১৭ই জুন ২০২৩
গত ১৪ই জুন আফ্রিকার সবচাইতে বড় জনসংখ্যা এবং অর্থনীতির দেশ নাইজেরিয়ার সরকার দেশের জাতীয় মুদ্রা নাইয়ারা-র উপর থেকে সকল নিয়ন্ত্রণ তুলে নিয়ে সেটাকে বাজারের উপরে ছেড়ে দেয়। এর ফলশ্রুতিতে একদিনের মাঝে ডলারের বিপরীতে নাইয়ারা-র মূল্য প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে গিয়ে ইতিহাসের সর্বনিম্ন ডলারপ্রতি ৭’শ ৫৫তে গিয়ে দাঁড়ায়। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন যে, এতে দেশের জনগণের উপর স্বল্পমেয়াদে কষ্ট বয়ে নিয়ে আসলেও দীর্ঘমেয়াদে তা নাইজেরিয়ার জন্যে ভালো হবে। নাইজেরিয়ার জাতীয় মুদ্রার মূল্য এতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করতো। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমদানি করা দ্রব্যের জন্যে ডলারের বিপরীতে মুদ্রার মূল্য অপেক্ষাকৃত উচ্চতর রেখেছিল; যাতে করে আমদানি করা দ্রব্য সাধারণ মানুষের ক্রমক্ষমতার মাঝে থাকে। নাইজেরিয়া আমদানি করা গমের উপরে যথেষ্ট নির্ভরশীল; যা ডলারের বিনিময়ে আমদানি করা হয়।
পশ্চিমা সংস্থাগুলি বলছে যে, নতুন নীতির ফলে নাইজেরিয়ায় বিনিয়োগ বাড়বে এবং অর্থনীতিকে শক্ত ভিতের উপরে প্রতিষ্ঠা করবে। সাম্প্রতিক সময়ে নাইজেরিয়া ব্যাপক মূল্যস্ফীতি এবং মারাত্মক বেকারত্ব সমস্যার মাঝ দিয়ে যাচ্ছে। ‘আফ্রিকা নিউজ’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে আন্তর্জাতিক কনসালট্যান্সি কোম্পানি ‘প্রাইস ওয়াটারহাউজ কুপার্স’ বা ‘পিডব্লিউসি’র নাইজেরিয়া অফিসের বিশ্লেষক তাইয়ো ওইয়েদেলে বলছেন যে, ডলারের বিপরীতে ভিন্ন ভিন্ন বিনিময় হার রাখার ফলে এতকাল বাজারে সকল ব্যবসায়ীদের জন্যে একরকম অধিকার নিশ্চিত হয়নি। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা অফিশিয়াল বিনিময় হারে ডলার বিক্রি করতে বাধ্য থাকতো; এবং একইসাথে দেশের বাইরে থেকে ডলার বিনিয়োগ আনতে পারছিলো না। মারাত্মক ডলার সংকটের ফলে নাইজেরিয়ায় ব্যবসা করা বিদেশী কোম্পানিগুলি তাদের আয় করা অর্থ দেশের বাইরে নিতে পারছিলো না। শুধুমাত্র বিদেশী এয়ারলাইন্সগুলিই সাড়ে ৪’শ মিলিয়ন ডলারের আয় নাইজেরিয়ার বাইরে নিয়ে যেতে পারছে না। একারণেই নাইজেরিয়াতে বিদেশী বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
নাইজেরিয়ার নতুন মুদ্রানীতিকে স্বাগত জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ‘আইএমএফ’। ১৬ই জুন ‘আইএমএফ’এর এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, বহুদিন ধরে নাইজেরিয়ার মুদ্রা ব্যবস্থার ব্যাপারে ‘আইএমএফ’এর যে উপদেশ ছিল, সেটার বাস্তবায়নের কারণে সংস্থাটা দেশের সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছে এবং এই নীতি বাস্তবায়নে সরকারকে সহায়তা দেবে ‘আইএমএফ’। নাইজেরিয়ার এনজিও ‘সেন্টার ফর দ্যা প্রোমোশন অব প্রাইভেট এন্টারপ্রাইজেস’ বা ‘সিপিপিই’এর প্রতিষ্ঠাতা মুদা ইউসুফ এক বিবৃতিতে এই নীতির সমর্থন জানিয়ে বলেন যে, এতে বিনিয়োগ, পুঁজি এবং কর্মসংস্থান বাড়বে এবং ব্যবসা-বান্ধব পরিস্থিতি তৈরি হবে।
প্রেসিডেন্ট বোলা তিনুবু সর্বদাই ছিলেন ব্যবসা-বান্ধব একজন রাজনীতিবিদ। ‘বাজ নাইজেরিয়া’ বলছে যে, ১৯৫২ সালে লেগোসের বড় ব্যবসায়ী পরিবারে জন্ম নেয়া এই রাজনীতিবিদ ১৯৭৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান পড়াশোনার জন্যে। সেখানে স্কুল শেষ করে ১৯৭৯ সালে হিসাবরক্ষণে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি নেন। পাস করে বিভিন্ন মার্কিন কোম্পানিতে কাজ করে ১৯৮৩ সালে দেশে ফিরে আসেন এবং আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি ‘মোবিল’এ কাজ শুরু করেন। ১৯৯১ সালে চাকুরি ছেড়ে দিয়ে ৪০ বছর বয়সে তিনি তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। লেগোস রাজ্যের গভর্নর ছাড়াও তিনি সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এবছরের পহেলা মার্চ তিনুবু প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২৯শে মে প্রেসিডেন্ট হবার পর তার স্বাগত বক্তব্যে তিনুবু ঘোষণা দেন যে, তিনি দেশটার মুদ্রা বিনিময় হারকে বাজারের উপরে ছেড়ে দেবেন।
এর ঠিক দুই দিন আগে ‘বিজনেস ইনসাইডার আফ্রিকার’ এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, নাইজেরিয়াতে ‘আইএমএফ’এর প্রতিনিধি আরি আইসেন এক ভার্চুয়াল আলোচনায় বলেন যে, নাইজেরিয়ার মূল সমস্যা হলো, সরকার কর থেকে যত আয় করছে, তার চাইতে বেশি ব্যয় করছে; যেকারণে ঋণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এভাবে দেশটা যদি আয়ের অধিক ব্যয় করতে থাকে, তাহলে কোন একদিন দাতারা ঋণের অর্থ ফেরত চাইবে, অথবা নতুন ঋণ দেয়া বন্ধ করে দেবে।
পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানিকারক দেশ হওয়া সত্ত্বেও আমদানি ব্যয় মেটাতে হিমসিম খাচ্ছে নাইজেরিয়া। ‘অবজারভেটরি অব ইকনমিক কমপ্লেক্সিটি’ বা ‘ওইসি’র হিসেবে নাজেরিয়া ২০২১ সালে প্রায় ৫৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য এবং প্রায় ৫ বিলয়ন ডলারের সেবা রপ্তানি করেছিল। এর বিপরীতে দেশটা একইবছর প্রায় ৬২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য এবং প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলারের সেবা আমদানি করে। ৫০ বিলিয়ন ডলারের অপরিশোধিত খনিজ তেল ও গ্যাস রপ্তানি করলেও নাইজেরিয়া প্রায় সাড়ে ১১ বিলিয়ন ডলারের পরিশোধিত তেল আমদানি করে। এছাড়াও দেশটা বিপুল পরিমাণ ডলার ব্যায়ে গম, গাড়ি, ঔষধ, যন্ত্রপাতি, ইত্যাদি আমদানি করে। বিদেশী ব্যবসায়িক সেবা, ব্যক্তিগত ভ্রমণ এবং পরিবহণ সেবা খাতে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার প্রতিবছর নাইজেরিয়া থেকে চলে যাচ্ছে। এছাড়াও এপ্রিল মাসে কনসাল্টিং কোম্পানি ‘কেপিএমজি’ বলে যে, দেশটার বেকারত্বের হার ২০২২ সালে যেখানে ছিল প্রায় ৩৮ শতাংশ, তা ২০২৩ সালে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৪১ শতাংশে ঠেকবে। তারা বলে যে, শিল্পায়ন না হওয়ায় এবং ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ না বাড়ায় বেকারত্বের সমস্যা থেকেই যাবে।
উপনিবেশ না হয়েও ঔপনিবেশিক নীতি যেন ছাড়ছে না নাইজেরিয়াকে। রেকর্ড মূল্যে জ্বালানি তেল রপ্তানি করলেও দেশটা এখন ব্যাপকভাবে ঋণগ্রস্ত। পরিশোধিত জ্বালানি এলপিজি রপ্তানি করে নাইজেরিয়রা নিজেদের বাসাবাড়িতে রান্নার জন্যে আমদানি করা পরিশোধিত কেরোসিন তেল ব্যবহার করে। শিল্পায়ন না হওয়ায় বেকারত্বের হার আকাশচুম্বী। ‘আফ্রিকা নিউজ’ বলছে যে, নতুন প্রেসিডেন্ট বোলা তিনুবু দেশের অর্থনীতিকে ঘোরাবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর গডউইন এমেফিয়েল এবং অর্থনৈতিক ও আর্থিক দুর্নীতি দমন সংস্থার প্রধান আব্দুলরশীদ বাওয়া-কে পদচ্যুত ও গ্রেপ্তার করেছেন, এবং জ্বালানির উপর থেকে ভর্তুকি সরিয়ে নিয়েছেন। এতে ‘আইএমএফ’ খুশি হলেও পরিবহণ খরচ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত জেনারেটরের খরচ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন পশ্চিমা প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে জাতীয় মুদ্রা নাইয়ারাকে বাজারের উপরে ছেড়ে দেয়ার কারণে জনগণকে আমদানি করা খাদ্য বহুগুণ বেশি মূল্যে ক্রয় করতে হবে। ফলস্বরূপ, ‘আইএমএফ’এর উপদেশ মেনে নাইজেরিয়ার ব্যবসা-বান্ধব সরকার এখন জনগণকে কষ্ট সহ্য করতে বলছে। পশ্চিমা ঋণের শর্তে নিষ্পেষিত পশ্চিম আফ্রিকার বৃহত্তম দেশ নাইজেরিয়ার অর্থনৈতিক দৈন্যতা আঞ্চলিক ভূরাজনীতিকে প্রভাবিত করবে নিঃসন্দেহে।
Showing posts with label IMF. Show all posts
Showing posts with label IMF. Show all posts
Saturday, 17 June 2023
‘আইএমএফ’এর ছোবলে দিশেহারা নাইজেরিয়ার জনগণ
Labels:
Capitalism,
Economic Crisis,
Geopolitics,
IMF,
Neo-Colonialism,
Nigeria,
West Africa
Sunday, 17 April 2022
শেহবাজ শরীফ কি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ককে মেরামত করতে পারবেন?
১৭ই এপ্রিল ২০২২
পাকিস্তানের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ক্ষমতা হারাবার আগে এবং পরে বারংবার বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্যে ষড়যন্ত্র করেছে। তিনি বলেছেন যে, তিনি পাকিস্তানের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতেই রাশিয়া সফর করার কারণে ওয়াশিংটন তার উপরে ক্ষুব্ধ হয়েছিল। ইমরানের পক্ষে এই ষড়যন্ত্রের পিছনে যেমন কোন বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দেখানো কঠিন, তেমনি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের মুসলিম লীগ মনোনীত নতুন প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের পক্ষেও দুই দেশের মাঝে সম্পর্ককে পুরোপুরিভাবে মেরামত করাটা কঠিন। তবে ইমরানের প্রস্থানের পর পাকিস্তানের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কিছুটা ভালো হবার সম্ভাবনা দেখছেন অনেকে।
‘আল জাজিরা’র সাথে কথা বলতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ‘টাফট ইউনিভার্সিটির’র প্রফেসর আয়েশা জালাল বলছেন যে, পাকিস্তানের শাসকরা এর আগে বহুবার নিজের ঘর সামাল দিতে না পেরে বিদেশী ষড়যন্ত্রের কথা বলেছেন। তারা সমস্যার সমাধান না করতে পেরে সেটার দায় বিদেশের উপরে দিয়েছেন। কিন্তু পাকিস্তানের শাসকেরা এধরণের কথার উপর নির্ভর করেছেন কারণ দেশটার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বহুদিন যাবতই টানাপোড়েনের মাঝ দিয়ে চলেছে। ফলশ্রুতিতে নতুন প্রধানমন্ত্রী এবং সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বের প্রধান কাজ হবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ককে মেরামত করা। ১৩ই এপ্রিল মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিংকেন এক বার্তায় শেহবাজ শরীফকে অভিন্দন জানিয়ে বলেন যে, দুই দেশের মাঝে দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতা অব্যহত থাকবে বলে তিনি আশা করেন। শরীফও একই দিনে এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, তার দেশ অন্যান্য দেশের সাথে পারস্পরিক সন্মান ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্কোন্নন করতে থাকবে। তবে প্রশ্ন হলো, বাইডেন প্রশাসনের কাছে পাকিস্তান এখন কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘আটলান্টিক কাউন্সিল’এর এক লেখায় নতুন দিল্লীর ‘জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া ইউনিভার্সিটি’র নাজির আহমেদ মীর বলছেন যে, গত কয়েক দশক ধরেই যুক্তরাষ্ট্র এবং পাকিস্তানের মাঝে সম্পর্কটা আদান প্রদানের মাঝে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের কাছ থেকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বিশেষ করে আফগানিস্তানের ব্যাপারে সহযোগিতা চেয়েছে; আর এর বিনিময়ে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতা চেয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বারংবার অভিযোগ করেছেন যে, তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ পাকিস্তান তাদের সাথে যথেষ্ট সহযোগিতা করছে না এবং তালিবানের মতো অস্ত্রধারী গোষ্ঠীকে নিজ দেশে আশ্রয় দিয়েছে। অপরদিকে ইসলামাবাদ বলেছে যে, পাকিস্তান মার্কিন ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে এবং মার্কিন নেতৃত্বে আফগানিস্তানের যুদ্ধে জড়িয়ে তাদের বিশাল ক্ষতির সন্মুখীন হতে হয়েছে। আরেক মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ব্রুকিংস ইন্সটিটিউশন’এর ফেলো মাদিহা আফজাল মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তন করে পাকিস্তানের জন্যে নিরাপত্তা সাহায্য বন্ধ করে দিলে দুই দেশের মাঝে সম্পর্ক আরও নিচে নেমে যায়। তবে ২০১৯এর মাঝামাঝি ইমরান খানের ওয়াশিংটন সফরের পর ওয়াশিংটনের সাথে ইসলামাবাদের সম্পর্ক ভালোর দিকে ফেরত আসে। কারণ সেই সময়ে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির নতুন লক্ষ্য ছিল আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়া। সেটা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে তালিবানদের সাথে মার্কিনীরা আলোচনায় বসছিলো; আর পাকিস্তান সেখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা ভূমিকা রাখছিলো।
২০২১এর জুনে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর সাথে এক সাক্ষাতে ইমরান খান বলেন যে, ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’র সময় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কটা একপেশে ছিল। কারণ যুক্তরাষ্ট্র মনে করছিল যে, তারা পাকিস্তানকে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে; কাজেই পাকিস্তানের উচিৎ যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অনুযায়ী চলা। ইমরান বলেন যে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটা সমতার সম্পর্ক চাইছিলেন, যার মাঝে যথেষ্ট অর্থনৈতিক সুযোগও থাকবে পাকিস্তানের জন্যে। মাদিহা আফজাল বলছেন যে, জো বাইডেনের প্রশাসন ক্ষমতা নেবার পর থেকে ওয়াশিংটনের কাছে পাকিস্তানের গুরুত্ব যথেষ্টই কমে গেছে। কারণ গত অগাস্টেই যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ছেড়ে গেছে। চীনকে নিয়ন্ত্রণের জন্যে মার্কিনীদের কাছে এখন ভারতের গুরুত্বই বেশি। তবে ঐতিহাসিকভাবেই পাকিস্তানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের কেন্দ্রে ছিল পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। ইমরান খান ক্ষমতা নেবার পর থেকে সেনাবাহিনীর নীতির সাথে খাপ খাইয়েই চলেছেন। উভয়েই পাকিস্তানের ‘স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি’র উপর গুরুত্ব দিয়েছে; যার মাধ্যমে পাকিস্তান সকল দেশের সাথেই সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলবে। কিন্তু গত কয়েক মাসের মাঝে বেইজিং এবং মস্কোর সাথে ইমরান সরকারের সখ্যতা বৃদ্ধি পেলেও সেই হিসেবে ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন হয়নি। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী সর্বদাই ওয়াশিংটনের সাথে ভালো সম্পর্ক চেয়েছে। ওয়াশিংটনকে বাদ দিয়ে বেইজিংএর সাথে সম্পর্কোন্নয়ন সেনাবাহিনী চায়নি।
আয়েশা জালাল বলছেন যে, ওয়াশিংটন এবং বেইজিংএর সাথে সম্পর্ক ব্যালান্স করে চলার নীতিটা ইমরান খানের নীতি নয়; এটা পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় নীতি। কিন্তু পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির এই ব্যালান্স সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ‘সিএনবিসি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে ওয়াশিংটনের ‘অলব্রাইট স্টোনব্রিজ গ্রুপ’এর ডিরেক্টর জেমস শোয়েমলেইন বলছেন যে, ইমরান খান পাকিস্তানের ঐতিহাসিক ওয়াশিংটন কেন্দ্রিক নীতিকে পরিবর্তন করে চীনকে আলিঙ্গন করেছেন; যা পাকিস্তানের জন্যে খুবই বিপজ্জনক। কারণ পাকিস্তান চীনে রপ্তানি করতে চাইলেও বাস্তবে পাকিস্তানের রপ্তানি যায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে।
