Showing posts with label Northwest Passage. Show all posts
Showing posts with label Northwest Passage. Show all posts

Friday, 4 April 2025

ট্রাম্পের গ্রীনল্যান্ড চাই – এটাই নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা

০৫ই এপ্রিল ২০২৫

ডেনমার্ক ন্যাটোর সদস্যদেশ হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ডেনমার্কের অধীন অঞ্চল দখল করে নিতে চাইছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপিত বিশ্বব্যবস্থা এখন যে আর নেই, তার আরেকটা প্রমাণ এটা। অপরদিকে এই ইস্যু যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইইউ, ব্রিটেন এবং ব্রিটিশ কমনওয়েলথের অধীন কানাডার প্রতিদ্বন্দ্বিতা; যা কিনা বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার একটা অংশ। 


মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার হোয়াইট হাউজে এসেই গ্রীনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানায় নেয়ার কথা বলতে থাকেন। এর আগে প্রথম টার্মেও ট্রাম্প গ্রীনল্যান্ড ক্রয় করার কথা বলেছিলেন। অনেকেই প্রশ্ন করেছেন যে, ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা বাস্তবতার সাথে যায় কিনা। তবে মার্চ মাস থেকেই গ্রীনল্যান্ডের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান যথেষ্ট শক্ত হতে শুরু করে। এখন অনেকেই ধরে নিচ্ছেন যে, ট্রাম্প গ্রীনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার ব্যাপারে যথেষ্টই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

ট্রাম্প কেন গ্রীনল্যান্ড চাইছেন?

গত ১২ই ফেব্রুয়ারি মার্কিন সিনেটের এক শুনানিতে 'টেক্সাস মিনারাল রিসোর্সেস'এর এনথনি মারচেজি বলেন যে, গ্রীনল্যান্ডের পুরো উপকূল নিঃসন্দেহে বিশ্বের সবচাইতে বড় খনিজ সম্পদের ভান্ডারগুলির একটা। এই উপকূলের যেকোন স্থানে কেউ ঢিল ছুঁড়লেই একটা বিশ্বমানের খনির সন্ধান পাবে। 'ডয়েচে ভেলে' বলছে যে, এই মুহুর্তে গ্রীনল্যান্ডে মাত্র দু'টা খনিতে কাজ চলছে; যেখানে শ'খানেক মানুষ কাজ করে। সেখানে খনিজ আহরণ খুবই কষ্টকর। অন্য অনেক স্থানের চাইতেও এখানে খনিজ আহরণ অনেক ব্যববহুল। এখানে কোন রাস্তা নেই এবং ভূপ্রকৃতি খুবই বন্ধুর। চীনের বাইরে 'রেয়ার আর্থ' খনিজের সবচাইতে বড় উৎসগুলির একটা ২০২১ সালে গ্রীনল্যান্ড সরকার বন্ধ করে দেয়। কারণ ঐ একই সাথে তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়ামের খনি রয়েছে এবং তা জনবসতির বেশ কাছাকাছি। আর্কটিক অঞ্চলে বরফ গলতে শুরু করার কারণে এই অঞ্চল দিয়ে কৌশলগত সমুদ্রপথ চালুর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে; যার মাঝে একটা গিয়েছে রাশিয়ার উত্তর উপকূল ঘেঁষে; যা 'নর্দার্ন সী রুট' বা 'এনএসআর' নামে পরিচিত। দ্বিতীয়টা গিয়েছে গ্রীনল্যান্ডের পাশ দিয়ে কানাডার মাঝ দিয়ে; যা 'নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ' নামে পরিচিত। তৃতীয়টা গিয়েছে একেবারে উত্তর মেরুর মাঝ দিয়ে; যা 'ট্রান্স পোলার সী রুট' হিসেবে পরিচিত। এই রুটগুলি এশিয়া এবং ইউরোপের মাঝে সমুদ্রপথকে অনেক কমিয়ে ফেলতে পারে। বর্তমানে আর্কটিক অঞ্চল দিয়ে জাহাজ পার করতে হলে আইস ব্রেকার জাহাজ লাগে; যা বেশ ব্যয়বহুল। কাজেই এখনও পর্যন্ত খনিজ আহরণ এবং সমুদ্রপথ ব্যবহার করার ব্যাপারটা ভবিষ্যতের আলোচনা। এই মুহুর্তে গ্রীনল্যান্ডের জনগণের আয় শুধুমাত্র মাছ ধরার উপর নির্ভরশীল। একারণে ডেনমার্ক সরকার বছরে প্রায় ৫'শ মিলিয়ন ইউরো বাজেট সহায়তা দিচ্ছে। তবে গ্রীনল্যান্ড নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় ডেনমার্ক শক্তিশালী দেশগুলির সাথে বড় রকমের দেনদরবার করতে পারে; যা ডেনমার্কের আকারের তুলনায় বেশি শক্তির প্রতীক।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক টিম মার্শাল 'বিবিসি'কে বলছেন যে, এর আগেও ১৯৫০এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র গ্রীনল্যান্ড ক্রয় করতে চেয়েছিল। কাজেই একটা অঞ্চল ক্রয় করার ব্যপারটা নতুন নয়। অর্থনৈতিক দিক থেকে ছাড়াও সামরিক দিক থেকে গ্রীনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর মেরুর উপর দিয়ে রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলি সবচাইতে কম দূরত্ব অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে পারে। আবার একইসাথে, রুশ সাবমেরিনের যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি পৌঁছাবার ক্ষেত্রে সবচাইতে স্বল্প দূরতের রুট হলো উত্তর মেরুর বরফের নিচ দিয়ে। গ্রীনল্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ খনিগুলির বেশিরভাগই গ্রীনল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে কানাডার কাছাকাছি। গ্রীনল্যান্ড যদি স্বাধীন হয়ে যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রই সবচাইতে বেশি লাভবান হবে। প্রশান্ত মহাসাগরের মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ এবং মাইক্রোনেশিয়ার পররাষ্ট্রনীতি যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। সেইরকমই একটা বোঝাপড়া মার্কিনীরা করতে পারে গ্রীনল্যান্ডের সাথে। নব্যস্বাধীন গ্রীনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রথমে নিজেদের অবস্থানকে সুসংহত করে, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলি থেকে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে যাবে।
 
আর্কটিক অঞ্চলে বরফ গলতে শুরু করার কারণে এই অঞ্চল দিয়ে কৌশলগত সমুদ্রপথ চালুর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে; যার মাঝে একটা গিয়েছে রাশিয়ার উত্তর উপকূল ঘেঁষে; যা 'নর্দার্ন সী রুট' বা 'এনএসআর' নামে পরিচিত। দ্বিতীয়টা গিয়েছে গ্রীনল্যান্ডের পাশ দিয়ে কানাডার মাঝ দিয়ে; যা 'নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ' নামে পরিচিত। তৃতীয়টা গিয়েছে একেবারে উত্তর মেরুর মাঝ দিয়ে; যা 'ট্রান্স পোলার সী রুট' হিসেবে পরিচিত। এই রুটগুলি এশিয়া এবং ইউরোপের মাঝে সমুদ্রপথকে অনেক কমিয়ে ফেলতে পারে।


ডেনমার্কের উপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়ছে

মার্চের শেষ সপ্তাহে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের স্ত্রী উশা ভ্যান্সের গ্রীনল্যান্ডে ঘুরতে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হবার পর গ্রীনল্যান্ড এবং ডেনমার্কে ব্যাপক হৈচৈ পড়ে যায়। এই ভিজিট সম্পর্কে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডারিকসেন সাংবাদিকদের বলেন যে, এই ভ্রমণ গ্রীনল্যান্ডের প্রয়োজন নেই এবং এটা গ্রীনল্যান্ড চাচ্ছেও না। গ্রীনল্যান্ড এবং ডেনমার্কের উপর যে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে, তা মেনে নেয়া যায় না। তিনি বলেন যে, এই চাপের মুখে তারা বাধা প্রদান করবেন। হৈচৈ শুরু হবার পর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এক ভিডিও বার্তায় ঘোষণা দেন যে, হৈচৈ শুরু হবার কারণে তিনি নিজেও এখন তার পরিবারের সাথে গ্রীনল্যান্ডে যাবেন। তবে তিনি বলেন যে, তার এই সফর গ্রীনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির মাঝে সীমাবদ্ধ থাকবে। এই সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন স্পেস ফোর্সের গুরুত্বপূর্ণ রাডার রয়েছে; যার মাধ্যমে উত্তর মেরুর দিক থেকে ধেয়ে আসা পারমাণবিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপারে আগাম সতর্কতা পাবে যুক্তরাষ্ট্র। 'গ্রীনল্যান্ডিক ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন'এর মারকাস ভ্যালেন্টিন 'ডয়েচে ভেলে'কে বলছেন যে, ভ্যান্সের গ্রীনল্যান্ড সফর শুধুমাত্র সামরিক ঘাঁটিতে সীমাবদ্ধ করার ফলে সেখানে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে এবং বিক্ষোভ সমাবেশ বন্ধের ঘোষণাও দেয়া হয়েছে। গ্রীনল্যান্ডের জনগণ ভ্যান্স পরিবারের সাথে অসহযোগিতা করার পথে হেঁটেছে। সরকারিভাবে ভ্যান্সের পরিবারকে গ্রহণ না করার কথাও বলা হয়েছে গ্রীনল্যান্ডের পক্ষ থেকে। গ্রীনল্যান্ড এবং ডেনমার্কের অনেকেই মনে করতে শুরু করেছেন যে, স্বল্প মেয়াদে হলেও তাদের প্রতিবাদ অনেকটাই সফল হয়েছে। গ্রীনল্যান্ডের স্বল্পসংখ্যক কিছু মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুক্ত হতে আগ্রহী। তবে গ্রীনল্যান্ডের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর করতে ইচ্ছুক। 'বিবিসি'র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, আপাততঃ গ্রীনল্যান্ডের অধিবাসীরা একটা ছোট জয় পেয়েছে বলে মনে হলেও আসন্ন দিনগুলিতে গ্রীনল্যান্ডের উপর চাপ বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে। গ্রীনল্যান্ডে ৭৪ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র চাইলে এই ঘাঁটিকে যতটা ইচ্ছা বৃদ্ধি করতে পারবে। তাহলে এখানে সমস্যাটা কোথায়, তা স্পষ্ট নয়। গ্রীনল্যান্ডের জনগণও হয়তো ডেনমার্ক থেকে আলাদা হতে চাইবে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন সবকিছু অতি দ্রুত চাইছে।

