Friday, 15 October 2021
ভারতের বিজেপি সরকারের ধর্মান্ধ কর্মকান্ড দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ভারতের অস্তিত্ব রক্ষা এখন দক্ষিণ এশিয়ার চ্যালেঞ্জ!
বাংলাদেশে বাঙালি হিন্দুদের অনুষ্ঠান দূর্গাপুজার পুজামন্ডপে পবিত্র কূরআন পাওয়ার ঘটনা এবং পরবর্তীতে সেটাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পুজামন্ডপে হামলা দেশটার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে চ্যালেঞ্জ করে। পরদিন ১৪ই অক্টোবর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি সাংবাদিকদের বলেন যে, তারা বাংলাদেশে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে হামলার খবর পেয়েছেন, যা তাদেরকে দুশ্চিন্তা দিয়েছে। তবে বাগচি বলেন যে, বাংলাদেশ সরকার দ্রুতই ঘটনার নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্যে ব্যবস্থা নেয়। একইসাথে তিনি এও বলেন যে, তাদের জানা রয়েছে যে, বাংলাদেশে দূর্গাপুজার অনুষ্ঠান সরকারের সহায়তাতেই হয়ে থাকে। ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তর বাংলাদেশ সরকারের পদক্ষেপের পক্ষে কথা বললেও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিজেপি নেতা সামিক ভট্টাচার্য্য বাংলাদেশ সরকারকে দোষারোপ করেন। তিনি বলেন যে, বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর এরকম নির্যাতন গত কয়েক মাসে বৃদ্ধি পেয়েছে; আর সেখানে সরকার চুপ করে দেখছে। একই দিনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হিন্দুদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতা ও প্রতিনিধিদের সাথে পুজার শুভেচ্ছা জানানোর অনুষ্ঠানে কঠোর ভাষায় এই কর্মকান্ডের পিছনে যারা জড়িত, তাদের শাস্তি দেবার কথা বলেন। একইসাথে তিনি ভারতকে উদ্দেশ্য করেও কিছু বলেন, যা অনেক মিডিয়াই এড়িয়ে যায় অথবা হাইলাইট না করার সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন যে, ভারত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশকে স্বাধীনতা পেতে সহায়তা দিয়েছে; যার জন্যে তাদের কথা বাংলাদেশ সবসময় কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করে। কিন্তু ভারতকে সাবধান থাকতে হবে যে, সেখানেও যাতে এমন কোনকিছু যেন না করা হয়, যা বাংলাদেশের উপরেও প্রভাব ফেলে এবং বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর আঘাত আসে। তিনি আরও বলেন যে, ধর্মান্ধরা সবসময়ই ধর্মীয় সংঘাত দেখতে চায়। এরা শুধু মুসলিমদের মাঝ থেকেই আসে না; অন্যান্য ধর্ম থেকেও আসে। শেখ হাসিনা ভারতের কোন ঘটনাকে নির্দিষ্ট করে না বললেও ভারতীয় মিডিয়া এই যোগসূত্র ধরতে ভুলেনি।
ভারতীয় পত্রিকা ‘দ্যা টেলিগ্রাফ’ বলছে যে, শেখ হাসিনা এমন সময়ে কথাগুলি বললেন, যখন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ্য বাংলাদেশে এমন একটা ধারণা জন্মেছে যে, ২০১৪ সালে বিজেপি সরকার ক্ষমতা নেবার পর থেকে ভারতের মুসলিমদের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকারের নতুন নাগরিকত্ব আইন, যার মাধ্যমে আসামে অগুণিত বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমকে বেআইনী বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী আখ্যা দিয়ে নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে বাস্তুচ্যুত করা হচ্ছে এবং ‘আর্টিকেল ৩৭০’ পরিবর্তনের মাধ্যমে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের বিশেষ স্ট্যাটাস বাতিল করে সেখানে অন্য অঞ্চলের হিন্দুদের বসতি স্থাপনের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা বাংলাদেশে মুসলিম বিরোধী কর্মকান্ড বলে পরিচিতি পেয়েছে।
গত ২৩শে সেপ্টেম্বর আসামের দারাং জেলায় তথাকথিত ‘বেআইনী বসতি স্থাপনকারী’দের বাস্তুচ্যুত করার পুলিশী মিশনে সাধারণ জনগণ বাধা দেয়। ‘হিন্দুস্তান টাইমস’ বলছে যে, এই সংঘর্ষে পুলিশের গুলিতে দু’জন ব্যক্তির মৃত্যু হয়। প্রতিবেদনে বলা হয় যে, সিপাঝার অঞ্চলের ধলপুর গ্রামে পুলিশের এই অভিযানের সময় করা এক ভিডিওতে দেখা যায় যে, এক ব্যক্তি পুলিশ এবং একজন ফটোগ্রাফারকে তাড়া করছে। এরপর একসময় পুলিশ সদস্যরা সেই ব্যক্তিকে ঘিরে ফেলে। সে মাটিতে পড়ে যায়, কারণ তার বুকে গুলি লেগেছিল। পুলিশ তখন তার উপর লাঠি দিয়ে আঘাত করতে থাকে। এরপর সেখানকার এক ফটোগ্রাফার বিজয় শংকর বানিয়া পড়ে যাওয়া মানুষটাকে লাথি মারতে থাকে এবং তার শরীরের উপর উঠে লাফাতে থাকে। একসময় সকলে যখন বুঝতে পারে যে, সে মৃত্যুবরণ করেছে, তখন পুলিশ তার মৃতদেহ সরিয়ে নিয়ে আসে। পুলিশ বলে যে, মৃত দুই ব্যক্তির নাম মইনুল হক এবং শেখ ফরিদ। পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ধলপুর গ্রামের অধিকাংশ মানুষ বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম। শেখ ফরিদ ছিল ১২ বছর বয়সী এক শিশু, যে পোস্ট অফিস থেকে সেখান দিয়ে বাড়ি যাচ্ছিল। ৩৫ বছর বয়সী মইনুল হক ছিলেন একজন সাধারণ গ্রামবাসী।
আসামের মূখ্যমন্ত্রী হিমান্ত বিশ্ব সর্মা বলেন যে, পুলিশ তাদের নিজেদের কাজ করছে। তিনি বলেন যে, তার পাওয়া তথ্য অনুযায়ী পুলিশ জনগণের কাছ থেকে রামদা, বল্লম এবং অন্যান্য অস্ত্র দ্বারা আক্রমণের শিকার হয়। তিনি পরিষ্কার করেন যে, বাস্তুচ্যুত করার এই মিশন চলবে। হিমান্ত সর্মা একসময় কংগ্রেস দলের সদস্য থাকলেও ২০১৫ সালে তিনি দল বদল করে বিজেপিতে যোগ দেন। ‘দ্যা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ বলছে যে, আসামের ধলপুর গ্রামের উত্তেজনা সেদিনই বন্ধ হয়ে যায়নি। পুলিশ ৩০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরও তিন ব্যক্তিকে ২৩শে সেপ্টেম্বরের ঘটনায় ইন্ধন যোগাবার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে।
