Showing posts with label Nigeria. Show all posts
Showing posts with label Nigeria. Show all posts

Saturday, 17 June 2023

‘আইএমএফ’এর ছোবলে দিশেহারা নাইজেরিয়ার জনগণ

১৭ই জুন ২০২৩

নাইজেরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট তিনুবু সর্বদাই ছিলেন ব্যবসা-বান্ধব একজন রাজনীতিবিদ। প্রেসিডেন্ট হবার পর তার স্বাগত বক্তব্যে তিনুবু ঘোষণা দেন যে, তিনি দেশটার মুদ্রা বিনিময় হারকে বাজারের উপরে ছেড়ে দেবেন। পশ্চিমা প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে জাতীয় মুদ্রা নাইয়ারাকে বাজারের উপরে ছেড়ে দেয়ার কারণে জনগণকে আমদানি করা খাদ্য বহুগুণ বেশি মূল্যে ক্রয় করতে হবে। ফলস্বরূপ, ‘আইএমএফ’এর উপদেশ মেনে নাইজেরিয়ার ব্যবসা-বান্ধব সরকার এখন জনগণকে কষ্ট সহ্য করতে বলছে।


গত ১৪ই জুন আফ্রিকার সবচাইতে বড় জনসংখ্যা এবং অর্থনীতির দেশ নাইজেরিয়ার সরকার দেশের জাতীয় মুদ্রা নাইয়ারা-র উপর থেকে সকল নিয়ন্ত্রণ তুলে নিয়ে সেটাকে বাজারের উপরে ছেড়ে দেয়। এর ফলশ্রুতিতে একদিনের মাঝে ডলারের বিপরীতে নাইয়ারা-র মূল্য প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে গিয়ে ইতিহাসের সর্বনিম্ন ডলারপ্রতি ৭’শ ৫৫তে গিয়ে দাঁড়ায়। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন যে, এতে দেশের জনগণের উপর স্বল্পমেয়াদে কষ্ট বয়ে নিয়ে আসলেও দীর্ঘমেয়াদে তা নাইজেরিয়ার জন্যে ভালো হবে। নাইজেরিয়ার জাতীয় মুদ্রার মূল্য এতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করতো। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমদানি করা দ্রব্যের জন্যে ডলারের বিপরীতে মুদ্রার মূল্য অপেক্ষাকৃত উচ্চতর রেখেছিল; যাতে করে আমদানি করা দ্রব্য সাধারণ মানুষের ক্রমক্ষমতার মাঝে থাকে। নাইজেরিয়া আমদানি করা গমের উপরে যথেষ্ট নির্ভরশীল; যা ডলারের বিনিময়ে আমদানি করা হয়।

পশ্চিমা সংস্থাগুলি বলছে যে, নতুন নীতির ফলে নাইজেরিয়ায় বিনিয়োগ বাড়বে এবং অর্থনীতিকে শক্ত ভিতের উপরে প্রতিষ্ঠা করবে। সাম্প্রতিক সময়ে নাইজেরিয়া ব্যাপক মূল্যস্ফীতি এবং মারাত্মক বেকারত্ব সমস্যার মাঝ দিয়ে যাচ্ছে। ‘আফ্রিকা নিউজ’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে আন্তর্জাতিক কনসালট্যান্সি কোম্পানি ‘প্রাইস ওয়াটারহাউজ কুপার্স’ বা ‘পিডব্লিউসি’র নাইজেরিয়া অফিসের বিশ্লেষক তাইয়ো ওইয়েদেলে বলছেন যে, ডলারের বিপরীতে ভিন্ন ভিন্ন বিনিময় হার রাখার ফলে এতকাল বাজারে সকল ব্যবসায়ীদের জন্যে একরকম অধিকার নিশ্চিত হয়নি। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা অফিশিয়াল বিনিময় হারে ডলার বিক্রি করতে বাধ্য থাকতো; এবং একইসাথে দেশের বাইরে থেকে ডলার বিনিয়োগ আনতে পারছিলো না। মারাত্মক ডলার সংকটের ফলে নাইজেরিয়ায় ব্যবসা করা বিদেশী কোম্পানিগুলি তাদের আয় করা অর্থ দেশের বাইরে নিতে পারছিলো না। শুধুমাত্র বিদেশী এয়ারলাইন্সগুলিই সাড়ে ৪’শ মিলিয়ন ডলারের আয় নাইজেরিয়ার বাইরে নিয়ে যেতে পারছে না। একারণেই নাইজেরিয়াতে বিদেশী বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

নাইজেরিয়ার নতুন মুদ্রানীতিকে স্বাগত জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ‘আইএমএফ’। ১৬ই জুন ‘আইএমএফ’এর এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, বহুদিন ধরে নাইজেরিয়ার মুদ্রা ব্যবস্থার ব্যাপারে ‘আইএমএফ’এর যে উপদেশ ছিল, সেটার বাস্তবায়নের কারণে সংস্থাটা দেশের সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছে এবং এই নীতি বাস্তবায়নে সরকারকে সহায়তা দেবে ‘আইএমএফ’। নাইজেরিয়ার এনজিও ‘সেন্টার ফর দ্যা প্রোমোশন অব প্রাইভেট এন্টারপ্রাইজেস’ বা ‘সিপিপিই’এর প্রতিষ্ঠাতা মুদা ইউসুফ এক বিবৃতিতে এই নীতির সমর্থন জানিয়ে বলেন যে, এতে বিনিয়োগ, পুঁজি এবং কর্মসংস্থান বাড়বে এবং ব্যবসা-বান্ধব পরিস্থিতি তৈরি হবে।

প্রেসিডেন্ট বোলা তিনুবু সর্বদাই ছিলেন ব্যবসা-বান্ধব একজন রাজনীতিবিদ। ‘বাজ নাইজেরিয়া’ বলছে যে, ১৯৫২ সালে লেগোসের বড় ব্যবসায়ী পরিবারে জন্ম নেয়া এই রাজনীতিবিদ ১৯৭৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান পড়াশোনার জন্যে। সেখানে স্কুল শেষ করে ১৯৭৯ সালে হিসাবরক্ষণে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি নেন। পাস করে বিভিন্ন মার্কিন কোম্পানিতে কাজ করে ১৯৮৩ সালে দেশে ফিরে আসেন এবং আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি ‘মোবিল’এ কাজ শুরু করেন। ১৯৯১ সালে চাকুরি ছেড়ে দিয়ে ৪০ বছর বয়সে তিনি তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। লেগোস রাজ্যের গভর্নর ছাড়াও তিনি সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এবছরের পহেলা মার্চ তিনুবু প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২৯শে মে প্রেসিডেন্ট হবার পর তার স্বাগত বক্তব্যে তিনুবু ঘোষণা দেন যে, তিনি দেশটার মুদ্রা বিনিময় হারকে বাজারের উপরে ছেড়ে দেবেন।

এর ঠিক দুই দিন আগে ‘বিজনেস ইনসাইডার আফ্রিকার’ এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, নাইজেরিয়াতে ‘আইএমএফ’এর প্রতিনিধি আরি আইসেন এক ভার্চুয়াল আলোচনায় বলেন যে, নাইজেরিয়ার মূল সমস্যা হলো, সরকার কর থেকে যত আয় করছে, তার চাইতে বেশি ব্যয় করছে; যেকারণে ঋণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এভাবে দেশটা যদি আয়ের অধিক ব্যয় করতে থাকে, তাহলে কোন একদিন দাতারা ঋণের অর্থ ফেরত চাইবে, অথবা নতুন ঋণ দেয়া বন্ধ করে দেবে।

পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানিকারক দেশ হওয়া সত্ত্বেও আমদানি ব্যয় মেটাতে হিমসিম খাচ্ছে নাইজেরিয়া। ‘অবজারভেটরি অব ইকনমিক কমপ্লেক্সিটি’ বা ‘ওইসি’র হিসেবে নাজেরিয়া ২০২১ সালে প্রায় ৫৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য এবং প্রায় ৫ বিলয়ন ডলারের সেবা রপ্তানি করেছিল। এর বিপরীতে দেশটা একইবছর প্রায় ৬২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য এবং প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলারের সেবা আমদানি করে। ৫০ বিলিয়ন ডলারের অপরিশোধিত খনিজ তেল ও গ্যাস রপ্তানি করলেও নাইজেরিয়া প্রায় সাড়ে ১১ বিলিয়ন ডলারের পরিশোধিত তেল আমদানি করে। এছাড়াও দেশটা বিপুল পরিমাণ ডলার ব্যায়ে গম, গাড়ি, ঔষধ, যন্ত্রপাতি, ইত্যাদি আমদানি করে। বিদেশী ব্যবসায়িক সেবা, ব্যক্তিগত ভ্রমণ এবং পরিবহণ সেবা খাতে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার প্রতিবছর নাইজেরিয়া থেকে চলে যাচ্ছে। এছাড়াও এপ্রিল মাসে কনসাল্টিং কোম্পানি ‘কেপিএমজি’ বলে যে, দেশটার বেকারত্বের হার ২০২২ সালে যেখানে ছিল প্রায় ৩৮ শতাংশ, তা ২০২৩ সালে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৪১ শতাংশে ঠেকবে। তারা বলে যে, শিল্পায়ন না হওয়ায় এবং ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ না বাড়ায় বেকারত্বের সমস্যা থেকেই যাবে।

উপনিবেশ না হয়েও ঔপনিবেশিক নীতি যেন ছাড়ছে না নাইজেরিয়াকে। রেকর্ড মূল্যে জ্বালানি তেল রপ্তানি করলেও দেশটা এখন ব্যাপকভাবে ঋণগ্রস্ত। পরিশোধিত জ্বালানি এলপিজি রপ্তানি করে নাইজেরিয়রা নিজেদের বাসাবাড়িতে রান্নার জন্যে আমদানি করা পরিশোধিত কেরোসিন তেল ব্যবহার করে। শিল্পায়ন না হওয়ায় বেকারত্বের হার আকাশচুম্বী। ‘আফ্রিকা নিউজ’ বলছে যে, নতুন প্রেসিডেন্ট বোলা তিনুবু দেশের অর্থনীতিকে ঘোরাবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর গডউইন এমেফিয়েল এবং অর্থনৈতিক ও আর্থিক দুর্নীতি দমন সংস্থার প্রধান আব্দুলরশীদ বাওয়া-কে পদচ্যুত ও গ্রেপ্তার করেছেন, এবং জ্বালানির উপর থেকে ভর্তুকি সরিয়ে নিয়েছেন। এতে ‘আইএমএফ’ খুশি হলেও পরিবহণ খরচ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত জেনারেটরের খরচ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন পশ্চিমা প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে জাতীয় মুদ্রা নাইয়ারাকে বাজারের উপরে ছেড়ে দেয়ার কারণে জনগণকে আমদানি করা খাদ্য বহুগুণ বেশি মূল্যে ক্রয় করতে হবে। ফলস্বরূপ, ‘আইএমএফ’এর উপদেশ মেনে নাইজেরিয়ার ব্যবসা-বান্ধব সরকার এখন জনগণকে কষ্ট সহ্য করতে বলছে। পশ্চিমা ঋণের শর্তে নিষ্পেষিত পশ্চিম আফ্রিকার বৃহত্তম দেশ নাইজেরিয়ার অর্থনৈতিক দৈন্যতা আঞ্চলিক ভূরাজনীতিকে প্রভাবিত করবে নিঃসন্দেহে।

Saturday, 23 October 2021

তুরস্ক কি আফ্রিকাতে সামরিক শক্তি হিসেবে রূপ নিচ্ছে?

