Showing posts with label Bangladesh. Show all posts
Showing posts with label Bangladesh. Show all posts

Monday, 21 July 2025

২০২৫এর ২১শে জুলাই দিয়াবাড়ি ট্র্যাজেডি থেকে যা শিক্ষনীয়

২২শে জুলাই ২০২৫

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর 'এফ-৭বিজিআই' বিমানগুলি ২০১২ সালে বাহিনীতে যুক্ত হয়। তৈরি করার বয়স বিচারে এগুলি বেশ নতুন। আর এই বিমানগুলি এখন চীনা 'এলএস-৬' জিপিএস গাইডেড গ্লাইড বোমা এবং তুরস্কের 'তেবার' লেজার গাইডেড বোমা ছুঁড়ে ভূমিতে নিখুঁতভাবে টার্গেট ধ্বংস করতে সক্ষম। কাজেই যদি প্রাযুক্তিক সক্ষমতার কথা বলা হয়, তাহলে এগুলি একেবারে ফেলে দেবার জিনিস নয়। যে সক্ষমতার অভাব রয়েছে তা হলো, এগুলি দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র বহণ করতে পারে না। একারণেই বাংলাদেশের প্রয়োজন 'জে-১০' এবং 'জেএফ-১৭' ফাইটার বিমান। একমাত্র চীন থেকেই দূরপাল্লার এরূপ ক্ষেপণাস্ত্র (‘পিএল-১৫') পাবার সম্ভাবনা রয়েছে। (Photo: Shahriar Sonet)


২০২৫এর ২১শে জুলাই একটা ট্র্যাজেডির দিবস হিসেবে মনে থাকবে বাংলাদেশের অনেক মানুষের। কমপক্ষে ২০ জন মানুষের প্রাণ ঝরে গেছে বিমান বাহিনীর বিমান দুর্ঘটনায়; যার মাঝে বেশিরভাগই ছিল শিশু; যারা ছিল উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলের ছাত্র। তবে এই স্মৃতি কতদিন এদেশের মানুষ মনে রাখবে, সেটা দেখার বিষয়। মাত্র দশ দিন আগে, অর্থাৎ ১১ই জুলাই ছিল আরেকটা ট্র্যাজেডির ১৪তম বার্ষিকী। ২০১১এর ১১ই জুলাই চট্টগ্রামের মিরসরাইএ একটা সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৫ জন নিহত হয়েছিল; যারে মাঝে ৪৩ জনই ছিল শিশু শিক্ষার্থী। এর মাঝে ৩৪ জনই ছিল মিরসরাই উপজেলার মায়ানী ইউনিয়নের আবু তোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। ১৯৭১ সালের পর থেকে একসাথে এতজন শিশুর মৃত্যু ঘটেনি। দুর্ঘটনায় এরূপ অপমৃত্যু বাংলাদেশে নতুন নয়। কিছুদিন সেই ঘটনা নিয়ে হৈচৈ হয়; বিশেষ করে রাজনৈতিক পক্ষগুলি এর থেকে 'পলিটিক্যাল পয়েন্টস' বের করার চেষ্টায় থাকে; এরপর সকলেই ভুলে যায়। এই ব্যবস্থাটাই চলছে বাংলাদেশে যুগের পর যুগ ধরে। মানুষের আবেগকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়; কিন্তু সমস্যার সমাধান করার ইচ্ছা কারুরই থাকে না। বরং যতদিন সমস্যা থাকে, ততদিনই সেটা ভোটের রাজনীতির জন্যে ব্যবহারযোগ্য হয়। একারণেই বিমান বাহিনীর বিমান দুর্ঘটনার ব্যাপারে একটা 'হোলিস্টিক ভিউ' থাকাটা জরুরি।

১। অনেকেই বলা শুরু করেছেন যে, 'মান্ধাতার আমলের বিমান ওড়ায় কেন'? খুবই যৌক্তিক কথা। 'এফ-৭' যুদ্ধবিমান তো ১৯৫০এর দশকে সোভিয়েত ডিজাইনের 'মিগ-২১' বিমানের চীনা কপি। একারণেই বাংলাদেশের উচিৎ এই মুহুর্তে কয়েক স্কোয়াড্রন 'জে-১০সি' এবং 'জেএফ-১৭বি' যুদ্ধবিমান যোগাড় করা। একদিকে যেমন এগুলি জাতীয় নিরাপত্তার জন্যে অতি জরুরি; তেমনি পুরোনো বিমানগুলিকে (যেমন – ‘এফ-৭এমবি') প্রতিস্থাপন করার ক্ষেত্রেও অতি প্রয়োজনীয়। প্রধান উপদেষ্টা নিজেই কিছুদিন আগেই বিমান বাহিনীর একটা অনুষ্ঠানে বলেছেন যে, বিভিন্ন দিক থেকে যুদ্ধের হুমকি আসছে। তাই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে। আর প্রস্তুতি নিতে গেলে অর্ধেক প্রস্তুতি নিলে হবে না; পুরো প্রস্তুতি নিতে হবে। ভারতীয় মিডিয়া (ওয়াশিংটনেরও সমর্থন রয়েছে) চাইছে বিমান নির্মাতা চীনের সাথে বাংলাদেশের একটা দ্বন্দ্ব উস্কে দিতে। কাজেই এদেশের মানুষকে সাবধানে পা ফেলতে হবে।

২। মান্ধাতার আমলের বিমানগুলিকে সরিয়ে ফেললেই তো বিমান দুর্ঘটনা আর হবে না তাই না? মার্কিন বিমান বাহিনী হলো দুনিয়ার সবচাইতে শক্তিশালী বিমান বাহিনী। তাদের দিকে তাকালে কি দেখা যায়? তাদের রয়েছে 'বি-৫২এইচ' বোমারু বিমান; যা প্রথম উড়েছিল ১৯৬০ সালের ১০ই জুলাই; অর্থাৎ ৬৫ বছর আগে! এটা সার্ভিসে আসে ১৯৬১ সালের ৯ই মে। শেষ 'বি-৫২এইচ' বিমান ফ্যাক্টরি থেকে বের হয়েছিল ১৯৬২ সালের ২৬শে অক্টোবর। তবে এই বিমানের প্রথম ভার্সনটা প্রথম আকাশে উড়েছিল আরও প্রায় দশ বছর আগে ১৫ই এপ্রিল ১৯৫২ সালে। তাহলে ৬০-৭০ বছর আগে তৈরি এই বিমানগুলি যুক্তরাষ্ট্র কেন এখনও ব্যবহার করছে? তারা 'বি-১বি' এবং 'বি-২' বোমারু বিমানও তৈরি করেছে। এরপরও তারা 'বি-৫২'এর মতো মান্ধাতার আমলের বিমান আকাশে ওড়াচ্ছেই শুধু নয়; সারা দুনিয়ার বহু দেশ ধ্বংস করতে ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্র তো জানে যে, এই বিমানগুলি যে চালানো বিপজ্জনক; নাকি জানে না?
 
শেষ 'বি-৫২এইচ' বিমান ফ্যাক্টরি থেকে বের হয়েছিল ১৯৬২ সালের ২৬শে অক্টোবর। তাহলে ৬০-৭০ বছর আগে তৈরি এই বিমানগুলি যুক্তরাষ্ট্র কেন এখনও ব্যবহার করছে? বাস্তবতা হলো, একটা দেশ ধ্বংস করার যোগ্যতা কিন্তু এই বিমানগুলির রয়েছে! অনেক ধরণের অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র এখন এই বিমানে বহণ করা যায়; যার ফলে বিমানগুলি এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী কমব্যাট প্ল্যাটফর্ম। অর্থাৎ বিমান মান্ধাতার আমলের হতে পারে; কিন্তু এর বহণ করা অস্ত্র মোটেই মান্ধাতার আমলের নয়।


৩। তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের তো এটাও হিসেবে রয়েছে যে, ২০১৪ সাল থেকে ২০২৫ সালের মাঝে সর্বাধুনিক 'এফ-৩৫' যুদ্ধবিমানের ১৬টা দুর্ঘটনা ঘটেছে। সর্বাধুনিক বিমানের ক্ষেত্রেই যদি এতগুলি দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে এটা কি বলা যায় যে, বিমান দুর্ঘটনা শুধুই বিমানের বয়সের উপর নির্ভরশীল? আর বিমানের বয়স বলতে কি বোঝানো হবে? বিমানের টাইপের প্রথম ফ্লাইট? নাকি দুর্ঘটনায় পতিত বিমানটার ফ্যাক্টরি থেকে বের হবার তারিখ? উভয় ক্ষেত্রেই 'বি-৫২' বিমানের আকাশে ওড়ার যোগ্যতা থাকার কথা নয়। তবে বাস্তবতা হলো, একটা দেশ ধ্বংস করার যোগ্যতা কিন্তু এই বিমানগুলির রয়েছে! অনেক ধরণের অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র এখন এই বিমানে বহণ করা যায়; যার ফলে বিমানগুলি এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী কমব্যাট প্ল্যাটফর্ম। অর্থাৎ বিমান মান্ধাতার আমলের হতে পারে; কিন্তু এর বহণ করা অস্ত্র মোটেই মান্ধাতার আমলের নয়।

৪। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর 'এফ-৭বিজিআই' বিমানগুলি ২০১১ সালে তৈরি এবং ২০১২ সালে এগুলি বিমান বাহিনীতে যুক্ত হয়। তৈরি করার বয়স বিচারে এগুলি বেশ নতুন। আর এই বিমানগুলি এখন চীনা 'এলএস-৬' জিপিএস গাইডেড গ্লাইড বোমা এবং তুরস্কের 'তেবার' লেজার গাইডেড বোমা ছুঁড়ে ভূমিতে নিখুঁতভাবে টার্গেট ধ্বংস করতে সক্ষম। কাজেই যদি প্রাযুক্তিক সক্ষমতার কথা বলা হয়, তাহলে এগুলি একেবারে ফেলে দেবার জিনিস নয়। যে সক্ষমতার অভাব রয়েছে তা হলো, এগুলি দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র বহণ করতে পারে না। এটা এই মুহুর্তে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর মাত্র ৬টা 'মিগ-২৯' বিমান পারে ('আর-২৭' ক্ষেপণাস্ত্র)। একারণেই বাংলাদেশের প্রয়োজন 'জে-১০' এবং 'জেএফ-১৭' ফাইটার বিমান। একমাত্র চীন থেকেই দূরপাল্লার এরূপ ক্ষেপণাস্ত্র (‘পিএল-১৫') পাবার সম্ভাবনা রয়েছে। এটা পুরোপুরিভাবে নিশ্চিত যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ ভারতের সাথে সম্পর্ক খারাপ করতে চাইবে না। তাই এটা ভুলে যাওয়া যায় যে, ‘ইউরোফাইটার টাইফুন' অথবা ফরাসি 'রাফাল' অথবা মার্কিন 'এফ-১৬'এর সাথে দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র পাওয়া সম্ভব।
 
অনেকেই বলছেন যে, এত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ফাইটার বিমান ওড়ানো হচ্ছে কেন? খুবই যৈক্তিক প্রশ্ন। কিন্তু বিমান বাহিনীর বিমানগুলিকে অন্যস্থানে (যেমন ভারতে) সরিয়ে ফেললেই কি জনগণকে নিরাপদে রাখা যাবে? একটা 'বোয়িং ৭৮৭' যাত্রীবাহী বিমান সর্বোচ্চ ১২৬টন পর্যন্ত জেট ফুয়েল বহণ করতে পারে! এই পরিমাণ জেট ফুয়েল নিয়ে যদি একটা বিমান কুর্মিটোলার আশেপাশে কোন একটা স্কুলের উপর ধ্বসে পড়ে; অথবা প্রধান উপদেষ্টার অফিসের উপর ধ্বসে পড়ে, তাহলে কি হতে পারে?


৫। অনেকেই বলছেন যে, এত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ফাইটার বিমান ওড়ানো হচ্ছে কেন? খুবই যৈক্তিক প্রশ্ন। তাহলে কি করা উচিৎ? সিঙ্গাপুর বা ইস্রাইলকে অনুসরণ করা উচিৎ। সিঙ্গাপুর ভারত এবং অস্ট্রেলিয়ার ভূমি এবং আকাশসীমা ব্যবহার করে তাদের পাইলটদের ট্রেনিং দেয়; আর ইস্রাইল তুরস্কের আকাশসীমা ব্যবহার করে। কাজেই সিঙ্গাপুর এবং ইস্রাইলের মানুষ থাকে পুরোপুরিভাবে নিরাপদ। যেহেতু বাংলাদেশের সরকারের পক্ষে নতুন করে আরেকটা বিমান ঘাঁটি তৈরি করা অসম্ভব, তাই যারা এই যুক্তি দিচ্ছেন, তাদের অবশ্যই সমাধান হিসেবে বিমান মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা উচিৎ যে, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর বিমানগুলিকে যেন ভারতের বিশাল আকাশসীমায় ট্রেনিং নেবার সুযোগ করে দেয়া হয়। এর আগে মুন্সিগঞ্জে বিমানবন্দর প্রকল্প ভেস্তে যাওয়া, বাগেরহাটে খান জাহান আলী বিমানবন্দর প্রকল্প ভেস্তে যাওয়া এবং লালমনিরহাট বিমানবন্দর চালু করা প্রচেষ্টা ভেস্তে যাওয়া থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া বাংলাদেশের যেকোন সরকারের পক্ষে কোন বিমানবন্দর তৈরি বা পুরোনো বিমানবন্দর চালু করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ ভারত এবং মার্কিন সরকারের আরও কাছাকাছি (পড়ুন অনুগত) হতে পারলে বাংলাদেশের মানুষকে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর জেট ফুয়েল দ্বারা পুড়ে যাওয়া থেকে বাঁচানো যাবে! অন্য কথায় বলতে গেলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের হাতে 'আউটসোর্স' (চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটিএর মতো) করে দিতে পারলেই এদেশের মানুষকে যুদ্ধবিমানের শব্দ শুনতে হবে না। থাকবে শুধু শান্তি; আর শান্তি!

৬। কিন্তু বিমান বাহিনীর বিমানগুলিকে অন্যস্থানে (যেমন ভারতে) সরিয়ে ফেললেই কি জনগণকে নিরাপদে রাখা যাবে? একটা 'বোয়িং ৭৮৭' যাত্রীবাহী বিমান সর্বোচ্চ ১২৬টন পর্যন্ত জেট ফুয়েল বহণ করতে পারে! এই পরিমাণ জেট ফুয়েল নিয়ে যদি একটা বিমান কুর্মিটোলার আশেপাশে কোন একটা স্কুলের উপর ধ্বসে পড়ে; অথবা প্রধান উপদেষ্টার অফিসের উপর ধ্বসে পড়ে, তাহলে কি হতে পারে? কিছুটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে গত ১২ই জুলাই ভারতের আহমেদাবাদে এই রকমই একটা বিমানের দুর্ঘটনা থেকে; যেখানে বিমানের ২৪২ জন আরোহী ছাড়াও ভূমিতে আরও ১৯ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৩ সালে ফ্যাক্টরি থেকে বের হয়ে আসা এই বিমানটা ৫৪ টনের বেশি জেট ফুয়েল বহণ করছিল! এর তুলনায় ঢাকায় ধ্বংসপ্রাপ্ত 'এফটি-৭বিজিআই' যুদ্ধবিমানটা সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৮ টন জেট ফুয়েল বহণ করতে পারে (যদিও তা নিঃসন্দেহে অনেক কম ফুয়েল বহণ করছিল)। কাজেই এই 'এফ-৭'এর স্থলে যদি একটা 'বোয়িং-৭৮৭' বিমান থাকতো, তাহলে মাইলস্টোন স্কুল এবং কলেজের কোন নিশানা পাওয়া যেতো কিনা সন্দেহ! সুতরাং যারা প্রশ্ন করছেন যে, ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা থেকে বিমান বাহিনীর বিমান ওড়ে কেন, তাদের উচিৎ সরকারের কাছে আবেদন জানানো, যাতে করে ঢাকা বিমানবন্দর বন্ধ করে দেয়া হয়। থার্ড টার্মিনালের মতো মার্কিন প্রকল্পও বন্ধ করার দাবি জানানো উচিৎ; যেটা বাস্তবায়নের উছিলায় মুন্সিগঞ্জে বিমানবন্দরের প্রকল্প বাতিল করা হয়।
 
২০১১ সালের ১১ই জুলাই মিরসরাইএর দুর্ঘটনায় ৪৩ জন শিশুসহ ৪৫ জন নিহত হয়েছিল। কতজন মনে রেখেছে? দুর্ঘটনায় এরূপ অপমৃত্যু বাংলাদেশে নতুন নয়। কিছুদিন সেই ঘটনা নিয়ে হৈচৈ হয়; বিশেষ করে রাজনৈতিক পক্ষগুলি এর থেকে 'পলিটিক্যাল পয়েন্টস' বের করার চেষ্টায় থাকে; এরপর সকলেই ভুলে যায়। এই ব্যবস্থাটাই চলছে বাংলাদেশে যুগের পর যুগ ধরে। মানুষের আবেগকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়; কিন্তু সমস্যার সমাধান করার ইচ্ছা কারুরই থাকে না। বরং যতদিন সমস্যা থাকে, ততদিনই সেটা ভোটের রাজনীতির জন্যে ব্যবহারযোগ্য হয়।


৭। অনেকেই বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে গালাগালি দিচ্ছেন – তাদের পাইলট অনভিজ্ঞ; অনভিজ্ঞ পাইলট দিয়ে ঢাকা শহরের উপর দিয়ে বিমান ওড়ানো হচ্ছে; দুর্নীতির আখড়া হয়ে গেছে বিমান বাহিনী; ইত্যাদি। যারা বলছেন, তারা হয়তো জানেন না যে, একটা 'এফ-৭' ফাইটার পাইলট হতে গেলে কতগুলি ধাপ পার করে আসতে হয়। প্রথমে 'পিটি-৬' এবং 'গ্রোব জি-১২০পি' বিমানে ওড়া শিখতে হয়। যারা বিশেষভাবে ভালো পারদর্শিতা দেখায়, তাদের মাঝ থেকেই সাধারণতঃ ফাইটার পাইলট সিলেক্ট করা হয়। এরা আবার 'কে-৮' জেট প্রশিক্ষণ বিমানে ওড়া শেখে। এরপর 'ইয়াক-১৩০' এডভান্সড ট্রেইনার বিমানে অস্ত্র চালনা শেখে। এরপর সে 'এফ-৭' স্কোয়াড্রনে 'এফটি-৭' বিমানে প্রশিক্ষণ নিয়ে টাইপ ফ্লাইং কোয়ালিফাই করে। এই ফ্লাইং কোয়ালিফিকেশনের শেষ ধাপের 'সোলো ফ্লাইট' ছিল ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মোঃ তৌকির ইসলামের। প্রায় ১০ মিনিট ভালোভাবে ওড়ার পর বিমানটাতে সমস্যা দেখা দেয়। তার সহকর্মীরা বলেন যে, বিমানটা মধ্য আকাশে হঠাত বন্ধ হয়ে যায়। তৌকির শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করছিলেন বিমানটাকে একটা খোলা স্থানে ল্যান্ডিং করাতে। একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন যে, দু'টা বিমান একসাথে উড়ছিল। এর মাঝে একটা দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো যে সমস্যা পড়েছে। এই বিমানটা মাইলস্টোন কলেজের ১০-১২ তলা উঁচু ভবনের সাথে ধাক্কা খেয়ে এরপর দুই তলা স্কুল ভবনের উপর ধ্বসে পড়ে।

