Friday, 30 October 2015

সম্রাট আওরঙ্গজেব, দুবলার চর এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপ

৩০শে অক্টোবর ২০১৫

সম্রাট আওরঙ্গজেব ব্রিটিশদের নাকে খত দেওয়াতে পেরেছিলেন, কারণ তখন বাংলা তথা ভারত বিদেশ বাণিজ্যের উপরে নির্ভরশীল ছিল না। তবে আজ কিন্তু ব্যাপারটা সেরকম নেই।


১৬৮০-এর দশকে ভারতীয় উপমহাদেশ ছিল মুঘল শাসক আওরঙ্গজেবের অধীনে। ইংরেজরা বাণিজ্য করতে এসে অন্য ইউরোপীয় দেশগুলির চাইতে বেশি সুবিধা চাইলে আওরঙ্গজেব সেটা মেনে নেননি। এসময় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নর ছিলেন জোসাইয়া চাইল্ড, যার ঔধ্যত্বের কারণে ব্রিটিশরা আওরঙ্গজেবের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এই যুদ্ধ ইতিহাসে ‘চাইল্ড’স ওয়ার’ বলে পরিচিত। তারা ভারত থেকে হজ্জ্বযাত্রায় যাওয়া এক জাহাজ লুট করে এবং যাত্রীদের খুন-ধ্বর্ষন করে। ব্রিটিশরা বাংলাকে তথা পুরো ভারতবর্ষকে নৌ অবরোধে ফেলার চেষ্টা করে। তারা হুগলী নদীর উপরে একটা দ্বীপ দখল করে সেই নদী নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে। কিন্তু ইংরেজদের এই অবরোধ সফল হয়নি, কারণ ভারতের প্রধান প্রদেশ বাংলা বহিঃবাণিজ্যের উপরে নির্ভরশীল ছিল না। অবরোধ দেবার কারণে বাংলার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু কারুরই না খেয়ে মরার উপক্রম হয়নি। এই ঘটনার মাধ্যমে সমুদ্রবন্দর অবরোধ দেয়ার একটা কৌশল ব্রিটিশরা জানিয়ে দিয়েছিল। আর সেই অবরোধ তারা দিয়েছিল সমুদ্রবন্দরের বাইরে দ্বীপে ঘাঁটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ঘাঁটির দরকার হয়েছিল, কারণ সমুদ্রে অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত থাকা সম্ভব নয়। রসদ নেবার জন্যে সবচাইতে কাছের গন্তব্যটিও যদি অনেক দূরে হয়ে থাকে, তাহলে অবরোধ ধরে রাখা সম্ভব নয়। সেকারণেই হুগলীর সেই দ্বীপ দখল দরকার হয়েছিল।

তিন শতক পরে…

তিন শতাধিক বছর আগে ব্রিটিশদের দেখানো কৌশলের একটা অন্য ভার্সন আমরা দেখতে পাই ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ে, যেখানে মার্কিনরা ভিয়েতনামের মেকং নদীর বদ্বীপ এলাকাসহ ভিয়েতনামের পুরো উপকূল নিয়ন্ত্রণ করেছিল। তারা দক্ষিণ ভিয়েতনামের তাঁবেদার সরকারের জাহাজগুলিকে গেরিলাদের হাত থেকে রক্ষা করা ছাড়াও গেরিলাদের সাপ্লাই লাইন অবরোধ দিয়েছিল। এই অবরোধ দিতে গিয়ে আমেরিকানরা মেকং নদীর বদ্বীপ অঞ্চলে কিছু ভাসমান ঘাঁটি তৈরি করা ছাড়াও ভূমিতেও বদ্বীপের কৌশলগত এলাকাগুলিতে ঘাঁটি বানিয়েছিল, যেগুলি থেকে গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটগুলি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। গেরিলারা স্থলপথ এবং নদীপথে নিয়মিত এসব ঘাঁটি আক্রমণ করতো ঠিকই, কিন্তু ঘাঁটিগুলি বন্ধ করে দেবার মতো শক্তি তারা কখনোই যোগাড় করতে পারেনি। ঘাঁটিগুলির অনেকগুলিই খুব দুর্গম জংলা এলাকায় ছিল, যেখানে ঘাঁটি রক্ষা করাটা অপেক্ষাকৃত সহজ ছিল।

 
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গুয়াদালক্যানালের যুদ্ধের সময়ে স্ট্র্যাটেজিক জায়গায় একটা ঘাঁটি (বিশেষত বিমান ঘাঁটি)-এর গুরুত্ব প্রকাশ পায়। একেবারেই অগুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপটি রাতারাতি সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ টার্গেট হয়ে দাঁড়ায়। তবে যারা আগে দ্বীপের দখল নিতে পেরেছিল (আমেরিকানরা), তারাই লাভবান হয়েছে শেষে।


কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এধরনের ঘাঁটি রক্ষা করার আরেকটি উদাহরণ পাওয়া যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গুয়াদালক্যানাল-এর যুদ্ধ থেকে। এই দ্বীপখানার নামও কেউ জানতো না একসময়। কিন্তু যে মুহুর্তে মার্কিন ম্যারিন সেনারা এই দ্বীপে নেমে জাপানীদের নির্মিতব্য ঘাঁটিটি দখল করে নেয়, তখন থেকেই এটা ইতিহাসের অংশ। জংলা এই দ্বীপের ঘাঁটিটি মার্কিনরা ব্যবহার করে বিমান এবং নৌঘাঁটি হিসেবে, যা কিনা প্রশান্ত মহাসাগরে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। জাপানীরা বহুবার চেষ্টা করেছিল দ্বীপে অবতরণ করে ঘাঁটিটি দখল করে নিতে; কিন্তু জঙ্গলের বাস্তবতা এবং মার্কিনীদের প্রতিরোধের কারণে জাপানীরা অবশেষে ঘাঁটি দখল করার এই চিন্তাটি বাদ দিয়েছিল। পরবর্তীতে আমেরিকানরা এই ঘাঁটিকে ব্যবহার করে সোলোমন দ্বীপপুঞ্জের বেশিরভাগ দ্বীপ দখল করেছিল। গুয়াদালক্যানাল প্রমাণ করে যে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের উপরে যদি এমন একটা সামরিক ঘাঁটি তৈরি করা যায়, যেটা দুর্গমতার কারণে রক্ষা করা সহজ, তাহলে সেই ঘাঁটিটি কৌশলগত দিক থেকে যুদ্ধের মোড় ঘোরাতে সক্ষম।

https://upload.wikimedia.org/wikipedia/commons/3/3a/Guantanamo.jpg
কিউবার মাটিতে গুয়ান্তানামো বে একটা বিষফোঁড়ার মতো। মার্কিনীদের সাথে যথেষ্ট শত্রুতা থাকার পরেও কিউবা মার্কিনীদের এই ঘাঁটিকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।

দ্বীপ পূণর্দখল কি এতটাই কঠিন?

একটা দ্বীপের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, সেটা দখল করতে হলে নদী বা সমুদ্রপথে আক্রমণ ছাড়া গতি নেই। আর যদি দ্বীপটি জঙ্গল বা পাহাড়-বেষ্টিত হয়, তবে সেটা দখল করাটা আরও বেশি কঠিন। ব্রিটিশরা এই একই কারণে জিব্রালটার দখলে রাখতে পেরেছে এতকাল। স্থলভাগের দিকে পাহাড়-বেষ্টিত থাকায় এর নৌঘাঁটিটি সমুদ্রপথে আক্রমণ করে দখল করা ছাড়া গতি নেই। আমেরিকানরাও কিউবাতে গুয়ান্তানামো বে-তে একটা ঘাঁটি রেখে দিয়েছে একইভাবে। উঁচু পাহাড়-বেষ্টিত এই ছোট্ট ঘাঁটিটি কিউবানরা দখল করে নিতে চেষ্টাও করেনি তেমন একটা। সপ্তদশ শতকে ব্রিটিশরা যখন হুগলীর দ্বীপে বাণিজ্য জাহাজ দখল করার অপেক্ষায় চাতক পাখির মতো বসে ছিল, তখন সুন্দরবনের রোগ-বালাই আর সুপেয় পানির অভাব তাদের পেয়ে বসে। বাংলার সুবাদার শায়েস্তা খান মৃতপ্রায় ব্রিটিশদের ওই দ্বীপ থেকে উদ্ধার না করলে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। পরবর্তীতে যুদ্ধ বন্ধ করতে গিয়ে ব্রিটিশ অফিশিয়ালরা আওরঙ্গজেবের দরবারে গিয়ে নাকে খত দিয়েছিল! কিন্তু মনে রাখতে হবে যে হুগলী নদীর সমুদ্র বাণিজ্য তখন বাংলার জন্যে বাঁচা-মরার ব্যাপার ছিল না। তাই ব্রিটিশদের কাছ থেকে ওই দ্বীপ পূণর্দখল করাটাও বাঁচা-মরার লড়াই ছিল না। যদি উল্টোটা হতো, তাহলে কিন্তু শায়েস্তা খানের জন্যে সুন্দরবনের ভিতরে অভিযান চালিয়ে ওই দ্বীপ পূণর্দখল করাটা বেশ কঠিন হতো। এবারে এই দ্বীপের ব্যাপারটা আমরা বাংলাদেশের বদ্বীপের ক্ষেত্রে চিন্তা করলে কি দেখি?

দুবলার চর এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপ

পসুর নদীর ভেতরে বাংলাদেশের মংলা সমুদ্রবন্দর। আর এই নদী যেখানে সমুদ্রে মিশেছে, সেখানে রয়েছে কিছু জংলা দ্বীপ, যা কিনা এই নদীর মুখ, তথা এই সমুদ্রবন্দরের নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থানে রয়েছে। দুবলার চর এবং হিরণ পয়েন্ট এই চ্যানেলের নিয়ন্ত্রক। কোন বহিঃশত্রু যদি কখনো মংলা বন্দরকে অবরোধ দেবার চিন্তা করে, তবে তারা এই দ্বীপগুলিকে নিয়ন্ত্রণের চিন্তা করবে। একটা অবরোধের প্রধান দিক হলো Sustainability. আর সেটা সম্ভব করতেই নদীমুখে একটি দ্বীপ অপরিহার্য্য। শুধুমাত্র সমুদ্রের উপরে নির্ভর করে আবরোধ চালিয়ে নেয়াটা যে কারুর জন্যেই কঠিন। আর কেউ যদি ঝটিকা আক্রমণের মাধ্যমে এই দীপগুলি বা আশেপাশের কোন একটি জবরদখল করে নেয়, তাহলে সেটা পূণর্দখল করাটাও প্রচন্ড কঠিন হবে। তবে সঠিকভাবে ধরে রাখার ব্যবস্থা করলে সেটা আবার বহিঃশত্রুর পক্ষে দখল করে নেয়াটা বেশ কঠিন হবে।

একই রকমের উদাহরণ হচ্ছে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। এই দ্বীপ চট্টগ্রাম বন্দরের জাহাজ রুটগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। আবার মূল ভূখন্ড থেকে আলাদা থাকার কারণে একবার বেদখল হয়ে গেলে পূণর্দখল করাটা ভীষণ কঠিন হবে। কেউ এই দ্বীপ দখলে নিলে একইসাথে টেকনাফের দক্ষিণ প্রান্তে শাহপরীর দ্বীপের কিছু পাহাড়ী এলাকাও দখলে নিয়ে রাখতে চাইবে। কারণ এই উঁচু এলাকা থেকে এখানকার সমুদ্রপথ এবং টেকনাফের রাস্তাগুলি অবলোকন করাটা সহজ। দুবলার চর এবং সেন্ট মার্টিনের মতো দ্বীপগুলিতে স্পেশাল ফোর্স, আর্টিলারি, দ্রুতগামী শক্তিশালী প্যাট্রোল বোট এবং আর্মড হেলিকপ্টার মোতায়েন করে কোন বহিঃশত্রু বাংলাদেশের প্রধান দুই বন্দরকে অবরোধ দিতে সক্ষম হতে পারে। একারণেই এই দ্বীপগুলিকে কালক্ষেপণ না করে সুরক্ষার ব্যবস্থা করাটা জাতীয় নিরাপত্তার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সপ্তদশ শতকের মতো পরিস্থিতি এখন নেই যে সমুদ্র অবরোধে এদেশের কোন ক্ষতি হবে না। সমুদ্রপথে আমদানির উপরে পুরোপুরি নির্ভরশীল এই দেশকে অবরোধ দেবার পদ্ধতিটাই কোন আগ্রাসী শক্তির জন্যে ইকনমিক্যাল হবে। আর বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় বিদেশী কোন শক্তি এই দেশে কোনভাবেই তাদের আগ্রাসী ততপরতা চালাবে না – এরকম পদলেহনকারী চিন্তা এখন ধোপে টেকে না।

দুবলার চর এবং সেন্ট মার্টিনের মতো দ্বীপগুলিকে সুরক্ষা দিতে গেলে অনেক ধরনের বাধা আসবে। কিন্তু যারা বাধা দেবেন, তার কখনোই এই দ্বীপগুলির কৌশলগত দিক চিন্তা করবেন না, অথবা চিন্তা করার পরেও বলবেন যে বিদেশী শক্তিদের তোষণ করে চলার মাঝেই এই দেশের ‘নিরাপত্তা’ নিহিত। নিজেদেরকে দুর্বল ভেবে অন্যের স্বার্থের কাছে সঁপে দিতেই তারা স্বাছন্দ্য বোধ করেন। এই দ্বীপগুলির সুরক্ষা দিতে চাইলেই এরা বিদেশী Subversion-এর অংশ হয়ে নানা প্রকারে বাধার সৃষ্টি করবেন। উপরে কৌশলগত যতগুলি দ্বীপের উদাহরণ দিয়েছি, তার কোনটিতেই শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলি জাতীয় নিরাপত্তার বাইরে কোন কিছুকে প্রাধান্য দেয়নি; আমাদেরও দেওয়া উচিত হবে না।

Tuesday, 13 October 2015

সিরিয়ায় রাশিয়ার ক্রুজ মিসাইল হামলার কৌশলগত গুরুত্ব

১৩ই সেপ্টেম্বর ২০১৫

সিরিয়ায় রাশিয়ার নৌবাহিনী জাহাজ থেকে মিসাইল ছোঁড়ার সাথে সাথে সামরিক দিক থেকে বেশকিছু নতুন ব্যাপার সামনে এসে পড়েছে। সিরিয়ায় রাশিয়ার সামরিক হস্তক্ষেপে কার কতটা সুবিধা হলো, সেটা আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু নয়, বরং আলোচনা করতে চাই সামরিক দিক দিয়ে নতুন কি কি ব্যাপার ধরা পড়লো, যেগুলি শুধু সিরিয়া নয়, বরং বিশ্বের যেকোন স্থানে সামরিক ব্যালান্সেও ভূমিকা রাখতে পারে।

এতো ছোট জাহাজ থেকে কেন?

এখানে প্রথম চিন্তাটা আসে যে জাহাজ থেকে মিসাইল কেনো ছোঁড়া হলো; ভূমি থেকে হলে কি সমস্যা হতো? ১৯৮৭ সালের Intermediate-Range Nuclear Forces (INF) Treaty অনুযায়ী ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ায় বাধা রয়েছে, কিন্তু জাহাজ থেকে ভূমিতে ছোঁড়াতে বাধা নেই। বলাই বাহুল্য যে যুক্তরাষ্ট্রের সুবিধা মাথায় রেখেই এই চুক্তি করা হয়েছিল অত বছর আগে। এর পর থেকে ১৯৯০ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র সব যুদ্ধে জাহাজ থেকে ভূমিতে মিসাইল ছুঁড়েছে। ২০১১ সালে লিবিয়ায় Operation Odyssey Dawn-এ যুক্তরাষ্ট্র তাদের Ohio-class পারমাণবিক মিসাইল সাবমেরিনের কনভার্সন ক্রুজ মিসাইল সাবমেরিন ব্যবহার করেছিল। বিশাল ওই সাবমেরিন ১৫৪টা Tomahawk মিসাইল বহণ করতে পারে। মার্কিন অন্যান্য যুদ্ধজাহাজগুলি এই সাবমেরিনের মতো এত্তোবড় মিসাইলের ডিপো না রাখলেও অনেকগুলি মিসাইলই বহন করে থাকে। বলাই বাহুল্য যে আমরা ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য মিসাইল নিয়ে কথা বলছি। বর্তমান বিশ্বের বেশিরভাগ যুদ্ধজাহাজই জাহাজ-ধ্বংসী মিসাইল বহণ করে। একটা জাহাজকে মিসাইল-সজ্জিত করতে এটাই প্রধানতম পদ্ধতি। মিসাইল দিয়ে ভূমির অভ্যন্তরে বহুদূরে আক্রমণ করতে পারাটা সাধারণত সেকেন্ডারি উদ্দেশ্য হিসেবেই থাকে। গত দু’দশকে ভূমি আক্রমণ করতে পারার ক্ষমতাটা যুক্তরাষ্ট্রে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। যে কারণে তাদের বড় বড় সব যুদ্ধজাহাজ Tomahawk মিসাইল-সজ্জিত হয়ে পানিতে ভাসছে। তাদের নতুন Zumwalt-class ডেস্ট্রয়ারগুলি ভূমিতে টার্গেট ধংসের জন্যেই যেন তৈরি করা হচ্ছে। মোট ৮০টা VLS (Vertical Launch System) মিসাইল লঞ্চারের মধ্যে বেশিরভাগটাই যে Tomahawk ক্রুজ মিসাইল হবে, সেটা মার্কিন নৌবাহিনীর অফিসাররা গোপন রাখেননি।



Buyan-class-এর জাহাজগুলি মাত্র ৭৫ মিটার লম্বা। এতো ছোট জাহাজগুলি কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ স্ট্রাইক করতে পারে, সেটা খুব বেশি মানুষের চিন্তায় থাকার কথা ছিল না। এখন থেকে হিসেবটা পালটে গেল।

এরকম একটা পরিস্থিতিতে রাশিয়া যেসব যুদ্ধজাহাজ ব্যবহার করলো ক্রুজ মিসাইল ছোঁড়ার কাজে, সেগুলি কেউ শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজের ক্যাটাগরিতে কখনো ফেলেছেন বলে খুব একটা মনে হয় না। এখানে রাশিয়া ব্যবহার করেছে Gepard-class-এর একটা ফ্রিগেট আর Buyan-class-এর তিনটা কর্ভেট। রাশিয়ার কাসপিয়ান সাগরের ফ্লোটিলাতে Gepard-class-এর দু’টা জাহাজ আছে, যার একটা সেই ভুমিতে নিক্ষেপণযোগ্য Klub মিসাইল (২,৫০০ কিমি পাল্লার) বহন করে। আসলে সেটাও একটা মাঝারি পাল্লার জাহাজ-ধ্বংসী মিসাইল, যেটার একটা ভার্সন তৈরি করা হয়েছে দূরপাল্লার ভূমিতে নিক্ষেপের মিসাইল হিসেবে। যেকারণে ওই মিসাইল একই বক্স (Missile Canister) থেকে ছোঁড়া যায়। অর্থাৎ শুধু মিসাইলগুলি পরিবর্তন করে ফেললেই চলে। Gepard-class-এর একটা জাহাযে এই সুবিধা থাকলেও অন্যটা বহন করে Kh-35 মিসাইল (১৩০ কিমি পাল্লার), যার কিনা ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য কোন ভার্সন নেই। Buyan-class-এর তিনটা কর্ভেটের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। ৬টা জাহাজের মধ্যে মাত্র ৩টা জাহাজ Klub মিসাইল বহন করে। কাসপিয়ান ফ্লোটিলার ভূমিতে আক্রমণ করতে পারা মোট এই ৪টা জাহাজই ব্যবহার করা হয়েছে। ৩২টা মিসাইল এরা ছুঁড়তে পারতো সর্বোচ্চ; ছুঁড়েছে ২৬টা। Gepard-class-এর ফ্রিগেটগুলি মাত্র ১০২ মিটার লম্বা আর Buyan-class-এর কর্ভেটগুলি মাত্র ৭৫ মিটার লম্বা। এতো ছোট জাহাজের পক্ষে এতো দূরে ভূমিতে হামলা চালানোর ঘটনা এই প্রথম। এই ধরনের মিসাইলের একটা স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব রয়েছে, যেকারণে পাকিস্তান এরকমই একটা মিসাইল তাদের কিছু সাবমেরিনে সংযুক্ত করার প্রয়াস নিয়েছে। সাবমেরিনের এই স্ট্র্যাটেজিক বা কৌশলগত গুরুত্ব জানা থাকলেও এত্তো ছোট্ট ফ্রিগেট বা কর্ভেটের ক্ষেত্রে এই গুরুত্ব এর আগে কেউ দেয়নি। স্ট্র্যাটেজিক্ স্ট্রাইকের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ জাহাজের আকার হঠাত করেই মনে হয় অনেক ছোট হয়ে গেল। এরকম সাইজের জাহাজের সংখ্যা বিশ্বে অনেক; ছোট ছোট অনেক দেশের হাতেই রয়েছে। এসব জাহাজ যদি কেউ ভূমিতে আঘাত করার মতো মিসাইল দিয়ে সজ্জিত করার জন্যে তৈরি করে রাখে, সেটা শক্তিশালী দেশগুলির জন্যে মাথাব্যাথার কারণ হয়ে যেতে পারে। আর এটা খুব একটা কঠিন ব্যাপার, তা-ও কিন্তু নয়। জাহাজ-ধ্বংসী মিসাইল কিন্তু ভূমির টার্গেটেও ব্যবহার করা সম্ভব। ১৯৭১ সালে ভারতীয় নৌবাহিনীর ছোট্ট ছোট্ট মিসাইল বোটগুলি পাকিস্তানের করাচী বন্দর ধ্বংসপ্রাপ্ত করেছিল জাহাজ-ধ্বংসী মিসাইল ব্যবহার করেই। এখানে একটা ব্যাপারই রয়েছে এখন চিন্তা করার, সেটি হচ্ছে দূরপাল্লার ক্রুজ মিসাইল বিক্রির উপরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা। তবে এই নিষেধাজ্ঞা যে কতটা কার্যকর, তা উত্তর কোরিয়া, পাকিস্তান এবং ইরানের মতো দেশগুলির মিসাইল প্রোগ্রাম দেখলে সন্দেহ জাগে। রাশিয়ার এই মিসাইল হামলা স্ট্র্যাটেজিক স্ট্রাইকের ক্ষমতা অনেকের মাঝে বিতরণ করে দেওয়ার জন্যে একটা উদাহরণ হয়ে দেখা দিতে পারে।





রাশিয়ার মিসাইল হামলা হঠাত করেই কাসপিয়ান সাগরকে মধ্যপ্রাচ্যের স্ট্র্যাটেজিক হিসাবের ভেতরে ফেলে দিল। এখন থেকে এই সাগরকে ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক হিসেব পূর্ণ হবে না।


কাসপিয়ান সাগর কেন? কৃষ্ণ সাগর কেন নয়?

