Showing posts with label AUKUS. Show all posts
Showing posts with label AUKUS. Show all posts

Tuesday, 5 April 2022

অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব উঠানে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় চীন

০৫ই এপ্রিল ২০২২

সেপ্টেম্বর ২০১৯। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়িএর সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার স্বারক আদানপ্রদান করছেন সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমায়া মানেলে। অস্ট্রেলিয়া যেমন দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের অর্থনৈতিক বিনিয়োগকে তার নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে দেখেছে, তেমনি চীনও দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ছোট দ্বীপ দেশগুলিকে জাতিসংঘে তাইওয়ানের পক্ষে ভোট দিতে দেখে প্রতিক্রিয়াস্বরূপ সেই অঞ্চলে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে।

 
দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ দেশ সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের সাথে চীনের নিরাপত্তা আলোচনা চলছে কিনা, সেব্যাপারে গত ২৯শে মার্চ সেদেশের প্রধানমন্ত্রী মানাসেহ সোগাভারে পার্লামেন্টে বলেন যে, রাষ্ট্র হিসেবে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ কার সাথে আলোচনা করবে, সেব্যাপারে অন্য দেশের মন্তব্য করাটা খুবই অপমানজনক। এর অর্থ হলো এই দেশের নেতৃত্ব রাষ্ট্র পরিচালনায় অক্ষম। এর আগে ২৪শে মার্চ অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিটার ডাটন সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের সাথে চীনের সম্ভাব্য নিরাপত্তা চুক্তির ব্যাপারে বলেন যে, অস্ট্রেলিয়া থেকে ২ হাজার কিঃমিঃ দূরে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে কোন সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠিত হলে অস্ট্রেলিয়া খুবই চিন্তিত হবে। তিনি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ দেশগুলিকে চীনের কর্মকান্ড সম্পর্কে হুঁশিয়ার থাকার জন্যে আহ্বান জানান। তিনি বলেন যে, অস্ট্রেলিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ দেশগুলি যে আদর্শকে আলিঙ্গন করে, চীনাদের কর্মকান্ড সেই আদর্শের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বলছে যে, সম্ভাব্য এই চুক্তির একটা খসড়া কে বা কারা সোশাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে দেয়ার পর অস্ট্রেলিয়ার পক্ষ থেকে এই মন্তব্য এসেছে। সম্ভাব্য সেই চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, চীনা পুলিশ এবং নিরাপত্তা বাহিনী সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে আইন শৃংখলা রক্ষা, দুর্যোগের সময়ে ত্রাণসহায়তা দেয়া, এবং সেদেশে চীনা নাগরিক ও চীনা প্রকল্প রক্ষায় মোতায়েন করা যাবে। আর উভয় দেশ তাদের পার্লামেন্টের কাছে আরও বিস্তৃত আকারে নিরাপত্তা সহযোগিতার জন্যে প্রস্তাব পাঠাবে। সেখানে বলা হচ্ছে যে, সেই প্রস্তাবে চীনা যুদ্ধজাহাজ সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের নৌঘাঁটি ব্যবহার করতে পারবে।

সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের পুলিশ ও জাতীয় নিরাপত্তা সচিব ক্যারেন গালোকালে ‘রয়টার্স’কে বলেন যে, চীনের সাথে তার দেশের আইন শৃংখলা রক্ষার ব্যাপারে একটা চুক্তি হয়েছে। এবং আরও বিস্তৃত ক্ষেত্রে চুক্তির ব্যাপারে আলোচনা চলছে। আর এধরণের চুক্তি অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের সাথে যেমন রয়েছে তেমনই হবে। পদ্ধতিগতভাবেই সেই চুক্তিকে মন্ত্রীসভার অনুমতি নিতে হবে। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০১৮ সাল থেকে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে শান্তি শৃংখলা রক্ষার জন্যে অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনের অনুমতি দিয়ে একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে এর আগে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে পুঁজি করে ২০০৩ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সেখানে অস্ট্রেলিয়ার সামরিক বাহিনী মোতায়েন ছিল। সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের পুলিশ মন্ত্রী এন্থনি ভেকে বলেন যে, ১৮ই মার্চ চীনের পাবলিক সিকিউরিটি মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী ওয়াং শিয়াওহংএর সাথে তিনি এক ভার্চুয়াল বৈঠকের পর একটা সমঝোতাপত্রে স্বাক্ষর করেন। এই সমঝোতা বিশ্বকে দেখিয়ে দেয় যে, সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ তাদের নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের জন্যে যেকোন দেশের সাথেই সহযোগিতা করতে উচ্ছুক।

 
নভেম্বর ২০২১। সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে অস্ট্রেলিয়ার সেনা। ‘স্বাধীন দেশ’ হিসেবে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ যখন তাইওয়ানকে আলিঙ্গন করেছে, তখন অস্ট্রেলিয়া দ্বীপ দেশটাকে ‘স্বাধীন’ হিসেবেই আখ্যা দিয়েছে। কিন্তু যখন তারা অস্ট্রেলিয়ার স্বার্থের বাইরে গিয়ে চীনের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছে, তখনই অস্ট্রেলিয়া দেশটার ‘স্বাধীনতা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে এবং দেশটার ‘সার্বভৌমত্ব’কে তুচ্ছজ্ঞান করছে।


সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ কি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ?

প্রধানমন্ত্রী সোগাভারে পার্লামেন্টে কথা বলার সময় চাপের মুখে তিনি বলেন যে, চীনের সাথে চুক্তি এখন স্বাক্ষর করার জন্যে প্রস্তুত। তিনি অস্ট্রেলিয়ার মিডিয়ার প্রতিবেদনগুলি অস্বীকার করেন; যেখানে বলা হয় যে, সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ চাপের মুখে চীনের কাছে নতি স্বীকার করেছে। অস্ট্রেলিয়ার ‘নিউজ কর্পোরেশন’এর এক কলামে এও লেখা হয় যে, দরকার হলে এই চুক্তি থামাতে অস্ট্রেলিয়ার উচিৎ সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে সামরিক অগ্রাসন চালিয়ে সেখানকার সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা। সোগাভারে বলেন যে, অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়াতে এহেন কথাগুলি অপমানজনক এবং তা অস্ট্রেলিয়ার সাথে সম্পর্ককে দুর্বল করে। সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্যে যেকোন দেশকেই আমন্ত্রণ জানাবে। আর নিজের জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশ যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে তিনি বলেন যে, চীনকে সামরিক ঘাঁটি তৈরিতে আহ্বান করার কোন ঘটনাই ঘটেনি। আর এর আগে অস্ট্রেলিয়াও আহ্বান করার পর সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে নৌঘাঁটি তৈরি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। তবে তিনি সপ্তাখানেক আগে দেশের পূর্বাঞ্চলে তেমোতুতে একটা প্যাট্রোল বোটের জেটি বানাবার অস্ট্রেলিয়ান প্রস্তাবকে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন। সোগাভারে বলছেন যে, নিরাপত্তা সহযোগী হিসেবে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড সর্বদাই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। তবে তিনি এও বলেন যে, সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের উচিৎ হবে দেশের নিরাপত্তার জন্যে সহযোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা। তিনি অভিযোগ করে বলেন যে, কিছু লোক রয়েছে যারা বিদেশী এজেন্ট; যারা গোপনীয়তাকে অস্বীকার করে এবং সরকারকে দুর্বল করতে চায়। তার দেশ জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন সহযোগী খুঁজবে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান সাংবাদিকদের বলেন যে, সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের সাথে নিরাপত্তা সহযোগিতার উদ্দেশ্য হলো জনগণের জানমাল রক্ষা করা। এর বাইরে মিডিয়াতে যা বলা হচ্ছে, সেগুলি মূলতঃ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

তবে অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিবিদেরা এই চুক্তিকে মেনে নিতে পারছেন না। অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যারেন এন্ড্রুজ সাংবাদিকদের বলেন যে, প্রশান্ত মহাসাগর হলো অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব উঠান। এই অঞ্চলের যেকোন দ্বীপে যেকোন ঘটনা অস্ট্রেলিয়ার জন্যে চিন্তার কারণ। অপরদিকে অস্ট্রেলিয়ার বিরোধী দলের উপনেতা রিচার্ড মার্লেস দেশের প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন যাতে তিনি নিশ্চিত করেন যে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দ্বীপ দেশগুলি যেন স্বাভাবিকভাবেই শুধুমাত্র অস্ট্রেলিয়াকেই একমাত্র নিরাপত্তা সহযোগী হিসেবে চিন্তা করে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন ইতোমধ্যেই এব্যাপারে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্নের সাথে ফোনালাপ করেছেন বলে অস্ট্রেলিয়ার সরকার বলে।

সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ তাইওয়ানের সাথে তাদের সম্পর্ক কর্তন করে চীনের সাথে সম্পর্কোন্নয়নে মনোযোগী হলে এর প্রতিক্রিয়ায় গত নভেম্বরে সেদেশের রাজধানী হোনিয়ারাতে ব্যাপক সহিংসতা দেখা দেয় এবং সেই ছুতোয় অস্ট্রেলিয়া সেখানে ২’শ সেনা মোতায়েন করে। এই সেনা মোতায়েনের আইনী স্তম্ভ ছিল ২০১৮ সালের চুক্তি। তবে সেসময়েই চীন সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের পুলিশকে সরঞ্জাম এবং ট্রেনিং দেয়ার প্রস্তাব দেয়। চীনের সাথে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবেই অস্ট্রেলিয়া গত বছর ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ‘অকাস’ চুক্তি করে। যুক্তরাষ্ট্রও ফেব্রুয়ারি মাসে ঘোষণা দেয় যে, প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের সামরিক অবস্থানকে নিয়ন্ত্রণ করতে তারা সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে দূতাবাস খুলবে। 

