Tuesday, 8 September 2026

সোমালিয়ার কাদায় তুরস্ক…

০৮ই সেপ্টেম্বর ২০২৬

তুরস্কের ড্রিলিং জাহাজ 'চাগরি বে'। ২০২৬এর এপ্রিল থেকে জাহাজটা সোমালিয়ার উপকূলে তেল-গ্যাসের জন্যে ড্রিলিং শুরু করেছে। সোমালিয়াতে তুরস্কের তেল-গ্যাসের ড্রিলিং জাহাজ এবং স্পেস পোর্টের নিরাপত্তা দেয়ার জন্যে তুরস্ক তাদের বিমান বাহিনীর ৩টা ‘এফ-১৬’ যুদ্ধবিমান মোগাদিশুতে মোতায়েন করেছে। এর আগেই ২০২৫এর মার্চে তুরস্ক সোমালিয়াতে দূরপাল্লার ‘বায়রাক্তার আকিঞ্চি’ ড্রোন এবং জুন মাসে ৩টা ‘টি-১২৯ আতাক’ এটাক হেলিকপ্টার মোতায়েন করেছে।   


গত ৪ঠা সেপ্টেম্বর সোমালিয়ার কারাগার ব্যবস্থার প্রাক্তন প্রধান বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মাহাদ আব্দিরাহমান আদান-এর উপর এক বিমান হামলা হয়। সোমালিয়ার সাথে ইথিওপিয়ার সীমান্তবর্তী শহর দুলাউ-তে তার নিজের বাড়ির উপর এই হামলায় জেনারেল মাহাদ হাল্কা আহত হন; তবে তার বাড়ির আরও কিছু সদস্য নিহত হন বলে খবরে প্রকাশ। দুলাউ শহর সোমালিয়ার জুবাল্যান্ড প্রদেশের একটা শহর। জুবাল্যান্ডের পাশের সাউথ-ওয়েস্ট স্টেট প্রদেশের সাথে গত মার্চ মাস থেকে সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধ চরমে উঠেছে। জেনারেল মাহাদ হলেন সাউথ-ওয়েস্ট স্টেট প্রদেশের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আব্দিআজিজ হাসান মোহামেদ লাফতাগারীনএর শ্বশুর। গত মার্চে লাফতাগারীন সোমালি সেনাবাহিনীর মিশনে ক্ষমতাচ্যুত হন। আর প্রায় একইসাথে জেনারেল মাহাদকেও তার চাকুরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। ১৬ই অগাস্ট ‘সোমালি গার্ডিয়ান’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায় যে, সাউথ-ওয়েস্ট স্টেটের কিছু নাগরিক তুরস্কের জাতীয় পতাকা আগুনে পোড়াচ্ছে। তাদের অভিযোগ হলো, তাদের প্রদেশে বিভিন্ন হামলার ঘটনায় তুরস্ক সরাসরি জড়িত। তবে তুরস্ক সরকার এব্যাপারে কোনরূপ বিবৃতি দেয়া থেকে বিরত থাকার নীতিতে অটল রয়েছে। সোমালিয়ার ঘটনাগুলি শুধু নিছক অভ্যন্তরীণ কোন্দল নয়। আর এখানে তুরস্কের জড়িয়ে পড়ার বিষয়টাও কাকতালীয় বিষয় নয়। লোহিত সাগর, বাব-এল মান্ডেব প্রণালি এবং তৎসংলগ্ন আদেন উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এখন চরমে।

