Showing posts with label Qatar. Show all posts
Showing posts with label Qatar. Show all posts

Saturday, 3 December 2022

কাতারে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২২এর ভূরাজনীতি

০৩রা ডিসেম্বর ২০২২

বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২২ নিয়ে সংবাদ সন্মেলনে ফিফা প্রধান জিয়ানি ইনফানটিনো। কাতারের মানুষের সংস্কৃতির সাথে খাপ খাওয়ানো নয়; বরং কাতারের মানুষকে নিজেদের সংস্কৃতি ফেলে দিয়ে পশ্চিমা সংস্কৃতি নিতে চাপ দেয়ার ব্যাপারটাই তার কথায় ফুটে উঠেছে। খেলার অনুষ্ঠান হলেও পশ্চিমা আদর্শের ক্রান্তিলগ্নে বিশ্বকাপের এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পশ্চিমারা তাদের আদর্শগুলিকে সার্বজনীন, সর্বোন্নত এবং ইসলামের আদর্শ থেকে উন্নততর প্রমাণ করার সুযোগটা হাতছাড়া করেনি।

কাতার বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে সমালোচনা যেন থামছেই না। আসর বসার ১২ বছর আগেই আয়োজক হিসেবে কাতার কতটুকু যোগ্যতাসম্পন্ন, তা নিয়ে কথাবার্তা শুরু হয়েছিল। ‘এনপিআর’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০১০ সালে থেকেই কাতারের আবহাওয়া এবং দেশটার পক্ষে ভোট দেয়া ফিফা কর্মকর্তাদের দুর্নীতির ব্যাপারে বিতর্ক শুরু হয়েছিল। পশ্চিমারা কাতারের মানবাধিকার নিয়েও খুব একটা সন্তুষ্ট ছিল না। তবে তারা বেশি সমালোচনা করছে সমকামিতার বিরুদ্ধে কাতারের শক্ত অবস্থান, মানবাধিকার নিশ্চিত না করা এবং অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার না দেয়ার ব্যাপারে। মোটকথা কাতার নিয়ে আলোচনার কোনকিছুই খেলা নিয়ে ছিল না; ছিল রাজনীতি নিয়ে।

ফিফার প্রাক্তন প্রধান সেপ ব্ল্যাটার ‘বিবিসি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, ভেন্যু হিসেবে কাতারকে নেয়ার সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল। তবে তিনি কারণ হিসেবে সমকামিতা বা মানবাধিকারের ব্যাপারগুলিকে সামনে আনেননি। তার কথায়, বিশ্বকাপ একটা অনেক বড় টুর্নামেন্ট, যা আয়োজন করার জন্যে একটা বড় দেশ প্রয়োজন। ব্ল্যাটারের চিন্তাটা অমূলক ছিল না। কারণ কাতারের ২৮ লক্ষ অধিবাসীর মাঝে মাত্র ৩ লক্ষ কাতারের নাগরিক; বাকিরা অভিবাসী কর্মী। এই কর্মীদের ব্যবহার করেই দেশটা বিশ্বকাপের মতো বিশাল আয়োজনকে সম্ভব করতে পেরেছে। কর্মীদের অধিকার নিয়ে রয়েছে যথেষ্ট সমালোচনা। ২০২১ সালে ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ২০১০ সাল থেকে বিভিন্ন কারণে সাড়ে ৬ হাজারেরও বেশি অভিবাসী কর্মীর মৃত্যু হয়েছে সেখানে। বিশ্বকাপের মাঝে কাতারের কর্মকর্তারা স্বীকার করেন যে, স্টেডিয়ামগুলি তৈরি করতে গিয়ে প্রায় ৫’শ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

কিন্তু পশ্চিমা আদর্শের দূতরা অনেকেই ব্ল্যাটারের মতো চিন্তা করেনি। এবারের বিশ্বকাপে বড় রাজনীতি হলো সমকামিদের বিরুদ্ধে কাতারের শক্ত অবস্থান। ‘এনপিআর’ বলছে যে, কাতারে সমকামিতার শাস্তি হলো ৭ বছরের কারাদন্ড। কাতারের প্রাক্তন ফুটবলার এবং ফিফা বিশ্বকাপের দূত খালিদ সালমান জার্মান টেলিভিশন ‘জেডডিএফ’কে বলেন যে, সমকামিতা হলো মস্তিষ্কের একটা সমস্যা; আর সমকামিরা কেউ যদি কাতারে ভ্রমণ করে, তাহলে তাদেরকে কাতারের আইন মেনে চলতে হবে। তিনি বলেন যে, তিনি খুব একটা ইসলামিক ব্যক্তিত্ব নন; তবে সমকামিতা ইসলামে পুরোপুরিভাবে নিষিদ্ধ। তার এই বক্তব্যগুলির বিরুদ্ধে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরসহ অনেকেই ব্যাপক সমালোচনা করে। ‘বিবিসি’ সালমান খালিদএর সাথে এক সাক্ষাতে সমকামিতার ব্যাপারটাকে আলোচনায় নিয়ে আসলে ফিফার কর্মকর্তারা বাধা দিয়ে আলোচনা বন্ধ করে দেন।

‘বিবিসি’ বলছে যে, সমকামিদের সমর্থনে ওয়েলস ফুটবল দলের ক্যাপ্টেন গ্যারেথ বেইল সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি তার হাতে ‘ওয়ান লাভ’ চিহ্ন সম্বলিত একটা ব্যান্ড পড়বেন; যা কিনা সমকামিতাকে সমর্থন করবে। ইংল্যান্ড ফুটবল দলের ক্যাপ্টেন হারি কেইনও একই সিদ্ধান্ত নেন। আর ব্রিটিশ পার্লামেন্টের লেবার দলীয় এমপি লিউক পোলার্ড পার্লামেন্টে বলেন যে, যেহেতু কাতারের সমকামিরা নিরাপদে নেই এবং অভিবাসীদের মানবাধিকার সেখানে নিশ্চিত করা হয়নি, তাই তিনি মনে করেন যে, তার পক্ষেও কাতারে গিয়ে খেলা দেখাটা নিরাপদ নয়।

ফিফার প্রধান জিয়ানি ইনফানটিনো বিশ্বকাপ শুরুর আগে এক সংবাদ সন্মেলনে কাতারকে ভেন্যু হিসেবে নির্বাচনের পক্ষে সাংবাদিকদের সাথে বিতর্কে জড়ান। তিনি বলেন যে, ইউরোপিয়রা বাকি বিশ্বে যা করেছে, সেটার কারণে অন্যদেরকে শেখানোর আগে আগামী ৩ হাজার বছর ইউরোপিওদের উচিৎ ক্ষমা চাওয়া। কাতারে অভিবাসী কর্মীদের অধিকারের ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে তিনি তার ছোটকালে সুইজারল্যান্ডে অভিবাসী কর্মী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে তুলে ধরে বলেন যে, সেখানে ইতালিয় বলে এবং লাল চুল থাকার কারণে তাকে হেয় করা হতো। তবে ইনফানটিনোর যুক্তি ছিল, শুধুমাত্র সমালোচনা না করে কাতারের মতো দেশগুলির মানুষের শিক্ষার জন্যে পশ্চিমাদের বিনিয়োগ করা উচিৎ। বিশেষ করে কাতারকে দূরে সরিয়ে না দিয়ে বরং পাশে রেখে তাদের উপরে চাপ সৃষ্টি করে তাদের চিন্তাভাবনার পরিবর্তন ঘটানো।

ফিফার প্রধান ইনফানটিনো সমকামিতা এবং মানবাধিকারের মতো পশ্চিমা চিন্তাগুলির সমালোচনা করেননি। বরং তিনি বলেছেন যে, কাতারের মতো দেশগুলিতে বিশ্বকাপের মতো অনুষ্ঠান আয়োজন করে তাদেরকে পশ্চিমা ধ্যানধারণায় অভ্যস্ত করানো। কাতারের মানুষের সংস্কৃতির সাথে খাপ খাওয়ানো নয়; বরং কাতারের মানুষকে নিজেদের সংস্কৃতি ফেলে দিয়ে পশ্চিমা সংস্কৃতি নিতে চাপ দেয়ার ব্যাপারটাই তার কথায় ফুটে উঠেছে। ইনফানটিনো সাংবাদিকদেরকে বলেন যে, স্টেডিয়ামে মদ খাওয়ার ব্যাপারে কাতার সরকারকে রাজি করাতে তারা শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। এটা অবাক ব্যাপার যে, ইনফানটিনো এড়িয়ে যান যে, ফ্রান্স, স্পেন এবং পর্তুগালের মতো ইউরোপিয় দেশগুলিতেও যে স্টেডিয়ামে মদ খাওয়ার উপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ২০১৯ সালেও ফ্রান্সের স্বাস্থ্যমন্ত্রী এগনেস বুজিন এই নিষেধাজ্ঞাকে আরও কঠোর করার ব্যাপারে মতামত দিয়েছেন।

কাতারের বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রধান কর্মকর্তা নাসের আল-খাতার ‘আল জাজিরা’র সাথে এক সাক্ষাতে সমকামিতার ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে পশ্চিমা চিন্তাগুলিকেই প্রতিফলিত করে বলেন যে, সকলেরই অধিকার রয়েছে তার নিজস্ব মতামত প্রকাশ করার। বিশ্বকাপ একটা খেলার অনুষ্ঠান। পৃথিবীতে অনেক জায়গা রয়েছে নিজেদের মতামত প্রকাশের। খেলাকে খেলা হিসেবেই দেখা উচিৎ। তিনি মদ খাওয়ার ব্যাপারটাকেও পশ্চিমা চিন্তাকে প্রতিফলিত করেই বলেন যে, সকল দেশেরই কিছু আইনকানুন রয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ নিজের এবং অন্যের জন্যে ক্ষতির কারণ না হয়, ততক্ষণ কোন সমস্যা হবার কথা নয়।

ব্রিটিশ সরকারের ওয়েবসাইট বলছে যে, কাতার ব্রিটেনে ৪০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করেছে এবং এবছরের মে মাসে কাতারের আমির তার লন্ডন সফরে আরও ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেন। ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝে ইউরোপের জ্বালানি সমস্যা নিরসনেও কাতার ইউরোপের পাশে দাঁড়িয়েছে। কাতারে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিনীদের বৃহত্তম সামরিক ঘাঁটি। তাহলে এরপরেও কেন বিশ্বকাপ আয়োজন করতে গিয়ে কাতার পশ্চিমা আদর্শকে পুরোপুরিভাবে অনুসরণ না করার জন্যে সমালোচিত হচ্ছে? প্রকৃতপক্ষে সমকামিতা এবং মদের ব্যাপারগুলি কাতারের ইস্যু নয়; বরং পশ্চিমা আদর্শের সাথে কাতারের মুসলিম জনগণের ধর্মীয় আবেগের সাথে সংঘর্ষ। খেলার অনুষ্ঠান হলেও পশ্চিমা আদর্শের ক্রান্তিলগ্নে বিশ্বকাপের এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পশ্চিমারা তাদের আদর্শগুলিকে সার্বজনীন, সর্বোন্নত এবং ইসলামের আদর্শ থেকে উন্নততর প্রমাণ করার সুযোগটা হাতছাড়া করেনি।

Sunday, 12 June 2022

ভারতে নবী (সাঃ)কে অবমাননার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব কতটুকু?

১২ই জুন ২০২২
মালদ্বীপের সৈকতে ময়লার ঝুড়িতে মোদির ছবি। যদিও বিজেপি সরকার তার মুসলিম বিদ্বেষী নীতি বাস্তবায়নে মুসলিম দেশগুলির নেতৃত্বের ‘রেড লাইন’ কোথায়, তা বুঝতে পেরেছে; তথাপি মুসলিম বিশ্বের জনগণের ‘রেড লাইন’ তাদের কাছে পরিষ্কার না হওয়াটাই স্বাভাবিক। এটা এড়িয়ে যাবার উপায় নেই যে, উগ্র হিন্দুবাদী ভারত তৈরির আকাংক্ষা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সুস্থ্য মস্তিষ্কের চিন্তা বেশিরভাগক্ষেত্রেই অবহেলিত হবে; যার ফলশ্রুতিতে আবারও হয়তো মুসলিম বিশ্বের সেকুলার নেতৃত্ব তাদের জনগণের কাছ থেকে চাপ অনুভব করবে। প্রতি ক্ষেত্রেই মুসলিম বিশ্বের জনগণের মাঝে নেতৃত্বের হাহাকার জেঁকে বসবে; যা কিনা ভূরাজনৈতিকভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ।

 
ভারতের বিজেপি সরকারের দুই মুখপাত্র ও রাজনীতিবিদ নুপুর শর্মা এবং নাভীন জিনদালের নবী মুহাম্মদ (সাঃ)কে নিয়ে করা অবমাননাকর মন্তব্যের উপর ভর করে পুরো মুসলিম বিশ্বে যখন ঝড় বয়ে যাচ্ছে, তখন এই ঘটনার সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে মাত্র। গত ২৬শে মে নুপুর শর্মা এক ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলে রাসূল (সাঃ) এবং তার স্ত্রী আয়েশা (রাঃ)কে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন। এই মন্তব্যের মারাত্মক সমালোচনা শুরুর পর বিজেপির আরেক মুখপাত্র নাভীন জিনদাল টুইটারে তার সহকর্মীকে সমর্থন দেন। ‘সিএনএন’এর খবরে বলা হচ্ছে যে, ঘটনার স্পর্শকাতরতা অনুধাবন করে বেশিরভাগ ভারতীয় মিডিয়া শর্মার কথাগুলি কি ছিল, তা পরিষ্কার করে বলা থেকেও বিরত থেকেছে। শর্মা পরবর্তীতে এক টুইটার বার্তায় তার এই মন্তব্য তুলে নেন। পুরো মুসলিম বিশ্ব থেকে চাপ আসার পর ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি ৫ই জুন নুপুর শর্মার সদস্যপদ স্থগিত করে এবং নাভীন জিনদালকে দল থেকে বহিষ্কার করে। প্রশ্ন উঠেছে যে, বিজেপির অধীনে ভারতীয় মুসলিম নাগরিকদের উপর চরম অত্যাচারের খবরের ব্যাপারে মুসলিম বিশ্ব থেকে এতকাল কোন চাপ না আসলেও এখন কেন চাপ আসা শুরু হয়েছে?

