Showing posts with label Spain. Show all posts
Showing posts with label Spain. Show all posts

Saturday, 6 May 2023

ইউরোপজুড়ে মে দিবসের বিক্ষোভ শ্রমিকদের অপূর্ণ অধিকারকেই তুলে ধরে

০৬ মে ২০২৩

ফ্রান্সে মে দিবসে শ্রমিকদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ। ‘আইএলও’ প্রধান তার হতাশা ব্যক্ত করে বলেন যে, এখনও নীতির ঘুরপাকেই পড়ে থাকতে হচ্ছে; যেখানে বৈষম্য এবং অস্থিরতাই স্বাভাবিক। ‘আইএলও’ প্রধানের হতাশার কথাগুলি ইউরোপের লিবারাল পুঁজিবাদী দেশগুলির রাস্তায় শ্রমিক বিক্ষোভের মাঝেই প্রতিফলিত হচ্ছে। ন্যায্য বেতন, জীবনযাত্রার মান, ছুটি, ইত্যাদি ইস্যুতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ দেখিয়ে দেয় যে, ইউরোপের উন্নত দেশগুলি শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিতে যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা রক্ষা করতে মোটেই মনোযোগী হয়নি।

‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এবারের মে দিবসে পুরো ইউরোপজুড়ে শ্রমিক ইউনিয়নগুলি বহু বিক্ষোভের আয়োজন করেছে। বিশেষ করে ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতির কারণে যে মানুষগুলি অর্থনৈতিকভাবে বেশি চাপের মাঝে পড়েছে, তারাই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে। ‘জার্মান ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন’ বা ‘ডিজিবি’ বলছে যে, তাদের আয়োজিত ৩’শ ৯৮টা মিছিলে ২ লক্ষ ৮৮ হাজার মানুষ যোগ দিয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা, বিমান পরিবহণ, সড়ক পরিবহণ, রেলওয়ে, ডাকবিভাগ, পরিচ্ছন্নকর্মী ছাড়াও বিভিন্ন সেক্টরের শ্রমিকরা এবছরে জার্মানিতে ন্যায্য পারিশ্রমিক এবং কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন সুবিধা বৃদ্ধির দাবিতে ধর্মঘট পালন করেছে। বার্লিনে এক মিছিলে জার্মান শিল্পভিত্তিক ট্রেড ইউনিয়ন ‘আইজি মেটাল’এর নেতা জোর্গ হফমান ঘোষণা দেন যে, তারা ধর্মঘট করার অধিকারের উপর কোন প্রকারের নিয়ন্ত্রণ সহ্য করবেন না।

তবে ফ্রান্সের রাস্তাগুলি ছিল সবচাইতে উত্তপ্ত। পুরো ফ্রান্সজুড়ে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর নতুন পেনশন আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে। অবসরের বয়স ৬২ বছর থেকে বাড়িয়ে ৬৪ বছর করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ফরাসি শ্রমিক ইউনিয়নগুলি ৩’শর বেশি মিছিলের ডাক দিয়েছিল। দিন যত গড়িয়েছে, বিক্ষোভগুলি ক্রমেই সহিংস হয়েছে এবং পুলিশের সাথে শ্রমিকদের সংঘর্ষ হয়েছে। ফরাসি বার্তাসংস্থা ‘এএফপি’ বলছে যে, বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু ছুঁড়ে মেরেছে এবং রাস্তার পাশের বিভিন্ন দোকানপাট ও ব্যাংকের জানালার গ্লাস ভাংচুর করেছে। লিয়ঁ শহরে পুলিশ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেরাল্ড ডারমারিন এক সংবাদ সন্মেলনে বলেন যে, সহিংসতায় ১’শ ৮ জন পুলিশ আহত হয়েছে এবং দেশজুড়ে ২’শ ৯১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ৮ লক্ষাধিক মানুষ এই বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিল। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, একদিকে শ্রমিকরা যেখানে বলছে যে, সরকারের নতুন আইনে তাদের অধিকার খর্ব হচ্ছে, সেখানে সরকার বলছে যে, দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে এটা প্রয়োজন; কারণ ফ্রান্সের জনগণের গড় বয়স বেড়ে যাচ্ছে। এবারে বামপন্থীদের সাথে যোগ দিয়েছিল সাধারণ জনগণ; যারা অর্থনৈতিক সুবিচার চায় এবং প্রেসিডেন্টের ব্যবসায়ী-বান্ধব নীতির বিরোধী।

এদিকে ইতালিতে ডানপন্থী সরকার কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি হবে এই লক্ষ্য নিয়ে দরিদ্রদের জন্যে সামাজিক সুরক্ষা কমিয়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এক বিবৃতিতে ঘোষণা দেন যে, চার বছর আগে চালু করা দরিদ্রদের সুরক্ষা আইনে পরিবর্তন আনা হয়েছে; যাতে করে কারা কাজ করতে পারে, আর কারা কাজ করতে পারে না, তাদের মাঝে আলাদা করা যায়। অর্থাৎ যাদেরকে এই সুবিধা দেয়া হবে, তাদের সংখ্যা কমিয়ে আনা হচ্ছে। ইতালির বিরোধী দলগুলি ক্ষমতাসীনদের সামাজিক সুরক্ষা কমিয়ে ফেলার নীতির ব্যাপক সমালোচনা করছে। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, ইতালির উত্তরের তুরিন শহরে বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির পাপেট নিয়ে মিছিল করে, যেখানে মেলোনি ফ্যাসিস্ট স্যালুট দিচ্ছেন বলে দেখানো হয়।

এদিকে ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, স্পেনের শ্রমিক ইউনিয়নগুলি ৭০টার বেশি মিছিলের আয়োজন করে; যেখানে বলা হয় যে, মুদ্রাস্ফীতির সাথেসাথে শ্রমিকদের বেতন না বাড়লে সামাজিক দ্বন্দ্ব তৈরি হবে। মাদ্রিদের ‘ইলাসট্রিয়াস কলেজ অব ল’ইয়ার্স’এর আইনজীবিরাও রাস্তায় মিছিল করে। তাদের দাবি ছিল ছুটির। স্পেনের আইন অনুযায়ী একজন আইনজীবিকে বছরে ৩৬৫ দিনই কাজের জন্যে প্রস্তুত থাকতে হয়। এমনকি তাদের কাছের কোন ব্যক্তির যদি মৃত্যুও হয়, অথবা তারা নিজেরা যদি অসুস্থও হয়, তাহলেও তাদেরকে কাজের ডিউটি দিতে হয়। তারা বলছেন যে, করোনা মহামারির সময়ে আইনজীবিরা হাসপাতাল থেকে টুইটারে ছবি পোস্ট করেছিলেন, যেখানে তারা বলছিলেন যে, স্যালাইন দেওয়া অবস্থায় তারা কাজ করছিলেন।

‘আনাদোলু এজেন্সি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে হাজারো শ্রমিক রাস্তায় বিক্ষোভ করেছে। মূলতঃ বামপন্থী সংগঠনগুলির আয়োজন করা এই বিক্ষোভে ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতির মাঝে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান রক্ষা করার কষ্টটাকেই তুলে ধরা হয়। একই দিনে গ্রিসে রেল শ্রমিক, জাহাজ ও বন্দর শ্রমিকরা ধর্মঘট করে। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, মেসিডোনিয়ায় মন্ত্রীদের বেতন ৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি করার প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। সে দেশে শ্রমিকদের বেতন সাড়ে ৩’শ ডলার হলেও মন্ত্রীদের বর্তমান বেতন বাড়িয়ে ২ হাজার ৫’শ ৩০ ডলার করা হয়েছে।

ইউরোপের রাস্তায় বিক্ষোভগুলি যে বিশ্বব্যবস্থার সমস্যা, তা ‘আইএলও’ প্রধানের বক্তব্যতেই পরিষ্কার হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ‘আইএলও’এর ডিরেক্টর জেনারেল গিলবার্ট হুংবো মে দিবস উপলক্ষে এক বার্তায় বিশ্বব্যাপী শ্রমিকদের জন্যে সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। একইসাথে তিনি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও জলবায়ুগত নীতিতে পরিবর্তন আনার আহ্বান জানান; যাতে করে সকলের অধিকার নিশ্চিত করা যায়। তিনি তার হতাশা ব্যক্ত করে বলেন যে, করোনা মহামারির সময়ে শ্রমিকদেরকে যেসকল প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, সেগুলি বাস্তবায়িত হয়নি। বিশ্বব্যাপী শ্রমিকদের সত্যিকারের বেতন কমে গেছে, দারিদ্র্য বেড়ে যাচ্ছে, অর্থনৈতিক বৈষম্য আগের চাইতেও আরও মারাত্মকভাবে যেঁকে বসেছে। শ্রমিকরা মনে করছে যে, করোনা মহামারির সময় তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে কাজগুলি করেছে, সেগুলির পুরষ্কার কেন, স্বীকৃতিই দেয়া হয়নি। এগুলির কারণে শ্রমিকদের মাঝে মারাত্মক আকারের অবিশ্বাস দেখা দিয়েছে।

‘আইএলও’ প্রধান মনে করিয়ে দেন যে, ১৯৪৪ সালে ‘আইএলও’ প্রতিষ্ঠার সময়ে বলা হয়েছিল যে, বিশ্ব অর্থনীতি শুধুমাত্র প্রবৃদ্ধি এবং কিছু পরিসংখ্যান টার্গেটের পিছনেই ছুটবে না; বরং সেখানে মানুষের চাহিদা এবং ইচ্ছাকে প্রধান্য দেবে। অর্থাৎ বৈষম্য দূরীকরণ, দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং সামাজিক সুরক্ষা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল; বিশেষ করে জনগণের জন্যে এমন ধরণের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, যাতে করে মানুষ নিজেদের দায়িত্ব নিজেরাই নিতে পারে। কিন্তু তিনি তার হতাশা ব্যক্ত করে বলেন যে, এখনও নীতির ঘুরপাকেই পড়ে থাকতে হচ্ছে; যেখানে বৈষম্য এবং অস্থিরতাই স্বাভাবিক। ‘আইএলও’ প্রধানের হতাশার কথাগুলি ইউরোপের লিবারাল পুঁজিবাদী দেশগুলির রাস্তায় শ্রমিক বিক্ষোভের মাঝেই প্রতিফলিত হচ্ছে। ন্যায্য বেতন, জীবনযাত্রার মান, ছুটি, ইত্যাদি ইস্যুতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ দেখিয়ে দেয় যে, ইউরোপের উন্নত দেশগুলি শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিতে যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা রক্ষা করতে মোটেই মনোযোগী হয়নি।

Monday, 16 May 2022

‘পেগাসাস’ স্পাইওয়্যার কেন স্পেন এবং মরক্কোর মাঝে সম্পর্ককে উত্তপ্ত করছে?

১৬ই মে ২০২২

 
‘পেগাসাস’এর ব্যবহার স্পেন এবং মরক্কোর সম্পর্কের মাঝে একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়; যা এই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে ইস্রাইলের অবস্থান জানান দিচ্ছে। এর মাধ্যমে ইস্রাইল তার নিজের নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে কৌশলগত দরকষাকষি বৃদ্ধি করেছে। বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমতে থাকার সাথেসাথে ইস্রাইল এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত; যা কিনা নতুন নতুন আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার জন্ম দিচ্ছে।


গত ২রা মে স্পেনের ক্যাবিনেট মন্ত্রী ফেলিক্স বোলানিয়স তড়িঘড়ি করে আয়োজিত এক সংবাদ সন্মেলনে বলেন যে, সেদেশের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী মারগারিতা রোবলসএর ফোন ইস্রাইলের ডেভেলপ করা ‘পেগাসাস’ স্পাইওয়্যার দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল। ২০২১ সালের মে মাসে প্রধানমন্ত্রীর ফোন দু’বার এবং জুন মাসে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ফোন একবার আক্রান্ত হয়। এই কর্মকান্ডের মাধ্যমে দুই মন্ত্রীর ফোন থেকে যথেষ্ট পরিমাণ তথ্য চুরি করা হয়। তিনি বলেন যে, এই কাজটা স্পেনের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে থেকে করা হয়েছে। বোলানিয়স বলেননি যে, কে এই স্পাইওয়্যারের পিছনে থাকতে পারে। তবে তিনি বলেন যে, স্পেনের আইনবিভাগ এবং পার্লামেন্ট এব্যাপারে তদন্ত করছে। এই ঘটনার জের ধরে ১০ই মে স্পেন সরকার ঘোষণা দেয় যে, দেশটার ইন্টেলিজেন্স সংস্থা ‘সিএনআই’এর প্রধান পাজ এস্তেবানকে বরখাস্ত করা হয়েছে। যদিও এই বরখাস্তকে সরকার ‘প্রতিস্থাপন’ বলে আখ্যা দিয়েছে, তথাপি সরকার দেশটার ইন্টেলিজেন্স সংস্থা ‘সিএনআই’এর কর্মকান্ডের ব্যার্থতাকে তুলে ধরেছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ফোনের উপর যে গোয়েন্দাবৃত্তি হয়েছে, সেটা বুঝতে কেন এক বছর সময় লেগেছে, সেব্যাপারে সরকারের কর্তাব্যক্তিরা প্রশ্ন করছেন।

‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০২১এর মাঝামাঝি সময়ে স্পেনের সাথে মরক্কোর সম্পর্ক খুবই খারাপ পর্যায়ে ছিল। একইসাথে স্পেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী কাতালোনিয়া অঞ্চলের আটককৃত নেতাদের ছেড়ে দেয়া নিয়ে সেসময় অভ্যন্তরীণভাবেও উত্তাল ছিল স্পেন। স্পেন এবং মরক্কোর দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে ছিল মরক্কোর নিয়ন্ত্রণে থাকা পশ্চিম সাহারা অঞ্চলের স্বাধীনতাকামীদের নেতাকে স্পেনে চিকিৎসার জন্যে ঢুকতে দেয়া এবং এরপর মরক্কোর মূল ভুখন্ডে স্প্যানিশ ছিটমহল সেউতাতে সীমান্ত অতিক্রম করে ৮ হাজার উদ্বাস্তুর আগমণ। মরক্কো সরকার অস্বীকার করেছিল যে, তারা উদ্বাস্তুদেরকে স্পেনের ছিটমহলে ঢুকতে কোনপ্রকার সহায়তা দিয়েছিল।

‘এনপিআর’এর সাথে এক সাক্ষাতে মাদ্রিদের সাংবাদিক হোজে বাউতিস্তা বলছেন যে, ২০২১ সালে প্যারিসভিত্তিক তদন্তমুখী সংবাদ সংস্থা ‘ফরবিডেন স্টোরিজ’ এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে; যেখানে বলা হয় যে, মরক্কো ইস্রাইলি ‘পেগাসাস’ স্পাইওয়্যার ব্যবহার করে ১০ হাজারের বেশি মানুষের উপর গোয়েন্দাবৃত্তি করছে। এগুলির মাঝে ২’শ মোবাইল ফোন নম্বরের মালিক হলেন স্প্যানিশ নাগরিকেরা; যাদের মাঝে রয়েছেন রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মী। গত বছর মে এবং জুন মাসে স্পেনের সাথে মরক্কোর কূটনৈতিক সম্পর্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছে; যার মূল কারণ ছিল মরক্কোর নিয়ন্ত্রণে থাকা পশ্চিম সাহারা অঞ্চল; যা কিনা একসময় স্প্যানিশ উপনিবেশ ছিল। ২০২০এর ডিসেম্বরে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পশ্চিম সাহারার উপর মরক্কোর সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়ার ঘোষণা দেন। এর বিনিময়ে মরক্কো ইস্রাইলকে স্বীকৃতি দেয়। এতে মরক্কো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থানকে অনেক শক্তিশালী মনে করতে শুরু করে। অনেকেই মনে করেছিলেন যে, জো বাইডেন হোয়াইট হাউজে আসার পর ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবেন; কিন্তু বাইডেন সেটা করেননি। অপরদিকে স্পেন পশ্চিম সাহারার ইস্যু থেকে দূরে থাকতে পারছে না; কারণ তারা ঔপনিবেশিক সময় থেকেই পশ্চিম সাহারার সাহরাউই জনগণের সাথে একটা গভীর সম্পর্ক তৈরি করেছে। পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে স্পেন সর্বদাই নিরপেক্ষ একটা অবস্থানে থাকার চেষ্টা করেছে; যদিও সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম সাহারাকে কিছুটা স্বায়ত্তশাসন দেয়ার মরক্কো সরকারের সিদ্ধান্তকেই মেনে নেয়ার কথা বলছে স্প্যানিশরা। বাউতিস্তা মনে করছেন যে, ‘পেগাসাস’ স্পাইওয়্যারের এই ইস্যু পশ্চিম সাহারার ক্ষেত্রে স্প্যানিশ সরকারের অবস্থানকে পরিবর্তন করতে পারে। তবে সেটা নির্ভর করছে স্প্যানিশরা ‘পেগাসাস’এর উৎসটা ঠিকমতো প্রকাশ করতে পারে কিনা; যা খুব একটা সহজ কাজ হবে না।

 
স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজের সোশালিস্ট সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যে কাতালোনিয়ার স্বাধীনতাকামীদের নেতৃত্বে থাকা বামপন্থী দল ‘ইআরসি’র নেতা পেরে আরাগোনেসএর সমর্থনের উপর যথেষ্ট নির্ভরশীল। তবে ‘ইআরসি’ দল বেশ বাস্তববাদী। তারা হয়তো ইন্টেলিজেন্স প্রধানকে বরখাস্তের ব্যাপারটাকে ভালোভাবেই নেবে। তারা ভালো করেই জানে যে, বর্তমানে ক্ষমতাসীন বামপন্থী দলের উপর ‘ইআরসি’র যতটা প্রভাব রয়েছে, ডানপন্থীরা ক্ষমতায় আসলে সেটা থাকবে না।

স্পেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী কাতালোনিয়াতে ‘পেগাসাস’এর ভূমিকা

