Showing posts with label Hizb-ut-Tahrir. Show all posts
Showing posts with label Hizb-ut-Tahrir. Show all posts

Saturday, 8 March 2025

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ ২০২৫ – রাইজ অব এইচটি

০৯ই মার্চ ২০২৫

ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে আগমণ যুক্তরাষ্ট্রে শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে; যার প্রমাণ ন্যাটো, ইউক্রেন এবং মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে দৃশ্যমান। আটলান্টিকের ওপাড়ে এহেন বড় পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে ঢাকায় এইচটি-র উত্থান একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ৭ই মার্চ ২০২৫ সত্যিই ছিল একটা ঐতিহাসিক দিন!


গত ০৭ই মার্চ রমজান মাসের প্রথম জুমআর দিনে ঢাকার বাইতুল মুকাররম মসজিদের উত্তর গেটে হিযবুত তাহরীর বা এইচটি-র মিছিল নিয়ে পুরো দেশব্যাপী ব্যাপক আলোচনার ঝড় উঠেছে। সেকুলার ব্যক্তিত্বদের মাঝে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন যে, নিষিদ্ধ্ব ঘোষণা করা এই দল কিভাবে দিনে দুপুরে এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ঘোষণা দিয়ে একটা মিছিলের আয়োজন করতে পারে? অনেকেই মন্তব্য করছেন যে, আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের সময় ব্যাপক দমন-পীড়নের মাঝ দিয়ে যাবার পরেও কি করে তারা ১৬ বছর পর এতবড় মিছিলের আয়োজন করতে পেরেছে? অনেকেই আইনশৃংখলা বাহিনীর সমালোচনা করেছেন যে, কেন পুলিশ আরও কঠোর হলো না। কেউ কেউ বলছেন যে, পুলিশ কেন গুলি চালালো না? অবশ্য যারা বুঝতে পেরেছেন যে, এইচটি-র মিছিলে গুলি চালালে এই পুলিশ আর হাসিনা সরকারের জুলুমবাজ পুলিশের মাঝে কোন পার্থক্য থাকে না, তারা কিন্তু অন্ততঃ রয়েসয়ে কথা বলেছেন। তদুপরি অনেকেই বলেছেন যে, পুলিশের উচিৎ ছিল এইচটি-র সদস্যরা যাতে মিছিল শুরুই করতে না পারে, সেই ব্যবস্থা করা। এই কথা বলেও তারা অবশ্য ফেঁসে গেছেন যে, ঠিক এই কাজটাই আওয়ামী সরকার করেছিল বিএনপি-জামাতের বিরুদ্ধে - রাজনৈতিক কর্মকান্ড শুরু করার আগেই সেটাকে পুলিশ এবং গুন্ডাবাহিনী দ্বারা লন্ডভন্ড করে দেয়া। পুলিশ অবশ্য গত সাত মাসের অক্ষমতার রেকর্ড অক্ষুন্ন রেখেই নিজেদের অবস্থানকে তুলে ধরেছে - এখানে তো অনেক সাধারণ মুসল্লী ছিল। অর্থাৎ পুলিশ অন্ততঃ বুঝেছে যে, যখন বহু পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে হাসিনা সরকারের নির্দেশ মান্য করার জন্যে মামলা ঝুলছে, তখন নতুন করে কোন অমানবিক কাজের ফাঁদে আরেকবার পা দেয়াটা বিচক্ষণের কাজ হবে না। তারা অন্ততঃ এটা বুঝেছেন যে, কোন সরকারই স্থায়ী নয় – এমনকি আওয়ামী সরকার - যারা একসময় যখন মনে করতো যে তারা জার্মানির 'থাউজ্যান্ড ইয়ার রাইখ'এর মতো কিছু একটা বাংলাদেশের মাটিতে কায়েম করবে - তাদেরও পতন হয়েছে। সুতরাং আর কাউকেই পুরোপুরিভাবে বিশ্বাস করে আগুনে ঝাঁপ দেয়ার মতো বোকামি তারা করতে রাজি ছিল না। তবে সরকারের চাপ ছিল বলেই তারা কাপুরুষের মতো মিছিলের পেছন থেকে কোন উস্কানি ছাড়াই টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড এবং লাঠিচার্চের মাধ্যমে হামলা করেছে। এতে মিছিলকারীদের তেমন কোন ক্ষতি না হলেও পুলিশের কপালে কিন্তু আবারও জুলুমবাজের তকমা জুটে গেলো! বেচারা পুলিশ!
 
নিষেধাজ্ঞা না তোলার পরেও এইচটি তাদের কর্মকান্ড চালিয়ে যেতে পেরেছে; এবং একইসাথে ইউনুস সরকার কেন হাসিনা সরকারের জুলুমবাজ নীতিকে চালিয়ে নিলো, সেটার জন্যে ইউনুস সরকারের গণতন্ত্র রক্ষা করার কৌশলও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। কারণ ইউনুস সরকার যদি শক্তিশালী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতেই চায়, তাহলে সেটাকে পুলিশী কর্মকান্ডের মাধ্যমে রক্ষা করতে হবে কেন? দুর্বল গণতন্ত্রকে যদি স্ক্যাচে ভর করে চলতে হয়, তাহলে সেটা এইচটি-র বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে লড়বে কিভাবে? প্রকারান্তরে হাসিনার সিদ্ধান্তকে সমুন্নত রাখতে গিয়ে পুলিশি ব্যবস্থা প্রয়োগ করে সরকার এইচটি-র কাছে বুদ্ধিবৃত্তিক হারই স্বীকার করে নিয়েছে।


এইচটি কতটা সফল ছিল?

