Showing posts with label US elections 2020. Show all posts
Showing posts with label US elections 2020. Show all posts

Wednesday, 2 December 2020

তুর্কি এবং সৌদিদের সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা ... মার্কিন নির্বাচনের ফলাফল?

০৩রা ডিসেম্বর ২০২০

 

২৭শে নভেম্বর ‘ওআইসি’র ৪৭তম বৈঠকের সাইডলাইনে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সউদএর সাথে মিলিত হন। সাম্প্রতিক চরম বিরোধপূর্ণ মার্কিন নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে যেব্যাপারে সকলেই নিশ্চিত তা হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখন অভ্যন্তরীণভাবে বিভাজিত। সাম্প্রতিক সময়ে দ্রুত আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাব হারাবার সাথে সাথে বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের ব্যাপারে কেউই নিশ্চিত হতে পারছে না। একারণে সৌদি আরব এবং তুরস্কের মতো যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী বন্ধু দেশগুলি ওয়াশিংটনের নীতির উপর নির্ভর করতে পারছে না। বাইডেন প্রশাসন ক্ষমতায় আরোহণের আগেই এই অস্থিরতাগুলি সামনে চলে আসছে এবং আবারও ভূরাজনৈতিক ব্যালান্স পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে।


২০শে নভেম্বর সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আব্দুলআজিজের সাথে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগানের ফোনালাপের পর তুর্কি প্রেসিডেন্টের অফিসের এক বার্তায় বলা হয় যে, দুই দেশ তাদের মাঝে বিরোধ নিরসন এবং সম্পর্কোন্নয়ন করার লক্ষ্যে আলোচনার পথ খোলা রাখার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। পরদিনই সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত ‘জি২০’ জোটের শীর্ষ বৈঠকে এরদোগান ভার্চুয়াল ভাষণ দেন। এরপর ২৭শে নভেম্বর ‘ওআইসি’র ৪৭তম বৈঠকের সাইডলাইনে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সউদএর সাথে মিলিত হন। কাভুসোগলু এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, দুই দেশের শক্তিশালী সম্পর্ক শুধু তাদের জন্যে নয়, পুরো অঞ্চলের জন্যেই সুবিধাজনক। নভেম্বরের কয়েকদিনের ভেতরেই দুই আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মাঝে সম্পর্কোন্নয়নের আভাস দেখা যাওয়াকে অনেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভূরাজনৈতিক ফলাফল হিসেবে দেখছেন।

‘ভয়েস অব আমেরিকা’ বলছে যে, বিশ্লেষকেরা তুরস্ক এবং সৌদি আরবের দ্বন্দ্বকে মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকায় চলমান সংঘাতের পিছনে দায়ি করছেন। তবে মার্কিন নির্বাচনে জো বাইডেনের জয়লাভের পর তুরস্ক এবং সৌদি আরব নিজেদের সম্পর্ককে নতুন করে চিন্তা করতে চাইছে। কাতারে তুরস্কের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত মিতহাত রেন্দে মত দিচ্ছেন যে, জো বাইডেনের প্রশাসন সৌদিদের সাথে সম্পর্ককে নতুন করে সাজাবে বলেই সৌদিরা প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছে। এর ফলে সৌদিরা এবং তুর্কিরা উভয়েই চিন্তা করতে শুরু করেছে যে, দু’দেশের মাঝে বৈরিতার সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে চালিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। আঙ্কারার ‘মিডলইস্ট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি’র অধ্যাপক হুসাইন বাগচি বলছেন যে, অতীতে সৌদিরা তুরস্কে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। এখন তুরস্কের বর্তমান অর্থনৈতিক দৈন্যদশার মাঝে তারা আবারও সৌদি বিনিয়োগ আশা করছে। ১৫ই নভেম্বর তুর্কি মিডিয়াতে বলা হয় যে, তুর্কি গোমাংস, খাশি, পোল্ট্রি, মাছ, দুধ, ডিম, মধু এবং আরও কিছু পণ্যের উপর সৌদিরা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এর আগ থেকেই সৌদিরা তুর্কি পণ্যের উপর অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা চালাচ্ছিল বলে বলছে তুর্কি মিডিয়া ‘ডেইলি সাবাহ’। ‘টারকিশ এক্সপোর্টার্স এসেম্বলি’ বলছে যে, এবছরের অক্টোবর পর্যন্ত সৌদি আরবে তুর্কি পণ্যের রপ্তানি ১৬ শতাংশ কমে ২ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। ২০১৯ সালে সৌদিরা তুরস্ক থেকে ৩ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছিল। তবে তুর্কি বাণিজ্যমন্ত্রী রুশার পেকান ‘ডেইলি সাবাহ’র সাথে সাক্ষাতে বলছেন যে, দুই দেশের বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমস্যাগুলি নিরসনে তারা সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ আশা করছেন। তিনি বলেন যে, সৌদিরা তাকে বলেছেন যে, সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে তুর্কি পণ্যের ব্যাপারে আলাদা কোন সিদ্ধান্তই হয়নি। তুর্কি সরকারি বার্তা সংস্থা ‘আনাদোলু এজেন্সি’ বলছে যে, সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল ইতোমধ্যেই কাতারের উপর সৌদি অবরোধ তুলে নেবার আভাস দিয়েছেন। ২০১৭ থেকে উপসাগরীয় দেশগুলি কাতারের উপর অবরোধ দিয়েছে, এবং কাতারের পক্ষ নেবার কারণে তুরস্কেরও বিরোধিতা করেছে।