দ্বিতীয় চিন্তা, যেটি আসে রাশিয়ার মিসাইল হামলা থেকে, সেটি হচ্ছে - কাসপিয়ান সাগর বেছে নেওয়া হলো কেন এই স্ট্রাইকের জন্যে। কৃষ্ণ সাগরে যেখানে আরেকটা অপেক্ষাকৃত বড় ফ্লীট ছিল রাশিয়ার, সেখানে কাসপিয়ান সাগর কেন ব্যবহার করা হলো। কৃষ্ণ সাগরের জাহাজগুলি মোটামুটি নিয়মিতই বসফরাস প্রণালী অতিক্রম করে ভূমধ্যসাগরে পাড়ি জমায়। সিরিয়ার সমস্যা শুরু হবার পর থেকে আসাদ সরকারের প্রতি রাশিয়ার সমর্থন জানাতে এভাবে একাধিকবার তাদের জাহাজগুলি সিরিয়ার উপকূলে টহল দিয়েছে। কৃষ্ণ সাগরর ফ্লীটে বড় ক্রুজার এবং ডেস্ট্রয়ার থাকলেও Klub মিসাইল, যেটা সিরিয়ায় ব্যবহার করা হয়েছে, তেমন মিসাইল বহনকারী জাহাজের সংখ্যা কম। Buyan-class-এর কর্ভেট রয়েছে মাত্র দু’টি। কৃষ্ণ সাগরের এই জাহাজগুলির যুদ্ধ-ক্ষমতার উপরেও কিছুটা হলেও প্রশ্ন করা যায়। ২০১৫ সালের জুলাই মাসে সেবাস্তোপোলের নেভি ডে প্যারেডের সময় Ladnyy নামের ফ্রিগেট থেকে SS-N-14 মিসাইল ছোঁড়ার পরে সেটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অবশেষে সমুদ্রে গিয়ে পড়ে। তবে এই জাহাজগুলিকে ভূমধ্যসাগরে রাশিয়ার ফ্ল্যাগ উড়ানোতে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই লেখাটি লেখার সময়ে (অক্টোবর ২০১৫) পূর্ব ভূমধ্যসাগরে Slava-class ক্রুজার Moskva, Kashin-class ডেস্ট্রয়ার Smetlivyy, এবং Krivak-class ফ্রিগেট Ladnyy এবং Pytlivyy - যেগুলি ১১তম এন্টি-সাবমেরিন ব্রিগেডের অংশ – ভূমধ্যসাগরে মহড়া দিচ্ছে। এগুলি কৃষ্ণ সাগরের সবচাইতে শক্তিশালী জাহাজ। এগুলিকে শক্তি প্রদর্শন এবং সিরিয়ার লাটাকিয়া এবং টারটাস বন্দরের আশেপাশে রাশিয়ার নৌসম্পদের সুরক্ষা দেয়ার কাজেই ব্যবহার করা হবে বলে মনে হচ্ছে। ভূমিতে হামলা করার মতো মিসাইল দিয়েও এরা সজ্জিত নয়, আবার কৃষ্ণ সাগরে রেখে আসা অন্য মিসাইল-সজ্জিত জাহাজগুলিও এরকম আক্রমণের জন্যে যথেষ্ট নয়। কাজেই কাসপিয়ান ফ্লোটিলাতেই রাশিয়ার ভরসা। শুধু তা-ই নয়, কাসপিয়ান সাগরকে হঠাত করেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে দেওয়া হলো। এই সাগর (যা কিনা আসলে একটা বড় হ্রদ) ককেশাস এলাকার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখন এই সাগর পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্যেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল। রাশিয়ার সামরিক হাতের ক্ষমতা নিয়ে চিন্তা করতে হলে এই সাগরের কথা এখন থেকে সবাই চিন্তা করবে। এই সাগর থেকে মোটামুটি ২,৫০০ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যপ্রাচ্যের পুরো এলাকা এখন রাশিয়ার মিসাইলের পাল্লার মাঝে।


ইরান-ইরাকের ওভারফ্লাইট অনুমতি

তৃতীয় চিন্তাটি হলো ওভারফ্লাইট নিয়ে। মিসাইল ছোঁড়ার জন্যে ওভারফ্লাইটের অনুমতি লেগেছে ইরান এবং ইরাকের কাছ থেকে। ইরান রাশিয়ার বন্ধু রাষ্ট্র। আর ইরাকের মার্কিন-সমর্থিত সরকারও যে রাশিয়ার কার্যক্রমের পক্ষে, সেটা এবার বোঝা গেল। মধ্যপ্রাচ্য রাশিয়ার দক্ষিণ সীমান্তে, যেখানে রাশিয়া ইসলামিক কোন শক্তির আবির্ভাব দেখতে ইচ্ছুক নয়। আমেরিকাও মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামকে শক্তি হিসেবে দেখতে চায় না, যেকারণে তারা ইরাকের জেলখানাতে আইএসআইএস-এর মতো এক রক্তোন্মাদের জন্ম দিয়েছে এবং মুসলিমদেরকে আরও বেশি বিভক্ত করতে পেরেছে। একই হিসাবের অংশ হিসেবে মুসলিমদের মাঝে শিয়া-সুন্নী সংঘাত রাশিয়া এবং আমেরিকাকে স্বস্তি দেয়। এর মাঝে রাশিয়া শিয়া মুসলিমদেরকে নিজেদের অপেক্ষাকৃত ভালো বন্ধুরূপে দেখে। ইরান এবং হিযবুল্লাহ ছাড়াও সিরিয়ার আসাদ সরকারও শিয়া (আলাওয়াতি সম্প্রদায়)। সিরিয়ার বেশিরভাগ মানুষ সুন্নী হলেও রাশিয়া শিয়া সরকারকেই তাদের বন্ধু ভাবছে, যদিও আসাদ সরকার নিজের দেশের মানুষের বিরূদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্রও ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে ইরাকে শিয়াদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় এবং সরকারও শিয়া হওয়ায় সেক্ষেত্রে রাশিয়ারও যে তাদের জন্য একটা বন্ধুসুলভ মনোভাব থাকবে, সেটা বোঝাই যায়। কাসপিয়ান সাগর থেকে মিসাইল ছোঁড়ার জন্যে দুই শিয়া দেশের কাছ থেকে অনুমতি লেগেছে, কিন্তু কৃষ্ণ সাগর থেকে ছোঁড়া হলে লাগতো তুরস্কের। রাশিয়ার সাথে তুরস্কের ইতিহাস অতো পরিষ্কার নয়। খিলাফতের সময়ে বেশ কয়েকবার ইস্তাম্বুলের উসমানিয়া বংশের খলিফার যুদ্ধ হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে তুরস্কের জন্মের সময়েও নতুন দেশের সাথে ততকালীন সোভিয়েতদের সম্পর্ক ভালো হয়নি। শীতল যুদ্ধের সময়ে তুরস্ক ছিল শীতল যুদ্ধের ফ্রন্টলাইন। এরকম উত্তেজক সম্পর্কের কারণে রাশিয়ার জন্য তুরস্কের কাছে থেকে ওভারফ্লাইট না চেয়ে ইরান-ইরাকের কাছ থেকে চাওয়াটাই স্বাভাবিক বলে মনে হয়।

রাশিয়া-তুরস্ক সম্পর্ক

চতুর্থ চিন্তাটি চলে আসে একই সূত্রে। রাশিয়ার কৃষ্ণ সাগরের ফ্লীট ভূমধ্যসাগরে পৌঁছাতে পারে বসফরাস প্রণালীকে ঘিরে তুরস্কের সাথে রাশিয়ার চুক্তির কারণে। কোন কারণে তুরস্কের সাথে রাশিয়ার কোন বিরোধ দেখা দিলে এই প্রণালী রাশিয়ার জন্যে উন্মুক্ত না-ও থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে কৃষ্ণ সাগরে রাশিয়ার নৌবহরের সম্ভাব্য ব্যবহার সীমিত হয়ে যাবার সম্ভাবনা রয়ে যায়। কৃষ্ণ সাগর এবং কাসপিয়ান সাগরের নৌবহরের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলি তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যেতে পারে রাশিয়ার জন্যে।

মিসাইল টেস্টিং?
পঞ্চম চিন্তাটি আসে ক্রুজ মিসাইল নিয়ে, যা কিনা ফিক্সড টার্গেটের জন্যে প্রধানত উপযোগী। আইএসআইএস এমন একটা সংগঠন, যারা কিনা ছোট ছোট মোবাইল গ্রুপে বিভক্ত হয়ে কাজ করে। আসাদ-বিরোধী গ্রুপগুলিও কাছাকাছি ধাঁচের। ক্রুজ মিসাইলগুলি সিরিয়ার একেবারে পশ্চিম উপকূলের কাছাকাছি শহরগুলিতে পড়েছে, যেগুলি আসাদ-বিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠিগুলির হাতে, আইএসআইএস-এর হাতে নয়। বিমান হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলিও মিসাইলগুলির মতোই; শহরগুলির নামই বলে দেয় যে কাদের উপরে হামলা হচ্ছে। মার্কিনীরাও গত অনেকদিন ধরে সিরিয়াতে যেসব শহরে ড্রোন হামলা করছে, সেগুলিও বেশিরভাগই আসাদ-বিরোধীদের হাতে। ইরানের সৈন্যরাও সেসব শহরেই যুদ্ধ করতে যাচ্ছে। আসাদ-বিরোধীরা রাশিয়া, আমেরিকা এবং ইরানের মূল টার্গেট হলেও বিমান হামলার সাথে সাথে ক্রুজ মিসাইল ব্যবহার এক্ষেত্রে আমাদের জানান দিচ্ছে যে রাশিয়া মিসাইল হামলার ব্যাপারে প্রায় অত্যুতসাহী ছিল। অর্থাৎ ক্রুজ মিসাইল মিশনটা কঠিন টার্গেট ধ্বংস করার অতি-প্রয়োজনীয় সমাধান দেবার চাইতে রাশিয়ার নতুন ধরনের অস্ত্র টেস্ট করার কাজেই বেশি লেগেছে। এতকাল যুক্তরাষ্ট্র এই কাজটা করেছে মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যত্র সকল যুদ্ধে। রাশিয়া অবশেষে আমেরিকার কাছ থেকে এই শিক্ষাটি নিয়েছে। রাশিয়া তাদের আক্রমণভাগে ক্রুজ মিসাইল যোগ করে অপশন তৈরি করলো। এখন তারা তাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনায় কয়েক ধরনের সমাধানের কথা চিন্তা করতে পারবে।




রাশিয়া ভিয়েতনামের কাছে ৬টা Gepard-class ফ্রিগেট রপ্তানি করছে। এই জাহাজগুলিতে কাসপিয়ান সাগরের আড়াই হাজার কিঃমিঃ পাল্লার মিসাইল না থাকলেও কাসপিয়ান সাগরের অপারেশন রাশিয়ার নৌ-অস্ত্র বাণিজ্যকে আরও চাঙ্গা করতে পারে।


অস্ত্রের বাজার ধরা

যষ্ঠ চিন্তাটি হচ্ছে রাশিয়ার মিলিটারি হার্ডওয়্যার নিয়ে। সিরিয়াতে রাশিয়ার বেশকিছু অস্ত্র টেস্ট করা হচ্ছে। রাশিয়ার অর্থনীতির একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে অস্ত্র রপ্তানি। একইসাথে এই রপ্তানিকে রাশিয়া কূটনৈতিকভাবে ব্যবহার করে। সিরিয়াতে নৌবাহিনীর অস্ত্র টেস্ট করার সম্ভাবনা ছিল বেশ খানিকটা কম। এই মিসাইল মিশনের মাধ্যমে রাশিয়া তাদের নৌজাহাজের জন্যে অস্ত্র-বাণিজ্যের একটা বাজার তৈরি করার সুযোগ খুঁজবে। রাশিয়া বর্তমানে ভিয়েতনামের কাছে Gepard-class-এর ছয়টা ফ্রিগেট বিক্রি করছে। কাসপিয়ান সাগরে ছোট জাহাজের শক্তি দেখানোর কারণে রাশিয়ার তৈরি ছোট জাহাজের বাজার তৈরি হতে পারে। তবে এটা এ-ই নয় যে রাশিয়া ২,৫০০ কিমি পাল্লার মিসাইল এর সাথে বিক্রি করতে পারবে। তারপরেও বিক্রি করা জাহাজগুলি যদি সেইরকম মিসাইল বহন করার ক্ষমতা-সহ বিক্রি করা হয়, তাহলে সেটা অন্যান্য শক্রিশালী রাষ্ট্রের জন্য গভীর চিন্তার বিষয় হবে।

কাসপিয়ান থেকে দূরের সাগরে

পরিশেষে এই সবগুলি চিন্তাকে একত্রিত করলে আমরা কয়েকটি বিষয়ে কিছু ধারণা লিপিবদ্ধ করতে পারি। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে স্ট্র্যাটেজিক দিক থেকে প্রভাব বিস্তার করতে গেলে তাদেরকে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক বাস্তবতাকে নিয়ে ভাবলেই হবে। কিন্তু রাশিয়াকে মধ্যপ্রাচ্যের সাথে সাথে তাদের নিজেদের ভৌগোলিক বাস্তবতাকে নিয়েও ভাবতে হবে। কাসপিয়ান সাগর এবং কৃষ্ণ সাগরের সাথে সাথে ইরান-ইরাক-তুরস্কের অবস্থান রাশিয়ার ভৌগোলিক বাস্তবতা। একারণে রাশিয়া কাসপিয়ানের দিকে ঝুঁকছে। কাসপিয়ান এমন একটা সাগর যেখানে চলাচলের জন্যে রাশিয়ানরা জাহাজ বানাচ্ছে কাসপিয়ান থেকে প্রায় ৮০০ মাইল দূরে ভলগা নদীতে, যেকারণে জাহাজগুলি হচ্ছে অপেক্ষাকৃত ছোট। আবার কাসপিয়ান এমন কোন সাগর নয়, যেখানে সমুদ্রে টহল দিতে ডেস্ট্রয়ার বা ক্রুজারের মতো বিশাল জাহাজ বানাতে হবে। কাজেই কাসপিয়ানের জাহাজগুলি স্বভাবতই ছোট হবে। আর এই সাগরের জাহাজগুলিকে ভূমিতে আক্রমণযোগ্য মিসাইল সজ্জিত করতে হলে ছোট জাহাজই হবে ভরসা। অর্থাৎ ছোট জাহাজের উপরে রাশিয়ার স্থলভাগ আক্রমণের ভার দেওয়াকে আমরা রাশিয়ার ভৌগোলিক বাস্তবতার অংশ ধরতে পারি। এই বাস্তবতা রাশিয়ার সাথে থাকবে সকল সময়; শুধু আজকে সিরিয়ার যুদ্ধের সময় নয়। কিন্তু এই ছোট জাহাজের দূরপাল্লার অপারেশন অপেক্ষাকৃত ছোট নৌবহরের দেশের জন্যে অনুপ্রেরণার কারণ হতে পারে; জন্ম দিতে পারে একটা নতুন স্ট্র্যাটেজিক ডিটারেন্ট-এর। সিরিয়ায় মিসাইল অপারেশনের কারণে রাশিয়ার নৌশক্তির রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়তে পারে ঠিকই, কিন্তু ছোট জাহাজের স্ট্র্যাটেজিক ডিটারেন্ট হবার সম্ভাবনা এমন একটা ধারণাকে রপ্তানি করতে পারে, যা কিনা বিশ্বের কিছু এলাকার স্ট্র্যাটেজিক ব্যালান্সও পালটে দিতে পারে।

Wednesday, 30 September 2015

হান্টিংটনের দুই দশক এবং আমাদের বাস্তবতা

৩০শে সেপ্টেম্বর ২০১৫

http://likesuccess.com/author/samuel-p-huntington
স্যামুয়েল হান্টিংটনের দুই দশক আগের থিউরি আজ বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে। কাজেই সেই কথাগুলিকে উদ্ভট চিন্তা বলার অবকাশ আজ আমাদের আর নেই।

বিশ্ব-রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান বুঝতে না পারলে নিজেদের নীতি তৈরি করাটা শুধু কঠিনই নয়, বরং না বুঝে নীতি তৈরি করাটা মহাবিপদের কারণ হতে পারে। প্রথমেই বুঝতে হবে যে বাংলাদেশ বিশ্বের বাইরে নয়। কাজেই বিশ্বের অন্য কোথায় কি হচ্ছে, সেটা বুঝতে পারাটা এবং সেই ব্যাপারগুলি আমাদের দেশকে কিভাবে প্রভাবিত করতে পারে, সেটা বোঝাটা জরুরি। ইউক্রেন সমস্যা যে আমাদের দেশ থেকে তেমন দূরে নয়, সেটা আমরা টের পেয়েছি হাড়ে হাড়ে। মার্কিন এবং ইউরোপিয়ান অবরোধের কারণে রাশিয়ায় পণ্য সরবরাহের বিরাট ঘাটতি হওয়ার পরে রাশিয়ার সাথে বাংলাদেশের যেকোন বাণিজ্য চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রভাবিত করতে চাইছে। বাংলাদেশে রাশিয়ার পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপন এবং বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর কেনাকাটার জন্যে রাশিয়ান প্রেসিডেন্টের এক বিলিয়ন ডলারের ঋণ যুক্তরাষ্ট্রের ভালো চোখে দেখার কোন কারণ নেই। এমনিতেই বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের আধিক্য এবং বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর জন্যে চীনা অস্ত্রসস্ত্রের দুয়ার খুলে দেওয়াটা ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রকে চিন্তায় ফেলেছে। এর উপরে ইউক্রেন সমস্যার পরপর রাশিয়ার সাথে চীনের সম্পর্কোন্নয়ন এবং বঙ্গোপসাগরের গভীর গুরুত্বপূর্ণ স্ট্র্যাটেজিক এলাকায় রাশিয়ার অবতরণ পুরো ব্যাপারটাকে ঘোলাটে করে ফেলেছে। এই মুহূর্তে আমাদের নিজেদের অবস্থান বুঝে এগুনো হবে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।

আসল লাইন কোনটা?

বিশ্ব-রাজনীতি বুঝতে আমাদের দেখতে হবে শীতল যুদ্ধের পরে বিশ্ব কোন দিকে এগুচ্ছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে বিশ্ব ব্যবস্থায় কি ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, সেটা নিয়ে অনেকেই অনেক থিউরি দিয়েছেন। কিন্তু লাল ফৌজ ধ্বংসের পঁচিশ বছর পরে বুঝতে খুব একটা বাকি থাকে না কোন থিউরি বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন (Samuel P Huntington) ১৯৯৩ সালে ‘The Clash of Civilizations? The Next Pattern of Conflict’ শীর্ষক একটা প্রবন্ধ লিখেন, যা বিরাট সাড়া ফেলে এবং ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত হয়। এই লেখার উপরে তিনি ১৯৯৬ সালে তার থিউরিকে শক্ত ফাউন্ডেশন দেওয়ার নিমিত্তে একটি বইও (The Clash of Civilizations and the Remaking of World Order) লিখে ফেলেন। দুই দশক পর তার সেই থিউরিগুলি আর হাইপোথিসিস আকারে নেই; এর অনেকটাই বাস্তবায়নের আকারে এগুচ্ছে। তার পরবর্তীতে জিবিগনিউ ব্রেজিন্সকি, জর্জ ফ্রীডম্যান, হেনরি কিসিঞ্জার এবং অন্যান্যরাও মোটামুটি একই সুরে কথা বলেছেন; থিউরির কিছুটা বিরোধিতা করলেও আসল লাইন থেকে দূরে সরে যাননি একেবারেই। তাহলে এই আসল লাইনটি কি, সেটা বোঝাটা গুরুত্বপূর্ণ।



https://en.wikipedia.org/wiki/Western_world
হান্টিংটনের কাছে সভ্যতার ম্যাপের বাইরে অন্য কোন জাতীয়তা গুরুত্ব পায়নি, কারণ সেসব জাতীয়তার পক্ষে বিশ্ব-রাজনীতিতে দীর্ঘ-মেয়াদী অবদান রাখা সম্ভব নয়।

কার-কার মাঝে এই দ্বন্দ্ব? 

হান্টিংটন যেটা বলতে চেয়েছিলেন, সেটা হচ্ছে, কমিউনিজমের পতনের পর মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সভ্যতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হতে যাচ্ছে ‘ইসলামিক সভ্যতা’। মুসলিম দেশগুলি আলাদা-আলাদা-ভাবে বিক্ষিপ্ত হয়ে থাকলেও তিনি পুরো মুসলিম সমাজকে একত্রেই দেখেছেন। যেহেতু পশ্চিমা সভ্যতা মুসলিমদেরকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করবে, কাজেই মুসলিমরাও প্রায় স্বভাবসিদ্ধভাবেই নিজেদেরকে একই কাতারে দেখা শুরু করবে। এটা মুসলিম দেশগুলির সরকারের ক্ষেত্রে নয়, বরং মুসলিম দেশগুলির জনগণের চিন্তায় প্রতিফলিত হবে। হান্টিংটন দেখিয়েছেন যে মুসলিম সভ্যতার সাথে সবচাইতে কম রেষারেষি হচ্ছে ‘চৈনিক সভ্যতা’র (Sinic Civilaization) বা চীনের। অর্থাৎ ইসলামিক দুনিয়াকে শক্তিশালী হতে চীন সাহায্য করতে পারে। এই গ্র্যান্ড থিউরির উপরে নির্ভর করে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সভ্যতার জন্যে হান্টিংটন কিছু উপদেশ দিতেও কার্পণ্য করেননি, যেখানে তিনি স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন – “to restrain the development of the conventional and unconventional military power of Islamic and Sinic countries”. ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তান, লিবিয়া, এবং অন্যান্য দেশের বর্তমান অবস্থা দেখলে বুঝতে খুব একটা কষ্ট হয় না যে হান্টিংটন-কে পশ্চিমারা হাল্কাভাবে নেয়নি এবং হান্টিংটনের পরের থিউরিস্টরাও ওই একই পথ নেয়াকেই যুক্তিযুক্ত মনে করেছেন।

এখানে বলাই বাহুল্য যে হান্টিংটনের কাছে জিওপলিটিক্সে গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিতে পারা শক্তি ছাড়া বাকিরা গুরুত্ব পায়নি একেবারেই। যেমন ‘আফ্রিকান সভ্যতা’ নিয়ে তিনি তেমন মাথা ঘামাননি। তবে ‘ল্যাটিন আমেরিকান সভ্যতা’-কে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন এই বলে যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু হতে পারে। রাশিয়া (পূর্ব অর্থোডক্স সভ্যতা), জাপান এবং ভারতকে (হিন্দু সভ্যতা) তিনি আলাদা শক্তি হিসেবে দেখেছেন, তবে তাদের আসল দ্বন্দ্বের (পশ্চিম বনাম ইসলাম) সাইড-শোর বাইরে গুরুত্ব দেননি। তার কথায় এরা নিজেদের স্বার্থ বুঝে প্রধান দল দু’টির (পশ্চিম এবং ইসলাম) যেকোন একটির সাথে যাবে। হান্টিংটনের লেখায় প্রথমেই প্রত্যেক মানুষকে তিনি প্রশ্ন করেছেন যে মানুষ নিজের পরিচয় সন্বন্ধে কতটা ওয়াকিবহাল। সেই পরিচয়ের উপরে নির্ভর করেই তিনি তার থিউরি সাজিয়েছেন। তিনি এক্ষেত্রে আরব মুসলিমদের জন্যে ‘আরব’-এর চাইতে ‘মুসলিম’-কে গুরুত্ব দিয়েছেন বেশি। অর্থাৎ আরবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আরবের জাতীয়তার চাইতে মুসলিম পরিচয় বেশি গুরুত্ব বহণ করবে। এই মুসলিম পরিচয় কিন্তু শুধু আরবের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পশ্চিম আফ্রিকার উপকূল থেকে শুধু করে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত সকল মুসলিম-প্রধান দেশকেই বুঝিয়ে সারে। আর যখন আমরা উপরে উল্লিখিত হান্টিংটনের উপদেশের কথা মনে করি, তখন শিউরি উঠি যে এই সকল মুসলিম দেশই এই হিসাবের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। মানে সকল মুসলিম দেশকে নিরস্ত্র করার মাঝেই পশ্চিমা সভ্যতার গ্রানাইট ফাউন্ডেশন! বাংলাদেশও এই একই হিসাবের ভেতরে।

বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে সমস্যা হিসেবে দেখানো হলেও এই জনসংখ্যার কারণেই যে এই দেশ গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে, সেটা অনেকেই হিসেব করেন না।



