Showing posts with label COVID-19. Show all posts
Showing posts with label COVID-19. Show all posts

Monday, 18 April 2022

‘জিরো কোভিড’ নীতি নিয়ে চীন কোনদিকে এগুচ্ছে?

১৮ই এপ্রিল ২০২২

‘জিরো কোভিড’ নীতি থেকে সড়ে আসলে শি জিনপিংএর সরকারকে ভুল স্বীকার করতে হবে; যা হবে রাজনৈতিক আত্মহত্যার শামিল। তাই তারা এখন পর্যন্ত তাদের সাফল্যগুলিকেই হাইলাইট করে যাচ্ছে। ফলাফলস্বরূপ, সারা দুনিয়ার ‘ম্যানুফ্যাকচারিং ক্যাপিটাল’ চীনের ‘জিরো কোভিড’ নীতির দিকেই সকলে চেয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছে।


চীনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ শহর সাংহাই এবং এর আশেপাশের এলাকায় করোনাভাইরাসের ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্টের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় লকডাউন চলছে। এপ্রিলের শুরুতে দৈনিক সংক্রমণ ২০ হাজারে পৌঁছে গেলে ৪ঠা এপ্রিল থেকে পুরো সাংহাই শহরের আড়াই কোটি মানুষকেই অনির্দিষ্ট কালের জন্যে লকডাউনের মাঝে ফেলে দেয়া হয়। ‘বিবিসি’ বলছে যে, সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে যে, জনগণ বাসা থেকে অনলাইনে দরকারি জিনিসপত্র অর্ডার করতে পারবে; আর সরকারি স্বেচ্ছাসেবকরা সেগুলি মানুষের বাড়িতে পৌঁছে দেবে। কিন্তু সমস্যা হলো প্রথম সপ্তাহ থেকেই ডেলিভারি সার্ভিসগুলি চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে পারছে না। ডেলিভারির লোকদের মাঝেই অনেকে লকডাউনের বিধিনিষেধে আটকা পড়ে গেছে। ‘উইবো’ সোশাল মিডিয়াতে সরকারি ভিডিও মেসেজের নিচেই অনেকে মন্তব্য করছেন যে, দ্রুত ডেলিভারি সমস্যার সমাধান করা উচিৎ। কেউবা সেখানে লিখেছেন যে, প্রথমবারের মতো তিনি অনাহারে থাকছেন। সাংহাই মিউনিসিপ্যাল কমিশনের ডিরেক্টর লিউ মিন স্বীকার করেছেন যে, খাদ্যের যথেষ্ট মজুত থাকা সত্ত্বেও তারা ডেলিভারি দিতে সক্ষম হচ্ছেন না। সাংহাইএর ভাইস মেয়র চেন টং ৭ই এপ্রিল বলেন যে, তারা জনগণের সমস্যাগুলি সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সাংহাই এবং অন্যান্য শহরে ‘জিরো কোভিড’ নীতির প্রয়োগ

পশ্চিমাদের ভুল নীতি স্বীকার না করেই ‘বিবিসি’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, বাকি বিশ্বের দেশগুলি ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্টের সাথে জীবনযাপন করার নীতিতে এগুলেও চীনারা এখনও ভাইরাসকে সমূলে উৎপাটন করার নীতিতে এগুচ্ছে। এর আগে উহান এবং শিয়ান শহরে তারা বেশ সফলতার সাথে কোভিড নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও সাংহাইতে তারা হিমসিম খাচ্ছে। প্রথমতঃ সাংহাই তাদের সবচাইতে বড় শহর। আর দ্বিতীয়তঃ এবারের সংক্রমণের ব্যাপ্তি আগের চাইতে অনেক বেশি। সাংহাই হলো চীনের অর্থনৈতিক ইঞ্জিন। কাজেই সাংহাইএর লকডাউনের প্রভাব নিয়ে বিশ্বব্যাপী সকলেই চিন্তিত। বিশ্বের ‘ম্যানুফ্যাকচারিং ক্যাপিটাল’ বলে খ্যাত চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠছে, তেমনি চীনা সরকারের ‘জিরো কোভিড’ নীতিও ব্যাপক সমালোচনার মাঝে পড়ছে। ইতোমধ্যেই সাংহাইয়ে জনগণের মাঝে অসন্তোষের বিভিন্ন রিপোর্ট চীনের নিয়ন্ত্রিত সোশাল মিডিয়াকে ছাপিয়ে বাইরে চলে আসছে।

‘সিএনএন’ বলছে যে, এর আগে মার্চ মাসে শেনজেন শহরে এক সপ্তাহের লকডাউন প্রয়োগের মাধ্যমে করোনা সংক্রমণ রোধ করেছিল চীনা সরকার। এরপর ১০ই এপ্রিল ১ কোটি ৮০ লক্ষ জনসংখ্যার গুয়াংঝু শহরে ৩৭ জনের মাঝে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ার পর পুরো শহরের সকলকে বাধ্যতামূলক কোভিড পরীক্ষার মাঝে নিয়ে আসা হয়। উত্তর পূর্বাঞ্চলের জিলিন প্রদেশেও ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্টের সংক্রমণ বেড়েছে। প্রথম সংক্রমিত হওয়া উহান শহরে ট্রেনে চড়তে গেলে কোভিড নেগেটিভ সার্টিফিকেট দেখাতে হয়। বেইজিংএর কিছু ‘হাই রিস্ক’ অঞ্চলেও মানুষের চলাচল বেশ নিয়ন্ত্রিত করে ফেলা হয়েছে। হংকংএর ‘সিটি ইউনিভার্সিটি’র এসোসিয়েট প্রফেসর নিকোলাস থমাস বলছেন যে, এটা নিশ্চিত যে, সাংহাইতে লকডাউন প্রয়োগের আগেই সেখান থেকে করোনাভাইরাস অন্য স্থানে সংক্রমিত হয়েছে। ছোট এলাকাগুলি লকডাউনের মাঝে আনা সহজ হলেও সাংহাই শহরের অভিজ্ঞতা বলছে যে, বাকি বড় শহরগুলিতেও প্রয়োজনে একই নীতি প্রয়োগ হতে পারে। তবে সাংহাই লকডাউনের সবচাইতে বড় ফলাফল হবে চীনা কোভিড ব্যবস্থাপনার উপর জনগণের বিশ্বাসকে নতুন করে তৈরি করার চ্যালেঞ্জ। এটা না করা গেলে ভবিষ্যতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের সরকারি চেষ্টাগুলির সফলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। 

সাইংহাইতে স্বেচ্ছাসেবকরা জনগণের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যোগাড় করছে। ইতোমধ্যেই সাংহাই শহরে লকডাউনের মাঝে থাকা জনগণের একাংশ পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। খাবারের সংকটে অনেক মানুষ ‘বারটারিং’ বা পণ্য অদলবদলের দিকে ধাবিত হয়েছে। জনরোষের মুখে চীনা রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলি ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে হিমসিম খাচ্ছে। কোভিড ব্যবস্থাপনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ছাড়াও সরকারের ভাষ্যকেই অনেকে অবিশ্বাস শুরু করেছে।


খাদ্য সংকট এবং জনরোষ

‘দ্যা গার্ডিয়ান’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সাংহাই এবং এর আশেপাশের অঞ্চলের বাৎসরিক জিডিপি পুরো চীনের প্রায় ৪০ শতাংশ; যা ১৭ই এপ্রিল নাগাদ কোন না কোন প্রকারের লকডাউনের মাঝে রয়েছে। ইতোমধ্যেই সাংহাই শহরে লকডাউনের মাঝে থাকা জনগণের একাংশ পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। খাবারের সংকটে অনেক মানুষ ‘বারটারিং’ বা পণ্য অদলবদলের দিকে ধাবিত হয়েছে। জনরোষের মুখে চীনা রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলি ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে হিমসিম খাচ্ছে। কোভিড ব্যবস্থাপনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ছাড়াও সরকারের ভাষ্যকেই অনেকে অবিশ্বাস শুরু করেছে। ইতোমধ্যেই জনগণের প্রতিবাদের কিছু ভিডিও চীনা সোশাল মিডিয়াতে আপলোড করা হয়েছে। চীনা রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলি ভিডিওগুলি নামিয়ে ফেলতে সক্ষম হলেও সেগুলি আবারও পশ্চিমা সোশাল মিডিয়াতে আপলোড করা হয়েছে। তবে পশ্চিমা সোশাল মিডিয়া চীনে এখন নিষিদ্ধ।

‘উইচ্যাট’ সোশাল মিডিয়াতে দু’জন লোকের ফোনালাপের রেকর্ড বেশ ভাইরাল হয়েছে। সাংহাই শহরের ৮২ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ ইউ ওয়েনমিং কিছুদিন আগেই করোনা পজিটিভ হয়েছেন। তিনি তার এলাকার চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকে ফোন করে বলেন যে, তার বাড়িতে কোন খাবার নেই এবং তার সকল ঔষধও শেষ হয়ে গিয়েছে; এখন তিনি কি করবেন? তিনি কি তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এখানে অপেক্ষা করবেন? পার্টি নেতা ঝাং ঝেন বৃদ্ধের বারংবার পীড়াপীড়িতে বিরক্ত হয়ে বলেন যে, তিনি তার উচ্চপদস্থদের এব্যাপারে অবহিত করেছেন; এর বাইরে তিনি আর কিছুই করতে পারবেন না। ঝাং বলছেন যে, সাম্প্রতিক সময়ে সহায়তার জন্যে অনুরোধের সংখ্যা বেশ বেড়ে গেছে। কিন্তু তার উচ্চপদস্থরা তাকে কোন সহায়তাই দিচ্ছেন না। তিনি যতক্ষণ সম্ভব ততক্ষণ এই কাজ করবেন; সম্ভব না হলে শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দেবেন। বৃদ্ধ ওয়েনমিংএর মতো সাধারণ মানুষের বিভিন্ন বক্তব্য সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে সামনে চলে আসছে। প্রচন্ড চাপের মুখে ৫৫ বছর বয়সী একজন পাবলিক হেলথ কর্মকর্তা চিয়ান ওয়েনশিয়ং নিজের অফিসে আত্মহত্যা করেন। চীনা কর্মকর্তারা ঘটনাটাকে স্বীকার করে নিয়ে বলছেন যে, ভদ্রলোক ১৪ই এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেছেন। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং উপ প্রধানমন্ত্রী সুন চুনলান মানুষের হতাশাজনক চিন্তাভাবনাকে অতিক্রম করার শক্তি অর্জন করার কথা বলেছেন, যাতে করে সরকারের ‘জিরো কোভিড’ নীতিকে সফল করা সম্ভব হয়। সরকার তাদের কোভিড নীতিকেই বিশ্বসেরা বলে আখ্যা দিচ্ছে। ‘শিনহুয়া’ সংবাদ সংস্থা জানাচ্ছে যে, শি জিনপিং তার এক ভাষণে বলেন যে, শীতকালীন অলিম্পিকে অংশ নেয়া কিছু বিদেশী এথলেট মন্তব্য করেছেন যে, যদি কোভিড নিয়ন্ত্রণে কাউকে গোল্ড মেডেল দেয়ার কথা বলা হয়, তাহলে সেটা চীনই পাবে। 

শি জিনপিংকে স্বীকার করতে হবে যে, এর আগে মাত্র দু’টা ভাইরাসকে দুনিয়া থেকে সরানো সম্ভব হয়েছিল। এর একটা হলো ‘স্মলপক্স’ এবং অপরটা হলো ‘রিন্ডারপেস্ট’; এটা নিশ্চিত যে, ‘সার্স কোভ-২’ এরকম তৃতীয় একটা ভাইরাস হবে না। শেষবার “মানুষের প্রকৃতিকে জয় করতে হবে” বলে যে চেষ্টা করা হয়েছিল, তা মারাত্মক ফলাফল বয়ে এনেছিল- এই চিন্তাটা কোনভাবেই মুছে ফেলা যাবে না।


বয়বৃদ্ধদের ভ্যাকসিন দেয়া নিয়ে বিতর্ক

‘ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসগো’র প্রফেসর জেইন ডুকেট বলছেন যে, সাংহাইএর নাগরিকরা চিন্তাও করতে পারেনি যে, সেখানে খাবার এবং অতি প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির ঘাটতি তৈরি হতে পারে। আর এগুলির লজিস্টিকসে সমস্যা হলে জনগণের মাঝ থেকে লকডাউনে ছাড় দেয়ার জন্যে চাপ আসতে থাকবে। আবার ছাড় দিলেও সংক্রমণ থামানোতে সমস্যা হয়ে যাচ্ছে। কাজেই চীনা সরকার এক্ষেত্রে উভয় সংকটে রয়েছে; এর যেকোন একটাতে সমস্যা হলেই জনরোষ তৈরি হতে পারে। এর মাঝে আবার বেশি বয়স্কদের ভ্যাকসিন পাওয়া নিয়েও রয়েছে জটিলতা। চীনা সরকারের হিসেবে ৫ই এপ্রিল পর্যন্ত ৬৫ বছরের উর্ধ্বে জনগণের মাঝে ৯ কোটি ২০ লক্ষ এখনও ভ্যাকসিনের তিন ডোজ পাননি। আবার ৮০ বছরের উর্ধ্বে ২ কোটি মানুষও পুরোপুরিভাবে ভ্যাকসিন পাননি। জনসংখ্যার এই অংশটারই কোভিডে আক্রান্ত হয়ে বেশি অসুস্থ্য হওয়া বা মৃত্যুর সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃত বেশি। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এবং বিশেষ করে চীনা নেতা শি জিনপিং দেশটার কোভিড ব্যবস্থাপনা নিয়ে এবছরের শেষের দিকে ২০তম জাতীয় কংগ্রেসে চাপের মাঝে পড়তে পারেন বলে মনে করছেন ‘ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, স্যান ডিয়েগো’র ভিক্টর শিহ।

পশ্চিমারাও যে তাদের লকডাউনের নীতিতে ভুল করেছে, সেটা নিয়ে কথা না বলেই মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর সিনিয়র ফেলো ইয়ানঝং হুয়াং বলছেন যে, চীনের উচিৎ সকলকে একত্রে বাড়িতে আটকে না রেখে শুধুমাত্র যারা বৃদ্ধ, তাদেরকে তিন ডোজের ভ্যাকসিন দেয়া এবং তাদের জন্যে এন্টিভাইরাল ঔষধ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পাবার ব্যবস্থা করা। একইসাথে তাদের উচিৎ পশ্চিমা ভ্যাকসিন নিজেদের দেশে প্রয়োগের ব্যবস্থা করা। 


করোনা মহামারির লকডাউন তুলে নেবার পর থেকে চলেছে আন্তর্জাতিক সাপ্লাই জট। এরপর ২০২১ সাল থেকেই চলছে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির মূল্যস্ফীতি; যার সাথে ২০২২ সালে যোগ হয়েছে খাদ্যশস্যের বাজারে ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাব। এই সকল কিছুর উপর যুক্ত হয়েছে চীনের লকডাউন; যা কিনা বর্তমান পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থার অসারতার প্রকৃষ্ঠ প্রমাণ। প্রকৃতপক্ষে বিশ্ব এখন এমন এক দিকে ধাবিত হচ্ছে যে, মানুষ যেকোন বিকল্প বিশ্বব্যবস্থাকে ট্রায়াল দিতে রাজি থাকবে।


‘জিরো কোভিড’এর ভবিষ্যৎ এবং এর ভূরাজনৈতিক প্রভাব

‘ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর’এর ‘সাউ সুয়ি হোক স্কুল অব পাবলিক হেলথ’এর এসোসিয়েট প্রফেসর এলেক্স কুক ‘সিএনএন’কে বলছেন যে, যেহেতু ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্ট খুব সহজে ছড়ায় এবং এটা খুব একটা প্রাণঘাতী নয়, সেহেতু এটা একবার ছড়িয়ে পড়লে আগের ভ্যারিয়্যান্টগুলির মতো নিয়ন্ত্রণ করাটা কঠিন। এতকাল চীনারা ‘জিরো কোভিড’ নীতিতে ব্যাপক সাফল্য পেলেও সেই একই কৌশল ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্টের ক্ষেত্রে কতটা সফল হতে পারে, সেটা অনিশ্চিত। ‘নিকেই এশিয়া’র এক লেখায় ‘চায়না মানি নেটওয়ার্ক’এর নিনা শিয়াং মত দিচ্ছেন যে, মহামারি নিয়ন্ত্রণ প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংএর ক্ষমতার প্রতি একটা চ্যলেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে। তিনি বলছেন যে, আড়াই বছর হয়ে গেলো সামনা সামনি কূটনীতি এবং জনগণের মাঝে আদানপ্রদান প্রায় বন্ধ। এটা অনেক ক্ষেত্রেই একসময়কার চীনের ‘কালচারাল রেভোলিউশন’এর মতো হয়ে উঠছে; যখন চীনারা সারা দুনিয়া থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। এখন পশ্চিমাদের সাথে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মাঝে চীনারা ক্রমান্বয়েই নিজেদেরকে গুটিয়ে নিচ্ছে। শি জিনপিংকে স্বীকার করতে হবে যে, এর আগে মাত্র দু’টা ভাইরাসকে দুনিয়া থেকে সরানো সম্ভব হয়েছিল। এর একটা হলো ‘স্মলপক্স’ এবং অপরটা হলো ‘রিন্ডারপেস্ট’; এটা নিশ্চিত যে, ‘সার্স কোভ-২’ এরকম তৃতীয় একটা ভাইরাস হবে না। শেষবার “মানুষের প্রকৃতিকে জয় করতে হবে” বলে যে চেষ্টা করা হয়েছিল, তা মারাত্মক ফলাফল বয়ে এনেছিল- এই চিন্তাটা কোনভাবেই মুছে ফেলা যাবে না।

