Tuesday, 19 October 2021

ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী সরকারকে সমর্থন দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়াতে তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে চাইছে

১৯শে অক্টবর ২০২১

বঙ্গোপসাগরকে মার্কিন প্রভাব বলয়ের অধীনে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র সকল প্রচেষ্টাই চালাবে। তথাপি পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় কোনকিছুই এখন আগের মত যে নেই, তা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে ভারতীয় মিডিয়ার অবাক হবার মাঝ দিয়ে প্রমাণ হয়। এতদিন দিল্লীর নীতিনির্ধারকরা যদি মনে করে থাকেন যে, তাদের উগ্রবাদী নীতি তারা ইচ্ছেমতো বাস্তবায়ন করবেন, তবে তারা বেশ বড়সড় ধাক্কাই খেয়েছেন।

 
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের জনগণের উপর হামলার ব্যাপারে নিন্দা জ্ঞাপন করেন বলে জানাচ্ছে ভারতীয় মিডিয়া। ১৯শে অক্টোবর ভারতীয় সরকারি বার্তা সংস্থা ‘পিটিআই’ এবং বেসরকারি মিডিয়া ‘এনডিটিভি’ নাম না জানা দপ্তরের মুখপাত্রের বরাত দিয়ে বলে যে, ধর্ম বা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা মানুষের অধিকার। বিশ্বের সকল ধর্মের মানুষেরই নিরাপদ থাকার অধিকার রয়েছে এবং তাদের গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান পালনে সমর্থন পাবার অধিকার রাখে। এদিকে ‘এনডিটিভি’ বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশী হিন্দুরা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কাছে আবেদন জানায় যেন বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর আর কোন ধরনের হামলা না হয়। তারা মার্কিন মানবাধিকার গ্রুপগুলি এবং মিডিয়া হাউজগুলিকে বাংলাদেশে সহিংসতার খবর হাইলাইট করার আবেদন জানায়।

বাংলাদেশ বলছে ‘তৃতীয় শক্তি’ জড়িত

অপরদিকে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল এক অনুষ্ঠানে বলেন যে, যিনি কুমিল্লার ঘটনা ঘটিয়েছেন, তাকে তারা এখনও ধরতে পারেননি; কারণ তিনি বারবার স্থান পরিবর্তন করছেন। তবে আইন শৃংখলা বাহিনী শিগগিরই তাকে ধরে ফেলবে বলে তিনি বলেন। এর আগের দিন সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন যে, রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করতেই উদ্দেশ্যমূলকভাবে কুমিল্লার ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে তারা মনে করছেন। এর আগে রামু, ভোলা এবং নাসিরনগরের ঘটনাগুলিও এ ধরনের ঘটনা ছিল বলে বলেন তিনি; যা মূলতঃ সোশাল মিডিয়াতে অপপ্রচারের মাধ্যমে ঘটানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন যে, বিশৃংখলা, অরাজক পরিস্থিতি এবং রাষ্ট্রের মাঝে ভাঙ্গন সৃষ্টির জন্যে এটা একটা কৌশল ছিল। কিন্তু অনেকেই এখানে না বুঝে অনেক কিছু করে ফেলেছেন। নোয়াখালী, কুমিল্লা এবং হাজিগঞ্জে যা ঘটেছে, তা একই সূত্রে গাঁথা বলে বলেন মন্ত্রী। এগুলির পিছনে মুষ্টিমেয় কিছু লোক রয়েছে এবং এরইমাঝে সন্দেহজনক লোকদের চিহ্নিত এবং গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে বলেন তিনি। ১৭ই অক্টোবরও তিনি প্রায় একই ধরনের কথা বলেন। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পিছনে ‘তৃতীয় পক্ষের’ ইন্ধন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। সাংবাদিকরা যখন প্রশ্ন করেন যে, কারা এই ঘটনার পিছনে জড়িত, তখন মন্ত্রী বলেন যে, সাংবাদিকরাই এব্যাপারে অনুমান করে নিতে পারেন।

এর আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হিন্দুদের দূর্গাপুজা অনুষ্ঠানে বলেন যে, ভারতকে সাবধান থাকতে হবে যে, সেখানেও যাতে এমন কোনকিছু যেন না করা হয়, যা বাংলাদেশের উপরেও প্রভাব ফেলে এবং বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর আঘাত আসে। তিনি আরও বলেন যে, ধর্মান্ধরা সবসময়ই ধর্মীয় সংঘাত দেখতে চায়। এরা শুধু মুসলিমদের মাঝ থেকেই আসে না; অন্যান্য ধর্ম থেকেও আসে। শেখ হাসিনা ভারতের কোন ঘটনাকে নির্দিষ্ট করে না বললেও ভারতীয় মিডিয়া এই যোগসূত্র ধরতে ভুলেনি। ভারতীয় পত্রিকা ‘দ্যা টেলিগ্রাফ’ বলছে যে, শেখ হাসিনা এমন সময়ে কথাগুলি বললেন, যখন ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকারের নতুন নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে আসামে অগুণিত বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমকে বেআইনী বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী আখ্যা দিয়ে নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে বাস্তুচ্যুত করা হচ্ছে এবং ‘আর্টিকেল ৩৭০’ পরিবর্তনের মাধ্যমে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের বিশেষ স্ট্যাটাস বাতিল করে সেখানে অন্য অঞ্চলের হিন্দুদের বসতি স্থাপনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

গত ২৩শে সেপ্টেম্বর আসামের দারাং জেলায় তথাকথিত ‘বেআইনী বসতি স্থাপনকারী’দের বাস্তুচ্যুত করার পুলিশী মিশনে পুলিশের গুলিতে দু’জন বাঙ্গালী মুসলিম নৃশংসভাবে নিহত হয়। এর মাঝে এক ব্যক্তিকে হত্যা করে তার শরীরের উপর লাফানোর ভিডিও সোশাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে। আসামের মূখ্যমন্ত্রী এই ঘটনার পর এই বাস্তুচ্যুত করার মিশনকে চালিয়ে নেবার ঘোষণা দেন। তবে এই ঘটনা বা এর আগে আসামের নাগরিকত্ব আইন নিয়ে ব্যাপক সহিংসতার ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোন অবস্থানই চোখে পড়েনি।

দিল্লী যখন ওয়াশিংটনের ক্রীড়নক…

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কাছ থেকে যখন ভারত সরকারের উগ্রবাদী অভ্যন্তরীণ নীতিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যার সাথে যুক্ত করে বিবৃতি আসছে, তখন ওয়াশিংটন থেকে বাংলাদেশের ঘটনার নিন্দা ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের দিকেই ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশ সরকারও নির্দিষ্ট করে না বলেই ‘তৃতীয় পক্ষের’ জড়িত থাকার কথা বলছে; যা মূলতঃ আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের দিকেই ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন যে, মে মাসে ঢাকার পল্লবীতে সংঘটিত এক হত্যাকান্ডের ভিডিওকে নোয়াখালীতে একজন হিন্দু হত্যার ভিডিও বলে সোশাল মিডিয়াতে ছড়ানো হয়। অর্থাৎ তিনি বলছেন যে, উদ্দেশ্যমূলকভাবে কেউ এই সহিংসতাকে উস্কে দিচ্ছে।