গত ১৮ই এপ্রিল কানাডার ‘ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো’র সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক সংস্থা ‘দ্যা সিটিজেন ল্যাব’ এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে; যেখানে বলা হয় যে, স্পেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল কাতালোনিয়ার কমপক্ষে ৬৫ জন ব্যক্তির মোবাইল ফোনে ‘পেগাসাস’ স্পাইওয়্যার পাওয়া গিয়েছে। এই ব্যক্তিদের মাঝে রয়েছে কাতালোনিয়ার প্রেসিডেন্ট পেরে আরাগোনেস এবং বেশ ক’জন আইনজীবি, সাংবাদিক এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের নাগরিক। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মাঝে ‘পেগাসাস’ ব্যবহার করে কাতালান নেতাদের উপর গোয়ান্দাগিরির ব্যাপারটা নিয়ে স্পেনের সোশালিস্ট সরকার বেশ চাপের মাঝে ছিল। বরখাস্তের পাঁচ দিন আগে গত ৫ই মে স্পেনের ইন্টেলিজেন্স সংস্থা ‘সিএনআই’এর প্রধান পাজ এস্তেবান পার্লামেন্টের তদন্ত কমিটির সামনে বলেন যে, আইন বিভাগের অনুমতি নিয়ে ১৮ জন কাতালান নেতার উপর গোয়েন্দাবৃত্তি করা হয়েছিল।

ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, তারাই ২০২০এর জুনে স্পেনের পত্রিকা ‘এল পায়িস’এর সাথে যুক্ত হয়ে প্রকাশ করেছিল যে, স্পেনের স্বাধীনতাকামী কাতালোনিয়া অঞ্চলের শীর্ষ নেতাদের উপর নজরদারি করার জন্যে ‘পেগাসাস’ স্পাইওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছিলো। ‘পেগাসাস’ হলো ইস্রাইলি কোম্পানি ‘এনএসও’র ডেভেলপ করা গোয়েন্দাবৃত্তির একটা সফটওয়্যার; যা কারো মোবাইল ফোনে ঢোকানো গেলে সেই মোবাইল ফোন থেকে ই-মেইল পড়া ছাড়াও, মোবাইলে রাখা ছবি এবং মেসেজও ডাউনলোড করা সম্ভব। এছাড়াও ‘পেগাসাস’ সেই ফোনের অডিও রেকর্ডার এবং ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেই ফোনকে একটা গোয়েন্দাবৃত্তির বস্তুতে পরিণত করতে পারে। কোম্পানিটা বলছে যে, এই স্পাইওয়্যার তারা কোন রাষ্ট্রের সরকার ছাড়া কারুর কাছে বিক্রি করে না। কাতালান নেতাদের উপর গোয়েন্দাবৃত্তির কাজটা খুব সম্ভবতঃ ২০১৯এর এপ্রিল এবং মে মাসে করা হয়েছিল। এর প্রায় দু’বছর আগে কাতালানরা স্পেন থেকে আলাদা হবার জন্যে একটা গণভোট আয়োজন করেছিল। কাতালানদের উপর গোয়েন্দাবৃত্তির ব্যাপারটা হয়তো স্প্যানিশ ইন্টেলিজেন্সই করেছে। কিন্তু স্প্যানিশ মন্ত্রীদের উপর গোয়েন্দাবৃত্তির ব্যাপারটা পুরোপুরি আলাদা। সরকার বলছে যে, রাষ্ট্রের কাঠামোর বাইরে থেকে কেউ এটা করেছে; যার অর্থ হলো অন্য কোন রাষ্ট্র এটা করেছে। এখানে মরক্কোর নাম আসলেও মরক্কো সরকার বলছে যে, সাংবাদিকরা এখন পর্যন্ত মরক্কোর সাথে ‘পেগাসাস’এর নির্মাতা ‘এনএসও’র কোন সম্পর্ক দেখাতে পারেনি। আর মরক্কো সরকার অন্য কোন রাষ্ট্রের নেতৃত্বের উপর নজরদারি করে না বলেও বলছেন তারা।

‘দ্যা গার্ডিয়ান’ বলছে যে, স্পেনের সোশালিস্ট সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যে কাতালোনিয়ার স্বাধীনতাকামীদের নেতৃত্বে থাকা বামপন্থী দল ‘ইআরসি’র নেতা পেরে আরাগোনেসএর সমর্থনের উপর যথেষ্ট নির্ভরশীল। যেকারণে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সানচেজ আগের কনজারভেটিভ প্রশাসনের চাইতে কাতালোনিয়ার ব্যাপারে অনেকটাই ছাড় দেয়ার নীতিতে এগিয়েছেন। যদিও তিনি কাতালোনিয়ায় গণভোট হবার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন, তথাপি তিনি তাদের সাথে আলোচনা চালিয়ে যেতে ইচ্ছুক। ২০২১ সালে কাতালোনিয়ার ৯ জন শীর্ষ নেতাকে কারাগার থেকে মুক্তি দিতে গিয়ে সানচেজের সরকারকে বিরোধীদের চরম সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। এখন এই গোয়েন্দাবৃত্তির খবরগুলি স্পেনের সোশালিস্ট সরকারের উপর ‘ইআরসি’র বিশ্বাসকে ভেঙ্গে দেবে। তবে কাতালোনিয়ার ‘ইআরসি’ দল বেশ বাস্তববাদী। তারা হয়তো ইন্টেলিজেন্স প্রধানকে বরখাস্তের ব্যাপারটাকে ভালোভাবেই নেবে। তারা ভালো করেই জানে যে, বর্তমানে ক্ষমতাসীন বামপন্থী দলের উপর ‘ইআরসি’র যতটা প্রভাব রয়েছে, ডানপন্থীরা ক্ষমতায় আসলে সেটা থাকবে না। স্পেনের কনজারভেটিভ বিরোধী দল বলছে যে, ইন্টেলিজেন্স প্রধান এস্তেবানের ‘মস্তক’ কাতালোনিয়ার স্বাধীনতাকামীদের হাতে তুলে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী সানচেজ তার রাজনৈতিক অবস্থানকে বাঁচাচ্ছেন।

 

মরক্কো এবং জিব্রালটারের নিয়ন্ত্রণ

কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ জিব্রালটার প্রণালির দক্ষিণ প্রান্তের মালিক মরক্কো অনেকের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ। ১৭০৪ সাল থেকে ব্রিটেন জিব্রালটারে সামরিক ঘাঁটি রেখে চলেছে। আর এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে ব্রিটেন সকল কিছুই করেছে। ১৮৮৪ সালে বার্লিন কনফারেন্সে ব্রিটিশদের সমর্থনে স্পেন মরক্কোর দক্ষিণের পশ্চিম সাহারা অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ পায়। ১৯০৫ সালে জার্মানি মরক্কোর নিয়ন্ত্রণ নেবার চেষ্টা করলে ব্রিটেনের বাধায় তা সম্ভব হয়নি। ১৯১১ সালে জার্মানি আবারও মরক্কোতে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করলে ব্রিটেন আবারও হুমকি দেয়। ১৯৭৫ সালে স্প্যানিশরা পশ্চিম সাহারা ছেড়ে দেয়ার পর থেকে সেখানে দ্বন্দ্ব চলছে। এবং সেসময় থেকেই পশ্চিম সাহারার দ্বন্দ্বে স্পেন একটা ভূমিকা রেখে চলছে। বর্তমানে মরক্কোর নিয়ন্ত্রণে থাকা পশ্চিম সাহারার স্বাধীনতাকামী ‘পলিসারিও ফ্রন্ট’এর ব্যাপারে সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি স্পেন যেমন সর্বদাই জড়াচ্ছে, ঠিক তেমনি এখন স্পেনের রাজনীতিতেও মরক্কোর নাম জড়িয়ে যাচ্ছে। ২০২১ সালে মরক্কো স্পেনের ছিটমহল সেউতাতে হাজারো শরণার্থীকে ঠেলে দিয়ে স্পেনকে চাপের মাঝে ফেলেছে। হয়তো সেকারণেই স্পেন সরকার পশ্চিম সাহারার ব্যাপারে মরক্কো সরকারের নীতির সাথে সমান্তরালে থাকার চেষ্টা করেছে। ১৯৭০এর দশকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ব্রিটেনের প্রস্থানে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বৃদ্ধির সাথেসাথে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মরক্কোর গুরুত্ব বাড়তে থাকে। কারণ সেসময় থেকে মধ্যপ্রাচ্য এবং ভূমধ্যসাগরে মার্কিন উপস্থিতি রাখার জন্যে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এবং যুদ্ধবিমানগুলির জন্যে মরক্কো একটা ‘দরজা’র ভূমিকা পালন করে আসছে। পশ্চিম সাহারায় স্বাধীনতাকামী বামপন্থী ‘পলিসারিও ফ্রন্ট’এর সাথে যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র মরক্কোকে ব্যাপক সামরিক সহায়তা দেয়। এখনও মরক্কোর প্রধান সামরিক সরঞ্জামগুলি যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি।

একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্র মরক্কোকে পশ্চিম সাহারার প্রকৃত মালিক বলে ঘোষণা দিচ্ছে, ঠিক তার প্রতিদানে ইস্রাইলের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের মাধ্যমে মরক্কোর পররাষ্ট্রনীতিতে ইস্রাইলের তৈরি ‘পেগাসাস’ স্পাইওয়্যারের নাম আসতে শুরু করেছে। পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে স্পেনের সাথে ইউরোপিয় ইউনিয়ন থাকলেও মরক্কোর পক্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং সর্বশেষে সেখানে যুক্ত হয়েছে ইস্রাইল। তবে কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ জিব্রালটার প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এখন পরিষ্কার। মরক্কো এবং স্পেনের মাঝে পশ্চিম সাহারা, শরণার্থী এবং এখন ‘পেগাসাস’ ইস্যুতে উত্তেজনায় এ ব্যাপারটা প্রকাশ পাচ্ছে। ‘পেগাসাস’এর ব্যবহার স্পেন এবং মরক্কোর সম্পর্কের মাঝে একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়; যা এই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে ইস্রাইলের অবস্থান জানান দিচ্ছে। এর মাধ্যমে ইস্রাইল তার নিজের নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে কৌশলগত দরকষাকষি বৃদ্ধি করেছে। বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমতে থাকার সাথেসাথে ইস্রাইল এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত; যা কিনা নতুন নতুন আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার জন্ম দিচ্ছে।

Thursday, 26 August 2021

আলজেরিয়া এবং মরক্কোর দ্বন্দ্ব ... এখন কেন?

২৬শে অগাস্ট ২০২১
পশ্চিম সাহারার অবস্থান উল্টোদিকে মরক্কোর দক্ষিণে; যেখানে ব্যস্ত থেকে জিবরালটার থেকে দূরে রয়েছে মরক্কোর সেনাবাহিনী। জিবরালটারের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবাণিজ্যপথ মরক্কোর পররাষ্ট্রনীতি থেকে দূরে থাকবে ততদিন, যতদিন পশ্চিম সাহারার দ্বন্দ্ব জিইয়ে রাখবে ইউরোপ এবং আলজেরিয়া। এই দ্বন্দ্ব তুরস্ক এবং ইস্রাইলের মত দেশগুলিকেও যুক্তরাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় পশ্চিম আফ্রিকায় প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় টেনে আনছে। একইসাথে এই দ্বন্দ্বের কারণে মরক্কো মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ধরে রাখার জন্যে একটা ‘দরজা’ হিসেবে ব্যবহৃত হবে।



গত ২৪শে অগাস্ট আলজেরিয়ার সরকার মরক্কোর সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা প্রদান করতে গিয়ে আলজেরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রামদানি লামামরা সাংবাদিকদের বলেন যে, মরক্কো আলজেরিয়ার কর্মকর্তাদের উপর ‘পেগাসাস’ সফটওয়্যার ব্যবহার করে গোয়েন্দাগিরি করছে। একইসাথে মরক্কো আলজেরিয়ার অভ্যন্তরে একটা বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপকে সমর্থন দিচ্ছে এবং পশ্চিম সাহারার ব্যাপারে মরক্কো যে প্রতিশ্রুতিগুলি দিয়েছে, সেগুলি তারা রাখছে না। লামামরা বলেন যে, মরক্কো কখনোই আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে শত্রুতাপূর্ণ আচরণ বন্ধ করেনি। আলজেরিয়ার এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া হিসেবে মরক্কোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক টুইটার বার্তায় বলে যে, আলজেরিয়ার এই সিদ্ধান্ত দুঃখজনক এবং অহেতুক। ‘রয়টার্স’ জানাচ্ছে যে, দুই দেশের মাঝে সীমানা ১৯৯৪ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে। এর আগে দুই দেশের দ্বন্দ্বে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হলেও ১৯৮৮ সালে তা আবারও পূর্বাবস্থায় আনা হয়েছিল। তবে সেই সময় থেকে এবারই প্রথম কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হলো। মরক্কো দুই দেশের মাঝে সীমানা খুলতে চাইলেও নিরাপত্তার কথা বলে আলজেরিয়া সীমানা বন্ধ রেখেছে।

এর এক সপ্তাহ আগেই আলজেরিয়ার সরকার বলে যে, সেদেশে ভয়াবহ দাবানলে ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানোর পিছনে দু’টা গ্রুপ জড়িত; যাদেরকে আলজেরিয়া কিছুদিন আগেই সন্ত্রাসী বলে ঘোষণা দিয়েছে। আলজেরিয়ার পূর্বাঞ্চলে কাবাইলি অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘এমএকে’ এই দুই গ্রুপের একটা। এই গ্রুপকে মরক্কো এবং ইস্রাইল সহায়তা দিচ্ছে বলে অভিযোগ করে আলজেরিয়ার সরকার। দাবানলে ঐ অঞ্চলই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আলজেরিয়া সরকার আগুন লাগাবার এবং একজন নিরপরাধ মানুষকে দোষী অপবাদ দিয়ে গণপিটুনি দিয়ে খুন করে মরদেহ পুড়িয়ে ফেলার অভিযোগে ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করে; যাদের কয়েকজন নিজেদেরকে ‘এমএকে’এর সদস্য বলে স্বীকার করে। আলজেরিয়ার টেলিভিশনে তাদের স্বীকারোক্তি প্রচার করা হয়। একইসাথে নিরপরাধ গায়ক জামাল বেন ইসমাইলের মৃত্যুকে সরকারের সিদ্ধান্তের পিছনে জনসমর্থন আদায়ে ব্যবহার করা হয়।

এর আগে গত ১৮ই জুলাই আলজেরিয়ার সরকার মরক্কো থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নেয়। অভিযোগ ছিল যে, নিউ ইয়র্কে মরক্কোর রাষ্ট্রদূত ওমর হিলালি জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের এক বৈঠকে আলজেরিয়ার বিচ্ছন্নতাবাদীদের পক্ষে কথা বলেছেন। হিলালি বলেন যে, যদি পশ্চিম সাহারার জনগণের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারের ব্যাপারে আলজেরিয়া এতটা সোচ্চার থাকে, তাহলে তাদের নিজেদের দেশে কাবাইলি অঞ্চলের জনগণকেও নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার দেয়া উচিৎ। হিলালির কথাগুলি দুই দেশের বহু বছরের দ্বন্দ্বকে তুলে ধরে। ১৯৭০এর দশক থেকেই মরক্কোর দক্ষিণে পশ্চিম সাহারা অঞ্চলে ‘পলিসারিও ফ্রন্ট’ স্বাধীনতার জন্যে যুদ্ধ করছে। পলিসারিওকে সরাসরি সহায়তা দিচ্ছে আলজেরিয়া। অপরদিকে মরক্কো এই অঞ্চলকে নিজের অঞ্চল বলে মনে করে। ১৯৯১ সালে যুদ্ধ শেষ হলেও অনেক বছর ঠান্ডা থাকার পর ২০২০ সালের শেষ দিকে পশ্চিম সাহারার ইস্যু আবারও গরম হয়ে উঠতে শুরু করে, যখন গত নভেম্বরে পলিসারিও ঘোষণা দেয় যে, তারা আবারও সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করতে যাচ্ছে। এরপর অবশেষে গত ডিসেম্বরে ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম সাহার উপর মরক্কোর সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেয়।
 
ইইউ বলে যে, মরক্কোর সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর সহায়তাতেই শরণার্থীরা স্প্যানিশ ছিটমহলে ঢুকে পড়ে; উদ্দেশ্য ছিল স্পেনের উপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা। অনেকেই মনে করেছেন যে, স্পেনের সেউতা ছিটমহলে শরণার্থীদের প্রেরণ করা ছিল মূলতঃ পশ্চিম সাহারার পলিসারিওর নেতাকে স্পেনে ঢুকতে দেয়ার প্রতিশোধমূলক কর্মকান্ড।


মরক্কোর সাথে আলজেরিয়া নতুন করে দ্বন্দ্ব এমন এক সময়ে এলো, যখন ইউরোপের সাথে মরক্কোর সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। গত ১০ই জুন ইইউ পার্লামেন্টে পাস করা এক রেজোলিউশনে বলা হয় যে, গত মে মাসে মরক্কোর মূল ভুখন্ডে স্প্যানিশ ছিটমহল সেউতাতে ১০ হাজার শরণার্থী ঢুকে যাবার পিছনে মরক্কো সরকারের হাত ছিল। ইইউ বলে যে, মরক্কোর সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর সহায়তাতেই শরণার্থীরা স্প্যানিশ ছিটমহলে ঢুকে পড়ে; উদ্দেশ্য ছিল স্পেনের উপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা। অনেকেই মনে করেছেন যে, স্পেনের সেউতা ছিটমহলে শরণার্থীদের প্রেরণ করা ছিল মূলতঃ পশ্চিম সাহারার পলিসারিওর নেতাকে স্পেনে ঢুকতে দেয়ার প্রতিশোধমূলক কর্মকান্ড।