‘ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর’এর ‘ইন্সটিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ’এর ডিরেক্টর ইকবাল সিং সেভেয়া বলছেন যে, পাকিস্তান এই মুহুর্তে দেউলিয়াত্ব ঘোচাতে ‘আইএমএফ’এর ২৩তম সহায়তা প্যাকেজের মাঝে রয়েছে। দেশের মুদ্রাস্ফীতি এখন ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। শেহবাজ শরীফ খুব সম্ভবতঃ ‘আইএমএফ’এর কাছ থেকে আরও ঋণের দিকে ধাবিত হবেন। আর এর ফলশ্রুতিতে ‘আইএমএফ’এর কঠিন শর্ত পূরণে আর্থিক খাতের পরিবর্তন নিশ্চিত করতে হবে পাকিস্তানকে; একইসাথে কর বৃদ্ধি করা এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি করার দিকে যেতে হবে সরকারকে। আর শেহবাজ শরীফের সরকারকে হয়তো এই কঠিন কাজটা করতে হবে ভর্তুকি বজায় রেখেই।
নওয়াজ শরীফের পরিবারের প্রাক্তন ইতিহাস শেহবাজ শরীফের ব্যাপারে পাকিস্তানীদেরকে খুব বেশি আপ্লুত করার কথা নয়। বরং পাকিস্তানের জনগণের মাঝে মার্কিন বিরোধী চিন্তার উপর ভিত্তি করেই যেহেতু ইমরান ক্ষমতায় আসতে পেরেছিলেন, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতি পাকিস্তানকে কয়েক দশক ধরে নিয়ন্ত্রণ করলেও একুশ শতকে চীনকে নিয়ন্ত্রণে ভারতের ভূমিকা এবং পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার ক্রান্তিলগ্নে মস্কো ও বেইজিংএর ব্যাপারে পাকিস্তানের ‘নিরপেক্ষ’ নীতি মার্কিনীদের দুশ্চিন্তায় রাখছে।
পাকিস্তানের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ক্ষমতা হারাবার আগে এবং পরে বারংবার বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্যে ষড়যন্ত্র করেছে। তিনি বলেছেন যে, তিনি পাকিস্তানের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতেই রাশিয়া সফর করার কারণে ওয়াশিংটন তার উপরে ক্ষুব্ধ হয়েছিল। ইমরানের পক্ষে এই ষড়যন্ত্রের পিছনে যেমন কোন বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দেখানো কঠিন, তেমনি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের মুসলিম লীগ মনোনীত নতুন প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের পক্ষেও দুই দেশের মাঝে সম্পর্ককে পুরোপুরিভাবে মেরামত করাটা কঠিন। তবে ইমরানের প্রস্থানের পর পাকিস্তানের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কিছুটা ভালো হবার সম্ভাবনা দেখছেন অনেকে।
‘আল জাজিরা’র সাথে কথা বলতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ‘টাফট ইউনিভার্সিটির’র প্রফেসর আয়েশা জালাল বলছেন যে, পাকিস্তানের শাসকরা এর আগে বহুবার নিজের ঘর সামাল দিতে না পেরে বিদেশী ষড়যন্ত্রের কথা বলেছেন। তারা সমস্যার সমাধান না করতে পেরে সেটার দায় বিদেশের উপরে দিয়েছেন। কিন্তু পাকিস্তানের শাসকেরা এধরণের কথার উপর নির্ভর করেছেন কারণ দেশটার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বহুদিন যাবতই টানাপোড়েনের মাঝ দিয়ে চলেছে। ফলশ্রুতিতে নতুন প্রধানমন্ত্রী এবং সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বের প্রধান কাজ হবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ককে মেরামত করা। ১৩ই এপ্রিল মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিংকেন এক বার্তায় শেহবাজ শরীফকে অভিন্দন জানিয়ে বলেন যে, দুই দেশের মাঝে দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতা অব্যহত থাকবে বলে তিনি আশা করেন। শরীফও একই দিনে এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, তার দেশ অন্যান্য দেশের সাথে পারস্পরিক সন্মান ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্কোন্নন করতে থাকবে। তবে প্রশ্ন হলো, বাইডেন প্রশাসনের কাছে পাকিস্তান এখন কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘আটলান্টিক কাউন্সিল’এর এক লেখায় নতুন দিল্লীর ‘জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া ইউনিভার্সিটি’র নাজির আহমেদ মীর বলছেন যে, গত কয়েক দশক ধরেই যুক্তরাষ্ট্র এবং পাকিস্তানের মাঝে সম্পর্কটা আদান প্রদানের মাঝে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের কাছ থেকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বিশেষ করে আফগানিস্তানের ব্যাপারে সহযোগিতা চেয়েছে; আর এর বিনিময়ে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতা চেয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বারংবার অভিযোগ করেছেন যে, তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ পাকিস্তান তাদের সাথে যথেষ্ট সহযোগিতা করছে না এবং তালিবানের মতো অস্ত্রধারী গোষ্ঠীকে নিজ দেশে আশ্রয় দিয়েছে। অপরদিকে ইসলামাবাদ বলেছে যে, পাকিস্তান মার্কিন ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে এবং মার্কিন নেতৃত্বে আফগানিস্তানের যুদ্ধে জড়িয়ে তাদের বিশাল ক্ষতির সন্মুখীন হতে হয়েছে। আরেক মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ব্রুকিংস ইন্সটিটিউশন’এর ফেলো মাদিহা আফজাল মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তন করে পাকিস্তানের জন্যে নিরাপত্তা সাহায্য বন্ধ করে দিলে দুই দেশের মাঝে সম্পর্ক আরও নিচে নেমে যায়। তবে ২০১৯এর মাঝামাঝি ইমরান খানের ওয়াশিংটন সফরের পর ওয়াশিংটনের সাথে ইসলামাবাদের সম্পর্ক ভালোর দিকে ফেরত আসে। কারণ সেই সময়ে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির নতুন লক্ষ্য ছিল আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়া। সেটা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে তালিবানদের সাথে মার্কিনীরা আলোচনায় বসছিলো; আর পাকিস্তান সেখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা ভূমিকা রাখছিলো।
২০২১এর জুনে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর সাথে এক সাক্ষাতে ইমরান খান বলেন যে, ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’র সময় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কটা একপেশে ছিল। কারণ যুক্তরাষ্ট্র মনে করছিল যে, তারা পাকিস্তানকে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে; কাজেই পাকিস্তানের উচিৎ যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অনুযায়ী চলা। ইমরান বলেন যে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটা সমতার সম্পর্ক চাইছিলেন, যার মাঝে যথেষ্ট অর্থনৈতিক সুযোগও থাকবে পাকিস্তানের জন্যে। মাদিহা আফজাল বলছেন যে, জো বাইডেনের প্রশাসন ক্ষমতা নেবার পর থেকে ওয়াশিংটনের কাছে পাকিস্তানের গুরুত্ব যথেষ্টই কমে গেছে। কারণ গত অগাস্টেই যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ছেড়ে গেছে। চীনকে নিয়ন্ত্রণের জন্যে মার্কিনীদের কাছে এখন ভারতের গুরুত্বই বেশি। তবে ঐতিহাসিকভাবেই পাকিস্তানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের কেন্দ্রে ছিল পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। ইমরান খান ক্ষমতা নেবার পর থেকে সেনাবাহিনীর নীতির সাথে খাপ খাইয়েই চলেছেন। উভয়েই পাকিস্তানের ‘স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি’র উপর গুরুত্ব দিয়েছে; যার মাধ্যমে পাকিস্তান সকল দেশের সাথেই সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলবে। কিন্তু গত কয়েক মাসের মাঝে বেইজিং এবং মস্কোর সাথে ইমরান সরকারের সখ্যতা বৃদ্ধি পেলেও সেই হিসেবে ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন হয়নি। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী সর্বদাই ওয়াশিংটনের সাথে ভালো সম্পর্ক চেয়েছে। ওয়াশিংটনকে বাদ দিয়ে বেইজিংএর সাথে সম্পর্কোন্নয়ন সেনাবাহিনী চায়নি।
আয়েশা জালাল বলছেন যে, ওয়াশিংটন এবং বেইজিংএর সাথে সম্পর্ক ব্যালান্স করে চলার নীতিটা ইমরান খানের নীতি নয়; এটা পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় নীতি। কিন্তু পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির এই ব্যালান্স সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ‘সিএনবিসি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে ওয়াশিংটনের ‘অলব্রাইট স্টোনব্রিজ গ্রুপ’এর ডিরেক্টর জেমস শোয়েমলেইন বলছেন যে, ইমরান খান পাকিস্তানের ঐতিহাসিক ওয়াশিংটন কেন্দ্রিক নীতিকে পরিবর্তন করে চীনকে আলিঙ্গন করেছেন; যা পাকিস্তানের জন্যে খুবই বিপজ্জনক। কারণ পাকিস্তান চীনে রপ্তানি করতে চাইলেও বাস্তবে পাকিস্তানের রপ্তানি যায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে।
‘ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর’এর ‘ইন্সটিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ’এর ডিরেক্টর ইকবাল সিং সেভেয়া বলছেন যে, পাকিস্তান এই মুহুর্তে দেউলিয়াত্ব ঘোচাতে ‘আইএমএফ’এর ২৩তম সহায়তা প্যাকেজের মাঝে রয়েছে। দেশের মুদ্রাস্ফীতি এখন ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। শেহবাজ শরীফ খুব সম্ভবতঃ ‘আইএমএফ’এর কাছ থেকে আরও ঋণের দিকে ধাবিত হবেন। আর এর ফলশ্রুতিতে ‘আইএমএফ’এর কঠিন শর্ত পূরণে আর্থিক খাতের পরিবর্তন নিশ্চিত করতে হবে পাকিস্তানকে; একইসাথে কর বৃদ্ধি করা এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি করার দিকে যেতে হবে সরকারকে। আর শেহবাজ শরীফের সরকারকে হয়তো এই কঠিন কাজটা করতে হবে ভর্তুকি বজায় রেখেই।
নওয়াজ শরীফের পরিবারের প্রাক্তন ইতিহাস শেহবাজ শরীফের ব্যাপারে পাকিস্তানীদেরকে খুব বেশি আপ্লুত করার কথা নয়। বরং পাকিস্তানের জনগণের মাঝে মার্কিন বিরোধী চিন্তার উপর ভিত্তি করেই যেহেতু ইমরান ক্ষমতায় আসতে পেরেছিলেন, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতি পাকিস্তানকে কয়েক দশক ধরে নিয়ন্ত্রণ করলেও একুশ শতকে চীনকে নিয়ন্ত্রণে ভারতের ভূমিকা এবং পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার ক্রান্তিলগ্নে মস্কো ও বেইজিংএর ব্যাপারে পাকিস্তানের ‘নিরপেক্ষ’ নীতি মার্কিনীদের দুশ্চিন্তায় রাখছে।
Labels:
China,
Geopolitics,
IMF,
India,
New World Order,
Pakistan,
Russia,
USA
Monday, 4 April 2022
শ্রীলংকার ভবিষ্যৎ কি?
০৪ঠা এপ্রিল ২০২২
ভারত মহাসাগরের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র বাণিজ্যপথের উপর অবস্থিত শ্রীলংকার সমস্যা যেন হিমালয়সম হয়ে দাঁড়িয়েছে! দেশটায় মারাত্মক মূল্যস্ফীতি চলছে। তদুপরি অর্থ দিয়েও মানুষ তাদের দরকারি জিনিস কিনতে পারছে না। বিশেষ করে আমদানিকৃত যেকোন জিনিসই দুর্লভ হয়ে গেছে। আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্যে যথেষ্ট বৈদেশিক মুদ্রা দেশটার হাতে নেই। চরম অসন্তোষে মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। জরুরি অবস্থা এবং কারফিউ দিয়েও বিক্ষোভ থামানো যাচ্ছে না। সরকারের সকল মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপক্ষে পার্লামেন্টের সকল দলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন মন্ত্রীসভা তৈরি করার জন্যে, যাতে করে সমস্যার একটা সমাধান পাওয়া যায়। একসময় দক্ষিণ এশিয়াতে শ্রীলংকাকে সকলের জন্যে মডেল হিসেবে দেখানো হতো। দেশটার মাথাপিছু আয় ছিল প্রায় ৪ হাজার ডলার; যা কিনা আশেপাশের দেশগুলির প্রায় দ্বিগুণ! দেশটার শিক্ষার হার প্রায় ১’শ ভাগ। ২ কোটি ২০ লক্ষ জনসংখ্যার দেশটার জিডিপি প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলারের মতো। অথচ বারংবার দেশটাকে দেউলিয়া অবস্থান থেকে উদ্ধার পাবার জন্যে ‘আইএমএফ’এর সরণাপন্ন হতে হয়েছে। শ্রীলংকার সমস্যার গভীরে যেতে হলে দেশটার অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের যথেষ্ট বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
‘দ্যা ইকনমিক টাইমস’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০২০ সালে ‘আইএমএফ’ শ্রীলংকাকে প্রতিশ্রুত ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণের মাঝে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার দেয়ার পর ঋণের প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। এতে শ্রীলংকা করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে হিমসিম খেয়ে ওঠে। এর ফলশ্রুতিতে ২০২১এর ফেব্রুয়ারি মাসে শ্রীলংকা সরকার পুঁজি ধরে রাখার উদ্দেশ্যে কিছু নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেয়; যার মাঝে ছিল ছয় মাসের মাঝে রপ্তানির অর্থ দেশে ফেরত নিয়ে আসা; রপ্তানি আয়ের কিছু অংশকে রুপিতে পরিবর্তন করে নেয়া; বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহকে তাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের কিছু অংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য করা। এই পদক্ষেপগুলির উদ্দেশ্য ছিল ‘আইএমএফ’এর ঋণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং করোনার কারণে পর্যটন শিল্পে ভাটা পড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার যে ঘাটতি পড়েছে, সেটাকে কিছুটা পুষিয়ে নেয়া। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছিল যে, এর মাধ্যমে শ্রীলংকা বিদেশী ঋণের উপর নির্ভর না করে নিজস্ব সম্পদের উপর নির্ভরশীলতা বাড়াবে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এই পদক্ষেপগুলির মাধ্যমে আরও একটা লক্ষ্য অর্জিত হবে, তা হলো ‘আইএমএফ’এর শর্তের বেড়াজাল থেকে মুক্ত থাকা। শ্রীলংকার প্রতিমন্ত্রী অজিত নিভাদ কাব্রাল বলেন যে, সরকার আশা করছে যে, ২০২১ সালে দেশের মোট রপ্তানি আয় এবং রেমিটান্স মিলে আসবে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার; আর দেশ থেকে বের হবে মোট ২৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। এর ফলে দেশে ৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত থাকবে। কিন্তু বছর শেষে এই হিসেব পুরোপুরি উল্টে যায়।
পর্যটন শিল্পে ধ্বস এবং রেমিট্যান্স আয়ে হুন্ডি
দেশটার পর্যটন কর্তৃপক্ষ ফেব্রুয়ারি মাসে জানায় যে, ২০২১ সালে পর্যটন শিল্প প্রায় ৬’শ ৩৪ মিলিয়ন ডলার আয় করে। শ্রীলংকার ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’ বলছে যে, ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে যেখানে দেশটাতে মাত্র ১৭’শ পর্যটক এসেছিল, সেখানে ডিসেম্বর মাসে তা গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯০ হাজারে। আর পুরো বছরে এসেছিল ২ লক্ষের কিছু কম। গত জানুয়ারিতেও ৮২ হাজারের উপর পর্যটক এসেছিল। কিন্তু এটা খুশি হবার কোন খবর নয়; কারণ পর্যটন খাতে শ্রীলংকার আয় ২০১৮ সালে ছিল ৪ বিলিয়ন ডলারের উপর। সেবছর সেদেশে ২০ লক্ষাধিক পর্যটক এসেছিল। তবে ২০১৯ সালে সন্ত্রাসী হামলার পর আয় ৩ দশমিক ৬ বিলিয়নে নেমে আসে। আর ২০২০ সালে করোনার কারণে তা ৭’শ মিলিয়নের নিচে নেমে যায়! অর্থাৎ ২০১৮ সালের তুলনায় পর্যটন খাতে শ্রীলংকার আয় এখন ছয় ভাগের এক ভাগেরও কম!