মুসলিমদের নিরাপত্তার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কোন অবস্থান আশা করাটা কঠিন; যখন দুই দশক ধরে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ মার্কিন সামরিক হামলায় ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তানসহ বহু দেশে লক্ষ লক্ষ মুসলিম নিহত হয়েছে। বাস্তবিকপক্ষে গত দুই দশক থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে তার বলয়ে নিতে চাইছিল। এই সুযোগটা খুলে যায় ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির উগ্রবাদী বিজেপি সরকারের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হবার পর। যুক্তরাষ্ট্র চীনকে নিয়ন্ত্রণ করার নতুন কৌশল বাস্তবায়নে ভারতকে উন্নত অস্ত্র দিতে থাকে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল হিমালয়ে পাঁচ হাজার মিটার উচ্চতায় চীনের সাথে উত্তেজনা সৃষ্টি করে সেখানে চীনা সামরিক বাহিনীকে ব্যস্ত রাখা। একইসাথে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ‘কোয়াড’ সামরিক জোটের অংশ হওয়ায় ভারতীয় নৌবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ভারত মহাসাগরে চীনা নৌবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। মার্কিন ইন্দোপ্যাসিফিক কৌশল বাস্তবায়নে দিল্লী এখন ওয়াশিংটনের ক্রীড়নক। কাজেই ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী সরকারের কড়া সমালোচনা করে তাদেরকে দূরে ঠেলে দেবার কোন চিন্তা জো বাইডেনের মার্কিন সরকারের রয়েছে বলে মনে করাটা ভুল হবে। উল্টো মার্কিন ইন্দোপ্যাসিফিক নীতি বাস্তবায়নে পথের কাঁটা হয়ে কেউ যেন না দাঁড়ায়, সেব্যাপারেই বরং ওয়াশিংটনের দৃষ্টি থাকবে। এবং সে অনুযায়ী বঙ্গোপসাগরকে মার্কিন প্রভাব বলয়ের অধীনে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র সকল প্রচেষ্টাই চালাবে। তথাপি পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় কোনকিছুই এখন আগের মত যে নেই, তা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে ভারতীয় মিডিয়ার অবাক হবার মাঝ দিয়ে প্রমাণ হয়। এতদিন দিল্লীর নীতিনির্ধারকরা যদি মনে করে থাকেন যে, তাদের উগ্রবাদী নীতি তারা ইচ্ছেমতো বাস্তবায়ন করবেন, তবে তারা বেশ বড়সড় ধাক্কাই খেয়েছেন। জাতিরাষ্ট্রের সম্পর্কের ওয়েস্টফালিয়ান ব্যবস্থা এখন যে নামমাত্র টিকে আছে, তা সীমানার দুই পাড়ের ঘটনাই বলে দিচ্ছে। পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থার সূর্যাস্ত আসন্ন।

Friday, 15 October 2021

ভারতের বিজেপি সরকারের ধর্মান্ধ কর্মকান্ড দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ভারতের অস্তিত্ব রক্ষা এখন দক্ষিণ এশিয়ার চ্যালেঞ্জ!

১৬ই অক্টোবর ২০২১

সেপ্টেম্বর ২০২১। আসামের মুসলিমদের বাস্তুচ্যুত করার জন্যে পুলিশী অভিযান। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাস নতুন নয়; তবে মোদির বিজেপি সরকার প্রথমবারের মতো ভারতের সেকুলার পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ বিভাজন এতটাই স্থায়ী রূপ নিচ্ছে যে, দেশটার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাটা এখন আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে। ভারতের অভ্যন্তরের উগ্র হিন্দুত্ববাদী কর্মকান্ডের প্রভাবের সীমানা অতিক্রম রোধ করার চিন্তাটাই দক্ষিণ এশিয়াকে সেই সহযোগিতার পথে হাঁটাবে।

 বাংলাদেশে বাঙালি হিন্দুদের অনুষ্ঠান দূর্গাপুজার পুজামন্ডপে পবিত্র কূরআন পাওয়ার ঘটনা এবং পরবর্তীতে সেটাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পুজামন্ডপে হামলা দেশটার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে চ্যালেঞ্জ করে। পরদিন ১৪ই অক্টোবর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি সাংবাদিকদের বলেন যে, তারা বাংলাদেশে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে হামলার খবর পেয়েছেন, যা তাদেরকে দুশ্চিন্তা দিয়েছে। তবে বাগচি বলেন যে, বাংলাদেশ সরকার দ্রুতই ঘটনার নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্যে ব্যবস্থা নেয়। একইসাথে তিনি এও বলেন যে, তাদের জানা রয়েছে যে, বাংলাদেশে দূর্গাপুজার অনুষ্ঠান সরকারের সহায়তাতেই হয়ে থাকে। ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তর বাংলাদেশ সরকারের পদক্ষেপের পক্ষে কথা বললেও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিজেপি নেতা সামিক ভট্টাচার্য্য বাংলাদেশ সরকারকে দোষারোপ করেন। তিনি বলেন যে, বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর এরকম নির্যাতন গত কয়েক মাসে বৃদ্ধি পেয়েছে; আর সেখানে সরকার চুপ করে দেখছে। একই দিনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হিন্দুদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতা ও প্রতিনিধিদের সাথে পুজার শুভেচ্ছা জানানোর অনুষ্ঠানে কঠোর ভাষায় এই কর্মকান্ডের পিছনে যারা জড়িত, তাদের শাস্তি দেবার কথা বলেন। একইসাথে তিনি ভারতকে উদ্দেশ্য করেও কিছু বলেন, যা অনেক মিডিয়াই এড়িয়ে যায় অথবা হাইলাইট না করার সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন যে, ভারত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশকে স্বাধীনতা পেতে সহায়তা দিয়েছে; যার জন্যে তাদের কথা বাংলাদেশ সবসময় কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করে। কিন্তু ভারতকে সাবধান থাকতে হবে যে, সেখানেও যাতে এমন কোনকিছু যেন না করা হয়, যা বাংলাদেশের উপরেও প্রভাব ফেলে এবং বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর আঘাত আসে। তিনি আরও বলেন যে, ধর্মান্ধরা সবসময়ই ধর্মীয় সংঘাত দেখতে চায়। এরা শুধু মুসলিমদের মাঝ থেকেই আসে না; অন্যান্য ধর্ম থেকেও আসে। শেখ হাসিনা ভারতের কোন ঘটনাকে নির্দিষ্ট করে না বললেও ভারতীয় মিডিয়া এই যোগসূত্র ধরতে ভুলেনি।

ভারতীয় পত্রিকা ‘দ্যা টেলিগ্রাফ’ বলছে যে, শেখ হাসিনা এমন সময়ে কথাগুলি বললেন, যখন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ্য বাংলাদেশে এমন একটা ধারণা জন্মেছে যে, ২০১৪ সালে বিজেপি সরকার ক্ষমতা নেবার পর থেকে ভারতের মুসলিমদের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকারের নতুন নাগরিকত্ব আইন, যার মাধ্যমে আসামে অগুণিত বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমকে বেআইনী বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী আখ্যা দিয়ে নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে বাস্তুচ্যুত করা হচ্ছে এবং ‘আর্টিকেল ৩৭০’ পরিবর্তনের মাধ্যমে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের বিশেষ স্ট্যাটাস বাতিল করে সেখানে অন্য অঞ্চলের হিন্দুদের বসতি স্থাপনের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা বাংলাদেশে মুসলিম বিরোধী কর্মকান্ড বলে পরিচিতি পেয়েছে।

গত ২৩শে সেপ্টেম্বর আসামের দারাং জেলায় তথাকথিত ‘বেআইনী বসতি স্থাপনকারী’দের বাস্তুচ্যুত করার পুলিশী মিশনে সাধারণ জনগণ বাধা দেয়। ‘হিন্দুস্তান টাইমস’ বলছে যে, এই সংঘর্ষে পুলিশের গুলিতে দু’জন ব্যক্তির মৃত্যু হয়। প্রতিবেদনে বলা হয় যে, সিপাঝার অঞ্চলের ধলপুর গ্রামে পুলিশের এই অভিযানের সময় করা এক ভিডিওতে দেখা যায় যে, এক ব্যক্তি পুলিশ এবং একজন ফটোগ্রাফারকে তাড়া করছে। এরপর একসময় পুলিশ সদস্যরা সেই ব্যক্তিকে ঘিরে ফেলে। সে মাটিতে পড়ে যায়, কারণ তার বুকে গুলি লেগেছিল। পুলিশ তখন তার উপর লাঠি দিয়ে আঘাত করতে থাকে। এরপর সেখানকার এক ফটোগ্রাফার বিজয় শংকর বানিয়া পড়ে যাওয়া মানুষটাকে লাথি মারতে থাকে এবং তার শরীরের উপর উঠে লাফাতে থাকে। একসময় সকলে যখন বুঝতে পারে যে, সে মৃত্যুবরণ করেছে, তখন পুলিশ তার মৃতদেহ সরিয়ে নিয়ে আসে। পুলিশ বলে যে, মৃত দুই ব্যক্তির নাম মইনুল হক এবং শেখ ফরিদ। পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ধলপুর গ্রামের অধিকাংশ মানুষ বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম। শেখ ফরিদ ছিল ১২ বছর বয়সী এক শিশু, যে পোস্ট অফিস থেকে সেখান দিয়ে বাড়ি যাচ্ছিল। ৩৫ বছর বয়সী মইনুল হক ছিলেন একজন সাধারণ গ্রামবাসী।

