Thursday, 23 July 2026

যুক্তরাষ্ট্র কি ব্রিটেনের কাছ থেকে ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জ পুনরুদ্ধারে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন দেবে?

২৩শে জুলাই ২০২৬

বিশ্বকাপ ফুটবলের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ডের খেলা শেষ হবার পর আর্জেন্টাইন ফুটবলাররা একটা ব্যানার মাঠে নিয়ে আসেন; যেটাতে স্প্যানিশ ভাষায় লেখা ছিল ‘লাস মালভিনাস সন আর্জেন্টিনাস’; বাংলা তরজমা করলে যা দাঁড়ায়, ‘মালভিনাস আর্জেন্টিনার’। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের পেছনে যে সরকারি সমর্থন রয়েছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় যখন আর্জেন্টিনার ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিক্টোরিয়া ভিলারুয়েল এই ব্যানারের স্বপক্ষে বক্তব্য দেন। সোশাল মিডিয়া ‘এক্স’এ খেলোয়াড়দের ব্যানার বহণ করার ছবি পোস্ট করে তিনি বলেন যে, তারা স্টেডিয়ামে এই ব্যানার আনা নিষেধ করলেও তারা ভুলে যাচ্ছে যে, আর্জেন্টিনার জনগণ এটা বুকে বহণ করে। 



যুক্তরাষ্ট্র কেন ফকল্যান্ডসকে আলোচনায় আনছে?

গত এপ্রিল মাসে পেন্টাগনের এক অভ্যন্তরীণ ইমেইলের বরাত দিয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা ‘রয়টার্স’কে বলেন যে, হোয়াইট হাউজ ইউরোপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিভিন্ন অপশন খতিয়ে দেখছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বেশকিছু ইউরোপিয় দেশের সমর্থন না দেওয়া, তাদের সামরিক ঘাঁটিগুলিকে মার্কিন বাহিনীকে ব্যবহার করতে না দেয়া এবং তাদের আকাশসীমাকে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলিকে ব্যবহার করতে না দেয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে একাধিকবার উষ্মা প্রকাশ করেছেন। পেন্টাগনের অপশনগুলির একটা ছিল স্পেনকে সামরিক জোট ন্যাটো থেকে বের করে দেয়া। আরেকটা অপশন হলো, ইউরোপিয় দেশগুলির হাতে যেসকল ঔপনিবেশিক এলাকা এখনও রয়ে গেছে, সেগুলির পক্ষে সমর্থন সরিয়ে নেয়া; যার মাঝে রয়েছে ব্রিটিশ দখলে থাকা দক্ষিণ আটলান্টিকের ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জ এবং আশেপাশের কিছু দ্বীপ। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এখনও পর্যন্ত ফকল্যান্ডসের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের অফিশিয়াল অবস্থান হলো, ১৯৮২ সালের দুই মাসের অবৈধ দখল বাদে ১৮৩৩ সাল থেকে ফকল্যান্ডস শান্তিপূর্ণভাবে ব্রিটেনের অধীনে রয়েছে। তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কথা হলো, ফকল্যান্ডস হলো ব্রিটেন এবং আর্জেন্টিনার দ্বিপাক্ষিক বিষয়। আর যুক্তরাষ্ট্র চায় উভয় দেশ কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে তাদের দ্বন্দ্ব মিটমাট করুক। যুক্তরাষ্ট্র মেনে নিচ্ছে যে এই মুহুর্তে ফকল্যান্ডস ব্রিটিশ সরকারের অধীনে রয়েছে; কিন্তু দ্বীপগুলির সার্বভৌমত্ব কার থাকা উচিৎ, সেব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কোন মতামত নেই। ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ডস যুদ্ধের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনকে সমর্থন দিয়েছে। আর যুদ্ধের পর থেকে আর্জেন্টিনা জাতিসংঘে বেশ কয়েকবার ফকল্যান্ডসের ইস্যুকে তুলতে চেয়েছিল; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেগুলিকে সমর্থন দেয়নি। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ বলছে যে, যদি ফকল্যান্ডসের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র আর্জেন্টিনাকে সমর্থন দিতে শুরু করে, অথবা নতুন করে আলোচনা শুরু করতে ব্রিটেনের উপর চাপ প্রয়োগ করে, তাহলে ব্রিটেন অনেকটাই একা হয়ে যাবে। ব্রিটিশ রাজ তৃতীয় চার্লসের যুক্তরাষ্ট্র সফরের মাত্র তিন দিন আগে এই খবর বেরিয়ে আসে।

গত ২৫শে এপ্রিল পেন্টাগনের ইমেইলের খবর প্রচার হবার পর ডাউনিং স্ট্রীট থেকে বার্তা দেয়া হয় যে, ফকল্যান্ডসের সার্বভৌমত্ব শুধুমাত্র ব্রিটেনের। ব্রিটিশ মুখপাত্র বলেন যে, এর আগে ফকল্যান্ডসের জনগণ সর্বসম্মতিক্রমে ব্রিটেনের সাথে থাকার পক্ষে রায় দিয়েছে। এই ব্যাপারটা ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রকে বারংবার বলেছে এবং কোনকিছুই এটাকে পরিবর্তন করতে পারবে না। ‘বিবিসি’ বলছে যে, ২০১৩ সালের এক ভোটে দ্বীপের ১,৬৭২ জন ভোটারের মাঝে তিনজন বাদে সকলেই ব্রিটেনের সাথে থাকার পক্ষে রায় দিয়েছিল। ব্রিটিশ রাজনীতিবিদদের প্রায় সকলেই ফকল্যান্ডসের ব্যাপারে একমত। ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির প্রাক্তন নিরাপত্তা মন্ত্রী লর্ড ওয়েস্ট ‘বিবিসি’কে বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এই ব্যাপারটাকে বুঝতে পারছে না। তিনি মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথকে “স্থূল” বলে আখ্যা দেন এবং বলেন যে, হেগসেথ ন্যাটোর কিছুই বোঝেন না। হেগসেথ বলেছেন যে, ন্যাটো যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে কিছুই করেনি। অথচ একবার মাত্র ‘আর্টিকেল ৫’এর অধীনে ন্যাটো কাজ করেছিলে; আর সেটা ছিল ২০০১ সালে ১১ই সেপ্টেম্বরের পর যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যে। কনজারভেটিভ দলের নেতা কেমি বাডোনেক যুক্তরাষ্ট্রের এহেন চিন্তাকে অর্থহীন বলে আখ্যা দেন। রিফর্ম ইউকে-র নেতা নাইজেল ফারাজ বলছেন যে, ফকল্যান্ডসের ব্যাপারটা একেবারেই আলোচনার বিষয় নয়। এই দ্বীপগুলির সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে কোন বিতর্ক মেনে নেয়া হবে না। তিনি বলেন যে, এই বছরের শেষের দিকে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট জেভিয়ার মিলেইএর সাথে তার দেখা করার কথা রয়েছে। সেসময় তিনি এই ইস্যু নিয়ে কথা বলবেন। লিবারাল ডেমোক্র্যাট নেতা এড ড্যাভি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কটাক্ষ করে বলেন যে, এই প্রেসিডেন্ট ব্রিটেনকে অপমান না করে থাকতেই পারেন না।
 
