২৭শে অক্টোবর ২০২১
ব্রেক্সিটের পর ব্রিটিশ সরকার তাদের বৈশ্বিক কৌশল নির্ধারণ করার পর থেকে পুরো ব্রিটেন জুড়ে শুরু হয়েছে কর্মযজ্ঞ। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, পুরো ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী বর্তমানে গবেষণা প্রকল্পের মাঝে ডুবে গেছে। ছোট আকৃতির মনুষ্যবিহীন ড্রোন বিমান, মনুষ্যবিহীন গাড়ি বা পানির নিচের যান, ইত্যাদি এই গবেষণার মাঝে রয়েছে; যার কিছু রয়েছে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্যে; কিছু থাকবে অস্ত্রসজ্জিত। ২০২০এর নভেম্বরে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ অফিসার জেনারেল নিক কার্টার ‘স্কাই নিউজ’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, ২০৩০ সালের মাঝে তারা যে সামরিক বাহিনী তৈরি করতে চাইছেন, যেখানে বড় সংখ্যক স্বয়ংচালিত অথবা দূর নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেন যে, ১ লক্ষ ২০ হাজার সদস্যের সেনাবাহিনীর মাঝে ৩০ হাজারই হয়তো রোবোট হতে পারে। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটেন তার সামরিক বাহিনীর সদস্যসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে করতে হিমসিম খাচ্ছে। ৮২ হাজার সেনার টার্গেটের তুলনায় বর্তমানে সেনা রয়েছে ৭৪ হাজারেরও কম। এখন টার্গেটকে ৭৫ হাজারের নিচে নামিয়ে আনা হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে শূণ্যস্থানগুলির কিছু হয়তো পূরণ করা হতে পারে। তবে সেখানেও প্রশ্ন রয়েছে। কারণ অনেকেই এখনও মনে করছেন যে, রোবোট হয়তো মানুষ খুন করার সিদ্ধান্ত দিতে এবং নিজে খুন করতে পারে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে যে, রোবোটের হাতে গুলি করার সিদ্ধান্ত দেয়া হবে না। তথাপি ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী এখন উন্নততর প্রযুক্তির মালিক হতে দিনরাত কাজ করতে শুরু করেছে; যেন তাদের হাতে সময় খুব বেশি একটা নেই। প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশ সরকার লক্ষ্য স্থির করেছে যে, ২০৩০ সালের মাঝে তারা ব্রিটেনকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বৈশ্বিক ‘সুপারপাওয়ার’ দেখতে চায়।
হাইপারসনিক এবং লেজার অস্ত্র ডেভেলপ করছে ব্রিটেন
গত মার্চে ব্রিটিশ পত্রিকা ‘দ্যা টেলিগ্রাফ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ব্রিটিশ সরকার তাদের নতুন নীতিপত্রে নতুন ধরনের অস্ত্র ডেভেলপ করতে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার বাজেট রেখেছে; যার মাঝে থাকবে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং লেজার অস্ত্র। রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন যখন হাইপারসনিক অস্ত্র ডেভেলপে বেশ এগিয়ে গেছে, তখন ব্রিটেনই এখানে সর্বশেষ খেলোয়াড় হিসেবে যোগ হতে চলেছে। হাইপারসনিক অস্ত্র হলো শব্দের পাঁচ গুণ বা তার চাইতেও বেশি দ্রুত চলা অস্ত্র। সাধারণ ব্যালিস্টক ক্ষেপণাস্ত্র অনেক উঁচু দিয়ে আক্রমণ করে বিধায় তা আগে থেকে দেখা যায় এবং দূরে থাকা অবস্থাতেই আটকানো যায়। কিন্তু হাইপারসনিক অস্ত্র বায়ুমন্ডলের মাঝ দিয়েই বেশিরভাগ সময় চলে বলে এটাকে আটকানো খুবই কঠিন। এধরনের অস্ত্র বা এর ইঞ্জিন ডেভেলপ করা কঠিন হলেও আরও বড় সমস্যা হলো, এত দ্রুত চালিত হলে অতিরিক্ত তাপমাত্রায় ক্ষেপণাস্ত্রের রাসায়নিক উপাদানগুলি পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে। বাকিদের থেকে পিছিয়ে থাকলেও ব্রিটিশরা বলছে যে, তারা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা ‘এআই’ ব্যবহার করে এর ডেভেলপমেন্ট দ্রুত এগিয়ে নিতে পারবে।
গত ১৪ই সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ সরকার ১’শ মিলিয়ন ডলার বাজেটে তিনটা প্রকল্পের কাজে হাত দেয়। ‘ডিরেক্টেড এনার্জি ওয়েপন’ নামে আখ্যা দেয়া এই প্রকল্পগুলিকে সাধারণ মানুষ লেজার অস্ত্র বলেই চেনে। প্রকল্পগুলির দু’টা ব্যবহার করবে লেজার রশ্মি; বাকিটা ব্যবহার করবে ‘রেডিও ফ্রিকুয়েন্সি’। ‘ডিফেন্স নিউজ’ বলছে যে, ‘থালেস’ কোম্পানির নেতৃত্বে একটা কনসোর্টিয়াম একটা লেজার অস্ত্র তৈরি করে সেটা ব্রিটিশ রয়াল নেভির ‘টাইপ ২৩’ ফ্রিগেটের উপর পরীক্ষা করবে। ‘থালেস’এর নেতৃত্বে আরেকটা কনসোর্টিয়াম উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন রেডিও ফ্রিকুয়েন্সি ব্যবহার করে একটা অস্ত্র তৈরি করবে, যা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একটা ট্রাকের উপর বসানো হবে। তৃতীয় প্রকল্পটা ‘রেথিয়ন’ কোম্পানির নেতৃত্বে একটা কনসোর্টিয়ামকে দেয়া হয়েছে; যারা আরেকটা লেজার অস্ত্র ডেভেলপ করে একটা সাঁজোয়া যানের উপর বসাবে। এই অস্ত্রগুলির মূল লক্ষ্য হবে শত্রুর ড্রোন বিমানগুলিকে টার্গেট করে ধ্বংস করা। প্রকল্পের কাজ ২০২৩ থেকে ২০২৫এর মাঝে শেষ হবে।
ড্রোন, ড্রোন এবং আরও ড্রোন
তবে শত্রুর ড্রোন ভূপাতিত করাই নয়, নিজেদের ড্রোন ডেভেলপ করার পিছনেও মনোযোগ দিয়েছে ব্রিটেন। সামরিক ম্যাগাজিন ‘আর্মি টেকনলজি’ বলছে যে, ২০১৯এর মার্চ মাসে ব্রিটিশ ড্রোন ডেভেলপার কোম্পানি ‘ব্লু বেয়ার’ ৩ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলারের নতুন এক প্রকল্পের কাজ পায়; যার মাধ্যমে তারা ছোট ও মাঝারি আকৃতির ড্রোনের ঝাঁক ডেভেলপ করা শুরু করে। এর উদ্দেশ্য হলো এই ড্রোনগুলিকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে কাজে লাগানো; এবং একইসাথে শত্রুপক্ষের আকাশ ছেয়ে ফেলে সিদ্ধান্তহীনতার জন্ম দেয়া, যাতে তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কাকে ছেড়ে কাকে টার্গেট করবে, সেটা ঠিক করতে না পারে। ছোট ড্রোনগুলি একদিকে যেমন স্বপক্ষের মানুষের জীবনের প্রতি হুমকি কমাবে, তেমনি হেলিকপ্টার বা এরকম কোন বিমানের স্থলাভিষিক্ত হয়ে অনেক কম খরচে মিশন সম্পাদন করবে। ড্রোনগুলি যেহেতু অনেক কম শব্দ উৎপন্ন করে, তাই সেগুলি খালি চোখে আকাশে খুঁজে পাওয়াও অপেক্ষাকৃত কঠিন হবে। ২০১৮ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ‘আর্মি ওয়ারফাইটিং এক্সপিরিয়েন্স ২০১৮’ মহড়ায় এটা প্রমাণিত হয় যে, সেনারা ছোট আকারের ড্রোন ব্যবহার করে বনভূমি এলাকায় শত্রুর লুকিয়ে থাকা অসম্ভব করে ফেলতে পারে।
শুধু ছোট ড্রোনের ঝাঁকই নয়, ব্রিটিশ সরকার ২০২১এর জানুয়ারিতে ‘প্রজেক্ট মসকিটো’ নামে একটা ড্রোন প্রকল্প শুরু করে। ‘ডিফেন্স নিউজ’ বলছে যে, ৪১ মিলিয়ন ডলারের বাজেটের এই প্রকল্পে নেতৃত্ব দেবে ব্রিটিশ কোম্পানি ‘স্পিরিট এরোসিস্টেম’ এবং সাথে থাকবে ‘নর্থরোপ গ্রুমান’। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো ২০২৩ সালের মাঝে একটা ড্রোন ফাইটার বিমান ডেভেলপ করা, যা কিনা ‘লয়াল উইংম্যান’ কনসেপ্টকে এগিয়ে নেবে। এই কনসেপ্টের মাধ্যমে একটা মনুষ্যবিহীন ড্রোন ফাইটার একটা মনুষ্যচালিত ফাইটার বিমানের সাথে একত্রে কাজ করবে এবং একে অপরের কাজকে সহায়তা করবে। ব্রিটিশ রয়াল এয়ার ফোর্সের প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মাইক উইগস্টন বলছেন যে, ব্রিটিশরা এক যুগান্তকারী দিকনির্দেশনা নিয়ে এগুচ্ছে, যার মাধ্যমে ড্রোনের ঝাঁক, ‘মসকিটো’র মতো মনুষ্যবিহীন ড্রোন ফাইটার, ভবিষ্যতের মনুষ্যচালিত ফাইটার ‘টেমপেস্ট’ মিলে যুদ্ধক্ষেত্রের হিসেবকেই পরিবর্তিত করে ফেলবে।
গোয়েন্দা স্যাটেলাইটের জগতে পা রাখছে ব্রিটেন
শুধু ড্রোন থেকেই নয়; ব্রিটিশরা চাইছে মহাকাশ থেকেও নিজেদের গোয়েন্দাগিরি বৃদ্ধি করতে। এতকাল মহাকাশের ইন্টেলিজেন্সের জন্যে ব্রিটিশরা প্রায় পুরোপুরিভাবে মার্কিনীদের উপরেই নির্ভরশীল ছিল। একটা স্যাটেলাইট ডেভেলপ করে সেটাকে মহাকাশে প্রেরণ করার বাজেট ব্রিটিশ অর্থনীতির জন্যে কঠিন ব্যাপার ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রযুক্তির অগ্রগামিতার কারণে ব্রিটিশদের সামনে এক নতুন দুয়ার খুলে গেছে। ব্রিটিশ বিলিয়নায়ার ব্যবসায়ী রিচার্ড ব্র্যানসন ২০২১এর জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া থেকে একটা ‘বোয়িং ৭৪৭’ বিমান ব্যবহার করে স্যাটেলাইটসহ একটা রকেট মহাকাশে প্রেরণ করেন। তার কোম্পানি ‘ভার্জিন অরবিট’ বিমানটাকে পরিবর্তিত করে একটা হাল্কা রকেট বহনের উপযোগী করে। ভূমি থেকে উৎক্ষেপিত না হবার কারণে রকেটটা অনেক ছোট। প্রযুক্তিগত কারণে এখন অনেক ছোট স্যাটেলাইট তৈরি সম্ভব হচ্ছে বিধায় এই ছোট রকেট দিয়েই স্যাটেলাইট মহাকাশে প্রেরণ করা যাচ্ছে। ‘বিবিসি’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০২০ সালের মে মাসে আরও একবার চেষ্টা করে বিফল হয়েছিল ‘ভার্জিন’। বিমানের নিচে বহণযোগ্য এই রকেটগুলি ব্যবহার করে ব্রিটিশরা সামরিক ইন্টেলিজেন্স স্যাটেলাইট মহাকাশে প্রেরণ করতে চাইছে। এই স্যাটেলাইটগুলি ছোট আকারের এবং ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি থেকে ভূমির হাই রেজোলিউশন ছবি তুলতে পারবে। ব্রিটেন এধরনের স্যাটেলাইট ডেভেলপ করে বন্ধু দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীলতা কমাতে চাইছে। গত মে মাসে ‘ভার্জিন অরবিট’ ঘোষণা দেয় যে, তারা ব্রিটেনের কর্নওয়াল থেকে তাদের মহাকাশ অপারেশন শুরু করার জন্যে কাজ শুরু করেছে। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ইউরোপের মাটি থেকে মহাকাশে স্যাটেলাইট প্রেরণ করা হবে। এভাবে রিচার্ড ব্র্যানসনের বাণিজ্যিক প্রকল্পকে ব্রিটিশরা সামরিক ইন্টেলিজেন্স প্রযুক্তি এগিয়ে নিতে ব্যবহার করবে। ব্রিটিশ সরকার স্কটল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলে আরেকটা ‘স্পেসপোর্ট’ ডেভেলপ করার পরিকল্পনাতেও হাত দিয়েছে, যেখানে ভূমি থেকে রকেট উতক্ষেপণ করা যাবে।
