপরে হেলিকপ্টার নামতে পারে।

নৌবাহিনী নয়, মার্কিন কোস্ট গার্ডই ছিল হেলিকপ্টারের প্রবর্তক

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সামরিক ব্যবহারের জন্যে হেলিকপ্টার তৈরি করার চিন্তাখানা এসেছিলো মার্কিন সেনাবাহিনী থেকে। মার্কিন বিমানবাহিনী তখনও ছিল সেবাবাহিনীর একটা অংশ। অন্যদিকে মার্কিন নৌবাহিনী সমুদ্রে ব্যবহারের জন্যে হেলিকপ্টার নিয়ে একেবারেই আগ্রহী ছিল না। বরং আগ্রহী ছিল মার্কিন কোস্ট গার্ড! নৌবাহিনীর নীতিনির্ধারকেরা মনে করতেন যে তখনকার হেলিকপ্টারের ধারণক্ষমতা ছিল যথেষ্টই কম; যা কিনা ব্যবহারিক দিক থেকে তেমন একটা কার্যকারী না হবার সম্ভাবনাই বেশি। এছাড়াও তারা মনে করতেন যে ঐমুহুর্তে যুদ্ধ চালিয়ে নেবার জন্যে হেলিকপ্টারের চাইতে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট ছিল; তাই হেলিকপ্টারের পিছনে সময় এবং অর্থ ব্যয় করাটা যুক্তিযুক্ত হবে না। ঠিক এসময়েই – ১৯৪২ সালে মার্কিন কোস্ট গার্ডের কয়েকজন অফিসার মার্কিন বিমান ডিজাইনার ইগর সিকোর্স্কির একখানা হেলিকপ্টারের উড্ডয়ন দেখতে যান। তারা শূণ্যের মাঝে হেলিকপ্টারটাকে ঝুলে থাকতে দেখে যারপরনাই পুলকিত হন। ঐ মুহুর্তেই তারা তাদের উর্ধ্বতনদের কাছে লিখে পাঠান হেলিকপ্টার নিয়ে গবেষণায় যাতে কোস্ট গার্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তখন সেই অফিসারদের চিন্তা ছিল যে হেলিকপ্টারকে তারা ব্যবহার করতে পারবেন উদ্ধ্বারকারী যান হিসেবে। কিন্তু তাদেরকে সাফ জানিয়ে দেয়া হয় যে এখন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে মূল লক্ষ্য শত্রুকে হত্যা করা, মানুষ বাঁচানো নয়! এরকম অবস্থায় আরেক মার্কিন কোস্ট গার্ড অফিসারের আবির্ভাব হয়, যিনি হেলিকপ্টারের উড্ডয়ন দেখার পরে লিখে পাঠান যে এটা সাবমেরিন ধ্বংসে ব্যবহার করা যেতে পারে। এই লেখাই সব হিসেব পাল্টে দিল। ওই মুহুর্তে মার্কিন সরকারের কাছে আটলান্টিকে জার্মান সাবমেরিনের হাত থেকে বাণিজ্য জাহাজের কনভয় রক্ষাটা ছিল বিরাট এক ইস্যু। তাই ওই মুহুর্তেই মার্কিন নৌবাহিনীর চীফের কাছ থেকে অনুমতিপত্র মিলে যায়। তবে নৌবাহিনীর সর্বোচ্চ অফিসারের কাছ থেকে অনুমতি এলেও এই গবেষণাকে এগিয়ে নেন কোস্ট গার্ডের অফিসারেরাই। কারণ মার্কিন নৌবাহিনী তখনও হেলিকপ্টারে আগ্রহী ছিল না। তবে এক্ষেত্রে একটা ভালো সাপোর্ট তারা পায় ব্রিটিশ নৌবাহিনীর কাছ থেকে, যারা হেলিকপ্টারে আগ্রহী ছিল এবং বেশ কয়েক’শ হেলিকপ্টার তারা অর্ডার করেছিল।
  

   
প্রথম হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার মার্কিন কোস্ট গার্ডের যুদ্ধজাহাজ 'কব'। মার্কিন কোস্ট গার্ড ৩৭ বছরের পুরোনো ‘এসএস গভর্নর কব’ নামের একটা প্যাসেঞ্জার জাহাজ কিনে সেটাকে পরিবর্তন করে। ২৮৯ফুট (৮৮মিটার) লম্বা জাহাজটার উপরের সুপারস্ট্রাকচার প্রায় পুরোটাই ভেঙ্গে ফেলে নতুন করে গড়া হয়। কিছু অস্ত্রসস্ত্রও বসানো হয় উপরে। তবে সবচাইতে বড় পরিবর্তনটা ছিল ৩৮ফুট x ৬৩ফুট আকারের কাঠের তৈরি একটা ফ্লাইট ডেক। ১৯৪৩-এর জুলাইতে জাহাজটা কমিশনিং করা হয়।



