Showing posts with label Poland. Show all posts
Showing posts with label Poland. Show all posts

Saturday, 19 November 2022

যুক্তরাষ্ট্র কি ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যাপারে তার নীতির পরিবর্তন করতে যাচ্ছে?

১৯শে নভেম্বর ২০২২

ইন্দোনেশিয়ার বালিতে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ইউক্রেনের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র যে চীনের সাথে একটা সমঝোতায় পোঁছার চেষ্টায় রয়েছে, তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। বাইডেন বলেন যে, ইউক্রেনে রুশ পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকির ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন একমত হয়েছে; এবং দুই দেশ এব্যাপারে যোগাযোগ রেখে চলবে। তার কথাগুলি যুদ্ধের কারণে ব্যাপক মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক মন্দার ব্যাপারে মার্কিন জনগণের মতামতকেই প্রতিফলিত করছে। তদুপরি মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর কংগ্রেসে বিরোধী রিপাবলিকান শিবিরের শক্তিশালী অবস্থান হোয়াইট হাউজকে চাপে রাখবে।

 গত ১৭ই নভেম্বর মার্কিন সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা জয়েন্ট চীফ অব স্টাফএর চেয়ারম্যান জেনারেল মার্ক মিলি সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, ইউক্রেন এই মুহুর্তে যুদ্ধক্ষেত্রে শক্তিশালী অবস্থানে আছে। আর এই অবস্থাতেই তারা যদি আলোচনার টেবিলে বসে, তাহলে রুশরা হয়তো কোন একটা রাজনৈতিক সমাধানের দিকে এগুতেও পারে। জেনারেল মিলির কথাগুলি ওয়াশিংটনের ইউক্রেন নীতিতে নতুন সুর যোগ করেছে বলে মনে করছেন অনেকেই।

জেনারেল মিলি বলেন যে, রুশরা প্রায় ১ লক্ষ ৭০ হাজারেরও বেশি সেনা নিয়ে ইউক্রেন হামলা করে বহু হতাহতের শিকার হয়েছে। কিন্তু তারপরেও যে বাহিনী তারা ইউক্রেনে রেখেছে, তা বেশ শক্তিশালী। আর এর সাথে নতুন করে মোবিলাইজ করা সেনারা যুক্ত হচ্ছে। ইউক্রেনিয়রা রুশদের আক্রমণ সফলভাবে ঠেকাতে পেরেছে; এবং এরপর তারা আক্রমণে গিয়ে খারকিভ এবং খেরসনের বেশকিছু এলাকা পুনরুদ্ধার করেছে। তবে এই পুনরুদ্ধার করা ভূমি রুশদের দখলীকৃত ভূমির খুব বড় কোন অংশ নয়। রুশদেরকে সামরিকভাবে ইউক্রেনের দখলীকৃত ভূমি থেকে উৎখাত করাটা অত্যন্ত কঠিন একটা কাজ। কাজেই ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর ক্রিমিয়া সহ ইউক্রেনের পুরো ভূমি থেকে রুশদেরকে বিতাড়িত করতে পারার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে রাজনৈতিকভাবে রাশিয়ার ইউক্রেন ছেড়ে যাবার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। এখন পর্যন্ত রুশ সামরিক বাহিনী যতটা ক্ষয়ক্ষতির সন্মুখীন হয়েছে, তাতে তারা আলোচনার মাধ্যমে একটা রাজনৈতিক সমাধানের দিকে এগুলে অবাক হবার কিছু থাকবে না।

‘সিএনএন’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এক সপ্তাহ আগেও জেনারেল মিলি বলেছেন যে, শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেলে ইউক্রেনিয়দের তা হাতছাড়া করা উচিৎ হবে না। অপদিকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেইক সুলিভান বলছেন যে, ওয়াশিংটন ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেয়া অব্যাহত রাখবে। শান্তিচুক্তির জন্যে টেবিলে বসা হবে কিনা, সেটা ইউক্রেনের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। যুক্তরাষ্ট্র এক্ষেত্রে কোন প্রভাব রাখবে না। জেনারেল মিলি এবং জেইক সুলিভানের এহেন ধোঁয়াশা বক্তব্যে ইউক্রেনে অনেকেই প্রশ্ন করতে শুরু করেছে যে, তারা কার কথা শুনবে?

প্রায় একই সময়ে ঘটে যাওয়া আরেকটা ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে, ওয়াশিংটন প্রকৃতপক্ষে ইউক্রেনের যুদ্ধকে আরও বড় কোন যুদ্ধের দিকে নিতে ইচ্ছুক নয়। মার্কিন ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলে যে, ইউক্রেনের আকাশ থেকে একটা ক্ষেপণাস্ত্র এসে ইউক্রেনের প্রতিবেশী ন্যাটো দেশ পোল্যান্ডে আছড়ে পড়েছে এবং সেখানে দুই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। ‘সিএনএন’ বলছে যে, এই খবরটা মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কাছে পৌঁছায় যখন তিনি ‘জি-২০’ শীর্ষ বৈঠকের জন্যে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে অবস্থান করছিলেন। খবরটা দিতে ভোর রাতে প্রেসিডেন্টকে ডেকে তোলা হয় এবং তিনি তার কর্মকর্তাদের ছাড়াও পোলিশ প্রেসিডেন্ট এবং ইউক্রেনের নেতৃত্বের সাথে কথা বলে তাদেরকে শান্ত থাকার জন্যে উপদেশ দেন।

‘ডিফেন্স নিউজ’এর এক খবরে বলা হচ্ছে যে, ন্যাটো সদস্য দেশ হিসেবে পোল্যান্ডের উপরে ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়ার এই ঘটনা যদি রুশদের হামলা হিসেবে প্রমাণ হয়, তাহলে প্রশ্ন আসবে যে, জোটের ‘আর্টিকেল-৫’ অনুসারে ন্যাটোভুক্ত বাকি দেশগুলি পোল্যান্ডকে সামরিক সহায়তা দিতে এগিয়ে আসবে কিনা। এই আর্টিকেল অনুসারে জোটের একটা দেশের উপরে হামলা হলে বাকিরাও তাদের উপরে হামলা হয়েছে বলে ধরে নেবে। তবে ঘটনার ২৪ ঘন্টার মাঝেই ন্যাটো সেক্রেটারি জেনারেল জ্যান্স স্টলটেনবার্গ সাংবাদিকদের বলেন যে, ক্ষেপণাস্ত্রটা খুব সম্ভবতঃ ইউক্রেনিয় বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ছিল, যা রুশ ক্ষেপণাস্ত্রকে ঘায়েল করতে গিয়ে টার্গেট মিস করে পোল্যান্ডে আছড়ে পড়ে। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের পক্ষ থেকেও বলা হয় যে, পোল্যান্ডের উপরে রুশ সামরিক হামলার কোন প্রমাণ মেলেনি।

ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর মিডিয়া ‘ফোর্সেস নিউজ’এর সাথে এক সাক্ষাতে ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স সংস্থা ‘বেলিংক্যাট’এর লেখক ব্রিটিশ সাংবাদিক এলিয়ট হিগিন্স বলছেন যে, ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ দেখে যে ব্যাপারটা নিশ্চিত হওয়া গেছে তা হলো, এটা ‘এস-৩০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র, যা এই মুহুর্তে ইউক্রেন এবং রাশিয়া উভয়েই ব্যবহার করছে। তবে প্রমাণাদি দেখে মনে হচ্ছে যে, মিডিয়াতে প্রচারিত খবরটা সত্য নয়। অর্থাৎ এই ক্ষেপণাস্ত্র রাশিয়া ছোঁড়েনি। লন্ডনের ‘কিংস কলেজ’এর প্রফেসর মাইকেল ক্লার্ক বলেন যে, পোল্যান্ডের ঘটনাটা ঘটার সাথেসাথেই ইউক্রেন ঘোষণা দেয় যে, ক্ষেপণাস্ত্রটা রুশরা ছুঁড়েছে। কিন্তু বাকি সকলেই বলে যে, তদন্ত সম্পূর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত কিছু বলা যাচ্ছে না। ইউক্রেনের চারিদিকে ন্যাটোর গোয়েন্দা বিমানগুলি দিনরাত উড়ছে। কাজেই ইউক্রেনের আকাশে কতগুলি ক্ষেপণাস্ত্র উড়ছে, তা ন্যাটোর অজানা থাকার কথা নয়।

পোল্যান্ডের ঘটনাটা দেখিয়ে দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্র, তথা পশ্চিমা দেশগুলি রাশিয়ার সাথে সরাসরি সংঘর্ষে জড়াতে মোটেই আগ্রহী নয়। পশ্চিমাদের সামরিক সক্ষমতাও প্রশ্নাতীত নয়। ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রতিরক্ষা শিল্পের কাছ থেকে সময়মতো খুচরা যন্ত্রাংশ পাচ্ছে না। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে অস্ত্রের অর্ডার বেড়েছে। কিন্তু সরবরাহ ২০২৪এর মাঝেও সমস্যায় থাকবে। অপরদিকে জেইক সুলিভান ইউক্রেনকে সহায়তা দেয়া অব্যাহত রাখার কথা বললেও ইউক্রেনের শান্তি আলোচনায় যাবার ব্যাপারে জেনারেল মিলির বক্তব্যকে বাতিল করেননি। প্রকৃতপক্ষে তিনি শান্তি আলোচনার ব্যাপারটা একপ্রকার এড়িয়েই গেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইউক্রেন এই মুহুর্তে পশ্চিমা, বিশেষ করে মার্কিন সামরিক সহায়তার উপরে পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল। অর্থাৎ ইউক্রেনের যুদ্ধ চালিয়ে নিতে পারার সক্ষমতা পশ্চিমা সহায়তার উপরেই নির্ভর করবে। ইউক্রেনের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র যে চীনের সাথে একটা সমঝোতায় পোঁছার চেষ্টায় রয়েছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ‘জি-২০’ বৈঠক থেকে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংএর সাথে বৈঠকের পর প্রেসিডেন্ট বাইডেন সাংবাদিকদের বলেন যে, ইউক্রেনে রুশ পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকির ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন একমত হয়েছে; এবং দুই দেশ এব্যাপারে যোগাযোগ রেখে চলবে। একইসাথে তিনি বলেন যে, তিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেইক সুলিভানকে আলোচনা এগিয়ে নিতে বেইজিং যেতে বলেছেন। বাইডেনের কথাগুলি যুদ্ধের কারণে ব্যাপক মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক মন্দার ব্যাপারে মার্কিন জনগণের মতামতকেই প্রতিফলিত করছে। তদুপরি মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর কংগ্রেসে বিরোধী রিপাবলিকান শিবিরের শক্তিশালী অবস্থান হোয়াইট হাউজকে চাপে রাখবে।

Friday, 10 June 2022

পশ্চিমারা একমত হতে পারছে না যে ইউক্রেন যুদ্ধ কিভাবে শেষ হওয়া উচিৎ

১০ই জুন ২০২২

 
ন্যাটোর সদস্যদেশগুলির পতাকা উড়ছে। পশ্চিমাদের মাঝে যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যের ব্যাপারে অনৈক্য যখন আবারও মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, তখন আবারও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যের উপরেই সকলকে নির্ভর করতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যখন রাশিয়াকে ‘দুর্বল’ করার কথা বলছে, তখন রাষ্ট্র হিসেবে ইউক্রেনের লক্ষ্যগুলি গৌন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অর্থাৎ ইউক্রেনকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব মেনে নিয়ে ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে যুদ্ধ দীর্ঘ হচ্ছে; যা গোটা বিশ্বের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক কাঠামোকে হুমকির মাঝে ফেলে দিয়ে বিকল্পের রাস্তা প্রসারিত করছে।


ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর সাড়ে তিন মাস পর পশ্চিমা দেশগুলি যুদ্ধ শেষ হবার ব্যাপারে একমত হতে পারছে না। যুদ্ধের শুরুতে পশ্চিমারা ইউক্রেনকে সহায়তা দেয়ার ব্যাপারে যতটা ঐক্য প্রদর্শন করেছিল, যুদ্ধ লম্বা হবার সাথেসাথে তাদের চিন্তাগুলি ততটাই অনৈক্যে রূপ নিচ্ছে।

বার্লিনের ‘রবার্ট বশ একাডেমি’র ফেলো এবং ‘লে মন্ড’ পত্রিকার কলামিস্ট সিলভি কাউফম্যান ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’এর এক লেখায় বলেছেন যে, ইউক্রেন যুদ্ধ কিভাবে শেষ হওয়া উচিৎ, তা নিয়ে পশ্চিমাদের মাঝে দু’টা গ্রুপ তৈরি হয়েছে। প্রথম গ্রুপটা মনে করছে যে, রাশিয়াকে এমনভাবে শাস্তি দেয়া উচিৎ, যাতে করে সে আর এধরনের কাজ না করে। ২০০৮ সালে রাশিয়া জর্জিয়া আক্রমণ করার সময়ে এবং ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখল করার সময়ে পশ্চিমারা যদি যথেষ্ট শক্তভাবে বাধা দিতো, তাহলে রাশিয়া হয়তো ২০২২ সালের কাজটা করতে সাহস পেতো না। ২৫শে এপ্রিল মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব লয়েড অস্টিন বলেছেন যে, রাশিয়াকে যথেষ্ট ‘দুর্বল’ করে ফেলা উচিৎ। তবে এই কথার সাথে ওয়াশিংটনের লক্ষ্যের সম্পর্ক কতটুকু, তা এখনও যথেষ্ট পরিষ্কার নয়। অপরদিকে দ্বিতীয় গ্রুপটা মনে করছে যে, যুদ্ধ শেষ হওয়া উচিৎ ইউক্রেনের জয় দিয়ে। আর ইউক্রেনের সীমানা নিয়ে সিদ্ধান্ত ইউক্রেনকেই নিতে দেয়া উচিৎ। ইউরোপের অনেকেই ভুলেনি কিভাবে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপকে ভাগাভাগি করেছিল; যা কিনা পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্ম দেয়। আর এই দেশগুলিই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পূর্ব ও মধ্য ইউরোপকে সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে তুলে দেয়।

ব্রিটেনের ‘দ্যা টেলিগ্রাফ’ পত্রিকার প্রতিরক্ষা বিষয়ক সম্পাদক কন কাফলিন কিছু ন্যাটো সদস্যদেশের মারাত্মক সমালোচনা করছেন। তিনি বলছেন যে, জার্মানি এবং ফ্রান্স ইউক্রেনকে রক্ষা করার চাইতে রাশিয়াকে তুষ্ট করাতেই বেশি আগ্রহী। হেনরি কিসিঞ্জারের মতো পশ্চিমা চিন্তাবিদও এখন যুদ্ধ শেষ করতে ইউক্রেনকে ছাড় দেয়ার কথা বলছেন। ১৯৯০এর দশকে সাদ্দাম হোসেনকে কুয়েত থেকে বের করতে পশ্চিমারা পাঁচ লক্ষ সেনার বিশাল বাহিনী মোতায়েন করেছিল। কিন্তু এখন পশ্চিমারা একনায়কদেরকে মোকাবিলা করতে যথেষ্ট ইচ্ছুক নয়। রুশ আগ্রাসন মোকাবিলায় ইউক্রেনকে যথেষ্ট সহায়তা না দেয়ার অর্থ হলো অন্যান্য একনায়কেরাও মনে করতে পারে যে, তারাও পশ্চিমাদের তেমন কোন বাধা ছাড়াই আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে পারে। কন কাফলিনের কথায়, ইউক্রেনকে সহায়তা দিয়ে যুদ্ধ জেতানোর মাধ্যমেই বিশ্বের অন্যান্য একনায়কদেরকে শিক্ষা দেয়া সম্ভব।

‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় ‘সেন্টার ফর ইউরোপিয়ান পলিসি এনালিসিস’এর ফেলো ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ এডওয়ার্ড লুকাস ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন যে, তিন বছর আগে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ যখন বলছিলেন যে, ন্যাটোর ‘মস্তিষ্ক মৃত’, তখন তিনি সেসময়কার বাস্তবতাকেই তুলে ধরেছিলেন। কারণ তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির ব্যাপারে কেউই নিশ্চিত হতে পারছিলো না। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু পর অনেকেই মনে করেছিলেন যে, এবার বুঝি ন্যাটো পুনরায় তার লক্ষ্য ফিরে পেয়েছে। তারা ইউক্রেনকে একযোগে অস্ত্র দিয়েছে, রাশিয়ার হুমকিকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেছে, সামরিক বাজেট বৃদ্ধি করেছে, এবং পূর্বদিকের সীমানার নিরাপত্তা বৃদ্ধি করেছে। কিন্তু ন্যাটোর এই ‘হানিমুন’ এখন শেষ! লিথুয়ানিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী গ্যাব্রিয়েলিয়াস ল্যান্ডসবার্গিস বলেছেন যে, ‘হানিমুন’এর সময়টা ছিল স্বল্প সময়ের। যুদ্ধ যখন দীর্ঘ হতে শুরু করেছে, তখনই এই ঐক্যে টানাপোড়েন পড়েছে এবং এই জোট এখনও দোদুল্যমান। লুকাস বলছেন যে, মাত্র ১৪ বছর আগেও ন্যাটোর গোপন গ্রুপ ‘এমসি ১৬১’এর হিসেবের মাঝে রাশিয়া কোন হুমকি হিসেবে ছিল না; যার মূল কারণ ছিল জার্মানি এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার পক্ষপাতি ছিল। রাশিয়াকে হুমকি হিসেবে না দেখার কারণে ন্যাটোর পূর্ব দিকের সদস্য রাষ্ট্র পোল্যান্ড এবং তিনটা বল্টিক রাষ্ট্র এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়াকে দ্বিতীয় সাড়ির সদস্য দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছিলো। পোল্যান্ডের প্রশ্নের উত্তরে ন্যাটো বলেছিল যে, ন্যাটোর পক্ষে এই দেশগুলিকে বেলারুশের আগ্রাসন থেকে বাঁচানো সম্ভব হলেও রাশিয়ার আগ্রাসন থেকে বাঁচানো সম্ভব নয়।

 
১৪ বছর আগে রাশিয়াকে হুমকি হিসেবে না দেখার কারণে ন্যাটোর পূর্ব দিকের সদস্য রাষ্ট্র পোল্যান্ড এবং তিনটা বল্টিক রাষ্ট্র এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়াকে দ্বিতীয় সাড়ির সদস্য দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছিলো। পোল্যান্ডের প্রশ্নের উত্তরে ন্যাটো বলেছিল যে, ন্যাটোর পক্ষে এই দেশগুলিকে বেলারুশের আগ্রাসন থেকে বাঁচানো সম্ভব হলেও রাশিয়ার আগ্রাসন থেকে বাঁচানো সম্ভব নয়।

কাউফম্যান বলছেন যে, ইউক্রেন যুদ্ধের মাধ্যমে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের স্বার্থের দ্বন্দ্বগুলি সবার সামনে চলে এসেছে। একদিকে জার্মানি, ফ্রান্স এবং ইতালি ঠান্ডা যুদ্ধের পর থেকে রাশিয়ার সাথে তৈরি করা বাণিজ্যিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখে বিপদে পড়ে গেছে। আর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ মনে করছেন যে, ফ্রান্সের নেতৃত্বে ইউরোপের যে নিরাপত্তা কাঠামো তিনি তৈরি করার স্বপ্ন দেখছিলেন, তা ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ভেস্তে যাচ্ছে। অপরদিকে, পোল্যান্ড এবং বল্টিক রাষ্ট্রগুলি মনে করছে যে, তারা এতদিন যাবত রাশিয়াকে যেভাবে অবিশ্বাস করতো, তা এখন শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েছে। আর ফিনল্যান্ড এবং সুইডেন ন্যাটোতে যোগদানের ইচ্ছা ব্যক্ত করাতেও তারা নিজেদেরকে আরও বলীয়ান ভাবছে। পোল্যান্ড তো ভাবতে শুরু করেছে যে, ইউক্রেনের সাথে একযোগ হয়ে তারা ফ্রান্স ও জার্মানির পুরোনো জোটের বিপরীতে একটা নতুন জোট গঠন করতে পারবে, যা যথেষ্ট শক্তিশালী হবে এবং প্রভাব বহণ করবে। আর পশ্চিমাদের কাছ থেকে রাশিয়ার অপমানিত হবার কিছু নেই; কারণ পুতিন নিজেই নিজেকে যথেষ্ট অপমানিত করেছেন।

ইউক্রেনে হামলা করার আগে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যে ব্যাপারগুলি ভেবেছিলেন তার মাঝে হয়তো বৈশ্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ক্ষয়ের সাথেসাথে পশ্চিমাদের সিদ্ধান্তহীনতার ব্যাপারটাও ছিল। তবে এর অর্থ তা নয় যে, তিনি ইউক্রেনকে যেনতেনভাবে হারাতে পারতেন। কিয়েভ এবং খারকিভ থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর বুঝতে বাকি নেই যে, পুতিনও যুদ্ধ শেষ করার সর্বোচ্চ চেষ্টাই করছেন। তবে পশ্চিমাদের মাঝে যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যের ব্যাপারে অনৈক্য যখন আবারও মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, তখন আবারও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যের উপরেই সকলকে নির্ভর করতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যখন রাশিয়াকে ‘দুর্বল’ করার কথা বলছে, তখন রাষ্ট্র হিসেবে ইউক্রেনের লক্ষ্যগুলি গৌন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অর্থাৎ ইউক্রেনকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব মেনে নিয়ে ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে যুদ্ধ দীর্ঘ হচ্ছে; যা গোটা বিশ্বের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক কাঠামোকে হুমকির মাঝে ফেলে দিয়ে বিকল্পের রাস্তা প্রসারিত করছে।

Sunday, 6 March 2022

ইউক্রেন যুদ্ধে শরণার্থী চ্যালেঞ্জ ইউরোপের জাতিগত বিদ্বেষকে সামনে নিয়ে আসছে

০৬ই মার্চ ২০২২

 
‘ইউরোপিয়ান’ শব্দটা একটা কোড হয়ে গিয়েছে। জনগণ কোন সংঘাত নিয়ে মাথা ঘামাবে, সেটার মাপকাঠিও হয়ে গেছে সেটা। সিরিয়া, সোমালিয়া বা অন্যান্য স্থানের ভয়াবহ সংঘাতগুলি পশ্চিমা মিডিয়াতে সেভাবে উঠে আসেনি; যেভাবে ইউক্রেনের যুদ্ধ উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রে আফ্রিকানদের ক্রীতদাস হিসেবে রাখা এবং ইউরোপিয়দের হাতে আফ্রিকার উপনিবেশ তৈরির সেই ইতিহাসগুলিই যেন ইউক্রেনের যুদ্ধের মাঝে নতুন করে দেখা দিচ্ছে। একুশ শতকেও ইউরোপের চিন্তায় জাতিগত বিদ্বেষ শক্তভাবে প্রোথিত রয়েছে।


গত ২৪শে ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক হামলা শুরু করার পর থেকে বিদেশীরা ছাড়াও বহু ইউক্রেনিয়ান দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। ২৬শে ফেব্রুয়ারি থেকে প্রতিদিন দেড় লাখের বেশি মানুষ দেশ ছেড়েছে। জাতিসংঘের হিসেবে ৬ই মার্চ পর্যন্ত আনুমানিক ১৪ লক্ষাধিক মানুষ ইউরোপের দেশগুলিতে আশ্রয় নিয়েছে। এর মাঝে সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে ৭ লক্ষ গিয়েছে পোল্যান্ডে; হাঙ্গেরিতে দেড় লক্ষ; মলদোভায় ১ লাখের বেশি; স্লোভাকিয়ায় ১ লাখ; রোমানিয়ায় ৬৩ হাজার; রাশিয়ায় ৫৩ হাজার। এছাড়াও আরও অন্যান্য দেশে গিয়েছে প্রায় ১ লক্ষ ৩৪ হাজারের মতো। যুদ্ধের ভয়াবহতার মাঝে এই শরণার্থী চ্যালেঞ্জ ইউরোপের গভীর কিছু সমস্যাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

‘আল জাজিরা’ বলছে যে, পোল্যান্ডে বহু স্বেচ্ছাসেবক সীমান্ত অঞ্চলে আসতে শুরু করেছে ইউক্রেনিয় শরণার্থীদের জন্যে পরিবহণ ও থাকার ব্যবস্থা করার জন্যে। স্বেচ্ছাসেবীরা খাবার, চা এবং পানি নিয়ে শরণার্থীদের জন্যে অপেক্ষা করছে। সোশাল মিডিয়াতে হাজারো মানুষ শরণার্থীদের সহায়তা দেবার জন্যে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। শরণার্থীদের জন্যে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টারও কমতি নেই। শরণার্থীদের ব্যাপারে পোলিশ আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের মহানুভবতায় অনেকেই অবাক হয়েছেন। কারণ গত বছর সেপ্টেম্বর থেকে পোলিশ আইনশৃংখলা বাহিনী বেলারুশের সীমানায় মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকা থেকে আসা শরণার্থীদেরকে জোরপূর্বক দেশে ঢুকতে বাধা দিয়েছিল। সীমান্ত অঞ্চলে মানবিক সহায়তা এবং সাংবাদিকদের পৌঁছাতে বাধা দেয়া হয়েছিল। ফলশ্রুতিতে শতশত মানুষ খোলা আকাশের নিচে থাকতে বাধ্য হয়। প্রচন্ড ঠান্ডায় বেশ ক’জন মৃত্যুবরণও করেছিল। এনজিও ‘গ্রুপা গ্রানিকা’র আনা আলবোথ বলছেন যে, সীমান্ত এলাকায় তারা এতো বেশি খাবার এনে রেখেছিলেন যে, খাবার নষ্ট হচ্ছে। কারণ তাদের আশানুরূপ সংখ্যক শরণার্থী আসেনি। শরণার্থীদের জন্যে চাকুরি, ইউক্রেনিয় ভাষার শিক্ষক এবং ক্লাসরুপে কমপিউটারের ব্যবস্থা করা কষ্টসাধ্য হতে পারে। মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিনকেন ৫ই মার্চ পোল্যান্ড সফরকালে বলেন যে, ইউক্রেন যুদ্ধের মানবিক সহায়তা হিসেবে ২ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন সহায়তার জন্যে চেষ্টা করছে হোয়াইট হাউজ।

অপরদিকে ২৬ লক্ষ জনগণের ছোট্ট দেশ মলদোভার প্রধানমন্ত্রী নাতালিয়া গাভরিলিতা জাতিসংঘকে আরও সহায়তা দিতে অনুরোধ করেছেন। তিনি বলছেন যে, ৬ই মার্চ পর্যন্ত মোট ২ লক্ষ ৩০ হাজার মানুষ ইউক্রেন থেকে মলদোভায় ঢুকেছে। এর মাঝে ১ লক্ষ ২০ হাজার এখানে রয়েছে গেছে; যাদের মাঝে ৯৬ হাজার ইউক্রেনিয়। তিনি বলেন যে, মলদোভার মতো ছোট দেশের জন্যে এটা অনেক বড় সংখ্যা।

এদিকে গত ৩রা মার্চ দেশটার উগ্র ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান সীমান্ত শহর বেরেগসুরানিতে সাংবাদিকদেরকে বলেন যে, তার দেশ জানে কারা অভিবাসী, আর কারা শরণার্থী। অভিবাসীদেরকে থামিয়ে দেয়া হবে; তবে শরণার্থীদের ঢুকতে দেয়া হবে। অরবান এতদিন যাবত শরণার্থীদের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর নীতিতে ছিলেন। ২০১৫ সালে শরণার্থী ঠেকাতে হাঙ্গেরি সরকার সার্বিয়ার সীমানায় কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছিল। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে অরবানের সরকার শরণার্থীদেরকে দেশে ঢুকতে বাধা দিতে নতুন আইন করেছিল। এখন সরকারি সমর্থনে পুরো হাঙ্গেরি থেকে মানবিক সহায়তা দিতে জনগণ সীমান্ত অঞ্চলে আসছে। 


‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, মাত্র ছয় সপ্তাহ আগেই পোল্যান্ডের বেলারুশ সীমানায় সিরিয়া, ইরাক এবং আফগানিস্তান থেকে আসা শরণার্থীদের ঠেকাতে দেয়াল তৈরি করা হচ্ছিলো। অথচ এখন হঠাত করেই ইউরোপ তার সীমানা খুলে দিয়েছে। ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন বলছেন যে, শরণার্থীদের আসতে কোন সমস্যা নেই। ইইউ মনে করছে যে, প্রায় ৪০ লক্ষ শরণার্থী ইউক্রেন থেকে আসতে পারে; যা হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপের সবচাইতে বড় শরণার্থী সমস্যা। ‘ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন রেফেউজিস এন্ড এক্সাইলস’এর ডিরেক্টর ক্যাথারিন উলার্ড বলছেন যে, কতবড় পরিবর্তনই না হয়েছে! তিনি বলছেন যে, ২০১৫ সালে ১০ লক্ষ সিরিয় শরণার্থীর মাঝে কোন দেশকে কতজন রাখতে দেয়া হবে, তা নিয়ে ইইউএর সদস্য দেশগুলির মাঝে মারাত্মক রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়েছিল। ইইউএর দেশগুলি এবারে ইউক্রেনিয় শরণার্থীদের কমপক্ষে ১২ মাসের থাকার ব্যাপারে সমঝোতায় পৌঁছেছে। এর মাঝে শরণার্থীদের বাসস্থান, স্বাস্থ্য সুবিধা, শিক্ষা এবং চাকুরির ব্যাপারেও ঐকমত্য হয়েছে। উলার্ড বলছেন যে, ইইউএর দেশগুলির পরিষ্কার দু’মুখো নীতি দৃশ্যমান। ২০১৫ সালে পোল্যান্ড এবং হাঙ্গেরি সিরিয় শরণার্থীদের ঠেকাতে তাদের দক্ষিণের সীমানায় দেয়াল তুলেছিল। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, দেশগুলির অভিবাসন নীতি নির্ভর করেছে ধর্ম, জাতি এবং শরণার্থীদের উৎস দেশের উপর। এই ব্যবস্থা যথেষ্টই পক্ষপাতদুষ্ট।

‘আল জাজিরা’ বলছে যে, পোল্যান্ডের সীমানায় আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারত থেকে আসা শরণার্থীদেরকে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে; কারণ তারা ইউক্রেনের নাগরিক নন। শরণার্থীদের কেউ কেউ বলছেন যে, তাদের সাথে পশুর মতো আচরণ করা হয়েছে। ইউক্রেনের লেভিভ রেলস্টেশনে এক আফ্রিকান মহিলাকে ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া হয় এই বলে যে, শুধু মহিলারাই ট্রেনে উঠতে পারবে! পোলিশ সাহায্য সংস্থা ‘গ্রুপা জাগরানিকা’র স্বেচ্ছাসেবক জ্যান মস বলছেন যে, মেদিকা শহরে শরণার্থীদের ঢোকার সময় তাদেরকে জাতি ভিত্তিতে আলাদা করা হচ্ছিলো। পোলিশ এবং ইউক্রেনিয়দেরকে গাড়ির লাইনে অতি দ্রুততার সাথে যাবার ব্যবস্থা করা হচ্ছিলো। অথচ অন্যদেরকে পায়ে হেঁটে তিন ধাপ পেরিয়ে ঢোকানো হচ্ছিলো, যা ১৪ থেকে ৫০ ঘন্টা পর্যন্ত লাগছিলো।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ব্রুকিংস ইন্সটিটিউশন’এর এক লেখায় সিনিয়র ফেলো রাশাওন রে বলছেন যে, শ্বেতাঙ্গদের জন্যে ‘ইউরোপিয়ান’ শব্দটা একটা কোড হয়ে গিয়েছে। জনগণ কোন সংঘাত নিয়ে মাথা ঘামাবে, সেটার মাপকাঠিও হয়ে গেছে সেটা। সিরিয়া, সোমালিয়া বা অন্যান্য স্থানের ভয়াবহ সংঘাতগুলি পশ্চিমা মিডিয়াতে সেভাবে উঠে আসেনি; যেভাবে ইউক্রেনের যুদ্ধ উঠে এসেছে। করোনাভাইরাসের টেস্ট, চিকিৎসা এবং ভ্যাকসিন পাবার ক্ষেত্রেও কোন জাতি বা দেশের মানুষদের প্রাধান্য দেয়া হয়েছে, তা সকলেই দেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রে আফ্রিকানদের ক্রীতদাস হিসেবে রাখা এবং ইউরোপিয়দের হাতে আফ্রিকার উপনিবেশ তৈরির সেই ইতিহাসগুলিই যেন ইউক্রেনের যুদ্ধের মাঝে নতুন করে দেখা দিচ্ছে। রাশাওন রেএর কথায় পরিষ্কার যে, একুশ শতকেও ইউরোপের চিন্তায় জাতিগত বিদ্বেষ শক্তভাবে প্রোথিত রয়েছে।

Friday, 17 December 2021

নতুন জার্মান পররাষ্ট্রনীতি… কতটা বাস্তবসম্মত?

