Friday, 30 October 2015

সম্রাট আওরঙ্গজেব, দুবলার চর এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপ

৩০শে অক্টোবর ২০১৫

সম্রাট আওরঙ্গজেব ব্রিটিশদের নাকে খত দেওয়াতে পেরেছিলেন, কারণ তখন বাংলা তথা ভারত বিদেশ বাণিজ্যের উপরে নির্ভরশীল ছিল না। তবে আজ কিন্তু ব্যাপারটা সেরকম নেই।


১৬৮০-এর দশকে ভারতীয় উপমহাদেশ ছিল মুঘল শাসক আওরঙ্গজেবের অধীনে। ইংরেজরা বাণিজ্য করতে এসে অন্য ইউরোপীয় দেশগুলির চাইতে বেশি সুবিধা চাইলে আওরঙ্গজেব সেটা মেনে নেননি। এসময় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নর ছিলেন জোসাইয়া চাইল্ড, যার ঔধ্যত্বের কারণে ব্রিটিশরা আওরঙ্গজেবের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এই যুদ্ধ ইতিহাসে ‘চাইল্ড’স ওয়ার’ বলে পরিচিত। তারা ভারত থেকে হজ্জ্বযাত্রায় যাওয়া এক জাহাজ লুট করে এবং যাত্রীদের খুন-ধ্বর্ষন করে। ব্রিটিশরা বাংলাকে তথা পুরো ভারতবর্ষকে নৌ অবরোধে ফেলার চেষ্টা করে। তারা হুগলী নদীর উপরে একটা দ্বীপ দখল করে সেই নদী নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে। কিন্তু ইংরেজদের এই অবরোধ সফল হয়নি, কারণ ভারতের প্রধান প্রদেশ বাংলা বহিঃবাণিজ্যের উপরে নির্ভরশীল ছিল না। অবরোধ দেবার কারণে বাংলার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু কারুরই না খেয়ে মরার উপক্রম হয়নি। এই ঘটনার মাধ্যমে সমুদ্রবন্দর অবরোধ দেয়ার একটা কৌশল ব্রিটিশরা জানিয়ে দিয়েছিল। আর সেই অবরোধ তারা দিয়েছিল সমুদ্রবন্দরের বাইরে দ্বীপে ঘাঁটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ঘাঁটির দরকার হয়েছিল, কারণ সমুদ্রে অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত থাকা সম্ভব নয়। রসদ নেবার জন্যে সবচাইতে কাছের গন্তব্যটিও যদি অনেক দূরে হয়ে থাকে, তাহলে অবরোধ ধরে রাখা সম্ভব নয়। সেকারণেই হুগলীর সেই দ্বীপ দখল দরকার হয়েছিল।

তিন শতক পরে…

তিন শতাধিক বছর আগে ব্রিটিশদের দেখানো কৌশলের একটা অন্য ভার্সন আমরা দেখতে পাই ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ে, যেখানে মার্কিনরা ভিয়েতনামের মেকং নদীর বদ্বীপ এলাকাসহ ভিয়েতনামের পুরো উপকূল নিয়ন্ত্রণ করেছিল। তারা দক্ষিণ ভিয়েতনামের তাঁবেদার সরকারের জাহাজগুলিকে গেরিলাদের হাত থেকে রক্ষা করা ছাড়াও গেরিলাদের সাপ্লাই লাইন অবরোধ দিয়েছিল। এই অবরোধ দিতে গিয়ে আমেরিকানরা মেকং নদীর বদ্বীপ অঞ্চলে কিছু ভাসমান ঘাঁটি তৈরি করা ছাড়াও ভূমিতেও বদ্বীপের কৌশলগত এলাকাগুলিতে ঘাঁটি বানিয়েছিল, যেগুলি থেকে গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটগুলি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। গেরিলারা স্থলপথ এবং নদীপথে নিয়মিত এসব ঘাঁটি আক্রমণ করতো ঠিকই, কিন্তু ঘাঁটিগুলি বন্ধ করে দেবার মতো শক্তি তারা কখনোই যোগাড় করতে পারেনি। ঘাঁটিগুলির অনেকগুলিই খুব দুর্গম জংলা এলাকায় ছিল, যেখানে ঘাঁটি রক্ষা করাটা অপেক্ষাকৃত সহজ ছিল।

 
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গুয়াদালক্যানালের যুদ্ধের সময়ে স্ট্র্যাটেজিক জায়গায় একটা ঘাঁটি (বিশেষত বিমান ঘাঁটি)-এর গুরুত্ব প্রকাশ পায়। একেবারেই অগুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপটি রাতারাতি সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ টার্গেট হয়ে দাঁড়ায়। তবে যারা আগে দ্বীপের দখল নিতে পেরেছিল (আমেরিকানরা), তারাই লাভবান হয়েছে শেষে।


কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এধরনের ঘাঁটি রক্ষা করার আরেকটি উদাহরণ পাওয়া যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গুয়াদালক্যানাল-এর যুদ্ধ থেকে। এই দ্বীপখানার নামও কেউ জানতো না একসময়। কিন্তু যে মুহুর্তে মার্কিন ম্যারিন সেনারা এই দ্বীপে নেমে জাপানীদের নির্মিতব্য ঘাঁটিটি দখল করে নেয়, তখন থেকেই এটা ইতিহাসের অংশ। জংলা এই দ্বীপের ঘাঁটিটি মার্কিনরা ব্যবহার করে বিমান এবং নৌঘাঁটি হিসেবে, যা কিনা প্রশান্ত মহাসাগরে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। জাপানীরা বহুবার চেষ্টা করেছিল দ্বীপে অবতরণ করে ঘাঁটিটি দখল করে নিতে; কিন্তু জঙ্গলের বাস্তবতা এবং মার্কিনীদের প্রতিরোধের কারণে জাপানীরা অবশেষে ঘাঁটি দখল করার এই চিন্তাটি বাদ দিয়েছিল। পরবর্তীতে আমেরিকানরা এই ঘাঁটিকে ব্যবহার করে সোলোমন দ্বীপপুঞ্জের বেশিরভাগ দ্বীপ দখল করেছিল। গুয়াদালক্যানাল প্রমাণ করে যে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের উপরে যদি এমন একটা সামরিক ঘাঁটি তৈরি করা যায়, যেটা দুর্গমতার কারণে রক্ষা করা সহজ, তাহলে সেই ঘাঁটিটি কৌশলগত দিক থেকে যুদ্ধের মোড় ঘোরাতে সক্ষম।

https://upload.wikimedia.org/wikipedia/commons/3/3a/Guantanamo.jpg
কিউবার মাটিতে গুয়ান্তানামো বে একটা বিষফোঁড়ার মতো। মার্কিনীদের সাথে যথেষ্ট শত্রুতা থাকার পরেও কিউবা মার্কিনীদের এই ঘাঁটিকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।

দ্বীপ পূণর্দখল কি এতটাই কঠিন?

একটা দ্বীপের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, সেটা দখল করতে হলে নদী বা সমুদ্রপথে আক্রমণ ছাড়া গতি নেই। আর যদি দ্বীপটি জঙ্গল বা পাহাড়-বেষ্টিত হয়, তবে সেটা দখল করাটা আরও বেশি কঠিন। ব্রিটিশরা এই একই কারণে জিব্রালটার দখলে রাখতে পেরেছে এতকাল। স্থলভাগের দিকে পাহাড়-বেষ্টিত থাকায় এর নৌঘাঁটিটি সমুদ্রপথে আক্রমণ করে দখল করা ছাড়া গতি নেই। আমেরিকানরাও কিউবাতে গুয়ান্তানামো বে-তে একটা ঘাঁটি রেখে দিয়েছে একইভাবে। উঁচু পাহাড়-বেষ্টিত এই ছোট্ট ঘাঁটিটি কিউবানরা দখল করে নিতে চেষ্টাও করেনি তেমন একটা। সপ্তদশ শতকে ব্রিটিশরা যখন হুগলীর দ্বীপে বাণিজ্য জাহাজ দখল করার অপেক্ষায় চাতক পাখির মতো বসে ছিল, তখন সুন্দরবনের রোগ-বালাই আর সুপেয় পানির অভাব তাদের পেয়ে বসে। বাংলার সুবাদার শায়েস্তা খান মৃতপ্রায় ব্রিটিশদের ওই দ্বীপ থেকে উদ্ধার না করলে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। পরবর্তীতে যুদ্ধ বন্ধ করতে গিয়ে ব্রিটিশ অফিশিয়ালরা আওরঙ্গজেবের দরবারে গিয়ে নাকে খত দিয়েছিল! কিন্তু মনে রাখতে হবে যে হুগলী নদীর সমুদ্র বাণিজ্য তখন বাংলার জন্যে বাঁচা-মরার ব্যাপার ছিল না। তাই ব্রিটিশদের কাছ থেকে ওই দ্বীপ পূণর্দখল করাটাও বাঁচা-মরার লড়াই ছিল না। যদি উল্টোটা হতো, তাহলে কিন্তু শায়েস্তা খানের জন্যে সুন্দরবনের ভিতরে অভিযান চালিয়ে ওই দ্বীপ পূণর্দখল করাটা বেশ কঠিন হতো। এবারে এই দ্বীপের ব্যাপারটা আমরা বাংলাদেশের বদ্বীপের ক্ষেত্রে চিন্তা করলে কি দেখি?