আসামের মূখ্যমন্ত্রী হিমান্ত বিশ্ব সর্মা বলেন যে, পুলিশ তাদের নিজেদের কাজ করছে। তিনি বলেন যে, তার পাওয়া তথ্য অনুযায়ী পুলিশ জনগণের কাছ থেকে রামদা, বল্লম এবং অন্যান্য অস্ত্র দ্বারা আক্রমণের শিকার হয়। তিনি পরিষ্কার করেন যে, বাস্তুচ্যুত করার এই মিশন চলবে। হিমান্ত সর্মা একসময় কংগ্রেস দলের সদস্য থাকলেও ২০১৫ সালে তিনি দল বদল করে বিজেপিতে যোগ দেন। ‘দ্যা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ বলছে যে, আসামের ধলপুর গ্রামের উত্তেজনা সেদিনই বন্ধ হয়ে যায়নি। পুলিশ ৩০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরও তিন ব্যক্তিকে ২৩শে সেপ্টেম্বরের ঘটনায় ইন্ধন যোগাবার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে।

ভারতের পূর্ব সীমানার কাছে আসামে যখন মুসলিমদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা হচ্ছে, তখন পশ্চিম সীমান্তে কাশ্মিরে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। ১১ই অক্টোবর ভারত অধিকৃত কাশ্মিরের পুঞ্চ জেলায় নিরাপত্তা বাহিনী বিচ্ছিন্নতাবাদী গেরিলাদের খোঁজা শুরু করলে গোলাগুলিতে পাঁচজন ভারতীয় সেনা নিহত হয়। এর কিছুদিন আগেই কাশ্মিরে সংখ্যালঘু হিন্দু বেসামরিক জনগণের উপর আক্রমণ শুরু হয়। হামলা এবং পাল্টা হামলায় বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হয়। ‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, অনেক সংখ্যালঘু পরিবারই এখন কাশ্মির ছাড়তে শুরু করেছে। তারা বলছে যে, এখন ১৯৯০এর দশকের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে সরকার কাশ্মিরে শান্তি ফেরার যে দাবিগুলি করছিল, তা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। ২০১৯ সালে বিজেপি সরকার কাশ্মিদের বিশেষ স্ট্যাটাস বাতিল করার পর থেকেই ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল কাশ্মিরে জনসংখ্যা বিষয়ক পরিবর্তন আনতে চেষ্টা চালাচ্ছে।

ধর্মান্ধতাকে উপজীব্য করে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে জড়িয়ে ভারতের বিজেপি সরকার শুধু ভারত তৈরির স্তম্ভকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে ক্ষান্ত হয়নি, পুরো দক্ষিণ এশিয়াতেও ধর্মীয় সহিংসতাকে উস্কে দিয়েছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাস নতুন নয়; তবে মোদির বিজেপি সরকার প্রথমবারের মতো ভারতের সেকুলার পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ বিভাজন এতটাই স্থায়ী রূপ নিচ্ছে যে, দেশটার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাটা এখন আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে। ভারতের অভ্যন্তরের উগ্র হিন্দুত্ববাদী কর্মকান্ডের প্রভাবের সীমানা অতিক্রম রোধ করার চিন্তাটাই দক্ষিণ এশিয়াকে সেই সহযোগিতার পথে হাঁটাবে।

Wednesday, 13 October 2021

সোমালিয়া এবং কেনিয়ার সমুদ্রসীমা নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

১৪ই অক্টোবর ২০২১

আন্তর্জাতিক আদালতে সমুদ্রসীমা নিয়ে রায়ের পর, সোমালিয়ার উপকূলে তেল গ্যাস আহরণের জন্যেও তুরস্ক সর্বোচ্চ প্রচেষ্টাই চালাবে। এই প্রচেষ্টাতে কেনিয়া যদি বাধা দেবার চেষ্টা চালায়, তা তুরস্ককে সোমালিয়ার উপকূলে ভারত মহাসাগরে সামরিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে অনুপ্রেরণা যোগাবে। অর্থাৎ তেল গ্যাস আহরণের নিরাপত্তা দিতেই তুরস্ক সোমালিয়ার উপকূলে সামরিক অবস্থান তৈরি করবে। 

 
গত ১৩ই অক্টোবর জাতিসংঘের সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির আদালত পূর্ব আফ্রিকার দেশ সোমালিয়া এবং কেনিয়ার মাঝে সমুদ্রসীমা নিয়ে একটা রায় প্রদান করে। প্রায় এক লক্ষ বর্গ কিঃমিঃ আয়তনের সমুদ্রসীমার উপর আদালতের এই রায় মূলতঃ সোমালিয়ার পক্ষেই গিয়েছে। সোমালিয়ার তথ্যমন্ত্রী ওসমান দুবে এক টুইটার বার্তায় আদালতের রায়কে স্বাগত জানিয়ে সোমালিয়ার জনগণকে অভিনন্দন জানান। ‘বিবিসি’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এই সমুদ্রসীমার মাঝে তেল গ্যাস পাবার সম্ভাবনা বেশি থাকার কারণেই দুই দেশ এব্যাপারে দ্বন্দ্বের মাঝে ছিল।

২০০৯ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্ততায় দুই দেশ আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের বিরোধ মিটিয়ে ফেলার ব্যাপারে একমত হয়। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, ২০১৪ সালে দুই দফা আলোচনার পর কেনিয়রা তৃতীয় দফা আলোচনা পরিত্যাগ করলে সোমালিয়া আন্তর্জাতিক আদালতে যায়। কেনিয়া বলছিল যে, দুই দেশের সীমানা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে পূর্ব দিকে লাইন টেনে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করা হোক। আর সোমালিয়া চাইছিল যে, দুই দেশের স্থলসীমানা যে বরাবর গিয়েছে, সেই বরাবর সমুদ্রেও লাইন টেনে সীমানা নির্ধারণ করা হোক। আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারকরা দুই প্রস্তাবের মাঝামাঝি একটা লাইন টেনে রায় দিয়েছেন। সোমালিয়া যা চেয়েছিল, তা তারা পায়নি; তবে তারা রায়ে খুশি। কারণ তারা যা চেয়েছিল, তার অনেকটাই পেয়েছে। অপরদিকে কেনিয়া যা চেয়েছিল, তার কোন অংশই ছাড়তে রাজি ছিল না।

কেনিয়া আদালতে বলেছিল যে, ২০০৯ সালে সোমালিয়ার সাথে যে সমঝোতা হয়েছিল, তা দুই দেশের উপর বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছিল। অপরদিকে আদালত বলছে যে, সেই সমঝোতায় সোমালিয়া যে কেনিয়ার প্রস্তাবিত সমুদ্রসীমা মেনে নিয়েছিল, তা কেনিয়া প্রমাণ করতে পারেনি। এবছরের মার্চ মাস থেকেই কেনিয়া আদালতের শুনানিতে অংশ নেয়নি। তারা ১৪ জন বিচারকের প্যানেলে একজন সোমালি থাকার ব্যাপারটাকেও প্রত্যাখ্যান করে। কেনিয়া সরকার এই মামলাকে ‘ত্রুটিযুক্ত আইনী পদ্ধতি’ বলে আখ্যা দেয়। এবং তারা বলে যে, এর মাঝে ‘অন্তর্নিহিত পক্ষপাতদুষ্টতা’ রয়েছে।

