Sunday, 23 April 2017

ব্যর্থ সফর এবং নিম্নমানের কূটনীতি

২৪শে এপ্রিল ২০১৭

ভারত যেসব দেশের সাথে সামরিক সমঝোতা করতে পারে, যেমন নেপাল, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, ভুটান – এরাও যখন ভারতের প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে আসার চিন্তা করছে, তখন বাংলাদেশের নেতৃত্বের ভারতের পক্ষ থেকে আসা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় সামরিক সমঝোতার প্রস্তাব এড়িয়ে যেতে না পারাটা রাজনৈতিক দুর্বলতার লক্ষণ। অন্তত তিস্তা চুক্তি না হবার কারণেও বাংলাদেশের পক্ষে সহজেই ভারতের উপরে চাপ সৃষ্টি করে সামরিক সমঝোতা এড়ানো যেত।


একটি সম্পূর্ণ অদরকারি সমঝোতা......

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফর করলেন এবং বাংলাদেশের জনগণের অতি আকাংক্ষিত পানির সমস্যা সমাধান না করেই দেশে ফেরত আসলেন। কাজেই এই সফরকে আপাতদৃষ্টিতে ব্যর্থ সফর বলা ছাড়া গতি থাকে না। ভারত তাঁকে ডেকে নিয়ে গেছে এমন সময়, যখন তিস্তার ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত বাংলাদেশের মানুষ শুধু পানির ব্যাপারেই একটি মিমাংসা চাইছিল। মূল আলোচ্য বিষয় পানিকে পাশে ঠেলে দিয়ে যখন নিরাপত্তা এবং সামরিক বিষয়ে একটি চুক্তির প্রস্তাব করা হলো, তখন সেই সফরের যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠাটা স্বাভাবিক। ভারত খুব ভালো করেই জানে যে বাংলাদেশের মানুষ ভারতের সাথে যে কোন ধরণের সামরিক সমঝোতার বিরুদ্ধতা করবে; কারণ একে তো মুসলিম বিশ্বাসের বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ভারতের বিজেপি সরকারের মাঝে হিন্দুত্ববাদিতা দেখে, তার উপরে ভৌগোলিক এবং রাজনৈতিক কারণেও ভারতকে একমাত্র শত্রুদেশ হিসেবে চিন্তা করে। এমন একটি রাষ্ট্রের সাথে সামরিক সমঝোতা বাংলাদেশের মানুষের কাছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে ছোট করা হবে জেনেই ভারত এই সমঝোতায় বাংলাদেশকে চাপ দেয়।

তবে শুধু ভারতকে দোষারোপ করলেই তো হবে না। বাংলাদেশের তরফ থেকেই বা এই সমঝোতায় সই করা হলো কেন? বাংলাদেশ যখন সাবমেরিন ক্রয় করেছিল, তখন দিল্লীর নীতিনির্ধারকদের ঘর্মাক্ত শরীর জানান দিয়েছিল এমন এক বাংলাদেশের আবির্ভাবের, যা কিনা কারও দাসত্ব স্বীকার করবে না। কিন্তু এর পরবর্তীতে কি এমন ঘটে গেল যে ভারতীয় ইন্টেলিজেন্সের কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে চীন থেকে সমরাস্ত্র ক্রয়কে ব্যালান্স করতে গিয়ে আবার ভারতের সাথেই সামরিক সমঝোতায় বসতে হবে? চীন থেকে সমরাস্ত্র ক্রয়কে যদি ব্যালান্স করতেই হয়, তাহলে ভারতকে দিয়ে সেই ব্যালান্স নয়, করতে হবে অন্য কাউকে দিয়ে; যাতে ভারতও ব্যালান্সে থাকে। ভারত যেসব দেশের সাথে সামরিক সমঝোতা করতে পারে, যেমন নেপাল, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, ভুটান – এরাও যখন ভারতের প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে আসার চিন্তা করছে, তখন বাংলাদেশের নেতৃত্বের ভারতের পক্ষ থেকে আসা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় সামরিক সমঝোতার প্রস্তাব এড়িয়ে যেতে না পারাটা রাজনৈতিক দুর্বলতার লক্ষণ। অন্তত তিস্তা চুক্তি না হবার কারণেও বাংলাদেশের পক্ষে সহজেই ভারতের উপরে চাপ সৃষ্টি করে সামরিক সমঝোতা এড়ানো যেত।


বঙ্গবন্ধু যে মুহুর্তে জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে করমর্দন করলেন এবং অনান্য মুসলিম দেশের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিলেন, তখন ভারতের পায়ের তলা থেকে মাটি সড়ে গিয়েছিল। আন্তর্জাতিক কূটনীতির এরূপ উদাহরণ থাকতে বাংলাদেশের চীনকে ব্যালান্স করার জন্যে ভারতের সাথে সামরিক সমঝোতা করাটা অত্যন্ত নিম্নমানের কূটনীতির পর্যায়ে পড়ে।

ভারতের সাথে সামরিক সমঝোতা পুরো দক্ষিণ এশিয়াকে ইমব্যালান্স করবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরেও পাকিস্তানের কাছ থেকে যুদ্ধাপরাধের জন্যে একটি ক্ষমা প্রার্থনাও আসেনি; বরং সম্পর্ক আগের মতোই ঠান্ডা রয়ে গেছে। এই বিরোধ মিটমাট করাটাই কি সবচাইতে বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল না, যা করতে পারলে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ব্যালান্সটাই পরিবর্তিত হয়ে যেত। এরকম সমস্যা মিটমাট না করাটি কি ভারতের স্বার্থকেই সমুন্নত করেনি? ভারত কি নিশ্চিন্ত থাকছে না, যে বাংলাদেশ অথবা পাকিস্তানের সাথে সে আলাদাভাবে সামরিক সংঘাতে যেতে পারবে, কারণ একজনকে আক্রমণ করলে অন্যজন ‘নিরপেক্ষ’ থাকবে? বাংলাদেশের ইতিহাসেই ভারত-পাকিস্তানকে ব্যালান্স করার চমৎকার উদাহরণ রয়েছে। বঙ্গবন্ধু যে মুহুর্তে জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে করমর্দন করলেন এবং অনান্য মুসলিম দেশের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিলেন, তখন ভারতের পায়ের তলা থেকে মাটি সড়ে গিয়েছিল। আন্তর্জাতিক কূটনীতির এরূপ উদাহরণ থাকতে বাংলাদেশের চীনকে ব্যালান্স করার জন্যে ভারতের সাথে সামরিক সমঝোতা করাটা অত্যন্ত নিম্নমানের কূটনীতির পর্যায়ে পড়ে।



   
হিন্দুত্ববাদী ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ কি মুচলেকা নেবে, যে ভারত তার মার্কিন-নির্মিত এপাচি হেলিকপ্টার বাংলাদেশের ট্যাঙ্কের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে না? কোন গ্যারান্টিতে বাংলাদেশের জনগণ মেনে নেবে যে ভারত তার পি-৮ বিমানকে বাংলাদেশের সদ্য ক্রয় করা সাবমেরিনকে খুঁজে বের করতে ব্যবহার করবে না? ভারতের সাথে সামরিক সমঝোতা করে বাংলাদেশ কি জানান দিলো না, যে ভারতের সাথে চীন বা পাকিস্তানের সংঘর্ষে বাংলাদেশ ভারতের সাথেই থাকবে? আর এরকম সমঝোতার ফলাফল যদি হয় যে বাংলাদেশ তেমন কোন সংঘাতে ভারতের পাশেই থাকবে, তাহলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কি ভারতের দ্বারা ঠিক করা হলো না? বাংলাদেশের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা তখন কোথায় গেলো?

ভারত একটি শত্রু রাষ্ট্র

বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী থাকার একমাত্র কারণ ভারত। বাংলাদেশের নেতৃবর্গকেও ভুলে গেলে চলবে না যে ভারতীয় সমরাস্ত্র ব্যবহৃত হবার স্থান শুধু পাকিস্তান বা চীনের সীমানা নয়; এখানে বাংলাদেশও অন্তর্ভুক্ত। হিন্দুত্ববাদী ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ কি মুচলেকা নেবে, যে ভারত তার মার্কিন-নির্মিত এপাচি হেলিকপ্টার বাংলাদেশের ট্যাঙ্কের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে না? কোন গ্যারান্টিতে বাংলাদেশের জনগণ মেনে নেবে যে ভারত তার পি-৮ বিমানকে বাংলাদেশের সদ্য ক্রয় করা সাবমেরিনকে খুঁজে বের করতে ব্যবহার করবে না? তাহলে বাংলাদেশই বা কেন ভারতের সাথে সামরিক সমঝোতা করবে, যখন এটি একটি জানা ব্যাপার যে অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে চীনের সাথে এবং কাশ্মির নিয়ে পাকিস্তানের সাথে ভারতের সংঘর্ষ বাধার সম্ভাবনা সর্বদাই রয়েছে? ভারতের সাথে সামরিক সমঝোতা করে বাংলাদেশ কি জানান দিলো না, যে এধরণের যেকোন আন্তর্জাতিক সংঘর্ষে বাংলাদেশ ভারতের সাথেই থাকবে? আর এরকম সমঝোতার ফলাফল যদি হয় যে বাংলাদেশ তেমন কোন সংঘাতে ভারতের পাশেই থাকবে, তাহলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কি ভারতের দ্বারা ঠিক করা হলো না? বাংলাদেশের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা তখন কোথায় গেলো?