ভারতের পূর্ব সীমানার কাছে আসামে যখন মুসলিমদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা হচ্ছে, তখন পশ্চিম সীমান্তে কাশ্মিরে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। ১১ই অক্টোবর ভারত অধিকৃত কাশ্মিরের পুঞ্চ জেলায় নিরাপত্তা বাহিনী বিচ্ছিন্নতাবাদী গেরিলাদের খোঁজা শুরু করলে গোলাগুলিতে পাঁচজন ভারতীয় সেনা নিহত হয়। এর কিছুদিন আগেই কাশ্মিরে সংখ্যালঘু হিন্দু বেসামরিক জনগণের উপর আক্রমণ শুরু হয়। হামলা এবং পাল্টা হামলায় বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হয়। ‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, অনেক সংখ্যালঘু পরিবারই এখন কাশ্মির ছাড়তে শুরু করেছে। তারা বলছে যে, এখন ১৯৯০এর দশকের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে সরকার কাশ্মিরে শান্তি ফেরার যে দাবিগুলি করছিল, তা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। ২০১৯ সালে বিজেপি সরকার কাশ্মিদের বিশেষ স্ট্যাটাস বাতিল করার পর থেকেই ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল কাশ্মিরে জনসংখ্যা বিষয়ক পরিবর্তন আনতে চেষ্টা চালাচ্ছে।
ধর্মান্ধতাকে উপজীব্য করে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে জড়িয়ে ভারতের বিজেপি সরকার শুধু ভারত তৈরির স্তম্ভকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে ক্ষান্ত হয়নি, পুরো দক্ষিণ এশিয়াতেও ধর্মীয় সহিংসতাকে উস্কে দিয়েছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাস নতুন নয়; তবে মোদির বিজেপি সরকার প্রথমবারের মতো ভারতের সেকুলার পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ বিভাজন এতটাই স্থায়ী রূপ নিচ্ছে যে, দেশটার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাটা এখন আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে। ভারতের অভ্যন্তরের উগ্র হিন্দুত্ববাদী কর্মকান্ডের প্রভাবের সীমানা অতিক্রম রোধ করার চিন্তাটাই দক্ষিণ এশিয়াকে সেই সহযোগিতার পথে হাঁটাবে।
Saturday, 5 September 2020
সৌদি পাকিস্তান টানাপোড়েন মুসলিম নেতৃত্বের বিভাজনকেই দেখিয়ে দেয়
০৫ই সেপ্টেম্বর ২০২০
পাকিস্তানের সাথে সৌদি আরবের সম্পর্ক নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ আলোচনা শুরু হয়েছে। দুই দেশের সম্পর্ক বেশ গভীর বলেই সকলে জানে, কিন্তু তারপরেও হঠাত করেই সম্পর্কে একটা টানাপোড়েন দেখা দেয়ায় অনেকেই অবাক হয়েছেন। ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন পাকিস্তানের পরররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশী গত ৪ঠা অগাস্ট পাকিস্তানের একটা টেলিভিশন চ্যানেলে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন যে, তিনি আবারও ‘ওআইসি’কে আহ্বান করছেন যাতে তারা কাশ্মির ইস্যুতে কাউন্সিল অব ফরেন মিনিস্টার্সএর একটা আলোচনার ডাক দেয়। যদি ‘ওআইসি’ সেটা করতে ব্যর্থ হয়, তবে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে বলতে বাধ্য হবেন যে, তিনি যেন এমন একটা আলাদা আলোচনার ডাক দেন, যেখানে কাশ্মির ইস্যুতে পাকিস্তানের সাথে দাঁড়াবে এমন মুসলিম দেশগুলি যোগ দেয়। তিনি বলেন যে, পাকিস্তানের নিজস্ব কিছু অবস্থান রয়েছে যেগুলি ‘ওআইসি’ এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলিকে বুঝতে হবে। কোরোশীর এই বক্তব্যের পরপরই ‘ফিনানশিয়াল টাইমস’ বলে যে, সৌদি আরব পাকিস্তানের জন্যে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা স্থগিত করেছে। একইসাথে তারা পাকিস্তানকে ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ ফেরত দিতে বলে। চীনাদের জরুরি সহায়তায় পাকিস্তান এই ঋণ ফেরত দেয়। এই ঋণ ২০১৮ সালের নভেম্বরে দেয়া হয়েছিল, তখন পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ভয়াবহ রকমের কমে গিয়েছিল। সৌদি আরব থেকে তেল কেনার মূল্য দেরিতে পরিশোধ করার ব্যাপারে দুই দেশের মাঝে যে চুক্তি রয়েছে, সেই চুক্তিও সৌদি আরব নবায়ন করা বন্ধ করে দিয়েছে বলে জানা যায়। ১৭ই অগাস্ট পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া সৌদি আরব সফরে গেলে পাকিস্তানের ‘ডন’ পত্রিকা বলে যে, অনেকেই মনে করছেন যে, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘ওআইসি’র আরব নেতৃত্বের সমালোচনা এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানের জন্যে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক সহায়তা বন্ধ করে দেয়ার ব্যাপারটার সাথে সেনাপ্রধানের এই সফরের সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এই সফরকে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মাঝে নিয়মিত সফরের অংশ হিসেবেই আখ্যা দেয়। এর কয়েকদিন পরেই পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এক বিবৃতিতে কাশ্মিরের ব্যাপারে ‘ওআইসি’র ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করা হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোরেশীও সাংবাদিকদের বলেন যে, কাশ্মির ইস্যুতে ‘ওআইসি’ বহু রেজোলিউশন পাস করেছে, যার ব্যাপারে কোন সন্দেহই নেই। আর সেই ব্যাপারগুলি পাকিস্তানের অবস্থানের সাথে মিল রেখেই হয়েছিল। তিনি আরও পরিষ্কার করে বলেন যে, পাকিস্তানের সাথে সৌদি আরবের কোন মতপার্থক্য নেই। এতো অল্প সময়ের মাঝে পরস্পরবিরোধী এই খবরগুলির গুরুত্ব আসলে কোথায়?
সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের মাঝে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা রয়েছে। গত বছর দুই দশের মাঝে বাণিজ্য ছিল ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার; যার মাঝে ৭৪ শতাংশই ছিল সৌদি আরব থেকে পাকিস্তানের তেল আমদানি। পাকিস্তানের এক চতুর্থাংশ তেল আসে সৌদি আরব থেকে। এছাড়াও প্রায় ২৫ লক্ষ পাকিস্তানি সৌদি আরবে কর্মরত রয়েছে; যাদের কাছ থেকে পাকিস্তানের মোট রেমিট্যান্স আয়ের ৩০ শতাংশ আসে। অপরদিকে সৌদি আরবের সামরিক বাহিনীর গঠন এবং প্রশিক্ষণের পিছনে পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তথাপি কাশ্মির ইস্যুতে সৌদি আরবের পক্ষে সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষ নেয়াটা অতটা সহজ নয়। ‘আল জাজিরা’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ভারতের সাথে সৌদি আরবের বার্ষিক বাণিজ্য এখন প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। সৌদি আরব এতবড় বাণিজ্যকে ছেড়ে দিয়ে কাশ্মির ইস্যুতে ভারতের বিপক্ষে অবস্থান নিতে চাইবে না। ভারতের সাথে সৌদিদের সম্পর্কের ব্যাপারে পাকিস্তানের অসন্তোষ থাকলেও সেক্ষেত্রে পাকিস্তানের দরকষাকষির সুযোগ খুব কমই রয়েছে। অন্ততঃ পরবর্তীতে সৌদিদের ব্যাপারে পাকিস্তানের সুর পাল্টে ফেলার ব্যাপারটা সেটাই দেখিয়ে দিচ্ছে।
মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘ব্রুকিংস ইন্সটিটিউট’এর ফেলো মাদিহা আফজাল বলছেন যে, দুই দেশের নির্ভরশীলতার মাঝে পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথাগুলি বেশ অদ্ভূতই ঠেকেছে। তবে এতে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বের ক্ষেত্রে সৌদি আরবের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। এটা এর আগেও একবার হয়েছে, যখন গতবছর কুয়ালালামপুরে মালয়েশিয়া, তুরস্ক এবং পাকিস্তান আলাদাভাবে ‘ওআইসি’কে বাইপাস করে মুসলিম দেশগুলির নেতৃত্ব নেবার একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরির দিকে এগিয়ে যায়। পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সেই বৈঠক থেকে শেষ মুহুর্তে নিজের নাম সড়িয়ে নিয়ে সৌদি আরবের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করেন। সাম্প্রতিক সময়ে যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান বা ‘এমবিএস’এর অধীনে সৌদি আরব তুরস্ক, ইরান এবং কাতারকে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র হিসেবে দেখছে; পাকিস্তানের সাথে এই দেশগুলির সম্পর্কোন্নয়নও তাই সৌদি আরবের কাছে ভালো ঠেকছে না।
‘উড্রো উইলসন সেন্টার ফর স্কলার্স’এর দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলমান ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, পাকিস্তানের পক্ষে প্রমাণ করা কঠিন হচ্ছে যে, পাকিস্তানের কাশ্মির নীতি কাজ করছে। এই প্রচেষ্টা যদি ফলাফল না নিয়ে আসে, তাহলে তারা কি করবে? ইসলামাবাদের ‘কায়েদ এ আজম ইউনিভার্সিটি’র এসিসট্যান্ট প্রফেসর রাজা কায়সার আহমেদ বলছেন যে, এখন পর্যন্ত কাশ্মির ইস্যুতে পাকিস্তান শুধুমাত্র চীন, তুরস্ক এবং মালয়েশিয়াকে পাশে পেয়েছে। এর থেকে বের হতে পাকিস্তানের আরও আক্রমণাত্মক কূটনীতিতে যেতে হবে। কুগেলমান বলছেন যে, সৌদিদের সাথে সমস্যা খুব সহজেই মুছে যাবে না; তবে চীন এবং আরবের বাইরে অন্যান্য মুসলিম দেশের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান।
কাশ্মির ইস্যুতে অনৈক্য মুসলিম দেশগুলির পারস্পরিক সাংঘর্ষিক জাতীয় স্বার্থের বেড়াজালে আটকে রয়েছে। সৌদি নেতৃত্বের দেশগুলির সাথে তুর্কি নেতৃত্বের দেশগুলির দ্বন্দ্ব এতটাই প্রাধান্য পেয়েছে যে, মুসলিম নেতৃত্বের কাছে কাশ্মির, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইয়েমেন বা উইঘুরের মতো সমস্যাগুলি ছোট হয়ে গিয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে চীনের কাছ থেকে ব্যাপক সহায়তা পাওয়ায় পাকিস্তানের জন্যে সৌদি আরবের সাথে মনোমালিন্য কাটিয়ে ওঠা সহজতর হবে। তবে কাশ্মির ইস্যুতে চীন, তুরস্ক বা মালয়েশিয়ার সমর্থন পেলেও এখানেও যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকবে না, তার নিশ্চয়তা পাকিস্তানের কাছে নেই। আদর্শগত অবস্থান নয়, বরং জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই এগুচ্ছে পাকিস্তানসহ সকলে। অপরদিকে কোন পথে এগুলে কাশ্মির সমস্যার সত্যিকার সমাধান হবে, সেটার উত্তরও পাকিস্তানের কাছে নেই।
Monday, 31 August 2020
কাশ্মির থেকে উইঘুর... মুসলিমরা জাতীয়তাবাদী রাজনীতির শিকার
৩১শে অগাস্ট ২০২০
