Showing posts with label World Bank. Show all posts
Showing posts with label World Bank. Show all posts

Saturday, 30 October 2021

সুদানে অভ্যুত্থান মূলতঃ পশ্চিমা হস্তক্ষেপেরই ফলাফল

৩০শে অক্টবর ২০২১

ওয়াশিংটন আপাততঃ সুদানের অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধাচরণ করলেও সুদানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দেখিয়ে দেয় যে, মার্কিনীরা সুদানের সামরিক বাহিনীর সাথে সম্পর্ক কখনোই কর্তন করেনি। ওমর আল বশির ক্ষমতায় থাকার সময়েই যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদের সমর্থনকারী দেশের তালিকা থেকে সুদানের নাম সরিয়ে নেয়। বিনিময়ে সুদান মানবাধিকার বিষয়ে সুদানের কিছু আইন পরিবর্তন করে। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনেই সৌদি আরব সুদানকে তেল সরবরাহসহ আর্থিক সহায়তা দিতে থাকে।

 
গত ২৫শে অক্টোবর আফ্রিকার দেশ সুদানে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর থেকে দেশটার চরমভাবে বিভক্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব অর্থহীন হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সুদানের মারাত্মক অর্থনৈতিক বিপর্জয় ২০১৯ সালে একনায়ক ওমর আল বশিরের সরকারের পতনের পিছনে নেতৃত্ব দেয়া জোট ‘ফোর্সেস অব ফ্রিডম এন্ড চেইঞ্জ’ বা ‘এফএফসি’কে মানুষের কাছে হেয় করেছে। ২০১৯ সালের অগাস্টে দেশ পরিচালনার জন্যে ‘এফএফসি’এর মনোনীত পাঁচজন এবং সেনাবাহিনীর মনোনীত পাঁচজন সদস্য মিলে ‘সভেরেইন কাউন্সিল’ গঠন করেছিল। তবে দুই বছরের মাঝে ‘এফএফসি’র নেতৃবৃন্দ দেশটাকে কোনরূপ দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের সম্ভাবনার কথা বেশ কিছুদিন আগ থেকেই শোনা যাচ্ছিল। ২০২২ সালের নভেম্বরে প্রতিশ্রুত গণতান্ত্রিক নির্বাচনের আগেই এই অভ্যুত্থানকে শুধু সুদানের অভ্যন্তরীণ আঙ্গিক থেকে নয়, বরং দেশটা আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে।

সুদানের দুই রাজনৈতিক দল গত ২রা অক্টোবর একটা নতুন জোট গঠন করে। মিনি মিনাউইএর নেতৃত্বে ‘সুদান লিবারেশন মুভমেন্ট’ এবং জিবরিল ইব্রাহিমের নেতৃত্বে ‘জাস্টিস এন্ড ইকুয়ালিটি মুভমেন্ট’ এই জোট গঠন করে। এই দলগুলি ২০২০এর অক্টোবরে সুদান সরকারের সাথে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। এরপর থেকে উভয় নেতাই এতদিন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন। মিনাউই বলেন যে, তারা চান যে, ‘এফএফসি’র নেতারা তাদের কথা শুনবেন। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, এর ফলে ‘এফএফসি’এর বিভাজন আরও গভীর হয়। এই দুই রাজনৈতিক দল মূলতঃ দারফুর অঞ্চলের সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠন; যারা বশির সরকারের সময় আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের জন্যে যুদ্ধ করেছে। ‘এফএফসি’র মাঝে আরও রয়েছে দক্ষিণ সুদানের সীমানায় অবস্থিত কুরদুফান অঞ্চলের বিদ্রোহী দল ‘সুদান পিপলস লিবারেশন মুভমেন্ট নর্থ’। এছাড়াও রয়েছে দারফুরের ওয়াহিদ আল নূরএর নেতৃত্বে ‘সুদান লিবারেশন মুভমেন্ট’এর আরেক অংশ। অস্ত্র নিয়ে সংগ্রাম করা এই দলগুলি একত্রে ‘সুদান রেভোলিউশনারি ফ্রন্ট’ নামে ‘এফএফসি’র মাঝে ছিল। এই আঞ্চলিক বিদ্রোহী গ্রুপগুলি সুদানের ভৌগোলিক অখন্ডতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই গ্রুপগুলিকে আঞ্চলিক এবং পশ্চিমা শক্তিরা সরাসরি বা প্রচ্ছন্ন সমর্থন দিয়েছে। সবচাইতে বড় উদাহরণ ছিল দক্ষিণ সুদান, যা সুদান থেকে আলাদা হয়ে যায় পশ্চিমা মদদে।