তবে ২৯শে মার্চ গ্রীনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সফরের সময় জেডি ভ্যান্স এক ভাষণে ডেনমার্ক সরকারের ব্যাপক সমালোচনা করেন। তিনি বলেন যে, ডেনমার্কের প্রতি তার বার্তা খুবই পরিষ্কার – গ্রীনল্যান্ডের জনগণের জন্যে ডেনমার্ক যথেষ্ট বিনিয়োগ করেনি এবং গ্রীনল্যান্ডের নিরাপত্তা বৃদ্ধিতেও ডেনমার্ক কিছু করেনি। তিনি বলেন যে, এই পরিস্থিতির পরিবর্তন প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের বিতর্ক গ্রীনল্যান্ডের অধিবাসীদের সাথে নয়; বরং তা হলো ডেনমার্কের নেতৃত্বের সাথে; যারা তাদের দায়িত্ব পালন করেনি। ভ্যান্স এমন এক সময়ে গ্রীনল্যান্ড সফর করেছেন, যখন গ্রীনল্যান্ডের সরকার পরিবর্তন হচ্ছিলো। ভ্যান্সের সফরের পরপরই নবগঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী জেন্স ফ্রেডেরিক নিয়েলসেন সাংবাদিকদের বলেন যে, সরকার পরিবর্তনের এমন এক সময়ে ভ্যান্সের গ্রীনল্যান্ড সফর করতে আসাটা একটা বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্রের প্রতি অসন্মান দেখানো। এটা একটা লজ্জাজনক অধ্যায় ছিল।
 
গ্রীনল্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ খনিগুলির বেশিরভাগই গ্রীনল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে কানাডার কাছাকাছি। গ্রীনল্যান্ড যদি স্বাধীন হয়ে যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রই সবচাইতে বেশি লাভবান হবে। প্রশান্ত মহাসাগরের মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ এবং মাইক্রোনেশিয়ার পররাষ্ট্রনীতি যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। সেইরকমই একটা বোঝাপড়া মার্কিনীরা করতে পারে গ্রীনল্যান্ডের সাথে। নব্যস্বাধীন গ্রীনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রথমে নিজেদের অবস্থানকে সুসংহত করে, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলি থেকে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে যাবে।


ভ্যান্সের গ্রীনল্যান্ড সফরের একই দিন, ২৯শে মার্চ, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন যে, গ্রীনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অতি প্রয়োজন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যে নয়; সারা দুনিয়ার শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যে। গ্রীনল্যান্ডের আশেপাশের সমুদ্রপথগুলি চীনা এবং রুশ জাহাজে ভরে গিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ডেনমার্ক বা অন্য কারুর উপর এই পরিস্থিতি সামাল দেয়ার ভার ছেড়ে দিতে পারে না। এক'শ বছর আগেও গ্রীনল্যান্ডের আশেপাশের সমুদ্রপথগুলি খোলা ছিল না। কিন্তু এখন আইসব্রেকার জাহাজের মাধ্যমে গ্রীনল্যান্ডের আশেপাশে দিয়ে রাশিয়া এবং চীনে যাওয়া যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন যে, তার আশা ডেনমার্ক এটা বুঝতে পারছে এবং ইইউও এটা বুঝতে পারছে। আর না বুঝতে পারলে যুক্তরাষ্ট্র তাদেরকে বোঝাবে। দু'দিন পর ৩১শে মার্চ এক ভিডিও বার্তায় ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লারস লোকি রাসমুসেন বলেন যে, ডেনমার্ক সরকার সমালোচনা পছন্দ করে; তবে যে ভাষায় মার্কিনীরা কথা বলছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। এভাবে কেউ কাছের বন্ধু রাষ্ট্রের সাথে কথা বলে না। তিনি বলেন যে, ব্যক্তিগতভাবে তিনি এখনও ডেনমার্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রকে কাছের বন্ধু হিসেবেই দেখেন। ১৯৫১ সালের চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র গ্রীনল্যান্ডে তার সামরিক শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি করতে পারে। ১৯৪৫ সালে গ্রীনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের ১৭টা সামরিক ঘাঁটি ছিল এবং কয়েক হাজার সেনা সেখানে মোতায়েন ছিল। বর্তমানে একটা ঘাঁটিতে মাত্র ২'শ সেনা রয়েছে। ১৯৫১ সালের চুক্তি অনুযায়ী একত্রে অনেক কিছুই করা সম্ভব। একসময় শুধু ডেনমার্ক নয়, সকলেই মনে করেছিল যে, আর্কটিকে কোন নিরাপত্তা হুমকি নেই। বর্তমানে পরিস্থতি পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে। একারণেই কিছুদিন আগেই ডেনমার্ক আর্কটিকের নিরাপত্তায় বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার ঘোষণা দিয়েছে। আর ভুলে গেলে চলবে না যে, গ্রীনল্যান্ড ন্যাটোর অংশ এবং ন্যাটোর নিরাপত্তার মাঝে গ্রীনল্যান্ডের নিরাপত্তাও রয়েছে।

৩রা এপ্রিল ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডারিকসেন সাংবাদিকদের বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র গ্রীনল্যান্ডের মালিকানা নেবে না। গ্রীনল্যান্ডের মালিকানা হলো গ্রীনল্যান্ডবাসীর। গ্রীনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব, সীমানা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে সকলকে একত্রিত থাকতে হবে; সেটা ডেনমার্ক এবং গ্রীনল্যান্ডের মাঝে যে আলোচনাই হোক না কেন। তিনি বলেন যে, তার ধারণা এখন পর্যন্ত তারা কাজটা ঠিকমতোই করতে পেরেছেন; তবে এটা পরিষ্কার যে, তাদেরকে খোলা জানালাগুলিকে আরও ভালোভাবে আটকাতে হবে। এটা পরিষ্কার যে, ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী গ্রীনল্যান্ডবাসীদের মতামতকে পুরোপুরিভাবে নিজেদের পক্ষে আনতে পারেননি। আর ৪ঠা এপ্রিল ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লারস লোকি রাসমুসেন মার্কিন পররাষ্ট্রসচিব মার্কো রুবিওর সাথে আলোচনার পর সাংবাদিকদের বলেন যে, তিনি রুবিওকে বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং তা ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বের উপর আক্রমণ।
 
উত্তর মেরুর উপর দিয়ে রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলি সবচাইতে কম দূরত্ব অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে পারে। আবার একইসাথে, রুশ সাবমেরিনের যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি পৌঁছাবার ক্ষেত্রে সবচাইতে স্বল্প দূরতের রুট হলো উত্তর মেরুর বরফের নিচ দিয়ে। ১৯৫১ সালের চুক্তি অনুযায়ী ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রীনল্যান্ডে সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করতে দিয়েছিল। এই ঘাঁটি মূলতঃ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ; গ্রীনল্যান্ডের নিরাপত্তার জন্যে নয়। এটা গ্রীনল্যান্ডের চাইতে যুক্তরাষ্ট্রকে বেশি সুবিধা দেয়। 


যুক্তরাষ্ট্র কি গ্রীনল্যান্ডকে আলাদা করতে চায়, নাকি দখল করতে চায়?

'জার্মান মার্শাল ফান্ড'এর ফেলো সোফি আর্টস 'ডয়েচে ভেলে'কে বলছেন যে, ভ্যান্সের বক্তব্য সঠিক নয়। ডেনমার্ক সরকার গ্রীনল্যান্ডের বাজেটের অর্ধেকের বেশি দিয়ে থাকে। এর বাইরেও রয়েছে প্রতিরক্ষা সহায়তা; যা ডেনমার্ক তার বন্ধুপ্রতীম দেশগুলির সাথে একত্রে দিয়ে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের হুমকির পর গ্রীনল্যান্ড ও আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করার জন্যে ২ বিলিয়ন ডলার খরচের ঘোষণা দিয়েছে ডেনমার্ক। এটা এই অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্যে বর্তমানের ১০ গুণ বেশি খরচ। ১৯৫১ সালের চুক্তি অনুযায়ী ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রীনল্যান্ডে সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করতে দিয়েছিল। এই ঘাঁটি মূলতঃ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ; গ্রীনল্যান্ডের নিরাপত্তার জন্যে নয়। এটা গ্রীনল্যান্ডের চাইতে যুক্তরাষ্ট্রকে বেশি সুবিধা দেয়। তবে গ্রীনল্যান্ডের নিরাপত্তার সাথে পুরো আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা জড়িত। এখানে ন্যাটো জোটের স্বার্থ জড়িত। জোটকে ছোট করে এখানে গ্রীনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা করতে গেলে উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। ন্যাটোর অংশ হিসেবে ডেনমার্ক মার্কিনীদের সাথে আফগানিস্তানে যুদ্ধ করেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র ডেনমার্কের বিরুদ্ধে কথা বলছে এবং গ্রীনল্যান্ডকে ডেনমার্ক থেকে আলাদা করার কথাও শোনা যাচ্ছে।

‘এএফপি'র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, গ্রীনল্যান্ড ডেনমার্ক থেকে পুরোপুরিভাবে আলাদা হবার চেষ্টা করছে। গ্রীনল্যান্ডবাসীদের একটা প্রধান অভিযোগ হলো, ডেনমার্ক সরকার ঐতিহাসিকভাবেই গ্রীনল্যান্ডের ইনুইট আদিবাসীদের সংস্কৃতিকে দমন করেছে। আদিবাসীদেরকে জোর করে বন্ধাত্ব বরণ করিয়েছে এবং তাদের সন্তানদেরকে পরিবার থেকে আলাদা করে নিয়ে গেছে ডেনমার্ক সরকার। গ্রীনল্যান্ডে অনেকেই মনে করেন যে, ডেনমার্ক গ্রীনল্যান্ডবাসীদেরকে নিচু জাতের নাগরিক হিসেবে দেখে। তবে তারা মনে করে না যে, তাদের ভূমি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রি হবার জন্যে। গ্রীনল্যান্ডের প্রায় সকল জনগণ স্বাধীনতার পক্ষে থাকলেও ট্রাম্পের পরিকল্পনার পক্ষে খুব কমই রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন যে, খুব দ্রুত ডেনমার্ক থেকে আলাদা হতে গেলে যুক্তরাষ্ট্র গ্রীনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে। 'ডয়েচে ভেলে' মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ১৭২১ সালে ডেনমার্ক গ্রীনল্যান্ডে উপনিবেশ স্থাপন করেছিল। এরপর দু'শ বছর ধরে ইনুইট জাতির উপর খ্রিস্টান ধর্ম এবং ড্যানিস ভাষা চাপানো হয়। শুধুমাত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরই গ্রীনল্যান্ডে ঔপনিবেশিক প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে বন্ধ করা হতে থাকে। একসময় গ্রীনল্যান্ডকে নিজস্ব পার্লামেন্ট এবং সরকার দেয়া হয়। বর্তমানে গ্রীনল্যান্ড ডেনমার্কের অধীনে একটা স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল। অভ্যন্তরীণ ইস্যুগুলি গ্রীনল্যান্ড নিজে নিয়ন্ত্রণ করলেও নিরাপত্তা এবং পররাষ্ট্রনীতি দেখাশোনা করে ডেনমার্ক। গ্রীনল্যান্ডের সরকার বলছে যে, কোন একটা সময় তারা ডেনমার্ক থেকে আলাদা হবার লক্ষ্যেই এগুচ্ছে। ৮৪ শতাংশ মানুষ স্বাধীনতার পক্ষে। এই মুহুর্তে গ্রীনল্যান্ড তাদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ইইউ, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে তাদের অফিস খুলেছে। তারা খনিজ সম্পদ আহরণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউএর সাথেও সমঝোতা স্বাক্ষর করেছে। অর্থাৎ গ্রীনল্যান্ডের অর্থনীতিতে অনেকেই অংশীদার হতে চাইছে। একারণেই ডেনমার্ক গ্রীনল্যান্ডের ইস্যুকে ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে রেখেছে।
 
