Tuesday, 7 March 2017

শক্তিশালী রাষ্ট্রের শক্তিশালী পাট চাই

০৭ মার্চ ২০১৭

https://s3-eu-central-1.amazonaws.com/centaur-wp/theengineer/prod/content/uploads/2012/06/25093400/24-26-Merc-fibre.gif
মার্সিডিস গাড়িতে ব্যবহার করা ন্যাচারাল ফাইবারের কম্পোনেন্টগুলি। ন্যাচারাল ফাইবার হিসেবে পাটের নামকে উপরে তুলে ধরতে জুট-কম্পোজিট ম্যাটেরিয়াল তৈরি এবং ব্যবহার করতে হবে। বাংলাদেশের পাটের উপরে অন্য দেশ উন্নত হবে - এই চিন্তার দিন শেষ।


জাতীয় পাট দিবস পালিত হয়ে গেল মাত্র। অনেক কথা হলো পাট নিয়ে, কিন্তু পাটকে বিশ্বের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ফাইবারে পরিণত করার কোন প্রয়াস দেখা গেলো না, যদিও এটা পাটের প্রাপ্য সন্মান এবং একুশ শতকের অদম্য বাংলাদেশের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ। পাটের গুরুত্ব বুঝতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে ফাইবারের (বা আঁশের বা তন্তুর) আধুনিক ব্যবহার কোন ক্ষেত্রে। ফাইবার হলো বিল্ডিং তৈরির রডের মতো; কংক্রীটকে একত্রে ধরে রাখে এবং শক্তিশালী করে। অনেকটা কংকালের মতো। এভাবে রড যেমত বিল্ডিং এবং অনান্য অবকাঠামো তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, তেমনি ফাইবার ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন আকৃতির বস্তু তৈরিতে। কংক্রীট যেমন ভেজা অবস্থায় নরম থাকে এবং শুকিয়ে গেলেই শক্ত হয়ে যায়, তেমনি রেজিন ব্যবহার করা হয় ফাইবারের সাথে, যা শুকিয়ে গেলেই যেকোন মোল্ডের আকৃতি নিয়ে নেয়। এক্ষেত্রে এই আকৃতিকে শক্তিশালী করে ফাইবার। সবচাইতে বেশি ব্যবহৃত ফাইবার গ্লাস-ফাইবার হলেও এটা কৃত্রিম ফাইবার, যা তৈরি করতে হলে বিশেষ কিছু কাঁচামাল লাগে, যা আহরণ করতে হয়। তবে প্রাকৃতিক ফাইবার ফসলের খেতে উৎপাদন করা যায়, যা একটি বিরাট সুবিধা। ন্যাচারাল ফাইবারের আরও একটি ব্যাপার হলো, এটি বিশেষ কিছু এলাকায় ভালো জন্মে। তাই ন্যাচারাল ফাইবার সাধারণতঃ বিশ্বের কিছু দেশের কাছে সম্পদ হিসেবে থাকে। পাট হলো এমনই এক ন্যাচারাল ফাইবার। পৃথিবীর অন্যান্য স্থানে পাট উৎপাদন হলেও বাংলাদেশের পাট বিশ্বের সবচাইতে উন্নতমানের পাট। একারণেই “গোল্ডেন ফাইবার” কথাটি শুধু এই দেশেই প্রচলিত।


https://tibotaratari.files.wordpress.com/2010/10/ambulance.jpg
পাটের কম্পোজিট থেকে কি কি তৈরি হয়, সেটা অনেকেই জানেন না। বাংলাদেশেই পাট থেকে নৌযান তৈরি হচ্ছে।


পাটের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কম হয়নি। কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বিশ্বশক্তিরা সর্বদাই খেয়াল রেখেছে যেন এই ফসলটি ব্যবহার করে কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ কোন পণ্য তৈরি করা না হয়। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশকে অর্থ দিয়েছে জুটমিল বন্ধ করার জন্যে। একইসাথে ভারতকে অর্থ দিয়েছে নতুন করে জুটমিল খোলার জন্যে, যাতে বাংলাদেশে উৎপন্ন কাঁচাপাট ভারতের কারখানায় ব্যবহৃত হয়। এতে বাংলাদেশে যেমন কৌশলগত কোন পণ্য তৈরি হতে পারবে না, তেমনি ভারতের উপরে বাংলাদেশ নির্ভরশীল থাকবে রপ্তানি আয়ের জন্যে। শুধু তা-ই নয়, যেখানে বিশ্বের সবচাইতে ভালো মানের পাট উৎপাদন হয় বাংলাদেশে, সেখানে বর্তমানে প্রায় সকল পাটের বীজ আসে ভারত থেকে!! এই বাস্তবতা তৈরি করা হয়েছে ভালো মানের পাটের উৎপাদন বন্ধ করার জন্যে। ভারতের পাটের আঁশ হয় মোটা; আর বাংলাদেশের পাটের আঁশ হয় সরু। সরু আঁশ থেকে তৈরি পণ্যের বৈচিত্র্য এবং মান অনেক বেশি ভালো হবে। উন্নত প্রযুক্তির পণ্য উৎপাদন ভারতের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখার উদ্দেশ্য থেকেই এটা করা হয়েছে। পশ্চিমারা জানে যে ভারত পাটের সর্বাধিক ব্যবহার কোনদিনই করতে সক্ষম হবে না, কারণ কাঁচা পাটের জন্যে ভারত বাংলাদেশের উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ যখন নিজ দেশে পাটের বস্তার বাধ্যতামূলক ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছিল, তখন ভারতীয়রা বাধা দিয়েছিল। তারা বলছিল যে এটা বাস্তসম্মত সিদ্ধান্ত হবে না। অথত ভারতে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হচ্ছে প্রায় তিন দশক ধরে!! এরপরেও বাংলাদেশের কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবি এবং তথাকথিত গবেষণা সংস্থা পাটের উন্নয়নে ভারতের সাথে একত্রিত হয়ে কাজ করার কথা বলে থাকে!!


