Showing posts with label State Job. Show all posts
Showing posts with label State Job. Show all posts

Friday, 2 December 2016

সৃজনশীলতাকে আমরা কি করে এগিয়ে নেব?

০৩ ডিসেম্বর ২০১৬
সইচিরো হনডা জাপানের বিখ্যাত হনডা কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৪৬ সালে তিনি একটি মোটরসাইকেল তৈরি করেন, যা আসলে ছিল একখানা ইঞ্জিন বসানো বাইসাইকেল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর জাপানের সমাজে আবারো উঠে দাঁড়াবার যে বিপুল আকাংক্ষা ছিল, সেটার মাধ্যমে এই ইঞ্জিন-লাগানো বাইসাইকেল থেকে হনডা শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর সবচাইতে বড় মোটরসাইকেল কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। সমাজ চাইছিলো হনডা মোটরসাইকেল তৈরি করেন, সন্ত্রাসীসের অস্ত্র নয়।


সৃজনশীলতাকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেয়া যাবে না

বাংলাদেশ তথা পুরো বিশ্বেই তথাকথিত জঙ্গীবাদের কথা যখন আমরা টেলিভিশন ও পত্রপত্রিকায় দেখি, তখন এমন কিছু মানুষের কাহিনী আমরা জানতে পারি, যারা তাদের high-tech জ্ঞানকে ভুল পথে প্রবাহিত করে বহু মানুষের হত্যাকান্ডের কারণ হয়েছে। এরা এই সমাজ থেকেই তাদের সৃজনশীলতাকে এগিয়ে নেবার জন্যে ভুল দিকনির্দেশনা পেয়েছে বলেই এটা হয়েছে। সমাজ চাইলে এই সৃজনশীলতা মানুষের কাজে লাগতো। একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটাকে বোঝানোর চেষ্টা করি। সইচিরো হনডা (Soichiro Honda) ছিলেন জাপানের বিখ্যাত হনডা কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ছিলেন মোটরগাড়ি কারখানার মেকানিক। পরে ইঞ্জিনের পিস্টন তৈরি করার কারখানা করেন এবং পরবর্তীতে নিজেই অটোমোবাইল কারখানা দিয়ে ফেলেন। তার অটোমোবাইল কারখানা করার শুরুতে ১৯৪৬ সালে তিনি একটি মোটরসাইকেল তৈরি করেন, যা আসলে ছিল একখানা ইঞ্জিন বসানো বাইসাইকেল; আর এর ফুয়েল ট্যাংকটা ছিল পানির বোতল দিয়ে তৈরি। উদ্ভট শোনাতে পারে তার এই প্রথম মোটরসাইকেলের কথা। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর জাপানের সমাজে আবারো উঠে দাঁড়াবার যে বিপুল আকাংক্ষা ছিল, সেটার মাধ্যমে এই ইঞ্জিন-লাগানো বাইসাইকেল থেকে হনডা শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর সবচাইতে বড় মোটরসাইকেল কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। সমাজ চাইছিলো হনডা মোটরসাইকেল তৈরি করেন, সন্ত্রাসীসের অস্ত্র নয়।

বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায় বহু নতুন নতুন আবিষ্কারের কাহিনী আসে নিয়মিতই। কিন্তু রাষ্ট্র কি সেই আবিষ্কারগুলিকে বুঝতে পারে? আবার যেহেতু সেই আবিষ্কারকেরা এই সমাজ থেকেই আবির্ভূত, প্রশ্ন আসবে যে সমাজের কোন ধরনের চিন্তা তাদেরকে এই বিশেষ আবিষ্কারের দিকে মনোনিবেশ করালো? সেই চিন্তাটা সমাজের বা‌‌ রাষ্ট্রের কি আসলেই কাজে লাগবে? নাকি মানুষের কাজে লাগে না – এমন কোন আবিষ্কারের চিন্তা সমাজ থেকে সেই মানুষটি পাচ্ছে? যদি এরকম ব্যর্থ আবিষ্কারের কাহিনী লেখার জন্যেই এই সমাজের বা‌‌ রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়ে থাকে, তাহলে আজ অথবা কাল যেকোন সময়েই হোক, এই আবিষ্কারকের দল বিভ্রান্ত হতে বাধ্য! আর বিভ্রান্ত এই আবিষ্কারকেরাই হবে সমাজের তথা রাষ্ট্রের জন্যে হুমকি স্বরূপ। যেহেতু এই সমাজ এই আবিষ্কার বোঝেনা, এই আবিষ্কারের চিন্তা সমাজের কোন চিন্তার ফলাফল সেটাও সে বোঝেনা, তাই যারা এই সমাজকে বা রাষ্ট্রকে বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণ করেন, তারাই এই আবিষ্কারকে নিজেদের কাজে ব্যবহার করবেন – এটাই স্বাভাবিক। এমনকি দরকার হলে সেই আবিষ্কারকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে বা‌‌ রাষ্ট্রকে দুর্বল থেকে আরও বেশি দুর্বল করে তুলবে। আমরা আমাদের intellectual ability-তে ঘাটতি কারণে কিছুই বুঝতে ব্যর্থ হবো।
  
বরিশালের আজোপাড়াগাঁয়ের এক সৃজনশীল ইঞ্জিনিয়ারের স্বপ্নের জেট ইঞ্জিন কি ঢাকার এক শিল্পপতির জেট বিমানের স্বপ্নের সাথে মিলে যায়? চট্টগ্রামের এক মোটরসাইকেল নির্মাতার স্বপ্নের সাথে রাজশাহীর এক তরুণ ইঞ্জিনিয়ারের জ্বালানি সাশ্রয়ী মোটরসাইকেলের কি মিল খুঁজে পাওয়া যায়? গাজীপুরের কোন ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারারের স্বপ্নের সাথে খুলনার কোন স্পাইং ডিভাইস আবিষ্কারকের স্বপ্নের কি মিল হয়? ইঞ্জিন, ড্রোন, সী-প্লেন, রকেট, হাই-টেক কেমিক্যাল, ইত্যাদি যে কোন জিনিসই সমাজের বিভিন্ন মানুষের স্বপ্নের যোগাযোগ করে দিতে পারে। কিন্তু এখানে আসল প্রভাবক হবে রাষ্ট্র।

রাষ্ট্রকে স্বপ্ন দেখাতে হবে, হতে হবে স্বপ্নের যোগাযোগের মাধ্যম

আমাদের শিল্পপতিরা এদেশের ব্লু ইকনমি গড়ার ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারেন। সমাজের সৃজনশীল মানুষেরাও কি রাষ্ট্রের জন্যে কাজ করার স্পৃহা পান? একজন মানুষ তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে কি আরেকজনের স্বপ্নের সাথে মিল খুঁজে পান? একজনের স্বপ্ন কি আরেকজনের স্বপ্ন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আরও বেশি দ্রুত সামনে এগুতে থাকে? বরিশালের আজোপাড়াগাঁয়ের এক সৃজনশীল ইঞ্জিনিয়ারের স্বপ্নের জেট ইঞ্জিন কি ঢাকার এক শিল্পপতির জেট বিমানের স্বপ্নের সাথে মিলে যায়? চট্টগ্রামের এক মোটরসাইকেল নির্মাতার স্বপ্নের সাথে রাজশাহীর এক তরুণ ইঞ্জিনিয়ারের জ্বালানি সাশ্রয়ী মোটরসাইকেলের কি মিল খুঁজে পাওয়া যায়? গাজীপুরের কোন ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারারের স্বপ্নের সাথে খুলনার কোন স্পাইং ডিভাইস আবিষ্কারকের স্বপ্নের কি মিল হয়? ইঞ্জিন, ড্রোন, সী-প্লেন, রকেট, হাই-টেক কেমিক্যাল, ইত্যাদি যে কোন জিনিসই সমাজের বিভিন্ন মানুষের স্বপ্নের যোগাযোগ করে দিতে পারে। কিন্তু এখানে আসল প্রভাবক হবে রাষ্ট্র।