গত ৩১শে জুলাই যুক্তরাষ্ট্র বৃহৎ চীনা কোম্পানি ‘শিনজিয়াং প্রোডাকশন এন্ড কন্সট্রাকশন কর্পোরেশন’ এবং এর দুইজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা প্রাক্তন পার্টি সেক্রেটারি সুন জিলং এবং ডেপুটি সেক্রেটারি পেং জিয়ারুইএর উপর চীনের পশ্চিমের উইঘুর অঞ্চলে মুসলিমদের উপর নির্যাতনের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে অবরোধ আরোপ করে। ‘ভয়েস অব আমেরিকা’ এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলছে যে, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র এই কোম্পানি এবং ব্যাক্তিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা ছাড়াও ব্যাক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেবে এবং মার্কিনীদের এদের সাথে ব্যবসা করার উপর নিষেধাজ্ঞা দেবে। এর আগে গত ১৭ই জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উইঘুর মুসলিমদের উপর নির্যাতনের কারণ দেখিয়ে তৈরি করা নতুন মার্কিন আইনে স্বাক্ষর করেন। গত ডিসেম্বরে এই আইন মার্কিন কংগ্রেসে প্রায় সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়; যেখানে বিপক্ষে পড়েছিল মাত্র এক ভোট। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল চীনকে মানবাধিকার বিষয়ে একটা বার্তা দেয়া। এই আইনের অধীনে চীনের উইঘুর বা শিনজিয়াং রাজ্যের কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি চেন কুয়াংগুয়োর উপর অবরোধের কথা বলা হয়েছে এবং মার্কিন কোম্পানিগুলিকে উইঘুরের জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি যে কোন পণ্য বর্জন করতে বলা হয়েছে। জাতিসংঘের হিসেবে উইঘুরে ১০ লক্ষ মুসলিমকে চীন সরকার আটকে রেখে ‘নতুন করে শিক্ষা’ দিচ্ছে। মার্কিন নেতৃবৃন্দ বলছেন যে, চীনারা উইঘুরের মুসলিমদের সংস্কৃতি এবং বিশ্বাসকে মুছে ফেলতে চাইছে। অপরদিকে চীনারা বলছে যে, এই ক্যাম্পগুলিতে বিভিন্ন বিষয়ে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে এবং এটা উগ্রবাদী চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণের জন্যে দরকার রয়েছে। চীনারা মার্কিন কংগ্রেসে পাস করা আইনের কড়া সমালোচনা করে বলে যে, এর মাধ্যমে চীনকে খারাপ প্রমাণ করার ষড়যন্ত্র চলছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে তার ভুল শুধরে নিতে বলা হয়। চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার ব্যাপারেও হুঁশিয়ার করে দেয়া হয়। এতে আরও বলা হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র এর থেকে বিরত না হলে চীন এর বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেবে এবং যুক্তরাষ্ট্র এই দ্বন্দ্বের জন্যে পুরোপুরি দায়ী থাকবে। উইঘুর মুসলিমদের সংগঠন ‘ওয়ার্ল্ড উইঘুর কংগ্রেস’ ট্রাম্পকে ধন্যবাদ দিয়ে বলে যে, এটা উইঘুরের জনগণকে আশা দেবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, উইঘুরের মুসলিমদের রক্ষায় তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে? এতে কার স্বার্থই বা কি?
‘বিজনেস ইনসাইডার’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, শুধু উইঘুরই সমস্যা নয়। ভারত তার অধিকৃত কাশ্মির অঞ্চলের বিশেষ অধিকার বাতিল করেছে এবং তার পূর্বের আসাম রাজ্যে বাঙ্গালী মুসলিমদের আটক করার ব্যবস্থা করছে। চীন এবং ভারত উভয়েই বলছে যে, এই ব্যবস্থাগুলি তারা নিচ্ছে সহিংসতা বন্ধ করতে; এবং একইসাথে অন্যান্য দেশগুলিকে তারা এব্যাপারে নাক না গলাতে হুঁশিয়ার করে দিচ্ছে। প্রতিবেদনে বিশেষভাবে বলা হচ্ছে যে, উভয় দেশই মূলতঃ মুসলিমদেরকে টার্গেট করেছে ‘সহিংসতা বন্ধের’ কথা বলে। আর বাকি বিশ্ব এই দুই দেশের বিরুদ্ধে প্রকৃতপক্ষে কোন ব্যবস্থাই নেয়নি। হয় চীনের সাথে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক ধরে রাখতে বা চীনের হুমকির ভয়ে একটা মুসলিম দেশও চীনের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও চীনকে শুধরে নিতে বলেছে, কিন্তু চীনকে বাধ্য করতে কোন পদক্ষেপই নেয়নি। উইনিভার্সিটি অব কলোরাডোর গবেষক ড্যারেন বায়লার বলছেন যে, অনেককেই চীনের বিরুদ্ধে অনেক কথা বলতে শোনা যাচ্ছে; কিন্তু যখন এর ফলশ্রুতিতে মানবসম্পদ বা অর্থসম্পদহানির কোন সম্ভাবনা দেখা দেয়, তখনই তারা নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। তারা একইসাথে মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলির নেতৃবৃন্দের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলছে যে, মুসলিম দেশগুলিই তো কিছু করছে না, তাহলে তাদের উপর কেন দায় থাকবে? তারা নিজেদের অবস্থানের সমর্থনে বলছেন যে, অন্ততঃপক্ষে এর বিরুদ্ধে কিছু কথা তো তারা বলছেন।
উইঘুরের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র পদক্ষেপ নিলেও কাশ্মির এবং আসামের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি চুপ থেকেছে। গত অক্টোবরের মার্কিন কংগ্রেসের ‘হাউজ এশিয়া’ সাবকমিটির মানবাধিকার বিষয়ক শুনানিতে এবং এর পরবর্তীতে ‘ইউএস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম’ রিপোর্টে ভারতের মুসলিমদের উপর নাগরিকত্বের শর্ত দিয়ে মানবাধিকার ভূলুন্ঠিত করার কথা এসেছিল। কাশ্মির ইস্যুতে সবচাইতে সরব রয়েছে পাকিস্তান; আর ঠিক একইভাবে উইঘুর ইস্যুতে একইরূপ নিস্তব্ধ রয়েছে তারা। এবছরের জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ‘ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরাম’এর এক আলোচনায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান প্রথমে বলেন যে, তিনি উইঘুরে চীনা সরকারের কর্মকান্ডের ব্যাপারে পুরোপুরি অবগত নন। পরে সাংবাদিকদের চাপের মুখে সরাসরিই বলেন যে, পাকিস্তানের সবচাইতে খারাপ সময়ে চীন পাকিস্তানকে সহায়তায় এগিয়ে এসেছে; তাই তারা চীনা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ। কাশ্মির ইস্যুতে পাকিস্তানী মিডিয়া যতটা সরব, ততটাই সরব দেখা যাচ্ছে ভারতীয় মিডিয়াকে উইঘুর ইস্যুতে। বিশেষ করে লাদাখ সীমান্তে চীনের সাথে সংঘর্ষ শুরুর পর থেকেই ভারতীয় মিডিয়া উইঘুর ইস্যুতে পাকিস্তানের সমালোচনায় মুখর রয়েছে। পরিষ্কারভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে, বিভিন্ন রাষ্ট্রের ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় স্বার্থ এক্ষেত্রে কাশ্মির, উইঘুর এবং আসামের মুসলিমদের উপর নির্যাতন চলমান থাকার পিছনে বড় রকমের ইন্ধন যুগিয়েছে।