এতো বড় খেলায় বাংলাদেশ কোথায়?
 যারা বিশ্বাস করতে পারেন না যে কেন ছোট্ট বাংলাদেশ এই হিসেবের মধ্যে পড়বে, তারাও হয়তো বিশ্বাস করবেন যখন এই হিসেবের সরাসরি Receiving End-এ থাকবেন। বাংলাদেশ ছোট দেশ নয়। একুশ শতকে দেশের আকার হিসেব হচ্ছে সেই দেশের জনসংখ্যা এবং সেই জনসংখ্যার প্রকৃতির উপরে। মুসলিম বিশ্বের মধ্যে জনসংখ্যার দিক থেকে ইন্দোনেশিয়া এবং পাকিস্তানের (ভারতকেও ধরা যায় এর মধ্যে) পরপরই বাংলাদেশের স্থান। হান্টিংটন দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যার দেশগুলির জিওপলিটিক্সে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সম্ভাবনার কথা বলেছেন; কারণ যার জনসংখ্যা যত দ্রুত বাড়বে, তার কাছেই যুব সমাজের (১৫ থেকে ২৪ বছর বয়স) সবচাইতে বড় অংশটা থাকবে, যারা সমাজের চালিকাশক্তি হবে। একটা দেশ কোন সমরে জড়িয়ে পড়লে এই যুব সমাজই কিন্তু জীবন দেবার জন্যে তৈরি থাকে। হান্টিংটন মুখে না বললেও বিভিন্ন গ্রাফিক্যাল এনালিসিসের মাধ্যমে এটা বুঝিয়ে দিয়েছেন যে মুসলিম বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যার কারণে মুসলিম যুবসমাজ পশ্চিমের জন্যে হুমকি। জনসংখ্যার দিক থেকে বড় মুসলিম দেশগুলির কাছেই এই যুবসমাজের সবচাইতে বড় অংশটুকু রয়েছে, যা কিনা এখন টার্গেট।

একটা রাষ্ট্র বা সভ্যতা দাঁড় করাতে মানুষ লাগে। যন্ত্রপাতি লাগে সভ্যতাকে এগিয়ে নিতে, কিন্তু মানুষই তো সেই যন্ত্র তৈরি করে। তালগাছ ভর্তি একটা দেশ কোন দেশ নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত সেখানে মানুষ বসতি স্থাপন না করে। কাজেই এই মুসলিম জনসংখ্যার কারণেই আমরা যে টার্গেট, সেটা বুঝতে বাকি থাকেনা। এই টার্গেটকে তাহলে কি করে দুর্বল করা যায়, সেটা বুঝতে পারলে টার্গেটের নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব। প্রথম টার্গেট হলো জনসংখ্যা যতটা সম্ভব কমিয়ে রাখা। আমাকে কেউ যদি বড় জনসংখ্যার সমর্থক বলে ধিক্কার দিতে চান, তাহলে দিতে পারেন। কিন্তু এটা তাদের বোঝা উচিত যে চীন এবং ভারত শক্তিশালী দেশ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে তাদের বিশাল জনসংখ্যার কারণে, জনসংখ্যা কমিয়ে রাখার কারণে নয়। আর দ্বিতীয়ত, যুবসমাজই যেহেতু মূল টার্গেট, কাজেই যুবসমাজকে অগ্রগামী হতে বাধা দেওয়া। তাদেরকে Subversion-এর মাধ্যমে বিপথে নেওয়ার বিভিন্ন পদ্ধতি কাজে লাগানো এবং সরাসরি মাদক এবং অন্যান্য অবৈধ কাজে তাদেরকে নিয়োজিত করে ফেলে তাদের একটা শক্তি হিসেবে আবির্ভাবে বাধা প্রদান করা। তৃতীয়ত, দেশকে অকারণে একটা যুদ্ধে নিয়োজিত করা, যাতে যুবসমাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। শেষোক্ত এই পদ্ধতি মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশেই পাওয়া যাবে, যেখানে বিরাট এক যুবসমাজকে মুসলিমদের নিজেদের মধ্যে মারামারি লাগিয়ে ধসংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সিরিয়া এবং ইরাকে অযথা যুদ্ধ বাধিয়ে বিশাল এক জনগোষ্ঠীর সবচাইতে ভালো অংশটিকে পশ্চিমা সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে বলি দেওয়া হয়েছে। তাহলে এই তিনটি পদ্ধতিকে একত্র করলে আমরা পশ্চিমা সভ্যতার রক্ষাকবচ বলতে যা দেখতে পাই, তা হচ্ছে – মুসলিম জনসংখ্যা কমিয়ে রাখো; যদি তারপরেও বেড়ে যায়, তাহলে তাদের যুবসমাজকে নষ্ট করো; আর তার পরেও যদি জেগে ওঠার চেষ্টা করে, তাহলে তাদের নিজেদের মধ্যে মারামারি লাগিয়ে ধ্বংস করো।
http://thepoliticalscienceclub.com/wp-content/uploads/2014/04/damaged-buildings-syrian-civil-war1.jpg
ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, লিবিয়া থেকে আমাদেরও শিক্ষা নিতে হবে। Big Picture না বুঝতে পারলে মহাবিপদের সন্মুখীন হওয়াটা আমাদের জন্যে অসম্ভব নয়।


 ভুল শুধু ভুল নয়!

বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্বের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা দেশ। এদেশের ম্যারিটাইম শক্তির সম্ভাবনার উপরে আমি এর আগের কয়েকটি লেখায় আলোকপাত করেছি। এদেশের অর্থনীতির দ্রুত এগুনোর মূলে আছে এদেশের জনগণ। জনগণের বিরূদ্ধে যায় এমন যেকোন কিছু থেকে দূরে থাকাটা এই বিশ্ব-দ্বন্দ্বের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ। নিজেদেরকে দুনিয়া থেকে আলাদা ভেবে অন্য কোন ফর্মুলায় ফেলার বৃথা চেষ্টা করা ঠিক হবে না; কারণ উপরেই বলেছি যে বর্তমানের সব পশ্চিমা থিউরিস্টরাই ওই একই লাইনে কথা বলছেন। তারা কিন্তু তাদের কথা লুকাননি; আমরা যদি বুঝতে ভুল করি, সেই ভুল আমাদের। সাদ্দাম হোসেন ইরাকী জাতীয়তাবাদের নাম করে যুদ্ধে জড়িয়ে ইরাকের সামরিক শক্তিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে পশ্চিমাদের খায়েস মিটিয়েছিলেন। যা বাকি ছিল, সেটা ২০০৩ সালে জর্জ বুশ ফিনিস করেছিলেন ইরাক আক্রমণ করে। এরপর ইরাক এবং সিরিয়ার পুরো যুবসমাজ ধ্বংস হচ্ছে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত জেলখানায় সৃষ্ট ISIS এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে ব্রিটিশ-ফ্রেঞ্চদের তৈরি সিরিয়ার আল-আসাদ পরিবারের দুষ্টচিন্তা-প্রসূত উন্মাদনার কারণে। তুরস্কও ওই যুদ্ধে যোগ দিচ্ছে। লিবিয়া বেসামাল; আর ইয়েমেনের যুদ্ধে জড়ানো হয়েছে পুরো আরবকে। তিউনিসিয়া এবং মিসর অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল। আফগানিস্তান আর দাঁড়াতে পারবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। পাকিস্তান ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ক্রন্দনরত। দূরবর্তী দ্বীপদেশ ইন্দোনেশিয়া এবং মালেশিয়াকে বাইরে রাখলে বাকি থাকছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের যুবসমাজকে কল্পনার জগতে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে আরও আগে থেকেই। তবে এতে এখনো পুরো কাজ হয়নি। ষোল কলা পূর্ণ করতে কি দরকার? --- যুদ্ধ! নিজের দেশের উপরে আক্রমণ আসলে যুদ্ধ করতে হতেই পারে। কিন্তু সেটারও সময় আছে। দেশ সেই যুদ্ধের জন্যে কতটুকু প্রস্তুত, সেটা চিন্তা করে দেখতে হবে। প্রস্তুত হবার আগেই এড্রিনালিনের উপরে ভর করে নিজেদের গৌরব বৃদ্ধি করতে গিয়ে যুদ্ধে জড়ানো হবে নিজেদের পায়ে কুড়াল মারা এবং সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে বিপদের মাঝে ফেলে দেওয়া। Big picture ভুলে গিয়ে Small picture নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলে মারাত্মক ভুল হয়ে যাবে। সেই ভুলের মাশুল চিরকাল গুণতে হতে পারে। প্ররোচনা আসতেই পারে। কিন্তু সেই প্ররোচনা জাদুকরের ছলনা কিনা, সেটা বুঝতে পারার ক্ষমতা থাকাটা জরুরি। জাদুকর কিন্তু মানুষের ছোট ছোট প্রবৃত্তিকেই (Instinct) কাজে লাগাবে। কাজেই কোন ধরনের আবেগের বশবর্তী না হয়ে Rational চিন্তাকে কাজে লাগিয়ে Big picture চিন্তা করে সঠিক সময়ের জন্যে অপেক্ষা করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। যেদিন আমরা জাদুকরের ছলনা পুরোপুরি বুঝতে সক্ষম হবো, সেদিনই বুঝে নেব যে আমরা প্রস্তুত; তার আগে নয়।

Tuesday, 22 September 2015

ফ্রান্সিস ড্রেইক এবং আমাদের নৌ-চিন্তার ভিত্তি

২২ সেপ্টেম্বর ২০১৫

ফ্রান্সিস ড্রেইক কে ছিলেন সেটা নিয়ে একেক দেশের মানুষের মাঝে দ্বিমত থাকলেও তিনি যে ব্রিটেনকে একটা ম্যারিটাইম দেশ হিসেবে তৈরি করতে বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন, সেটা অস্বীকার করার উপায় কারুরই নেই।


ফ্রান্সিস ড্রেইক (Sir Francis Drake, 1540-1596) ইতিহাসে কি হিসেবে পরিচিত? সেটা অবশ্য নির্ভর করছে সেই ইতিহাস কে রচনা করেছিল। কারণ স্প্যানিশ-পর্তুগীজ-ফ্রেঞ্চদের কাছে ড্রেইক ছিলেন একজন জসদস্যু; আর ব্রিটিশদের কাছে তিনি একজন জাতীয় বীর। তিনি আসলে কি করতেন? ড্রেইক ইংল্যান্ডের শত্রু দেশের বাণিজ্য জাহাজ এবং বাণিজ্য কেন্দ্র হামলা করে লুট করতেন। ইংল্যান্ডের রানী এলিজাবেথ (রানী ছিলেন ১৫৫৮ খ্রিঃ-১৬০৩ খ্রিঃ) ড্রেইককে পছন্দ করতেন বলেই তিনি তাকে জলদস্যুতার জন্যে সাজা দেননি। বরং যখন স্পেনের সাথে ইংল্যান্ডের যুদ্ধ (১৫৮৫ খ্রিঃ-১৬০৪খ্রিঃ) বেধে গেল, তখন এলিজাবেথ তাকে ভাইস এডমিরাল পদে নিয়োগ দেন। এর আগেই পৃথিবী প্রদক্ষিণের (১৫৭৭ খ্রিঃ-১৫৮০খ্রিঃ) পরপরেই ড্রেইককে নাইট উপাধি দেন রানী। স্প্যানিশদের কাছ থেকে সমুদ্রের দখল নিতে ইংল্যান্ডের জন্যে ড্রেইকের অবদান অনস্বীকার্য। ড্রেইকের আসল অবদান অবশ্য স্প্যানিশদের বিরূদ্ধে যুদ্ধ করা বা দস্যুবৃত্তি নয়। ১৫৭৭ সালে দুনিয়া প্রদক্ষিণের মিশনে বের হবার সময় ড্রেইক বেশ কিছু সম্ভান্ত বংশীয় যুবককে তার সাথে নেন। এই ব্যাপারটার গুরুত্ব অনেকে না বুঝলেও স্প্যানিশ নীতিনির্ধারকেরা ঠিকই বুঝেছিলেন। তারা যেটা সন্দেহ করেছিলেন তা হচ্ছে, ড্রেইক ইংলিশ নৌবাহিনীর অফিসার কোর তৈরি করার জন্যেই তার সাথে ওই যুবকদের নিয়েছিলেন। ড্রেইকের মিশনে রানী এলিজাবেথ নিজেও গোপনে বিনিয়োগ করেছিলেন, যা কিনা ওই মিশনের গুরুত্ব বুঝিয়ে দেয়। ড্রেইক এই মিশনের মাধ্যমে রয়্যাল নেভির অফিসার কোর তৈরি করার যে ট্র্যাডিশন তৈরি করেছিলেন, সেটা পরবর্তীতে ব্রিটিশদের সমুদ্রের রানী বানাতে ব্যাপক সাহায্য করেছিল।


শুধুই বাণিজ্য, নাকি আরও কিছু?


এখানে একটা ব্যাপার কিছুটা অদ্ভুত ঠেকলেও বিশেষভাবে বিবেচ্য। ড্রেইকের মিশনটা কি বেসামরিক ছিল, নাকি সামরিক ছিল? প্রাইভেট ছিল, নাকি সরকারী ছিল? এই প্রশ্নগুলির উত্তর দিতে হলে কিছু ব্যাপার ক্ষতিয়ে দেখতে হবে। ড্রেইক কয়েকবার স্প্যানিশদের আমেরিকান উপনবেশের বিরূদ্ধে মিশনে বের হন। ষোড়শ শতকে ক্যাথোলিক স্প্যানিশ এবং পর্তুগীজরা তাদের আমেরিকান কলোনিগুলিতে আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাস, সোনা, রূপা, চিনি, ইত্যাদির একচেটিয়া ব্যবসা করতো। ইংলিশ এবং ফ্রেঞ্চরা এই ব্যবসা থেকে ছিল বঞ্চিত। স্প্যানিশ-পর্তুগীজরা শক্তি দিয়ে এই বাণিজ্য রক্ষা করতো। কাজেই এই বাণিজ্যে ভাগ বসাতে হলেও শক্তির প্রয়োজন হতো। নব্য পুঁজিবাদের এই সময়ে মার্কেন্টিলিস্ট পলিসি অনুসরণ করতো সবাই – অর্থাৎ অর্থনীতি ছিল রপ্তানি নির্ভর; কমদামে বেসিক পণ্য আমদানী করে বেশি দামে ফিনিশড গুডস রপ্তানি করেই চলতো এসব দেশের অর্থনীতি। এই নীতিতে একে অপরকে নিজের আফ্রিকান এবং আমেরিকান বাণিজ্য কেন্দ্রের কাছে আসতেই দিত না; ব্রিটিশ-ফ্রেঞ্চ জাহাজ দেখলেই স্প্যানিশ-পর্তুগীজরা আক্রমণ করে বসতো, অথচ এসব দেশের মধ্যে তখন যুদ্ধাবস্থা ছিল না! ইংল্যান্ড থেকে যেসব জাহাজ আমেরিকায় বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হতো, তারা গোপনে ইংল্যান্ড ছাড়তো। কিন্তু তারা ইংল্যান্ড ছাড়ার আগেই স্প্যানিশ চর মারফত স্প্যানিশ সরকার খবর পেয়ে যেত এবং স্প্যানিশ রাষ্ট্রদূত এলিজাবেথের কাছে আর্জি নিয়ে যেত সেই মিশন বন্ধ করার জন্যে। এই ধরনের প্রতিযোগীতার কারণে ড্রেইক এবং অন্যান্য যারা আমেরিকার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাতো, তারা তাদের জাহাজগুলিকেই শুধু অস্ত্রসজ্জিত করে ক্ষান্ত হয়নি, তারা তাদের নাবিকদের সিলেক্ট করার ক্ষেত্রেও একই রকম সাবধানতা অবলম্বন করতো। তাদের জাহাজের নাবিকদের বেশিরভাগই অস্ত্র চালনায় দক্ষ হতো। অথচ তারা কিন্তু ‘বাণিজ্যের’ উদ্দেশ্য নিয়েই বের হতো সমুদ্রে।

আটলান্টিক মহাসাগরে বাণিজ্য ছিল ক্রীতদাস বাণিজ্যের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এই বাণিজ্যের দখল নিতেই ইউরোপিয় দেশগুলির মাঝে হয় তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা

একচেটিয়া ব্যবসার রক্ষার্থে

প্রথমে পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলে গিয়ে তারা ইংল্যান্ড এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে আনা পণ্য বিক্রি করতো এবং সেখান থেকে কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাস দিয়ে জাহাজ ভর্তি করতো। এরপরে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে এই ক্রীতদাসদের তারা আমেরিকায় স্প্যানিশ উপনিবেশগুলিতে বিক্রি করতো, যেখানে আদিবাসীদের নির্মমভাবে নিধনের কারণে চাষাবাদ এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কাজের জন্যে জনবলের বড়ই অভাব ছিল। আফ্রিকার উপকূলে এলেই পর্তুগীজরা ইংলিশ জাহাজগুলিকে আক্রমণ করে বসতো। ইংলিশরা নিজেদেরকে রক্ষা করেই জোরপূর্বক আফ্রিকায় তাদের বাণিজ্য সম্পন্ন করতো; আবার আমেরিকাতে গিয়েও জোরপূর্বক তারা বাণিজ্য করতো। স্প্যানিশ উপনিবেশের অধিকর্তারা তাদের সরকারের নির্দেশের বিরূদ্ধে না গিয়ে ইংলিশ জাহাজকে বাণিজ্য করতে না দিলে ইংলিশরা তাদের জাহাজ থেকে উপকূলে অস্ত্রধারী নাবিকদের নামিয়ে দিত। তারা পরে অস্ত্রের মুখে বাণিজ্য করতো। ড্রেইক এবং বাকিরা এরকম অস্ত্রের মুখে বাণিজ্য করেই ক্ষান্ত হননি। তারা সরাসরি স্প্যানিশ জাহাজে হামলা করে জাহাজ লুট করেছেন, জাহাজের নাবিকদের মাঝে কিছু লোককে বন্দী করে পরবর্তীতে আলোচনায় ব্যবহার করেছেন, এবং যেখানেই সুযোগ পেয়েছেন সেখানেই স্থলভাগে সৈন্য নামিয়ে (উভচর উভিযান) ব্যাপক লুটতরাজ এবং ক্ষতিসাধন করেছেন। এই ব্যাপারগুলি ইংলিশরা খারাপ চোখে দেখেনি। তারা চেয়েছে আমেরিকার নতুন বাজারে বাণিজ্য করতে, কারণ সেই বাণিজ্যের মাঝেই তারা নিজেদের সমৃদ্ধি দেখতে পেয়েছিল। স্প্যানিশ-পর্তুগীজদের একচেটিয়া বাণিজ্য তারা দেখতে আগ্রহী ছিল না। অন্যদিকে স্প্যানিশ-পর্তুগীজরা মনে করতো যে – আমরাই আমেরিকায় প্রথম এসেছি; আমরাই সেই ভূমি খুঁজে পেয়েছি অনেক কষ্ট করে; যদি কারও বাণিজ্য করার অধিকার সেখানে থাকে, তাহলে সেটা আমাদের। এটা ছিল একটা এলাকার বাণিজ্যসহ পুরো ভূমি কপিরাইট করার এক অনন্য উদাহরণ। আপাতদৃষ্টে এই মনোপলি ব্যাবসার বিরূদ্ধে ইংলিশদের একটা ভালো জাতি মনে হলেও পরবর্তীতে সারা বিশ্বে নিজেদের বাণিজ্য আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় ব্রিটিশরা ঠিক এই কাজটাই করেছে; তখন অবশ্য ব্রিটিশদের কাছে এটা মনে হয়েছে নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার যুক্তিযুক্ত সংগ্রাম।



স্প্যানিশদের বাণিজ্য জাহাজগুলির হাত থেকে বাণিজ্যের কতৃত্ব ছিনিয়ে নেবার জন্যে ব্রিটিশরা তাদের বাণিজ্য জাহাজগুলিকে সাজাতো যুদ্ধজাহাজের আঙ্গিকে; নাবিকগুলিকেও তারা সেভাবেই নিত।


বাণিজ্যের জন্যে জাহাজ, নাকি যুদ্ধের জন্যে?


ইংলিশ রাজ দেখেছেন তার দেশের উন্নতির দিকগুলি। যেকারণে তিনি তার দেশের ব্যবসায়ীদের স্বার্থ দেখেছেন। যেখানেই দরকার হয়েছে, সেখানেই তিনি ব্যবসায়ীদের সাথে অংশীদারীত্বে গিয়েছেন - ব্যবসা করার জন্যে নয়, বরং দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্যে। দেশের স্বার্থ এখানে সরকারী-বেসরকারী মালিকানার উর্ধে ছিল সবসময়। নিজের দেশের বাণিজ্যকে রক্ষা করার জন্যে সবকিছু করেছেন ইংলিশ রাজ। এমনকি যখন তারা এটা বুঝতে পেরেছেন যে স্প্যানিশ সমুদ্র বাণিজ্যে ভাগ বসানোর মাঝেই তাদের উন্নতি নিহিত, তখন তারা স্প্যানিশদের বিরূদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতেও পিছপা হননি। এই ব্যাপারগুলিকে খুব হিংসাত্মক মনে হলেও এটা কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে এরকম হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতা পুঁজিবাদ স্বাভাবিকভাবেই তৈরি করে। কাজেই যতদিন পৃথিবীতে পুঁজিবাদী শাসন চালু থাকবে, ততদিন সব দেশেরই নিজের বাণিজ্যিক স্বার্থকে নিজেরই দেখতে হবে। এখানে লজ্জা পেয়ে অভদ্রতা মনে করে কেউ যদি অন্য কোন বাণিজ্য-শক্তিকে ছাড় দিয়ে বসে, সেটা হবে কৌশলগত দিক থেকে বিরাট এক ভুল। ব্রিটিশরা লজ্জা করেনি বলেই ছোট্ট একটা দেশ হয়েও তারা দুনিয়ার রাজা বনে গিয়েছিল। বাণিজ্য করা এবং বাণিজ্য রক্ষার মাঝে তারা কোন পার্থক্য করেনি। দুই-ই তাদের জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যেকারণে তাদের বাণিজ্য জাহাজের বহর দেখলে বোঝা সম্ভব ছিল না যে সেগুলি বাণিজ্যের জন্যে, নাকি যুদ্ধের জন্যে তৈরি। তাদের বাণিজ্য জাহাজের সব নাবিকেরাই যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত থেকেছে সর্বদা। যেসব জাহাজ সরাসরি বিপক্ষের যুদ্ধজাহাজের বিরূদ্ধে যুদ্ধে নামেনি, সেসব জাহাজ সৈন্য পরিবহণ করেছে এবং উভচর অভিযানে অংশ নিয়েছে। বিপক্ষের সম্পদবাহী বাণিজ্য জাহাজ দখলের মাঝে তারা তাদের দেশের উন্নতিই শুধু দেখেনি, বরং এটা ছিল পরবর্তীতে বিংশ শতকের অর্থনৈতিক অবরোধ এবং যুদ্ধের চিন্তার শুরু। বিশেষ করে সমুদ্র বাণিজ্যের উপরে নির্ভরশীল একটা দেশকে কুপোকাত করতে হলে সেই দেশের সমুদ্র বাণিজ্যকেই যে কুপোকাত করতে হবে, এই থিওরিটা বুঝতে খুব একটা কষ্ট করতে হয়নি কারুর। বিপক্ষের বাণিজ্য জাহাজ আক্রমণ থেকে লজ্জাবশতঃ দূরে থাকলে নিজেদেরই ক্ষতি – এটা ইউরোপিয়দের মাঝে ব্রিটিশরাই প্রথম বুঝেছিল। নিজের উপরে এই থিওরি কার্যকর হলে কেমন লাগে, সেটাও অবশ্য ব্রিটিশরা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জার্মান সাবমেরিন বহর ব্রিটেনকে না খাইয়ে মারার উপক্রম করেছিল।



ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারত, ১৮০৫ সাল। যদি কোম্পানি হয় বেসরকরারী সংস্থা, তাহলে তারা ভারতে রাজনীতি এবং সমরনীতিতে কি করছিল? তাহলে ১৮০৫ সালের এই ম্যাপ কি বেসরকারী না সরকারী??


