Saturday, 1 October 2022
অর্থনৈতিক দৈন্যতা জার্মানদেরকে ইউক্রেনের শরণার্থীদের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করাচ্ছে
গত ২৭শে সেপ্টেম্বর জার্মান ‘ফেডেরাল স্ট্যাটিসটিক্যাল অফিস’ বলে যে, জার্মানির জনসংখ্যা ২০২২ সালে রেকর্ড সংখ্যক বেড়েছে। এর কারণ ছিল ইউক্রেন থেকে শরণার্থীর ঢল। বর্তমানে দেশটার জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ৪০ লক্ষের বেশি। শরণার্থীদের কারণে জার্মানির জনসংখ্যা ২০২২ সালের প্রথম ছয় মাসে ৮ লক্ষ ৪৩ হাজার বা ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২১ সালের পুরো বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল মাত্র ৮২ হাজার। যুদ্ধের আগে সরকারি হিসেবে জার্মানিতে ইউক্রেনিয়দের সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় লক্ষ। যুদ্ধ শুরুর পর প্রায় ৯ লক্ষ ৭১ হাজার নতুন শরণার্থীকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, এর আগে ১৯৯২ সালে সাবেক যুগোশ্লাভিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় শরণার্থীদের চাপে জার্মানির জনসংখ্যা ৭ লক্ষ বৃদ্ধি পেয়েছিল। আবার ২০১৫ সালে সিরিয় শরণার্থীর ঢলে দেশটার জনসংখ্যা আরও প্রায় ১০ লক্ষ বৃদ্ধি পায়। আর ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝে ইউক্রেন সরকার বেশিরভাগ পুরুষ মানুষকে দেশ ছাড়তে অনুমতি না দেয়ায় জার্মানিতে বেশিরভাগ ইউক্রেনিয় শরণার্থীই হলো নারী ও শিশু। তবে শরণার্থীদের ঢল আসার আগেই জার্মানি শুধু ইউরোপের সবচাইতে ধনীর দেশই ছিল না; সেখানে জন্মহার ছিল অত্যধিক কম এবং অল্প বয়সের মানুষের সংখ্যাও ছিল অপেক্ষাকৃত অনেক কম। তাই জার্মানির অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যে কর্মঠ অপেক্ষাকৃত অল্প বয়সের মানুষের চাহিদা তৈরি হয়েছিল।
জার্মানিতে শরণার্থীদের নিয়ে সমস্যা বাড়ছে
জার্মানির পশ্চিমের আখেন শহরের ২০ কিঃমিঃ দূরে ছোট একটা এলাকার চিত্র তুলে ধরে ‘ডয়েচে ভেলে’। ৫০ হাজার জনসংখ্যার এই ছোট্ট শহরে প্রতি বছর ৫০ থেকে ৬০ জন করে শরণার্থী গ্রহণ করা হয়। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কয়েক মাসের মাঝেই সেখানে ৫’শ ৩০ জন শরণার্থী হাজির হয়েছে। এর বাইরেও আরও ২০টা দেশের ৮’শ ৫০ জন শরণার্থীকে সেখানে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শহরের খেলাধূলার জিমনেসিয়াম এবং হল রুমে পার্টিশনের ব্যবস্থা করে শরণার্থীদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একসময় অনেকেই নিজেদের বাড়িতে শরণার্থীদের থাকতে দিলেও এখন কেউ অগ্রগামী হচ্ছে না। কারণ জ্বালানির মূল্য এতটাই বেড়ে গেছে যে, তারা মনে করছে যে, শরণার্থীদের নিলে তাদের দৈনন্দিন খরচ সক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। শরণার্থীদের মাঝে কেউ কেউ কাজ যোগাড় করতে পারলেও অনেকেই এখনও পারেনি। সাহায্যকারীরা খুবই ব্যস্ত সময় পার করছে। তারা শরণার্থীদের জন্যে ফর্ম পূরণের কাজ ছাড়াও তাদের জন্যে ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করছে; তাদের থাকার জন্যে জায়গা খুঁজে দিচ্ছে; এমনকি তাদের সন্তানদের দেখাশুনা এবং তাদেরকে রান্না করার শিক্ষাও দিচ্ছে।
আখেন শহরের মেয়রও ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন যে, তার শহরে এখন আর কোন শরণার্থী রাখার ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। সেখানে ৪ হাজার ইউক্রেনিয় শরণার্থী রাখার পর সকল যায়গা ফুরিয়ে গেছে; যার মাঝে ৮টা জিমনেসিয়াম হলও রয়েছে। আখেন শহরে যুদ্ধের আগেই ইউক্রেনিয়দের একটা বড়সড় গ্রুপ বসবাস করতো; এরা অনেকেই শরণার্থীদেরকে তাদের বাড়িতে থাকতে দিয়েছে। ২০১৬ সালে সিরিয়া এবং আফ্রিকা থেকে আসা ১’শ ২০ জন শরণার্থীর জন্যে শহরের খেলার মাঠে অস্থায়ী বাড়ি তৈরি করা হয়। এই বাড়িগুলি পুরোনো হলেও সেখানে একান্তভাবে বসবাসের সুযোগ থাকায় সকলেই তেমন বাড়ি চায়। শহরের খালি বাণিজ্যিক জায়গাগুলিকে ব্যবহার করে শরণার্থীদেরকে জিমনেসিয়াম থেকে সরিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। কারণ সকলেই এখন বুঝতে পারছে যে, যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হবে। শরণার্থীদের সন্তানদের জন্যে শিক্ষা এবং অন্যান্য সেবার ব্যবস্থাও করতে হবে। কিন্তু এই সেবা পেতে এখন শরণার্থীরা সাধারণ জার্মান নাগরিকদের সাথে প্রতিযোগিতা করছে। ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর জন্যে আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থা করা ছাড়া কোন গতি নেই; নাহলে শান্তিশৃংখলা ব্যাহত হতে পারে। সাহায্যকারীরা বলছেন যে, বেশিরভাগ বাড়িওয়ালাই শরণার্থীদের কাছে বাড়ি দেয়ার কথা শুনলে ফোন রেখে দিচ্ছে। মোটকথা শরণার্থীদের বাসস্থান যোগাড় করতে এখন অনেক বেশি কষ্ট করতে হচ্ছে।
‘ইউরোনিউজ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জার্মানিতে ইউক্রেনিয় এবং রুশদের মাঝে চলছে সংঘর্ষ; যা জার্মানির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছে। একদিকে ইউক্রেনিয়রা বার্লিনের রাস্তায় জার্মানির রুশ গ্যাস আমদানি করার নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে। অপরদিকে রুশরা ইউক্রেনিয়দেরকে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। এখানেই শেষ নয়, জার্মানিতে রুশদের মালিকানায় থাকা ব্যবসা বাণিজ্যেও ভূতুড়ে ফোন আসছে হুমকিসহ। জার্মানিতে রুশদের একটা স্কুলে আগ্নিসন্ত্রাসও হয়েছে বলে বলছে ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’। জার্মান পুলিশ বলছে যে, এপ্রিল মাসে জার্মানিতে ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রুশ, ইউক্রেনিয় এবং বেলারুশদের মাঝে ১৭’শ অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে ইউক্রেনিয়দের সংখ্যা ১১ লক্ষ ছাড়িয়ে গেলেও জার্মানিতে ১৯৯০এর দশক থেকেই প্রায় ৩০ লক্ষ রুশ ভাষাভাষী মানুষ বাস করে।
শরণার্থীদের ব্যাপারে রাজনীতিবিদেরা তাদের মতামত পাল্টাচ্ছেন
জার্মানির বৃহত্তম বিরোধী দল এঙ্গেলা মার্কেলের মধ্য-ডানপন্থী ‘ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট’ বা ‘সিডিইউ’ দলের প্রধান ফ্রেডরিক মার্জ জার্মান টেলিভিশন ‘বিল্ড টিভি’র সাথে এক সাক্ষাতে বলেন যে, ইউক্রেন থেকে আসা শরণার্থীরা জার্মান সরকারের সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থা থেকে সুবিধা ভোগ করতে পর্যটকের মতো আচরণ করছে। ১১ লক্ষের বেশি ইউক্রেনিয় শরণার্থীদের জন্যে শীতকালে ঘর উষ্ণ করার সুবিধা দিলে সেটা জার্মান নাগরিকদের জন্যে অন্যায্য হয়ে যাচ্ছে। কারণ অনেক খেটে খাওয়া জার্মান তাদের জ্বালানি খরচ বহণ করতে পারছে না। ‘পলিটিকো’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জার্মানির অর্ধেক বাড়িঘরই শীতকালে উষ্ণ রাখার জন্যে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করে থাকে। এই বাড়িগুলির জন্যে জ্বালানি খরচ কমপক্ষে দ্বিগুণ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। ফ্রেডরিক মার্জের কথাগুলির পর দেশজুড়ে সমালোচনা শুরু হলে তিনি এক টুইটার বার্তায় তার মন্তব্যের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। মার্জ ক্ষমতাসীন সোশালিস্ট সরকারের শরণার্থী নীতির সমালোচনা করে বলছেন যে, সরকারের কোন সুনির্দিষ্ট নীতি নেই। যে-ই জার্মানিতে আসতে চাইছে, তাকেই সরকার দেশে ঢুকতে দিচ্ছে। সরকারের উচিৎ কঠোরভাবে নির্দিষ্ট করে দেয়া যে, কত শরণার্থী দেশে ঢুকতে পারবে। ‘পলিটিকো’ বলছে যে, মার্জের কথাগুলি বেশ খানিকটা পপুলিস্ট ঘরানার, যা কিনা ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী ‘অলটারনেটিভ ফর জার্মানি’ বা ‘এএফডি’ দলের কথার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে যে, ‘সিডিইউ’এর চিন্তায় বেশ খানিকটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এতদিন ‘সিডিইউ’ ইউক্রেনিয় শরণার্থীদের ব্যাপারে জার্মান সরকারের নীতিকে সমর্থন করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সরকারের ব্যর্থতাকে কাজে লাগাতে ‘সিডিইউ’ হয়তো এই সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইছে না।
‘ইউরোনিউজ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জার্মানির পূর্ব দিকের ছোট দেশগুলিতেও শরণার্থীদের চাপ অনুভূত হচ্ছে। চেক রিপাবলিক ৪ লক্ষ ৩৯ হাজারের বেশি ইউক্রেনিয় শরণার্থী নিয়েছে; পাশের স্লোভাকিয়া নিয়েছে আরও প্রায় ১ লক্ষ। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসে সিরিয়া থেকে শরণার্থী আসা বেড়ে যাওয়ায় তারা তাদের সীমান্তে পাহাড়া বসিয়েছে; যদিও ইইউএর নিয়ম অনুসারে একদেশ থেকে অন্যদেশে যাতায়াতে কোন বাধা থাকার কথা নয়। সমস্যা হলো, যেখানে চেক রিপাবলিকের ৭৫ শতাংশ জনগণ ইউক্রেনের শরণার্থীদের দেশে ঢোকার পক্ষে, সেখানে ২০১৫ সালে সিরিয়া এবং আফ্রিকার মুসলিম শরণার্থীদের দেশে ঢোকার বিরুদ্ধে ছিল ৭০ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ ইউক্রেনের শরণার্থীদেরকে তারা ভাইয়ের মতো দেখলেও মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার মুসলিমদেরকে তারা ভিন্ন চোখে দেখেছে। কিন্তু এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে চলেছে। কারণ জীবনযাত্রার খরচ মারাত্মকভাবে বেড়ে যাওয়ায় চেক রিপাবলিকের কট্টর বামপন্থী এবং কট্টর ডানপন্থী দলগুলি রাজধানী প্রাগের রাস্তায় সরকার বিরোধী বিক্ষোভ করেছে। অনেকেই বলা শুরু করেছে যে, সরকার শরণার্থীদেরকে চেক নাগরিকদের তুলনায় বেশি সুবিধা দিচ্ছে। স্লোভাকিয়াতেও অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধিতে চেক রিপাবলিকে মূদ্রাস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১৭ শতাংশ; আর স্লোভাকিয়াতে ১৪ শতাংশ; যা কিনা ইউরোপের সর্বোচ্চগুলির মাঝে।
জার্মানিতে ডানপন্থীদের জনসমর্থন বাড়ছে
জার্মানির ‘ডের স্পাইগেল’ পত্রিকা বলছে যে, জার্মানির ১৬টা রাজ্যের মাঝে ১২টা রাজ্য ইতোমধ্যেই বলে দিয়েছে যে তারা ইউক্রেন থেকে আর কোন শরণার্থী নিতে পারবে না। জার্মান স্বারাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলছেন যে, খুব শীঘ্রই সবগুলি রাজ্যই তাদের সক্ষমতার সীমানা অতিক্রম করবে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে ৮শ’ ৭৫ জন শরণার্থী জার্মানিতে প্রবেশ করেছে। অর্থনৈতিক চাপের মাঝে শরণার্থীদের ভার নিতে হিমসিম খাচ্ছে ইউরোপ; বিশেষ করে জার্মানি। এই সুযোগটাই নিচ্ছে জার্মানির কট্টর ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী দল ‘অলটারনেটিভ ফর জার্মানি’ বা ‘এএফডি’। তবে জার্মানির প্রাক্তন চ্যালেন্সর গেরহার্ড শ্রোডার মনে করছেন যে, ‘এএফডি’র নিজেদের মাঝেই বিভেদ রয়েছে। তিনি ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, দেশের পূর্বাঞ্চলে এই দলের সমর্থকেরা রাশিয়াকে সমর্থন করলেও পশ্চিমাঞ্চলের সমর্থকেরা রাশিয়ার পক্ষে নয়। এমতাবস্থায় তারা সরকারের বিরুদ্ধে শক্ত কোন আন্দোলন করতে পারবে না। তথাপি জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধির ইস্যুতে ‘এএফডি’র সরকার বিরোধী বিক্ষোভে হাজারো মানুষ যোগ দিচ্ছে। গবেষণা সংস্থা ‘আইএনএসএ’র এক জরিপে বলা হচ্ছে যে, ক্ষমতাসীন চ্যান্সেলর ওলাফ শোলজএর বামপন্থী সোশালিস্ট দলের পক্ষে জনমত ২৬ শতাংশ থেকে কমে ১৮ শতাংশে নেমে এসেছে; শরীক দল ‘এফডিপি’র অর্ধেক কমে গিয়ে হয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ। অপর শরীক দল ‘গ্রিন পার্টি’ও জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। অপরদিকে ‘এএফডি’র সমর্থন ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশে উঠে গেছে; যা কিনা ইতিহাসের সর্বোচ্চ। অক্টোবর থেকে রাস্তায় বিক্ষোভে ‘এএফডি’র এজেন্ডা হবে ‘আমাদের দেশ আগে’; যা প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’এর সাথে মিলে যায়।
ইউরোপে মুসলিম এবং ইউক্রেনিয় খ্রিস্টান শরণার্থীদের ব্যাপারে জনমতে ব্যাপক পার্থক্য থাকলেও জ্বালানির ব্যাপক মূল্যস্ফীতির মাঝে এখন যেকোন শরণার্থীই বোঝা হয়ে যাচ্ছে। এমনকি মধ্যপন্থায় থাকা রাজনীতিবিদেরাও শরণার্থীদের আটকাতে বলছেন। জার্মানির বামপন্থী সোশালিস্ট কোয়ালিশন সরকার জনগণকে আশ্বাস দিতে ব্যার্থ হয়েছে যে জার্মানির নীতি সঠিক পথে রয়েছে। অন্ততঃ সিদ্ধান্তগত দিক থেকে অনিশ্চয়তা এবং নীতিগত দিক থেকে স্বাধীনভাবে চলতে না পারাটা জার্মানির জাতীয় গর্বকে আঘাত করছে। এই সুযোগটাই নিতে চাইছে ডানপন্থী গ্রুপগুলি। মধ্যপন্থী বিরোধী দলগুলিও ডানপন্থীদের শ্লোগানকে পুঁজি করাটাকেই সঠিক বলে মনে করছে। ইউরোপজুড়ে ডানপন্থী রাজনীতির জয়জয়কার দৃশ্যমান হওয়ায় জার্মানির ডানপন্থীরাও এতে আনুপ্রাণিত হয়েছে। নিজেদের দলের কর্মকান্ডের সফলতার চাইতে লিবারাল রাজনৈতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতাই ডানপন্থীদের বেশি সহায়তা দিয়েছে। ২০২০ সালে কট্টর ডানপন্থী দল ‘এএফডি’র মুখপাত্র ক্রিশ্চিয়ান লুথ বলেছিলেন যে, জার্মানির অবস্থা যত খারাপ হবে, ‘এএফডি’র অবস্থান তত শক্ত হবে। বোঝাই যাচ্ছে যে, আসন্ন শীতকাল ইউরোপে, তথা জার্মানিতে, পশ্চিমা লিবারাল আদর্শের জন্যে অতি শীতল পরীক্ষা নিয়ে আসতে যাচ্ছে।
Friday, 30 September 2022
ইতালির ডানে মোড়… ইউরোপের জন্যে এটা কেমন বার্তা?