সোমালিয়ার ঘটনাগুলি কে কিভাবে দেখছে, সেটা থেকেই ভূরাজনৈতিক একটা চিত্র পাওয়া সম্ভব। গত ৩১শে মার্চ সোমালিয়ার সাউথ-ওয়েস্ট স্টেটএর ব্যাপারে ইথিওপিয়ার যুক্তরাষ্ট্র-প্রবাসী বিরোধী রাজনৈতিক নেতা জাওয়ার মোহাম্মেদ সোশাল মিডিয়া ‘এক্স’এ একটা বিবৃতি দেন। এই বিবৃতি আবার সোমালিয়ার মিডিয়া ‘সোমালিয়া টুডে’তে প্রচার করা হয়। বিবৃতিতে জাওয়ার মোহাম্মেদ বলেন যে, সোমালিয়ার সাউথ-ওয়েস্ট স্টেটের রাজধানী বাইদোয়া শহর সরকারি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে যাওয়া এবং সাউথ-ওয়েস্ট প্রদেশের প্রেসিডেন্ট আব্দিআজিজ হাসান মোহামেদ লাফতাগারীনএর পদত্যাগে বাধ্য হবার পর এটা প্রমাণ হয়েছে যে, সোমালিয়াতে ইথিওপিয়ার প্রভাব ক্ষুন্ন হতে চলেছে; যা ইথিওপিয়ার জন্যে একটা বড় কূটনৈতিক ব্যর্থতা। ‘সোমালিয়া টুডে’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, লাফতাগারীন সোমালিয়াতে ইথিওপিয়ার সবচাইতে কাছের লোক। ক্ষমতা হারানোর ঠিক আগে আগেই লাফতাগারীন গোপনে ইথিওপিয়াতে গিয়ে সেই দেশের প্রেসিডেন্ট আবি আহমেদের সাথে দেখা করে এসেছিলেন। কিন্তু ফেরত আসার পরে সোমালিয়ার সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে ইথিওপিয়ার সেনারা কিছুই করেনি। সোমালিয়াতে ইথিওপিয়ার কয়েক হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে; যারা মূলতঃ রয়েছে জুবাল্যান্ড এবং সাউথ-ওয়েস্ট স্টেট-এ। জাওয়ার মোহাম্মেদ বলছেন যে, দুই দশক পর বাইদোয়ার নিয়ন্ত্রণ ইথিওপিয় সেনাদের হাত থেকে চলে গেলো; আর এই ঘটনার মাধ্যমে সোমালিয়াতে ইথিওপিয়ার প্রভাবকে প্রতিস্থাপিত করবে তুরস্ক এবং মিশর। তবে জাওয়ার মোহাম্মেদ যে ব্যাপারটা এড়িয়ে যান তা হলো, সোমালিয়াতে ইথিওপিয় সেনারা মোতায়েন রয়েছে ইউরোপিয়দের অর্থায়নে। আর ইউরোপিয়রা সর্বদাই লাফতাগারীনের প্রাদেশিক সরকারের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে চলছিল; যা এখন পরিবর্তিত হতে চলেছে। লাফতাগারীন প্রাদেশিক নির্বাচনের মাধ্যমে আরও পাঁচ বছরের জন্যে নিজের অবস্থানকে পাকাপোক্ত করার প্রায় সাথেসাথেই ক্ষমতাচ্যুত হলেন। এর আগে সোমালি প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহামুদএর সরকার সাংবিধানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করার ঘোষণা দেয়ার পর গত ১৭ই মার্চ লাফতাগারীনের নেতৃত্বে সাউথ-ওয়েস্ট স্টেট সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছিল। এরপর সোমালি সরকার রাজধানী মোগাদিশু থেকে ২২০কিঃমিঃ দূরে অবস্থিত বাইদোয়াতে সকল প্রকারের বাণিজ্যিক বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেয়।

‘সোমালিয়া টুডে’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ইথিওপিয়া সরকার সোমালিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রদেশ সোমালিল্যান্ডের সাথে একটা সমঝোতা স্বাক্ষর করেছিল। এই সমঝোতার মাধ্যমে ভূমি-বেষ্টিত দেশ ইথিওপিয়া সমুদ্রে যাবার একটা পথ খুঁজছিল। তবে এর ফলশ্রুতিতে ইথিওপিয়ার সাথে সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয় এবং সোমালিয়া পুরোপুরিভাবে তুরস্ক এবং মিশরের দিকে ঝুঁকে পড়ে। শুধু তা-ই নয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে ইথিওপিয়ার কাছের সম্পর্ক থাকার কারণে সৌদি আরব সোমালিয়ার পক্ষ নিয়েছে।
 
সোমালিয়ার ফেডারেল রাজনৈতিক ব্যবস্থা দেশটার অভ্যন্তরে অনেক বহির্শক্তিকে জায়গা করে নেয়ার সুযোগ দিয়েছে। সোমালিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রদেশ সোমালিল্যান্ডে আমিরাতি কোম্পানি ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’ বারবেরা বন্দর তৈরি করেছে। আমিরাতিরা সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের চোখ রাঙ্গানো এড়িয়ে জুবাল্যান্ড এবং পুন্টল্যান্ড প্রদেশের সাথেও আলাদা সম্পর্ক রেখে চলেছে। ২০২৬এর জানুয়ারিতে সার্বভৌমত্বকে হুমকির মাঝে ফেলার অভিযোগে সোমালিয়া আমিরাতের সাথে সকল প্রকার নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা এবং বন্দর সংক্রান্ত চুক্তি বাতিল করে।



