Friday, 5 August 2016

তুরস্কের ব্যর্থ অভ্যুত্থান ও আমাদের জন্যে শিক্ষা

০৫ অগাস্ট ২০১৬

 
তুরস্কের জনগণ প্রমাণ করেছে যে ভূরাজনীতিক্তে তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ সেই দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্যে; সেই দেশের শাসকে জন্যে নয়, যাকে নিয়ে কিনা মিডিয়াতে সবচাইতে বেশি আলোচনা হচ্ছে।

তুরস্কের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান নিয়ে অনেক লেখা পড়া হয়ে গেছে সবার। তবে সেই ঘটনার মাঝে আমাদের জন্যে কি শেখার রয়েছে, সেটাই সবচাইতে বড় বিষয় হওয়া সত্ত্বেও সেখানেই তথ্যের সবচাইতে বড় ঘাটতি লক্ষ্যনীয়। আজকে সেই দিকটা নিয়েই আলোচনা করবো। ২০১৬ সালের প্রায় পাঁচ মাস বাকি; এখনই এই বছর একটা ঘটনাবহুল বছর বলে সবার কাছে পারিচিতি পেতে যাচ্ছে। প্রতি মাসে নয়, এমনকি প্রতি সপ্তাহেও নয়; একেবারে প্রতিদিনই কিছু কিছু বড় ধরনের ঘটনা দেখতে হচ্ছে টিভির পর্দায় এবং খবরের কাগজে। প্রতিদিন এরকম ওজনদার খবরের ভারে মানুষের নুয়ে পড়ার উপক্রম হচ্ছে। যদিও নিজেদের দেশের অভ্যন্তরে বিপদের আশংকার কথা বলছিলাম অনেকদিন থেকেই, এটা মোটামুটি জানা ছিল যে মাথার উপরে কিছু একটা ভেঙ্গে না পড়লে মানুষের সন্বিত ফেরে না। আর সেটা আমাদের ফিরেছে গুলশানের ঘটনার পরে। এখন আন্তর্জাতিক বড় ঘটনাগুলিকেও যেন খুব বেশি দূরের মনে হচ্ছে না।

তুরস্কের সমস্যা এর ইতিহাসের মাঝে নিহিত…

তুরস্কে কি কি ঘটেছে সেটা বর্ণনা না করে বরং ঘটনাগুলির অর্থ কি দাঁড়ায়, সেটা নিয়ে কথা বলবো; কারণ সেখানেই আমাদের জন্যে শেখার রয়েছে। প্রথমে বুঝতে হবে তুরস্কের রাজনীতির মূল বিষয়; যার মাঝ দিয়ে তুরস্কের ইতিহাস পর্যালোচনা জরুরি। ভূরাজনীতিতে তুরস্কের অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত সাড়ে চার’শ বছরের বেশি সময় ধরে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব ছিল ইস্তাম্বুলে। বিশ্বের মুসলিমদের স্বার্থরক্ষার দায়িত্ব ছিল ইস্তাম্বুলে আসীন খলিফার নেতৃত্বের উপরে। বিশ্বের বাকি মুসলিম শাসকগণও ইস্তাম্বুলকেই ইসলামের কেন্দ্র হিসেবে মেনে চলতেন এবং মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষার্থে খলিফার সাহায্য চাইতেন। এরকমই একটা উদাহরণ এর আগের একটা লেখায় দিয়েছিলাম, যখন খলিফা আচেহ-এর (ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের উত্তরে) সুলতানকে সহায়তা দান করেছিলেন পর্তুগীজদের থামাতে। সেটা ছিল খলিফার আদর্শিক হস্তক্ষেপ। ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে উসমানিয়া খিলাফতের অধীনের পুরো এলাকা ব্রিটিশরা দখল করে নেয় এবং ১৯১৬ সালের সাইকস-পিকো চুক্তির মাধ্যমে এই এলাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির জন্ম দেয়। এর মাঝে একটি দেশ হচ্ছে তুরস্ক, যার ক্ষমতা চলে যায় মুস্তফা কেমাল (কেমাল আতাতুর্ক) নামের একজন সামরিক অফিসারের হাতে। ব্রিটিশ-ফ্রেঞ্চরা কেমালকে ক্ষমতায় যেতে সবধরণের সহায়তা দান করেছিল। কেমাল ১৯২৩ সালে ক্ষমতা নিয়ে খিলাফত বিলুপ্ত ঘোষণা করেন এবং দেশ থেকে ইসলামের সকল চিহ্ন মুছে ফেলতে সক্রিয় হন। কেমালের অত্যন্ত কঠোর এই প্রক্রিয়াকে চালু রাখার দায়িত্ব নেয় কেমালের আদর্শে দীক্ষিত সেকুলার সেনাবাহিনী, যারা ব্রিটিশ-ফ্রেঞ্চদের দ্বারা সমর্থনপুষ্ট ছিল। এভাবে তুরস্কের জন্ম হয় ইউরোপিয়ানদের হাতে। তবে মার্কিনীরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দুনিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিতে গিয়ে তুরস্ককে ইউরোপিয় প্রভাব থেকে বের করে আনতে ব্যর্থ হয়। তবে মোটা দাগে কমিউনিজমের বিপক্ষে থাকায় যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে নিয়ে খুশিই ছিল, যদিও দেশটিতে গণতন্ত্রের প্রচলন ছিল না বললেই চলে।

১৯৬০, ১৯৭১, ১৯৮০ এবং ১৯৯৭ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তুরস্কের সেনাবাহিনী বন্দুকের নলের ভয় দেখিয়ে রাজনীতিতে ইসলামের প্রবেশ রোধ করে, যদিও মানুষ বারংবার ইসলামের পক্ষেই রায় দিচ্ছিল। কেমালের তৈরি সেনাবাহিনীর এই স্বেচ্ছাচারিতা এবং পশ্চিমাদের তাতে পরোক্ষ সমর্থন তুরস্কের জনগণের মাঝে সেকুলার-বিরোধী এবং পশ্চিমা-বিরোধী মনোভাবের জন্ম দেয়। এই সুযোগে রিসেপ তাইয়িপ এরদোগানের একেপি দলের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের রাজনীতিতে ঢুকে পড়ে। একেপি নামমাত্র ইসলামিক দল হিসেবে জনগণের ভোট আদায়ে সক্ষম হয় এবং ২০০২ সাল থেকে ধীরে ধীরে ইউরোপিয় সমর্থিত সেনাবাহিনীর সেকুলার অংশের ক্ষমতা কমতে থাকে। ইসলামের নামে রাজনীতি করার কারণে এরদোগানকে জনগণ ক্ষমতা প্রদান করতে থাকে এবং সেই ক্ষমতা এরদোগান তার বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে থাকেন। তবে ইস্তাম্বুলের সুলতানরা যেভাবে মুসলিম বিশ্বকে সহায়তা দিয়েছিল, সেটা এরদোগান করেননি। বরং মার্কিনীদের স্বার্থই রক্ষা করে চলেছেন তিনি। তুরস্কের পাশেই সিরিয়াতে পাঁচ বছরে পাঁচ লক্ষ মুসলিমের জীবনাবসানও এরদোগানকে নড়াতে পারেনি, কারণ সেটা করতে গেলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরাগভাজন হতেন। তবে তুরস্কের মানুষ এরপরেও এরদোগানের সাথেই থাকে, কারণ তাদের কাছে এরদোগানের শাসন কেমালের সেকুলার সামরিকতন্ত্রের কঠোরতার তুলনায় ভালো মনে হয়েছে। তুরস্কও আশেপাশের দেশগুলির যুদ্ধ থেকে দূরে থেকে নিজেকে বাঁচিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তুরস্কের এই নীতি পছন্দ হয়নি। তারা তুরস্ককে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাস-বিরোধী যুদ্ধে সরাসরি যুক্ত দেখতে চেয়েছে। এরদোগান যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে নামতে পারেননি তুরস্কের জনগণের সমর্থনের অভাবে। পরপর কয়েকটি জঙ্গী হামলাও তুরস্কের নীতি পরিবর্তন করতে পারেনি।
 
কেমাল আতাতুর্কের বিভীষিকাময় সেকুলার-তন্ত্রের ভয়েই তুরস্কের জনগণ রাস্তায় নেমে ট্যাঙ্কের সামনে জীবন দিয়েছে। ইসলামের উপরে আঘাত ঠেকাতেই তারা এটা করেছে; এরদোগানকে বাঁচাতে নয়!

সেকুলার বিদ্রোহ…

ঠিক এই সময়টাতেই সামরিক অভ্যত্থানের সূচনা হয়, যখন অভ্যত্থানকারীরা টিভি স্টেশন দখল করে এটাকে জোর গলাতেই ‘সেকুলার অভ্যুত্থান’ বলে আখ্যা দিতে থাকে। বিদ্রোহী সেনাদের এই শব্দগুলি শুনে তুরস্কের মানুষ চোখের সামনে আবারও কেমালের বিভীষিকাময় আধ্যায়কে দেখতে পায়। যদিও ইউরোপীয় সমর্থিত সেকুলার গোষ্ঠী এই অভ্যুত্থানে জড়িত থেকেছে, তথাপি তুরস্কের মাটিতে ইনচিরলিক বিমান ঘাঁটি (যা কিনা মার্কিনীরা নিয়ন্ত্রণ করে) এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেয়ায় সন্দেহের তীর যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই তাক হয়। এরদোগান এই সুযোগে যুক্তরাষ্ট্র-প্রবাসী ফেতুল্লা গুলেনকে অভ্যুত্থানে জড়িত থাকার কথা বলতে থাকেন, যদিও সবাই জানে যে গুলেনের দল নিতান্তই দন্তহীন। এরদোগান এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়ে দেবেন, যাদের একটা বড় অংশ থাকবে ইউরোপিয়-সমর্থিত সেকুলার সমাজের লোকজন।

তবে এরদোগান কর্তৃত্ব করতে চাচ্ছেন বলে ‘মানবাধিকার’এর দোহাই দিয়ে এখন আবার পশ্চিমা-সমর্থিত অভ্যুত্থানকারীদেরও বাঁচানোর চেষ্টা চলবে। দেশের বিরুদ্ধে, দেশের জনগণের বিরুদ্ধে, ইসলামের বিরুদ্ধে যে লোকগুলি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো, তাদেরকেই এখন ‘দয়া’ দেখানোর কথা বলা হবে। অথচ এদের হাতে বহু তুর্কী মৃত্যুবরণ করেছে। আবার তুরস্কের ভেতরে যুগ যুগ ধরে subversion চালানো এজেন্টরা ধরা পরে যাবার পরে এখন বিদেশের দিকে চেয়ে থাকবে। এরা বিভিন্ন সময়ে সামরিক অভ্যুত্থান সফল করতে সেকুলার সেনাদের সরাসরি সমর্থন দিয়ে তুর্কী জনগণের বিরুদ্ধে নিজেদের দাঁড় করিয়েছে। বিদেশী এজেন্টদের এহেন জঘন্য কার্যকলাপের পরেও এদের বাঁচানোর চেষ্টাটা নিঃসন্দেহে অভ্যুত্থানকারীদের প্রতি পশ্চিমাদের সরাসরি সমর্থনের বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করবে। এরদোগান যুক্তরাষ্ট্রের দিকে আঙ্গুল তাক করবেন দেশের মানুষের যুক্তরাষ্ট্র-বিরোধী চেতনাকে কাজে লাগানোর জন্য। গাজা অপারেশনের সময়ে ইস্রাইলীরা তুরস্কের সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মেরে ফেললেও এরদোগান কিন্তু মুখেই বকর বকর করেছিলেন; কাজে কিছুই করেননি। এবারেও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তিনি শুধু মুখেই খই ফোটাবেন।

এরদোগানের প্রতিদ্বন্দ্বী সরানোর কার্যকলাপ ইউরোপিয়রা পছন্দ করছে না এবং তুরস্ককে ন্যাটো থেকে বের করে দেবার কথাও তারা তুলছেন। কিন্তু যেই তুরস্ক সাড়ে চার’শ বছরেরও বেশি সময় মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব দিয়েছে, যে তুরস্ককে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করা হয়েছে যাতে তাদের ইসলামের নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা না থাকে, যে তুরস্কে ইসলামের পূনরাবির্ভাব ঠেকাতে সামরিক অভ্যুত্থান সমর্থন করেছে পশ্চিমারা, যে তুরস্ককে তার ইতিহাস থেকে সরিয়ে রাখতেই তাকে ন্যাটোর মাঝে আটকে রাখা হয়েছে, সেই তুরস্ককে একুশ শতকে এসে ছেড়ে দেবার পাত্র যুক্তরাষ্ট্র নয়। ন্যাটোর সদস্যপদই তুরস্ককে ভূরাজনৈতিকভাবে আটকে রাখার পদ্ধতি। আর এই আটকে রাখার চেষ্টা যে স্থায়ী হবে না, সেটা পশ্চিমারা জানেন অনেক আগ থেকেই। ভূরাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব স্যামুয়েল হান্টিংটনের কথায়ঃ

“What, however, if Turkey redefined itself? At some point, Turkey could be ready to give up its frustrating and humiliating role as a beggar pleading for membership in the West and to resume its much more impressive and elevated historical role as the principal Islamic interlocutor and antagonist of the West…. Having experienced the bad and the good of the West in secularism and democracy, Turkey may be equally qualified to lead Islam. But to do so it would have to reject Ataturk’s legacy more thoroughly than Russia has rejected Lenin’s”.

হান্টিংটন এই কথাগুলি লিখেছিলেন তার “The Clash of Civilizations and the Remaking of World Order” বইতে, যা দুই দশক আগে প্রকাশিত হয়েছিল। হান্টিংটন এখানে এরদোগান বা কোন রাজনৈতিক দলের কথা চিন্তা করে এই কথাগুলি বলেননি; বলেছিলেন তুরস্কের মানুষের কথা চিন্তা করে, কারণ ভূরাজনীতিতে রাজনৈতিক দলের গুরুত্ব খুব কম, বরং জনগণের গুরুত্ব বেশি। রাজনৈতিক দল আসবে-যাবে, কিন্তু দেশ চলবে জনগণ যেদিকে যেতে যায়, সেদিকে। তাই তুরস্কের প্রকৃত মূল্যায়ন করতে এবং অভ্যত্থান চেষ্টার বাস্তবসম্মত হিসেব কষতে গেলে তুরস্কের জনগণ কি চায়, সেটা বুঝতে হবে।

তুরস্কের ভূরাজনীতি তুরস্কের জনগণের হাতে, এরদোগানের হাতে নয়

অভ্যত্থান চেষ্টা প্রথমে দেখে মনে হচ্ছিল সফল হচ্ছে, কিন্তু সব পালটে গেল যখন ৩০-৪০ জনের একদল সাহসী বেসামরিক লোক “আল্লাহু আকবার” ধ্বনি দিয়ে বিদ্রোহী সেনাদের ট্যাঙ্কের সামনে চলে আসে। সৈন্যরা ভয় পেয়ে গুলি চালিয়ে বসে; তারা চিন্তাও করেনি যে কতবড় ভুল তারা করেছে। বীর এই বেসমরিক নাগরিকদের লাশ রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে তুরস্কের মানুষ আর নিরপেক্ষ হয়ে বসে থাকতে পারেনি। কেমালের দুস্বপ্ন তাদের পেয়ে বসে এবং দলে দলে তারা বিদ্রোহকারীদের উপরে চড়াও হয়। রাস্তায় মানুষ দেখে সেনাবাহিনীতেও একই ঘটনা ঘটে। ইনচিরলিক ঘাঁটিতে বিপদের বাঁশি বেজে ওঠে। মার্কিনীরা বুঝে ফেলে যে কিছুক্ষণ আগেও যা নিশ্চিত বলে মনে হচ্ছিল, তা এখন পুরোপুরি অনিশ্চিত। রাস্তায় মোতায়েন বিদ্রোহী সেনারা আত্মসমর্পণ করতে থাকে এবং জনগণ খালি হাতে এদের উপরে প্রতিশোধ নিতে থাকে। ট্যাঙ্কের সামনে আত্মাহুতি দেয়া মানুষগুলি এরদোগানের প্রতি ভালোবাসার কারণে জীবন উতসর্গ করেনি, করেছে ইসলামের উপরে আঘাতের আশংকায়। জনগণের এই চিন্তাটাই স্যামুয়েল হান্টিংটনসহ অন্যান্য পশ্চিমা চিন্তাবিদেরা বুঝেছিলেন। যেকারণে তুরস্ককে নিয়ন্ত্রণে রাখাটা তাদের কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ ঠেকেছে সবসময়।

আইসিস-এর হামলা তুরস্ককে নড়াতে পারছিল না, তাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তুরস্ককে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় ছিল পশ্চিমারা। এখানে এরদোগান আসলে তেমন বড় কোন বিষয় নয়, যদিও মিডিয়া এরদোগানকেই বড় করে প্রচার করছে। এরদোগানকে ছোট্ট করে ফেলেছে সাধারণ মানুষের ছোট্ট একটি দল, যারা বিশাল হৃদয় নিয়ে ট্যাঙ্কের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। জনগণের শক্তির সামনে ‘সুলতান এরদোগান’ নামে খ্যাত পশ্চিমের বন্ধুটিকে দুর্বল মনে হয়েছে। জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীও হতে যাচ্ছিলেন তিনি। ঠিক সেসময় তুরস্কের জনগণ দেখিয়ে দিল যে ভূরাজনীতি তারাই নিয়ন্ত্রণ করে, এরদোগান নয়।
  
পারভেজ মুশাররফ যুক্তরাষ্ট্রকে সেবা করার জন্যেই ক্ষমতা দকল করেছিলেন। আর যুক্তরাষ্ট্র তাকে বন্ধুরূপে নেয়াতে বোঝা হয়ে গেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গণতন্ত্রের মূল্য কতটুকু। পশ্চিমাদের কথায় চললে কি হয়, সেক্ষেত্রে পাকিস্তান আমাদের জন্যে একটা বাজে উদাহরণ হয়ে আছে। আর যা-ই হোক পাকিস্তান হওয়া যাবে না!