এখন প্রশ্ন হলো, এইচটি-র জন্যে এটা কি সফলতা ছিল কিনা? এটা বুঝতে হলে দেখতে হবে যে, তারা এর মাধ্যমে কি করতে চেয়েছে। 'মার্চ ফর খিলাফত' নামের প্রকল্প এবং এর ন্যারেটিভগুলি মোটামুটিভাবে ৩রা মার্চ থেকে পোস্টার আকারে সারা ঢাকা শহরে ছড়িয়ে যেতে থাকে। এতে একদিকে যেমন এইচটি তাদের দলীয় সক্ষমতার প্রমাণ দেয়, তেমনি সমাজের মাঝে তাদের সরাসরি ও চাপা সমর্থনের প্রমাণও সামনে চলে আসে। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই তারা দিনের বেলায় পোস্টার লাগিয়েছে; এবং অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ তাদেরকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে। পুলিশ এক্ষেত্রে বর্তমান প্রেক্ষাপটে নীরব ভূমিকা পালন করাটাকেই যুক্তিযুক্ত মনে করেছে। অন্ততঃ আওয়ামী সময়ে এইচটি-র সদস্যদের ধরে ধরে আয়নাঘরে ছুঁড়ে ফেলার মতো বাজে কাজের দুর্গন্ধ তাদের ইউনিফর্মে যখন লেগে আছে, তখন পুলিশ বক্সের উপর এইচটি-র পোস্টার লাগানোতে বাধা দিয়ে সেই জঘন্য স্মৃতি তারা আর সামনে আনতে চায়নি। তাই পোস্টার লাগানো চলেছে; যে যা কিছুই মনে করুক; এটাই বাস্তবতা। যারা অভিযোগ করছেন, তাদেরকে বাস্তবতা মেনে নিতেই হবে।

মোটকথা এইচটি বাস্তবতাকে তাদের পক্ষে পরিবর্তন করিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে; যা অবশ্য ২০২৪এর ০৫ই অগাস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতি দ্বারা প্রভাবিত হলেও ১৫ বছরের শক্তিশালী রাজনৈতিক কর্মকান্ডের ফলাফল হিসেবেই এসেছে। কেননা, আওয়ামী সময়ের ১৫ বছর তারা যদি কোন কাজ করতে না-ই পারতো, তাহলে কেউই বলতে পারতো না যে, এইচটি ০৫ই অগাস্টের অভ্যুত্থানের অংশীদার। আর কেউ যদি এইচটি-র নাম না-ই জানতো, তাহলে তারা আওয়ামী লীগের পতনের পরপরই বাইতুল মুকাররমের উত্তর গেটে দু'টা বড় বড় মিছিল করতে সক্ষম হতো না। এছাড়াও তারা গত ২৯শে নভেম্বর একটা আন্তর্জাতিক অনলাইন কনফারেন্সও করেছে। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এইচটি-র উপর থেকে হাসিনা সরকারের দেয়া নিষেধাজ্ঞা তুলে না নিলেও এই কর্মকান্ডগুলিকে আটকানো সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞা না তোলার পরেও এইচটি তাদের কর্মকান্ড চালিয়ে যেতে পেরেছে; এবং একইসাথে ইউনুস সরকার কেন হাসিনা সরকারের জুলুমবাজ নীতিকে চালিয়ে নিলো, সেটার জন্যে ইউনুস সরকারের গণতন্ত্র রক্ষা করার কৌশলও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। কারণ ইউনুস সরকার যদি শক্তিশালী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতেই চায়, তাহলে সেটাকে পুলিশী কর্মকান্ডের মাধ্যমে রক্ষা করতে হবে কেন? দুর্বল গণতন্ত্রকে যদি স্ক্যাচে ভর করে চলতে হয়, তাহলে সেটা এইচটি-র বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে লড়বে কিভাবে? প্রকারান্তরে হাসিনার সিদ্ধান্তকে সমুন্নত রাখতে গিয়ে পুলিশি ব্যবস্থা প্রয়োগ করে সরকার এইচটি-র কাছে বুদ্ধিবৃত্তিক হারই স্বীকার করে নিয়েছে।
 
তারা যে ব্যাপারটা ধরতেই পারেনি তা হলো, এইচটি-র পক্ষে বা বিপক্ষে যেকোন কিছু লিখলেই সেটা এইচটি-কে সহায়তা করবে। কারণ এইচটি হলো একটা আদর্শিক দল; যারা সকল মুসলিমকে নিজেদের দাওয়ার আওতায় ধরে। অর্থাৎ তারা আওয়ামী লীগ, বিএনপি, সরকারি-বেসরকারি চাকুরিজীবি, ব্যবসায়ী, সামরিক অফিসার, শিক্ষক, চিন্তাবিদ, যে কাউকে দাওয়া করে; বিশেষ করে যারা সমাজের এলিট শ্রেণি। বর্তমানে কেউ কেউ বলছে যে, এইচটি-র বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাথে সখ্যতা রয়েছে। আবার আরেক দল বলছে যে, এইচটি-র পেছনে আওয়ামী লীগের পান্ডারা লুকিয়ে আছে। 