সোমালিয়ার উপ প্রধানমন্ত্রী মোহামেদ গুলেদ ‘বিবিসি’কে বলেছিলেন যে, সোমালিয়া এই আদালতে এসেছে কারণ তারা আন্তর্জাতিকভাবে আইনের শাসনের ব্যবস্থার উপর বিশ্বাস করে। কিন্ত সমস্যা হলো, সোমালিয়ার উপ প্রধানমন্ত্রীর কথাগুলির সাথে আদালতের সক্ষমতার দূরত্ব রয়েছে। কারণ এই আদালত কোন দেশকেই রায় বাস্তবায়নে বাধ্য করতে পারে না। কেনিয়া ইতোমধ্যেই আদালতের রায় প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই অনেকেই এই রায় বাস্তবায়নের ভবিষ্যতের ব্যাপারে সন্দিহান। কেনিয়া বলেছে যে, তারা সমুদ্রসীমা রক্ষা করতে যুদ্ধ করতেও প্রস্তুত। ‘বিবিসি’ বলছে যে, কেনিয়ার মতো সোমালিয়ার নৌবাহিনী নেই; তবে সোমালিয়ার বন্ধু রয়েছে। এমতাবস্থায় দুই দেশের মাঝে আরও আলোচনার সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি কূটনৈতিক চ্যানেল বন্ধ হয়ে যাবার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে যুদ্ধ হয়তো শেষ অপশন।

‘আল জাজিরা’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, দুই দেশের মাঝে বিরোধ যথেষ্ট। সোমালিয়ার সীমানার কাছাকাছি এলাকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কেনিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগ করে আসছে সোমালিয়া। ২০১৯ সালে সোমালিয়ার বিরুদ্ধে বিতর্কিত সমুদ্রাঞ্চলের তেল গ্যাসের ব্লক বিক্রি করার অভিযোগে কেনিয়া মোগাদিশু থেকে তার রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠায়। একইসাথে কেনিয়া মনে করিয়ে দেয় যে, আল শাবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সোমালিয়াতে কয়েক হাজার কেনিয় সৈন্য মোতায়েন রয়েছে। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে সোমালিয়া কেনিয়ার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে; যখন সোমালিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল সোমালিল্যান্ডের নেতৃত্বকে কেনিয়া নিজ দেশে আপ্যায়ণ করে। তবে ২০২১ সালের অগাস্টে দুই দেশ আবারও সম্পর্ক পুনস্থাপন করে।

 

তবে দুই দেশের সমুদ্রসীমার রায় অন্যরকম অর্থ বহণ করে, যখন সোমালিয়ার সবচাইতে প্রভাবশালী বন্ধু দেশ তুরস্কের নাম চলে আসে। সোমালিয়াতে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করেছে তুরস্ক। বিশেষ করে দেশটার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলির অনেকগুলিই এখন তুরস্কের ব্যবস্থাপনায় চলছে। সোমালিয়ার সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেবার জন্যে সেখানে বড় আকারের একটা সামরিক ঘাঁটিও তৈরি করেছে তুরস্ক। সোমালিয়ার হাজার হাজার ছাত্র এখন তুরস্কের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে তুর্কি মিডিয়া ‘এনটিভি’ বলে যে, তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান বলেছেন যে, সোমালিয়া তুরস্ককে সোমালি উপকূলে তেল গ্যাস আহরণে সহায়তা করার জন্যে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তিনি আরও বলেন যে, সেখানে অপারেশন শুরু করার জন্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ তার সরকার নেবে।

প্রকৃতপক্ষে ২০১৬ সালে তুরস্কের সাথে সোমালিয়ার স্বাক্ষরিত এক সমঝোতার মাঝে ছিল জ্বালানি ও খণিজ সম্পদ আহরণ। তুর্কি জ্বালানি বিশ্লেষক রাহমি কোপার বলছেন যে, ২০১৬ সালে তুরস্কের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের কারণে এই প্রচেষ্টা পিছিয়ে গেলেও ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে এই সমঝোতা চুক্তি তুর্কি পার্লামেন্টে উপস্থাপন করা হয়। অপরদিকে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সোমালি পার্লামেন্টে ‘সোমালি পেট্রোলিয়াম আইন’ পাস করা হয়। এর মাধ্যমে ‘সোমালিয়া পেট্রোলিয়াম অথরিটি’র জন্ম দেয়া হয়। রাহমি কোপার বলছেন যে, এই পদক্ষেপগুলি নিশ্চিত করে যে, তুরস্ক সোমালি উপকূলে তেল গ্যাস আহরণের জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে। ‘ডেইলি সাবাহ’র এক লেখায় হাসান ইউসুফ ওয়াল মত দিচ্ছেন যে, যেহেতু সোমালিয়াতে নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তুর্কিরা সেখানে ব্যাপকভাবে কাজ করে যাচ্ছে, তাই তেল গ্যাস আহরণের ক্ষেত্রেও তারা অন্যদের চাইতে এগিয়ে থাকবে। তবে তিনি মনে করছেন যে, সোমালিয়ার তেল গ্যাসের সেক্টর এখন আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলিকে আগ্রহী করতে পারে। তিনি আরও মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, আফ্রিকার অনেক দেশের উদাহরণই আনা যায় খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে, যেখানে ব্যাপক খনিজ সম্পদ থাকার পরেও দেশের জনগণের কোন উন্নয়ন হয়নি। তুরস্কের জন্যে চ্যালেঞ্জ হবে তেল গ্যাস আহরণ করে তা সোমালিয়ার জনগণের প্রকৃত উন্নয়নে কাজে লাগানো। নতুবা তুরস্কের এই প্রচেষ্টা সমস্যায় পড়বে।

উসমানি খিলাফতের সময় সোমালিয়া তুর্কি প্রভাবে থাকার ইতিহাসকে উপজীব্য করেই তুরস্ক এক দশক আগে সোমালিয়াতে জড়িয়েছে। এরপর থেকে সোমালিয়াতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে তুরস্ক সবকিছুই করেছে। সামনের দিনগুলিতে, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক আদালতে সমুদ্রসীমা নিয়ে রায়ের পর, সোমালিয়ার উপকূলে তেল গ্যাস আহরণের জন্যেও তুরস্ক সর্বোচ্চ প্রচেষ্টাই চালাবে। এই প্রচেষ্টাতে কেনিয়া যদি বাধা দেবার চেষ্টা চালায়, তা তুরস্ককে সোমালিয়ার উপকূলে ভারত মহাসাগরে সামরিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে অনুপ্রেরণা যোগাবে। অর্থাৎ তেল গ্যাস আহরণের নিরাপত্তা দিতেই তুরস্ক সোমালিয়ার উপকূলে সামরিক অবস্থান তৈরি করবে। ভারত মহাসাগরে তুরস্কের অবস্থান এখনও তেমন উল্লেখ করার মতো নয়। তবে সোমালিয়া তুরস্কের জন্যে একটা বড় সুযোগ; যার মাধ্যমে পৃথিবীর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের উপর তুরস্ক একটা নৌঘাঁটি তৈরি করতে পারবে।

Tuesday, 12 October 2021

আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের নেতৃত্ব নিয়ে কেলেঙ্কারি কি দেখিয়ে দিচ্ছে?

