২১শে অক্টোবর ২০২১
‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং আস্ট্রেলিয়ার মাঝে কৌশলগত চুক্তি ‘অকাস’ স্বাক্ষরিত হবার পর থেকে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক জোট ‘এসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনস’ বা ‘আসিয়ান’এর সদস্য দেশগুলির মাঝে সিদ্ধান্তহীনতা দেখা দিয়েছে। জোটের সদস্য মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া যখন বলছে যে, এই চুক্তির ফলে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছের রাষ্ট্র ফিলিপাইন এই চুক্তিকে সমর্থন দিয়েছে।
গত ১২ই অক্টোবর মালয়েশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসামুদ্দিন হুসেইন পার্লামেন্টকে বলেন যে, মালয়েশিয়ার মূল লক্ষ্য হলো চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে শক্তির ব্যালান্স যাই থাকুক না কেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে রক্ষা করা। ‘আসিয়ান’এর সদস্য রাষ্ট্রদের চিন্তার মাঝে একটা সমঝোতাই কেবল এই দুই শক্তিশালী দেশকে মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে। জাপানের মিডিয়া ‘এনএইচকে’ বলছে যে, গত ১৭ই সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ইসমাঈল সাবরি ইয়াকব অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনকে বলেন যে, ‘অকাস’ চুক্তি দক্ষিণ চীন সাগরে অন্যান্য শক্তিকে আরও আগ্রাসী ভূমিকা নিতে উস্কে দিতে পারে। একই দিনে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয় যে, অত্র অঞ্চলে অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিয়ে ইন্দোনেশিয়া ভীষণভাবে চিন্তিত। মার্কিন সামরিক পত্রিকা ‘স্ট্রারস এন্ড স্ট্রাইপস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ১৬ই সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লী সিয়েন লুং অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে বলেন যে, এই চুক্তি আঞ্চলিক শান্তি এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে সহায়তা করবে এবং আঞ্চলিক কাঠামোকে সমর্থন দেবে। পরদিন ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডেলফিন লরেনজানা অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিটার ডাটনকে ফোন করে বলেন যে, অস্ট্রেলিয়ার অধিকার রয়েছে তার সাবমেরিন প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার; ফিলিপাইনও তার নিজস্ব অঞ্চলকে রক্ষা করতে সক্ষমতা তৈরি করছে। ২৩শে সেপ্টেম্বর ভিয়েতনামের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লে থি থু হাং নির্দিষ্ট না করেই বলেন যে, সকল রাষ্ট্রই শান্তি, স্থিতিশীলতা, সহযোগিতা এবং উন্নয়ন চায়। অস্ট্রেলিয়ার পারমাণবিক প্রযুক্তি কেনা নিয়ে তিনি বলেন যে, পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার হতে হবে শান্তিপূর্ণ এবং তা আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাজে লাগতে হবে।
থাইল্যান্ডের ‘চুলালংকর্ন ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর থিতিনান পংসুধিরাক ‘ব্যাংকক পোস্ট’এর এক লেখায় মত দিচ্ছেন যে, ‘অকাস’ চুক্তি চীনকে যেমন উস্কে দেবে, তেমনি ‘আসিয়ান’কে আরও বিভক্ত করবে। একইসাথে এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র অস্ট্রেলিয়াকে পারমাণবিক সাবমেরিন সরবরাহ করলে ইইউ এবং জাপানসহ অন্যান্য শক্তিশালী দেশগুলিও চ্যালেঞ্জের মাঝে পড়ে যাবে। পংসুধিরাকের সাথে একমত নন থাইল্যান্ডের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কাভি চংকিত্তাভর্ন। একই পত্রিকার এক লেখায় তিনি বলছেন যে, একসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন অত্র অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে; এখন করছে চীন। তিনি বলেন যে, ‘আসিয়ান’ যদি সময়োচিত সিদ্ধান্ত নিতে না পারে, তবে সংস্থার আকাত্মতায় সমস্যা হবে। গত পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা বলছে যে, ‘আসিয়ান’এর সক্ষমতা রয়েছে টিকে থাকার। এর আগেও বিভিন্ন ইস্যুতে এর সদস্য দেশগুলির কেউ কেউ ভিন্ন পথে হাঁটার চেষ্টা করেছে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সংস্থায় ভাঙ্গন ধরাতে পারেনি।
নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে কাজ করা মার্কিন নিরাপত্তা বিশ্লেষক পল বিউকানান ‘স্টারস এন্ড স্ট্রাইপস’কে বলছেন যে, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি চিন্তিত যে, দক্ষিণ চীন সাগর, মালাক্কা প্রণালি, মালয় দ্বীপপুঞ্জ এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় পারমাণবিক শক্তির আনাগোনা আরও দেশকে পারমাণবিক শক্তির দিকে আকর্ষণ করতে পারে। বিশেষ করে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মত দেশগুলি, যেগুলি এই মুহুর্তে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে না, তারাও এব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। এই পুরো ব্যাপারটা সংঘাতের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ চীন তার আঞ্চলিক অবস্থানকে ধরে রাখতে চেষ্টা করবে এবং চাপের মুখে তার শক্তি বৃদ্ধি করতে বাধ্য হবে।
সিঙ্গাপুরের সরকারি গবেষণা সংস্থা ‘ইসেয়াস ইউসোফ ইসহাক ইন্সটিটিউট’এর সিনিয়র ফেলো উইলিয়াম চুং এবং শ্যারন সেয়া ‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় বলছেন যে, যখন ‘আসিয়ান’এর বাইরের দেশগুলি অত্র অঞ্চলের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিচ্ছে, তখন বোঝা যায় যে, চীনা আগ্রাসী তৎপরতাকে নিয়ন্ত্রণে ‘আসিয়ান’ ব্যর্থ হয়েছে। ‘আসিয়ান’ মনে করছে যে, ‘কোয়াড’এর মতো জোট তৈরি হওয়া মানেই চীনকে আরও খেপিয়ে তোলা। তারা ‘আসিয়ান’এর শক্ত নেতৃত্ব দাবি করেন এবং বর্তমান নেতৃত্বের সমালোচনা করেন। ‘আসিয়ান’এর বর্তমান চেয়ারম্যান ব্রুনাইএর কার্যকলাপকেও তারা বিবৃতিসর্বস্ব বলে আখ্যা দেন। একইসাথে সংস্থার মাঝে এখন অনেক বিষয়েই বিরোধ; যার ফলশ্রুতিতে শুধু ছাড় দিয়েই চলতে হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে শীর্ষ বৈঠকে আমন্ত্রণ না জানানো হলেও তার একজন প্রতিনিধিকে সন্মেলনে আসার অনুমতি দেয়া হয়। একারণেই বাইডেন প্রশাসন ‘আসিয়ান’এর সমঝোতার জন্যে অপেক্ষা না করে সিঙ্গাপুর এবং ভিয়েতনামের মতো সদস্যদেশগুলির সাথে আলাদাভাবে সম্পর্ক তৈরি করছে। লেখকেরা বলছেন যে, দিন শেষে ‘আসিয়ান’ হয়তো কোনমতে চালিয়ে নেবে; কিন্তু এটা পরিষ্কার যে, ‘আসিয়ান’এর বয়স হয়েছে।
‘অকাস’ চুক্তি ‘আসিয়ান’এর মতো একটা সংস্থার অস্তিত্বকেই চ্যালেঞ্জ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র তার চীনকে নিয়ন্ত্রণের নীতিতে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিকে বাধ্য করছে এক পক্ষ নিতে। কিন্তু এই দেশগুলি অর্থনৈতিকভাবে অনেকাংশেই চীনের উপর নির্ভরশীল। এছাড়াও আরেক বাস্তবতার মাঝে রয়েছে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া। পূর্ব এশিয়ার প্রায় সবগুলি কৌশলগত সমুদ্রপথই এই দেশগুলির মাঝ দিয়ে গিয়েছে। কাজেই যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মাঝে যে কোন সম্ভাব্য সংঘাতে এই দেশগুলির উঠানই হয়ে উঠবে যুদ্ধক্ষেত্র। চীনের বেশি কাছে অবস্থিত হওয়ায় ফিলিপাইন এবং ভিয়েতনামের কাছে যখন চীনের হাত থেকে সমুদ্রসীমা উদ্ধার মূল লক্ষ্য, তখন মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া তাদের আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমাকে সংঘাতমুক্ত দেখতেই বেশি আগ্রহী। অর্থাৎ সংস্থার সদস্যদেশগুলির জাতীয় লক্ষ্য এখন সংস্থার সাথে একাত্মতা প্রকাশকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। একারণেই যুক্তরাষ্ট্র অত্র অঞ্চলে ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম এবং সিঙ্গাপুরের সাথে আলাদা সম্পর্ক তৈরিতে আগ্রহী হয়েছে। এমতাবস্থায় মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া নিজস্ব কৌশলগত দিকনির্দেশনা খুঁজবে। একইসাথে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবার সাথেসাথে অত্র অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে নতুন খেলোয়াড় যোগ হবে এবং নতুন নতুন কৌশলগত জোট তৈরি হবে।
