Showing posts with label Nationalism. Show all posts
Showing posts with label Nationalism. Show all posts

Friday, 30 September 2022

ইতালির ডানে মোড়… ইউরোপের জন্যে এটা কেমন বার্তা?

৩০শে সেপ্টেম্বর ২০২২
 
ইতালির নির্বাচনে জেতার পর কট্টর ডানপন্থী কোয়ালিশনের তিন নেতা মাত্তেও সালভিনি, সিলভিও বারলুসকোনি এবং জর্জিয়া মেলোনি। ইতালিতে ফ্যাসিস্ট রাজনীতি কোন না কোন ফর্ম্যাটে চলেছে। নব্য-ফ্যাসিস্টরা তাদের কথাগুলি পরিবর্তন করেছে। কিন্তু তাদের কথার কেন্দ্রে ছিল অভিবাসী নীতি; যেটাকে তারা ইতালির অর্থনৈতিক দৈন্যতার মাঝে সকল সমস্যার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। মেলোনির সরকার কতদিন টিকবে সেটা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও অশ্বেতাঙ্গ অভিবাসীদের উপর এর বিরূপ প্রভাব যে বাড়বে, তা নিশ্চিত।

সেপ্টেম্বরের ইতালির নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী জাতীয়তাবাদীরা বিশাল বিজয় পেয়েছে। নির্বাচনের সর্বশেষ হিসেবে বলা হচ্ছে যে, জর্জিয়া মেলোনির ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’, মাত্তেও সালভিনির ‘লেগা নর্ড’ এবং সিলভিও বারলুসকোনির ‘ফোর্তসা ইতালিয়া’ দলের ডানপন্থী কোয়ালিশন প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এর মাঝে মেলোনির দল পেয়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ ভোট। ইতালির সকল পত্রিকাই মেলোনির দলের বিজয়ের ব্যবধান নিয়ে হেডলাইন করে। কেউ কেউ বলে যে, মেলোনি ইতালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন। তবে মাত্র ৬৪ শতাংশ ভোটার ভোট দেয়ার কারণে অনেকেই এই ভোটের গুরুত্বকে কিছুটা হলেও কম হিসেবে দেখছেন বলে বলছে ‘ডয়েচে ভেলে’। যারা ডানপন্থী দলের পক্ষে ভোট দেয়নি, তারা আশা করছেন দেশের বাকি জনগণকে সাথে নিয়েই যেন সরকার কাজ করে। তবে এই মুহুর্তে জীবনযাত্রার খরচ মারাত্মক বেড়ে যাওয়ায় এবং ইউক্রেনে যুদ্ধ চলমান থাকায় প্রথম দিন থেকেই মেলোনির সরকার চ্যালেঞ্জের মাঝে পড়বে। নির্বাচিত হবার পর জর্জিয়া মেলোনি তার প্রথম ভাষণে বলেন যে, তিনি ইতালিকে একত্রিত করার চেষ্টা করবেন।

ইতালিতে ডানপন্থী রাজনীতির ইতিহাস

৪৫ বছর বয়স্ক মেলোনির দল ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’ ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠা পেলেও আগের কিছু ইতিহাসের সাথে দলটার সম্পর্ক রয়েছে বলে বলছেন অনেকে। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, ১৯২২ সালে ইতালিতে বেনিতো মুসোলিনির নেতৃত্বে ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী ‘ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টি’ ক্ষমতা দখল করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইতালি প্রথমে নাজি জার্মানির পক্ষে থাকলেও মুসোলিনির পতনের পর তারা মিত্রপক্ষে যোগ দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬ সালে মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট সরকারের চিফ অব স্টাফ গিওরগিও আলমিরান্তের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয় নব্য-ফ্যাসিস্ট দল ‘ইতালিয়ান সোশাল মুভমেন্ট’ বা ‘এমএসআই’। বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ফ্যাসিস্ট সমর্থকরা এই দলে যোগদান করতে থাকে। প্রায় তিন দশক ধরে চলা এর রাজনীতিতে তারা ১০ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি। তবে ইতিহাসবিদ পল জিনসবর্গ মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, এই দল যে এতকাল টিকে থেকেছিল, সেটাই বড় বিষয়। ইতালির দক্ষিণের জনগণ, শহরাঞ্চলের গরীব মানুষেরা এবং নিম্ন মধ্যবিত্তরা অনেকেই এদের পক্ষে ভোট দিয়েছে। জিয়ানফ্রাঙ্কো ফিনির অধীনে ১৯৯০এর দশকে এই দলে পরিবর্তন আসে। তিনি দলের বক্তব্যগুলিকে পরিবর্তন করেন এবং ১৯৯৩ সালে রোমের মেয়র নির্বাচনে ৪৭ শতাংশ ভোট পেয়ে সকলকে অবাক করে দেন। পরের বছরেই তিনি তার দলের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘ন্যাশনাল এলায়েন্স’। এই সময়টাতেই রোমের খেটে খাওয়া একজন মহিলার সন্তান জর্জিয়া মেলোনি ‘এমএসআই’তে যোগদান করেন এবং পরে ‘ন্যাশনাল এলায়েন্স’এর যুব দলের নেতা হয়ে যান।

একসময় মুসোলিনিকে বিংশ শতকের সেরা রাজনীতিবিদ বলে আখ্যা দিলেও জিয়ানফ্রাঙ্কো ফিনি তার মতামতকে পরিবর্তন করেন এবং ২০০৩ সালে ইস্রাইল সফর করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গণহত্যার শিকার ইহুদিদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সেখানে গিয়ে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ইতালির ইহুদী বিদ্বেষী আইনের সমালোচনা করেন। জর্জিয়া মেলোনিও ২০০৯ সালে সিলভিও বারলুসকোনির সরকারের মন্ত্রী থাকার সময় ইস্রাইল সফর করে একই স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ২০১১ সালে ইইউএর প্রভাবে ইতালিতে গঠিত সরকারে মেলোনি যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। এবং ২০১২ সালে ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি তার দলকে ‘পুরোনো ঐতিহ্যের জন্যে নতুন দল’ হিসেবে পরিচিত করান। তবে ২০২২ সালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত তার দল ১০ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি।

মেলোনির ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’র লোগো হলো ইতালির জাতীয় পতাকার তিন রঙের আগুন। এর আগের ‘এমএসআই’ এবং ‘ন্যাশনাল এলায়েন্স’এর লোগোও সেটাই ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ‘রুটগার্স ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর কোরি ব্রেনান ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’কে বলছেন যে, রাজনীতিতে লোগোটা ব্র্যান্ডিংএর মতো গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ এটাকে খোঁজে এবং অনুসরণ করে। ইতালিতে মুসোলিনির তৈরি করা অনেক কিছুই এখনও টিকে আছে। বড় বড় স্থাপত্য ছাড়াও রোমের ম্যানহোলের ডাকনার এক-চতুর্থাংশের উপরে লেখা রয়েছে ‘এসপিকিউআর’। যার অর্থ হলো, ‘রোমের সিনেট এবং জনগণ’। মুসোলিনি তার সাম্রাজ্যকে প্রাচীন রোমের সাথে তুলনা দিতে এটা ব্যবহার করতেন। অনেক ম্যানহোলে ফ্যাসিট লোগোটাও রয়েছে। যদিও ইতালিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ফ্যাসিস্ট দল নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তথাপি ডানপন্থীরা এখনও ফ্যাসিস্ট স্যালুট ব্যবহার করে।

বড় বড় স্থাপত্য ছাড়াও রোমের ম্যানহোলের ডাকনার এক-চতুর্থাংশের উপরে লেখা রয়েছে ‘এসপিকিউআর’। যার অর্থ হলো, ‘রোমের সিনেট এবং জনগণ’। মুসোলিনি তার সাম্রাজ্যকে প্রাচীন রোমের সাথে তুলনা দিতে এটা ব্যবহার করতেন। অনেক ম্যানহোলে ফ্যাসিট লোগোটাও রয়েছে। ইউরোপে ডানপন্থী রাজনীতি কখনোই বন্ধ করা হয়নি। উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকেরা লিবারাল রাজনৈতিক ব্যবস্থার মাঝেই তাদের কর্মকান্ড চালিয়ে গেছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে অভিবাসী সংকটের পর থেকে ইউরোপজুড়ে ডানপন্থীদের উত্থান হয়েছে। যেকারণে ইতালির এই নির্বাচন পুরো ইউরোপের জন্যেই গুরুত্বপূর্ণ।

 ডানপন্থীরা কিভাবে ইতালির নির্বাচনে জিততে পারলো?

রোমে ‘ইইউ’এর পররাষ্ট্র বিষয়ক কাউন্সিলের প্রকল্প ব্যবস্থাপক টেরেসা কোরাটেলা ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, মেলোনির এই অবস্থানে আসার সবচাইতে বড় কারণ হলো, ২০১৮ সাল থেকে ইতালিতে যতগুলি অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়েছে, তিনি সেগুলির কোনটারই অংশ ছিলেন না। আর দ্বিতীয়তঃ তার কোয়ালিশন সহযোগী মাত্তেও সালভিনি এবং সিলভিও বারলুসকোনি এই মুহুর্তে তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে সবচাইতে খারাপ সময় পার করছেন। ইতালির আগের সরকার প্রধানদের অনেকেই প্যারিস এবং বার্লিনের নেতৃত্বের সাথে যেমন সমঝোতা করে চলতে বাধ্য হয়েছেন, তিনি হয়তো সেই পথে নাও হাঁটতে পারেন। অন্ততঃ ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত তিনি হাঙ্গেরি এবং পোল্যান্ডের ডানপন্থী নেতৃত্বের সাথে বেশি কাছের সম্পর্ক রেখেছিলেন।

‘এসোসিয়েটেড প্রেস’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে রোমের ‘ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার্স’এর ডিরেক্টর নাথালি টচ্চি ডানপন্থীদের জয়কে ইতালির রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতার সাথে যুক্ত করেন। ডানপন্থীরা জিতেছে, এর অর্থ এই নয় যে, ইতালিয়রা ফ্যাসিস্ট হয়ে গেছে। এদের জয়ের মূল কারণ হলো, জনগণ ইতালির রাজনীতির ব্যাপারে যারপরনাই ক্ষুব্ধ; তারা পরিবর্তন চাইছে। তারা ভিন্ন একটা দলকে ভোট দিতে চাইছিল।

তবে ‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ডানপন্থীরা ভোট পাবার জন্যে এমন কিছু ইস্যুকে বেছে নিয়েছে, তা চিন্তা করার মতো। মাত্তিও সালভিনির নির্বাচনী এলাকা ফেরারা কিভাবে বামপন্থী থেকে ডানপন্থী হয়ে গেলো তার উত্তর খুঁজতে ‘বিবিসি’ বলছে যে, সেখানকার জনগণ মনে করছে যে, অভিবাসীদের কারণে তাদের শহরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে এবং সাধারণ ইতালিয়রা অর্থনৈতিক সমস্যা পড়েছে। অথচ প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এই অঞ্চলটা ইতালির অনেক অঞ্চলের চাইতে অধিকতর সমৃদ্বশালী। এখানকার সমস্যা হলো এখানকার স্থবির জনসংখ্যা; যেটার কারণে এখানকার মানুষের অর্থনৈতিক জীবনে পরিবর্তন আসছে না; তাদের ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নতি হচ্ছে না। ডানপন্থীরা বলছে যে, এখানকার অর্থনৈতিক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে অভিবাসীদের কারণেই; আর সেটাই অনেক মানুষ সমর্থন করছে। অথচ একসময় এই শহরে ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অপরাধে অনেক মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে; যাদের মাঝে কেউ কেউ এখনও বেঁচে আছেন। তাদের জীবদ্দশাতেই তারা দেখতে পাচ্ছেন যে, ইতালি আবারও উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির দিকে ধাবিত হচ্ছে।

অনেকেই ডানপন্থীদের জয়ের পিছনে কিছু ষড়যন্ত্র থিউরির কথা বলছেন; যা মানুষ বিশ্বাস করছে। ‘ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলি’র প্রফেসর লরেন্স রোজেনথাল ‘আল জাজিরা’কে বলছেন যে, মেলোনি বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে মানুষকে জাগিয়ে তুলেছেন; যার মাঝে রয়েছে নারীবাদী ইস্যুগুলি। তিনি ইতালির পরিবারগুলির স্বার্থ নিয়ে কথা বলেছেন; শরণার্থী থামাতে সীমানা পাহাড়া দেবার কথা বলেছেন। তিনি সেই থিউরির কথা বলে জনগণকে ক্ষেপিয়েছেন, যেখানে বলা হচ্ছে যে, ‘গ্লোবাল এলিট’রা পশ্চিমা দেশগুলির আদিবাসীদেরকে অশ্বেতাঙ্গ অভিবাসী দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে চাইছে। এই থিউরিটাই জনগণের ক্রোধের কেন্দ্রে রয়েছে; যা তিনি ব্যবহার করেছেন। সবগুলি পশ্চিমা দেশেই এই চিন্তাটা ঘনীভূত হচ্ছে এবং এরা সকলেই অশ্বেতাঙ্গদেরকে তাদের সমস্যার কারণ হিসেবে দেখছে।

মেলোনি কিছুদিন আগেই এক বক্তব্যে বলেছেন যে, বামপন্থীরা রক্ষণশীলদের সকল বিশ্বাসের উপরে হামলা করেছে। তিনি সিসিলির উপকূলে আফ্রিকা থেকে আসা অভিবাসীদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ও মেক্সিকোর সীমানার তুলনা করেন। তিনি বলেন যে, হাজারো অভিবাসী শহরের বস্তিগুলি ভরে ফেলছে; এবং তাদের কারণে ইতালির জনগণের পারিশ্রমিক কমে গেছে; এই অভিবাসীরা অনেকেই বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত। মেলোনি ইউরোপের অন্যান্য দেশের জনগণের উদ্দেশ্যে যখন কথা বলছেন, তখন তার কথাগুলি বেশ স্পস্ট। স্পেনের কট্টর ডানপন্থী ‘ভোক্স’ পার্টির এক র‍্যালিতে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন যে, তিনি স্বাভাবিক পরিবারের পক্ষে; সমকামি লবির পক্ষে নন। মানুষের লিঙ্গ পরিচয়ের ব্যাপারে তিনি একাত্মতা প্রকাশ করলেও লিঙ্গ নিয়ে আদর্শের বিরোধী।

 
জর্জিয়া মেলোনির পিছনে 'ব্রাদার্স অব ইতালি'র লোগো; যেখানে রয়েছে ইতালির পতাকার তিন রঙের আগুন। এর আগের নব্য-ফ্যাসিস্ট দল ‘ইতালিয়ান সোশাল মুভমেন্ট’ বা ‘এমএসআই’ এবং ‘ন্যাশনাল এলায়েন্স’এর লোগোও ছিল এটাই। রাজনীতিতে লোগোটা ব্র্যান্ডিংএর মতো গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ এটাকে খোঁজে এবং অনুসরণ করে।

ডানপন্থীদের নীতি কি ইইউএর সাথে সাংঘর্ষিক হবে?

ইইউ পার্লামেন্টে জার্মানির ক্ষমতাসীন সোশালিস্ট দলের প্রতিনিধি এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্যাটারিনা বারলি ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, মেলোনি ক্ষমতায় যাবার পরে তার পূর্বের নীতির মতোই চলবেন, নাকি পরিবর্তিত হবেন, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে এটা নিশ্চিত যে, অর্থনৈতিক এবং আর্থিক নীতির ক্ষেত্রে তিনি রক্ষণশীল ভূমিকা নেবেন; আর মানবাধিকার, নারীর অধিকার, এবং সংখ্যালঘুদের অধিকারের মতো আদর্শিক বিষয়ের ক্ষেত্রে খুবই কঠোরভাবে জনমতের উপরে চলবেন। ইউরোপের খারাপ সময়ে তার জাতীয়তাবাদী এজেন্ডাগুলি ইউরোপকে একত্রিত করবে না। ক্যাটারিনা বারলি বলছেন যে, তাদের অভিজ্ঞতায় এধরনের সরকারগুলির ইইউএর মাঝে ছাড় দেয়ার প্রবণতা থাকে না। অথচ ইইউএর নীতি তখনই তৈরি করা সম্ভব, যখন সেখানে একেকটা দেশের ছাড় দেয়ার প্রবণতা থাকে। যদি একেকটা দেশ মাঝে মাঝে নিজের স্বার্থ দেখে, তাহলে সেটা মেনে নেয়া যায়। কিন্তু সেটা যদি চলতেই থাকে, তাহলে ইইউ আর ইইউ থাকবে না; তা হয়ে যাবে কিছু স্বার্থপর মানুষের ক্লাব। বারলি বলছেন যে, এখন পর্যন্ত মেলোনি ইউক্রেন যুদ্ধে ইউক্রেনের পক্ষে কথা বললেও তার কোয়ালিশন সহযোগী মাত্তেও সালভিনি এবং সিলভিও বারলুসকোনি ভ্লাদিমির পুতিনের সমর্থক বলে পরিচিত। কাজেই এখনই বলা যাচ্ছে না যে, ইউক্রেন যুদ্ধে ইতালির অবস্থান কি হবে। তবে ইইউএর জ্বালানি সংকটের মাঝে ইতালি খুব সম্ভবতঃ রুশ জ্বালানির উপরে নির্ভরশীল দেশগুলির জন্যে কোন ছাড় দিতে রাজি হবে না।

মেলোনির ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’ দলের সংসদ সদস্য ইলেনিয়া লুকাসেলি ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, ইতালির জনগণ রক্ষণশীল; তাদের দলও সেইরকমই। অভিবাসী, সমকামিদের অধিকার, গর্ভপাতের অধিকার ইত্যাদি আদর্শিক বিষয় এই মুহুর্তে তাদের দলের কাছে অর্থনৈতিক সমস্যার চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইতালির রক্ষণশীল জনগণ প্রকৃতপক্ষে শরণার্থীদের জন্যে জীবন দিতে প্রস্তুত নয়। লুকাসেলি বলছেন যে, তাদের দলের সাথে মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট দলের কোন সম্পর্ক নেই। এই দলের সাথে সম্পর্কিত কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে সোশাল মিডিয়াতে কোন উগ্রপন্থী কথা বলে থাকে, সেটা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন; কারণ এই দলটা অনেক বড়। প্রতিটা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে দলের কোন নীতির মাঝে উগ্রতা নেই।

ডানপন্থীদের বিজয়কে কে কিভাবে দেখছে?

‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জার্মানির ক্ষমতাসীন বামপন্থী সোশালিস্ট সরকার ইতালির নির্বাচনের ব্যাপারে রয়েসয়ে বক্তব্য দিচ্ছে। তবে উগ্র ডানপন্থী ‘অলটারনেটিভ ফর জার্মানি’ বা ‘এএফডি’ দল ইতালির নির্বাচনে খুশি। তারা বলছে যে, সুইডেন এবং ইতালিতে ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলির বিজয় প্রমাণ করছে যে, বামপন্থী রাজনীতি এখন অতীতের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফ্রান্স এবং স্পেনের ডানপন্থী বিরোধী দলগুলিই মেলোনির বিজয়ে প্রথম অভিনন্দন জানিয়েছে। এছাড়াও ইইউএর মাঝে ‘ইউরোস্কেপটিক’ পোল্যান্ড এবং হাঙ্গেরির সরকারও তাদের উৎফুল্লতা প্রকাশ করেছে। তবে ইইউএর বাকি দেশগুলি মেলোনির ব্যাপারে একেবারেই আশাবাদী নয়; কারণ তিনি এতদিন তার নীতিতে ইতালির স্বার্থকেই প্রাধান্য দেবার কথা বলেছেন। যদিও ইইউএর পক্ষ থেকে নীতিগত কারণে ইতালির নির্বাচন নিয়ে কোন মন্তব্য করা হয়নি, তথাপি ইইউ কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইয়েন বলেছেন যে, যেসব দেশ ইইউএর আদর্শকে সন্মান করবে না, সেসব দেশকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো পদ্ধতি ইইউএর জানা রয়েছে।

জার্মানির ‘গ্রিন পার্টি’র সংসদ সদস্য টোবিয়াস বাখেরলে ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না যে, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে সহায়তা দেয়া এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবরোধ চালিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে ইতালির ডানপন্থী দলের নীতি কি হবে। তবে এটা নিশ্চিত যে, বিভিন্ন ইস্যুতে ইইউএর অন্যান্য দেশের ডানপন্থী সরকারগুলির সাথে ইতালির এই সরকার তাল মেলাবে। বাখেরলে পুরো ইউরোপ জুড়ে ডানপন্থী দলগুলির জয়জয়কারে যথেষ্ট চিন্তিত। তিনি মনে করছেন না যে, ডানপন্থীদের উত্থানের ব্যাপারে শুধুমাত্র তার দলের মতো বামপন্থী দলগুলিরই চিন্তা করতে হবে। তিনি বিশেষ করে উগ্র ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী চিন্তার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়াটা সকলের কর্তব্য বলে মনে করেন; কারণ এই চিন্তাগুলি গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে কাজ করছে।

‘আল জাজিরা’ বলছে যে, পশ্চিমা দেশগুলিতে ডানপন্থী জাতীয়তাবাদীরা কিছু ইস্যুতে একমত হচ্ছে; যার মাঝে রয়েছে অভিবাসী ইস্যু, গর্ভপাতের অধিকার, সমকামিদের অধিকার; এবং এর সাথে কিছু ইস্যু, যেগুলিকে ডানপন্থীরা ‘গ্লোবালিস্ট’ ইস্যু বলে আখ্যা দিচ্ছে; অর্থাৎ তারা বলছে যে, সেগুলি দুনিয়ার সমস্যা হলেও তাদের দেশের সেখানে মাথা ঘামাবার দরকার নেই। এই চিন্তগুলি যুক্তরাষ্ট্রেও অনেকেই সমর্থন করেন; যারা মূলতঃ রিপাবলিকান দলের সমর্থক। রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ এবং টম কটন; কংগ্রেস সদস্য মারজোরি টেইলর গ্রিন, এবং প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পেও সকলেই ইতালির ডানপন্থী নেতাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। কংগ্রেস সদস্য লরেন বুবার্ট এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, বামপন্থীরা শুধু ধ্বংসই করেছে; যা সারা দুনিয়ার মানুষ বুঝতে পারছে। রিপাবলিকানপন্থী মিডিয়া ‘ফক্স নিউজ’এর প্রভাবশালী সাংবাদিক টাকার কার্লসন ইতালিতে ডানপন্থীদের বিজয়কে একটা বিপ্লব হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

 
ফ্যাসিস্ট স্যালুট দিচ্ছে ইতালির ফুটবল ক্লাব 'লাতসিও'র সমর্থকেরা। ইতালিতে মেলোনির জয় বাকি ইউরোপে এবং যুক্তরাষ্ট্রে চরম ডানপন্থীদের শক্তিশালী করবে। বিশেষ করে জার্মানির উগ্র ডানপন্থী গ্রুপগুলি এই নির্বাচনের ফলাফলে আরও অনুপ্রাণিত হবে। এমতাবস্থায় সবচাইতে বড় প্রশ্নের মুখে পড়বে জার্মানির রাজনৈতিক লক্ষ্য; যা কিনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উগ্র ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে মিত্রশক্তিই নির্ধারণ করে দিয়েছিল।

ইউরোপে উগ্রপন্থীদের পুনরুত্থান

ফিলিস্তিন বংশোদ্ভূত ইতালিয় সাংবাদিক এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অব মায়ামি’র প্রফেসর রুলা জেব্রীল ‘আল জাজিরা’কে বলছেন যে, ইতালিতে মেলোনির জয় বাকি ইউরোপে এবং যুক্তরাষ্ট্রে চরম ডানপন্থীদের শক্তিশালী করবে। ডানপন্থী এই কর্মকান্ডগুলি যথেষ্ট সংগঠিত এবং এদের বিচরণ এখন বিশ্বব্যাপী। একসময় মেলোনিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার ফলে তিনি ডানপন্থীদের ক্রোধের শিকার হন। ইতালিতে নির্বাচনের পর থেকে তার এবং তার মতো ডানপন্থীদের সমালোচকদের বিরুদ্ধে প্রাণনাশের হুমকি আসতে শুরু করেছে।

২০১৯এর এপ্রিলে ইতালির ফুটবল ক্লাব ‘লাতসিও’র কিছু সমর্থক মিলানে একটা খেলা শুরুর আগে রাস্তায় ‘বেনিতো মুসোলিনির প্রতি সন্মান’ লেখা একটা ব্যানার তুলে ধরে। প্রায় ৭০ জনের মতো সমর্থক ফ্যাসিস্ট সঙ্গীত গায় এবং ফ্যাসিস্ট স্যালুট দেখায়। ‘সিএনএন’ বলছে যে, ব্যানারটা যে যায়গায় দেখানো হয়, তার কাছেই ১৯৪৫ সালে মুসোলিনি, তার স্ত্রী এবং উচ্চপদস্থ ফ্যাসিস্ট নেতাদের হত্যা করে তাদের মৃতদেহ উল্টো করে ঝুলিয়া রাখা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, দিনটাও ছিল ‘লিবারেশন ডে’র আগের দিন; যে দিনটা ইতালিতে ফ্যাসিস্টদের হাত থেকে ইতালির মুক্ত হওয়ার দিন হিসেবে পালন করা হয়। অবশ্য ইতালিতে ফুটবল মাঠে ডানপন্থীদের স্যালুট এবং অন্যান্য প্রতীকের দৃশ্যমান হওয়াটা নতুন নয়। বহুবার এ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলেও তা চলছে। তৎকালীন ডানপন্থী উপপ্রধানমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনি ফুটবল মাঠে ফ্যাসিস্ট স্যালুটের সমালোচনা করলেও এর বাইরে তিনি তেমন কিছু করেননি।

ডানপন্থীরা কতদিন ক্ষমতায় থাকতে পারবে?

‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে প্রশ্ন করা হচ্ছে যে, ইতালিতে যখন ১৯৪৮ সালের পর থেকে একেকটা সরকারের গড় আয়ু মাত্র ১৪ মাস, সেখানে ডানপন্থী কোয়ালিশনের প্রতিশ্রুত ৫ বছর উচ্চাকাংক্ষাই বটে। আর দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সমস্যা নিরসনে নীতি নিয়ে কোয়ালিশনের সদস্য দলগুলির মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। মূল্যস্ফীতির প্রভাব কমাতে আগের সরকার ৪০ বিলিয়ন ইউরোর প্রণোদনা দিয়েছে। এখন মেলোনির শরীক দলের প্রধান বারলুসকোনি চাইছেন আরও ৩১ বিলিয়ন ইউরো ঋণ করে প্রতি মাসে ১ হাজার ইউরো পেনসনের ব্যবস্থা করতে। কিন্তু ইতালির বর্তমান রাষ্ট্রীয় ঋণ ২ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ইউরো, যা কিনা দেশটার জিডিপির দেড় গুণ! এমতাবস্থায় উচ্চ সুদে ইতালি কতটা অর্থ ঋণ করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অপরদিকে মেলোনির উপদেষ্টারা বলছেন যে, তারা হয়তো দারিদ্র্য বিমোচনে অর্থায়ন কমিয়ে দিয়ে কর কমাবার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু মেলোনির শরীক দলগুলি যদি তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বেশি আগ্রহী হয়, তাহলে তার নীতি বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির সমস্যাকে কাটিয়ে উঠতে না পারলে ১ লক্ষ ২০ হাজার কোম্পানি এবং ৩ লক্ষ ৭০ হাজার কর্মসংস্থান ঝুঁকির মাঝে পড়বে।

ইউরোপে ডানপন্থী রাজনীতি কখনোই বন্ধ করা হয়নি। উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকেরা লিবারাল রাজনৈতিক ব্যবস্থার মাঝেই তাদের কর্মকান্ড চালিয়ে গেছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে অভিবাসী সংকটের পর থেকে ইউরোপজুড়ে ডানপন্থীদের উত্থান হয়েছে। যেকারণে ইতালির এই নির্বাচন পুরো ইউরোপের জন্যেই গুরুত্বপূর্ণ। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে জার্মানিতে নাজি পার্টির সকল স্তম্ভ দূরীকরণের যে প্রচেষ্টা চলেছে, তা ইতালিতে হয়নি। কিন্তু তারা বলছে না যে, জার্মানিতে এতকিছু করার পরেও নব্য-নাজিরা এখনও সক্রিয় এবং উগ্র ডানপন্থী দল ‘এএফডি’ আইনগতভাবেই রাজনীতিতে রয়েছে। অপরদিকে ইতালিতে নব্য-ফ্যাসিস্ট দলের রাজনীতি করার ব্যাপারটা অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলি যতটা মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করেছে, ইতালিতে সেটা তেমন বড় কোন বিষয় ছিল না কখনোই। মোটকথা ইতালিতে ফ্যাসিস্ট রাজনীতি কোন না কোন ফর্ম্যাটে চলেছে। নব্য-ফ্যাসিস্টরা তাদের কথাগুলি পরিবর্তন করেছে। কিন্তু তাদের কথার কেন্দ্রে ছিল অভিবাসী নীতি; যেটাকে তারা ইতালির অর্থনৈতিক দৈন্যতার মাঝে সকল সমস্যার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। মেলোনির সরকার কতদিন টিকবে সেটা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও অশ্বেতাঙ্গ অভিবাসীদের উপর এর বিরূপ প্রভাব যে বাড়বে, তা নিশ্চিত। আর ইউরোপের অন্যান্য দেশ, বিশেষ করে জার্মানির উগ্র ডানপন্থী গ্রুপগুলি এই নির্বাচনের ফলাফলে আরও অনুপ্রাণিত হবে। ইউরোপজুড়ে ডানপন্থীদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি ইইউএর কর্মসম্পাদনকে আরও চ্যালেঞ্জের মাঝে ফেলে দেবে। একেকটা দেশ যখন জাতীয় স্বার্থকে ইউরোপের উপরে স্থান দিচ্ছে, তখন ইইউএর অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় সবচাইতে বড় প্রশ্নের মুখে পড়বে জার্মানির রাজনৈতিক লক্ষ্য; যা কিনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উগ্র ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে মিত্রশক্তিই নির্ধারণ করে দিয়েছিল।



সূত্রঃ
‘Why Republicans are elated by ‘triumph’ of Italy’s Giorgia Meloni’ in Al-Jazeera, 27 September 2022
‘Italy’s right-wing winners inherit poison chalice’ in Reuters, 26 September 2022
‘How a party of neo-fascist roots won big in Italy’ in Associated Press, 26 September 2022
‘Lazio fans hang pro-Mussolini banner, make fascist salutes ahead of Liberation day’ in CNN, 24 April 2019
‘Why is Italy swinging to the far right?’ in BBC News, (https://www.youtube.com/watch?v=BNRQTSfAR1o)
‘How extremist is Italy's designated far-right government?’ in DW News, 27 September 2022 (https://www.youtube.com/watch?v=4S89Iuz1I7E)

Friday, 29 July 2022

রুশ গ্যাস ছাড়া শীতকাল পার হতে পারবে জার্মানি?

৩০শে জুলাই ২০২২

একসময় কিছু দেশ অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়ে জার্মানির লেকচার শুনেছে। এখন এই দেশগুলিকেই অনুরোধ করা হচ্ছে, তারা যেন গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে জার্মানিকে ‘গ্যাসের দেউলিয়াত্ব’ থেকে উদ্ধার করে! ইইউএর মাঝে থেকেও জার্মানি নিজস্ব নীতিকে অনুসরণ করতে চেয়েছে; প্রয়োজনে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশগুলিকে জার্মানির তৈরি করে দেয়া নীতি অনুসরণ করতে বাধ্যও করেছে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউরোপের বাকি দেশগুলির সাথে জার্মানির নীতিগত সংঘর্ষ আরও প্রবল হয়েছে।

রাশিয়া থেকে জার্মানি পর্যন্ত ‘নর্ড স্ট্রিম ১’ গ্যাস পাইপলাইনে রুশ কোম্পানি ‘গ্যাজপ্রম’ গ্যাস সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেয়ার ঘোষণা দেবার পরপরই জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে ইইউ সমঝোতায় পৌঁছে যে, তারা আগামী শীতের মাঝে অগাস্ট থেকে মার্চ পর্যন্ত স্বেচ্ছায় তাদের গ্যাসের ব্যবহার ১৫ শতাংশ কমাবে। আর রাশিয়া যদি ইউরোপে গ্যাস রপ্তানি পুরোপুরিভাবে বন্ধ করে দেয়, তাহলে জরুরি ভিত্তিতে বাধ্যতামূলকভাবে গ্যাস ব্যবহার কমাতে হবে। তবে এই জরুরি অবস্থা কখন কিভাবে ঘোষণা হতে পারে, সেব্যাপারে সমঝোতা হয়নি। তথাপি ইইউএর গ্যাস নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত নয় বা এই নেটওয়ার্কের উপর নির্ভরশীলতা কম, এমন দেশগুলি এই সমঝোতার বাইরে থাকতে পারবে; যার মাঝে পড়বে দ্বীপ দেশ আয়ারল্যান্ড, সাইপ্রাস এবং মাল্টা; তিনটা বল্টিক রাষ্ট্র লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়া; এবং দক্ষিণ ইউরোপের দেশ স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি ও গ্রিস। প্রস্তাবের পক্ষে জোরেসোরে কাজ করা চেক রিপাবলিকের মন্ত্রী জোসেফ সিকেলা সাংবাদিকদের বলেন যে, এই সমঝোতা বেশ কঠিন ছিল; তবে এর দরকার সকলেই বুঝতে পেরেছে। এখন সকলে মিলে কষ্ট ভাগাভাগি করে নেবে তারা। জার্মান মন্ত্রী রবার্ট হাবেক স্বীকার করেন যে, রুশ গ্যাসের উপর নির্ভরশীল হয়ে জার্মানি কৌশলগত ভুল করেছে। তবে এখন এটা শুধু জার্মানির সমস্যা নয়। ফরাসি মন্ত্রী আগনেস পানিয়ে-রানুশে বলেন যে, এখানে পুরো ইউরোপের অর্থনীতির স্বাস্থ্য প্রশ্নের মুখে পড়েছে; কারণ ইইউএর শিল্পগুলি একে অপরের উপর নির্ভরশীল। জার্মানির কেমিক্যাল শিল্পে সমস্যা হলে সারা ইউরোপের শিল্পই সমস্যায় পড়ে যাবে।

ইইউএর মাঝে হাঙ্গেরি এই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। তারা এর আগেও রাশিয়ার তেল আমদানি বন্ধের ইইউ সিদ্ধান্তের সাথে একমত হয়নি। স্পেনের মন্ত্রী তেরেসা রিবেরা জার্মানিকে উদ্দেশ্য করে বলেন যে, তারা তাদের জ্বালানির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার সময় তো অন্য কারুর উপদেশ নেয়নি; তাহলে স্পেন কেন তাদের জন্যে কষ্ট সহ্য করবে? তিনি এই ভাষা ব্যবহার করেছেন, কারণ স্পেন তার বেশিরভাগ গ্যাস আফ্রিকা থেকে আমদানি করে।

ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এক দশক আগে দক্ষিণ ইউরোপের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সময় জার্মানি সেই দেশগুলির ঋণে জর্জরিত হয়ে যাবার সমালোচনায় বলেছিল যে, তারা তাদের নিজেদের ঘরের কাজগুলি করেনি। এখন রুশ গ্যাসের উপর নির্ভরশীলতা কমাবার ক্ষেত্রে বাস্তবতা হলো, জার্মানি ক্লাসের সবচাইতে খারাপ ছাত্র। স্পেনের মন্ত্রী রিবেরা এবার জার্মানিকে ঐ একই কথাগুলি ফেরত দিয়ে বলেছেন যে, এলএনজি আমদানির অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করে স্পেন নিজেদের ঘরের কাজগুলি করেছে। তিনি প্রকৃতপক্ষে জার্মানির সমালোচনাই করেছেন; কারণ জার্মানি রুশ গ্যাসের উপর নির্ভরশীল থেকে এলএনজি আমদানির কোন অবকাঠামোই তৈরি করেনি। জার্মান পত্রিকা ‘সুডশে জাইটুং’ প্রায় একইভাবে বলছে যে, একসময় কিছু দেশ অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়ে জার্মানির লেকচার শুনেছে। এখন এই দেশগুলিকেই অনুরোধ করা হচ্ছে, তারা যেন গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে জার্মানিকে ‘গ্যাসের দেউলিয়াত্ব’ থেকে উদ্ধার করে! আরেক জার্মান পত্রিকা ‘ফ্রাংকফুটার আলেমাইনে’ বলছে যে, ‘নর্ড স্ট্রিম ১’ পাইপলাইন তৈরি করার সময় জার্মানরা পোল্যান্ড ও পূর্ব ইউরোপের বাকি দেশগুলির জ্বালানি এবং নিরাপত্তার প্রশ্নকে উপেক্ষা করেছিল। আর জার্মানরা সর্বদাই দাবি করেছে যে, তারা বাকিদের চাইতে বেশি জানে!

‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে যে, জার্মানি কি কি পদ্ধতিতে এই সংকট কাটাবার চেষ্টা করতে পারে। প্রথমতঃ এলএনজিএর মাধ্যমে অন্যান্য সূত্র থেকে সমুদ্রপথে গ্যাস আমদানি করতে পারে তারা। দ্বিতীয়তঃ নিজ দেশে গ্যাসের ব্যবহার কমাতে চেষ্টা করতে পারে। তৃতীয়তঃ কয়লার ব্যবহার বাড়িয়ে দিতে পারে। চতুর্থতঃ তারা ক্ষমতাসীন কোয়ালিশনে থাকা ছোট দল ‘ফ্রি ডেমোক্র্যাট’এর কথা শুনে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিকে আরও বেশি সময়ের জন্যে সার্ভিসে রাখার চেষ্টা করতে পারে। ২০২২ সালের মাঝেই জার্মানির সর্বশেষ তিনটা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেয়ার কথা রয়েছে। জার্মানি ইতোমধ্যেই পারমাণবিক বিদ্যুতের জন্যে জ্বালানি কেনা বন্ধ করে দিয়েছে; নতুন করে কিনতে গেলে সেটা ২০২৩ সালের শরতকালের আগে সম্ভব হবে না। শীতকালে চালু রাখলে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলি থেকে কম উৎপাদন আসবে। এছাড়াও সমস্যা হলো পারমাণবিক বিদ্যুতের জন্যে ইউরেনিয়ামের ২০ শতাংশ আসে রাশিয়া থেকে; আরও ২০ শতাংশ আসে রাশিয়ার বন্ধু দেশ কাজাখস্থান থেকে। তথাপি পারমাণবিক বিদ্যুৎ জার্মানির মোট বিদ্যুতের তুলনায় তেমন কিছুই নয়; বায়ুশক্তি থেকেই আসে এর চাইতে তিনগুণ বিদ্যুৎ। আর গ্রীষ্মে বেশি গরম পড়লে নদীর উষ্ণ পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লি ঠান্ডা করার কাজে ব্যবহার করা যাবে না। বায়ুশক্তি বৃদ্ধি করার ১০ হাজার মেগাওয়াটের প্রকল্প রয়েছে জার্মানির; তবে প্রথম টার্বাইন থেকে বিদ্যুৎ আসতেও ৬ বছর লেগে যাবে। এছাড়াও পরিবেশ রক্ষার আইনের কারণে সোলার এবং বায়োগ্যাস থেকে দ্রুতই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ আশা করা যাচ্ছে না। এমতাবস্থায় পরিবেশ রক্ষার ব্রতকে আপাততঃ ভুলে গিয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলির উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্যাসের ব্যবহার কমানোই জার্মানির সামনে খোলা পথ।

রুশ গ্যাসের সরবরাহ বন্ধের কাছাকাছি চলে যাওয়ার পর জার্মানির হ্যানোভার শহর সরকারি ভবনগুলিতে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গরম পানির সরবরাহ বন্ধ ঘোষণা করেছে। ঝরণাগুলি বন্ধ থাকবে; রাতের বেলায় সরকারি ভবনগুলিতে আলো জ্বলবে না। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও তাপমাত্রা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। ‘বিবিসি’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এই ব্যবস্থাগুলি আসছে শীতকালের আগে গ্যাসের মজুত বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে। জার্মানির জ্বালানি কোম্পানিগুলিকে দেউলিয়াত্ব থেকে বাঁচাতে জার্মান পরিবারগুলিকে বছরে অতিরিক্ত ৫’শ ইউরো গুণতে হতে পারে। ইইউএর মাঝে থেকেও জার্মানি নিজস্ব নীতিকে অনুসরণ করতে চেয়েছে; প্রয়োজনে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশগুলিকে জার্মানির তৈরি করে দেয়া নীতি অনুসরণ করতে বাধ্যও করেছে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউরোপের বাকি দেশগুলির সাথে জার্মানির নীতিগত সংঘর্ষ আরও প্রবল হয়েছে। জাতীয়তাবাদের উত্থানের বাস্তবতার মাঝে ইইউএর চিন্তাটাই যখন প্রশ্নবিদ্ধ, তখন বিশাল অর্থনৈতিক শক্তি হবার পরেও জার্মানির অসহায়ত্ব এখন সকলের সামনে পরিষ্কার। এহেন দুর্বলতা জার্মানির জাতীয় গর্বের উপর আঘাত; যা দেশটার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করার বীজ হতে পারে।

Saturday, 28 May 2022

উত্তর আয়ারল্যান্ডের নির্বাচন – ব্রিটেনের ভৌগোলিক অখন্ডতার প্রতি চ্যালেঞ্জ?