পশ্চিমা চিন্তাবিদেরা অথবা পশ্চিমা চিন্তাধারা অনুসরণ করা এশিয়রা এখন বুঝতে পারছেন যে, লকডাউনের মতো স্ববিধ্বংসী নীতি অনুসরণ করাটা ভুল। যদিও তারা কেউই স্বীকার করতে চাইছেন না যে, পশ্চিমারা ভুল করেছে। এখন সেই ‘ট্রায়াল এন্ড এরর’ ভিতের উপর গড়ে ওঠা পশ্চিমা সমাধানগুলিই তারা চীনকে গ্রহণ করতে বলছেন। স্বভাবতই চীনারাও করোনা নিয়ন্ত্রণে পশ্চিমাদের ব্যর্থতাকে মাথায় রেখেই পশ্চিমা উপদেশ উড়িয়ে দিয়েছে। তবে সাংহাই লকডাউন দেখিয়ে দিচ্ছে যে, চীনারা উহানে যে পদ্ধতি অনুসরণ করেছিল, সেই একই পদ্ধতি সাংহাইএর মতো একটা শহরে প্রয়োগ করাটা কতটা কঠিন। বিশেষ করে সেটা যখন অতি সংক্রমণ প্রবণ এবং অপেক্ষাকৃত দুর্বল ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্ট। ‘জিরো কোভিড’ নীতি থেকে সড়ে আসলে শি জিনপিংএর সরকারকে ভুল স্বীকার করতে হবে; যা হবে রাজনৈতিক আত্মহত্যার শামিল। তাই তারা এখন পর্যন্ত তাদের সাফল্যগুলিকেই হাইলাইট করে যাচ্ছে। ফলাফলস্বরূপ, সারা দুনিয়ার ‘ম্যানুফ্যাকচারিং ক্যাপিটাল’ চীনের ‘জিরো কোভিড’ নীতির দিকেই সকলে চেয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। করোনা মহামারির লকডাউন তুলে নেবার পর থেকে চলেছে আন্তর্জাতিক সাপ্লাই জট। এরপর ২০২১ সাল থেকেই চলছে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির মূল্যস্ফীতি; যার সাথে ২০২২ সালে যোগ হয়েছে খাদ্যশস্যের বাজারে ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাব। এই সকল কিছুর উপর যুক্ত হয়েছে চীনের লকডাউন; যা কিনা বর্তমান পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থার অসারতার প্রকৃষ্ঠ প্রমাণ। প্রকৃতপক্ষে বিশ্ব এখন এমন এক দিকে ধাবিত হচ্ছে যে, মানুষ যেকোন বিকল্প বিশ্বব্যবস্থাকে ট্রায়াল দিতে রাজি থাকবে।

Tuesday, 11 January 2022

ইউরোপজুড়ে ভ্যাকসিন বিরোধী আন্দোলন রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থাকেই তুলে ধরে

১২ই জানুয়ারি ২০২২

প্যারিসের রাস্তায় ভ্যাকসিন বিরোধী অন্দোলন। ডোজের পর ডোজ ভ্যাকসিন দেয়া সত্ত্বেও যখন ‘ওমিক্রণ’এর সংক্রমণ ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না, তখন সংখ্যাগরিষ্ঠতাই রাজনীতিবিদদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের শক্তি; লিবারাল আদর্শ নয়। ফ্রান্স এবং চেক রিপাবলিকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বলে দিচ্ছে যে, রাজনীতিবিদেরা মূলতঃ জনগণের মতামতের ব্যাপারে মোটেও আগ্রহী নন। তবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাঝ দিয়ে নেয়া সিদ্ধান্তগুলির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখিয়ে দেয় যে, জনগণ পশ্চিমা রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারাচ্ছে।

 
নতুন বছরের শুরুতেই পুরো ইউরোপ উত্তপ্ত হয়েছে ভ্যাকসিন বিরোধী আন্দোলনে। ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ইতালি, বেলজিয়াম, চেক রিপাবলিকসহ ইউরোপের দেশগুলিতে করোনার ভ্যাকসিনের বিষয়ে সরকারি বাধ্যবাধতার বিরুদ্ধে চলছে এই বিক্ষোভ। বেশিরভাগ স্থানেই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ হলেও কিছু শহরে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং কিছু ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। বিক্ষোভকারীরা ভ্যাকসিন নেয়ার ক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতার ব্যাপারটাকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, এর আগে গত ১৮ই ডিসেম্বর ফ্রান্সে যে বিক্ষোভ হয়েছিল, এবারের বিক্ষোভ তার চাইতে চার গুণ বড় ছিল।

‘আল জাজিরা’ বলছে যে, ৮ই জানুয়ারি ভ্যাকসিনের বাধ্যবাধকতার বিরোধিতা করে ফ্রান্সে ১ লক্ষ ৫ হাজার মানুষ রাস্তায় বিক্ষোভ করে। পুলিশ বলছে যে, রাজধানী প্যারিসে প্রচন্ড ঠান্ডা এবং বৃষ্টি উপেক্ষা করে ১৮ হাজার মানুষ ‘সত্য’, ‘স্বাধীনতা’ এবং ‘ভ্যাকসিন পাস মানি না’ লেখা প্লাকার্ড নিয়ে বিক্ষোভ করে। অনেকেই তাদের ক্ষোভের কেন্দ্রে রেখেছিল ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁকে। এক সপ্তাহ আগেই ম্যাক্রঁ ‘লে প্যারিসিয়ান’ পত্রিকার সাথে সাক্ষাতে ভ্যাকসিন বিরোধীদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত খারাপ শব্দ ব্যবহার করে হুমকি দেন যে, যারা ভ্যাকসিন নেবে না তিনি তাদের জীবন এতটাই দুর্বিসহ করে ফেলবেন যে, তারা বাধ্য হবে ভ্যাকসিন নিতে। আন্দোলনকারীরা ম্যাক্রঁর বিরুদ্ধেও একই ধরনের খারাপ শব্দ ব্যবহার করে প্রতিবাদ করে। একজন বিক্ষোভকারী ‘রয়টার্স’কে বলেন যে, এটা ছিল ম্যাক্রঁর ‘শেষ চেষ্টা’। বিক্ষোভকারীরা বলছে যে, সরকার তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব করা ছাড়াও নাগরিকদের মাঝে পার্থক্য করছে।

এই বিক্ষোভ এমন সময়ে এলো, যখন এক সপ্তাহে দ্বিতীয়বারের মতো ফ্রান্সে ‘ওমিক্রন’ ভ্যারিয়্যান্টের কারণে একদিনে ৩ লাখের বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। অথচ ইউরোপের দেশগুলির মাঝে ফ্রান্স সবচাইতে বেশি ভ্যাকসিন দেয়া দেশগুলির একটা। ‘বিবিসি’ বলছে যে, ১২ বছরের বেশি বয়সের জনগণের ৯০ শতাংশকেই পুরোপুরি ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। আইসিইউগুলি ভর্তি হয়ে যাচ্ছে; হাসপাতালগুলি চাপের মাঝে রয়েছে। আর এর আগের দিন ৬ই জানুয়ারি ফ্রান্সের পার্লামেন্টে আইন পাস করে বলা হয় যে, জনগণকে রেস্টুরেন্টে খেতে, আন্তশহর বাসে চড়তে বা কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হলে পুরোপুরিভাবে ভ্যাকসিন নিতে হবে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, ফরাসি সিনেটে বিরোধী দলের শক্তি বেশি থাকায় সেখানে বিল পাস হতে কিছু সময় লাগতে পারে। এই আইন ১৫ই জানুয়ারি থেকেই বাস্তবায়িত হবার কথা রয়েছে। প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে পুলিশ ৩৪ জনকে গ্রেপ্তার করে। ১০ জন পুলিশ অফিসারও কিছুটা আহত হয়। মঁপেলিয়ে শহরে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ে।

অস্ট্রিয়ার পুলিশ বলছে যে, রাজধানী ভিয়েনাতে ৪০ হাজার মানুষ রাস্তায় বিক্ষোভ করে। সেখানে আগামী মাস থেকে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন নেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জার্মানিতেও অনেকগুলি শহরে বিক্ষোভ চলে। এর মাঝে সবচাইতে বড় বিক্ষোভ হয় হামবুর্গ শহরে; যেখানে ১৩ হাজার মানুষ রাস্তায় ছিল। সেখানে প্লাকার্ডে লেখা ছিল ‘যথেষ্ট হয়েছে; আমাদের সন্তানদেরকে রেহাই দাও’। একজন বিক্ষোভকারী তার গায়ে ইহুদিদের ‘স্টার অব ডেভিড’ বহন করছিলেন; যেখানে লেখা ছিল ‘ভ্যাকসিন নেয়া হয়নি’। এর মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানিতে ইহুদিদের গায়ে বাধ্যতামূলকভাবে ‘স্টার অব ডেভিড’ এঁকে রাখার নির্দেশনার সাথে তুলনা দেয়া হয়। জার্মানিতে ভ্যাকসিন বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা চলছে। সেখানে এক মাস আগে থেকে ৫ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুদেরকে ভ্যাকসিন দেয়া শুরু হয়েছে। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, ৯ই জানুয়ারি বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে ৫ হাজার মানুষ বিক্ষোভ করে। পুলিশ ৪১ জনকে গ্রেপ্তার করে। বিক্ষোভকারীদের প্লাকার্ডে লেখা ছিল ‘ভ্যাকসিন একনায়কতন্ত্র’। বেলজিয়ামে রেস্টুরেন্ট, বার এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে কোভিড পাস বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সেখানে এক সপ্তাহে নতুন সংক্রমণ বেড়েছে ৯৬ শতাংশ। চেক রিপাবলিকে ৬০ বছরের উপরে জনগণ, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ এবং জরুরি সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের ভ্যাকসিন নিতে বাধ্য করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। দেশটার নতুন কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতা নেবার আগে এই পরিকল্পনাগুলির বিরোধিতা করেছিল। এখন ক্ষমতায় গিয়ে নীতি পরিবর্তন করে তারা বিভিন্ন প্রফেশনালদের বাধ্যতামূলক ভ্যাকসিনের পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে চাইছে।

 
বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে ভ্যাকসিন বিরোধী আন্দোলন। ইউরোপের সরকারগুলি করোনার ভ্যাকসিন প্রয়োগের নীতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তাদের দুই শতকের ব্যক্তিস্বাধীনতা ভিত্তিক চিন্তাকে জ্বলাঞ্জলি দিচ্ছে। রাস্তায় বিক্ষোভকারীরা তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে তুলে ধরতে চাইলেও সরকার তাদের সংখ্যাকে ছোট বলে এড়িয়ে যেতে চাইছে।

ইতালির তুরিন শহরেও শতশত মানুষ বিক্ষোভ করে। সেখানে ৫০ বছরের বেশি বয়সী সকল ব্যক্তির ভ্যাকসিন নেয়া বাধ্যমূলক করা হয়েছে। আর ১১ই জানুয়ারি থেকে ইতালিতে ভ্যাকসিন না নিলে কেউ রেস্টুরেন্টে ঢুকতে পারবে না, অথবা গণপরিবহণে চড়তে পারবে না। জার্মানির স্বাস্থ্যমন্ত্রী কার্ল লাউটারবাক ‘ডাই আম সনটাগ’ পত্রিকাকে বলেন যে, স্বল্প সংখ্যক মানুষ সকল বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে উপেক্ষা করে সেচ্ছায় মিথ্যা তথ্যের মাঝে ডুবে থাকতে চাইছে। তিনি বলেন যে, ভ্যাকসিন বিরোধীরা এবং করোনাভাইরাসকে ষড়যন্ত্র আখ্যা দেয়া মানুষেরা সকল মাপকাঠি এবং লক্ষ্য হারিয়ে ফেলেছে।

‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, জার্মানির মিনডেন শহরে আড়াই হাজার এবং ড্রেসডেন শহরে সাড়ে ৩ হাজার মানুষ সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে মানব বন্ধন করে। তাদের বক্তব্য ছিল, তারা ভ্যাকসিন বিরোধীদের আক্রমণের শিকার। এর মাঝে ৭ই জানুয়ারি অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর কার্ল নেহামার পুরোপুরি ভ্যাকসিন নেবার পর বুস্টার ডোজ নিয়েও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি ইতোমধ্যেই ভ্যাকসিন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর ভূমিকা নেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। অপরদিকে ফ্রান্সের বিক্ষোভগুলি এমন সময়ে এসেছে, যখন কিছুদিন পরেই সেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ ভ্যাকসিন বিরোধীদের বিরুদ্ধে খারাপ শব্দ ব্যবহার করে বেশ বড় একটা ঝুঁকি নিয়েছেন।

ইউরোপের সরকারগুলি করোনার ভ্যাকসিন প্রয়োগের নীতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তাদের দুই শতকের ব্যক্তিস্বাধীনতা ভিত্তিক চিন্তাকে জ্বলাঞ্জলি দিচ্ছে। রাস্তায় বিক্ষোভকারীরা তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে তুলে ধরতে চাইলেও সরকার তাদের সংখ্যাকে ছোট বলে এড়িয়ে যেতে চাইছে। ডোজের পর ডোজ ভ্যাকসিন দেয়া সত্ত্বেও যখন ‘ওমিক্রণ’এর সংক্রমণ ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না, তখন সংখ্যাগরিষ্ঠতাই রাজনীতিবিদদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের শক্তি; লিবারাল আদর্শ নয়। ফ্রান্স এবং চেক রিপাবলিকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বলে দিচ্ছে যে, রাজনীতিবিদেরা মূলতঃ জনগণের মতামতের ব্যাপারে মোটেও আগ্রহী নন। তবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাঝ দিয়ে নেয়া সিদ্ধান্তগুলির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখিয়ে দেয় যে, জনগণ পশ্চিমা রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারাচ্ছে।

Saturday, 25 December 2021

পশ্চিমা অর্থনীতিকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে করোনার ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্ট

২৫শে ডিসেম্বর ২০২১

করোনাভাইরাসের ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্টের সংক্রমণের কারণে পশ্চিমা দুনিয়ায় ক্রিসমাসের আগে আগে ৪ হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। মানুষের মৃত্যুর মহামারি যতটা, তার চাইতে বেশি সম্পদের মহামারি। অপ্রতুল এবং যথেচ্ছ সমাধানের কারণে পশ্চিমা পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মারাত্মক চাপের মাঝে পড়েছে। এই যথেচ্ছ সমাধানগুলিকে জোরপূর্বক বাস্তবায়নের চেষ্টা মানুষকে আরও বিভ্রান্ত করছে এবং জনমনে ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই পড়েছে প্রশ্নের মুখে। করোনা মহামারি বিশ্বের জনগণকে ধ্বসে পড়া পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প খুঁজতে বাধ্য করছে।


করোনাভাইরাসের ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্টের সংক্রমণের কারণে পশ্চিমা দুনিয়ায় ক্রিসমাসের আগে আগে ৪ হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ওয়েবসাইট ‘ফ্লাইটএওয়্যার’এর বরাত দিয়ে ‘বিবিসি’ বলছে যে, ফ্লাইট বাতিলের এক চতুর্থাংশই ছিল যুক্তরাষ্ট্রে। ক্রিসমাসের আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রে বাতিল হয়েছে ৬’শ ৮৯টা ফ্লাইট; ক্রিসমাসের দিন আরও ৭’শ বাতিলের অপেক্ষায়। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে যে, অনেক ফ্লাইট ক্রু এবং অপারেশনসএর সাথে জড়িত লোকজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে; অথবা তাদের নিজেদেরকে কোয়ার‍্যান্টাইন করতে হয়েছে। যদিও গবেষকেরা বলেছেন যে, ওমিক্রন আগের ভ্যারিয়্যান্টগুলির চাইতে বেশি প্রাণনাশী নয়, তথাপি এর সংক্রমণ করতে পারার সক্ষমতা অনেক বেশি থাকায় অনেকেই চিন্তা পড়েছেন। ‘ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান’এর এসোসিয়েট প্রফেসর হ্যালি প্রেসকট ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’কে বলছেন যে, যখন একইসাথে লক্ষ লক্ষ মানুষ আক্রান্ত হয়ে যায়, তখন এদের মাঝে স্বল্প শতাংশ মানুষও যদি হাসপাতালে যায়, সেটাও মেডিক্যাল ব্যবস্থাকে ব্যতিব্যস্ত করে ফেলার জন্যে যথেষ্ট।