Showing posts with label Vietnam. Show all posts
Showing posts with label Vietnam. Show all posts
Thursday, 21 October 2021
‘আসিয়ান’এর অস্তিত্বকেই চ্যালেঞ্জ করছে ‘অকাস’ চুক্তি
Labels:
ASEAN,
AUKUS,
Australia,
China,
Geopolitics,
Global Britain,
Indonesia,
Malaysia,
New World Order,
Philippines,
USA,
Vietnam
Saturday, 4 May 2019
ইন্দোনেশিয়া-ভিয়েতনাম নৌ-বিরোধ পূর্ব এশিয়ায় নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে
৫ই মে ২০১৯
গত ২৭শে এপ্রিল দক্ষিণ চীন সাগরে ইন্দোনেশিয়ার নতুনা দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি দেশটার নৌবাহিনীর জাহাজ ‘তিপতাদি’কে ভিয়েতনামের কোস্ট গার্ডের একটা জাহাজ ধাক্কা দেয়। ইন্দোনেশিয়ার জাহাজখানা ভিয়েতনামের একটা ফিশিং ট্রলারকে আটক করে এবং এর ১২ জন নাবিককে গ্রেপ্তার করে। জাহাজের দু’জন ক্রুকে অবশ্য ভিয়েতনামের কোস্ট গার্ডের জাহাজ তুলে নেয়। ভিয়েতনাম সরকার দাবি করে যে, ইন্দোনেশিয়া সমুদ্রের যে স্থানে ভিয়েতনামের ফিশিং ট্রলারটা আটক করে, তা ভিয়েতনামের ‘এক্সক্লুসিভ ইকনমিক জোন’ বা ‘ইইজেড’এর অংশ। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়া দাবি করে যে, ফিশিং ট্রলারটা বেআইনীভাবে ইন্দোনেশিয়ার ‘ইইজেড’এ মাছ ধরছিলো। ইন্দোনেশিয়া সরকার তাদের নৌবাহিনীর জাহাজ থেকে ধারণ করা একটা ভিডিও প্রকাশ করে, যা-তে দেখা যায় যে, ভিয়েতনামের কোস্ট গার্ডের জাহাজ ‘কেএন-২১৩’ ইন্দোনেশিয়ার জাহাজটাকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ঘটনার পর ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র দপ্তর জাকার্তাতে ভিয়েতনামের রাষ্টদূতকে ডেকে প্রতিবাদ করে। ‘দ্যা ডিপ্লোম্যাট’ ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এই ঘটনা ইন্দোনেশিয়া-ভিয়েতনামের সম্পর্ককে আরও জটিল করছে। তবে এই ঘটনার সূত্র ধরে অত্র অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক সমীকরণও নতুন করে দেখার সময় এসেছে।
গত ফেব্রুয়ারিতেও ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনী ভিয়েতনামের ৪টা ফিশিং ট্রলার আটক করে। ইন্দোনেশিয়ার মৎস্য মন্ত্রী সুসি পুজিয়াস্তুতি তখন বলেন যে, ভিয়েতনামের কোস্ট গার্ডের দু’টা জাহাজ এই আটক কর্মকান্ডে বাধা দিতে এসেছিল। আর এই ঘটনার পুরোটাই সংঘটিত হয় ইন্দোনেশিয়ার ‘ইইজেড’এর ভেতরে। শুধু তা-ই নয়, ইন্দোনেশিয়ার মন্ত্রী বলেন যে, এরকম ঘটনা অহরহই ঘটছে। ঐ ঘটনার কিছুদিন আগেই ভিয়েতনামের কোস্ট গার্ডের জাহাজ একই রকম এক আটক কাজে ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীকে বাধা দিতে এসেছিল। এপ্রিলের ঘটনার পর ইন্দোনেশিয়ার মন্ত্রী ঘোষণা দেন যে, ইন্দোনেশিয়া আটক করা বিদেশী ট্রলার একত্রে জনসম্মুখে ডুবানোর রীতি পুনরায় চালু করছে। এর আগে চীন, ভিয়েতনাম এবং অন্যান্য দেশের বিরূপ প্রতিক্রিয়াতে বিদেশী ট্রলার ডুবানোর এই অনুষ্ঠান ইন্দোনেশিয়া স্থগিত করেছিল। এখন এই অনুষ্ঠান আবারও শুরু করার ঘোষণায় ইন্দোনেশিয়ার সাথে চীন এবং ভিয়েতনামের সম্পর্ক নতুন করে চাপের মাঝে পড়বে। ঘোষণা অনুযায়ী ৪ঠা মে ইন্দোনেশিয়া ৫১টা ফিশিং ট্রলার ডুবানোর কাজ শুরু করে, যা কিনা দুই সপ্তাহ ধরে চলার কথা রয়েছে।