সেপ্টেম্বরের ইতালির নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী জাতীয়তাবাদীরা বিশাল বিজয় পেয়েছে। নির্বাচনের সর্বশেষ হিসেবে বলা হচ্ছে যে, জর্জিয়া মেলোনির ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’, মাত্তেও সালভিনির ‘লেগা নর্ড’ এবং সিলভিও বারলুসকোনির ‘ফোর্তসা ইতালিয়া’ দলের ডানপন্থী কোয়ালিশন প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এর মাঝে মেলোনির দল পেয়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ ভোট। ইতালির সকল পত্রিকাই মেলোনির দলের বিজয়ের ব্যবধান নিয়ে হেডলাইন করে। কেউ কেউ বলে যে, মেলোনি ইতালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন। তবে মাত্র ৬৪ শতাংশ ভোটার ভোট দেয়ার কারণে অনেকেই এই ভোটের গুরুত্বকে কিছুটা হলেও কম হিসেবে দেখছেন বলে বলছে ‘ডয়েচে ভেলে’। যারা ডানপন্থী দলের পক্ষে ভোট দেয়নি, তারা আশা করছেন দেশের বাকি জনগণকে সাথে নিয়েই যেন সরকার কাজ করে। তবে এই মুহুর্তে জীবনযাত্রার খরচ মারাত্মক বেড়ে যাওয়ায় এবং ইউক্রেনে যুদ্ধ চলমান থাকায় প্রথম দিন থেকেই মেলোনির সরকার চ্যালেঞ্জের মাঝে পড়বে। নির্বাচিত হবার পর জর্জিয়া মেলোনি তার প্রথম ভাষণে বলেন যে, তিনি ইতালিকে একত্রিত করার চেষ্টা করবেন।
ইতালিতে ডানপন্থী রাজনীতির ইতিহাস
৪৫ বছর বয়স্ক মেলোনির দল ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’ ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠা পেলেও আগের কিছু ইতিহাসের সাথে দলটার সম্পর্ক রয়েছে বলে বলছেন অনেকে। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, ১৯২২ সালে ইতালিতে বেনিতো মুসোলিনির নেতৃত্বে ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী ‘ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টি’ ক্ষমতা দখল করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইতালি প্রথমে নাজি জার্মানির পক্ষে থাকলেও মুসোলিনির পতনের পর তারা মিত্রপক্ষে যোগ দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬ সালে মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট সরকারের চিফ অব স্টাফ গিওরগিও আলমিরান্তের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয় নব্য-ফ্যাসিস্ট দল ‘ইতালিয়ান সোশাল মুভমেন্ট’ বা ‘এমএসআই’। বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ফ্যাসিস্ট সমর্থকরা এই দলে যোগদান করতে থাকে। প্রায় তিন দশক ধরে চলা এর রাজনীতিতে তারা ১০ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি। তবে ইতিহাসবিদ পল জিনসবর্গ মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, এই দল যে এতকাল টিকে থেকেছিল, সেটাই বড় বিষয়। ইতালির দক্ষিণের জনগণ, শহরাঞ্চলের গরীব মানুষেরা এবং নিম্ন মধ্যবিত্তরা অনেকেই এদের পক্ষে ভোট দিয়েছে। জিয়ানফ্রাঙ্কো ফিনির অধীনে ১৯৯০এর দশকে এই দলে পরিবর্তন আসে। তিনি দলের বক্তব্যগুলিকে পরিবর্তন করেন এবং ১৯৯৩ সালে রোমের মেয়র নির্বাচনে ৪৭ শতাংশ ভোট পেয়ে সকলকে অবাক করে দেন। পরের বছরেই তিনি তার দলের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘ন্যাশনাল এলায়েন্স’। এই সময়টাতেই রোমের খেটে খাওয়া একজন মহিলার সন্তান জর্জিয়া মেলোনি ‘এমএসআই’তে যোগদান করেন এবং পরে ‘ন্যাশনাল এলায়েন্স’এর যুব দলের নেতা হয়ে যান।
একসময় মুসোলিনিকে বিংশ শতকের সেরা রাজনীতিবিদ বলে আখ্যা দিলেও জিয়ানফ্রাঙ্কো ফিনি তার মতামতকে পরিবর্তন করেন এবং ২০০৩ সালে ইস্রাইল সফর করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গণহত্যার শিকার ইহুদিদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সেখানে গিয়ে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ইতালির ইহুদী বিদ্বেষী আইনের সমালোচনা করেন। জর্জিয়া মেলোনিও ২০০৯ সালে সিলভিও বারলুসকোনির সরকারের মন্ত্রী থাকার সময় ইস্রাইল সফর করে একই স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ২০১১ সালে ইইউএর প্রভাবে ইতালিতে গঠিত সরকারে মেলোনি যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। এবং ২০১২ সালে ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি তার দলকে ‘পুরোনো ঐতিহ্যের জন্যে নতুন দল’ হিসেবে পরিচিত করান। তবে ২০২২ সালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত তার দল ১০ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি।
মেলোনির ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’র লোগো হলো ইতালির জাতীয় পতাকার তিন রঙের আগুন। এর আগের ‘এমএসআই’ এবং ‘ন্যাশনাল এলায়েন্স’এর লোগোও সেটাই ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ‘রুটগার্স ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর কোরি ব্রেনান ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’কে বলছেন যে, রাজনীতিতে লোগোটা ব্র্যান্ডিংএর মতো গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ এটাকে খোঁজে এবং অনুসরণ করে। ইতালিতে মুসোলিনির তৈরি করা অনেক কিছুই এখনও টিকে আছে। বড় বড় স্থাপত্য ছাড়াও রোমের ম্যানহোলের ডাকনার এক-চতুর্থাংশের উপরে লেখা রয়েছে ‘এসপিকিউআর’। যার অর্থ হলো, ‘রোমের সিনেট এবং জনগণ’। মুসোলিনি তার সাম্রাজ্যকে প্রাচীন রোমের সাথে তুলনা দিতে এটা ব্যবহার করতেন। অনেক ম্যানহোলে ফ্যাসিট লোগোটাও রয়েছে। যদিও ইতালিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ফ্যাসিস্ট দল নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তথাপি ডানপন্থীরা এখনও ফ্যাসিস্ট স্যালুট ব্যবহার করে।
ডানপন্থীরা কিভাবে ইতালির নির্বাচনে জিততে পারলো?
রোমে ‘ইইউ’এর পররাষ্ট্র বিষয়ক কাউন্সিলের প্রকল্প ব্যবস্থাপক টেরেসা কোরাটেলা ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, মেলোনির এই অবস্থানে আসার সবচাইতে বড় কারণ হলো, ২০১৮ সাল থেকে ইতালিতে যতগুলি অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়েছে, তিনি সেগুলির কোনটারই অংশ ছিলেন না। আর দ্বিতীয়তঃ তার কোয়ালিশন সহযোগী মাত্তেও সালভিনি এবং সিলভিও বারলুসকোনি এই মুহুর্তে তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে সবচাইতে খারাপ সময় পার করছেন। ইতালির আগের সরকার প্রধানদের অনেকেই প্যারিস এবং বার্লিনের নেতৃত্বের সাথে যেমন সমঝোতা করে চলতে বাধ্য হয়েছেন, তিনি হয়তো সেই পথে নাও হাঁটতে পারেন। অন্ততঃ ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত তিনি হাঙ্গেরি এবং পোল্যান্ডের ডানপন্থী নেতৃত্বের সাথে বেশি কাছের সম্পর্ক রেখেছিলেন।
‘এসোসিয়েটেড প্রেস’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে রোমের ‘ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার্স’এর ডিরেক্টর নাথালি টচ্চি ডানপন্থীদের জয়কে ইতালির রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতার সাথে যুক্ত করেন। ডানপন্থীরা জিতেছে, এর অর্থ এই নয় যে, ইতালিয়রা ফ্যাসিস্ট হয়ে গেছে। এদের জয়ের মূল কারণ হলো, জনগণ ইতালির রাজনীতির ব্যাপারে যারপরনাই ক্ষুব্ধ; তারা পরিবর্তন চাইছে। তারা ভিন্ন একটা দলকে ভোট দিতে চাইছিল।
তবে ‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ডানপন্থীরা ভোট পাবার জন্যে এমন কিছু ইস্যুকে বেছে নিয়েছে, তা চিন্তা করার মতো। মাত্তিও সালভিনির নির্বাচনী এলাকা ফেরারা কিভাবে বামপন্থী থেকে ডানপন্থী হয়ে গেলো তার উত্তর খুঁজতে ‘বিবিসি’ বলছে যে, সেখানকার জনগণ মনে করছে যে, অভিবাসীদের কারণে তাদের শহরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে এবং সাধারণ ইতালিয়রা অর্থনৈতিক সমস্যা পড়েছে। অথচ প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এই অঞ্চলটা ইতালির অনেক অঞ্চলের চাইতে অধিকতর সমৃদ্বশালী। এখানকার সমস্যা হলো এখানকার স্থবির জনসংখ্যা; যেটার কারণে এখানকার মানুষের অর্থনৈতিক জীবনে পরিবর্তন আসছে না; তাদের ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নতি হচ্ছে না। ডানপন্থীরা বলছে যে, এখানকার অর্থনৈতিক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে অভিবাসীদের কারণেই; আর সেটাই অনেক মানুষ সমর্থন করছে। অথচ একসময় এই শহরে ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অপরাধে অনেক মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে; যাদের মাঝে কেউ কেউ এখনও বেঁচে আছেন। তাদের জীবদ্দশাতেই তারা দেখতে পাচ্ছেন যে, ইতালি আবারও উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির দিকে ধাবিত হচ্ছে।
অনেকেই ডানপন্থীদের জয়ের পিছনে কিছু ষড়যন্ত্র থিউরির কথা বলছেন; যা মানুষ বিশ্বাস করছে। ‘ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলি’র প্রফেসর লরেন্স রোজেনথাল ‘আল জাজিরা’কে বলছেন যে, মেলোনি বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে মানুষকে জাগিয়ে তুলেছেন; যার মাঝে রয়েছে নারীবাদী ইস্যুগুলি। তিনি ইতালির পরিবারগুলির স্বার্থ নিয়ে কথা বলেছেন; শরণার্থী থামাতে সীমানা পাহাড়া দেবার কথা বলেছেন। তিনি সেই থিউরির কথা বলে জনগণকে ক্ষেপিয়েছেন, যেখানে বলা হচ্ছে যে, ‘গ্লোবাল এলিট’রা পশ্চিমা দেশগুলির আদিবাসীদেরকে অশ্বেতাঙ্গ অভিবাসী দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে চাইছে। এই থিউরিটাই জনগণের ক্রোধের কেন্দ্রে রয়েছে; যা তিনি ব্যবহার করেছেন। সবগুলি পশ্চিমা দেশেই এই চিন্তাটা ঘনীভূত হচ্ছে এবং এরা সকলেই অশ্বেতাঙ্গদেরকে তাদের সমস্যার কারণ হিসেবে দেখছে।
মেলোনি কিছুদিন আগেই এক বক্তব্যে বলেছেন যে, বামপন্থীরা রক্ষণশীলদের সকল বিশ্বাসের উপরে হামলা করেছে। তিনি সিসিলির উপকূলে আফ্রিকা থেকে আসা অভিবাসীদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ও মেক্সিকোর সীমানার তুলনা করেন। তিনি বলেন যে, হাজারো অভিবাসী শহরের বস্তিগুলি ভরে ফেলছে; এবং তাদের কারণে ইতালির জনগণের পারিশ্রমিক কমে গেছে; এই অভিবাসীরা অনেকেই বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত। মেলোনি ইউরোপের অন্যান্য দেশের জনগণের উদ্দেশ্যে যখন কথা বলছেন, তখন তার কথাগুলি বেশ স্পস্ট। স্পেনের কট্টর ডানপন্থী ‘ভোক্স’ পার্টির এক র্যালিতে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন যে, তিনি স্বাভাবিক পরিবারের পক্ষে; সমকামি লবির পক্ষে নন। মানুষের লিঙ্গ পরিচয়ের ব্যাপারে তিনি একাত্মতা প্রকাশ করলেও লিঙ্গ নিয়ে আদর্শের বিরোধী।
ডানপন্থীদের নীতি কি ইইউএর সাথে সাংঘর্ষিক হবে?