ভেঙ্গে পড়া বিশ্বব্যবস্থার মাঝে প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরের সংযোগস্থলের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন উভয়ের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত লক্ষ্য। এছাড়াও দক্ষিণ আমেরিকার শেষ মাথায় একটা সামরিক ঘাঁটি খনিজ সমৃদ্ধ এন্টার্কটিকা মহাদেশে ঢোকার পথ। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইউরোপের দূরত্ব এমন সময়ে এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যের গাজা ও ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইস্রাইলকে শর্তহীন সমর্থন দিয়েছে আর্জেন্টিনা। 


আর্জেন্টিনা কেন ফকল্যান্ডসকে আবারও আলোচনায় আনতে চাইছে?

১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা নিজেদের উপকূল থেকে ৪৮৩কিঃমিঃ পূর্বে অবস্থিত ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জ ব্রিটেনের কাছ থেকে দখল করে নেয়। এরপর ব্রিটেন ১২ হাজার কিঃমিঃ সমুদ্র পাড়ি দিয়ে নৌবহর প্রেরণ করে ১০ সপ্তাহের যুদ্ধের মাধ্যমে ফকল্যান্ডস পুনর্দখল করে নেয়। যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন সামরিক সদস্য এবং ২৫৫ জন ব্রিটিশ সামরিক সদস্য নিহত হয়; ফকল্যান্ডসের তিনজন বেসামরিক নাগরিকও প্রাণ হারায়। ফকল্যান্ডসে আর্জেন্টিনার সেনারা আত্মসমর্পণ করেছিল ঠিকই; তবে আর্জেন্টিনা ফকল্যান্ডসের (যেটাকে আর্জেন্টিনা মালভিনাস বলে) উপর থেকে সার্বভৌমত্বের দাবি ছেড়ে দেয়নি কখনোই। পেন্টাগনের ইমেইলের খবর বের হবার পর আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাবলো কুয়ার্নো সোশাল মিডিয়া ‘এক্স’এ লেখেন যে, ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার এবং আর্জেন্টিনা প্রস্তুত রয়েছে ব্রিটেনের সাথে আলোচনার জন্যে। কুয়ার্নো তার সরকারের দীর্ঘমেয়াদী নীতিকেই তুলে ধরেছিলেন মাত্র। সাম্প্রতিক সময়ে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট জেভিয়ার মিলেই ফকল্যান্ডস নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদেরকে কটাক্ষ করে বলেন যে, তারা বুক চাপড়ে ফকল্যান্ডসের সার্বভৌমত্ব চাইলেও ফলাফল শূণ্য।