সারা মুসলিম বিশ্বে প্রতিক্রিয়া

বার্তা সংস্থা ‘এএফপি’ জানাচ্ছে যে, ৫ই জুন ভারতের ভাইস প্রেসিডেন্ট ভেঙ্কাইয়াহ নাইডু কাতার সফর করার সময় ভারতের কাছ থেকে ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানানো হয়। একই দিনে ইরানের বার্তা সংস্থা ‘ইরনা’ জানায় যে, সেদেশে ভারতের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে ইরানের ‘সরকার এবং জনগণের পক্ষ থেকে’ প্রতিবাদ জানানো হয়। মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টা দেশ নিয়ে গঠিত ‘গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল’ বা ‘জিসিসি’র সেক্রেটারি জেনারেল নায়েফ ফালাহ আল হাজরাফএর পক্ষ থেকেও বিবৃতি দেয়া হয়। ৫৭টা মুসলিম দেশ নিয়ে গঠিত ‘ওআইসি’র পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে জাতিসংঘকে অনুরোধ জানানো হয় যাতে করে ভারতের মুসলিমদের রক্ষা করার জন্যে ব্যবস্থা নেয়া হয়। ৬ই জুন ভারতের বার্তা সংস্থা ‘পিটিআই’ জানায় যে, সোদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্দান, বাহরাইন, আফগানিস্তান, পাকিস্তানের সাথে ইন্দোনেশিয়াও যোগ দিয়েছে নিন্দা জানাতে। তবে একইসাথে সৌদি আরব এবং কুয়েত বিজেপির মুখপাত্রকে দল থেকে সাময়িক বরখাস্ত করার মোদি সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়।

৬ই জুন ‘ইজিপ্ট টুডে’র এক খবরে বলা হচ্ছে যে, মিশরের সর্বোচ্চ ধর্মীয় সংস্থা ‘আল আজহার’ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, বিজেপির নেতৃত্বের বক্তব্য সন্ত্রাসের শামিল। এধরনের মন্তব্য পুরো বিশ্বকে মারাত্মক বিপর্যয়ের মাঝে ফেলা দেয়া ছাড়াও যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিবৃতিতে বলা হয় যে, ভারতের কিছু রাজনীতিবিদেরা নিজেদের ভোট বাড়াতে এধরনের কথা বলছে। সেখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানানো হয়। সৌদি আরবের ‘জেনারেল প্রেসিডেন্সি অব দ্যা এফেয়ার্স অব দ্যা গ্র্যান্ড মস্ক’এর পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে ভারতীয় রাজনীতিবিদদের বক্তব্যকে নিকৃষ্টতম কর্মকান্ড বলে আখ্যা দেয়া হয়। ‘সৌদি আরবের ‘মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগ’এর পক্ষ থেকে বলা হয় যে, এর মাধ্যমে বিদ্বেষ বৃদ্ধি পাবে। এর দু’দিন আগে ওমানের গ্র্যান্ড মুফতি শেখ আহমাদ বিন হামাদ আল খলিল এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, এধরনের মন্তব্য সকল মুসলিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধের শামিল। তিনি ভারতীয় পণ্য বয়কট করারও আহ্বান জানান। বার্তা সংস্থা ‘এএফপি’র এক খবরে বলা হয় যে, কুয়েতের ‘আল আরাবিয়া কোঅপারেটিভ সোসাইটি’র এক সুপারস্টোরের কর্মচারীরা সেখানকার ভারতীয় পণ্য শেলফ থেকে সড়িয়ে ট্রলিতে করে জমিয়ে আলাদা করেছে। প্লাস্টিকে মুড়িয়ে রাখা চাল এবং মসলার প্যাকেটের উপর লিখে দেয়া হয় যে, ‘আমরা ভারতীয় পণ্য সড়িয়ে ফেলেছি’। কোম্পানির একজন কর্মকর্তা বলেন যে, তারা পুরো কোম্পানিজুড়ে ভারতীয় পণ্য বয়কট করার চিন্তা করছে। ‘দ্যা মালদিভস জার্নাল’ বলছে যে, মালদ্বীপে হুলহুমালে দ্বীপের সৈকতে এবং হাউজিং প্রকল্প এলাকায় ময়লার ঝুড়ির উপর নরেন্দ্র মোদির ছবি লাগানো হয়েছে। ছবিতে মোদির চেহারার উপর জুতার ছাপ দেয়া ছিল। কুয়েতেও ডাস্টবিনের উপর একই ছবি দেখা গেছে। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, ভারতের বন্ধু রাষ্ট্র বলে খ্যাত প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় ১০ই জুন শুক্রবার জুমআর নামাজের পর হাজারো মানুষ রাস্তায় বিক্ষোভ করেছে।

 
২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি। ভারত সফরের সময় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে আলিঙ্গন করছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির নেতৃত্বও যথারীতি বাস্তববাদীই থেকেছে। তারা নুপুর শর্মার বিরুদ্ধে নেয়া বিজেপির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু এই মুসলিম দেশগুলির কোনটাই ভারতের মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিজেপি সরকারের অত্যাচার নিয়ে কোন কথাই বলেনি। ভারতের মুসলিমদের উপর অত্যাচারের খবরাখবর যাতে দিল্লীর সাথে অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত থাকার লক্ষ্যের উপর কোন বিরুপ প্রভাব না ফেলে, সেব্যাপারে মধ্যপ্রাচ্যের নেতৃত্ব সর্বদাই খেয়াল রেখেছে। ঠিক একারণেই এই দেশগুলির পক্ষ থেকে নবী (সাঃ)কে অবমাননার বিষয়ে ভারত সরকারের সমালোচনা অনেকের কাছেই অদ্ভূত ঠেকেছে।


সকলেই ঘটনার সুযোগ নিচ্ছে

সাংবাদিক এবং লেখক দেবাশিষ রায় চৌধুরী ‘টাইম’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় বলছেন যে, হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের প্রতিনিধিরা যখন নবী মুহাম্মদ (সাঃ)কে অবমাননা করেছে, তখন ভারতের সেকুলার রাজনীতিবিদেরাও চুপ থেকেছে। শুধুমাত্র এক সপ্তাহ পর মুসলিম বিশ্ব থেকে প্রতিবাদ আসার পরেই তারা মুখ খুলেছেন। মুসলিম বিশ্ব থেকে ভারত সরকারের উপর চাপ আসায় ভারতের মুসলিমরা কিছুটা স্বস্তি পেলেও সেটা খুব বেশি হলে স্বল্প সময়ের জন্যে। এই উত্তেজনা যখন ঠান্ডা হয়ে আসবে, তখনই বোঝা যাবে যে, ভারতের মুসলিম জনগণের নিরাপত্তার চাইতে বাণিজ্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মোদি সরকার তখন হয়তো রাষ্ট্রদ্রোহিতার কথা বলে কিছু ব্যক্তিকে কারাবন্দী করবে। আর উগ্রবাদী হিন্দু এবং সরকারি শক্তিকে আবারও মুসলিমদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়া হবে। শুধু তাই নয়, মোদি আবারও মুসলিম দেশগুলি সফর করে তাদের নেতৃত্বকে আলিঙ্গন করবেন। যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ নবী মুহাম্মদ (সাঃ)কে নিয়ে কথা না বলবে, ততক্ষণ সকলকিছু স্বাভাবিক থাকবে। বিজেপির ৮ বছরের শাসনের মাঝে ভারতের মুসলিমদের উপর চরম অত্যাচার হলেও মুসলিম বিশ্ব থেকে কোন প্রতিবাদই আসেনি। উল্টো সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরব দিল্লীর সাথে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করেছে।

ভারতের উগ্রবাদী হিন্দুরা বিজেপির মুখপাত্রকে বরখাস্ত করার মোদির সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারেনি। এদের কেউ কেউ মোদিকে কাপুরুষ হিসেবে আখ্যা দিয়ে ‘শেইম অন মোদি’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করছে। তারা অনেকেই টুইটারে মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালনা শুরু করেছে। কেউ কেউ মুসলিম দেশগুলির বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধের ডাক দিচ্ছে। কাতারের সমালোচনা করে কেউ কেউ ‘কাতার এয়ারলাইন্স’কে বয়কটের ডাকও দিয়েছে।

তবে নুপুর শর্মা এবং নাভীন জিনদালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে ভারতের ক্ষমতাসীনরা দেখাতে চেয়েছে যে, তারা পুরো মুসলিম বিশ্বের সাথে সংঘাতে যাবার জন্যে প্রস্তুত নয়। এতে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের দুর্বলতাটাও প্রকাশ পায়। সকলেই এই দুর্বলতাকে ব্যবহার করতে চাইছে। জঙ্গী সংগঠন আল কায়েদার পক্ষ থেকেও ভারতকে হুমকি দেয়া হয়েছে। ‘সিএনএন’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে ভারতের প্রভাবশালী থিংকট্যাংক ‘অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’এর ফেলো মোহাম্মদ সিনান সিয়েচ বলছেন যে, এটা আল কায়েদার রিক্রুটিং প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’এর ফেলো হাসান আল হাসান বলছেন যে, মোদি সর্বদাই চেষ্টা করেছেন যাতে করে তার অভ্যন্তরীণ হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডার ফলাফল দেশের বাইরে চলে না যায়; এবং সেটা যেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির সাথে ভারতের সম্পর্ককে সমস্যায় না ফেলে।

 
১০ই জুন ২০২২। ভারতের বন্ধু রাষ্ট্র বলে খ্যাত বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার রাস্তায় হাজারো মানুষের বিক্ষোভ। প্রতিবাদ শুধু সরকার নয়, বরং সকল প্রকারের ধর্মীয় সংস্থার পক্ষ থেকে এমনকি বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকেও এসেছে। এটা বলে দিচ্ছে যে, পুরো মুসলিম বিশ্বের জনগণের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে বলেই এখানে কূটনীতিকদের জড়িত হতে হয়েছে; যা এর আগে দেখা যায়নি। অর্থাৎ মুসলিম বিশ্বের জনগণের এই প্রতিক্রিয়া মুসলিম দেশগুলির সেকুলার নেতৃত্বের বাস্তবাদী থাকার নীতিকে চ্যালেঞ্জ করেছে বলেই বিজেপিকে ছাড় দিতে হয়েছে।


ভারতের মুসলিমদের কি হবে?


‘সিএনএন’এর এক প্রতিদেবনে বলা হচ্ছে যে, নবী (সাঃ)কে অবমাননার ঘটনা ভারতের প্রায় ২০ কোটি মুসলিমদের কাছে নতুন কোন ব্যাপার হয়ে আসেনি। কারণ গত ৮ বছর ধরে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের অধীনে তারা মারাত্মক অত্যাচারের শিকার হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে ভারতে উগ্রবাদী হিন্দুদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক কর্মকান্ড বেড়েছে। গত জানুয়ারি মাসেই ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের জ্যেষ্ঠ বিজেপি নেতা পূজা শাকুন পান্ডে ভারতকে রক্ষা করতে মুসলিমদের নিধন করে ফেলার কথা বলেন। তিনি বলেন যে, তারা যদি ২০ লক্ষের মতো মুসলিম হত্যা করে ফেলতে পারে, তাহলে একটা হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। এরপর ফেব্রুয়ারি মাসেই দক্ষিণের কর্ণাটক রাজ্যে মুসলিম ছাত্রীদের হিজাব পড়া নিষিদ্ধ করা হয়। ২০১৮ সালে বিজেপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন যে, বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলিমরা হলো ‘পিঁপড়া’র মতো এবং এদেরকে উৎপাটন করার জন্যে তারা ব্যবস্থা নেবেন। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মাঝে বহু মুসলিমকে হিন্দুত্ববাদীরা গরুর গোশত খাওয়ার ‘অপরাধে’ হত্যা করেছে বলে বলছে মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’। ২০১৯ সালে ভারতীয় পার্লামেন্টে নাগরিকত্ব বিল পাস হয়; যার মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশ থেকে সংখ্যালঘুদেরকে ভারতে আশ্রয় দেয়ার কথা বলা হয়। অপরদিকে লক্ষ লক্ষ মুসলিমের ভারতীয় নাগরিকত্ব বাতিল ঘোষণা করা হয়। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে উত্তর প্রদেশে নতুন আইন করা হয়, যার মাধ্যমে হিন্দুদের পক্ষে ইসলাম গ্রহণ করার কঠিন করে ফেলা হয়।

মুসলিম দেশগুলি যদি ভারতকে এতটাই গুরুত্ব দেয় এবং মুসলিমদের উপর অত্যাচারের ব্যাপারে এতদিন চুপ থাকে, তাহলে এখন কেন তারা মুখ খুলছে? দেবাশিষ রায় চৌধুরী বলছেন যে, হয়তো মুসলিম নেতৃত্ব নিজেদের দেশের জনগণকে ঠান্ডা রাখার জন্যেই ভারতের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে। কুয়েতের মিডিয়া বলছে যে, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক খাদ্যসংকটে নিজেদের সুরক্ষা দিতে ভারত গম রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ার পর কুয়েতের সরকার দিল্লীকে তাদের এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার অনুরোধ জানিয়েছে। ভারতের মোট বহির্বাণিজ্যের ১৫ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টা দেশের সাথে হয়ে থাকে। ভারতের মোট জ্বালানি তেলের এক তৃতীয়াংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসেবে বিশ্বব্যাপী ভারতের মোট ১ কোটি ৩৫ লক্ষ প্রবাসীর মাঝে প্রায় ৮৭ লক্ষই বাস করে ‘জিসিসি’ অন্তর্ভুক্ত দেশগুলিতে। এই প্রবাসীদের কাছ থেকে বছর প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে; যা কিনা ভারতের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৬৫ শতাংশ। বুঝতে বাকি থাকে না যে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির সাথে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ভারত মধ্যপ্রাচ্যের উপর যেমন অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল, তেমনি মধ্যপ্রাচ্যও ভারতের সাথে বাণিজ্যের উপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি জনবলের সংকটের কারণে বিদেশী শ্রম, বিশেষ করে ভারতীয় নাগরিকদের উপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল।

নবী (সাঃ)কে অবমাননার ফলে মোদির বিজেপি সরকারের অবস্থান অভ্যন্তরীণভাবে পরিবর্তন হচ্ছে না ঠিকই; তবে ঘটনার বাস্তবতার চাপ মোকাবিলা করতে বিজেপি সরকার যে তাদের হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডায় কিছুটা ছাড় দিয়ে বাস্তববাদীও হতে পারে সেটার প্রমাণ মিলেছে আবারও। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির নেতৃত্বও যথারীতি বাস্তববাদীই থেকেছে। তারা নুপুর শর্মার বিরুদ্ধে নেয়া বিজেপির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু এই মুসলিম দেশগুলির কোনটাই ভারতের মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিজেপি সরকারের অত্যাচার নিয়ে কোন কথাই বলেনি। ভারতের মুসলিমদের উপর অত্যাচারের খবরাখবর যাতে দিল্লীর সাথে অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত থাকার লক্ষ্যের উপর কোন বিরুপ প্রভাব না ফেলে, সেব্যাপারে মধ্যপ্রাচ্যের নেতৃত্ব সর্বদাই খেয়াল রেখেছে। ঠিক একারণেই এই দেশগুলির পক্ষ থেকে নবী (সাঃ)কে অবমাননার বিষয়ে ভারত সরকারের সমালোচনা অনেকের কাছেই অদ্ভূত ঠেকেছে। এই প্রতিবাদ শুধু সরকার নয়, বরং সকল প্রকারের ধর্মীয় সংস্থার পক্ষ থেকে এমনকি বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকেও এসেছে। এটা বলে দিচ্ছে যে, পুরো মুসলিম বিশ্বের জনগণের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে বলেই এখানে কূটনীতিকদের জড়িত হতে হয়েছে; যা এর আগে দেখা যায়নি। অর্থাৎ মুসলিম বিশ্বের জনগণের এই প্রতিক্রিয়া মুসলিম দেশগুলির সেকুলার নেতৃত্বের বাস্তবাদী থাকার নীতিকে চ্যালেঞ্জ করেছে বলেই বিজেপিকে ছাড় দিতে হয়েছে। যদিও বিজেপি সরকার তার মুসলিম বিদ্বেষী নীতি বাস্তবায়নে মুসলিম দেশগুলির নেতৃত্বের ‘রেড লাইন’ কোথায়, তা বুঝতে পেরেছে; তথাপি মুসলিম বিশ্বের জনগণের ‘রেড লাইন’ তাদের কাছে পরিষ্কার না হওয়াটাই স্বাভাবিক। এটা এড়িয়ে যাবার উপায় নেই যে, উগ্র হিন্দুবাদী ভারত তৈরির আকাংক্ষা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সুস্থ্য মস্তিষ্কের চিন্তা বেশিরভাগক্ষেত্রেই অবহেলিত হবে; যার ফলশ্রুতিতে আবারও হয়তো মুসলিম বিশ্বের সেকুলার নেতৃত্ব তাদের জনগণের কাছ থেকে চাপ অনুভব করবে। প্রতি ক্ষেত্রেই মুসলিম বিশ্বের জনগণের মাঝে নেতৃত্বের হাহাকার জেঁকে বসবে; যা কিনা ভূরাজনৈতিকভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ।

Tuesday, 22 March 2022

ইউক্রেন যুদ্ধ কি জার্মানির নীতির পরিবর্তন করিয়েছে?