ইইউ পার্লামেন্টে জার্মানির ক্ষমতাসীন সোশালিস্ট দলের প্রতিনিধি এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্যাটারিনা বারলি ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, মেলোনি ক্ষমতায় যাবার পরে তার পূর্বের নীতির মতোই চলবেন, নাকি পরিবর্তিত হবেন, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে এটা নিশ্চিত যে, অর্থনৈতিক এবং আর্থিক নীতির ক্ষেত্রে তিনি রক্ষণশীল ভূমিকা নেবেন; আর মানবাধিকার, নারীর অধিকার, এবং সংখ্যালঘুদের অধিকারের মতো আদর্শিক বিষয়ের ক্ষেত্রে খুবই কঠোরভাবে জনমতের উপরে চলবেন। ইউরোপের খারাপ সময়ে তার জাতীয়তাবাদী এজেন্ডাগুলি ইউরোপকে একত্রিত করবে না। ক্যাটারিনা বারলি বলছেন যে, তাদের অভিজ্ঞতায় এধরনের সরকারগুলির ইইউএর মাঝে ছাড় দেয়ার প্রবণতা থাকে না। অথচ ইইউএর নীতি তখনই তৈরি করা সম্ভব, যখন সেখানে একেকটা দেশের ছাড় দেয়ার প্রবণতা থাকে। যদি একেকটা দেশ মাঝে মাঝে নিজের স্বার্থ দেখে, তাহলে সেটা মেনে নেয়া যায়। কিন্তু সেটা যদি চলতেই থাকে, তাহলে ইইউ আর ইইউ থাকবে না; তা হয়ে যাবে কিছু স্বার্থপর মানুষের ক্লাব। বারলি বলছেন যে, এখন পর্যন্ত মেলোনি ইউক্রেন যুদ্ধে ইউক্রেনের পক্ষে কথা বললেও তার কোয়ালিশন সহযোগী মাত্তেও সালভিনি এবং সিলভিও বারলুসকোনি ভ্লাদিমির পুতিনের সমর্থক বলে পরিচিত। কাজেই এখনই বলা যাচ্ছে না যে, ইউক্রেন যুদ্ধে ইতালির অবস্থান কি হবে। তবে ইইউএর জ্বালানি সংকটের মাঝে ইতালি খুব সম্ভবতঃ রুশ জ্বালানির উপরে নির্ভরশীল দেশগুলির জন্যে কোন ছাড় দিতে রাজি হবে না।
মেলোনির ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’ দলের সংসদ সদস্য ইলেনিয়া লুকাসেলি ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, ইতালির জনগণ রক্ষণশীল; তাদের দলও সেইরকমই। অভিবাসী, সমকামিদের অধিকার, গর্ভপাতের অধিকার ইত্যাদি আদর্শিক বিষয় এই মুহুর্তে তাদের দলের কাছে অর্থনৈতিক সমস্যার চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইতালির রক্ষণশীল জনগণ প্রকৃতপক্ষে শরণার্থীদের জন্যে জীবন দিতে প্রস্তুত নয়। লুকাসেলি বলছেন যে, তাদের দলের সাথে মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট দলের কোন সম্পর্ক নেই। এই দলের সাথে সম্পর্কিত কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে সোশাল মিডিয়াতে কোন উগ্রপন্থী কথা বলে থাকে, সেটা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন; কারণ এই দলটা অনেক বড়। প্রতিটা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে দলের কোন নীতির মাঝে উগ্রতা নেই।
ডানপন্থীদের বিজয়কে কে কিভাবে দেখছে?
‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জার্মানির ক্ষমতাসীন বামপন্থী সোশালিস্ট সরকার ইতালির নির্বাচনের ব্যাপারে রয়েসয়ে বক্তব্য দিচ্ছে। তবে উগ্র ডানপন্থী ‘অলটারনেটিভ ফর জার্মানি’ বা ‘এএফডি’ দল ইতালির নির্বাচনে খুশি। তারা বলছে যে, সুইডেন এবং ইতালিতে ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলির বিজয় প্রমাণ করছে যে, বামপন্থী রাজনীতি এখন অতীতের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফ্রান্স এবং স্পেনের ডানপন্থী বিরোধী দলগুলিই মেলোনির বিজয়ে প্রথম অভিনন্দন জানিয়েছে। এছাড়াও ইইউএর মাঝে ‘ইউরোস্কেপটিক’ পোল্যান্ড এবং হাঙ্গেরির সরকারও তাদের উৎফুল্লতা প্রকাশ করেছে। তবে ইইউএর বাকি দেশগুলি মেলোনির ব্যাপারে একেবারেই আশাবাদী নয়; কারণ তিনি এতদিন তার নীতিতে ইতালির স্বার্থকেই প্রাধান্য দেবার কথা বলেছেন। যদিও ইইউএর পক্ষ থেকে নীতিগত কারণে ইতালির নির্বাচন নিয়ে কোন মন্তব্য করা হয়নি, তথাপি ইইউ কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইয়েন বলেছেন যে, যেসব দেশ ইইউএর আদর্শকে সন্মান করবে না, সেসব দেশকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো পদ্ধতি ইইউএর জানা রয়েছে।
জার্মানির ‘গ্রিন পার্টি’র সংসদ সদস্য টোবিয়াস বাখেরলে ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না যে, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে সহায়তা দেয়া এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবরোধ চালিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে ইতালির ডানপন্থী দলের নীতি কি হবে। তবে এটা নিশ্চিত যে, বিভিন্ন ইস্যুতে ইইউএর অন্যান্য দেশের ডানপন্থী সরকারগুলির সাথে ইতালির এই সরকার তাল মেলাবে। বাখেরলে পুরো ইউরোপ জুড়ে ডানপন্থী দলগুলির জয়জয়কারে যথেষ্ট চিন্তিত। তিনি মনে করছেন না যে, ডানপন্থীদের উত্থানের ব্যাপারে শুধুমাত্র তার দলের মতো বামপন্থী দলগুলিরই চিন্তা করতে হবে। তিনি বিশেষ করে উগ্র ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী চিন্তার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়াটা সকলের কর্তব্য বলে মনে করেন; কারণ এই চিন্তাগুলি গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে কাজ করছে।
‘আল জাজিরা’ বলছে যে, পশ্চিমা দেশগুলিতে ডানপন্থী জাতীয়তাবাদীরা কিছু ইস্যুতে একমত হচ্ছে; যার মাঝে রয়েছে অভিবাসী ইস্যু, গর্ভপাতের অধিকার, সমকামিদের অধিকার; এবং এর সাথে কিছু ইস্যু, যেগুলিকে ডানপন্থীরা ‘গ্লোবালিস্ট’ ইস্যু বলে আখ্যা দিচ্ছে; অর্থাৎ তারা বলছে যে, সেগুলি দুনিয়ার সমস্যা হলেও তাদের দেশের সেখানে মাথা ঘামাবার দরকার নেই। এই চিন্তগুলি যুক্তরাষ্ট্রেও অনেকেই সমর্থন করেন; যারা মূলতঃ রিপাবলিকান দলের সমর্থক। রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ এবং টম কটন; কংগ্রেস সদস্য মারজোরি টেইলর গ্রিন, এবং প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পেও সকলেই ইতালির ডানপন্থী নেতাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। কংগ্রেস সদস্য লরেন বুবার্ট এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, বামপন্থীরা শুধু ধ্বংসই করেছে; যা সারা দুনিয়ার মানুষ বুঝতে পারছে। রিপাবলিকানপন্থী মিডিয়া ‘ফক্স নিউজ’এর প্রভাবশালী সাংবাদিক টাকার কার্লসন ইতালিতে ডানপন্থীদের বিজয়কে একটা বিপ্লব হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ইউরোপে উগ্রপন্থীদের পুনরুত্থান
ফিলিস্তিন বংশোদ্ভূত ইতালিয় সাংবাদিক এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অব মায়ামি’র প্রফেসর রুলা জেব্রীল ‘আল জাজিরা’কে বলছেন যে, ইতালিতে মেলোনির জয় বাকি ইউরোপে এবং যুক্তরাষ্ট্রে চরম ডানপন্থীদের শক্তিশালী করবে। ডানপন্থী এই কর্মকান্ডগুলি যথেষ্ট সংগঠিত এবং এদের বিচরণ এখন বিশ্বব্যাপী। একসময় মেলোনিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার ফলে তিনি ডানপন্থীদের ক্রোধের শিকার হন। ইতালিতে নির্বাচনের পর থেকে তার এবং তার মতো ডানপন্থীদের সমালোচকদের বিরুদ্ধে প্রাণনাশের হুমকি আসতে শুরু করেছে।
২০১৯এর এপ্রিলে ইতালির ফুটবল ক্লাব ‘লাতসিও’র কিছু সমর্থক মিলানে একটা খেলা শুরুর আগে রাস্তায় ‘বেনিতো মুসোলিনির প্রতি সন্মান’ লেখা একটা ব্যানার তুলে ধরে। প্রায় ৭০ জনের মতো সমর্থক ফ্যাসিস্ট সঙ্গীত গায় এবং ফ্যাসিস্ট স্যালুট দেখায়। ‘সিএনএন’ বলছে যে, ব্যানারটা যে যায়গায় দেখানো হয়, তার কাছেই ১৯৪৫ সালে মুসোলিনি, তার স্ত্রী এবং উচ্চপদস্থ ফ্যাসিস্ট নেতাদের হত্যা করে তাদের মৃতদেহ উল্টো করে ঝুলিয়া রাখা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, দিনটাও ছিল ‘লিবারেশন ডে’র আগের দিন; যে দিনটা ইতালিতে ফ্যাসিস্টদের হাত থেকে ইতালির মুক্ত হওয়ার দিন হিসেবে পালন করা হয়। অবশ্য ইতালিতে ফুটবল মাঠে ডানপন্থীদের স্যালুট এবং অন্যান্য প্রতীকের দৃশ্যমান হওয়াটা নতুন নয়। বহুবার এ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলেও তা চলছে। তৎকালীন ডানপন্থী উপপ্রধানমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনি ফুটবল মাঠে ফ্যাসিস্ট স্যালুটের সমালোচনা করলেও এর বাইরে তিনি তেমন কিছু করেননি।
ডানপন্থীরা কতদিন ক্ষমতায় থাকতে পারবে?
‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে প্রশ্ন করা হচ্ছে যে, ইতালিতে যখন ১৯৪৮ সালের পর থেকে একেকটা সরকারের গড় আয়ু মাত্র ১৪ মাস, সেখানে ডানপন্থী কোয়ালিশনের প্রতিশ্রুত ৫ বছর উচ্চাকাংক্ষাই বটে। আর দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সমস্যা নিরসনে নীতি নিয়ে কোয়ালিশনের সদস্য দলগুলির মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। মূল্যস্ফীতির প্রভাব কমাতে আগের সরকার ৪০ বিলিয়ন ইউরোর প্রণোদনা দিয়েছে। এখন মেলোনির শরীক দলের প্রধান বারলুসকোনি চাইছেন আরও ৩১ বিলিয়ন ইউরো ঋণ করে প্রতি মাসে ১ হাজার ইউরো পেনসনের ব্যবস্থা করতে। কিন্তু ইতালির বর্তমান রাষ্ট্রীয় ঋণ ২ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ইউরো, যা কিনা দেশটার জিডিপির দেড় গুণ! এমতাবস্থায় উচ্চ সুদে ইতালি কতটা অর্থ ঋণ করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অপরদিকে মেলোনির উপদেষ্টারা বলছেন যে, তারা হয়তো দারিদ্র্য বিমোচনে অর্থায়ন কমিয়ে দিয়ে কর কমাবার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু মেলোনির শরীক দলগুলি যদি তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বেশি আগ্রহী হয়, তাহলে তার নীতি বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির সমস্যাকে কাটিয়ে উঠতে না পারলে ১ লক্ষ ২০ হাজার কোম্পানি এবং ৩ লক্ষ ৭০ হাজার কর্মসংস্থান ঝুঁকির মাঝে পড়বে।
ইউরোপে ডানপন্থী রাজনীতি কখনোই বন্ধ করা হয়নি। উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকেরা লিবারাল রাজনৈতিক ব্যবস্থার মাঝেই তাদের কর্মকান্ড চালিয়ে গেছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে অভিবাসী সংকটের পর থেকে ইউরোপজুড়ে ডানপন্থীদের উত্থান হয়েছে। যেকারণে ইতালির এই নির্বাচন পুরো ইউরোপের জন্যেই গুরুত্বপূর্ণ। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে জার্মানিতে নাজি পার্টির সকল স্তম্ভ দূরীকরণের যে প্রচেষ্টা চলেছে, তা ইতালিতে হয়নি। কিন্তু তারা বলছে না যে, জার্মানিতে এতকিছু করার পরেও নব্য-নাজিরা এখনও সক্রিয় এবং উগ্র ডানপন্থী দল ‘এএফডি’ আইনগতভাবেই রাজনীতিতে রয়েছে। অপরদিকে ইতালিতে নব্য-ফ্যাসিস্ট দলের রাজনীতি করার ব্যাপারটা অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলি যতটা মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করেছে, ইতালিতে সেটা তেমন বড় কোন বিষয় ছিল না কখনোই। মোটকথা ইতালিতে ফ্যাসিস্ট রাজনীতি কোন না কোন ফর্ম্যাটে চলেছে। নব্য-ফ্যাসিস্টরা তাদের কথাগুলি পরিবর্তন করেছে। কিন্তু তাদের কথার কেন্দ্রে ছিল অভিবাসী নীতি; যেটাকে তারা ইতালির অর্থনৈতিক দৈন্যতার মাঝে সকল সমস্যার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। মেলোনির সরকার কতদিন টিকবে সেটা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও অশ্বেতাঙ্গ অভিবাসীদের উপর এর বিরূপ প্রভাব যে বাড়বে, তা নিশ্চিত। আর ইউরোপের অন্যান্য দেশ, বিশেষ করে জার্মানির উগ্র ডানপন্থী গ্রুপগুলি এই নির্বাচনের ফলাফলে আরও অনুপ্রাণিত হবে। ইউরোপজুড়ে ডানপন্থীদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি ইইউএর কর্মসম্পাদনকে আরও চ্যালেঞ্জের মাঝে ফেলে দেবে। একেকটা দেশ যখন জাতীয় স্বার্থকে ইউরোপের উপরে স্থান দিচ্ছে, তখন ইইউএর অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় সবচাইতে বড় প্রশ্নের মুখে পড়বে জার্মানির রাজনৈতিক লক্ষ্য; যা কিনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উগ্র ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে মিত্রশক্তিই নির্ধারণ করে দিয়েছিল।
সূত্রঃ
‘Why Republicans are elated by ‘triumph’ of Italy’s Giorgia Meloni’ in Al-Jazeera, 27 September 2022
‘Italy’s right-wing winners inherit poison chalice’ in Reuters, 26 September 2022
‘How a party of neo-fascist roots won big in Italy’ in Associated Press, 26 September 2022
‘Lazio fans hang pro-Mussolini banner, make fascist salutes ahead of Liberation day’ in CNN, 24 April 2019
‘Why is Italy swinging to the far right?’ in BBC News, (https://www.youtube.com/watch?v=BNRQTSfAR1o)
‘How extremist is Italy's designated far-right government?’ in DW News, 27 September 2022 (https://www.youtube.com/watch?v=4S89Iuz1I7E)
Saturday, 12 February 2022
কর্ণাটকের হিযাব বিতর্ক মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বের দায়িত্ব না নেবার প্রবণতাকেই দেখিয়ে দেয়
ভারতের দক্ষিণের কর্ণাটক রাজ্যে হিযাব নিয়ে বিতর্ক এখন শুধু ভারতের মাঝে সীমাবদ্ধ নেই। সোশাল মিডিয়ার বদৌলতে আন্তর্জাতিক সীমানা পার হবার কারণে এর ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব যথেষ্ট। বিষয়টা মাত্র কিছুদিন হলো মিডিয়াতে আসলেও এর সূত্রপাত হয়েছে আরও আগেই। ২০২১এর ডিসেম্বরে কর্ণাটকের উদুপিতে একটা কলেজে ছয়জন মুসলিম ছাত্রীকে ক্লাসে ঢোকার আগে তাদের মাথার হিযাব খুলে ফেলতে বলা হয়। কলেজ কর্তৃপক্ষ বলে যে, ছাত্রীরা কলেজ ক্যাম্পাসে হিযাব পড়তে পারবে; তবে ক্লাসরুমে নয়। কলেজের প্রিন্সিপাল বলেন যে, শিক্ষকের জন্যে ছাত্রীদের চেহারা দেখতে পারাটা গুরুত্বপূর্ণ; আর ছাত্রদের একজনকে যেন অপরজন থেকে আলাদা করে না দেখা হয়, সেজন্য কলেজ ইউনিফর্ম রয়েছে। ছাত্রীরা হিযাবের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। এরপর ৪ঠা জানুয়ারি উগ্র ডানপন্থী হিন্দু গ্রুপগুলির সমর্থনে কিছু হিন্দু ছাত্র গেরুয়া রঙের শাল পড়ে একই রাজ্যের কোপ্পাতে পাল্টা প্রতিবাদ শুরু করে। তাদের দাবি ছিল যে, যদি মুসলিম মেয়েদেরকে হিযাব পড়তে দেয়া হয়, তাহলে তাদেরকেও ক্লাসরুমে গেরুয়া শাল পড়তে দেয়া হোক। পরদিন ম্যাঙ্গালোরের ‘পম্পেই কলেজ’এও হিন্দু শিক্ষার্থীরা একই রকমের প্রতিবাদ শুরু করে।
এরপর ১৪ই জানুয়ারি উদুপি কলেজের মুসলিম ছাত্রীদেরকে হিযাব পড়ার কারণে ক্লাসে ঢুকতে বারণ করা হয়। ৩রা ফেরুয়ারি কুন্ডাপুর সরকারি কলেজের ছাত্রীরা তাদের মুখের উপরে গেট বন্ধ করে দেয়ার পর তারা কর্তৃপক্ষকে ক্লাস করতে দেয়ার অনুরোধ জানায়। পরদিন মহীশূরে উদুপি এবং ম্যাঙ্গালোরের ছাত্রীদের সমর্থন জানিয়ে প্রতিবাদ শুরু হয়। ৭ই ফেব্রুয়ারি ভারতের নিম্নবর্ণের দলিত শ্রেণীর হিন্দুরা মুসলিম মেয়েদের হিযাব পড়ার পক্ষে প্রতিবাদ করে। এই সময়েই গেরুয়া পরিহিত উগ্রবাদী হিন্দুদের সাথে হিযাবের সমর্থনে মুসলিমদের দ্বন্দ্বের মাঝেই মান্দিয়া জেলায় একজন হিযাব পরিহিত মুসলিম তরুণী কলেজের বাইরে ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দেয়া হিন্দু ছাত্রদের দ্বারা উত্তক্ত হবার মুহুর্তে হাত উঁচিয়ে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে চিৎকার করে উঠলে সেই ঘটনার ভিডিও সারা দুনিয়াব্যাপী সোশাল মিডিয়াতে ভাইরাল হয়ে যায়। মেয়েটির একা হিন্দুদের বড় একটা গ্রুপের সামনে দাঁড়িয়ে শক্ত অবস্থান নেয়া সকলেই অবাক করে। এই সাহসী প্রতিবাদের পর মুসকান খান নামের মেয়েটি হিযাবের পক্ষে আন্দোলনে প্রধান অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়।
কর্ণাটনের উত্তেজনা ইতোমধ্যেই খুব দ্রুতই সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, কোলকাতা, চেন্নাই এবং হায়দ্রাবাদে শতশত মানুষ কর্ণাটকের হিযাবের উপর নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। বিভিন্ন স্থানে হিন্দু মুসলিমদের মাঝে ঢিল নিক্ষেপ এবং অগ্নিসংযোগের খবরও পাওয়া গেছে। শিভামজ্ঞা জেলায় কিছু হিন্দু ছাত্র নিজেরদের কলেজে গেরুয়া পতাকাও উত্তোলন করে। কর্ণাটকের শিক্ষামন্ত্রী নাগেশ বিসি বলছেন যে, হিযাবের পক্ষে এই অন্দোলন পুরোপুরিভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। তিনি এই অন্দোলনের পিছনে ‘পপুলার ফ্রন্ট অব ইন্ডিয়া’র ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ করেন।
১১ই ফেব্রুয়ারি কর্ণাটকের হাই কোর্ট ৫টা নির্দেশনা দেয়। প্রথমতঃ সেকুলার রাষ্ট্র হিসেবে ভারতে যেকোন ধর্মের সম্প্রদায়ের ধর্ম পালনের অধিকার রয়েছে। তবে ক্লাসরুমে হিযাব পড়ার ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশনা রয়েছে কিনা এবং সেটা ভারতের সংবিধানে কতটা অনুমতি দিয়েছে, সেটা আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। দ্বিতীয়তঃ সবগুলি পিটিশনের রায় না হওয়া পর্যন্ত ছাত্রদেরকে ক্লাসরুমে হিযাব বা গেরুয়া শাল পড়তে বারণ করা হয়েছে। তৃতীয়তঃ এই নির্দেশনা শুধুমাত্র ঐসব কলেজের জন্যে, যেখানে ড্রেস কোড দেয়া রয়েছে। চতুর্থতঃ ধর্মের নামে কাউকেই বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে দেয়া যাবে না। পঞ্চমতঃ আন্দোলন এবং প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার চাইতে ছাত্ররা যদি ক্লাসে ফিরে যায়, সেটাই হবে তাদের জন্যে মঙ্গল। ইউনিফর্মের ব্যাপারে আদালতের সিদ্ধান্তের মাত্র ছয়দিন আগে ৫ই ফেব্রুয়ারি কর্ণাটকের রাজ্যসরকার এক আদেশের মাধ্যমে রাজ্যের সকল স্কুল কলেজে ইউনিফর্ম পড়া বাধ্যতামূলক করে। ‘ডেকান হেরাল্ড’ বলছে যে, এর একদিন আগেই রাজ্যসরকার বলেছিল যে, তারা হিযাব এবং গেরুয়া কোনটারই পক্ষে নয়। রাজ্যসরকারের কর্মকর্তারা বলছে যে, যারা কলেজে হাজিরা দেবে না, তাদেরকে পরীক্ষা দিতে দেয়া হবে না। রাজ্যসরকারের এই নির্দেশের বৈধতার ব্যাপারে নির্দেশনা চেয়ে আদালতে পিটিশন করা হয়েছে।
ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও কর্ণাটকের ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে বিবৃতি দিয়েছেন অনেকে। পাকিস্তান সরকার ইসলামাবাদে ভারতের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাকিস্তান সরকারের উদ্বিগ্নতার কথা জানিয়েছে। ৮ই ফেব্রুয়ারি নোবেল পুরষ্কার জয়ী মালালা ইউসুফজাই এক বিবৃতিতে আপাতদৃষ্টে হিযাব আন্দোলনের পক্ষে কথা বললেও, তিনি উল্লেখ করেন যে, মহিলাদের কম কাপড় বা বেশি কাপড় পড়ার ব্যাপারে বিতর্কের পক্ষপাতি নন। অর্থাৎ তিনি হিযাব পড়া বা না পড়ার আলোচনার সমর্থক নন। ১১ই ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ‘অফিস অব ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম’এর দূত রাশাদ হুসাইন এক টুইটার বার্তায় কর্ণাটক রাজ্যসরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন যে, কর্ণাটক রাজ্যের ধর্মীয় কাপড়চোপড়ের ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়া উচিৎ নয়। এতে ছাত্রীদের ধর্মীয় অধিকার খন্ডিত হচ্ছে। পরদিন ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচী সাংবাদিকদের বলেন যে, ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে অন্য দেশের মন্তব্য করা উচিৎ নয়।
ক্ষমতাসীন বিজেপির নেতা অমিত মালভিয়া ভারতীয় সংবাদ সংস্থা ‘এএনআই’কে বলেন যে, ইরান এবং তুরস্কতে যেখানে হিযাবের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে, সেখানে ভারতে মেয়েদেরকে হিযাবের পিছনে লুকানো হচ্ছে। ২০১৮ সালে কেরালা হাই কোর্ট রায় দিয়েছিল যে, স্কুলের কর্তৃপক্ষই সিদ্ধান্ত নেবে কি ইউনিফর্ম পড়তে হবে। ২০১৯ সালে কেরালাতেই একটা মুসলিম শিক্ষা সংস্থা হিযাব পড়া নিষিদ্ধ করেছিল। বিজেপির সমালোচনাকারী কংগ্রেসের কেরালার এমপি হিসেবে রাহুল গান্ধীর তো এগুলি জানা থাকার কথা। তিনি বলেন যে, হিযাবের কথা বলে মুসলিম মেয়েদেরকে সমাজ থেকে আলাদা করে ফেলা হচ্ছে। ১০ই ফেব্রুয়ারি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি উত্তর প্রদেশে এক নির্বাচনী ভাষণে বলেন যে, তার সরকার তিন তালাকের নিয়ম বাতিল করে মুসলিম মহিলাদের মুক্ত করেছে।
‘সিএনএন’ বলছে যে, অনেক মুসলিম মহিলার কাছেই হিযাব বিশ্বাসের একটা অংশ। অপরদিকে অনেক পশ্চিমা দেশেই হিযাব বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ভারতে প্রকাশ্যে হিযাব পড়ার উপর কোন নিষেধাজ্ঞা নেই, যা পশ্চিমা কিছু দেশে আরোপ করা হয়েছে। তবে কর্ণাটকে হিযাব নিষিদ্ধ করার গভীরতা অনেক। কর্ণাটকের বিজেপি সরকার ইতোমধ্যেই মুসলিমদের কুরবানির জন্যে পশু বেচা এবং জবাই করা নিষিদ্ধ করেছে। সেখানে হিন্দু ধর্ম থেকে মুসলিম বা খ্রিস্টান হওয়াটাও অনেক কঠিন করে দেয়া হয়েছে। তদুপরি প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, আগামী বছর সেখানে রাজ্যসভার নির্বাচনের আগে আগে সহিংসতা আরও বাড়তে পারে।
ভারতে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেশটাতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে মুসলিমদের উপর অত্যাচার বেড়েছে। একইসাথে বেড়েছে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিভাজন। চীনের বিরুদ্ধে কৌশলগত মিত্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারতের গুরুত্ব যথেষ্ট; যেকারণে ভারতের উপর সাম্প্রদায়িক অসম্প্রীতির কথা বলে চাপ সৃষ্টি করে ওয়াশিংটন দিল্লীর সাথে সম্পর্ক খারাপ করতে চায় না। অপরদিকে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বের মাঝে কেউই ভারতের সাথে শত্রুতা চাইছে না। আর বিজেপি সরকারের কাছে এটা অজানা নয় যে, সেকুলার চিন্তার অনুসারী হওয়ায় কোন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশই ভারতের মুসলিম সংখ্যালঘুদের পক্ষে দাঁড়াবে না। এমতাবস্থায় ভারতের মুসলিমদের জন্যে মুসকান খানের মতো বলিষ্ঠ প্রতিবাদই যেন একমাত্র আশা; আর বাকি মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের জন্যে লজ্জা। এই ঘটনাগুলি মুসলিম বিশ্বের জনগণের মাঝে নেতৃত্বের হাহাকারকে প্রবলতর করবে এবং পরিবর্তনের আকাংক্ষাকে আরও গভীরতা দেবে।
Thursday, 13 January 2022
তুরস্কে ডানপন্থী উগ্র জাতীয়তাবাদীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে কেন?