আমরা কি করবো, তার আগে বরং ঠিক করি “কি করবো না”

তুরস্কের জনগণের ভাষা বুঝতে যদি আমরা ভুল করি, তাহলে জনগণের শক্তিকেও আমরা বুঝতে ভুল করবো। পশ্চিমারা মুসলিম বিশ্বের সাথে যে নিয়ন্ত্রণমূলক নীতি নিয়েছে, সেটা থেকে উদ্ধার পেতে জনগণকে একত্রিত হতে হবে। ভূরাজনীতিতে আমাদের অবস্থান বোঝার সময় আমাদের হয়েছে। আদর্শিক যুদ্ধের পূণরাবির্ভাবের মাঝে আমাদের অবস্থান কোথায়, সেটা বুঝতে হবে আমাদের। পাকিস্তানের মতো ভুল পথে চললে দেশের এবং দেশের মানুষের উপরে ভয়াবহ বিপর্যয় চলে আসবে।

২০০১ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর সকালে পাকিস্তানের সামরিক শাসক পারভেজ মুশাররফ বৈঠক করছিলেন আগের রাতে নিউ ইয়র্কে ঘটে যাওয়া ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে, যখন মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব কলিন পাওয়েলের ফোন এলো। মুশাররফ বললেন যে বৈঠক শেষে কল-ব্যাক করবেন। কিন্তু পাওয়েল চাইলেন যে মুশাররফ যেন বৈঠক ছেড়ে এসে ফোন ধরেন। আজ্ঞাবহ দাসের মতো মুশাররফ তা-ই করলেন। পাওয়েল বললেন, “You are either with us or against us”. পরদিন পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর প্রধান, যিনি তখন ওয়াশিংটনে ছিলেন, জানালেন যে ডেপুটি পররাষ্ট্র সচিব রিচার্ড আরমিটেজ তাকে বলেছেন পাকিস্তানকে ঠিক করতে হবে যে তারা কোন দলে থাকবে। যদি পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে অবস্থান নেয়, তাহলে পাকিস্তান “should be prepared to be bombed back to the Stone Age.” মুশাররফ এসবকিছু বর্ণনা করেছে তারা বই “In the Line of Fire: A Memoir”-এ। তিনি পাকিস্তানের যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতি স্বীকার প্রসঙ্গে বলেছেনঃ

“My decision was based on the well-being of my people and the best interests of my country – Pakistan always comes first. I war-gamed the United States as an adversary. There would be a violent and angry reaction if we didn’t support the United States. Thus the question was: if we do not join them, can we confront them and withstand the onslaught? The answer was no, we could not”.

পারভেজ মুশাররফের এই সিদ্ধান্ত পাকিস্তানকে কোথায় নিয়ে গেছে, তা আজ সকলের সামনে পরিষ্কার। এটা বলতে দ্বিধা করি না যে মুশাররফের মতো নেতৃত্ব আমাদের দেশে আসেনি বলেই আমরা এখনো পাকিস্তানের মতো ব্যর্থ রাষ্ট্র হয়ে যাইনি। নাহলে এদেশে জঙ্গী তৈরির কারখানাকে ফুয়েল দিতে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন ঘাঁটি তৈরি করা থেকেও আমরা পিছপা হতাম না। সেই ড্রোন ঘাঁটি ব্যবহার করে ‘ভুল করে’ হামলা করা হতো কওমী মাদ্রাসাগুলিতে, আর তারপর থেকে জঙ্গী তৈরির প্রোডাকশন লাইন প্রস্তুত হয়ে যেত! সেই জঙ্গীদের দিয়ে হামলা করাতো সেনাবাহিনীর পরিবারদের উপরে, যাতে সেনাবাহিনী ক্ষেপে গিয়ে জঙ্গীদের পরিবার নিশ্চিহ্ন করে ফেলে – ঠিক যা যা পাকিস্তানে করা হয়েছে। দেশকে টুকরা টুকরা করে ফেলার চমতকার এক ফর্মূলা, যা পাকিস্তানে বেশ সফলতা পেয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে সমস্যা যে পাকিস্তানের সরকার নয়, বরং সেদেশের জনগণ, তার প্রমাণ আমরা পাই প্রাক্তন মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিলারি ক্লিনটন-এর লেখা ‘Hard Choices’ বইতে। তিনি সেখানে লিখেছেন যে ২০০৯ সালে পাকিস্তানের জনগণের মুখোমুখি হতে তিনি কতটা শঙ্কিত ছিলেন। তিনে লিখেন যে, “পাকিস্তানের অবস্থা খারাপ হওয়ার সাথে সাথে পাকিস্তানিদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বিদ্বেষও বাড়তে থাকে। এক্ষেত্রে পাকিস্তানের মিডিয়াগুলো অসন্তোষের আগুনে বরাবরই ডিজেল ঢেলেছে। তারা পাকিস্তানে তালিবান দৌরাত্ম বাড়ার জন্যে বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছে। এছাড়াও আরও প্রচার হতে থাকে, যুক্তরাষ্ট্র নাকি ভারতের সাথে হাত মিলিয়ে পাকিস্তানের পেছনে লেগেছে। এসব ছাড়াও আরও অনেক কারণে, বছরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দেয়ার পরেও, পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র-বিরোধী মনোভাব বাড়তেই থাকে। আর এজন্যেই পাকিস্তান সরকারের পক্ষেও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কাজ করা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠতে থাকে”। এখানে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো হিলারি ক্লিনটন পাকিস্তানের সরকারকে বন্ধু মনে করছেন; আর জনগণকে মনে করছেন সমস্যা! এ-ই হলো গণতন্ত্রের তথাকথিত ধারক ও বাহক। তিনি আরও বলেন, “উদ্দেশ্য … পাকিস্তানিদের মাঝে যুক্তরাষ্ট্র-বিরোধী মনোভাব কমানো। …… সবাই বললো, ‘পাবলিক মনের ঝাল সব আপনার উপর ঝাড়বে’। আমি বললাম, ‘ঝাড়তে দাও’”। তিনি লাহোরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সাথে এক বৈঠক করতে গিয়ে অত্যন্ত বাজে সব প্রশ্নের সন্মুখীন হন। তিনি নিজেই স্বীকার করেন যে তিনি ছাত্রছাত্রীদের উত্তর দিয়ে খুশি করতে পারেননি।

এ প্রসঙ্গে তার বই থেকে এ-ও তুলে ধরতে পারি - “২০০৭ সালের এক জরিপে দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তুর্কীদের সমর্থন ৯ শতাংশে নেমে এসেছে”। আবার, তিনি এরদোগান (তখন প্রধানমন্ত্রী) সম্পর্কে বলছেন যে, “যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারে খুবই আন্তরিক এই তুর্কী প্রধানমন্ত্রী”। এখানে আমরা তুর্কী জনগণ এবং পাকিস্তানের জনগণের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের একই রকম নীতি দেখতে পাই। আবার তুর্কী রাজনীতিবিদ এবং পাকিস্তানের রাজনীতিবিদদের সাথে মার্কিনীদের সুসম্পর্কের ব্যাপারে জানতে পারি। এটা আমাদেরকে অবাক করার কথা নয়, কারণ মিশরের হোসনি মুবারক ও এল-সিসি, জর্ডানের বাদশা হুসেন ও বাদশা আবদুল্লাহ, সৌদি রাজপরিবার, ওমানের আমির, ইত্যাদি যত সব একনায়করা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সবসময় সমর্থন পেয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসিদ্ধি করার অপর নামই হচ্ছে গণতন্ত্র!

১৯৯৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পারভেজ মুশাররফ পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করে আফগানিস্তান-পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ বাস্তবায়ন করেন, যদিও ততকালীন নওয়াজ শরীফ সরকারের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক খারাপ ছিল না। তুরস্কেও হয়তো অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়া-ইরাক-তুরস্কসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে তার স্বার্থ বাস্তবায়ন করতো, যদিও এরদোগানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক খারাপ ছিল না। ভূরাজনীতি এখানে আমাদের জন্যে কয়েকটি শিক্ষনীয় ব্যাপার রেখেছে।

আমরা যা শিখলাম

প্রথমতঃ তুরস্কের জনগণ প্রমাণ করেছে যে ভূরাজনীতিতে তুরস্কের গুরুত্ব তুরস্কের জনগণের কারণে। তাদের মার্কিন সমর্থিত সরকার শুধুমাত্র তুর্কী জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখার পশ্চিমা চেষ্টায় ফুয়েল দিচ্ছে। অভ্যুত্থান ব্যর্থ করে দিয়ে তুর্কী জনগণ মার্কিন পরিকল্পনায় পানি ঢেলে দিয়েছে। পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ হবার কারণও পাকিস্তানের জনগণ, তাদের মার্কিন তাঁবেদার সরকার নয়। ঠিক একইভাবে, বাংলাদেশের মানুষকেও একত্রিত হতে হবে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন রুখতে। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্যে, অন্য কোন কারণে নয়। দেশের স্বার্থ, দেশের জনগণের স্বার্থ, ইসলামের স্বার্থ বুঝতে হবে ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হলে। দেশের মানুষকে এই প্রসেসে সরাসরি যুক্ত করাটা জরুরি। চিন্তাহীন জাতির সামনে চিন্তার দুয়ার খুলে দিতে হবে, যাতে তারা বিদেশী ষড়যন্ত্র ধরতে পারে। জনগণের উপরে চাপ সৃষ্টি করাটা পশ্চিমা উদ্দেশ্য; জনগণকে সচেতন ও সম্পৃক্ত করাটা হবে আমাদের উদ্দেশ্য।

দ্বিতীয়তঃ পশ্চিমা চাপে নতি স্বীকার না করলে নয়, বরং করলেই একটা দেশের সর্বনাশ হবে। পাকিস্তান এর উতকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে আছে। আমাদের সেই উদাহরণ এড়িয়ে চলা উচিত। আমরা পশ্চিমা পরিকল্পনার ঘোরের মাঝে পড়ে গেলে আর কোনদিন উঠতে হবে না সেখান থেকে। পশ্চিমা চাপের কাছে নতি স্বীকার করা যাবে না; অন্যথায় পাকিস্তান হতে হবে!
  
বঙ্গবন্ধুর 'অসমাপ্ত জীবনী'তে আমরা দেখতে পাই তিনি কিভাবে জেলের ভেতর সৃষ্টিকর্তাকে খুঁজেছেন। তিনি নিঃসন্দেহে কেমাল আতাতুর্কের মতো ইসলাম-ত্যাগীদের অধীনে থাকতে পারতেন না। ইসলাম ত্যাগ নয়, বরং ইসলামকে জানার মাঝেই রয়েছে পশ্চিমা ষড়যন্ত্র রোখার মূলমন্ত্র।

তৃতীয়তঃ ভূরাজনীতিতে তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ এর ঐতিহ্যপূর্ণ ইসলামি ইতিহাসের জন্যে, কেমাল আতাতুর্কের ‘অন্ধ-সেকুলারিজম’-এর জন্যে নয়। ধর্মান্ধতা যেমন পরিবেশ দূষণ করে, ঠিক তেমনি ‘অন্ধ-সেকুলারিজম’-ও তা-ই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’-তে তাঁর বহুবার জেল খাটার কাহিনীর মাঝে বারংবার লিখেছেন কিভাবে তিনি সৃষ্টিকর্তাকে খুঁজে ফিরেছেন। একবার তিনি লিখেন, “মওলানা সাহেবের [মওলানা ভাসানী] সাথে আমরা তিনজনই নামাজ পড়তাম। মওলানা সাহেব মাগরিবের নামাজের পরে কোরআন মজিদের অর্থ করে আমাদের বোঝাতেন। রোজই এটা আমদের জন্যে বাঁধা নিয়ম ছিল”। আরেকবার লিখেন, “আমি তখন নামাজ পড়তাম এবং কোরআন তেলাওয়াত করতাম রোজ। কোরআন শরীফের বাংলা তরজমাও কয়েক খন্ড ছিল আমার কাছে। ঢাকা জেলে শামসুল হক সাহেবের কাছ থেকে নিয়ে মওলানা মোহাম্মদ আলীর ইংরেজি তরজমাও পড়েছি”। বর্তমানে বঙ্গবন্ধুর অনুসারীরা সৃষ্টিকর্তাকে কোথায় রেখেছেন জানিনা, তবে এটা ভাবতেই অবাক লাগে যে তুরস্কের মানুষ কি করে কেমাল আতাতুর্কের শাসনের অধীনে দিনাতিপাত করেছে, যেখানে নামাজ-রোজা-কোরআন-ইসলামিক আলোচনা ছিল হারাম বস্তু!! দম আটকে মারা যাবার কথা তুর্কীদের। অবাক হইনা, যখন দেখি তুর্কীরা সেকুলারদের বিদ্রোহ দেখে ট্যাঙ্কের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কয়েকটি প্রাণ বাঁচিয়েছে কোটি মুসলিমের অধিকার। বঙ্গবন্ধু নিজে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি করেছেন, কিন্তু তিনিও যদি কেমালের তুরস্কে থাকতেন, তাহলে সেখানে টিকতে পারতেন কিনা সন্দেহ। অথচ তুরস্কের সেই গোড়ামিপূর্ণ সেকুলার লোকটির নামে আমাদের ঢাকা শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার নামকরণও করা হয়েছে! কত কম জানি এবং বুঝি আমরা! ইসলাম ত্যাগ নয়, বরং ইসলামকে সঠিকভাবে বোঝার মাঝেই পশ্চিমা ষড়যন্ত্র রোখার অস্ত্র নিহিত।

চতুর্থতঃ জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সামরিক-বেসামরিক বলে কোন কিছু যেমন নেই, ঠিক তেমনি সরকারি-বেসরকারি বলেও কিছু নেই। যে তুর্কী জনগণ ট্যাঙ্কের সামনে জীবন দিয়েছে, তারা না সামরিক বাহিনীর সদস্য, না সরকারের সদস্য। কিন্তু তাঁদের আত্মত্যাগ দেশকে পশ্চিমা আগ্রাসন থেকে বাঁচিয়েছে। এই লোকগুলির আত্মত্যাগ শুধু জনগণকে রাস্তায় নামায়নি, সামরিক বাহিনীর অন্যান্য সদস্যদেরকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে অনুপ্রাণিত করেছে। দেশের স্বার্থে সামরিক-বেসামরিক জনগণের মাঝে কোন বিভেদ থাকে না। এই দুই সমাজের মাঝে ব্যবধান পশ্চিমাদের তৈরি। পশ্চিমাদের এই দূরভিসন্ধিমূলক ‘ডিভাইড-এন্ড-রুল’ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে যারা নিয়মিত সামরিক-বেসামরিক দ্বন্দ্বে ইন্ধন দেয়, এরা দেশের মানুষকে ভাগ করে দেশকে দুর্বল করতে উদ্যত। পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্র রুখতে হলে এদের রুখতে হবে।

পঞ্চমতঃ দেশের বিরুদ্ধে, দেশের জনগণের বিরুদ্ধে এবং ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের জন্য কোন ক্ষমা দেখানোর প্রশ্নই ওঠে না। ‘মানবাধিকার’-এর কথা বলে যুদ্ধাপরাধীদের যেমন মাফ করে দেয়া যায় না, ঠিক তেমনি, পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের অংশ হবার কারণে দেশী-বিদেশী এজেন্টদেরও ক্ষমা করার প্রশ্নই ওঠে না।

শেষতঃ বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্বের, তথা গোটা বিশ্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশকে দুনিয়া থেকে আলাদা করে ভাবে, এরকম কূপমুন্ডুকদের তালিকায় আমাদের নাম যদি এখনও থেকে থাকে, তাহলে সেখান থেকে আমাদের নাম বাদ দিতে হবে।

Friday, 22 July 2016

“স্টিং অপারেশন” – মার্কিনীদের জঙ্গী তৈরির পদ্ধতি

২২ জুলাই ২০১৬
মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই কিভাবে জোর করে সন্ত্রাসী তৈরি করছে, সেটা দেখলে বুঝে নেয়া যাবে আমাদের দেশে কিভাবে জঙ্গী তৈরি করা হচ্ছে। সেই প্রসেসটা, যার নাম স্টিং অপারেশন, পুরো আদ্যো-পান্ত ফাঁস হয়ে পড়ে ২০১৫ সালের শুরুতে। এফবিআই সন্ত্রাসী তৈরি করছে সেটা সবাই জানতো, কিন্তু ডকুমেট-সহ বমাল সমেত ধরা পড়াটা বিশ্রী পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।





















বাংলাদেশের মাটিতে জঙ্গী তৈরি করে একটা “আদর্শিক ফোড়া” তৈরি করার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আগেই লিখেছি। জঙ্গী তৈরির জন্যে অনেক দিন ধরে টোপ হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল এক “Trojan Horse”. আর আমাদের দেশের মিডিয়া এবং কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবী গুলশান ৭৯ নম্বরের ঘটনার পর থেকে আদর্শিক শক্তির ইচ্ছা বাস্তবায়ন করতে বাংলাদেশের উপরে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামাজিক চাপ প্রয়োগ করে পশ্চিমা “ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতা”-প্রসূত সমাধান promote করতেও মরিয়া হয়েছেন। আজকে কথা বলবো কিভাবে “ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতা”র নিয়ন্ত্রকেরা নিজেদের সভ্যতার দুর্বলতাগুলিকে সমাধানের পথ না খুঁজে বরং সেগুলিকে মুসলিম যুবকদের জঙ্গী তৈরির টোপ হিসেবে ব্যবহার করছে। কিভাবে ইসলামের নামকে নষ্ট করতে জোর করে নামমাত্র মুসলিম সেকুলার সমাজ থেকে জঙ্গী তৈরি করছে তারা নিজেদের দেশের মাটিতেই। তাদের দেশে প্রয়োগ করা ফাঁস হয়ে যাওয়া সেই প্রসেস জানা থাকলে আমাদের দেশে জঙ্গী বানানোর কারখানাগুলি বন্ধ করার একটা সুযোগ আমরা পেলেও পেতে পারি।

স্টিং অপারেশন (Sting Operation) আসলে কি?