নভেম্বর ২০২১। সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের প্রধানমন্ত্রী সোগাভারে অস্ট্রেলিয়ার কাছ থেকে প্যাট্রোল বোটের ডেলিভারি নিচ্ছেন। কয়েক দশকের অস্ট্রেলিয় সহায়তা দেশটার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। কাজেই এখন অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতার ব্যাপারে প্রশ্ন আসছে, এবং তারা অন্য অপশন খুঁজছে।


‘চেকবুক কূটনীতি’

‘আল জাজিরা’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, গত বছর অস্ট্রেলিয়া দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উন্নয়ন সহযোগিতার অংশ হিসেবে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। এছাড়াও অস্ট্রেলিয়া সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে ৪৯ মিলিয়ন ডলার খরচে দ্বিতীয় একটা প্যাট্রোল বোট দিয়েছে এবং নতুন একটা জেটি তৈরি করছে। সরকারি কর্মচারিদের বেতন, পুলিশের কর্মকান্ড, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ মোকাবেলার জন্যে দেশজুড়ে রেডিও নেটওয়ার্ক তৈরিতে আরও সাড়ে ১৬ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে অস্ট্রেলিয়া। গত বছর চীনা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের উপর কিছু লোক হামলা করে লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগ করলে পুলিশ রাবার বুলেট ছুঁড়ে জনগণকে ছত্রভঙ্গ করে। এই ঘটনার জেরে বিরোধী দল পার্লামেন্টে অনাস্থা প্রস্তাব আনে। সরকারের বিরোধীরা অভিযোগ করে যে, চীন সরকার পার্লামেন্ট সদস্যদের মাঝে অর্থ বিলি করে অনাস্থা প্রস্তাব বাতিল করার জন্যে, যদিও এর সুনির্দিষ্ট কোন প্রমাণ কেউ দেখাতে পারেনি। সরকার বলছে যে, যারা সহিংসতা উস্কে দিয়েছিল, তারাই এধরনের ভিত্তিহীন অভিযোগ দাঁড় করিয়েছে।

গত নভেম্বরে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের সহিংসতার পিছনে দেশটার মালাইতা প্রদেশের নেতৃত্বের ইন্ধন ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। মালাইতার নেতৃত্ব খোলাখুলিভাবেই অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে এবং চীনের বিপক্ষে কথা বলে থাকে। মালাইতা প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী ড্যানিয়েল সুইদানিএর উপদেষ্টা তালিফিলু বলছেন যে, সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের মানুষ অস্ট্রেলিয়দের ব্যাপারে খুব ভালো দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করে। অপরদিকে চীনারা এখানে গাছ কাটছে, খনি উন্নয়ন করছে এবং মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে; যেগুলির কারণে দেশটার পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে এবং সেখানে চীন বিরোধী চিন্তা বাড়ছে। তবে চীনারা যেহেতু সরাসরি সরকারের লোকদের পকেটে অর্থ দিচ্ছে, সেহেতু অস্ট্রেলিয়া দ্রুত সেখানে প্রভাব হারাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘লোয়ি ইন্সটিটিউট’এর রিসার্চ ফেলো মিহাই সোরা বলছেন যে, উন্নয়ন সহায়তা দিয়েও অস্ট্রেলিয়া সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের একমাত্র নিরাপত্তা সহযোগী হতে পারেনি। এতে প্রমাণ হয় যে, সেখানকার নিরাপত্তার কিছু দিক রয়েছে যা অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে পূরণ করা সম্ভব নয়; এবং শুধুমাত্র অর্থ সহায়তা দিয়ে অস্ট্রেলিয়া সেই দ্বীপ দেশটার একমাত্র সহযোগী হতে পারবে না। সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের সরকার মনে করেছে যে, উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে চীন তাইওয়ানের চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেকারণে তারা তাইওয়ানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। আর প্রধানমন্ত্রী সোগাভারে জানেন যে, তার দেশে জনসমর্থন রয়েছে যে, নিরাপত্তার জন্যে তার দেশ শুধুমাত্র অস্ট্রেলিয়ার উপরেই নির্ভরশীল না থাকুক। মেলবোর্নের ‘লা ট্রোব ইউনিভার্সিটি’র শিক্ষক মাইকেল ওকীফ বলছেন যে, সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের দিক থেকে দেখলে, কয়েক দশকের অস্ট্রেলিয় সহায়তা দেশটার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। কাজেই এখন অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতার ব্যাপারে প্রশ্ন আসছে, এবং তারা অন্য অপশন খুঁজছে। আর চীন দেখতে পাচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী তাদের নাগরিকদেরকে রক্ষা করছে। একই আঙ্গিকে, সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে চীনারা যখন তাদের নাগরিক এবং বিনিয়োগের উপর হামলা হতে দেখছে, তখন তারাও সেই অনুযায়ী এগুচ্ছে।

সুইদানিএর উপদেষ্টা তালিফিলু অস্ট্রেলিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ অনুসরণ করতে বলছেন। যুক্তরাষ্ট্র মালাইতা প্রদেশে বিভিন্ন এনজিওকে ২৫ মিলিয়ন ডলার দিচ্ছে, যারা কৃষি, বনজ সম্পদ এবং মৎস্য সম্পদ ব্যবহারে জনগণকে অর্থায়ন করছে। এভাবে অস্ট্রেলিয়াও যদি জনগণকে সরাসরি অর্থ সহায়তা দেয়ার ব্যবস্থা করে, তাহলে তারা বিরোধী দলের পক্ষে ভোট দেবে, যারা কিনা অস্ট্রেলিয়াকে ভালোবাসে এবং তাইওয়ানকেও পছন্দ করে। অপরদিকে মাইকেল ওকীফ বলছেন যে, অস্ট্রেলিয়ার উচিৎ হবে চীনের সকল কর্মকান্ডকে হুমকি হিসেবে না দেখে বরং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চীনের সাথে সমান্তরালে কাজ করা।


তাইওয়ান প্রণালি থেকে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ…

অস্ট্রেলিয়ার ভূকৌশলগত অবস্থান যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হবার কারণেই ‘অকাস’ চুক্তির মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া একাধারে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অতি সংবেদনশীল প্রযুক্তি পেতে চলেছে, তেমনি তা ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তাটাকেও শক্তিশালী করেছে। তবে এহেন কৌশলগত চুক্তি চীনের জন্যে হুমকি হবার কারণেই চীনও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার সহযোগিতার মাঝে নিরাপত্তাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। অস্ট্রেলিয়া যেমন দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের অর্থনৈতিক বিনিয়োগকে তার নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে দেখেছে, তেমনি চীনও দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ছোট দ্বীপ দেশগুলিকে জাতিসংঘে তাইওয়ানের পক্ষে ভোট দিতে দেখে প্রতিক্রিয়াস্বরূপ সেই অঞ্চলে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। অস্ট্রেলিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দ্বীপ দেশগুলিকে তার ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছে এতকাল। যার ফলাফল হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার নিজ উঠানে তাইওয়ান এবং চীনের মাঝে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। আর একই সূত্রে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে থাকা জনগণের মাঝে চীন বিরোধী চিন্তার জেরে চীনা নাগরিক এবং বিনিয়োগের উপর হামলা শেষ পর্যন্ত চীনকে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে নিরাপত্তা সহযোগী হিসেবে টেনে নিয়ে এসেছে। তাইওয়ান প্রণালিতে অস্ট্রেলিয়ার যুদ্ধজাহাজ চীনের জন্যে যেমন হুমকি তৈরি করেছে, ঠিক তেমনই হুমকি এখন অস্ট্রেলিয়া দেখতে পাচ্ছে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে; যার ভূকৌশলগত অবস্থান অস্ট্রেলিয়ার জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ। ‘স্বাধীন দেশ’ হিসেবে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ যখন তাইওয়ানকে আলিঙ্গন করেছে, তখন অস্ট্রেলিয়া দ্বীপ দেশটাকে ‘স্বাধীন’ হিসেবেই আখ্যা দিয়েছে। কিন্তু যখন তারা অস্ট্রেলিয়ার স্বার্থের বাইরে গিয়ে চীনের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছে, তখনই অস্ট্রেলিয়া দেশটার ‘স্বাধীনতা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে এবং দেশটার ‘সার্বভৌমত্ব’কে তুচ্ছজ্ঞান করছে। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দ্বীপ দেশ সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের সাথে চীনের নিরাপত্তা চুক্তি বেইজিংএর নীতির ক্ষেত্রে একটা নতুন অধ্যায়; যা কিনা ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের সাথে পশ্চিমা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর স্বার্থের দ্বন্দ্বকে আরও ঘনীভূত করবে। এতে অত্র অঞ্চলে অস্থিরতা এবং সংঘাতের সম্ভাবনাও বেড়ে যাবে।

Friday, 22 October 2021

‘অকাস’ চুক্তির যে ব্যাপারটা নিয়ে কেউ কথা বলছে না…

২২শে অক্টোবর ২০২১


 
যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং অস্ট্রেলিয়ার মাঝে স্বাক্ষরিত ‘অকাস’ কৌশলগত চুক্তির মাঝে যে ব্যাপারটা মিডিয়াতে বেশি হাইলাইট হয়েছে, তা হলো অস্ট্রেলিয়ার পারমাণবিক সাবমেরিন কেনার পরিকল্পনা। তবে অনেকেই হয়তো খেয়াল করেনি যে, এই চুক্তির আরও কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সাইবার নিরাপত্তা, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা ‘এআই’ এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিং। পারমাণবিক সাবমেরিনের পরিকল্পনার কারণে ফ্রান্সের কাছ থেকে অস্ট্রেলিয়ার ডিজেল সাবমেরিন কেনার বড় রকমের চুক্তিও বাতিল হয়ে যায়। ফ্রান্স এই চুক্তির ব্যাপারে একেবারেই অবগত না থাকার কারণে এবং নিজেদের সাবমেরিন বিক্রির চুক্তি বাতিল হবার কারণে যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে পাঠায়। এমনকি ফরাসিরা এই চুক্তিকে ফ্রান্সের পিছন থেকে ছুরি মারার সাথেও তুলনা করে। ফ্রান্সের সাথে কূটনৈতিক এই দ্বন্দ্ব কিছু সময়ের জন্যে আন্তর্জাতিক হেডলাইন কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু কখনোই সাইবার নিরাপত্তা এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স হাইলাইট হয়নি। কিছু কৌশলগত বিশ্লেষকেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, চুক্তির এই অংশটা চীনের সাথে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে পশ্চিমাদের জন্যে অনেক বড় পদক্ষেপ ছিল।