পলিসারিওর সাথে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সবসময় মরক্কোর পক্ষে থেকেছে এবং প্রচুর অস্ত্র দিয়ে সহায়তা দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের উত্তেজনার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র কিনছে মরক্কো। গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র মরক্কোর কাছে ১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির প্রতিশ্রুতি দেয়। এই অস্ত্রের মাঝে ছিল ৪টা ‘এমকিউ ৯ রীপার’ অস্ত্রবাহী ড্রোন এবং লেজার গাইডেড বোমা। ‘ডিফেন্স ওয়ার্ল্ড’ বলছে যে, ২০১৯এর নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র মরক্কোর কাছে ২৪টা ‘এএইচ ৬৪ এপাচি’ এটাক হেলিকপ্টার এবং প্রায় আড়াই হাজার ‘টো ২এ’ এন্টিট্যাঙ্ক ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই চুক্তির মূল্যমান ছিল ৪ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। এর মাঝে ‘ম্যান আনম্যানড টিমিং’ নামে একটা প্রযুক্তিও বিক্রি করা হচ্ছে; যার মাধ্যমে এপাচি হেলিকপ্টারের পাইলট একটা ড্রোন নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে এবং ড্রোনের পাঠানো ভিডিও সরাসরি দেখতে পাবে। এর মাধ্যমে মরক্কোর সামরিক সক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পাবে। এর আগে ২০১৯এর মার্চে যুক্তরাষ্ট্র মরক্কোকে ২৫টা নতুন ‘এফ ১৬’ যুদ্ধবিমান বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয়। এছাড়াও গত এপ্রিলে মরক্কো তুরস্কের ‘বায়কার মাকিনা’ কোম্পানির কাছ থেকে ৭০ মিলিয়ন ডলারে ১৩টা ‘বায়রাকতার টিবি ২’ ড্রোন কিনছে বলে বলা হয়। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির স্যামুয়েল রামানি ‘ডিফেন্স নিউজ’কে বলছেন যে, গত এপ্রিল মাসে মরক্কো প্রথমবারের মতো ড্রোন ব্যবহার করে পলিসারিওর উপর হামলা করে। যুক্তরাষ্ট্র এবং তুরস্ক একত্রে মরক্কোর সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে। একইসাথে ইস্রাইলের সাথে মরক্কোর সম্পর্ক স্বাভাবিক হবার কারণে ইস্রাইলও হয়তো মরক্কোকে সামরিক সহয়তা দেবে; বিশেষ করে ড্রোন প্রযুক্তি দিয়ে।

মরক্কোর কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিচ্ছে। মরক্কোর উত্তরে রয়েছে কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ জিবরালটার প্রণালি। সেউতা ছিটমহলের অবস্থানও ঠিক তার দক্ষিণে। অপরদিকে পশ্চিম সাহারার অবস্থান উল্টোদিকে মরক্কোর দক্ষিণে; যেখানে ব্যস্ত থেকে জিবরালটার থেকে দূরে রয়েছে মরক্কোর সেনাবাহিনী। জিবরালটারের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবাণিজ্যপথ মরক্কোর পররাষ্ট্রনীতি থেকে দূরে থাকবে ততদিন, যতদিন পশ্চিম সাহারার দ্বন্দ্ব জিইয়ে রাখবে ইউরোপ এবং আলজেরিয়া। এই দ্বন্দ্ব তুরস্ক এবং ইস্রাইলের মত দেশগুলিকেও যুক্তরাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় পশ্চিম আফ্রিকায় প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় টেনে আনছে। একইসাথে এই দ্বন্দ্বের কারণে মরক্কো মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ধরে রাখার জন্যে একটা ‘দরজা’ হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

Wednesday, 9 June 2021

জিব্রালটার প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বের শুরু?

১০ই জুন ২০২১
১৯৭০এর দশকে স্পেন মরক্কো ছেড়ে আসলেও মরক্কোর উত্তর উপকূলে কয়েকটা বন্দরকে স্পেন ছিটমহল হিসেবে রেখে দেয়। ভবিষ্যতে জিব্রালটার প্রণালীর দক্ষিণ উপকূল নিয়ন্ত্রণে এই ছিটমহলগুলি ইউরোপের জন্যে কাজে দিতে পারে। ইস্রাইলের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের মতো জনবিরোধী সিদ্ধান্তও মরক্কোর সরকার নিয়েছে পশ্চিম সাহারায় মরক্কোর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি পাবার জন্যে। তবে এর ফলশ্রুতিতে ইউরোপের সাথে মরক্কোর সম্পর্ক টানাপোড়েনের মাঝে পড়েছে। যদিও মরক্কোর সাথে ইউরোপের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা কম, তথাপি মরক্কোর উত্তর উপকূলে স্পেনের ছিটমহলগুলি যখন হাজারো শরণার্থীর জোয়ারে ভেসে যাবার উপক্রম, তখন এই ছিটমহলগুলির সামনের দিনগুলিতে ইউরোপের ‘ব্রিজহেড’ হিসেবে থাকার সম্ভাবনা প্রশ্নের মুখে পড়ে।



মে এবং জুন মাসে হঠাত করেই উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কোর সাথে ইউরোপের, বিশেষ করে স্পেন এবং জার্মানির সম্পর্ক নিম্নমুখী হয়েছে। সংবাদ মাধ্যমগুলি এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে বিতর্কিত পশ্চিম সাহারার কথা বললেও এর ভূরাজনৈতিক গভীরতা যথেষ্ট। এই গভীরতার একটা ধারণা পাওয়া যাবে মরক্কোর সাথে ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ইতিহাস এবং বর্তমানে তাদের মাঝে সম্পর্কের দিকে তাকালে। তবে একইসাথে তাকাতে হবে মরক্কোর অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূকৌশলগত অবস্থানের দিকে। মরক্কোর ব্যাপারগুলিকে কোন অবস্থাতেই ভূরাজনৈতিকভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ জিব্রালটার প্রণালীকে বাদ দিয়ে চিন্তা করা যাবে না।

পশ্চিম সাহারার সমস্যা ঔপনিবেশিক সময়ের

সপ্তদশ শতক থেকে স্পেন মরক্কোর উপকূলে কয়েকটা ছিটমহল উপনিবেশ হিসেবে দখল করে নেয়। ঊনিশ শতকের শেষ দিক থেকে পশ্চিম আফ্রিকার পুরোটাই ইউরোপিয় ঔপনিবেশিকদের অধীনে চলে যায়। ১৯০৬ সালে মরক্কোর সরকারের দুর্বলতার কারণ দেখিয়ে মরক্কোর দখল নিয়ে জার্মানি এবং ফ্রান্সের মাঝে দ্বন্দ্ব বাধলে ব্রিটেনের মধ্যস্ততায় মরক্কোর নিয়ন্ত্রণ নেয় ইউরোপিয়রা। ১৯১২ সালে মরক্কোর নিয়ন্ত্রণ চলে যায় স্পেন এবং ফ্রান্সের কাছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আফ্রিকায় নিজেদের উপনিবেশ থাকা অঞ্চলগুলিকে ইউরোপিয়রা নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী বিভক্ত করে অনেকগুলি নতুন রাষ্ট্র তৈরি করে। পশ্চিম আফ্রিকায় একইভাবে তৈরি করা হয় মরক্কো, আলজেরিয়া, মৌরিতানিয়া এবং অন্যান্য দেশ। ফরাসিরা ১৯৫৬ সালে মরক্কো ছেড়ে যায়। মরক্কোর দক্ষিণ অঞ্চল ছিল স্পেনের অধিকারে; অন্যদিকে আলজেরিয়া, মৌরিতানিয়া এবং অন্যান্য অঞ্চলগুলি ছিল ফরাসিদের অধীনে। এই দেশগুলির সীমানাও ঔপনিবেশিকরা তৈরি করে; যা পরবর্তীতে বহু ধরনের সংঘাতের জন্ম দেয়। এরকমই একটা দ্বন্দ্ব হলো পশ্চিম সাহারার দ্বন্দ্ব। মরক্কোর দক্ষিণের পশ্চিম সাহারা অঞ্চলটা ছিল স্পেনের উপনিবেশ; যার নাম ছিল ‘রিও ডে অরো’। আঞ্চলিকভাবে অঞ্চলটা সাহরাউই নামে পরিচিত। ১৯৭৫ সালে স্পেন এই অঞ্চল ছেড়ে যাবার সময় রিও ডে অরো অঞ্চলকে দুই ভাগে ভাগ করে নতুন তৈরি করা দুই দেশ মরক্কো এবং মৌরিতানিয়ার মাঝে বিতরণ করে। এরপরই সাহরাউই অঞ্চলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেয়া পলিসারিও ফ্রন্টের সাথে মৌরিতানিয়া এবং মরক্কোর যুদ্ধ শুরু হয়। চার বছর যুদ্ধ করার পর ১৯৭৯ সালে মৌরিতানিয়া তাদের অংশ ছেড়ে দিয়ে পশ্চিম সাহারা ত্যাগ করে। কিন্তু মরক্কো যুদ্ধ চালিয়ে যায়। এই যুদ্ধে মরক্কোকে সামরিক সহায়তা দেয় যুক্তরাষ্ট্র; আর পলিসারিওকে সোভিয়েত অস্ত্র দিয়ে সহায়তা দেয় আলজেরিয়া এবং লিবিয়া। পলিসারিওর সকল অস্ত্রসস্ত্রই আলজেরিয়া হয়ে আসে এবং আলজেরিয়াকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেই পলিসারিও মরক্কোর সামরিক বাহিনীর উপর হামলা চালিয়ে যায়।। ১৯৮০এর দশকে মরক্কো পশ্চিম সাহারার মাঝ বরাবর উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত ২ হাজার ৭’শ কিঃমিঃ লম্বা বালুর দেয়াল তৈরি করে। এই দেয়ালের ফলে যুদ্ধ মরক্কো সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে; এবং পলিসারিওর সামরিক জয় পাবার আশা স্তিমিত হয়ে যায়। ১৯৯১ সালে ঠান্ডা যুদ্ধ শেষ হলে পশ্চিম সাহারার যুদ্ধও শেষ হয়ে যায়; এবং একটা যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। জাতিসংঘের একটা মিশনের মাধ্যমে এই যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ করা হয়; যেখানে মরক্কো সরকারের অধীনে রয়েছে পশ্চিমের অংশ; আর পলিসারিওর হাতে রয়েছে আলজেরিয়ার সীমানা ঘেঁষে পূর্বের অংশ। এই সমস্যার একটা মূল ভিত্তি হলো কে এই সংঘাতকে কিভাবে দেখছে।

পশ্চিম সাহারার যুদ্ধ মরক্কোর সাথে অনেক দেশের সম্পর্ক নির্ধারণ করেছে। আরব দেশগুলি মরক্কোর পক্ষে থেকেছে; অন্যদিকে আফ্রিকার বেশিরভাগ দেশই পলিসারিওর পক্ষ নিয়েছে। যুদ্ধের ফলে আলজেরিয়ার সাথে মরক্কোর সম্পর্ক বরাবরই খারাপ রয়েছে। আফ্রিকার দেশগুলি সাহরাউই রিপাবলিককে স্বীকৃতি দিলে ১৯৮৪ সালে মরক্কো আফ্রিকান ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যায়। তবে তিন দশক পর ২০১৭ সালে মরক্কো আবারও আফ্রিকান ইউনিয়নে প্রবেশ করে। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, আফ্রিকার দেশগুলি মূলতঃ অর্থনৈতিক কারণেই মরক্কোর আফ্রিকান ইউনিয়নে ঢোকাকে সমর্থন করেছে। মরক্কো সাম্প্রতিক সময়ে আফ্রিকার দেশগুলির সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন করেছে; যার উদ্দেশ্যই ছিল আফ্রিকান ইউনিয়নে ঢোকার পথ প্রসারিত করা। ৩৯টা দেশ মরক্কোর পক্ষে ভোট দেয়; তবে ৯টা বিপক্ষে থাকে। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বলছে যে, বিপক্ষে ভোট দেয়া দেশগুলি মূলতঃ আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলের দেশ। সাহরাউইএর ব্যাপারে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের অবস্থান দেখলে বোঝা যাবে যে, বিপক্ষে ভোট দেয়া দেশগুলির মাঝে খুব সম্ভবতঃ দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে, এঙ্গোলা থাকতে পারে। কারণ এই দেশগুলি মরক্কোর আফ্রিকান ইউনিয়নে যোগ দেয়ার সরাসরি বিরোধিতা করেছিল।
 
পশ্চিম সাহারায় মরক্কোর তৈরি করা বালির দেয়াল। ১৯৮০এর দশকে মরক্কো ২ হাজার ৭’শ কিঃমিঃ লম্বা বালুর দেয়াল তৈরি করে। এই দেয়ালের ফলে যুদ্ধ মরক্কো সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে; এবং পলিসারিওর সামরিক জয় পাবার আশা স্তিমিত হয়ে যায়। ১৯৯১ সালে ঠান্ডা যুদ্ধ শেষ হলে পশ্চিম সাহারার যুদ্ধও শেষ হয়ে যায়; এবং একটা যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তবে মরক্কোর প্রায় ২ লক্ষ সদস্যের সেনাবাহিনী পশ্চিম সাহারায় ব্যস্ত থেকে জিব্রালটার এবং স্প্যানিশ ছিটমহলগুলি থেকে যে দূরে থাকছে, সেব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র খুব বেশি চিন্তিত হবার কথা নয়। 


স্পেনের সাথে দ্বন্দ্ব

মে মাসের মাঝামাঝি হঠাত করেই মরক্কো থেকে স্পেনের ছিটমহল সেউতাতে ৮ হাজার শরণার্থী ঢুকে পড়ে। স্পেন বলছে যে, মরক্কো তার সীমানা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে; যার ফলে হাজার হাজার শরণার্থী সেউতায় ঢুকেছে। সাধারণতঃ শরণার্থীদের নিয়ন্ত্রণে মরক্কো স্পেনকে যথেষ্ট সহায়তা করে থাকে। ‘বিবিসি’র এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, এপ্রিল মাসে স্পেন পশ্চিম সাহারার পলিসারিওর নেতা ব্রাহিম ঘালিকে স্পেনের এক হাসপাতালে করনোভাইরাসের চিকিৎসার জন্যে ভর্তি করে। মরক্কো বলছে যে, স্পেন মরক্কোকে না জানিয়ে পশ্চিম সাহারা পলিসারিওর নেতাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। অনেকেই বলছেন যে, এর প্রতিশোধ হিসেবেই মে মাসে মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনী কিছু সময়ের জন্যে শরণার্থীদের উপর থেকে তাদের নজরদারি সরিয়ে ফেলে; যার ফলশ্রুতিতে হাজারো শরণার্থী সেউতায় ঢুকে পড়ে। একই সময়ে স্পেনের পক্ষ থেকে পশ্চিম সাহারা নিয়ে বিবৃতি আসতে থাকে। স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঞ্চা গোঞ্জালেজ লায়া বলেন যে, স্পেন পশ্চিম সাহার ব্যাপারে জাতিসংঘের সিদ্ধান্তের উপরেই নির্ভর করবে। স্পেন চায় সকল পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমাধান।

৬ই জুন মরক্কোর সরকার ঘোষণা দেয় যে, মরক্কো স্পেনের সাথে সমুদ্রে যাত্রীবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, ইউরোপে বসবাসকারী প্রায় ৩০ লক্ষ মরক্কোর নাগরিকের বেশিরভাগই স্পেন হয়ে মরক্কো যেতো। তবে মরক্কো সরকার ফরাসি এবং ইতালিয় বন্দরগুলির সাথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখবে বলে বলেছে। কারণ হিসেবে মরক্কোর সরকার করোনাভাইরাসের কথা বললেও অনেকেই মনে করছেন যে, এর সাথে দুই দেশের মাঝে চলমান উত্তেজনার সম্পর্ক থাকতে পারে।

‘আল জাজিরা’ জানাচ্ছে যে, মে মাসের প্রথম সপ্তাহে ইউরোপিয় আদালতে মরক্কোর সাথে ইইউএর বাণিজ্য চুক্তির ব্যাপারে শুনানি হয়। পলিসারিওর পক্ষ থেকে এই চুক্তির বিরোধিতা করে ইইউএর কাছে আবেদন জানানো হয়েছিল। পলিসারিও বলছে যে, মরক্কো পশ্চিম সাহারার সম্পদ লুন্ঠন করছে; যার মাঝে রয়েছে রক ফসফেট, কৃষিদ্রব্য এবং পশ্চিম সাহারার উপকূলের মৎস্যসম্পদ। অনেকেই মনে করছেন যে, এই বছরের শেষের দিকে আদালয়ের যে রায় আসবে, তা পলিসারিওর পক্ষে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। ইইউ আদালতের রায় মরক্কোর বিপক্ষে গেলে মরক্কোর সাথে ইইউএর সম্পর্কে নতুন করে দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে।

জার্মানির সাথে দ্বন্দ্ব

মরক্কো ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার এবং যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম সাহারায় মরক্কোর সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়ার ১১ দিনের মাথায় ২০২০এর ২১শে ডিসেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে জার্মানির রাষ্ট্রদূত ক্রিসটফ হিউসগেন পশ্চিম সাহারা নিয়ে একটা রুদ্ধদ্বার বৈঠকের ডাক দেন। তার উপস্থাপনায় হিউসগেন বলেন যে, পশ্চিম সাহারার সমস্যার মূলে রয়েছে মরক্কো। হিউসগেন পলিসারিওর সামরিক দুর্বলতার অবস্থান উল্লেখ করেন। পলিসারিও যুদ্ধবিরতি ভাঙলেও তিনি এর জন্যে মরক্কোকে দায়ি করেন। আর পলিসারিও যদি আশাহত হয়, তবে তারা উগ্রবাদী হয়ে যেতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। ২০১৯ সালে জাতিসংঘ মহাসচিবের দূত হিসেবে প্রাক্তন জার্মান প্রেসিডেন্ট কোহলারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, কোহলার অসুস্থ হয়ে যাবার পর থেকে কথাবার্তা থেমে গেছে। জার্মানি চাইছে যে, পশ্চিম সাহারা নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হোক এবং রাজনৈতিকভাবে এর সমাধান হোক। জার্মান রাষ্ট্রদূত তার মার্কিন বন্ধুদেরকে শক্ত অবস্থান নেবার কথা বলেন।

