Friday, 10 March 2017

জাকার্তা সামিটঃ ভারত মহাসাগরে নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ

১০ মার্চ ২০১৭
http://greenwatchbd.com/wp-content/uploads/2017/03/PM-with-leaders-of-IORA-summit.jpg
স্থাপিত হবার দুই দশক পর প্রথম শীর্ষ সন্মেলনে ভূ-রাজনীতির বেশকিছু ব্যাপার উঠে এসেছে। বাংলাদেশ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সেখানে গিয়েছিলেন, যা কিনা বাংলাদেশকেও এই আন্তর্জাতিক রাজনীতির অংশ করে ফেলেছে। অনেক বড় সংস্থা হলেও এর নাম কূটনৈতিক পরিসরের বাইরে তেমন একটা শোনা যায়নি। এটা প্রথম হেডলাইনে এলো প্রথম শীর্ষ সন্মেলনের মাঝ দিয়ে। এখন প্রশ্ন হলো, বিশ বছর পর এই শীর্ষ সন্মেলনের গুরুত্ব কতখানি?

   
আইওআরএ কিভাবে আবির্ভূত হলো?

ক’দিন আগেই ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ‘ইন্ডিয়ান ওশান রিম এসোসিয়েশন’ (আইওআরএ)এর প্রথম শীর্ষ বৈঠক (জাকার্তা সামিট)। স্থাপিত হবার দুই দশক পর প্রথম শীর্ষ সন্মেলনে ভূ-রাজনীতির বেশকিছু ব্যাপার উঠে এসেছে, যা নিয়ে অনেকেই কথা বলা শুরু করেছেন। বাংলাদেশ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সেখানে গিয়েছিলেন, যা কিনা বাংলাদেশকেও এই আন্তর্জাতিক রাজনীতির অংশ করে ফেলেছে। ২১টি সদস্য দেশ এবং ৭টি ‘ডায়ালগ পার্টনার’এর এই সংস্থা ভারত মহাসাগরের সমুদ্রসীমাতে অবস্থিত দেশগুলি নিয়ে গঠিত। এতবড় সংস্থা হলেও এর নাম কূটনৈতিক পরিসরের বাইরে তেমন একটা শোনা যায়নি। এটা প্রথম হেডলাইনে এলো প্রথম শীর্ষ সন্মেলনের মাঝ দিয়ে। এখন প্রশ্ন হলো, বিশ বছর পর এই শীর্ষ সন্মেলনের গুরুত্ব কতখানি? প্রথমে সংস্থাটির ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে।

ইন্ডিয়ান ওশান রিম এসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের সন্মানের বেশিরভাগটুকুই দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলাকে দেয়া হয়। ১৯৯৩ সালে ঠান্ডাযুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতায় ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলির মাঝে সহযোগিতার সম্প্রসারণকে গুরুত্বপূর্ণ আখ্যা দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পিক বোথার ভারত সফরের সময় প্রথম এই প্রস্তাব নিয়ে কথা হয়। এরপর ম্যান্ডেলা ১৯৯৫ সালে ভারত সফর করলে প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা শুরু হয়। মূলতঃ অর্থনৈতিক উন্নয়নকে লক্ষ্য রেখেই ১৯৯৭ সালে মরিশাসে প্রথম বৈঠক করে সাতটি দেশ – দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ওমান, সিঙ্গাপুর, কেনিয়া ও মরিশাস। অর্থাৎ দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ভারত আরও পাঁচটি দেশকে তালিকায় ঢোকায়। সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে নতুন সদস্যপদের জন্যে সকল বর্তমান সদস্যের একমত হতে হবে। ১৯৯৬ সালে আরও সাতটি দেশের কাছে সদস্য হবার প্রস্তাব পাঠানো হয়; এগুলি হলো – ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ইয়েমেন, তাঞ্জানিয়া, মাদাগাস্কার এবং মোজাম্বিক। ১৯৯৭ সালে প্রথম মন্ত্রীদের সভা হয় মরিশাসে। দ্বিবার্ষিক এই বৈঠকের দ্বিতীয়টি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৯ সালে মোজাম্বিকে, যেখানে বাংলাদেশ, ইরান, শেইসেলস, থাইল্যান্ড এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। একইসাথে প্রথম বারের মতো মিশর এবং জাপানকে আমন্ত্রণ জানানো হয় ‘ডায়ালগ পার্টনার’ হিসেবে, যে দেশগুলি ভারত মহাসাগরে অবস্থিত নয়। শেইসেলস ছাড়া বাকি সবাই ১৯৯৯ সালে এই সংস্থায় ঢুকে যায়, যখন এর সদস্যসংখ্যা হয় ১৮ এবং সাথে দুইজন ডায়ালগ পার্টনার।