মার্কিন সেনাবাহিনীর সাইবার কমান্ডের প্রাক্তন প্রধান কৌশলী নিকোল কামারিলো এবং ব্রিটিশ সরকারের ‘ডিজিটাল সার্ভিস’এর ডেপুটি ডিরেক্টর অলিভার লুইস সামরিক ম্যাগাজিন ‘ডিফেন্স ওয়ান’এর এক লেখায় বলছেন যে, অস্ট্রেলিয়ার সাথে সাবমেরিনের চুক্তিটা ছিল আরও বড় কর্মকান্ডের জন্যে ‘ডাউনপেমেন্ট’; উন্নততর প্রযুক্তি ডেভেলপ করার পিছনে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার বন্ধুদের প্রতিশ্রুতি। এই প্রযুক্তির মাঝে রয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং আরও কিছু অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি, যেখানে পশ্চিমারা এখন চীনাদের সাথে কৌশলগত প্রতিযোগিতার মাঝে রয়েছে। তারা যুক্তি দিচ্ছেন যে, নতুন যুগের ডিটারেন্স বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ, বোমারু বিমান বা সাবমেরিনের উপরে তেমন নির্ভরশীল নয়; বরং সেখানে মূল নির্ভরশীলতা থাকবে সফটওয়্যারের শক্তি, দ্রুতি এবং টিকে থাকার সক্ষমতার উপর। চীনা সরকার এই ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকার জন্যেই প্রচুর বিনিয়োগ করছে এবং তাদের কাছে ১’শ ৪০ কোটি মানুষের বিশাল ডাটাবেস তো রয়েছেই। চীনারা বেসরকারি খাতকেও সামরিক প্রযুক্তি ডেভেলপ করতে বলছে।

কামারিলো এবং লুইস বলছেন যে, চীনা কর্মকান্ডকে মোকাবিলা করার জন্যে পশ্চিমাদেরকে ‘এআই’ ডেভেলপ করায় সহযোগিতা বাড়ানো ছাড়াও সম্ভব সবচাইতে বড় ডাটাবেস যোগাড় করতে হবে; যার মাঝে তারা ‘এআই’কে প্রশিক্ষণ দিতে পারবে। তবে পশ্চিমারা যেখানে চীনাদের থেকে এগিয়ে আছে, তা হলো ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স জোট; যার মাঝে অকাসের যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও অস্ট্রেলিয়ার সাথে রয়েছে কানাডা এবং নিউজিল্যান্ড। লেখকেরা বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের ইন্টেলিজেন্স সহযোগিতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানিকে পরাজিত করেছিল। এরপর ঠান্ডা যুদ্ধের সময় ‘ফাইভ আইজ’ সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে জিততে সহায়তা দিয়েছে। আর বর্তমানে ইন্টেলিজেন্স জোগাড় এবং বিশ্লেষণ পুরোটাই যেহেতু ডিজিটাল ডোমেইনে হয়ে থাকে, তাই সেখানে নেটওয়ার্কে যুক্ত সেন্সর, ‘এআই’এর এলগোরিদমের মাধ্যমে ডাটা প্রসেসিং ইত্যাদি অতি গুরুত্বপূর্ণ। ‘এআই’ ব্যবহার করা না হলে তা সাইবার আক্রমণের শিকার হবে; আর এটাকে রক্ষা করা না গেলে ‘এআই’এর গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলি প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাতে চলে যাবে। কামারিলো এবং লুইস প্রস্তাব দিচ্ছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং তার বন্ধু দেশগুলিকে পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে সকলেই বুঝতে পারে যে, ‘এআই’ প্রকৃতপক্ষে ভালো কাজে ব্যবহার হবে; মানুষকে নিয়ন্ত্রণের কাজে নয়। আর মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ‘এআই’ কাজ করবে না কখনোই।

অস্ট্রেলিয়ার নীতিগত ফোরাম ‘ইস্টএশিয়া ফোরাম’এর এক লেখায় ‘স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি’র গবেষক আরজান তারাপোর বলছেন যে, ‘অকাস’ চুক্তি ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স জোটকে ছাপিয়ে উন্নততর প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং ইন্ডাস্ট্রিকে একত্রে নিয়ে এসেছে। সামরিক প্রযুক্তি শেয়ার করাটা নতুন নয়; তবে কিছু প্রযুক্তি অন্যগুলি থেকে একটু বেশিই দামি। যেমন পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনের প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ঠান্ডা যুদ্ধের চরম পর্যায়ে শুধুমাত্র ব্রিটেনের সাথে শেয়ার করেছে। এখন বেশ কয়েক দশক পর তারা একই প্রযুক্তি অস্ট্রেলিয়াকে দিতে রাজি হয়েছে। কিন্তু কেন? কারণ ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স জোটের মাধ্যমে এই দেশগুলি ইন্টেলিজেন্স জোগাড় এবং শেয়ার করার জন্যে বহুকাল ধরে যৌথ সিস্টেম, সংস্থা ও প্রসেস ডেভেলপ করেছে। ‘ফাইভ আইজ’এর পার্টনারদেরকেই ওয়াশিংটন বিশ্বাস করছে; কারণ ওয়াশিংটন ‘অকাস’এর মাধ্যমে এমন সকল প্রযুক্তি শেয়ার করতে যাচ্ছে, যা কিনা তারা তাদের সবচাইতে কাছের ইন্টেলিজেন্স পার্টনারদের সাথেই শেয়ার করবে। ‘এআই’, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং সাইবার প্রযুক্তিই সামনের দিনগুলিতে ইন্টেলিজেন্স সক্ষমতার সর্বসন্মুখে থাকবে। আরজান তারাপোর বলছেন যে, ফ্রান্স এই ‘ফাইভ আইজ’এর অংশ না থাকার কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ফ্রান্সকে ‘অকাস’এ রাখতে চায়নি।

তারাপোর প্রস্তাব দিচ্ছেন যে, ‘অকাস’কে যদি আঞ্চলিক পার্টনারদের কাছে আরও বিশ্বাসযোগ্য করতে হয়, তাহলে ফ্রান্স এবং ভারতের মতো বন্ধুদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রযুক্তি এবং ডাটা শেয়ার করতে হবে। এই দেশগুলি’ ‘অকাস’এর মাঝে না থকলেও এদের গুরুত্ব অনেক। ‘অকাস’ সকল কিছু করতে পারবে না। তাই বিভিন্ন আঞ্চলিক গ্রুপিংএর সাথে ‘অকাস’কে একত্রে কাজ করতে হবে। একেকটা গ্রুপিং একেক উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছে। যেমন ‘কোয়াড’ ব্যবহৃত হবে আঞ্চলিক সহযোগিতার ‘নিউক্লিয়াস’ হিসেবে। ফ্রান্স এবং ভারতের নিজস্ব সামরিক শক্তি, ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রভাবের আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক রয়েছে, যা ‘অকাস’ ব্যবহার করতে পারে। একারনেই তারাপোর ‘অকাস’কে ফ্রান্সের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের দিকে মনোনিবেশ করতে বলছেন। তবে তিনি বলছেন যে, ‘অকাস’এর পুরো ব্যাপারটাই সম্পূর্ণ আলাদা।

সবশেষে ‘অকাস’ চুক্তির ভিত্তি নিয়ে কথা বলেছেন কামারিলো এবং লুইস। তারা বলছেন যে, ১৯৪১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের মাঝে স্বাক্ষরিত ‘আটলান্টিক চার্টার’ই হলো এই দুই দেশের সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু। এবছরের জুন মাসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সেই একই চার্টারের একটা পরিবর্তিত ভার্সন স্বাক্ষর করেন। মুক্ত, গণতান্ত্রিক সমাজের আদর্শকে দুনিয়াব্যাপী প্রচার করা ছাড়াও তাদের প্রযুক্তিগুলিকে ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টির মাধ্যমে নিজেদের হাতে ধরে রাখা এবং সাইবার হামলা প্রতিহত করার মতো চিন্তাগুলির ভিত সেই চার্টারের মাঝেই রয়েছে।

বিশ্লেষকদের এই কথাগুলি থেকে পরিষ্কার যে, ‘অকাস’ সাম্প্রতিক সময়ে স্বাক্ষরিত সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত চুক্তি। ইংরেজি ভাষাভাষী ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং কানাডার মাঝেই গড়ে উঠেছে সেই ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স জোট, যাকে পুঁজি করেই সামনের দিনগুলিকে ‘অকাস’ প্রযুক্তিগত দিক থেকে দুনিয়াতে এগিয়ে থাকতে চাইছে। এই প্রযুক্তির সর্বসন্মুখে রয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা ‘এআই’; যাকে সমর্থন যোগাবে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং নিরাপত্তা দেবে সাইবার প্রযুক্তি। ‘আকাস’ চুক্তির মূলেই রয়েছে এই প্রযুক্তিগুলি; যা সামনের দিনগুলিতে প্রতিরক্ষা খাতে অতি গুরুত্বপূর্ণ হবে; যদিও মিডিয়াতে পারমাণবিক সাবমেরিনের কথাই বেশি প্রচারিত হয়েছে। অতি সংবেদনশীল এই প্রযুক্তিগুলিকে যুক্তরাষ্ট্র শুধুমাত্র তার সবচাইতে কাছের ‘বিশেষ’ গ্রুপের সাথেই শেয়ার করতে চাইছে। আর নিজেদের এই ‘বিশেষ’ গ্রুপের মাঝে ফান্স এবং ভারতের মতো দেশগুলিকে ঢুকতে না দিলেও ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্র চাইছে বাকি দেশগুলিকেও তাদের সাথে রেখে তাদের কৌশলগত উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে।