২৯শে মে ২০২২

 
উত্তর আয়ারল্যান্ডের দেয়ালে জাতীয়তাবাদী গ্রাফিতির পাশে নির্বাচনী পোস্টার। পশ্চিমা দেশগুলিতে জাতীয়তাবাদের জোয়ারে উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভোট যদি স্কটল্যান্ডের বিচ্ছিন্নতাবাদীদেরকে অনুপ্রাণিত করে, তবে সেটাই ব্রিটেনের জন্যে বেশি দুশ্চিন্তার হবে। বিশেষ করে করোনা পরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মাঝে নিজেদের অর্থনৈতিক দৈন্যদশাই যখন বেশিরভাগ মানুষের সিদ্ধান্ত নেবার পেছনে মূল স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন ব্রিটেনের অখন্ডতা প্রশ্নাতীত থাকছে না।


ছোট্ট দেশ উত্তর আয়ারল্যান্ডের নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়াতে যথেষ্ট আলোচনা হচ্ছে। ১৯২১ সালের মে মাসে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে উত্তর আয়ারল্যান্ডের সরকারের আইন প্রণয়নের মাধ্যমে ব্রিটেনের অংশ হিসেবে উত্তর আয়ারল্যান্ডের জন্ম দেয়া হয়েছিল। সেই সময় থেকে ১’শ ১ বছর পর প্রথমবারের মতো দেশটার পার্লামেন্টে আইরিশ জাতীয়তাবাদীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। এতদিন পর্যন্ত সকল নির্বাচনেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে ‘ইউনিয়নিস্ট’ দলগুলি; যাদের মূল চিন্তা হলো ব্রিটেনের সাথে যুক্ত থাকা। বহু বছর ধরে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগ্রামে লিপ্ত থাকা ‘আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি’র রাজনৈতিক মুখপাত্র ‘সিন ফেইন’ ২৯ শতাংশ ভোট পেয়ে সর্বোচ্চ ২৭টা আসন পেয়েছে। মাত্র ১৯ লক্ষ জনসংখ্যার এই দেশের নির্বাচন ভূরাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ; কারণ একদিকে উত্তর আয়ারল্যান্ড যেমন ব্রিটেনের একটা অংশ, অপরদিকে আইরিশ জাতীয়তাবাদীরা বহুদিন থেকে উত্তর আয়ারল্যান্ডকে ব্রিটেন থেকে আলাদা করে রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ডের সাথে একত্রীকরণের পক্ষপাতি। অর্থাৎ উত্তর আয়ারল্যান্ডের রাজনীতি ব্রিটেনের ভৌগোলিক অখন্ডতার সাথে সম্পর্কিত।

নির্বাচনে ২১ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ‘ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টি’ বা ‘ডিইউপি’; যারা পেয়েছে ২৫টা আসন। ‘আলস্টার ইউনিয়নিস্ট পার্টি’ বা ‘ইউইউপি’ পেয়েছে ৯টা আসন। বাকিরা পেয়েছে ২৯টা আসন। ‘বিবিসি’র এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, উত্তর আয়ারল্যান্ডের ক্ষমতা ভাগাভাগির ফর্মূলা অনুযায়ী দেশটার সরকারের শীর্ষ নেতা ‘ফার্স্ট মিনিস্টার’ এবং ‘ডেপুটি ফার্স্ট মিনিস্টার’ আসবে জাতীয়তাবাদী এবং সবচাইতে বড় ‘ইউনিয়নিস্ট’ দল থেকে। বাকি মন্ত্রীরা আসবে নির্বাচনে বেশি আসন পাওয়া দলগুলি থেকে। শীর্ষ দু’টা পদের নাম আলাদা হলেও এদের কাজ একই; এবং এদের একজন পদত্যাগ করলে আরেকজন ক্ষমতায় থাকতে পারে না। কাজেই সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতীয়তাবাদী ‘সিন ফেইন’ দলের কাউকে যদি সরকার প্রধান হতে হয়, তাহলে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ইউনিয়নিস্ট দলের কাউকে ‘ডেপুটি’র পদটা মেনে নিতে হবে। কিন্তু দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ‘ডিইউপি’ দলের প্রধান জেফরি ডোনাল্ডসন বলে দিয়েছেন যে, ব্রেক্সিটের পর থেকে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বাণিজ্য যেভাবে চলছে, সেটা তার দলের মনপূতঃ না হওয়া পর্যন্ত তিনি ‘ডেপুটি’র পদ সমর্থন করবেন না। ‘নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড প্রোটোকল’ নামের পরিচিত এই বাণিজ্য ব্যবস্থা ‘ডিইউপি’ সমর্থন করে না।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে এই প্রোটকলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেই ‘ডিইউপি’র সদস্য পল গিভান ‘ফার্স্ট মিনিস্টার’এর পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। ইউনিয়নিস্টরা মনে করে যে, এই প্রটোকলের মাধ্যমে উত্তর আয়াল্যান্ডকে আলাদা করে দেখা হচ্ছে এবং এতে ব্রিটেনের অংশ হিসেবে উত্তর আয়ারল্যান্ডের অবস্থান দুর্বল হচ্ছে। ‘ডিইউপি’ যদি ‘ডেপুটি’ পদে লোক না দেয়, তাহলে এই সমস্যা ৬ মাস পর্যন্ত চলতে পারে। বিরোধ তখনও চলতে থাকলে নির্বাচন দিতে হতে পারে; অথবা ব্রিটিশ সরকারের উত্তর আয়ারল্যান্ড সচিবকে নতুন কোন পদ্ধতি বের করতে হবে। উত্তর আয়ারল্যান্ডের সাথে ব্রিটেনের বাকি অংশের বাণিজ্য যে নীতিতে চলছে, তার মাঝে কিছু আইন ব্রিটেন একতরফাভাবে বাতিল করতে পারে বলে জানিয়েছে। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, এর মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার অনেক বড় ঝুঁকি নিতে চলেছে; কারণ এর মাধ্যমে ব্রিটেন আবারও ইইউএর সাথে দ্বন্দ্বে জড়াতে পারে।

১৯৯৮ সালের ‘গুড ফ্রাইডে এগ্রিমেন্ট’এর মাধ্যমে উত্তর আয়ারল্যান্ডের গৃহযুদ্ধ শেষ হয় এবং ‘আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি’র সদস্যরা অস্ত্র ফেলে পার্লামেন্টে এসে বসে। তবে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় জাতীয়তাবাদীরা কখনোই দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক পদটা পায়নি। দেশটার রাজনৈতিক বিভেদের মাঝে জাতিগত এবং ধর্মীয় ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর আয়ারল্যান্ডের ক্যাথোলিক খ্রিস্টানদের বেশিরভাগই নিজেদেরকে আইরিশ বলে আখ্যা দেয়; অপরদিকে প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টানদের বেশিরভাগই নিজেদেরকে ব্রিটিশ বলে আখ্যা দেয়। এখানে উল্লেখ্য যে, স্বাধীন দেশ রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ড ব্রিটেনের অংশ নয়; এবং সেখানে বেশিরভাগ জনগণই হলো ক্যাথোলিক খ্রিস্টান। ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটেনের প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টানরা উত্তর আয়ারল্যান্ডে উপনিবেশ স্থাপনের মাধ্যমে সেখানে ব্রিটেনের শাসনকে মজবুত করেছে। বর্তমানে দেশটার প্রোটেস্ট্যান্ট জনগণ সেই বসতি স্থাপনকারীদেরই বংশধর।

 
ব্রেক্সিটের ভোটে ব্রিটেনের একেক অংশের ফলাফল ছিল একেক রকম। ইইউ থেকে বের হয়ে যাবার ব্যাপারে ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসএর জনগণ যতটা উৎসুক ছিল, স্কটিশ এবং আইরিশরা ততটা ছিল না। এখন ব্রেক্সিটের পর তারা মনে করছে যে, ব্রিটেনের সাথে একত্রে থাকাটা তাদের জন্যে কোন অর্থনৈতিক সুবিধা বয়ে আনছে না।

‘সিন ফেইন’ বলছে যে, তারা আয়ারল্যান্ডের একত্রীকরণের ব্যাপারে বদ্ধ পরিকর। দলটার নেতা লু ম্যাকডোনাল্ড বলছেন যে, পাঁচ বছরের মাঝে তারা আয়ারল্যান্ডের একত্রীকরণের জন্যে গণভোটের ডাক দেবেন। অপরদিকে ইউনিয়নিস্টরা বলছে যে, সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলিতে জাতীয়তাবাদীরা কম ভোট পেয়েছে; তাই গণভোটের প্রশ্নই আসে না। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২৮শে মে প্রায় ১০ হাজার ইউনিয়নিস্ট উত্তর আয়ারল্যান্ডের শতবর্ষ উদযাপন করে। অনুষ্ঠানে ‘অরেঞ্জ অর্ডার’এর গ্র্যান্ড মাস্টার এডওয়ার্ড স্টিভেনসন ঘোষণা দেন যে, উত্তর আয়ারল্যান্ড সবসময় ব্রিটেনের অংশই থাকবে।

ব্রেক্সিটের মাধ্যমে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তাকে এগিয়ে নেবার যে স্বপ্ন ব্রিটেন দেখেছে, সেখানে একটা শক্ত কাঁটা হয়ে দেখা দিয়েছে জাতীয়তাবাদ। কারণ উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিচ্ছন্নতাবাদীরা এখনও সংখ্যাগরিষ্ঠ না হলেও স্কটল্যান্ড কিন্তু ২০১৪ সালে ব্রিটেন থেকে আলাদা হবার জন্যে গণভোটের আয়োজন করেছে; যেখানে ৪৫ শতাংশ জনগণ স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দিয়েছিল। ব্রেক্সিটের পক্ষে বিপক্ষে ভোটই বলে দিয়েছে যে, স্কটল্যান্ড এবং উত্তর আয়ারল্যান্ড বাকি ব্রিটেনের থেকে ভিন্নভাবে চিন্তা করছে। অর্থাৎ ইইউ থেকে বের হয়ে যাবার ব্যাপারে ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসএর জনগণ যতটা উৎসুক ছিল, স্কটিশ এবং আইরিশরা ততটা ছিল না। এখন ব্রেক্সিটের পর তারা মনে করছে যে, ব্রিটেনের সাথে একত্রে থাকাটা তাদের জন্যে কোন অর্থনৈতিক সুবিধা বয়ে আনছে না।

ব্রিটেনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে ইউরোপের মূল ভূখন্ডের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলি গত কয়েক’শ বছরে বিভিন্ন সময়ে আইরিশ ক্যাথোলিকদেরকে ব্যবহার করতে চেয়েছে। সেই হিসেবে আয়ারল্যান্ড সর্বদাই ব্রিটেনের অস্তিত্বের প্রতি একটা হমকি হয়ে কাজ করেছে। আইরিশ দ্বীপে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার জন্যেই ব্রিটেন উত্তর আয়ারল্যান্ডে প্রোটেস্ট্যান্ট উপনিবেশ স্থাপন করেছিল। একুশ শতকেও সেই ইতিহাসই বয়ে বেড়াচ্ছে উত্তর আয়ারল্যান্ড। তবে পশ্চিমা দেশগুলিতে জাতীয়তাবাদের জোয়ারে উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভোট যদি স্কটল্যান্ডের বিচ্ছিন্নতাবাদীদেরকে অনুপ্রাণিত করে, তবে সেটাই ব্রিটেনের জন্যে বেশি দুশ্চিন্তার হবে। বিশেষ করে করোনা পরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মাঝে নিজেদের অর্থনৈতিক দৈন্যদশাই যখন বেশিরভাগ মানুষের সিদ্ধান্ত নেবার পেছনে মূল স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন ব্রিটেনের অখন্ডতা প্রশ্নাতীত থাকছে না।

Thursday, 13 January 2022

তুরস্কে ডানপন্থী উগ্র জাতীয়তাবাদীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে কেন?

১৩ই জানুয়ারি ২০২২

তুর্কি উগ্রপন্থী জাতীয়তাবাদী ‘উলকুচু’ বা ‘গ্রে উল্ভস’ গ্রুপের ‘উলফ স্যালুট’। তুরস্কে সিরিয় শরণার্থীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনাগুলি ঘটনাগুলি একটা ধারাবাহিকতাকেই দেখিয়ে দিচ্ছে। আঙ্কারায় সিরিয় শরণার্থীদের সাথে তুর্কিদের দাঙ্গার পর ‘আমরা সিরিয়দেরকে চাই না’, ‘আমরা কোন আফগান চাইনা’ এবং ‘তুরস্ক হলো শুধুমাত্র তুর্কিদের জন্যে’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে সোশাল মিডিয়া ভরে যায়।

 
গত ১১ই জানুয়ারি তুরস্কের দক্ষিণের দিয়ারবাকির শহরে ১৮ বছর বয়সী একজন সিরিয় শরণার্থীকে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার সময় ছুরিকাঘাত করা হয়। এর আগের দিন তুরস্কের বড় শহর ইস্তাম্বুলের বায়রামপাশা এলাকায় নাঈল আল নাঈফ নামের ১৯ বছর বয়সী আরেকজন সিরিয় শরণার্থীকে গভীর রাতে তার ঘরে ঢুকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এর আগে ৯ই জানুয়ারি একজন তুর্কি নাগরিককে একজন সিরিয় শরণার্থী সিগারেট দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় ইস্তাম্বুলের এসেনইয়ুর্ত এলাকায় সিরিয়দের ব্যবহৃত একটা শপিং মলে অনেকজন দুর্বৃত্ত একত্রে হামলা চালিয়ে ক্ষতিসাধন করে। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, সোশাল মিডিয়াতে ভাইরাল হওয়া একটা ভিডিওতে দেখা যায় যে, কয়েক’শ মানুষ মিছিল করতে করতে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে এবং স্লোগান দিচ্ছে ‘এটা তুরস্ক; সিরিয়া নয়’। তারা একসময় রাস্তার পার্শ্ববর্তী শপিং মলে হামলা চালিয়ে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে এবং মলের ভেতরে থাকা সিরিয়দের উপর হামলা করে। তবে সবচাইতে ভয়ংকর ঘটনাটা ঘটে তুরস্কের পশ্চিমের শহর ইজমিরে। ১৬ই নভেম্বর কনস্ট্রাকশন সেক্টরে কাজ করা তিনজন সিরিয় কর্মীকে ঘুমের মাঝে পুড়িয়ে মারা হয়। প্রথমে ঘটনাটা দুর্ঘটনা বলে বলা হলেও পরে এর পিছনে হত্যার লক্ষণগুলি প্রকাশ পেতে থাকে। পুলিশ প্রায় একমাস পর ২১শে ডিসেম্বর কেমাল কোরুকমাজ নামের ৪০ বছর বয়সী একজন তুর্কি নাগরিকের স্বীকারোক্তির উপর ভিত্তি করে হত্যাকান্ডের তদন্ত শুরু করে। ২৩ বছর বয়সী মামুন আল নাবহান, ২১ বছর বয়সী আহমেদ আল আলী, এবং ১৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ আল বিশ রাতের বেলায় তাদের ঘরে আগুন লাগলে আর বের হতে পারেননি। গ্রেপ্তারকৃত কেমাল কোরুকমাজ নিজেই ঘটনার দিন আরেক ব্যক্তিকে বলেছিল যে, সে সিরিয়দেরকে খুন করতে চায়। এই সূত্রে পুলিশ তার উপর নজরে রাখার পরেও ঘটনা ঘটে এবং ঘটনার দশ দিন পর পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, এই ঘটনাগুলি তুরস্কে শরণার্থীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মারাত্মক ধারাবাহিকতাকেই দেখিয়ে দিচ্ছে। তবে এই সহিংসতা যে কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, তা একটু গভীরে গেলেই বোঝা যাবে।

রাজনীতিবিদেরাই যখন উগ্র জাতীয়তাবাদী

তুরস্কে বর্তমানে ৬০ লাখের মতো অভিবাসী এবং শরণার্থী রয়েছে; যাদের মাঝে প্রায় ৩৬ লাখ হলো সিরিয়। তুরস্কের রাজনৈতিক মহলে অনেকেই বলতে শুরু করেছে যে, তুরস্কের অর্থনৈতিক সমস্যার জন্যে সিরিয় শরণার্থীরাই দায়ী। ২০২১ সালে তুরস্কের একটা আদালত ইস্তাম্বুলের পূর্বের শহর বোলুর মেয়রের শরণার্থী বিরোধী কিছু সিদ্ধান্তকে খোলাখুলিভাবে বর্ণবাদী আখ্যা দিয়ে বাতিল ঘোষণা করে। তুরস্কের প্রধান বিরোধী দল ‘রিপাবলিকান পিপলস পার্টি’ বা ‘সিএইচপি’র সদস্য মেয়র তানজু ওজকান সিরিয় শরণার্থীদের জন্যে ১১ গুণ বেশি মূল্যে পানি সরবরাহ করার পরিকল্পনা করেন; একইসাথে সিরিয়দের বিয়ের লাইসেন্স ১ লক্ষ লিরা ধার্য করেন। তিনি বলেন যে, এই সিদ্ধান্তের পিছনে তার উদ্দেশ্য হলো সিরিয় শরণার্থীদেরকে তার শহর থেকে তাড়ানো। ‘সিএইচপি’র নেতৃত্ব ওজকানের এহেন বর্ণবাদী সিদ্ধান্তের সমর্থন না করলেও তুর্কি রাজনীতিবিদেরা অনেকেই তাদের শরণার্থী বিরোধী কথা চালিয়ে যাচ্ছেন।

