Showing posts with label Libya. Show all posts
Showing posts with label Libya. Show all posts

Friday, 10 July 2020

ফ্রান্স কেন ১৭০ বছর পর আলজেরিয়ার বিদ্রোহীদের মস্তক ফেরত দিলো?

১০ই জুলাই ২০২০

ফ্রান্স আলজেরিয়াকে আর যা-ই হোক, তুরস্কের পক্ষে দেখতে চাইছে না। এই ব্যাপারটাই ফ্রান্সের সাথে দরকষাকষিতে আলজেরিয়াকে শক্তিশালী করেছে। অপরদিকে আলজেরিয়া তুরস্ককে সরাসরি সমর্থন না দিলেও নিজের অবস্থানকে জানান দিতে তার সীমানার বাইরে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করলে তা উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকায় ফ্রান্সের অবস্থানকে হুমকির মাঝে ফেলবে। ফ্রান্সের ক্ষমা চাওয়ার ব্যাপারটা তখন লোক দেখানোই মনে হতে পারে।

গত ৩রা জুলাই ফ্রান্স আলজেরিয়ায় ঔপনিবেশিক সময়ে হত্যা করা ২৪ জন বিদ্রোহীর মস্তক ফেরত দিয়েছে। ১৮৩০ সাল থেকে ১৯৬২ সালের মাঝে ফরাসীরা ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ব্যক্তিদের হত্যা করে তাদের মস্তক ফ্রান্সে নিয়ে যায় এবং সেগুলিকে প্যারিসের ‘ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রি’তে সাজিয়ে রাখে। আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আব্দেলমাজিদ তেবুনে এক ভাষণে বলেন যে, ১৭০ বছর ধরে এই বিদ্রোহীদেরকে কবর পাওয়া থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। পরদিন ৪ঠা জুলাই ‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’এর সাথে এক সাক্ষাতে তেবুনে বলেন যে, ঔপনিবেশিক সময়ের অপরাধের জন্যে আলজেরিয়ার কাছে ফ্রান্সের পুরো ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিৎ; এখন পর্যন্ত অর্ধেকের মতো ক্ষমা প্রার্থনা পাওয়া গিয়েছে। তিনি বলেন যে, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ বর্তমান অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে আরও অগ্রগামী হতে পারেন। কিন্তু এতো বছর পরে কেন ঔপনিবেশিক সময়ের অত্যাচারের কাহিনীগুলি গুরুত্ব পাচ্ছে? ‘সিএনএন’ বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের হত্যার পর পশ্চিমা দেশগুলিতে ঔপনিবেশিক সময়ের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। এতকাল পর ফ্রান্সের এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সাথে এই আন্দোলনের সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে ‘সিএনএন’এর বিশ্লেষণের বাইরেও আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণ পাওয়া যাবে উত্তর এবং পশ্চিম আফ্রিকার সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন থেকে। এর মাঝে আলজেরিয়ায় সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন উল্লেখযোগ্য।

গত বছরের ২৩শে ডিসেম্বর আলজেরিয়ার সেনাপ্রধান জেনারেল আহমেদ গাইদ সালাহ ৭৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। অনেকেই মনে করেন যে, গত দুই দশক ধরে প্রেসিডেন্ট আব্দেলআজিজ বুতাফ্লিকার হাতে দেশের ক্ষমতা থাকার পিছনে জেনারেল গাইদ সালাহর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ২০০৪ সালে বুতাফ্লিকা তাকে সেনাপ্রধান নিয়োগ করেন। ২০১৩ সালে তিনি উপ প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিযুক্ত হন। ‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, গত বছরের এপ্রিল মাসে বুতাফ্লিকা ক্ষমতা ছেড়ে দিলেও আন্দোলনকারীরা ক্ষমতায় থাকা সকলের পদত্যাগ দাবি করছিল। কারণ বুতাফ্লিকা ক্ষমতাচ্যুত হবার পর আলজেরিয়ার নিয়ন্ত্রণ মূলতঃ জেনারেল গাইদ সালাহর হাতেই ছিল। সালাহ ১৭ বছর বয়সে আলজেরিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দিয়ে ফরাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। ১৯৫৪ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেয়া নেতৃবৃন্দের হাতেই আলজেরিয়ার ক্ষমতা ছিল এতকাল। বুতাফ্লিকা এবং গাইদ সালাহ ছিলেন সেই জেনারেশনের শেষ নেতৃবৃন্দ। সালাহর মৃত্যুর মাত্র চারদিন আগে বুতাফ্লিকার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী আব্দেলমাজিদ তেবুনে আলজেরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আরোহন করেন। সালাহর স্থলাভিষিক্ত হন ৭৪ বছর বয়সী জেনারেল সাঈদ চেংরিহা। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে সেনাবাহিনীর কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। তেবুনে এবং চেংরিহা উভয়েই আলজেরিয়ার এতকালের ক্ষমতাধর নেতৃত্বের অংশ হলেও তাদের অধীনে দেশটার রাষ্ট্রীয় নীতিতে বেশকিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্টের অফিসের এক বার্তায় বলা হয় যে, গত ২৬শে ডিসেম্বর দেশটার শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত হয় যে, বিশ্বে আলজেরিয়ার অবস্থানকে পুনর্জাগরিত করতে লিবিয়া, মালি, সাহারা মরুভূমির সাহেল অঞ্চল এবং আফ্রিকাতে আলজেরিয়ার ভূমিকাকে পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। গত পহেলা জুন আলজেরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রেসিডেন্ট তেবুনের পরিদর্শনের সময় জেনারেল চেংরিহা তার ভাষণে বলেন যে, আলজেরিয়ার সংবিধান পরিবর্তনের যে প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে, সেটাকে সেনাবাহিনী যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি নতুন সংবিধানে আলজেরিয়ার সীমানার বাইরে সেনাবাহিনীর অংশ নেয়ার ব্যাপারটাকে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। লন্ডনকেন্দ্রিক মিডিয়া ‘মিডলইস্ট মনিটর’ বলছে যে, আলজেরিয়ার সংবিধান পরিবর্তনের পিছনে সেনাবাহিনীর সমর্থন দেশটার সামরিক বাহিনীর চিন্তায় ব্যাপক পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে। ‘দ্যা এরাব উইকলি’র এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, সংবিধানের নতুন পরিবর্তনে আলজেরিয়ার নিরাপত্তা চিন্তাকেই পরিবর্তন করে ফেলা হচ্ছে। নিজ সীমানার ভেতর থেকেই বাইরের হুমকি মোকাবিলা করার এতকালের চিন্তাটাকে এখন পরিবর্তন করা হচ্ছে। অর্থাৎ নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আলজেরিয়া এখন তার পূর্বে অবস্থিত লিবিয়া এবং দক্ষিণের মালিতে সহিংসতাকে নিষ্ক্রিয় অবস্থান থেকে না-ও দেখতে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হচ্ছে যে, একারণেই সংবিধান পরিবর্তনে আলজেরিয়ার সেনাবাহিনীর সমর্থন শক্তিশালী দেশগুলির কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে।

৬ই জানুয়ারি লিবিয়ার ত্রিপোলি-কেন্দ্রিক ‘গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল একর্ড’ বা ‘জিএনএ’এর প্রধানমন্ত্রী ফায়েজ আল-সারাজ এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু আলজেরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এই সাক্ষাতের পরপরই তুরস্ক লিবিয়াতে সামরিক হস্তক্ষেপ করে সেখানকার যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ফ্রান্স লিবিয়াতে জেনারেল হাফতারের অধীনে ‘লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’ বা ‘এলএনএ’কে সমর্থন দিচ্ছে; এবং তারা লিবিয়াতে তুরস্কের সামরিক হস্তক্ষেপের যারপরনাই বিরোধী। ফ্রান্স এবং তুরস্ক উভয় পক্ষই লিবিয়ার যুদ্ধে আলজেরিয়ার সমর্থন চাইছে। উত্তর এবং পশ্চিম আফ্রিকায় আলজেরিয়ার রয়েছে সবচাইতে শক্তিধর সামরিক বাহিনী। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে আলজেরিয়ার শাসকরা আলজেরিয়ার সীমানার বাইরে প্রভাব বিস্তারকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। ইউরোপ, বিশেষ করে ফ্রান্সের সাথে বড় ধরণের বাণিজ্য সম্পর্ককে ঝুঁকিতে ফেলতে চাননি তারা। বুতাফ্লিকা এবং জেনারেল গাইদ সালাহর প্রস্থানের পর অনেক কিছুই নতুন করে হিসেব কষতে হচ্ছে। লিবিয়াতে তুরস্কের অবস্থান শক্ত হতে শুরু করায় ফ্রান্স শুধু উত্তর আফ্রিকা নয়, ভূমধ্যসাগরেও তার প্রভাবকে হুমকির মুখে দেখতে পাচ্ছে। ‘মিডলইস্ট মনিটর’এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, তিউনিসিয়ার পার্লামেন্টে ফ্রান্সের কাছ থেকে ঔপনিবেশিক অত্যাচারের জন্যে ক্ষমা চাইবার আইন পাস করা না গেলেও আলজেরিয়া কিন্তু সেই পথে হাঁটছে না। আলজেরিয়ার দক্ষিণে মালিতে ফ্রান্স সাত বছর ধরে এক ‘শেষ না হওয়া’ যুদ্ধে আটকে রয়েছে। এমতাবস্থায় এই অঞ্চলে নতুন শক্তি হিসেবে আলজেরিয়ার আবির্ভাব ফ্রান্সকে বিচলিত করেছে। ফ্রান্স আলজেরিয়াকে আর যা-ই হোক, তুরস্কের পক্ষে দেখতে চাইছে না। এই ব্যাপারটাই ফ্রান্সের সাথে দরকষাকষিতে আলজেরিয়াকে শক্তিশালী করেছে। অপরদিকে আলজেরিয়া তুরস্ককে সরাসরি সমর্থন না দিলেও নিজের অবস্থানকে জানান দিতে তার সীমানার বাইরে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করলে তা উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকায় ফ্রান্সের অবস্থানকে হুমকির মাঝে ফেলবে। ফ্রান্সের ক্ষমা চাওয়ার ব্যাপারটা তখন লোক দেখানোই মনে হতে পারে।

Wednesday, 24 June 2020

তিউনিসিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফ্রান্স ও তুরস্কের মাঝে চলছে প্রতিযোগিতা

২৪শে জুন ২০২০

ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর সাথে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদ। দুই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলোচনা এমন সময়ে এলো, যখন তিউনিসিয়ার প্রতিবেশী দেশ লিবিয়ার যুদ্ধে তুরস্কের হস্তক্ষেপের পর যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেছে। লিবিয়াতে কোণঠাসা হয়ে যাবার পর ফ্রান্স লিবিয়ার প্রতিবেশী তিউনিসিয়াতে তার দুর্বল হয়ে যাওয়া অবস্থানকে আরও দৃঢ় করতে চাইছে।