Thursday, 21 October 2021

‘আসিয়ান’এর অস্তিত্বকেই চ্যালেঞ্জ করছে ‘অকাস’ চুক্তি

২১শে অক্টোবর ২০২১


 

‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং আস্ট্রেলিয়ার মাঝে কৌশলগত চুক্তি ‘অকাস’ স্বাক্ষরিত হবার পর থেকে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক জোট ‘এসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনস’ বা ‘আসিয়ান’এর সদস্য দেশগুলির মাঝে সিদ্ধান্তহীনতা দেখা দিয়েছে। জোটের সদস্য মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া যখন বলছে যে, এই চুক্তির ফলে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছের রাষ্ট্র ফিলিপাইন এই চুক্তিকে সমর্থন দিয়েছে।

গত ১২ই অক্টোবর মালয়েশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসামুদ্দিন হুসেইন পার্লামেন্টকে বলেন যে, মালয়েশিয়ার মূল লক্ষ্য হলো চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে শক্তির ব্যালান্স যাই থাকুক না কেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে রক্ষা করা। ‘আসিয়ান’এর সদস্য রাষ্ট্রদের চিন্তার মাঝে একটা সমঝোতাই কেবল এই দুই শক্তিশালী দেশকে মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে। জাপানের মিডিয়া ‘এনএইচকে’ বলছে যে, গত ১৭ই সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ইসমাঈল সাবরি ইয়াকব অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনকে বলেন যে, ‘অকাস’ চুক্তি দক্ষিণ চীন সাগরে অন্যান্য শক্তিকে আরও আগ্রাসী ভূমিকা নিতে উস্কে দিতে পারে। একই দিনে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয় যে, অত্র অঞ্চলে অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিয়ে ইন্দোনেশিয়া ভীষণভাবে চিন্তিত। মার্কিন সামরিক পত্রিকা ‘স্ট্রারস এন্ড স্ট্রাইপস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ১৬ই সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লী সিয়েন লুং অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে বলেন যে, এই চুক্তি আঞ্চলিক শান্তি এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে সহায়তা করবে এবং আঞ্চলিক কাঠামোকে সমর্থন দেবে। পরদিন ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডেলফিন লরেনজানা অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিটার ডাটনকে ফোন করে বলেন যে, অস্ট্রেলিয়ার অধিকার রয়েছে তার সাবমেরিন প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার; ফিলিপাইনও তার নিজস্ব অঞ্চলকে রক্ষা করতে সক্ষমতা তৈরি করছে। ২৩শে সেপ্টেম্বর ভিয়েতনামের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লে থি থু হাং নির্দিষ্ট না করেই বলেন যে, সকল রাষ্ট্রই শান্তি, স্থিতিশীলতা, সহযোগিতা এবং উন্নয়ন চায়। অস্ট্রেলিয়ার পারমাণবিক প্রযুক্তি কেনা নিয়ে তিনি বলেন যে, পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার হতে হবে শান্তিপূর্ণ এবং তা আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাজে লাগতে হবে।

থাইল্যান্ডের ‘চুলালংকর্ন ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর থিতিনান পংসুধিরাক ‘ব্যাংকক পোস্ট’এর এক লেখায় মত দিচ্ছেন যে, ‘অকাস’ চুক্তি চীনকে যেমন উস্কে দেবে, তেমনি ‘আসিয়ান’কে আরও বিভক্ত করবে। একইসাথে এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র অস্ট্রেলিয়াকে পারমাণবিক সাবমেরিন সরবরাহ করলে ইইউ এবং জাপানসহ অন্যান্য শক্তিশালী দেশগুলিও চ্যালেঞ্জের মাঝে পড়ে যাবে। পংসুধিরাকের সাথে একমত নন থাইল্যান্ডের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কাভি চংকিত্তাভর্ন। একই পত্রিকার এক লেখায় তিনি বলছেন যে, একসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন অত্র অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে; এখন করছে চীন। তিনি বলেন যে, ‘আসিয়ান’ যদি সময়োচিত সিদ্ধান্ত নিতে না পারে, তবে সংস্থার আকাত্মতায় সমস্যা হবে। গত পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা বলছে যে, ‘আসিয়ান’এর সক্ষমতা রয়েছে টিকে থাকার। এর আগেও বিভিন্ন ইস্যুতে এর সদস্য দেশগুলির কেউ কেউ ভিন্ন পথে হাঁটার চেষ্টা করেছে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সংস্থায় ভাঙ্গন ধরাতে পারেনি।

নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে কাজ করা মার্কিন নিরাপত্তা বিশ্লেষক পল বিউকানান ‘স্টারস এন্ড স্ট্রাইপস’কে বলছেন যে, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি চিন্তিত যে, দক্ষিণ চীন সাগর, মালাক্কা প্রণালি, মালয় দ্বীপপুঞ্জ এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় পারমাণবিক শক্তির আনাগোনা আরও দেশকে পারমাণবিক শক্তির দিকে আকর্ষণ করতে পারে। বিশেষ করে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মত দেশগুলি, যেগুলি এই মুহুর্তে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে না, তারাও এব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। এই পুরো ব্যাপারটা সংঘাতের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ চীন তার আঞ্চলিক অবস্থানকে ধরে রাখতে চেষ্টা করবে এবং চাপের মুখে তার শক্তি বৃদ্ধি করতে বাধ্য হবে।

সিঙ্গাপুরের সরকারি গবেষণা সংস্থা ‘ইসেয়াস ইউসোফ ইসহাক ইন্সটিটিউট’এর সিনিয়র ফেলো উইলিয়াম চুং এবং শ্যারন সেয়া ‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় বলছেন যে, যখন ‘আসিয়ান’এর বাইরের দেশগুলি অত্র অঞ্চলের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিচ্ছে, তখন বোঝা যায় যে, চীনা আগ্রাসী তৎপরতাকে নিয়ন্ত্রণে ‘আসিয়ান’ ব্যর্থ হয়েছে। ‘আসিয়ান’ মনে করছে যে, ‘কোয়াড’এর মতো জোট তৈরি হওয়া মানেই চীনকে আরও খেপিয়ে তোলা। তারা ‘আসিয়ান’এর শক্ত নেতৃত্ব দাবি করেন এবং বর্তমান নেতৃত্বের সমালোচনা করেন। ‘আসিয়ান’এর বর্তমান চেয়ারম্যান ব্রুনাইএর কার্যকলাপকেও তারা বিবৃতিসর্বস্ব বলে আখ্যা দেন। একইসাথে সংস্থার মাঝে এখন অনেক বিষয়েই বিরোধ; যার ফলশ্রুতিতে শুধু ছাড় দিয়েই চলতে হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে শীর্ষ বৈঠকে আমন্ত্রণ না জানানো হলেও তার একজন প্রতিনিধিকে সন্মেলনে আসার অনুমতি দেয়া হয়। একারণেই বাইডেন প্রশাসন ‘আসিয়ান’এর সমঝোতার জন্যে অপেক্ষা না করে সিঙ্গাপুর এবং ভিয়েতনামের মতো সদস্যদেশগুলির সাথে আলাদাভাবে সম্পর্ক তৈরি করছে। লেখকেরা বলছেন যে, দিন শেষে ‘আসিয়ান’ হয়তো কোনমতে চালিয়ে নেবে; কিন্তু এটা পরিষ্কার যে, ‘আসিয়ান’এর বয়স হয়েছে।

‘অকাস’ চুক্তি ‘আসিয়ান’এর মতো একটা সংস্থার অস্তিত্বকেই চ্যালেঞ্জ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র তার চীনকে নিয়ন্ত্রণের নীতিতে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিকে বাধ্য করছে এক পক্ষ নিতে। কিন্তু এই দেশগুলি অর্থনৈতিকভাবে অনেকাংশেই চীনের উপর নির্ভরশীল। এছাড়াও আরেক বাস্তবতার মাঝে রয়েছে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া। পূর্ব এশিয়ার প্রায় সবগুলি কৌশলগত সমুদ্রপথই এই দেশগুলির মাঝ দিয়ে গিয়েছে। কাজেই যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মাঝে যে কোন সম্ভাব্য সংঘাতে এই দেশগুলির উঠানই হয়ে উঠবে যুদ্ধক্ষেত্র। চীনের বেশি কাছে অবস্থিত হওয়ায় ফিলিপাইন এবং ভিয়েতনামের কাছে যখন চীনের হাত থেকে সমুদ্রসীমা উদ্ধার মূল লক্ষ্য, তখন মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া তাদের আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমাকে সংঘাতমুক্ত দেখতেই বেশি আগ্রহী। অর্থাৎ সংস্থার সদস্যদেশগুলির জাতীয় লক্ষ্য এখন সংস্থার সাথে একাত্মতা প্রকাশকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। একারণেই যুক্তরাষ্ট্র অত্র অঞ্চলে ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম এবং সিঙ্গাপুরের সাথে আলাদা সম্পর্ক তৈরিতে আগ্রহী হয়েছে। এমতাবস্থায় মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া নিজস্ব কৌশলগত দিকনির্দেশনা খুঁজবে। একইসাথে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবার সাথেসাথে অত্র অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে নতুন খেলোয়াড় যোগ হবে এবং নতুন নতুন কৌশলগত জোট তৈরি হবে।

Sunday, 10 October 2021

কানাডার সাথে ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা চুক্তি কি আসন্ন?