১৭ই ডিসেম্বর ২০২১

পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশতে যৌথ সংবাদ সন্মেলন করছেন নতুন জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক এবং পোলিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিবিগনিউ রাউ। ইইউএর মাঝে পোল্যান্ডের অবস্থান শক্তিশালী ইইউএর বিরুদ্ধে। কারণ শক্তিশালী ইইউএর মাঝে পোল্যান্ড শক্তিশালী জার্মানিকে দেখতে পাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাত দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ইউরোপের লিবারাল আদর্শের দেশগুলির মাঝে এখনও অবিশ্বাস বিদ্যমান। ইইউএর ভঙ্গুর এই পরিস্থিতিতে নতুন জার্মান কোয়ালিশন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির সফলতা কতটুকু হতে পারে, তা নিয়ে কেউই নিশ্চিত নয়।

 
জার্মানির নতুন কোয়ালিশন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক বিভিন্ন ইউরোপিয় দেশ ভ্রমণ করা শুরু করেছেন। ‘গ্রীন পার্টি’র নেতা হিসেবে ভ্রমণের শুরুতেই তিনি বলেন যে, জলবায়ু সমস্যা মোকাবিলাকে তিনি পররাষ্ট্রনীতিতে প্রাধান্য দেবেন। কারণ ভবিষ্যতের কোন সমস্যাই মানবজাতির জন্যে জলবায়ু সমস্যার চাইতে বড় নয়। এর আগের সকল জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো তিনিও প্যারিস দিয়ে তার যাত্রা শুরু করেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন যে, ফ্রান্সের চাইতে কাছের বন্ধু নেই জার্মানির। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছেন যে, প্যারিস এবং ব্রাসেলসে ইইউ এবং ন্যাটোর হেডকোয়ার্টার্স সফরে তিনি বেলারুশ এবং ইউক্রেনের ব্যাপারে ইউরোপের নীতির একাত্মতা নিয়ে কথা বলেন। প্যারিস সফরে তিনি চীনা মহিলা টেনিস খেলোয়াড় পেং শুইএর ইস্যুতে একাত্মতা ছাড়াও বেইজিংএ শীতকালীন অলিম্পিক কূটনৈতিকভাবে বর্জনের বিষয়ে আলোচনা করেন। বেয়ারবক পরিষ্কারভাবেই উল্লেখ করেন যে, ইউরোপ যেসকল আদর্শিক স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলিকে ভেঙ্গে যেতে দিতে পারে না; বিশেষ করে আইনের শাসন এবং মানবাধিকার।

তবে বেয়ারবকের পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ সফর অতটা মধুর ছিলনা। বেয়ারবক পোল্যান্ডের বার্তা সংস্থা ‘টিভিপি’কে বলেন যে, দুই দেশের সম্পর্কের মাঝে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে পোল্যান্ডে জার্মানির কর্মকান্ডের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা, দায়িত্ব নেয়া এবং ক্ষতিপূরণের ব্যাপারগুলি রয়েছে। দুই দেশের মাঝে বন্ধুত্ব গড়ে তোলাকে তিনি ঐতিহাসিক কাজ বলে আখ্যা দেন। পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিবিগনিউ রাউ বলেন যে, পোল্যান্ডের জনগণের চিন্তায় সুবিচারের ব্যাপারটা প্রোথিত হতে হলে অনেকগুলি ইস্যুর সমাধান প্রয়োজন। তিনি বলেন যে, পোল্যান্ড নতুন সরকারের কাছ থেকে দায়িত্ব স্বীকার এবং ক্ষতিপূরণ চায়। পোলিশ মিডিয়া ‘এনএফপি’ বলছে যে, ওয়ারশ সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে বার্লিনের কাছ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষতিপূরণ চাইলেও এর আগের এঙ্গেলা মার্কেলের সরকার এর কোন আইনী ভিত্তি নেই বলে প্রত্যাখ্যান করে। এছাড়াও পোল্যান্ডের সাংবিধানিক আদালত পোল্যান্ডের আইনকে ইইউএর আইনের উপরে স্থান দেয়ার পর থেকে ইইউএর সাথে পোল্যান্ডের যে টানাপোড়েন চলছে, সেব্যাপারেও বেয়ারবক আলোচনা করেন। তবে তিনি ওয়ারশ সফরে সাংবাদিকদের এব্যাপারে কিছু বলতে রাজি হননি। অপরদিকে পোলিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাউ রাশিয়া থেকে জার্মানি পর্যন্ত ‘নর্ড স্ট্রিম ২’ গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প বাতিল করে দেয়ার দাবি জানান। ‘এনএফপি’ বলছে যে, পোল্যান্ডের ক্ষমতাসীন দলের চেয়ারম্যান ইয়ারোস্লাভ কাচিনস্কি ইইউএর আরও শক্তিশালীকরণকে জার্মানির আরও শক্তিশালী হওয়া হিসেবে দেখছেন। তিনি ৫ই ডিসেম্বর ইউরোপের ডানপন্থী নেতা ফ্রান্সের মারিন লা পেন এবং হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবানকে নিয়ে বৈঠক করেন।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ফরেন পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট’এর সাথে এক সাক্ষাতে জার্মান ‘সোশাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি’ বা ‘এসপিডি’র পররাষ্ট্রনীতির মুখপাত্র নিলস শ্মিড বলেন যে, ‘এসডিপি’, ‘গ্রীন পার্টি’ এবং ‘ফ্রি ডেমোক্র্যাটস’ বা ‘এফডিপি’এর নতুন কোয়ালিশন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি আগের নীতিকেই এগিয়ে নেবে; বড় রকমের পরিবর্তনের আশংকা নেই। ইউরোপ এবং আন্তআটলান্টিক নীতির ব্যাপারে সকলের ঐকমত্য রয়েছে। নতুন ক্ষেত্র হিসেবে তিনি ইন্টারনেট কোম্পানিগুলিকে শৃংখলার মাঝে আনা, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ‘ফাইভ জি’ এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মতো নতুন প্রযুক্তিকে নিয়মের অধীনে আনতে, এমনকি মহামারি নিয়ন্ত্রণে এবং নতুন ঔষধ ডেভেলপ করতে তিনি ইইউ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার উপর গুরুত্ব দেন। তবে তিনি বলেন যে, সবচাইতে বড় পরিবর্তনটা আসতে পারে চীন নীতির ক্ষেত্রে। এর মূল কারণ হলো চীন ইউরোপের জন্যে যেমন হুমকি, তেমনি গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করা ছাড়াও পুরো বিশ্বব্যবস্থাকেই সমস্যায় ফেলে দিয়েছে।

জার্মান থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘জার্মান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’ বা ‘ডিজিএপি’র প্রধান নির্বাহী ক্যাথরিন ক্লুভার এশব্রুক এক লেখায় বলছেন যে, নতুন জার্মান সরকারের পররাষ্ট্রনীতি এঙ্গেলা মার্কেলের সুযোগসন্ধানী এবং মার্কেন্টিলিস্ট পররাষ্ট্রনীতি থেকে অনেক আলাদা হতে চলেছে। তিনি বলছেন যে, জার্মান সরকার যুক্তরাষ্ট্র এবং সমমনা দেশগুলিকে একত্রিত করে চীনের উপর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা কমাতে চাইছে, যাতে তারা অর্থনৈতিক ভ্যালু চেইনগুলিকে ঠিক রেখেই মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইনগুলিকে রক্ষা করতে পারে। তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইউরোপের নিয়মকানুন এবং স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করার ক্ষমতার উপর জোর দেবে; যেমন প্রযুক্তি, সাইবারস্পেস এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ক্ষেত্রে। তবে সেটা সম্ভব হবে যদি জার্মানি নিজেদের ডিজিটাল এবং ডাটা সক্ষমতাকে দ্রুত উন্নত করতে সক্ষম হয়। আর জলবায়ুভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে নেতৃত্ব পেতে গেলে জার্মানিকে অভ্যন্তরীণ জলবায়ু লক্ষ্য ঠিক এবং বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে তিন দলের কোয়ালিশনের মাঝে পার্থক্যগুলি লক্ষ্যনীয় এবং কিছু ক্ষেত্রে নীতি পরিষ্কার নয়; যেমন রাশিয়া এবং তুরস্কের ক্ষেত্রে নীতির স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে; প্রতিরক্ষানীতিও একেবারেই উচ্চাভিলাসী নয়। জিডিপির ৩ শতাংশ প্রতিরক্ষায় খরচ করার কথা বলা হয়েছে; তবে কোন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই বাজেট ব্যবহৃত হবে, তা নিশ্চিত করে বলা হয়নি। আগামী বছর জার্মানি প্রথমবারের মতো তার জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল প্রকাশ করতে যাচ্ছে; যেখানে সরকার হয়তো বাধ্য হবে জার্মানির নিজস্ব স্বার্থগুলিকে উল্লেখ করতে। এর মাধ্যমে জার্মানি হয়তো অবশেষে একটা ‘স্বাভাবিক’ পররাষ্ট্রনীতির খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করতে পারে।

ব্রাসেলসের ‘সেন্টার ফর রাশিয়া ইউরোপ এশিয়া স্টাডিজ’এর প্রতিষ্ঠাতা থেরেসা ফ্যালন সন্দেহ প্রকাশ করছেন যে, জার্মানি তার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য সহযোগী চীনের ব্যাপারে যে আদর্শিক নীতিতে যেতে চলেছে, সেটা খুব সহজে বাস্তবায়নযোগ্য। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, এঙ্গেলা মার্কেলের সরকারও ক্ষমতা নেয়ার শুরুতে আদর্শিক কথা বলে তিব্বতের দালাই লামার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিল; পরে বাস্তবতা মেনে নিয়ে চীনের সাথে সম্পর্ক চালিয়ে নেয়ার নীতিতে এগিয়েছে। বিশ্লেষকেরা জার্মানির নতুন কোয়ালিশন সরকারের চীন নীতি নিয়ে আলোচনা করলেও জার্মানির সীমানাতেই যে বড় সমস্যা রয়েছে, তা নিয়ে খুব একটা কথা বলছেন না। ইইউএর মাঝে পোল্যান্ডের অবস্থান শক্তিশালী ইইউএর বিরুদ্ধে। কারণ শক্তিশালী ইইউএর মাঝে পোল্যান্ড শক্তিশালী জার্মানিকে দেখতে পাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাত দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ইউরোপের লিবারাল আদর্শের দেশগুলির মাঝে এখনও অবিশ্বাস বিদ্যমান। ইইউএর ভঙ্গুর এই পরিস্থিতিতে নতুন জার্মান কোয়ালিশন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির সফলতা কতটুকু হতে পারে, তা নিয়ে কেউই নিশ্চিত নয়।

Saturday, 20 November 2021

পোল্যান্ড এবং বেলারুশের সীমানায় তুরস্কের স্বার্থ কি?

২০শে নভেম্বর ২০২১

পোল্যান্ড সীমান্তে সেনাদের জলকামান থেকে বাঁচতে চেষ্টা করছেন এক শরণার্থী। ঠান্ডা যুদ্ধ শেষেও একুশ শতকের ধ্বসে পরা বিশ্বব্যবস্থায় তুরস্ক পশ্চিমাদের কাছে তার মূল্য ধরে রাখতে চাইছে। অন্ততঃ ইইউএর সীমান্তে প্রচন্ড শীতের মাঝে শরণার্থীদের উপর জলকামানের ব্যবহার ইইউএর মানবাধিকারের স্তম্ভকে যতক্ষণ নাড়া দেবে, ততক্ষণ তুরস্ক ইইউএর সাথে কূটনৈতিক দরকষাকষির সুযোগ পাবে। আর তুরস্কের সাথে ইইউএর দ্বন্দ্বের তালিকা এখন বেশ বড়।

 
পোল্যান্ড এবং বেলারুশের সীমানায় মধ্যপ্রাচ্যের হাজার হাজার শরণার্থীদের উপর যখন পোলিশ সেনারা জলকামান, পেপার স্প্রে এবং অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহার করছে, তখন কেউ কেউ প্রশ্ন করছেন যে, এর সমস্যার পিছনে শুধুমাত্র বেলারুশের প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কো এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনই রয়েছেন কিনা। ব্রিটেনের ‘দ্যা স্পেকট্যাটর’ পত্রিকার এক লেখায় ‘বলকান ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিং নেটওয়ার্ক’এর ফেলো ইয়ানিস বাবুলিয়াস বলছেন যে, এই ভূরাজনৈতিক খেলায় তুরস্ককে বাদ দিয়ে ভুল হবে। কারণ বেলারুশের সীমানায় মধ্যপ্রাচ্যের শরণার্থীরা পৌঁছেছে তুরস্কের ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’এর মাধ্যমে।

তুর্কি কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ‘হুরিয়েত ডেইলি নিউজ’ জানাচ্ছে যে, ১০ই নভেম্বর তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু পোলিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিবিগনিউ রাউএর সাথে ফোনে কথা বলেন। এই কথোপকথনে কাভুসোগলু বলেন যে, তুরস্ক এই সমস্যার অংশ না হলেও কেউ কেউ তা বোঝাতে চাইছে। তিনি তুরস্ক এবং ‘টারকিশ এয়ারওয়েজ’এর বিরুদ্ধে অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে আখ্যা দেন। একইসাথে তিনি বলেন যে, জনগণকে এই অভিযোগের ব্যাপারে সত্যটা জানাতে হবে। তিনি পোল্যান্ডের টেকনিক্যাল তদন্ত দলকে তুরস্কে আমন্ত্রণ জানান। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এহেন কথোপকথন মাত্র একমাস আগের বৈঠকের সময়েও অন্যরকম ছিল। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহেই কাভুসোগলু পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ সফর করেন এবং পোল্যান্ডের সীমান্ত ইস্যুতে তুরস্কের সহায়তা দেয়ার আশ্বাস দেন। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা যৌথ ঘোষণায় বলেন যে, তাদের ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস একত্রে এধরণের হুমকি মোকাবিলায় এবং ইইউএর ভেতর ঢোকার উদ্দেশ্যে মানব পাচারের রুটগুলি খুঁজে বের করবে। জিবিগনিউ রাউ বলেন যে, তিনি কাভুসোগলুকে শরণার্থীদের বিমানে করে বেলারুশের রাজধানী মিনস্কে যাবার ব্যাপারে আরও মনোযোগ দেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন যে, শরণার্থীদের নিয়ে আসা ফ্লাইটগুলি অনেক ক্ষেত্রেই ইস্তাম্বুলকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে। কাভুসোগলু বলেন যে, নয় মাসে ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’ মিনস্কে ৬’শ ইরাকি নাগরিককে নিয়ে গিয়েছে; যাদের অর্ধেকই আবার ফিরে এসেছে। এই সফরের সময় পোলিশ মন্ত্রী রাউ বলেন যে, দুই দেশের বাণিজ্য এখন প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার; যা শীঘ্রই ৯ বিলিয়নে যাবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।