দুবলার চর এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপ

পসুর নদীর ভেতরে বাংলাদেশের মংলা সমুদ্রবন্দর। আর এই নদী যেখানে সমুদ্রে মিশেছে, সেখানে রয়েছে কিছু জংলা দ্বীপ, যা কিনা এই নদীর মুখ, তথা এই সমুদ্রবন্দরের নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থানে রয়েছে। দুবলার চর এবং হিরণ পয়েন্ট এই চ্যানেলের নিয়ন্ত্রক। কোন বহিঃশত্রু যদি কখনো মংলা বন্দরকে অবরোধ দেবার চিন্তা করে, তবে তারা এই দ্বীপগুলিকে নিয়ন্ত্রণের চিন্তা করবে। একটা অবরোধের প্রধান দিক হলো Sustainability. আর সেটা সম্ভব করতেই নদীমুখে একটি দ্বীপ অপরিহার্য্য। শুধুমাত্র সমুদ্রের উপরে নির্ভর করে আবরোধ চালিয়ে নেয়াটা যে কারুর জন্যেই কঠিন। আর কেউ যদি ঝটিকা আক্রমণের মাধ্যমে এই দীপগুলি বা আশেপাশের কোন একটি জবরদখল করে নেয়, তাহলে সেটা পূণর্দখল করাটাও প্রচন্ড কঠিন হবে। তবে সঠিকভাবে ধরে রাখার ব্যবস্থা করলে সেটা আবার বহিঃশত্রুর পক্ষে দখল করে নেয়াটা বেশ কঠিন হবে।

একই রকমের উদাহরণ হচ্ছে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। এই দ্বীপ চট্টগ্রাম বন্দরের জাহাজ রুটগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। আবার মূল ভূখন্ড থেকে আলাদা থাকার কারণে একবার বেদখল হয়ে গেলে পূণর্দখল করাটা ভীষণ কঠিন হবে। কেউ এই দ্বীপ দখলে নিলে একইসাথে টেকনাফের দক্ষিণ প্রান্তে শাহপরীর দ্বীপের কিছু পাহাড়ী এলাকাও দখলে নিয়ে রাখতে চাইবে। কারণ এই উঁচু এলাকা থেকে এখানকার সমুদ্রপথ এবং টেকনাফের রাস্তাগুলি অবলোকন করাটা সহজ। দুবলার চর এবং সেন্ট মার্টিনের মতো দ্বীপগুলিতে স্পেশাল ফোর্স, আর্টিলারি, দ্রুতগামী শক্তিশালী প্যাট্রোল বোট এবং আর্মড হেলিকপ্টার মোতায়েন করে কোন বহিঃশত্রু বাংলাদেশের প্রধান দুই বন্দরকে অবরোধ দিতে সক্ষম হতে পারে। একারণেই এই দ্বীপগুলিকে কালক্ষেপণ না করে সুরক্ষার ব্যবস্থা করাটা জাতীয় নিরাপত্তার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সপ্তদশ শতকের মতো পরিস্থিতি এখন নেই যে সমুদ্র অবরোধে এদেশের কোন ক্ষতি হবে না। সমুদ্রপথে আমদানির উপরে পুরোপুরি নির্ভরশীল এই দেশকে অবরোধ দেবার পদ্ধতিটাই কোন আগ্রাসী শক্তির জন্যে ইকনমিক্যাল হবে। আর বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় বিদেশী কোন শক্তি এই দেশে কোনভাবেই তাদের আগ্রাসী ততপরতা চালাবে না – এরকম পদলেহনকারী চিন্তা এখন ধোপে টেকে না।

দুবলার চর এবং সেন্ট মার্টিনের মতো দ্বীপগুলিকে সুরক্ষা দিতে গেলে অনেক ধরনের বাধা আসবে। কিন্তু যারা বাধা দেবেন, তার কখনোই এই দ্বীপগুলির কৌশলগত দিক চিন্তা করবেন না, অথবা চিন্তা করার পরেও বলবেন যে বিদেশী শক্তিদের তোষণ করে চলার মাঝেই এই দেশের ‘নিরাপত্তা’ নিহিত। নিজেদেরকে দুর্বল ভেবে অন্যের স্বার্থের কাছে সঁপে দিতেই তারা স্বাছন্দ্য বোধ করেন। এই দ্বীপগুলির সুরক্ষা দিতে চাইলেই এরা বিদেশী Subversion-এর অংশ হয়ে নানা প্রকারে বাধার সৃষ্টি করবেন। উপরে কৌশলগত যতগুলি দ্বীপের উদাহরণ দিয়েছি, তার কোনটিতেই শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলি জাতীয় নিরাপত্তার বাইরে কোন কিছুকে প্রাধান্য দেয়নি; আমাদেরও দেওয়া উচিত হবে না।

Tuesday, 13 October 2015

সিরিয়ায় রাশিয়ার ক্রুজ মিসাইল হামলার কৌশলগত গুরুত্ব

১৩ই সেপ্টেম্বর ২০১৫

সিরিয়ায় রাশিয়ার নৌবাহিনী জাহাজ থেকে মিসাইল ছোঁড়ার সাথে সাথে সামরিক দিক থেকে বেশকিছু নতুন ব্যাপার সামনে এসে পড়েছে। সিরিয়ায় রাশিয়ার সামরিক হস্তক্ষেপে কার কতটা সুবিধা হলো, সেটা আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু নয়, বরং আলোচনা করতে চাই সামরিক দিক দিয়ে নতুন কি কি ব্যাপার ধরা পড়লো, যেগুলি শুধু সিরিয়া নয়, বরং বিশ্বের যেকোন স্থানে সামরিক ব্যালান্সেও ভূমিকা রাখতে পারে।

এতো ছোট জাহাজ থেকে কেন?