মার্কিন অভ্যন্তরীণ কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ফেডেরাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে কিভাবে সন্ত্রাসী তৈরি করছে, তার মোটামুটি একটা বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায় ২০১৫ সালের শুরুতে ফাঁস হয়ে যাওয়া কিছু নথি থেকে। মার্কিন জনগণ এবং বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা চালানো একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘The Intercept’ এই নথিগুলিকে সামনে নিয়ে আসে। এফবিআই এই অপারেশনগুলিকে বলছে ‘স্টিং অপারেশন’ (Sting Operation)। এর মাধ্যমে মুসলিম পরিবারের ছেলে-মেয়েদের সন্ত্রাসী হিসেবে তৈরি করে তাদেরকে গ্রেপ্তার হবার ব্যবস্থা করা হয়। এফবিআই বলে যে এই অপারেশনগুলির মাধ্যমে সন্ত্রাসী কার্যক্রম সংঘটিত হবার আগেই তারা ‘সন্ত্রাসী’ ধরে ফেলছে। কিন্তু ২০১৫-এর সেই ফাঁস হওয়া নথিগুলি তা সমর্থন করে না।

এই অপারেশনে মুসলিম দেশ থেকে আসা সেকুলার মূল্যবোধের পরিবারের সদস্যদের টার্গেট করে তাদেরকে উগ্রবাদী হিসেবে তৈরি করা হয়। তাদের সামনে সমাজের মূল্যবোধের অবক্ষয়কে তুলে ধরা হয়। মদ-জুয়া-বেশ্যাবৃত্তি-বিবাহ বিচ্ছেদ-ব্যাভিচার-সমকামিতা-র সেই সমাজে অবক্ষয় তুলে ধরা খুবই সহজ। মজার ব্যাপার হলো এফবিআই নিজের দেশের সামাজিক অবক্ষয়কে ব্যবহার করতে বিন্দুমাত্র পিছপা হয়নি। ইসলামকে উগ্রবাদী প্রমাণ করতে মার্কিন সরকার সকল কিছুই করতে পারে – এ অপারেশনের মাধ্যমে সেটিই বেরিয়ে আসে। সেই নথির ফাঁস হওয়া অবধি যুক্তরাষ্ট্রে ৫০৮ জনকে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে যুক্ত থাকার অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়; যার মাঝে ২৪৩ জনকে ধরার জন্যে এফবিআই লুকিয়ে থাকা নিজস্ব লোক ব্যবহার করে। আর ১৫৮ জনকে ধরা হয় স্টিং অপারেশনের মাধ্যমে। এর মাঝে আবার ৪৯ জনকে এফবিআই-এর নিজস্ব লোকেরা সন্ত্রাসী কার্যক্রমে যুক্ত হতে সরাসরি সাহায্য করে।

১৯৯২ সালে কসোভো থেকে চলে আসা মুসলিম পরিবারটি পুরোপুরি সেকুলার লাইসস্টাইলে চলছিল। তারপরেও সেই পরিবারের সন্তানকেই টার্গেট করে এফবিআই; কারণ moral দিক থেকে দুর্বল থাকে বলে সেকুলার সমাজের মানুষের ভিত নড়িয়ে ফেলা বেশ সহজ। এক্ষেত্রে নিজেদের সমাজের অনাচারকে সমাধান না করে বরং সেগুলিকেই টোপ হিসেবে মুসলিম জঙ্গী তৈরির কাজে ব্যবহার করে এফবিআই!


যেভাবে ফুসলিয়ে জঙ্গী বানায় এফবিআই

ইচ্ছাকৃতভাবেই এফবিআই শুধুমাত্র সেকুলার পরিবারের সদস্যদের টার্গেট করে, কারণ ইসলামিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা লোকেদের নতুন কোন মন্ত্রে দীক্ষা দেয়া অসম্ভব না হলেও অপেক্ষাকৃত কঠিন। যে ইসলামকে একেবারেই চেনে না, তাকেই বরং ভুল পথে নেয়াটা অপেক্ষাকৃত সহজ। পুরানো চিন্তা ঝেরে নতুন চিন্তায় নিয়ে আসাটা তেমন সহজ নয়। বুড়ো ঘোড়াকে নতুন জিনিস শেখানোটা একটু কঠিন। moral দিক থেকে দুর্বল থাকে বলে আর কোন ধরনের Intellecual Basis না থাকায় খুব সহজেই সেকুলার পরিবারের সদস্যদের বাগে নিয়ে আসা যায়। এভাবেই ১৯৯২ সালে কসোভো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়া এক পরিবারকে টার্গেট করে তাদের সর্বকনিষ্ঠ সন্তানকে সন্ত্রাসী বানিয়ে ৪০ বছরের সাজা দেয়া হয়। সেই পরিবারের কেউ নামাজ পড়তো না, রোযা রাখতো না; এমনকি নিজেদের পরিবার যে রেস্টুরেন্ট চালাতো, সেখানে pork (শুকরের গোশত) পরিবেশন করতো। এই পরিবার থেকেই সেই ছেলেকে রিক্রুট করে লাল দাড়ি বিশিষ্ট এক তথাকথিত ধর্মান্তরিত মুসলিম-এর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। এর পর থেকেই ছেলেটি পুরোপুরি অন্য মানুষ হয়ে যায়। ওই লাল দাড়ির লোক কয়েকজনকে এফবিআই-এর কাছে ধরিয়ে দিয়ে এখন হাওয়া। কেউ কেউ নাকি শুনেছে সে নাকি সিরিয়া চলে গেছে। এরকম আরও ঘটনা আছে, যেখানে যুবকদের মাধা নষ্ট করা লোকগুলি এফবিআই গ্রেপ্তার তো করেইনি, বরং তাদের নিরুদ্দেশ হতে সাহায্য করেছে। এরা হয় কোথাও চলে যায়, বা মারা যায়, বা হারিয়ে যায় … একেবারে হলিউডের ড্রামা যাকে বলে আরকি।

কসোভোর ছেলেটিকে সন্ত্রাসী হিসেবে তৈরি করতে সাহায্য করে এক এফবিআই এজেন্ট, যে কিনা অস্ত্র সরবরাহ করে। ছেলেটির কাছে টাকা না থাকায় তাকে অস্ত্র কেনার জন্যে চাকরির ব্যবস্থাও করা হয়। এক প্যালেস্টাইনি লোক এফবিআই-এর কাছ থেকে টাকা নিয়ে ছেলেটিকে চাকরি দেয়।


লাল দাড়ির সেই লোক ওই ছেলেটিকে নিয়ে যায় এক প্যালেস্টিনিয়ান লোকের কাছে, যে ছেলেটিকে চাকরি দেয়, কারণ ছেলেটির অস্ত্র কেনার কোন টাকা ছিল না। প্যালেস্টাইনি ভদ্রলোক টাকার সমস্যায় ছিলেন। এফবিআই তাকে টাকা দেয় ছেলেটিকে পারিশ্রমিক দেবার জন্যে। একইসাথে তিনি এফবিআই থেকে টাকা পান ছেলেটিকে অস্ত্র ব্যবসায়ীর কাছে নিয়ে যাবার জন্যে। পুরো ঘটনা ভিডিও এবং অডিও রেকর্ড করা হয়েছিল আদালতের সামনে ছেলেটিকে জঙ্গী প্রমাণ করার জন্য। কিন্তু রাখে আল্লাহ মারে কে – সকল ভিডিও, একেবারে এফবিআই-এর সদস্যদের নিজেদের মাঝের বেফাঁস কথা সহ সব ফাঁস হয়ে যায়; একেবারে পুরো ট্রান্সক্রিপ্ট সহ!! অস্ত্র ব্যবসায়ী ছিল এফবিআই-এর নিজস্ব চর। এই অস্ত্র ব্যবসায়ীই ছেলেটিকে অস্ত্র কিভাবে চালাতে হবে সেসব প্রশিক্ষণ দেন এবং তার সুইসাইড নোট হিসেবে ভিডিওখানা রেকর্ড করেন।

স্টিং অপারেশনের শেষের দিকে কাহিনী। ছেলেটি সুইসাইড ভিডিওতে কথা বলছে। ভিডিওটি তৈরি করে দেয় ওই লোকটি যে কিনা অস্ত্র সরবরাহ করেছিল। ছেলেটি জীবনে কোনদিন কোন অস্ত্র চালায়নি। ছেলেটিকে জঙ্গী বানাতে এফবিআই-এর যে কষ্ট হচ্ছিল, সেটা ফাঁস হয়ে যাওয়া অডিও-ভিডিও-ট্রান্সক্রিপ্ট থেকে জানা যায়।


কাজেই একত্রিত করলে যা দাঁড়াচ্ছে তা হলো – লাল দাড়ির এক লোক তাকে উগ্র বানিয়েছিল; এরপর প্যালেস্টাইনি লোক টাকার লোভে তাকে চাকুরি দেয় এবং অস্ত্র ব্যবসায়ীর কাছে নিয়ে যায়; আর শেষে অস্ত্র ব্যবসায়ী তাকে অস্ত্র বিক্রি করে, ট্রেনিং দেয় এবং শেষ সুইসাইড ভিডিওটি করে দেয়। স্টিং অপারেশনে জড়িত থাকা এই তিনটি লোকই ছিল এফবিআই-এর বেতনভুক। এখানে লাল দাড়ির লোকটি ছিল সবচাইতে বিপজ্জনক; এই লোকটি যথারীতি হাওয়া হয়ে যায়। লাল দাড়ির লোকটির সাথে ওই ছেলেটির কি করে পরিচিতি হয়েছিল, সেটা জানা যায় না। এখানে ওই ছেলেটির সেকুলার জীবনের সাথে জড়িত কেউ একজন ছিল। কারণ ওই লাল দাড়ি লোকটি সেকুলার লাইফের ধারেকাছেও থাকতো না। অর্থাৎ এফবিআই-এর আরেকজন ছেলেটিকে ওই লাল দাড়ির কাছে নিয়ে যায়, যার পরিচয় জানা যায় না।

এই সেই লাল দাড়ির লোক। এফবিআই-কে বেশ কিছু লোককে গ্রেপ্তার করতে সাহায্য করে লোকটি। কিন্তু একে এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। এই লোকগুলিই ছেলে-মেয়েদের মাথায় বিষ ঢোকায় ইসলামের পথে না নিয়ে ভুল পথে নেয়ার জন্যে। এবং সময়মত গায়েব হয়ে যায়। তবে যে এজেন্টরা সেকুলার সমাজের ছেলে-মেয়েদের রিক্রুট করে এই লোকগুলির কাছে  নিয়ে যায়, তাদেরও খোঁজ পাওয়া যায় না। ওই লোকগুলি সেকুলার সমাজের মাঝেই ঘোরাঘুরি করে।


যেভাবে ইসলামের আদেশ বিকৃত করা হয়…

ইসলাম সম্পর্কে অত্যন্ত কম জানার জন্যেই সমাজের ‘শিক্ষিত’ তরুণেরা ভুল পথে চলে যাচ্ছে। শুধু ইসলাম সম্পর্কে কেন, কোন কিছু সম্পর্কেই আজকের তরুণেরা কিছুই জানে না। ফেসবুক-গার্লফ্রেন্ড-সেলফি-শো অফ-শপিং-রেস্টুরেন্ট চেক-ইন-পার্সোনাল গ্রুমিং, ইত্যাদির মতো সস্তা ব্যাপার নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত থাকার ফলে আজকের যুবসমাজ চিন্তাশক্তি হারিয়েছে। যে কিছুই জানে না, এমনকি চিন্তা করার ক্ষমতাও হারিয়েছে, তাকে ভুল পথে নেয়াটা খুবই সহজ। চিন্তা এবং জ্ঞানের পথ না খুললে সমস্যার সমাধান পাওয়া সম্ভব নয়; বরং সমস্যারগুলিকে ব্যবহার করে মানুষকে ক্ষেপিয়ে ভুল পথে নেয়া যেতে পারে। এভাবেই সমাজের অনাচার নিয়ে কথা বলে এই ছেলে-মেয়েদেরকে লাইনে নিয়ে আসা হয় ঠিকই, কিন্তু এর পরে শান্তিপূর্ণ পদ্ধতি ছেড়ে জঙ্গী পদ্ধতি নেয় কি করে? সেটা বুঝতে হলে ইসলামের কিছু আদেশের দিকে তাকাতে হবে, যেগুলি রিক্রুট ট্রেনিং-এর সময়ে বিকৃতরূপে উপস্থাপন করা হয়। যেমন, ইসলামের কিছু আদেশ আমরা উল্লেখ করতে পারি, যেগুলিকে সরাসরি ভঙ্গ করা হচ্ছে তথাকথিত “জিহাদী”দের দ্বারা।

প্রথমতঃ রাসুল (সঃ) কখন জিহাদ করেছেন?

রাসুল (সাঃ) যখন মক্কায় অবস্থান করছিলেন, তখন ইসলাম প্রচারের কারণে তাঁর এবং তাঁর সাহাবাদের উপরে নির্মম অত্যাচার করা হয়। সুমাইয়া (রাঃ)-কে হত্যা করা হয় (তিনি ছিলেন প্রথম শহীদ)। উমর (রাঃ) ছিলেন একজন বিখ্যাত যোদ্ধা। তিনি ইসলাম গ্রহণ করার পরে রাসুল (সাঃ) তো মক্কায় civil war-এর জন্ম দেয়ার চেষ্টা করতে পারতেন; কিন্তু তিনি তার সাহাবাদের কাউকে প্রতিহিংসার ছলে একটা পাথরও ছুঁড়তে দেননি। বিলাল (রাঃ)-এর বুকে উপরে পাথর চড়িয়ে দেবার পরেও তিনি আবু জেহেল-এর দিকে একটা নুড়িও ছোঁড়েননি। কারণ রাসুল (সাঃ) সেই নির্দেশ তখন দেননি। অথচ রাসুল (সাঃ) বেশ কতগুলি যুদ্ধে নিজে নেতৃত্ব দিয়েছেন, যেখানে অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ব্যাপারটা স্ববিরোধী মনে হয় না? এটা স্ববিরোধী মনে হবে তখনই যখন কেউ ইসলামের কিছুটা নেবে, আর বাকিটা নেবে না। উপরে বর্ণিত এফবিআই-এর কাহিনীতে মাথা নষ্ট করার জন্যে ঠিক সেই কাজটিই করা হয়েছে – বিকৃত করে ইসলামকে উপস্থাপন করা হয়েছে। রাসুল (সাঃ) যুদ্ধ করেছেন মদিনায় হিযরত করে সেখানে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর; মক্কায় থাকা অবস্থায় তিনি তাঁর সাহাবাদেরকে কোন ধরনের violence-এ জড়াতে দেননি। এই পদ্ধতি অনসরণ করার কারণ হলো রাসুল (সাঃ) মক্কায় থাকা অবস্থায় আল্লাহর কাছ থেকে violence-এ জড়াতে নির্দেশিত হননি। কোন মাক্কী সূরায় যুদ্ধ বা জিহাদের কথা নেই; সকল জিহাদের কথা বলা হয়েছে মাদানী সূরাতে, অর্থাৎ মদীনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরে। মনে রাখতে হবে যে আমরা এখন কুরআনকে একত্রে পাই; আর তখন কুরআনের আয়াত নাযিল হচ্ছিল প্রতিদিন। কাজেই কোন আয়াত কখন কোন প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছিল, সেটা না জেনে ইসলাম বোঝার চেষ্টা করা যাবে না। সেটা করতে গেলে ইসলামকে বিকৃতরূপে উপস্থাপন করা হবে। কোন কারণ ছাড়া ইসলামে কোন চিন্তার দেয়া হয়নি; আর কোন আদেশ ছাড়া কোন চিন্তাও ইসলামে দেয়া হয়নি। আর কারণ আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল (সাঃ) আমাদের বলে দিলেও অনেক কারণ আবার বলেনও নাই; তাই আমাদের সসীম বুদ্ধি দিয়ে সেগুলি বোঝার ক্ষমতাও আমাদের নাই।

ইসলামের সকল যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত সেনাবাহিনী দ্বারা। মক্কায় বসে বসে চুপিসারে ট্রেনিং নিয়ে একা একা কেউ জিহাদ করেনি; চোরাগুপ্তা হামলা করেনি সাধারণ মানুষের উপর। রাসুল (সাঃ)-এর পরে যতজন খলিফা এসেছেন, তাঁরাও তাঁকেই (সাঃ) অনুসরণ করেছেন। কেউ যদি গেরিলা যুদ্ধের কথা বলেন, সেটাও রাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট না হলে করা হয়নি। মোট কথা রাষ্ট্র ছাড়া ইসলামে কোন জিহাদের নজির নেই। ওযু ছাড়া যেমন নামায পড়া সম্ভব নয়, ঠিক তেমনি, রাষ্ট্র ছাড়াও জিহাদ করা সম্ভব নয়! তাহলে জিহাদের মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার থিউরি এরা কোত্থেকে নিয়ে আসছেন?