১২ই অক্টোবর ২০২১

পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় সংস্থাদু’টার উদ্দেশ্য নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠছে, তখন সংস্থার কর্মকান্ডের মাঝে স্বচ্ছতার অভাব বিশ্বব্যাপী এর বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। অনেকেই অভিযোগ করছেন যে, জর্জিয়েভা মূলতঃ সংস্থার অর্থায়ন বৃদ্ধি করতে চীনের কাছ থেকে আরও বেশি বিনিয়োগ যোগাড় করতেই ইনডেক্সে চীনের অবস্থানকে পরিবর্তন করিয়েছেন। তবে এতেও যে ব্যাপারটা এড়ানো যায়না তা হলো, সংস্থাদু’টা এতকাল মূলতঃ তাদের যেসব কর্মকান্ডের মাধ্যমে পশ্চিমা উদ্দেশ্যকেই বাস্তবায়ন করেছে সেগুলির ভবিষ্যৎ এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

 
গত ৪ঠা অক্টোবর ‘ইন্টারন্যাশনাল মনেটারি ফান্ড’ বা আইএমএফএর এক্সিকিউটিভ বোর্ডের সাথে ‘উইলমার হেইল’ নামের এক আইনব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়। ‘উইলমার হেইল’এর ১৭ই সেপ্টেম্বরের এক তদন্ত রিপোর্টে বেরিয়ে এসেছে যে, আইএমএফএর প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা যখন বিশ্বব্যাংকের প্রধান ছিলেন, তখন সংস্থার ‘ডুইং বিজনেস ইনডেক্স’এর র‍্যাংকিংএ চীনের অবস্থানকে পরিবর্তন করা হয়। এই ইনডেক্সের অর্থ হলো একটা রাষ্ট্র প্রাইভেট সেক্টরের বিনিয়োগকে কতটা সহায়তা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয় যে, এক বছরে চীনের অবস্থান ৭৮ নম্বরে ছিল; যার পরের বছর ৮৫ নম্বরে নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখে চীনারা ক্ষুব্ধ ছিল। জর্জিয়েভা এবং সংস্থার অন্যান্য কর্মকর্তারা সেসময় ইনডেক্সের হিসেবকে পরিবর্তন করে চীনের অবস্থানকে আগের বছরের, অর্থাৎ ৭৮ নম্বরে নামিয়ে আনেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয় যে, জর্জিয়েভা ইনডেক্স হিসেবের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এনেছিলেন চীনের অবস্থানকে পরিবর্তন করার জন্যে। এই প্রতিবেদনের ফলশ্রুতিতে জর্জিয়েভাকে আইএমএফএর প্রধান হিসেবে বহাল রাখা হবে কিনা, তা নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই বলে যে, এই অভিযোগ খুবই গুরুতর এবং এসময় তারা জর্জিয়েভাকে সমর্থন করা বন্ধ করে দেয়। তবে এক সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্র জানায় যে, তারা জর্জিয়েভাকে তার পদ থেকে সরাবার চেষ্টা করবে না। বার্তা সংস্থা ‘ব্লুমবার্গ’ বলছে যে, ফরাসিরা ইতোমধ্যেই জর্জিয়েভার পক্ষে কথা বলেছিল এবং ব্রিটিশরাও একই পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’ জর্জিয়েভা এবং তার সমর্থকদের বরাত দিয়ে বলছে যে, সংস্থার ভেতর জর্জিয়েভার বিরোধীরা অভ্যুত্থান করতে চেয়েছিল; যারা জর্জিয়েভার ‘প্রগ্রেসিভ’ লক্ষ্যগুলির সাথে একমত নয়। তবে কেউ কেউ এধরণের বক্তব্যের পুরোপুরি বিরোধী। ‘নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর এবং অর্থনীতিতে নোবেল জয়ী পল রোমার কিছুদিন আগেও বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং রিসার্চ ডিভিশনের প্রধান ছিলেন। সেই হিসেবে তিনি সংস্থার ‘ডুইং বিজনেস ইনডেক্স’এর উপর যে কাজ হতো, তার মূল ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ‘ব্লুমবার্গ’এর সাথে এক সাক্ষাতে ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন যে, এই ইনডেক্সে ভালো অবস্থানে থাকার জন্যে আন্তর্জাতিকভাবে অনেক দেশের মাঝে প্রতিযোগিতা রয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে অনেক দেশই ইনডেক্সে তাদের স্কোরকে কিছুটা ভালো অবস্থানে দেখার জন্যে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করে। রোমার বলছেন যে, বিশ্বব্যাংকের মাঝে একটা সংস্কৃতি রয়েছে যে, ইনডেক্সের সংখ্যাগুলিকে রিভিউ করা এবং কিছু দেশকে অধিক সুবিধা দিয়ে তাদের স্কোরকে অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থানে রাখা। তিনি বলছেন যে, সংস্থার নেতৃত্ব চীনকে ভালো স্কোর দিয়ে হয়তো চীনের কাছ থেকে কিছু সুবিধা আদায় করতে চাইছিলেন, তবে সেব্যাপারে তিনি নিশ্চিত নন। তবে রোমারের অভিযোগ হলো যেসব দেশ ইনডেক্সে তাদের অবস্থানকে পরিবর্তন করতে চাপ সৃষ্টি করে, তারা স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য দেশের সাথে নিজেদের একটা পার্থক্য করে ফেলছে। এবং শেষ পর্যন্ত কিছু দেশকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে ইনডেক্স প্রকাশ করা হচ্ছে। এভাবে বিশ্বব্যাংক একদিকে একটা বৈজ্ঞানিক তথ্যের উৎস, আবার এটা একইসাথে একটা কূটনৈতিক সংস্থা। কারণ তারা বিভিন্ন দেশের সাথে কূটনৈতিক দেনদরবার চালায়। কিন্তু বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রকাশে যে বিশ্বাসযোগ্যতা দরকার, তা কূটনৈতিক আলোচনায় ছাড় দেবার মাধ্যমে তথ্যের উৎসের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় কঠোর নিয়মে ঘাটতি পড়ে যায়। এটা পুরো সংস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

‘সিএনবিসি’এর এক প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে যে, ১৯৪৪ সালে ‘ব্রেটন উডস কনফারেন্স’এর মাধ্যমে তৈরি করা আইএমএফ এবং বিশ্ব ব্যাংকের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে। আইএমএফ সাধারণতঃ এর সদস্য দেশগুলিকে স্বল্প মেয়াদে ঋণ দেয়, যাতে সেসব দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবিলা করা যায়। সদস্য দেশগুলির অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রেও আইএমএফএর বহুবিধ লক্ষ্য রয়েছে। অপরদিকে বিশ্বব্যাংকের কাজ হলো বিভিন্ন দেশে উন্নয়নমূলক প্রকল্পে অর্থায়ন করা এবং দারিদ্র্য বিমোচনে কাজ করা। বিশ্বব্যাংকের বেশিরভাগ কাজ উন্নয়নশীল দেশগুলিতে। উভয় সংস্থারই ১’শ ৮৯টা সদস্য। আইএমএফএর মূল অর্থায়ন হয় কোটা ব্যবস্থায়। এর মাধ্যমে সংস্থার মোট অর্থায়ন প্রায় ৬’শ ৭৫ বিলিয়ন ডলারের মতো। কোটা পদ্ধতিতে সংস্থার প্রায় ৩৬ শতাংশ ভোট চারটা দেশের হাতে; যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, চীন এবং জার্মানি। ফ্রান্স, ব্রিটেন এবং ইতালির হাতে রয়েছে আরও প্রায় ১২ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ মাত্র সাতটা দেশের হাতেই সংস্থার প্রায় অর্ধেক ভোট। সংস্থার সবচাইতে বড় ঋণগ্রহীতা দেশ হলো গ্রিস, ইউক্রেন, পর্তুগাল এবং পাকিস্তান। অপরদিকে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন আসে বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীদের মাঝে বন্ড ইস্যু করে ঋণ নেবার মাধ্যমে।

পল রোমার বলছেন যে, আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক একসময় বিশ্বের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ সেসময় একটা দেশের পক্ষে খুব বেশি উৎস থেকে ঋণ পাওয়া সম্ভব ছিল না। কাজেই দুই সংস্থাই সেসময় আন্তর্জাতিক পুঁজির জোগানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু বর্তমানে এই সংস্থাগুলি আন্তর্জাতিক পুঁজির বাজারের তুলনায় অনেক ছোট হয়ে গিয়েছে। এমতাবস্থায় উভয় সংস্থাই তাদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে নতুন কিছু করতে চাইছে। রোমার বলছেন যে, ১৯৫০এর দশকে এই সংস্থাগুলির উদ্দেশ্য যা ছিল, বর্তমান দুনিয়ার সাথে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; কাজেই এখন সময় এসেছে এই সংস্থাগুলির উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে চিন্তা করার। তিনি মনে করছেন যে, এই সংস্থার এখন সবচাইতে বড় কাজ হলো বিভিন্ন দেশের মাঝে কূটনৈতিক আলোচনা সচল রাখা।

আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার অতি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় সংস্থাদু’টার উদ্দেশ্য নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠছে, তখন সংস্থার কর্মকান্ডের মাঝে স্বচ্ছতার অভাব বিশ্বব্যাপী এর বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। শক্তিশালী দেশগুলি যদি সংস্থার ‘ডুইং বিজনেস ইনডেক্স’এর হিসাবের প্রতিবাদ করে র‍্যাঙ্কিংএ পরিবর্তন আনতে পারে, তাহলে বাকি দেশগুলির সদস্যপদের গুরুত্ব যতটুকুইবা ছিল, তা অর্থহীন হয়ে যায়। তদুপরি অনেকেই অভিযোগ করছেন যে, জর্জিয়েভা মূলতঃ সংস্থার অর্থায়ন বৃদ্ধি করতে চীনের কাছ থেকে আরও বেশি বিনিয়োগ যোগাড় করতেই ইনডেক্সে চীনের অবস্থানকে পরিবর্তন করিয়েছেন। তবে এতেও যে ব্যাপারটা এড়ানো যায়না তা হলো, সংস্থাদু’টা এতকাল মূলতঃ তাদের যেসব কর্মকান্ডের মাধ্যমে পশ্চিমা উদ্দেশ্যকেই বাস্তবায়ন করেছে সেগুলির ভবিষ্যৎ এখন প্রশ্নবিদ্ধ।



Sunday, 10 October 2021

কানাডার সাথে ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা চুক্তি কি আসন্ন?

১০ই অক্টোবর ২০২১

ছবিঃ ২০১৮ সালের মার্চ। ব্রিটিশ রয়াল নেভির পারমাণবিক সাবমেরিন ‘ট্রেনচ্যান্ট’ আর্কটিকের বরফ ফুঁড়ে উঠে এসেছে। ব্রিটেন তার পারমাণবিক সাবমেরিন সক্ষমতাকে কানাডার আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্যে ব্যবহার করতে চাইছে। কিন্তু এত কাছের বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও কানাডার সাথে আর্কটিকের ‘নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ’এর সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব রয়েছে। একারণেই কানাডা ব্রিটেনের প্রস্তাবের ব্যাপারে এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।

 
সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে কানাডার মিডিয়া ‘সিবিসি’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, কানাডার সর্বউত্তরের উত্তর মেরুর কাছাকাছি অতিশীতল অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্রিটেন তার সামরিক সক্ষমতাকে কানাডার সহায়তায় মোতায়েন করতে চাইছে; বিশেষ করে ব্রিটেন তার পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনগুলিকে উত্তরাঞ্চলে নজরদারি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে কানাডার সহায়তায় ব্যবহার করতে চাইছে। ‘সিবিসি’র সাথে সাম্প্রতিক এক সাক্ষাতে ব্রিটেনের সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল নিক কার্টার বলেন যে, ব্রিটেন কানাডার উত্তরাঞ্চলে বেঁচে থাকা এবং যুদ্ধ করার ব্যাপারে শিখতে ইচ্ছুক; এবং তারা সেই হিসেবে কানাডার সাথে সহযোগিতার জন্যে যথেষ্ট আগ্রহী। আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কানাডাকে যা যা করতে হবে, ব্রিটেন সেই ব্যাপারগুলিতে সহযোগিতা করতে চায়। নিক কার্টারের এই প্রস্তাবখানা প্রকৃতপক্ষে কয়েক মাস আগেই কানাডার সরকারি বিভিন্ন মহলে দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, কানাডার কোন সরকারই আর্কটিক অঞ্চলে কোন রাষ্ট্রকেই অবস্থান নিতে দেয়নি; এমনকি সবচাইতে কাছের বন্ধু রাষ্ট্রগুলিকেও। এর মূল কারণ হলো কানাডার আর্কটিক অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব নিয়ে অনেকগুলি দেশের মাঝে প্রতিযোগিতা রয়েছে। তবে ‘সিবিসি’ বলছে যে, কানাডার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ড্যানিয়েল মিনডেন এক ইমেইলে ব্রিটেনের এই প্রস্তাবের ব্যাপারে নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে চাননি।

তবে ‘সিবিসি’ বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং অস্ট্রেলিয়ার মাঝে সাম্প্রতিক ‘অকাস’ প্রতিরক্ষা চুক্তি থেকে কানাডার বাদ পড়ার ব্যাপারটা হয়তো ব্রিটেনের প্রস্তাবের ব্যাপারে কানাডাকে নতুন করে ভাবাবে। ন্যাটোর সদস্য হিসেবে ব্রিটেন এবং কানাডা নিয়মিত নরওয়েতে শীতকালীন মহড়ায় অংশ নেয়। আর কানাডার এলবার্টা রাজ্যের সাফিল্ডের বিশাল ভূখন্ডে ব্রিটেন বহু বছর ধরে তার সেনাবাহিনীর আর্মার্ড এবং কম্বাইন্ড অপারেশনের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কানাডার বন্ধু রাষ্ট্রগুলি আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার নতুন করে সামরিক অবস্থান শক্তিশালীকরণ এবং সেই অঞ্চলে চীনের মতো প্রতিযোগী রাষ্ট্রের কর্মকান্ড বৃদ্ধির ব্যাপারে কথা বলছে।

কানাডার আর্কটিকের নিরাপত্তা

২০০৬ সালে কানাডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী স্টিভেন হারপারএর কনজারভেটিভ সরকার আর্কটকের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলতে শুরু করে। এই হিসেবে আর্কটিক অফশোর প্যাট্রল শিপ প্রকল্পের সূচনা করে কানাডা সরকার। ২০১১ সালে ছয় থেকে আটটা জাহাজ তৈরির এই প্রকল্প শুরু করা হয়, যেগুলি বরফাচ্ছাদিত অঞ্চলে চলাচল করতে সক্ষম হবে। কিন্তু এই প্রকল্পের বাজেট যোগাড় করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ২০১৫ সালে জাহাজ নির্মাণ শুরু হয়। ‘হ্যারি ডে উলফ ক্লাস’এর সাড়ে ৬ হাজার টনের এই জাহাজগুলি গত ৫০ বছরে কানাডায় তৈরি সবচাইতে বড় সামরিক জাহাজ। ২০২১ সাল পর্যন্ত দু’টা জাহাজ তৈরি শেষ হয়েছে। এই জাহাজগুলির সহায়তায় কানাডার উত্তরের বাফিন দ্বীপের নুনাভুত এলাকায় ‘নানিসিভিক নেভাল ফ্যাসিলিটি’ তৈরি করা শুরু হয়। এখান থেকে জাহাজগুলি জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারবে। তবে এই জাহাজগুলি এবং নতুন সামরিক স্থাপনা কানাডার উত্তরের পানির নিচের নজরদারি এবং স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নজরদারির চ্যালেঞ্জগুলির সমাধান দেয় না। এখানেই কানাডার সহায়তায় আসতে চাইছে ব্রিটেন।