প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘সিফোরআইএসআরনেট’এর সাথে এক সাক্ষাতে ব্রিটিশ রয়াল এয়ার ফোর্সের প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মাইক উইগস্টন বলছেন যে, ব্রিটিশ সরকার চাইছে ‘লো আর্থ অরবিট’এ স্থাপনের যোগ্য ছোট স্যাটেলাইট; যেগুলি কি বহণ করবে বা মহাকাশে কোথায় স্থাপিত হবে বা কি লক্ষ্য বাস্তবায়ন করবে, তা ব্রিটিশরা নিজেরাই ঠিক করতে পারবে। একইসাথে তারা অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মাঝেই এই স্যাটেলাইটগুলি মহাকাশে প্রেরণ করতে পারবে। এর মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোন স্থানে কোন পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্রিটিশ সরকার নিজস্ব ইন্টেলিজেন্স স্যাটেলাইট ব্যবহার করতে সক্ষম হবে। ব্রিটিশরা তাদের নিজস্ব স্পেস কমান্ড তৈরি করে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে স্যাটেলাইট নিয়ে কাজ করা জনগণকে একত্রে আনার ব্যবস্থা করেছে। এরা মূলতঃ যুক্তরাষ্ট্রের সাথেই কাজ করছিল এবং এদের স্যাটেলাইটের ব্যাপারে প্রচুর অভিজ্ঞতা রয়েছে। মহাকাশে ব্রিটেনের বিনিয়োগের বেশিরভাগটাই বেসরকারি খাতে হবে; সরকার এক্ষেত্রে সহায়তা দেবে মাত্র। সামরিক বাহিনী মহাকাশে ব্রিটেনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলির নিরাপত্তা দেবে।
এবছরের জুলাই মাসে ব্রিটিশ সরকার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিকে এগিয়ে নিতে নতুন এক প্রকল্প শুরু করে। ব্রিটেনের সামরিক গবেষণা সংস্থা ‘ডিফেন্স সায়েন্স টেকনলজি ল্যাবরেটরি’ বা ‘ডিএসটিএল’ প্রায় ৪ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলারে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। এর মাধ্যমে আকাশে উড়ন্ত অবস্থায় একটা ক্ষেপণাস্ত্র আরেকটা ক্ষেপণাস্ত্রের সাথে যোগাযোগ করতে পারবে। ব্রিটিশ সরকার বলছে যে, এতে ক্ষেপণাস্ত্রগুলি তাদের টার্গেটের গুরুত্ব অনুসারে কর্ম সম্পাদন করতে সক্ষম হবে। বর্তমানে ব্রিটিশ ক্ষেপণাস্ত্রগুলি শুধুমাত্র যেখান থেকে ছোঁড়া হয়েছে, যেমন বহণকারী যুদ্ধবিমানের সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম। ‘কোঅপারেটিভ স্ট্রাইক ওয়েপন্স টেকনলজি ডেমোনস্ট্রেটর’ নামে আগামী দুই বছর ধরে এই প্রকল্প চলবে।
সমুদ্রে প্রযুক্তি ডেভেলপ করছে রয়াল নেভি
ব্রিটিশ রয়াল নেভি গত মার্চ মাসে মনুষ্যবিহীন প্যাট্রোল বোট ‘ম্যাডফক্স’এর ডেলিভারি পেয়েছে। রয়াল নেভির প্রযুক্তিগত গবেষণা সংস্থা ‘নেভিএক্স’এর অধীনে পরিচালিত হওয়া এই প্রকল্পে ‘এল থ্রি হ্যারিস’ কোম্পানির ‘মাস্ট ১৩’ বোটকে ব্যবহার করে ১৮ মাস ধরে পরীক্ষা করা হয়। এবছরের শেষে ব্রিটিশ নৌবাহিনী আরেকটা মনুষ্যবিহীন বোটের ডেলিভারি পাবে। ‘নেভাল টেকনলজি’ ম্যাগাজিন বলছে যে, এই বোটগুলি নৌবাহিনী ছাড়াও রয়াল ম্যারিনের সদস্যরা ব্যবহার করবে। ‘নেভিএক্স’এর প্রধান কমান্ডার এন্টনি ক্র্যাব বলছেন যে, পরীক্ষামূলক এই কর্মকান্ডগুলি বলে দেবে যে, সামনের দিনগুলিতে রয়াল নেভির ‘টাইপ ২৬’ এবং ‘টাইপ ৩১’ ফ্রিগেটের উপর এধরণের প্রযুক্তিগুলি কিভাবে মোতায়েন হবে।
এছাড়াও রয়াল নেভি ২০১৯ সালে ব্রিটিশ বাণিজ্যিক সেক্টরের সাথে পার্টনারশিপের মাধ্যমে প্রযুক্তি ডেভেলপ করার কাজে হাত দিয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ‘ইউকে ডিফেন্স সলিউশন্স সেন্টার’ বা ‘ইউকেডিএসসি’ এই প্রকল্পে বেসামরিক সংস্থা ‘সাবসী ইউকে’ এবং ‘ন্যাশনাল সাবসী রিসার্চ ইন্সটিটিউট’এর সাথে এই কাজ বাস্তবায়ন করছে। ‘বিবিসি’ বলছে যে, এর মাধ্যমে বেসামরিক এবং সামরিক গবেষকেরা সমুদ্রের নিচে কাজ করার প্রযুক্তিগত উতকর্ষতা নিয়ে কাজ করবে। এই প্রযুক্তির মাঝে থাকবে রোবোটিক্স, মনুষ্যবিহীণ যন্ত্রপাতি এবং ডিজিটাল যোগাযোগ। এতে বেসামরিক এবং সামরিক গবেষকেরা একে অপরের কাছ থেকে শিখবে। ‘ইউকেডিএসসি’এর ওয়েবসাইট বলছে যে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে পানির নিচে বিভিন্ন সেন্সর ব্যবহার এবং সেগুলি থেকে ডাটা সংগ্রহ ও স্টোর করা ছাড়াও সেই ডাটা যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য করা হবে। তাছাড়া পানির নিচে অপারেশন চালনা করার অভিজ্ঞতাও এই প্রকল্পের মাধ্যমে শেয়ার করা সম্ভব হবে। ‘সাবসী ইউকে’ হলো ব্রিটেনের সমুদ্রের নিচে প্রযুক্তি ডেভেলপ করার সর্বোন্নত সংস্থা। এরা মূলতঃ তেল গ্যাস আহরণের কাজে সহায়তা দিলেও সাম্প্রতিক সময়ে সমুদ্রের মাঝে বায়ু বিদ্যুৎ উতপাদন এবং সেগুলির ব্যবস্থাপনা তাদের একটা বড় কাজ হয়ে গেছে।
সারা বিশ্বের সেরা মেধা ব্যবহার করে নেতৃত্ব দিতে চাইছে ব্রিটেন
ব্রিটেনের প্রযুক্তি ডেভেলপ করার একেবারে মূলে রয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা ‘এআই’। ব্রিটেন ‘এআই’এর উপর নির্ভর করেই প্রযুক্তির শিখরে পৌঁছাতে চাইছে। মার্কিন বা চীনা বাজেটের তুলনায় ব্রিটেনের প্রযুক্তি বাজেট কিছুই নয়। ব্রিটেন তার বর্তমান সামরিক বাহিনীকে আকারে ছোট করে অর্থ বাঁচাচ্ছে; আর সেই অর্থ বিনিয়োগ করছে নতুন প্রযুক্তি ডেভেলপ করতে। কিছু ক্ষেত্রে, যেমন হাইপারসনিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে ব্রিটেন পিছিয়ে আছে। এই দুর্বলতাগুলিকে ব্রিটেন জয় করতে চাইছে ‘এআই’ প্রযুক্তির মাধ্যমে। ড্রোনের ঝাঁক, ফাইটার ড্রোন, গোয়েন্দা স্যাটেলাইট, লেজার অস্ত্র, কথা বলা ক্ষেপণাস্ত্র, মনুষ্যবিহীন বোট বা সাবমেরিন, ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই ব্রিটেন ‘এআই’এর সর্বোত্তম ব্যবহার করতে চাইছে। কিন্তু ‘এআই’ ডেভেলপ করতে গিয়ে ব্রিটেনের যে জিনিসটা প্রথমেই দরকার তা হলো মেধা।
ব্রিটিশ সরকারের ওয়েবসাইট বলছে যে, সারা বিশ্ব থেকে মেধা আকর্ষণ করে ব্রিটেন ‘এআই মাস্টার্স’এর প্রফেশনাল তৈরি করতে চাইছে। ব্রিটেনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে বিশেষ ‘সেন্টার’ তৈরি করে তারা পরবর্তী জেনারেশনের ‘এআই পিএইচডি’ তৈরি করবে। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা হয় ‘এলান টুরিং ইন্সটিটিউট’এর ‘এআই’ রিসার্স ফেলোশিপ; যা এখন এখন সকলের জন্যে উন্মুক্ত করা হয়েছে। ব্রিটেনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে কমপক্ষে ২’শ ‘এআই’ মাস্টার্স ছাত্রকে নিজস্ব অর্থে পড়াচ্ছে ‘ডিপ মাইন্ড’, ‘কোয়ান্টাম ব্ল্যাক’, ‘সিসকো’ এবং ‘ব্রিটিশ এরোস্পেস সিস্টেমস’এর মতো কোম্পানিগুলি। ১৬টা ‘ইউকে রিসার্চ এন্ড ইনোভেশন এআই সেন্টার্স ফর ডকটরাল ট্রেনিং’এ ১ হাজার ছাত্রকে পড়ার সুবিধা দেয়া হচ্ছে। ব্রিটিশ সরকারের এই প্রকল্পগুলি বলে দিচ্ছে যে, সামরিক প্রযুক্তিতে আগামী এক দশকে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার যে টার্গেট নিয়ে এগুচ্ছে ব্রিটিশ সরকার, তার ভিত্তি মূলতঃ ব্রিটেনের শিক্ষা সেক্টরে। শিক্ষা সেক্টরে ব্রিটেনের প্রধান ফোকাস হলো ‘এআই’, যা ডেভেলপ করতে গেলে ব্রিটিনের নিজস্ব মেধা যথেষ্ট নয়; বরং সারা বিশ্বের সেরা মেধাগুলিকে ব্রিটিশ পতাকাতলে আনতে হবে। ব্রেক্সিট পরবর্তী ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সর্বদাই ব্রিটেনের নিজস্ব সম্পদকে ছাপিয়ে গেছে। তবে অন্যান্য রাষ্ট্র এবং অঞ্চলের সম্পদ ও মেধা ব্রিটেন নিজস্ব জাতীয় স্বার্থে কতটা ব্যবহার করতে পারবে, তা নির্ভর করছে পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় ব্রিটেনের আদর্শিক নেতৃত্ব নিতে পারার সক্ষমতার উপর। কিন্তু যেখানে পশ্চিমা আদর্শই মারাত্মক সমস্যায় জর্জরিত রয়েছে, সেখানে সেই আদর্শিক সমস্যার বেড়াজাল পেরিয়ে অন্যের সম্পদ ব্যবহার করে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ তার বৈশ্বিক আকাংক্ষা বাস্তবায়নে কতটা সফলতা পাবে, তা প্রশ্ন করা যেতেই পারে।
Wednesday, 27 October 2021
ব্রিটেন কেন সামরিক প্রযুক্তি যোগাড়ে উঠেপড়ে লেগেছে?