গত ১১ই জানুয়ারি তুরস্কের দক্ষিণের দিয়ারবাকির শহরে ১৮ বছর বয়সী একজন সিরিয় শরণার্থীকে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার সময় ছুরিকাঘাত করা হয়। এর আগের দিন তুরস্কের বড় শহর ইস্তাম্বুলের বায়রামপাশা এলাকায় নাঈল আল নাঈফ নামের ১৯ বছর বয়সী আরেকজন সিরিয় শরণার্থীকে গভীর রাতে তার ঘরে ঢুকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এর আগে ৯ই জানুয়ারি একজন তুর্কি নাগরিককে একজন সিরিয় শরণার্থী সিগারেট দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় ইস্তাম্বুলের এসেনইয়ুর্ত এলাকায় সিরিয়দের ব্যবহৃত একটা শপিং মলে অনেকজন দুর্বৃত্ত একত্রে হামলা চালিয়ে ক্ষতিসাধন করে। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, সোশাল মিডিয়াতে ভাইরাল হওয়া একটা ভিডিওতে দেখা যায় যে, কয়েক’শ মানুষ মিছিল করতে করতে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে এবং স্লোগান দিচ্ছে ‘এটা তুরস্ক; সিরিয়া নয়’। তারা একসময় রাস্তার পার্শ্ববর্তী শপিং মলে হামলা চালিয়ে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে এবং মলের ভেতরে থাকা সিরিয়দের উপর হামলা করে। তবে সবচাইতে ভয়ংকর ঘটনাটা ঘটে তুরস্কের পশ্চিমের শহর ইজমিরে। ১৬ই নভেম্বর কনস্ট্রাকশন সেক্টরে কাজ করা তিনজন সিরিয় কর্মীকে ঘুমের মাঝে পুড়িয়ে মারা হয়। প্রথমে ঘটনাটা দুর্ঘটনা বলে বলা হলেও পরে এর পিছনে হত্যার লক্ষণগুলি প্রকাশ পেতে থাকে। পুলিশ প্রায় একমাস পর ২১শে ডিসেম্বর কেমাল কোরুকমাজ নামের ৪০ বছর বয়সী একজন তুর্কি নাগরিকের স্বীকারোক্তির উপর ভিত্তি করে হত্যাকান্ডের তদন্ত শুরু করে। ২৩ বছর বয়সী মামুন আল নাবহান, ২১ বছর বয়সী আহমেদ আল আলী, এবং ১৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ আল বিশ রাতের বেলায় তাদের ঘরে আগুন লাগলে আর বের হতে পারেননি। গ্রেপ্তারকৃত কেমাল কোরুকমাজ নিজেই ঘটনার দিন আরেক ব্যক্তিকে বলেছিল যে, সে সিরিয়দেরকে খুন করতে চায়। এই সূত্রে পুলিশ তার উপর নজরে রাখার পরেও ঘটনা ঘটে এবং ঘটনার দশ দিন পর পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, এই ঘটনাগুলি তুরস্কে শরণার্থীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মারাত্মক ধারাবাহিকতাকেই দেখিয়ে দিচ্ছে। তবে এই সহিংসতা যে কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, তা একটু গভীরে গেলেই বোঝা যাবে।
রাজনীতিবিদেরাই যখন উগ্র জাতীয়তাবাদী
তুরস্কে বর্তমানে ৬০ লাখের মতো অভিবাসী এবং শরণার্থী রয়েছে; যাদের মাঝে প্রায় ৩৬ লাখ হলো সিরিয়। তুরস্কের রাজনৈতিক মহলে অনেকেই বলতে শুরু করেছে যে, তুরস্কের অর্থনৈতিক সমস্যার জন্যে সিরিয় শরণার্থীরাই দায়ী। ২০২১ সালে তুরস্কের একটা আদালত ইস্তাম্বুলের পূর্বের শহর বোলুর মেয়রের শরণার্থী বিরোধী কিছু সিদ্ধান্তকে খোলাখুলিভাবে বর্ণবাদী আখ্যা দিয়ে বাতিল ঘোষণা করে। তুরস্কের প্রধান বিরোধী দল ‘রিপাবলিকান পিপলস পার্টি’ বা ‘সিএইচপি’র সদস্য মেয়র তানজু ওজকান সিরিয় শরণার্থীদের জন্যে ১১ গুণ বেশি মূল্যে পানি সরবরাহ করার পরিকল্পনা করেন; একইসাথে সিরিয়দের বিয়ের লাইসেন্স ১ লক্ষ লিরা ধার্য করেন। তিনি বলেন যে, এই সিদ্ধান্তের পিছনে তার উদ্দেশ্য হলো সিরিয় শরণার্থীদেরকে তার শহর থেকে তাড়ানো। ‘সিএইচপি’র নেতৃত্ব ওজকানের এহেন বর্ণবাদী সিদ্ধান্তের সমর্থন না করলেও তুর্কি রাজনীতিবিদেরা অনেকেই তাদের শরণার্থী বিরোধী কথা চালিয়ে যাচ্ছেন।
জানুয়ারির শুরুতেই তুরস্কের পুলিশ ডানপন্থী দল ‘জাফের পার্টি’র প্রধান উমিত ওজদাগএর বিরুদ্ধে ‘মানুষের মাঝে ঘৃণা ছড়ানো’র অভিযোগ আনে। অথচ অভিযোগ দায়ের কথার তিন বছরেরও বেশি সময় আগে ২০১৭ সালের নভেম্বরে ওজদাগ দাবি করেছিলেন যে, সিরিয় শরণার্থীরা স্থূলকায় হয়ে যাচ্ছে; যেখানে তুর্কিরা দারিদ্র্যের মাঝে পতিত হচ্ছে। ওজদাগ একদিন একটা সিরিয় মালিকানার দোকানে ঢুকে ট্যাক্সের কাগজ এবং পরিচয়পত্র দেখতে চান এবং পুরো ব্যাপারটাকে ভিডিও করে অনলাইনে প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি দোকান মালিককে তুর্কি ভাষা না বলতে পারার জন্যে তিরস্কার করেন। তিনি টুইটারে লেখেন যে, এই দোকান মালিকের মতো আরও ৯ লক্ষ লোক তুরস্কে রয়েছে; যারা তুরস্কের জন্যে হুমকি। আরেকটা ঘটনায় গত নভেম্বরে তুরস্কের বিরোধী দল ‘আইওয়াইআই পার্টি’র সদস্য ইলায় আসকোয় ৪৫ জন সিরিয়কে তুরস্কের অর্থনীতিকে নিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক ভিডিও তৈরির অভিযোগে দেশ থেকে বের করে দেয়ার ব্যাপারে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেন। তুর্কি মিডিয়া ‘আহভাল’ বলে যে, গত অক্টোবরে তুরস্কের রাস্তায় এক ব্যক্তি মিডিয়াকে বলে যে, তুর্কিরা অর্থনৈতিকভাবে খুব খারাপ রয়েছে; অথচ তুরস্কে থাকা সিরিয়রা বেশ রয়েছে। তিনি বলেন যে, তিনি কলা কিনতে পারছেন না; অথচ সিরিয়রা কেজি কেজি কলা কিনতে পারছে। এই সাক্ষাতের পর তুরস্কে বসবাসরত কয়েকজন সিরিয় অনলাইনে ব্যাঙ্গাত্মকভাবে কলা খাওয়ার ভিডিও প্রকাশ করে।
‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০২১এর অগাস্টে আঙ্কারার আলতিনদাগ এলাকায় সিরিয় শরণার্থী এবং তুর্কিদের মাঝে দ্বন্দ্ব হানাহানিতে পরিণত হয়। এর মাঝে দু’জন তুর্কি ছুরিকাহত হয়; যাদের একজন পরবর্তীতে মৃত্যুবরণ করে। ঘটনার পর শতশত তুর্কি শহরের সিরিয় বাড়িঘর, দোকানপাট এবং গাড়ি ভাংচুর করে। এই ভাংচুরের দৃশ্য অনেকেই টুইটারে লাইভ প্রকাশ করে। ভিডিওগুলিতে অনেককেই দেখা যায় উগ্র জাতীয়তাবাদী স্লোগান ব্যবহার করতে। কেউ কেউ তাদের হাত দিয়ে ‘উলফ স্যালুট’ দিচ্ছিলো; যা হলো তুর্কি উগ্রপন্থী জাতীয়তাবাদী ‘উলকুচু’ বা ‘গ্রে উল্ভস’ গ্রুপের চিহ্ন। দাঙ্গার পর ‘আমরা সিরিয়দেরকে চাই না’, ‘আমরা কোন আফগান চাইনা’ এবং ‘তুরস্ক হলো শুধুমাত্র তুর্কিদের জন্যে’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে সোশাল মিডিয়া ভরে যায়।
তুরস্কের শরণার্থী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা ‘হেপিমিজ গোচমেনিজ’এর একজন সদস্য য়িলদিজ ওনেন ‘আল জাজিরা’কে বলেন যে, ‘আইওয়াইআই পার্টি’ বা ‘সিএইচপি’র সদস্য বোলুর মেয়র বা উমিত ওজদাগএর মতো লোকেরা যখন বারংবার বলতে থাকে যে শরণার্থীরা তুরস্কের প্রধান সমস্যা, তখন কিছু উগ্রপন্থী লোক শরণার্থীদের উপর হামলা করার কারণ পেয়ে যায়। এটা শুধু কয়েক ব্যক্তির কর্মকান্ড নয়, বরং পুরো দেশে কয়েক মাস ধরে চলা রাজনৈতিক পরিবেশই এসকল ঘটনার জন্যে দায়ী। ওনেন বলছেন যে, সবচাইতে মারাত্মক ব্যাপার হলো, এই ঘটনাগুলি তুরস্কের সরকার বা মিডিয়ার কাছে তেমন কোন গুরুত্বই পায়নি; অথচ লক্ষ লক্ষ তুর্কি, যারা জার্মানিতে বসবাস করে জাতিগত বৈষম্যের শিকার হচ্ছে, তাদের ব্যাপারগুলি পুরোপুরি আলাদাভাবে দেখা হচ্ছে। যখন জার্মানিতে তুর্কিদের উপর হামলা হয়, তখন রাজনীতিবিদেরা এবং সরকার কঠোর বিবৃতি দেয়; অনেকেই রাস্তায় প্রতিবাদ সমাবেশ করে। অথচ ইস্তাম্বুলের এসেনইয়ুর্ত এলাকার ভিডিওতে যখন শতশত মানুষকে সিরিয় দোকানে হামলা করতে দেখা গেলো, তখন মাত্র সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হলো!