মার্চ ২০২৫। মার্কিন সেনাদের সাথে গ্রীনল্যান্ডের সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। নতুন বিশ্বব্যবস্থায় ট্রাম্প প্রশাসনের গ্রীনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই অদ্ভুত ঠেকলেও বাস্তবিক ক্ষেত্রে অঞ্চল কেনাবেচা নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০ শতাংশ অঞ্চল ক্রয় করা; যার মাঝে রয়েছে লুইজিয়ানা, ক্যালিফোর্নিয়া এবং আলাস্কা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনের কাছ থেকে অস্ত্রের বিনিময়ে ক্যারিবিয়ানের কিছু দ্বীপ পেয়ে যায়। তাই আর্কটিক অঞ্চলে বরফ গলে যেতে থাকায় গ্রীনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনায় অবাক হবার কিছু নেই। 


প্রাক্তন ব্রিটিশ সামরিক কর্মকর্তা ফিলিপ ইনগ্রাম ব্রিটিশ মিডিয়া 'দ্যা সান'কে বলছেন যে, গ্রীনল্যান্ডের কোন সামরিক বাহিনী নেই। যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই যেকোন দিন সেখানে হেঁটে ঢুকে যেতে পারে। তবে এর ভূরাজনৈতিক ফলাফল হবে খুবই মারাত্মক। তার ধারণা, গ্রীনল্যান্ডের ব্যাপারটা অনেক ক্ষেত্রেই কানাডার সাথে যুক্ত। ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে গ্রীনল্যান্ড, কানাডা এবং পানামা নিয়ে যখন কথা বলেছেন, তখন সর্বদাই তিনি সমুদ্রপথের প্রসঙ্গ এনেছেন। অর্থাৎ তিনি এই অঞ্চলগুলিকে সমুদ্রবাণিজ্য এবং লজিস্টিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেছেন। ন্যাটোর সদস্য দেশ কানাডা এখনও পর্যন্ত তাদের জিডিপির ২ শতাংশ প্রতিরক্ষার পিছনে খরচ করছে না। এবং 'ফাইভ আইজ' ইন্টেলিজেন্স সমঝোতার মাঝে কানাডাকে দুর্বল সদস্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। খুব সম্ভবতঃ ট্রাম্প গ্রীনল্যান্ডকে হুমকির মাঝে রেখে কানাডার উপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছেন। কানাডার উপর বাণিজ্যিক শুল্ক আরোপের ব্যাপারটাও খুব সম্ভবতঃ একই সূত্রে গাঁথা।

ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর মিডিয়া 'বিএফবিএস ফোর্সেস নিউজ'এর এক আলোচনায় ব্রিটিশ সামরিক চিন্তাবিদ ক্যারোলাইন কেনেডি-পাইপ বলছেন যে, মূলতঃ ২০১৭-১৮ সালের দিকে চীনারা যখন গ্রীনল্যান্ডে বিমানবন্দরের রানওয়ে তৈরি করতে ইচ্ছুক হয়, তখনই মার্কিনীরা এবং ড্যানিশরা নড়েচড়ে বসে। দুই দেশের প্রতিরোধের মুখে চীনা প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়াও 'নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ' নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কানাডার একটা দ্বন্দ্ব রয়েছে। এটাও গ্রীনল্যান্ডের হিসেবে মাঝে নিতে হবে। কানাডা এখনও পর্যন্ত আর্কটিকে তাদের সক্ষমতার অনেক নিচে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে তারাও তড়িঘড়ি করে আর্কটিক নিয়ে কাজ করা শুরু করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা উভয়েই আর্কটিককে রাশিয়ার চোখ দিয়ে দেখা শুরু করেছে। নরওয়ের ডিফেন্স কমান্ড এন্ড স্টাফ কলেজের প্রফেসর টরমড হাইয়ার বলছেন যে, আর্কটিকে নরওয়ের অধীনে থাকা সুয়ালবার্ড দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে; যা কিনা গ্রীনল্যান্ডের সমান্তরালে দরকষাকষির অংশ হতে পারে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২০ সালের চুক্তি অনুযায়ী এই দ্বীপপুঞ্জকে বাণিজ্যিকভাবে সকলের জন্যে খোলা রাখা হলেও এর সার্বভৌমত্বকে নরওয়ের অধীনে দেয়া হয়; যা এখন রুশরা প্রশ্ন করছে। এই দ্বীপপুঞ্জ থেকে ন্যাটো রুশ সাবমেরিনের উপর নজরদারি করে। ইতোমধ্যেই সেখানে রুশ এবং চীনারা গবেষণা কাজ চালাবার জন্যে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করছে।

নতুন বিশ্বব্যবস্থায় ট্রাম্প প্রশাসনের গ্রীনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই অদ্ভুত ঠেকলেও বাস্তবিক ক্ষেত্রে অঞ্চল কেনাবেচা নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০ শতাংশ অঞ্চল ক্রয় করা; যার মাঝে রয়েছে লুইজিয়ানা, ক্যালিফোর্নিয়া এবং আলাস্কা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনের কাছ থেকে অস্ত্রের বিনিময়ে ক্যারিবিয়ানের কিছু দ্বীপ পেয়ে যায়। তাই আর্কটিক অঞ্চলে বরফ গলে যেতে থাকায় গ্রীনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনায় অবাক হবার কিছু নেই। ডেনমার্ক ন্যাটোর সদস্যদেশ হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ডেনমার্কের অধীন অঞ্চল দখল করে নিতে চাইছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপিত বিশ্বব্যবস্থা এখন যে আর নেই, তার আরেকটা প্রমাণ এটা। অপরদিকে এই ইস্যু যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইইউ, ব্রিটেন এবং ব্রিটিশ কমনওয়েলথের অধীন কানাডার প্রতিদ্বন্দ্বিতা; যা কিনা বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার একটা অংশ।

Sunday, 10 October 2021

কানাডার সাথে ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা চুক্তি কি আসন্ন?

১০ই অক্টোবর ২০২১

ছবিঃ ২০১৮ সালের মার্চ। ব্রিটিশ রয়াল নেভির পারমাণবিক সাবমেরিন ‘ট্রেনচ্যান্ট’ আর্কটিকের বরফ ফুঁড়ে উঠে এসেছে। ব্রিটেন তার পারমাণবিক সাবমেরিন সক্ষমতাকে কানাডার আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্যে ব্যবহার করতে চাইছে। কিন্তু এত কাছের বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও কানাডার সাথে আর্কটিকের ‘নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ’এর সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব রয়েছে। একারণেই কানাডা ব্রিটেনের প্রস্তাবের ব্যাপারে এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।

 
সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে কানাডার মিডিয়া ‘সিবিসি’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, কানাডার সর্বউত্তরের উত্তর মেরুর কাছাকাছি অতিশীতল অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্রিটেন তার সামরিক সক্ষমতাকে কানাডার সহায়তায় মোতায়েন করতে চাইছে; বিশেষ করে ব্রিটেন তার পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনগুলিকে উত্তরাঞ্চলে নজরদারি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে কানাডার সহায়তায় ব্যবহার করতে চাইছে। ‘সিবিসি’র সাথে সাম্প্রতিক এক সাক্ষাতে ব্রিটেনের সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল নিক কার্টার বলেন যে, ব্রিটেন কানাডার উত্তরাঞ্চলে বেঁচে থাকা এবং যুদ্ধ করার ব্যাপারে শিখতে ইচ্ছুক; এবং তারা সেই হিসেবে কানাডার সাথে সহযোগিতার জন্যে যথেষ্ট আগ্রহী। আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কানাডাকে যা যা করতে হবে, ব্রিটেন সেই ব্যাপারগুলিতে সহযোগিতা করতে চায়। নিক কার্টারের এই প্রস্তাবখানা প্রকৃতপক্ষে কয়েক মাস আগেই কানাডার সরকারি বিভিন্ন মহলে দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, কানাডার কোন সরকারই আর্কটিক অঞ্চলে কোন রাষ্ট্রকেই অবস্থান নিতে দেয়নি; এমনকি সবচাইতে কাছের বন্ধু রাষ্ট্রগুলিকেও। এর মূল কারণ হলো কানাডার আর্কটিক অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব নিয়ে অনেকগুলি দেশের মাঝে প্রতিযোগিতা রয়েছে। তবে ‘সিবিসি’ বলছে যে, কানাডার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ড্যানিয়েল মিনডেন এক ইমেইলে ব্রিটেনের এই প্রস্তাবের ব্যাপারে নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে চাননি।

তবে ‘সিবিসি’ বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং অস্ট্রেলিয়ার মাঝে সাম্প্রতিক ‘অকাস’ প্রতিরক্ষা চুক্তি থেকে কানাডার বাদ পড়ার ব্যাপারটা হয়তো ব্রিটেনের প্রস্তাবের ব্যাপারে কানাডাকে নতুন করে ভাবাবে। ন্যাটোর সদস্য হিসেবে ব্রিটেন এবং কানাডা নিয়মিত নরওয়েতে শীতকালীন মহড়ায় অংশ নেয়। আর কানাডার এলবার্টা রাজ্যের সাফিল্ডের বিশাল ভূখন্ডে ব্রিটেন বহু বছর ধরে তার সেনাবাহিনীর আর্মার্ড এবং কম্বাইন্ড অপারেশনের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কানাডার বন্ধু রাষ্ট্রগুলি আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার নতুন করে সামরিক অবস্থান শক্তিশালীকরণ এবং সেই অঞ্চলে চীনের মতো প্রতিযোগী রাষ্ট্রের কর্মকান্ড বৃদ্ধির ব্যাপারে কথা বলছে।