Labels:
Artificial Intelligence,
China,
Directed Energy Weapon,
Drone Warfare,
Geopolitics,
Global Britain,
hypersonic weapon,
Laser Weapon,
Loyal Wingman,
Military,
New World Order,
Technology,
unmanned vehicle,
USA
Saturday, 23 October 2021
তুরস্ক কি আফ্রিকাতে সামরিক শক্তি হিসেবে রূপ নিচ্ছে?
২৩শে অক্টোবর ২০২১
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান পশ্চিম আফ্রিকার তিন দেশ এঙ্গোলা, টোগো এবং নাইজেরিয়া ঘুরে এসেছেন। এর মাধ্যমে ৩০টা দেশ ভ্রমণ করে তিনি আফ্রিকায় সবচাইতে বেশি দেশ ভ্রমণকারী রাষ্ট্রনায়ক হলেন। নাইজেরিয়া এবং এঙ্গোলার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদে তুর্কি বিনিয়োগ এবং দেশগুলির সাথে বাণিজ্য বৃদ্ধির খবরগুলিই মিডিয়াতে এসেছে বেশি। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, আফ্রিকাতে তুরস্কের বাণিজ্য বৃদ্ধি পেলেও তা এখনও ইউরোপের সাথে বাণিজ্যের তুলনায় কিছুই নয়। তবে আফ্রিকায় তুরস্কের কর্মকান্ড বৃদ্ধির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয়; রয়েছে অন্য কোথাও। মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’এর ‘জি জিরো মিডিয়া’র এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, তুরস্ক আফ্রিকাতে বড় শক্তিগুলির সাথে সরাসরি প্রতিযোগিতা না করে নিজেদের জন্যে কিছু জায়গা বের করে নিয়েছে; যেখানে তারা বেশ সাফল্য পাচ্ছে। তুরস্কের সবচাইতে বড় সুবিধা হলো, তারা ফ্রান্স, ব্রিটেন বা বেলজিয়ামের মতো উপনিবেশিক শক্তি নয়; এমনকি বর্তমান যুগের বড় শক্তিগুলির একটাও তারা নয়। একইসাথে তুরস্ক নিজেদেরকে যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের মতো আগ্রাসী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে না।
আফ্রিকায় তুরস্কের মূল লক্ষ্য কি ড্রোন বিক্রি?
‘মিডলইস্ট আই’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, তুর্কি প্রেসিডেন্টের আফ্রিকায় তিন দেশ সফরের ঘটনা তুর্কি মিডিয়াতে খুব কমই এসেছে। বরং পত্রিকাগুলি সরকারি প্রেসনোটকেই মূলতঃ হাইলাইট করেছে; যার মাঝে মূল বক্তব্য ছিল আফ্রিকায় তুরস্কের মানবকল্যাণমূলক কর্মকান্ড এবং উপনিবেশিকতা বিমুখ দিকনির্দেশনা। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, গত দুই দশকে আফ্রিকাতে তুরস্ক তার কূটনৈতিক মিশনের সংখ্যা ১২ থেকে ৪৩শে উন্নীত করা হয়েছে; বাণিজ্য ৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে; বিনিয়োগ ১’শ মিলিয়ন ডলার থেকে সাড়ে ৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে; ৬ হাজার আফ্রিকান ছাত্র তুরস্কের বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপে পড়ছে। ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’ আফ্রিকার ৩৯টা দেশের ৬০টা গন্তব্যে যাচ্ছে; যার মাধ্যমে আফ্রিকা এবং বাকি বিশ্বের মাঝে হাব হয়ে যাচ্ছে ইস্তাম্বুল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আফ্রিকার কিছু অংশে সামরিক হস্তক্ষেপ এবং বিভিন্ন দেশে তুর্কিদের তৈরি মনুষ্যবিহীন ড্রোনের বাজার তৈরি হওয়ায় বিশ্লেষকেরা প্রশ্ন করছেন যে, আফ্রিকায় তুরস্ক তার কৌশল পরিবর্তন করে আঞ্চলিক খেলা পরিবর্তন করার মতো অবস্থানে যাবার চেষ্টা করছে কিনা। জার্মানির ‘ইউনিভার্সিটি অব বেইরিউথ’এর গবেষক ইব্রাহিম বাকির আব্দুলাই মনে করছেন যে, সোমালিয়া, লিবিয়া এবং পশ্চিম আফ্রিকায় তুরস্কের ভূমিকা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, তুরস্ক আফ্রিকা জুড়েই তার প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে।
সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কের তৈরি ড্রোন সিরিয়া, লিবিয়া এবং আজেরবাইজানে ব্যাপক সাফল্য পাবার পর তুর্কিরা প্রচুর ড্রোনের অর্ডার পেতে শুরু করেছে। ইউক্রেন এবং পোল্যান্ডের কাছে তুর্কি ড্রোন বিক্রয়ের খবর এসেছে। মধ্য এশিয়ার তুর্কমেনিস্তান প্যারেডে তুর্কি ড্রোন দেখিয়েছে; কিরগিজস্তানও একই ড্রোন অর্ডার করেছে বলছে। এমনকি ব্রিটিশরাও এতে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়াতে তুর্কি ড্রোন বিক্রি হয়েছে, যদিও এই মুহুর্তে তিউনিসিয়ার ক্ষমতা নেয়া প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদের সাথে তুরস্কের সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। মরক্কোতেও তুরস্কের ড্রোন বিক্রি হয়েছে; যেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল পশ্চিম সাহারা নিয়ে মরক্কো এবং আলজেরিয়ার মাঝে ব্যাপক বিরোধ রয়েছে। তুরস্ক দুই দেশের সাথেই সম্পর্ক রেখে চলেছে। ‘আফ্রিকান ইন্টেলিজেন্স’ খবর দিচ্ছে যে, মোজাম্বিকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত রুয়ান্ডার সেনবাহিনী তুর্কি ড্রোন কেনার চিন্তা করছে। কিছুকাল আগ পর্যন্তও তুর্কিরা রুয়ান্ডায় কিছু বড় অবকাঠামো প্রকল্পে কাজ করছিল; এখন সেখানে প্রতিরক্ষাও যোগ হলো। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, অফিশিয়ালি ঘোষণা না আসলেও ইথিওপিয়াও তুরস্কের কাছ থেকে ড্রোন কেনার ব্যাপারে একমত হয়েছে। ইথিওপিয়া বর্তমানে বিচ্ছিন্নতাবাদী তিগ্রে অঞ্চলের সাথে প্রায় এক বছর ধরে ভয়াবহ যুদ্ধে জড়িয়ে আছে। ইথিওপিয়াতে তুরস্কের বড় রকমের বিনিয়োগ রয়েছে টেক্সটাইল সেক্টরে। দেশটার বড় বড় অবকাঠামোর কাজও তুর্কিরা করছে। নাইজেরিয়াও তার উত্তরাঞ্চলে বোকো হারামের সাথে যুদ্ধে তুর্কি ড্রোন ব্যবহার করতে চাইছে। এঙ্গোলাও তুর্কি ড্রোনের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে।
আঙ্কারার ‘ফরেন পলিসি সেন্টার’এর ফেলো এমরে চালিসকান বলছেন যে, তুরস্ক মূলতঃ মাঝারি আকৃতির ব্যবসাগুলিতে বিনিয়োগ করেছে; বড় আকারের ব্যবসায় নয়। অর্থাৎ আফ্রিকার সাথে তুরস্কের ব্যবসার প্রসার আসলে খুব বড় কিছু নয়। তবে প্রতিরক্ষা খাতে বিক্রির ব্যাপারগুলি আলাদা; কারণ এর মাঝে থাকে অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তির আদানপ্রদান এবং গভীরতর সহযোগিতা। অনেকেই প্রশ্ন করছেন যে, তুরস্ক কি আফ্রিকাতে ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা রাশিয়ার প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করছে কিনা। তারা বলছেন যে, লিবিয়াতে এবং আজেরবাইজানে তুর্কি ড্রোন যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পেরেছিল। লিবিয়ার যুদ্ধে পরিবর্তন আনার পরপরই তুরস্ক আফ্রিকাতে শুধুমাত্র মানবিক সহায়তা প্রদানকারী থেকে সামরিক শক্তিতে পরিণত হতে শুরু করে। চালিসকান বলছেন যে, লিবিয়াকে কেন্দ্র করেই আশেপাশের দেশগুলিতে তুরস্ক সামরিক শক্তি হতে চাইছে। তবে লিবিয়ার বাইরে সামরিক ঘাঁটি রাখার মতো অর্থনৈতিক সক্ষমতা তুরস্কের নেই। অপরদিকে চীনারা অস্ত্রও বিক্রি করছে; আবার বিশাল আকারের ঋণও দিচ্ছে।
ইস্তাম্বুলের ‘ইয়েদিতেপে ইউনিভার্সিটি’র এসিসট্যান্ট প্রফেসর ভোলকান ইপেক বলছেন যে, তুরস্কের আফ্রিকায় যাওয়া দেখিয়ে দেয় যে, তারা তাদের আশেপাশের দেশের মাঝে আর কূটনৈতিক কর্মকান্ডকে সীমাবদ্ধ করে রাখতে চাইছে না। এক্ষেত্রে ইউরোপিয় শক্তিদের তুলনায় তুরস্ক এগিয়ে আছে; কারণ তুরস্কের কোন ঔপনিবেশিক ইতিহাস নেই।
তুরস্ক আফ্রিকাতে কার সাথে প্রতিযোগিতা করছে?