ক্রিসমাসের ঠিক আগে আগে ব্রিটেনের রেস্টুর‍্যান্টগুলি ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্টের কারণে মারাত্মক সমস্যায় পতিত হয়েছে। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বলছে যে, গত বসন্তের পর থেকে সবচাইতে খারাপ অবস্থায় পড়েছে তারা। ‘অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিক্স’ বা ‘ওএনএস’ বলছে যে, ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে রেস্টুর‍্যান্টগুলিতে বসা খদ্দেরের সংখ্যা ১৪ শতাংশ কমেছে। ওমিক্রনের কারণে ব্রিটিশরা এখন বাইরে গিয়ে খাচ্ছে কম; এবং বাসায় বসে কাজ করছে বেশি। লন্ডনে এই অবস্থা সবচাইতে খারাপ; সেখানে খদ্দেরের সংখ্যা কমেছে ১৮ শতাংশ। ‘ওএনএস’ আরও বলছে যে, বাসা থেকে কাজ করতে বলা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দুই সপ্তাহে ২ শতাংশ বেড়ে ১৪ শতাংশে ঠেকেছে। ব্রিটেনের আঞ্চলিক শহরগুলিতে বেচাকেনা ভালো চললেও লন্ডনে বেচাকেনা ২৯ শতাংশ কমে গেছে। কনসালট্যান্সি কোম্পানি ‘অক্সফোর্ড ইকনমিক্স’এর অর্থনীতিবিদ এন্ড্রু গুডউইন বলছেন যে, যদিও সরকার বেশিরভাগ বিধিনিষেধ ক্রিসমাসের আগে চালু না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তথাপি জনগণের মাঝেই সাবধানতা অবলম্বণ করার প্রবণতা বেড়েছে; এর উপর রয়েছে অবাধে চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা। তিনি মনে করছেন যে, এগুলির কারণে ব্রিটেনের জিডিপি ডিসেম্বর মাসে কমবে।

অপরদিকে আটলান্টিকে ওপাড়ে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডেরাল রিজার্ভ’ বলছে যে, মার্কিন অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি প্রায় চার দশকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। বলা হচ্ছে যে, গত নভেম্বরে ব্যক্তিগত খরচার হিসেবে ব্যয় বেড়েছে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ; যা ১৯৮২ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ। গত অক্টোবরে এটা ছিল ৫ দশমিক ১ শতাংশ। নভেম্বরে জনগণের খরচ বাড়লেও আয় সেই তুলনায় বাড়েনি। খরচ বেড়েছে দশমিক ৬ শতাংশ; আয় বেড়েছে দশমিক ৪ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে কমপক্ষে দুই সপ্তাহ ধরে বেকার ভাতা দাবি করা মানুষের সংখ্যা ডিসেম্বরে দাঁড়িয়েছে ১৮ লক্ষ ৫৯ হাজারে। মহামারির মাঝে এটা সর্বনিম্ন সংখ্যা হলেও সংখ্যাটা যথেষ্টই বড়। কারণ এর বাইরেও অনেকেই রয়েছে যারা বেকারত্বের এই সংজ্ঞার মাঝে না পড়লেও কোনমতে সংসার চালাচ্ছে।

‘বিবিসি’ বলছে যে, ওমিক্রন ঠেকাতে বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন ব্যবস্থা নিচ্ছে। ইতালি, স্পেন এবং গ্রিসে মাস্ক পড়ে বাইরে যাওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উত্তর স্পেনের কাতালোনিয়াতে রাত্রিকালীন কারফিউ বলবত করা হয়েছে। নেদারল্যান্ডসে চলছে কঠোর লকডাউন। জার্মানিতে ২৮ ডিসেম্বর থেকে প্রাইভেট গণজমায়েত ১০ জনের বেশি করা যাবে না; নাইট ক্লাবগুলিও বন্ধ থাকবে। ফুটবল খেলা হবে দর্শকবিহীন মাঠে। পর্তুগালে ২৬শে ডিসেম্বর থেকে বার এবং নাইট ক্লাবগুলি বন্ধ হচ্ছে; আর ৯ই জানুয়ারি পর্যন্ত বাসা থেকে কাজ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার প্রধান এন্থনি ফাউচি বলছেন যে, ক্রিসমাসের সময় মানুষ বেশি ঘোরাঘুরি করলে পুরোপুরি ভ্যাকসিন নেয়া থাকলেও সংক্রমণ বাড়বে।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি’র হিসেবে বিশ্বব্যাপী কমপক্ষে ৫৩ লক্ষ মানুষ করোনাভাইরাসে মৃত্যুবরণ করেছে; আক্রান্ত হয়েছে কমপক্ষে ২৭ কোটি ৯০ লক্ষ। যুক্তরাষ্ট্রে ১৫ই ডিসেম্বর অফিশিয়ালি করোনায় মৃতের সংখ্যা ৮ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। গত ২রা অক্টোবরে তা ৭ লক্ষ ছাড়িয়েছিল। অর্থাৎ ৭৫ দিনে বা প্রায় আড়াই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় মারা গেছে ১ লক্ষ মানুষ। প্রতিদিন গড়ে এই সংখ্যা ১ হাজার ৩’শ ৩৩ জন। ২০২০ সালের মার্চের শুরু থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৯ মাসে মৃত্যু হয়েছিল ৭ লক্ষ মানুষের। অর্থাৎ এই সময়ের মাঝে গড়ে প্রতিদিন মৃতের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২’শ ২৮ জন; যা কিনা গত আড়াই মাসের চাইতে কম! অথচ প্রথম ১৯ মাসের তুলনায় শেষ আড়াই মাসে বেশিরভাগ মানুষই ভ্যাকসিনের আওতায় এসেছে। ‘ব্লুমবার্গ’এর প্রতিবেদনে দেখানো হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৭৩ শতাংশ মানুষ কমপক্ষে একবার ভ্যাকসিন নিয়েছে; ৬২ শতাংশ মানুষকে পুরোপুরিভাবে ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। এর মাঝে ২০ শতাংশ আবার বুস্টার ডোজও পেয়েছে। ইইউতে ৭০ শতাংশ মানুষকে দেয়া হয়ে পুরোপুরি ভ্যাকসিন; ২৬ শতাংশ বুস্টারও পেয়েছে। মাল্টিবিলিয়ন ডলারের এই ভ্যাকসিন ব্যবস্থাও মৃত্যুর মিছিল কমাতে পারছে না। থামাতে পারছে না অর্থনৈতিক নিম্নগতি।

পশ্চিমা দেশগুলিতে ভ্যাকসিন নেয়ার বাধ্যবাধকতার বিরুদ্ধে যেমন প্রতিবাদ হয়েছে, তেমনি করোনার কারণে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপের বিরুদ্ধেও হয়েছে বিক্ষোভ। রাষ্ট্রগুলি কোন সমাধান দিতে পারেনি তাদের জনগণকে, যার মাধ্যমে সংক্রমণ বা মৃত্যু কমানো যেতে পারতো। অথচ পরীক্ষামূলক বিধিনিষেধের যাঁতাকলে পরে জনগণের আর্থিক অবস্থা হয়েছে করুণ। ভ্যাকসিনের ডোজ বৃদ্ধি করার পরেও মেলেনি কাংক্ষিত ফলাফল। অথচ এর ফলে কিছু ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি প্রচুর লাভ করেছে; তাদের গুটিকয়েক শেয়ারহোল্ডার লাশের মিছিলের উপর হয়েছে বিলিয়নায়ার। ওমিক্রন মানুষের জীবন নিচ্ছে কম; কিন্তু দুই বছর ধরে থেকে থেকে বিধিনিষেধের পর পশ্চিমা অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টাটুকুকে ধ্বসিয়ে ফেলছে। মানুষের মৃত্যুর মহামারি যতটা, তার চাইতে বেশি সম্পদের মহামারি। অপ্রতুল এবং যথেচ্ছ সমাধানের কারণে পশ্চিমা পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মারাত্মক চাপের মাঝে পড়েছে। এই যথেচ্ছ সমাধানগুলিকে জোরপূর্বক বাস্তবায়নের চেষ্টা মানুষকে আরও বিভ্রান্ত করছে এবং জনমনে ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই পড়েছে প্রশ্নের মুখে। করোনা মহামারি বিশ্বের জনগণকে ধ্বসে পড়া পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প খুঁজতে বাধ্য করছে।

Thursday, 9 December 2021

চীনা অর্থনীতির গতি কি মন্থর হয়ে আসছে?

০৯ই ডিসেম্বর ২০২১

চীনের 'এভারগ্র্যান্ড' কোম্পানির দৈত্যাকৃতির রিয়েল এস্টেট প্রকল্প। চীনা অর্থনীতি পুঁজিবাদের সমস্যাগুলি থেকে মুক্ত নয়। লাগামহীন ঋণের উপর নির্ভরশীল হবার কারণেই চীনের রিয়েল এস্টেট সেক্টর সমস্যায় পতিত; যা পুঁজিবাদী অর্থনীতিকে অনুসরণ করারই ফলাফলস্বরূপ।

 
গত ৬ই ডিসেম্বর চীনা সরকারি থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘চাইনিজ একাডেমি অব সোশাল সায়েন্সেস’ বা ‘সিএএসএস’এর এক বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০২২ সালে চীনের আর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০২০ সালে কোভিড দুর্যোগের পর ২০২১ সালে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল দেশটার। এর ফলে ২০২০ থেকে ২০২২এর মাঝে গড় প্রবৃদ্ধি হবে প্রায় ৫ দশমিক ২ শতাংশ। তবে ‘সিএএসএস’ বলছে যে, আগামী বছর চীনের রিয়েল এস্টেট সেক্টরের সমস্যাগুলি চলমান থাকবে এবং তা প্রাদেশিক সরকারগুলির বাজেটকে প্রভাবিত করবে। রিয়েল এস্টেট সমস্যা, স্থবির রপ্তানি এবং করোনাভাইরাসের কারণে কড়াকড়ি আরোপে জনগণের খরচ করার প্রবৃত্তি কমে যাওয়ায় ‘সিএএসএস’ চীনা সরকারকে ২০২২ সালের প্রবৃদ্ধির টার্গেট ২০২১ সালের চাইতে কম রাখতে পরামর্শ দিয়েছে। একইসাথে তারা সরকারকে রিয়েল এস্টেট বাজারকে বাঁচাতে হস্তক্ষেপ করতে উপদেশ দেয়। তাদের কথায়, বড় শহরগুলিতে ভূমির নিলাম বাজারে বিপর্জয় এবং ছোট শহরগুলিতে রিয়েল এস্টেটের মূল্য দ্রুত কমে যাওয়া থামাতে সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হবে। ‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, চীনের বিশাল রিয়েল এস্টেট কোম্পানি ‘এভারগ্র্যান্ড’ ব্যাংকের ঋণ ফেরত দিতে না পারার কারণে চীন সরকার রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলির জন্যে ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া কঠিন করে ফেলেছে। এর ফলে রিয়েল এস্টেট সেক্টর অর্থায়ন পেতে হিমসিম খাচ্ছে। এতে ব্যাংকিং সেক্টরও সমস্যায় পতিত হয়েছে। এছাড়াও মারাত্মক জ্বালানি সমস্যায় পতিত হয়েছে চীন।

নানামুখী চ্যালেঞ্জে চীনা অর্থনীতি

‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে চীনের জ্বালানি সমস্যাকে ব্যাখ্যা করা হয়। ২০৬০ সালের মাঝে চীন সরকার গ্রীন হাউজ গ্যাসের নির্গমণ শূণ্যের কোঠায় নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে চীনা সরকার তাদের প্রাদেশিক সরকারগুলির উপর পরিবেশ রক্ষার ব্যাপারে চাপ প্রদান করা শুরু করে। একারণে অনেক অঞ্চলেই বিদ্যুতের ব্যবহারকে র‍্যাশনিং ব্যবস্থার অধীনে আনা হয়। এতে বহু বাড়িঘর অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়া ছাড়াও সিমেন্ট, স্টিল এবং এলুমিনিয়াম শিল্পের মতো বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করা অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। এর মাঝে ৩০ শতাংশ কয়লা উৎপাদনকারী শানজি প্রদেশে বন্যা হওয়ায় কয়লার মূল্য আরেক দফা বৃদ্ধি পায়। এরই মাঝে যুক্ত হয় ‘এভারগ্র্যান্ড’এর সমস্যা। রিয়েল এস্টেট এই কোম্পানি ৩’শ বিলিয়ন ডলারের ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দেউলিয়া হবার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। ‘ফ্যান্টাসিয়া’ নামের আরেকটা ডেভেলপার কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে গিয়েছে; আর ‘সাইনিক হোল্ডিংস’ও একই পথে যাবার কথা বলছে।

 
চীনের সাংহাই শহরের মারাত্মক দূষণ।  পুঁজিবাদী আদর্শকে অনুসরণ করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ায় চীনের পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটেছে। আর এই বিপর্যয় এড়াতে গিয়েই মারাত্মক জ্বালানি সংকটে পড়ে চীনা জনগণ অন্ধকারে রাত কাটাচ্ছে।

‘দ্যা ইকনমিস্ট’ পত্রিকার ‘ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’এর ইউ সু বলছেন যে, রিয়েল এস্টেট সেক্টর স্থবির হয়ে আসলে এর সাথে যুক্ত কন্সট্রাকশন কনট্রাক্টর, বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াস প্রস্তুতকারক এবং বাড়িঘরের অভ্যন্তরের ফার্নিশিংএর ব্যবসাগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে চীনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিরেক্টর জৌ ল্যান বলছেন যে, ‘এভারগ্র্যান্ড’এর সমস্যা নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত হবার কিছু নেই। কারণ এই কোম্পানির ঋণ অনেক ব্যাংকের মাঝে ছড়িয়ে আছে। কোন একটা ব্যাংক এখানে বড় সমস্যায় পড়বে না। অর্থাৎ আর্থিক সেক্টরে ‘এভারগ্র্যান্ড’এর প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ‘বিবিসি’ বলছে যে, চীনের বড় প্রযুক্তি কোম্পানি, গেমিং কোম্পানি এবং শিক্ষা সেক্টর সরকারের নিয়ন্ত্রণের শিকার হয়েছে। সরকার সামাজিক দিকনির্দেশনাকে পরিবর্তন করতে পাঁচ বছর মেয়াদী এই নিয়ন্ত্রণমূলক কর্মকান্ডগুলি বাস্তবায়ন করছে। অর্থাৎ এই নিয়ন্ত্রণমূলক কর্মকান্ড আরও কয়েক বছর ধরে চলবে। তবে একইসাথে অনেকগুলি নীতির পরিবর্তনের স্বল্পমেয়াদী প্রভাব অবশ্যই দেখা যাবে।

চীনা সরকার চিন্তিত; সেকারণেই তারা তাদের নীতিতে পরিবর্তন আনছে

চীনা সরকার ইতোমধ্যেই অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে পদক্ষেপ নিচ্ছে। ৬ই ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘পিপলস ব্যাংক অব চায়না’ তার নীতিতে পরিবর্তন এনেছে। ১৫ই ডিসেম্বর থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলি তাদের রিজার্ভ থেকে শূণ্য দশমিক ৫ শতাংশ করে কমিয়ে ফেলতে পারবে। রিজার্ভ হলো ব্যাংকগুলির পুঁজির একটা অংশ যা ব্যাংক সবসময় ধরে রাখতে বাধ্য। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংকগুলি নতুন করে অর্থ যোগার করা ছাড়াই আরও অতিরিক্ত ১’শ ৮৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিতে সক্ষম হবে। ‘সিএনএন’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এবছরে দ্বিতীয়বার চীনা বাণিজ্যিক ব্যাংকের রিজার্ভের বাধ্যবাধকতা কমানো হলো। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব ‘পলিটব্যুরো’র এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, ২০২২ সালে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সরকার আরও সাহসী সিদ্ধান্ত নেবে। অস্ট্রেলিয়ার আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘ম্যাককুয়ারি গ্রুপ’এর অর্থনীতিবিদ ল্যারি হু মত দিচ্ছেন যে, এর আগে কখনোই চীনা নেতৃত্ব ‘স্থিতিশীলতা এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’এর মতো কথা বলেনি। এর অর্থ হতে পারে যে, চীনা শীর্ষ নেতৃত্ব সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতার ব্যাপারে যথেষ্টই চিন্তিত।

‘সিএনএন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, করোনাভাইরাসের দুর্যোগের মাঝেও চীন সরকার অর্থনীতিতে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থেকেছে। ২০২০এর প্রথম ভাগের পর থেকে চীনা সরকার সুদের হার কমায়নি। এমনকি অর্থনীতিতে বড় রকমের কোন প্রণোদনার বন্যাও বইয়ে দেয়নি। তারা শুধুমাত্র করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত ছোট ব্যবসাগুলিকে কিছু সমর্থন দিয়েছে। ২০২০ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে চীন প্রায় সকল বড় অর্থনীতিকে ছাপিয়ে যায়। তবে তার অর্থনীতি ২০২১ সালে কিছু সমস্যায় পতিত হয়; যার মাঝে রয়েছে নিজেদের জ্বালানি সংকট, আন্তর্জাতিক শিপিং সাপ্লাইএর বিলম্ব এবং অভ্যন্তরীণ রিয়েল এস্টেট সমস্যা। এছাড়াও দেশটার প্রযুক্তি কোম্পানিগুলি এবং আরও কিছু বেসরকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের উপর সরকারের চাপপ্রয়োগের ব্যাপারটাও অনেক বিশ্লেষকদের চিন্তিত করেছে। রিয়েল এস্টেট কোম্পানি ‘এভারগ্র্যান্ড’ গত ৩রা ডিসেম্বর ঘোষণা দেয় যে, তারা হয়তো তাদের সকল ঋণ ফেরত দিতে পারবে না। এই ঘোষণায় ৬ই ডিসেম্বর হংকংএর পুঁজি বাজারে কোম্পানির শেয়ারের মূল্য একদিনে ২০ শতাংশ পড়ে যায়।