নিঃসন্দেহেই বলা যায় যে, আর্জেন্টিনা রাষ্ট্রীয়ভাবে ফকল্যান্ডস ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসতে চাইছে। তারা ফুটবল বিশ্বকাপকে এক্ষেত্রে কাজে লাগিয়েছে বাকি দুনিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে। বিশ্বকাপ ফুটবলের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ডের খেলা শেষ হবার পর আর্জেন্টাইন ফুটবলার জিওভানি লো সেলসো খেলা শেষে একটা ব্যানার মাঠে নিয়ে আসেন; যেটাতে স্প্যানিশ ভাষায় লেখা ছিল ‘লাস মালভিনাস সন আর্জেন্টিনাস’; বাংলা তরজমা করলে যা দাঁড়ায়, ‘মালভিনাস আর্জেন্টিনার’। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, লো সেলসো খুব সম্ভবতঃ ব্যানারটাকে গ্যালারিতে দর্শকদের কাছে থেকে নিয়ে আসেন। এরপরে আরেক খেলোয়াড় নিকোলাস ওতামেন্দি ব্যানারটাকে মাঠে শুইয়ে দেন। ‘বিবিসি’র সাথে এক সাক্ষাতে আর্জেন্টাইন খেলোয়াড় লিয়ান্দো পারেদেস বলেন যে, ফকল্যান্ডসের স্মৃতি ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে জেতার পিছনে অনেক বড় প্রেরণা যুগিয়েছিল। তবে আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের জানার কথা যে, ফিফার নিয়মে যেকোন প্রকারের রাজনৈতিক পতাকা, স্লোগান বা ইঙ্গিত বহন করা যাবে না। এই নিয়ম ভাঙলে খেলোয়াড় বা দলকে শাস্তি দেয়া হবে। তথাপি, আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের পেছনে যে সরকারি সমর্থন রয়েছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় যখন আর্জেন্টিনার ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিক্টোরিয়া ভিলারুয়েল এই ব্যানারের স্বপক্ষে বক্তব্য দেন। সোশাল মিডিয়া ‘এক্স’এ খেলোয়াড়দের ব্যানার বহণ করার ছবি পোস্ট করে তিনি বলেন যে, তারা স্টেডিয়ামে এই ব্যানার আনা নিষেধ করলেও তারা ভুলে যাচ্ছে যে, আর্জেন্টিনার জনগণ এটা বুকে বহণ করে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র এর জবাবে বলেন যে, ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ না পেলেও ফকল্যান্ডস ব্রিটেনেরই থাকবে। ব্রিটিশ লিবারাল পার্টির নেতা এড ডেভি বলেন যে, ২০২৪ সালে ইউরোপিয়ান লীগের খেলায় স্প্যানিশ খেলোয়াড় রোড্রি এবং আলভারো মোরাটাকে এক ম্যাচের জন্যে সাসপেন্ড করা হয়েছিল; কারণ তারা “জিব্রালটার স্পেনের” বলে গান গেয়েছিল। সেই হিসেবে তিনি দাবি করেন যে, দায়ী আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দেরকে যেন ফাইনালে খেলতে দেয়া না হয়। সেমিফাইনাল খেলা শেষ হবার কয়েক ঘন্টা পরেই আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্র দপ্তর অভিযোগ করে যে, ব্রিটিশ রয়াল নেভির প্যাট্রোল জাহাজ ‘মেডওয়ে’ আর্জেন্টিনার সমুদ্রসীমার ভেতরে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছিল। এর জবাবে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, তাদের জাহাজ ‘মেডওয়ে’ এন্টার্কটিকায় ব্রিটিশ সার্ভে মিশনের সহায়তায় কাজ করতে ফকল্যান্ডস থেকে চিলিতে গিয়েছিল। এই যাত্রায় জাহাজটা সেই রুটটাই নিয়েছিল, যা কিনা সেই আবহাওয়ার জন্য ছিল নিরাপদ।

সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটন থেকে আর্জেন্টিনার পক্ষে যে সমর্থনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, সেটা একপাক্ষিক নয়। কারণ জেভিয়ার মিলেইএর আর্জেন্টিনা সরকার যুক্তরাষ্ট্র ও ইস্রাইলের অতি কাছের বন্ধুরূপে আবির্ভূত হয়েছে। গত মার্চে পার্লামেন্টে এক বক্তব্যে মিলেই বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত বন্ধুত্বকে তিনি আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গেঁথে ফেলতে চাইছেন। তিনি ট্রাম্পকে প্রধান বন্ধুরূপে আখ্যা দেন এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইস্রাইলের যৌথ হামলাকে প্রথম দিন থেকেই সমর্থন দেন। তিনি পুরো আমেরিকা মহাদেশকে একত্রে শক্তিশালী করার কথা বলেন; এবং বলেন যে, পশ্চিমা বিশ্বের অতি প্রয়োজনীয় সকল খণিজই আমেরিকাতে রয়েছে। তিনি ট্রাম্পের স্লোগানের সাথে মিল রেখে “মেইক আমেরিকাস গ্রেট এগেইন” স্লোগান দেন। এছাড়াও তিনি বলেন যে, সামনের দশকগুলিতে দক্ষিণ আটলান্টিক হবে কৌশলগত যুদ্ধক্ষেত্র। মিলেইএর আর্জেন্টিনা একদিকে যেমন আর্জেন্টিনার সর্বদক্ষিণে ম্যাজেলান ও বীগল প্রণালিকে নিয়ন্ত্রণ করা উশুআইয়া বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি তৈরির অনুমতি দিয়েছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রও আর্জেন্টিনার অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে ২০ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। আর্জেন্টিনার সর্বদক্ষিণে টিয়েরা ডেল ফুয়েগো প্রদেশে ‘রেয়ার আর্থ’ খনিজ পাবার সম্ভাবনাও আর্জেন্টিনাকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ করেছে। তবে আটলান্টিক এবং প্রশান্ত মহাসাগরের সংযোগপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বই সবচাইতে বড় ইস্যু বলে আবির্ভূত হচ্ছে। কারণ এই সাগরপথের উপরেই রয়েছে ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জ। এছাড়াও, মিলেইএর কথায়, উশুআইয়া সামরিক ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্র ও আর্জেন্টিনাকে এন্টার্কটিকা মহাদেশের ‘গেইটকিপার’ বা প্রহরী হিসেবে তুলে ধরবে।
 
আর্জেন্টাইন বিমান বাহিনীর 'এফ-১৬'। ডেনমার্কের পুরোনো ২৪টা ‘এফ-১৬’ যুদ্ধবিমান ক্রয় করে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় এই বিমানগুলিকে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করছে আর্জেন্টিনা। মার্কিন ‘এমর‍্যাম’ ক্ষেপণাস্ত্রগুলি আর্জেন্টিনার পুরোনো ‘এফ-১৬’গুলিকে নতুন সক্ষমতা দেবে; যা কিনা ব্রিটিশ বিমানগুলিকে কিছুটা হলেও হুমকির মাঝে ফেলতে পারে। ব্রিটিশ বিমান বাহিনীকে ধ্বংস করতে পারলে আর্জেন্টাইনরা হয়তো ফকল্যান্ডস পর্যন্ত পৌঁছাতেও পারে। তদুপরি, এই মুহুর্তে ফকল্যান্ডসের নিরাপত্তায় রয়েছে প্রায় ১,৫০০ ব্রিটিশ সেনা। ফকল্যান্ডসের মাটিতে নামতে পারলেও ব্রিটিশ সেনাদেরকে দ্রুত পরাজিত করাটাও একটা চ্যালেঞ্জ হবে আর্জেন্টাইনদের জন্যে। 


আর্জেন্টিনা কি ফকল্যান্ডস পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম?