জানুয়ারির শুরুতেই তুরস্কের পুলিশ ডানপন্থী দল ‘জাফের পার্টি’র প্রধান উমিত ওজদাগএর বিরুদ্ধে ‘মানুষের মাঝে ঘৃণা ছড়ানো’র অভিযোগ আনে। অথচ অভিযোগ দায়ের কথার তিন বছরেরও বেশি সময় আগে ২০১৭ সালের নভেম্বরে ওজদাগ দাবি করেছিলেন যে, সিরিয় শরণার্থীরা স্থূলকায় হয়ে যাচ্ছে; যেখানে তুর্কিরা দারিদ্র্যের মাঝে পতিত হচ্ছে। ওজদাগ একদিন একটা সিরিয় মালিকানার দোকানে ঢুকে ট্যাক্সের কাগজ এবং পরিচয়পত্র দেখতে চান এবং পুরো ব্যাপারটাকে ভিডিও করে অনলাইনে প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি দোকান মালিককে তুর্কি ভাষা না বলতে পারার জন্যে তিরস্কার করেন। তিনি টুইটারে লেখেন যে, এই দোকান মালিকের মতো আরও ৯ লক্ষ লোক তুরস্কে রয়েছে; যারা তুরস্কের জন্যে হুমকি। আরেকটা ঘটনায় গত নভেম্বরে তুরস্কের বিরোধী দল ‘আইওয়াইআই পার্টি’র সদস্য ইলায় আসকোয় ৪৫ জন সিরিয়কে তুরস্কের অর্থনীতিকে নিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক ভিডিও তৈরির অভিযোগে দেশ থেকে বের করে দেয়ার ব্যাপারে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেন। তুর্কি মিডিয়া ‘আহভাল’ বলে যে, গত অক্টোবরে তুরস্কের রাস্তায় এক ব্যক্তি মিডিয়াকে বলে যে, তুর্কিরা অর্থনৈতিকভাবে খুব খারাপ রয়েছে; অথচ তুরস্কে থাকা সিরিয়রা বেশ রয়েছে। তিনি বলেন যে, তিনি কলা কিনতে পারছেন না; অথচ সিরিয়রা কেজি কেজি কলা কিনতে পারছে। এই সাক্ষাতের পর তুরস্কে বসবাসরত কয়েকজন সিরিয় অনলাইনে ব্যাঙ্গাত্মকভাবে কলা খাওয়ার ভিডিও প্রকাশ করে।

‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০২১এর অগাস্টে আঙ্কারার আলতিনদাগ এলাকায় সিরিয় শরণার্থী এবং তুর্কিদের মাঝে দ্বন্দ্ব হানাহানিতে পরিণত হয়। এর মাঝে দু’জন তুর্কি ছুরিকাহত হয়; যাদের একজন পরবর্তীতে মৃত্যুবরণ করে। ঘটনার পর শতশত তুর্কি শহরের সিরিয় বাড়িঘর, দোকানপাট এবং গাড়ি ভাংচুর করে। এই ভাংচুরের দৃশ্য অনেকেই টুইটারে লাইভ প্রকাশ করে। ভিডিওগুলিতে অনেককেই দেখা যায় উগ্র জাতীয়তাবাদী স্লোগান ব্যবহার করতে। কেউ কেউ তাদের হাত দিয়ে ‘উলফ স্যালুট’ দিচ্ছিলো; যা হলো তুর্কি উগ্রপন্থী জাতীয়তাবাদী ‘উলকুচু’ বা ‘গ্রে উল্ভস’ গ্রুপের চিহ্ন। দাঙ্গার পর ‘আমরা সিরিয়দেরকে চাই না’, ‘আমরা কোন আফগান চাইনা’ এবং ‘তুরস্ক হলো শুধুমাত্র তুর্কিদের জন্যে’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে সোশাল মিডিয়া ভরে যায়।

তুরস্কের শরণার্থী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা ‘হেপিমিজ গোচমেনিজ’এর একজন সদস্য য়িলদিজ ওনেন ‘আল জাজিরা’কে বলেন যে, ‘আইওয়াইআই পার্টি’ বা ‘সিএইচপি’র সদস্য বোলুর মেয়র বা উমিত ওজদাগএর মতো লোকেরা যখন বারংবার বলতে থাকে যে শরণার্থীরা তুরস্কের প্রধান সমস্যা, তখন কিছু উগ্রপন্থী লোক শরণার্থীদের উপর হামলা করার কারণ পেয়ে যায়। এটা শুধু কয়েক ব্যক্তির কর্মকান্ড নয়, বরং পুরো দেশে কয়েক মাস ধরে চলা রাজনৈতিক পরিবেশই এসকল ঘটনার জন্যে দায়ী। ওনেন বলছেন যে, সবচাইতে মারাত্মক ব্যাপার হলো, এই ঘটনাগুলি তুরস্কের সরকার বা মিডিয়ার কাছে তেমন কোন গুরুত্বই পায়নি; অথচ লক্ষ লক্ষ তুর্কি, যারা জার্মানিতে বসবাস করে জাতিগত বৈষম্যের শিকার হচ্ছে, তাদের ব্যাপারগুলি পুরোপুরি আলাদাভাবে দেখা হচ্ছে। যখন জার্মানিতে তুর্কিদের উপর হামলা হয়, তখন রাজনীতিবিদেরা এবং সরকার কঠোর বিবৃতি দেয়; অনেকেই রাস্তায় প্রতিবাদ সমাবেশ করে। অথচ ইস্তাম্বুলের এসেনইয়ুর্ত এলাকার ভিডিওতে যখন শতশত মানুষকে সিরিয় দোকানে হামলা করতে দেখা গেলো, তখন মাত্র সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হলো!

 
আঙ্কারার রাস্তায় 'উলফ স্যালুট' দিচ্ছে তুর্কি যুবারা। সিরিয় শরণার্থীর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনাগুলি তুরস্কের সরকার বা মিডিয়ার কাছে তেমন কোন গুরুত্বই পায়নি; অথচ লক্ষ লক্ষ তুর্কি, যারা জার্মানিতে বসবাস করে জাতিগত বৈষম্যের শিকার হচ্ছে, তাদের ব্যাপারগুলি পুরোপুরি আলাদাভাবে দেখা হচ্ছে। যখন জার্মানিতে তুর্কিদের উপর হামলা হয়, তখন রাজনীতিবিদেরা এবং সরকার কঠোর বিবৃতি দেয়; অনেকেই রাস্তায় প্রতিবাদ সমাবেশ করে। অথচ ইস্তাম্বুলের এসেনইয়ুর্ত এলাকার ভিডিওতে যখন শতশত মানুষকে সিরিয় দোকানে হামলা করতে দেখা গেলো, তখন মাত্র সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হলো!

ইজমিরের নৃশংসতা

তুর্কি পত্রিকা ‘ইয়েনি সাফাক’ বলছে যে, ইজমিরের হত্যাকান্ডের স্বীকারোক্তি দেয়া কেমাল কোরুকমাজ ঘটনার ১০ দিন পর গত ২৬শে নভেম্বর দু’জন ব্যক্তিকে আলাদাভাবে ছুরিকাঘাত করে। পুলিশের সামনে সে গর্ব করে স্বীকার করে যে, এর আগে তিনজন সিরিয় নাগরিককে সে নিজেই আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। তুর্কি মিডিয়া ‘এভরেনসেল’ বলছে যে, কোরুকমাজ পুলিশকে বলে যে, সে দুই দশক আগে তুরস্কের সামরিক ইন্টেলিজেন্স সংস্থা ‘জেআইটিইএম’এর অধীনে গোপন মিশনে কাজ করতো। সে বলে যে, সে তার গাড়ির উইন্ডশিল্ডের উপর সিরিয়দেরকে হত্যা করার ব্যাপারে পরপর তিনটা নির্দেশনা পাবার পরেই কাজটার পরিকল্পনা শুরু করে। সে অভিযোগ করে যে, সিরিয়রা আসার পর থেকে সে চাকুরি পাচ্ছিলো না। সে মৃত ব্যক্তিদের সাথে একই বাড়িতে থাকা শুরু করে, যা কংক্রিট কোম্পানি ‘বিরলিক বেটন’এর মালিকানায় ছিলো। ঘটনার রাতে সে বের হয়ে গিয়ে পাঁচ লিটার পেট্রোল কিনে এনে বাড়িতে আগুন লাগায়।

ইজমিরে পুড়ে মারা যাওয়া সিরিয়দের একজনের ভাই আহমেদ আল বিশ তুরস্কের কুর্দি মিডিয়া ‘রুদাউ’কে বলেন যে, ভবিষ্যতে যাতে এধরনের ঘটনা না ঘটে, সেজন্য তিনি ক্ষমতাসীন ‘একে পার্টি’, তুরস্কের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘকে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানাচ্ছেন। এধরনের হামলা জাতীয়তাবাদীরা করছে বলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। মৃত আরেকজনের ভাই আহমেদ আল নাবহান তুর্কি মিডিয়া ‘দুভার’কে বলেন যে, পুলিশ তাকে বলেছিল যাতে সে ঘটনার ব্যাপারে চুপ থাকে। পুলিশ এক ব্যক্তিকে সন্দেহ করছে; এবং সেই ব্যক্তি গ্রেপ্তার হবার আগ পর্যন্ত যেন সে কাউকে কিছু না বলে। আল নাবহান আরও বলেন যে, তিনি চান সরকার যাতে সুষ্ঠু বিচার করে এবং বর্ণবাদ রোধে দায়ী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ সাজা দেয়। তিনি বলেন যে, তুর্কি, সিরিয়, ইরাকি, জর্ডানিয়ানরা সকলেই মুসলিম। তুরস্কের ১৩টা মানবাধিকার সংস্থা এক যৌথ বিবৃতিতে বলে যে, ইজমিরের ঘটনাটা ছিল পুরোপুরিভাবে বর্ণবাদী চিন্তা প্রসূত। তারা ঘটনা তুরস্কের জনগণ এবং মৃতদের আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখার জন্যে তুর্কি সরকারকে দায়ী করেন। তুরস্কের মানবাধিকার এসোসিয়েশন ‘আইএইচডি’র প্রধান জাফের ইনসে বলেন যে, তারা জানেন যে, আইন শৃংখলা বাহিনী এবং অগ্নি নির্বাপক বাহিনীর সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। তবে দায়ী ব্যক্তি নিজেই স্বীকার করেছে যে, সে এক মারাত্মক পরিকল্পনার মাধ্যমে এই কাজটা করেছে। যদিও এখনও তদন্ত শুরুর দিকে রয়েছে, তথাপি এটা বোঝা যাচ্ছে যে, অনেক লোক এই ঘটনায় জড়িত।

 
তুরস্কের জাতীয়তাবাদীরা সিরিয় শরণার্থীদেরকে তাদের অর্থনৈতিক সমস্যার জন্যে দায়ী করছে। কিন্তু যে ব্যাপারটা অনেকেই এড়িয়ে যাচ্ছেন তা হলো, শরণার্থী সমস্যার মাঝেই তুরস্কের জিডিপি ২০০৯ সালে সাড়ে ৬’শ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০১৩ সাল নাগাদ সাড়ে ৯’শ বিলিয়নে পৌঁছায়। তুরস্কের অর্থনীতি যখন ভালো ছিল, তখন কেউ শরণার্থী নিয়ে কথা বলেনি; অর্থনীতি খারাপ হবার সাথেসাথেই অনেকেই এর জন্যে শরণার্থীদের দায়ী করতে থাকে।

তুরস্কের শরণার্থী রাজনীতি

২০২১এর জুলাইএ তুরস্কের প্রধান বিরোধী দল ‘সিএইচপি’র প্রধান কেমাল কিলিশদারোগলু বলেন যে, তার দলের পাঁচটা মূল লক্ষ্যের একটা হলো সিরিয় শরণার্থীদেরকে দেশে ফেরত পাঠানো। তারা ক্ষমতায় যাবার দুই বছরের মাঝেই সকল শরণার্থীকে ফেরত পাঠাবেন; এবং এব্যাপারে তাদের সকল পরিকল্পনা করাই আছে। এর জবাবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান বলেন যে, তিনি তুরস্কে আশ্রয় খোঁজা ‘আল্লাহতে বিশ্বাসী’ মানুষদেরকে খুনিদের হাতে তুলে দেবেন না। তবে এরদোগানের এই কথাগুলির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন করেন অনেকেই। ‘মাইগ্রেশন পলিসি ইন্সটিটিউট’এর লেখায় বলা হচ্ছে যে, ২০১৬ সালে তুরস্ক ইইউএর সাথে সিরিয় শরণার্থীদের ব্যাপারে একটা চুক্তি করে। চুক্তি মোতাবেক তুরস্ক ইইউএর সীমানা থেকে শরণার্থীদেরকে দূরে রাখবে। ইইউ শরণার্থীদের জন্যে ডেবিট কার্ড ইস্যু করে তাদেরকে অর্থ সহায়তা দিতে থাকে; যা ব্যবহার করে শরণার্থীরা বাজার থেকে কেনাকাটা করতে থাকে। চুক্তির ফলে ইইউতে শরণার্থী আসা অনেক কমে যায়। চুক্তিতে পরিবর্তন আনার ব্যাপারে ইইউএর উপর চাপ সৃষ্টি করতে তুরস্ক ২০২০এর প্রথমাংশে কয়েক লক্ষ শরণার্থীকে গ্রিসে পাঠানোর হুমকি দেয়। এই ঘটনা বলে দিচ্ছে যে, ইইউ এবং তুরস্কের মাঝে শরণার্থী চুক্তি একটা অস্বস্তিকর চুক্তি, যা রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত।

তুরস্কের চাপের মুখে ২০২১এর জুনে ইইউ সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, তারা শরণার্থীদের জন্যে তুরস্ককে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আরও ৩ বিলিয়ন ইউরো সহায়তা দেবে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইইউ গত ডিসেম্বরে ঘোষণা দেয় যে, ১৫ লক্ষ শরণার্থীর ডেবিট কার্ডে ৩’শ ২৫ মিলিয়ন ইউরো দেয়া হবে; যা ব্যবহার করে তারা তাদের দরকারি খাদ্য, বাড়িভাড়া, পরিবহণ এবং ঔষধ কেনাকাটা করতে পারবে। ইইউএর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক কমিশনার জানেজ লেনারসিচ বলেন যে, এই অর্থ সহায়তার ফলে শরণার্থীরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে যে, তাদের কোন জিনিসটা সবচাইতে বেশি দরকার; এবং একইসাথে তারা তুরস্কের অর্থনীতিকে সহায়তা দিতে পারবে।

‘ডেইলি সাবাহ’ বলছে যে, ইইউএর শরণার্থী দূরে রাখার প্রবণতা এবং তুরস্কে শরণার্থীদের অর্থায়নে ইইউএর আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ব্যাপারে তুর্কি রাজনীতিবিদেরা সর্বদাই সমালোচনার ঝড় তুলেন। এরদোগানের তুর্কি সরকারের অভিযোগ যে, ইইউ তুরস্ককে যে পরিমাণ অর্থের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা না দিয়ে গ্রিসকে অর্থায়ন করে যাচ্ছে। চুক্তির পাঁচ বছর পর শরণার্থী নীতির ব্যাপারে ইইউ আগের চাইতে অনেক বেশি বিভাজিত; এবং চুক্তির শর্তগুলি এখন ভেঙ্গে পড়ছে।

 
তুরস্কের প্রধান বিরোধী দল উগ্র জাতীয়তাবাদী 'সিএইচপি'র প্রধান কেমাল কিলিশদারোগলু। তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান এবং তার ‘একে পার্টি’ শরণার্থীদেরকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার কোন সুযোগই হাতছাড়া করেনি। অপরদিকে তুরস্কের বিরোধী উগ্র জাতীয়তাবাদী দলগুলিও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান না পেয়ে দায়ভার চাপিয়েছে শরণার্থীদের উপর; যা কিনা তাদেরকে ডানপন্থীদের ভোট পেতে সহায়তা করবে। মোটকথা সিরিয় শরণার্থীরা এবং ডানপন্থী উগ্রবাদীরা এখন তুরস্কের রাজনৈতিক ময়দানে খেলার গুটি ছাড়া আর কিছুই নয়।

তুরস্কের উগ্র জাতীয়তাবাদী চিন্তার নেপথ্যে

‘ডেইলি সাবাহ’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০১১ সালে সিরিয়াতে গৃহযুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত তুরস্কে ৬০ হাজার অভিবাসী প্রত্যাশী ছিল। এখন তুরস্কে প্রায় ৬০ লক্ষ অভিবাসী বসবাস করছে; যার মাঝে প্রায় ৪০ লক্ষই এসেছে সিরিয়া থেকে। আর ২০১৬ সালে ইইউএর সাথে শরণার্থী চুক্তি করার পর তুরস্কে আরও ২০ লক্ষ শরণার্থী আশ্রয় নেয়। রেড ক্রিসেন্ট বলছে যে, তুরস্কে শরণার্থীদের অর্ধেকই প্রয়োজনীয় খাদ্য যোগাড় করতে পারছে না। আর করোনা মহামারি শুরুর পর থেকে শরণার্থীদের উপর ঋণের বোঝা আগের চাইতে দ্বিগুণ হয়েছে। আর গত অগাস্টে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পলায়নের পর তুরস্কে আবারও নতুন করে শরণার্থী আসার শংকা শুরু হয়। এই শংকাকে কেন্দ্র করে তুরস্কে উগ্র জাতীয়তাবাদীদের আরেক দফা শরণার্থী বিরোধী কর্মকান্ড দানা বাঁধে। তুরস্কের ‘রিসার্চ সেন্টার ফর এসাইলাম এন্ড ইমিগ্রেশন’ বা ‘আইজিএএম’এর প্রধান মেতিন কোরাবাতির ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, তুরস্কের উগ্র জাতীয়তাবাদের পিছনে রাজনীতিবিদদের একটা বড় অবদান রয়েছে। তারা অনেকেই ২০২৩ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখেই শরণার্থীদেরকে দেশে ফেরত পাঠাবার কথা বলছেন। সমাজ গবেষক উলাস সুনাতাও বলছেন যে, রাজনীতিবিদেরা যখন বারংবার বলছেন যে, শরণার্থীরা দেশে ফেরত পাঠানো হবে, তখন সামনের দিনগুলিতে আরও মারাত্মক সহিংসতা অপেক্ষা করবে।

তুরস্কের জাতীয়তাবাদীরা সিরিয় শরণার্থীদেরকে তাদের অর্থনৈতিক সমস্যার জন্যে দায়ী করছে। কিন্তু যে ব্যাপারটা অনেকেই এড়িয়ে যাচ্ছেন তা হলো, শরণার্থী সমস্যার মাঝেই তুরস্কের জিডিপি ২০০৯ সালে সাড়ে ৬’শ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০১৩ সাল নাগাদ সাড়ে ৯’শ বিলিয়নে পৌঁছায়। তবে অর্থনৈতিক অবব্যস্থাপনার কারণে তুরস্কের জিডিপি কমে এখন ৭’শ বিলিয়নে নেমে এসেছে। বিশেষ করে ২০১৮ সাল থেকে তুর্কি লিরার ব্যাপক দরপতন ঠেকাতে না পারার ফলশ্রুতিতে মারাত্মক মূল্যস্ফীতি গ্রাস করেছে তুরস্কের অর্থনীতিকে। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, তুরস্কের অর্থনীতি যখন ভালো ছিল, তখন কেউ শরণার্থী নিয়ে কথা বলেনি; অর্থনীতি খারাপ হবার সাথেসাথেই অনেকেই এর জন্যে শরণার্থীদের দায়ী করতে থাকে।

তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান এবং তার ‘একে পার্টি’ শরণার্থীদেরকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার কোন সুযোগই হাতছাড়া করেনি। এরদোগান একদিকে যেমন সিরিয় শরণার্থীদেরকে সীমানা অতিক্রম করে ইউরোপে যাবার ট্রানজিট দিয়ে ইইউকে ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায় করেছেন, তেমনি সিরিয় শরণার্থীদেরকে তিনি ‘আল্লাহতে বিশ্বাসী’ শরণার্থী বলেই থাকতে দিয়েছেন বলে তুর্কি জনগণের ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়েছেন। একইসাথে বিরোধী জাতীয়তাবাদী দলগুলিকে তিনি আক্রমণ করেছেন ‘বিশ্বাসী জনগণ’কে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা করার জন্যে। এগুলি তিনি করেছেন তার ভোট ব্যাংক বাড়াবার উদ্দেশ্যেই। এরদোগানের সরকার শরণার্থীদের নিরাপত্তার ব্যাপারে কতটা আন্তরিক, তা ইজমিরে তিনজন সিরিয় কর্মীকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনাকে তার সরকারের প্রায় একমাস গোপন রাখার মাঝেই বোঝা যায়। অপরদিকে তুরস্কের বিরোধী উগ্র জাতীয়তাবাদী দলগুলিও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান না পেয়ে দায়ভার চাপিয়েছে শরণার্থীদের উপর; যা কিনা তাদেরকে ডানপন্থীদের ভোট পেতে সহায়তা করবে। মোটকথা সিরিয় শরণার্থীরা এবং ডানপন্থী উগ্রবাদীরা এখন তুরস্কের রাজনৈতিক ময়দানে খেলার গুটি ছাড়া আর কিছুই নয়।

Sunday, 2 January 2022

যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দোপ্যাসিফিক ফোকাসের মাঝেই বলকানে জাতিগত সমস্যার পুনরুদ্ধান

০২রা জানুয়ারি ২০২২

ডানপন্থী সার্ব জাতীয়তাবাদী নেতা মিলোরাদ দোদিক।  পূর্ব ইউরোপে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতারা যখন নতুন করে সংঘাতের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে, তখন ইন্দোপ্যাসিফিক নিয়েই ব্যস্ত যুক্তরাষ্ট্র; ১৯৯০এর দশকে ওয়াশিংটনের ছায়াতলে স্বাক্ষরিত ডেইটন শান্তি চুক্তিকে ধরে রাখার মতো সময় তাদের নেই। বলকানে তিন দশকের ভিতরেই গণতান্ত্রিকভাবেই ভেঙ্গে পড়ছে মার্কিন রাজনৈতিক সমাধান।

 
গত ১০ই ডিসেম্বর বসনিয়ার জাতিগত সার্ব অংশের পার্লামেন্টের এক ভোটাভুটিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, সার্বরা বসনিয়ার রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলি থেকে বের হয়ে যাবে। উত্তপ্ত বাকবিতন্ডার মাঝে ডানপন্থী সার্ব জাতীয়তাবাদী নেতা মিলোরাদ দোদিক যথেষ্ট ভোট পেয়ে সার্বদেরকে বসনিয়ার সেনাবাহিনী, আদালত এবং কর ব্যবস্থা থেকে বের করে নিয়ে আসার জন্যে আইন তৈরি করার জন্যে সমর্থন পেয়ে যান। ছয় মাসের মধ্যে এই প্রস্তাবগুলি আইন আকারে স্বীকৃতি পেতে পারে। বিরোধী দলীয় সাংসদ ব্রানিস্লাভ বোরেনোভিচ সমালোচনা করে বলেন যে, এই প্রস্তাবের অর্থ হলো সংঘাত; যুদ্ধ এবং মৃত্যু। তিনি দোদিককে জিজ্ঞেস করেন যে, রিপাবলিকা সার্পস্কার সেনাবাহিনী কিসের প্রতিনিধিত্ব করবে? ট্যাংক এবং যুদ্ধবিমানের জন্যে অর্থ কোত্থেকে আসবে? সীমানায় চেকপোস্ট বসানোর শর্তগুলি কি হবে? এই উত্তরগুলি দোদিককে দিতে হবে বলে তিনি দাবি করেন। আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে সার্বদের এই সিদ্ধান্তের খবরটা বসনিয়ার তথা পুরো বলকানের কঠিন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বলেই উল্লেখিত হয়।

পৃথিবীর অন্যতম জটিল রাজনৈতিক ব্যবস্থা আখ্যা দিয়ে ‘ইউরোনিউজ’ বসনিয়ার রাষ্ট্র ব্যবস্থার বর্ণনা দিয়েছে। ১৯৯৫ সালে বসনিয়ার গৃহযুদ্ধের শেষে মার্কিন মধ্যস্ততায় ডেইটন শান্তি চুক্তির মাধ্যমে বর্তমান বসনিয়া রাষ্ট্রের জন্ম দেয়া হয়। এই রাষ্ট্রের মাঝে রয়েছে দু’টা আলাদা প্রশাসনিক সত্ত্বা। একটা হলো জাতিগত সার্ব সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে রিপাবলিকা সার্পস্কা; আর অন্যটা হলো বসনিয়াক এবং ক্রোয়াটদের নিয়ে গঠিত ফেডারেশন অব বসনিয়া এন্ড হার্জেগোভিনা। জাতিগত সার্বরা হলো মূলতঃ অর্থোডক্স খ্রিস্টান; বসনিয়াকরা মূলতঃ মুসলিম; ক্রোয়াটরা মূলতঃ ক্যাথোলিক খ্রিস্টান। উভয় অঞ্চলকেই বেশকিছু ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। তবে বসনিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার কিছু ব্যাপার নিয়ন্ত্রণ করে; যার মাঝে রয়েছে সেনাবাহিনী, সর্বোচ্চ আদালত এবং কর আদায়ের কাঠামো। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধান হলো তিন সদস্য বিশিষ্ট প্রেসিডেন্সি; যার সদস্যরা হলেন বসনিয়াক, সার্ব এবং ক্রোয়াট। তিন জাতির মানুষের ভোটের দ্বারা তারা আলাদাভাবে নির্বাচিত হন। বর্তমানে এর বসনিয়াক সদস্য হলেন শেফিক জাফেরোভিচ; আর ক্রোয়াট সদস্য জেলিকো কমসিচ। উগ্র জাতীয়তাবাদী অচরণের জন্যে তারা পশ্চিমা দেশগুলির কাছে দোদিক এবং তার সমর্থকদের উপর চাপ সৃষ্টির আনুরোধ জানিয়ে আসছেন। ২০১৩ সালের শুমারি অনুযায়ি বসনিয়ার প্রায় ৩৩ লক্ষ জনসংখ্যার মাঝে ৫০ শতাংশ হলো বসনিয়াক; সার্বরা হলো প্রায় ৩১ শতাংশ; ক্রোয়াটরা ১৫ শতাংশের মতো। ১৯৯০এর দশকে সাবেক ইউগোস্লাভিয়া ভেঙ্গে যাবার পর ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে ১ লক্ষের বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। যুদ্ধের মাঝে ভয়ংকর মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে বসনিয়ার স্রেব্রেনিসা শহরে সার্বদের হাতে ৮ হাজার নিরপরাধ বসনিয়াক মুসলিমের মৃত্যুর ঘটনা এখনও ভয়াবহ এক উদাহরণ হিসেবে রয়ে গেছে।

মিলোরাদ দোদিক ২০১০ সালে গণতান্ত্রিক ভোটে রিপাবলিকা সার্পস্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের অক্টোবরে বসনিয়ার প্রেসিডেন্সির সদস্য নির্বাচিত হবার আগ পর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল ছিলেন। এই পদে থাকার সময়েই তিনি বারংবার রিপাবলিকা সার্পস্কাকে বসনিয়ার রাষ্ট্রকাঠামো থেকে আলাদা করে ফেলার কথা বলেন। ডেইটন শান্তি চুক্তিকে হুমকিতে ফেলার কারণে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন সরকার দোদিকের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ঘোষণা দেয় এবং তার সাথে কোন মার্কিন ব্যক্তি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা করার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কিন্তু দোদিক বলেন যে তিনি তার উপর অবরোধের কোন তোয়াক্কা করেন না। তিনি বসনিয়ার প্রেসিডেন্সির সদস্য হবার পর থেকে তার জাতীয়তাবাদী কথার তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। ‘ইউরোনিউজ’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, গত সেপ্টেম্বর মাসে তিনি রিপাবলিকা সার্পস্কার আলাদা সেনাবাহিনী, আদালত এবং কর কাঠামো তৈরি করার পরিকল্পনার ঘোষণা দেন। তবে তিনি বলেন যে, এসব পরিকল্পনা বসনিয়া থেকে আলাদা হয়ে যাবার প্রচেষ্টা নয়, অথবা নতুন করে যুদ্ধ শুরুর সম্ভাবনাকেও উস্কে দেবে না।

 

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কাউন্সিল অব ফরে রিলেশন্স’ বা ‘সিএফআর’এর এক লেখায় চার্লস কুপচান বলছেন যে, ডেইটন চুক্তি অনুসারে বসনিয়ার রাজনীতিটাই হলো জাতিগত। আর সার্বদের নতুন সিদ্ধান্তের অর্থ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আর কিছু নয়। তিনি বলেন যে, পুরো বলকান অঞ্চলেই এখন জাতীয়তাবাদের উত্থান হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ সার্বিয়াও দ্রুত নিজেদের সামরিক বাজেট বৃদ্ধি করছে এবং দেশটার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দুনিয়ার সকল সার্বদের একত্রিত হবার আহ্বান জানিয়েছেন। সার্বিয়া এখনও ১৯৯৯ সালে ন্যাটোর সহায়তায় সার্বিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আলবেনিয় মুসলিম অধ্যুষিত কসভোকে স্বীকৃতি দেয়নি; এবং এখনও সার্বিয়ার সাথে কসভোর সম্পর্ক বেশ খারাপ। একইসাথে অত্র অঞ্চলে রাশিয়াও অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের মাঝে তার প্রভাব বিস্তার করছে; যার মাধ্যমে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিকে ইইউ এবং ন্যাটো থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে রাশিয়া। এর মাঝে ইইউ বলকানের ব্যাপারে খুব বেশি দৃষ্টি দিচ্ছে না; আর যুক্তরাষ্ট্রও ইন্দোপ্যাসিফিক নিয়ে ব্যস্ত। রাশিয়ার সাথেও চলছে উত্তেজনা। এমতাবস্থায় দোদিকের জাতীয়তাবাদী কর্মকান্ডের ফলে রিপাবলিকা সার্পস্কা যদি বসনিয়া থেকে আলাদা হয়ে যায়, তাহলে সংঘাতের সৃষ্টি হতে পারে; যা বসনিয়ার সীমানার বাইরেও ছড়িয়ে যেতে পারে।

কুপচান বলকানের বেশ কয়েকটা দেশের ইইউ এবং ন্যাটোর সদস্য হওয়াকে সেখানকার উন্নয়ন আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু ইইউ এবং ন্যাটো সদস্য দেশ হাঙ্গেরির গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ভিক্টর অরবানই যখন উগ্রপন্থী কথা বলছেন, তখন ইউরোপের গণতান্ত্রিকতার মাঝেই জাতীয়তাবাদী সমস্যার গভীরতা নতুধাবন করা যায়। বুদাপেস্টে এক ভাষণে তিনি বলেন যে, বসনিয়াকে যদি ইইউএর ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে ২০ লক্ষ মুসলিমের কারণে নিরাপত্তার সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। গত ডিসেম্বরে এক সংবাদ সন্মেলনে অরবান বলেন যে, তিনি রিপাবলিকা সার্পস্কাকে অর্থনৈতিক সহায়তা দিচ্ছেন এবং তিনি মিলোরাদ দোদিকের উপর অবরোধের বিরোধী। অরবান জার্মানির প্রতি দোদিকের বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকান্ডের কারণে শাস্তি না দিয়ে বরং আলিঙ্গন করার আহ্বান জানান। পূর্ব ইউরোপে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতারা যখন নতুন করে সংঘাতের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে, তখন ইন্দোপ্যাসিফিক নিয়েই ব্যস্ত যুক্তরাষ্ট্র; ১৯৯০এর দশকে ওয়াশিংটনের ছায়াতলে স্বাক্ষরিত ডেইটন শান্তি চুক্তিকে ধরে রাখার মতো সময় তাদের নেই। বলকানে তিন দশকের ভিতরেই গণতান্ত্রিকভাবেই ভেঙ্গে পড়ছে মার্কিন রাজনৈতিক সমাধান।

Saturday, 11 September 2021

৯/১১… মার্কিনীরা কি বুঝতে পারছে যে সাম্রাজ্যের খেলা শেষ?

১১ই সেপ্টেম্বর ২০২১

দুই দশক আগে যুক্তরাষ্ট্র ঠান্ডা যুদ্ধে জয়ের কারণে নেতৃত্বশীল অবস্থানে ছিল। কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্র অনেকগুলি বড় শক্তির মাঝে একটা। গায়ের জোর দিয়ে তো বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়া যায় না। অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় হিমসিম খাচ্ছে; আর ভূরাজনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র এখন একটা অনির্ভরযোগ্য সুপারপাওয়ার। হয়তো ব্রিটিশদের মতোই মার্কিনীরাও বুঝতে পারছে যে, সাম্রাজ্যের খেলা শেষ!


 ১১ই সেপ্টেম্বর ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ঘটে যাওয়া ঘটনার জের এখনও দুনিয়া বয়ে বেড়াচ্ছে। বিশেষ করে মার্কিনীরা দুই দশক পরেও সেই ঘটনা নিয়ে কথা বলছে। ‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ঘটনার পর থেকেই ৯/১১এর ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রে অনেকেই ষড়যন্ত্র বলে মনে করতে থাকে। সোশাল মিডিয়াতে অনেকেই বলতে থাকে যে, ঘটনাগুলি যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডীপ স্টেট’এর লোকজন ঘটিয়েছে। এর পিছনে সেই দিনের ঘটে যাওয়া ঘটনার কিছু তথ্য উপাত্ত নিয়েই অনলাইনে পোস্ট দিতে থাকে মানুষ; যা আজও চলছে। অনেকেই মনে করেন যে, জেট ফুয়েলের মাধ্যমে স্টিলের বীম গলিয়ে ফেলা সম্ভব নয়; যার ফলশ্রুতিতে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ১’শ তলা দু’টা ভবন ধ্বসে পড়ে বলে বলা হয়েছিল। এরপর রয়েছে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের কিছু দূরে অবস্থিত ৪৭ তলা ‘৭ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার’এর ধ্বসে পড়া। ১’শ তলা ভবনগুলি ধ্বসে পড়ার কয়েক ঘন্টা পর এই ভবনটা ধ্বসে পড়ে। ‘বিবিসি’র তৎকালীন প্রতিনিধি জেইন স্ট্যানলি টেলিভিশনে লাইভ রিপোর্টে বলেন যে, ‘৭ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার’ ধ্বসে পড়েছে। অথচ রিপোর্টারের পিছনে তখনও পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছিলো যে, ভবনটা দাঁড়িয়ে আছে। এছাড়াও পেন্টাগন ভবনে বিমান আঘাত হেনেছে বলে বলা হয়; সেখানে ভবনে তৈরি হওয়া ছোট্ট ফুটো দিয়ে একটা বিমানের পক্ষে যাওয়া সম্ভব ছিল না। সেখানে বিমানের ডানা বা বিমানের বডির কিছুই ছিল না। অনেকেই সন্দেহ করেছে যে, সেখানে বিমানের স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। এছাড়াও আরও অনেকগুলি যুক্তিতর্কের অবতারণা হয় সেদিনের ঘটনাকে ঘিরে। ‘বিবিসি’ তাদের প্রতিবেদনে মার্কিন সরকার এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলির বিভিন্ন প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে; যেগুলি এই প্রশ্নগুলির উত্তর দেয় বলে দাবি করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখনও মার্কিন জনগণের একটা অংশ রাষ্ট্র এবং মিডিয়ার এই ব্যাখ্যাগুলিকে মেনে নিচ্ছে না। “৯/১১ ট্রুথ” মুভমেন্ট নামে একটা আন্দোলন এখনও সেই ঘটনাগুলির ব্যাপারে সোশাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে পোস্ট দিচ্ছে এবং সত্যিকারের ঘটনা জনগণকে জানাবার জন্যে দাবি করছে।

‘ইউএসএ টুডে’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ৯/১১এর ঘটনা পশ্চিমা দুনিয়াকে এক লক্ষ্যে টেনে এনেছিল। কিন্তু এখন কোনকিছুই তাদেরকে এক রাখতে পারছে না। যে ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের সকল দলই একমত তা হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখন গুরুত্বপূর্ণ আদর্শের ব্যাপারে পুরোপুরিভাবে বিভক্ত। বিশ বছর কেন, দশ বছর আগেও ক্যাপিটল হিলে হামলা চিন্তার বাইরে ছিল। আর এখন মার্কিন এটর্নি জেনারেল মেরিক গারল্যান্ড বলছেন যে, শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদীরা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যে সবচাইতে বড় হুমকি। ‘পিউ রিসার্চ’এর এক গবেষণায় বলা হচ্ছে যে, ২০১৬ সালের নির্বাচনের পর থেকে মার্কিন রিপাবলিকানদের মাঝে মিডিয়ার উপর বিশ্বাস ৭০ শতাংশ থেকে কমে ৩৫ শতাংশে নেমে এসেছে। অথচ ডেমোক্র্যাটদের মাঝে ৮০ শতাংশই মিডিয়াকে বিশ্বাস করছে। ভ্যাকসিনের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মাঝে অনেকেই রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলিকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সামাজিক এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ এখন ইতিহাসে সবচাইতে মারাত্মক পর্যায়ে রয়েছে। বৈচিত্র্যকে একসময় যুক্তরাষ্ট্রের ভিত বলে মনে করা হতো। কিন্তু এখন রাজনৈতিক মেরুকরণ একটা রোগের মতো যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়েছে। ‘বিবিসি’র উত্তর আমেরিকা সম্পাদক জন সোপেল এক লেখায় বলছেন যে, ৯/১১এর বিশ বছর পূর্তিতে ‘ইউনাইটেড স্টেটস’ এখন ‘ডিজইউনাইটেড স্টেটস’ হয়ে গেছে।

‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, গত দুই দশকে আফগানিস্তান এবং ইরাকের যুদ্ধে ৭ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা এবং ১ হাজারের বেশি মার্কিনীদের বন্ধু দেশের সেনা মৃত্যুবরণ করেছে। ‘ব্রাউন ইউনিভার্সিটি’র ‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রকল্পের হিসেবে যুদ্ধাহত সেনাদের পিছনে যুক্তরাষ্ট্রের ৬ ট্রিলিয়ন ডলার বা ৬ হাজার বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে! এটা যুক্তরাষ্ট্রের দশ বছরের সামরিক বাজেটের সমান! এখন পশ্চিমা বিশ্বের মানুষ বেড়ে উঠছে সিকিউরিটি ক্যামেরার নিচে; মানুষের ব্যক্তিগত যোগাযোগের উপর এখন নজরদারি হচ্ছে। বড় এবং ছোট শহরগুলির নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ব্যাপক সামরিক যন্ত্রপাতি দেখে সেটা সন্ত্রাসবাদ দমনে ব্যবহার করা হবে, এই যুক্তি দেয়া কঠিন। সরকারি অফিসগুলি এখন দূর্গের মতো; বিমানবন্দরগুলি এখন নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা।

প্রেসিডেন্ট বুশ যুদ্ধ আরম্ভ করলেও পরবর্তী সকল প্রেসিডেন্টই চেয়েছিলেন মার্কিন সেনাদের দেশের ফিরিয়ে নিয়ে আনতে। তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ পশ্চিমা বিশ্বের মাঝে একাত্মতা তৈরি হবার যে আশা জেগেছিল, তা এখন জাতীয়তাবাদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। ওবামা এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ‘বিশ্বের পুলিশম্যান’ থাকার ভূমিকা ছেড়ে দিতে চাইছিল। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ আরও বলছে যে, ৯/১১এর পর বিশ্ব ব্যবস্থা যা দাঁড়িয়েছিল, তা এখন পুরোপুরিভাবে ভেস্তে গেছে অর্থনৈতিক মন্দা এবং করোনাভাইরাসের সংক্রমণের পর।

‘বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’ বলছে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেন তার বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণকে ধরে রাখতে চেষ্টা করেছিল; যেন ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন খুব বেশি কিছু একটা ছিল না। ১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৭০এর মাঝে তারা বিশ্বব্যাপী মোট ৩৪টা সামরিক মিশন চালিয়েছিল। একটা বৈশ্বিক শক্তির পক্ষে তার শক্তির অবক্ষয় মেনে নেয়া কঠিন। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে সরে এসে চীনের দিকে মনোনিবেশ করেছে। কিন্তু চীন তো সোভিয়েত ইউনিয়ন নয়। চীনারা একটা জাতীয়তাবাদী বড় অর্থনৈতিক শক্তি; যারা মার্কিনীদের নিজস্ব উঠানেই বিনিয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে কমাচ্ছে।

‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ফলে রাশিয়া এবং চীন যেমন প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুরাও বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করছে। ‘বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’ বলছে যে, দুই দশক আগে যুক্তরাষ্ট্র ঠান্ডা যুদ্ধে জয়ের কারণে নেতৃত্বশীল অবস্থানে ছিল। কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্র অনেকগুলি বড় শক্তির মাঝে একটা। গায়ের জোর দিয়ে তো বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়া যায় না। অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় হিমসিম খাচ্ছে; আর ভূরাজনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র এখন একটা অনির্ভরযোগ্য সুপারপাওয়ার। হয়তো ব্রিটিশদের মতোই মার্কিনীরাও বুঝতে পারছে যে, সাম্রাজ্যের খেলা শেষ!