ইজমিরের নৃশংসতা
তুর্কি পত্রিকা ‘ইয়েনি সাফাক’ বলছে যে, ইজমিরের হত্যাকান্ডের স্বীকারোক্তি দেয়া কেমাল কোরুকমাজ ঘটনার ১০ দিন পর গত ২৬শে নভেম্বর দু’জন ব্যক্তিকে আলাদাভাবে ছুরিকাঘাত করে। পুলিশের সামনে সে গর্ব করে স্বীকার করে যে, এর আগে তিনজন সিরিয় নাগরিককে সে নিজেই আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। তুর্কি মিডিয়া ‘এভরেনসেল’ বলছে যে, কোরুকমাজ পুলিশকে বলে যে, সে দুই দশক আগে তুরস্কের সামরিক ইন্টেলিজেন্স সংস্থা ‘জেআইটিইএম’এর অধীনে গোপন মিশনে কাজ করতো। সে বলে যে, সে তার গাড়ির উইন্ডশিল্ডের উপর সিরিয়দেরকে হত্যা করার ব্যাপারে পরপর তিনটা নির্দেশনা পাবার পরেই কাজটার পরিকল্পনা শুরু করে। সে অভিযোগ করে যে, সিরিয়রা আসার পর থেকে সে চাকুরি পাচ্ছিলো না। সে মৃত ব্যক্তিদের সাথে একই বাড়িতে থাকা শুরু করে, যা কংক্রিট কোম্পানি ‘বিরলিক বেটন’এর মালিকানায় ছিলো। ঘটনার রাতে সে বের হয়ে গিয়ে পাঁচ লিটার পেট্রোল কিনে এনে বাড়িতে আগুন লাগায়।
ইজমিরে পুড়ে মারা যাওয়া সিরিয়দের একজনের ভাই আহমেদ আল বিশ তুরস্কের কুর্দি মিডিয়া ‘রুদাউ’কে বলেন যে, ভবিষ্যতে যাতে এধরনের ঘটনা না ঘটে, সেজন্য তিনি ক্ষমতাসীন ‘একে পার্টি’, তুরস্কের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘকে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানাচ্ছেন। এধরনের হামলা জাতীয়তাবাদীরা করছে বলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। মৃত আরেকজনের ভাই আহমেদ আল নাবহান তুর্কি মিডিয়া ‘দুভার’কে বলেন যে, পুলিশ তাকে বলেছিল যাতে সে ঘটনার ব্যাপারে চুপ থাকে। পুলিশ এক ব্যক্তিকে সন্দেহ করছে; এবং সেই ব্যক্তি গ্রেপ্তার হবার আগ পর্যন্ত যেন সে কাউকে কিছু না বলে। আল নাবহান আরও বলেন যে, তিনি চান সরকার যাতে সুষ্ঠু বিচার করে এবং বর্ণবাদ রোধে দায়ী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ সাজা দেয়। তিনি বলেন যে, তুর্কি, সিরিয়, ইরাকি, জর্ডানিয়ানরা সকলেই মুসলিম। তুরস্কের ১৩টা মানবাধিকার সংস্থা এক যৌথ বিবৃতিতে বলে যে, ইজমিরের ঘটনাটা ছিল পুরোপুরিভাবে বর্ণবাদী চিন্তা প্রসূত। তারা ঘটনা তুরস্কের জনগণ এবং মৃতদের আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখার জন্যে তুর্কি সরকারকে দায়ী করেন। তুরস্কের মানবাধিকার এসোসিয়েশন ‘আইএইচডি’র প্রধান জাফের ইনসে বলেন যে, তারা জানেন যে, আইন শৃংখলা বাহিনী এবং অগ্নি নির্বাপক বাহিনীর সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। তবে দায়ী ব্যক্তি নিজেই স্বীকার করেছে যে, সে এক মারাত্মক পরিকল্পনার মাধ্যমে এই কাজটা করেছে। যদিও এখনও তদন্ত শুরুর দিকে রয়েছে, তথাপি এটা বোঝা যাচ্ছে যে, অনেক লোক এই ঘটনায় জড়িত।
তুরস্কের শরণার্থী রাজনীতি
২০২১এর জুলাইএ তুরস্কের প্রধান বিরোধী দল ‘সিএইচপি’র প্রধান কেমাল কিলিশদারোগলু বলেন যে, তার দলের পাঁচটা মূল লক্ষ্যের একটা হলো সিরিয় শরণার্থীদেরকে দেশে ফেরত পাঠানো। তারা ক্ষমতায় যাবার দুই বছরের মাঝেই সকল শরণার্থীকে ফেরত পাঠাবেন; এবং এব্যাপারে তাদের সকল পরিকল্পনা করাই আছে। এর জবাবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান বলেন যে, তিনি তুরস্কে আশ্রয় খোঁজা ‘আল্লাহতে বিশ্বাসী’ মানুষদেরকে খুনিদের হাতে তুলে দেবেন না। তবে এরদোগানের এই কথাগুলির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন করেন অনেকেই। ‘মাইগ্রেশন পলিসি ইন্সটিটিউট’এর লেখায় বলা হচ্ছে যে, ২০১৬ সালে তুরস্ক ইইউএর সাথে সিরিয় শরণার্থীদের ব্যাপারে একটা চুক্তি করে। চুক্তি মোতাবেক তুরস্ক ইইউএর সীমানা থেকে শরণার্থীদেরকে দূরে রাখবে। ইইউ শরণার্থীদের জন্যে ডেবিট কার্ড ইস্যু করে তাদেরকে অর্থ সহায়তা দিতে থাকে; যা ব্যবহার করে শরণার্থীরা বাজার থেকে কেনাকাটা করতে থাকে। চুক্তির ফলে ইইউতে শরণার্থী আসা অনেক কমে যায়। চুক্তিতে পরিবর্তন আনার ব্যাপারে ইইউএর উপর চাপ সৃষ্টি করতে তুরস্ক ২০২০এর প্রথমাংশে কয়েক লক্ষ শরণার্থীকে গ্রিসে পাঠানোর হুমকি দেয়। এই ঘটনা বলে দিচ্ছে যে, ইইউ এবং তুরস্কের মাঝে শরণার্থী চুক্তি একটা অস্বস্তিকর চুক্তি, যা রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত।
তুরস্কের চাপের মুখে ২০২১এর জুনে ইইউ সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, তারা শরণার্থীদের জন্যে তুরস্ককে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আরও ৩ বিলিয়ন ইউরো সহায়তা দেবে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইইউ গত ডিসেম্বরে ঘোষণা দেয় যে, ১৫ লক্ষ শরণার্থীর ডেবিট কার্ডে ৩’শ ২৫ মিলিয়ন ইউরো দেয়া হবে; যা ব্যবহার করে তারা তাদের দরকারি খাদ্য, বাড়িভাড়া, পরিবহণ এবং ঔষধ কেনাকাটা করতে পারবে। ইইউএর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক কমিশনার জানেজ লেনারসিচ বলেন যে, এই অর্থ সহায়তার ফলে শরণার্থীরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে যে, তাদের কোন জিনিসটা সবচাইতে বেশি দরকার; এবং একইসাথে তারা তুরস্কের অর্থনীতিকে সহায়তা দিতে পারবে।
‘ডেইলি সাবাহ’ বলছে যে, ইইউএর শরণার্থী দূরে রাখার প্রবণতা এবং তুরস্কে শরণার্থীদের অর্থায়নে ইইউএর আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ব্যাপারে তুর্কি রাজনীতিবিদেরা সর্বদাই সমালোচনার ঝড় তুলেন। এরদোগানের তুর্কি সরকারের অভিযোগ যে, ইইউ তুরস্ককে যে পরিমাণ অর্থের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা না দিয়ে গ্রিসকে অর্থায়ন করে যাচ্ছে। চুক্তির পাঁচ বছর পর শরণার্থী নীতির ব্যাপারে ইইউ আগের চাইতে অনেক বেশি বিভাজিত; এবং চুক্তির শর্তগুলি এখন ভেঙ্গে পড়ছে।
তুরস্কের উগ্র জাতীয়তাবাদী চিন্তার নেপথ্যে
‘ডেইলি সাবাহ’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০১১ সালে সিরিয়াতে গৃহযুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত তুরস্কে ৬০ হাজার অভিবাসী প্রত্যাশী ছিল। এখন তুরস্কে প্রায় ৬০ লক্ষ অভিবাসী বসবাস করছে; যার মাঝে প্রায় ৪০ লক্ষই এসেছে সিরিয়া থেকে। আর ২০১৬ সালে ইইউএর সাথে শরণার্থী চুক্তি করার পর তুরস্কে আরও ২০ লক্ষ শরণার্থী আশ্রয় নেয়। রেড ক্রিসেন্ট বলছে যে, তুরস্কে শরণার্থীদের অর্ধেকই প্রয়োজনীয় খাদ্য যোগাড় করতে পারছে না। আর করোনা মহামারি শুরুর পর থেকে শরণার্থীদের উপর ঋণের বোঝা আগের চাইতে দ্বিগুণ হয়েছে। আর গত অগাস্টে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পলায়নের পর তুরস্কে আবারও নতুন করে শরণার্থী আসার শংকা শুরু হয়। এই শংকাকে কেন্দ্র করে তুরস্কে উগ্র জাতীয়তাবাদীদের আরেক দফা শরণার্থী বিরোধী কর্মকান্ড দানা বাঁধে। তুরস্কের ‘রিসার্চ সেন্টার ফর এসাইলাম এন্ড ইমিগ্রেশন’ বা ‘আইজিএএম’এর প্রধান মেতিন কোরাবাতির ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, তুরস্কের উগ্র জাতীয়তাবাদের পিছনে রাজনীতিবিদদের একটা বড় অবদান রয়েছে। তারা অনেকেই ২০২৩ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখেই শরণার্থীদেরকে দেশে ফেরত পাঠাবার কথা বলছেন। সমাজ গবেষক উলাস সুনাতাও বলছেন যে, রাজনীতিবিদেরা যখন বারংবার বলছেন যে, শরণার্থীরা দেশে ফেরত পাঠানো হবে, তখন সামনের দিনগুলিতে আরও মারাত্মক সহিংসতা অপেক্ষা করবে।
তুরস্কের জাতীয়তাবাদীরা সিরিয় শরণার্থীদেরকে তাদের অর্থনৈতিক সমস্যার জন্যে দায়ী করছে। কিন্তু যে ব্যাপারটা অনেকেই এড়িয়ে যাচ্ছেন তা হলো, শরণার্থী সমস্যার মাঝেই তুরস্কের জিডিপি ২০০৯ সালে সাড়ে ৬’শ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০১৩ সাল নাগাদ সাড়ে ৯’শ বিলিয়নে পৌঁছায়। তবে অর্থনৈতিক অবব্যস্থাপনার কারণে তুরস্কের জিডিপি কমে এখন ৭’শ বিলিয়নে নেমে এসেছে। বিশেষ করে ২০১৮ সাল থেকে তুর্কি লিরার ব্যাপক দরপতন ঠেকাতে না পারার ফলশ্রুতিতে মারাত্মক মূল্যস্ফীতি গ্রাস করেছে তুরস্কের অর্থনীতিকে। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, তুরস্কের অর্থনীতি যখন ভালো ছিল, তখন কেউ শরণার্থী নিয়ে কথা বলেনি; অর্থনীতি খারাপ হবার সাথেসাথেই অনেকেই এর জন্যে শরণার্থীদের দায়ী করতে থাকে।
তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান এবং তার ‘একে পার্টি’ শরণার্থীদেরকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার কোন সুযোগই হাতছাড়া করেনি। এরদোগান একদিকে যেমন সিরিয় শরণার্থীদেরকে সীমানা অতিক্রম করে ইউরোপে যাবার ট্রানজিট দিয়ে ইইউকে ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায় করেছেন, তেমনি সিরিয় শরণার্থীদেরকে তিনি ‘আল্লাহতে বিশ্বাসী’ শরণার্থী বলেই থাকতে দিয়েছেন বলে তুর্কি জনগণের ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়েছেন। একইসাথে বিরোধী জাতীয়তাবাদী দলগুলিকে তিনি আক্রমণ করেছেন ‘বিশ্বাসী জনগণ’কে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা করার জন্যে। এগুলি তিনি করেছেন তার ভোট ব্যাংক বাড়াবার উদ্দেশ্যেই। এরদোগানের সরকার শরণার্থীদের নিরাপত্তার ব্যাপারে কতটা আন্তরিক, তা ইজমিরে তিনজন সিরিয় কর্মীকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনাকে তার সরকারের প্রায় একমাস গোপন রাখার মাঝেই বোঝা যায়। অপরদিকে তুরস্কের বিরোধী উগ্র জাতীয়তাবাদী দলগুলিও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান না পেয়ে দায়ভার চাপিয়েছে শরণার্থীদের উপর; যা কিনা তাদেরকে ডানপন্থীদের ভোট পেতে সহায়তা করবে। মোটকথা সিরিয় শরণার্থীরা এবং ডানপন্থী উগ্রবাদীরা এখন তুরস্কের রাজনৈতিক ময়দানে খেলার গুটি ছাড়া আর কিছুই নয়।
Sunday, 2 January 2022
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দোপ্যাসিফিক ফোকাসের মাঝেই বলকানে জাতিগত সমস্যার পুনরুদ্ধান
গত ১০ই ডিসেম্বর বসনিয়ার জাতিগত সার্ব অংশের পার্লামেন্টের এক ভোটাভুটিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, সার্বরা বসনিয়ার রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলি থেকে বের হয়ে যাবে। উত্তপ্ত বাকবিতন্ডার মাঝে ডানপন্থী সার্ব জাতীয়তাবাদী নেতা মিলোরাদ দোদিক যথেষ্ট ভোট পেয়ে সার্বদেরকে বসনিয়ার সেনাবাহিনী, আদালত এবং কর ব্যবস্থা থেকে বের করে নিয়ে আসার জন্যে আইন তৈরি করার জন্যে সমর্থন পেয়ে যান। ছয় মাসের মধ্যে এই প্রস্তাবগুলি আইন আকারে স্বীকৃতি পেতে পারে। বিরোধী দলীয় সাংসদ ব্রানিস্লাভ বোরেনোভিচ সমালোচনা করে বলেন যে, এই প্রস্তাবের অর্থ হলো সংঘাত; যুদ্ধ এবং মৃত্যু। তিনি দোদিককে জিজ্ঞেস করেন যে, রিপাবলিকা সার্পস্কার সেনাবাহিনী কিসের প্রতিনিধিত্ব করবে? ট্যাংক এবং যুদ্ধবিমানের জন্যে অর্থ কোত্থেকে আসবে? সীমানায় চেকপোস্ট বসানোর শর্তগুলি কি হবে? এই উত্তরগুলি দোদিককে দিতে হবে বলে তিনি দাবি করেন। আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে সার্বদের এই সিদ্ধান্তের খবরটা বসনিয়ার তথা পুরো বলকানের কঠিন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বলেই উল্লেখিত হয়।
