Showing posts with label Koushol. Show all posts
Showing posts with label Koushol. Show all posts

Thursday, 31 October 2019

পুতিনের আফ্রিকায় অবতরণ!

৩১শে অক্টোবর ২০১৯
 


২৩শে অক্টোবর রুশ বিমান বাহিনীর দু’টা ‘তুপোলেভ টিইউ-১৬০’ পারমানবিক বোমারু বিমান দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে অবতরণ করে। এটা ছিল আফ্রিকার মাটিতে রুশ পারমানবিক বোমারু বিমানের প্রথম অবতরণ। রাশিয়া থেকে ১১ হাজার কিঃমিঃ উড়ে আসা এই বিমানগুলির মিশনকে প্রশিক্ষণ মিশন হিসেবে বলা হলেও এর রয়েছে বিশেষ কৌশলগত তাতপর্য। বিমানগুলি যখন দক্ষিণ আফ্রিকায় অবতরণ করছিল, তখনই রাশিয়ার কৃষ্ণ সাগরের উপকূলের শহর সোচিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল প্রথম রাশিয়া-আফ্রিকা শীর্ষ বৈঠক। বৈঠকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের আমন্ত্রণে সেখানে যান আফ্রিকার ৪৩ জন রাষ্ট্রপ্রধান এবং ৩ হাজারের বেশি ব্যবসায়ী। পুরো অনুষ্ঠানটির কান্ডারী হিসেবে পুতিনের সাথে ছিলেন মিশরের প্রেসিডেন্ট আব্দেল ফাত্তাহ এল-সিসি।

‘দ্যা মস্কো টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এই অনুষ্ঠানটি সোচির অলিম্পিক ভিলেজে আয়োজন করাটা একটা প্রতীকি ব্যাপার ছিল। এই অলিম্পিক ভিলেজেই ২০১৪ সালে শীতকালীন অলিম্পিক গেমসের সময় পুতিন তার নতুন বহিঃর্মুখী পররাষ্ট্রনীতির আভাস দেন। সেই গেমসের প্রায় সাথে সাথেই রাশিয়া ইউক্রেনের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পরে। সেবছরের এপ্রিলে রাশিয়া ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করে নেয়; এবং সেপ্টেম্বরে ইউক্রেনের পূর্বে ডনবাস এলাকায় রাশিয়ার সাথে ইউক্রেনের যুদ্ধ শুরু হয়। এর পরের বছর সেপ্টেম্বরে রাশিয়া সিরিয়ার যুদ্ধে বাশার আল-আসাদের সরকারের পক্ষে হস্তক্ষেপ করে। পরবর্তী সময়ে মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষপের অভিযোগ, মার্কিন ইন্টেলিজেন্স সদস্য এডওয়ার্ড স্নোডেনকে আশ্রয় প্রদান, ভেনিজুয়েলার সরকারকে সামরিক সমর্থন প্রদান এবং তুরস্কের কাছে অত্যাধুনিক ‘এস-৪০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিক্রয়সহ আরও অনেক আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার অংশ হয় রাশিয়া। ‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, প্রকৃতপক্ষে ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকেই রাশিয়ার উপর পশ্চিমাদের যে অবরোধের চাপ নেমে এসেছে, সেটাই রাশিয়ার পৃথিবীব্যাপী বন্ধু খোঁজার কাজকে ত্বরান্বিত করেছে। রাশিয়ার আফ্রিকায় গমনের কারণও সেটাই। সোচির রাশিয়া-আফ্রিকা বৈঠকের অনেক অগেই রাশিয়া আফ্রিকাতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। এই বৈঠকের মাধ্যমে সেই চেষ্টাকে একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিলো রাশিয়া।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগানের সাথে বৈঠক শেষ করেই পুতিন আফ্রিকার বৈঠকে যোগ দেন। মধ্যপ্রাচ্যে একটা সাফল্যমন্ডিত সফর শেষ করেই পুতিন সোচিতে আসেন। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যে একটা শক্তিশালী অবস্থান পাকাপোক্ত করেই তবে তিনি সোচিতে আফ্রিকা নিয়ে বসেছিলেন। সাম্প্রতিককালে আফ্রিকাতে রাশিয়ার অবস্থান নিয়ে খুব কমই কথা হয়েছে। আফ্রিকার সাথে চীন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি, জাপান, ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক যতটা গভীর সেক্ষেত্রে রাশিয়ার অবস্থান তেমন কিছুই নয়। আফ্রিকার সাথে রাশিয়ার বাৎসরিক বাণিজ্য ২০ বিলিয়ন ডলারের মতো; যেখানে এই মহাদেশের সাথে ইইউ-এর বাণিজ্য ৩’শ বিলিয়ন ডলার; চীনের বাণিজ্য ২’শ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এমনকি ফ্রান্সের বাণিজ্যও ৫০ বিলিয়ন ডলারের উপর। ‘ইউরোস্ট্যাট’এর হিসেবে আফ্রিকার বৃহত্তম পাঁচ বাণিজ্য সহযোগী দেশের মাঝে রাশিয়ার নাম নেই; ইইউ, চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের পর আসে রাশিয়ার নাম। ভ্লাদিমির পুতিন এক্ষেত্রে আর্থিক সম্পর্ককে সামনে না টেনে আফ্রিকার দেশগুলির স্বাধীনভাবে চলতে পারার প্রসঙ্গটি সামনে নিয়ে আসেন। সন্মেলনের আগে রুশ বার্তা সংস্থা ‘তাস’এর সাথে এক সাক্ষাতে তিনি বলেন যে, পশ্চিমা দেশগুলি আফ্রিকার দেশগুলির উপর চাপ প্রয়োগ, ভীতি প্রদর্শন এবং ব্ল্যাকমেইলের পথ বেছে নিয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়া আফ্রিকার দেশগুলিকে কোন শর্ত ছাড়াই সহায়তা করতে প্রস্তুত। তিন বলেন যে, রাশিয়া আফ্রিকার দেশগুলিকে ঔপনিবেশিক দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত হতে সহায়তা দিয়েছিল। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আফ্রিকার সাথে রাশিয়ার দূরত্ব তৈরি হলেও ইতিহাস মুছে যায়নি। যেমন, মোজাম্বিক পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যে দেশের পতাকায় একটা কালাশনিকভ রাইফেল রয়েছে। সন্মেলনে অংশ নেয়া অনেকেই পুতিনের কথাগুলির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে সাহায্যের বদলে সহযোগিতা এবং বশ্যতার পরিবর্তে সার্বভৌমত্ব নিয়ে কথা বলেন। আফ্রিকার দেশগুলির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে রাশিয়া সরব থাকলেও নিজের সীমানাতেই ইউক্রেন, জর্জিয়া এবং অন্যান্য দেশের ব্যাপারে রাশিয়া চুপ থেকেছে।
 


আফ্রিকার নিরাপত্তায় রাশিয়া

অর্থনীতিবিদ চার্লস রবার্টসন ‘দ্যা মস্কো টাইমস’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, আফ্রিকাতে রাশিয়ার মোট রপ্তানির দুই-তৃতীয়াংশ যায় মাত্র দু’টা দেশে – মিশর এবং আলজেরিয়াতে। তবে আফ্রিকার দেশগুলির সাথে নিরাপত্তার সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাশিয়া অনেকের থেকেই এগিয়ে। সোভিয়েত সময় থেকেই আফ্রিকার বহু দেশ রুশ অস্ত্রের উপরে নির্ভরশীল। ‘স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইন্সটিটিউট’এর হিসেবে গত পাঁচ বছরে রাশিয়া আফ্রিকার সবচাইতে বড় অস্ত্র রপ্তানিকারকে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমা সরকারগুলি যখন আফ্রিকার দেশগুলিতে মানবাধিকারের মতো ইস্যুগুলিকে প্রাধান্য দিয়ে অস্ত্র সরবরাহে লাগাম টেনেছে, তখন রাশিয়া সেই শূণ্যস্থান পূরণ করে নিয়েছে।

সোচির সন্মেলনের বাইরেই রুশ নির্মিত অস্ত্রের এক বিরাট প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়; যা ছিল অস্ত্র কেনাবেচার আলোচনায় মুখর। রুশ সামরিক রপ্তানিকারক কোম্পানি ‘রসবরনএক্সপোর্ট’এর ডিরেক্টর জেনারেল আলেক্সান্ডার মিখিভ বলেন যে, আফ্রিকার ২০টি দেশে তাদের মোট অস্ত্র রপ্তানির এক-তৃতীয়াংশ যাচ্ছে; যার মূল্যমান ১৪ বিলিয়ন ডলার। সোচির বৈঠকের সাইডলাইনে ‘রসবরনএক্সপোর্ট’ ১৫টা দেশের সাথে আলোচনায় বসে। ‘আরআইএ’ সংবাদ সংস্থা বলছে যে, বৈঠকের ফাঁকে রাশিয়া নাইজেরিয়ার কাছে ১২টা ‘এমআই-৩৫পি’ এটাক হেলিকপ্টার বিক্রয়ের চুক্তি করে। নাইজেরিয়া বলছে যে, এই হেলিকপ্টারগুলি বোকো হারাম জঙ্গীগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহৃত হবে। নাইজেরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাল্লা আনকুরাও-এর বরাত দিয়ে রুশ মিডিয়া ‘আরটি’ বলছে যে, রুশ মিলিটারি একাডেমিগুলিতে এখন ১’শরও বেশি নাইজেরিয়ান সামরিক সদস্য ট্রেনিং নিচ্ছে। ‘রাশান হেলিকপ্টারস’ কোম্পানির ডিরেক্টর জেনারেল আন্দ্রেই বোগিনস্কি বলেন যে, বর্তমানে আফ্রিকায় উড়ছে ৯’শরও বেশি রুশ-নির্মিত হেলিকপ্টার, যা কিনা পুরো মহাদেশের মোট হেলিকপ্টারের এক-চতুর্থাংশ। আর সেখানে সামরিক হেলিকপ্টারের প্রায় ৪০ শতাংশই রুশ-নির্মিত। কাজেই এই হেলিকপ্টারগুলি সার্ভিসিং, আধুনিকায়ন এবং নবায়নের অনেক ব্যবসায়িক কনট্রাক্ট রুশরা পেতে পারে।

‘মস্কো স্টেট ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স’এর আইভান লোশকারেভ বলছেন যে, রাশিয়া চাইছে পৃথিবীর শক্তির কেন্দ্রকে একটা দেশের (যুক্তরাষ্ট্র) হাতে থাকতে না দিয়ে অনেকগুলি দেশের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া; যার মাঝে একটা দেশ হবে রাশিয়া। আর আফ্রিকাতে কয়েকটা দেশকে রাশিয়া শক্তির কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চাইছে; যেমন, উত্তর আফ্রিকায় মিশর; পশ্চিম আফ্রিকায় নাইজেরিয়া; আর আফ্রিকার দক্ষিণে দক্ষিণ আফ্রিকা। এই শক্তির কেন্দ্রগুলিতে রাশিয়া শক্ত অবস্থানে বসার লক্ষ্য নিয়েই এগুচ্ছে। ‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, আফ্রিকাতে রাশিয়ার প্রভাব বৃদ্ধির একটা প্রমাণ ছিল ২০১৮ সালে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে তিনজন রুশ সাংবাদিককে হত্যা। এই সাংবাদিকেরা সেই দেশে ‘ওয়াগনার গ্রুপ’ নামের গোপন রুশ ভাড়াটে সেনাদের অবস্থান নিয়ে রিপোর্ট করতে এসেছিলেন। সোচিতে পুতিন এবং সেন্ট্রাল আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট ফস্টিন-আরশাঞ্জ তুয়াদেরা এই হত্যাকান্ডের তদন্তের ব্যাপারে আলোচনা করেছেন বলে ক্রেমলিন থেকে বলা হয়।

আফ্রিকাতে মস্কোর প্রভাব বৃদ্ধির সাথেসাথে এই অঞ্চলের পুরোনো শক্তিরা নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে মনোযোগী হয়েছে বলে বলছেন ‘কন্ট্রোল রিস্কস’এর টিম স্ট্যানলি এবং বার্নাবি ফ্লেচার। ‘দ্যা মস্কো টাইমস’এ এক লেখায় তারা বলছেন যে, পশ্চিমা দেশগুলি তাদের রাজনৈতিকভাবে কর্মকান্ড বাড়াবার সাথে সাথে নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থগুলিকেও বেশি করে সামনে নিয়ে আসছে। জুন মাসে ঘোষিত যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রসপার আফ্রিকা’ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে আফ্রিকাতে উন্নয়নের জন্যে সহায়তা দেবার সাথে সাথে সেই প্রকল্পগুলিতে মার্কিন কোম্পানিগুলিকে কাজ পাইয়ে দেবার চিন্তা আসছে। এর আগে মার্কিন নীতি ছিল মূলতঃ রাজনৈতিক সংস্কারকে ঘিরে। অন্যদিকে চীন আফ্রিকাতে তাদের অর্থনৈতিক প্রভাবকে রাজনৈতিক প্রভাবে রূপান্তরিত করতে চাইছে।

‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ার সাথে পশ্চিমাদের টানাপোড়েন চলছে। পশ্চিমা অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে রাশিয়া তার অর্থনীতিকে ইউরোপ থেকে অন্যদিকে নিয়ে যেতে চাইছে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকাতে যুক্তরাষ্ট্রের ফোকাস কমে যাবার ফলে রাশিয়ার জন্যে সুযোগ তৈরি হয়েছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও আফ্রিকার দেশগুলির সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে শরণার্থী সমস্যাকে প্রাধান্য দিয়েছে এবং আফ্রিকার সরকারগুলির উপর নানামুখী চাপের সৃষ্টি করেছে। এই সুযোগে রাশিয়া আফ্রিকার দেশগুলির সাথে সামরিক সম্পর্ক গভীর করেছে, বাণিজ্যিক সম্পর্কও বাড়িয়েছে, এবং সেসব দেশের স্বেচ্ছাচারী শাসকদের ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যে বিভিন্নভাবে সহায়তা দিয়েছে। প্রাক্তন রুশ রাষ্ট্রদূত আলেক্সান্ডার ব্রেগাদজে এখন পশ্চিম আফ্রিকার গিনিতে রুশ এলুমিনিয়াম কোম্পানি রুসালে রয়েছেন; যেখান থেকে তিনি গিনির প্রেসিডেন্ট আলফা কন্ডেকে সমর্থন যোগাচ্ছেন। প্রাক্তন রুশ ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তা ভ্যালেরি জাখারভ এখন সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকের প্রেসিডেন্ট ফস্টিন-আরশাঞ্জ তুয়াদেরার নিরাপত্তা উপদেষ্টা। সেন্ট্রাল আফ্রিকা এবং মোজাম্বিকে রুশ ভাড়াটে সেনারা সরকারের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে বলেও বিভিন্ন রিপোর্টে বলা হচ্ছে। গত জুনে রাশিয়ার প্রাক্তন ধনকুবের মিখাইল খদরকভস্কির মাধ্যমে পাওয়া কিছু নথি জনসম্মুখে আনে ‘দ্যা গার্ডিয়ান’। সেখানে বেশ লম্বা বর্ণনা দেয়া হয় যে, কিভাবে নিরাপত্তা, রাজনীতি, ব্যবসা, মিডিয়া, এনজিও, ইত্যাদির উপর ভর করে রাশিয়া আফ্রিকায় তার প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে। সেখানে ১৩টা দেশকে রাশিয়ার সাথে সম্পর্কের হৃদ্যতার উপর ভিত্তি করে রেটিং করা হয়।






রাশিয়ার সক্ষমতা আসলে কতটুকু?
রাশিয়ার সামনে চ্যালেঞ্জ রয়েছে অনেক। ‘দ্যা আফ্রিকা রিপোর্ট’এর এক লেখায় অলিভিয়ে মারবো মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, সাম্প্রতিক সময়ে আফ্রিকায় রাশিয়া বেশকিছু বন্ধু হারিয়েছে, যার মাঝে রয়েছে সুদান এবং আলজেরিয়া। এই দেশগুলিতে বহুকাল ক্ষমতায় থাকা নেতৃবৃন্দের পতন হয়েছে। একইসাথে কয়েক বছর ধরে আফ্রিকার মাটিতে একটা সামরিক ঘাঁটি বসাবার জন্যে যথেষ্ট চেষ্টা করলেও রাশিয়া এখনও সেই প্রচেষ্টায় সফল হতে পারেনি। তদুপরি আফ্রিকার দেশগুলির সামরিক বাহিনীগুলির সাথে রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক আফ্রিকার মাটিতে রাশিয়ার স্বার্থকে সমুন্নত রেখেছে।

রাশিয়ার অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে রয়েছে আরও বড় প্রশ্ন। ২০১৮ সালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন আফ্রিকাতে ৬০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। চ্যাটহ্যাম হাউজের আফ্রিকা প্রোগ্রামের প্রধান এলেক্স ভাইন্স বলছেন যে, এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে রাশিয়াকে অনেক চতুর হতে হবে। কম খরচে কাজ হাসিল করার চেষ্টা করতে হবে তাদের, নতুবা সক্ষমতার বাইরে গিয়ে কাজ করতে বাধ্য হতে পারে। ‘মেডুজা’ বার্তা সংস্থা বলছে যে, লিবিয়ার সামরিক নেতা খলিফা হাফতারের পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে কয়েক ডজন রুশ ভাড়াটে সেনার মৃত্যু হয়েছে। ‘কারটা ডে মোজাম্বিক’ জানাচ্ছে যে, পূর্ব আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিকে যুদ্ধ করতে গিয়ে পাঁচজন রুশ ভাড়াটে সেনার মৃত্যু হয়েছে। অক্টোবর মাসের শুরুতে মোজাম্বিকে একজন রুশ নাগরিকের মৃত্যুর পর ক্রেমলিন থেকে দাবি করা হয়েছিল যে, মোজাম্বিকে কোন রুশ সেনা নেই।

রাশিয়ার আফ্রিকাতে টিকে থাকার সক্ষমতা কতটুকু, তা নিয়ে প্রশ্ন করছেন অনেকেই। ‘রাশান একাডেমি অব সাইন্সেস’এর ইন্সটিটিউট ফর আফ্রিকান স্টাডিজের ওলগা কুলকোভা রাশিয়ার আফ্রিকায় ফেরত আসাকে রেলগাড়ির শেষ কম্পার্টমেন্টে বসার সাথে তুলনা করেছেন। তিনি বলছেন যে, আফ্রিকাতে রাশিয়াকে চেনে পুরোনো সোভিয়েত প্রজন্মের মানুষগুলি। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের সাথে রাশিয়ার সেই সম্পর্ক নেই। পুরোনো প্রজন্মের প্রস্থানের আগেই রাশিয়াকে সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। তবে সেই সুযোগ রাশিয়ার জন্যে কখনও না-ও আসতে পারে। ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’এর আফ্রিকা প্রোগ্রামের ডিরেক্টর জাড ডেভারমন্ট বলছেন যে, পুরোনো সূত্রে রাশিয়া ‘গ্রেট পাওয়ার প্রতিযোগিতা’য় নেমেছে; কিন্তু এক্ষেত্রে তারা কতটুকু সক্ষমতা রাখে, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। রুশরা জাতিসংঘেও আফ্রিকার দেশগুলিকে নিজেদের পক্ষে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। বিশেষতঃ ইউক্রেনের যুদ্ধের ব্যাপারে জাতিসংঘে যে কোন আলোচনায় রাশিয়া আফ্রিকাতে বন্ধু খুঁজেছে। তবে এই চেষ্টার উদ্দেশ্য নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন করেছেন। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের রিচার্ড গোওয়ান বলছেন যে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার পক্ষে রাশিয়ার দাঁড়ানোর বিষয়টা রাশিয়ার নিজের ‘স্ট্যাটাস’ ঘোষণা করা এবং পশ্চিমা শক্তিদের ত্যাক্ত করার চাইতে বেশি কিছু বলে মনে হয় না। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে পরিবর্তন করার কোন মাস্টার প্ল্যান রাশিয়ার নেই।


Saturday, 24 August 2019

ভেনিজুয়েলার সরকারকে টিকিয়ে রেখেছে কিউবার ইন্টেলিজেন্স?