এইচটি-র ব্যাপারে হাসিনা সরকারের নীতি

গত ১৫ বছর হাসিনা সরকার মার্কিন ইন্টেলিজেন্সের গাইডলাইন অনুযায়ী চলেছে। এইচটি হলো একটা আদর্শিক সংগঠন। তাদেরকে হয় আদর্শিক কাউন্টার-ন্যারেটিভের মাধ্যমে আটকাতে হবে; নতুবা তাদের কথা জনগণের কাছে যাতে একেবারেই পৌঁছাতে না পারে, সেটার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রথমটা বেশ কঠিন। কারণ এইচটি কোন জিহাদী গ্রুপ নয়; যার বিরুদ্ধে সহজেই কোন ন্যারেটিভ তৈরি করে সাধারণ মানুষকে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা থেকে দূরে রাখা সম্ভব। একারণে হাসিনা সরকার দ্বিতীয় পদ্ধতিটা অনুসরণ করেছে; যদিও তাদের সামনে আর কোন পদ্ধতিও খোলা ছিল না। কারণ ২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহে ভারত এবং আওয়ামী লীগের সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকার ব্যাপারে লিফলেট ইস্যু করার পর এইচটি আওয়ামীদের চক্ষুশূলে পরিণত হয়। একইসাথে এইচটি হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে তাদের কাছে হস্তান্তরের জন্যে সামরিক বাহিনীর অফিসারদের দিকে আহ্বান করতে থাকে। নিষেধাজ্ঞা আসাটা ছিল প্রায় অবধারিত। এটা জানা সত্ত্বেও তারা তাদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি এবং পরবর্তীতে অনেক বছর ধরে ব্যাপক জুলুম নির্যাতন সহ্য করেছে। বাংলাদেশের আইনে কোন অপরাধ প্রমাণিত না হলেও কোন কারণ ছাড়াই তাদের সদস্যদেরকে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর জেলে পুরে রাখা হয়েছিল। আয়নাঘরে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিকভাবে মারত্মক নির্যাতন করা হয়েছিল।

তবে এই ১৫ বছরের সবচাইতে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল টোটাল মিডিয়া ব্ল্যাকআউট। সকল মিডিয়াকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিলো, যাতে করে কোন মিডিয়াতে এইচটি-র কোন কর্মকান্ড না আসে। এই সুযোগে হাসিনা সরকার এইচটি-র বিরুদ্ধে বিভিন্ন মিথ্যা তথ্য ছড়াতে সক্ষম হয়েছিলো। কারণ জগগণ শুধু সরকার-নিয়ন্ত্রিত মিডিয়াই দেখতে পেতো। এরপরেও এইচটি এই সময়ে তাদের কর্মকান্ডকে চালিয়ে নিতে পেরেছে; যা কিনা যে কোন সাধারণ রাজনৈতিক দলের জন্যে প্রায় অসম্ভব কাজ। এক্ষেত্রে অন্যান্য দেশে এইচটি-র অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছে। কারণ এইচটি বিভিন্ন দেশে ভয়াবহতম একনায়ককে মোকাবিলা করেছে; যাদের মাঝে ছিল ইরাকের সাদ্দাম হোসেন, লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফি, মিশরের হোসনি মুবারক এবং উজবেকিস্তানের ইসলাম কারিমভ। গ্লোবাল আদর্শিক দল হবার কারণে তারা বাংলাদেশে ১৫ বছরের আওয়ামী দুঃশাসনের মাঝে শুধু টিকেই যায়নি; নিজেদের দলকে আরও বড় ও মজবুত করেছে। ঢাকার স্বনামধন্য স্কুল-কলেজের ছাত্ররা কালেমা খচিত পতাকা নিয়ে মিছিল করার পর দিল্লীতে অনেকেরই ঘাম ঝড়ে গিয়েছে। কারণ ভারত মনে করেছে যে, এটা এইচটি-ই করেছে। ঢাকায় জেনারেশন-জেড (জেন-জি)এর পতাকা মিছিল দিল্লীর জন্যে ছিল অশনি সংকেত।

০৫ই অগাস্টের পরিবর্তনের পর এইচটি-র জন্যে সবচাইতে বড় ব্যাপার ছিল প্রকাশ্যে দাওয়ার কাজ করতে পারা। এটা অবশ্য পুলিশ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার কারণেই সম্ভব হয়েছে। তথাপি মিডিয়া ব্ল্যাকআউট কিন্তু ঠিকই চলেছে। এই ব্যাপারটা পুরোপুরিভাবে পরিবর্তন হয়ে গেছে, যখন 'মার্চ ফর খিলাফত' অনুষ্ঠানের ব্যাপারে পুলিশের বিবৃতি আসে এবং সকল মিডিয়া এটাকে ফলাও করে প্রচার করে। এটা ঠিক যে, পুলিশের এই নিষেধাজ্ঞার কারণে এইচটি-র অনেক সমর্থকই হয়তো মিছিলে যোগ দেয়নি। তথাপি যে পরিমাণ প্রচার পুলিশ এবং মিডিয়ার মাধ্যমে তারা পেয়েছে, তাতে অনুষ্ঠানের আগেই তাদের অর্ধেক বিজয় হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে এইচটি-র বড় একটা বিজয় হয়ে গিয়েছে অনুষ্ঠানের আগেই। আর অনুষ্ঠানের দিন জুমআর নামাজ শেষ হবার সাথেসাথেই যখন দেখা গেলো যে, হাজারো মুসল্লির বিশাল জনস্রোত এইচটি-র সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছে, তখন বাকি অর্ধেক বিজয়ও তারা পেয়ে গেছে। কারণ নিষেধাজ্ঞার পরেও এত মানুষ এই মিছিলে যোগ দেবে, এটা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি!