আর্জেন্টিনা ফকল্যান্ডস পুনর্দখলের পরিকল্পনা করছে কিনা, সেটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে এটা নিশ্চিত যে, আর্জেন্টিনা তার বিমান বাহিনীকে বহুকাল পরে শক্তিশালী করতে পারছে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায়। এতকাল ব্রিটেনের বাধায় আর্জেন্টিনা নতুন যুদ্ধবিমান কিনতে সক্ষম হয়নি। ডেনমার্কের পুরোনো ২৪টা ‘এফ-১৬’ যুদ্ধবিমান ক্রয় করে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় এই বিমানগুলিকে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করছে আর্জেন্টিনা। ২০২৪ সালের অক্টোবরে পেন্টাগনের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, এই ‘এফ-১৬’ যুদ্ধবিমানের সাথে যুক্ত হবে ৩৬টা অত্যাধুনিক ‘এআইএম-১২০ এএমআরএএএম’ বা ‘এমর‍্যাম’ দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, লেজার গাইডেড বোমা, ডাটালিঙ্ক সিস্টেম, ক্রিপ্টোগ্রাফিক যন্ত্রপাতি এবং মিশন প্ল্যানিং সিস্টেম। এই মুহুর্তে ফকল্যান্ডসের নিরাপত্তায় রয়েছে ব্রিটিশ রয়াল এয়ার ফোর্সের ৪টা অত্যাধুনিক ‘ইউরোফাইটার টাইফুন’ যুদ্ধবিমান। মার্কিন ‘এমর‍্যাম’ ক্ষেপণাস্ত্রগুলি আর্জেন্টিনার পুরোনো ‘এফ-১৬’গুলিকে নতুন সক্ষমতা দেবে; যা কিনা ব্রিটিশ বিমানগুলিকে কিছুটা হলেও হুমকির মাঝে ফেলতে পারে। এছাড়াও গত পহেলা মে সামরিক ম্যাগাজিন ‘জোনা মিলিটার’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে আর্জেন্টাইন বিমান বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জেভিয়ার ভ্যালভের্দে বলেন যে, ‘এফ-১৬’ যুদ্ধবিমানের পাল্লা বৃদ্ধি করতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দু’টা ‘কেসি-১৩৫’ রিফুয়েলিং বিমান কেনা হচ্ছে। এই মুহুর্তে আর্জেন্টিনার নৌবাহিনী খুব বেশি শক্তিশালী না হলেও বিমান বাহিনীর সহায়তায় ফকল্যান্ডস পর্যন্ত গিয়ে সেনা মোতায়েন করতে সক্ষম হতেও পারে। ফ্রান্সে নির্মিত ৪টা ‘গোউইন্ড-ক্লাস’এর অত্যাধুনিক কর্ভেট তাদের নৌবাহিনীর মূল শক্তি। এগুলি ছাড়া নৌবাহিনীর বেশিরভাগ জাহাজই অকার্যকরা অবস্থায় রয়েছে; যার মাঝে রয়েছে দু’টা সাবমেরিন, চার দশকের পুরোনো তিনটা ফ্রিগেট এবং ৬টা পুরোনো কর্ভেট। তবে ব্রিটিশ বিমান বাহিনীকে ধ্বংস করতে পারলে আর্জেন্টাইনরা হয়তো ফকল্যান্ডস পর্যন্ত পৌঁছাতেও পারে। তদুপরি, এই মুহুর্তে ফকল্যান্ডসের নিরাপত্তায় রয়েছে প্রায় ১,৫০০ ব্রিটিশ সেনা। ফকল্যান্ডসের মাটিতে নামতে পারলেও ব্রিটিশ সেনাদেরকে দ্রুত পরাজিত করাটাও একটা চ্যালেঞ্জ হবে আর্জেন্টাইনদের জন্যে। এই মুহুর্তে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর সেই সক্ষমতা নেই যে, ১৯৮২ সালের মতো ১২ হাজার কিঃমিঃ পথ পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ আটলান্টিকের খারাপ আবহাওয়ায় বেঁচে থেকে ফকল্যান্ডসকে আর্জেন্টিনার হাত থেকে পুনরুদ্ধার করবে। তথাপি ব্রিটিশরা তাদের স্বপক্ষে যথেষ্ট কূটনৈতিক সমর্থন যোগাড় করার আগেই আর্জেন্টিনাকে যুদ্ধ শেষ করতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখল করে নেয়ার হুমকি ইউরোপিয়দেরকে একত্রিত করেছে। আবার ইরান যুদ্ধের সময়ে ইউরোপিয়দের সমর্থন না পেয়ে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউরোপিয় দেশগুলির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যায়, সেটাও ইউরোপিয়দেরকে একত্রিত করবে। আর ফকল্যান্ডসকে লক্ষ্য করে যেকোন আর্জেন্টাইন সামরিক মিশনকে ইউরোপিয়দের বিরূপ দৃষ্টিতে দেখার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক, নরওয়ে, পর্তুগাল এবং স্পেনের মতো দেশগুলি এখনও নিজেদের মূল ভূখন্ড থেকে বহু দূরে উপনিবেশ ধরে রেখেছে। তথাপি, ভেঙ্গে পড়া বিশ্বব্যবস্থার মাঝে প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরের সংযোগস্থলের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন উভয়ের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত লক্ষ্য। এছাড়াও দক্ষিণ আমেরিকার শেষ মাথায় একটা সামরিক ঘাঁটি খনিজ সমৃদ্ধ এন্টার্কটিকা মহাদেশে ঢোকার পথ। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইউরোপের দূরত্ব এমন সময়ে এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যের গাজা ও ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইস্রাইলকে শর্তহীন সমর্থন দিয়েছে আর্জেন্টিনা। যদি ইউরোপিয়রা ইরান যুদ্ধে সহায়তা না দেয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের শাস্তির মাঝে পড়ে, তাহলে ঠিক একই কারণে আর্জেন্টিনা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা পুরষ্কৃত হতেই পারে। তবে সেটা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ব্রিটেনের ভূরাজনৈতিক দরকষাকষির বাইরে যাবে না।

Tuesday, 30 June 2026

যুক্তরাষ্ট্র-ইস্রাইল দ্বন্দ্ব আসলে কতটুকু গভীর?