পশ্চিম সাহারার বিষয়ে জাতিসংঘে জার্মানির বৈঠক ডাকার কারণ দেখিয়ে চার মাস পর ২০২১এর মে মাসের শুরুতে মরক্কো বার্লিনে তার রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে। ২০২০এর শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পশ্চিম সাহারাতে মরক্কোর সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেয়ার পরেও মরক্কোর বিরুদ্ধে জার্মানির অবস্থানের ব্যাপক সমালোচনা করে মরক্কো। মরক্কো ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সেই স্বীকৃতি পেয়েছিল। এক বিবৃতিতে মরক্কোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলে যে, জার্মানি গঠনমূলক সমাধানের পথে না হেঁটে ধংসাত্মক মনোভাব দেখাচ্ছে। একইসাথে মরক্কো বলে যে, জার্মানি মরক্কোর প্রভাব নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে সর্বদা; বিশেষ করে লিবিয়া ইস্যুর কথা উল্লেখ করা হয়। ২০২০এর জানুয়ারিতে বার্লিনে লিবিয়া নিয়ে আলোচনায় মরক্কোকে বাদ দেয়ার জন্যে জার্মান সরকারকে অভিযুক্ত করা হয়। ‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, গত মার্চে মরক্কো সরকার তাদের সরকারি দপ্তরগুলিকে জার্মান দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিতে নির্দেশ দেয়।

‘আল জাজিরা’র সাথে কথা বলতে গিয়ে স্প্যানিশ সাংবাদিক ইগনাসিও সেমব্রেরো বলছেন যে, মরক্কো চাইছে যে, ইইউ এবং প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তি স্পেনের উপর চাপ সৃষ্টি করে পশ্চিম সাহারার উপর মরক্কোর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি আদায় করে নেয়া। তবে আপাততঃ ইইউ এব্যাপারে মরক্কোকে স্বীকৃতি দেবে বলে মনে করছেন না সেমব্রেরো; অন্ততঃ প্রকাশ্যে নয়। মরক্কো এবং জার্মানির অর্থনৈতিক সম্পর্ক কিন্তু বেশ ভালো। মরক্কোর সপ্তম বৃহত্তম বাণিজ্য সহযোগী হলো জার্মানি। এছাড়াও ২০২০ সালেই জার্মানির কাছ থেকে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণ এবং অনুদান পেয়েছে মরক্কো।
 
২০১৮ সাল। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁর সাথে মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ। মরক্কোর নিরাপত্তা চিন্তায় ইউরোপ সবসময়ই রূঢ় বাস্তবতা; কারণ ইউরোপ মরক্কোকে ভূমধ্যসাগরে ঢোকার পশ্চিম দরজার দক্ষিণ পাল্লা হিসেবে দেখে। একারণেই বিংশ শতকে ইউরোপিয় উপনিবেশ হওয়া থেকে বাঁচতে পারেনি মরক্কো; যার ফলশ্রুতিতে বর্তমান মরক্কো অর্থনৈতিকভাবে ইউরোপের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। তবে নির্ভরশীলতা একমুখী নয় মোটেই; কারণ ইউরোপিয়রাও মরক্কোতে তাদের বিনিয়োগের সুরক্ষা চায়।  


ইউরোপের উপর মরক্কোর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা

মরক্কো হলো পৃথিবীর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ফসফেট উৎপাদক। রক ফসফেট খনিজ থেকে ফসফেট সার তৈরি হয়। পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথেসাথে ফসফেট সারের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টন রক ফসফেট উৎপাদন হয়; যার প্রায় এক তৃতীয়াংশই মরক্কোতে উৎপাদিত হয়। তবে পুরো দুনিয়ার প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টন রক ফসফেট রিজার্ভের মাঝে শুধু মরক্কো এবং পশ্চিম সাহারাতেই পাওয়া গেছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টন। মরক্কোর প্রায় সকল রক ফসফেট উৎপাদন করে সরকারি মালিকানার কোম্পানি ‘ওসিপি’। ১৯৭৬ সালে পশ্চিম সাহারা মরক্কো নিজের নিয়ন্ত্রণে নেবার পর থেকে সেখানকার ‘বৌ ক্রা’ এবং ‘লাইউনি’ খনি থেকে ফসফেট উত্তোলন শুরু হয়। বর্তমানে ‘ওসিপি’র প্রায় ৮ শতাংশ উৎপাদন পশ্চিম সাহারার এই খনি থেকে আসে।

‘আইএইচএস মার্কিট’এর হিসেবে বিশ্বের প্রায় অর্থেক রক ফসফেটের ব্যবহারকারী হলো চীন। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, আফ্রিকা এবং পূর্ব ইউরোপ মিলে প্রায় এক চতুর্থাংশ ব্যবহার করে। এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্য এবং আমেরিকা মহাদেশের অন্যান্য দেশ ফসফেটের গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা। যদিও অর্থের হিসেবে ফসফেট এবং আনুসাঙ্গিক পণ্য মরক্কোর সবচাইতে বড় রপ্তানি পণ্য নয়, তথাপি বিশ্বব্যাপী শস্য উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে ফসফেট মরক্কোকে গুরুত্বপূর্ণ করেছে।

‘ওইসি’র হিসেবে মরক্কোর সবচাইতে বড় রপ্তানি বাজার হলো স্পেন; যেখানে প্রায় ২৩ শতাংশ রপ্তানি হয়। এরপর প্রায় ২০ শতাংশ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ফ্রান্স; ৪ শতাংশ নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে ইতালি; সাড়ে ৩ শতাংশ নিয়ে চতুর্থ স্থানে জার্মানি। এছাড়াও ইউরোপের দেশগুলির মাঝে ব্রিটেন, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম এবং রাশিয়া মরক্কোর গুরুত্বপূর্ণ বাজার। ইউরোপের বাইরে রয়েছে ভারত, তুরস্ক, চীন এবং জাপান। পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলির সাথে মরক্কোর নির্ভরশীলতা ফসফেট নিয়ে নয়; গাড়ি, ইনসুলেটেড তার এবং গার্মেন্টস পণ্যের মতো তৈরি পণ্য ইউরোপে রপ্তানি করে মরক্কো; যা কিনা ইউরোপের উপর মরক্কোকে নির্ভরশীল করেছে। মরক্কোতে বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ফ্রান্স এবং স্পেন এগিয়ে আছে। মরক্কোর মাটিতে ফরাসি গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি ‘রেনো’ এবং ‘পোঁজো’ বিনিয়োগ করেছে।

মরক্কোর বিশাল সাড়ে তিন হাজার কিঃমিঃ লম্বা উপকূল সামুদ্রিক মাছের একটা বড় উৎস; অথচ মরক্কোর নিজের সক্ষমতা নেই গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ করার। জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ‘এফএও’এর হিসেবে মরক্কোর বাৎসরিক সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ এবং চাষ প্রায় ১৫ লক্ষ টন; যা আফ্রিকার বৃহত্তম এবং বিশ্বে ১৭তম। প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ মৎস্য আহরণ এবং চাষের উপর নির্ভরশীল। প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার আয় হয় মৎস্য রপ্তানি করে; যার বেশিরভাগটাই যায় ইউরোপে। ১৯৯৬ সালে ইইউএর সাথে চুক্তি অনুযায়ী মরক্কো তার দেশের উপকূলে ইইউএর, বিশেষ করে স্পেনের জাহাজগুলিকে মাছ ধরার অনুমতি দেয়। এর বিনিময়ে মরক্কো ইইউএর কাছ থেকে বাৎসরিক অর্থ সহায়তা পায়। ২০১৬ সালে মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ পশ্চিম সাহারার দাখলা উদ এদদাহাব উপকূল অঞ্চলে বিভিন্ন মৎস্যজাতীয় চাষের প্রকল্প উদ্ভোধন করেন। এই প্রকল্পগুলিতে ইউরোপিয় দেশগুলি ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। ২০১৯ সালে ইইউ মরক্কোর সাথে এক চুক্তি করে; যার মাধ্যমে পশ্চিম সাহারা উপকূলে ইইউ মাছ ধরার অনুমতি পায়। ‘এএফপি’র হিসেবে চার বছরের এই চুক্তির মাধ্যমে মরক্কো ইইউ থেকে ১’শ ৫৩ মিলিয়ন ইউরো পাবে। ইইউএর পার্লামেন্টে পাস হওয়া এই চুক্তির বিপক্ষে রয়েছে পশ্চিম সাহারার লবিং গ্রুপ। পলিসারিওর উপদেষ্টা নূর বকর ‘আরএফআই’কে বলছেন যে, ইউরোপের আদালতে তারা সকল প্রকারের চেষ্টা চালাবেন মরক্কোর সাথে এই চুক্তি বাতিল করতে। ইউরোপিয়ান কমিশনের হিসেবে ২০১৯ সালে মরক্কো পশ্চিম সাহারা থেকে ৫’শ ২৪ মিলিয়ন ডলার মূল্যের মৎস্য এবং কৃষিজ পণ্য ইউরোপে রপ্তানি করে।

পশ্চিম সাহারার ফসফেট ইউরোপের সাথে বাণিজ্যে বড় কোন ইস্যু না হলেও মরক্কো ইইউএর উপর অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্টই নির্ভরশীল। আর সেই হিসেবে ইউরোপের আদালতে পশ্চিম সাহারার অভিযোগ মরক্কোর জন্যে বিরক্তির ব্যাপার হতে পারে। তবে মরক্কো যেমন ইইউএর উপর নির্ভরশীল, তেমনি মরক্কোতে বড় বিনিয়োগও ইইউএর দেশগুলির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। মরক্কোর বিরুদ্ধে ইইউ আদালতের যেকোন সিদ্ধান্ত ইউরোপিয় কোম্পানিগুলিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। মরক্কোর ৩২ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির বিপরীতে আমদানি হলো প্রায় ৪৯ বিলিয়ন ডলার। আমদানি এবং রপ্তানির মাঝে বড় ব্যবধান দেশটার অর্থনীতিকে ব্যাতিব্যস্ত রেখেছে। এমতাবস্থায় মরক্কোও এমন কোন সিদ্ধান্ত নিতে যাবে না, যা কিনা দেশটার অর্থনীতিকে আরও চাপের মাঝে ফেলবে।

জিব্রালটার প্রণালী উত্তর ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার সাথে ভূমধ্যসাগর, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার সংযোগপথ। একসময় প্রাকৃতিক কারণে মরক্কোর উপকূলে বড় বন্দর নির্মাণ কঠিন হলেও প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথেসাথে মরক্কোর উপকূলে বড় বড় সমুদ্রবন্দর তৈরি হতে থাকে। এর ফলে জিব্রালটার প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ বহুকাল জিব্রালটার এবং স্পেনের উপর নির্ভরশীল হলেও এখন মরক্কোও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। একারণেই মরক্কোর নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী দেশগুলির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। 


ভূকৌশলগত দিক থেকে মরক্কোর অতি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান

মরক্কো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা ভৌগোলিক অবস্থান ধরে রেখেছে, যা কিনা ভূকৌশলগত দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মরক্কোর উত্তর উপকূল জিব্রালটার প্রণালির দক্ষিণ কূল নিয়ন্ত্রণ করে। ১৯০৬ সালে মরক্কোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী ইউরোপিয় দেশগুলি ব্রিটেনের একটা শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। ব্রিটেন বলেছিল যে, মরক্কোর নিয়ন্ত্রণ যার কাছেই যাক না কেন, জিব্রালটারের উল্টো পাসে মরক্কোর উত্তর উপকূলে কোন বন্দরে দুর্গ তৈরি করা যাবে না। ব্রিটেন বিশেষ করে খেয়াল রেখেছিল জার্মানি যেন মরক্কোর উপর প্রভাব বিস্তার করে সেখানে একটা নৌঘাঁটি করে ফেলতে না পারে। এটা জিব্রালটারের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্রিটেনের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৯৭০এর দশকে স্পেন মরক্কো ছেড়ে আসলেও মরক্কোর উত্তর উপকূলে কয়েকটা বন্দরকে স্পেন ছিটমহল হিসেবে রেখে দেয়। ভবিষ্যতে জিব্রালটার প্রণালীর দক্ষিণ উপকূল নিয়ন্ত্রণে এই ছিটমহলগুলি ইউরোপের জন্যে কাজে দিতে পারে। এগুলির মাঝে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেউতা এবং মেলিলা। সেউতার পাশেই মরক্কোর তাঞ্জিয়ার এবং তাঞ্জিয়ার মেড জিব্রালটারের উল্টো দিকে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর।

জিব্রালটার প্রণালী উত্তর ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার সাথে ভূমধ্যসাগর, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার সংযোগপথ। ব্রিটেন, নেদারল্যান্ডস, জার্মানিসহ পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলি এই প্রণালীর মধ্য দিয়ে যাওয়া বাণিজ্যপথের উপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল। ফ্রান্সের আটলান্টিক উপকূলের সাথে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের সংযোগও জিব্রালটারের মাধ্যমে। তাই এই সংযোগপথের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে ইউরোপিয়দের কাছে মরক্কোর গুরুত্ব সর্বদাই বেশি ছিল। একসময় প্রাকৃতিক কারণে মরক্কোর উপকূলে বড় বন্দর নির্মাণ কঠিন হলেও প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথেসাথে মরক্কোর উপকূলে বড় বড় সমুদ্রবন্দর তৈরি হতে থাকে। এর ফলে জিব্রালটার প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ বহুকাল জিব্রালটার এবং স্পেনের উপর নির্ভরশীল হলেও এখন মরক্কোও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। একারণেই মরক্কোর নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী দেশগুলির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও মরক্কো হলো যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের মাঝে অবস্থিত একটা দরজা। এর মাঝ দিয়ে মার্কিন সামরিক বিমানগুলি উড়ে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া আসা করে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলিও এই পথে ভূমধ্যসাগর এবং মধ্যপ্রাচ্যে যায়। কাজেই মার্কিনীরাও মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ রাখতে মরক্কোর নিয়ন্ত্রণ চায়।

মরক্কো নিজের অবস্থানকে ব্যবহার করে আফ্রিকার গ্যাস ইউরোপে রপ্তানি করতে চাইছে। আলজেরিয়া থেকে একটা পাইপলাইনের মাধ্যমে মরক্কো হয়ে গ্যাস রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপে। আরেকটা পাইপলাইনের মাধ্যমে নাইজেরিয়ার গ্যাস ইউরোপে রপ্তানি করতে চাইছে মরক্কো। এই পাইপলাইনগুলি নিয়ে মরক্কোর সাথে আলজেরিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে।

মরক্কোর সাথে পশ্চিম আফ্রিকার অন্যান্য দেশের সড়ক যোগাযোগের একমাত্র পথ হল পশ্চিম সাহারার মাঝ দিয়ে যাওয়া একটা মাত্র রাস্তা। ২০২০এর নভেম্বরে প্রায় দু’শ মালবাহী ট্রাক মৌরিতানিয়ার সীমানায় আটকে থেকে অভিযোগ করে যে, মিলিশিয়ারা রাস্তা অবরোধ করে রেখেছে। এরপরই মরক্কো এই রাস্তার নিরাপত্তা নিশ্চিতে পশ্চিম সাহারার দক্ষিণে মৌরিতানিয়ার সীমানায় গুরগেরাত বাফার জোনে সেনা মোতায়েন করে। ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’এর রিকার্ডো ফাবিয়ানি ‘আল জাজিরা’কে বলেন যে, নতুন করে শুরু হওয়া এই উত্তেজনার ফলাফল সুদূরপ্রসারী হতে পারে। আলজেরিয়ার পররাষ্ট্র দপ্তর মরক্কোর এই সামরিক মিশনের সমালোচনা করে বিবৃতি দেয়।
 
২০১৩ সাল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথে মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ। মরক্কোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বহুকালের। যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে ভূমধ্যসাগরে ঢোকার একটা পথ হলো জিব্রালটার। এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ধরে রাখতে মরক্কো একটা দরজার মতো। আরব দেশগুলিও সেকারণেই যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা পাবার জন্যে মরক্কোর এই ‘দরজা’ খোলা দেখতে চায়। ইউরোপের নিয়ন্ত্রণ থেকে বাঁচতেই মরক্কো যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকিয়েছিল।  

মরক্কোর যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রিক রাজনীতি

মরক্কো যুক্তরাষ্ট্রের অনেক পুরোনো বন্ধু। যুক্তরাষ্ট্র তৈরি হবার সময়েই মরক্কোর সুলতান মোহাম্মদ বেন আব্দেল্লাহ ১৭৭৭ সালে ব্রিটেনের চোখ রাঙ্গানো উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ১৭৮৬ সালে মরক্কোর করা বন্ধুত্বের চুক্তি এখনও বলবত রয়েছে। ১৯০৬ সালে ইউরোপিয় শক্তিরা মরক্কোর দখল নেবার সময় যুক্তরাষ্ট্র এর বিরোধিতা করেছিল। ১৯৫৬ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাবার পরের বছরেই মরক্কোর রাজা পঞ্চম মোহাম্মদ ওয়াশিংটন সফর করেন। পরবর্তী রাজা দ্বিতীয় হাসানও কয়েকবার ওয়াশিংটন সফর করেন। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় মরক্কো যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবেই থাকে। ১৯৯৯ সাল থেকে পরবর্তী রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে তার পূর্ববর্তীদের নীতি অনুসরণ করেন। ১৯৮৭ সালে মরক্কোর সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের দেশের বিমান ঘাঁটিগুলি ব্যবহার করার অনুমতি দেয়। মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকায় মার্কিন সামরিক অপারেশন চালাতে মরক্কোর বিমান ঘাঁটিগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পলিসারিওর বিরুদ্ধে যুদ্ধে মরক্কোকে সামরিক সহায়তা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এই সামরিক সহায়তার পিছনে অর্থায়ন সৌদি আরব করে বলেই মনে করেন বিশ্লেষকেরা। ওয়াশিংটনে মরক্কোর পক্ষে শক্তিশালী লবিং গ্রুপ থাকায় পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে মার্কিন সরকার মরক্কোকে সরাসরি সমর্থন না করলেও যুক্তরাষ্ট্র মূলতঃ মরক্কোর পক্ষেই থাকে। মার্কিনীরা পশ্চিম সাহার জন্যে মরক্কোর অধীনে স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে লবিং করতে থাকে।