২৩শে অক্টোবর ২০২১

এরদোগানের কাছে তুর্কি জনগণের আবেগকে জাগিয়ে রাখাটাই ক্ষমতায় টিকে থাকার ফাউন্ডেশন। তবে তুর্কি জনগণের আবেগকে ব্যবহার করতে গিয়ে তুরস্ক তার নীতিকে যতটা বহির্মুখী করবে, ততই আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক শক্তিদের সাথে প্রতিযোগিতার মাঝে পড়বে। আফ্রিকা তুরস্কের জন্যে নতুন যুদ্ধক্ষেত্র। এখানে বড় শক্তিদের সাথে প্রতিযোগিতায় তুরস্ক নিজেদের জন্যে আলাদা জায়গা করে নিতে চাইছে। তুরস্কের ড্রোনগুলি এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এতে ফ্রান্সের দুশ্চিন্তাই হবে সবচাইতে বেশি; কারণ ঔপনিবেশিক শক্তিদের মাঝে দুর্বল হয়ে পড়া ফ্রান্সেরই প্রভাব হারাবার ভয়ে থাকবে সবচাইতে বেশি।

 
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান পশ্চিম আফ্রিকার তিন দেশ এঙ্গোলা, টোগো এবং নাইজেরিয়া ঘুরে এসেছেন। এর মাধ্যমে ৩০টা দেশ ভ্রমণ করে তিনি আফ্রিকায় সবচাইতে বেশি দেশ ভ্রমণকারী রাষ্ট্রনায়ক হলেন। নাইজেরিয়া এবং এঙ্গোলার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদে তুর্কি বিনিয়োগ এবং দেশগুলির সাথে বাণিজ্য বৃদ্ধির খবরগুলিই মিডিয়াতে এসেছে বেশি। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, আফ্রিকাতে তুরস্কের বাণিজ্য বৃদ্ধি পেলেও তা এখনও ইউরোপের সাথে বাণিজ্যের তুলনায় কিছুই নয়। তবে আফ্রিকায় তুরস্কের কর্মকান্ড বৃদ্ধির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয়; রয়েছে অন্য কোথাও। মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’এর ‘জি জিরো মিডিয়া’র এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, তুরস্ক আফ্রিকাতে বড় শক্তিগুলির সাথে সরাসরি প্রতিযোগিতা না করে নিজেদের জন্যে কিছু জায়গা বের করে নিয়েছে; যেখানে তারা বেশ সাফল্য পাচ্ছে। তুরস্কের সবচাইতে বড় সুবিধা হলো, তারা ফ্রান্স, ব্রিটেন বা বেলজিয়ামের মতো উপনিবেশিক শক্তি নয়; এমনকি বর্তমান যুগের বড় শক্তিগুলির একটাও তারা নয়। একইসাথে তুরস্ক নিজেদেরকে যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের মতো আগ্রাসী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে না।

আফ্রিকায় তুরস্কের মূল লক্ষ্য কি ড্রোন বিক্রি?


‘মিডলইস্ট আই’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, তুর্কি প্রেসিডেন্টের আফ্রিকায় তিন দেশ সফরের ঘটনা তুর্কি মিডিয়াতে খুব কমই এসেছে। বরং পত্রিকাগুলি সরকারি প্রেসনোটকেই মূলতঃ হাইলাইট করেছে; যার মাঝে মূল বক্তব্য ছিল আফ্রিকায় তুরস্কের মানবকল্যাণমূলক কর্মকান্ড এবং উপনিবেশিকতা বিমুখ দিকনির্দেশনা। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, গত দুই দশকে আফ্রিকাতে তুরস্ক তার কূটনৈতিক মিশনের সংখ্যা ১২ থেকে ৪৩শে উন্নীত করা হয়েছে; বাণিজ্য ৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে; বিনিয়োগ ১’শ মিলিয়ন ডলার থেকে সাড়ে ৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে; ৬ হাজার আফ্রিকান ছাত্র তুরস্কের বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপে পড়ছে। ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’ আফ্রিকার ৩৯টা দেশের ৬০টা গন্তব্যে যাচ্ছে; যার মাধ্যমে আফ্রিকা এবং বাকি বিশ্বের মাঝে হাব হয়ে যাচ্ছে ইস্তাম্বুল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আফ্রিকার কিছু অংশে সামরিক হস্তক্ষেপ এবং বিভিন্ন দেশে তুর্কিদের তৈরি মনুষ্যবিহীন ড্রোনের বাজার তৈরি হওয়ায় বিশ্লেষকেরা প্রশ্ন করছেন যে, আফ্রিকায় তুরস্ক তার কৌশল পরিবর্তন করে আঞ্চলিক খেলা পরিবর্তন করার মতো অবস্থানে যাবার চেষ্টা করছে কিনা। জার্মানির ‘ইউনিভার্সিটি অব বেইরিউথ’এর গবেষক ইব্রাহিম বাকির আব্দুলাই মনে করছেন যে, সোমালিয়া, লিবিয়া এবং পশ্চিম আফ্রিকায় তুরস্কের ভূমিকা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, তুরস্ক আফ্রিকা জুড়েই তার প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে।

সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কের তৈরি ড্রোন সিরিয়া, লিবিয়া এবং আজেরবাইজানে ব্যাপক সাফল্য পাবার পর তুর্কিরা প্রচুর ড্রোনের অর্ডার পেতে শুরু করেছে। ইউক্রেন এবং পোল্যান্ডের কাছে তুর্কি ড্রোন বিক্রয়ের খবর এসেছে। মধ্য এশিয়ার তুর্কমেনিস্তান প্যারেডে তুর্কি ড্রোন দেখিয়েছে; কিরগিজস্তানও একই ড্রোন অর্ডার করেছে বলছে। এমনকি ব্রিটিশরাও এতে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়াতে তুর্কি ড্রোন বিক্রি হয়েছে, যদিও এই মুহুর্তে তিউনিসিয়ার ক্ষমতা নেয়া প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদের সাথে তুরস্কের সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। মরক্কোতেও তুরস্কের ড্রোন বিক্রি হয়েছে; যেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল পশ্চিম সাহারা নিয়ে মরক্কো এবং আলজেরিয়ার মাঝে ব্যাপক বিরোধ রয়েছে। তুরস্ক দুই দেশের সাথেই সম্পর্ক রেখে চলেছে। ‘আফ্রিকান ইন্টেলিজেন্স’ খবর দিচ্ছে যে, মোজাম্বিকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত রুয়ান্ডার সেনবাহিনী তুর্কি ড্রোন কেনার চিন্তা করছে। কিছুকাল আগ পর্যন্তও তুর্কিরা রুয়ান্ডায় কিছু বড় অবকাঠামো প্রকল্পে কাজ করছিল; এখন সেখানে প্রতিরক্ষাও যোগ হলো। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, অফিশিয়ালি ঘোষণা না আসলেও ইথিওপিয়াও তুরস্কের কাছ থেকে ড্রোন কেনার ব্যাপারে একমত হয়েছে। ইথিওপিয়া বর্তমানে বিচ্ছিন্নতাবাদী তিগ্রে অঞ্চলের সাথে প্রায় এক বছর ধরে ভয়াবহ যুদ্ধে জড়িয়ে আছে। ইথিওপিয়াতে তুরস্কের বড় রকমের বিনিয়োগ রয়েছে টেক্সটাইল সেক্টরে। দেশটার বড় বড় অবকাঠামোর কাজও তুর্কিরা করছে। নাইজেরিয়াও তার উত্তরাঞ্চলে বোকো হারামের সাথে যুদ্ধে তুর্কি ড্রোন ব্যবহার করতে চাইছে। এঙ্গোলাও তুর্কি ড্রোনের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে।

আঙ্কারার ‘ফরেন পলিসি সেন্টার’এর ফেলো এমরে চালিসকান বলছেন যে, তুরস্ক মূলতঃ মাঝারি আকৃতির ব্যবসাগুলিতে বিনিয়োগ করেছে; বড় আকারের ব্যবসায় নয়। অর্থাৎ আফ্রিকার সাথে তুরস্কের ব্যবসার প্রসার আসলে খুব বড় কিছু নয়। তবে প্রতিরক্ষা খাতে বিক্রির ব্যাপারগুলি আলাদা; কারণ এর মাঝে থাকে অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তির আদানপ্রদান এবং গভীরতর সহযোগিতা। অনেকেই প্রশ্ন করছেন যে, তুরস্ক কি আফ্রিকাতে ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা রাশিয়ার প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করছে কিনা। তারা বলছেন যে, লিবিয়াতে এবং আজেরবাইজানে তুর্কি ড্রোন যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পেরেছিল। লিবিয়ার যুদ্ধে পরিবর্তন আনার পরপরই তুরস্ক আফ্রিকাতে শুধুমাত্র মানবিক সহায়তা প্রদানকারী থেকে সামরিক শক্তিতে পরিণত হতে শুরু করে। চালিসকান বলছেন যে, লিবিয়াকে কেন্দ্র করেই আশেপাশের দেশগুলিতে তুরস্ক সামরিক শক্তি হতে চাইছে। তবে লিবিয়ার বাইরে সামরিক ঘাঁটি রাখার মতো অর্থনৈতিক সক্ষমতা তুরস্কের নেই। অপরদিকে চীনারা অস্ত্রও বিক্রি করছে; আবার বিশাল আকারের ঋণও দিচ্ছে।

ইস্তাম্বুলের ‘ইয়েদিতেপে ইউনিভার্সিটি’র এসিসট্যান্ট প্রফেসর ভোলকান ইপেক বলছেন যে, তুরস্কের আফ্রিকায় যাওয়া দেখিয়ে দেয় যে, তারা তাদের আশেপাশের দেশের মাঝে আর কূটনৈতিক কর্মকান্ডকে সীমাবদ্ধ করে রাখতে চাইছে না। এক্ষেত্রে ইউরোপিয় শক্তিদের তুলনায় তুরস্ক এগিয়ে আছে; কারণ তুরস্কের কোন ঔপনিবেশিক ইতিহাস নেই।

 
তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান এবং নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বুহারি। তুরস্ক তার নিজের জন্যে একটা আলাদা স্থান করে নিতে চাইছে। আরও শক্তিশালী কূটনীতির দিকে যেতে চাইছে তুরস্ক; যেখানে আফ্রিকার দেশগুলি তুরস্কের সাথে পার্টনারিশিপে নিজেরাও লাভবান হবে। উদাহরণস্বরূপ, নাইজেরিয়া চাইছে তার এলএনজির জন্যে বাজার খুঁজতে; যেখানে তুরস্ক এগিয়ে এসেছে নাইজেরিয়ার গ্যাস অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করতে।

তুরস্ক আফ্রিকাতে কার সাথে প্রতিযোগিতা করছে?