ব্রিটেনের ‘ইন্ডেপেন্ডেন্ট’ পত্রিকার প্রবীন কলামিস্ট প্যাট্রিক ককবার্ন বলছেন যে, দুনিয়াব্যাপী জাতীয়তাবাদের এক উত্থান দেখা যাচ্ছে। তিনি বলছেন যে, তুরস্ক তার তুর্কি জাতীয়তাবাদের সাথে ইসলামকে ব্যবহার করে তার প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে; অন্যদিকে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি হিন্দুত্ববাদী চিন্তার উপর ভর করে ভারতের পরিচয় পূননির্ধারণ করতে চাইছে। চীনারাও তাদের হান ভিত্তিক চৈনিক জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্রীয় শক্তির ভিত্তি হিসেবে দেখতে চাইছে। এই জাতীয়তাবাদী চিন্তার ফলে একেকটা দেশের অভ্যন্তরে জাতি এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর বয়ে আসছে অমানুষিক অত্যাচার। অধিকৃত কাশ্মির ছাড়াও ভারতের প্রায় ২০ কোটি মুসলিম সংখ্যালঘুদের উপর যেমন অত্যাচার হচ্ছে, তেমনি চীনের পশ্চিমাঞ্চলের উইঘুর রাজ্যেও কয়েক বছর ধরেই মুসলিমদের উপর চলছে ‘শুদ্ধাভিযান’। তুরস্কের অভ্যন্তরে কুর্দিদেরকে আলাদাভাবে দেখা হচ্ছে তুরস্কের ভৌগোলিক অখন্ডতার প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে। ককবার্নের কথাগুলিকে সাম্প্রতিক বিশ্ব মিডিয়ার খবরের সাথে সমন্বয় করলে দেখা যায় যে, প্রতি ক্ষেত্রেই বাইরের দেশগুলি সেই দেশের অভ্যন্তরের সংখ্যালঘুদেরকে সমর্থন দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে চাইছে। কারণ ককবার্ন মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, এই সংখ্যালঘুরা কতটুকু শক্তিশালী, তা নির্ভর করছে বিশ্বব্যাপী তারা কতটা রাজনৈতিক সমর্থন আদায় করতে পারে সেটার উপর। সেই হিসেবেই কাশ্মিরের মুসলিমদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে পাকিস্তান; কুর্দিদের আলাদা রাষ্ট্র গড়ার পিছনে মদদ যোগাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র; আর গত এক বছরের মাঝে উইঘুর মুসলিমদের পক্ষে কথা বলে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলি ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে চীনকে চাপের মুখে রাখতে চাইছে।
তবে ককবার্ন এক্ষেত্রে বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছেন উইঘুর এবং কাশ্মির ইস্যুতে। কাশ্মিরের জনগণের উপর ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর লকডাউন এবং বিচারবহির্ভূত অত্যাচার ভাইরাসের লকডাউনের চাইতেও বহুগুণে বেশি ক্ষতি করেছে। তবে কাশ্মির ছাড়াও ভারতের প্রায় ২০ কোটি মুসলিমের প্রতি বিজেপি সরকারের শত্রুভাবাপন্ন আচরণ এড়ানো যাবে না। রাম মন্দিরের ভিত্তি স্থাপন করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেধরণের মনোভাবই দেখিয়েছেন। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে ফেলার পর ফলাফলস্বরূপ দাঙ্গায় প্রায় ২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। মোদি সরকার মনে করছে যে, তারা কাশ্মির সমস্যার ‘সমাধান’ করে ফেলবেন। তারা ভারতের বাকি মুসলিমদের ‘সমস্যা’ও সমাধান করে ফেলবেন বলে বলছেন। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে দিল্লীর দাঙ্গাই দেখিয়ে দেয় যে, ২০ কোটি মানুষের সংখ্যালঘু জনসংখ্যাকে এতো হাল্কাভাবে নিলে মারাত্মক ভুল হবে। ভারতের চিন্তাবিদদের চিন্তার দৈন্যতা বোঝাতে ককবার্ন এক্ষেত্রে বৈরুতের কর্মকর্তাদের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, যারা বছরের পর বছর নিশ্চিন্তে বিশাল বোমার উপর বসে ছিলেন। ভারতের সরকারকে পশ্চিমারা নিঃশর্ত সমর্থন দিচ্ছে; কারণ তারা মনে করছে যে, ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় ভারত চীনকে নিয়ন্ত্রণের একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। একই সুত্রে তারা উইঘুর ইস্যুতে মুসলিমদের পক্ষাবলম্বন করছে নিজেদের স্বার্থে।
ঊইঘুর ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান মুসলিমদের ব্যাপারে ট্রাম্পের দীর্ঘমেয়াদী চিন্তার পুরোপুরি বিরুদ্ধে। ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’এর এক প্রতিবেদনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইসলাম এবং মুসলিমবিদ্বেষী মন্তব্যের একটা তালিকা দেয়া হয়। এতে ২০১১ সাল থেকে ট্রাম্পের মুসলিমবিদ্বষী মনোভাবের প্রকাশ পায়। ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে বলেন যে, মুসলিমরা যুক্তরাষ্ট্রকে পছন্দ করে না। আবার বিভিন্ন সময়ে এ-ও বলেন যে, মুসলিমরা যুক্তরাষ্ট্রে টাইম বোমার মতো; এবং তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মসজিদগুলিকে বন্ধ করে দেবার পক্ষেও যুক্তি দেন।
