Friday, 30 December 2016

২০১৭ সাল হতে যাচ্ছে নিয়ম ভাঙ্গার বছর

৩১শে ডিসেম্বর ২০১৬
এম ভি সি-চ্যাম্পিয়ন নামের রঙচঙ্গা এই জাহাজটি মার্কিন নৌবাহিনীর Military Sealift Command (MSC) নামের সংস্থার অধীন একটি জাহাজ, যার কাজ হচ্ছে সাবমেরিন এবং স্পেশাল ওয়ারফেয়ার-এ সহায়তা প্রদান। জাহাজটা দেখলে কেউ চিন্তা করবে না যে এটি সামরিক জাহাজ। এই সংস্থার জাহাজগুলি মূলতঃ বেসামরিক নাবিকেরা চালায়, যদিও মিশন পুরোপুরি সামরিক।

যুক্তরাষ্ট্রের Military Sealift Command (MSC) নামের যে সংস্থাটি আছে, তার কাজ হলো মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্যে বিশ্বব্যাপী পরিবহণের কাজ করা এবং আরও অনান্য সাপোর্ট দেয়া। এক’শ-এরও বেশি জাহাজ রয়েছে এই সংস্থার। এই জাহাজগুলির মাঝে রয়েছে সাপ্লাই জাহাজ, ওশানোগ্রাফিক সার্ভে জাহাজ, টাগবোট, স্যালভেজ ভেসেল, সাবমেরিন টেন্ডার, মিসাইল ট্র্যাকিং জাহাজ, উভচর অভিযানের জাহাজ, কেবল লেইং জাহাজ, স্পেশাল ওয়ারফেয়ার জাহাজ, পরিবহণ জাহাজ, ইত্যাদি। তবে এই সংস্থার সবচাইতে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, এর জাহাজগুলির চালনা করার জন্যে প্রায় ১০ হাজার লোকের যে জনবল রয়েছে, তার প্রায় ৮৮% হলো বেসামরিক। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের বহরে খাবার, অস্ত্র এবং গোলাবারুদ এবং ডেস্ট্রয়ার-ফ্রিগেট ইত্যাদি জাহাজগুলিতে জ্বালানি সরবরাহ করে এই জাহাজগুলি। তাদের সাবমেরিন ফ্লিটের চলাচলের সুবিধার জন্যে বিশ্বব্যাপী সমুদ্র তলদেশের ম্যাপিং করে এই সংস্থার সার্ভে জাহাজগুলি। রঙচঙ্গা কিছু ভাড়া করা জাহাজ রয়েছে এই সংস্থার যেগুলি মার্কিন স্পেশাল ফোর্স ব্যবহার করে বিভিন্ন গোপন মিশনে; বোঝার উপায় নেই যে সেগুলি সামরিক জাহাজ! তবে এই সংস্থার বড় একটি অংশ হলো পরিবহণ জাহাজ। যুক্তরাষ্ট্র যখন কোন দেশে যুদ্ধ করতে যায়, তখন সেখানে শুধু সৈন্যরা কিছু হাল্কা অস্ত্রসহ বিমানে গিয়ে অবতরণ করে। এরপর সেই দেশের যদি সমুদ্র বন্দর থাকে, সেখানে বাকি সকল ভারি অস্ত্র এবং গোলাবারুদ খুব দ্রুত পৌঁছে দেয় এই সংস্থার পরিবহণ জাহাজগুলি। এসব জাহাজে আর্টিলারি শেল, বিমান থেকে ফেলা বোমা, মিসাইল, এবং অনান্য গোলাবারুদসহ জ্বালানি, ট্যাঙ্ক, এপিসি, আর্টিলারি, গাড়ি, ট্রাক, ইত্যাদি সবসময় ভরে রাখা হয়। জাহাজগুলি পৃথিবীর বিভিন্ন কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নোঙ্গর করে রাখা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ভারত মহাসাগরে দিয়েগো গার্সিয়া নামের একটি ব্রিটিশ দ্বীপ রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে। এখানে ২০টি জাহাজ সবসময় নোঙ্গর করে রাখা হয়। নির্দেশ পাওয়া মাত্রই জাহাজগুলি কোন সমুদ্রবন্দরে গিয়ে তাদের কার্গো নামিয়ে দেবে। এতে ভারত মহাসাগরীয় যেকোন দেশে খুব অল্প সময়ের মাঝেই তারা অপারেশনে যেতে সক্ষম। বুঝতে অপেক্ষা রাখে না যে মিশনগুলি পুরোপুরিভাবে সামরিক।
হুইলার নামের এই জাহাজটি নৌবাহিনীর জাহাজ, কিন্তু চালনা করে বেসামরিক লোকেরা। জাহাজটির কাজ হলো স্থলভাগ থেকে চার মেইল দূর থেকে পাইপের মাধ্যমে তেল সরবরাহ। বিশ্বের কোন স্থানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি করা হলে সেখানে যদি ভালো সমুদ্রবন্দর না থাকে, তাহলে এই জাহজের মাধ্যমে তেল সমুদ্রে দাঁড়িয়ে থাকা ট্যাঙ্কার থেকে স্থলভাগে নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সামরিক মিশনে বেসামরিক লোকদের ব্যবহার তারা করতে পারে, কারণ কোনটা সকল সংজ্ঞা তাদের তৈরি। তারা অন্যদের জন্যে সংজ্ঞা তৈরি করে, যা তারা নিজেরা মানতে বাধ্য নন।
 