‘জি জিরো মিডিয়া’ বলছে যে, আফ্রিকাতে তুরস্কের কর্মকান্ড যার জন্যে সবচাইতে বেশি হুমকির সৃষ্টি করেছে, সে হলো ফ্রান্স। পশ্চিম আফ্রিকায় তুরস্কের অবস্থানের ব্যাপারে সবচাইতে বিরক্ত ফ্রান্স। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ সরাসরিই বলেছেন যে, তুরস্ক আফ্রিকাতে ফরাসিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। ফরাসি মিডিয়াতে এরদোগানের আফ্রিকা সফরে সাধারণ বাণিজ্যের তুলনায় ড্রোন বাণিজ্যকেই বেশি হাইলাইট করা হয়েছে। ‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’এর এক প্রতিবেদনে আফ্রিকাতে তুরস্কের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড নিয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছে; কারণ তুর্কি মুদ্রা লিরা এখন যথেষ্টই দুর্বল; মুদ্রাস্ফীতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে; দেশটার ব্যাংকিং সেক্টরের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এমতাবস্থায় ডিসেম্বর মাসে ইস্তাম্বুলে তুরস্ক আফ্রিকা শীর্ষ বৈঠককে কতটুকু স্বার্থক করা সম্ভব? ইতালির ‘ইউনিভার্সিটি অব জেনোয়া’র ফেডেরিকো ডনেলি বলছেন যে, প্রতিবারই আফ্রিকার সাথে তুরস্কের শীর্ষ বৈঠক তুর্কিদের নতুন নীতিকে সামনে নিয়ে এসেছে। এখন নতুন যে দিকটাকে তুর্কিরা গুরুত্ব দিচ্ছে, তা হলো নিরাপত্তা। ড্রোন বিক্রির মাধ্যমে তুর্কিরা আফ্রিকার দেশগুলির সাথে একরকমের দরকষাকষিতে যেতে পারছে; কারণ পশ্চিমাদের ড্রোনগুলির চাইতে কমদামি হলেও তুর্কি ড্রোনগুলির কর্মক্ষমতা যথেষ্ট। আফ্রিকার দেশগুলির নিরাপত্তার জন্যে এই ড্রোনগুলি বড় সুবিধা দিচ্ছে।

ইস্তাম্বুলের সাংবাদিক বারসিন ইনান্স বলছেন যে, এরদোগানের আফ্রিকা সফর তুরস্কের চাইতে ইউরোপেই বেশি আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। ইউরোপিয় মিডিয়াতে এব্যাপারে যত বিতর্ক হচ্ছে, তা তুরস্কে প্রায় কখনোই দেখা যায় না। তুরস্কের আফ্রিকা নীতিতে পরিবর্তন এরদোগানের আগেই শুরু হলেও সকলে এব্যাপারে এরদোগানকেই ক্রেডিট দিচ্ছেন। তুরস্কের জ্বালানি উৎসকে আরও শক্ত ভিত দিতে তুরস্ক নাইজেরিয়া থেকে এলএনজি আমদানিতে গুরুত্ব দিতে চাইছে। এই ব্যাপারটা যতটা না হাইলাইট হয়েছে, তার চাইতে ড্রোন বিক্রি নিয়েই কথা হচ্ছে বেশি। নাইজেরিয়ার ডেভেলপমেন্ট কনসালট্যান্ট নাজিম আনিমাশাউন মনে করেননা যে তুরস্ক আফ্রিকাতে কাউকে প্রতিস্থাপিত করতে চাইছে। তিনি বলছেন যে, তুরস্ক তার নিজের জন্যে একটা আলাদা স্থান করে নিতে চাইছে। আরও শক্তিশালী কূটনীতির দিকে যেতে চাইছে তুরস্ক; যেখানে আফ্রিকার দেশগুলি তুরস্কের সাথে পার্টনারিশিপে নিজেরাও লাভবান হবে। উদাহরণস্বরূপ, নাইজেরিয়া চাইছে তার এলএনজির জন্যে বাজার খুঁজতে; যেখানে তুরস্ক এগিয়ে এসেছে নাইজেরিয়ার গ্যাস অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করতে। যখন পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলি নিজেদের কর্মকান্ড কমিয়ে ফেলতে চাইছে, তুরস্ক ঠিক সেখানেই নিজেদের জায়গা করে নিতে চাইছে। তুর্কি সাংবাদিক বারসিন ইনান্স বলছেন যে, ইস্তাম্বুলে আসন্ন আফ্রিকা শীর্ষ বৈঠক খুব সহজেই অন্যান্য ইস্যুর নিচে পড়ে যেতে পারে। কারণ তুরস্কের আশেপাশে সিরিয়া, রাশিয়া, ইরাক, ইরান, গ্রিসসহ আরও অনেক ইস্যু রয়েছে; যেগুলি যেকোন সময় সামনে চলে আসতে পারে এবং সেই ইস্যুগুলিকেই মিডিয়া আফ্রিকার চাইতে বেশি গুরুত্ব দিতে পারে। এমনকি তুরস্কে বড় কোন ইস্যু তৈরি না হলেও হয়তো আফ্রিকা শীর্ষ বৈঠক তুর্কি মিডিয়াতে অতবড় হেডলাইন হবে না। তুরস্কের আফ্রিকা নীতি সরকারের কাছে যতটা না গুরুত্বপূর্ণ, সাধারণ জনগণের কাছে ততটা নয়। তবে তুর্কি ব্যবসায়ীরা আফ্রিকার ব্যাপারে যথেষ্টই আগ্রহী। তুর্কি চিন্তাবিদদের মাঝেও খুব কম সংখ্যক আফ্রিকা নিয়ে কথা বলছেন।

তুর্কিরা তাদের উসমানি খিলাফতের ইতিহাসের স্বপ্নে বিভোর। তাই উসমানি সময়ে তুর্কিদের প্রভাবের মাঝে থাকা এলাকাগুলিকেই তুরস্ক টার্গেট করছে। এরদোগানও তুর্কি জনগণের এই আবেগকে কাজে লাগাতে চাইছেন। তবে আফ্রিকা এখনও তুর্কিদের চিন্তায় বেশ ছোট। আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় তুরস্ক এখন সর্বদাই সিরিয়া, রাশিয়া, ককেশাস, ইরাক, ইরান, গ্রিস, ইত্যাদি ইস্যু নিয়ে জর্জরিত; যা কিনা তুর্কি মিডিয়াকে আফ্রিকার ব্যাপারে অনাগ্রহী রেখেছে। এর মাঝে তুরস্কের অর্থনীতি চলছে ধুঁকে ধুঁকে। তুর্কি লিরার ব্যাপক দরপতন এবং মারত্মক মূল্যস্ফীতিই জনগণকে ব্যতিব্যস্ত রাখার জন্যে যথেষ্ট; যা কিনা সামনের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হবে। এমতাবস্থায় এরদোগানের কাছে তুর্কি জনগণের আবেগকে জাগিয়ে রাখাটাই ক্ষমতায় টিকে থাকার ফাউন্ডেশন। তবে তুর্কি জনগণের আবেগকে ব্যবহার করতে গিয়ে তুরস্ক তার নীতিকে যতটা বহির্মুখী করবে, ততই আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক শক্তিদের সাথে প্রতিযোগিতার মাঝে পড়বে। আফ্রিকা তুরস্কের জন্যে নতুন যুদ্ধক্ষেত্র। এখানে বড় শক্তিদের সাথে প্রতিযোগিতায় তুরস্ক নিজেদের জন্যে আলাদা জায়গা করে নিতে চাইছে। তুরস্কের ড্রোনগুলি এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এতে ফ্রান্সের দুশ্চিন্তাই হবে সবচাইতে বেশি; কারণ ঔপনিবেশিক শক্তিদের মাঝে দুর্বল হয়ে পড়া ফ্রান্সেরই প্রভাব হারাবার ভয়ে থাকবে সবচাইতে বেশি।

Sunday, 13 June 2021

টুইটারের সাথে বিরোধ … নাইজেরিয়ার আস্তিত্বের সংকট?