পৃথিবীর অন্যতম জটিল রাজনৈতিক ব্যবস্থা আখ্যা দিয়ে ‘ইউরোনিউজ’ বসনিয়ার রাষ্ট্র ব্যবস্থার বর্ণনা দিয়েছে। ১৯৯৫ সালে বসনিয়ার গৃহযুদ্ধের শেষে মার্কিন মধ্যস্ততায় ডেইটন শান্তি চুক্তির মাধ্যমে বর্তমান বসনিয়া রাষ্ট্রের জন্ম দেয়া হয়। এই রাষ্ট্রের মাঝে রয়েছে দু’টা আলাদা প্রশাসনিক সত্ত্বা। একটা হলো জাতিগত সার্ব সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে রিপাবলিকা সার্পস্কা; আর অন্যটা হলো বসনিয়াক এবং ক্রোয়াটদের নিয়ে গঠিত ফেডারেশন অব বসনিয়া এন্ড হার্জেগোভিনা। জাতিগত সার্বরা হলো মূলতঃ অর্থোডক্স খ্রিস্টান; বসনিয়াকরা মূলতঃ মুসলিম; ক্রোয়াটরা মূলতঃ ক্যাথোলিক খ্রিস্টান। উভয় অঞ্চলকেই বেশকিছু ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। তবে বসনিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার কিছু ব্যাপার নিয়ন্ত্রণ করে; যার মাঝে রয়েছে সেনাবাহিনী, সর্বোচ্চ আদালত এবং কর আদায়ের কাঠামো। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধান হলো তিন সদস্য বিশিষ্ট প্রেসিডেন্সি; যার সদস্যরা হলেন বসনিয়াক, সার্ব এবং ক্রোয়াট। তিন জাতির মানুষের ভোটের দ্বারা তারা আলাদাভাবে নির্বাচিত হন। বর্তমানে এর বসনিয়াক সদস্য হলেন শেফিক জাফেরোভিচ; আর ক্রোয়াট সদস্য জেলিকো কমসিচ। উগ্র জাতীয়তাবাদী অচরণের জন্যে তারা পশ্চিমা দেশগুলির কাছে দোদিক এবং তার সমর্থকদের উপর চাপ সৃষ্টির আনুরোধ জানিয়ে আসছেন। ২০১৩ সালের শুমারি অনুযায়ি বসনিয়ার প্রায় ৩৩ লক্ষ জনসংখ্যার মাঝে ৫০ শতাংশ হলো বসনিয়াক; সার্বরা হলো প্রায় ৩১ শতাংশ; ক্রোয়াটরা ১৫ শতাংশের মতো। ১৯৯০এর দশকে সাবেক ইউগোস্লাভিয়া ভেঙ্গে যাবার পর ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে ১ লক্ষের বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। যুদ্ধের মাঝে ভয়ংকর মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে বসনিয়ার স্রেব্রেনিসা শহরে সার্বদের হাতে ৮ হাজার নিরপরাধ বসনিয়াক মুসলিমের মৃত্যুর ঘটনা এখনও ভয়াবহ এক উদাহরণ হিসেবে রয়ে গেছে।
মিলোরাদ দোদিক ২০১০ সালে গণতান্ত্রিক ভোটে রিপাবলিকা সার্পস্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের অক্টোবরে বসনিয়ার প্রেসিডেন্সির সদস্য নির্বাচিত হবার আগ পর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল ছিলেন। এই পদে থাকার সময়েই তিনি বারংবার রিপাবলিকা সার্পস্কাকে বসনিয়ার রাষ্ট্রকাঠামো থেকে আলাদা করে ফেলার কথা বলেন। ডেইটন শান্তি চুক্তিকে হুমকিতে ফেলার কারণে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন সরকার দোদিকের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ঘোষণা দেয় এবং তার সাথে কোন মার্কিন ব্যক্তি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা করার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কিন্তু দোদিক বলেন যে তিনি তার উপর অবরোধের কোন তোয়াক্কা করেন না। তিনি বসনিয়ার প্রেসিডেন্সির সদস্য হবার পর থেকে তার জাতীয়তাবাদী কথার তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। ‘ইউরোনিউজ’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, গত সেপ্টেম্বর মাসে তিনি রিপাবলিকা সার্পস্কার আলাদা সেনাবাহিনী, আদালত এবং কর কাঠামো তৈরি করার পরিকল্পনার ঘোষণা দেন। তবে তিনি বলেন যে, এসব পরিকল্পনা বসনিয়া থেকে আলাদা হয়ে যাবার প্রচেষ্টা নয়, অথবা নতুন করে যুদ্ধ শুরুর সম্ভাবনাকেও উস্কে দেবে না।
মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কাউন্সিল অব ফরে রিলেশন্স’ বা ‘সিএফআর’এর এক লেখায় চার্লস কুপচান বলছেন যে, ডেইটন চুক্তি অনুসারে বসনিয়ার রাজনীতিটাই হলো জাতিগত। আর সার্বদের নতুন সিদ্ধান্তের অর্থ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আর কিছু নয়। তিনি বলেন যে, পুরো বলকান অঞ্চলেই এখন জাতীয়তাবাদের উত্থান হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ সার্বিয়াও দ্রুত নিজেদের সামরিক বাজেট বৃদ্ধি করছে এবং দেশটার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দুনিয়ার সকল সার্বদের একত্রিত হবার আহ্বান জানিয়েছেন। সার্বিয়া এখনও ১৯৯৯ সালে ন্যাটোর সহায়তায় সার্বিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আলবেনিয় মুসলিম অধ্যুষিত কসভোকে স্বীকৃতি দেয়নি; এবং এখনও সার্বিয়ার সাথে কসভোর সম্পর্ক বেশ খারাপ। একইসাথে অত্র অঞ্চলে রাশিয়াও অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের মাঝে তার প্রভাব বিস্তার করছে; যার মাধ্যমে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিকে ইইউ এবং ন্যাটো থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে রাশিয়া। এর মাঝে ইইউ বলকানের ব্যাপারে খুব বেশি দৃষ্টি দিচ্ছে না; আর যুক্তরাষ্ট্রও ইন্দোপ্যাসিফিক নিয়ে ব্যস্ত। রাশিয়ার সাথেও চলছে উত্তেজনা। এমতাবস্থায় দোদিকের জাতীয়তাবাদী কর্মকান্ডের ফলে রিপাবলিকা সার্পস্কা যদি বসনিয়া থেকে আলাদা হয়ে যায়, তাহলে সংঘাতের সৃষ্টি হতে পারে; যা বসনিয়ার সীমানার বাইরেও ছড়িয়ে যেতে পারে।
কুপচান বলকানের বেশ কয়েকটা দেশের ইইউ এবং ন্যাটোর সদস্য হওয়াকে সেখানকার উন্নয়ন আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু ইইউ এবং ন্যাটো সদস্য দেশ হাঙ্গেরির গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ভিক্টর অরবানই যখন উগ্রপন্থী কথা বলছেন, তখন ইউরোপের গণতান্ত্রিকতার মাঝেই জাতীয়তাবাদী সমস্যার গভীরতা নতুধাবন করা যায়। বুদাপেস্টে এক ভাষণে তিনি বলেন যে, বসনিয়াকে যদি ইইউএর ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে ২০ লক্ষ মুসলিমের কারণে নিরাপত্তার সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। গত ডিসেম্বরে এক সংবাদ সন্মেলনে অরবান বলেন যে, তিনি রিপাবলিকা সার্পস্কাকে অর্থনৈতিক সহায়তা দিচ্ছেন এবং তিনি মিলোরাদ দোদিকের উপর অবরোধের বিরোধী। অরবান জার্মানির প্রতি দোদিকের বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকান্ডের কারণে শাস্তি না দিয়ে বরং আলিঙ্গন করার আহ্বান জানান। পূর্ব ইউরোপে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতারা যখন নতুন করে সংঘাতের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে, তখন ইন্দোপ্যাসিফিক নিয়েই ব্যস্ত যুক্তরাষ্ট্র; ১৯৯০এর দশকে ওয়াশিংটনের ছায়াতলে স্বাক্ষরিত ডেইটন শান্তি চুক্তিকে ধরে রাখার মতো সময় তাদের নেই। বলকানে তিন দশকের ভিতরেই গণতান্ত্রিকভাবেই ভেঙ্গে পড়ছে মার্কিন রাজনৈতিক সমাধান।
Monday, 7 September 2020
ইউরোপে উগ্রপন্থীদের উত্থান প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমা আদর্শের সংকট
অগাস্টের শেষে জার্মান রাজধানী বার্লিনে ৩৮ হাজার মানুষের এক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। করোনাভাইরাস বিষয়ে জার্মান সরকারের নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এই বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়েছিল। পুলিশ এদের মাঝ থেকে প্রায় ৩’শ প্রতিবাদকারীকে গ্রেপ্তারও করে। পরবর্তীতে কয়েক’শ ডানপন্থী প্রতিবাদকারী জার্মান পার্লামেন্ট ‘রাইখস্টাগ’এ হামলা করার চেষ্টা করে। জার্মান রাজনীতিবিদেরা অনেকেই এই হামলাকে ‘লজ্জাজনক’ এবং ‘অগ্রহনীয়’ বলে আখ্যা দেন। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, প্রতিবাদকারীদের মাঝে অনেকেই উগ্রপন্থী কথা লেখা টি শার্ট বা পতাকা বহন করছিল। ‘ল্যাটেরাল থিংকিং ৭১১’ নামের একতা সংগঠন বলে যে, সরকারের করোনাভাইরাসের নিয়মকানুন জনগণের ব্যক্তিস্বাধীনতার উপর আঘাতের স্বরূপ। অংশগ্রহণকারীদের মাঝে অনেকেই করোনাভাইরাস বলে কিছু আছে, সেটাই বিশ্বাস করে না। তারা মনে করছে যে, করোনাভাইরাস একটা ষড়যন্ত্র; এবং সরকার করোনাভাইরাসের নামে মানুষের উপর গোয়েন্দাগিরি করছে। একই রকমের চিন্তার মানুষের লন্ডন, প্যারিস, ভিয়েনা এবং জুরিখ শহরেও বিক্ষোভ করে।
‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জার্মানিতে মোট ২ লক্ষ ৪২ হাজার মানুষের মাঝে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পাওয়া গিয়েছে, যা কিনা অন্যান্য ইউরোপিয় দেশ থেকে কম। ৯ হাজার ৩’শ মানুষের মৃত্যুর সংখ্যাটাও ব্রিটেন, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি বা রাশিয়ার চাইতে কম বলে বলছে ‘জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি’র গবেষণা। ‘ইসিডিসি’র হিসেবে অগাস্ট মাসে পুরো ইউরোপেই সংক্রমণ আবারও বাড়তে শুরু করেছে। জার্মানিতেও তাই ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে আরও কঠোর হচ্ছে সরকার। ২৭শে অগাস্ট চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মার্কেলের সরকার জনসমক্ষে মাস্ক না পড়ার জন্যে ৫০ ইউরো জরিমানা ধার্য্য করে। আগামী বছর পর্যন্ত জনসমাগমের উপরে নিষেধাজ্ঞা বলবত করা হয়েছে। বার্লিনের করোনা বিরোধী প্রতিবাদের বিশেষত্ব ছিল উগ্র ডানপন্থীদের অংশগ্রহণ এবং জার্মান পার্লামেন্টে হামলার চেষ্টা। করোনা ইস্যুকে কেন্দ্র করে ডানপন্থীরা নিজেদের অবস্থান সংহত করতে চাইছে কিনা, তা নিয়েও কথা শুরু হয়েছে। কারণ জার্মানিতে উগ্রবাদী, বিশেষ করে নিও নাজিদের কর্মকান্ড নিয়ে উদার ও মধ্যপন্থীরা যারপরনাই চিন্তিত।
গত মার্চে জার্মানির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা ‘বিএফভি’এর প্রধান থমাস হালডেনওয়াং এক সংবাদ সন্মেলনে বলেন যে, ডানপন্থী উগ্রবাদ এবং সন্ত্রাসবাদ জার্মানির গণতন্ত্রের জন্যে সবচাইতে বড় হুমকি। তিনি বলেন যে, উগ্র ডানপন্থীদের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৩২ হাজারের মতো; এর মাঝে ১৩ হাজারের সম্ভাব্য সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়াবার সম্ভাবনা বেশি। তিনি আরও বলেন যে, জার্মানির ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ‘অলটারনেটিভ ফুর ডয়েচল্যান্ড’ ‘এএফডি’ বা ‘অলটারনেটিভ ফর জার্মানি’র সবচাইতে উগ্রবাদী অংশের নেতৃবৃন্দকে গোয়েন্দা নজরে রাখা হয়েছে। এই অংশটার নাম ‘ডের ফ্লুগেল’ বা ‘দ্যা উইং’; যার সদস্যসংখ্যা আনুমানিক ৭ হাজারের মতো। ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বলছে যে, এই গ্রুপের গুরুত্ব তাদের সংখ্যার চাইতেও আরও বেশি; কারণ এরা পুরো দলের নীতি নির্ধারণেও প্রভাবশালী ভূমিকা রাখে। জার্মান পুলিশ এবং তাদের কথাবার্তা শুনতে এবং রেকর্ড করতে পারবে। হালডেনওয়াং বলেন যে, জার্মানিতে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন হামলার ঘটনাই বলে দিচ্ছে যে, উগ্রবাদী গ্রুপগুলিকে নিয়ন্ত্রণে রাখাটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। গত ফেব্রুয়ারিতে হানাউ শহরে একতা শিশা বারে এক উগ্রপন্থী বন্দুকধারী ৯ জনকে গুলি করে হত্যা করে। এর আগে অক্টোবরে হাল শহরে ইহুদিদের উপাসনালয় সিনাগগে হামলায় দুই জন নিহত হয়। তারও আগে জুন মাসে হেস রাজ্যে ইমিগ্রেশনের ব্যাপারে নমনীয় অবস্থানে থাকা এক রাজনীতিবিদ ওয়াল্টার লুবেককে এক উগ্রপন্থী ব্যক্তি গুলি করে হত্যা করে।