১৯৯৯ সাল পর্যন্ত সংস্থাটির গুরুত্ব বেশ কমই ছিল, যা পরিবর্তিত হয়ে যায় ২০০০ সালে ওমানের ‘বিশেষ অধিবেশন’এ ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে চীন এবং ব্রিটেনের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে। পরের বছরের এপ্রিলে ওমানের আরেক সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয় ফ্রান্সকে। ভারত মহাসাগরে ব্রিটেন এবং ফ্রান্স উভয়েরই কিছু কৌশলগত দ্বীপ উপনিবেশ হিসেবে রয়েছে। ২০১২ সালে পরবর্তী বড় পরিবর্তনটি হয়। এবছরে ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে যোগ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, সংস্থাটির বয়স ১৫ বছর হতে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের চোখে পড়তে! আর ২০১৫ সালে অনেককে অবাক করে দিয়ে জার্মানি এই সংস্থায় ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে যোগ দেয়। ২০১১ সালে শেইসেলস, ২০১২ সালে কমরুস, এবং ২০১৪ সালে সোমালিয়া সদস্য হয়। তবে মানচিত্রের দিকে দেখলেই বোঝা যায় যে ভারত মহাসাগরের সব দেশ এই সংস্থায় নেই। যারা নেই, তাদের মাঝে রয়েছে – পাকিস্তান, মালদ্বীপ এবং মিয়ানমার। একটু বাড়িয়ে লোহিত সাগর এবং পারস্য উপসাগর যোগ করলে সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, ইরাক, কুয়েত, সুদান, এরিত্রিয়া, জিবুতিও চলে আসবে। যেহেতু সংস্থাটিই ম্যারিটাইম অঞ্চলের সংস্থা, তাই যেসব দেশের সমুদ্রসীমা ভারত মহাসাগরে রয়েছে, তারাই এক্ষেত্রে সদস্যপদের দাবিদার হতে পারে।

 
https://www.aspistrategist.org.au/wp-content/uploads/2015/06/8427451274_4f440722b4_z.jpg
আইওআরএ-এর মূল লক্ষ্যগুলি হলো – ১) বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহজীকরণ, ২) সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ (তথ্য আদানপ্রদান, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা), ৩) মৎস্য সম্পদ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, ৪) শিক্ষার আদানপ্রদান (সমুদ্র অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা), ৫) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা (নলেজ শেয়ারিং এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি), ৬) পর্যটনের উন্নয়ন, ৭) সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান এবং ৮) নারীর ক্ষমতায়ন। এর মাঝে প্রথম প্রথম ছয়টিকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইওআরএ আসলে কি কাজ করে?

সংস্থাটির কর্মকান্ডের দিকে তাকালে কিছু ব্যাপার পরিষ্কার হতে শুরু করবে। সংস্থার মূল লক্ষ্যগুলি হলো – ১) বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহজীকরণ, ২) সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ (তথ্য আদানপ্রদান, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা), ৩) মৎস্য সম্পদ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, ৪) শিক্ষার আদানপ্রদান (সমুদ্র অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা), ৫) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা (নলেজ শেয়ারিং এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি), ৬) পর্যটনের উন্নয়ন, ৭) সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান এবং ৮) নারীর ক্ষমতায়ন। এর মাঝে প্রথম প্রথম ছয়টিকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলির মাঝে রয়েছে প্রযুক্তির আদানপ্রদান (ইরানের উদ্যোগ), বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আদানপ্রদান (অস্ট্রেলিয়ার উদ্যোগ), পর্যটন উন্নয়নের সম্ভাব্যতা যাচাই (ওমানকে দায়িত্ব দেয়া হয়), ম্যারিটাইম ট্রান্সপোর্ট কাউন্সিল (ওমানের উদ্যোগ), কন্সট্রাকশন সুযোগ খোঁজা (মালয়েশিয়ার উদ্যোগ), ফিশারিজ সাপোর্ট ইউনিট (২০০৪ থেকে ওমানের দায়িত্বে, যদিও ২০০৩ সালে শ্রীলঙ্কার নাম বলা হয়েছিল), প্রেফারেনশিয়াল ট্রেড এগ্রিমেন্ট (ইরান, কেনিয়া, মরিশাস, ওমান, শ্রীলঙ্কা, তাঞ্জানিয়া এবং ইয়েমেন এতে আগ্রহী) এবং সর্বশেষে সাংস্কৃতিক প্রচার (ভারত অগ্রগামী ভূমিকা নেয় ২০০৮ থেকে)। এই প্রকল্পগুলিকে এগিয়ে নিতে যে অর্থ দরকার, তার অর্ধেকেরও বেশি এসেছে ভারতের কাছ থেকে। প্রায় ১ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার এখন পর্যন্ত এই সংস্থার ফান্ড হিসেবে এসেছে, যা এতবড় একটি সংস্থা পরিচালনা করতে নিতান্তই নগন্য। তবে সংস্থাটি অন্য উৎস থেকে ফান্ডের ব্যবস্থা করে দেয়। এক্ষেত্রে চীন, জাপান, জার্মানির মতো দেশগুলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। আর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র-বাণিজ্য রুট হওয়ায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা এখানে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির একটি।