‘আল জাজিরা’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনসুলেটে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যাকান্ডের পর থেকে তুরস্ক সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের বিরুদ্ধে শক্ত ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। ‘অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি’র এমরে চালিসকান বলছেন যে, এতদিন খাশোগির হত্যাকান্ড নিয়ে সরব থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তুর্কিরা খুব সম্ভবতঃ তাদের ভাষা পরিবর্তন করে অপেক্ষাকৃত নরম সুরে কথা বলছে। ইস্তাম্বুলের এক আদালতে সৌদিদের অনুপস্থিতিতে খাশোগি হত্যার বিচার চলছে। তুর্কি সরকার বরাবরই এই মামলার শুনানির ব্যাপারে বিশ্বব্যাপী প্রচারণা চালালেও নভেম্বরের শেষের দিকে শুনানির ব্যাপারে তুর্কি সরকার বা কোন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কোন কথা বলা থেকে বিরত থাকেন। আগামি মার্চ মাস পর্যন্ত এই মামলার শুনানি মুলতুবি করা হয়েছে। চালিসকান বলছেন যে, এরদোগান বাস্তববাদিতার চ্যাম্পিয়ন। কাজেই তুর্কি এবং সৌদিরা অবশ্যই একত্রে কাজ করার ব্যাপারে সুযোগ বের করে নেবে।

‘আনাদোলু এজেন্সি’র এক বিশ্লেষণে জনাথন ফেনটন হারভি বলছেন যে, একসময় বিভিন্ন ইস্যুতে তুরস্ক এবং সৌদি আরব একত্রে কাজ করেছে; বিশেষ করে সিরিয়ার যুদ্ধে বাশার আল আসাদের সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী গ্রুপগুলিকে সহায়তা দিয়েছে উভয়েই। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যুবরাজ বিন সালমান ক্ষমতাশালী হবার পর থেকেই তুরস্কের সাথে সৌদিদের দূরত্ব বাড়তে থাকে। সিরিয়ার বাশার সরকারের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন এবং লিবিয়াতে জেনারেল খলিফা হাফতারকে সমর্থন প্রদান আঞ্চলিকভাবে সৌদি আরবকে তুরস্কের বিপক্ষে দাঁড় করায়। সৌদি মিডিয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসায়িক সংগঠনগুলির মাঝেও তুরস্ক বিরোধী মনোভাব দানা বাঁধতে থাকে। দুই দেশের রাষ্ট্রীয় কর্তাব্যক্তিদের মাঝে বিভেদ বেশ খানিকটা। তুরস্কের কর্মকর্তাদের মাঝে কেউ কেউ এখনই সৌদিদের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের ব্যাপারে উপসংহার না টেনে আরও কিছুদিন দেখার পক্ষপাতি। সৌদিরাও মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি তুরস্কের ক্ষমতাসীন ‘একে পার্টি’র সমর্থনকে ভুলে যেতে পারছে না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে নির্বাচনী প্রচারণার সময়েই জো বাইডেন বলেছেন যে, তিনি সৌদিদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে পুনর্বিবেচনা করবেন; বিশেষ করে জামাল খাশোগি হত্যা এবং ইয়েমেনের যুদ্ধ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারগুলিকে তিনি প্রাধান্য দেবেন। এটা পরিষ্কার যে, তুরস্ক আর সৌদি আরবের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। সাম্প্রতিক চরম বিরোধপূর্ণ মার্কিন নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে যেব্যাপারে সকলেই নিশ্চিত তা হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখন অভ্যন্তরীণভাবে বিভাজিত। সাম্প্রতিক সময়ে দ্রুত আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাব হারাবার সাথে সাথে বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের ব্যাপারে কেউই নিশ্চিত হতে পারছে না। একারণে সৌদি আরব এবং তুরস্কের মতো যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী বন্ধু দেশগুলি ওয়াশিংটনের নীতির উপর নির্ভর করতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনকে কাজে লাগিয়ে করা কর্মকান্ডই এখন ওয়াশিংটনের চোখে ভিন্নরূপে দেখা দিচ্ছে, যা সৌদি এবং তুর্কিদের বিচলিত করেছে। বাইডেন প্রশাসন ক্ষমতায় আরোহণের আগেই এই অস্থিরতাগুলি সামনে চলে আসছে এবং আবারও ভূরাজনৈতিক ব্যালান্স পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে।

