যুক্তরাষ্ট্র-ইস্রাইল কাদা ছোঁড়াছুড়ি
ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা স্বাক্ষরিত হবার আগে থেকেই ইস্রাইলিরা অনেকেই প্রশ্ন করতে শুরু করে যে, যুক্তরাষ্ট্র কি ইস্রাইলের প্রতি তার সমর্থন তুলে নিচ্ছে কিনা? আবার কেউ কেউ সরাসরি বলতে শুরু করে যে, যুক্তরাষ্ট্র ইস্রাইলের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছে। ‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার মাঝে ইরানকে ৩০০ বিলিয়ন ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। আবার এই সমঝোতাতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রক্সিগুলির ব্যাপার স্থান পায়নি। অপরদিকে সমঝোতাতে রয়েছে যে, লেবাননেও যুদ্ধবিরতি হবে; অন্যকথায় বলতে গেলে, ইস্রাইল লেবাননে সকল সামরিক অভিযান বন্ধ করবে; যা ইস্রাইলিরা ভালোভাবে নেয়নি। ইস্রাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইস্রাইলিদের কাছে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপর ইস্রাইলিরা নির্ভর করতে পারে – এই ধারণাটা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার মাধ্যমে পুরোপুরিভাবে ধ্বসে গেছে।
ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা স্বাক্ষরিত হবার পরপরই ইস্রাইলি সংবাদ মাধ্যমে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মুখপাত্র রাজনীতিবিদ ইনোন মাগাল সোশাল মিডিয়া ‘এক্স’এ মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, ট্রাম্প প্রশাসনের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন। এবং বলেন যে, তারা কাতার এবং অন্যান্য আরব দেশের পক্ষে কাজ করেছেন। ইস্রাইলি সাংবাদিক বারাক রাভিদ ‘সিএনএন’কে বলছেন যে, যখন নেতানিয়াহুর এত কাছের একজন লোক ট্রাম্প প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের সম্পর্কে এরূপ মন্তব্য করেন, তখন বোঝাই যায় যে ইস্রাইলিরা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের সমঝোতাকে কিভাবে দেখেছে। এছাড়াও তিনি বলছেন যে, ইরানিরা মনে করে না যে ট্রাম্প ইস্রাইলিদেরকে লেবাননে হামলা চালানো থেকে বিরত রাখতে পারবেন; যা কিনা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা বাস্তবায়নের পথে সবচাইতে বড় বাধা।
গত ১৫ই জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইস্রাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ‘খুবই কঠিন একজন মানুষ’ বলে আখ্যা দেন। এবং একই সাথে তিনি বলেন যে, ইস্রাইলের যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিৎ যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপর হামলা করেছে। কারণ ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে ইস্রাইল দুই ঘন্টাও টিকতে পারতো না। ‘এক্সিওস’এর সাংবাদিক বারাক রাভিদকে ট্রাম্প ফোনে ইন্টারভিউ দিয়ে নেতানিয়াহু সম্পর্কে এমন কিছু কথা বলেছেন, যা এর আগে কোন মার্কিন প্রেসিডেন্ট কোন ইস্রাইলি প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে বলেননি। শুধু তা-ই নয়, ট্রাম্প কথাগুলি কয়েকবার করে বলেছেন, যাতে করে ইস্রাইলিদের কাছে বার্তা পরিষ্কারভাবে পৌঁছায় এবং কেউ যেন মনে না করে যে ট্রাম্প ভুল করে কথাগুলি বলেছেন। ১৮ই জুন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এক সংবাদ সন্মেলনে বলেন যে, ইস্রাইলি প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতাকে আক্রমণ করে কথা বলেছেন এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকেও ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে কথা বলেছেন। ভ্যান্স বলেন যে, প্রথমতঃ ট্রাম্প হলেন সারা বিশ্বে একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি এই মুহুর্তে ইস্রাইলের প্রতি সহানুভূতিশীল; এবং তিনি বিশ্বের সুপারপাওয়ার রাষ্ট্রের প্রধান। ভ্যান্স বলেন যে, তিনি নিজে যদি ইস্রাইলি ক্যাবিনেটের সদস্য হতেন, তাহলে তিনি ইস্রাইলের একমাত্র শক্তিশালী বন্ধুকে আক্রমণ করে কথা বলতেন না। আর দ্বিতীয়তঃ গত তিন মাসে ইস্রাইল নিজেকে রক্ষা করতে যেসকল অস্ত্র এবং রসদ ব্যবহার করেছে, তার দুই তৃতীয়াংশ যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি এবং যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ সেগুলির অর্থায়ন করেছে। কাজেই ইস্রাইলে যারা এই মুহুর্তে ট্রাম্পকে সমস্যা মনে করছেন, তাদের উচিৎ ঘুমে থেকে জেগে উঠে ইস্রাইল কিরূপ বাস্তবতার মাঝে রয়েছে, তা অনুধাবন করা।
মার্কিন জনমতে পরিবর্তন?