ফ্রান্স লিবিয়ার যুদ্ধে তিউনিসিয়ার সমর্থন চাইছে

গত ২২শে জুন ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ করোনাভাইরাস মোকাবিলায় তিউনিসিয়ার জন্যে সাড়ে ৩’শ মিলিয়ন ইউরো সহায়তার ঘোষণা দেন। ইলাইসি প্যালেসে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদের সাথে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় ম্যাক্রঁ বলেন যে, তিউনিসিয়ার স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়া, সেদেশে হাসপাতাল তৈরি এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পুনরায় শুরু করার লক্ষ্যে সহায়তা দেবে ফ্রান্স। তিনি আরও বলেন যে, এই অর্থ ২০২২ সাল পর্যন্ত তিউনিসার স্বাস্থ্যখাত এবং যুব উন্নয়নের জন্যে ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ইউরো বরাদ্দের অংশ। দুই দেশ আঞ্চলিক ইস্যু নিয়েও কথা বলেছে। ম্যাক্রঁ বলেন যে, ফ্রান্স এবং তিউনিসিয়া একত্রে দাবি করছে যে, লিবিয়াতে যুদ্ধরত পক্ষগুলি যেন আলোচনার টেবিলে বসে সকলের জন্যে নিরাপত্তা এবং লিবিয়ার সংস্থাগুলির পুনএকত্রীকরণ নিশ্চিত করে। ফরাসী প্রেসিডেন্ট লিবিয়াতে বিদেশী হস্তক্ষেপ বন্ধের আহ্বান জানান। একইসাথে ম্যাক্রঁ লিবিয়াতে তুরস্কের ভূমিকাকে ‘বিপজ্জনক খেলা’ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন যে, এটা ঐ অঞ্চল এবং ইউরোপের জন্যে সরাসরি হুমকিস্বরূপ। তিনি বলেন যে, একই কথাগুলি ঐদিনই তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন করে বলেছেন। অপরদিকে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদ বলেন যে, তার দেশ ফ্রান্সের সাথে অতীতের ক্ষতচিহ্ন ভুলে গিয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে চাইছে। তিনি তিউনিসিয়ার উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত একটা রেলওয়ে লাইন তৈরির চিন্তায় ফ্রান্সের সহায়তা দেয়াকে স্বাগত জানান। দুই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলোচনা এমন সময়ে এলো, যখন তিউনিসিয়ার প্রতিবেশী দেশ লিবিয়ার যুদ্ধে তুরস্কের হস্তক্ষেপের পর যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে তিউনিসিয়ার সাথে ফ্রান্সের সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টার ব্যাপক ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।

লন্ডন থেকে প্রকাশিত পত্রিকা ‘আল এরাব উইকলি’র এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, লিবিয়াতে কোণঠাসা হয়ে যাবার পর ফ্রান্স লিবিয়ার প্রতিবেশী তিউনিসিয়াতে তার দুর্বল হয়ে যাওয়া অবস্থানকে আরও দৃঢ় করতে চাইছে। কিছুদিন ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মন্তব্য করেন যে, লিবিয়াতে আরেকটা সিরিয়া তৈরি হতে চলেছে; যা খুবই দুশ্চিন্তার ব্যাপার। ২৬শে মে তিউনিসিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইমেদ হাজগুই ফ্রান্সের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফ্লোরেন্স পার্লির সাথে ফোনে লিবিয়া নিয়ে কথা বলেন। তারা লিবিয়ায় বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপের ব্যাপারে একমত পোষণ করেন এবং লিবিয়ার সমস্যা লিবিয়ার মানুষদের মাঝেই সমাধান হওয়া উচিৎ বলে বলেন। দুই দেশের মাঝে সামরিক সহযোগিতা আরও বাড়ানো যায় কিভাবে, তা নিয়েও তারা আলোচনা করেন।

২০১৮ সালের নভেম্বরে তিউনিসিয়ার নৌবাহিনীর ৪র্থ অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল ‘সফোনিসবে’ ডেলিভারি দেয়া হয়। এই জাহাজগুলি তিউনিসিয়াকে ভূমধ্যসাগরে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। তিউনিসিয়ার সামরিক বাহিনীকে যুক্তরাষ্ট্র গড়ে দিলেও ২০১৬ সাল থেকে তিউনিসিয়া নিজস্ব নৌবাহিনী গঠন করা শুরু করে। তিউনিসিয়ার জনগণের সাথে সামরিক বাহিনীর সম্পর্ক বেশ মধুর। সামরিক বাহিনীর শক্তিশালী হওয়ার পিছনে জনগণের সমর্থন রয়েছে; কিন্তু রাজনীতিবিদদের মাঝে এব্যাপারে রয়েছে বিরোধ।


তিউনিসিয়ার সামরিক বাহিনী গড়ে দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক

ঐতিহাসিকভাবে তিউনিসিয়ার সাথে ফ্রান্সের সম্পর্ক বেশি গভীর থাকলেও সামরিক বাহিনীর ক্ষেত্রে বেশকিছু পরিবর্তন এসেছে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’ তিউনিসিয়া নিয়ে বেশ কয়েকটা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তারা বলছে যে, একনায়ক বেন আলি তিউনিসিয়ার সামরিক বাহিনীকে ছোট করে রেখেছিলেন, যাতে সামরিক বাহিনী দেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। তিউনিসিয়ার নিয়ন্ত্রণ ছিল মূলতঃ ন্যাশনাল গার্ডের হাতে, যা কিনা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালের অধীন, এবং যার মূল কাজ ছিল দেশের উপর শাসকের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। ব্যাপারটা পরিবর্তন হয়ে যায় ২০১১ সালে বেন আলির পতনের পর। যুক্তরাষ্ট্র তিউনিসিয়া নিয়ে চিন্তিত ছিল যে, ছোট হলেও তিউনিসিয়া থেকেই সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ ইরাক ও সিরিয়াতে বিভিন্ন জিহাদি গ্রুপে যোগ দিয়েছে। এছাড়াও তিউনিসিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভেদ এবং অস্থিরতা মানুষকে গণতন্ত্রবিমুখ করে ফেলেছে। উদাহরণস্বরূপ, তিউনিসিয়ার বর্তমান সরকারে ৬টা রাজনৈতিক দল থেকে ১৫ জন এমপি এবং আরও ১৭ জন স্বতন্ত্র এমপি মন্ত্রীত্ব পেয়েছেন। কোন দলই প্রতিশ্রুতি দিয়ে কথা রাখেনি; তাই কোন দলই বেশি সংখ্যক আসন পাচ্ছে না। ২০১৪ সালে ‘পিউ রিসার্চ’এর এক জরিপ বলছে যে, মাত্র ৪৮ শতাংশ তিউনিসিয়ান গণতন্ত্রকে সমর্থন করছে। ৫১ শতাংশ মানুষ মনে করছে যে গণতান্ত্রিক সময়ের চাইতে একনায়কের সময়েই দেশের অবস্থা ভালো ছিল। মুসলিম ব্রাদারহুডপন্থী ‘এননাহদা পার্টি’র সমর্থন দুই বছরের মাঝে ৬৫ শতাংশ থেকে ৩১ শতাংশে নেমে আসে। ৮৩ শতাংশ তিউনিসিয়ান মনে করে যে, দেশের রাজনীতিতে ইসলামের আদর্শগুলি বাস্তবায়িত থাকা উচিৎ; যাদের মাঝে ৩০ শতাংশ মনে করে যে, ইসলামকে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা উচিৎ। কিন্তু সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সামরিক বাহিনীর ব্যাপারে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। ৯৫ শতাংশ মানুষ সামরিক বাহিনীর প্রশংসা করে; যেখানে মিডিয়ার পক্ষে বলে ৬২ শতাংশ মানুষ; আদালতের পক্ষে ৪৪ শতাংশ; আর ধর্মীয় নেতাদের পক্ষে মাত্র ৩৩ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র এই ব্যাপারগুলিকে পুঁজি করেই তিউনিসিয়ার সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দেয়া শুরু করে এবং তাদের সাথে মহড়া এবং অপারেশনে অংশ নিয়ে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে থাকে।

লিবিয়া থেকে আসা জিহাদী গ্রুপগুলির সাথে তিউনিসিয়ার সেনাদের ব্যাপক সংঘর্ষে নিয়মিত প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে থাকে। মার্কিন সেনারাও সেখানে সরাসরি জড়িত থাকলেও তা পত্রিকার খবরে আসতে দেয়া হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসন হোয়াইট হাউজে আসার পর থেকে তিউনিসিয়ার জন্যে সামরিক সহায়তা কমে গেলেও তিউনিসিয়া নিজের নিরাপত্তায় বিনিয়োগ করতে থাকে। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে অংশ নিতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র মার্কিনীরা তিউনিসিয়াকে সরবরাহ করেছে। এর মাঝে রয়েছে ৮০টারও বেশি হেলিকপ্টার; যার মাঝে ২৪টা ‘ওএইচ-৫৮ডি কিওওয়া ওয়ারিয়র’, ৮টা ‘ইউএইচ-৬০এম ব্ল্যাক হক’, ৩৬টা ‘ইউএইচ-১’ রয়েছে। এছাড়াও ৯টা ‘সি-১৩০’ পরিবহণ বিমান দেয়া হয় তিউনিসিয়াকে; যার মাঝে ২০১৪ সালে দেয়া হয় সর্বশেষ মডেলের ‘সি-১৩০জে সুপার হারকিউলিস’। এবছরের এপ্রিল মাসে একটা ‘সি-১৩০জে’ বিমান করোনাভাইরাস মোকাবিলায় ২২ হাজার কিঃমিঃ উড়ে চীন থেকে মেডিক্যাল সাপ্লাই নিয়ে আসে। এই ফ্লাইটের মাঝে বিমানটা দু’বার কাজাখস্তানে রিফুয়েলিং করে। নিরাপত্তা বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘ওয়ার অন দ্যা রকস’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, করোনাভাইরাস মোকাবিলায় তিউনিসিয়ার রাস্তায় সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়; যা কিনা দেশের মানুষ ভালোভাবে দেখেছে। অন্যদিকে মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’ বলছে যে, তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক দলগুলি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্যে প্রতিযোগিতা করছে। একদিকে ‘নিদা তিউনেস’ এবং ‘এননাহদা পার্টি’ সামরিক বাহিনীর উপর তাদের প্রভাব বাড়াতে চাইছে; অন্যদিকে বিরোধীরা চাইছে এতে বাধা দিতে।

মার্কিনীরা তিউনিসিয়ার উপকূল সন্ত্রাসীমুক্ত রাখতে তিউনিসিয়ার নৌবাহিনীকে কমপক্ষে ২২টা ছোট বোট দেয়। তবে ২০১৬ সাল থেকে তিউনিসিয়া নিজস্ব নৌবাহিনী গঠন করা শুরু করে। প্রথমবারের মতো নেদারল্যান্ডসের ‘ডামেন’ শিপইয়ার্ড থেকে অত্যাধুনিক চারটা অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল অর্ডার করে তারা। ৭২ মিটার লম্বা এবং প্রায় ১৩’শ টনের হেলিকপ্টার ও ড্রোন বহনে সক্ষম এই জাহাজগুলি তিউনিসিয়াকে ভূমধ্যসাগরে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ২০১৮ সালের মাঝেই ‘ডামেন’ চারটা জাহাজই ডেলিভারি দিয়ে দেয়। এর আগ পর্যন্ত তিউনিসিয়ার ফরাসী ও জার্মান নির্মিত পুরোনো ফাস্ট এটাক ক্রাফটগুলি শুধুমাত্র তিউনিসিয়ার উপকূলের কাছাকাছি অঞ্চল পাহাড়া দিতে সক্ষম ছিল। শুধু তাই নয়, তিউনিসিয়া নিজেরাই ৩টা ছোট আকৃতির ২৬ মিটার লম্বা প্যাট্রোল বোট তৈরি করে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা জানান দেয়।

সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র এবং তুরস্ক তিউনিসিয়ার সাথে সামরিক সম্পর্ক গভীর করেছে। ২০১৪ সালে তিউনিসিয়ার সেনাবাহিনী তুরস্ক থেকে ১’শটা ‘কিরপি’ আর্মার্ড ভেহিকল অর্ডার করে। ২০১৬ সাল থেকে এর ডেলিভারি শুরু হয়। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের তিউনিসিয়া সফরের সময়ে দুই দেশের মাঝে কয়েকটা সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মাঝে আগের ৩’শ মিলিয়ন ডলার সহায়তার সাথে আরও ৩’শ মিলিয়ন ডলার সহায়তার আশ্বাস দেয়া হয়। তুরস্ক তিউনিসিয়ার সেনাবাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। ২০১১ সাল থেকে ২০১৭ সালের মাঝে তুরস্ক তিউনিসিয়াকে ২’শ মিলিয়ন ডলারের নিরাপত্তা সহায়তা দেয়।

গত মার্চেই ‘ডিফেন্স নিউজ’ জানায় যে, তুরস্কের প্রতিরক্ষা কোম্পানি ‘টিএআই’ তিউনিসিয়ার কাছে ২’শ ৪০ মিলিয়ন ডলারে ৬টা ‘আনকা-এস’ সার্ভেইল্যান্স ড্রোন এবং তিনটা কন্ট্রোল স্টেশন বিক্রির ক্রয়াদেশ নিশ্চিত করেছে। তুর্কি কর্মকর্তারা বলছেন যে, তারা এই ক্রয়াদেশের জন্যে এক বছরের বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করছিলেন। আর তারা তিউনিসিয়ার কাছে অস্ত্র বহণকারী ড্রোন বিক্রি করার চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছেন। ‘আনকা-এস’ ড্রোনের বৈশিষ্ট্য হলো এটা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়; যার ফলশ্রুতিতে এই ড্রোন নিয়ন্ত্রক স্টেশন থেকে বেশ দূরে গিয়েও কাজ করতে সক্ষম। অর্থাৎ এই ড্রোনগুলি তিউনিসিয়ার উপকূলের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলির উপর নজরদারি করতে সক্ষম হবে।

তিউনিসিয়ার মুসলিম ব্রাদারহুডপন্থী ‘এননাহদা পার্ট’র প্রধান রাচেদ ঘানুচির সাথে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান। আঙ্কারার সাথে ‘এননাহদা পার্টি’র সম্পর্ক যে বাস্তবতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তা জুন মাসে পার্লামেন্টে ফ্রান্সের কাছ থেকে ঔপনিবেশিক সময়ের অপরাধের ক্ষমা চাওয়ার বিলে ‘এননাহদা’র সমর্থন না দেয়াই প্রমাণ করে।



লিবিয়ার যুদ্ধে তুরস্কের আবির্ভাব তিউনিসিয়ার রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে

লিবিয়াতে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের ঠিক আগেআগে গত বছরের ডিসেম্বরের শেষে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান হঠাত করেই তিউনিসিয়ার রাজধানীতে আবির্ভূত হন। এরদোগানের সাথে বৈঠকের পর তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট সাইয়েদ সাংবাদিকদের বলেন যে, লিবিয়ার সাথে তুরস্কের সমুদ্রসীমা নিয়ে যে চুক্তি হয়েছে, তা ঐ দুই দেশের ব্যাপার এবং তাতে তিউসিয়ার কিছু বলার নেই। অপরদিকে এরদোগান বলেন যে, লিবিয়ার ব্যাপারে আলোচনায় আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া এবং কাতারকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিৎ ছিল, কারণ এই দেশগুলি লিবিয়া সমাজ এবং রাজনৈতিক কাঠামোকে ভালোভাবে বোঝে। এরদোগানের এই সফরের পর তুরস্ক শুধু কথায় নয়, কার্যত তিউনিসিয়াকে লিবিয়ার ব্যাপারে জড়িত হতে বাধ্য করেছে। ‘রয়টার্স’ খবর দিচ্ছে যে, গত ৮ই মে তুরস্কের একটা পরিবহণ বিমান ত্রিপোলির বিমানন্দর অনিরাপদ বলে তিউনিসিয়ার দক্ষিণে লিবিয়ার সীমানার কাছাকাছি জিয়েরবা বিমানবন্দরে অবতরণ করার অনুমতি চায়। তিউনিসিয়া বিমানটাকে নামতে দেয়। এই বিমানে লিবিয়ার জন্যে মেডিক্যাল সামগ্রী ছিল বলে বলা হয়; এবং এই সামগ্রীগুলি লিবিয়া পর্যন্ত পৌঁছে দেবার জন্যে তিউনিসিয়াকে অনুরোধ করা হয়। তিউনিসিয়ার বিরোধী দল ‘ফ্রি দেস্তুরিয়ান পার্টি’র নেতারা অভিযোগ করেন যে, তুরস্ক তিউনিসিয়াকে লিবিয়ার যুদ্ধের লজিস্টিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।

ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত আরেক পত্রিকা ‘আল মনিটর’ বলছে যে, লিবিয়ার যুদ্ধ তিউনিসিয়ার রাজনীতিকে ঘোলাটে করে ফেলেছে। কারণ তিউনিসিয়াতে সকলেই লিবিয়ার যুদ্ধে কোন না কোন পক্ষ নিয়ে কথা বলা শুরু করেছে। তিউনিসিয়ার পার্লামেন্টে বর্তমানে সবচাইতে বেশি আসন দখন করে আছে ‘এননাহদা পার্ট’, যারা মুসলিম ব্রাদারহুডের চিন্তার সাথে একমত পোষণ করে। ‘এননাহদা’ লিবিয়ার যুদ্ধে ত্রিপোলির ‘গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল একর্ড’ বা ‘জিএনএ’ সরকারকে সমর্থন করছে। একইসাথে তুরস্কের ক্ষমতাসীন ‘একে পার্ট’র সাথেও তাদের বেশ ভালো সম্পর্ক রয়েছে। অপরদিকে তিউনিসিয়ায় ২৪ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা এবং ২০১১ সালে ক্ষমতাচ্যুত প্রাক্তন একনায়ক জিনে এল আবিদিন বেন আলির সমর্থকদের থেকে গঠন করা ‘ফ্রি দেস্তুরিয়ান পার্টি’ বা ‘পিডিএল’ লিবিয়ার জেনারেল হাফতারের পক্ষ সমর্থন করছে। তিউনিসের ‘কলাম্বিয়া গ্লোবাল সেন্টার্স’এর প্রধান ইউসেফ শেরিফ বলছেন যে, সকলেই আসলে তিউনিসিয়াকে লিবিয়াতে যাবার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখে। লিবিয়া থেকে সন্ত্রাসীরা যাতে তিউনিসিয়ায় প্রবেশ করতে না পারে, এই অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র তিউনিসিয়ার সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করেছে। তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষক সেইফ এদ্দিন ত্রাবেলসির মতে, লিবিয়াতে ‘জিএনএ’এর সাম্প্রতিক সফলতা তিউনিসিয়ার নিরাপত্তাকে আরও সুসংহত করবে। তিনি বলেন যে, তিউনিসিয়া আর লিবিয়া একই সূত্রে গাঁথা। লিবিয়াতে যা কিছুই ঘটবে, সেটাই তিউনিসিয়াকে প্রভাবিত করবে। লিবিয়ার ঘটনার ব্যাপারে তিউনিসিয়ার জনগণ চিন্তিত থাকবে, এটাই তো স্বাভাবিক। হাফতারের বিরুদ্ধে লিবিয়াতে ‘জিএনএ’র বড় বিজয়ের পরপরই ‘এননাহদা পার্টি’র প্রধান এবং পার্লামেন্টের স্পিকার রাচেদ ঘানুচি ত্রিপোলি সরকারের প্রধান ফায়েজ আল-সারাজকে ফোন করে অভিনন্দন জানান। কিন্তু এই ব্যাপারটা তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদ একেবারেই পছন্দ করেননি। তিউনিসিয়ার সংবিধান অনুযায়ী পররাষ্ট্রনীতি প্রেসিডেন্টের হাতে। সাইয়েদ ঈদ উল-ফিতরের এক বার্তায় জোর গলায় বলেন যে, সকলেরই জানা উচিৎ যে তিউনিসিয়া একটাই এবং এর একজনই প্রেসিডেন্ট।

তিউনিসিয়ার প্রধানমন্ত্রী এলিয়েস ফাখফাখ। দেশের এলিট ক্লাসের বেশিরভাগ ব্যক্তিরই কোন না কোনভাবে ফ্রান্সের সাথে যোগসূত্র রয়েছে। ফাখফাখ ফ্রান্সের লিয়ঁ এবং প্যারিস থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ব্যবসায় বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। তিউনিসিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভেদ এবং অস্থিরতা মানুষকে গণতন্ত্রবিমুখ করে ফেলেছে। মাত্র ৪৮ শতাংশ তিউনিসিয়ান গণতন্ত্রকে সমর্থন করছে; অপরদিকে ৮৩ শতাংশ মনে করে দেশের রাজনীতিতে ইসলামের আদর্শগুলি বাস্তবায়িত থাকা উচিৎ। রাজনীতিবিদেরা জনগণের আস্থায় না থাকলেও সামরিক বাহিনীর উপর আস্থা ৯৫ শতাংশ মানুষের; যা তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক পরিমন্ডলে বিরাট পরিবর্তন এনেছে।



তিউনিসিয়ায় ঔপনিবেশিক শাসক ফ্রান্সের প্রভাব

তিউনিসিয়ার প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তি হওয়ায় সেখানকার রাজনীতিতে ফ্রান্সের প্রভাব ব্যাপক। দেশের এলিট ক্লাসের বেশিরভাগ ব্যক্তিরই কোন না কোনভাবে ফ্রান্সের সাথে যোগসূত্র রয়েছে। ‘পিডিএল’এর প্রতিষ্ঠাতা এবং বেন আলি সরকারের প্রধানমন্ত্রী হামেদ কারুয়ি ফ্রান্সে মেডিসিন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এলিয়েস ফাখফাখ ফ্রান্সের লিয়ঁ এবং প্যারিস থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ব্যবসায় বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইমেদ হাজগুই ফ্রান্সে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। ক্ষমতাসীন কোয়ালিশনের মাঝের দল ‘তাহিয়া তিউনেস’এর নেতা এবং গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইউসেফ চাহেদ ফ্রান্সে কৃষি বিষয়ে পড়াশোনা করেন। বিলিয়নায়ার ব্যবসায়ী, মিডিয়া টাইকুন এবং ২০১৯ সালের প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনে প্রার্থী নাবিল কারুয়ি ফ্রান্সের বিভিন্ন কোম্পানিতে চাকুরি করে ক্যারিয়ার শুরু করেন।

‘পিডিএল’এর নেতা আবির মুসি ৩রা জুন লিবিয়াতে বিদেশী হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে বিল উত্থাপন করেন। বিলটা শেষ পর্যন্ত পাস না হলেও তর্ক বিতর্কের সময় আবির মুসি ‘এননাহদা’র নেতা রাচেদ ঘানুচিকে তুরস্ক এবং কাতারের অনুগত বলে অভিযোগ করেন। এরপর এই বিলের পাল্টা জবাব হিসেবে পার্লামেন্টে ১৯ আসনের অধিকারী দল ‘কোয়ালিশন আল কারামা’ আরেকটা বিল উত্থাপন করে, যা পাস হলে প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শাসক ফ্রান্সের কাছ থেকে ঔপনিবেশিক সময়ের অপরাধের জন্যে ক্ষমা চাইবার দাবি জানানো হবে। ১৪ ঘন্টা তুমুল বাকযুদ্ধের পর সাংসদরা এই বিল রুখে দেয়। ৭৭ জন সাংসদ এই বিলের পক্ষে ভোট দেয়; মাত্র ৫ জন ভোট দেয় বিপক্ষে। কিন্তু ৪৬ জন ভোটদানে বিরত থাকার কারণে বিল পাসের জন্যে দরকার ১’শ ৯ ভোট পাওয়া যায়নি। তবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল যে, মুসলিম ব্রাদারহুডপন্থী ‘এননাহদা’ এই বিল পাসের বিপক্ষে কথা বলে। তারা বলে যে, এই বিল পাস হলে তা তিউনিসিয়ার অর্থনীতিকে আঘাত করবে এবং দেশটার গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপিয় বন্ধুদের দূরে ঠেলে দেবে। ১৮৮১ সাল থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ফ্রান্স তিউনিসিয়ার ঔপনিবেশিক শাসক ছিল। এই বিল পাস না হওয়ায় এখনও তিউনিসিয়ার উপর ফ্রান্সের প্রভাব টের পাওয়া যায়।

তিউনিসিয়াতে ফ্রান্সের কি স্বার্থ রয়েছে?

তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুস্তফা আব্দেলকাবির ‘দ্যা এরাব উইকলি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, তিউনিসিয়ার ভৌগোলিক অবস্থান ফ্রান্সের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একইসাথে দেশটার কৌশলগত অবস্থান লিবিয়াতে যুদ্ধরত সকল পক্ষের জন্যেই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন যে, লিবিয়াতে তুরস্কের স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের ব্যাপারে কিছু রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে লিবিয়াতে তুরস্কের অবস্থানকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দেয়ায় তা পশ্চিম লিবিয়া নিয়ে ফ্রান্সের পরিকল্পনাকে হুমকির মাঝে ফেলে দিয়েছে। লিবিয়ার সাথে তুরস্কের সমুদ্রসীমার চুক্তি ফ্রান্সের জন্যে সরাসরি হুমকি তৈরি না করার পরেও ফরাসীরা গ্রীস এবং গ্রীক সাইপ্রাসের সাথে ঐকমত্য প্রকাশ করে তুরস্কের বিরুদ্ধাচরণ করেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন লিবিয়ার সমুদ্রসীমায় অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা নিশ্চিত করতে গত ফেব্রুয়ারি মাসে ‘অপারেশন ইরিনি’ নামে এক মিশন শুরুর ঘোষণা দেয়। আমিরাতের ‘দ্যা ন্যাশনাল’ পত্রিকা বলছে যে, ইইউ সদস্য দেশগুলির মাঝে অনৈক্যের কারণে এই মিশন শুরু করাটা খুবই কঠিন হয়েছে। ‘ইরিনি’র অধীনে নৌ মিশনের নেতৃত্বে থাকা ইতালি এখনও ঠিক করতে পারেনি যে, তারা এই মিশনে কিভাবে অংশ নেবে। মে মাসে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী লুইজি ডি মাইও পার্লামেন্টে বলেন যে, ‘ইরিনি’র জন্যে পরিকল্পিত একটা নৌজাহাজ, ৩টা বিমান এবং ৫’শ সামরিক সদস্য মোতায়েনের ব্যাপারটা ইতালি সরকার খতিয়ে দেখছে। আর এই প্রস্তাব পার্লামেন্টের হাউজগুলিতেও অনুমোদন পেতে হবে। বর্তমানে শুধুমাত্র ফ্রান্স এবং গ্রীসই অপারেশন ‘ইরিনি’র অধীনে লিবিয়ার উপকূলে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে। উভয় দেশই লিবিয়াতে তুরস্কের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছে এবং লিবিয়ার সাথে তুরস্কের সমুদ্রসীমা বিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষরের বিরোধিতা করেছে।

গত ১৯শে জুন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু ইতালি ভ্রমণকালে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে ‘অপারেশন ইরিনি’র ব্যাপক সমালোচনা করেন। তিনি বলেন যে, এই মিশনের মাধ্যমে সিরিয়া থেকে লিবিয়ায় যুদ্ধবিমান উড়িয়ে আনাকে বাধা দেয়া হয়নি। আবুধাবি থেকে আকাশপথে অস্ত্র আসার ব্যাপারটাও এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন যে, ‘ইরিনি’ লিবিয়ার সমস্যার কোন সমাধান দেয় না এবং লিবিয়ার উপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞাও নিশ্চিত করেনা। ‘দ্যা এরাব উইকলি’ বলছে যে, ফরাসী এবং গ্রীকদের অবস্থানের কারণেই ন্যাটোকে এই মিশনের অংশ করার মার্কিন এবং তুর্কি চেষ্টা সফল হচ্ছে না। লিবিয়ার জেনারেল হাফতারের অধীন ‘লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’ বা ‘এলএনএ’কে ফ্রান্স সমর্থন দিয়ে চলেছে বলেই ইইউএর মাঝ থেকে হাফতারের বাহিনীর বিরোধিতা করার চেষ্টাকে ফ্রান্স বারংবার বাধাগ্রস্ত করেছে। আব্দেলকাবির বলছেন যে, ২০১১ সালে লিবিয়ার একনায়ক মুয়াম্মার গাদ্দাফির সরকারকে অপসারণের পিছনে ফ্রান্সের সমর্থনই ছিল সবচাইতে জোরালো। তারা মনে করেছিল যে, গাদ্দাফিকে সরানোর পর লিবিয়াতে ফ্রান্সের একটা শক্ত ভিত প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু লিবিয়ার যুদ্ধে অনেকগুলি রাষ্ট্র যুক্ত হওয়ায় ফ্রান্স তার কাংক্ষিত ফলাফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর আফ্রিকা কমান্ডের অপারেশনস ডিরেক্টর ব্র্যাডফোর্ড গেরিং বলছে যে, লিবিয়াতে রুশ সামরিক অবস্থান শক্তিশালী হবার সাথেসাথে তা ইউরোপের দক্ষিণ সীমানার জন্যে হুমকি সৃষ্টি করছে। তথাপি তুরস্কের জন্যে মার্কিন সমর্থন পরিষ্কার হতে থাকায় ফ্রান্স হয়তো লিবিয়াতে রুশ সামরিক অবস্থানের বিপক্ষে কথা নাও বলতে পারে।

তিউনিসিয়ার কৌশলগত অবস্থান ফ্রান্সের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ। তিউনিসিয়ার উত্তর উপকূল থেকে ইতালির দক্ষিণের সিসিলি দ্বীপের উপকূলের দূরত্ব মাত্র ১’শ ৬০ কিঃমিঃ। সিসিলি প্রণালী নামে পরিচিত এই সরু নৌপথের মাঝ দিয়েই ফ্রান্সের সাথে সুয়েজ খাল, তথা ভারত মহাসাগর এবং পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগ। একারণেই ফ্রান্স তিউনিসিয়াকে কাছে রাখতে চাইছে। লিবিয়ার যুদ্ধে তুর্কি সমর্থনে ‘জিএনএ’এর সাম্প্রতিক বিজয়ের পর কৌশলগত এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ তুরস্কের কাছে হারাবার ভয় পেয়ে বসেছে ফ্রান্সকে।



তিউনিসিয়ার ভূকৌশলগত অবস্থান ফ্রান্স ও তুরস্ককে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে


উসমানি খিলাফতের সময় ষোড়শ শতক থেকেই তিউনিসিয়ার সাথে ইস্তাম্বুলের গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। তুরস্ক সেই সম্পর্ককেই আবার জাগিয়ে তুলতে চাইছে। তবে আঙ্কারার সাথে তিউনিসিয়ার মুসলিম ব্রাদারহুডপন্থী ‘এননাহদা পার্টি’র সম্পর্ক যে বাস্তবতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তা জুন মাসে পার্লামেন্টে ফ্রান্সের কাছ থেকে ঔপনিবেশিক সময়ের অপরাধের ক্ষমা চাওয়ার বিলে ‘এননাহদা’র সমর্থন না দেয়াই প্রমাণ করে। তথাপি এই বিল তিউনিসিয়ার জনগণের ঔপনিবেশিক সময়ের প্রতি ঘৃণা এবং ঔপনিবেশিক সময় থেকে টেনে আনা সম্পর্কের ইতি টানার ইচ্ছেরই বহিঃপ্রকাশ; যা কিনা ফ্রান্সকে বিচলিত করেছে। তিউনিসিয়ার সামরিক বাহিনীর দ্রুত উন্নয়ন, জনগণের মাঝে তাদের জনপ্রিয়তা এবং তাদের সাথে তুরস্কের সম্পর্কের ব্যাপারটাও ফ্রান্সকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। কারণ এতে লিবিয়ায় তুরস্কের সামরিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

তিউনিসিয়ার কৌশলগত অবস্থান ফ্রান্সের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ। তিউনিসিয়ার উত্তর উপকূল থেকে ইতালির দক্ষিণের সিসিলি দ্বীপের উপকূলের দূরত্ব মাত্র ১’শ ৬০ কিঃমিঃ। সিসিলি প্রণালী নামে পরিচিত এই সরু নৌপথ ভূমধ্যসাগরের পূর্ব এবং পশ্চিম ভাগকে যুক্ত করেছে। আর এর মাঝ দিয়েই ফ্রান্সের সাথে সুয়েজ খাল, তথা ভারত মহাসাগর এবং পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগ। একারণেই ফ্রান্স তিউনিসিয়াকে কাছে রাখতে চাইছে। লিবিয়ার যুদ্ধে তুর্কি সমর্থনে ‘জিএনএ’এর সাম্প্রতিক বিজয়ের পর কৌশলগত এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ তুরস্কের কাছে হারাবার ভয় পেয়ে বসেছে ফ্রান্সকে। আর একইসাথে ইতালিকে পাশে না পাওয়ায় ফ্রান্সের হতাশা চরমে পৌঁছেছে। তুরস্কের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র গ্রীসকে সাথে করেই ফ্রান্স লিবিয়ার উপকূল পাহাড়া দেবার যে মিশনে মনোনিবেশ করেছে, তা ইতোমধ্যেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, যখন গত ১০ই জুন লিবিয়ার উপকূলে ফরাসী এবং তুর্কি যুদ্ধজাহাজের মাঝে অসৌজন্যমূলক পরিস্থিতির সূচনা হয়। তুরস্ক যদি লিবিয়াতে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনে মনোযোগী হয়, আর ফ্রান্স ও গ্রীস যদি তুরস্ককে একাজে বাধা দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকে, তাহলে সামনের দিনগুলিতে দুই পক্ষের মাঝে সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়তে থাকবে।



Monday, 13 April 2020

করোনা ঝুঁকির মাঝেও যুদ্ধ চলছে লিবিয়াতে

১৩ই এপ্রিল ২০২০

লিবিয়ার বেশিরভাগ এলাকাই এখন জেনারেল খলিফা হাফতারের বাহিনীর হাতে। তবে রাজধানী ত্রিপোলিসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শহর এখনও ‘জিএনএ’এর নিয়ন্ত্রণে। প্রায় এক বছর চেষ্টার পরেও হাফতারের বাহিনী ত্রিপোলির নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। যুদ্ধে নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন আনতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের মাঝেও চলছে সামরিক অভিযান।

লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলির ‘ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল’এর বরাত দিয়ে ‘লিবিয়া হেরাল্ড’ জানাচ্ছে যে, ৭ই এপ্রিল পর্যন্ত লিবিয়াতে মোট ২১ জন নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রুগী সনাক্ত হয়েছে। এর মাঝে একজন মৃত্যুবরণ করেছেন এবং দু’জন সুস্থ্য হয়ে উঠেছেন। ২৫শে মার্চ লিবিয়ার সরকার যুদ্ধবিদ্ধ্বস্ত দেশটাতে করোনাভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ খুঁজে পায়, যখন ৭৩ বছর বয়সী এক ব্যক্তির শরীরে রোগের সংক্রমণ ধরা পড়ে। তখন বলা হয় যে, তিনি তিন সপ্তাহ আগে সৌদি আরব থেকে তিউনিসিয়া হয়ে লিবিয়া পৌঁছান। লিবিয়ার পুর্বের জেনারেল খলিফা হাফতারের অধীন ‘লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’ বা ‘এলএনএ’এর নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকায় বেনগাজি শহরেও প্রথম করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। তুরস্ক থেকে ৫৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি তিন সপ্তাহ আগে তিউনিসিয়া হয়ে বেনগাজি পৌঁছান। কিন্তু করোনাভাইরাসের এই দুর্যোগের মাঝেও লিবিয়াতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়নি। ৬ই এপ্রিল ত্রিপোলির ‘আল খাদরা জেনারেল হসপিটাল’এর উপর আর্টিলারি হামলা হয়, যার ফলশ্রুতিতে ৬ জন মেডিক্যাল কর্মী আহত হন। জাতিসংঘের মানবাধিকার কর্মকান্ডের মুখপাত্র জ্যান্স লেরকা এক বার্তায় এই হামলার সমালোচনা করে বলেন যে, লিবিয়ার মানুষের যখন নিরাপদ বাড়ি এবং কার্যক্ষম মেডিক্যাল সার্ভিসের সবচাইতে বেশি দরকার, তখনই হাসপাতালে হামলার আরেকটা খবর এলো। লিবিয়ার মেডিক্যাল সার্ভিস এবং কর্মীরা এসময়ে বৈশ্বিক মহামারী মোকাবিলায় অতি গুরুত্বপূর্ণ।

লিবিয়াতে যুদ্ধরত উভয় পক্ষই তাদের সমর্থক দেশগুলি থেকে বেশি করে অস্ত্রের সরবরাহ পাচ্ছে। ডিসেম্বর মাসে ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ জানায় যে, সুদান থেকে ৩ হাজার যোদ্ধা ‘এলএনএ’এর পক্ষে যোগ দিয়েছে। এছাড়াও রাশিয়া থেকেও এসেছে ৬’শ ভাড়াটে সেনা। ফেব্রুয়ারি মাসের এক প্রতিবেদনে ফ্লাইট ট্র্যাকিং ডাটার বরাত দিয়ে ‘রয়টার্স’ বলছে যে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ‘এলএনএ’কে ৮৯টা ফ্লাইটের মাধ্যমে বড় আকারের কার্গো বিমানে করে ৪ হাজার ৬’শ ৮০ টন সাপ্লাই পাঠিয়েছে। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ এবং ‘আইএইচএস জেনস’ বলছে যে, ‘জিএনএ’ও তুরস্কের কাছ থেকে জাহাজে করে সাঁজোয়া যান, আর্টিলারি, বিমান বিধ্বংসী কামান এবং ড্রোন পেয়েছে। সিরিয় মিলিশিয়া যোদ্ধাদেরকে সিরিয়া থেকে লিবিয়ায় মোতায়েন করেছে তুরস্ক। অস্ত্রের সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় এটা বোঝাই যাচ্ছিল যে, নতুন করে আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে উভয় পক্ষই। মার্চের শুরুতে হাফতারের বাহিনী ত্রিপোলি এবং মিসরাতা শহরের উপর অবরোধ আরও কঠোর করলেও তুরস্কের সমর্থন পাবার পর আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে ‘জিএনএ’ই আক্রমণে যায়।

হাফতারের বাহিনী ত্রিপোলির উপকন্ঠে পৌঁছে গেলেও আল আজিজিয়াহ এলাকা ‘জিএনএ’এর নিয়ন্ত্রণে থাকায় হাফতারের ত্রিপোলি অপারেশনের সফলতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একইসাথে ভবিষ্যতে ত্রিপোলির উপকন্ঠে হাফতারের বাহিনীর আটকা পড়ে যাবার সম্ভাবনাও রয়েছে।



২০১৯এর এপ্রিল মাসে নতুন অভিযান শুরুর পর থেকে লিবিয়ার বেশিরভাগ এলাকাই হাফতারের অধীন ‘এলএনএ’ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। তবে ‘এলএনএ’ রাজধানী ত্রিপোলি অধিকার করতে ব্যর্থ হয়। একইসাথে জুন মাসে পাল্টা আক্রমণে ত্রিপোলির ৯৩ কিঃমিঃ দক্ষিণে গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক্যাল শহর ‘ঘারিয়ান’ দখল করে নেয় ‘জিএনএ’। ঘারিয়ানের উত্তরে গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার জংশন আল আজিজিয়াহ শহরও ‘জিএনএ’এর হাতে থাকে। ঘারিয়ানের পশ্চিমের জাবাল নাফুসাহ এলাকার ইয়াফরান, আল ঘাওয়ালেশ, কিকলাহ, জাদু, নালুতসহ বেশকিছু শহর ‘জিএনএ’এর নিয়ন্ত্রণে থাকে। তবে ত্রিপোলির পশ্চিমে তিউনিসিয়ার সীমানার কাছাকাছি কিছু এলাকা ‘এলএনএ’এর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এর মাঝে রয়েছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘আল ওয়াতিয়াহ’ বিমান ঘাঁটি। এর ফলশ্রুতিতে উত্তরে জুয়ারাহ থেকে দক্ষিণে জাদু শহর পর্যন্ত এবং পূর্বে ঘারিয়ান শহর থেকে পশ্চিমে তিউনিসিয়ার সীমানা পর্যন্ত ‘এলএনএ’এর নিয়ন্ত্রণাধীন একটা ‘পকেট’এর আবির্ভাব হয়, যার দক্ষিণ এবং পূর্বে ‘জিএনএ’এর অধিকৃত অঞ্চল, পশ্চিমে তিউনিসিয়া এবং উত্তরে ভূমধ্যসাগর। ‘এলএনএ’ গত অগাস্টে আবারও ঘারিয়ান শহরের নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যর্থ হলে এই ‘পকেট’টা রয়েই যায়। প্রায় এক বছর ধরে টিকে থাকা এই ‘পকেট’টাই এখন ‘জিএনএ’এর টার্গেট। ‘রাশান ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার্স কাউন্সিল’এর এক লেখায় কিরিল সেমেনভ এক বিশ্লেষণে বলেন যে, আজিজিয়াহ এবং ঘারিয়ান শহরের নিয়ন্ত্রণ ‘জিএনএ’এর হাতে থেকে যাওয়ায় তা হাফতারের ত্রিপোলি দখল করার চেষ্টাকেই শুধু বাধাগ্রস্ত করবে না, ত্রিপোলিকে অবরোধ করে রাখা হাফতারের বাহিনীকে ঘিরে ফেলার মতো অবস্থায়ও নিয়ে যেতে পারে।

গত ২৫শে মার্চ থেকে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিতে অবস্থিত ‘গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল একর্ড’ বা ‘জিএনএ’ সরকারের অধীন বাহিনী ত্রিপোলি অবরোধকারী ‘এলএনএ’এর বিরুদ্ধে নতুন অভিযান শুরু করে। ‘জিএনএ’কে সরাসরি সহায়তা দিচ্ছে তুরস্ক ও কাতার; আর ‘এলএনএ’কে সহায়তা দিচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর, সৌদি আরব, জর্দান, রাশিয়া এবং ফ্রান্স। নতুন এই অভিযানের নাম দেয়া হয়েছে ‘অপারেশন পিস স্টর্ম’। এই নামকে অনেকেই সিরিয়াতে তুরস্কের ‘অপারেশন পিস স্প্রিং’ এবং ‘অপারেশন ‘স্প্রিং শিল্ড’এর সাথে তুলনা করছেন। ‘আল মনিটর’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ত্রিপোলির কাছের মিতিগা মিলিটারি একাডেমিতে স্থাপিত অপারেশন সেন্টারে এখন তুর্কি সামরিক এবং ইন্টেলিজেন্স অফিসারদের ব্যাপক প্রভাব। এই অপারেশনের লক্ষ্য হলো ত্রিপোলি থেকে ১’শ ৬০ কিঃমিঃ দক্ষিণ-পশ্চিমে তিউনিসিয়ার সীমানার কাছাকাছি ‘আল ওয়াতিয়াহ’ বিমান ঘাঁটি। ২০১৪ সালের অগাস্ট থেকে এই ঘাঁটি হাফতারের বাহিনীর হাতে রয়েছে। অপারেশনের প্রথম দিনেই ঘাঁটিটা ‘জিএনএ’ হাত করে নেয়। তবে পরদিন হাফতারের সেনারা পাল্টা আক্রমণে এই ঘাঁটি পুনর্দখল করার দাবি করে। আর একইসাথে এর প্রায় ৫০ কিঃমিঃ উত্তরে সমুদ্রউপকূলের কাছে জুয়ারা শহরের বাইরে পৌঁছে যাবার দাবি করে। হাফতারের বাহিনী ৩০শে মার্চ ত্রিপোলির দক্ষিণে একটা তুর্কি নির্মিত ‘বায়রাকতার টিবি-২’ ড্রোন বিমান ভূপাতিত করে এর ছবি প্রকাশ করে। আর পহেলা এপ্রিল ‘এলএনএ’ তুর্কি যুদ্ধজাহাজ থেকে ছোঁড়া একটা ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের ছবি প্রকাশ করে। তারা বলে যে, উপকূলের কাছাকাছি ‘আল আযাইলাত’ এলাকায় হাফতারের বাহিনীর উপর তুর্কি নৌবাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করে। ছবিতে মার্কিন নির্মিত ‘আরআইএম-৬৬ই’ বা ‘স্ট্যান্ডার্ড এসএম-১’ ক্ষেপণাস্ত্র দেখা যায়, যা কিনা তুরস্কের মার্কিন নির্মিত ৮টা ‘জি-ক্লাস’এর ফ্রিগেট ব্যবহার করে। এছাড়াও লিবিয়াতে তুর্কিরা সিরিয় মিলিশিয়াদের জড়িত করার পর থেকে এদের মাঝেও হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। ‘সিরিয়ান অবজারভেটরি অব হিউম্যান রাইটস’এর হিসেবে লিবিয়াতে ১১ই এপ্রিল পর্যন্ত ১’শ ৮২ জন সিরিয় যোদ্ধা নিহত হয়েছে। সংস্থাটা আরও বলছে যে, ইতোমধ্যেই ৪ হাজার ৭’শ ৫০ জন সিরিয় যোদ্ধাকে লিবিয়াতে পাঠানো হয়েছে। আরও ১ হাজার ৯’শ জন তুরস্কে অবস্থান করছে প্রশিক্ষণের জন্যে।


ঘারিয়ান শহরের পশ্চিমে হাফতার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা ‘পকেট’এর মাঝে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা ‘আল ওয়াতিয়াহ’ বিমান ঘাঁটিই বর্তমানে ‘জিএনএ’এর অভিযানের মূল টার্গেট