তুরস্কের প্রতি ইইউএর হুমকি

৮ই নভেম্বর ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইয়েন বলেন যে, ইইউ খতিয়ে দেখছে যে, তৃতীয় কোন দেশের এয়ারলাইন্স, যারা কিনা “মানব পাচারে জড়িত” রয়েছে, তাদের উপর অবরোধ দেয়া বা তাদেরকে কালো তালিকাভুক্ত করা যায় কিনা। ‘ইইউ অবজারভার’ বলছে যে, ভন ডার লেইয়েন যে তৃতীয় দেশের এয়ারলাইন্সের কথা বলেছে, তা হলো ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’। আর ‘পলিটিকো ইউরোপ’এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, মিনস্কে যাবার প্রধান বিমান রুটটাই হলো তুরস্ক থেকে। ১০ই নভেম্বর পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ম্যাটিউজ মোরাউইয়েকি পার্লামেন্টের এক জরুরি বৈঠকে অভিযোগ করে বলেন যে, পরিষ্কারভাবেই দেখা যাচ্ছে যে, তুরস্কের কর্মকান্ডগুলি বেলারুশ এবং রাশিয়ার সাথে সমন্বয় করা; যা পোলিশরা পছন্দ করছে না। তিনি আরও বলেন যে, মাত্র এক বা দুইমাস আগেই তুরস্ক পোল্যান্ডের সাথে একসাথে কাজ করতে চায় বলে মনে হয়েছিল। তুরস্কের দাবানল ঠেকাতে সহায়তা এবং তুর্কি পর্যটন শিল্পে সহায়তা দেয়াটা খুব সম্ভবতঃ একমুখী সহায়তা ছিল। এই ব্যাপারটা তুরস্ক সরকারকে জানানো হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

 
কেউ কেউ বলছেন যে, ইইউ এবং যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের মাঝে সমন্বয় করে তুরস্কের উপর চাপ সৃষ্টি করে বেলারুশে তুর্কি বিমানের ফ্লাইট বন্ধ করেছে। ইইউএর বিভাজনের সময়েই ইউরোপ এবং রাশিয়ার মাঝে যুক্তরাষ্ট্র ব্যালান্স দেখতে চায়। সেই জায়গাটাতেই তুরস্ক জড়িত থাকতে চাইছে, ঠিক যেখানে যুক্তরাষ্ট্র একটা শূন্যস্থান রেখে যাচ্ছে। যুদ্ধবিমান বা যুদ্ধজাহাজ বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে নয়, বরং নিজস্ব বেসামরিক এয়ারলাইন্স ব্যবহার করেই তুরস্ক এই কাজটা করেছে। একুশ শতকে যুদ্ধের নতুন সংজ্ঞায় শরণার্থীরা যেমন বেলারুশ এবং রাশিয়ার কাছে অস্ত্র, তেমনি ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’ হয়েছে তুরস্কের অস্ত্র।

একইদিন ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’এর এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, তারা সকল নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সংবেদনশীলতার সাথে সহযোগিতা করে আসছে। একইসাথে বিবৃতিতে বলা হয় যে, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন। ‘এএফপি’ জানাচ্ছে যে, বেলারুশের রাজধানীতে যাবার সবচাইতে বেশি ব্যবহৃত আকাশ নেটওয়ার্ক হলো ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’। এছাড়াও তুরস্কে রয়েছে বিভিন্ন দেশের প্রায় ৫০ লক্ষ শরণার্থী এবং অভিবাসী। এবং এখনও দেশটা ইউরোপ অভিমুখী শরণার্থীদের যাতায়াতের একটা গুরুত্বপূর্ণ রুট। ‘মিডলইস্ট আই’এর এক প্রতিবেদনে ফ্লাইটের তথ্য দিয়ে বলা হয় যে, গত ৩১শে অক্টোবর থেকে ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’ ইস্তাম্বুল থেকে মিনস্কে সাপ্তাহিক ফ্লাইটের সংখ্যা ১৪ থেকে ১০এ নামিয়ে আনে। ভিসা ফ্রি ট্রাভেল সুবিধা থাকার কারণে বেলারুশ তুর্কি পর্যটকদের জন্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য।

তুরস্কের ‘ইউ টার্ন’

১২ই নভেম্বর তুরস্কের বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা মধ্যপ্রাচ্যের তিনটা দেশ ইরাক, সিরিয়া এবং ইয়েমেনের নাগরিকদের তুরস্ক থেকে বেলারুশে যাওয়া বন্ধ ঘোষণা করে। এই খবর পাবার পর ইউরোপিয়ান কাউন্সিনের প্রেসিডেন্ট চার্লস মিশেল এক টুইটার বার্তায় তুর্কি সরকারকে ধন্যবাদ জানান। পরদিন বার্তাসংস্থা ‘এএফপি’র সাথে এক সাক্ষাতে তুর্কি প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা ইব্রাহিম কালিন বলেন যে, পোল্যান্ডের সীমান্তে মানবিক দুর্যোগের ব্যাপারে তুরস্ক বা ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’কে দোষারোপ করাটা সমীচিন নয়। ভ্রমণকারীরা বেলারুশ গিয়ে সেখান থেকে পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া বা অন্যান্য ইইউ দেশে যাচ্ছে। এর জন্যে তুরস্ক বা ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’কে দোষারোপ করাটা পুরোপুরি অবান্তর। তিনি আরও বলেন যে, তারা নিশ্চিত করতে চান যে, যারা তুরস্ক হয়ে বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করে, তারা যেন যাওয়া এবং ফেরত আসার টিকিট সাথে রাখে; অর্থাৎ তারা যেন ফেরত আসে। কিন্তু কেউ যদি বেলারুশে গিয়ে হারিয়ে যায়, তাহলে সেটা তুরস্কের দায় নয়। ‘আল মনিটর’এর সাথে এক সাক্ষাতে ‘পোলিশ ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার্স’এর মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা প্রোগ্রামের প্রধান ক্যারল ওয়াসিলেউস্কি বলেন যে, যদিও তুর্কিরা বলছে যে, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনকিছু করেনি, তথাপি পোলিশ সমাজের কাছে ব্যাপারটা সেভাবে ঠেকেনি। তিনি বলেন যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ। পোল্যান্ডের কৌশলগত সংস্কৃতিতে এর একটা প্রভাব থাকবে। পোলিশরা মনে রাখবে যে, পোল্যান্ডের দুর্যোগের সময় তুরস্ক পাশে থাকেনি। ওয়াসিলেউস্কি মনে করছেন যে, বর্তমানের এই বিরোধ স্বল্প সময়ই স্থায়ী হবে; কূটনীতির মাধ্যমে তা সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু পোল্যান্ডের কর্মকর্তাদের মাঝে যারা একসময় তুরস্কের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের পক্ষপাতি ছিলেন না, তারা এখন এই উদাহরণ টেনে বলতে পারবে যে, তুরস্ক প্রকৃতপক্ষে কোন নির্ভরযোগ্য বন্ধু নয়।

কেউ কেউ বলছেন যে, ইইউ এবং যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের মাঝে সমন্বয় করে তুরস্কের উপর চাপ সৃষ্টি করে বেলারুশে তুর্কি বিমানের ফ্লাইট বন্ধ করেছে। প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘ডিফেন্স নিউজ’এ মতামত দিতে গিয়ে তুর্কি পার্লামেন্টের প্রক্তন সদস্য এবং বর্তমানে ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্র্যাসিস’এর সিনিয়র ডিরেক্টর আইকান এরদেমির বলছেন যে, যদিও ওয়াশিংটন বা ব্রাসেলস কেউই সরাসরি ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’ নিয়ে কথা বলেনি, তথাপি আপাতঃদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে যে, হুমকি দিয়েই ফ্লাইটগুলি বন্ধ করা হয়েছে। কারণ ভন ডার লেইয়েনের হুমকির দু’দিনের মাথায় মেভলুত কাভুসোগলু যেমন দায় স্বীকার করেননি, তেমনি ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’ও বলেছে যে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ অবান্তর। অথচ এর দু’দিনের মাথাতেই ইস্তাম্বুল থেকে মিনস্কে মধ্যপ্রাচ্যের তিন দেশের নাগরিকদের যাওয়া বন্ধ করে দেয়া হয়।

তুরস্ক আসলে কি চাইছে?

কিন্তু প্রশ্ন হলো, গত মে মাসেই যেখানে পোল্যান্ডের সাথে তুরস্কের ২৪টা ‘বায়রাকতার টিবি২’ মনুষ্যবিহীন ড্রোন বিমান কেনার চুক্তি হয়েছে, সেখানে মাত্র কয়েক মাসের মাঝেই তুরস্কের সাথে পোল্যান্ডের সম্পর্ক এই পর্যায়ে কিভাবে আসতে পারে? আর পোল্যান্ডের সীমান্তে তুরস্কের স্বার্থই বা কি? কেনই বা আরেকটা ন্যাটো সদস্য দেশের সাথে তুরস্কের সমন্বয় এত কঠিন হবে? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক ফোকাসের দিকে তাকালেই। পোল্যান্ডের সীমান্ত সমস্যায় তুরস্কের প্রভাব খাটাবার চেষ্টার আলোচনাটা এমন সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ফোকাস হলো চীন। মার্কিনীরা ইউরোপ সহ দুনিয়ার সকল অঞ্চলে তাদের সামরিক অবস্থান কমিয়ে ইন্দোপ্যাসিফিকে চীনের বিরুদ্ধে মোতায়েন করছে। আর এমন একটা অবস্থায় পূর্ব ইউরোপে উত্তেজনা নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রকে বিচলিত করবে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র চাইবে যে, ইউরোপিয়রাই তাদের নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিক। তথাপি যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের সীমান্তে একটা দ্বন্দ্বে আটকে থাকলে তা অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নীতিকে প্রভাবিত করবে।

ঠান্ডা যুদ্ধের সময় তুরস্ক যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ইউরোপের ঢাল হিসেবে কাজ করেছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের কাছে তুরস্কের যে মূল্য ছিল, তা এখন নেই। কারণ বর্তমানে রুশ হুমকিকে ইউরোপের শক্তিধর দেশগুলি ততটা বড় হিসেবে দেখছে না। ইইউ এবং ন্যাটোর সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে জার্মানি এবং তার পার্শ্ববর্তী পোল্যান্ডের মাঝে চিন্তার ব্যাপক ফারাক রয়েছে। ইইউএর প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি জার্মানি তার বেশিরভাগ গ্যাস আমদানি করে থাকে রাশিয়া থেকে। অপরদিকে রাশিয়ার হুমকি মোকাবিলায় পোল্যান্ড চাইছে তাদের দেশে ন্যাটোর সেনা মোতায়েন থাকুক। ইইউএর এই বিভাজনের সময়েই ইউরোপ এবং রাশিয়ার মাঝে যুক্তরাষ্ট্র ব্যালান্স দেখতে চায়। ব্রেক্সিট পরবর্তী ব্রিটেনও সেটাই চায়; তাই তারাও পোল্যান্ডকে সীমান্ত শক্তিশালী করতে সহায়তা দিতে এগিয়ে এসেছে। সেই জায়গাটাতেই তুরস্ক জড়িত থাকতে চাইছে, ঠিক যেখানে যুক্তরাষ্ট্র একটা শূন্যস্থান রেখে যাচ্ছে। ঠান্ডা যুদ্ধ শেষেও একুশ শতকের ধ্বসে পরা বিশ্বব্যবস্থায় তুরস্ক পশ্চিমাদের কাছে তার মূল্য ধরে রাখতে চাইছে। অন্ততঃ ইইউএর সীমান্তে প্রচন্ড শীতের মাঝে শরণার্থীদের উপর জলকামানের ব্যবহার ইইউএর মানবাধিকারের স্তম্ভকে যতক্ষণ নাড়া দেবে, ততক্ষণ তুরস্ক ইইউএর সাথে কূটনৈতিক দরকষাকষির সুযোগ পাবে। আর তুরস্কের সাথে ইইউএর দ্বন্দ্বের তালিকা এখন বেশ বড়। তবে যুদ্ধবিমান বা যুদ্ধজাহাজ বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে নয়, বরং নিজস্ব বেসামরিক এয়ারলাইন্স ব্যবহার করেই তুরস্ক এই কাজটা করেছে। একুশ শতকে যুদ্ধের নতুন সংজ্ঞায় শরণার্থীরা যেমন বেলারুশ এবং রাশিয়ার কাছে অস্ত্র, তেমনি ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’ হয়েছে তুরস্কের অস্ত্র।

Thursday, 18 November 2021

পোল্যান্ড এবং বেলারুশের সীমান্তে ব্রিটেন কি চাইছে?

১৮ই নভেম্বর ২০২১

পোল্যান্ড বেলারুশ সীমান্তে শরণার্থী সমস্যা মোকাবিলায় ব্রিটেন পোল্যান্ডের সাথে থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। অমানবিকতার উদাহরণ সৃষ্টি করে ঠান্ডায় জমে যাওয়া শরণার্থীদেরকে শক্তি প্রয়োগে ঠেকিয়ে রাখতে পোল্যান্ডকে সমর্থন এবং টেকনিক্যাল সহায়তা দিয়ে ব্রিটেন প্রমাণ করছে যে, তার ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ কৌশল বিশ্বব্যাপী আদর্শকে পূনপ্রতিষ্ঠা করার জন্যে নয়; নিছক ইংরেজি ভাষাভাষী দেশগুলিকে বিশ্বের সবচাইতে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে।

 
পোল্যান্ড বেলারুশ সীমান্তে শরণার্থী সমস্যা মোকাবিলায় ব্রিটেন পোল্যান্ডের সাথে থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। ১৩ই নভেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব লিজ ট্রাস ‘সানডে টেলিগ্রাফ’ পত্রিকার এক লেখায় বলেন যে, বেলারুশের প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কো অসহায় শরণার্থীদেরকে খুব সুচতুরভাবে ব্যবহার করে একটা সমস্যার জন্ম দিয়েছেন। তিনি সমস্যা সমাধানে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানান। ‘ইভিনিং স্ট্যান্ডার্ড’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ইইউ এই সমস্যাকে বেলারুশ সরকারের ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ বলে আখ্যা দিচ্ছে। তারা বলছে যে, বেলারুশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে শরণার্থীদের পোল্যান্ডের সীমানায় জড়ো করে চাপ সৃষ্টি করছে। লিজ ট্রাসের জবাবে পরদিন রুশ পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেন যে, এই সমস্যার ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট পুতিনের কোন দায়বদ্ধতা নেই। তিনি উল্টো বলেন যে, বরং ইরাকে ব্রিটিশ হামলাই ছিল সুচতুরভাবে করা। ইরাকের জনগণের মৃত্যু, রাষ্ট্রের পতন, অগুণিত শরণার্থী, আইসিসের উত্থান, মানবাধিকার দুর্যোগের জন্যে ব্রিটেন পুরোপুরিভাবে দায়ী। যতক্ষণ পর্যন্ত লন্ডন এই অপরাধগুলির জন্যে দায়বদ্ধতা নিচ্ছে না, ততক্ষণ তাদের প্রতিনিধিদের অন্য কারুর দিকে আঙ্গুল তাক করার অধিকার নেই। ভ্লাদিমির পুতিন একই দিনে রুশ টেলিভিশনের এক স্বাক্ষাতে জাখারোভার কথাগুলিকেই সমর্থন দেন। তিনি বলেন যে, পোলিশ সেনারা শরণার্থীদের পেটাচ্ছে, তাদের মাথার উপর দিয়ে গুলি ছুঁড়ছে এবং রাতের বেলায় বাতি এবং সাইরেন দিয়ে তাদের দূরে রাখছে। এই কর্মকান্ডগুলি পশ্চিমা দেশগুলির মানবাধিকারের কথাগুলির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

পোল্যান্ডই কেন?