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’এর কার্যকলাপ নিয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীই যখন কথা বলেছেন, তখন কাউকে বলে দিতে হয় না যে ভারত বাংলাদেশের জন্যে একটি নিরাপত্তা সমস্যা। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা সমস্যা তৈরি করা একটি দেশের সাথে কোন ধরনের নিরাপত্তা সমঝোতা সম্ভব হতে পারে, সেটার বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যাখ্যা দেয়া কষ্টকর। সেই সমস্যা সৃষ্টিকারী দেশকেই আবার বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করার সক্ষমতা দিতে হবে – সেটাই বা কোন ধরনের হীন চিন্তার ফসল? প্রধানমন্ত্রী যখন বলেছিলেন যে, ‘আক্রান্ত হলে সমুচিত জবাব দেবার সক্ষমতা আমাদের আছে’, তখন তো তিনি নিশ্চয়ই ভারতকে বাদ দিয়ে বলেননি! তাহলে যার থেকে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা রয়েছে (সবচাইতে বেশিই রয়েছে), তার সাথেই আবার নিরাপত্তা সমঝোতায় যাওয়াটা কোন যুক্তিতে যুক্তিযুক্ত? যাতে আক্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচা যায় – এই যুক্তিতে? এটা কি মাথা নোয়াবার পর্যায়ে পড়ে যায় না? মুসলিম হিসেবে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে মাথা নত করাটা এদেশের মানুষের বাস্তবতা হতে পারে না।
ক্ষয়িষ্ণু পরাশক্তির তোষণের মাঝেই ভারত তার ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে। কোন বুদ্ধিতে পানি চুক্তি না করে বরং একটি সম্পূর্ণ অদরকারি সামরিক সমঝোতায় স্বাক্ষর করার জন্যে বাংলাদেশের উপরে চাপ দিয়ে তারা যেভাবে পুরো বাংলাদেশকে নিজেদের বিরুদ্ধে উজ্জীবিত করলেন, সেটা তারাই ভালো বলতে পারবেন। বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিত্বের প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ ছিল ভারতের এই কর্মকান্ড। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের ব্যর্থতার দায়ভার অনেকাংশেই ভারতের।

নিম্নমানের কূটনীতি এবং রাজনৈতিক চিন্তার দেউলিয়াত্ব

পৃথিবীর সবচাইতে বড় অস্ত্র আমদানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের কাছে অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব আনতে ভারতের নেতৃবর্গের লজ্জাবোধ হওয়া উচিত ছিল। জাতিসংঘের মিশনে ভারতের সৈন্য প্রেরণের পরে জাতিসংঘ বাজে মানের অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগে ভারতকে জরিমানা করে! আর সেই ভারত কোনরূপ লজ্জাবোধ তো দূরে থাকুক, বরং ক্ষয়িষ্ণু পরাশক্তির তোষণের মাঝেই তাদের ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে। [১] কোন বুদ্ধিতে পানি চুক্তি না করে বরং একটি সম্পূর্ণ অদরকারি সামরিক সমঝোতায় স্বাক্ষর করার জন্যে বাংলাদেশের উপরে চাপ দিয়ে তারা যেভাবে পুরো বাংলাদেশকে নিজেদের বিরুদ্ধে উজ্জীবিত করলেন, সেটা তারাই ভালো বলতে পারবেন। বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিত্বের প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ ছিল ভারতের এই কর্মকান্ড। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের ব্যর্থতার দায়ভার অনেকাংশেই ভারতের।

বাংলাদেশ শক্তিশালী হবেই। কিন্তু তাই বলে চীনকে ব্যালান্স করার নামে ভারতের সাথে সামরিক সমঝোতা করার মতো নিম্নমানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা? এধরণের সমঝোতা শক্তিশালী বাংলাদেশের পরিপন্থী, তাই এর বাস্তবায়নও বর্জনীয়। বিশেষ করে যে সমঝোতা রাষ্ট্রের নাগরিকদের মনে সন্দেহের উদ্রেক করে এবং বিভাজনের রাজনীতিকে উস্কে দেয়, তা কোনদিনও জনকল্যানকর হতে পারে না। এই রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সৃষ্টি হয়েছে যাদের হাত থেকে রাষ্ট্রকে নিরাপত্তা দিতে তাদের সাথেই নিরাপত্তা চুক্তি করাটা রাজনৈতিক চিন্তার দেউলিয়াত্বের লক্ষণ। 



[১] 'যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভারতের নির্ভরশীলতা বাড়ছে', সাম্প্রতিক দেশকাল, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৬
'অতঃপর যুক্তরাষ্ট্রের ভারত জয়?', সাম্প্রতিক দেশকাল, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬

Wednesday, 12 April 2017

বাংলাদেশ- জাপান সম্পর্ক কোনদিকে যাবে?

১৩ই এপ্রিল ২০১৭

জাপানের কোস্ট গার্ড খুবই সমৃদ্ধ। ১২ হাজার সদস্যের এই বাহিনী আকারে আরেকটি নৌবাহিনীর মতো। পূর্ব চীন সাগরে চীনের সাথে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় কোস্ট গার্ডের গুরুত্ব বেড়ে গিয়েছে আরও বেশি। কোস্ট গার্ড সেদেশের নেতৃত্বকে আরও একটি অপশন দেয়। যেখানে নৌবাহিনী পাঠানোটা কূটনৈতিক দিক থেকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে কোস্ট গার্ডের জাহাজ পাঠানোকে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ মনে হতে পারে। সাদা রঙের জাহাজের বিরুদ্ধে সাদাই মোতায়েন করতে হবে – এরমকম একটা অলিখিত নিয়মই যেন সবাই মেনে চলছে। তবে মজার ব্যাপার হলো, নিজের শক্তিকে উপরে তুলে ধরতে কোস্ট গার্ডের জাহাজগুলি ক্রমেই বড় থেকে আরও বড় হচ্ছে।



জাপানের নৌশক্তির নানাবিধ ব্যবহার

জাপানের নৌবাহিনী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আগ্রাসী কোন কর্মকান্ড থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখার পরেও পৃথিবীর সবচাইতে বড় নৌবাহিনীগুলির একটি। এর সদস্যসংখ্যা প্রায় ৫১ হাজার; রয়েছে ১৫০টির মতো জাহাজ এবং ৩৫০টির মতো বিমান। জাপানের কোস্ট গার্ডও খুবই সমৃদ্ধ। ১২ হাজার সদস্যের এই বাহিনী আকারে আরেকটি নৌবাহিনীর মতো। পূর্ব চীন সাগরে চীনের সাথে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় কোস্ট গার্ডের গুরুত্ব বেড়ে গিয়েছে আরও বেশি। কোস্ট গার্ড সেদেশের নেতৃত্বকে আরও একটি অপশন দেয়। যেখানে নৌবাহিনী পাঠানোটা কূটনৈতিক দিক থেকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে কোস্ট গার্ডের জাহাজ পাঠানোকে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ মনে হতে পারে। সাদা রঙের জাহাজের বিরুদ্ধে সাদাই মোতায়েন করতে হবে – এরমকম একটা অলিখিত নিয়মই যেন সবাই মেনে চলছে। তবে মজার ব্যাপার হলো, নিজের শক্তিকে উপরে তুলে ধরতে কোস্ট গার্ডের জাহাজগুলি ক্রমেই বড় থেকে আরও বড় হচ্ছে। জাপানের কোস্ট গার্ডের সবচাইতে বড় জাহাজ হলো শিকিশিমা-ক্লাসের দু’টি জাহাজ, যেগুলি একেকটি ৯,৩০০ টনের এবং ১৫০ মিটার পর্যন্ত লম্বা। এগুলির গতি ২৫ নটিক্যাল মাইল এবং রেঞ্জ ২০ হাজার নটিক্যাল মাইল। অস্ত্র হিসেবে আপাতত ৩৫মিঃমিঃ-এর দু’টি কামান এবং ২০মিঃমিঃ দু’টি কামান খুব বেশি কিছু নয়। তবে এটা বলাই যায় যে দরকারের সময়ে এই জাহাজে আরও অস্ত্র বহণ করা হবে, কারণ জাহাজগুলি বড় আকারের ডেস্ট্রয়ারের আকৃতির! দুই-দুইটি সুপার পুমা হেলিকপ্টার বহণ করে এই জাহাজগুলি। এই জাহাজ ছাড়াও জাপানের কোস্ট গার্ডে আরও অনেক জাহাজ রয়েছে। নৌবাহিনী থেকে ডিকমিশন করে হাটসুয়ুকি-ক্লাসের (৪,০০০ টন) চারটি ডেস্ট্রয়ার আনা হয়েছে কোস্ট গার্ডে। ঠিক যেমনটি করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। ইতালির নৌবাহিনী থেকে ডিকমিশন করে ৪টা মিনার্ভা-ক্লাসের কর্ভেট যেমন মিসাইল সরিয়ে ওপিভি-তে রূপান্তর করা হয়েছে বাংলাদেশের জন্যে। ১,০০০ টন থেকে ৩,৫০০ টনের বেশকিছু জাহাজ রয়েছে তাদের। ১৩০ টন থেকে ৫০০ টনের প্যাট্রোল ভেসেলও রয়েছে অনেকগুলি। এছাড়াও রয়েছে ১৫ মিটার থেকে ৩৫ মিটারের অনেক প্যাট্রোল বোট। ট্রেনিং, ফায়ার-ফাইটিং, সার্ভে, লাইট-হাউস টেন্ডার, ইত্যাদি জাহাজও রয়েছে বেশকিছু। মোটকথা এ আরেক নৌবাহিনী।
গত নভেম্বরে মালয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট নজিব রাজাকের টোকিও ভ্রমণের সময় শিনজো আবে মালয়েশিয়াকে জাপানের কোস্ট গার্ড থেকে দু’টি প্যাট্রোল বোট দেবার ঘোষণা দেন। ‘ওযিকা-ক্লাস’এর একটি জাহাজ গত জানুয়ারীতে মালয়েশিয়াতে এসে পৌঁছেছে। গত অক্টোবরে মালয়েশিয়া প্রথমবারের মতো চীন থেকে ৪টি যুদ্ধজাহাজ কেনার ঘোষণা দেয়, যেখানে মালয়েশিয়ার সামরিক বাহিনীর প্রায় সকল জিনিসই পশ্চিমা ডিজাইনের। এই ঘটনাতেও নজিব রাজাকের চীনের দিকে ঝোঁকার আভাস পাওয়া গেলেও তিনিও কিন্তু জাপান থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেননি; ব্যালান্স করে চলেছেন। মোটকথা, চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। চীনকে সকলেই বন্ধু হিসেবে পাশে চাইছে; বৈরিতা চাইছে না। আবার একইসাথে কোন একটি রাষ্ট্রের কোলের উপরেও কেউ বসে পড়তে চাইছেন না, যা কিনা রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির লক্ষণ। এক্ষেত্রে জাপানের নৌসক্ষমতা একটি বড় ভূমিকা রাখছে।