সোমালিয়া – ভূরাজনৈতিক খেলার মাঠ

সোমালিয়ার ফেডারেল রাজনৈতিক ব্যবস্থা দেশটার অভ্যন্তরে অনেক বহির্শক্তিকে জায়গা করে নেয়ার সুযোগ দিয়েছে। ২০২৪এর মার্চে পুন্টল্যান্ড প্রদেশ ঘোষণা দেয় যে, তারা সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারকে মানবে না। আর একই বছরের নভেম্বরে আরেক প্রদেশ জুবাল্যান্ড কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে সম্পর্ক স্থগিত করে। সোমালিয়ার অভ্যন্তরীণ কোন্দলে সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। আমিরাতের মিডিয়া ‘আল-এসতিকলাল’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, সোমালিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রদেশ সোমালিল্যান্ডে আমিরাতি কোম্পানি ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’ বারবেরা বন্দর তৈরি করেছে এবং সেখানে তারা ৪৪২ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। আমিরাতিরা সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের চোখ রাঙ্গানো এড়িয়ে জুবাল্যান্ড এবং পুন্টল্যান্ড প্রদেশের সাথেও আলাদা সম্পর্ক রেখে চলেছে। ২০২৬এর জানুয়ারিতে সার্বভৌমত্বকে হুমকির মাঝে ফেলার অভিযোগে সোমালিয়া আমিরাতের সাথে সকল প্রকার নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা এবং বন্দর সংক্রান্ত চুক্তি বাতিল করে। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, সোমালিয়াকে পেছন থেকে সমর্থন দিচ্ছে তুরস্ক, সৌদি আরব এবং মিশর। তবে জাওয়ার মোহাম্মেদ বলছেন যে, বাইদোয়াতে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে যে বার্তা বাকি প্রদেশগুলির কাছে যেতে পারে তা হলো - আমিরাত এবং ইথিওপিয়া তাদেরকে বাঁচাতে এগিয়ে আসবে না। আমিরাত ছাড়াও এই অঞ্চলে আরেক খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ইস্রাইল। ২০২৫এর ডিসেম্বরে ইস্রাইল সোমালিল্যান্ডকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবার পর থেকে অত্র অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে।

‘রয়টার্স’ বলছে যে, একদিকে সোমালিয়াতে আমিরাতিরা অনেক চ্যালেঞ্জের মাঝে তাদের বর্তমান অবস্থানকে ধরে রাখার চেষ্টা করবে; অপরদিকে সৌদি-তুর্কি জোট সোমালিয়ার অভ্যন্তরীণ জটিলতাকে জয় করতে কতটুকু নিরাপত্তা দিতে পারে, সেটা দেখার বিষয় হবে। তুর্কি মিডিয়া ‘ক্রিতিক বাকিস’এর এক লেখায় তুর্কি লেখক কেমাল ওজতুর্ক বলছেন যে, লোহিত সাগর এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় তুরস্ক, সৌদি আরব এবং মিশরের সহযোগিতা অনেকটা নিজেদের প্রয়োজনের খাতিরেই। তবে তাদের মাঝে সমন্বয়ে এখনও যথেষ্ট ঘাটতি রয়ে গেছে। বিশেষ করে ইস্রাইল এবং তাদের বন্ধুদের প্রভাবের বিপক্ষে তাদের সমন্বয় কেমন হবে, সেটা দেখার বিষয়। সিরিয়াতে তুরস্ক এবং সৌদিরা একত্রে কাজ করেছে; আর লিবিয়াতে তুরস্ক এবং মিশর নিজেদের বিরোধকে কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। হয়তো সেগুলি লোহিত সাগরে তাদের একত্রে কাজ করতে সহায়তা করবে।