দেশের স্বার্থ কি সরকারী-বেসরকারী বা সামরিক-বেসামরিকের মাঝে আলাদা?

দেশের স্বার্থের মাঝে সরকারী-বেসরকারী অথবা সামরিক-বেসামরিক কিছু নেই; দেশের স্বার্থ মানেই সেটাকে রক্ষা করতে হবে সর্বশক্তি দিয়ে – এটাই ছিল ড্রেইকের সময়ের পুঁজিবাদী সমাজের নীতিনির্ধারকদের চেতনা। এই চেতনার উপরে নির্ভর করেই তারা দুনিয়া শাসন করেছে এবং যেসব জাতির উপরে ছড়ি ঘুরিয়েছে, সেসব জাতির মাঝে যাতে এই চেতনাগুলির জন্ম না হয়, সেটার ব্যবস্থা করেছে। এমন এক বিশ্বব্যবস্থার জন্ম তারা দিয়েছে, যেখানে সমুদ্র বাণিজ্য থাকবে অল্প কিছু কোম্পানির হাতে, যেগুলির মালিকানা থাকবে পশ্চিমা পুঁজিবাদী দেশগুলির হাতে। আর এই বিশ্বব্যবস্থা এমন একটা নিয়ম করে রাখবে, যার কারণে ওই বাণিজ্যকে চ্যালেঞ্জ করার একমাত্র পদ্ধতি থাকবে বেসামরিক-বাণিজ্যিক, যা কিনা বেশিরভাগ আপশ্চিমা দেশের জন্যে পুঁজিভিত্তিক অর্থনৈতিক কারণে সম্ভব হবে না। কাজেই যেকোন মুহূর্তে খুব সহজেই যেকোন দেশের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া বা অর্থনৈতিক যুদ্ধ পরিচালনা করা সম্ভব হবে। অথচ ব্রিটিশসহ অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলি যখন নিজেদের বাণিজিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছে, তখন কিন্তু সামরিক-বেসামরিক কোন আলাদা কিছু ছিল না। আমরা সকলেই ভুলে যাই যে ভারতীয় উপমহাদেশ প্রথম একশ’ বছর শাসন করেছে ব্রিটিশ সরকার নয়, বরং ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি, যা কিনা প্রাচ্যে ব্রিটিশদের সকল বাণিজ্যের দেখভাল করতো। তারা সৈন্য এবং যুদ্ধজাহাজ দিয়ে উপমহাদেশের বাণিজ্যকেন্দ্রগুলি দখল করেছে এবং সকল ধরণের কূটকৌশল অবলম্বন করেছে এই দেশের রাজনীতিতে প্রবেশ করে দেশের বাণিজ্যসহ স্থলভূমি দখল করে এদেশের মানুষকে ক্রীতদাসে পরিণত করতে। তাহলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কি সরকারী প্রতিষ্ঠান ছিল, নাকি বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ছিল? সামরিক প্রতিষ্ঠান ছিল, নাকি বেসামরিক? আজ আমাদের দেশের এফবিসিসিআই যদি ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো কাজ করতে যায়, তাহলে শুধু উদ্ভটই শোনাবে না, পশ্চিমা শক্তিগুলি তাদের কূটনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামরিক সকল শক্তিকে কাজে লাগাবে এই ধরনের কার্যকলাপের বিরূদ্ধে। যে কাজটা পশ্চিমা দেশগুলি একসময় নির্দ্বিধায় করেছে, সেটাকে তারা আজ খারাপ বলবে – এটা হতে পারে না। বরং তারা চায় না যে তাদের পথ অনুসরণ করে তাদেরই সাম্রাজ্য অন্য কেউ দখল করে নিক। চীনারা যখন এশিয়া, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকায় তাদের বিনিয়োগ এবং বাণিজ্য বৃদ্ধি করে, পশ্চিমা দেশগুলি তখন এই বিপদটাই দেখে। চীনারাও গত কয়েকশ’ বছরের ইতিহাস ভুলে না গিয়ে তাদের বাণিজ্য জাহাজের পিছনে পিছনে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে ভুলেনি। তারা পশ্চিমা ক্রীতদাসের শৃংখল থেকে বের হয়ে আসার আপ্রাণ চেষ্টায় রত।

বিখ্যাত মার্কিন জিওস্ট্র্যাটেজিস্ট এবং জিওপলিটিশিয়ান আলফ্রেড মাহান একটা জাতিকে ম্যারিটাইম জাতিতে পরিণত করতে ‘রিজার্ভের’ কথা বলেছিলেন। এই রিজার্ভে তিনি বলেছিলেন সেই জাতির সী-ফেয়ারিং মানুষের সংখ্যার কথা – অর্থাৎ কত মানুষ সমুদ্র-চারণের উপরে নির্ভরশীল। সেই দেশের সমুদ্রগামী বাণিজ্যিক জাহাজ পরিচালনা করা ছাড়াও সেই জাহাজ তৈরি এবং মেরামতের দক্ষ জনশক্তিকে মাহান রিজার্ভের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। ষোড়শ শতকে ব্রিটিশ নাবিক এবং পরবর্তীতে রয়্যাল নেভির এডমিরাল ফ্রান্সিস ড্রেইক যখন তার জাহাজে সম্ভ্রান্ত যুবকদের ট্রেনিং দিচ্ছিলেন, তখন কিন্তু তিনিও এই ‘রিজার্ভ’ তৈরি করছিলেন। এই রিজার্ভই পবর্তীতে ব্রিটিশদের নৌবাহিনীকে করেছে জগদ্বিখ্যাত। মাহান সামরিক সমুদ্রশক্তিকে বেসামরিক সমুদ্রশক্তির পিছনে রেখেছিলেন। কারণ তার কথায় বাণিজ্য জাহাজ ছাড়া একটা জাতি খামোকা যুদ্ধজাহাজ বানাবে না। আর বাণিজ্য জাহাজ চালাতে না জানলে সেই জাতি সমুদ্রকেও চিনবে না এবং যুদ্ধজাহাজও চালাতে শিখবে না; অর্থাৎ সেই জাতির ম্যারিটাইম জাতি হবার কোন সম্ভাবনাই থাকবে না।

ব্রিটিশরা যখন দুনিয়ার দখল নিয়েছিল, তখন তারা সামরিক-বেসামরিক বা সরকারী-বেসারকারীর মাঝে দাগ টানেনি। কিন্তু তাদের উপনিবেশগুলিকে স্বাধীনতা দেবার সময় কিন্তু এই দাগগুলি টেনে দিতে তারা ভুলেনি

আসলে চিন্তার ভিত্তিটা কোথায়?

এই সামরিক-বেসামরিক আলোচনার ইতি টানতে ষোড়শ শতকে তৈরি ব্রিটেনের ‘এডমিরালটি এন্ড ম্যারিন এফেয়ার্স’ অফিসের দিকে তাকাতে হবে। এই অফিস তাদের ম্যারিটাইম সকল কিছু দেখাশুনা করতো, যার সর্বোচ্চ পদাধারী ছিলেন লর্ড হাই এডমিরাল, যিনি বেশিরভাগ সময়েই ছিলেন একজন রাজনৈতিক ব্যাক্তি। তার দায়িত্ব বর্তমান যুগের বাণিজ্য, নৌ, নৌবাহিনী এবং কোস্ট-গার্ড একত্র করে মন্ত্রণালয় তৈরি করলে সেটার সমান হতে পারে। তার অধীনে দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিলেন ভাইস এডমিরাল অব ইংল্যান্ড, যিনি ছিলেন আসলে নেভি-এর চীফ অব স্টাফ। নৌবাহিনীর ব্যাপারে তিনি সিভিলিয়ান লর্ড হাই এডমিরালকে উপদেশ দিতেন। এই দু’জনের নিচে একই এডমিরালটি অফিসের অধীনে ছিল অর্ডন্যান্স, ট্রেজারার, সার্ভেয়র, কন্ট্রোলার এবং ক্লার্ক, যারা জাহাজ তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করতেন এবং ম্যারিটাইম শক্তি ধরে রাখার জন্যে সব ধরনের রিজার্ভের দিকে খেয়াল রাখতেন। নৌ-বিষয়ক সকল কিছু একটা অফিসের অধীনে হওয়াতে সমুদ্রকেন্দ্রিক জাতীয় নিরাপত্তার ব্যাপারে সবসময় একই নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। এই নীতিই কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে বর্তমানে চালু আছে। এই নীতির সুবিধা হিসেবে উদাহরণস্বরূপ বলা যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জাহাজের সংখ্যা বাড়ানোর ক্ষেত্রে। ব্রিটেনের বেশিরভাগ ফিশিং ট্রলারই মিলিটারি সার্ভিসের জন্যে উপযুক্ত ছিল এবং শত শত জাহাজ নৌবহরে শুধু যুক্তই হয়নি, বেসামরিক জাহাজের ডিজাইন কপি করে হাজার হাজার জাহাজ তৈরি করা হয়েছিল যেগুলি যুদ্ধের সময়ে জার্মান সাবমেরিনের হাত থেকে আটলান্টিক নৌ-বাণিজ্যপথ রক্ষা করতে এন্টি-সাবমেরিন জাহাজ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, অথবা নৌপথ নিরাপদ রাখতে মাইন-সুইপার হিসেবে ব্যবহার হয়েছে, অথবা প্যাট্রোল বোট হিসেবে ব্রিটিশ উপকূল রক্ষায় ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময়েও ব্রিটিশরা অবিশ্বাস্য দ্রুততায় সিভিলিয়ান লাইনার জাহাজ সৈন্য পরিবহণের জন্যে প্রস্তুত করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আটলান্টিক মহাসাগরের পরিবহণ জাহাজের কনভয়গুলির কমান্ডার থাকতেন একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ নৌবাহিনী অফিসার। এগুলি সম্ভব হতো না কোনদিনই যদি ব্রিটিশদের ম্যারিটাইম চিন্তায় সরকারী-বেসরকারী বা সামরিক-বেসামরিক চিন্তার বিভেদ থাকতো।

বাংলাদেশ ইতিহাসের এমন একটা অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে আমাদের চিন্তা করতে হচ্ছে সমুদ্র নিয়ে। আমরা চিন্তা কোন ভিত্তির উপরে করবো, সেটার উপরে নির্ভর করবে চিন্তাটা কতটা শক্তিশালী হবে। অন্যের তৈরি করে দেওয়া ভিত্তির উপরে দাঁড়াতে চাইলে অন্যের স্বার্থই দেখা হবে। তবে এটাও জেনে রাখা প্রয়োজন যে নিজেদের ভিত্তি নিজেরা তৈরি করতে চাইলে যেসব বাধা আসবে সামনে, সেগুলি অতিক্রম করার মতো শক্ত নীতি-নির্ধারনী ভূমিকা নিতে পারার মতো স্বাধীনতা আমাদের নেতৃত্বের থাকতে হবে।

Tuesday, 15 September 2015

ব্রিটিশ-ডাচ বিরোধ এবং আমাদের জন্য শিক্ষা

১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫
  
ইংলিশরা রানী এলিজাবেথের সময় তেমন শক্তিশালী না হলেও তার সময়েই ইংল্যান্ড সমুদ্রে তার প্রথম প্রতিদ্বন্দী স্পেনকে তার রাস্তা থেকে সড়াতে সক্ষম হয়।



ইউরোপের ছোট্ট রাষ্ট্র ইংল্যান্ডের সারা বিশ্বের মধ্যে সবচাইতে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভাব এবং তাদের দ্বারা পরবর্তীতে বিশ্বের এক বিশাল অংশের ভাগ্য নির্ধারণী রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিভাজন এক সত্যিকারের আশ্চর্য্য ইতিহাস। দুই শতকের বেশি সময় ধরে দুনিয়ার রাজা বনে যাওয়া এই রাষ্ট্রের ইতিহাস পর্যালোচনার মাঝে নিহিত রয়েছে অনেক রাষ্ট্রের বর্তমান উত্থান বা পতনের মূল গল্প, যা কিনা সেই রাষ্ট্রসমূহের ভবিষ্যত চিন্তার পেছনে ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। কিছুদিন আগে মার্কিন জিওপলিটিশিয়ান আলফ্রেড মাহানের থিওরির উপরে ভিত্তি করে ব্রিটিশদের (তথা ইংলিশদের) ভারতীয় উপমহাদেশের সবচাইতে শক্তিশালী রাষ্ট্র বাংলাকে বিভাজনের কাহিনী নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। সেই আলোচনারই ধারাবাহিকতায় বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সামনের দিনগুলি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বাণিজ্য জাহাজের গুরুত্ব তুলে ধরেছিলাম। এই সমুদ্র বাণিজ্য নিয়েই আজকে কিছু কথা বলতে চাই, যা থেকে ভারত মহাসাগর এবং অন্যত্র ব্রিটিশদের সমুদ্র বাণিজ্য-কেন্দ্রিক চিন্তাধারার কিছু প্রধান দিক পাওয়া সম্ভব। আর এই চিন্তাধারাগুলি বাংলাদেশের মানুষের জন্যে ভারত মহাসাগর নিয়ে চিন্তার জন্যে দেবে নতুন খোরাক।

ইংল্যান্ডের কাহিনী কি শুধু ইংল্যান্ডে?

ইংল্যান্ড নিয়ে কথা বলতে চাইলেও ইংল্যান্ডের ইতিহাস এখানে বর্ণনা করতে চাই না। বরং ইউরোপের কঠিন বাস্তবতা পেরিয়ে ইংল্যান্ড কিভাবে অন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলির সামনে চলে আসে, সেটা নিয়েই কথা বলবো। অর্থাৎ ইংল্যান্ডের সাথে ইউরোপের অন্য দেশগুলির সম্পর্কই হবে আজকের আলোচনার মূল ভিত্তি। এর আগের লেখাগুলিতে বলার চেষ্টা করেছি যে ইংল্যান্ড (তথা ব্রিটেন) সমুদ্র বাণিজ্যকে কাজে লাগিয়ে বিশাল সম্পদের মালিক বনে যায়। সেই ইতিহাস ঘাটতে হলে ইউরোপের অন্য দেশগুলির সমুদ্র বাণিজের ইতিহাসও ঘাটতে হবে; কারণ এদের সকলের ইতিহাস একই সূত্রে গাঁথা। একজনের উত্থান আরেকজনের পতন ঘটিয়েছে। ইউরোপের এই পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলি পুঁজিবাদের প্রধান স্তম্ভগুলিকে কাজে লাগিয়েই একে অপরকে পেছনে ফেলতে চেয়েছে। একত্রে চলার নীতি তারা পুঁজিবাদ থেকে কখনো পায়নি বলেই কোন কোন ক্ষেত্রে তাদেরকে একত্রে হতে দেখা গেলেও সেটা ছিল মূলত স্বল্প সময়ের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত; দীর্ঘমেয়াদী কোন পরিকল্পনা নয়। দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা বলতে রাষ্ট্রের উত্থানই তাদের একমাত্র পাথেয় হিসেবে কাজ করেছে। ইউরোপে রেনেসাঁর সময় থেকে শুরু করে ইংল্যান্ডের বিরূদ্ধে সবচাইতে বড় প্রতিদ্বন্দী হয়ে দাঁড়ায় স্পেন এবং পর্তুগাল। এই দুইটি দেশ আফ্রিকা এবং আমেরিকায় নতুন ভূমি খুঁজে পাওয়া এবং সেখানে উপনিবেশ স্থাপনের মাধ্যমে বিশাল সম্পদের অধিকারী হতে থাকে। তারা পুঁজিবাদের মার্কেন্টিলিস্ট পলিসির উদাহরণ টেনে একচেটিয়া (মনোপলি) ব্যবসা করতে থাকে সেই নতুন জায়গাগুলিতে। এখানে ইংলিশ এবং ফ্রেঞ্চদেরকে তারা দাঁড়াতেই দেয়নি। ইংল্যান্ড এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলি তখন দক্ষিণ ইউরোপের সাথে উত্তর এবং পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিরে মাঝে সমুদ্র বাণিজ্য করেই দেশ চালাতো। এই বাণিজ্য তাদের জন্যে ছিল অপেক্ষাকৃত কম লাভজনক, কারণ এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ডাচদের হাতে, যারা ছিল স্প্যানিশ রাজ্যের একটা অংশ। এই ডাচদের কাহিনীই হয়ে দাঁড়ালো ইউরোপের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাহিনী।

 
https://en.wikipedia.org/wiki/Anglo-Dutch_Wars
ইংলিশরা সপ্তদশ শতকে ডাচদের বিরূদ্ধে তিন দফা যুদ্ধ করেও তাদের নৌশক্তিকে পুরোপুরি খর্ব করতে ব্যর্থ হয়। তবে তৃতীয় দফা যুদ্ধই বলে দেয় যে ডাচদের দুর্বলতা কোথায়।

ডাচদের উত্থান ও পতন

ষোড়শ শতকের শেষ দিকে ইংলিশদের সাথে স্প্যানিশ এবং পর্তুগীজদের বাণিজ্য দ্বন্দ শুরু হয়। ক্যাথোলিক এই দুই দেশ ‘নিউ ওয়ার্ল্ড’ বা আমেরিকাতে ইংলিশ এবং ফ্রেঞ্চদের বাণিজ্য করার অনুমতি না দেয়ায় শেষোক্ত দেশদু’টি জলদস্যুতার আশ্রয় নেয়। সমুদ্রগামী জাহাজ তৈরি এবং চালনায় ইংলিশরা এগিয়ে থাকায় তারাই একমাত্র স্প্যানিশদের জন্যে সত্যিকারের বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। স্পানিশরা বহু দূরদুরান্তে উপনিবেশ স্থাপন করলেও স্প্যানিশরা জাতি হিসেবে সমুদ্রের প্রতি খুব বেশি ভালোবাসা রাখতো না। তাদের বাণিজ্য জাহাজের একটা বিরাট অংশ চালনা করতো ডাচরা, যারা বহু আগে থেকেই সমুদ্রগামী জাতি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিল (এ বিষয়ে এর আগেও আলোচনা করেছি)। ডাচদের সমস্যা ছিল তাদের প্রায় উন্মুক্ত স্থলসীমান্ত। স্প্যানিশরা স্থলশক্তি হওয়ায় তারা ডাচদের সীমানা প্রহরার জন্যে সেনাবাহিনী রক্ষণাবেক্ষণ করতো, যা কিনা ডাচদের নিজেদের জন্যে ছিল বেশ কষ্টকর। ডাচরা এর বিনিময়ে স্পানিশদের সমুদ্রগামী জাহাজগুলি চালনা করতো। শুধু তা-ই নয়, ইউরোপের উপকূলের ঠিক মাঝামাঝি হবার কারণে দক্ষিণ ইউরোপ এবং উত্তর-পূর্ব ইউরোপের মাঝে বেশিরভাগ বাণিজ্যই তারা নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ পায়। এর সাথে সাথে রাইন নদী নেদারল্যান্ডের মাঝে দিয়ে সমুদ্রে পড়ায় তাদের দেশের মাঝ দিয়ে এই নদী ব্যবহার করে জার্মানরা তাদের প্রায় সকল বাণিজ্য সম্পাদন করতো। রাইন ছিল মধ্য-ইউরোপের সুপার হাইওয়ে; আর সেটার চাবি ছিল ডাচদের হাতে। ডাচদের হাতে ছিল ইউরোপের সমুদ্রগামী বাণিজ্য জাহাজের বহরের বেশিরভাগ। ডাচরা আমেরিকা এবং এশিয়াতে অনেক উপনিবেশ স্থাপন করে এবং বিশাল সম্পদের মালিক হয়ে যায়। তবে ডাচরা স্প্যানিশদের অধীনে থাকতে চায়নি। তারা স্প্যানিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতার জন্যে ১৫৬৮ সাল থেকে ১৬৪৮ পর্যন্ত ৮০ বছর সংগ্রাম করেছে। স্প্যানিশদের থেকে ডাচরা আলাদা হবার সাথে সাথেই ডাচদের স্থলসীমান্ত পাহাড়া দেবার দায়িত্ব পড়ে যায় নিজেদের ঘাড়ে। সেনাবাহিনীর ভার সামলাতে গিয়ে তারা নৌবাহিনীকে দুর্বল করতে বাধ্য হয়। আর শক্তিশালী নৌবহর না থাকার কারণে তাদের সমুদ্র বাণিজ্যকে শত্রু দেশগুলি থেকে রক্ষা করার কোন পদ্ধতিই রইলো না। আর অপরদিকে এমনিতেই সমুদ্রাভিমুখী না হবার কারণে স্প্যানিশরা ইংলিশদের কাছে শুধু হেরেই যাচ্ছিলো। আর ডাচদের হারিয়ে স্প্যানিশদের দুর্বল হবার ইতিহাসের শেষ হয়।

সপ্তদশ শতাব্দীকে ডাচদের স্বর্ণযুগ বলা হয়; যার অবসান হয় ব্রিটিশদের সাথে টিকতে না পেরে। স্বাধীনতা পাবার পরপরেই ডাচদের উপরে চড়াও হয় ইংলিশরা। সমুদ্র বাণিজ্য থেকে ডাচদের বের করার চেষ্টায় ১৬৫২ সালে ইংলিশরা যুদ্ধ শুরু করে ডাচদের সাথে। যুদ্ধে ইংলিশরা ডাচদের ১,২০০ থেকে ১,৫০০ বাণিজ্য জাহাজ দখল করে নেয়, কিন্তু তারপরেও ১৬৫৪ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত সমুদ্র থেকে ডাচদের বিতাড়িত করতে ব্যর্থ হয়। এই কারণে ১৬৬৫-৬৭ সালের মধ্যে ইংলিশদের সাথে ডাচদের আরেক দফা যুদ্ধ হয় সমুদ্র বাণিজ্যের দখল নিয়ে। এবারেও ইংলিশরা ৪৫০টা ডাচ জাহাজ দখল করলেও যুদ্ধ জিততে ব্যর্থ হয়। পরপর দু’টা যুদ্ধ শেষপর্যন্ত ডাচদের দিকে হেলেই শেষ হয়। কিন্তু ইংলিশরা হাল ছাড়েনি। ১৬৭২ সালে ইংলিশরা ফ্রেঞ্চদের সাথে একত্রিত হয়ে যুদ্ধ শুরু করে ডাচদের বিরূদ্ধে। ফ্রেঞ্চরা ডাচদের স্থলভূমি দিয়ে আক্রমণ করায় এবারে যুদ্ধের প্রকৃতি পরিবর্তন হয়ে যায়। সমুদ্র থেকে ইংলিশ এবং ফ্রেঞ্চ নৌবহর আক্রমণ করে ডাচদের হারাতে ব্যর্থ হয়, কিন্তু ফ্রেঞ্চ সেনাবাহিনীকে প্রতিহত করতে গিয়ে ডাচদের সেনাবাহিনীতে বিনিয়োগ করতে হয়। ইংলিশরা ১৬৭৪ সালে যুদ্ধ থেকে ঝরে পরে, কিন্তু ফ্রেঞ্চরা ১৬৭৮ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যায়। এই যুদ্ধের ফলে ডাচদের সমুদ্র শক্তি দুর্বল হতে থাকে।

 
http://skepticism.org/timeline/july-history/7162-protestant-king-william-iii-england-defeats-catholic-king-james-ii-battle-boyne.html
ডাচ রাজা তৃতীয় উইলিয়াম ইংল্যান্ডেরও রাজা হবার পরে ডাচদের সমুদ্রশক্তির কফিনের শেষ পেরেকগুলি গাঁথা হয়। ডাচদের রাজা হয়েও উইলিয়ামের নীতি ভেতর থেকে ডাচ শক্তির বিরূদ্ধে এজেন্টের মতো কাজ করেছে।