‘এফএফসি’র আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ‘ন্যাশনাল কনসেনসাস ফোর্সেস’; যাদের মূল নেতৃত্ব ছিল জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক দলগুলির হাতে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী সাদিক আল মাহদির প্রতিষ্ঠা করা ‘ন্যাশনাল উম্মা পার্টি’র সাথে কোয়ালিশনে ছিল বামপন্থী ‘সুদানিজ বাথ পার্টি’, ‘সুদানিজ কমিউনিস্ট পার্টি’ এবং হাসান আল তুরাবির প্রতিষ্ঠা করা ‘পপুলার কংগ্রেস পার্টি’। এই দলগুলি বরাবরই পশ্চিমা, বিশেষ করে ইউরোপের কাছ থেকে সমর্থন পেয়েছে। ১৯৮৯ সালে সাদিক আল মাহদির সরকারকে উৎখাত করেই ওমর আল বশির ক্ষমতা দখল করেছিলেন। এরপর থেকে মাহদি বশির সরকারের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। ‘এফএফসি’তে আরও অংশীদার ছিল বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের সমন্বয়ে গঠিত ‘সুদানিজ প্রফেশনালস এসোসিয়েশন’ এবং আরও কিছু নারীবাদী সংগঠন; যেগুলি গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের মাপকাঠিতে ইউরোপ থেকে সরাসরি সমর্থন পেয়েছে।

সুদানের অর্থনৈতিক দৈন্যতাকে পশ্চিমা নীতি থেকে আলাদা করে দেখা যাবে না। এবছরের ২৯শে জুন ‘ইন্টারন্যাশনাল মনেটারি ফান্ড বা ‘আইএমএফ’এর প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা এবং বিশ্বব্যাংকের প্রধান ডেভিড ম্যালপাসের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, সংস্থাগুলির শর্ত হিসেবে সুদান তার নিজস্ব মুদ্রার মূল্যমান পুনর্নিধারণ করার পর বিশ্বব্যংকের ঋণ শোধ করে। এতে তিন দশক পর বিশ্বব্যংকের সাথে সুদানের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। বিশ্বব্যংকের শর্ত মানার পুরষ্কার হিসেবে ‘আইএমএফ’ দেশটার ২৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণ মওকুফ করে। এই মওকুফ সামনের দিনগুলিতে ৫০ বিলিয়ন ডলার বা দেশটার মোট বৈদেশিক ঋণের ৯০ শতাংশ ছাপিয়ে যাবে। তবে ঋণ মাফের শর্ত হিসেবে মুদ্রামান কমিয়ে ফেলায় সুদানে মুদ্রাস্ফীতি মারাত্মক আকার ধারণ করে। দ্রব্যমূল্যের ব্যাপক ঊর্ধগতির সাথে যুক্ত হয় চরম বেকারত্ব; যা কিনা জনগণকে দেশটার রাস্তায় নামায়। সুদানের বিরোধী রাজনীতিবিদেরা এই অসন্তোষের সুযোগ নিয়ে বশিরের সরকারকে উৎখাতে সফলতা পেলেও সেই একই অসন্তোষ বেসামরিক ও সামরিক যৌথ নেতৃত্বকে অর্থহীন করেছে।

ওমর আল বশির ক্ষমতায় থাকার সময়েই যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদের সমর্থনকারী দেশের তালিকা থেকে সুদানের নাম সরিয়ে নেয়। বিনিময়ে সুদান মানবাধিকার বিষয়ে সুদানের কিছু আইন পরিবর্তন করে। দক্ষিণ সুদানের তেলখনিগুলি সুদান থেকে আলাদা হয়ে যাবার পর থেকেই সুদানের অর্থনীতি বিপদে পড়ে। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনেই সৌদি আরব সুদানকে তেল সরবরাহসহ আর্থিক সহায়তা দিতে থাকে। ইয়েমেনের যুদ্ধে সুদান সৌদিদের পক্ষে সৈন্যও প্রেরণ করে। গত এপ্রিলে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ঘোষণা দেয় যে, কৃষিখাতে তারা এবছর সুদানকে ৪’শ মিলিয়ন ডলার দেবে। এই সহায়তা মূলতঃ ৩ বিলিয়ন ডলারের মূল সহায়তার অংশ। সুদান সরকারের বরাত দিয়ে ‘ভয়েস অব আমেরিকা’ বলে যে, এর মাঝে সাড়ে ৭’শ মিলিয়ন ডলার ইতোমধ্যেই সুদান পেয়ে গেছে; যার মাঝে ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্যে ৫’শ মিলিয়ন ডলারের পুঁজি। দুই বছর আগের আরও দেড় বিলিয়ন ডলারের অনুদানও নিশ্চিত করা হয়। ‘আরব নিউজ’ বলছে যে, অভ্যুত্থানে সৌদিরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং তারা সকল পক্ষকে আলোচনার টেবিলে দেখতে চায়।