বিশ্লেষকেরা ভয় পাচ্ছেন যে, ‘এভারগ্র্যান্ড’এর সমস্যা হয়তো চীনের পুরো রিয়েল এস্টেট ব্যবসাকে আক্রান্ত করে ফেলতে পারে। আর চীনের জিডিপির ৩০ শতাংশই রিয়েল এস্টেট সেক্টরের উপর নির্ভরশীল। এতকাল ‘পলিটব্যুরো’র সদস্যরা বলেছেন যে, রিয়েল এস্টেট সেক্টরকে নিয়ম মেনে চলতে হবে এবং সেব্যাপারে শি জিনপিং নিজেও যথেষ্ট কঠোর ছিলেন। কিন্তু এবছরই প্রথমবারের মতো তারা রিয়েল এস্টেট সেক্টরের ব্যাপারে কঠোর কোন কথা বলেননি। ‘সিটি গ্রুপ’এর বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, ব্যাংকের রিজার্ভের বাধ্যবাধকতা কমানো এবং ‘পলিটব্যুরো’র বিবৃতিতে বাসস্থানের চাহিদাকে সমর্থন দিয়ে যাবার কথায় বোঝা যাচ্ছে যে, সামনের দিনগুলিতে রিয়েল এস্টেট সেক্টরের ব্যাপারে চীনা সরকার আরও নরম সুরেই কথা বলবে।

 
চীনারা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকেই এগুচ্ছে এবং স্বল্পমেয়াদী সমস্যাগুলির সমাধান করতে যেয়ে তারা দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যেতে চাইছে না। আর নিজেদের অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণের মাঝে রেখে তারা সমস্যাগুলিকে বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়া থেকে বিরত রাখতে পারবে।

চীনা অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন; তবে ধ্বস নয়

চীন ভিত্তিক বাজার গবেষণা সংস্থা ‘চায়না বেইজ বুক ইন্টারন্যাশনাল’এর প্রধান নির্বাহী লেল্যান্ড মিলার ‘ব্লুমবার্গ’এর সাথে এক সাক্ষাতে বলছেন যে, তিনি মনে করেননা যে বর্তমানে চীনে যে অর্থনৈতিক পরিবর্তনগুলি হচ্ছে, তা পূর্বে ঘটে যাওয়া ছোটখাটো কোনো ঘটনার মতো। তার মতে, আজকে চীনে যা ঘটছে, তার প্রভাব আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ হবে। এর মূল কারণ হলো সারা বিশ্বের হিসেবটাই এখন পাল্টে গেছে; যা কিনা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করবে। ওয়াল স্ট্রীটের পুঁজিপতিরা মনে করছিলেন যে, কোভিডের লকডাউনের পর চীনারা বড় ধরনের অর্থনৈতিক প্রণোদনার ঘোষণা দেবে; কিন্তু সেটার ঘোষণা এখনও আসেনি। কারণ চীনারা মনে করছে যে, ধীরস্থির কম প্রবৃদ্ধিই চীনের অর্থনীতির জন্যে ভালো হবে। মিলার আরও বলছেন যে, চীনের রিয়েল এস্টেট সেক্টর যখন মুষরে পড়ছে, সেখানে অভ্যন্তরীণ বেসরকারি কনজাম্পশন বা খরচ বেড়ে গিয়ে সেটাকে প্রতিস্থাপন করার কোন সম্ভাবনা আসলে নেই। সরকার মানুষের খরচ বৃদ্ধি করতে পারার জন্যে বড় কোন সহায়তা দেয়নি। রাষ্ট্রের সম্পদকে জনগণের হাতে তুলে দেয়া হয়নি। আর বাইরের বিশ্বের বিনিয়োগকারীদের জন্যে বর্তমানে চীনের আর্থিক সেক্টর ছাড়া অন্য সেক্টরগুলিতে বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত। তবে মিলার মনে করেন না যে, ‘এভারগ্র্যান্ড’এর সমস্যা চীনের অর্থনীতির জন্যে বিশাল কোন সমস্যা বয়ে নিয়ে আসবে। এর কারণ হলো, চীনা অর্থনীতি পশ্চিমা অর্থনীতির মতো মুক্তভাবে চলে না। এখানে সরকার ইচ্ছে করলেই অর্থনৈতিক সমস্যাগুলিকে স্বল্প পরিসরে আটকে দিয়ে বাকি অর্থনীতিকে রক্ষা করতে পারে। চীনা সরকার ‘এভারগ্র্যান্ড’এর ব্যাপারে প্রথমেই সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে চীনা জনগণকে শিক্ষা দিচ্ছে যাতে তারা রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগের আগে হিসেব করে সিদ্ধান্ত নেয়।

‘কর্নেল ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর এবং মার্কিন থিংকট্যাংক ‘ব্রুকিংস ইন্সটিটিউশন’এর সিনিয়র ফেলো এসওয়ার প্রসাদ ‘ব্রুকিংস’এর এক আলোচনায় বলেন যে, যেটা বোঝা যাচ্ছে তা হলো, চীনারা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা দেখতে চায়। একইসাথে তারা মধ্যমেয়াদে রিয়েল এস্টেট সেক্টরে চিন্তাভাবনা না করে কেনাবেচাকে নিরুৎসাহিত করা ছাড়াও পরিবেশের উপর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রভাবকে কমাতে চাইছে। এই মধ্যমেয়াদী লক্ষ্যগুলিকে বাস্তবায়ন করতে চীন স্বল্প মেয়াদে কিছু প্রবৃদ্ধিকে ছেড়ে দিতে প্রস্তুত। চীনা সরকার জনগণকে বোঝাতে চাইছে যে, যেসব কোম্পানির বিনিয়োগের উৎস ঝুঁকিপূর্ণ, সেসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা উচিৎ নয়। আর একইসাথে কেউ যদি মনে করে যে, কোন কোম্পানি নিজেদের খারাপ ব্যবস্থাপনার জন্যে দেউলিয়া হয়ে গেলে সরকার তাদেরকে উদ্ধার করবে, সেটা একেবারেই সঠিক নয়। তবে বহু মানুষের পুঁজি রিয়েল এস্টেট সেক্টরে আটকে থাকার ব্যাপারটা চীনা সরকারের চিন্তার কারণ হিসেবে রয়েছে। প্রফেসর প্রসাদ মনে করছেন না যে, রিয়েল এস্টেটের সমস্যাগুলি পুরো আর্থিক সেক্টরকে প্রভাবিত করবে।

 
চীনে 'মার্সিডিস' কোম্পানির কারখানা। চীনের পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোকে হিসেবে ধরেই অনেক পশ্চিমা চিন্তাবিদেরা ভবিষ্যৎবাণী করছেন যে, চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে যাচ্ছে। মূলতঃ এই দৃষ্টিভঙ্গিটা পশ্চিমা পুঁজিপতিদের; যারা চীনে শতশত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ করেছে মুনাফার আশায়। তারা চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় শংকিত; যদিও সেই প্রবৃদ্ধি সকল বৃহৎ অর্থনীতি থেকে বেশি। ওয়াল স্ট্রীটের পুঁজিপতিরা শংকায় রয়েছে যে, তাদের ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ বুঝি ডিম দেয়া বন্ধ করে দিচ্ছে!

‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’!

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা আটলান্টিক কাউন্সিল’ এবং ‘রোডিয়াম গ্রুপ’এর এক যৌথ প্রতিবেদনে চীনের দুই নৌকায় পা রাখার ব্যাপারটা নিয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, চীন এতকাল মনে করছিল যে, তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সংকীর্ণ নীতিকে তারা সমান্তরালে রেখেই এগিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু ২০২২ সাল থেকে শুরু করে চীনাদের ভবিষ্যৎ জিডিপি পূর্বাভাসই বলে দিচ্ছে যে, চীনারা তাদের এতকালের পথ থেকে সরে আসছে। এই প্রতিবেদনের সাথে পশ্চিমা চিন্তাবিদেরা মোটামুটিভাবে একমত যে, চীনারা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকেই এগুচ্ছে এবং স্বল্পমেয়াদী সমস্যাগুলির সমাধান করতে যেয়ে তারা দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যেতে চাইছে না। আর নিজেদের অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণের মাঝে রেখে তারা সমস্যাগুলিকে বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়া থেকে বিরত রাখতে পারবে।

চীনের অর্থনীতি এখনও পশ্চিমা দেশগুলিতে রপ্তানির উপর নির্ভরশীল। পশ্চিমা বিশ্বে করোনাভাইরাসের প্রভাবে অর্থনৈতিক মন্দা চীনা পণ্যের বাজারকে চ্যালেঞ্জের মাঝে ফেলছে। চীনা অর্থনীতি পুঁজিবাদের সমস্যাগুলি থেকে মুক্ত নয়। লাগামহীন ঋণের উপর নির্ভরশীল হবার কারণেই চীনের রিয়েল এস্টেট সেক্টর সমস্যায় পতিত; যা পুঁজিবাদী অর্থনীতিকে অনুসরণ করারই ফলাফলস্বরূপ। পুঁজিবাদী আদর্শকে অনুসরণ করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ায় চীনের পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটেছে। আর এই বিপর্যয় এড়াতে গিয়েই মারাত্মক জ্বালানি সংকটে পড়ে চীনা জনগণ অন্ধকারে রাত কাটাচ্ছে। চীনের পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোকে হিসেবে ধরেই অনেক পশ্চিমা চিন্তাবিদেরা ভবিষ্যৎবাণী করছেন যে, চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে যাচ্ছে। মূলতঃ এই দৃষ্টিভঙ্গিটা পশ্চিমা পুঁজিপতিদের; যারা চীনে শতশত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ করেছে মুনাফার আশায়। তারা চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় শংকিত; যদিও সেই প্রবৃদ্ধি সকল বৃহৎ অর্থনীতি থেকে বেশি। ওয়াল স্ট্রীটের পুঁজিপতিরা শংকায় রয়েছে যে, তাদের ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ বুঝি ডিম দেয়া বন্ধ করে দিচ্ছে!

Thursday, 18 February 2021

ডলার ছাপিয়ে চলছে যুক্তরাষ্ট্র ..... কিন্তু এভাবে কতদিন?

১৯শে ফেব্রুয়ারি ২০২১

মার্কিন সরকারের নিজের ব্যাংক থেকে ইচ্ছেমতো ঋণ নেয়া এবং শূণ্য থেকে ডলার তৈরি করে ঘাটতি পূরণ করার এহেন কাহিনী গায়ের জোরে এক মুদ্রাব্যবস্থাকে ধরে রাখাকেই দেখিয়ে দিচ্ছে। কেউ কেউ এই ব্যবস্থাকে সমর্থনও করে যাচ্ছেন এই ভেবে যে, এটা কখনোই ভেঙ্গে পড়বে না। কিন্তু করোনা মহামারি দেখিয়ে দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের গায়ের জোর কেন, কোনকিছুই আসলে স্থায়ী নয়। পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় ডলারের স্থায়িত্ব কতদিন, তা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও ডলারের উপর বিশ্ব অর্থনীতির নির্ভরশীলতা কতদিন যুক্তরাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখবে, সেব্যাপারে আলোচনা হতে পারে।


নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন করোনাভাইরাসের মহামারি এবং এর ফলশ্রুতিতে সৃষ্ট মহামন্দা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে বাঁচাতে ১ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার বা ১৯’শ বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ প্রস্তাব করেছেন। এর মাঝে ১ ট্রিলিয়ন বা ১ হাজার বিলিয়ন ডলার নগদ অর্থ সহায়তা হিসেবে খেটে খাওয়া মানুষকে দেয়া হবে। ৪’শ বিলিয়ন খরচ করা হবে ভ্যাকসিন এবং মেডিক্যাল ব্যবস্থার উন্নয়নের পিছনে। আরও ৪’শ ৪০ বিলিয়ন ডলার দেয়া হবে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য এবং ছোট ব্যবসাগুলিকে, যারা পুঁজি বাজার থেকে ঋণ পাবে না। ‘কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস’ বা ‘সিবিও’এর হিসেবে এই প্রণোদনা প্যাকেজ ২০২১ সালের পুরো মার্কিন জিডিপির প্রায় ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে সমস্যা সেখানে নয়, ‘সিবিও’ হিসেব করে বলছে যে, ২০২১ সালে সরকারের পুরো রাজস্ব হবে খুব বেশি হলে সাড়ে ৩ ট্রিলিয়ন বা ৩৫’শ বিলিয়ন ডলার হবে। অর্থাৎ ১৯’শ বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ মার্কিন সরকারের বাৎসরিক রাজস্বের ৫৪ শতাংশ। অথচ এই ‘রেসকিউ প্যাকেজ’ আসলে করোনাভাইরাসের কারণে বেড়ে যাওয়া খরচের উপরে যোগ হওয়া খরচ। ২০২১ সালে সরকারের বাজেট ঘাটতি হবে ২৩’শ বিলিয়ন ডলার; যা জিডিপির ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। আর রাষ্ট্রীয় ঋণ দাঁড়াচ্ছে জিডিপির ১’শ শতাংশ বা জিডিপির সমান। এটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ।

‘সিএনএন’এর এক লেখায় ‘কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর জেফরি সাক্স বলছেন যে, বাইডেন তার করোনা প্রণোদনার ব্যাপারে বেশ শক্ত যুক্তি রেখেছেন; এবং একইসাথে দীর্ঘমেয়াদী উত্তোরণের পিছনেও কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অর্থ আসবে কোত্থেকে? বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী অবকাঠামো উন্নয়নে আরও ২ ট্রিলিয়ন বা ২ হাজার বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সাক্স বলছেন যে, তিন পদ্ধতিতে এই কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের ঘাটতি পূরণ করা যেতে পারে। প্রথমতঃ মার্কিন সরকার আরও ঋণ করতে পারে। দ্বিতীয়তঃ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডেরাল রিজার্ভ’ বা ‘ফেড’ আরও ডলার ছাপাতে পারে। আর তৃতীয়তঃ সরকার ট্যাক্স বাড়াতে পারে। সরকার ঋণ করতেই পারে। কিন্তু যখন রাষ্ট্রীয় ঋণ জিডিপির সমান, তখন ঋণ করার সীমা নিয়ে প্রশ্ন আসতেই পারে। আর ‘ফেড’ ফেব্রুয়ারি ২০২০ থেকে জানুয়ারি ২০২১ সালের মাঝে প্রায় ১৮’শ বিলিয়ন ডলার ছাপিয়েছে! বর্তমানে বাজারে থাকা মোট ডলার হলো ৫ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন বা ৫২’শ বিলিয়ন। অর্থাৎ ২০২০ সালের এক বছরে যুক্তরাষ্ট্র বাজারের মোট ডলারের ৩৪ শতাংশ ছাপিয়েছে! ২০০৮ সালে ‘ফেড’এর মোট ছাপানো ডলারের পরিমাণ ছিল মাত্র ৮’শ ৪৭ বিলিয়ন ডলার। সাক্স বলছেন যে, ঋণ করার যেমন সীমা রয়েছে, তেমনি ডলার ছাপানোরও সীমা রয়েছে। কারণ ডলার বেশি ছাপালে মুদ্রাস্ফীতি হবে। তিনি বলছেন যে, ইতোমধ্যেই বিভিন্ন পণ্যের মূল্য বেড়েছে, যা কিনা সামনের দিনগুলিতে আরও বেশি মুদ্রাস্ফীতির দিকেই ইঙ্গিত দেয়। এটা নিশ্চিত যে, ঋণ করে আর ডলার ছাপিয়ে সরকারের বাজেট ঘাটতি দূর করা যাবে না। তাই জনগণের উপর করের বোঝাও বাড়াতে হবে।

জেফরি সাক্সের কথার কিছু প্রমাণ পাওয়া যায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ দ্রব্যের মূল্যের দিকে তাকালে। ‘গোল্ড হাব’এর হিসেবে, ২০২০এর অগাস্টে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্য আউন্স প্রতি সর্বোচ্চ ২ হাজার ডলার পেরিয়ে যায়। ২০১৯এর ডিসেম্বরে তা ছিল প্রায় ১৪’শ ৭৯ ডলার। অর্থাৎ ২০২০ সালের আট মাসে স্বর্ণের মূল্য ৩৭ শতাংশ বেড়ে যায়! তবে এরপর কিছুটা কমে এসে স্বর্ণের মূল্য ২০২১এর ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ১৭’শ ৮০ ডলার হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যশস্যের মূল্যও বেড়েছে। ‘ট্রেডিং ইকনমিকস’এর হিসেবে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে গমের মূল্য যেখানে ছিল সর্বোচ্চ ৫’শ ৮০ ডলার, সেখানে ২০২১এর জানুয়ারিতে তা ৬’শ ৭৮ ডলারে উঠে যায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে গমের মূল্য বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে গমের মূল্য ৬’শ ৪৮ ডলারের কাছাকাছি রয়েছে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা সর্বোচ্চ ৫’শ ৬৩ ডলার ছিল। ফেব্রুয়ারি মাসেও মূল্য ১৫ শতাংশ বেশি রয়েছে।

 
২০২০এর অগাস্টে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্য আউন্স প্রতি সর্বোচ্চ ২ হাজার ডলার পেরিয়ে যায়। স্বর্ণের মূল্য বহুবার কমেছে বা বেড়েছে। আসলে স্বর্ণ আগের জায়গাতেই আছে; ডলারের মূল্য কমেছে বা বেড়েছে। ‘ফেড’ যখন ইচ্ছে ডলার ছাপিয়ে বা বাজার থেকে ডলার কিনে বাজারে ডলারের মূল্য ঠিক রাখার চেষ্টা করেছে।

‘ইউএসএ টুডে’র এক প্রতিবেদনে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেড’এর ডলার ছাপানোকে ‘জাদু’র সাথে তুলনা করা হয়। যখনই ডলারের দরকার পরবে, তখনই ‘ফেড’ কম্পিউটারের কিছু বাটন চাপ দিয়ে একেবারে শূণ্য থেকে ডলার তৈরি করে নেয়। ইলেকট্রনিক ডিপোজিটের মতো ‘ফেড’ ‘ভার্চুয়াল প্রিন্টিং’এর মাধ্যমে ডলার তৈরি করে বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কের কাছে পাঠিয়ে দেয়। ‘অক্সফোর্ড ইকনমিক্স’ বলছে যে, এটা করোনা মহামারি এবং এর ফলশ্রুতিতে মহামন্দা থেকে উত্তোরণের জন্যে একটা উপায়। নিউ ইয়র্কের ‘বার্ড কলেজ’এর অর্থনীতিবিদ পাভলিনা চেরনেভা বুঝিয়ে বলেন যে, একজন ব্যক্তি অর্থ দরকার হলে যেভাবে চেক লিখে একাউন্ট থেকে অর্থ তুলতে পারে, তেমনি বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলিও ‘ফেড’ থেকে ঋণ নিতে পারে। মার্কিন কংগ্রেস বিশাল রাষ্ট্রীয় ঋণের অনুমোদন দিচ্ছে; আর সেটা পূরণ করে দিচ্ছে ‘ফেড’। ‘ফেড’এর ডলার ছাপানোর এই পদ্ধতির সমালোচক প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেনশনিয়াল প্রার্থী রন পল ‘ইউএসএ টুডে’কে বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র মিথ্যা অর্থ দিয়ে কাজ করছে। এখানে মাপকাঠিটাও বানোয়াট; যা কিনা সত্যিকার অর্থেই অবিশ্বাস্য! ব্যক্তি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাদের ক্রেডিট কার্ডের বিল একটা বাটন চেপেই দিয়ে দিয়ে পারছেন না; নিজেদের কষ্ট করে আয় করে সেখান থেকে দিতে হচ্ছে। অথচ মার্কিন সরকার একটা বাটন চেপেই তার ঋণ পরিশোধ করে ফেলতে পারছে; কারণ সরকারের নিজস্ব ব্যাংক ডলার ছাপাচ্ছে!