রাজার এক দেশ; মনে-প্রাণে দুই দেশ

১৬৮৯ সালে ডাচ রাজা তৃতীয় উইলিয়াম ব্রিটিশদের আমন্ত্রণে ব্রিটিশদেরও রাজা (রাজা ছিলেন ১৬৮৯ খ্রিঃ-১৭০২ খ্রিঃ) হয়ে যান। ব্রিটিশ এবং ডাচদের নৌবাহিনী তখন একত্রিত হয়ে যায়। এসময় একই দেশের অংশ হওয়া সত্তেও ব্রিটিশরা ডাচদের নিজেদের সমকক্ষ করতে চাননি। ঠিক করা হয় যে, পুরো নৌবহরের ৮ ভাগের ৫ ভাগ হবে ব্রিটিশ এবং বাকি ৩ ভাগ হবে ডাচ। অর্থাৎ ডাচ নৌবহরের আকৃতি হবে ব্রিটিশ নৌবহরের প্রায় অর্ধেক (৩/৫), যা কিনা আগে শক্তির দিক থেকে যথেষ্ট কাছাকাছি ছিল। এভাবে একই রাজের সুযোগ নিয়ে ব্রিটিশ নীতিনির্ধারকেরা ডাচদের নৌবহরকে ছোট করে ফেলে। উইলিয়াম ডাচদের স্থলসীমানা রক্ষার জন্যে বড়সড় একটা সেনাবাহিনীও গড়ে তোলেন, যা কিনা বড় নৌবহর রক্ষণাবেক্ষণ করার পেছনে অন্তরায় হয়ে দেখা দেয়। শুধু ফ্লীটের আকৃতি ছোট করাই নয়, একজন ডাচ এডমিরালকে একজন ব্রিটিশ ক্যাপ্টেনের নিচে স্থান দেওয়া হতো। একই রাজা থাকা সত্তেও ব্রিটিশরা ডাচদেরকে সবসময়েই নিজেদের সমুদ্রনীতিতে প্রতিদ্বন্দী হিসেবেই দেখেছে। উইলিয়ামের শাসনকে ব্রিটিশরা ইতিহাসে ছোট একটা ঘটনা হিসেবে দেখেছে, তাই তারা তাদের দীর্ঘমেয়াদী নীতিতে পরিবর্তন আনেনি। উইলিয়ামের নীতির কারণে ইউরোপের বাণিজ্যের কেন্দ্র হল্যান্ড থেকে লন্ডনে চলে যায়। ১৭২০ সাল নাগাদ ডাচদের অর্থনীতি স্থবির হয়ে যায়। আর ১৭৮০ সাল নাগাদ ইংল্যান্ড (এখন গ্রেট ব্রিটেন)-এর মাথাপিছু জিডিপি ডাচদের অতিক্রম করে যায়। ১৭৮০ থেকে ১৭৮৪ সালের আরেক দফা যুদ্ধে ডাচরা ব্রিটিশদের বিরূদ্ধে দাঁড়ানোর সকল ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এভাবে সপ্তদশ শতকের স্বর্ণযুগের অধিকর্তা ডাচদের করুন পরিণতি হয়। ফ্রেঞ্চ বিপ্লবের পর ন্যাপোলিয়নের আবির্ভাবে ডাচদের স্বাধীনতাও শেষ হয়ে যায়।

 
http://www.returnofkings.com/37944/10-life-lessons-from-louis-xiv
ফ্রেঞ্চ রাজা চতুর্দশ লুই ফ্রান্সকে শক্তিশালী স্থলশক্তিতে পরিণত করেন। কিন্তু একইসাথে ডাচদের বিরূদ্ধে স্থলযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে ব্রিটিশ সমুদ্র বাণিজ্যের জন্য পথ উন্মুক্ত করে দেন

ব্রিটিশদের পরবর্তী শিকার – ফ্রান্স

স্প্যানিশদের থেকে আলাদা হবার সাথে সাথেই ডাচদের উপরে চড়াও হয় ইংলিশরা। ফ্রেঞ্চরা ইংলিশদের পক্ষ নেয় ডাচদের বিরূদ্ধে। আলফ্রেড মাহানের মতে এটা ছিল ফ্রেঞ্চদের একটা বিরাট ভুল। স্প্যানিশদের মতো ফ্রেঞ্চরাও ইউরোপের মূল ভূখন্ডের স্থলশক্তি ছিল; সমুদ্র ছিল তাদের জন্যে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর। ফ্রেঞ্চরা ডাচদেরকে তাদের বন্ধু না বানিয়ে শত্রু বানিয়ে ফেলায় ফ্রেঞ্চরা একটা শক্তিশালী সমুদ্রাভিমুখী বন্ধু থেকে বঞ্চিত হয়। এর ফলশ্রুতিতে সেনাবাহিনী তৈরি করতে গিয়ে ডাচদের নৌশক্তি দুর্বল হতে থাকে এবং সমুদ্র বাণিজ্যের প্রায় পুরোটাই ব্রিটিশদের (তথা ইংলিশদের) নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এভাবে পর পর স্প্যানিশ এবং ডাচদের মতো দু’টা বিরাট শক্তিকে নিজের পথ থেকে সরিয়ে দিতে সফল হয় ব্রিটিশরা। এখন তাদের সামনে রইলো শুধু ফ্রান্স। ঐতিহাসিকভাবেই ফ্রেঞ্চরা সমুদ্র বাণিজ্যকে খুব একটা গৌরবোদ্দীপ্ত কাজ মনে করতো না, সে কারণে ব্রিটিশরা যে সমুদ্রের রাণী, এটা ফ্রেঞ্চরা একরকম মেনেই নিল। একসময় ব্রিটিশদের ১৩০ খানা যুদ্ধজাহাজের বিপক্ষে ফ্রেঞ্চদের পক্ষে ৪৫টার বেশি মোতায়েন করা সম্ভব ছিল না। ফ্রান্সের প্রতাপশালী রাজা চতুর্দশ লুই-এর সময়ে (রাজা ছিলেন ১৬৪৩ খ্রিঃ- ১৭১৫ খ্রিঃ) অর্থমন্ত্রী জঁ-বাতিস্ত কলবের (মন্ত্রী ছিলেন ১৬৬৫ খ্রীঃ-১৬৮৩ খ্রীঃ) ফ্রেঞ্চ সরকারের সমুদ্র নিয়ে ভাবনায় কিছুটা পরিবর্তন আনলেও তার পরবর্তী নীতিনির্ধারকেরা তাকে অনুসরণ করেননি। যার কারণে ফ্রান্স ইউরোপের মূল ভূখন্ডে অনেক কিছু জয় করতে পারলেও ব্রিটেনের মতো সম্পদশালী হতে পারেনি কখনোই। ব্রিটেন ইংলিশ চ্যানলের ওই পাড়ে থেকেই ফ্রান্সের আশেপাশের সকল সমুদ্র বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করেছে। শুধু তা-ই নয়, ব্রিটিশরা আমেরিকা, আফ্রিকা এবং এশিয়াতেও ঐপনিবেশিক শক্তি হিসেবে ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল এবং ডাচদের ছাড়িয়ে যায়। এভাবে একে একে স্প্যানিশ, ডাচ এবং ফ্রেঞ্চদের পেছনে ফেলে উপরে উঠে আসে ব্রিটিশরা।

ডাচদের থেকে কি কিছু শেখার আছে?

ডাচদের সমুদ্রশক্তির বিরূদ্ধে ব্রিটিশদের এই গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি থেকে কিছু জিনিস বের করা যায়। প্রথমত, সমুদ্র বাণিজ্য যারা নিয়ন্ত্রণ করে, তারা অন্যের হাতে সেটার নিয়ন্ত্রণ কখনোই ছেড়ে দেবে না। কারণ এই বাণিজ্যই হচ্ছে উতপাদন কেন্দ্র এবং পণ্যের বাজারের মাঝে একমাত্র যোগসূত্র। সমুদ্র বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করার মাঝেই পুঁজিবাদী বিশ্বে একটা দেশ অন্য দেশের উপরে কর্তৃত্ব করে। নতুন কোন শক্তি যাতে সমুদ্র বাণিজ্যের উপরে ভাগ বসাতে না পারে, সেটা বর্তমান কর্তারা খেয়াল রাখবে; দরকার হলে কয়েকজন একত্রিত হয় নতুন শক্তিকে প্রতিহত করতে চেষ্টা করবে। দ্বিতীয়ত, সমুদ্র শক্তির একটা দেশকে সমুদ্র থেকে সরানোর একটা পদ্ধতি হলো তাকে স্থলভাগে ব্যতিব্যস্ত রাখা। ব্রিটিশরা ফ্রেঞ্চদের সাথে একত্রিত হবার সাথেসাথেই ডাচদের স্থলসীমানায় ফ্রেঞ্চদেরকে আবির্ভাব ঘটে। তৃতীয়ত, নিজেদের স্থলসীমানা নিরাপদ করতে একটা সমুদ্র-শক্তির যদি অন্য একটা স্থলশক্তির সাহায্য লাগে, সেক্ষেত্রে তৃতীয় শক্তি চাইবে এই সমুদ্র-শক্তি এবং স্থলশক্তির মাঝে দূরত্ব তৈরি করতে। বাইরের শক্তির উপরে নিজের সীমানা রক্ষার জন্যে নির্ভর করার কারণে ঐ সমুদ্র-শক্তি সবসময়েই বিপদের মুখে থাকবে। চতুর্থত, কোন নব্য সমুদ্রশক্তির দেশ যদি নিজেদের নীতিনির্ধারণে আরেকটি প্রতিষ্ঠিত সমুদ্রশক্তিকে ডেকে আনে বা সুযোগ করে দেয়, তাহলে সেই নব্য সমুদ্রশক্তির দেশের সমুদ্রশক্তি হবার সম্ভাবনা নিঃশেষ হয়ে যাবার সম্ভাবনাই বেশি।

কি করা, আর কি না করা

বাংলাদেশ এখন বঙ্গোপসাগরের দিকে তাকাচ্ছে; যা নিয়ে এর আগেই বিস্তর আলোচনা করেছি। এখন এদেশের নেতৃত্বের খেয়াল রাখতে হবে যে ব্যাপারগুলির দিকে, তা হচ্ছে – এক. সমুদ্রশক্তি হতে গেলে বাধা আসবেই, এমনকি সমন্বিত বাধাও আসতে পারে। এক্ষেত্রে পুঁজিবাদী বিশ্বের শক্তিদের সাথে পেরে ওঠা ছাড়া দ্বিতীয় কোন পথ খালি নেই। নেতৃত্বের কঠোর ভূমিকাই একমাত্র দেশকে এগিয়ে নিতে পারে। কিন্তু পুঁজিবাদী বিশ্বে যারা নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে, তারা নিজেদের স্বার্থ দেখে এবং কখনো দরজা ছেড়ে সড়ে দাঁড়ায় না। আরেকজনের নিয়ন্ত্রিত দরজা দিয়ে কতদিন নিজের খেয়ালখুশিমতো যাতায়াত করা সম্ভব, সেটা প্রশ্নাতীত নয়। দুই. অপর কোন সমুদ্রশক্তিকে কোন অবস্থাতেই দেশের নীতি নির্ধারণে ঢুকতে দেওয়া যাবে না। সেটা দেওয়া হলে সমুদ্র বাণিজ্য তো ক্ষতিগ্রস্ত হবেই, এমনকি তারা ছলে বলে কৌশলে দেশের স্থলসীমানায় অস্থিরতা সৃষ্টি করে অভ্যন্তরীণ সম্পদ নষ্ট করার পদ্ধতি করে দিতে পারে, যাতে সমুদ্রশক্তি তৈরি করার জন্যে অর্থের সঙ্কুলান না হয়।

Friday, 28 August 2015

মাহানের থিওরি এবং প্রাসঙ্গিক কিছু প্রশ্ন

২৮ আগস্ট ২০১৫

কিছুদিন আগে মার্কিন জিওস্ট্র্যাটেজিস্ট আলফ্রেড মাহানের থিওরির উপরে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছিলাম যে বঙ্গোপসাগরে একটি ম্যারিটাইম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আবির্ভাব হতে চলেছে। এখন প্রশ্ন এসে পড়ে যে সেটা কিভাবে হবে? কিভাবে হবে, সেটা নিয়ে কথা বলার আগে কিছু কথা সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা রাখা জরুরি। মাহান তার চিন্তাতে এনেছিলেন যে, মানুষের চিরাচরিত চিন্তার ফসল আন্তর্জাতিক পরিসরে কিভাবে প্রয়োগ হতে পারে। এক্ষেত্রে যেহেতু ঐতিহাসিক কারণে তিনি পুঁজিবাদী বিশ্বের বাইরে চিন্তা করতে পারেননি এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে বিশ্বে এখন শুধু পুঁজিবাদই বিরাজ করছে, তাই মাহানের থিওরি এসময়ে অনেক কিছুই ব্যাখ্যা করতে পারছে। তবে এখানে বলে রাখা ভালো যে কারো পক্ষেই হলফ করে বলা যায় না যে পুঁজিবাদী বিশ্বব্যাবস্থা চিরস্থায়ী হবে। বিশেষ করে পুঁজিবাদের স্পন্সর পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলি এখন অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সামরিক দিক থেকে বিশ্বের উপরে তাদের নিয়ন্ত্রণ হারাতে বসেছে। এশিয়া এবং ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলি বেশ দ্রুতই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, যা কিনা ভবিষ্যতে বিশ্ব নেতৃত্বতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে। তখন পুঁজিবাদ সহ বা পুঁজিবাদ ছাড়া বিশ্বের অবস্থা কেমন দাঁড়াবে, সেটা এখন বলা দুষ্কর। চীন এখন তার সমাজতন্ত্রকে ছেড়ে দিয়ে পুঁজিবাদ থেকে নিজেদের ইচ্ছেমতো কিছু সুবিধা নিয়ে দেশকে গড়ার চেষ্টায় রয়েছে। চীন, জাপান এবং জার্মানি-সহ অনেক দেশ এখন মার্কেন্টিলিস্ট ইকনমি অনুসরণ করছে, যার অর্থ হচ্ছে, রপ্তানির পিছনে সর্বশক্তি নিয়োগ, অথচ আমদানি নিরুতসাহিত করা। এই নীতি ইউরোপিয়রা অনুসরণ করেছিল কয়েকশ’ বছর, যখন তারা উপনিবেশগুলিকে নিজেদের তৈরি পণ্যের বাজারে পরিণত করেছিল এবং একেবারে বেসিক কাঁচামাল ছাড়া উপনিবেশের তৈরি যেকোন জিনিসের উপরে উচ্চ কর আরোপ করেছিল। মুক্ত বাজার অর্থনীতির অগ্রপথিক ব্রিটেন এবং আমেরিকা নিজেরাও নিজেদের কৃষকদের ভর্তুকি দেয়, যা কিনা মুক্ত বাজারের নীতি-বিরূদ্ধ। যাইহোক, সামনের দিনগুলিতে মাহানের থিওরি পুরোপুরি কাজ করবে, সেটা হলফ করে বলা যাচ্ছে না। তবে এটাও ঠিক মাহানের থিওরির কিছু ব্যাপার মানুষের জন্মগত কিছু চাহিদাকে ঘিরে, যেকারণে সমাজব্যাবস্থা এবং সরকার নির্বিশেষে সেগুলি বাস্তবে রূপ নেবার সম্ভাবনা প্রচুর। উদাহরণস্বরূপ, যেকোন মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে সে কিন্তু শক্তভাবে দাঁড়াবার চেষ্টা করে – ঠিক যেমনটি হয়েছে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। এমন অবস্থায় এদেশের মানুষ সারভাইভাল ইন্সটিংক্ট কাজে লাগিয়ে বঙ্গোপসাগরে (এবং বঙ্গোপসাগর পার হয়ে) পাড়ি জমাবে।

বহিঃবাণিজ্য-নির্ভরতা বাংলাদেশকে ঠেলে দিচ্ছে এমন একদিকে যেখানে অনেকেরই পা মাড়াতে বাধ্য হবে দেশ। এমতাবস্থায় শক্ত নেতৃত্ব না দিতে পারলে দেশ মহা বিপদে পড়বে




পুঁজিবাদ এবং পরিবর্তিত বাংলাদেশ

ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া বহিঃবাণিজ্য-নির্ভর বাংলাদেশ তার বিশাল জনসংখ্যার চাপেই বঙ্গোপসাগরকে নিজেদের সাগর হিসেবে দেখতে শুরু করবে। বহিঃবাণিজ্যের উপরে ব্যাপক নির্ভরশীলতার কারণে বাণিজ্য রক্ষা করাকে সে তার বেঁচে থাকার প্রধান কর্মকান্ডের সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখবে। বিশ্বে পুঁজিবাদ না থাকলেও বাংলাদেশের মানুষ এদিকেই এগুবে, কারণ ব্রিটিশদের চিন্তা এবং কর্মকান্ডের (প্রধাণত ভৌগোলিক সীমা নির্দেশ সংক্রান্ত কর্মকান্ড) কারণে ভবিষ্যতে কখনো এদেশের মানুষের পুরোপুরি স্বনির্ভর হবার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। বেঁচে থাকার জন্যে জরুরি বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বেসিক কাঁচামালের উতস এখন বাংলাদেশে নেই এবং ভবিষ্যতেও সেটার তৈরি হবার সম্ভাবনা কম। এখন এটা বলাই বাহুল্য যে সরকারের নীতি এক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা ভূমিকা রাখবে; কিন্তু কিছু ব্যাপার সংঘটিত হবে মানুষের প্রকৃতিগত চাপে, যা কিনা সরকারের পক্ষে আটকানো কঠিন, অথবা সরকারই বাধ্য হবে মানুষের দেখভালের অংশ হিসেবে কিছু পদক্ষেপ নিতে, যা কিনা সে আগে কখনো নেয়নি। এসব পদক্ষেপ অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভর করবে সরকারের আন্তরিকতার উপরে এবং বহিঃশক্তির কবল থেকে মুক্ত হয়ে নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার উপরে। প্রথম কারণটি অবশ্য অনেকাংশেই দ্বিতীয়টির উপরে নির্ভরশীল থাকবে জিওপলিটিক্সের কারণে। এদেশের মানুষ সারভাইভাল ইন্সটিংক্ট কাজে লাগিয়ে যেসব কাজ করবে, তা বঙ্গোপসাগর, তথা ভারত মহাসাগর, তথা এশিয়া, তথা পুরো বিশ্বের স্ট্র্যাটেজিক ব্যালান্সে প্রভাব ফেলবে। আর সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বশক্তিদের ব্যাপক আগ্রহের কারণ হবে। এরকম বাস্তবতায় শক্তিশালী এবং বিচক্ষণ নেতৃত্বের অভাব ঘটলে দেশ মহাবিপদে পতিত হবে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা আর যাই হোক, মানুষকে নিজের স্বার্থ জ্বলাঞ্জলি দিতে শেখায় না। নেতৃত্বের দৃঢ়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার। নির্ভরশীলতার উপরে স্বাধীনতা দাঁড়িয়ে থাকে না।

নেতৃত্ব ও নীতি

উপরে বর্ণিত ব্যাপারগুলি বুঝেই বাংলাদেশকে এগুতে হবে। বিশ্বব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা বুঝতে পারা থেকে শুরু করে সামনের দিনগুলিকে কি কি ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে সেগুলি চিন্তা করেই প্রস্তুতি নিতে হবে। বিশ্বরাজনীতি এবং বিশ্বঅর্থনীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে চলার মতো মানসিকতা তৈরি এবং প্রস্তুতি নেবার দায়িত্বও নেতৃত্বের। এক্ষেত্রে মানুষের বৃহত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে ব্যাক্তি এবং বহিঃস্বার্থকে পিছনে ফেলে নীতি নির্ধারণের মাঝেই আসল সাফল্য নিহিত থাকবে। ম্যারিটাইম দেশ গঠনে কেন, দেশের যেকোন নীতি নির্ধারণেই এই বিষয়গুলি প্রাধাণ্য পাওয়া উচিত। আর দেশের ভেতরে যা কিছু ঘটবে, তার সবকিছুই ম্যারিটাইম ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হবে। উদাহরণস্বরূপ, দেশের নদনদী সঠিকভাবে ড্রেজিং-এর পরে এর প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতিতে, এবং সেটার কারণে বহিঃবাণিজ্য থেকে শুরু করে জাহাজ নির্মাণ, কূটনীতি, এমনকি সামরিক প্রস্তুতিতেও আসবে পরিবর্তন। এসব বিভিন্ন ক্ষেত্রে আগাম প্রস্তুতি নিতে পারার ক্ষমতা শুধু সেধরণের নেতৃত্বেরই থাকবে, যারা কিনা আলফ্রেড মাহান এবং অন্যান্য বিখ্যাত থিওরিস্টরা যেসব বেসিক প্রশ্নের উপরে নির্ভর করে তাদের চিন্তাভাবনাকে এগিয়েছিলেন, সেসব প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য উত্তর খুঁজে পাবেন, এমনকি দরকার বিশেষে ব্যাকরণ পরিবর্তন করার সক্ষমতা এবং সাহস রাখবেন।

যারা এর আগের লেখাটি পড়ে মনে করছেন যে বাংলাদেশ নিয়ে এরকম চিন্তা করাটা অবান্তর, তাদের জন্যে শুধু এটাই বলতে চাই যে তারা খুব সম্ভবত ভূগোল, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস এবং আরও কিছু জিনিসের সমন্বয়ে তৈরি খিচুরির স্বাদ নেননি; এই খিচুরির নামই হচ্ছে জিওপলিটিক্স। হল্যান্ড, বেলজিয়াম এবং পর্তুগালের মতো ছোট্ট দেশগুলিও একসময় ঔপনিবেশিক শক্তি ছিলো। ব্রিটিশ ভারতে মাত্র কয়েক হাজার ব্রিটিশ শাসন করতো কোটি কোটি ভারতীয়কে। আসলে যারা এগুলির গভীরতা বুঝতে অক্ষম, তারা সামনের দিনগুলিতে এদেশের নীতি তৈরিতেও অক্ষমতার পরিচয় দেবেন। সঠিক দূরদর্শী নীতিতে অনেক কিছুই থাকতে পারে, যার সবকিছু একবারে লিখে শেষ করা কঠিন। এই লেখার মাধ্যমে এ ধরণের পদক্ষেপগুলির উপরে আলোচনা শুরু করতে পারি কেবল। আজ শুরু করে সামনের দিনগুলিতে আরও কিছু পদক্ষেপ নিয়ে কথা বলার প্রয়াস রাখছি।
 
ম্যারিটাইম দেশ হবার জন্যে বাংলাদেশের কাছে তার সবচাইতে বড় সম্পদ হলো বিরাট জনসংখ্যা। সামনের দিনগুলিতে এই জনসম্পদকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়াটা জরুরি


জনসংখ্যা সমস্যা, নাকি জনসম্পদ?