সংস্থার ধনী দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত খুব একটা আগায়নি, যদিও ইরানকে ব্যালান্স করার একটা চিন্তা তাদের থাকবে। ইরান চাইছে মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকায় কিছুটা এগিয়ে যেতে। ওমান হয়তো চাইছে উপসাগরীয় জোটের বাইরে কিছু করতে। তবে ভারতের কাছে সমুদ্র নিরাপত্তা এবং সংস্কৃতির প্রসার ছাড়া খুব বেশি কিছু গুরুত্ব পায়নি।
https://www.mcci.org/media/133222/iora-map.jpg?anchor=center&mode=crop&width=640&height=370&rnd=131050318770000000
ভূরাজনৈতিক দিক থেকে আইওআরএ খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে। পৃথিবীর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ এই মহাসাগরের মাঝ দিয়ে গেছে। একারণে এই সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আঞ্চলিক শক্তিগুলির মাঝে চলছে প্রতিযোগিতা। সংস্থাটি ১৯৯৭ সালে চালু হলেও ২০০০ সালে চীনের অন্তর্ভুক্তির মাঝ দিয়ে আসল রাজনীতির সূচনা। এই অঞ্চলে চীনের অর্থনৈতিক শক্তির সাথে ভারত পেরে উঠছে না। সংস্থার বেশিরভাগ দেশই উন্নয়নের জন্যে চীনের সহায়তা চাইছে।


