Sunday, 30 July 2017

যুদ্ধজাহাজের সংজ্ঞা কি? (পর্ব ৩ - মাঝসমুদ্রে বিমান)

৩০শে জুলাই ২০১৭

ফরাসী নৌবাহিনীর সীপ্লেন টেন্ডার Foudre থেকে ক্রেনের সাহায্যে বিমান পানিতে নামানো হচ্ছে। সীপ্লেন সমুদ্রে যুদ্ধজাহাজের ক্যাপ্টেনের জন্যে আকাশে ওড়া চক্ষুর কাজ করে। এছাড়াও শত্রু জাহাজ এবং সাবমেরিনের উপরে হামলা করে বিমানগুলি যুদ্ধজাহাজের সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি করেছিল। 


সী-প্লেন থেকে শুরু…

প্রথমবার আকাছে ওড়ার পর থেকেই গবেষণা শুরু হয়ে যায় যে পানি থেকে কি করে বিমান উড্ডয়ন করা সম্ভব। সেসময় বিমানের উড্ডয়ন এবং অবতরণের জন্যে আলাদা সমতল ভূমির দরকারের প্রেক্ষিতেই এই চিন্তা শুরু হয়। আর পৃথিবীর উপরের বেশিরভাগটাই যেখানে পানি, সেখানে পানিতে বিমান ওঠানামা করাবার চেষ্টাটা স্বাভাবিকই বটে। ১৯১০ সালে সাফল্যের সাথে পানি থেকে বিমান উড্ডয়ের পদ্ধতি আবিষ্কারের পরে শুরু হয়ে যায় সমুদ্রে জাহাজ থেকে কি করে বিমান উড্ডয়ন করানো যায়, সেটা নিয়ে গবেষণা। ফরাসীরা এগিয়ে থাকে এক্ষেত্রে, কারণ তারাই “সী-প্লেন"-এর চিন্তাটাকে প্রথম বাস্তবায়িত করেছিল। ১৯১০ সালের এপ্রিলে ফরাসী নৌমন্ত্রী ভাইস এডমিরাল Auguste Boué de Lapeyrère-এর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয় গবেষণার জন্যে যে নৌবাহিনীতে কিরে বেলুন এবং বিমানের ব্যবহার করা যায়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯১১ সালে ফরাসীরা Foudre নামের নৌবাহিনীর একটি টর্পেডো বোট টেন্ডারকে রূপান্তরিত করে সীপ্লেন টেন্ডার বানিয়ে নেয়। এর আগে জাহাজটির কাজ ছিল তার ডেকের উপরে ছোট টর্পেডো বোট বহণ করে সমুদ্রে নিয়ে যায় এবং গভীর সমুদ্রে টর্পেডো বোটের মতো ছোট বোটের অপারেশন সম্ভব করা। রূপান্তরের ফলে টর্পেডো বোটের সাপোর্ট জাহাজ থেকে এটা হয়ে যায় সীপ্লেনের সাপোর্ট জাহাজ। জাহাজটি ৪টা সীপ্লেন বহণ করতে পারতো। প্লেনগুলি ক্রেনের সাহায্যে পানিতে নামানো হতো। এরপর সীপ্লেন পানি থেকে উড্ডয়ন করতো। ল্যান্ডিং হতো পানিতে, এবং ল্যান্ডিং-এর পরে আবারও ক্রেনের সাহায্যে প্লেনটাকে জাহাজে তুলে নেয়া হতো। ১৯১৩ সালে জাহাজের ডেকের উপর থেকেই সীপ্লেনের উড্ডয়নের ব্যবস্থা করা হয়। Foudre-এর মতো জাহাজ অন্যন্য দেশও তৈরি করতে থাকে। মূলতঃ পুরনো কোন জাহাজকে রূপান্তর করেই এই ব্যবস্থা করা হয়। এগুলিকে বলা হতে থাকে “সীপ্লেন টেন্ডার”। জাহাজগুলিতে বিমানের জ্বালানি বহণ করা হয়, পাইলটদের থাকার কোয়ার্টার দেয়া হয়, বিভিন্ন রকমের মেইনটেন্যান্স এবং মেরামতের ব্যবস্থা করা হয়।
 