২০১৭ সালের জুলাই মাসে ইন্দোনেশিয়া দক্ষিণ চীন সাগরের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তের সমুদ্রের নতুন করে নামকরণ করে। দক্ষিণ চীন সাগরে ইন্দোনেশিয়ার অধীনে থাকা নতুনা দ্বীপপুঞ্জের আশেপাশের এলাকাকে ইন্দোনেশিয়ার সরকার ‘নর্থ নতুনা সী’ বা উত্তর নতুনা সাগর নামকরণ করে। ইন্দোনেশিয় সরকার বলে যে, তারা শুধুমাত্র ঐ এলাকায় নিজেদের ‘ইইজেড’এর অংশটা নতুন করে নামকরণ করেছে। তবে সমস্যা দাঁড়ায় ইন্দনেশিয়ার অধীন ‘ইইজেড’এর সীমানা নিয়ে। চীনারা দক্ষিণ চীন সাগরের প্রায় পুরোটাই নিজেদের বলে দাবি করে, এবং নিজেদের সজ্ঞায়িত ‘নাইন-ড্যাস লাইন’এর অধীনে সকল দ্বীপ এবং সমুদ্রাঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবার জন্যে আশেপাশের দেশগুলির সাথে বিবাদেও জড়িয়েছে। চীনারা নতুনা সাগরে ইন্দোনেশিয়ার দাবি করা ‘ইইজেড’কে স্বীকৃতি দেয় না। তবে ইন্দোনেশিয়া তার দাবি করা ‘ইইজেড’এর মাঝে বিদেশী ফিশিং ট্রলার গ্রেপ্তার করতে থাকে। চীনা ফিশিং ট্রলারগুলিকে গ্রেপ্তার করার সময় চীনা নৌবাহিনী এবং কোস্ট গার্ডের জাহাজগুলি বাধা দিতে আসে। এভাবে দুই দেশের নৌবাহিনীর মাঝে সংঘাতের সম্ভাবনা বেড়েই চলেছে প্রতিদিন। তবে মিডিয়া চীনকে এতটাই বেশি গুরুত্ব দেয় যে, ভিয়েতনামের সাথে ইন্দোনেশিয়ার সমুদ্র নিয়ে বিরোধের ব্যাপারটা একেবারেই চাপা পড়ে যায়।
ইন্দোনেশিয়ার সাথে ভিয়েতনামের সমুদ্র-বিরোধ নতুন নয়। ২০০৭ সাল থেকে ২০১৫-এর মাঝে ইন্দোনেশিয়া সর্বমোট ৬’শ ৯২টা বিদেশী ফিশিং ট্রলার গ্রেপ্তার করে। এর মাঝে ৪’শ ৫৪টাই ছিল ভিয়েতনামের। ১’শ ১৬টা থাইল্যান্ডের, ৯১টা মালয়েশিয়ার এবং ৩১টা মাত্র চীনের। অর্থাৎ ৬৫ শতাংশ ফিশিং ট্রলার ভিয়েতনামের হবার পরেও মিডিয়াতে চীনের ব্যাপারটাই হাইলাইট হয়েছে। চীন-ইন্দোনেশিয়া বিরোধই ছিল মিডিয়ার উপজীব্য। তবে এবারে ভিয়েতনামের সাথে ইন্দোনেশিয়ার নৌ-বিরোধ দুই দেশের সরকারি বাহিনীর মাঝে হবার কারণে তা নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
উভয় দেশই নিজেদের সম্পর্ককে এগিয়ে নিচ্ছে ২০০৩ সাল থেকে। ২০১৩ সালে দুই দেশের মাঝে কৌশলগত পার্টনারশিপের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। উভয় দেশই অত্র অঞ্চলে বেআইনীভাবে মাছ ধরা এবং চোরাচালান প্রতিরোধে নিজেদের নৌবাহিনীর মাঝে সমন্বয় সাধনে অগ্রসর হবার চেষ্টা করে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে, দুই দেশের সম্পর্ক এখনও কন্টকমুক্ত নয়। ইন্দোনেশিয়ার ভাইস-প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ জুসুফ কাল্লা বলেন যে, উভয় দেশ এই মুহুর্তে আন্তর্জাতিক সীমানা নির্ধারণে আলোচনা চালাচ্ছে। এর আগে ‘নর্থ নতুনা সী’ ঘোষণা যে চীনের সাথে ভিয়েতনামের স্বার্থেও আঘাত করেছে, তা এখন সকলের সামনে চলে আসলো। সমুদ্রসীমা নির্ধারণ দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারে। তবে আঞ্চলিকভাবে ইন্দোনেশিয়ার ভূকৌশলগত অবস্থান এবং সেই অবস্থানকে ঘিরে ইন্দোনেশিয়ার নীতি এখন আলোচনায় চলে আসছে। আঞ্চলিক শক্তি, বিশেষ করে চীনের চাপে, ইন্দোনেশিয়া তার সামরিক শক্তিকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। একসময় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনী সামরিক বাজেটের বেশিরভাগটা পেলেও এখন নৌ-সীমানার নিরাপত্তা নিশ্চিতে নৌবাহিনী এবং বিমান বাহিনী বাজেটের একটা বড় অংশ পাচ্ছে। নিরাপত্তা-বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘ওয়ার অন দ্যা রকস’এ এক লেখায় মার্কিন বিমান বাহিনীর অফিসার মেজর ক্যালেব স্লেইটন ইন্দোনেশিয়ার বিমান বাহিনীর এয়ার কমান্ড এন্ড স্টাফ কলেজের প্রশিক্ষণের লক্ষ্যের ব্যাপারে আলোচনা করেন। ঐ কোর্সে অংশ নেয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন যে, সেখানে বছরব্যাপী একটা প্রশিক্ষণ মহড়া চালানো হয়, যেখানে শত্রু হিসেবে ধরা হয় আঞ্চলিক শক্তিধর একটা দেশকে, যার কিনা রয়েছে শক্তিশালী নৌবাহিনী। এই প্রশিক্ষণ মহড়া ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকিগুলিকে সামনে রেখেই আয়োজন করা হচ্ছে। এতে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, দ্বীপ দেশ ইন্দোনেশিয়ার সামরিক শক্তির বর্তমান ফোকাস সমুদ্রের দিকে। আর দেশটার উত্তরে অবস্থিত শক্তিশালী রাষ্ট্র চীনকেই এক্ষেত্রে সবচাইতে বড় হুমকি হিসেবে মনে করা হচ্ছে। তবে স্লেইটনের লেখায় ভিয়েতনামের উল্লেখ নেই। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সাথে রেষারেষিতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামের পক্ষ নিয়েছে। তাই ইন্দোনেশিয়া কেন চীন এবং ভিয়েতনাম উভয়ের ব্যাপারেই কড়া নীতি নিয়ে এগুচ্ছে, তা বুঝতে হলে সাম্প্রতিককালে ইন্দোনেশিয়ার সামরিক ঘাঁটি উন্নয়ের ধারার দিকে তাকাতে হবে।