‘সিবিসি’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ব্রিটেনের সেটাই রয়েছে যা কানাডার নেই; আর তা হলো পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন; যা কিনা বরফের নিচে লম্বা সময় থাকতে পারে। কানাডা ব্রিটেনের কাছ থেকে ১৯৮০এর দশকে তৈরি চারটা ডিজেল সাবমেরিন কেনে ১৯৯০এর দশকের শেষের দিকে। তারা চেয়েছিল এই সাবমেরিনগুলিকে আরও উন্নত করে সেগুলির বরফের নিচে থাকার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে। কিন্তু সেই পরিকল্পনাও ভেস্তে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে আর্কটিক অঞ্চলে রুশ সাবমেরিনের আনাগোনা বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্চ মাসে রাশিয়ার তিনটা সাবমেরিন একই সময়ে আর্কটিকের বরফ ফুঁড়ে উপরে উঠে আসে। কানাডার প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ‘ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারি’র প্রফেসর রব হিউবার্ট প্রশ্ন করছেন যে, কানাডার কি সক্ষমতা রয়েছে রুশ এবং চীনা সাবমেরিন মোকাবিলা করার? তিনি বলছেন যে, ব্রিটিশরা সর্বপ্রথমে এই সক্ষমতাটাই আর্কটিকে নিয়ে আসছে। হিউবার্ট বলছেন যে, কানাডা আর্কটিকে তার সবচাইতে কাছের বন্ধুদেরও অবস্থান দিতে নারাজ। কারণ ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই কানাডার উত্তরাঞ্চলের আর্কটিক দ্বীপপুঞ্জের মাঝ দিয়ে যাওয়া ‘নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ’এর সার্বভৌমত্ব কানাডার বলে স্বীকার করে না। এই প্যাসেজের মাধ্যমে আটলান্টিক এবং প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে যাতায়াত করা যায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আর্কটিকে ব্যাপকভাবে বরফ গলতে থাকায় এই রুটে জাহাজ চলাচল নিয়ে কথা শুরু হয়েছে। ২০০৮ সালে কানাডার কোস্ট গার্ড এই প্যাসেজের মাঝ দিয়ে প্রথম বাণিজ্যিক জাহাজ ‘ক্যামিলিয়া দেসগাগনেস’এর চলাচল নিশ্চিত করে। ২০১৩ সালে ‘নরডিক ওরাইয়ন’ নামের একটা কয়লাবাহী জাহাজ কানাডার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের ভ্যাঙ্কুভার থেকে সাড়ে ৭৩ হাজার টন কয়লা নিয়ে ‘নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ’ ব্যবহার করে ৩৩ দিনের মাঝে ইউরোপের ফিনল্যান্ডে পৌঁছে। বেশি গভীরতার হবার কারণে এই ওজন নিয়ে জাহাজটার পানামা খাল অতিক্রম করতে পারার কথা ছিল না। ২০১৬ সালে ‘ক্রিস্টাল সেরেনিটি’ নামের একটা যাত্রীবাহী ক্রুজ শিপ ১৭’শ যাত্রী নিয়ে এই প্যাসেজ অতিক্রম করে।

‘কানাডিয়ান গ্লোবাল এফেয়ার্স ইন্সটিটিউট’এর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেইভ পেরি বলছেন যে, ব্রিটিশদের প্রস্তাব বলে দিচ্ছে যে, আর্কটিক অঞ্চলে কানাডার অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে হবে; যা জাস্টিন ট্রুডোর অধীন বর্তমান লিবারাল সরকারের জন্যে একটা ঘুম থেকে জেগে ওঠার ডাক। তিনি আরও বলছেন যে, ‘অকাস’ চুক্তি দেখিয়ে দিচ্ছে যা কানাডার সবচাইতে কাছের বন্ধু রাষ্ট্রগুলি নিজেদের মাঝে আরও কাছাকাছি এবং আরও ছোট ক্লাব তৈরি করছে। আর যুক্তরাষ্ট্র এমন বন্ধু চাইছে যারা অন্ততঃ নিজেদের ওজন বহন করতে সক্ষম।

 
ছবিঃ কানাডিয়ান বিমান বাহিনীর ‘সিএফ ১৮’ যুদ্ধবিমান। ১৯৮৩ সাল থেকে এই বিমানগুলি উড়ছে। বিশ্বব্যাপী বহু মিশনে এই বিমানগুলি ব্যবহৃত হলেও এগুলিকে প্রতিস্থাপনের ব্যাপারে কানাডার কোন সরকারই সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। হয়তো তা কানাডার প্রতিরক্ষা চিন্তারই ফসল। কানাডা হলো একটা অগ্নিনিরোধক বাড়ি; যা দাহ্য বস্তু থেকে বহু দূরে।


কানাডা হলো অগ্নিরিরোধক বাড়ি

‘দ্যা কনভারসেশন’এর এক লেখায় ‘কানাডিয়ান ফোর্সেস কলেজ’এর প্রফেসর পল টি মিচেল ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন যে, কানাডিয়রা তাদের নিরাপত্তাকে কিভাবে দেখে। ১৯২৪ সালে কানাডার রাজনীতিবিদ রাউল ডানডুরান্ড বলেন যে, কানাডা হলো একটা অগ্নিনিরোধক বাড়ি; যা দাহ্য বস্তু থেকে বহু দূরে। তিনি প্রকৃতপক্ষে ১৮৬৭ সাল থেকে কানাডার প্রতিরক্ষা চিন্তাকেই তুলে ধরেন। সহজ কথা বলতে গেলে, তিনটা মহাসাগরের মাঝে অবস্থান এবং একটা সুপারপাওয়ারের পাশে থাকার কারণে কানাডিয়দের নিজেদের প্রতিরক্ষা নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই। ১৯৫০এর দশক থেকেই কানাডার সকল সরকারের প্রতিরক্ষানীতির মূল কর্মকান্ড ছিল তিনটা; কানাডাকে রক্ষা করা; উত্তর আমেরিকাকে রক্ষা করা; এবং আন্তর্জাতিক শান্তি এবং নিরাপত্তায় সহায়তা করা। এই ব্যাপারগুলি এতটাই অপরিবর্তনীয় রয়েছে যে, সাম্প্রতিক নির্বাচনেও প্রতিরক্ষার ব্যাপারটা নিয়ে কেউ কোন কথাই বলেনি। অনেকেই মনে করেন যে, কানাডার প্রকৃতপক্ষে কনস্টাবুলারি বাহিনী ছাড়া আর কিছুর দরকার নেই; যাদের কাজ হবে বনের দাবানল থামানো এবং মানুষকে বিপদে উদ্ধার করা। কেবলমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেরই সক্ষমতা আছে কানাডাকে আক্রমণ করার। এটা হয়তো বাস্তবে হবে না; তবে যদি এটা হয়েই যায়, তাহলে মিচেলের ব্যাখ্যা হলো, কানাডা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সহায়তার আবেদন জানাবে।

১৯৫০এর দশক থেকেই কানাডা তার সামরিক সক্ষমতা কমাচ্ছে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে কানাডার বিমান বাহিনীর ‘সিএফ ১৮’ যুদ্ধবিমানগুলিকে প্রতিস্থাপনের গুরুত্ব বোঝা গেলেও সকল সরকারই এই বিমানগুলির ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীনতায় পড়েছে। এমনকি প্রতিরক্ষা নিয়ে বেশি চিন্তিত কনজারভেটিভ সরকারও এব্যাপারে কিছু করতে পারেনি। অথচ যুগে যুগে কানাডা বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন যুদ্ধে জড়িয়েছে এবং এই বিমানগুলিই সার্ভিস দিয়ে গেছে। ১৯৮৩ সালে কানাডার বিমান বাহিনী ১’শ ৩৮টা ‘সিএফ ১৮’ বিমান সংগ্রহ শুরু করে। বিমানগুলি ১৯৯১ সালে ইরাক যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়। এরপর ১৯৯০এর দশকে কসভোতে; ২০১১ সালে লিবিয়াতে; এমনকি সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আইসিসের বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হয়েছে। প্রায় চার দশক ধরে ব্যবহারের পরে এখন মাত্র ৮৫টার মতো বিমান সার্ভিসে রয়েছে। এই বিমানগুলিকে আরও সময় সার্ভিসে রাখার জন্যে অস্ট্রেলিয়ার বিমান বাহিনী থেকে রিটায়ার করা একই ধরনের ১৮টা বিমান এর সাথে যুক্ত করা হয়।

কানাডা তার সামরিক সক্ষমতা কমাতে থাকলেও তার বৈশ্বিক দায়িত্ব থেকে সে সড়ে আসেনি। কাজেই বিভিন্ন সময়ে কানাডা যুদ্ধে জড়িয়েছে; এবং প্রতিবারই কানাডার সামরিক বাহিনী সেই দায়িত্ব পালনের জন্যে তৈরি ছিল না। কারণ কানাডিয়রা মনে করেছে যে, তাদের সামরিক সক্ষমতার ব্যাপারে চিন্তার দরকার নেই। পল মিচেল বলছেন যে, কানাডিয়দের এহেন চিন্তার ফলে বর্তমান আইনের শাসনের উপর প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে রক্ষার ব্যাপারে কানাডিয়দের কতটা সদিচ্ছা রয়েছে, তা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। অর্থাৎ সামরিক সক্ষমতার ব্যাপারে উদাসীনতা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, পশ্চিমা আদর্শকে রক্ষার পিছনে কানাডার চেষ্টার ঘাটতি রয়েছে।