৩০শে জুন ২০২৬

সাংবাদিক বারাক রাভিদকে ট্রাম্প ফোনে ইন্টারভিউ দিয়ে নেতানিয়াহু সম্পর্কে এমন কিছু কথা বলেছেন, যা এর আগে কোন মার্কিন প্রেসিডেন্ট কোন ইস্রাইলি প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে বলেননি। শুধু তা-ই নয়, ট্রাম্প কথাগুলি কয়েকবার করে বলেছেন, যাতে করে ইস্রাইলিদের কাছে বার্তা পরিষ্কারভাবে পৌঁছায় এবং কেউ যেন মনে না করে যে ট্রাম্প ভুল করে কথাগুলি বলেছেন। 


যুক্তরাষ্ট্র-ইস্রাইল কাদা ছোঁড়াছুড়ি

ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা স্বাক্ষরিত হবার আগে থেকেই ইস্রাইলিরা অনেকেই প্রশ্ন করতে শুরু করে যে, যুক্তরাষ্ট্র কি ইস্রাইলের প্রতি তার সমর্থন তুলে নিচ্ছে কিনা? আবার কেউ কেউ সরাসরি বলতে শুরু করে যে, যুক্তরাষ্ট্র ইস্রাইলের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছে। ‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার মাঝে ইরানকে ৩০০ বিলিয়ন ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। আবার এই সমঝোতাতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রক্সিগুলির ব্যাপার স্থান পায়নি। অপরদিকে সমঝোতাতে রয়েছে যে, লেবাননেও যুদ্ধবিরতি হবে; অন্যকথায় বলতে গেলে, ইস্রাইল লেবাননে সকল সামরিক অভিযান বন্ধ করবে; যা ইস্রাইলিরা ভালোভাবে নেয়নি। ইস্রাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইস্রাইলিদের কাছে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপর ইস্রাইলিরা নির্ভর করতে পারে – এই ধারণাটা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার মাধ্যমে পুরোপুরিভাবে ধ্বসে গেছে।

ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা স্বাক্ষরিত হবার পরপরই ইস্রাইলি সংবাদ মাধ্যমে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মুখপাত্র রাজনীতিবিদ ইনোন মাগাল সোশাল মিডিয়া ‘এক্স’এ মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, ট্রাম্প প্রশাসনের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন। এবং বলেন যে, তারা কাতার এবং অন্যান্য আরব দেশের পক্ষে কাজ করেছেন। ইস্রাইলি সাংবাদিক বারাক রাভিদ ‘সিএনএন’কে বলছেন যে, যখন নেতানিয়াহুর এত কাছের একজন লোক ট্রাম্প প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের সম্পর্কে এরূপ মন্তব্য করেন, তখন বোঝাই যায় যে ইস্রাইলিরা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের সমঝোতাকে কিভাবে দেখেছে। এছাড়াও তিনি বলছেন যে, ইরানিরা মনে করে না যে ট্রাম্প ইস্রাইলিদেরকে লেবাননে হামলা চালানো থেকে বিরত রাখতে পারবেন; যা কিনা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা বাস্তবায়নের পথে সবচাইতে বড় বাধা।

গত ১৫ই জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইস্রাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ‘খুবই কঠিন একজন মানুষ’ বলে আখ্যা দেন। এবং একই সাথে তিনি বলেন যে, ইস্রাইলের যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিৎ যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপর হামলা করেছে। কারণ ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে ইস্রাইল দুই ঘন্টাও টিকতে পারতো না। ‘এক্সিওস’এর সাংবাদিক বারাক রাভিদকে ট্রাম্প ফোনে ইন্টারভিউ দিয়ে নেতানিয়াহু সম্পর্কে এমন কিছু কথা বলেছেন, যা এর আগে কোন মার্কিন প্রেসিডেন্ট কোন ইস্রাইলি প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে বলেননি। শুধু তা-ই নয়, ট্রাম্প কথাগুলি কয়েকবার করে বলেছেন, যাতে করে ইস্রাইলিদের কাছে বার্তা পরিষ্কারভাবে পৌঁছায় এবং কেউ যেন মনে না করে যে ট্রাম্প ভুল করে কথাগুলি বলেছেন। ১৮ই জুন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এক সংবাদ সন্মেলনে বলেন যে, ইস্রাইলি প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতাকে আক্রমণ করে কথা বলেছেন এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকেও ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে কথা বলেছেন। ভ্যান্স বলেন যে, প্রথমতঃ ট্রাম্প হলেন সারা বিশ্বে একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি এই মুহুর্তে ইস্রাইলের প্রতি সহানুভূতিশীল; এবং তিনি বিশ্বের সুপারপাওয়ার রাষ্ট্রের প্রধান। ভ্যান্স বলেন যে, তিনি নিজে যদি ইস্রাইলি ক্যাবিনেটের সদস্য হতেন, তাহলে তিনি ইস্রাইলের একমাত্র শক্তিশালী বন্ধুকে আক্রমণ করে কথা বলতেন না। আর দ্বিতীয়তঃ গত তিন মাসে ইস্রাইল নিজেকে রক্ষা করতে যেসকল অস্ত্র এবং রসদ ব্যবহার করেছে, তার দুই তৃতীয়াংশ যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি এবং যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ সেগুলির অর্থায়ন করেছে। কাজেই ইস্রাইলে যারা এই মুহুর্তে ট্রাম্পকে সমস্যা মনে করছেন, তাদের উচিৎ ঘুমে থেকে জেগে উঠে ইস্রাইল কিরূপ বাস্তবতার মাঝে রয়েছে, তা অনুধাবন করা।
 
লিসা লেরার বলছেন যে, গাজাতে যা ঘটছে, এর কারণে হয়তো যুক্তরাষ্ট্রে ইস্রাইলের অবস্থানকে আগের জায়গায় নিতে অনেক বছর, এমনকি কয়েক দশকও লেগে যেতে পারে। এর মূল কারণ হলো যুবকদের মাঝে ইস্রাইলের সমর্থন একেবারেই কমে গেছে। আর ইতোমধ্যেই মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতিতে এই মতামত প্রভাব ফেলতে শুরু করে দিয়েছে।


মার্কিন জনমতে পরিবর্তন?