বাকিটা ছিল ইতিহাস। যে এইচটি ১৫ বছরে মিডিয়াতে আসতে পারেনি, তারা ৭ই মার্চ ছিল সকল মিডিয়ার প্রধান শিরোনাম। প্রকৃতপক্ষে সেদিন এইচটি ছিল বাংলাদেশের একমাত্র শিরোনাম! এটা এই দলকে কতটা এগিয়ে নিয়ে গেছে, তা যারা ভূরাজনীতি নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন তাদের বোঝার কথা। এইচটি-র টার্গেট অডিয়েন্স ছিল মূলতঃ সামরিক বাহিনীর সদস্যরা; যারা এইচটি-র সক্ষমতার একটা চাক্ষুশ প্রমাণ পেলো। অন্ততঃ তাদের টার্গেট অডিয়েন্সের কাছে এইচটি-র সন্মান যে বহুগুণে বেড়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
 
হাসিনা সরকারের ১৫ বছরের দমন পীড়নের পরেও এইচটি যখন এতবড় জনসমাগম করতে সক্ষম হয়েছে, তখন এদেশের সেকুলার সমাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত পুলিশকে দোষারোপ করেছে; যেখানে সকলেই জানে যে, সারা দেশের কোথাও নিরাপত্তা দেয়ার সক্ষমতা পুলিশের নেই। কোন বুদ্ধিবৃত্তিক কাউন্টার-ন্যারেটিভ বের করতে না পেরে হাসিনা সরকারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে জুলুমবাজ নীতিকে অগ্রাধিকার দেয়ার ব্যাপারটা সেকুলার চিন্তাবিদদের বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিউয়াত্বকেই তুলে ধরে। অথচ এইচটি-র কন্ঠরোধ করার এই নীতিতে তাদের গণতান্ত্রিক আদর্শের প্রধান একটা স্তম্ভ বাক-স্বাধীনতা যে ভূলুন্ঠিত হয়ে যাচ্ছে, সেদিকে তাদের খেয়ালই নেই।


এইচটি-র বিরুদ্ধে প্রচারণা - লাভ কার?

বাংলাদেশের পুরো সেকুলার সমাজের ব্যাপক প্রচেষ্টা শুরু হয়ে গেলো কিভাবে এইচটি-কে জনগণের সামনে খারাপভাবে তুলে ধরা যায়। সত্যাসত্য অনেক কিছুই সোশাল মিডিয়াতে ভরিয়ে দিতে থাকে অনেকে। অথচ তারা যে ব্যাপারটা ধরতেই পারেনি তা হলো, এইচটি-র পক্ষে বা বিপক্ষে যেকোন কিছু লিখলেই সেটা এইচটি-কে সহায়তা করবে। কারণ এইচটি হলো একটা আদর্শিক দল; যারা সকল মুসলিমকে নিজেদের দাওয়ার আওতায় ধরে। অর্থাৎ তারা আওয়ামী লীগ, বিএনপি, সরকারি-বেসরকারি চাকুরিজীবি, ব্যবসায়ী, সামরিক অফিসার, শিক্ষক, চিন্তাবিদ, যে কাউকে দাওয়া করে; বিশেষ করে যারা সমাজের এলিট শ্রেণি। বর্তমানে কেউ কেউ বলছে যে, এইচটি-র বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাথে সখ্যতা রয়েছে। আবার আরেক দল বলছে যে, এইচটি-র পেছনে আওয়ামী লীগের পান্ডারা লুকিয়ে আছে। যেটা এরা কেউই চিন্তা করতে পারছে না তা হলো, এইচটি-র এব্যাপারে কোন মাথাব্যাথা থাকবে না। কারণ এত বছরে এইচটি-র কোন ন্যারেটিভে দেখা যাবে না যে, তারা অন্য কারুর কর্মকান্ডকে অনুসরণ করে নিজেদের কর্মকান্ডকে সাজিয়েছে। তারা সর্বদাই নিজেদের অদর্শকে সমুন্নত রেখে তাদের লক্ষ্য ঠিক করেছে এবং সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিভিন্ন কর্মকান্ড করেছে। অর্থাৎ তারা সর্বদাই 'প্রোএকটিভ' থেকেছে; কখনোই 'রিএকটিভ' হয়নি। কাজেই এটা আশা করা যায় না যে, তারা কারুর মিথ্যা তথ্য ছড়ানোতে 'রিএকশন' দেখাবে। বরং এতে এইচটি-র ব্যাপারে সমাজে আরও বেশি কৌতুহল তৈরি হবে এবং আরও বেশি আলোচনা হবে; যেখানে এইচটি-কে কেউই বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে হারাতে সক্ষম হবে না। কারণ তাদের বিরুদ্ধে কাউন্টার-ন্যারেটিভ তৈরি করাটা যথেষ্টই কঠিন। মোটকথা, এর মাধ্যমে এইচটি আবারও বাস্তবতাকে পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে। একসময় তাদের ব্যাপারে কেউ কোন কথা বলতো না; আর এখন তাদের কথা সকলের মুখে মুখে। এটা এইচটি-র জন্যে অনেক বড় একটা বিজয়।