১৩ই জুন ২০২১

২০১৭ সাল। নাইজেরিয়ার দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের বায়াফ্রা অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আন্দোলন। পশ্চিম আফ্রিকায় নাইজেরিয়া সবচাইতে বড় এবং সম্পদশালী দেশ হলেও তার কৃত্রিম সীমানা তাকে অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল করে রেখেছে। এই দুর্বলতা তাকে পশ্চিমাদের উপর নির্ভরশীল রেখেছে; যা আজও দৃশ্যমান। পশ্চিম আফ্রিকা জুড়ে দেশটার আশেপাশের অস্থিরতা নাইজেরিয়াকে টেনে নিলেও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণে নাইজেরিয়া ভূরাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়নি; বরং পশ্চিমাদের নিজস্ব দ্বন্দ্বের শিকারে পরিণত হয়েছে।

 
১২ই জুন নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদু বুহারি ‘গণতন্ত্র দিবস’ উপলক্ষে এক টিভি ভাষণে দেশের উত্তর পূর্বে এবং দক্ষিণ পূর্বে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবণতির কথা স্বীকার করেন। ‘সিএনএন’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, গত ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত ৮’শর বেশি স্কুল ছাত্রীকে অপহরণ করা হয়েছে। বুহারি একইসাথে দেশের দারিদ্র্য এবং যুবকদের বেকারত্বের কথা উল্লেখ করেন এবং এসব সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন। তবে বুহারির সমস্যা কমছে না; বরং বাড়ছে। ‘গণতন্ত্র দিবস’ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে বুহারির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে; যেখানে ‘বুহারিকে অবশ্যই যেতে হবে’ লেখা প্লাকার্ড দেখায় মানুষ। প্রতিবাদকারীরা বুহারির কর্মপদ্ধতির সমালোচনা করে; বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘টুইটার’কে নাইজেরিয়াতে বন্ধ করার সমালোচনা করে তারা। গত ৪ঠা জুন নাইজেরিয়ার সরকার সেদেশে টুইটার বন্ধ করে এই বলে যে, টুইটারকে ব্যবহার করে এমন কিছু কর্মকান্ড চালানো হচ্ছে, যা কিনা নাইজেরিয়ার অস্তিত্বকেই বিপন্ন করতে পারে।

অনেকেই ধারণা করছেন যে, নাইজেরিয়ায় টুইটারকে বন্ধ করার পিছনে ১লা জুনের বুহারির টুইট বার্তার সম্পর্ক থাকতে পারে। সেই বার্তায় প্রেসিডেন্ট বুহারি দেশের দক্ষিণ পূর্বের বিচ্ছন্নতাকামী সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবার হুমকি দেন, যারা সেখানে নির্বাচন অফিসসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়েছে। টুইটার বুহারির এই বার্তা মুছে ফেলে বলে যে, এই বার্তা টুইটারের নিয়মকানুন লঙ্ঘন করেছে। বুহারি ১৯৬০এর দশকে দেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে ‘বায়াফ্রা’ অঞ্চলে ঘটে যাওয়া গৃহযুদ্ধের কথাই স্মরণ করেছিলেন; এবং সেই অঞ্চলে এরকম কোন বিচ্ছন্নতাবাদী আন্দোলন আবার যেন না দেখা দেয়, তিনি সেব্যাপারে সতর্ক করেন। ‘আল জাজিরা’র এক লেখায় নাইজেরিয়ার সাংবাদিক ফিসায়ো সোইয়োমবো মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, ২০২০এর অক্টোবরে মার্কিন টেকনলজি কোম্পানি টুইটারের প্রধান নির্বাহী জ্যাক ডরসি এক টুইটার বার্তায় নাইজেরিয়ার ‘এন্ডসার্স’ আন্দোলনে বিটকয়েনের মাধ্যমে অর্থ দেবার জন্যে আনুরোধ করেন। সোইয়োমবো বলছেন যে, জ্যাক ডরসির এই টুইট বার্তার পরেই বোঝা গিয়েছিল যে, টুইটার নাইজেরিয়ার সরকারের সাথে সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে। টুইটার ছাড়া এই আন্দোলন হয়তো সম্ভব হতো না। ‘এন্ডসার্স’ হলো একটা আন্দোলন, যার মাধ্যমে নাইজেরিয়ার পুলিশের ‘স্পেশাল এন্টি রবারি স্কোয়াড’ বা ‘সার্স’কে ভেঙ্গে ফেলার দাবি জানানো হয়। ‘কোয়ার্টজ আফ্রিকা’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০১৭ সাল থেকে শুরু হয়ে ২০২০এর ১৩ই অক্টোবর পর্যন্ত ‘হ্যাশট্যাগ’এর মাধ্যমে টুইটারে ২ কোটি ৮০ লক্ষ বার ছড়ায় এই আন্দোলনের বার্তা। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিনেয়াপলসে জর্জ ফ্লয়েড নামের এক কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি পুলিশের নির্যাতনে মৃত্যুবরণ করার পর সোশাল মিডিয়াতে ফ্লয়েডের উপর অত্যাচারের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলশ্রুতিতে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে পুলিশের সাথে দাঙ্গা শুরু হয়। নাইজেরিয়াতেও ফ্লয়েডের সূত্র ধরেই আন্দোলন হয়েছে। ২০২০এর ৩রা অক্টোবর টুইটারে একটা ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায় যে, খুব সম্ভবতঃ ‘সার্স’ পুলিশ সদস্যরা নাইজেরিয়ার এক তরুণকে গুলি করছে। এর ফলশ্রুতিতে পুরো দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভ দমনে বুহারির সরকারের দমনপীড়নের পদ্ধতি পরিস্থিতিকে আরও বেশি আশান্ত করে।

নাইজেরিয়া সরকারের তথ্যমন্ত্রী লাই মোহাম্মদ সাংবাদিকদের বলেন যে, নাইজেরিয়ার দক্ষিণ পূর্বের বিচ্ছন্নতাবাদী নেতা নামদি কানুর বিপজ্জনক টুইট বার্তা টুইটার কখনও মুছে না। কানু বিদেশে বসবাস করে নাইজেরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলির উপর হামলা করার নির্দেশ দিচ্ছেন। নামদি কানু হলেন নাইজেরিয়ার দক্ষিণ পূর্বের ইগবো জাতি অধ্যুষিত বিচ্ছন্নতাবাদী ‘বায়াফ্রা’ এলাকার ‘ইন্ডিজেনাস পিপল অব বায়াফ্রা’ বা ‘আইপিওবি’এর নেতা; যিনি ১৯৬০এর দশকে ব্যর্থ হওয়া বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দলনকে জিইয়ে রেখেছেন। ২০১৫ সালে তিনি একবার গ্রেপ্তার হন; দু’বছর পর তাকে ছেড়েও দেয়া হয়। সাংবাদিক সোইয়োমবো বলছেন যে, দেশের দক্ষিণ পূর্বের কিছু অঞ্চল ছাড়া ইহুদী ধর্মের অনুসারী নামদি কানুর তেমন অনুসারী নেই। কিন্তু কানুর ব্যাপারে বুহারি সরকারের অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার সূত্র ধরে নাইজেরিয়ার প্রায় ৪ কোটি টুইটার ব্যবহারকারীকেই অন্ধকারে নিপতিত করে দেয়াটা দেশব্যাপী বিক্ষোভ ডেকে এনেছে।

নাইজেরিয়া সরকার বলছে যে, টুইটার যদি নাইজেরিয়াতে অপারেট করতে চায়, তাহলে তাকে নাইজেরিয়াতে লাইসেন্স নিতে হবে। ‘সিএনএন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ভারত এবং নাইজেরিয়ার মতো বড় দুই দেশেই টুইটার সমস্যা পড়েছে। অথচ নিজেদের ব্যবসার সম্প্রসারণ চাইলে দুই দেশেই টুইটারের অপারেট করার কোন বিকল্প নেই। ভারত সরকার গত কয়েক মাস ধরেই টুইটারের সাথে বাকস্বাধীনতা বিষয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে আছে। কিছুদিন আগে অস্ট্রেলিয়া এবং ব্রিটেনের সাথেও মার্কিন সোশাল মিডিয়া কোম্পানিগুলির দ্বন্দ্ব শুরু হয়।

‘ডয়েচে ভেলে’র সাথে কথা বলতে গিয়ে নাইজেরিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষক আব্দুল্লাহি মোহামেদ কোলি বলেন যে, টুইটার নাইজেরিয়ার বিপক্ষে যারা কাজ করছে, তাদেরকে শক্তি যোগাচ্ছে। ‘আইপিওবি’ ছাড়াও আরও অনেক সংগঠন টুইটারকে কাজে লাগিয়ে নাইজেরিয়ার অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলছে। টুইটার নাইজেরিয়াতে অফিস খোলা, রেজিস্টার করা, নাইজেরিয়ার আইন মানা, বা ট্যাক্স প্রদান করতে চাইছে না; যা নাইজেরিয়ার স্বার্থের বিরুদ্ধে। মোহামেদ কোলির কথাগুলি নাইজেরিয়ার সরকারের কথাগুলিকেই প্রতিফলিত করে। বায়াফ্রা গৃহযুদ্ধের অর্ধশতবর্ষ পরেও নাইজেরিয়া নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে লড়াই করছে। ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া কৃত্রিম ভৌগোলিক সীমানাকে রক্ষা করতে গিয়ে নাইজেরিয়ার নেতৃত্ব নিজ জনগণকেও দূরে ঠেলে দিয়েছে; দেশকে করেছে আরও দুর্বল। টুইটারের মতো মার্কিন টেকনলজি কোম্পানিগুলি নাইজেরিয়া, ভারত, অস্ট্রেলিয়াসহ ব্রিটিশ কমনওয়েলথের দেশগুলির সাথে আইনগত দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে; যা তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং কর্পোরেট আদর্শকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বায়াফ্রা যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ডসহ কিছু ক্যাথোলিক খ্রিস্টান দেশ এবং সংস্থা বায়াফ্রাকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সহায়তা দিয়েছিল। প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশ নাইজেরিয়া সবচাইতে বড় সহায়তা পেয়েছিল ব্রিটেন এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে। পশ্চিম আফ্রিকায় নাইজেরিয়া সবচাইতে বড় এবং সম্পদশালী দেশ হলেও তার কৃত্রিম সীমানা তাকে অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল করে রেখেছে। এই দুর্বলতা তাকে পশ্চিমাদের উপর নির্ভরশীল রেখেছে; যা আজও দৃশ্যমান। পশ্চিম আফ্রিকা জুড়ে দেশটার আশেপাশের অস্থিরতা নাইজেরিয়াকে টেনে নিলেও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণে নাইজেরিয়া ভূরাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়নি; বরং পশ্চিমাদের নিজস্ব দ্বন্দ্বের শিকারে পরিণত হয়েছে।

Monday, 8 February 2021

পাকিস্তানের ‘লুক আফ্রিকা’ নীতির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব কতটুকু?