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদগুলির ভেতরে সবচাইতে বড় সম্পদ হচ্ছে এর জনসংখ্যা। একসময় বাইরে থেকে প্রচুর ডলার এসেছে এদেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে। অথচ এখন জনসংখ্যার কারণেই বাংলাদেশ-সহ বিশ্বের অনেকগুলি দেশ এখন সামনের দিনগুলিতে শক্তিশালী দেশরূপে আবির্ভাব হতে যাচ্ছে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ফল হিসেবে পশ্চিমা দেশগুলি এখন বিশ্বের নিয়ন্ত্রন হারাতে বসেছে এবং নিজেদের সম্ভুক গতির অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখতে সারা বিশ্ব থেকে জনশক্তি আমদানি করে টিকে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। বাংলাদেশকে ম্যারিটাইম দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে জনশক্তির অন্তর্নিহিত শক্তিকে উপলব্ধি করাটা জরুরি। মাহান ডাচদের উদাহরণ দিয়েছিলেন - কিভাবে তারা একটা ম্যারিটাইম দেশে পরিণত হয়। ডাচদের চিন্তাশীল লোকেরা হিসেব করে বের করেছিলেন যে হল্যান্ডের ভূখন্ডের পক্ষে তাদের জনসংখ্যার মাত্র আট ভাগের এক ভাগের ভরণপোষণ যোগান দেওয়া সম্ভব। ডাচরা প্রথমে সাগরে মাছ ধরতে বের হলো। এরপরে তার মাছ প্রসেসিং করতে শিখলো এবং সেই প্রসেস করা মাছ ইউরোপের অন্যান্য দেশে রপ্তানি করতে শুরু করলো। এক্ষেত্রে ইউরোপের উপকূলের ঠিক মাঝামাঝি হওয়ায় এবং রাইন নদীর মোহনায় অবস্থিত হওয়ায় গোটা ইউরোপের সাথে চমতকার যোগাযোগ ব্যবস্থা তাদের সাহায্য করেছিল। খুব শিগগিরই ডাচরা নাবিকের জাতি হয়ে উঠলো। একসময় স্প্যানিশ রাজের বেশিরভাগ জাহাজই ডাচরা চালাতো। নিজেদের দেশে ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পও গড়ে উঠতে থাকলো বাণিজ্যের সাফল্যের সাথে সাথে। এভাবে ডাচদের বিরাট এক বাণিজ্য নৌবহর গড়ে উঠলো, যা কিনা ইউরোপে বাণিজ্য করতে গিয়ে অন্যান্য শক্তিশালী দেশের স্বার্থের রোষানলে পড়লো এবং জলদস্যুদের কবলেও পড়তে থাকলো। এভাবেই ডাচরা তৈরি করলো তাদের নৌবাহিনী এবং নৌ-নিরাপত্তা, যা কিনা পরবর্তীতে তাদেরকে অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের সাথে প্রতিযোগিতা করে বিশ্ব আবিষ্কারের স্পৃহা যোগায় এবং এক ঐপনিবেশিক শক্তিতে পরিণত করে। এখানে ডাচদের দ্রুত বর্ধনশীল জনস্ংখ্যা এবং দেশে অভাবের কারণে জাহাজের নাবিক হবার জন্যে অনেক মানুষ পাওয়া যায়। প্রাকৃতিক সম্পদের তুলনায় বেশি জনসংখ্যার চাপেই তারা বাণিজ্য জাহাজ তৈরিতে মনোনিবেশ করে। জনসংখ্যা একেবারে কম থাকলে কিন্তু ডাচরা সমুদ্রে আধিপত্য লাভের চেষ্টাই করতে পারতো না। সমুদ্র তাদেরকে কর্মসংস্থান এবং নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়েছে। সমুদ্র দেখে তারা ভয় পায়নি; বরং এই নতুন এডভেঞ্চারকে তারা তাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ হিসেবে মেনে নিয়েছে।


ডাচদের উত্থানের পিছনে তাদের ফিশিং ইন্ডাস্ট্রি একটা বিরাট ভূমিকা রাখে। সমুদ্রের দিকে ডাচদের আগ্রহী করে তোলার জন্যে মাছ আহরণ একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল

মাছ থেকে উপনিবেশ – ডাচদের উত্থান

ডাচদের জনশক্তির কর্মসংস্থান হয়েছে মূলত জাহাজ, জাহাজ-নির্মাণ, মাছ আহরণ, সমুদ্র-বাণিজ্যের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন কারখানা, নৌবাহিনী, ইত্যাদিতে সেক্টরে। অনেকেই আবার বিশ্বব্যাপী ডাচদের স্থাপিত ব্যবসাকেন্দ্রগুলিতে জীবিকা খুঁজে নিয়েছে। এই প্রতিটা সেক্টরেই বিপুল জনসম্পদের দরকার ছিল তাদের। ডাচদের কাছ থেকে শেখার রয়েছে বাংলাদেশেরও। রাইনের সবগুলি শাখানদী হল্যান্ডের মাঝ দিয়ে সমুদ্রে পড়ায় ডাচরা এমনিতেই পানির দেশের মানুষ ছিল। নদীপথে ডাচরা জার্মানিসহ এবং ইউরোপের অন্য দেশের সাথে বাণিজ্য করতো; এখনও ডাচরা নদী এবং খাল ব্যবহার করে নিজেদের বেশিরভাগ পণ্য পরিবহণ করে এবং জার্মানিতে রপ্তানি করে। বাংলাদেশের দু’টি বিশাল নদী গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্র ব্রিটিশরা মানচিত্রে কেটে দিয়ে গেছে, যাতে এখানে রাইনের মতো কোন শক্তিশালী নদীপথের উত্থান না হয়। ব্রিটিশরা চলে যাবার পরে তাদের মিত্র ভারত সরকার গঙ্গা নদীতে বাঁধ দিয়ে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করেছে, যা নিয়ে এর আগের লেখায় বিস্তারিত লিখেছি। নদীপথে ডাচদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিরাট লাভবান হলেও আমরা এই উদাহরণটুকু কাজে লাগাতে পারছি না। তবে দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথকে কাজে লাগাতে মনোনিবেশ করতে পারি।

ক্যাপিটাল ড্রেজিং করার মাধ্যমে পুরাতন নদীপথগুলিকে জীবন দিতে পারি আমরা। ড্রেজার এবং এর আনুষাঙ্গিক যন্ত্রপাতি এবং বালুবাহী জাহাজ তৈরি করতে গিয়ে জাহাজ নির্মাণ শিল্প চাঙ্গা হবে। রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, যশোর, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ, চাপাই নবাবগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, সিলেট, ইত্যাদি শহরকে নদীপথে পুণরায় যুক্ত করতে পারলে দেশের ভেতরে শিল্প এবং বাণিজ্যের বিকেন্দ্রীকরণ হবে এবং জাহাজ নির্মাণ শিল্প আরও একটা অণুপ্রেরণা পাবে। ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনাল সরকারীভাবে একটা তৈরি করা হলেও আরও দরকার নদনদীর পাশে। এখন পর্যন্ত এসব টার্মিনালে ব্যবহৃত হবে বলে অনেক কনটেইনাল জাহাজ দেশীয় শিপইয়ার্ডগুলিতে তৈরি হচ্ছে। এই জাহাজগুলি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কনটেইনার ঢাকার আশেপাশের জায়গায় পরিবহণ করবে এবং ব্যয়বহুল ও যনজটপূর্ণ ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়েকে বাইপাস করবে। নদীপথগুলি উন্মুক্ত করা গেলে দেশের অনেকস্থানে নদীর তীরে খাদ্যশস্য, জ্বালানি তেল এবং রাসায়নিক সারের গুদাম তৈরি করা যাবে; এতে দেশীয় জাহাজ আরও দেখা যাবে। যাত্রীবাহী জাহাজের সংখ্যাও বাড়বে একইসাথে; মানুষ ব্যয়বহুল সড়কপথের উপরে নির্ভর না করে সাশ্রয়ী নৌপথের দিকেই যাবে। একই সাথে ছোট-বড় সকল ধরনের পণ্যবাহী জাহাজের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে। বঙ্গোপসাগরে মাছ আহরণের জন্যে ফিশিং ট্রলার তৈরি করা শুরু হয়েছে কেবল; এর সংখ্যা সামনের দিনগুলিতে আরও বাড়বে। বর্তমানে বাংলাদেশে জাহাজ শিল্পের সবচাইতে উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যে রয়েছে লাইটার জাহাজ; এরকম হাজার খানেক জাহাজ চট্টগ্রাম এবং মংলা বন্দর থেকে তেল এবং অন্যান্য পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যায়। এই নৌ-পরিবহণ শিল্প যেন অটুট থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখাটা জরুরি। কোন ধরনের সরকারী বা বেসরকারী প্রজেক্ট যদি এই নৌপরিবহণের বিকল্প তৈরি করতে চায়, সেটা প্রতিরোধ করাটা দেশের ম্যারিটাইম ভবিষ্যতকে চিন্তা করে জরুরী কর্তব্য।


বাংলাদেশের বাণিজ্য জাহাজের ক্ষুদ্র বহর যেভাবে কমছে, তাতে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে। দেশের নেতৃত্ব ম্যারিটাইম দেশের স্বপ্ন দেখতে চাইলে মার্চেন্ট নেভি নিয়ে ভাবতে হবে এখনই।



বাংলাদেশের মার্চেন্ট নেভির গুরুত্ব

তবে এইসকল জাহাজই হচ্ছে অভ্যন্তরীণ নৌপথের জন্যে জাহাজ (ফিশিং ট্রলার বাদে)। এগুলি জাহাজে কর্মসংস্থান হতে কাউকে সমুদ্রের সাথে অভ্যস্ত হতে হয় না। ২০০৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের পতাকাবাহী সমুদ্রগামী জাহাজের সংখ্যা ছিল ২৪টি। ওই বছর দেশে সমুদ্রগামী জাহাজ নিবন্ধন সহজ করা হয় এবং শুল্ক কমানো হয়।এর ফলশ্রুতিতে চার বছরে নতুন যুক্ত হয় ৪৭টি জাহাজ। কিন্তু বিশ্বমন্দায় পড়ে জাহাজ মালিকেরা তাদের জাহাজগুলি স্ক্র্যাপ করে ফেলতে থাকেন। যেখানে ২০১৩ সালে বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৮-এ, সেটা ২০১৫ সালের মাঝামাঝি কমে এসে দাঁড়ায় মাত্র ৩৮-এ; এবং সামনের দিনগুলিতে সেটা আরও কমতে যাচ্ছে। সরকারী বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের জাহাজ এখন মাত্র ৫টি, যা ’৯০-এর আগে ছিল ৩৮টি! ২০১২ সালে যেখানে দেশী জাহাজে নাবিক এবং অফিসার ছিল ১,৬০০, সেটা ২০১৫ সালের মাঝামাঝি মাত্র ৮০০-তে এসে ঠেকেছে।২০১৪ সালের এক হিসাব অনুযায়ী দেশে ৮৫০ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নাবিক ও অফিসার বেকার রয়েছে। নৌ একাডেমিগুলা প্রতিবছরই আরও নাবিক প্রশিক্ষণ দিয়ে চলেছে। সরকারী এবং বেসরকারী প্রায় সব জাহাজই অনেক পুরোনো। পুরোনো জাহাজ পশ্চিমা দেশগুলির বন্দরগুলিতে ভিড়তে পারেনা; তাই এই জাহাজগুলি শুধু এশিয়া এবং আফ্রিকার কিছু দেশগুলিতেই যেতে পারে। আর পুরোনো বিধায় জাহাজগুলির মেইনটেন্যান্স খরচ বেশি, যা কিনা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্যে কঠিন। এরই মধ্যে বিশ্বমন্দার কারণে শিপিং কোম্পানিগুলির লোকসান আরও বেড়ে যায়। এসব জাহাজের প্রায় সবই বাল্ক কার্গো ক্যারিয়ার; কনটেইনার জাহাজ একটাও নেই। অর্থাৎ প্রতিবছর চট্টগ্রাম বন্দর যে ১৬ লক্ষ টিইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে, তার পুরোটাই বিদেশী জাহাজে পরিবহণ করা হয়। বিদেশী জাহাজের শিপিং চার্জ ব্যয়বাবদ বাংলদেশ প্রতিবছর ৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে, যা বিদেশে চলে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় সরকারের সামনে সিদ্ধান্ত – বাংলাদেশ কি সব সামুদ্রিক বাণিজ্য জাহাজ হারাবে, নাকি এই নৌবহরকে রক্ষা করার চেষ্টা করবে? সরকার সবকিছুতে টাকা-পয়সার লাভ-লোকসানের হিসাব করতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, সরকার লাভ-লোকসান চিন্তা করলে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য চিন্তা থেকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে দেবার কথা; কৃষিতে ভর্তুকি দেবার চিন্তাও সরকার করতো না কখনো। জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকার শুধু টাকার চিন্তা করবে কেন? ম্যারিটাইম দেশ গড়াটা বাংলাদেশের মানুষের জন্যে সারভাইভাল ইন্সটিংক্ট। এখানে সরকার যদি মানুষিকে ঠিকমতো পথপ্রদর্শন না করে, তাহলে দেশের বিপদ আসন্ন। আর ম্যারিটাইম দেশ গড়ার পেছনে একটা বিশাল অবদান থাকবে এই বাণিজ্যিক নৌবহর বা মার্চেন্ট নেভির। বঙ্গোপসাগরে যদি কোন গুরুত্বপূর্ণ জিওপলিটিক্যাল ঘটনা বাংলাদেশের বিরূদ্ধে যায়, তাহলে বাংলাদেশের ফ্ল্যাগ উড়ানো মার্চেন্ট জাহাজ অতীব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে। বাংলাদেশ সরকার বিপদের সময়ে অন্য কোন দেশ, সংস্থা বা মানুষের উপরে নির্ভর করতে পারে না, যেখানে এই বাণিজ্যপথের সাথে দেশের মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্ন জড়িত। এধরনের একটা জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় সরকার উপেক্ষা করতে পারে না কোনভাবেই।
https://en.wikipedia.org/wiki/SS_Canberra
ফকল্যান্ড যুদ্ধ। সিভিলিয়ান লাইনার 'ক্যানবেরা'-কে এসকর্ট করছে রয়্যাল নেভির ফ্রিগেট 'এন্ড্রোমিডা'। ক্যানবেরা ৩,০০০ সৈন্য পরিবহণ করে ফকল্যান্ডে নিয়ে যায়। একটা দেশের জাতীয় নিরাপত্তায় বেসামরিক জাহাজ কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার জ্বলন্ত উদাহরণ এটি।

বেসামরিক জাহাজ এবং জাতীয় নিরাপত্তা

১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময়ে ব্রিটেনের নৌবাহিনীর কাছে সৈন্য পরিবহণের জন্যে যথেষ্ট সংখ্যক জাহাজ ছিল না। তখন তারা ‘কুইন এলিজাবেথ-২’ নামের একটা যাত্রীবাহী ক্রুজ লাইনার ব্যবহার করে ৫ম ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেডের ৩,০০০ সৈন্যকে পরিবহণ করতে। এই উদাহরণ যদি একমাত্র উদাহরণ হতো তাহলেও হতো। আসলে বেসামরিক জাহাজ ব্যবহার করে সামরিক সরঞ্জাম এমনকি সৈন্য পরিবহণের ঘটনা বহু রয়েছে। আর শুধু সামরিকই বা কেন? একটা দেশকে সমুদ্র অবরোধের মধ্যে ফেললে সেই জনগোষ্ঠী যদি না খেয়ে মারা যেতে থাকে, সেটা জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় বৈকি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ব্রিটিশরা আশংকাজনকভাবে জার্মান সাবমেরিনের কাছে তাদের বাণিজ্য জাহাজগুলি হারাতে থাকে। যে হারে জাহাজ বানানো যাচ্ছিল, তার চাইতে আরও বেশি গতিতে জাহাজ চলে যাচ্ছিল আটলান্টিকের নিচে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভর্তি হয়ে আসা এই জাহাজগুলি কোন রকমে ব্রিটেনকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। জার্মান সাবমেরিনগুলি ব্রিটেনকে না খাইয়ে মারার চেষ্টায় ছিল; সামরিক-বেসামরিকের কোন বাছ-বিচার ছিল না সেখানে। যুদ্ধের সময়ে এই বাছ বিচার নিয়ে সর্বদাই সমস্যা হয়। বাণিজ্যিক অবরোধের কথা বললে কোন পণ্য বেসামরিক আর কোনটা সামরিক সেটাও তো আলাদা করা সম্ভব হয় না। একই পণ্যের সামরিক এবং বেসামরিক ব্যবহার থাকতে পারে। আবার বেসামরিক পণ্যের মাঝে সামরিক পণ্যও থাকতে পারে। এসব বিষয় চিন্তাতে আনার অর্থই হচ্ছে - বাণিজ্যিক অবরোধে আসলে কেউই পার পায় না। নিজেদের দেশের উপরে অন্য কোন বহিঃশক্তি বাণিজ্যিক অবরোধ দিয়ে দয়া দাক্ষিণ্য দেখাবে – এটা চিন্তা করাটা যতটা অবান্তর, ঠিক তেমনিভাবে বাণিজ্যিক অবরোধে পরার ভয়ে দেশের জাতীয় সত্তা বিকিয়ে দিয়ে বহিঃশক্তিকে তোয়াক করাটাও দেশদ্রোহিতার শামিল। পশ্চিমা দেশগুলি আর যাই হোক এসব বাস্তবতা পার হয়ে এসেছে। তাদের তাত্ত্বিক চিন্তা তাদেরকে অনেক গভীরে নিয়েছে। গভীর থেকে চিন্তা করার ফলেই তাদের জাতীয় নীতি সকল ক্ষেত্রে একই পথ অনুসরণ করেছে। অপরদিকে এশিয়া-আফ্রিকার দেশগুলি পশ্চিমাদের অধীনে থাকার ফলে চিন্তাগত দিক থেকে কোন গভীরতাতেই পৌঁছাতে পারেনি। আন্তর্জাতিক রীতি, পার্শ্ববর্তী দেশের চোখ-রাঙ্গানি, পরাশক্তির-সমর্থিত সাহায্য সংস্থার বৈরি আচরণ ইত্যাদি কথা চিন্তা করে এই দেশগুলি জাতীয় স্বার্থকে জ্বলাঞ্জলি দিয়েছে সময়ে সময়ে।


সান ফ্রান্সিস্কো-এর কাছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'ন্যাশনাল ডিফেন্স রিজার্ভ ফ্লীট'এর একাংশ। পুরোনো এই জাহাজগুলি রেখে দেওয়া হয় বছরের পর বছর - যদি কখনো কাজে লেগে যায়।


ওল্ড ইজ গোল্ড

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ব্রিটিশরা চিন্তা করে শুধুমাত্র একটা ডিজাইনের জাহাজ বানানোর, কিন্তু তাদের শিপইয়ার্ডগুলি তখন প্রচন্ড চাপের মুখে। তাই মার্কিনীরা এই জাহাজগুলি বানাবার দায়িত্ব নিল। ১৮টা আমেরিকান শিপইয়ার্ড ১৯৪১ সাল থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে মোট ২,৭১০টা জাহাজ তৈরি করে, যেগুলি ‘লিবার্টি শিপ’ নামে পরিচিত ছিল। ১০,০০০ টন ক্যাপাসিটির এই জাহাজগুলি ১৩৪ মিটার লম্বা ছিল। এসময় বিশাল জাহাজ তৈরি করাটা তেমন সমীচিন ছিল না; কারণ যুদ্ধের মাঝে ডুবে গেলে বড় জাহাজের ক্ষতি পুষানো বেশি কঠিন ছিল। এই জাহাজগুলি তৈরিতে ইতিহাসের সকল রেকর্ড ভেঙ্গেছে মার্কিনীরা। প্রথম জাহাজটা তৈরি করতে ২৩০ দিন লাগলেও পরবর্তীতে গড় সময় নেমে এসেছিল মাত্র ৪২ দিনে! অর্থাৎ প্রতি ৪২ দিনে একটি করে নতুন জাহাজ তারা ডেলিভারি দিয়েছিল। পাবলিসিটি করার জন্যে একটা জাহাজ মাত্র ৪ দিন ১৫ ঘন্টায় পানিতে ছাড়া হয়েছিল! লিবার্টি শিপ-এর একটু ইম্প্রুভড ভার্সনের ৫৩৪ খানা ‘ভিক্টোরি শিপ’-ও তৈরি করা হয়েছিল ১৯৪৪-৪৫ সালের মাঝেই। এই ধরনের জাহাজগুলি প্রধানত মালামাল পরিবহণ করলেও বেশকিছু জাহাজ সৈন্য পরিবহণেও ব্যবহার করা হয়েছিল।

যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবার পরে কয়েক হাজার জাহাজ পুরোপুরি বেকার হয়ে যায়। কিছু কিছু জাহাজ নৌবাহিনী বিভিন্ন টেকনিক্যাল কাজে ব্যবহার করেছিল। ১৯৪৬ থেকে ১৯৬৩ পর্যন্ত মার্কিন সরকার ৫০০ জাহাজ স্টোর করে রাখে। এই জাহাজগুলিকে এমনভাবে রেখে দেওয়া হয় যেন সর্বনিম্ন ক্ষয়ের মধ্যে এই জাহাজগুলি অনেকদিন টিকে থাকতে পারে। ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স রিজার্ভ ফ্লীট’ নামে এই নৌবহরে বেশিরভাগ জাহাজই ছিল বাণিজ্যিক জাহাজ। যদি ভবিষ্যতে কোন ইমার্জেন্সি কাজে দরকার লাগে – এই কথা ভেবে এগুলিকে রেখে দেওয়া হতো। কোরিয়ার যুদ্ধের সময়ে ৫৪০টা জাহাজ কাজে লাগানো হয়েছিল। ১৯৫১-৫৩ সালে কয়লা এবং খাদ্যশস্য পরিবহণের জন্যে ৬০০ জাহাজ ডেকে পাঠানো হয়েছিল। ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৪-এর মাঝে ৬০০ জাহাজ ব্যবহার করা হয়েছিল খাদ্যশস্যের ভাসমান মজুদ হিসেবে। ১৯৫৬ সালে সুয়েজ খাল বন্ধ হয়ে গেলে ২৫২টা জাহাজ ব্যবহার করা হয়েছিল। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ে ব্যবহার করা হয়েছিল ১৭২টা জাহাজ। তবে ১৯৫০ সালে এই ফ্লীটে ২,২৭৭টা জাহাজ থাকলেও ২০০৭ সাল নাগাদ এই সংখ্যা ২৩০-এ নেমে আসে। এই পুরোনো ‘অদরকারি’ জাহজগুলি রেখে দেওয়ার অর্থ মার্কিন সরকার চিন্তা করতে পারতো বলেই অনেক অর্থ খরচ করে হলেও জাহাজগুলিকে রিজার্ভে রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ধনী দেশ বলে এটা পেরেছে – এটা অনেকেই বলবেন। কিন্তু আসল কথা তো শুধু সেখানে নয়; তারা যে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোথাও ছাড় দেয়নি, এটা তার প্রকৃষ্ঠ প্রমাণ। তারা তাদের অনেক জাহাজই বহু বছর রেখে দিয়েছে – অর্ধশত বছর পেরিয়েও – আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করেনি।

বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার চিন্তায় বাণিজ্যিক জাহাজের বহর এবং পুরোনো জাহাজের বহর আসা উচিত। অভ্যন্তরীণ জাহাজ তৈরি দেশের জাহাজ শিল্পকে এগিয়ে নেবে, কিন্তু দেশকে ম্যারিটাইম দেশে রূপ দিতে হলে সমুদ্রগামী জাহাজের বহরের বিকল্প নেই। দেশের শিপইয়ার্ডগুলি এখন সমুদ্রগামী জাহাজ তৈরিতে যথেষ্ট পারঙ্গম। এটাই সময় সরকারের নীতি নিয়ে ভাবনার। আলফ্রেড মাহান যে পথের কথা বলেছেন, সে পথে অনেক কাঁটা থাকবে। শক্ত নেতৃত্ব না হলে দেশের মানুষের মঙ্গলের জন্য সবল নীতি নির্ধারণ করা সম্ভবপর হবে না।