যদিও অনেকেরই ধারণা যে, ইস্রাইলের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যা আসলে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু বিরোধ, প্রকৃতপক্ষে ব্যাপারটা অনেক বেশি গভীর। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এ প্রকাশিত এক জরিপের বরাত দিয়ে বলা হয় যে, যুক্তরাষ্ট্রে ইস্রাইলের সমর্থন নাটকীয়ভাবে কমে গিয়েছে। এটা মূলতঃ হয়েছে গাজায় ইস্রাইলি বর্বরতার কারণে। প্রতিবেদনের লেখক লিসা লেরার ‘এমএসএনবিসি’র সাথে সাক্ষাতে বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইস্রাইলের যে ‘বিশেষ সম্পর্ক’ এতকাল বিদ্যমান ছিল, তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। জরিপে ৪১ শতাংশ জনগণ ইস্রাইলের জন্যে আর্থিক এবং সামরিক সহায়তার বিরোধিতা করেছে; আর এর বিপরীতে সমর্থন করেছে ৩৯ শতাংশ জনগণ। এটা যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মতামতে বিশাল এক পরিবর্তন। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে যে, মার্কিন জনগণের মাঝে ফিলিস্তিনের জন্যে সমর্থন ইস্রাইলের সমর্থনের চাইতে সামান্য কিছু এগিয়ে গেছে। এই পরিবর্তন হয়তো ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের মাঝে বেশি হয়েছে, তবে তা রিপাবলিকান সমর্থকদের মাঝেও হয়েছে। যুবকদের মাঝে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ইস্রাইলকে সহায়তা দেয়ার বিপক্ষে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে যেখানে মাত্র ২২ শতাংশ জনগণ মনে করতো যে, ইস্রাইল ইচ্ছা করেই ফিলিস্তিনিদের হত্যা করছে, সেখানে ২০২৫এর সেপ্টেম্বরে এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ শতাংশে! গত সেপ্টেম্বরে মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘কাউন্সিন অন ফরেন রিলেশন্স’এর প্রেসিডেন্ট রিচার্ড হাস বলেছিলেন যে, এই জনমত এখনই মার্কিন নীতিকে প্রভাবিত না করলেও তা একটা ‘ওয়ার্নিং সিগনাল’। ‘সিএনবিসি’র বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, এর অর্থ হলো, ইস্রাইল এখন আর ধরে নিতে পারবে না যে, যুক্তরাষ্ট্রে ইস্রাইলের ‘অটোম্যাটিক’ সমর্থন রয়েছে। এই ব্যাপারটা তখনই নীতিতে প্রভাব ফেলবে, যখন রাজনীতিবিদেরা বুঝতে পারবেন যে, তার নির্বাচনী এলাকায় ভোটারদের মতামত কোন দিকে যাচ্ছে। প্রতি নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ৭০ শতাংশ ইহুদি ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ভোট দেয়। কাজেই এই মতামত ইহুদী-বিদ্বেষী কোন মতামতও নয়। লিসা লেরার বলছেন যে, গাজাতে যা ঘটছে, এর কারণে হয়তো যুক্তরাষ্ট্রে ইস্রাইলের অবস্থানকে আগের জায়গায় নিতে অনেক বছর, এমনকি কয়েক দশকও লেগে যেতে পারে। এর মূল কারণ হলো যুবকদের মাঝে ইস্রাইলের সমর্থন একেবারেই কমে গেছে। আর ইতোমধ্যেই মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতিতে এই মতামত প্রভাব ফেলতে শুরু করে দিয়েছে।
 
ভৌগোলিক দিক থেকে ইস্রাইলের প্রস্থ মাত্র ১১৪কিঃমিঃ। অর্থাৎ ইস্রাইলের উপরে হামলা হলে তারা সর্বোচ্চ ১১৪কিঃমিঃ পিছু হটার সুযোগ পেতে পারে। হামাসের হামলায় ইস্রাইলের এই নিরাপত্তাহীনতা আরও সংকটে পড়ে যায়; কেননা সেসময় ইস্রাইলের ইন্টেলিজেন্স হামলার কোনরূপ পূর্বাভাস দিতে ব্যর্থ হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ইস্রাইলিরা তাদের চতুর্দিকের সীমানায় ‘বাফার জোন’ তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গাজায় তারা তাদের প্রথম বাফার জোন তৈরি করেছে; এখন দক্ষিণ লেবাননেও তারা সেটাই করছে। ইস্রাইলের এহেন কর্মকান্ডের কারণে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সাথে শান্তিচুক্তি মানতে চাইছে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক। 


সমস্যার কারণ কি ট্রাম্প?