শুধু কাশ্মির, আসাম বা উইঘুরই নয়; এর সাথে রয়েছে ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, ইয়েমেন, লিবিয়া, আরাকান এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিমদের উপর নির্যাতনের অগুণিত প্রতিবেদন। প্রতিটা ক্ষেত্রেই জাতিরাষ্ট্রগুলি তার নিজস্ব জাতিস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছে। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ফায়দা লুঠতে একে অপরের দুর্বলতা ব্যবহার করতে চেয়েছে; মুসলিমদের বাঁচাবার উদ্দেশ্যে নয়। নিজের ভৌগোলিক অখন্ডতা অটুট রাখতে প্রতিটা জাতিরাষ্ট্র আবার চেয়েছে জাতীয় পরিচয় নির্ধারণ করতে। আর সেক্ষেত্রে জাতিগত এবং বিশ্বাসগত দিক থেকে সংখ্যালঘুরা হয়েছে অমানবিক নির্যাতনের শিকার। জাতীয়তাবাদের নামে চলেছে ‘শুদ্ধিকরণ’, যা উইঘুরই হোক, বা আসামই হোক। অভিভাবকহীন সন্তানের মতো কাশ্মির, আসাম, উইঘুর, আরাকান, ফিলিস্তিনের মুসলিমরা দ্বারে দ্বারে ঘুরছে রাজনৈতিক সমর্থনের জন্যে। প্রত্যেকেই তাদের এই অসহায়ত্বকে ব্যবহার করেছে নিজেদের জাতীয় স্বার্থে। করোনাভাইরাসের মহামারি এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার মাঝে পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত ক্ষয়িষ্ণু বিশ্বব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ ‘মানবাধিকার’ এখন হাস্যকর এক শব্দে পরিণত হয়েছে। অন্ততঃ মুসলিম বিশ্বের মাঝে জাতীয়তাবাদ প্রসূত স্বার্থের রাজনীতি যে বিভাজন ও অন্যায়ের জন্ম দিচ্ছে, তা মুসলিমদেরকে বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা খুঁজতে বেশি অনুপ্রাণিত করবে।
Tuesday, 20 August 2019
কাশ্মির – আবার অগ্নুৎপাতের অপেক্ষায় ভূরাজনৈতিক অগ্নিগিরি
ভারতের সংবিধানের ‘আর্টিকেল ৩৭০’এর মাধ্যমে কাশ্মিরকে আলাদা কিছু সুবিধা দেয়া হতো; যেমন পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রতিরক্ষা ছাড়া বাকি ব্যাপারগুলিতে ভারত সরকার হস্তক্ষেপ করবে না। তবে ভারতের ইতিহাস নিয়ে গবেষক করা লেখক জন উইলসনের মতে, এই আর্টিকেল কাশ্মিরকে ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে আলাদা কোন সুবিধা দিত কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকারের নির্বাচনী ওয়াদা মোতাবেক এই আর্টিকেল বাতিল ঘোষণার পর থেকে কাশ্মিরে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে। বন্ধ রাখা হয়েছে ইন্টারনেট এবং মিডিয়া। ‘বিবিসি’র ভিডিও প্রতিবেদনে দেখা যায় যে শ্রীনগরে শুক্রবার জুমআর নামাজের পর ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের উপর কাঁদানে গ্যাস এবং গুলি ব্যবহার করছে। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, হাসপাতালগুলিতে নেই কোন স্টাফ; আর প্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনতে রাস্তায় বের হলেই জনগণের উপর চলছে নিরাপত্তা বাহিনীর মারধর। ‘এনডিটিভি’র প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ১২ই অগাস্ট ঈদ-উল-আজহার দিন শ্রীনগরের মসজিদগুলি বন্ধ করে রাখা হয়েছিল; ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হতে দেয়া হয়নি।
‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, কাশ্মিরের এহেন পরিস্থিতির জন্যে মূলতঃ দায়ী অত্র অঞ্চলের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময়ের চিন্তাগুলি। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় অবিভক্ত ভারতের ৪০ শতাংশ এলাকা ছিল বিভিন্ন রাজন্যদের হাতে; কাশ্মির ছিল এরকমই একটা রাজ্য। এই রাজ্যগুলির শাসকরা বিভিন্ন চুক্তির বদৌলতে ব্রিটিশ অধীনতা মেনে চলতো। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা ব্রিটিশদের আনুগত্য করেছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার তাদের স্বায়ত্বশাসন মেনে নিয়েছে। ব্রিটিশ-পরবর্তী জাতীয়তাবাদী ভারতে কাশ্মিরকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের পতাকাতলে আনার চেষ্টা করা হয়েছে, যা কিনা হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের আমলে কঠোর আকার ধারণ করে। তবে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্যে বলপ্রয়োগের পদ্ধতিগুলি ব্রিটিশ সময় থেকে বিজেপির সময় পর্যন্ত খুব একটা পরিবর্তিত হয়নি।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত বিভাগের সময় কাশ্মিরের হিন্দু রাজা হরি সিং কাশ্মিরকে ভারতের অংশ হিসেবে ঘোষণা দেন, যদিও বর্তমান কাশ্মিরের প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখের মতো জনসংখ্যার প্রায় ৯৭ শতাংশই মুসলিম। কাশ্মিরের হিন্দু রাজাদের শুরু ১৮৪৬ সালে; যখন প্রথম এংলো-শিখ যুদ্ধে শিখদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয়ের পর ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হেনরি লরেন্স-এর অনুগত দোগরা রাজপুত বংশীয় গুলাব সিং-কে ৭৫ লক্ষ রুপির বিনিময়ে সিন্ধু নদের পূর্ব এবং রাভি নদীর পশ্চিম পাড়ের মাঝের কাশ্মির উপত্যকা নামের পাহাড়ি এলাকাটার রাজত্ব দিয়ে দেয়া হয়। অমরিতসরের চুক্তির মাধ্যমে কাশ্মির ব্রিটিশদের অধীনে আলাদা রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের সময় কাশ্মিরের দোগরা রাজারা বিপ্লব দমনে ব্রিটিশদেরকে যথাসাধ্য সহায়তা করেছিলেন।