‘মিডল-ইস্ট আই’এর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, তুরস্ক সোমালিয়াকে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি মানবিক সহায়তা দিয়েছে। ব্রিটিশ থিংকট্যাঙ্ক ‘রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউট’ বা ‘রুসি’এর এক লেখায় সাংবাদিক ম্যাথিউ চ্যান্ডলার ডে ওয়াল বলছেন যে, সোমালিয়াতে তুরস্ক ২০১১ সাল থেকে বিনিয়োগ করছে। গত ১৫ বছরে তুরস্ক সোমালিয়ার সবচাইতে কাছের দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। রাজধানী মোগাদিশুর সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দর তুর্কিরা চালাচ্ছে। তুরস্ক থেকে হাজারো তরুণরা পড়াশোনার জন্যে ইস্তাম্বুল এবং আঙ্কারা যাচ্ছে। সোমালিয়াতে ‘ক্যাম্প তুর্কসোম’ নামে বিশাল এক সামরিক ঘাঁটি তৈরি করেছে তুরস্ক, যেখানে তুর্কিরা ২০১৭ সাল থেকে সোমালিয়ার সেনাবাহিনী এবং স্পেশাল ফোর্সকে ট্রেনিং দিচ্ছে। ডে ওয়াল বলছেন যে, তুরস্কের এই কর্মকান্ডগুলিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে ২০২৪ সালে সোমালিয়ার সাথে তেল-গ্যাসের খনিতে তুর্কি বিনিয়োগের সমঝোতা। এর মাধ্যমে তুরস্ক আজেরবাইজান, ইরাক, কাজাকস্তান এবং রাশিয়ার বাইরে জ্বালানির উৎস তৈরি করতে চাইছে। সাম্প্রতিক সময়ের সার্ভেতে বলা হচ্ছে যে, সোমালিয়ায় রয়েছে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের মজুত। তুর্কিদের সাথে তেল-গ্যাসের চুক্তির অনেক সমালোচক রয়েছে সোমালিয়াতে। কিন্তু এই চুক্তিটা করা হয়েছিল সোমালিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রদেশ সোমালিল্যান্ডের সাথে ইথিওপিয়ার সমঝোতা স্বাক্ষরের ঠিক পরপরই। ২০২৬এর এপ্রিল থেকে তুর্কি ড্রিলিং জাহাজ ‘চাগরি বে’ সোমালিয়ার উপকূল থেকে ৩৭২কিঃমিঃ দূরে সমুদ্রে সাড়ে ৭কিঃমিঃ গভীরে খনন করা শুরু করে। তুর্কি নৌবাহিনীর জাহাজ এই ড্রিলিং অপারেশনের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দিচ্ছে।

২০২৫এর শেষের দিকে তুর্কিরা ঘোষণা দেয় যে, তারা মোগাদিশু থেকে ৭০কিঃমিঃ উত্তরে সোমালিয়ার উপকূলে ওয়ারশেখ নামের এক স্থানে কৌশলগত স্পেস-পোর্ট তৈরি করছে। তুরস্কের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা এই কর্মকান্ডকে স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। ইস্রাইলি পত্রিকা ‘জেরুজালেম পোস্ট’ বলছে যে, ওয়ারশেখ ফ্যাসিলিটিতে রকেট উৎক্ষেপণ ছাড়াও দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র টেস্ট করা হবে। এছাড়াও আদেন উপসাগরে একটা সামরিক উপস্থিতি তৈরির লক্ষ্যে তুরস্ক উত্তর সোমালিয়ার লাসকোরায় নামক স্থানে সমুদ্রবন্দর এবং নৌঘাঁটি তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। এলাকাটা বিচ্ছিন্নতাবাদী সোমালিল্যান্ড এবং পুন্টল্যান্ড প্রদেশ উভয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন। তুরস্ক তাদের এই প্রকল্পকে কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে চুক্তির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে চাইছে। ‘রুসি’র লেখায় ডে ওয়াল বলছেন যে, এর বাস্তবায়ন নিঃসন্দেহে তুরস্ককে আমিরাতি এবং ইস্রাইলিদের সামনে দাঁড় করাবে। এই প্রতিযোগিতায় সৌদি আরব এবং মিশরের অবস্থান হবে গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৬এর জানুয়ারিতে সোমালি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ‘মিডল-ইস্ট আই’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, সোমালিয়াতে তুরস্কের তেল-গ্যাসের ড্রিলিং জাহাজ এবং স্পেস পোর্টের নিরাপত্তা দেয়ার জন্যে তুরস্ক তাদের বিমান বাহিনীর ৩টা ‘এফ-১৬’ যুদ্ধবিমান মোগাদিশুতে মোতায়েন করেছে; যার জন্যে ২০২৫এর সেপ্টেম্বর থেকে অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সোমালিল্যান্ডকে ইস্রাইলের স্বীকৃতি দেয়ার প্রায় একই সময় মোগাদিশুতে তুরস্কের ‘এফ-১৬’ মোতায়েন যথেষ্ট গুরুত্ববহ। তবে এর আগেই ২০২৫এর মার্চে তুরস্ক সোমালিয়াতে দূরপাল্লার ‘বায়রাক্তার আকিঞ্চি’ ড্রোন এবং জুন মাসে ৩টা ‘টি-১২৯ আতাক’ এটাক হেলিকপ্টার মোতায়েন করেছে। এছাড়াও সোমালিয়ার সামরিক বাহিনী ২০২২ সাল থেকে তুরস্কের তৈরি ‘বায়রাক্তার টিবি-২’ ড্রোন ব্যবহার করছে।
 