এই সমস্যার মাঝে পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মাটিউজ মোরাউইয়েকি ন্যাটোকে জড়িত হবার অনুরোধ করেছেন। তিনি বলেন যে, পোল্যান্ড নিজেদের সমস্যাগুলি জনসন্মুখে বলেছে সেটাই যথেষ্ট। এখন পোল্যান্ড ন্যাটোর সদস্য দেশগুলির কাছ থেকে বাস্তব সহায়তা আশা করছে। ১২ই নভেম্বর ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা দপ্তরের বরাত দিয়ে ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ জানায় যে, ব্রিটিশ সরকার পোল্যান্ডের সীমানা রক্ষায় ১০ জন ব্রিটিশ সেনা পাঠিয়েছে। এই সেনারা সীমানা প্রাচীর আরও শক্তিশালী করতে ইঞ্জিনিয়ারিং সহায়তা দেবে। তবে এরপর আর কোন সৈন্য পাঠাবার উদ্দেশ্য ব্রিটেনের নেই বলে জানায় তারা। ইতোমধ্যেই পোলিশ সরকার বেলারুশের সীমানায় ২০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। পোলিশ সরকার ব্রিটেনের কাছে সহায়তা চাইলেও ইইউএর সীমানা ব্যবস্থাপনা সংস্থা ‘ফ্রনটেক্স’এর সহায়তা চায়নি। পত্রিকাটা বলছে যে, কি কারণে পোল্যান্ড ব্রিটেনের সহায়তা চেয়েছে তা পরিষ্কার না হলেও ইইউএর সাথে উভয় দেশই দ্বন্দ্বে জড়াবার পর থেকে তাদের মাঝে সখ্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থা ‘এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’ বলছে যে, যখন শরণার্থীরা মারা যাচ্ছে, তখন তাদের সহায়তা না দিয়ে ব্রিটিশ সেনা পাঠিয়ে সীমানা প্রাচীর শক্তিশালী করাটা মানুষের জীবনের প্রতি মারাত্মক অবহেলা এবং অভিবাসী প্রত্যাশী মানুষের অধিকারের প্রতি চরম অবহেলাকে দেখিয়ে দেয়।

 
সমতলভূমি হওয়ায় দেশটা পশ্চিম ইউরোপ এবং রাশিয়ার মাঝে একটা খোলা জায়গা। এই অবস্থানটাই পোল্যান্ডকে অষ্টাদশ শতকের পর থেকে চ্যালেঞ্জে ফেলেছে। অষ্টাদশ শতকে রাশিয়া এবং প্রুশিয়া এবং ঊনিশ শতকে জার্মানির আবির্ভাবের পর থেকে জার্মানি, রাশিয়া এবং অস্ট্রিয়া মিলে পোল্যান্ডের ভূখন্ড ভাগাভাগি করে ফেলে। এর ফলশ্রুতিতে ষোড়শ শতকের শক্তিশালী পোলিশ লিথুয়ানিয়ান সাম্রাজ্য প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পোল্যান্ড ইউরোপের অন্যান্য শক্তিদের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়।

পোল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থান দেশটার এধরনের সমস্যার একটা প্রধান কারণ। পোল্যান্ডের ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জের একটা বর্ণনা দিয়েছে মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘স্ট্রাটফর’। দেশটা উত্তর ইউরোপের সমতলভূমির উপর অবস্থিত; যার পূর্ব এবং পশ্চিমে তেমন কোন বড় ভৌগোলিক বাধা নেই। তবে এর উত্তরে বল্টিক সাগর এবং দক্ষিণে কার্পেথিয়ান পর্বতমালা দেশটাকে উত্তর-দক্ষিণে সংকুচিত করে রেখেছে। সমতলভূমি হওয়ায় দেশটা পশ্চিম ইউরোপ এবং রাশিয়ার মাঝে একটা খোলা জায়গা। এই অবস্থানটাই পোল্যান্ডকে অষ্টাদশ শতকের পর থেকে চ্যালেঞ্জে ফেলেছে। অষ্টাদশ শতকে রাশিয়া এবং প্রুশিয়া এবং ঊনিশ শতকে জার্মানির আবির্ভাবের পর থেকে জার্মানি, রাশিয়া এবং অস্ট্রিয়া মিলে পোল্যান্ডের ভূখন্ড ভাগাভাগি করে ফেলে। এর ফলশ্রুতিতে ষোড়শ শতকের শক্তিশালী পোলিশ লিথুয়ানিয়ান সাম্রাজ্য প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পোল্যান্ড ইউরোপের অন্যান্য শক্তিদের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাবের অধীন হয়ে যায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পোল্যান্ড ১৯৯৯ সালে ন্যাটোতে যুক্ত হয় এবং ২০০৪ সালে ইইউতে যুক্ত হয়। বিপুল পশ্চিমা বিনিয়োগে পোল্যান্ডের অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত উন্নতি হতে থাকে। রাশিয়ার ভীতি পোল্যান্ডকে ন্যাটোর সামরিক বাহিনীর উপর নির্ভরশীল করেছে এবং দেশটাতে ইউরোপের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়। একইসাথে ইউক্রেনকে পশ্চিমা ধাঁচে নিয়ে এসে পোল্যান্ড তার পূর্ব সীমানাকে নিরাপত্তা দেয়ার চেষ্টা করেছে।

জার্মান রুশ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বল্টিক সাগরে ব্রিটেনের অবস্থান


পোল্যান্ড একদিকে যেমন উত্তর ইউরোপের সমতলভূমির উপর বড় একটা দেশ, তেমনি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বল্টিক সাগরে পোল্যান্ডের রয়েছে উপকূল এবং বড় সমুদ্রবন্দর। বল্টিক সাগরে ব্রিটেনের রয়েছে ঐতিহাসিক উপস্থিতি। ২০১৮ সালে ব্রিটেন এস্তোনিয়ার স্বাধীনতার শতবর্ষ উদযাপন করে। সেই অনুষ্ঠানে এস্তোনিয়ানরা মনে করে যে, ১৯১৮-১৯ সালের সেই যুদ্ধে ব্রিটিশ নৌ এবং বিমান শক্তি এস্তোনিয়ার স্বাধীনতা অর্জনে বড় ভূমিকা রেখেছিল। এস্তোনিয়ার স্বাধীনতা ছিল রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লবের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশের সামরিক মিশনের ফলাফলস্বরূপ যুদ্ধ। ব্রিটিশরা তখন রাশিয়ার উত্তরে মুরমানস্ক এবং আর্কেঞ্জেলস্ক এবং দক্ষিণে ইউক্রেনে বলশেভিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ছিল। প্রায় একইসাথে চলেছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে সদ্য গঠিত দ্বিতীয় পোলিশ রিপাবলিকের সাথে লেনিনের বলশেভিক রাশিয়ার যুদ্ধ। পোল্যান্ডের সরকারি ওয়েবসাইটে বলা হচ্ছে যে, ১৯২০ সালের অগাস্টে সোভিয়েত বাহিনীর হাত থেকে পোলিশরা যখন তাদের রাজধানী ওয়ারশ মুক্ত করার চেষ্টা করছিল, তখন ব্রিটিশরা পোল্যান্ডকে ১’শটা যুদ্ধবিমান এবং বেশকিছু কামান এবং বন্দুক সরবরাহ করেছিল। এভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ব্রিটেন বল্টিকে তার প্রভাবকে আরও বাড়াতে চেষ্টা করে। তবে জার্মানি এবং রাশিয়ার কারণে এই প্রভাব সবসময়ই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।

‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ব্রিটেনের সাথে পোল্যান্ডের সম্পর্কটা দৃঢ় হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে। ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরে জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করলে ব্রিটেন যুদ্ধে যোগ দেয়। ব্রিটেন পোল্যান্ডকে নিরাপত্তা দিতে না পারলেও হাজার হাজার পোলিশ নাগরিক ব্রিটেনের নিরাপত্তার জন্যে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং জীবন দেয়। ‘দ্যা ফার্স্ট নিউজ’এর এক প্রতিবেদনে মনে করিয়ে দেয়া হয় যে, বিশ্বযুদ্ধের সময় পোলিশ ইন্টেলিজেন্স ছিল ইউরোপের সবচাইতে সফল ইন্টেলিজেন্স সংস্থা। কর্নেল স্টানিসলাউ গানোর নেতৃত্বে এই ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্ক ছিল ব্রিটিশ তথা মিত্রবাহিনীর ইন্টেলিজেন্সের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মূল অফিস ছিল পশ্চিম লন্ডনের হ্যামারস্মিথের সেন্ট পলস স্কুল। বিশ্বযুদ্ধের শেষে ১৯৫১ সালে ব্রিটেনে পোলিশ নাগরিক ছিল প্রায় ১ লক্ষ ৬০ হাজার; যা পোল্যান্ডের ইইউতে যোগদানের পর ২০১১ সাল নাগাদ ৫ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। ২০০৪ সালে পোলিশরা ব্রিটেনের ১৩তম বিদেশী নাগরিকের গ্রুপ ছিল; ২০০৮ সাল নাগাদ তারা হয়ে যায় বৃহত্তম।

 

ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউট’ বা ‘রুসি’র এক লেখায় এসোসিয়েট ফেলো ডানকান ডিপ্লেজ বলছেন যে, ২০০৮ সালে রাশিয়া জর্জিয়া আক্রমণ করার পর ছোট বল্টিক রাষ্ট্রগুলি দুশ্চিন্তায় পরে যায়। বিশেষ করে রাশিয়া ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখল করে নেবার পর এই দুশ্চিন্তা জেঁকে বসে। উত্তর এস্তোনিয়ার শহরগুলিতে রুশ নাগরিকের অধিক্য সবসময়ই এস্তোনিয়ানদের ভয়ের মাঝে রাখছে। ন্যাটোর সদস্য হওয়ায় এই দেশগুলি রুশ আক্রমণের শিকার হলে ন্যাটোর অন্যান্য দেশ এখানে হস্তক্ষেপ করবে। আর বল্টিকে সম্ভাব্য যেকোন হস্তক্ষেপে ব্রিটেন নেতৃত্ব দেবে। ২০১৭ সাল থেকে ব্রিটেন ন্যাটোর ‘ফ্রেমওয়ার্ক নেশনস কনসেপ্ট’ বা ‘এফএনসি’এর অধীনে বল্টিকে সামরিক মিশন প্রেরণ করছে। ২০১৯ সালে ‘অপারেশন কাবরিট’এর অধীনে ব্রিটেন এস্তোনিয়াতে ৯’শ সেনা প্রেরণ করে। ১৬তম এয়ার এসল্ট ব্রিগেডের প্রায় ২’শ সেনা আকাশ থেকে প্যারাশুট জাম্প করে। সেবছরের এপ্রিল মাস থেকে রয়াল এয়ার ফোর্সের ৪টা ‘ইউরোফাইটার টাইফুন’ যুদ্ধবিমান এস্তোনিয়াতে মোতায়েন করা হয়। তবে ব্রিটিশ বিমান শক্তি মোতায়েনের এরকম কার্যক্রম নিয়মিত চলছে ২০০৪ সাল থেকেই। ২০২০এর জুলাই মাসে রয়াল এয়ার ফোর্স বলে যে, তাদের ‘টাইফুন’ বিমানগুলি তিনটা রুশ যুদ্ধবিমানকে লিথুয়ানিয়ার কাছাকাছি আকাশে বাধা দেয়। এরকম ঘটনা প্রায় নিয়মিতই ঘটছে। বিশেষ করে বল্টিক সাগরে ন্যাটোর সামরিক মহড়া সর্বদাই মস্কোর জন্যে বিরক্তির কারণ। আবার প্রত্যুত্তর হিসেবে রাশিয়াও অত্র অঞ্চলে নিয়মিত সামরিক মহড়া চালায়। বল্টিকে ব্রিটিশ বিমানগুলির সাথে জার্মান, ফরাসি, স্প্যানিশ এবং অন্যান্য মোট ১৪টা দেশের যুদ্ধবিমানও আকাশ পাহাড়া দেয়। তিনটা বল্টিক রাষ্ট্র লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া এবং এস্তোনিয়ার জনসংখ্যা যথাক্রমে ২৮ লক্ষ, ১৯ লক্ষ এবং ১৩ লক্ষ। ছোট্ট এই দেশগুলির বিমান বাহিনীতে কোন ফাইটার বিমান নেই। তাই দেশগুলি নিরাপত্তার জন্যে ন্যাটোর উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতাই ব্রিটেনকে বল্টিক সাগরে গুরুত্বপূর্ণ করে রেখেছে।

বল্টিকের নিরাপত্তায় ন্যাটোর মাঝে নেতৃত্ব ব্রিটেনের হাতে

বল্টিক সাগরের উপকূলে ব্রিটেনের বর্তমান সামরিক অবস্থানকে বুঝতে হলে ন্যাটোর ‘এফএনসি’এর দিকে তাকাতে হবে। সুজারল্যান্ডের থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর সিকিউরিটি স্টাডিজ’ বা ‘সিএসএস’এর এক প্রতিবেদনে ‘জার্মান ইন্সটিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল এন্ড সিকিউরিটি এফেয়ার্স’ বা ‘এসডব্লিউপি’এর রেইনার গ্লাটজ এবং ‘সিএসএস’এর মার্টন জাপফে ন্যাটোর ‘এফএনসি’এর একটা ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। ‘এফএনসি’এর অধীনে ২০১৩ সাল থেকে ন্যাটোর তিন সীমানা অঞ্চলের নিরাপত্তা দিতে তিনটা দেশের নেতৃত্বে তিনটা নিরাপত্তা কাঠামো পরিকল্পনা করা হয়। এই তিনটা কাঠামোর নেতৃত্বে রয়েছে জার্মানি, ব্রিটেন এবং ইতালি। জার্মানির নেতৃত্বে গ্রুপটা মোট ১৬টা সামরিক সক্ষমতার কথা উল্লেখ করেছে; এর মাঝে ন্যাটোর যে দেশ এই সক্ষমতাগুলির যেটা দিতে পারবে, তারা সেটাতে অংশ নেবে। জার্মানির নেতৃত্বে এই গ্রুপের একটা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো ন্যাটোর পূর্ব সীমান্তে একটা সমন্বিত সেনাবাহিনী তৈরি করা। ইতালির নেতৃত্বে গ্রুপটা কাজ করবে ইউরোপের দক্ষিণ সীমান্তে; মূলতঃ উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে। তবে এই গ্রুপটা খুব বড় কোন লক্ষ্য রেখে এগুচ্ছে না। উত্তর ইউরোপে যে গ্রুপটা বড় লক্ষ্য নিয়ে এগুচ্ছে, সেটা হলো ব্রিটেনের নেতৃত্বে থাকা ‘জয়েন্ট এক্সপিডিশনারি ফোর্স’ বা ‘জেইএফ’। ২০১২ সালে পরিকল্পিত হওয়া ‘জেইএফ’এর মাঝে ২০১৪ সালে যুক্ত হয় নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক, স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশ নরওয়ে এবং তিনটা বল্টিক রাষ্ট্র লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়া। ২০১৭ সালে ন্যাটোর বাইরের স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশ সুইডেন এবং ফিনল্যান্ডও যুক্ত হয়। এদের একটা লক্ষ্য ছিল ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়া ব্রিটেনের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন। তবে এই দেশগুলির সবগুলিরই মূল লক্ষ্য ছিল উত্তর ইউরোপে রাশিয়ার আগ্রাসী অবস্থানকে মোকাবিলা করা। ব্রিটেন ‘জেইএফ’ নামের এই গ্রুপের কাঠামোটাকে এমনভাবে ডিজাইন করেছে যে, যেকোন দেশ যেকোন সময়ে এই মাঝে যুক্ত হতে পারবে। ‘জেইএফ’এর মূল কর্মক্ষেত্র হলো নরওয়ের উপকূল এবং বল্টিক সাগর। নিয়মিতভাবেই ‘জেইএফ’এর মহড়া অনুষ্ঠিত হচ্ছে বল্টিকে এবং নরওয়ের উপকূলে। ব্রিটেন এর মাধ্যমে পোল্যান্ডের সাথে সামরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করতে চাইবে।