১০ই অক্টোবর ২০২১

ছবিঃ ২০১৮ সালের মার্চ। ব্রিটিশ রয়াল নেভির পারমাণবিক সাবমেরিন ‘ট্রেনচ্যান্ট’ আর্কটিকের বরফ ফুঁড়ে উঠে এসেছে। ব্রিটেন তার পারমাণবিক সাবমেরিন সক্ষমতাকে কানাডার আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্যে ব্যবহার করতে চাইছে। কিন্তু এত কাছের বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও কানাডার সাথে আর্কটিকের ‘নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ’এর সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব রয়েছে। একারণেই কানাডা ব্রিটেনের প্রস্তাবের ব্যাপারে এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।

 
সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে কানাডার মিডিয়া ‘সিবিসি’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, কানাডার সর্বউত্তরের উত্তর মেরুর কাছাকাছি অতিশীতল অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্রিটেন তার সামরিক সক্ষমতাকে কানাডার সহায়তায় মোতায়েন করতে চাইছে; বিশেষ করে ব্রিটেন তার পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনগুলিকে উত্তরাঞ্চলে নজরদারি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে কানাডার সহায়তায় ব্যবহার করতে চাইছে। ‘সিবিসি’র সাথে সাম্প্রতিক এক সাক্ষাতে ব্রিটেনের সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল নিক কার্টার বলেন যে, ব্রিটেন কানাডার উত্তরাঞ্চলে বেঁচে থাকা এবং যুদ্ধ করার ব্যাপারে শিখতে ইচ্ছুক; এবং তারা সেই হিসেবে কানাডার সাথে সহযোগিতার জন্যে যথেষ্ট আগ্রহী। আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কানাডাকে যা যা করতে হবে, ব্রিটেন সেই ব্যাপারগুলিতে সহযোগিতা করতে চায়। নিক কার্টারের এই প্রস্তাবখানা প্রকৃতপক্ষে কয়েক মাস আগেই কানাডার সরকারি বিভিন্ন মহলে দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, কানাডার কোন সরকারই আর্কটিক অঞ্চলে কোন রাষ্ট্রকেই অবস্থান নিতে দেয়নি; এমনকি সবচাইতে কাছের বন্ধু রাষ্ট্রগুলিকেও। এর মূল কারণ হলো কানাডার আর্কটিক অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব নিয়ে অনেকগুলি দেশের মাঝে প্রতিযোগিতা রয়েছে। তবে ‘সিবিসি’ বলছে যে, কানাডার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ড্যানিয়েল মিনডেন এক ইমেইলে ব্রিটেনের এই প্রস্তাবের ব্যাপারে নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে চাননি।

তবে ‘সিবিসি’ বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং অস্ট্রেলিয়ার মাঝে সাম্প্রতিক ‘অকাস’ প্রতিরক্ষা চুক্তি থেকে কানাডার বাদ পড়ার ব্যাপারটা হয়তো ব্রিটেনের প্রস্তাবের ব্যাপারে কানাডাকে নতুন করে ভাবাবে। ন্যাটোর সদস্য হিসেবে ব্রিটেন এবং কানাডা নিয়মিত নরওয়েতে শীতকালীন মহড়ায় অংশ নেয়। আর কানাডার এলবার্টা রাজ্যের সাফিল্ডের বিশাল ভূখন্ডে ব্রিটেন বহু বছর ধরে তার সেনাবাহিনীর আর্মার্ড এবং কম্বাইন্ড অপারেশনের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কানাডার বন্ধু রাষ্ট্রগুলি আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার নতুন করে সামরিক অবস্থান শক্তিশালীকরণ এবং সেই অঞ্চলে চীনের মতো প্রতিযোগী রাষ্ট্রের কর্মকান্ড বৃদ্ধির ব্যাপারে কথা বলছে।

কানাডার আর্কটিকের নিরাপত্তা

২০০৬ সালে কানাডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী স্টিভেন হারপারএর কনজারভেটিভ সরকার আর্কটকের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলতে শুরু করে। এই হিসেবে আর্কটিক অফশোর প্যাট্রল শিপ প্রকল্পের সূচনা করে কানাডা সরকার। ২০১১ সালে ছয় থেকে আটটা জাহাজ তৈরির এই প্রকল্প শুরু করা হয়, যেগুলি বরফাচ্ছাদিত অঞ্চলে চলাচল করতে সক্ষম হবে। কিন্তু এই প্রকল্পের বাজেট যোগাড় করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ২০১৫ সালে জাহাজ নির্মাণ শুরু হয়। ‘হ্যারি ডে উলফ ক্লাস’এর সাড়ে ৬ হাজার টনের এই জাহাজগুলি গত ৫০ বছরে কানাডায় তৈরি সবচাইতে বড় সামরিক জাহাজ। ২০২১ সাল পর্যন্ত দু’টা জাহাজ তৈরি শেষ হয়েছে। এই জাহাজগুলির সহায়তায় কানাডার উত্তরের বাফিন দ্বীপের নুনাভুত এলাকায় ‘নানিসিভিক নেভাল ফ্যাসিলিটি’ তৈরি করা শুরু হয়। এখান থেকে জাহাজগুলি জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারবে। তবে এই জাহাজগুলি এবং নতুন সামরিক স্থাপনা কানাডার উত্তরের পানির নিচের নজরদারি এবং স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নজরদারির চ্যালেঞ্জগুলির সমাধান দেয় না। এখানেই কানাডার সহায়তায় আসতে চাইছে ব্রিটেন।

‘সিবিসি’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ব্রিটেনের সেটাই রয়েছে যা কানাডার নেই; আর তা হলো পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন; যা কিনা বরফের নিচে লম্বা সময় থাকতে পারে। কানাডা ব্রিটেনের কাছ থেকে ১৯৮০এর দশকে তৈরি চারটা ডিজেল সাবমেরিন কেনে ১৯৯০এর দশকের শেষের দিকে। তারা চেয়েছিল এই সাবমেরিনগুলিকে আরও উন্নত করে সেগুলির বরফের নিচে থাকার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে। কিন্তু সেই পরিকল্পনাও ভেস্তে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে আর্কটিক অঞ্চলে রুশ সাবমেরিনের আনাগোনা বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্চ মাসে রাশিয়ার তিনটা সাবমেরিন একই সময়ে আর্কটিকের বরফ ফুঁড়ে উপরে উঠে আসে। কানাডার প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ‘ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারি’র প্রফেসর রব হিউবার্ট প্রশ্ন করছেন যে, কানাডার কি সক্ষমতা রয়েছে রুশ এবং চীনা সাবমেরিন মোকাবিলা করার? তিনি বলছেন যে, ব্রিটিশরা সর্বপ্রথমে এই সক্ষমতাটাই আর্কটিকে নিয়ে আসছে। হিউবার্ট বলছেন যে, কানাডা আর্কটিকে তার সবচাইতে কাছের বন্ধুদেরও অবস্থান দিতে নারাজ। কারণ ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই কানাডার উত্তরাঞ্চলের আর্কটিক দ্বীপপুঞ্জের মাঝ দিয়ে যাওয়া ‘নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ’এর সার্বভৌমত্ব কানাডার বলে স্বীকার করে না। এই প্যাসেজের মাধ্যমে আটলান্টিক এবং প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে যাতায়াত করা যায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আর্কটিকে ব্যাপকভাবে বরফ গলতে থাকায় এই রুটে জাহাজ চলাচল নিয়ে কথা শুরু হয়েছে। ২০০৮ সালে কানাডার কোস্ট গার্ড এই প্যাসেজের মাঝ দিয়ে প্রথম বাণিজ্যিক জাহাজ ‘ক্যামিলিয়া দেসগাগনেস’এর চলাচল নিশ্চিত করে। ২০১৩ সালে ‘নরডিক ওরাইয়ন’ নামের একটা কয়লাবাহী জাহাজ কানাডার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের ভ্যাঙ্কুভার থেকে সাড়ে ৭৩ হাজার টন কয়লা নিয়ে ‘নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ’ ব্যবহার করে ৩৩ দিনের মাঝে ইউরোপের ফিনল্যান্ডে পৌঁছে। বেশি গভীরতার হবার কারণে এই ওজন নিয়ে জাহাজটার পানামা খাল অতিক্রম করতে পারার কথা ছিল না। ২০১৬ সালে ‘ক্রিস্টাল সেরেনিটি’ নামের একটা যাত্রীবাহী ক্রুজ শিপ ১৭’শ যাত্রী নিয়ে এই প্যাসেজ অতিক্রম করে।

‘কানাডিয়ান গ্লোবাল এফেয়ার্স ইন্সটিটিউট’এর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেইভ পেরি বলছেন যে, ব্রিটিশদের প্রস্তাব বলে দিচ্ছে যে, আর্কটিক অঞ্চলে কানাডার অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে হবে; যা জাস্টিন ট্রুডোর অধীন বর্তমান লিবারাল সরকারের জন্যে একটা ঘুম থেকে জেগে ওঠার ডাক। তিনি আরও বলছেন যে, ‘অকাস’ চুক্তি দেখিয়ে দিচ্ছে যা কানাডার সবচাইতে কাছের বন্ধু রাষ্ট্রগুলি নিজেদের মাঝে আরও কাছাকাছি এবং আরও ছোট ক্লাব তৈরি করছে। আর যুক্তরাষ্ট্র এমন বন্ধু চাইছে যারা অন্ততঃ নিজেদের ওজন বহন করতে সক্ষম।

 
ছবিঃ কানাডিয়ান বিমান বাহিনীর ‘সিএফ ১৮’ যুদ্ধবিমান। ১৯৮৩ সাল থেকে এই বিমানগুলি উড়ছে। বিশ্বব্যাপী বহু মিশনে এই বিমানগুলি ব্যবহৃত হলেও এগুলিকে প্রতিস্থাপনের ব্যাপারে কানাডার কোন সরকারই সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। হয়তো তা কানাডার প্রতিরক্ষা চিন্তারই ফসল। কানাডা হলো একটা অগ্নিনিরোধক বাড়ি; যা দাহ্য বস্তু থেকে বহু দূরে।