৮। পৃথিবীর অনেক দেশের বিমান বাহিনীতেই এতগুলি ধাপ পার হয়ে ফাইটার পাইলট হতে হয় না। একজন ফাইটার পাইলট হতে গেলে বেশ কয়েক বছর লেগে যায়। আর একজন পাইলট খুব বেশিদিন সুপারসনিক বিমানের পাইলট থাকতে পারেন না। এক্ষেত্রে শারীরিক সক্ষমতা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আবার অভিজ্ঞ পাইলটদের মূল গুরুত্ব হলো ট্রেইনার হিসেবে। তাই বিমান বাহিনী সাধারণতঃ তাদেরকে বেশি বয়সে ফাইটার বিমান ওড়াতে দেয় না। টাকা খরচ করলে মোটামুটি দ্রুতই একটা বিমান কেনা সম্ভব। কিন্তু একজন পাইলট তৈরি করতে 'অমূল্য' সময় লাগে; যা অর্থ দিয়েও পাওয়া যায় না। গত ২০২৪এর মে মাসেও একটা 'ইয়াক-১৩০' বিমান ধ্বংস হয়ে স্কোয়াড্রন লীডার আসীম জাওয়াদ মৃত্যুবরণ করেন। জাওয়াদ এবং তৌকিরের পেছনে ব্যয় করা পুরো সময়টা বাংলাদেশ বিমান বাহিনী হারিয়েছে; যা পূরণ করতে কয়েক বছর লাগবে।

৯। যারা বলছেন যে, অনভিজ্ঞ পাইলট দিয়ে কেন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার উপর দিয়ে বিমান ওড়ানো হচ্ছে, তাদের অবশ্যই জানা উচিৎ যে গত ২৯শে জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে সামরিক 'ব্ল্যাক হক' হেলিকপ্টারের সাথে যাত্রীবাহী বিমানের সংঘর্ষে ৬৭ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। হেলিকপ্টারের পাইলট ক্যাপ্টেন রেবেকা লোবাক ছয় বছর ধরে সেনাবাহিনীর পাইলট ছিলেন। তার সাথের দু'জন এনসিও ছিলেন, যারা ছিলেন যথেষ্ট অভিজ্ঞ। এরপরেও একটা অত্যাধুনিক হেলিকপ্টার একটা বেসামরিক যাত্রীবাহী বিমানের সাথে ধাক্কা লাগা এড়াতে পারেনি। আর পৃথিবীর সবচাইতে বিপজ্জনক আকাশপথ হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র এই সামরিক ট্রেনিং মিশনকে বাতিল করেনি। কারণ এই ট্রেনিং মিশনটাকে তারা তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছে। দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে; তাই বলে জাতীয় নিরাপত্তাকে ছোট করার মতো ক্ষুদ্র চিন্তা তাদেরকে গ্রাস করেনি।
 
যারা বিমান বাহিনীর সমালোচনা করছেন, তাদের উচিৎ 'প্রকৃত' সমালোচনা করা। এই বিমান বাহিনী হলো সাইফুল আজমের উত্তরসুরী; যিনি ১৯৬৭ সালে একদিনে ৩টা ইস্রাইলি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছিলেন। এই বিমান বাহিনী তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছে যখন সাইফুল আজমের শত্রুরা ৫৬ হাজারেরও বেশি মুসলিম ভাই-বোনদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর পাইলটরা নিঃসন্দেহে অতি উচ্চমানের পাইলট। কিন্তু নিজের ভাই-বোনদের মৃত্যুতে যাদের অন্তর কাঁদে না, তারা আর কারুর চোখে না হলেও আল্লাহর চোখে অপরাধী হবে। ইস্রাইলের বিরুদ্ধে না লড়েও তারা যে মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাবেন না, সেই প্রমাণ তারা পেয়েছেন। মৃত্যু আসবেই; কিন্তু তাদের কাছে অপশন ছিলো - মৃত্যুটা কতটা সন্মানের হবে। হয়তো ২০২৫ সালের ২১শে জুলাইয়ের মর্মান্তিক ঘটনা তাদেরকে সেটাই মনে করিয়ে দেবে।


১০। যারা দুর্নীতির কথা বলছেন, তারা দুর্নীতির আসল আখড়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে এড়িয়ে যাচ্ছেন। এই ব্যবস্থায় মানুষকে শেখানো হয় যাতে করে ব্যক্তিগত বেনেফিট ছাড়া কেউ কোন কাজ না করে। দুর্নীতি করলে তো ব্যক্তিগত বেনেফিট হয়; তাহলে কেন সেটা খারাপ হবে? ব্যক্তিগত বেনেফিটের এই একই চিন্তা বাংলাদেশের সকল মানুষকেই শুধু দেয়া হয় না, রাষ্ট্রও চলে বেনেফিটের উপর ভিত্তি করে। যেমন, হাসিনা সরকার বেনেফিটের কথা চিন্তা করেই ভারতের আদানির সাথে রাষ্ট্রবিরোধী চুক্তি করেছিল; যা আবার অন্তর্বর্তী সরকারও বজায় রেখেছে। বেনেফিট চিন্তা করেই সরকার এই চুক্তি বাতিল করেনি অথবা সীমান্ত ও অন্যান্য ইস্যুতে ভারতের সাথে ঝামেলায় জড়ায়নি। বেনেফিট রয়েছে বলেই সরকার চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশীদেরকে দিতে চাইছে। বেনেফিট চিন্তা করেই ভারতের সুবিধার্থে তৈরি করা মাতারবাড়ি বন্দরকে সরকার অর্থনৈতিক বিষফোঁড়া মনে করছে না; অথচ পায়রা বন্দরকে ক্ষতিকর মনে করছে। বেনেফিট চিন্তা করেই প্রধান উপদেষ্টা চাডিগাঁও ভাষায় চট্টগ্রামের মানুষকে বুঝিয়েছেন যে মাতারবাড়ি বন্দর ভারতকে ব্যবহার করতে দিলে বাংলাদেশের কি কি বেনেফিট হবে। যখন পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাটাই চলছে বেনেফিটের উপর ভিত্তি করে, তখন এই ব্যবস্থা পরিবর্তন না করে নির্দিষ্ট কোন একটা গোষ্ঠীকে টার্গেট করার অর্থ হলো, কোন বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে কথাগুলি বলা হচ্ছে।

যারা এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাকে পুঁজি করে ঢাকা থেকে বিমান বাহিনীর ঘাঁটি সরিয়ে ফেলার কথা বলছেন, তারা ভারতের ন্যারেটিভ অনুসরণ করছেন। ভারতীয় মিডিয়া এই ঘটনাকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর সাথে সাধারণ মানুষের দূরত্ব তৈরি করতে এবং বাংলাদেশের সাথে চীনের (বিমান নির্মাতা) দূরত্ব তৈরি করতে। তারা এড়িয়ে যাচ্ছেন যে, ‘এফ-৭' বিমানের স্থলে 'বোয়িং-৭৮৭' বিমান থাকলে মাইলস্টোন কলেজ, স্কুল ও আশেপাশের বহু স্থাপনার অস্তিত্বই থাকতো না! যারা বিমান বাহিনীর সমালোচনা করছেন, তাদের উচিৎ 'প্রকৃত' সমালোচনা করা। এই বিমান বাহিনী হলো সাইফুল আজমের উত্তরসুরী; যিনি ১৯৬৭ সালে অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের 'হান্টার' যুদ্ধবিমান উড়িয়ে একদিনে ৩টা ইস্রাইলি যুদ্ধবিমান (অপেক্ষাকৃত উচ্চমানের) ভূপাতিত করেছিলেন। এই বিমান বাহিনী তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছে যখন সাইফুল আজমের শত্রুরা ৫৬ হাজারেরও বেশি মুসলিম ভাই-বোনদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর পাইলটরা নিঃসন্দেহে অতি উচ্চমানের পাইলট। কিন্তু নিজের ভাই-বোনদের মৃত্যুতে যাদের অন্তর কাঁদে না, তারা আর কারুর চোখে না হলেও আল্লাহর চোখে অপরাধী হবে। ইস্রাইলের বিরুদ্ধে না লড়েও তারা যে মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাবেন না, সেই প্রমাণ তারা পেয়েছেন। মৃত্যু আসবেই; কিন্তু তাদের কাছে অপশন ছিলো - মৃত্যুটা কতটা সন্মানের হবে। হয়তো ২০২৫ সালের ২১শে জুলাইয়ের মর্মান্তিক ঘটনা তাদেরকে সেটাই মনে করিয়ে দেবে।






সূত্রঃ




‘Stratofortress... The Big One from Boeing’ by Robert F Dorr in Air Enthusiast, Summer 1990

‘Pilot is safe after crash of F-35 fighter jet seen in dramatic video’ in CNN, 29 January 2025

‘What we know so far about Air India crash investigation’ in BBC, 12 July 2025

‘AI-171’s flight to tragedy: A minute-by-minute account of events that led to Ahmedabad plane crash’ Deccan Herald, 12 July 2025

‘মিরসরাই ট্র্যাজেডি: সেদিন যেভাবে প্রাণ হারিয়েছিল ৪৩ শিশুসহ ৪৫ জন' প্রথম আলো, ১১ই জুলাই ২০২৪

‘Pilot tried to avoid disaster by steering crashing jet away from populated area: ISPR’ in The Business Standard, 21 July 2025

‘At least 27 Air Force jet crashes in last 3 decades’ in Dhaka Tribune, 11 July 2025

‘Palestinians mourn death of a Bangladeshi war hero’ in Al-Jazeera, 15 June 2020

‘What we know about the deadly air crash between a passenger jet and a US Army helicopter’ in Associated Press, 28 March 2025

‘Friends say Army captain killed in midair collision was a ‘brilliant and fearless’ patriot’ in Associated Press, 03 February 2025

Saturday, 19 April 2025

আসন্ন ভূরাজনৈতিক ঝড়ের জন্যে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত?

২০শে এপ্রিল ২০২৫

সবগুলি ঘটনা দেখিয়ে দিছে যে, যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে সামরিক সংঘাতের জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে। একারণে বাকি বিশ্বও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সামরিক শক্তি তৈরির দিকে মনোনিবেশ করছে। বাংলাদেশ কি এই ব্যাপারগুলি সম্পর্কে অবহিত রয়েছে? অনুধাবন করার এই ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের সামনে প্রস্তুতি নেয়ার জন্যে দুই বছর রয়েছে কিনা, সেটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না! অন্য কথা বলতে গেলে, সময় এখন আপাততঃ মাসের হিসেবে এগুচ্ছে!


ইউক্রেনের পর যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ থেকে তার সামরিক শক্তি সরিয়ে নেবার প্রসেস শুরু করেছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মিউনিখ বক্তব্য যারা শুনেছেন, তাদের এই ব্যাপারটা বুঝে নিতে এক মুহুর্তও লাগার কথা নয়। মধ্যপ্রাচ্যে সিরিয়াতে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক শক্তিকে অর্ধেক করে তুরস্কের হাতে দায়িত্ব ছেড়ে দিচ্ছে। এখন তুরস্ক ইস্রাইলের নিরাপত্তা দেবে। একইসাথে ইরানকে, বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পকে নিয়ন্ত্রণ করতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল সামরিক শক্তি মোতায়েন করেছে। উদ্দেশ্য হলো, ইরানকে ভয় দেখিয়ে চুক্তি করতে বাধ্য করা; যাতে করে ইস্রাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। এগুলির অর্থ হলো - যুক্তরাষ্ট্র সারা দুনিয়া থেকে সামরিক শক্তি সরিয়ে নিয়ে ইন্দোপ্যাসিফিকে মোতায়েন করছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতা চীনাদের তুলনায় নস্যি; চীনের একটা শিপইয়ার্ডের সক্ষমতা সমস্ত যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতার চাইতে বেশি! তাই যুক্তরাষ্ট্র এখন কোরিয়াকে নিয়োজিত করতে চাইছে মার্কিন নৌবহরের জন্যে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের বাণিজ্যযুদ্ধও ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর, রেয়ার আর্থ ম্যাটেরিয়াল, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ফাইভ-জি প্রযুক্তি, ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা এখন যুদ্ধাবস্তা প্রায়। এই সবগুলি ঘটনা দেখিয়ে দিছে যে, যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে সামরিক সংঘাতের জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে। একারণে বাকি বিশ্বও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সামরিক শক্তি তৈরির দিকে মনোনিবেশ করছে। বাংলাদেশ কি এই ব্যাপারগুলি সম্পর্কে অবহিত রয়েছে? অনুধাবন করার এই ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের সামনে প্রস্তুতি নেয়ার জন্যে দুই বছর রয়েছে কিনা, সেটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না! অন্য কথা বলতে গেলে, সময় এখন আপাততঃ মাসের হিসেবে এগুচ্ছে!

প্রথমতঃ বাংলাদেশকে স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব বিদেশ-নির্ভরতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে; বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের ক্ষেত্রে। কারণ দুনিয়াতে একটা যুদ্ধাবস্থা তৈরি হবার সাথেসাথেই বৈদেশিক বাণিজ্য-কেন্দ্রিক সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন বাতাসে মিলিয়ে যাবে! কোন কোন পণ্য বাংলাদেশের না হলেই নয়, সেগুলির একটা তালিকা করতে হবে এবং সেগুলিকে যথাসম্ভব দেশে উৎপাদনের জন্যে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাতে হবে। কিছু পণ্য বাইরে থেকে আনতেই হবে। সেগুলির উৎস নিয়ে গভীর চিন্তা ব্যয় করতে হবে - কোথা থেকে কিভাবে সেগুলি আনা সম্ভব হবে; এবং সেগুলির বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা কিভাবে দেয়া যাবে। এক্ষেত্রে কোন কোন দেশ বাংলাদেশের দুর্যোগের সময় সাথে থাকতে পারে, তার একটা তালিকা করতে হবে। যেসকল দেশের উপর নির্ভর করা কঠিন, বা যেগুলি বাংলাদেশকে তাদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে, সেগুলিকে তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে - এখানে কোন ভালোবাসার সম্পর্ক রাখা যাবে না।

 
ডিজেল ইঞ্জিন, ইলেকট্রিক মোটর এবং কম্প্রেসারের উৎপাদন করার জন্যে ফ্যাক্টরি দিতে হবে। এগুলি খুব জটিল কোন ইন্ডাস্ট্রি নয়। সদিচ্ছা থাকলে এসব ফ্যাক্টরি করতে এক বছরও লাগার কথা নয়। এই তিনটা জিনিস ছাড়া কোন ইন্ডাস্ট্রিই তৈরি করা সম্ভব নয়। বর্তমানে বাংলাদেশ এগুলির জন্যে আমদানির উপর পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল।



দ্বিতীয়তঃ যত দ্রুত সম্ভব কিছু ইন্ডাস্ট্রিয়াল সক্ষমতা বাংলাদেশে গড়ে তোলার ব্যবস্থা করতে হবে।

১। ফ্ল্যাট স্টিলের উৎপাদন শুরু করতে হবে। বর্তমানে উৎপাদিত স্টিল প্লেটের মান যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশে একাধিক ফ্যাক্টরি রয়েছে, যেগুলিতে ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস বা ইএএফ চুল্লি রয়েছে। এসব চুল্লিতে তৈরি স্টিলের মান ফ্ল্যাট স্টিলের জন্যে সঠিক মানের (বিশুদ্ধতা বিবেচনায়)। ফ্ল্যাট স্টিল ছাড়া কোন কৌশলগত সামগ্রী তৈরি করা যাবে না; বিশেষ করে যানবাহন তৈরি করতে গেলে ফ্ল্যাট স্টিল লাগবেই।

২। ডিজেল ইঞ্জিন, ইলেকট্রিক মোটর এবং কম্প্রেসারের উৎপাদন করার জন্যে ফ্যাক্টরি দিতে হবে। এগুলি খুব জটিল কোন ইন্ডাস্ট্রি নয়। সদিচ্ছা থাকলে এসব ফ্যাক্টরি করতে এক বছরও লাগার কথা নয়। এই তিনটা জিনিস ছাড়া কোন ইন্ডাস্ট্রিই তৈরি করা সম্ভব নয়। বর্তমানে বাংলাদেশ এগুলির জন্যে আমদানির উপর পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল।

৩। পেট্রোকেমিক্যাল এবং বেসিক কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলতে হবে। মিথানলের উৎপাদন বাংলাদেশে শুরু হয়ে গিয়েছে। এখন মিথানলের পরের পণ্যগুলিকে উৎপাদনে নিয়ে আসতে হবে। নাইট্রিক এসিড, ফরমালডিহাইড, এমোনিয়া এবং এগুলির মাধ্যমে তৈরি আরও কিছু যৌগ রয়েছে, যেগুলি উৎপাদন না করতে পারলে এক্সপ্লোসিভ ইন্ডাস্ট্রি করা সম্ভব নয়। আর এক্সপ্লোসিভ উৎপাদন না করতে পারলে সামরিক শক্তি তৈরির কথা ভুলে যেতে হবে। প্লাস্টিকের ধরণগুলির মাঝে শুধুমাত্র পিভিসি উৎপাদনে গিয়েছে বাংলাদেশে। এখানে পিইউ, পিএস, পিইটি, ইত্যাদি রেজিনের উৎপাদন শুরু করতে হবে যত দ্রুত সম্ভব। কারণ এগুলি ছাড়া কম্পোজিট ম্যাটেরিয়াল তৈরি করা যাবে না।