পরিবহণ জাহাজের উপরে হেলিকপ্টার

১৯৪৩ সালের মে মাসে ‘বাংকার হিল’ নামের একটা মার্কিন এবং ‘এমপায়ার মার্সি’ নামের একটা ব্রিটিশ তেলবাহী জাহাজের উপরে ৪০ফুট x ৮০ফুট প্ল্যাটফর্মের উপরে হেলিকপ্টার অবতরণ করে দেখানো হয় যে জাহাজের উপরে হেলিকপ্টার নামতে পারে। তবে সেটা ছিল বন্দরে ভেড়ানো জাহাজ; সমুদ্রে জাহাজের উপরে অবতরণ ছিল অন্য কথা। ‘জেমস পার্কার’ নামের একটা পরিবহণ জাহাজকে হেলিকপ্টার বহণের উপযোগী করে (৬০ফুট x ৫০ফুট প্ল্যাটফর্ম ) তার উপরে দু’টা হেলিকপ্টার দিয়ে দেয়া হয়। মার্কিন উপকূলের কাছাকাছি জাহাজটায় দুই দিন ধরে ৯৮ বার হেলিকপ্টার উড্ডয়ন করে ও নেমে দেখায়। মার্কিন কোস্ট গার্ড ৩৭ বছরের পুরোনো ‘এসএস গভর্নর কব’ নামের একটা প্যাসেঞ্জার জাহাজ কিনে সেটাকে পরিবর্তন করে। ২৮৯ফুট (৮৮মিটার) লম্বা জাহাজটার উপরের সুপারস্ট্রাকচার প্রায় পুরোটাই ভেঙ্গে ফেলে নতুন করে গড়া হয়। কিছু অস্ত্রসস্ত্রও বসানো হয় উপরে। তবে সবচাইতে বড় পরিবর্তনটা ছিল ৩৮ফুট x ৬৩ফুট আকারের কাঠের তৈরি একটা ফ্লাইট ডেক। ১৯৪৩-এর জুলাইতে জাহাজটা কমিশনিং করা হয়। ব্রিটিশরাও ‘এসএস দাগেস্তান’ নামের একটা জাহাজ লিজ নিয়ে সেটাকে হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার বানিয়ে নেয়। ব্রিটশ নৌবাহিনী ‘দাগেস্তান’ জাহাজে হেলিকপ্টার নিয়ে প্রথম আটলান্টিক পাড়ি দেয় ১৯৪৪ সালের জানুয়ারীতে। নিউ ইয়র্ক থেকে লিভারপুল পর্যন্ত যেতে সেই জাহাজের উপর থেকে হেলিকপ্টারগুলি ৫০ফুট x ৯৬ফুট ফ্লাইট ডেকের উপরে উড্ডয়ন-অবতরণের ট্রায়াল দিতে থাকে। জাহাজটা একইসাথে ৮ হাজার টন খাদ্যশস্যও বহণ করছিল! জাহাজটা ঠিকমতো লোডিং না করায় সমুদ্রে ভীষণভাবে দুলছিল এবং কার্গো একপাশে চলে যাওয়ায় স্থায়ীভাবে ৫ ডিগ্রি বেঁকে চলছিল! ১৬ দিনের এই জার্নিতে খারাপ আবহাওয়ার দরুন (মাঝে মাঝে ১৪৮ কিঃমিঃ/ঘন্টা পর্যন্ত বাতাস ছিল!) মাত্র তিন দিন হেলিকপ্টার অপারেশন সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু তার পরেও ৩২৮ বার হেলিকপ্টারগুলি ওঠা-নামা করে জাহাজের উপরে। তারা বুঝতে পারেন যে ৭৪কিঃমিঃ/ঘন্টা বাতাসের গতিতেও হেলিকপ্টার অপারেশন সম্ভব!

জাহাজের উপরে হেলিকপ্টার নামার ইতিহাস থেকে কিছু ব্যাপার বেরিয়ে আসে –

১। পরিবহণ এবং যাত্রীবাহী জাহাজকেও যুদ্ধজাহাজ বানানো সম্ভব

২। পরিবহণ এবং যাত্রীবাহী জাহাজকেও হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার বানানো সম্ভব

৩। স্পেশালাইজড যুদ্ধজাহাজ না হলেও সেটাকে হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার বানানো সম্ভব

৪। কোস্ট গার্ড এন্টি-সাবমেরিন কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করতে পারে

৫। কোস্ট গার্ডের যুদ্ধজাহাজ থাকতে পারে

৬। কোস্ট গার্ডের এন্টি-সাবমেরিন কর্মকান্ডের জন্যে যুদ্ধজাহাজ তৈরি করা যেতে পারে


মার্কিন নৌবাহিনীও তাদের নতুন তৈরি করা USS Lewis B. Puller জাহাজটাকে পারস্য উপসাগরে পাঠিয়ে কমিশনিং করেছে ২০১৭-এর অগাস্টে। এই জাহাজটা এখন CH-53-এর মতো বিশাল হেলিকপ্টার যেমন অপারেট করতে পারবে, আবার এপাচি এটাক হেলিকপ্টারও অপারেট করতে পারবে। Expeditionary Mobile Base(ESB)নামের একটা নতুন ক্যাটাগরিই তারা তৈরি করে ফেলেছে কম খরচে (৪০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার) হেলিকপ্টার অপারেশনের জন্যে। যেখানে একটা এম্ফিবিয়াস হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার তৈরি করতে আড়াই থেকে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার খরচ হয়, সেখানে পাঁচ ভাগের এক ভাগ খরচেই কমার্শিয়াল তেলবাহী জাহাজের ডিজাইনের উপরে কিছু পরিবর্তন করে স্পেশালাইজড জাহাজের বেশ কিছু কাজ করে ফেলা সম্ভব হচ্ছে।