০৮ই ফেব্রুয়ারি ২০২১

জানুয়ারি ২০২০, নাইরোবি, কেনিয়া। ‘পাকিস্তান আফ্রিকা ট্রেড ডেভেলপমেন্ট কনফারেন্স’ নামে একটা সন্মেলন। ‘লুক আফ্রিকা ইনিশিয়েটিভ’এর অধীনে পাকিস্তানের সমুদ্রবন্দরগুলি আফ্রিকার জন্যে মধ্য এশিয়ার দেশগুলি এবং চীনের পশ্চিমাঞ্চলের বাজার ধরার দরজা হতে পারে।

 
পাকিস্তানের পত্রিকা ‘দ্যা নিউজ’ বলছে যে, ২০১৭ সালের অগাস্টে পাকিস্তান মুসলিম লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় ‘লুক আফ্রিকা ইনিশিয়েটিভ’ নামে একটা পরিকল্পনা নেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এর উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের প্রধান বাণিজ্য সহযোগীদের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নতুন বাজার খোঁজা। পাকিস্তানের মোট বৈদেশিক বাণিজ্য যেখানে প্রায় ৮৮ বিলিয়ন ডলার, সেখানে আফ্রিকার সাথে বাণিজ্য মাত্র ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। একই নীতির অধীনে ২০১৯ সালে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা দেয় যে, পররাষ্ট্র দপ্তর ছয়টা নতুন বাণিজ্য সেকশন ইউরোপ থেকে আফ্রিকায় স্থানান্তরিত করছে। এই সেকশনগুলি উত্তর আফ্রিকার আলজেরিয়া ও সুদানে; পূর্ব আফ্রকার ইথিওপিয়া, সুদান ও তাঞ্জানিয়ায়; এবং পশ্চিম আফ্রিকার সেনেগালে স্থাপন করা হচ্ছে। একই চেষ্টার অংশ হিসেবে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে ‘পাকিস্তান আফ্রিকা ট্রেড ডেভেলপমেন্ট কনফারেন্স’ নামে একটা সন্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে আফ্রিকার মোট ২৬টা দেশের বাণিজ্য প্রতিনিধিরা অংশ নেয়। পাকিস্তানের ম্যারিটাইম এফেয়ার্স সচিব রিজওয়ান আহমেদ সন্মেলনে বলেন যে, পাকিস্তানের সমুদ্রবন্দরগুলি আফ্রিকার জন্যে মধ্য এশিয়ার দেশগুলির এবং চীনের পশ্চিমাঞ্চলের বাজার ধরার দরজা হতে পারে। পাকিস্তানি সচিবের কথাগুলি পাকিস্তানের কৌশলগত চিন্তাকেই প্রতিফলিত করে। পাকিস্তানের ‘লুক আফ্রিকা ইনিশিয়েটিভ’এর ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব আসলে কতটুকু?

পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দৈন্যতা

আফ্রিকার সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কোন্নয়নের কেন্দ্রে রয়েছে দেশটার অর্থনৈতিক দৈন্যদশা। পাকিস্তানের অর্থনীতি এশিয়া এবং পশ্চিমা দেশগুলির উপর বেশ নির্ভরশীল। দেশটার বাণিজ্য ঘাটতি যথেষ্ট। ২০১৮ সালের হিসেব অনুযায়ী পাকিস্তানের রপ্তানি যেখানে ছিল প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলার, সেখানে আমদানি ছিল ৬১ বিলিয়ন ডলারের উপর। প্রতিমাসে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির বিপরীতে আমদানি করতে হয় প্রায় সাড়ে ৩ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার। ‘পাকিস্তান ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিক্স’এর হিসেবে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে দেশটার মাসিক বাণিজ্য ঘাটতি গিয়ে দাঁড়ায় আড়াই বিলিয়ন ডলারের উপর। ২০০১ সালে মার্কিন নেতৃত্বে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ যোগ দিয়ে পাকিস্তানের অর্থনীতির মারাত্মক ক্ষতি হয়। রপ্তানি বাণিজ্যে স্থবিরতা আসে এবং আমদানি বাড়তে থাকায় খুব দ্রুত বাণিজ্য ঘাটতি বাড়তে থাকে। বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে ব্যাপকভাবে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে দেশটা। তবে ২০১০ সালের পর থেকে ঋণের বোঝা কিছুটা কমে আসে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের হিসেবে যেখানে ২০০১ সালে রাষ্ট্রীয় ঋণ গিয়ে দাঁড়ায় জিডিপির ৮৮ শতাংশে, সেখানে ২০১০ সালের দিকে তা ৬০ শতাংশে নেমে আসে। কিন্তু ২০১৬ সালের পর থেকে তা আবারও বাড়তে থাকে এবং ২০১৯ সালে তা জিডিপির প্রায় ৮৫ শতাংশ হয়ে যায়। ১৫ই জানুয়ারি ‘আইএমএফ’এর ৬ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্যাকেজের শর্ত হিসেবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ঘোষণা দেন যে, বিদ্যুতের ট্যারিফ প্রতি ইউনিটের জন্যে ১ রুপি ৯০ পয়সা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। ‘দ্যা নিউজ’ পত্রিকা বলছে যে, এই বৃদ্ধি ৩ রুপি ৩০ পয়সা বৃদ্ধি করার পরিকল্পনার প্রথম ধাপ মাত্র। এছাড়াও জানুয়ারির শেষে ‘এআরওয়াই নিউজ’এর এক খবরে পাকিস্তানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বলা হয় যে, পেট্রোলের মূল্য লিটারপ্রতি ২ রুপি ৭০ পয়সা বৃদ্ধি করে ১’শ ১১ রুপি ৯০ পয়সা এবং ডিজেলের মূল্য ২ রুপি ৮৮ পয়সা বৃদ্ধি করে ১’শ ১৬ রুপি ৭ পয়সা করা হয়েছে। ‘এশিয়া টাইমস’ বলছে যে, ২০১৮ সালে ক্ষমতার আসার পর থেকে ইমরান খানের সরকার প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার ঋণ যোগ করেছেন; যার মাঝে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি থেকে নেয়া সাড়ে ৫ বিলিয়ন; চীন থেকে নেয়া ৬ দশমিক ৭ বিলয়ন; এবং ‘আইএমএফ’ ও বিশ্বব্যাঙ্ক থেকে নেয়া ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় ‘আইএমএফ’এর কাছ থেকে ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেবার পরেও দেশটার মুদ্রাস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১১ শতাংশের উপর। পাকিস্তানি রুপির মূল্য এতটাই কমে গিয়েছে যে, ২০১০ সালের আগে ৫০ রুপিতে এক মার্কিন ডলার পাওয়া গেলেও বর্তমানে ১’শ ৬০ রুপি ব্যয় করতে হচ্ছে।

অর্থনৈতিক দৈন্যতা কাটিয়ে উঠতেই পাকিস্তান আফ্রিকার দিকে তাকাচ্ছে। গত ৭ই জানুয়ারি ইসলামাবাদে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশি আফ্রিকার ৮টা দেশের রাষ্ট্রদূতদের সাথে বৈঠক করেন। দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়া বাকি দেশগুলি ছিল উত্তর ও পূর্ব আফ্রিকার। মন্ত্রী আফ্রিকার সাথে কৃষি, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি এবং পর্যটন উন্নয়ন বিষয়ে সম্পর্কোন্নয়নে আগ্রহ প্রকাশ করেন। একইসাথে পাকিস্তান আফ্রিকার সাথে কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি করতে চায় বলে উল্লেখ করেন কোরেশি। এক সপ্তাহ আগে পাকিস্তান জিবুতিতে নতুন কূটনৈতিক মিশন চালু করার ঘোষণা দেয়; এবং আরও মিশন চালু করবে বলেও বলা হয়। ‘গালফ নিউজ’ বলছে যে এর কিছুদিন আগেই শাহ মাহমুদ কোরেশি আফ্রিকায় পাকিস্তানের ১৪টা কূটনৈতিক মিশনের প্রধানদের সাথে ভার্চুয়াল বৈঠক করেন। তিনি সেই বৈঠকে অর্থনৈতিক কূটনীতির উপর জোর দেন। ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনকে পুঁজি করে আফ্রিকার দেশগুলির সাথে সম্পর্কোন্নয়নের মাধ্যমে বাণিজ্য, অর্থের আদানপ্রদান, বিনিয়োগ, পর্যটন এবং প্রযুক্তি দেয়ানেয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াবার উপর জোর দেন। তবে আফ্রিকায় পাকিস্তানের সম্পর্কোন্নয়ন শুধুমাত্র বাণিজ্যের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়।

 
২০১৩ সাল। ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে পাকিস্তানি শান্তিরক্ষীদের মেডাল প্রদান করা হচ্ছে। শান্তিরক্ষী মিশনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আফ্রিকার দেশগুলিতে সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যাপারে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতে চাইছে পাকিস্তান।


নিরাপত্তা সহযোগিতা ও সামরিক প্রশিক্ষণ

অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার চিন্তা থেকে শুরু হলেও পাকিস্তান এই প্রচেষ্টাকে আরও এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছে; বিশেষ করে নিরাপত্তা বিষয়ে সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত করার চেষ্টা করেছে। জাতিসংঘের হিসেবে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে শান্তিরক্ষী মিশনে পাকিস্তানের মোট ৪ হাজার ৭’শ ৩৭ জন সেনা মোতায়েন রয়েছে; যার প্রায় সবাই রয়েছে আফ্রিকার মাটিতে। এর মাঝে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে রয়েছে প্রায় ১২’শ; ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে রয়েছে প্রায় ১৯’শ; দারফুরে রয়েছে প্রায় ১ হাজার; দক্ষিণ সুদানে রয়েছে প্রায় আড়াই’শ; মালিতে রয়েছে প্রায় দেড়’শ সেনা। আফ্রিকার অনেক দেশের সেনারা পাকিস্তানের সামরিক একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকে। দক্ষিণ আফ্রিকার সামরিক ম্যাগাজিন ‘ডিফেন্স ওয়েব’ বলছে যে, ২০১৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে পাকিস্তানের এমনই এক সামরিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি মোতাবেক দক্ষিণ আফ্রিকার সেনারা পাকিস্তানে এবং পাকিস্তানের সেনারা দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রশিক্ষণ নেয়। ২০১৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ৪০ জনের মতো সেনা পাকিস্তানে সন্ত্রাসবিরোধী প্রশিক্ষণে অংশ নেয়। এছাড়াও উভয় দেশের সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ নেতৃবৃন্দ পারস্পরিক সফর বিনিময় করেছেন নিয়মিতই। পাকিস্তান নৌবাহিনীর জাহাজও নিয়মিত বিরতিতে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যাচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়াও আফ্রিকার অন্যান্য দেশও পাকিস্তানের দিকে তাকাচ্ছে প্রশিক্ষণের জন্যে। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সেনেগালের প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল পাকিস্তান সফরের সময় পাকিস্তানের সাথে বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যাপারে সমঝোতা করেন। ২০১৯ সালের জুলাইএ পাকিস্তান নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল জাফর মাহমুদ আব্বাসির পূর্ব আফ্রিকার দেশ কেনিয়া সফরের সময় কেনিয়া সরকার পাকিস্তানের সাথে সামরিক প্রশিক্ষণ এবং সহযোগিতা বৃদ্ধি করার আগ্রহ ব্যাক্ত করে।