‘জি জিরো মিডিয়া’ বলছে যে, আফ্রিকাতে তুরস্কের কর্মকান্ড যার জন্যে সবচাইতে বেশি হুমকির সৃষ্টি করেছে, সে হলো ফ্রান্স। পশ্চিম আফ্রিকায় তুরস্কের অবস্থানের ব্যাপারে সবচাইতে বিরক্ত ফ্রান্স। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ সরাসরিই বলেছেন যে, তুরস্ক আফ্রিকাতে ফরাসিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। ফরাসি মিডিয়াতে এরদোগানের আফ্রিকা সফরে সাধারণ বাণিজ্যের তুলনায় ড্রোন বাণিজ্যকেই বেশি হাইলাইট করা হয়েছে। ‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’এর এক প্রতিবেদনে আফ্রিকাতে তুরস্কের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড নিয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছে; কারণ তুর্কি মুদ্রা লিরা এখন যথেষ্টই দুর্বল; মুদ্রাস্ফীতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে; দেশটার ব্যাংকিং সেক্টরের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এমতাবস্থায় ডিসেম্বর মাসে ইস্তাম্বুলে তুরস্ক আফ্রিকা শীর্ষ বৈঠককে কতটুকু স্বার্থক করা সম্ভব? ইতালির ‘ইউনিভার্সিটি অব জেনোয়া’র ফেডেরিকো ডনেলি বলছেন যে, প্রতিবারই আফ্রিকার সাথে তুরস্কের শীর্ষ বৈঠক তুর্কিদের নতুন নীতিকে সামনে নিয়ে এসেছে। এখন নতুন যে দিকটাকে তুর্কিরা গুরুত্ব দিচ্ছে, তা হলো নিরাপত্তা। ড্রোন বিক্রির মাধ্যমে তুর্কিরা আফ্রিকার দেশগুলির সাথে একরকমের দরকষাকষিতে যেতে পারছে; কারণ পশ্চিমাদের ড্রোনগুলির চাইতে কমদামি হলেও তুর্কি ড্রোনগুলির কর্মক্ষমতা যথেষ্ট। আফ্রিকার দেশগুলির নিরাপত্তার জন্যে এই ড্রোনগুলি বড় সুবিধা দিচ্ছে।
ইস্তাম্বুলের সাংবাদিক বারসিন ইনান্স বলছেন যে, এরদোগানের আফ্রিকা সফর তুরস্কের চাইতে ইউরোপেই বেশি আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। ইউরোপিয় মিডিয়াতে এব্যাপারে যত বিতর্ক হচ্ছে, তা তুরস্কে প্রায় কখনোই দেখা যায় না। তুরস্কের আফ্রিকা নীতিতে পরিবর্তন এরদোগানের আগেই শুরু হলেও সকলে এব্যাপারে এরদোগানকেই ক্রেডিট দিচ্ছেন। তুরস্কের জ্বালানি উৎসকে আরও শক্ত ভিত দিতে তুরস্ক নাইজেরিয়া থেকে এলএনজি আমদানিতে গুরুত্ব দিতে চাইছে। এই ব্যাপারটা যতটা না হাইলাইট হয়েছে, তার চাইতে ড্রোন বিক্রি নিয়েই কথা হচ্ছে বেশি। নাইজেরিয়ার ডেভেলপমেন্ট কনসালট্যান্ট নাজিম আনিমাশাউন মনে করেননা যে তুরস্ক আফ্রিকাতে কাউকে প্রতিস্থাপিত করতে চাইছে। তিনি বলছেন যে, তুরস্ক তার নিজের জন্যে একটা আলাদা স্থান করে নিতে চাইছে। আরও শক্তিশালী কূটনীতির দিকে যেতে চাইছে তুরস্ক; যেখানে আফ্রিকার দেশগুলি তুরস্কের সাথে পার্টনারিশিপে নিজেরাও লাভবান হবে। উদাহরণস্বরূপ, নাইজেরিয়া চাইছে তার এলএনজির জন্যে বাজার খুঁজতে; যেখানে তুরস্ক এগিয়ে এসেছে নাইজেরিয়ার গ্যাস অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করতে। যখন পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলি নিজেদের কর্মকান্ড কমিয়ে ফেলতে চাইছে, তুরস্ক ঠিক সেখানেই নিজেদের জায়গা করে নিতে চাইছে। তুর্কি সাংবাদিক বারসিন ইনান্স বলছেন যে, ইস্তাম্বুলে আসন্ন আফ্রিকা শীর্ষ বৈঠক খুব সহজেই অন্যান্য ইস্যুর নিচে পড়ে যেতে পারে। কারণ তুরস্কের আশেপাশে সিরিয়া, রাশিয়া, ইরাক, ইরান, গ্রিসসহ আরও অনেক ইস্যু রয়েছে; যেগুলি যেকোন সময় সামনে চলে আসতে পারে এবং সেই ইস্যুগুলিকেই মিডিয়া আফ্রিকার চাইতে বেশি গুরুত্ব দিতে পারে। এমনকি তুরস্কে বড় কোন ইস্যু তৈরি না হলেও হয়তো আফ্রিকা শীর্ষ বৈঠক তুর্কি মিডিয়াতে অতবড় হেডলাইন হবে না। তুরস্কের আফ্রিকা নীতি সরকারের কাছে যতটা না গুরুত্বপূর্ণ, সাধারণ জনগণের কাছে ততটা নয়। তবে তুর্কি ব্যবসায়ীরা আফ্রিকার ব্যাপারে যথেষ্টই আগ্রহী। তুর্কি চিন্তাবিদদের মাঝেও খুব কম সংখ্যক আফ্রিকা নিয়ে কথা বলছেন।
তুর্কিরা তাদের উসমানি খিলাফতের ইতিহাসের স্বপ্নে বিভোর। তাই উসমানি সময়ে তুর্কিদের প্রভাবের মাঝে থাকা এলাকাগুলিকেই তুরস্ক টার্গেট করছে। এরদোগানও তুর্কি জনগণের এই আবেগকে কাজে লাগাতে চাইছেন। তবে আফ্রিকা এখনও তুর্কিদের চিন্তায় বেশ ছোট। আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় তুরস্ক এখন সর্বদাই সিরিয়া, রাশিয়া, ককেশাস, ইরাক, ইরান, গ্রিস, ইত্যাদি ইস্যু নিয়ে জর্জরিত; যা কিনা তুর্কি মিডিয়াকে আফ্রিকার ব্যাপারে অনাগ্রহী রেখেছে। এর মাঝে তুরস্কের অর্থনীতি চলছে ধুঁকে ধুঁকে। তুর্কি লিরার ব্যাপক দরপতন এবং মারত্মক মূল্যস্ফীতিই জনগণকে ব্যতিব্যস্ত রাখার জন্যে যথেষ্ট; যা কিনা সামনের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হবে। এমতাবস্থায় এরদোগানের কাছে তুর্কি জনগণের আবেগকে জাগিয়ে রাখাটাই ক্ষমতায় টিকে থাকার ফাউন্ডেশন। তবে তুর্কি জনগণের আবেগকে ব্যবহার করতে গিয়ে তুরস্ক তার নীতিকে যতটা বহির্মুখী করবে, ততই আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক শক্তিদের সাথে প্রতিযোগিতার মাঝে পড়বে। আফ্রিকা তুরস্কের জন্যে নতুন যুদ্ধক্ষেত্র। এখানে বড় শক্তিদের সাথে প্রতিযোগিতায় তুরস্ক নিজেদের জন্যে আলাদা জায়গা করে নিতে চাইছে। তুরস্কের ড্রোনগুলি এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এতে ফ্রান্সের দুশ্চিন্তাই হবে সবচাইতে বেশি; কারণ ঔপনিবেশিক শক্তিদের মাঝে দুর্বল হয়ে পড়া ফ্রান্সেরই প্রভাব হারাবার ভয়ে থাকবে সবচাইতে বেশি।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান পশ্চিম আফ্রিকার তিন দেশ এঙ্গোলা, টোগো এবং নাইজেরিয়া ঘুরে এসেছেন। এর মাধ্যমে ৩০টা দেশ ভ্রমণ করে তিনি আফ্রিকায় সবচাইতে বেশি দেশ ভ্রমণকারী রাষ্ট্রনায়ক হলেন। নাইজেরিয়া এবং এঙ্গোলার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদে তুর্কি বিনিয়োগ এবং দেশগুলির সাথে বাণিজ্য বৃদ্ধির খবরগুলিই মিডিয়াতে এসেছে বেশি। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, আফ্রিকাতে তুরস্কের বাণিজ্য বৃদ্ধি পেলেও তা এখনও ইউরোপের সাথে বাণিজ্যের তুলনায় কিছুই নয়। তবে আফ্রিকায় তুরস্কের কর্মকান্ড বৃদ্ধির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয়; রয়েছে অন্য কোথাও। মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’এর ‘জি জিরো মিডিয়া’র এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, তুরস্ক আফ্রিকাতে বড় শক্তিগুলির সাথে সরাসরি প্রতিযোগিতা না করে নিজেদের জন্যে কিছু জায়গা বের করে নিয়েছে; যেখানে তারা বেশ সাফল্য পাচ্ছে। তুরস্কের সবচাইতে বড় সুবিধা হলো, তারা ফ্রান্স, ব্রিটেন বা বেলজিয়ামের মতো উপনিবেশিক শক্তি নয়; এমনকি বর্তমান যুগের বড় শক্তিগুলির একটাও তারা নয়। একইসাথে তুরস্ক নিজেদেরকে যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের মতো আগ্রাসী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে না।
আফ্রিকায় তুরস্কের মূল লক্ষ্য কি ড্রোন বিক্রি?