Wednesday, 1 September 2021

যুক্তরাষ্ট্র … আফগানিস্তানের পর

১লা সেপ্টেম্বর ২০২১

যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজেকে দুনিয়ার আদর্শিক নেতৃত্বের অবস্থানে দেখতে চাইছে না। আফগানিস্তান ছেড়ে আসার ঘটনা এই ব্যাপারটাকে আরও পরিষ্কার করলো। মার্কিনীরা এখন অনেক ‘জাতীয়তাবাদী; তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যায় জর্জরিত থেকে বাকি দুনিয়ার ‘পুলিশম্যান’ হতে চাইছে না। তবে যেহেতু কোন একক শক্তি এখনও যুক্তরাষ্ট্রের স্থলাভিষিক্ত হবার মতো অবস্থানে নেই, তাই বিশ্বকে হয়তো নতুন নেতৃত্বের জন্যে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

 
আফগানিস্তান ছেড়ে আসার পর বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আসলে কি হবে? এ নিয়ে অনেকেই কথা বলছেন।

মার্কিন চিন্তাবিদ জর্জ ফ্রীডম্যান থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘জিওপলিটিক্যাল ফিউচার্স’এর এক লেখায় বলছেন যে, ২০ বছর যুদ্ধ করে হেরে যাবার পরেও যুক্তরাষ্ট্রে কেউ কেউ চাইছেন যুদ্ধ চালিয়ে নিতে। কিন্তু তিনি মনে করছেন না যে, আরও ২০ বছর যুদ্ধ করলেও জয়ের দেখা মিলবে; কেননা, সফলতার সংজ্ঞাই এখানে অস্পস্ট এবং অতিরিক্ত রকমের উচ্চাভিলাসী। এর লক্ষ্য ছিল একটা সমাজকে তাদের জীবনযাত্রা থেকে পরিবর্তিত করে মার্কিনীরা যেমন চায় সেরকম করে গড়ে তোলা। কিন্তু এই অঞ্চলের বহু যুদ্ধরত গ্রুপগুলিকে যুদ্ধক্ষেত্রে হারিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা এবং নতুন একটা সংস্কৃতির জন্ম দেয়া ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সাধ্যের বাইরে। ফ্রীডম্যান বলছেন যে, সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে ঠান্ডা যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র যেমন চেয়েছিল পশ্চিমা লিবারাল আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করতে, ঠিক একইভাবে আফগানিস্তানের যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছে আফগানদের সংস্কৃতিকে পরিবর্তন করতে। শক্তি প্রয়োগে দেশটার মাত্র কিছু অংশকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আবার আফগানদের নিজস্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থা ছিল পশ্চিমা লিবারাল আদর্শ থেকে অনেক আলাদা। আফগানরা তাদের নৈতিকতাকেই সঠিক মনে করেছে; তাই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আফগানদের নৈতিকতা পরিবর্তন করে তাদেরকে পশ্চিমা ধাঁচের নৈতিকতাতে নিয়ে আসা ছিল দুষ্কর।

মার্কিন সামরিক কন্ট্রাক্টর ‘ব্ল্যাকওয়াটার’এর প্রতিষ্ঠাতা এরিক প্রিন্স মার্কিন টিভি চ্যানেল ‘ফক্স নিউজ’এর সাথে এক সাক্ষাতে বলছেন যে, ডেমোক্র্যাটরা বলছিলেন যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটোর ক্ষতি করেছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের একা একা আফগানিস্তান ছেড়ে আসার ঘোষণা ন্যাটোর যতটুকু বাকি রয়েছে, তাও ধ্বংস করবে। যুক্তরাষ্ট্রের উপর তার ইউরোপিয় মিত্রদের আস্থা চলে গেছে। মার্কিন ইন্টেলিজেন্স যদি কোন দেশে তাদের লোক নিয়োগ করতে চায়, অথবা কোন দেশকে চীনের বিপক্ষে দাঁড়াতে বলে, তাহলে তারা চিন্তা করবে যে, যুক্তরাষ্ট্র তার বন্ধুদেরকে কিভাবে ফেলে চলে যায়। মার্কিন ডলার দুনিয়ার রিজার্ভ মুদ্রা, কারণ এর পিছনে রয়েছে মার্কিন সামরিক সক্ষমতা। যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি পূরণ করা হচ্ছে ডলার ছাপিয়ে। এখন সারা দুনিয়াতে যদি মার্কিন শ্রেষ্ঠত্ব নিঃশেষ হয়ে আসে, তাহলে তা মার্কিন ডলারের উপর দুনিয়ার জনগণের আস্থাকেও প্রভাবিত করবে। এর ফলশ্রুতিতে মার্কিন অর্থনীতি এবং জীবনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এমন একটা জাতির কাছে পরাজিত হয়, যারা কিনা ৭০ বছরের পুরোনো অস্ত্র ব্যবহার করছে এবং চিন্তাধারার দিক থেকে ষষ্ঠ শতাব্দীতে রয়েছে, তাহলে বুঝতে হবে যে, মার্কিন সামরিক সক্ষমতা যতটা মনে করা হয়, ততটা নয়। সেখানে যতটা সার্ভেইল্যান্সই থাকুক না কেন, তা সেখানকার সমাজের বাস্তবতাতে কতটা পরিবর্তন করতে পারলো, সেটাই আসল কথা। করোনাভাইরাসকে যখন অনেক বড় হুমকি বলে বলা হচ্ছে, তখন এটা মনে রাখা উচিৎ যে, তালিবানরা কোন মাস্ক না পড়েই পুরো দেশ জয় করে নিয়েছে। এই মহামারি তাদেরকে জয়কে খুব একটা আটকাতে পারেনি।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’এর প্রতিষ্ঠাতা ইয়ান ব্রেমার বলছেন যে, আফগানিস্তান থেকে সড়ে আসার সাথে সাথে বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কি হওয়া উচিৎ, তা নিয়ে কথা হচ্ছে। বহুকাল যাবত মার্কিনীরা মেনেই নিয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র দুনিয়ার ‘পুলিশম্যান’। কিন্তু এখন সেই চিন্তায় পরিবর্তন হয়েছে। সারা দুনিয়াব্যাপী যুক্তরাষ্ট্র উন্মুক্ত সমাজ, আইনের শাসন, মানবাধিকারের মতো পশ্চিমা আদর্শগুলিকে প্রতিষ্ঠা করেছে। মার্কিন জনগণ প্রশ্ন করা শুরু করেছে যে, তারা মার্কিন সরকারকে যেসকল প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করার জন্যে নির্বাচিত করছে, তা তারা বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। উল্টো বহু অভিবাসী সেদেশে ঢুকে পড়ছে এবং সমাজকে পরিবর্তন করে ফেলছে। স্ট্যাচু অব লিবার্টির চিন্তাগুলি হঠাত করেই বহু আমেরিকানের কাছে আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে না। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তাতেই সহিংসতা থামছে না, সেখানে অন্য দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে যাওয়া কেন? বাকি দুনিয়ার কাছে উদাহরণ হতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজের জনগণের দেখাশুনা করতে হবে। ব্রেমার বলছেন যে, যদিও বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান বলবত থাকবে, তথাপি যুক্তরাষ্ট্র যে দুনিয়ার ‘পুলিশম্যান’, সেই চিন্তাটা একটা বড় ধাক্কা খেলো। এখন জাতীয়তাবাদী চিন্তাটাই বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র দুনিয়ার নিরাপত্তার জন্যে কাজ করবে মার্কিন জনগণের স্বার্থে। অর্থাৎ যেখানে মার্কিন জনগণ নিজেদের সুবিধা দেখবে না, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র নাক গলাবে না। ২০২১ সাল পর্যন্ত মার্কিনীরা মনে করেছে যে, তাদের আদর্শ দুনিয়ার বাকি আদর্শের চাইতে উন্নততর। কিন্তু বর্তমানে মার্কিন আদর্শ আসলে কোনটা, সেটাই কেউ নিশ্চিতভাবে বলছে পারছে না। তবে মার্কিন মিত্ররাও সমস্যায় রয়েছে; যেকারণে তারাও যুক্তরাষ্ট্রের ছেড়ে আসা জায়গাগুলি অত সহজে পূরণ করতে পারবে না। অপরদিকে চীনারা তাদের প্রভাব বৃদ্ধি করলেও চীনারা যুক্তরাষ্ট্রের ছেড়ে আসা স্থান নিয়ে নেবে, এটা ভাবার পক্ষে কোন যুক্তিই নেই। রুশরাও সেটা করবে না। নেতৃত্ব হয়ে উঠছে আঞ্চলিক; বৈশ্বিক নয়। এতে আঞ্চলিক সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়বে। ওবামা, ট্রাম্প বা বাইডেন সকলেই চাপের মাঝে পড়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এতকাল যে বৈশ্বিক নেতৃত্ব দিয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সমর্থন করছে না। অনেকেই মনে করেছিলেন যে, ট্রাম্পের উত্থান একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা; কাঠামোগত পরিবর্তন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা বলে দিচ্ছে যে, আসল ব্যাপার তার ঠিক উল্টোটা।

এক টুইটার বার্তায় জর্জ ফ্রীডম্যান বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র হলো একটা আদর্শিক প্রকল্প। যেকোন আদর্শিক প্রকল্পের মতোই সে নিজের আদর্শকে অন্যের আদর্শ থেকে উন্নততর মনে করে। তবে আদর্শিক কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে সামরিক হস্তক্ষেপ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়; এবং এর শেষ প্রায় কখনোই ভালো হয় না। ফ্রীডম্যান, প্রিন্স এবং ব্রেমারের কথা থেকে পরিষ্কার যে, যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজেকে দুনিয়ার আদর্শিক নেতৃত্বের অবস্থানে দেখতে চাইছে না। আফগানিস্তান ছেড়ে আসার ঘটনা এই ব্যাপারটাকে আরও পরিষ্কার করলো। মার্কিনীরা এখন অনেক ‘জাতীয়তাবাদী; তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যায় জর্জরিত থেকে বাকি দুনিয়ার ‘পুলিশম্যান’ হতে চাইছে না। তবে যেহেতু কোন একক শক্তি এখনও যুক্তরাষ্ট্রের স্থলাভিষিক্ত হবার মতো অবস্থানে নেই, তাই বিশ্বকে হয়তো নতুন নেতৃত্বের জন্যে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

Sunday, 5 April 2020

পশ্চিমা দেশগুলিতে বর্ণবাদী চিন্তাকে উস্কে দিয়েছে করোনাভাইরাস!

৫ই এপ্রিল ২০২০

     
ফ্রান্সের নঁতে শহরে গ্রাফিতি বলছে, ‘করোনাভাইরাস যত মানুষকে অসুস্থ্য করেছে, তার চাইতে বেশি মানুষকে বর্ণবাদী করেছে’



গত পহেলা এপ্রিল দু’জন ডাক্তার ফরাসী টিভিতে এসে মতামত দেন যে, নভেল করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আফ্রিকার জনগণের উপর টেস্ট করে দেখা যেতে পারে। এই মন্তব্যের পর থেকে এই ডাক্তারদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদের অভিযোগ উঠেছে। টিভি চ্যানেল ‘এলসিআই’এর সাথে সাক্ষাতে প্যারিসের কোচিন হসপিটালের আইসিইউএর প্রধান জঁ-পল মিরা বলেন যে, এইডসএর ভ্যাকসিন টেস্ট করার জন্যে যেমন পতিতাদের বেছে নেয়া হয়েছিল, তেমনি করোনাভাইরাসের প্রতিরোধক হিসেবে যক্ষ্মার প্রতিরোধক ‘বিসিজি’ ভ্যাকসিন টেস্ট করার জন্যে আফ্রিকার মানুষগুলিকে বেছে নেয়া যেতে পারে; কারণ পতিতাদের যেমন এইডসএর বিরুদ্ধে আলাদা কোন প্রতিরোধ নেই, তেমনি আফ্রিকার মানুষগুলিরও করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে কোন প্রতিরোধ নেই। তিনি যুক্তি দেন যে, ইউরোপ বা অস্ট্রেলিয়ার মেডিক্যাল কর্মীরা যথেষ্ট সুরক্ষা নিয়ে কাজ করেন, যার ফলে এমনিতেই তাদের করোনভাইরাসে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা কম থাকবে; তাদেরকে ভ্যাকসিন দেয়া হোক আর না হোক। ফ্রান্সের ন্যাশনাল হেলথ ইন্সটিটিউটের রিসার্চ ডিরেক্টর ক্যামিল লক্ট তার সাথে সহমত পোষণ করে বলেন যে, তারা ইতোমধ্যেই ইউরোপের সমান্তরালে আফ্রিকাতেও এই টেস্ট চালাবার চিন্তা করছেন। এই টেলিভিশন অনুষ্ঠানের পর থেকে প্রায় সাথেসাথেই শুরু হয় সমালোচনার ঝড়। আইভোরি কোস্টের বিখ্যাত ফুটবলার দিদিয়ের দ্রগবা এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, এটা আশ্চর্য্য একটা ব্যাপার যে এধরণের কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে বারংবার সাবধান করতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন যে, আফ্রিকা কোন টেস্টিং ল্যাবরেটরি নয়। তিনি তাদের কথাগুলিকে বর্ণবাদী কথা বলে আখ্যা দেন। দ্রগবার মতো ফ্রান্সের সোশালিস্ট পার্টি এবং বর্ণবাদ বিরোধী গ্রুপগুলিও বিবৃতি দিয়েছে।

‘আল জাজিরা’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, আফ্রিকা এই মুহুর্তে সবচাইতে কম আক্রান্ত মহাদেশ, যেখানে সাড়ে ৭ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এবং মারা গিয়েছে মোট ৩’শ ২০ জন। জঁ-পল মিরা পরবর্তীতে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং ‘হাফিংটন পোস্ট’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে তার বক্তব্যের ব্যাখ্যা হিসেবে বলেন যে, ফ্রান্স এবং আস্ট্রেলিয়ার সাথে আফ্রিকার একটা দেশ এই গবেষণার অংশ হতে পারে, এধরনের কথা আগে কখনোই শোনা যায়নি। ‘বিবিসি’ এক সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফল টেনে নিয়ে এসে বলে যে, যক্ষ্মার প্রতিরোধে ‘বিসিজি’ ভ্যাকসিন বা টিকা যেসব দেশে জনগণের মাঝে দেয়া হয়েছে, সেসব দেশে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা কম হয়ে থাকতে পারে। তারা বলছেন যে, যেসব দেশে যক্ষ্মার প্রকোপ বেশি, সেসব দেশেই শিশুদের মাঝে ‘বিসিজি’ ভ্যাকসিন দেবার প্রচলন রয়েছে। এই চিন্তার উপর নির্ভর করেই কিছু গবেষক ‘বিসিজি’ ভ্যাকসিনকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ব্যবহার করা যায় কিনা, তা নিয়ে চিন্তা করছেন। তবে এই টিভি সাক্ষাতের পর থেকে ভ্যাকসিনের চাইতে পশ্চিমা সমাজের বর্ণবাদ নিয়েই কথা হচ্ছে বেশি।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হবার পর থেকে পশ্চিমা বিশ্বে বর্ণবাদী এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী আচরণের খবর আবারও সংবাদপত্রে আসা শুরু হয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে লন্ডনের অক্সফোর্ড স্ট্রীটে এক সিঙ্গাপুর বংশোদ্ভূত ব্যক্তির উপর চার ব্যক্তি হামলা করে ব্যাপক মারধর করে। হামলাকারীরা বলে যে, ‘আমরা তোমার করোনাভাইরাস আমাদের দেশে চাই না’। ফেব্রুয়ারির শুরুতে নিউ ইয়র্কের সাবওয়ে স্টেশনে মাস্ক পড়া এক চীনা বংশোদ্ভূত মহিলার উপর হামলা করা হয় এবং তাকে ‘রোগের বাহক’ বলে আখ্যা দেয়া হয়। ক্যালিফোর্নিয়ায় এক এশিয় পরিবারের গাড়ির উপর করোনাভাইরাসকে কেন্দ্র করে গালাগালি লেখা হয়। ক্যালিফোর্নিয়াতে এক স্কুলে চীনা বংশোদ্ভূত এক ছাত্রকে কাশি দেবার কারণে শিক্ষক নার্সের কাছে যেতে বলেন, যদিও অন্যদের জন্যে তিনি তা বলেননি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৬ই মার্চ এক টুইটার বার্তায় করোনাভাইরাসকে ‘চীনা ভাইরাস’ বলে আখ্যা দেবার সাথেসাথেই চীনা বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকদের মাঝে নতুন করে শংকা দেখা দিয়েছে। নিউ ইয়র্কের জনপ্রতিনিধি গ্রেইস মেং একজন চীনা বংশোদ্ভূত মার্কিনী। তিনি ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর সাথে সাক্ষাতে বলেন যে, বিভিন্ন দেশে চীনাদের বিরুদ্ধে হয়রানি এবং আক্রমণের ঘটনার খবর শুনে মনে হয় যে, চীনা বংশোদ্ভূত জনগণকে এখনও বিদেশী বলেই আখ্যা দেয়া হয়। পত্রিকাটা বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে যুগের পর যুগ বর্ণবাদ এবং বৈষম্য পেরিয়ে এশিয় বংশোদ্ভূতরা অনেক আশা নিয়ে একুশ শতক শুরু করেছিল। তিনজন এশিয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও দাঁড়িয়েছেন, যা কিনা এশিয়দের মাঝে আশার সঞ্চার করেছিল। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু পর থেকে মার্কিন শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদীরা এশিয় বংশোদ্ভূতদেরকে ভাইরাসের সংক্রমণের জন্যে দায়ি করতে থাকে এবং একইসাথে এশিয়দের উপর বিপুল সংখ্যায় আক্রমণ আসতে থাকে। শতশত মানুষ হামলার কথা রিপোর্ট করলেও বহু মানুষ এব্যাপারে কোন রিপোর্টই করেনি।
   