তুর্কি মিডিয়া ‘টিআরটি ওয়ার্ল্ড’এর এক লেখায় ‘রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউট’এর ভিজিটিং ফেলো কামাল আলম বলছেন যে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এখন তার আন্তর্জাতিক অবস্থানকে বেশ শক্তিশালী করেছে। দুনিয়ার তিন ডজন দেশ তাদের সেনাদের পাকিস্তানে প্রশিক্ষণের জন্যে পাঠাচ্ছে। এর প্রধান কারণ হলো আগের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও অর্থনৈতিক সহায়তার উপর নির্ভরশীলতা কমেছে পাকিস্তানের। অন্যদিকে আফগানিস্তানে বহুদিন ধরে যুদ্ধ করার কারণে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞতাকে অনেক দেশই গুরুত্ব সহকারে দেখছে এবং পাকিস্তানিদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিতে চাইছে। এছাড়াও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে লম্বা সময় পাকিস্তানিরা শান্তিরক্ষী হিসেবে কাজ করার কারণে পাকিস্তানের সামরিক একাডেমিগুলিকে শান্তিরক্ষী প্রশিক্ষণের জন্যে প্রধান কেন্দ্র হিসবে দেখছে অনেক দেশ।

 
নভেম্বর ২০২০। নাইজেরিয়ার জন্যে তৈরি করা ‘জেএফ ১৭’ ফাইটার বিমান। নাইজেরিয়ায় পাকিস্তানের সামরিক সরঞ্জামের রপ্তানি বাড়ছে, তথাপি বাকি আফ্রিকায় পাকিস্তানের অস্ত্র বাণিজ্য এখনও উল্লেখ করার মতো নয়।


আফ্রিকার অস্ত্রের বাজারে পাকিস্তান

বহুদিন ভারতের সাথে সামরিক প্রতিযোগিতার কারণে পাকিস্তান তার সামরিক শিল্পকে গড়ে তুলেছে। এখন সেই শিল্পকে ব্যবহার করেই পাকিস্তান বৈদেশিক মুদ্র অর্জন করা ছাড়াও অন্তর্জাতিকভাবে বন্ধু তৈরি করতে চাইছে। ২০১৬ সালে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়া পাকিস্তান থেকে ১০টা ‘সুপার মুশশাক’ প্রশিক্ষণ বিমান কেনার চুক্তি করে। এরপর ২০১৯ সালে নাইজেরিয়া ১’শ ৮৪ মিলিয়ন ডলারে পাকিস্তানের কাছ থেকে ৩টা ‘জেএফ ১৭’ ফাইটার বিমান এবং বিমানগুলির জন্যে বিভিন্ন অস্ত্র কেনার চুক্তি করে। ‘ডিফেন্স ওয়ার্ল্ড’ বলছে যে, নাইজেরিয়া ইতোমধ্যেই পাকিস্তান থেকে আরও ‘জেএফ ১৭’ বিমান কেনার জন্যে আলোচনা চালাচ্ছে। তবে আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়াতে সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি করার ব্যাপারটাকে ভারত ভালো চোখে দেখেনি। ভারতের ‘ইকনমিক টাইমস’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, চীনের সহায়তায় পাকিস্তান ভারতের সামরিক সরঞ্জামের বাজারকে টার্গেট করে এগুচ্ছে।

 
জানুয়ারি ২০২০। ভারত মহাসাগরের সেইশেল দ্বীপপুঞ্জে পাকিস্তানের নৌবাহিনীর জাহাজ। সফরকালে জাহাজগুলি আফ্রিকার উপকূলে বিভিন্ন স্থানে শুভেচ্ছা সফর সফর ছাড়াও সাধারণ জনগণের জন্যে মেডিক্যাল ক্যাম্পের আয়োজন করে। সেসব দেশের জনগণের সাথে একটা সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টাতেই এক সফরের আয়োজন করে পাকিস্তান নৌবাহিনী। তবে পাকিস্তানের কৌশলগত চিন্তায় এখনও পূর্ব আফ্রিকার উপকূলই প্রাধান্য পাচ্ছে।


নৌ কূটনীতি

‘গালফ নিউজ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ১৮ই জানুয়ারি পাকিস্তান নৌবাহিনীর সাপ্লাই জাহাজ ‘নাসর’ ত্রাণসামগ্রী নিয়ে আফ্রিকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছে। নৌবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, জাহাজটা বন্যা ও খরায় আক্রান্ত মানুষকে সহায়তা দিতে পূর্ব আফ্রিকার জিবুতি ও সুদান এবং পশ্চিম আফ্রিকার নিজের যাবে। এছাড়াও জাহাজটা কেনিয়ার মোম্বাসা বন্ধর সফর করবে। এর আগে ২০১৯এর নভেম্বর থেকে ২০২০এর জানুয়ারি পর্যন্ত পাকিস্তান নৌবাহিনীর ফ্রিগেট ‘আসলাত’ এবং সাপ্লাই জাহাজ ‘মোয়াউইন’ পুরো আফ্রিকা প্রদক্ষিণ করে। সফরকালে জাহাজগুলি মরক্কো, মৌরিতানিয়া, ঘানা, নাইজেরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, মোজাম্বিক, তাঞ্জানিয়া, কেনিয়া ও সেইশেল দ্বীপপুঞ্জ ভ্রমণ করে। সফরকালে জাহাজগুলি বিভিন্ন স্থানে শুভেচ্ছা সফর ছাড়াও সাধারণ জনগণের জন্যে মেডিক্যাল ক্যাম্পের আয়োজন করে। সেসব দেশের জনগণের সাথে একটা সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টাতেই এই সফরের আয়োজন করে পাকিস্তান নৌবাহিনী।

চীনা সরকারি মিডিয়া ‘গ্লোবাল টাইমস’এর সাথে এক সাক্ষাতে পাকিস্তান নৌবাহিনীর প্রধান এডমিরাল আমজাদ খান নিয়াজি পাকিস্তান নৌবাহিনীর আফ্রিকা প্রদক্ষিণের মিশনকে তুলে ধরেন। তিনি বলেন যে, এই মিশন ছিল পাকিস্তান সরকারের ‘এনগেজ আফ্রিকা’ নীতির অংশ। সরকারের আফ্রিকা নীতি যে নৌবাহিনীর প্রধান মিশনগুলির মাঝে পড়ছে না, তা ২০১৮এর ডিসেম্বরে প্রকাশ করা পাকিস্তানের ‘ম্যারিটাইম ডকট্রাইন’ থেকেই বোঝা যায়। প্রথমবারের মতো প্রকাশ করা এই নীতিতে আফ্রিকার উল্লেখ নেই বললেই চলে। এই নীতির বর্ণনা দিতে গিয়ে নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কমান্ডার মুহাম্মদ আজম খান ‘গ্লোবাল ভিলেজ স্পেস’এর এক লেখায় শুধুমাত্র পূর্ব আফ্রিকার উপকূলের কথাই উল্লেখ করেন।

পাকিস্তানের চিন্তা এখনও পূর্ব আফ্রিকা নিয়ে

২০১৯এর জুলাইএ পাকিস্তানের থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইন্সটিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ ইসলামাবাদ’এর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ভারত মহাসাগরে ভারতের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আফ্রিকায় পাকিস্তানের রপ্তানি বৃদ্ধি করার উপর জোর দেয়া হয়। তবে প্রতিবেদনে বলা হয় যে, আফ্রিকায় ভারতের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে যতটা শক্তিশালী নৌবাহিনীর প্রয়োজন, পাকিস্তানের পক্ষে তা তৈরি করা কষ্টকর। এছাড়াও আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের কেনিয়া এবং তাঞ্জানিয়ার উপকূলীয় শহরগুলিতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত জনগণের বসবাস থাকায় সেখানে ভারতের প্রভাব তৈরি করাটা সহজ হয়েছে। সেখানে ভারতীয় পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকাটা পাকিস্তানের পণ্যের জন্যে বেশ কঠিন হবে। তবে বলাই বাহুল্য যে, প্রতিবেদনে মূলতঃ ভারত মহাসাগরের তীরবর্তী পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলিকে নিয়েই কথা বলা হয়েছে। পাকিস্তানের কৌশলগত চিন্তায় এখনও পূর্ব আফ্রিকার উপকূলই প্রাধান্য পাচ্ছে। পূর্ব আফ্রিকার কেনিয়ার বাইরে দক্ষিণ আফ্রিকা, মরক্কো, নাইজেরিয়া এবং মিশর আফ্রিকায় পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য সহযোগী। ‘অবজারভেটরি অব ইকনমিক কমপ্লেক্সিটি’র হিসেবে পুরো আফ্রিকা থেকে পাকিস্তান যে ৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য কেনে, তার ৮৪ শতাংশই এই পাঁচ দেশ থেকে আসে; যদিও আফ্রিকার ১৪টা দেশে পাকিস্তানের কূটনৈতিক মিশন রয়েছে। আফ্রিকায় পাকিস্তানের মোট ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির ৪৬ শতাংশই যায় পূর্ব আফ্রিকার ৭টা দেশে।

নতুন নৌশক্তির উদ্দেশ্য কি?