১৯৪৭ সালে ভারতের অংশ হবার সিদ্ধান্ত নেবার আগে রাজা হরি সিং কাশ্মিরের জনগণের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেননি। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পাকিস্তান প্রান্তের পুশতুন গোত্রীয় মিলিশিয়ারা কাশ্মির আক্রমণ করলে ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন রাজাকে ভারতের কাছে নতি স্বীকার করতে বলেন। সেই হিসেবে ১৯৪৭ সালের ২৬শে অক্টোবর রাজা হরি সিং কাশ্মিরকে ভারতের অংশ হিসেবে মেনে নিয়ে চুক্তি সই করেন। তখন কাশ্মিরের অংশ হিসেবে ছিল জম্মু, কাশ্মির, উত্তরের গিলগিট-বালতিস্তান, লাদাখ, ট্রান্স-কারাকোরাম এবং আকসাই চিন। ব্রিটিশ ভারতের সীমারেখার ভাগবাটোয়ারার উপরেই শুরু হয় ১৯৪৭-৪৮ সালের প্রথম পাক-ভারত যুদ্ধ। ১৯৪৮ সালে ১৩ই অগাস্টের জাতিসংঘ ঘোষণার মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ হয়। কাশ্মিরের দুই-তৃতীয়াংশ দেয়া হয় ভারতকে; আর বাকি এক-তৃতীয়াংশ পাকিস্তানকে দেয়া হয়। এই যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে পাকিস্তান কাশ্মির থেকে তাদের নিয়মিত এবং অনিয়মিত বাহিনী সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। অল্পসংখ্যক সেনা মোতায়েনের বদলে কাশ্মিরের বেশিরভাগটার নিয়ন্ত্রণ দেয়া হয় ভারতকে। তবে এখনও পাকিস্তান পুরো কাশ্মিরকে নিজের বলে মনে করে; ভারতও একই নীতিতে রয়েছে। আর অন্যদিকে আকসাই চিন অংশটার দাবিদার হলো চীন।
কাশ্মিরকে বলা যায় ভূরাজনৈতিক অগ্নিগিরি। এই অঞ্চলে ১৯৪৭, ১৯৬৫, ১৯৭১ এবং ১৯৯৯ সালে সংঘটিত হয়েছে চারটা পাক-ভারত যুদ্ধ। ১৯৮৯ সাল থেকে পাকিস্তানের সমর্থনে কাশ্মিরে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছে; আর ভারত বলছে পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদের ইন্ধনদাতা। এবছরের ফেব্রুয়ারিতেও পুলওয়ামায় জঙ্গী হামলার পর আরেকটা ছোটখাটো পাক-ভারত সংঘর্ষ হয়ে গেছে। শুধু ভারত-পাকিস্তানই নয়, আকসাই চিন-এর দাবি করা চীনও পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। ‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’এর বিশ্লেষক কেভিন এলিসন বলছেন যে, মোদি সরকারের এই ঘোষণায় কাশ্মির নিয়ে পাক-ভারত উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে। পাকিস্তান বলছে যে, ভারতের এই ঘোষণায় কাশ্মিরের পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলছেন যে, এই ঘোষণা ভারত সরকারের একটা কৌশলগত ভুল। অন্ততঃ কাশ্মিরের নরমপন্থী রাজনীতিবিদদের গ্রেপ্তারি পরওয়ানা পর সেটাই মনে হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে ৬ই অগাস্ট পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারেল আসিফ ঘাফুর বলেন যে, পাকিস্তান ভারতীয় সংবিধানের ‘আর্টিকেল ৩৭০’কে কখনোই স্বীকৃতি দেয়নি; কারণ এই আর্টিকেল কাশ্মিরকে ভারতের অংশ হিসেবে মনে করিয়ে দেয়। কেভিন এলিসন বলছেন যে, কাশ্মিরের জনগণ স্বভাবগতভাবেই নিজেদের মুক্ত দেখতে যায়, যা ভারত সরকার সহজে এড়িয়ে যেতে পাববে না। আর এই আর্টিকেল-ই এতকাল কাশ্মিরের জনগনের একটা বড় অংশকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে জড়ানো থেকে দূরে রেখেছিল। এখন কাশ্মিরের বাইরের জনগণও কাশ্মিরে জমি কিনতে পারবে, যা কিনা কাশ্মিরের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে চ্যালেঞ্জ করবে, এবং উত্তেজনা বাড়াবে।
কাশ্মিরের কিছু ভৌগোলিক বাস্তবতা পাকিস্তান-ভারতকে আটকে রেখেছে। পাকিস্তান-অধিকৃত আজাদ কাশ্মির থেকে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের দূরত্ব মাত্র ৬৭ কিঃমিঃ। এর মাঝের অংশটা বেশ দুর্গম হলেও তা পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যে হুমকি। ‘দ্যা ডিপ্লোম্যাট’ ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, কাশ্মিরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তা দিয়ে পাকিস্তান তার ‘কৌশলগত গভীরতা’ বৃদ্ধি করতে চায়। অন্যদিকে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লী থেকে কাশ্মিরের শ্রীনগরের সড়কপথে দূরত্ব ৯শ’ ১৪ কিঃমিঃ। এই দূরত্ব বেশি মনে হলেও এর মাঝে প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা নেই তেমন। অর্থাৎ কাশ্মিরের নিয়ন্ত্রণ ভারতের হাতে না থাকলে দিল্লীর নিরাপত্তা হুমকির মাঝে পড়বে। একারণেই দিল্লীর চিন্তাবিদেরা কাশ্মিরকে পাকিস্তানের অংশ তো নয়ই, কোন প্রকারের স্বাধীনও দেখতে চান না। বিজেপির বিরোধী দল কংগ্রেস ‘আর্টিকেল ৩৭০’ বাদ দেয়ার সমালোচনা করলেও ভারতের বেশিরভাগ মানুষই ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ তকমা পাবার ভয়ে তেমন কিছু বলতে নারাজ।