মার্কিন নৌবাহিনীর সীপ্লেন টেন্ডার USS Timbalier-এর পাশে ভাসমান অবস্থায় দেখা যাচ্ছে দু'টা ফ্লাইং বোটকে। এই জাহাজগুলি মহাসমুদ্রে বিমানের পাল্লা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল। ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান ভূমি থেকে ওঠানামা শুরু করার পর থেকে সমুদ্রে জাহাজের সহায়তায় বিমানের পাল্লা বাড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।

সীপ্লেন টেন্ডার…

সীপ্লেন বহণ করার ফলে নৌবাহিনীর জাহাজে কি পরিবর্তন এলো? ১৯১৪ সালেই শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এই যুদ্ধে ব্যাপক হারে বিমানের ব্যবহার শুরু হয়। নৌবাহিনীগুলিও পিছিয়ে থাকে না। আকাশ থেকে শত্রুর গতিবিধি লক্ষ্য করার গুরুত্ব বাড়তে থাকে। শত্রুর যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিনের গতিবিধি আকাশ থেকে লক্ষ্য করাটা একটা ট্যাকটিক্যাল এডভান্টেজে রূপ নেয়। আর বিশ্বযুদ্ধের মাঝেই বিমান যখন অস্ত্র বহণ করতে থাকে, তখন সমুদ্রেও সীপ্লেন হয়ে ওঠে আক্রমণকারী বিমান, বিশেষ করে সাবমেরিনের বিরুদ্ধে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এই প্রযুক্তিগুলির ব্যাপক উন্নতি হতে থাকে। সীপ্লেনের আকৃতি ছিল ছোট; এর পাল্লাও ছিল কম (১ হাজার থেকে ২ হাজার কিঃমিঃ)। কাজেই দূরপাল্লার (৩ হাজার থেকে ৭ হাজার কিঃমিঃ পাল্লার) বিমানের ব্যাপারটাও চলে এলো আলোচনায়। নিজের পেটের উপরে উড্ডয়ন-অবতরণ করা বড় এই বিমানগুলিকে “ফ্লাইং বোট” বলা হতে থাকে। এগুলি জাহাজের উপরে বহণ করার জন্যে অনেক বেশি বড়। তবে এই ফ্লাইং বোটগুলিকে সাপোর্ট দেয়ার জন্যেও তৈরি করা হতে থাকে সীপ্লেন টেন্ডার। বিমানগুলি উপকূল থেকে অপারেট করতো, তবে গভীর সমুদ্রে গিয়ে সীপ্লেন টেন্ডারের সাপোর্ট পেয়ে এর পাল্লা আরও বহুগুণে বেড়ে যেত। বিমানটা জাহাজের পাশে ভিড়ে তেল নিয়ে, ক্রু পরিবর্তন করে, অথবা কিছু মেইনটেন্যান্সের কাজ করে আবারও উড়ে যেত। এভাবে একটা বিমান প্রায় অনির্দিষ্টকালের জন্যে উপকূল থেকে হাজারো মাইল দূরে থাকতে পারতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে এধরনের ফ্লাইং বোটের ব্যবহার ব্যাপক আকারে বেড়ে যায়। শত্রুপক্ষের ফ্লীটের গতিবিধি অবলোকন করার লক্ষ্যে এই বিমানগুলি সর্বদা আকাশে থাকতো; আর সেগুলিকে সাপোর্ট দেয়া জন্যে সীপ্লেন টেন্ডারগুলিও এগিয়ে থাকতো। বিশ্বযুদ্ধের সময়ে মার্কিন, জাপানি, জার্মান এবং ব্রিটিশ অনেক ফ্লাইং বোট ব্যবহৃত হয়েছিল। ছোট সীপ্লেনও ব্যবহৃত হয়েছে অনেক। ছোট বিমানগুলি বহণ করা হতো ব্যাটলশিপ এবং ক্রুজারের উপরে – জাহাজের ক্যাপ্টেনকে আকাশ থেকে একটা চোখ দেবার জন্যে। শত্রুর সাবমেরিনের বিরুদ্ধেও এই বিমানগুলি আক্রমণ চালাতো। বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ততদিনে শক্তিশালী জাহাজ হয়ে গেছে। কিন্তু বিমান ওড়ার জন্যে তো জায়গা লাগে; সব জাহাজে তো জায়গা নেই। ব্যাটলশিপ বা ক্রুজারের উপরে নেবার মতো বিমান থাকেই ঐ সীপ্লেন। তবে জার্মানরা জাহাজের উপর থেকে বিমান অপারেশনকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জার্মান যুদ্ধজাহাজের ছোট্ট জায়গায় অবতরণ করছে হেলিকপ্টার Flettner Fl-282 Kolibri । জাহাজের উপরে সীপ্লেনের স্থান নিয়েছে হেলিকপ্টার। হেলিকপ্টারের সক্ষমতা কিছু জাহাজকে সক্ষম করেছে; বানিয়েছে যুদ্ধজাহাজ। 