ওয়াশিংটন আপাততঃ সুদানের অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধাচরণ করলেও সুদানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দেখিয়ে দেয় যে, মার্কিনীরা সুদানের সামরিক বাহিনীর সাথে সম্পর্ক কখনোই কর্তন করেনি। মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘দ্যা আটলান্টিক কাউন্সিল’এর সিনিয়র ফেলো ক্যামেরন হাডসন এক লেখায় সুদানের সমস্যার জন্যে সামরিক বাহিনীকে পুরোপুরি দায়ী করেন। তার কথায়, সুদানের সেনাবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বোকা বানিয়েছে’; যা বারংবার হতে দেয়া যায় না। তিনি অবশ্য সুদানের অর্থনীতিতে ‘আইএমএফ’ এবং বিশ্বব্যাংকের চাপিয়ে দেয়া শর্তের ফলাফলগুলি ঠিকই এড়িয়ে যান। তবে আরবের মার্কিন বন্ধু দেশগুলির সুদানের সাথে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, সুদানের অভ্যুত্থানে মিশর, সৌদি বা আমিরাত যেন সরাসরি সমর্থন না দেয়, সেজন্য ওয়াশিংটন যথেষ্ট কূটনৈতিক তৎপরতা চালায়। সুদানের রাজনীতিতে ইউরোপের প্রভাবের কথাও তিনি আলোচনায় আনেননি; যা বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে পরিপূর্ণতা দেয় না।



Tuesday, 12 October 2021

আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের নেতৃত্ব নিয়ে কেলেঙ্কারি কি দেখিয়ে দিচ্ছে?

১২ই অক্টোবর ২০২১

পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় সংস্থাদু’টার উদ্দেশ্য নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠছে, তখন সংস্থার কর্মকান্ডের মাঝে স্বচ্ছতার অভাব বিশ্বব্যাপী এর বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। অনেকেই অভিযোগ করছেন যে, জর্জিয়েভা মূলতঃ সংস্থার অর্থায়ন বৃদ্ধি করতে চীনের কাছ থেকে আরও বেশি বিনিয়োগ যোগাড় করতেই ইনডেক্সে চীনের অবস্থানকে পরিবর্তন করিয়েছেন। তবে এতেও যে ব্যাপারটা এড়ানো যায়না তা হলো, সংস্থাদু’টা এতকাল মূলতঃ তাদের যেসব কর্মকান্ডের মাধ্যমে পশ্চিমা উদ্দেশ্যকেই বাস্তবায়ন করেছে সেগুলির ভবিষ্যৎ এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