১৯৯০এর দশক পর্যন্ত পাকিস্তানের নৌবাহিনীর মূল সমুদ্রগামী জাহাজ বলতে ছিল ১৯৭০এর দশকে ব্রিটেনে তৈরি ৬টা ‘টাইপ ২১’ ফ্রিগেট এবং ১৯৮০এর দশকে চীন থেকে ক্রয় করা ১৫ হাজার টনের সাপ্লাই জাহাজ ‘নাসর’। ২০০৪ সাল থেকে চীনের সহায়তায় ‘জুলফিকার ক্লাস’এর ৪টা ফ্রিগেট তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০১৩ সালের মাঝে এই ফ্রিগেটগুলি পাকিস্তানের হাতে আসে। প্রায় একই সময়ে ২০১০ সালে মার্কিন নৌবাহিনীর ‘অলিভার পেরি ক্লাস’এর পুরোনো একটা ফ্রিগেট পায় পাকিস্তান। ২০১৩ সালে তুরস্কের কোম্পানি ‘এসটিএম’এর সহায়তায় ১৭ হাজার টনের একটা সাপ্লাই জাহাজ তৈরি করা শুরু করে পাকিস্তান। ২০১৮ সালে ‘মোয়াউইন’ নামের এই জাহাজটা কমিশনিং করা হয়। ২০১৭ সালে হল্যান্ডের ‘ডামেন’ শিপইয়ার্ড থেকে ‘ইয়ারমুক ক্লাস’এর ২টা কর্ভেট অর্ডার করে পাকিস্তান। ২০২০এ এগুলি কমিশনিং করা হয়। ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে চীন থেকে ৪টা ‘টাইপ ০৫৪ এপি ক্লাস’এর ফ্রিগেট অর্ডার করে পাকিস্তান। ২০২১ সালের মাঝেই সবগুলি জাহাজের কাজ শেষ হবার কথা রয়েছে। ২০১৮ সালে পাকিস্তান তুরস্কের কাছ থেকে ‘মিলজেম ক্লাস’এর ৪টা কর্ভেট অর্ডার করে। ২০১৯ থেকে এগুলির কাজ শুরু হয়ে ২০২৪এর মাঝে শেষ হবার কথা রয়েছে। নৌবাহিনীর জাহাজ ক্রয়ের এই প্রক্রিয়ার ফলাফলস্বরূপ ১৯৯০এর দশকে পাকিস্তান নৌবাহিনীর সমুদ্রগামী জাহাজ যেখানে ছিল ৬টা ফ্রিগেট ও ১টা সাপ্লাই জাহাজ, সেখানে ২০২০ সাল নাগাদ তা দাঁড়ায় ৮টা ফ্রিগেট, ২টা কর্ভেট, ২টা সাপ্লাই জাহাজে। এক দশকের মাঝে পাকিস্তান নৌবাহিনীর দূরদেশের বন্দরে পাঠাবার মতো জাহাজের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। আরও ৪টা ফ্রিগেট ও ৪টা কর্ভেট বর্তমানে তৈরি হচ্ছে; যেগুলি বছর পাঁচেকের মাঝেই সার্ভিসে আসবে। তখন সমুদ্রগামী জাহাজের সংখ্যা আরও বাড়বে।

গত বেশ কয়েক দশক ধরেই পাকিস্তান নৌবাহিনীর মূল শক্তি সাবমেরিন। কিছুদিন আগ পর্যন্তও পাকিস্তান নৌবাহিনীর মূল শক্তি ছিল ৫টা সাবমেরিন। সমুদ্রগামী জাহাজ পাকিস্তানের শক্তিশালী হস্ত ছিল না কখনোই। সামরিক বাজেটের প্রায় সবটাই গিয়েছে সেনা এবং বিমান বাহিনীর কাছে। কারণ মূল উদ্দেশ্যই ছিল ভারতের সাথে স্থলসীমানা রক্ষা। পাকিস্তানের জনগণের কাছে নৌবাহিনীর গুরুত্ব কখনোই খুব বেশি ছিল না। ‘গ্লোবাল ভিলেজ স্পেস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, পাকিস্তানের বেশিরভাগ মানুষ এখনও নিজ চোখে সমুদ্র দেখেনি। তাই দেশটাকে ‘ম্যারিটাইম নেশন’ হিসেবে তৈরি করতে এখনও বেশ কষ্ট করতে হচ্ছে।

 
সেপ্টেম্বর ২০১৯। তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান পাকিস্তান নৌবাহিনীর জন্যে ‘মিলজেম ক্লাস’ কর্ভেট তৈরি উদ্ভোধন করছেন। ভারতের প্রভাবকে ব্যালান্স করে আফ্রিকার মাটিতে নিজের অবস্থান শক্ত করতে চীন এবং তুরস্কের মতো দেশগুলির সহায়তা চাইবে পাকিস্তান।

আফ্রিকায় পাকিস্তানের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কি?

আফ্রিকায় পাকিস্তানের কূটনৈতিক কর্মকান্ডের কেন্দ্রে অর্থনীতি থাকলেও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কাশ্মিরকে সবসময়ই আলোচনার বিষয়বস্তু করেছে পাকিস্তান। কাশ্মির ইস্যুতে ভারতের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক সমর্থন আদায়ের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে পাকিস্তান। ২০১৯ সালের নভেম্বরে পাকিস্তান নৌবাহিনীর দু’টা জাহাজ পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মৌরিতানিয়া ভ্রমণ করে। ‘দ্যা নিউজ’ বলছে যে, সেই ভ্রমণে পাকিস্তান নৌবাহিনীর কমান্ডার মৌরিতানিয়ার প্রতিনিধিদের সাথে কাশ্মিরে ভারতের আগ্রাসী কর্মকান্ড এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে কথা বলেন। ‘দ্যা ফ্রন্টিয়ার পোস্ট’ বলছে যে, এই জাহাজগুলি পরবর্তী জানুয়ারি মাসে যখন তাঞ্জানিয়া সফর করে, তখনও পাকিস্তানি কমান্ডার কাশ্মির ইস্যু নিয়ে কথা বলেন। পাকিস্তানের ‘ডন’ পত্রিকা বলছে যে, ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে কেনিয়ার নৌবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল লেভি ফ্রাঙ্কলিন মাঘালু যখন পাকিস্তান সফর করেন, তখন পাকিস্তান নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল জাফর মাহমুদ আব্বাসি কাশ্মির ইস্যুকে তুলে ধরেন এবং সেখানে ভারতের ‘আর্টিকেল ৩৭০’ বাতিল করার পর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলি নিয়ে কথা বলেন। তবে এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পাকিস্তানের জন্যে বা কাশ্মিরের জন্যে কতটুকু সুবিধা এনে দিয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। ২০১৯ সালের অগাস্টে কাশ্মির ইস্যু নিয়ে ব্যাপক উত্তেজনার মুহুর্তে দক্ষিণ আফ্রিকা নিরপেক্ষ থেকেই দুই দেশকে আলোচনার পথ অনুসরণ করতে বলেছে। ভারতের সাথে দক্ষিণ আফ্রিকার বাণিজ্য প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। স্বাভাবিকভাবেই কাশ্মিরে ভারতীয় বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা শক্ত কোন বিবৃতি দেয়া থেকে বিরত থাকে।

আফ্রিকায় পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ কি?

পাকিস্তানের ‘লুক আফ্রিকা’ বা ‘এনগেজ আফ্রিকা’ নীতি মূলতঃ দেশটার অর্থনৈতিক দৈন্যতা থেকে মুক্তি পাবার একটা প্রচেষ্টা। এখানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এখনও কাশ্মিরের পক্ষে ফাঁপা জনসমর্থন আদায়ের মাঝেই সীমিত। আফ্রিকার সাথে ভারতের বাৎসরিক বাণিজ্য ৬২ বিলিয়ন ডলারের উপরে; যার ধারেকাছেও নেই পাকিস্তান। তাই আফ্রিকায় পাকিস্তানের প্রভাব এখনও উল্লেখ করার মতো নয়। তবে পাকিস্তান তার নামকরা ইন্টেলিজেন্সের কারণে আফ্রিকায় নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করার একটা জোর প্রচেষ্টা চালাতে পারে। পাকিস্তানের চিন্তাবিদেরা ভারত মহাসাগরে ভারতের প্রভাব কমাবার কৌশল হিসেবে আফ্রিকায় বাণিজ্য বৃদ্ধির কথা বললেও তা মূলতঃ পূর্ব আফ্রিকাতেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। যদিও পশ্চিম আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়ায় পাকিস্তানের সামরিক সরঞ্জামের রপ্তানি বাড়ছে, তথাপি বাকি আফ্রিকায় পাকিস্তানের অস্ত্র বাণিজ্য এখনও উল্লেখ করার মতো নয়। ভারতকে মোকাবিলার জন্যে তৈরি করা অস্ত্রগুলি আফ্রিকার দেশগুলির জন্যে সকল ক্ষেত্রে উপযোগী নয়। তারপরেও ভারতীয় চিন্তাবিদেরা আফ্রিকায় পাকিস্তানের অস্ত্র বিক্রির ব্যাপারে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। পাকিস্তানের নৌবাহিনী আফ্রিকা প্রদক্ষিণ করে আসলেও আফ্রিকা নিয়ে পাকিস্তানের চিন্তা এখনও যথেষ্টই সংকীর্ণ। আফ্রিকার উপকূলে ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রভাবের তুলনায় তা এখনও উল্লেখ করার মতো কিছু নয়।

তথাপি পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি কমার সাথেসাথে পাকিস্তানের মতো দেশের প্রভাব তৈরি করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আফ্রিকায় পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে অংশ নেবার ফলে আফ্রিকার দেশগুলির সাথে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর একটা নির্ভরতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, যা পাকিস্তান এখন ব্যবহার করতে চাইছে। ভারতের প্রভাবকে ব্যালান্স করে আফ্রিকার মাটিতে নিজের অবস্থান শক্ত করতে চীন এবং তুরস্কের মতো দেশগুলির সহায়তা চাইবে পাকিস্তান। রূঢ় অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে আফ্রিকা নীতিকে হাল্কা করে দেখাটা পাকিস্তানের পক্ষে সম্ভব নয়। দেশের বেশিরভাগ মানুষ এখনও সমুদ্র না দেখলেও একটা শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ার দিকে এগুচ্ছে পাকিস্তান, যা কিনা পাকিস্তানের জন্মের পর সাত দশকে প্রথমবারের মতো দেশটার দৃষ্টিকে ভারত এবং আফগানিস্তানের স্থলসীমানা থেকে মহাসাগরের দিকে নিয়ে যাবে। আফ্রিকার সাথে বাণিজ্য বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জই পাকিস্তানকে এই কঠিন লক্ষ্য বাস্তবায়নের দিকে নিয়ে যাবে। আর এতে আফ্রিকার মাটিতে পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থার ফলাফল হিসেবে নতুন ভূরাজনৈতিক খেলায় পাকিস্তানও যোগ হবে। আফ্রিকার প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তিরা পাকিস্তানের প্রভাব বিস্তারকে কিভাবে দেখবে, সেটাও হবে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।

Saturday, 12 September 2020

পশ্চিম আফ্রিকার মালির অভ্যুত্থান... ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় প্রভাব হারাচ্ছে ফ্রান্স