কানাডা হলো অগ্নিরিরোধক বাড়ি

‘দ্যা কনভারসেশন’এর এক লেখায় ‘কানাডিয়ান ফোর্সেস কলেজ’এর প্রফেসর পল টি মিচেল ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন যে, কানাডিয়রা তাদের নিরাপত্তাকে কিভাবে দেখে। ১৯২৪ সালে কানাডার রাজনীতিবিদ রাউল ডানডুরান্ড বলেন যে, কানাডা হলো একটা অগ্নিনিরোধক বাড়ি; যা দাহ্য বস্তু থেকে বহু দূরে। তিনি প্রকৃতপক্ষে ১৮৬৭ সাল থেকে কানাডার প্রতিরক্ষা চিন্তাকেই তুলে ধরেন। সহজ কথা বলতে গেলে, তিনটা মহাসাগরের মাঝে অবস্থান এবং একটা সুপারপাওয়ারের পাশে থাকার কারণে কানাডিয়দের নিজেদের প্রতিরক্ষা নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই। ১৯৫০এর দশক থেকেই কানাডার সকল সরকারের প্রতিরক্ষানীতির মূল কর্মকান্ড ছিল তিনটা; কানাডাকে রক্ষা করা; উত্তর আমেরিকাকে রক্ষা করা; এবং আন্তর্জাতিক শান্তি এবং নিরাপত্তায় সহায়তা করা। এই ব্যাপারগুলি এতটাই অপরিবর্তনীয় রয়েছে যে, সাম্প্রতিক নির্বাচনেও প্রতিরক্ষার ব্যাপারটা নিয়ে কেউ কোন কথাই বলেনি। অনেকেই মনে করেন যে, কানাডার প্রকৃতপক্ষে কনস্টাবুলারি বাহিনী ছাড়া আর কিছুর দরকার নেই; যাদের কাজ হবে বনের দাবানল থামানো এবং মানুষকে বিপদে উদ্ধার করা। কেবলমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেরই সক্ষমতা আছে কানাডাকে আক্রমণ করার। এটা হয়তো বাস্তবে হবে না; তবে যদি এটা হয়েই যায়, তাহলে মিচেলের ব্যাখ্যা হলো, কানাডা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সহায়তার আবেদন জানাবে।

১৯৫০এর দশক থেকেই কানাডা তার সামরিক সক্ষমতা কমাচ্ছে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে কানাডার বিমান বাহিনীর ‘সিএফ ১৮’ যুদ্ধবিমানগুলিকে প্রতিস্থাপনের গুরুত্ব বোঝা গেলেও সকল সরকারই এই বিমানগুলির ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীনতায় পড়েছে। এমনকি প্রতিরক্ষা নিয়ে বেশি চিন্তিত কনজারভেটিভ সরকারও এব্যাপারে কিছু করতে পারেনি। অথচ যুগে যুগে কানাডা বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন যুদ্ধে জড়িয়েছে এবং এই বিমানগুলিই সার্ভিস দিয়ে গেছে। ১৯৮৩ সালে কানাডার বিমান বাহিনী ১’শ ৩৮টা ‘সিএফ ১৮’ বিমান সংগ্রহ শুরু করে। বিমানগুলি ১৯৯১ সালে ইরাক যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়। এরপর ১৯৯০এর দশকে কসভোতে; ২০১১ সালে লিবিয়াতে; এমনকি সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আইসিসের বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হয়েছে। প্রায় চার দশক ধরে ব্যবহারের পরে এখন মাত্র ৮৫টার মতো বিমান সার্ভিসে রয়েছে। এই বিমানগুলিকে আরও সময় সার্ভিসে রাখার জন্যে অস্ট্রেলিয়ার বিমান বাহিনী থেকে রিটায়ার করা একই ধরনের ১৮টা বিমান এর সাথে যুক্ত করা হয়।

কানাডা তার সামরিক সক্ষমতা কমাতে থাকলেও তার বৈশ্বিক দায়িত্ব থেকে সে সড়ে আসেনি। কাজেই বিভিন্ন সময়ে কানাডা যুদ্ধে জড়িয়েছে; এবং প্রতিবারই কানাডার সামরিক বাহিনী সেই দায়িত্ব পালনের জন্যে তৈরি ছিল না। কারণ কানাডিয়রা মনে করেছে যে, তাদের সামরিক সক্ষমতার ব্যাপারে চিন্তার দরকার নেই। পল মিচেল বলছেন যে, কানাডিয়দের এহেন চিন্তার ফলে বর্তমান আইনের শাসনের উপর প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে রক্ষার ব্যাপারে কানাডিয়দের কতটা সদিচ্ছা রয়েছে, তা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। অর্থাৎ সামরিক সক্ষমতার ব্যাপারে উদাসীনতা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, পশ্চিমা আদর্শকে রক্ষার পিছনে কানাডার চেষ্টার ঘাটতি রয়েছে।

সেপ্টেম্বর ২০২১; নির্বাচনে জয়লাভ করেছে জাস্টিন ট্রুডোর লিবারাল পার্টি। ১৯৫০এর দশক থেকে কানাডার কোন নির্বাচনেই প্রতিরক্ষা কোন আলোচ্য বিষয়বস্তুই ছিল না। বিশেষ করে ২০২০ সালে লিবারাল সরকার কানাডার জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৪৫ শতাংশ প্রতিরক্ষায় খরচ করায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নিয়মিত বিরোধের মাঝে রয়েছে।



কানাডার লিবারাল সরকার এবং প্রতিরক্ষা বাজেট

জ্যেষ্ঠ কানাডিয় সাংবাদিক এবং মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা আটলান্টিক কাউন্সিল’এর সিনিয়র ফেলো ডাইএন ফ্রান্সিস ‘ফিনানশিয়াল পোস্ট’এর লেখায় কানাডার প্রতিরক্ষানীতির ব্যাপক সমালোচনা করেন। তিনি বলছেন যে, কানাডার আর্কটিকে রুশ এবং চীনা হুমকি মোকাবিলায় কানাডা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে; যার ফলশ্রুতিতে যুক্তরাষ্ট্র কিছু দায়িত্ব নিয়েছে; আর ব্রিটিশরাও এখন এখানে জড়িত হতে চাইছে। প্রশান্ত মহাসাগরে অস্ট্রেলিয়া চীনের হুমকি বুঝতে পেরেছে বলেই যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের সাথে চুক্তি করেছে এবং আটটা পারমাণবিক সাবমেরিন কেনার পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু কানাডা এখনও চীনের হুমকি মোকাবিলায় চিন্তা করছে না। একইসাথে আর্কটিকে কানাডার সক্ষমতা একেবারেই যথেষ্ট নয়। আর লিবারাল সরকার প্রতিরক্ষা বাজেট যেমন একেবারেই কমিয়ে রেখেছে, তেমনি আর্কটিক অঞ্চলও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রতিরক্ষার ব্যাপারে কানাডার সিদ্ধান্তহীনতা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি। শুধু তাই নয়, ন্যাটোর মাঝে কানাডার অবস্থান সন্মানজনক নয়। ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের সদস্যরা মনে করে যে, কানাডার ইন্টেলিজেন্সের উপর নির্ভর করা যায় না; কারণ তারা তথ্য গোপন রাখতে অক্ষম। ফ্রান্সিস বলছেন যে, কানাডার সবচাইতে কাছের বন্ধুরা কানাডার নিরাপত্তা নিজেদের হাতে নিতে চাইছে; কারণ কানাডার লিবারাল সরকার সার্বভৌম রাষ্ট্রের মতো কাজ করতে চাইছে না।

কানাডার প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রকল্প ‘নেটওয়ার্ক ফর স্ট্র্যাটেজিক এনালিসিস’এর এক লেখায় মাক্সান্ড্রে ফোর্টিয়ের ব্রিটেন এবং আস্ট্রেলিয়ার উদাহরণ টেনে নিয়ে আসছেন। তিনি বলছেন যে, কানাডার উচিৎ এই দুই দেশের মতো নিজেদের উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে চিন্তা করা। ব্রিটেন এবং অস্ট্রেলিয়া তাদের আকাংক্ষা বাস্তবায়নে যা দরকার সেগুলি যোগাড় করায় মনোনিবেশ করেছে। করোনাভাইরাসের মাঝে অর্থনৈতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও এবং অস্ট্রেলিয়ার দাবানলে মারাত্মক ক্ষতির পরেও এই দেশগুলি ন্যাটোর ঠিক করে দেয়া জিডিপির ২ শতাংশ প্রতিরক্ষায় খরচ করেছে। প্রতিরক্ষার পিছনে কম খরচ করাটা কানাডার সাথে তার বন্ধু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনার কারণ। তিনি ২০২০ সালের একটা জনমত জরিপের বরাত দিয়ে বলছেন যে, কানাডার জনগণ এখন সামরিক বাহিনীতে বিনিয়োগ করার পক্ষে। কাজেই এখন কানাডার প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় না করাটা অর্থহীন। উল্লেখ্য যে, কানাডার লিবারাল সরকার ২০২০ সালে কানাডার জিডিপির ১ দশমিক ৪৫ শতাংশ প্রতিরক্ষায় খরচ করেছে।