২০১৯ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র মরক্কোর কাছে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যে ২৫টা ‘এফ ১৬ ব্লক ৭২’ ফাইটার বিমান বিক্রয়ের অনুমোদন দেয়; এবং আরও প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারে বর্তমানে মরক্কোর বিমান বাহিনীতে থাকা ২৩টা ‘এফ ১৬’ বিমানকে আপগ্রেড করার কথা বলে। একই বছরের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর মরক্কোর কাছে আরও ১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাবের অনুমোদন দেয়। ‘ডিফেন্স নিউজ’ বলছে যে, এর মাঝে ছিল ‘এফ ১৬’ যুদ্ধবিমানে ব্যবহারের জন্যে ৫ হাজার ৮’শ ‘মার্ক ৮২’ বোমা, ৩’শ ‘মার্ক ৮৪’ বোমা, ১’শ ৫টা ‘জেডিএএম’ বোমার কিট, ১’শ ৮০টা ‘জিবিইউ ১০’ বোমার কিট, ৪ হাজার ১’শ ২৫টা ‘জিবিইউ ১২’ বোমার কিট। এছাড়াও ৪’শ টা লঞ্চার সহ ২ হাজার ৪’শটা ‘টিওডব্লিউ’ ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। এক বছরের মাঝে মরক্কো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের অস্ত্র কেনার অনুমোদন পায়।

২০২০এর ১০ই ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে, ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম সাহারায় মরক্কোর সার্বভোমত্ব স্বীকার করে নিয়েছে। পরদিনই যুক্তরাষ্ট্র মরক্কোর কাছে আরও ১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির ঘোষণা দেয়। ‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, এই অস্ত্রের মাঝে রয়েছে চারটা ‘এমকিউ ৯বি সী গার্ডিয়ান’ ড্রোন এবং ‘হেলফায়ার’ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ‘পেইভওয়ে’ ও ‘জেডিএএম’ বোমা। এই অস্ত্রগুলি পশ্চিম সাহারা নিয়ে পুনরায় সংঘাত শুরু হলে মরক্কোকে নিশ্চিতভাবে এগিয়ে রাখবে।

জিব্রালটার প্রণালী নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র বনাম ইউরোপ

মরক্কোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বহুকালের। যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে ভূমধ্যসাগরে ঢোকার একটা পথ হলো জিব্রালটার। এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ধরে রাখতে মরক্কো একটা দরজার মতো। আরব দেশগুলিও সেকারণেই যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা পাবার জন্যে মরক্কোর এই ‘দরজা’ খোলা দেখতে চায়। ইউরোপের নিয়ন্ত্রণ থেকে বাঁচতেই মরক্কো যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকিয়েছিল। মরক্কোর নিরাপত্তা চিন্তায় ইউরোপ সবসময়ই রূঢ় বাস্তবতা; কারণ ইউরোপ মরক্কোকে ভূমধ্যসাগরে ঢোকার পশ্চিম দরজার দক্ষিণ পাল্লা হিসেবে দেখে। একারণেই বিংশ শতকে ইউরোপিয় উপনিবেশ হওয়া থেকে বাঁচতে পারেনি মরক্কো; যার ফলশ্রুতিতে বর্তমান মরক্কো অর্থনৈতিকভাবে ইউরোপের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। তবে নির্ভরশীলতা একমুখী নয় মোটেই; কারণ ইউরোপিয়রাও মরক্কোতে তাদের বিনিয়োগের সুরক্ষা চায়।

অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্ব ইউরোপের সাথে দরকষাকষিতে মরক্কোকে শক্ত ভিত্তি দেয়। একারণেই ১৯৭০এর দশক থেকে সামরিক শক্তি দিয়ে পশ্চিম সাহারাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করলেও মরক্কোর উপর কোন অবরোধ কেউ দিতে পারেনি। উল্টো পলিসারিওর সাথে যুদ্ধে মরক্কো যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা অস্ত্র পেয়েছে। তবে মরক্কোর প্রায় ২ লক্ষ সদস্যের সেনাবাহিনী পশ্চিম সাহারায় ব্যস্ত থেকে জিব্রালটার এবং স্প্যানিশ ছিটমহলগুলি থেকে যে দূরে থাকছে, সেব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র খুব বেশি চিন্তিত হবার কথা নয়। পশ্চিম সাহারার ফ্রন্টলাইন অনেকদিন ঠান্ডা থাকার পর আবারও উত্তপ্ত হচ্ছে; যা মূলতঃ পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থারই ফলাফল। সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতা মরক্কোর উপর ইউরোপের চাপ বৃদ্ধির পিছনে বড় কারণ। ইস্রাইলের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের মতো জনবিরোধী সিদ্ধান্তও মরক্কোর সরকার নিয়েছে পশ্চিম সাহারায় মরক্কোর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি পাবার জন্যে। তবে এর ফলশ্রুতিতে ইউরোপের সাথে মরক্কোর সম্পর্ক টানাপোড়েনের মাঝে পড়েছে। যদিও মরক্কোর সাথে ইউরোপের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা কম, তথাপি মরক্কোর উত্তর উপকূলে স্পেনের ছিটমহলগুলি যখন হাজারো শরণার্থীর জোয়ারে ভেসে যাবার উপক্রম, তখন এই ছিটমহলগুলির সামনের দিনগুলিতে ইউরোপের ‘ব্রিজহেড’ হিসেবে থাকার সম্ভাবনা প্রশ্নের মুখে পড়ে। জিব্রালটার প্রণালীর উভয় উপকূল নিয়ন্ত্রণে রাখা ইউরোপের জন্যে ততক্ষণই কঠিন, যতক্ষণ যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী হাতে মরক্কোর নিরাপত্তার দায়ভার নিতে পারবে। সাম্প্রতিক সময়ে মরক্কোর জন্যে বিপুল সামরিক সহায়তা ইউরোপের জন্যে সেই বার্তা বহণ করে।

Tuesday, 14 April 2020

করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট ভূরাজনৈতিক শূণ্যতা পূরণে নেতৃত্ব দিচ্ছে তুরস্ক

১৪ই এপ্রিল ২০২০

১০ই এপ্রিল তুর্কিরা বিমানে করে মেডিক্যাল সামগ্রী পাঠায় ব্রিটেনে। তুরস্ক মানবিক সহায়তার রাজনীতিকে উস্কে দেবার পর আমিরাত, কাতার, মিশর, বাংলাদেশের মতো মুসলিম দেশগুলির অগ্রগামী ভূমিকা বিশ্বব্যাপী নতুন ভূরাজনীতির জন্ম দিচ্ছে।

গত পহেলা এপ্রিল তুরস্কের বিমান বাহিনীর ‘এ-৪০০এম’ পরিবহণ বিমান আঙ্কারা ছেড়ে যায়। এর গন্তব্য ছিল ইতালি এবং স্পেন; যারা নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণে সবচাইতে বেশি আক্রান্ত হয়েছে। তুর্কি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক টুইটার বার্তায় বলা হয় যে, বিমানে ছিল করোনাভাইরাস প্রতিরোধে অতি দরকারি মাস্ক, গাউন এবং জীবাণুনাশক, যা কিনা তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারখানাগুলিতে তৈরি হয়েছে। ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী লুইজি ডি মাইও এবং স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঞ্চা গঞ্জালেজ তুরস্ককে এই সহায়তার জন্যে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। ‘দ্যা ডিফেন্স পোস্ট’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, পহেলা এপ্রিল পর্যন্ত তুরস্কে করোনাভাইরাসে ২’শ ১৪ জনের প্রাণহানি হয়েছে; আক্রান্ত হয়েছে সাড়ে ১৩ হাজারেরও বেশি মানুষ। অর্থাৎ তুরস্ক তার নিজের দেশে মেডিক্যাল সরঞ্জামের ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ইতালি এবং স্পেনকে সহায়তা দিয়েছে। ইতালির ১০ বছর বয়সী একটা ছেলে এক ভিডিও বার্তায় তুরস্কের এই সহায়তাকে ধন্যবাদ দেয়, যা কিনা দুর্যোগের মুহুর্তে তুর্কিদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়ার চিন্তাটাকেই হাইলাইট করেছে। মিলানের এই বাসিন্দা আর্নেস্ত গাব্রিয়েল স্ক্রোচ্চি তার বার্তায় বলে যে, প্রতি পাঁচ মিনিটে একটা করে এম্বুল্যান্সের শব্দ শুনতে শুনতে সে ব্যাথিত। এমন এক সময়েই তুরস্ক ইতালিকে সহায়তা দিয়েছে। তুর্কিদের প্রতি ইতালি কৃতজ্ঞ। তবে স্ক্রোচ্চির আবেগঘন বার্তাই তুরস্কের জন্যে একমাত্র পাওয়া নয়। করোনাভাইরাসকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী নতুন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার একটা অংশ এই সহায়তা।

মার্চ মাস জুড়ে চীন বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সহায়তা দিয়েছে। কম্বোডিয়াতে তারা পাঠিয়েছে টেস্টিং কিট, ইতালি এবং ফ্রান্সকে দিয়েছে ভেন্টিলেটর, মাস্ক এবং মেডিক্যাল কর্মী; ইরাক এবং ইরানেও পাঠিয়েছে মেডিক্যাল কর্মী। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং স্পেনের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে বলেন যে, ঝড়ের পরেই সূর্য দেখা যায়। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ বলছে যে, করোনা দুর্যোগের মাঝে চীন নিজেকে জনস্বাস্থ্যের ব্যাপারে বিশ্বের নেতৃত্বে বসাতে চাইছে। শুধু তা-ই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতার মাঝে চীন বিশ্বব্যাপী তার প্রভাব বাড়িয়ে নিতে চাইছে। নিজ দেশে চীন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কমিয়ে আনার সাথেসাথেই বিশ্বের প্রতি চীনের বাক্যগুলি পরিবর্তিত হয়ে গেছে। নিজ দেশে চীন করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রায় ‘জয়লাভ’ করার দাবি করছে এবং বাকি বিশ্বকে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়তে সহায়তা দিতে চাইছে। অস্ট্রেলিয়ার ‘লোয়ি ইন্সটিটিউট’এর রিসার্চ ফেলো নাতাশা কাসাম বলছেন যে, চীনাদের প্রচারমাধ্যম করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে ‘জয়লাভ’এর ইতিহাস লিখেছে, এবং তারা চাইছে যে বিশ্বব্যাপী সকলে তা বিশ্বাস করুক। শি জিনপিং ইতালির প্রধানমন্ত্রী গুইসেপ কন্টিকে ফোনে বলেন যে, তিনি একটা ‘হেলথ সিল্ক রোড’ তৈরি করার পরিকল্পনা করছেন। ‘জার্মান মার্শাল ফান্ড’এর সিনিয়র ভিজিটিং ফেলো নোয়াহ বারকিন বলছেন যে, চীন চাইছে ইউরোপিয়দের নিজেদের মাঝের দূরত্বকে বাড়াতে; আর যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে চ্যালেঞ্জ করতে। একইসাথে শি জিনপিংএর সরকার নিজ জনগণকে বোঝাতে চাইছে যে, চীন নিজ দেশের দুর্যোগকে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছে। ভাইরাস সংক্রমণের প্রথম দিকে চীনা সরকারের ব্যর্থতাগুলিকে এখন তারা আর আলোচনায় রাখতে চাইছে না। ‘চায়না ডেইলি’র এক প্রতিবেদনে গর্ব করেই লেখা হয় যে বাকি বিশ্বে সংক্রমণের সংখ্যা চীনের সংক্রমণের সংখ্যাকে অতিক্রম করেছে; যা কিনা “ভাগ্য উল্টে যাওয়া”র সাথে তুলনা করা হয়। এই প্রতিবেদনের জবাবে একজন পাঠক লিখেন যে, চীনাদের ঘরে পানির পাইপ ভেঙ্গে যাবার পর তারা প্রতিবেশীদের বাড়ি ডুবিয়ে দিয়েছে। এটাই কি সেই ‘স্বর্ণযুগ’, যার আশা চীনারা করেছিল?
 
বেলগ্রেডের রাস্তায় বিলবোর্ড ঘোষণা করছে কিভাবে “ব্রাদার শি” সার্বিয়ার মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। চীন এতকাল তার নিজের দেড়’শ কোটি মানুষকে উন্নততর জীবন দেবার জন্যেই সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। বিশ্বের মানুষের সমস্যা নিরসনে তার কোন ভূমিকা ছিল না। এখন চীনা মাস্ক এবং ডাক্তাররা চীনের এই অবস্থানকে পরিবর্তন করতে চাইছে।


‘আটলান্টিক কাউন্সিল’এর ইউরেশিয়া সেন্টারের সিনিয়র ফেলো দিমিতার বেচেভ বলছেন যে, রাজনীতিতে অনেক সময়ই হুমকি এবং সুযোগ একত্রে আসে। চীনের উদাহরণ দিয়ে বেচেভ বলছেন যে, মার্চের মাঝামাঝি ইতালি এবং স্পেনকে মেডিক্যাল সহায়তা দেবার মাধ্যমে চীন তার ক্ষয়ে যাওয়া প্রতিচ্ছবিটাকে কিছু ঘষামাজা করতে চাইছে। অনেকেই চীনে করোনাভাইরাসের আবির্ভাব হবার ব্যাপারটাকে হাইলাইট করেছেন; আবার অনেকেই ভাইরাস সংক্রমণের প্রথম দিকে চীনা সরকারের অস্বচ্চতা এবং অব্যবস্থাপনার সমালোচনা করেছেন, যার ফলশ্রুতিতে ভাইরাস সারা বিশ্বে ছড়াতে পেরেছিল। চীন এতকাল তার নিজের দেড়’শ কোটি মানুষকে উন্নততর জীবন দেবার জন্যেই সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। বিশ্বের মানুষের সমস্যা নিরসনে তার কোন ভূমিকা ছিল না। এখন চীনা মাস্ক এবং ডাক্তাররা চীনের এই অবস্থানকে পরিবর্তন করতে চাইছে। রাশিয়াও চীনকে অনুসরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে মেডিক্যাল সহায়তা পাঠিয়েছে। অনেক মার্কিনীরাই রুশ এই সহায়তাকে প্রচারণার খাতিরে করা হয়েছে বলেই বলছেন। অন্যদিকে ইতালিতে রুশ সহায়তা পাঠাবার পর ইতালি থেকে কেউ কেউ অভিযোগ করা শুরু করে যে, রুশ মেডিক্যাল কর্মীদের মাঝে ইন্টেলিজেন্সের লোকও এসেছে। একইসাথে সার্বিয়াতে চীনা সহায়তা যাবার পর সার্বিয়ান প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার ভুচিচ দুঃখ করে বলেন যে, ইউরোপের মাঝে কোন ঐক্য নেই। তিনি বলেন যে, ইউরোপিয়রাই সার্বিয়াকে বলেছিল তাদের টেন্ডারের নিয়ম পরিবর্তন করতে, যাতে ইউরোপিয় কোম্পানিগুলি চীনা কোম্পানির স্থলাভিষিক্ত হতে পারে। আর এখন ইউরোপের কাছে সার্বিয়ার কোন গুরুত্ব নেই। বেলগ্রেডের রাস্তায় সরকারপন্থী পত্রিকার বিলবোর্ড বসানো হয়েছে, যেখানে ঘোষণা করা হয়েছে কিভাবে “ব্রাদার শি” সার্বিয়ার মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও সার্বয়াতে মেডিক্যাল সহায়তা পাঠিয়েছেন।

চীনারা করোনাভাইরাসের সংক্রমণের উপর মানবিক সহায়তার ভিত গড়ে তুলতে চাইলেও তুরস্ক এদিক থেকে পুরোনো খেলোয়াড়। বিশ্বব্যাপী মানবিক সহায়তা দেয়াটা সবসময়ই তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতির অংশ। বসনিয়া থেকে শুরু করে সোমালিয়া বা আফগানিস্তান পর্যন্ত তুরস্ক মানবিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে অনেক বছর ধরেই। গত নভেম্বরে আলবেনিয়াতে ভূমিকম্পের পর তুরস্ক সেখানে সহায়তা প্রেরণ করে। তুরস্ক ৮ই এপ্রিল বলকানের পাঁচটা দেশে মেডিক্যাল সরঞ্জাম পাঠায়। তুর্কি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক টুইটার বার্তায় বলে যে, সার্বিয়া, বসনিয়া হার্জেগোভিনা, মন্টিনিগ্রো, নর্থ মেসিডোনিয়া এবং কসোভোতে মাস্ক, গাউন এবং টেস্ট সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে। ১০ই এপ্রিল তুর্কিরা আরেকটা বিমানে করে মেডিক্যাল সামগ্রী পাঠায় ব্রিটেনে। ১২ তারিখে দ্বিতীয় বিমানটা যায় ব্রিটেনে। ইউরোপের দেশগুলিতে তুর্কিদের পাঠানো মেডিক্যাল সামগ্রীর বাক্সগুলির উপর লেখা ছিল ত্রয়োদশ শতাব্দীর মুসলিম সাধক জালালুদ্দিন রুমির কবিতা - নৈরাশ্যতার পরেই রয়েছে অনেক আশা; এবং আঁধারের পরেই রয়েছে অনেক বেশি উজ্জ্বলতর সূর্য। ৯ই এপ্রিল তুর্কি সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা ‘ব্লুমবার্গ’ জানায় যে, ইস্রাইলও তুরস্কের কাছে মাস্ক, গাউন এবং গ্লাভস চেয়েছে। এর বিনিময়ে ইস্রাইলি সরকার প্যালেস্টাইনিদের কাছে তুর্কি ত্রাণ যাবার সুযোগ দেবে বলে সমঝোতা হয়েছে। তবে ইস্রাইলি কর্মকর্তারা ইস্রাইলের ‘ইনেত’ পত্রিকার সাথে কথা বলতে গিয়ে প্যালেস্টাইনে ত্রাণ পাঠাবার সমঝোতার কথাটা অস্বীকার করেন।