ইন্দোনেশিয়ার স্বঘোষিত ‘নর্থ নতুনা সী’তে নতুনা দ্বীপপুঞ্জের অবস্থান কৌশলগত দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই দ্বীপের ৬’শ ৫৫ কিঃমিঃ উত্তর-পূর্বে রয়েছে স্প্রাটলি দ্বীপপুঞ্জের চীনা সামরিক ঘাঁটি। সিঙ্গাপুর থেকে এর দূরত্ব ৫’শ ৬৫ কিঃমিঃ; ব্রুনাই থেকে ৭’শ ৭০ কিঃমিঃ; ভিয়েতনাম থেকে ৫’শ ৬০ কিঃমিঃ। অর্থাৎ এই অঞ্চলের সকল স্থলভাগের ঠিক মাঝখানে এই দ্বীপ। কৌশলগত মালাক্কা প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করা বেশিরভাগ জাহাজকেই এই দ্বীপের পাশ দিয়ে যেতে হয়। এই দ্বীপপুঞ্জের নতুনা বা রিয়াউ দ্বীপে সেনা, নৌ এবং বিমান বাহিনীর সমন্বিত ঘাঁটি উন্নয়নের কাজ করছে ইন্দোনেশিয়া। ২০১৮-এর ১৮ই ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার সামরিক বাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল হাদি তিয়াহিয়ান্তো নতুনা দ্বীপে ঘাঁটির উদ্বোধন করেন। তিয়াহিয়ান্তো বলেন যে, এই ঘাঁটির কাজ হলো ইন্দোনেশিয়ার সীমানায় আগ্রাসী শক্রির বিরুদ্ধে একটা “ডিটারেন্ট” তৈরি করা।
তিয়াহিয়ান্তোর আগের প্রাক্তন প্রধান জেনারেল নুরমানতায়ো বলেছিলেন যে, ইন্দোনেশিয়ার চারিদিকে মোট পাঁচটা দূরবর্তী দ্বীপকে ‘বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ দ্বীপ’ হিসেবে উন্নয়ন করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর মাঝে নতুনা দ্বীপ হলো এরূপ প্রথম ঘাঁটি। বাকি ঘাঁটিগুলির সবগুলিই পূর্ব দিকে আস্ট্রেলিয়া এবং ফিলিপাইনের কাছাকাছি; এগুলি হলো –মালুকু দ্বীপপুঞ্জের সাউমলাকি (পূর্ব তিমরের কাছে), উত্তর মালুকুর মরোতাই (ফিলিপাইনের দক্ষিণে), এবং পপুয়ার বিয়াক ও মেরাউকে (অস্ট্রেলিয়ার উত্তরে)। জাকার্তার ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’এর ম্যাগাজিনের এক লেখায় এভান লাক্সমানা বলছেন যে, নতুনা দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করাটা ইন্দোনেশিয়ার জন্যে চীনকে নিয়ন্ত্রণের অংশ নয়, বরং এটা পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের নীতির অংশ। ১৯৪৬ সাল থেকে এই অঞ্চলের বেসামরিক বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রিত হয় সিঙ্গাপুর থেকে। ইন্দোনেশিয়া চাইছে যে, নতুনা দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি পূর্ণাঙ্গরূপে চালু হলে অত্র অঞ্চলের বিমান চলাচলের নিয়ন্ত্রণ থাকবে নতুনা দ্বীপে।
ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাথে পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যের প্রায় পুরোটাই যায় ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপগুলির মাঝ দিয়ে প্রবাহিত মালাক্কা, সুন্দা এবং লম্বক প্রণালী দিয়ে। তবে এই প্রণালীগুলি পার হতে হলে জাহাজগুলিকে হয় নতুনা সাগর, কিংবা পূর্বে ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপ এবং ইন্দোনেশিয়ার পপুয়া দ্বীপের মাঝ দিয়ে যেতে হবে। নতুনা সাগরের মাঝে ইন্দোনেশিয়া নতুনা দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করছে। আর মিন্দানাও এবং পপুয়ার মাঝের সমুদ্রপথ পাহাড়া দিতে ইন্দোনেশিয়া মরোতাই এবং বিয়াক ছাড়াও আরও কয়েকটা সামরিক ঘাঁটির উন্নয়ন করছে। মোটকথা অত্র অঞ্চলের সবগুলি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে ইন্দোনেশিয়া পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে, যা কিনা পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র সিঙ্গাপুরে নৌ-ঘাঁটি করেছে; গুয়ামের ঘাঁটিতেও শক্তি বৃদ্ধি করছে। আর গত ডিসেম্বরে ব্রিটেন ঘোষণা দিয়েছে যে, তারাও হয় সিঙ্গাপুর, নতুবা ব্রুনাই-এ সামরিক ঘাঁটি করতে যাচ্ছে। ফ্রান্সেরও প্রশান্ত মহাসাগরে