২৪শে অগাস্ট ২০১৯
অর্থনৈতিক সমস্যায় পতিত হবার পর ভেনিজুয়েলার অর্থনীতি এখন মধ্য আমেরিকার ছোট দেশগুলির আকারে এসে পৌঁছেছে, যদিও দেশটা বিশ্বে বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলির একটা; এবং পৃথিবীর সবচাইতে বড় তেলের রিজার্ভ (প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ব্যারেল) রয়েছে সেখানে। মার্কিন অবরোধ এবং ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে প্রতি মাসে ভেনিজুয়েলার তেল বিক্রির আয় ১৫ শতাংশ করে কমছে। ভেনিজুয়েলা সরকারের ক্ষমতায় টিকে থাকার পিছনে সবচাইতে বড় স্তম্ভ হলো এর সেনাবাহিনী, যা এখনও প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সমর্থন করে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে যে, মাদুরোকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছে কিউবা।



যুক্তরাষ্ট্র বনাম ভেনিজুয়েলা-কিউবা

গত ২৪শে জুলাই ভেনিজুয়েলায় মার্কিন বিশেষ প্রতিনিধি এলিয়ট এব্রামস এক অনুষ্ঠানে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে টিকিয়ে রাখতে বাইরের দেশের হস্তক্ষেপের ব্যাপারে কথা বলেন। তিনি বলেন যে, ভেনিজুয়েলার অর্থনৈতিক অচলাবস্থার মাঝে মাদুরো সরকার ৩৮ মিলিয়ন ডলার খরচ করে সামরিক ইউনিফর্ম কিনেছে। মে মাসে ২’শ ৯ মিলিয়ন ডলার খরচে ভেনিজুয়েলা সরকার রাশিয়ার সহায়তায় তার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ঠিকঠাক করেছে। একইসাথে ৯টা রুশ ‘সুখোই-৩০’ যুদ্ধবিমান আর ৮টা পরিবহণ হেলিকপ্টার ক্রয়ের কথাও হয়েছে রুশদের সাথে। তবে রাশিয়ার ব্যাপারে এব্রামসের কথাগুলিতে নতুন কিছু না থাকলেও তিনি কিউবা নিয়ে যে কথাগুলি বলেছেন, তা অনেককেই অবাক করেছে। তিনি বলেন যে, ভেনিজুয়েলাতে আড়াই হাজার কিউবান ইন্টেলিজেন্স এজেন্ট কাজ করছে। আর এই সুযোগে কিউবা ভেনিজুয়েলা থেকে বিনা খরচে তেলের সরবরাহ পাচ্ছে। এব্রামসের কথার একদিন পরই আরেকজন উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের সাথে টেলিকনফারেন্সের সময় একই ধরনের কথা বলেন। তিনি বলেন যে, কিউবার আর্থিক নেটওয়ার্ক, আয়ের উৎস, তেলের বাণিজ্য – এসকল কিছুর বিরুদ্ধেই মার্কিন সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে। এই ব্যবস্থা আরও কঠোর হবে যদি কিউবানরা ভেনিজুয়েলার সরকারকে সমর্থন দেয়া বন্ধ না করে। আসলেই কি ভেনিজুয়েলায় কিউবার ততটা প্রভাব রয়েছে? মার্কিন চেষ্টার বিরুদ্ধে ভেনিজুয়েলার সরকারকে টিকিয়ে রাখতে কিউবার ভূমিকাই বা কতটুকু?

মার্কিন কর্মকর্তাদের হুমকির পরদিনই কিউবার ‘হাভানা টাইমস’ পত্রিকার এক খবরে বলা হয় যে, কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেল কিউবা ভেনিজুয়েলাকে তার সমর্থন দেয়া অব্যাহত রাখবে। কিউবান বিপ্লবের ৬৬তম বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে দিয়াজ-কানেল বলেন যে, ওয়াশিংটন কিউবার বিদ্যুৎ, পানি, এমনকি বাতাস আটকে দিতে চাইছে যাতে কিউবা ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে সহায়তা দিতে না পারে। মার্কিনীরা কিউবার বন্দরে তেলের জাহাজ ভিড়তে বাধা দিচ্ছে, জাহাজ কোম্পানিগুলিকে ভীতি প্রদর্শন করছে। ভেনিজুয়েলা থেকে কিউবায় তেল নিয়ে যাওয়া কয়েকটা কোম্পানির উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। মার্কিন অবরোধের কারণে জুলাই মাসে কিউবায় পর্যটকের আগমন প্রায় ২৪ শতাংশ কমে গেছে। তবে একইসাথে কিউবার প্রেসিডেন্ট এ-ও বলেন যে, কিউবা ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায়; পারস্পরিক সন্মান প্রদর্শনের ভিত্তিতে নিজেদের বিরোধগুলিকে দেখতে চাচ্ছে কিউবা। তবে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ে মার্কিনীরা যখন কিউবার সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে দেশটাকে নিজেদের প্রভাব বলয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই ট্রাম্প প্রশাসন সেখান থেকে পুরোপুরি উল্টো পথে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। কিউবার সাথে মার্কিনীদের বহু বছরের বিরোধের সূত্রে কিউবা তাদের নিরাপত্তাকে সর্বদাই গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে; বিশেষতঃ তাদের ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের সক্ষমতাকে গড়ে তুলেছে।

‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’এর ফেলো মইজেস নাইম ১৯৯০-এর দশকে ভেনিজুয়েলার সরকারে ছিলেন। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘জি’-জিরো মিডিয়া’র সাথে এক সাক্ষাতে তিনি বলেন যে, অর্থনৈতিক সমস্যায় পতিত হবার পর ভেনিজুয়েলার অর্থনীতি এখন মধ্য আমেরিকার ছোট দেশগুলির আকারে এসে পৌঁছেছে, যদিও দেশটা বিশ্বে বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলির একটা; এবং পৃথিবীর সবচাইতে বড় তেলের রিজার্ভ (প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ব্যারেল) রয়েছে সেখানে। মার্কিন অবরোধ এবং ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে প্রতি মাসে ভেনিজুয়েলার তেল বিক্রির আয় ১৫ শতাংশ করে কমছে। ভেনিজুয়েলা সরকারের ক্ষমতায় টিকে থাকার পিছনে সবচাইতে বড় স্তম্ভ হলো এর সেনাবাহিনী, যা এখনও প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সমর্থন করে যাচ্ছে। এর কারণ হিসেবে মইজেস নাইম বলছেন যে, সেনাবাহিনীর হাতে আর কোন অপশন নেই। এবং একইসাথে মাদুরোকে সমর্থন দিয়ে চলছে কিউবার ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস। ভেনিজুয়েলার অর্থনীতি, রাজনীতি, কূটনীতি – বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিউবার ইন্টেলিজেন্সের প্রভাব এখন ব্যাপক।

গত মে মাসে ‘অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটস’এ এক ভাষণে কিউবা গবেষক মারিয়া সি ওয়েরলাউ বলেন যে, দুর্বল অর্থনীতি এবং ছোট জনসংখ্যা সত্ত্বেও কিউবা বস্তুতঃ ভেনিজুয়েলার দখল নিয়ে নিয়েছে। কোন গুলি খরচ না করেই কিউবা তার চাইতে অনেক বড় এবং অনেক বেশি বিত্তশালী একটা দেশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। ওয়েরলাউ-এর কথাগুলি যে ভিত্তিহীন নয়, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ভেনিজুয়েলার ব্যাপারে কানাডার কূটনৈতিক চেষ্টা দেখে। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড ২২শে অগাস্ট ঘোষণা দেন যে, তিনি কিউবা যাচ্ছেন সেদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদরিগেজের সাথে ভেনিজুয়েলা বিষয়ে কথা বলতে। মে মাস থেকে এটা হবে রদরিগেজের সাথে তার তৃতীয় বৈঠক।

 
ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সাথে ভালো বন্ধুত্ব থাকার কারণে ১৯৯৯ সালে হুগো শাভেজ ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হবার পর ‘জি-২’এর জন্যে নতুন করে দুয়ার খুলে যায়। কিউবা থেকে আসা ডাক্তার, ক্রীড়া প্রশিক্ষক, টেকনিশিয়ান, ইঞ্জিনিয়ারদের মাঝ দিয়েই ‘জি-২’ ভেনিজুয়েলায় তাদের উপস্থিতি গড়ে তোলে। ২০০৭ সালে হুগো শাভেজ বলেন যে, ভেনিজুয়েলাতে ২০ হাজারের বেশি কিউবান ডাক্তার, নার্স এবং টেকনিশিয়ান কাজ করছে। ২০০২ সালে হুগো শাভেজকে ক্ষমতাচ্যুত করার ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টাটাই ছিল দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে টার্নিং পয়েন্ট।



হুগো শাভেজ এবং ফিদেল ক্যাস্ট্রো

‘জিওপলিটিক্যাল মনিটর’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, ‘কিউবান ইন্টেলিজেন্স ডিরেকটরেট’ বা ‘জি-২’-এর শক্তির উৎস হচ্ছে ঠান্ডা যুদ্ধের সময় ১৯৬০-৭০-এর দশকে সোভিয়েত এবং পূর্ব-জার্মানির ইন্টেলিজেন্সের দ্বারা প্রশিক্ষণের ভিত। টানা ছয় দশক যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি অবস্থিত হয়েও সমাজতান্ত্রিক সরকারকে রক্ষা করতে পারার সাথে সাথে ‘জি-২’-এর ভিত আরও শক্ত হয়েছে। ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে হত্যা করার বেশ কয়েকটা চেষ্টাকেও তারা প্রতিহত করেছে বলে শোনা যায়। মধ্য এবং দক্ষিণ আমেরিকার বেশকিছু সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী গ্রুপকে ‘জি-২’ প্রশিক্ষণ দিয়েছে। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং ভিয়েতনামেও তাদের জড়িত থাকার কথা জানা যায়। ১৯৫৯ সালে কিউবায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর থেকেই ‘জি-২’ ভেনিজুয়েলায় প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট হয়েছিল। কিউবা ভেনিজুয়েলার বামপন্থী বিপ্লবীদের সহায়তা করছিল। অন্যদিকে ভেনিজুয়েলার সরকার ছিল বামপন্থা-বিরোধী। তাই এসময়ে দুই দেশের সম্পর্ক সহজ ছিল না। ঠান্ডা যুদ্ধ শেষের পর থেকে কিউবার জ্বালানি নিরাপত্তা শঙ্কার মাঝে পড়ে গেলে ভেনিজুয়েলা কিউবার কাছে আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সাথে ভালো বন্ধুত্ব থাকার কারণে ১৯৯৯ সালে হুগো শাভেজ ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হবার পর ‘জি-২’এর জন্যে নতুন করে দুয়ার খুলে যায়। কিউবা থেকে আসা ডাক্তার, ক্রীড়া প্রশিক্ষক, টেকনিশিয়ান, ইঞ্জিনিয়ারদের মাঝ দিয়েই ‘জি-২’ ভেনিজুয়েলায় তাদের উপস্থিতি গড়ে তোলে। ২০০৭ সালে হুগো শাভেজ বলেন যে, ভেনিজুয়েলাতে ২০ হাজারের বেশি কিউবান ডাক্তার, নার্স এবং টেকনিশিয়ান কাজ করছে। বেসরকারি হিসেবে অনেকে এই সংখ্যাকে ৪০ হাজার বলছেন।

অভিজ্ঞতার দিক থেকে ‘জি-২’ ভেনিজুয়েলার ইন্টেলিজেন্স থেকে অনেক এগিয়ে থাকার কারণেই কিউবা তার নেতৃত্ব ধরে রাখতে পেরেছে। তবে ভেনিজুয়েলার ইন্টেলিজেন্সের মাঝে অনেকেই বামপন্থী-বিরোধী থাকায় তারা ‘জি-২’এর প্রভাবকে পছন্দ করেনি। ২০০২ সালে হুগো শাভেজকে ক্ষমতাচ্যুত করার ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টায় মার্কিনীদের জড়িত থাকার খবর দেয় ব্রিটেনের ‘দ্যা অবজার্ভার’ পত্রিকা। জার্মান মিডিয়া ‘ডিডব্লিউ’ বলছে যে, শাভেজের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানচেষ্টাটাই ছিল দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে টার্নিং পয়েন্ট। ‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ক্যাস্ট্রো এবং শাভেজ ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিতে চুক্তি করেন। চুক্তি মোতাবেক কিউবা ভেনিজুয়েলার সেনাবাহিনী এবং ইন্টেলিজেন্সকে প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করে। প্রথম উদ্দেশ্যই থাকে ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরে শত্রু দেশের ইন্টেলিজেন্সের কর্মকান্ডকে খুঁজে বের করে দমন করা। এই কাজে ভেনিজুয়েলার ইন্টেলিজেন্স ব্যাপক ধরপাকরড় চালায়।

নিরাপত্তা-বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সিএনএ’-এর সিনিয়র এনালিস্ট উইলিয়াম রোজনাউ এবং রালফ এসপাচ ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় বলছেন যে, ছোট দেশ হয়েও কিউবা তার ইন্টেলিজেন্সের বদৌলতে নিজের ওজন বাড়িয়ে নিয়েছে। প্রাক্তন মার্কিন ইন্টেলিজেন্স সদস্য এডওয়ার্ড স্নোডেন-কে ল্যাটিন আমেরিকায় রাজনৈতিক আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দেবার জন্যে কিউবার ইন্টেলিজেন্স মধ্যস্ততা করে। সোভিয়েতদের সাথে কিউবানরাও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর এবং ইন্টেলিজেন্সের ভেতরে ঢুকে পড়ে। স্পেন এবং ল্যাটিন আমেরিকায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলিতেও কিউবানরা কাজ চালিয়ে যায়। ১৯৮০-এর দশকে মধ্য আমেরিকার এল-সালভাদর এবং গুয়াতেমালাতে মার্কিন সমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে গেরিলাদের সহায়তা দেয় ‘জি-২’। ঠান্ডা যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রে ‘জি-২’এর কর্মকান্ড বৃদ্ধি পায়; বিশেষ করে ফ্লোরিডায় ক্যাস্ট্রো-বিরোধী গ্রুপগুলির ব্যাপারে ‘জি-২’ বেশি সক্রিয় ছিল। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ‘এফবিআই’ ১৯৯০ থেকে ২০১০ পর্যন্ত মার্কিন নিরাপত্তা স্থাপনায় বহুদিন ধরে কাজ করা বেশকিছু কিউবার ইন্টেলিজেন্স সদস্যকে গ্রেপ্তার করে এবং আদালতে বিচারও করে। ২০১০ সালে ‘উইকিলিকস’এর ফাঁস করা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তারবার্তার বরাত দিয়ে ‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ কিউবান ইন্টেলিজেন্সের উপদেশেই চলছেন। মার্কিন তারবার্তায় বলা হয় যে, ভেনিজুয়েলার ইন্টেলিজেন্স কিউবার ইন্টেলিজেন্সের মতো সক্ষম নয়; তাই কিউবানরা ভেনিজুয়েলার ইন্টেলিজেন্সকে প্রশিক্ষণও দেয়। স্পেনের পত্রিকা ‘এবিসি’ এক প্রতিবেদনে বলে যে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠকে যোগ দেবার জন্যে মাদুরো যখন নিউ ইয়র্ক যাচ্ছিলেন, তখন তার বিমানে থাকা কিউবানদেরকে মার্কিন সরকার যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি না দেয়ায় মাদুরোর বিমান ভেনিজুয়েলায় ফিরে যায়। ভেনিজুয়েলাকে ব্যবহার করে ‘জি-২’ ল্যাটিন আমেরিকার অন্যান্য দেশ, যেমন ব্রাজিল এবং কলম্বিয়াতে ইন্টেলিজেন্স অপারেশন চালাচ্ছে কিউবা।

তেলের বিনিময়ে নিরাপত্তা

কিউবা ভেনিজুয়েলার কাছ থেকে অর্থনৈতিক সহায়তা পাচ্ছে; আর ভেনিজুয়েলা কিউবা থেকে পাচ্ছে নিরাপত্তা, রাজনৈতিক, কৌশলগত এবং ইন্টেলিজেন্স সহায়তা। ‘ব্রুকিংস ইন্সটিটিউট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০১২ সাল নাগাদ দুই দেশের বাণিজ্য কিউবার জিডিপির ২১ শতাংশে দাঁড়ায়। অথচ সেই তুলনায় এই বাণিজ্য ভেনিজুয়েলার অর্থনীতির মাত্র ৪ শতাংশ ছিল। ভেনিজুয়েলা থেকে কিউবা ১ লক্ষ ৪ হাজার ব্যারেল তেল আমদানি করে ঐ বছরে, যা ছিল ভেনিজুয়েলার মোট জ্বালানি তেলের চাহিদার ৬১ শতাংশ। অথচ কিউবায় রপ্তানি করা তেল ছিল ভেনিজুয়েলার মোট তেল রপ্তানির ৫ শতাংশ। এই তেল ভেনিজুয়েলা কিউবাকে দেয় অতি সুলভ মূল্যে। মাত্র ৬০ শতাংশ মূল্য ৯০ দিনের মাঝে পরিশোধ করতে হয়; বাকিটা ২৫ বছরে ১ শতাংশ সুদে পরিশোধযোগ্য। অন্যদিকে কিউবা থেকে আসা ডাক্তার-প্রশিক্ষক-টেকনিশিয়ানরা ভেনিজুয়েলার সামাজিক উন্নয়নের দায়িত্ব নিয়েছে। ভেনিজুয়েলার মানুষ উচ্চতর চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে কিউবাতে। আবার হাজার হাজার ভেনিজুয়েলান ছাত্র মেডিক্যাল বিষয়ে পড়াশোনা করছে কিউবাতে।

এর বিনিময়ে কিউবাকে ভেনিজুয়েলা কতটা আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে, তা সঠিক মূল্যায়ন করা কঠিন। তবে তেলের বিনিময়ে ভেনিজুয়েলাকে নিরাপত্তা সহায়তা দিচ্ছে কিউবা। ভেনিজুয়েলার জনগণের বায়োমেট্রিক ডাটাবেস তৈরি করে দিচ্ছে কিউবান সরকারি কোম্পানি। হুগো শাভেজের ক্যান্সার ধরা পড়ার পর তার চিকিৎসাও হয়েছে কিউবাতে – ব্যাপক নিরাপত্তার মাঝে। ২০১৩ সালে শাভেজ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার মন্ত্রীসভার বৈঠকগুলি কিউবাতেই করতেন। ‘রয়টার্স’এর প্রতিবেদন বলছে যে, কিউবার ইন্টেলিজেন্সের সহায়তার কারণেই মাদুরো ক্ষমতায় টিকে গেছেন। ব্যাপক অর্থনৈতিক ধ্বস এবং ৪০ লক্ষ মানুষের দেশত্যাগের পরেও কিউবানদের প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী মাদুরোর বিরুদ্ধে যায়নি। ভেনিজুয়েলার ইন্টেলিজেন্সের একসময় দায়িত্ব ছিল গণতন্ত্র রক্ষা। কিউবানদের প্রশিক্ষণের পর নতুন দায়িত্ব দাঁড়ায় সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা। এবছরের শুরুতে ভেনিজুয়েলার বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদো নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন এবং সেনাবাহিনীকে মাদুরোর বিরুদ্ধে যাবার জন্যে অনুরোধ করেন। যুক্তরাষ্ট্র গুয়াইদোর কথায় সমর্থন দিলেও ভেনিজুয়েলার সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে কোন সাড়াই মেলেনি।
মধ্য আমেরিকায় ভেনিজুয়েলার তেলের বিনিময়ে কিউবা প্রভাব বিস্তারের একটা সুযোগ পেয়েছে। বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্থার মাঝেও কিউবা তার স্থান করে নিচ্ছে। মার্কিন প্রভাবে থাকা সংস্থাগুলিকে কিউবা অকার্যকর করে দিচ্ছে। ২০০১ সালে বিশ্বব্যাপী তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ কারণে ল্যাটিন আমেরিকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টি সড়ে যাবার পরই যুক্তরাষ্ট্রকে বাইপাস করে বিভিন্ন সংগঠন তৈরি হতে থাকে। কিউবা-ভেনিজুয়েলার একত্রে কাজ করার কারণে পুরো আমেরিকাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমছে প্রতি নিয়ত। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমার সাথে এটা সাংঘর্ষিক নয়। 



আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াচ্ছে কিউবা

‘ব্রুকিংস ইন্সটিটিউট’এর প্রতিবেদন বলছে যে, কিউবা এবং ভেনিজুয়েলার মাঝে ‘বলিভারিয়ান’ সহযোগিতাকে পুরো ল্যাটিন আমেরিকা এবং মধ্য আমেরিকায় ছড়িয়ে দিতে চাইছে কিউবা। ২০০৫ সালের ‘পেট্রোক্যারিব’ প্রকল্পের মাধ্যমে ভেনিজুয়েলার তেল শুধু কিউবা নয়, ক্যারিবিয়ানের দ্বীপ দেশগুলি এবং মধ্য আমেরিকার দেশগুলির বেশিরভাগের কাছেই যাওয়া শুরু করেছিল। মোট ১৫টা দেশ এই চুক্তির অধীনে সাশ্রয়ী মূল্যে ভেনিজুয়েলার তেল পাচ্ছিলো। এভাবে মধ্য আমেরিকায় ভেনিজুয়েলার তেলের বিনিময়ে কিউবা প্রভাব বিস্তারের একটা সুযোগ পেয়েছে। বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্থার মাঝেও কিউবা তার স্থান করে নিচ্ছে। যেমন ‘অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটস’এর মতো মার্কিন প্রভাবে থাকা সংস্থাগুলিকে কিউবা অকার্যকর করে দিচ্ছে। এধরনের সংস্থাগুলির প্রধান এজেন্ডা হচ্ছে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার, যেগুলি ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশই এড়িয়ে যেতে চায়। ২০০১ সালে বিশ্বব্যাপী তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ কারণে ল্যাটিন আমেরিকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টি সড়ে যাবার পরই যুক্তরাষ্ট্রকে বাইপাস করে বিভিন্ন সংগঠন তৈরি হতে থাকে। কিউবা সরাসরি জড়িত থেকে অথবা ভেনিজুয়েলার মাধ্যমে এসব ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ভেনিজুয়েলার হুগো শাভেজের চেষ্টায় ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা বাদে পুরো আমেরিকার বাকি ৩৩টা দেশকে নিয়ে ‘কমিউনিটি অব ল্যাটিন আমেরিকান এন্ড ক্যারিবিয়ান স্টেটস’ গঠন করা হয়। ২০০৮ সালে গঠন করা হয় ‘ইউনিয়ন অব সাউথ আমেরিকান নেশনস’ (যদিও কিউব এর সদস্য নয়), যেটাকে আবার ‘বামপন্থী’ আখ্যা দিয়ে মার্কিন প্রভাবে থাকা বেশ কয়েকটা দেশ ২০১৮-১৯ সালে সেখান থেকে বের হয়ে যায়।

রোজনাউ এবং এসপাচ তাদের প্রতিবেদনে লিখছেন যে, কিউবা নিশ্চিতভাবেই তার ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্ককে কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ে ব্যবহার করছে। কোন রাষ্ট্রই বিনা কারণে ইন্টেলিজেন্স তথ্য যোগাড় করে না। আর গোপন তথ্য যোগাড় করার খরচও তো যোগাতে হবে। কিউবা মার্কিনীদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলির সাথে ইন্টেলিজেন্সের তথ্য আদান-প্রদান করে তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন সুবিধা আদায় করতে পারে। কিউবানরা মার্কিন নিরাপত্তা, ইন্ডাস্ট্রি, বাণিজ্য এবং প্রযুক্তি সম্পর্কে তথ্য যোগাড় করে সেগুলি মার্কিনীদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ, যেমন - রাশিয়া, চীন এবং অন্যান্য দেশের সাথে বাণিজ্য করতে পারে।

ভেনিজুয়েলা বন্ধু খুঁজছে

কিছুদিন আগেই মাদুরো সরকারকে উৎখাত করার জন্যে মার্কিনীরা ভেনিজুয়েলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্তাব্যক্তিদের সাথে কথা চালিয়ে যায়। পরবর্তীতে এই অভ্যুত্থান চেষ্টা ভেস্তে গেলেও মাদুরো অভ্যুত্থান চেষ্টার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের কিছু করেননি অথবা করতে পারেননি। এর স্বপক্ষে যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে যে, অভ্যুত্থানের চেষ্টাকারীরা ভেনিজুয়েলার সমাজে এতটাই প্রভাশালী যে, মাদুরো তাদেরকে আটক করা বা তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেবার চেষ্টাই করতে পারেননি। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলছেন যে, মাদুরোর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানচেষ্টা ভেস্তে যাবার একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো মোক্ষম সময়ে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ। রাশিয়ার পাঠানো সেনারা ভেনিজুয়েলার ক্ষমতার সমীকরণে অনিশ্চয়তা জুড়ে দিলে অভ্যুত্থান ভেস্তে যায়। রুশ সরকার দরকারমতো সহায়তা দিলেও কিউবানরা মাদুরোর সাথে আঠার মতোই লেগে আছে।

২১শে অগাস্ট ভেনিজুয়েলা উত্তর কোরিয়াতে তার দূতাবাস খুলেছে। উত্তর কোরিয়ার উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সাথে ভেনিজুয়েলা সরকার নিজেদের অবস্থানের অভিন্নতা খুঁজছে; উদ্দেশ্য – বহিঃবিশ্বে সমর্থন খোঁজা। এর কয়েকদিন আগেই ১৫ই অগাস্ট ভেনিজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ মস্কো সফর করেন। রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু ভেনিজুয়েলার সরকারের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি এবং মার্কিন চাপের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার জন্যে রুশ সমর্থনের কথা মনে করিয়ে দেন। এই বছরেই রুশ প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তারা কমপক্ষে দু’বার ভেনিজুয়েলা সফর করেন। তবে ভেনিজুয়েলাকে সমর্থন দেবার ক্ষেত্রে পুরোনো বন্ধুরাও শক্ত অবস্থানে থাকতে পারছে না। ১৯শে অগাস্ট ‘রয়টার্স’ বলছে যে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপে চীনা তেল কোম্পানি ‘চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন’ বা ‘সিএনপিসি’ অগাস্ট মাসে ভেনিজুয়েলার তেল আমদানি স্থগিত করেছে। ভেনিজুয়েলা তেল সরবরাহের বিনিময়ে চীনাদের কাছ থেকে বড় অংকের ঋণ পেয়েছে। ভেনিজুয়েলার বেশিরভাগ তেলের ক্রেতাই চীন। সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিং-এ মার্কিন দূতাবাসের সাথে ‘সিএনপিসি’র আলোচনার পরই এই সিদ্ধান্ত এলো। অথচ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিকোলাস মাদুরোর বন্ধুর প্রয়োজনীয়তা এখন সর্বোচ্চ।

ভেনিজুয়েলায় প্রভাব বিস্তার কিউবার জন্যে সবচাইতে বড় ভূকৌশলগত সাফল্য। যুক্তরাষ্ট্রের উঠানে ছয় দশক ধরে সমাজতান্ত্রিক সরকারকে টিকিয়ে রাখার পর ভেনিজুয়েলার সরকারকেও টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব নিয়েছে কিউবা। ছোট্ট কিউবার পক্ষে পশ্চিম গোলার্ধে শক্তিধর দেশগুলিকে ব্যালান্সে রাখাটা নয়া বিশ্ব ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হবার ইঙ্গিত। 


কিউবার সাফল্য যা ইঙ্গিত দিচ্ছে

ভেনিজুয়েলার জনস্যংখ্যা কিউবার প্রায় তিন গুণ; ৩ কোটি ২০ লাখ বনাম ১ কোটি ১৫ লাখ। অর্থনৈতিক দিক থেকেও একইরকম গল্প। ভেনিজুয়েলার জিডিপি ২০১৪ সালে ছিল ৪’শ ৮২ বিলিয়ন ডলার; আর কিউবার ছিল ৮১ বিলিয়ন ডলার; অর্থাৎ প্রায় ৬ গুণ। (এখন অবশ্য ভেনিজুয়েলার অর্থনীতি পঙ্গু।) ‘জিওপলিটিক্যাল মনিটর’এর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ভেনিজুয়েলায় প্রভাব বিস্তার কিউবার জন্যে সবচাইতে বড় ভূকৌশলগত সাফল্য। যুক্তরাষ্ট্রের উঠানে ছয় দশক ধরে সমাজতান্ত্রিক সরকারকে টিকিয়ে রাখার পর ভেনিজুয়েলার সরকারকেও টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব নিয়েছে কিউবা। কিউবার ‘জি-২’এর সাফল্য বলছে যে, শুধু বড় রাষ্ট্রগুলিই নয়, ছোট রাষ্ট্রও শক্তিশালী ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস তৈরি করতে সক্ষম, যদি তার জনগোষ্ঠির সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশটা চিন্তার দিক থেকে অন্যদের তুলনায় এগিয়ে থাকে। ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহারের মাধ্যমে যে আন্তর্জাতিক ব্যালান্স অব পাওয়ার পরিবর্তন সম্ভব, তা কিউবার কর্মকান্ডই প্রমাণ দেয়। পশ্চিম গোলার্ধে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, এবং অন্যান্য শক্তিধর দেশগুলিকে ব্যালান্সে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে কিউবা।

কিউবার সাফল্য প্রথমতঃ দেখিয়ে দিচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি অবস্থান করেও ঐতিহ্যগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের মাঝে থাকা দেশগুলিতে কিউবা প্রভাব বিস্তার করছে। ভেনিজুয়েলার মাদুরো সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোটা যুক্তরাষ্ট্রের অত্র অঞ্চলে প্রভাব ধরে রাখার জন্যে অতি জরুরি। কিউবা-ভেনিজুয়েলার একত্রে কাজ করার কারণে পুরো আমেরিকাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমছে প্রতি নিয়ত। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমার সাথে এটা সাংঘর্ষিক নয়। 
দ্বিতীয়তঃ চিন্তাগত দিক থেকে এগিয়ে থাকার কারণে শুধু ভেনিজুয়েলা নয়, পুরো এলাকায় কিউবা প্রাধান্য বিস্তার করে চলেছে। আকারে ছোট হলেও একটা আদর্শিক ভিতের উপর দাঁড়িয়ে থাকার কারণে কিউবা এটা করতে পারছে। বাকি বিশ্বের জন্যে এটা একটা উদাহরণ বটে – চিন্তাগত উতকর্ষতা থাকলে ছোট দেশও সুপারপাওয়ারের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম। 
তৃতীয়তঃ কিউবা পশ্চিম গোলার্ধে ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতাকে আরও উস্কে দিচ্ছে। কিউবার ইন্টেলিজেন্স যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগী রাশিয়া, চীন এবং অন্যান্য দেশকে ইন্টেলিজেন্স সহায়তা দিয়ে এই প্রতিযোগিতাকে আরও ঘনীভূত করতে যাচ্ছে। 
চতুর্থতঃ ছোট্ট কিউবার পক্ষে পশ্চিম গোলার্ধে শক্তিধর দেশগুলিকে ব্যালান্সে রাখাটা নয়া বিশ্ব ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হবার ইঙ্গিত।

Tuesday, 20 August 2019

কাশ্মির – আবার অগ্নুৎপাতের অপেক্ষায় ভূরাজনৈতিক অগ্নিগিরি


কাশ্মিরের পরিস্থিতির জন্যে মূলতঃ দায়ী অত্র অঞ্চলের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময়ের চিন্তাগুলি। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় অবিভক্ত ভারতের ৪০ শতাংশ এলাকা ছিল বিভিন্ন রাজন্যদের হাতে; কাশ্মির ছিল এরকমই একটা রাজ্য। এই রাজ্যগুলির শাসকরা বিভিন্ন চুক্তির বদৌলতে ব্রিটিশ অধীনতা মেনে চলতো। ব্রিটিশ-পরবর্তী জাতীয়তাবাদী ভারতে কাশ্মিরকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের পতাকাতলে আনার চেষ্টা করা হয়েছে, যা কিনা হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের আমলে কঠোর আকার ধারণ করে। তবে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্যে বলপ্রয়োগের পদ্ধতিগুলি ব্রিটিশ সময় থেকে বিজেপির সময় পর্যন্ত খুব একটা পরিবর্তিত হয়নি। 
২১শে অগাস্ট ২০১৯


ভারতের সংবিধানের ‘আর্টিকেল ৩৭০’এর মাধ্যমে কাশ্মিরকে আলাদা কিছু সুবিধা দেয়া হতো; যেমন পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রতিরক্ষা ছাড়া বাকি ব্যাপারগুলিতে ভারত সরকার হস্তক্ষেপ করবে না। তবে ভারতের ইতিহাস নিয়ে গবেষক করা লেখক জন উইলসনের মতে, এই আর্টিকেল কাশ্মিরকে ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে আলাদা কোন সুবিধা দিত কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকারের নির্বাচনী ওয়াদা মোতাবেক এই আর্টিকেল বাতিল ঘোষণার পর থেকে কাশ্মিরে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে। বন্ধ রাখা হয়েছে ইন্টারনেট এবং মিডিয়া। ‘বিবিসি’র ভিডিও প্রতিবেদনে দেখা যায় যে শ্রীনগরে শুক্রবার জুমআর নামাজের পর ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের উপর কাঁদানে গ্যাস এবং গুলি ব্যবহার করছে। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, হাসপাতালগুলিতে নেই কোন স্টাফ; আর প্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনতে রাস্তায় বের হলেই জনগণের উপর চলছে নিরাপত্তা বাহিনীর মারধর। ‘এনডিটিভি’র প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ১২ই অগাস্ট ঈদ-উল-আজহার দিন শ্রীনগরের মসজিদগুলি বন্ধ করে রাখা হয়েছিল; ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হতে দেয়া হয়নি।

‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, কাশ্মিরের এহেন পরিস্থিতির জন্যে মূলতঃ দায়ী অত্র অঞ্চলের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময়ের চিন্তাগুলি। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় অবিভক্ত ভারতের ৪০ শতাংশ এলাকা ছিল বিভিন্ন রাজন্যদের হাতে; কাশ্মির ছিল এরকমই একটা রাজ্য। এই রাজ্যগুলির শাসকরা বিভিন্ন চুক্তির বদৌলতে ব্রিটিশ অধীনতা মেনে চলতো। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা ব্রিটিশদের আনুগত্য করেছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার তাদের স্বায়ত্বশাসন মেনে নিয়েছে। ব্রিটিশ-পরবর্তী জাতীয়তাবাদী ভারতে কাশ্মিরকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের পতাকাতলে আনার চেষ্টা করা হয়েছে, যা কিনা হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের আমলে কঠোর আকার ধারণ করে। তবে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্যে বলপ্রয়োগের পদ্ধতিগুলি ব্রিটিশ সময় থেকে বিজেপির সময় পর্যন্ত খুব একটা পরিবর্তিত হয়নি।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত বিভাগের সময় কাশ্মিরের হিন্দু রাজা হরি সিং কাশ্মিরকে ভারতের অংশ হিসেবে ঘোষণা দেন, যদিও বর্তমান কাশ্মিরের প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখের মতো জনসংখ্যার প্রায় ৯৭ শতাংশই মুসলিম। কাশ্মিরের হিন্দু রাজাদের শুরু ১৮৪৬ সালে; যখন প্রথম এংলো-শিখ যুদ্ধে শিখদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয়ের পর ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হেনরি লরেন্স-এর অনুগত দোগরা রাজপুত বংশীয় গুলাব সিং-কে ৭৫ লক্ষ রুপির বিনিময়ে সিন্ধু নদের পূর্ব এবং রাভি নদীর পশ্চিম পাড়ের মাঝের কাশ্মির উপত্যকা নামের পাহাড়ি এলাকাটার রাজত্ব দিয়ে দেয়া হয়। অমরিতসরের চুক্তির মাধ্যমে কাশ্মির ব্রিটিশদের অধীনে আলাদা রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের সময় কাশ্মিরের দোগরা রাজারা বিপ্লব দমনে ব্রিটিশদেরকে যথাসাধ্য সহায়তা করেছিলেন।

১৯৪৭ সালে ভারতের অংশ হবার সিদ্ধান্ত নেবার আগে রাজা হরি সিং কাশ্মিরের জনগণের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেননি। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পাকিস্তান প্রান্তের পুশতুন গোত্রীয় মিলিশিয়ারা কাশ্মির আক্রমণ করলে ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন রাজাকে ভারতের কাছে নতি স্বীকার করতে বলেন। সেই হিসেবে ১৯৪৭ সালের ২৬শে অক্টোবর রাজা হরি সিং কাশ্মিরকে ভারতের অংশ হিসেবে মেনে নিয়ে চুক্তি সই করেন। তখন কাশ্মিরের অংশ হিসেবে ছিল জম্মু, কাশ্মির, উত্তরের গিলগিট-বালতিস্তান, লাদাখ, ট্রান্স-কারাকোরাম এবং আকসাই চিন। ব্রিটিশ ভারতের সীমারেখার ভাগবাটোয়ারার উপরেই শুরু হয় ১৯৪৭-৪৮ সালের প্রথম পাক-ভারত যুদ্ধ। ১৯৪৮ সালে ১৩ই অগাস্টের জাতিসংঘ ঘোষণার মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ হয়। কাশ্মিরের দুই-তৃতীয়াংশ দেয়া হয় ভারতকে; আর বাকি এক-তৃতীয়াংশ পাকিস্তানকে দেয়া হয়। এই যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে পাকিস্তান কাশ্মির থেকে তাদের নিয়মিত এবং অনিয়মিত বাহিনী সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। অল্পসংখ্যক সেনা মোতায়েনের বদলে কাশ্মিরের বেশিরভাগটার নিয়ন্ত্রণ দেয়া হয় ভারতকে। তবে এখনও পাকিস্তান পুরো কাশ্মিরকে নিজের বলে মনে করে; ভারতও একই নীতিতে রয়েছে। আর অন্যদিকে আকসাই চিন অংশটার দাবিদার হলো চীন।
কাশ্মিরের কিছু ভৌগোলিক বাস্তবতা পাকিস্তান-ভারতকে আটকে রেখেছে। পাকিস্তান-অধিকৃত আজাদ কাশ্মির থেকে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের দূরত্ব মাত্র ৬৭ কিঃমিঃ। এর মাঝের অংশটা বেশ দুর্গম হলেও তা পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যে হুমকি। কাশ্মিরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তা দিয়ে পাকিস্তান তার ‘কৌশলগত গভীরতা’ বৃদ্ধি করতে চায়। অন্যদিকে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লী থেকে কাশ্মিরের শ্রীনগরের সড়কপথে দূরত্ব ৯শ’ ১৪ কিঃমিঃ। এই দূরত্ব বেশি মনে হলেও এর মাঝে প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা নেই তেমন। অর্থাৎ কাশ্মিরের নিয়ন্ত্রণ ভারতের হাতে না থাকলে দিল্লীর নিরাপত্তা হুমকির মাঝে পড়বে। একারণেই দিল্লীর চিন্তাবিদেরা কাশ্মিরকে পাকিস্তানের অংশ তো নয়ই, কোন প্রকারের স্বাধীনও দেখতে চান না। 