কম খরচে হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার


বাংলাদেশে এখনো অনেকেই নিয়ম ভাঙতে পারছেন না বলে অনেক কিছুই তাদের জন্যে কঠিন ঠেকছে। তাদের জন্যেই নিয়ম ভাঙ্গার এই ইতিহাসটুকু দেয়া। যেটা মনে রাখতে হবে তা হলো, নতুন যেকোন কিছুই তৈরি হয়েছে বর্তমান নিয়ম ভাঙ্গার মাধ্যমে। পৃথিবীর যে সময়টাতে কোন হেলিকপ্টার ছিল না, সে সময়টা নিয়ে চিন্তা করলেই বোঝা যাবে যে হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার আসলে তেমন বিশাল কোনকিছু নয়। একটা জাহাজের উপরে একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার মাধ্যমেই হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার তৈরি করা যায়। ব্রিটিশরা কয়েকটা কনটেইনার জাহাজকে ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ডে নিয়ে গিয়েছিল হেলিকপ্টার এবং হ্যারিয়ার বিমান বহণ করে নিয়ে যাবার জন্যে। তার মাঝ থেকে একটা জাহাজকে পরবর্তীতে স্পেশালাইজড হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার বানিয়ে ফেলে তারা। RFA Argus নামের ঐ জাহাজটা World War Z নামের একটা হলিউড মুভিতেও ব্যবহার করা হয়েছিল। ব্রিটিশ রয়াল নেভি HMS Ocean নামে আরেকটা হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার তৈরি করে, যার ১৯৯৮ সালে খরচ পড়েছিল ১৫০ মিলিয়ন পাউন্ড; যা আজকের হিসেবে ৩০০ মিলিয়ন পাউন্ডের (৪০০ মিলিয়ন ডলার) মতো। কমার্শিয়াল ডিজাইনকে পরিবর্তন করে ঐ জাহাজটা তৈরি করা হয়েছিল বলেই এতো কম খরচে তৈরি করা গিয়েছিল। ২০১৮ সালে জাহাজটা ব্রিটিশরা রিটায়ার করিয়ে দিচ্ছে অর্থ সংকুলান না হওয়ায়। ৮০ মিলিয়ন পাউন্ডে ব্রাজিলের কাছে অফার করা হলেও ব্রাজিল সরকার তার বর্তমান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে তা কিনতে সক্ষম হবে কিনা, সেটা প্রশ্নবিদ্ধ।

মার্কিনীরাও খরচ বাঁচানোর দিকেই যাচ্ছে। Expeditionary Mobile Base(ESB)নামের একটা নতুন ক্যাটাগরিই তারা তৈরি করে ফেলেছে কম খরচে (৪০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার) হেলিকপ্টার অপারেশনের জন্যে। এই ক্যাটাগরিকেও তারা বেশ কয়েক দফা নামকরণ করেছে; এখনকার নামটাই যে স্থায়ী, সেটা এখনো বলা যাচ্ছে না। যাই হোক, যেখানে একটা এম্ফিবিয়াস হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার তৈরি করতে আড়াই থেকে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার খরচ হয়, সেখানে পাঁচ ভাগের এক ভাগ খরচেই কমার্শিয়াল তেলবাহী জাহাজের ডিজাইনের উপরে কিছু পরিবর্তন করে স্পেশালাইজড জাহাজের বেশ কিছু কাজ করে ফেলা সম্ভব হচ্ছে। মার্কিনরী দুনিয়ার নেতৃত্ব দিয়েছে বলেই বাকি দুনিয়ার মানুষ কষ্ট করে তাদের তৈরি করা LHA, LHD, LPH, LSD, LPD, ইত্যাদি সংজ্ঞা মুখস্ত করছে মিলিটারি একাডেমিগুলিতে। অথচ তারা নিজেরাই প্রতি নিয়ত এরকম সংজ্ঞার জন্ম দিচ্ছে। বাকিরা সেই সুরের তালেই নেচে যাচ্ছে। নিজেদের কোন কনসেপ্ট জন্ম দেবার ক্ষমতা নেই!
    
 
ব্রিটিশরা কয়েকটা কনটেইনার জাহাজকে ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ডে নিয়ে গিয়েছিল হেলিকপ্টার এবং হ্যারিয়ার বিমান বহণ করে নিয়ে যাবার জন্যে। তার মাঝ থেকে একটা জাহাজকে পরবর্তীতে স্পেশালাইজড হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার বানিয়ে ফেলে তারা। RFA Argus নামের ঐ জাহাজটা World War Z নামের একটা হলিউড মুভিতেও ব্যবহার করা হয়েছিল।

কমার্শিয়াল জাহাজের উপরে তৈরি করা এহেন জাহাজগুলি দেখতে খুব মারাত্মক কিছু না হলেও যে কাজের জন্যে তৈরি, সেটা কিন্তু করে ফেলতে পারছে। ব্রিটিশ রয়াল নেভির RFA Argus এবং HMS Ocean জাহাজগুলি সারা দুনিয়াতে ব্রিটেনের প্রভাব বিস্তারে সহায়তা করেছে। মার্কিন নৌবাহিনীও তাদের নতুন তৈরি করা USS Lewis B. Puller জাহাজটাকে পারস্য উপসাগরে পাঠিয়ে কমিশনিং করেছে ২০১৭-এর অগাস্টে। যেটা সকলের জন্যেই একটা মেসেজ হিসেবে গিয়েছে। এই জাহাজটা এখন CH-53-এর মতো বিশাল হেলিকপ্টার যেমন অপারেট করতে পারবে, আবার এপাচি এটাক হেলিকপ্টারও অপারেট করতে পারবে। মিশনের উপরে নির্ভর করবে জাহাজটা কোন হেলিকপ্টার বহন করবে। এতে পরিষ্কার হয়ে যায় যে জাহাজের উপরে যা বহণ করা হবে, সেটা নির্ধারণ করবে জাহাজের শক্তি-সামর্থ্য। জাহাজটা তার নিজের আত্মরক্ষার জন্যে যেকোন মডিউলার অস্ত্রও বহন করতে পারবে, যা কিনা জাহাজটার পুরো সক্ষমতাকেই পাল্টে দেবে মুহুর্মুহু।

বাংলাদেশের হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার কোথায়?