তিনি তো রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা কিভাবে করতে হবে সেটা কাজে কর্মেই দেখিয়ে দিয়েছেন। কুরআনে কোথাও তো লেখা নেই কিভাবে নামায পড়তে হবে? তাহলে মুসলিমরা নামায কিভাবে পড়েন? সেভাবেই পড়েন যেভাবে রাসুল (সাঃ) দেখিয়েছেন। অর্থাৎ রাসুল (সাঃ) যেভাবে দেখিয়েছেন, সেভাবে ছাড়া অন্য কোনভাবে নামায পড়া যাবে না। আমি ইচ্ছে করলেই অতি ভক্তি দেখিয়ে তিন-চারটা অতিরিক্ত সিজদা ঠুকে দিতে পারবা না। তাহলে তাঁর দেখানো পদ্ধতি ছাড়া অন্য কোন পদ্ধতিতে কেন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে যাবো অথবা যুদ্ধ করতে যাবো? যেটা রাসুল (সঃ) নিজে করেননি, সেটা এরা কার নির্দেশে করছে? যদি আল্লাহর রাসুল (সাঃ)-এর নির্দেশ তাদের পছন্দ না হয়, তাহলে একেবারে গোড়ায় গলদ রয়েছে বলতেই হবে।

দ্বিতীয়তঃ কার কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা যায় না?

“রাসুল (সাঃ)-এর কোন এক যুদ্ধে একজন স্ত্রীলোককে নিহত অবস্থায় পাওয়া গেল। তখন রাসুল (সাঃ) মহিলা ও শিশুদেরকে হত্যা করতে নিষেধ করে দিলেন”। (মুসলিম)

তাহলে এই জিহাদীরা যে নির্বিচারে হত্যা করে যাচ্ছে, সেই আদেশ তারা কোন নবীর কাছ থেকে পেয়েছে, মুহম্মদ (সাঃ), নাকি অন্য কাউকে নবী বানিয়েছে তারা? কোন কিতাব তারা অনুসরণ করছে, কুরআন, নাকি অন্য কিছু? যদি আল্লাহর রাসুল (সাঃ) এবং আল্লাহর কালাম এরা না মানে, তাহলে প্রশ্ন করতেই হবে যে যারা এই থিউরি আবিষ্কার করেছে, এদের প্রভু আসলে কে?

তৃতীয়তঃ অমুসলিমদেরকে গণহারে মেরে ফেলার নির্দেশ কে তৈরি করলো??

মক্কা বিজয়ের পরে মুহম্মদ (সাঃ) কি মক্কার সকল অমুসলিম অধিবাসীকে মেরে ফেলার হুকুম দিয়েছিলেন? এরকম হুকুম কি অন্য কোন একটি এলাকার জন্যে কোনকালেও দেয়া হয়েছিল? ইসলাম অমুসলিমদেরকে প্রতিরক্ষা দেবার বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে জিজিয়া আদায় করেছে; আল্লাহু আকবার বলে কতল করে ফেলেনি। ১১৮৭ সাল থেকে ১৯১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭৩১ বছর (মুহম্মদ(সঃ)-এর অনেক পরে) একনাগারে জেরুজালেম মুসলিমদের অধীনে ছিল। বহু ইহুদী সেখানে বাস করতো মুসলিম শাসনের অধীনে; কোন সমস্যা তো হয় নাই। রাসুল (সাঃ) আরবের অমুসলিমদের মেরে ফেলেননি, কারণ সবাইকে মেরে ফেললে ইসলাম কার মধ্যে প্রচার করবে? ভারতীয় উপমহাদেশের বেশিরভাগ মানুষই ত্রয়োদশ শতকের শুরু পর্যন্ত অমুসলিম ছিল। ১২০৬ সালে ইসলাম ভারতের ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হলে ইসলামের প্রচার সহজ হয়ে যায়। তখন মুসলিম শাসকরা অমুসলিমদের মেরে ফেলেননি, বরং তারা শুধু অমুসলিমদের কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করেছিলেন। আর মুসলিম হোক আর অমুসলিমই হোক সকলেই মুসলিম শাসনের অধীনে প্রতিরক্ষা পেয়েছে। কারণ এটা আল্লাহর নির্দেশ।

“আর মুশরিকদের কেউ যদি তোমার কাছে আশ্রয় পার্থনা করে, তবে তাকে আশ্রয় দেবে, যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনতে পায়, অতঃপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেবে। এটি এজন্যে যে এরা জ্ঞান রাখে না”। [সূরা তাউবা, আয়াত ৬]

তাহলে এই “কাফের হত্যা”র থিউরি কোত্থেকে এলো? যেখানে কুরআনে বলা হয়েছে কাফেরের জন্যে ইসলামকে বুঝতে পারাটা সহজ করে দেবার জন্যে, সেখানে ইসলামের নামে কাফের মেরে ফেলার কথা বলাটা ইসলামকে কলুষিত করার অপচেষ্টা ছাড়া কি বলা যায়?

স্টিং অপারেশনের পুরোটাই যে ফাঁস হতে যেতে পারে, সেটা হয়তো এফবিআই চিন্তাও করতে পারেনি। মুসলিম ছেলে-মেয়েদের সন্ত্রাসী বানিয়ে ইসলামকে কলুষিত করার জন্যে যে ডকুমেন্ট তৈরি করা হচ্ছিল, সেগুলিই এখন মার্কিন অপকর্মের দলিল হয়ে মুসলিম দ্বারে দ্বারে পৌঁছে যাচ্ছে! সত্য গোপন থাকে না...... 


বাকি বিশ্বে স্টিং অপারেশন

এফবিআই যুক্তরাষ্ট্রে জঙ্গী বানিয়েছে জিহাদী কর্মকান্ডে জড়িত হবার মুহুর্তে তাকে অস্ত্রসহ ধরে ফেলার জন্যে। তারা নিজেরাই এদেরকে অস্ত্র সরবরাহ করেছে যাতে অস্ত্রের উপরে তাদের নিয়ন্ত্রণ থাকে। কোন জিহাদীকেই তারা কর্মক্ষম অস্ত্র দেয়নি; অর্থাৎ অস্ত্রগুলি প্রকৃতপক্ষে অকার্যকর ছিল। তারা চাননি নিজেদের দেশের মানুষ জঙ্গী বানাতে গিয়ে হত্যাকান্ডের শিকার হোক। কিন্তু অন্য দেশের ক্ষেত্রে এই রুলস তারা মানবেন – এই গ্যারান্টি তারা কাকে দিয়েছে? অন্য দেশে গিয়ে তো কোন এফবিআই আক্রমণের পূর্বমুহুর্তে বমালসমেত গ্রেপ্তার করে ফেলবে না তাকে। অথবা অকার্যকর অস্ত্রও দেবে না। অর্থাৎ সেখানে নিশ্চিতভাবে হতাহতের ঘটনা ঘটবে। আর কিছুক্ষেত্রে দেখা যাবে যে মার্কিন নাগরিক; অনেকদিন ধরে নাকি watch list-এ ছিল (আসলে স্টিং অপারেশনের অংশ), তবু তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি; ঠিক যে মুহুর্তে লোকটা টার্গেট দেশে ভ্রমণ করলো, তখনই সেই দেশের মাটিতে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হলো। এর উদ্দেশ্য বোঝা কঠিন নয় – সেই টার্গেট দেশের উপরে চাপ সৃষ্টির একটা পদ্ধতি এটা। বাংলাদেশের উপরে এর আগেও এটা প্রয়োগ করা হয়েছিল।

জঙ্গীদেরকে লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে জঙ্গী বানাবার এই পদ্ধতি কাজে পরিণত করতে পারে একমাত্র ইন্টেলিজেন্সের লোকজন। এরা জানে কিভাবে নিরাপত্তা বাহিনীর চোখে ধূলা দেয়া যায়। এরা জানে কিভাবে পাসপোর্টসহ বিভিন্ন দলিল নকল করতে হয়। অল্প অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে কিভাবে অধিক হত্যাকান্ড চালানো যায়, সেটা জানে ইন্টেলিজেন্স এবং স্পেশাল ফোর্সের লোকজন। সাধারণত ইন্টেলিজেন্সের মাঝে যারা গোপন সামরিক ট্রেনিং দিয়ে থাকে, তারা স্পেশাল ফোর্স থেকেই ইন্টেলিজেন্সে আসে। এরা বিভিন্ন ভাষা এবং সংস্কৃতির এক্সপার্ট থাকে। এরা psychological warfare-এ ট্রেনিংপ্রাপ্ত হয়, যাতে যে কারুর উপরে কর্তৃত্ব কায়েম করতে পারে। * এদেরকেই ইরাক-আফগানিস্তান-সিরিয়া-পাকিস্তানসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশে গোপনে মোতায়েন করা হয় এজেন্ট প্রশিক্ষণ দেবার জন্যে, অথবা সবধরণের লজিস্টিক্যাল সাপোর্ট দেবার জন্যে। এরা বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরে প্রশিক্ষক তৈরি করে দেয়, যারা পরবর্তীতে কাজ চালিয়ে নিতে পারে। কিন্তু আসল নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই থাকে, কারণ জঙ্গীদের অতটুকুই প্রশিক্ষণই দেয়া হয়, যতটুকু ব্যবহার করে তারা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারবে না।

ইসলামকে খাঁচায় পোরা…

নিজেদের ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতার অনাচারকে দূর না করে বরং অনাচারকে জিইয়ে রাখার নিমিত্তে সেই অনাচারকেই টোপ হিসেবে ব্যবহার করে মুসলিমদের ক্ষেপিয়ে তুলে আবার তাদের ভুল পথে প্রবাহিত করে আনাচারকে আরও কয়েক যুগ প্রতিষ্ঠিত করে রাখার যে অপচেষ্টা, সেটাকে কোন খারাপ শব্দ দ্বারাই আখ্যা দেয়া সম্ভব নয় যা অভিধানে পাওয়া যায়। প্রায় সবাই বুঝতে পারছেন যে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলছে। কিন্তু সেই যুদ্ধ কেন এবং কিভাবে করা হচ্ছে, সেট তো বুঝতে হবে। পশ্চিমা চিন্তাবিদেরা ইসলামকে কিভাবে দেখছে? রবার্ট ক্যাপলান বলছেন যে রাশিয়ার দক্ষিণে অবস্থিত মধ্য এশিয়ার দেশগুলি ইসলামের কারণে রাশিয়ার প্রতি হুমকিস্বরূপ। হেনরি কিসিঞ্জার বলছেন যে ইসলামের কারণে বিশ্বের Balance of Power নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। স্যামুয়েল হান্টিংটন বলছেন যে সকল মুসলিম দেশের সামরিক শক্তির উত্থান আটকাতে হবে। জর্জ ফ্রীডম্যান বলছেন যে দুনিয়ার নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্যে মুসলিম বিশ্বে আরও নতুন নতুন ইরাক-আফগানিস্তান তৈরি করতে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র। এরা প্রত্যেকেই ইসলামকে কি শুধুই “ধর্ম” হিসেবে দেখছেন? একটা “ধর্ম” কি করে এধরণের Geopolitical Earthquake তৈরি করতে সক্ষম, যার কারণে পশ্চিমা ভূরাজনৈতিক চিন্তাবিদদের মাথার চুল পড়ে যাচ্ছে? পৃথিবীতে তো অন্য আরও অনেক ধর্মই আছে, কোন ধর্মকে নিয়েই তো পশ্চিমাদের কোন ভাবনা নেই!

আমরা ইসলামকে “ধর্ম” নামের খাঁচায় পুরে রাখতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। প্রশ্ন করি না যে এ কি এমন ধর্ম যেখানে টয়লেট করার নিয়ম থেকে শুরু করে যুদ্ধ করার পদ্ধতি, অর্থনীতি চালাবার পদ্ধতি, জ্ঞানার্জনের পদ্ধতি, সমাজে অনাচার রোধ করার পদ্ধতি, চুরি করলে শাস্তির পদ্ধতি, বৈদেশিক নীতি কোন ভিত্তির উপরে থাকবে সেটার পদ্ধতি –সকল কিছু আছে? একবারও কি প্রশ্ন করা যায় না যে ইসলাম কি আসলে শুধুই ধর্ম? আমরা ইসলামকে বুঝেও না বোঝার ভান করলেও পশ্চিমারা কিন্তু ঠিকই বুঝেছে যে ইসলাম শুধু ধর্ম নয়। তারা বহু চিন্তাভাবনা করে যেসব নিয়মকানুন বের করেছেন, সেগুলির প্রত্যেকটিরই better version ইসলামের মধ্যেই রয়েছে। তারা ইসলামকে তাদের নিজেদের আদর্শের (Ideology) বিরোধী আদর্শ হিসেবে দেখেছে। তাই ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে ইসলামকেই টার্গেট করেছে। তারা জানে যে দুনিয়া চালানোর পদ্ধতি হলো আদর্শিকভাবে দুনিয়াকে নেতৃত্ব দেয়া। আর সেটা একমাত্র সম্ভব যদি কোন বিরোধী আদর্শ সেখানে এসে নিজেদের আদর্শকে চ্যালেঞ্জ না করে।

জঘন্য কার্যকলাপে জড়িত করে মুসলিম বিশ্বকে ব্যস্ত রাখার এই পরিকল্পনা বুঝতে পারার সময় আমাদের এসেছে। ‘বুঝি না’ বলে বোকা বনে ভুল পথে যাওয়া যাবে না। বোকামি কোন কৈফিয়ত হতে পারে না।



*পড়ুনঃ ‘মার্কিন স্পেশাল ফোর্স ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’ – সাম্প্রতিক দেশকাল, ২২শে অক্টোবর ২০১৫

Tuesday, 12 July 2016

“ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতা”র এজেন্টরা জঙ্গী রিক্রুটদের বাঁচানোর চেষ্টায়

১৩ জুলাই ২০১৬

 
আমদানি করা সংস্কৃতি যে সমস্যার সৃষ্টি করেছে, সেই সমস্যার সমাধানও কি সেখান থেকেই নিতে হবে? অন্তত এই দেশে পশ্চিমাদের এজেন্টরা তো তা-ই বলেন। আর মিডিয়া যখন তাদেরই দখলে, তখন মানুষের কাছে কোন বার্তা পৌঁছুবে?