কাশ্মিরকে বলা যায় ভূরাজনৈতিক অগ্নিগিরি। এই অঞ্চলে ১৯৪৭, ১৯৬৫, ১৯৭১ এবং ১৯৯৯ সালে সংঘটিত হয়েছে চারটা পাক-ভারত যুদ্ধ। ১৯৮৯ সাল থেকে পাকিস্তানের সমর্থনে কাশ্মিরে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছে; আর ভারত বলছে পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদের ইন্ধনদাতা। এবছরের ফেব্রুয়ারিতেও পুলওয়ামায় জঙ্গী হামলার পর আরেকটা ছোটখাটো পাক-ভারত সংঘর্ষ হয়ে গেছে। শুধু ভারত-পাকিস্তানই নয়, আকসাই চিন-এর দাবি করা চীনও পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। ‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’এর বিশ্লেষক কেভিন এলিসন বলছেন যে, মোদি সরকারের এই ঘোষণায় কাশ্মির নিয়ে পাক-ভারত উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে। পাকিস্তান বলছে যে, ভারতের এই ঘোষণায় কাশ্মিরের পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলছেন যে, এই ঘোষণা ভারত সরকারের একটা কৌশলগত ভুল। অন্ততঃ কাশ্মিরের নরমপন্থী রাজনীতিবিদদের গ্রেপ্তারি পরওয়ানা পর সেটাই মনে হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে ৬ই অগাস্ট পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারেল আসিফ ঘাফুর বলেন যে, পাকিস্তান ভারতীয় সংবিধানের ‘আর্টিকেল ৩৭০’কে কখনোই স্বীকৃতি দেয়নি; কারণ এই আর্টিকেল কাশ্মিরকে ভারতের অংশ হিসেবে মনে করিয়ে দেয়। কেভিন এলিসন বলছেন যে, কাশ্মিরের জনগণ স্বভাবগতভাবেই নিজেদের মুক্ত দেখতে যায়, যা ভারত সরকার সহজে এড়িয়ে যেতে পাববে না। আর এই আর্টিকেল-ই এতকাল কাশ্মিরের জনগনের একটা বড় অংশকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে জড়ানো থেকে দূরে রেখেছিল। এখন কাশ্মিরের বাইরের জনগণও কাশ্মিরে জমি কিনতে পারবে, যা কিনা কাশ্মিরের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে চ্যালেঞ্জ করবে, এবং উত্তেজনা বাড়াবে।

কাশ্মিরের কিছু ভৌগোলিক বাস্তবতা পাকিস্তান-ভারতকে আটকে রেখেছে। পাকিস্তান-অধিকৃত আজাদ কাশ্মির থেকে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের দূরত্ব মাত্র ৬৭ কিঃমিঃ। এর মাঝের অংশটা বেশ দুর্গম হলেও তা পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যে হুমকি। ‘দ্যা ডিপ্লোম্যাট’ ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, কাশ্মিরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তা দিয়ে পাকিস্তান তার ‘কৌশলগত গভীরতা’ বৃদ্ধি করতে চায়। অন্যদিকে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লী থেকে কাশ্মিরের শ্রীনগরের সড়কপথে দূরত্ব ৯শ’ ১৪ কিঃমিঃ। এই দূরত্ব বেশি মনে হলেও এর মাঝে প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা নেই তেমন। অর্থাৎ কাশ্মিরের নিয়ন্ত্রণ ভারতের হাতে না থাকলে দিল্লীর নিরাপত্তা হুমকির মাঝে পড়বে। একারণেই দিল্লীর চিন্তাবিদেরা কাশ্মিরকে পাকিস্তানের অংশ তো নয়ই, কোন প্রকারের স্বাধীনও দেখতে চান না। বিজেপির বিরোধী দল কংগ্রেস ‘আর্টিকেল ৩৭০’ বাদ দেয়ার সমালোচনা করলেও ভারতের বেশিরভাগ মানুষই ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ তকমা পাবার ভয়ে তেমন কিছু বলতে নারাজ।

অন্যদিকে কাশ্মিরে রয়েছে চীনের স্বার্থ। পাকিস্তানের মাঝ দিয়ে তৈরি হচ্ছে ‘চায়না-পাকিস্তান ইকনমিক করিডোর’ বা ‘সিপিইসি’, যা আরব সাগরে গোয়াদর সমুদ্রবন্দর থেকে চীনের পশ্চিমাঞ্চলের উইঘুর বা শিনজিয়াং প্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ‘সিপিইসি’র মাধ্যমে চীন পূর্ব এশিয়ার মালাক্কা প্রণালীকে বাইপাস করে এবং মার্কিন নৌবাহিনীকে এড়িয়ে তার জ্বালানি তেলের সরবরাহ পাওয়া নিশ্চিত করতে চাইছে। ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতাতে এই ‘সিপিইসি’ চীনের জন্যে কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। অন্যদিকে পাকিস্তান এই প্রকল্প চাইছে তার অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে। ‘সিপিইসি’-কে তার নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে দেখে বলেই বালুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদেরকে ভারত সরকার সমর্থন দিয়েছে। ‘সিপিইসি’ চীনে পৌঁছাবার আগে পাকিস্তান-অধিকৃত আজাদ কাশ্মিরের উপর দিয়ে যাচ্ছে। ভারত-অধিকৃত কাশ্মির থেকে এই ‘সিপিইসি’র এর দূরত্ব ইসলামাবাদের কাছাকাছি ১’শ কিঃমিঃ-এর মতো। চীন শুধু এ-ই দেখতে চায় যে ‘সিপিইসি’র নিরাপত্তা যেন হুমকির মাঝে না পড়ে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশির আহ্বানে ১৬ই অগাস্ট জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বদ্ধদুয়ার বৈঠকে চীনের রাষ্ট্রদূত ঝ্যাং জুন বলেন যে, ভারতের সংবিধানে পরিবর্তনের ফলে এই অঞ্চলের শান্তি বিঘ্নিত হতে যাচ্ছে। চীন এক্ষেত্রে সকল পক্ষকে রয়েসয়ে চলার উপদেশ দিচ্ছে। কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ‘ব্লুমবার্গ’ বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ফ্রান্সের বিরোধিতার কারণে নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে ঐকমত্যে পৌঁছে এই উপদেশ দেয়া সম্ভব হয়নি।

কাশ্মির ইস্যু বিশ্বব্যাপী মুসলিম জনগোষ্ঠীর একাত্মতা প্রকাশের একটা মাধ্যম। তবে মুসলিম দেশগুলির নেতৃত্ব এই ইস্যুতে ততটা সক্রিয় কিনা, তা প্রশ্ন করাই যায়। ৮ই অগাস্ট সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সূত্রের বরাত দিয়ে ‘গালফ নিউজ’ জানায় যে, সৌদি সরকার কাশ্মিরের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন, এবং সেখানে কোন সহিংসতা হোক, তারা তা চাচ্ছেন না। আর এব্যাপারে জাতিসংঘের চুক্তিগুলিকে মেনে চলতেই তারা উপদেশ দিচ্ছেন। ২০১৮ সালে ভারতের সাথে সৌদি আরবের বাণিজ্য ছিল সাড়ে ২৭ বিলিয়ন ডলার; যা হয়তো ভারতের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে যাওয়া থেকে সৌদি সরকারকে বাধা দিতে পারে। অন্যদিকে ১৭ই অগাস্ট তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, তারা চাইছেন যে জাতিসংঘ কাশ্মির ইস্যুতে আরও অগ্রগামী ভূমিকা নিক। আগের দিন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এব্যাপারে আলোচনা হওয়াকেই তুরস্ক সরকার ভালো দিক বলে দেখছে। মুসলিম বিশ্বের নেতৃস্থানীয় দুই দেশের জাতিসংঘের উপর নির্ভরশীলতাই জানিয়ে দিচ্ছে যে, ১৬ই অগাস্ট নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক থেকে তেমন কিছু না আসাটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অন্যদিকে ১৪ই অগাস্ট পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মিরে যেকোন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ভারতকে সাবধান করেন। তিনি বলেন যে, ভারত যদি আজাদ কাশ্মিরে সামরিক হস্তক্ষেপ করে, তাহলে পাকিস্তান তার উচিৎ জবাব দেবে। ভারতীয় অধিকৃত কাশ্মিরের ব্যাপারে পাকিস্তান অবশ্য জাতিসংঘের দিকেই তাকিয়ে। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, পাকিস্তান সরাসরি ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে না জড়াতে চাইলেও কাশ্মিরের উত্তেজনা পাক-ভারত প্রক্সি যুদ্ধকে আবারও উস্কে দিতে পারে। আর সেটার উপর ভর করে বিশ্বব্যাপী মুসলিম আবেগকে নেতৃত্বস্থানীয়রা জনমত আদায়ে ব্যবহার করতে পারেন।

‘আর্টিকেল ৩৭০’ বাতিল করার পর আপাততঃ নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা বাড়বে বলেই বিশ্লেষকরা মনে করছেন। দীর্ঘ মেয়াদে কাশ্মিরের উপর ভারত সরকারের আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করবে এই ঘোষণা। তবে স্বল্প মেয়াদে কাশ্মিরে ভারত-বিরোধী চিন্তা দানা বাধার সম্ভাবনাই বেশি, যা কিনা দীর্ঘ মেয়াদে মোদির সফলতাকে চ্যালেঞ্জ করবে। আর কাশ্মিরে সহিংসতা বৃদ্ধি মানেই পাক-ভারত উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে। মুসলিম বিশ্বে কাশ্মির ইস্যুতে আবেগ থাকলেও মুসলিম দেশগুলির নেতৃত্ব ভারতের বিরুদ্ধে বিশেষ কিছু করা থেকে বিরত থাকবে। এই আর্টিকেল বাতিলের ঘটনা চীনের ‘সিপিইসি’ বা আকসাই চিন-কে আপাততঃ চ্যালেঞ্জ করবে না; তাই চীনও এব্যাপারে বিশেষ কিছু করা থেকে বিরত থাকবে। পশ্চিমারাও ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া বাস্তবতার উপর প্রতিষ্ঠিত ‘স্থিতাবস্থা’কে পরিবর্তন করতে চায় না বলেই এব্যাপারে খুব বেশি কিছু করবে না। কাশ্মিরের জনগণের কষ্টকে নয়, বরং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং জাতীয় স্বার্থকেই প্রাধান্য দেবে সবাই।

Saturday, 27 July 2019

নেপালের একটা নৌবাহিনী থাকা উচিৎ

২৮শে জুলাই ২০১৯
  
  
নেপালের চ্যালেঞ্জকে বুঝতে হলে নেপালের দিক হতে বিশ্বকে দেখতে হবে। মানচিত্রকে উল্টো করে, অর্থাৎ দক্ষিণ দিককে মানচিত্রের উপরের দিকে রেখে দেখা হয়। দক্ষিণে নেপালের এই দৃষ্টিই বলে দেবে নেপাল আসলে কি দেখতে পাচ্ছে, আর কি চাইছে। নেপালের প্রয়োজন সমুদ্র বাণিজ্যের। নেপালের থাকতে পারে একটা মার্চেন্ট মেরিন ফ্লিট। আর সেই ফ্লিটের নিরাপত্তা দেয়ার জন্যে তাদের একটা নৌবহরও থাকতে পারে।


নেপালের সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের এঁকে দেয়া মানচিত্র। দেশটাকে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে তা সারাজীবন ভারতের উপর নির্ভরশীল থাকে। মদেশী আন্দোলনকে ব্যবহার করে ভারত নেপালের উপর অঘোষিত অবরোধ দেবার পরেও নেপাল ভারতের উপর থেকে নির্ভরশীলতা কমাতে পারেনি। নেপালের উত্তরে রয়েছে হিমালয় পর্বত; যার উত্তরে চীনের তিব্বত। ভারতের নিষেধাজ্ঞাকে এড়িয়ে চীন নেপালকে সহায়তা করতে উদ্দ্যত হলেও হিমালয়ের বাস্তবতাকে এড়াতে পারেনি চীন। কিছুদিনের জন্যে চীন নেপালের জন্যে আশা জাগালেও শেষ পর্যন্ত ভারতের গ্রাস থেকে বের হতে পারেনি দেশটা। নেপালের এই চ্যালেঞ্জকে বুঝতে হলে নেপালের দিক হতে বিশ্বকে দেখতে হবে। মানচিত্রে দেশগুলিকে সাধারণতঃ যেভাবে দেখানো হয়, তাতে একেকটা দেশের নিজস্ব দৃষ্টিকে বোঝা যায় না। নেপালের ক্ষেত্রে এর কিছুটা উপলব্ধি করা সম্ভব যদি এর মানচিত্রকে উল্টো করে, অর্থাৎ দক্ষিণ দিককে মানচিত্রের উপরের দিকে রেখে দেখা হয়। যেহেতু উত্তরের হিমালয়কে অতিক্রম করাটা অতি দুরূহ কাজ, তাই হিমালয়কে পিছনের দেয়াল মনে করেই নেপাল দৃষ্টি দেয় দক্ষিণে।

দক্ষিণে নেপালের এই দৃষ্টিই বলে দেবে নেপাল আসলে কি দেখতে পাচ্ছে, আর কি চাইছে। নেপালের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশটার জনগণকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনতে হলে নেপালকে বাইরের দুনিয়ার সাথে যোগাযোগ করার সুযোগ দিতে হবে। বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্যে স্থলপথে নেপালকে যুক্ত হতে হবে আশেপাশের দেশগুলির সাথে। আর এক্ষেত্রে নেপাল থেকে দক্ষিণে তাকালে ভারত-বাংলাদেশই প্রথমে চোখে পড়বে। এই দুই দেশই যে নেপালের সাথে সকল ধরনের বাণিজ্য করবে, তা যুক্তিযুক্ত হতে পারে না। এর বাইরে অন্য দেশের সাথেও নেপালকে বাণিজ্যের অধিকার দিতে হবে। আর সেক্ষেত্রে নেপালের প্রয়োজন সমুদ্র বাণিজ্যের। স্থলবেষ্টিত একটা দেশের জন্যে সমুদ্র পর্যন্ত পৌঁছানো একটা চ্যালেঞ্জই বটে। এতদিন সমুদ্রে পৌঁছতে গেলে নেপালের জন্যে ভারতের উপর নির্ভর করা ছাড়া কোন গতি ছিল না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করতে পারার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে নেপালের জন্যে।

পুরো ব্যাপারটাই দৃষ্টিভঙ্গির উপর

ডলারের হিসেবে নেপালের ৬৬% বাণিজ্য সংঘটিত হয় ভারতের সাথে। বাকি ৩৪%-এর বেশিরভাগটাই সমুদ্র পার হয়ে আসতে হয়। এখানেই বাংলাদেশ পারে নেপালকে নতুন আশা জাগাতে। নেপাল থেকে সমুদ্রে পৌঁছাবার সবচাইতে সহজ পথ হলো বাংলাদেশের মাঝ দিয়ে। এই ব্যাপারটা দক্ষিণ দিককে মানচিত্রের উপরের দিকে দিয়ে দেখলেই কেবলমাত্র বোঝা সম্ভব। শুধু সমুদ্র পর্যন্ত পৌঁছানোই নয়, নেপালের থাকতে পারে একটা মার্চেন্ট মেরিন ফ্লিট। আর সেই ফ্লিটের নিরাপত্তা দেয়ার জন্যে তাদের একটা নৌবহরও থাকতে পারে। ব্যাপারটা অবাস্তব মনে হলেও একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই বোঝা যাবে যে, এটা কতটা বাস্তবসম্মত। পুরোটাই আটকে আছে দৃষ্টিভঙ্গির উপর।

প্রথমতঃ সুইজারল্যান্ডের মতো একটা স্থলবেষ্টিত দেশ হলো বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কনটেইনার পরিবহন কোম্পানি ‘এমএসসি’এর কেন্দ্র। অন্যদিকে ইথিওপিয়া এখন স্থলবেষ্টিত হলেও একসময় তার সমুদ্রতট ছিল। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় সুপারপাওয়ারদের দ্বন্দ্বে বলি হয়ে এরিত্রিয়া যুদ্ধ করে ইথিওপিয়া থেকে আলাদা হয়ে যায়। আর তাতে ইথিওপিয়ার পুরো সমুদ্রতট এরিত্রিয়ার হয়ে যায়। ইথিওপিয়া তার নৌবহর এবং মার্চেন্ট মেরিন হারায়। কারণ এরিত্রিয়ার সাথে ইথিওপিয়ার সম্পর্ক ভালো ছিল না। বর্তমানে ইথিওপিয়া জিবুতির মাধ্যমে তাদের সমুদ্র বাণিজ্য চালাচ্ছে। এবং তারা তাদের মার্চেন্ট মেরিন আবারও তৈরি করতে যাচ্ছে। এই ইতিহাসগুলি বলে যে, ইথিওপিয়ার সমুদ্রে যাওয়াটা অবাস্তব কিছু নয়। আরও একটা উদাহরণ দেয়া যায় বলিভিয়ার। একসময় বলিভিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রতট ছিল। সুপারপাওয়ারদের দ্বন্দ্বে পেরু এবং চিলি বলিভিয়ার কাছ থেকে সেই সমুদ্রতট সামরিকভাবে দখল করে নেয়। বলিভিয়া এখনও একটা নৌবাহিনী রেখেছে; এবং প্রতি বছর একটা দিনে সেই নৌবাহিনীর সদস্যরা রাস্তায় প্যারেড করে। তারা এখনও তাদের সমুদ্রে যাবার ন্যায্য হিস্যা চায়।

দ্বিতীয়তঃ কে সমুদ্রে যেতে পারবে, আর কে যেতে পারবে না, সেটা সৃষ্টিকর্তা ঠিক করে দেননি; মানুষ ঠিক করেছে। মানুষ নিজেদের মাঝে হিংসাত্মক কাজের অংশ হিসেবে অন্য আরেক জাতিকে সমুদ্রে পৌঁছানো থেকে বাধা দিয়েছে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরাই সৃষ্টিকর্তার স্থানে নিজেদেরকে বসিয়ে অত্র এলাকার বাউন্ডারিগুলি এঁকে দেয়। সেই আঁকা মানচিত্রে নেপালকে সমুদ্রে পৌঁছানো থেকে বাধা দেয়া হয়। অথচ বাংলা যখন সুলতান এবং নবাবদের অধীনে ছিল, তখন যে কেউই সমুদ্র পর্যন্ত পৌঁছাতে পারতো; কারুরই ভিসা লাগতো না এতে! নেপালের মানুষগুলির দিনাজপুরের মানুষগুলির মতোই সমুদ্রে যাবার অধিকার ছিল।

তৃতীয়তঃ পুরো ব্যাপারটা আসলে একটা নির্দিষ্ট আয়তনের ভূখন্ডের মানুষের সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত রাস্তার উপরে নির্ভরশীল। যেমন – যদি ঢাকা একটা আলাদা দেশ হতো, তাহলে ঢাকার মানুষকে রাস্তা, রেল বা নদীপথে চট্টগ্রাম, মংলা বা পায়রা সমুদ্রবন্দরে পৌঁছাতে হতো। ব্রিটিশরা ঢাকা আর চট্টগ্রামকে এক দেশের অধীনে রাখার ফলে ঢাকার মানুষের চট্টগ্রাম বন্দরে যেতে ভিসা লাগেনা। কিন্তু কাঠমুন্ডুর মানুষের লাগে!