২২শে মার্চ ২০২২

২৭শে ফেব্রুয়ারি জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শোলজ জার্মান পার্লামেন্ট বুন্দেস্টাগএ নতুন প্রতিরক্ষা নীতির ঘোষণা দেন। শোলজের নতুন প্রতিরক্ষা নীতি প্রকৃতপক্ষে আলদা কোন নীতি নয়। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জার্মানি শিশুমাত্র! ইউক্রেনের যুদ্ধ জার্মানির বাস্তবতা পরিবর্তন করে দিয়েছে; যেখানে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া বড় ভূমিকা নিয়েছিল এবং জার্মানি ছিল নিছক দর্শক। জার্মানি সেই পরিবর্তিত বাস্তবতার সাথে খাপ খাওয়াবার চেষ্টা করছে মাত্র।

 
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর তিন দিন পর গত ২৭শে ফেব্রুয়ারি জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শোলজ জার্মান পার্লামেন্ট বুন্দেস্টাগএ নতুন প্রতিরক্ষা নীতির ঘোষণা দেন। তিনি বলেন যে, ইউক্রেনে আগ্রাসনের কারণে জার্মানি নতুন এক যুগে প্রবেশ করলো। ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, জার্মান সরকারের এই অবস্থান অনেককেই অবাক করেছিল; কারণ বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরেই জার্মান সরকারকে সরাসরি ইউক্রেনের পক্ষ না নেবার এবং আরও কঠোরভাবে রাশিয়ার বিরুদ্ধাচরণ না করার ব্যাপারে ব্যাপক সমালোচনার শিকার হতে হয়েছে। শোলজ বলেন যে, সাম্প্রতিক ঘটনা এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে তার সর্বশেষ আলোচনার পর তিনি নিশ্চিত হয়েছেন যে, রুশ প্রেসিডেন্ট একটা নতুন সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে চাইছেন; এবং এই মুহুর্তে গণতন্ত্র এবং শান্তি রক্ষার জন্যে ইউরোপের প্রয়োজন নিজেদের প্রতিরক্ষাকে শক্তিশালী করা।

শোলজ এবছরেই জার্মান সামরিক বাহিনীকে আধুনিকীকরণ করার জন্যে ১’শ বিলিয়ন ইউরো বা ১’শ ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার ঘোষণা দেন। একইসাথে তিনি সামনের বছরগুলিতে জার্মান প্রতিরক্ষা বাজেটকে জিডিপির ২ শতাংশের উপরে তোলারও আশ্বাস দেন। ন্যাটো সদস্য হিসেবে জার্মানি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, তারা তাদের জিডিপির ২ শতাংশ প্রতিরক্ষায় খরচ করবে। কিন্তু ইউরোপের অনেক দেশের মতো জার্মানি সেই টার্গেটের ধারেকাছেও যায়নি। ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’এর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, আগের চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মার্কেলের ১৬ বছরের শাসনামলে জার্মানি রাশিয়ার সাথে সাবধানে সম্পর্ক রেখে চলেছে। বিশেষ করে রাশিয়া থেকে জার্মানি পর্যন্ত বল্টিক সাগরের তলদেশ দিয়ে ‘নর্ড স্ট্রিম ২’ গ্যাস পাইপলাইনের ব্যাপারেও দুই দেশের মাঝে সমঝোতা মার্কেলের আমলেই হয়েছিল। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় মার্কেল প্রতিরক্ষা খরচ বাড়াবার ব্যাপারে মার্কিন চাপকে উপেক্ষা করেছিলেন। মাত্র কিছুদিন আগ পর্যন্তও জার্মানি ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দানে বিরত ছিল। জার্মানি বলছিল যে, তারা যেকোন যুদ্ধে অস্ত্র সরবরাহ না করার নীতিতে অটল থাকবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জার্মানি তার সেই নীতি থেকে সরে এসে ইউক্রেনকে অস্ত্র দেবার ঘোষণা দিয়েছে।

মার্কিন মিডিয়া ‘এনবিসি’ বলছে যে, মার্কেল রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ভালো রেখে জার্মানির সামরিক বাজেট কমিয়ে রেখেছিলেন। এখন অনেকেই তার ভূমিকাকে ভিন্ন চোখে দেখছে। থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন্স’এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ড্যানিয়েলা শোয়ার্জার বলছেন যে, ২০১৪ সালে রাশিয়া ইউক্রেনের ক্রিমিয়া দখল করে নেবার পরে মার্কেল রাশিয়ার উপর হাইড্রোকার্বনের জন্যে নির্ভরতা কমাননি, বরং তিনি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউক্রেনের প্রতিবাদ সত্ত্বেও ‘নর্ড স্ট্রিম ২’ পাইপলাইনকে সমর্থন দিয়েছেন। ‘ইউরোস্ট্যাট’এর হিসেবে ২০১০ সালে জার্মানির ৩৬ শতাংশ গ্যাস আসতো রাশিয়া থেকে; ২০২০ সালে তা দাঁড়ায় ৬৫ শতাংশে।

নতুন প্রতিরক্ষা নীতির মাঝে কিছু ব্যাপারকে ওলাফ শোলজ পরিষ্কার করেছেন। জার্মানি সামনের দিনগুলিতে পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর সদস্য দেশগুলিতে জার্মান সামরিক অবস্থানকে আরও সুসংহত করবে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথভাবে জার্মানির যে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের চুক্তি রয়েছে, সেটার আঙ্গিকে তাদের পারমাণবিক আক্রমণের জন্যে ব্যবহৃত ফাইটার বিমানের বহরকে আরও উন্নত করবে। ড্রোন ক্রয় করা ছাড়াও তার সরকার ফ্রান্সের সাথে যৌথভাবে ৬ষ্ঠ জেনারেশনের ফাইটার বিমান এবং ট্যাংক ডেভেলপ করবে বলে বলেন তিনি। শোলজ বলেন যে, পুতিনকে অতীতে ফিরে যেতে না দিয়ে তার মতো ‘যুদ্ধবাজ’কে সীমানার মাঝে আটকে ফেলার প্রশ্ন এখন ইউরোপের সামনে। রুশ হাইড্রোকার্বনের উপর নির্ভরশীলতাকে দ্রুত কমিয়ে ফেলার জন্যে চেষ্টা করার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। বৈশ্বিক বাজার থেকে আরও গ্যাস কিনে, যত দ্রুত সম্ভব দু’টা নতুন এলএনজি টার্মিনাল তৈরি করে এবং নিজেদের কয়লা এবং গ্যাসের মজুত বাড়িয়ে এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ইচ্ছা পোষণ করেন তিনি। তবে এর পরেও ২০৪৫ সালের মাঝে জার্মানিকে ‘কার্বন নিউট্রাল’ করার জলবায়ুগত প্রতিশ্রুতিতে বহাল থাকতে চান তিনি।

 
জ্বালানির নতুন সরবরাহকারী খুঁজতে কাতার সফরে জার্মান অর্থমন্ত্রী হাবেক। জলবায়ুর উপর জোর দেয়া ‘গ্রিন পার্টি’র নেতা জার্মান মন্ত্রী হাবেক এখন জলবায়ুকে ভুলে গিয়ে হাইড্রোকার্বন আমদানি করতে এলএনজি টার্মিনাল তৈরি করছেন; আর রাশিয়ার অগণতান্ত্রিক সরকারকে রুখতে কাতার ও আমিরাতের গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের প্রশ্ন ভুলে গিয়ে সেখান থেকে জ্বালানি আমদানি করতে উঠেপড়ে লেগেছেন।

জার্মান অর্থমন্ত্রী রবার্ট হাবেক ‘ডয়েশল্যান্ডফুঙ্ক’ রেডিওকে বলেন যে, আগামী শীতের আগে জার্মানি গ্যাসের নতুন সরবরাহকারী না পেলে এবং রুশ গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে জার্মানিতে বাড়ি গরম করার জন্যে এবং কারখানা চালু রাখার জন্যে যথেষ্ট গ্যাস থাকবে না। এই লক্ষ্যেই তিনি গ্যাসের নতুন সরবরাহকারী খুঁজতে কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়ে এসেছেন। তরলীকৃত গ্যাস এবং ‘গ্রিন হাইড্রোজেন’ নিয়ে এই দুই দেশের সাথে আলোচনায় বড় বড় জার্মান কোম্পনিগুলিও অংশ নেয়। জার্মান কোম্পানি ‘থাইসেন ক্রুপ’এর প্রধান নির্বাহী মার্টিনা মার্জ এই সফরে জার্মান মন্ত্রীর প্রচেষ্টার ভূয়সী প্রশংসা করেন। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, কাতার বর্তমানে ইইউএর ৩০ শতাংশ তরলীকৃত গ্যাসের সরবরাহ দিলেও জার্মানি আমদানিকারক নয়। কারণ রুশ গ্যাসের উপর নির্ভর করে জার্মানি এলএনজি টার্মিনাল তৈরি করেনি। হাবেক আশা করছেন যে, পাঁচ বছরের মাঝে জার্মানি দু’টা টার্মিনাল তৈরি করতে পারবে।

ড্যানিয়েলা শোয়ার্জার বলছেন যে, শোলজের নতুন প্রতিরক্ষা বিনিয়োগের একটা বড় অংশ নতুন কোন নীতির জন্যে নয়, বরং এতকাল মার্কেলের সময়ে জার্মানির প্রতিরক্ষা বাজেট কম রাখার ব্যাপারটাকে ব্যালান্স করতে। এই অর্থের মাধ্যমে অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় থাকা জার্মানির সামরিক বাহিনীর উন্নয়ন করা হবে। অপরদিকে এলএনজি টার্মিনালের অভাবে রুশ গ্যাসের বিকল্প হিসেবে কাতার এবং আমিরাত থেকে গ্যাস এবং হাইড্রোজেন আমদানি করাও রাতারাতি সম্ভব হচ্ছে না। সেই সময় পর্যন্ত জার্মানিকে ভ্লাদিমির পুতিনের দিকেই হয়তো চেয়ে থাকতে হবে। ‘ডয়েচে ভেলে’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, জলবায়ুর উপর জোর দেয়া ‘গ্রিন পার্টি’র নেতা জার্মান মন্ত্রী হাবেক এখন জলবায়ুকে ভুলে গিয়ে হাইড্রোকার্বন আমদানি করতে এলএনজি টার্মিনাল তৈরি করছেন; আর রাশিয়ার অগণতান্ত্রিক সরকারকে রুখতে কাতার ও আমিরাতের গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের প্রশ্ন ভুলে গিয়ে সেখান থেকে জ্বালানি আমদানি করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। চ্যান্সেলর শোলজের নতুন প্রতিরক্ষা নীতি প্রকৃতপক্ষে আলাদা কোন নীতি নয়। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জার্মানি শিশুমাত্র! ইউক্রেনের যুদ্ধ শোলজ এবং হাবেকের জন্যে বাস্তবতা পরিবর্তন করে দিয়েছে; যেখানে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া বড় ভূমিকা নিয়েছিল এবং জার্মানি ছিল নিছক দর্শক। জার্মানি সেই পরিবর্তিত বাস্তবতার সাথে খাপ খাওয়াবার চেষ্টা করছে মাত্র।

Monday, 7 February 2022

মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষুদ্র দেশ কাতারের বড় কূটনৈতিক কর্মকান্ডের উদ্দেশ্য কি?

০৮ই ফেব্রুয়ারি ২০২২

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সাথে ওয়াশিংটনে বৈঠক করছেন কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি। কাতারের বিশাল হাইড্রোকার্বন সম্পদকে ব্যবহার করে পশ্চিমারা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখছে। ইউরোপে কাতারের এলএনজি সরবরাহ করে রুশ গ্যাসকে প্রতিস্থাপন করার বাইডেনের পরিকল্পনাও এরই অংশ। ছোট্ট কাতারের বিরাট আকারের কূটনৈতিক কর্মকান্ডও মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং আফগানিস্তানে পশ্চিমাদের স্বার্থকেই রক্ষা করেছে। তবে অর্ধশতাব্দী আগে সূক্ষ্ম ব্রিটিশ পরিকল্পনায় তৈরি কাতারের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থ ব্রিটেনেরও প্রভাব বৃদ্ধি।

 
গত ২৭শে জানুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, কাতার এবং তুরস্ক আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালিবান সরকারের সাথে কাবুল বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে একটা সমঝোতায় পৌঁছেছে। এর চারদিন পর ৩১শে জানুয়ারি কাতার বলে যে, তাদের সাথে তালিবান সরকারের এক সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার মাধ্যমে আফগানিস্তান থেকে যারা চলে যেতে চায়, তাদের জন্যে নতুন করে কাতার এয়ারওয়াজের চার্টার করা বিমানের ফ্লাইট চালু করা হবে। আফগানিস্তান থেকে মার্কিনীদের পলায়নের পর থেকে কয়েক মাস ধরে তালিবানদের সাথে সমঝোতা না হওয়ায় এই ফ্লাইট বন্ধ ছিল। এই চুক্তির ফলে আফগানিস্তানে আটকে পড়া হাজারো পশ্চিমা নাগরিক এবং আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীকে সহায়তা দেওয়া হাজারো আফগানদেরকে দেশ থেকে সরিয়ে ফেলা যাবে। কাতারের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুলরহমান আল থানি ওয়াশিংটনে মার্কিন মিডিয়া ‘এক্সিওস’এর সাথে এক সাক্ষাতে এই কথাগুলি প্রকাশ করেন। উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সাথে ওয়াশিংটন সফর করছিলেন। শেখ তামিম হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সময়ে ওয়াশিংটন সফর করা মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম নেতা। সফরকালে বাইডেন কাতারকে ন্যাটোর বাইরে ১৭টা প্রধান মিত্র দেশের মাঝে একটা বলে ঘোষণা দেন। ‘আল মনিটর’ বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিকে এগিয়ে নিতে কাতারের বড় ভূমিকার জন্যেই প্রেসিডেন্ট বাইডেন কাতারকে এই সন্মাননা দিয়েছেন। এর মাঝে কাতারের সবচাইতে বড় ভূমিকা ছিল আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পলায়নের সময় দোহার সমর্থন। মার্কিনীদের সাথে তালিবানদের আলোচনার মূল মাধ্যমই ছিল কাতার। নিজেদের আকারের তুলনায় কাতারের বিশাল কূটনৈতিক কর্মকান্ডের কারণে দেশটা নাম সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক আলোচনায় উঠে আসছে।

গত ২২শে জানুয়ারি বার্তাসংস্থা ‘ব্লুমবার্গ’ মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলে যে, বাইডেন শেখ তামিমকে ওয়াশিংটনে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এই আমন্ত্রণের একটা গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক হামলা হলে পশ্চিমা অবরোধের মুখে রাশিয়া যদি ইউরোপে গ্যাস রপ্তানি বন্ধ করে দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের জ্বালানি সমস্যাকে কিভাবে মোকাবিলা করবে। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, মার্কিন সরকারের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আমোস হোকস্টাইন প্রধানতম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি উৎপাদনকারী কোম্পানি এবং দেশের সাথে আলোচনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কাতার হলো বিশ্বের সবচাইতে বড় এলএনজি উৎপাদনকারী দেশগুলির একটা। তবে দেশটার বেশিরভাগ এলএনজিই পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে রপ্তানি হয়ে থাকে। অপরদিকে ইইউএর দেশগুলি তাদের ৪০ শতাংশ গ্যাসের সরবরাহের জন্যে রাশিয়ার উপর নির্ভরশীল; যেকারণে ইউক্রেন ইস্যুতে ইউরোপের দেশগুলিকে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার বিরুদ্ধে একত্রিত করতে পারছে না।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘মিডলইস্ট ইন্সটিটিউট’এর এক লেখায় ‘কাতার ইউনিভার্সিটি’র এসোসিয়েট প্রফেসর নিকোলে কোজানভ বলছেন যে, বাইডেনের এবং তামিমের পরিকল্পনা সফল হলে কাতার ইউরোপের গ্যাসের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিতে পারে; যার ফলশ্রুতিতে কাতার অনেক ক্ষেত্রেই রাশিয়াকে প্রতিস্থাপিত করতে পারবে। ২০২১এর শেষের দিকে ব্রিটেনের জ্বালানি সংকটের সময় কাতার পূর্ব এশিয়ায় এলএনজি পাঠানো স্থগিত করে ব্রিটেনকে সহায়তা দেয়। এর ফলে ব্রিটেন কাতারকে সন্মাননা জানিয়ে ‘দুর্যোগের সময়ের সরবরাহকারী’ বলে আখ্যা দেয় এবং একটা গোপন চুক্তি করে। ওয়াশিংটনের সাথে কাতারের সখ্যতা বাড়লে তা কাতারকে বাড়তি নিরাপত্তা দেবে। প্রায় তিন বছর ধরে কাতারকে সৌদি আরবের নেতৃত্বে থাকা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি অবরোধ দিয়ে রেখেছিল; যা কিনা কাতারকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ট করতে অনুপ্রাণিত করবে।