সীপ্লেন থেকে হেলিকপ্টার…

১৯৪০ সালের আগ থেকেই জার্মান ইঞ্জিনিয়ার এন্টন ফ্লেটনার (Anton Flettner) হেলিকপ্টার নিয়ে গবেষণা চালিয়ে আসছিলেন। সেবছরের জুলাই মাসে ফ্লেটনার তৈরি করেন নতুন এক হেলিকপ্টার - Fl 282 Kolibri । জার্মান নৌবাহিনী এই হেলিকপ্টারের ডিজাইনে খুবই খুশি হয় এবং ১৫টা বিমান অর্ডার করে ফেলে (যার পরে তৈরি হবে আরও ৩০টা); এর মূল মিশন হয় সাবমেরিন খুঁজে বের করা। ভূমধ্যসাগরের পরিষ্কার পানিতে ১৩০ ফিট গভীর পানিতে থাকার পরেও সাবমেরিন দেখা যায় আকাশ থেকে! বিমানগুলির পাল্লা মাত্র ১৭০ কিঃমিঃ হলেও যেকোন স্থানে নামতে পারাটা ছিল বিরাট সুবিধা। বাজে আবহাওয়ায় অপারেশন চালাতে পারাটাও ছিল এই বিমানের একটা বিরাট গুণ। জার্মান নৌবাহিনীর বেশিরভাগ জাহাজই ছিল ছোট। সেসব ছোট জাহাজে নামার মতো কোন বিমান তখনও তৈরি হয়নি। জাহাজের উপরে মাত্র ৫ মিটার X ৫ মিটার আকারের স্থানে এই হেলিকপ্টার ওঠা-নামা করতে পারতো। মিত্রবাহিনীর বোমা হামলায় ফ্লেটনার এবং বিএমডব্লিউ-এর ফ্যাক্টরি গুড়িয়ে গেলে যুদ্ধ শেষ হবার আগে ব্যাপক হারে এই হেলিকপ্টার তৈরি করা যায়নি। তবে জার্মানরাই জাহাজের উপর থেকে হেলিকপ্টার অপারেশনের পথ দেখিয়ে দেয়। বিশ্বযুদ্ধ থেকে মাত্র ৩টা ফ্লেটনার হেলিকপ্টার বেঁচে থাকে, যার একটা যায় মার্কিনীদের হাতে; একটা ব্রিটিশদের হাতে, আর আরেকটা সোভিয়েতদের হাতে। জার্মানদের অন্য সকল প্রযুক্তির মতো হেলিকপ্টারের প্রযুক্তিটাও মিত্রবাহিনী ভাগ করে নেয়। যুদ্ধের পর বিজয়ী শক্তিরা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজেদের সামরিক উন্নতি ঘটায়। আজ পৃথিবীর এতো জাহাজে হেলিকপ্টার ওঠানামা করলেও এটা যে এন্টন ফ্লেটনারের ডেভেলপ করা যুদ্ধপ্রযুক্তি ছিল, সেটা আজ কেউ মনে করে না।