নেপালের ফ্লিট এবং এর ভবিষ্যৎ ফলাফল

নেপালকে বাংলাদেশ তার সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করতে দিলে নেপালকে শুধু বাংলাদেশের বন্দর পর্যন্ত একটা পথ বের করতে হবে; সেটা রাস্তা, রেল বা নদীপথই হোক। দিনাজপুর থেকে চট্টগ্রাম পৌঁছাতে যেমন রাস্তা তৈরি করতে হয়েছে, তেমনি কাঠমুন্ডু থেকে চট্টগ্রাম বা মংলা পৌঁছাতেও সেই ব্যবস্থাই করতে হবে। নেপালকে শুধু সমুদ্র পর্যন্ত পৌঁছানো নয়, তাদেরকে একটা মার্চেন্ট ফ্লিট গঠন করতেও বাংলাদেশের সহায়তা করা উচিৎ। আর সেই মার্চেন্ট ফ্লিটের নিরাপত্তা দিতে নেপালকে একটা নৌবাহিনী তৈরি করার জন্যেও সব ধরনের সহায়তা করা দরকার। এর ফলশ্রুতিতে যে ব্যাপারগুলি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হিসেবে দেখা দেবে তা হলো –

১। সমুদ্র বাণিজ্যের প্রসারে নেপালের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে; দারিদ্র্য থেকে বের হয়ে আসবে নেপালের জনগণ। নেপাল অত্র এলাকার ব্যবসায়ীদের জন্যে আরও আকর্ষণীয় বাজার হিসেবে আবির্ভূত হবে।

২। বাংলাদেশের সাথে নেপালের বাণিজ্য ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে, যা এখন নেই বললেই চলে।

৩। নেপালের জনগণের সাথে বাংলাদেশের জনগণের যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদী বন্ধুত্ব তৈরি হবে, যা কিনা বঙ্গোপসাগরে একটা শক্তিশালী রাষ্ট্র তৈরি হবার শর্ত।

৪। সমুদ্রবন্দরগুলির উন্নয়ন হবে; বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। নেপালও বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে অংশ নেবে। যেমন, এই মুহুর্তে নেপাল বাংলাদেশের সাথে হাইড্রোইলেকট্রিক প্রকল্প করতে চাইছে।

৫। সমুদ্র বাণিজ্য বৃদ্ধির সাথে সাথে বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে। নেপাল নিজের স্বার্থের জন্যেই চাইবে বঙ্গোপসাগরকে নিরাপদ রাখতে। বাংলাদেশের নৌবাহিনীর সাথে তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে।


৬। এই বন্ধুত্বের নিদর্শন নেপালের জনগণ কখনও ভুলবে না। এর ফলে হিমালয়ের পাদদেশে যে অকৃত্রিম বন্ধুর আবির্ভাব হবে, তা আর কোন ভাবেই পাওয়া সম্ভব নয়।


-------------------------------------------------------------------------------



নেপাল – একটা পরিচিতি

জনসংখ্যা – প্রায় ৩ কোটি (২০১৮)

জিডিপি –২৭ বিলিয়ন ডলার (২০১৮)

মাথাপিছু জিডিপি – ৯২০ ডলার (২০১৮)

আমদানি – ৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার (২০১৭)

রপ্তানি – ৮০৩ মিলিয়ন ডলার (২০১৭)

প্রধান আমদানি পণ্য – পরিশোধিত জ্বালানি তেল (১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার), সেমি-ফিনিশড আয়রন (৪৪৭ মিলিয়ন ডলার), বিমান, হেলিকপ্টার (৩৩০ মিলিয়ন), স্বর্ণ (২৪৬ মিলিয়ন), কন্সট্রাকশন ভেহিকল (২৩৩ মিলিয়ন)।

মূলতঃ (৬৬%) ভারত থেকেই আমদানি করা হয় (৬ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার) – কনজিউমার গুডস ২ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার, ইন্টারমিডিয়ারি গুডস ২ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার, জ্বালানি তেল (১ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার), ক্যাপিটাল গুডস (১ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার), মেটাল (১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার), মেশিনারি (৭০০ মিলিয়ন), শাকসবজি (৬৮২ মিলিয়ন), ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইনপুট (৬৭৪ মিলিয়ন), ট্রান্সপোর্ট (৬৫৮ মিলিয়ন), কেমিক্যাল (৪৪৭ মিলিয়ন), মিনারাল (৩৬২ মিলিয়ন), ফুড প্রডাক্টস (৩০৫ মিলিয়ন), প্লাস্টিক এন্ড রাবার (২৬০ মিলিয়ন), টেক্সটাইল (১৯০ মিলিয়ন), কাঠ (১২৫ মিলিয়ন), স্টোন এন্ড গ্লাস (১০৮ মিলিয়ন), পশু (৫৫ মিলিয়ন), ফুটওয়্যার (১২ মিলিয়ন)।

চীন থেকে আমদানি হয় ১৩% পণ্য বা ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার; আরব আমিরাত থেকে ১৭৫ মিলিয়ন; ফ্রান্স থেকে ১৫৫ মিলিয়ন; আর্জেন্টিনা থেকে ১৩৪ মিলিয়ন; ইন্দোনেশিয়া থেকে ১২১ মিলিয়ন; থাইল্যান্ড থেকে ১০৮ মিলিয়ন; কোরিয়া থেকে ৯৩ মিলিয়ন; ভিয়েতনাম থেকে ৯১ মিলিয়ন; সৌদি আরব থেকে ৮৯ মিলিয়ন; মালয়েশিয়া থেকে ৮৬ মিলিয়ন; কানাডা থেকে ৮৬ মিলিয়ন; যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৮২ মিলিয়ন; ইউক্রেন থেকে ৬১ মিলিয়ন; দক্ষিণ আফ্রিকা ৫৭ মিলিয়ন; জাপান ৫৬ মিলিয়ন; জার্মানি ৫২ মিলিয়ন; অস্ট্রেলিয়া ৫১ মিলিয়ন; সিঙ্গাপুর ৪৫ মিলিয়ন; সুইজারল্যান্ড ৪০ মিলিয়ন; বাংলাদেশ থেকে ৩৯ মিলিয়ন; মিয়ানমার ৩২ মিলিয়ন; তুরস্ক ৩২ মিলিয়ন; মিশর ২৬ মিলিয়ন; ব্রিটেন ২৫ মিলিয়ন।

প্রধান রপ্তানি পণ্য – সিন্থেটিক স্টেপল ফাইবার ইয়ার্ন (৮০ মিলিয়ন ডলার), নটেড কার্পেট (৭১ মিলিয়ন), ফ্লেভার্ড ড্রিঙ্ক (৪৬ মিলিয়ন), ফ্রুট জুস (৪৫ মিলিয়ন), জয়ফল (৪৩ মিলিয়ন)।

৬৬% রপ্তানি হয় ভারতে (৪২০ মিলিয়ন ডলার); যুক্তরাষ্ট্রে যায় ৮৩ মিলিয়ন; তুরস্কে ৪৭ মিলিয়ন; জার্মানিতে ২৯ মিলিয়ন; ব্রিটেনে ২৫ মিলিয়ন; চীনে ২২ মিলিয়ন; ইতালিতে ১২ মিলিয়ন; ফ্রান্সে ১১ মিলিয়ন; বাংলাদেশে ১০ মিলিয়ন; জাপানে ১০ মিলিয়ন।

রেমিট্যান্স – ৮ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার (২০১৮), যা জিডিপি-এর ২৮%

ট্যুরিজম – ৬৪৩ মিলিয়ন ডলার (২০১৮); এটা বেশিরভাগ সময় ৩৪০ মিলিয়ন থেকে ৫৫০ মিলিয়নের মাঝে ওঠানামা করে।

স্বর্ণ রিজার্ভ – ৬ দশমিক ৪ থেকে ৬ দশমিক ৫ টন;

কৃষি – ৬৬% মানুষ কৃষিতে জড়িত; জিডিপির ৩৩% কৃষি থেকে আসে; কৃষিযোগ্য জমি ১৫% বা ২১ লক্ষ হেক্টর; ১৩ লক্ষ হেক্টর সেচের আওতায়; বনভূমি ২৫%; খাদ্যশস্য উৎপাদন ৮৬ থেকে ৯৬ লক্ষ টন;

প্রধান শস্য – ধান ৫২ থেকে ৫৬ লক্ষ টন (৮৬% থেকে ৯৭% জমিতে ধান চাষ হয়);

জ্বালানি – কাঠ, গোবর, কয়লা – ৮২%; পেট্রোলিয়াম – ৮% (মূলতঃ ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল);

গ্রামাঞ্চলে রান্নার জ্বালানি - কাঠ (৮১%), গোবর (৯%), এলপিজি (৪%), বায়োগ্যাস (৩ শতাংশ)। শহরাঞ্চলে রান্নার জ্বালানি – এলপিজি (৪০%), কাঠ (৩৬%), কেরোসিন (১৬%), বায়োগ্যাস (৩%), গোবর (৩%)।

বিদ্যুৎ – ৪৪% মানুষ বিদ্যুত পাচ্ছে; শীতকালে (শুষ্ক মৌসুমে) বিদ্যুৎ চাহিদা – ১,২০০ মেগাওয়াট; ৫০% নিজ উৎপাদন এবং বাকিটা ভারত থেকে আমদানিকৃত।

১,০১৬ মেগাওয়াট হাইড্রোপাওয়ার; ৩,৯০০ গিগাওয়াট-আওয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদন; হাইড্রোপাওয়ারের সম্ভাবনা ৪২ হাজার মেগাওয়াট (৬০০ খরস্রোতা নদী)



তথ্যসূত্র -

বিশ্ব ব্যাংক; অবজারভেটরি অব ইকনমিক কমপ্লেক্সিটি (ওইসি); ফুড এন্ড আগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন (এফএও); ওয়ার্ল্ড ইন্টিগ্রেটেড ট্রেড সলিউশন; জাতিসংঘ কমট্রেড ডাটাবেস; সিইআইসি ডাটা; ইন্টারন্যাশনাল হাইড্রোপাওয়ার এসোসিয়েশন; এনার্জিপিডিয়া।


Thursday, 4 July 2019

ভারত মহাসগরে একা হয়ে যাচ্ছে চীন


চীনের ৮০ শতাংশ জ্বালানি তেলের সরবরাহ ভারত মহসাগর দিয়ে আশা-যাওয়া করে। চীনের ‘বেল্ট-এন্ড-রোড’ পরিকল্পনাকে হুমকি ভেবেই ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং সমমনা অন্যান্য রাষ্ট্রগুলি ভারত মহাসাগরে তাদের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করছে।
৪ঠা জুলাই ২০১৯

ভারত মহাসাগরে বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীর মহড়া বেড়েই চলেছে। গত ১৭ থেকে ২৫শে মে বঙ্গোপসাগরে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল নৌ-মহড়া ‘লা পেরৌজি’; যাতে অংশ নেয় ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং জাপানের মোট ৬টা যুদ্ধজাহাজ। মহড়ার বিষয়বস্তুর মাঝে সাবমেরিন-ধ্বংসী এবং বিমান-ধ্বংসী সক্ষমতার পরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত ছিল। মহড়ার নেতৃত্ব ছিল ফ্রান্সের বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘শার্ল দ্য গল’এর কাছে। জাপানের শক্তিশালী ফ্লোটিলার অংশ ছিল হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার ‘ইজুমো’ এবং ডেস্ট্রয়ার ‘মুরাসামে’। অস্ট্রেলিয়া থেকে ফ্রিগেট ‘টুঊম্বা’ এবং সাবমেরিন ‘কলিন্স’ অংশ নেয়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে অংশ নেয় ডেস্ট্রয়ার ‘উইলিয়াম পি লরেন্স’। ‘ফ্রি এন্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করতেই এই মহড়ার আয়োজন করা হয়েছিল। ‘ফ্রি’ এবং ‘ওপেন’ বলতে যে চীনের প্রভাবমুক্ততাকেই বোঝানো হয়েছে, সেব্যাপারে বিশ্লেষকেরা মোটামুটি একমত। মার্কিন সপ্তম নৌবহরের কমান্ডার ভাইস এডমিরাল ফিল সইয়ার বলেন যে, এই মহড়ার মাধ্যমে বোঝা যায় যে, তারা ইন্দো-প্যাসিফিকের যেকোন স্থানেই অপারেট করতে সক্ষম। একইসাথে তিনি এ-ও বলেন যে, এর মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী দেশগুলির চিন্তার একাত্মতা প্রকাশ পায়। এই মহড়া শুরুর আগেই ১৪ই মে ফরাসী নৌবহরের সাথে মার্কিন নৌবাহিনী যৌথ মহড়ায় অংশ নেয়। সেখানে ফরাসী নৌবাহিনীর বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ’ শার্ল দ্য গল’এর সাথে ছিল এয়ার-ডিফেন্স ডেস্ট্রয়ার ‘ফোরবিন’, ‘ডুর‍্যান্স’-ক্লাসের জ্বালানি সরবরাহকারী জাহাজ ‘মার্ন’, এন্টি-সাবমেরিন ফ্রিগেট ‘লা-টুশে-ট্রেভিল’ এবং ‘প্রোভেন্স’। এই মহড়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল সাবমেরিন-ধ্বংসী সক্ষমতাগুলিকে ঝালাই করে নেয়া।

এখানেই শেষ নয়। ফরাসীদের এই ফ্লোটিলাই পহেলা মে থেকে ১০ই মে পর্যন্ত আরব সাগরে ভারতের পশ্চিম উপকূলে ভারতীয় নৌবাহিনীর সাথে ‘ভারুনা’ নামে আরেক নৌমহড়ায় অংশ নেয়। উভয় দেশের মোট ১১টা যুদ্ধজাহাজ সেই মহড়ায় অংশ নেয়। এই একই মহড়ার দ্বিতীয় অংশটা অনুষ্ঠিত হয় পূর্ব আফ্রিকার জিবুতির কাছে একই মাসের ২২ থেকে ২৫ তারিখ। সেখানে ফরাসী নৌবাহিনীর একটা পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনের সাথে অংশ নেয় আরেকটা ভারতীয় সাবমেরিন। জিবুতিতে অন্যান্য দেশ ছাড়াও চীনের প্রথম ওভারসিজ নৌঘাঁটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর ভারতীয় নৌবাহিনী এর বাইরেও এপ্রিলের ১৫ তারিখে ভারত মহাসাগরে মার্কিন নৌঘাঁটি দিয়েগো গার্সিয়ার কাছে মার্কিন নৌবাহিনীর সাথে সাবমেরিন-ধ্বংসী মহড়ায় অংশ নেয়। এখানে মার্কিন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার ‘স্প্রুয়্যান্স’এর সাথে যোগ দেয় মার্কিন এবং ভারতীয় নৌবাহিনীর দু’টি অত্যাধুনিক ‘পি-৮’ সাবমেরিন-ধ্বংসী বিমান। এছাড়াও অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর সাথে ভিশাখাপত্তম-এর কাছাকাছি বঙ্গোপসাগরে ‘অসইনডেক্স-১৯’ নামের আরেক মহড়ায় অংশ নেয় ভারতীয় নৌবাহিনী। ৩রা এপ্রিলে শুরু হওয়া সাবমেরিন-বিধ্বংসী এই মহড়ায় অংশ নেয় অস্ট্রেলিয়ার হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার ‘ক্যানবেরা’, ফ্রিগেট ‘নিউকাসল’ ও ‘পারামাত্তা’ এবং জ্বালানীবাহী জাহাজ ‘সাকসেস’।

২০১৫ সাল থেকে বঙ্গোপসাগরে নৌমহড়া ‘মালাবার’এর মাঝে যুক্ত হয়েছে জাপান। ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯২ সাল থেকে এই মহড়ার আয়োজন করে আসছে। গত বছরের জুনেও এর আয়োজক ছিল ভারত। বঙ্গোপসাগরে নিয়মিত আয়োজনের পাশাপাশি এক বছর এই মহড়া প্রশান্ত মহাসাগরের ফিলিপাইন সাগরেও হয়েছে। অস্ট্রেলিয়াকে এই মহড়ায় নেবার জন্যে বিভিন্ন মহলের চাপ থাকলেও ভারত সরকার অস্ট্রেলিয়াকে এই মহড়ার অংশ করেনি। অন্ততঃ লোক দেখানো হলেও এই মহড়া থেকে অস্ট্রেলিয়াকে বাইরে রেখে ভারত বোঝাতে চাইছে যে, তারা চীনকে রাগাতে চায় না। অথচ এটা অনেকেই ভুলে যাচ্ছেন যে, ‘মালাবার’ মহড়া এখন পুরোপুরিভাবেই চীনকে নিয়ন্ত্রণের চিন্তা দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। তদুপরি অস্ট্রেলিয়ার সাথে ভারতের আলাদাভাবে মহড়া তো হচ্ছেই। 

অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর সাথে ভিশাখাপত্তম-এর কাছাকাছি বঙ্গোপসাগরে ‘অসইনডেক্স-১৯’ নামের আরেক মহড়ায় অংশ নেয় ভারতীয় নৌবাহিনী। অন্ততঃ লোক দেখানো হলেও 'মালাবার' মহড়া থেকে অস্ট্রেলিয়াকে বাইরে রেখে ভারত বোঝাতে চাইছে যে, তারা চীনকে রাগাতে চায় না। অথচ এটা অনেকেই ভুলে যাচ্ছেন যে, ‘মালাবার’ মহড়া এখন পুরোপুরিভাবেই চীনকে নিয়ন্ত্রণের চিন্তা দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। তদুপরি অস্ট্রেলিয়ার সাথে ভারতের আলাদাভাবে মহড়া তো হচ্ছেই।


দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হবার পরপরই জুন মাসে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মালদ্বীপ এবং শ্রীলংকা সফর করে আসেন। মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহামেদ সলিহ-এর সাথে বৈঠক ছাড়াও মোট ৬টা চুক্তি সই করেন মোদি; যার মাঝে ছিল ‘হোয়াইট শিপিং ইনফরমেশন’এর উপর চুক্তি। এর মাধ্যমে মালদ্বীপ সরকার মালদ্বীপের সীমানায় আসা যেকোন জাহাজের সম্পর্কে তথ্য ভারতীয় নৌবাহিনীর কাছে সরবরাহ করবে। উভয় নেতা একত্রে মালদ্বীপ ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্স ট্রেনিং সেন্টার এবং উপকূলীয় রাডার সিস্টেম-এর উদ্ভোধন করেন। এই রাডারগুলির মাধ্যমে মালদ্বীপ ও এর আশেপাশের এলাকায় যেকোন জাহাজের উপস্থিতি সম্পর্কে মালদ্বীপ সরকার ওয়াকিবহাল থাকবে এবং এসব তথ্য ভারতীয় নৌবাহিনীকে সরবরাহ করবে। শ্রীলঙ্কা সফরের সময়েও নরেন্দ্র মোদি সামরিক প্রশিক্ষণ সহায়তার চুক্তি সই করেন। শ্রীলংকার নৌবাহিনীর জন্যে যুদ্ধজাহাজ সরবরাহ করছে ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে চীন তার স্থান করে নিতে চাইলেও তা তাদের জন্যে মোটেই সহজ ঠেকছে না।

‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকার এক লেখায় ভারতীয় চিন্তাবিদ রাজা মোহন বলেন যে, মালে এবং কলম্বো সফরের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্রগুলিকে ভারত তার আঞ্চলিক ভূগোলের মাঝে শক্তভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে। একেবারে ছোট দ্বীপগুলিও এখন ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গিয়েছে। ভারত চাইছে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় আফ্রিকার উপকূল থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ করতে। চীনের ৮০ শতাংশ জ্বালানি তেলের সরবরাহ এই পথেই আশা-যাওয়া করে। চীনের ‘বেল্ট-এন্ড-রোড’ পরিকল্পনাকে হুমকি ভেবেই ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং সমমনা অন্যান্য রাষ্ট্রগুলি ভারত মহাসাগরে তাদের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করছে।

আফ্রিকার উপকূলেও ভারত তার সামরিক অবস্থান দৃঢ় করেছে। দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিকে গত মার্চ মাসে সাইক্লোন ‘ইদাই’ আঘাত হানার পর সেখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ভারতীয় নৌবাহিনীর চারটি জাহাজ সবার আগে সেখানে ত্রানসামগ্রী নিয়ে পৌঁছায়। জুনের প্রথম সপ্তাহে মোজাম্বিকের প্রেসিডেন্ট ফিলিপ নাইয়ুসি নরেন্দ্র মোদিকে ফোন করে ভারতের এই সহায়তার জন্যে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাঞ্জানিয়ার সাথে ভারতীয় নৌবাহিনীর সহযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে দিনদিন। ২০১৭ সালে ভারতীয় নৌবাহিনীর জাহাজ তাঞ্জানিয়ার উপকূলে হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভের কাজও করে। গত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলিকে সাথে নিয়ে হয়ে গেল ‘কাটল্যাস এক্সপ্রেস-২০১৯’ নামের নৌ-মহড়া, যাতে নেতৃত্ব দেয় যুক্তরাষ্ট্রের আফ্রিকা কমান্ড। পূর্ব আফ্রিকার ৯টা দেশের পাশাপাশি এই মহড়ায় অংশ নেয় ফ্রান্স, পর্তুগাল, নেদারল্যান্ডস, কানাডা এবং ভারত। ভারতীয় নৌবাহিনীর ফ্রিগেট ‘ত্রিকান্দ’ জিবুতির কাছে এই মহড়ায় অংশ নেয়। ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপ দেশ মরিশাসের সাথে ভারতের সামরিক সহযোগিতার সম্পর্ক আরও গভীর হচ্ছে। মরিশাসের কোস্ট গার্ডের জন্যে যুদ্ধজাহাজ সরবরাহ করেছে ভারত। আবার পূর্ব আফ্রিকার উপকূলে মোজাম্বিক চ্যানেলে সেইশেল দ্বীপের অধীনে থাকা এসাম্পশন দ্বীপেও ভারত নৌঘাঁটি করতে চাইছে। 