‘মিডলইস্ট আই’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, তুর্কি প্রেসিডেন্টের আফ্রিকায় তিন দেশ সফরের ঘটনা তুর্কি মিডিয়াতে খুব কমই এসেছে। বরং পত্রিকাগুলি সরকারি প্রেসনোটকেই মূলতঃ হাইলাইট করেছে; যার মাঝে মূল বক্তব্য ছিল আফ্রিকায় তুরস্কের মানবকল্যাণমূলক কর্মকান্ড এবং উপনিবেশিকতা বিমুখ দিকনির্দেশনা। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, গত দুই দশকে আফ্রিকাতে তুরস্ক তার কূটনৈতিক মিশনের সংখ্যা ১২ থেকে ৪৩শে উন্নীত করা হয়েছে; বাণিজ্য ৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে; বিনিয়োগ ১’শ মিলিয়ন ডলার থেকে সাড়ে ৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে; ৬ হাজার আফ্রিকান ছাত্র তুরস্কের বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপে পড়ছে। ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’ আফ্রিকার ৩৯টা দেশের ৬০টা গন্তব্যে যাচ্ছে; যার মাধ্যমে আফ্রিকা এবং বাকি বিশ্বের মাঝে হাব হয়ে যাচ্ছে ইস্তাম্বুল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আফ্রিকার কিছু অংশে সামরিক হস্তক্ষেপ এবং বিভিন্ন দেশে তুর্কিদের তৈরি মনুষ্যবিহীন ড্রোনের বাজার তৈরি হওয়ায় বিশ্লেষকেরা প্রশ্ন করছেন যে, আফ্রিকায় তুরস্ক তার কৌশল পরিবর্তন করে আঞ্চলিক খেলা পরিবর্তন করার মতো অবস্থানে যাবার চেষ্টা করছে কিনা। জার্মানির ‘ইউনিভার্সিটি অব বেইরিউথ’এর গবেষক ইব্রাহিম বাকির আব্দুলাই মনে করছেন যে, সোমালিয়া, লিবিয়া এবং পশ্চিম আফ্রিকায় তুরস্কের ভূমিকা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, তুরস্ক আফ্রিকা জুড়েই তার প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে।
সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কের তৈরি ড্রোন সিরিয়া, লিবিয়া এবং আজেরবাইজানে ব্যাপক সাফল্য পাবার পর তুর্কিরা প্রচুর ড্রোনের অর্ডার পেতে শুরু করেছে। ইউক্রেন এবং পোল্যান্ডের কাছে তুর্কি ড্রোন বিক্রয়ের খবর এসেছে। মধ্য এশিয়ার তুর্কমেনিস্তান প্যারেডে তুর্কি ড্রোন দেখিয়েছে; কিরগিজস্তানও একই ড্রোন অর্ডার করেছে বলছে। এমনকি ব্রিটিশরাও এতে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়াতে তুর্কি ড্রোন বিক্রি হয়েছে, যদিও এই মুহুর্তে তিউনিসিয়ার ক্ষমতা নেয়া প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদের সাথে তুরস্কের সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। মরক্কোতেও তুরস্কের ড্রোন বিক্রি হয়েছে; যেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল পশ্চিম সাহারা নিয়ে মরক্কো এবং আলজেরিয়ার মাঝে ব্যাপক বিরোধ রয়েছে। তুরস্ক দুই দেশের সাথেই সম্পর্ক রেখে চলেছে। ‘আফ্রিকান ইন্টেলিজেন্স’ খবর দিচ্ছে যে, মোজাম্বিকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত রুয়ান্ডার সেনবাহিনী তুর্কি ড্রোন কেনার চিন্তা করছে। কিছুকাল আগ পর্যন্তও তুর্কিরা রুয়ান্ডায় কিছু বড় অবকাঠামো প্রকল্পে কাজ করছিল; এখন সেখানে প্রতিরক্ষাও যোগ হলো। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, অফিশিয়ালি ঘোষণা না আসলেও ইথিওপিয়াও তুরস্কের কাছ থেকে ড্রোন কেনার ব্যাপারে একমত হয়েছে। ইথিওপিয়া বর্তমানে বিচ্ছিন্নতাবাদী তিগ্রে অঞ্চলের সাথে প্রায় এক বছর ধরে ভয়াবহ যুদ্ধে জড়িয়ে আছে। ইথিওপিয়াতে তুরস্কের বড় রকমের বিনিয়োগ রয়েছে টেক্সটাইল সেক্টরে। দেশটার বড় বড় অবকাঠামোর কাজও তুর্কিরা করছে। নাইজেরিয়াও তার উত্তরাঞ্চলে বোকো হারামের সাথে যুদ্ধে তুর্কি ড্রোন ব্যবহার করতে চাইছে। এঙ্গোলাও তুর্কি ড্রোনের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে।
আঙ্কারার ‘ফরেন পলিসি সেন্টার’এর ফেলো এমরে চালিসকান বলছেন যে, তুরস্ক মূলতঃ মাঝারি আকৃতির ব্যবসাগুলিতে বিনিয়োগ করেছে; বড় আকারের ব্যবসায় নয়। অর্থাৎ আফ্রিকার সাথে তুরস্কের ব্যবসার প্রসার আসলে খুব বড় কিছু নয়। তবে প্রতিরক্ষা খাতে বিক্রির ব্যাপারগুলি আলাদা; কারণ এর মাঝে থাকে অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তির আদানপ্রদান এবং গভীরতর সহযোগিতা। অনেকেই প্রশ্ন করছেন যে, তুরস্ক কি আফ্রিকাতে ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা রাশিয়ার প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করছে কিনা। তারা বলছেন যে, লিবিয়াতে এবং আজেরবাইজানে তুর্কি ড্রোন যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পেরেছিল। লিবিয়ার যুদ্ধে পরিবর্তন আনার পরপরই তুরস্ক আফ্রিকাতে শুধুমাত্র মানবিক সহায়তা প্রদানকারী থেকে সামরিক শক্তিতে পরিণত হতে শুরু করে। চালিসকান বলছেন যে, লিবিয়াকে কেন্দ্র করেই আশেপাশের দেশগুলিতে তুরস্ক সামরিক শক্তি হতে চাইছে। তবে লিবিয়ার বাইরে সামরিক ঘাঁটি রাখার মতো অর্থনৈতিক সক্ষমতা তুরস্কের নেই। অপরদিকে চীনারা অস্ত্রও বিক্রি করছে; আবার বিশাল আকারের ঋণও দিচ্ছে।
ইস্তাম্বুলের ‘ইয়েদিতেপে ইউনিভার্সিটি’র এসিসট্যান্ট প্রফেসর ভোলকান ইপেক বলছেন যে, তুরস্কের আফ্রিকায় যাওয়া দেখিয়ে দেয় যে, তারা তাদের আশেপাশের দেশের মাঝে আর কূটনৈতিক কর্মকান্ডকে সীমাবদ্ধ করে রাখতে চাইছে না। এক্ষেত্রে ইউরোপিয় শক্তিদের তুলনায় তুরস্ক এগিয়ে আছে; কারণ তুরস্কের কোন ঔপনিবেশিক ইতিহাস নেই।
তুরস্ক আফ্রিকাতে কার সাথে প্রতিযোগিতা করছে?
‘জি জিরো মিডিয়া’ বলছে যে, আফ্রিকাতে তুরস্কের কর্মকান্ড যার জন্যে সবচাইতে বেশি হুমকির সৃষ্টি করেছে, সে হলো ফ্রান্স। পশ্চিম আফ্রিকায় তুরস্কের অবস্থানের ব্যাপারে সবচাইতে বিরক্ত ফ্রান্স। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ সরাসরিই বলেছেন যে, তুরস্ক আফ্রিকাতে ফরাসিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। ফরাসি মিডিয়াতে এরদোগানের আফ্রিকা সফরে সাধারণ বাণিজ্যের তুলনায় ড্রোন বাণিজ্যকেই বেশি হাইলাইট করা হয়েছে। ‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’এর এক প্রতিবেদনে আফ্রিকাতে তুরস্কের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড নিয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছে; কারণ তুর্কি মুদ্রা লিরা এখন যথেষ্টই দুর্বল; মুদ্রাস্ফীতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে; দেশটার ব্যাংকিং সেক্টরের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এমতাবস্থায় ডিসেম্বর মাসে ইস্তাম্বুলে তুরস্ক আফ্রিকা শীর্ষ বৈঠককে কতটুকু স্বার্থক করা সম্ভব? ইতালির ‘ইউনিভার্সিটি অব জেনোয়া’র ফেডেরিকো ডনেলি বলছেন যে, প্রতিবারই আফ্রিকার সাথে তুরস্কের শীর্ষ বৈঠক তুর্কিদের নতুন নীতিকে সামনে নিয়ে এসেছে। এখন নতুন যে দিকটাকে তুর্কিরা গুরুত্ব দিচ্ছে, তা হলো নিরাপত্তা। ড্রোন বিক্রির মাধ্যমে তুর্কিরা আফ্রিকার দেশগুলির সাথে একরকমের দরকষাকষিতে যেতে পারছে; কারণ পশ্চিমাদের ড্রোনগুলির চাইতে কমদামি হলেও তুর্কি ড্রোনগুলির কর্মক্ষমতা যথেষ্ট। আফ্রিকার দেশগুলির নিরাপত্তার জন্যে এই ড্রোনগুলি বড় সুবিধা দিচ্ছে।
ইস্তাম্বুলের সাংবাদিক বারসিন ইনান্স বলছেন যে, এরদোগানের আফ্রিকা সফর তুরস্কের চাইতে ইউরোপেই বেশি আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। ইউরোপিয় মিডিয়াতে এব্যাপারে যত বিতর্ক হচ্ছে, তা তুরস্কে প্রায় কখনোই দেখা যায় না। তুরস্কের আফ্রিকা নীতিতে পরিবর্তন এরদোগানের আগেই শুরু হলেও সকলে এব্যাপারে এরদোগানকেই ক্রেডিট দিচ্ছেন। তুরস্কের জ্বালানি উৎসকে আরও শক্ত ভিত দিতে তুরস্ক নাইজেরিয়া থেকে এলএনজি আমদানিতে গুরুত্ব দিতে চাইছে। এই ব্যাপারটা যতটা না হাইলাইট হয়েছে, তার চাইতে ড্রোন বিক্রি নিয়েই কথা হচ্ছে বেশি। নাইজেরিয়ার ডেভেলপমেন্ট কনসালট্যান্ট নাজিম আনিমাশাউন মনে করেননা যে তুরস্ক আফ্রিকাতে কাউকে প্রতিস্থাপিত করতে চাইছে। তিনি বলছেন যে, তুরস্ক তার নিজের জন্যে একটা আলাদা স্থান করে নিতে চাইছে। আরও শক্তিশালী কূটনীতির দিকে যেতে চাইছে তুরস্ক; যেখানে আফ্রিকার দেশগুলি তুরস্কের সাথে পার্টনারিশিপে নিজেরাও লাভবান হবে। উদাহরণস্বরূপ, নাইজেরিয়া চাইছে তার এলএনজির জন্যে বাজার খুঁজতে; যেখানে তুরস্ক এগিয়ে এসেছে নাইজেরিয়ার গ্যাস অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করতে। যখন পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলি নিজেদের কর্মকান্ড কমিয়ে ফেলতে চাইছে, তুরস্ক ঠিক সেখানেই নিজেদের জায়গা করে নিতে চাইছে। তুর্কি সাংবাদিক বারসিন ইনান্স বলছেন যে, ইস্তাম্বুলে আসন্ন আফ্রিকা শীর্ষ বৈঠক খুব সহজেই অন্যান্য ইস্যুর নিচে পড়ে যেতে পারে। কারণ তুরস্কের আশেপাশে সিরিয়া, রাশিয়া, ইরাক, ইরান, গ্রিসসহ আরও অনেক ইস্যু রয়েছে; যেগুলি যেকোন সময় সামনে চলে আসতে পারে এবং সেই ইস্যুগুলিকেই মিডিয়া আফ্রিকার চাইতে বেশি গুরুত্ব দিতে পারে। এমনকি তুরস্কে বড় কোন ইস্যু তৈরি না হলেও হয়তো আফ্রিকা শীর্ষ বৈঠক তুর্কি মিডিয়াতে অতবড় হেডলাইন হবে না। তুরস্কের আফ্রিকা নীতি সরকারের কাছে যতটা না গুরুত্বপূর্ণ, সাধারণ জনগণের কাছে ততটা নয়। তবে তুর্কি ব্যবসায়ীরা আফ্রিকার ব্যাপারে যথেষ্টই আগ্রহী। তুর্কি চিন্তাবিদদের মাঝেও খুব কম সংখ্যক আফ্রিকা নিয়ে কথা বলছেন।