Tuesday, 1 December 2020

ইরানের শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানীর হত্যাকান্ড যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিভাজনেরই ফলফল

০১লা ডিসেম্বর ২০২০ 

মার্কিনীরা তাদের নিজেদের ঘরে মারাত্মকভাবে বিবাদে জড়িয়েছে, যার ফলাফল বিশ্বব্যাপী প্রকাশ পাচ্ছে। এটা পরিষ্কার যে, ট্রাম্প প্রশাসন হোয়াইট হাউজ ছাড়ার আগে নিশ্চিত করতে চাইছে যে, পরবর্তী বাইডেন প্রশাসনের জন্যে ইরানের সাথে নতুন করে চুক্তি করা যেন কঠিন হয়ে যায়। ইরানের জন্যেও এখন জাতীয় গৌরব রক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আবার আলোচনায় বসাটা দুরূহ হয়ে গেলো।

গত ২৭শে নভেম্বর ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পের শীর্ষ বিজ্ঞানী মোহসেন ফাখরিজাদেহ আজানা আততায়ীদের হাতে নিহত হবার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। ইরানের সম্ভাব্য প্রত্যুত্তরই শুধু নয়, এই হত্যাকান্ডের পিছনে ইস্রাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিভাজনও আলোচনায় আসছে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, ফাখরিজাদেহ ছিলেন ইরানের পরমাণু অস্ত্র প্রকল্পের জনক। সে হিসেবে হামলাকারীরা ইরানের পরমাণু প্রকল্পে এর চাইতে বড় কোন টার্গেট পেতে পারে না। ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মাঝে ইরানের ৪ জন পরমাণু বিজ্ঞানী রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করে। ইরানিরা ইস্রাইলকেই এই হামলাগুলির জন্যে দোষারোপ করেছিল। এবার ইস্রাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এব্যাপারে কোন মন্তব্য করতে রাজি না হলেও বিশ্লেষকেরা ইস্রাইলকেই এব্যাপারে দায়ি করছেন। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ কর্তাব্যক্তিদের হত্যাকান্ড সাম্প্রতিককালে বড় খবর হয়েছে। ২০১৯এর ২৭শে ডিসেম্বর ইরাকের কিরকুক শহরে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াদের রকেট হামলায় একজন মার্কিন কন্ট্রাক্টর নিহত হবার পর ৩রা জানুয়ারি বাগদাদ বিমানবন্দরে মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানের ‘আইআরজিসি’ বাহিনীর প্রধান কাসেম সুলাইমানিকে নিহত হন। এর প্রতিশোধ হিসেবে ৮ই জানুয়ারি ইরানিরা ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের দু’টা সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করে, যেখানে কেউ হতাহত হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিবাদ

মার্কিন অভ্যন্তরীণ কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘এফবিআই’এর প্রাক্তন কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স এসিসট্যান্ট ডিরেক্টর ফ্র্যাঙ্ক ফিগলিউজি ‘এমএসএনবিসি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, ইস্রাইল বুঝতে পারছিল যে, ইরানের বিরুদ্ধে তারা কিছু করতে গেলে সেটা কয়েক সপ্তাহের মাঝেই করতে হবে; যতদিন ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আছেন। আর যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া ইস্রাইল খুব সম্ভবতঃ এরকম কোন কাজের মাঝে যাবে না। ট্রাম্প এই কাজগুলির দায়িত্ব নেবেন না; নিতে হবে বাইডেনকে। এটা পরিষ্কার যে, ট্রাম্প প্রশাসন হোয়াইট হাউজ ছাড়ার আগে নিশ্চিত করতে চাইছে যে, পরবর্তী বাইডেন প্রশাসনের জন্যে ইরানের সাথে নতুন করে চুক্তি করা যেন কঠিন হয়ে যায়। ইরানের জন্যেও এখন জাতীয় গৌরব রক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আবার আলোচনায় বসাটা দুরূহ হয়ে গেলো। আর ইরানও চাইবে ইস্রাইলের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে গেলে তা যেন ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি কয়েকদিনের মাঝেই সম্পন্ন হয়; বাইডেন ক্ষমতায় বসার আগেই। ফিগলিউজি মনে করছেন যে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মাঝেই হয়তো ইস্রাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিশোধমূলক আক্রমণ দেখা যাবে। তিনি আরও বলছেন যে, ইরাকে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়া গ্রুপগুলি বেশি সক্রিয় বিধায় সেখানেই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে হামলা হবার সম্ভাবনা বেশি।

তবে যুক্তরাষ্ট্রেই সকলে এক সুরে কথা বলছেন না। প্রাক্তন মার্কিন জেনারেল জ্যাক কীন ‘ফক্স নিউজ’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে বহুবার হামলা করলেও দেশটা যুক্তরাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি নয়; কিন্তু ইরানের পরমাণু প্রকল্প ইস্রাইলের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি। যেকারণে ইরানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইস্রাইলের নীতি সবসময়েই ভিন্ন ছিল। ইস্রাইলিরা সবসময়েই বিশ্বাস করেছে যে, ইরান গোপনে পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রকল্প চালিয়ে নিয়েছে। ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে ইস্রাইলিরা তেহরানের একটা গোডাউন থেকে বিপুল পরিমাণ গোপন দলিলপত্র চুরি করে তেল আভিভে নিয়ে আসে। সেই দলিলগুলি প্রমাণ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর করার পরেও ইরান তার বোমা তৈরির প্রকল্প থেকে সরে আসেনি। ইরানের নাতানজ পারমাণবিক স্থাপনা এবং ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির স্থাপনায় ইস্রাইলিরা হামলা করে দেশটার পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রকল্পকে পিছিয়ে দেবার চেষ্টা করে। জানুয়ারি মাসে কাসেম সুলাইমানিকে হত্যার পর ইরানিরা মার্কিন নির্বাচনকে মাথায় রেখেই হয়তো বড় কোন প্রতিশোধমূলক হামলা থেকে বিরত থাকে। এবারও জো বাইডেন নির্বাচনে জেতার কারণে ইরানিরা সেরকমই চিন্তা করতে পারে। ইরানিরা হয়তো মনে করতে পারে যে, বাইডেন প্রশাসন ইরানের উপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেবে।

 

ইরানের পরমাণু বিজ্ঞানীর গাড়ি। এই হত্যাকান্ডটা ছিল অন্য কোন হত্যাকান্ড থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। প্রায় হলিউড স্টাইলে রিমোট কন্ট্রোল মেশিন গানের মাধ্যমে এই হত্যাকান্ড চালনা করা হয়। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, এধরণের ঘটনা সামনের দিনগুলিতে সংঘাতের ভাষা পরিবর্তন করে দিচ্ছে। যুদ্ধবিগ্রহে প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন এক উচ্চতা অর্জন করেছে, যেখানে অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ সরাসরি অংশ নিচ্ছে না। হত্যাকান্ডের ধরণ নতুন ধরণের এক সংঘাতের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা ভূরাজনৈতিক ব্যালান্সকেও চ্যালেঞ্জ করতে পারে।