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধ শুরুর এবং বাণিজ্যিক জাহাজে ইয়েমেনের হুথিদের হামলা শুরুর বহু আগে থেকেই লোহিত সাগর, বাব-এল মান্ডেব প্রণালি এবং তৎসংলগ্ন আদেন উপসাগরের কৌশলগত এলাকায় বহু রাষ্ট্র তাদের অবস্থান তৈরি করেছে। গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথের উপর তুরস্ক, সৌদি আরব, আমিরাত, মিশর এবং ইস্রাইলসহ সকলেই অত্র অঞ্চলে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে নেমেছে। তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি তুরস্ককে তার বন্ধুদের, বিশেষ করে সৌদি আরব এবং মিশরের কাছে গুরুত্বপূর্ণ করবে; আর প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে, বিশেষ করে আমিরাত, ইস্রাইল এবং ইথিওপিয়ার সামনে হুমকি হিসেবে দাঁড় করাবে। 



তুরস্কের সামনে চ্যালেঞ্জ

ইতোমধ্যেই সোমালিয়াতে তুরস্কের অবস্থানের বিরুদ্ধে জনমত তৈরিতে সচেষ্ট রয়েছে তুরস্কের প্রতিদ্বন্দ্বীরা। জুবাল্যান্ড স্টেটে ইথিওপিয়ার সীমান্তবর্তী দুলাউ শহরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহাদের উপর ড্রোন হামলায় তুর্কিরা জড়িত বলে ইস্রাইলি মিডিয়া ‘টাইমস অব ইস্রাইল’এ উল্লেখ করা হয়; যদিও তুরস্ক অফিশিয়ালি কোনকিছু বলা থেকে বিরত থেকেছে। ‘সোমালি গার্ডিয়ান’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সোমালিয়ার সিনেটর এবং প্রফেসর আব্দি ইসমাঈল সামাতার তুরস্কের প্রকল্পগুলিকে ‘নব্য উপনিবেশবাদী’ প্রকল্প হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলছেন যে, তুরস্ক সোমালিয়ার সাথে সামরিক সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে সোমালিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে। তিনি আরও বলছেন যে, তুরস্কের সরবরাহ করা ড্রোনের মাধ্যমে সোমালি সরকার তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্মূল করার প্রচেষ্টায় রয়েছে।

পশ্চিমা বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে ‘সোমালি গার্ডিয়ান’ বলছে যে, তুর্কিরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয় ইউনিয়নের এতকাল ধরে করা বিনিয়োগগুলিকে হুমকিতে ফেলছে; বিশেষ করে তাদের অর্থায়নে সোমালিয়াতে আফ্রিকান ইউনিয়নের শান্তিরক্ষী বাহিনীর কর্মকান্ড, বিভিন্ন ইন্সটিটিউশন তৈরি এবং সোমালি বাহিনীকে ট্রেনিং দেয়ার বিষয়গুলি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তুরস্কের ট্রেনিং দেয়া নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা আফ্রিকান ইউনিয়নের শান্তিরক্ষী বাহিনী (যেমন ইথিওপিয়ার সেনারা) এবং যুক্তরাষ্ট্রের এয়ার সাপোর্ট ছাড়া আল-শাবাব সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তেমন কিছু করতে পারছে না। তবে প্রতিবেদনে ইউরোপিয় অর্থায়নে আফ্রিকান ইউনিয়ন সেনাদের দুই দশকের উপস্থিতির পরেও কিভাবে আল-শাবাব সোমালিয়ার বড় অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে, সেই প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়া হয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হচ্ছে যে, সাউথ-ওয়েস্ট স্টেটের রাজধানী বাইদোয়ার বিমানবন্দরে তুরস্ক ‘এফ-১৬’ যুদ্ধবিমান মোতায়েনের চিন্তাভাবনা করছে বলে শোনা যাচ্ছে।