শ্রীলংকা সরকার আশা করছিল যে, ২০২২ সালে দেশটায় ১০ লক্ষের বেশি পর্যটক আসবে। কিন্তু সেই আশা এখন ধুলোয় মিশে গেছে! ‘ব্লুমবার্গ’ বলছে যে, গত মার্চ মাসে শ্রীলংকার পর্যটন কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দেয় যে, ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে তাদের পর্যটন শিল্প আরও এক দফা সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে। কারণ রাশিয়া এবং ইউক্রেন থেকেই তাদের সবচাইতে বেশি পর্যটক এসে থাকে। ফেব্রুয়ারি মাসে শ্রীলংকায় মোট পর্যটকের মাঝে প্রায় ১৬ শতাংশ এসেছিল রাশিয়া থেকে।
অপরদিকে ২০২১ সালে রেমিট্যান্স আয় একেবারেই পড়ে যায়। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, গত বছর রেমিট্যান্স আয় ছিল প্রায় সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার; যা ছিল দশ বছরের মাঝে সর্বনিম্ন! শ্রীলংকার থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ভেরিটে রিসার্চ’ বলছে যে, রেমিট্যান্স আয় কমার মূল কারণ হলো সরকার অলিখিতভাবে ডলারের বিপরীতে রুপির মূল্য ২’শ থেকে ২’শ ৩এ নিয়ন্ত্রণ করেছে। অথচ খোলা বাজারে তখন এক ডলারে প্রায় আড়াই’শ রুপি পাওয়া যেতো। এর ফলে বেশিরভাগ প্রবাসী শ্রীলংকান হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠাতে থাকে। তবে সমস্যা হলো যখন দেশটার পর্যটন শিল্প শিখরে ছিল এবং রেমিট্যান্সও ভালো আসছিল, তখনও দেশটাকে বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে দেউলিয়াত্বের মাঝে পড়ে ‘আইএমএফ’এর দ্বারস্থ হতে হয়েছে। এর অর্থ হলো, মূল সমস্যা পর্যটন বা রেমিট্যান্স খাতে নয়; অন্য কোথাও।
আমদানি নির্ভরতা শেষ পর্যন্ত ‘আইএমএফ’এর কাছে নিয়ে গেলো শ্রীলংকাকে
গত জানুয়ারি মাসে শ্রীলংকার রপ্তানি উন্নয়ন সংস্থা জানায় যে, ২০২১ সালে দেশের মোট রপ্তানি আয় ছিল প্রায় সাড়ে ১২ বিলিয়ন ডলার, যা ছিল রপ্তানি টার্গেটের চাইতেও বেশি। কিন্তু ২০২০ সালের ডিসেম্বরে যেখানে শ্রীলংকার মাসিক বাণিজ্য ঘাটতি ছিল প্রায় সাড়ে ৫’শ মিলিয়ন ডলার, তা ২০২১এর ডিসেম্বরে এসে দাঁড়ায় ১ বিলিয়ন ডলারেরও উপর। এর মূল কারণ হলো, রপ্তানি বাড়ার হার যেখানে ছিল প্রায় ২০ শতাংশ, সেখানে আমদানি বেড়েছিল প্রায় ৪৭ শতাংশ হারে। গত ডিসেম্বরে শ্রীলংকা প্রায় ২ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছিল; যা ছিল দেশটার ইতিহাসে এক মাসে সর্বোচ্চ আমদানি।
শ্রীলংকার পত্রিকা ‘ইকনমি নেক্সট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, দেশটার আমদানি ব্যয় আগের বছরের ১৬ বিলিয়নের তুলনায় সাড়ে ২৮ শতাংশ বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ২০ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে। এই আমদানি দেশের জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশ। করোনার আগে ২০১৯ সালেও আমদানি ছিল ২০ বিলিয়নের চাইতে কম। এর ফলশ্রুতিতে দেশটার বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। সরকার গাড়ি আমদানির উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় গাড়ি আমদানির ব্যয় ২০১৯ সালে ৮’শ ১৬ মিলিয়ন ডলার থেকে মাত্র ১৩ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। তবে সার্বিকভাবে যেহেতু আমদানি ব্যয় কমানো সম্ভব হচ্ছে না, তাই রপ্তানি বৃদ্ধি করেও বাণিজ্য ঘাটতি কমানো অথবা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। এই মুহুর্তে পর্যটন শিল্পের অবস্থা খারাপ রয়েছে। কিন্তু পর্যটন শিল্প ভালো হলেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়বে না। কারণ যারা পর্যটন শিল্পের সাথে জড়িত, তারা খরচ বাড়াবে এবং ফলশ্রুতিতে আমদানি বাড়তে থাকবে। হোটেলগুলিও জরুরি মেরামতের কাজগুলি করবে এবং তাদের ঋণ ফেরত দিতে থাকবে। এর ফলে আরও বিনিয়োগ হবে এবং আমদানি বাড়বে। ব্যাংকগুলি যদি সরকারি বন্ড কেনে, সেটাও ব্যবহৃত হবে সরকারি কর্মচারিদের বেতন দিতে; যা কিনা আবারও আমদানি বাড়াবে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এই সমস্যার মূলে ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রুপি ছাপানো। যখন অর্থনীতে যথেষ্ট বৈদেশিক মুদ্রা আসছিলো না এবং সরকার যথেষ্ট আয় করতে পারছিলো না, তখন তারা সিদ্ধান্ত নেয় রুপি ছাপানো বৃদ্ধি করার। এতে মারত্মক মুদ্রাস্ফীতির সৃষ্টি হয়েছে। ঋণের উপর সুদের হার কম থাকায় বিনিয়োগ বেড়েছে এবং প্রচুর যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছে। ফলশ্রুতি যন্ত্রপাতি আমদানি ২ দশমিক ১ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ২ দশমিক ৮ বিলিয়নে উঠে গেছে। শিল্পের জন্যে ক্যাপিটাল গুডসএর আমদানি সাড়ে ৩ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৪ বিলিয়নে পৌঁছেছে। কন্সট্রাকশন দ্রব্যের আমদানি বেড়ে ১ বিলিয়ন থেকে হয়েছে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। খাদ্যদ্রব্য আমদানিতে খরচ হয়েছে দেড় বিলিয়ন ডলার। মোট ভোগ্যপণ্য আমদানি হয়েছে ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার; যা আগের বছর ছিল ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। বিরাট পরিবর্তন এসেছে জ্বালানি আমদানিতে। আড়াই বিলিয়ন ডলার থেকে জ্বালানি আমদানি ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে উঠে গেছে। এই মুহুর্তে মোট আমদানির ১৮ শতাংশ জ্বালানি; রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস শিল্পের জন্যে আমদানি করা কাপড় ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ; যন্ত্রপাতি ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ; খাদ্য বাদে অন্যান্য ভোগ্যপণ্য সাড়ে ১০ শতাংশ; খাদ্যদ্রব্য ৮ শতাংশ; ঔষধ ও মেডিক্যাল দ্রব্য ৪ শতাংশ।
শ্রীলংকার রাজাপক্ষে সরকার শেষ পর্যন্ত বাস্তবতার কাছে হার মেনেছে। ফলশ্রুতিতে সরকার গত ১৪ই মার্চ ‘আইএমএফ’এর সাথে আলোচনায় বসে। ক্ষমতা নেবার পর থেকে ‘আইএমএফ’এর কঠিন শর্তের বেড়াজাল এড়িয়ে চলার চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। ‘ব্লুমবার্গ’ বলছে যে, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে শ্রীলংকার ঋণদাতা দেশ ভারত এবং চীন অন্যদিকে ব্যস্ত। এর আগেই শ্রীলংকা সরকার রুপির মূল্য কমিয়ে ঋণ নেয়াকে আরও কঠিন করে দেয়। এই পদক্ষেপ ‘আইএমএফ’এর প্রেসক্রিপশনের মাঝে থাকায় অনেকেই ধারণা করে যে, সরকার খুব সম্ভবতঃ আবারও ‘আইএমএফ’এর কাছে যাচ্ছে। মার্চ মাস নাগাদ দেশটার বৈদেশিক রিজার্ভ ২ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসে। অথচ এবছরেই তাদের ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ফেরত দিতে হবে। এর মাঝে জুলাই মাসে ফেরত দিতে হবে ১ বিলিয়ন ডলারের বন্ড।
জন্মের পর থেকেই বৈদেশিক মুদ্রার পিছনে ছুটেছে শ্রীলংকা
‘সিএনবিসি’র এক প্রতিবেদনে মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, শ্রীলংকার অর্থনীতির করুণ দশা আজকের নয়। অর্থাৎ এই সমস্যার গভীরতা যথেষ্ট। ২০১৬ সালে দেশটার বৈদেশিক রিজার্ভ মারাত্মক নেমে গেলে সরকার ‘আইএমএফ’এর কাছে ঋণের জন্যে যেতে বাধ্য হয়। ‘আইএমএফ’এর শর্ত মেনে শ্রীলংকার সরকার দেড় বিলিয়ন ডলার ঋণ পায়। সেই বছরের শেষ নাগাদ দেশটার বৈদেশিক ঋণ প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকে। এমনকি সরকার নিজেই বলতে পারছিলো না যে, দেশটার মোট ঋণ আসলে কত। বৈদেশিক ঋণ ফেরত দেয়ার লক্ষ্যে সরকার ‘আইএমএফ’এর ফর্মূলায় মূল্য সংযোজন কর বৃদ্ধি করে। ২০১৮ সালে চীন শ্রীলংকাকে আরও ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ দেয়। ভারতের কাছ থেকে ঋণ না পেয়ে শ্রীলংকা বাংলাদেশের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে।
১৫ বছরের মাঝে দেশটার সবচাইতে মারাত্মক আর্থিক সমস্যার মাঝে ২০১৯ সালে গোতাবায়া রাজাপক্ষে এবং তার পরিবারবর্গ ক্ষমতায় আসে। তাদের প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল কর কমানো। মূল্য সংযোজন কর ১৫ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশে নামিয়ে আনা ছাড়াও সরকার বহু ক্ষেত্রে বিপুলভাবে কর কর্তন করে। সরকারের যুক্তি ছিল যে, কর কমালে বিনিয়োগ বাড়বে এবং অর্থনীতি চাঙ্গা হবে; জিডিপি বাড়বে। এর মাধ্যমে যেসব ক্ষেত্রে কর পাওয়া যেতো না, তারাও কর দেয়ার সামর্থ্য অর্জন করবে। কিন্তু ২০১৯ সালে সন্ত্রাসী হামলা এবং ২০২০ সালে করোনার লকডাউনের কারণে শ্রীলংকার অর্থনীতিতে ধ্বস নামে। আর রাজাপক্ষে সরকার ‘আইএমএফ’এর শর্ত বাস্তবায়নে গড়িমসি করায় ‘আইএমএফ’ ঋণ দেয়া বন্ধ করে দেয়। বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি পোষাতে না পেরে সরকার রুপি ছাপাতে থাকে। এতে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়।
২০১৯ সাল থেকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে গোতাবায়া রাজাপক্ষে সরকার জনগণের উপর কর কমানো থেকে সরে আসতে চায়নি। এর ফলশ্রুতিতে সরকারের রাজস্ব নিম্নগামী হয় এবং বৈদেশিক ঋণ ফেরত দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শ্রীলংকার সমস্যা শুধু রাজাপক্ষের পরিবার নয়। কারণ ২০১৯ সালে তারা ক্ষমতায় আসার আগেও দেশটার অর্থনীতি ধুঁকে ধুঁকে চলছিল। শ্রীলংকার অর্থনীতি গড়ে উঠেছে বৈদেশিক বাণিজ্যের উপর ভিত্তি করে। দেশটার অর্থনীতি পর্যটন খাত এবং রেমিট্যান্স থেকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে থাকার কারণে জনগণের খরচ বাড়তে থাকে। দেশের রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস খাত এবং পর্যটনমুখী হোটেল ব্যবসাও আমদানিনির্ভর থাকে। রপ্তানি বাড়লেও আমদানির সাথে পাল্লা দিয়ে উঠতে পারেনি কখনোই। ২০১৬ সালে দেশটার পর্যটন শিল্প যখন বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছিল, তখনও দেশের আমদানি ব্যয় মেটাতে না পেরে সরকার ‘আইএমএফ’এর কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিল। ‘আইএমএফ’এর শর্ত পূরণে দেশের মানুষের উপর কর বৃদ্ধি করে সরকার। ‘আইএমএফ’ দেশটার রপ্তানি বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য উদারীকরণের উপর চাপ দিলেও আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে কখনোই উপদেশ দেয়নি, যা কিনা সর্বদাই দেশটার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাবার মূল কারণ ছিল। স্বাবলম্বী হবার চেষ্টা না করে আমদানিনির্ভর অর্থনীতি হবার কারণে শ্রীলংকার অর্থনীতি আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে ওঠানামা করেছে। করোনার লকডাউন উঠে যাবার পর আন্তর্জাতিক বাজারে যখন জ্বালানি তেলের মূল্য বেড়ে যায়, তখন শ্রীলংকার আমদানি ব্যয়ও বাড়তে থাকে। আমদানি ব্যয় মেটাতে শ্রীলংকার সরকার বৈদেশিক ঋণের দিকে ঝুঁকে যায়। এর মাঝে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানির মূল্য আরেকবার বৃদ্ধি পাওয়া ছাড়াও পর্যটন শিল্প আরেকবার ধ্বসের মুখে পড়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের চেষ্টা শ্রীলংকাকে উন্মাদ করেছে। রপ্তানি, পর্যটন এবং রেমিট্যান্স থেকে শ্রীলংকা কম উপার্জন করেনি। কিন্তু উন্নততর লাইফস্টাইলও এতে পেয়ে বসেছে দেশটাকে। আমদানি করা জিনিসের প্রতি আগ্রহ দেশটার জনগণের কাছে স্বাবলম্বী হবার চেষ্টা করা থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর ফলশ্রুতিতে দেশটার উপর ‘আইএমএফ’এর মতো আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ‘দ্যা ডিপ্লোম্যাট’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় থামিল ভেনথান আনান্থাভিনায়াগান মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, স্বাধীনতার পর থেকে মোট ১৬ বার ‘আইএমএফ’এর দ্বারস্থ হতে হয়েছে শ্রীলংকাকে। প্রতিবারই ‘আইএমএফ’ দেশটার সরকারের উপর কঠিন শর্তারোপ করেছে, যা জনগণের জন্যে বয়ে এনেছে ভোগান্তি। কিন্তু এতে দেশটার অর্থনৈতিক সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আসেনি। বিদেশীদের কাছে ঋণের জন্যে হাত পেতেই চলতে হয়েছে দেশটাকে। বহু বছর তামিল টাইগারদের সাথে গৃহযুদ্ধের মাঝে ‘আইএমএফ’ দেশটার উপর নিয়ন্ত্রণ রেখেছে; যুদ্ধও চলেছে যুগের পর যুগ। অর্থাৎ শ্রীলংকা কখনোই স্বাধীন হতে পারেনি। অন্ততঃ পৃথিবীর প্রধান সমুদ্রপথের উপর অবস্থিত এই দ্বীপ দেশের উপর পশ্চিমারা কখনোই নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে রাজি ছিল না। মাহিন্দা রাজাপক্ষের জাতীয়তাবাদী সরকার ২০০৯ সালে গৃহযুদ্ধ শেষ করে শ্রীলংকাকে যুদ্ধের শৃংখল থেকে মুক্ত করলেও অর্থনৈতিক শৃংখল থেকে মুক্ত করার ফর্মূলা রাজাপক্ষেদের হাতে ছিল না; এখনও নেই। রাজাপক্ষেদের জাতীয়তাবাদী আবেগের চিন্তাগুলি অনেকের কাছে আকর্ষনীয় মনে হলেও তা পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে এড়িয়ে যায়না। ভেড়ার পালের মতো বাকিদের অনুসরণ করার বাইরে শ্রীলংকার হাতে কিছুই করার নেই। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনই যেন শ্রীলংকার সামনে একমাত্র আশা।