জাপানের সামরিক বাণিজ্যের শুরু

২০১৬-এর অগাস্টে ফিলিপাইনের জন্যে জাপানে তৈরি করা প্রথম কোস্ট গার্ড জাহাজটি ফিলিপাইনে এসে পৌঁছায়। ৪৪ মিটার লম্বা মোট ১০টি জাহাজ জাপান বিক্রি করছে ফিলিপাইনের কাছে। এর জন্যে সহজ শর্তে ১৫৮ মিলিয়ন ডলারের ঋণ দিয়েছে জাপান। এর উপরে গত সেপ্টেম্বরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সাথে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রডরিগো দুতার্তের সাক্ষাতে জাপান ফিলিপাইনকে ৯০ মিটার লম্বা দু’টি বড় জাহাজ দেবার অঙ্গীকার করে। দুতার্তে সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিং-এর দিকে ঝুঁকলেও জাপানের সাথে সম্পর্ক উষ্ণ রেখে চলেছেন। গত নভেম্বরে মালয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট নজিব রাজাকের টোকিও ভ্রমণের সময় শিনজো আবে মালয়েশিয়াকে জাপানের কোস্ট গার্ড থেকে দু’টি প্যাট্রোল বোট দেবার ঘোষণা দেন। ‘ওযিকা-ক্লাস’এর একটি জাহাজ গত জানুয়ারীতে মালয়েশিয়াতে এসে পৌঁছেছে। গত অক্টোবরে মালয়েশিয়া প্রথমবারের মতো চীন থেকে ৪টি যুদ্ধজাহাজ কেনার ঘোষণা দেয়, যেখানে মালয়েশিয়ার সামরিক বাহিনীর প্রায় সকল জিনিসই পশ্চিমা ডিজাইনের। এই ঘটনাতেও নজিব রাজাকের চীনের দিকে ঝোঁকার আভাস পাওয়া গেলেও তিনিও কিন্তু জাপান থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেননি; ব্যালান্স করে চলেছেন। মোটকথা, চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। চীনকে সকলেই বন্ধু হিসেবে পাশে চাইছে; বৈরিতা চাইছে না। আবার একইসাথে কোন একটি রাষ্ট্রের কোলের উপরেও কেউ বসে পড়তে চাইছেন না, যা কিনা রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির লক্ষণ। এক্ষেত্রে জাপানের নৌসক্ষমতা একটি বড় ভূমিকা রাখছে।

জাপানের রাজনৈতিক লক্ষ্যে পরিবর্তন


কিছুদিন আগ পর্যন্ত জাপানকে সবাই শুধুমাত্র অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবেই দেখতো; রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নয়। রাজনীতির কথা বলতে গেলেই সামরিক শক্তির বিষয়টি এসে যায়। শিনজো আবের সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে জাপানের প্রভাবশালী মহল চাইছেন সামরিক দিক থেকে জাপানের যুক্তরাষ্ট্র-নির্ভরশীলতা কমাতে। উত্তর কোরিয়ার ছুতো ধরে যুক্তরাষ্ট্র কোরিয়ান উপদ্বীপ এবং জাপানে তার সামরিক শক্তি মোতায়েন রাখছে এবং তা দিয়ে চীনকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। এভাবে চীন-জাপান ব্যালান্সে থাকছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করে। তবে ভারত মহাসাগরে জাপানি ম্যারিটাইম রুটগুলির নিরাপত্তায় জাপানি যুদ্ধজাহাজ নিয়মিতই যাতায়াত করছে; সেখানে ব্যালান্স করছে চীনকে। সোমালিয়ার উপকূলের কাছাকাছি জাপানের যুদ্ধজাহাজ জলদস্যুতা-বিরোধী টহল দিচ্ছে কয়েক বছর ধরে। কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বাব-এল-মান্ডেব প্রণালীতে অবস্থিত জিবুতিতে জাপান ছোটখাটো একটি সামরিক ঘাঁটিও তৈরি করেছে, যা কিনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে প্রথম। দু’টি পি-৩ ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান ভারত মহাসাগরে টহল দেয় সেখান থেকে। জাপানের সামরিক শক্তি অনেক সাগরেই দেখা যাচ্ছে, কারণ জাপান তার প্যাসিফিস্ট সংবিধান থেকে বের হবার বার্তা দিয়েছে। জাপান তার অর্থনৈতিক কার্ডের সাথে সামরিক কার্ডটিও খেলতে চাইছে ধীরে ধীরে। চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে শুধু অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে যে লাভ নেই, সেটা জাপানের ওয়াকিবহাল মহল বুঝতে পারছেন। মালয়েশিয়া-ফিলিপাইনকে সামরিক সহায়তা প্রদান এই নীতিরই অংশ।
ভারত মহাসাগর পাহাড়া দিতে ভারতের কাছে জাপান ১.৩৫ বিলিয়ন ডলারে ১২টি ‘ইউএস-২’ উভচর ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান বিক্রি করছে। জাপান বুঝতে পারছে যে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে ভূরাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের উপরেই নির্ভর করে থাকতে হবে। তাই নিজেদের সামরিক সক্ষমতা তৈরিতে মনোনিবেশ করেছে জাপান। এরই অংশ হিসেবে সামরিক বাণিজ্যের অবতারণা।


সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সামরিক শক্তিকে ব্যালান্স করাটা জাপানের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হিসেবে কাজ করেছে; কারণ এই সমুদ্রপথেই জাপানের বেশিরভাগ বাণিজ্য হয়ে থাকে। ২০১৫ সালে ভিয়েতনামকে দু’টি প্যাট্রোল বোট দেবার পরে এবছরের জানুয়ারী মাসে জাপান ৩৩৮ মিলিয়ন ডলারের সহজ শর্তের ঋণে আরও ৬টি প্যাট্রোল বোট সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। গত বছর জাপান শ্রীলংকাকেও ১৮ মিলিয়ন ডলারের ঋণ দিয়েছে দু’টি ৩০ মিটার লম্বা প্যাট্রোল বোট কেনার জন্যে। শুধু প্যাট্রোল বোট নয়, জাপান তার এয়ার ইন্ডেপেন্ডেন্ট প্রোপালশন (এআইপি) প্রযুক্তির সাবমেরিন অস্ট্রেলিয়ার কাছে অফার করেছিল (যদিও অস্ট্রেলিয়া ফ্রেঞ্চ সাবমেরিনের দিকে গিয়েছে)। ভারত মহাসাগর পাহাড়া দিতে ভারতের কাছে জাপান ১.৩৫ বিলিয়ন ডলারে ১২টি ‘ইউএস-২’ উভচর ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান বিক্রি করছে।

বাংলাদেশে জাপান

জাপান বাংলাদেশের স্বীকৃত উন্নয়ন সহযোগী। এদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জাপানের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মার্কিনীদের “বাস্কেট কেইস”-তকমা মুছে ফেলে বাংলাদেশ যখন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই হোলি আর্টিসানের ঘটনাটি ঘটলো – জাপানিদের টার্গেট করে। উদ্দেশ্য বাংলাদেশ থেকে জাপানকে সরানো। কিছুদিনের জন্যে তারা সেক্ষেত্রে সফলও হয়েছিল, যখন জাপানি অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রজেক্ট থেমে গিয়েছিল। তবে জাপানিরা এই ষড়যন্ত্রের মর্ম বুঝতে পেরেছে বলেই তারা বাংলাদেশের সাথে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জাপানের জানার কথা যে ভারত মহাসাগরে জাপানি স্বার্থকে রক্ষা করতে একটি শক্তিশালী বাংলাদেশের বিকল্প নেই। একটি দুর্বল বাংলাদেশই কেবল নড়বড়ে হয়ে সকলকে বিচলিত করতে পারে। একুশ শতকে এসে বাংলাদেশ তার উন্নয়নের পথে জাপানকে সাথে চাইবে। জাপানের রাজনৈতিক নীতির পরিবর্তন এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে সহযোগিতার আরেকটি দুয়ার উন্মোচন করবে। এশিয়ার অনান্য রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশও জাপানের নৌশক্তি তৈরির অভিজ্ঞতা থেকে সুবিধা নিতে পারে। জাপান তার বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিশ্চিতে এশিয়ার দেশগুলির ম্যারিটাইম সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা দিচ্ছে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড জাপান থেকে ২৪টি ছোট বোট সংগ্রহের পথে রয়েছে। তবে এই সহযোগিতা আরও এগিয়ে নেয়া যায়। এয়ার-ডিফেন্স রাডার, মিসাইল-সহ জাপানের বেশকিছু সামরিক প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের উপরে নির্ভরশীল, যেগুলি হয়তো বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। তবে কোস্ট গার্ডের জন্যে বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাটফর্ম জাপান সরবরাহ করলে সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তির উপরে নির্ভরশীল হবার সম্ভাবনা অনেকটাই কম।

বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে জাকার্তায় আইওআরএ শীর্ষ বৈঠক, ঢাকায় ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের কনফারেন্স, কসোভোকে স্বীকৃতি, চীনা প্রেসিডেন্ট এবং জাপানি প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর, ইত্যাদি কর্মকান্ডের মাধ্যমে বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছে যে বঙ্গোপসাগরে একটি নতুন শক্তির আবির্ভাব হতে চলেছে। আর দেশের অভ্যন্তরে সকল ধরনের Subversion নস্যাৎ করে দিয়ে বাংলাদেশ জানান দিয়েছে যে এই রাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে নতি স্বীকার করবে না। আর একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র বিশ্বে অনেক বন্ধু পাবে; সেটাই স্বাভাবিক। শক্তিশালীদের জন্যে অনেক বন্ধু থাকে; দুর্বলের জন্যে থাকে প্রভু। বাংলাদেশ এখন নিজের স্বার্থ রক্ষার্থে দুনিয়ার যেকারুর সাথেই বন্ধুত্ব করতে সক্ষম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত সফরের মাধ্যমে এটাই পরিষ্কার হয়েছে। বাংলাদেশের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সহযোগী চীনও এই বার্তাটাই পাবে। সাথেসাথে জাপানের কাছেও বার্তা যাবে যে বাংলাদেশের দুয়ার যে কারুর জন্যেই উন্মুক্ত, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা সাম্রাজ্যবাদীদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন থেকে বিরত থাকে।

Friday, 7 April 2017

বাংলাদেশের পূর্ব ইউরোপে প্রবেশ!

০৮ এপ্রিল ২০১৭
বাংলাদেশ কেন প্রায় ৯ বছর পর তার নীতিতে পরিবর্তন আনলো, যখন কসোভো অন্য দেশের অভ্যন্তরে বিদেশী হস্তক্ষপের একটি উদাহরণ? যখন বাংলাদেশ জানে যে রাশিয়া, চীন এবং ভারত এই দেশটিকে স্বীকৃতি দেয়নি, তখন কসোভোকে স্বীকৃতি দিয়ে বাংলাদেশ কি এই দেশগুলির সাথে সম্পর্ককে ঝুঁকিতে ফেলেনি?

২০১৭ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারী বাংলাদেশ কসোভোকে স্বীকৃতি দেয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ পূর্ব ইউরোপের রাজনীতিতে সরাসরি প্রবেশ করে। এই স্বীকৃতির গুরুত্ব অনুধাবন করতে হলে কসোভোর সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে দেখতে হবে।

কসোভোর স্বীকৃতির ইতিহাস
কসোভো স্বাধীনতা ঘোষণা করে ২০০৮ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারী। পরের দিন ১৮ই ফেব্রুয়ারী যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, তুরস্ক, আলবেনিয়া-সহ ৮টি দেশ কসোভোকে স্বীকৃতি দেয়। ২০০৮ সালের মাঝে মোট ৫৩টি দেশ স্বীকৃতি দেয়, যার মাঝে ৩১টি ইউরোপিয়ান দেশ ছাড়াও ছিল যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, কানাডা ও তুরস্ক। এর বাইরে সকল দেশই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন সরকারগুলির মাঝে থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের মাঝ থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং পূর্ব এশিয়া থেকে মালয়েশিয়া স্বীকৃতি দেয়। ২০০৯ সালে কসোভোকে স্বীকৃতি দেয় আরও ১১টি দেশ, যার মাঝে গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে ছিল সৌদি আরব, বাহরাইন এবং জর্দান। ২০১০ সালে আরও ৮টি দেশ স্বীকৃতি দিলেও এর মাঝে গুরুত্বপূর্ণ কোন দেশ ছিল না। ২০১১ সালে স্বীকৃতি দেয়া ১২টি দেশের মাঝে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কাতার, ওমান এবং কুয়েত। ততদিনে কসোভোর স্বাধীনতা ঘোষণার প্রায় তিনটি বছর পেরিয়ে গেছে। এখানে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, এই দেশগুলি এতো সময় নিয়ে স্বীকৃতি দিলেও এরা সকলেই কিন্তু মার্কিন সরকারের প্রভাব বলয়ে থাকা দেশ। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রই চেয়েছিল যে স্বীকৃতিগুলি আস্তে আস্তে আসুক। তবে যতোই দিন যাচ্ছিল, মার্কিন প্রভাব বলয়ের একেবারে বাইরের দিকে থাকা দেশগুলি এগুচ্ছিল স্বীকৃতি নিয়ে। তারা এগুচ্ছিল কূটনৈতিক সুযোগের সদ্যবহার করার জন্যে। এর কেউ কেউ শুধু মার্কিন না, অন্য দেশ দ্বারাও প্রভাবিত ছিল। ২০১২ সালের ডিসেম্বরের শেষে আরেক গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় পাকিস্তান। সেবছরে মোট ১১টি দেশ স্বীকৃতি দেয়। স্বীকৃতি দেয়া মোট দেশের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৫। ২০১৩ সালে স্বীকৃতি দেয়া ৮টি দেশের মাঝে ছিল মিশর ও থাইল্যান্ড। ২০১৪ সালে স্বীকৃতি দেয়া ৪টি দেশের মাঝে একটিও গুরুত্বপূর্ণ দেশ ছিল না। ২০১৫ সালে একটি মাত্র দেশ এবং ২০১৬ সালে মাত্র দুইটি দেশ স্বীকৃতি দিয়েছে, যার মাঝে সিঙ্গাপুর কিছুটা গুরুত্বপূর্ণ। সিঙ্গাপুর ছিল জাতিসংঘের ১১০তম সদস্য দেশ; বাংলাদেশ ১১১তম। এর বাইরে চারটি দেশ এমন কিছু নেতৃত্বের কাছ থেকে আসে, যাদের নিজেদের স্বীকৃতি নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে, যেমন তাইওয়ান। এগুলি যোগ করলে বাংলাদেশ ১১৫তম দেশ হিসেবে কসোভোকে স্বীকৃতি দিয়েছে। স্বীকৃতি দিতে বাংলাদেশ সময় নিয়েছে প্রায় ৯ বছর!


 
ফেব্রুয়ারী মাসে কসোভোকে স্বীকৃতি দেয়া এবং মার্চ-এপ্রিলে আইপিইউ সন্মেলনে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রস্তাব আনার মাধ্যমে সেটাকে ব্যালান্স করে বাংলাদেশ জানান দিলো যে রাশিয়া-চীন-ভারত কারুরই প্রভাব বলয়ে নেই এই রাষ্ট্র। বরং রাশিয়া-চীন-ভারতের মতো বিরাট দেশগুলিকেও ব্যালান্সে ধরে রাখার সক্ষমতা এই রাষ্ট্রের রয়েছে। রাশিয়া-চীন-ভারতকে ব্যালান্সে রেখেই বাংলাদেশ পূর্ব ইউরোপের রাজনীতিতে প্রবেশ করলো। ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে বাংলাদেশের এই ‘কসোভো কার্ড’ একটি নতুন মাথাব্যাথার কারণ হবে।

বাংলাদেশ কেন ৯ বছর অপেক্ষা করে কসোভোকে স্বীকৃতি দিলো?
প্রায় চার বছর ধরে তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ দেশ কসোভোকে স্বীকৃতি দেয়নি। বাংলাদেশ এব্যাপারে ‘নিয়ম’ ভঙ্গ করেছে। নতুন করে স্বীকৃতি দেয়ার ইস্যুটিকে সামনে নিয়ে এসেছে। এখানে দেখতে হবে যে, কসোভোকে স্বীকৃতি দেয়ার ব্যাপারে এরকম কচ্ছপের গতি কেন সকলের? উত্তর রয়েছে কসোভোর জন্মকে কে কিভাবে দেখছে, সেটার উপরে। রাশিয়া, চীন, ভারত,ইরান-সহ বেশকিছু দেশ কসোভোকে পশ্চিমা দেশগুলির অন্য দেশের অভ্যন্তরে হস্তক্ষেপের উদাহরণ হিসেবে দেখে। যেসব দেশে বিচ্ছন্নতাবাদী সমস্যা রয়েছে, সেসব দেশ কসোভোকে একটি বাজে উদাহরণ হিসেবে দেখে। একইসাথে রাশিয়ার প্রভাব বলয়ে থাকা বেশকিছু দেশ কসোভোকে স্বীকৃতি দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র অনেক রাষ্ট্রের উপরেই স্বীকৃতি দেবার জন্যে চাপ সৃষ্টি করেছিল। এখন প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে, বাংলাদেশ কেন প্রায় ৯ বছর পর তার নীতিতে পরিবর্তন আনলো, যখন কসোভো অন্য দেশের অভ্যন্তরে বিদেশী হস্তক্ষপের একটি উদাহরণ? যখন বাংলাদেশ জানে যে রাশিয়া, চীন এবং ভারত এই দেশটিকে স্বীকৃতি দেয়নি, তখন কসোভোকে স্বীকৃতি দিয়ে বাংলাদেশ কি এই দেশগুলির সাথে সম্পর্ককে ঝুঁকিতে ফেলেনি?