 
গত ৪ঠা অক্টোবর ‘ইন্টারন্যাশনাল মনেটারি ফান্ড’ বা আইএমএফএর এক্সিকিউটিভ বোর্ডের সাথে ‘উইলমার হেইল’ নামের এক আইনব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়। ‘উইলমার হেইল’এর ১৭ই সেপ্টেম্বরের এক তদন্ত রিপোর্টে বেরিয়ে এসেছে যে, আইএমএফএর প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা যখন বিশ্বব্যাংকের প্রধান ছিলেন, তখন সংস্থার ‘ডুইং বিজনেস ইনডেক্স’এর র‍্যাংকিংএ চীনের অবস্থানকে পরিবর্তন করা হয়। এই ইনডেক্সের অর্থ হলো একটা রাষ্ট্র প্রাইভেট সেক্টরের বিনিয়োগকে কতটা সহায়তা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয় যে, এক বছরে চীনের অবস্থান ৭৮ নম্বরে ছিল; যার পরের বছর ৮৫ নম্বরে নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখে চীনারা ক্ষুব্ধ ছিল। জর্জিয়েভা এবং সংস্থার অন্যান্য কর্মকর্তারা সেসময় ইনডেক্সের হিসেবকে পরিবর্তন করে চীনের অবস্থানকে আগের বছরের, অর্থাৎ ৭৮ নম্বরে নামিয়ে আনেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয় যে, জর্জিয়েভা ইনডেক্স হিসেবের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এনেছিলেন চীনের অবস্থানকে পরিবর্তন করার জন্যে। এই প্রতিবেদনের ফলশ্রুতিতে জর্জিয়েভাকে আইএমএফএর প্রধান হিসেবে বহাল রাখা হবে কিনা, তা নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই বলে যে, এই অভিযোগ খুবই গুরুতর এবং এসময় তারা জর্জিয়েভাকে সমর্থন করা বন্ধ করে দেয়। তবে এক সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্র জানায় যে, তারা জর্জিয়েভাকে তার পদ থেকে সরাবার চেষ্টা করবে না। বার্তা সংস্থা ‘ব্লুমবার্গ’ বলছে যে, ফরাসিরা ইতোমধ্যেই জর্জিয়েভার পক্ষে কথা বলেছিল এবং ব্রিটিশরাও একই পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’ জর্জিয়েভা এবং তার সমর্থকদের বরাত দিয়ে বলছে যে, সংস্থার ভেতর জর্জিয়েভার বিরোধীরা অভ্যুত্থান করতে চেয়েছিল; যারা জর্জিয়েভার ‘প্রগ্রেসিভ’ লক্ষ্যগুলির সাথে একমত নয়। তবে কেউ কেউ এধরণের বক্তব্যের পুরোপুরি বিরোধী। ‘নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর এবং অর্থনীতিতে নোবেল জয়ী পল রোমার কিছুদিন আগেও বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং রিসার্চ ডিভিশনের প্রধান ছিলেন। সেই হিসেবে তিনি সংস্থার ‘ডুইং বিজনেস ইনডেক্স’এর উপর যে কাজ হতো, তার মূল ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ‘ব্লুমবার্গ’এর সাথে এক সাক্ষাতে ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন যে, এই ইনডেক্সে ভালো অবস্থানে থাকার জন্যে আন্তর্জাতিকভাবে অনেক দেশের মাঝে প্রতিযোগিতা রয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে অনেক দেশই ইনডেক্সে তাদের স্কোরকে কিছুটা ভালো অবস্থানে দেখার জন্যে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করে। রোমার বলছেন যে, বিশ্বব্যাংকের মাঝে একটা সংস্কৃতি রয়েছে যে, ইনডেক্সের সংখ্যাগুলিকে রিভিউ করা এবং কিছু দেশকে অধিক সুবিধা দিয়ে তাদের স্কোরকে অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থানে রাখা। তিনি বলছেন যে, সংস্থার নেতৃত্ব চীনকে ভালো স্কোর দিয়ে হয়তো চীনের কাছ থেকে কিছু সুবিধা আদায় করতে চাইছিলেন, তবে সেব্যাপারে তিনি নিশ্চিত নন। তবে রোমারের অভিযোগ হলো যেসব দেশ ইনডেক্সে তাদের অবস্থানকে পরিবর্তন করতে চাপ সৃষ্টি করে, তারা স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য দেশের সাথে নিজেদের একটা পার্থক্য করে ফেলছে। এবং শেষ পর্যন্ত কিছু দেশকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে ইনডেক্স প্রকাশ করা হচ্ছে। এভাবে বিশ্বব্যাংক একদিকে একটা বৈজ্ঞানিক তথ্যের উৎস, আবার এটা একইসাথে একটা কূটনৈতিক সংস্থা। কারণ তারা বিভিন্ন দেশের সাথে কূটনৈতিক দেনদরবার চালায়। কিন্তু বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রকাশে যে বিশ্বাসযোগ্যতা দরকার, তা কূটনৈতিক আলোচনায় ছাড় দেবার মাধ্যমে তথ্যের উৎসের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় কঠোর নিয়মে ঘাটতি পড়ে যায়। এটা পুরো সংস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