মার্কিন ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান Lockheed P-3 Orion । বিমানটি যথেষ্ট সক্ষম হলেও আগের ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান থেকে সবচাইতে আলাদা ব্যাপারটা ছিল যে এটা ভূমি থেকে ওঠানামা করে। এই বিমানের ডিজাইনের সাথে সাথে সমুদ্রের জাহাজের পাশে ভিড়তে পারার গুরুত্বকে মার্কিনীরা বাতিল ঘোষণা করেছে। 


সমুদ্র থেকে ভূমিতে…

তবে উপরের আলোচনায় এটা পরিষ্কার যে সীপ্লেনের ডেভেলপমেন্ট থেকেই হেলিকপ্টারের দিকে গিয়েছে প্রযুক্তি। আকাশ থেকে শত্রুর গতিবিধি লক্ষ্য করাই ছিল এখানে প্রধানতম লক্ষ্য। একসময় এটা করেছে সীপ্লেন; এখন করছে হেলিকপ্টার। আর এই বাইরে রয়েছে দূরপাল্লার ফ্লাইং বোট, যা কিনা ছোট সীপ্লেনের পাল্লার বাইরে শত্রুর গতিবিধি লক্ষ্য করতে পারে। বিশ্বযুদ্ধের পরে কথা এলো যে সারা বিশ্বে বহু এয়ারপোর্ট তৈরি হয়ে গিয়েছে বিশ্বযুদ্ধের সময়ে; এখন তো আর বিমানের ওঠানামার স্থানের অভাব নেই। কাজেই এখন তো সীপ্লেন বা ফ্লাইং বোটের প্রয়োজন তেমন একটা নেই। ভূমি থেকেই ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান ওঠানামা করতে শুরু করলো। মার্কিনীরা ডেভেলপ করলো Lockheed P-3 Orion ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান, যা কিনা বেশিরভাগ ফ্লাইং বোটকে সরিয়ে ফেললো। কাজেই সীপ্লেন টেন্ডারের দরকার রইলো না। এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিনীদের দুনিয়ার কোথাও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারে বাধা রইলো না। তাই পৃথিবীর সকল স্থানেই তারা পেয়ে গেল ভূমি, যেখান থেকে তারা P-3 Orion ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান অপারেট করতে পারলো। আরও একটা ব্যাপার হলো, বিশ্বযুদ্ধের পর কোন বড় ম্যারিটাইম শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না থাকা। সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রচুর সাবমেরিন তৈরি করলেও পৃথিবীর সকল মহাসমুদ্রে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে সাগর নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা তারা করেনি, যা কিনা কোন ম্যারিটাইম শক্তি করতে চাইতো। তাই P-3 Orion ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমানের ৩,০০০ কিঃমিঃ পাল্লা সোভিয়েত সাবমেরিনের জন্যে ছিল যথেষ্ট। অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জাপান চেয়েছিল পুরো প্রশান্ত মহাসাগরের বিশাল জলরাশিকে নিয়ন্ত্রণ করতে। সেই মহাসাগরের ছোট ছোট দ্বীপগুলি একেকটি থেকে হাজারো মাইল দূরে। তাই জাপানের বিমান এবং নৌবাহিনীর যেকোন বিমানের পাল্লা ছিল বিশাল। ফ্লাইং বোটগুলির পাল্লা ছিল ৬,৫০০ থেকে ৭,০০০ কিঃমিঃ। ছোট সীপ্লেনগুলির পাল্লাও ছিল ২,০০০ কিঃমিঃ-এর মতো।

ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জাহাজ RFA Argu-কে কেউ কেউ যুদ্ধজাহাজই বলতে যেন চান না। জাহাজটাকে কেউ কেউ "হসপিটাল শিপ" বলতেও চাইছেন। কিন্তু জাহাজটা যখন তার ডেকের উপরে এপাচি হেলিকপ্টার বহণ করে, তখন জাহাজটা তার সত্যিকারের সক্ষমতার পরিচয় দেয়। হেলিকপ্টারগুলির সক্ষমতাই এই জাহাজের সক্ষমতা। 


বর্তমান যুগের সীপ্লেন টেন্ডার...