গুলশান ৭৯ পশ্চিমাদের সভ্যতার ক্ষয়িষ্ণুতাকেই উপরে তুলে ধরছে

এদেশের মিডিয়া যে অন্য কারুর দখলে, সেটা আগের লেখাতেই লিখেছি। যদিও কিছু মানুষ এখনও সেই দখলীকৃত মিডিয়ায় আলোচিত বিষয়গুলিকেই ফোকাস করার যারপরনাই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, তদুপরি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের উচ্চপদস্থ কূটনীতিকের বাংলাদেশ সফরের সময়ে বিশেষ কিছু প্রভাবশালী সাংবাদিকের সাথে বিশেষ বৈঠক করাটা এদেশের মিডিয়া কাদের দখলে, সেটা আরেকবার দেখিয়ে দেয়। গুলশান ৭৯ নম্বরের ঘটনা বিশ্বরাজনীতির যে ব্যাপারগুলি আমাদের কাছে এতদিন পুরোপুরি পরিষ্কার ছিল না, সেগুলিই এখন দিনের মতো পরিষ্কার করে দিচ্ছে। এদেশের মানুষকে একটা ঘোরের মাঝে রেখে দেয়া হয়েছিল এতকাল, তারপরেও পশ্চিমারা বাংলাদেশকে হুমকি হিসেবে দেখেছে। তারা বুঝতে পারছিল যে বেশিদিন এই ঘোর টিকবে না। তাই তারা সরাসরি হস্তক্ষেপের ব্যবস্থা তৈরি করেছে। কিন্তু এটা করতে গিয়ে যে ভুলটা তারা করেছে তা হলো ওই Trojan Horse-টাই তারা ব্যবহার করেছে, যেটা তারা নিজেদের বলে ব্র্যান্ডিং করতে ভুলেনি। সবার সামনে একেবারে উন্মুক্ত হয়ে গেল যে শস্যের মাঝেই ছিল ভূত। এর আগে মসজিদ-মাদ্রাসাতে আমেরিকার উপস্থিতি প্রমাণ করাটা বেশ কঠিন ছিল; অনেকেই বিশ্বাস করতে চাইতো না। কিন্তু এখন বার্গার-পিতজা, দামী ব্র্যান্ডেড রেস্টুরেন্ট, আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ, রিয়েলিটি শো – এগুলির মাঝে যখন জঙ্গী রিক্রুটাররা ঘোরাঘুরি করছে, তখন তারা কি একবারও জিহ্বা কামড় দেয়ার প্রয়োজন মনে করেননি? তার মানে কি তারা বোঝেননি যে কতবড় ভুল তারা করেছেন?? এটাকে পশ্চিমাদের intellectual decline বলতেই হবে। ঠান্ডা যুদ্ধের সময়ে এধরনের অপেশাদারী ভুল তারা করেনি কখনো। অবশ্য বার্গার-ফেসবুক-সমকামিতা-আত্মকেন্দ্রীকতা-কে কেন্দ্র করে বেশিদিন একটা জাতির intellectual leadership ধরে রাখা কঠিন। এসব সস্তা লাইফস্টাইলের উপরে ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্র যে সত্তর বছর তাদের নেতৃত্ব রেখেছে, সেটাই বরং একটা কাকতালীয় ব্যাপার।

জঙ্গী রিক্রুটদের বাঁচানো হচ্ছে যেভাবে…

যাই হোক, এদেশের মিডিয়াতে অথর্ব কিছু লোককে দেখা যায় ঘন্টার পর ঘন্টা চর্বিত চর্বন চাবিয়ে যান; যারা কয়েক বছর আগেও ওই একইভাবে অর্থহীন কথা বলে মানুষের সময় নষ্ট করেছেন, আজও করছেন। অর্থাৎ তারা কত কোটি মানুষের কত কোটি মহামূল্যবান ঘন্টা সময় নষ্ট করেছেন, তা যদি আমরা হিসাব করি তাহলে মোটামুটি একটা ধারণা তো করা যেত যে সেটা এই দেশের অর্থনৈতিকভাবে কতটা ক্ষতি করেছে। যা লাভ অর্থনীতির হয়েছে তা হলো ওই লোকগুলির সংসার চলেছে, তারা তাদের উপার্জনকে ব্যাবহার করে বাজারে কিছু কেনাকাটা করেছে। তবে যখন আমরা দেখবো যে তাদের পুরো কর্মকান্ডই অন্য কিছু দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ করা ছাড়া আর কিছুই করেনি, তখন বোঝা যাবে যে আমরা দুধ-কলা দিয়ে শুধু সাপই পুষে যাচ্ছি। এরাই আজ একেবারে নগ্নভাবে মার্কিন সহায়তা নেয়ার ওকালতি করে চলেছেন। জঙ্গী রিক্রুটাররা যেসব স্থান থেকে জঙ্গীদের রিক্রুট করেছে, সেসব স্থানকে সার্ভেইল্যান্সে আনার কথা না বলে এরা মসজিদে সার্ভেইল্যান্সের কথা বলছেন। কি উদ্ভট কথা!! যে ব্যক্তি বলিউডের মহিলা ‘সেলেব্রিটি’র হাত ধরে স্টেজে উঠে নেচেছে, যে ব্যক্তি রিয়েলিটি শো-তে পার্ফরমেন্স দেখিয়েছে, যে ব্যক্তি যুবসমাজের কাম বাসনায় সুড়সুড়ি দেয়া মডেলকে বিয়ে করেছে, যে ব্যাক্তি বিদেশী লাইফস্টাইল ছাড়া কিছুই নেয়নি, সে মসজিদ পর্যন্ত কি করে গেল সেটা জিজ্ঞেস না করেই আপনি মসজিদের পিছনে লাগলেন কেন?? তারমানে এটা কি বোঝা যাচ্ছে না যে মসজিদকে টার্গেট করাই উদ্দেশ্য ছিল? অর্থাৎ ইসলামকে টার্গেটই সকল কিছুর মূলে। এ-তো অত্যন্ত সস্তা চিন্তা থেকে আসা হে! শুধু তা-ই নয়, সংস্কৃতির ইতিহাসের কথা টেনে কেউ কেউ সমাধান দিচ্ছেন; আর সেই সংস্কৃতির মাঝে দেখাচ্ছেন সমকামিদের ‘রংধনু’ সংস্কৃতি, যা কিনা একটা বিশেষ দেশের দূতাবাস টাকাপয়সা দিয়ে সরাসরি সাপোর্ট দেয়। এসব হাস্যকর প্ল্যানিং-এর চেয়ে ভালো কিছু কি তারা আজ জন্ম দিতে অক্ষম?

সেই Trojan Horse-এর সাথে যে এই এজেন্টরাও এসেছেন; তাই তারা সেটার বিরুদ্ধে কথা বলেন না। জঙ্গী রিক্রুটার নাকি অনলাইনে ব্রেইনওয়াশ করছে!! কি আশ্চর্য কথা এটা! ফেইসবুকে একটা অপরিচিত মানুষ কিছু মেসেজ দিবে তাকে আর সে ৩৬০ ডিগ্রী ঘুরে যাবে? এটা কি হলিউডের কোন Zombie মুভির স্ক্রিপ্ট পেয়েছেন নাকি তারা? এগুলি কথা বলে তারা যেসব হাই-এন্ড posh আড্ডার আসরে জঙ্গী রিক্রুট করা হচ্ছে সেগুলি বাদ দিতে বলছেন। সংস্কৃতির নামে বিদেশী এজেন্টদের ঘোরাফিরা করা যায়গাগুলি এড়িয়ে যেতে বলছেন। জঙ্গীদের ট্রেনিং কে দিল? অস্ত্র কোত্থেকে আসলো? লজিস্টিক সাপোর্ট কে দিল? পাসপোর্টে ভিসা কে লাগালো? এগুলি কি ভুতে এসে দিয়ে গেল?? তাহলে এগুলি নিয়ে কথা না বলে কেন এদেশের মুসলিম পরিবারগুলিকে চাপের মুখে ফেলা হচ্ছে? এ-তো সেই ৬৪ জেলায় জঙ্গী হামলার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। সেই হামলার পর পর মানুষ মসজিদে যেতেই ভয় পেত। শোলাকিয়ার হামলা তো দেখিয়ে দিচ্ছে যে মুসলিমরাই এদের টার্গেট। ভয় দেখিয়ে মানুষকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে রাখার কি বিশ্রী অপচেষ্টা এটা। রিক্রুট করার নোংড়া স্থানগুলিকে সার্ভেইল্যান্সে না এনে মানুষের উপাসনালয়গুলিকে সার্ভেইল্যান্সে আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে!
হেনরি কিসিঞ্জারের মতো লোক যখন পশ্চি্মা নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থার ব্যর্থতার কথা বলতে ভুল করছেন না, তখন আমাদের দেশের পশ্চিমা এজেন্টরা এখনো পশ্চিমে আলো দেখে চলেছেন!


ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতাকে উদাহরণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে কেন?

বিশিষ্ট মার্কিন ভূরাজনৈতিক চিন্তাবিদ হেনরি কিসিঞ্জার শেষ বয়সে এসে এখনও চালিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন, কারণ নতুন জেনারেশন তার মতো চিন্তাবিদের জন্ম দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। তার ২০১৪ সালে লেখা ‘World Order’ বইতে তিনি বর্তমান বিশ্বের পুরো ব্যবস্থাকেই প্রশ্ন করে ছেড়েছেন। এমন তিনটি ব্যাপারে তিনি প্রশ্ন করেছেন, যার উত্তর দিতে অনেকেই চুল ছিড়ে ফেলবেন। তিনি প্রশ্ন করছেন –

১. রাষ্ট্র-ব্যাবস্থা নিয়ে চিন্তা করার আগে রাষ্ট্রের সংজ্ঞা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে! কারণ একুশ শতকে বহু রাষ্ট্রকেই টিকিয়ে রাখা কঠিন হচ্ছে; তাদের মানচিত্র এবং জনগোষ্ঠীর পরিচয় নিয়ে টান পড়েছে। একেকটি দেশের মানচিত্র আঁকার ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন উঠছে আজ। অনেক রাষ্ট্রই আজ নামমাত্র রাষ্ট্র। রাষ্ট্রই যেখানে থাকছে না, সেখানে কার সাথে কোথায় কিভাবে আলোচনা হবে?

২. পুরো বিশ্বের অর্থনীতি চলে এক ব্যবস্থায়, অথচ রাষ্ট্র বহু। রাষ্ট্র অনেক কেন? কারণ তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ আলাদা। তাহলে তো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেও তারা সকলেই চাইবে নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী চালাতে। এভাবে তো দুনিয়া বেশিদিন চলবে না!

৩. শক্তিশালী দেশগুলি একত্রে বসে বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে কথা বলছে না। কি বলছেন এসব? সারা বছর জুড়ে কত্তো কত মিটিং হচ্ছে! কিন্তু সেই মিটিং-এ তারা তো শুধুমাত্র আজকের সমস্যা নিয়ে কথা বলতেই সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে; দীর্ঘমেয়াদী কোন কথাই তারা বলছে না। অর্থাৎ বিশ্বব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্যে কথা বলার কোন প্ল্যাটফর্মই নেই আজ! কোন কিছুই কাজ করছে না যে!

এই তিন প্রশ্ন বর্তমানের পুরো বিশ্বব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিয়ে বিরাট প্রশ্ন জুড়ে দিচ্ছে। আমাদের দেশের তথাকথিত ‘বুদ্ধিজীবি’রা টেলিভিশনের টক-মিষ্টি শো-তে ক্ষয়িষ্ণু (decaying) পশ্চিমা আদর্শের গীত গেয়ে সময় নষ্ট না করে এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজে হেনরি কিসিঞ্জার সাহেবকে শান্তিতে মরতে দেবেন? বেচারা বহু বয়স পর্যন্ত পশ্চিমা বিশ্বের চিন্তার ভার নিতে গিয়ে অনেক কষ্ট করছেন।
 
হলিউডের সুপারহিরোরা হচ্ছে কল্পকাহিনী। তারা জানে যে সুপারহিরোরা তাদের সমস্যার সমধান দিতে পারবে না। তাহলে যারা নিজেদের সমস্যার সমাধান দিতে অক্ষম, তারা আমাদের সমস্যার সমাধান দিতে আসছে কেন? আর আমাদের মিডিয়াই বা কেন সেই সমাধান নিয়ে জাবর কেটে যাচ্ছে?

যে নিজের সমস্যারই সমাধান দিতে পারছে না, সে কি করে আমাদের সমস্যার সমাধান দেবে?

ব্রেক্সিটের পর ইইউ ভেঙ্গে যাবার মুখে অনেক পশ্চিমা রাষ্ট্রই এখন ভাঙ্গনের মুখে পড়ছে। স্কটল্যান্ড যুক্তরাজ্য থেকে আলাদা হতে চাইছে। এরপর লাইনে দাঁড়াবে ইটালি এবং স্পেন। এরও পেছনে অনেক দেশের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রও থাকতে পারে। দেশগুলি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হয়ে যাচ্ছে। ইংল্যান্ডের মানুষ মনে করেছে যে বাকি ইউরোপের মানুষ এসে তাদের চাকরি খেয়ে ফেলবে। অথচ ইইউ থেকে বের হলে যে তাদের পুরো দেশের অর্থনীতি ক্ষতির মুখে পড়বে, সেটা তারা চিন্তাই করেনি। ব্যক্তি-স্বার্থকে অন্য সকল কিছুর উপরে স্থান দেবার অনন্য দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠা করছে তারা। সেই স্বার্থপর সমাজে সকলের স্বার্থ রক্ষার্থে সমাজ-বিরোধী বহু কর্মকান্ডও আজ আইনত সিদ্ধ! হলিউডের মুভিতে নাহয় সুপার হিরোরা এসে সমাজ-বিরোধী কর্মকান্ড থেকে শহরকে এবং দেশকে রক্ষা করে। কিন্তু তারা তো জানে যে বাস্তব দুনিয়াতে সেটা সম্ভব নয়; আকাশের দিকে চেয়ে থাকলেই কোন সুপারহিরো নেমে আসবে না। টিভি স্ক্রীন থেকে বের হয়ে এসে কেউ যুক্তরাষ্ট্রের কালো-সাদা দ্বন্দ্ব থামাবে না। হলিউডকে নকল করে বলিউডে বানানো ‘কৃষ’ বা ‘রা-ওয়ান’ সুপারহিরোরা আজকে দিল্লীর নারীদের নিরাপত্তা দিতে পারবে না। কল্পনা দিয়ে সভ্যতা টিকিয়ে রাখা যায় না। কাজেই টিভির স্ক্রীন ভরিয়ে রাখা ওইসব পশ্চিমা এজেন্টরা যে আমাদের সমস্যার সমাধান দিতে পারবে না, তা আজ যে কেউ বুঝবে।

কিসিঞ্জার মেনে নিচ্ছেন যে বিশ্বের সমস্যা এখন আকাশচুম্বী, সেটার সমাধান পশ্চিমারা দিতে পারছে না। “A quarter century of political and economic crisis perceived as produced or least abetted by Western admonitions and practices along with imploding regional orders, sectarian bloodbaths, terrorism and wars ended on terms short of victory has thrown into question the optimistic assumptions of the immediate post-Cold War era that the spread of democracy and free markets would automatically create a just, peaceful and inclusive world.” অর্থাৎ পশ্চিমা গণতন্ত্র এবং মুক্ত বাজার অর্থনীতি বিশ্বের সমস্যার সমাধান দিতে পারেনি। “ A countervailing impetus has risen on several parts of the world to construct bulwarks against what are now seen as the crisis inducing policies of the developed West, including aspects of globalization.” বাকি বিশ্বে যে পশ্চিমাদের নীতিকে এমনকি বিশ্বায়নকেও আগ্রাসী হিসেবে দেখা হচ্ছে, সেটাও তিনি স্বীকার করে নিচ্ছেন। যখন পশ্চিমারা নিজেরাই স্বীকার নিচ্ছেন যে তারা সমস্যার সমাধান দিতে অক্ষম, তখনও আমাদের দেশের এজেন্টরা পশ্চিমাদের গীতই গেয়ে যাচ্ছেন!

বাংলাদেশের ভয় তাদের ঘুম নষ্ট করছে

বাংলাদেশের শক্তিশালী ভৌগোলিক অবস্থান এবং বিরাট মুসলিম জনসংখ্যা ভারত, তথা তার প্রভু যুক্তরাষ্ট্রকে ভাবিয়েছে। সেই ভাবনাকে সামনে রেখেই বাকি মুসলিম বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও তারা প্রজেক্ট শুরু করেছে। আমাদের জন্যে এটা বুঝতে পারাটা খুব একটা কঠিন হবার কথা নয়, কারণ সিরিয়া-ইরাক-আফগানিস্তান-ইয়েমেন-সোমালিয়া-মালি-লিবিয়া আমাদের সামনে জ্বলজ্যান্ত উদাহারণ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। সারা পৃথিবীতে যুক্তরাষ্ট্র তার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে “Lily Pad” (পদ্ম পাতা) নামের এক কনসেপ্টে সাজাচ্ছে। পদ্ম পাতার উপরে একটা পাখি বা একটা ব্যাং বা একটা পোকা দাঁড়াতে পারে। এই চিন্তার উপরেই সেই কনসেপ্ট। বাংলাদেশকেও ওই ব্যবস্থার মাঝে আনার চেষ্টা চলছে। আশা করি সেটা নিয়ে লিখবো কখনো। এই পুরো চেষ্টায় ইস্রাইলের প্রবেশ topping on cake-এর মতো কাজ করেছে। ভারতের মাটিতে ইস্রাইলী গোয়েন্দা সংস্থার অফিস থাকার পরেও আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবিরা ভারতকে দেখতে পাননি। কিছু তথাকথিত রাজনৈতিক দল আবার ইস্রাইলকে দেখলেও যুক্তরাষ্ট্রকে কোথাও দেখতে পায় না। ভারত এবং ইস্রাইলের বিরুদ্ধে হাল্কা কথা বলেই তারা ক্ষান্ত থাকেন, যা দিয়ে সেসব দেশের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে না কোনদিন। আর ভারতের অস্তিত্ব যে বাংলাদেশ টিকিয়ে রেখেছে, সেটা নিয়ে তো এর আগেই লিখেছি। তারা ভারত-ইস্রাইলকে নিয়েই বেশি মাথা ঘামায়; এই দেশ দু’টির পশ্চিমা জন্মদাতাদের নিয়ে নয়। মোট কথা দাদামশাইকে ছেড়ে দিয়ে তারা বাপকে নিয়েই কথা বলেন; তা-ও আবার দোয়া করেন যেন বাপ আবার হার্ট এটাক না করে! কারণ হার্ট এটাকের সেই ভয় তাদের সত্যিকার অর্থে আছে বলেই ইসলামের বিরুদ্ধে এত ষড়যন্ত্র তারা আজ করছে।