রাষ্ট্র তার চিন্তাকে প্রতিষ্ঠা করে, নিরাপত্তা দেয় এবং বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়। সেটাই হচ্ছে রাষ্ট্রের লক্ষ্য। রাষ্ট্র যখন তার লক্ষ্যের পিছনে ছুটবে, তখন সমাজের শিল্পপতি, আবিষ্কারক, চিন্তাবিদ, এবং অন্যান্য সকলেই একই লক্ষ্যের পিছনে ছুটবে। একই লক্ষ্যের পিছনে ছোটা মানুষগুলি একে অপরকে একই রাস্তায় নিজের পাশেই খুঁজে পাবে। কোনকিছুই অসংলগ্ন মনে হবে না। কোন শিল্পপতির জেট বিমান বানাবার স্বপ্ন তার ঘুমের ওষুধ হিসেবেই শুধু কাজ করবে না; কোন আবিষ্কারকের আবিষ্কৃত জেট ইঞ্জিনখানাকে তার মা চালের ঝুড়ি হিসেবে ব্যবহার করবে না; কোন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের স্বপ্নের কেমিক্যাল প্ল্যান্টের প্ল্যান তার বিছানার বালিশ হিসেবে ব্যবহৃত হবে না; কোন এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের তৈরি প্রথম বিমান শুধু মশা মারার অস্ত্র হিসেবেই সমাজের কাছে গণ্য হবে না। হাজার হাজার নতুন আবিষ্কার শুধুমাত্র সায়েন্স ফেয়ারে হাততালি পাবার জন্যে বা পশ্চিমা দেশকে সমৃদ্ধ করার জন্যেই তৈরি হবে না। কোন শিল্পপতি পৃথিবীর সবচাইতে হাই-টেক অন্তর্বাস তৈরি করেছেন বলে শান্তিতে কবরে যেতে পারবেন বলে ভাববেন না। এদেশের পাটের মাঝে এই দেশের আসল উন্নতি মনে করে কেউ পাট থেকে হাই-টেক কম্পোজিট ম্যাটেরিয়াল তৈরির দিকে না গিয়ে মনোরম ঝুড়ি তৈরি করে কিছু ডলার কামিয়ে একবেলা আগের চাইতে একটু বেশি ভালো খাবার খাওয়ার চেষ্টাকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে দেখবে না। বরং, স্টিলের পাতের মাঝে সে আফ্রিকার বন্দরে নিজেদের জাহাজ দেখবে! এলুমিনিয়ামের মাঝে সে ঘটি-বাটি নয়, বরং বিমান দেখবে। পাটের মাঝে সে ভারতে রপ্তানিযোগ্য সুতা নয়, বরং কম্পোজিট ম্যাটেরিয়ালের মিলিটারি এপ্লিকেশন দেখবে। ধানের তুষের মাঝে সে রপ্তানিযোগ্য ছাই নয়, বরং দেখতে পাবে কেমিক্যাল প্ল্যান্ট।
 
নিজেদের শ্রমে পশ্চিমাদের উপরে তোলার চেষ্টা বাদ দিতে হবে – এগুলি আমরা করে চলেছি আড়াই’শ বছরের বেশি সময় ধরে। এখন এদেশের ওইসব প্রভাবশালী পত্রিকার পশ্চিম-মুখী লোলুপ প্রতিবেদন গেলার সময় নয়। পশ্চিমা বিশ্বকে আজ অতি-জাতীয়তাবাদ ও বর্ণবাদ, চলমান ও ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ বেকারত্ব, ক্ষয়িষ্ণু জনসংখ্যা, চরম নৈতিক অবক্ষয়, ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বার্থপরতা, বৃদ্ধ জনসংখ্যা, ইত্যাদি মারাত্মক সমস্যা জেঁকে বসেছে। সামনের দিনগুলিতে এসব সমস্যা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। কাজেই তাদেরকে আইডল হিসেবে দেখাটা বোকার স্বর্গে বাস করা।