 
বহু আগ থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে চীনাদেরকে অপেক্ষাকৃত নিচু স্তরের, নোংড়া এবং রুগ্ন মানুষ হিসেবে দেখা হতো। ১৮৭০ সাল থেকে চীন থেকে আসা শ্রমিকদেরকে শ্বেতাঙ্গরা তাদের চাকুরি হারাবার কারণ হিসেবে দেখতে থাকে। ১৮৮২ সালে এক আইনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে চীনা শ্রমিকের আসা বন্ধ করা হয়েছিল। এরপর ১৯৪০এর দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রে থাকা জাপানিদের ভাগ্যে জোটে ব্যাপক অত্যাচার। যুক্তরাষ্ট্রে বরাবরই এশিয় এবং অন্যান্য অশ্বেতাঙ্গ দেশ থেকে আগত জনগণকে অপেক্ষাকৃত নিম্ন স্তরের মানুষ এবং রোগের বাহক হিসেবে দেখা হয়েছে।




জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের প্রফেসর রসালিন্ড চৌ বলছেন যে, তিনি এখন জনসন্মুখে কাশি দিতেও ভয় পান। কারণ তিনি মনে করছেন যে, এশিয় বংশোদ্ভূত হওয়ায় তাকে কাশি দিতে দেখে অন্যরা সেটাকে কিভাবে দেখবে। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রফেসর ক্লেয়ার জীন কিম বলেন যে, বহু আগ থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে চীনাদেরকে অপেক্ষাকৃত নিচু স্তরের, নোংড়া এবং রুগ্ন মানুষ হিসেবে দেখা হতো। ১৮৭০ সাল থেকে চীন থেকে আসা শ্রমিকদেরকে শ্বেতাঙ্গরা তাদের চাকুরি হারাবার কারণ হিসেবে দেখতে থাকে। ১৮৮২ সালে এক আইনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে চীনা শ্রমিকের আসা বন্ধ করা হয়েছিল। এরপর ১৯৪০এর দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রে থাকা জাপানিদের ভাগ্যে জোটে ব্যাপক অত্যাচার। যুক্তরাষ্ট্রে বরাবরই এশিয় এবং অন্যান্য অশ্বেতাঙ্গ দেশ থেকে আগত জনগণকে অপেক্ষাকৃত নিম্ন স্তরের মানুষ এবং রোগের বাহক হিসেবে দেখা হয়েছে। ১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েট শহরে গাড়ির ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করা কিছু লোক ভিনসেন্ট চিন নামে এক চীনা আমেরিকানকে পিটিয়ে হত্যা করে। সেসময় তারা তাদের অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্যে এশিয়দেরকে দায়ি করেছিল। এরপর ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের পর থেকে বাদামি বর্ণের যেকোন মানুষ দেখলেই তাকে সন্ত্রাসী বলে আখ্যা দেয়া হতো। এখন করোনাভাইরাসের প্রভাব কবে কমবে, তা যেহেতু কেউই বলতে পারছে না, তাই এশিয়দের বিরুদ্ধে মার্কিন উগ্রবাদী শ্বেতাঙ্গদের আক্রমণাত্মক এই অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

‘দ্যা আটলান্টিক’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, পশ্চিমা সমাজে মহামারী সবসময়েই ভীতির সঞ্চার করেছে। আর এই ভীতি শেষ পর্যন্ত বৈষম্যের মাঝ দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাসের সংক্রমণের সময় পূর্ব এশিয়দের টার্গেট করা হয়েছিল। ২০১৪ সালে ইবোলা ভাইরাসের কারণে টার্গেট করা হয়েছিল আফ্রিকানদের। ইবোলা ভাইরাসের নাম দেয়া হয়েছে আফ্রিকার একটা নদীর নামে; যেকারণে এই ভাইরাসটা স্বাভাবিকভাবেই আফ্রিকান ভাইরাস হিসেবে পরিচিতি পায়। ২০১২ সালে সংক্রমিত হওয়া ‘মিডল ইস্ট রেস্পিরেটরি সিনড্রোম’ বা ‘মার্স’ ভাইরাসের নামের সাথেই মধ্যপ্রাচ্যকে জুড়ে দেয়া হয়। এবারে করোনাভাইরাসকে একইভাবে অনেক মার্কিন নেতারা ‘উহান ভাইরাস’ বলে আখ্যা দিতে কার্পণ্য করেননি। ইউরোপের উগ্রবাদী ডানপন্থী নেতারা ভাইরাসের সংক্রমণকে যুক্ত করতে চাইছেন সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের সাথে। ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স এবং স্পেনে ডানপন্থী নেতারা ভাইরাস সংক্রমণের কারণ হিসেবে এশিয় এবং আফ্রিকান অভিবাসীদের দুষতে ভুল করেননি। ইউনিভার্সিটি অব কেন্টের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর মিরি সং ‘টাইম’ ম্যাগাজিনের সাথে এক সাক্ষাতে বলেন যে, মানুষ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ছুতোয় বাহ্যিকভাবে আলাদা করা যায় এমন গ্রুপগুলিকে টার্গেট করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের মতো দেশে এটা বাকিদের চাইতে অনেক বেশি হয়েছে। ‘নাইন ইলেভেন’এর পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা, বা আরব, মুসলিম এবং শিখদের উপর হামলা বেড়ে যায়। ব্রিটেনেও ২০১৬ সালে ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকে জাতিগত এবং ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত হামলার সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে।
  
  
চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপে প্লেগের আবির্ভাব হয়, যা ‘ব্ল্যাক ডেথ’ বলে পরিচিত। সেসময় ইউরোপিয়রা মনে করেছিল যে, ইহুদী বণিকরা সিল্ক রুটের মাধ্যমে ইউরোপে প্লেগ এনেছিল। এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে সারা ইউরোপে ইহুদীদের উপর ভয়াবহ অত্যাচার চলেছিল। ১৩৪৯ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ গণহত্যা ছিল সবচাইতে ভয়াবহ; যখন ২ হাজার ইহুদীকে স্ট্রাসবুর্গ শহরে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। মানুষকে রোগের বাহক বা তেলাপোকার সাথে তুলনা দিলে হত্যা করাটা সহজতর হয়েছে। এই কথাগুলি পশ্চিমা সমাজের গোঁড়ার সমস্যাকেই তুলে ধরে। করোনাভাইরাস এই সমস্যাকে শুধু আরেকবার সামনে নিয়ে এলো মাত্র।



ইউনিভার্সিটি অব বাথএর প্রফেসর ব্র্যাড ইভান্স ব্রিটেনের ‘দ্যা ইন্ডেপেন্ডেন্ট’এর এক লেখায় পশ্চিমা সমাজের বর্ণবাদের ইতিহাসকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন। চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপে প্লেগের আবির্ভাব হয়, যা ‘ব্ল্যাক ডেথ’ বলে পরিচিত। সেসময় ইউরোপিয়রা মনে করেছিল যে, ইহুদী বণিকরা সিল্ক রুটের মাধ্যমে ইউরোপে প্লেগ এনেছিল। এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে সারা ইউরোপে ইহুদীদের উপর ভয়াবহ অত্যাচার চলেছিল। ১৩৪৯ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ গণহত্যা ছিল সবচাইতে ভয়াবহ; যখন ২ হাজার ইহুদীকে স্ট্রাসবুর্গ শহরে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। ইভান্স বলছেন যে, বর্ণবাদ ও জাতিগত বিদ্বেষ পশ্চিমাদের জীবনব্যবস্থার মাঝে গেঁথেই ছিল। ব্যক্তিস্বাধীনতার মতো পশ্চিমা চিন্তাগুলি এই বিদ্বেষকে নিয়ন্ত্রণ তো করেইনি, বরং লালনপালন করেছে। প্রতিটা গণহত্যার সময়ই সমাজের কিছু মানুষকে ইঁদুরের সাথে তুলনা দেয়া হয়েছে; বলা হয়েছে যে, এরা হলো রোগের বাহক। মানুষকে রোগের বাহক বা তেলাপোকার সাথে তুলনা দিলে হত্যা করাটা সহজতর হয়েছে। ইভান্সএর কথাগুলি পশ্চিমা সমাজের গোঁড়ার সমস্যাকেই তুলে ধরে। করোনাভাইরাস এই সমস্যাকে শুধু আরেকবার সামনে নিয়ে এলো মাত্র।


Wednesday, 4 July 2018

ভেনিজুয়েলা-কলম্বিয়া-ইকুয়েডরের পতাকা একইরকম কেন?

ঊনিশ শতকে গ্র্যান কলম্বিয়া তৈরি হয় স্পেন থেকে আলাদা হয়ে। এরপরে গ্র্যান কলম্বিয়া ভেঙ্গে তৈরি হয় ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া এবং ইকুয়েডর। দেশগুলির পতাকায় মিল এতটাই যে, এদের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন আসাটা স্বাভাবিক। 


 ০৫ জুলাই ২০১৮
 
দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলি একসময় ছিল স্প্যানিস এবং পর্তুগীজ উপনিবেশ। পঞ্চদশ শতকের শেষে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের অভিযানের পর থেকে ঐ এলাকার মানুষগুলিকে প্রায় নির্মূল করে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকেরা সেখানে বসতি গড়ে। জনসংখ্যার পুরোটাই প্রকৃতপক্ষে ইউরোপিয়ান বংশোদ্ভূত। এদের ভাষা এবং সংস্কৃতি একই। তবুও অনেকগুলি দেশে বিভক্ত এই মহাদেশ। অনেকগুলি পতাকা; জাতীয় সঙ্গীত; জাতীয় প্রতীক। এই বিভক্তির কারণ খুঁজতে যেতে হবে অষ্টম শতাব্দীতে, যখন ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলি আলাদা হবার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
  
স্প্যানিস সামরিক অফিসার ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা ব্রিটিশদের সহায়তায় স্পেনের কাছ থেকে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলিকে আলাদা করার ব্যবস্থা করেন। তার কর্মকান্ডের মাধ্যমে সবচাইতে বেশি লাভবান হয়েছে তৎকালীন সুপারপাওয়ার ব্রিটেন। স্প্যানিসরা ফ্রাঞ্চিসকোকে ব্রিটিশ গুপ্তচর সন্দেহ করতো।


ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা – যিনি দক্ষিণ আমেরিকাকে স্পেন থেকে আলাদা করেন

১৭৫০ সালে ভেনিজুয়েলাতে জন্ম নেয়া স্প্যানিস সামরিক অফিসার ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা বহু দেশের বহু যুদ্ধে অংশ নেন। মার্কিন স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় স্প্যানিসরা সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্রিটিশদের কিছু উপনিবেশ বাগিয়ে নিতে চায়। ১৭৮১ থেকে ১৭৮৪ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এবং ক্যারিবিয় দ্বীপপুঞ্জে স্প্যানিস বাহিনীর অধীনে যুদ্ধে করেন ফ্রাঞ্চিসকো। ১৭৮১ সালে ফ্রাঞ্চিসকোকে ব্রিটিশ উপনিবেশ জামাইকাতে গোয়েন্দাগিরি করতে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি তার কর্মসম্পাদনের মাঝে ব্রিটিশ ব্যবসায়ী ফিলিপ অলউডের সাথে এক চুক্তিও করে ফেলেন। চুক্তি মোতাবেক ব্রিটিশদেরকে তিনি স্পেনের সাথে বাণিজ্যের আড়ালে স্পেনে যাবার একটা চ্যানেল খুলে দেন। স্প্যানিসরা পরবর্তীতে ফ্রাঞ্চিসকোকে গুপ্তচর আখ্যা দেয় এবং অবিশ্বাস করতে থাকে। ফ্রাঞ্চিসকো স্পেন এবং ফ্রান্সের এক যৌথ অপারেশনে অংশ নেন, যার উদ্দেশ্য ছিল ক্যারিবিয়ানে ব্রিটিশদের সবচাইতে শক্ত ঘাঁটি জামাইকাকে দখল করা। পুরো দলের মাঝে ফ্রাঞ্চিসকোরই ব্রিটিশদের সম্পর্কে সবচাইতে ভালো ধারণা ছিল, কারণ তাকে ব্রিটিশদের উপরে গোয়ান্দাগিরিতে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু এই অভিযান চলার মাঝেই কিভাবে যেন ব্রিটশরা আগেভাগে পরিকল্পনা জেনে ফেলে এবং আগেই আক্রমণ করে বসে; ভেস্তে যায় অভিযান। জামাইকা ব্রিটিশদের হাতেই থাকে। আভিযান ব্যর্থ হবার পর ফ্রাঞ্চিসকোর বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ আবারও গভীর হয়। ফ্রাঞ্চিসকো ১৭৮৩ সালের জুলাই মাসে স্প্যানিস কিউবা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান, এবং পরের বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করেন। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে তিনি জর্জ ওয়াশিংটন, হেনরি নক্স, থমাস পেইন, আলেক্সান্ডার হ্যামিল্টন, স্যামুয়েল এডামস এবং থমাস জেফারসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন।

ফ্রাঞ্চিসকো কি ব্রিটিশ গুপ্তচর ছিলেন?

১৭৮৫ সালে ফ্রাঞ্চিসকো লন্ডনে আসেন। সেখান থেকে মার্কিন দূতাবাসের এক সামরিক কূটনীতিবিদ কর্নেল উইলিয়াম স্টিফেন স্মিথের সাথে তিনি প্রুশিয়া যান সামরিক মহড়া দেখতে। পুরো ইউরোপ ঘুরে তিনি অনেকের সাথে বন্ধুত্ব করেন।স্প্যানিয়ার্ডরা সবসময়েই তার উপরে নজর রাখছিল। তারা ফ্রাঞ্চিসকোকে গ্রপ্তার করার চেষ্টাও করেছিল, কিন্তু শক্তিশালী বন্ধুরা ফ্রাঞ্চিসকোকে রক্ষা করে। ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা অনেকদিন থেকেই দক্ষিণ আমেরিকায় স্পেনের উপনিবেশের একটা বড় অংশের দায়িত্বে থাকা ‘ক্যাপ্টেন্সি জেনারেল অব ভেনেজুয়েলা’র কর্তৃত্ব নিতে এক পরিকল্পনা করেন। এই ক্যাপ্টেন্সির অধীনে বর্তমান ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া, পানামা, ইকুয়েডর এবং পেরুর বিরাট অঞ্চল ছিল। তিনি ১৭৯০ সালে প্রথম ব্রিটিশ রাজনীতিবিদের সাথে দক্ষিণ আমেরিকায় আলাদা রাষ্ট্র গঠনের চিন্তাটা আলোচনা করেন। তখন ব্রিটিশদের সাথে স্প্যানিয়ার্ডদের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিলো না। তবে দু’দেশের সম্পর্কে বসন্ত এসে গেলে এই প্রকল্পে ব্রিটিশরা আগ্রহ হারায়।

১৭৯১ থেকে ১৭৯৭ পর্যন্ত সময় ফ্রাঞ্চিসকো ফ্রান্সে কাটান এবং সেখানকার ফরাসী বিপ্লবে সরাসরি অংশ নেন। তিনি ফরাসি বিপ্লবের বিপক্ষে রাজতন্ত্রকামীদের সাথে থাকেন। একাধিকবার বিপ্লবীদের হাতে গ্রেপ্তার হবার পরেও তাকে নিয়ে কি করা হবে, সেটা ঠিক করতে না পেরে তাকে বারংবার ছেড়ে দেয়া হয়। ছাড়া পাবার পরেও তিনি তার কর্মকান্ড অব্যহত রাখেন এবং ১৭৯৬-৯৭ সালের মাঝে দু’দু’বার রাজতন্ত্রপন্থীদের পক্ষে অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেন। অবশেষে সকল চেষ্টা ভেস্তে গেলে ১৭৯৮ সালে গোপনে ব্রিটেনে পালিয়ে যান, যেখানে সবসময়ই তার নিরাপদ আশ্রয় আপেক্ষা করছিল। ব্রিটেন সবসময়েই ফরাসী বিপ্লবের বিরুদ্ধে রাজতন্ত্রীদের সহায়তা দিয়েছিল। আর ১৭৯৯ সাল থেকে ফরাসী বিপ্লব থেকে উত্থিত ন্যাপোলিয়ন আবির্ভূত হন ব্রিটেনের বিশাল শত্রু হিসেবে।

ল্যাটিন আমেরিকায় ফ্রাঞ্চিসকোর প্রথম অভিযান - যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা


তার দক্ষিণ আমেরিকার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ১৮০১ সালে ব্রিটিশদের সহায়তা চান ফ্রাঞ্চিসকো। স্পেন তখন ব্রিটেনের শত্রু দেশ, কেননা ১৭৯৬ থেকে ফ্রান্সের সাথে স্পেন হাত মিলিয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম পিট দ্যা ইয়াংগার ১৮০৫ সালে রিয়ার এডমিরাল হোম রিগস পপহ্যামকে দায়িত্ব দেন ফ্রাঞ্চিসকোর পরিকল্পনাটি খতিয়ে দেখার জন্যে। পপহ্যাম ব্রিটিশ নেতৃত্বকে বোঝান যে, দক্ষিণ আমেরিকায় স্প্যানিস উপনিবেশকে স্পেন থেকে আলাদা করতে গেলে ভেনিজুয়েলা নয়, বরং বর্তমান আর্জেন্টিনার বুয়েনস আয়ার্সের ফলাফল বয়ে আনার সম্ভাবনা বেশি। সেখানে ব্রিটিশ হামলা হলে স্প্যানিস নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ উস্কে দেয়া যাবে অপেক্ষাকৃত সহজে।

ফ্রাঞ্চিসকো এতে মনোক্ষুন্ন হলেন। তিনি তার পরিকল্পনা পাল্টে ১৮০৫-এর নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সরণাপন্ন হলেন। ফ্রাঞ্চিসকো মার্কিন প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন এবং পররাষ্ট্র সচিব জেমস ম্যাডিসনের সাথেও একান্ত বৈঠক করেন। যুক্তরাষ্ট্র ফ্রাঞ্চিসকোকে সরাসরি সহায়তা করতে অস্বীকৃতি জানান, কারণ ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তখনও পক্ষ নেয়নি। ফ্রাঞ্চিসকো থেমে যাননি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অর্থ এবং জনবল যোগাড় করায় মনোনিবেশ করেন, যা ব্যবহার করে তিনি ভেনিজুয়েলাতে সামরিক অপারেশনে যাবেন। দু’শ-এর মতো ভাড়াটে সৈন্য এ অভিযানে যেতে রাজি হয়। তার সাথে থাকে ফ্রাঞ্চিসকোর পুরোনো বন্ধু মার্কিন কর্নেল উইলিয়াম স্টিফেন স্মিথ। মার্কিন ব্যবসায়ী স্যামুয়েল ওগডেনের কাছ থেকে তিনি ২০টি কামানের একটা জাহাজ ভাড়া নেন; নাম দেন ‘লিয়্যান্ডার’। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ থেকে ফ্রাঞ্চিসকো আরও দু’টা জাহাজ সাথে নেন। এই সময়েই তিনি ভেনিজুয়েলার পতাকার ডিজাইন করে ১২ই মার্চ উত্তোলন করেন। পতাকাটা ছিল তিনটি রঙের সমান্তরাল দাগ – হলুদ, নীল এবং লাল। তবে ফ্রাঞ্চিসকোর মিশন সফল হলো না। ১৮০৬ সালের ২৮শে এপ্রিল ভেনিজুয়েলার উপকূলে অবতরণ করতে গিয়ে ফ্রাঞ্চিসকো স্প্যানিশ নৌবাহিনীর কাছে তার ক্যারিবিয়ান থেকে সংগৃহীত দু’টি জাহাজই হারান। ৬০ জন নাবিক বন্দী হয়, যাদের বিচারের পরে ১০ জনের মৃত্যুদন্ড দিয়ে মরদেহ কয়েক খন্ড করে ঝুলিয়ে রাখা হয়। ফ্রাঞ্চিসকো অবশ্য লিয়্যান্ডার-এ চড়ে প্রাণ নিয়ে পালান। তাকে পলায়নে সহায়তা দেয় ব্রিটিশ রয়াল নেভির যুদ্ধজাহাজ ‘লিলি’। ব্রিটিশরা ফ্রাঞ্চিসকোকে ব্রিটিশ উপনিবেশ বার্বাডোসে নিয়ে যায়, এবং ফাঞ্চিসকোকে আরেকবার সামরিক অভিযানে সহায়তা দিতে আগ্রহী হয়।