পশ্চিমা বিশ্বের মানুষ গণহারে আজ ইসলামে দিক্ষীত হচ্ছে। ভারতেও একই অবস্থা। গুরুত্বপূর্ণ পশ্চিমা রাজনীতিকের পরিবারের সদস্যরাও ইসলাম নিয়ে নিচ্ছে। এ তো গেল যারা জানিয়ে মুসলিম হচ্ছেন তাদের কথা। যারা না জানিয়ে হচ্ছেন, তাদের হিসেব তো কারো কাছেই নেই! তারা তো তাদের সমাজের সমস্যার চিত্র দেখতেই পাচ্ছে প্রতিদিন। আমাদের মাঝেই বরং জন্মগতভাবে ইসলাম পাবার এক অবান্তর গরিমা কাজ করছে, যার ভারে আমরা নিজেরা কার সামনে নত হয়ে যাচ্ছি, সেটা খেয়ালই করছি না। ডিভোর্স, পারিবারিক কলহ, ব্যাভিচার, মাদক, বেশ্যাবৃত্তি, সমকামিতা, ইত্যাদি অনাচারের কবলে নিপতিত সেকুলার সমাজ moral দিক থেকে দুর্বল থাকে। তাই এদেরকে একবার ধাক্কা দিলেই তার সামনের পুরো দুনিয়া তাসের ঘরের মতো ধ্বসে পড়ে। পশ্চিমাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এই এলিট সেকুলারদেরকে টার্গেট করেই। তারা জানে যে ইসলামের পথে গেলে এরা পশ্চিমা বিশ্বের কাছ থেকে intellectual leadership নিয়ে নেবে। তাই সেই সুযোগ এদেরকে না দিয়ে বরং ফুসলিয়ে জঙ্গী বানিয়ে হাতে অস্ত্র তুলে দেবার ব্যবস্থা করছে। পশ্চিমারা তাদের এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যেই এদেশের সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবিদের নিয়ে বৈঠক করে ঢাকায়, কোলকাতায়, আগ্রা-দিল্লীতে।

পশ্চিমা সভ্যতা আজ ধ্বংসোন্মুখে পতিত। এই ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতাকে এখন লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। এদের এজেন্টদের অবস্থা তাদের আব্বুদের চাইতে ভালো হবে না। যারা সমস্যার সমাধান দেয়ার ক্ষমতা হারিয়েছে, তাদের কাছ থেকে আমরা কি নিতে পারি আজ? বরং সামনের দিনগুলিতে তাদেরকে গভীর কূপ থেকে উদ্ধার করতে আমাদেরই দড়ি ছাড়তে হতে পারে।

Saturday, 9 July 2016

আমদানি করা “Trojan Horse” থেকেই জঙ্গীবাদ

০৯ জুলাই ২০১৬
 

যে লাইফস্টাইলের মাঝ থেকে আজ জঙ্গী রিক্রুট হচ্ছে, তা আসলে কতটা স্বাভাবিক? অস্বাভাবিকতাকে স্বাভাবিকতা দান করলো কে? কিভাবে?

কল্পকাহিনী নাকি বাস্তবতা?

হলিউডে সাম্প্রতিককালের নামকরা ডিরেক্টর এম নাইট শায়ামালান। ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই ডিরেক্টর Sixth Sense মুভি তৈরি করে রাতারাতিই সাড়া ফেলে দেন। তবে তার এরেকটা মুভি সম্পর্কে সবাই হয়তো অবগত নন, যার নাম Unbreakable. এই মুভিতেও এই তরুণ ডিরেক্টর রোমাঞ্চের মূলটা রেখে দেন মুভির শেষের জন্যে। যারা মুভিটা দেখেননি, তাদের জন্যে একটু spoiler হলেও আজকের আলোচনার খাতিরে কিছু কথা বলতে হচ্ছে। মুভিটাতে সুপারহিরো খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে এক লোক নিজেই ভিলেন সেজে ফেলেন। অর্থাৎ এখানে দেখানো হয় যে ভিলেন না থাকলে হিরো কি করবে? Batman Trilogy মুভিগুলিতেও মোটামুটি সেই চিন্তাটাকেই উপস্থাপন করা হয়। আরও বেশকিছু মুভিতে দেখানো হয় যে ভাইরাস তৈরি করা হয় এন্টিভাইরাস বিক্রির উদ্দেশ্যে। এই মুভিগুলো যে মূল চিন্তাটার উপরে ভিত্তি করে গড়া তা হলো – একটা খেলা খেলতে দুইটা পক্ষ লাগে।

হলিউডের মুভিগুলি কল্পকাহিনী হলেও চিন্তাটা কিন্তু কল্পকাহিনী নয়। এই চিন্তা বহু প্রাচীনকালের; যখন থেকে মানুষ নিজের স্বার্থকে সবকিছুর উপরে স্থান দিতে শুরু করে। নিজের শত্রুদেরকে দুই ভাগে ভাগ করে তাদের মাঝে মারামারি লাগিয়ে দিয়ে গোপনে উভয় পক্ষকেই ইন্ধন যোগানো – চিন্তাটা বোঝা গেলেও যখন কেউ এটা কাজে লাগায়, তখন বেশিরভাগ মানুষের পক্ষেই সেটা ধরা সম্ভব হয় না। বুঝতে পারার সুবিধার্থে একটা সত্যিকারের উদাহরণ দেয়া যাক, যা বেশিদিনের পুরোনো নয়। শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের সময়ে শ্রীলংকার সেনাবাহিনী এবং তামিল টাইগারদের একই ট্রেনিং ক্যাম্পের দুই প্রান্তে ট্রেনিং দেবার ব্যবস্থা করেছিল ইস্রাইল। উভয় পক্ষের উপরেই অস্ত্র এবং নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে ইস্রাইলের ব্যাপক সুবিধা হয়েছিল। দুই পক্ষকে একে অপরের মাঝে লাগিয়ে দিয়ে খেলা উপভোগ করাটা একটা কৌশল, যা ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ থিওরির নামান্তর মাত্র। এতে একজন আম্পায়ার সেজে বসে থাকেন এবং দুই পক্ষ খেলতেই থাকে, খেলতেই থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের শেষ রক্তবিন্দু অবশিষ্ট থাকে। এটা একটা আদর্শিক খেলা (Ideological Game), যার মূলটা গুলশান ৭৯ নম্বরের ঘটনা নিয়ে লিখতে গিয়ে ব্যাখ্যা করেছিলাম। আজকে বাংলাদেশে এই খেলাটার ‘রুলবুক’ নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই, যা কিনা খেলার আম্পায়ার ঠিক করেছেন, কিন্তু খেলোয়াড়েরা জানেন না!

ইস্রাইলের একই ক্যাম্পে দুই পক্ষকে ট্রেনিং দেয়ার মতোই একই বাড়ির দুই ঘরে ভিলেন এবং হিরোর জন্ম দেয়া হয়েছে। একজনকে দেখিয়ে আরেকজনকে তৈরি করা হয়েছে, যদিও দুজনেই একই বাড়ির, হয়তো একই মায়ের সন্তান! এতে সংসার হয়েছে ধ্বংস; সমাজ হয়েছে নষ্ট; দেশ হয়েছে দুর্বল। এটা ultimate subversion. দুঃখজনক হলেও আমাদের অজান্তেই আমরা এই subversion-এর শিকার হয়েছি; হচ্ছি। আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা ধূলায় মিশতে বসেছে আজ! আমাদেরকে চিন্তার দিক থেকে যে অথর্ব করে ফেলা হয়েছে, তা এর আগেই লিখেছি। দুর্বল করে তারপরেই এই কাজে হাত দেয়া হয়েছে। কাজেই আমরা এটা ধরতে তো পারিই নাই, বরং এখন ধরতে পারলেও এর থেকে বের হবার কোন পথ খুঁজে পাচ্ছি না। Subversion-এর মূল চিন্তাটাই হলো একটা জাতিকে দুর্বল করে তারপরে সাহায্যের হাত বাড়ানো এবং হাত ধরতে বাধ্য করা। আর হাত ধরার পরে তারা এই জাতিকে পুরোপুরি ধ্বংসের দোড়গোড়ায় নিয়ে যাবে। এই ক্রাইসিসের সমাধান কি করে হবে, সেটা বোঝার আগে সমস্যাটা কিভাবে পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছে, সেটা খতিয়ে দেখতে হবে।
 
সম্ভ্রান্ত ঘরের সন্তানদের সেলেব্রিটি বানাবার পরে হঠাত হাওয়া হয়ে যাওয়া এবং আটলান্টিকের ওপাড় থেকে তাদের ছবি প্রকাশ হওয়া কি একেবারেই কাকতালীয় ব্যাপার?

খেলার মাঠ তৈরি

শিক্ষিত মেধাবী মধ্য বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত ঘরের একটা ছেলেকে জঙ্গী হিসেবে তৈরি করতে হলে তার জন্যে একটা playing field আগে তৈরি করতে হবে। সেটা তৈরির উদ্দেশ্যে সে সহ তার আশেপাশের মানুষের উপরে কিছু ব্যাপার চাপানো হয়েছে, যা কিনা ওই ছেলেটির সামনে জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ হিসেবে কাজ করেছে। যে ছেলেটি নিজেই সেই culture বা lifestyle-এ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন, তার সামনে culture-টাকে ‘ভিলেন’ হিসেবে দেখানোটা বেশ সহজই হয়েছে। তার বন্ধুবান্ধব বা ভাই-বোন এমনকি নিজের মাঝেই সেই অন্ধকার উদাহরণ সে দেখতে পায়। যতদিন মাদ্রাসার ছাত্রদের কাছে এই উদাহরণ আনা হয়েছে, ততদিন ব্যাপারটা ক্রাইসিসে রূপ নেয়নি। মাদ্রাসার একটা ছেলে কয়টা মানুষকে চেনে? আর শহুরে মধ্য বা উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের একটা ছেলে বা একটা মেয়ের ফেইসবুক প্রোফাইলে কতজন ফ্রেন্ড থাকে? এভাবে মাদ্রাসার ছেলেটাকে ব্যবহার করে সমাজের যতটা না ক্ষতি করা সম্ভব, তার চাইতে বহুগুণ বেশি ক্ষতি করা সম্ভব মধ্যবিত্ত পরিবারের একটা ছেলেকে বা মেয়েকে টার্গেট করে, কারণ এই দ্বিতীয় ধরণের ছেলে-মেয়েদেরই সমাজে নেতৃত্ব দিতে পারার সম্ভাবনাটা বেশি থাকে। এরা নিঃসন্দেহে বড় টার্গেট।

যে ছেলেমেয়েগুলিকে টার্গেট করা হয়েছে, তারা তো রাস্তার পাশের টং দোকানের কাস্টমার নয়। বরং নামীদামী ব্র্যান্ডেড কফিশপ, ভাজা মুরগি বা বার্গার-পিতজার দোকানেই এদের আনাগোণা। পড়াশোনা করেছে নামী এবং expensive প্রাইভেট স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্কলারশিপ পেয়ে বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়েছে তাদের। স্পন্সর করে দেশের এম্বাস্যাডর হিসেবে দেখানো হয়েছে এদের। বিদেশী সেলেব্রিটিদের হাত ধরে স্টেজে উঠে নাচার লোক এরা। হেভিলি স্পন্সরড কালচারাল পার্ফরমেন্স-এর টিভি রিয়েলিটি শো-তে এনে পুরো জাতির সন্মুখে সেলেব্রিটি হিসেবে তৈরি করা হয়েছে এদের। এরাই সেই সেলফি জেনারেশন, যারা কিনা ভাজা মুরগির posh দোকান থেকে গার্লফ্রেন্ডকে সাথে নিয়ে সেলফি তুলেছে ফেসবুকে আপলোড করে অনেক অনেক লাইক পাবার জন্যে। ঘন্টার পর ঘন্টা পার করেছে ফেসবুকে; সময়ের দিকে খেয়াল রাখেনি। বিদেশী সেলেব্রিটিদের লাইভ প্রোগামে যাবার জন্যে উন্মুখ হয়ে থেকেছে; টিকেটের মূল্যের কথা চিন্তাও করেনি। তাদের এই lifestyle-এর কারণে এদেরকে তো মাদ্রাসার কেউ এসে ব্রেনওয়াশ করার প্রশ্নই ওঠে না। এদেরকে তো মসজিদে রিক্রুট করা হয়নি; কারণ এদের lifestyle ছিল পুরোপুরি সেকুলার। যারা টার্গেট করেছে, তারা এদের প্রথমবার ধরেছে এদের interaction point-গুলিতেই। ব্রেনওয়াশ শুরুর সর্বপ্রথম ধাপ এটি। অর্থাৎ শস্যের মধ্যেই যে ভূত ছিল!
 
ট্রয় নগরীর মানুষেরা স্পার্টানদের রেখে যাওয়া কাঠের ঘোড়াখানা না বুঝেই যত্ন করে শহরের ভেতরে টেনে নিয়েছিল। তারা জানতো না যে এর মাঝে ট্রয় নগরী ধ্বংসের লক্ষ্যে লুকিয়ে ছিল স্পার্টার সৈন্যরা।

আমদানি করা “Trojan Horse”

ফেসবুক, কফিশপ, ভাজা মুরগির দোকান, বিভিন্ন লাইভ ইভেন্ট, ইত্যাদি একই সাথে যেমন তাদের রিক্রুট করার জন্যে মূল স্থান হিসেবে কাজ করেছে, ঠিক তেমনিভাবে এই একই culture এবং lifestyle-কে ভিলেন হিসেবে তার সামনে হাজির করে জঙ্গী বানানোর ভিত্তি গড়া হয়েছে। এদের রিক্রুটিং এজেন্টরা এই culture এবং lifestyle-এর সাথেই এসেছে। এরাই সেই এজেন্ট, আদর্শিক শক্তিদের প্রজেক্ট বাস্তবায়নই যাদের উদ্দেশ্য। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে যে এই culture এবং lifestyle খুব অল্প সময়ের মাঝে গড়ে তোলা হয়েছে। কল্পনা করেছিলাম কি যে এই আমদানি করা secular lifestyle-এ আসক্ত করে আবার সেটার বিরুদ্ধেই তাদের ক্ষেপিয়ে তুলে জঙ্গী বানিয়ে উদ্দেশ্য হাসিল করা হতে পারে? একবারও কি চিন্তা করে দেখেছি যে ফেইসবুক কালচারকে ব্যবহার করে আমাদের উতকৃষ্ট যুবক-যুবতীদের ধ্বংস করার ব্যবস্থা করা হবে? বিদেশী posh ব্র্যান্ডেড রেস্টুরেন্টের কোন টেবিলে expensive recipe-এর আড়ালে তাদের এজেন্টরা লুকিয়ে থাকতে পারে, সেটা কি আমরা ভেবে দেখেছি একবারও? মেধাবী ছেলে-মেয়েদের স্কলারশিপ দিয়ে দেশের বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করে বা স্পন্সর করে দেশের এম্বাস্যাডর করে বাইরে পাঠাবার কয়েক মাস পরে বা টিভি রিয়্যালিটি শো-তে সেলেব্রিটি বানানোর কিছুদিন পরে কি করে ছেলে-মেয়ারা গায়েব হয়ে যায় এবং এরপর হঠাত করেই কোন সুইসাইড মিশনের আগে ছবি বা ভিডিওতে তাদেরকে মাথায় পাগড়ি বেধে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, যা কিনা আবার আটলান্টিকের ওপাড় থেকে টুইটারের মাধ্যমে প্রচার করা হয়? এটা কি শুধুই coincidence? ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ পলিসি বাস্তবায়নের জন্যে এই culture এবং lifestyle যে “Trojan Horse” হয়ে দেখা দিতে পারে, সেটা কি আমারা স্বপ্নেও ভেবেছিলাম? এখনো ভাবছেন যে কেন এখানে তরুণদের সাথে তরুণীদের কথা বলছি? ইউরোপ থেকে সিরিয়াতে চলে গিয়ে সুইসাইড মিশনে অংশ নেয়া তরুণীদের কথা কি কেউ মনে করতে পারেন? আপনার চেনাজানা সেই Western lifestyle-এ চলা মেয়েটি যে কয়েক মাসের মধ্যেই জঙ্গী হয়ে সুইসাইড মিশনে চলে যাবে না সেটা কি আমরা এখন গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি? অন্তত সারা মুসলিম বিশ্ব থেকে যেসব উদাহরণ আমাদের সামনে আসছে, তাতে আমরা কি করে উদাস থাকতে পারি? মাদ্রাসার ছেলেরা নয়, বরং Secular lifestyle-এ অভ্যস্ত হওয়া উঁচু ঘরের উচ্চশক্ষিত এবং মেধাবী ছেলে-মেয়েরাই আজকে সবচাইতে বড় টার্গেট! এদের জন্যেই খুব যত্ন করে playground তৈরি করা হয়েছে।
 

পত্রিকায় লাইফস্টাইলের নামে কি কি আসবে সেটা কে নিয়ন্ত্রণ করে?