এখানে প্রথম চিন্তাটা আসে যে জাহাজ থেকে মিসাইল কেনো ছোঁড়া হলো; ভূমি থেকে হলে কি সমস্যা হতো? ১৯৮৭ সালের Intermediate-Range Nuclear Forces (INF) Treaty অনুযায়ী ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ায় বাধা রয়েছে, কিন্তু জাহাজ থেকে ভূমিতে ছোঁড়াতে বাধা নেই। বলাই বাহুল্য যে যুক্তরাষ্ট্রের সুবিধা মাথায় রেখেই এই চুক্তি করা হয়েছিল অত বছর আগে। এর পর থেকে ১৯৯০ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র সব যুদ্ধে জাহাজ থেকে ভূমিতে মিসাইল ছুঁড়েছে। ২০১১ সালে লিবিয়ায় Operation Odyssey Dawn-এ যুক্তরাষ্ট্র তাদের Ohio-class পারমাণবিক মিসাইল সাবমেরিনের কনভার্সন ক্রুজ মিসাইল সাবমেরিন ব্যবহার করেছিল। বিশাল ওই সাবমেরিন ১৫৪টা Tomahawk মিসাইল বহণ করতে পারে। মার্কিন অন্যান্য যুদ্ধজাহাজগুলি এই সাবমেরিনের মতো এত্তোবড় মিসাইলের ডিপো না রাখলেও অনেকগুলি মিসাইলই বহন করে থাকে। বলাই বাহুল্য যে আমরা ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য মিসাইল নিয়ে কথা বলছি। বর্তমান বিশ্বের বেশিরভাগ যুদ্ধজাহাজই জাহাজ-ধ্বংসী মিসাইল বহণ করে। একটা জাহাজকে মিসাইল-সজ্জিত করতে এটাই প্রধানতম পদ্ধতি। মিসাইল দিয়ে ভূমির অভ্যন্তরে বহুদূরে আক্রমণ করতে পারাটা সাধারণত সেকেন্ডারি উদ্দেশ্য হিসেবেই থাকে। গত দু’দশকে ভূমি আক্রমণ করতে পারার ক্ষমতাটা যুক্তরাষ্ট্রে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। যে কারণে তাদের বড় বড় সব যুদ্ধজাহাজ Tomahawk মিসাইল-সজ্জিত হয়ে পানিতে ভাসছে। তাদের নতুন Zumwalt-class ডেস্ট্রয়ারগুলি ভূমিতে টার্গেট ধংসের জন্যেই যেন তৈরি করা হচ্ছে। মোট ৮০টা VLS (Vertical Launch System) মিসাইল লঞ্চারের মধ্যে বেশিরভাগটাই যে Tomahawk ক্রুজ মিসাইল হবে, সেটা মার্কিন নৌবাহিনীর অফিসাররা গোপন রাখেননি।



Buyan-class-এর জাহাজগুলি মাত্র ৭৫ মিটার লম্বা। এতো ছোট জাহাজগুলি কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ স্ট্রাইক করতে পারে, সেটা খুব বেশি মানুষের চিন্তায় থাকার কথা ছিল না। এখন থেকে হিসেবটা পালটে গেল।

এরকম একটা পরিস্থিতিতে রাশিয়া যেসব যুদ্ধজাহাজ ব্যবহার করলো ক্রুজ মিসাইল ছোঁড়ার কাজে, সেগুলি কেউ শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজের ক্যাটাগরিতে কখনো ফেলেছেন বলে খুব একটা মনে হয় না। এখানে রাশিয়া ব্যবহার করেছে Gepard-class-এর একটা ফ্রিগেট আর Buyan-class-এর তিনটা কর্ভেট। রাশিয়ার কাসপিয়ান সাগরের ফ্লোটিলাতে Gepard-class-এর দু’টা জাহাজ আছে, যার একটা সেই ভুমিতে নিক্ষেপণযোগ্য Klub মিসাইল (২,৫০০ কিমি পাল্লার) বহন করে। আসলে সেটাও একটা মাঝারি পাল্লার জাহাজ-ধ্বংসী মিসাইল, যেটার একটা ভার্সন তৈরি করা হয়েছে দূরপাল্লার ভূমিতে নিক্ষেপের মিসাইল হিসেবে। যেকারণে ওই মিসাইল একই বক্স (Missile Canister) থেকে ছোঁড়া যায়। অর্থাৎ শুধু মিসাইলগুলি পরিবর্তন করে ফেললেই চলে। Gepard-class-এর একটা জাহাযে এই সুবিধা থাকলেও অন্যটা বহন করে Kh-35 মিসাইল (১৩০ কিমি পাল্লার), যার কিনা ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য কোন ভার্সন নেই। Buyan-class-এর তিনটা কর্ভেটের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। ৬টা জাহাজের মধ্যে মাত্র ৩টা জাহাজ Klub মিসাইল বহন করে। কাসপিয়ান ফ্লোটিলার ভূমিতে আক্রমণ করতে পারা মোট এই ৪টা জাহাজই ব্যবহার করা হয়েছে। ৩২টা মিসাইল এরা ছুঁড়তে পারতো সর্বোচ্চ; ছুঁড়েছে ২৬টা। Gepard-class-এর ফ্রিগেটগুলি মাত্র ১০২ মিটার লম্বা আর Buyan-class-এর কর্ভেটগুলি মাত্র ৭৫ মিটার লম্বা। এতো ছোট জাহাজের পক্ষে এতো দূরে ভূমিতে হামলা চালানোর ঘটনা এই প্রথম। এই ধরনের মিসাইলের একটা স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব রয়েছে, যেকারণে পাকিস্তান এরকমই একটা মিসাইল তাদের কিছু সাবমেরিনে সংযুক্ত করার প্রয়াস নিয়েছে। সাবমেরিনের এই স্ট্র্যাটেজিক বা কৌশলগত গুরুত্ব জানা থাকলেও এত্তো ছোট্ট ফ্রিগেট বা কর্ভেটের ক্ষেত্রে এই গুরুত্ব এর আগে কেউ দেয়নি। স্ট্র্যাটেজিক্ স্ট্রাইকের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ জাহাজের আকার হঠাত করেই মনে হয় অনেক ছোট হয়ে গেল। এরকম সাইজের জাহাজের সংখ্যা বিশ্বে অনেক; ছোট ছোট অনেক দেশের হাতেই রয়েছে। এসব জাহাজ যদি কেউ ভূমিতে আঘাত করার মতো মিসাইল দিয়ে সজ্জিত করার জন্যে তৈরি করে রাখে, সেটা শক্তিশালী দেশগুলির জন্যে মাথাব্যাথার কারণ হয়ে যেতে পারে। আর এটা খুব একটা কঠিন ব্যাপার, তা-ও কিন্তু নয়। জাহাজ-ধ্বংসী মিসাইল কিন্তু ভূমির টার্গেটেও ব্যবহার করা সম্ভব। ১৯৭১ সালে ভারতীয় নৌবাহিনীর ছোট্ট ছোট্ট মিসাইল বোটগুলি পাকিস্তানের করাচী বন্দর ধ্বংসপ্রাপ্ত করেছিল জাহাজ-ধ্বংসী মিসাইল ব্যবহার করেই। এখানে একটা ব্যাপারই রয়েছে এখন চিন্তা করার, সেটি হচ্ছে দূরপাল্লার ক্রুজ মিসাইল বিক্রির উপরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা। তবে এই নিষেধাজ্ঞা যে কতটা কার্যকর, তা উত্তর কোরিয়া, পাকিস্তান এবং ইরানের মতো দেশগুলির মিসাইল প্রোগ্রাম দেখলে সন্দেহ জাগে। রাশিয়ার এই মিসাইল হামলা স্ট্র্যাটেজিক স্ট্রাইকের ক্ষমতা অনেকের মাঝে বিতরণ করে দেওয়ার জন্যে একটা উদাহরণ হয়ে দেখা দিতে পারে।





রাশিয়ার মিসাইল হামলা হঠাত করেই কাসপিয়ান সাগরকে মধ্যপ্রাচ্যের স্ট্র্যাটেজিক হিসাবের ভেতরে ফেলে দিল। এখন থেকে এই সাগরকে ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক হিসেব পূর্ণ হবে না।


কাসপিয়ান সাগর কেন? কৃষ্ণ সাগর কেন নয়?