ফ্রাঞ্চিসকোর দ্বিতীয় অভিযান - যুক্তরাষ্ট্রের স্থানে ব্রিটেন

১৮০৬ সালের ২৪শে জুলাই ত্রিনিদাদের পোর্ট অব স্পেন থেকে ফ্রাঞ্চিসকোর নতুন অভিযানের শুরু হয়। তার যুদ্ধজাহাজ লিয়্যান্ডার-এর সাথে রয়েছে রয়াল নেভির ৪টা যুদ্ধজাহাজ। ফ্রাঞ্চিসকোর ভাড়াটে সেনারা এবং ব্রিটিশ নৌবাহিনীর নাবিকেরা উপকূলে নেমে কিছুদিন তাদের দখলের চেষ্টা চালিয়ে যান। কিন্তু স্প্যানিশ সৈন্যদের সংখ্যাধিক্যের কারণে অগাস্টের মাঝেই তিনি তার অভিযান গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন। এই ব্যর্থ অভিযানের পর যুক্তরাষ্ট্র সরকার ফ্রাঞ্চিসকোকে সহায়তা করার জন্যে কর্নেল উইলিয়াম স্মিথ এবং ব্যবসায়ী স্যামুয়েল ওগডেনের বিরুদ্ধে মামলা করে। অভিযোগ ছিল যে, তারা দস্যুতা করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরপেক্ষতাকে নষ্ট করেছেন। আদালতে হাজির হয়ে কর্নেল স্মিথ বীরদর্পে বলেন যে, তিনি এই অপারেশনে গিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন এবং পররাষ্ট্র সচিব জেমস ম্যাডিসনের নির্দেশে। এই রাজনীতিবিদেরা উভয়েই আদালতে যেতে অস্বীকৃতি জানান এবং ফলশ্রুতিতে স্মিথ এবং ওগডেন উভয়কেই নির্দোষ ঘোষণা করা হয়। আসলে এই অপারেশনটা প্রথমে ছিল মার্কিন। এরপর প্রথম ব্যর্থতার পর ব্রিটিশরা সেটার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলাতেই যতো বিপত্তির সৃষ্টি হয়। ভেনিজুয়েলাকে স্পেন থেকে আলাদা করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন উভয়েই সেটার নিয়ন্ত্রণ চাইছিল।


  
আর্জেন্টিনার প্রতিষ্ঠাতা হোজে ডে স্যান মার্টিন এবং চিলির প্রতিষ্ঠাতা বার্নার্ডো ও'হিগিন্স আন্দিজ পর্বত পাড়ি দিচ্ছেন চিলির উদ্দেশ্যে। ব্রিটিশরা আর্জেন্টিনায় অভিযান চালানোর পর পুরো ল্যাটিন আমেরিকা স্প্যানিস শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে। আপাতদৃষ্টিতে ব্রিটিশ অপারেশনকে ব্যর্থ মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে ল্যাটিন আমেরিকাকে স্পেন থেকে আলাদা করাই ছিল ব্রিটিশ পরিকল্পনা। আর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্বাধীনতাকামী নেতারা বিরাট ভূমিকা পালন করে। 


ব্রিটিশরা কি দক্ষিণ আমেরিকায় ব্যার্থ হয়েছিল?

এর মাঝেই ১৮০৬-০৭ সালের মাঝে ব্রিটিশ সরকার বর্তমান আর্জেন্টিনার বুয়েনস আয়ার্সে একটা সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। স্প্যানিসদের বেশিরভাগ সামরিক শক্তি কেন্দ্রীভূত ছিল ভেনিজুয়েলাতে; আর্জেন্টিনার আশেপাশে শক্তি ছিল খুবই কম; যেকারণেই ব্রিটিশরা সেখানে অপারেশনে যায়। এরপরেও সরাসরি সাফল্য না পেয়ে ব্রিটিশরা সেখান থেকে চলে আসে। ফ্রাঞ্চিসকো এবার লন্ডন যান এবং নতুন করে ভেনিজুয়েলা আভিযানের জন্যে ব্রিটিশ সহায়তা চাইতে থাকেন। কিন্তু ঠিক সেসময় বিরাট এক রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়ে যায়। ১৮০৫ সালে ফরাসী-স্প্যানিস নৌবহর ব্রিটিশদের হাতে ত্রাফালগার-এর যুদ্ধে পরাজিত হলে পর্তুগীজরা আত্মায় শক্তি পায় এবং ব্রিটিশদের পক্ষে চলে যায়। এতে ন্যাপোলিয়ন ক্ষেপে গিয়ে স্পেন এবং পর্তুগালে সৈন্য পাঠান। এভাবে স্পেন হয়ে যায় ব্রিটিশ বন্ধু; এবং দক্ষিণ আমেরিকায় স্প্যানিস উপনিবেশকে স্পেন থেকে আলাদা করার পরিকল্পনা মুলতুবি করা হয়। কিন্তু ততদিনে যা হবার, তা হয়ে গেছে। ব্রিটিশ আক্রমণের ফলশ্রুতিতে ভেনিজুয়েলা এবং আর্জেন্টিনায় বিদ্রোহ শুরু হয়ে গেছে। ১৮১০ সালের মে মাসে আর্জেন্টিনায় বিদ্রোহীরা স্প্যানিস নেতৃত্বের কাছ থেকে ক্ষমতা দখল করে নেয়। আর্জেন্টিনার বিদ্রোহীরা হোজে ডে স্যান মার্টিনের নেতৃত্বে এরপর চিলি এবং পেরুকে স্পেন থেকে আলাদা করে ফেলে।

প্রায় তিন’শ বছর ধরে ব্রিটিশরা দক্ষিণ আমেরিকায় বড় কোন অপারেশনে যায়নি। ন্যাপোলিয়নের অভিযানকে উপজীব্য করে ব্রিটিশরা স্পেনের উপনিবেশগুলিকে স্পেন থেকে আলাদা করার প্রক্রিয়া শুরু করে। সেই প্রক্রিয়াতে ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা সহায়তা করেছিলেন শুধু। মিরান্ডার আঁকা পতাকাকেই পরবর্তীতে ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া এবং ইকুয়েডর নিজেদের জাতীয়তার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দেয়। ১৮১০ সালের ১৯শে এপ্রিল ভেনিজুয়েলার কারাকাসে বিদ্রোহীরা স্প্যানিস নেতৃত্বকে বন্দী করে ফেলে। সিমন বলিভার এবং আন্দ্রেস বেলোর নেতৃত্বে তারা লন্ডনে প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে ব্রিটিশদের কাছ থেকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি চায় এবং সরাসরি ব্রিটিশদের হস্তক্ষেপ কামনা করে। তারা ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডাকেও তাদের সাথে ভেনিজুয়েলাতে নিয়ে আসে। ১৮১১ সালের জুলাই মাসে স্বাধীন ভেনিজুয়েলার ঘোষণা দেয়া এবং ফ্রাঞ্চিসকোর ব্যবহার করা তিন রঙের ভেনিজুয়েলার পতাকাকে অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু ১৮১২ সালে এক প্রতিবিপ্লবের মাঝ দিয়ে স্পেনপন্থীরা আবারও ক্ষমতা দখল করে নেয়। ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা স্প্যানিসদের সাথে চুক্তি করতে গেলে সিমন বলিভার এতে নাখোশ হন। বলিভারের হিসবে সেটা ছিল রাষ্ট্রদ্রোহিতার সামিল। ফ্রাঞ্চিসকোকে তারা স্প্যানিস নেতৃত্বের হাতে তুলে দেয়, আর এর বিনিয়মে চুক্তি মোতাবেক সিমন বলিভারকে নিরাপদে স্পেনে ভ্রমণ করার অনুমতি দেয় স্প্যানিয়ার্ডরা। ১৮১৬ সালের ১৪ই জুলাই ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা বিচারাধীন অবস্থায়ই স্পেনে মৃত্যুবরণ করেন এবং তার লাশ গণকবরে দাফন করা হয়, যাতে কোনটা তার কবর, সেটা যেন খুঁজে পাওয়া না যায়।
  

জার্মান দার্শনিক উলফগ্যাং ফন গোথে ভেনিজুয়েলার পতাকার রংগুলি বেছে নিতে সহায়তা করেছিলেন। পতাকার ডিজাইন করেছিলেন ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা। পরবর্তীতে এই তিন রঙের পতাকাই ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া এবং ইকুয়েডরের পতাকায় স্থান পায়। উৎস একই বলে ল্যাটিন আমেরিকার এই দেশগুলির মাঝে পার্থক্য করা কঠিন।

যেভাবে তিন দেশের পতাকা আঁকা হলো

ফ্রাঞ্চিসকো ভেনিজুয়েলার পতাকার ধারণাকে আকারে রূপ দিতে কথা বলেছিলেন জার্মান দার্শনিক জোহান উলফগ্যাং ফন গোথে এবং রুশ কূটনীতিবিদ সাইমন রোমানোভিচ ভরনজফের সাথে। গোথের সাথে ফ্রাঞ্চিসকোর পতাকা নিয়ে কথা হয় ১৭৮৫ সালে। গোথে তাকে বলেন যে, তিনটা মূল রঙ থেকেই আলোর সৃষ্টি হয় – হলুদ, নীল এবং লাল। এই তিনটা রঙ আলাদাভাবে শুরু হলেও শেষ হয় এক লক্ষ্যে। ফ্রাঞ্চিসকোরও তাই এরকমই এক লক্ষ্যে এক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা উচিৎ। ফ্রাঞ্চিসকো চাইছিলেন আমেরিকাতে পুরো স্প্যানিস উপনিবেশ মিলিয়ে বিশাল এক রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা। একেবারে বর্তমানের যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম এবং মধ্যাংশ থেকে শুরু করে মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা, কিউবা সহ, দক্ষিণ আমেরিকার বর্তমান ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর মিলে সেই রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন ফ্রাঞ্চিসকো। ব্রিটিশদের কাছে উপস্থাপিত তার পরিকল্পনা তেমনই ছিল। মূলতঃ স্পেন থেকে আলাদা হবার কাজটাই তিনি করেছিলেন। বিশেষ বিশেষ সময়ে বিশেষ বিশেষ স্থানে উপস্থিত থাকায় স্পেন তাকে ব্রিটিশ গুপ্তচর হিসেবে মনে করতো। ফরাসী বিপ্লবের সময়ে বিপ্লবের বিপক্ষের রাজতন্ত্রকামীদের (যাদেরকে ব্রিটিশরা সহায়তা করতো) পক্ষে একাধিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা তার স্প্যানিস দোষারোপকে মুছে ফেলতে সহায়তা করে না। স্পেন ন্যাপোলিয়নের পক্ষে থাকার সময় তিনি ব্রিটিশদের সহায়তায় ল্যাটিন আমেরিকার বিদ্রোহ উস্কে দেন। এরপর স্পেন ব্রিটিশদের পক্ষে গেলেও তার কর্মকান্ড চালিয়ে যান, এবং স্পেন থেকে তার সকল ল্যাটিন আমেরিকার উপনিবেশ আলাদা করে ফেলেন। তিনি স্থিতিশীল কোন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে যেতে পারেননি; যে কাজটা পরে সিমন বলিভার করেছিলেন।
 

ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো সিমন বলিভারের ছবির সামনে কথা বলছেন। সিমন বলিভার ল্যাটিন আমেরিকার জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে স্বীকৃত হলেও তিনি আসলে কয়েকটা দেশের জন্মদাতা। ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা যেখানে ল্যাটিন আমেরিকাকে স্পেন থেকে আলাদা করেছিলেন, বলিভার সেই আলাদা হওয়া ল্যাটিন আমেরিকাকে টুকরো টুকরো করায় অংশ নিয়েছেন।

 
সিমন বলিভার এবং ল্যাটিন আমেরিকার বিভক্তি

সিমন বলিভার ল্যাটিন আমেরিকার স্প্যানিস অঞ্চলগুলিকে টুকরো টুকরো করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৮১৯ সালে রিপাবলিক অব কলম্বিয়া তৈরি করে নিজে প্রেসিডেন্ট হন, এবং দুই জন ভাইস প্রেসিডেন্টের অধীনে দেশটাকে দুই ভাগ করেন। একটার নাম দেয়া হয় ভেনিজুয়েলা, আর আরেকটা নিউ গ্রানাডা (পরবর্তীতে কলম্বিয়া)। তবে দেশগুলি যে একই উৎস থেকে এসেছিল, তা ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া এবং ইকুয়েডরের পতাকা দেখলেই বোঝা যায়। তিন দেশের পতাকাতেই একই রঙ ব্যবহার করা হয়েছে, যা কিনা ফ্রাঞ্চিসকোর আঁকা। বলিভার এবং ফ্রাঞ্চিসকোর চিন্তাধারায় কিছুটা দ্বিমত ছিল। যেখানে ফ্রাঞ্চিসকো ছিলেন ব্রিটিশপন্থী, বলিভার ছিলেন সমাজতন্ত্রী। বলিভারের সমাজন্তন্ত্রী চিন্তাধারা তার শিক্ষক ডন সিমন রদ্রিগেজ দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিল। তারা দু’জনে মিলে ইউরোপ ভ্রমণে বের হয়েছিলেন এবং ১৮০৫ সালে মিলানে ইতালির রাজা হিসেবে ন্যাপোলিয়নের রাজকীয় অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। রদ্রিগেজ ১৭৯৭ সালেই স্প্যানিস শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে জড়িত থাকার অপরাধে ভেনিজুয়েলা ছেড়েছিলেন। বলিভার ১৮২১ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের নামানুসারে ‘গ্র্যান কলম্বিয়া’ নামে আরেকটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন, যার মাঝে ছিল বর্তমানের ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া, পানামা, ইকুয়েডর। আর্জেন্টিনার জেনারেল হোজে ডে স্যান মার্টিন-এর সাথে একত্রিত হয়ে বলিভার পেরু এবং ইকুয়েডরকে আলাদা করেন। সকলের কাছে এই কাজটি ছিল স্পেন থেকে মুক্ত করার কাজ। প্রকৃতপক্ষে তারা আলাদা কয়েকটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন, যাদের মাঝে আলাদা হবার কোন কারণই ছিল না। আলাদা আলাদা নেতৃত্ব দেয়া হয় এসব স্থানে, যারা খুব শিগগিরই নিজেদের আখের গোছাতে আলাদা রাষ্ট্র চাইতে থাকেন। ১৮২৫ সালের ৬ই অগাস্ট নতুন আরেকটি দেশের জন্ম দেয়া হয়; যার নামকরণ করা হয় সিমন বলিভারের নামে – বলিভিয়া। এই সবগুলিই তখন ছিল গ্র্যান কলম্বিয়ার অধীনে, যার একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন বলিভার। কিন্তু ১৮৩০ সালের মাঝেই গ্র্যান কলম্বিয়া ভেঙ্গে ভেনিজুয়েলা, নিউ গ্রানাডা (কলম্বিয়া) এবং ইকুয়েডর তৈরি হয়; প্রত্যেকটির একচ্ছত্র অধিপতি হন বলিভারেরই সমালোচকেরা, যারা একসময় বলিভারের একনায়কোচিত কার্যকলাপের বিরোধী ছিলেন।
  
খুব অল্প সময়ের মাঝেই ল্যাটিন আমেরিকার পুরো এলাকা স্প্যানিসদের হাতছাড়া তো হয়ই, তদুপরি অনেকগুলি দেশে বিভক্ত হয়ে যায়। সুপারপাওয়ার ব্রিটেন ল্যাটিন আমেরিকাকে একত্রিত দেখতে চায়নি।


ব্রিটেন – সুপারপাওয়ারের রাজনীতিই সবকিছু

ন্যাপোলিয়নের আবির্ভাবের আগ পর্যন্ত ব্রিটিশরা দক্ষিণ আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপন করেনি। গায়ানা উপকূলের অল্প কিছু অঞ্চল ডাচ এবং ফ্রেঞ্চদের অধীনে ছাড়া এর প্রায় পুরোটাই ছিল পর্তুগাল এবং স্পেনের অধীনে। ১৮৩০ সাল নাগাদ পর্তুগীজদের অধীনে ব্রাজিল ছাড়াও সৃষ্টি হয় রিও ডে লা প্লাটা (আর্জেন্টিনা), উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে, চিলি, বলিভিয়া, পেরু, ইকুয়েডর, কলম্বিয়া এবং ভেনিজুয়েলা। ব্রিটিশরাও গায়ানা উপকূলে একটা উপনিবেশ করে ফেলে। স্প্যানিস উপনিবেশিক এলাকাটা কেটে টুকরা টুকরা করে ৯টা দেশ তৈরি হলেও ব্রাজিল একত্রেই থাকে; কেউ একে ভাঙ্গেনি। কারণ ব্রাজিল ছিল ব্রিটিশদের বন্ধু পর্তুগালের উপনিবেশ। ব্রিটিশরা চায়নি ব্রাজিল ভেঙ্গে যাক।

ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলি স্বপ্নে পাওয়া জাতীয়তার উপরে প্রতিষ্ঠিত। নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা নিজেদের মাঝে ক্ষমতার ভাগাভাগি করতে গিয়ে দেশগুলিকে টুকরো টুকরো করেছে। আলাদা করে জাতীয় পতাকা ডিজাইন করার সময় রয়েছে কার? ফ্রাঞ্চিসকো তো কষ্ট করে ডিজাইন করেই দিয়ে গেছেন; তাই ওটার উপরেই কেটে-চিরে দাঁড়িয়ে আছে আজকের পতাকাগুলি। এই পতাকাকে ঘিরেই কতনা আবেগ; উচ্ছ্বাস! কেউ চিন্তাও করেনি যে ৯টা পতাকা মানে ৯টা আলাদা জাতিরাষ্ট্রে বিভক্ত তারা; যদিও তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, আকৃতি, সকলকিছুই এক! এদের সকলেই একবাক্যে ফ্রাঞ্চিসকো, বলিভার, স্যান মার্টিন-এর মতো কয়েক ব্যক্তিকেই স্মরণ করে; কারণ তাদের সকলেরই জন্ম এদের হাতে। আর এরা আবার কাজটা সম্পাদন করেছে তৎকালীন সুপারপাওয়ার ব্রিটিশদের হাত ধরে। ব্রিটিশরা স্পেন থেকে ল্যাটিন আমেরিকার অঞ্চলকে আলাদা করলেও এদেরকে একত্রে বিরাট এক দেশ হিসেবে দেখতে চায়নি। ছোট ছোট দেশে বিভক্ত হয়ে তারা একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করে নিজেদের মাঝে ব্যাস্ত থেকেছে। জাতীয় পতাকা, সঙ্গীত এবং প্রতীকগুলি তাদের সেই ইন্ধন যুগিয়েছে। হাল্কা বিষয়গুলি তাদের আবেগকে নাড়া দিয়েছে এবং আবেগ হয়েছে তাদের চালিকাশক্তি। ফ্রাঞ্চিসকো, বলিভার, স্যান মার্টিন-এর সৃষ্ট দেশগুলি ভূরাজনীতিতে তাই শিশুই রয়ে গিয়েছে।

আরও পড়ুনঃ
আর্জেন্টিনা কি পারবে?