‘সোমালি গার্ডিয়ান’এর আরেক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০২৬এর অগাস্টের মাঝামাঝি সোমালিয়ার পুন্টল্যান্ড প্রদেশে জলদস্যু সন্দেহে চার ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। এই চার ব্যক্তি এক দিন আগে ‘লুতুফ’ নামের একটা বাণিজ্যিক জাহাজে দস্যুতা করেছে বলে অভিযোগ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, পুন্টল্যান্ডের লোকেরা বলছে যে, এই চার ব্যক্তি নিরপরাধ ছিল। তবে ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ‘লুতুফ’ জাহাজকে হাইজ্যাক করে সোমালি উপকূলের কাছে নিয়ে আসা হলে দু’টা তুর্কি যুদ্ধজাহাজ, হেলিকপ্টার এবং ড্রোন তাদেরকে ঘিরে ধরে। হাইজ্যাকাররা সন্দেহভাজন যে ছোট নৌকায় করে হামলা করে, তা সোমালি উপকূলে পৌঁছালে সেখানে বিমান হামলায় চারজন নিহত হয়। ‘লুতুফ’ জাহাজটা সোমালিয়ায় তুরস্কের ট্রেনিং ঘাঁটির জন্যে অস্ত্র বহণ করছিল।

রুসি’এর লেখায় ম্যাথিউ চ্যান্ডলার ডে ওয়াল বলছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধ শুরুর এবং বাণিজ্যিক জাহাজে ইয়েমেনের হুথিদের হামলা শুরুর বহু আগে থেকেই লোহিত সাগর, বাব-এল মান্ডেব প্রণালি এবং তৎসংলগ্ন আদেন উপসাগরের কৌশলগত এলাকায় বহু রাষ্ট্র তাদের অবস্থান তৈরি করেছে। জলদস্যু নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন দেখিয়ে ইউরোপিয়রা ‘অপারেশন আটালান্টা’ নামে এক মিশনের মাধ্যমে এই এলাকায় যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রেখেছে বহু বছর ধরে। সোমালিয়ার পাশেই জিবুতিতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান এবং চীনের সামরিক ঘাঁটি। গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথের উপর শক্তিশালী দেশগুলির নজরদারি ছিল অনেক আগে থেকেই। তবে যা পরিবর্তিত হয়েছে তা হলো, ‘লিবারাল দুনিয়ার শান্তির কাঠামো’তে ধ্বস। এখন তুরস্ক, সৌদি আরব, আমিরাত, মিশর এবং ইস্রাইলসহ সকলেই অত্র অঞ্চলে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে নেমেছে। ডে ওয়াল মনে করছেন যে, তুরস্কের নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জগুলি তুরস্ক থেকে দূরে সোমালিয়াতে এসে হাজির হয়েছে। সোমালিয়াতে তুরস্কের কৌশলগত বিনিয়োগগুলিকে, বিশেষ করে তেল-গ্যাসের ড্রিলিং রিগ, স্পেস পোর্ট এবং সামরিক ঘাঁটির নিরাপত্তা দিতে যুদ্ধজাহাজ, ‘এফ-১৬’ যুদ্ধবিমান, ‘বায়রাক্তার আকিঞ্চি’ ড্রোন এবং ‘টি-১২৯ আতাক’ এটাক হেলিকপ্টার মোতায়েন করতে হয়েছে। নিঃসন্দেহে এই সামরিক উপস্থিতি তুরস্ককে তার বন্ধুদের, বিশেষ করে সৌদি আরব এবং মিশরের কাছে গুরুত্বপূর্ণ করবে; আর প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে, বিশেষ করে আমিরাত, ইস্রাইল এবং ইথিওপিয়ার সামনে হুমকি হিসেবে দাঁড় করাবে। এর প্রতিফলন দেখা যাবে সোমালিয়াতে তুর্কি স্বার্থকে টার্গেট করে সহিংসতা এবং তুরস্ক-বিরোধী জনমত তৈরির প্রচেষ্টার মাঝ দিয়ে। এটাই হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-বিহীন মধ্যপ্রাচ্যের ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ অংশের চেহাড়া।

No comments:

Post a Comment