দ্বিতীয় চিন্তা, যেটি আসে রাশিয়ার মিসাইল হামলা থেকে, সেটি হচ্ছে - কাসপিয়ান সাগর বেছে নেওয়া হলো কেন এই স্ট্রাইকের জন্যে। কৃষ্ণ সাগরে যেখানে আরেকটা অপেক্ষাকৃত বড় ফ্লীট ছিল রাশিয়ার, সেখানে কাসপিয়ান সাগর কেন ব্যবহার করা হলো। কৃষ্ণ সাগরের জাহাজগুলি মোটামুটি নিয়মিতই বসফরাস প্রণালী অতিক্রম করে ভূমধ্যসাগরে পাড়ি জমায়। সিরিয়ার সমস্যা শুরু হবার পর থেকে আসাদ সরকারের প্রতি রাশিয়ার সমর্থন জানাতে এভাবে একাধিকবার তাদের জাহাজগুলি সিরিয়ার উপকূলে টহল দিয়েছে। কৃষ্ণ সাগরর ফ্লীটে বড় ক্রুজার এবং ডেস্ট্রয়ার থাকলেও Klub মিসাইল, যেটা সিরিয়ায় ব্যবহার করা হয়েছে, তেমন মিসাইল বহনকারী জাহাজের সংখ্যা কম। Buyan-class-এর কর্ভেট রয়েছে মাত্র দু’টি। কৃষ্ণ সাগরের এই জাহাজগুলির যুদ্ধ-ক্ষমতার উপরেও কিছুটা হলেও প্রশ্ন করা যায়। ২০১৫ সালের জুলাই মাসে সেবাস্তোপোলের নেভি ডে প্যারেডের সময় Ladnyy নামের ফ্রিগেট থেকে SS-N-14 মিসাইল ছোঁড়ার পরে সেটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অবশেষে সমুদ্রে গিয়ে পড়ে। তবে এই জাহাজগুলিকে ভূমধ্যসাগরে রাশিয়ার ফ্ল্যাগ উড়ানোতে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই লেখাটি লেখার সময়ে (অক্টোবর ২০১৫) পূর্ব ভূমধ্যসাগরে Slava-class ক্রুজার Moskva, Kashin-class ডেস্ট্রয়ার Smetlivyy, এবং Krivak-class ফ্রিগেট Ladnyy এবং Pytlivyy - যেগুলি ১১তম এন্টি-সাবমেরিন ব্রিগেডের অংশ – ভূমধ্যসাগরে মহড়া দিচ্ছে। এগুলি কৃষ্ণ সাগরের সবচাইতে শক্তিশালী জাহাজ। এগুলিকে শক্তি প্রদর্শন এবং সিরিয়ার লাটাকিয়া এবং টারটাস বন্দরের আশেপাশে রাশিয়ার নৌসম্পদের সুরক্ষা দেয়ার কাজেই ব্যবহার করা হবে বলে মনে হচ্ছে। ভূমিতে হামলা করার মতো মিসাইল দিয়েও এরা সজ্জিত নয়, আবার কৃষ্ণ সাগরে রেখে আসা অন্য মিসাইল-সজ্জিত জাহাজগুলিও এরকম আক্রমণের জন্যে যথেষ্ট নয়। কাজেই কাসপিয়ান ফ্লোটিলাতেই রাশিয়ার ভরসা। শুধু তা-ই নয়, কাসপিয়ান সাগরকে হঠাত করেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে দেওয়া হলো। এই সাগর (যা কিনা আসলে একটা বড় হ্রদ) ককেশাস এলাকার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখন এই সাগর পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্যেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল। রাশিয়ার সামরিক হাতের ক্ষমতা নিয়ে চিন্তা করতে হলে এই সাগরের কথা এখন থেকে সবাই চিন্তা করবে। এই সাগর থেকে মোটামুটি ২,৫০০ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যপ্রাচ্যের পুরো এলাকা এখন রাশিয়ার মিসাইলের পাল্লার মাঝে।


ইরান-ইরাকের ওভারফ্লাইট অনুমতি

তৃতীয় চিন্তাটি হলো ওভারফ্লাইট নিয়ে। মিসাইল ছোঁড়ার জন্যে ওভারফ্লাইটের অনুমতি লেগেছে ইরান এবং ইরাকের কাছ থেকে। ইরান রাশিয়ার বন্ধু রাষ্ট্র। আর ইরাকের মার্কিন-সমর্থিত সরকারও যে রাশিয়ার কার্যক্রমের পক্ষে, সেটা এবার বোঝা গেল। মধ্যপ্রাচ্য রাশিয়ার দক্ষিণ সীমান্তে, যেখানে রাশিয়া ইসলামিক কোন শক্তির আবির্ভাব দেখতে ইচ্ছুক নয়। আমেরিকাও মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামকে শক্তি হিসেবে দেখতে চায় না, যেকারণে তারা ইরাকের জেলখানাতে আইএসআইএস-এর মতো এক রক্তোন্মাদের জন্ম দিয়েছে এবং মুসলিমদেরকে আরও বেশি বিভক্ত করতে পেরেছে। একই হিসাবের অংশ হিসেবে মুসলিমদের মাঝে শিয়া-সুন্নী সংঘাত রাশিয়া এবং আমেরিকাকে স্বস্তি দেয়। এর মাঝে রাশিয়া শিয়া মুসলিমদেরকে নিজেদের অপেক্ষাকৃত ভালো বন্ধুরূপে দেখে। ইরান এবং হিযবুল্লাহ ছাড়াও সিরিয়ার আসাদ সরকারও শিয়া (আলাওয়াতি সম্প্রদায়)। সিরিয়ার বেশিরভাগ মানুষ সুন্নী হলেও রাশিয়া শিয়া সরকারকেই তাদের বন্ধু ভাবছে, যদিও আসাদ সরকার নিজের দেশের মানুষের বিরূদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্রও ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে ইরাকে শিয়াদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় এবং সরকারও শিয়া হওয়ায় সেক্ষেত্রে রাশিয়ারও যে তাদের জন্য একটা বন্ধুসুলভ মনোভাব থাকবে, সেটা বোঝাই যায়। কাসপিয়ান সাগর থেকে মিসাইল ছোঁড়ার জন্যে দুই শিয়া দেশের কাছ থেকে অনুমতি লেগেছে, কিন্তু কৃষ্ণ সাগর থেকে ছোঁড়া হলে লাগতো তুরস্কের। রাশিয়ার সাথে তুরস্কের ইতিহাস অতো পরিষ্কার নয়। খিলাফতের সময়ে বেশ কয়েকবার ইস্তাম্বুলের উসমানিয়া বংশের খলিফার যুদ্ধ হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে তুরস্কের জন্মের সময়েও নতুন দেশের সাথে ততকালীন সোভিয়েতদের সম্পর্ক ভালো হয়নি। শীতল যুদ্ধের সময়ে তুরস্ক ছিল শীতল যুদ্ধের ফ্রন্টলাইন। এরকম উত্তেজক সম্পর্কের কারণে রাশিয়ার জন্য তুরস্কের কাছে থেকে ওভারফ্লাইট না চেয়ে ইরান-ইরাকের কাছ থেকে চাওয়াটাই স্বাভাবিক বলে মনে হয়।