 
অতি ক্ষুদ্র কাতারকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে তৈরি করার মাধ্যমে ব্রিটেন একটা পশ্চিমা নির্ভরশীল রাষ্ট্র জন্ম দিয়েছিল। এখনও দেশটার বহু গুরুত্বপূর্ণ পদে ব্রিটেন এবং অন্যান্য দেশের নাগরিকেরা কাজ করছে। ব্রিটেনে কাতারের বিশাল বিনিয়োগও রয়েছে। ছোট্ট দেশটার উপর অপর পশ্চিমা বন্ধু সৌদি আরবের হুমকির কারণে কাতার সর্বদাই পশ্চিমা সামরিক সহায়তার উপর নির্ভরশীল।

২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময় মার্কিনীরা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রধান সামরিক ঘাঁটি সৌদি আরবের ‘প্রিন্স সুলতান এয়ার বেইস’ থেকে কাতারের আল উদাইদ বিমান ঘাঁটিতে সরিয়ে নেয়। যুক্তরাষ্ট্রকে এই ঘাঁটি দেয়ার মাধ্যমে কাতার তার বড় প্রতিবেশী সৌদি আরব থেকে নিজেকে রক্ষা করে। তবে কাতারের এই চিন্তা নতুন নয়। ঊনিশ শতক থেকেই কাতারের আল থানি পরিবার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের আগ্রাসন থেকে নিজেদেরকে বাঁচাতে ব্রিটেনকে আলিঙ্গন করে। ১৯১৬ থেকে কাতারের নিরাপত্তা ছিল ব্রিটেনের হাতে। ১৯৭১ সালে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে কাতারের ঘোষণা দেয় ব্রিটেন। সেসময় থেকে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সবসময়ই ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল রয়েছে কাতার। মাত্র ৩ লক্ষ জনগণের কাতারের পক্ষে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ একটা অবাস্তব চিন্তাই বটে। সামরিক বাহিনী এবং সরকারি বহু কাজে বিদেশীদের উপর নির্ভর করে কাতার। দেশটায় ২৩ লক্ষ মানুষের বিশাল এক বিদেশী কর্মীদল কাজ করে, যারা সেদেশের নাগরিকদেরকে সংখ্যালঘিষ্ঠ করে ফেলেছে। ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘চ্যাটহ্যাম হাউজ’এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, নিজের নিরাপত্তাহীনতাকে কাটাতেই কাতার বাস্তবতাকে পুঁজি করে তার কূটনৈতিক কর্মকান্ডকে প্রাধান্য দিয়েছে; যাতে করে পশ্চিমাদের কাছে কাতারের গুরুত্ব অনেক বেশি থাকে। একারণেই মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার বিভিন্ন সংঘাতে কাতার মধ্যস্ততাকারীর ভূমিকা নিয়েছে। অনেকেই মনে করেন যে, কাতার তার নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিভিন্ন স্থানে জঙ্গীগোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়েছে। তবে কাতার জঙ্গীগোষ্ঠীদের সাথে সম্পর্ক রাখার কারণেই মধ্যস্ততাকারীর ভূমিকা নিতে পেরেছে। উদাহরণ হিসেবে তালিবানের সাথে আলোচনায় কাতারের মধ্যস্ততা উল্লেখযোগ্য।

অতি ক্ষুদ্র কাতারকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে তৈরি করার মাধ্যমে ব্রিটেন একটা পশ্চিমা নির্ভরশীল রাষ্ট্র জন্ম দিয়েছিল। এখনও দেশটার বহু গুরুত্বপূর্ণ পদে ব্রিটেন এবং অন্যান্য দেশের নাগরিকেরা কাজ করছে। ব্রিটেনে কাতারের বিশাল বিনিয়োগও রয়েছে। ছোট্ট দেশটার উপর অপর পশ্চিমা বন্ধু সৌদি আরবের হুমকির কারণে কাতার সর্বদাই পশ্চিমা সামরিক সহায়তার উপর নির্ভরশীল। এলএনজি রপ্তানি করে অর্জিত বিপুল অর্থ পশ্চিমা অস্ত্র কেনায় ব্যবহৃত হলেও সেগুলি চালনা করার মতো জনবল কাতারের নেই। স্বল্প জনসংখ্যার কারণে কাতারকে তার সামরিক এবং সরকারি জনবলের অনেকটাই বাইরে থেকে নিয়ে আসতে হয়। আবার কাতারের বিশাল হাইড্রোকার্বন সম্পদকে ব্যবহার করে পশ্চিমারা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখছে। ইউরোপে কাতারের এলএনজি সরবরাহ করে রুশ গ্যাসকে প্রতিস্থাপন করার বাইডেনের পরিকল্পনাও এরই অংশ। ছোট্ট কাতারের বিরাট আকারের কূটনৈতিক কর্মকান্ডও মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং আফগানিস্তানে পশ্চিমাদের স্বার্থকেই রক্ষা করেছে। তবে অর্ধশতাব্দী আগে সূক্ষ্ম ব্রিটিশ পরিকল্পনায় তৈরি কাতারের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থ ব্রিটেনেরও প্রভাব বৃদ্ধি।

Wednesday, 29 September 2021

মধ্য এশিয়াতে তুরস্ক ও পাকিস্তানের কৌশলগত সহযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে

৩০শে সেপ্টেম্বর ২০২১

ইরানের কর্মকর্তারা কাস্পিয়ান সাগরীয় অঞ্চলে তুরস্ক এবং পাকিস্তানের সামরিক অবস্থানকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছেন। মধ্য এশিয়ার ‘লাপিস লাজুলি করিডোর’ বরাবর তুরস্কের এবং পাকিস্তানের প্রভাব বৃদ্ধি ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে।


সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্ক এবং পাকিস্তানের কৌশলগত সম্পর্কের গভীরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে আফগানিস্তান থেকে পশ্চিমা সৈন্য চলে যাবার পর থেকে তালিবানদের অধীনে আফগানিস্তানকে বিভিন্নভাবে সমর্থন দেবার ক্ষেত্রে পাকিস্তান এবং তুরস্কের কৌশলগত সহযোগিতা চোখে পড়ছে। তবে এক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটা দেশের নামও উল্লেখ করার মতো; যার নাম কাতার। প্রায় একইসাথে মধ্য এশিয়ার মাঝ দিয়ে পাকিস্তান থেকে তুরস্ক পর্যন্ত ‘লাপিস লাজুলি’ নামের একটা কৌশলগত পরিবহণ নেটওয়ার্ক ডেভেলপ করে ভূমধ্যসাগরকে মধ্য এশিয়ার মাঝ দিয়ে ভারত মহাসগরের সাথে যুক্ত করে তার নিরাপত্তা দেয়ার ক্ষেত্রেও মধ্য এশিয়ার দেশ আজেরবাইজান এবং তুর্কমেনিস্তানের নাম সামনে আসছে।

গত জুন এবং জুলাই মাসে তুরস্কে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো যৌথ সামরিক মহড়া ‘আনাতোলিয়ান ঈগল ২০২১’। তুরস্কের বিমান বাহিনীর অফিশিয়াল বিবৃতি অনুযায়ী এই মহড়ার উদ্দেশ্য ছিল অংশগ্রহণকারী দেশগুলির জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতাকে একে অপরের সাথে সমন্বয় করা। এবং একইসাথে সত্যিকারের যুদ্ধাবস্থায় যৌথ অপারেশনে অভ্যস্ত হওয়া। এটা ছিল মূলতঃ চারটা দেশের বিমান বাহিনীর একটা মহড়া। তুরস্ক এই মহড়া অনেকদিন ধরেই আয়োজন করে চলেছে। তবে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই মহড়ার আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। মহড়ায় পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ৫টা ‘জেএফ ১৭’ ফাইটার বিমান অংশ নেয়। এর সাথে মহড়ায় অংশ নেয় আজেরবাইজানের রুশ নির্মিত ২টা ‘মিগ ২৯’ বিমান এবং ২টা ‘সুখোই ২৫’ যুদ্ধবিমান। তুরস্কের পক্ষ থেকে ৩৮টা ‘এফ ১৬’ বিমান, একটা ‘আনকা এস’ ড্রোন এবং একটা ‘কেসি ১৩৫’ রিফুয়েলিং বিমান অংশ নেয়। তবে পুরো মহড়ার সবচাইতে আলাদা অংশগ্রহণকারী ছিল কাতারি বিমান বাহিনীর ৪টা ফরাসি নির্মিত ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমান। এর ফলে তুর্কি এবং পাকিস্তানি ফাইটার পাইলটরা প্রথমবারের মতো ফরাসি ‘রাফাল’ ফাইটার জেটের বিরুদ্ধে একটা সত্যিকারের মহড়ায় অংশ নেয়। পাকিস্তানের মূল আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ফ্রান্স থেকে ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমান কিনেছে। অপরদিকে তুরস্কের ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রিসও ফ্রান্স থেকে ‘রাফাল’ বিমান পাচ্ছে। এই যৌথ মহড়ার ব্যাপারে ভারত এবং গ্রিস উভয় দেশের বিশ্লেষকেরাই দুশ্চিন্তা দেখিয়েছেন। কারণ এর মাধ্যমে তুরস্ক এবং পাকিস্তান উভয়েই ‘রাফাল’ বিমানের সক্ষমতা সম্পর্কে একটা সম্যক ধারণা অর্জন করতে পারবে।

শুধু মহড়াই নয়। জুন মাসে কাতারের সাথে তুরস্কের একটা আলাদা চুক্তি তুর্কি পার্লামেন্টে পেশ করা হয়, যার মাধ্যমে কাতারি বিমান বাহিনীর ৩৬টা বিমান এবং প্রায় আড়াই’শ সদস্য তুরস্কে ট্রেনিং নেবে। ‘মিডলইস্ট আই’ বলছে যে, গত মার্চেই তুর্কি সামরিক বাহিনীর জেনারেল ইয়াসার গুলার কাতারিদের সাথে এই চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তি অনুযায়ী কাতারি বিমান বাহিনী পাঁচ বছরের জন্যে তুরস্কে প্রশিক্ষণ নিতে পারবে। প্রতিবারের প্রশিক্ষণের আগে দুই মাসের একটা আগাম খবর দেবে কাতারিরা। ডকুমেন্টে বলা হয় যে, এর মাধ্যমে দুই দেশের মাঝে সামরিক সহযোগিতা আরও বৃদ্ধি পাবে। তুরস্কের আকাশসীমা এবং বন্দরসমূহ ব্যবহার করে কাতারিরা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারবে। প্রতিবেদনে আরও মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, ২০১৭ সাল থেকে কাতারের উপর সৌদি গ্রুপের অবরোধ আরোপের পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিশেষ করে সেসসম্য় থেকেই কাতারে তুরস্কের একটা সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পেও কাতারিরা বিনিয়োগ করেছে এবং তুরস্কের পর্যটন ও রিয়েল এস্টেট খাত ছাড়াও বিভিন্ন খাতে কাতার ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। তবে তুরস্কের মাটিতে কাতারিদের বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ নতুন কিছু নয়। ১৯৯০এর দশক থেকে শুরু করে এক দশকের বেশি সময় ধরে ইস্রাইলি বিমান বাহিনী তুরস্কের পাহাড়ি অঞ্চলকে আকাশ প্রশিক্ষণের জন্যে ব্যবহার করে। উভয় পক্ষ একে অপরের বিমান এবং কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করে। সেই হিসেবে গ্রিক বিশ্লেষকদের মতে, তুর্কিরা কাতারের ‘রাফাল’ ফাইটার বিমান সম্পর্কে গভীর ধারণা পেতেই কাতারি বিমান বাহিনীর বিমানকে নিজ দেশে প্রশিক্ষণে দেখতে চায়। এতে তুর্কিরা ফরাসি বিমান সম্পর্কে আরও বেশি জানতে পারবে।

 

অপরদিকে তুরস্কের সাথে পাকিস্তানের কৌশলগত সহযোগিতা আরও এক ধাপ এগিয়ে যায় সেপ্টেম্বর মাসে। ১২ই সেপ্টেম্বর থেকে আজেরবাইজানের রাজধানী বাকুতে শুরু হয় ত্রিদেশীয় আরেকটা যৌথ মহড়া। ‘থ্রি ব্রাদার্স ২০২১’ নামের এই মহড়া আরেকটা দিকনির্দেশনা দেয়। আজেরবাইজানের স্পেশাল ফোর্সের কমান্ডার লেঃ জেনারেল হিকমাত মিরজাইয়েভ তুর্কি এবং পাকিস্তানের স্পেশাল ফোর্সের সদস্যদের নিজ দেশে স্বাগত জানান। তিন দেশের কাছাকাছি সম্পর্ককে সংজ্ঞায়িত করতে জেনারেল মিরজাইয়েভ আর্মেনিয়ার সাথে ৪৪ দিনের যুদ্ধের প্রথম থেকেই তুরস্ক এবং পাকিস্তানের পুরোপুরি সমর্থনের কথা উল্লেখ করেন। প্রায় তিন দশকের আর্মেনিয় দখলদারিত্বের পর আজেরিরারা নাগোর্নো কারাবাখের কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ শহরসহ প্রায় ৩’শ বসতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়; যখন উভয় পক্ষ রুশ মধ্যস্ততায় যুদ্ধবিরতি মেনে নেয়। জেনারেল মিরজাইয়েভ তিন দেশের সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক নিরাপত্তার উপর গুরুত্বারোপ করেন। তুর্কি লেঃ কর্নেল কুরসাত কনুক এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর লেঃ কর্নেল আমির শাহজাদ দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এই সামরিক সম্পর্কের গুরুত্বকে তুলে ধরেন।

তুরস্কের ‘কাদির হাস ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর মিতাত চেলিকপালা তুর্কি মিডিয়া ‘টিআরটি’র সাথে এক সাক্ষাতে বলছেন যে, এই মহড়ার মাধ্যমে তুরস্ক এবং আজেরবাইজানের কৌশলগত অবস্থানকে মধ্য এশিয়ার মাঝ দিয়ে আফগানিস্তান পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মাঝে সামরিক এবং কৌশলগত সম্পর্ককে আরও শক্ত ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত করতেই আজেরবাইজানের মাধ্যমে দেশদু’টাকে আরও কাছাকাছি আনা হচ্ছে। অপরদিকে আজেরবাইজানের ‘এডিএ ইউনিভার্সিটি’র ফারিজ ইসমাঈলজাদে বলছেন যে, এই মহড়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মধ্য এশিয়ার মাঝ দিয়ে পরিবহণ করিডোর, যার মাধ্যমে আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে। যদিও এই মহড়া কোন বিশেষ দেশকে টার্গেট করে হচ্ছে না, তথাপি আর্মেনিয়ার মতো কোন দেশ যদি আবারও অত্র অঞ্চলে শান্তি বিঘ্নিত করার চেষ্টা করে, তবে তার জন্যে এই মহড়া হবে একটা হুমকি। তবে ইরানের কর্মকর্তারা কাস্পিয়ান সাগরীয় অঞ্চলে তুরস্ক এবং পাকিস্তানের সামরিক অবস্থানকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছেন। মধ্য এশিয়ার ‘লাপিস লাজুলি করিডোর’ বরাবর তুরস্কের এবং পাকিস্তানের প্রভাব বৃদ্ধি ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে।