রয়েছে কয়েকটা দ্বীপ উপনিবেশ। ইন্দোনেশিয়া-ভিয়েতনাম নৌ-বিরোধ দেখিয়ে দিচ্ছে যে, এই জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণে ইন্দোনেশিয়া একটা অংশ হতে চলেছে। বহুকাল ধরেই ইন্দোনেশিয়া শুধুমাত্র তার দ্বীপগুলির স্থলভাগের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও এখন কৌশলগত সমুদ্রপথগুলির নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। ইন্দোনেশিয়ার এহেন চিন্তা শুধু চীন নয়, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জাপান, কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলিকেও ভাবাবে।
![]() |
| ২৭শে এপ্রিল ভিয়েতনামের কোস্ট গার্ডের জাহাজ ‘কেএন-২১৩’ ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীর জাহাজ ‘তিপতাদি’কে সজোরে ধাক্কা দেয়। |
গত ২৭শে এপ্রিল দক্ষিণ চীন সাগরে ইন্দোনেশিয়ার নতুনা দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি দেশটার নৌবাহিনীর জাহাজ ‘তিপতাদি’কে ভিয়েতনামের কোস্ট গার্ডের একটা জাহাজ ধাক্কা দেয়। ইন্দোনেশিয়ার জাহাজখানা ভিয়েতনামের একটা ফিশিং ট্রলারকে আটক করে এবং এর ১২ জন নাবিককে গ্রেপ্তার করে। জাহাজের দু’জন ক্রুকে অবশ্য ভিয়েতনামের কোস্ট গার্ডের জাহাজ তুলে নেয়। ভিয়েতনাম সরকার দাবি করে যে, ইন্দোনেশিয়া সমুদ্রের যে স্থানে ভিয়েতনামের ফিশিং ট্রলারটা আটক করে, তা ভিয়েতনামের ‘এক্সক্লুসিভ ইকনমিক জোন’ বা ‘ইইজেড’এর অংশ। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়া দাবি করে যে, ফিশিং ট্রলারটা বেআইনীভাবে ইন্দোনেশিয়ার ‘ইইজেড’এ মাছ ধরছিলো। ইন্দোনেশিয়া সরকার তাদের নৌবাহিনীর জাহাজ থেকে ধারণ করা একটা ভিডিও প্রকাশ করে, যা-তে দেখা যায় যে, ভিয়েতনামের কোস্ট গার্ডের জাহাজ ‘কেএন-২১৩’ ইন্দোনেশিয়ার জাহাজটাকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ঘটনার পর ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র দপ্তর জাকার্তাতে ভিয়েতনামের রাষ্টদূতকে ডেকে প্রতিবাদ করে। ‘দ্যা ডিপ্লোম্যাট’ ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এই ঘটনা ইন্দোনেশিয়া-ভিয়েতনামের সম্পর্ককে আরও জটিল করছে। তবে এই ঘটনার সূত্র ধরে অত্র অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক সমীকরণও নতুন করে দেখার সময় এসেছে।
গত ফেব্রুয়ারিতেও ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনী ভিয়েতনামের ৪টা ফিশিং ট্রলার আটক করে। ইন্দোনেশিয়ার মৎস্য মন্ত্রী সুসি পুজিয়াস্তুতি তখন বলেন যে, ভিয়েতনামের কোস্ট গার্ডের দু’টা জাহাজ এই আটক কর্মকান্ডে বাধা দিতে এসেছিল। আর এই ঘটনার পুরোটাই সংঘটিত হয় ইন্দোনেশিয়ার ‘ইইজেড’এর ভেতরে। শুধু তা-ই নয়, ইন্দোনেশিয়ার মন্ত্রী বলেন যে, এরকম ঘটনা অহরহই ঘটছে। ঐ ঘটনার কিছুদিন আগেই ভিয়েতনামের কোস্ট গার্ডের জাহাজ একই রকম এক আটক কাজে ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীকে বাধা দিতে এসেছিল। এপ্রিলের ঘটনার পর ইন্দোনেশিয়ার মন্ত্রী ঘোষণা দেন যে, ইন্দোনেশিয়া আটক করা বিদেশী ট্রলার একত্রে জনসম্মুখে ডুবানোর রীতি পুনরায় চালু করছে। এর আগে চীন, ভিয়েতনাম এবং অন্যান্য দেশের বিরূপ প্রতিক্রিয়াতে বিদেশী ট্রলার ডুবানোর এই অনুষ্ঠান ইন্দোনেশিয়া স্থগিত করেছিল। এখন এই অনুষ্ঠান আবারও শুরু করার ঘোষণায় ইন্দোনেশিয়ার সাথে চীন এবং ভিয়েতনামের সম্পর্ক নতুন করে চাপের মাঝে পড়বে। ঘোষণা অনুযায়ী ৪ঠা মে ইন্দোনেশিয়া ৫১টা ফিশিং ট্রলার ডুবানোর কাজ শুরু করে, যা কিনা দুই সপ্তাহ ধরে চলার কথা রয়েছে।
| ইন্দোনেশিয়ার সাথে ভিয়েতনামের সমুদ্র-বিরোধ নতুন নয়। ২০০৭ সাল থেকে ২০১৫-এর মাঝে ইন্দোনেশিয়া সর্বমোট ৬’শ ৯২টা বিদেশী ফিশিং ট্রলার গ্রেপ্তার করে। এর মাঝে ৬৫ শতাংশ ফিশিং ট্রলার ভিয়েতনামের হবার পরেও মিডিয়াতে চীনের ব্যাপারটাই হাইলাইট হয়েছে। চীন-ইন্দোনেশিয়া বিরোধই ছিল মিডিয়ার উপজীব্য। তবে এবারে ভিয়েতনামের সাথে ইন্দোনেশিয়ার নৌ-বিরোধ দুই দেশের সরকারি বাহিনীর মাঝে হবার কারণে তা নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। |