৪। সিএনসি মেশিন যত বেশি সম্ভব আনার ব্যবস্থা করতে হবে এবং দেশেই সিএনসি মেশিন তৈরির ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমানে বেশিরভাগ সিএনসি মেশিন হলো মিলিং মেশিন, ডব্লিউডিএম; কিছু লেজার কাটিং মেশিনও রয়েছে। একইসাথে সিএনসি লেদ মেশিন প্রয়োজন অনেক। দেশে এই মুহুর্তে লেদ মেশিন (নন সিএনসি) তৈরির সক্ষমতা রয়েছে। এটাকে আরও বাড়াতে হবে; সাথে মিলিং, সারফেস গ্রাইন্ডিং, শিয়ারিং, ইত্যাদি বেসিক মেশিন তৈরির সক্ষমতাকে আরও বাড়াতে হবে। বিএমটিএফ, বিওএফ, ইএমই ওয়ার্কশপ, ওয়াল্টন এবং আরও কিছু কারখানায় টুলস তৈরি করা হয়। এই সক্ষমতাগুলিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং দীর্ঘস্থায়ীত্ব দিতে হবে।

৫। এই মুহুর্তে বাংলাদেশের নিজস্ব কিছু ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্ল্যান্ট ডিজাইন, কম্পোনেন্ট উৎপাদন এবং ইন্সটলেশনের সক্ষমতা রয়েছে। এগুলিকে আরও একধাপ এগিয়ে নিতে হবে। নলেজ বেইজটাকে আরও বাড়াতে হবে এবং ইন্সটিটিউশনাল জ্ঞানসম্পন্ন নতুন ইঞ্জিনিয়ারদেরকে এসব ক্ষেত্রে জড়িত করতে হবে।

৬। ইলেকট্রনিক্স ইন্ডাস্ট্রিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। টেলিকমিউনিকেশন, রাডার, জিপিএস এবং স্যাটকমসহ ইলেকট্রোম্যাগনেটিক স্পেকট্রাম নিয়ে কাজ করা সকল ধরণের যন্ত্র উৎপাদন শুরু করতে হবে। রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংএর যন্ত্রের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করতে হবে; বিশেষ করে মাল্টিলেয়ার পিসিবি তৈরির মেশিন, প্রোটোটাইপিং মেশিন, অটোম্যাটিক টেস্টিং ইকুইপমেন্ট, ইত্যাদির সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। লিথিয়াম ব্যাটারির উৎপাদন (শুধু সংযোজন নয়) শুরু করতে হবে। ইপিজেডগুলিতে এই মুহুর্তে কিছু অপটিক্যাল সরঞ্জাম তৈরি হয়। এগুলি বাংলাদেশের জন্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইলেকট্রো-অপটিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট তৈরির সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। কোন যুদ্ধাস্ত্রই এসকল সরঞ্জাম ছাড়া কার্যকর হবে না।

৭। টায়ার তৈরির সক্ষমতা বাড়াতে হবে; বিশেষ করে রেডিয়্যাল টায়ার। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে কিছু বিদেশী শক্তি এদেশের গাজী টায়ার ফ্যাক্টরি ধ্বংস করে ফেলে। এটা ছিল বাংলাদেশের একমাত্র ফ্যাক্টরি, যেখানে ট্রাকে ব্যবহার করা কমার্শিয়াল ভেহিকল টায়ার তৈরি করা হতো। এটা ধ্বংস করে ফেলার কারণে ট্রাক টায়ার ভারত থেকে আনা ছাড়া কোন পদ্ধতিই থাকেনি। এই অবস্থা চলতে দেয়া যায় না। চীনের প্রযুক্তিতে আরও একটা টায়ার ফ্যাক্টরি (রেডিয়্যাল টায়ারসহ) তৈরি হবার প্রসেস শুরু হলেও সেটার ভবিষ্যৎ অনেক আগেই অনিশ্চিত হয়ে গিয়েছে। টায়ার তৈরির ফ্যাক্টরি এখন অতি গুরুত্বপূর্ণ – সকল প্রকারের টায়ার তৈরির সক্ষমতা প্রয়োজন।

৮। গ্লাস তৈরির সক্ষমতাকে নতুন ধাপে নিয়ে যেতে হবে। বুলেটপ্রুফ গ্লাস এবং ফাইটার বিমানের ককপিটের ক্যানোপি তৈরির সক্ষমতা প্রয়োজন।

৯। আর্মার প্লেট এবং সিরামিক আর্মার তৈরির সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে সিরামিক এবং গার্মেন্টস শিল্পে কিছু বিশেষ দক্ষতা রয়েছে; যেগুলিকে সমন্বয় করতে হবে।
 
বর্তমানে বাংলাদেশের বিমানবন্দরের সংখ্যা বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমানগুলিকে সুরক্ষা দেয়ার জন্যে যথেষ্ট নয়। ইউক্রেনে ৫০টার মতো বিমানবন্দর থাকার কারণে তারা রুশ হামলা থেকে তাদের বিমান বাহিনীর বিমানগুলিকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পেরেছে। ইউক্রেনের তুলনায় আকৃতিতে বাংলাদেশ অনেক ছোট। কাজেই বাংলাদেশের পুরাতন সকল বিমানবন্দরের রানওয়ে নতুন করে তৈরি করতে হবে। এছাড়াও নতুন করে বহু স্থানে রানওয়ে তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে যতগুলি হাইওয়ে রয়েছে, তার সকল স্থানে খুঁজে দেখতে হবে যে, কোথায় কোথায় ফাইটার বিমান ওঠানামা করার মতো দীর্ঘ রানওয়ে তৈরি করা যায়।



তৃতীয়তঃ কৌশলগত অবকাঠামো নির্মাণে মনোনিবেশ করতে হবে।

১। বিমানবন্দরের সংখ্যা বাড়াতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের বিমানবন্দরের সংখ্যা বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমানগুলিকে সুরক্ষা দেয়ার জন্যে যথেষ্ট নয়। ইউক্রেনে ৫০টার মতো বিমানবন্দর থাকার কারণে তারা রুশ হামলা থেকে তাদের বিমান বাহিনীর বিমানগুলিকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পেরেছে। ইউক্রেনের তুলনায় আকৃতিতে বাংলাদেশ অনেক ছোট। কাজেই বাংলাদেশের পুরাতন সকল বিমানবন্দরের রানওয়ে নতুন করে তৈরি করতে হবে; যাতে করে মোটামুটিভাবে পরিবহণ বিমান হলেও যেন ওঠানামা করতে পারে। এছাড়াও নতুন করে বহু স্থানে রানওয়ে তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে যতগুলি হাইওয়ে রয়েছে, তার সকল স্থানে খুঁজে দেখতে হবে যে, কোথায় কোথায় ফাইটার বিমান ওঠানামা করার মতো দীর্ঘ রানওয়ে তৈরি করা যায়। সেই স্থানগুলির সারফেসকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। ভারত ইতোমধ্যেই হাইওয়েতে ফাইটার বিমান নামানোর পরীক্ষা চালিয়ে ফেলেছে।

২। নদীবন্দরের সংখ্যা কয়েকগুণ বাড়াতে হবে। প্রকৃতপক্ষে বেশকিছু নদীবন্দর রয়েছে বর্তমানে; সেগুলিকে নতুন অবকাঠামো যোগ করে সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। এর মাঝে প্রথমেই থাকবে ড্রেজিং। নদীপথে নাব্যতা না থাকলে নদীবন্দর দিয়ে কি হবে? নাব্যতা নিশ্চিত করতে ড্রেজার এবং আনুসাঙ্গিক যন্ত্রপাতির সংখ্যা বাড়াতে হবে। ড্রেজারের ভেসেলগুলি বাংলাদেশে তৈরি হলেও ড্রেজারের কাটিং মেশিন এবং ডিজেল ইঞ্জিন আমদানির উপর নির্ভরশীল। এক্ষেত্রে নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।

৩। শিপবিল্ডিংএর ক্ষেত্রে সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করতে হবে; বিশেষ করে খুলনা শিপইয়ার্ড ও নারায়নগঞ্জ ডকইয়ার্ডের তত্ত্বাবধানে আরও অনেক স্থানে উচ্চমানের জাহাজ তৈরির ফ্যাসিলিটি গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ জাহাজ তৈরির জন্যে বরিশাল ও পটুয়াখালি এলাকা, চাঁদপুর, মুন্সিগঞ্জ, গজারিয়া, ভৈরব, আশুগঞ্জ, নারায়নগঞ্জ, ঢাকা ভালো এলাকা হতে পারে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং খুলনা অঞ্চলকে সমুদ্রগামী জাহাজ তৈরির জন্যে আলাদাভাবে গড়ে তোলা যেতে পারে।


জানুয়ারি ২০২৫। মিয়ানমার নৌবাহিনীর ফ্রিগেট পানিতে ভেসেছে। তাদের প্রথম ফ্রিগেটটা পানিতে ভেসেছে ১৩ বছর আগে। বাংলাদেশ এখনও পর্যন্ত ফ্রিগেট তৈরির উপযোগী একটা ডকইয়ার্ডও তৈরি করতে পারেনি! এই লজ্জা নিয়েই বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দ সুখে শান্তিতে দিন কাটাচ্ছেন।


চতুর্থতঃ সামরিক ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে।

১। বিমান সংযোজন ও নির্মাণের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এই মুহুর্তে বাংলাদেশ 'পিটি-৬', ‘বেল-২১২', ‘বেল-২০৬', ‘এমআই-১৭১' এবং 'এফ-৭' বিমান ওভারহোলিং করে থাকে। এছাড়াও 'গ্রোব জি-১২০টিপি' বিমানের কম্পোজিট স্ট্রাকচার তৈরির সক্ষমতাও রয়েছে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনী অতি সম্প্রতি নিজস্ব দু'টা প্রোটোটাইপ বিমান তৈরি করে উড্ডয়ন করেছে। এই সক্ষমতাগুলিকে পরের ধাপে নিয়ে যেতে হবে। বিমান সংযোজনের সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে হবে এবং ফাইটার বিমান নির্মাণের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

২। নৌবাহিনীর ফ্রিগেট তৈরির সক্ষমতা অর্জন করার কথা ছিলো কয়েক বছর আগেই। মিয়ানমার তাদের নৌবাহিনীর জন্যে প্রথম ফ্রিগেট পানিতে ভাসিয়েছে ১৩ বছর আগে। বাংলাদেশ এখনও পর্যন্ত ফ্রিগেট তৈরির উপযোগী একটা ডকইয়ার্ডও তৈরি করতে পারেনি! এই লজ্জা নিয়েই বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দ সুখে শান্তিতে দিন কাটাচ্ছেন।

৩। ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। সকল প্রকারের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা প্রয়োজন। এন্টি-ট্যাঙ্ক, ম্যানপ্যাডস, শোরাড, মিডিয়াম রেঞ্জ এয়ার ডিফেন্স, এন্টি-শিপ, এয়ার-টু-সারফেস, এয়ার-টু-এয়ার, সারফেস-টু-সারফেস ব্যালিস্টিক, সারফেস-টু-সারফেস ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা প্রয়োজন। এই মুহুর্তে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ওভারহোলিং (এবং প্রয়োজনে এসেম্বলি) করার সক্ষমতা রয়েছে; যেগুলিকে পরের ধাপে নিয়ে যেতে হবে।

৪। ড্রোন তৈরির কারখানা তৈরি করতে হবে। ড্রোন বহু প্রকারের; তবে এর মাঝে কিছু প্রকারের ড্রোনকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। গোয়েন্দা কাজের জন্যে ইলেকট্রো-অপটিক্যাল সেন্সর (উপরে আলোচিত) সমৃদ্ধ ড্রোন প্রয়োজন। আর আক্রমণকারী ড্রোন হিসেবে 'ফার্স্ট পারসন ভিউ' বা 'এফপিভি' ড্রোন তৈরি করতে হবে। এই ড্রোনগুলি কোয়াডকপ্টার, হেক্সাকপ্টার, অক্টাকপ্টার, ফিক্সড-উইং হতে পারে। এই ড্রোনের প্রপালশন হিসেবে বিভিন্ন আকৃতির ইলেকট্রিক মোটর (উপরে মোটরের কারখানার কথা আলোচিত হয়েছে) এবং ছোট পেট্রোল ইঞ্জিন (মূলতঃ মোটরসাইকেল ইঞ্জিন) তৈরির কারখানা বসাতে হবে। এগুলিতে ব্যবহার করা জিপিএস, রিমোট-কন্ট্রোল কমিউনিকেশন ডিভাইস, লিথিয়াম ব্যাটারির (উপরে আলোচিত) আলাদা কারখানা প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রেই এগুলির বডি (বিশেষ করে এফপিভি ড্রোনের) কার্বন-ফাইবার ম্যাটেরিয়াল দিয়ে তৈরি করতে হয়। কার্বন-ফাইবার কিভাবে যোগাড় করা যায়, অথবা কিভাবে এগুলি নিজেদের দেশে উৎপাদন করার প্রযুক্তি আনা যায়, সেটা খুঁজতে হবে।

৫। আর্টিলারি কামান তৈরির কারখানা প্রয়োজন। ইউক্রেন যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে, ন্যাটোর মতো এয়ার সুপেরিয়রিটি না থাকলে (যেটার ব্যাপারে এখন অনেকেই সন্দিহান) যেকোন দেশকে আর্টিলারির উপরেই নির্ভর করতে হবে। ১০৫মিঃমিঃ এবং ১৫৫মিঃমিঃ আর্টিলারি ব্যারেল অবশ্যই তৈরি করতে হবে। ১০৫মিঃমিঃ, ১৫৫মিঃমিঃ আর্টিলারি এমুনিশন তৈরির ব্যাপক সক্ষমতা প্রয়োজন। এছাড়াও আরও দূরের পাল্লার টার্গেটে আঘাত করার লক্ষ্যে ১২২মিঃমিঃ, ২৩০মিঃমিঃ, ৩০০মিঃমিঃ আর্টিলারি রকেটের কারখানা করতে হবে। এছাড়াও বিমান বিধ্বংসী কামান তৈরির সক্ষমতা প্রয়োজন। ২০মিঃমিঃ অথবা ১৪ দশমিক ৫মিঃমিঃ (যেকোন একটা), ৩৫ অথবা ৩৭মিঃমিঃ (যেকোন একটা), ৫৭মিঃমিঃ কামান নিজস্ব কারখানায় তৈরি করতে হবে। এগুলির সাথে ব্যবহার করার জন্যে নিজস্ব তৈরি ইলেকট্রো-অপটিক ডিভাইস এবং রাডারের সমন্বয় করতে হবে।

৬। সামরিক অফরোড গাড়ির কারখানা তৈরি করতে হবে। এগুলি সকল প্রকারের পরিবহণ ছাড়াও আর্টিলারি ট্রাকটর হিসেবে কাজ করবে। এগুলির মাঝে 'বাগি' প্রকারের হাল্কা যানও প্রয়োজন, যেগুলি মোটরসাইকেলের সাথে চলার উপযোগী। বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতিতে এধরণের যানবাহন উপযোগী হবে। বেশকিছু গাড়ি প্রয়োজন, যেগুলি উভচর হবে; অর্থাৎ নদী-খাল-বিল পার হতে পারবে। গাড়িগুলিকে পরিবর্তিত করেই এধরণের উভচর যান তৈরি করা সম্ভব। এসকল গাড়িতে ব্যবহারের জন্যে ডিজেল ইঞ্জিন, স্টিল প্লেট, আর্মার, বুলেটপ্রুফ গ্লাসের কারখানার কথা উপরে উল্লিখিত হয়েছে।

৭। বন্দুকের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। এই মুহুর্তে বাংলাদেশের এসল্ট রাইফেল তৈরির সক্ষমতা মোটেই যথেষ্ট নয়। অতি দ্রুত এই উৎপাদন সক্ষমতাকে কয়েক গুণ করতে হবে। একইসাথে ৭ দশমিক ৬২মিঃমিঃ জিপি মেশিন গান এবং ১২ দশমিক ৭মিঃমিঃ হেভি মেশিন গান (এয়ার ডিফেন্সের জন্যে) তৈরির সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। এসকল বন্দুকের জন্যে ৭ দশমিক ৬২মিঃমিঃ (রাইফেল ও মেশিন গান) এবং ১২ দশমিক ৭মিঃমিঃ এমুনিশন উৎপাদন কয়েক গুণ করতে হবে।

৮। এয়ারড্রপ এমুনিশন এবং নেভাল মাইন তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

এছাড়াও আরও বেশকিছু সামরিক সক্ষমতা রয়েছে, যেগুলি উল্লেখ করতে থাকলে তালিকা বড় হতেই থাকবে। কিন্তু উপরে উল্লেখ করা সক্ষমতাগুলি অর্জিত না হলে এর সাথে আরও কয়েক'শ সক্ষমতা যুক্ত করাটা অর্থহীন হয়ে দাঁড়াবে।
 
কেউ কেউ এখনও দিবাস্বপ্নে বিভোর রয়েছেন। তাদেরকে বলতে হবে - ঘুম থেকে জেগে উঠুন! বাস্তবতা বুঝুন! উপরে উল্লিখিত বাংলাদেশের স্বনির্ভরতার ভিত্তিগুলি বাস্তবে রূপ দিতে পারলেও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সহজ হবে না। কারণ রাজনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশ কোন আদর্শিক রাষ্ট্র নয়। তারা 'প্রোএকটিভ' নয়; বরং তারা বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহ দেখে প্রতিক্রিয়া (রিয়্যাকটিভ) হিসেবে কিছু পরিকল্পনা করে থাকে। যেকারণে বেশিরভাগ সময়ই তারা বাইরের শক্তির প্রভাব বলয়ে আবর্তিত হয়।


উপরে দেয়া তালিকার বাইরে বাংলাদেশকে আরও অনেক কিছুই করতে হবে। যেমন, অতি দ্রুত কয়েক স্কোয়াড্রন চীনা 'জে-১০' এবং পাকিস্তানি 'জেএফ-১৭' যুদ্ধবিমান যোগাড় করতে হবে। একইসাথে অফ-দ্যা-শেলফ কিছু ফ্রিগেট (চীনা এবং আর যেখানে পাওয়া যায়) যোগাড় করতে হবে; যেগুলি আনার পর সেগুলির সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। নতুন জাহাজ তৈরি করতে কয়েক বছর লেগে যাবে; এখন সেই সময়টুকু আছে কিনা, তা সন্দেহ। পুরোনো জাহাজগুলির সাথে ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং এয়ার, সারফেস ও সাব-সারফেস ড্রোনের সমন্বয় ঘটিয়ে সেগুলিকে সর্বোচ্চ ব্যবহারের উপযোগী করে প্রস্তুত করা যেতে পারে। এই মুহুর্তে সংখ্যা অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার; যা কোনভাবেই প্রতিস্থাপনীয় নয়। মধ্যম পাল্লার এয়ার ডিফেন্স ক্ষেপণাস্ত্র (চীনা এবং তুর্কি) অবশ্যই প্রয়োজন। এগুলি না থাকলে দেশের কোন স্থাপনাই রক্ষা করা সম্ভব হবে না।