প্রথমতঃ মার্কিন প্রভাব বলয়ে থাকা দেশ/সরকারগুলি প্রথম চার-পাঁচ বছরের মাঝেই কসোভোকে স্বীকৃতি দিয়েছে বা দিতে বাধ্য হয়েছে। ৯ বছর অপেক্ষা করার ফলে বাংলাদেশের মার্কিন প্রভাব বলয়ে থাকার ব্যাপারটি একেবারেই নাকচ হয়ে গিয়েছে। বরং সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের কঠিন অবস্থান দেখিয়ে দেয় যে মার্কিন উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে এই স্বীকৃতি দেয়া হয়নি।

দ্বিতীয়তঃ কসোভোকে অন্য দেশের অভ্যন্তরে বিদেশী হস্তক্ষপের একটি উদাহরণ হিসেবে দেখে রাশিয়া-চীন-ভারত। স্বীকৃতি দেয়ার মাত্র এক মাসের মাঝেই ঢাকায় ১৩৬তম ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ)-এর সন্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, এবং সেখানে এক দেশের অভ্যন্তরে অন্য দেশের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাশ হয়। এই প্রস্তাবে বাংলাদেশের সাথে ছিল রাশিয়া, চীন এবং ভারত। অর্থাৎ কসোভোকে স্বীকৃতি দেয়ার পরেও এই তিন দেশের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক অটুট রয়েছেই নয়, বরং আরও শক্ত হয়েছে।

তৃতীয়তঃ ফেব্রুয়ারী মাসে কসোভোকে স্বীকৃতি দেয়া এবং মার্চ-এপ্রিলে আইপিইউ সন্মেলনে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রস্তাব আনার মাধ্যমে সেটাকে ব্যালান্স করে বাংলাদেশ জানান দিলো যে রাশিয়া-চীন-ভারত কারুরই প্রভাব বলয়ে নেই এই রাষ্ট্র। বরং রাশিয়া-চীন-ভারতের মতো বিরাট দেশগুলিকেও ব্যালান্সে ধরে রাখার সক্ষমতা এই রাষ্ট্রের রয়েছে। রাশিয়া-চীন-ভারতকে ব্যালান্সে রেখেই বাংলাদেশ পূর্ব ইউরোপের রাজনীতিতে প্রবেশ করলো। ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে বাংলাদেশের এই ‘কসোভো কার্ড’ একটি নতুন মাথাব্যাথার কারণ হবে।

এখন দেখতে হবে যে, ২০১৭ সালে ‘কসোভো কার্ড’ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেলো কেন?

সিআইএ-এর হিসেবে কসোভোর জনসংখ্যা ১৮ লক্ষের মতো। তবে কেউ কেউ ১৯ থেকে ২২ লক্ষের মতো বলছেন। এর মাঝে বিভিন্ন মতভেদে ৮৮% থেকে ৯৫% মুসলিম; যাদের আবার বেশিরভাগই জাতিগতভাবে আলবেনিয়ান। আর ৪% থেকে ৮% সার্ব। সাবেক যুগোস্লাভিয়ার গৃহযুদ্ধের মাঝেই ১৯৯৬ সাল নাগাদ কসোভোর প্রতিবেশী দেশ আলবেনিয়ার সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠিগুলি কসোভোকে স্বাধীন করার চেষ্টা শুরু করে দেয়। এই প্রচেষ্টায় বাইরের ইন্ধন ছিল বলে সার্বিয়ানরা এবং রাশিয়ানরা অভিযোগ করে। এর মাঝে সার্বরা কসোভারদের উপরে নির্যাতন শুরু করলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে যায়। এই ঘোলাটে পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র বাকি বিশ্বের সমর্থন না পেয়ে জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে ন্যাটোকে সাথে নিয়ে ১৯৯৯ সালে সামরিক হস্তক্ষেপ করে। মার্কিন সরকার সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট মিলোসেভিচকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করে, যখন রাশিয়া-চীন এর বিপক্ষে কঠোর অবস্থান নেয়। রাশিয়া-চীন এক্ষেত্রে মানবাধিকারের নামে অন্য দেশের অভ্যন্তরে হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করছিলো। যুদ্ধের ফলে প্রায় ১০ লক্ষ মুসলিম কসোভো ছেড়ে যায়; মৃত্যু হয় কমপক্ষে ১১ হাজার মানুষের, যাদের বেশিরভাগই ছিল মুসলিম। যুদ্ধ বন্ধের শর্ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সার্বিয়ান সৈন্যদের কসোভো ছেড়ে যেতে বাধ্য করে এবং এর স্থলে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনী মোতায়েন করে। মার্কিন হস্তক্ষেপে প্রায় দুই লক্ষের মতো সার্ব কসোভো ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। কসোভোকে ‘রক্ষা করা’র লক্ষ্যে পশ্চিমা বাহিনী কসোভোতে ৫০ হাজার সৈন্য পাঠায়। তবে পশ্চিমাদের ব্যালান্স করতে ‘কসোভো ফোর্স’ নামের এই বাহিনীতে রাশিয়াও ৪ হাজার সৈন্য পাঠায়। ভারত কসোভোকে স্বীকৃতি না দিলেও সেসময় ৮০০ সৈন্য পাঠায় কসোভোতে।

কসোভোর প্রেসিডেন্ট হাসিম থাচি ২০১৭ সালে এসে কসোভোর সেনাবাহিনী গড়ার পেছনে জোর দেয়া শুরু করেন। ১০ই মার্চ তিনি বলেন যে তিনি এমন দেশের রাষ্ট্রপতি থাকতে চাননা, যেদেশের পার্লামেন্ট নিজ দেশের কোন সামরিক বাহিনী থাকুক, সেটা চায় না। এখানেই হয়ে যায় বিপত্তি। ন্যাটো এবং যুক্তরাষ্ট্র এর কঠোর বিরোধিতা করে; সার্বরাও বিরোধিতা করে। এদের কেউই চাচ্ছে না যে কসোভোর সেনাবাহিনী তৈরি হোক। অর্থাৎ মার্কিনীরা, ইউরোপিয়ানরা এবং সার্বরা সকলেই এক্ষেত্রে এক পক্ষে!

কসোভোর পার্লামেন্ট কসোভোর সেনাবাহিনী রাখার বিরোধী?

কসোভোর নিরাপত্তার ভার বেশ কিছুটা কসোভো পুলিশ এবং ‘কসোভো সিকিউরিটি ফোর্স’-এর (কেএসএফ) হাতে দিলেও ২০১৬ সালেও সেখানে ৪,৬০০ বিদেশী সৈন্য মোতায়েন ছিল। ৯ হাজার পুলিশের সাথে রয়েছে কেএসএফ-এর প্রায় সাড়ে চার হাজার সদস্য, যাদেরকে কসোভো সরকার চাইছে সেনাবাহিনীতে রূপান্তরিত করতে। তবে এখানে বাধা হলো পশ্চিমাদের তৈরি করে দেয়া সংবিধান। সংবিধান অনুযায়ী সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সংখ্যালঘুদের কাছ থেকে আলাদাভাবে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট না পেলে সংবিধান সংশোধন করা যাবে না। আর সংবিধান সংশোধন না করতে পারলে কসোভোর সেনাবাহিনীও তৈরি করা সম্ভব নয়। ১০০ জন এমপি রয়েছেন আলবেনিয়ান মুসলিম, যাদের বেশিরভাগই হয়তো সেনাবাহিনীর পক্ষে ভোট দেবেন। কিন্তু ২০ জন সংখ্যালঘু এমপির মাঝে ১০ জন রয়েছেন সার্ব, যারা কসোভোর যেকোন সামরিক বাহিনীর পুরোপুরি বিরোধী। সার্বরা চায় কসোভোর নিরাপত্তা সার্বিয়ার হাতে থাকুক, নাহলে কসোভোতে সার্বদের স্বার্থ রক্ষা হবে না। ২০ জনের মাঝে এই ১০ জন কখনোই কসোভোর সেনাবাহিনীর পক্ষে ভোট দেবেন না, অর্থাৎ কসোভোর সেনাবাহিনীর থাকার সম্ভাবনা কখনোই থাকছে না। আর এর অর্থ হলো, কসোভোররা সর্বদাই তাদের নিরাপত্তার জন্যে পশ্চিমাদের দিকে তাকিয়ে থাকবে। কসোভোর প্রেসিডেন্ট হাসিম থাচি ২০১৭ সালে এসে কসোভোর সেনাবাহিনী গড়ার পেছনে জোর দেয়া শুরু করেন। ১০ই মার্চ তিনি বলেন যে তিনি এমন দেশের রাষ্ট্রপতি থাকতে চাননা, যেদেশের পার্লামেন্ট নিজ দেশের কোন সামরিক বাহিনী থাকুক, সেটা চায় না। এখানেই হয়ে যায় বিপত্তি। ন্যাটো এবং যুক্তরাষ্ট্র এর কঠোর বিরোধিতা করে; সার্বরাও বিরোধিতা করে। এদের কেউই চাচ্ছে না যে কসোভোর সেনাবাহিনী তৈরি হোক। অর্থাৎ মার্কিনীরা, ইউরোপিয়ানরা এবং সার্বরা সকলেই এক্ষেত্রে এক পক্ষে!

কসোভোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূকৌশলগত অবস্থান

কসোভোর সেনাবাহিনীর রাজনীতিকে বুঝতে হলে কসোভোর ভূকৌশলগত অবস্থান বুঝতে হবে। কসোভোর ভূকৌশলগত অবস্থান পূর্ব ইউরোপে বলকানের নিয়ন্ত্রকের অবস্থানে। ১০ হাজার ৯০০ বর্গ কিঃমিঃ আয়তনের ছোট্ট কসোভো (বাংলাদেশের ময়মনসিংহ বিভাগের প্রায় সমান) পুরোপুরি স্থলবেষ্টিত। তবে আলবেনিয়ার সাথে ভালো সম্পর্ক থাকার কারণে আলবেনিয়ার মাধ্যমে কসোভো সমুদ্রের দেখা পায়। এই ছোট্ট দেশটি ইউরোপের সবচাইতে গরীব দেশ। দেশটির অর্থনীতির আকার মাত্র ৮ বিলিয়ন ডলার। সাড়ে তিন’শো মিলিয়ন ডলার রপ্তানি করলেও আমদানি করে প্রায় ২,৭০০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। অর্থাৎ দেশটি বৈদেশিক বাণিজ্যের উপরে পুরোপুরি নির্ভরশীল। সবচাইতে বেশি রপ্তানি হয় ইতালি, আলবেনিয়া, মেসিডোনিয়াতে এবং আমদানি হয় জার্মানি, মেসিডোনিয়া, সার্বিয়া, তুরস্ক, ইতালি, আলবেনিয়া থেকে। গরীব হলেও দেশটি খণিজ সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। জাতিসংঘের মতে দেশটিতে মজুদ খণিজ সম্পদের মূল্য সাড়ে ১৩ বিলিয়ন ইউরোর বেশি। খণিজের মাঝে রয়েছে প্রায় ১৫ বিলিয়ন টন লিগনাইট কয়লা (পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম মজুদ)। কসোভোর ৯৭% বিদ্যুৎ তৈরি হয় এই কয়লা থেকে। এছাড়াও রয়েছে সীসা-জিঙ্ক-সিলভারের খণি। রয়েছে নিকেল এবং ক্রোমিয়ামের খণি। বক্সাইট এবং ম্যাগনেসিয়ামের খণিও রয়েছে এখানে। এসব খণিজ পদার্থ একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র তৈরির জন্য যথেষ্ট। এর বাইরেও রয়েছে গ্রানাইট, চুনাপাথর, মার্বেল, ইত্যাদি বিভিন্ন কন্সট্রাকশন মিনারেলের খণি। এসব খণির নিয়ন্ত্রণ কার কাছে থাকবে, সেই প্রশ্ন এখন সবার কাছেই গুরুত্বপূর্ণ।
 
সার্বরা পালন করছে ১৩৮৯ সালের কসোভোর যুদ্ধের ৬২০তম বার্ষিকী। ইস্টার্ন অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের কাছে কসোভোর গুরুত্ব অনেক। ১৩৮৯ সালের যুদ্ধে সার্বরা হেরেছিল উসমানি সুলতান মুরাদের কাছে, তারপরেও সার্বরা মনে রাখতে চায় সেই যুদ্ধের ফলাফলের কথা। ঐ সময় থেকেই বলকানে ইসলামের আবির্ভাব হয় এবং সেখানকার ইতিহাস পালটে যায় সারাজীবনের জন্যে। বর্তমানে পূর্ব ইউরোপে তুরস্কের প্রভাব বৃদ্ধির মাঝে ইউরোপিয়ানরা ইউরোপে ৫০০ বছরের উসমানিয়া খিলাফতের ছায়াকে দেখতে পাচ্ছে।

কসোভোর ঐতিহাসিক বাস্তবতা

এই অঞ্চলের ইতিহাস ভূরাজনৈতিক হিসেবের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বলকান অঞ্চল পঞ্চদশ শতক থেকে শুরু করে বিংশ শতকের গোড়া অবধি ৫০০ বছরের মধ্যে বেশিরভাগ সময়ই তুর্কি উসমানিয়া খিলাফতের অধীনে ছিল। বলকানে ইসলামের আবির্ভাব হয় এসময়েই। বলকানের খ্রিস্টানরা হচ্ছে ইস্টার্ন অর্থোডক্স খ্রিস্টান, যা পশ্চিম ইউরোপের ক্যাথোলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টানদের থেকে আলাদা। মুসলিমদের সাথে ইস্টার্ন অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের সমস্যা হজরত মুহম্মদ (সঃ)-এর সময় থেকে, যখন ইস্তাম্বুল (তখনকার নাম কনস্টানটিনোপোল) ছিল ইস্টার্ন অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের (বাইজ্যানটাইন এম্পায়ার) রাজধানী। ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে ইস্তাম্বুল মুসলিমদের হাতে চলে গেলে ইস্টার্ন অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায় রাশিয়া, তথা মস্কো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাঝ দিয়ে তুর্কি খিলাফতের পতনের সাথে সাথে বলকানের কর্তৃত্ব নিয়ে টানাটানি শুরু হয়। জার্মান এবং ইটালিয়ানরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পর্যন্ত সেখানে প্রভাবশালী ছিল। ব্রিটিশ এবং ফরাসীদের প্রভাবও ছিল। বিশ্বযুদ্ধের পর এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে। ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকেই পশ্চিমাদের ইন্ধনে এই এলাকায় সমস্যার শুরু। রাশিয়া বলকানে পশ্চিমাদের প্রভাবকে নিজের স্বার্থবিরুদ্ধ দেখতে শুরু করে বলেই বলকানের সমস্যার দুই প্রান্তে অবস্থান করে রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পূর্ব ইউরোপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রস্থানের সাথে সাথে এখানকার ভূরাজনীতি অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা একমত যে বর্তমানে পূর্ব ইউরোপের বলকানে তুরস্কের প্রভাব প্রতিদিনই বাড়ছে। ইউরোপিয়ানরা তুরস্কের মাঝে সেই তুর্কি খিলাফতের ছায়া দেখতে পাচ্ছে, যা তাদেরকে ভীতিতে ফেলছে।

ঠিক এই সময়েই কসোভোকে স্বীকৃতি দিল বাংলাদেশ। যখন যুক্তরাষ্ট্র কসোভোকে স্বীকৃতি দেবার জন্যে বিভিন্ন রাষ্ট্রের উপর চাপ সৃষ্টি করেছিল, তখন বাংলাদেশ সিদ্ধান্ত নেয়নি। এখন সেই স্বীকৃতিই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র এই স্বীকৃতিকে তার স্বার্থবিরুদ্ধ মনে করলেও তুরস্ক এই স্বীকৃতির বিরুদ্ধে না-ও থাকতে পারে। এই স্বীকৃতির মাঝ দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বরাজনীতিতে একটি নতুন উপাখ্যান খুললো, কিছুদিন আগেও যার অস্তিত্বই ছিল না। বাংলাদেশের হাতে এর মাধ্যমে ‘কসোভো কার্ড’ এলো, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপের উল্টোদিকে পারফেক্ট ব্যালান্সে রয়েছে রাশিয়া-চীন-ভারত। এতো বিশাল ওজনের দুই পক্ষ দুই পাশে থাকলেও ব্যালান্সে এতটুকু চাপও অনুভূত হয়নি! এতো শক্তিশালী অবস্থানকে বুঝতে পারাটা অতটা সহজ নয়, কারণ বেশিরভাগ লোকই বাংলাদেশের দৃশ্যমান আকৃতি নিয়েই ব্যস্ত থাকবে।

Wednesday, 5 April 2017

১৩৬তম আইপিইউ সন্মেলনঃ বিকল্প বিশ্ব-ব্যবস্থার হাতছানি?

০৬ এপ্রিল ২০১৭

পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রের জনপ্রতিনিধিদের একটি এসোসিয়েশন হিসেবে এই সংস্থাটির জন্ম ১৮৮৯ সালে। র সদস্যসংখ্যা এবার ১৭১ থেকে ১৭৩ হয়ে গেল; অর্থাৎ এর পরিধি বিশ্বব্যাপী এবং এর সদস্য নয়, এমন দেশ হাতে গোণা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি সংস্থার নাম বেশিরভাগ মানুষই শোনেনি কেনো, অথবা এই সংস্থাটির নাম শোনানো হয়নি কেন? উত্তর সহজ – যুক্তরাষ্ট্র চায়নি বলে!

বাংলাদেশে মাত্র হয়ে গেল ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ)-এর ১৩৬তম সন্মেলন। পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রের জনপ্রতিনিধিদের একটি এসোসিয়েশন হিসেবে এই সংস্থাটির জন্ম ১৮৮৯ সালে; ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে। এর জন্ম দিয়েছিল তখনকার বিশ্বের শক্তিধর দেশ ব্রিটেন এবং ফ্রান্স। এর সদস্যসংখ্যা এবার ১৭১ থেকে ১৭৩ হয়ে গেল; অর্থাৎ এর পরিধি বিশ্বব্যাপী এবং এর সদস্য নয়, এমন দেশ হাতে গোণা। এই সংস্থাটির মাধ্যমেই বেশকিছু ইন্টার-গভর্নমেন্ট সংস্থার জন্ম হয়েছিল, যেমন জাতিসংঘ। সংস্থাটিকে ভিত্তি করে জাতিসংঘের ইন্টার-পার্লামেন্টারি এসেম্বলি তৈরি করার চেষ্টাও করেছিল কিছু সংগঠন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি সংস্থার নাম বেশিরভাগ মানুষই শোনেনি কেনো, অথবা এই সংস্থাটির নাম শোনানো হয়নি কেন? উত্তর সহজ – যুক্তরাষ্ট্র চায়নি বলে!