যদিও অনেকেরই ধারণা যে, ইস্রাইলের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যা আসলে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু বিরোধ, প্রকৃতপক্ষে ব্যাপারটা অনেক বেশি গভীর। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এ প্রকাশিত এক জরিপের বরাত দিয়ে বলা হয় যে, যুক্তরাষ্ট্রে ইস্রাইলের সমর্থন নাটকীয়ভাবে কমে গিয়েছে। এটা মূলতঃ হয়েছে গাজায় ইস্রাইলি বর্বরতার কারণে। প্রতিবেদনের লেখক লিসা লেরার ‘এমএসএনবিসি’র সাথে সাক্ষাতে বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইস্রাইলের যে ‘বিশেষ সম্পর্ক’ এতকাল বিদ্যমান ছিল, তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। জরিপে ৪১ শতাংশ জনগণ ইস্রাইলের জন্যে আর্থিক এবং সামরিক সহায়তার বিরোধিতা করেছে; আর এর বিপরীতে সমর্থন করেছে ৩৯ শতাংশ জনগণ। এটা যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মতামতে বিশাল এক পরিবর্তন। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে যে, মার্কিন জনগণের মাঝে ফিলিস্তিনের জন্যে সমর্থন ইস্রাইলের সমর্থনের চাইতে সামান্য কিছু এগিয়ে গেছে। এই পরিবর্তন হয়তো ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের মাঝে বেশি হয়েছে, তবে তা রিপাবলিকান সমর্থকদের মাঝেও হয়েছে। যুবকদের মাঝে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ইস্রাইলকে সহায়তা দেয়ার বিপক্ষে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে যেখানে মাত্র ২২ শতাংশ জনগণ মনে করতো যে, ইস্রাইল ইচ্ছা করেই ফিলিস্তিনিদের হত্যা করছে, সেখানে ২০২৫এর সেপ্টেম্বরে এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ শতাংশে! গত সেপ্টেম্বরে মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘কাউন্সিন অন ফরেন রিলেশন্স’এর প্রেসিডেন্ট রিচার্ড হাস বলেছিলেন যে, এই জনমত এখনই মার্কিন নীতিকে প্রভাবিত না করলেও তা একটা ‘ওয়ার্নিং সিগনাল’। ‘সিএনবিসি’র বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, এর অর্থ হলো, ইস্রাইল এখন আর ধরে নিতে পারবে না যে, যুক্তরাষ্ট্রে ইস্রাইলের ‘অটোম্যাটিক’ সমর্থন রয়েছে। এই ব্যাপারটা তখনই নীতিতে প্রভাব ফেলবে, যখন রাজনীতিবিদেরা বুঝতে পারবেন যে, তার নির্বাচনী এলাকায় ভোটারদের মতামত কোন দিকে যাচ্ছে। প্রতি নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ৭০ শতাংশ ইহুদি ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ভোট দেয়। কাজেই এই মতামত ইহুদী-বিদ্বেষী কোন মতামতও নয়। লিসা লেরার বলছেন যে, গাজাতে যা ঘটছে, এর কারণে হয়তো যুক্তরাষ্ট্রে ইস্রাইলের অবস্থানকে আগের জায়গায় নিতে অনেক বছর, এমনকি কয়েক দশকও লেগে যেতে পারে। এর মূল কারণ হলো যুবকদের মাঝে ইস্রাইলের সমর্থন একেবারেই কমে গেছে। আর ইতোমধ্যেই মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতিতে এই মতামত প্রভাব ফেলতে শুরু করে দিয়েছে।
সমস্যার কারণ কি ট্রাম্প?