যে জাহাজগুলি ফ্লাইং বোট বা সীপ্লেনগুলিকে সাপোর্ট দিয়ে হাজারো মাইলের সমুদ্রকে নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করেছে, সেগুলিকে কি ধরনের জাহাজ বলা যাবে? সামরিক কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় সেগুলি নিঃসন্দেহে সামরিক জাহাজ। যেহেতু যুদ্ধের জন্যে তৈরি করা সামরিক বিমানের সক্ষমতাকে এই জাহাজ বাড়িয়ে দিচ্ছে, তাই এগুলিকেও যুদ্ধজাহাজই বলতে হবে; এদের ডেকের উপরে তেমন কোন অস্ত্র না থাকলেও। খুব স্বাভাবিকভাবেই বলা যায় যে, যে ছয়টি বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ১৯৪১ সালে পার্ল হারবারে হামলা করেছিল, সেগুলির শক্তি কেন্দ্রীভূত ছিল বহনকৃত যুদ্ধবিমানগুলিতে; ডেকের উপরের কামানগুলিতে নয়। প্রকৃতপক্ষে এই জাহাজগুলিতে কতগুলি কামান ছিল, তার ব্যাপারে খুব আগ্রহই ছিল মানুষের। অর্থাৎ বিমানের শক্তিতেই শক্তিশালী হয়েছে বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ। ঠিক একইভাবে ফ্লাইং বোট এবং সীপ্লেনের শক্তিতে শক্তিশালী হয়েছে সীপ্লেন টেন্ডারগুলি। আর তাহলে এই সীপ্লেন টেন্ডারের মডার্ন যুগের উদাহরণ কোনগুলি? উপরের আলোচনায় উঠে এসেছে যে সীপ্লেনের স্থান নিয়েছে হেলিকপ্টার। শত্রুর ফ্লিটকে খুঁজে বের করতে সহায়তা করা, জাহাজের অস্ত্রকে টার্গেট খোঁজায় সহায়তা, সাবমেরিন খুঁজে ধ্বংস করা, সমুদ্রে উদ্ধার অভিযান চালানো, উপকূলের সাথে যোগাযোগ স্থাপন, এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে মালামাল আনা-নেওয়া, ইত্যাদি মিশনে হেলিকপ্টার স্থান নিয়েছে সীপ্লেনের। বহু জাহাজ হেলিকপ্টার বহণ করে নিজের সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। আবার কিছু জাহাজ বহণ করেছে বেশ কয়েকটি হেলিকপ্টার – একেকটা একেক ধরনের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। এই জাহাজগুলিই মডার্ন যুগে সীপ্লেন টেন্ডারের কাজ করছে – সীপ্লেনের স্থানে হেলিকপ্টারের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে।

অর্থাৎ আজকের যুগে অন্য কোন অস্ত্র বহণ না করেই যে জাহাজ হেলিকপ্টার বহণ করছে, সে আসলে হয়ে যাচ্ছে যুদ্ধজাহাজ। হেলিকপ্টারের মাধ্যমে আরেক জাহাজের উপরে সৈন্য নামিয়ে সেই জাহাজ দখল করে নেয়া হচ্ছে। সোমালিয়ার উপকূলে মালয়েশিয়ার একটি জাহাজ থেকে হেলিকপ্টার দিয়ে সেই কাজটাই করা হয়েছে। হেলিকপ্টার থেকে ডেপথ চার্জ বা টর্পেডো ফেলে সাবমেরিন ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। হেলিকপ্টার থেকে মিসাইল ছুঁড়ে শ্ত্রুর জাহাজও ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড যুদ্ধে এবং ১৯৯১ সালের ইরাক যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জাহাজে বহনকৃত হেলিকপ্টারগুলি বেশ কিছু ছোট জাহাজকে ধ্বংস করেছে, ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, বা ডূবিয়ে দিয়েছে। আর এছাড়া ফ্লীটের চক্ষু হিসেবে তো হেলিকপ্টারই কাজ করেছে। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর ছোট বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজগুলিতে বিশেষ ধরনের রাডার বহনকারী হেলিকপ্টারও ছিল, যা বহু দূর থেকে শত্রুর আগমণের খবর দিতে পারতো। তবে কিছু জাহাজ তেমন একটা বড় নাম না করলেও সমুদ্রের মাঝে হেলিকপ্টারের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর RFA Argus এর সবচাইতে চমৎকার উদাহরণ। এই জাহাজটি ছিল একটি কনটেইনার জাহাজ। ১৯৮১ সালে তৈরি করা এই জাহাজটি ব্রিটিশ সরকার কিনে নেয় এবং ১৯৮৮ সালে সামরিক জাহাজে রূপান্তর করে। ডেকের উপরে খালি জায়গায় বেশ কয়েকটি হেলিকপ্টার বহণ করা ছাড়াও এর ডেকের নিচে হ্যাঙ্গারও রয়েছে। জাহাজটি যাতে সামনের দিনে এপাচি এটাক হেলিকপ্টার বহণ করতে পারে, সেই ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। অর্থাৎ হেলিকপ্টারের শক্তিতে এর শক্তি বাড়ছে।