তুরস্ক মানবিক সহায়তার রাজনীতিকে উস্কে দেবার পর সংযুক্ত আরব আমিরাত ৬ই এপ্রিল ইতালিতে ১০ টন এবং পাকিস্তানে ১১ টন মেডিক্যাল সরঞ্জাম পাঠায়। এরপর ১০ই এপ্রিল ইউক্রেনে ১১ টন মেডিক্যাল সরঞ্জাম পাঠায়। এছাড়াও আমিরাত ইথিওপিয়া, সোমালিয়া, গ্রীক সাইপ্রাস এবং আরও কিছু দেশে সহায়তা পাঠাচ্ছে। ৮ই এপ্রিল ইতালিতে দু’টা ফিল্ড হাসপাতাল পাঠায় কাতার; যার মাধ্যমে মোট ২ হাজার করোনাভাইরাস রুগীর চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হবে। অপরদিকে নিজেদের স্বল্পতা থাকা সত্ত্বেও ইতালিকে সহায়তা দিয়েছে মিশর। মিশরের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হালা জায়েদ নিজে ইতালিতে দু’টা বিমান ভর্তি মেডিক্যাল সরঞ্জাম নিয়ে যান। ১৪ই এপ্রিল এক টুইটার বার্তায় ব্রিটিশ বাণিজ্যমন্ত্রী গ্রেগ হ্যান্ডস বলেন যে, মিশর থেকে বিরাট সংখ্যক মেডিক্যাল গাউন আসছে; যার জন্যে তিনি মিশরকে ধন্যবাদ জানান। মিশরে এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসে ১’শ ৬৪ জন মৃত্যুবরণ করেছেন; সংক্রমিত হয়েছে দুই হাজারেরও বেশি। আর কুয়েতে ১’শরও বেশি মেডিক্যাল কর্মী এবং মেডিক্যাল সরঞ্জাম দিয়ে সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ। মালদ্বীপকেও ত্রাণ সহায়তা দিতে চাইছে বাংলাদেশ।

চীন করোনাভাইরাস থেকে কতটা ‘মুক্ত’ হতে পেরেছে, তা প্রশ্নাতীত না হলেও এই ভাইরাসকে পুঁজি করে শি জিনপিংএর চীন নিঃসন্দেহে বিশ্বব্যাপী তার প্রভাব গড়ে তুলতে চাইছে। ভাইরাসের আক্রমণে সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের নাজেহাল হবার এই সুযোগে চীনারা এশিয়া, আফ্রিকা ছাড়াও ইউরোপের রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা এবং সার্বিয়ার রাস্তায় বিলবোর্ডে শি জিনপিংএর ছবি একটা বড় ভূরাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে এমনই সময় করোনাভাইরাস মোকাবিলায় তুরস্ক, এবং তার সাথেসাথে আমিরাত, কাতার, মিশর, বাংলাদেশের মতো মুসলিম দেশগুলির অগ্রগামী ভূমিকা বিশ্বব্যাপী নতুন ভূরাজনীতির জন্ম দিচ্ছে। নিজ দেশে করোনাভাইরাস নিয়ে ব্যাপক সমস্যায় থাকা এবং মেডিক্যাল সরঞ্জামের স্বল্পতা থাকা সত্ত্বেও দেশগুলি অন্যকে সহায়তা দিতে অগ্রসর হয়েছে, যা কিনা করোনাভাইরাসের কারণে ভূরাজনৈতিক শূণ্যতা পূরণের একটা চেষ্টা। সামনের দিনগুলিতে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে নিশ্চিতভাবে কেউ কিছু বলতে না পারলেও এর ফলশ্রুতিতে অবশ্যম্ভাবী ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনকে কেউ এখন আর অস্বীকার করছেন না।


Tuesday, 12 February 2019

যুক্তরাষ্ট্র কি যুক্তরাষ্ট্রই থাকবে?

১২ই ফেব্রুয়ারি ২০১৯ 

১৭৮৩ সাল থেকে ১৮৫৩ সালের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখন্ড প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়েছে।  ফ্রান্স, স্পেন এবং মেক্সিকো থেকে ভূখন্ড নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ভৌগোলিকভাবে বড় হয়েছে। তবে ভৌগোলিক পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভিত পরিবর্তিত হয়নি। 


নির্দিষ্ট ভূখন্ড কি রাষ্ট্রের সংজ্ঞার অন্তর্গত? 

একটা রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় ভূমি বা ভূখন্ড কতটা গুরুত্বপূর্ণ? ভূখন্ড নির্দিষ্টকরণ না হলে কি রাষ্ট্র হবে, নাকি হবে না? একটা রাষ্ট্রের ভিত্তির সংজ্ঞার মাঝে কি তার ভূখন্ডের মানচিত্রও পড়ে? ভূখন্ড বা মানচিত্রে পরিবর্তন হলে সেই রাষ্ট্রের সংজ্ঞা কি আগের মতোই থাকবে, নাকি নতুন কোন রাষ্ট্র হিসেবে সেটাকে দেখতে হবে? যে জিনিসগুলি দিয়ে একটা রাষ্ট্রকে অন্যদের থেকে আলাদা করা যায়, তার মাঝে কি তার ভূখন্ডের মানচিত্রও পড়ে? এই প্রশ্নগুলি সমাজে অপ্রচলিত বললেও অত্যুক্তি হয় না। বর্তমানে মানচিত্র বা ভূখন্ডকে একটা রাষ্ট্রের ভিতের সাথে এমনভাবে গেঁথে দেয়া হয়েছে যে, রাষ্ট্র তৈরির আগেই সকলে ভূখন্ড নিয়ে ভাবতে থাকেন। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে যে, এখানে যে ব্যাপারটা ধরে নেয়া হচ্ছে, তা হলো – একটা রাষ্ট্র আসলে তৈরিই হয় ভূখন্ড হিসেবে অন্য ভূখন্ড থেকে আলাদা হবার কারণে। এরসাথে জাতিগত ব্যাপারটাকে যোগ করলে দেখা যাবে যে, একটা জাতি একটা নির্দিষ্ট ভূখন্ডে বাস করে বলেই সেই ভূখন্ড নির্দিষ্টকরণের মাঝেই তাদের আলাদা একটা রাষ্ট্র গঠনের অনুপ্রেরণা। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, জাতিগতভাবে নিজেদেরকে আলাদা করে দেখাবার ‘টেরিটোরিয়াল’ উদ্দেশ্য থেকেই একটা রাষ্ট্রের জন্ম হচ্ছে। ব্যাপারটা অনেকটা জঙ্গলের জীবজন্তুর মতোই হয়ে যাচ্ছে। বন্য প্রাণীরাও নিজেদের এলাকা আগলে রাখে অন্যদের থেকে রক্ষা করার জন্যে। বাইরের কেউ সেখানে প্রবেশ করতে গেলেই তারা আক্রমণ করে। আপাতঃদৃষ্টে বর্তমান বিশ্বে রাষ্ট্র গঠনের চিন্তাখানাও জঙ্গলের মতোই। শুনতে খারাপ লাগলেও তা আসলে কিছুটা পাশবিক প্রকৃতির।

কিন্তু জাতি এবং নির্দিষ্ট ভূখন্ডের মাধ্যমে সর্বক্ষেত্রে একটা রাষ্ট্রের সংজ্ঞা দেয়া যাবে না। কোরিয়া উপদ্বীপের কথাই ধরা যাক। উত্তর এবং দক্ষিণ কোরিয়ার জনগণের মাঝে জাতিগত কোন পার্থক্য নেই; তারপরেও তারা আলাদা। এক্ষেত্রে দুই কোরিয়াকে আলাদা করে রাখা হয়েছে চিন্তাগত কারণে – উত্তর কোরিয়া সমাজতান্ত্রিক; দক্ষিণ কোরিয়া পুঁজিবাদী। একসময় এই ব্যাপারটা কিউবা এবং ভিয়েতনামের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ছিল। তবে মূল কথা হলো, এই রাষ্ট্রগুলি সংজ্ঞায়িত হয়েছে রাষ্ট্রের চিন্তার উপরে ভিত্তি করে; তার জাতিগত বা ভৌগোলিক নির্দিষ্টকরণের মাধ্যমে নয়। তাহলে বিশ্বের বাকি দেশগুলি কেন চিন্তার ভিত্তিতে গঠিত রাষ্ট্র নয়? উত্তর সহজ – সকলেই একই চিন্তার মাঝে রয়েছে। সেই একই চিন্তার মাঝে পাশবিক প্রবৃত্তিগুলিকে লালন করেই বর্তমান বিশ্বের জাতিগত ভৌগোলিক বাউন্ডারিগুলি দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই সীমানাগুলি আসলে কতটা শক্ত ভিতের উপরে?

ভৌগোলিক আকার এবং নাগরিকত্ব – দু’টা উদাহরণ

রাষ্ট্রগুলির সীমানার ভিত দেখতে হলে রাষ্ট্রের সীমানার ইতিহাস দেখতে হবে। যেমন ১৯৩০ সালে ঢাকায় জন্ম নেয়া একটা মানুষের জাতীয়তা কি সর্বদা একই ছিল? ১৯৪৬ সালে তার জাতীয়তা কি পরিবর্তিত হয়েছিল? ১৯৪৭ সালে তার জাতীয়তা কি ছিল? ১৯৭২ সালে? লোকটার পারিবারিক ইতিহাস তো পরিবর্তিত হয়নি; তার ভৌগোলিক অবস্থানও আগের মতোই রয়েছে। তারপরেও তার জাতীয়তা কি পরিবর্তিত হয়নি? যদি পরিবর্তিত হয়েই থাকে, তাহলে কিসের ভিত্তিতে হলো সেটা? আরেকটা উদাহরণ দেয়া যাক।

জার্মান কারা? যারা বর্তমানে জার্মানি নামের রাষ্ট্রের ভূখন্ডের অন্তর্গত তারা? নাকি অন্য রাষ্ট্রের মাঝে বসবাসকারীরাও জার্মান বলে পরিগণিত হতে পারে? আর যদি রাষ্ট্র হিসেবে জার্মানির অন্তর্গত মানুষকেই বোঝানো হয়ে থাকে, তাহলে কোন কালের জার্মানির কথা বলা হবে, তা-ও কিন্তু সংজ্ঞায়িত করে ফেলতে হবে। হ্যাঁ, অনেকেই শুধু বর্তমানের কথাই বলবেন। কিন্তু যে ব্যক্তির ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত জার্মান নাগরিকত্ব ছিল, কিন্তু ১৯৪৬ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি হেরে যাবার পর তার শহরটা যদি পোল্যান্ডের অধীনে চলে গিয়ে থাকে, তাহলে সেই ব্যক্তির জাতীয়তার কি হবে? আর এই ব্যক্তির জাতীয়তা তার বাকি জীবনে যে একই থাকবে, তার নিশ্চয়তা কে দিচ্ছে?

ব্রিটিশ কলোনির মাত্র ১৩টা রাজ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জন্ম হয়। ১৭৮৩ সালের এই মানচিত্রে দেখা যাচ্ছে যে, শুধুমাত্র আটলান্টিকের পাড়ে কিছু অঞ্চল জুড়েই ছিল যুক্তরাষ্ট্র।  


যুক্তরাষ্ট্রের আকারের ইতিহাস –

সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের কথাই বলা যাক। ১৭৮৩ সালে ব্রিটেনের অধীনে থাকা ব্রিটিশ নর্থ আমেরিকার ১৩টা রাজ্য ব্রিটেন থেকে আলাদা হয়ে যুক্তরাষ্ট্র গঠন করে। এই রাজ্যগুলি ছিল –

১। ম্যাসাচুসেটস,

২। নিউ হ্যাম্পশায়ার,

৩। রোড আইল্যান্ড,

৪। কানেকটিকাট,

৫। নিউ ইয়র্ক,

৬। নিউ জার্সি,

৭। পেনসিলভানিয়া,

৮। ডেলাওয়্যার,

৯। ম্যারিল্যান্ড,

১০। ভার্জিনিয়া,

১১। নর্থ ক্যারোলাইনা,

১২। সাউথ ক্যারোলাইনা এবং

১৩। জর্জিয়া।

এর বাইরে দক্ষিণ এবং পশ্চিমের ভূখন্ড ছিল ফ্রান্স ও স্পেনের অধীনে; উত্তর ছিল ব্রিটেনের অধীনে। ২০ বছর পর ১৮০৩ সালে পশ্চিমের লুইসিয়ানা নামের বিশাল এলাকা যুক্তরাষ্ট্র ফ্রান্সের কাছ থেকে কিনে নেয়। এরও ১৮ বছর পর ১৮২১ সালে দক্ষিণের ফ্লোরিডাকে যুক্তরাষ্ট্র কিনে নেয় স্পেনের কাছ থেকে। আরও ২৪ বছর পর ১৮৪৫ সালে টেক্সাসকে যুক্তরাষ্ট্র দখল করে নেয়। পরের বছর ১৮৪৬ সালে উত্তর-পশ্চিমের ওরেগন অঞ্চলকে যুক্তরাষ্ট্র পেয়ে যায় কানাডার সাথে সীমানা নির্ধারণ করার মাধ্যমে। এরও দুই বছর পর ১৮৪৮ সালে মেক্সিকোর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভের পর গুয়াদেলুপ হিদালগো চুক্তির মাধ্যমে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত পশ্চিমের বিরাট এলাকা যুক্তরাষ্ট্র নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এভাবে মাত্র ৭০ বছরের ভেতর যুক্তরাষ্ট্র আটলান্টিক মহাসাগরের তীরবর্তী কিছু এলাকা থেকে দুই মহাসাগরের মধ্যবর্তী বিশাল ভূখন্ডের মালিক হয়ে যায়। তবে এতেও সন্তুষ্ট থাকেনি যুক্তরাষ্ট্র। ১৮৬৭ সালে রাশিয়ার কাছ থেকে আলাস্কা কিনে নেবার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইউরেশিয়ার সীমানায় পৌঁছে যায়। ১৮৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রশান্ত মহাসাগরের হাওয়াই দ্বীপ, ফিলিপাইন এবং ক্যারিবিয়ানস-এ পুয়ের্তো রিকো দখল করে নেয়।

এই সময়ের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকারও পরিবর্তন হতে থাকে। প্রথমে পতাকায় থাকে ১৩টা তারা; অর্থাৎ ১৩টা রাজ্য। ১৮৯৫ সালে তারার সংখ্যা হয় ১৫; ১৮০৩ সালে হয় ১৭; ১৮১৩ সালে ১৮; ১৮১৮ সালে ২০; ১৮২২ সালে ২৪; ১৮৩৭ সালে ২৬; ১৮৬১ সালে ৩৪; ১৮৬৫ সালে ৩৬; ১৮৬৭ সালে ৩৭; ১৮৭৭ সালে ৩৮; ১৯১২ সালে ৪৮; ১৯৫৯ সালে ৪৯; ১৯৬০ সালে ৫০। অর্থাৎ নিয়মিত বিরতিতে ভূখন্ডের পরিধি বাড়ার সাথে সাথে পতাকার ডিজাইনে পরিবর্তন হয়েছে। শেষ পর্যন্ত রাজ্যের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০-এ।
  
মার্কিন জাতীয় পতাকার বিবর্তন। ১৩টা রাজ্যের জন্যে ছিল ১৩টা তারা। সেই তারার সংখ্যা এখন ৫০। কিন্তু কে নিশ্চয়তা দিতে পারে যে এই তারা বা রাজ্যের সংখ্যা বাকি সময়ও একই থাকবে? 


ভৌগোলিক পরিবর্তনের সাথে সাথে যুক্তরাষ্ট্র কতটুকু পরিবর্তিত হয়েছে?

রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভিত গড়ার সময় যা যা বলা হয়েছিল, তার অনেকটাই এখন পর্যন্ত রয়ে গেছে; আবার বেশকিছু ব্যাপার পরিবর্তনও হয়েছে। ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র মূলতঃ নিজেকে আমেরিকার আশেপাশেই সীমাবদ্ধ রেখেছিল। এই ব্যাপারখানা পরিবর্তিত হতে থাকে যখন ১৮৪৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাউন্ডারির মাঝে আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত পুরো এলাকা চলে আসে। উত্তর আমেরিকাতে ভূখন্ড বাড়াবার সুযোগ কমতে থাকলে ঊনিশ শতকের শেষের দিকে কিছু চিন্তাবিদেরা যুক্তরাষ্ট্রকে তার উপকূল থেকে দূরে পাঠাতে থাকে। হাওয়াই, ফিলিপাইন এবং পুয়ের্তো রিকো দখল করা এই চিন্তারই ফসল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একেবারে শেষের দিকে ১৯১৭ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের মাটিতে যুদ্ধে যোগদান করে। দেরিতে হলেও এই যুদ্ধ আমেরিকাকে ইউরোপের মাটিতে রাজনৈতিক ভিত গাড়তে সহায়তা করে। পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের মাটিতে শক্তভাবেই গেড়ে বসে। যেহেতু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত ইউরোপের হাতেই বিশ্বের বেশিভাগ অঞ্চলের ক্ষমতা ছিল, তাই ইউরোপকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনাটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আসলে সেটাই ছিল ইউরোপের হাত থেকে ক্ষমতা আটলান্টিকের ওপাড়ে চলে যাবার মুহুর্ত। ইউরোপীয় সাম্রাজ্য থেকে মার্কিন সাম্রাজ্যের সূচনা তখন থেকেই।

ভূখন্ডগত দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র সর্বদাই পরিবর্তিত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী তার প্রভাবেরও পরিবর্তন হয়েছে। একসময় যেখানে ইউরোপের আশেপাশেও ভিড়তো না যুক্তরাষ্ট্র, এখন সেই যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের ‘রক্ষাকবচ’ ন্যাটোর নেতৃত্বে। জাপান-কোরিয়ার নিরাপত্তায় এখনও রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ফিলিপাইনকে কলোনি হিসেবে না রাখলেও সেদেশের নিরাপত্তা যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই ছিল বহুকাল; এখনও অনেকাংশেই তাই। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ গুয়ামে রয়েছে বিশাল সামরিক ঘাঁটি। মধ্য এবং দক্ষিণ আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকাতেও রয়েছে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি। ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়া এবং পাকিস্তান-আফগানিস্তানে রয়েছে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। এগুলি কোনটাই যুক্তরাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমারেখার মাঝে না থাকলেও সবখানেই মার্কিন সামরিক সদস্যরা মোতায়েন রয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমারেখা দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়। সকলে মার্কিন নাগরিক হতে পারে না; কিন্তু সকলেই মার্কিন নাগরিক হতে চায়। তারা চায় নির্দিষ্টভাবে বলে দেয়া মার্কিন রাজনৈতিক সীমানার মাঝে বসবাস করতে। কোন সীমানা? এখন যেই সীমানা রয়েছে সেই সীমানা; ১৭৮৩ সালের সীমানা নয়। তবে রাষ্ট্র কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রই।

এই আলোচনার শুরু হয়েছিল রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় ভূখন্ডগত নির্দিষ্টতার প্রয়োজনীয়তা থেকে। ঢাকায় জন্মগ্রহণ করা মানুষটার পরিচয় যেহেতে বারংবার পরিবর্তিত হয়েছে, তাই এটা বলা যেতেই পারে যে তার পরিচয় বাকি সময়ের জন্যেও নির্দিষ্ট হয়ে যায়নি। জার্মান নাগরিকের ভৌগোলিক অবস্থানও ইতিহাসের সাথে পরিবর্তিত হয়েছে। রাষ্ট্রের বাউন্ডারি পরিবর্তিত হবার কারণে তার জাতিগত পরিচয় নিয়েও শুরু হয়েছে সংশয়। আর মার্কিন সীমানা কবে যে নির্দিষ্ট ছিল, তা বলা কঠিন। মার্কিন রাষ্ট্র তার নিরাপত্তার বাউন্ডারি আঁকতে গিয়ে তার ভৌগোলিক সীমানার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বাকি বিশ্বের ভূখন্ডকেও এর মাঝে ধরে নিয়েছে। এই উদাহরণগুলি ভৌগোলিক নির্দিষ্টকরণকে রাষ্ট্রের সংজ্ঞার মাঝে ফেলে না। একটা রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের মতো ভৌগোলিক দিক থেকে বড়ও হতে যেতে পারে; আবার জার্মানির মতো ছোটও হয়ে যেতে পারে। আর এই ছোটবড় হবার মাঝ দিয়ে কেউ সেই রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পেতেও পারে; আবার নাগরিকত্ব হারাতেও পারে। 

যুক্তরাষ্ট্র ভৌগোলিকভাবে যত বড় হয়েছে, তার রাজ্যের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। ৫০টা রাজ্যের সংযুক্তিতেই যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু কখনও যদি এতে বিযুক্তি আসে, তাহলে দেশটার নাম কি যুক্তরাষ্ট্রই থাকবে? 