ভারতীয় নৌবাহিনীর ফ্রিগেট 'ত্রিকান্দ' তাঞ্জানিয়ার রাজধানী দার-এস-সালাম-এ। ভারত চাইছে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় আফ্রিকার উপকূল থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ করতে। ভারত মহাসাগরের মাঝ দিয়ে যাওয়া চীনের সমুদ্র বাণিজ্য রুটগুলিকে নিজস্ব নৌবহরের মাধ্যমে রক্ষা করার সক্ষমতা থেকে চীনা এখনও বহুদূরে রয়েছে। ভারত মহাসাগরে চীনা যুদ্ধজাহাজের ব্যবহার করতে পারার মতো বন্দর খুব বেশি একটা নেই। মার্কিন বলয়ে থাকা দেশগুলি ভারত মহাসাগর জুড়ে নৌ-মহড়া চালিয়ে চীনকে সেই বার্তাই দিচ্ছে।  


গত বছরের মে মাসে ভারত মহাসাগরের অপর প্রান্তে ইন্দোনেশিয়া সফরের সময় নরেন্দ্র মোদি ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদোর সাথে সামরিক সহযোগিতার ব্যাপারে একমত হন। সে অনুযায়ী ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের উত্তর প্রান্তে সাবাং-এ একটা নৌঘাঁটি করার প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে। এই নৌঘাঁটির মাধ্যমে মালাক্কা প্রণালী হয়ে ভারত মহাসাগরে ঢোকার সময় যেকোন সামরিক জাহাজের উপর নজরদারি করা সম্ভব হবে। মিয়ানমারের সাথেও ভারতীয় নৌবাহিনী গত বছরের মার্চ এবং সেপ্টেম্বরে যৌথ মহড়া করে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সাথে করা চুক্তি অনুযায়ী মিয়ানমার ভারতীয় নৌবাহিনীকে তার নিজস্ব সীমানায় আসা সকল জাহাজের তথ্য সরবরাহ করছে। মিয়ানমারে ভারতীয় নৌবাহিনীর জাহাজের সফর বৃদ্ধি পেয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। আরব সাগরেও ওমানের দুকম বন্দর ভারতীয় নৌবাহিনী ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছে। ব্রিটিশ নৌবাহিনীও দুকমে বড় আকারের নৌঘাঁটি তৈরি করছে; যেখানে ‘কুইন এলিজাবেথ-ক্লাস’এর বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজগুলি ঢুকতে পারবে।

চীন তার ‘বেল্ট-এন্ড-রোড’ পরিকল্পনার অধীনে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। মিয়ানমার, পাকিস্তান, তাঞ্জানিয়া এবং শ্রীলংকায় সমুদ্রবন্দর উন্নয়নের কাজও করছে চীন। কিন্তু ভারত মহাসাগরের মাঝ দিয়ে যাওয়া চীনের সমুদ্র বাণিজ্য রুটগুলিকে নিজস্ব নৌবহরের মাধ্যমে রক্ষা করার সক্ষমতা থেকে চীনা এখনও বহুদূরে রয়েছে। ভারত মহাসাগরে চীনা যুদ্ধজাহাজের ব্যবহার করতে পারার মতো বন্দর খুব বেশি একটা নেই। মার্কিন বলয়ে থাকা দেশগুলি ভারত মহাসাগর জুড়ে নৌ-মহড়া চালিয়ে চীনকে সেই বার্তাই দিচ্ছে। মিয়ানমার, পাকিস্তান এবং শ্রীলংকা – এই সবগুলি দেশেই চীনের সমুদ্রবন্দরগুলি রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে পরার আশংকা থেকে মুক্ত নয়। পাকিস্তানে বালুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্যে ভারতীয় সমর্থন রয়েছে। অন্যদিকে মিয়ানমারের রাখাইনে মুসলিম-বিরোধী গণহত্যা এবং ফলশ্রুতিতে প্রতিবেশী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ১০ লাখ মানুষের শরণার্থী হিসেবে পালিয়ে যাবার পর থেকে রাখাইন অস্থিতিশীল রয়েছে। শ্রীলংকার গৃহযুদ্ধ শেষ হলেও নতুন করে উগ্রবাদী হামলা হবার পর থেকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

এমতাবস্থায় চীনের কাছে দু’টা পথ খোলা রয়েছে। প্রথমতঃ নিজেদের সামরিক শক্তির উন্নয়নের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরের কর্তৃত্ব নিয়ে নেয়া। এবং দ্বিতীয়তঃ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শক্তিশালী বন্ধু খোঁজা, যার কিনা শক্তিশালী নৌবহর থাকবে। ভারত মহাসাগরে যথেষ্ট সংখ্যক সামরিক ঘাঁটি না থাকায় প্রথম অপশনটা চীনের জন্যে বর্তমানে প্রায় অসম্ভব। ভারত মহাসাগর চীনের সমুদ্রবন্দর থেকে যথেষ্ট দূরে থাকায় চীনের কাছে দ্বিতীয় অপশন ছাড়া আর গতি নেই। যুক্তরাষ্ট্রও ভারত মহাসাগরে এভাবেই চলছে। সুদূর যুক্তরাষ্ট্র থেকে যুদ্ধজাহাজ ভাসিয়ে এনে ভারত মহাসাগর পাড়ি দেয়াটা অত্যন্ত কঠিন কাজ। এক্ষেত্রে ভারত মহাসাগরীয় দেশগুলি যুক্তরাষ্ট্রকে লজিস্টিক সহায়তা না দিলে এটা মার্কিনীদের পক্ষে একেবারেই সম্ভব ছিল না। আর দ্বিতীয় অপশনটা এখন যুক্তরাষ্ট্রই ব্যবহার করছে; কারণ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এখন একা সারা দুনিয়ার সমদ্রপথ টহল দেয়া সম্ভব নয়। তাই যুক্তরাষ্ট্র এখন তার কাজ অন্যদের মাঝে ভাগ করে দিচ্ছেভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলি যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্বের বেশিরভাগটাই নিয়ে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং ব্রিটেন এতে সহায়তা দিচ্ছে মাত্র। নৌ-মহড়া ‘লা পেরৌজি’তে ৬টা যুদ্ধজাহাজের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের ছিল মাত্র একটা। ‘কাটল্যাস এক্সপ্রেস-২০১৯’এও মার্কিন জাহাজ ছিল মাত্র একটা। আর মহড়ার মাধ্যমে এই সহযোগিতার মূল লক্ষ্যই হলো অত্র অঞ্চলে চীনা প্রভাব বিস্তারকে নিয়ন্ত্রণ করা। মার্কিন-ব্রিটিশ-ফরাসী প্রভাব বলয়ে ভারত মহাসাগরে যে নৌশক্তির নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, চীনের হাতে এর ধারেকাছেও কিছু নেই। ভারত মহাসাগরে শক্তিশালী নৌশক্তি-সম্পন্ন বন্ধু তৈরি নিয়ে চীনকে নতুন করে ভাবতে হবে। অন্ততঃ ২০১৯ সালের প্রথম ছয় মাসে ভারত মহাসাগরে চীন-বিরোধী নৌ-মহড়ার জমজমাট আসর সেদিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এক্ষেত্রে পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোন দেশের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরে নতুন কোন নৌশক্তির আবির্ভাব ঘটানো দুষ্কর। যদিও উভয় দেশই শুধুমাত্র চীনের প্রভাবে থাকতে চাইছে না; যদিও তারা চীনের বিনিয়োগকে স্বাগত জানাচ্ছে।

Wednesday, 29 May 2019

“বেঙ্গল গেইট” এবং আওরঙ্গজেবের “স্বর্গ”

২৯শে মে ২০১৯


বৃষ্টিপাত, ভৌগোলিক অবস্থান এবং ভূ-প্রকৃতি

পৃথিবীর বহু স্থান রয়েছে যেখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়; কিন্তু মানুষ বসবাসের উপযোগী নয়। বিষুবীয় অঞ্চলে অবস্থিত দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন জঙ্গল, আফ্রিকার কঙ্গো এবং ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও, সুমাত্রা এবং পপুয়া নিউ গিনির মত এলাকাগুলি এই প্রকারের মাঝে পড়বে। ঘন বনাঞ্চল হবার কারণে এই এলাকাগুলিতে মানুষ বসবাস কঠিন। সারাবছর বৃষ্টিপাত হওয়া সত্ত্বেও এই অঞ্চলগুলি অনেক মানুষ বাঁচিয়ে রাখার জন্যে উপযোগী নয়। আবার রয়েছে পাহাড়ি অঞ্চল। বৃষ্টিপাত হলেও পাহাড়ি অঞ্চল বসবাসের জন্যে কম উপযোগী। প্রথম সমস্যা হলো, ঢালু অঞ্চলে হবার কারণে প্রাকৃতিকভাবে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা কঠিন। আর দ্বিতীয় সমস্যা হলো যাতায়াতের সমস্যা। পাহাড়ি নদীতে নৌকা চালিয়ে উজানের দিকে যাওয়া কঠিন। আর পাহাড়ের গা বেয়ে রাস্তা তৈরি করা তো আরও কষ্টকর। জঙ্গল এবং পাহাড়ি অঞ্চলে চাষাবাদ অপেক্ষাকৃত কঠিন। আর চাষাবাদ ছাড়া বহু মানুষের জন্যে অন্নের সংস্থান করাটাও কঠিন। প্রচুর বৃষ্টি হলেও তা যথেষ্ট নয়; বৃষ্টির পানি যদি প্রাকৃতিকভাবে ধরে রাখার ব্যবস্থা থাকে, তাহলেই কেবল তা চাষাবাদের জন্যে উপযোগী এলাকা হবে। আর সেখানে অনেক মানুষের থাকার ব্যবস্থাও সম্ভব।

এরপরও কথা থেকে যায়। বৃষ্টির মেঘ সমুদ্র থেকে ভূমির দিকে এগুলে যেকোন স্থানেই বৃষ্টি হয়ে ঝড়তে পারে। এই বৃষ্টি যত কম স্থানের উপরে পড়বে, সেখানে স্বাদু পানির সংস্থান সবচাইতে বেশি হবে। যদি বৃষ্টি অনেক বেশি এলাকা নিয়ে পড়ে, তবে সেই পানি ব্যবহার করতে একটা নির্দিষ্ট স্থানে বাস করলেই হবে না; ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে হবে। তবে বৃষ্টির পরিমাণ যদি অনেক বেশি হয়, সেক্ষেত্রে তা অনেক বেশি মানুষের সংস্থান করতে পারবে। বৃষ্টির নির্দিষ্ট স্থানে পড়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হলো পাহাড়-পর্বত। বৃষ্টির মেঘ উঁচু পাহাড়ে আটকে গিয়ে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পারে। যদি সেই পাহাড়ের পাদদেশে মানুষ বসবাস করে, তাহলে তারা সেই বৃষ্টির পানি যথেষ্ট পরিমাণে পাবে। তবে পাহাড়ের পাদদেশের আয়তন এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক স্থানেই পাহাড় প্রায় সমুদ্রের উপকূলে অবস্থিত। তাই পাহাড়ে মেঘের ধাক্কায় যে বৃষ্টিপাত হয়, তা সরাসরিই সমুদ্রে চলে যায়। তাহলে বৃষ্টির পানি ব্যবহার করতে হলে পাহাড়ের পাদদেশের প্রাকৃতিক পরিস্থিতি দেখতে হবে।

একটা সমতল এলাকায় বৃষ্টির পানি পড়লে সেটা সমুদ্রে যেতে অনেক সময় নেবে। ভূমির ঢাল যত কম হবে, পানি তত ধীরে ধীরে সমুদ্রে পৌঁছাবে। আর এই ধীরে সমুদ্রে পৌঁছার মাঝে সমতলে বসবাসরত মানুষেরা সেই পানিকে ব্যবহার করতে পারবে। সেই অঞ্চলের নদী-নালা-খাল-বিল পানি ধরে রাখতে পারবে অনেক সময়; যদিও তা একসময় না একসময় সমুদ্রে পৌঁছাবে। এখানে সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়ি অঞ্চলের বৃষ্টির পানি খুব দ্রুত সমুদ্রে চলে যায়; সমতলের পানি অনেক ধীরে যায় সমুদ্রে। আরও ব্যাপার রয়েছে সমতলের আয়তন নিয়ে। সমতলের আয়তন বেশি হলে সেই পানির সমুদ্রে পৌঁছাতে অনেক বেশি সময় লাগবে; আয়তন ছোট হলে দ্রুত পৌঁছাবে সমুদ্রে। আর এই সমতলের পাশে পাহাড় থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড় যদি সমতল আর সমুদ্রের মাঝে থাকে, তাহলে পাহাড় বৃষ্টির মেঘকে সমতলে পৌঁছাতে দেবে না; অর্থাৎ সমতলে বৃষ্টি হবে না এবং তা মানুষ বসবাসের জন্যে কম উপযোগী হবে। অন্যদিকে সমতল যদি পাহাড় এবং সমুদ্রের মাঝে থাকে, তাহলে বৃষ্টির মেঘ পাহাড়ে বাধা পেয়ে যে বৃষ্টি হবে, তার পানি ঐ সমতলের মাঝ দিয়েই ধীরে ধীরে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রে পৌঁছাবে। এক্ষেত্রে ঐ সমতলে থাকা মানুষ বহু সময় ধরে বহমান পানি ব্যবহার করতে পারবে।

আর এই সবকিছুর উপরে রয়েছে বাতাসের দিক। সমুদ্র থেকে বৃষ্টির মেঘ সকল দিকে ধাবিত হয় না; সকল সময়েও ধাবিত হয় না। বাতাসের দিকও সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়, যা কিনা ঋতুর পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ বৃষ্টির পানির পুরোপুরি ব্যবহার হতে হলে সমুদ্র থেকে বাতাসের দিক হতে হবে নির্দিষ্ট ভূখন্ডের দিকে, যেখানে রয়েছে বিরাট সমতল, এবং সমতলের পর রয়েছে উঁচু পাহাড়, যেখানে বৃষ্টির মেঘ ধাক্কা খেয়ে বৃষ্টি ঘটায়। সেই সমতল আর সমুদ্রের মাঝে থাকবে না কোন পাহাড়, যা বৃষ্টির মেঘ সমতলে ঢোকার আগেই আটকে দিতে পারে। জঙ্গলের মাঝে মানুষ বসবাস কঠিন হবে, তাই এই পুরো এলাকা আবার জংলা অঞ্চলে হলেও সমস্যা। প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ধ্বংস করেও অবশ্য কৃষির ব্যবস্থা করা সম্ভব।

এই দরজাটাই হলো বাংলা অঞ্চলে বৃষ্টির মেঘ ঢোকার রাস্তা। এই দরজার পূর্বে রয়েছে আরাকান পর্বত, আর পশ্চিমে পূর্ব-ঘাট পর্বত। এই “বেঙ্গল গেইট” দিয়েই ঢোকে ভারত মহাসাগর থেকে উড়ে আসা দক্ষিণ-পশ্চিমের মেঘ। একবার “বেঙ্গল গেইট” দিয়ে বৃষ্টির মেঘ ঢুকে গেলে তা তিনদিকে মেঘের মাঝে আটকা পড়ে যায়, এবং এর পুরোটাই বৃষ্টি হয়ে এই সমতলে ঝরে পড়ে; পালাবার পথ নেই! 

“বেঙ্গল গেইট”

ভারতীয় উপমহাদেশে বৃষ্টিপাতের সেই অবস্থাটাই বিরাজ করছে, যা কিনা বহু মানুষের বসবাসের জন্যে উপযোগী। এর মাঝে আবার গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রা-মেঘনা অববাহিকার গুরুত্ব সবচাইতে বেশি।

প্রথমতঃ ভারত মহাসাগরের বৃষ্টির মেঘগুলি ঠিক দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত হয়ে এই নদী অববাহিকা পর্যন্ত পৌঁছে; মাঝে কোন বাধা নেই। এটা সম্ভব হচ্ছে বঙ্গোপসাগরের ফানেল আকৃতির কারণে।

দ্বিতীয়তঃ উপকূলে কোন পাহাড় নেই; তাই বৃষ্টির মেঘ ভূমির অনেক ভেতর ঢুকতে পারে।

তৃতীয়তঃ ভারতের দক্ষিণ অঞ্চলটা উপদ্বীপ আকৃতির; যার পূর্ব উপকূলে রয়েছে পূর্ব-ঘাট পর্বত। এই পর্বতের কারণে বৃষ্টির মেঘগুলি উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক বৃষ্টিপাত ঘটায়। কিন্তু পাহাড়ের উত্তরের দিকে বৃষ্টি খুব হয়। পূর্ব-ঘাট পর্বত যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানেই বৃষ্টি মেঘের সামনে সমতলে ঢোকার একটা দরজা খুলে যায়। এই দরজাটাই হলো বাংলা অঞ্চলে বৃষ্টির মেঘ ঢোকার রাস্তা। এই দরজার পূর্বে রয়েছে আরাকান পর্বত, আর পশ্চিমে পূর্ব-ঘাট পর্বত। এই “বেঙ্গল গেইট” দিয়েই ঢোকে ভারত মহাসাগর থেকে উড়ে আসা দক্ষিণ-পশ্চিমের মেঘ।

চতুর্থতঃ এই মেঘ ঢুকে যায় সমতল অববাহিকায়, এবং এর উত্তরের উঁচু হিমালয় পর্বত এবং এর শাখা প্রশাখায় মেঘ ধাক্কা খেয়ে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। পঞ্চমতঃ একবার “বেঙ্গল গেইট” দিয়ে বৃষ্টির মেঘ ঢুকে গেলে তা তিনদিকে মেঘের মাঝে আটকা পড়ে যায়, এবং এর পুরোটাই বৃষ্টি হয়ে এই সমতলে ঝরে পড়ে; পালাবার পথ নেই! উত্তর ভারতে গঙ্গা নদীর অববাহিকা জুড়ে বেশ কিছু এলাকায় এই মেঘ পৌঁছে। তবে যত উত্তর-পশ্চিমে যাওয়া যায়, বৃষ্টি কমতে থাকে। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় হিমালয়ের পাদদেশে ব্যাপক বৃষ্টি হয়, যা ব্রহ্মপুত্র নদের মাধ্যমে সমতলে প্রবাহিত হয়। এরও পূর্বে হিমালয়, মেঘালয় এবং আরাকান পর্বতের মাঝে আটকা পড়ে মেঘ। এইসব পাহাড়ে বৃষ্টির পানি ব্রহ্মপুত্র, বরাক এবং অন্যান্য নদী বেয়ে সমতলে পৌঁছায়। মোটকথা “বেঙ্গল গেইট”এর ভেতর দিয়ে ঢোকার পরে এই মেঘগুলি একটা বৃষ্টির রাজ্য তৈরি করে, যা কিনা দুনিয়ার আর কোথাও দেখা যায় না।

গঙ্গা অববাহিকায় বাস করে ভারতের ৪০ কোটি মানুষ। আর গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-বরাকের মিলিত স্রোতের নদী-বিধৌত অঞ্চলে বাস করে আরও ২১ কোটির মতো মানুষ। অর্থাৎ এই “বেঙ্গল গেইট”এর মাঝ দিয়ে ঢোকা বৃষ্টির মেঘের উপর বেঁচে থাকছে ৬০ কোটিরও বেশি মানুষ। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টি এই অঞ্চলে চাষাবাদের এক বিরাট সুযোগ করে দিয়েছে; যা কিনা এত বিশাল এক জনসংখ্যাকে বাঁচিয়ে রাখছে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এই মৌসুমী বায়ু প্রতিবছর প্রায় একই সময়ে একই দিক থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে ছোটে। আর বঙ্গোপসাগরের ফানেলের কারণে তা বাধা না পেয়ে উত্তরের দিকে যেতে থাকে। এরপর সে পেয়ে যায় “বেঙ্গল গেইট”! পুরো মেঘমালা ঢুকে যায় এই গেইট দিয়ে; আর আটকা পড়ে যায় তিন দিকের উঁচু পাহাড়ের মাঝে; বৃষ্টি হয়ে ঝড়ে পরে; তৈরি করে বিশাল বিশাল প্রবাহমান জলাধার, যেগুলিকে আমরা নদী বলে জানি। তিন নদীর মিলিত স্রোতেই এই অঞ্চলই পৃথিবীর সবচাইতে সম্পদশালী অঞ্চলগুলির একটা। এই সম্পদ হলো এর মৌসুমী বায়ু, ভৌগোলিক অবস্থান এবং ভূ-প্রকৃতি; যার সবগুলিই সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত! এবং এগুলি কখনোই ফুরাবার নয়, যদি না সৃষ্টিকর্তা অন্য কিছু চান! অর্থাৎ এই অঞ্চল যে সবচাইতে সম্পদশালী হবে, তা সৃষ্টিকর্তা নিজেই ঠিক করে দিয়েছেন!
হিন্দুস্তান আর চীন – এই দুই অর্থনৈতিক দৈত্যের মাঝে বাণিজ্যের সম্পর্ক গভীর করার পিছরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল আরবদের। আর আরবরা ইসলাম নেবার পর থেকে এই বাণিজ্যের প্রসার আরও বহুগুণে বেড়ে যায়। ইসলামের দাওয়া পৌঁছে দেবার স্পৃহা মুসলিম বণিকদের বহুদূর নিয়ে গেছে। পুরো ভারত মহাসাগর জুড়ে তারা বসতি স্থাপন করেছিল; এনেছিল ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়ন। হিন্দুস্তান-চীন-ইন্দোচীন-মালয়ের অর্থনীতি ছিল একই সূত্রে গাঁথা।