Tuesday, 25 August 2015

আলফ্রেড মাহান এবং বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ

২৫শে অগাস্ট ২০১৫


বিখ্যাত মার্কিন জিওস্ট্র্যাটেজিস্ট এবং জিওপলিটিশিয়ান আলফ্রেড থেয়ার মাহান (Alfred Thayer Mahan, 1840-1914) আজকাল আবার আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছেন। উনিশ শতকের শেষের দিকে তার থিওরিগুলি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পরিবর্তন করেছিল। তার কথায় অনুপ্রাণিত হয়েই মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট (Theodore Roosevelt, 1858-1919; president 1901-1909) দেশের স্ট্র্যাটেজি পরিবর্তন করেছিলেন। তখন থেকেই আমেরিকা হয়ে উঠতে থাকে একটা বিশ্বশক্তি বা গ্লোবাল পাওয়ার। ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের সাথে পাল্লা দিয়ে সমুদ্রে টিকে থাকার মাঝেই যে আমেরিকার ভবিষ্যত শক্তি নিহিত, সেটা মাহান-ই প্রথম বলেন। যদিও মাহানের থিওরি সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার জন্ম দিয়েছিল এবং সেজন্য তিনি বেশ সমালোচিত ছিলেন কিছু মহলে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে মাহানের দেখিয়ে দেয়া পথ অনুসরণ করেই আমেরিকা দুনিয়ার রাজা বনেছে; যদিও সেটাতে সময় লেগেছে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো একটা যুদ্ধকে সংগঠিত হতে হয়েছে। যাই হোক, এখনকার দুনিয়াতে অনেক দেশ সমুদ্রের দিকে ঝুঁকছে বলেই এখন ২১শতকে এসে আবারও মাহানের কথাই মনে করতে হচ্ছে।


মাহান ভূরাজনীতির প্রথম দিককার চিন্তাবিদ। শীতল যুদ্ধের সময় সবাই তাকে ভুলে গেলেও নপুন বাস্তবতায় তার নাম আবারো উচ্চারিত হচ্ছে।


মাহানের পূণরুত্থান

মাহান নৌ-শক্তির সাথে অর্থনীতি, সামাজিক অবস্থা, রাজনীতি এবং সর্বোপরি ভৌগোলিক সত্যগুলিকে একত্রিত করেছিলেন। তারই সমসাময়িক ব্রিটিশ জিওপলিটিশিয়ান হ্যালফোর্ড ম্যাকিন্ডার (Halford Mackinder, 1861-1947) এবং এদের কিছু পরের ডাচ বংশোদ্ভূত মার্কিন চিন্তাবিদ নিকোলাস স্পাইকম্যান (Nocholas J. Spykman, 1893-1943) জিওপলিটিক্স নামে নতুন এক ক্ষেত্রের জন্ম দেন। এদেরকে অনুসরণ করে আরও অনেকেই চিন্তায় অগ্রসর হয়েছেন। এসব চিন্তাবিদদের বেশিরভাগই পশ্চিমা দেশের। অপশ্চিমা দেশগুলিতে এরকম জিওপলিটিক্স নিয়ে চিন্তা করতে পারার মতো মানুষ তেমন একটা নেই, তবে ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে। কয়েকশ’ বছর পশ্চিমা শাসনে বিশ্ব শাসিত হবার ফলে চিন্তার ক্ষেত্রেও এরকম মেরুকরণ হয়েছে। তবে গত দুই-তিন দশকে অর্থনৈতিক এবং শিক্ষাগত দিক থেকে অগ্রগতি হবার কারণে অনেক দেশ বিশ্ব রাজনীতিতে এগিয়ে এসেছে। ঠিক যেভাবে মাহান শতবর্ষ আগে মার্কিন নেতৃত্বকে বলেছিলেন যে বিশ্ব-বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণের মাঝেই মার্কিন বিশ্ব-নেতৃত্ব নিহিত, ঠিক একই পরিস্থিতি এখন তৈরি হয়েছে সারা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে। মাহান বলেছিলেন যে বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণের মাঝেই একটা দেশ উঠবে এবং একই সাথে তার নৌ-শক্তির বিকাশ ঘটবে, যা কিনা বিশ্বব্যাপী তার শক্তিকে ধরে রাখতে সাহায্য করবে। মাহানের থিওরির কারণে বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং জাপানের মাঝে ব্যাপক বাণিজ্য এবং নৌ-প্রতিযোগিতা শুরু হয়, যা কিনা দু’টি বিশ্বযুদ্ধকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে কয়েক দশক ঠান্ডা যুদ্ধের সময়ে মাহানের থিওরি সবাই ভুলেই গিয়েছিল। কিন্তু সমাজতন্ত্রের পতনের পরে পুঁজিবাদের ব্যাপক প্রসারের কারণে এখন আবার সেই একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।

ইউরোপ থেকে এশিয়া

পশ্চিমা বিশ্ব তাদের ঔপনিবেশিকতাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশকেই করেছে বিশ্ববাণিজ্য-নির্ভর। যেসময় ইউরোপের মানুষ বাণিজ্যের উপরে পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল, সেসময় যুদ্ধের কারণে বাণিজ্যের ক্ষতি হলে না খেয়ে থাকার অবস্থা হতো তাদের, ঠিক যেমনটা ডাচদের ক্ষেত্রে হয়েছিল ইংল্যান্ডের সাথে আঠারো মাস যুদ্ধের পরে (১৬৫৩-৫৪)। ঔপনিবেশিক যুগের আগে এশিয়ার বেশিরভাগ দেশ বহিঃবাণিজ্যের উপরে তেমন একটা নির্ভরশীল ছিল না; অন্তঃত বাণিজ্য বন্ধ হলে না খেয়ে থাকার অবস্থা ছিল না। ইউরোপিয়ানরা এসে এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। আজ এশিয়াতে বিশ্বের বিরাট এক জনগোষ্ঠীর বসবাসের কারণে দুনিয়ার বেশিরভাগ উতপাদন আবারও এশিয়াতে ফেরত এসেছে। তবে এবার এই উতপাদন এসেছে বহিঃবাণিজ্যের উপরে নির্ভরশীল হয়ে। এর ফলশ্রুতিতে ইউরোপে যেমন বাণিজ্য রক্ষার কাজকে জীবন রক্ষার সম-গুরুত্ব দেওয়া হতো, ঠিক একই অবস্থা এখন এশিয়াতে বিরাজ করতে যাচ্ছে। গত দুই-তিন দশকে এশিয়ার অনেক দেশের কাছে এই উতপাদন-রপ্তানি-আমদানি বাণিজ্যের কারণে বিপুল সম্পদ এসে পড়েছে। এই সম্পদ যেমন তাদের অর্থনীতিকে করেছে বেগবান, একইসাথে তাদের সমাজকে করেছে শিক্ষিত। এই অর্থ এবং শিক্ষা জন্ম দিয়েছে এক জাতীয়তাবাদের, যা কিনা তাদের বেঁচে থাকার জন্যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বহিঃবাণিজ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এই উদ্বিগ্নতা বা অস্থিরতা তাদেরকে জাতীয় নিরাপত্তার দিকে মনোনিবেশ করতে বাধ্য করছে। বাণিজ্যের বাজার, কাঁচামালের উতস এবং বাণিজ্যপথগুলিকে নিরাপদ রাখতে সবাই নৌ-শক্তিবৃদ্ধিতে মনোনিবেশ করছে। পূর্ব চীন সাগর এবং দক্ষিণ চীন সাগর থেকে শুরু করে ভারত মহাসাগর অঞ্চল পার হয়ে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত এই অবস্থাই বিরাজ করছে। ছোট ছোট অনেক দেশের হাতে এখন বেশ ক্ষমতা, তবে তারা সবাই ছোট ছোট দেশে বিভক্ত এবং রাজনৈতিক হিংসার কারণে এদের একত্রে কাজ করার সম্ভাবনা খুবই কম; তাই শক্তিধর দেশগুলি এটা ভেবে চিন্তিত নয়; বরং এক দেশকে অপরের বিরূদ্ধে লাগিয়ে রাখাকেই তারা বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে। আর এরকম আঞ্চলিক সমস্যা বৃহত শক্তিগুলিকে নাক গলানোর সুযোগ দেবে। তবে এরকম আঞ্চলিক সমস্যার সংখ্যা খুব বেশি হয়ে গেলে আবার সেটা শক্তিধর দেশগুলির পক্ষেও ম্যানেজ করাটা কঠিন হয়ে যাবে, যেমনটি হয়েছে আমেরিকার ক্ষেত্রে ইরাক, আফগানিস্তান-সহ আরও বিভিন্নস্থানে একযোগে জড়িয়ে গিয়ে।

মাহানের থিওরি ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাথে নৌ-শক্তির সম্পর্ক নিয়ে। ভারত মহাসাগরে নিজেদের বাণিজ্যের নিরাপত্তায় চীনের আবির্ভাব অনেক হিসেবই পালটে দিয়েছে।

চীন – পূর্ব থেকে পশ্চিমে


পূর্ব চীন সাগর, দক্ষিণ চীন সাগর এবং ভারত মহাসাগর অবশ্য অন্য হিসেবে পড়েছে। এখানে চীনকে একপেশে করার জন্যে অনেকেই সাধারণ (কমন) কারণ খুঁজে পেয়েছে। তবে একটি চিন্তা করলেই বোঝা যাবে যে সকলের চিন্তাতেই নিজেদের বহিঃবাণিজ্য সবচাইতে বড় স্থান অধিকার করে রয়েছে। মাহানীয় থিওরিতে চীনের উত্থানকে ব্যাখ্যা করা যায় – চীনের স্থলসীমানা আজ আর বিপদসংকুল নয়, তাই চীন সমুদ্রে পাল তুলতে পারছে সহজেই। চীনের বাণিজ্যিক এবং নৌ-শক্তির উত্থানের কারণে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া ছাড়াও সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, তাইওয়ান এবং ভিয়েতনাম তাদের নৌশক্তি বৃদ্ধি করছে। এই অবস্থাটাই উপচে পড়ে (ওভারফ্লো) ভারত মহাসাগরে এসে হাজির হয়েছে। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের বহুদিনের সামরিক সরবরাহকারী চীন; আর পাকিস্তান এবং শ্রীলংকায় ডীপ-সী পোর্ট তৈরি করেছে চীন। এসব ব্যাপার ভারতের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছে। মালাক্কা প্রণালীকে বাইপাস করতে মিয়ানমারের উপকূলে চীন তেলবাহী জাহাজের জন্যে ডীপ-সী পোর্ট করেছে এবং সেই পোর্টের সাথে চীনের ভূখন্ড পর্যন্ত তেলের পাইপলাইন করেছে গ্যাস পাইপলাইনের পাশাপাশি। ঠিক একইভাবে পাকিস্তানে গোয়াদর পোর্ট থেকে চীনের সীমান্ত পর্যন্ত ইকনমিক করিডোর করা হচ্ছে বিশাল এক প্রজেক্টের মাধ্যমে। মিয়ানমারের পাইপলাইন এবং পাকিস্তানের ইকনমিক করিডোর সাফল্য পাবে যদি বঙ্গোপসাগর এবং আরব সাগরে চীনা বাণিজ্য জাহাজ ভিড়তে পারে কোন সমস্যা ছাড়াই। কিন্তু এই নিষ্কন্টক ভ্রমণের নিশ্চয়তা তো চীনকে কেউ দেয়নি। কাজেই ভারত মহাসাগরে চীনা যুদ্ধজাহাজ দেখা যাবে – এটা ধরেই নেয়া যায়। একইসাথে চীন চাইবে ভারত মহাসাগরে তার বন্ধুরাষ্ট্র তৈরি করতে, যাদের সাথে চীন শুধু বাণিজ্যই করবে না, তার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলি দেখভাল করবে। পূর্ব চীন সাগর এবং দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সাথে বেশ কয়েকটি দেশের সমুদ্রসীমা নিয়ে সরাসরি বিরোধ থাকলেও হিমালয় পর্বতের কারণে ভারত মহাসাগরের দেশগুলির সাথে তাদের ততটা বিরোধ নেই, শুধু ভারত ছাড়া। যদিও মিয়ানমারের সাথে সীমান্তে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের একটা বিবাদ রয়েছে, সেটা ভারতের সাথে চীনের বিরোধের কাছে নস্যি। চীনের প্রতিটি পদক্ষেপ ভারত বিরোধিতা করার চেষ্টা করবে সেটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশে্র ডীপ-সী পোর্ট প্রজেক্টে চীনের আগ্রহ ঠিক একইভাবে ভারতের কাছে বিপজ্জনক ঠেকবে। এমনকি ভারতের আশেপাশের দেশে চীনের বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ ভারতের কাছে হুমকিস্বরূপ দেখা যাওয়াটা স্বাভাবিক, কারণ এতে ভারত শুধু তার পণ্যের বাজারই হারাবে না, তাদের রাজনৈতিক প্রতিপত্তি হারাবে, এবং ক্ষেত্রবিশেষে ভারতের অখন্ডতার জন্যেও সেটা হুমকিস্বরূপ হয়ে দেখা দিতে পারে। যেহেতু এটা জানা কথা যে সৃষ্টির পর থেকেই ভারতের অখন্ডতা বজায় রাখার চিন্তা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার চিন্তাকে আগলে রেখেছে, চীনের এরকম ‘এগ্রেসিভ এপ্রোচ’ ভারতের কাছে তাই ভয়ঙ্কর হিসেবে দেখা দেবে। ভারত মহাসাগরের অন্যান্য দেশ নিজেদের সমুদ্র-বাণিজ্যের নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিলে সেটাও ভারতের কাছে সন্দেহের উদ্রেক করবে। একজনের বাণিজ্যের নিরাপত্তা আরেকজনের বাণিজ্যের প্রতি হুমকি।

মধ্যপ্রাচ্য একাধারে চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং অন্যান্য দেশের জন্যে জ্বালানী তেলের প্রধান উতস হওয়াতে ভারত মহাসাগরে চীনের যুদ্ধজাহাজের আনাগোনা বাড়ার সাথেসাথে জাপান এবং কোরিয়ার নৌবাহিনীকেও দেখা যাবে শিগগিরই। আপাতত জাপান বঙ্গোপসাগরে ‘বিগ-বি’ প্রজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও এই প্রজেক্টের পিছনে পিছনে জাপানী নৌবাহিনীও ভারত মহাসাগরে আসবে। মাহানের থিওরি এখানে একেবারে চমতকারভাবে ফলতে যাচ্ছে। আমদানি-রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতি এরকম নৌশক্তির জন্ম দেবে - এটা আলফ্রেড মাহান চিন্তা করতে পেরেছিলেন বলেই তার থিওরি এখন আবার নতুন করে অনেকেই পড়া শুরু করেছেন।

প্রবাহ না দেখলে ভারতীয় উপমহাদেশে আসল শক্তির উতস যেমন নিরূপণ করা যাবে না, ঠিক তেমনি বর্তমান ভারতের কৌশলগত শক্তি বা এর দুর্বলতাও সঠিকভাবে হিসেব করা যাবে না।

 ভারত – দুর্বল রাষ্ট্র?

ভারত মহাসাগরের ভূরাজনীতিকে আলাদাভাবে দেখলে যে বিষয়গুলি চোখে পড়বে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার উপকূলের বৈচিত্র্য। এই উপকূলের সবচাইতে বড় স্থান জুড়ে রয়েছে ভারত। তবে উলটা ত্রিভুজ আকৃতির হবার কারণে ভারতের নৌবহরকে প্রধান দু’টি ভাগে ভাগ করতে হচ্ছে। কাজেই বিশাল শক্তিধর নৌবাহিনী হওয়া সত্তেও ভারতের নৌবহর প্রকৃতপক্ষে আলাদা দু’টি ফ্লীট হিসেবে অপারেট করবে; এদের একত্রিত হয়ে কাজ করতে পারার সম্ভাবনা খুবই কম। এই অবস্থান ভারতের নৌবাহিনীর জন্যে বিরাট দুর্বল একটা দিক। আবার তাদের উপকূলের বাণিজ্য কেন্দ্রগুলির দিকে তাকালে দেখা যাবে যে কোলকাতা ছাড়া বাকি বন্দরগুলি নদীপথে দেশের গভীরের সাথে সংযুক্ত নয়। এটা একদিকে যেমন অধিকতর ব্যয়বহুল রেলপথ এবং স্থলপথের উপরে ভারতকে নির্ভরশীল হতে বাধ্য কাছে, তেমনি আবার নদীপথের মুখের নিরাপত্তা দেবার দায়িত্ব থেকে তাদের মুক্ত করেছে। বেশিরভাগ সমুদ্রবন্দরগুলি নদীর মুখে না হবার কারণে ভারত অভ্যন্তরীণ পরিবহণের আসল সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অবশ্য এই ভৌগোলিক নিয়তি ভারতীয় উপমহাদেশে হাজার হাজার বছর ধরে। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনা-সহ অন্যান্য নদীগুলির সঙ্গমস্থল বাংলাতে হবার কারণে বাংলা ছিল ভারতের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য। উর্বর ভূমি, খণিজ সম্পদ, বিশাল নদীর অববাহিকা, বৃষ্টির প্রাচুর্য্য এবং নদীগুলির সঙ্গমস্থলে সুমদ্রবন্দর থাকায় বাংলা ছিল বিদেশী শক্তির কাছে সবচাইতে লোভনীয় টার্গেট। মাহান নদী অববাহিকার মুখে বন্দরের গুরুত্ব আলাদাভাবে বর্ণনা করেছেন। মিসিসিপি নদী, হাডসন নদী, পটোম্যাক নদী এবং সেন্ট লরেন্স নদীর স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্বকে তিনি হাইলাইট করেছেন। ঠিক একইভাবে ব্রিটিশরা গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনা অববাহিকার সঙ্গমস্থলে সমুদ্রবন্দরের গুরুত্ব ধরতে পেরেছিল। যেকারণেই তারা বাংলাতে এসে কলকাতা বন্দর তৈরি করেছিল, যা কিনা ওই নদীগুলির সঙ্গমস্থল থেকে অনেক পশ্চিমে, অর্থাৎ নদীগুলির প্রাকৃতিক প্রবাহের একেবারে উল্টোদিকে। পরবর্তীতে ব্রিটিশরা যখন বাংলার কর্তিত্ব নিয়ে নেয়, তখন এই কৃত্রিম স্থানেই ভারতের প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং প্রধান শহর স্থাপন করে। কোলকাতায় প্রধান সমুদ্রবন্দর স্থাপনের কারণে বাংলার পূর্বাঞ্চল থেকে পণ্য উল্টাদিকে নদীপথে পাঠাতে হতো কলকাতায়। পূর্বাঞ্চলেই চাল, পাট, চা-সহ বেশিরভাগ পণ্য উতপাদিত হতো। ব্রিটিশরা কোলকাতায় প্রধান শহর করার কারণে কোলকাতায় সকল কারখানা গড়ে উঠলো, যেগুলি বাংলার পূর্বাংশের উপরে নির্ভরশীল ছিল। আবার বাংলার পূর্বাংশে সকল নদী থাকার কারণে সেখানে স্বাভাবিকভাবেই জাহাজ-নির্মাণ শিল্প গড়ে উঠেছিল। ব্রিটিশরা এই শিল্পের বারোটা বাজিয়ে কোলকাতায় জাহাজ-নির্মাণ শিল্প করে, যেখানে মানুষের জীবনধারণের জন্যে জাহাজ নির্মাণ করাটা জরুরি নয়। এই ইতিহাসগুলির ফলশ্রুতিতে যা দাঁড়ালো তা হলো, যখন ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা দেশ বিভাগ করলো, তখন ভারত কোলকাতার পশ্চাদভূমির বেশিভাগ হারালো পাকিস্তান (পরবর্তীতে বাংলাদেশ)-এর কাছে। আসামের বিশাল এক ভূমি (বর্তমানে সাতটি রাজ্য) কোলকাতা থেকে আলাদ হয়ে গেলো ব্রহ্মপুত্র নদ এবং গঙ্গা নদীকে কেটে ফেলার জন্যে। বিহার এবং উড়িষ্যাকেও বাংলা থেকে আলাদা করা হলেও সেগুলি অবশ্য ভারতের নিয়ন্ত্রণেই থাকলো। ব্রিটিশদের এই বিভাজন ভারতকে জন্ম থেকে দুর্বল করেছে। পশ্চাদভূমি ছাড়া আধা-গুরুত্বের কোলকাতা বন্দর পায় ভারত এবং তিনটি প্রধান নদীর সঙ্গমস্থল সমুদ্রবন্দর-সহ হারায় ভারত। ব্রিটিশরা বুঝতে পেরেছিল যে ভারতীয় উপমহাদেশের মূল শক্তি হচ্ছে বাংলা। তাই বাংলাকেই তারা প্রায় দু’শ বছর তাদের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক কার্যক্রমের কেন্ত্রভূমি করেছিল। বাকি অঞ্চল ছিল অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাকে একটা অঞ্চল হিসেবে না রাখার ক্ষেত্রে তারা ছিল বদ্ধ পরিকর। ভারত এবং পাকিস্তান গঠনের চাইতে বাংলাকে কয়েক ভাগ করে দুই দেশের মাঝে বিতরণ করাটা বৃটিশদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৮৫৭ সালের সিপাই বিপ্লব সহ উপমহাদেশের বেশিরভাগ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন বাংলাতেই সংগঠিত হয়েছিল। ব্রিটিশরা বঙ্গোপসাগরে একটা শক্তিশালী দেশ রেখে যাবার পক্ষপাতি ছিল না; বরং এমন একটা ভারতের পক্ষপাতি ছিল যার কিনা আকারে বিশাল হলেও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে উঠতে অনেক কষ্ট করতে হতো। বহুজাতিক এক রাষ্ট্র ভারত নিজেকে সামাল দিতেই ব্যস্ত থাকবে চিরকাল। আর এরকম একটা উদ্ভট রাজনৈতিক ম্যাপ ভারতের নেতৃবৃন্দকে সারাজীবন ভারতের অখন্ডতা বজায় রাখার চিন্তায় (যেখানে বাংলা নিয়ে চিন্তা থাকবে সবার উপরে) মশগুল রাখবে এবং তাদেরকে পশ্চিমা শক্তির কথায় চলতে বাধ্য করবে। বহু বছর আগে থেকেই চীনারা ভারতের উপরে পশ্চিমা প্রভাবের এই ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই ভারতকে বিশ্বাস করতে ছিল অনিচ্ছুক।

ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া এই বিন্যাসের ষোল কলা পূর্ণ করেছে ভারত নিজেই। অজায়গায় ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া কোলকাতা বন্দর চালু রাখতে ভারত গঙ্গা নদীতে বাঁধ দিয়ে স্রষ্টার দেওয়া সবচাইতে বড় উপহারগুলির একটিকে ধর্ষণ করেছে। প্রাকৃতিক এই নদীকে কেটে ফেলে ভারত ভাটির দেশ বাংলাদেশের যতটা না ক্ষতি করেছে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি তারা ভারতের করেছে। বাংলাদেশে যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়, তাতে সঠিক নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ পানির সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেয়েও যেতে পারে, কিন্তু ভারত সারাজীবন খুঁড়িয়ে চলবে। অন্যান্য নদীর উপরে বাঁধ এবং নদী-সংযোগ প্রকল্পের মতো আত্মহননের চেষ্টা ভারতকে ডোবাবে। এভাবে প্রাকৃতিক সম্পদকে ধ্বংস করে এবং ভাটির দেশের উপরে চরম চাপ সৃষ্টি করে ভারতের পক্ষে বঙ্গোপসাগরের কর্তিত্ব রাখা কতোটা সম্ভব হবে, সেটা প্রশ্নাতীত নয়। বঙ্গোপসাগরে ভারতের বিশাল লম্বা সমুদ্রতট রক্ষা করা ভারতের জন্যে বেশ কঠিনই হবে। এই লম্বা সমুদ্রতট তাদের বঙ্গোপসাগরের সামরিক শক্তিকে কয়েকটা ভাগে ভাগ করে ফেলবে, যেটা তাদের ভবিষ্যতের যে কোন সামরিক পদক্ষেপে তাদের বিপক্ষে কাজ করবে। আলফ্রেড মাহান ১৮০৫ সালের ব্রিটিশদের সাথে নৌ-যুদ্ধে ন্যাপোলিয়নের ফ্রান্সের এই দুর্বলতার কথা বলেছিলেন, যেখানে ফ্রান্সের আকৃতি ভারত থেকে আরও অনেক ছোট। ভারতের সমস্যা ফ্রান্সের কয়েক গুণ হবে –এটাই স্বাভাবিক। নদী কম থাকার কারণে এই লম্বা উপকূল বরাবর কোলকাতা, বিশাখাপত্তম, চেন্নাই-সহ অনেকগুলি বন্দর রক্ষা করার চ্যালেঞ্জের সাথে যোগ হয়েছে মূল ভূখন্ড থেকে আলাদা থাকার কারণে আন্দামান এবং নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের নিরাপত্তা দেওয়া, যা কিনা বঙ্গোপসাগরে ভারতকে আরও বেশি দুর্বল করবে। বঙ্গোপসাগরে ভারত চিরকাল অকর্মণ্য শক্তির মোকাবিলা করবে বলে চিন্তা করে থাকলে সামনের দিনগুলিতে তাদের সামনে চমক অপেক্ষা করছে।


আরব সাগরে পাকিস্তানের সাবমেরিন ভারতের বাণিজ্যপথের জন্য মারাত্মক হুমকি। এই বিপদ ভারতের বিভক্ত নৌবহরকে বেশ ব্যস্ত রাখতে পারবে।

পাকিস্তান – অল্পেই সাফল্য?