সংস্থাটির ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব

সংস্থাটির ধরন অর্থনৈতিক হলেও রাজনীতি এখানে সবচাইতে মূখ্য; আর ২০০০ সালে চীনের ঢোকার সাথে সাথে এটা ভূ-রাজনীতিতে মোড় নিয়েছে। প্রথম থেকেই ভারত চাইছিলো পাকিস্তানকে এই সংস্থায় ঢুকতে না দিতে। পাকিস্তানের ‘ডন’ পত্রিকায় বলা হয় যে সংস্থার বাকি সবগুলি দেশ পাকিস্তানের ঢোকার পক্ষে ছিল; শুধুমাত্র ভারতের কারণে যোগদান সম্ভব হয়নি। তবে এর মাধ্যমে দু’টি আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা এই সংস্থায় ঢুকতে পারেনি – প্রথমটি অবশ্যই ভারত-পাকিস্তান, এবং অপরটি সৌদি আরব-ইরান। এখানে মজার ব্যাপার হলো, এতো বড় একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি হবার পরেও এবং শুরু থেকেই জড়িত থাকার পরেও ভারতীয়রা এই সংস্থাকে তেমন গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে না। ‘কার্নেগি ইন্ডিয়া’র রাজা মোহন ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’এ লিখতে গিয়ে বলেন যে ভারতীয়দের মাঝে অর্থনৈতিক ছাড় দেয়ার প্রবণতা এতোটাই কম যে এক্ষেত্রে অন্য দেশগুলির সাথে বাণিজ্যের বিশেষ প্রসার ঘটানো তাদের পক্ষে সম্ভন নয়। আবার এই অঞ্চলে যোগাযোগের উন্নয়নের জন্যে চীন যে বিনিয়োগ নিয়ে আসছে, সেটাও ভারতের পক্ষে করা সম্ভব নয়। তবে এখানে শুধু চীন নয়, জার্মানি এবং জাপানের কথাও চিন্তা করতে হবে। এ অঞ্চলে জাপানের বিরাট বিনিয়োগ থাকলেও সে তুলনায় জার্মানির তেমটা নেই। তবে ব্রেক্সিটের পরবর্তী এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরমুখী নীতির দিকে ঝুঁকে পরার সময়ে জার্মানি যখন ইউরোপের নেতৃত্ব নিতে ফ্রান্সের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছে, তখন ভারত মহাসাগরে জার্মানির উপস্থিতিকে আলাদাভাবে দেখতেই হবে। আতমাজায়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দিন্না উইসনু ‘দ্যা জাকার্তা পোস্ট’এ লিখতে গিয়ে বলেন যে এবারের শীর্ষ সন্মেলন থেকে তিনি জেনেছেন যে জার্মানি এখন এই এলাকায় চীনের মতো বড় ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে ইচ্ছুক। পরাশক্তির দুর্বল হবার লক্ষণে জার্মানি হয়তো ভারত মহাসাগরের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। আবার পাকিস্তানকে বাইরে রাখার জন্যে ভারতের গোঁ ধরার প্রবণতাকে অনেকে চ্যালেঞ্জ করছেন।
http://images.indianexpress.com/2016/10/hamid-ansari-7591.jpg
ভারত থেকে প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট – দু’জনের কেউই যাননি; গিয়েছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হামিদ আনসারি। ইরান পাঠিয়েছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে; সংযুক্ত আরব আমিরাত একজন প্রতিমন্ত্রীকে পাঠিয়েছিল। ভারতের বক্তব্যের মাঝে “রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস”এর কথা তুলে ধরে পাকিস্তানকেই টার্গেট করা হয়। পাকিস্তানকে এই সংস্থায় ঢুকতে বাধা দেয়ায় ভারতের গোঁয়াড় স্বভাবটা বাকি সকল দেশের বিরক্তির কারণ হবে এবং ভারতের স্বার্থকে ক্রমেই অন্য দেশগুলি তাদের স্বার্থের পরিপন্থী হিসেবে দেখতে শুরু করবে। ভারতকে তারা দেখবে উন্নয়নে বাধাদানকারী শক্তি হিসেবে, যা কিনা ভারতকে অযথা শক্তি প্রয়োগে বাধ্য করবে।


জাকার্তা – সকল আলোচনার জন্ম যেখানে

দুই দশক পরেই কেবল প্রথম শীর্ষ সন্মেলন হলো সংস্থাটির, যা গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৩ সালে ভারতের কাছ থেকে চেয়ারম্যানের পদ যায় অস্ট্রেলিয়ার কাছে। ২০১৫ সালে সেটা যায় ইন্দোনেশিয়ার কাছে। তবে এর আগে কেউই শীর্ষ সন্মেলন ডাকেনি; ইন্দোনেশিয়াই সংস্থাটির গুরুত্বকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেল। অনেক দেশেরই রাষ্ট্র/সরকারপ্রধান যোগদান করেছিলেন সেখানে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের মধ্যে ছিলেন অস্টেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল, মালেশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক, মোজাম্বিকের প্রেসিডেন্ট ফিলিপে জাচিনটো নাইউসি, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমা, শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মৈত্রিপালা সিরিসেনা, তানজানিয়ার প্রেসিডেন্ট আলী মোহাম্মদ শিয়েন, ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট মনসুর হাদি (যিনি এখন সৌদি সমর্থনে হুথিদের সাথে যুদ্ধরত), ওমানের সুলতান কাবুস বিন সাঈদ আল সাঈদ, সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট মোহামেদ আবদুল্লাহি মোহামেদ এবং মাদাগাসকারের প্রেসিডেন্ট হেরি রাজাওনারিমামপিয়ানিনা। এছাড়াও অনান্য দেশ থেকে ছিলেন কোমোরুস-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট আজালি অ্যাসাউমানি, ভারতের ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হামিদ আনসারি, শেইসেলস-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট, সিঙ্গাপুরের উপ প্রধানমন্ত্রী, থাইল্যান্ডের উপ প্রধানমন্ত্রী, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এছাড়াও চীন, মিশর, জাপান, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, মিয়ানমার, মালদ্বীপ, ইউনেস্কোসহ সংস্থার ২১ সদস্য দেশ ও ৭ ডায়ালগ পার্টনারসহ মোট ৩৪টি আর্ন্তজাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন। খেয়াল করলে দেখা যাবে যে ভারত থেকে প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট – দু’জনের কেউই যাননি; গিয়েছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট। ইরান পাঠিয়েছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে; সংযুক্ত আরব আমিরাত একজন প্রতিমন্ত্রীকে পাঠিয়েছিল। সদস্য না হলেও মালদ্বীপ এবং মিয়ানমারের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেছিলেন।