ঔপনিবেশিকরাও বুঝেছিল “বেঙ্গল গেইট”এর গুরুত্ব

ষোড়শ শতকে ঔপনিবেশিক শক্তিরা এখানে এসেছিল এই সম্পদের খোঁজেই। তারা জানতো এই সম্পদ ফুরাবার নয়। তাই তারা চীরজীবন এই সম্পদকে নিজেদের উন্নয়নে ব্যবহার করার লক্ষ্যে রাজনৈতিকভাবে এখানকার গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলির দখল নিতে মনোযোগী হয়। পর্তুগীজরা যখন এই “বেঙ্গল গেইট”এ পৌঁছায়, তখনও তারা এখানকার সম্পদের মাপ করতে সক্ষম হয়নি। আসলে এত সম্পদ তারা জীবনে কখনও দেখেনি বলেই এই মাপ তারা করতে পারেনি। এখানকার ভাব বুঝতেই তাদের বেশকিছু সময় চলে যায়। তবে ভাব বোঝার সাথেসাথেই তারা কাজে নেমে পড়ে – এই অঞ্চলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতেই হবে। সপ্তদশ শতকে এখানে হাজির হয় ডাচ, ব্রিটিশ, ফরাসীরা। এরাও এই অঞ্চলের অশেষ সম্পদের লোভে পড়ে যায়। শুরু হয় এদের মাঝে দ্বন্দ্ব। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশরাই টিকে যায়। এবং তারা বেঙ্গলকে পুরো ভারতের মাঝে সবচাইতে বেশি গুরুত্ব দিতো। তাদের আগে পর্তুগীজরাও তা-ই দিয়েছিল। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব ছিলেন একজন যোদ্ধা; জীবনের বেশিরভাগ সময়ই তিনি যুদ্ধের ময়দানে কাটিয়েছেন। তার সেনাবাহিনীকে টিকিয়ে রাখার আর্থিক শক্তিটুকুর বেশিরভাগটাই তিনি বাংলা থেকে পেয়েছিলেন। কাজেই অবাক হবার কি আছে, যখন তিনি বাংলাকে বলেছেন “হিন্দুস্তানের স্বর্গ”? ব্রিটিশরা এই “স্বর্গ” নিয়ে এতটাই প্রেমে পড়েছিল যে, ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে বাকি দুনিয়ার সবকিছু ফেলে তারা তাদের সকল চিন্তাকে ভারত-কেন্দ্রিক করে ফেলেছিল। ভারতের, তথা বাংলার সম্পদকে ব্যবহার করে ব্রিটিশরা দেড়’শ বছর দুনিয়া শাসন করেছিল। দুনিয়ার ইতিহাসের সবচাইতে শক্তিশালী নৌবহর তারা তৈরি করতে পেরেছিল ভারতের সম্পদকে কাজে লাগিয়েই।

এখানেই শেষ নয়। এশিয়ার অন্য প্রান্তে রয়েছে আরেক জনবহুল অঞ্চল – চীন। আরও রয়েছে এর আশেপাশের মালয় দ্বীপপুঞ্জ এবং ইন্দোচীন উপদ্বীপ। হিন্দুস্তানের সাথে চীন এবং আশেপাশের অঞ্চলের চলেছে হাজার বছরের বাণিজ্য। এই বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ ছিল আরব বণিকদের হাতে। আরবরা বাণিজ্য করতো; কারণ তাদের অঞ্চল ছিল মরুভূমি; ফসল ফলে না একেবারেই। তার রিযিক অন্বেষণে তারা হয়েছিল বণিক। হিন্দুস্তান আর চীন – এই দুই অর্থনৈতিক দৈত্যের মাঝে বাণিজ্যের সম্পর্ক গভীর করার পিছরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল আরবদের। আর আরবরা ইসলাম নেবার পর থেকে এই বাণিজ্যের প্রসার আরও বহুগুণে বেড়ে যায়। ইসলামের দাওয়া পৌঁছে দেবার স্পৃহা মুসলিম বণিকদের বহুদূর নিয়ে গেছে। পুরো ভারত মহাসাগর জুড়ে তারা বসতি স্থাপন করেছিল; এনেছিল ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়ন। হিন্দুস্তান-চীন-ইন্দোচীন-মালয়ের অর্থনীতি ছিল একই সূত্রে গাঁথা। মুসলিমরা এই সম্পদশালী অঞ্চলের সম্পদকে বাণিজ্যের মাধ্যমে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছিল। মুসলিমদের এই বাণিজ্য সাফল্যই ইউরোপিয়দের অনুপ্রাণিত করেছিল পূর্বের সাথে বাণিজ্য করার। এটা তারা করতে পেরেছিল ভাস্কো দা গামার ভারত মহাসাগর অভিযানের পর থেকে।

ইতিহাসে হিন্দুস্তান এবং চীনের অর্থনীতি একত্রেই ওঠা-নামা করেছে। দুনিয়ার প্রায় অর্ধেক মানুষের বসবাস সবসময় এখানেই ছিল। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই এখানকার অর্থনীতি ছিল দুনিয়ার অর্থনীতিরও অর্ধেক। এই ব্যাপারটা পরিবর্তন করে ফেলে ঔপনিবেশিকেরা। তারা পুঁজিবাদী চিন্তার মাধ্যমে সম্পদের অসুস্থ্য বন্টন করে ইউরোপকে সম্পদশালী করে, যেখানে ইউরোপের জনসংখ্যা সারা দুনিয়ার তুলনায় কিছুই নয়। একটা মানুষের বেঁচে থাকার জন্যে যা প্রয়োজন, তার চাইতে বহুগুণ সম্পদ তারা কুক্ষিগত করে সারা দুনিয়ার অর্থনীতিকে ধ্বংস করে। প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য্যের কারণেই হিন্দুস্তান-চীনের বিশাল জনসংখ্যা। এটা সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং ঠিক করে দিয়েছেন। তাঁর তৈরি করে দেয়া এই নিয়মের হেরফের করার ফলে বিশ্বব্যাপী মানুষের মাঝে তৈরি হয়েছে সংঘাত এবং অশান্তি।



“আর তারা কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন সব সত্ত্বার পূজা করে যাদের না আকাশ থেকে তাদের কিছু রিযিক দেবার ক্ষমতা ও অধিকার আছে, না পৃথিবী থেকে?” [সূরা আন-নাহল – আয়াত ৭৩]

Wednesday, 22 May 2019

আর্কটিকে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার দ্বন্দ্ব কোনদিকে যাচ্ছে?

‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’এর কারণে আর্কটিকে বরফ গলার সাথেসাথে সমুদ্রপথ উন্মুক্ত হচ্ছে। এখন বছরের বেশ কয়েক মাস রুশ আর্কটিক দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে পারছে, যা ইতিহাসে প্রথম। এই নৌ-রুটের সাথে সাথে এর নিরাপত্তার ব্যাপারটাও রাশিয়ার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
২৩শে মে ২০১৯

৬ই মে মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পেও উত্তর মেরুর কাছের আর্কটিক এলাকায় রাশিয়া এবং চীনের আগ্রাসী ভূমিকার বিরুদ্ধে সাবধান করেন। তিনি বলেন যে, আর্কটিক এলাকা এখন বিশ্বশক্তিদের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। পম্পেও ফিনল্যান্ডে ‘আর্কটিক কাউন্সিল’এর এক সভায় এই কথাগুলি বলেন। ‘আর্কটিক কাউন্সিল’এ রয়েছে আর্কটিক অঞ্চলের আটটা রাষ্ট্র এবং ঐ অঞ্চলে বসবাসরত মানুষদের প্রতিনিধিরা। পম্পেও আর্কটিকের পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলি নিয়ে কথা না বলে বরং এই অঞ্চলকে একটা সুযোগের অঞ্চল বলে আখ্যা দেন। আর্কটিকের তেল, গ্যাস, ইউরেনিয়াম, স্বর্ণ, মৎস্য সম্পদ এবং ‘রেয়ার আর্থ’ খনিজ-কেই তিনি বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। একইসাথে আর্কটিকের সমুদ্র রুটের উপর বেইজিং এবং মস্কোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা অত্র অঞ্চলে দক্ষিণ চীন সাগরের মতোই এক প্রতিযোগিতার জন্ম দিতে পারে বলে বলেন তিনি। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এই কাউন্সিল তৈরির সময় এর মূল আলোচ্য বিষয় ছিল পরিবেশ; আর নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার কোন ব্যবস্থাই এখানে রাখা হয়নি। তাই পম্পেও-এর কথায় আলোচনায় অংশ নেয়া প্রতিনিধিরা হতবাক হয়ে যান।

শুধু তা-ই নয়, পম্পেও কানাডার মাঝ দিয়ে যাওয়া ‘নর্থ-ওয়েস্ট প্যাসেজ’-কে আন্তর্জাতিক নৌ-রুট বলে আখ্যা দেন, যা কিনা কানাডা নিজেদের বলে মনে করে। পম্পেও-এর কথায় কানাডিয়রা বেশ ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তবে রাশিয়ার আর্কটিকের ‘নর্দার্ন সী রুট’ বা ‘এনএসআর’কে আন্তর্জাতিক নৌ-রুট হিসেবে আখ্যা দেবার জন্যেই যে পম্পেও কানাডার ‘নর্থ-ওয়েস্ট প্যাসেজ’-কে আন্তর্জাতিক নৌ-রুট বলে আখ্যা দেন, তা বোঝা যাচ্ছে। তদুপরি ‘নর্থ-ওয়েস্ট প্যাসেজ’-কে রক্ষা করার নিমিত্তে কানাডা সেখানে যতটা নিরাপত্তা কার্যক্রমে হাত দিয়েছে, তা রাশিয়ার নিরাপত্তা কার্যক্রমের সাথে তুলনীয় নয় মোটেই। ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’এর কারণে আর্কটিকে বরফ গলার সাথেসাথে সমুদ্রপথ উন্মুক্ত হচ্ছে। এখন বছরের বেশ কয়েক মাস রুশ আর্কটিক দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে পারছে, যা ইতিহাসে প্রথম। এই নৌ-রুটের সাথে সাথে এর নিরাপত্তার ব্যাপারটাও রাশিয়ার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

আর্কটিকের সামরিকীকরণ
রাশিয়ার তিনি-কোণা এই ঘাঁটিগুলিকে বলা হচ্ছে ‘আর্কটিক ট্রেফয়েল’। লাল-সাদা-নীল রং-এর এই ঘাঁটিগুলির ১৪ হাজার বর্গমিটার স্থানে ১’শ ৫০ জন সেনা দেড় বছর থাকতে পারবে বলে বলা হচ্ছে।

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে রুশ সেনারা সাইবেরিয়ার উত্তরে নিউ সাইবেরিয়ান দ্বীপপুঞ্জের কোটেলনি দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করা শুরু করে। একইসাথে সেখানে সারাবছর সাপ্লাই পৌঁছানোর জন্যে একটা বড়সড় এয়ারফিল্ড এবং উপকূলে একটা জেটি তৈরি শুরু করে। আর্কটিকে দ্বিতীয় ঘাঁটিটি তৈরি করা হয় আরও পশ্চিমে ফ্রাঞ্জ যোসেফ ল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের আলেক্সান্দ্রা ল্যান্ড-এ। এখানেও একটা আড়াই কিঃমিঃ লম্বা এয়ারফিল্ড তৈরি করা হচ্ছে। তিনি-কোণা এই ঘাঁটিগুলিকে বলা হচ্ছে ‘আর্কটিক ট্রেফয়েল’। লাল-সাদা-নীল রং-এর এই ঘাঁটিগুলির ১৪ হাজার বর্গমিটার স্থানে ১’শ ৫০ জন সেনা দেড় বছর থাকতে পারবে বলে বলা হচ্ছে। এগুলি ছাড়াও নোভায়া জেমলিয়া দ্বীপের রোগাচেভো, সাইবেরিয়ার চুকচি সাগরে কেপ শ্মিট ও র‍্যাংগেল দ্বীপ, এবং মুরমানস্ক-এর কাছাকাছি স্রেদনি-তে আরও সামরিক ঘাঁটি তৈরি করা হচ্ছে।

গত মার্চে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পত্রিকা ‘ক্রাসনায়া জুএজদা’র সাথে কথা বলতে গিয়ে রুশ নৌবাহিনীর নর্দার্ন ফ্লিটের কমান্ডার এডমিরাল নিকোলাই ইয়েভমেনভ বলেন যে, রুশ সাইবেরিয়ার উত্তরে তিকসি শহরে নতুন করে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে, যা কিনা আর্কটিকের ‘নর্দার্ন সী রুট’ বা ‘এনএসআর’এর আকাশের নিরাপত্তা দেবে। এয়েভমেনভ আরও বলেন যে, নির্দার্ন ফ্লিটকে ‘ব্যাসচন’ উপকূল প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা দিয়ে সজ্জিত করা হবে। ‘ব্যাসচন’ ব্যবস্থার মূলে রয়েছে ৬’শ কিঃমিঃ পাল্লার জাহাজ বিধ্বংসী সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘ওনিক্স’। ২০১৮-এর সেপ্টেম্বরে এক সামরিক মহড়ায় আর্কটিকের কোতেলনি দ্বীপে ‘ব্যাসচন’ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছিল বলে রুশ মিডিয়া ‘ইন্টারফ্যাক্স’ জানায়। আর একই বছরের নভেম্বর থেকে আর্কটিকে ‘টর-এম২ডিটি’ স্বল্পপাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন শুরু হয়েছে বলে রুশ বার্তা সংস্থা ‘তাস’ জানায়।

২১শে মে রুশ নৌবাহিনীর নর্দার্ন ফ্লিটের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা ‘ইজভেস্তিয়া’ জানাচ্ছে যে, রুশ সামরিক বাহিনী পুরো আর্কটিক অঞ্চল জুড়ে ইলেকট্রনিক যুদ্ধের সরঞ্জাম বসিয়েছে। এই সুবাদে পুরো উত্তর মেরু এলাকা জুড়ে শত্রুপক্ষের যেকোন সামরিক ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিকে অকার্যকর করে ফেলার সক্ষমতা অর্জন করেছে তারা। মোতায়েনকৃত সরঞ্জামের মাঝে রয়েছে সর্বশেষ প্রযুক্তির ‘মুরমানস্ক-বিএন’ নামের স্ট্রাটেজিক জ্যামিং সিস্টেম, যা কিনা ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার কিঃমিঃ দূর পর্যন্ত প্রতিপক্ষের শর্টওয়েভ রেডিও যোগাযোগ ব্যবস্থা অকার্যকর করে দিয়ে সক্ষম। এই প্রযুক্তি তৈরি করা হয়েছে পশ্চিমাদের ‘হাই-ফ্রিকুয়েন্সি গ্লোবাল কমিউনিকেন্স সিস্টেম’কে টার্গেট করে। ২০১৬ সালের নভেম্বর থেকে এই প্রযুক্তি কার্যকর হয়েছে। রুশ পত্রিকা ‘ব্যারেন্টস অবজার্ভার’ জানাচ্ছে যে, এই সিস্টেমের একটা মোতায়েন করা হয়েছে রুশ আর্কটিকের একেবারে পশ্চিমে স্ক্যান্ডিনেভিয়া (নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক)-এর কাছে কোলা উপদ্বীপের সেভেরোমোরস্ক-এ; আর আরেকটা মোতায়েন করা হয়েছে একেবারে পূর্বে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে কামচাটকা উপদ্বীপে। রুশ আর্কটিকে পশ্চিম এবং পূর্ব দিক থেকে ঢোকার পথগুলিকেই পাহাড়া দিচ্ছে এই স্থাপনাগুলি।

‘মুরমানস্ক-বিএন’ ছাড়াও রুশরা ‘ক্রাসুখা-২’ এবং ‘ক্রাসুখা-৪’ নামের মধ্যম-পাল্লার জ্যামিং সিস্টেম মোতায়েন করেছে। এগুলি আড়াই’শ থেকে ৩’শ কিঃমিঃ দূর পর্যন্ত শত্রুর আকাশে পরিবাহিত রাডার অকার্যকর করে ফেলতে সক্ষম। পশ্চিমাদের ‘এয়ারবোর্ন ওয়ার্নিং এন্ড কন্ট্রোল সিস্টেম’ বা ‘এওয়াকস’ বিমানকে টার্গেট করে এই প্রযুক্তি তৈরি করা হলেও ‘ক্রাসুখা-৪’ স্যাটেলাইটের সাথে যোগাযোগ ব্যাহত করতে সক্ষম বলে মনে করা হয়। ২০১৪ সাল থেকে এগুলি সার্ভিসে এসেছে। রুশ আর্কটিকের নোভায়া জেমলিয়া, সেভেরনায়া জেমলিয়া, নিউ সাইবেরিয়ান দ্বীপপুঞ্জ এবং চুকোতকা-তে এই সিস্টেমগুলি মোতায়েন করা হয়েছে। এগুলি ছাড়াও সর্বশেষ প্রযুক্তির ‘দিভনোমোরইয়ে’ নামের আরও একটা জ্যামিং সিস্টেম মোতায়েন করা হয়েছে, যা কিনা আকাশে ওড়া বিমানের রাডার ও ইলেকট্রনিক্স এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগ অচল করে দিতে সক্ষম। মধ্যম-পাল্লার এই জ্যামিং সিস্টেমগুলি রুশ আর্কটিকের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলিকে নিরাপত্তা দেবার উদ্দেশ্যে মোতায়েন করা হয়েছে। এগুলিকে খুব দ্রুত মোতায়েন করা এবং সরিয়ে নেয়া সম্ভব। ‘ব্যারেন্টস অবজার্ভার’ বলছে যে, গত দুই বছর ধরেই স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলে বেসামরিক বিমান এবং বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে স্যাটেলাইটের সাথে যোগাযোগ হারাবার ঘটনা ঘটছে। এবছরের মার্চে নরওয়ের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রুশ সামরিক বাহিনীকে তাদের জ্যামিং অপারেশন থামাবার জন্যে অনুরোধ করেছে। তারা বলছেন যে, রাশিয়া তার নিজ ভূখন্ডে নিজেদের সক্ষমতা যাচাইয়ে যেকোন কিছুই করতে পারে, কিন্তু তা নরওয়ের আকাশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে নয়।