ভারত মহাসাগরের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র বাণিজ্যপথের উপর অবস্থিত শ্রীলংকার সমস্যা যেন হিমালয়সম হয়ে দাঁড়িয়েছে! দেশটায় মারাত্মক মূল্যস্ফীতি চলছে। তদুপরি অর্থ দিয়েও মানুষ তাদের দরকারি জিনিস কিনতে পারছে না। বিশেষ করে আমদানিকৃত যেকোন জিনিসই দুর্লভ হয়ে গেছে। আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্যে যথেষ্ট বৈদেশিক মুদ্রা দেশটার হাতে নেই। চরম অসন্তোষে মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। জরুরি অবস্থা এবং কারফিউ দিয়েও বিক্ষোভ থামানো যাচ্ছে না। সরকারের সকল মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপক্ষে পার্লামেন্টের সকল দলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন মন্ত্রীসভা তৈরি করার জন্যে, যাতে করে সমস্যার একটা সমাধান পাওয়া যায়। একসময় দক্ষিণ এশিয়াতে শ্রীলংকাকে সকলের জন্যে মডেল হিসেবে দেখানো হতো। দেশটার মাথাপিছু আয় ছিল প্রায় ৪ হাজার ডলার; যা কিনা আশেপাশের দেশগুলির প্রায় দ্বিগুণ! দেশটার শিক্ষার হার প্রায় ১’শ ভাগ। ২ কোটি ২০ লক্ষ জনসংখ্যার দেশটার জিডিপি প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলারের মতো। অথচ বারংবার দেশটাকে দেউলিয়া অবস্থান থেকে উদ্ধার পাবার জন্যে ‘আইএমএফ’এর সরণাপন্ন হতে হয়েছে। শ্রীলংকার সমস্যার গভীরে যেতে হলে দেশটার অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের যথেষ্ট বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
‘দ্যা ইকনমিক টাইমস’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০২০ সালে ‘আইএমএফ’ শ্রীলংকাকে প্রতিশ্রুত ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণের মাঝে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার দেয়ার পর ঋণের প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। এতে শ্রীলংকা করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে হিমসিম খেয়ে ওঠে। এর ফলশ্রুতিতে ২০২১এর ফেব্রুয়ারি মাসে শ্রীলংকা সরকার পুঁজি ধরে রাখার উদ্দেশ্যে কিছু নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেয়; যার মাঝে ছিল ছয় মাসের মাঝে রপ্তানির অর্থ দেশে ফেরত নিয়ে আসা; রপ্তানি আয়ের কিছু অংশকে রুপিতে পরিবর্তন করে নেয়া; বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহকে তাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের কিছু অংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য করা। এই পদক্ষেপগুলির উদ্দেশ্য ছিল ‘আইএমএফ’এর ঋণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং করোনার কারণে পর্যটন শিল্পে ভাটা পড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার যে ঘাটতি পড়েছে, সেটাকে কিছুটা পুষিয়ে নেয়া। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছিল যে, এর মাধ্যমে শ্রীলংকা বিদেশী ঋণের উপর নির্ভর না করে নিজস্ব সম্পদের উপর নির্ভরশীলতা বাড়াবে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এই পদক্ষেপগুলির মাধ্যমে আরও একটা লক্ষ্য অর্জিত হবে, তা হলো ‘আইএমএফ’এর শর্তের বেড়াজাল থেকে মুক্ত থাকা। শ্রীলংকার প্রতিমন্ত্রী অজিত নিভাদ কাব্রাল বলেন যে, সরকার আশা করছে যে, ২০২১ সালে দেশের মোট রপ্তানি আয় এবং রেমিটান্স মিলে আসবে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার; আর দেশ থেকে বের হবে মোট ২৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। এর ফলে দেশে ৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত থাকবে। কিন্তু বছর শেষে এই হিসেব পুরোপুরি উল্টে যায়।
পর্যটন শিল্পে ধ্বস এবং রেমিট্যান্স আয়ে হুন্ডি
দেশটার পর্যটন কর্তৃপক্ষ ফেব্রুয়ারি মাসে জানায় যে, ২০২১ সালে পর্যটন শিল্প প্রায় ৬’শ ৩৪ মিলিয়ন ডলার আয় করে। শ্রীলংকার ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’ বলছে যে, ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে যেখানে দেশটাতে মাত্র ১৭’শ পর্যটক এসেছিল, সেখানে ডিসেম্বর মাসে তা গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯০ হাজারে। আর পুরো বছরে এসেছিল ২ লক্ষের কিছু কম। গত জানুয়ারিতেও ৮২ হাজারের উপর পর্যটক এসেছিল। কিন্তু এটা খুশি হবার কোন খবর নয়; কারণ পর্যটন খাতে শ্রীলংকার আয় ২০১৮ সালে ছিল ৪ বিলিয়ন ডলারের উপর। সেবছর সেদেশে ২০ লক্ষাধিক পর্যটক এসেছিল। তবে ২০১৯ সালে সন্ত্রাসী হামলার পর আয় ৩ দশমিক ৬ বিলিয়নে নেমে আসে। আর ২০২০ সালে করোনার কারণে তা ৭’শ মিলিয়নের নিচে নেমে যায়! অর্থাৎ ২০১৮ সালের তুলনায় পর্যটন খাতে শ্রীলংকার আয় এখন ছয় ভাগের এক ভাগেরও কম!
শ্রীলংকা সরকার আশা করছিল যে, ২০২২ সালে দেশটায় ১০ লক্ষের বেশি পর্যটক আসবে। কিন্তু সেই আশা এখন ধুলোয় মিশে গেছে! ‘ব্লুমবার্গ’ বলছে যে, গত মার্চ মাসে শ্রীলংকার পর্যটন কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দেয় যে, ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে তাদের পর্যটন শিল্প আরও এক দফা সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে। কারণ রাশিয়া এবং ইউক্রেন থেকেই তাদের সবচাইতে বেশি পর্যটক এসে থাকে। ফেব্রুয়ারি মাসে শ্রীলংকায় মোট পর্যটকের মাঝে প্রায় ১৬ শতাংশ এসেছিল রাশিয়া থেকে।
অপরদিকে ২০২১ সালে রেমিট্যান্স আয় একেবারেই পড়ে যায়। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, গত বছর রেমিট্যান্স আয় ছিল প্রায় সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার; যা ছিল দশ বছরের মাঝে সর্বনিম্ন! শ্রীলংকার থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ভেরিটে রিসার্চ’ বলছে যে, রেমিট্যান্স আয় কমার মূল কারণ হলো সরকার অলিখিতভাবে ডলারের বিপরীতে রুপির মূল্য ২’শ থেকে ২’শ ৩এ নিয়ন্ত্রণ করেছে। অথচ খোলা বাজারে তখন এক ডলারে প্রায় আড়াই’শ রুপি পাওয়া যেতো। এর ফলে বেশিরভাগ প্রবাসী শ্রীলংকান হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠাতে থাকে। তবে সমস্যা হলো যখন দেশটার পর্যটন শিল্প শিখরে ছিল এবং রেমিট্যান্সও ভালো আসছিল, তখনও দেশটাকে বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে দেউলিয়াত্বের মাঝে পড়ে ‘আইএমএফ’এর দ্বারস্থ হতে হয়েছে। এর অর্থ হলো, মূল সমস্যা পর্যটন বা রেমিট্যান্স খাতে নয়; অন্য কোথাও।
আমদানি নির্ভরতা শেষ পর্যন্ত ‘আইএমএফ’এর কাছে নিয়ে গেলো শ্রীলংকাকে
গত জানুয়ারি মাসে শ্রীলংকার রপ্তানি উন্নয়ন সংস্থা জানায় যে, ২০২১ সালে দেশের মোট রপ্তানি আয় ছিল প্রায় সাড়ে ১২ বিলিয়ন ডলার, যা ছিল রপ্তানি টার্গেটের চাইতেও বেশি। কিন্তু ২০২০ সালের ডিসেম্বরে যেখানে শ্রীলংকার মাসিক বাণিজ্য ঘাটতি ছিল প্রায় সাড়ে ৫’শ মিলিয়ন ডলার, তা ২০২১এর ডিসেম্বরে এসে দাঁড়ায় ১ বিলিয়ন ডলারেরও উপর। এর মূল কারণ হলো, রপ্তানি বাড়ার হার যেখানে ছিল প্রায় ২০ শতাংশ, সেখানে আমদানি বেড়েছিল প্রায় ৪৭ শতাংশ হারে। গত ডিসেম্বরে শ্রীলংকা প্রায় ২ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছিল; যা ছিল দেশটার ইতিহাসে এক মাসে সর্বোচ্চ আমদানি।
শ্রীলংকার পত্রিকা ‘ইকনমি নেক্সট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, দেশটার আমদানি ব্যয় আগের বছরের ১৬ বিলিয়নের তুলনায় সাড়ে ২৮ শতাংশ বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ২০ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে। এই আমদানি দেশের জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশ। করোনার আগে ২০১৯ সালেও আমদানি ছিল ২০ বিলিয়নের চাইতে কম। এর ফলশ্রুতিতে দেশটার বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। সরকার গাড়ি আমদানির উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় গাড়ি আমদানির ব্যয় ২০১৯ সালে ৮’শ ১৬ মিলিয়ন ডলার থেকে মাত্র ১৩ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। তবে সার্বিকভাবে যেহেতু আমদানি ব্যয় কমানো সম্ভব হচ্ছে না, তাই রপ্তানি বৃদ্ধি করেও বাণিজ্য ঘাটতি কমানো অথবা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। এই মুহুর্তে পর্যটন শিল্পের অবস্থা খারাপ রয়েছে। কিন্তু পর্যটন শিল্প ভালো হলেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়বে না। কারণ যারা পর্যটন শিল্পের সাথে জড়িত, তারা খরচ বাড়াবে এবং ফলশ্রুতিতে আমদানি বাড়তে থাকবে। হোটেলগুলিও জরুরি মেরামতের কাজগুলি করবে এবং তাদের ঋণ ফেরত দিতে থাকবে। এর ফলে আরও বিনিয়োগ হবে এবং আমদানি বাড়বে। ব্যাংকগুলি যদি সরকারি বন্ড কেনে, সেটাও ব্যবহৃত হবে সরকারি কর্মচারিদের বেতন দিতে; যা কিনা আবারও আমদানি বাড়াবে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এই সমস্যার মূলে ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রুপি ছাপানো। যখন অর্থনীতে যথেষ্ট বৈদেশিক মুদ্রা আসছিলো না এবং সরকার যথেষ্ট আয় করতে পারছিলো না, তখন তারা সিদ্ধান্ত নেয় রুপি ছাপানো বৃদ্ধি করার। এতে মারত্মক মুদ্রাস্ফীতির সৃষ্টি হয়েছে। ঋণের উপর সুদের হার কম থাকায় বিনিয়োগ বেড়েছে এবং প্রচুর যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছে। ফলশ্রুতি যন্ত্রপাতি আমদানি ২ দশমিক ১ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ২ দশমিক ৮ বিলিয়নে উঠে গেছে। শিল্পের জন্যে ক্যাপিটাল গুডসএর আমদানি সাড়ে ৩ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৪ বিলিয়নে পৌঁছেছে। কন্সট্রাকশন দ্রব্যের আমদানি বেড়ে ১ বিলিয়ন থেকে হয়েছে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। খাদ্যদ্রব্য আমদানিতে খরচ হয়েছে দেড় বিলিয়ন ডলার। মোট ভোগ্যপণ্য আমদানি হয়েছে ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার; যা আগের বছর ছিল ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। বিরাট পরিবর্তন এসেছে জ্বালানি আমদানিতে। আড়াই বিলিয়ন ডলার থেকে জ্বালানি আমদানি ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে উঠে গেছে। এই মুহুর্তে মোট আমদানির ১৮ শতাংশ জ্বালানি; রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস শিল্পের জন্যে আমদানি করা কাপড় ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ; যন্ত্রপাতি ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ; খাদ্য বাদে অন্যান্য ভোগ্যপণ্য সাড়ে ১০ শতাংশ; খাদ্যদ্রব্য ৮ শতাংশ; ঔষধ ও মেডিক্যাল দ্রব্য ৪ শতাংশ।
শ্রীলংকার রাজাপক্ষে সরকার শেষ পর্যন্ত বাস্তবতার কাছে হার মেনেছে। ফলশ্রুতিতে সরকার গত ১৪ই মার্চ ‘আইএমএফ’এর সাথে আলোচনায় বসে। ক্ষমতা নেবার পর থেকে ‘আইএমএফ’এর কঠিন শর্তের বেড়াজাল এড়িয়ে চলার চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। ‘ব্লুমবার্গ’ বলছে যে, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে শ্রীলংকার ঋণদাতা দেশ ভারত এবং চীন অন্যদিকে ব্যস্ত। এর আগেই শ্রীলংকা সরকার রুপির মূল্য কমিয়ে ঋণ নেয়াকে আরও কঠিন করে দেয়। এই পদক্ষেপ ‘আইএমএফ’এর প্রেসক্রিপশনের মাঝে থাকায় অনেকেই ধারণা করে যে, সরকার খুব সম্ভবতঃ আবারও ‘আইএমএফ’এর কাছে যাচ্ছে। মার্চ মাস নাগাদ দেশটার বৈদেশিক রিজার্ভ ২ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসে। অথচ এবছরেই তাদের ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ফেরত দিতে হবে। এর মাঝে জুলাই মাসে ফেরত দিতে হবে ১ বিলিয়ন ডলারের বন্ড।
জন্মের পর থেকেই বৈদেশিক মুদ্রার পিছনে ছুটেছে শ্রীলংকা