দীর্ঘমেয়াদী চিত্র

এই হত্যাকান্ডটা ছিল অন্য কোন হত্যাকান্ড থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। প্রায় হলিউড স্টাইলে রিমোট কন্ট্রোল মেশিন গানের মাধ্যমে এই হত্যাকান্ড পরিচালনা করা হয়। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, এধরণের ঘটনা সামনের দিনগুলিতে সংঘাতের ভাষা পরিবর্তন করে দিচ্ছে। যুদ্ধবিগ্রহে প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন এক উচ্চতা অর্জন করেছে, যেখানে অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ সরাসরি অংশ নিচ্ছে না। ড্রোন যুদ্ধ এই মুহুর্তে যথেষ্ট আলোচিত বিষয় হয়ে গিয়েছে; বিশেষ করে সিরিয়া, লিবিয়া এবং আজেরবাইজানের যুদ্ধে ড্রোনের সফল ব্যবহারের কারণে তা বারংবার আলোচনায় উঠে আসছে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপর গোয়েন্দাবৃত্তি এমনকি হামলার জন্যেও ব্যবহৃত হচ্ছে ড্রোন। কাসেম সুলাইমানিকেও ড্রোন হামলার মাধ্যমেই হত্যা করা হয়েছিল। ছোট ড্রোনগুলিও অতি দ্রুতই মারাত্মক সক্ষমতা দ্বারা সজ্জিত হচ্ছে। অনেকেই বলছেন যে, ড্রোন ব্যবহারের ফলে অনেক রাষ্ট্র বা গোষ্ঠী কম খরচেই গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতা অর্জন করে ফেলতে পারে; যেগুলির ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিকভাবে হতে পারে অতি গুরুত্ববহ। ইরান এই হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ নিক আর না নিক, এই হত্যাকান্ড নতুন ধরণের এক সংঘাতের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা ভূরাজনৈতিক ব্যালান্সকেও চ্যালেঞ্জ করতে পারে।

২০২০ সাল ইরানের জন্যে সকল দিক থেকেই খারাপ যাচ্ছে। এবছরেই ইরানের নাতানজ পারমাণবিক স্থাপনায় এক বোমা হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই স্থাপনায় পারমাণবিক বোমা তৈরিতে প্রয়োজনীয় ইউরেনিয়াম এনরিচমেন্টএর জন্যে ‘সেন্ট্রিফিউজ’ নামক যন্ত্র তৈরি করা হতো। অনেকেই এই হামলার পিছনে ইস্রাইলকেই দায়ি করেছে। তবে ইরান এই হামলার প্রতিশোধ হিসেবেও তেমন কিছু দেখাতে পারেনি, যা ইরানের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাকে আরও একবার প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। অনেকেই বলছেন যে, ইরান তার গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা এবং ব্যক্তিত্বদের রক্ষা করতে সক্ষম হচ্ছে না; উপরন্তু এরকম হামলার প্রত্যুত্তর দিতেও তার অক্ষম বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এই সকলকিছুই এমন সময়ে আসছে, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের বাজার সর্বনিম্ন এবং এর উপরে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের উপর নিষেধাজ্ঞা নতুন করে আরোপ করেছে। এছাড়াও অর্থনৈতিক মন্দার মাঝে থাকা অবস্থাতেই ইরানে আঘাত করেছে করোনাভাইরাস। মহামারি ঠেকাতে ব্যর্থতাই শুধু নয়, নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে মহামারির প্রকোপ সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য প্রদান, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারে ইউক্রেনের বেসামরিক বিমান ভূপাতিত করা এবং সেটা প্রথমতঃ অস্বীকার করা; এবং পরবর্তীতে আবার স্বীকার করে ক্ষতিপূরণ দেয়া; ইত্যাদি ঘটনা ইরানের রাষ্ট্রকে দুর্বল করেছে।