এই “Trojan Horse”-কে যেভাবে আমাদের মাঝে স্থাপন করা হলো…

বিভিন্ন মিডিয়া হাউজের মাধ্যমে প্রডাক্ট ডিজাইন করা হয়েছে এই lifestyle-কে উপরে তুলে ধরার লক্ষ্যে; বিজ্ঞাপন এবং প্রমোশন ক্যাম্পেইন ডিজাইন করা হয়েছে। বেশি টাকা আয়ের লোভে মানুষ ভুলেই গেছে যে নিজের সন্তান এবং ছোট ভাই-বোনদের কোথায় তারা ঠেলে দিচ্ছে। এই subversion পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কৌশলগত স্থানগুলিতে এজেন্ট বসানো হয়েছে এবং ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে বাকিরা এই এজেন্টদের গুরু মেনে অনুসরণ করে যায়। এই lifestyle কতটা সস্তা প্রকৃতির, সেটা সকলেরই জানা; তারপরেও কোন যুক্তিতে সেগুলি শত শত কোটি টাকা খরচ করে promote করা হলো? কে মাথায় ঢুকালো যে এই lifestyle-কে promote না করলে কোন প্রডাক্ট বিক্রি হবে না? কে যুক্তি দিল যে এই lifestyle না নিলে একটা ছেলে বা একটা মেয়ের জীবন বৃথা হয়ে যাবে? একবারও কি প্রশ্ন করে দেখেছি যে বিজ্ঞাপণে যা দেখানো হচ্ছে, তা দেশের বর্তমান অবস্থাকে প্রতিফলিত করে কিনা? আমরা রাস্তায় যা দেখি একই জিনিস কি বিজ্ঞাপণে দেখি? মোট কথা আমরা কি বিজ্ঞাপণে দেশের বর্তমান বাস্তব চিত্র দেখতে পাই? যদি না পাই, তার অর্থ কি এ-ই দাঁড়াচ্ছে না যে বাস্তবতাকে পরিবর্তন করার উদ্দেশ্যেই এই পণ্য এবং বিজ্ঞাপণগুলিকে ডিজাইন করা হচ্ছে? একটা alien culture and lifestyle-কে দেশের যুবসমাজের উপরে জোর করে চাপিয়ে দেয়ার জন্যে দেশের মিডিয়া হাউজগুলি কি যারপরনাই চেষ্টা চালাচ্ছে। ফ্যাশন ডিজাইনার, মেকআপ আর্টিস্ট, হাই-এন্ড পার্লার, ইভেন্ট অর্গানাইজার, ফ্যাশন ম্যাগাজিন, দৈনিক পত্রিকার lifestyle supplement-গুলি এবং আরও অনেকে হাতে-হাত ধরে একই লক্ষ্যে কাজ করেছে। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আয় করা টাকা দিয়েই আবার এই ক্যাম্পেইন চালানো হচ্ছে। অর্থাৎ কই-এর তেলেই কই ভাজা! সেটাও আবার অন্যের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্যে?? কি অবাস্তব রকমের অবস্থা, অথচ কেউ একটা টুঁ শব্দটি করে না এই ব্যাপারে? কেন করে না? যাতে এই ব্যাপারে শুধুমাত্র posh কফিশপ ও branded ভাজা মুরগির দোকানের কোণার টেবিলে বসা ওই জঙ্গী রিক্রুটিং এজেন্টই কথা বলার সুযোগ পায় সেই জন্যে? জঙ্গী রিক্রুটিং এজেন্টদের জন্যে এটা কত বড় ব্যাকআপ! সেটাও তৈরি করা হয়েছে এদেশের মানুষেরই কষ্টার্জিত অর্থে??
 
প্রডাক্টের সাথে সাথে আর কি কি মার্কেটিং করা হয়েছে সেটা কি আমরা জানি? এই বিষয়ে প্রশ্ন তোলার দায়িত্ব আমরা দিয়েছি জঙ্গী রিক্রুটকারীদের হাতে?

প্রত্যেকটা বিজ্ঞাপণে এধরনের lifestyle-এর অন্তত কিছু ছোঁয়া থাকতেই হবে। এই rule কে বা কারা ঠিক করে দেয়? একটা বড় সংখ্যক নাটকেরও এখন একই অবস্থা। আগে সিনেমা তৈরি করা হতো সমাজের নিম্নবিত্তদের জন্যে। অশ্লীলতার নাম করে সেগুলি উতপাটন করা হলো কেন? এখন মধ্যবিত্ত যুবক-যুবতীদের সেই একই সস্তা টনিক যাতে আরও sophisticated-ভাবে দেয়া যায় সেজন্যে? কারণ টার্গেটের priority এখন মধ্য এবং উচ্চমধ্যবিত্ত শিক্ষিত ও মেধাবী তরুণ-তরুণীরা; সেটাই তো? উপরে এই lifestyle-এর সাথে যায় এরকম যতগুলি interaction point-এর কথা বলেছি, তার সবগুলিই মিডিয়াতে heavily promoted. অর্থাৎ জঙ্গী রিক্রুটিং এজেন্টদের জন্যে যুবক-যুবতীদের constant supply তৈরি করে রাখা হচ্ছে! এই অথর্ব সমাজের একটা প্রশ্ন করার ক্ষমতা নেই যে এই unnecessary and cheap lifestyle কি করে সকলের চোখের সামনে অবাঞ্ছিত ঘোষিত না হয়ে বরং জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে promoted হলো? আমরা কি মনে করতে পারি, এগুলি ঘটার সময়ে আমরা আসলে ঠিক কি করছিলাম? না পারি না। কারণ আমরাও সেই একই lifestyle-এ ডুবে আছি, যার প্রতিদিনের ঘটনার মাঝে কোন ঘটনাই মনে রাখার মতো নয়, যদি না সেটা ফেইসবুকে আপলোড করে রাখা হয়! এরকমই একটা অবস্তব দুনিয়ার ঘোরের মাঝে আমরা আছি যে উপরে বর্ণিত সকল কর্মকান্ড আমাদের নাকের ডগার সামনে দিয়ে বাস্তবায়িত হবার পরেও আমরা paralyzed হয়ে দেখেছি! শুধু তা-ই নয়, আরও আশ্চর্য ব্যাপার হলো সেই অবাস্তব কর্মকান্ডকে আমরা ভালোবাসতেও শিখেছি! কেউ কেউ যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করতে পারেন যে বোকার কোন শত্রু নেই। হ্যাঁ, সেটা ছাড়া আর কোন ভাষা দিয়ে নিজেদেরকে মূল্যায়ন করার intellectual ability আমাদের আজ নেই!
 
একটা সমাজ ধ্বংস সবচাইতে বড় অস্ত্র হলো এর নারীদেরকে ধ্বংস করা।

এই “Trojan Horse”-এর খপ্পর থেকে বের হতে হবে

ইংরেজীতে একটা কথা আছে – ‘হুক, লাইন এন্ড সিঙ্কার’ (Hook, line and sinker)। যার আভিধানিক অর্থ হলো একটা কাজ সম্পূর্ণভাবে করা। আসলে বরশির আগায় টোপ দিয়ে মাছ শিকারের প্রসেস এটি। এর জন্যে আগে টোপ গেলাতে হয়। মাদ্রাসা থেকে জঙ্গী রিক্রুটের খবর যখন জানা গেল, তখন জঙ্গীবাদ রুখতে আমরা মাদ্রাসা কেন্দ্রিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলাম। যদিও আমদানি করা অবাস্তব lifestyle-কে টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, তথাপি আমরা সেটিকে আগের স্থানেই রেখে দিয়েছিলাম। টোপ রেখে দিয়ে মাছকে নিয়ে ব্যস্ত হবার ফল আমরা এখন টের পাচ্ছি। এবার সেই একই অবাস্তব lifestyle-কে টোপ হিসেবেই শুধু নয়, বরং রিক্রুটিং গ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে! এখন আমরা কি করবো? টিভির টক শো-তে hand-picked কিছু এজেন্ট এবং অথর্ব লোকদের অর্থহীন কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বকবক শুনে ঘন্টার পর ঘন্টা জীবন থেকে চলে যেতে দেব? নাকি রাষ্ট্রদ্রোহী এই subversion কর্মকান্ড বন্ধ করার চেষ্টা করবো?
 
অবাস্তবকে বাস্তবে রূপ দেয়ার চেষ্টার কমতি নেই আজ।

আমাদের কে কি এই আমদানি করা অবাস্তব lifestyle-এ এতটাই addicted করে ফেলা হয়েছে, যাতে নিজেদের সন্তান, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধবকে হারিয়েও সেখানেই নিজেদের শান্তিকে খুঁজে ফিরবো? কি অবস্থা তৈরি হলে বাবা তার যুবক ছেলের লাশটাও ফেরত নিতে চায় না একবার ভেবে দেখতে পারেন? সমাজে সন্মানিত এবং ‘জীবনে সফল’ সেই বাবার কষ্টটা আমাদের পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব নয়। এতটাই কি সস্তা হয়ে গেছি আমরা যে মনুষ্যত্ব ভুলে গিয়ে culture এবং lifestyle-এর পুজায় মনোনিবেশ করবো? এটাই সেই “Trojan Horse”, যার মোহে আমরা শুধু intellectually bankrupt-ই হইনি, মনুষ্যত্বকেও হারাতে বসেছি। চিন্তাশূণ্য থাকার কারণে রাষ্ট্রবিরোধী ওইসব কর্মকান্ডকে ভালোবেসে বছরের পর বছর চলতে দিয়েছি! উপরে বর্ণিত এজেন্টদের আদর করে মোটা টাকার পারিশ্রমিক দিয়েছি তাদের subversion সফলভাবে করার জন্যে!! তাদেরকে আইকন বানিয়েছি নিজেদের জন্যে; নিজেদের সন্তানদের জন্যে!! ফলাফল আমরা ভোগ করবো না তো কে করবে?? অধঃপতন অনেক দূর পর্যন্ত হতে পারে, কিন্তু নিজেদের অবস্থানে থেকে অনেক সময়েই অধঃপতনের গভীরতা পরিমাপ করা কষ্টকর। আজ সেই অধঃপতন আমাদের সামনে প্রিয়জনের রক্তাক্ত লাশের আকারে তার গভীরতা দেখাচ্ছে। অদর্শিক শক্তির অশুভ এই প্রজেক্ট থেকে দেশ এবং দেশের তরুণ-তরুণীদের বাঁচাতে হলে আগে আমদেরকে আমদানি করা অবাস্তব সেই lifestyle-রূপী “Trojan Horse”-এর খপ্পর থেকে বের হতে হবে।

Monday, 4 July 2016

গুলশান ৭৯ নম্বর – “আদর্শিক ফোড়া”র শিকার বাংলাদেশ

০৪ জুলাই ২০১৬
"জঙ্গী-জঙ্গী" খেলাটা হচ্ছে একটা আদর্শিক খেলা। এই খেলা না বুঝতে পারলে অন্যের আদর্শিক উদ্দেশ্যই বাস্তবায়িত করা হবে। একটা "আদর্শিক ফোড়া" তৈরি করে জাতিকে ব্যস্ত রাখাটাই উদ্দেশ্য।


গুলশান ৭৯ নম্বর রোডের ক্যাফেতে রক্তের বন্যা বয়ে গেল। এর আগে যা যা নিয়ে লিখেছি, এই ঘটনা তারই চলমান প্রবাহ মাত্র। কিছুদিন আগেই আদর্শিক যুদ্ধের (Ideological Conflict) পুণরাবির্ভাব নিয়ে লিখেছিলাম, যেখানে বলেছিলাম যে পশ্চিমা আদর্শিক চিন্তাবিদ এবং ভূরাজনীতি বিশারদরা কিভাবে চিন্তা করছেন সামনের দিনগুলি নিয়ে। তারা সামনের দিনগুলিতে বিশ্বের Balance of Power-এ ব্যাপক পরিবর্তনের আশংকা করছেন বলেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তথা পশ্চিমা বিশ্বকে ‘উদ্ভট’ সব কৌশল অবলম্বন করার উপদেশ দিচ্ছেন। ‘উদ্ভট’ বলছি আসলে সেগুলি উদ্ভট বলে নয়, বরং সাধারণ মানুষের কাছে সেগুলি উদ্ভট ঠেকবে সেজন্যে। যেমন - মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মুখে অন্য কথা বললেও দুনিয়ার উল্লেখযোগ্য কিছু স্থানে সে আসলে স্থিতিশীলতা চায় না। স্থিতিশীলতা হচ্ছে একটা শক্তিশালী জাতি গড়ে ওঠার পূর্বশর্ত। স্থিতিশীল জাতিই চিন্তা করে ঠান্ডা মাথায় নিজেদের চিন্তার বিকাশের পথে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু সেই জাতি যদি অবাঞ্ছিত কোন কাজে ব্যস্ত থাকে, তাহলে সে চিন্তা করার সময়ও পাবে না এবং তারা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ভিত্তিগুলিও হবে দুর্বল। এই প্রেক্ষাপটেই আজকে গুলশান ৭৯ নম্বর রোডের ঘটনার মূল্যায়ন করা চেষ্টা করবো।

গুলশান ৭৯ নম্বর – প্রাসঙ্গিক আলোচনা

গুলশানের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে কিছু কথা বলতেই হয়। তবে সবকিছু প্রাসঙ্গিক নয় বিধায় সবকিছু নিয়ে কথা বলবো না। আর circumstantial evidence নিয়ে এখানে বেশি কথা বলতে চাই না, কারণ এগুলি manipulate করা সম্ভব। যেসব ব্যাপার ভূরাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে, শুধু সেসব ব্যাপার নিয়েই কথা বলবো।

প্রথমতঃ এটা বুঝতে বাকি থাকে না যে এই অপারেশনে “বিদেশী” হওয়াটাই টার্গেট হবার মূল শর্ত ছিল। বিভিন্ন জাতীয়তার মানুষ হত্যা হওয়াটা সেটাই প্রমাণ করে। এখানে বিশেষ কোন শক্তিশালী দেশের বিরুদ্ধে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করা বা বিশ্বের সকল সমস্যার মূল বলে ধমকি দেবার মতো কোন রাজনৈতিক মেসেজ ছিল না। অর্থাৎ আক্রমণটা বিশ্ব-নিয়ন্ত্রকের বিরুদ্ধে ছিল না।

দ্বিতীয়তঃ এক ঘন্টার মাঝে অপারেশন শেষ করে না ফেলে একটা জিম্মি সিচুয়েশনের অবতারণা করে সেটাকে ১০ ঘন্টা ঝুলিয়ে রাখার কি মানে দাঁড়ায়? কেউ কেউ কথা তুলবেন যে আইন-শৃংখলা বাহিনী ১০ ঘন্টা ঝুলিয়ে রেখেছে। কিন্তু যে প্রশ্ন কেউ করবে না তা হলো, জিম্মিকারীদের কি খেয়ে কাজ ছিল না যে ১০ ঘন্টা বসে থাকবে? তারা যদি জানতোই যে তারা মারা পড়বে, তাহলে ১০ ঘন্টা ওখানে বসে ঘুমিয়ে তাদের লাভ কি ছিল? যদি সবাইকে মেরেই ফেলা হবে, তাহলে এত ঘন্টা ঝুলিয়ে রেখে কিছু লোকের মুখে কথা তুলে দেয়া কেন? কিছু সমালোচক এখন কি করলে কি হতে পারতো, বা কখন কি করা উচিত ছিল, বা কোনটা করা ঠিক হয়নি, এগুলি নিয়ে কথা বলার সুযোগ তৈরি করা কেন? এক্ষেত্রে কথা বলার সুযোগ নিয়ে কে চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ পাচ্ছে? জিম্মিকারীরা সেই চাপ সৃষ্টিকারীদের পক্ষেই কাজ করেছে।

তৃতীয়তঃ বাংলাদেশ কোন পর্যটন কেন্দ্র নয়। এদেশে যে বিদেশীরা আসে, তার ৯০%-এরও বেশি আসে কাজ করতে। বিদেশীরা এদেশে আসেন বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের জন্যে। কাজের ফাঁকে এরা দেশের বিভিন্ন স্থান ঘুরে আসে। যদি এদেশে বিদেশীদের উপরে হামলা হয়, তাহলে এদেশের পর্যটন শিল্পের কিছু হবে না, বরং অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হত্যাকান্ডের শিকার জাপানিরা মেট্রো-রেল প্রজেক্টে কাজ করছিলেন আর ইটালিয়ানরা গার্মেন্টস ব্যবসায়ে ছিলেন; অর্থাৎ সকলেই অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে এখানে এসেছিলেন। আরও নয়জন তাবেলা আর আরও সাতজন কুনিওকে হত্যা করা কেন? এই দু’টি দেশতো যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ প্রথম সারির অংশগ্রহণকারী দেশ নয়। তাহলে এই দেশগুলিকে কেন টার্গেট করা? ইটালিয়ান এবং জাপানিরা তো অর্থনৈতিক কাজে এখানে আসে। এদের হত্যার মাধ্যমে এদেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্য কি? কি হাসিল হবে এতে?