‘দ্যা ডিপ্লোম্যাট’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় ইন্দোনেশিয়ার এই সংস্থাকে এগিয়ে নেয়া নিয়ে কিছুটা সন্দেহ পোষণ করা হয়। আসিয়ানের স্থবিরতাকে ইন্দোনেশিয়ার টার্গেট পরিবর্তনের কারণ হিসেবে তুলে ধরলেও সেই রিপোর্টে মতামত দেয়া হয় যে ইন্দোনেশিয়ার পক্ষে পূর্ব এশিয়াকে ছেড়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। তবে সেই লেখায় ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিমের দিকে যাওয়ার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বকে নিয়ে তেমন একটা আলোচনা করা হয়নি। ‘ফিনানশিয়াল এক্সপ্রেস’এর মতে এই সন্মেলনে ভারতের বক্তব্যের মাঝে “রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস”এর কথা তুলে ধরে পাকিস্তানকেই টার্গেট করা হয়। এর মাঝে এই সংস্থা যে রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তার প্রমাণ আবারও পাওয়া যাচ্ছে। ভারত যথারীতি সন্ত্রাসবাদ দমন এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তাকেই এই সংস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে উল্লেখ করে। তবে বাংলাদেশ এই অঞ্চলের মূল সমস্যা হিসেবে জলদস্যু, ডাকাতি, মানব পাচার, অস্ত্র পাচার ও অবৈধ মৎস্য আহরণ-কে উল্লেখ করে। একইসাথে আইওআরএ-কে এসব বিষয়ে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখার অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ। যেখানে ভারত এই সংস্থাকে খুব একটা গুরুত্বই দিচ্ছে না, সেখানে এমন একটি প্রস্তাব চিন্তার দাবিদার। প্রথমবারের মতো শীর্ষ সন্মেলন আয়োজন করে ইন্দোনেশিয়া এই অঞ্চলে এগিয়ে গেল। একসময় ভারত উঠতি শক্তি হিসেবে ইন্দোনেশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার সাথে একত্রে এই সংস্থাকে এগিয়ে নেবার কথা বলেছে। কিন্তু প্রথমবারের মতো শীর্ষ সন্মেলন ডেকে ইন্দোনেশিয়া ভারত এবং অস্ট্রেলিয়ার মাঝে তো পড়েই নি, বরং তাদের বাইপাস করেছে।
http://assets.rappler.com/3E618760326B4247B205FB5DD933980C/img/D7AC705B973B405BBA0CFF8195D54CCC/epa-20150520-indonesia-rohingya-refugees-001-640.jpg
সার্ক এবং আসিয়ান (সাথে পশ্চিমা-নিয়ন্ত্রিত জাতিসংঘ) মিয়ানমারের সমস্যার সমাধান দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এইওআরএ প্ল্যাটফর্মকে নিয়ে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়া নতুনভাবে ভাববে। জাকার্তায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই অঞ্চলের বড় সমস্যাগুলি হিসেবে যে কথাগুলি বলা হয়েছে, তা সেদিকেই পথ দেখাচ্ছে। সমুদ্র নিরাপত্তায় এই তিন দেশই বিনিয়োগ করবে, যা মিয়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টি করবে এবং মিয়ানমারকে ভারতের দিকে (সামরিক সাহায্যের জন্যে) আরও বেশি ঝোঁকাবে। আর যেহেতু রাখাইনে গোলযোগের ফলে চীনের তেল এবং গ্যাস পাইপলাইন সমস্যায় পড়েছে, তাই চীনও এই তিন দেশের একত্রে কাজ করাকে সমর্থন করবে। এই সমর্থনে চীন অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে সহায়তা দিতে আগ্রহী হবে। এভাবে এই তিন দেশের একত্রে কার্যকলাপ বঙ্গোপসাগরে ভারতের জন্যে হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।