মার্কিন সরকার ঋণ নেবার জন্যে ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করে। সেটা কিনে নেয় বিনিয়োগকারীরা। এর বিনিময়ে তারা সরকার থেকে সুদ আয় করে। মার্কিন সরকারের ‘গভর্নমেন্টে একাউন্টাবিলিটি অফিস’ বা ‘জিএও’এর ২০১৯ সালের হিসেবে সরকারের ইস্যু করা মোট ট্রেজারি বন্ডের প্রায় ১৪ শতাংশ ‘ফেড’ কিনেছে; বাকিটা কিনেছে মার্কিন এবং অন্য দেশের বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু গত মার্চ মাস থেকে মার্কিন সরকারের ইস্যু করা বেশিরভাগ ট্রেজারি বন্ড কিনেছে মার্কিন সরকারের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডেরাল রিজার্ভ’। অর্থাৎ মার্কিন সরকারের একটা প্রতিষ্ঠান আরেকটা সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিচ্ছে! আর সেই ঋণের অর্থ এসেছে শূণ্য থেকে! রন পল বলছেন যে, এভাবে ডলার ছাপানোর অর্থ হলো অর্থনীতি ফুলে ফেঁপে বেলুনের মতো হয়ে যাবে। বাজারে পণ্য যা রয়েছে, তার চাইতে ডলার বেশি হয়ে যাবে। ফলশ্রুতিতে মুদ্রাস্ফীতি হবে। এক ডলারে আগে যত পণ্য কেনা যেত, এখন তার চাইতে অনেক কম কেনা যাবে। রন পলের উল্টো কথা বলছেন ‘মডার্ন মনেটারি থিওরি’র অনুসারীরা। তারা বলছেন যে, বর্তমান ব্যবস্থায় ডলার ছাপিয়ে সরকার সর্বদাই তার ঋণগুলি শোধ করতে পারবে। কাজেই বাজেট ঘাটতি বা অনেক বেশি ঋণ কোন সমস্যা নয়। কিন্তু বিশ্বের সকল দেশ দরকার হলেই নিজের অর্থ নিজে ছাপিয়ে নিতে পারে না। আর বিশ্বের সবচাইতে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এবং সুপারপাওয়ার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ঋণ পেতে পারে, তা দুনিয়ার আর কেউ পেতে পারে না। সকলেই মার্কিন সরকারের ট্রেজারি বন্ড কিনতে চায়। কিন্তু এভাবে কতদিন চলবে?

যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় ঋণ প্রায় ২৭ ট্রিলিয়ন বা ২৭ হাজার বিলিয়ন ডলার! এই ঋণ যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির ১’শ ২৭ শতাংশ! সরকারি ও বেসরকারি মিলে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ঋণ দেশটার জিডিপির ৩’শ ১৯ শতাংশ বা তিন গুণেরও বেশি! এই ঋণের বেশিরভাগটাই স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড থেকে আসেনি। যখনই দরকার হয়েছে, তখনই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডেরাল রিজার্ভ’ বা ‘ফেড’ শূণ্য থেকে ডলার তৈরি করে দিয়েছে! এই ডলারই ১৯৭১ সাল থেকে সারা বিশ্বের রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে চলছে।


যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি চলছে ঋণের উপর। বিশ্বব্যাংকের হিসেবে ২০১৯ সালের শেষে যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি ঋণ ছিল জিডিপির প্রায় ১’শ ৯২ শতাংশ! মার্কিন ‘ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট’এর হিসেব বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় ঋণ প্রায় ২৭ ট্রিলিয়ন বা ২৭ হাজার বিলিয়ন ডলার! ‘ফ্রেড ইকনমিক ডাটা’ বলছে যে, এই ঋণ যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির ১’শ ২৭ শতাংশ! অর্থাৎ সরকারি ও বেসরকারি মিলে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ঋণ দেশটার জিডিপির ৩’শ ১৯ শতাংশ বা তিন গুণেরও বেশি! এই ঋণের বেশিরভাগটাই স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড থেকে আসেনি। যখনই দরকার হয়েছে, তখনই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডেরাল রিজার্ভ’ বা ‘ফেড’ শূণ্য থেকে ডলার তৈরি করে দিয়েছে! এই ডলারই ১৯৭১ সাল থেকে সারা বিশ্বের রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে চলছে। সেবছরের অগাস্ট মাসে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে ১৯৪৪ সালে করা ‘ব্রেটন উডস’ চুক্তি থেকে বের হয়ে যায়। সেই চুক্তি মোতাবেক মার্কিন ডলারের মূল্য স্বর্ণের সাথে যুক্ত করা ছিল। স্বর্ণকে মুদ্রা ব্যবস্থার মাপকাঠি হিসেবে রাখাকে বলা হতো ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’। কিন্তু চুক্তি থেকে বের হয়ে যাবার পর মার্কিন ডলারের মূল্যের কোন হদিসই থাকলো না। বরং অন্যান্য মুদ্রার মূল্য নির্ধারিত হতে থাকলো মার্কিন ডলারের বিপরীতে। ডলারই হয়ে গেল বৈশ্বিক মুদ্রাব্যবস্থার মাপকাঠি। ‘ম্যাক্রোট্রেন্ডস’এর এক হিসেবে দেখানো হচ্ছে যে, ১৯৪৪ সালে এক আউন্স স্বর্ণ কিনতে লাগতো প্রায় ৫’শ ডলারের মতো। সেটা ২০২১ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি ছিল ১৭’শ ৭২ ডলার ৮০ সেন্ট। এর মাঝে স্বর্ণের মূল্য বহুবার কমেছে বা বেড়েছে। আসলে স্বর্ণ আগের জায়গাতেই আছে; ডলারের মূল্য কমেছে বা বেড়েছে। ‘ফেড’ যখন ইচ্ছে ডলার ছাপিয়ে বা বাজার থেকে ডলার কিনে বাজারে ডলারের মূল্য ঠিক রাখার চেষ্টা করেছে। মার্কিন সরকারের নিজের ব্যাংক থেকে ইচ্ছেমতো ঋণ নেয়া এবং শূণ্য থেকে ডলার তৈরি করে ঘাটতি পূরণ করার এহেন কাহিনী গায়ের জোরে এক মুদ্রাব্যবস্থাকে ধরে রাখাকেই দেখিয়ে দিচ্ছে। কেউ কেউ এই ব্যবস্থাকে সমর্থনও করে যাচ্ছেন এই ভেবে যে, এটা কখনোই ভেঙ্গে পড়বে না। কিন্তু করোনা মহামারি দেখিয়ে দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের গায়ের জোর কেন, কোনকিছুই আসলে স্থায়ী নয়। পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় ডলারের স্থায়িত্ব কতদিন, তা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও ডলারের উপর বিশ্ব অর্থনীতির নির্ভরশীলতা কতদিন যুক্তরাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখবে, সেব্যাপারে আলোচনা হতে পারে।

Friday, 29 January 2021

‘ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ’ পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থার বাস্তবতার দিকেই ইঙ্গিত দেয়

২৯শে জানুয়ারি ২০২১

 
‘ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ’এর পরিস্থিতি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যাবস্থায় আদর্শ নয়, বরং জাতীয় স্বার্থই সকল সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে। একইসাথে মানুষের জীবন নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির উপর প্রভাবই জাতীয় সিদ্ধান্তের পিছনে মূল প্রেরণা।


করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন সরবরাহ নিয়ে ব্রিটেন এবং ইউরোপিয় ইউনিয়নের দ্বন্দ্ব এখন বেশ পরিষ্কার। ব্রিটিশ সুইডিশ কোম্পানি ‘এসট্রাজেনেকা’ বলছে যে, তারা ইইউএর কাছে যে পরিমাণ ভ্যাকসিন ২০২১ সালের মার্চের মধ্যে সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা তারা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হচ্ছে না। ২৬শে জানুয়ারি ইতালিয় পত্রিকা ‘লা রিপাবলিকা’র সাথে এক সাক্ষাতে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী পাসকাল সোরিঅট বলেন যে, চুক্তি অনুযায়ী ‘সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা’ দেয়ার জন্যে কোম্পানির বাধ্যবাধকতা রয়েছে; তবে নির্দিষ্ট তারিখের মাঝে সকল ভ্যাকসিন সরবরাহ করার কোন বাধ্যবাধকতা নেই। তবে ইইউ ‘এসট্রাজেনেকা’র এই বক্তব্য মানতে নারাজ। ইইউএর স্বাস্থ্য কমিশনার স্টেলা কিরিয়াকিদেস ২৭শে জানুয়ারি সাংবাদিকদের বলেন যে, কোম্পানির ব্রিটিশ কারখানাগুলি ইইউএর সাথে করা চুক্তির অংশ। যেহেতু ব্রিটিশ কারখানাগুলির সরবরাহ ভালোমতো চলছে, তাই কোম্পানি তার প্রতিশ্রুতি রাখতে বাধ্য। পরদিন এক টুইটার বার্তায় তিনি বলেন যে, ইইউ ‘এসট্রাজেনেকা’র চলমান অস্বচ্ছ সরবরাহ শিডিউলে ব্যাথিত। কিরিয়াকিদেস সাংবাদিকদের বলেন যে, কোম্পানি চুক্তিকে যেভাবে ব্যাখ্যা করছে, তা ভুল এবং অগ্রহণযোগ্য। এর সপ্তাখানেক আগে কোম্পানি বলে যে, মার্চের মাঝে তারা তাদের প্রতিশ্রুত ৮ কোটি ভ্যাকসিনের মাঝে মাত্র ৩ কোটি ১০ লক্ষ সরবরাহ করতে পারবে। কারণ হিসেবে কোম্পানিটা বলছে যে, তাদের ইইউএর ভূমিতে বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসের কারখানাগুলি সরবরাহ দিতে হিমসিম খাচ্ছে। এছাড়াও কোম্পানির দু’টা কারখানা রয়েছে ব্রিটেনে। ইইউএর সাথে ‘এসট্রাজেনেকা’র দ্বন্দ্বের মাঝে ব্রিটিশ ক্যাবিনেট অফিসের মন্ত্রী মাইকেল গোভ বলেন যে, ইইউএর সাথে ‘এসট্রাজেনেকা’র যে দ্বন্দ্বই থাকুক না কেন, ব্রিটিশ জনগণের ভ্যাকসিন পেতে কোন সমস্যাই হবে না। তিনি সাংবাদিকদের বলেন যে, ব্রিটেনের কাছে ‘পূর্ণ নিশ্চয়তা’ রয়েছে যে, ব্রিটেন তার ভ্যাকসিন ঠিকমতোই পাবে। আর ব্রিটেনের ভ্যাকসিন প্রকল্প সম্পূর্ণ সফলতা পাবার পরই ইইউএর দেশগুলিকে সহায়তা দেবার কথা আসবে। তিনি আরও বলেন যে, ইউরোপিয়ান কমিশনের চাপ সত্ত্বেও ‘এসট্রাজেনেকা’ ব্রিটেনকে নিশ্চিত করেছে যে, তারা তাদের প্রতিশ্রুতি রাখবে। ভ্যাকসিন নিয়ে ইইউ এবং ব্রিটিশ সরকারের পরস্পরবিরোধী কথাগুলি ‘ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ’এর আলোচনাকে সামনে নিয়ে আসছে, যার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব যথেষ্ট।

ইইউ করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে এবং ভ্যাকসিন প্রকল্প বাস্তবায়নে হিমসিম খাচ্ছে। ‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ইইউ তার প্রায় ৪৫ কোটি জনসংখ্যার জন্যে এখন পর্যন্ত মোট ২’শ ৩০ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন অর্ডার করেছে। এর মাঝে ‘এসট্রাজেনেকা’র কাছ থেকে অর্ডার করেছে ৪০ কোটি। ইইউ কর্মকর্তারা বলছেন যে, ইইউএর কাছ থেকে কোম্পানি যে অর্থ পেয়েছে, তা দিয়েই কোম্পানির ব্রিটিশ কারখানার উন্নয়ন করা হয়েছে। ইইউএর সাথে চুক্তিতে বলা হয়েছে যে, কোম্পানির মূল কারখানা ব্রিটেনে; বেলজিয়াম আর নেদারল্যান্ডসের কারখানাগুলি দ্বিতীয় সারির। ‘এসট্রাজেনেকা’ ছাড়াও মার্কিন কোম্পানি ‘ফাইজার’ ও জার্মান কোম্পানি ‘বায়োএনটেক’এর জয়েন্ট ভেঞ্চার থেকে ইইউ অর্ডার করেছে ৬০ কোটি ডোজ; আর মার্কিন কোম্পানি ‘মডার্না’র কাছ থেকে অর্ডার করেছে ১৬ কোটি ডোজ। ‘ফাইজার’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, ২০২০এর ডিসেম্বরের মাঝে তারা ১ কোটি ২৫ লক্ষ ডোজ সরবরাহ করবে। কোম্পানির বেলজিয়ান কারখানা সম্প্রসারণের কাজ চলায় তারা সিডিউলে কয়েক সপ্তাহ পিছিয়ে রয়েছে বলে বলছে। এর ফলাফলস্বরূপ স্পেন সরকার ২৭শে জানুয়ারি ঘোষণা দেয় যে, ভ্যাকসিনের অভাবে মাদ্রিদ এলাকায় ভ্যাকসিন দেয়ার কর্মকান্ড দুই সপ্তাহের জন্যে স্থগিত করা হয়েছে। কাতালোনিয়াতেও ভ্যাকসিন কর্মকান্ড বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ইতালি সরকার ইতোমধ্যেই ‘এসট্রাজেনেকা’র বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দিয়েছে। অপরদিকে জার্মান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেন্স স্পাহন ইউরোপিয়ান কমিশনের উপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছেন যাতে ভ্যাকসিন কারখানাগুলি ইইউএর যে সদস্য রাষ্ট্রের সীমানার মাঝে অবস্থিত, তাদের সরকারের অনুমতি ব্যাতীত যেন ভ্যাকসিন রপ্তানি করতে না পারে।