তুর্কিরা তাদের উসমানি খিলাফতের ইতিহাসের স্বপ্নে বিভোর। তাই উসমানি সময়ে তুর্কিদের প্রভাবের মাঝে থাকা এলাকাগুলিকেই তুরস্ক টার্গেট করছে। এরদোগানও তুর্কি জনগণের এই আবেগকে কাজে লাগাতে চাইছেন। তবে আফ্রিকা এখনও তুর্কিদের চিন্তায় বেশ ছোট। আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় তুরস্ক এখন সর্বদাই সিরিয়া, রাশিয়া, ককেশাস, ইরাক, ইরান, গ্রিস, ইত্যাদি ইস্যু নিয়ে জর্জরিত; যা কিনা তুর্কি মিডিয়াকে আফ্রিকার ব্যাপারে অনাগ্রহী রেখেছে। এর মাঝে তুরস্কের অর্থনীতি চলছে ধুঁকে ধুঁকে। তুর্কি লিরার ব্যাপক দরপতন এবং মারত্মক মূল্যস্ফীতিই জনগণকে ব্যতিব্যস্ত রাখার জন্যে যথেষ্ট; যা কিনা সামনের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হবে। এমতাবস্থায় এরদোগানের কাছে তুর্কি জনগণের আবেগকে জাগিয়ে রাখাটাই ক্ষমতায় টিকে থাকার ফাউন্ডেশন। তবে তুর্কি জনগণের আবেগকে ব্যবহার করতে গিয়ে তুরস্ক তার নীতিকে যতটা বহির্মুখী করবে, ততই আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক শক্তিদের সাথে প্রতিযোগিতার মাঝে পড়বে। আফ্রিকা তুরস্কের জন্যে নতুন যুদ্ধক্ষেত্র। এখানে বড় শক্তিদের সাথে প্রতিযোগিতায় তুরস্ক নিজেদের জন্যে আলাদা জায়গা করে নিতে চাইছে। তুরস্কের ড্রোনগুলি এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এতে ফ্রান্সের দুশ্চিন্তাই হবে সবচাইতে বেশি; কারণ ঔপনিবেশিক শক্তিদের মাঝে দুর্বল হয়ে পড়া ফ্রান্সেরই প্রভাব হারাবার ভয়ে থাকবে সবচাইতে বেশি।
Labels:
Africa,
Drone Warfare,
France,
Geopolitics,
New World Order,
Nigeria,
Turkey
Friday, 22 October 2021
‘অকাস’ চুক্তির যে ব্যাপারটা নিয়ে কেউ কথা বলছে না…
২২শে অক্টোবর ২০২১
যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং অস্ট্রেলিয়ার মাঝে স্বাক্ষরিত ‘অকাস’ কৌশলগত চুক্তির মাঝে যে ব্যাপারটা মিডিয়াতে বেশি হাইলাইট হয়েছে, তা হলো অস্ট্রেলিয়ার পারমাণবিক সাবমেরিন কেনার পরিকল্পনা। তবে অনেকেই হয়তো খেয়াল করেনি যে, এই চুক্তির আরও কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সাইবার নিরাপত্তা, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা ‘এআই’ এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিং। পারমাণবিক সাবমেরিনের পরিকল্পনার কারণে ফ্রান্সের কাছ থেকে অস্ট্রেলিয়ার ডিজেল সাবমেরিন কেনার বড় রকমের চুক্তিও বাতিল হয়ে যায়। ফ্রান্স এই চুক্তির ব্যাপারে একেবারেই অবগত না থাকার কারণে এবং নিজেদের সাবমেরিন বিক্রির চুক্তি বাতিল হবার কারণে যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে পাঠায়। এমনকি ফরাসিরা এই চুক্তিকে ফ্রান্সের পিছন থেকে ছুরি মারার সাথেও তুলনা করে। ফ্রান্সের সাথে কূটনৈতিক এই দ্বন্দ্ব কিছু সময়ের জন্যে আন্তর্জাতিক হেডলাইন কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু কখনোই সাইবার নিরাপত্তা এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স হাইলাইট হয়নি। কিছু কৌশলগত বিশ্লেষকেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, চুক্তির এই অংশটা চীনের সাথে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে পশ্চিমাদের জন্যে অনেক বড় পদক্ষেপ ছিল।
মার্কিন সেনাবাহিনীর সাইবার কমান্ডের প্রাক্তন প্রধান কৌশলী নিকোল কামারিলো এবং ব্রিটিশ সরকারের ‘ডিজিটাল সার্ভিস’এর ডেপুটি ডিরেক্টর অলিভার লুইস সামরিক ম্যাগাজিন ‘ডিফেন্স ওয়ান’এর এক লেখায় বলছেন যে, অস্ট্রেলিয়ার সাথে সাবমেরিনের চুক্তিটা ছিল আরও বড় কর্মকান্ডের জন্যে ‘ডাউনপেমেন্ট’; উন্নততর প্রযুক্তি ডেভেলপ করার পিছনে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার বন্ধুদের প্রতিশ্রুতি। এই প্রযুক্তির মাঝে রয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং আরও কিছু অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি, যেখানে পশ্চিমারা এখন চীনাদের সাথে কৌশলগত প্রতিযোগিতার মাঝে রয়েছে। তারা যুক্তি দিচ্ছেন যে, নতুন যুগের ডিটারেন্স বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ, বোমারু বিমান বা সাবমেরিনের উপরে তেমন নির্ভরশীল নয়; বরং সেখানে মূল নির্ভরশীলতা থাকবে সফটওয়্যারের শক্তি, দ্রুতি এবং টিকে থাকার সক্ষমতার উপর। চীনা সরকার এই ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকার জন্যেই প্রচুর বিনিয়োগ করছে এবং তাদের কাছে ১’শ ৪০ কোটি মানুষের বিশাল ডাটাবেস তো রয়েছেই। চীনারা বেসরকারি খাতকেও সামরিক প্রযুক্তি ডেভেলপ করতে বলছে।
কামারিলো এবং লুইস বলছেন যে, চীনা কর্মকান্ডকে মোকাবিলা করার জন্যে পশ্চিমাদেরকে ‘এআই’ ডেভেলপ করায় সহযোগিতা বাড়ানো ছাড়াও সম্ভব সবচাইতে বড় ডাটাবেস যোগাড় করতে হবে; যার মাঝে তারা ‘এআই’কে প্রশিক্ষণ দিতে পারবে। তবে পশ্চিমারা যেখানে চীনাদের থেকে এগিয়ে আছে, তা হলো ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স জোট; যার মাঝে অকাসের যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও অস্ট্রেলিয়ার সাথে রয়েছে কানাডা এবং নিউজিল্যান্ড। লেখকেরা বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের ইন্টেলিজেন্স সহযোগিতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানিকে পরাজিত করেছিল। এরপর ঠান্ডা যুদ্ধের সময় ‘ফাইভ আইজ’ সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে জিততে সহায়তা দিয়েছে। আর বর্তমানে ইন্টেলিজেন্স জোগাড় এবং বিশ্লেষণ পুরোটাই যেহেতু ডিজিটাল ডোমেইনে হয়ে থাকে, তাই সেখানে নেটওয়ার্কে যুক্ত সেন্সর, ‘এআই’এর এলগোরিদমের মাধ্যমে ডাটা প্রসেসিং ইত্যাদি অতি গুরুত্বপূর্ণ। ‘এআই’ ব্যবহার করা না হলে তা সাইবার আক্রমণের শিকার হবে; আর এটাকে রক্ষা করা না গেলে ‘এআই’এর গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলি প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাতে চলে যাবে। কামারিলো এবং লুইস প্রস্তাব দিচ্ছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং তার বন্ধু দেশগুলিকে পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে সকলেই বুঝতে পারে যে, ‘এআই’ প্রকৃতপক্ষে ভালো কাজে ব্যবহার হবে; মানুষকে নিয়ন্ত্রণের কাজে নয়। আর মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ‘এআই’ কাজ করবে না কখনোই।
অস্ট্রেলিয়ার নীতিগত ফোরাম ‘ইস্টএশিয়া ফোরাম’এর এক লেখায় ‘স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি’র গবেষক আরজান তারাপোর বলছেন যে, ‘অকাস’ চুক্তি ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স জোটকে ছাপিয়ে উন্নততর প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং ইন্ডাস্ট্রিকে একত্রে নিয়ে এসেছে। সামরিক প্রযুক্তি শেয়ার করাটা নতুন নয়; তবে কিছু প্রযুক্তি অন্যগুলি থেকে একটু বেশিই দামি। যেমন পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনের প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ঠান্ডা যুদ্ধের চরম পর্যায়ে শুধুমাত্র ব্রিটেনের সাথে শেয়ার করেছে। এখন বেশ কয়েক দশক পর তারা একই প্রযুক্তি অস্ট্রেলিয়াকে দিতে রাজি হয়েছে। কিন্তু কেন? কারণ ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স জোটের মাধ্যমে এই দেশগুলি ইন্টেলিজেন্স জোগাড় এবং শেয়ার করার জন্যে বহুকাল ধরে যৌথ সিস্টেম, সংস্থা ও প্রসেস ডেভেলপ করেছে। ‘ফাইভ আইজ’এর পার্টনারদেরকেই ওয়াশিংটন বিশ্বাস করছে; কারণ ওয়াশিংটন ‘অকাস’এর মাধ্যমে এমন সকল প্রযুক্তি শেয়ার করতে যাচ্ছে, যা কিনা তারা তাদের সবচাইতে কাছের ইন্টেলিজেন্স পার্টনারদের সাথেই শেয়ার করবে। ‘এআই’, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং সাইবার প্রযুক্তিই সামনের দিনগুলিতে ইন্টেলিজেন্স সক্ষমতার সর্বসন্মুখে থাকবে। আরজান তারাপোর বলছেন যে, ফ্রান্স এই ‘ফাইভ আইজ’এর অংশ না থাকার কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ফ্রান্সকে ‘অকাস’এ রাখতে চায়নি।
তারাপোর প্রস্তাব দিচ্ছেন যে, ‘অকাস’কে যদি আঞ্চলিক পার্টনারদের কাছে আরও বিশ্বাসযোগ্য করতে হয়, তাহলে ফ্রান্স এবং ভারতের মতো বন্ধুদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রযুক্তি এবং ডাটা শেয়ার করতে হবে। এই দেশগুলি’ ‘অকাস’এর মাঝে না থকলেও এদের গুরুত্ব অনেক। ‘অকাস’ সকল কিছু করতে পারবে না। তাই বিভিন্ন আঞ্চলিক গ্রুপিংএর সাথে ‘অকাস’কে একত্রে কাজ করতে হবে। একেকটা গ্রুপিং একেক উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছে। যেমন ‘কোয়াড’ ব্যবহৃত হবে আঞ্চলিক সহযোগিতার ‘নিউক্লিয়াস’ হিসেবে। ফ্রান্স এবং ভারতের নিজস্ব সামরিক শক্তি, ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রভাবের আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক রয়েছে, যা ‘অকাস’ ব্যবহার করতে পারে। একারনেই তারাপোর ‘অকাস’কে ফ্রান্সের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের দিকে মনোনিবেশ করতে বলছেন। তবে তিনি বলছেন যে, ‘অকাস’এর পুরো ব্যাপারটাই সম্পূর্ণ আলাদা।
সবশেষে ‘অকাস’ চুক্তির ভিত্তি নিয়ে কথা বলেছেন কামারিলো এবং লুইস। তারা বলছেন যে, ১৯৪১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের মাঝে স্বাক্ষরিত ‘আটলান্টিক চার্টার’ই হলো এই দুই দেশের সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু। এবছরের জুন মাসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সেই একই চার্টারের একটা পরিবর্তিত ভার্সন স্বাক্ষর করেন। মুক্ত, গণতান্ত্রিক সমাজের আদর্শকে দুনিয়াব্যাপী প্রচার করা ছাড়াও তাদের প্রযুক্তিগুলিকে ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টির মাধ্যমে নিজেদের হাতে ধরে রাখা এবং সাইবার হামলা প্রতিহত করার মতো চিন্তাগুলির ভিত সেই চার্টারের মাঝেই রয়েছে।