নয় মাস পর এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত পেরিয়ে মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে জনমতের প্রভাব কিছুটা হলেও পড়তে শুরু করেছে। ‘আল-জাজিরা’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ইস্রাইলি লবি গ্রুপ ‘এআইপিএসি’ বা ‘আইপ্যাক’এর কাছ থেকে কয়েক দশক ধরে নির্বাচনের জন্যে অর্থ সহায়তা নেয়ার পর সাম্প্রতিক সময়ে জনমতের চাপে ডেমোক্র্যাট রাজনীতিবিদদের অনেকেই এই অর্থ সহায়তা নিতে চাইছে না। এমনকি বামপন্থী সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ইস্রাইলের অস্তিত্ব রক্ষার অধিকারকে অগ্রাধিকার দেয়ার কারণে সমালোচনার শিকার হয়েছেন। এখন স্যান্ডার্স জনসন্মুখে বলছেন যে, তিনি মার্কিন সিনেটে ইস্রাইলের জন্যে সামরিক সহায়তা বন্ধ করার পেছনে প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে প্রাক্তন রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান থমাস ম্যাসি আবার ইস্রাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের সমালোচনা করে নির্বাচনে হেরে গেছেন। ম্যাসির ঠিক উল্টোদিকে রয়েছে টম কটনের মতো রিপাবলিকানরা, যারা ইস্রাইলের জন্যে বর্তমান ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তার উপরে আবার ইন্টেলিজেন্স শেয়ারিং আরও বৃদ্ধি করার পক্ষে। এটা অনেক মার্কিন ভোটারকে ক্ষেপিয়েছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত মার্কিন-ইস্রাইলি সম্পর্ককে আরও টানাপোড়েনের মাঝে ফেলে দিচ্ছে। ‘ইকনমিক টাইমস’এর আলোচনায় বলা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ক্যান্ডিডেটরা ইস্রাইলকে সমর্থন দেয়ার ইস্যুকে কেন্দ্র করে একে অপরকে ছিঁড়ে ফেলছেন। নিউ ইয়র্কের একজন রাজনীতিবিদ গাজার হত্যাকান্ডকে ‘জেনোসাইড’ আখ্যা না দেয়ার কারণে নির্বাচন হারার মুখে পড়েছেন। আবার ট্রাম্পের ডানপন্থী সমর্থকেরা সকল সমস্যার জন্যে ইস্রাইলকে দায়ী করছে; যা ট্রাম্প হয়তো উস্কেও দিতে পারেন।

মার্কিন-ইস্রাইলি সম্পর্কের ভিত্তি কিসের উপরে? আর এই সম্পর্কে কি আসলেই গভীর কোন ফাটল ধরেছে, নাকি তা শুধু সাময়িক কোন ভুল বোঝাবুঝি? মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘জিওপলিটিক্যাল ফিউচার্স’এর প্রতিষ্ঠাতা জর্জ ফ্রীডম্যান বলছেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার আগে মার্কিন জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি মধ্যপ্রাচ্যের ‘চিরকাল চলা যুদ্ধ’ শেষ করবেন। সেই হিসেবে ইরানের সাথে শান্তিচুক্তি ট্রাম্পের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে সমস্যা হলো, ইরান শান্তিচুক্তির শর্ত হিসেবে লেবাননের শান্তিকেও যুক্ত করেছে। কিন্তু ইস্রাইল মনে করছে যে, লেবানন থেকে সৈন্য সরিয়ে নিলে ইস্রাইলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে; তাই তারা লেবাননে কোন যুদ্ধবিরতিতে রাজি নয়।

‘ইকনমিক টাইমস’এর সিনিয়র সাংবাদিকদের এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, ২০২২ সালের ৭ই অক্টোবর ইস্রাইলের উপরে হামাসের নেতৃত্বে গাজার ফিলিস্তিনি হামলার আগ পর্যন্ত ইস্রাইলের প্রতিরক্ষার ভিত্তি ছিল দু’টা - প্রথমতঃ ডিটারেন্ট; অর্থাৎ ইস্রাইলের সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে শত্রুদেরকে দূরে রাখা; এবং দ্বিতীয়তঃ ইন্টেলিজেন্সের পূর্বাভাস; যার মাধ্যমে ইস্রাইল আগে থেকেই শত্রুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে। ৭ই অক্টোবরের হামলার পর থেকে ইস্রাইল প্রায় তিন বছর ধরে বিরতিহীন যুদ্ধের মাঝে রয়েছে; যার মাধ্যমে সে গাজা, লেবানন এবং সিরিয়ার ভেতর ‘বাফার জোন’ তৈরিতে উঠে পড়ে লেগেছে। ইরানের সাথেও তারা দু’বার সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছে। জর্জ ফ্রীডম্যান এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন যে, ভৌগোলিক দিক থেকে ইস্রাইলের প্রস্থ মাত্র ১১৪কিঃমিঃ। অর্থাৎ ইস্রাইলের উপরে হামলা হলে তারা সর্বোচ্চ ১১৪কিঃমিঃ পিছু হটার সুযোগ পেতে পারে। হামাসের হামলায় ইস্রাইলের এই নিরাপত্তাহীনতা আরও সংকটে পড়ে যায়; কেননা সেসময় ইস্রাইলের ইন্টেলিজেন্স হামলার কোনরূপ পূর্বাভাস দিতে ব্যর্থ হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ইস্রাইলিরা তাদের চতুর্দিকের সীমানায় ‘বাফার জোন’ তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গাজায় তারা তাদের প্রথম বাফার জোন তৈরি করেছে; এখন দক্ষিণ লেবাননেও তারা সেটাই করছে। ইস্রাইলের এহেন কর্মকান্ডের কারণে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সাথে শান্তিচুক্তি মানতে চাইছে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সাথে যুদ্ধ শেষ করতেই হবে এবং হরমুজ প্রণালিকে খুলে দিতে হবে। ফ্রীডম্যানের মতে, দুই দেশের বাস্তবতা এবং কর্তব্য এখন ভিন্ন; এটাই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইস্রাইলের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
 
নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, ২০২২ সালের ৭ই অক্টোবর থেকে ইস্রাইল সত্যিকারের অস্তিত্ব সংকটের মাঝে পড়ে গেছে, যখন থেকে ইস্রাইলের দুর্বলতাগুলি ক্রমেই হাইলাইট হতে শুরু করে। ইস্রাইলের সামরিক দুর্বলতা তার প্রতিবেশীদের দৃষ্টি এড়ায়নি; বিশেষ করে তুর্কি-সৌদি-পাকিস্তানের জোট বাঁধার কারণে ইস্রাইল সামরিক দিক থেকে আগের অবস্থানে নেই। এবং একই সময়ে ইস্রাইল মার্কিন জনগণের সমর্থন হারাচ্ছে; যা কিনা এমন এক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে, যে ইস্রাইল এখন নিশ্চিত নয় যে, মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটা যুদ্ধে ইস্রাইল যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পাবে কিনা।


মার্কিন-ইস্রাইল সম্পর্ক কি আগের জায়গায় ফেরত যেতে পারে?