 
এপ্রিল ১৮০১ সাল। কোপেনহাগেনের যুদ্ধে ব্রিটিশরা ড্যানিশ নৌবাহিনীকে পরাজিত করে বল্টিকের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে। বল্টিক সাগরে ব্রিটেনের স্বার্থ কয়েক শতক ধরে। সপ্তদশ শতক থেকে ঊনিশ শতকের শুরু পর্যন্ত কাঠের পালতোলা জাহাজের যুগে ব্রিটেনের একটা বড় বাণিজ্য ছিল বল্টিকের সাথে। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ তৈরির উপকরণের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ আসতো সুইডেন, রাশিয়া, প্রুশিয়া, পোল্যান্ড, নরওয়ে থেকে। এই বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে ব্রিটেন স্প্যানিশ, ডাচ এবং ড্যানিশদের সাথে যুদ্ধও করেছে।


বল্টিকে ব্রিটেনের ঐতিহাসিক স্বার্থ

বল্টিক সাগরে ব্রিটেনের স্বার্থ কয়েক শতক ধরে। সপ্তদশ শতক থেকে ঊনিশ শতকের শুরু পর্যন্ত কাঠের পালতোলা জাহাজের যুগে ব্রিটেনের একটা বড় বাণিজ্য ছিল বল্টিকের সাথে। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ তৈরির উপকরণের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ আসতো সুইডেন, রাশিয়া, প্রুশিয়া, পোল্যান্ড, নরওয়ে থেকে। এই বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে ব্রিটেন স্প্যানিশ, ডাচ এবং ড্যানিশদের সাথে যুদ্ধও করেছে। ১৭১৮ থেকে ১৭২৬ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশরা বল্টিকে টহল দিয়েছে রুশ হামলা থেকে সুইডিশ উপকুলকে রক্ষা করতে। স্থলভাগে রুশদের আগ্রাসী কর্মকান্ড ব্রিটিশরা থামাতে না পারলেও ১৭৫০এর দশকে প্রুশিয়াকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে বল্টিকে প্রভাব ধরে রাখে। বল্টিক সাগরে ঢোকার পথের নিয়ন্ত্রণ মুলতঃ ডেনমার্ক এবং সুইডেনের হাতে; কারণ কোপেনহাগেন শহর এবং সুইডেনের মালমো শহরের পাশ দিয়েই জাহাজগুলিকে বল্টিক সাগরে ঢুকতে বা সেখান থেকে বের হতে হয়। মাত্র ৩ থেকে ৫ কিঃমিঃ চওড়া এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ যাতে অন্য কারুর হাতে চলে না যায়, সেজন্য ব্রিটেন দু’বার কোপেনহাগেন আক্রমণ করে। ১৮০১ সালে প্রথমবার রুশ প্রভাব থেকে মুক্ত করার জন্যে ড্যানিশ নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ব্রিটেন। রুশ রাজা জার পল হত্যার পর বল্টিকের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরিভাবে ব্রিটেনের হাতে যায়। অনেকেই মনে করে থাকেন যে, জার পলের হত্যার পিছনে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত চার্লস হুইটওয়ার্থ জড়িত ছিলেন। এর ছয় বছর পর ১৮০৭ সালে ব্রিটেন আবারও কোপেনহাগেন আক্রমণ করে যাতে ন্যাপোলিয়নের ফ্রান্স ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ড্যানিশ যুদ্ধজাহাজগুলিকে বল্টিকের নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যবহার করতে না পারে।

ঊনিশ শতকে জার্মানির আবির্ভাবের পর ব্রিটিশ নৌবাহিনী বল্টিকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চ্যালেঞ্জের মাঝে পড়ে। তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ‘অপারেশন রেড ট্রেক’ নামে বল্টিকে বলশেভিক বিরোধী মিশন শুরু করে; যার ফলশ্রুতিতে এস্তোনিয়া এবং লাটভিয়ার জন্ম দেয় ব্রিটেন। ১৯১৮ সালের ডিসেম্বরে ব্রিটিশ নৌবাহিনী এস্তোনিয়ার স্বাধীনতাকামীদেরকে বলশেভিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সাড়ে ছয় হাজার রাইফেল, ২’শ মেশিন গান এবং দু’টা কামান সরবরাহ করে। এস্তোনিয়া এবং লাটভিয়া ব্রিটিশদের দ্বারা এতটাই প্রভাবিত ছিল যে, তাদের নতুন তৈরি করা নৌবাহিনীর পতাকাগুলিও ছিল ব্রিটিশ ইউনিয়ন জ্যাক পতাকার আদলে তৈরি। ব্রিটিশ সহায়তা ছাড়া এই দেশগুলির স্বাধীনতা অর্জন যেমন সম্ভব ছিল না, তেমনি তাদের স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখাও ছিল পুরোপুরিভাবে অবাস্তব।

‘রুসি’র ডানকান ডিপ্লেজ বলছেন যে, ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্র তিনটা বল্টিক রাষ্ট্রকে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে ছেড়ে দিলে অনেকেই তা মানতে পারেননি। তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার পর এই দেশগুলিকে ন্যাটোর মাঝে এনে নিরাপত্তা দেয়ার ব্যাপারটা কিছুটা হলেও পুরোনো ক্ষতগুলিকে সাড়াতে সহায়তা করবে। 

মার্চ ২০২১। ব্রিটেনের নেতৃত্বে থাকা ‘জয়েন্ট এক্সপিডিশনারি ফোর্স’ বা ‘জেইএফ’ মহড়া দিচ্ছে বল্টিক সাগরে। ব্রিটেন শুধু বল্টিক সাগরে নিজের অবস্থানই ধরে রাখতে চাইছে না; ইউরোপের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ককেও নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। ব্রিটেন এখন ওয়ারশতে নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে চাইছে। বেলারুশের সাথে পোল্যান্ড এবং বল্টিক রাষ্ট্রগুলির সীমান্ত সমস্যায় ব্রিটেন অগ্রগামী ভূমিকা নিতে চাইছে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র চাইছে বাকি বিশ্ব থেকে তার বাহিনী সরিয়ে ইন্দোপ্যাসিফিকে চীনের বিরুদ্ধে মোতায়েন করতে। পূর্ব ইউরোপের উত্তেজনার উপর ব্রিটেনের প্রভাব যত বেশি থাকবে, যুক্তরাষ্ট্র তার ইউরোপ নীতির জন্যে ব্রিটেনের উপর ততটাই নির্ভর করতে বাধ্য হবে।

ব্রিটেন আসলে কি চাইছে?

ব্রিটেন শুধু বল্টিক সাগরে নিজের অবস্থানই ধরে রাখতে চাইছে না; ইউরোপের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ককেও নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। রাশিয়ার ব্যাপারে জার্মানি এবং পোল্যান্ডের নীতির পার্থক্য রয়েছে। জার্মানরা যখন রুশ গ্যাসের উপর তাদের নির্ভরশীলতা বাড়িয়েছে, তখন পোলিশরা রুশ হুমকি মোকাবিলায় নিজ দেশে ন্যাটোর সেনা মোতায়েন চেয়েছে। আর ছোট্ট বল্টিক রাষ্ট্রগুলি নিজেদের কোন নিরাপত্তা কাঠামো না থাকায় ন্যাটোর উপর সম্পূর্ণই নির্ভরশীল থাকতে বাধ্য। ঠান্ডা যুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পোল্যান্ডের সম্পর্ক গভীর হয়েছে। ব্রিটেন এখন ওয়ারশতে নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে চাইছে। বেলারুশের সাথে পোল্যান্ড এবং বল্টিক রাষ্ট্রগুলির সীমান্ত সমস্যায় ব্রিটেন অগ্রগামী ভূমিকা নিতে চাইছে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র চাইছে বাকি বিশ্ব থেকে তার বাহিনী সরিয়ে ইন্দোপ্যাসিফিকে চীনের বিরুদ্ধে মোতায়েন করতে। পূর্ব ইউরোপের উত্তেজনার উপর ব্রিটেনের প্রভাব যত বেশি থাকবে, যুক্তরাষ্ট্র তার ইউরোপ নীতির জন্যে ব্রিটেনের উপর ততটাই নির্ভর করতে বাধ্য হবে। আর ইউরোপ নীতি নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত সম্পদের বিশ্বব্যাপী বন্টনকে প্রভাবিত করবে বলেই যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হবে। ব্রেক্সিটের পর যে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ নীতি নিয়ে ব্রিটেন এগুচ্ছে, তার ফলাফলই এখন দেখছে মানুষ বেলারুশের সীমানায়। অমানবিকতার উদাহরণ সৃষ্টি করে ঠান্ডায় জমে যাওয়া শরণার্থীদেরকে শক্তি প্রয়োগে ঠেকিয়ে রাখতে পোল্যান্ডকে সমর্থন এবং টেকনিক্যাল সহায়তা দিয়ে ব্রিটেন প্রমাণ করছে যে, তার ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ কৌশল বিশ্বব্যাপী আদর্শকে পূনপ্রতিষ্ঠা করার জন্যে নয়; নিছক ইংরেজি ভাষাভাষী দেশগুলিকে বিশ্বের সবচাইতে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে।

Sunday, 31 October 2021

বেলারুশ কি ইইউএর বিরুদ্ধে ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ চালাচ্ছে?

৩১শে অক্টোবর ২০২১

পশ্চিমা চিন্তার স্তম্ভ মানবাধিকার ইইউএর সদস্য রাষ্ট্রগুলির শরণার্থী বিরোধী জাতীয়তাবাদী চিন্তার কাছে হার মেনেছে। পোল্যান্ডের পার্লামেন্টে গণতান্ত্রিকভাবেই শরণার্থীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। রাশিয়ার সমর্থনে বেলারুশ ইউরোপের দুর্বলতাকেই উস্কে দিচ্ছে; যাকে ইইউ বলছে ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ। ইউরোপের লিবারাল গণতান্ত্রিক আদর্শ দিনে দিনে দুর্বল হচ্ছে; আর এর স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে উগ্রবাদী জাতীয়তাবাদী চিন্তা। লিবারাল চিন্তার উৎসস্থলে এই দুর্যোগ ধ্বসে পড়া বিশ্বব্যবস্থারই প্রমাণ মাত্র।

 পূর্ব ইউরোপের দেশ বেলারুশের সাথে ইইউএর যখন উত্তপ্ত সম্পর্ক চলছে, তখন ইইউএর অনেকেই অভিযোগ করছেন যে, বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কো ইইউএর সাথে শরণার্থী ব্যবহার করে ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। আর এই যুদ্ধে লুকাশেঙ্কোর প্রধান সমর্থনকারী হলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। অপরদিকে ইইউএর পূর্ব সীমানার দেশ লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া এবং পোল্যান্ড শরণার্থীদের আটকাতে তাদের সীমানায় দেয়াল তৈরিতে উদ্যত হয়েছে; এবং এব্যাপারে তারা ইইউএর সহায়তা চাইছে।

‘ফিনানশিয়াল টাইমস’এর সাথে সাক্ষাতে ইইউএর স্বরাষ্ট্র কমিশনার ইয়ালভা জোহানসন বলেন যে, বেলারুশের প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কো মানুষকে আগ্রাসনের জন্যে ব্যবহার করছেন। তিনি দাবি করেন যে, বেলারুশের উপর ইইউএর অবরোধগুলি তাকে আঘাত করছে বলেই তিনি এখন মরিয়া হয়ে দ্বন্দ্বের দিকে ধাবিত হতে বাধ্য হচ্ছেন। ‘ইউরোনিউজ’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০২০ সালে বেলারুশের নির্বাচনে জেতার পর থেকেই ইইউএর সাথে লুকাশেঙ্কো সরকারের সম্পর্ক খারাপের দিকে যেতে থাকে। ইইউ থেকে নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং এরপর থেকে বেলারুশের রাস্তায় প্রতিবাদ শুরু হয়। ইইউ লুকাশেঙ্কো সরকারের উপর অবরোধ আরোপ করে এবং দ্বন্দ্ব চলতেই থাকে। বেলারুশ সরকার ‘রায়ান এয়ার’এর একটা বিমানকে মিনস্ক বিমানবন্দরে নামতে বাধ্য করে এবং বিমানের অভ্যন্তর থেকে এক সাংবাদিককে বের করে এনে গ্রেপ্তার করে। গত অগাস্টে টোকিও অলিম্পিক থেকে পালানো বেলারুশ এথলেট ক্রিস্টসিনা সিমানুস্কায়াকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয় ইইউএর সদস্য দেশ পোল্যান্ড; যা বেলারুশের সাথে দেশটার সম্পর্ক খারাপ করে। তবে এক সংবাদ সন্মেলনে লুকাশেঙ্কো অস্বীকার করেন যে, তিনি শরণার্থীদেরকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। তিনি বলেন যে, বেলারুশ কাউকে ‘ব্ল্যাকমেইল’ করে না; তবে তারা যদি বেলারুশকে শর্তের মাঝে ফেলে, তাহলে বেলারুশ প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হবে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন যে, তার দেশের রাশিয়া, চীন বা ইইউএর মতো সম্পদ নেই।

 

তবে বেলারুশ থেকে আসা শরণার্থীর চাপে প্রতিবেশী দেশ লিথুয়ানিয়া এবং লাটভিয়া জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। পোল্যান্ডও তার সীমান্ত অঞ্চলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে এবং প্রায় ৬ হাজার সেনা সীমানায় মোতায়েন করে। লাটভিয়া এবং পোল্যান্ড উভয় দেশই তাদের সীমান্তরক্ষী এবং সামরিক বাহিনীকে শক্তি ব্যবহার করে শরণার্থীদের বেলারুশে ফিরিয়ে দেয়ার ক্ষমতা প্রদান করেছে। পোল্যান্ডের পার্লামেন্টে বিল পাশ করে সাড়ে তিন’শ মিলিয়ন ইউরো ব্যয়ে বেলারুশের সাথে ৪’শ কিঃমিঃ সীমানা বরাবর দেয়াল তোলার প্রকল্প নেয়া হয়েছে। পোলিশ সরকার বলছে যে, এবছরেই তারা বেলারুশ থেকে শরণার্থী ঢোকার চেষ্টার ২৩ হাজার প্রচেষ্টাকে তালিকাভুক্ত করেছে। লিথুয়ানিয়াও বেলারুশের সীমানায় কাঁটাতাদের বেড়া দেয়া শুরু করেছে। ইউরোপিয়ান কমিশনের এক বিবৃতিতে এই বেড়া দেয়াকে ‘ভালো চিন্তা’ বলে আখ্যা দেয়া হয়। তবে ইইউ এই প্রকল্পে কোন অর্থায়ন করবে না বলে বলা হয়। লিথুয়ানিয়া সরকার ইইউএর কাছ থেকে এব্যাপারে সহায়তা চেয়েছে।

‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, শরণার্থীদের মূল স্রোত আসছে ইরাকের উত্তরের কুর্দী অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে। ইরাক, সিরিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে শরণার্থীরা ১৪ থেকে ১৭ হাজার ডলার খরচ করে মানব পাচারকারীদের মাধ্যমে সেখানে পৌঁছাচ্ছে। প্রথমে এবছরের অগাস্টে বাগদাদ থেকে সরাসরি শরণার্থীরা বেলারুশে আসতে থাকে। এরপর ইইউএর চাপের মুখে ইরাক সরকার সরাসরি ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে ইরাক থেকে শরণার্থীরা দুবাই, লেবানন, সিরিয়া, জর্দান, তুরস্ক, ইত্যাদি দেশ হয়ে বেলারুশে আসতে থাকে। অনেকেই অভিযোগ করছেন যে, বেলারুশ সরকার মিনস্ক বিমানবন্দর থেকেই শরণার্থীদের সরাসরি পোল্যান্ডের সীমানায় পাঠিয়ে দিচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ইইউএর সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হবার পর থেকে বেলারুশ সরকার ভিসা ইস্যু করার দায়িত্ব বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সির হাতে দিয়ে দেয়। এই এজেন্সিগুলি বিভিন্ন উপায়ে শরণার্থীদের বেলারুশে পাঠাবার ব্যবস্থা করতে থাকে।

 

বেলারুশের সীমানার সমস্যার এক ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘চ্যাটহ্যাম হাউজ’এর এসোসিয়েট ফেলো সামানথা ডে বেনডার্ন। বেলারুশের বিতর্কিত নির্বাচনের এক বছরের মাথায় ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা বেলারুশের প্রধান রপ্তানি দ্রব্য পটাশ, অপরিশোধিত তেল, এবং আরও কিছু পণ্যের উপর অবরোধ দেয়। একইসাথে বেলারুশের উপর ব্রিটেনের অর্থবাজার থেকে অর্থ যোগানের উপরও অবরোধ দেয়া হয়। এর পাল্টা হিসেবে লুকাশেঙ্কো মধ্যপ্রাচ্য থেকে শরণার্থী ঢোকার পথ খুলে দেন। বেনডার্ন বলছেন যে, এটা হলো একধরনের ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ, যা শরণার্থীদেরকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ইইউ এবং ন্যাটোর পূর্ব সীমানায় উত্তেজনা সৃষ্টি করা ছাড়াও মিত্র দেশগুলির মাঝে বিরোধের জন্ম দিতে চাইছে। নতুন শরণার্থী সমস্যার কারণে পূর্ব ইউরোপে শরণার্থী বিরোধী মনোভাবকে আরও বেশি উস্কে দিতে পারে এবং অভিবাসন বিরোধী রাজনৈতিক গ্রুপগুলিকে শক্তিশালী করতে পারে। এই ব্যাপারটা ইতোমধ্যেই জার্মানি এবং সুইডেনে দেখা গেছে; যেখানে সমাজের সমস্যার জন্যে উগ্র ডানপন্থীরা শরণার্থীদের দায়ী করছে। একইসাথে তা উগ্র জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ইইউ বিরোধী চিন্তার জন্ম দিয়েছে। রাশিয়া বহুদিন ধরেই চাইছে ইউরোপে ডানপন্থীদের উত্থান হোক; যা ইইউ এবং ন্যাটোকে দুর্বল করবে। বেনডার্ন মনে করেন না যে, এই ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ বেলারুশের পক্ষে মস্কোর অনুমতি ছাড়া করা সম্ভব।

মানবাধিকার সংস্থাগুলি পোল্যান্ড এবং বেলারুশ উভয় দেশের বিরুদ্ধেই আশ্রয়প্রার্থীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগে মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গের অভিযোগ করেছে। ইতোমধ্যেই প্রচন্ড শীত এবং অন্যান্য সমস্যায় পড়ে কমপক্ষে আটজন শরণার্থীর মৃত্যু হয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়। পশ্চিমা চিন্তার স্তম্ভ মানবাধিকার ইইউএর সদস্য রাষ্ট্রগুলির শরণার্থী বিরোধী জাতীয়তাবাদী চিন্তার কাছে হার মেনেছে। পোল্যান্ডের পার্লামেন্টে গণতান্ত্রিকভাবেই শরণার্থীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। রাশিয়ার সমর্থনে বেলারুশ ইউরোপের দুর্বলতাকেই উস্কে দিচ্ছে; যাকে ইইউ বলছে ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ। লিবারাল গণতান্ত্রিক দেশগুলি যখন শরণার্থীর ঢল ঠেকাতে দেয়াল তুলছে এবং সামরিক বাহিনী ব্যবহার করছে, তখন বেলারুশে লিবারাল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার দাবি তুলে লুকাশেঙ্কো সরকারের উপর অবরোধ আরোপ পরস্পরবিরোধীই বটে। ইউরোপের লিবারাল গণতান্ত্রিক আদর্শ দিনে দিনে দুর্বল হচ্ছে; আর এর স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে উগ্রবাদী জাতীয়তাবাদী চিন্তা। লিবারাল চিন্তার উৎসস্থলে এই দুর্যোগ ধ্বসে পড়া বিশ্বব্যবস্থারই প্রমাণ মাত্র।

Monday, 1 February 2021

পোল্যান্ড এবং আর্জেন্টিনায় গর্ভপাতের আইন পশ্চিমা চিন্তার অসঙ্গতিরই ফলাফল

১লা ফেব্রুয়ারি ২০২১

আইন করে পোল্যান্ডে গর্ভপাত নিষিদ্ধ করা, বা আর্জেন্টিনায় গর্ভপাত বৈধ করার ফলে তাদের সমাজের অসঙ্গতি চলে যাচ্ছে না। ক্যাথোলিক বিশ্বাসের দেশ হলেও সেকুলার চিন্তা বাস্তবায়নের কারণে নারী পুরুষের অবাধ যৌনাচার এই দেশগুলিতে অবৈধ নয়। একদিকে বামপন্থী লিবারালরা সেকুলার চিন্তা বাস্তবায়নের পক্ষে লড়ছে; অপরদিকে ডানপন্থী রক্ষণশীলরা ধর্মীয় বিশ্বাসকে রক্ষায় বদ্ধপরিকর। কিন্তু কেউই সমাজে অবাধ যৌনাচারের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি।

 
পূর্ব ইউরোপের দেশ পোল্যান্ডে গর্ভপাত বিরোধী আইন পাসের পর থেকেই রাজধানী ওয়ারস’র রাস্তায় কনকনে ঠান্ডা এবং করোনা মহামারির কারণে কড়াকড়ি উপেক্ষা করে চলছে বিক্ষোভ। ‘সিএনএন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, আইন কার্যকর হবার পর থেকে তিন দিন ধরে নারীবাদী সংগঠনগুলি বিক্ষোভ করছে। এর আগে সাংবিধানিক আদালতে গর্ভপাত বিরোধী রুলিং দেয়া হয় অক্টোবর মাসে; যার পর থেকে কয়েক সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ চলেছে রাস্তায়। এই আইনের অধীনে ধর্ষণের ক্ষেত্রে এবং যেখানে গর্ভধারিনীর স্বাস্থ্যহানির আশংকা রয়েছে সেক্ষেত্রেও গর্ভপাত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইউরোপের সেকুলার চিন্তাধারার দেশ হলেও ধর্মীয় বিশ্বাসের ব্যাপারগুলি দেশটাকে বিভক্ত করেছে।

পোল্যান্ডের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসেব থেকে দেখা যায় যে, দেশটার কমিউনিস্ট শাসনামলে ১৯৮০এর দশকে প্রতিবছর ১ লক্ষ ২০ হাজার থেকে ১ লক্ষ ৪০ হাজার পর্যন্ত আইনগতভাবে বৈধ গর্ভপাত করা হতো। তবে কমিউনিস্ট শাসন থেকে বের হয়ে আসার পর ১৯৯০ সালে এক আইনের মাধ্যমে গর্ভপাত কঠিন করে দেয়া হয়। এরপর ১৯৯৩ সালের আইন অনুযায়ী শুধুমাত্র ‘কঠিন জীবন’এর কারণ দেখিয়ে গর্ভপাত করা যেতো। শুধুমাত্র গর্ভধারিনীর স্বাস্থ্য বা জীবনের প্রতি হুমকি তৈরি হলে বা ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটলেই গর্ভপাত করার অনুমতি দেয়া হতো। এরপর ১৯৯৬ সালে আইন করে সামাজিক কারণে গর্ভপাত করার অনুমতি দেয়া হয়। তবে ১৯৯৭ সালে সাংবিধানিক আদালতে সেই আইন বতিলও করা হয়। একুশ শতকে পোল্যান্ডে ডানপন্থী ‘ল এন্ড জাস্টিস’ এবং ‘পোল্যান্ড কামস ফার্স্ট’ দলগুলি গর্ভপাত পুরোপুরি বাতিল করার পক্ষে লবিং শুরু করে। অপরপক্ষে বামপন্থী ‘ডেমোক্র্যাটিক লেফট এলায়েন্স’ গর্ভপাত সমর্থন করে লবিং শুরু করে। পোল্যান্ডের বর্তমান পার্লামেন্টের ৪’শ ৬০টা আসনের মাঝে ১’শ ৯৮টা আসনই এখন ডানপন্থী ‘ল এন্ড জাস্টিস’ দলের দখলে। আর সরকার গঠন করা ডানপন্থী ‘ইউনাইটেড রাইট’এর আসন রয়েছে ২’শ ৩৪টা। বামপন্থী দলগুলির আসন রয়েছে ৪৮টা; যার মাঝে গর্ভপাতের পক্ষে থাকা ‘ডেমোক্র্যাটিক লেফট এলায়েন্স’এর আসন ২৪টা। অর্থাৎ গর্ভপাতবিরোধী ডানপন্থী দলগুলি পার্লামেন্টে বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ডানপন্থীদের মূল ভিত হলো পোল্যান্ডের রোমান ক্যাথোলিক খ্রিস্টান ঐতিহ্য। ৯০ শতাংশের বেশি ক্যাথোলিক এই দেশ তাদের খ্রিস্টান ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করে। ইউরোপের আর কোন দেশের জনসংখ্যার এত বড় অংশ ক্যাথোলিক নয়। কিন্তু ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করলেও পোল্যান্ডের সামাজিক অবস্থা গর্ব করার মতো নয়। ১৯৯০এর দশক থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত পোল্যান্ডে প্রতি বছর এক থেকে দুই হাজার বৈধ গর্ভপাত হয়ে থাকে। তবে নারীবাদী এনজিও ‘ফেডারেশন ফর উইমেন এন্ড ফ্যামিলি প্ল্যানিং’এর মতে পোল্যান্ডে প্রতিবছর ৮০ হাজার থেকে ২ লক্ষ অবৈধ গর্ভপাত হচ্ছে। ‘বিবিসি’ বলছে এই সংখ্যা ৮০ হাজার থেকে ১ লক্ষ ২০ হাজার। ‘দ্যা ল্যানসেট’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় ৭৫ হাজার থেকে ৩ লক্ষ গর্ভপাতের কথা বলা হচ্ছে। ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মহিলা গর্ভপাতের জন্যে পার্শ্ববর্তী জার্মানি, স্লোভাকিয়া এবং চেক রিপাবলিকে যায়। পোল্যান্ডে ধর্ষণের ঘটনা গত কয়েক বছরে বেশ কমে এসে ৭’শ নিচে এসে দাঁড়িয়েছে, যা ইউরোপের মাঝে ১১তম। কিন্তু লাখো গর্ভপাতের সংখ্যা পোল্যান্ডকে শান্তি দেয় না। ক্যাথোলিক বিশ্বাস এই সংখ্যাগুলির সামনে এসে দুর্বল হয়ে পড়ছে। ধর্মীয়ভাবে শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে থাকার দাবি করলেও প্রতি বছর লাখো গর্ভপাতের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে পোল্যান্ডের সমাজে। শুধুমাত্র আইন করে নিজের ক্যাথোলিক সত্ত্বার প্রমাণ দেয়ার চেষ্টাই করে যাচ্ছে পোল্যান্ডের ডানপন্থী নেতৃত্ব।

অপরদিকে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনাতেও শুরু হয়েছে অস্থিরতা। মূলতঃ ইউরোপিয় বংশোদ্ভূত স্প্যানিশ ভাষাভাষী এই দেশে ৩০শে ডিসেম্বর পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটে আইন পাস করে গর্ভপাত বৈধ করে দেয়া হয়। আর্জেন্টিনায় গর্ভপাত একটা সংবেদনশীল বিষয়। পার্লামেন্টে ম্যারাথন বাকবিতন্ডার পর এই সিদ্ধান্ত এসেছে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, সিনেটে ৩৮ জন গর্ভপাতের পক্ষে ভোট দেন; বিপক্ষে ভোট দেন ২৯ জন। এর আগে ২০১৮ সালে পার্লামেন্টে আইন করার একটা চেষ্টা ভেস্তে গেলেও এবারে ক্ষমতাসীন মধ্য বামপন্থী ‘ফ্রেন্তে দে তোদোস’ কোয়ালিশন সরকার গর্ভপাতের পক্ষে থাকার কারণে আইন পাস হয়। কেউ কেউ ২০১৮ সালে বিপক্ষে ভোট দিলেও এবারে পক্ষে ভোট দেন। ক্ষমতাসীন ‘ফ্রেন্তে দে তোদোস’এর পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে শক্ত অবস্থান রয়েছে। সেখানে ৭২টা আসনের ৪১টাই তাদের। তবে নিম্নকক্ষে ২’শ ৫৭টা আসনের মাঝে মাত্র ১’শ ১৯টা তাদের। ডিসেম্বরের শুরুতে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইএর পর ১’শ ৩১ বনাম ১’শ ১৮ ভোটে এই আইন পাস হয়েছিল। প্রতিটা দলের মাঝেই কিছু সাংসদ পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন; কিছু দিয়েছিলেন বিপক্ষে। ২০১৮ সালের ভোটে নিম্নকক্ষে গর্ভপাতের পক্ষে ছিল ১’শ ২৯ জন; বিপক্ষে ছিল ১’শ ২৫ জন। আর উচ্চকক্ষে গর্ভপাতের পক্ষে ছিল ৩১ জন; বিপক্ষে ছিল ৩৭ জন। ফলে সেবারে আইন পাস করা যায়নি। তবে এর মাধ্যমে গর্ভপাতের মতো বিষয়ে আর্জেন্টিনার সমাজের বিভক্তিটা পরিষ্কার হয়ে যায়।