‘সিএনবিসি’র এক প্রতিবেদনে মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, শ্রীলংকার অর্থনীতির করুণ দশা আজকের নয়। অর্থাৎ এই সমস্যার গভীরতা যথেষ্ট। ২০১৬ সালে দেশটার বৈদেশিক রিজার্ভ মারাত্মক নেমে গেলে সরকার ‘আইএমএফ’এর কাছে ঋণের জন্যে যেতে বাধ্য হয়। ‘আইএমএফ’এর শর্ত মেনে শ্রীলংকার সরকার দেড় বিলিয়ন ডলার ঋণ পায়। সেই বছরের শেষ নাগাদ দেশটার বৈদেশিক ঋণ প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকে। এমনকি সরকার নিজেই বলতে পারছিলো না যে, দেশটার মোট ঋণ আসলে কত। বৈদেশিক ঋণ ফেরত দেয়ার লক্ষ্যে সরকার ‘আইএমএফ’এর ফর্মূলায় মূল্য সংযোজন কর বৃদ্ধি করে। ২০১৮ সালে চীন শ্রীলংকাকে আরও ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ দেয়। ভারতের কাছ থেকে ঋণ না পেয়ে শ্রীলংকা বাংলাদেশের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে।
১৫ বছরের মাঝে দেশটার সবচাইতে মারাত্মক আর্থিক সমস্যার মাঝে ২০১৯ সালে গোতাবায়া রাজাপক্ষে এবং তার পরিবারবর্গ ক্ষমতায় আসে। তাদের প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল কর কমানো। মূল্য সংযোজন কর ১৫ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশে নামিয়ে আনা ছাড়াও সরকার বহু ক্ষেত্রে বিপুলভাবে কর কর্তন করে। সরকারের যুক্তি ছিল যে, কর কমালে বিনিয়োগ বাড়বে এবং অর্থনীতি চাঙ্গা হবে; জিডিপি বাড়বে। এর মাধ্যমে যেসব ক্ষেত্রে কর পাওয়া যেতো না, তারাও কর দেয়ার সামর্থ্য অর্জন করবে। কিন্তু ২০১৯ সালে সন্ত্রাসী হামলা এবং ২০২০ সালে করোনার লকডাউনের কারণে শ্রীলংকার অর্থনীতিতে ধ্বস নামে। আর রাজাপক্ষে সরকার ‘আইএমএফ’এর শর্ত বাস্তবায়নে গড়িমসি করায় ‘আইএমএফ’ ঋণ দেয়া বন্ধ করে দেয়। বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি পোষাতে না পেরে সরকার রুপি ছাপাতে থাকে। এতে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়।
২০১৯ সাল থেকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে গোতাবায়া রাজাপক্ষে সরকার জনগণের উপর কর কমানো থেকে সরে আসতে চায়নি। এর ফলশ্রুতিতে সরকারের রাজস্ব নিম্নগামী হয় এবং বৈদেশিক ঋণ ফেরত দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শ্রীলংকার সমস্যা শুধু রাজাপক্ষের পরিবার নয়। কারণ ২০১৯ সালে তারা ক্ষমতায় আসার আগেও দেশটার অর্থনীতি ধুঁকে ধুঁকে চলছিল। শ্রীলংকার অর্থনীতি গড়ে উঠেছে বৈদেশিক বাণিজ্যের উপর ভিত্তি করে। দেশটার অর্থনীতি পর্যটন খাত এবং রেমিট্যান্স থেকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে থাকার কারণে জনগণের খরচ বাড়তে থাকে। দেশের রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস খাত এবং পর্যটনমুখী হোটেল ব্যবসাও আমদানিনির্ভর থাকে। রপ্তানি বাড়লেও আমদানির সাথে পাল্লা দিয়ে উঠতে পারেনি কখনোই। ২০১৬ সালে দেশটার পর্যটন শিল্প যখন বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছিল, তখনও দেশের আমদানি ব্যয় মেটাতে না পেরে সরকার ‘আইএমএফ’এর কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিল। ‘আইএমএফ’এর শর্ত পূরণে দেশের মানুষের উপর কর বৃদ্ধি করে সরকার। ‘আইএমএফ’ দেশটার রপ্তানি বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য উদারীকরণের উপর চাপ দিলেও আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে কখনোই উপদেশ দেয়নি, যা কিনা সর্বদাই দেশটার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাবার মূল কারণ ছিল। স্বাবলম্বী হবার চেষ্টা না করে আমদানিনির্ভর অর্থনীতি হবার কারণে শ্রীলংকার অর্থনীতি আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে ওঠানামা করেছে। করোনার লকডাউন উঠে যাবার পর আন্তর্জাতিক বাজারে যখন জ্বালানি তেলের মূল্য বেড়ে যায়, তখন শ্রীলংকার আমদানি ব্যয়ও বাড়তে থাকে। আমদানি ব্যয় মেটাতে শ্রীলংকার সরকার বৈদেশিক ঋণের দিকে ঝুঁকে যায়। এর মাঝে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানির মূল্য আরেকবার বৃদ্ধি পাওয়া ছাড়াও পর্যটন শিল্প আরেকবার ধ্বসের মুখে পড়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের চেষ্টা শ্রীলংকাকে উন্মাদ করেছে। রপ্তানি, পর্যটন এবং রেমিট্যান্স থেকে শ্রীলংকা কম উপার্জন করেনি। কিন্তু উন্নততর লাইফস্টাইলও এতে পেয়ে বসেছে দেশটাকে। আমদানি করা জিনিসের প্রতি আগ্রহ দেশটার জনগণের কাছে স্বাবলম্বী হবার চেষ্টা করা থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর ফলশ্রুতিতে দেশটার উপর ‘আইএমএফ’এর মতো আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ‘দ্যা ডিপ্লোম্যাট’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় থামিল ভেনথান আনান্থাভিনায়াগান মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, স্বাধীনতার পর থেকে মোট ১৬ বার ‘আইএমএফ’এর দ্বারস্থ হতে হয়েছে শ্রীলংকাকে। প্রতিবারই ‘আইএমএফ’ দেশটার সরকারের উপর কঠিন শর্তারোপ করেছে, যা জনগণের জন্যে বয়ে এনেছে ভোগান্তি। কিন্তু এতে দেশটার অর্থনৈতিক সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আসেনি। বিদেশীদের কাছে ঋণের জন্যে হাত পেতেই চলতে হয়েছে দেশটাকে। বহু বছর তামিল টাইগারদের সাথে গৃহযুদ্ধের মাঝে ‘আইএমএফ’ দেশটার উপর নিয়ন্ত্রণ রেখেছে; যুদ্ধও চলেছে যুগের পর যুগ। অর্থাৎ শ্রীলংকা কখনোই স্বাধীন হতে পারেনি। অন্ততঃ পৃথিবীর প্রধান সমুদ্রপথের উপর অবস্থিত এই দ্বীপ দেশের উপর পশ্চিমারা কখনোই নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে রাজি ছিল না। মাহিন্দা রাজাপক্ষের জাতীয়তাবাদী সরকার ২০০৯ সালে গৃহযুদ্ধ শেষ করে শ্রীলংকাকে যুদ্ধের শৃংখল থেকে মুক্ত করলেও অর্থনৈতিক শৃংখল থেকে মুক্ত করার ফর্মূলা রাজাপক্ষেদের হাতে ছিল না; এখনও নেই। রাজাপক্ষেদের জাতীয়তাবাদী আবেগের চিন্তাগুলি অনেকের কাছে আকর্ষনীয় মনে হলেও তা পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে এড়িয়ে যায়না। ভেড়ার পালের মতো বাকিদের অনুসরণ করার বাইরে শ্রীলংকার হাতে কিছুই করার নেই। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনই যেন শ্রীলংকার সামনে একমাত্র আশা।
Labels:
Capitalism,
economics,
Geopolitics,
IMF,
Sri Lanka,
Ukraine War
Saturday, 2 April 2022
পাকিস্তানের রাজনৈতিক কলহের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব
০২রা এপ্রিল ২০২২
পাকিস্তানে যখন আবারও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তখন বেশিরভাগ মিডিয়াই ফোকাস করেছে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সরকার টিকবে কিনা, বা না টিকলে কে তার স্থলাভিষিক্ত হবে সেটা উপর। তবে দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক শক্তিধর এবং আঞ্চলিকভাবে প্রভাবশালী দেশ পাকিস্তানের রাজনীতির এই অস্থিরতার কারণ যেমন বেশ গভীর, তেমনি এর প্রভাবও হবে সুদূরপ্রসারী। বিশেষ করে আফগানিস্তানে পাকিস্তানের প্রভাব এবং পাকিস্তানে চীনের প্রভাব এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হবে। তবে এর আগে বর্তমান রাজনৈতিক সমস্যার পিছনের মূল কারণ অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনার উপর বিদেশী প্রভাবের ব্যাপারগুলিকে দেখতে হবে।
‘ফিনানশিয়াল টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, গত ডিসেম্বরে ইমরানের সরকার নতুন একটা আর্থিক আইন নিয়ে এসেছিল এমন সময়ে, যখন দেশের অর্থনীতি ধুঁকে ধুঁকে চলছিল। পাকিস্তান সরকারের হিসেবে দেশটার মুদ্রাস্ফীতি ১২ শতাংশের উপরে রয়েছে। এছাড়াও পাকিস্তানি রুপি সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের বিপরীতে ১৭ শতাংশের বেশি মূল্য হারিয়েছে। বাজারের বিভিন্ন দ্রব্যের মূল্য ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান’ বা ‘এসবিপি’ সাম্প্রতিক সময়ে দু’বার সুদের হার বাড়িয়ে ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশে উঠিয়েছে। ২০১৮ সালের অগাস্টে ক্ষমতায় আসার আগে ইমরান খানের সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, পাকিস্তানের অর্থনীতির ব্যাপক অস্থিরতার অবসান ঘটানো হবে। ১৯৮০এর দশক থেকে পাকিস্তান মোট ১২ বার ‘ইন্টারন্যাশনাল মনেটারি ফান্ড’ বা ‘আইএমএফ’এর কাছ থেকে ঋণ নিয়ে অর্থনৈতিক বিপদ থেকে বাঁচার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ইমরান নিজেই সেই একই পথে পা বাড়িয়েছেন। নতুন আইনের মাঝে ছিল সরকারের উন্নয়ন বাজেটে কর্তন, বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের ক্ষেত্রে সরকারের ভর্তুকি তুলে ফেলা, এবং কাঁচামাল ও ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্পের জন্যে যে সেলস ট্যাক্স ছাড় ছিল, তা তুলে নেয়া। এই পদক্ষেপগুলি ছিল ‘আইএমএফ’এর প্রেসক্রিপশন। ‘আইএমএফ’ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারের ঋণ পেতে ইমরানের সরকার এই আইনগুলি নিয়ে এসেছিল। ২০১৯ সালে পাকিস্তানের সাথে সমঝোতায় পৌছাবার পরেও শর্ত বাস্তবায়ন না করার কারণে ২০২১ সালে ঋণ দেয়া বন্ধ করে দেয় ‘আইএমএফ’। ২০২২ সালে নতুন করে ১ বিলিয়ন ডলার ছাড় দেয়ার জন্যে পাকিস্তান সরকার শর্ত পূরণে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’ বলছে যে, সেলস ট্যাক্স দেয়ার কারণে পাকিস্তানের প্রান্তিক জনগণ সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এরপরেও গত ১৩ই জানুয়ারি পাকিস্তানের পার্লামেন্টে তুমুল বিতন্ডার মাঝেই ১’শ ৬৩ বনাম ১’শ ৪৬ ভোটে এই আইনে কিছু পরিবর্তন এনে পাস হয়।
‘আইএমএফ’এর শর্ত পূরণ করতে গিয়ে নতুন আর্থিক আইন বাদেও আরেকটা আইন ইমরানের সরকার নিয়ে আসে, যা পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘এসবিপি’এর স্বায়ত্বশাসনের ব্যাপারে। অনেকেই বলেছেন যে, এর ফলে ‘এসবিপি’এর কোন জবাবদিহিতা থাকবে না; এবং ‘এসবিপি’এর গভর্নর বাস্তবিকপক্ষে পাকিস্তানের ‘অর্থনৈতিক ভাইসরয়’ হয়ে যাবেন। পাকিস্তানের পত্রিকা ‘ডন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, নতুন আইন অনুযায়ী ‘এসবিপি’র বোর্ড অব ডিরেক্টরসে সরকারের প্রতিনিধি থাকলেও তাদের কোন ভোটাধিকার থাকবে না। সরকার ‘এসবিপি’ থেকে কোন ঋণ নিতে পারবে না; এবং ‘এসবিপি’ও সরাসরি কোন সরকারি বন্ড কিনতে পারবে না।
সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক চাপের মাঝে ইমরান খানের দল ‘পিটিআই’এর সাথে শরীক দলগুলি দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছে। ‘এমকিউএম’ এবং ‘পিএমএল-কিউ’এর সদস্যরা বিরোধী দলের সাথে খোলাখুলিভাবেই কথা বলেছে। অনেকেই বলছেন যে, এর অর্থ হলো পাকিস্তানের রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব রাখা সামরিক বাহিনী এবং তাদের ইন্টেলিজেন্স সংস্থা ‘আইএসআই’ এটা হতে দিচ্ছে। যেটা মূলতঃ ইমরানের সরকারের উপর থেকে সামরিক বাহিনীর আস্থা তুলে নেবারই লক্ষণ।
এদিকে চীনারা পাকিস্তানের দ্বন্দ্বকে কিভাবে দেখছে, তার গুরুত্ব যথেষ্ট। ‘নিকেই এশিয়া’র এক প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে যে, এই দ্বন্দ্বে চীনারা অপেক্ষা করার নীতিতে রয়েছে। চীনের পছন্দের দল হলো প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের দল ‘পিএমএল-এন’। তবে তারা বাধ্য হলে ইমরানের ‘পিটিআই’এর সাথেও কাজ করে যাবে। ইসলামাবাদের ‘কায়েদ ই-আজম ইউনিভার্সিটি’র এসোসিয়েট প্রফেসর ইশতিয়াক আহমেদ বলছেন যে, ২০১৮ সাল থেকে ইমরানের সরকারের অধীনে চীনের অর্থায়নে পাকিস্তানের সবচাইতে বড় প্রকল্প ৫০ বিলিয়ন ডলারের ‘চায়না পাকিস্তান ইকনমিক করিডোর’ বা ‘সিপেক’এর অগ্রগতি বেশ কমই ছিল। এতে মনক্ষুন্ন হওয়া চীনারা হয়তো মনে করতে পারে যে, ‘পিএমএল-এন’ ক্ষমতায় আসলে এই প্রকল্প নতুনভাবে গুরুত্ব পাবে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘উইলসন সেন্টার’এর ডেপুটি ডিরেক্টর মাইকেল কুগেলম্যান বলছেন যে, ‘সিপেক’ প্রকল্প শুরু করেছিল ‘পিএমএল-এন’। সেই হিসেবে তাদের সাথে চীনাদের সাচ্ছন্দ্য অপেক্ষাকৃত বেশি। আর চীনারা এও মনে করেছে যে, ইমরান এই প্রকল্পের এবং পাকিস্তানে কাজ করা চীনা নাগরিকদের যথেষ্ট নিরাপত্তা দেয়নি। তবে ‘সারগোদা ইউনিভার্সিটি’র ‘পাকিস্তান ইন্সটিটিউট অব চায়না স্টাডিজ’এর ডিরেক্টর ফজল রেহমান বলছেন যে, যদি ইমরান খানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়, সেক্ষেত্রে পাকিস্তানের রাস্তায় বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক অসন্তোষ দেখা দিতে পারে; যা কিনা অর্থনৈতিক দৈন্যতার মাঝে আরও জটিল সমস্যার জন্ম দেবে। সেই হিসেবে চীনারা চাইবে ইমরান তার পুরো সময় শেষ করে ক্ষমতা হস্তান্তর করুক।