ইরান কি করতে পারে

অঞ্চলিকভাবেও ইরানের অবস্থান দুর্বল হচ্ছে। কাসেম সুলাইমানির হত্যার ফলে সিরিয়া এবং ইরাকে ইরানের অবস্থান যথেষ্টই দুর্বল হয়েছে। নভেম্বর মাসেই ইস্রাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পেও সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের সাথে বৈঠকে বসেন। এই বৈঠক ইরানের জন্যে মোটেই ভালো খবর নয়; কারণ এর মাধ্যমে ইস্রাইল, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো ইরানের শত্রু দেশগুলির একত্রে বসার আরেকটা সুযোগ তৈরি হয়েছে। আরব দেশগুলি তাদের অর্থনৈতিক মন্দার মাঝেও অস্ত্র ক্রয় বন্ধ রাখেনি। এছাড়াও সিরিয়ার যুদ্ধেও ইরানকে তুরস্কের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ইরাকেও ইরানের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করছে তুরস্ক এবং সৌদি আরব। লেবাননেও অর্থনৈতিক ধ্বস, বৈরুতের বিস্ফোরণ এবং সামাজিক অসন্তোষের কারণে ইরানের অবস্থান দুর্বল হচ্ছে। ইয়েমেনের যুদ্ধও প্রায় শেষের দিকে চলে এসেছে।

মার্কিন ভূরাজনৈতিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’এর প্রতিষ্ঠাতা ইয়ান ব্রেমার বলছেন যে, ইরানি পরমাণু বিজ্ঞানী হত্যার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্টের পক্ষে ইরানের সাথে নতুন করে আরেকটা চুক্তি করা কঠিন হবে। একইসাথে তিনি মনে করছেন যে, ইরান এমন কিছু করতে চাইবে না, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্টের অধীনে আরেকটা চুক্তি করাটা একেবারে অবাস্তব হয়ে যায়। ২০২০ সালে ইরানের জন্যে একমাত্র ‘ভালো’ খবর হলো, জো বাইডেন মার্কিন নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন। বাইডেন সরকারের হবু জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেইক সুলিভান এবং পররাষ্ট্র সচিব টনি ব্লিনকিন ইরানের সাথে আলোচনার ব্যাপারে আগ্রহী। এমতাবস্থায় ইরান হয়তো ইস্রাইলের কিছু কর্তাব্যক্তির বিরুদ্ধে হামলা করে প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করতে পারে। তবে ইরানের সক্ষমতা এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এই প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

মার্কিনীরা তাদের নিজেদের ঘরে মারাত্মকভাবে বিবাদে জড়িয়েছে, যার ফলাফল বিশ্বব্যাপী প্রকাশ পাচ্ছে। ইরানের শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানীর হত্যাকান্ড এরকমই একটা ঘটনা মাত্র। ওবামা প্রশাসনের সময় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ‘সিআইএ’এর প্রাক্তন ডিরেক্টর জন ব্রেনান ২৭শে নভেম্বর এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, ইরানের বিজ্ঞানীকে হত্যা করাটা ছিল একটা অপরাধমূলক এবং ঔধ্যত্বপূর্ণ কাজ। এর ফলে পাল্টাপাল্টি হামলায় আঞ্চলিক সংঘাতের সৃষ্টি হতে পারে। ইরানের নেতৃবৃন্দের উচিৎ হবে পরবর্তী প্রজ্ঞাবান এবং দ্বায়িত্বশীল মার্কিন নেতৃত্বের জন্যে অপেক্ষা করা; এবং ধৈর্য্যধারণ করে প্রতিশোধমূলক কর্মকান্ড থেকে দূরে থাকা। ব্রেনানের এই বার্তা যে ব্যাপারটা এড়িয়ে যায় তা হলো, তিনি ‘সিআইএ’এর নেতৃত্বে থাকার সময়েই ৪ জন ইরানি পরমাণু বিজ্ঞানীকে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি অবশ্য সেসময় চুপই ছিলেন। ব্রেনানের বার্তার জবাবে টেক্সাসের মার্কিন সিনেটর টেড ক্রুজ আরেক টুইটার বার্তায় বলেন যে, এটা অদ্ভুত ব্যাপার যে, ‘সিআইএ’এর একজন প্রাক্তন প্রধান নিয়মিতভাবে এমন একটা সরকারের পক্ষে কথা বলছে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের ধ্বংস কামনা করে। ক্রুজ আরও বলেন যে, ইরান ইস্রাইলকে সকল সময়েই আক্রমণ করে কথা বলে; জো বাইডেন কি এব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন? ক্রুজের বার্তার জবাবে জন ব্রেনান আবারও টুইটার বার্তায় বলেন যে, ক্রুজের আইনের তোয়াক্কা না করা এবং সবকিছু সাধারণভাবে নেবার চিন্তাটাই দেখিয়ে দিচ্ছে যে, তিনি টেক্সাসের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা রাখেন না।