সৃজনশীলতাকে পশ্চিম-মুখী করার সময় শেষ

একজন তরুণের স্বপ্ন হতে পারে না প্যারিসের ক্যাটওয়াকে তার ডিজাইন করা অর্ধনগ্ন জামাকাপড়ের জড়ানো মডেলের দিকে সবাই লোলুপ দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে থাকবে। অথবা তার ডিজাইন করা পাইলট-বিহীন সোলার বিমান ইউরোপের বড় কোম্পানি মোটা অঙ্কের বিনিময়ে তার কাছ থেকে কিনে নেবে। অথবা বাংলাদেশের পাটকে ব্যবহার করে সে ইউরোপের কোম্পানির জন্যে মোটগাড়ির ইন্টেরিয়র ও বাম্পার তৈরি করবে। অথবা নাসার জন্যে রকেট বানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাথে করমর্দনরত অবস্থায় একটা সেলফি তুলবে। নিজেদের শ্রমে পশ্চিমাদের উপরে তোলার চেষ্টা বাদ দিতে হবে – এগুলি আমরা করে চলেছি আড়াই’শ বছরের বেশি সময় ধরে। এখন এদেশের ওইসব প্রভাবশালী পত্রিকার পশ্চিম-মুখী লোলুপ প্রতিবেদন গেলার সময় নয়। ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতার পক্ষে ঢোল পেটানোর মতো সময় আমাদের এখন নেই। পশ্চিমা বিশ্বকে আজ অতি-জাতীয়তাবাদ ও বর্ণবাদ, চলমান ও ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ বেকারত্ব, ক্ষয়িষ্ণু জনসংখ্যা, চরম নৈতিক অবক্ষয়, ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বার্থপরতা, বৃদ্ধ জনসংখ্যা, ইত্যাদি মারাত্মক সমস্যা জেঁকে বসেছে। সামনের দিনগুলিতে এসব সমস্যা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। কাজেই তাদেরকে আইডল হিসেবে দেখাটা বোকার স্বর্গে বাস করা। সবার হাতেই এখন ইন্টারনেট পৌঁছে গেছে। একটু সার্চ করলেই সামনে এসে যাচ্ছে তাদের এই সমস্যাগুলির কথা। এখন সকল ভবিষ্যত এখানে। সকল সৃজনশীলতার প্রয়োগও এখানেই হতে হবে।
 
সইচিরো হনডা তার বাইসেকেলে পানির বোতল ব্যবহার করেছিলেন ফুয়েল ট্যাঙ্ক হিসেবে – এটা জানলে কিন্তু আমাদের আবার আগের জায়গায় ফেরত যেতে হবে না। অর্থাৎ আবারও নতুন করে মোটসাইকেল আবিষ্কারের দরকার নেই। বরং একুশ শতকে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে আমরা নতুন কি দিতে পারি, সেটাই আজকে প্রশ্ন। ড্রোন, রাডার, সোনার, রকেট, স্যাটেলাইট, নাইট ভিশন, সিমুলেটর, রোবোটিক্স, ইত্যাদি প্রযুক্তি এখন হওয়া উচিত স্বাভাবিক। এগুলিকে পুঁজি করেই আগাতে হবে সামনে; রাষ্ট্র এখানে হবে মাধ্যম। রাষ্ট্র দেখাবে পথ; বলে দেবে ভবিষ্যত কোনটা - আন্ডার-ওয়্যার, নাকি আন্ডার-ওয়াটার ওয়ারফেয়ার।

সৃজনশীলতার দরকার একটা কর্মপদ্ধতি…

সৃজনশীলতাকে রাষ্ট্রের সাথে একই পথে নেয়ার জন্যে কিছু পথ অনুসরণ করা যেতে পারে। যেমন –

১. সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খবর পৌঁছে দেয়া যে নতুন কোন সৃজনশীল কাজ দেখলেই সেটা যেন ডকুমেন্ট করা হয় এবং রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের কাছে (যেমন প্রশাসক, আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী, সামরিক বাহিনী, প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ) সেটা লিখিত আকারে পৌঁছে দেয়া হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সৃজনশীল কাজের মেলা বা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা এবং সেখানে রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের জড়িত হওয়া এক্ষেত্রে অনেকদূর এগিয়ে নেবে। তবে এখানে ক্রিয়েটিভিটি ফিল্টারিং-এর একটা ব্যবস্থা থাকতে হবে, নয়তো অদরকারী ব্যাপারগুলিও সৃজনশীল হিসেবে স্থান পেয়ে যাবে।

২. রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের কাছে লিখিত আকারে বলে দেয়া যে কোন ধরনের সৃজনশীল কর্মকান্ডকে কোথায় রিপোর্ট করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে যেসকল সৃজনশীল কর্মকান্ড থাকবে, সেগুলি রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা নিজেরাই রিপোর্ট করবেন। তাদের সকল অধঃস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে এধরনের সৃজনশীল কর্মকান্ড দেখলেই রিপোর্ট করার নিয়ম থাকবে।

৩. রাষ্ট্রের সকল বিভাগে রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আরএন্ডডি) উইং থাকতে হবে, যারা সৃজনশীলতা সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের রিপোর্ট প্রসেস করবে। এই উইং-গুলি এই রিপোর্টগুলিকে ডকুমেন্ট করবে এবং সেগুলি গুরুত্ব অনুসারে পরিদর্শনের ব্যবস্থা করবে। বিভিন্ন বিভাগের আরএন্ডডি উইং-এর মাঝে যোগসূত্র থাকবে কাজের সুবিধার্থে। উদাহরণস্বরূপ - আইসিটি সেক্টরে কোন সৃজনশীল কাজের রিপোর্ট যাবে আইসিটি বিভাগে। যদি নৌ-পরিবহণ বিভাগের আইসিটি বিভাগের সাথে যোগাযোগ থাকে, তাহলে এমন হতে পারে যে আইসিটি বিভাগের ওই কাজ নৌ-পরিবহণের কাজে লেগে যেতে পারে।

৪. আরএন্ডডি উইং-গুলির সাথে এপ্লিকেশন এরিয়ার সরাসরি সংযোগ থাকতে হবে। তারা প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগের উপদেশ দেবে অথবা উচ্চতর শিক্ষার উপদেশ দেবে। উদাহরণস্বরূপ – কৃষি ক্ষেত্রের অনেক গবেষণা কৃষক পর্যায়ে যাচ্ছে বিএডিসি-র মাধ্যমে। তাই কৃষিক্ষেত্রে সকল সৃজনশীল কাজগুলিকেও এই প্রসেসের মাঝে নিয়ে আসতে হবে।

৫. আরএন্ডডি উইং-গুলির সাথে ওই বিভাগের সাথে সম্পর্কিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির সরাসরি যোগাযোগ থাকতে হবে, যাতে কোন সৃজনশীলতাকে সরাসরি এপ্লিকেশনে পাঠানো যায় কিনা বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে আরও আরএন্ডডি-তে নেয়া যায় কিনা, সেটা দেখা হবে। উদাহরণস্বরূপ – মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির আরএন্ডডি উইং-এর সাথে স্টিল ইন্ডাস্ট্রির যোগ থাকতে পারে, যাতে নতুন কোন সৃজনশীল প্রজেক্টকে এগিয়ে নেয়া যায়।

৬. গুরুত্ব অনুধাবন করা গেলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগের পদ্ধতিও রাখতে হবে। এভাবে গুরুত্ব অনুসারে বেসরকারি শিল্পোদ্যক্তাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে সম্পূর্ণ নতুন কোন শিল্প-ধারণাকেও এগিয়ে নেয়া যায়।

৭. রাষ্ট্রের কোন কাজগুলি কাকে দিয়ে করা যাবে, সেটা রাষ্ট্রকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ভুল পোস্টিং দিলে কোন সৃজনশীল কাজই কোনদিন দিনের আলো দেখবে না; রাষ্ট্র হবে প্রতারিত।