পশ্চিম পাকিস্তানের (বর্তমান পাকিস্তান) জন্ম হয়েছিল এমন একটা ভূমি নিয়ে, যেখানে অত্যন্ত শক্তিশালী একটা নদীর (সিন্ধু নদ) মুখে একটা গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর (করাচী) তারা পেয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান এই নদী এবং বন্দরের পুরো সদ্যবহার করতে পারেনি। এটার কারণ হিসেবে ভারতের সাথে পাকিস্তানের বিশাল ভূমি-সীমান্তের কথা বলা যায়। এতবড় ভূমিকে নিরাপত্তা দিতে পাকিস্তানের নেতৃত্বের দৃষ্টি চলে যায় ভূমির দিকে। মাত্র কিছুদিন আগে, ২০১১ সালে, পাকিস্তান সিন্ধু নদকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ নদীপথ উন্নয়নের চেষ্টা শুরু করে। পাকিস্তানের ৯৬% পণ্য পরিবহণ হয় স্থলপথে; বাকি ৪% রেলপথে। এর অর্থ হচ্ছে, পাকিস্তান নিজেদেরকে ম্যারিটাইম শক্তি হিসেবে তৈরি করার চেষ্টাই করেনি কখনো। মাহান বলেছিলেন যে ইউরোপিয়ান ভূমির অংশ হবার কারণে ফ্রান্স নৌশক্তিতে ঠিকমতো উন্নতি করতে পারেনি; যেটা ব্রিটেন পেরেছিল দ্বীপ দেশ হবার কারণে। পাকিস্তানও ফ্রান্সের মতো তার জাতীয় শক্তির বেশিরভাগটা খরচ করবে স্থলশক্তি তৈরি করতে; অর্থাৎ পাকিস্তানের স্থলসীমানার আশেপাশের এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতে পারার চাইতে খুব বেশি ক্ষমতা থাকছে না। এরপরেও পাকিস্তান তাদের নৌবাহিনী তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে যা কিনা আরব সাগরে পাকিস্তানের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের যোগাযোগ অটুট রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে। আর একইসাথে ভারতের নৌবহর দুই সাগরের মাঝে ভাগ হয়ে যাবার কারণে আরব সাগরে পাকিস্তান কিছুটা হলেও স্বস্তিতে থাকবে। স্থলভাগে দৃষ্টি থাকার কারণে পাকিস্তান গভীর সমুদ্রে যাবার ক্ষেত্রে গুরুত্বারোপ না করে আরব সাগরে নিজেদের বাণিজ্য রক্ষা করা এবং দরকারে আক্রমণাত্মক কাজের মাধ্যমে ভারতের আরব সাগরের বাণিজ্য ব্যাহত করবে। এক্ষেত্রে ভারত অত্যন্ত দুর্বল অবস্থানে থাকবে, কারণ মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারতের ঠিক মাঝখানে পাকিস্তানের অবস্থান। ম্যারিটাইম শক্তি না হয়েই পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ভারতের যথেষ্ট ক্ষতি করা সম্ভব। আরব সাগরের বাণিজ্য রক্ষা করতে ভারতের নৌবহরের বেশিরভাগটাই লাগবে; অথচ তারা তাদের পূর্বের সমুদ্র উপকূলও খালি রাখতে পারছে না। চীন পুরো ভারত মহাসাগরে নৌশক্তি মোতায়েনের মাধ্যমে ভারতকে যতটা না সমস্যায় ফেলতে পারবে, তার চাইতে পাকিস্তানী নৌবাহিনীর আক্রমণাত্মক শক্তি বৃদ্ধি করে এর চাইতে অনেক সমস্যায় জর্জ্জরিত করতে পারবে – এটা চীনারা ভালোই বুঝেছে।

মিয়ানমার যুদ্ধজাহাজ তৈরিতে বেশ এগুচ্ছে। কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল নীতি তাদেরকে অন্ধকারে পতিত করবে।

মিয়ানমার – উদ্দেশ্যহীন?

বার্মার (বর্তমান মিয়ানমার) জন্ম হয়েছে ইরাবতী নদী এবং এর দক্ষিণ প্রান্তে রেঙ্গুন (বর্তমান ইয়াংগন) সমুদ্রবন্দর নিয়ে। একইসাথে মিয়ানমার বিশাল এক উপকূল পেয়েছে। প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এই দেশ প্রকৃতই নদীমাতৃক; নদীভিত্তিক পরিবহণ ব্যবস্থা খুবই চমতকার। তবে মিয়ানমারের বিশাল উপকূলের নিরাপত্তা দেওয়া এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিন সামরিক জান্তার অধীনে থাকার কারণে মিয়ানমার বহিঃবাণিজ্যের উপরে নির্ভরশীল হয়নি একেবারেই। কিন্তু একইসাথে শক্তিশালী একটা দেশ হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারেনি সুযোগ থাকা সত্ত্বেও। সামরিক জান্তা মিয়ানমারের ভৌগোলিক অখন্ডতা ঠিক রাখতে নিজেদের নাগরিকদের মেরে শেষ করেছে; দেশকে করেছে দুর্বল। মিয়ানমারের সাম্প্রদায়িক এই সমস্যাকে কাজে লাগিয়েছে তার প্রতিবেশী চীন, ভারত ও থাইল্যান্ড। মিয়ানমার ১৯৯০ সাল থেকে তার নৌবাহিনী তৈরির কাজে হাত দিয়েছে; নিজেরাই যুদ্ধজাহাজ বানাচ্ছে তারা। আপাতঃদৃষ্টিতে এই নৌবহর তৈরির উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশের বিরূদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, কারণ তাদের সাথে রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিয়ে একটা দীর্ঘমেয়াদী সাম্প্রদায়িক সমস্যা রয়েছে। মিয়ানমারে উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়বাদীরা খুবই শক্তিশালী, যা কিনা মিয়ানমারকে ভেতর থেকে দুর্বল রাখবে। কিন্তু যেহেতু মিয়ানমার সরকার দেশকে ম্যারিটাইম দেশ হিসেবে তৈরির কোন চেষ্টাই কখনো করেনি, তাই তাদের এই জাহাজ নির্মাণ অন্তসারশূণ্যই মনে হয় আপাতঃদৃষ্টিতে। বাংলাদেশের বাস্তবতা বুঝতে না পারার কারণেই মিয়ানমার হয়তো এই প্রতিযোগিতায় নেমেছে। যেহেতু এই নীতি প্রতিক্রিয়াশীল, তাই এটা বেশিদূর এগুবে বলে মনে করাটা সমীচীন হবে না। চীনের কাছ থেকে সাহায্য নিলেও এখন তারা ভারতের দিকে হাত বাড়িয়েছে, যা কিনা চীনের ভালো চোখে দেখার কথা নয়। মিয়ানমারে চীনের প্রচুর স্ট্র্যাটেজিক বিনিয়োগ রয়েছে যেটা চীন রক্ষা করতে চাইবে যেকোন মূল্যে; বিশেষ করে যদি কোন কারণে চীন মালাক্কা প্রণালী ব্যবহারে বাধাপ্রাপ্ত হয়, তাহলে মিয়ানমারে তৈরি ডীপ-সী পোর্ট হয়ে উঠবে চীনের রক্ষাকবচ। চীনের কাছে মিয়ানমারের এই ধরনের স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্বের কারণেই চীন মিয়ানমারকে তার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সচেষ্ট হবে। কিন্তু চীনের ক্ষেত্রেও এই বাণিজ্যপথ রক্ষা করাটা কঠিন। কারণ এতে করে বঙ্গোপসাগরে চীনের একটা নৌবহর রাখতে হবে, যা কিনা বর্তমান বাস্তবতায় খাটে না। এমতাবস্থায় চীন বঙ্গোপসাগরে সবসময়ই যুদ্ধ এড়িয়ে চলবে।


নদীমাতৃক বাংলাদেশে জাহাজ তৈরি একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। তারপরেও ম্যারিটাইম দেশ হতে এখনও কিছু পথ পেরুতে হবে


বাংলাদেশ – ফিনিক্স ফ্রম দ্যা এশেজ?

পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) জন্ম বাংলা প্রদেশকে ভাগ করে। উপরেই বলেছি যে ব্রিটিশরা গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্র-কে ভাগ করতেই বেশি সচেষ্ট ছিল। বহুকাল রাজনৈতিক সমস্যায় জর্জ্জরিত থাকলেও গত ১৫-২০ বছরে এদেশ অর্থনৈতিকভাবে যা অর্জন করেছে, সেটা অনেক জিওপলিটিশিয়ানকে অবাক করেছে। মাত্র এক দশক আগেও বাংলাদেশ কোন হিসাবেই ছিল না; অথচ আজ সব হিসাবেই বাংলাদেশ বিদ্যমান। ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া অভাব অনটন এদেশের মানুষকে আর্থিক উন্নতির জন্যে ভুভুক্ষু করেছিল। দেশ বিভাগের সময় বেশিরভাগ কারখানা রয়ে যায় কোলকাতায়, অথচ কারখানার বেশিরভাগ কাঁচামাল আসতো বাংলাদেশ থেকে। এদেশের অর্থনীতি ধুঁকে ধুঁকে চলে পাকিস্তান আমলে এবং ১৯৭১-এ বাংলাদেশ হবার পরেও। শীতলযুদ্ধের প্রভাবে বৃহত শক্তিদের ততপরতায় বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল রক্তাক্ত; সামরিক শাসনও ছিল বহুকাল। এদেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক অগ্রগতি শুরু হয় ১৯৮০-এর শেষের দিকে, যখন থেকে এদেশে তৈরি পোষাকের কারখানা স্থাপন শুরু হয়। কমদামী দর্জিগিরির কাজ হলেও এখানেই প্রকৃত বৈদেশিক বাণিজ্যের উদ্ভব হয় এদেশের। এই শিল্প জন্ম দেয় ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজের এবং সেগুলি জন্ম দেয় আরও শিল্পের। বৈদেশিক বাণিজ্যের অভিজ্ঞতা নিয়ে বহু পণ্যের রপ্তানি শুরু হয় পরবর্তী দশকগুলিতে। শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রগতির কারণে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আবির্ভাব হয়, যারা বিভিন্ন বাণিজ্য এবং কলকারখানার হাল ধরে। ’৯০-এর দশকে কৃষিতে শুরু হয় বিপ্লব; এদেশের মাটি, আবহাওয়া এবং ব্যাপক বৃষ্টিপাত সাহায্য না করলে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কাজ হতো না, কারণ উজানে ভারত প্রায় সব নদীতে বাঁধ দিয়েছে; ব্রিটিশরা হয়তো এটা চিন্তা করেই সীমান্ত ঠিক করেছিল। ২৪,০০০ কিলোমিটার নদীপথ শুকিয়ে কমতে কমতে চার হাজার কিলোমিটারে নেমে এসেছে আজ, কিন্তু তারপরেও এদেশের মানুষ এখনো পানির উপরে নির্ভরশীল। গুগল আর্থের ম্যাপে গেলে বোঝা যায় যে এদেশের বিরাট একটা অংশ আসলে পানিতে ভর্তি। শুধু মানুষের চিন্তা থেকে পানিকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে (কিভাবে করা হয়েছে সেটা নাহয় আরেকদিন লিখবো)। ম্যারিটাইম দেশ তৈরিতে এটা একটা বড় বাধা।

কিছুদিন আগে মিয়ানমার এবং ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা মিটমাট করার পর থেকে ম্যারিটাইম সেক্টর বেশ গুরুত্ব পেতে শুরু করে। আলফ্রেড মাহান বলেছিলেন যে একটা দেশ ম্যারিটাইম দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে হলে তার দরকার একটা বড় জনসংখ্যা (যেটা বাংলাদেশের আছে) এবং দেশের মানুষের পানির সাথে সম্পৃক্ততা (যেটা অনেকটাই কমে গেছে গত কয়েক দশকে)। একসময় দেশের জনস্ংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বিদেশ থেকে প্রচুর অর্থ পাওয়া গেলেও এখন এটা পরিষ্কার যে এই বিশাল জনগোষ্ঠীই এদেশের সবচাইতে বড় সম্পদ। বিশ্ব অর্থনীতি এখন দ্রুত জনবহুল দেশগুলির দিকেই ঝুঁকে যাচ্ছে। গত এক দশকে দেশে জাহাজ নির্মাণ শিল্প উঠে দাঁড়াতে শুরু করেছে। ব্রিটিশরা ১৭৭৮ সাল থেকে বাংলায় জাহাজ নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ শুরু করে; তারা জানতো যে এদেশের মানুষ জাহাজ তৈরিতে মনোনিবেশ করলে কি হতে পারে। এদেশে জাহাজ-নির্মাণ শিল্পের পিছনে সবচাইতে বড় ভূমিকা পালন করেছে জাহাজ-ভাঙ্গা শিল্প, যেকারণে এই শিল্পের বিরূদ্ধে Subversive Activity ছিল সবচাইতে বেশি। এই শিল্প থেকে আসা স্ক্র্যাপ লোহা দিয়েই গড়ে উঠেছে দেশের কৃষি-যন্ত্র শিল্প, মেশিন শিল্প, রড তৈরি শিল্প (যা কিনা রিয়েল এস্টেটের বিকাশে বিশাল ভূমিকা রেখেছে)। রিয়েল এস্টেট জন্ম দিয়েছে সিমেন্ট শিল্পের, জন্ম দিয়েছে ইট তৈরি শিল্পের, কাঁচ শিল্পের, এলুমিনিয়াম শিল্পের, ইলেক্ট্রিক পণ্যের, পেইন্ট শিল্পের, স্যানিটারি ওয়্যার শিল্পের, কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি ইত্যাদির। এসব ইন্ডাস্ট্রির জন্যে লেগেছে জাহাজ – বালুবাহী জাহাজ, ড্রেজার, কার্গো জাহাজ, তেলবাহী জাহাজ, ইত্যাদি। কন্টেইনার জাহাজও তৈরি শুরু হয়েছে কিছুদিন হলো। এই জাহাজগুলির অনেকগুলিই ব্যবহৃত হলো চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে মালামাল দেশের অন্যান্য স্থানে পরিবহণে। দেশের ৯০% তেল নদীপথে পরিবাহিত হয়। কাজের জন্যে মানুষ বিভিন্ন শহরে বসবাসের কারণে নদীপথে বহু যাত্রী পরিবাহিত হয়; যাত্রীবাহী জাহাজ তৈরিও চলছে ব্যাপক হারে। এদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথে প্রায় ৩৫ হাজার নৌযান চলছে। এতকিছুর পরেও কেন ম্যারিটাইম দেশ নয়? কারণ এখন পর্যন্ত চিন্তায় সমুদ্র খুব অল্প স্থান জুড়ে রয়েছে; দেশের মানুষ পানিকে বন্ধু ভাবে না (সেটা অবশ্য তৈরি করা হয়েছে); ড্রেজিং-এর মাধ্যমে দেশের নদীপথ উন্নয়নে বাজেট থাকে না (যদিও সড়ক ও রেলপথ উন্নয়নে প্রচুর বিদেশী ডলার আসে); সমুদ্রগামী জাহাজ তৈরিতে দেশীয় উদ্যোগতাদের তেমন আগ্রহ নেই (যদিও এদেশের জাহাজ ইউরোপে রপ্তানি হয়); সমুদ্রবন্দর উন্নয়নে অথর্বের নীতি অনুসরণ (যদিও বন্দর বাণিজ্য বিরাট সাফল্য পেয়েছে); বঙ্গোপসাগরে খণিজ সম্পদ আহরণের কোন কিনারাই হলো না (যদিও ভারত ও মিয়ানমার এগিয়ে গেছে); গভীর সমুদ্রবন্দর প্রজেক্ট শম্ভুক গতিতে চলছে (জিওপলিটিক্সে আটকে গেছে); ইত্যাদি। উপরের লম্বা বর্ণনাতে ইন্ডাস্ট্রির সাথে সাথে জাহাজ-নির্মাণ এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের উল্লেখ করেছি, যা কিনা বাংলাদেশকে বঙ্গোপসাগরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নদী এবং সমুদ্র বিষয়ে পড়াশোনা শুরু হয়েছে সবে; বঙ্গোপসাগরের জন্যে ফিশিং ট্রলার তৈরি শুরু হয়েছে দেশে; শিপিং লাইনারও চালু হতে চলেছে (যা কিনা মানুষকে সমুদ্রের ব্যাপারে আগ্রহী করবে); ইউরোপে মন্দার পরেও জাহাজ রপ্তানি শুরু হয়েছে আবার; যুদ্ধজাহাজ তৈরি শুরু হয়েছে; তিনটা নদীর পলিত উপরে নির্ভরশীল বদ্বীপ অঞ্চল হওয়ায় বঙ্গোপসাগরে দ্বীপ উন্নয়ন নিয়ে চিন্তাভাবনা হচ্ছে; নৌবাহিনীর মূল্যায়ন শুরু হয়েছে অবশেষে – এগুলি সামনের দিন দেখায়। তবে দেশের সরকারের সঠিক নীতি এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

বেঁচে থাকার তাগিদেই বাংলাদেশের মানুষ বঙ্গোপসাগরের দিকে ছুটবে। সমুদ্র বাণিজ্য এবং সমুদ্র সম্পদের নিরাপত্তার প্রশ্ন এই জাতিকে যতো বেশি ভাবাবে, তারা ততো বেশি বঙ্গোপসাগর থেকে ছুটে বের হতে চাইবে।

বঙ্গোপসাগর – বাংলাদেশের বেসিন?

বঙ্গোপসাগরের ভবিষ্যত নির্ভর করছে বাংলাদেশের মানুষের নিজেদেরকে মূল্যায়নের উপরে। ভৌগোলিক অখন্ডতার কোন প্রশ্ন এদেশের নেই; এদেশের ভূ-প্রকৃতি এবং বিশাল জনসংখ্যা যেকোন আগ্রাসী শক্তির জন্যে দুঃস্বপ্ন; ভারতের মতো সামরিক শক্তির বিভক্ত হবার সম্ভাবনাও নেই একেবারেই – এসব ব্যাপার বাংলাদশের স্থলভাগকে করবে শক্তিশালী এবং বঙ্গোপসাগর নিয়ে চিন্তায় করবে আগ্রহী। অপরদিকে ভারত তার যে অবস্থানে রয়েছে (যা উপরে বর্ণনা করা হয়েছে), সেখান থেকে খুব বেশি দূরে যাবার সম্ভাবনা কম। মিয়ানমার তাকিয়ে রয়েছে বাংলাদেশের দিকে। আরব সাগরে পাকিস্তানের অবস্থান বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরের অবস্থানকে প্রভাবিত করলেও সেটা হবে পরোক্ষভাবে। বিশাল সম্পদশালী বাংলাকে চিরে ব্রিটিশদের স্বজত্নে তৈরি করা বাংলাদেশের হাতে এখনও রয়েছে বিশাল তিনটা নদী (যা ১৯৪৭ সালে সীমানা দিয়ে কেটে ফেলার পরেও এবং পরে উজানে বাঁধ দিয়ে আটকালেও বৃষ্টির পানিতে ভরা সম্ভব) এবং এর সঙ্গমস্থলে রয়েছে একাধিক সমুদ্রবন্দর। এদেশ এখন বহিঃবানিজ্যের উপরে এতটাই নির্ভরশীল যে বহিঃবাণিজ্যকে রক্ষা করাটা দেশের বাঁচা-মরার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাহান ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন যে ব্রিটেন এবং হল্যান্ড কিভাবে তাদের দেশের অভাবের কারণে বৈদেশিক বাণিজ্যের উপরে নির্ভরশীল হয় এবং অবশেষে ঔপনিবেশিক শক্তিতে পরিণত হয়। দু’টা দেশই পানির দেশ হবার কারণে এদের সাথে বাংলার সবচাইতে বেশি মিল ছিল। পার্থক্য ছিল একটাই – বাংলা ছিল সমৃদ্ধশালী এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ; অপরদিকে ইউরোপিয়ানরা ছিল দরিদ্র এবং বহিঃবাণিজ্যের উপরে নির্ভরশীল। কিন্তু এ-তো ১৭৬৪ সালের আগের কথা বলছি; আজকের বাস্তবতা তো ভিন্ন। ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া ভুভুক্ষু বাংলাদেশ গত ১৫-২০ বছরে বৈদেশিক বাণিজ্যের উপরে নির্ভরশীল এক দেশে পরিণত হয়েছে। বেঁচে থাকার তাগিদেই সারভাইভাল ইন্সটিংক্ট নিয়ে এই দেশের মানুষ বঙ্গোপসাগর আবিষ্কারে বের হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত এদেশের বাণিজ্যিক স্বাধীনতা পূর্ণতা না পায়, ততদিন এদেশের মানুষ বঙ্গোপসাগরে পাড়ি জমাবে এবং এই সাগর থেকে ভারত মহাসাগরে পাড়ি জমাবে। মাহানের থিওরি এখানে পুরোপুরি সফলতা পেতে চলেছে। ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণমূলক সীমারেখা এদেশে প্রায় অর্ধশত বছর সাফল্য দেখিয়েছে; কিন্তু এখন এই নিয়ন্ত্রণই একটা এগ্রেসিভ ম্যারিটাইম দেশের জন্ম দিতে চলেছে। বিশাল এক জনগোষ্ঠী যখন ছোট্ট একটা দেশে বেঁচে থাকার চাপে থাকবে, তখন তার অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসার ইচ্ছে থাকবে প্রবল। একটা জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে শিক্ষিত করে Subversion-এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও এই শিক্ষাই একসময় মানুষকে তার ঘোর থেকে জাগিয়ে তুলে – এটা মানুষের সৃষ্টিতত্বেই নিহিত, যা কিনা অনেকেই বোঝেন না।