পুরো বাংলাদেশের মানুষ অবাক হয়ে দেখেছে কিভাবে এইচটি ঘোষণা দিয়ে বাইতুল মুকাররমে মিছিল করেছে; সেটাও আবার পুলিশের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও। হাসিনা সরকারের ১৫ বছরের দমন পীড়নের পরেও এইচটি যখন এতবড় জনসমাগম করতে সক্ষম হয়েছে, তখন এদেশের সেকুলার সমাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত পুলিশকে দোষারোপ করেছে; যেখানে সকলেই জানে যে, সারা দেশের কোথাও নিরাপত্তা দেয়ার সক্ষমতা পুলিশের নেই। কোন বুদ্ধিবৃত্তিক কাউন্টার-ন্যারেটিভ বের করতে না পেরে হাসিনা সরকারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে জুলুমবাজ নীতিকে অগ্রাধিকার দেয়ার ব্যাপারটা সেকুলার চিন্তাবিদদের বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিউয়াত্বকেই তুলে ধরে। অথচ এইচটি-র কন্ঠরোধ করার এই নীতিতে তাদের গণতান্ত্রিক আদর্শের প্রধান একটা স্তম্ভ বাক-স্বাধীনতা যে ভূলুন্ঠিত হয়ে যাচ্ছে, সেদিকে তাদের খেয়ালই নেই। অপরদিকে সেকুলার রাজনৈতিক দলের সমর্থকেরা হতবিহ্বল হয়ে একে অপরকে দোষারোপ করছে - বলছে যে, এইচটি উমুক বা তুমুক দলের সাথে রয়েছে। এইচটি কিছুই বলবে না। তারা তো আদর্শিক দল হবার কারণে সকলকেই দাওয়া করে। তাই তারা সকলকেই তাদের নিজেদের লোক মনে করে। কাজেই কেউ যদি বলে যে, এইচটি ওদের লোক, তারা কখনোই এতে ব্যাথিত হবে না। কারণ এতে তাদের সংখ্যা শুধু বৃদ্ধিই পায়। শুধুমাত্র এই বাস্তবতাটুকু অনুধাবন করার সক্ষমতাও যে বাংলাদেশের বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবিদের নেই, সেটা আজ প্রমাণিত সত্য। বাংলাদেশের পুরো সেকুলার সমাজ আজকে এইচটি-র কাছে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পরাজিত! এটা ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও দিনটাকে গুরুত্বপূর্ণ করেছে। কারণ প্রথমতঃ এইদিনের মিছিল ছিল ৩রা মার্চের খিলাফত পতন দিবসের ১০১তম (ইংরেজি ক্যালেন্ডারে) বর্ষপুর্তি উপলক্ষে; যা সারা বিশ্বে রমজানের প্রথম জুমআর দিনে একযোগে পালিত হয়েছে। আর দ্বিতীয়তঃ ঢাকায় এইচটি-র এতবড় উত্থান ওয়াশিংটন ও দিল্লীর জন্যে বড় একটা চিন্তার বিষয়। ওয়াশিংটনে যখন বড় রকমের পরিবর্তন চলছে, দিল্লীর নেতৃত্ব তখন শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে বিপদ গুণছে। ০৫ই অগাস্টের পর থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারত বিভিন্ন সাবভার্সনের কাজ করে বাংলাদেশ সরকারকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছাড় দিতে বাধ্য করেছে। তথাপি এক্ষেত্রে হোয়াইট হাউজে বাইডেন সরকার থাকার সময় ওয়াশিংটন থেকে বাংলাদেশের উপর রাজনৈতিক চাপ বড় ভূমিকা রেখেছিল। এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে আগমণ যুক্তরাষ্ট্রে শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে; যার প্রমাণ ন্যাটো, ইউক্রেন এবং মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে দৃশ্যমান। আটলান্টিকের ওপাড়ে এহেন বড় পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে ঢাকায় এইচটি-র উত্থান একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ৭ই মার্চ ২০২৫ সত্যিই ছিল একটা ঐতিহাসিক দিন!

Tuesday, 3 December 2024

ভারত কেন অস্তিত্ব সংকটে?

০৩রা ডিসেম্বর ২০২৪

হিযবুত তাহরীরের সরাসরি কর্মকান্ড ছাড়াও ঢাকার রাস্তায় সবচাইতে প্রসিদ্ধ স্কুলগুলির ছাত্রদের মিছিল ছিল উল্লেখ করার মতো; যেখানে তারা কলেমা খচিত কালো পতাকা নিয়ে মিছিল করে এবং খিলাফতের দাবিতে স্লোগান দেয়। এর অর্থ হলো দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে হিযবুত তাহরীর শক্ত অবস্থান নিয়েছে এবং এই প্রতিষ্টানগুলির ছাত্রদেরকে তারা রাস্তায় নামাতে সক্ষম। 


বাংলাদেশে উগ্রপন্থী হিন্দু সংগঠন 'ইসকন'এর কর্মকান্ড এবং এর নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেপ্তার ও দেশদ্রোহীতার মামলাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশ এবং ভারতের সম্পর্ক নিয়ে আরেক দফা আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছে। গত ৫ই অগাস্ট গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। বিশেষ করে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় প্রদানকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী চিন্তাটা শক্তিশালী হচ্ছিলো। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে নিরাপত্তা পরিস্থিতি টালমাটাল হবার পেছনে অনেকেই ভারতের ইন্ধনকেই দায়ী করছিলেন। তবে এর মাঝে 'ইসকন'এর ব্যাপারটা সামনে চলে আসার পর উগ্রবাদী হিন্দুদের নিয়ে আলোচনা প্রবল হয়েছে; কারণ ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বসবাসরত হিন্দুদের ব্যাপারে বক্তব্য দিচ্ছে; যা কিনা কিনা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ভারতের হস্তক্ষেপের শামিল। বাংলাদেশকে নিয়ে ভারতের শংকার মূল কারণটা বের করতে হলে ভারতীয় চিন্তাবিদেরা কোন ব্যাপারটাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে এবং তাদের মিডিয়া পুরো ব্যাপারটাকে কিভাবে দেখছে, তা খতিয়ে দেখতে হবে।