রাশিয়া-তুরস্ক সম্পর্ক

চতুর্থ চিন্তাটি চলে আসে একই সূত্রে। রাশিয়ার কৃষ্ণ সাগরের ফ্লীট ভূমধ্যসাগরে পৌঁছাতে পারে বসফরাস প্রণালীকে ঘিরে তুরস্কের সাথে রাশিয়ার চুক্তির কারণে। কোন কারণে তুরস্কের সাথে রাশিয়ার কোন বিরোধ দেখা দিলে এই প্রণালী রাশিয়ার জন্যে উন্মুক্ত না-ও থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে কৃষ্ণ সাগরে রাশিয়ার নৌবহরের সম্ভাব্য ব্যবহার সীমিত হয়ে যাবার সম্ভাবনা রয়ে যায়। কৃষ্ণ সাগর এবং কাসপিয়ান সাগরের নৌবহরের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলি তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যেতে পারে রাশিয়ার জন্যে।

মিসাইল টেস্টিং?
পঞ্চম চিন্তাটি আসে ক্রুজ মিসাইল নিয়ে, যা কিনা ফিক্সড টার্গেটের জন্যে প্রধানত উপযোগী। আইএসআইএস এমন একটা সংগঠন, যারা কিনা ছোট ছোট মোবাইল গ্রুপে বিভক্ত হয়ে কাজ করে। আসাদ-বিরোধী গ্রুপগুলিও কাছাকাছি ধাঁচের। ক্রুজ মিসাইলগুলি সিরিয়ার একেবারে পশ্চিম উপকূলের কাছাকাছি শহরগুলিতে পড়েছে, যেগুলি আসাদ-বিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠিগুলির হাতে, আইএসআইএস-এর হাতে নয়। বিমান হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলিও মিসাইলগুলির মতোই; শহরগুলির নামই বলে দেয় যে কাদের উপরে হামলা হচ্ছে। মার্কিনীরাও গত অনেকদিন ধরে সিরিয়াতে যেসব শহরে ড্রোন হামলা করছে, সেগুলিও বেশিরভাগই আসাদ-বিরোধীদের হাতে। ইরানের সৈন্যরাও সেসব শহরেই যুদ্ধ করতে যাচ্ছে। আসাদ-বিরোধীরা রাশিয়া, আমেরিকা এবং ইরানের মূল টার্গেট হলেও বিমান হামলার সাথে সাথে ক্রুজ মিসাইল ব্যবহার এক্ষেত্রে আমাদের জানান দিচ্ছে যে রাশিয়া মিসাইল হামলার ব্যাপারে প্রায় অত্যুতসাহী ছিল। অর্থাৎ ক্রুজ মিসাইল মিশনটা কঠিন টার্গেট ধ্বংস করার অতি-প্রয়োজনীয় সমাধান দেবার চাইতে রাশিয়ার নতুন ধরনের অস্ত্র টেস্ট করার কাজেই বেশি লেগেছে। এতকাল যুক্তরাষ্ট্র এই কাজটা করেছে মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যত্র সকল যুদ্ধে। রাশিয়া অবশেষে আমেরিকার কাছ থেকে এই শিক্ষাটি নিয়েছে। রাশিয়া তাদের আক্রমণভাগে ক্রুজ মিসাইল যোগ করে অপশন তৈরি করলো। এখন তারা তাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনায় কয়েক ধরনের সমাধানের কথা চিন্তা করতে পারবে।




রাশিয়া ভিয়েতনামের কাছে ৬টা Gepard-class ফ্রিগেট রপ্তানি করছে। এই জাহাজগুলিতে কাসপিয়ান সাগরের আড়াই হাজার কিঃমিঃ পাল্লার মিসাইল না থাকলেও কাসপিয়ান সাগরের অপারেশন রাশিয়ার নৌ-অস্ত্র বাণিজ্যকে আরও চাঙ্গা করতে পারে।