সেপ্টেম্বর ২০২১; নির্বাচনে জয়লাভ করেছে জাস্টিন ট্রুডোর লিবারাল পার্টি। ১৯৫০এর দশক থেকে কানাডার কোন নির্বাচনেই প্রতিরক্ষা কোন আলোচ্য বিষয়বস্তুই ছিল না। বিশেষ করে ২০২০ সালে লিবারাল সরকার কানাডার জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৪৫ শতাংশ প্রতিরক্ষায় খরচ করায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নিয়মিত বিরোধের মাঝে রয়েছে।



কানাডার লিবারাল সরকার এবং প্রতিরক্ষা বাজেট

জ্যেষ্ঠ কানাডিয় সাংবাদিক এবং মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা আটলান্টিক কাউন্সিল’এর সিনিয়র ফেলো ডাইএন ফ্রান্সিস ‘ফিনানশিয়াল পোস্ট’এর লেখায় কানাডার প্রতিরক্ষানীতির ব্যাপক সমালোচনা করেন। তিনি বলছেন যে, কানাডার আর্কটিকে রুশ এবং চীনা হুমকি মোকাবিলায় কানাডা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে; যার ফলশ্রুতিতে যুক্তরাষ্ট্র কিছু দায়িত্ব নিয়েছে; আর ব্রিটিশরাও এখন এখানে জড়িত হতে চাইছে। প্রশান্ত মহাসাগরে অস্ট্রেলিয়া চীনের হুমকি বুঝতে পেরেছে বলেই যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের সাথে চুক্তি করেছে এবং আটটা পারমাণবিক সাবমেরিন কেনার পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু কানাডা এখনও চীনের হুমকি মোকাবিলায় চিন্তা করছে না। একইসাথে আর্কটিকে কানাডার সক্ষমতা একেবারেই যথেষ্ট নয়। আর লিবারাল সরকার প্রতিরক্ষা বাজেট যেমন একেবারেই কমিয়ে রেখেছে, তেমনি আর্কটিক অঞ্চলও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রতিরক্ষার ব্যাপারে কানাডার সিদ্ধান্তহীনতা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি। শুধু তাই নয়, ন্যাটোর মাঝে কানাডার অবস্থান সন্মানজনক নয়। ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের সদস্যরা মনে করে যে, কানাডার ইন্টেলিজেন্সের উপর নির্ভর করা যায় না; কারণ তারা তথ্য গোপন রাখতে অক্ষম। ফ্রান্সিস বলছেন যে, কানাডার সবচাইতে কাছের বন্ধুরা কানাডার নিরাপত্তা নিজেদের হাতে নিতে চাইছে; কারণ কানাডার লিবারাল সরকার সার্বভৌম রাষ্ট্রের মতো কাজ করতে চাইছে না।

কানাডার প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রকল্প ‘নেটওয়ার্ক ফর স্ট্র্যাটেজিক এনালিসিস’এর এক লেখায় মাক্সান্ড্রে ফোর্টিয়ের ব্রিটেন এবং আস্ট্রেলিয়ার উদাহরণ টেনে নিয়ে আসছেন। তিনি বলছেন যে, কানাডার উচিৎ এই দুই দেশের মতো নিজেদের উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে চিন্তা করা। ব্রিটেন এবং অস্ট্রেলিয়া তাদের আকাংক্ষা বাস্তবায়নে যা দরকার সেগুলি যোগাড় করায় মনোনিবেশ করেছে। করোনাভাইরাসের মাঝে অর্থনৈতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও এবং অস্ট্রেলিয়ার দাবানলে মারাত্মক ক্ষতির পরেও এই দেশগুলি ন্যাটোর ঠিক করে দেয়া জিডিপির ২ শতাংশ প্রতিরক্ষায় খরচ করেছে। প্রতিরক্ষার পিছনে কম খরচ করাটা কানাডার সাথে তার বন্ধু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনার কারণ। তিনি ২০২০ সালের একটা জনমত জরিপের বরাত দিয়ে বলছেন যে, কানাডার জনগণ এখন সামরিক বাহিনীতে বিনিয়োগ করার পক্ষে। কাজেই এখন কানাডার প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় না করাটা অর্থহীন। উল্লেখ্য যে, কানাডার লিবারাল সরকার ২০২০ সালে কানাডার জিডিপির ১ দশমিক ৪৫ শতাংশ প্রতিরক্ষায় খরচ করেছে।

‘রয়াল মিলিটারি কলেজ অব কানাডা’র প্রফেসর প্রাক্তন সামরিক অফিসার রস ফেটারলি কানাডার রাজনীতিতে সামরিক বাজেটের বিষয়টাকে নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলছেন যে, প্রতিরক্ষার বিষয়গুলি সবসময়ই দীর্ঘমেয়াদি এবং কানাডিয়দের কাছে এর সুবিধাগুলি সরাসরি নয়। অপরদিকে রাজনৈতিক দলগুলি এমন ইস্যুগুলি নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকে, যেগুলি মানুষের জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করে। নির্বাচনে জেতার জন্যে রাজনৈতিক দলগুলি সর্বদাই অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলি নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকে। অথচ কানাডার বাইরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলিই কিন্তু কানাডাকে দূরে কোথাও সৈন্য প্রেরণে বাধ্য করেছে। চার বছরের জন্যে যে সরকার নিয়োগ পেয়েছে, সেই সরকারের রেখে যাওয়া সিদ্ধান্তগুলি পরবর্তী দুই দশকের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ হবে। কাজেই কানাডার সরকারের উচিৎ হবে পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতি বিচার করেই বর্তমান প্রতিরক্ষানীতিকে নতুন করে দেখা এবং এতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সাধন করা। 

কানাডা আর্কটিকে তার সবচাইতে কাছের বন্ধুদেরও অবস্থান দিতে নারাজ। কারণ ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই কানাডার উত্তরাঞ্চলের আর্কটিক দ্বীপপুঞ্জের মাঝ দিয়ে যাওয়া ‘নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ’এর সার্বভৌমত্ব কানাডার বলে স্বীকার করে না।


‘অকাস’ চুক্তির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব এখনও সবে সামনে আসছে। ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর মাঝে অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডার চিন্তাগত পার্থক্যগুলি এখনও পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান। অস্ট্রেলিয়া চীনকে যতটা হুমকি হিসেবে দেখছে, কানাডা ততটা হুমকি হিসেবে দেখছে না। নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইস্যুগুলিকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে কানাডার সরকার পশ্চিমা আদর্শকে রক্ষা করার আন্তর্জাতিক দায়িত্বকে দ্বিতীয় সাড়ির দায়িত্ব হিসেবে দেখেছে। একারণে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কানাডা সরকারের টানাপোড়েন চলছেই। এখন এখানে ব্রিটেনও যোগ হয়েছে। কানাডার রাষ্ট্রীয় চিন্তাবিদদের মাঝে প্রতিরক্ষা বিষয়ে খরচ বৃদ্ধি করার ব্যাপারে যথেষ্ট একাত্মতা থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলি এখনও ভোট পাবার জন্যে অভ্যন্তরীণ ইস্যুগুলির উপরেই নির্ভরশীল। সুরক্ষিত ‘অগ্নি নিরোধক বাড়ি’র সাথে নিজেদের অবস্থানকে তুলনা করে কানাডিয়রা প্রতিরক্ষা খাতে নিজেদের ব্যয় বৃদ্ধি করতে চাইছে না। আবার আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা দেবার সক্ষমতা খুব কম থাকলেও সেখানে ‘নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ’এর সার্বভৌমত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের সাথে দ্বন্দ্বের মাঝে রয়েছে কানাডা। একারণেই আর্কটিকের বরফের নিচে ব্রিটিশ পারমাণবিক সাবমেরিন মোতায়েনের প্রস্তাবটা এখনও কানাডার সরকারের কাছে আলোচ্য বিষয়। ইংরেজি ভাষাভাষী ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের সদস্য হবার পরেও দেশগুলির মাঝে বিরোধ লক্ষ্যণীয়।