ভারতীয় কূটনীতিবিদ হর্ষবর্ধন শ্রিংলা 'এনডিটিভি'র সাথে এক সাক্ষাতে বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের মূল শংকাটা তুলে ধরেন। তিনি বলেন যে, ভারত বাংলাদেশের সেকুলার সংবিধানের অবমাননা অবলোকন করে শংকিত হয়েছে। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর যারা সুবিধা পেয়েছে, তাদের মাঝে রয়েছে বিভিন্ন ইসলামপন্থী দল; যারা বাংলাদেশের রাজনীতি এবং সমাজের সাথে অনেকদিন থেকেই জড়িত। তিনি বলেন যে, বাংলাদেশে জামাত-এ ইসলামী ছাড়াও হিযবুত তাহরীর, জামাতে মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), হিযবুল আনসার (সম্ভবতঃ তিনি আনসারউল্লাহ বাংলা টীম বা এবিটিকে বুঝিয়েছেন), ইত্যাদি দল রয়েছে; যারা বাংলাদেশে একটা খিলাফত প্রতিষ্ঠার সুযোগ খুঁজছে। তিনি বলেন যে, এই শক্তিগুলি ধীরে ধীরে বাংলাদেশের ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে চলে যাচ্ছে। মোহাম্মদ ইউনুসের সরকার প্রচেষ্টা চালালেও এই ইসলামিক দলগুলি আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া শূণ্যস্থানগুলি পূরণ করছে এবং তারা অনেক ক্ষেত্রেই যথেষ্ট প্রভাবশালী। এই অবস্থানগুলিতে থেকে তারা মিডিয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে প্রভাবিত করা ছাড়াও যারা ক্ষমতায় রয়েছে তাদেরকেও প্রভাবিত করতে সক্ষম হচ্ছে। তিনি আরও বলেন যে, বাংলাদেশে ৫ই অগাস্টের পরিবর্তনের পর ভারতের মূল চিন্তা ছিল দু'টা। প্রথমতঃ সীমানা পেরিয়ে ভারতে যেন কোন প্রকারের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ না হয়; বিশেষ করে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলের 'সেভেন সিস্টার্স' বলে পরিচিত রাজ্যগুলিতে। আর দ্বিতীয়তঃ বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর যেন কোন প্রকারের অত্যাচার না হয়, যা নিয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে ভারতের কথা বলতে হয়। এই দু'টা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার যদি শক্ত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ভারতের দিক থেকে বিবৃতি আসতে থাকবে এবং ভারত অগ্রগামী হয়ে সিদ্ধান্ত নেবে; কারণ এটা ভারতের জন্যে একটা চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি। আর এই ব্যাপারগুলির সমাধান না হলে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে যথেষ্টা অবনতি হতে পারে।
 
৫ই অগাস্টের পরিবর্তনের সাথেসাথেই বাংলাদেশের রাস্তায় হিযবুত তাহরীরের মিছিল দেখে ভারতীয় চিন্তাবিদেরা এবং মিডিয়া বিচলিত হয়ে পড়ে। ১০ই অক্টোবর ভারত সরকার হিযবুত তাহরীরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। খবরে বলা হয় যে, নিষিদ্ধ ঘোষণার মূল কারণ হলো, হিযবুত তাহরীর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে উৎখাত করে ভারতসহ সারা বিশ্বে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়; যা কিনা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।  


শ্রিংলার বক্তব্যে কয়েকটা ইসলামি সংগঠনের নাম আসলেও মূলতঃ জামাত-এ-ইসলামী, জেএমবি এবং এবিটির নাম তিনি উল্লেখ করেছেন সীমান্ত পেরিয়ে কার্যকলাপ এবং 'সেভেন সিস্টার্স'এর নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে। আর হিযবুত তাহরীরএর নাম তিনি বলেছেন বাংলাদেশে খিলাফত প্রতিষ্ঠার শংকা থেকে। গত ১০ই অক্টোবর ভারত সরকার হিযবুত তাহরীরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিকে উল্লেখ করে 'দ্যা হিন্দু' পত্রিকার এক খবরে বলা হয় যে, নিষিদ্ধ ঘোষণার মূল কারণ হলো, হিযবুত তাহরীর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে উৎখাত করে ভারতসহ সারা বিশ্বে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়; যা কিনা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। ৫ই অগাস্টের পরিবর্তনের সাথেসাথেই বাংলাদেশের রাস্তায় হিযবুত তাহরীরের মিছিল দেখে ভারতীয় চিন্তাবিদেরা এবং মিডিয়া বিচলিত হয়ে পড়ে। ৯ই অগাস্ট ঢাকার বাইতুল মুকাররম মসজিদে হিযবুত তাহরীরের বিশাল মিছিলকে কেন্দ্র করে ভারতীয় মিডিয়া 'অপইন্ডিয়া' বিশদ প্রতিবেদন উপস্থাপন করে। সেখানে উল্লেখ করা হয় যে, হিযবুত তাহরীর বলছে যে, দেশের সকল সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে সেকুলার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। এবং শুধুমাত্র খিলাফত ব্যবস্থাই সত্যিকারের সুবিচার এবং কল্যাণ বয়ে আনতে সক্ষম। একইসাথে তারা বিদেশী কোম্পানিগুলিকে বের করে দেয়ার কথা বলে এবং অমুসলিম দেশগুলির সাথে সমস্ত কৌশলগত চুক্তি বাতিল করার কথা বলে। 'অপইন্ডিয়া' হিযবুত তাহরীরের পোস্টারে সূরা মায়িদার ৪৫ নম্বর আয়াতের কথা উল্লেখ করে, যেখানে বলা হয়েছে যে, ‘যারা আল্লাহর আইন দ্বারা বিচার ফয়সালা করেনা, তারা জালিম'। সেখানে পোস্টারের উল্লেখ করে বলা হয় যে, হিযবুত তাহরীর সামরিক বাহিনীর নিষ্ঠাবান অফিসারদেরকে আহ্বান জানাচ্ছিল যাতে করে তারা সরকারকে উৎখাত করে হিযবুত তাহরীরের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। অগাস্ট মাসে ভারতের 'দ্যা নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস' হিযবুত তাহরীরএর উপর এক প্রতিবেদনে শংকা প্রকাশ করে বলে যে, নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পরেও তারা যে ঢাকা এবং অন্যান্য স্থানে মিছিল করতে পারছে এবং পোস্টার লাগাতে পারছে, তা ভারতের জন্যে বিরাট শংকার ব্যাপার। প্রতিবেদনে বলা হয় যে, এই সংস্থাটির শক্ত অবস্থান রয়েছে শিক্ষিত জনগণের মাঝে। এছাড়াও সেনাবাহিনীর মাঝে তাদের শক্তিশালী সমর্থন রয়েছে। আর যেহেতু তারা সেকুলার গণতন্ত্রের বিরোধী, তাই সেটা যথেষ্টা চিন্তার বিষয়।