‘এসট্রাজেনেকা’ এবং ইইউএর দ্বন্দ্ব বলে দিচ্ছে যে, ভ্যাকসিনের কারখানা কোন দেশের জাতীয় সীমানার মাঝে রয়েছে, তা এখন যথেষ্টই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সব দেশের মাটিতে তো কারখানা নেই; বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে। ২৬শে জানুয়ারি ‘প্যান আফ্রিকানিস্ট’ সাংবাদিক সন্মেলনে ধনকুবের বিল গেটস বলেন যে, মহামারি থেকে উদ্ধার পেতে আরও অনেক ভ্যাকসিন কারখানা চালু করতে হবে এবং সব দেশের মানুষকে ভ্যাকসিন দিতে হবে। গেটস বলেন যে, তিনি বিশ্বের ভ্যাকসিন কারখানাগুলিকে অর্থায়ন করছেন, যাতে করে ভ্যাকসিন ডেভেলপ করা বায়োটেকনলজি কোম্পানিগুলির ভ্যাকসিন অনেকগুলি কারখানায় তৈরি করা সম্ভব হয়। উদাহরণস্বরূপ, ব্রিটেনের ‘অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি’র ডেভেলপ করা ভ্যাকসিন তৈরি করছে ‘এসট্রাজেনেকা’; আর ‘এসট্রাজেনেকা’র সহায়তা নিয়ে ভ্যাকসিন উৎপাদন করছে ভারতের ‘সিরাম ইন্সটিটিউট’। তবে গেটস বিশ্বের সকল স্থানে কারখানা তৈরিকেও আবার সমর্থন করছেন না। এক প্রশ্নের জবাবে গেটস বলেন যে, আফ্রিকায় একটা ভ্যাকসিন কারখানা করতে কমপক্ষে পাঁচ বছর সময় লাগবে; কাজেই এটা বরং ভবিষ্যতের কোন মহামারির প্রস্তুতি হিসেবে দেখা যেতে পারে। বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশেগুলির বড় কারখানাগুলির উপর নির্ভর করা ছাড়া গতি নেই। তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলিতে ভ্যাকসিন কারখানার জন্যে ধনী দেশগুলির বিনিয়োগ প্রত্যাশা করেন।

‘ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স’এর গবেষণায় বলা হচ্ছে যে, বিশ্বব্যাপী সব দেশে ভ্যাকসিন প্রকল্প চালু করা না গেলে বিশ্ব অর্থনীতি ৯ হাজার ২’শ বিলিয়ন বা ৯ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার হারাবে। বিল গেটস বলছেন যে, করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্ব যেখানে ২৮ হাজার বিলিয়ন বা ২৮ ট্রিলিয়ন ডলার হারিয়েছে, সেই তুলনায় ভ্যাকসিনের জন্যে নতুন কারখানার পিছনে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ কিছুই নয়। কিন্তু গেটসএর কথায় এটা পরিষ্কার যে, কেউই আসলে এই মুহুর্তে আফ্রিকার মতো উন্নয়নশীল অঞ্চলে ভ্যাকসিন কারখানার কথা চিন্তা করছেন না। আর ‘এসট্রাজেনেকা’র কোন কারখানা কোন দেশের সীমানার মাঝে অবস্থিত, তা যখন ব্রিটেন এবং ইইউএর মাঝে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করছে, তখন আফ্রিকাসহ উন্নয়নশীল দেশগুলিতে ভ্যাকসিন কারখানা তৈরি করাটা অবাস্তবই শোনাবে। ‘ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ’এর এই পরিস্থিতি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যাবস্থায় আদর্শ নয়, বরং জাতীয় স্বার্থই সকল সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে। একইসাথে মানুষের জীবন নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির উপর প্রভাবই জাতীয় সিদ্ধান্তের পিছনে মূল প্রেরণা।

Sunday, 17 January 2021

ভূরাজনীতিতে করোনা মহামারির প্রভাব কতটুকু?

১৭ই জানুয়ারি ২০২১


করোনা মহামারির সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী ৯ কোটি ৫০ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছে; যার মাঝে ২০ লক্ষ ৩২ হাজার ৭’শ ৫০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। শুধুমাত্র ১৫ই জানুয়ারি এক দিনেই মৃত্যুবরণ করেছে ১৪ হাজার ৯’শ ১৩ জন। এর তুলনায় গত এপ্রিলের ১৭ তারিখে মৃতের সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ ৮ হাজার ৫’শ ২৭ জন। অর্থাৎ প্রথম ঢেউএর তুলনায় দ্বিতীয় ঢেউএ মৃতের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গত জুলাই মাসে এই সংখ্যা বেশ বাড়লেও তা ২২শে জুলাইএর ৭ হাজার ৩’শ ২৬ জনের বেশি ছিল না। সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে; ৪ লক্ষ ৫ হাজার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্রাজিলে; ২ লক্ষ ৯ হাজার। তৃতীয় সর্বোচ্চ ভারতে; ১ লক্ষ ৫২ হাজার। চতুর্থ সর্বোচ্চ মেক্সিকোতে; ১ লক্ষ ৪০ হাজার। এরপর রয়েছে ব্রিটেন ৮৮ হাজার; ইতালি ৮২ হাজার; ফ্রান্স ৭০ হাজার; রাশিয়া ৬৫ হাজার; ইরান ৫৭ হাজার; স্পেন ৫৩ হাজার; কলম্বিয়া ৪৮ হাজার; জার্মানি ৪৭ হাজার; আর্জেন্টিনা ৪৫ হাজার; পেরু ৩৯ হাজার; দক্ষিণ আফ্রিকা ৩৭ হাজার; পোল্যান্ড ৩৩ হাজার। প্রতি ১ লক্ষ জনসংখ্যার মাঝে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে বেলজিয়ামে; ১’শ ৭৫ জন মানুষের। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্লোভেনিয়া ১’শ ৫৩ জন; ইতালি ১’শ ৩৫ জন। জনসংখ্যার বিচারে মৃত্যুর সংখ্যা ইউরোপে সবচাইতে বেশি। প্রথম ১০টা দেশের সবগুলিই ইউরোপের। ১১তম স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়াও ১৫তম স্থানে পেরু, ১৮তম স্থানে পানামা এবং ১৯তম স্থানে মেক্সিকো ছাড়া প্রথম ২০টা দেশের ১৬টাই ইউরোপের। বলাই বাহুল্য যে, ইউরোপ এবং আমেরিকা করোনা মহামারিতে সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।

করোনা মহামারির প্রভাব সারা বিশ্বের উপর পরলেও সকল ক্ষেত্রে এর প্রভাব এক নয়। ভূরাজনীতিতে মহামারির প্রভাব হিসেব করতে গেলে ইউরোপ এবং আমেরিকার কথাই আসবে শুরুতে। একইসাথে সেই অঞ্চলগুলিতে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বিপর্যয়ের কথাগুলি আসবে, যার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। তবে করোনার সরাসরি প্রভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধ্বস নামায় বিশ্বের অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলির কথাও চলে আসবে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনকে নিয়ে থাকবে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। এছাড়াও আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে সবচাইতে বড় সরবরাহকারী মধ্যপ্রাচ্যকে নিয়েও কথা হবে। পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার নিম্নগামিতাকে করোনাভাইরাস আরও দ্রুতগামী করেছে। পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক দুর্বলতার সময়ে আঞ্চলিক শক্তিগুলি ভূরাজনৈতিক শূণ্যস্থানগুলি পূরণ করতে এগিয়ে এসেছে। এতে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আরও প্রবল হয়েছে। এই প্রতিযোগিতার অনেকটাই মহামারির আগে থেকেই চললেও এর উপর মহামারির প্রভাব উল্লেখ করার মতো।

মহামারির মাঝেও চলেছে লিবিয়ার যুদ্ধ; যেখানে তুরস্ক হস্তক্ষেপ করে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়েছে। নাগোর্নো কারাবাখ নিয়ে আজেরবাইজান এবং আর্মেনিয়ার মাঝে চলেছে যুদ্ধ; সেখানেও তুরস্ক হস্তক্ষেপ করেছে। হিমালয়ের পাদদেশে ভারত এবং চীনের মাঝে হয়েছে সংঘর্ষ; যদিও তা পুরোদস্তর সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়নি। ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হর্ন অব আফ্রিকা’র ইথিওপিয়াতে শুরু হয়েছে গৃহযুদ্ধ। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালিতে হয়েছে সামরিক অভ্যুত্থান। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে। সৌদি গ্রুপের দেশগুলিও তুরস্কের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে যাচ্ছে। এই ঘটনাগুলির উপর মহামারির সরাসরি প্রভাব না থাকলেও পরোক্ষ প্রভাব কিছুটা হলেও ছিল।

পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ

মার্কিন ভূরাজনৈতিক চিন্তাবিদ জর্জ ফ্রীডম্যান ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স এন্ড সাসটেইনেবাল ডেভেলপমেন্ট’এর এক লেখায় বলছেন যে, মহামারির সমাধান স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাছে চাওয়া হলেও তারা সেই মুহুর্তে কোন প্রতিষেধক বা ঔষধ দিতে সক্ষম হয়নি। তদুপরি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যখন ভেন্টিলেটর, মাস্ক এবং টেস্টিং কিটের মতো জিনিসগুলি চাওয়া শুরু করলো, তখন তা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং সামাজিক ব্যবস্থাকেও চাপের মাঝে ফেলে দিলো। আর পুরো ব্যাপারটার দায় রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপর থাকার কারণে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও চাপের মাঝে পড়ে গেলো। মহামারি মারাত্মক আকার ধারণ করায় তখন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা থেকে আসা সামাজিক সমাধানকেই বেছে নেয়া হলো; যেটাকে বলা হলো লকডাউন। কিন্তু এর ফলে অর্থনীতির চাকা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলো। অর্থাৎ এই মুহুর্তে সহজলভ্য মেডিক্যাল সমাধান অর্থনৈতিক ধ্বস ডেকে আনছে। তবে জর্জ ফ্রীডম্যান বলছেন যে, অর্থনীতি স্থবির করে ফেলার ফলাফল হলো দীর্ঘমেয়াদে পুরো অর্থনীতিকেই ধ্বংস করে ফেলা। কাজেই মেডিক্যাল সমাধানের চাপ সহ্য করার জন্যে স্বল্প মেয়াদে রাজনৈতিক ব্যবস্থা থেকে দেয়া হলো অর্থনৈতিক প্রণোদনা। ফ্রীডম্যান বলছেন যে, অর্থনীতি স্থবির করে দিয়ে লকডাউনের সমাধান কোন টেকসই সমাধান নয়। জনগণকে ঘরের মাঝে আটকে থাকতে বাধ্য করলে অর্থনৈতিক, পারিবারিক, মনস্তাত্বিক এবং সামাজিক চাপে পড়ে একসময় তারা নিয়ম ভেঙ্গে বের হয়ে আসবেই। জোরপূর্বক লকডাউন বাস্তবায়নের ফলাফল হবে ভয়াবহ সামাজিক অসন্তোষ। এর ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি ছাড়াও সামাজিক সংস্থাগুলির উপর মানুষের আস্থা বিলুপ্ত হবে। মানুষের কাছে মনে হতে থাকবে যে, এর কোন সমাধান কেউ দিতে পারেনি।

‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ বা ‘আইআইএসএস’এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, করোনাভাইরাসের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রভাব শুধু ব্যাপকই ছিল না, এটা হবে সুদূরপ্রসারী। আর চীনে যখন রোগের প্রদুর্ভাব শুরু হয়, তখন অনেকেই মনে করেছিলেন যে, ‘লকডাউন’এর মতো একটা সমাধানের পথে এগুলে রোগের সংক্রমণ এড়ানো সম্ভব হবে। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেলো যে, লকডাউন পূর্ব এশিয়ার বেশ কিছু দেশে মোটামুটি কাজ করলেও ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা এবং দক্ষিণ এশিয়াতে তেমন সফল হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং ব্রাজিল মিলেই গোটা বিশ্বের মোট সংক্রমণের এক তৃতীয়াংশ হয়ে গিয়েছে।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘আটলান্টিক কাউন্সিল’এর এক বিশ্লেষণে করোনা পরবর্তী বিশ্বের একটা মলিন ছবি আঁকা হয়। সেখানে লেখা হয় যে, মার্কিন নেতৃত্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তৈরি করা বিশ্বব্যবস্থা এখন হুমকির মুখে। এই বিশ্বব্যবস্থার মাঝে রয়েছে লিবারাল গণতান্ত্রিক ভাবধারার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আইনের শাসন, মুক্ত বাজার অর্থনীতি, এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দেশগুলির মদদে গড়ে ওঠা কতগুলি আন্তর্জাতিক সংস্থা। পশ্চিমা দেশগুলির অর্থনীতি সমস্যায় পতিত হবার সাথেসাথে চীনের উত্থান হচ্ছে। এবং একইসাথে বৈশ্বিক মহামন্দার মাঝে একেকটা দেশ নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে। বৈশ্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিতে তৈরি করা সংস্থাগুলি নিজেদের ব্যর্থতাকে লুকাতে সক্ষম হয়নি। আটলান্টিকের দুই পাড়ের দেশগুলি নিজেকে বাঁচাতে তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিচ্ছে। বিশ্বে আইনের শাসন, চিন্তার স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শক্ত পদক্ষেপ নেয়া ছাড়া আর কোন গতি নেই বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র কি আসলেই সেরকম পদক্ষেপ নেবার সক্ষমতা রাখে? অন্ততঃ ২০২০এর নভেম্বরে চরম বিরোধপূর্ণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর এক বিভক্ত রাষ্ট্রকে মাথায় রেখে যুক্তরাষ্ট্র সেই সক্ষমতা কতটুকু দেখাতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

 

অর্থনৈতিক মহামন্দা এবং সামাজিক অসন্তোষ

অস্ট্রেলিয়ার থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘লোয়ি ইন্সটিটিউট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণের আগেই বিশ্ব অর্থনীতি ধুঁকে ধুঁকে চলছিল। ২০১৯ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ দশমিক ৯ শতাংশ। বেকারত্বের হার বৃদ্ধি, জিডিপির নিম্নগামিতা, ধনী দরিদ্রের বৈষম্যের ব্যাপক বৃদ্ধি, এক রাষ্ট্রের সাথে আরেক রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ব্যাপক পার্থক্য, ইত্যাদি সমস্যা বিশ্বে সামাজিক অসন্তোষ তৈরি করার ক্ষেত্র তৈরি করেই রেখেছিল। যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির মৃত্যুর পর যে ব্যাপক বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল, তার ভিতও ছিল মূলতঃ অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং মহামারির মাঝে ব্যাপক বেকারত্বের করাল গ্রাসের বহিঃপ্রকাশ। বিশ্বব্যাপী অনেক দেশেই বিক্ষোভ এবং সহিংসতার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, যেগুলির ফলাফল অঞ্চলভেদে ভিন্ন হতে পারে। গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকছে; আর একনায়কোচিত দেশগুলিতে সরকারগুলি হয়তো ক্ষমতায় টিকে থাকতে প্রতিবাদী জনগণের উপর আরও বেশি করে চড়াও হবে।

তুরস্কের আনতালিয়া বিলিম ইউনিভার্সিটির প্রফেসর তারিক ওগুজলু ‘ডেইলি সাবাহ’ পত্রিকার এক লেখায় বলছেন যে, বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বহুগুণে বেড়ে যাবার কারণেই মূলতঃ করোনাভাইরাস সারা দুনিয়াতে এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। ভাইরাসের সংক্রমণে চীনের অর্থনীতি স্থবির হবার সাথে সাথেই চীনের সাপ্লাই চেইনের উপর নির্ভরশীল দেশগুলিও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মাঝে ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতা

‘লোয়ি ইন্সটিটিউট’ বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মাঝে বাণিজ্য যুদ্ধ এবং বিশ্বায়নের বিরুদ্ধাচরণ করে জাতীয়তাবাদের উত্থান মহামারির আগে থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের একে অপরকে দোষারোপ করে দ্বন্দ্বে জড়ানোটা করোনার কারণে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে গেছে। তবে প্রতিবেদনে আরও বলা হচ্ছে যে, ২০০৮ সালে বৈশ্বিক মন্দার পরপর যুক্তরাষ্ট্র যখন নিজের অর্থনীতিকে পুনরায় দাঁড় করাতে এবং বিশ্বব্যাপী তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ জড়িয়ে ব্যস্ত ছিল, সেই সুযোগে চীন শূণ্যস্থান পূরণে মনোযোগী হয়েছিল। ঠিক একইভাবে করোনা মহামারির মাঝে পশ্চিমা শক্তিরা যখন নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত, সেসময় চীনারা দক্ষিণ চীন সাগর এবং পূর্ব চীন সাগরে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করে নিতে চাইছে। এর সমান্তরালে হংকংএর আন্দোলনকারীদের যখন চীনা সরকার জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, তখন পশ্চিমা দেশগুলি আন্দোলনকারীদের পক্ষাবলম্বণ করে চীনের সাথে দ্বন্দ্বকে আরও গভীর করছে। এর ফলশ্রুতিতে মার্কিন কোম্পানিগুলি চীন ছাড়তে শুরু করেছে এবং ফলশ্রুতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা কমছে। তবে হংকংএর আন্দোলন চীনের উইঘুর এবং তিব্বতের মতো অঞ্চলগুলিতে যেনো ছড়িয়ে না পড়ে, সেব্যাপারে চীনা সরকার যথেষ্ট সাবধান থাকতে চাইবে।

মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘হাডসন ইন্সটিটিউট’এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, করোনার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের প্রযুক্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব আরও বাড়বে। চীনারা করোনা নিয়ন্ত্রণে ‘বিগ ডাটা’, ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’, ‘ফেশিয়াল রেকগনিশন’ এবং ড্রোনের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে চীনকে প্রযুক্তিতেই শুধু এগিয়ে নেবে না, নিজ জনগণের উপর নিয়ন্ত্রণ আরও বৃদ্ধি করবে। চীনারা ‘মেইড ইন চায়না ২০২৫’ প্রকল্পের অধীনে অতি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকার উদ্দেশ্যে আরও বিনিয়োগ করবে। আর উল্টোদিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা দেশগুলি চীনের উপর প্রযুক্তিগত নির্ভরশীলতা কমাতে অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীনের সাথে দূরত্ব তৈরি করতে থাকবে। তবে মার্কিনীরা চীন থেকে তাদের শিল্পগুলিকে সরিয়ে নেবার যে ইচ্ছা ব্যক্ত করছে, তা বাস্তবায়ন করাটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে খুব সহজ হবে না। আর চীনের বড় বাজার হারিয়ে কোন কোম্পানিই নিজেদের আয় কমাতে চাইবে না।