জাকার্তা-পরবর্তী ভারত মহাসাগর কেমন হবে

জাকার্তায় আইওআরএ-এর শীর্ষ সন্মেলন একটি বড় ভূরাজনৈতিক ঘটনা ছিল। এর ফলে ভারত মহাসাগরে যেসকল ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, সেগুলিকে কয়েকটি পয়েন্টে বলা যায় –

১। ভারতের নেতৃত্ব হুমকির মুখে –

ভারত বুঝতে পারছে যে এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এই এলাকায় তার নেতৃত্ব নিশ্চিত হবে না। পাকিস্থানকে এই সংস্থায় ঢুকতে না দিলেও ২০০০ সালে ভারত চীনের ঢোকা প্রতিরোধ করেনি। সেই ভুলের খেসারত ভারতকে এখন দিতে হচ্ছে। চীন আইওআরএ-এর প্রকল্পগুলিতে বিনিয়োগ করতে কোন সমস্যা বোধ করবে না। শুধু তা-ই নয়, সমুদ্র অর্থনীতি এবং সমুদ্র নিরাপত্তাতেও চীন বিনিয়োগ করবে সানন্দে, কারণ এতে ভারত মহাসাগরে চীনের হাত শক্তিশালী হবে এবং ভারতের আধিপত্যে ভাটা পড়বে।

২। মিয়ানমার সমস্যা বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়াকে কাছে আনবে –

সমুদ্র নিরাপত্তায় অংশগ্রহণে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং বাংলাদেশের অনেক কিছু পাবার রয়েছে। বঙ্গোপসাগরে উদ্বাস্তু সমস্যা এই তিন দেশকেই সমস্যায় জর্জরিত করে রেখেছে। বিশেষতঃ মিয়ানমারের মুসলিমদের উপর অত্যাচারের কারণে এই সমস্যা প্রকট হয়েছে। এই তিনটি মুসলিম-প্রধান দেশে মিয়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টি করার পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থনের জন্ম হয়েছে, যার বহিঃপ্রকাশ পাওয়া যাবে দেশ তিনটির মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নেয়া কার্যকলাপে। [১] যদিও এই কার্যকলাপ এখনও তেমন কিছুই দেখা যায়নি, তবে সামনের দিনগুলিতে এই সমস্যা বঙ্গোপসাগরে এই তিন দেশকে কাছাকাছি আনবে। সার্ক এবং আসিয়ান (সাথে পশ্চিমা-নিয়ন্ত্রিত জাতিসংঘ) মিয়ানমারের সমস্যার সমাধান দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এইওআরএ প্ল্যাটফর্মকে দেশগুলি নতুনভাবে ভাববে। জাকার্তায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই অঞ্চলের বড় সমস্যাগুলি হিসেবে যে কথাগুলি বলা হয়েছে, তা সেদিকেই পথ দেখাচ্ছে। সমুদ্র নিরাপত্তায় এই তিন দেশই বিনিয়োগ করবে, যা মিয়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টি করবে এবং মিয়ানমারকে ভারতের দিকে (সামরিক সাহায্যের জন্যে) আরও বেশি ঝোঁকাবে। আর যেহেতু রাখাইনে গোলযোগের ফলে চীনের তেল এবং গ্যাস পাইপলাইন সমস্যায় পড়েছে, তাই চীনও এই তিন দেশের একত্রে কাজ করাকে সমর্থন করবে। এই সমর্থনে চীন অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে সহায়তা দিতে আগ্রহী হবে। এভাবে এই তিন দেশের একত্রে কার্যকলাপ বঙ্গোপসাগরে ভারতের জন্যে হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। যে কাজগুলি এই দেশগুলি সাম্প্রতিককালে মিয়ানমার সমস্যার সময় করা থেকে বিরত ছিল, সেগুলিই তারা তখন করে দেখাতে চাইবে।
http://www.eibela.com/upload/1462996856716.jpg
ভারত চেষ্টা করবে বাংলাদেশকে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে দূরে রাখতে। বিশেষ করে বাংলাদেশ এবং ইন্দোনেশিয়ার সাথে আলাদা আলাদা নিরাপত্তা-অর্থনৈতিক-বিনিয়োগ-প্রযুক্তি-সামরিক চুক্তি করে এই কাজে এগুতে চাইবে ভারত। কিন্তু মিয়ানমারের মুসলিম সমস্যা এবং মানব-অস্ত্র-মাদক চোরাচালান দেশগুলিকে আরও কাছে টেনে আনবে। বিশ্বের সবচাইতে বেশি মুসলিম-অধ্যুষিত দেশ ইন্দোনেশিয়াকে ভারত প্রভাব বিস্তার করতে বাধা দেবে; বিশেষত এই অঞ্চলের অন্য মুসমিল দেশগুলির সাথে সম্পর্কোন্নয়নের বিপক্ষে থাকবে ভারত।