ঝড় আসছে! কিন্তু বাংলাদেশ এই মুহুর্তে মোটেই প্রস্তুত নয়! বিপদে ভয় পাওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভয় না পেলে অনেক সময়েই স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠা যায় না। ভয় পেলেই শরীরের ডিফেন্সিভ মেকানিজম কাজ করা শুরু করে; আবার কোন কোন ক্ষেত্রে প্যারালাইসিসেও আক্রান্ত হতে পারে। দ্বিতীয়টা বাংলাদেশের জনগণ তাদের নেতৃত্বের কাছ থেকে কখনোই আশা করবে না। কিন্তু আশা না করলেই যে তা বাস্তবে হবে না, তার কোন গ্যারান্টি নেই। কারণ কেউ কেউ এখনও দিবাস্বপ্নে বিভোর রয়েছেন। তাদেরকে বলতে হবে - ঘুম থেকে জেগে উঠুন! বাস্তবতা বুঝুন! উপরে উল্লিখিত বাংলাদেশের স্বনির্ভরতার ভিত্তিগুলি বাস্তবে রূপ দিতে পারলেও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সহজ হবে না। কারণ রাজনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশ কোন আদর্শিক রাষ্ট্র নয়। তারা 'প্রোএকটিভ' নয়; বরং তারা বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহ দেখে প্রতিক্রিয়া (রিয়্যাকটিভ) হিসেবে কিছু পরিকল্পনা করে থাকে। যেকারণে বেশিরভাগ সময়ই তারা বাইরের শক্তির প্রভাব বলয়ে আবর্তিত হয়।

Friday, 28 March 2025

যুদ্ধাস্ত্রের ব্যাপারে অন্য রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীলতা সার্বভৌমত্বকে হুমকিতে ফেলতে পারে

২৮শে মার্চ ২০২৫

পেরু বিমান বাহিনীর ফরাসি নির্মিত 'মিরাজ-২০০০পি' যুদ্ধবিমান। ইকুয়েডরের বিরুদ্ধে ১৯৯৫ সালের সেনেপা যুদ্ধে পেরু এই বিমানগুলিকে এয়ারবোর্ন রাডার হিসেবে ব্যবহার করা ছাড়া তেমন কোন কাজে লাগাতে পারেনি। কারণ ফরাসিরা এই বিমানের সাথে মধ্যম পাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করতে রাজি ছিল না। অস্ত্র নির্মাতা রাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সাথে সমন্বয় না হলে যুদ্ধের দিন সরঞ্জামের রেডিনেসের সমস্যা হতে পারে।


সেনেপা যুদ্ধ – পেরু বনাম ইকুয়েডর

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরু এবং ইকুয়েডর। পেরুর জনসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লক্ষ এবং ইকুয়েডরের জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৮০ লক্ষ। আয়তনের দিক থেকেও পেরু অনেক বড় দেশ; ১৩ লক্ষ বর্গকিঃমিঃ বনাম ৩ লক্ষ বর্গকিঃমিঃ। বর্তমানে পেরুর জিডিপি (২৭০ বিলিয়ন ডলার) ইকুয়েডরের চাইতে (১২০ বিলিয়ন ডলার) অনেক বড় হলেও ১৯৮০এর দশকে একেবারে সমান ছিল। এই দুই দেশের মাঝে বহু আগে থেকেই সীমানা নিয়ে একটা দ্বন্দ্ব ছিল। সেনেপা নামে গভীর অরণ্যের পাহাড়ি এলাকায় প্রায় ৭০কিঃমিঃএর মতো অঞ্চলে সীমানা নির্ধারণে কিছুটা ধোঁয়াশা ছিল। ১৯৪০এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্ততায় এই দ্বন্দ্ব কিছুটা কাটলেও ১৯৫০এর দশকে ইকুয়েডরের পার্লামেন্টে সেই সীমানাকে স্বীকৃতি না দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এই সমস্যা আবারও জেঁকে বসে ১৯৮১ সালে; যখন ইকুয়েডর সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে গোপনে এই দুর্গম অঞ্চলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। তবে সামরিক দিক থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী পেরু খুব সহজেই ইকুয়েডরের সেনাদেরকে সেখান থেকে বিতাড়িত করে সেনেপা অঞ্চলের উপর তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। মূলতঃ এই অঞ্চলের ইকুয়েডর প্রান্তে স্বর্ণ এবং তামার খনির সন্ধান পাবার কারণে ইকুয়েডর এই অঞ্চলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইছিল। ১৯৮১ সালের অপমান ইকুয়েডর ভোলেনি। ১৯৮৮ সাল থেকে দক্ষিণ আমেরিকার অনেকগুলি দেশেই অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। ইকুয়েডর সুযোগ খোঁজে। অর্থনৈতিক চাপে পেরু তার সামরিক বাজেট কমিয়ে ফেলে। তাদের বিমান বাহিনীতে ১২টা ফরাসি নির্মিত অত্যাধুনিক 'মিরাজ-২০০০পি' বিমান ছাড়াও ছিল ১৫টা সুপারসনিক 'মিরাজ-৫পি' ফাইটার (১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনাকে ১০টা দিয়ে দেয়ার পর), ৩৪টা সোভিয়েত 'সুখোই-২২' সুপারসনিক বোমারু বিমান, ১৫টা ব্রিটিশ 'ক্যানবেরা' মধ্যম পাল্লার বোমারু বিমান, ২৪টা মার্কিন নির্মিত 'এ-৩৭বি' হাল্কা এটাক বিমান এবং ১৫টা সোভিয়েত নির্মিত 'এমআই-২৪' এটাক হেলিকপ্টার। কাগজে কলমে এটা ছিল দক্ষিণ আমেরিকার সবচাইতে শক্তিশালী বিমান বাহিনী। কিন্তু সমস্যা হলো, বাজেট না থাকায় স্পেয়ার পার্টসের অভাবে পেরুর বিমান বাহিনীর মাত্র ৩টা 'মিরাজ-২০০০পি', ৭টা 'সুখোই-২২', ৪টা 'ক্যানবেরা', ৮টা 'এ-৩৭বি' বিমান এবং মাত্র ৫টা সোভিয়েত নির্মিত 'এমআই-২৪' এটাক হেলিকপ্টার অপারেশনাল ছিল। তাদের ২০টা বিমান প্রতিরক্ষা রাডারের মাঝে মাত্র ৮টা অপারেশনাল ছিল। এছাড়াও মধ্যম পাল্লার সোভিয়েত নির্মিত ৬টা 'এসএ-৩' আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (১১৬টা ক্ষেপণাস্ত্র), ১২৫টা 'এসএ-৭' ও ১১০টা 'এসএ-১৬' স্বল্পপাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মাঝে মাত্র ২০ শতাংশ অপারেশনাল ছিল। এছাড়াও তাদের বহরে ১২৪টা সোভিয়েত নির্মিত ২৩মিঃমিঃ বিমান প্রতিরক্ষা কামানও ছিল; তবে সেগুলিকে হেলিকপ্টারে করে বহণ করে দুর্গম এলাকায় নিয়ে যাবার মতো সক্ষমতা পেরুর ছিল না। এই অবস্থার ধীরে ধীরে উন্নতি হলেও তা যুদ্ধের এক মাসের মাঝে পুরোপুরিভাবে কাটিয়ে ওঠা যায়নি। একারণে ১৯৯৫ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে সেনেপা যুদ্ধে পেরুর বিমান বাহিনীর অত্যাধুনিক 'মিরাজ-২০০০' এবং 'মিরাজ-৫' বিমানগুলি একবারের জন্যেও ইকুয়েডরের বিমানগুলিকে বাধা দিতে পারেনি। অপরদিকে ইকুয়েডরের 'মিরাজ-এফ১' এবং ইস্রাইলের তৈরি 'কেফির সি২' সুপারসনিক বিমানগুলি পেরুর কয়েকটা বিমান ভূপাতিত করে ফেলে। বাজে অর্থনৈতিক অবস্থা স্বল্প সময়ের জন্যে পেরুর সাথে ইকুয়েডরের সামরিক সক্ষমতার সমতা তৈরি করেছিল। পেরুর প্রায় ১০টার মতো 'মিরাজ-এফ১' এবং ১০টার মতো 'কেফির সি২' বিমান অপারেশনাল ছিল; যা যুদ্ধের ফলাফল তাদের পক্ষে নিয়ে আসতে সহায়তা করেছিল। তাদের বিমান বাহিনীর সবচাইতে আধুনিক ব্রিটিশ 'জাগুয়ার' বোমারু বিমানকে ব্যবহার করারই দরকার হয়নি। এবারে আবারও যখন যুদ্ধবিরতি হয় এবং সকলে আলোচনার টেবিলে বসে, তখন ইকুয়েডর সেনেপা অঞ্চল থেকে তার সেনা সরিয়ে নিয়ে আসতে বাধ্য হয় ঠিকই, কিন্তু খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ অঞ্চলটা তাদের নামে নিশ্চিতভাবে লিখিয়ে নেয়। এই অঞ্চলে কানাডার একটা কোম্পানি স্বর্ণের খনি ডেভেলপ করেছে এবং একটা চীনা কোম্পানি তামার খনি ডেভেলপ করেছে। অর্থাৎ ইকুয়েডর যা চেয়েছিল, সেটাই পেয়েছে।

স্বল্প সময়ের সেনেপা যুদ্ধ যে ব্যাপারটা পরিষ্কার করে দেয় তা হলো, একটা রাষ্ট্র কোন অবস্থাতেই তার প্রতিরক্ষাকে হাল্কাভাবে নিতে পারে না। এটা স্বার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। যুদ্ধ শেষ হবার সাথেসাথেই পেরু রাশিয়া থেকে 'মিগ-২৯' এবং 'সুখোই-২৫' যুদ্ধবিমান কেনে। ২০০১ সালেই পেরু 'মিগ-২৯' যুদ্ধবিমানগুলিকে আপগ্রেড করে মধ্যম পাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য 'আর-৭৭' রাডার গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র বহণের উপযোগী করে নেয়। তাদের অতি দামী 'মিরাজ-২০০০পি' ফাইটারগুলি এয়ারবোর্ন রাডার ছাড়া খুব বেশি একটা কাজে আসেনি। এই বিমানগুলি একবারের জন্যেও ইকুয়েডরের বিমানগুলিকে বাধা দিতে পারেনি। সেগুলিতে বহণ করার জন্যে মধ্যম পাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রও ফরাসিরা পেরুকে দিতে রাজি হয়নি।
 
ইকুয়েডর বিমান বাহিনীর 'মিরাজ-এফ১' যুদ্ধবিমান। পেরুর প্রায় ১০টার মতো 'মিরাজ-এফ১' এবং ১০টার মতো 'কেফির সি২' বিমান অপারেশনাল ছিল; যা যুদ্ধের ফলাফল তাদের পক্ষে নিয়ে আসতে সহায়তা করেছিল। বাজে অর্থনৈতিক অবস্থা স্বল্প সময়ের জন্যে পেরুর সাথে ইকুয়েডরের সামরিক সক্ষমতার সমতা তৈরি করেছিল। কোন একটা সময় একটা রাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহারের উপরে কোন নিয়ন্ত্রণ চলে আসলে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের ইন্টেলিজেন্স সেটার উপর নজরদারি করবে এবং প্রয়োজন হলে সেই পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে নিজেদের আখের গোছাতে পারে।


সেনেপা যুদ্ধ থেকে শিক্ষা

প্রথমতঃ বিশাল শক্তিশালী সামরিক সরঞ্জামের বহর কোন কাজেই আসবে না যদি সেগুলি সর্বদা ব্যবহারের উপযোগী না থাকে। যুদ্ধের দিনে যুদ্ধক্ষেত্রে কে কতটা সামরিক শক্তি মোতায়েন করতে পারে, সেটার উপরেই জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়। কোন একটা সময় সেই সরঞ্জামগুলি ব্যবহারের উপরে কোন নিয়ন্ত্রণ চলে আসলে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের ইন্টেলিজেন্স সেটার উপর নজরদারি করবে এবং প্রয়োজন হলে সেই পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে নিজেদের আখের গোছাতে পারে। সামরিক সরঞ্জামের রেডিনেস বা ব্যবহারের উপযোগিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এই রেডিনেস একদিকে যেমন নির্ভর করবে সরঞ্জামের কর্মক্ষমতার উপর, তেমনি নির্ভর করবে মানবসম্পদের ট্রেনিংএর উপর। এটা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।

দ্বিতীয়তঃ সরঞ্জামের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি; বিশেষ করে যেদিন প্রয়োজন হবে। যদি সরঞ্জাম অন্য কারুর তৈরি হয়, তাহলে সেখানে নির্ভরশীলতা তৈরি হতে পারে। বাইরে থেকে সরঞ্জাম কিনে আনার সাথে আর্থিক স্বচ্ছলতার প্রশ্ন ছাড়াও ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্য জড়িত। অস্ত্র নির্মাতা রাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সাথে সমন্বয় না হলে যুদ্ধের দিন সরঞ্জামের রেডিনেসের সমস্যা হতে পারে। স্পেয়ার পার্টস ছাড়া এখানে সফটওয়্যার আপগ্রেডের ব্যাপার রয়েছে। আবার যুদ্ধ শুরু হলে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞাও চলে আসতে পারে। অস্ত্র নির্মাতা দেশগুলি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র বহণের সক্ষমতা রেখে তাদের বিমানগুলি রপ্তানি করে না। বরং শর্ত সাপেক্ষে কিছু কিছু করে প্রযুক্তির ছাড় দেয়া হয়। পেরু 'মিরাজ-২০০০' বিমান ঠিকই পেয়েছিল; কিন্তু সেগুলি মধ্যম পাল্লার আকাশ থেকে আকাশে বহণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং 'এক্সোসেট' জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র বহণ করতে পারতো না। ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনার 'সুপার এটেনডার্ড' যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছিল। ব্রিটেনের চাপে ফরাসিরা আর্জেন্টিনার বেশিরভাগ 'সুপার এটেনডার্ড' যুদ্ধবিমানকে 'এক্সোসেট' ক্ষেপণাস্ত্র বহণের উপযোগী করেনি; কালক্ষেপণ করেও আর্জেন্টিনার ক্ষতি করে তারা। পেরুকে ফ্রান্স 'এক্সোসেট' ক্ষেপণাস্ত্র দেয়নি এই সন্দেহে যে, পেরু সেগুলি আর্জেন্টিনাকে দিয়ে দিতে পারে। মিশরেরও একই অভিজ্ঞতা হয়েছে মার্কিন 'এফ-১৬' (১৯২টা) এবং ফরাসি 'রাফাল' (৫৪টার মাঝে ২৪টা ডেলিভারি পেয়েছে) যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রে। যুক্তরাষ্ট্র যেমন তাদের মধ্যম পাল্লার 'এআইএম-১২০ এমর‍্যাম' আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র মিশরকে দেয়নি; তেমনি ফরাসিরাও তাদের 'রাফাল' বিমানের সাথে 'মাইকা' এবং 'মিটিয়র' ক্ষেপণাস্ত্র দিতে রাজি হয়নি। কারণ উভয় দেশের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ হলো ইস্রাইলকে রক্ষা করা; তাই তারা মিশরের হাতে এই অত্যাধুনিক অস্ত্রগুলি দেয়নি। সুতরাং অতি দামী মার্কিন ও ফরাসি যুদ্ধবিমান কেনার পরেও মিশর সেগুলি নিয়ে কিছুই করতে পারেনি। একারণে তারা শেষ পর্যন্ত চীনের দ্বারস্থ হয়েছে 'জে-১০সি' যুদ্ধবিমানের জন্যে। তারা আশা করছে যে, অবশেষে তারা এই বিমানের সাথে মধ্যম পাল্লার 'পিএল-১৫' আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র পাবে। মার্কিন 'এফ-১৬'এর সাথে তুরস্কের অভিজ্ঞতাও ভালো নয়। তুরস্কের 'এফ-১৬' বিমানগুলির সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার আপগ্রেড করার জন্যে তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের পেছনে পেছনে ঘুরছে। আর যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে নাকে দড়ি দিয়ে তার কাজগুলি করিয়ে নিচ্ছে। মার্কিন 'এফ-৩৫' স্টেলথ বিমানের প্রকল্পে যুক্ত হয়েও তুরস্ক ফেঁসে গেছে। রাশিয়া থেকে 'এস-৪০০' বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার 'অপরাধে' যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের উপর নিষেধাজ্ঞা দেয় এবং তুরস্কের পাইলটরা 'এফ-৩৫' বিমানে ট্রেনিং সম্পন্ন করার পর যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে বিমানগুলি ডেলিভারি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এমনকি আগাম দেয়া অর্থও যুক্তরাষ্ট্র ফেরত দেয়নি তুরস্ককে! দেরিতে হলেও তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের ব্ল্যাকমেইল বুঝতে পেরেছে (যদিও কিছু লোক এখনও যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়তে পারছে না); এবং একারণে তারা নিজেদের যুদ্ধ সরঞ্জাম ডেভেলপ করছে।
 
মিশরের বিমান বাহিনীর মার্কিন নির্মিত 'এফ-১৬' যুদ্ধবিমান। যুক্তরাষ্ট্র মিশরকে বিমান দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এর সাথে 'এআইএম-১২০ এমর‍্যাম' মধ্যম পাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র দেয়নি। ফ্রান্সও 'রাফাল' বিমানের সাথে মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স নিশ্চিত করেছে যে, ইস্রাইলের বিরুদ্ধে কেউ মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণস্ত্র মোতায়েন করতে পারবে না। 


তৃতীয়তঃ যেকোন ইন্ডাস্ট্রিয়াল সরঞ্জাম ডেলিভারির ক্ষেত্রে একটা লীডটাইম থাকে। অর্থাৎ প্রস্তুতকারীকে কিছুটা সময় দিতে হয় সরঞ্জাম তৈরি করে ডেলিভারি দেয়ার; বিশেষ করে সরঞ্জাম যদি এমন হয়, যা কিনা আগে থেকে তৈরি করে রেখে দেয়া হয় না। সমরাস্ত্রের ক্ষেত্রে লীডটাইম খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা বেশ দীর্ঘ। হাতে গোণা কয়েকজন এসকল সরঞ্জাম প্রস্তুত করে। একারণে অনেক সময়েই দেখা যায় যে, সমরাস্ত্রের স্পেয়ার পার্টস পেতে সময়ক্ষেপণ হয়। পেরুর ক্ষেত্রেও সম্ভবতঃ সেটা হয়েছিল। কোন কোন সময় অতি প্রয়োজন হলে প্রস্তুতকারী দেশ নিজেদের বাহিনী থেকে সমরাস্ত্র সেকেন্ড-হ্যান্ড ডেলিভারি দিয়ে থাকে। তবে সেটা শুধুমাত্র প্রস্তুতকারী রাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সাথে সমন্বিত হলেই হয়ে থাকে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্র যখন ভিয়েতনাম ছেড়ে গিয়েছিল, তখন তারা দক্ষিণ ভিয়েতনামের বিমান বাহিনীকে প্রায় ১১'শ যুদ্ধবিমান দিয়েছিল। অপরদিকে ১৯৬৫ সালে ভারতের সাথে যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এর ফলে পাকিস্তান কানাডা থেকে 'এফ-৮৬এফ স্যাবর' ফাইটার বিমান যোগাড় করে।