নয় মাস পর এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত পেরিয়ে মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে জনমতের প্রভাব কিছুটা হলেও পড়তে শুরু করেছে। ‘আল-জাজিরা’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ইস্রাইলি লবি গ্রুপ ‘এআইপিএসি’ বা ‘আইপ্যাক’এর কাছ থেকে কয়েক দশক ধরে নির্বাচনের জন্যে অর্থ সহায়তা নেয়ার পর সাম্প্রতিক সময়ে জনমতের চাপে ডেমোক্র্যাট রাজনীতিবিদদের অনেকেই এই অর্থ সহায়তা নিতে চাইছে না। এমনকি বামপন্থী সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ইস্রাইলের অস্তিত্ব রক্ষার অধিকারকে অগ্রাধিকার দেয়ার কারণে সমালোচনার শিকার হয়েছেন। এখন স্যান্ডার্স জনসন্মুখে বলছেন যে, তিনি মার্কিন সিনেটে ইস্রাইলের জন্যে সামরিক সহায়তা বন্ধ করার পেছনে প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে প্রাক্তন রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান থমাস ম্যাসি আবার ইস্রাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের সমালোচনা করে নির্বাচনে হেরে গেছেন। ম্যাসির ঠিক উল্টোদিকে রয়েছে টম কটনের মতো রিপাবলিকানরা, যারা ইস্রাইলের জন্যে বর্তমান ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তার উপরে আবার ইন্টেলিজেন্স শেয়ারিং আরও বৃদ্ধি করার পক্ষে। এটা অনেক মার্কিন ভোটারকে ক্ষেপিয়েছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত মার্কিন-ইস্রাইলি সম্পর্ককে আরও টানাপোড়েনের মাঝে ফেলে দিচ্ছে। ‘ইকনমিক টাইমস’এর আলোচনায় বলা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ক্যান্ডিডেটরা ইস্রাইলকে সমর্থন দেয়ার ইস্যুকে কেন্দ্র করে একে অপরকে ছিঁড়ে ফেলছেন। নিউ ইয়র্কের একজন রাজনীতিবিদ গাজার হত্যাকান্ডকে ‘জেনোসাইড’ আখ্যা না দেয়ার কারণে নির্বাচন হারার মুখে পড়েছেন। আবার ট্রাম্পের ডানপন্থী সমর্থকেরা সকল সমস্যার জন্যে ইস্রাইলকে দায়ী করছে; যা ট্রাম্প হয়তো উস্কেও দিতে পারেন।
মার্কিন-ইস্রাইলি সম্পর্কের ভিত্তি কিসের উপরে? আর এই সম্পর্কে কি আসলেই গভীর কোন ফাটল ধরেছে, নাকি তা শুধু সাময়িক কোন ভুল বোঝাবুঝি? মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘জিওপলিটিক্যাল ফিউচার্স’এর প্রতিষ্ঠাতা জর্জ ফ্রীডম্যান বলছেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার আগে মার্কিন জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি মধ্যপ্রাচ্যের ‘চিরকাল চলা যুদ্ধ’ শেষ করবেন। সেই হিসেবে ইরানের সাথে শান্তিচুক্তি ট্রাম্পের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে সমস্যা হলো, ইরান শান্তিচুক্তির শর্ত হিসেবে লেবাননের শান্তিকেও যুক্ত করেছে। কিন্তু ইস্রাইল মনে করছে যে, লেবানন থেকে সৈন্য সরিয়ে নিলে ইস্রাইলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে; তাই তারা লেবাননে কোন যুদ্ধবিরতিতে রাজি নয়।
‘ইকনমিক টাইমস’এর সিনিয়র সাংবাদিকদের এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, ২০২২ সালের ৭ই অক্টোবর ইস্রাইলের উপরে হামাসের নেতৃত্বে গাজার ফিলিস্তিনি হামলার আগ পর্যন্ত ইস্রাইলের প্রতিরক্ষার ভিত্তি ছিল দু’টা - প্রথমতঃ ডিটারেন্ট; অর্থাৎ ইস্রাইলের সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে শত্রুদেরকে দূরে রাখা; এবং দ্বিতীয়তঃ ইন্টেলিজেন্সের পূর্বাভাস; যার মাধ্যমে ইস্রাইল আগে থেকেই শত্রুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে। ৭ই অক্টোবরের হামলার পর থেকে ইস্রাইল প্রায় তিন বছর ধরে বিরতিহীন যুদ্ধের মাঝে রয়েছে; যার মাধ্যমে সে গাজা, লেবানন এবং সিরিয়ার ভেতর ‘বাফার জোন’ তৈরিতে উঠে পড়ে লেগেছে। ইরানের সাথেও তারা দু’বার সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছে। জর্জ ফ্রীডম্যান এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন যে, ভৌগোলিক দিক থেকে ইস্রাইলের প্রস্থ মাত্র ১১৪কিঃমিঃ। অর্থাৎ ইস্রাইলের উপরে হামলা হলে তারা সর্বোচ্চ ১১৪কিঃমিঃ পিছু হটার সুযোগ পেতে পারে। হামাসের হামলায় ইস্রাইলের এই নিরাপত্তাহীনতা আরও সংকটে পড়ে যায়; কেননা সেসময় ইস্রাইলের ইন্টেলিজেন্স হামলার কোনরূপ পূর্বাভাস দিতে ব্যর্থ হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ইস্রাইলিরা তাদের চতুর্দিকের সীমানায় ‘বাফার জোন’ তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গাজায় তারা তাদের প্রথম বাফার জোন তৈরি করেছে; এখন দক্ষিণ লেবাননেও তারা সেটাই করছে। ইস্রাইলের এহেন কর্মকান্ডের কারণে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সাথে শান্তিচুক্তি মানতে চাইছে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সাথে যুদ্ধ শেষ করতেই হবে এবং হরমুজ প্রণালিকে খুলে দিতে হবে। ফ্রীডম্যানের মতে, দুই দেশের বাস্তবতা এবং কর্তব্য এখন ভিন্ন; এটাই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইস্রাইলের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
মার্কিন-ইস্রাইল সম্পর্ক কি আগের জায়গায় ফেরত যেতে পারে?
‘ইকনমিক টাইমস’এর বিশ্লেষণে উঠে আসছে যে, ইস্রাইলকে তার সামরিক চিন্তাই শুধু নয়, কূটনৈতিক চিন্তাতেও পরিবর্তন আনতে হবে। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে কোন প্রকারের কূটনৈতিক সংলাপে ইস্রাইলকে দেখা যাচ্ছে না। জর্জ ফ্রীডম্যান মনে করছেন যে, ইস্রাইলের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় রকমের পরিবর্তন আসতে হবে; কেননা বাস্তবতা এখন পরিবর্তিত হয়ে গেছে। ইস্রাইলের উচিৎ হবে আরব দেশগুলির সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা। তবে তুরস্ক, সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের জোট তৈরির সম্ভাবনায় ইস্রাইলকে দুর্বল অবস্থানে মনে হতে পারে। কাজেই ইস্রাইল দুর্বল অবস্থানে থেকে এই কাজটা করবে কিনা, সেটাও ভাববার বিষয়। একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের সাথেই ইস্রাইলি এবং সৌদিদের গাঢ় সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যাটাই এমন যে, যুক্তরাষ্ট্র চাইলেও ইস্রাইলের সাথে আরব দেশগুলির সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কাজটা প্রায় অসম্ভব।
আর অনেকেই প্রশ্ন করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কি ইস্রাইলকে ছাড়তে পারবে কিনা? ফ্রীডম্যান বলছেন যে, ঠান্ডা যুদ্ধের সময়ে ৮৬ হাজার মার্কিন নাগরিক সারা বিশ্বের নিরাপত্তায় নিজেদের জীবন দিয়েছে; এখন যুক্তরাষ্ট্র সেই দায়িত্ব নিতে চাইছে না। পশ্চিম ইউরোপের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের এত গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কে যদি এত বড় পরিবর্তন আসতে পারে, ইস্রাইলের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কেও অবশ্যই তা আসতে পারে। কাজেই ইস্রাইলকে বুঝতে হবে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের সম্পর্কের মূলে ছিল ঠান্ডা যুদ্ধের বাস্তবতা; যেসময় ইস্রাইল যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু এখন এটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে বোঝা হয়ে গিয়েছে। আর এটা ইস্রাইলের জন্যে আরেকটা বড় চ্যালেঞ্জ – যদি যুক্তরাষ্ট্র ইস্রাইলের নিরাপত্তার ভার নেয়া থেকে সড়ে আসে, তাহলে আরব দেশগুলি ইস্রাইলকে সহায়তা করার কারণ খুঁজে পাবে না। যদি মধ্যপ্রাচ্যে ইস্রাইলের আশেপাশের কোন দেশ সামরিক দিক থেকে ইস্রাইলের চাইতে বেশি শক্তিশালী হয়ে যায় এবং ইস্রাইলের সাথে তার সম্পর্ক তিক্ত হয়, তাহলে ইস্রাইল মহা বিপদে পড়ে যাবে।
মূলতঃ স্বার্থের সেকুলার রাজনীতিতে ইস্রাইল এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ১৯৪৮ সালে ইস্রাইলের জন্মের সময় যুক্তরাষ্ট্র ইস্রাইলকে তেমন কোন আর্থিক সহায়তা দেয়নি। তবে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর থেকে ইস্রাইলের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হতে থাকে; বিশেষ করে যখন থেকে ব্রিটেন মধ্যপ্রাচ্য থেকে তল্পিতল্পা গুটাতে থাকে। ১৯৭৩ সালের যুদ্ধের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সময়োচিত সমর্থন ব্যাতীত ইস্রাইলের অস্তিত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ে গিয়েছিল। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় ইস্রাইল যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্ব পেয়েছিল। ঠান্ডা যুদ্ধের পর তথাকথিত ‘ওয়ার অন টেরর’এর মাধ্যমে ইস্রাইল যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ থেকেছিল। কিন্তু দুই দশকের ব্যার্থ ‘ওয়ার অন টেরর’এর পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এখন চীন; যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইস্রাইলের কোন গুরুত্ব নেই। যুক্তরাষ্ট্র এখন মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে যেতে চাইছে চীনকে মোকাবিলা করতে; যা ইস্রাইলকে নিরাপত্তাহীনতায় ফেলেছে। তবে নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, ২০২২ সালের ৭ই অক্টোবর থেকে ইস্রাইল সত্যিকারের অস্তিত্ব সংকটের মাঝে পড়ে গেছে, যখন থেকে ইস্রাইলের দুর্বলতাগুলি ক্রমেই হাইলাইট হতে শুরু করে। ইস্রাইলের সামরিক দুর্বলতা তার প্রতিবেশীদের দৃষ্টি এড়ায়নি; বিশেষ করে তুর্কি-সৌদি-পাকিস্তানের জোট বাঁধার কারণে ইস্রাইল সামরিক দিক থেকে আগের অবস্থানে নেই। এবং একই সময়ে ইস্রাইল মার্কিন জনগণের সমর্থন হারাচ্ছে; যা কিনা এমন এক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে, যে ইস্রাইল এখন নিশ্চিত নয় যে, মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটা যুদ্ধে ইস্রাইল যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পাবে কিনা।