৩। ভারত চাইবে বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়াকে আলাদা করতে –

সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া ভারতকে দুশ্চিন্তা দিয়েছে যথাক্রমে চীনের দিকে ঝুঁকে [২] এবং আস্ট্রেলিয়ার সাথে সম্পর্ককে প্রশ্নবিদ্ধ করে। [৩] ভারত চেষ্টা করবে বাংলাদেশকে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে দূরে রাখতে। বিশেষ করে বাংলাদেশ এবং ইন্দোনেশিয়ার সাথে আলাদা আলাদা নিরাপত্তা-অর্থনৈতিক-বিনিয়োগ-প্রযুক্তি-সামরিক চুক্তি করে এই কাজে এগুতে চাইবে ভারত। কিন্তু মিয়ানমারের মুসলিম সমস্যা এবং মানব-অস্ত্র-মাদক চোরাচালান দেশগুলিকে আরও কাছে টেনে আনবে। বিশ্বের সবচাইতে বেশি মুসলিম-অধ্যুষিত দেশ ইন্দোনেশিয়াকে ভারত প্রভাব বিস্তার করতে বাধা দেবে; বিশেষত এই অঞ্চলের অন্য মুসমিল দেশগুলির সাথে সম্পর্কোন্নয়নের বিপক্ষে থাকবে ভারত।

৪। চীন থাইল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইবে –

এখানে থাইল্যান্ডের কথাও উল্লেখ করা যেতে পারে, কারণ মিয়ানমারের উদ্বাস্তু সমস্যা এবং মানব-অস্ত্র-মাদক পাচার থাইল্যান্ডকেও সমস্যায় ফেলেছে। চীন এক্ষেত্রে থাইল্যান্ডকে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার সাথে থাকতে অনুপ্রাণিত করবে।
http://s3.india.com/wp-content/uploads/2015/03/sri-lanka-president-maithripala-sirisena-and-china-president-xi-jinping-023.jpg
শ্রীলংকা চাইবে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার সাথে যুক্ত হয়ে ভারতের প্রভাব কমাতে। ভারত সর্বদাই শ্রীলংকাকে নিয়ে ভয়ে রয়েছে; পাছে শ্রীলংকা ভারতের স্বার্থবিরুদ্ধ কোন কর্মকান্ডে যুক্ত হয়ে যায়। ভারতের পক্ষে যায় না – এমন যেকোন সংস্থায় শ্রীলঙ্কার অংশগ্রহণকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে ভারত। ভারত শ্রীলংকার উপরে চাপ বাড়াবে যাতে শ্রীলংকা ঐ তিন দেশের কাছাকাছি না যায়। এক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা ভারতে অনেকটাই ব্যালান্স করে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার সাথে শ্রীলঙ্কার পার্টনারশিপ সহজ করে দেবে।

৫। শ্রীলঙ্কা চাইবে ভারতের প্রভাব বলয় থেকে বের হতে –

শ্রীলংকা চাইবে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার সাথে যুক্ত হয়ে ভারতের প্রভাব কমাতে। ভারত সর্বদাই শ্রীলংকাকে নিয়ে ভয়ে রয়েছে; পাছে শ্রীলংকা ভারতের স্বার্থবিরুদ্ধ কোন কর্মকান্ডে যুক্ত হয়ে যায়। ভারতের পক্ষে যায় না – এমন যেকোন সংস্থায় শ্রীলঙ্কার অংশগ্রহণকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে ভারত। [৪] ভারত শ্রীলংকার উপরে চাপ বাড়াবে যাতে শ্রীলংকা ঐ তিন দেশের কাছাকাছি না যায়। এক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা ভারতে অনেকটাই ব্যালান্স করে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার সাথে শ্রীলঙ্কার পার্টনারশিপ সহজ করে দেবে।