ভবিষ্যতের যুক্তরাষ্ট্র কেমন হবে?

জার্মানির জন্ম ১৮৭১ সালে। ১৯১৪ সালে বড় হবার নিমিত্তে তারা যুদ্ধ শুরু করে। কিন্তু যুদ্ধে হেরে ১৯১৮ সাল নাগাদ বরং আরও ছোট হয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আবারও বড় হবার আশা করলেও ১৯৪৫ সাল নাগাদ আরও ছোট হয়ে যায় জার্মানি। ১৯৮৯ সালে আবার কিছু অংশ পূনএকত্রিকরণ হয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্ম ১৭৭৬ সালে; ব্রিটেনের ১৩টা রাজ্য নিয়ে। এখন সেই রাজ্যের সংখ্যা ৫০; এবং আকারে অনেক বড়। কিন্তু কেউ আসলে এই ছোটবড় থাকার ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিতে পারে না। অন্ততঃ ইতিহাস থেকে সেটাই ধারণা করা যায়। রাষ্ট্রের শক্তি কমতে থাকলে তার ভৌগোলিক আকৃতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। বাইরের শক্তিরা তার ভূখন্ড থেকে অংশবিশেষ কেড়ে নিতে চাইবে। আমেরিকাও সময়ের বিবর্তনে ব্রিটেন, ফ্রান্স, স্পেন, রাশিয়ার কাছ থেকে ভূখন্ড কেড়ে নিয়ে বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের আকৃতি পেয়েছে। বাকি বিশ্বে তার প্রভাবও বাড়িয়েছে অন্যদের প্রভাবকে খর্ব করে। বর্তমান বিশ্বে মার্কিন প্রভাব কমার সাথেসাথে একসময় যুক্তরাষ্ট্রের ভৌগোলিক আকার-আকৃতি নিয়েও প্রশ্ন আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সংজ্ঞার মাঝে তো ৫০টা রাজ্য নেই; দেশটার জন্ম যেহেতু মাত্র ১৩টা রাজ্য নিয়ে। তাই কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারে না যে ভবিষ্যতে কখনোই বিযুক্তির মাধ্যমে দেশটার রাজ্যের সংখ্যা কমে যাবে না। বরং যে প্রশ্নটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে তা হলো – তখনও কি যুক্তরাষ্ট্রকে যুক্তরাষ্ট্রই ডাকা হবে?

Wednesday, 4 July 2018

ভেনিজুয়েলা-কলম্বিয়া-ইকুয়েডরের পতাকা একইরকম কেন?

ঊনিশ শতকে গ্র্যান কলম্বিয়া তৈরি হয় স্পেন থেকে আলাদা হয়ে। এরপরে গ্র্যান কলম্বিয়া ভেঙ্গে তৈরি হয় ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া এবং ইকুয়েডর। দেশগুলির পতাকায় মিল এতটাই যে, এদের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন আসাটা স্বাভাবিক। 


 ০৫ জুলাই ২০১৮
 
দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলি একসময় ছিল স্প্যানিস এবং পর্তুগীজ উপনিবেশ। পঞ্চদশ শতকের শেষে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের অভিযানের পর থেকে ঐ এলাকার মানুষগুলিকে প্রায় নির্মূল করে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকেরা সেখানে বসতি গড়ে। জনসংখ্যার পুরোটাই প্রকৃতপক্ষে ইউরোপিয়ান বংশোদ্ভূত। এদের ভাষা এবং সংস্কৃতি একই। তবুও অনেকগুলি দেশে বিভক্ত এই মহাদেশ। অনেকগুলি পতাকা; জাতীয় সঙ্গীত; জাতীয় প্রতীক। এই বিভক্তির কারণ খুঁজতে যেতে হবে অষ্টম শতাব্দীতে, যখন ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলি আলাদা হবার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
  
স্প্যানিস সামরিক অফিসার ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা ব্রিটিশদের সহায়তায় স্পেনের কাছ থেকে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলিকে আলাদা করার ব্যবস্থা করেন। তার কর্মকান্ডের মাধ্যমে সবচাইতে বেশি লাভবান হয়েছে তৎকালীন সুপারপাওয়ার ব্রিটেন। স্প্যানিসরা ফ্রাঞ্চিসকোকে ব্রিটিশ গুপ্তচর সন্দেহ করতো।


ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা – যিনি দক্ষিণ আমেরিকাকে স্পেন থেকে আলাদা করেন

১৭৫০ সালে ভেনিজুয়েলাতে জন্ম নেয়া স্প্যানিস সামরিক অফিসার ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা বহু দেশের বহু যুদ্ধে অংশ নেন। মার্কিন স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় স্প্যানিসরা সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্রিটিশদের কিছু উপনিবেশ বাগিয়ে নিতে চায়। ১৭৮১ থেকে ১৭৮৪ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এবং ক্যারিবিয় দ্বীপপুঞ্জে স্প্যানিস বাহিনীর অধীনে যুদ্ধে করেন ফ্রাঞ্চিসকো। ১৭৮১ সালে ফ্রাঞ্চিসকোকে ব্রিটিশ উপনিবেশ জামাইকাতে গোয়েন্দাগিরি করতে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি তার কর্মসম্পাদনের মাঝে ব্রিটিশ ব্যবসায়ী ফিলিপ অলউডের সাথে এক চুক্তিও করে ফেলেন। চুক্তি মোতাবেক ব্রিটিশদেরকে তিনি স্পেনের সাথে বাণিজ্যের আড়ালে স্পেনে যাবার একটা চ্যানেল খুলে দেন। স্প্যানিসরা পরবর্তীতে ফ্রাঞ্চিসকোকে গুপ্তচর আখ্যা দেয় এবং অবিশ্বাস করতে থাকে। ফ্রাঞ্চিসকো স্পেন এবং ফ্রান্সের এক যৌথ অপারেশনে অংশ নেন, যার উদ্দেশ্য ছিল ক্যারিবিয়ানে ব্রিটিশদের সবচাইতে শক্ত ঘাঁটি জামাইকাকে দখল করা। পুরো দলের মাঝে ফ্রাঞ্চিসকোরই ব্রিটিশদের সম্পর্কে সবচাইতে ভালো ধারণা ছিল, কারণ তাকে ব্রিটিশদের উপরে গোয়ান্দাগিরিতে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু এই অভিযান চলার মাঝেই কিভাবে যেন ব্রিটশরা আগেভাগে পরিকল্পনা জেনে ফেলে এবং আগেই আক্রমণ করে বসে; ভেস্তে যায় অভিযান। জামাইকা ব্রিটিশদের হাতেই থাকে। আভিযান ব্যর্থ হবার পর ফ্রাঞ্চিসকোর বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ আবারও গভীর হয়। ফ্রাঞ্চিসকো ১৭৮৩ সালের জুলাই মাসে স্প্যানিস কিউবা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান, এবং পরের বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করেন। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে তিনি জর্জ ওয়াশিংটন, হেনরি নক্স, থমাস পেইন, আলেক্সান্ডার হ্যামিল্টন, স্যামুয়েল এডামস এবং থমাস জেফারসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন।

ফ্রাঞ্চিসকো কি ব্রিটিশ গুপ্তচর ছিলেন?

১৭৮৫ সালে ফ্রাঞ্চিসকো লন্ডনে আসেন। সেখান থেকে মার্কিন দূতাবাসের এক সামরিক কূটনীতিবিদ কর্নেল উইলিয়াম স্টিফেন স্মিথের সাথে তিনি প্রুশিয়া যান সামরিক মহড়া দেখতে। পুরো ইউরোপ ঘুরে তিনি অনেকের সাথে বন্ধুত্ব করেন।স্প্যানিয়ার্ডরা সবসময়েই তার উপরে নজর রাখছিল। তারা ফ্রাঞ্চিসকোকে গ্রপ্তার করার চেষ্টাও করেছিল, কিন্তু শক্তিশালী বন্ধুরা ফ্রাঞ্চিসকোকে রক্ষা করে। ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা অনেকদিন থেকেই দক্ষিণ আমেরিকায় স্পেনের উপনিবেশের একটা বড় অংশের দায়িত্বে থাকা ‘ক্যাপ্টেন্সি জেনারেল অব ভেনেজুয়েলা’র কর্তৃত্ব নিতে এক পরিকল্পনা করেন। এই ক্যাপ্টেন্সির অধীনে বর্তমান ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া, পানামা, ইকুয়েডর এবং পেরুর বিরাট অঞ্চল ছিল। তিনি ১৭৯০ সালে প্রথম ব্রিটিশ রাজনীতিবিদের সাথে দক্ষিণ আমেরিকায় আলাদা রাষ্ট্র গঠনের চিন্তাটা আলোচনা করেন। তখন ব্রিটিশদের সাথে স্প্যানিয়ার্ডদের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিলো না। তবে দু’দেশের সম্পর্কে বসন্ত এসে গেলে এই প্রকল্পে ব্রিটিশরা আগ্রহ হারায়।

১৭৯১ থেকে ১৭৯৭ পর্যন্ত সময় ফ্রাঞ্চিসকো ফ্রান্সে কাটান এবং সেখানকার ফরাসী বিপ্লবে সরাসরি অংশ নেন। তিনি ফরাসি বিপ্লবের বিপক্ষে রাজতন্ত্রকামীদের সাথে থাকেন। একাধিকবার বিপ্লবীদের হাতে গ্রেপ্তার হবার পরেও তাকে নিয়ে কি করা হবে, সেটা ঠিক করতে না পেরে তাকে বারংবার ছেড়ে দেয়া হয়। ছাড়া পাবার পরেও তিনি তার কর্মকান্ড অব্যহত রাখেন এবং ১৭৯৬-৯৭ সালের মাঝে দু’দু’বার রাজতন্ত্রপন্থীদের পক্ষে অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেন। অবশেষে সকল চেষ্টা ভেস্তে গেলে ১৭৯৮ সালে গোপনে ব্রিটেনে পালিয়ে যান, যেখানে সবসময়ই তার নিরাপদ আশ্রয় আপেক্ষা করছিল। ব্রিটেন সবসময়েই ফরাসী বিপ্লবের বিরুদ্ধে রাজতন্ত্রীদের সহায়তা দিয়েছিল। আর ১৭৯৯ সাল থেকে ফরাসী বিপ্লব থেকে উত্থিত ন্যাপোলিয়ন আবির্ভূত হন ব্রিটেনের বিশাল শত্রু হিসেবে।

ল্যাটিন আমেরিকায় ফ্রাঞ্চিসকোর প্রথম অভিযান - যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা


তার দক্ষিণ আমেরিকার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ১৮০১ সালে ব্রিটিশদের সহায়তা চান ফ্রাঞ্চিসকো। স্পেন তখন ব্রিটেনের শত্রু দেশ, কেননা ১৭৯৬ থেকে ফ্রান্সের সাথে স্পেন হাত মিলিয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম পিট দ্যা ইয়াংগার ১৮০৫ সালে রিয়ার এডমিরাল হোম রিগস পপহ্যামকে দায়িত্ব দেন ফ্রাঞ্চিসকোর পরিকল্পনাটি খতিয়ে দেখার জন্যে। পপহ্যাম ব্রিটিশ নেতৃত্বকে বোঝান যে, দক্ষিণ আমেরিকায় স্প্যানিস উপনিবেশকে স্পেন থেকে আলাদা করতে গেলে ভেনিজুয়েলা নয়, বরং বর্তমান আর্জেন্টিনার বুয়েনস আয়ার্সের ফলাফল বয়ে আনার সম্ভাবনা বেশি। সেখানে ব্রিটিশ হামলা হলে স্প্যানিস নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ উস্কে দেয়া যাবে অপেক্ষাকৃত সহজে।

ফ্রাঞ্চিসকো এতে মনোক্ষুন্ন হলেন। তিনি তার পরিকল্পনা পাল্টে ১৮০৫-এর নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সরণাপন্ন হলেন। ফ্রাঞ্চিসকো মার্কিন প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন এবং পররাষ্ট্র সচিব জেমস ম্যাডিসনের সাথেও একান্ত বৈঠক করেন। যুক্তরাষ্ট্র ফ্রাঞ্চিসকোকে সরাসরি সহায়তা করতে অস্বীকৃতি জানান, কারণ ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তখনও পক্ষ নেয়নি। ফ্রাঞ্চিসকো থেমে যাননি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অর্থ এবং জনবল যোগাড় করায় মনোনিবেশ করেন, যা ব্যবহার করে তিনি ভেনিজুয়েলাতে সামরিক অপারেশনে যাবেন। দু’শ-এর মতো ভাড়াটে সৈন্য এ অভিযানে যেতে রাজি হয়। তার সাথে থাকে ফ্রাঞ্চিসকোর পুরোনো বন্ধু মার্কিন কর্নেল উইলিয়াম স্টিফেন স্মিথ। মার্কিন ব্যবসায়ী স্যামুয়েল ওগডেনের কাছ থেকে তিনি ২০টি কামানের একটা জাহাজ ভাড়া নেন; নাম দেন ‘লিয়্যান্ডার’। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ থেকে ফ্রাঞ্চিসকো আরও দু’টা জাহাজ সাথে নেন। এই সময়েই তিনি ভেনিজুয়েলার পতাকার ডিজাইন করে ১২ই মার্চ উত্তোলন করেন। পতাকাটা ছিল তিনটি রঙের সমান্তরাল দাগ – হলুদ, নীল এবং লাল। তবে ফ্রাঞ্চিসকোর মিশন সফল হলো না। ১৮০৬ সালের ২৮শে এপ্রিল ভেনিজুয়েলার উপকূলে অবতরণ করতে গিয়ে ফ্রাঞ্চিসকো স্প্যানিশ নৌবাহিনীর কাছে তার ক্যারিবিয়ান থেকে সংগৃহীত দু’টি জাহাজই হারান। ৬০ জন নাবিক বন্দী হয়, যাদের বিচারের পরে ১০ জনের মৃত্যুদন্ড দিয়ে মরদেহ কয়েক খন্ড করে ঝুলিয়ে রাখা হয়। ফ্রাঞ্চিসকো অবশ্য লিয়্যান্ডার-এ চড়ে প্রাণ নিয়ে পালান। তাকে পলায়নে সহায়তা দেয় ব্রিটিশ রয়াল নেভির যুদ্ধজাহাজ ‘লিলি’। ব্রিটিশরা ফ্রাঞ্চিসকোকে ব্রিটিশ উপনিবেশ বার্বাডোসে নিয়ে যায়, এবং ফাঞ্চিসকোকে আরেকবার সামরিক অভিযানে সহায়তা দিতে আগ্রহী হয়।

ফ্রাঞ্চিসকোর দ্বিতীয় অভিযান - যুক্তরাষ্ট্রের স্থানে ব্রিটেন

১৮০৬ সালের ২৪শে জুলাই ত্রিনিদাদের পোর্ট অব স্পেন থেকে ফ্রাঞ্চিসকোর নতুন অভিযানের শুরু হয়। তার যুদ্ধজাহাজ লিয়্যান্ডার-এর সাথে রয়েছে রয়াল নেভির ৪টা যুদ্ধজাহাজ। ফ্রাঞ্চিসকোর ভাড়াটে সেনারা এবং ব্রিটিশ নৌবাহিনীর নাবিকেরা উপকূলে নেমে কিছুদিন তাদের দখলের চেষ্টা চালিয়ে যান। কিন্তু স্প্যানিশ সৈন্যদের সংখ্যাধিক্যের কারণে অগাস্টের মাঝেই তিনি তার অভিযান গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন। এই ব্যর্থ অভিযানের পর যুক্তরাষ্ট্র সরকার ফ্রাঞ্চিসকোকে সহায়তা করার জন্যে কর্নেল উইলিয়াম স্মিথ এবং ব্যবসায়ী স্যামুয়েল ওগডেনের বিরুদ্ধে মামলা করে। অভিযোগ ছিল যে, তারা দস্যুতা করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরপেক্ষতাকে নষ্ট করেছেন। আদালতে হাজির হয়ে কর্নেল স্মিথ বীরদর্পে বলেন যে, তিনি এই অপারেশনে গিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন এবং পররাষ্ট্র সচিব জেমস ম্যাডিসনের নির্দেশে। এই রাজনীতিবিদেরা উভয়েই আদালতে যেতে অস্বীকৃতি জানান এবং ফলশ্রুতিতে স্মিথ এবং ওগডেন উভয়কেই নির্দোষ ঘোষণা করা হয়। আসলে এই অপারেশনটা প্রথমে ছিল মার্কিন। এরপর প্রথম ব্যর্থতার পর ব্রিটিশরা সেটার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলাতেই যতো বিপত্তির সৃষ্টি হয়। ভেনিজুয়েলাকে স্পেন থেকে আলাদা করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন উভয়েই সেটার নিয়ন্ত্রণ চাইছিল।


  
আর্জেন্টিনার প্রতিষ্ঠাতা হোজে ডে স্যান মার্টিন এবং চিলির প্রতিষ্ঠাতা বার্নার্ডো ও'হিগিন্স আন্দিজ পর্বত পাড়ি দিচ্ছেন চিলির উদ্দেশ্যে। ব্রিটিশরা আর্জেন্টিনায় অভিযান চালানোর পর পুরো ল্যাটিন আমেরিকা স্প্যানিস শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে। আপাতদৃষ্টিতে ব্রিটিশ অপারেশনকে ব্যর্থ মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে ল্যাটিন আমেরিকাকে স্পেন থেকে আলাদা করাই ছিল ব্রিটিশ পরিকল্পনা। আর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্বাধীনতাকামী নেতারা বিরাট ভূমিকা পালন করে। 


ব্রিটিশরা কি দক্ষিণ আমেরিকায় ব্যার্থ হয়েছিল?