শক্তিশালী রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের তৈরি করা নিয়ম মেনে চলবে না; নিজেই নিয়ম তৈরি করতে জানবে। যুদ্ধজাহাজের অপারেটিং কনসেপ্টগুলিও সেরকমই। অন্যের কনসেপ্ট মেনে চললে অন্যের নেতৃত্বই মেনে চলতে হবে চিরকাল। আর অন্যের নেতৃত্ব মেনে চলতে গেলে অন্যের উদ্দেশ্যই বাস্তবায়িত হতে থাকবে; নিজের উদ্দেশ্যই হবে অন্যের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন! এভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্র তৈরি হয় না। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি দেখিয়ে দেয় যে বাংলাদেশকে টিকে থাকতে হলে বঙ্গোপসাগরের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। আর এর জন্যে শক্ত অবস্থান নিতে হবে, নতুবা অন্যের দাস হয়ে থাকতে হবে। বাংলাদেশের উদ্দেশ্য ভারতের মতো নয়। ভারত যেভাবে পরাশক্তির দাস হয়ে চিরকাল বাংলাদেশের সাথে সমস্যা করতে থাকবে, সেই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের নয়। তাই বঙ্গোপসাগর পাহাড়া দেবার জন্যে ভারতীয় নৌবাহিনীর সহায়তা দরকার – এমন শিয়ালের কাছে মুরগি দেবার মতো চিন্তা পরিহার করা বাঞ্ছনীয়। বাংলাদেশের হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার থাকাটা “অন্যায়” নয়, “অবাস্তব”ও নয়, বরং নেকড়ের পালের মাঝে বসবাস করার জন্যে অতি জরুরি।

Tuesday, 26 September 2017

ভারতের আধিপত্যবাদকে যেভাবে মোকাবিলা করবে বাংলাদেশ

মালদ্বীপের রাজধানী মালের অদূরে ২০১২ সালে ভারত-শ্রীলংকা-মালদ্বীপ অংশ নিচ্ছে যৌথ সামরিক মহড়া 'দোস্তি-১১'-তে। ভারত যৌথ সামরিক মহড়াগুলিকে ব্যবহার করে এই এলাকার ছোট দেশগুলির উপরে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যে। ভারতের প্রভাবকে কমাতে হলে বাংলাদেশকে এই অঞ্চলের ছোট দেশগুলির সাথে সামরিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।    
২৭শে সেপ্টেম্বর ২০১৭

দুর্বল রাষ্ট্রের আধিপত্যবাদ


ভারত একটা দুর্বল রাষ্ট্র। দুর্বল ভারতকে সর্বদাই সুপারপাওয়ার নিয়ন্ত্রণ করেছে, এবং উপমহাদেশকে ‘সঠিকভাবে’ বিভাজিত রেখে বঙ্গোপসাগর তথা ভারত মহাসাগরে কোন শক্তিশালী রাষ্ট্রের আবির্ভাবকে থামিয়ে রেখেছে, যা কিনা সুপারপাওয়ারের বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার একটা ফর্মূলা। একসময় সোভিয়েত রাশিয়া ভারতকে নিয়ন্ত্রণ করেছে; এখন করছে যুক্তরাষ্ট্র। এতবড় একটা রাষ্ট্রের বিশাল সম্পদকে সুপারপাওয়ার ব্যবহার করতে চাইবে – এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে এধরনের ভূরাজনৈতিক খেলার কারণে ভারতের প্রতিবেশীদের বারোটা বাজছে সর্বদাই। ঠিক একারণেই ভারত তার প্রতিবেশীদের জন্যে হুমকিস্বরূপ। চীনকে ব্যালান্স করার জন্যে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে ব্যবহার করছে। ভারতকে তারা নিয়ে গেছে দক্ষিণ চীন সাগর, এবং ফিলিপাইন সাগরে। আর চীন অন্যদিকে ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করেছে তার নৌবাহিনী নিয়ে। বাব-এল মান্ডেব প্রণালীর পাশে জিবুতিতে করেছে সামরিক ঘাঁটি [১]; পাকিস্তান, শ্রীলংকা এবং মিয়ানমারে করছে স্ট্র্যাটেজিক প্রজেক্ট [২] । আর এতে এই অঞ্চলে ভারত-চীন দ্বন্দ্বও উঠেছে চরমে। মজার ব্যাপার হলো, এই পুরো গেমটারই নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র। ভারতকে চীনের পেছনে লাগিয়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক ইউনিটগুলিকে ভারত মহাসাগরের অন্যত্র মোতায়েন করতে সক্ষম হচ্ছে। এভাবেই ব্যবহৃত হচ্ছে ভারত। [৩]



মিয়ানমারে যুক্তরাষ্ট্র প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে অং সান সু কি-র মাধ্যমে। আর সেই সুযোগখানা নিতে পেছনে পেছনে ঢুকেছে ভারত। এর আগে মিয়ানমারে যেমন চীনের একচ্ছত্র প্রভাব ছিল, এখন সেটা বিভক্ত হয়ে গেছে চীন আর ভারতের মাঝে, যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়ন করেছে। মিয়ানমারে প্রভাব ধরে রাখতে ভারত আর চীন উভয়েই মিয়ানমারের উগ্রপন্থী জঙ্গি বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের মানবতাবিরোধী অপরাধের দিকে না তাকানোর নীতি নিয়েছে। রোহিঙ্গারা মুসলিম হওয়াতে এই নীতি নেয়া উভয়ের জন্যেই হয়েছে সহজ, কারণ উভয় দেশেই মুসলিমরা নিপীড়িত। রাখাইনে মুসলিমদের উপরে নিপীড়নের কারণে সরাসরি সমস্যায় পতিত হয়েছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রেও ভারত ও চীন উভয়েই বুঝিয়ে দিয়েছে যে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক ধরে রাখতে গিয়ে তারা মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক খারাপ করবে না। অর্থাৎ মিয়ানমার তাদের জন্যে বাংলাদেশের চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের কেউই আসলে বঙ্গোপসাগরে শক্তিশালী একটা রাষ্ট্রকে দেখতে চাইছে না। এই সিদ্ধান্ত তাদের জন্যে কতটা বিপদ বয়ে আনছে, সেটা তারা এখনো অনুধাবন করতে সক্ষম হননি।



ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের প্রক্রিয়ায় ভারত এবং চীন তাদের প্রতিযোগিতাকে এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে, যা কিনা তার প্রতিবেশীদের নাভিশ্বাস উঠিয়েছে। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সমস্যা ‘ইনজেক্ট’ করার আগেই বেশ ক’বছর ধরে ভারত-চীন ঠেলাঠেলি চলছে। চীনের অর্থায়নে বিভিন্ন বড় প্রজেক্ট বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও ভারত-যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত গ্রুপগুলি বিভিন্নভাবে সেই প্রজেক্টগুলিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের টারবাইন বসাতে জেটি বানাতে গিয়ে আদালতে মামলা করে প্রজেক্ট আটকে দিয়েছে; দেরি করিয়েছে ছয় মাস। চার-লেইন প্রজেক্টে শুধু চাইনিজ সেকশনে গাদা-গাদা মামলা করে দেরি করিয়েছে কয়েক বছর। বিদ্যুতকেন্দ্রের জন্যে ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে মারামারি করিয়ে হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। পত্রিকায় রিপোর্ট করে বিভিন্ন প্রজেক্টের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করেছে। বিমানবন্দর উন্নয়ন, গভীর সমুদ্রবন্দর – এসব প্রজেক্ট আটকে দিয়েছে একাধিকবার। এলএনজি প্রজেক্ট পিছিয়ে দিয়েছে কমপক্ষে পাঁচ বছর। আর পদ্মা সেতুর কথা সবাই জানেন। যারা এই কাজগুলি করেছে, তাদের দু’টা উদ্দেশ্য একত্রে হাসিল হয়েছে – ১। চীনের প্রভাবকে ব্যালান্স করা এবং ২। বঙ্গোপসগরে শক্তিশালী একটা রাষ্ট্র তৈরিতে বাধা দেয়া। ভারত-মার্কিন-চীনা এই ভূরাজনৈতিক খেলায় নাভিশ্বাস উঠেছে বাংলাদেশের জনগণের। শুধু কি বাংলাদেশের জনগণের? না; আশেপাশের দেশগুলিতেও এই খেলা চলছে।

    
জুন ২০১৭ - ভারতীয় নৌবাহিনীর জাহাজ 'আইএনএস তেগ' টেনে নিয়ে চলেছে মরিশাসের জন্যে তৈরি প্যাট্রোল বোট 'ভ্যালিয়্যান্ট'-কে। ভারত বিভিন্ন দেশে তার প্রভাব বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি করছে। রপ্তানি এগিয়ে নিতে ঋণও দিচ্ছে ভারত সরকার।

ভারতের আধিপত্যবাদ এবং সামরিক হস্তক্ষেপ




মিয়ানমারের নৌবাহিনী ৩টা ফ্রিগেট নিজ দেশেই চীনের সহায়তায় তৈরি করলেও ভারতের সাথে মিয়ানমারের সখ্যতা বাড়ার পর থেকে চীন এক পা এগুচ্ছে তো তিন পা পেছাচ্ছে। বহুদিন ধরে জাহাজগুলির কাজ ঝুলে ছিল। এই সুযোগে ভারত এই ফ্রিগেটগুলির জন্যে রাডার এবং সোনার সরবরাহ করে। অর্থাৎ বাংলাদেশের বিমান, জাহাজ এবং সাবমেরিন খুঁজতে বা টার্গেট করতে মিয়ানমার নৌবাহিনী ভারতীয় ইলেকট্রনিক্স (ইউরোপিয়ান জিনিস লাইসেন্স প্রডাকশন) ব্যবহার করবে! এখন মিয়ানমার নৌবাহিনীর জন্যে অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল (ওপিভি) দিতে চাচ্ছে ভারত, যেগুলিকে খুব শিগগিরই হয়তো বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বিপক্ষে দেখা যাবে সমুদ্রে। ভারত মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে আরও বেশি করে সামরিক প্রশিক্ষণ দেবার চেষ্টায় রয়েছে। উভয় দেশ খুব শিগগিরই যৌথ সামরিক মহড়া দেবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে ভারতের স্পেশাল ফোর্স অপারেশনও চালিয়েছে, কিন্তু মিয়ানমার তাতে কিছুই মনে করেনি। মিয়ানমারের সাথে ভারতের সামরিক সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্যে নতুন হুমকি তৈরি করছে।



শ্রীলংকায়ও গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ নিয়ে ভারত আর চীনের মাঝে বেশ বড়সড় ধাক্কাধাক্কি হয়ে গেছে। ভারত কিছুতেই শ্রীলংকাতে চীনা সমুদ্রবন্দর সমর্থন করবে না, সেটা শ্রীলংকার অর্থনীতির জন্যে যতটা গুরুত্বপূর্ণই হোক না কেন। শ্রীলংকার সামরিক বাহিনীকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিচ্ছে ভারত। যাদিও যুদ্ধের অভিজ্ঞতা হিসেব করলে শ্রীলংকারই বরং প্রশিক্ষক হবার কথা! শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীর জন্যে ভারত দিয়েছে দু’টা অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল (ওপিভি)। আরও দু’টা নতুন ওপিভি তৈরি করে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে তাদের কোস্ট গার্ডের একটা কাটার। অস্ট্রেলিয়াও দিয়েছে প্যাট্রোল বোট। এর আগের চীনা এবং ইস্রাইলী প্যাট্রোল বোটগুলিকে ভূরাজনৈতিকভাবে ব্যালান্স করছে এগুলি। শ্রীলংকাকে সামরিক রাডারও দিয়েছে ভারত। তামিল টাইগারদের কয়েক যুগ ধরে সহায়তা দিয়ে শ্রীলঙ্কাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে এখন সামরিক সহায়তা দেয়ার চেষ্টাকে কি ধরনের দু’মুখী নীতি বলা উচিৎ?

ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল, যাকে ভারত "নিজস্ব হ্রদ" মনে করে
    

১৯৮৮ সালে মালদ্বীপেও সামরিক হস্তক্ষেপ করেছিল ভারত (অপারেশন ক্যাকটাস)। মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টকে রক্ষার নামে এই সামরিক হস্তক্ষেপ ভারতের প্রভাব বিস্তারেরর অংশ ছিল। এখন সেখানে চীনের সাথে ভারতের চলছে ব্যাপক প্রতিযোগিতা। মালদ্বীপে বিমানবন্দরের উন্নয়ন ভারতীয় অর্থায়নে না করে চীনা অর্থায়ন করায় ভারত জোরেসোরে লেগেছে এর পেছনে। অথচ বর্তমানে পুরো মালদ্বীপ জুড়ে রাডার বসাচ্ছে ভারত, যাতে মালদ্বীপের আশেপাশের পুরো এলাকার সমুদ্রের উপরে নজরদাড়ি করা যায়। ২০০৭ সালে প্রথমটা, ২০১২ সালে দ্বিতীয়টা এবং ২০১৫ সালে তৃতীয় রাডারটা বসায় ভারত। মালদ্বীপকে দু’টা সামরিক হেলিকপ্টার, কিছু সামরিক গাড়ি, আর প্যাট্রোল বোট দিয়েছে ভারত। এর উপরে নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং যৌথ মহড়া তো আছেই। এগুলির মাধ্যমে মালদ্বীপের নিরাপত্তা বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় ভারত।



নেপালের সাথে ভারতের সম্পর্ক নিম্নমুখী বেশ অনেকদিন ধরেই। চীন হিমালয়ের মাঝ দিয়ে কাঠমুন্ডু পর্যন্ত রাস্তা তৈরির পর থেকে নেপালকে নিয়ে ভারত-চীনের খেলা বেড়ে চলেছে। নেপাল সর্বদা ভারতের সাথেই যৌথ সামরিক মহড়া চালাতো। কিন্তু ২০১৭-এর মে মাসে সেখানে যুক্ত হয়েছে চীন। নেপালের উপরে চাপ সৃষ্টির যেকোন সুযোগই ভারত হাতছাড়া হতে দেয়নি। ২০১৫ সালের এপ্রিলে ভূমিকম্পে লন্ডভন্ড হওয়া নেপালে একই বছরের সেপ্টেম্বরেই ভারত মদেশী আন্দোলনের নাম করে ‘আনঅফিশিয়াল’ অবরোধ দেয়। ভূমিকম্পের পরপর রিলিফের কাজ করতে আসা ভারতীয়দের ভাবচক্করের বিরুদ্ধে যেমন নেপালিরা খেপে গিয়েছিল, সেই খেপা ভাবটাই মদেশী আন্দোলনের সময় আরও ব্যাপক বিস্তৃতি পেয়েছে।



ভারত মহাসাগরের দ্বীপ দেশ মরিশাস এবং সেইশেল-এও ভারত প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছে। ১৯৮৬ সালে ‘অপারেশন ফ্লাওয়ারস আর ব্লুমিং’-এর নামে ভারত সরকার সেইশেল সরকারকে অভ্যুত্থান থেকে বাঁচাবার নামে সামরিক হস্তক্ষেপ করেছিল। ১৯৮৩ সালে ‘অপারেশন লা দোরা’র নামে ভারত সরকার মরিশাসে সামরিক হস্তক্ষেপ করতে যাচ্ছিল; শেষ মুহুর্তে তা বাতিল করা হয়। বর্তমানেও সেইশেল এবং মরিশাসে ভারতের প্রভাব রয়েছে। তাদের জন্যে ভারত দিচ্ছে প্যাট্রোল বোট। ২০১৪-এর ডিসেম্বরে মরিশাসের জন্যে ভারত একটা ওপিভি তৈরি করে দিয়েছে। সেটা কেনার জন্যে আবার মরিশাস সরকারকে ঋণও দিয়েছে ভারত। ২০১৭ সালেও মরিশাসের কাছে প্যাট্রোল বোট বিক্রি করেছে ভারত। এভাবে ঋণের মাধ্যমে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করে ছোট দেশগুলির উপরে ভারত তার প্রভাব বলয় বৃদ্ধি করে যাচ্ছে।

ডিসেম্বর ২০১৪ - বাংলাদেশ নৌবাহিনী জাহাজ 'বিএনএস সমুদ্র জয়' পানি সহায়তা নিয়ে রওয়ানা দিয়েছে মালদ্বীপের উদ্দেশ্যে। এই অঞ্চলে ভারতের প্রভাব কমাতে বাংলাদেশকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং সামরিক সহযোগিতাকে প্রাধান্য দিতে হবে।    
 