চতুর্থতঃ যে ব্যাপারটা পেরু হয়তো মোকাবিলা করেনি, তবে অন্য অনেক দেশকেই মোকাবিলা করতে হতে পারে। যেমন অস্ত্র ডেলিভারি করা বিমানকে আকাশসীমানা ব্যবহার করতে না দেয়া। অস্ত্র যদি আমদানি করতে হয়, তখন শক্তিশালী কোন দেশ ইচ্ছা করলে বহণকারী বিমানের চলাচলকে বিঘ্নিত করতে পারে। এখানে যুদ্ধে জড়ানো রাষ্ট্রের আকাশসীমানা কোন কোন দেশের সাথে বা তাদের সমুদ্রসীমানা রয়েছে কিনা, সেগুলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। ১৯৮০এর দশকের শেষের দিকে বাংলাদেশ চীন থেকে ২০টা 'এফ-৭এমবি' এবং ১২টা 'এ-৫' বিমান ক্রয় করে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ চীন থেকে আরও যুদ্ধবিমান ক্রয় করে। এই বিমানগুলি অনেক ক্ষেত্রেই আকাশপথে উড়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল। অন্ততঃ 'কে-৮ডব্লিউ' বিমানগুলি যে আকাশপথে মিয়ানমার হয়ে এসেছিল, তা পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। জাতীয় নিরাপত্তার কারণে এই আকাশপথের বর্ণনা এখানে না দেয়া গেলেও যে ব্যাপারটা বোঝানো সম্ভব তা হলো, যুদ্ধের সময় সমরাস্ত্র আমদানি করতে গেলে কোন একটা পথে আকাশসীমানা খোলা রাখতেই হবে। এটা সার্বভৌমত্ব রক্ষার সাথে সম্পর্কিত।

পঞ্চমতঃ সকল সমরাস্ত্র নিজেরা ডেভেলপ ও তৈরি করতে পারলে উপরের বেশিরভাগ সমস্যাই এড়ানো সম্ভব। সকল সরঞ্জাম না হলেও অন্ততঃ ক্রিটিক্যাল কম্পোনেন্টগুলি যদি নিজেরা তৈরি করা যায়, তাহলে পেরুর মতো পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব। তবে এর সাথে একটা এয়ার করিডোর খোলা রাখতেই হবে; যাতে করে বাইরে থেকে এমন কিছু সরঞ্জাম নিয়ে আসা যায়, যা কিনা নিজেদের কাছে নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের 'ইউএইচ-৬০ ব্ল্যাক হক' হেলিকপ্টার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটা বলাই যেতে পারে যে, বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা যদি ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্যে প্রস্তুত রাখা না হয়, তাহলে এই রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী রাখার কোন প্রয়োজনই নেই। আর এই সামরিক বাহিনীর জন্যে বাইরে থেকে কেনা কোন অস্ত্রের উপর যদি শর্ত থাকে যে, তা ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে না, অথবা যুদ্ধের সময়ে অস্ত্র অবরোধের মাঝে পড়তে হবে, বা স্পেয়ার পার্টস বা সফটওয়্যার আপডেট পাওয়া যাবে না, তাহলে সেই অস্ত্রের ব্যাপারে বাংলাদেশের অনীহা থাকাটাই স্বাভাবিক হওয়া উচিৎ।

 
সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে যদি একটা রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে সেই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নের মুখে পড়বে। সেই রাষ্ট্র নিঃসন্দেহে অন্য রাষ্ট্রের পক্ষে প্রক্সি যুদ্ধে নামতে বাধ্য হবে; ঠিক যেমনটা ইউক্রেনের ক্ষেত্রে হয়েছে। নিজের অর্থ খরচ করে অন্যের কাছ থেকে কেনা অস্ত্রের উপর নির্ভর করে কেউ কখনও বড় হতে পারেনি। সে সর্বদাই আরেকজনের কথায় উঠেছে বসেছে। অন্য কথায় অন্যের দাস হিসেবে কাজ করেছে। অনেকে এই দাস মনোভাবের মাঝেই গর্ব দেখে - সবচাইতে শক্তিশালী রাষ্ট্রের দাসত্ব করাও গর্বের ব্যাপার! তবে বিভিন্ন সময়ের ইতিহাস শিক্ষা দেয় যে, যুদ্ধের সময়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলি নিয়মিতই নিজেদের স্বার্থ দেখতে গিয়ে অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে জ্বলাঞ্জলি দেয়। তাই সেসকল রাষ্ট্রের উপর সামরিক সরঞ্জামের ব্যাপারে নির্ভরশীলতা তৈরি করাটা বিপদ ডেকে নিয়ে আসতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটা বলাই যেতে পারে যে, বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা যদি ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্যে প্রস্তুত রাখা না হয়, তাহলে এই রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী রাখার কোন প্রয়োজনই নেই। আর এই সামরিক বাহিনীর জন্যে বাইরে থেকে কেনা কোন অস্ত্রের উপর যদি শর্ত থাকে যে, তা ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে না, অথবা যুদ্ধের সময়ে অস্ত্র অবরোধের মাঝে পড়তে হবে, বা স্পেয়ার পার্টস বা সফটওয়্যার আপডেট পাওয়া যাবে না, তাহলে সেই অস্ত্রের ব্যাপারে বাংলাদেশের অনীহা থাকাটাই স্বাভাবিক হওয়া উচিৎ। অন্ততঃ এটা নিশ্চিত যে, বিশাল অংক খরচ করে পশ্চিমা দেশ থেকে কেনা অত্যাধুনিক সামরিক বিমান যদি মধ্যম পাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, বা এন্টি রাডার ক্ষেপণাস্ত্র, বা জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র বহণে সক্ষম না হয়, তাহলে সেগুলি শো-কেসে সাজিয়ে রাখা চকচকে খেলনা থেকে আলাদা কিছু হবে না।






সূত্রঃ




‘The Time Ecuador and Peru Fought a 34-Day War Over a Patch of Amazonian Jungle’ in Historynet, 16 June 2023 (https://www.historynet.com/cenepa-war-peru-ecuador/)

‘The Cenepa Conflict at 25: Lessons Learned' by Lt Col Oswal Sigüeñas Alvarado in Journal of the Americas, Third Edition 2021

‘Mirage vs. Sukhoi; February 10, 1995 – The Cenepa War’ in Ed Nash’s Military Matters, 20 March 2020 (https://www.youtube.com/watch?v=fKJcm7E59oU)

‘Exocet missile: how the sinking of HMS Sheffield made it famous’ in The Guardian, 15 October 2017

‘Turkey scales down $23 bln F-16 jet deal with US, minister says’ in Reuters, 27 November 2024

‘Egypt to Replace US F-16s With China’s J-10C Fighter Jets: Report’ in The Defense Post, 10 September 2024

‘Egypt has spent big on diversifying its air force, but to what end?’ in Middle East Eye, 09 September 2022

‘Egypt barred from receiving BVR missiles for F-16 and Rafale’ in Bulgarian Military, 12 September 2024 (https://bulgarianmilitary.com/2024/09/12/egypt-barred-from-receiving-bvr-missiles-for-f-16-and-rafale/)

‘Turkey’s readmission to the F-35 program must come with a cost’ by Jonathan Schanzer and Sinan Ciddi in The Hill, 26 March 2025

‘US formally removes Turkey from F-35 programme’ in TRT World (https://www.trtworld.com/turkey/us-formally-removes-turkey-from-f-35-programme-46112)

‘Canadair Sabre’ in Joe Baugher (http://joebaugher.com/usaf_fighters/p86_22.html)

Saturday, 15 March 2025

বাংলাদেশে রাজনীতির উপর আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাব

১৬ই মার্চ ২০২৫

২০২৪এর জুলাই-অগাস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনে জেনারেশন জেড বা 'জেন-জি'এর নেতৃত্ব দেয়া নিয়ে সরচাইতে বেশি আলোচনা হয়েছে। যেটা অস্বীকার করার উপায় নেই তা হলো, ২০২৪এর ০৫ই অগাস্ট শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা সেনাবাহিনীর অফিসারদের একটা বড় অংশ হলো তরুণ বা 'জেন-জি'।


২০২৪এর জুলাই-অগাস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনে ছাত্র-জনতার যে স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল, তা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে; এখনও হচ্ছে। এর মাঝে জেনারেশন জেড বা 'জেন-জি'এর নেতৃত্ব দেয়া নিয়ে সরচাইতে বেশি আলোচনা হয়েছে। মোটামুটিভাবে ১৯৯৭ সাল থেকে ২০১২ সালের মাঝে জন্মানো ব্যক্তিদেরকে এই জেনারেশনের মাঝে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে; আন্দোলনের সময় যাদের বয়স মোটামুটিভাবে ১২ থেকে ২৭ বছর ছিল। এখানে বেশিরভাগই ছিল স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এদের মাঝে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া এলিট শ্রেণীর সন্তানেরাও রয়েছে। কারখানা শ্রমিক, কৃষক এবং অন্যান্য পেশার জনগণের সরাসরি সমর্থন থাকলেও তারা এখানে নেতৃত্ব দেয়নি। যদিও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির সদস্যদের মাঝে এই গ্রুপগুলি ছিল। এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাথে বাংলাদেশের গত দুই দশকের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন বেশ গভীর একটা সম্পর্ক রয়েছে। ক্ষমতাচ্যুতদের ক্ষমতা ধরে রাখতে না পারা এবং বিরোধীদের এই ব্যাপারটাকে ব্যবহার করতে পারাটা শেষ ফলাফলের পিছনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। যেটা অস্বীকার করার উপায় নেই তা হলো, ২০২৪এর ০৫ই অগাস্ট শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা সেনাবাহিনীর অফিসারদের একটা বড় অংশ হলো তরুণ বা 'জেন-জি'।

প্রযুক্তি ও গ্লোবালাইজেশনের প্রভাব

গত দুই দশকে বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এর মাঝে সম্ভবতঃ সবচাইতে বড় প্রভাব ফেলেছে প্রযুক্তির ব্যবহার। এটা অবশ্য শধু বাংলাদেশ নয়; সারা বিশ্বের ক্ষেত্রেই ঘটেছে। ইতিহাসে কখনো একজন ব্যক্তি এত সহজে বাকি দুনিয়ার সাথে যুক্ত হতে পারেনি। মাত্র তিন দশক আগেও যোগাযোগের মাধ্যম ছিল ফিক্সড লাইনের টেলিফোন। এরপর একসময় এর সাথে যুক্ত হয় অতি উচ্চ খরচের মোবাইল ফোন। ১৯৯০এর দশকে এবং ২০০০এর পরেও ইন্টারনেটে ঢোকার পদ্ধতি ছিল ডায়াল-আপ কানেকশন। খুবই মন্থর গতি এবং অতিরিক্ত খরচের এই মাধ্যম ব্যবহার করে খুব স্বল্প সংখ্যক মানুষই ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারতো। আর বলাই বাহুল্য যে, তখন ইন্টারনেট ছিল কম্পিউটারের মাধ্যমে। খুব স্বল্প সংখ্যক মানুষের কাছেই ছিল কম্পিউটার। বাকিরা সাইবার ক্যাফেতে গিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করতো। এই পুরো ব্যাপারটার মাঝে আমূল পরিবর্তন আসে ২০১২-১৩ সালের দিকে মোবাইল ফোনে থ্রি-জি সেবা চালুর পর থেকে। ফোর-জি সেবা শুরু হয় ২০১৮ সালে। ইন্টারনেটের খরচ নিয়ে মানুষের অভিযোগ থাকলেও মোবাইল ফোনে হাই-স্পীড ইন্টারনেট আসার সাথেসাথে স্মার্ট মোবাইল হ্যান্ডসেটও মানুষের নাগালের মাঝে চলে আসে। বিশেষ করে ২০১৭এর পর থেকে মোবাইল হ্যান্ডসেট যখন বাংলাদেশেই সংযোজিত হওয়া শুরু করলো, তখন হ্যান্ডসেটের মূল্য আরও কমে যায়। চীন থেকে আমদানি করা হ্যান্ডসেটগুলিও মানুষের পক্ষে কেনা সহজতর হয়ে যায়। কোটি কোটি মানুষ অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মাঝে হঠাৎ করেই ইন্টারনেট সার্ভিসের সাথে যুক্ত হয়ে যায়। এটা ছিল একটা বিশাল বিবর্তন।

এক যুগ আগে যখন থ্রি-জি সেবা মোবাইল অপারেটররা শুরু করেছিল, তখন এই প্রযুক্তি বাংলাদেশে চালু করার পিছনে বেশি আগ্রহী ছিল চীনা হার্ডওয়্যার কোম্পানিগুলি - বিশেষ করে হুয়াই। চীনারা তাদের হার্ডওয়্যার মার্কেটিংএই বেশি আগ্রহী ছিল বলে তারাই থ্রি-জির পেছনে বেশি প্রচেষ্টা ব্যয় করেছিল। বাংলাদেশের মোবাইল ফোন অপারেটররা প্রথমদিকে দোটানার মাঝে ছিল যে, এত বেশি খরচের একটা নেটওয়ার্কের মাঝে বিনিয়োগ করে ফেলার পর জনগণ কি এই প্রযুক্তির জন্যে খরচ করতে ইচ্ছুক কিনা। এই ব্যাপারটা পরিবর্তিত হতে থাকে সোশাল মিডিয়ার উত্থানের পর থেকে। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সোশাল মিডিয়ার জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকলেও সেটা স্বল্প সংখ্যক কিছু উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তির মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। গত এক দশকের মাঝে এই ব্যাপারটা পুরোপুরিভাবে পরিবর্তিত হয়ে যায় ফেইসবুক, ইউটিউব এবং টিকটকএর উত্থানের মাধ্যমে। এই সার্ভিসগুলি মানুষকে ইন্টারনেটের পেছনে খরচ করার একটা কারণ দেয়। একইসাথে সারা দেশে ছড়িয়ে যেতে থাকে ওয়াইফাই ইন্টারনেট সংযোগ; যার মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহারের খরচ আরও বেশি মানুষের নাগালের মাঝে চলে আসে। ইন্টারনেট এবং সোশাল মিডিয়া শুধুমাত্র উচ্চ শিক্ষিতদের জন্যে আর থাকলো না। গত দুই দশকের মাঝে যে মানুষগুলি প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে, তারা প্রায় সকলেই মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট এবং সোশাল মিডিয়ার ব্যবহারকারী। অর্থাৎ যাদের বয়স এখন মোটামুটিভাবে ১২ থেকে ৪০ বছর। এই গ্রুপটা ২০২৪এর জুলাই-অগাস্ট আন্দোলনে সিংহভাগ ভূমিকা রেখেছে। এর মাঝে কেউ হয়তো বেশি জড়িত ছিল; কেউ হয়তো কম।
 
শিক্ষিতদের জন্যে অনেক নতুন নতুন কাজের জন্ম হয়েছে। উবার, পাঠাও মোটরসাইকেল চালক এরকম একটা কাজ। ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলার বা রিক্সা চালানোতে কিছু হলেও শিক্ষা প্রয়োজন। জনগণের একটা বিশাল সংখ্যা ইন্টারনেটে যুক্ত হবার জন্যে যথেষ্ট আয় যোগাড় করেছে। অথবা যথেষ্ট আয় না থাকলেও সামাজিক চাপের মাঝে পড়ে স্মার্টফোন যোগাড় করেছে।


অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান

এখানে অর্থনীতির একটা ব্যাপার রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দুই দশকে ব্যাপক পরিবর্তনের মাঝ দিয়ে গিয়েছে। শিক্ষিতদের জন্যে অনেক নতুন নতুন কাজের জন্ম হয়েছে। উবার, পাঠাও মোটরসাইকেল চালক এরকম একটা কাজ। ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলার বা রিক্সা চালানোতে কিছু হলেও শিক্ষা প্রয়োজন। প্যাডেল রিক্সা চালাতে শিক্ষিত যুবকরা কখনও আসেনি। কম্পিউটার পরিচালনা, মোবাইল ফোনের কারিগর, ইলেকট্রনিক্স দ্রব্যের কারিগর, বিভিন্ন মেশিনের অপারেটর, ইত্যাদি পেশা শিক্ষিত সমাজ থেকে অনেককেই টেনে নিয়েছে। করোনা লকডাউনের পর অনেকেই তাদের সর্বস্ব হারিয়ে নতুন কাজ খুঁজেছে। অনলাইন সার্ভিসের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে করোনার কারণে। সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করে অনেকেই নতুন ব্যবসা খুঁজে নেবার চেষ্টা করেছে। যারা অনলাইনে খুব বেশি সময় ব্যয় করতো না, তারাও অনেকে করোনার পর অনলাইন এডিকশনের মাঝে পড়ে গেছে। এদের মাঝে ৫০-৬০ বছরের অধিক বয়সের মানুষও রয়েছে। কেউ কেউ আবার সোশাল মিডিয়া থেকেই আয়ের উৎস খুঁজে নিয়েছে। জনগণের একটা বিশাল সংখ্যা ইন্টারনেটে যুক্ত হবার জন্যে যথেষ্ট আয় যোগাড় করেছে। অথবা যথেষ্ট আয় না থাকলেও সামাজিক চাপের মাঝে পড়ে স্মার্টফোন যোগাড় করেছে। পঞ্চগড়ের কিছু পাথর শ্রমিক মোটরসাইকেলে চেপে কাজে যায় – এই ব্যাপারটা অনেকের কাছেই অবাক করার মতো হতে পারে। তবে এই ব্যাপারটা বাংলাদেশের সর্বত্র নয়।