কানাডার আর্কটিকের নিরাপত্তা

২০০৬ সালে কানাডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী স্টিভেন হারপারএর কনজারভেটিভ সরকার আর্কটকের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলতে শুরু করে। এই হিসেবে আর্কটিক অফশোর প্যাট্রল শিপ প্রকল্পের সূচনা করে কানাডা সরকার। ২০১১ সালে ছয় থেকে আটটা জাহাজ তৈরির এই প্রকল্প শুরু করা হয়, যেগুলি বরফাচ্ছাদিত অঞ্চলে চলাচল করতে সক্ষম হবে। কিন্তু এই প্রকল্পের বাজেট যোগাড় করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ২০১৫ সালে জাহাজ নির্মাণ শুরু হয়। ‘হ্যারি ডে উলফ ক্লাস’এর সাড়ে ৬ হাজার টনের এই জাহাজগুলি গত ৫০ বছরে কানাডায় তৈরি সবচাইতে বড় সামরিক জাহাজ। ২০২১ সাল পর্যন্ত দু’টা জাহাজ তৈরি শেষ হয়েছে। এই জাহাজগুলির সহায়তায় কানাডার উত্তরের বাফিন দ্বীপের নুনাভুত এলাকায় ‘নানিসিভিক নেভাল ফ্যাসিলিটি’ তৈরি করা শুরু হয়। এখান থেকে জাহাজগুলি জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারবে। তবে এই জাহাজগুলি এবং নতুন সামরিক স্থাপনা কানাডার উত্তরের পানির নিচের নজরদারি এবং স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নজরদারির চ্যালেঞ্জগুলির সমাধান দেয় না। এখানেই কানাডার সহায়তায় আসতে চাইছে ব্রিটেন।

‘সিবিসি’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ব্রিটেনের সেটাই রয়েছে যা কানাডার নেই; আর তা হলো পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন; যা কিনা বরফের নিচে লম্বা সময় থাকতে পারে। কানাডা ব্রিটেনের কাছ থেকে ১৯৮০এর দশকে তৈরি চারটা ডিজেল সাবমেরিন কেনে ১৯৯০এর দশকের শেষের দিকে। তারা চেয়েছিল এই সাবমেরিনগুলিকে আরও উন্নত করে সেগুলির বরফের নিচে থাকার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে। কিন্তু সেই পরিকল্পনাও ভেস্তে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে আর্কটিক অঞ্চলে রুশ সাবমেরিনের আনাগোনা বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্চ মাসে রাশিয়ার তিনটা সাবমেরিন একই সময়ে আর্কটিকের বরফ ফুঁড়ে উপরে উঠে আসে। কানাডার প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ‘ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারি’র প্রফেসর রব হিউবার্ট প্রশ্ন করছেন যে, কানাডার কি সক্ষমতা রয়েছে রুশ এবং চীনা সাবমেরিন মোকাবিলা করার? তিনি বলছেন যে, ব্রিটিশরা সর্বপ্রথমে এই সক্ষমতাটাই আর্কটিকে নিয়ে আসছে। হিউবার্ট বলছেন যে, কানাডা আর্কটিকে তার সবচাইতে কাছের বন্ধুদেরও অবস্থান দিতে নারাজ। কারণ ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই কানাডার উত্তরাঞ্চলের আর্কটিক দ্বীপপুঞ্জের মাঝ দিয়ে যাওয়া ‘নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ’এর সার্বভৌমত্ব কানাডার বলে স্বীকার করে না। এই প্যাসেজের মাধ্যমে আটলান্টিক এবং প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে যাতায়াত করা যায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আর্কটিকে ব্যাপকভাবে বরফ গলতে থাকায় এই রুটে জাহাজ চলাচল নিয়ে কথা শুরু হয়েছে। ২০০৮ সালে কানাডার কোস্ট গার্ড এই প্যাসেজের মাঝ দিয়ে প্রথম বাণিজ্যিক জাহাজ ‘ক্যামিলিয়া দেসগাগনেস’এর চলাচল নিশ্চিত করে। ২০১৩ সালে ‘নরডিক ওরাইয়ন’ নামের একটা কয়লাবাহী জাহাজ কানাডার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের ভ্যাঙ্কুভার থেকে সাড়ে ৭৩ হাজার টন কয়লা নিয়ে ‘নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ’ ব্যবহার করে ৩৩ দিনের মাঝে ইউরোপের ফিনল্যান্ডে পৌঁছে। বেশি গভীরতার হবার কারণে এই ওজন নিয়ে জাহাজটার পানামা খাল অতিক্রম করতে পারার কথা ছিল না। ২০১৬ সালে ‘ক্রিস্টাল সেরেনিটি’ নামের একটা যাত্রীবাহী ক্রুজ শিপ ১৭’শ যাত্রী নিয়ে এই প্যাসেজ অতিক্রম করে।

‘কানাডিয়ান গ্লোবাল এফেয়ার্স ইন্সটিটিউট’এর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেইভ পেরি বলছেন যে, ব্রিটিশদের প্রস্তাব বলে দিচ্ছে যে, আর্কটিক অঞ্চলে কানাডার অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে হবে; যা জাস্টিন ট্রুডোর অধীন বর্তমান লিবারাল সরকারের জন্যে একটা ঘুম থেকে জেগে ওঠার ডাক। তিনি আরও বলছেন যে, ‘অকাস’ চুক্তি দেখিয়ে দিচ্ছে যা কানাডার সবচাইতে কাছের বন্ধু রাষ্ট্রগুলি নিজেদের মাঝে আরও কাছাকাছি এবং আরও ছোট ক্লাব তৈরি করছে। আর যুক্তরাষ্ট্র এমন বন্ধু চাইছে যারা অন্ততঃ নিজেদের ওজন বহন করতে সক্ষম।

 
ছবিঃ কানাডিয়ান বিমান বাহিনীর ‘সিএফ ১৮’ যুদ্ধবিমান। ১৯৮৩ সাল থেকে এই বিমানগুলি উড়ছে। বিশ্বব্যাপী বহু মিশনে এই বিমানগুলি ব্যবহৃত হলেও এগুলিকে প্রতিস্থাপনের ব্যাপারে কানাডার কোন সরকারই সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। হয়তো তা কানাডার প্রতিরক্ষা চিন্তারই ফসল। কানাডা হলো একটা অগ্নিনিরোধক বাড়ি; যা দাহ্য বস্তু থেকে বহু দূরে।


কানাডা হলো অগ্নিরিরোধক বাড়ি

‘দ্যা কনভারসেশন’এর এক লেখায় ‘কানাডিয়ান ফোর্সেস কলেজ’এর প্রফেসর পল টি মিচেল ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন যে, কানাডিয়রা তাদের নিরাপত্তাকে কিভাবে দেখে। ১৯২৪ সালে কানাডার রাজনীতিবিদ রাউল ডানডুরান্ড বলেন যে, কানাডা হলো একটা অগ্নিনিরোধক বাড়ি; যা দাহ্য বস্তু থেকে বহু দূরে। তিনি প্রকৃতপক্ষে ১৮৬৭ সাল থেকে কানাডার প্রতিরক্ষা চিন্তাকেই তুলে ধরেন। সহজ কথা বলতে গেলে, তিনটা মহাসাগরের মাঝে অবস্থান এবং একটা সুপারপাওয়ারের পাশে থাকার কারণে কানাডিয়দের নিজেদের প্রতিরক্ষা নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই। ১৯৫০এর দশক থেকেই কানাডার সকল সরকারের প্রতিরক্ষানীতির মূল কর্মকান্ড ছিল তিনটা; কানাডাকে রক্ষা করা; উত্তর আমেরিকাকে রক্ষা করা; এবং আন্তর্জাতিক শান্তি এবং নিরাপত্তায় সহায়তা করা। এই ব্যাপারগুলি এতটাই অপরিবর্তনীয় রয়েছে যে, সাম্প্রতিক নির্বাচনেও প্রতিরক্ষার ব্যাপারটা নিয়ে কেউ কোন কথাই বলেনি। অনেকেই মনে করেন যে, কানাডার প্রকৃতপক্ষে কনস্টাবুলারি বাহিনী ছাড়া আর কিছুর দরকার নেই; যাদের কাজ হবে বনের দাবানল থামানো এবং মানুষকে বিপদে উদ্ধার করা। কেবলমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেরই সক্ষমতা আছে কানাডাকে আক্রমণ করার। এটা হয়তো বাস্তবে হবে না; তবে যদি এটা হয়েই যায়, তাহলে মিচেলের ব্যাখ্যা হলো, কানাডা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সহায়তার আবেদন জানাবে।

১৯৫০এর দশক থেকেই কানাডা তার সামরিক সক্ষমতা কমাচ্ছে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে কানাডার বিমান বাহিনীর ‘সিএফ ১৮’ যুদ্ধবিমানগুলিকে প্রতিস্থাপনের গুরুত্ব বোঝা গেলেও সকল সরকারই এই বিমানগুলির ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীনতায় পড়েছে। এমনকি প্রতিরক্ষা নিয়ে বেশি চিন্তিত কনজারভেটিভ সরকারও এব্যাপারে কিছু করতে পারেনি। অথচ যুগে যুগে কানাডা বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন যুদ্ধে জড়িয়েছে এবং এই বিমানগুলিই সার্ভিস দিয়ে গেছে। ১৯৮৩ সালে কানাডার বিমান বাহিনী ১’শ ৩৮টা ‘সিএফ ১৮’ বিমান সংগ্রহ শুরু করে। বিমানগুলি ১৯৯১ সালে ইরাক যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়। এরপর ১৯৯০এর দশকে কসভোতে; ২০১১ সালে লিবিয়াতে; এমনকি সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আইসিসের বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হয়েছে। প্রায় চার দশক ধরে ব্যবহারের পরে এখন মাত্র ৮৫টার মতো বিমান সার্ভিসে রয়েছে। এই বিমানগুলিকে আরও সময় সার্ভিসে রাখার জন্যে অস্ট্রেলিয়ার বিমান বাহিনী থেকে রিটায়ার করা একই ধরনের ১৮টা বিমান এর সাথে যুক্ত করা হয়।