ব্রিটিশ নৌবাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে ছোঁড়া হচ্ছে জাহাজ-ধ্বংসী 'সী স্কুয়া' মিসাইল। ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড যুদ্ধে এবং ১৯৯১ সালের ইরাক যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জাহাজে বহনকৃত হেলিকপ্টারগুলি বেশ কিছু ছোট জাহাজকে ধ্বংস করেছিল, ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল, বা ডূবিয়ে দিয়েছিল। হেলিকপ্টার একটা সাধারণ জাহাজকে যুদ্ধজাহাজের মর্যাদা দিতে পারে।


হেলিকপ্টারের কারণে যুদ্ধজাহাজ......

সীপ্লেন বা হেলিকপ্টার যা-ই বলা হোক না কেন, এগুলিকে সহায়তাকারী জাহাজগুলি এদের পাল্লাকে অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত করেছে। একটা হেলিকপ্টার বড়জোড় কয়েক’শ কিঃমিঃ উড়তে পারে। কিন্তু একটা জাহাজে উঠে গেলে এটি হাজারো মাইল পাড়ি দিতে পারছে। জাহাজগুলি কাজ করছে হেলিকপ্টারের পা হিসেবে! ফ্লাইং বোট না থাকায় ভূমি থেকে অপারেট করা বিমানগুলিই ম্যারিটাইম প্যাট্রোলের কাজ করছে। এক্ষেত্রে সহায়তাকারী জাহাজের মাধ্যমে এর পাল্লা বাড়ানো যাচ্ছে না; কারণ এই বিমানগুলি তো পানিতে নেমে জাহাজের পাশে ভিড়তে পারছে না।

সীপ্লেন, ফ্লাইং বোট এবং হেলিকপ্টারের নিজস্ব ক্ষমতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। আর সেই সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়েছে এর সহায়তাকারী জাহাজগুলি। এই জাহাজগুলি কোন অস্ত্র বহণ না করলেও সীপ্লেন এবং হেলিকপ্টারের সামরিক সক্ষমতায় এদের সক্ষমতা বেড়েছে। সীপ্লেন এবং হেলিকপ্টারের যুদ্ধক্ষমতা এই জাহাজগুলিকে দিয়েছে যুদ্ধক্ষমতা। অর্থাৎ আপাতঃদৃষ্টিতে কোন অস্ত্র বহণ না করলেও সীপ্লেন বা হেলিকপ্টার বহণ করে এই জাহাজগুলি প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধজাহাজে পরিণত হয়েছে! এভাবে একটা পরিবহণ জাহাজকে হেলিকপ্টার বহণের জন্যে উপযুক্ত করে সেটিকে যুদ্ধজাহাজ বানিয়ে ফেলা হয়েছে। এরকম জাহাজগুলিকে যুদ্ধজাহাজ বলতে যাদের মনে শংকা জাগবে, তারা খুব সম্ভবতঃ যুদ্ধজাহাজের পশ্চিমাদের সংজ্ঞা মুখস্থ করতেই বেশি পারঙ্গম। সামনের দিনগুলিতে ঘটতে যাওয়া অনেক কিছুই তারা ঠাহর করে উঠতে ব্যর্থ হবেন।

No comments:

Post a Comment