সিলেট ও সুনামগঞ্জের সীমানার কাছের অঞ্চলগুলিতে পাথর, বালু ও কয়লার ব্যবসার সাথে যুক্ত হয়েছে লাখো মানুষ। এদের বেশিরভাগেরই আয় আহামরি কিছু নয়। অথবা ঢাকা এবং এর আশেপাশের এলাকায় গার্মেন্টস শিল্পের উপর ভিত্তি করে যে কোটিখানেক মানুষ কর্মসংস্থান পেয়েছে, তাদেরও আয়ের তুলনায় বাড়িভাড়া বেশি। রিয়েল এস্টেট শিল্পে জড়িত লাখো মানুষ এবং ঢাকা, বগুড়া, যশোর, সৈয়দপুরের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের সাথে যুক্ত লাখো মানুষও কোনমতে তাদের জীবন চালিয়ে নিচ্ছে। কিছু অঞ্চলে কর্মসংস্থানের প্রসারের কারণে মানুষের আয় বেশি; অন্যক্ষেত্রে কম। রাষ্ট্র তাদের জন্যে তেমন কিছু না করলেও জনগণ তাদের রিযিকের ব্যবস্থা করে নেবার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। এদের মাঝে বেশিরভাগেরই স্থায়ী কর্মসংস্থান নেই। তারা বছরের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাজ করেছে; একেক সিজনে একেক কাজ। কৃষির সাথেই বেশিরভাগ মানুষ জড়িত। তাই কখনও তাদের হাতে টাকা থাকে; কখনও কিছুই থাকে না। হাওড় অঞ্চল প্রাকৃতিক কারণেই একফসলি এলাকা। সেখানে এখনও সিজন-ভেদে কর্মসংস্থানের সমস্যা রয়ে গেছে। পুরো বরিশাল অঞ্চলে তেমন কোন ইন্ডাস্ট্রি নেই। গ্রেটার সিলেটেও মোটামুটিভাবে একই। তবে দারিদ্রপীড়িত এবং বঞ্চিত এই মানবগোষ্ঠী ২০২৪এর জুলাই-অগাস্টে মূল শক্তি যোগায়নি। কৃষক এবং কারখানার শ্রমিকরা আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল না; যদিও রাজনৈতিক দলগুলির আন্দোলনের অংশ হিসেবে এদের মাঝ থেকেই অনেকে রাস্তায় ছিল। অনেকে হতাহতও হয়েছে।
 
ফেনী শহর। গত দুই দশকে কয়েক কোটি মানুষ বিদেশে চাকুরির মাধ্যমে তাদের পরিবারকে অর্থায়ন করেছে; যার মাধ্যমে তারা হয় তাদের গ্রামের বাড়িতে পাকা দালান নির্মাণ করেছে; অথবা গ্রামাঞ্চল থেকে মাইগ্রেট করে কাছাকাছি শহরে চলে এসেছে। এই শহরগুলিতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পাঠানো টাকার উপর ভিত্তি করে হাউজিং প্রকল্প হয়েছে এবং ১০-১২ তলা এপার্টমেন্ট বিল্ডিং তৈরি হয়েছে। শহরগুলিতে মাইগ্রেট করা এই পরিবারগুলিকে সার্ভিস দেয়ার জন্যে তৈরি হয়েছে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, ক্যাডেট স্কুল ও কলেজ, ইসলামিক স্কুল ও মাদ্রাসা। বহু হাসপাতাল এবং ক্লিনিক তৈরি হয়েছে এই শহরগুলিতে।


বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রভাব

মানুষের আয়ের ক্ষেত্রে একটা বড় পরিবর্তন সাধিত হয়েছে বিদেশে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়াতে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে। বিদেশ যাবার জন্যে অনেকেই নিজেদের স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়েছে। কিন্তু বিদেশ থেকে পাঠানো অর্থের উপর ভিত্তি করে তারা অনেক নতুন সার্ভিসের ক্রেতা হয়েছে। গত দুই দশকে কয়েক কোটি মানুষ বিদেশে চাকুরির মাধ্যমে তাদের পরিবারকে অর্থায়ন করেছে; যার মাধ্যমে তারা হয় তাদের গ্রামের বাড়িতে পাকা দালান নির্মাণ করেছে; অথবা গ্রামাঞ্চল থেকে মাইগ্রেট করে কাছাকাছি শহরে চলে এসেছে। এই শহরগুলিতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পাঠানো টাকার উপর ভিত্তি করে হাউজিং প্রকল্প হয়েছে এবং ১০-১২ তলা এপার্টমেন্ট বিল্ডিং তৈরি হয়েছে। শহরগুলিতে মাইগ্রেট করা এই পরিবারগুলিকে সার্ভিস দেয়ার জন্যে তৈরি হয়েছে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, ক্যাডেট স্কুল ও কলেজ, ইসলামিক স্কুল ও মাদ্রাসা। বহু হাসপাতাল এবং ক্লিনিক তৈরি হয়েছে এই শহরগুলিতে; সবই বেসরকারি পর্যায়ে। বিদেশে চাকুরির এই ব্যাপারটা মূলতঃ যমুনা নদীর পূর্ব পাড়ের কাহিনী। যমুনার পশ্চিমে বেশিরভাগ মানুষই বিদেশে যায়নি।

ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালি, নরসিংদী, ইত্যাদি অনেক অঞ্চলের উদাহরণ এখানে টানা যেতে পারে। গ্রেটার সিলেটের ব্যাপারটা আলাদা; কারণ সেখানকার মানুষ মূলতঃ গিয়েছে ব্রিটেনে। এবং তারা অনেকেই আর দেশে ফেরত আসেনি; সেখানকার সিটিজেনশিপের দিকে অগ্রসর হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যারা গিয়েছে, তারা কেউই সেখানকার সিটিজেনশিপ পায়নি। তাই কোন না কোন একসময় ফেরত আসা নিশ্চিত। যারা দেশে ফেরত এসেছে, তাদের অনেকেই বিভিন্ন কাজে নিজেদেরকে নিয়োজিত করেছে। কেউ কেউ নতুন প্রযুক্তি, জ্ঞান বা কর্মপদ্ধতি এনে এই দেশে ব্যবসা শুরু করেছে। একসময় বিদেশে যাওয়া এই পরিবারগুলির বেশিরভাগই ছিল কৃষিকাজ-ভিত্তিক। তারা আজকে অনেকেই কৃষিকাজ থেকে সরে এসেছে। অনেকেরই আবাদি জমি অনাবাদি হয়ে পড়ে রয়েছে। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে অনাবাদি জমির মাঝখানে টাইলস-খচিত মাল্টি-স্টোরি দালান বেশ চোখে পড়বে।
 
যমুনার পূর্বাঞ্চল এবং পশ্চিমাঞ্চলের মাঝে মেয়েদের হিযাব পড়ার হারে পার্থক্য চোখে পড়ার মতো। পূর্বাঞ্চলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুধু অর্থই আসেনি; হিযাব পড়ার ধারণাটাও প্রভাবিত হয়েছে। যারা বিদেশে কাজ করেছে, তাদের অনেকেই শিক্ষার দিক থেকে তেমন এগুতে পারেনি। তবে তাদের অর্থায়নে তাদের সন্তানরা কিন্তু দামি স্কুলে পড়েছে। অনেকেই পড়েছে ইসলামিক স্কুল বা মাদ্রাসায়। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, ইসলামিক স্কুল, ক্যাডেট কলেজ ও স্কুল এবং মাদ্রাসার চাহিদা তৈরি হয়েছে মূলতঃ মধ্যপ্রাচ্য থেকে পাঠানো রেমিট্যান্সের টাকার উপর ভর করেই। 


পূর্বাঞ্চল-পশ্চিমাঞ্চলের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন ও পার্থক্য

তথাপি সারা দেশের খাদ্যের বড় অংশের যোগান দেয়া দেশের পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের চেহারা যথেষ্টই আলাদা। এখানকার বাড়িভাড়ার সাথে যমুনার পূর্বাঞ্চলের বাড়িভাড়ার তুলনা করলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। যমুনার পূর্বাঞ্চলে বিদেশ থেকে পাঠানো টাকার উপর ভিত্তি করে তৈরি করা এপার্টমেন্টগুলি অনেক বেশি ভাড়া হাঁকাচ্ছে। অপরদিকে যমুনার পশ্চিমাঞ্চলের এপার্টমেন্টগুলি তৈরি করা হচ্ছে মাইগ্রেট করা চাকুরিজীবিদের জন্যে; যারা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার কাজ নিয়ে সেই অঞ্চলে গিয়েছে। পূর্বাঞ্চলের গ্রামগুলির বেশিরভাগ বাড়িই পাকা হয়ে গিয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলে এখনও কাঁচা বাড়ি বেশ ভালোই চোখে পড়বে। বিশেষ করে সৈয়দপুর থেকে নিলফামারী হয়ে উত্তর দিকে চলতে শুরু করলেই প্রায় সকল বাড়িই কাঁচা দেখা যাবে। রংপুর, সৈয়দপুর, বগুড়া, নওগাঁ, নাটোর, ঈশ্বরদী, পাবনা, রাজশাহীর মত শহরগুলি দেখে অবশ্য গ্রামাঞ্চলের ধারণা পাওয়া যাবে না। গ্রামাঞ্চলগুলিতে দরিদ্র পরিবারগুলির মাঝে এনজিওর প্রভাব অনেক বেশি দেখা যাবে। পশ্চিমা অর্থায়নে চলা এসকল কর্মকান্ডে নারীস্বাধীনতার বিষয়গুলিকে প্রাধান্য দেয়া হয় বিধায় এই অঞ্চলে মেয়েদের সাইকেল ও মোটরসাইকেল চালানো চোখে পড়বে।

তবে যমুনার পূর্বাঞ্চলে মধ্যপ্রাচ্যের একটা প্রভাব দেখা যাবে জনগণের মাঝে। দারিদ্র্য কম হবার কারণে এই পরিবারগুলির উপর এনজিওর প্রভাব অন্ততঃ পশ্চিমাঞ্চলের মতো নয়। যমুনার পূর্বাঞ্চল এবং পশ্চিমাঞ্চলের মাঝে মেয়েদের হিযাব পড়ার হারে পার্থক্য চোখে পড়ার মতো। পূর্বাঞ্চলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুধু অর্থই আসেনি; হিযাব পড়ার ধারণাটাও প্রভাবিত হয়েছে। যারা বিদেশে কাজ করেছে, তাদের অনেকেই শিক্ষার দিক থেকে তেমন এগুতে পারেনি। তবে তাদের অর্থায়নে তাদের সন্তানরা কিন্তু দামি স্কুলে পড়েছে। অনেকেই পড়েছে ইসলামিক স্কুল বা মাদ্রাসায়। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, ইসলামিক স্কুল, ক্যাডেট কলেজ ও স্কুল এবং মাদ্রাসার চাহিদা তৈরি হয়েছে মূলতঃ মধ্যপ্রাচ্য থেকে পাঠানো রেমিট্যান্সের টাকার উপর ভর করেই। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মাঝে ইসলামের প্রতি আকর্ষণ তাদের আগের জেনারেশনের চাইতে অনেকটাই বেশি। একারণে এদের মাঝে আলেম সমাজের প্রভাবটাও অপেক্ষাকৃত বেশি। গত কয়েক বছরের মাঝে অনলাইনে ইসলামিক বক্তাদের সংখ্যাও ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। বেশিরভাগ আলেমরাই এখন একটা ইউটিউব চ্যানেল রাখছেন। বাংলাদেশ থেকে অনেক আলেমদেরকে বিভিন্ন দেশেও পাঠানো হয়েছে। যেমন, কয়েক বছর আগে শ্রীলংকাতে অমুসলিমদের উপর হামলার পর সেই দেশ থেকে অনেক বাংলাদেশি আলেমদেরকে বের করে দেয়া হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে দুই দেশের কথাবার্তার মাঝে তা মিটমাট করা হয়।
 
২০০১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চলা তথাকথিত 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে' প্রকৃতপক্ষে ইসলামকেই টার্গেট করা হয়েছে - এই ব্যাপারটা এখন সকলেই অনুধাবন করেন। এই অনুধাবন এসেছে ইন্টারনেট ও সোশাল মিডিয়াতে বিভিন্ন ব্যক্তি এবং সংগঠনের কর্মকান্ডের মাধ্যমে। ইতোমধ্যেই যখন এদেশের জনগণের একটা বড় অংশ ইসলামের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠছে, তখন এই ব্যক্তি এবং সংগঠনগুলি বিভিন্ন ন্যারেটিভের মাধ্যমে তাদের ফলোয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে।


সমাজে ইসলামিক কনসেপ্টের পরিবর্তন

গত দুই দশকে বাংলাদেশের মানুষের মাঝে ইসলামের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি ছিল দেখার মতো। ১৯৮০-৯০এর দশকেও মানুষ "শষ্যের চেয়ে টুপি বেশি; ধর্মের আগাছা বেশি"-টাইপের লেখা পাঠ্যবইতে পড়েছে এবং মুখস্ত করে পরীক্ষায় লিখে নম্বর পেয়েছে। এই সময়ে পড়াশোনা করা দেশের উচ্চশিক্ষিত বেশিরভাগ মানুষই এধরণের ইসলাম-বিদ্বেষী কনসেপ্টগুলি পেয়েছে। তবে ২০০০ সালের পর থেকে দেশে যেসকল নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে, সেগুলির বেশিরভাগই ছিল টেকনিক্যাল জ্ঞান-ভিত্তিক; যেমন ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিক্যাল এবং আইটি সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে। এই বিষয়গুলির মাঝে সামাজিক কনসেপ্টগুলি ততটা শক্তভাবে যায়নি; যতটা গিয়েছিল ১৯৮০-৯০এর দশকে। একারণে সেই সময়ে শিক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের চিন্তার সাথে সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষাপ্রাপ্তদের চিন্তার একটা বড় পার্থক্য দৃশ্যমান। তথাপি শিক্ষার বাইরেও যে ব্যাপারগুলি সমাজের চিন্তাকে প্রভাবিত করেছে, তার মাঝে ছিল গল্প-সাহিত্যের বই, টেলিভিশন মিডিয়ায় নাটক-বিজ্ঞাপণ এবং ইন্টারনেট। এখানে উল্লেখযোগ্য একটা পরিবর্তন দেখা যায় জনগণের বই পড়ার হার কমে যাওয়া এবং টেলিভিশনের জনপ্রিয়তা কমে যাবার মাঝে। মানুষের এই সময়টাকে প্রতিস্থাপিত করেছে ইন্টারনেট এবং সোশাল মিডিয়া। এতকাল মানুষ কি কি কনসেপ্ট পাবে, সেটা নির্ধারণ করতো রাষ্ট্র। রাষ্ট্রই ঠিক করতো পাঠ্যবইতে কি কি কনসেপ্ট দেয়া হবে, কি ধরণের গল্পের বই বাজারে পাওয়া যাবে এবং টেলিভিশনে কি কি নাটক-সিনেমা-বিজ্ঞাপণ দেখানো হবে। এখনও সেটা চলে আসছে। এখনও দেশের সাহিত্য এবং সোশাল সাইন্সের বেশিরভাগ শিক্ষকই ইসলাম-বিদ্বেষী কনসেপ্ট ধারণ করে থাকেন। কিন্তু টেকনিক্যাল বিষয়গুলিতে পড়াশোনা করা ছাত্রদের উপর এই শিক্ষকদের প্রভাব ততটা নয়। আর অনেকেই ইন্টারনেটের প্রভাবে রাষ্ট্র ইসলাম সম্পর্কে যেসকল ধারণা দিয়েছে, তার বাইরেও ধারণা পেয়েছে। একারণে গত দুই দশকে শিক্ষা নেয়া বেশিরভাগ জনগণের মাঝে ইসলামের ব্যাপারে ধারণা ১৯৮০-৯০এর মাঝে পড়াশোনা করা ব্যক্তিদের চাইতে অনেকটাই ভিন্ন। ইসলাম বিদ্বেষী-কনসেপ্ট শক্তভাবে না পাবার কারণেই তারা ইসলামের ব্যাপারে অনেক আলোচনাই শুনতে ইচ্ছুক; যে ব্যাপারটা ১৯৮০-৯০এর দশকে একেবারেই দেখা যায়নি। এমনি ২০০০ থেকে ২০১০এর মাঝেও তেমনটা ছিল না।

মোটামুটিভাবে ২০১০এর পর থেকে ইসলামের ব্যাপারে আলোচনা বেশ অনেকটাই পরিবর্তিত হয়ে গেছে। এখানে ইন্টারনেট ও সোশাল মিডিয়ার প্রভাব অনস্বীকার্য। তবে এই মিডিয়াগুলিতে কি প্রকারের কনটেন্ট পাওয়া যাচ্ছে, সেটাও চিন্তা করার মতো। কারণ কনটেন্টগুলি তো কোন যন্ত্র তৈরি করেনি; মানুষই তৈরি করেছে। ২০০১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চলা তথাকথিত 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে' প্রকৃতপক্ষে ইসলামকেই টার্গেট করা হয়েছে - এই ব্যাপারটা এখন সকলেই অনুধাবন করেন। এই অনুধাবন এসেছে ইন্টারনেট ও সোশাল মিডিয়াতে বিভিন্ন ব্যক্তি এবং সংগঠনের কর্মকান্ডের মাধ্যমে। ইতোমধ্যেই যখন এদেশের জনগণের একটা বড় অংশ ইসলামের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠছে, তখন এই ব্যক্তি এবং সংগঠনগুলি বিভিন্ন ন্যারেটিভের মাধ্যমে তাদের ফলোয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে। তবে এখানে কিছু সংগঠনের প্রভাব ছিল বাকিদের চাইতে অনেক বেশি। এদের মাঝে হিযবুত তাহরীর বা এইচটি এবং বিভিন্ন সালাফিস্ট ও জিহাদি গ্রুপগুলি রয়েছে। বাকিরা এই গ্রুপগুলির কর্মকান্ডের 'রিয়্যাকশন' হিসেবে নিজেদের ন্যারেটিভকে সাজাবার চেষ্টা করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের মাধ্যমে এই দেশে ইসলামের প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি পেয়েছে ঠিকই; কিন্তু কনসেপ্টের ব্যাপারে এই গ্রুপগুলি অগ্রগামী ভূমিকা নিয়েছে। এই গ্রুপগুলির প্রভাবে ইসলামের ভিন্ন ন্যারেটিভের আবির্ভাব ঘটেছে সমাজে। যেমন, একটা সময়ে সমাজ-স্বীকৃত আলেমরা যা বলতেন, সেটাই সকলে মেনে নিতো। এখন প্রশ্ন করার একটা সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে এইচটি-র কার্যকলাপ শুরুর পর থেকে জনগণের মাঝে ইসলামের ব্যাপারে প্রশ্ন বেড়ে গেছে। আগে একজন আলেম কথা বললে, কেউ রেফারেন্স জিজ্ঞেস করতো না; এখন প্রশ্ন করে যে, এর পিছনে আয়াত এবং হাদিস রয়েছে কিনা; অথবা এটা কোন একজন আলেমের নিজস্ব মতামত কিনা। একসময় পাঠ্য বইতেও কিছু জিনিস ঢোকানো হয়েছিল হাদিসের নাম করে। সামাজিক চাপের মুখে পাঠ্যবইতে পরিবর্তন এনে সেগুলির পাশ থেকে হাদিস শব্দটা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। একসময় কোন আলেমই সমাজে শরীয়াহ আইন বাস্তবায়নের কথা বলতো না। কিন্তু এখন জনগণের চাপে আলেমরা অনেকেই শরীয়াহ আইনের পক্ষে কথা বলতে বাধ্য হচ্ছে। আবার আলেমরা একসময় কেউই খিলাফতের কথা বলতো না। কিন্তু এখন অনেকেই খিলাফতের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। এর পেছনে অবশ্য বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের উপর অত্যাচার যথেষ্টই দায়ী। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিশ্বব্যাপী তথাকথিত 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে'র মাঝে মুসলিমরা যতই নির্যাতিত হয়েছে, মুসলিমদের ঢাল হিসেবে খিলাফতের দাবি ততটাই প্রকট আকার ধারণ করেছে। হাসিনা সরকার খিলাফতের এই দাবিকে গলা টিপে হত্যা করতে গিয়ে সফল তো হয়ই নাই, বরং এই দাবিকে আরও শক্তিশালী করেছে এবং এই দাবি বাস্তবায়নের একটা কারণ হিসেবে নিজেদের জুলুমকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।