কানাডা তার সামরিক সক্ষমতা কমাতে থাকলেও তার বৈশ্বিক দায়িত্ব থেকে সে সড়ে আসেনি। কাজেই বিভিন্ন সময়ে কানাডা যুদ্ধে জড়িয়েছে; এবং প্রতিবারই কানাডার সামরিক বাহিনী সেই দায়িত্ব পালনের জন্যে তৈরি ছিল না। কারণ কানাডিয়রা মনে করেছে যে, তাদের সামরিক সক্ষমতার ব্যাপারে চিন্তার দরকার নেই। পল মিচেল বলছেন যে, কানাডিয়দের এহেন চিন্তার ফলে বর্তমান আইনের শাসনের উপর প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে রক্ষার ব্যাপারে কানাডিয়দের কতটা সদিচ্ছা রয়েছে, তা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। অর্থাৎ সামরিক সক্ষমতার ব্যাপারে উদাসীনতা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, পশ্চিমা আদর্শকে রক্ষার পিছনে কানাডার চেষ্টার ঘাটতি রয়েছে।

সেপ্টেম্বর ২০২১; নির্বাচনে জয়লাভ করেছে জাস্টিন ট্রুডোর লিবারাল পার্টি। ১৯৫০এর দশক থেকে কানাডার কোন নির্বাচনেই প্রতিরক্ষা কোন আলোচ্য বিষয়বস্তুই ছিল না। বিশেষ করে ২০২০ সালে লিবারাল সরকার কানাডার জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৪৫ শতাংশ প্রতিরক্ষায় খরচ করায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নিয়মিত বিরোধের মাঝে রয়েছে।



কানাডার লিবারাল সরকার এবং প্রতিরক্ষা বাজেট

জ্যেষ্ঠ কানাডিয় সাংবাদিক এবং মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা আটলান্টিক কাউন্সিল’এর সিনিয়র ফেলো ডাইএন ফ্রান্সিস ‘ফিনানশিয়াল পোস্ট’এর লেখায় কানাডার প্রতিরক্ষানীতির ব্যাপক সমালোচনা করেন। তিনি বলছেন যে, কানাডার আর্কটিকে রুশ এবং চীনা হুমকি মোকাবিলায় কানাডা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে; যার ফলশ্রুতিতে যুক্তরাষ্ট্র কিছু দায়িত্ব নিয়েছে; আর ব্রিটিশরাও এখন এখানে জড়িত হতে চাইছে। প্রশান্ত মহাসাগরে অস্ট্রেলিয়া চীনের হুমকি বুঝতে পেরেছে বলেই যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের সাথে চুক্তি করেছে এবং আটটা পারমাণবিক সাবমেরিন কেনার পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু কানাডা এখনও চীনের হুমকি মোকাবিলায় চিন্তা করছে না। একইসাথে আর্কটিকে কানাডার সক্ষমতা একেবারেই যথেষ্ট নয়। আর লিবারাল সরকার প্রতিরক্ষা বাজেট যেমন একেবারেই কমিয়ে রেখেছে, তেমনি আর্কটিক অঞ্চলও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রতিরক্ষার ব্যাপারে কানাডার সিদ্ধান্তহীনতা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি। শুধু তাই নয়, ন্যাটোর মাঝে কানাডার অবস্থান সন্মানজনক নয়। ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের সদস্যরা মনে করে যে, কানাডার ইন্টেলিজেন্সের উপর নির্ভর করা যায় না; কারণ তারা তথ্য গোপন রাখতে অক্ষম। ফ্রান্সিস বলছেন যে, কানাডার সবচাইতে কাছের বন্ধুরা কানাডার নিরাপত্তা নিজেদের হাতে নিতে চাইছে; কারণ কানাডার লিবারাল সরকার সার্বভৌম রাষ্ট্রের মতো কাজ করতে চাইছে না।

কানাডার প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রকল্প ‘নেটওয়ার্ক ফর স্ট্র্যাটেজিক এনালিসিস’এর এক লেখায় মাক্সান্ড্রে ফোর্টিয়ের ব্রিটেন এবং আস্ট্রেলিয়ার উদাহরণ টেনে নিয়ে আসছেন। তিনি বলছেন যে, কানাডার উচিৎ এই দুই দেশের মতো নিজেদের উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে চিন্তা করা। ব্রিটেন এবং অস্ট্রেলিয়া তাদের আকাংক্ষা বাস্তবায়নে যা দরকার সেগুলি যোগাড় করায় মনোনিবেশ করেছে। করোনাভাইরাসের মাঝে অর্থনৈতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও এবং অস্ট্রেলিয়ার দাবানলে মারাত্মক ক্ষতির পরেও এই দেশগুলি ন্যাটোর ঠিক করে দেয়া জিডিপির ২ শতাংশ প্রতিরক্ষায় খরচ করেছে। প্রতিরক্ষার পিছনে কম খরচ করাটা কানাডার সাথে তার বন্ধু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনার কারণ। তিনি ২০২০ সালের একটা জনমত জরিপের বরাত দিয়ে বলছেন যে, কানাডার জনগণ এখন সামরিক বাহিনীতে বিনিয়োগ করার পক্ষে। কাজেই এখন কানাডার প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় না করাটা অর্থহীন। উল্লেখ্য যে, কানাডার লিবারাল সরকার ২০২০ সালে কানাডার জিডিপির ১ দশমিক ৪৫ শতাংশ প্রতিরক্ষায় খরচ করেছে।

‘রয়াল মিলিটারি কলেজ অব কানাডা’র প্রফেসর প্রাক্তন সামরিক অফিসার রস ফেটারলি কানাডার রাজনীতিতে সামরিক বাজেটের বিষয়টাকে নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলছেন যে, প্রতিরক্ষার বিষয়গুলি সবসময়ই দীর্ঘমেয়াদি এবং কানাডিয়দের কাছে এর সুবিধাগুলি সরাসরি নয়। অপরদিকে রাজনৈতিক দলগুলি এমন ইস্যুগুলি নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকে, যেগুলি মানুষের জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করে। নির্বাচনে জেতার জন্যে রাজনৈতিক দলগুলি সর্বদাই অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলি নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকে। অথচ কানাডার বাইরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলিই কিন্তু কানাডাকে দূরে কোথাও সৈন্য প্রেরণে বাধ্য করেছে। চার বছরের জন্যে যে সরকার নিয়োগ পেয়েছে, সেই সরকারের রেখে যাওয়া সিদ্ধান্তগুলি পরবর্তী দুই দশকের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ হবে। কাজেই কানাডার সরকারের উচিৎ হবে পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতি বিচার করেই বর্তমান প্রতিরক্ষানীতিকে নতুন করে দেখা এবং এতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সাধন করা। 

কানাডা আর্কটিকে তার সবচাইতে কাছের বন্ধুদেরও অবস্থান দিতে নারাজ। কারণ ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই কানাডার উত্তরাঞ্চলের আর্কটিক দ্বীপপুঞ্জের মাঝ দিয়ে যাওয়া ‘নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ’এর সার্বভৌমত্ব কানাডার বলে স্বীকার করে না।


‘অকাস’ চুক্তির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব এখনও সবে সামনে আসছে। ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর মাঝে অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডার চিন্তাগত পার্থক্যগুলি এখনও পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান। অস্ট্রেলিয়া চীনকে যতটা হুমকি হিসেবে দেখছে, কানাডা ততটা হুমকি হিসেবে দেখছে না। নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইস্যুগুলিকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে কানাডার সরকার পশ্চিমা আদর্শকে রক্ষা করার আন্তর্জাতিক দায়িত্বকে দ্বিতীয় সাড়ির দায়িত্ব হিসেবে দেখেছে। একারণে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কানাডা সরকারের টানাপোড়েন চলছেই। এখন এখানে ব্রিটেনও যোগ হয়েছে। কানাডার রাষ্ট্রীয় চিন্তাবিদদের মাঝে প্রতিরক্ষা বিষয়ে খরচ বৃদ্ধি করার ব্যাপারে যথেষ্ট একাত্মতা থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলি এখনও ভোট পাবার জন্যে অভ্যন্তরীণ ইস্যুগুলির উপরেই নির্ভরশীল। সুরক্ষিত ‘অগ্নি নিরোধক বাড়ি’র সাথে নিজেদের অবস্থানকে তুলনা করে কানাডিয়রা প্রতিরক্ষা খাতে নিজেদের ব্যয় বৃদ্ধি করতে চাইছে না। আবার আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা দেবার সক্ষমতা খুব কম থাকলেও সেখানে ‘নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ’এর সার্বভৌমত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের সাথে দ্বন্দ্বের মাঝে রয়েছে কানাডা। একারণেই আর্কটিকের বরফের নিচে ব্রিটিশ পারমাণবিক সাবমেরিন মোতায়েনের প্রস্তাবটা এখনও কানাডার সরকারের কাছে আলোচ্য বিষয়। ইংরেজি ভাষাভাষী ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের সদস্য হবার পরেও দেশগুলির মাঝে বিরোধ লক্ষ্যণীয়।

Wednesday, 22 May 2019

আর্কটিকে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার দ্বন্দ্ব কোনদিকে যাচ্ছে?

‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’এর কারণে আর্কটিকে বরফ গলার সাথেসাথে সমুদ্রপথ উন্মুক্ত হচ্ছে। এখন বছরের বেশ কয়েক মাস রুশ আর্কটিক দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে পারছে, যা ইতিহাসে প্রথম। এই নৌ-রুটের সাথে সাথে এর নিরাপত্তার ব্যাপারটাও রাশিয়ার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
২৩শে মে ২০১৯

৬ই মে মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পেও উত্তর মেরুর কাছের আর্কটিক এলাকায় রাশিয়া এবং চীনের আগ্রাসী ভূমিকার বিরুদ্ধে সাবধান করেন। তিনি বলেন যে, আর্কটিক এলাকা এখন বিশ্বশক্তিদের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। পম্পেও ফিনল্যান্ডে ‘আর্কটিক কাউন্সিল’এর এক সভায় এই কথাগুলি বলেন। ‘আর্কটিক কাউন্সিল’এ রয়েছে আর্কটিক অঞ্চলের আটটা রাষ্ট্র এবং ঐ অঞ্চলে বসবাসরত মানুষদের প্রতিনিধিরা। পম্পেও আর্কটিকের পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলি নিয়ে কথা না বলে বরং এই অঞ্চলকে একটা সুযোগের অঞ্চল বলে আখ্যা দেন। আর্কটিকের তেল, গ্যাস, ইউরেনিয়াম, স্বর্ণ, মৎস্য সম্পদ এবং ‘রেয়ার আর্থ’ খনিজ-কেই তিনি বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। একইসাথে আর্কটিকের সমুদ্র রুটের উপর বেইজিং এবং মস্কোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা অত্র অঞ্চলে দক্ষিণ চীন সাগরের মতোই এক প্রতিযোগিতার জন্ম দিতে পারে বলে বলেন তিনি। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এই কাউন্সিল তৈরির সময় এর মূল আলোচ্য বিষয় ছিল পরিবেশ; আর নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার কোন ব্যবস্থাই এখানে রাখা হয়নি। তাই পম্পেও-এর কথায় আলোচনায় অংশ নেয়া প্রতিনিধিরা হতবাক হয়ে যান।

শুধু তা-ই নয়, পম্পেও কানাডার মাঝ দিয়ে যাওয়া ‘নর্থ-ওয়েস্ট প্যাসেজ’-কে আন্তর্জাতিক নৌ-রুট বলে আখ্যা দেন, যা কিনা কানাডা নিজেদের বলে মনে করে। পম্পেও-এর কথায় কানাডিয়রা বেশ ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তবে রাশিয়ার আর্কটিকের ‘নর্দার্ন সী রুট’ বা ‘এনএসআর’কে আন্তর্জাতিক নৌ-রুট হিসেবে আখ্যা দেবার জন্যেই যে পম্পেও কানাডার ‘নর্থ-ওয়েস্ট প্যাসেজ’-কে আন্তর্জাতিক নৌ-রুট বলে আখ্যা দেন, তা বোঝা যাচ্ছে। তদুপরি ‘নর্থ-ওয়েস্ট প্যাসেজ’-কে রক্ষা করার নিমিত্তে কানাডা সেখানে যতটা নিরাপত্তা কার্যক্রমে হাত দিয়েছে, তা রাশিয়ার নিরাপত্তা কার্যক্রমের সাথে তুলনীয় নয় মোটেই। ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’এর কারণে আর্কটিকে বরফ গলার সাথেসাথে সমুদ্রপথ উন্মুক্ত হচ্ছে। এখন বছরের বেশ কয়েক মাস রুশ আর্কটিক দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে পারছে, যা ইতিহাসে প্রথম। এই নৌ-রুটের সাথে সাথে এর নিরাপত্তার ব্যাপারটাও রাশিয়ার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

আর্কটিকের সামরিকীকরণ
রাশিয়ার তিনি-কোণা এই ঘাঁটিগুলিকে বলা হচ্ছে ‘আর্কটিক ট্রেফয়েল’। লাল-সাদা-নীল রং-এর এই ঘাঁটিগুলির ১৪ হাজার বর্গমিটার স্থানে ১’শ ৫০ জন সেনা দেড় বছর থাকতে পারবে বলে বলা হচ্ছে।

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে রুশ সেনারা সাইবেরিয়ার উত্তরে নিউ সাইবেরিয়ান দ্বীপপুঞ্জের কোটেলনি দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করা শুরু করে। একইসাথে সেখানে সারাবছর সাপ্লাই পৌঁছানোর জন্যে একটা বড়সড় এয়ারফিল্ড এবং উপকূলে একটা জেটি তৈরি শুরু করে। আর্কটিকে দ্বিতীয় ঘাঁটিটি তৈরি করা হয় আরও পশ্চিমে ফ্রাঞ্জ যোসেফ ল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের আলেক্সান্দ্রা ল্যান্ড-এ। এখানেও একটা আড়াই কিঃমিঃ লম্বা এয়ারফিল্ড তৈরি করা হচ্ছে। তিনি-কোণা এই ঘাঁটিগুলিকে বলা হচ্ছে ‘আর্কটিক ট্রেফয়েল’। লাল-সাদা-নীল রং-এর এই ঘাঁটিগুলির ১৪ হাজার বর্গমিটার স্থানে ১’শ ৫০ জন সেনা দেড় বছর থাকতে পারবে বলে বলা হচ্ছে। এগুলি ছাড়াও নোভায়া জেমলিয়া দ্বীপের রোগাচেভো, সাইবেরিয়ার চুকচি সাগরে কেপ শ্মিট ও র‍্যাংগেল দ্বীপ, এবং মুরমানস্ক-এর কাছাকাছি স্রেদনি-তে আরও সামরিক ঘাঁটি তৈরি করা হচ্ছে।

গত মার্চে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পত্রিকা ‘ক্রাসনায়া জুএজদা’র সাথে কথা বলতে গিয়ে রুশ নৌবাহিনীর নর্দার্ন ফ্লিটের কমান্ডার এডমিরাল নিকোলাই ইয়েভমেনভ বলেন যে, রুশ সাইবেরিয়ার উত্তরে তিকসি শহরে নতুন করে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে, যা কিনা আর্কটিকের ‘নর্দার্ন সী রুট’ বা ‘এনএসআর’এর আকাশের নিরাপত্তা দেবে। এয়েভমেনভ আরও বলেন যে, নির্দার্ন ফ্লিটকে ‘ব্যাসচন’ উপকূল প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা দিয়ে সজ্জিত করা হবে। ‘ব্যাসচন’ ব্যবস্থার মূলে রয়েছে ৬’শ কিঃমিঃ পাল্লার জাহাজ বিধ্বংসী সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘ওনিক্স’। ২০১৮-এর সেপ্টেম্বরে এক সামরিক মহড়ায় আর্কটিকের কোতেলনি দ্বীপে ‘ব্যাসচন’ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছিল বলে রুশ মিডিয়া ‘ইন্টারফ্যাক্স’ জানায়। আর একই বছরের নভেম্বর থেকে আর্কটিকে ‘টর-এম২ডিটি’ স্বল্পপাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন শুরু হয়েছে বলে রুশ বার্তা সংস্থা ‘তাস’ জানায়।

২১শে মে রুশ নৌবাহিনীর নর্দার্ন ফ্লিটের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা ‘ইজভেস্তিয়া’ জানাচ্ছে যে, রুশ সামরিক বাহিনী পুরো আর্কটিক অঞ্চল জুড়ে ইলেকট্রনিক যুদ্ধের সরঞ্জাম বসিয়েছে। এই সুবাদে পুরো উত্তর মেরু এলাকা জুড়ে শত্রুপক্ষের যেকোন সামরিক ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিকে অকার্যকর করে ফেলার সক্ষমতা অর্জন করেছে তারা। মোতায়েনকৃত সরঞ্জামের মাঝে রয়েছে সর্বশেষ প্রযুক্তির ‘মুরমানস্ক-বিএন’ নামের স্ট্রাটেজিক জ্যামিং সিস্টেম, যা কিনা ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার কিঃমিঃ দূর পর্যন্ত প্রতিপক্ষের শর্টওয়েভ রেডিও যোগাযোগ ব্যবস্থা অকার্যকর করে দিয়ে সক্ষম। এই প্রযুক্তি তৈরি করা হয়েছে পশ্চিমাদের ‘হাই-ফ্রিকুয়েন্সি গ্লোবাল কমিউনিকেন্স সিস্টেম’কে টার্গেট করে। ২০১৬ সালের নভেম্বর থেকে এই প্রযুক্তি কার্যকর হয়েছে। রুশ পত্রিকা ‘ব্যারেন্টস অবজার্ভার’ জানাচ্ছে যে, এই সিস্টেমের একটা মোতায়েন করা হয়েছে রুশ আর্কটিকের একেবারে পশ্চিমে স্ক্যান্ডিনেভিয়া (নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক)-এর কাছে কোলা উপদ্বীপের সেভেরোমোরস্ক-এ; আর আরেকটা মোতায়েন করা হয়েছে একেবারে পূর্বে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে কামচাটকা উপদ্বীপে। রুশ আর্কটিকে পশ্চিম এবং পূর্ব দিক থেকে ঢোকার পথগুলিকেই পাহাড়া দিচ্ছে এই স্থাপনাগুলি।

‘মুরমানস্ক-বিএন’ ছাড়াও রুশরা ‘ক্রাসুখা-২’ এবং ‘ক্রাসুখা-৪’ নামের মধ্যম-পাল্লার জ্যামিং সিস্টেম মোতায়েন করেছে। এগুলি আড়াই’শ থেকে ৩’শ কিঃমিঃ দূর পর্যন্ত শত্রুর আকাশে পরিবাহিত রাডার অকার্যকর করে ফেলতে সক্ষম। পশ্চিমাদের ‘এয়ারবোর্ন ওয়ার্নিং এন্ড কন্ট্রোল সিস্টেম’ বা ‘এওয়াকস’ বিমানকে টার্গেট করে এই প্রযুক্তি তৈরি করা হলেও ‘ক্রাসুখা-৪’ স্যাটেলাইটের সাথে যোগাযোগ ব্যাহত করতে সক্ষম বলে মনে করা হয়। ২০১৪ সাল থেকে এগুলি সার্ভিসে এসেছে। রুশ আর্কটিকের নোভায়া জেমলিয়া, সেভেরনায়া জেমলিয়া, নিউ সাইবেরিয়ান দ্বীপপুঞ্জ এবং চুকোতকা-তে এই সিস্টেমগুলি মোতায়েন করা হয়েছে। এগুলি ছাড়াও সর্বশেষ প্রযুক্তির ‘দিভনোমোরইয়ে’ নামের আরও একটা জ্যামিং সিস্টেম মোতায়েন করা হয়েছে, যা কিনা আকাশে ওড়া বিমানের রাডার ও ইলেকট্রনিক্স এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগ অচল করে দিতে সক্ষম। মধ্যম-পাল্লার এই জ্যামিং সিস্টেমগুলি রুশ আর্কটিকের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলিকে নিরাপত্তা দেবার উদ্দেশ্যে মোতায়েন করা হয়েছে। এগুলিকে খুব দ্রুত মোতায়েন করা এবং সরিয়ে নেয়া সম্ভব। ‘ব্যারেন্টস অবজার্ভার’ বলছে যে, গত দুই বছর ধরেই স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলে বেসামরিক বিমান এবং বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে স্যাটেলাইটের সাথে যোগাযোগ হারাবার ঘটনা ঘটছে। এবছরের মার্চে নরওয়ের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রুশ সামরিক বাহিনীকে তাদের জ্যামিং অপারেশন থামাবার জন্যে অনুরোধ করেছে। তারা বলছেন যে, রাশিয়া তার নিজ ভূখন্ডে নিজেদের সক্ষমতা যাচাইয়ে যেকোন কিছুই করতে পারে, কিন্তু তা নরওয়ের আকাশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে নয়।