ইন্দোনেশিয়ার সাথে ভিয়েতনামের সমুদ্র-বিরোধ নতুন নয়। ২০০৭ সাল থেকে ২০১৫-এর মাঝে ইন্দোনেশিয়া সর্বমোট ৬’শ ৯২টা বিদেশী ফিশিং ট্রলার গ্রেপ্তার করে। এর মাঝে ৪’শ ৫৪টাই ছিল ভিয়েতনামের। ১’শ ১৬টা থাইল্যান্ডের, ৯১টা মালয়েশিয়ার এবং ৩১টা মাত্র চীনের। অর্থাৎ ৬৫ শতাংশ ফিশিং ট্রলার ভিয়েতনামের হবার পরেও মিডিয়াতে চীনের ব্যাপারটাই হাইলাইট হয়েছে। চীন-ইন্দোনেশিয়া বিরোধই ছিল মিডিয়ার উপজীব্য। তবে এবারে ভিয়েতনামের সাথে ইন্দোনেশিয়ার নৌ-বিরোধ দুই দেশের সরকারি বাহিনীর মাঝে হবার কারণে তা নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
উভয় দেশই নিজেদের সম্পর্ককে এগিয়ে নিচ্ছে ২০০৩ সাল থেকে। ২০১৩ সালে দুই দেশের মাঝে কৌশলগত পার্টনারশিপের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। উভয় দেশই অত্র অঞ্চলে বেআইনীভাবে মাছ ধরা এবং চোরাচালান প্রতিরোধে নিজেদের নৌবাহিনীর মাঝে সমন্বয় সাধনে অগ্রসর হবার চেষ্টা করে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে, দুই দেশের সম্পর্ক এখনও কন্টকমুক্ত নয়। ইন্দোনেশিয়ার ভাইস-প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ জুসুফ কাল্লা বলেন যে, উভয় দেশ এই মুহুর্তে আন্তর্জাতিক সীমানা নির্ধারণে আলোচনা চালাচ্ছে। এর আগে ‘নর্থ নতুনা সী’ ঘোষণা যে চীনের সাথে ভিয়েতনামের স্বার্থেও আঘাত করেছে, তা এখন সকলের সামনে চলে আসলো। সমুদ্রসীমা নির্ধারণ দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারে। তবে আঞ্চলিকভাবে ইন্দোনেশিয়ার ভূকৌশলগত অবস্থান এবং সেই অবস্থানকে ঘিরে ইন্দোনেশিয়ার নীতি এখন আলোচনায় চলে আসছে। আঞ্চলিক শক্তি, বিশেষ করে চীনের চাপে, ইন্দোনেশিয়া তার সামরিক শক্তিকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। একসময় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনী সামরিক বাজেটের বেশিরভাগটা পেলেও এখন নৌ-সীমানার নিরাপত্তা নিশ্চিতে নৌবাহিনী এবং বিমান বাহিনী বাজেটের একটা বড় অংশ পাচ্ছে। নিরাপত্তা-বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘ওয়ার অন দ্যা রকস’এ এক লেখায় মার্কিন বিমান বাহিনীর অফিসার মেজর ক্যালেব স্লেইটন ইন্দোনেশিয়ার বিমান বাহিনীর এয়ার কমান্ড এন্ড স্টাফ কলেজের প্রশিক্ষণের লক্ষ্যের ব্যাপারে আলোচনা করেন। ঐ কোর্সে অংশ নেয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন যে, সেখানে বছরব্যাপী একটা প্রশিক্ষণ মহড়া চালানো হয়, যেখানে শত্রু হিসেবে ধরা হয় আঞ্চলিক শক্তিধর একটা দেশকে, যার কিনা রয়েছে শক্তিশালী নৌবাহিনী। এই প্রশিক্ষণ মহড়া ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকিগুলিকে সামনে রেখেই আয়োজন করা হচ্ছে। এতে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, দ্বীপ দেশ ইন্দোনেশিয়ার সামরিক শক্তির বর্তমান ফোকাস সমুদ্রের দিকে। আর দেশটার উত্তরে অবস্থিত শক্তিশালী রাষ্ট্র চীনকেই এক্ষেত্রে সবচাইতে বড় হুমকি হিসেবে মনে করা হচ্ছে। তবে স্লেইটনের লেখায় ভিয়েতনামের উল্লেখ নেই। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সাথে রেষারেষিতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামের পক্ষ নিয়েছে। তাই ইন্দোনেশিয়া কেন চীন এবং ভিয়েতনাম উভয়ের ব্যাপারেই কড়া নীতি নিয়ে এগুচ্ছে, তা বুঝতে হলে সাম্প্রতিককালে ইন্দোনেশিয়ার সামরিক ঘাঁটি উন্নয়ের ধারার দিকে তাকাতে হবে।