বিশ্লেষকদের এই কথাগুলি থেকে পরিষ্কার যে, ‘অকাস’ সাম্প্রতিক সময়ে স্বাক্ষরিত সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত চুক্তি। ইংরেজি ভাষাভাষী ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং কানাডার মাঝেই গড়ে উঠেছে সেই ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স জোট, যাকে পুঁজি করেই সামনের দিনগুলিকে ‘অকাস’ প্রযুক্তিগত দিক থেকে দুনিয়াতে এগিয়ে থাকতে চাইছে। এই প্রযুক্তির সর্বসন্মুখে রয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা ‘এআই’; যাকে সমর্থন যোগাবে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং নিরাপত্তা দেবে সাইবার প্রযুক্তি। ‘আকাস’ চুক্তির মূলেই রয়েছে এই প্রযুক্তিগুলি; যা সামনের দিনগুলিতে প্রতিরক্ষা খাতে অতি গুরুত্বপূর্ণ হবে; যদিও মিডিয়াতে পারমাণবিক সাবমেরিনের কথাই বেশি প্রচারিত হয়েছে। অতি সংবেদনশীল এই প্রযুক্তিগুলিকে যুক্তরাষ্ট্র শুধুমাত্র তার সবচাইতে কাছের ‘বিশেষ’ গ্রুপের সাথেই শেয়ার করতে চাইছে। আর নিজেদের এই ‘বিশেষ’ গ্রুপের মাঝে ফান্স এবং ভারতের মতো দেশগুলিকে ঢুকতে না দিলেও ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্র চাইছে বাকি দেশগুলিকেও তাদের সাথে রেখে তাদের কৌশলগত উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে।
যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং অস্ট্রেলিয়ার মাঝে স্বাক্ষরিত ‘অকাস’ কৌশলগত চুক্তির মাঝে যে ব্যাপারটা মিডিয়াতে বেশি হাইলাইট হয়েছে, তা হলো অস্ট্রেলিয়ার পারমাণবিক সাবমেরিন কেনার পরিকল্পনা। তবে অনেকেই হয়তো খেয়াল করেনি যে, এই চুক্তির আরও কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সাইবার নিরাপত্তা, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা ‘এআই’ এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিং। পারমাণবিক সাবমেরিনের পরিকল্পনার কারণে ফ্রান্সের কাছ থেকে অস্ট্রেলিয়ার ডিজেল সাবমেরিন কেনার বড় রকমের চুক্তিও বাতিল হয়ে যায়। ফ্রান্স এই চুক্তির ব্যাপারে একেবারেই অবগত না থাকার কারণে এবং নিজেদের সাবমেরিন বিক্রির চুক্তি বাতিল হবার কারণে যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে পাঠায়। এমনকি ফরাসিরা এই চুক্তিকে ফ্রান্সের পিছন থেকে ছুরি মারার সাথেও তুলনা করে। ফ্রান্সের সাথে কূটনৈতিক এই দ্বন্দ্ব কিছু সময়ের জন্যে আন্তর্জাতিক হেডলাইন কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু কখনোই সাইবার নিরাপত্তা এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স হাইলাইট হয়নি। কিছু কৌশলগত বিশ্লেষকেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, চুক্তির এই অংশটা চীনের সাথে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে পশ্চিমাদের জন্যে অনেক বড় পদক্ষেপ ছিল।
মার্কিন সেনাবাহিনীর সাইবার কমান্ডের প্রাক্তন প্রধান কৌশলী নিকোল কামারিলো এবং ব্রিটিশ সরকারের ‘ডিজিটাল সার্ভিস’এর ডেপুটি ডিরেক্টর অলিভার লুইস সামরিক ম্যাগাজিন ‘ডিফেন্স ওয়ান’এর এক লেখায় বলছেন যে, অস্ট্রেলিয়ার সাথে সাবমেরিনের চুক্তিটা ছিল আরও বড় কর্মকান্ডের জন্যে ‘ডাউনপেমেন্ট’; উন্নততর প্রযুক্তি ডেভেলপ করার পিছনে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার বন্ধুদের প্রতিশ্রুতি। এই প্রযুক্তির মাঝে রয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং আরও কিছু অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি, যেখানে পশ্চিমারা এখন চীনাদের সাথে কৌশলগত প্রতিযোগিতার মাঝে রয়েছে। তারা যুক্তি দিচ্ছেন যে, নতুন যুগের ডিটারেন্স বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ, বোমারু বিমান বা সাবমেরিনের উপরে তেমন নির্ভরশীল নয়; বরং সেখানে মূল নির্ভরশীলতা থাকবে সফটওয়্যারের শক্তি, দ্রুতি এবং টিকে থাকার সক্ষমতার উপর। চীনা সরকার এই ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকার জন্যেই প্রচুর বিনিয়োগ করছে এবং তাদের কাছে ১’শ ৪০ কোটি মানুষের বিশাল ডাটাবেস তো রয়েছেই। চীনারা বেসরকারি খাতকেও সামরিক প্রযুক্তি ডেভেলপ করতে বলছে।
কামারিলো এবং লুইস বলছেন যে, চীনা কর্মকান্ডকে মোকাবিলা করার জন্যে পশ্চিমাদেরকে ‘এআই’ ডেভেলপ করায় সহযোগিতা বাড়ানো ছাড়াও সম্ভব সবচাইতে বড় ডাটাবেস যোগাড় করতে হবে; যার মাঝে তারা ‘এআই’কে প্রশিক্ষণ দিতে পারবে। তবে পশ্চিমারা যেখানে চীনাদের থেকে এগিয়ে আছে, তা হলো ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স জোট; যার মাঝে অকাসের যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও অস্ট্রেলিয়ার সাথে রয়েছে কানাডা এবং নিউজিল্যান্ড। লেখকেরা বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের ইন্টেলিজেন্স সহযোগিতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানিকে পরাজিত করেছিল। এরপর ঠান্ডা যুদ্ধের সময় ‘ফাইভ আইজ’ সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে জিততে সহায়তা দিয়েছে। আর বর্তমানে ইন্টেলিজেন্স জোগাড় এবং বিশ্লেষণ পুরোটাই যেহেতু ডিজিটাল ডোমেইনে হয়ে থাকে, তাই সেখানে নেটওয়ার্কে যুক্ত সেন্সর, ‘এআই’এর এলগোরিদমের মাধ্যমে ডাটা প্রসেসিং ইত্যাদি অতি গুরুত্বপূর্ণ। ‘এআই’ ব্যবহার করা না হলে তা সাইবার আক্রমণের শিকার হবে; আর এটাকে রক্ষা করা না গেলে ‘এআই’এর গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলি প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাতে চলে যাবে। কামারিলো এবং লুইস প্রস্তাব দিচ্ছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং তার বন্ধু দেশগুলিকে পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে সকলেই বুঝতে পারে যে, ‘এআই’ প্রকৃতপক্ষে ভালো কাজে ব্যবহার হবে; মানুষকে নিয়ন্ত্রণের কাজে নয়। আর মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ‘এআই’ কাজ করবে না কখনোই।
অস্ট্রেলিয়ার নীতিগত ফোরাম ‘ইস্টএশিয়া ফোরাম’এর এক লেখায় ‘স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি’র গবেষক আরজান তারাপোর বলছেন যে, ‘অকাস’ চুক্তি ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স জোটকে ছাপিয়ে উন্নততর প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং ইন্ডাস্ট্রিকে একত্রে নিয়ে এসেছে। সামরিক প্রযুক্তি শেয়ার করাটা নতুন নয়; তবে কিছু প্রযুক্তি অন্যগুলি থেকে একটু বেশিই দামি। যেমন পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনের প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ঠান্ডা যুদ্ধের চরম পর্যায়ে শুধুমাত্র ব্রিটেনের সাথে শেয়ার করেছে। এখন বেশ কয়েক দশক পর তারা একই প্রযুক্তি অস্ট্রেলিয়াকে দিতে রাজি হয়েছে। কিন্তু কেন? কারণ ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স জোটের মাধ্যমে এই দেশগুলি ইন্টেলিজেন্স জোগাড় এবং শেয়ার করার জন্যে বহুকাল ধরে যৌথ সিস্টেম, সংস্থা ও প্রসেস ডেভেলপ করেছে। ‘ফাইভ আইজ’এর পার্টনারদেরকেই ওয়াশিংটন বিশ্বাস করছে; কারণ ওয়াশিংটন ‘অকাস’এর মাধ্যমে এমন সকল প্রযুক্তি শেয়ার করতে যাচ্ছে, যা কিনা তারা তাদের সবচাইতে কাছের ইন্টেলিজেন্স পার্টনারদের সাথেই শেয়ার করবে। ‘এআই’, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং সাইবার প্রযুক্তিই সামনের দিনগুলিতে ইন্টেলিজেন্স সক্ষমতার সর্বসন্মুখে থাকবে। আরজান তারাপোর বলছেন যে, ফ্রান্স এই ‘ফাইভ আইজ’এর অংশ না থাকার কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ফ্রান্সকে ‘অকাস’এ রাখতে চায়নি।
তারাপোর প্রস্তাব দিচ্ছেন যে, ‘অকাস’কে যদি আঞ্চলিক পার্টনারদের কাছে আরও বিশ্বাসযোগ্য করতে হয়, তাহলে ফ্রান্স এবং ভারতের মতো বন্ধুদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রযুক্তি এবং ডাটা শেয়ার করতে হবে। এই দেশগুলি’ ‘অকাস’এর মাঝে না থকলেও এদের গুরুত্ব অনেক। ‘অকাস’ সকল কিছু করতে পারবে না। তাই বিভিন্ন আঞ্চলিক গ্রুপিংএর সাথে ‘অকাস’কে একত্রে কাজ করতে হবে। একেকটা গ্রুপিং একেক উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছে। যেমন ‘কোয়াড’ ব্যবহৃত হবে আঞ্চলিক সহযোগিতার ‘নিউক্লিয়াস’ হিসেবে। ফ্রান্স এবং ভারতের নিজস্ব সামরিক শক্তি, ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রভাবের আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক রয়েছে, যা ‘অকাস’ ব্যবহার করতে পারে। একারনেই তারাপোর ‘অকাস’কে ফ্রান্সের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের দিকে মনোনিবেশ করতে বলছেন। তবে তিনি বলছেন যে, ‘অকাস’এর পুরো ব্যাপারটাই সম্পূর্ণ আলাদা।
সবশেষে ‘অকাস’ চুক্তির ভিত্তি নিয়ে কথা বলেছেন কামারিলো এবং লুইস। তারা বলছেন যে, ১৯৪১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের মাঝে স্বাক্ষরিত ‘আটলান্টিক চার্টার’ই হলো এই দুই দেশের সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু। এবছরের জুন মাসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সেই একই চার্টারের একটা পরিবর্তিত ভার্সন স্বাক্ষর করেন। মুক্ত, গণতান্ত্রিক সমাজের আদর্শকে দুনিয়াব্যাপী প্রচার করা ছাড়াও তাদের প্রযুক্তিগুলিকে ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টির মাধ্যমে নিজেদের হাতে ধরে রাখা এবং সাইবার হামলা প্রতিহত করার মতো চিন্তাগুলির ভিত সেই চার্টারের মাঝেই রয়েছে।