যুক্তরাষ্ট্র কেন আইপিইউ-তে নেই?

১৮৮৯ সালে সংস্থাটির জন্মের সময়েই যুক্তরাষ্ট্র এর সাথে জড়িত থাকলেও অফিশিয়ালি যুক্তরাষ্ট্র এতে যুক্ত হয় ১৯৩৫ সালে; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর চার বছর আগে। মার্কিন কংগ্রেস এবং সিনেট থেকে অনুমতি আসার পরেই যুক্তরাষ্ট্র এতে যুক্ত হয়। এরপর শুরু হয় বিশ্বযুদ্ধের ঘনঘটা। জার্মানি-জাপান-ইতালি কিছুদিনের জন্যে ব্রিটেন-ফ্রান্স-যুক্তরাষ্ট্র-সোভিয়েত ইউনিয়নকে চ্যালেঞ্জ করে বসে। তবে যুদ্ধ শেষ হবার পরে পৃথিবীর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তিত হয়ে যায়। পুরো ইউরোপে যখন একটিও বিল্ডিং দাঁড়িয়ে ছিল না, তখন যুক্তরাষ্ট্রে একটি বোমাও পড়েনি। দুনিয়ার সকলে ঐ মুহুর্তেই বুঝে গিয়েছিল যে বিশ্বযুদ্ধ কাকে উঠিয়েছে। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের গোড়াপত্তনে তাই মার্কিন প্রভাব ছিল সবচাইতে বেশি; আজও রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটিকে মার্কিনীরা এমনভাবে তৈরি করে, যাতে চাবি থাকে তাদের হাতে। এই সংস্থা বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলি ছাড়া বাকি সকলকেই নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত ছিল সবসময়, যদিও কাগজে-কলমে তার উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধ প্রতিহত করা। যাইহোক, বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের কর্তৃত্ব কমতে থাকার সাথেসাথে তাদের তৈরি করা সংস্থাগুলিও চাপা পড়ে যেতে থাকে। এর স্থলাভিষিক্ত হয় নতুন তৈরি করা মার্কিন সংস্থাগুলি। যেসকল সংস্থার গুরুত্ব কমে যেতে থাকে, তার মাঝে একটি ছিল আইপিইউ। মার্কিন জনপ্রতিনিধিরা ধীরে ধীরে আইপিইউ-তে যাওয়া বন্ধ করে দিলেন। আর ১৯৯৭ সালে মার্কিন কংগ্রেস থেকে আইপিইউ-এর কাছে একটি চিঠি দিয়ে বলা হয় যে যেহেতু মার্কিন কংগ্রেসম্যানরা সেখানে আর যাচ্ছেন না, তাহলে আইপিইউ-এ মার্কিনীদের বাৎসরিক চাঁদা এক মিলিয়ন ডলার থেকে কমিয়ে আধা মিলিয়ন ডলার করা যায় কিনা। আইপিইউ-এর এক্সিকিউটিভ কমিটি মার্কিন উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে প্রস্তাবটি নাকচ করে দেয়। মাত্র এক মিলিয়ন ডলার দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে কঠিন হয়ে যাওয়ায় ১৯৯৯ সালের পহেলা অক্টোবর মার্কিন কংগ্রেসে একটি আইন পাস করে যুক্তরাষ্ট্র অফিশিয়ালি আইপিইউ থেকে বের হয়ে যায়। অর্থাৎ গত ১৭ বছর যাবত যুক্তরাষ্ট্র এর সদস্য নয়, যদিও সংস্থাটির সদস্য পৃথিবীর বেশিরভাগ রাষ্ট্র – গণতান্ত্রিক হোক, আর না হোক। ১৯০৪, ১৯২৫ এবং ১৯৫৩ সালের তিনটি সন্মেলন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিতও হয়েছিল।


সংস্থার বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল ক্যামেরুনের নাগরিক মার্টিন চুংগং বলেন যে কিছু দেশ নিরাপত্তার ঘাটতির কথা বলে বাংলাদেশের স্বাগতিক দেশ হবার বিরুদ্ধে   কঠোর আপত্তি জানায়। তবে বাকি বেশিরভাগ দেশ সমর্থন দেয়ায় প্রস্তাবটি পাস হয়ে যায়। ২০১৪ সালের মার্চে প্রথম আফ্রিকান সেক্রেটারি জেনারেল হন চুংগং, এবং একইসাথে ২০১৪ সালেরই অক্টোবরে বাংলাদেশ থেকে তিন বছরের জন্যে সংস্থার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা হয়। এই সময়টি থেকেই নতুন ইতিহাস রচিত হতে থাকে।

২০১৪ থেকে ২০১৭

সংস্থাটির হেডকোয়ার্টার্স হলো সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়। এর আগের ১৩৫টি সন্মেলনের মাঝে ২০টি সন্মেলনই হয়েছে সুইজারল্যান্ডে; এর মাঝে ২০০৩ থেকে ২০১৬-এর মাঝে ১৪টি সন্মেলন সুইজারল্যান্ডে হয়। ২০০১ সালের পর থেকে জাম্বিয়া, ইকুয়েডর, পানামা, উগান্ডা, ইথিওপিয়া, কেনিয়া, বুরকিনা ফাসোর মতো দেশেও এই সন্মেলন অনুষ্ঠিত হয়; কিন্তু বাংলাদেশে একবারও হয়নি। এই দেশগুলির নাম দেখলেই বোধ করা যায় যে আয়োজকের যোগ্যতা কোন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল না কখনোই। কিন্তু সেটাকেই ইস্যু করা হয় যখন বাংলাদেশ ১৩৬তম সন্মেলন ঢাকায় করার প্রস্তাব দেয়। এই সংস্থার বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল ক্যামেরুনের নাগরিক মার্টিন চুংগং বলেন যে কিছু দেশ বাংলাদেশে নিরাপত্তার ঘাটতি আছে বলে কঠোর আপত্তি জানায়। তবে বাকি বেশিরভাগ দেশ সমর্থন দেয়ায় প্রস্তাবটি পাস হয়ে যায়। ২০১৪ সালের মার্চে প্রথম আফ্রিকান সেক্রেটারি জেনারেল হন চুংগং, এবং একইসাথে ২০১৪ সালেরই অক্টোবরে বাংলাদেশ থেকে তিন বছরের জন্যে সংস্থার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা হয়। এই সময়টি থেকেই নতুন ইতিহাস রচিত হতে থাকে।


ঢাকায় অনুষ্ঠিত ১৩৬তম আইপিইউ সন্মেলনে ১৩২টি দেশের জনপ্রতিনিধিরা অংশ নেয়। সেখানে অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রস্তাব আনা হয়। বলা হয় যে জঙ্গিবাদ, গণতন্ত্র রক্ষা, মানবাধিকার, ইত্যাদি ছুতো ব্যবহার করে অন্য দেশের ভেতরে নাক গলানো যাবে না। উদাহরণস্বরূপ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপগুলিকেই হাইলাইট করা হয়। এই প্রস্তাবটি নিয়েই কয়েকদিন ধরে নাটকীয় বাকবিতন্ডা হয় এবং অবশেষে প্রস্তাব গৃহীত হয়। জাতিসংঘে এই প্রস্তাব আনা কখনোই সম্ভব ছিল না; যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাব তুলতেই দিতো না। তুলতে পারলেও হয়তো ভেটো দিয়ে দিতো। যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত জাতিসংঘের মতো আইপিইউ-তে কারো ভেটো প্রদানের ক্ষমতা নেই। বাংলাদেশ এই সন্মেলনের আয়োজক হবার প্রস্তাব দেয়ার সাথেসাথেই একটি সাম্রাজ্যবাদী চক্র বাধা দিতে চেয়েছিল। তারা বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদ এবং সন্ত্রাসীদের আখড়া বলে প্রমাণ করতে চেয়েছিল। তাদের সেই চেষ্টা তো ব্যর্থ হলোই, একইসাথে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটানোর ষড়যন্ত্রও বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলি নস্যাৎ করে দেয়। তারা এই সন্মেলনের গুরুত্ব অনুধাবন করেই তাদের পরিকল্পনাগুলি আঁটতে থাকে। যেটার উপরে পুঁজি করে তারা বাংলাদেশকে ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ প্রমাণ করতে চেয়েছিল; চেয়েছিল সামরিক-বেসামরিক চুক্তি করে নিয়ন্ত্রণের বলয় শক্ত করতে; চেয়েছিল এদেশের সামরিক বাহিনীকে ধ্বংস করতে, সেটাই এখন পুরোপুরি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিদেশী গোয়ান্দা সংস্থার অন্তর্ধানমূলক কর্মকান্ড, বিশেষ করে মার্কিন সিআইএ এবং ভারতের ‘র’-এর একত্রে কাজ করার প্রয়াস, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। আইপিইউ-এর অন্য দেশের অভ্যন্তরে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত এই সাম্রাজ্যবাদী চক্রের গালে চপেটাঘাত।


অন্যায্য বিশ্ব-ব্যবস্থাকে পরিবর্তনের পথ খুঁজছে সবাই। বাংলাদেশে মার্কিন-নিয়ন্ত্রিত সাম্রাজ্যবাদী চক্রের সকল ষড়যন্ত্রকেই নস্যাৎ করা হচ্ছে এবং একইসাথে এই সন্মেলনগুলির মাঝ দিয়ে মার্কিন বিশ্ব-ব্যবস্থার বিকল্প একটি ব্যবস্থার গোড়াপত্তনের গুরুত্ব তুলে ধরা হচ্ছে, যার ফলাফল হবে সুদূরপ্রসারী ।