এর মাঝেই ১৮০৬-০৭ সালের মাঝে ব্রিটিশ সরকার বর্তমান আর্জেন্টিনার বুয়েনস আয়ার্সে একটা সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। স্প্যানিসদের বেশিরভাগ সামরিক শক্তি কেন্দ্রীভূত ছিল ভেনিজুয়েলাতে; আর্জেন্টিনার আশেপাশে শক্তি ছিল খুবই কম; যেকারণেই ব্রিটিশরা সেখানে অপারেশনে যায়। এরপরেও সরাসরি সাফল্য না পেয়ে ব্রিটিশরা সেখান থেকে চলে আসে। ফ্রাঞ্চিসকো এবার লন্ডন যান এবং নতুন করে ভেনিজুয়েলা আভিযানের জন্যে ব্রিটিশ সহায়তা চাইতে থাকেন। কিন্তু ঠিক সেসময় বিরাট এক রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়ে যায়। ১৮০৫ সালে ফরাসী-স্প্যানিস নৌবহর ব্রিটিশদের হাতে ত্রাফালগার-এর যুদ্ধে পরাজিত হলে পর্তুগীজরা আত্মায় শক্তি পায় এবং ব্রিটিশদের পক্ষে চলে যায়। এতে ন্যাপোলিয়ন ক্ষেপে গিয়ে স্পেন এবং পর্তুগালে সৈন্য পাঠান। এভাবে স্পেন হয়ে যায় ব্রিটিশ বন্ধু; এবং দক্ষিণ আমেরিকায় স্প্যানিস উপনিবেশকে স্পেন থেকে আলাদা করার পরিকল্পনা মুলতুবি করা হয়। কিন্তু ততদিনে যা হবার, তা হয়ে গেছে। ব্রিটিশ আক্রমণের ফলশ্রুতিতে ভেনিজুয়েলা এবং আর্জেন্টিনায় বিদ্রোহ শুরু হয়ে গেছে। ১৮১০ সালের মে মাসে আর্জেন্টিনায় বিদ্রোহীরা স্প্যানিস নেতৃত্বের কাছ থেকে ক্ষমতা দখল করে নেয়। আর্জেন্টিনার বিদ্রোহীরা হোজে ডে স্যান মার্টিনের নেতৃত্বে এরপর চিলি এবং পেরুকে স্পেন থেকে আলাদা করে ফেলে।

প্রায় তিন’শ বছর ধরে ব্রিটিশরা দক্ষিণ আমেরিকায় বড় কোন অপারেশনে যায়নি। ন্যাপোলিয়নের অভিযানকে উপজীব্য করে ব্রিটিশরা স্পেনের উপনিবেশগুলিকে স্পেন থেকে আলাদা করার প্রক্রিয়া শুরু করে। সেই প্রক্রিয়াতে ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা সহায়তা করেছিলেন শুধু। মিরান্ডার আঁকা পতাকাকেই পরবর্তীতে ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া এবং ইকুয়েডর নিজেদের জাতীয়তার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দেয়। ১৮১০ সালের ১৯শে এপ্রিল ভেনিজুয়েলার কারাকাসে বিদ্রোহীরা স্প্যানিস নেতৃত্বকে বন্দী করে ফেলে। সিমন বলিভার এবং আন্দ্রেস বেলোর নেতৃত্বে তারা লন্ডনে প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে ব্রিটিশদের কাছ থেকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি চায় এবং সরাসরি ব্রিটিশদের হস্তক্ষেপ কামনা করে। তারা ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডাকেও তাদের সাথে ভেনিজুয়েলাতে নিয়ে আসে। ১৮১১ সালের জুলাই মাসে স্বাধীন ভেনিজুয়েলার ঘোষণা দেয়া এবং ফ্রাঞ্চিসকোর ব্যবহার করা তিন রঙের ভেনিজুয়েলার পতাকাকে অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু ১৮১২ সালে এক প্রতিবিপ্লবের মাঝ দিয়ে স্পেনপন্থীরা আবারও ক্ষমতা দখল করে নেয়। ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা স্প্যানিসদের সাথে চুক্তি করতে গেলে সিমন বলিভার এতে নাখোশ হন। বলিভারের হিসবে সেটা ছিল রাষ্ট্রদ্রোহিতার সামিল। ফ্রাঞ্চিসকোকে তারা স্প্যানিস নেতৃত্বের হাতে তুলে দেয়, আর এর বিনিয়মে চুক্তি মোতাবেক সিমন বলিভারকে নিরাপদে স্পেনে ভ্রমণ করার অনুমতি দেয় স্প্যানিয়ার্ডরা। ১৮১৬ সালের ১৪ই জুলাই ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা বিচারাধীন অবস্থায়ই স্পেনে মৃত্যুবরণ করেন এবং তার লাশ গণকবরে দাফন করা হয়, যাতে কোনটা তার কবর, সেটা যেন খুঁজে পাওয়া না যায়।
  

জার্মান দার্শনিক উলফগ্যাং ফন গোথে ভেনিজুয়েলার পতাকার রংগুলি বেছে নিতে সহায়তা করেছিলেন। পতাকার ডিজাইন করেছিলেন ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা। পরবর্তীতে এই তিন রঙের পতাকাই ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া এবং ইকুয়েডরের পতাকায় স্থান পায়। উৎস একই বলে ল্যাটিন আমেরিকার এই দেশগুলির মাঝে পার্থক্য করা কঠিন।

যেভাবে তিন দেশের পতাকা আঁকা হলো

ফ্রাঞ্চিসকো ভেনিজুয়েলার পতাকার ধারণাকে আকারে রূপ দিতে কথা বলেছিলেন জার্মান দার্শনিক জোহান উলফগ্যাং ফন গোথে এবং রুশ কূটনীতিবিদ সাইমন রোমানোভিচ ভরনজফের সাথে। গোথের সাথে ফ্রাঞ্চিসকোর পতাকা নিয়ে কথা হয় ১৭৮৫ সালে। গোথে তাকে বলেন যে, তিনটা মূল রঙ থেকেই আলোর সৃষ্টি হয় – হলুদ, নীল এবং লাল। এই তিনটা রঙ আলাদাভাবে শুরু হলেও শেষ হয় এক লক্ষ্যে। ফ্রাঞ্চিসকোরও তাই এরকমই এক লক্ষ্যে এক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা উচিৎ। ফ্রাঞ্চিসকো চাইছিলেন আমেরিকাতে পুরো স্প্যানিস উপনিবেশ মিলিয়ে বিশাল এক রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা। একেবারে বর্তমানের যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম এবং মধ্যাংশ থেকে শুরু করে মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা, কিউবা সহ, দক্ষিণ আমেরিকার বর্তমান ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর মিলে সেই রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন ফ্রাঞ্চিসকো। ব্রিটিশদের কাছে উপস্থাপিত তার পরিকল্পনা তেমনই ছিল। মূলতঃ স্পেন থেকে আলাদা হবার কাজটাই তিনি করেছিলেন। বিশেষ বিশেষ সময়ে বিশেষ বিশেষ স্থানে উপস্থিত থাকায় স্পেন তাকে ব্রিটিশ গুপ্তচর হিসেবে মনে করতো। ফরাসী বিপ্লবের সময়ে বিপ্লবের বিপক্ষের রাজতন্ত্রকামীদের (যাদেরকে ব্রিটিশরা সহায়তা করতো) পক্ষে একাধিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা তার স্প্যানিস দোষারোপকে মুছে ফেলতে সহায়তা করে না। স্পেন ন্যাপোলিয়নের পক্ষে থাকার সময় তিনি ব্রিটিশদের সহায়তায় ল্যাটিন আমেরিকার বিদ্রোহ উস্কে দেন। এরপর স্পেন ব্রিটিশদের পক্ষে গেলেও তার কর্মকান্ড চালিয়ে যান, এবং স্পেন থেকে তার সকল ল্যাটিন আমেরিকার উপনিবেশ আলাদা করে ফেলেন। তিনি স্থিতিশীল কোন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে যেতে পারেননি; যে কাজটা পরে সিমন বলিভার করেছিলেন।
 

ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো সিমন বলিভারের ছবির সামনে কথা বলছেন। সিমন বলিভার ল্যাটিন আমেরিকার জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে স্বীকৃত হলেও তিনি আসলে কয়েকটা দেশের জন্মদাতা। ফ্রাঞ্চিসকো ডে মিরান্ডা যেখানে ল্যাটিন আমেরিকাকে স্পেন থেকে আলাদা করেছিলেন, বলিভার সেই আলাদা হওয়া ল্যাটিন আমেরিকাকে টুকরো টুকরো করায় অংশ নিয়েছেন।

 
সিমন বলিভার এবং ল্যাটিন আমেরিকার বিভক্তি

সিমন বলিভার ল্যাটিন আমেরিকার স্প্যানিস অঞ্চলগুলিকে টুকরো টুকরো করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৮১৯ সালে রিপাবলিক অব কলম্বিয়া তৈরি করে নিজে প্রেসিডেন্ট হন, এবং দুই জন ভাইস প্রেসিডেন্টের অধীনে দেশটাকে দুই ভাগ করেন। একটার নাম দেয়া হয় ভেনিজুয়েলা, আর আরেকটা নিউ গ্রানাডা (পরবর্তীতে কলম্বিয়া)। তবে দেশগুলি যে একই উৎস থেকে এসেছিল, তা ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া এবং ইকুয়েডরের পতাকা দেখলেই বোঝা যায়। তিন দেশের পতাকাতেই একই রঙ ব্যবহার করা হয়েছে, যা কিনা ফ্রাঞ্চিসকোর আঁকা। বলিভার এবং ফ্রাঞ্চিসকোর চিন্তাধারায় কিছুটা দ্বিমত ছিল। যেখানে ফ্রাঞ্চিসকো ছিলেন ব্রিটিশপন্থী, বলিভার ছিলেন সমাজতন্ত্রী। বলিভারের সমাজন্তন্ত্রী চিন্তাধারা তার শিক্ষক ডন সিমন রদ্রিগেজ দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিল। তারা দু’জনে মিলে ইউরোপ ভ্রমণে বের হয়েছিলেন এবং ১৮০৫ সালে মিলানে ইতালির রাজা হিসেবে ন্যাপোলিয়নের রাজকীয় অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। রদ্রিগেজ ১৭৯৭ সালেই স্প্যানিস শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে জড়িত থাকার অপরাধে ভেনিজুয়েলা ছেড়েছিলেন। বলিভার ১৮২১ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের নামানুসারে ‘গ্র্যান কলম্বিয়া’ নামে আরেকটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন, যার মাঝে ছিল বর্তমানের ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া, পানামা, ইকুয়েডর। আর্জেন্টিনার জেনারেল হোজে ডে স্যান মার্টিন-এর সাথে একত্রিত হয়ে বলিভার পেরু এবং ইকুয়েডরকে আলাদা করেন। সকলের কাছে এই কাজটি ছিল স্পেন থেকে মুক্ত করার কাজ। প্রকৃতপক্ষে তারা আলাদা কয়েকটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন, যাদের মাঝে আলাদা হবার কোন কারণই ছিল না। আলাদা আলাদা নেতৃত্ব দেয়া হয় এসব স্থানে, যারা খুব শিগগিরই নিজেদের আখের গোছাতে আলাদা রাষ্ট্র চাইতে থাকেন। ১৮২৫ সালের ৬ই অগাস্ট নতুন আরেকটি দেশের জন্ম দেয়া হয়; যার নামকরণ করা হয় সিমন বলিভারের নামে – বলিভিয়া। এই সবগুলিই তখন ছিল গ্র্যান কলম্বিয়ার অধীনে, যার একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন বলিভার। কিন্তু ১৮৩০ সালের মাঝেই গ্র্যান কলম্বিয়া ভেঙ্গে ভেনিজুয়েলা, নিউ গ্রানাডা (কলম্বিয়া) এবং ইকুয়েডর তৈরি হয়; প্রত্যেকটির একচ্ছত্র অধিপতি হন বলিভারেরই সমালোচকেরা, যারা একসময় বলিভারের একনায়কোচিত কার্যকলাপের বিরোধী ছিলেন।
  
খুব অল্প সময়ের মাঝেই ল্যাটিন আমেরিকার পুরো এলাকা স্প্যানিসদের হাতছাড়া তো হয়ই, তদুপরি অনেকগুলি দেশে বিভক্ত হয়ে যায়। সুপারপাওয়ার ব্রিটেন ল্যাটিন আমেরিকাকে একত্রিত দেখতে চায়নি।


ব্রিটেন – সুপারপাওয়ারের রাজনীতিই সবকিছু

ন্যাপোলিয়নের আবির্ভাবের আগ পর্যন্ত ব্রিটিশরা দক্ষিণ আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপন করেনি। গায়ানা উপকূলের অল্প কিছু অঞ্চল ডাচ এবং ফ্রেঞ্চদের অধীনে ছাড়া এর প্রায় পুরোটাই ছিল পর্তুগাল এবং স্পেনের অধীনে। ১৮৩০ সাল নাগাদ পর্তুগীজদের অধীনে ব্রাজিল ছাড়াও সৃষ্টি হয় রিও ডে লা প্লাটা (আর্জেন্টিনা), উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে, চিলি, বলিভিয়া, পেরু, ইকুয়েডর, কলম্বিয়া এবং ভেনিজুয়েলা। ব্রিটিশরাও গায়ানা উপকূলে একটা উপনিবেশ করে ফেলে। স্প্যানিস উপনিবেশিক এলাকাটা কেটে টুকরা টুকরা করে ৯টা দেশ তৈরি হলেও ব্রাজিল একত্রেই থাকে; কেউ একে ভাঙ্গেনি। কারণ ব্রাজিল ছিল ব্রিটিশদের বন্ধু পর্তুগালের উপনিবেশ। ব্রিটিশরা চায়নি ব্রাজিল ভেঙ্গে যাক।

ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলি স্বপ্নে পাওয়া জাতীয়তার উপরে প্রতিষ্ঠিত। নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা নিজেদের মাঝে ক্ষমতার ভাগাভাগি করতে গিয়ে দেশগুলিকে টুকরো টুকরো করেছে। আলাদা করে জাতীয় পতাকা ডিজাইন করার সময় রয়েছে কার? ফ্রাঞ্চিসকো তো কষ্ট করে ডিজাইন করেই দিয়ে গেছেন; তাই ওটার উপরেই কেটে-চিরে দাঁড়িয়ে আছে আজকের পতাকাগুলি। এই পতাকাকে ঘিরেই কতনা আবেগ; উচ্ছ্বাস! কেউ চিন্তাও করেনি যে ৯টা পতাকা মানে ৯টা আলাদা জাতিরাষ্ট্রে বিভক্ত তারা; যদিও তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, আকৃতি, সকলকিছুই এক! এদের সকলেই একবাক্যে ফ্রাঞ্চিসকো, বলিভার, স্যান মার্টিন-এর মতো কয়েক ব্যক্তিকেই স্মরণ করে; কারণ তাদের সকলেরই জন্ম এদের হাতে। আর এরা আবার কাজটা সম্পাদন করেছে তৎকালীন সুপারপাওয়ার ব্রিটিশদের হাত ধরে। ব্রিটিশরা স্পেন থেকে ল্যাটিন আমেরিকার অঞ্চলকে আলাদা করলেও এদেরকে একত্রে বিরাট এক দেশ হিসেবে দেখতে চায়নি। ছোট ছোট দেশে বিভক্ত হয়ে তারা একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করে নিজেদের মাঝে ব্যাস্ত থেকেছে। জাতীয় পতাকা, সঙ্গীত এবং প্রতীকগুলি তাদের সেই ইন্ধন যুগিয়েছে। হাল্কা বিষয়গুলি তাদের আবেগকে নাড়া দিয়েছে এবং আবেগ হয়েছে তাদের চালিকাশক্তি। ফ্রাঞ্চিসকো, বলিভার, স্যান মার্টিন-এর সৃষ্ট দেশগুলি ভূরাজনীতিতে তাই শিশুই রয়ে গিয়েছে।

আরও পড়ুনঃ
আর্জেন্টিনা কি পারবে?