অন্যদিকে কাশ্মিরে রয়েছে চীনের স্বার্থ। পাকিস্তানের মাঝ দিয়ে তৈরি হচ্ছে ‘চায়না-পাকিস্তান ইকনমিক করিডোর’ বা ‘সিপিইসি’, যা আরব সাগরে গোয়াদর সমুদ্রবন্দর থেকে চীনের পশ্চিমাঞ্চলের উইঘুর বা শিনজিয়াং প্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ‘সিপিইসি’র মাধ্যমে চীন পূর্ব এশিয়ার মালাক্কা প্রণালীকে বাইপাস করে এবং মার্কিন নৌবাহিনীকে এড়িয়ে তার জ্বালানি তেলের সরবরাহ পাওয়া নিশ্চিত করতে চাইছে। ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতাতে এই ‘সিপিইসি’ চীনের জন্যে কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। অন্যদিকে পাকিস্তান এই প্রকল্প চাইছে তার অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে। ‘সিপিইসি’-কে তার নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে দেখে বলেই বালুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদেরকে ভারত সরকার সমর্থন দিয়েছে। ‘সিপিইসি’ চীনে পৌঁছাবার আগে পাকিস্তান-অধিকৃত আজাদ কাশ্মিরের উপর দিয়ে যাচ্ছে। ভারত-অধিকৃত কাশ্মির থেকে এই ‘সিপিইসি’র এর দূরত্ব ইসলামাবাদের কাছাকাছি ১’শ কিঃমিঃ-এর মতো। চীন শুধু এ-ই দেখতে চায় যে ‘সিপিইসি’র নিরাপত্তা যেন হুমকির মাঝে না পড়ে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশির আহ্বানে ১৬ই অগাস্ট জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বদ্ধদুয়ার বৈঠকে চীনের রাষ্ট্রদূত ঝ্যাং জুন বলেন যে, ভারতের সংবিধানে পরিবর্তনের ফলে এই অঞ্চলের শান্তি বিঘ্নিত হতে যাচ্ছে। চীন এক্ষেত্রে সকল পক্ষকে রয়েসয়ে চলার উপদেশ দিচ্ছে। কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ‘ব্লুমবার্গ’ বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ফ্রান্সের বিরোধিতার কারণে নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে ঐকমত্যে পৌঁছে এই উপদেশ দেয়া সম্ভব হয়নি।
কাশ্মির ইস্যু বিশ্বব্যাপী মুসলিম জনগোষ্ঠীর একাত্মতা প্রকাশের একটা মাধ্যম। তবে মুসলিম দেশগুলির নেতৃত্ব এই ইস্যুতে ততটা সক্রিয় কিনা, তা প্রশ্ন করাই যায়। ৮ই অগাস্ট সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সূত্রের বরাত দিয়ে ‘গালফ নিউজ’ জানায় যে, সৌদি সরকার কাশ্মিরের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন, এবং সেখানে কোন সহিংসতা হোক, তারা তা চাচ্ছেন না। আর এব্যাপারে জাতিসংঘের চুক্তিগুলিকে মেনে চলতেই তারা উপদেশ দিচ্ছেন। ২০১৮ সালে ভারতের সাথে সৌদি আরবের বাণিজ্য ছিল সাড়ে ২৭ বিলিয়ন ডলার; যা হয়তো ভারতের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে যাওয়া থেকে সৌদি সরকারকে বাধা দিতে পারে। অন্যদিকে ১৭ই অগাস্ট তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, তারা চাইছেন যে জাতিসংঘ কাশ্মির ইস্যুতে আরও অগ্রগামী ভূমিকা নিক। আগের দিন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এব্যাপারে আলোচনা হওয়াকেই তুরস্ক সরকার ভালো দিক বলে দেখছে। মুসলিম বিশ্বের নেতৃস্থানীয় দুই দেশের জাতিসংঘের উপর নির্ভরশীলতাই জানিয়ে দিচ্ছে যে, ১৬ই অগাস্ট নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক থেকে তেমন কিছু না আসাটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অন্যদিকে ১৪ই অগাস্ট পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মিরে যেকোন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ভারতকে সাবধান করেন। তিনি বলেন যে, ভারত যদি আজাদ কাশ্মিরে সামরিক হস্তক্ষেপ করে, তাহলে পাকিস্তান তার উচিৎ জবাব দেবে। ভারতীয় অধিকৃত কাশ্মিরের ব্যাপারে পাকিস্তান অবশ্য জাতিসংঘের দিকেই তাকিয়ে। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, পাকিস্তান সরাসরি ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে না জড়াতে চাইলেও কাশ্মিরের উত্তেজনা পাক-ভারত প্রক্সি যুদ্ধকে আবারও উস্কে দিতে পারে। আর সেটার উপর ভর করে বিশ্বব্যাপী মুসলিম আবেগকে নেতৃত্বস্থানীয়রা জনমত আদায়ে ব্যবহার করতে পারেন।
‘আর্টিকেল ৩৭০’ বাতিল করার পর আপাততঃ নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা বাড়বে বলেই বিশ্লেষকরা মনে করছেন। দীর্ঘ মেয়াদে কাশ্মিরের উপর ভারত সরকারের আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করবে এই ঘোষণা। তবে স্বল্প মেয়াদে কাশ্মিরে ভারত-বিরোধী চিন্তা দানা বাধার সম্ভাবনাই বেশি, যা কিনা দীর্ঘ মেয়াদে মোদির সফলতাকে চ্যালেঞ্জ করবে। আর কাশ্মিরে সহিংসতা বৃদ্ধি মানেই পাক-ভারত উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে। মুসলিম বিশ্বে কাশ্মির ইস্যুতে আবেগ থাকলেও মুসলিম দেশগুলির নেতৃত্ব ভারতের বিরুদ্ধে বিশেষ কিছু করা থেকে বিরত থাকবে। এই আর্টিকেল বাতিলের ঘটনা চীনের ‘সিপিইসি’ বা আকসাই চিন-কে আপাততঃ চ্যালেঞ্জ করবে না; তাই চীনও এব্যাপারে বিশেষ কিছু করা থেকে বিরত থাকবে। পশ্চিমারাও ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া বাস্তবতার উপর প্রতিষ্ঠিত ‘স্থিতাবস্থা’কে পরিবর্তন করতে চায় না বলেই এব্যাপারে খুব বেশি কিছু করবে না। কাশ্মিরের জনগণের কষ্টকে নয়, বরং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং জাতীয় স্বার্থকেই প্রাধান্য দেবে সবাই।