বাংলাদেশের সাথে আশেপাশের দেশগুলির সম্পর্ক



শ্রীলংকা এবং মালদ্বীপ উভয় দেশই বাংলাদেশের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশের সমুদ্র-বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাব। একইসাথে শ্রীলঙ্কার সাথে বাংলাদেশের মানুষের রয়েছে প্রাচীন এক বন্ধন। একসময় এই বদ্বীপের মানুষেরাই শ্রীলঙ্কাকে বসবাসের উপযোগী করেছিল। আর মালদ্বীপের মানুষের সাথে বাংলাদেশের মানুষের বন্ধনও যথেষ্ট গভীর। মালদ্বীপের অর্থনীতির মূলে রয়েছে তাদের ট্যুরিজম ব্যবসা, যেখানে বেশিরভাগ লোকই বাংলাদেশী। মাত্র চার লাখ মানুষের ঐ দেশে ৫০ হাজারের বেশি বাংলাদেশীর বসবাস! উভয় দেশেই সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দুর্যোগে বাংলাদেশ সহায়তা দিয়েছে। ২০১৪-এর ডিসেম্বরে মালদ্বীপে পানি সমস্যা হলে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ দিয়ে মালদ্বীপে পানি এবং পানি শোধনের যন্ত্রপাতি পাঠানো হয়েছিল। ২০১৬-এর জানুয়ারীতে মালদ্বীপকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিতে তৈরি গাড়িও দিয়েছে। ২০১৭-এর মে-জুন মাসে শ্রীলংকায় বন্যার সময় বিমান বাহিনীর বিমান এবং নৌবাহিনীর জাহাজে করে ত্রাণসামগ্রী পাঠায় বাংলাদেশ। [৪]



নেপালের দুর্যোগের সময়েও বাংলাদেশ সহায়তা দিয়েছে। সেখানে ভূমিকম্পের সময় ফায়ার সার্ভিসের দল গেছে। পরবর্তীতে ২০১৬-এর মাঝামাঝি বাংলাদেশ নেপালের খাদ্য সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করলে ১০ হাজার টন চাল পাঠায়। ভারত-সমর্থিত মদেশী আন্দোলনের সময়ও বাংলাদেশ নেপালকে সহায়তা দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। নেপালের ব্যবহারের জন্যে সৈয়দপুর বিমানবন্দর এবং মংলা সমুদ্রবন্দরও অফার করেছে বাংলাদেশ। নেপালের সাংকোশি নদীতে বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা বাংলাদেশে নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে, যা কিনা ভারতের দয়াদাক্ষিন্যের উপরে নির্ভর করছে এখনও।



২০১৭-এর জুনে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মরিশাস একটা ভোটের আয়োজন করে। যার মূল ছিল মরিশাসের আশেপাশের দ্বীপগুলি মরিশাসের অধীনেই থাকা উচিৎ ছিল কিনা। এই দ্বীপগুলি এখনও ব্রিটিশ উপনিবেশ। আর এর একটি দ্বীপ হলো দিয়েগো গার্সিয়া, যেখানে মার্কিন বিমান বাহিনীর বি-৫২ বোমারু বিমানের ঘাঁটি রয়েছে। ৯৪টি দেশ মরিশাসের পক্ষে এবং ১৯টি দেশ বিপক্ষে (যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন সহ) ভোট দেয়। ৬৫টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে (চীন এবং রাশিয়া সহ)। বাংলাদেশ মরিশাসের পক্ষে ভোট দেয়। এই ভোটের ফলাফল খুব বেশি কিছু না হলেও এই ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশ মরিশাসের রাজনীতিতে প্রবেশ করলো। ২০১৪ সালের হিসেব অনুযায়ী মরিশাসে কর্মরত ৩৮ হাজার বিদেশী শ্রমিকের মাঝে সাড়ে ২১ হাজার এসেছে বাংলাদেশ থেকে, ২০১১ সালে যে সংখ্যাটা ছিল ১০ হাজারের মতো। মরিশাসের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতেই এরা কাজ করছে মূলতঃ। সাড়ে ১২ লাখ মানুষের ছোট্ট একটা দ্বীপ দেশের জন্যে সংখ্যাটা বেশ বড়। দ্বীপে ভারতের আধিপত্য থাকায় বাংলাদেশী শ্রমিকেরা মানবেতর জীবনযাপন করছে। বোঝাই যায় যে বাংলাদেশ এখনো দায়িত্ব নেবার সংস্কৃতিতে প্রবেশ করেনি। জাতিসংঘে বাংলাদেশের মরিশাসের পক্ষে দাঁড়ানোটা বাংলাদেশের সামনে একটা নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। বাংলাদেশের বুঝতে হবে যে মরিশাস এবং সেইশেল বাংলাদেশের সাথে আফ্রিকার যোগাযোগ পথের মাঝে অবস্থিত। আর যেহেতু সামনের দিনগুলিতে আফ্রিকা বাংলাদেশের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে, তাই মরিশাস এবং সেইশেলের গুরুত্বও বাংলাদেশের কাছে বাড়তে বাধ্য।

বাংলাদেশের ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের একটা গ্রুপ ফটো। বাংলাদেশ তার বিশ্বমানের সামরিক প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটগুলিকে এই অঞ্চলের দেশগুলির সাথে সম্পর্কোন্নয়নে ব্যবহার করতে পারে।  
 

বাংলাদেশের সুযোগ কাজে লাগাতে হলে দায়িত্ব নিতে হবে



মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশকে দেখিয়ে দিয়েছে যে পিছনের সীটে বসে কূটনীতি হয় না। পিছনের সীটে বসলে কেউ পাত্তাও দেবে না; বরং যাচ্ছেতাই ব্যবহার করবে। অন্যদিকে দায়িত্ব নিয়ে ড্রাইভিং সীটে বসার চেষ্টা বাংলাদেশকে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। এই লক্ষ্যে বাংলাদেশ সামনের দিনগুলিতে কিছু কূটনৈতিক পথ অনুসরণ করতে পারে, যা কিনা অদ্য অঞ্চলের ভূরাজনীতিকে প্রভাবিত করবে। নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, সেইশেল এবং মরিশাসের সাথে সম্পর্কোন্নয়নে কিছু পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে।



১। বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা আরও সম্প্রসারিত করা।



২। যোগাযোগ বৃদ্ধি। অদ্য এলাকার দেশগুলির সাথে বাংলাদেশের বিমান, সড়ক এবং নৌযোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে দাপ্তরিক ঝামেলাগুলিকে কমাতে হবে।



৩। সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি। বাংলাদেশের সামরিক প্রশিক্ষণ সংস্থাগুলিতে এসব দেশের প্রশিক্ষণার্থীদের প্রাধান্য দেয়া এবং তাদের সাথে দীর্ঘমেয়াদী সুসম্পর্ক তৈরি করা। উদাহরণস্বরূপ নাইজেরিয়ার সেনাবাহিনী প্রধান লেঃ জেনারেল ইউসুফ বুরাতাই-এর কথা বলা যেতে পারে, যিনি বাংলাদেশের ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস থেকে গ্র্যাজুয়েট ছিলেন। তাঁর সাথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সম্পর্ক কতটা গভীর, তা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলালের নাইজেরিয়া সফরের সময় বেশ বোঝা গিয়েছিল।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এসল্ট রিভার ক্রসিং মহড়া। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর শুধুমাত্র নিজেরা মহড়া দিলেই হবে না। এই অঞ্চলের ছোট দেশগুলির সামরিক বাহিনীর সাথেও যৌথ মহড়ার আয়োজন করতে হবে। নেকড়ের ঝাঁকের মাঝে বসবাস করতে গেলে বিড়াল হয়ে থাকা যাবে না। নিজে বিড়াল হলে ভেড়ার পালকে নেকড়ের কাছেই ছেড়ে দিতে হবে। আর যদি বিড়াল হয়ে বেঁচে থাকার বাসনা পরিহার করতে হয়, তাহলে ভেড়ার পালের দায়িত্ব নিতে হবে।
  

৪। যৌথ মহড়ার আয়োজন। এসব দেশের সাথে নিয়মিত যৌথ সামরিক মহড়ার আয়োজন করতে হবে। নিয়মিত নৌবাহিনীর জাহাজ, বিমান বাহিনীর বিমান এবং স্পেশাল ফোর্সের সদস্যদের পাঠাতে হবে যৌথ প্রশিক্ষণের জন্যে। নেপালের সাথে মাউন্টেন ওয়ারফেয়ার ট্রেনিং, শ্রীলংকার সাথে জাঙ্গল ওয়ারফেয়ার ট্রেনিং, মালদ্বীপের সাথে এম্ফিবিয়াস ওয়ারফেয়ার ট্রেনিং করতে হবে। ভারত এতে কি মনে করলো, সেটা চিন্তা করে উচিৎ কাজ বাদ দেয়া যাবে না।



৫। নিরাপত্তা চিন্তার আমূল পরিবর্তন সাধন করা। এখন থেকেই চিন্তা করতে হবে যে নৌবাহিনী এবং কোস্ট গার্ডের জাহাজ মালদ্বীপ-সেইশেল-মরিশাসে যেতে পারবে কিনা; বিমান বাহিনীর বিমান রিফুয়েলিং ছাড়া (বা শ্রীলংকায় রিফুয়েলিং করে) ঐ দ্বীপ দেশগুলিতে ল্যান্ড করতে পারবে কিনা। ঐসব দেশের ল্যাঙ্গুয়েজ বোঝা এবং শেখার ব্যবস্থা করতে হবে। বিমান বাহিনীর কোন বিমান নেপালের দুর্গম এলাকায় ল্যান্ডিং করতে পারবে এবং সেই ল্যান্ডিং-এর জন্যে ট্রেনিং নেপালের কাছ থেকে পাওয়া যাবে কিনা; ইত্যাদি।



নেকড়ের ঝাঁকের মাঝে বসবাস করতে গেলে বিড়াল হয়ে থাকা যাবে না। নিজে বিড়াল হলে ভেড়ার পালকে নেকড়ের কাছেই ছেড়ে দিতে হবে। আর যদি বিড়াল হয়ে বেঁচে থাকার বাসনা পরিহার করতে হয়, তাহলে ভেড়ার পালের দায়িত্ব নিতে হবে। দায়িত্ব নেবার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সেই দায়িত্ব শুধু বাণিজ্য সম্প্রসারণের মাঝে রেখে দিলেই হবে না। কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্ববহ বিষয়গুলিতে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। ভেড়ার পালের নিরাপত্তা দিতে হবে; নিরাপত্তা দেবার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। রাখাইনের রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশকে দায়িত্ব নেবার এবং নিরাপত্তা দেবার শিক্ষাটাই দিয়েছে।


[১] 'পূর্ব আফ্রিকায় সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা', সাম্প্রতিক দেশকাল, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
[২] 'চীন-মিয়ানমার - পাইপলাইনের রাজনীতি', সাম্প্রতিক দেশকাল, ১২ নভেম্বর ২০১৫
[৩]  'চীনকে নিয়ন্ত্রণে ভারতকে ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র', সাম্প্রতিক দেশকাল, ১৭ জুন ২০১৬
[৪] 'দক্ষিণ এশিয়ার রিলিফ ডিপ্লোম্যাসি', সাম্প্রতিক দেশকাল, ২৬ মে ২০১৬