http://www.jagonews24.com/media/PhotoGallery/2015September/Green-line120150923041846.jpg
বাংলাদেশেই তৈরি হয়েছে গ্লাস-ফাইবারের জাহাজ। তবে এক্ষেত্রে পাটের মতো ন্যাচারাল ফাইবারের ব্যবহার যেতো কিনা, তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। অন্ততঃ পশ্চিমারা যদি গাড়ির ভেতএর কম্পোনেন্ট পাট দিয়ে তৈরি করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশে জাহাজের অভ্যন্তরে পাটের ব্যবহার হতেই পারে।


একুশ শতকের অদম্য বাংলাদেশ গড়তে যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের ষড়যন্ত্রের জাল থেকে বের হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। একুশ শতকের পণ্য উৎপাদনই হবে পাট চাষের উদ্দেশ্য। মোটরগাড়ি, জাহাজ, বিমান, উইন্ডমিল, ঘর-বাড়ি, ফার্নিচার, ইত্যাদি তৈরিতে ন্যাচারাল ফাইবার ব্যবহৃত হচ্ছে। জার্মানিতে ভারতের সহায়তায় পাটের প্রযুক্তিগত ব্যবহারে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা জার্মানিতে গিয়ে তাদের জন্যে উন্নত প্রযুক্তিকে উন্নততর করেছেন, যাতে বাংলাদেশ থেকে শুধুই কাঁচা পাট রপ্তানি হয় এবং কৌশলগত পণ্যের ইন্ডাস্ট্রি কখনোই গড়ে না ওঠে। তবে এই কৌশলগত পণ্য বলতে কিন্তু উন্নত ধরনের কাপড়, ব্যাগ, জুতা, বস্তা এগুলি বোঝায় না। এগুলি তৈরি হবে অবশ্যই। কিন্তু একুশ শতকের একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র এগুলির উপরে নির্ভর করে তৈরি হবে না। পাটের কাপড় গুরুত্বপূর্ণ হবে যদি এটা দিয়ে প্যারাশুট তৈরি করা যায়, কম্পোজিট ম্যাটেরিয়াল তৈরি করা যায়, জাহাজ-গাড়ি-বিমান তৈরি করা যায়। বাংলাদেশের পাটের উপরে পশ্চিমারা এসব উন্নত জিনিসপত্র তৈরি করে সেগুলি আবার বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণ করতেই ব্যবহার করবে, আর এদেশের মানুষ সেটা নিয়ে “গর্ববোধ” করবো, সেই দিন আর নেই! তাদের দেশে গিয়ে তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের দিনও শেষ। এখন প্রযুক্তি দরকার এখানে, এবং দ্রুত। এখানে দরকার মেধা। মেধা হলো শক্তিশালী হবার জন্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান; এটা রপ্তানিযোগ্য নয়।

পাট তার সন্মান ফিরে পাবে, যখন পাটের তৈরি পণ্য একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র তৈরিতে সাহায্য করবে। রাষ্ট্র সন্মান পেলে পাটও পাবে। রাষ্ট্রের লক্ষ্যের সাথে পাটের লক্ষ্যের সমন্বয় ঘটাতে হবে। রাষ্ট্রের চিন্তাকে পাট প্রতিষ্ঠা করবে; রক্ষা করবে এবং বিশ্বে ছড়িয়ে দেবে। এটাই হবে পাটের উদ্দেশ্য। পাটের পণ্য দেখলে মানুষ যেন বোঝে যে এই পণ্য এসেছে এমন এক রাষ্ট্র থেকে, যার সামর্থ্য নিয়ে কারো মাঝে দ্বিমত নেই। পণ্যই যেন রাষ্ট্রের শক্তিকে তুলে ধরে। একুশ শতকে “শক্তিশালী পাট” চাই।

“Jute is Power!”

1 comment: