Showing posts with label China. Show all posts
Showing posts with label China. Show all posts

Tuesday, 4 November 2025

ক্যারিবিয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি বৃদ্ধি - পশ্চিম গোলার্ধে হারানো মার্কিন প্রভাব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা

০৫ই নভেম্বর ২০২৫
ক্যারিবিয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলি স্বল্পমেয়াদী হতে পারে; আবার লম্বা সময়ের জন্যে অত্র অঞ্চলে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অপারেশনেও ব্যবহৃত হতে পারে। ১৯৯৪ সালে হাইতিতে সামরিক অপারেশনের পর থেকে ক্যারিবিয়ানে এটা যুক্তরাষ্ট্রের সবচাইতে বড় সামরিক কর্মকান্ড।


মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি - তিন দশকে সর্বোচ্চ

‘রয়টার্স'এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবিয়ানে দীর্ঘ মেয়াদী সামরিক অবস্থানের জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেপ্টেম্বর নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের উপনিবেশ পুয়ের্তো রিকো দ্বীপে ২০০৪ সালে বন্ধ করে দেয়া রুজভেল্ট রোডস ঘাঁটিকে নতুন করে তৈরি করা শুরু হয়েছে। এছাড়াও পুয়ের্তো রিকো এবং ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসের বেসামরিক বিমানবন্দরগুলিতেও নতুন করে অবকাঠামো উন্নয়ন করা হচ্ছে। গত অগাস্ট মাস থেকে ক্যারিবিয়ানে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন, ফাইটার বিমান এবং গোয়েন্দা বিমান মোতায়েন শুরু হয়েছে। বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ 'জেরাল্ড ফোর্ড' বর্তমানে ক্যারিবিয়ানের পথে রয়েছে। এছাড়াও ইতোমধ্যেই অত্র এলাকায় মোতায়েন করা গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধজাহাজগুলির মাঝে রয়েছে উভচর এসল্ট শিপ 'আইও জিমা', স্পেশাল ফোর্সের মিশনের জাহাজ 'ওশান ট্রেডার', ক্রুজার 'লেক এরি', ডেস্ট্রয়ার 'গ্রেভলি', ‘স্টকডেল', 'জেসন ডানহ্যাম' এবং উভচর ডক ল্যান্ডিং প্ল্যাটফর্ম 'স্যান এন্টোনিও'। এর বাইরেও পুয়ের্তো রিকোতে বিমান বাহিনীর ১০টা 'এফ-৩৫' স্টেলথ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছে।

অক্টোবরে মার্কিন বিমান বাহিনীর 'বি-১' এবং 'বি-৫২' বোমারু বিমান ভেনিজুয়েলার উপকূল ঘেঁষে উড়ে যায়। 'রয়টার্স'এর ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায় যে, ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসের সেইন্ট ক্রোয়া-তে 'হেনরি ই রোহলসেন' বিমানবন্দরে দূরপাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা রাডার স্থাপন করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। পুয়ের্তো রিকোর রাফায়েল হেরনানডেজ বেসামরিক বিমানবন্দরে বিমান বাহিনীর 'এমকিউ-৯ রীপার' ড্রোন মোতায়েন করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে অত্র অঞ্চলে মার্কিন 'সি-১৭' সামরিক পরিবহণ বিমান এবং 'পি-৮' গোয়েন্দা বিমানের ফ্লাইটও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন থিঙ্কট্যাংক 'সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ' বা 'সিএসআইএস'এর সিনিয়র ফেলো ক্রিস্টোফার হেরনানডেজ-রয়-এর মতে, এগুলি সবই করা হচ্ছে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার সমর্থিত জেনারেলদেরকে ভয় দেখাবার জন্যে। প্রাক্তন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা মার্ক ক্যানসিয়ানের মতে, এই সামরিক স্থাপনাগুলি স্বল্পমেয়াদী হতে পারে; আবার লম্বা সময়ের জন্যে অত্র অঞ্চলে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অপারেশনেও ব্যবহৃত হতে পারে। ১৯৯৪ সালে হাইতিতে সামরিক অপারেশনের পর থেকে ক্যারিবিয়ানে এটা যুক্তরাষ্ট্রের সবচাইতে বড় সামরিক কর্মকান্ড। গত সেপ্টেম্বর মাস থেকে শুরু করে কমপক্ষে ১৪টা হামলায় যুক্তরাষ্ট্র তথাকথিত মাদক ব্যাবসায়ীদের ৬১ জনকে হত্যা করেছে। এই হত্যাকান্ডগুলিকে কেন্দ্র করে ভেনিজুয়েলা এবং কলম্বিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি হয়েছে।
 
নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভার পর কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট পেত্রো ফিলিস্তিনের পক্ষে মিছিলে নেতৃত্ব দেয়ার পর মার্কিন সরকার প্রেসিডেন্ট পেত্রোর ভিসা বাতিল করে। 'বিবিসি' বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, কলম্বিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও খারাপের দিকে যেতে পারে।


যুক্তরাষ্ট্র-কলম্বিয়া সম্পর্কের অবনতি

সকলেই শুধু ভেনিজুয়েলা নিয়ে কথা বললেও যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যা শুধু ভেনিজুয়েলাই নয়। অত্র অঞ্চলের বেশকিছু নেতৃত্বের সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি সংঘর্ষে নেমেছেন। কলম্বিয়ার বামপন্থী লিবারাল প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো 'বিবিসি'র সাথে সাক্ষাতে হামলাগুলিকে জুলুম বলে আখ্যা দেন এবং এই হত্যাকান্ডের জন্যে দায়ী মার্কিন কর্মকর্তাদের বিচার দাবি করেন। এর জবাবে ট্রাম্প কলম্বিয়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা বন্ধ ঘোষণা করেন এবং হুমকি দেন যে, পেত্রো যদি নিজে কলম্বিয়ার মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেন, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই সেটা করবে এবং সেটা সুখকর ভাবে করা হবে না। কলম্বিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে যে, ট্রাম্পের কথাগুলি মূলতঃ কলম্বিয়াতে যুক্তরাষ্ট্রের বেআইনী হস্তক্ষেপের হুমকি। বহু দশক ধরে কলম্বিয়ায় মার্কিন সহায়তায় বামপন্থীদের গ্রুপগুলি এবং মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলেছে। তবে ২০১৬ সালে বিদ্রোহীদের সাথে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হবার পর থেকে কলম্বিয়াতে মার্কিন সামরিক এবং আর্থিক সহায়তা কমতে থাকে; সেইসাথে কমতে থাকে রাজনৈতিক প্রভাবও। ট্রাম্প ক্ষমতায় আরোহণের পরপরই শেষ মুহুর্তে কোনক্রমে কলম্বিয়ার সাথে বাণিজ্য যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হয়েছিল। তবে জুন মাসে কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোটাতে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মিগেল উরিবে তুরবে হত্যাকান্ডের শিকার হবার পর মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মার্কো রুবিও সেই ঘটনার সাথে কলম্বিয়ার শীর্ষ নেতৃত্বের জড়িত থাকার অভিযোগ করেন। উভয় দেশের রাষ্ট্রদূতদেরকে নিজ দেশে ডেকে পাঠানো হয়। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভার পর প্রেসিডেন্ট পেত্রো ফিলিস্তিনের পক্ষে মিছিলে নেতৃত্ব দেয়ার পর মার্কিন সরকার প্রেসিডেন্ট পেত্রোর ভিসা বাতিল করে। 'বিবিসি' বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, কলম্বিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও খারাপের দিকে যেতে পারে।

কিউবার সাথে ভেনিজুয়েলা এবং নিকারাগুয়ার বন্ধুত্ব

মার্কিন মিডিয়া এবং প্রাইভেট সেক্টরের অর্থায়নে তৈরি 'প্রজেক্ট সিন্ডিকেট'এর ২০২৪এর অক্টোবরের এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, ২০০২ সালে ভেনিজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার পর থেকে কিউবা ভেনিজুয়েলাতে হাজার হাজার ডাক্তার, নার্স, খেলাধূলা প্রশিক্ষক, নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং ইন্টেলিজেন্স এজেন্ট পাঠিয়েছে। কিউবার এই সমর্থনই ভেনিজুয়েলার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারার মূল কারণ। নিকারাগুয়া থেকে পরিচালিত মিডিয়া 'হাভানা টাইমস'এর ২০২৪এর অগাস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, গত ১৫ বছর ধরে কিউবা ভেনিজুয়েলার সশস্ত্র বাহিনী এবং ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসকে নতুন করে তৈরি করতে সহায়তা দিয়েছে। 'রয়টার্স'এর ২০১৯ সালের এক তদন্তের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০০৮ সালে দুই দেশের মাঝে স্বাক্ষরিত চুক্তির বলে তৈরি 'জেনারেল ডিরেক্টরেট অব মিলিটারি কাউন্টারইন্টেলিজেন্স' বা 'ডিজিসিআইএম' নামের এক সংস্থার মাধ্যমে ভেনিজুয়েলার সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের উপর ব্যাপক নজরদারি শুরু হয়। একইসাথে কিউবা ভেনিজুয়েলার সামরিক সদস্যদেরকে ট্রেনিং দেয়, বাহিনীর কাঠামোতে পরিবর্তন আনে, হাভানাতে ভেনিজুয়েলার ইন্টেলিজেন্স সদস্যদেরকে ট্রেনিং দেয়, এবং ইন্টেলিজেন্সের মূল কাজকে অন্য দেশের উপর গোয়ান্দাগিরি থেকে সরিয়ে নিজ দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের উপর কেন্দ্রীভূত করে। ভেনিজুয়েলা থেকে পালিয়ে আসা প্রাক্তন জেনারেল এন্টোনিও রিভেরো বলেন যে, ২০০৮ সালে দুই দেশের মাঝে ১৫টা গোপন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মাধ্যমে ভেনিজুয়েলার সেনাবাহিনীকে কিউবার বাহিনীর ধাঁচে গড়ে তোলা হয়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে ভেনিজুয়েলার সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ উঠে এসেছে।

২০০২ সালে ভেনিজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার পর থেকে কিউবা ভেনিজুয়েলাতে হাজার হাজার ডাক্তার, নার্স, খেলাধূলা প্রশিক্ষক, নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং ইন্টেলিজেন্স এজেন্ট পাঠিয়েছে। কিউবার এই সমর্থনই ভেনিজুয়েলার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারার মূল কারণ।

 
মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মার্কো রুবিও গত ফেব্রুয়ারিতে কোস্টারিকা ভ্রমণে গিয়ে বলেন যে, কিউবা, ভেনিজুয়েলা এবং নিকারাগুয়ার সরকার হলো মানবতার শত্রু। তিনি আরও বলেন যে, এই তিন দেশের কারণে পশ্চিম গোলার্ধে শরণার্থী সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে; কারণ এই দেশগুলির ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করছে না। কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেল রুবিওর এই মন্তব্যকে নির্লজ্জ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন যে, কিউবার উপর অর্থনৈতিক অবরোধের কারণেই কিউবানরা দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। মার্কিন রাজনীতিবিদদের নব্য ফ্যাসিস্ট চিন্তার কারণে মানবিক বিপর্যয় হচ্ছে। অর্ধেক দুনিয়াতে অরাজকতা এবং দৈন্যতার জন্যে মার্কিন যুদ্ধবাজরাই দায়ী। আর ভেনিজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান গিল বলেন যে, রুবিও এই তিন দেশ নিয়ে করুণ এবং অসুস্থ্য চিন্তার মাঝে রয়েছেন।

কিউবা যে সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে, তার নিশ্চয়তা পাওয়া যায় গত ফেব্রুয়ারিতে; যখন নিকারাগুয়ার বামপন্থী সরকারের সেনাপ্রধান জেনারেল জুলিও আভিলেসের অভিষেক অনুষ্ঠানে কিউবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল আলভারো লোপেজ মিয়েরা উপস্থিত ছিলেন বলে বলছে 'কিউবান নিউজ এজেন্সি'। ১৯৭৯ সালে নিকারাগুয়াতে বামপন্থী স্যান্ডানিস্টা সরকারের উত্থানের সময় থেকে কিউবার সাথে নিকারাগুয়ার গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। ক্যারিবিয়ানে চলমান উত্তেজনার মাঝেই ৮ই অক্টোবর নিকারাগুয়ার সেনাপ্রধান জেনারেল আভিলেস কিউবার রাজধানী হাভানা ভ্রমণ করেন।
 

কিউবা ক্যারিবিয়ান সাগরে এমন অবস্থানে রয়েছে, যেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণে মেক্সিকো উপসাগরের উপকূলে সমুদ্রবন্দরগুলির সমুদ্র বাণিজ্যকে হুমকির মাঝে ফেলে দেয়া সম্ভব। কিউবা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা উপদ্বীপের মাঝে সমুদ্রপথ মাত্র ১৪৫কিঃমিঃ চওড়া। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় অর্ধেক বাণিজ্য হয় এই বন্দরগুলির মাধ্যমে। ১৯৬২ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবাতে ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছিল। আর পুরো ঠান্ডা যুদ্ধের সময় ল্যাটিন আমেরিকাতে মাদক ব্যবসায়ীদেরকে এবং বামপন্থী বিদ্রোহী গ্রুপ এবং সরকারগুলিকে সোভিয়েত ইন্টেলিজেন্স সহায়তা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সরকারগুলিকে সমস্যায় ফেলার জন্যে। আর এই পুরো অপারেশনের কেন্দ্র ছিল কিউবা। 


রাশিয়ার ভূমিকা এবং কিউবার কৌশলগত গুরুত্ব

তবে ভেনিজুয়েলা এবং কিউবার সামরিক সহযোগিতার খবরগুলি নতুন নয়। কাজেই হঠাত করেই বা কেন যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবিয়ানে তার সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকবে, তা অন্ততঃ এই দুই দেশের নিরাপত্তা চুক্তির মাঝে পাওয়া যায় না। মার্কিন ভূরাজনৈতিক চিন্তাবিদ জর্জ ফ্রীডম্যান 'জিওপলিটিক্যাল ফিউচার্স'এর এক লেখায় তার ধারণা প্রকাশ করছেন যে, ক্যারিবিয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি বৃদ্ধির পেছনে ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের 'টোমাহক' ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের হুমকির সম্পর্ক থাকতে পারে। হয়তো রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সেই হুমকি মোকাবিলায় কিউবার সাথে সামরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করেছে এবং ল্যাটিন আমেরিকার ড্রাগ ব্যাবসায়ীদের সাথে সম্পর্ক পুনর্নিমাণ করেছে। অক্টোবরের শুরুতেই রুশ পার্লামেন্টে কিউবার সাথে গত মার্চে স্বাক্ষরিত সামরিক চুক্তিকে অনুমোদন দেয়া হয়। এই চুক্তি মোতাবেক দুই দেশের মাঝে যৌথ সামরিক মহড়া, অস্ত্র সরবরাহ সহ কিউবাতে রুশ সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। ফ্রীডম্যান বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে এটা মোটেই সুখকর খবর নয়। কিউবা ক্যারিবিয়ান সাগরে এমন অবস্থানে রয়েছে, যেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণে মেক্সিকো উপসাগরের উপকূলে সমুদ্রবন্দরগুলির সমুদ্র বাণিজ্যকে হুমকির মাঝে ফেলে দেয়া সম্ভব। কিউবা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা উপদ্বীপের মাঝে সমুদ্রপথ মাত্র ১৪৫কিঃমিঃ চওড়া। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় অর্ধেক বাণিজ্য হয় এই বন্দরগুলির মাধ্যমে। ১৯৬২ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবাতে ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছিল। আর পুরো ঠান্ডা যুদ্ধের সময় ল্যাটিন আমেরিকাতে মাদক ব্যবসায়ীদেরকে এবং বামপন্থী বিদ্রোহী গ্রুপ এবং সরকারগুলিকে সোভিয়েত ইন্টেলিজেন্স সহায়তা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সরকারগুলিকে সমস্যায় ফেলার জন্যে। আর এই পুরো অপারেশনের কেন্দ্র ছিল কিউবা। ফ্রীডম্যানের কথাগুলি সপ্তাখানেক পরেই মস্কোতেও প্রতিফলিত হয়। ২৯শে অক্টোবর রুশ পার্লামেন্টের প্রতিরক্ষা কমিটির ডেপুটি চেয়ারপার্সন আলেক্সেই ঝুরাভলিয়ভ বলেন যে, রাশিয়া ভেনিজুয়েলা বা কিউবাতে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন করতে পারে; যা কিনা রাশিয়ার প্রধান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগী যুক্তরাষ্ট্রের খুব কাছে অবস্থিত। রাশিয়ার কাছে বহু ধরণের ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে; যেগুলি প্রয়োজনমাফিক ব্যবহার করা যেতে পারে। মার্কিন সামরিক থিঙ্কট্যাঙ্ক 'ইন্সটিটিউট ফর দ্যা স্টাডি অব ওয়ার' বা 'আইএসডব্লিউ' বলছে যে, ঝুরাভলিয়ভের এই হুমকি ১৯৬২ সালের কিউবান মিসাইল ক্রাইসিসের কথা মনে করিয়ে দেয়।

'ডিফেন্স নিউজ'এর খবরে বলা হচ্ছে যে, একটা রুশ 'ইলিউশিন-৭৬' পরিবহণ বিমান ২৬শে অক্টোবর ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে অবতরণ করে। এর দু'দিন পর বিমানটা কিউবার রাজধানী হাভানাতে যায়; সেখান থেকে নিকারাগুয়ার রাজধানী মানাগুয়াতে গিয়ে ২৯শে অক্টোবর নাগাদ আবারও কারাকাসে ফেরত আসে। পরদিন বিমানটা রাশিয়ার উদ্দেশ্যে কারাকাস ছেড়ে যায়। বিমানটা রুশ সরকারের না হলেও তা সরকারের সাথে সম্পর্ক রাখা বিমান সংস্থা 'এভিয়াকন জিটোট্রান্স'এর। যাবার পথে তা আফ্রিকার মৌরিতানিয়ার নুয়াকছোট এবং আলজেরিয়ার আলজিয়ার্সে অবতরণ করে। 'ডিফেন্স নিউজ' বলছে যে, বারবার অবতরণ করার একটা কারণ হতে পারে যে, বিমানটা অতিরিক্ত ভার বহণ করছিলো। অথবা রাশিয়ার উপর অবরোধের কারণে উদ্ভূত সমস্যাকে বাইপাস করার জন্যে বিমানটা কোথা থেকে এসেছে, সেটা ঘোলাটে করার কৌশল হতে পারে। যদিও বিমানটার মিশন সম্পর্কে কিছু জানা যায় না, তথাপি যেহেতু বিমানটার মালিক সংস্থার উপর যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সরঞ্জাম পরিবহণ করার কারণে অবরোধ আরোপ করেছে, তাই এর উদ্দেশ্য ধোঁয়াশার মাঝেই থাকবে।

কিউবাতে রাশিয়ার উপস্থিতি ছাড়াও চীনের উপস্থিতি নিয়েও কথা শুরু হয়েছে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক 'সিএসআইএস' ২০২৪এর ডিসেম্বরে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে; যেখানে বলা হয় যে, এতকাল নির্দিষ্ট কোন তথ্য না থাকলেও এখন প্রায় নিশ্চিত যে, কিউবার কমপক্ষে চার স্থানে চীনারা যুক্তরাষ্ট্রের উপর নজরদারি করার জন্যে গোয়ান্দা স্থাপনা বসিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক চাপে পড়ার কারণে কিউবা চীনের আরও কাছে গিয়েছে।

কিউবা-মেক্সিকো বন্ধুত্ব

কিউবা যে পুরো ক্যারিবিয়ান এবং ল্যাটিন আমেরিকাতে যুক্তরাষ্ট্রের চক্ষুশূল, তা নিশ্চিত। ‘মেক্সিকানস এগেইনস্ট করাপশন এন্ড ইমপিউনিটি' নামক থিঙ্কট্যাঙ্কের বরাত দিয়ে 'মায়ামি হেরাল্ড' বলছে যে, মেক্সিকোর বর্তমান বামপন্থী লিবারাল প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শাইনবাউম ক্ষমতায় আসার পর থেকে মেক্সিকো কিউবাতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ তিন গুণ করেছে। গত মে মাস থেকে অগাস্টের মাঝে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের তেল ভর্তুকি মূল্যে বিক্রি করেছে মেক্সিকো। আগের প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস ম্যানুয়েল ওব্রাদরের সরকার দুই বছরে ১ বিলিয়ন ডলারের তেল সরবরাহ করেছিল। শুধু তা-ই নয়, প্রেসিডেন্ট শাইনবাউম কিউবাকে রাজনৈতিকভাবেও জোরালো সমর্থন দিচ্ছেন। ১৩ই অক্টোবর তিনি ঘোষণা দেন যে, ডিসেম্বরে ডোমিনিকাতে অনুষ্ঠেয় আমেরিকা মহাদেশের দেশগুলির শীর্ষ সন্মেলন তিনি বয়কট করেছেন; কারণ সেই সন্মেলন থেকে কিউবা, ভেনিজুয়েলা এবং নিকারাগুয়াকে বাদ দেয়া হয়েছে। এর আগে ২০২২ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও লস এঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত সন্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের অপছন্দনীয় রাষ্ট্রপ্রধানদেরকে আমন্ত্রণ জানাননি।

ট্রাম্প প্রশাসনের উপ-পররাষ্ট্র সচিব ক্রিস্টোফার ল্যানডাউ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে কিউবাকে সমর্থন দেয়ার জন্যে মেক্সিকোর ব্যাপক সমালোচনা করেন। স্প্যানিশ ভাষার পত্রিকা 'এল পাইস'এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ১৯৯২ সাল থেকে প্রতি বছর জাতিসংঘে ভোটাভুটি হয়ে চলেছে কিউবার উপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধ উঠিয়ে দেয়ার জন্যে। মেক্সিকো এই প্রস্তাবে প্রতি বছর কিউবাকে সমর্থন দিয়ে গেছে। এবছরও মেক্সিকো কিউবাকে সমর্থন করায় ল্যানডাউ বলেন যে, মেক্সিকোর বন্ধু হিসেবে তিনি কষ্ট পেয়েছেন। কিউবার প্রতি মেক্সিকোর সমর্থন বিভিন্ন সরকারের আমলে অটুট থেকেছে। প্রেসিডেন্ট শাইনবাউমের আগে তার দলেরই প্রেসিডেন্ট ওব্রাদর কিউবাকে তেল সরবরাহের বিনিময়ে কিউবা থেকে ডাক্তার পেয়েছেন। করোনা মহামারির সময় মেক্সিকোকে ডাক্তার দিয়ে সহায়তার করার জন্যে ওব্রাদর ২০২৩ সালে কিউবার নেতা মিগেল দিয়াজ-কানেলকে মেক্সিকোর সর্বোচ্চ পুরষ্কার 'অর্ডার অব দ্যা আজটেক ঈগল'এ ভূষিত করেছিলেন। ওব্রাদরের আগে 'পিআরআই' পার্টির প্রেসিডেন্ট পেনা নিয়েতোর সময় মেক্সিকো কিউবার বড় অংকের ঋণ মওকুফ করে দেয়। 'ইবেরো আমেরিকান ইউনিভার্সিটি'র বিশ্লেষক পিয়া তারাসেনা 'এল পাইস'কে বলছেন যে, ঠান্ডা যুদ্ধকে মোকাবিলার সময় মেক্সিকো কিউবা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে সেতু হিসেবে কাজ করেছে। এর ফলে অত্র অঞ্চলে মেক্সিকোর অবস্থানও শক্তিশালী হয়েছে। জাতিসংঘে মেক্সিকোর দূত হেক্টর ভাসকনচেলস যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এখনও ঠান্ডা যুদ্ধের চিন্তাধারা পরিত্যাগ করতে পারেনি। কিউবার উপর অবরোধ বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিয়ত বেশিরভাগ জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক আবেলারডো রডরিগেজ 'এল পাইস'কে বলছেন যে, ট্রাম্প প্রশাসন এখন তাদের অপছন্দের কথা বলা কাউকেই সহ্য করতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে 'মনরো ডকট্রাইন'কে কাজে লাগিয়ে পশ্চিম গোলার্ধে হারিয়ে যাওয়া প্রভাবকে পুনরূদ্ধার করতে চাইছে। 'জিওপলিটিক্যাল ফিউচার্স'এর লেখায় জর্জ ফ্রীডম্যানও 'মনরো ডকট্রাইন'কে মার্কিন ভূরাজনৈতিক স্বার্থ এবং সাম্রাজ্যবাদী হাতিয়ার হিসেবেই উল্লেখ করেন। কারণ যুক্তরাষ্ট্র বাকি বিশ্বে জনসমর্থনের কথা বললেও পশ্চিম গোলার্ধ বা আমেরিকা মহাদেশে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে জনসমর্থনের কোন তোয়াক্কা করেনি কখনও।
 
১৯৭৯ সালে নিকারাগুয়াতে বামপন্থী স্যান্ডানিস্টা সরকারের উত্থানের সময় থেকে কিউবার সাথে নিকারাগুয়ার গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। ক্যারিবিয়ানে চলমান উত্তেজনার মাঝেই ৮ই অক্টোবর নিকারাগুয়ার সেনাপ্রধান জেনারেল আভিলেস কিউবার রাজধানী হাভানা ভ্রমণ করেন।


কিউবার অর্থনীতিতে মার্কিন অবরোধের প্রভাব

কিউবার অর্থনীতি অনেকটাই পর্যটনের উপর নির্ভরশীল। ‘হাভানা টাইমস'এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, কিউবাতে সবচাইতে বেশি পর্যটক আসে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, বিদেশে কিউবান সম্প্রদায় এবং রাশিয়া থেকে। ২০২৪ সালের পর্যটক সিজন জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে কিউবায় ২ লক্ষ ৬১ হাজারের বেশি কানাডিয় পর্যটক গিয়েছিল; বিদেশে থাকা কিউবানরা গিয়েছিল ৪৫ হাজার, মার্কিনীরা গিয়েছিল ২৮ হাজার এবং রুশরা গিয়েছিল ৪৩ হাজার। ২০২৫ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে কিউবাতে পর্যটকের সংখ্যা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ইউরোপিয়রাও কিউবাতে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। কিউবার সরকার বলছে যে, এর মূল কারণ হলো কিউবার উপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত ভিসা নিয়ন্ত্রণ। কারণ ইউরোপিয়রা কিউবাতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রে যাবার জন্যে আলাদাভাবে ভিসা নিতে হবে। ২০২৪ সালে কিউবাতে ২৭ লক্ষ পর্যটক গিয়েছিল। ২০২৫ সালে ২৬ লক্ষ টার্গেট থাকলেও অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে, এই টার্গেটও পুরণ হবে না।

কিউবা পশ্চিম গোলার্ধে একটা বড় রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সমর্থন পায় কানাডার কাছ থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের মাঝে কানাডা কিউবাকে অতি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিচ্ছে। কানাডার লিবারাল সরকার সর্বদাই কিউবার সমাজতান্ত্রিক সরকারের সাথে ভালো সম্পর্ক রেখে এসেছে। কানাডার সরকারি ওয়েবসাইটে বলা হচ্ছে যে, কানাডার সাথে কিউবা সরকারের রাজনৈতিক সম্পর্ক ভালো এবং কানাডা কিউবার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর পর কানাডিয় পর্যটকদের প্রিয় গন্তব্য হলো কিউবা। আর কিউবার জন্যে কানাডা হলো পর্যটকের সবচাইতে বড় উৎস। করোনা মহামারির আগ পর্যন্ত বছরে প্রায় ১০ লক্ষ কানাডিয় কিউবাতে যেতো। বর্তমানে কিউবাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিদেশী বিনিয়োগ কানাডার; যা মূলতঃ খনিজ, জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সেক্টরে। কিউবার নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, অবকাঠামো এবং নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে কানাডা উন্নয়ন সহায়তা দিয়ে থাকে। এছাড়াও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে কিউবাকে সহায়তা দিচ্ছে কানাডা।

কিউবার অর্থনীতি অনেকটাই নির্ভরশীল ছিল ভেনিজুয়েলার তেল-ভিত্তিক অর্থনীতির উপর। তবে 'ট্রেডিং ইকনমিকস'এর হিসেবে ২০১২ সাল থেকে ২০২০ সালের মাঝে ভেনিজুয়েলার জিডিপি প্রায় চার ভাগের এক ভাগ হয়ে যায়। এর প্রভাব কিউবার অর্থনীতিতেও পড়েছে। ভেনিজুয়েলার পর রাশিয়া এবং মেক্সিকো কিউবার তেলের উৎস হিসেবে দেখা দিয়েছে। ২০২৫ সালে রাশিয়া কিউবাতে প্রায় ১ লক্ষ টন তেল রপ্তানি করেছে। 'মায়ামি হেরাল্ড' বলছে যে, অর্থনৈতিক মন্দা কাটাতে কিউবা ইউক্রেনে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করার জন্যে যোদ্ধা পাঠিয়ে থাকতে পারে। অপরদিকে চীন কিউবার প্রধান রপ্তানি বাজার। ২০২১ সালে কিউবা চীনে প্রায় তিন'শ মিলিয়ন ডলারের নিকেল এবং অন্যান্য খনিজ দ্রব্য রপ্তানি করে। প্রায় ৪ লক্ষ চিনি একসময় চীনে রপ্তানি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে কিউবার চিনি উৎপাদনে ধ্বস নেমেছে।

ক্যারিবিয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব প্রশ্নের মুখে পড়েছে বহুদিন ধরেই। কিউবার বামপন্থী সরকারকে উৎখাত করতে না পেরে অর্থনৈতিক অবরোধের মাঝে রেখে যুক্তরাষ্ট্র প্রকৃপক্ষে কিউবার সমর্থন বৃদ্ধিই করেছে। বিশেষ করে কিউবায় সরকার পরিবর্তন না করতে পারা, অথবা পশ্চিম গোলার্ধে কিউবাকে পুরোপুরিভাবে একঘরে না করতে পারাটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে বড় ব্যার্থতা। মধ্য আমেরিকাতে বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে মেক্সিকো, কলম্বিয়া, নিকারাগুয়া এবং ভেনিজুয়েলাতে বামপন্থী এবং লিবারালরা ক্ষমতায় আসীন হওয়ার কারণে কিউবা রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সমর্থন পেয়েছে। অর্থনৈতিক ধ্বসের আগ পর্যন্ত ভেনিজুয়েলা কিউবার অর্থনীতিকে সবচাইতে বড় সহায়তা দিয়েছে। এখন সেই ভার বহণ করছে মেক্সিকো, কানাডা, রাশিয়া এবং অন্যান্যরা। তবে পশ্চিম গোলার্ধে কিউবার সবচাইতে বড় বন্ধু হলো কানাডা; যার সমর্থন না পেলে মার্কিন অবরোধের মাঝে কিউবার পক্ষে টিকে থাকাটাই দুষ্কর হতো। এই সম্পর্কের মাধ্যমে কানাডাও ক্যারিবিয়ানের মতো ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রভাব ধরে রাখছে। কানাডার এই প্রচেষ্টা 'গ্লোবাল ব্রিটেন'এর অংশ। ক্যারিবিয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাবার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলি, বিশেষ করে রাশিয়া এবং চীনের জন্যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে; যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে কৌশলগত হুমকি। নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রের টার্গেট ভেনিজুয়েলার সরকার উৎখাত নয়; বরং পুরো ক্যারিবিয়ান এবং ল্যাটিন আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা। তবে শুধুমাত্র সামরিক হুমকির মাধ্যমে এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

Monday, 21 July 2025

২০২৫এর ২১শে জুলাই দিয়াবাড়ি ট্র্যাজেডি থেকে যা শিক্ষনীয়

২২শে জুলাই ২০২৫

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর 'এফ-৭বিজিআই' বিমানগুলি ২০১২ সালে বাহিনীতে যুক্ত হয়। তৈরি করার বয়স বিচারে এগুলি বেশ নতুন। আর এই বিমানগুলি এখন চীনা 'এলএস-৬' জিপিএস গাইডেড গ্লাইড বোমা এবং তুরস্কের 'তেবার' লেজার গাইডেড বোমা ছুঁড়ে ভূমিতে নিখুঁতভাবে টার্গেট ধ্বংস করতে সক্ষম। কাজেই যদি প্রাযুক্তিক সক্ষমতার কথা বলা হয়, তাহলে এগুলি একেবারে ফেলে দেবার জিনিস নয়। যে সক্ষমতার অভাব রয়েছে তা হলো, এগুলি দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র বহণ করতে পারে না। একারণেই বাংলাদেশের প্রয়োজন 'জে-১০' এবং 'জেএফ-১৭' ফাইটার বিমান। একমাত্র চীন থেকেই দূরপাল্লার এরূপ ক্ষেপণাস্ত্র (‘পিএল-১৫') পাবার সম্ভাবনা রয়েছে। (Photo: Shahriar Sonet)


২০২৫এর ২১শে জুলাই একটা ট্র্যাজেডির দিবস হিসেবে মনে থাকবে বাংলাদেশের অনেক মানুষের। কমপক্ষে ২০ জন মানুষের প্রাণ ঝরে গেছে বিমান বাহিনীর বিমান দুর্ঘটনায়; যার মাঝে বেশিরভাগই ছিল শিশু; যারা ছিল উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলের ছাত্র। তবে এই স্মৃতি কতদিন এদেশের মানুষ মনে রাখবে, সেটা দেখার বিষয়। মাত্র দশ দিন আগে, অর্থাৎ ১১ই জুলাই ছিল আরেকটা ট্র্যাজেডির ১৪তম বার্ষিকী। ২০১১এর ১১ই জুলাই চট্টগ্রামের মিরসরাইএ একটা সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৫ জন নিহত হয়েছিল; যারে মাঝে ৪৩ জনই ছিল শিশু শিক্ষার্থী। এর মাঝে ৩৪ জনই ছিল মিরসরাই উপজেলার মায়ানী ইউনিয়নের আবু তোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। ১৯৭১ সালের পর থেকে একসাথে এতজন শিশুর মৃত্যু ঘটেনি। দুর্ঘটনায় এরূপ অপমৃত্যু বাংলাদেশে নতুন নয়। কিছুদিন সেই ঘটনা নিয়ে হৈচৈ হয়; বিশেষ করে রাজনৈতিক পক্ষগুলি এর থেকে 'পলিটিক্যাল পয়েন্টস' বের করার চেষ্টায় থাকে; এরপর সকলেই ভুলে যায়। এই ব্যবস্থাটাই চলছে বাংলাদেশে যুগের পর যুগ ধরে। মানুষের আবেগকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়; কিন্তু সমস্যার সমাধান করার ইচ্ছা কারুরই থাকে না। বরং যতদিন সমস্যা থাকে, ততদিনই সেটা ভোটের রাজনীতির জন্যে ব্যবহারযোগ্য হয়। একারণেই বিমান বাহিনীর বিমান দুর্ঘটনার ব্যাপারে একটা 'হোলিস্টিক ভিউ' থাকাটা জরুরি।

১। অনেকেই বলা শুরু করেছেন যে, 'মান্ধাতার আমলের বিমান ওড়ায় কেন'? খুবই যৌক্তিক কথা। 'এফ-৭' যুদ্ধবিমান তো ১৯৫০এর দশকে সোভিয়েত ডিজাইনের 'মিগ-২১' বিমানের চীনা কপি। একারণেই বাংলাদেশের উচিৎ এই মুহুর্তে কয়েক স্কোয়াড্রন 'জে-১০সি' এবং 'জেএফ-১৭বি' যুদ্ধবিমান যোগাড় করা। একদিকে যেমন এগুলি জাতীয় নিরাপত্তার জন্যে অতি জরুরি; তেমনি পুরোনো বিমানগুলিকে (যেমন – ‘এফ-৭এমবি') প্রতিস্থাপন করার ক্ষেত্রেও অতি প্রয়োজনীয়। প্রধান উপদেষ্টা নিজেই কিছুদিন আগেই বিমান বাহিনীর একটা অনুষ্ঠানে বলেছেন যে, বিভিন্ন দিক থেকে যুদ্ধের হুমকি আসছে। তাই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে। আর প্রস্তুতি নিতে গেলে অর্ধেক প্রস্তুতি নিলে হবে না; পুরো প্রস্তুতি নিতে হবে। ভারতীয় মিডিয়া (ওয়াশিংটনেরও সমর্থন রয়েছে) চাইছে বিমান নির্মাতা চীনের সাথে বাংলাদেশের একটা দ্বন্দ্ব উস্কে দিতে। কাজেই এদেশের মানুষকে সাবধানে পা ফেলতে হবে।

২। মান্ধাতার আমলের বিমানগুলিকে সরিয়ে ফেললেই তো বিমান দুর্ঘটনা আর হবে না তাই না? মার্কিন বিমান বাহিনী হলো দুনিয়ার সবচাইতে শক্তিশালী বিমান বাহিনী। তাদের দিকে তাকালে কি দেখা যায়? তাদের রয়েছে 'বি-৫২এইচ' বোমারু বিমান; যা প্রথম উড়েছিল ১৯৬০ সালের ১০ই জুলাই; অর্থাৎ ৬৫ বছর আগে! এটা সার্ভিসে আসে ১৯৬১ সালের ৯ই মে। শেষ 'বি-৫২এইচ' বিমান ফ্যাক্টরি থেকে বের হয়েছিল ১৯৬২ সালের ২৬শে অক্টোবর। তবে এই বিমানের প্রথম ভার্সনটা প্রথম আকাশে উড়েছিল আরও প্রায় দশ বছর আগে ১৫ই এপ্রিল ১৯৫২ সালে। তাহলে ৬০-৭০ বছর আগে তৈরি এই বিমানগুলি যুক্তরাষ্ট্র কেন এখনও ব্যবহার করছে? তারা 'বি-১বি' এবং 'বি-২' বোমারু বিমানও তৈরি করেছে। এরপরও তারা 'বি-৫২'এর মতো মান্ধাতার আমলের বিমান আকাশে ওড়াচ্ছেই শুধু নয়; সারা দুনিয়ার বহু দেশ ধ্বংস করতে ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্র তো জানে যে, এই বিমানগুলি যে চালানো বিপজ্জনক; নাকি জানে না?
 
শেষ 'বি-৫২এইচ' বিমান ফ্যাক্টরি থেকে বের হয়েছিল ১৯৬২ সালের ২৬শে অক্টোবর। তাহলে ৬০-৭০ বছর আগে তৈরি এই বিমানগুলি যুক্তরাষ্ট্র কেন এখনও ব্যবহার করছে? বাস্তবতা হলো, একটা দেশ ধ্বংস করার যোগ্যতা কিন্তু এই বিমানগুলির রয়েছে! অনেক ধরণের অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র এখন এই বিমানে বহণ করা যায়; যার ফলে বিমানগুলি এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী কমব্যাট প্ল্যাটফর্ম। অর্থাৎ বিমান মান্ধাতার আমলের হতে পারে; কিন্তু এর বহণ করা অস্ত্র মোটেই মান্ধাতার আমলের নয়।


৩। তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের তো এটাও হিসেবে রয়েছে যে, ২০১৪ সাল থেকে ২০২৫ সালের মাঝে সর্বাধুনিক 'এফ-৩৫' যুদ্ধবিমানের ১৬টা দুর্ঘটনা ঘটেছে। সর্বাধুনিক বিমানের ক্ষেত্রেই যদি এতগুলি দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে এটা কি বলা যায় যে, বিমান দুর্ঘটনা শুধুই বিমানের বয়সের উপর নির্ভরশীল? আর বিমানের বয়স বলতে কি বোঝানো হবে? বিমানের টাইপের প্রথম ফ্লাইট? নাকি দুর্ঘটনায় পতিত বিমানটার ফ্যাক্টরি থেকে বের হবার তারিখ? উভয় ক্ষেত্রেই 'বি-৫২' বিমানের আকাশে ওড়ার যোগ্যতা থাকার কথা নয়। তবে বাস্তবতা হলো, একটা দেশ ধ্বংস করার যোগ্যতা কিন্তু এই বিমানগুলির রয়েছে! অনেক ধরণের অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র এখন এই বিমানে বহণ করা যায়; যার ফলে বিমানগুলি এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী কমব্যাট প্ল্যাটফর্ম। অর্থাৎ বিমান মান্ধাতার আমলের হতে পারে; কিন্তু এর বহণ করা অস্ত্র মোটেই মান্ধাতার আমলের নয়।

৪। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর 'এফ-৭বিজিআই' বিমানগুলি ২০১১ সালে তৈরি এবং ২০১২ সালে এগুলি বিমান বাহিনীতে যুক্ত হয়। তৈরি করার বয়স বিচারে এগুলি বেশ নতুন। আর এই বিমানগুলি এখন চীনা 'এলএস-৬' জিপিএস গাইডেড গ্লাইড বোমা এবং তুরস্কের 'তেবার' লেজার গাইডেড বোমা ছুঁড়ে ভূমিতে নিখুঁতভাবে টার্গেট ধ্বংস করতে সক্ষম। কাজেই যদি প্রাযুক্তিক সক্ষমতার কথা বলা হয়, তাহলে এগুলি একেবারে ফেলে দেবার জিনিস নয়। যে সক্ষমতার অভাব রয়েছে তা হলো, এগুলি দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র বহণ করতে পারে না। এটা এই মুহুর্তে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর মাত্র ৬টা 'মিগ-২৯' বিমান পারে ('আর-২৭' ক্ষেপণাস্ত্র)। একারণেই বাংলাদেশের প্রয়োজন 'জে-১০' এবং 'জেএফ-১৭' ফাইটার বিমান। একমাত্র চীন থেকেই দূরপাল্লার এরূপ ক্ষেপণাস্ত্র (‘পিএল-১৫') পাবার সম্ভাবনা রয়েছে। এটা পুরোপুরিভাবে নিশ্চিত যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ ভারতের সাথে সম্পর্ক খারাপ করতে চাইবে না। তাই এটা ভুলে যাওয়া যায় যে, ‘ইউরোফাইটার টাইফুন' অথবা ফরাসি 'রাফাল' অথবা মার্কিন 'এফ-১৬'এর সাথে দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র পাওয়া সম্ভব।
 
অনেকেই বলছেন যে, এত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ফাইটার বিমান ওড়ানো হচ্ছে কেন? খুবই যৈক্তিক প্রশ্ন। কিন্তু বিমান বাহিনীর বিমানগুলিকে অন্যস্থানে (যেমন ভারতে) সরিয়ে ফেললেই কি জনগণকে নিরাপদে রাখা যাবে? একটা 'বোয়িং ৭৮৭' যাত্রীবাহী বিমান সর্বোচ্চ ১২৬টন পর্যন্ত জেট ফুয়েল বহণ করতে পারে! এই পরিমাণ জেট ফুয়েল নিয়ে যদি একটা বিমান কুর্মিটোলার আশেপাশে কোন একটা স্কুলের উপর ধ্বসে পড়ে; অথবা প্রধান উপদেষ্টার অফিসের উপর ধ্বসে পড়ে, তাহলে কি হতে পারে?


৫। অনেকেই বলছেন যে, এত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ফাইটার বিমান ওড়ানো হচ্ছে কেন? খুবই যৈক্তিক প্রশ্ন। তাহলে কি করা উচিৎ? সিঙ্গাপুর বা ইস্রাইলকে অনুসরণ করা উচিৎ। সিঙ্গাপুর ভারত এবং অস্ট্রেলিয়ার ভূমি এবং আকাশসীমা ব্যবহার করে তাদের পাইলটদের ট্রেনিং দেয়; আর ইস্রাইল তুরস্কের আকাশসীমা ব্যবহার করে। কাজেই সিঙ্গাপুর এবং ইস্রাইলের মানুষ থাকে পুরোপুরিভাবে নিরাপদ। যেহেতু বাংলাদেশের সরকারের পক্ষে নতুন করে আরেকটা বিমান ঘাঁটি তৈরি করা অসম্ভব, তাই যারা এই যুক্তি দিচ্ছেন, তাদের অবশ্যই সমাধান হিসেবে বিমান মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা উচিৎ যে, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর বিমানগুলিকে যেন ভারতের বিশাল আকাশসীমায় ট্রেনিং নেবার সুযোগ করে দেয়া হয়। এর আগে মুন্সিগঞ্জে বিমানবন্দর প্রকল্প ভেস্তে যাওয়া, বাগেরহাটে খান জাহান আলী বিমানবন্দর প্রকল্প ভেস্তে যাওয়া এবং লালমনিরহাট বিমানবন্দর চালু করা প্রচেষ্টা ভেস্তে যাওয়া থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া বাংলাদেশের যেকোন সরকারের পক্ষে কোন বিমানবন্দর তৈরি বা পুরোনো বিমানবন্দর চালু করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ ভারত এবং মার্কিন সরকারের আরও কাছাকাছি (পড়ুন অনুগত) হতে পারলে বাংলাদেশের মানুষকে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর জেট ফুয়েল দ্বারা পুড়ে যাওয়া থেকে বাঁচানো যাবে! অন্য কথায় বলতে গেলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের হাতে 'আউটসোর্স' (চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটিএর মতো) করে দিতে পারলেই এদেশের মানুষকে যুদ্ধবিমানের শব্দ শুনতে হবে না। থাকবে শুধু শান্তি; আর শান্তি!

৬। কিন্তু বিমান বাহিনীর বিমানগুলিকে অন্যস্থানে (যেমন ভারতে) সরিয়ে ফেললেই কি জনগণকে নিরাপদে রাখা যাবে? একটা 'বোয়িং ৭৮৭' যাত্রীবাহী বিমান সর্বোচ্চ ১২৬টন পর্যন্ত জেট ফুয়েল বহণ করতে পারে! এই পরিমাণ জেট ফুয়েল নিয়ে যদি একটা বিমান কুর্মিটোলার আশেপাশে কোন একটা স্কুলের উপর ধ্বসে পড়ে; অথবা প্রধান উপদেষ্টার অফিসের উপর ধ্বসে পড়ে, তাহলে কি হতে পারে? কিছুটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে গত ১২ই জুলাই ভারতের আহমেদাবাদে এই রকমই একটা বিমানের দুর্ঘটনা থেকে; যেখানে বিমানের ২৪২ জন আরোহী ছাড়াও ভূমিতে আরও ১৯ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৩ সালে ফ্যাক্টরি থেকে বের হয়ে আসা এই বিমানটা ৫৪ টনের বেশি জেট ফুয়েল বহণ করছিল! এর তুলনায় ঢাকায় ধ্বংসপ্রাপ্ত 'এফটি-৭বিজিআই' যুদ্ধবিমানটা সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৮ টন জেট ফুয়েল বহণ করতে পারে (যদিও তা নিঃসন্দেহে অনেক কম ফুয়েল বহণ করছিল)। কাজেই এই 'এফ-৭'এর স্থলে যদি একটা 'বোয়িং-৭৮৭' বিমান থাকতো, তাহলে মাইলস্টোন স্কুল এবং কলেজের কোন নিশানা পাওয়া যেতো কিনা সন্দেহ! সুতরাং যারা প্রশ্ন করছেন যে, ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা থেকে বিমান বাহিনীর বিমান ওড়ে কেন, তাদের উচিৎ সরকারের কাছে আবেদন জানানো, যাতে করে ঢাকা বিমানবন্দর বন্ধ করে দেয়া হয়। থার্ড টার্মিনালের মতো মার্কিন প্রকল্পও বন্ধ করার দাবি জানানো উচিৎ; যেটা বাস্তবায়নের উছিলায় মুন্সিগঞ্জে বিমানবন্দরের প্রকল্প বাতিল করা হয়।
 
২০১১ সালের ১১ই জুলাই মিরসরাইএর দুর্ঘটনায় ৪৩ জন শিশুসহ ৪৫ জন নিহত হয়েছিল। কতজন মনে রেখেছে? দুর্ঘটনায় এরূপ অপমৃত্যু বাংলাদেশে নতুন নয়। কিছুদিন সেই ঘটনা নিয়ে হৈচৈ হয়; বিশেষ করে রাজনৈতিক পক্ষগুলি এর থেকে 'পলিটিক্যাল পয়েন্টস' বের করার চেষ্টায় থাকে; এরপর সকলেই ভুলে যায়। এই ব্যবস্থাটাই চলছে বাংলাদেশে যুগের পর যুগ ধরে। মানুষের আবেগকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়; কিন্তু সমস্যার সমাধান করার ইচ্ছা কারুরই থাকে না। বরং যতদিন সমস্যা থাকে, ততদিনই সেটা ভোটের রাজনীতির জন্যে ব্যবহারযোগ্য হয়।


৭। অনেকেই বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে গালাগালি দিচ্ছেন – তাদের পাইলট অনভিজ্ঞ; অনভিজ্ঞ পাইলট দিয়ে ঢাকা শহরের উপর দিয়ে বিমান ওড়ানো হচ্ছে; দুর্নীতির আখড়া হয়ে গেছে বিমান বাহিনী; ইত্যাদি। যারা বলছেন, তারা হয়তো জানেন না যে, একটা 'এফ-৭' ফাইটার পাইলট হতে গেলে কতগুলি ধাপ পার করে আসতে হয়। প্রথমে 'পিটি-৬' এবং 'গ্রোব জি-১২০পি' বিমানে ওড়া শিখতে হয়। যারা বিশেষভাবে ভালো পারদর্শিতা দেখায়, তাদের মাঝ থেকেই সাধারণতঃ ফাইটার পাইলট সিলেক্ট করা হয়। এরা আবার 'কে-৮' জেট প্রশিক্ষণ বিমানে ওড়া শেখে। এরপর 'ইয়াক-১৩০' এডভান্সড ট্রেইনার বিমানে অস্ত্র চালনা শেখে। এরপর সে 'এফ-৭' স্কোয়াড্রনে 'এফটি-৭' বিমানে প্রশিক্ষণ নিয়ে টাইপ ফ্লাইং কোয়ালিফাই করে। এই ফ্লাইং কোয়ালিফিকেশনের শেষ ধাপের 'সোলো ফ্লাইট' ছিল ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মোঃ তৌকির ইসলামের। প্রায় ১০ মিনিট ভালোভাবে ওড়ার পর বিমানটাতে সমস্যা দেখা দেয়। তার সহকর্মীরা বলেন যে, বিমানটা মধ্য আকাশে হঠাত বন্ধ হয়ে যায়। তৌকির শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করছিলেন বিমানটাকে একটা খোলা স্থানে ল্যান্ডিং করাতে। একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন যে, দু'টা বিমান একসাথে উড়ছিল। এর মাঝে একটা দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো যে সমস্যা পড়েছে। এই বিমানটা মাইলস্টোন কলেজের ১০-১২ তলা উঁচু ভবনের সাথে ধাক্কা খেয়ে এরপর দুই তলা স্কুল ভবনের উপর ধ্বসে পড়ে।

৮। পৃথিবীর অনেক দেশের বিমান বাহিনীতেই এতগুলি ধাপ পার হয়ে ফাইটার পাইলট হতে হয় না। একজন ফাইটার পাইলট হতে গেলে বেশ কয়েক বছর লেগে যায়। আর একজন পাইলট খুব বেশিদিন সুপারসনিক বিমানের পাইলট থাকতে পারেন না। এক্ষেত্রে শারীরিক সক্ষমতা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আবার অভিজ্ঞ পাইলটদের মূল গুরুত্ব হলো ট্রেইনার হিসেবে। তাই বিমান বাহিনী সাধারণতঃ তাদেরকে বেশি বয়সে ফাইটার বিমান ওড়াতে দেয় না। টাকা খরচ করলে মোটামুটি দ্রুতই একটা বিমান কেনা সম্ভব। কিন্তু একজন পাইলট তৈরি করতে 'অমূল্য' সময় লাগে; যা অর্থ দিয়েও পাওয়া যায় না। গত ২০২৪এর মে মাসেও একটা 'ইয়াক-১৩০' বিমান ধ্বংস হয়ে স্কোয়াড্রন লীডার আসীম জাওয়াদ মৃত্যুবরণ করেন। জাওয়াদ এবং তৌকিরের পেছনে ব্যয় করা পুরো সময়টা বাংলাদেশ বিমান বাহিনী হারিয়েছে; যা পূরণ করতে কয়েক বছর লাগবে।

৯। যারা বলছেন যে, অনভিজ্ঞ পাইলট দিয়ে কেন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার উপর দিয়ে বিমান ওড়ানো হচ্ছে, তাদের অবশ্যই জানা উচিৎ যে গত ২৯শে জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে সামরিক 'ব্ল্যাক হক' হেলিকপ্টারের সাথে যাত্রীবাহী বিমানের সংঘর্ষে ৬৭ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। হেলিকপ্টারের পাইলট ক্যাপ্টেন রেবেকা লোবাক ছয় বছর ধরে সেনাবাহিনীর পাইলট ছিলেন। তার সাথের দু'জন এনসিও ছিলেন, যারা ছিলেন যথেষ্ট অভিজ্ঞ। এরপরেও একটা অত্যাধুনিক হেলিকপ্টার একটা বেসামরিক যাত্রীবাহী বিমানের সাথে ধাক্কা লাগা এড়াতে পারেনি। আর পৃথিবীর সবচাইতে বিপজ্জনক আকাশপথ হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র এই সামরিক ট্রেনিং মিশনকে বাতিল করেনি। কারণ এই ট্রেনিং মিশনটাকে তারা তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছে। দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে; তাই বলে জাতীয় নিরাপত্তাকে ছোট করার মতো ক্ষুদ্র চিন্তা তাদেরকে গ্রাস করেনি।
 
যারা বিমান বাহিনীর সমালোচনা করছেন, তাদের উচিৎ 'প্রকৃত' সমালোচনা করা। এই বিমান বাহিনী হলো সাইফুল আজমের উত্তরসুরী; যিনি ১৯৬৭ সালে একদিনে ৩টা ইস্রাইলি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছিলেন। এই বিমান বাহিনী তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছে যখন সাইফুল আজমের শত্রুরা ৫৬ হাজারেরও বেশি মুসলিম ভাই-বোনদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর পাইলটরা নিঃসন্দেহে অতি উচ্চমানের পাইলট। কিন্তু নিজের ভাই-বোনদের মৃত্যুতে যাদের অন্তর কাঁদে না, তারা আর কারুর চোখে না হলেও আল্লাহর চোখে অপরাধী হবে। ইস্রাইলের বিরুদ্ধে না লড়েও তারা যে মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাবেন না, সেই প্রমাণ তারা পেয়েছেন। মৃত্যু আসবেই; কিন্তু তাদের কাছে অপশন ছিলো - মৃত্যুটা কতটা সন্মানের হবে। হয়তো ২০২৫ সালের ২১শে জুলাইয়ের মর্মান্তিক ঘটনা তাদেরকে সেটাই মনে করিয়ে দেবে।


১০। যারা দুর্নীতির কথা বলছেন, তারা দুর্নীতির আসল আখড়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে এড়িয়ে যাচ্ছেন। এই ব্যবস্থায় মানুষকে শেখানো হয় যাতে করে ব্যক্তিগত বেনেফিট ছাড়া কেউ কোন কাজ না করে। দুর্নীতি করলে তো ব্যক্তিগত বেনেফিট হয়; তাহলে কেন সেটা খারাপ হবে? ব্যক্তিগত বেনেফিটের এই একই চিন্তা বাংলাদেশের সকল মানুষকেই শুধু দেয়া হয় না, রাষ্ট্রও চলে বেনেফিটের উপর ভিত্তি করে। যেমন, হাসিনা সরকার বেনেফিটের কথা চিন্তা করেই ভারতের আদানির সাথে রাষ্ট্রবিরোধী চুক্তি করেছিল; যা আবার অন্তর্বর্তী সরকারও বজায় রেখেছে। বেনেফিট চিন্তা করেই সরকার এই চুক্তি বাতিল করেনি অথবা সীমান্ত ও অন্যান্য ইস্যুতে ভারতের সাথে ঝামেলায় জড়ায়নি। বেনেফিট রয়েছে বলেই সরকার চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশীদেরকে দিতে চাইছে। বেনেফিট চিন্তা করেই ভারতের সুবিধার্থে তৈরি করা মাতারবাড়ি বন্দরকে সরকার অর্থনৈতিক বিষফোঁড়া মনে করছে না; অথচ পায়রা বন্দরকে ক্ষতিকর মনে করছে। বেনেফিট চিন্তা করেই প্রধান উপদেষ্টা চাডিগাঁও ভাষায় চট্টগ্রামের মানুষকে বুঝিয়েছেন যে মাতারবাড়ি বন্দর ভারতকে ব্যবহার করতে দিলে বাংলাদেশের কি কি বেনেফিট হবে। যখন পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাটাই চলছে বেনেফিটের উপর ভিত্তি করে, তখন এই ব্যবস্থা পরিবর্তন না করে নির্দিষ্ট কোন একটা গোষ্ঠীকে টার্গেট করার অর্থ হলো, কোন বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে কথাগুলি বলা হচ্ছে।

যারা এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাকে পুঁজি করে ঢাকা থেকে বিমান বাহিনীর ঘাঁটি সরিয়ে ফেলার কথা বলছেন, তারা ভারতের ন্যারেটিভ অনুসরণ করছেন। ভারতীয় মিডিয়া এই ঘটনাকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর সাথে সাধারণ মানুষের দূরত্ব তৈরি করতে এবং বাংলাদেশের সাথে চীনের (বিমান নির্মাতা) দূরত্ব তৈরি করতে। তারা এড়িয়ে যাচ্ছেন যে, ‘এফ-৭' বিমানের স্থলে 'বোয়িং-৭৮৭' বিমান থাকলে মাইলস্টোন কলেজ, স্কুল ও আশেপাশের বহু স্থাপনার অস্তিত্বই থাকতো না! যারা বিমান বাহিনীর সমালোচনা করছেন, তাদের উচিৎ 'প্রকৃত' সমালোচনা করা। এই বিমান বাহিনী হলো সাইফুল আজমের উত্তরসুরী; যিনি ১৯৬৭ সালে অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের 'হান্টার' যুদ্ধবিমান উড়িয়ে একদিনে ৩টা ইস্রাইলি যুদ্ধবিমান (অপেক্ষাকৃত উচ্চমানের) ভূপাতিত করেছিলেন। এই বিমান বাহিনী তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছে যখন সাইফুল আজমের শত্রুরা ৫৬ হাজারেরও বেশি মুসলিম ভাই-বোনদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর পাইলটরা নিঃসন্দেহে অতি উচ্চমানের পাইলট। কিন্তু নিজের ভাই-বোনদের মৃত্যুতে যাদের অন্তর কাঁদে না, তারা আর কারুর চোখে না হলেও আল্লাহর চোখে অপরাধী হবে। ইস্রাইলের বিরুদ্ধে না লড়েও তারা যে মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাবেন না, সেই প্রমাণ তারা পেয়েছেন। মৃত্যু আসবেই; কিন্তু তাদের কাছে অপশন ছিলো - মৃত্যুটা কতটা সন্মানের হবে। হয়তো ২০২৫ সালের ২১শে জুলাইয়ের মর্মান্তিক ঘটনা তাদেরকে সেটাই মনে করিয়ে দেবে।






সূত্রঃ




‘Stratofortress... The Big One from Boeing’ by Robert F Dorr in Air Enthusiast, Summer 1990

‘Pilot is safe after crash of F-35 fighter jet seen in dramatic video’ in CNN, 29 January 2025

‘What we know so far about Air India crash investigation’ in BBC, 12 July 2025

‘AI-171’s flight to tragedy: A minute-by-minute account of events that led to Ahmedabad plane crash’ Deccan Herald, 12 July 2025

‘মিরসরাই ট্র্যাজেডি: সেদিন যেভাবে প্রাণ হারিয়েছিল ৪৩ শিশুসহ ৪৫ জন' প্রথম আলো, ১১ই জুলাই ২০২৪

‘Pilot tried to avoid disaster by steering crashing jet away from populated area: ISPR’ in The Business Standard, 21 July 2025

‘At least 27 Air Force jet crashes in last 3 decades’ in Dhaka Tribune, 11 July 2025

‘Palestinians mourn death of a Bangladeshi war hero’ in Al-Jazeera, 15 June 2020

‘What we know about the deadly air crash between a passenger jet and a US Army helicopter’ in Associated Press, 28 March 2025

‘Friends say Army captain killed in midair collision was a ‘brilliant and fearless’ patriot’ in Associated Press, 03 February 2025

Sunday, 11 May 2025

ভারত-পাকিস্তান আকাশ যুদ্ধ – বাকি বিশ্বের জন্যে শিক্ষা

১১ই মে ২০২৫

ফরাসি 'রাফাল' বিমানগুলি অকার্যকর কিনা; অথবা চীনা ‘জে-১০’ বিশ্বসেরা বিমান কিনা - এগুলি নিয়ে অনেক আলোচনা চলছে। প্রকৃতপক্ষে একটা টাইপের হার্ডওয়্যার দিয়ে কোন যুদ্ধ জয় সম্ভব নয়। জার্মানরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় 'কাম্ফগ্রুপ' নামের যে কনসেপ্ট জন্ম দিয়েছিল, তা আজকে 'কম্বাইন্ড আর্মস' ট্যাকটিকস নামে পরিচিত। আজকের দিনে এই 'কম্বাইন্ড আর্মস' ট্যাকটিকসকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে 'মাল্টিডোমেইন ওয়ারফেয়ার' হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে; যার মাঝে যুক্ত রয়েছে স্যাটেলাইট, সাইবারস্পেস, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এমনকি অপ্রচলিত যুদ্ধের উপাদানও।


১০ই মে প্রায় হঠাৎ করেই ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের পক্ষ থেকেই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে! গত ২২শে এপ্রিল ভারতীয় অধিকৃত কাশ্মিরের পেহেলগামে এক হামলায় ২৬ জন নিহত হবার পর ভারত পাকিস্তানকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং ৭ই মে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মির এবং পাকিস্তানের পাঞ্জাবে ভারতীয় বিমান বাহিনী বিমান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখানে বড় ভূমিকা নিয়েছেন বলে তিনি সোশাল মিডিয়াতে ঘোষণা দেন। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার ছয় ঘন্টার মাঝেই ভারত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জন্যে পাকিস্তানকে দোষারোপ করেছে। তবে দুই দেশের মাঝে শান্তিচুক্তি এখনও হয়নি। বিশেষ করে সিন্ধু নদের পানি বন্টন নিয়ে চুক্তি, যা ভারত বাতিল করেছিল, সেটা নিয়ে কোন আলোচনা শুরু হয়নি এখনও। কাজেই কূটনৈতিক আলোচনা সবে শুরু হলো বলে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে দক্ষিণ এশিয়া এবং ভারত মহাসাগর যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তা এখন পরিষ্কার।

ভারত-পাকিস্তানের এই সংঘাত কি যুদ্ধ ছিল? ‘আল জাজিরার'র সাথে কথা বলতে গিয়ে মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক 'উইলসন সেন্টার'এর ডিরেক্টর মাইকেল কুগেলম্যান বলছেন যে, ভারত-পাকিস্তানের সংঘাত যেভাবেই সংজ্ঞায়িত হোক না কেন, সেটা প্রকৃতপক্ষে দুই দেশের মাঝে যুদ্ধই ছিল। উভয় পক্ষই একে অপরের সামরিক স্থাপনায় হামলা করেছে; যা নিঃসন্দেহেই সহিংসতাকে আরও বেশি উস্কে দিয়েছে। কুগেলম্যান এটাকে যুদ্ধ বলছেন। তবে এই যুদ্ধের মাঝে সবচাইতে বেশি আলোচিত হয়েছে দুই দেশের মাঝের আকাশ যুদ্ধ। কারণ এই প্রথম একটা বড় আকারের আকাশ যুদ্ধে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে চোখে না দেখার পরেও প্রায় এক ঘন্টা ধরে যুদ্ধ চলেছে। এটা ইতিহাসে প্রথম। এখনও বেশিরভাগ তথ্যই অজানা। তবে এই যুদ্ধ থেকে কিছু শিক্ষা এখনই নেয়া সম্ভব। ৭ই মে বিমান হামলা দিয়ে শুরু হলেও পরদিন থেকেই যুদ্ধ সঞ্চালিত হয় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দিকে। আর যুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষই সীমান্তে স্বল্প পাল্লার আর্টিলারি ও রকেট ছুঁড়েছে। হতাহতের সংখ্যার ব্যাপারে এখনও কেউ নিশ্চিত নয়।
 
কুগেলম্যান মনে করছেন যে, ভারতের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ভারতের সংজ্ঞায়িত তথাকথিত সন্ত্রাসীদের অস্তানা ধ্বংস করাই নয়; বরং ভারত চাইছে পাকিস্তানকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে; যাতে করে দাতা সংস্থাগুলি যেন পাকিস্তানকে অর্থিক সহায়তা না দেয়। ভারত চাইছে পাকিস্তানের জন্যে ভারত-বিরোধী কর্মকান্ডের মূল্য অত্যধিক করে ফেলা। তবে বর্তমান এই সংঘাতের পেছনে উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মোদী সরকারের উপর ভারতে যথেষ্ট চাপ ছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে শক্ত কিছু করার। কারণ ভারত সরকারের পক্ষে থেকে পাকিস্তানকে সন্ত্রাসী হামলার জন্যে দায়ী করা হয়েছিল। অপরদিকে পাকিস্তানের সরকার এবং সামরিক বাহিনীর পক্ষে জনমত তেমন একটা নেই। এমতাবস্থায় ভারতকে শত্রু হিসেবে তুলে ধরে তারা জনমতকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসতে পারে।



ডিটারেন্স বনাম উস্কানি

যুদ্ধের শুরু থেকেই ভারত এবং পাকিস্তান একে অপরকে দোষারোপ করেছে উস্কানিদাতা হিসেবে। কিন্তু এখানে কোনটা উস্কানি, আর কোনটা ডিটারেন্স, সেটা বিবেচ্য বিষয়। কে কোনটাকে কিভাবে দেখছে, সেব্যাপারে কেউই নিশ্চিত নয়। কুগেলম্যান মনে করছেন যে, ভারতের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ভারতের সংজ্ঞায়িত তথাকথিত সন্ত্রাসীদের অস্তানা ধ্বংস করাই নয়; বরং ভারত চাইছে পাকিস্তানকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে; যাতে করে দাতা সংস্থাগুলি যেন পাকিস্তানকে অর্থিক সহায়তা না দেয়। ভারত চাইছে পাকিস্তানের জন্যে ভারত-বিরোধী কর্মকান্ডের মূল্য অত্যধিক করে ফেলা। তবে বর্তমান এই সংঘাতের পেছনে উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মোদী সরকারের উপর ভারতে যথেষ্ট চাপ ছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে শক্ত কিছু করার। কারণ ভারত সরকারের পক্ষে থেকে পাকিস্তানকে সন্ত্রাসী হামলার জন্যে দায়ী করা হয়েছিল। অপরদিকে পাকিস্তানের সরকার এবং সামরিক বাহিনীর পক্ষে জনমত তেমন একটা নেই। এমতাবস্থায় ভারতকে শত্রু হিসেবে তুলে ধরে তারা জনমতকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসতে পারে।

‘স্কাই নিউজ'এর সাথে কথা বলতে গিয়ে ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক 'রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউট' বা 'রুসি'র প্রাক্তন ডিরেক্টর জেনারেল মাইকেল ক্লার্ক বলছেন যে, উভয় পক্ষই খুব সাবধানে তাদের পরবর্তী টার্গেট নির্বাচন করেছে। ভারত প্রথম দিকে শুধু কাশ্মির এবং বাহওয়ালপুরের মাঝে আক্রমণকে সীমাবদ্ধ রেখেছিল। পাকিস্তানও প্রথমদিকে তাদের টার্গেট নির্বাচন করেছে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের অভ্যন্তরে এবং পাঞ্জাবের অমৃতসরে। এরপর থেকে তারা ধীরে ধীরে উভয় পক্ষে সামরিক ঘাঁটিতে হামলা করেছে। ভারত তাদের পশ্চিম নৌবহরের বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজকে পাকিস্তানের উপকূলের দিকে যেতে বলেছিল; যার অর্থ হলো, তারা পাকিস্তানের প্রধান সমুদ্রবন্দর করাচিকে (যা কিনা কাশ্মির থেকে বহু দূরে) হুমকির মাঝে ফেলতে চেয়েছিল।

ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর প্রাক্তন কর্মকর্তা এয়ার ভাইস মার্শাল শন বেল 'আল জাজিরা'কে বলছেন যে, একটা খবরে যখন বলা হচ্ছিলো যে, পাকিস্তানি সেনারা 'লাইন অব কন্ট্রোল'এর দিকে আগ্রসর হচ্ছে। এই ব্যাপারটাকে ভারত নিয়েছে উত্তেজনাকে বৃদ্ধি করার একটা কর্মকান্ড হিসেবে। অথচ একজন সামরিক কর্মকর্তার কাছে এই একই ব্যাপারটা মনে হতে পারে আক্রমণাত্মক অথবা প্রতিরক্ষামূলক। তার কাছে হয়তো মনে হতে পারে যে, সীমান্তের কাছাকাছি সামরিক শক্তি মোতায়েনের অর্থ হলো অপর পক্ষকে অগ্রসর হওয়া থেকে বিরত থাকতে বলা। কাজেই একই কর্মকান্ডকে কে কিভাবে দেখছে, সেই ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ।
 
মাইকেল ক্লার্ক বলছেন যে, যখন পাকিস্তানীরা প্রথমে বলেছিল যে, তারা ভারতের পাঁচটা বিমান ভূপাতিত করেছে, তখন তিনি নিজেই সেটা বিশ্বাস করতে পারেননি। কারণ পাকিস্তানে হামলা করার জন্যে ভারতের বিমানের পাকিস্তানের আকাশ সীমানায় ঢোকারই প্রয়োজন নেই। এখন বোঝা যাচ্ছে যে, ভারতের আকাশ সীমানায় থাকার সময়েই তাদের 'রাফাল' ফাইটারগুলিকে ভূপাতিত করা হয়েছে। আর যেহেতু বিমানগুলি ভারতে ভূপাতিত হয়েছে, তাই পাকিস্তানের পক্ষে বিমানগুলির ধ্বংসাবশেষ দেখানো সম্ভব নয়; আর ভারতীয়রাও এব্যাপারে কোন তথ্য দেবে না। এর মাঝে এটাও ধারণা করা যেতে পারে যে, চীনের তৈরি 'এইচকিউ-৯' বিমান-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রও 'রাফাল' বিমান ভূপাতিত করে থাকতে পারে। তবে এই প্রথমবারের মতো চীনের উচ্চ প্রযুক্তির সরঞ্জাম পশ্চিমাদের তৈরি উচ্চ প্রযুক্তির সরঞ্জামের মুখোমুখি হয়েছে; যার গুরুত্ব অনেক।



চীনা অস্ত্র বনাম পশ্চিমা অস্ত্র

আকাশ যুদ্ধের মাঝে সবচাইতে গুরুত্ব পেয়েছে পাকিস্তানের হাতে থাকা চীনা অস্ত্রের সক্ষমতা। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝে ভারতের হাতে থাকা পশ্চিমা অস্ত্রের বিরুদ্ধে চীনা অস্ত্রের সক্ষমতা কতটুকু, সেব্যাপারে এখন সকলেই আগ্রহী। কুগেলম্যান বলছেন যে, পাকিস্তান খুব সম্ভবতঃ চীনে নির্মিত 'জে-১০' ফাইটার বিমানের মাধ্যমে ফ্রান্সে তৈরি ভারতের 'রাফাল' ফাইটার বিমান ধ্বংস করেছে। উভয় পক্ষই অন্যান্য দেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে উচ্চ প্রযুক্তির অস্ত্র যোগাড় করতে পেরেছে; যা কিনা তাদেরকে সামরিক কর্মকান্ড বৃদ্ধি করতে সহায়তা করেছে।

মাইকেল ক্লার্ক বলছেন যে, ২০১০এর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে। তখন থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা অস্ত্রের উপর পাকিস্তানের নির্ভরশীলতা কমতে থাকে; এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্থান নিতে থাকে চীন। অনেক আগে থেকেই চীন পাকিস্তানের সামরিক সরঞ্জামের বড় সরবরাহকারী। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চীন পাকিস্তানের উচ্চ প্রযুক্তির সরঞ্জামের প্রধান সরবরাহকারীরূপে আবির্ভূত হয়েছে। মাইকেল ক্লার্ক বলছেন যে, যখন পাকিস্তানীরা প্রথমে বলেছিল যে, তারা ভারতের পাঁচটা বিমান ভূপাতিত করেছে, তখন তিনি নিজেই সেটা বিশ্বাস করতে পারেননি। কারণ পাকিস্তানে হামলা করার জন্যে ভারতের বিমানের পাকিস্তানের আকাশ সীমানায় ঢোকারই প্রয়োজন নেই। এখন বোঝা যাচ্ছে যে, ভারতের আকাশ সীমানায় থাকার সময়েই তাদের 'রাফাল' ফাইটারগুলিকে ভূপাতিত করা হয়েছে। আর যেহেতু বিমানগুলি ভারতে ভূপাতিত হয়েছে, তাই পাকিস্তানের পক্ষে বিমানগুলির ধ্বংসাবশেষ দেখানো সম্ভব নয়; আর ভারতীয়রাও এব্যাপারে কোন তথ্য দেবে না। এর মাঝে এটাও ধারণা করা যেতে পারে যে, চীনের তৈরি 'এইচকিউ-৯' বিমান-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রও 'রাফাল' বিমান ভূপাতিত করে থাকতে পারে। তবে এই প্রথমবারের মতো চীনের উচ্চ প্রযুক্তির সরঞ্জাম পশ্চিমাদের তৈরি উচ্চ প্রযুক্তির সরঞ্জামের মুখোমুখি হয়েছে; যার গুরুত্ব অনেক।

এয়ার ভাইস মার্শাল শন বেল 'আল জাজিরা'কে বলছেন যে, আপাতঃদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে যে, পাকিস্তানিরা চীনাদের সরবরাহকৃত ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ভারতের ফরাসি নির্মিত 'রাফাল' ফাইটার ভূপাতিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকেও জানা গেছে যে, ভারতের কমপক্ষে ৩টা বিমান ভূপাতিত হয়েছে। অথচ পাকিস্তানকে চীনারা হয়তো তাদের সর্বোচ্চ সক্ষমতার ক্ষেপণাস্ত্র দেয়নি; দিয়েছে শুধু 'এক্সপোর্ট ভার্সন'। আর তা দিয়েই পাকিস্তানিরা পশ্চিমাদের উচ্চ প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। অর্থাৎ চীনারা তাদের 'এক্সপোর্ট ভার্সন' ক্ষেপণাস্ত্রকে পশ্চিমা সরঞ্জামের বিরুদ্ধে মোতায়েন করে পরীক্ষা করছে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই এই ব্যাপারটা পরিষ্কার না হলেও এখন সেটা সত্যিই মনে হচ্ছে।
 
ভারত এবং পাকিস্তান উভয়েরই বিমান-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্র ও ইস্রাইলের মতো উন্নততর বিমান বাহিনীগুলিই শত্রুর বিমান প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে শক্তিশালী হামলা চালাতে সক্ষমতা রাখে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াও ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে পারেনি। ভারত-পাকিস্তানের সংঘাত খুব বেশিদিন চলা সম্ভব ছিল না। কারণ একসময় দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা কমে গেলে শত্রুর এলাকার ভেতরে গিয়ে গাইডেড বোমা দিয়ে হামলা চালাতে হবে। এতে ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেড়ে যেতে পারতো। 


আকাশ সক্ষমতা কতটা থাকা যথেষ্ট?

ভারত-পাকিস্তানের আকাশ যুদ্ধ প্রযুক্তির দ্বন্দ্ব হিসেবে যেমন বিশ্বের সকল দেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে সংখ্যার দিক থেকে পিছিয়ে থেকে একটা রাষ্ট্র সামরিক দিক থেকে কতটুকু সক্ষমতা থাকলে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারবে, সেব্যাপারেও অনেক দেশকে আগ্রহী করবে। ক্রোয়েশিয়ার অনলাইন সামরিক ওয়েবসাইট 'বিনকভস ব্যাটসফিল্ডস'এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, ভারতের বিমান বাহিনীর সবচাইতে বেশি ফাইটার বিমান হলো 'সুখোই-৩০এমকেআই' (২৬০টা); যেগুলি অনেক বড় আকারের হলেও রাডারের সক্ষমতার দিক থেকে পাকিস্তানের 'জেএফ-১৭'এর 'ব্লক-৩' ভার্সনের (৪০টার মতো) চাইতে শক্তিশালী নয়। ভারতের কাছে মধ্যম পাল্লার 'আর-৭৭' আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বশেষ ভার্সনটা রয়েছে। তবে বিমানের সংখ্যার তুলনায় সর্বশেষ ভার্সনের ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা অনেক কম। একারণে ভারতীয়রা এই বিমানে মূলতঃ পুরোনো ভার্সনের 'আর-৭৭' ক্ষেপণাস্ত্র এবং ভারতের নিজস্ব তৈরি 'অস্ত্র' ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে বলে জানা যায়। ভারতীয়রা তাদের 'মিগ-২৯' বিমানগুলিকেও (৯১টার মতো) উন্নত করেছে। কিন্তু সেগুলি হয়তো এখনও পুরোনো ভার্সনের 'আর-৭৭' ক্ষেপণাস্ত্রই বহণ করছে। অপরদিকে পাকিস্তানের 'জে-১০' বিমানে (৩০টার মতো) বহণ করা মধ্যম পাল্লার 'পিএল-১৫' আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র অনেক ক্ষেত্রেই পশ্চিমা 'মিটিঅর' ক্ষেপণাস্ত্রের সমকক্ষ বা আরও উন্নততর। এছাড়াও 'জেএফ-১৭'এর 'ব্লক-৩' ভার্সনের বিমানগুলিও 'পিএল-১৫' ক্ষেপণাস্ত্র বহণে সক্ষম। মোটামুটিভাবে পাকিস্তানের ২৬০-২৭০টা বিমানে মধ্যমে পাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র বহণ সম্ভব। ভারতের এরকম বিমান রয়েছে ৫'শ বেশি। তবে পাকিস্তানের কাছে 'পিএল-১৫' ক্ষেপণাস্ত্রের স্টক খুব বেশি একটা নেই বলেই জানা যায়। 'স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পীস রিসার্চ ইন্সটিটিউট' বা 'সিপরি'র হিসেবে ১৯৮০এর দশক থেকে ২০২৪ পর্যন্ত পাকিস্তান প্রায় ১৩'শ মধ্যম পাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র যোগাড় করেছে; ভারত যোগাড় করেছে ৪১'শ। স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পাকিস্তান পেয়েছে ৩৫'শ; ভারত পেয়েছে ৫২'শ। তবে ভারত নিজেও কিছু ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে; যেগুলির সংখ্যা জানা দুষ্কর। ভারতের নিজস্ব তৈরি 'তেজাস' ফাইটার (৩৭টার মতো) পাকিস্তানের 'জেএফ-১৭'এর 'ব্লক-১, ২'এর (১৩০টার মতো) কাছাকাছি সক্ষমতার। এছাড়াও পাকিস্তানের রয়েছে ৭৫টা 'এফ-১৬', ৪৫টা 'এফ-৭' এবং ৩৫টা 'মিরাজ-৩'। আর ভারতের রয়েছে ৪৪টা 'মিরাজ-২০০০', ৪০টা 'মিগ-২১' আর ১১০টা 'জাগুয়ার'। উভয় পক্ষের কারুরই রাডার এড়ানো স্টেলথ বিমান নেই। তাই শত্রুর অভ্যন্তরে হামলায় তাদের মূল শক্তি হলো দূর থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া অথবা অনেক নিচু দিয়ে উড়ে রাডার এড়ানো। পাকিস্তান আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য গাইডেড বম্ব পেয়েছে ৪৭'শ; ভারত পেয়েছে ৩৭'শ। পাকিস্তান আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র পেয়েছে ৮৭০টা; ভারত পেয়েছে প্রায় আড়াই হাজার। এই সংখ্যাগুলি লম্বা যুদ্ধের জন্যে যথেষ্ট নয়। তবে উভয় পক্ষই নিজেরা অস্ত্র তৈরি করে; যার সক্ষমতা যাচাই করা কঠিন। নিচু দিয়ে ওড়া বিমান খুঁজে পাবার ক্ষেত্রে এয়ারবোর্ন রাডার গুরুত্বপূর্ণ। এয়ারবোর্ন রাডারের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সক্ষমতা খুব বেশি না হলেও তা ভারতের চাইতে বেশি। এই বিমানগুলি শত্রুর বিরুদ্ধে ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের জন্যেও ব্যবহৃত হয়; যেগুলির মাধ্যমে শত্রুর রাডার এবং যোগাযোগের উপর গোয়েন্দাগিরি সম্ভব। আর উভয় দেশের কাছেই আকাশ থেকে আকাশে রিফুয়েলিং করার মতো বিমানের সংখ্যা ৪ থেকে ৬টার বেশি নয়। একারণে তাদের উভয়ের পক্ষেই বিপক্ষের আকাশ সীমানার অনেক ভেতরে গিয়ে আঘাত করা কঠিন।

‘বিনকভস ব্যাটলফিল্ডস'এর বিশ্লেষণে ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের ভূমিতে থাকা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। ভূমিতে থাকা রাডারগুলি শত্রুর বিমানের অবস্থান অনেক আগে থেকে খুঁজে পেয়ে নিজেদের ফাইটার বিমানকে দিয়ে দেয়। এর ফলে নিজেদের ফাইটার বিমানগুলি নিজস্ব রাডার বন্ধ রেখেই শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। এর ফলে অনেক ছোট একটা ফাইটার ফোর্সও অনেক বড় ফোর্সের মতো কর্মক্ষম হয়। আর ইউক্রেন যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে, পুরোনো ভার্সনের বিমান-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েও শত্রুর বিমান ভূপাতিত করা সম্ভব; যদি সেগুলি সংখ্যায় যথেষ্ট থাকে। ভারত এবং পাকিস্তান উভয়েরই বিমান-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্র ও ইস্রাইলের মতো উন্নততর বিমান বাহিনীগুলিই শত্রুর বিমান প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে শক্তিশালী হামলা চালাতে সক্ষমতা রাখে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াও ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে পারেনি। ভারত-পাকিস্তানের সংঘাত খুব বেশিদিন চলা সম্ভব ছিল না। কারণ একসময় দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা কমে গেলে শত্রুর এলাকার ভেতরে গিয়ে গাইডেড বোমা দিয়ে হামলা চালাতে হবে। এতে ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেড়ে যেতে পারতো। সংখ্যার দিক থেকে পিছিয়ে থাকার কারণেই পাকিস্তান দূর থেকে ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে হামলা করতে সচ্ছন্দ বোধ করেছে। অপরদিকে ভারতীয়রা জানে যে, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ঢুকে বিমান হামলা করতে গেলে ভারতের সংখ্যাধিক্যের ব্যাপারটা অকার্যকর হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে যে ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, ভারতের বিমান বাহিনীর একটা বড় অংশ চীনের বিরুদ্ধে মোতায়েন রাখা হয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের পুরো বিমান শক্তিই ভারতের বিরুদ্ধে মোতায়েন করা।
 
কিছু অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভিডিও ফুটেজ তুলে ধরা হয়। মেহমুনা জয়ার ভিডিও ফুটেজটা খুব সম্ভবতঃ সুইসাইড ড্রোনের ছিল। পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলার জন্যে সুইসাইড ড্রোনের ব্যবহার দেখিয়ে দিয়েছে যে, প্রথম দিনের বিমান হামলার ক্ষয়ক্ষতি ভারতের পক্ষে কয়েকদিন ধরে বহণ করা অসম্ভব ছিল। আর যেহেতু প্রথম দিনের ক্ষয়ক্ষতি ভারতকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছিল, তাই জনগণের সামনে নিজেদের বিজয় দেখাতে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দিনেও হামলা অব্যাহত রাখতে বাধ্য হয়েছিল ভারত। শুধু তা-ই নয়, এই হামলাগুলি ছিল পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটির উপর। পাকিস্তানের ব্রিফিংএ বলা হয় যে, পাকিস্তানিরা ৭৭টা ভারতীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে; যেগুলি ছিল মূলতঃ ইস্রাইলের তৈরি 'হারপি' এবং 'হারোপ' ড্রোন।  


ট্যাকটিকস এবং স্ট্র্যাটেজি

গত ৭ই মে ভারতের সামরিক বাহিনীর ব্রিফিংএ পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মির এবং পাকিস্তানের মূল ভূখন্ডে ভারতীয় বিমান হামলার চিত্র তুলে ধরা হয়। কিছু অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভিডিও ফুটেজ তুলে ধরা হয়; যার মাঝে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে মেহমুনা জয়া এবং লাহোরের কাছাকাছি মুরিদকে (ভারত সীমান্ত থেকে প্রায় ৩১কিঃমিঃ দূরে) এলাকায় হামলার চিত্র দেখানো হয়। মেহমুনা জয়ার ভিডিও ফুটেজটা খুব সম্ভবতঃ সুইসাইড ড্রোনের ছিল। অপরদিকে মুরিদকে এবং কাশ্মিরের কোটলি আব্বাস (ভারতীয় অধিকৃত কাশ্মির থেকে প্রায় ২৫কিঃমিঃ দূরে) হামলায় অনেক দূরে আকাশ থেকে তোলা ফুটেজ দেখানো হয়। পুরো ব্রিফিংএ কোথায় কোথায় হামলা করা হয়েছে, সেগুলি বলা ছাড়া আকাশ যুদ্ধ নিয়ে তেমন কোন তথ্য প্রদান করা হয়নি। তবে পাকিস্তানের ব্রিফিং ছিল পুরোটাই আকাশ যুদ্ধ নিয়ে।

গত ৯ই মে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ব্রিফিংএ প্রথমে তুলে ধরা হয় যে, ভারতের দিক থেকে পেহেলগাম হামলার যেসকল উপাত্ত তুলে ধরা হয়েছে, তার মাঝে রয়েছে ব্যাপক সমন্বয়হীনতা; যে প্রকাশ করে দেয় যে, ভারতীয়রা নিজেরাই পেহেলগামের নাটক সাজিয়েছে। এরপর বিমান বাহিনীর পক্ষ থেকে যথেষ্ট উপাত্ত সহ প্রথম দিনের আকাশ যুদ্ধের বর্ণনা দেয়া হয়। সেখানে বলা হয় যে, পাকিস্তানের পক্ষ থেকে প্রায় ৪২টার মতো উচ্চমানের যুদ্ধবিমান ভারতের ৬০টার মতো যুদ্ধবিমানের মোকাবিলা করেছে। আর ভারতীয়দের বিমানের সংখ্যা ৬০টা থেকে সময়ে সময়ে প্রায় ৭২টার মতো উঠেছিল। ভারতীয় বিমানগুলি তাদের রাডার অন করার সাথেসাথেই পাকিস্তানিরা প্রতিটা বিমানের অবস্থান জেনে যায়। একইসাথে বিমানগুলির ইলেকট্রনিক সিগনালের মাধ্যমে প্রতিটা বিমানের টাইপ তারা নিশ্চিত হয়ে যায়। ব্রিফিংএর এই তথ্য জানিয়ে দেয় যে, পাকিস্তানের ভূমির রাডার এবং এয়ারবোর্ন রাডারগুলি কতটা কার্যকর ছিল। ব্রিফিংএ বলা হয়ে যে, পাকিস্তানিরা ইচ্ছে করেই ভারতের ১৪টা 'রাফাল' বিমানকে আলাদাভাবে টার্গেট করেছে। এর কারণ হলো, পাকিস্তানিরা নিশ্চিত ছিল যে, এই বিমানগুলিই ভারতের পুরো আক্রমণকারী বাহিনীর মূল শক্তি হিসেবে কাজ করছিল। একারণে ভারতের ৫টা ভূপাতিত বিমানের মাঝে ৩টাই ছিল 'রাফাল'। বাকিগুলির একটা ছিল 'সুখোই-৩০' এবং একটা ছিল 'মিগ-২৯'। এর বাইরেও ইস্রাইলের তৈরি একটা 'হেরন' ড্রোন ভূপাতিত করার কথা বলা হয়। পাকিস্তানিরা বলে যে, এখানে হার্ডওয়্যারের সক্ষমতার চাইতেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল বাহিনীর সকল সদস্যদের সমন্বিত দক্ষতা। পাকিস্তান তাদের সকল শক্তিকে সমন্বয়ের দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে সংখ্যার চাইতে বেশি সক্ষমতা অর্জন করেছে। ব্রিফিংএ ভারতীয় বিমান বাহিনীর 'রাফাল' পাইলটদের মাঝে যোগাযোগের অডিও প্রকাশ করা হয়; যেখানে ভারতীয় 'রাফাল' বিমানগুলি নিজেদের রেডিও যোগাযোগের মাঝে 'গডজিলা' নামে নিজেদের পরিচয় দিচ্ছিলো। এর মাধ্যমে পাকিস্তানিরা তাদের কমিউনিকেন্স ইন্টেলিজেন্সের সক্ষমতার পরিচয় দেয়। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পাকিস্তানিরা 'এইচকিউ-৯' এবং 'পিএল-১৫' ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার হয়েছে কিনা, তা এড়িয়ে যাওয়া হয়।

ভারতের ৯ই মের ব্রিফিংএ বলা হয় যে, পাকিস্তানিরা দুই দেশের পুরো সীমান্ত জুড়ে ৩৬টা স্থানে প্রায় ৩'শ থেকে ৪'শ ড্রোন ব্যবহার করে ভারতের সীমানায় প্রবেশ করেছে। এই ড্রোনের কিছু ভারতীয়রা ভূপাতিত করেছে বলে দাবি করা হয়। এর মাঝে কমপক্ষে একটা ড্রোন ছিল তুর্কিদের তৈরি 'আসিসগার্ড সোঙ্গার'; যা মাঝারি আকৃতির একটা কোয়াডকপ্টার ড্রোন। ব্রিফিংএ বলা হয় যে, পাকিস্তানিরা এই ড্রোনগুলির মাধ্যমে খুব সম্ভবতঃ ভারতীয় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পরীক্ষা করছিলো। ১০ই মে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর আরেক ব্রিফিংএ পাকিস্তানের বিভিন্ন দাবিকে মিথ্যা বলে আখ্যা দেয়া হয়। এর আগে পাকিস্তান বলেছিল যে, তারা ভারতীয় 'এস-৪০০' বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, 'ব্রাহমোস' ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং কিছু গোলাবারুদের ডিপো ধ্বংস করেছে।
 
মাল্টিডোমেইন ওয়ারফেয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো স্যাটেলাইট, সাইবারস্পেস এবং 'আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স' বা 'এআই'। চীনারা পাকিস্তানকে এই ক্ষেত্রগুলিতে কতটুকু সহায়তা দিয়েছে, তা এখনও নিশ্চিত করে বলা না গেলেও এটা নিশ্চিত যে, চীনারা তাদের যুদ্ধের কনসেপ্টগুলিকে কিছুটা হলেও পরীক্ষা করিয়ে নিয়েছে। আসন্ন সম্ভাব্য চীন-মার্কিন দ্বন্দ্বের জন্যে পাক-ভারত আকাশ যুদ্ধে ব্যবহৃত কনসেপ্টগুলি গুরুত্বপূর্ণ।


আকাশ যুদ্ধের শিক্ষা

আপাতদৃষ্টে এটা নিশ্চিত যে, পাকিস্তান ৭ই মেএর আকাশ যুদ্ধে কমপক্ষে ৩টা ভারতীয় ফাইটার বিমান ভূপাতিত করেছে। ভারতের পক্ষে এটা ফলাও করে বলাটা কঠিন; কারণ তারা পাকিস্তানের কাছে তাদের হার দেখাতে চাইবে না। অপরদিকে পাকিস্তান যা দাবি করেছে, সেগুলির স্বপক্ষে তারা যথেষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করেছে; যেগুলি ভারতের পক্ষে বাতিল করে দেয়া অসম্ভব। অন্ততঃ পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলার জন্যে সুইসাইড ড্রোনের ব্যবহার দেখিয়ে দিয়েছে যে, প্রথম দিনের বিমান হামলার ক্ষয়ক্ষতি ভারতের পক্ষে কয়েকদিন ধরে বহণ করা অসম্ভব ছিল। আর যেহেতু প্রথম দিনের ক্ষয়ক্ষতি ভারতকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছিল, তাই জনগণের সামনে নিজেদের বিজয় দেখাতে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দিনেও হামলা অব্যাহত রাখতে বাধ্য হয়েছিল ভারত। শুধু তা-ই নয়, এই হামলাগুলি ছিল পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটির উপর। পাকিস্তানের ব্রিফিংএ বলা হয় যে, পাকিস্তানিরা ৭৭টা ভারতীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে; যেগুলি ছিল মূলতঃ ইস্রাইলের তৈরি 'হারপি' এবং 'হারোপ' ড্রোন।

১। ভারত-পাকিস্তান আকাশ যুদ্ধ ছিল সারা দুনিয়ার জন্যে একটা শিক্ষা। প্রথমবারের মতো এতবড় একটা যুদ্ধ হয়েছে উভয় পক্ষ একে অপরকে চোখে দেখা ছাড়াই। অর্থাৎ এক্ষেত্রে দূরপাল্লার বিমান-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ পেয়েছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রের কিছু ছোঁড়া হয়েছে ফাইটার বিমান থেকে; আর কিছু ছোঁড়া হয়েছে ভূমি থেকে। দূরপাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি সামনের দিনগুলিতে আরও বেশি গুরুত্ব বহণ করবে। ভারতীয়রা দূর থেকে পাকিস্তানি টার্গেটে ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছে এই মনে করে যে, এতে পাকিস্তানি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভারতীয়দের কিছু করতে পারবে না। কিন্তু এখানে পাল্লার হিসেবে একটা মারাত্মক ভুল করে ফেলেছে ভারতীয়রা। হয় তারা পাকিস্তানের হাতে থাকা 'পিএল-১৫' এবং 'এইচকিউ-৯'এর পাল্লাকে পাত্তা দেয়নি, অথবা তারা নিশ্চিত ছিল যে, তারা 'পিএল-১৫' এবং 'এইচকিউ-৯'কে মোকাবিলা করতে পারবে।

২। এই যুদ্ধে কে কাকে কতটুকু দেখতে পেয়েছিল, সেটা পরিষ্কার না হলেও কিছু ব্যাপার ধারণা করা যায়। যেমন, ভারতীয় বিমানগুলি নিশ্চিতভাবেই তাদের রাডারগুলিকে অন করেছিল। অবশ্য আক্রমণকারী হবার ফলে ভারতীয় বিমান বাহিনীর এছাড়া আর কোন পথও ছিল না। এর ফলে সেগুলি পাকিস্তানের ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সরঞ্জামে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছিল। পাকিস্তানিরা ভারতীয় বিমানগুলির অবস্থানই শুধু জানতে পারেনি; কোন বিমানগুলি কোন টাইপের, সেটাই বুঝতে পেরেছে। সেই হিসেবেই তারা 'রাফাল' বিমানগুলিকে আলাদাভাবে টার্গেট করতে পেরেছে। কাজেই আবারও প্রমাণ হলো যে, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে একটা 'ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার'।

৩। পাকিস্তান তাদের ভূমিতে অবস্থিত এবং আকাশে এয়ারবোর্ন রাডারগুলির সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছে। এই রাডারগুলিই তাদের ক্ষেপণাস্ত্রগুলির জন্যে টার্গেট নির্ধারণ করে দিয়েছে। এর ফলে পাকিস্তানের বিমানগুলি খুব সম্ভবতঃ রাডার অন করেইনি। এটা ক্ল্যাসিক 'গ্রাইন্ড কন্ট্রোলড ইন্টারসেপশন' বা 'জিসিআই'। আট দশকের বেশি সময় ধরে রাডারের মাধ্যমে শত্রুর বিমানের বিরুদ্ধে নিজস্ব ফাইটার বিমান গাইড করার পদ্ধতি চলে আসছে। ব্রিটিশ এবং জার্মানরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই কৌশল বেশ ভালোভাবে রপ্ত করেছিল। ভারত-পাকিস্তান আকাশ যুদ্ধে প্রমাণ হলো যে, আজও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে 'জিসিআই' কার্যকর একটা পদ্ধতি।

৪। ফরাসি 'রাফাল' বিমানগুলি অকার্যকর কিনা; অথবা চীনা ‘জে-১০’ বিশ্বসেরা বিমান কিনা - এগুলি নিয়ে অনেক আলোচনা চলছে। প্রকৃতপক্ষে একটা টাইপের হার্ডওয়্যার দিয়ে কোন যুদ্ধ জয় সম্ভব নয়। জার্মানরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় 'কাম্ফগ্রুপ' নামের যে কনসেপ্ট জন্ম দিয়েছিল, তা আজকে 'কম্বাইন্ড আর্মস' ট্যাকটিকস নামে পরিচিত। এতে যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের পক্ষের বিভিন্ন প্রকারের অস্ত্র একত্রে সমন্বিতভাবে কাজ করে। এর ফলে একেকটা হার্ডওয়্যারের দুর্বলতা যেমন ঢেকে যায়; তেমনি প্রতিটা হার্ডওয়্যারের শক্তিশালী অংশগুলি কাজে লাগানো যায়। পাকিস্তানিরা এই ট্যাকটিকসটাকেই সুন্দরভাবে কাজে লাগিয়েছে। অপরদিকে এটা কাজে লাগাতে না পারার কারণেই রুশরা ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে অত্যন্ত খারাপ পার্ফরম্যান্স দেখিয়েছে। আজকের দিনে এই 'কম্বাইন্ড আর্মস' ট্যাকটিকসকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে 'মাল্টিডোমেইন ওয়ারফেয়ার' হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে; যার মাঝে যুক্ত রয়েছে স্যাটেলাইট, সাইবারস্পেস, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এমনকি অপ্রচলিত যুদ্ধের উপাদানও।

৫। যে ব্যাপারটা নিশ্চিত নয় তা হলো, ‘পিএল-১৫' তার ফ্লাইটের শেষ পর্যায়ে কি আসলেই নিজস্ব রাডারের মাধ্যমে টার্গেট খুঁজেছে কিনা। যদি সেটা করে থাকে, তাহলে 'রাফাল' কেন, যেকোন বিমানের রাডার ওয়ার্নিং রিসিভার (আরডব্লিউআর)এর মাধ্যমে জেনে যাবার কথা যে, বিমানটা কোন একটা ক্ষেপণাস্ত্র দ্বারা আক্রান্ত হতে যাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, ভারতীয় 'সুখোই-৩০', ‘মিগ-২৯' এবং 'রাফাল' বিমানে রয়েছে 'ইনফ্রারেড সার্চ এন্ড ট্র্যাক' বা 'আইআরএসটি'। এর মাধ্যমে বিমানগুলি অনেক দূর থেকে যেকোন বস্তুর ইনফ্রারেড সিগনাল ধরে ফেলতে পারে। যেকোন ক্ষেপণাস্ত্রই এর মাধ্যমে ধরা পড়ার কথা। পাকিস্তানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলি নিঃসন্দেহে 'আরডব্লিউআর' এবং 'আইআরএসটি' উভয়কেই হার মানাতে সক্ষম হয়েছে। 'আইআরএসটি' ৩৬০ডিগ্রিতে একরকম কার্যকর নয়। কাজেই ক্ষেপণাস্ত্রের দিক পরিবর্তনের মাধ্যমে এই ডিভাইসকে অকার্যকর করা যেতে পারে। যেহেতু এই মুহুর্তে জানা যাচ্ছে না যে, পাকিস্তানিরা কতগুলি ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছিল, তাই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না যে, কি হয়েছিল। কারণ ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা অনেক বেশি হলে যেকোন বিমানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই চ্যালেঞ্জের মাঝে পড়ে যাবে। আবার, ক্ষেপণাস্ত্রের রাডার যদি অনেক বেশি দেরিতে অন করা হয়, তাহলেও বিমানগুলির পক্ষে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর করার সময় ভীষণভাবে কমে যেতে পারে। এটা সম্ভব হতে পারে যদি আগে থেকে জেনে যাওয়া যায় যে, ক্ষেপণাস্ত্রের টার্গেট শত্রু বিমান কিছুক্ষণ পর আকাশের কোথায় অবস্থান করবে। অর্থাৎ আগে থেকেই আকাশে একটা অবস্থান তাক করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে দেয়া; এবং পথিমধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রের রাডার অন করে শেষ পর্যায়ে টার্গেট বিমানকে খুঁজে নেয়া। এই কাজটা বাস্তবায়ন করতে হলে নিশ্চিত হতে হবে যে, শত্রুর বিমান যেপথে এগুচ্ছে, সেই পথেই এগুবে এবং আগে থেকে নির্দিষ্ট করা সেই অবস্থান পার হয়ে যাবে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে বা 'এআই’-এর মাধ্যমে এটা করা সম্ভব হতে পারে। চীনারা 'এআই' প্রযুক্তিতে বেশ এগিয়েছে। তারা পাকিস্তানকে এক্ষেত্রে কতটুকু সহায়তা দিয়েছে, সেটা আলোচ্য বিষয় হতে পারে। কারণ এর মাধ্যমে বলা যাবে যে, পাকিস্তানিরা 'মাল্টিডোমেইন ওয়ারফেয়ার'এর কতটুকু বাস্তবায়ন করেছে।

পাকিস্তান নিঃসন্দেহে যুদ্ধক্ষেত্রে জিতেছে। কিন্তু পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দৈন্যতার সময়ে এমন একটা যুদ্ধ দেশটাকে আরও বেশি অর্থনৈতিক সমস্যার মাঝে ফেলবে; যা পাকিস্তানকে বিদেশী ঋণের উপর আরও বেশি নির্ভরশীল করে ফেলবে। এক্ষেত্রে পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক চাপে ফেলার ভারতীয় উদ্দেশ্য কিছুটা হলেও সফল হয়েছে। এটা ভারতের অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের জন্যেও সতর্কবার্তা। ভারত-পাকিস্তান আকাশ যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে - ১। দূরপাল্লার আকাশ যুদ্ধ আজকের বাস্তবতা; ২। ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে একটা 'ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার'; ৩। আজও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে 'জিসিআই' কার্যকর একটা পদ্ধতি; ৪। 'কম্বাইন্ড আর্মস' ট্যাকটিকসএর নতুন ভার্সন হলো 'মাল্টিডোমেইন ওয়ারফেয়ার'। শেষোক্ত মাল্টিডোমেইন ওয়ারফেয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো স্যাটেলাইট, সাইবারস্পেস এবং 'আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স' বা 'এআই'। চীনারা পাকিস্তানকে এই ক্ষেত্রগুলিতে কতটুকু সহায়তা দিয়েছে, তা এখনও নিশ্চিত করে বলা না গেলেও এটা নিশ্চিত যে, চীনারা তাদের যুদ্ধের কনসেপ্টগুলিকে কিছুটা হলেও পরীক্ষা করিয়ে নিয়েছে। আসন্ন সম্ভাব্য চীন-মার্কিন দ্বন্দ্বের জন্যে পাক-ভারত আকাশ যুদ্ধে ব্যবহৃত কনসেপ্টগুলি গুরুত্বপূর্ণ।

Saturday, 19 April 2025

আসন্ন ভূরাজনৈতিক ঝড়ের জন্যে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত?

২০শে এপ্রিল ২০২৫

সবগুলি ঘটনা দেখিয়ে দিছে যে, যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে সামরিক সংঘাতের জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে। একারণে বাকি বিশ্বও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সামরিক শক্তি তৈরির দিকে মনোনিবেশ করছে। বাংলাদেশ কি এই ব্যাপারগুলি সম্পর্কে অবহিত রয়েছে? অনুধাবন করার এই ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের সামনে প্রস্তুতি নেয়ার জন্যে দুই বছর রয়েছে কিনা, সেটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না! অন্য কথা বলতে গেলে, সময় এখন আপাততঃ মাসের হিসেবে এগুচ্ছে!


ইউক্রেনের পর যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ থেকে তার সামরিক শক্তি সরিয়ে নেবার প্রসেস শুরু করেছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মিউনিখ বক্তব্য যারা শুনেছেন, তাদের এই ব্যাপারটা বুঝে নিতে এক মুহুর্তও লাগার কথা নয়। মধ্যপ্রাচ্যে সিরিয়াতে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক শক্তিকে অর্ধেক করে তুরস্কের হাতে দায়িত্ব ছেড়ে দিচ্ছে। এখন তুরস্ক ইস্রাইলের নিরাপত্তা দেবে। একইসাথে ইরানকে, বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পকে নিয়ন্ত্রণ করতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল সামরিক শক্তি মোতায়েন করেছে। উদ্দেশ্য হলো, ইরানকে ভয় দেখিয়ে চুক্তি করতে বাধ্য করা; যাতে করে ইস্রাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। এগুলির অর্থ হলো - যুক্তরাষ্ট্র সারা দুনিয়া থেকে সামরিক শক্তি সরিয়ে নিয়ে ইন্দোপ্যাসিফিকে মোতায়েন করছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতা চীনাদের তুলনায় নস্যি; চীনের একটা শিপইয়ার্ডের সক্ষমতা সমস্ত যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতার চাইতে বেশি! তাই যুক্তরাষ্ট্র এখন কোরিয়াকে নিয়োজিত করতে চাইছে মার্কিন নৌবহরের জন্যে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের বাণিজ্যযুদ্ধও ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর, রেয়ার আর্থ ম্যাটেরিয়াল, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ফাইভ-জি প্রযুক্তি, ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা এখন যুদ্ধাবস্তা প্রায়। এই সবগুলি ঘটনা দেখিয়ে দিছে যে, যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে সামরিক সংঘাতের জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে। একারণে বাকি বিশ্বও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সামরিক শক্তি তৈরির দিকে মনোনিবেশ করছে। বাংলাদেশ কি এই ব্যাপারগুলি সম্পর্কে অবহিত রয়েছে? অনুধাবন করার এই ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের সামনে প্রস্তুতি নেয়ার জন্যে দুই বছর রয়েছে কিনা, সেটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না! অন্য কথা বলতে গেলে, সময় এখন আপাততঃ মাসের হিসেবে এগুচ্ছে!

প্রথমতঃ বাংলাদেশকে স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব বিদেশ-নির্ভরতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে; বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের ক্ষেত্রে। কারণ দুনিয়াতে একটা যুদ্ধাবস্থা তৈরি হবার সাথেসাথেই বৈদেশিক বাণিজ্য-কেন্দ্রিক সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন বাতাসে মিলিয়ে যাবে! কোন কোন পণ্য বাংলাদেশের না হলেই নয়, সেগুলির একটা তালিকা করতে হবে এবং সেগুলিকে যথাসম্ভব দেশে উৎপাদনের জন্যে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাতে হবে। কিছু পণ্য বাইরে থেকে আনতেই হবে। সেগুলির উৎস নিয়ে গভীর চিন্তা ব্যয় করতে হবে - কোথা থেকে কিভাবে সেগুলি আনা সম্ভব হবে; এবং সেগুলির বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা কিভাবে দেয়া যাবে। এক্ষেত্রে কোন কোন দেশ বাংলাদেশের দুর্যোগের সময় সাথে থাকতে পারে, তার একটা তালিকা করতে হবে। যেসকল দেশের উপর নির্ভর করা কঠিন, বা যেগুলি বাংলাদেশকে তাদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে, সেগুলিকে তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে - এখানে কোন ভালোবাসার সম্পর্ক রাখা যাবে না।

 
ডিজেল ইঞ্জিন, ইলেকট্রিক মোটর এবং কম্প্রেসারের উৎপাদন করার জন্যে ফ্যাক্টরি দিতে হবে। এগুলি খুব জটিল কোন ইন্ডাস্ট্রি নয়। সদিচ্ছা থাকলে এসব ফ্যাক্টরি করতে এক বছরও লাগার কথা নয়। এই তিনটা জিনিস ছাড়া কোন ইন্ডাস্ট্রিই তৈরি করা সম্ভব নয়। বর্তমানে বাংলাদেশ এগুলির জন্যে আমদানির উপর পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল।



দ্বিতীয়তঃ যত দ্রুত সম্ভব কিছু ইন্ডাস্ট্রিয়াল সক্ষমতা বাংলাদেশে গড়ে তোলার ব্যবস্থা করতে হবে।

১। ফ্ল্যাট স্টিলের উৎপাদন শুরু করতে হবে। বর্তমানে উৎপাদিত স্টিল প্লেটের মান যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশে একাধিক ফ্যাক্টরি রয়েছে, যেগুলিতে ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস বা ইএএফ চুল্লি রয়েছে। এসব চুল্লিতে তৈরি স্টিলের মান ফ্ল্যাট স্টিলের জন্যে সঠিক মানের (বিশুদ্ধতা বিবেচনায়)। ফ্ল্যাট স্টিল ছাড়া কোন কৌশলগত সামগ্রী তৈরি করা যাবে না; বিশেষ করে যানবাহন তৈরি করতে গেলে ফ্ল্যাট স্টিল লাগবেই।

২। ডিজেল ইঞ্জিন, ইলেকট্রিক মোটর এবং কম্প্রেসারের উৎপাদন করার জন্যে ফ্যাক্টরি দিতে হবে। এগুলি খুব জটিল কোন ইন্ডাস্ট্রি নয়। সদিচ্ছা থাকলে এসব ফ্যাক্টরি করতে এক বছরও লাগার কথা নয়। এই তিনটা জিনিস ছাড়া কোন ইন্ডাস্ট্রিই তৈরি করা সম্ভব নয়। বর্তমানে বাংলাদেশ এগুলির জন্যে আমদানির উপর পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল।

৩। পেট্রোকেমিক্যাল এবং বেসিক কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলতে হবে। মিথানলের উৎপাদন বাংলাদেশে শুরু হয়ে গিয়েছে। এখন মিথানলের পরের পণ্যগুলিকে উৎপাদনে নিয়ে আসতে হবে। নাইট্রিক এসিড, ফরমালডিহাইড, এমোনিয়া এবং এগুলির মাধ্যমে তৈরি আরও কিছু যৌগ রয়েছে, যেগুলি উৎপাদন না করতে পারলে এক্সপ্লোসিভ ইন্ডাস্ট্রি করা সম্ভব নয়। আর এক্সপ্লোসিভ উৎপাদন না করতে পারলে সামরিক শক্তি তৈরির কথা ভুলে যেতে হবে। প্লাস্টিকের ধরণগুলির মাঝে শুধুমাত্র পিভিসি উৎপাদনে গিয়েছে বাংলাদেশে। এখানে পিইউ, পিএস, পিইটি, ইত্যাদি রেজিনের উৎপাদন শুরু করতে হবে যত দ্রুত সম্ভব। কারণ এগুলি ছাড়া কম্পোজিট ম্যাটেরিয়াল তৈরি করা যাবে না।

৪। সিএনসি মেশিন যত বেশি সম্ভব আনার ব্যবস্থা করতে হবে এবং দেশেই সিএনসি মেশিন তৈরির ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমানে বেশিরভাগ সিএনসি মেশিন হলো মিলিং মেশিন, ডব্লিউডিএম; কিছু লেজার কাটিং মেশিনও রয়েছে। একইসাথে সিএনসি লেদ মেশিন প্রয়োজন অনেক। দেশে এই মুহুর্তে লেদ মেশিন (নন সিএনসি) তৈরির সক্ষমতা রয়েছে। এটাকে আরও বাড়াতে হবে; সাথে মিলিং, সারফেস গ্রাইন্ডিং, শিয়ারিং, ইত্যাদি বেসিক মেশিন তৈরির সক্ষমতাকে আরও বাড়াতে হবে। বিএমটিএফ, বিওএফ, ইএমই ওয়ার্কশপ, ওয়াল্টন এবং আরও কিছু কারখানায় টুলস তৈরি করা হয়। এই সক্ষমতাগুলিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং দীর্ঘস্থায়ীত্ব দিতে হবে।

৫। এই মুহুর্তে বাংলাদেশের নিজস্ব কিছু ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্ল্যান্ট ডিজাইন, কম্পোনেন্ট উৎপাদন এবং ইন্সটলেশনের সক্ষমতা রয়েছে। এগুলিকে আরও একধাপ এগিয়ে নিতে হবে। নলেজ বেইজটাকে আরও বাড়াতে হবে এবং ইন্সটিটিউশনাল জ্ঞানসম্পন্ন নতুন ইঞ্জিনিয়ারদেরকে এসব ক্ষেত্রে জড়িত করতে হবে।

৬। ইলেকট্রনিক্স ইন্ডাস্ট্রিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। টেলিকমিউনিকেশন, রাডার, জিপিএস এবং স্যাটকমসহ ইলেকট্রোম্যাগনেটিক স্পেকট্রাম নিয়ে কাজ করা সকল ধরণের যন্ত্র উৎপাদন শুরু করতে হবে। রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংএর যন্ত্রের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করতে হবে; বিশেষ করে মাল্টিলেয়ার পিসিবি তৈরির মেশিন, প্রোটোটাইপিং মেশিন, অটোম্যাটিক টেস্টিং ইকুইপমেন্ট, ইত্যাদির সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। লিথিয়াম ব্যাটারির উৎপাদন (শুধু সংযোজন নয়) শুরু করতে হবে। ইপিজেডগুলিতে এই মুহুর্তে কিছু অপটিক্যাল সরঞ্জাম তৈরি হয়। এগুলি বাংলাদেশের জন্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইলেকট্রো-অপটিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট তৈরির সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। কোন যুদ্ধাস্ত্রই এসকল সরঞ্জাম ছাড়া কার্যকর হবে না।

৭। টায়ার তৈরির সক্ষমতা বাড়াতে হবে; বিশেষ করে রেডিয়্যাল টায়ার। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে কিছু বিদেশী শক্তি এদেশের গাজী টায়ার ফ্যাক্টরি ধ্বংস করে ফেলে। এটা ছিল বাংলাদেশের একমাত্র ফ্যাক্টরি, যেখানে ট্রাকে ব্যবহার করা কমার্শিয়াল ভেহিকল টায়ার তৈরি করা হতো। এটা ধ্বংস করে ফেলার কারণে ট্রাক টায়ার ভারত থেকে আনা ছাড়া কোন পদ্ধতিই থাকেনি। এই অবস্থা চলতে দেয়া যায় না। চীনের প্রযুক্তিতে আরও একটা টায়ার ফ্যাক্টরি (রেডিয়্যাল টায়ারসহ) তৈরি হবার প্রসেস শুরু হলেও সেটার ভবিষ্যৎ অনেক আগেই অনিশ্চিত হয়ে গিয়েছে। টায়ার তৈরির ফ্যাক্টরি এখন অতি গুরুত্বপূর্ণ – সকল প্রকারের টায়ার তৈরির সক্ষমতা প্রয়োজন।

৮। গ্লাস তৈরির সক্ষমতাকে নতুন ধাপে নিয়ে যেতে হবে। বুলেটপ্রুফ গ্লাস এবং ফাইটার বিমানের ককপিটের ক্যানোপি তৈরির সক্ষমতা প্রয়োজন।

৯। আর্মার প্লেট এবং সিরামিক আর্মার তৈরির সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে সিরামিক এবং গার্মেন্টস শিল্পে কিছু বিশেষ দক্ষতা রয়েছে; যেগুলিকে সমন্বয় করতে হবে।
 
বর্তমানে বাংলাদেশের বিমানবন্দরের সংখ্যা বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমানগুলিকে সুরক্ষা দেয়ার জন্যে যথেষ্ট নয়। ইউক্রেনে ৫০টার মতো বিমানবন্দর থাকার কারণে তারা রুশ হামলা থেকে তাদের বিমান বাহিনীর বিমানগুলিকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পেরেছে। ইউক্রেনের তুলনায় আকৃতিতে বাংলাদেশ অনেক ছোট। কাজেই বাংলাদেশের পুরাতন সকল বিমানবন্দরের রানওয়ে নতুন করে তৈরি করতে হবে। এছাড়াও নতুন করে বহু স্থানে রানওয়ে তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে যতগুলি হাইওয়ে রয়েছে, তার সকল স্থানে খুঁজে দেখতে হবে যে, কোথায় কোথায় ফাইটার বিমান ওঠানামা করার মতো দীর্ঘ রানওয়ে তৈরি করা যায়।



তৃতীয়তঃ কৌশলগত অবকাঠামো নির্মাণে মনোনিবেশ করতে হবে।

১। বিমানবন্দরের সংখ্যা বাড়াতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের বিমানবন্দরের সংখ্যা বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমানগুলিকে সুরক্ষা দেয়ার জন্যে যথেষ্ট নয়। ইউক্রেনে ৫০টার মতো বিমানবন্দর থাকার কারণে তারা রুশ হামলা থেকে তাদের বিমান বাহিনীর বিমানগুলিকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পেরেছে। ইউক্রেনের তুলনায় আকৃতিতে বাংলাদেশ অনেক ছোট। কাজেই বাংলাদেশের পুরাতন সকল বিমানবন্দরের রানওয়ে নতুন করে তৈরি করতে হবে; যাতে করে মোটামুটিভাবে পরিবহণ বিমান হলেও যেন ওঠানামা করতে পারে। এছাড়াও নতুন করে বহু স্থানে রানওয়ে তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে যতগুলি হাইওয়ে রয়েছে, তার সকল স্থানে খুঁজে দেখতে হবে যে, কোথায় কোথায় ফাইটার বিমান ওঠানামা করার মতো দীর্ঘ রানওয়ে তৈরি করা যায়। সেই স্থানগুলির সারফেসকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। ভারত ইতোমধ্যেই হাইওয়েতে ফাইটার বিমান নামানোর পরীক্ষা চালিয়ে ফেলেছে।

২। নদীবন্দরের সংখ্যা কয়েকগুণ বাড়াতে হবে। প্রকৃতপক্ষে বেশকিছু নদীবন্দর রয়েছে বর্তমানে; সেগুলিকে নতুন অবকাঠামো যোগ করে সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। এর মাঝে প্রথমেই থাকবে ড্রেজিং। নদীপথে নাব্যতা না থাকলে নদীবন্দর দিয়ে কি হবে? নাব্যতা নিশ্চিত করতে ড্রেজার এবং আনুসাঙ্গিক যন্ত্রপাতির সংখ্যা বাড়াতে হবে। ড্রেজারের ভেসেলগুলি বাংলাদেশে তৈরি হলেও ড্রেজারের কাটিং মেশিন এবং ডিজেল ইঞ্জিন আমদানির উপর নির্ভরশীল। এক্ষেত্রে নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।

৩। শিপবিল্ডিংএর ক্ষেত্রে সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করতে হবে; বিশেষ করে খুলনা শিপইয়ার্ড ও নারায়নগঞ্জ ডকইয়ার্ডের তত্ত্বাবধানে আরও অনেক স্থানে উচ্চমানের জাহাজ তৈরির ফ্যাসিলিটি গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ জাহাজ তৈরির জন্যে বরিশাল ও পটুয়াখালি এলাকা, চাঁদপুর, মুন্সিগঞ্জ, গজারিয়া, ভৈরব, আশুগঞ্জ, নারায়নগঞ্জ, ঢাকা ভালো এলাকা হতে পারে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং খুলনা অঞ্চলকে সমুদ্রগামী জাহাজ তৈরির জন্যে আলাদাভাবে গড়ে তোলা যেতে পারে।


জানুয়ারি ২০২৫। মিয়ানমার নৌবাহিনীর ফ্রিগেট পানিতে ভেসেছে। তাদের প্রথম ফ্রিগেটটা পানিতে ভেসেছে ১৩ বছর আগে। বাংলাদেশ এখনও পর্যন্ত ফ্রিগেট তৈরির উপযোগী একটা ডকইয়ার্ডও তৈরি করতে পারেনি! এই লজ্জা নিয়েই বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দ সুখে শান্তিতে দিন কাটাচ্ছেন।


চতুর্থতঃ সামরিক ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে।

১। বিমান সংযোজন ও নির্মাণের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এই মুহুর্তে বাংলাদেশ 'পিটি-৬', ‘বেল-২১২', ‘বেল-২০৬', ‘এমআই-১৭১' এবং 'এফ-৭' বিমান ওভারহোলিং করে থাকে। এছাড়াও 'গ্রোব জি-১২০টিপি' বিমানের কম্পোজিট স্ট্রাকচার তৈরির সক্ষমতাও রয়েছে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনী অতি সম্প্রতি নিজস্ব দু'টা প্রোটোটাইপ বিমান তৈরি করে উড্ডয়ন করেছে। এই সক্ষমতাগুলিকে পরের ধাপে নিয়ে যেতে হবে। বিমান সংযোজনের সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে হবে এবং ফাইটার বিমান নির্মাণের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

২। নৌবাহিনীর ফ্রিগেট তৈরির সক্ষমতা অর্জন করার কথা ছিলো কয়েক বছর আগেই। মিয়ানমার তাদের নৌবাহিনীর জন্যে প্রথম ফ্রিগেট পানিতে ভাসিয়েছে ১৩ বছর আগে। বাংলাদেশ এখনও পর্যন্ত ফ্রিগেট তৈরির উপযোগী একটা ডকইয়ার্ডও তৈরি করতে পারেনি! এই লজ্জা নিয়েই বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দ সুখে শান্তিতে দিন কাটাচ্ছেন।

৩। ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। সকল প্রকারের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা প্রয়োজন। এন্টি-ট্যাঙ্ক, ম্যানপ্যাডস, শোরাড, মিডিয়াম রেঞ্জ এয়ার ডিফেন্স, এন্টি-শিপ, এয়ার-টু-সারফেস, এয়ার-টু-এয়ার, সারফেস-টু-সারফেস ব্যালিস্টিক, সারফেস-টু-সারফেস ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা প্রয়োজন। এই মুহুর্তে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ওভারহোলিং (এবং প্রয়োজনে এসেম্বলি) করার সক্ষমতা রয়েছে; যেগুলিকে পরের ধাপে নিয়ে যেতে হবে।

৪। ড্রোন তৈরির কারখানা তৈরি করতে হবে। ড্রোন বহু প্রকারের; তবে এর মাঝে কিছু প্রকারের ড্রোনকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। গোয়েন্দা কাজের জন্যে ইলেকট্রো-অপটিক্যাল সেন্সর (উপরে আলোচিত) সমৃদ্ধ ড্রোন প্রয়োজন। আর আক্রমণকারী ড্রোন হিসেবে 'ফার্স্ট পারসন ভিউ' বা 'এফপিভি' ড্রোন তৈরি করতে হবে। এই ড্রোনগুলি কোয়াডকপ্টার, হেক্সাকপ্টার, অক্টাকপ্টার, ফিক্সড-উইং হতে পারে। এই ড্রোনের প্রপালশন হিসেবে বিভিন্ন আকৃতির ইলেকট্রিক মোটর (উপরে মোটরের কারখানার কথা আলোচিত হয়েছে) এবং ছোট পেট্রোল ইঞ্জিন (মূলতঃ মোটরসাইকেল ইঞ্জিন) তৈরির কারখানা বসাতে হবে। এগুলিতে ব্যবহার করা জিপিএস, রিমোট-কন্ট্রোল কমিউনিকেশন ডিভাইস, লিথিয়াম ব্যাটারির (উপরে আলোচিত) আলাদা কারখানা প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রেই এগুলির বডি (বিশেষ করে এফপিভি ড্রোনের) কার্বন-ফাইবার ম্যাটেরিয়াল দিয়ে তৈরি করতে হয়। কার্বন-ফাইবার কিভাবে যোগাড় করা যায়, অথবা কিভাবে এগুলি নিজেদের দেশে উৎপাদন করার প্রযুক্তি আনা যায়, সেটা খুঁজতে হবে।

৫। আর্টিলারি কামান তৈরির কারখানা প্রয়োজন। ইউক্রেন যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে, ন্যাটোর মতো এয়ার সুপেরিয়রিটি না থাকলে (যেটার ব্যাপারে এখন অনেকেই সন্দিহান) যেকোন দেশকে আর্টিলারির উপরেই নির্ভর করতে হবে। ১০৫মিঃমিঃ এবং ১৫৫মিঃমিঃ আর্টিলারি ব্যারেল অবশ্যই তৈরি করতে হবে। ১০৫মিঃমিঃ, ১৫৫মিঃমিঃ আর্টিলারি এমুনিশন তৈরির ব্যাপক সক্ষমতা প্রয়োজন। এছাড়াও আরও দূরের পাল্লার টার্গেটে আঘাত করার লক্ষ্যে ১২২মিঃমিঃ, ২৩০মিঃমিঃ, ৩০০মিঃমিঃ আর্টিলারি রকেটের কারখানা করতে হবে। এছাড়াও বিমান বিধ্বংসী কামান তৈরির সক্ষমতা প্রয়োজন। ২০মিঃমিঃ অথবা ১৪ দশমিক ৫মিঃমিঃ (যেকোন একটা), ৩৫ অথবা ৩৭মিঃমিঃ (যেকোন একটা), ৫৭মিঃমিঃ কামান নিজস্ব কারখানায় তৈরি করতে হবে। এগুলির সাথে ব্যবহার করার জন্যে নিজস্ব তৈরি ইলেকট্রো-অপটিক ডিভাইস এবং রাডারের সমন্বয় করতে হবে।

৬। সামরিক অফরোড গাড়ির কারখানা তৈরি করতে হবে। এগুলি সকল প্রকারের পরিবহণ ছাড়াও আর্টিলারি ট্রাকটর হিসেবে কাজ করবে। এগুলির মাঝে 'বাগি' প্রকারের হাল্কা যানও প্রয়োজন, যেগুলি মোটরসাইকেলের সাথে চলার উপযোগী। বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতিতে এধরণের যানবাহন উপযোগী হবে। বেশকিছু গাড়ি প্রয়োজন, যেগুলি উভচর হবে; অর্থাৎ নদী-খাল-বিল পার হতে পারবে। গাড়িগুলিকে পরিবর্তিত করেই এধরণের উভচর যান তৈরি করা সম্ভব। এসকল গাড়িতে ব্যবহারের জন্যে ডিজেল ইঞ্জিন, স্টিল প্লেট, আর্মার, বুলেটপ্রুফ গ্লাসের কারখানার কথা উপরে উল্লিখিত হয়েছে।

৭। বন্দুকের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। এই মুহুর্তে বাংলাদেশের এসল্ট রাইফেল তৈরির সক্ষমতা মোটেই যথেষ্ট নয়। অতি দ্রুত এই উৎপাদন সক্ষমতাকে কয়েক গুণ করতে হবে। একইসাথে ৭ দশমিক ৬২মিঃমিঃ জিপি মেশিন গান এবং ১২ দশমিক ৭মিঃমিঃ হেভি মেশিন গান (এয়ার ডিফেন্সের জন্যে) তৈরির সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। এসকল বন্দুকের জন্যে ৭ দশমিক ৬২মিঃমিঃ (রাইফেল ও মেশিন গান) এবং ১২ দশমিক ৭মিঃমিঃ এমুনিশন উৎপাদন কয়েক গুণ করতে হবে।

৮। এয়ারড্রপ এমুনিশন এবং নেভাল মাইন তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

এছাড়াও আরও বেশকিছু সামরিক সক্ষমতা রয়েছে, যেগুলি উল্লেখ করতে থাকলে তালিকা বড় হতেই থাকবে। কিন্তু উপরে উল্লেখ করা সক্ষমতাগুলি অর্জিত না হলে এর সাথে আরও কয়েক'শ সক্ষমতা যুক্ত করাটা অর্থহীন হয়ে দাঁড়াবে।
 
কেউ কেউ এখনও দিবাস্বপ্নে বিভোর রয়েছেন। তাদেরকে বলতে হবে - ঘুম থেকে জেগে উঠুন! বাস্তবতা বুঝুন! উপরে উল্লিখিত বাংলাদেশের স্বনির্ভরতার ভিত্তিগুলি বাস্তবে রূপ দিতে পারলেও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সহজ হবে না। কারণ রাজনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশ কোন আদর্শিক রাষ্ট্র নয়। তারা 'প্রোএকটিভ' নয়; বরং তারা বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহ দেখে প্রতিক্রিয়া (রিয়্যাকটিভ) হিসেবে কিছু পরিকল্পনা করে থাকে। যেকারণে বেশিরভাগ সময়ই তারা বাইরের শক্তির প্রভাব বলয়ে আবর্তিত হয়।


উপরে দেয়া তালিকার বাইরে বাংলাদেশকে আরও অনেক কিছুই করতে হবে। যেমন, অতি দ্রুত কয়েক স্কোয়াড্রন চীনা 'জে-১০' এবং পাকিস্তানি 'জেএফ-১৭' যুদ্ধবিমান যোগাড় করতে হবে। একইসাথে অফ-দ্যা-শেলফ কিছু ফ্রিগেট (চীনা এবং আর যেখানে পাওয়া যায়) যোগাড় করতে হবে; যেগুলি আনার পর সেগুলির সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। নতুন জাহাজ তৈরি করতে কয়েক বছর লেগে যাবে; এখন সেই সময়টুকু আছে কিনা, তা সন্দেহ। পুরোনো জাহাজগুলির সাথে ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং এয়ার, সারফেস ও সাব-সারফেস ড্রোনের সমন্বয় ঘটিয়ে সেগুলিকে সর্বোচ্চ ব্যবহারের উপযোগী করে প্রস্তুত করা যেতে পারে। এই মুহুর্তে সংখ্যা অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার; যা কোনভাবেই প্রতিস্থাপনীয় নয়। মধ্যম পাল্লার এয়ার ডিফেন্স ক্ষেপণাস্ত্র (চীনা এবং তুর্কি) অবশ্যই প্রয়োজন। এগুলি না থাকলে দেশের কোন স্থাপনাই রক্ষা করা সম্ভব হবে না।

ঝড় আসছে! কিন্তু বাংলাদেশ এই মুহুর্তে মোটেই প্রস্তুত নয়! বিপদে ভয় পাওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভয় না পেলে অনেক সময়েই স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠা যায় না। ভয় পেলেই শরীরের ডিফেন্সিভ মেকানিজম কাজ করা শুরু করে; আবার কোন কোন ক্ষেত্রে প্যারালাইসিসেও আক্রান্ত হতে পারে। দ্বিতীয়টা বাংলাদেশের জনগণ তাদের নেতৃত্বের কাছ থেকে কখনোই আশা করবে না। কিন্তু আশা না করলেই যে তা বাস্তবে হবে না, তার কোন গ্যারান্টি নেই। কারণ কেউ কেউ এখনও দিবাস্বপ্নে বিভোর রয়েছেন। তাদেরকে বলতে হবে - ঘুম থেকে জেগে উঠুন! বাস্তবতা বুঝুন! উপরে উল্লিখিত বাংলাদেশের স্বনির্ভরতার ভিত্তিগুলি বাস্তবে রূপ দিতে পারলেও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সহজ হবে না। কারণ রাজনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশ কোন আদর্শিক রাষ্ট্র নয়। তারা 'প্রোএকটিভ' নয়; বরং তারা বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহ দেখে প্রতিক্রিয়া (রিয়্যাকটিভ) হিসেবে কিছু পরিকল্পনা করে থাকে। যেকারণে বেশিরভাগ সময়ই তারা বাইরের শক্তির প্রভাব বলয়ে আবর্তিত হয়।

Tuesday, 18 March 2025

পাকিস্তানের ট্রেনে হামলা - ভারত কেন সন্ত্রাসী রাষ্ট্র নয়?

১৯শে মার্চ ২০২৫

পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলার এই ঘটনা যে বাস্তবতাকে এড়িয়ে যায় না তা হলো, পাকিস্তান রাষ্ট্র তার জনগণের মৌলিক চাহিদা পুরণে যথেষ্ট যত্নবান হয়নি কখনোই। এছাড়াও পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় এবং তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জাতিগত বৈষম্যকেই প্রাধান্য দিয়েছে সর্বদা। একারণেই যুগ যুগ ধরে পুরো পাকিস্তান জুড়ে অস্থিরতা তৈরির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ভারতীয়রা এই অস্থিরতায় ইন্ধন যুগিয়েছে মাত্র।


গত ১১ই মার্চ পাকিস্তানের বালুচিস্তান প্রদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী 'বালুচ লিবারেশন আর্মি' বা 'বিএলএ'এর একটা সশস্ত্র গ্রুপ দুর্গম অঞ্চলে 'জাফর এক্সপ্রেস' নামের একটা ট্রেন হাইজ্যাক করে ৪'শ মানুষকে জিম্মি করে। প্রায় ৩৬ ঘন্টা পর পাকিস্তানের স্পেশাল ফোর্স 'এসএসজি'র 'আল জারার কোম্পানি' ট্রেনটার নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়। এর ফলাফল হিসেবে ১৮ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, ৩ জন রেলওয়ে কর্মী, ৫ জন সাধারণ যাত্রী এবং ৩৩ জন বিচ্ছিন্নতাবাদীর মৃত্যু হয় এবং ৩'শ ৫৪ জন যাত্রীকে উদ্ধার করা হয় বলে সরকারি সূত্র বলছে। আক্রমণকারীরা ট্রেন লাইনে বোমা ফাটিয়ে ট্রেন থামানোর ব্যবস্থা করেছিল। 'এসোসিয়েটেড প্রেস'এর এক খবরে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে বলা হয় যে, আক্রমণকারীরা ট্রেনের যাত্রীদের সকলের পরিচয়পত্র চেক করতে থাকে এবং যারা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, তাদেরকে গুলি করে মেরে ফেলতে থাকে। হত্যা করা ব্যক্তিদের মাঝে সেনাসদস্য ছাড়াও সংখ্যালঘু শিয়া এবং পাঞ্জাবিরা ছিল। বালুচ অধিবাসীদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন যে, হামলাকারীরা কিছু যাত্রীর হাত বেঁধে তাদেরকে কয়েকবার গুলি করে হত্যা করে। একজন মহিলার চোখের সামনে সামরিক বাহিনীতে কাজ করা তার তিন ছেলেকে হত্যা করা হয়। পাকিস্তানী সেনাদের সাথে আক্রমণকারীদের গুলি বিনিময়ের সময় বেশ কিছু যাত্রী পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

একইদিনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেঃ জেনারেল আহমাদ শরীফ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন যে, এই সন্ত্রাসী হামলা এবং এর আগের আক্রমণগুলির পেছনে ইন্ধন যুগিয়েছে ভারত। তিনি অবশ্য ভারতের জড়িত থাকার ব্যাপারে কোন প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। তিনি উল্লেখ করেন যে, ২০১৬ সালে কুলভূষণ যাদব নামে ভারতের নৌবাহিনীর একজন অফিসার পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছিলেন। ভারতের পক্ষে গোয়ান্দাবৃত্তির কাজ করা এবং বালুচিস্তান ও অন্যান্য অঞ্চলের গেরিলা গ্রুপগুলিকে ইন্ধন দেয়ার অপরাধে তাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছিল। জেনারেল চৌধুরী বলেন যে, কিছু আক্রমণকারী পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে; যাদেরকে পাকরাও করার চেষ্টা চলছে। হতাহতের মাঝে বেশিরভাগই ছিল ট্রেনের যাত্রীদেরকে রক্ষা করতে যাওয়া নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং নিজেদের গ্রামের বাড়িতে ফেরত যাওয়া সেনা সদস্য। তিনি আরও বলেন যে, ভারতীয় মিডিয়াতে 'বিএলএ'এর প্রকাশ করা ভিডিও প্রচার করা হয়; যেগুলি হয় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআইএর মাধ্যমে তৈরি, নতুবা পুরোনো ছবি। জেনারেল চৌধুরী বলেন যে, হামলাকারীরা মহিলা এবং শিশুদেরকে আলাদা করে ৮ ঘন্টা পরে ছেড়ে দেয়। তারা পুরুষ যাত্রীদেরকে বাইরে নিয়ে আসে এবং যাত্রীদের জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা করে। 'আল জাজিরা' বলছে যে, তারাও যাত্রীদের সাথে কথা বলে সেটাই জানতে পেরেছে। জেনারেল চৌধুরী বলেন যে, আক্রমণকারীদের বড় অংশ পাহাড়ি অঞ্চলে লুকিয়ে পড়ে। আর ছোট একটা গ্রুপ জিম্মিদের সাথে থাকে। থেকে যাওয়া হামলাকারীদের প্রায় সকলেই ছিল সুইসাইড স্কোয়াডের সদস্য। পাকিস্তানি ইন্টেলিজেন্স বুঝতে পেরেছে যে, হামলাকারীরা ওয়াকিটকির মাধ্যমে আফগানিস্তানে তাদের ইন্ধনদাতাদের সাথে কথা বলছিল। দ্বিতীয় দিনে সামরিক স্নাইপারদের গুলিতে জিম্মিদের কাছে দাঁড়ানো কয়েকজন সুইসাইড স্কোয়াড হামলাকারীর মৃত্যু হলে কয়েকজন জিম্মি পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এরপরই জিম্মি উদ্ধারের মূল অপারেশন চালানো হয়। উদ্ধার অভিযানের সময় কোন জিম্মির মৃত্যু হয়নি বলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়। 'আল জাজিরা'র সাথে কথা বলতে গিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিরাপত্তা বাহিনীর অফিসার বলেন যে, গেরিলাদের জীবন্ত ধরার জন্যে সর্বোচ্চ লক্ষ্য থাকলেও এধরণের অপারেশনে জিম্মি উদ্ধারে গেরিলাদেরকে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন।
 
২০১৬ সালে কুলভূষণ যাদব নামে ভারতের নৌবাহিনীর একজন অফিসার পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছিলেন। ভারতের পক্ষে গোয়ান্দাবৃত্তির কাজ করা এবং বালুচিস্তান ও অন্যান্য অঞ্চলের গেরিলা গ্রুপগুলিকে ইন্ধন দেয়ার অপরাধে তাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমা মিডিয়া যখন পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলায় ভারতের সংশ্লিষ্টতা দেখতে পাচ্ছে না, তখন এটা বলাই বাহুল্য যে, পশ্চিমারা ভারত-ঘেঁষা নীতিতেই অটল থাকবে। কারণ বালুচিস্তানের গেরিলাদেরকে পশ্চিমারা সন্ত্রাসী সংগঠন বলে আখ্যা দিয়েছে। এখন এই সংগঠনগুলির সাথে ভারতের সংশ্লিষ্টতা মেনে নেয়ার অর্থ হলো ভারত সন্ত্রাসবাদের ইন্ধনদাতা। 


হামলার আন্তর্জাতিক চেহারা

দিল্লীতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রানধির জাইসওয়াল সাংবাদিকদের বলেন যে, পাকিস্তানের ট্রেন হামলায় ভারতের যোগসাজসের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি বলেন যে, পাকিস্তানের নিজস্ব ভূখন্ডই সন্ত্রাসের আখড়া। পাকিস্তানের উচিৎ নিজের অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও ব্যর্থতাকে ঢাকতে অন্যের উপর দোষ না চাপিয়ে নিজের দিকে তাকানো। এর আগে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শাফকাত আলী খান বলেন যে, এই হামলার পরিকল্পনা আফগানিস্তানে বসে করা হয়েছে। এবং সেখানে হামলাকারীদের সাথে ইন্ধনদাতাদের যোগাযোগ হয়েছে। পাকিস্তান বরাবরই আফগানিস্তান সরকারকে বলেছে যে, তারা যেন 'বিএলএ'কে তাদের ভূখন্ড ব্যবহার করতে না দেয়। কাবুলের তালিবান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আব্দুল ক্বাহার বালখি এক বিবৃতিতে এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন যে, আফগানিস্তানে 'বিএলএ'র কোন উপস্থিতি নেই। তিনি আরও বলেন যে, পাকিস্তানের উচিৎ দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা না বলে নিজস্ব নিরাপত্তা জোড়দার করা এবং অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান করা।

‘এসোসিয়েটেড প্রেস'এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, বালুচিস্তান প্রদেশের অনেকেই পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগ করে আসছিল; যদিও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার তা সর্বদাই অস্বীকার করেছে। এই প্রদেশে প্রচুর খনিজ সম্পদও রয়েছে। 'বিএলএ' পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে চাইছে এবং সেই লক্ষ্যে তারা এর আগেও ট্রেনে হামলা করেছে। তবে ট্রেন হাইজ্যাকের ঘটনা এটাই প্রথম। এই আক্রমণ সারা দুনিয়া থেকে নিন্দা কুড়িয়েছে; যার মাঝে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, তুরস্ক, ইরান এবং ব্রিটেন রয়েছে। ১৪ই মার্চ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদেও এই আক্রমনের নিন্দা জানানো হয় এবং এই আক্রমণকে সন্ত্রাসী আক্রমণ আখ্যা দিয়ে দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির দাবি করা হয়।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ২০২১ সালের অগাস্ট থেকে আফগানিস্তানের তালিবান সরকার পাকিস্তানের 'তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান' বা 'টিটিপি'কে সহায়তা দিয়ে আসছে; যারা পাকিস্তানের অভ্যন্তরে অনেক হামলার সাথে জড়িত ছিল। এছাড়াও সেই প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ‘বিএলএ'র সাথে 'টিটিপি' এবং আইসিসের খোরাসান শাখার যোগাযোগ রয়েছে। যদিও এই গ্রুপগুলির লক্ষ্য ভিন্ন, তথাপি নিজেদের স্বার্থে তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে।
 
বালুচিস্তানে চীনের কৌশলগত প্রকল্পে কাজ করা চীনা নাগরিকদের উপর হামলার ব্যাপারটা ভূরাজনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাকিস্তানের গোয়াদরে চীনের কৌশলত সমুদ্রবন্দর তৈরিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত কেউই ভালো চোখে দেখেনি। চীনাদের উপর সন্ত্রাসী হামলা যেন একপ্রকার গ্রীন লাইটই পাচ্ছে পশ্চিমাদের কাছ থেকে। হাজার হলেও চীনকে নিয়ন্ত্রণে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের বড় বন্ধু। 


বালুচিস্তানের ভূরাজনীতি

‘বিবিসি'র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বালুচিস্তান হলো পাকিস্তানের পুরো ভূখন্ডের ৪৪ শতাংশ। তবে জনসংখ্যার দিক থেকে পাকিস্তানের ২৪ কোটি মানুষের মাত্র ৬ শতাংশ হলো বালুচ। তবে খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে এই প্রদেশ পাকিস্তানের সবচাইতে ধনী। কানাডার 'বারিক গোল্ড' কোম্পানি এখানে 'রেকো ডিক' খনি ডেভেলপ করছে; যা কিনা বর্তমানে ডেভেলপের মাঝে থাকা সর্ববৃহত তামা এবং স্বর্ণ খনিগুলির অন্যতম। এই প্রদেশে চীনারা 'চায়না পাকিস্তান ইকনমিক করিডোর' বা 'সিপেক' নামের কৌশলগত প্রকল্পে বিশাল বিনিয়োগ করেছে। এই প্রকল্পের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো গোয়াদর গভীর সমুদ্রবন্দর; যা কিনা চীনের 'বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ'এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই প্রদেশে চীনারা খনিজ প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে এবং গোয়াদরে একটা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তৈরি করছে। 'বিএলএ' এই প্রকল্পগুলির ঘোর বিরোধী। ইরান এবং আফগানিস্তানের সাথে বিশাল সীমানা ছাড়াও আরব সাগরে এর রয়েছে বেশ লম্বা সমুদ্রতট। বালুচ জাতির মাঝে বেশ অনেকেই আফগানিস্তান এবং ইরানের বাসিন্দা। ২০২৪এর জানুয়ারিতে ইরান এবং পাকিস্তান একে অপরের ভূমিতে বিমান হামলা করে। তাদের উভয়েরই যুক্তি ছিল যে, অপর দেশের অভ্যন্তরে বিদ্রোহীদের ক্যাম্প রয়েছে। বালুচিস্তানের বাসিন্দারা অভিযোগ করে যে, পাকিস্তান সরকার বালুচিস্তানের খনিজগুলিকে তুলছে ঠিকই, কিন্তু সেখানকার অধিবাসীদের অবস্থার উন্নয়ন করছে না। ১৯৪৮ সালে শুরু হয়ে বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ১৯৭০এর দশক পর্যন্ত তাদের কর্মকান্ড চালিয়ে গিয়েছিল। এরপর বেশকিছু সময় পর ২০০৩ সাল থেকে তারা আবারও সক্রিয় হয়। 'বালুচ লিবারেশন আর্মি' বা 'বিএলএ' এবং 'বালুচ লিবারেশন ফ্রন্ট' বা 'বিএলএফ' প্রধান বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ। এর মাঝে 'বিএলএ'র সক্ষমতা সবচাইতে বেশি। যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন 'বিএলএ'কে সন্ত্রাসী সংগঠন বলে আখ্যা দিয়ে থাকে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এক অপারেশনে বালুচ নেতা নওয়াব আকবর খান বুগতিকে হত্যা করে। অভিযোগ রয়েছে যে, পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে বহু বালুচ জনগণ গুম হয়েছে। পাকিস্তান সরকার অবশ্য এগুলি অস্বীকার করে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে 'বিএলএ' পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী ছাড়াও বড় প্রকল্পগুলিতে কাজ করা চীনা নাগরিকদের উপর হামলা করছে। 'বিএলএফ'ও বিদেশী নাগরিকদের উপর হামলা করছে। পাকিস্তান সরকার দাবি করছে যে, ইরান এবং আফগানিস্তানে এই গ্রুপগুলির ঘাঁটি রয়েছে। এবং এদের অনেককেই ভারত অর্থায়ন করছে।

পাকিস্তানের ট্রেনে হামলার ঘটনা পশ্চিমা মিডিয়াতে ততটা গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হয়নি; যতটা দেখা গিয়েছে ভারতের উপর বিভিন্ন হামলার সময়। একইসাথে ভারতের উপর হামলার সময় পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতাকে যতটা হাইলাইট করা হয়েছে, ততটা কখনোই দেখা যায়নি পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলায় ভারতের জড়িত থাকার ব্যাপারে। এমনকি যখন ভারতের সামরিক বাহিনীর একজন অফিসার পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার পরেও পশ্চিমা মিডিয়া পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলায় ভারতের সংশ্লিষ্টতা দেখতে পাচ্ছে না, তখন এটা বলাই বাহুল্য যে, পশ্চিমারা ভারত-ঘেঁষা নীতিতেই অটল থাকবে। কারণ বালুচিস্তানের গেরিলাদেরকে পশ্চিমারা সন্ত্রাসী সংগঠন বলে আখ্যা দিয়েছে। এখন এই সংগঠনগুলির সাথে ভারতের সংশ্লিষ্টতা মেনে নেয়ার অর্থ হলো ভারত সন্ত্রাসবাদের ইন্ধনদাতা। আর বালুচিস্তানে চীনের কৌশলগত প্রকল্পে কাজ করা চীনা নাগরিকদের উপর হামলার ব্যাপারটা ভূরাজনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাকিস্তানের গোয়াদরে চীনের কৌশলত সমুদ্রবন্দর তৈরিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত কেউই ভালো চোখে দেখেনি। চীনাদের উপর সন্ত্রাসী হামলা যেন একপ্রকার গ্রীন লাইটই পাচ্ছে পশ্চিমাদের কাছ থেকে। হাজার হলেও চীনকে নিয়ন্ত্রণে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের বড় বন্ধু। তবে সন্ত্রাসী হামলার এই ঘটনাগুলি যে বাস্তবতাকে এড়িয়ে যায় না তা হলো, পাকিস্তান রাষ্ট্র তার জনগণের মৌলিক চাহিদা পুরণে যথেষ্ট যত্নবান হয়নি কখনোই। এছাড়াও পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় এবং তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জাতিগত বৈষম্যকেই প্রাধান্য দিয়েছে সর্বদা। একারণেই যুগ যুগ ধরে পুরো পাকিস্তান জুড়ে অস্থিরতা তৈরির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ভারতীয়রা এই অস্থিরতায় ইন্ধন যুগিয়েছে মাত্র।