বিগত সরকারের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টেলিজেন্সের সহায়তায় এই দেশে একদিকে যেমন বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তৈরি করা হয়েছে, তেমনি মসজিদ-মাদ্রাসায় কি ধরণের কথা বলা হবে, তার উপরে দেয়া হয়েছে নির্দেশিকা। একইসাথে আলেমদের উপর চলেছে ব্যাপক দমন-পীড়ন। ইসলামের কথা বলা হয়ে গিয়েছিল অপরাধ; এমনকি টুপি-দাড়িওয়ালা মানুষই টার্গেটে পরিণত হয়েছিল। মার্কিন ইন্টেলিজেন্সের সহায়তায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার মুসলিমদের উপর এতটাই দমন-পীড়ন চালিয়েছিল যে, একসময় এই সরকার কোন ভাবেই প্রমাণ করতে পারছিলো না যে, তারা ইসলাম-বিদ্বেষী নয়। পশ্চিমা দেশসহ বাংলাদেশে রাসূল (সাঃ) এবং কুরআন অবমাননার প্রতিবাদে মুসলিমরা রাস্তায় নেমে এসেছিল। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইস্রাইলি গণহত্যার প্রতিবাদেও মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। অপরদিকে হাসিনা সরকার বাংলাদেশের পাসপোর্ট থেকে ইস্রাইলে যাবার নিষেধাজ্ঞা সরিয়ে ফেলে। আর অনেক ক্ষেত্রেই ইস্রাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে বাধা দেয়। হাসিনা সরকার জাতিসংঘের প্রেসক্রিপশন অনুসারে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে রংধনু নামে এলজিবিটি বা সমকামীদের প্রমোট করেছে। বাইডেন প্রশাসনের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র এলজিবিটি প্রমোট করার জন্যে বাংলাদেশে অর্থও ঢেলেছে। হাসিনা সরকার এগুলি করতে দিয়ে বাংলাদেশের মুসলিমদের চরম আঘাত করেছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের একটা বড় কারণ ছিল নিজেদের ইসলাম-বিদ্বেষী তকমাটাকে মুছে ফেলতে না পারা। আওয়ামী বিরোধীরা বিভিন্ন সময়ে, বিশেষ করে ২০২৪এর জুলাই-অগাস্টে এই ব্যাপারটাকেই কাজে লাগিয়েছে এবং ব্যাপকভাবে সফলও হয়েছে। অন্ততঃ ইসলামপন্থীদেরকে রাস্তায় নামাতে না পারলে এই আন্দোলন সফল করাটা কঠিন ছিলো।
 
বাংলাদেশের মানুষ সর্বদাই ভারত-বিদ্বেষী। ভারতকে বাংলাদেশের জনগণ দেখে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ একটা রাষ্ট্র হিসেবে; যেখানে নিয়মিতই মুসলিমদের উপর দমন-পীড়ন হয়। হিন্দুত্ববাদী সরকার ভারতের ক্ষমতায় আসীন হবার পর থেকে এই ন্যারেটিভের পালে আরও শক্তিশালী হাওয়া লেগেছে। এমনকি ২০২৪এর জুলাই-অগাস্টে এই ন্যারেটিভ আওয়ামীদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে। দিল্লীর চিন্তাবিদেরা বুঝতে পারছে না যে, ভারত যখনই ঢাকায় আসীন নেতৃত্বের সাথে সখ্যতা তৈরি করবে, তখনই সেই নেতৃত্ব জনগণের আক্বীদার শত্রুতে পরিণত হবে। শুধুমাত্র সেকুলার চিন্তার মাঝে থেকে কারুর পক্ষে এই বাস্তবতা অনুধাবন সম্ভব নয়।


বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এবং জনগণের মতামত

২০১৪ সালে ভারতে হিন্দুত্ববাদী সরকার ক্ষমতা নেবার পর থেকে বাংলাদেশে সামাজিকভাবে ইসলামের প্রভাব আরও বাড়তে থাকে। ভারতে মুসলিমদের উপর অত্যাচার ও দমন-পীড়নের প্রতিবাদে বাংলাদেশে নিয়মিতভাবে প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে। সরকারের এক্ষেত্রে কিছু বলার ছিল না। অনেক ক্ষেত্রেই সরকার নীরব ভূমিকা পালন করেছে। কারণ ভারতের আসামে এনআরসি নিয়ে ঝামেলা সৃষ্টি করে যখন সেখানকার মুসলিমদেরকে বাংলাদেশে ঢোকানোর চেষ্টা করা হচ্ছিলো, তখন বাংলাদেশ সরকার হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে সমাবেশগুলিকে একটা রক্ষাকবচ হিসেবেই দেখেছে। এছাড়াও ২০২০ সালে করোনা ইমার্জেন্সির মাঝে চীনের সাথে ভারতের সীমান্ত উত্তেজনার সময় বাংলাদেশের নিরপেক্ষ নীতি ভারতের পছন্দ হয়নি। বাংলাদেশের সাথে চীনের বাণিজ্য ও সামরিক সম্পর্ক বৃদ্ধিকেও ভারত সন্দেহের চোখে দেখেছে। তবে যখনই বাংলাদেশের জনগণ হাসিনা সরকারের সাথে ভারতের সখ্যতাকে টার্গেট করেছে, তখনই দমন-পীড়নের নীতি বাস্তবায়িত হয়েছে। বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদের হত্যার ঘটনা এখানে উল্লেখযোগ্য। আওয়ামী লীগ সরকার ভারত-তোষণ নীতিকেই ভারতের বিরুদ্ধে প্রধানতম ডিটারেন্ট হিসেবে দেখেছে। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর ভারতের সাথে নিয়মিতভাবে যৌথ মহড়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, এর আগে যেহেতু ভারতে কোন হিন্দুত্ববাদী সরকার ক্ষমতাসীন হয়নি, তাই ভারতের সাথে আওয়ামী লীগের সখ্যতাকে বাংলাদেশের বেশিরভাগ জনগণ খারাপ চোখে দেখেছে। নিশ্চিতভাবেই গত দুই দশকের ডেমোগ্রাফিক পরিবর্তন আওয়ামী লীগ ধরতে পারেনি। ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ককে জনগণ শুধুমাত্র রাজনীতি বা স্টেটক্রাফট হিসেবে দেখেনি; দেখেছে নিজেদের বিশ্বাসের প্রতি অপমান হিসেবে। অর্থাৎ কখন যে রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং ইসলাম একত্রিত হয়ে গিয়েছে, তা কেউ খেয়ালই করেনি!

বাংলাদেশের মানুষ সর্বদাই ভারত-বিদ্বেষী। এর মূল কারণ শুধুমাত্র এ-ই নয় যে, ভারত একটা বিশাল রাষ্ট্র, যা বাংলাদেশকে ঘিরে রয়েছে। বরং ভারতকে বাংলাদেশের জনগণ দেখে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ একটা রাষ্ট্র হিসেবে; যেখানে নিয়মিতই মুসলিমদের উপর দমন-পীড়ন হয়। ভারতের কোন সরকারই এই ন্যারেটিভ পরিবর্তন করতে পারেনি। আর হিন্দুত্ববাদী সরকার ভারতের ক্ষমতায় আসীন হবার পর থেকে এই ন্যারেটিভের পালে আরও শক্তিশালী হাওয়া লেগেছে। এমনকি ২০২৪এর জুলাই-অগাস্টে এই ন্যারেটিভ আওয়ামীদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে। আওয়ামী সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে ঠিকই; কিন্তু ভারত চাইছে বাংলাদেশ সরকারের উপর তার প্রভাব ধরে রাখতে। দিল্লীর চিন্তাবিদেরা বুঝতে পারছে না যে, ভারত যখনই ঢাকায় আসীন নেতৃত্বের সাথে সখ্যতা তৈরি করবে, তখনই সেই নেতৃত্ব জনগণের আক্বীদার শত্রুতে পরিণত হবে। শুধুমাত্র সেকুলার চিন্তার মাঝে থেকে কারুর পক্ষে এই বাস্তবতা অনুধাবন সম্ভব নয়।
 
যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে' হাসিনা সরকারের একাত্মতা বাংলাদেশের মানুষের মাঝে ইসলামের প্রতি ভালোবাসাকে থামাতে তো পারেইনি; উল্টো, ওয়াশিংটনের প্রেসক্রিপশনে ইসলামপন্থীদের উপর দমন-পীড়ন করে, এলজিবিটি প্রমোট করে, এবং হিন্দুত্ববাদী ভারত সরকারের সাথে সখ্যতা করে নিজেদের উপরে ইসলাম-বিদ্বেষী তকমা নিয়ে এসেছিল আওয়ামী সরকার। এছাড়াও ফিলিস্তিন এবং ভারতে মুসলিমদের উপর নির্যাতন এখন বাংলাদেশের মুসলিমদের ইস্যুও বটে। অর্থাৎ পররাষ্ট্রনীতি এবং ইসলাম এখন আলাদা কিছু নয়। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের নেতৃত্বের সম্পর্ক কিরূপ হবে, তা এই দেশের মানুষের আক্বীদার বিরুদ্ধে গেলে নিঃসন্দেহে বড় রকমের সমস্যা তৈরি করছে।


গত দুই দশকে ইন্টারনেট এবং সোশাল মিডিয়ার আবির্ভাব; মধ্যপ্রাচ্যে মাইগ্রেশন; টেকনিক্যাল শিক্ষা, বই পড়ার প্রতি অনাগ্রহ, টেলিভিশনের প্রভাব কমে যাবার কারণে সেকুলার কনসেপ্টের প্রভাব কমে যাওয়া ছিল উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। এর মাঝে বিভিন্ন ইসলামি গ্রুপ মানুষের মাঝে কনসেপ্টের ঘাটতিগুলিকে পুরণ করেছে। সমাজে ইসলাম এখন একটা আলোচ্য বিষয়; যেই বাস্তবতা এড়িয়ে যাবার কোন পদ্ধতিই নেই। যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে' হাসিনা সরকারের একাত্মতা বাংলাদেশের মানুষের মাঝে ইসলামের প্রতি ভালোবাসাকে থামাতে তো পারেইনি; উল্টো, ওয়াশিংটনের প্রেসক্রিপশনে ইসলামপন্থীদের উপর দমন-পীড়ন করে, এলজিবিটি প্রমোট করে, এবং হিন্দুত্ববাদী ভারত সরকারের সাথে সখ্যতা করে নিজেদের উপরে ইসলাম-বিদ্বেষী তকমা নিয়ে এসেছিল আওয়ামী সরকার। এছাড়াও ফিলিস্তিন এবং ভারতে মুসলিমদের উপর নির্যাতন এখন বাংলাদেশের মুসলিমদের ইস্যুও বটে। অর্থাৎ পররাষ্ট্রনীতি এবং ইসলাম এখন আলাদা কিছু নয়। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের নেতৃত্বের সম্পর্ক কিরূপ হবে, তা এই দেশের মানুষের আক্বীদার বিরুদ্ধে গেলে নিঃসন্দেহে বড় রকমের সমস্যা তৈরি করছে। এবং একইসাথে তা ১৯৪৭এর সেকুলার নেশন স্টেটএর কন্সট্রাক্টকে চ্যালেঞ্জ করছে।

Saturday, 8 March 2025

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ ২০২৫ – রাইজ অব এইচটি

০৯ই মার্চ ২০২৫

ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে আগমণ যুক্তরাষ্ট্রে শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে; যার প্রমাণ ন্যাটো, ইউক্রেন এবং মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে দৃশ্যমান। আটলান্টিকের ওপাড়ে এহেন বড় পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে ঢাকায় এইচটি-র উত্থান একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ৭ই মার্চ ২০২৫ সত্যিই ছিল একটা ঐতিহাসিক দিন!


গত ০৭ই মার্চ রমজান মাসের প্রথম জুমআর দিনে ঢাকার বাইতুল মুকাররম মসজিদের উত্তর গেটে হিযবুত তাহরীর বা এইচটি-র মিছিল নিয়ে পুরো দেশব্যাপী ব্যাপক আলোচনার ঝড় উঠেছে। সেকুলার ব্যক্তিত্বদের মাঝে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন যে, নিষিদ্ধ্ব ঘোষণা করা এই দল কিভাবে দিনে দুপুরে এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ঘোষণা দিয়ে একটা মিছিলের আয়োজন করতে পারে? অনেকেই মন্তব্য করছেন যে, আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের সময় ব্যাপক দমন-পীড়নের মাঝ দিয়ে যাবার পরেও কি করে তারা ১৬ বছর পর এতবড় মিছিলের আয়োজন করতে পেরেছে? অনেকেই আইনশৃংখলা বাহিনীর সমালোচনা করেছেন যে, কেন পুলিশ আরও কঠোর হলো না। কেউ কেউ বলছেন যে, পুলিশ কেন গুলি চালালো না? অবশ্য যারা বুঝতে পেরেছেন যে, এইচটি-র মিছিলে গুলি চালালে এই পুলিশ আর হাসিনা সরকারের জুলুমবাজ পুলিশের মাঝে কোন পার্থক্য থাকে না, তারা কিন্তু অন্ততঃ রয়েসয়ে কথা বলেছেন। তদুপরি অনেকেই বলেছেন যে, পুলিশের উচিৎ ছিল এইচটি-র সদস্যরা যাতে মিছিল শুরুই করতে না পারে, সেই ব্যবস্থা করা। এই কথা বলেও তারা অবশ্য ফেঁসে গেছেন যে, ঠিক এই কাজটাই আওয়ামী সরকার করেছিল বিএনপি-জামাতের বিরুদ্ধে - রাজনৈতিক কর্মকান্ড শুরু করার আগেই সেটাকে পুলিশ এবং গুন্ডাবাহিনী দ্বারা লন্ডভন্ড করে দেয়া। পুলিশ অবশ্য গত সাত মাসের অক্ষমতার রেকর্ড অক্ষুন্ন রেখেই নিজেদের অবস্থানকে তুলে ধরেছে - এখানে তো অনেক সাধারণ মুসল্লী ছিল। অর্থাৎ পুলিশ অন্ততঃ বুঝেছে যে, যখন বহু পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে হাসিনা সরকারের নির্দেশ মান্য করার জন্যে মামলা ঝুলছে, তখন নতুন করে কোন অমানবিক কাজের ফাঁদে আরেকবার পা দেয়াটা বিচক্ষণের কাজ হবে না। তারা অন্ততঃ এটা বুঝেছেন যে, কোন সরকারই স্থায়ী নয় – এমনকি আওয়ামী সরকার - যারা একসময় যখন মনে করতো যে তারা জার্মানির 'থাউজ্যান্ড ইয়ার রাইখ'এর মতো কিছু একটা বাংলাদেশের মাটিতে কায়েম করবে - তাদেরও পতন হয়েছে। সুতরাং আর কাউকেই পুরোপুরিভাবে বিশ্বাস করে আগুনে ঝাঁপ দেয়ার মতো বোকামি তারা করতে রাজি ছিল না। তবে সরকারের চাপ ছিল বলেই তারা কাপুরুষের মতো মিছিলের পেছন থেকে কোন উস্কানি ছাড়াই টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড এবং লাঠিচার্চের মাধ্যমে হামলা করেছে। এতে মিছিলকারীদের তেমন কোন ক্ষতি না হলেও পুলিশের কপালে কিন্তু আবারও জুলুমবাজের তকমা জুটে গেলো! বেচারা পুলিশ!
 
নিষেধাজ্ঞা না তোলার পরেও এইচটি তাদের কর্মকান্ড চালিয়ে যেতে পেরেছে; এবং একইসাথে ইউনুস সরকার কেন হাসিনা সরকারের জুলুমবাজ নীতিকে চালিয়ে নিলো, সেটার জন্যে ইউনুস সরকারের গণতন্ত্র রক্ষা করার কৌশলও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। কারণ ইউনুস সরকার যদি শক্তিশালী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতেই চায়, তাহলে সেটাকে পুলিশী কর্মকান্ডের মাধ্যমে রক্ষা করতে হবে কেন? দুর্বল গণতন্ত্রকে যদি স্ক্যাচে ভর করে চলতে হয়, তাহলে সেটা এইচটি-র বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে লড়বে কিভাবে? প্রকারান্তরে হাসিনার সিদ্ধান্তকে সমুন্নত রাখতে গিয়ে পুলিশি ব্যবস্থা প্রয়োগ করে সরকার এইচটি-র কাছে বুদ্ধিবৃত্তিক হারই স্বীকার করে নিয়েছে।


এইচটি কতটা সফল ছিল?