সৃজনশীলতার ব্যাপারে কর্মপদ্ধতিগুলি নিয়ে আগানোর সময় এখনই। সইচিরো হনডা তার বাইসেকেলে পানির বোতল ব্যবহার করেছিলেন ফুয়েল ট্যাঙ্ক হিসেবে – এটা জানলে কিন্তু আমাদের আবার আগের জায়গায় ফেরত যেতে হবে না। অর্থাৎ আবারও নতুন করে মোটসাইকেল আবিষ্কারের দরকার নেই। বরং একুশ শতকে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে আমরা নতুন কি দিতে পারি, সেটাই আজকে প্রশ্ন। ড্রোন, রাডার, সোনার, রকেট, স্যাটেলাইট, নাইট ভিশন, সিমুলেটর, রোবোটিক্স, ইত্যাদি প্রযুক্তি এখন হওয়া উচিত স্বাভাবিক। এগুলিকে পুঁজি করেই আগাতে হবে সামনে; রাষ্ট্র এখানে হবে মাধ্যম। রাষ্ট্র দেখাবে পথ; বলে দেবে ভবিষ্যত কোনটা - আন্ডার-ওয়্যার, নাকি আন্ডার-ওয়াটার ওয়ারফেয়ার।

Tuesday, 29 November 2016

রাষ্ট্রের জন্যে কাজ করা বলতে আমরা কি বুঝি?

২৯শে নভেম্বর ২০১৬

 
Motorola-কে আমরা মোবাইল হ্যান্ডসেট কোম্পানি বলে চিনি। কিন্তু তারা যে ডিফেন্স সাপ্লাইয়ার, সেটা আমরা কতজন জানি?


ডিফেন্স কনট্রাকটর কারা?

ইস্রাইলের মেরকাভা (Merkava) ট্যাঙ্কের বিভিন্ন কম্পোনেন্ট-এর সাপ্লাইয়ারের নাম আমরা কতটুকু জানি? অথবা জিজ্ঞেস করার মতো চিন্তা কতজন করি? আমরা যতটুকু জানি সেটা হলো ইস্রাইল মেরকাভা ট্যাঙ্ক তৈরি করে। কিন্তু একটা ট্যাঙ্ক তো আর এমনি এমনি কেউ তৈরি করে ফেলতে পারবে না। এর বিভিন্ন কম্পোনেন্ট তৈরিতে বিভিন্ন ব্যাপারে এক্সপার্ট হতে হবে। যেমন যে ট্যাঙ্কের কামান তৈরি করবে, সে ইলেকট্রনিক্স বা ইঞ্জিন বা ট্র্যাক তৈরি করবে না। এই ট্যাঙ্কের কমিউনিকেশন যন্ত্রপাতির encryption-এর সাপ্লাইয়ার হলো Motorola, যাকে আমরা মোবাইল হ্যান্ডসেট কোম্পানি বলে চিনি। এর ব্যালিস্টিক প্রোটেকশনের জন্যে যেসব জিনিস লাগছে, সেগুলি আসছে কেমিক্যাল কোম্পানি DuPont-এর কাছ থেকে। Caterpillar-কে আমরা চিনি কন্সট্রাকশন যন্ত্রপাতি তৈরি করার কোম্পানি হিসেবে; এরা সাহায্য করেছে ট্যাঙ্কটির ট্র্যাক ডিজাইন করতে। কাজেই এখন Motorola, DuPont আর Caterpillar-কে আপনি কি ধরনের কোম্পানি হিসেবে দেখবেন? এরা যে সকলেই ডিফেন্স কনট্রাকটর হিসেবে কাজ করছে এটা কি আমরা এখন বুঝতে পারছি?
  
মাহিন্দ্রা আমাদের কাছে গাড়ির কোম্পানি।মাহিন্দ্রা সেনাবাহিনীর জন্যে গাড়ি তৈরি করে। মাহিন্দ্রার সাথে Airbus Helicopters-এর চুক্তি হয়েছে সামরিক হেলিকপ্টার তৈরি করার জন্যে।

ভারতীয় কর্পোরেট হাউস, নাকি ডিফেন্স কনট্রাকটর?