১৩ই সেপ্টেম্বর ২০২০

‘ফ্রাঙ্কোফোন’ প্রাক্তন ফরাসী উপনিবেশ মালির রাজনৈতিক সমস্যায় ‘এংলোফোন’ প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশ নাইজেরিয়ার ভূমিকা অত্র অঞ্চলের ভূরাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করছে। মালির অভ্যুত্থান নেতারা কতদিন ক্ষমতায় থাকবেন, তা নির্ধারণে ‘এংলোফোন’ নাইজেরিয়ার অবস্থানই যখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তখন পশ্চিম আফ্রিকায় ফ্রান্সের শক্তি খর্ব হবার ইঙ্গিতই পাওয়া যায়।

১৮ই অগাস্ট পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চলছে। ১১ই সেপ্টেম্বর মালির সামরিক সরকারের নিযুক্ত ২০ সদস্যের এক বিশেষজ্ঞ কমিটি নতুন এক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রস্তাব করে, যার মেয়াদ হবে দুই বছর; প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত করবে সেনাবাহিনী। আর প্রেসিডেন্ট নিজে সেনাবাহিনীর প্রস্তাব করা প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেবেন। এই প্রস্তাবে প্রেসিডেন্টকে সামরিক বা বেসামরিক ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মালির বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বেসামরিক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন ইউনিয়ন এবং গ্রুপের কয়েক’শ সদস্যকে সেনাবাহিনী রাজধানী বামাকোতে তিনদিনের এক আলোচনায় ডাকে। এই আলোচনার দ্বিতীয় দিনের মাথায় এক চার্টারে বলা হয় যে, মালির সমস্যার গভীরতার কথা চিন্তা করেই দুই বছরের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। পশ্চিম আফ্রিকার আঞ্চলিক জোট ‘ইকনমিক কমিউনিটি অব ওয়েস্ট আফ্রিকান স্টেটস’ বা ‘একোওয়াস’ মালির সেনাবাহিনীকে ১৭ই সেপ্টেম্বরের মাঝে একজন প্রেসিডেন্ট এবং একজন প্রধানমন্ত্রীর নাম প্রকাশ করার জন্যে সময় বেঁধে দেয়। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, বামাকোর আলোচনায় যারা অংশ নিয়েছেন, তারা দু’টা ব্যাপারে বেশ বিভক্ত। প্রথমতঃ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ কতদিন হবে; আর দ্বিতীয়তঃ সেনাবাহিনীর ভূমিকাই বা এক্ষেত্রে কি হবে। সেনাবাহিনী প্রথমে প্রস্তাব করেছিল যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ হবে তিন বছর। অর্থাৎ সেনাবাহিনী হয়তো তাদের আগের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসেছে। তবে সরকারের নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তারা কোন ছাড় যে দেয়নি তা মোটামুটিভাবে পরিষ্কার। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পুরো পশ্চিম আফ্রিকার উপর মালির রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রভাব কতটুকু হবে, সেটাই হবে ভূরাজনৈতিকভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

মালির সেনাবাহিনীর একাংশ এমন একটা সময়ে ক্ষমতা দখল করে, যখন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম বুবাকার কেইতার বিরুদ্ধে এক মাস ধরে রাস্তায় ব্যাপক বিক্ষোভ চলছিল। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা অভিযোগ আনা হয়েছিল। মালির উত্তরাংশে ২০১২ সাল থেকে গৃহযুদ্ধ চলছে; এবং এই সংঘাত ইতোমধ্যেই পার্শ্ববর্তী দেশ নিজের, বুরকিনা ফাসো এবং আইভোরি কোস্টে ছড়িয়ে পড়েছে। এভাবে পুরো অঞ্চল অস্থির হওয়া ছাড়াও মারাত্মক মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে। মালির এই রাজনৈতিক সমস্যা অত্র অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করবে, এই যুক্তিতেই অঞ্চলিক জোট মালির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছে।

মালিতে মাসব্যাপী সহিংস বিক্ষোভের মাঝেই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নটা আলোচনায় আসতে থাকে। বিরোধী ‘জুন ফাইভ মুভমেন্ট’ এই বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেয়। সমস্যা সমাধানে ‘একোওয়াস’এর একটা প্রতিনিধিদল জুলাইএর মাঝামাঝি মালি রওয়ানা দেয়। নাইজেরিয়ার পত্রিকা ‘প্রিমিয়াম টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে ‘একোওয়াস’এর কমিশন প্রেসিডেন্ট জঁ ক্লদ কাসি ব্রুএর স্বাক্ষরিত এক চিঠির বরাত দিয়ে বলা হয় যে, নাইজেরিয়ার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট গুডলাক জনাথনকে এই মিশনের বিশেষ প্রতিনিধি নিয়োগ করা হয়েছে। জনাথন তার মিশনের মাধ্যমে একটা জাতীয় ঐক্যের সরকার প্রস্তাব করেন, যেখানে বিরোধী দল এবং বেসামরিক ব্যক্তিত্বরাও থাকবেন। তবে জনাথনের প্রস্তাবে ‘জুন ফাইভ মুভমেন্ট’ রাজি হয়নি। জনাথনের ব্যর্থতার পর ‘একোওয়াস’এর পাঁচটা দেশ নাইজেরিয়া, ঘানা, আইভোরি কোস্ট, নিজের এবং সেনেগালের প্রেসিডেন্টরা মালিতে গিয়ে উপস্থিত। কিন্তু প্রেসিডেন্ট কেইতা যেমন ক্ষমতা ছাড়তে ছিলেন নারাজ, তেমনি বিরোধী গ্রুপের নেতা ইব্রাহিম ডিকোও ছিলেন নিজের অবস্থানে অটল। ‘একোওয়াস’এর এই প্রচেষ্টাও হয় ব্যর্থ।

মালির সমস্যার পিছনে শক্তিশালী দেশগুলির বড় ভূমিকা রয়েছে। মালির গৃহযুদ্ধে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে দেশটার প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শাসক ফ্রান্স। মালিতে ফ্রান্সের ৫ হাজারের বেশি সেনা রয়েছে। অপরদিকে দেশটার রাজনৈতিক সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে আঞ্চলিক সংগঠন ‘একোওয়াস’। এই সংস্থার ১৫টা সদস্য রাষ্ট্রের মাঝে ৮টা দেশই ছিল ফ্রান্সের উপনিবেশ; যেগুলির রাষ্ট্রীয় ভাষা ফরাসী; এগুলিকে বলা হয় ‘ফ্রাঙ্কোফোন’ দেশ। চারটা ব্রিটেনের উপনিবেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা একটা রাষ্ট্রের অফিশিয়াল ভাষা ইংরেজি; এগুলিকে বলা হয় ‘এংলোফোন’ দেশ। বাকি দু’টা দেশ পর্তুগালের উপনিবেশ হওয়ায় তাদের অফিশিয়াল ভাষা পুর্তুগীজ। তবে জনসংখ্যার দিক থেকে ‘একোওয়াস’এর প্রায় ৩৫ কোটি জনগণের মাঝে ইংরেজি ভাষাভাষি দেশগুলির জনসংখ্যা প্রায় ২৪ কোটি। এর মাঝে আবার এক নাইজেরিয়ার জনসংখ্যাই প্রায় ২০ কোটি। অর্থনীতির আকারের দিক থেকেও পুরো অঞ্চলে নাইজেরিয়ার ধারেকাছেও কোন দেশ নেই। ‘একোওয়াস’এর মোট প্রায় ৬’শ ৭৫ বিলিয়ন ডলারের জিডিপির মাঝে নাইজেরিয়ার একার জিডিপিই প্রায় ৫’শ বিলিয়ন ডলার। ‘একোওয়াস’এর মাঝে প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশ নাইজেরিয়ার অবস্থান অতি শক্তিশালী হওয়ার কারণে সংস্থার উপর ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণ খুবই কম এবং ফ্রান্স ‘একোওয়াস’এর ব্যাপারে সর্বদাই সন্দেহ প্রকাশ করেছে। ‘একোওয়াস’এর মাধ্যমে পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে নাইজেরিয়ার নেতৃত্ব নেয়াকে ফ্রান্স তার প্রাক্তন উপনিবেশগুলির উপর ‘এংলোফোন’ প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশগুলির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হিসেবেই দেখেছে।

‘মিডল ইস্ট মনিটর’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, পশ্চিম আফ্রিকার মূল সমস্যা হলো ফ্রান্স। যতদিন ফ্রান্স আফ্রিকার দেশগুলির উপর থেকে তার নিয়ন্ত্রণ না সরিয়ে নেবে, ততদিন আফ্রিকার সমস্যাগুলির সমাধান হবে না। এই মন্তব্যের সাথে মিল পাওয়া যাবে আফ্রিকার দেশগুলির মুদ্রার দিকে তাকালেই। পশ্চিম আফ্রিকার ৮টা এবং মধ্য আফ্রিকার ৬টা দেশের মুদ্রা ‘সিএফএ ফ্রাঙ্ক’, যা ফরাসী মুদ্রা ফ্রাঙ্কের সাথে যুক্ত; যেকারণে এই দেশগুলির অর্থনীতি বহুলাংশেই ফ্রান্সের উপর নির্ভরশীল। নাইজেরিয়ার নেতৃত্বে ‘একোওয়াস’এর চাপের মুখে ২০১৯এর শেষের দিকে পশ্চিম আফ্রিকার ৮টা ফরাসী ভাষাভাষী দেশ ২০২০ সাল থেকে ‘সিএফএ ফ্রাঙ্ক’ থেকে বের হয়ে যাবার ঘোষণা দেয়। তবে ফ্রান্স এর মাধ্যমে তার আঞ্চলিক অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ হারাবার পরিস্থিতিই দেখছে। ফরাসী নেতৃত্বে দীর্ঘ আট বছর ধরে মালির যুদ্ধ চলতে থাকার ফলে অত্র অঞ্চলে ফ্রান্সের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ‘ফ্রাঙ্কোফোন’ প্রাক্তন ফরাসী উপনিবেশ মালির রাজনৈতিক সমস্যায় ‘এংলোফোন’ প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশ নাইজেরিয়ার ভূমিকা অত্র অঞ্চলের ভূরাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করছে। মালির অভ্যুত্থান নেতারা কতদিন ক্ষমতায় থাকবেন, তা নির্ধারণে ‘এংলোফোন’ নাইজেরিয়ার অবস্থানই যখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তখন পশ্চিম আফ্রিকায় ফ্রান্সের শক্তি খর্ব হবার ইঙ্গিতই পাওয়া যায়।