লিবিয়ায় ‘অপারেশন পিস স্টর্ম’এর বিষদ বর্ণনা দেন তুর্কি নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেতিন গুরকান। লিবিয়ার ‘জিএনএ’ বাহিনী সাম্প্রতিককালে সিরিয়াতে তুরস্কের সামরিক অপারেশনের আঙ্গিকেই তাদের অপারেশনের পরিকল্পনা করে। এই অভিযানের মূলে থাকে কাতাদের অর্থায়নে তুর্কিদের সরবরাহ করা ‘বায়রাকতার টিবি-২’ ড্রোন। এই ড্রোনগুলিকে রক্ষা করার জন্যে লিবিয়াতে মোতায়েন করা হয়েছে তুরস্কের অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক জ্যামার ‘কোরাল’। এই ‘কোরাল’এর কাজ হলো ড্রোনের কাছাকাছি এলাকায় হাফতারের বাহিনীর মোতায়েনকৃত বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের রাডারগুলিকে অকার্যকর করে দেয়া। ছোট এই ড্রোনগুলি ‘এমএএম-এল’ নামের ক্ষুদ্র ক্ষেপণাস্ত্র বহণ করে এবং অব্যর্থভাবে শত্রুর টার্গেটে হামলা করে। তবে ক্ষুদ্র হওয়ায় এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলির ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা অপেক্ষাকৃত কম। ইতোমধ্যেই ‘এলএনএ’এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার ড্রোন হামলায় নিহত হবার খবর আসছে। বেশ কিছুদিন আগে ইস্রাইলের কাছ থেকে কেনা ‘অরবিটার-৩’ ড্রোনও তুরস্ক সরবরাহ করেছে ‘জিএনএ’কে। হাফতারের বাহিনীও আরব আমিরাতের কেনা চীনা ‘উইং লুং-২’ ড্রোন ব্যবহার করছে বেশ কিছুদিন ধরেই। ১লা এপ্রিল লিবিয়ার উপকূলে টহল দেয়া তুরস্কের নৌবাহিনীর ফ্রিগেট থেকে এমনই একটা ড্রোনকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হয়েছিল। ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই তুর্কি ‘জি-ক্লাস’এর ফ্রিগেট ‘গোকসু’ এবং ‘গোকোভা’ ত্রিপোলি এবং সাব্রাথার মাঝামাঝি লিবিয়ার উপকূল পাহাড়া দিচ্ছে।


লিবিয়াতে ভূপাতিত তুরস্কের নির্মিত ‘বায়রাকতার টিবি-২’ ড্রোন। সিরিয়ার যুদ্ধের কৌশল অনুসরণ করে এই ড্রোনগুলি লিবিয়ার যুদ্ধের চিত্র দ্রুত পাল্টে দিচ্ছে।


মেতিন গুরকান বলছেন যে, এখন লিবিয়ার আকাশের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার যুদ্ধ চলছে দুই পক্ষের মাঝে। এমতাবস্থায় সমুদ্র থেকে তুর্কি নৌবাহিনীর পক্ষে লিবিয়ার আকাশের নিরাপত্তা দেয়াটা কঠিন হবে। তাই খুব দ্রুতই লিবিয়াতে তুর্কিদের নিজস্ব ‘হিসার-ও’ বিমানধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা হতে পারে। তুর্কি বিমান বাহিনীর একটা ‘বোয়িং ই-৭টি ওয়েজটেইল’ ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বিমান লিবিয়ার উপকূল বরাবর উড়ে আকাশ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা দিচ্ছে। সামরিক বিমানের ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ‘ইতামিল রাডার’ বলছে যে, তুরস্কের ‘কনইয়া’ বিমান ঘাঁটি থেকে ওড়া ‘ওয়েজটেইল’ বিমানগুলি গত বছরের জুন মাস থেকে বেশ নিয়মিতই লিবিয়ার উপকূলে টহল দিচ্ছে।

এটা এখন পরিষ্কার যে, করোনাভাইরাসের কারণে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্যবাধকতা আছে বলে লিবিয়ার যুদ্ধরত পক্ষগুলি মনে করছে না। তুরস্কের সরাসরি সমর্থন পাবার পর থেকে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে ‘জিএনএ’। তবে এতে ত্রিপোলি হারাবার সম্ভাবনা কিছুটা কমলেও যুদ্ধ জেতাটা এখনও বহু দূরে। এদিকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন চাইছে লিবিয়ার উপকূল পাহাড়া দিয়ে লিবিয়ার উপর জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞাকে নিশ্চিত করতে। তবে এতে সমুদ্রপথের উপর নির্ভরশীল ‘জিএনএ’ই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এরূপ সম্ভাবনা তুরস্ককে ভূমধ্যসাগরে সরাসরি ইইউএর বিরুদ্ধে দাঁড় করাবে। যুক্তরাষ্ট্রও এখন চাইছে না যে, লিবিয়ার তেল বিক্রির অর্থ শুধুমাত্র তুর্কি সমর্থিত ‘জিএনএ’এর কাছে যাক। বর্তমানে তেলক্ষেত্রগুলি হাফতারের বাহিনী অবরোধ করে তেল রপ্তানি বন্ধ করে রেখেছে। ভূমধ্যসাগরে নিজের প্রভাব বাড়াতে তুরস্ক কোন ছাড় দিতে নারাজ। অপরদিকে সৌদি গ্রুপের মিশর ও আমিরাত এবং তার সাথে রাশিয়াও নিজেদের ভাগ ছাড়তে চাচ্ছে না। করোনাভাইরাস ইউরোপকে ভীষণভাবে আক্রান্ত করেছে, যা কিছুদিনের জন্যে হলেও লিবিয়াতে ইউরোপিয় শক্তিদের প্রভাব কমাবে। তবে ভূমধ্যসাগর হলো ইউরোপের দক্ষিণের সীমান্ত; ইউরোপিয়রা অত সহজে এর নিয়ন্ত্রণ তুরস্কের কাছে ছেড়ে দিতে চাইবে না। করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারির মাঝেও কেউই চাইছে না লিবিয়ার নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে। অন্য কথায়, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা করোনাভাইরাস সংক্রমণের মাঝেও থেমে থাকেনি।

Tuesday, 21 January 2020

লিবিয়াতে কি চাইছে ইতালি?

২২শে জানুয়ারি ২০২০

  
গত ৭ই জানুয়ারি ইতালির প্রধানমন্ত্রী গুইসেপ কন্টি লিবিয়ার জেনারেল হাফতারের সাথে সাক্ষাৎ করেন; যার ফলাফল যায় ইতালির বিপক্ষে। ‘জিএনএ’এর প্রতিপক্ষ জেনারেল খলিফা হাফতারের অধীন পূর্ব লিবিয়ার ‘লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’ বা ‘এলএনএ’কেও একইসাথে আলিঙ্গন করার ফলে ইতালি এখন দুই কূলই হারাতে বসেছে। ইতালির রাজনীতিবিদদের ব্যাপক সমালোচনা করে বলা হচ্ছে যে, তারা প্রকৃতপক্ষে কূটনীতি বোঝেন না।


গত ৭ই জানুয়ারি ইতালির প্রধানমন্ত্রী গুইসেপ কন্টি লিবিয়ার যুদ্ধরত দুই পক্ষকে হঠাত করেই একত্রে আলোচনায় বসাবার চেষ্টা করেন; যার ফলাফল যায় ইতালির বিপক্ষে। ইতালি এতকাল ধরে ত্রিপোলির জাতিসংঘ সমর্থিত ‘গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল একর্ড’ বা ‘জিএনএ’কে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ‘জিএনএ’এর প্রতিপক্ষ জেনারেল খলিফা হাফতারের অধীন পূর্ব লিবিয়ার ‘লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’ বা ‘এলএনএ’কেও একইসাথে আলিঙ্গন করার ফলে ইতালি এখন দুই কূলই হারাতে বসেছে। ‘জিএনএ’ প্রেসিডেন্ট ফায়েজ আল-সারাজএর দেখা করার আগেই কন্টি হাফতারের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এই খবর পাবার পর আল-সারাজ কন্টির সাথে দেখা করতেই রাজি হননি। ‘ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর রোম অফিসের ডিরেক্টর আরটুরো ভারভেলি বলছেন যে, ইতালির রাজনীতিবিদেরা পররাষ্ট্রনীতির দিকে যথেষ্ট মনোযোগ দেননা; যার ফলাফল এখন দেখা যাচ্ছে। ‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে ইতালির রাজনীতিবিদদের ব্যাপক সমালোচনা করে বলা হয় যে, তারা প্রকৃতপক্ষে কূটনীতি বোঝেন না। ২০১৮ সালে সরকার গঠন করার সময় কন্টি এবং তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী লুইজি ডি মাইও উভয়েরই কূটনীতি বিষয়ে কোন অভিজ্ঞতা ছিল না। আর এর ফলে ইতালি লিবিয়াতে তার প্রভাব হারিয়েছে। ইতালির উগ্র ডানপন্থী নেতা মাত্তেও সালভিনি প্রধানমন্ত্রী কন্টির সমালোচনা করে বলেন যে, কন্টির আসলে কোন যোগ্যতাই নেই। তার সরকারের লোকজন অপেশাদার। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, লিবিয়ার উপর এক আলোচনায় বসার পর ইতালি বুঝতে পারে যে সে একঘরে হয়ে গেছে। আলোচনায় ফ্রান্স, মিশর, গ্রীস এবং গ্রীক সাইপ্রাস, সকলেই হাফতারের পক্ষ নেয়ায় ডি মাইও লিবিয়া বিষয়ে যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান।

‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০১১ সালে ইউরোপ মুয়াম্মার গাদ্দাফির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে আগ্রহী হলেও পরবর্তীতে দেশটাকে যুদ্ধরত বিভিন্ন গ্রুপের হাতে সপে দেয়। লিবিয়ার অস্ত্র আফ্রিকার অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন দেশে সহিংসতার জন্ম দেয়, যা বিরাট শরণার্থী সমস্যার সৃষ্টি করে। ইউরোপের দেশগুলি লিবিয়াতে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির পেছনেই ছুটেছে; একেকজন একেক পক্ষকে সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু তুরস্ক যুদ্ধে জড়াবার পরপরই পুরো ইউরোপ মনোযোগ দেয়া শুরু করেছে। এখানে যেন নতুন কোন ‘গ্রেট গেম’ শুরু হয়ে গেছে, যা ইউরোপের আশেপাশের অঞ্চলকে অস্থির করছে। তুরস্ক এবং রাশিয়া একত্রে আলোচনায় বসে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেবার পরপরই জার্মানি লিবিয়ায় স্বার্থ আছে এমন সকলকে নিয়ে বৈঠকের আয়োজন করেছে। ‘জার্মান মার্শাল ফান্ড’এর ব্রাসেলস অফিসের ডিরেক্টর ইয়ান লেসার বলছেন যে, লিবিয়া নিয়ে ইউরোপের চিন্তা করার কারণগুলির মাঝে রয়েছে শরণার্থী, জ্বালানি তেল, নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবাদ। কিন্তু তুরস্ক এবং রাশিয়া লিবিয়াতে অতটা সক্রিয় না হলে লিবিয়া নিয়ে সকলে এতটা ব্যস্ত হয়ে যেত না।

ডাচ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ক্লিগেনডেল ইন্সটিটিউট’এর রিসার্চ ফেলো জালেল হারচাউই বলছেন যে, লিবিয়াতে তুরস্ক এবং রাশিয়া যেভাবে আগ্রাসী কূটনীতি চালাচ্ছে, তাতে ইতালি একেবারেই কোনঠাসা হয়ে পড়েছে। ইতালিয়ান ইন্টেলিজেন্সএর এক কর্মকর্তা ‘রয়টার্স’কে বলেন যে, ইতালির রাজনীতিবিদেরা তাদের নির্দেশ দিয়েছেন সকল পক্ষের সাথেই যোগাযোগ রাখতে। অর্থাৎ ইতালি সকলকেই একত্রে বন্ধু রাখতে চাইছে। কিন্তু এধরনের চলমান সংঘাতে নিজের অবস্থানকে পরিষ্কার না করতে পারলে প্রভাব হারানোটাই স্বাভাবিক বলে মনে করছেন তিনি। শুধু লিবিয়াই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেই ইতালি প্রভাব হারাচ্ছে। বাগদাদে ইরানি জেনারেল কাসেম সুলাইমানিকে হত্যার পর মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পেও বিশ্বব্যাপী ফোন করে জনমত আদায়ের চেষ্টা করলেও ইতালিতে কারুর সাথেই তিনি কথা বলেননি; যদিও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের পর পশ্চিমা দেশগুলির মাঝে ইতালির সৈন্যসংখ্যাই সবচাইতে বেশি।