‘সিএনবিসি’এর এক প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে যে, ১৯৪৪ সালে ‘ব্রেটন উডস কনফারেন্স’এর মাধ্যমে তৈরি করা আইএমএফ এবং বিশ্ব ব্যাংকের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে। আইএমএফ সাধারণতঃ এর সদস্য দেশগুলিকে স্বল্প মেয়াদে ঋণ দেয়, যাতে সেসব দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবিলা করা যায়। সদস্য দেশগুলির অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রেও আইএমএফএর বহুবিধ লক্ষ্য রয়েছে। অপরদিকে বিশ্বব্যাংকের কাজ হলো বিভিন্ন দেশে উন্নয়নমূলক প্রকল্পে অর্থায়ন করা এবং দারিদ্র্য বিমোচনে কাজ করা। বিশ্বব্যাংকের বেশিরভাগ কাজ উন্নয়নশীল দেশগুলিতে। উভয় সংস্থারই ১’শ ৮৯টা সদস্য। আইএমএফএর মূল অর্থায়ন হয় কোটা ব্যবস্থায়। এর মাধ্যমে সংস্থার মোট অর্থায়ন প্রায় ৬’শ ৭৫ বিলিয়ন ডলারের মতো। কোটা পদ্ধতিতে সংস্থার প্রায় ৩৬ শতাংশ ভোট চারটা দেশের হাতে; যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, চীন এবং জার্মানি। ফ্রান্স, ব্রিটেন এবং ইতালির হাতে রয়েছে আরও প্রায় ১২ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ মাত্র সাতটা দেশের হাতেই সংস্থার প্রায় অর্ধেক ভোট। সংস্থার সবচাইতে বড় ঋণগ্রহীতা দেশ হলো গ্রিস, ইউক্রেন, পর্তুগাল এবং পাকিস্তান। অপরদিকে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন আসে বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীদের মাঝে বন্ড ইস্যু করে ঋণ নেবার মাধ্যমে।

পল রোমার বলছেন যে, আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক একসময় বিশ্বের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ সেসময় একটা দেশের পক্ষে খুব বেশি উৎস থেকে ঋণ পাওয়া সম্ভব ছিল না। কাজেই দুই সংস্থাই সেসময় আন্তর্জাতিক পুঁজির জোগানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু বর্তমানে এই সংস্থাগুলি আন্তর্জাতিক পুঁজির বাজারের তুলনায় অনেক ছোট হয়ে গিয়েছে। এমতাবস্থায় উভয় সংস্থাই তাদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে নতুন কিছু করতে চাইছে। রোমার বলছেন যে, ১৯৫০এর দশকে এই সংস্থাগুলির উদ্দেশ্য যা ছিল, বর্তমান দুনিয়ার সাথে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; কাজেই এখন সময় এসেছে এই সংস্থাগুলির উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে চিন্তা করার। তিনি মনে করছেন যে, এই সংস্থার এখন সবচাইতে বড় কাজ হলো বিভিন্ন দেশের মাঝে কূটনৈতিক আলোচনা সচল রাখা।

আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার অতি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় সংস্থাদু’টার উদ্দেশ্য নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠছে, তখন সংস্থার কর্মকান্ডের মাঝে স্বচ্ছতার অভাব বিশ্বব্যাপী এর বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। শক্তিশালী দেশগুলি যদি সংস্থার ‘ডুইং বিজনেস ইনডেক্স’এর হিসাবের প্রতিবাদ করে র‍্যাঙ্কিংএ পরিবর্তন আনতে পারে, তাহলে বাকি দেশগুলির সদস্যপদের গুরুত্ব যতটুকুইবা ছিল, তা অর্থহীন হয়ে যায়। তদুপরি অনেকেই অভিযোগ করছেন যে, জর্জিয়েভা মূলতঃ সংস্থার অর্থায়ন বৃদ্ধি করতে চীনের কাছ থেকে আরও বেশি বিনিয়োগ যোগাড় করতেই ইনডেক্সে চীনের অবস্থানকে পরিবর্তন করিয়েছেন। তবে এতেও যে ব্যাপারটা এড়ানো যায়না তা হলো, সংস্থাদু’টা এতকাল মূলতঃ তাদের যেসব কর্মকান্ডের মাধ্যমে পশ্চিমা উদ্দেশ্যকেই বাস্তবায়ন করেছে সেগুলির ভবিষ্যৎ এখন প্রশ্নবিদ্ধ।