সবকিছুর মূলেই অর্থনীতি

রুশরা আর্কটিকে তাদের অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলির নিরাপত্তা দিতেই এই সামরিকীকরণ করছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আশা করছেন যে, আর্কটিকের ‘নর্দার্ন সী রুট’ বা ‘এনএসআর’ দিয়ে মালামাল পরিবহণ ২০২৫ সাল নাগাদ ৮ কোটি টন হবে। ‘সেন্টার ফর হাই নর্থ লজিস্টিকস’এর হিসেবে ২০১৮ সালে ‘এনএসআর’ দিয়ে ২ কোটি ২ লক্ষ টন মালামাল পরিবাহিত হয়েছে, যা আগের বছর ছিল ১ কোটি ৭ লক্ষ টন। রুশ মিডিয়া ‘আরবিসি’ জানাচ্ছে যে, গত মার্চে রুশ ‘ন্যাচারাল রিসোর্সেস এন্ড এনভায়রনমেন্ট মিনিস্ট্রি’ আর্কটিকে মোট ১’শ ১৮টা প্রকল্পের এক বিশাল তালিকা সরকারের কাছে পাঠিয়েছে। তাদের হিসেবে এই প্রকল্পগুলিতে মোট বিনিয়োগ হবে ১০ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন রুবল বা ১’শ ৬৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। এই পুরো বিনিয়োগই ‘এনএসআর’ বরাবর হবে। বর্তমানে চলমান ২৫টা প্রকল্পের মাঝে রয়েছে রুশ সরকারি কোম্পানি ‘গ্যাজপ্রম’এর ‘নভোপোর্টোভস্কই’ তেলের খনি; রুশ সরকারি কোম্পানি ‘রজফেফত’এর ‘ভ্যানকর’ তেলের খনি; সাইবেরিয়াতে ‘গ্যাজপ্রম’এর ‘আচিমগ্যাজ’ খনি; এবং সবচাইতে বড় ‘ইয়ামাল’ এলএনজি প্রকল্প। ২০১৬ সালের মে মাসে ভ্লাদিমির পুতিন ‘নভোপোর্টোভস্কই’ তেলের খনি থেকে প্রথমবারের মতো তেল উত্তোলন এবং পরিবহন উদ্ভোধন করেন। এই প্রকল্পে মোট ১’শ ৮৬ বিলিয়ন রুবল বা ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে বলে বলেন তিনি।

রুশ ইহুদি বিলিয়নেয়ার লিওনিড মিখেলসন-এর কোম্পানি ‘নোভাটেক’-এর নেতৃত্বে ‘ইয়ামাল’ উপদ্বীপে চলছে ২৭ বিলিয়ন ডলারের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। এখান থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন করে তরলীকৃত করে ‘এলএনজি’ আকারে জাহাজে করে গ্যাস রপ্তানি করা হচ্ছে চীনে। ‘ইয়ামাল’এর মালিকারার ৫০ শতাংশ রয়েছে রুশ কোম্পানি ‘নোভাটেক’-এর হাতে। বাকিটার ২০ শতাংশ রয়েছে ফরাসী কোম্পানি ‘টোটাল’এর কাছে; আরও ২০ শতাংশ চীনা কোম্পানি ‘সিএনপিসি’এর কাছে; আর আর বাকি প্রায় ১০ শতাংশের মতো রয়েছে চীনা ‘সিল্ক রোড ফান্ড’এর কাছে। ‘ইয়ামাল’ বছরে প্রায় ১ কোটি ৬৫ লক্ষ টন এলএনজি উৎপাদন করতে সক্ষম। এলএনজি পরিবহণের জন্যে সেখানে তৈরি করা হচ্ছে ‘সাবেত্তা’ নামের এক সমুদ্রবন্দর। সেখান থেকে এলএনজি পরিবহণ করে চীন পর্যন্ত নিয়ে যাবার জন্যে দৈত্যাকৃতির একেকটা প্রায় ৩’শ মিটার লম্বা এবং ১ লক্ষ ১০ হাজার টন এলএনজি ধারণক্ষমতার ১৫টা জাহাজ তৈরি করা হচ্ছে, যেগুলি কিনা আড়াই মিটার পর্যন্ত পুরু বরফ ভেঙ্গে চলতে সক্ষম। ফিনল্যান্ডে ডিজাইন করা এই জাহাজগুলিকে তৈরি করছে দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানি দাইউ শিপবিল্ডিং। জাহাজগুলির মালিকানা রয়েছে মূলতঃ আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলির কাছে – ড্যানিশ-ক্যানাডিয়ান কোম্পানি ‘টিকে কর্পোরেশন’ এবং ‘চায়না এলএনজি’এর জয়েন্ট ভেঞ্চার (৬টা), গ্রীক বিলিয়নেয়ার জর্জ প্রকোপিউ-এর কোম্পানি ‘ডাইনাগ্যাস’ (৫টা), জাপানি কোম্পানি ‘এমওএল’ (৩টা) এবং রুশ কোম্পানি ‘সভকমফ্লট’ (১টা)।
 


‘ইয়ামাল’এর পাশেই ‘গাইদান’ উপদ্বীপে নেয়া হয়েছে ‘আর্কটিক এলএনজি-২’ নামের ২৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের আরও একখানা মেগা প্রকল্প। এর উৎপাদন ক্ষমতা হবে বছরে ১ কোটি ৯৮ লক্ষ টন এলএনজি। রুশ কোম্পানি ‘নোভাটেক’ নিজেদের কাছে ৬০ শতাংশের মতো মালিকানা রেখে বাকিটা বিক্রি করার প্রচেষ্টায় রয়েছে। ‘রয়টার্স’ জানাচ্ছে যে, গত এপ্রিলে ‘নোভাটেক’ চীনের দু’টা কোম্পানির (‘সিএনওডিসি’ ও ‘সিএনওওসি’) কাছে ২০ শতাংশ মালিকানা বিক্রি করেছে। এর আগেই ২০১৯-এর শুরুতে ফরসী কোম্পানি ‘টোটাল’ কিনেছে ১০ শতাংশ মালিকানা। ‘নোভাটেক’ কোম্পানির মাঝেই আবার ‘টোটাল’এর ১৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। গত ডিসেম্বরেই খবর আসে যে, এই প্রকল্পে সৌদি কোম্পানি ‘আরামকো’, জাপানি কোম্পানি ‘মিতসুই’ এবং ‘রাশান ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড’ বিনিয়োগ করতে চাইছে। ২০২২-২৩ সাল থেকে এই প্রকল্পে উৎপাদন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। ক’দিন আগেই ফরাসী কোম্পানি ‘টেকনিপ’কে এই প্রকল্প তৈরি করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বলে খবরে প্রকাশ।

চীনারা রুশ আর্কটিকে তেল-গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে বিনিয়োগ করছে। আর্কটিকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে চীনা কোম্পানি ‘সিএনওওসি’এর সাথে রুশ কোম্পানি ‘গ্যাজপ্রম’এর এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর ফলে ইয়ামাল উপদ্বীপের পশ্চিমে কারা সাগরে ২০১৭ সাল থেকে কাজ করছে ১৫ হাজার টনের চীনা ড্রিলিং রিগ ‘নান হাই বা হাও’। ইতোমধ্যেই চীনারা সেখানে ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন কিউবিক মিটার বা প্রায় ৪২ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট গ্যাস আবিষ্কার করেছে।


২০১৮-এর মার্চে ‘আইস এক্সারসাইজ-২০১৮’ নামের মহড়ার সময় মার্কিন নৌবাহিনীর সাবমেরিন ‘ইউএসএস হার্টফোর্ড’ ও ‘ইউএসএস কানেকটিকাট’ এবং ব্রিটিশ রয়াল নেভির সাবমেরিন ‘এইচএমএস ট্রেনচ্যান্ট’ একত্রে আর্কটিক অঞ্চলের বরফ ফুঁড়ে উঠে আসে। এধরনের মিশনের মাধ্যমে পশ্চিমারা দক্ষিণ চীন সাগরে যে কাজটা করছে, সেটাই উত্তর মেরুতে করছে; আর তা হলো, পশ্চিমাদের ঘোষিত আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে নিজেদের সামরিক জাহাজ যেতে পারার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।

পশ্চিমা প্রত্যুত্তর

আর্কটিকে রাশিয়ার সামরিকীকরণের প্রত্যুত্তর হিসেবে পশ্চিমা দেশগুলিও আর্কটিক এলাকায় মহড়া চালাচ্ছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার নরওয়ে এবং ফিনল্যান্ডে মার্কিন এবং ব্রিটিশ সেনারা নিয়মিত মহড়া চালাচ্ছে। সেখানে তাপমাত্রা শূণ্যের ৩০ ডিগ্রী নিচে পর্যন্ত নেমে যায়। গত বছরের অক্টোবর-নভেম্বরে ন্যাটো ‘ট্রাইডেন্ট জাঙ্কচার’ নামে এক সামরিক মহড়া করে, যাতে অংশ নেয় ৫০ হাজার সৈন্য, ৬৫টা যুদ্ধজাহাজ, ২’শ ৫০টা যুদ্ধবিমান, ১০ হাজার গাড়ি। ১৯৮৭ সালের পর থেকে প্রথমবারের মতো মার্কিন নৌবাহিনী আর্কটিক অঞ্চলের কাছাকাছি একটা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ পাঠায়। ন্যাটোভুক্ত দেশগুলি ছাড়াও এতে অংশ নেয় সুইডেন এবং ফিনল্যান্ড। ‘দ্যা ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় ‘ইউএস নেভাল ওয়ার কলেজ’এর ম্যারি থম্পসন বলছেন যে, এধরনের মহড়া সংজ্ঞাগতভাবেই সীমাবদ্ধ। এই মহড়ার কারণে অত্র এলাকার সামরিক ব্যালান্সে স্থায়ী কোন পরিবর্তন সংগঠিত হবে না; স্থায়ী কোন সামরিক স্থাপনাও তৈরি হবে না। আবার এর ফলশ্রুতিতে বরফাচ্ছাদিত এলাকায় চলাচলের জন্যে কোন আইসব্রেকারও তৈরি করা হবে না।

২০১৩ সালের অগাস্টে মার্কিন নৌবাহিনীর পারমানবিক শক্তিচাইল সাবমেরিন ‘ইউএসএস সীউলফ’ যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলের ওয়াশিংটনে রাজ্যের ব্রেমারটন নৌঘাঁটি থেকে যাত্রা করে এক মাস পর নরওয়ের হাকন্সভার্ন নৌঁঘাঁটিতে গিয়ে নোঙ্গর করে; যেখানে নরওয়েতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্যারি হোয়াইট সাবমেরিন পরিদর্শন করেন। মানচিত্রের দিকে তাকালেই বোঝা সম্ভব যে সাবমেরিনটার প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ইউরোপ যাবার একমাত্র পদ্ধতিই হলো উত্তর মেরুর বরফের নিচ দিয়ে যাওয়া! ২০১৮-এর মার্চে ‘আইস এক্সারসাইজ-২০১৮’ নামের মহড়ার সময় মার্কিন নৌবাহিনীর সাবমেরিন ‘ইউএসএস হার্টফোর্ড’ ও ‘ইউএসএস কানেকটিকাট’ এবং ব্রিটিশ রয়াল নেভির সাবমেরিন ‘এইচএমএস ট্রেনচ্যান্ট’ একত্রে আর্কটিক অঞ্চলের বরফ ফুঁড়ে উঠে আসে। এধরনের মিশনের মাধ্যমে পশ্চিমারা দক্ষিণ চীন সাগরে যে কাজটা করছে, সেটাই উত্তর মেরুতে করছে; আর তা হলো, পশ্চিমাদের ঘোষিত আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে নিজেদের সামরিক জাহাজ যেতে পারার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।

সাবমেরিনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আর্কটিকে তার শক্তি প্রদর্শন করতে পারবে নিশ্চিত, তবে পানির উপরের ভাসমান জাহাজও তার দরকার হবে। আর ভাসমান জাহাজকে আর্কটিক অঞ্চলে চালাতে হলে পুরু বরফের আচ্ছাদন ভেঙ্গে চলার মতো আইসব্রেকার দরকার হবে। মার্কিন কোস্ট গার্ডের হিসেবে ২০ হাজার ব্রেকহর্সপাওয়ার বা এর চাইতে বেশি শক্তিশালী আইসব্রেকারের পক্ষেই শুধুমাত্র আর্কটিকে কাজ করা সম্ভব। আর্কটিক যে এতকাল যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে তেমন গুরুত্ব বহণ করেনি, তার প্রমাণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে মাত্র ৪টা আইসব্রেকার, যা কিনা আর্কটিক অঞ্চলে চলাচলে সক্ষম। ৪৩ বছর পর গত ফেব্রুয়ারিতে অবশেষে মার্কিন সরকার দু’টা আইসব্রেকার তৈরি করার জন্যে অর্থের সঙ্কুলান করেছে। কানাডার ৫টা আইসব্রেকারের মাঝে মাত্র দু’টা আর্কটিকে চলতে পারে। তারা বর্তমানে ৬টা হেভি আইসব্রেকার তৈরি করছে, যার প্রথমটা তৈরি প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। ফিনল্যান্ডের ১০টা আইসব্রেকারের মাঝে মাত্র ৩টা আর্কটিকের জন্য উপযোগী; সুইডেনের ১টা; আর জাপানের ১টা।
‘এনএসআর’এর নিরাপত্তা নিশ্চিতে রাশিয়া কিছু আইসব্রেকারকে অস্ত্রসজ্জিতও করছে। বর্তমানে নির্মীয়মান ‘প্রজেক্ট ২৩৫৫০’ প্রকল্পের জাহাজগুলি প্যাট্রোল জাহাজ হলেও এগুলি আর্কটিকে বরফ ভেঙ্গে চলার মতো করে তৈরি করা হচ্ছে। এগুলিকে কামান এবং ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সজ্জিত করা হচ্ছে

 
অন্যদিকে রাশিয়ার মোট ৪৬টা আইসব্রেকারের মাঝে আর্কটিকে চলাচলের জন্যে রয়েছে ২৬টা; যার মাঝে ৬টা আবার পারমানবিক শক্তিচালিত হেভি আইসব্রেকার। আর্কটিকে বরফে কোন একটা জাহাজ আটকা পড়ে গেলে পারমাণবিক আইসব্রেকারই সবচাইতে নির্ভরযোগ্য। কারণ তেলে-চালিত হলে সেটাকে আবার তেল নিতে হবে। রুশ আর্কটিকের হাজার মাইলের বরফাচ্ছাদিত অঞ্চলে জ্বালানির ব্যবস্থা করাটা আরেক চ্যালেঞ্জ। আরও ১১টা আইসব্রেকার তৈরি করছে রাশিয়া; যার মাঝে পারমাণবিক আইসব্রেকার রয়েছে কমপক্ষে ৩টা। রুশ আর্কটিকের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্থাপনা এবং সামরিক ঘাঁটিগুলিকে জ্বালানি, খাবার-দাবার এবং অন্যান্য রসদ সরবরাহ করে বছরব্যাপী চালু রাখতে আইসব্রেকারের কোন বিকল্প নেই। ‘এনএসআর’এর নিরাপত্তা নিশ্চিতে রাশিয়া কিছু আইসব্রেকারকে অস্ত্রসজ্জিতও করছে। বর্তমানে নির্মীয়মান ‘প্রজেক্ট ২৩৫৫০’ প্রকল্পের জাহাজগুলি প্যাট্রোল জাহাজ হলেও এগুলি আর্কটিকে বরফ ভেঙ্গে চলার মতো করে তৈরি করা হচ্ছে। এগুলিকে কামান এবং ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সজ্জিত করা হচ্ছে বলেও খবরে প্রকাশ। এগুলি ছাড়াও আর্কটিকে চলার জন্যে রাশিয়া স্পেশালিস্ট ট্যাঙ্কার জাহাজ, মাল্টি-পারপাস জাহাজ, আর্মামেন্ট সাপোর্ট শিপ এবং অন্যান্য ধরনের জাহাজ তৈরি করছে, যেগুলি ঐ অঞ্চলে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করবে। পশ্চিমাদের কাছে এগুলির ধারেকাছেও কোনকিছু নেই।

পশ্চিমা দেশগুলির আর্কটিকে তেমন কোন স্থাপনা নেই বলে তাদের হেভি আইসব্রেকারের দরকারও কম। আইসব্রেকারে বিনিয়োগই বলে দিচ্ছে কে আর্কটিককে কিভাবে দেখছে। রাশিয়ার জন্যে আর্কটিক অর্থনৈতিকভাবে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, পশ্চিমা দেশগুলির জন্যে কি ততটা গুরুত্বপূর্ণ? পশ্চিমারা আর্কটিকে শুধুমাত্র প্রভাব ধরে রাখতে সামরিক খাতে কতটা বিনিয়োগ করবে? কতগুলি আইসব্রেকারই বা তারা তৈরি করবে, যেগুলির কাজ হবে শুধুমাত্র রাশিয়াকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করা? কোন ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা পাবার আশা ছাড়াই পশ্চিমারা আর্কটিকে স্থায়ী স্থাপনা তৈরি করবে কি?

আর্কটিকের ভবিষ্যৎ কি?

রাশিয়া নিজেকে বিশ্বশক্তির কাতারে নিয়ে যেতে তার অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে চাইছে। সেই লক্ষ্যে আর্কটিকে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিয়ে আসছে রাশিয়া। বিনিয়োগকারীরাও চাইবে তাদের বিনিয়োগের সুরক্ষা হোক। তাই আর্কটিকের অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলির নিরাপত্তা দেবার রুশ প্রচেষ্টাকে বিনিয়োগকারীরা প্রশ্নবিদ্ধ করবে না; বরং নিরাপত্তার ব্যাপারগুলি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের সুরক্ষা দেবার রুশ সক্ষমতাকেই তুলে ধরবে। রুশ আর্কটিকে বিনিয়োগের এক বিশেষ দিক হলো এর উৎপাদিত বেশিরভাগ খনিজ সম্পদ চীনে রপ্তানি হবে। আর চীনা অর্থনীতির সাথে জড়িত হয়ে দুনিয়ার বড় বড় বিনিয়োগকারীরাও আরও বিত্তশালী হতে চাইছেন। যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলেও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীরা বরং ‘এনএসআর’কে ঝামেলা-মুক্ত দেখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে। তবে ‘এনএসআর’এর গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে পশ্চিমাদের ব্যাপক বিনিয়োগ এ-ও বলে দিচ্ছে যে তারা রুশ আর্কটিককে একেবারে চীনের হাতে ছেড়ে দিতে চাইছে না। পশ্চিমাদের বিনিয়োগের কারণেই আর্কটিকে চীনা প্রভাব নিয়ন্ত্রণে থাকবে, যা কিনা রাশিয়াকেও নাখোশ করবে না। অন্যদিকে কানাডার মাঝ দিয়ে প্রবাহিত ‘নর্থ-ওয়েস্ট প্যাসেজ’ যাতে চীনা প্রভাবের মাঝে পড়ে না যায়, সেদিকেও খেয়াল রাখবে যুক্তরাষ্ট্র। এই প্যাসেজ ব্যবহার করে চীন থেকে ইউরোপে জাহাজ যেতে পারবে অনেক তাড়াতাড়ি। কানাডার উপর প্রভাব খাটাতে পারলে এটা ‘এনএসআর’এর আরেকটা বিকল্পও হতে পারে চীনের জন্যে। আর একারণেই কানাডাকে নাখোশ করে হলেও ‘নর্থ-ওয়েস্ট প্যাসেজ’এর আন্তর্জাতিকীকরণ চাইবে যুক্তরাষ্ট্র।

চীনও চাইছে তার জ্বালানি চাহিদার একটা অংশকে মার্কিন নৌশক্তির নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল থেকে দূরে সরিয়ে নিতে। ‘এনএসআর’এর মাধ্যমে এলএনজি-বাহী জাহাজগুলি রুশ সামরিক পাহাড়ায় প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে। আর এভাবেই রাশিয়ার এই নৌ-রুট হয়ে উঠবে গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া এর আগে কখনোই গুরুত্বপূর্ণ কোন নৌপথের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। ‘গ্লোবাং ওয়ার্মিং’এর কারণে খুলে যাওয়া ‘এনএসআর’ রাশিয়াকে একটা ম্যারিটাইম রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি দিতে যাচ্ছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে রুশ পত্রিকা ‘দ্যা মস্কো টাইমস’এ এক লেখায় অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ‘সেন্টার ফর ইউরোপিয়ান স্টাডিজ’এর এলিজাবেথ বুকানান বলেন যে, ইউরোপ এবং এশিয়ার সংযোগ হিসেবে ‘নর্দার্ন সী রুট’ বা ‘এনএসআর’ রাশিয়াকে আর্কটিকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলছেন যে, ‘এনএসআর’এর ব্যবহার থেকে রাশিয়া যতটা না ট্যারিফ আয় করবে, তার চাইতে বড় ব্যাপার হবে পৃথিবীর একটা গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র রুটের উপরে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারা, যা কিনা হবে ইতিহাসে প্রথম।