সবকিছুর মূলেই অর্থনীতি

রুশরা আর্কটিকে তাদের অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলির নিরাপত্তা দিতেই এই সামরিকীকরণ করছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আশা করছেন যে, আর্কটিকের ‘নর্দার্ন সী রুট’ বা ‘এনএসআর’ দিয়ে মালামাল পরিবহণ ২০২৫ সাল নাগাদ ৮ কোটি টন হবে। ‘সেন্টার ফর হাই নর্থ লজিস্টিকস’এর হিসেবে ২০১৮ সালে ‘এনএসআর’ দিয়ে ২ কোটি ২ লক্ষ টন মালামাল পরিবাহিত হয়েছে, যা আগের বছর ছিল ১ কোটি ৭ লক্ষ টন। রুশ মিডিয়া ‘আরবিসি’ জানাচ্ছে যে, গত মার্চে রুশ ‘ন্যাচারাল রিসোর্সেস এন্ড এনভায়রনমেন্ট মিনিস্ট্রি’ আর্কটিকে মোট ১’শ ১৮টা প্রকল্পের এক বিশাল তালিকা সরকারের কাছে পাঠিয়েছে। তাদের হিসেবে এই প্রকল্পগুলিতে মোট বিনিয়োগ হবে ১০ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন রুবল বা ১’শ ৬৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। এই পুরো বিনিয়োগই ‘এনএসআর’ বরাবর হবে। বর্তমানে চলমান ২৫টা প্রকল্পের মাঝে রয়েছে রুশ সরকারি কোম্পানি ‘গ্যাজপ্রম’এর ‘নভোপোর্টোভস্কই’ তেলের খনি; রুশ সরকারি কোম্পানি ‘রজফেফত’এর ‘ভ্যানকর’ তেলের খনি; সাইবেরিয়াতে ‘গ্যাজপ্রম’এর ‘আচিমগ্যাজ’ খনি; এবং সবচাইতে বড় ‘ইয়ামাল’ এলএনজি প্রকল্প। ২০১৬ সালের মে মাসে ভ্লাদিমির পুতিন ‘নভোপোর্টোভস্কই’ তেলের খনি থেকে প্রথমবারের মতো তেল উত্তোলন এবং পরিবহন উদ্ভোধন করেন। এই প্রকল্পে মোট ১’শ ৮৬ বিলিয়ন রুবল বা ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে বলে বলেন তিনি।

রুশ ইহুদি বিলিয়নেয়ার লিওনিড মিখেলসন-এর কোম্পানি ‘নোভাটেক’-এর নেতৃত্বে ‘ইয়ামাল’ উপদ্বীপে চলছে ২৭ বিলিয়ন ডলারের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। এখান থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন করে তরলীকৃত করে ‘এলএনজি’ আকারে জাহাজে করে গ্যাস রপ্তানি করা হচ্ছে চীনে। ‘ইয়ামাল’এর মালিকারার ৫০ শতাংশ রয়েছে রুশ কোম্পানি ‘নোভাটেক’-এর হাতে। বাকিটার ২০ শতাংশ রয়েছে ফরাসী কোম্পানি ‘টোটাল’এর কাছে; আরও ২০ শতাংশ চীনা কোম্পানি ‘সিএনপিসি’এর কাছে; আর আর বাকি প্রায় ১০ শতাংশের মতো রয়েছে চীনা ‘সিল্ক রোড ফান্ড’এর কাছে। ‘ইয়ামাল’ বছরে প্রায় ১ কোটি ৬৫ লক্ষ টন এলএনজি উৎপাদন করতে সক্ষম। এলএনজি পরিবহণের জন্যে সেখানে তৈরি করা হচ্ছে ‘সাবেত্তা’ নামের এক সমুদ্রবন্দর। সেখান থেকে এলএনজি পরিবহণ করে চীন পর্যন্ত নিয়ে যাবার জন্যে দৈত্যাকৃতির একেকটা প্রায় ৩’শ মিটার লম্বা এবং ১ লক্ষ ১০ হাজার টন এলএনজি ধারণক্ষমতার ১৫টা জাহাজ তৈরি করা হচ্ছে, যেগুলি কিনা আড়াই মিটার পর্যন্ত পুরু বরফ ভেঙ্গে চলতে সক্ষম। ফিনল্যান্ডে ডিজাইন করা এই জাহাজগুলিকে তৈরি করছে দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানি দাইউ শিপবিল্ডিং। জাহাজগুলির মালিকানা রয়েছে মূলতঃ আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলির কাছে – ড্যানিশ-ক্যানাডিয়ান কোম্পানি ‘টিকে কর্পোরেশন’ এবং ‘চায়না এলএনজি’এর জয়েন্ট ভেঞ্চার (৬টা), গ্রীক বিলিয়নেয়ার জর্জ প্রকোপিউ-এর কোম্পানি ‘ডাইনাগ্যাস’ (৫টা), জাপানি কোম্পানি ‘এমওএল’ (৩টা) এবং রুশ কোম্পানি ‘সভকমফ্লট’ (১টা)।
 


‘ইয়ামাল’এর পাশেই ‘গাইদান’ উপদ্বীপে নেয়া হয়েছে ‘আর্কটিক এলএনজি-২’ নামের ২৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের আরও একখানা মেগা প্রকল্প। এর উৎপাদন ক্ষমতা হবে বছরে ১ কোটি ৯৮ লক্ষ টন এলএনজি। রুশ কোম্পানি ‘নোভাটেক’ নিজেদের কাছে ৬০ শতাংশের মতো মালিকানা রেখে বাকিটা বিক্রি করার প্রচেষ্টায় রয়েছে। ‘রয়টার্স’ জানাচ্ছে যে, গত এপ্রিলে ‘নোভাটেক’ চীনের দু’টা কোম্পানির (‘সিএনওডিসি’ ও ‘সিএনওওসি’) কাছে ২০ শতাংশ মালিকানা বিক্রি করেছে। এর আগেই ২০১৯-এর শুরুতে ফরসী কোম্পানি ‘টোটাল’ কিনেছে ১০ শতাংশ মালিকানা। ‘নোভাটেক’ কোম্পানির মাঝেই আবার ‘টোটাল’এর ১৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। গত ডিসেম্বরেই খবর আসে যে, এই প্রকল্পে সৌদি কোম্পানি ‘আরামকো’, জাপানি কোম্পানি ‘মিতসুই’ এবং ‘রাশান ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড’ বিনিয়োগ করতে চাইছে। ২০২২-২৩ সাল থেকে এই প্রকল্পে উৎপাদন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। ক’দিন আগেই ফরাসী কোম্পানি ‘টেকনিপ’কে এই প্রকল্প তৈরি করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বলে খবরে প্রকাশ।

চীনারা রুশ আর্কটিকে তেল-গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে বিনিয়োগ করছে। আর্কটিকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে চীনা কোম্পানি ‘সিএনওওসি’এর সাথে রুশ কোম্পানি ‘গ্যাজপ্রম’এর এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর ফলে ইয়ামাল উপদ্বীপের পশ্চিমে কারা সাগরে ২০১৭ সাল থেকে কাজ করছে ১৫ হাজার টনের চীনা ড্রিলিং রিগ ‘নান হাই বা হাও’। ইতোমধ্যেই চীনারা সেখানে ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন কিউবিক মিটার বা প্রায় ৪২ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট গ্যাস আবিষ্কার করেছে।


২০১৮-এর মার্চে ‘আইস এক্সারসাইজ-২০১৮’ নামের মহড়ার সময় মার্কিন নৌবাহিনীর সাবমেরিন ‘ইউএসএস হার্টফোর্ড’ ও ‘ইউএসএস কানেকটিকাট’ এবং ব্রিটিশ রয়াল নেভির সাবমেরিন ‘এইচএমএস ট্রেনচ্যান্ট’ একত্রে আর্কটিক অঞ্চলের বরফ ফুঁড়ে উঠে আসে। এধরনের মিশনের মাধ্যমে পশ্চিমারা দক্ষিণ চীন সাগরে যে কাজটা করছে, সেটাই উত্তর মেরুতে করছে; আর তা হলো, পশ্চিমাদের ঘোষিত আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে নিজেদের সামরিক জাহাজ যেতে পারার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।

পশ্চিমা প্রত্যুত্তর

আর্কটিকে রাশিয়ার সামরিকীকরণের প্রত্যুত্তর হিসেবে পশ্চিমা দেশগুলিও আর্কটিক এলাকায় মহড়া চালাচ্ছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার নরওয়ে এবং ফিনল্যান্ডে মার্কিন এবং ব্রিটিশ সেনারা নিয়মিত মহড়া চালাচ্ছে। সেখানে তাপমাত্রা শূণ্যের ৩০ ডিগ্রী নিচে পর্যন্ত নেমে যায়। গত বছরের অক্টোবর-নভেম্বরে ন্যাটো ‘ট্রাইডেন্ট জাঙ্কচার’ নামে এক সামরিক মহড়া করে, যাতে অংশ নেয় ৫০ হাজার সৈন্য, ৬৫টা যুদ্ধজাহাজ, ২’শ ৫০টা যুদ্ধবিমান, ১০ হাজার গাড়ি। ১৯৮৭ সালের পর থেকে প্রথমবারের মতো মার্কিন নৌবাহিনী আর্কটিক অঞ্চলের কাছাকাছি একটা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ পাঠায়। ন্যাটোভুক্ত দেশগুলি ছাড়াও এতে অংশ নেয় সুইডেন এবং ফিনল্যান্ড। ‘দ্যা ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় ‘ইউএস নেভাল ওয়ার কলেজ’এর ম্যারি থম্পসন বলছেন যে, এধরনের মহড়া সংজ্ঞাগতভাবেই সীমাবদ্ধ। এই মহড়ার কারণে অত্র এলাকার সামরিক ব্যালান্সে স্থায়ী কোন পরিবর্তন সংগঠিত হবে না; স্থায়ী কোন সামরিক স্থাপনাও তৈরি হবে না। আবার এর ফলশ্রুতিতে বরফাচ্ছাদিত এলাকায় চলাচলের জন্যে কোন আইসব্রেকারও তৈরি করা হবে না।