ভারতীয় সরকার হিযবুত তাহরীরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পর ভারতীয় মিডিয়া 'ফার্স্ট পোস্ট'এর এক লেখায় কোলকাতার 'সেন্ট জেভিয়ার কলেজ’এর শিক্ষক সায়ান্তান ঘোষ বলেন যে, নিষিদ্ধ ঘোষণা করার ব্যাপারটা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার ইস্যুকে হাইলাইট করছে এবং বলে দিচ্ছে যে, ভারত সরকার হিযবুত তাহরীরের ব্যাপারে কতটা শংকার মাঝে রয়েছে। সায়ান্তান ঘোষ বলছেন যে, হিযবুত তাহরীরের সরাসরি কর্মকান্ড ছাড়াও ঢাকার রাস্তায় সবচাইতে প্রসিদ্ধ স্কুলগুলির ছাত্রদের মিছিল ছিল উল্লেখ করার মতো; যেখানে তারা কলেমা খচিত কালো পতাকা নিয়ে মিছিল করে এবং খিলাফতের দাবিতে স্লোগান দেয়। এর অর্থ হলো দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে হিযবুত তাহরীর শক্ত অবস্থান নিয়েছে এবং এই প্রতিষ্টানগুলির ছাত্রদেরকে তারা রাস্তায় নামাতে সক্ষম। লেখায় বলা হয় যে, ১৯৫৩ সালে জেরুজালেমে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থার কর্মকান্ড অহিংস হলেও এর মূল লক্ষ্য হলো সেকুলার গণতান্ত্রিক সরকারগুলিকে উৎখাত করা, বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সরিয়ে দেয়া এবং একটা ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এই লক্ষ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলির সার্বভৌমত্বের বিরোধী এবং ধর্মনিরপেক্ষ সেকুলার সমাজের প্রতি হুমকিস্বরূপ। বাংলাদেশে ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠার পর ২০০৯ সালে সংস্থাটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু নিষিদ্ধ ঘোষণা করা সত্ত্বেও সংস্থাটি তাদের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করতে পেরেছে; বিশেষ করে রাজনৈতিক অত্যাচারের শিকার জনগণকে তারা তাদের পক্ষে নিয়ে এসেছে এবং বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে হতাশ জনগোষ্ঠীকে তারা আলিঙ্গন করেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তারা আরও শক্তিশালী পদক্ষেপ নিয়েছে; যেমন – প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে, সরকার-বিরোধী লিফলেট ছড়িয়েছে, এমনকি কলেমা-খচিত কালো পতাকা নিয়ে মিছিল করেছে। সায়ান্তান ঘোষ আরও বলছেন যে, হিযবুত তাহরীরের সবচাইতে শংকার দিক হলো তারা শিক্ষিত তরুণদেরকে তাদের দলে ভেড়াচ্ছে। তারা বেকারত্ব, রাজনৈতিক দূর্নীতি, এবং স্থবির সমাজের শিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের যুবকদের নিজেদের পতাকাতলে নিয়ে এসেছে। সংস্থাটি এই যুবকদেরকে বিশ্ব সম্পর্কে একটা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দিচ্ছে; যার মূলে রয়েছে ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সকল সমস্যার সমাধান। শিক্ষিত সমাজকে নিজেদের দলে নিয়ে আসতে পারার ব্যাপারটাই হিযবুত তাহরীরকে জামাত-এ-ইসলামীর মতো সংস্থাগুলি থেকে আলাদা করেছে। কারণ তারা বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে এগিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে নিজেদের দলে ভেড়াচ্ছে; যা প্রতিহত করাটা অনেক বেশি কঠিন। শুধু তা-ই নয়, তাদের চিন্তাগত কর্মকান্ডগুলি ক্ল্যাসিক ইসলামিক নেটওয়ার্কেরও (আলেম-ওলামা) বাইরে; একেবারে সমাজের প্রধান ধারার মানুষদের মাঝে; যা কিনা ভারতীয় নিরাপত্তা এজেন্সিগুলির সবচাইতে বড় চিন্তার কারণ।
 