‘ইকনমিক টাইমস’এর বিশ্লেষণে উঠে আসছে যে, ইস্রাইলকে তার সামরিক চিন্তাই শুধু নয়, কূটনৈতিক চিন্তাতেও পরিবর্তন আনতে হবে। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে কোন প্রকারের কূটনৈতিক সংলাপে ইস্রাইলকে দেখা যাচ্ছে না। জর্জ ফ্রীডম্যান মনে করছেন যে, ইস্রাইলের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় রকমের পরিবর্তন আসতে হবে; কেননা বাস্তবতা এখন পরিবর্তিত হয়ে গেছে। ইস্রাইলের উচিৎ হবে আরব দেশগুলির সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা। তবে তুরস্ক, সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের জোট তৈরির সম্ভাবনায় ইস্রাইলকে দুর্বল অবস্থানে মনে হতে পারে। কাজেই ইস্রাইল দুর্বল অবস্থানে থেকে এই কাজটা করবে কিনা, সেটাও ভাববার বিষয়। একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের সাথেই ইস্রাইলি এবং সৌদিদের গাঢ় সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যাটাই এমন যে, যুক্তরাষ্ট্র চাইলেও ইস্রাইলের সাথে আরব দেশগুলির সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কাজটা প্রায় অসম্ভব।

আর অনেকেই প্রশ্ন করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কি ইস্রাইলকে ছাড়তে পারবে কিনা? ফ্রীডম্যান বলছেন যে, ঠান্ডা যুদ্ধের সময়ে ৮৬ হাজার মার্কিন নাগরিক সারা বিশ্বের নিরাপত্তায় নিজেদের জীবন দিয়েছে; এখন যুক্তরাষ্ট্র সেই দায়িত্ব নিতে চাইছে না। পশ্চিম ইউরোপের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের এত গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কে যদি এত বড় পরিবর্তন আসতে পারে, ইস্রাইলের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কেও অবশ্যই তা আসতে পারে। কাজেই ইস্রাইলকে বুঝতে হবে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের সম্পর্কের মূলে ছিল ঠান্ডা যুদ্ধের বাস্তবতা; যেসময় ইস্রাইল যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু এখন এটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে বোঝা হয়ে গিয়েছে। আর এটা ইস্রাইলের জন্যে আরেকটা বড় চ্যালেঞ্জ – যদি যুক্তরাষ্ট্র ইস্রাইলের নিরাপত্তার ভার নেয়া থেকে সড়ে আসে, তাহলে আরব দেশগুলি ইস্রাইলকে সহায়তা করার কারণ খুঁজে পাবে না। যদি মধ্যপ্রাচ্যে ইস্রাইলের আশেপাশের কোন দেশ সামরিক দিক থেকে ইস্রাইলের চাইতে বেশি শক্তিশালী হয়ে যায় এবং ইস্রাইলের সাথে তার সম্পর্ক তিক্ত হয়, তাহলে ইস্রাইল মহা বিপদে পড়ে যাবে।

মূলতঃ স্বার্থের সেকুলার রাজনীতিতে ইস্রাইল এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ১৯৪৮ সালে ইস্রাইলের জন্মের সময় যুক্তরাষ্ট্র ইস্রাইলকে তেমন কোন আর্থিক সহায়তা দেয়নি। তবে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর থেকে ইস্রাইলের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হতে থাকে; বিশেষ করে যখন থেকে ব্রিটেন মধ্যপ্রাচ্য থেকে তল্পিতল্পা গুটাতে থাকে। ১৯৭৩ সালের যুদ্ধের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সময়োচিত সমর্থন ব্যাতীত ইস্রাইলের অস্তিত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ে গিয়েছিল। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় ইস্রাইল যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্ব পেয়েছিল। ঠান্ডা যুদ্ধের পর তথাকথিত ‘ওয়ার অন টেরর’এর মাধ্যমে ইস্রাইল যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ থেকেছিল। কিন্তু দুই দশকের ব্যার্থ ‘ওয়ার অন টেরর’এর পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এখন চীন; যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইস্রাইলের কোন গুরুত্ব নেই। যুক্তরাষ্ট্র এখন মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে যেতে চাইছে চীনকে মোকাবিলা করতে; যা ইস্রাইলকে নিরাপত্তাহীনতায় ফেলেছে। তবে নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, ২০২২ সালের ৭ই অক্টোবর থেকে ইস্রাইল সত্যিকারের অস্তিত্ব সংকটের মাঝে পড়ে গেছে, যখন থেকে ইস্রাইলের দুর্বলতাগুলি ক্রমেই হাইলাইট হতে শুরু করে। ইস্রাইলের সামরিক দুর্বলতা তার প্রতিবেশীদের দৃষ্টি এড়ায়নি; বিশেষ করে তুর্কি-সৌদি-পাকিস্তানের জোট বাঁধার কারণে ইস্রাইল সামরিক দিক থেকে আগের অবস্থানে নেই। এবং একই সময়ে ইস্রাইল মার্কিন জনগণের সমর্থন হারাচ্ছে; যা কিনা এমন এক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে, যে ইস্রাইল এখন নিশ্চিত নয় যে, মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটা যুদ্ধে ইস্রাইল যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পাবে কিনা।