এবার দেশের কাছাকাছি কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। মেরকাভা ট্যাঙ্কের ব্যালিস্টিক কম্পিউটার এবং ফায়ার কন্ট্রোল সিস্টেম তৈরি করেছে ইস্রাইলের Elbit Systems Ltd, যারা কিনা মূলত ডিফেন্স-এর কনট্রাকটর। এই একই কোম্পানি ভারতের অর্জুন ট্যাঙ্কের Laser Warning Control System (LWCS) তৈরি করতে সাহায্য করেছে। এই একই ট্যাঙ্কের ইঞ্জিনটি এখন ডেভেলপ করছে ভারতের কয়েকটি কোম্পানি মিলে। এর মাঝে রয়েছে মহারাষ্ট্রের পুনের Kirloskar Group, যারা পাম্প, ইঞ্জিন, মোটর, ট্রান্সফরমার, জেনারেটর, কমপ্রেসার, CNC Lathe, মোটরগাড়ি, ইত্যাদি তৈরি করে। ১৯৮৮ সালে এই গ্রুপের ১০০তম জন্মদিনে ভারতের রাষ্ট্রীয় ডাকটিকেট উন্মোচন করা হয়। এতে বোঝা যাচ্ছে যে সেই রাষ্ট্রের কাছে এই কোম্পানিটি শুধু একটি প্রাইভেট কোম্পানি নয়; অন্য কিছু। কোম্পানিটির ইঞ্জিন তৈরি করার সাবসিডিয়ারি ৩ হর্সপাওয়ারের পানির পাম্পের ইঞ্জিন থেকে শুধু করে ১১ হাজার হর্সপাওয়ারের ইলেকট্রিক পাওয়ার জেনারেশন ইঞ্জিন তৈরি করে। এরা ভারতে Toyota গাড়ি তৈরি করে। বর্তমানে কোম্পানিটি আমেরিকার Cummins-এর সাথে একত্রে অর্জুন ট্যাঙ্কের ইঞ্জিন ডেভেলপ করছে; সাথে অন্যান্যদের সহায়তাও রয়েছে। এখন Kirloskar Group-কে আমরা কি কোম্পানি বলবো? পানির পাম্প বা ইলেকট্রিক ট্রান্সফরমার তৈরি করা কোম্পানি, নাকি ডিফেন্স কনট্রাকটর?
  
বাংলাদেশে ভেড়ামারার ৩৬০ মেগাওয়াট গ্যাস-ভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্র এবং শিকলবাহার ২২৫ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুত কেন্দ্রের কাজ করছে Larsen & Toubro. তারা ভারতীয় সামরিক বাহিনীর জন্যে রাডার, মিসাইল, রকেট, নেভাল টর্পেডো, সাবমেরিন হাল, সোনার, ইত্যাদি তৈরি করে। Prithvi-II-সহ ভারতের অনেক স্ট্র্যাটেজিক মিসাইলের মোবাইল প্ল্যাটফর্ম Larsen & Toubro-এর হাতে তৈরি। এই কোম্পানিকে আমরা কি বলে চিনি?