Saturday, 9 January 2021

সৌদি আরব এবং কাতারের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

০৯ই জানুয়ারি ২০২১

আল উলা, সৌদি আরব, জানুয়ারি ২০২১। বিমানবন্দরে কাতারের আমির আল থানিকে স্বাগত জানাচ্ছে সৌদি যুবরাজ বিন সালমান। বিশ্বব্যাপী প্রভাব হারালেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির উপর মার্কিন প্রভাব যে এখনও যথেষ্ট, তা কাতারের ইস্যু থেকে পরিষ্কার হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থনপুষ্ট হয়েই সৌদিরা কাতারের উপর অবরোধ দিয়েছিল; আবার সেই একই প্রশাসন হোয়াইট হাউজ ছাড়ার আগে আলোচনার পিছনে চাপ দিয়েছে।

গত ৭ই জানুয়ারি রাতে কাতারের রাজধানী দোহা থেকে ‘কাতার এয়ারওয়েজ’এর একটা ফ্লাইট সৌদি ভূখন্ডের উপর দিয়ে উড়ে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহান্সবার্গের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। ‘আল আরাবিয়া টিভি’ বলছে যে, সৌদি আরবের সাথে কাতারের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের সাথে সাথে ২০১৭এর পর প্রথমবারের মতো কাতারের বিমান সৌদি আকাশসীমা ব্যবহার করে। এর আগে ৫ই জানুয়ারি সৌদি আরবের আল উলা শহরে ‘গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল’ বা ‘জিসিসি’র ৪১তম শীর্ষ বৈঠকে আরব দেশগুলি সর্বসম্মতিক্রমে কাতারের উপর থেকে সকল নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান সাংবাদিকদের বলেন যে, সকলে মিলে নিজেদের মাঝে দ্বন্দ্ব ভুলে যাবার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২০১৭ সালে সন্ত্রাসবাদে ইন্ধন দেবার অভিযোগে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং মিশর কাতারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং দেশটার উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবার জন্যে কাতারের কাছে সৌদি গ্রুপের মোট ১৩টা দাবি ছিল; যার মাঝে ছিল ‘আল জাজিরা’ টেলিভিশন বন্ধ করে দেয়া, কাতারে তুরস্কের সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করা, ইরানের সাথে কাতারের সম্পর্ককে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা, এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে কাতারের সকল সম্পর্ক কর্তন। তবে সাড়ে তিন বছর পর দুই পক্ষের মাঝে মিলমিশ হয়ে যাবার কারণ কি? ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বলছে যে, উভয় পক্ষই এই দ্বন্দ্বকে চালিয়ে নেবার শক্তি হারিয়ে ফেলায় শান্তির পথ বেছে নিয়েছে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে কুয়েত এবং যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এই সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে।

‘জিসিসি’ বৈঠকে সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান বা ‘এমবিএস’এর কথাগুলি কাতারের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের কারণ সম্পর্কে কিছুটা ইঙ্গিত দেয়। বিন সালমান তার বক্তব্যে বলেন যে, এই অঞ্চলের দেশগুলির একত্রিত হবার জন্যে একটা বিরাট চাহিদা তৈরি হয়েছে; যার উদ্দেশ্য হবে বর্তমানের চ্যালেঞ্জগুলি মোকাবিলা করা, বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রকল্পের হুমকি এবং স্যাবোটাজ ও ধ্বংসের পরিকল্পনা। ‘বিবিসি’ তাদের বিশ্লেষণে বলছে যে, ২০১৭ সালে মার্কিন সরকার সৌদিদের পক্ষাবলম্বন করে এবং কাতারকে ‘সন্ত্রাসের অর্থায়নকারী’ হিসেবে আখ্যা দেয়; যদিও মধ্যপ্রাচ্যের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের সবচাইতে বড় সামরিক ঘাঁটি হলো কাতারের আল উদাইদ। ২০১৮ সাল থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের প্রচেষ্টায় সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় কাতারের ভালো ভূমিকার কথা বলা হতে থাকে। ইরানকে নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত নীতির অংশ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন যখন উভয় পক্ষের উপর চাপ দিতে থাকে, তখনই আলোচনায় গতি আসে। ট্রাম্পের জেষ্ঠ্য উপদেষ্টা ও জামাতা জ্যারেড কুশনার ডিসেম্বরে সৌদি আরব এবং কাতার সফর করেন। আল উলার বৈঠকেও তিনি ছিলেন বলে খবর পাওয়া যায়।

‘রয়টার্স’ বলছে যে, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি তেলের খনিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর থেকে সৌদিরা কাতারের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের দিকে মনোযোগী হয়। সৌদি এবং মার্কিনীরা হামলার জন্যে ইরানকে দায়ি করেছিল। সেবছরের অক্টোবরে সৌদি আরব সফরের পর ডিসেম্বরে কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুররহিম আল থানি ‘সিএনএন’কে বলেন যে, সৌদিদের সাথে আলোচনার পর অন্ততঃ বন্ধ হয়ে যাওয়া কথাবার্তার ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। তবে কাতার মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে সরাসরি সম্পর্ক রাখার কথা অস্বীকার করে এবং কাতারে তুর্কি ঘাঁটি বন্ধ করার ব্যাপারে অপারগতা জানায়। কাতারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন যে, কাতারের খারাপ সময়ে যেসব দেশ সহায়তা দিয়েছে, তাদেরকে কাতার পিঠ দেখাবে না। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, সেই আলোচনাতেই সৌদিরা ‘আল জাজিরা’ বন্ধ করা এবং তুরস্কের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ব্যাপারে নমনীয়তা দেখিয়েছিল। আর এই আলোচনার পিছনে যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচ্ছন্ন প্রভাব ছিল, তা জানা যায় হোয়াইট হাউজের বিবৃতি থেকে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানিকে ফোনে বলেন যে, দুই দেশের মাঝে আলোচনা চলমান থাকলে তা উপসাগরীয় অঞ্চলের সমস্যা নিরসণে ভূমিকা রাখবে।

‘বিবিসি’ বলছে যে, কাতার হয়তো অত সহজে সৌদি গ্রুপের অবরোধের কথা ভুলে যাবে না। অপরদিকে আরব আমিরাত এখনও কাতারকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে না; বিশেষ করে ফিলিস্তিন এবং লিবিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে কাতারের সম্পর্ককে আমিরাত তার রাজতান্ত্রিক নেতৃত্বের প্রতি হুমকি হিসেবে দেখে। নিষেধাজ্ঞার সময়টাতে ২৭ লক্ষ জনগণের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে তুরস্ক ও ইরানের সাথে কাতার অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করে। ‘জিসিসি’র দু’টা সদস্য দেশ কাতারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেনি, যারা হলো কুয়েত এবং ওমান। এর মাঝে কুয়েতই আলোচনার মধ্যস্ততাকারী ছিল।

বিশ্বব্যাপী প্রভাব হারালেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির উপর মার্কিন প্রভাব যে এখনও যথেষ্ট, তা কাতারের ইস্যু থেকে পরিষ্কার হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থনপুষ্ট হয়েই সৌদিরা কাতারের উপর অবরোধ দিয়েছিল; আবার সেই একই প্রশাসন হোয়াইট হাউজ ছাড়ার আগে আলোচনার পিছনে চাপ দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে সৌদিদের ভালো সম্পর্ক থাকলেও আসন্ন ডেমোক্র্যাট প্রশাসনের আদর্শিক নীতির সাথে সৌদি সরকারের সম্ভাব্য বিরোধ আলোচনায় আসছে নিয়মিত। বিশেষ করে ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নীতি কি হবে, তা নিয়ে সৌদিরা চিন্তিত। মার্কিন ভূরাজনৈতিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘স্ট্রাটফর’ বলছে যে, কাতারের সাথে সৌদি গ্রুপের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পিছনে মূল উদ্দেশ্য হলো বাইডেন প্রশাসনের ভালো নজরে আসা। তবে সৌদিদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বহু বিষয়ে যথেষ্ট মতবিরোধ রয়েছে, যেগুলি থেকে সৌদিদের পক্ষে বেরিয়া আসা কঠিন। কাতারের উপর সৌদি অবরোধ পারস্য উপসাগরে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতির সুযোগ করে দেয়া ছাড়াও কাতারকে নতুন একটা সামরিক বাহিনী তৈরির অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে; যা গড়ে তুলতে তুরস্কের ভূমিকাই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদিরা তুরস্কের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে; তুরস্কও সৌদি গ্রুপের পথ অনুসরণ করে ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় নিজস্ব জাতীয় অবস্থানকে টিকিয়ে রাখতে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জোটের সৃষ্টি হচ্ছে, যেগুলির স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও স্বল্প মেয়াদে এগুলি আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিকে প্রভাবিত করবে।

Wednesday, 2 December 2020

তুর্কি এবং সৌদিদের সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা ... মার্কিন নির্বাচনের ফলাফল?

০৩রা ডিসেম্বর ২০২০

 

২৭শে নভেম্বর ‘ওআইসি’র ৪৭তম বৈঠকের সাইডলাইনে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সউদএর সাথে মিলিত হন। সাম্প্রতিক চরম বিরোধপূর্ণ মার্কিন নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে যেব্যাপারে সকলেই নিশ্চিত তা হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখন অভ্যন্তরীণভাবে বিভাজিত। সাম্প্রতিক সময়ে দ্রুত আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাব হারাবার সাথে সাথে বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের ব্যাপারে কেউই নিশ্চিত হতে পারছে না। একারণে সৌদি আরব এবং তুরস্কের মতো যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী বন্ধু দেশগুলি ওয়াশিংটনের নীতির উপর নির্ভর করতে পারছে না। বাইডেন প্রশাসন ক্ষমতায় আরোহণের আগেই এই অস্থিরতাগুলি সামনে চলে আসছে এবং আবারও ভূরাজনৈতিক ব্যালান্স পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে।


২০শে নভেম্বর সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আব্দুলআজিজের সাথে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগানের ফোনালাপের পর তুর্কি প্রেসিডেন্টের অফিসের এক বার্তায় বলা হয় যে, দুই দেশ তাদের মাঝে বিরোধ নিরসন এবং সম্পর্কোন্নয়ন করার লক্ষ্যে আলোচনার পথ খোলা রাখার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। পরদিনই সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত ‘জি২০’ জোটের শীর্ষ বৈঠকে এরদোগান ভার্চুয়াল ভাষণ দেন। এরপর ২৭শে নভেম্বর ‘ওআইসি’র ৪৭তম বৈঠকের সাইডলাইনে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সউদএর সাথে মিলিত হন। কাভুসোগলু এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, দুই দেশের শক্তিশালী সম্পর্ক শুধু তাদের জন্যে নয়, পুরো অঞ্চলের জন্যেই সুবিধাজনক। নভেম্বরের কয়েকদিনের ভেতরেই দুই আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মাঝে সম্পর্কোন্নয়নের আভাস দেখা যাওয়াকে অনেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভূরাজনৈতিক ফলাফল হিসেবে দেখছেন।

‘ভয়েস অব আমেরিকা’ বলছে যে, বিশ্লেষকেরা তুরস্ক এবং সৌদি আরবের দ্বন্দ্বকে মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকায় চলমান সংঘাতের পিছনে দায়ি করছেন। তবে মার্কিন নির্বাচনে জো বাইডেনের জয়লাভের পর তুরস্ক এবং সৌদি আরব নিজেদের সম্পর্ককে নতুন করে চিন্তা করতে চাইছে। কাতারে তুরস্কের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত মিতহাত রেন্দে মত দিচ্ছেন যে, জো বাইডেনের প্রশাসন সৌদিদের সাথে সম্পর্ককে নতুন করে সাজাবে বলেই সৌদিরা প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছে। এর ফলে সৌদিরা এবং তুর্কিরা উভয়েই চিন্তা করতে শুরু করেছে যে, দু’দেশের মাঝে বৈরিতার সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে চালিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। আঙ্কারার ‘মিডলইস্ট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি’র অধ্যাপক হুসাইন বাগচি বলছেন যে, অতীতে সৌদিরা তুরস্কে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। এখন তুরস্কের বর্তমান অর্থনৈতিক দৈন্যদশার মাঝে তারা আবারও সৌদি বিনিয়োগ আশা করছে। ১৫ই নভেম্বর তুর্কি মিডিয়াতে বলা হয় যে, তুর্কি গোমাংস, খাশি, পোল্ট্রি, মাছ, দুধ, ডিম, মধু এবং আরও কিছু পণ্যের উপর সৌদিরা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এর আগ থেকেই সৌদিরা তুর্কি পণ্যের উপর অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা চালাচ্ছিল বলে বলছে তুর্কি মিডিয়া ‘ডেইলি সাবাহ’। ‘টারকিশ এক্সপোর্টার্স এসেম্বলি’ বলছে যে, এবছরের অক্টোবর পর্যন্ত সৌদি আরবে তুর্কি পণ্যের রপ্তানি ১৬ শতাংশ কমে ২ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। ২০১৯ সালে সৌদিরা তুরস্ক থেকে ৩ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছিল। তবে তুর্কি বাণিজ্যমন্ত্রী রুশার পেকান ‘ডেইলি সাবাহ’র সাথে সাক্ষাতে বলছেন যে, দুই দেশের বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমস্যাগুলি নিরসনে তারা সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ আশা করছেন। তিনি বলেন যে, সৌদিরা তাকে বলেছেন যে, সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে তুর্কি পণ্যের ব্যাপারে আলাদা কোন সিদ্ধান্তই হয়নি। তুর্কি সরকারি বার্তা সংস্থা ‘আনাদোলু এজেন্সি’ বলছে যে, সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল ইতোমধ্যেই কাতারের উপর সৌদি অবরোধ তুলে নেবার আভাস দিয়েছেন। ২০১৭ থেকে উপসাগরীয় দেশগুলি কাতারের উপর অবরোধ দিয়েছে, এবং কাতারের পক্ষ নেবার কারণে তুরস্কেরও বিরোধিতা করেছে।

‘আল জাজিরা’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনসুলেটে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যাকান্ডের পর থেকে তুরস্ক সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের বিরুদ্ধে শক্ত ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। ‘অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি’র এমরে চালিসকান বলছেন যে, এতদিন খাশোগির হত্যাকান্ড নিয়ে সরব থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তুর্কিরা খুব সম্ভবতঃ তাদের ভাষা পরিবর্তন করে অপেক্ষাকৃত নরম সুরে কথা বলছে। ইস্তাম্বুলের এক আদালতে সৌদিদের অনুপস্থিতিতে খাশোগি হত্যার বিচার চলছে। তুর্কি সরকার বরাবরই এই মামলার শুনানির ব্যাপারে বিশ্বব্যাপী প্রচারণা চালালেও নভেম্বরের শেষের দিকে শুনানির ব্যাপারে তুর্কি সরকার বা কোন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কোন কথা বলা থেকে বিরত থাকেন। আগামি মার্চ মাস পর্যন্ত এই মামলার শুনানি মুলতুবি করা হয়েছে। চালিসকান বলছেন যে, এরদোগান বাস্তববাদিতার চ্যাম্পিয়ন। কাজেই তুর্কি এবং সৌদিরা অবশ্যই একত্রে কাজ করার ব্যাপারে সুযোগ বের করে নেবে।

‘আনাদোলু এজেন্সি’র এক বিশ্লেষণে জনাথন ফেনটন হারভি বলছেন যে, একসময় বিভিন্ন ইস্যুতে তুরস্ক এবং সৌদি আরব একত্রে কাজ করেছে; বিশেষ করে সিরিয়ার যুদ্ধে বাশার আল আসাদের সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী গ্রুপগুলিকে সহায়তা দিয়েছে উভয়েই। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যুবরাজ বিন সালমান ক্ষমতাশালী হবার পর থেকেই তুরস্কের সাথে সৌদিদের দূরত্ব বাড়তে থাকে। সিরিয়ার বাশার সরকারের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন এবং লিবিয়াতে জেনারেল খলিফা হাফতারকে সমর্থন প্রদান আঞ্চলিকভাবে সৌদি আরবকে তুরস্কের বিপক্ষে দাঁড় করায়। সৌদি মিডিয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসায়িক সংগঠনগুলির মাঝেও তুরস্ক বিরোধী মনোভাব দানা বাঁধতে থাকে। দুই দেশের রাষ্ট্রীয় কর্তাব্যক্তিদের মাঝে বিভেদ বেশ খানিকটা। তুরস্কের কর্মকর্তাদের মাঝে কেউ কেউ এখনই সৌদিদের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের ব্যাপারে উপসংহার না টেনে আরও কিছুদিন দেখার পক্ষপাতি। সৌদিরাও মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি তুরস্কের ক্ষমতাসীন ‘একে পার্টি’র সমর্থনকে ভুলে যেতে পারছে না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে নির্বাচনী প্রচারণার সময়েই জো বাইডেন বলেছেন যে, তিনি সৌদিদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে পুনর্বিবেচনা করবেন; বিশেষ করে জামাল খাশোগি হত্যা এবং ইয়েমেনের যুদ্ধ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারগুলিকে তিনি প্রাধান্য দেবেন। এটা পরিষ্কার যে, তুরস্ক আর সৌদি আরবের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। সাম্প্রতিক চরম বিরোধপূর্ণ মার্কিন নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে যেব্যাপারে সকলেই নিশ্চিত তা হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখন অভ্যন্তরীণভাবে বিভাজিত। সাম্প্রতিক সময়ে দ্রুত আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাব হারাবার সাথে সাথে বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের ব্যাপারে কেউই নিশ্চিত হতে পারছে না। একারণে সৌদি আরব এবং তুরস্কের মতো যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী বন্ধু দেশগুলি ওয়াশিংটনের নীতির উপর নির্ভর করতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনকে কাজে লাগিয়ে করা কর্মকান্ডই এখন ওয়াশিংটনের চোখে ভিন্নরূপে দেখা দিচ্ছে, যা সৌদি এবং তুর্কিদের বিচলিত করেছে। বাইডেন প্রশাসন ক্ষমতায় আরোহণের আগেই এই অস্থিরতাগুলি সামনে চলে আসছে এবং আবারও ভূরাজনৈতিক ব্যালান্স পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে।

Tuesday, 14 April 2020

করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট ভূরাজনৈতিক শূণ্যতা পূরণে নেতৃত্ব দিচ্ছে তুরস্ক

১৪ই এপ্রিল ২০২০

১০ই এপ্রিল তুর্কিরা বিমানে করে মেডিক্যাল সামগ্রী পাঠায় ব্রিটেনে। তুরস্ক মানবিক সহায়তার রাজনীতিকে উস্কে দেবার পর আমিরাত, কাতার, মিশর, বাংলাদেশের মতো মুসলিম দেশগুলির অগ্রগামী ভূমিকা বিশ্বব্যাপী নতুন ভূরাজনীতির জন্ম দিচ্ছে।

গত পহেলা এপ্রিল তুরস্কের বিমান বাহিনীর ‘এ-৪০০এম’ পরিবহণ বিমান আঙ্কারা ছেড়ে যায়। এর গন্তব্য ছিল ইতালি এবং স্পেন; যারা নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণে সবচাইতে বেশি আক্রান্ত হয়েছে। তুর্কি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক টুইটার বার্তায় বলা হয় যে, বিমানে ছিল করোনাভাইরাস প্রতিরোধে অতি দরকারি মাস্ক, গাউন এবং জীবাণুনাশক, যা কিনা তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারখানাগুলিতে তৈরি হয়েছে। ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী লুইজি ডি মাইও এবং স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঞ্চা গঞ্জালেজ তুরস্ককে এই সহায়তার জন্যে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। ‘দ্যা ডিফেন্স পোস্ট’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, পহেলা এপ্রিল পর্যন্ত তুরস্কে করোনাভাইরাসে ২’শ ১৪ জনের প্রাণহানি হয়েছে; আক্রান্ত হয়েছে সাড়ে ১৩ হাজারেরও বেশি মানুষ। অর্থাৎ তুরস্ক তার নিজের দেশে মেডিক্যাল সরঞ্জামের ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ইতালি এবং স্পেনকে সহায়তা দিয়েছে। ইতালির ১০ বছর বয়সী একটা ছেলে এক ভিডিও বার্তায় তুরস্কের এই সহায়তাকে ধন্যবাদ দেয়, যা কিনা দুর্যোগের মুহুর্তে তুর্কিদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়ার চিন্তাটাকেই হাইলাইট করেছে। মিলানের এই বাসিন্দা আর্নেস্ত গাব্রিয়েল স্ক্রোচ্চি তার বার্তায় বলে যে, প্রতি পাঁচ মিনিটে একটা করে এম্বুল্যান্সের শব্দ শুনতে শুনতে সে ব্যাথিত। এমন এক সময়েই তুরস্ক ইতালিকে সহায়তা দিয়েছে। তুর্কিদের প্রতি ইতালি কৃতজ্ঞ। তবে স্ক্রোচ্চির আবেগঘন বার্তাই তুরস্কের জন্যে একমাত্র পাওয়া নয়। করোনাভাইরাসকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী নতুন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার একটা অংশ এই সহায়তা।

মার্চ মাস জুড়ে চীন বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সহায়তা দিয়েছে। কম্বোডিয়াতে তারা পাঠিয়েছে টেস্টিং কিট, ইতালি এবং ফ্রান্সকে দিয়েছে ভেন্টিলেটর, মাস্ক এবং মেডিক্যাল কর্মী; ইরাক এবং ইরানেও পাঠিয়েছে মেডিক্যাল কর্মী। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং স্পেনের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে বলেন যে, ঝড়ের পরেই সূর্য দেখা যায়। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ বলছে যে, করোনা দুর্যোগের মাঝে চীন নিজেকে জনস্বাস্থ্যের ব্যাপারে বিশ্বের নেতৃত্বে বসাতে চাইছে। শুধু তা-ই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতার মাঝে চীন বিশ্বব্যাপী তার প্রভাব বাড়িয়ে নিতে চাইছে। নিজ দেশে চীন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কমিয়ে আনার সাথেসাথেই বিশ্বের প্রতি চীনের বাক্যগুলি পরিবর্তিত হয়ে গেছে। নিজ দেশে চীন করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রায় ‘জয়লাভ’ করার দাবি করছে এবং বাকি বিশ্বকে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়তে সহায়তা দিতে চাইছে। অস্ট্রেলিয়ার ‘লোয়ি ইন্সটিটিউট’এর রিসার্চ ফেলো নাতাশা কাসাম বলছেন যে, চীনাদের প্রচারমাধ্যম করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে ‘জয়লাভ’এর ইতিহাস লিখেছে, এবং তারা চাইছে যে বিশ্বব্যাপী সকলে তা বিশ্বাস করুক। শি জিনপিং ইতালির প্রধানমন্ত্রী গুইসেপ কন্টিকে ফোনে বলেন যে, তিনি একটা ‘হেলথ সিল্ক রোড’ তৈরি করার পরিকল্পনা করছেন। ‘জার্মান মার্শাল ফান্ড’এর সিনিয়র ভিজিটিং ফেলো নোয়াহ বারকিন বলছেন যে, চীন চাইছে ইউরোপিয়দের নিজেদের মাঝের দূরত্বকে বাড়াতে; আর যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে চ্যালেঞ্জ করতে। একইসাথে শি জিনপিংএর সরকার নিজ জনগণকে বোঝাতে চাইছে যে, চীন নিজ দেশের দুর্যোগকে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছে। ভাইরাস সংক্রমণের প্রথম দিকে চীনা সরকারের ব্যর্থতাগুলিকে এখন তারা আর আলোচনায় রাখতে চাইছে না। ‘চায়না ডেইলি’র এক প্রতিবেদনে গর্ব করেই লেখা হয় যে বাকি বিশ্বে সংক্রমণের সংখ্যা চীনের সংক্রমণের সংখ্যাকে অতিক্রম করেছে; যা কিনা “ভাগ্য উল্টে যাওয়া”র সাথে তুলনা করা হয়। এই প্রতিবেদনের জবাবে একজন পাঠক লিখেন যে, চীনাদের ঘরে পানির পাইপ ভেঙ্গে যাবার পর তারা প্রতিবেশীদের বাড়ি ডুবিয়ে দিয়েছে। এটাই কি সেই ‘স্বর্ণযুগ’, যার আশা চীনারা করেছিল?
 
বেলগ্রেডের রাস্তায় বিলবোর্ড ঘোষণা করছে কিভাবে “ব্রাদার শি” সার্বিয়ার মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। চীন এতকাল তার নিজের দেড়’শ কোটি মানুষকে উন্নততর জীবন দেবার জন্যেই সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। বিশ্বের মানুষের সমস্যা নিরসনে তার কোন ভূমিকা ছিল না। এখন চীনা মাস্ক এবং ডাক্তাররা চীনের এই অবস্থানকে পরিবর্তন করতে চাইছে।


‘আটলান্টিক কাউন্সিল’এর ইউরেশিয়া সেন্টারের সিনিয়র ফেলো দিমিতার বেচেভ বলছেন যে, রাজনীতিতে অনেক সময়ই হুমকি এবং সুযোগ একত্রে আসে। চীনের উদাহরণ দিয়ে বেচেভ বলছেন যে, মার্চের মাঝামাঝি ইতালি এবং স্পেনকে মেডিক্যাল সহায়তা দেবার মাধ্যমে চীন তার ক্ষয়ে যাওয়া প্রতিচ্ছবিটাকে কিছু ঘষামাজা করতে চাইছে। অনেকেই চীনে করোনাভাইরাসের আবির্ভাব হবার ব্যাপারটাকে হাইলাইট করেছেন; আবার অনেকেই ভাইরাস সংক্রমণের প্রথম দিকে চীনা সরকারের অস্বচ্চতা এবং অব্যবস্থাপনার সমালোচনা করেছেন, যার ফলশ্রুতিতে ভাইরাস সারা বিশ্বে ছড়াতে পেরেছিল। চীন এতকাল তার নিজের দেড়’শ কোটি মানুষকে উন্নততর জীবন দেবার জন্যেই সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। বিশ্বের মানুষের সমস্যা নিরসনে তার কোন ভূমিকা ছিল না। এখন চীনা মাস্ক এবং ডাক্তাররা চীনের এই অবস্থানকে পরিবর্তন করতে চাইছে। রাশিয়াও চীনকে অনুসরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে মেডিক্যাল সহায়তা পাঠিয়েছে। অনেক মার্কিনীরাই রুশ এই সহায়তাকে প্রচারণার খাতিরে করা হয়েছে বলেই বলছেন। অন্যদিকে ইতালিতে রুশ সহায়তা পাঠাবার পর ইতালি থেকে কেউ কেউ অভিযোগ করা শুরু করে যে, রুশ মেডিক্যাল কর্মীদের মাঝে ইন্টেলিজেন্সের লোকও এসেছে। একইসাথে সার্বিয়াতে চীনা সহায়তা যাবার পর সার্বিয়ান প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার ভুচিচ দুঃখ করে বলেন যে, ইউরোপের মাঝে কোন ঐক্য নেই। তিনি বলেন যে, ইউরোপিয়রাই সার্বিয়াকে বলেছিল তাদের টেন্ডারের নিয়ম পরিবর্তন করতে, যাতে ইউরোপিয় কোম্পানিগুলি চীনা কোম্পানির স্থলাভিষিক্ত হতে পারে। আর এখন ইউরোপের কাছে সার্বিয়ার কোন গুরুত্ব নেই। বেলগ্রেডের রাস্তায় সরকারপন্থী পত্রিকার বিলবোর্ড বসানো হয়েছে, যেখানে ঘোষণা করা হয়েছে কিভাবে “ব্রাদার শি” সার্বিয়ার মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও সার্বয়াতে মেডিক্যাল সহায়তা পাঠিয়েছেন।

চীনারা করোনাভাইরাসের সংক্রমণের উপর মানবিক সহায়তার ভিত গড়ে তুলতে চাইলেও তুরস্ক এদিক থেকে পুরোনো খেলোয়াড়। বিশ্বব্যাপী মানবিক সহায়তা দেয়াটা সবসময়ই তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতির অংশ। বসনিয়া থেকে শুরু করে সোমালিয়া বা আফগানিস্তান পর্যন্ত তুরস্ক মানবিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে অনেক বছর ধরেই। গত নভেম্বরে আলবেনিয়াতে ভূমিকম্পের পর তুরস্ক সেখানে সহায়তা প্রেরণ করে। তুরস্ক ৮ই এপ্রিল বলকানের পাঁচটা দেশে মেডিক্যাল সরঞ্জাম পাঠায়। তুর্কি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক টুইটার বার্তায় বলে যে, সার্বিয়া, বসনিয়া হার্জেগোভিনা, মন্টিনিগ্রো, নর্থ মেসিডোনিয়া এবং কসোভোতে মাস্ক, গাউন এবং টেস্ট সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে। ১০ই এপ্রিল তুর্কিরা আরেকটা বিমানে করে মেডিক্যাল সামগ্রী পাঠায় ব্রিটেনে। ১২ তারিখে দ্বিতীয় বিমানটা যায় ব্রিটেনে। ইউরোপের দেশগুলিতে তুর্কিদের পাঠানো মেডিক্যাল সামগ্রীর বাক্সগুলির উপর লেখা ছিল ত্রয়োদশ শতাব্দীর মুসলিম সাধক জালালুদ্দিন রুমির কবিতা - নৈরাশ্যতার পরেই রয়েছে অনেক আশা; এবং আঁধারের পরেই রয়েছে অনেক বেশি উজ্জ্বলতর সূর্য। ৯ই এপ্রিল তুর্কি সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা ‘ব্লুমবার্গ’ জানায় যে, ইস্রাইলও তুরস্কের কাছে মাস্ক, গাউন এবং গ্লাভস চেয়েছে। এর বিনিময়ে ইস্রাইলি সরকার প্যালেস্টাইনিদের কাছে তুর্কি ত্রাণ যাবার সুযোগ দেবে বলে সমঝোতা হয়েছে। তবে ইস্রাইলি কর্মকর্তারা ইস্রাইলের ‘ইনেত’ পত্রিকার সাথে কথা বলতে গিয়ে প্যালেস্টাইনে ত্রাণ পাঠাবার সমঝোতার কথাটা অস্বীকার করেন।




তুরস্ক মানবিক সহায়তার রাজনীতিকে উস্কে দেবার পর সংযুক্ত আরব আমিরাত ৬ই এপ্রিল ইতালিতে ১০ টন এবং পাকিস্তানে ১১ টন মেডিক্যাল সরঞ্জাম পাঠায়। এরপর ১০ই এপ্রিল ইউক্রেনে ১১ টন মেডিক্যাল সরঞ্জাম পাঠায়। এছাড়াও আমিরাত ইথিওপিয়া, সোমালিয়া, গ্রীক সাইপ্রাস এবং আরও কিছু দেশে সহায়তা পাঠাচ্ছে। ৮ই এপ্রিল ইতালিতে দু’টা ফিল্ড হাসপাতাল পাঠায় কাতার; যার মাধ্যমে মোট ২ হাজার করোনাভাইরাস রুগীর চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হবে। অপরদিকে নিজেদের স্বল্পতা থাকা সত্ত্বেও ইতালিকে সহায়তা দিয়েছে মিশর। মিশরের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হালা জায়েদ নিজে ইতালিতে দু’টা বিমান ভর্তি মেডিক্যাল সরঞ্জাম নিয়ে যান। ১৪ই এপ্রিল এক টুইটার বার্তায় ব্রিটিশ বাণিজ্যমন্ত্রী গ্রেগ হ্যান্ডস বলেন যে, মিশর থেকে বিরাট সংখ্যক মেডিক্যাল গাউন আসছে; যার জন্যে তিনি মিশরকে ধন্যবাদ জানান। মিশরে এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসে ১’শ ৬৪ জন মৃত্যুবরণ করেছেন; সংক্রমিত হয়েছে দুই হাজারেরও বেশি। আর কুয়েতে ১’শরও বেশি মেডিক্যাল কর্মী এবং মেডিক্যাল সরঞ্জাম দিয়ে সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ। মালদ্বীপকেও ত্রাণ সহায়তা দিতে চাইছে বাংলাদেশ।

চীন করোনাভাইরাস থেকে কতটা ‘মুক্ত’ হতে পেরেছে, তা প্রশ্নাতীত না হলেও এই ভাইরাসকে পুঁজি করে শি জিনপিংএর চীন নিঃসন্দেহে বিশ্বব্যাপী তার প্রভাব গড়ে তুলতে চাইছে। ভাইরাসের আক্রমণে সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের নাজেহাল হবার এই সুযোগে চীনারা এশিয়া, আফ্রিকা ছাড়াও ইউরোপের রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা এবং সার্বিয়ার রাস্তায় বিলবোর্ডে শি জিনপিংএর ছবি একটা বড় ভূরাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে এমনই সময় করোনাভাইরাস মোকাবিলায় তুরস্ক, এবং তার সাথেসাথে আমিরাত, কাতার, মিশর, বাংলাদেশের মতো মুসলিম দেশগুলির অগ্রগামী ভূমিকা বিশ্বব্যাপী নতুন ভূরাজনীতির জন্ম দিচ্ছে। নিজ দেশে করোনাভাইরাস নিয়ে ব্যাপক সমস্যায় থাকা এবং মেডিক্যাল সরঞ্জামের স্বল্পতা থাকা সত্ত্বেও দেশগুলি অন্যকে সহায়তা দিতে অগ্রসর হয়েছে, যা কিনা করোনাভাইরাসের কারণে ভূরাজনৈতিক শূণ্যতা পূরণের একটা চেষ্টা। সামনের দিনগুলিতে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে নিশ্চিতভাবে কেউ কিছু বলতে না পারলেও এর ফলশ্রুতিতে অবশ্যম্ভাবী ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনকে কেউ এখন আর অস্বীকার করছেন না।


Tuesday, 21 January 2020

লিবিয়াতে কি চাইছে ইতালি?

২২শে জানুয়ারি ২০২০

  
গত ৭ই জানুয়ারি ইতালির প্রধানমন্ত্রী গুইসেপ কন্টি লিবিয়ার জেনারেল হাফতারের সাথে সাক্ষাৎ করেন; যার ফলাফল যায় ইতালির বিপক্ষে। ‘জিএনএ’এর প্রতিপক্ষ জেনারেল খলিফা হাফতারের অধীন পূর্ব লিবিয়ার ‘লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’ বা ‘এলএনএ’কেও একইসাথে আলিঙ্গন করার ফলে ইতালি এখন দুই কূলই হারাতে বসেছে। ইতালির রাজনীতিবিদদের ব্যাপক সমালোচনা করে বলা হচ্ছে যে, তারা প্রকৃতপক্ষে কূটনীতি বোঝেন না।


গত ৭ই জানুয়ারি ইতালির প্রধানমন্ত্রী গুইসেপ কন্টি লিবিয়ার যুদ্ধরত দুই পক্ষকে হঠাত করেই একত্রে আলোচনায় বসাবার চেষ্টা করেন; যার ফলাফল যায় ইতালির বিপক্ষে। ইতালি এতকাল ধরে ত্রিপোলির জাতিসংঘ সমর্থিত ‘গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল একর্ড’ বা ‘জিএনএ’কে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ‘জিএনএ’এর প্রতিপক্ষ জেনারেল খলিফা হাফতারের অধীন পূর্ব লিবিয়ার ‘লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’ বা ‘এলএনএ’কেও একইসাথে আলিঙ্গন করার ফলে ইতালি এখন দুই কূলই হারাতে বসেছে। ‘জিএনএ’ প্রেসিডেন্ট ফায়েজ আল-সারাজএর দেখা করার আগেই কন্টি হাফতারের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এই খবর পাবার পর আল-সারাজ কন্টির সাথে দেখা করতেই রাজি হননি। ‘ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর রোম অফিসের ডিরেক্টর আরটুরো ভারভেলি বলছেন যে, ইতালির রাজনীতিবিদেরা পররাষ্ট্রনীতির দিকে যথেষ্ট মনোযোগ দেননা; যার ফলাফল এখন দেখা যাচ্ছে। ‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে ইতালির রাজনীতিবিদদের ব্যাপক সমালোচনা করে বলা হয় যে, তারা প্রকৃতপক্ষে কূটনীতি বোঝেন না। ২০১৮ সালে সরকার গঠন করার সময় কন্টি এবং তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী লুইজি ডি মাইও উভয়েরই কূটনীতি বিষয়ে কোন অভিজ্ঞতা ছিল না। আর এর ফলে ইতালি লিবিয়াতে তার প্রভাব হারিয়েছে। ইতালির উগ্র ডানপন্থী নেতা মাত্তেও সালভিনি প্রধানমন্ত্রী কন্টির সমালোচনা করে বলেন যে, কন্টির আসলে কোন যোগ্যতাই নেই। তার সরকারের লোকজন অপেশাদার। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, লিবিয়ার উপর এক আলোচনায় বসার পর ইতালি বুঝতে পারে যে সে একঘরে হয়ে গেছে। আলোচনায় ফ্রান্স, মিশর, গ্রীস এবং গ্রীক সাইপ্রাস, সকলেই হাফতারের পক্ষ নেয়ায় ডি মাইও লিবিয়া বিষয়ে যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান।

‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০১১ সালে ইউরোপ মুয়াম্মার গাদ্দাফির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে আগ্রহী হলেও পরবর্তীতে দেশটাকে যুদ্ধরত বিভিন্ন গ্রুপের হাতে সপে দেয়। লিবিয়ার অস্ত্র আফ্রিকার অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন দেশে সহিংসতার জন্ম দেয়, যা বিরাট শরণার্থী সমস্যার সৃষ্টি করে। ইউরোপের দেশগুলি লিবিয়াতে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির পেছনেই ছুটেছে; একেকজন একেক পক্ষকে সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু তুরস্ক যুদ্ধে জড়াবার পরপরই পুরো ইউরোপ মনোযোগ দেয়া শুরু করেছে। এখানে যেন নতুন কোন ‘গ্রেট গেম’ শুরু হয়ে গেছে, যা ইউরোপের আশেপাশের অঞ্চলকে অস্থির করছে। তুরস্ক এবং রাশিয়া একত্রে আলোচনায় বসে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেবার পরপরই জার্মানি লিবিয়ায় স্বার্থ আছে এমন সকলকে নিয়ে বৈঠকের আয়োজন করেছে। ‘জার্মান মার্শাল ফান্ড’এর ব্রাসেলস অফিসের ডিরেক্টর ইয়ান লেসার বলছেন যে, লিবিয়া নিয়ে ইউরোপের চিন্তা করার কারণগুলির মাঝে রয়েছে শরণার্থী, জ্বালানি তেল, নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবাদ। কিন্তু তুরস্ক এবং রাশিয়া লিবিয়াতে অতটা সক্রিয় না হলে লিবিয়া নিয়ে সকলে এতটা ব্যস্ত হয়ে যেত না।

ডাচ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ক্লিগেনডেল ইন্সটিটিউট’এর রিসার্চ ফেলো জালেল হারচাউই বলছেন যে, লিবিয়াতে তুরস্ক এবং রাশিয়া যেভাবে আগ্রাসী কূটনীতি চালাচ্ছে, তাতে ইতালি একেবারেই কোনঠাসা হয়ে পড়েছে। ইতালিয়ান ইন্টেলিজেন্সএর এক কর্মকর্তা ‘রয়টার্স’কে বলেন যে, ইতালির রাজনীতিবিদেরা তাদের নির্দেশ দিয়েছেন সকল পক্ষের সাথেই যোগাযোগ রাখতে। অর্থাৎ ইতালি সকলকেই একত্রে বন্ধু রাখতে চাইছে। কিন্তু এধরনের চলমান সংঘাতে নিজের অবস্থানকে পরিষ্কার না করতে পারলে প্রভাব হারানোটাই স্বাভাবিক বলে মনে করছেন তিনি। শুধু লিবিয়াই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেই ইতালি প্রভাব হারাচ্ছে। বাগদাদে ইরানি জেনারেল কাসেম সুলাইমানিকে হত্যার পর মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পেও বিশ্বব্যাপী ফোন করে জনমত আদায়ের চেষ্টা করলেও ইতালিতে কারুর সাথেই তিনি কথা বলেননি; যদিও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের পর পশ্চিমা দেশগুলির মাঝে ইতালির সৈন্যসংখ্যাই সবচাইতে বেশি।


  
শরণার্থী সমস্যা ইতালির জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি প্রধান হুমকি। ইতালিয়দের চিন্তায় শরণার্থী সমস্যা এতটাই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে যে, লিবিয়ায় তাদের রাজনৈতিক কর্মকান্ড এর তুলনায় হয়ে গেছে গৌণ। ২০১৭ সালে ইতালির দেয়া প্রায় ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বৈদেশিক সাহায্যের মাঝে ৫৬ শতাংশই গিয়েছে শরণার্থী সমস্যা নিরসনে। 


ইতালির প্রধান ভয় - শরণার্থী

‘আল জাজিরা’র এক লেখায় রোমানা রুবেও এবং রামজি বারুদ বলেন যে, লিবিয়ার ‘জিএনএ’ সরকারের কোস্ট গার্ডের নেতৃত্বে থাকা আব্দ আল-রাহমান বিজা মিলাদএর সাথে ইতালিয়রা কাজ করছে। মিলাদ হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যার সম্পর্কে ২০১৭ সালের জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিবেদনে বলা হয় যে, তিনি শুধু চোরাকারবারিতেই জড়িত নন, গুলি করে অভিবাসন প্রত্যাশীদের নৌকা ডুবিয়ে দেয়ার রেকর্ডও রয়েছে তার। ২০১৭এর ফেব্রুয়ারিতে ত্রিপোলির ‘জিএনএ’ সরকারের সাথে অবৈধ অভিবাসী ঠেকার জন্যে ইতালি একটা চুক্তি করে। চুক্তির অধীনে লিবিয়াতে শরণার্থীদের আটক করার জন্যে লিবিয়ার মাটিতেই ক্যাম্প তৈরির জন্যে অর্থায়ন করে ইতালি। মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’এর ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে এই ক্যাম্পের কার্যকলাপকে ‘অমানবিক’ বলে উল্লেখ করা হয়। এই চুক্তি করার জন্যে মিলাদ ইতালির দক্ষিণে সিসিলির কাতানিয়া শরণার্থী শিবিরে গেলে সেখানে অভিবাসীরা তাকে ‘ইতালিয়ান মাফিয়া’ বলে সম্ভোধন করে। অভিবাসন ঠেকাবার ইতালিয় চেষ্টাগুলি নতুন নয়।

২০০৮ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফির সময়ে তৎকালীন সিলভিও বারলুসকোনির ইতালি সরকার অভিবাসী ঠেকাতে লিবিয়াকে ৫ বিলিয়ন ডলার দেয়। চিন্তাটা ছিল এমন যে, ইতালির হয়ে লিবিয়াই অভিবাসীদের ঠেকাবে; আর এর সাথে মানবাধিকার লংঘনের ইস্যুগুলি থেকেও ইতালি নিজেকে দূরে রাখতে পারবে। ২০০৯ সালে গাদ্দাফিকে ইতালিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়; আর ২০১০ সালে বারলুসকোনিও লিবিয়া সফর করেন।

শরণার্থী সমস্যা ইতালির জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি প্রধান হুমকি। আফ্রিকার শরণার্থী সমস্যা থেকে বাঁচতে ইতালি আফ্রিকার দেশগুলিকে খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি, স্বাস্থ্য এবং নারীর ক্ষমতায়নে সহায়তা দিচ্ছে। ‘ওইসিডি’র হিসেবে ২০১৭ সালে ইতালির দেয়া প্রায় ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বৈদেশিক সাহায্যের মাঝে ৫৬ শতাংশই গিয়েছে শরণার্থী সমস্যা নিরসনে।

কূটনৈতিক অনভিজ্ঞতা

গত ১৩ই জানুয়ারি আঙ্কারায় ইতালির প্রধানমন্ত্রী গুইসেপ কন্টির সাথে লিবিয়া বিষয়ে এক বৈঠকের পর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান বলেন যে, ইতালির সাথে তুরস্ক একত্রে চেষ্টা করছে যাতে লিবিয়ার যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হয়। কন্টি বলেন যে, যুদ্ধবিরতি লিবিয়ায় একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানের সুযোগ তৈরি করবে। এর একদিন আগেই তুরস্ক এবং রাশিয়া একত্রে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলেও পরবর্তীতে খলিফা হাফতার যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে স্বাক্ষর না করেই মস্কো ত্যাগ করেন। লিবিয়া ইস্যুতে তুরস্ক এবং ইতালি উভয়েই ত্রিপোলি-কেন্দ্রিক ‘জিএনএ’এর পক্ষাবলম্বন করছে। তবে ইতালি লিবিয়ার ইস্যুকে ছেড়ে দিতে নারাজ। ১৬ই জানুয়ারি ইতালির প্রধানমন্ত্রী কন্টি লিবিয়ার প্রতিবেশী দেশ আলজেরিয়াতে ছুটে যান লিবিয়ার বিষয়ে কথা বলার জন্যে।

‘ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর প্যান ইউরোপিয়ান ফেলো মাত্তিয়া গিয়ামপাওলো এক লেখায় বলছেন যে, ইতালিয়দের চিন্তায় শরণার্থী সমস্যা এতটাই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে যে, লিবিয়ায় তাদের রাজনৈতিক কর্মকান্ড এর তুলনায় হয়ে গেছে গৌণ। ২০১৮ সালে ওয়াশিংটন সফরের সময়ে কন্টি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে বড় ধরনের কূটনৈতিক সমর্থন পান। ট্রাম্প ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সমস্যাগুলি সমাধানে ইতালিকে প্রধান বন্ধু হিসেবে সম্ভোধন করেন। কিন্তু সেই সময় থেকে লিবিয়াকে নিয়ন্ত্রণে ইতালির পকেটে শুধু ব্যর্থতাই জমা হয়েছে।

ইতালি লিবিয়াতে কেন?