২০১৩ সালের অগাস্টে মার্কিন নৌবাহিনীর পারমানবিক শক্তিচাইল সাবমেরিন ‘ইউএসএস সীউলফ’ যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলের ওয়াশিংটনে রাজ্যের ব্রেমারটন নৌঘাঁটি থেকে যাত্রা করে এক মাস পর নরওয়ের হাকন্সভার্ন নৌঁঘাঁটিতে গিয়ে নোঙ্গর করে; যেখানে নরওয়েতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্যারি হোয়াইট সাবমেরিন পরিদর্শন করেন। মানচিত্রের দিকে তাকালেই বোঝা সম্ভব যে সাবমেরিনটার প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ইউরোপ যাবার একমাত্র পদ্ধতিই হলো উত্তর মেরুর বরফের নিচ দিয়ে যাওয়া! ২০১৮-এর মার্চে ‘আইস এক্সারসাইজ-২০১৮’ নামের মহড়ার সময় মার্কিন নৌবাহিনীর সাবমেরিন ‘ইউএসএস হার্টফোর্ড’ ও ‘ইউএসএস কানেকটিকাট’ এবং ব্রিটিশ রয়াল নেভির সাবমেরিন ‘এইচএমএস ট্রেনচ্যান্ট’ একত্রে আর্কটিক অঞ্চলের বরফ ফুঁড়ে উঠে আসে। এধরনের মিশনের মাধ্যমে পশ্চিমারা দক্ষিণ চীন সাগরে যে কাজটা করছে, সেটাই উত্তর মেরুতে করছে; আর তা হলো, পশ্চিমাদের ঘোষিত আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে নিজেদের সামরিক জাহাজ যেতে পারার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।

সাবমেরিনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আর্কটিকে তার শক্তি প্রদর্শন করতে পারবে নিশ্চিত, তবে পানির উপরের ভাসমান জাহাজও তার দরকার হবে। আর ভাসমান জাহাজকে আর্কটিক অঞ্চলে চালাতে হলে পুরু বরফের আচ্ছাদন ভেঙ্গে চলার মতো আইসব্রেকার দরকার হবে। মার্কিন কোস্ট গার্ডের হিসেবে ২০ হাজার ব্রেকহর্সপাওয়ার বা এর চাইতে বেশি শক্তিশালী আইসব্রেকারের পক্ষেই শুধুমাত্র আর্কটিকে কাজ করা সম্ভব। আর্কটিক যে এতকাল যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে তেমন গুরুত্ব বহণ করেনি, তার প্রমাণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে মাত্র ৪টা আইসব্রেকার, যা কিনা আর্কটিক অঞ্চলে চলাচলে সক্ষম। ৪৩ বছর পর গত ফেব্রুয়ারিতে অবশেষে মার্কিন সরকার দু’টা আইসব্রেকার তৈরি করার জন্যে অর্থের সঙ্কুলান করেছে। কানাডার ৫টা আইসব্রেকারের মাঝে মাত্র দু’টা আর্কটিকে চলতে পারে। তারা বর্তমানে ৬টা হেভি আইসব্রেকার তৈরি করছে, যার প্রথমটা তৈরি প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। ফিনল্যান্ডের ১০টা আইসব্রেকারের মাঝে মাত্র ৩টা আর্কটিকের জন্য উপযোগী; সুইডেনের ১টা; আর জাপানের ১টা।
‘এনএসআর’এর নিরাপত্তা নিশ্চিতে রাশিয়া কিছু আইসব্রেকারকে অস্ত্রসজ্জিতও করছে। বর্তমানে নির্মীয়মান ‘প্রজেক্ট ২৩৫৫০’ প্রকল্পের জাহাজগুলি প্যাট্রোল জাহাজ হলেও এগুলি আর্কটিকে বরফ ভেঙ্গে চলার মতো করে তৈরি করা হচ্ছে। এগুলিকে কামান এবং ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সজ্জিত করা হচ্ছে

 
অন্যদিকে রাশিয়ার মোট ৪৬টা আইসব্রেকারের মাঝে আর্কটিকে চলাচলের জন্যে রয়েছে ২৬টা; যার মাঝে ৬টা আবার পারমানবিক শক্তিচালিত হেভি আইসব্রেকার। আর্কটিকে বরফে কোন একটা জাহাজ আটকা পড়ে গেলে পারমাণবিক আইসব্রেকারই সবচাইতে নির্ভরযোগ্য। কারণ তেলে-চালিত হলে সেটাকে আবার তেল নিতে হবে। রুশ আর্কটিকের হাজার মাইলের বরফাচ্ছাদিত অঞ্চলে জ্বালানির ব্যবস্থা করাটা আরেক চ্যালেঞ্জ। আরও ১১টা আইসব্রেকার তৈরি করছে রাশিয়া; যার মাঝে পারমাণবিক আইসব্রেকার রয়েছে কমপক্ষে ৩টা। রুশ আর্কটিকের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্থাপনা এবং সামরিক ঘাঁটিগুলিকে জ্বালানি, খাবার-দাবার এবং অন্যান্য রসদ সরবরাহ করে বছরব্যাপী চালু রাখতে আইসব্রেকারের কোন বিকল্প নেই। ‘এনএসআর’এর নিরাপত্তা নিশ্চিতে রাশিয়া কিছু আইসব্রেকারকে অস্ত্রসজ্জিতও করছে। বর্তমানে নির্মীয়মান ‘প্রজেক্ট ২৩৫৫০’ প্রকল্পের জাহাজগুলি প্যাট্রোল জাহাজ হলেও এগুলি আর্কটিকে বরফ ভেঙ্গে চলার মতো করে তৈরি করা হচ্ছে। এগুলিকে কামান এবং ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সজ্জিত করা হচ্ছে বলেও খবরে প্রকাশ। এগুলি ছাড়াও আর্কটিকে চলার জন্যে রাশিয়া স্পেশালিস্ট ট্যাঙ্কার জাহাজ, মাল্টি-পারপাস জাহাজ, আর্মামেন্ট সাপোর্ট শিপ এবং অন্যান্য ধরনের জাহাজ তৈরি করছে, যেগুলি ঐ অঞ্চলে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করবে। পশ্চিমাদের কাছে এগুলির ধারেকাছেও কোনকিছু নেই।

পশ্চিমা দেশগুলির আর্কটিকে তেমন কোন স্থাপনা নেই বলে তাদের হেভি আইসব্রেকারের দরকারও কম। আইসব্রেকারে বিনিয়োগই বলে দিচ্ছে কে আর্কটিককে কিভাবে দেখছে। রাশিয়ার জন্যে আর্কটিক অর্থনৈতিকভাবে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, পশ্চিমা দেশগুলির জন্যে কি ততটা গুরুত্বপূর্ণ? পশ্চিমারা আর্কটিকে শুধুমাত্র প্রভাব ধরে রাখতে সামরিক খাতে কতটা বিনিয়োগ করবে? কতগুলি আইসব্রেকারই বা তারা তৈরি করবে, যেগুলির কাজ হবে শুধুমাত্র রাশিয়াকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করা? কোন ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা পাবার আশা ছাড়াই পশ্চিমারা আর্কটিকে স্থায়ী স্থাপনা তৈরি করবে কি?

আর্কটিকের ভবিষ্যৎ কি?

রাশিয়া নিজেকে বিশ্বশক্তির কাতারে নিয়ে যেতে তার অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে চাইছে। সেই লক্ষ্যে আর্কটিকে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিয়ে আসছে রাশিয়া। বিনিয়োগকারীরাও চাইবে তাদের বিনিয়োগের সুরক্ষা হোক। তাই আর্কটিকের অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলির নিরাপত্তা দেবার রুশ প্রচেষ্টাকে বিনিয়োগকারীরা প্রশ্নবিদ্ধ করবে না; বরং নিরাপত্তার ব্যাপারগুলি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের সুরক্ষা দেবার রুশ সক্ষমতাকেই তুলে ধরবে। রুশ আর্কটিকে বিনিয়োগের এক বিশেষ দিক হলো এর উৎপাদিত বেশিরভাগ খনিজ সম্পদ চীনে রপ্তানি হবে। আর চীনা অর্থনীতির সাথে জড়িত হয়ে দুনিয়ার বড় বড় বিনিয়োগকারীরাও আরও বিত্তশালী হতে চাইছেন। যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলেও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীরা বরং ‘এনএসআর’কে ঝামেলা-মুক্ত দেখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে। তবে ‘এনএসআর’এর গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে পশ্চিমাদের ব্যাপক বিনিয়োগ এ-ও বলে দিচ্ছে যে তারা রুশ আর্কটিককে একেবারে চীনের হাতে ছেড়ে দিতে চাইছে না। পশ্চিমাদের বিনিয়োগের কারণেই আর্কটিকে চীনা প্রভাব নিয়ন্ত্রণে থাকবে, যা কিনা রাশিয়াকেও নাখোশ করবে না। অন্যদিকে কানাডার মাঝ দিয়ে প্রবাহিত ‘নর্থ-ওয়েস্ট প্যাসেজ’ যাতে চীনা প্রভাবের মাঝে পড়ে না যায়, সেদিকেও খেয়াল রাখবে যুক্তরাষ্ট্র। এই প্যাসেজ ব্যবহার করে চীন থেকে ইউরোপে জাহাজ যেতে পারবে অনেক তাড়াতাড়ি। কানাডার উপর প্রভাব খাটাতে পারলে এটা ‘এনএসআর’এর আরেকটা বিকল্পও হতে পারে চীনের জন্যে। আর একারণেই কানাডাকে নাখোশ করে হলেও ‘নর্থ-ওয়েস্ট প্যাসেজ’এর আন্তর্জাতিকীকরণ চাইবে যুক্তরাষ্ট্র।

চীনও চাইছে তার জ্বালানি চাহিদার একটা অংশকে মার্কিন নৌশক্তির নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল থেকে দূরে সরিয়ে নিতে। ‘এনএসআর’এর মাধ্যমে এলএনজি-বাহী জাহাজগুলি রুশ সামরিক পাহাড়ায় প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে। আর এভাবেই রাশিয়ার এই নৌ-রুট হয়ে উঠবে গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া এর আগে কখনোই গুরুত্বপূর্ণ কোন নৌপথের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। ‘গ্লোবাং ওয়ার্মিং’এর কারণে খুলে যাওয়া ‘এনএসআর’ রাশিয়াকে একটা ম্যারিটাইম রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি দিতে যাচ্ছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে রুশ পত্রিকা ‘দ্যা মস্কো টাইমস’এ এক লেখায় অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ‘সেন্টার ফর ইউরোপিয়ান স্টাডিজ’এর এলিজাবেথ বুকানান বলেন যে, ইউরোপ এবং এশিয়ার সংযোগ হিসেবে ‘নর্দার্ন সী রুট’ বা ‘এনএসআর’ রাশিয়াকে আর্কটিকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলছেন যে, ‘এনএসআর’এর ব্যবহার থেকে রাশিয়া যতটা না ট্যারিফ আয় করবে, তার চাইতে বড় ব্যাপার হবে পৃথিবীর একটা গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র রুটের উপরে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারা, যা কিনা হবে ইতিহাসে প্রথম।