এখন প্রশ্ন হলো, এইচটি-র জন্যে এটা কি সফলতা ছিল কিনা? এটা বুঝতে হলে দেখতে হবে যে, তারা এর মাধ্যমে কি করতে চেয়েছে। 'মার্চ ফর খিলাফত' নামের প্রকল্প এবং এর ন্যারেটিভগুলি মোটামুটিভাবে ৩রা মার্চ থেকে পোস্টার আকারে সারা ঢাকা শহরে ছড়িয়ে যেতে থাকে। এতে একদিকে যেমন এইচটি তাদের দলীয় সক্ষমতার প্রমাণ দেয়, তেমনি সমাজের মাঝে তাদের সরাসরি ও চাপা সমর্থনের প্রমাণও সামনে চলে আসে। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই তারা দিনের বেলায় পোস্টার লাগিয়েছে; এবং অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ তাদেরকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে। পুলিশ এক্ষেত্রে বর্তমান প্রেক্ষাপটে নীরব ভূমিকা পালন করাটাকেই যুক্তিযুক্ত মনে করেছে। অন্ততঃ আওয়ামী সময়ে এইচটি-র সদস্যদের ধরে ধরে আয়নাঘরে ছুঁড়ে ফেলার মতো বাজে কাজের দুর্গন্ধ তাদের ইউনিফর্মে যখন লেগে আছে, তখন পুলিশ বক্সের উপর এইচটি-র পোস্টার লাগানোতে বাধা দিয়ে সেই জঘন্য স্মৃতি তারা আর সামনে আনতে চায়নি। তাই পোস্টার লাগানো চলেছে; যে যা কিছুই মনে করুক; এটাই বাস্তবতা। যারা অভিযোগ করছেন, তাদেরকে বাস্তবতা মেনে নিতেই হবে।

মোটকথা এইচটি বাস্তবতাকে তাদের পক্ষে পরিবর্তন করিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে; যা অবশ্য ২০২৪এর ০৫ই অগাস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতি দ্বারা প্রভাবিত হলেও ১৫ বছরের শক্তিশালী রাজনৈতিক কর্মকান্ডের ফলাফল হিসেবেই এসেছে। কেননা, আওয়ামী সময়ের ১৫ বছর তারা যদি কোন কাজ করতে না-ই পারতো, তাহলে কেউই বলতে পারতো না যে, এইচটি ০৫ই অগাস্টের অভ্যুত্থানের অংশীদার। আর কেউ যদি এইচটি-র নাম না-ই জানতো, তাহলে তারা আওয়ামী লীগের পতনের পরপরই বাইতুল মুকাররমের উত্তর গেটে দু'টা বড় বড় মিছিল করতে সক্ষম হতো না। এছাড়াও তারা গত ২৯শে নভেম্বর একটা আন্তর্জাতিক অনলাইন কনফারেন্সও করেছে। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এইচটি-র উপর থেকে হাসিনা সরকারের দেয়া নিষেধাজ্ঞা তুলে না নিলেও এই কর্মকান্ডগুলিকে আটকানো সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞা না তোলার পরেও এইচটি তাদের কর্মকান্ড চালিয়ে যেতে পেরেছে; এবং একইসাথে ইউনুস সরকার কেন হাসিনা সরকারের জুলুমবাজ নীতিকে চালিয়ে নিলো, সেটার জন্যে ইউনুস সরকারের গণতন্ত্র রক্ষা করার কৌশলও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। কারণ ইউনুস সরকার যদি শক্তিশালী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতেই চায়, তাহলে সেটাকে পুলিশী কর্মকান্ডের মাধ্যমে রক্ষা করতে হবে কেন? দুর্বল গণতন্ত্রকে যদি স্ক্যাচে ভর করে চলতে হয়, তাহলে সেটা এইচটি-র বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে লড়বে কিভাবে? প্রকারান্তরে হাসিনার সিদ্ধান্তকে সমুন্নত রাখতে গিয়ে পুলিশি ব্যবস্থা প্রয়োগ করে সরকার এইচটি-র কাছে বুদ্ধিবৃত্তিক হারই স্বীকার করে নিয়েছে।
 
তারা যে ব্যাপারটা ধরতেই পারেনি তা হলো, এইচটি-র পক্ষে বা বিপক্ষে যেকোন কিছু লিখলেই সেটা এইচটি-কে সহায়তা করবে। কারণ এইচটি হলো একটা আদর্শিক দল; যারা সকল মুসলিমকে নিজেদের দাওয়ার আওতায় ধরে। অর্থাৎ তারা আওয়ামী লীগ, বিএনপি, সরকারি-বেসরকারি চাকুরিজীবি, ব্যবসায়ী, সামরিক অফিসার, শিক্ষক, চিন্তাবিদ, যে কাউকে দাওয়া করে; বিশেষ করে যারা সমাজের এলিট শ্রেণি। বর্তমানে কেউ কেউ বলছে যে, এইচটি-র বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাথে সখ্যতা রয়েছে। আবার আরেক দল বলছে যে, এইচটি-র পেছনে আওয়ামী লীগের পান্ডারা লুকিয়ে আছে। 


এইচটি-র ব্যাপারে হাসিনা সরকারের নীতি

গত ১৫ বছর হাসিনা সরকার মার্কিন ইন্টেলিজেন্সের গাইডলাইন অনুযায়ী চলেছে। এইচটি হলো একটা আদর্শিক সংগঠন। তাদেরকে হয় আদর্শিক কাউন্টার-ন্যারেটিভের মাধ্যমে আটকাতে হবে; নতুবা তাদের কথা জনগণের কাছে যাতে একেবারেই পৌঁছাতে না পারে, সেটার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রথমটা বেশ কঠিন। কারণ এইচটি কোন জিহাদী গ্রুপ নয়; যার বিরুদ্ধে সহজেই কোন ন্যারেটিভ তৈরি করে সাধারণ মানুষকে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা থেকে দূরে রাখা সম্ভব। একারণে হাসিনা সরকার দ্বিতীয় পদ্ধতিটা অনুসরণ করেছে; যদিও তাদের সামনে আর কোন পদ্ধতিও খোলা ছিল না। কারণ ২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহে ভারত এবং আওয়ামী লীগের সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকার ব্যাপারে লিফলেট ইস্যু করার পর এইচটি আওয়ামীদের চক্ষুশূলে পরিণত হয়। একইসাথে এইচটি হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে তাদের কাছে হস্তান্তরের জন্যে সামরিক বাহিনীর অফিসারদের দিকে আহ্বান করতে থাকে। নিষেধাজ্ঞা আসাটা ছিল প্রায় অবধারিত। এটা জানা সত্ত্বেও তারা তাদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি এবং পরবর্তীতে অনেক বছর ধরে ব্যাপক জুলুম নির্যাতন সহ্য করেছে। বাংলাদেশের আইনে কোন অপরাধ প্রমাণিত না হলেও কোন কারণ ছাড়াই তাদের সদস্যদেরকে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর জেলে পুরে রাখা হয়েছিল। আয়নাঘরে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিকভাবে মারত্মক নির্যাতন করা হয়েছিল।

তবে এই ১৫ বছরের সবচাইতে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল টোটাল মিডিয়া ব্ল্যাকআউট। সকল মিডিয়াকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিলো, যাতে করে কোন মিডিয়াতে এইচটি-র কোন কর্মকান্ড না আসে। এই সুযোগে হাসিনা সরকার এইচটি-র বিরুদ্ধে বিভিন্ন মিথ্যা তথ্য ছড়াতে সক্ষম হয়েছিলো। কারণ জগগণ শুধু সরকার-নিয়ন্ত্রিত মিডিয়াই দেখতে পেতো। এরপরেও এইচটি এই সময়ে তাদের কর্মকান্ডকে চালিয়ে নিতে পেরেছে; যা কিনা যে কোন সাধারণ রাজনৈতিক দলের জন্যে প্রায় অসম্ভব কাজ। এক্ষেত্রে অন্যান্য দেশে এইচটি-র অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছে। কারণ এইচটি বিভিন্ন দেশে ভয়াবহতম একনায়ককে মোকাবিলা করেছে; যাদের মাঝে ছিল ইরাকের সাদ্দাম হোসেন, লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফি, মিশরের হোসনি মুবারক এবং উজবেকিস্তানের ইসলাম কারিমভ। গ্লোবাল আদর্শিক দল হবার কারণে তারা বাংলাদেশে ১৫ বছরের আওয়ামী দুঃশাসনের মাঝে শুধু টিকেই যায়নি; নিজেদের দলকে আরও বড় ও মজবুত করেছে। ঢাকার স্বনামধন্য স্কুল-কলেজের ছাত্ররা কালেমা খচিত পতাকা নিয়ে মিছিল করার পর দিল্লীতে অনেকেরই ঘাম ঝড়ে গিয়েছে। কারণ ভারত মনে করেছে যে, এটা এইচটি-ই করেছে। ঢাকায় জেনারেশন-জেড (জেন-জি)এর পতাকা মিছিল দিল্লীর জন্যে ছিল অশনি সংকেত।

০৫ই অগাস্টের পরিবর্তনের পর এইচটি-র জন্যে সবচাইতে বড় ব্যাপার ছিল প্রকাশ্যে দাওয়ার কাজ করতে পারা। এটা অবশ্য পুলিশ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার কারণেই সম্ভব হয়েছে। তথাপি মিডিয়া ব্ল্যাকআউট কিন্তু ঠিকই চলেছে। এই ব্যাপারটা পুরোপুরিভাবে পরিবর্তন হয়ে গেছে, যখন 'মার্চ ফর খিলাফত' অনুষ্ঠানের ব্যাপারে পুলিশের বিবৃতি আসে এবং সকল মিডিয়া এটাকে ফলাও করে প্রচার করে। এটা ঠিক যে, পুলিশের এই নিষেধাজ্ঞার কারণে এইচটি-র অনেক সমর্থকই হয়তো মিছিলে যোগ দেয়নি। তথাপি যে পরিমাণ প্রচার পুলিশ এবং মিডিয়ার মাধ্যমে তারা পেয়েছে, তাতে অনুষ্ঠানের আগেই তাদের অর্ধেক বিজয় হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে এইচটি-র বড় একটা বিজয় হয়ে গিয়েছে অনুষ্ঠানের আগেই। আর অনুষ্ঠানের দিন জুমআর নামাজ শেষ হবার সাথেসাথেই যখন দেখা গেলো যে, হাজারো মুসল্লির বিশাল জনস্রোত এইচটি-র সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছে, তখন বাকি অর্ধেক বিজয়ও তারা পেয়ে গেছে। কারণ নিষেধাজ্ঞার পরেও এত মানুষ এই মিছিলে যোগ দেবে, এটা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি!

বাকিটা ছিল ইতিহাস। যে এইচটি ১৫ বছরে মিডিয়াতে আসতে পারেনি, তারা ৭ই মার্চ ছিল সকল মিডিয়ার প্রধান শিরোনাম। প্রকৃতপক্ষে সেদিন এইচটি ছিল বাংলাদেশের একমাত্র শিরোনাম! এটা এই দলকে কতটা এগিয়ে নিয়ে গেছে, তা যারা ভূরাজনীতি নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন তাদের বোঝার কথা। এইচটি-র টার্গেট অডিয়েন্স ছিল মূলতঃ সামরিক বাহিনীর সদস্যরা; যারা এইচটি-র সক্ষমতার একটা চাক্ষুশ প্রমাণ পেলো। অন্ততঃ তাদের টার্গেট অডিয়েন্সের কাছে এইচটি-র সন্মান যে বহুগুণে বেড়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
 
হাসিনা সরকারের ১৫ বছরের দমন পীড়নের পরেও এইচটি যখন এতবড় জনসমাগম করতে সক্ষম হয়েছে, তখন এদেশের সেকুলার সমাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত পুলিশকে দোষারোপ করেছে; যেখানে সকলেই জানে যে, সারা দেশের কোথাও নিরাপত্তা দেয়ার সক্ষমতা পুলিশের নেই। কোন বুদ্ধিবৃত্তিক কাউন্টার-ন্যারেটিভ বের করতে না পেরে হাসিনা সরকারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে জুলুমবাজ নীতিকে অগ্রাধিকার দেয়ার ব্যাপারটা সেকুলার চিন্তাবিদদের বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিউয়াত্বকেই তুলে ধরে। অথচ এইচটি-র কন্ঠরোধ করার এই নীতিতে তাদের গণতান্ত্রিক আদর্শের প্রধান একটা স্তম্ভ বাক-স্বাধীনতা যে ভূলুন্ঠিত হয়ে যাচ্ছে, সেদিকে তাদের খেয়ালই নেই।


এইচটি-র বিরুদ্ধে প্রচারণা - লাভ কার?

বাংলাদেশের পুরো সেকুলার সমাজের ব্যাপক প্রচেষ্টা শুরু হয়ে গেলো কিভাবে এইচটি-কে জনগণের সামনে খারাপভাবে তুলে ধরা যায়। সত্যাসত্য অনেক কিছুই সোশাল মিডিয়াতে ভরিয়ে দিতে থাকে অনেকে। অথচ তারা যে ব্যাপারটা ধরতেই পারেনি তা হলো, এইচটি-র পক্ষে বা বিপক্ষে যেকোন কিছু লিখলেই সেটা এইচটি-কে সহায়তা করবে। কারণ এইচটি হলো একটা আদর্শিক দল; যারা সকল মুসলিমকে নিজেদের দাওয়ার আওতায় ধরে। অর্থাৎ তারা আওয়ামী লীগ, বিএনপি, সরকারি-বেসরকারি চাকুরিজীবি, ব্যবসায়ী, সামরিক অফিসার, শিক্ষক, চিন্তাবিদ, যে কাউকে দাওয়া করে; বিশেষ করে যারা সমাজের এলিট শ্রেণি। বর্তমানে কেউ কেউ বলছে যে, এইচটি-র বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাথে সখ্যতা রয়েছে। আবার আরেক দল বলছে যে, এইচটি-র পেছনে আওয়ামী লীগের পান্ডারা লুকিয়ে আছে। যেটা এরা কেউই চিন্তা করতে পারছে না তা হলো, এইচটি-র এব্যাপারে কোন মাথাব্যাথা থাকবে না। কারণ এত বছরে এইচটি-র কোন ন্যারেটিভে দেখা যাবে না যে, তারা অন্য কারুর কর্মকান্ডকে অনুসরণ করে নিজেদের কর্মকান্ডকে সাজিয়েছে। তারা সর্বদাই নিজেদের অদর্শকে সমুন্নত রেখে তাদের লক্ষ্য ঠিক করেছে এবং সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিভিন্ন কর্মকান্ড করেছে। অর্থাৎ তারা সর্বদাই 'প্রোএকটিভ' থেকেছে; কখনোই 'রিএকটিভ' হয়নি। কাজেই এটা আশা করা যায় না যে, তারা কারুর মিথ্যা তথ্য ছড়ানোতে 'রিএকশন' দেখাবে। বরং এতে এইচটি-র ব্যাপারে সমাজে আরও বেশি কৌতুহল তৈরি হবে এবং আরও বেশি আলোচনা হবে; যেখানে এইচটি-কে কেউই বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে হারাতে সক্ষম হবে না। কারণ তাদের বিরুদ্ধে কাউন্টার-ন্যারেটিভ তৈরি করাটা যথেষ্টই কঠিন। মোটকথা, এর মাধ্যমে এইচটি আবারও বাস্তবতাকে পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে। একসময় তাদের ব্যাপারে কেউ কোন কথা বলতো না; আর এখন তাদের কথা সকলের মুখে মুখে। এটা এইচটি-র জন্যে অনেক বড় একটা বিজয়।

পুরো বাংলাদেশের মানুষ অবাক হয়ে দেখেছে কিভাবে এইচটি ঘোষণা দিয়ে বাইতুল মুকাররমে মিছিল করেছে; সেটাও আবার পুলিশের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও। হাসিনা সরকারের ১৫ বছরের দমন পীড়নের পরেও এইচটি যখন এতবড় জনসমাগম করতে সক্ষম হয়েছে, তখন এদেশের সেকুলার সমাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত পুলিশকে দোষারোপ করেছে; যেখানে সকলেই জানে যে, সারা দেশের কোথাও নিরাপত্তা দেয়ার সক্ষমতা পুলিশের নেই। কোন বুদ্ধিবৃত্তিক কাউন্টার-ন্যারেটিভ বের করতে না পেরে হাসিনা সরকারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে জুলুমবাজ নীতিকে অগ্রাধিকার দেয়ার ব্যাপারটা সেকুলার চিন্তাবিদদের বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিউয়াত্বকেই তুলে ধরে। অথচ এইচটি-র কন্ঠরোধ করার এই নীতিতে তাদের গণতান্ত্রিক আদর্শের প্রধান একটা স্তম্ভ বাক-স্বাধীনতা যে ভূলুন্ঠিত হয়ে যাচ্ছে, সেদিকে তাদের খেয়ালই নেই। অপরদিকে সেকুলার রাজনৈতিক দলের সমর্থকেরা হতবিহ্বল হয়ে একে অপরকে দোষারোপ করছে - বলছে যে, এইচটি উমুক বা তুমুক দলের সাথে রয়েছে। এইচটি কিছুই বলবে না। তারা তো আদর্শিক দল হবার কারণে সকলকেই দাওয়া করে। তাই তারা সকলকেই তাদের নিজেদের লোক মনে করে। কাজেই কেউ যদি বলে যে, এইচটি ওদের লোক, তারা কখনোই এতে ব্যাথিত হবে না। কারণ এতে তাদের সংখ্যা শুধু বৃদ্ধিই পায়। শুধুমাত্র এই বাস্তবতাটুকু অনুধাবন করার সক্ষমতাও যে বাংলাদেশের বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবিদের নেই, সেটা আজ প্রমাণিত সত্য। বাংলাদেশের পুরো সেকুলার সমাজ আজকে এইচটি-র কাছে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পরাজিত! এটা ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও দিনটাকে গুরুত্বপূর্ণ করেছে। কারণ প্রথমতঃ এইদিনের মিছিল ছিল ৩রা মার্চের খিলাফত পতন দিবসের ১০১তম (ইংরেজি ক্যালেন্ডারে) বর্ষপুর্তি উপলক্ষে; যা সারা বিশ্বে রমজানের প্রথম জুমআর দিনে একযোগে পালিত হয়েছে। আর দ্বিতীয়তঃ ঢাকায় এইচটি-র এতবড় উত্থান ওয়াশিংটন ও দিল্লীর জন্যে বড় একটা চিন্তার বিষয়। ওয়াশিংটনে যখন বড় রকমের পরিবর্তন চলছে, দিল্লীর নেতৃত্ব তখন শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে বিপদ গুণছে। ০৫ই অগাস্টের পর থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারত বিভিন্ন সাবভার্সনের কাজ করে বাংলাদেশ সরকারকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছাড় দিতে বাধ্য করেছে। তথাপি এক্ষেত্রে হোয়াইট হাউজে বাইডেন সরকার থাকার সময় ওয়াশিংটন থেকে বাংলাদেশের উপর রাজনৈতিক চাপ বড় ভূমিকা রেখেছিল। এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে আগমণ যুক্তরাষ্ট্রে শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে; যার প্রমাণ ন্যাটো, ইউক্রেন এবং মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে দৃশ্যমান। আটলান্টিকের ওপাড়ে এহেন বড় পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে ঢাকায় এইচটি-র উত্থান একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ৭ই মার্চ ২০২৫ সত্যিই ছিল একটা ঐতিহাসিক দিন!