মাইকেল কুগেলম্যান বলছেন যে, চীনাদের মূল চিন্তা হলো অনিশ্চয়তা এবং অস্থিতিশীলতা। যদি পাকিস্তানে সরকার পরিবর্তনে সময়ক্ষেপণ হয়, তাহলে চীনাদের সেই ভয়টাই বাস্তবে রূপ নেবে। তবে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাগুলির মাঝ দিয়ে যে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়েছে তা হলো, পশ্চিমা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘আইএমএফ’এর শর্তগুলি পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশাকে আরও ঘনীভূত করেছে; যার ফলশ্রুতিতে পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গন অস্থিরতার মাঝে পড়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর ইমরান খানের উপর থেকে তাদের আস্থা সরিয়ে নেবার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তথাপি পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে ‘আইএমএফ’এর নিয়ন্ত্রণকে এড়াতে সক্ষম নয়, সেটাও এখন পরিষ্কার। আফগানিস্তান থেকে মার্কিন বাহিনীর পলায়নের পর থেকে কাবুলের তালিবান সরকারের উপর পাকিস্তানের সামরিক ইন্টেলিজেন্স যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে রয়েছে। সেই হিসেবে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কাবুলের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্যে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি পাকিস্তানে চীনাদের কৌশলগত প্রকল্পগুলি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।
পাকিস্তানে যখন আবারও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তখন বেশিরভাগ মিডিয়াই ফোকাস করেছে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সরকার টিকবে কিনা, বা না টিকলে কে তার স্থলাভিষিক্ত হবে সেটা উপর। তবে দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক শক্তিধর এবং আঞ্চলিকভাবে প্রভাবশালী দেশ পাকিস্তানের রাজনীতির এই অস্থিরতার কারণ যেমন বেশ গভীর, তেমনি এর প্রভাবও হবে সুদূরপ্রসারী। বিশেষ করে আফগানিস্তানে পাকিস্তানের প্রভাব এবং পাকিস্তানে চীনের প্রভাব এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হবে। তবে এর আগে বর্তমান রাজনৈতিক সমস্যার পিছনের মূল কারণ অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনার উপর বিদেশী প্রভাবের ব্যাপারগুলিকে দেখতে হবে।
‘ফিনানশিয়াল টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, গত ডিসেম্বরে ইমরানের সরকার নতুন একটা আর্থিক আইন নিয়ে এসেছিল এমন সময়ে, যখন দেশের অর্থনীতি ধুঁকে ধুঁকে চলছিল। পাকিস্তান সরকারের হিসেবে দেশটার মুদ্রাস্ফীতি ১২ শতাংশের উপরে রয়েছে। এছাড়াও পাকিস্তানি রুপি সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের বিপরীতে ১৭ শতাংশের বেশি মূল্য হারিয়েছে। বাজারের বিভিন্ন দ্রব্যের মূল্য ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান’ বা ‘এসবিপি’ সাম্প্রতিক সময়ে দু’বার সুদের হার বাড়িয়ে ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশে উঠিয়েছে। ২০১৮ সালের অগাস্টে ক্ষমতায় আসার আগে ইমরান খানের সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, পাকিস্তানের অর্থনীতির ব্যাপক অস্থিরতার অবসান ঘটানো হবে। ১৯৮০এর দশক থেকে পাকিস্তান মোট ১২ বার ‘ইন্টারন্যাশনাল মনেটারি ফান্ড’ বা ‘আইএমএফ’এর কাছ থেকে ঋণ নিয়ে অর্থনৈতিক বিপদ থেকে বাঁচার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ইমরান নিজেই সেই একই পথে পা বাড়িয়েছেন। নতুন আইনের মাঝে ছিল সরকারের উন্নয়ন বাজেটে কর্তন, বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের ক্ষেত্রে সরকারের ভর্তুকি তুলে ফেলা, এবং কাঁচামাল ও ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্পের জন্যে যে সেলস ট্যাক্স ছাড় ছিল, তা তুলে নেয়া। এই পদক্ষেপগুলি ছিল ‘আইএমএফ’এর প্রেসক্রিপশন। ‘আইএমএফ’ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারের ঋণ পেতে ইমরানের সরকার এই আইনগুলি নিয়ে এসেছিল। ২০১৯ সালে পাকিস্তানের সাথে সমঝোতায় পৌছাবার পরেও শর্ত বাস্তবায়ন না করার কারণে ২০২১ সালে ঋণ দেয়া বন্ধ করে দেয় ‘আইএমএফ’। ২০২২ সালে নতুন করে ১ বিলিয়ন ডলার ছাড় দেয়ার জন্যে পাকিস্তান সরকার শর্ত পূরণে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’ বলছে যে, সেলস ট্যাক্স দেয়ার কারণে পাকিস্তানের প্রান্তিক জনগণ সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এরপরেও গত ১৩ই জানুয়ারি পাকিস্তানের পার্লামেন্টে তুমুল বিতন্ডার মাঝেই ১’শ ৬৩ বনাম ১’শ ৪৬ ভোটে এই আইনে কিছু পরিবর্তন এনে পাস হয়।
‘আইএমএফ’এর শর্ত পূরণ করতে গিয়ে নতুন আর্থিক আইন বাদেও আরেকটা আইন ইমরানের সরকার নিয়ে আসে, যা পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘এসবিপি’এর স্বায়ত্বশাসনের ব্যাপারে। অনেকেই বলেছেন যে, এর ফলে ‘এসবিপি’এর কোন জবাবদিহিতা থাকবে না; এবং ‘এসবিপি’এর গভর্নর বাস্তবিকপক্ষে পাকিস্তানের ‘অর্থনৈতিক ভাইসরয়’ হয়ে যাবেন। পাকিস্তানের পত্রিকা ‘ডন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, নতুন আইন অনুযায়ী ‘এসবিপি’র বোর্ড অব ডিরেক্টরসে সরকারের প্রতিনিধি থাকলেও তাদের কোন ভোটাধিকার থাকবে না। সরকার ‘এসবিপি’ থেকে কোন ঋণ নিতে পারবে না; এবং ‘এসবিপি’ও সরাসরি কোন সরকারি বন্ড কিনতে পারবে না।
সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক চাপের মাঝে ইমরান খানের দল ‘পিটিআই’এর সাথে শরীক দলগুলি দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছে। ‘এমকিউএম’ এবং ‘পিএমএল-কিউ’এর সদস্যরা বিরোধী দলের সাথে খোলাখুলিভাবেই কথা বলেছে। অনেকেই বলছেন যে, এর অর্থ হলো পাকিস্তানের রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব রাখা সামরিক বাহিনী এবং তাদের ইন্টেলিজেন্স সংস্থা ‘আইএসআই’ এটা হতে দিচ্ছে। যেটা মূলতঃ ইমরানের সরকারের উপর থেকে সামরিক বাহিনীর আস্থা তুলে নেবারই লক্ষণ।
এদিকে চীনারা পাকিস্তানের দ্বন্দ্বকে কিভাবে দেখছে, তার গুরুত্ব যথেষ্ট। ‘নিকেই এশিয়া’র এক প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে যে, এই দ্বন্দ্বে চীনারা অপেক্ষা করার নীতিতে রয়েছে। চীনের পছন্দের দল হলো প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের দল ‘পিএমএল-এন’। তবে তারা বাধ্য হলে ইমরানের ‘পিটিআই’এর সাথেও কাজ করে যাবে। ইসলামাবাদের ‘কায়েদ ই-আজম ইউনিভার্সিটি’র এসোসিয়েট প্রফেসর ইশতিয়াক আহমেদ বলছেন যে, ২০১৮ সাল থেকে ইমরানের সরকারের অধীনে চীনের অর্থায়নে পাকিস্তানের সবচাইতে বড় প্রকল্প ৫০ বিলিয়ন ডলারের ‘চায়না পাকিস্তান ইকনমিক করিডোর’ বা ‘সিপেক’এর অগ্রগতি বেশ কমই ছিল। এতে মনক্ষুন্ন হওয়া চীনারা হয়তো মনে করতে পারে যে, ‘পিএমএল-এন’ ক্ষমতায় আসলে এই প্রকল্প নতুনভাবে গুরুত্ব পাবে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘উইলসন সেন্টার’এর ডেপুটি ডিরেক্টর মাইকেল কুগেলম্যান বলছেন যে, ‘সিপেক’ প্রকল্প শুরু করেছিল ‘পিএমএল-এন’। সেই হিসেবে তাদের সাথে চীনাদের সাচ্ছন্দ্য অপেক্ষাকৃত বেশি। আর চীনারা এও মনে করেছে যে, ইমরান এই প্রকল্পের এবং পাকিস্তানে কাজ করা চীনা নাগরিকদের যথেষ্ট নিরাপত্তা দেয়নি। তবে ‘সারগোদা ইউনিভার্সিটি’র ‘পাকিস্তান ইন্সটিটিউট অব চায়না স্টাডিজ’এর ডিরেক্টর ফজল রেহমান বলছেন যে, যদি ইমরান খানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়, সেক্ষেত্রে পাকিস্তানের রাস্তায় বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক অসন্তোষ দেখা দিতে পারে; যা কিনা অর্থনৈতিক দৈন্যতার মাঝে আরও জটিল সমস্যার জন্ম দেবে। সেই হিসেবে চীনারা চাইবে ইমরান তার পুরো সময় শেষ করে ক্ষমতা হস্তান্তর করুক।
মাইকেল কুগেলম্যান বলছেন যে, চীনাদের মূল চিন্তা হলো অনিশ্চয়তা এবং অস্থিতিশীলতা। যদি পাকিস্তানে সরকার পরিবর্তনে সময়ক্ষেপণ হয়, তাহলে চীনাদের সেই ভয়টাই বাস্তবে রূপ নেবে। তবে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাগুলির মাঝ দিয়ে যে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়েছে তা হলো, পশ্চিমা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘আইএমএফ’এর শর্তগুলি পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশাকে আরও ঘনীভূত করেছে; যার ফলশ্রুতিতে পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গন অস্থিরতার মাঝে পড়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর ইমরান খানের উপর থেকে তাদের আস্থা সরিয়ে নেবার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তথাপি পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে ‘আইএমএফ’এর নিয়ন্ত্রণকে এড়াতে সক্ষম নয়, সেটাও এখন পরিষ্কার। আফগানিস্তান থেকে মার্কিন বাহিনীর পলায়নের পর থেকে কাবুলের তালিবান সরকারের উপর পাকিস্তানের সামরিক ইন্টেলিজেন্স যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে রয়েছে। সেই হিসেবে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কাবুলের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্যে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি পাকিস্তানে চীনাদের কৌশলগত প্রকল্পগুলি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।
Labels:
Afghanistan,
China,
Geopolitics,
IMF,
Imran Khan,
Pakistan,
USA
Saturday, 30 October 2021
সুদানে অভ্যুত্থান মূলতঃ পশ্চিমা হস্তক্ষেপেরই ফলাফল
৩০শে অক্টবর ২০২১
গত ২৫শে অক্টোবর আফ্রিকার দেশ সুদানে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর থেকে দেশটার চরমভাবে বিভক্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব অর্থহীন হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সুদানের মারাত্মক অর্থনৈতিক বিপর্জয় ২০১৯ সালে একনায়ক ওমর আল বশিরের সরকারের পতনের পিছনে নেতৃত্ব দেয়া জোট ‘ফোর্সেস অব ফ্রিডম এন্ড চেইঞ্জ’ বা ‘এফএফসি’কে মানুষের কাছে হেয় করেছে। ২০১৯ সালের অগাস্টে দেশ পরিচালনার জন্যে ‘এফএফসি’এর মনোনীত পাঁচজন এবং সেনাবাহিনীর মনোনীত পাঁচজন সদস্য মিলে ‘সভেরেইন কাউন্সিল’ গঠন করেছিল। তবে দুই বছরের মাঝে ‘এফএফসি’র নেতৃবৃন্দ দেশটাকে কোনরূপ দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের সম্ভাবনার কথা বেশ কিছুদিন আগ থেকেই শোনা যাচ্ছিল। ২০২২ সালের নভেম্বরে প্রতিশ্রুত গণতান্ত্রিক নির্বাচনের আগেই এই অভ্যুত্থানকে শুধু সুদানের অভ্যন্তরীণ আঙ্গিক থেকে নয়, বরং দেশটা আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে।
সুদানের দুই রাজনৈতিক দল গত ২রা অক্টোবর একটা নতুন জোট গঠন করে। মিনি মিনাউইএর নেতৃত্বে ‘সুদান লিবারেশন মুভমেন্ট’ এবং জিবরিল ইব্রাহিমের নেতৃত্বে ‘জাস্টিস এন্ড ইকুয়ালিটি মুভমেন্ট’ এই জোট গঠন করে। এই দলগুলি ২০২০এর অক্টোবরে সুদান সরকারের সাথে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। এরপর থেকে উভয় নেতাই এতদিন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন। মিনাউই বলেন যে, তারা চান যে, ‘এফএফসি’র নেতারা তাদের কথা শুনবেন। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, এর ফলে ‘এফএফসি’এর বিভাজন আরও গভীর হয়। এই দুই রাজনৈতিক দল মূলতঃ দারফুর অঞ্চলের সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠন; যারা বশির সরকারের সময় আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের জন্যে যুদ্ধ করেছে। ‘এফএফসি’র মাঝে আরও রয়েছে দক্ষিণ সুদানের সীমানায় অবস্থিত কুরদুফান অঞ্চলের বিদ্রোহী দল ‘সুদান পিপলস লিবারেশন মুভমেন্ট নর্থ’। এছাড়াও রয়েছে দারফুরের ওয়াহিদ আল নূরএর নেতৃত্বে ‘সুদান লিবারেশন মুভমেন্ট’এর আরেক অংশ। অস্ত্র নিয়ে সংগ্রাম করা এই দলগুলি একত্রে ‘সুদান রেভোলিউশনারি ফ্রন্ট’ নামে ‘এফএফসি’র মাঝে ছিল। এই আঞ্চলিক বিদ্রোহী গ্রুপগুলি সুদানের ভৌগোলিক অখন্ডতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই গ্রুপগুলিকে আঞ্চলিক এবং পশ্চিমা শক্তিরা সরাসরি বা প্রচ্ছন্ন সমর্থন দিয়েছে। সবচাইতে বড় উদাহরণ ছিল দক্ষিণ সুদান, যা সুদান থেকে আলাদা হয়ে যায় পশ্চিমা মদদে।