এরকম বহু উদাহরণ রয়েছে ভারতে এবং বাকি বিশ্বে। ভারতের প্রাইভেট ডিফেন্স কনট্রাকটরদের মাঝে রয়েছে Tata, Mahindra, Reliance, Hinduja, Larsen & Toubro, Godrej ইত্যাদি। Tata Advanced Systems Limited নামে কোম্পানিটি আমেরিকার Sikorsky Aircraft Corporation-এর সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চারে Sikorsky S-92 হেলিকপ্টার তৈরি করছে। Israel Aircraft Industries-এর সাথে একত্রে তারা ড্রোন তৈরি করছে। হিন্দুজা গ্রুপের Ashok Leyland Defence Systems ভারতীয় সেনাবাহিনীর বেশিরভাগ ট্রাক তৈরি করেছে। মাহিন্দ্রা সেনাবাহিনীর জন্যে গাড়ি তৈরি করে। মাহিন্দ্রার সাথে Airbus Helicopters-এর চুক্তি হয়েছে সামরিক হেলিকপ্টার তৈরি করার জন্যে। Reliance Defence and Engineering Limited ভারতের নৌবাহিনীর জন্যে যুদ্ধজাহাজ তৈরি করছে। Godrej Aerospace ভারতের স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেভিকেলের জন্যে ইঞ্জিন তৈরি করছে, BrahMos মিসাইল তৈরি করছে; যুক্তরাষ্ট্রের GE, Honeywell, যুক্তরাজ্যের Rolls-Royce এবং ইস্রাইলের Rafael-এর জন্যে বিভিন্ন কম্পোনেন্ট তৈরি করছে। Larsen & Toubro ভারতীয় সামরিক বাহিনীর জন্যে রাডার, মিসাইল, রকেট, নেভাল টর্পেডো, সাবমেরিন হাল, সোনার, ইত্যাদি তৈরি করে। Prithvi-II-সহ ভারতের অনেক স্ট্র্যাটেজিক মিসাইলের মোবাইল প্ল্যাটফর্ম Larsen & Toubro-এর হাতে তৈরি। এই কোম্পানিগুলিকে আমরা কি বলে চিনি? বাংলাদেশে ভেড়ামারার ৩৬০ মেগাওয়াট গ্যাস-ভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্র এবং শিকলবাহার ২২৫ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুত কেন্দ্রের কাজ করছে Larsen & Toubro. গোদরেজ-কে আমরা চিনি চুলের কালার এবং গুডনাইট মশার ওষুধের জন্যে। টাটা, মাহিন্দ্রা, অশোক লেল্যান্ড আমাদের কাছে গাড়ির কোম্পানি; রিলায়েন্স হলো মোবাইল ফোন কোম্পানি। মোটকথা, আমাদের কাছে এই কোম্পানিগুলি বেসামরিক কোম্পানি, মিসাইল-রাডার-ট্যাঙ্কের ইঞ্জিন তৈরির কোম্পানি নয়। আমরা এমন অদ্ভূত শিশুসুলভ আচরণ কতোদিন করে যাবো সেটাই কি প্রশ্ন নয়?
 
Caterpillar-কে আমরা চিনি কন্সট্রাকশন যন্ত্রপাতি তৈরি করার কোম্পানি হিসেবে; এরা সাহায্য করেছে ইস্রাইলের মেরকাভা ট্যাঙ্কের ট্র্যাক ডিজাইন করতে। তাদের তৈরি ইঞ্জিন বহু সামরিক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।

আমরা রাষ্ট্রের জন্যে কাজ করা শুরু করবো কবে থেকে?

এর আগেই লিখেছিলাম যে আমাদের শিল্পপতিরা কিভাবে ব্লু ইকনমি গড়বেন। সামরিক-বেসামরিক বিভেদ চিন্তা এখানে আসতে দিলে রাষ্ট্র হবে ক্ষতিগ্রস্ত। রাষ্ট্রের জন্যে কাজ করাই হচ্ছে উচ্চতর কাজ; বাকি সব গৌণ। ১০০ টাকার কাজের মাঝে ১ টাকার কাজ যদি রাষ্ট্রের জন্যে করা হয়, তার মানে হলো সেই কোম্পানিকে রাষ্ট্র বিশ্বাস করে। ওই ১% কাজই সেই কোম্পানিকে রাষ্ট্রের অংশ বানিয়ে ফেলে। আর সেটাই হয়ে যায় তার মার্কেটিং-এর সবচাইতে বড় অস্ত্র – “আমরা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকি”। তার আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয় না। ডিফেন্স কনট্রাকটর হওয়াটা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজের অংশ। চিপস-এর প্যাকেট, আন্ডারওয়্যার, বিউটি সাবান অনেক তৈরি হয়েছে; এবার রাষ্ট্রের জন্যে কাজ করার পালা। বাংলাদেশ এখন আর বিশ্বব্যাংকের সংজ্ঞায় পড়ছে না; যেকারণে শুধু দিল্লীতে নয়, আটলান্টিকের ওপাড়েও ক্রাইসিস চলছে। এই রাষ্ট্র এখন বিশ্বকে আগের মতো দেখছে না – আমাদের কর্পোরেটদের এই ব্যাপারটাকে শুধু অনুধাবন করা নয়, কাজে প্রমাণ করার সময় এসেছে। যারা এসময় গালে হাত দিয়ে বসে থাকবেন, তাদের একসময় বিরাট আফসোসের মাঝে পড়তে হবে। মনে রাখতে হবে – সময় ফেরত আসে না।