  
শরণার্থী সমস্যা ইতালির জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি প্রধান হুমকি। ইতালিয়দের চিন্তায় শরণার্থী সমস্যা এতটাই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে যে, লিবিয়ায় তাদের রাজনৈতিক কর্মকান্ড এর তুলনায় হয়ে গেছে গৌণ। ২০১৭ সালে ইতালির দেয়া প্রায় ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বৈদেশিক সাহায্যের মাঝে ৫৬ শতাংশই গিয়েছে শরণার্থী সমস্যা নিরসনে। 


ইতালির প্রধান ভয় - শরণার্থী

‘আল জাজিরা’র এক লেখায় রোমানা রুবেও এবং রামজি বারুদ বলেন যে, লিবিয়ার ‘জিএনএ’ সরকারের কোস্ট গার্ডের নেতৃত্বে থাকা আব্দ আল-রাহমান বিজা মিলাদএর সাথে ইতালিয়রা কাজ করছে। মিলাদ হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যার সম্পর্কে ২০১৭ সালের জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিবেদনে বলা হয় যে, তিনি শুধু চোরাকারবারিতেই জড়িত নন, গুলি করে অভিবাসন প্রত্যাশীদের নৌকা ডুবিয়ে দেয়ার রেকর্ডও রয়েছে তার। ২০১৭এর ফেব্রুয়ারিতে ত্রিপোলির ‘জিএনএ’ সরকারের সাথে অবৈধ অভিবাসী ঠেকার জন্যে ইতালি একটা চুক্তি করে। চুক্তির অধীনে লিবিয়াতে শরণার্থীদের আটক করার জন্যে লিবিয়ার মাটিতেই ক্যাম্প তৈরির জন্যে অর্থায়ন করে ইতালি। মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’এর ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে এই ক্যাম্পের কার্যকলাপকে ‘অমানবিক’ বলে উল্লেখ করা হয়। এই চুক্তি করার জন্যে মিলাদ ইতালির দক্ষিণে সিসিলির কাতানিয়া শরণার্থী শিবিরে গেলে সেখানে অভিবাসীরা তাকে ‘ইতালিয়ান মাফিয়া’ বলে সম্ভোধন করে। অভিবাসন ঠেকাবার ইতালিয় চেষ্টাগুলি নতুন নয়।

২০০৮ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফির সময়ে তৎকালীন সিলভিও বারলুসকোনির ইতালি সরকার অভিবাসী ঠেকাতে লিবিয়াকে ৫ বিলিয়ন ডলার দেয়। চিন্তাটা ছিল এমন যে, ইতালির হয়ে লিবিয়াই অভিবাসীদের ঠেকাবে; আর এর সাথে মানবাধিকার লংঘনের ইস্যুগুলি থেকেও ইতালি নিজেকে দূরে রাখতে পারবে। ২০০৯ সালে গাদ্দাফিকে ইতালিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়; আর ২০১০ সালে বারলুসকোনিও লিবিয়া সফর করেন।

শরণার্থী সমস্যা ইতালির জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি প্রধান হুমকি। আফ্রিকার শরণার্থী সমস্যা থেকে বাঁচতে ইতালি আফ্রিকার দেশগুলিকে খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি, স্বাস্থ্য এবং নারীর ক্ষমতায়নে সহায়তা দিচ্ছে। ‘ওইসিডি’র হিসেবে ২০১৭ সালে ইতালির দেয়া প্রায় ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বৈদেশিক সাহায্যের মাঝে ৫৬ শতাংশই গিয়েছে শরণার্থী সমস্যা নিরসনে।

কূটনৈতিক অনভিজ্ঞতা

গত ১৩ই জানুয়ারি আঙ্কারায় ইতালির প্রধানমন্ত্রী গুইসেপ কন্টির সাথে লিবিয়া বিষয়ে এক বৈঠকের পর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান বলেন যে, ইতালির সাথে তুরস্ক একত্রে চেষ্টা করছে যাতে লিবিয়ার যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হয়। কন্টি বলেন যে, যুদ্ধবিরতি লিবিয়ায় একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানের সুযোগ তৈরি করবে। এর একদিন আগেই তুরস্ক এবং রাশিয়া একত্রে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলেও পরবর্তীতে খলিফা হাফতার যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে স্বাক্ষর না করেই মস্কো ত্যাগ করেন। লিবিয়া ইস্যুতে তুরস্ক এবং ইতালি উভয়েই ত্রিপোলি-কেন্দ্রিক ‘জিএনএ’এর পক্ষাবলম্বন করছে। তবে ইতালি লিবিয়ার ইস্যুকে ছেড়ে দিতে নারাজ। ১৬ই জানুয়ারি ইতালির প্রধানমন্ত্রী কন্টি লিবিয়ার প্রতিবেশী দেশ আলজেরিয়াতে ছুটে যান লিবিয়ার বিষয়ে কথা বলার জন্যে।

‘ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর প্যান ইউরোপিয়ান ফেলো মাত্তিয়া গিয়ামপাওলো এক লেখায় বলছেন যে, ইতালিয়দের চিন্তায় শরণার্থী সমস্যা এতটাই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে যে, লিবিয়ায় তাদের রাজনৈতিক কর্মকান্ড এর তুলনায় হয়ে গেছে গৌণ। ২০১৮ সালে ওয়াশিংটন সফরের সময়ে কন্টি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে বড় ধরনের কূটনৈতিক সমর্থন পান। ট্রাম্প ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সমস্যাগুলি সমাধানে ইতালিকে প্রধান বন্ধু হিসেবে সম্ভোধন করেন। কিন্তু সেই সময় থেকে লিবিয়াকে নিয়ন্ত্রণে ইতালির পকেটে শুধু ব্যর্থতাই জমা হয়েছে।

ইতালি লিবিয়াতে কেন?

লিবিয়াতে ইতালির স্বার্থ বহুকাল থেকে। উত্তর আফ্রিকার লিবিয়া উপকূলে কার্থেজ সাম্রাজ্যের সাথে রোমের বৈরিতা ছিল। পরবর্তীতে সপ্তম শতাব্দীতে উত্তর আফ্রিকার পুরো উপকূল মুসলিমদের অধীন হয়ে গেলে ইতালির সাথে আফ্রিকার বৈরিতা আরও বৃদ্ধি পায়। বর্তমান রাষ্ট্র ইতালির একত্রীকরণ সম্পন্ন হয় ১৮৭১ সালে। নতুন এই দেশ ইউরোপের বাকি দেশগুলির দেখাদেখি নিজেরাও উপনিবেশ খুঁজতে শুরু করে। এক্ষেত্রে ব্রিটিশ আর ফরাসীদের সাথে সমঝোতা করেই তাদের চলতে হয়েছে। ১৮৮৯ সালে ইতালি পূর্ব আফ্রিকার সোমালিয়া এবং এরিত্রিয়া নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। ১৯১১ সালে লিবিয়া ছিল উসমানি খিলাফতের অধীনে। ইতালিয়রা ইস্তাম্বুলের খলিফার কাছে চরমপত্র দিয়ে লিবিয়া আক্রমণ করে। লিবিয়ার পূর্বে মিশরের দখলে ছিল ব্রিটিশরা; আর পশ্চিমে আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়ার নিয়ন্ত্রণে ছিল ফরাসীরা। তাদের সমর্থনেই ইতালি লিবিয়া আক্রমণ করে। ইতালিয়রা লিবিয়ার উপকূলের এলাকাগুলি সহজে দখলে নিতে পারলেও দেশের ভেতরের এলাকাগুলির নিয়ন্ত্রণ নিতে তাদের কয়েক দশক সময় লেগেছিল। এসময়ের মাঝে ইতালিয়রা নৃশংসভাবে লিবিয়ার জনগণের বিদ্রোহ দমন করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইতালিয়দের হাত থেকে ব্রিটিশ আর ফরাসীরা লিবিয়া দখল করে নেয়। ১৯৫১ সালে বর্তমান লিবিয়ার জন্ম হয়। ১৯৫৯ সালে তেলখনি আবিষ্কারের পর থেকে লিবিয়ার নতুন ইতিহাস লেখা শুরু হয়। ১৯৬৯ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে নেন। ২০১১ সালে পশ্চিমা হস্তক্ষেপে গাদ্দাফি সরকারের পতনের পর লিবিয়া অশান্ত রয়েছে।

২০১১ সালে গাদ্দাফিকে সরিয়ে দেবার পশ্চিমা চেষ্টায় ইতালিও সরাসরি অংশ নেয়। লিবিয়াতে নিজেদের স্বার্থকে সমুন্নত রাখতে ইতালির এখন আর গাদ্দাফিকে দরকার নেই। গাদ্দাফি পরবর্তী গৃহযুদ্ধ কবলিত লিবিয়াতে ইতালি এবং বাকি ইউরোপ তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থকে ছেড়ে দেয়নি। ২০১৮ সালে ইতালির সর্ববৃহৎ তেল কোম্পানি ‘ইএনআই’ লিবিয়ার তেলখনিতে বিনিয়োগ করে; এবং তাদের বিনিয়োগ সুরক্ষায় সেখানকার মিলিশিয়া গ্রুপগুলির সাথে নিরাপত্তা চুক্তি করে। লিবিয়ার তেল সবচাইতে বেশি রপ্তানি হয় ইতালিতে।

ইতালির অর্থনৈতিক দৈন্যদশা

ইতালির অর্থনীতি থেমে আছে। ২০০৭ সালে ইতালির জিডিপি যা ছিল, এখনও তার কাছাকাছিই আছে। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ বলছে যে, ইতালির রাষ্ট্রীয় ঋণ এখন ২ হাজার ২’শ ৪০ বিলিয়ন ডলার; যা পুরো ইতালির জিডিপির চাইতে ৩০ শতাংশ বেশি। খেলাপি ঋণে জর্জরিত ব্যাংকিং সেক্টর; ঋণ দেয়া প্রায় বন্ধ। ইতালির প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সংগঠন ‘কনফিন্ডাসট্রিয়া’র বোর্ড সদস্য পাওলো স্কুডেরি বলছেন যে, ইইউএর নীতির সাথে ইতালির ডানপন্থী সরকারের বিরোধ শুরু হবার পর থেকে ইতালিতে কেউ বিনিয়োগ করতে দুইবার চিন্তা করছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ইতালির অর্থনৈতিক দৈন্যদশাই ক্ষমতায় এনেছে ডানপন্থীদের। ইতালির উত্তরাঞ্চলের শিল্পাঞ্চলগুলির চাইতে দক্ষিণাঞ্চলে কম আয়ের এলাকাগুলিতে বেকারত্বের হার সবচাইতে বেশি; যেখানে ডানপন্থীরা শরণার্থী ঠেকানো এবং কর কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট পাচ্ছে। দক্ষিণের মানুষ চাকুরি হারিয়ে উত্তরের শিল্পাঞ্চলগুলিতে পাড়ি জমাচ্ছে। যথেষ্ট আয়ের অভাবে অনেক মধ্যবয়সীদের পরিবার নেই। ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’ বলছে যে, ২০১৪ সালের পর থেকে ইতালির যুবকদের মাঝে বেকারত্বের হার কমছে। ৪০ শতাংশের অধিক বেকার থেকে তা এখন ৩৩ শতাংশের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছে। অর্থাৎ প্রতি তিনজন যুবকের মাঝে একজন বেকার। গ্রীসের পর ইইউএর মাঝে এটা সর্বোচ্চ বেকারত্বের হার। এমতাবস্থায় দক্ষিণে লিবিয়া থেকে শরণার্থীর জোয়ার ইতালির জন্যে বিরাট দুঃসংবাদই বটে।