বিকল্প বিশ্ব-ব্যবস্থার খোঁজে

আইপিইউ সন্মেলন এবং কিছুদিন আগে জাকার্তায় অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া আইওআরএ-এর শীর্ষ বৈঠক আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ার বার্তা বহন করছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ জানান দিচ্ছে যে সাম্রাজ্যবাদীদের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে এই রাষ্ট্রের অবস্থান বেশ শক্ত। ১৯৯০ সালে ঠান্ডা যুদ্ধ শেষ হবার পর থেকে মার্কিন আদর্শকে দুনিয়াব্যাপী রক্ষা করার একটি পদ্ধতি হলো মুসলিম দেশগুলির সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে বাধা দেয়া। মুসলিম দেশগুলিকে বিভিন্নভাবে ব্যতিব্যস্ত রেখে বা সেসব দেশে সামরিক-বেসামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে দুর্বল করে দিয়ে দুনিয়াব্যাপী তার আদর্শকে জারি রাখাই সেই পদ্ধতির অংশ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা তৈরির মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলির শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখা হয়েছে, যাতে যেকোন সময়ে সেসব দেশে সামরিক-বেসামরিক হস্তক্ষেপ করা যায়। নিজেদের হাতে হাজারো পারমাণবিক অস্ত্র রেখে দিয়ে ‘ওয়েপনস অব ম্যাস ডেসট্রাকশন’এর মিথ্যা কথা বলে ইরাককে ধ্বংস করেছে। ইরাকের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে নিঃসন্দেহে ২০০৩ সালের সেই যুদ্ধ এড়ানো যেত; বাঁচতো লাখো মুসলিমের জীবন। দুনিয়াতে একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারকারী দেশটিই বাকি সকল দেশকে পারমাণবিক অস্ত্র রাখা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছে আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলির মাধ্যমে। একই কাহিনী কেমিক্যাল এবং জীবানু অস্ত্রের ক্ষেত্রেও। সিরিয়াতে বাশার আল-আসাদ সিরিয়ার মুসলিম জনগণের উপরে কেমিক্যাল অস্ত্র ব্যবহার করেছে বলেই মার্কিনীরা চুপ করে থেকেই ক্ষান্ত হয়নি, দিয়েছে পরোক্ষ সমর্থন। এই অন্যায্য বিশ্ব-ব্যবস্থাকে পরিবর্তনের পথ খুঁজছে সবাই। বাংলাদেশে মার্কিন-নিয়ন্ত্রিত সাম্রাজ্যবাদী চক্রের সকল ষড়যন্ত্রকেই নস্যাৎ করা হচ্ছে এবং একইসাথে এই সন্মেলনগুলির মাঝ দিয়ে মার্কিন বিশ্ব-ব্যবস্থার বিকল্প একটি ব্যবস্থার গোড়াপত্তনের গুরুত্ব তুলে ধরা হচ্ছে, যার ফলাফল হবে সুদূরপ্রসারী ।

ভারত-বাংলাদেশ-চীনঃ ব্যালান্স অব পাওয়ার

০৬ এপ্রিল ২০১৭

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশেষে ভারতে যাচ্ছেন বলেই আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে। কয়েক বছর ধরে দিল্লীর নিরন্তর চেষ্টার ফসল হতে যাচ্ছে এই সফর – অন্তত দিল্লীর কূটনীতিকেরা এটা ভেবেই খুশি হতে চাইবেন। যদিও মনোহর পারিকরের ব্যর্থতা এবং তার ফলাফল সম্পর্কে তারা ওয়াকিবহাল থাকবেন। আর এতোদিনে দিল্লীর বুঝে যাবার কথা যে এখন বাংলাদেশের সাথে কথা বলতে গেলে আগের ভাষায় কথা বললে চলবে না। চীন এবং ভারতের মতো দু’টি বিরাট রাষ্ট্রকে ব্যালান্স করে চলার মতো সক্ষমতা যে রাষ্ট্রের রয়েছে, তার শক্তি যাচাই করতে ভারতের হিসেব ভুল হওয়াটা একেবারেই সমীচিন নয়। দিল্লীর চিন্তাশীল মহল বোঝেন যে বঙ্গোপসাগরে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের আবির্ভাব ভারতের সকল চিন্তাকে প্রভাবিত করতে পারে। শক্তিশালী বাংলাদেশ মানেই ভারতের দুর্বল দিকগুলি তার জানা রয়েছে, এবং সেব্যাপারে সিদ্ধান্তও বাংলাদেশেরই। কাজেই বাংলাদেশের নেতৃত্বের পক্ষ থেকে যখন বলা হচ্ছে যে বাংলাদেশের মাটিকে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে দেয়া হবে না, তখন দিল্লীর বোঝা উচিত যে বাংলাদেশের সক্ষমতা কতটুকু।

সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সমঝোতা নিয়ে যে ব্যাপক আলোচনার ঝড় উঠেছে, তা ভারতের কাছে বার্তা হিসেবে যাওয়া উচিত যে বাংলাদেশের জনগণের মতামতের ভরবেগের বিরুদ্ধে কিছু আশা করাটা ভারতের পক্ষে সমীচিন হবে না। তবে পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশ কোন কার্ডটি কোথায় খেলবে, সেটা নিতান্তই রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। একটি ব্যালান্সের মাঝখানের অবস্থানটি যেমন শক্তিশালী, তেমনি দায়িত্বপূর্ণ। ব্যালান্সের দুই প্রান্তে অবস্থিত দুই পক্ষেরই বোঝা উচিত যে ব্যালান্সের মাঝের অবস্থানটিই সিদ্ধান্ত নেয় যে কোনদিকে দূরত্ব কমাতে বা বাড়াতে হবে। এই দূরত্বের হিসেব-নিকেশের অংশ হিসেবেই বাংলাদেশ চাইবে ভারতের সাথে প্রতিরক্ষা সমঝোতা করতে, যদিও সেটা বাংলাদেশের কতটুকু দরকার, তাতে প্রশ্ন থেকেই যাবে সাধারণ জনগণের মাঝে। বিশেষতঃ তিস্তার নায্য পানিবন্টনের মতো ইস্যুকে জিইয়ে রেখে প্রতিরক্ষা স্মারক স্বাক্ষর করাটা কতটা জরুরি, সেই আলোচনাটি অবান্তর নয় মোটেই। তিস্তার পানির বন্টন না করেও একগাদা হাল্কা ইস্যু নিয়ে আলোচনার কথা বলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দিল্লীতে ডেকে নিয়ে গিয়ে ভূরাজনৈতিকভাবে অপমান করার ভারতীয় পরিকল্পনা কতটা ভুল, তা ওয়াকিবহাল মহলের কাছে পরিষ্কার। ভারতকে বুঝতে হবে যে ভারত এবং চীনের মাঝে ‘পারফেক্ট ব্যালান্স’ কোথায় হবে, সেটি নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ; ভারত নয়। এখানে ভারতের ইচ্ছা-অনিচ্ছার গুরুত্ব খুব কমই রয়েছে।

বাংলাদেশকে শক্তিশালী হতেই হবে। একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের পূর্বশর্ত হলো স্থিতিশীলতা। এই স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করতে সাম্রাজ্যবাদী চক্রকে অনেক ছলচাতুরির আশ্রয় নিতে হয়েছে – তথাকথিত জঙ্গীবাদ, শ্রমিক অসন্তোষ, সাম্প্রদায়িক হামলা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে রিজার্ভ চুরি, ইত্যাদি। কিন্তু সবই ভেস্তে গেছে একে একে। ভারতকে বুঝতে হবে যে সাম্রাজ্যবাদী এই চক্র চাইছে ভারত-চীনের ব্যালান্সের মাঝে অবস্থান নেয়া দায়িত্বশীল রাষ্ট্রটিকে অস্থির করে তোলা, যাতে পুরো ব্যালান্সটাই ধ্বসে যায়; উদ্দেশ্য – বঙ্গোপসাগরে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঠেকানো। ভারতকে বুঝতে হবে যে শক্তিশালী বাংলাদেশ ভারতের স্থিতিশীলতার জন্যেই জরুরি। একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রই পারে ভারত এবং চীনকে ব্যালান্সে ধরে রাখতে; বঙ্গোপসাগরকে ব্যালান্সে রাখতে; ভারত মহাসাগরকে ব্যালান্সে রাখতে। নিজের স্বার্থ না বুঝে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ বাস্তবায়ন ভারতের জন্যে দুঃখ ছাড়া কিছুই বয়ে আনবে না। ইন্টারন্যাশনাল পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) ১৩৬তম সভা বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হওয়া এবং সেই সভায় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিদের বিভিন্ন ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়ে অন্য দেশের অভ্যন্তরে হস্তক্ষেপের কর্মকান্ড বন্ধের আহ্বান ভারতের কাছে একটি বার্তা হিসেবে যাওয়া উচিত। এর আগে জাকার্তায় অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়ান ওশান রিম এসোসিয়েশন (আইওআরএ)-এর প্রথম শীর্ষ বৈঠকও একইরকম বার্তা দিয়েছিল। ভারত তার নিজের স্বার্থেই কোন অবস্থাতেই এই বার্তাগুলি ভুল বুঝতে পারে না। এই বার্তাগুলির সঠিক অনুধাবনের মাঝেই ভারতের অস্তিত্ব নিহিত।