৬। মালদ্বীপও যুক্ত হতে চাইবে –

শ্রীলংকার সাথে মালদ্বীপও চাইবে যুক্ত হয়ে যেতে। পাকিস্তান এই সংস্থায় ঢুকতে পারবে না যতক্ষণ ভারত থাকবে। তবে পাকিস্তান চাইবে মালদ্বীপ যুক্ত হোক। মালদ্বীপ সদস্য না হয়েও এবারের বৈঠকে যোগ দিয়েছিল। বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়া-শ্রীলঙ্কাও চাইবে মালদ্বীপকে। ভারত এতে মহাবিপদ দেখবে!

৭। বঙ্গোপসাগরের শক্তিদের ভারত আফ্রিকার উপকূলে যেতে বাধা দেবে –

পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে আরব সাগরে এই সংস্থার তেমন কাজ নেই। তারপরেও শ্রীলংকা-মালদ্বীপ-ওমান পেরিয়ে আফ্রিকার উপকূলের সাথে যোগাযোগ নতুন এক বাস্তবতার জন্ম দিতে পারে। ভারত চাইবে না বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়া আফ্রিকার উপকূলে অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-নিরাপত্তা সকল দিক থেকে প্রভাবশালী হোক। অন্যদিকে চীন ঠিক সেটাই চাইবে।

৮। ভারতের গোঁয়াড়তমি সকলের স্বার্থের বিরুদ্ধ হবে –

পাকিস্তানকে ঢুকতে বাধা দেয়ায় ভারতের গোঁয়াড় স্বভাবটা বাকি সকল দেশের বিরক্তির কারণ হবে এবং ভারতের স্বার্থকে ক্রমেই অন্য দেশগুলি তাদের স্বার্থের পরিপন্থী হিসেবে দেখতে শুরু করবে। ভারতকে তারা দেখবে উন্নয়নে বাধাদানকারী শক্তি হিসেবে, যা কিনা ভারতকে অযথা শক্তি প্রয়োগে বাধ্য করবে এবং এই এলাকার সকল দেশকে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার দিকে ছোটাবে। চীন এই তিন দেশের সাথে থাকবে; ফলে ভারতের প্রভাব কমতেই থাকবে।

৯। পশ্চিমা সহায়তা ছাড়া ভারতের জন্যে কঠিন সময় হাজির হবে –

বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের প্রভাব দিন দিন কমছে। ব্রেক্সিটের পর ইউরোপ এখন আর একমত থাকতেও পারছে না। এমতাবস্থায় ভারত তার পক্ষে পশ্চিমাদের কাছ থেকে খুব বড় কোন সহায়তা পাবে না। ভারতের একা (যদিও অস্ট্রেলিয়া সাথে থাকবে) চীনকে ব্যালান্স করতে গিয়ে যে গলদঘর্ম হবে, তাতে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার উপরে ওঠা সহজ হয়ে যাবে।





[১] ‘মিয়ানমারে মুসলিমদের ত্রাণ সাহায্যের নেপথ্যে’, সাম্প্রতিক দেশকাল, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
[২] ‘ফিলিপাইনের পথে মালয়েশিয়া’, সাম্প্রতিক দেশকাল, ০৫ জানুয়ারি ২০১৭
[৩] ‘ইন্দোনেশিয়া-আস্ট্রেলিয়া সামরিক সম্পর্ক স্থগিতের গুরুত্ব’, সাম্প্রতিক দেশকাল, ১২ জানুয়ারি ২০১৭
[৪] ‘ভারতের নতুন শঙ্কা শ্রীলঙ্কা’, সাম্প্রতিক দেশকাল, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৬

1 comment:

  1. চমৎকার বিশ্লেষন, ভারত চায় সবাই তার স্বার্থ দেখবে অথবা তার চোখ দিয়েি সব ঘটনা যাচাই বাছাই করবে। আমাদের আগে দেখা দরকার আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সাথে কিরুপ আচারন করে ভারত সফরের সময়। তিস্তা চূক্তি যে হচ্ছে না সেটা নিশ্চিত।

    ReplyDelete