ইতালির দিকে হাত বাড়িয়েছে তুরস্কের কৌশলগত বন্ধু কাতার। লিবিয়াতে তুরস্কের পাশে কাতারেরও সমর্থন রয়েছে; আবার কাতারের নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছে তুরস্কের সেনারা। ইতালি তার অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে কাতারের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করতে চাইছে। ২০শে জানুয়ারি কাতার সফরে গিয়েছেন ইতালির প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাত্তারেলা। কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সাথে সাক্ষাৎ করেছেন তিনি। এর আগে ২০১৬ এবং ২০১৮ সালে ইতালি সফর করেন শেখ তামিম। আর ২০১৮ সালের এপ্রিলে কাতার সফর করেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী কন্টি। কাতারের নৌবাহিনীর জন্যে ৫ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের ৭টা যুদ্ধজাহাজ তৈরির ক্রয়াদেশ পেয়েছে ইতালি। কাতারে কাজ করছে প্রায় আড়াই’শ ইতালিয় কোম্পানি। অন্যদিকে ইতালির এড্রিয়াটিক সাগরের তীরে তৈরি করা টার্মিনালে কাতার থেকে আমদানি করা এলএনজি অবতরণ করছে। ইতালির ১০ শতাংশ গ্যাসের চাহিদা কাতার পূরণ করছে। ইতালিতে কাতারের বড় বিনিয়োগ রয়েছে আবাসন, হোটেল এবং এভিয়েশন খাতে; যেখানে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। মোটকথা লিবিয়ার সংঘাতে ইতালি, কাতার এবং তুরস্কের এক পক্ষে থাকার একাধিক কারণ রয়েছে।

শান্তি প্রচেষ্টার ভবিষ্যৎ কি?

১৯শে জানুয়ারি বার্লিনে লিবিয়ায় শান্তির বিষয়ে একটা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শুধু শক্তিশালী দেশগুলিই কথা বলেছে; ‘জিএনএ’ এবং ‘এলএনএ’ চুপ থেকেছে। আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’এর জেষ্ঠ্য বিশ্লেষক ক্লাউডিয়া গাজিনি বলছেন যে, বার্লিন কনফারেন্স দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ইউরোপিয়রা আঞ্চলিক শক্তিগুলির সাথে কথা বলে উত্তেজনা প্রশমণে ইচ্ছুক। কিন্তু এই ইচ্ছা কি উত্তেজনা প্রশমণে যথেষ্ট কিনা, তা অনিশ্চিত। ‘ইউরোপিয়ান কাউন্সিন অন ফরেন রিলেনশন্স’এর পলিসি ফেলো তারেক মাগেরিসি ‘আল জাজিরার’কে বলেন যে, এই আলোচনায় বোঝা যাবে যে, হাফতারকে যারা সমর্থন দিচ্ছেন, তারা হাফতারের উপর চাপ সৃষ্টি করার ব্যাপারে কতটা সততা রাখেন।

হাফতার মস্কো থেকে ফেরত এসেছেন যুদ্ধবিরতির চুক্তি না করেই। হাফতার এই আলোচনায় অংশ নেবার আগেই লিবিয়ার তেলখনির উৎপাদন প্রায় বন্ধ করে এসেছেন। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ বলছে যে, হাফতারের লোকেরা লিবিয়ার ব্রেগা, রাস লানুফ, হারিগা, জুয়াইতিনা এবং সিদ্রা বন্দরে তেল রপ্তানি করে দিয়েছে। লিবিয়ার তেল উৎপাদন এখন দৈনিক ১২ লাখ ব্যারেল থেকে নেমে মাত্র ৭২ হাজার ব্যারেলে এসে ঠেকেছে। এতে হাফতার তার শক্তিশালী অবস্থানকেই জানান দিয়েছেন। এই তেল বিক্রির অর্থ যাচ্ছে লিবিয়ার ‘ন্যাশনাল অয়েল কর্পোরেশন’ বা ‘এনওসি’এর কাছে, যা কিনা ত্রিপোলির অধীনে। অথচ তেলখনিগুলির নিয়ন্ত্রণ এখন হাফতারের কাছে! তেল বিক্রি বন্ধ করে হাফতার একইসাথে ত্রিপোলির ‘জিএনএ’ সরকারের উপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে এবং লিবিয়ার তেলের উপর নির্ভরশীল দেশগুলির উপর চাপ সৃষ্টি করছে, যাতে তারা ‘জিএনএ’কে সমর্থন দেয়া বন্ধ করে দেয়। চাপে পরা দেশগুলির শুরুতেই নাম আসবে ইতালির।

২০১৫ সাল থেকে ইউরোপিয়রা ‘অপারেশন সোফিয়া’ নামের একটা মিশনে লিবিয়ার উপকূল পাহাড়া দিতো। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ভূমধ্যসাগরে শরণার্থীদের পানিতে ডোবা থেকে বাঁচানো। কিন্তু ২০১৯ সালের মার্চে ইতালির প্রতিবাদে এই মিশন বন্ধ হয়ে যায়। ইতালি শরণার্থীদের দায়িত্ব নিতে নারাজ ছিল; তাদের কথা ছিল যে, শরণার্থীরা জাহাজ থেকে যেই দেশেই অবতরণ করুক না কেন, সেটা ইতালি হবে না। বার্লিন কনফারেন্সের পর ‘অপারেশন সোফিয়া’ আবারও শুরু করার কথা হচ্ছে। বলা হচ্ছে যে, এই মিশন লিবিয়ার উপকূলে অস্ত্রের চালানও আটকাবে। তবে এবারেও ইতালির অবস্থান হবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মিশনের মূল লজিস্টিক্যাল সাপোর্ট আসবে ইতালি থেকেই। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই অপারেশন চালিত হবে শুধুই সমুদ্রে; লিবিয়ার স্থলসীমানাগুলিতে নয়। অর্থাৎ স্থলসীমানা দিয়ে লিবিয়াতে অস্ত্র ঢোকার পথ খোলাই থাকছে। লিবিয়ার বেশিরভাগ স্থলসীমানা এখন হাফতারের নিয়ন্ত্রণে। 

২০শে জানুয়ারি কাতার সফরে গিয়েছেন ইতালির প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাত্তারেলা। কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সাথে সাক্ষাৎ করেছেন তিনি। ইতালির দিকে হাত বাড়িয়েছে তুরস্কের কৌশলগত বন্ধু কাতার। লিবিয়াতে তুরস্কের পাশে কাতারেরও সমর্থন রয়েছে; আবার কাতারের নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছে তুরস্কের সেনারা। ইতালি তার অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে কাতারের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করতে চাইছে। মোটকথা লিবিয়ার সংঘাতে ইতালি, কাতার এবং তুরস্কের এক পক্ষে থাকার একাধিক কারণ রয়েছে।


ইতালি আর কি করতে পারে?

পৃথিবীর ৮ম বৃহত্তম অর্থনীতি হয়েও ইতালি তার অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে রাজনৈতিক প্রভাবে রূপ দিতে পারেনি। ৮ম বৃহত্তম দাতা দেশ হয়েও ইতালি আফ্রিকার রাজনীতিতে ফ্রান্স বা ব্রিটেনের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ নয়। সবচাইতে শক্তিশালী ১০টা নৌবহরের একটা থাকার পরেও ভূমধ্যসাগরই ইতালির নিয়ন্ত্রণে নেই; অন্যান্য সাগর নিয়ে কথা বলা অমূলক। সেরা ১০টা অস্ত্র রপ্তানিকারক রাষ্ট্রের মাঝে থেকেও ইতালির ভূরাজনৈতিক প্রভাব নগন্য। ১৮৭১ সালে একত্রীকরণের পর থেকে ইতালি কখনোই ইউরোপের অন্যান্য শক্তিশালী রাষ্ট্রের সাথে পেরে ওঠেনি; ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও রাশিয়ার কাছে ইতালি ‘লিটল ব্রাদার’ থেকেছে সর্বদাই। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ফ্রান্সের পিছনেই থাকতে হয়েছে ইতালিকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেন এবং ফ্রান্স আফ্রিকাতে তাদের প্রাক্তন উপনিবেশগুলিতে প্রভাব ধরে রাখতে সচেষ্ট হলেও বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির পক্ষাবলম্বন করায় ইতালি সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। লিবিয়াও সেভাবেই ইতালির হাতছাড়া হয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে।

লিবিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি বেশ জটিল। তবে বার্লিন কনফারেন্স আবারও দেখিয়ে দিল যে, এই সংঘাতে শক্তিশালী দেশগুলির লক্ষ্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আর যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ দ্বারা প্রশিক্ষিত জেনারেল হাফতার মস্কো থেকে যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষর না করে চলে আসায় সকলেই হাফতারের লক্ষ্য নিয়ে কথা বলছেন। তুরস্ক এবং রাশিয়ার লিবিয়াতে জড়ানো নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও তারা যে এই যুদ্ধ বন্ধ করতে যথেষ্ট ক্ষমতা রাখে না, তা এখন নিশ্চিত। ইতালি বুঝতে পারছে যে, হাফতারকে সমর্থন দেয়া ফ্রান্সের সাথে সমঝোতা করে ইইউএর ছাতার নিচে কাজ করা কঠিন হবে।

লিবিয়া ইতালির ভৌগোলিক বাস্তবতা। ভূমধ্যসাগরে শরণার্থীবাহী নৌকাগুলিকে তারা ইতালির ভূখন্ডের চারিদিকে অবরোধের মতো দেখছে। আর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে উতপন্ন হওয়া শরণার্থী সমস্যা ইতালির নিয়ন্ত্রণে নয়। আফ্রিকা থেকে আসা শরণার্থীরা ইতালির জন্যে জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যু। তাই নিজের নিরাপত্তার জন্যেই লিবিয়ার সরকারকে নিজের পক্ষে রাখতে চাইবে ইতালি। কিন্তু হাফতারের হাতে ত্রিপোলির পতন হলে হাফতার কি ইতালিকে বন্ধু হিসেবে নেবে? বিশেষ করে এতোদিন ধরে ‘জিএনএ’কে সমর্থন দেবার পর হাফতার ইতালিকে কতটা বিশ্বাস করতে পারবেন? একইসাথে লিবিয়ার তেলের সরবরাহ ইতালির জন্যে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। আর তেলখনিগুলি হাফতারের নিয়ন্ত্রণে থাকলে ইতালিই সবচাইতে বেশি বিচলিত হবে। এই মুহুর্তে ‘জিএনএ’ সরকারকে সমর্থন করে যাওয়া ছাড়া ইতালির হাতে কোন অপশন নেই। ১৯১১ সালে ইস্তাম্বুলের হাত থেকে লিবিয়া ছিনিয়ে নিলেও শতবর্ষ পরে ‘জিএনএ’এর সমর্থক হিসেবে ইতালি শুধুমাত্র তুরস্ককেই তার পাশে দেখতে পাচ্ছে।