‘এএফডি’ তৈরি হয় ২০১২ সালে। দল গঠনের পিছনে মূল যুক্তি ছিল জার্মানিকে ইউরো থেকে নিজস্ব মুদ্রা ডয়েচ মার্কে ফিরিয়ে নেয়া। তাদের বক্তব্য ছিল যে, ইউরোর চাপে দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলি দেউলিয়া হয়ে যাবে এবং তারা ক্রমান্বয়ে জার্মানির উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠবে। ২০১০ সালে গ্রীসের দেউলিয়া হবার ঘটনায় জার্মানির অর্থনৈতিক সহায়তা দেবার প্রতিশ্রুতি দল গঠনের গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল। দলের উদ্যোক্তা হিসেবে তিনজনের নাম বলা হয়েছিল। এর মাঝে আলেক্সান্ডার গল্যান্ড ছিলেন একজন সরকারি আমলা এবং পরবর্তীতে পটসড্যামের একটা পত্রিকার সম্পাদক। গল্যান্ড একইসাথে এঙ্গেলা মার্কেলের ‘ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন’ বা ‘সিডিইউ’এর সদস্য ছিলেন। ‘সিডিইউ’ হলো জার্মানির সবচাইতে বড় রাজনৈতিক দল। জার্মান পার্লামেন্ট ‘বুন্দেস্টাগ’এর ৭’শ ৯টা আসনের মাঝে ‘সিডিইউ’এর আসন রয়েছে ২’শ। আরেকজন প্রতিষ্ঠাতা বার্ন্ড লাক ইউনিভার্সিটি অব হামবুর্গের অর্থনীতির প্রফেসর। তিনি বিশ্ব ব্যাঙ্কের একজন উপদেষ্টার পদে থাকা ছাড়াও কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ভিজিটিং স্কলার ছিলেন। আরেকজন প্রতিষ্ঠাতা কোনরাড এডাম মূলতঃ সাংবাদিক হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত। দীর্ঘ ২৮ বছর তিনি জার্মানির গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা ‘ফ্রাঙ্কফুটার আলেমাইন জাইটুং’ এবং ‘ডাই ওয়েল্ট’এর সাথে কাজ করেছে। ২০০৭ সাল থেকে তিনি পত্রিকাতে কলামিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। ‘এএফডি’ গঠনের পূর্বে তিনিও ‘সিডিইউ’এর সদস্য ছিলেন। গত সাত বছরে দলটা রও বেশি উগ্রবাদী ধারণা পোষণ শুরু করে এবং নিজেদের নেতৃত্বে বেশ কয়েক দফা পরিবর্তন হয়। ২০১৫ সালে ইউরোপে শরণার্থী আগমণ শুরু হলে ‘এএফডি’ চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মার্কেলের সীমান্ত খুলে রাখার নীতির ব্যাপক সমালোচনা করে। বর্তমানে ‘এএফডি’ই হলো ক্ষমতাসীন ‘সিডিইউ’এর সবচাইতে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। পার্লামেন্টে এখন তাদের ৮৮টা আসন রয়েছে; ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টেও এদের ১১টা আসন রয়েছে। কাজেই এই দলকে এড়িয়ে যাওয়া কারুর পক্ষেই সভব নয়। গোয়েন্দা সংস্থার বিবৃতির পর ‘এএফডি’র মুখপাত্র জোর্গ মিউথেন বলেন যে, দলের বিরুদ্ধে এই কর্মকান্ড দলটার কন্ঠরোধ করার একটা চেষ্টা। এই প্রচেষ্টা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত।
‘ডের ফ্লুগেল’ শাখার নেতা বিয়র্ন হোক হলেন জার্মানির পূর্বাংশের থুরিঞ্জিয়া রাজ্যের ‘এএফডি’র রাজনীতিবিদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানিতে ইহুদি নিধনের স্মৃতি স্তম্ভকে তিনি ‘লজ্জার স্মৃতি’ বলে আখ্যা দিয়ে এই স্মৃতি রোমন্থনের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসার আহ্বান জানান। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, গত অক্টোবরে থুরিঞ্জিয়ার প্রায় ২৩ শতাংশ মানুষ ‘এএফডি’কে ভোট দিয়েছে। সিরিয়া এবং আফ্রিকা থেকে আসা শরণার্থীদেরকে জার্মানিতে ডুকতে দেবার নীতির সমালোচনা থেকেই ‘এএফডি’র জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের কথা হলো, চ্যান্সেলর মার্কেল একনায়কের মতো দেশ চালান এবং তাদের মতামতকে কোন মূল্যই দেন না। বিয়র্ন হোক অভিযোগ করেন যে, আফ্রিকা থেকে আগত মানুষেরা জার্মানির সমাজকে কলুষিত করে ফেলছে। তার কথার ধরণ অনেকেই পছন্দ না করলেও তিনি যা বলছেন, সেগুলিকে যুক্তিযুক্ত বলছেন তারা। অনেকেরই ধারণা রয়েছে যে, জার্মানিতে যথেষ্ট গরীব মানুষ রয়েছে; সরকারের উচিৎ বাইরে থেকে আসা মানুষের পিছনে অর্থ ব্যয় না করা। তবে জার্মান গোয়েন্দারা শুধুমাত্র বিয়র্ন হোককে টার্গেট করার কথা বললেও ‘এএফডি’র অন্যান্য নেতৃবৃন্দও উগ্রপন্থী বক্তব্যে পিছিয়ে নেই। দলের প্রতিষ্ঠাতা রাজনীতিবিদ আলেক্সান্ডার গল্যান্ড মন্তব্য করেন যে, জার্মান ফুটবল দলের কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড় বোয়াটেং খেলার মাঠে জার্মানির জন্যে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হলেও জার্মানির অনেক মানুষই তাকে নিজেদের প্রতিবেশী হিসেবে দেখতে চাইবে না। তিনি আরও বলেছিলেন যে, শিশুদের চেহাড়া দেখে শরণার্থীকে জার্মানিতে ঢুকতে দেয়াটা ব্ল্যাকমেইলের শামিল। ২০১৭ সালে তিনি বলেন যে, তুর্কি বংশোদ্ভূত জার্মান রাজনীতিবিদ আইদান উজুগুজকে তুরস্কে ফেরত পাঠানো উচিৎ। ২০১৬ সালে ‘এএফডি’র রাজনীতিবিদ ফ্রাউকা পেট্রি এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে, শরণার্থীদের থামাতে সীমান্ত পুলিশের দরকার হলে গুলি করা উচিৎ। বিয়াট্রিক্স ভন স্টর্ক আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে শরণার্থীদেরকে আক্রমণকারী হিসেবে আখ্যা দেন। ব্র্যান্ডেনবার্গ রাজ্যের ‘এএফডি’র প্রধান আন্দ্রেয়াস কালবিতজ ২০০৭ সালে গ্রীসে এক নিও নাজি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন, যেখানে স্বস্তিকা সংবলিত পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল।
যে ব্যাপারটা পরিষ্কার তা হলো, জার্মানির উগ্রপন্থী রাজনীতিবিদেরা জার্মানির স্বাভাবিক জীবনযাত্রার মাঝ থেকেই উঠে এসেছে। এদের অনেকেই সবচাইতে বড় রাজনৈতিক দল এঙ্গেলা মার্কেলের ‘ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন’এর সদস্য ছিল; কেউ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর; সরকারি কর্মকর্তা; বা গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকার সাংবাদিক বা কলামিস্ট। জার্মান গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মাঝ দিয়েই এই উগ্রপন্থী চিন্তার আবির্ভাব ঘটেছে। ‘ডের ফ্লুগেল’এর নেতাদের নজরদারির মাঝে আনার কথা বলা হলেও পুরো ‘এএফডি’র নেতারাই তো প্রকাশ্যে স্বাধীনভাবে উগ্রপন্থী কথা বলছেন। শুধু তাই নয়, ‘এএফডি’ এখন জার্মান পার্লামেন্টে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল; তাদের রয়েছে লাখো সমর্থক। পুলিশি কর্মকান্ডের মাধ্যমে এই উগ্রপন্থী চিন্তা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টাটা কতটা যুক্তিযুক্ত, তা প্রশ্ন করা যেতেই পারে। স্বাধীনচেতা ইউরোপের কাছে কিছু রাজনীতিবিদদের উপর ধরপাকড়ের বিষয়টা মানুষের বাকস্বাধীনতার উপর হামলা বলে বিবেচিত হবে কিনা, তা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে তা সমাজকে যে বিভক্ত করবে, তা নিশ্চিত।
আর জার্মানি কেন, বাকি ইউরোপেও ডানপন্থী চিন্তার ব্যাপক প্রসার ঘটছে। ‘দ্যা টেলিগ্রাফ’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্সে সহিংসতার সংখ্যা বেড়ে গেছে। উদাহরণসরূপ, মাস্ক পড়তে বলার কারণে কিছু বাসযাত্রীর হাতে এক বাস ড্রাইভারের প্রাণ গিয়েছে। ফরাসী ফুটবল দল প্যারিস সাঁ জার্মেই জার্মানির বায়ার্ন মিউনিখের কাছে হেরে যাবার পর রাস্তায় কিছু লোক ভাংচুর করে। বিভিন্ন শহরের মেয়ররাও জনগণকে মাস্ক পড়তে বলার কারণে হামলার শিকার হয়েছে। ফ্রান্সের উগ্র ডানপন্থী নেতা ম্যারিন লা পেন ৬ই সেপ্টেম্বর জনসমক্ষে এক ভাষণে বলেন যে, প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর সরকার অপরাধের বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠোর হতে পারছে না। আর ফ্রান্স ধীরে ধীরে আরও ‘হিংস্র’ হয়ে যাচ্ছে। লা পেন ২০১৭ সালের প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনে ম্যাক্রঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। ২০২২ সালের নির্বাচনেও তিনি ম্যাক্রঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চাইছেন। তিনি মনে করছেন যে, ম্যাক্রঁর বিরুদ্ধে দাঁড়াবার মতো আর কেউই এখন ফ্রান্সে নেই। ২০১৭এর নির্বানের দ্বিতীয় ধাপে তিনি ৩৪ শতাংশ মানুষের ভোট পেয়েছিলেন। লা পেনের অভিবাসন নীতি জার্মান ডানপন্থীদের মতোই। তিনি ঘোরতরভাবে মুসলিম বিদ্বেষী এবং শরণার্থীদের ফ্রান্সে ঢোকার যারপরনাই বিরোধী। ফ্রান্সে মুসলিম অভিবাসী আসা থামাতে তিনি ফ্রান্সের সীমানা বন্ধ করে দেবার কথা বলেন। একজন উগ্র ডানপন্থী নেতার জন্যে প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনে এক তৃতীয়াংশ ভোট অর্জন বলে দেয় যে, পুরো জাতির মাঝেই ডানপন্থী চিন্তা কতটা বাসা বেঁধেছে। জার্মানি এবং ফ্রান্সের চাইতেও ডানপন্থীরা বেশি শক্তিশালী ইতালিতে। সেখানে ডানপন্থী কোয়ালিশন ক্ষমতায়ও গিয়েছে। হাঙ্গেরিতেও ডানপন্থী ভিক্টর অরবান বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী। গতবছর পোল্যান্ডের ক্ষমতাসীন ডানপন্থীরা তাদের ভোট ৩৮ শতাংশ থেকে ৪৪ শতাংশে বাড়িয়ে নিয়েছে।
জার্মানি ও ফ্রান্সসহ ইউরোপে ডানপন্থীদের উত্থান শুধু ইউরোপিয় ইউনিয়নের ঐক্যের জন্যেই যে হুমকি তা নয়; ব্যক্তিস্বাধীনতায় কঠোরভাবে বিশ্বাসী ইউরোপিয়দের আদর্শিক অবস্থানকেও তা আঘাত করেছে। ডানপন্থী রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে পুলিশি গোয়েন্দাগিরি চালনা করাটা সেই আঘাতেরই বহিঃপ্রকাশ। তবে যে চিন্তার স্বাধীনতা থেকে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মাঝে উগ্রপন্থী ধারণা বাসা বাঁধছে, সেই চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে নিজেদের আদর্শকেই খাঁচায় পুরতে হচ্ছে ইউরোপিয়দের। একইসাথে যে উগ্রপন্থী চিন্তাকে পুঁজি করে ডানপন্থীরা ইউরোপজুড়ে ক্ষমতায় যাচ্ছে, তার পিছনে জনগণের সমর্থন গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক ধারাতেই উগ্রপন্থীরা ইউরোপে আরও শক্ত অবস্থানে যাচ্ছে। সেই হিসেবে জার্মান পুলিশের উগ্রপন্থীদের টার্গেট করে চাপের মাঝে ফেলার চেষ্টাখানা যথেষ্টই অগণতান্ত্রিক। গণতন্ত্রকে পুঁজি করে পরস্পরবিরোধী এই কার্যকলাপ ইউরোপের আদর্শিক সংকটেরই চিত্র, যা থেকে বের হবার কোন পথ কেউ দেখাতে পারছেন না।