ব্রাজিলসহ ক্যাথোলিক সংখ্যাগরিষ্ঠ ল্যাটিন আমেরিকার বেশিরভাগ দেশে গর্ভপাত অবৈধ। শুধুমাত্র উরুগুয়ে, কিউবা, গায়ানা এবং মেক্সিকোর মেক্সিকো সিটিতে গর্ভপাত বৈধ। সেই হিসেবে সাড়ে ৪ কোটি জনসংখ্যার আর্জেন্টিনাই দক্ষিণ আমেরিকার সবচাইতে বড় দেশ, যেখানে গর্ভপাত বৈধ করা হলো। ভ্রুণের ১৪ সপ্তাহ বা সাড়ে তিন মাস বয়স পর্যন্ত গর্ভপাত করা যবে, এই মর্মে পাস করা আইনের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন গ্রুপ সোচ্চার হয়েছে। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, দক্ষিণ আমেরিকার নারীবাদী গ্রুপগুলি আর্জেন্টিনার এই আইনকে অত্র অঞ্চলের অন্যান্য দেশের জন্যে একটা উদাহরণ হিসেবে দেখতে চাইছে। গর্ভপাতের পক্ষে কাজ করা গ্রুপগুলি বলছে যে, আর্জেন্টিনার অপেক্ষাকৃত রক্ষণশীল রাজ্যগুলি থেকে মামলা হতে পারে; আর বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক গর্ভপাত করতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে। আর্জেন্টিনার নারী বিষয়ক মন্ত্রী এলিজাবেথ গোমেজ আলকর্তা বলছেন যে, এই আইন বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জিং হবে। আর্জেন্টিনার ‘কনসোর্টিয়াম অব ক্যাথোলিক ডক্টরস’ এবং ‘ক্যাথোলিক ল’ইয়ার্স কর্পোরেশন’সহ বিভিন্ন রক্ষণশীল গ্রুপ এই আইনের বিরুদ্ধে অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছে। গর্ভপাত বিরোধী বড় গ্রুপ ‘ইউনিদাদ প্রোভিদা’ ডাক্তারদেরকে নিজেদের বিবেক ব্যবহার করার আহ্বান জানিয়েছে। অপরদিকে ‘দ্যা ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন ফর দ্যা রাইট টু লিগ্যাল, সেইফ এন্ড ফ্রি এবোরশন’ নামের গর্ভপাতের পক্ষে কাজ করা সংস্থার মুখপাত্র লরা সালোমে বলছেন যে, তারা আইনের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে কাজ করবেন।

ক্যাথোলিক আর্জেন্টিনাতে প্রতিবছর ৩ থেকে ৪ হাজার ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে; যদিও দেশটাতে মানুষের যৌনাচারের যথেষ্ট স্বাধীনতা রয়েছে। এই সংখ্যা প্রতি ১ লক্ষ জনসংখ্যার মাঝে ৮ থেকে সাড়ে ৮এর মতো। পার্শ্ববর্তী ব্রাজিলে এই সংখ্যা আরও অনেক ভয়াবহ; প্রতি লক্ষ জনসংখ্যায় তা ২৪এর উপর! ব্রাজিলের মিডিয়া ‘ফোলিয়া ডে সাও পাওলো’এর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সেখানে ২০১৮ সালে ৬৬ হাজার ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে; যা দিনের ১’শ ৮০টার সমকক্ষ। এর মাঝে ৫৪ শতাংশের বয়স ১৩ বছরের নিচে। আর আর্জেন্টিনাতে প্রতিবছর কত আইন বহির্ভূত গর্ভপাত হচ্ছে, তার হিসেব মেলা কঠিন। ২০০৫ সালে প্রকাশ করা সর্বশেষ এক রিপোর্টে বলা হয়েছিল যে, প্রতিবছর ৩ লক্ষ ৭০ হাজার থেকে ৫ লক্ষ ২০ হাজার গর্ভপাত হয় আর্জেন্টিনায়। আর ২০১৪ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব উইমেনস হেলথ’এর প্রকশিত এক রিপোর্টে বলা হয় যে, ব্রাজিলে প্রতি বছর ৪৮ হাজার অবৈধ গর্ভপাতের ঘটনা ঘটছে। অপরপক্ষে গর্ভপাতের পক্ষে কাজ করা সংস্থাগুলি বলছে যে, ব্রাজিলে প্রতিবছর ৫ লক্ষ আইনবহির্ভূত গর্ভপাত ঘটছে।

ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে গর্ভপাত নিষিদ্ধ থাকায় সেকুলার রাষ্ট্রব্যবস্থার সাথে তা সাংঘর্ষিক অবস্থানে রয়েছে। তবে পশ্চিমা সেকুলার চিন্তা যে ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয়গুলিকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে সক্ষম হয়নি, তা পোল্যান্ড এবং আর্জেন্টিনার ঘটনাগুলি দেখলে বোঝা যায়। সমাজের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিই বলে দিচ্ছে যে, এই দ্বন্দ্বের সমাধান পশ্চিমা বিশ্ব এখনও পায়নি। আইন করে পোল্যান্ডে গর্ভপাত নিষিদ্ধ করা, বা আর্জেন্টিনায় গর্ভপাত বৈধ করার ফলে তাদের সমাজের অসঙ্গতি চলে যাচ্ছে না। ক্যাথোলিক বিশ্বাসের দেশ হলেও সেকুলার চিন্তা বাস্তবায়নের কারণে নারী পুরুষের অবাধ যৌনাচার এই দেশগুলিতে অবৈধ নয়। বেশিরভাগ গর্ভপাতের কারণ হিসেবে ধর্ষণ বা গর্ভধারিনীর স্বাস্থ্য বা ভ্রুণের সমস্যা নয়, বরং বৈবাহিক সম্পর্ক বহির্ভূত যৌনাচারই সামনে আসছে। পোল্যান্ডে ৭’শর কম ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেও গর্ভপাতের ঘটনা ঘটছে লাখে। আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিলের ক্ষেত্রেও একই। একদিকে বামপন্থী লিবারালরা সেকুলার চিন্তা বাস্তবায়নের পক্ষে লড়ছে; অপরদিকে ডানপন্থী রক্ষণশীলরা ধর্মীয় বিশ্বাসকে রক্ষায় বদ্ধপরিকর। কিন্তু কেউই সমাজে অবাধ যৌনাচারের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি। পশ্চিমা বিশ্বে ডানপন্থীদের উত্থান মূলত পশ্চিমা আদর্শের উপর জনগণের আস্থাহীনতার কারণেই। জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং রাষ্ট্রের সেকুলার চিন্তার এহেন সাংঘর্ষিক অবস্থানই পশ্চিমা চিন্তার অসংগতিকে তুলে ধরে। একইসাথে ডানপন্থী বনাম লিবারাল আদর্শিক এই দ্বন্দ্ব পশ্চিমা সমাজের নড়বড়ে ভিতের দিকেই ইঙ্গিত দেয়। পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় এই রাজনৈতিক মেরুকরণ পশ্চিমা বিশ্বকে ব্যতিব্যস্ত রাখবে সামনের দিনগুলিতে।

Saturday, 8 August 2020

জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার ইউরোপের অনৈক্যকে দেখিয়ে দিচ্ছে

০৯ই অগাস্ট ২০২০
রুশ হুমকি মোকাবিলায় জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করে যখন পোল্যান্ডে মোতায়েন করা হচ্ছে, তখন জার্মানরা তাতে খুশি; আর অপরদিকে পোল্যান্ড মার্কিন সেনাদের খরচ পুরোটাই বহণ করতে চাইছে। অর্থাৎ ইউরোপের দেশগুলির কাছে জাতীয় নিরাপত্তার সংজ্ঞা এক নয়। ইউরোপের ভিন্ন ভিন্ন দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ভিন্ন ভিন্ন সম্পর্ক ইউরোপের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বকে যেমন সামনে নিয়ে আসছে, তেমনি ইউরোপের অভ্যন্তরীণ অনৈক্যকে চোখে আঙ্গুল দেখিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, যা কিনা যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া উভয়েই ব্যবহার করতে চাইবে।

 

গত ২৯শে জুলাই যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দেয় যে, তারা জার্মানি থেকে তাদের প্রায় ১২ হাজার সেনা সরিয়ে নিচ্ছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপার এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে, যাতে রাশিয়া এবং চীনের মতো শক্তিগুলিকে আরও ভালোভাবে মোকাবিলা করা যায়। তিনি আরও বলেন যে, এর মাধ্যমে ন্যাটো আরও শক্তিশালী হবে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ডিটারেন্স তৈরি হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলা করাটা আরও সহজ করবে। কিন্তু প্রায় একইসাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে কোন রাখঢাক না রেখেই বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে কারণ জার্মানি তাদের নিজেদের রক্ষার জন্যে কোন খরচ করছে না। ব্যাপারটা খুবই সহজ; তারা ‘অপরাধী’। তিনি আরও বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এখন আর বোকা বনতে চায় না। আন্যান্য ন্যাটো দেশগুলির জন্যে এটা একটা উদাহরণ হিসেবে থাকবে। ট্রাম্প মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, ২০১৯ সালে জার্মানি তার জিডিপির ১ দশমিক ৩৮ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করেছে, যা ন্যাটোর বেঁধে দেয়া টার্গেট ২ শতাংশ থেকে অনেক নিচে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তে সমালোচনা আসছে খোদ যুক্তরাষ্ট্র থেকেই। মার্কিন সিনেটর মিট রমনি এই টুইটার বার্তায় বলেন যে, এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের একটা বন্ধু রাষ্ট্রের মুখে চপেটাঘাত। ডেমোক্র্যাট সিনেটর বব মেনেনডেজ বলছেন যে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ইউরোপে ক্রেমলিনের আগ্রাসী কর্মকান্ডকে রুখে দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে আরও কঠিন হয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে জার্মানি থেকে সেনা সরিয়ে নিয়ে তাদেরকে বেলজিয়াম এবং ইতালিতে মোতায়েন করতে। কিন্তু ইতালিও ২০১৯ সালে তার জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ২২ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করেছে; বেলজিয়াম করেছে শূণ্য দশমিক ৯৩ শতাংশ! অর্থাৎ ব্যাপারটা শুধুমাত্র প্রতিরক্ষা বাজেটের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। জার্মানির সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অন্য দিকগুলিও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

৭ই অগাস্ট জার্মান পত্রিকা ‘ডাই ওয়েল্ট’এর এক খবরে বলা হয়ে যে, রাশিয়ার সাথে ‘নর্ড স্ট্রিম ২’ গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প এগিয়ে নেয়ার ‘অপরাধে’ জার্মানির সাসনিতজ বন্দরের উপর ভীষণ রকমের আইনগত এবং অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করার হুমকি দিয়েছেন তিনজন মার্কিন সিনেটর টেড ক্রুজ, টম কটন এবং রন জনসন। বল্টিক সাগরের তলদেশ দিয়ে বসানো এই পাইপলাইনের কাজের অল্প কিছু অংশ বাকি রয়েছে; যা সমাপ্তির পিছনে সাসনিতজ বন্দরের অবকাঠামো খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সিনেটররা এই চিঠিতে বলছেন যে, এই প্রকল্পে সাসনিতজ বন্দর সহায়তা দিলে বন্দরের মালিক এবং ম্যানেজমেন্টের কর্তাব্যক্তিদেরকে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করতে দেয়া হবে না এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা তাদের সকল সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে। তারা বলছেন যে, এই পাইপলাইন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যে মারাত্মক হুমকি। তাদের কথায় মার্কিন কংগ্রেসের উভয় দলই রাশিয়ার সাথে জার্মানির এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে।

জার্মানরাও প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধী অবস্থান নিয়েছে। জার্মান পত্রিকা ‘তাগেস স্পাইজেল’কে জার্মান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিয়েলস আনেন বলেন যে, মার্কিন সিনেটরদের চিঠিটাকে জার্মান সরকার মোটেই স্বাভাবিকভাবে নেয়নি; এর ভাষা এবং শব্দচয়ন ছিল একেবারেই অনভিপ্রেত। তিনি বলেন যে, ইউরোপিয়রা যদি মার্কিনীদের এধরনের কর্মকান্ডের বিরুদ্ধাচরণ না করে, তবে তারা ‘ব্ল্যাকমেইল’এর শিকার হবে। জার্মান ম্যাগাজিন ‘উইয়ো’র সাথে এক সাক্ষাতে জার্মান ইস্টার্ন বিজনেস এসোসিয়েশনের প্রধান মাইকেল হার্মস বলেন যে, জার্মানরা মার্কিনীদের বিরুদ্ধে পাল্টা কোন ব্যবস্থা নিতে পারবে না, এটা যেন কেউ না বলে। ইউরোপিয় ইউনিয়নের কোম্পানিগুলির জন্যে একটা সুরক্ষা ব্যুহ থাকা উচিৎ, যেগুলি এধরনের অবরোধে কোম্পানিগুলিকে বাঁচাবে। তিনি বলেন যে, জার্মান সরকারের উচিৎ ইইউকে পাল্টা অবরোধ দিতে অনুপ্রাণিত করা।

৩১শে জুলাই থেকে ৩রা অগাস্টের মাঝে ‘ইউগভ’এর মাধ্যমে জার্মান প্রেস এজেন্সির করা এক মতামত জরিপে দেখা যাচ্ছে যে, ৪৭ শতাংশ জার্মান মনে করছে যে, জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা কমানো উচিৎ। আর ২৫ শতাংশের মতো মানুষ বলছে যে, মার্কিন সেনা জার্মানি থেকে একেবারেই সরিয়ে নেয়া উচিৎ। ৩২ শতাংশ মনে করছে যে, মার্কিন সেনা থাকা উচিৎ। আরেক প্রশ্নের উত্তরে ৬৬ শতাংশ জার্মান মতামত দেয় যে, জার্মানি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ২০টা পারমাণবিক বোমাই সরিয়ে ফেলা উচিৎ। মাত্র ১৯ শতাংশ চাইছে যে, বোমাগুলি জার্মানিতে থাকুক। ন্যাটোর প্রতিশ্রুতিকে আমলে না নিয়ে জার্মান প্রতিরক্ষা বাজেটের ব্যাপারে ৫৮ শতাংশ মানুষ বলছে যে, জার্মানি প্রতিরক্ষার পিছনে যথেষ্ট ব্যয় করে।

ন্যাটোর যে সদস্য রাষ্ট্রগুলি প্রতিশ্রুত ২ শতাংশের বেশি প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করছে, তার বেশিরভাগই রাশিয়ার সীমানায় অবস্থিত; যেমন লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া, এস্তোনিয়া, রোমানিয়া, পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া। এই দেশগুলির সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে ভাটা পড়েনি। ইতোমধ্যেই ২০১৯ সালে ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষণা দেয় যে, তারা পোল্যান্ডকে রক্ষা করতে সেখানে মার্কিন সেনার সংখ্যা আরও ১ হাজার বাড়িয়ে সাড়ে ৫ হাজার করবে। ‘মিলিটারি টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, অতিরিক্ত মার্কিন সেনাদের রাখার জন্যে অবকাঠামো তৈরি করা শুরু হয়েছে; আর এই খরচের প্রায় পুরোটাই বহণ করবে পোলিশ সরকার।

ইউরোপ আজ বেসুরে অর্কেস্ট্রার মতো কথা বলছে। রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি করতে জার্মানি ‘নর্ড স্ট্রিম ২’ গ্যাস পাইপলাইনের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইইউএর সমর্থন চাইছে। ইউরোপের সাথে রাশিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্ককে জার্মানরা স্বাভাবিকভাবে নিলেও যুক্তরাষ্ট্র ভালো চোখে দেখছে না। জাতীয় নিরাপত্তার হুমকির ব্যাপারে জার্মানদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক মতভেদ দৃশ্যমান। রুশ হুমকি মোকাবিলায় জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করে যখন পোল্যান্ডে মোতায়েন করা হচ্ছে, তখন জার্মানরা তাতে খুশি; আর অপরদিকে পোল্যান্ড মার্কিন সেনাদের খরচ পুরোটাই বহণ করতে চাইছে। অর্থাৎ ইউরোপের দেশগুলির কাছে জাতীয় নিরাপত্তার সংজ্ঞা এক নয়। ইউরোপের ভিন্ন ভিন্ন দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ভিন্ন ভিন্ন সম্পর্ক ইউরোপের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বকে যেমন সামনে নিয়ে আসছে, তেমনি ইউরোপের অভ্যন্তরীণ অনৈক্যকে চোখে আঙ্গুল দেখিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, যা কিনা যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া উভয়েই ব্যবহার করতে চাইবে।