অস্ত্রের বাজার ধরা

যষ্ঠ চিন্তাটি হচ্ছে রাশিয়ার মিলিটারি হার্ডওয়্যার নিয়ে। সিরিয়াতে রাশিয়ার বেশকিছু অস্ত্র টেস্ট করা হচ্ছে। রাশিয়ার অর্থনীতির একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে অস্ত্র রপ্তানি। একইসাথে এই রপ্তানিকে রাশিয়া কূটনৈতিকভাবে ব্যবহার করে। সিরিয়াতে নৌবাহিনীর অস্ত্র টেস্ট করার সম্ভাবনা ছিল বেশ খানিকটা কম। এই মিসাইল মিশনের মাধ্যমে রাশিয়া তাদের নৌজাহাজের জন্যে অস্ত্র-বাণিজ্যের একটা বাজার তৈরি করার সুযোগ খুঁজবে। রাশিয়া বর্তমানে ভিয়েতনামের কাছে Gepard-class-এর ছয়টা ফ্রিগেট বিক্রি করছে। কাসপিয়ান সাগরে ছোট জাহাজের শক্তি দেখানোর কারণে রাশিয়ার তৈরি ছোট জাহাজের বাজার তৈরি হতে পারে। তবে এটা এ-ই নয় যে রাশিয়া ২,৫০০ কিমি পাল্লার মিসাইল এর সাথে বিক্রি করতে পারবে। তারপরেও বিক্রি করা জাহাজগুলি যদি সেইরকম মিসাইল বহন করার ক্ষমতা-সহ বিক্রি করা হয়, তাহলে সেটা অন্যান্য শক্রিশালী রাষ্ট্রের জন্য গভীর চিন্তার বিষয় হবে।

কাসপিয়ান থেকে দূরের সাগরে

পরিশেষে এই সবগুলি চিন্তাকে একত্রিত করলে আমরা কয়েকটি বিষয়ে কিছু ধারণা লিপিবদ্ধ করতে পারি। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে স্ট্র্যাটেজিক দিক থেকে প্রভাব বিস্তার করতে গেলে তাদেরকে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক বাস্তবতাকে নিয়ে ভাবলেই হবে। কিন্তু রাশিয়াকে মধ্যপ্রাচ্যের সাথে সাথে তাদের নিজেদের ভৌগোলিক বাস্তবতাকে নিয়েও ভাবতে হবে। কাসপিয়ান সাগর এবং কৃষ্ণ সাগরের সাথে সাথে ইরান-ইরাক-তুরস্কের অবস্থান রাশিয়ার ভৌগোলিক বাস্তবতা। একারণে রাশিয়া কাসপিয়ানের দিকে ঝুঁকছে। কাসপিয়ান এমন একটা সাগর যেখানে চলাচলের জন্যে রাশিয়ানরা জাহাজ বানাচ্ছে কাসপিয়ান থেকে প্রায় ৮০০ মাইল দূরে ভলগা নদীতে, যেকারণে জাহাজগুলি হচ্ছে অপেক্ষাকৃত ছোট। আবার কাসপিয়ান এমন কোন সাগর নয়, যেখানে সমুদ্রে টহল দিতে ডেস্ট্রয়ার বা ক্রুজারের মতো বিশাল জাহাজ বানাতে হবে। কাজেই কাসপিয়ানের জাহাজগুলি স্বভাবতই ছোট হবে। আর এই সাগরের জাহাজগুলিকে ভূমিতে আক্রমণযোগ্য মিসাইল সজ্জিত করতে হলে ছোট জাহাজই হবে ভরসা। অর্থাৎ ছোট জাহাজের উপরে রাশিয়ার স্থলভাগ আক্রমণের ভার দেওয়াকে আমরা রাশিয়ার ভৌগোলিক বাস্তবতার অংশ ধরতে পারি। এই বাস্তবতা রাশিয়ার সাথে থাকবে সকল সময়; শুধু আজকে সিরিয়ার যুদ্ধের সময় নয়। কিন্তু এই ছোট জাহাজের দূরপাল্লার অপারেশন অপেক্ষাকৃত ছোট নৌবহরের দেশের জন্যে অনুপ্রেরণার কারণ হতে পারে; জন্ম দিতে পারে একটা নতুন স্ট্র্যাটেজিক ডিটারেন্ট-এর। সিরিয়ায় মিসাইল অপারেশনের কারণে রাশিয়ার নৌশক্তির রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়তে পারে ঠিকই, কিন্তু ছোট জাহাজের স্ট্র্যাটেজিক ডিটারেন্ট হবার সম্ভাবনা এমন একটা ধারণাকে রপ্তানি করতে পারে, যা কিনা বিশ্বের কিছু এলাকার স্ট্র্যাটেজিক ব্যালান্সও পালটে দিতে পারে।