চতুর্থতঃ বাংলাদেশ তথা ইসলামের ভাবমূর্তি নষ্ট করার একটা প্রয়াস মনে হতে পারে এটা। “আল্লাহু আকবার” কথাটাকে কলুষিত করে বেসামরিক বিদেশী হত্যা করে ইসলামকে বাজে ভাবে বাকি বিশ্বের সন্মুখে তুলে ধরার একটা ব্যর্থ প্রয়াস এটা। পশ্চিমা বিশ্বের মানুষই যেখানে প্রতিদিন ইসলামের মাঝে তাদের জীবনের সমস্যার সমাধান খুঁজে পেয়ে ইসলামকে আলিঙ্গন করছে, সেখানে এধরনের কার্যকলাপের মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো hawk-দের আকৃষ্ট করা ছাড়া আর কি অর্জন করা সম্ভব? ইসলামের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা নয়, বরং পশ্চিমের hawk-দের মুখে কথা তুলে দেয়াটাই এর মূল উদ্দেশ্য। আর এর সাথে সাথে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ওইসব hawk-দের এজেন্টরা সক্রিয় হবে।
http://d30fl32nd2baj9.cloudfront.net/media/2016/07/02/gulshan-17.jpg/ALTERNATES/w640/Gulshan-17.jpg
গুলশানের অপারেশনের পর এখন বিভিন্ন দিক থেকে চাপ আসতে থাকবে। যতক্ষণ পশ্চিমের আদর্শিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত করা না হবে, ততক্ষণ এই চাপ অব্যাহত থাকবে। এই আক্রমণ ছিল বাংলাদেশকে পশ্চিমের চাপের মাঝে ফেলার রেসিপি। আদর্শিক শক্তির ইচ্ছার বাস্তবায়ন এভাবেই করা হয়।


বাংলাদেশের উপরে চাপ সৃষ্টির রেসিপি…

লম্বা সময়ে ওখানে বসে থাকার জন্যে পশ্চিমের এজেন্টরা এখন সুযোগ পাবে এই অপারেশনের সমস্যাগুলির কথা বলে একটা বিভেদ সৃষ্টি করার। আর একইসাথে এদেশে অর্থনৈতিক কাজে আসা বিদেশীদের টার্গেট করে দেশের অর্থনীতির উপরে চাপ সৃষ্টি করে কিছু শর্ত চাপানোর কাজ চলবে। ঠিক যেমনটি ছয় মাস আগেই হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট এবং ফুটবল দলের ট্যুর নিয়ে ঝামেলার সৃষ্টি করে। এবং বিমানে পণ্য রপ্তানির উপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে। যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের বিশেষ শর্তগুলি চাপানোর কাজ না হবে, ততক্ষণ চাপ অব্যাহত থাকবে।

এখানে প্রকৃতপক্ষে রেস্টুরেন্টের মানুষগুলিকে জিম্মি করা হয়নি, বরং পশ্চিমের হাতে বাংলাদেশকে জিম্মি করার পথ তৈরি করা হয়েছে। পশ্চিমারা বাংলাদেশের উপরে চাপ সৃষ্টি করে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করবে। অর্থনৈতিক, সামাজিক, কূটনৈতিক, নিরাপত্তা, ইত্যাদি ক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি করাটাই তাদের মূল উদ্দেশ্য নয়। মূল উদ্দেশ্য হলো আদর্শিক, যেটা বাস্তবায়নের জন্যেই বরং এই চাপ সৃষ্টি করা।

যাদের নাম দিয়ে এসব কর্মকান্ড চালানো হচ্ছে তারা যে প্রকৃতপক্ষে অন্য কারো সৃষ্টি, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো এদের পক্ষে বর্তমান বিশ্বের কোন সমস্যার সমাধানই দেয়া সম্ভব নয়। ইসলাম কি করে বিশ্বের নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা রাখে, তা তাদের জানা নেই। তাদেরকে যদি আমরা জিজ্ঞেস করি যে বিশ্বের অর্থনৈতিক সমস্যার কি করে সমাধান করবেন? সবার জন্যে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন কি করে? অথবা মার্কিন ডলার বা বিশ্ব ব্যাংককে কি করে মোকাবিলা করবেন? আন্তর্জাতিক আইন বা সমুদ্র আইন বা আকাশপথ ব্যবহারের আইনের ব্যাপারে কি পদক্ষেপ নেবেন? অথবা বিশ্বকূটনীতি কোন ভিত্তির উপরে চলবে? ইত্যাদি কোন প্রশ্নেরই উত্তর তাদের পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়। পশ্চিমা বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ করার জন্যে এদের তৈরি করা হয়নি; তাই এদের কাছে কোন সমস্যারই সমাধান নেই। এদের তৈরি করা হচ্ছে ধর্মান্ধ হিসেবে; আদর্শিক চিন্তার অনুসারী হিসেবে নয়। ইসলাম যে একটা আদর্শ, সেটাই এদের কাছে কোনদিন পরিষ্কার করা হবে না। কারণ সেটা হলে তো গেম নষ্ট হয়ে যাবে; সেম-সাইড গোল হবে!
http://www.newsbangladesh.com/media/imgAll/2016May/SM/gulshan-attackers-sm20160703012636.jpg
বাংলাদেশের বিশাল মুসলিম জনসংখ্যা পশ্চিমের জন্যে হমকিস্বরূপ; বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণেরা। তাই এদেরকে ফুসলিয়ে বিপথে নিয়ে আবার বিপথগামীদের মারার জন্যে ফোর্স গঠনের জন্যে সাপোর্ট দেয়া হবে। এটাই আদর্শিক গেম, যা এর আগেও বাংলাদেশে হয়েছে ১৯৭০-এর দশকে। সেবার টার্গেট ছিল কমিউনিজম, এবার টার্গেট ইসলাম।


আদর্শিক শক্তির কার্যকলাপ বোঝার সময় হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব আদর্শিক দিক থেকে চিন্তা করে। তারা তাদের আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করতে সবকিছু করে এবং করবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায় না পৃথিবীর কোথাও তার কোন প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি হোক। যেখানেই সেই প্রতিদ্বন্দ্বী আদর্শের গন্ধ সে পাবে, সেখানেই সে ঝামেলার সৃষ্টি করবে। ‘জঙ্গী-জঙ্গী’ খেলাটাও এই আদর্শিক যুদ্ধেরই অংশ। এর মাধ্যমে চ্যালেঞ্জার আদর্শকে খারাপভাবে উপস্থাপনের চেষ্টাই শুধু করা হয়না, একইসাথে সেই আদর্শের রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়া নষ্ট করা হয়। একটা ভুল আদর্শকে would-be রিক্রুটদের কাছে তুলে ধরা হয়, যাতে তারা সঠিক রাস্তা থেকে সরে আসে। আর একইসাথে ওই বেঠিক রাস্তায় গমনকারীদের ধ্বংস করার জন্যে ওই দেশের মানুষকেই ট্রেনিং দেয়া হয়, টাকাপয়সা দেয়া হয়, অস্ত্রসস্ত্র দেয়া হয়। আক্রান্ত দেশ এসব কাজে এতটাই ব্যস্ত থাকবে যে অন্য কোন কিছু চিন্তা করার ক্ষমতা হারাবে। আর চাপের মুখে তাদেরকে পশ্চিমাদের হাত ধরে সাহায্য চাইতে বাধ্য করা হবে। এই কাহিনী কোন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নয়। এগুলি মার্কিনীরা ঠান্ডা যুদ্ধের সময় দেশে দেশে করেছে; এদেশেও করেছে। আবারও করতে যাচ্ছে।

১৯৭০-এর দশকে এই দেশে একটা বিশেষ রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করা হয়, যারা কমিউনিস্ট আন্দোলনে জড়িত হতে যাওয়া (would-be communist) শিক্ষিত এবং মেধাবী তরুণদের দলে ভেড়াতো। এরা নিজেদের বাম বলে দাবি করলেও এরা আসলে কমিউনিজমের আদর্শকে অন্য দিকে নেওয়ার চেষ্টায় ছিল, যে দিকে গেলে কমিউনিজমের উদ্দেশ্য সফল হবে না। তারা এক সশস্ত্র সংগ্রামে এই তরুণদের জড়িত করেছিল, যেই সংগ্রামের প্রকৃতপক্ষে কোন উদ্দেশ্য আজ অবধি কেউ বের করতে পারেনি। কোন নির্দিষ্ট প্ল্যান ছাড়াই এরা বছরের পর বছর সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যায়। এই সশস্ত্র সংগ্রামকে প্রতিরোধ করতে বিশেষ বাহিনীও তৈরি করা হয়, যেটাতে পশ্চিমাদের ছায়া সমর্থন ছিল। অর্থাৎ সংঘাতের উভয় পক্ষেই পশ্চিমাদের ইন্ধন ছিল। এভাবে দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় তরুণদেরকে আলাদা করে ফায়ারিং স্কোয়াডে নেবার ব্যবস্থা করা হয়, যাতে প্রতিদ্বন্দ্বী আদর্শ কমিউনিজমকে ঠেকানো যায়। হাজার হাজার তরুনকে এভাবে বলি দেয়া হয়।

১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে পশ্চিমাদের আদর্শিক প্রতিদ্বন্দ্বী যে ইসলাম তা এখন মোটামুটি সবাই বুঝতে পারছেন। মুসলিম দেশগুলির জনসংখ্যা বৃদ্ধি যে পশ্চিমা আদর্শের প্রতি হুমকিস্বরূপ, তা এর আগেও লিখেছি। বর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার বাইপ্রোডাক্ট হচ্ছে বিরাট সংখ্যক তরুণ (প্রধানতঃ ১৫ থেকে ২৪ বছর), যারা কিনা যেকোন আন্দোলনে সামনে থাকে, কারণ তাদের রক্ত গরম এবং কর্মশক্তি প্রচুর। যেহেতু জনগণকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের একটা প্রসেসের মাঝ দিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব, তাই এটা তাদের জানা ছিল যে কিছুকাল পরেই মুসলিম সমাজে তরুণদের সংখ্যা কমতে থাকবে। তখন সেই জাতি আস্তে আস্তে পশ্চিমাদের হুমকি হিসেবে থাকবে না। সেই সময়টা পার হওয়ার আগ পর্যন্ত এই আদর্শিক দ্বন্দ্ব লাগিয়ে রেখে জেনারেশনটা নষ্ট করাই উদ্দেশ্য।
বিংশ শতকের গোড়ার দিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন হেনরি ক্যাম্পবেল-ব্যানারম্যান। "আদর্শিক ফোড়া" কি জিনিস সেটা তার কথাতেই সবচাইতে ভালোভাবে বোঝা যায়। তিনি মুসলিমদের মাঝে এমন এক জিনিস ঢুকাতে বলেছিলেন, যা কিনা মুসলিমদের সারাজীবন ব্যস্ত রাখবে। এর ফলাফল ছিল ইস্রাইল। এই একই চিন্তার উপরে ভিত্তি করেই "জঙ্গী-জঙ্গী" খেলাটা ডিজাইন করা হয়েছে।


এ এক “আদর্শিক ফোড়া” মাত্র

জঙ্গীবাদ বা এধরনের কার্যকলাপ হলো “আদর্শিক ফোড়া” (Ideological Furuncle)। আইসিস-ও এই একই ফোড়ার অংশ। এক আদর্শিক শক্তি অন্য আদর্শের উত্থান ঠেকাতে এরকম “ফোড়া”র জন্ম দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেই ব্রিটিশরা চিন্তা করতে শুরু করে যে মধ্যপ্রাচ্যে একটা ইহুদী রাষ্ট্র তৈরি করে দেয়া যাক, যা কিনা বাকি জীবন মুসলিমদের শরীরে “ফোড়া”র মতো কাজ করবে। সারাজীবন এই “ফোড়া” চুলকাতে তার দুই হাত ব্যস্ত থাকবে। আর পশ্চিমারাও এই “ফোড়া”কে জিইয়ে রাখবে ইন্ধন যুগিয়ে। আর মুসলিমদের আলাদা করে দুর্বল করে রাখা হবে, যাতে তারা এই “ফোড়া”কে কেটে ফেলতে না পারে। আর “ফোড়া” নিয়ে ব্যস্ত থাকায় নিজেদের শক্তিশালী করে একত্রিত করার কোন সুযোগই যেন তারা না পায়। ১৯০৫ সাল থেকে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন হেনরি ক্যাম্পবেল-ব্যানারম্যান। ইহুদী রাষ্ট্র তৈরি করার আদর্শিক পটভূমি তার ১৯০৭ সালের ‘ক্যাম্পবেল-ব্যানারম্যান রিপোর্টে’র কিছু কথার মাঝে খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। বলা বাহুল্য যে তিনি যেসময় এই কথাগুলি বলেছিলেন, তখন জেরুজালেম মুসলিমদের হাতেই ছিল (১১৮৭ সাল থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত একনাগারে ৭৩১ বছর)। ব্রিটিশরা মুসলিমদের হাত থেকে জেরুজালেম দখল করেছিল ১৯১৭ সালের ৯ ডিসেম্বর, অর্থাৎ আরও ১০ বছর পর। এরপর প্রায় তিন দশক ধরে প্যালেস্টাইনে ইহুদীদের বসতি স্থাপনের মাধ্যমে এখানে ইহুদী রাষ্ট্র ঘোষণার (১৯৪৮) ভিত্তি তৈরি করা হয়। যাই হোক, তার কথাগুলি ছিল -

“There are people who control spacious territories teeming with manifest and hidden resources. They dominate the intersections of world routes. Their lands were the cradle of human civilizations and religions.

These people have one faith, one language, one history and the same aspirations.

No natural barriers can isolate these people from one another... if per chance, this nation were to be unified into one state, it would then take the fate of the world into its hands and would separate Europe from the rest of the world.

Taking these considerations seriously, a foreign body should be planted in the heart of this nation to prevent the convergence of its wings in such a way that it could exhaust its powers in never-ending wars. It could also serve as a springboard for the West to gain its coveted objects.”


“আদর্শিক ফোড়া”র সমাধান কোথায়?

যারা পশ্চিমাদের কর্মকান্ড নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে থাকেন, তাদেরকে ভুল পথে প্রবাহিত করারও পদ্ধতি আছে। একটা কনসেপ্ট রয়েছে, যেটাকে মানুষ conspiracy theory বলে জানে। যখনই কেউ পশ্চিমাদের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ পোষণ করবে, তখনই তাকে এমন একটা থিওরি ধরিয়ে দেয়া, যাতে সে খেই হারিয়ে ফেলে এবং কোন সমাধান খুঁজে না পায়। এভাবে সে সবকিছুকেই conspiracy theory বলা শুরু করবে, এমনকি আসলে ঘটে যাওয়া কোন ব্যাপারকেও সে তা-ই মনে করতে থাকবে। একটা ঘটনার পিছনে ৪/৫টা conspiracy theory বানালে শেষ পর্যন্ত সবাই confused হয়ে পড়বে এবং ওই ব্যাপারটা সম্পর্কে বিরক্ত হয়ে আস্থা হারিয়ে ফেলবে। এভাবে চোখের সামনে থাকার পরেও সত্যকে কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না। আদর্শিক শক্তির ক্ষমতা যাতে মানুষ উপলব্ধি করতে না পারে, সেজন্যে আদর্শিক কার্যকলাপকে conspiracy theory-র মাঝে ফেলে দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করে রাখাটা নিয়ন্ত্রণের একটা পদ্ধতি।

আদর্শিক চিন্তা কতটা শক্তিশালী, তার কিছু উদাহরণ এর আগের লেখাগুলিতে দিয়েছি। আজ আরেকটি দিচ্ছি। ১৯৬২ সালের ‘কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস’ সম্পর্কে কেউ কেউ জেনে থাকবেন। প্রায় সবাই মনে করেন যে সেটার কারণে দুনিয়া পারমাণবিক যুদ্ধের খুব কাছে চলে গিয়েছিল। আসলে এটা ছিল ব্রিটেনকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বের করে দেবার জন্যে মার্কিনীদের সাথে সোভিয়েতদের একটা সমন্বিত চেষ্টা, যা অনেকটাই সফল হয়েছিল। এরপর থেকে ব্রিটেনকে বের করে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির লড়াইয়ে নেমেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। থার্ড পার্টকে বের করে দেয়াই ছিল উদ্দেশ্য। এগুলি আদর্শিক চিন্তার ফলাফল, যা বেশিরভাগ মানুষের কাছে conspiracy theory হিসেবেও পৌঁছবে না, বোঝা তো দূরে থাকুক! আদর্শিক গেম হচ্ছে সবচাইতে বড় গেম; এগুলি জাতীয়তার গেম থেকে অনেক অনেক উপরে। ভূরাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে আদর্শিক শক্তিরা। তাই ভূরাজনীতি বুঝতে হলে আদর্শিক গেম বুঝতে হবে। একুশ শতকে এসে বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ কেন, সেটা বুঝতেও এই গেম বুঝতে হবে; নাহলে হিসেব মিলবে না কিছুতেই! এখন আর ‘বুঝি না ভাই’ বলে হা করে চেয়ে থাকার সময় নেই। গুলশানের ঘটনা মানুষের ঘোর কাটানো যথেষ্ট হওয়া উচিত।

গুলশান ৭৯ নম্বরের কাহিনী হলো আরেক “আদর্শিক ফোড়া”র কাহিনী। আমাদের আজকে যেটা বুঝতে হবে তা হলো আমরা কিভাবে এই “ফোড়া” নির্মূল করবো তা নয়, বরং কি কারণে জোর করে এই ফোড়া তৈরি করার চেষ্টা চলছে সেটা। সেই কারণখানা বুঝতে পারার মাঝেই আছে ফোড়া নির্মূলের চিকিতসা। কারণখানা না বুঝে ফোড়া নির্মূলের চেষ্টা সফল হবে না কোনদিনই। আদর্শিক আক্রমণকে আদর্শ দিয়েই মোকাবিলা করতে হবে, নাহলে ফোড়া চুলকাতে চুলকাতেই সারাজীবন পার করতে হবে।