‘এফএফসি’র আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ‘ন্যাশনাল কনসেনসাস ফোর্সেস’; যাদের মূল নেতৃত্ব ছিল জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক দলগুলির হাতে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী সাদিক আল মাহদির প্রতিষ্ঠা করা ‘ন্যাশনাল উম্মা পার্টি’র সাথে কোয়ালিশনে ছিল বামপন্থী ‘সুদানিজ বাথ পার্টি’, ‘সুদানিজ কমিউনিস্ট পার্টি’ এবং হাসান আল তুরাবির প্রতিষ্ঠা করা ‘পপুলার কংগ্রেস পার্টি’। এই দলগুলি বরাবরই পশ্চিমা, বিশেষ করে ইউরোপের কাছ থেকে সমর্থন পেয়েছে। ১৯৮৯ সালে সাদিক আল মাহদির সরকারকে উৎখাত করেই ওমর আল বশির ক্ষমতা দখল করেছিলেন। এরপর থেকে মাহদি বশির সরকারের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। ‘এফএফসি’তে আরও অংশীদার ছিল বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের সমন্বয়ে গঠিত ‘সুদানিজ প্রফেশনালস এসোসিয়েশন’ এবং আরও কিছু নারীবাদী সংগঠন; যেগুলি গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের মাপকাঠিতে ইউরোপ থেকে সরাসরি সমর্থন পেয়েছে।
সুদানের অর্থনৈতিক দৈন্যতাকে পশ্চিমা নীতি থেকে আলাদা করে দেখা যাবে না। এবছরের ২৯শে জুন ‘ইন্টারন্যাশনাল মনেটারি ফান্ড বা ‘আইএমএফ’এর প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা এবং বিশ্বব্যাংকের প্রধান ডেভিড ম্যালপাসের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, সংস্থাগুলির শর্ত হিসেবে সুদান তার নিজস্ব মুদ্রার মূল্যমান পুনর্নিধারণ করার পর বিশ্বব্যংকের ঋণ শোধ করে। এতে তিন দশক পর বিশ্বব্যংকের সাথে সুদানের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। বিশ্বব্যংকের শর্ত মানার পুরষ্কার হিসেবে ‘আইএমএফ’ দেশটার ২৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণ মওকুফ করে। এই মওকুফ সামনের দিনগুলিতে ৫০ বিলিয়ন ডলার বা দেশটার মোট বৈদেশিক ঋণের ৯০ শতাংশ ছাপিয়ে যাবে। তবে ঋণ মাফের শর্ত হিসেবে মুদ্রামান কমিয়ে ফেলায় সুদানে মুদ্রাস্ফীতি মারাত্মক আকার ধারণ করে। দ্রব্যমূল্যের ব্যাপক ঊর্ধগতির সাথে যুক্ত হয় চরম বেকারত্ব; যা কিনা জনগণকে দেশটার রাস্তায় নামায়। সুদানের বিরোধী রাজনীতিবিদেরা এই অসন্তোষের সুযোগ নিয়ে বশিরের সরকারকে উৎখাতে সফলতা পেলেও সেই একই অসন্তোষ বেসামরিক ও সামরিক যৌথ নেতৃত্বকে অর্থহীন করেছে।
ওমর আল বশির ক্ষমতায় থাকার সময়েই যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদের সমর্থনকারী দেশের তালিকা থেকে সুদানের নাম সরিয়ে নেয়। বিনিময়ে সুদান মানবাধিকার বিষয়ে সুদানের কিছু আইন পরিবর্তন করে। দক্ষিণ সুদানের তেলখনিগুলি সুদান থেকে আলাদা হয়ে যাবার পর থেকেই সুদানের অর্থনীতি বিপদে পড়ে। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনেই সৌদি আরব সুদানকে তেল সরবরাহসহ আর্থিক সহায়তা দিতে থাকে। ইয়েমেনের যুদ্ধে সুদান সৌদিদের পক্ষে সৈন্যও প্রেরণ করে। গত এপ্রিলে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ঘোষণা দেয় যে, কৃষিখাতে তারা এবছর সুদানকে ৪’শ মিলিয়ন ডলার দেবে। এই সহায়তা মূলতঃ ৩ বিলিয়ন ডলারের মূল সহায়তার অংশ। সুদান সরকারের বরাত দিয়ে ‘ভয়েস অব আমেরিকা’ বলে যে, এর মাঝে সাড়ে ৭’শ মিলিয়ন ডলার ইতোমধ্যেই সুদান পেয়ে গেছে; যার মাঝে ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্যে ৫’শ মিলিয়ন ডলারের পুঁজি। দুই বছর আগের আরও দেড় বিলিয়ন ডলারের অনুদানও নিশ্চিত করা হয়। ‘আরব নিউজ’ বলছে যে, অভ্যুত্থানে সৌদিরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং তারা সকল পক্ষকে আলোচনার টেবিলে দেখতে চায়।
ওয়াশিংটন আপাততঃ সুদানের অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধাচরণ করলেও সুদানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দেখিয়ে দেয় যে, মার্কিনীরা সুদানের সামরিক বাহিনীর সাথে সম্পর্ক কখনোই কর্তন করেনি। মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘দ্যা আটলান্টিক কাউন্সিল’এর সিনিয়র ফেলো ক্যামেরন হাডসন এক লেখায় সুদানের সমস্যার জন্যে সামরিক বাহিনীকে পুরোপুরি দায়ী করেন। তার কথায়, সুদানের সেনাবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বোকা বানিয়েছে’; যা বারংবার হতে দেয়া যায় না। তিনি অবশ্য সুদানের অর্থনীতিতে ‘আইএমএফ’ এবং বিশ্বব্যাংকের চাপিয়ে দেয়া শর্তের ফলাফলগুলি ঠিকই এড়িয়ে যান। তবে আরবের মার্কিন বন্ধু দেশগুলির সুদানের সাথে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, সুদানের অভ্যুত্থানে মিশর, সৌদি বা আমিরাত যেন সরাসরি সমর্থন না দেয়, সেজন্য ওয়াশিংটন যথেষ্ট কূটনৈতিক তৎপরতা চালায়। সুদানের রাজনীতিতে ইউরোপের প্রভাবের কথাও তিনি আলোচনায় আনেননি; যা বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে পরিপূর্ণতা দেয় না।
গত ২৫শে অক্টোবর আফ্রিকার দেশ সুদানে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর থেকে দেশটার চরমভাবে বিভক্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব অর্থহীন হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সুদানের মারাত্মক অর্থনৈতিক বিপর্জয় ২০১৯ সালে একনায়ক ওমর আল বশিরের সরকারের পতনের পিছনে নেতৃত্ব দেয়া জোট ‘ফোর্সেস অব ফ্রিডম এন্ড চেইঞ্জ’ বা ‘এফএফসি’কে মানুষের কাছে হেয় করেছে। ২০১৯ সালের অগাস্টে দেশ পরিচালনার জন্যে ‘এফএফসি’এর মনোনীত পাঁচজন এবং সেনাবাহিনীর মনোনীত পাঁচজন সদস্য মিলে ‘সভেরেইন কাউন্সিল’ গঠন করেছিল। তবে দুই বছরের মাঝে ‘এফএফসি’র নেতৃবৃন্দ দেশটাকে কোনরূপ দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের সম্ভাবনার কথা বেশ কিছুদিন আগ থেকেই শোনা যাচ্ছিল। ২০২২ সালের নভেম্বরে প্রতিশ্রুত গণতান্ত্রিক নির্বাচনের আগেই এই অভ্যুত্থানকে শুধু সুদানের অভ্যন্তরীণ আঙ্গিক থেকে নয়, বরং দেশটা আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে।
সুদানের দুই রাজনৈতিক দল গত ২রা অক্টোবর একটা নতুন জোট গঠন করে। মিনি মিনাউইএর নেতৃত্বে ‘সুদান লিবারেশন মুভমেন্ট’ এবং জিবরিল ইব্রাহিমের নেতৃত্বে ‘জাস্টিস এন্ড ইকুয়ালিটি মুভমেন্ট’ এই জোট গঠন করে। এই দলগুলি ২০২০এর অক্টোবরে সুদান সরকারের সাথে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। এরপর থেকে উভয় নেতাই এতদিন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন। মিনাউই বলেন যে, তারা চান যে, ‘এফএফসি’র নেতারা তাদের কথা শুনবেন। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, এর ফলে ‘এফএফসি’এর বিভাজন আরও গভীর হয়। এই দুই রাজনৈতিক দল মূলতঃ দারফুর অঞ্চলের সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠন; যারা বশির সরকারের সময় আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের জন্যে যুদ্ধ করেছে। ‘এফএফসি’র মাঝে আরও রয়েছে দক্ষিণ সুদানের সীমানায় অবস্থিত কুরদুফান অঞ্চলের বিদ্রোহী দল ‘সুদান পিপলস লিবারেশন মুভমেন্ট নর্থ’। এছাড়াও রয়েছে দারফুরের ওয়াহিদ আল নূরএর নেতৃত্বে ‘সুদান লিবারেশন মুভমেন্ট’এর আরেক অংশ। অস্ত্র নিয়ে সংগ্রাম করা এই দলগুলি একত্রে ‘সুদান রেভোলিউশনারি ফ্রন্ট’ নামে ‘এফএফসি’র মাঝে ছিল। এই আঞ্চলিক বিদ্রোহী গ্রুপগুলি সুদানের ভৌগোলিক অখন্ডতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই গ্রুপগুলিকে আঞ্চলিক এবং পশ্চিমা শক্তিরা সরাসরি বা প্রচ্ছন্ন সমর্থন দিয়েছে। সবচাইতে বড় উদাহরণ ছিল দক্ষিণ সুদান, যা সুদান থেকে আলাদা হয়ে যায় পশ্চিমা মদদে।
‘এফএফসি’র আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ‘ন্যাশনাল কনসেনসাস ফোর্সেস’; যাদের মূল নেতৃত্ব ছিল জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক দলগুলির হাতে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী সাদিক আল মাহদির প্রতিষ্ঠা করা ‘ন্যাশনাল উম্মা পার্টি’র সাথে কোয়ালিশনে ছিল বামপন্থী ‘সুদানিজ বাথ পার্টি’, ‘সুদানিজ কমিউনিস্ট পার্টি’ এবং হাসান আল তুরাবির প্রতিষ্ঠা করা ‘পপুলার কংগ্রেস পার্টি’। এই দলগুলি বরাবরই পশ্চিমা, বিশেষ করে ইউরোপের কাছ থেকে সমর্থন পেয়েছে। ১৯৮৯ সালে সাদিক আল মাহদির সরকারকে উৎখাত করেই ওমর আল বশির ক্ষমতা দখল করেছিলেন। এরপর থেকে মাহদি বশির সরকারের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। ‘এফএফসি’তে আরও অংশীদার ছিল বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের সমন্বয়ে গঠিত ‘সুদানিজ প্রফেশনালস এসোসিয়েশন’ এবং আরও কিছু নারীবাদী সংগঠন; যেগুলি গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের মাপকাঠিতে ইউরোপ থেকে সরাসরি সমর্থন পেয়েছে।
সুদানের অর্থনৈতিক দৈন্যতাকে পশ্চিমা নীতি থেকে আলাদা করে দেখা যাবে না। এবছরের ২৯শে জুন ‘ইন্টারন্যাশনাল মনেটারি ফান্ড বা ‘আইএমএফ’এর প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা এবং বিশ্বব্যাংকের প্রধান ডেভিড ম্যালপাসের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, সংস্থাগুলির শর্ত হিসেবে সুদান তার নিজস্ব মুদ্রার মূল্যমান পুনর্নিধারণ করার পর বিশ্বব্যংকের ঋণ শোধ করে। এতে তিন দশক পর বিশ্বব্যংকের সাথে সুদানের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। বিশ্বব্যংকের শর্ত মানার পুরষ্কার হিসেবে ‘আইএমএফ’ দেশটার ২৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণ মওকুফ করে। এই মওকুফ সামনের দিনগুলিতে ৫০ বিলিয়ন ডলার বা দেশটার মোট বৈদেশিক ঋণের ৯০ শতাংশ ছাপিয়ে যাবে। তবে ঋণ মাফের শর্ত হিসেবে মুদ্রামান কমিয়ে ফেলায় সুদানে মুদ্রাস্ফীতি মারাত্মক আকার ধারণ করে। দ্রব্যমূল্যের ব্যাপক ঊর্ধগতির সাথে যুক্ত হয় চরম বেকারত্ব; যা কিনা জনগণকে দেশটার রাস্তায় নামায়। সুদানের বিরোধী রাজনীতিবিদেরা এই অসন্তোষের সুযোগ নিয়ে বশিরের সরকারকে উৎখাতে সফলতা পেলেও সেই একই অসন্তোষ বেসামরিক ও সামরিক যৌথ নেতৃত্বকে অর্থহীন করেছে।
ওমর আল বশির ক্ষমতায় থাকার সময়েই যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদের সমর্থনকারী দেশের তালিকা থেকে সুদানের নাম সরিয়ে নেয়। বিনিময়ে সুদান মানবাধিকার বিষয়ে সুদানের কিছু আইন পরিবর্তন করে। দক্ষিণ সুদানের তেলখনিগুলি সুদান থেকে আলাদা হয়ে যাবার পর থেকেই সুদানের অর্থনীতি বিপদে পড়ে। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনেই সৌদি আরব সুদানকে তেল সরবরাহসহ আর্থিক সহায়তা দিতে থাকে। ইয়েমেনের যুদ্ধে সুদান সৌদিদের পক্ষে সৈন্যও প্রেরণ করে। গত এপ্রিলে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ঘোষণা দেয় যে, কৃষিখাতে তারা এবছর সুদানকে ৪’শ মিলিয়ন ডলার দেবে। এই সহায়তা মূলতঃ ৩ বিলিয়ন ডলারের মূল সহায়তার অংশ। সুদান সরকারের বরাত দিয়ে ‘ভয়েস অব আমেরিকা’ বলে যে, এর মাঝে সাড়ে ৭’শ মিলিয়ন ডলার ইতোমধ্যেই সুদান পেয়ে গেছে; যার মাঝে ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্যে ৫’শ মিলিয়ন ডলারের পুঁজি। দুই বছর আগের আরও দেড় বিলিয়ন ডলারের অনুদানও নিশ্চিত করা হয়। ‘আরব নিউজ’ বলছে যে, অভ্যুত্থানে সৌদিরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং তারা সকল পক্ষকে আলোচনার টেবিলে দেখতে চায়।
ওয়াশিংটন আপাততঃ সুদানের অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধাচরণ করলেও সুদানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দেখিয়ে দেয় যে, মার্কিনীরা সুদানের সামরিক বাহিনীর সাথে সম্পর্ক কখনোই কর্তন করেনি। মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘দ্যা আটলান্টিক কাউন্সিল’এর সিনিয়র ফেলো ক্যামেরন হাডসন এক লেখায় সুদানের সমস্যার জন্যে সামরিক বাহিনীকে পুরোপুরি দায়ী করেন। তার কথায়, সুদানের সেনাবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বোকা বানিয়েছে’; যা বারংবার হতে দেয়া যায় না। তিনি অবশ্য সুদানের অর্থনীতিতে ‘আইএমএফ’ এবং বিশ্বব্যাংকের চাপিয়ে দেয়া শর্তের ফলাফলগুলি ঠিকই এড়িয়ে যান। তবে আরবের মার্কিন বন্ধু দেশগুলির সুদানের সাথে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, সুদানের অভ্যুত্থানে মিশর, সৌদি বা আমিরাত যেন সরাসরি সমর্থন না দেয়, সেজন্য ওয়াশিংটন যথেষ্ট কূটনৈতিক তৎপরতা চালায়। সুদানের রাজনীতিতে ইউরোপের প্রভাবের কথাও তিনি আলোচনায় আনেননি; যা বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে পরিপূর্ণতা দেয় না।
Labels:
Europe,
Geopolitics,
IMF,
New World Order,
Sudan,
USA,
World Bank
Tuesday, 12 October 2021
আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের নেতৃত্ব নিয়ে কেলেঙ্কারি কি দেখিয়ে দিচ্ছে?