হিযবুত তাহরীরএর ভারত-বিরোধী মিছিল। বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও যে ভারতের সাথে সম্পর্ক খারাপ করতে চাইছে না, তা সরকারের উপদেষ্টাদের বিবৃতিতে পরিষ্কার। সরকার হিযবুত তাহরীরের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে না নেয়া ছাড়াও সংস্থাটির মিডিয়া সমন্বয়ক ইমতিয়াজ সেলিমকে ৪ঠা অক্টোবর গ্রেপ্তার করে ভারতের সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। কিন্তু চিন্ময় ইস্যুকে কেন্দ্র করে দিল্লী সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় ভারতীয় মিডিয়া যখন উগ্রপন্থী হিন্দু জনগোষ্ঠীকে খেপিয়ে তুলে, তখন বাংলাদেশের মানুষের মাঝে ভারত-বিদ্বেষী মনোভাব আরও একধাপ এগিয়ে যায়। বাংলাদেশের সেকুলার গ্রুপগুলিই এখন ভারত থেকে 'সেভেন সিস্টার্স' রাজ্যগুলিকে আলাদা করে ফেলার হুমকি দিচ্ছে।


হিযবুত তাহরীরের পক্ষ থেকে ইউনুস সরকারের প্রতি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবার আহ্বান জানানো হলে গত সেপ্টেম্বরে ‘দ্যা ইকনমিক টাইমস'এর এক প্রতিবেদনে ভারতের দুশ্চিন্তার কথা তুলে ধরা হয়। সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয় যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জামাত-এ-ইসলামীর উপর থেকে আওয়ামী লীগের দেয়া নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে; কাজেই একই সূত্রে হিযবুত তাহরীরএর উপর থেকেও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া উচিৎ। তবে বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও যে ভারতের সাথে সম্পর্ক খারাপ করতে চাইছে না, তা সরকারের উপদেষ্টাদের বিবৃতিতে পরিষ্কার। সরকার হিযবুত তাহরীরের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে না নেয়া ছাড়াও সংস্থাটির মিডিয়া সমন্বয়ক ইমতিয়াজ সেলিমকে ৪ঠা অক্টোবর গ্রেপ্তার করে ভারতের সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। কিন্তু চিন্ময় ইস্যুকে কেন্দ্র করে দিল্লী সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় ভারতীয় মিডিয়া যখন উগ্রপন্থী হিন্দু জনগোষ্ঠীকে খেপিয়ে তুলে, তখন বাংলাদেশের মানুষের মাঝে ভারত-বিদ্বেষী মনোভাব আরও একধাপ এগিয়ে যায়। বাংলাদেশের সেকুলার গ্রুপগুলিই এখন ভারত থেকে 'সেভেন সিস্টার্স' রাজ্যগুলিকে আলাদা করে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। বিএনপির মতো সেকুলার রাজনৈতিক দলগুলি এবং জামাত-এ-ইসলামীর মতো ইসলামী দলগুলি এক্ষেত্রে জনগণের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হিমসিম খাচ্ছে।

৫ই অগাস্টে বাংলাদেশের পট পরিবর্তন ভারতের জন্যে হুমকি-রূপে আবির্ভূত হয়েছে। জামাত-এ-ইসলামীর মতো সংগঠনের সমর্থকেরা সরকারের আশেপাশে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে থাকাকে ভারত যত বড় হুমকি হিসেবে দেখছে, তার চাইতে বহুগুণে বড় হুমকি হিসেবে দেখছে বাংলাদেশের শিক্ষিত 'এলিট' সমাজের যুবকদের মাঝে এবং দেশের সার্বভৌমত্বের রক্ষাকারী সেনাবাহিনীর অফিসারদের মাঝে হিযবুত তাহরীরের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিকে। হর্ষবর্ধন শ্রিংলার কথায় এটা পরিষ্কার যে, ঢাকায় খিলাফত প্রতিষ্ঠার ডাক ভারতের অস্তিত্বের প্রতি হুমকিস্বরূপ। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ব্যাপক ভারত-বিদ্বেষী মনোভাব জেগে ওঠার সাথেসাথে ঢাকার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজ-স্কুলের ছাত্রদের কলেমা-খচিত পতাকা নিয়ে ঢাকার রাস্তায় মিছিল ভারতকে মারাত্মকভাবে বিচলিত করেছে। বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি যখন টালমাটাল অবস্থায় রয়েছে, তখন হিযবুত তাহরীর সারা দেশে পোস্টার এবং লিফলেট বিলি করে গত ২৯শে নভেম্বর এক অনলাইন কনফারেন্সের আয়োজন করে; যেখানে সংস্থাটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সমস্যার সমাধান নিয়ে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটা সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রস্তাব করা হয়। এটা পরিষ্কার যে, ২০০৯ সালে বিডিআর হত্যাকান্ডের পর বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের নির্দেশে হিযবুত তাহরীরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত সেকুলার গণতন্ত্রকে রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদে কোন ফলাফল বয়ে নিয়ে আসেনি। আর ২০২৪ সালে ভারতে হিযবুত তাহরীরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা এবং 'ইসকন'সহ নানা ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ দিল্লীর অস্তিত্ব হারাবার শংকাকেই তুলে ধরে।