‘রয়াল মিলিটারি কলেজ অব কানাডা’র প্রফেসর প্রাক্তন সামরিক অফিসার রস ফেটারলি কানাডার রাজনীতিতে সামরিক বাজেটের বিষয়টাকে নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলছেন যে, প্রতিরক্ষার বিষয়গুলি সবসময়ই দীর্ঘমেয়াদি এবং কানাডিয়দের কাছে এর সুবিধাগুলি সরাসরি নয়। অপরদিকে রাজনৈতিক দলগুলি এমন ইস্যুগুলি নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকে, যেগুলি মানুষের জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করে। নির্বাচনে জেতার জন্যে রাজনৈতিক দলগুলি সর্বদাই অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলি নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকে। অথচ কানাডার বাইরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলিই কিন্তু কানাডাকে দূরে কোথাও সৈন্য প্রেরণে বাধ্য করেছে। চার বছরের জন্যে যে সরকার নিয়োগ পেয়েছে, সেই সরকারের রেখে যাওয়া সিদ্ধান্তগুলি পরবর্তী দুই দশকের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ হবে। কাজেই কানাডার সরকারের উচিৎ হবে পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতি বিচার করেই বর্তমান প্রতিরক্ষানীতিকে নতুন করে দেখা এবং এতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সাধন করা। 

কানাডা আর্কটিকে তার সবচাইতে কাছের বন্ধুদেরও অবস্থান দিতে নারাজ। কারণ ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই কানাডার উত্তরাঞ্চলের আর্কটিক দ্বীপপুঞ্জের মাঝ দিয়ে যাওয়া ‘নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ’এর সার্বভৌমত্ব কানাডার বলে স্বীকার করে না।


‘অকাস’ চুক্তির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব এখনও সবে সামনে আসছে। ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর মাঝে অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডার চিন্তাগত পার্থক্যগুলি এখনও পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান। অস্ট্রেলিয়া চীনকে যতটা হুমকি হিসেবে দেখছে, কানাডা ততটা হুমকি হিসেবে দেখছে না। নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইস্যুগুলিকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে কানাডার সরকার পশ্চিমা আদর্শকে রক্ষা করার আন্তর্জাতিক দায়িত্বকে দ্বিতীয় সাড়ির দায়িত্ব হিসেবে দেখেছে। একারণে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কানাডা সরকারের টানাপোড়েন চলছেই। এখন এখানে ব্রিটেনও যোগ হয়েছে। কানাডার রাষ্ট্রীয় চিন্তাবিদদের মাঝে প্রতিরক্ষা বিষয়ে খরচ বৃদ্ধি করার ব্যাপারে যথেষ্ট একাত্মতা থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলি এখনও ভোট পাবার জন্যে অভ্যন্তরীণ ইস্যুগুলির উপরেই নির্ভরশীল। সুরক্ষিত ‘অগ্নি নিরোধক বাড়ি’র সাথে নিজেদের অবস্থানকে তুলনা করে কানাডিয়রা প্রতিরক্ষা খাতে নিজেদের ব্যয় বৃদ্ধি করতে চাইছে না। আবার আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা দেবার সক্ষমতা খুব কম থাকলেও সেখানে ‘নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ’এর সার্বভৌমত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের সাথে দ্বন্দ্বের মাঝে রয়েছে কানাডা। একারণেই আর্কটিকের বরফের নিচে ব্রিটিশ পারমাণবিক সাবমেরিন মোতায়েনের প্রস্তাবটা এখনও কানাডার সরকারের কাছে আলোচ্য বিষয়। ইংরেজি ভাষাভাষী ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের সদস্য হবার পরেও দেশগুলির মাঝে বিরোধ লক্ষ্যণীয়।

Friday, 1 October 2021

‘অকাস’ চুক্তির মাধ্যমে ইন্দোপ্যাসিফিকে নিজের অবস্থানকে আরও সুসংহত করলো ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’

০১লা অক্টোবর ২০২১

ব্রিটেন এবং তার ইংরেজি ভাষাভাষী কমনওয়েলথের সদস্যদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর চিন্তাগত একাত্মতা এতটাই শক্ত ভিতের উপর স্থাপিত, যা এই দেশগুলির সম্পর্ককে আরও কাছাকাছি নেবে। পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় ক্রমান্বয়ে প্রভাবশালী হওয়া ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ এখন ক্রমেই যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দোপ্যাসিফিক কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যাচ্ছে; যেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ফেরত আসার কোন পথ থাকছে না।

 প্রায় হঠাত করেই গত ১৫ই সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং অস্ট্রেলিয়া ইন্দোপ্যাসিফিককে ঘিরে একটা কৌশলগত চুক্তির ঘোষণা দিয়েছে; যা অনেককেই যেমন অবাক করেছে, আবার কোন কোন পক্ষকে যথেষ্ট বিরক্তির মাঝে ফেলেছে। তিন দেশের মাঝে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি, যা ‘এইউকেইউএস’ বা ‘অকাস’ নামে পরিচিত হচ্ছে, তার ব্যাপারে মন্তব্য এসেছে বেশ দ্রুতই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন নিজেই এই চুক্তির ঘোষণা দেন।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনজন চুক্তির ঘোষণার দিন বলেন যে, ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেন প্রযুক্তিগত দিক থেকে তাদের জাতীয় সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে; এবং আরও গুরুত্ব সহকারে ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র আরও কাছাকাছি থেকে কাজ করবে। তিন দেশের কেউই চীনকে নিয়ন্ত্রণ করাকে এই চুক্তির স্তম্ভ হিসেবে আখ্যা না দিলেও তা ছিল বেশ পরিষ্কার। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন বলেন যে, ‘অকাস’এর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দিক হবে অস্ট্রেলিয়ার জন্যে একটা পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন ফ্লিট। আগামী ১৮ মাসে সেই লক্ষ্যে তিন দেশ একত্রে কাজ করবে বলে বলেন তিনি।

চীন ক্ষুব্ধ; কিন্তু ফ্রান্সও কেন?

চুক্তির মূল টার্গেট চীন থাকার কারণে বেইজিং থেকে ‘অকাস’এর বিরুদ্ধে দ্রুত বিবৃতি আসে। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান সাংবাদিকদের বলেন যে, এই চুক্তি পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করবে। তিনি বলেন যে, অস্ট্রেলিয়ার কাছে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের পারমাণবিক সাবমেরিন বিক্রি করাটা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, পারমাণবিক প্রযুক্তির বিক্রিকে তারা ভূরাজনৈতিক খেলার অংশ হিসেবে ব্যবহার করবে। এটা একটা দ্বিমুখী নীতি এবং যথেষ্টই দায়িত্বজ্ঞানহীন। তবে চীন ছাড়াও একইসাথে বিষয়টা নিয়ে কথা বলে ফ্রান্স। ২০১৬ সাল থেকে ফরাসিরা অস্ট্রেলিয়ার কাছে সাবমেরিন বিক্রির চেষ্টায় রয়েছে; যা এখন বাতিল হয়ে গেলো। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ ইভস লেড্রিয়ান এই ‘অকাস’ চুক্তিকে পিছন থেকে ছুরি মারার সাথে তুলনা করেন; এবং বলেন যে, এই চুক্তি সহযোগিতার চিন্তার বিরুদ্ধে। ফরাসিরা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ওয়াশিংটন এবং ক্যানবেরা থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠায় আলোচনা করার জন্যে। তবে লন্ডনে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূতকে অবশ্য ডেকে পাঠানো হয়নি।

‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ন্যাটো নতুন ‘অকাস’ চুক্তি সম্পর্কে একেবারেই চিন্তিত নয়। ন্যাটোর চিন্তায় চীন অনেক বড় কোন অংশ দখল না করলেও ইন্দোপ্যাসিফিকে চীনের আকাংক্ষাকে নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে ন্যাটোর সদস্যদের মাঝে বিরোধ নেই। তবে ফ্রান্স এবং ইইউএর প্রতিনিধিরা ব্যাপারটাকে ভালোভাবে দেখেনি। ফ্রান্স পছন্দ করছে না যে, প্যারিসকে না বলে এরকম একটা চুক্তি করা হলো। ফ্রান্স ছাড়াও ইইউএর পরররাষ্ট্রনীতি প্রধান জোসেফ বুরেল তার বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন যে, ‘অকাস’ চুক্তির ব্যাপারে তাকে কিছুই বলা হয়নি। তিনি বলছেন যে, এই চুক্তি নিয়ে হয়তো অনেক আগ থেকেই কথা হচ্ছিলো; কিন্তু তাকে এব্যাপারে কোন তথ্যই কেউ দেয়নি। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে চীনের সাথে সম্পর্ককে দেখতে চাইছে, ইইউ সেভাবে চীনের সাথে সম্পর্ককে স্থির করে ফেলতে চাইছে না। যদিও চীনের ব্যাপারে ইইউ মোটা দাগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথেই থাকছে, তথাপি চীনের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্ত অবস্থানে যেতে চাইছে না ইইউ।

 