১২ই অক্টোবর ২০২১
গত ৪ঠা অক্টোবর ‘ইন্টারন্যাশনাল মনেটারি ফান্ড’ বা আইএমএফএর এক্সিকিউটিভ বোর্ডের সাথে ‘উইলমার হেইল’ নামের এক আইনব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়। ‘উইলমার হেইল’এর ১৭ই সেপ্টেম্বরের এক তদন্ত রিপোর্টে বেরিয়ে এসেছে যে, আইএমএফএর প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা যখন বিশ্বব্যাংকের প্রধান ছিলেন, তখন সংস্থার ‘ডুইং বিজনেস ইনডেক্স’এর র্যাংকিংএ চীনের অবস্থানকে পরিবর্তন করা হয়। এই ইনডেক্সের অর্থ হলো একটা রাষ্ট্র প্রাইভেট সেক্টরের বিনিয়োগকে কতটা সহায়তা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয় যে, এক বছরে চীনের অবস্থান ৭৮ নম্বরে ছিল; যার পরের বছর ৮৫ নম্বরে নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখে চীনারা ক্ষুব্ধ ছিল। জর্জিয়েভা এবং সংস্থার অন্যান্য কর্মকর্তারা সেসময় ইনডেক্সের হিসেবকে পরিবর্তন করে চীনের অবস্থানকে আগের বছরের, অর্থাৎ ৭৮ নম্বরে নামিয়ে আনেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয় যে, জর্জিয়েভা ইনডেক্স হিসেবের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এনেছিলেন চীনের অবস্থানকে পরিবর্তন করার জন্যে। এই প্রতিবেদনের ফলশ্রুতিতে জর্জিয়েভাকে আইএমএফএর প্রধান হিসেবে বহাল রাখা হবে কিনা, তা নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই বলে যে, এই অভিযোগ খুবই গুরুতর এবং এসময় তারা জর্জিয়েভাকে সমর্থন করা বন্ধ করে দেয়। তবে এক সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্র জানায় যে, তারা জর্জিয়েভাকে তার পদ থেকে সরাবার চেষ্টা করবে না। বার্তা সংস্থা ‘ব্লুমবার্গ’ বলছে যে, ফরাসিরা ইতোমধ্যেই জর্জিয়েভার পক্ষে কথা বলেছিল এবং ব্রিটিশরাও একই পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’ জর্জিয়েভা এবং তার সমর্থকদের বরাত দিয়ে বলছে যে, সংস্থার ভেতর জর্জিয়েভার বিরোধীরা অভ্যুত্থান করতে চেয়েছিল; যারা জর্জিয়েভার ‘প্রগ্রেসিভ’ লক্ষ্যগুলির সাথে একমত নয়। তবে কেউ কেউ এধরণের বক্তব্যের পুরোপুরি বিরোধী। ‘নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর এবং অর্থনীতিতে নোবেল জয়ী পল রোমার কিছুদিন আগেও বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং রিসার্চ ডিভিশনের প্রধান ছিলেন। সেই হিসেবে তিনি সংস্থার ‘ডুইং বিজনেস ইনডেক্স’এর উপর যে কাজ হতো, তার মূল ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ‘ব্লুমবার্গ’এর সাথে এক সাক্ষাতে ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন যে, এই ইনডেক্সে ভালো অবস্থানে থাকার জন্যে আন্তর্জাতিকভাবে অনেক দেশের মাঝে প্রতিযোগিতা রয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে অনেক দেশই ইনডেক্সে তাদের স্কোরকে কিছুটা ভালো অবস্থানে দেখার জন্যে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করে। রোমার বলছেন যে, বিশ্বব্যাংকের মাঝে একটা সংস্কৃতি রয়েছে যে, ইনডেক্সের সংখ্যাগুলিকে রিভিউ করা এবং কিছু দেশকে অধিক সুবিধা দিয়ে তাদের স্কোরকে অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থানে রাখা। তিনি বলছেন যে, সংস্থার নেতৃত্ব চীনকে ভালো স্কোর দিয়ে হয়তো চীনের কাছ থেকে কিছু সুবিধা আদায় করতে চাইছিলেন, তবে সেব্যাপারে তিনি নিশ্চিত নন। তবে রোমারের অভিযোগ হলো যেসব দেশ ইনডেক্সে তাদের অবস্থানকে পরিবর্তন করতে চাপ সৃষ্টি করে, তারা স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য দেশের সাথে নিজেদের একটা পার্থক্য করে ফেলছে। এবং শেষ পর্যন্ত কিছু দেশকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে ইনডেক্স প্রকাশ করা হচ্ছে। এভাবে বিশ্বব্যাংক একদিকে একটা বৈজ্ঞানিক তথ্যের উৎস, আবার এটা একইসাথে একটা কূটনৈতিক সংস্থা। কারণ তারা বিভিন্ন দেশের সাথে কূটনৈতিক দেনদরবার চালায়। কিন্তু বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রকাশে যে বিশ্বাসযোগ্যতা দরকার, তা কূটনৈতিক আলোচনায় ছাড় দেবার মাধ্যমে তথ্যের উৎসের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় কঠোর নিয়মে ঘাটতি পড়ে যায়। এটা পুরো সংস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
‘সিএনবিসি’এর এক প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে যে, ১৯৪৪ সালে ‘ব্রেটন উডস কনফারেন্স’এর মাধ্যমে তৈরি করা আইএমএফ এবং বিশ্ব ব্যাংকের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে। আইএমএফ সাধারণতঃ এর সদস্য দেশগুলিকে স্বল্প মেয়াদে ঋণ দেয়, যাতে সেসব দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবিলা করা যায়। সদস্য দেশগুলির অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রেও আইএমএফএর বহুবিধ লক্ষ্য রয়েছে। অপরদিকে বিশ্বব্যাংকের কাজ হলো বিভিন্ন দেশে উন্নয়নমূলক প্রকল্পে অর্থায়ন করা এবং দারিদ্র্য বিমোচনে কাজ করা। বিশ্বব্যাংকের বেশিরভাগ কাজ উন্নয়নশীল দেশগুলিতে। উভয় সংস্থারই ১’শ ৮৯টা সদস্য। আইএমএফএর মূল অর্থায়ন হয় কোটা ব্যবস্থায়। এর মাধ্যমে সংস্থার মোট অর্থায়ন প্রায় ৬’শ ৭৫ বিলিয়ন ডলারের মতো। কোটা পদ্ধতিতে সংস্থার প্রায় ৩৬ শতাংশ ভোট চারটা দেশের হাতে; যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, চীন এবং জার্মানি। ফ্রান্স, ব্রিটেন এবং ইতালির হাতে রয়েছে আরও প্রায় ১২ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ মাত্র সাতটা দেশের হাতেই সংস্থার প্রায় অর্ধেক ভোট। সংস্থার সবচাইতে বড় ঋণগ্রহীতা দেশ হলো গ্রিস, ইউক্রেন, পর্তুগাল এবং পাকিস্তান। অপরদিকে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন আসে বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীদের মাঝে বন্ড ইস্যু করে ঋণ নেবার মাধ্যমে।
পল রোমার বলছেন যে, আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক একসময় বিশ্বের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ সেসময় একটা দেশের পক্ষে খুব বেশি উৎস থেকে ঋণ পাওয়া সম্ভব ছিল না। কাজেই দুই সংস্থাই সেসময় আন্তর্জাতিক পুঁজির জোগানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু বর্তমানে এই সংস্থাগুলি আন্তর্জাতিক পুঁজির বাজারের তুলনায় অনেক ছোট হয়ে গিয়েছে। এমতাবস্থায় উভয় সংস্থাই তাদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে নতুন কিছু করতে চাইছে। রোমার বলছেন যে, ১৯৫০এর দশকে এই সংস্থাগুলির উদ্দেশ্য যা ছিল, বর্তমান দুনিয়ার সাথে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; কাজেই এখন সময় এসেছে এই সংস্থাগুলির উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে চিন্তা করার। তিনি মনে করছেন যে, এই সংস্থার এখন সবচাইতে বড় কাজ হলো বিভিন্ন দেশের মাঝে কূটনৈতিক আলোচনা সচল রাখা।
আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার অতি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় সংস্থাদু’টার উদ্দেশ্য নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠছে, তখন সংস্থার কর্মকান্ডের মাঝে স্বচ্ছতার অভাব বিশ্বব্যাপী এর বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। শক্তিশালী দেশগুলি যদি সংস্থার ‘ডুইং বিজনেস ইনডেক্স’এর হিসাবের প্রতিবাদ করে র্যাঙ্কিংএ পরিবর্তন আনতে পারে, তাহলে বাকি দেশগুলির সদস্যপদের গুরুত্ব যতটুকুইবা ছিল, তা অর্থহীন হয়ে যায়। তদুপরি অনেকেই অভিযোগ করছেন যে, জর্জিয়েভা মূলতঃ সংস্থার অর্থায়ন বৃদ্ধি করতে চীনের কাছ থেকে আরও বেশি বিনিয়োগ যোগাড় করতেই ইনডেক্সে চীনের অবস্থানকে পরিবর্তন করিয়েছেন। তবে এতেও যে ব্যাপারটা এড়ানো যায়না তা হলো, সংস্থাদু’টা এতকাল মূলতঃ তাদের যেসব কর্মকান্ডের মাধ্যমে পশ্চিমা উদ্দেশ্যকেই বাস্তবায়ন করেছে সেগুলির ভবিষ্যৎ এখন প্রশ্নবিদ্ধ।
গত ৪ঠা অক্টোবর ‘ইন্টারন্যাশনাল মনেটারি ফান্ড’ বা আইএমএফএর এক্সিকিউটিভ বোর্ডের সাথে ‘উইলমার হেইল’ নামের এক আইনব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়। ‘উইলমার হেইল’এর ১৭ই সেপ্টেম্বরের এক তদন্ত রিপোর্টে বেরিয়ে এসেছে যে, আইএমএফএর প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা যখন বিশ্বব্যাংকের প্রধান ছিলেন, তখন সংস্থার ‘ডুইং বিজনেস ইনডেক্স’এর র্যাংকিংএ চীনের অবস্থানকে পরিবর্তন করা হয়। এই ইনডেক্সের অর্থ হলো একটা রাষ্ট্র প্রাইভেট সেক্টরের বিনিয়োগকে কতটা সহায়তা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয় যে, এক বছরে চীনের অবস্থান ৭৮ নম্বরে ছিল; যার পরের বছর ৮৫ নম্বরে নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখে চীনারা ক্ষুব্ধ ছিল। জর্জিয়েভা এবং সংস্থার অন্যান্য কর্মকর্তারা সেসময় ইনডেক্সের হিসেবকে পরিবর্তন করে চীনের অবস্থানকে আগের বছরের, অর্থাৎ ৭৮ নম্বরে নামিয়ে আনেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয় যে, জর্জিয়েভা ইনডেক্স হিসেবের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এনেছিলেন চীনের অবস্থানকে পরিবর্তন করার জন্যে। এই প্রতিবেদনের ফলশ্রুতিতে জর্জিয়েভাকে আইএমএফএর প্রধান হিসেবে বহাল রাখা হবে কিনা, তা নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই বলে যে, এই অভিযোগ খুবই গুরুতর এবং এসময় তারা জর্জিয়েভাকে সমর্থন করা বন্ধ করে দেয়। তবে এক সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্র জানায় যে, তারা জর্জিয়েভাকে তার পদ থেকে সরাবার চেষ্টা করবে না। বার্তা সংস্থা ‘ব্লুমবার্গ’ বলছে যে, ফরাসিরা ইতোমধ্যেই জর্জিয়েভার পক্ষে কথা বলেছিল এবং ব্রিটিশরাও একই পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’ জর্জিয়েভা এবং তার সমর্থকদের বরাত দিয়ে বলছে যে, সংস্থার ভেতর জর্জিয়েভার বিরোধীরা অভ্যুত্থান করতে চেয়েছিল; যারা জর্জিয়েভার ‘প্রগ্রেসিভ’ লক্ষ্যগুলির সাথে একমত নয়। তবে কেউ কেউ এধরণের বক্তব্যের পুরোপুরি বিরোধী। ‘নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর এবং অর্থনীতিতে নোবেল জয়ী পল রোমার কিছুদিন আগেও বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং রিসার্চ ডিভিশনের প্রধান ছিলেন। সেই হিসেবে তিনি সংস্থার ‘ডুইং বিজনেস ইনডেক্স’এর উপর যে কাজ হতো, তার মূল ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ‘ব্লুমবার্গ’এর সাথে এক সাক্ষাতে ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন যে, এই ইনডেক্সে ভালো অবস্থানে থাকার জন্যে আন্তর্জাতিকভাবে অনেক দেশের মাঝে প্রতিযোগিতা রয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে অনেক দেশই ইনডেক্সে তাদের স্কোরকে কিছুটা ভালো অবস্থানে দেখার জন্যে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করে। রোমার বলছেন যে, বিশ্বব্যাংকের মাঝে একটা সংস্কৃতি রয়েছে যে, ইনডেক্সের সংখ্যাগুলিকে রিভিউ করা এবং কিছু দেশকে অধিক সুবিধা দিয়ে তাদের স্কোরকে অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থানে রাখা। তিনি বলছেন যে, সংস্থার নেতৃত্ব চীনকে ভালো স্কোর দিয়ে হয়তো চীনের কাছ থেকে কিছু সুবিধা আদায় করতে চাইছিলেন, তবে সেব্যাপারে তিনি নিশ্চিত নন। তবে রোমারের অভিযোগ হলো যেসব দেশ ইনডেক্সে তাদের অবস্থানকে পরিবর্তন করতে চাপ সৃষ্টি করে, তারা স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য দেশের সাথে নিজেদের একটা পার্থক্য করে ফেলছে। এবং শেষ পর্যন্ত কিছু দেশকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে ইনডেক্স প্রকাশ করা হচ্ছে। এভাবে বিশ্বব্যাংক একদিকে একটা বৈজ্ঞানিক তথ্যের উৎস, আবার এটা একইসাথে একটা কূটনৈতিক সংস্থা। কারণ তারা বিভিন্ন দেশের সাথে কূটনৈতিক দেনদরবার চালায়। কিন্তু বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রকাশে যে বিশ্বাসযোগ্যতা দরকার, তা কূটনৈতিক আলোচনায় ছাড় দেবার মাধ্যমে তথ্যের উৎসের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় কঠোর নিয়মে ঘাটতি পড়ে যায়। এটা পুরো সংস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
‘সিএনবিসি’এর এক প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে যে, ১৯৪৪ সালে ‘ব্রেটন উডস কনফারেন্স’এর মাধ্যমে তৈরি করা আইএমএফ এবং বিশ্ব ব্যাংকের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে। আইএমএফ সাধারণতঃ এর সদস্য দেশগুলিকে স্বল্প মেয়াদে ঋণ দেয়, যাতে সেসব দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবিলা করা যায়। সদস্য দেশগুলির অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রেও আইএমএফএর বহুবিধ লক্ষ্য রয়েছে। অপরদিকে বিশ্বব্যাংকের কাজ হলো বিভিন্ন দেশে উন্নয়নমূলক প্রকল্পে অর্থায়ন করা এবং দারিদ্র্য বিমোচনে কাজ করা। বিশ্বব্যাংকের বেশিরভাগ কাজ উন্নয়নশীল দেশগুলিতে। উভয় সংস্থারই ১’শ ৮৯টা সদস্য। আইএমএফএর মূল অর্থায়ন হয় কোটা ব্যবস্থায়। এর মাধ্যমে সংস্থার মোট অর্থায়ন প্রায় ৬’শ ৭৫ বিলিয়ন ডলারের মতো। কোটা পদ্ধতিতে সংস্থার প্রায় ৩৬ শতাংশ ভোট চারটা দেশের হাতে; যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, চীন এবং জার্মানি। ফ্রান্স, ব্রিটেন এবং ইতালির হাতে রয়েছে আরও প্রায় ১২ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ মাত্র সাতটা দেশের হাতেই সংস্থার প্রায় অর্ধেক ভোট। সংস্থার সবচাইতে বড় ঋণগ্রহীতা দেশ হলো গ্রিস, ইউক্রেন, পর্তুগাল এবং পাকিস্তান। অপরদিকে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন আসে বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীদের মাঝে বন্ড ইস্যু করে ঋণ নেবার মাধ্যমে।
পল রোমার বলছেন যে, আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক একসময় বিশ্বের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ সেসময় একটা দেশের পক্ষে খুব বেশি উৎস থেকে ঋণ পাওয়া সম্ভব ছিল না। কাজেই দুই সংস্থাই সেসময় আন্তর্জাতিক পুঁজির জোগানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু বর্তমানে এই সংস্থাগুলি আন্তর্জাতিক পুঁজির বাজারের তুলনায় অনেক ছোট হয়ে গিয়েছে। এমতাবস্থায় উভয় সংস্থাই তাদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে নতুন কিছু করতে চাইছে। রোমার বলছেন যে, ১৯৫০এর দশকে এই সংস্থাগুলির উদ্দেশ্য যা ছিল, বর্তমান দুনিয়ার সাথে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; কাজেই এখন সময় এসেছে এই সংস্থাগুলির উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে চিন্তা করার। তিনি মনে করছেন যে, এই সংস্থার এখন সবচাইতে বড় কাজ হলো বিভিন্ন দেশের মাঝে কূটনৈতিক আলোচনা সচল রাখা।
আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার অতি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় সংস্থাদু’টার উদ্দেশ্য নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠছে, তখন সংস্থার কর্মকান্ডের মাঝে স্বচ্ছতার অভাব বিশ্বব্যাপী এর বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। শক্তিশালী দেশগুলি যদি সংস্থার ‘ডুইং বিজনেস ইনডেক্স’এর হিসাবের প্রতিবাদ করে র্যাঙ্কিংএ পরিবর্তন আনতে পারে, তাহলে বাকি দেশগুলির সদস্যপদের গুরুত্ব যতটুকুইবা ছিল, তা অর্থহীন হয়ে যায়। তদুপরি অনেকেই অভিযোগ করছেন যে, জর্জিয়েভা মূলতঃ সংস্থার অর্থায়ন বৃদ্ধি করতে চীনের কাছ থেকে আরও বেশি বিনিয়োগ যোগাড় করতেই ইনডেক্সে চীনের অবস্থানকে পরিবর্তন করিয়েছেন। তবে এতেও যে ব্যাপারটা এড়ানো যায়না তা হলো, সংস্থাদু’টা এতকাল মূলতঃ তাদের যেসব কর্মকান্ডের মাধ্যমে পশ্চিমা উদ্দেশ্যকেই বাস্তবায়ন করেছে সেগুলির ভবিষ্যৎ এখন প্রশ্নবিদ্ধ।
Labels:
China,
Geopolitics,
IMF,
New World Order,
USA,
World Bank
Subscribe to:
Posts (Atom)