ইন্দোনেশিয়ার স্বঘোষিত ‘নর্থ নতুনা সী’তে নতুনা দ্বীপপুঞ্জের অবস্থান কৌশলগত দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই দ্বীপের ৬’শ ৫৫ কিঃমিঃ উত্তর-পূর্বে রয়েছে স্প্রাটলি দ্বীপপুঞ্জের চীনা সামরিক ঘাঁটি। সিঙ্গাপুর থেকে এর দূরত্ব ৫’শ ৬৫ কিঃমিঃ; ব্রুনাই থেকে ৭’শ ৭০ কিঃমিঃ; ভিয়েতনাম থেকে ৫’শ ৬০ কিঃমিঃ। অর্থাৎ এই অঞ্চলের সকল স্থলভাগের ঠিক মাঝখানে এই দ্বীপ। কৌশলগত মালাক্কা প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করা বেশিরভাগ জাহাজকেই এই দ্বীপের পাশ দিয়ে যেতে হয়। এই দ্বীপপুঞ্জের নতুনা বা রিয়াউ দ্বীপে সেনা, নৌ এবং বিমান বাহিনীর সমন্বিত ঘাঁটি উন্নয়নের কাজ করছে ইন্দোনেশিয়া। ২০১৮-এর ১৮ই ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার সামরিক বাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল হাদি তিয়াহিয়ান্তো নতুনা দ্বীপে ঘাঁটির উদ্বোধন করেন। তিয়াহিয়ান্তো বলেন যে, এই ঘাঁটির কাজ হলো ইন্দোনেশিয়ার সীমানায় আগ্রাসী শক্রির বিরুদ্ধে একটা “ডিটারেন্ট” তৈরি করা।
তিয়াহিয়ান্তোর আগের প্রাক্তন প্রধান জেনারেল নুরমানতায়ো বলেছিলেন যে, ইন্দোনেশিয়ার চারিদিকে মোট পাঁচটা দূরবর্তী দ্বীপকে ‘বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ দ্বীপ’ হিসেবে উন্নয়ন করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর মাঝে নতুনা দ্বীপ হলো এরূপ প্রথম ঘাঁটি। বাকি ঘাঁটিগুলির সবগুলিই পূর্ব দিকে আস্ট্রেলিয়া এবং ফিলিপাইনের কাছাকাছি; এগুলি হলো –মালুকু দ্বীপপুঞ্জের সাউমলাকি (পূর্ব তিমরের কাছে), উত্তর মালুকুর মরোতাই (ফিলিপাইনের দক্ষিণে), এবং পপুয়ার বিয়াক ও মেরাউকে (অস্ট্রেলিয়ার উত্তরে)। জাকার্তার ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’এর ম্যাগাজিনের এক লেখায় এভান লাক্সমানা বলছেন যে, নতুনা দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করাটা ইন্দোনেশিয়ার জন্যে চীনকে নিয়ন্ত্রণের অংশ নয়, বরং এটা পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের নীতির অংশ। ১৯৪৬ সাল থেকে এই অঞ্চলের বেসামরিক বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রিত হয় সিঙ্গাপুর থেকে। ইন্দোনেশিয়া চাইছে যে, নতুনা দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি পূর্ণাঙ্গরূপে চালু হলে অত্র অঞ্চলের বিমান চলাচলের নিয়ন্ত্রণ থাকবে নতুনা দ্বীপে।
ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাথে পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যের প্রায় পুরোটাই যায় ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপগুলির মাঝ দিয়ে প্রবাহিত মালাক্কা, সুন্দা এবং লম্বক প্রণালী দিয়ে। তবে এই প্রণালীগুলি পার হতে হলে জাহাজগুলিকে হয় নতুনা সাগর, কিংবা পূর্বে ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপ এবং ইন্দোনেশিয়ার পপুয়া দ্বীপের মাঝ দিয়ে যেতে হবে। নতুনা সাগরের মাঝে ইন্দোনেশিয়া নতুনা দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করছে। আর মিন্দানাও এবং পপুয়ার মাঝের সমুদ্রপথ পাহাড়া দিতে ইন্দোনেশিয়া মরোতাই এবং বিয়াক ছাড়াও আরও কয়েকটা সামরিক ঘাঁটির উন্নয়ন করছে। মোটকথা অত্র অঞ্চলের সবগুলি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে ইন্দোনেশিয়া পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে, যা কিনা পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র সিঙ্গাপুরে নৌ-ঘাঁটি করেছে; গুয়ামের ঘাঁটিতেও শক্তি বৃদ্ধি করছে। আর গত ডিসেম্বরে ব্রিটেন ঘোষণা দিয়েছে যে, তারাও হয় সিঙ্গাপুর, নতুবা ব্রুনাই-এ সামরিক ঘাঁটি করতে যাচ্ছে। ফ্রান্সেরও প্রশান্ত মহাসাগরে রয়েছে কয়েকটা দ্বীপ উপনিবেশ। ইন্দোনেশিয়া-ভিয়েতনাম নৌ-বিরোধ দেখিয়ে দিচ্ছে যে, এই জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণে ইন্দোনেশিয়া একটা অংশ হতে চলেছে। বহুকাল ধরেই ইন্দোনেশিয়া শুধুমাত্র তার দ্বীপগুলির স্থলভাগের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও এখন কৌশলগত সমুদ্রপথগুলির নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। ইন্দোনেশিয়ার এহেন চিন্তা শুধু চীন নয়, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জাপান, কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলিকেও ভাবাবে।
Labels:
Geopolitics,
Indonesia,
Natuna Sea,
South China Sea,
Vietnam
Subscribe to:
Posts (Atom)