তারিক ওগুজলু বলছেন যে, মহামারির কারণে ‘গ্লোবালাইজেশন’ বা বিশ্বায়ন হয়তো কিছুটা স্থবির হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মাঝে ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতার কারণে চীন আঞ্চলিকভাবে নিজস্ব একটা ‘বিশ্বায়ন’এর দিকে এগুবে। সাপ্লাই চেইনের মাঝে নিজেদের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ না হলে কঠিন সময়ে তা কতটা মারাত্মক হতে পারে, তা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ দেখেছে। সেই হিসেবেই তারা চাইবে পারস্পরিক একটা নির্ভরশীলতা তৈরি করতে, যাতে ভবিষ্যতে আবারও বিপদে পড়তে না হয়। চীনের আশেপাশের দেশগুলি চীনের আগ্রাসী তৎপরতাতে ভীত হলেও এটা তারা বুঝতে পারছে যে, মহামারির পর অর্থনৈতিকে পুনরায় জাগাতে চীনের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইইউএর উপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি করাটা মোটেই সমীচিন নয়। বৈশ্বিকভাবে চীনা এবং মার্কিনী মডেলের প্রতিযোগিতা হবে। স্বাস্থ্য, টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য বিমোচন, ইত্যাদি বিষয়ে এই প্রতিযোগিতা হবে। উভয় দেশই নিজেদের উন্নয়নের মডেল অন্যান্য দেশের কাছে বিক্রি করতে চাইবে। চীনের ‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা ‘বিআরআই’ আলোচনায় আসতেই থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ‘মার্শাল প্ল্যান’এর মতো কোন পরিকল্পনা নিয়ে আসতে না পারে, তাহলে চীনকে সরিয়ে দিয়ে বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রাখাটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে কষ্টকরই হবে।

এশিয়ায় ব্রিটেনের প্রত্যাবর্তন

করোনা মহামারির মাঝে ইইউ থেকে ব্রিটেনের বের হয়ে যাবার প্রক্রিয়া বন্ধ থাকেনি। ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতার সুযোগ নিতে এবং একইসাথে ব্যাপক অর্থনৈতিক মন্দা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে ব্রিটেন ইইউএর গন্ডি থেকে বের হয়ে বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চাইছে। ব্রিটেনের থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘চ্যাটহ্যাম হাউজ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ব্রেক্সিট পরবর্তী ব্রিটেন ইন্দোপ্যাসিফিককে আরও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর ইন্দোপ্যাসিফিকের জন্যে নতুন একজন ডিরেক্টর জেনারেল নিয়োগ দিচ্ছে। একইসাথে ব্রিটেন তার ইন্দোপ্যাসিফিক কৌশলকে একটা ‘ফ্রেমওয়ার্ক’এর মাঝে সাজাচ্ছে। এশিয়াতে সামরিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার জন্যে ব্রিটিশ সরকার সামরিক বাজেট বৃদ্ধি করেছে। এই সামরিক অবস্থানের মূল কেন্দ্রবিন্দু ভারত মহাসাগর ও মধ্যপ্রাচ্য হলেও তা দক্ষিণ চীন সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।

 

মধ্যপ্রাচ্যে দ্বন্দ্ব এবং তেলের বাজারে অস্থিরতা

‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ বা ‘আইআইএসএস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মহামারি ঘোষণা করার ঠিক আগে আগেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কুদস ফোর্সের জেনারেল কাসেম সুলাইমানিকে ড্রোন হামলায় হত্যা করে। এছাড়াও লেবানন এবং ইরাকের রাস্তায় হাজারো মানুষের বিক্ষোভ গোটা অঞ্চলকে অস্থির করে রেখেছিলো আরও আগ থেকেই। শাসন ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং নিম্নগামী অর্থনীতি মানুষকে রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছিলো। এছাড়াও সিরিয়া, ইয়েমেন এবং লিবিয়ার যুদ্ধও চলমান ছিলো। আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় ইরানের সাথে সৌদি আরব এবং তুরস্কের সাথে আমিরাতের দ্বন্দ্ব বেড়েই চলছিল। ইরান এবং তুরস্ক উভয়েই আঞ্চলিকভাবে তাদের প্রভাব বিস্তারে ব্যাপকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। তবে একইসাথে তেলের বাজারে দরপতনের কারণে তেল রপ্তানির উপর নির্ভরশীল ধনী দেশগুলির অর্থনীতি যেমন ধাক্কা খেয়েছে, তেমনি এই দেশগুলিতে মানবসম্পদ রপ্তানির উপর নির্ভরশীল দেশগুলিও সমস্যায় পতিত হয়েছে। আর অর্থনৈতিক দৈন্যতা ও অব্যাবস্থাপনার ফলশ্রুতিতে শাসকশ্রেণীর উপর জনগণের আক্রোশ বেড়েই চলেছে। এরকম একটা পরিস্থিতিতে করোনাভাইরাসের আবির্ভাব পুরো অঞ্চলের ভূরাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

‘লোয়ি ইন্সটিটিউট’ বলছে যে, করোনা মহামারি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধ এবং ভাইরাসের চাপে পড়ে ইরান হয়তো আঞ্চলিকভাবে আরও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। এতে সৌদি গ্রুপের দেশগুলির সাথে যেমন ইরানের সংঘাত বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হবে, একইসাথে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইস্রাইলও এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে।

‘ইউনিভার্সিটি অব ডেনভার’এর এর প্রফেসর হায়দার খান ‘আল জাজিরা’তে এক লেখায় বলছেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের ব্যাপক দরপতনের সময় রাশিয়া নিজেকে বেশ ভালোই মানিয়ে নিয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে রাশিয়া নিজের অর্থনীতিকে বেশ কিছুটা বহুমুখীকরণ করে নিয়েছে। তেলের মূল্য কমে যাবার কারণে আমদানিকারক হিসেবে চীন বেশ লাভবান হয়েছে। অপরদিকে করোনার কারণে স্বাস্থ্য এবং অর্থনীতিতে ব্যাপক বিপর্যয়ের কারণে তেলের বাজার নিয়ে প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলশ্রুতিতে অর্থনৈতিক এবং ভূরাজনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিম্নগামিতা গতিশীল হতে পারে এবং চাপের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা ঢুকে পড়তে পারে। চীনকে নিয়ন্ত্রণ করতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি প্রদর্শনের সিদ্ধান্তগুলি সংঘাতের সম্ভাবনাকে বাড়িতে দিতে পারে।

 

উদ্দেশ্যবিহীন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং জাতীয়তাবাদের উত্থান

‘হাডসন ইন্সটিটিউট’ বলছে যে, করোনাভাইরাস ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অস্তিত্বকেই হুমকির মাঝে ফেলে দিচ্ছে। ইইউ তৈরি হয়েছিল এমন একটা সমঝোতার মাঝ দিয়ে, যার মাধ্যমে ইউরোপের এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতে কোন ঝামেলা থাকবে না। সদস্য দেশগুলি এটা মেনে নেবে কারণ এর বিনিময়ে তারা ইইউএর অন্য দেশগুলির বাজারে কোন বাধা ছাড়াই ঢুকতে পারবে। কিন্তু বর্তমান ইইউএর মূল সমস্যা হলো জনগণের আনুগত্য ইইউএর প্রতি নয়, বরং তাদের নিজ দেশের প্রতি। যতদিন ইইউ তার সদস্য দেশগুলিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখাতে পেরেছে, ততদিন তারা ইইউএর সদস্য থাকার পিছনে শক্তিশালী কারণ পেয়েছে। তবে সিরিয়া, লিবিয়া ও মালির যুদ্ধের ফলে ইউরোপে শরণার্থীর ঢল এবং অর্থনৈতিক মহামন্দায় ইইউএর অস্তিত্ব প্রশ্নের মাঝে পড়েছে। উত্তর এবং দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলির মাঝে বৈষম্য সকলের সামনে উপস্থাপিত হয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে ইউরোপ জুড়ে ডানপন্থী জাতীয়তাবাদীদের উত্থান পরিলক্ষিত হচ্ছে, যারা বর্তমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলছে। ইউরোপের দেশগুলিতে রাজনৈতিক দলগুলি জনগণের ভোট পেতে জাতীয়তাবাদকেই ব্যবহার করবে। তারা সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে ইউরোপিয় সমাধান নয়; জাতীয় সমাধানের পথ খুঁজবে। মহামারি ব্যবস্থাপনায় ইইউএর দুর্বল পদক্ষেপগুলি জনগণের কাছে ইইউএর চিন্তাটাকে অবান্তর করে তুলবে। আর করোনাভাইরাসের কারণে মার্কিন অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির উপর নির্ভরশীল ইউরোপের অর্থনীতি, বিশেষ করে জার্মানির অর্থনীতি, চাপের মুখে পড়বে।

জর্জ ফ্রীডম্যান আরও ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন যে, মহামারির সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে ইউরোপের জনগণ তাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের দিকেই তাকাবে; কারণ সেই নেতৃবৃন্দের তাদের জনগণের প্রতি একটা দায়বদ্ধতা রয়েছে। ব্রাসেলসের ইইউ নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে জনগণ এই সমস্যার সমাধান আশা করে না। জাতীয় দুর্যোগের সময় জনগণের কাছে জাতীয় পরিচয় এবং স্বশাসনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর সেকারণেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি জাতীয় নেতৃবৃন্দই নিচ্ছে; ইইউ নিচ্ছে না। যদিও ইইউএর সব দেশেই মহামারি ছড়িয়ে পড়েছে, তথাপি তারা নিজেদের জান মালের নিরাপত্তা দিতে অন্য দেশের সাথে সীমানা আটকে রাখার পথেই এগিয়েছে। এক্ষেত্রে ইইউএর সীমানাবিহীন চিন্তা কাজ করেনি। একটা জোট কতটা ভালোভাবে কাজ করছে, তা বুঝতে হলে দেখতে হবে তারা খারাপ সময়ে কিভাবে কাজ করে। কঠিন সময়ে ইউরোপের দেশগুলি নিজেদের স্বার্থকেই প্রথমে দেখেছে; তারপর অন্যের স্বার্থ দেখেছে। নিজ ভাষা, ইতিহাস এবং বিশ্বাসের মাঝেই ইউরোপিয় দেশগুলি নিজেদের গন্ডিকে সীমাবদ্ধ করেছে। বাকিরা সবসময়ই কম প্রাধান্য পেয়েছে। ইইউ তৈরি হয়েছিল এই দেয়ালগুলি ভেঙ্গে ফেলার জন্যে; তা সফল হয়নি। ইউরোপিয়ান পরিচয় তৈরি করার চেষ্টাটা যতটা সফল হবে বলে ভাবা হয়েছিল, তা হয়নি।

ফ্রীডম্যান শুধু ইইউএর মাঝেই দেয়াল তোলার কথা বলেননি। তিনি বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের একটা রাজ্য আরেকটা রাজ্যের সাথে প্রায় একই ধরণের ব্যবহার করেছে। যেমন টেক্সাসের গভর্নর পার্শ্ববর্তী লুইজিয়ানা রাজ্যের সাথে যাতায়াত বন্ধ করে দিয়েছিল, কারণ টেক্সাসের চাইতে লুইজিয়ানায় সংক্রমণ বেশি ছিল তখন। কিন্তু লুইজিয়ানার সাথে সীমানা বন্ধ করেও টেক্সাস তার সংক্রমণ থামাতে পারেনি। ফ্রীডম্যান বলছেন যে, দেয়াল তুলে দেয়ার ব্যাপারটা ইউরোপের একার নয়। তবে ইউরোপের ক্ষেত্রে এর পিছনে একটা লম্বা ইতিহাস রয়েছে। এক দেশ আরেক দেশের সাথে যুদ্ধ করেছে; সর্বদা সংঘাতের ভয় তাদের গ্রাস করেছে। টেক্সাস এবং লুইজিয়ানার মাঝে মনোমালিন্য খুব বেশিদূর হয়তো যাবে না; তবে ইইউএর সদস্য দেশগুলির জন্যে এই বিভেদ মারাত্মক। একইসাথে মার্কিনীদের চোখে বাকি বিশ্বের প্রতি অবিশ্বাসও হবে মারাত্মক। বৈশ্বিক সংস্থাগুলির উপর মানুষের আস্থাটাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

Monday, 5 October 2020

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ধ্বস কি আসন্ন?

০৫ই অক্টোবর ২০২০

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা পশ্চিমা চিন্তার একটা গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ মুক্ত বাজারের সাইনবোর্ড। সারা বিশ্বকে একটা মুক্ত বাজারের অধীনে আনার যে লক্ষ্য নিয়ে ‘ডব্লিউটিও’র যাত্রা শুরু, ২৫ বছর পর সেই লক্ষ্য অবাস্তব ঠেকছে। জাতিরাষ্ট্রগুলির নিজস্ব স্বার্থকে পেরিয়ে সংস্থার আইনগুলিকে প্রাধান্য দেবার জন্যে কেউই প্রস্তুত নয়; এমনকি সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রও। আর করোনাভাইরাসের মহামারি এবং মহামন্দার মাঝে জাতিরাষ্ট্রগুলিও ক্রমেই আরও রক্ষণশীল হচ্ছে; দূরে চলে যাচ্ছে সংস্থার প্রাথমিক লক্ষ্য মুক্ত বাজার।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন’ বা ‘ডব্লিউটিও’এর নতুন ডিরেক্টর জেনারেল নির্বাচন চলছে। বিদায়ী ডিরেক্টর জেনারেল ব্রাজিলের নাগরিক রবার্তো আজেভেদো তার মেয়াদ শেষের এক বছর আগেই পদত্যাগ করার কারণে নির্বাচনী কর্মকান্ড আগেভাগেই শুরু করতে হয়েছে। ১৮ই সেপ্টেম্বর পাঁচজন প্রার্থী প্রাথমিক নির্বাচনে সামনে এসেছেন; এরা হলেন কেনিয়ার মন্ত্রী আমিনা মোহামেদ, নাইজেরিয়ার প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী নগোজি ওকোঞ্জো ইওয়েআলা, দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী ইয়ু মিউংহি, সৌদি আরবের মোহাম্মদ আল তুওয়াইজরি এবং ব্রিটেনের প্রাক্তন মন্ত্রী লায়াম ফক্স। ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’ বলছে যে, সৌদি আরব আর ব্রিটেনের প্রার্থীরা প্রথম রাউন্ডের পরেও টিকে যাবেন, এটা অনেকেই ভাবেনি। তিনজন প্রার্থী বাদ পড়েছেন; যারা হলেন মেক্সিকোর জিসাস সীদ, মিশরের হামাদ মামদুহ এবং মলদোভার তুদর উলিয়ানভশি। ২৪শে সেপ্টেম্বর থেকে ৬ই অক্টোবর পর্যন্ত দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে সংস্থার ১’শ ৬৪টা সদস্য দেশ ভোট দিয়ে প্রার্থীর সংখ্যা দুইয়ে নামিয়ে নিয়ে আসবে। সংস্থা বলছে যে, নভেম্বরের শুরুতেই তারা নতুন ডিরেক্টর জেনারেল নির্বাচিত করে ফেলতে চাইছেন। সংস্থাটা ভূরাজনীতিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝার জন্যে এটাই যথেষ্ট যে, কেউ কেউ মনে করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের ৩রা নভেম্বরের নির্বাচনের কারণে সংস্থার ডিরেক্টর জেনারেল নিয়োগের সময়সীমা বৃদ্ধি পেতে পারে। ‘রয়টার্স’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, যে-ই ডিরেক্টর জেনারেল হোন না কেন, তার জন্যে বেশ কঠিন সময় অপেক্ষা করছে; বিশেষ করে করনাভাইরাসের মহামারি এবং বিশ্বব্যাপী মহামন্দার মাঝে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সকলেই রক্ষণশীল আচরণ করছে। আর বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মাঝে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা চরম আকার নিয়েছে, যেখানে বাণিজ্য যুদ্ধ একটা গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সংস্কারের দাবি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে জেঁকে ধরেছে। অনেকেই ডিরেক্টর জেনারেল নির্বাচন নিয়ে কথা বললেও এটা সংস্থার মূল চ্যালেঞ্জ নয়। বরং চ্যালেঞ্জগুলি এতটাই জটিল যে, তা সংস্থার ভবিষ্যৎকেই হুমকির মাঝে ফেলে দিয়েছে। এই হুমকিকে বুঝতে সংস্থার ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিশ্বব্যাপী মুক্ত বাজার তৈরি করতে ১৯৪৭ সালে ‘জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফস এন্ড ট্রেড’ বা ‘জিএটিটি’ বা ‘গ্যাট’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ২৩টা দেশ এর সদস্য ছিল। আর এই সংস্থা কার্যক্রম চালিয়ে যায় ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত; ১৯৯৫ সালে ‘উরুগুয়ে রাউন্ড’ আলোচনা শেষে ১’শ ২৩টা দেশের সমন্বয়ে ‘ডব্লিউটিও’ গঠন করা হয়। ‘গ্যাট’এর সদস্যরাষ্ট্রগুলি যে আইনের মাঝে ছিল, সেই আইন ‘ডব্লিউটিও’র মাঝেও চালিয়ে নেয়া হয়েছে। কিন্তু সদস্যরাষ্ট্রগুলির মাঝে বাণিজ্যের দ্বন্দ্ব থামানো যায়নি। ১৯৯৫ সালের পর থেকে দ্বন্দ্বের কারণে সংস্থার আইনে কোন পরিবর্তনই আনা সম্ভব হয়নি। যেকারণে সদস্যদের মাঝে দ্বন্দ্ব নিরসনে আপিল বডি অনেক বেশি হারে আইনের ‘ব্যাখ্যা’র আশ্রয় নিয়েছে। বড় অর্থনীতির দেশগুলি নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্যেই সংস্থাকে ব্যবহার করতে চেয়েছে; যেকারণে সংস্থার ২৫ বছরের ইতিহাস শুধুই সংঘাতে পরিপূর্ণ। বিশেষ করে ২০০১ সালে চীনকে সংস্থার সদস্য করে নেবার পর থেকে এই দ্বন্দ্ব নতুন গতি পেয়েছে। সংস্থার সদস্য হবার জন্যে চীনকে অন্যদের তৈরি আইন মেনে নিতে হয়েছে; মেনে নিতে হয়েছিল বেশকিছু শর্তও, যেগুলি পশ্চিমা আদর্শের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে বাকস্বাধীনতা এবং মানবাধিকার বিষয়ে ছাড়া দেবার বিষয়ে বলা হয়। তবে আইনের ফাঁকফোঁকড়ে আটকে যায় সেসব বিষয়; ‘যুক্তিসঙ্গত সময়’এর সংজ্ঞার ব্যাপারে কেউই একমত হতে পারেনি। এই শর্তগুলি চীন কতদিনে এবং কিভাবে পূরণ করবে, তা এখনও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের বিভেদের কারণ।