লিবিয়াতে ইতালির স্বার্থ বহুকাল থেকে। উত্তর আফ্রিকার লিবিয়া উপকূলে কার্থেজ সাম্রাজ্যের সাথে রোমের বৈরিতা ছিল। পরবর্তীতে সপ্তম শতাব্দীতে উত্তর আফ্রিকার পুরো উপকূল মুসলিমদের অধীন হয়ে গেলে ইতালির সাথে আফ্রিকার বৈরিতা আরও বৃদ্ধি পায়। বর্তমান রাষ্ট্র ইতালির একত্রীকরণ সম্পন্ন হয় ১৮৭১ সালে। নতুন এই দেশ ইউরোপের বাকি দেশগুলির দেখাদেখি নিজেরাও উপনিবেশ খুঁজতে শুরু করে। এক্ষেত্রে ব্রিটিশ আর ফরাসীদের সাথে সমঝোতা করেই তাদের চলতে হয়েছে। ১৮৮৯ সালে ইতালি পূর্ব আফ্রিকার সোমালিয়া এবং এরিত্রিয়া নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। ১৯১১ সালে লিবিয়া ছিল উসমানি খিলাফতের অধীনে। ইতালিয়রা ইস্তাম্বুলের খলিফার কাছে চরমপত্র দিয়ে লিবিয়া আক্রমণ করে। লিবিয়ার পূর্বে মিশরের দখলে ছিল ব্রিটিশরা; আর পশ্চিমে আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়ার নিয়ন্ত্রণে ছিল ফরাসীরা। তাদের সমর্থনেই ইতালি লিবিয়া আক্রমণ করে। ইতালিয়রা লিবিয়ার উপকূলের এলাকাগুলি সহজে দখলে নিতে পারলেও দেশের ভেতরের এলাকাগুলির নিয়ন্ত্রণ নিতে তাদের কয়েক দশক সময় লেগেছিল। এসময়ের মাঝে ইতালিয়রা নৃশংসভাবে লিবিয়ার জনগণের বিদ্রোহ দমন করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইতালিয়দের হাত থেকে ব্রিটিশ আর ফরাসীরা লিবিয়া দখল করে নেয়। ১৯৫১ সালে বর্তমান লিবিয়ার জন্ম হয়। ১৯৫৯ সালে তেলখনি আবিষ্কারের পর থেকে লিবিয়ার নতুন ইতিহাস লেখা শুরু হয়। ১৯৬৯ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে নেন। ২০১১ সালে পশ্চিমা হস্তক্ষেপে গাদ্দাফি সরকারের পতনের পর লিবিয়া অশান্ত রয়েছে।

২০১১ সালে গাদ্দাফিকে সরিয়ে দেবার পশ্চিমা চেষ্টায় ইতালিও সরাসরি অংশ নেয়। লিবিয়াতে নিজেদের স্বার্থকে সমুন্নত রাখতে ইতালির এখন আর গাদ্দাফিকে দরকার নেই। গাদ্দাফি পরবর্তী গৃহযুদ্ধ কবলিত লিবিয়াতে ইতালি এবং বাকি ইউরোপ তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থকে ছেড়ে দেয়নি। ২০১৮ সালে ইতালির সর্ববৃহৎ তেল কোম্পানি ‘ইএনআই’ লিবিয়ার তেলখনিতে বিনিয়োগ করে; এবং তাদের বিনিয়োগ সুরক্ষায় সেখানকার মিলিশিয়া গ্রুপগুলির সাথে নিরাপত্তা চুক্তি করে। লিবিয়ার তেল সবচাইতে বেশি রপ্তানি হয় ইতালিতে।

ইতালির অর্থনৈতিক দৈন্যদশা

ইতালির অর্থনীতি থেমে আছে। ২০০৭ সালে ইতালির জিডিপি যা ছিল, এখনও তার কাছাকাছিই আছে। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ বলছে যে, ইতালির রাষ্ট্রীয় ঋণ এখন ২ হাজার ২’শ ৪০ বিলিয়ন ডলার; যা পুরো ইতালির জিডিপির চাইতে ৩০ শতাংশ বেশি। খেলাপি ঋণে জর্জরিত ব্যাংকিং সেক্টর; ঋণ দেয়া প্রায় বন্ধ। ইতালির প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সংগঠন ‘কনফিন্ডাসট্রিয়া’র বোর্ড সদস্য পাওলো স্কুডেরি বলছেন যে, ইইউএর নীতির সাথে ইতালির ডানপন্থী সরকারের বিরোধ শুরু হবার পর থেকে ইতালিতে কেউ বিনিয়োগ করতে দুইবার চিন্তা করছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ইতালির অর্থনৈতিক দৈন্যদশাই ক্ষমতায় এনেছে ডানপন্থীদের। ইতালির উত্তরাঞ্চলের শিল্পাঞ্চলগুলির চাইতে দক্ষিণাঞ্চলে কম আয়ের এলাকাগুলিতে বেকারত্বের হার সবচাইতে বেশি; যেখানে ডানপন্থীরা শরণার্থী ঠেকানো এবং কর কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট পাচ্ছে। দক্ষিণের মানুষ চাকুরি হারিয়ে উত্তরের শিল্পাঞ্চলগুলিতে পাড়ি জমাচ্ছে। যথেষ্ট আয়ের অভাবে অনেক মধ্যবয়সীদের পরিবার নেই। ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’ বলছে যে, ২০১৪ সালের পর থেকে ইতালির যুবকদের মাঝে বেকারত্বের হার কমছে। ৪০ শতাংশের অধিক বেকার থেকে তা এখন ৩৩ শতাংশের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছে। অর্থাৎ প্রতি তিনজন যুবকের মাঝে একজন বেকার। গ্রীসের পর ইইউএর মাঝে এটা সর্বোচ্চ বেকারত্বের হার। এমতাবস্থায় দক্ষিণে লিবিয়া থেকে শরণার্থীর জোয়ার ইতালির জন্যে বিরাট দুঃসংবাদই বটে।

ইতালির দিকে হাত বাড়িয়েছে তুরস্কের কৌশলগত বন্ধু কাতার। লিবিয়াতে তুরস্কের পাশে কাতারেরও সমর্থন রয়েছে; আবার কাতারের নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছে তুরস্কের সেনারা। ইতালি তার অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে কাতারের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করতে চাইছে। ২০শে জানুয়ারি কাতার সফরে গিয়েছেন ইতালির প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাত্তারেলা। কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সাথে সাক্ষাৎ করেছেন তিনি। এর আগে ২০১৬ এবং ২০১৮ সালে ইতালি সফর করেন শেখ তামিম। আর ২০১৮ সালের এপ্রিলে কাতার সফর করেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী কন্টি। কাতারের নৌবাহিনীর জন্যে ৫ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের ৭টা যুদ্ধজাহাজ তৈরির ক্রয়াদেশ পেয়েছে ইতালি। কাতারে কাজ করছে প্রায় আড়াই’শ ইতালিয় কোম্পানি। অন্যদিকে ইতালির এড্রিয়াটিক সাগরের তীরে তৈরি করা টার্মিনালে কাতার থেকে আমদানি করা এলএনজি অবতরণ করছে। ইতালির ১০ শতাংশ গ্যাসের চাহিদা কাতার পূরণ করছে। ইতালিতে কাতারের বড় বিনিয়োগ রয়েছে আবাসন, হোটেল এবং এভিয়েশন খাতে; যেখানে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। মোটকথা লিবিয়ার সংঘাতে ইতালি, কাতার এবং তুরস্কের এক পক্ষে থাকার একাধিক কারণ রয়েছে।

শান্তি প্রচেষ্টার ভবিষ্যৎ কি?

১৯শে জানুয়ারি বার্লিনে লিবিয়ায় শান্তির বিষয়ে একটা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শুধু শক্তিশালী দেশগুলিই কথা বলেছে; ‘জিএনএ’ এবং ‘এলএনএ’ চুপ থেকেছে। আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’এর জেষ্ঠ্য বিশ্লেষক ক্লাউডিয়া গাজিনি বলছেন যে, বার্লিন কনফারেন্স দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ইউরোপিয়রা আঞ্চলিক শক্তিগুলির সাথে কথা বলে উত্তেজনা প্রশমণে ইচ্ছুক। কিন্তু এই ইচ্ছা কি উত্তেজনা প্রশমণে যথেষ্ট কিনা, তা অনিশ্চিত। ‘ইউরোপিয়ান কাউন্সিন অন ফরেন রিলেনশন্স’এর পলিসি ফেলো তারেক মাগেরিসি ‘আল জাজিরার’কে বলেন যে, এই আলোচনায় বোঝা যাবে যে, হাফতারকে যারা সমর্থন দিচ্ছেন, তারা হাফতারের উপর চাপ সৃষ্টি করার ব্যাপারে কতটা সততা রাখেন।

হাফতার মস্কো থেকে ফেরত এসেছেন যুদ্ধবিরতির চুক্তি না করেই। হাফতার এই আলোচনায় অংশ নেবার আগেই লিবিয়ার তেলখনির উৎপাদন প্রায় বন্ধ করে এসেছেন। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ বলছে যে, হাফতারের লোকেরা লিবিয়ার ব্রেগা, রাস লানুফ, হারিগা, জুয়াইতিনা এবং সিদ্রা বন্দরে তেল রপ্তানি করে দিয়েছে। লিবিয়ার তেল উৎপাদন এখন দৈনিক ১২ লাখ ব্যারেল থেকে নেমে মাত্র ৭২ হাজার ব্যারেলে এসে ঠেকেছে। এতে হাফতার তার শক্তিশালী অবস্থানকেই জানান দিয়েছেন। এই তেল বিক্রির অর্থ যাচ্ছে লিবিয়ার ‘ন্যাশনাল অয়েল কর্পোরেশন’ বা ‘এনওসি’এর কাছে, যা কিনা ত্রিপোলির অধীনে। অথচ তেলখনিগুলির নিয়ন্ত্রণ এখন হাফতারের কাছে! তেল বিক্রি বন্ধ করে হাফতার একইসাথে ত্রিপোলির ‘জিএনএ’ সরকারের উপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে এবং লিবিয়ার তেলের উপর নির্ভরশীল দেশগুলির উপর চাপ সৃষ্টি করছে, যাতে তারা ‘জিএনএ’কে সমর্থন দেয়া বন্ধ করে দেয়। চাপে পরা দেশগুলির শুরুতেই নাম আসবে ইতালির।

২০১৫ সাল থেকে ইউরোপিয়রা ‘অপারেশন সোফিয়া’ নামের একটা মিশনে লিবিয়ার উপকূল পাহাড়া দিতো। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ভূমধ্যসাগরে শরণার্থীদের পানিতে ডোবা থেকে বাঁচানো। কিন্তু ২০১৯ সালের মার্চে ইতালির প্রতিবাদে এই মিশন বন্ধ হয়ে যায়। ইতালি শরণার্থীদের দায়িত্ব নিতে নারাজ ছিল; তাদের কথা ছিল যে, শরণার্থীরা জাহাজ থেকে যেই দেশেই অবতরণ করুক না কেন, সেটা ইতালি হবে না। বার্লিন কনফারেন্সের পর ‘অপারেশন সোফিয়া’ আবারও শুরু করার কথা হচ্ছে। বলা হচ্ছে যে, এই মিশন লিবিয়ার উপকূলে অস্ত্রের চালানও আটকাবে। তবে এবারেও ইতালির অবস্থান হবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মিশনের মূল লজিস্টিক্যাল সাপোর্ট আসবে ইতালি থেকেই। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই অপারেশন চালিত হবে শুধুই সমুদ্রে; লিবিয়ার স্থলসীমানাগুলিতে নয়। অর্থাৎ স্থলসীমানা দিয়ে লিবিয়াতে অস্ত্র ঢোকার পথ খোলাই থাকছে। লিবিয়ার বেশিরভাগ স্থলসীমানা এখন হাফতারের নিয়ন্ত্রণে। 

২০শে জানুয়ারি কাতার সফরে গিয়েছেন ইতালির প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাত্তারেলা। কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সাথে সাক্ষাৎ করেছেন তিনি। ইতালির দিকে হাত বাড়িয়েছে তুরস্কের কৌশলগত বন্ধু কাতার। লিবিয়াতে তুরস্কের পাশে কাতারেরও সমর্থন রয়েছে; আবার কাতারের নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছে তুরস্কের সেনারা। ইতালি তার অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে কাতারের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করতে চাইছে। মোটকথা লিবিয়ার সংঘাতে ইতালি, কাতার এবং তুরস্কের এক পক্ষে থাকার একাধিক কারণ রয়েছে।


ইতালি আর কি করতে পারে?

পৃথিবীর ৮ম বৃহত্তম অর্থনীতি হয়েও ইতালি তার অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে রাজনৈতিক প্রভাবে রূপ দিতে পারেনি। ৮ম বৃহত্তম দাতা দেশ হয়েও ইতালি আফ্রিকার রাজনীতিতে ফ্রান্স বা ব্রিটেনের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ নয়। সবচাইতে শক্তিশালী ১০টা নৌবহরের একটা থাকার পরেও ভূমধ্যসাগরই ইতালির নিয়ন্ত্রণে নেই; অন্যান্য সাগর নিয়ে কথা বলা অমূলক। সেরা ১০টা অস্ত্র রপ্তানিকারক রাষ্ট্রের মাঝে থেকেও ইতালির ভূরাজনৈতিক প্রভাব নগন্য। ১৮৭১ সালে একত্রীকরণের পর থেকে ইতালি কখনোই ইউরোপের অন্যান্য শক্তিশালী রাষ্ট্রের সাথে পেরে ওঠেনি; ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও রাশিয়ার কাছে ইতালি ‘লিটল ব্রাদার’ থেকেছে সর্বদাই। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ফ্রান্সের পিছনেই থাকতে হয়েছে ইতালিকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেন এবং ফ্রান্স আফ্রিকাতে তাদের প্রাক্তন উপনিবেশগুলিতে প্রভাব ধরে রাখতে সচেষ্ট হলেও বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির পক্ষাবলম্বন করায় ইতালি সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। লিবিয়াও সেভাবেই ইতালির হাতছাড়া হয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে।

লিবিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি বেশ জটিল। তবে বার্লিন কনফারেন্স আবারও দেখিয়ে দিল যে, এই সংঘাতে শক্তিশালী দেশগুলির লক্ষ্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আর যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ দ্বারা প্রশিক্ষিত জেনারেল হাফতার মস্কো থেকে যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষর না করে চলে আসায় সকলেই হাফতারের লক্ষ্য নিয়ে কথা বলছেন। তুরস্ক এবং রাশিয়ার লিবিয়াতে জড়ানো নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও তারা যে এই যুদ্ধ বন্ধ করতে যথেষ্ট ক্ষমতা রাখে না, তা এখন নিশ্চিত। ইতালি বুঝতে পারছে যে, হাফতারকে সমর্থন দেয়া ফ্রান্সের সাথে সমঝোতা করে ইইউএর ছাতার নিচে কাজ করা কঠিন হবে।

লিবিয়া ইতালির ভৌগোলিক বাস্তবতা। ভূমধ্যসাগরে শরণার্থীবাহী নৌকাগুলিকে তারা ইতালির ভূখন্ডের চারিদিকে অবরোধের মতো দেখছে। আর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে উতপন্ন হওয়া শরণার্থী সমস্যা ইতালির নিয়ন্ত্রণে নয়। আফ্রিকা থেকে আসা শরণার্থীরা ইতালির জন্যে জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যু। তাই নিজের নিরাপত্তার জন্যেই লিবিয়ার সরকারকে নিজের পক্ষে রাখতে চাইবে ইতালি। কিন্তু হাফতারের হাতে ত্রিপোলির পতন হলে হাফতার কি ইতালিকে বন্ধু হিসেবে নেবে? বিশেষ করে এতোদিন ধরে ‘জিএনএ’কে সমর্থন দেবার পর হাফতার ইতালিকে কতটা বিশ্বাস করতে পারবেন? একইসাথে লিবিয়ার তেলের সরবরাহ ইতালির জন্যে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। আর তেলখনিগুলি হাফতারের নিয়ন্ত্রণে থাকলে ইতালিই সবচাইতে বেশি বিচলিত হবে। এই মুহুর্তে ‘জিএনএ’ সরকারকে সমর্থন করে যাওয়া ছাড়া ইতালির হাতে কোন অপশন নেই। ১৯১১ সালে ইস্তাম্বুলের হাত থেকে লিবিয়া ছিনিয়ে নিলেও শতবর্ষ পরে ‘জিএনএ’এর সমর্থক হিসেবে ইতালি শুধুমাত্র তুরস্ককেই তার পাশে দেখতে পাচ্ছে।