তাহলে প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি দেশ এরকম সামরিক মিশনে বেসামরিক লোকদের ব্যবহার করছে কেন? এর উত্তর পাওয়া যাবে সেই সংজ্ঞায় যে সংজ্ঞাটি আসলে শুধু অন্যদের জন্যে, তাদের জন্যে নয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতো আদর্শিক শক্তির দেশগুলি অন্যদের জন্যে সংজ্ঞা তৈরি করে বিশ্বে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে। বাকি বিশ্বের মানুষ ঐ সংজ্ঞার মাঝেই নিজেদের চিন্তাকে ধরে রাখে। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের নৌবাহিনীতে জাহাজের যে ক্যাটাগরি ব্যবহার করা হয়, তা আটলান্টিকের ওপাড় থেকে সংজ্ঞায়িত হয়ে আসা। ডেস্ট্রয়ার-ফ্রিগেট-করভেট-ওপিভি ইত্যাদি জাহাজের সংজ্ঞা কোন দেশের নৌবাহিনীই বানাতে সক্ষম হয় না। অর্থাৎ এই সংজ্ঞায়িত করা কয়েকটি ক্যাটাগরির বাইরে কোন জাহাজ তৈরি করে না কেউ। যদি কেউ করে, সেটা যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের কেউ করে। অন্ততঃ এটাই হয়ে আসছিলো এতোকাল।
ভারত মহাসাগরের দ্বীপ দিয়েগো গার্সিয়াতে নোঙ্গর করে আছে পরিবহণ জাহাজ, যার পেটের মাঝে রয়েছে বিপুল পরিমাণ রসদ। নির্দেশ পেলেই এশিয়ার যেকোন উপকূলের দিকে রওয়ানা হবে এই জাহাজগুলি। সামরিক পণ্যবাহী এই জাহাজগুলি বেসামরিক লোকেরা চালায়। সারা দুনিয়ার জন্যে সামরিক-বেসামরিক নিয়ম তৈরি করলেও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের বেলায় সেই নিয়ম মানে না।



ব্ল্যাক পাউডার নামের এই জাহাজটিও সামরিক জাহাজ; স্পেশাল ওয়ারফেয়ারে ব্যবহৃত হয়। যুক্তরাষ্ট্র নিজেরা এতকাল নিয়ম তৈরি করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কেউ কেউ তাদের তৈরি করা এসব নিয়ম ভঙ্গ করছে। গত ২৫ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র তার নিয়মের বাইরে যেতে দেখেনি কাউকেও। গত কয়েক বছর ধরে এর ব্যতিক্রম হচ্ছে। ২০১৬-তে অনেক নিয়ম ভঙ্গ করা হয়েছে। আর ২০১৭ হতে যাচ্ছে নিয়ম ভাঙ্গারই বছর!

  যে সমস্যায় যুক্তরাষ্ট্র আজ পড়েছে তা হলো তাদের সংজ্ঞার বাইরেও কেউ কেউ জাহাজ বানাচ্ছে। তাদের সংজ্ঞার ক্যাটাগরির মাঝে যে ব্যবধানগুলি রাখা হতো এতোকাল, সেই ব্যবধান মানা হচ্ছে না কোথাও কোথাও। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এখন যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে কোন দেশের নৌবাহিনী কতটা শক্তিশালী, তাহলে সবাই হিসেব করতে লেগে যায় যে কার কতটা ডেস্ট্রয়ার, কতটা ফ্রিগেট, কতটা করভেট, ইত্যাদি রয়েছে। কিন্তু এমন যদি জাহাজ থাকে যেটা এসব ক্যাটাগরিতে পড়ে না? সেই নৌবাহিনীকে মূল্যায়ন করা হবে কি করে? এরকম উদ্ভট সমস্যা তো যুক্তরাষ্ট্রের মতো আদর্শিক শক্তির মোকাবিলা করার কথা নয়; কারণ তারা তো সংজ্ঞা তৈরি করেন; অন্যের সংজ্ঞার পাঠোদ্ধারের চেষ্টায় থাকেন না কখনও। অন্ততঃ এটা তাদের গত ২৫ বছরে করতে হয়নি। এখন সেই সংজ্ঞা পরিবর্তন হচ্ছে বিভিন্ন স্থানে; পরিবর্তিত হচ্ছে ‘নিয়ম’। চেনাজানা ক্যাটাগরি সম্পর্কে সবাই ওয়াকিবহাল থাকে। সেটার উপরে ভিত্তি করে শত্রুকে মোকাবিলার একটা পরিকল্পনাও থাকে। কিন্তু ক্যাটাগরি মানা না হলে তো পুরো পরিকল্পনাই সমস্যায় পড়ে যায়! এতকালের পরিকল্পনায় কেউ পানি ঢেলে নষ্ট করে দিলে অনুভূতিটা সুখকর হবার কথা নয়।

পশ্চিমাদের তৈরি করা ‘নিয়ম’ এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে প্রতিনিয়ত। ‘নিয়ম’কে এখন নিয়মিতভাবে ‘অনিয়ম’ করা হচ্ছে। কিছুতেই যেন এগুলি ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। বিশ্বের উপরে পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিনিধিত্বকারী যুক্তরাষ্ট্রের যে নিয়ন্ত্রণ একসময় ছিল, তা এখন বিরাট প্রশ্নের মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়াই নিয়ম ভাঙ্গা হচ্ছে; আবির্ভাব হচ্ছে নতুন নিয়মের। গত ক’বছরে এসব ‘নিয়ম-ভাঙ্গা’ নিয়ম বেড়েই চলেছে। ২০১৬ সালে এসব অনেক দেখা গেছে। আর ২০১৭ সাল হতে যাচ্ছে নিয়ম ভাঙ্গার বছর।

No comments:

Post a Comment