 

নিজের স্বার্থের বিপক্ষে গেলেই যুক্তরাষ্ট্র সংস্থার আপিল বডির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আর সংস্থার আইনগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা যুক্তির অভাব হয়নি। চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে ‘ডব্লিউটিও’ অনেক ক্ষেত্রেই অর্থহীন হয়ে পড়েছে।


যুক্তরাষ্ট্র বনাম ‘ডব্লিউটিও’

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ কর্মকান্ডগুলির মাঝে একটা হলো সদস্যরাষ্ট্রগুলির মাঝে বাণিজ্যিক বিরোধের নিষ্পত্তি করা। দ্বন্দ্ব নিরসণের পদ্ধতির মাঝে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘এপেলেইট বডি’ বা আপিল বডি। এতে সাতজন সদস্য থাকার কথা রয়েছে, যারা মূলতঃ বিচারক। চার বছর মেয়াদে নিয়োগ পাওয়া এই সদস্যারা সর্বোচ্চ দুইবার সদস্যপদ পেতে পারেন। সংস্থার নিয়মানুসারে সদস্যদের ‘স্বাধীনভাবে’ সিদ্ধান্ত দিতে পারার শর্ত রয়েছে। তাদের রিপোর্টের উপর ভিত্তি করেই সংস্থার দ্বন্দ্বগুলি নিরসন হয়ে আসছে। তবে আপিল বডির ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ রয়েছে। ২০১১ সালে বারাক ওবামা হোয়াইট হাউজে থাকার সময় আপিল বডির সদস্য জেনিফার হিলম্যানের পুনরায় নিয়োগ পাওয়া বন্ধ করে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। নিয়মানুসারে সদস্য যদি তার পদে বহাল থাকতে ইচ্ছুক থাকেন, তবে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরায় নিযুক্ত হয়ে যাবেন। তবে হিলম্যানের ক্ষেত্রে কোন কারণ উল্লেখ না করেই ভেটো দেয় যুক্তরাষ্ট্র। মজার ব্যাপার হলো, হিলম্যান একজন মার্কিন নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অনাস্থা এসেছিল। আর একইসাথে কোন কারণ না দেখাবার ফলে ‘ডব্লিউটিও’র ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে অনেকেই স্বেচ্ছাচারিতা হিসেবে দেখতে শুরু করে। আবার আপিল বডির ‘স্বাধীনতা’র ব্যাপারেও সন্দেহ দেখা দেয়। হিলম্যানের এই ঘটনার পর একই রকম ব্যাপার ঘটে কোরিয়ার নাগরিক সিউং হোয়া চ্যাংএর ক্ষেত্রেও। ২০১৬ সালে তার দ্বিতীয় দফা নিয়োগের ক্ষেত্রে ভেটো দেয় যুক্তরাষ্ট্র। তবে এবার জানা যায় যে, তিনটা রুলিং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়েছে, যেখানে চ্যাং ছিলেন তিন সদস্যের আপিল কমিটির চেয়ারম্যান। মার্কিন প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত মাইকেল পাঙ্কএর কথায়, এই রুলিংগুলির প্রথমটা ছিল চীনের ১৭টা পণ্যের উপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশোধমূলক শুল্কারোপ; চীন এক্ষেত্রে আপিল জিতেছিল। দ্বিতীয়টা ছিল চীনা পণ্যের উপর যুক্তরাষ্ট্রের এন্টি ডাম্পিং শুল্কারোপ। আর তৃতীয়টা ছিল আর্জেন্টিনা এবং পানামার মাঝে পণ্য এবং সার্ভিসের উপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ছিল তৃতীয় পক্ষ। যুক্তরাষ্ট্র বলে যে, আর্জেন্টিনা যেভাবে পানামার বিপক্ষে মামলা জিতেছে, তা সংস্থার আইনের সাথে যায় না। মাইকেল পাঙ্ক আরও বলেন যে, সংস্থার আইনকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘আইন তৈরি’ করার এখতিয়ার নেই আপিল বডির। তিনি আরও ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, প্যানেল জুরি যদি আইনী জটিলতার কারণে কোন ইস্যুর সমাধান দিতে না পারে, তাহলে আপিল বডির উচিৎ নয় সেটার সমাধান করতে যাওয়া। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যখন কোন বাণিজ্য দ্বন্দ্ব নিয়ে দুই পক্ষের লড়াই শুরু হয়, তখন প্রথমেই প্যানেল জুরির সামনে শুনানি হয়। এই প্যানেল হলো এড হক প্রকৃতির; একেকটা বিশেষ সমস্যার জন্যে একেকটা বিশেষজ্ঞ প্যানেল তৈরি করা হয় এবং রিপোর্ট দেয়া শেষে প্যানেল ভেঙ্গে দেয়া হয়। এই রিপোর্ট পাঠানো হয় আপিল বডির কাছে। লিখিত বক্তব্যে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি টিম রাইফ বলেন যে, ওবামা প্রশাসন সংস্থার আইনকে সমুন্নত রাখা ছাড়াও মার্কিন কর্মী, কৃষক এবং ব্যবসায়ীদের স্বার্থকে তুলে ধরবে। আরও বলা হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রের মাঝে আলোচনার মাধ্যমে যে আইনগুলি তৈরি করা হয়েছে, সেগুলি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অধীন আপিল বডি নিজেদের মতো করে পরিবর্তন করে নিতে পারে না।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় পশ্চিমা এক দেশের প্রতিনিধি অভিযোগ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সিদ্ধান্তের ফলে আপিল বডির সদস্যদের কাছে এই বার্তা গেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে রুলিং না গেলে চাকুরি খোয়াতে হবে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা দ্বন্দ্ব নিরসনে কি সিদ্ধান্ত দেবে, তা নির্ধারণ করবে যুক্তরাষ্ট্র। ওবামা প্রশাসনের পদক্ষেপ ট্রাম্প প্রশাসন আরও একধাপ এগিয়ে নেয়। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র মরিশাসের নাগরিক শ্রী বাবু চেকিতান সেরভাসিংএর পুনরায় নিয়োগে ভেটো দিলে মাত্র তিনজন সদস্য অবশিষ্ট থাকে। আপিল বডিতে যেকোন শুনানি হতে হলে কমপক্ষে তিনজন সদস্য থাকতে হবে। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, সংস্থার ৬৭টা সদস্য রাষ্ট্র ওয়াশিংটনের কাছে পিটিশন দেয়, যাতে যুক্তরাষ্ট্র তার ভেটো তুলে নেয়। আপিল বডির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যে অভিযোগগুলি রয়েছে, তার মাঝে প্রধান হলো বিশেষজ্ঞ প্যানেলের দেয়া রিপোর্ট আপিল বডি অনেক ক্ষেত্রেই পরিবর্তন করে অথবা পুরোপুরি উল্টিয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র বলছে যে, এই কাজ করার ক্ষমতা আপিল বডির নেই। মার্কিনীরা আরও বলছে যে, সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী ৯০ দিনের মাঝে আপিল বডির কাজ শেষ হবার কথা থাকলেও সকল ক্ষেত্রেই আপিল বডির হস্তক্ষেপে রুলিংএ দেরি হয়। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র বলছে যে, সংস্থার আইনে ফাঁকফোঁকড় থাকার কারণে আপিল বডির সদস্যরা নিজেদের মতো করে রুলিং দিচ্ছেন, যা কিনা নতুন আইন হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে। তারা সদস্য রাষ্ট্রগুলির নিজস্ব আইনের ব্যাখ্যাও দিচ্ছেন নিজেদের মতো করে। আপিল বডির সদস্যরা সংস্থার আইন নতুন করে তৈরি করে দিতে পারেন না। আইনের যে জায়গাটাতে যুক্তরাষ্ট্র বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে তা হলো ‘যুক্তিসংগত সময়’। রুলিংএর সময় কোন সদস্য রাষ্ট্রকে সংস্থার আইন মানার জন্যে ‘যুক্তিসংগত সময়’ বেধে দেয়ার কথা থাকলেও এই ‘যুক্তিসংগত সময়’ আসলে কত, তা নিয়ে একেকজনের ভাবনা একেক রকম। এই বেধে দেয়া সময়ের মাঝে কেউ যদি আইন বাস্তবায়ন না করে, তাহলেও তার বিরুদ্ধে তেমন কোন কিছুই করার নেই সংস্থার। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র বলছে যে, সংস্থার আইন যদি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কোন অবস্থাতেই সেই আইন বাস্তবায়ন করবে না। আগের প্রশাসনগুলির মতো চাপা না থেকে ট্রাম্প প্রশাসন এক্ষেত্রে একেবারে রাখঢাক না রেখেই বলছে যে, আপিল বডির সদস্যরা অন্য দেশের হবার কারণে তারা অন্য দেশের স্বার্থ দেখে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ নয়। সংস্থায় একটা অলিখিত নিয়ম ছিল যে, আপিল বডির সাতজন সদস্যের মাঝে একজন করে আসবেন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং জাপান থেকে। বাকি সকল রাষ্ট্রের জন্যে থাকবে বাকি চারটা আসন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যখন আমেরিকান নাগরিককেই সদস্য পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে, সংস্থার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হিমসিম খাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

 

সংস্থার আপিল বিভাগের কর্মকান্ড পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় ২০১৯এর ডিসেম্বরে; যখন শেষ তিনজন সদস্যের মাঝে দুইজনের মেয়াদ শেষ হয়ে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের পুনরায় নিয়োগের ব্যাপারে ভেটো দেয়। খুব সম্ভবতঃ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মৃত্যুর শুরু এখানেই। আম্পায়ার ছাড়া খেলা চলতেই পারে; কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ জানে যে, আম্পায়ার ছাড়া খেলায় সমস্যা হবেই।


বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার উপসংহার?

আসলে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আইনের তোয়াক্কা করেনি কোনদিনই। জেনেভার ‘থার্ড ওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্ক’এর চক্রবর্তী রাঘাবন মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার দ্বন্দ্ব নিরসনের বেশিরভাগ রুলিং বাস্তবায়ন না করার বিশেষ রেকর্ড রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। এর মাঝে বেশিরভাগই হলো যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এন্টি ডাম্পিং শুল্ক এবং পাল্টা শুল্ক আরোপের ব্যাপারে রুলিং। অনেক আমদানির ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র রপ্তানিকারকের খরচকে কম হিসেব করে এন্টি ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে যে, আপিল বডির রুলিং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আইনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলেই তারা এগুলির বাস্তবায়ন করেনি।

সংস্থার আপিল বিভাগের কর্মকান্ড পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় ২০১৯এর ডিসেম্বরে; যখন শেষ তিনজন সদস্যের মাঝে দুইজনের মেয়াদ শেষ হয়ে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের পুনরায় নিয়োগের ব্যাপারে ভেটো দেয়। ‘ডয়েচে ভেলে’র সাথে কথা বলতে গিয়ে লন্ডনের ‘বেরেনবার্গ ব্যাঙ্ক’এর প্রধান অর্থনীতিবিদ হোলগার শ্মাইডিং বলেন যে, খুব সম্ভবতঃ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মৃত্যুর শুরু এখানেই। আম্পায়ার ছাড়া খেলা চলতেই পারে; কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ জানে যে, আম্পায়ার ছাড়া খেলায় সমস্যা হবেই। ‘দ্যা ইকনমিস্ট’ বলছে যে, সংস্থার রেফারি চলে যাবার সাথে সাথে এর আলোও নিভে যাচ্ছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র সংস্থাকে দুর্বল করতে চাইলেও আরেক পক্ষ চাইছে এটাকে টিকিয়ে রাখতে। ২০১৮ সালের অক্টোবরে সংস্থার সংস্কারের লক্ষ্যে একটা আলোচনার আয়োজন করে কানাডা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনকে আমন্ত্রণই জানানো হয়নি। গত বছরের নভেম্বরে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় নিউজিল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত ডেভিড ওয়াকার আপিল বডিকে নিয়ে কিছু প্রস্তাব দেন। তার লক্ষ্য ছিল আপিল বডির কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং যুক্তরাষ্ট্র যা যা চেয়েছে, সেগুলি মেনে নেয়া। তার প্রস্তাবগুলির মাঝে ছিল, আপিল বডির সিদ্ধান্ত ৯০ দিনের মাঝে দেবার ব্যাপারটা নিশ্চিত করা; আপিল বডির সদস্যরা যেন নিজেদের উপর অর্পিত ক্ষমতার বাইরে গিয়ে কোন ধরনের উপদেশ দিতে না যান; পূর্বের দেয়া আপিল বডির রুলিংকে যেন তারা আইনের উদাহরণ হিসেবে না নেন; আর তারা যেন খেয়াল রাখেন যে সদস্য দেশগুলির উপর তারা যেন সংস্থার ১৯৯৫ সালের আইনের বাইরে নতুন কোন বাধ্যবাধকতা আরোপ না করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ওয়াকারের প্রস্তাবের সমর্থন রয়েছে। মার্কিন থিঙ্কট্যাংক ‘কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন্স’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের উচিৎ ওয়াকারের চিন্তাগুলিকেই পুঁজি করে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আপিল বডিকে টিকিয়ে রাখা; নাহলে তা শুধু আপিল বডিকেই না, পুরো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এবং বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য ব্যবস্থাকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে। শিকাগোভিত্তিক আইন বিষয়ক কোম্পানি ‘বেকার ম্যাকেঞ্জি’ বলছে যে, ইতোমধ্যেই ইউরোপ এবং কানাডা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আপিল বডির বিকল্প খুঁজতে শুরু করেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন দ্বিপাক্ষিক দিকটাকে প্রাধান্য দিয়ে কানাডা এবং নরওয়ের সাথে আলোচনায় আপিল বডির মতোই একটা ব্যবস্থা নিজেরা তৈরি করে নিতে চাইছে। ওয়াকারের প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্রের দুশ্চিন্তাগুলি সমাধানের চেষ্টা করা হলেও তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যথেষ্ট মনে হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ছোটখাটো কোন পরিবর্তন চাইছে না; বরং পুরো সংস্থাটার আমূল পরিবর্তন করতে চাইছে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা পশ্চিমা চিন্তার একটা গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ মুক্ত বাজারের সাইনবোর্ড। সারা বিশ্বকে একটা মুক্ত বাজারের অধীনে আনার যে লক্ষ্য নিয়ে ‘ডব্লিউটিও’র যাত্রা শুরু, ২৫ বছর পরেও সেই লক্ষ্য অবাস্তব ঠেকছে। জাতিরাষ্ট্রগুলির নিজস্ব স্বার্থকে পেরিয়ে সংস্থার আইনগুলিকে প্রাধান্য দেবার জন্যে কেউই প্রস্তুত নয়; এমনকি সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রও। নিজের স্বার্থের বিপক্ষে গেলেই যুক্তরাষ্ট্র সংস্থার আপিল বডির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আর সংস্থার আইনগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা যুক্তির অভাব হয়নি। চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে ‘ডব্লিউটিও’ অনেক ক্ষেত্রেই অর্থহীন হয়ে পড়েছে। আর করোনাভাইরাসের মহামারি এবং মহামন্দার মাঝে জাতিরাষ্ট্রগুলিও ক্রমেই আরও রক্ষণশীল হচ্ছে; দূরে চলে যাচ্ছে সংস্থার প্রাথমিক লক্ষ্য মুক্ত বাজার। শুধু তা-ই নয়, এর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই সন্দিহান হয়ে পড়েছেন। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার এহেন করুণ অবস্থা পুঁজিবাদী আদর্শের উপর একটা কঠিন আঘাত হিসেবেই এসেছে।