ইন্দোপ্যাসিফিকে পারমাণবিক প্রযুক্তি

‘ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস, অস্টিন’এর নিরাপত্তা ম্যাগাজিন ‘ওয়ার অন দ্যা রক্স’এর এক অনলাইন বিতর্কে ‘অকাস’ চুক্তি সম্পর্কে মার্কিন চিন্তাবিদদের বিশ্লেষণের কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্ট্রাডিজ’এর মেলানি মারলো বলছেন যে, ফরাসিদের বিরক্ত হওয়াটা অবাক হবার মতো কিছু ছিল না। কারণ তারা একদিকে যেমন ইন্দোপ্যাসিফিকে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে, তেমনি অস্ট্রেলিয়াকে ১২টা ডিজেল সাবমেরিন বিক্রি করার ৬৬ বিলিয়ন ডলারের একটা কৌশলগত বাণিজ্যিক চুক্তিও তারা হারিয়েছে। ফ্রান্সের বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন এখন অস্ট্রেলিয়াকে কমপক্ষে ৮টা পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন সরবরাহ করবে। দীর্ঘমেয়াদী এই চুক্তির অংশ হিসেবে সাবমেরিনের সাথে ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ছাড়াও আঞ্চলিক নৌঘাঁটি ব্যবহার এবং ইন্দোপ্যাসিফিকে কৌশলগত শক্তি মোতায়েনের সমন্বয়নও থাকবে। সাবমেরিন ছাড়াও এই চুক্তিতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, সাইবার নিরাপত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, মনুষ্যবিহীন ড্রোন প্রযুক্তি, ইত্যাদিও থাকছে। ফরাসিরা মনে করছে যে, তাদের মার্কিন বন্ধুরা তাদেরকে পিছন থেকে ছুরি বসিয়েছে। তবে মেলানি মারলো অস্ট্রেলিয়ানদের কঠিন সিদ্ধান্ত নেবার সাহসিকতার প্রশংসা করে বলেন যে, অসিরা অবশেষে বুঝতে পেরেছে যে, ইন্দোপ্যাসিফিকে কৌশলগত অবস্থানকে শক্তিশালী করতে গেলে পারমাণবিক সাবমেরিন ছাড়া গত্যন্তর নেই। মারলো বলছেন যে, এই তিন দেশের মাঝে চুক্তি শুধু একটা চুক্তিই নয়। এর মাধ্যমে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, তাদের মাঝে চিন্তাগত দিক থেকে একাত্মতা কতটুকু। আগামী দুই, তিন বা পাঁচ দশকের কথা চিন্তা করলেও তাদের চিন্তার মাঝে সমন্বয় পাওয়া যাবে। তিন দেশের মাঝে শেয়ার করা কিছু অতি সংবেদনশীল প্রযুক্তি রয়েছে, যেগুলি হয়তো সকলের সাথে তারা শেয়ার করতে চাইবে না; তবে এই তিন দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আলাদা। এই দেশগুলি অতি গোপণীয় ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্কের সদস্য, যার মাধ্যমে তাদের মাঝে গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। ‘ফাইভ আইজ’এর বাকি সদস্য দেশগুলি হলো ব্রিটিশ কমনওয়েলথের অপরাপর সদস্য কানাডা এবং নিউজিল্যান্ড। এখানে শুধু সামরিক দিক থেকেই নয়, দেশগুলির জনগণের মাঝে, শিক্ষাবিদদের মাঝে এবং ব্যবসায়িক সংগঠনগুলির মাঝেও সম্পর্ক গভীর। মার্কিন বাইডেন প্রশাসন হয়তো ইন্দোপ্যাসিফিকে চীনকে নিয়ন্ত্রণে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ততটা শক্তভাবে বন্ধুদের উপর চাপ প্রয়োগ করতে চাইবে না; যতটা কৌশলগত, সামরিক বা ইন্টেলিজেন্সের দিক থেকে সহযোগিতা করবে। ইন্দোপ্যাসিফিকের দেশগুলির উপর চাপ সৃষ্টি না করে হলেও অন্ততঃ তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে রাখতে চাইবে।

‘আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইন্সটিটিউট’এর সিনিয়র ফেলো জ্যাক কুপার বলছেন যে, ফরাসিদেরকে নতুন চুক্তির ব্যাপারে আগে থেকেই হয়তো বলা উচিৎ ছিলো। ফরাসিরা যেভাবে ব্যাপারটা জেনেছে, তা তাদের বিরক্তির উদ্রেক করেছে। তবে বাস্তবতা হলো গত কয়েক বছর ধরেই অস্ট্রেলিয়ার সাথে সাবমেরিনের চুক্তি নিয়ে ফরাসিরা খুব ভালো অগ্রগতি দেখায়নি। তারা সকল ক্ষেত্রেই সময়ক্ষেপণ করেছে এবং খরচ বৃদ্ধি পাবার সাথেসাথে প্রকল্পের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছিলো। তবে কুপার এখানে মনে করিয়ে দিচ্ছেন পারমাণবিক প্রযুক্তির ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারটাকে। তিনি মনে করছেন যে, অস্ট্রেলিয়ার কাছে পারমাণবিক প্রযুক্তি যাওয়াটা বরং অত্র অঞ্চলে পারমাণবিক প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়াকে আটকাবে।

আরেক মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েনটিস্টস’এর সিনিয়র ফেলো এডাম মাউন্ট বলছেন যে, অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের কাছ থেকে পারমাণবিক প্রযুক্তি পেলে তার মূল ব্যবস্থাপনার জন্যে অস্ট্রেলিয়া সেই দু’টা দেশের প্রযুক্তির উপরেই নির্ভর করবে। অস্ট্রেলিয়া এক্ষেত্রে সাবমেরিনের পারমাণবিক জ্বালানিতে হাতও দেবে না। একইসাথে এই তিন দেশের মাঝে চুক্তি অন্যান্য দেশের জন্যে উদাহরণস্বরূপ হিসেবে দেখাতে হবে, যাতে করে কেউ নিয়ম বাঁকা করে এই প্রযুক্তিকে যথেচ্ছভাবে ছড়িয়ে দিতে না পারে। তবে এডাম মাউন্ট বলছেন যে, ‘লো এনরিচড ইউরেনিয়াম’ রিয়্যাক্টর ব্যবহারের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন হয়তো ফ্রান্সকেও সাথে রাখতে পারতো। কারণ ফ্রান্সও তার পারমাণবিক সাবমেরিনে ‘লো এনরিচড ইউরেনিয়াম’ ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু পারমাণবিক প্রযুক্তিকে ছড়িয়ে পড়া থেকে নিয়ন্ত্রণ করাটা খুব একটা সহজ নয়; যখন যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু দেশগুলির মাঝেই পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহার এবং পারমাণবিক অস্ত্র ডেভেলপ করার চিন্তা বিদ্যমান। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়াতে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন এবং পারমাণবিক অস্ত্র ডেভেলপ করার পক্ষে যথেষ্ট জনমত রয়েছে। কোরিয়ার পারমাণবিক আকাংক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করাটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে একটা চ্যালেঞ্জ। একইসাথে কোরিয়ার প্রতিবেশী জাপানেও প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক নেতারা পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনের দরকার নিয়ে বিতর্ক চালাচ্ছে। জ্যাক কুপার বলছেন যে, জাপানের প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনীতিবিদদের মাঝে একজন পারমাণবিক জ্বালানি এবং সাবমেরিনের বিরুদ্ধে রয়েছেন; তবে আশ্চর্য ব্যাপার হলো মাত্র কয়েক বছর আগেও এই ব্যাপারটার উপর জাপানে বিতর্ক সম্ভবই ছিল না। আর যখন দক্ষিণ কোরিয়ার আশেপাশে উত্তর কোরিয়া, চীন, রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র সকলের হাতেই পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, তখন দক্ষিণ কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্র ডেভেলপ করা থেকে বারন করাটা কঠিন।

জ্যাক কুপার মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, নতুন চুক্তি অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়া যে পারমাণবিক সাবমেরিন পাবে, তা এখনও অনেকটাই সময়সাপেক্ষ। কমপক্ষে দশ থেকে পনর বছর লেগে যাবে এসব সাবমেরিন অস্ট্রেলিয়ার হাতে পৌঁছানো শুরু হতে। তাহলে এই চুক্তির মূল দিকগুলি সাম্প্রতিক সময়ে অন্যান্য ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে; সাবমেরিনের ক্ষেত্রে নয়। অস্ট্রেলিয়া তার আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে তার ভৌগোলিক অবস্থান এবং দ্বীপাঞ্চলগুলিকে কাজে লাগাতে পারে। এক্ষেত্রে দূরপাল্লার বিমান এবং ক্ষেপণাস্ত্র অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অবস্থান নিলে তা অস্ট্রেলিয়ার আঞ্চলিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে।

মেলানি মারলো বলছেন যে বাইডেন প্রশাসন এখন পর্যন্ত তাদের কোন নীতিকেই মানুষের কাছে ঠিকমতো বিক্রি করতে পারেনি। ‘অকাস’ চুক্তি নিয়ে গোপনীয়তা এবং ফরাসিদের সাথে সমন্বয়হীনতা একই সমস্যার দিকেই ইঙ্গিত দেয়। এডাম মাউন্ট বলছেন যে, এই চুক্তি যেভাবে ফরাসিদের কাছ থেকে গোপন রাখা হয়েছিল, তা সত্যিই সমর্থনযোগ্য নয়। এই চুক্তি করতে গিয়ে বাকি সকল সমস্যাকে সমাধান না করে বরং এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

 

‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক


মূলতঃ অস্ট্রেলিয়ার ভৌগোলিক অবস্থানই এখন ইন্দোপ্যাসিফিকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অস্ট্রেলিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ করেছে। চীনকে নিয়ন্ত্রণের মার্কিন কৌশল বাস্তবায়ন করতে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ট্রেলিয়ার দিকে ফেরা ছাড়া গত্যন্তর নেই। অস্ট্রেলিয়ার মাটি থেকে ইন্দোপ্যাসিফিকের একটা বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলে অস্ট্রেলিয়ার এই ভৌগোলিক অবস্থানকেই কাজে লাগিয়েছে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’। এই সুযোগে অস্ট্রেলিয়া এমন কিছু প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পেতে চলেছে, যা অন্য কোন উপায়ে সম্ভব ছিল না। ‘অকাস’ চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটেন এবং অস্ট্রেলিয়া এখন অফিশিয়ালি চীনকে নিয়ন্ত্রণের মার্কিন কৌশলের অংশ হয়ে গেলো। এই কৌশল বাস্তবায়নের খরচ ছিল ফরাসিদের তথা ইইউএর সাথে সম্পর্কের অবণতি। তবে ব্রিটেন এবং তার ইংরেজি ভাষাভাষী কমনওয়েলথের সদস্যদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর চিন্তাগত একাত্মতা এতটাই শক্ত ভিতের উপর স্থাপিত, যা এই দেশগুলির সম্পর্ককে আরও কাছাকাছি নেবে। পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় ক্রমান্বয়ে প্রভাবশালী হওয়া ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ এখন ক্রমেই যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দোপ্যাসিফিক কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যাচ্ছে; যেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ফেরত আসার কোন পথ থাকছে না।