বিশ্লেষকদের এই কথাগুলি থেকে পরিষ্কার যে, ‘অকাস’ সাম্প্রতিক সময়ে স্বাক্ষরিত সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত চুক্তি। ইংরেজি ভাষাভাষী ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং কানাডার মাঝেই গড়ে উঠেছে সেই ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স জোট, যাকে পুঁজি করেই সামনের দিনগুলিকে ‘অকাস’ প্রযুক্তিগত দিক থেকে দুনিয়াতে এগিয়ে থাকতে চাইছে। এই প্রযুক্তির সর্বসন্মুখে রয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা ‘এআই’; যাকে সমর্থন যোগাবে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং নিরাপত্তা দেবে সাইবার প্রযুক্তি। ‘আকাস’ চুক্তির মূলেই রয়েছে এই প্রযুক্তিগুলি; যা সামনের দিনগুলিতে প্রতিরক্ষা খাতে অতি গুরুত্বপূর্ণ হবে; যদিও মিডিয়াতে পারমাণবিক সাবমেরিনের কথাই বেশি প্রচারিত হয়েছে। অতি সংবেদনশীল এই প্রযুক্তিগুলিকে যুক্তরাষ্ট্র শুধুমাত্র তার সবচাইতে কাছের ‘বিশেষ’ গ্রুপের সাথেই শেয়ার করতে চাইছে। আর নিজেদের এই ‘বিশেষ’ গ্রুপের মাঝে ফান্স এবং ভারতের মতো দেশগুলিকে ঢুকতে না দিলেও ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্র চাইছে বাকি দেশগুলিকেও তাদের সাথে রেখে তাদের কৌশলগত উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে।
Labels:
Artificial Intelligence,
AUKUS,
Australia,
China,
Cyber Warfare,
France,
Geopolitics,
Global Britain,
India,
New World Order,
Quantum Computing,
USA
Thursday, 21 October 2021
‘আসিয়ান’এর অস্তিত্বকেই চ্যালেঞ্জ করছে ‘অকাস’ চুক্তি
২১শে অক্টোবর ২০২১
‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং আস্ট্রেলিয়ার মাঝে কৌশলগত চুক্তি ‘অকাস’ স্বাক্ষরিত হবার পর থেকে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক জোট ‘এসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনস’ বা ‘আসিয়ান’এর সদস্য দেশগুলির মাঝে সিদ্ধান্তহীনতা দেখা দিয়েছে। জোটের সদস্য মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া যখন বলছে যে, এই চুক্তির ফলে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছের রাষ্ট্র ফিলিপাইন এই চুক্তিকে সমর্থন দিয়েছে।
গত ১২ই অক্টোবর মালয়েশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসামুদ্দিন হুসেইন পার্লামেন্টকে বলেন যে, মালয়েশিয়ার মূল লক্ষ্য হলো চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে শক্তির ব্যালান্স যাই থাকুক না কেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে রক্ষা করা। ‘আসিয়ান’এর সদস্য রাষ্ট্রদের চিন্তার মাঝে একটা সমঝোতাই কেবল এই দুই শক্তিশালী দেশকে মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে। জাপানের মিডিয়া ‘এনএইচকে’ বলছে যে, গত ১৭ই সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ইসমাঈল সাবরি ইয়াকব অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনকে বলেন যে, ‘অকাস’ চুক্তি দক্ষিণ চীন সাগরে অন্যান্য শক্তিকে আরও আগ্রাসী ভূমিকা নিতে উস্কে দিতে পারে। একই দিনে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয় যে, অত্র অঞ্চলে অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিয়ে ইন্দোনেশিয়া ভীষণভাবে চিন্তিত। মার্কিন সামরিক পত্রিকা ‘স্ট্রারস এন্ড স্ট্রাইপস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ১৬ই সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লী সিয়েন লুং অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে বলেন যে, এই চুক্তি আঞ্চলিক শান্তি এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে সহায়তা করবে এবং আঞ্চলিক কাঠামোকে সমর্থন দেবে। পরদিন ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডেলফিন লরেনজানা অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিটার ডাটনকে ফোন করে বলেন যে, অস্ট্রেলিয়ার অধিকার রয়েছে তার সাবমেরিন প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার; ফিলিপাইনও তার নিজস্ব অঞ্চলকে রক্ষা করতে সক্ষমতা তৈরি করছে। ২৩শে সেপ্টেম্বর ভিয়েতনামের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লে থি থু হাং নির্দিষ্ট না করেই বলেন যে, সকল রাষ্ট্রই শান্তি, স্থিতিশীলতা, সহযোগিতা এবং উন্নয়ন চায়। অস্ট্রেলিয়ার পারমাণবিক প্রযুক্তি কেনা নিয়ে তিনি বলেন যে, পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার হতে হবে শান্তিপূর্ণ এবং তা আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাজে লাগতে হবে।
থাইল্যান্ডের ‘চুলালংকর্ন ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর থিতিনান পংসুধিরাক ‘ব্যাংকক পোস্ট’এর এক লেখায় মত দিচ্ছেন যে, ‘অকাস’ চুক্তি চীনকে যেমন উস্কে দেবে, তেমনি ‘আসিয়ান’কে আরও বিভক্ত করবে। একইসাথে এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র অস্ট্রেলিয়াকে পারমাণবিক সাবমেরিন সরবরাহ করলে ইইউ এবং জাপানসহ অন্যান্য শক্তিশালী দেশগুলিও চ্যালেঞ্জের মাঝে পড়ে যাবে। পংসুধিরাকের সাথে একমত নন থাইল্যান্ডের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কাভি চংকিত্তাভর্ন। একই পত্রিকার এক লেখায় তিনি বলছেন যে, একসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন অত্র অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে; এখন করছে চীন। তিনি বলেন যে, ‘আসিয়ান’ যদি সময়োচিত সিদ্ধান্ত নিতে না পারে, তবে সংস্থার আকাত্মতায় সমস্যা হবে। গত পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা বলছে যে, ‘আসিয়ান’এর সক্ষমতা রয়েছে টিকে থাকার। এর আগেও বিভিন্ন ইস্যুতে এর সদস্য দেশগুলির কেউ কেউ ভিন্ন পথে হাঁটার চেষ্টা করেছে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সংস্থায় ভাঙ্গন ধরাতে পারেনি।
নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে কাজ করা মার্কিন নিরাপত্তা বিশ্লেষক পল বিউকানান ‘স্টারস এন্ড স্ট্রাইপস’কে বলছেন যে, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি চিন্তিত যে, দক্ষিণ চীন সাগর, মালাক্কা প্রণালি, মালয় দ্বীপপুঞ্জ এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় পারমাণবিক শক্তির আনাগোনা আরও দেশকে পারমাণবিক শক্তির দিকে আকর্ষণ করতে পারে। বিশেষ করে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মত দেশগুলি, যেগুলি এই মুহুর্তে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে না, তারাও এব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। এই পুরো ব্যাপারটা সংঘাতের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ চীন তার আঞ্চলিক অবস্থানকে ধরে রাখতে চেষ্টা করবে এবং চাপের মুখে তার শক্তি বৃদ্ধি করতে বাধ্য হবে।
সিঙ্গাপুরের সরকারি গবেষণা সংস্থা ‘ইসেয়াস ইউসোফ ইসহাক ইন্সটিটিউট’এর সিনিয়র ফেলো উইলিয়াম চুং এবং শ্যারন সেয়া ‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় বলছেন যে, যখন ‘আসিয়ান’এর বাইরের দেশগুলি অত্র অঞ্চলের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিচ্ছে, তখন বোঝা যায় যে, চীনা আগ্রাসী তৎপরতাকে নিয়ন্ত্রণে ‘আসিয়ান’ ব্যর্থ হয়েছে। ‘আসিয়ান’ মনে করছে যে, ‘কোয়াড’এর মতো জোট তৈরি হওয়া মানেই চীনকে আরও খেপিয়ে তোলা। তারা ‘আসিয়ান’এর শক্ত নেতৃত্ব দাবি করেন এবং বর্তমান নেতৃত্বের সমালোচনা করেন। ‘আসিয়ান’এর বর্তমান চেয়ারম্যান ব্রুনাইএর কার্যকলাপকেও তারা বিবৃতিসর্বস্ব বলে আখ্যা দেন। একইসাথে সংস্থার মাঝে এখন অনেক বিষয়েই বিরোধ; যার ফলশ্রুতিতে শুধু ছাড় দিয়েই চলতে হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে শীর্ষ বৈঠকে আমন্ত্রণ না জানানো হলেও তার একজন প্রতিনিধিকে সন্মেলনে আসার অনুমতি দেয়া হয়। একারণেই বাইডেন প্রশাসন ‘আসিয়ান’এর সমঝোতার জন্যে অপেক্ষা না করে সিঙ্গাপুর এবং ভিয়েতনামের মতো সদস্যদেশগুলির সাথে আলাদাভাবে সম্পর্ক তৈরি করছে। লেখকেরা বলছেন যে, দিন শেষে ‘আসিয়ান’ হয়তো কোনমতে চালিয়ে নেবে; কিন্তু এটা পরিষ্কার যে, ‘আসিয়ান’এর বয়স হয়েছে।
‘অকাস’ চুক্তি ‘আসিয়ান’এর মতো একটা সংস্থার অস্তিত্বকেই চ্যালেঞ্জ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র তার চীনকে নিয়ন্ত্রণের নীতিতে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিকে বাধ্য করছে এক পক্ষ নিতে। কিন্তু এই দেশগুলি অর্থনৈতিকভাবে অনেকাংশেই চীনের উপর নির্ভরশীল। এছাড়াও আরেক বাস্তবতার মাঝে রয়েছে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া। পূর্ব এশিয়ার প্রায় সবগুলি কৌশলগত সমুদ্রপথই এই দেশগুলির মাঝ দিয়ে গিয়েছে। কাজেই যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মাঝে যে কোন সম্ভাব্য সংঘাতে এই দেশগুলির উঠানই হয়ে উঠবে যুদ্ধক্ষেত্র। চীনের বেশি কাছে অবস্থিত হওয়ায় ফিলিপাইন এবং ভিয়েতনামের কাছে যখন চীনের হাত থেকে সমুদ্রসীমা উদ্ধার মূল লক্ষ্য, তখন মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া তাদের আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমাকে সংঘাতমুক্ত দেখতেই বেশি আগ্রহী। অর্থাৎ সংস্থার সদস্যদেশগুলির জাতীয় লক্ষ্য এখন সংস্থার সাথে একাত্মতা প্রকাশকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। একারণেই যুক্তরাষ্ট্র অত্র অঞ্চলে ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম এবং সিঙ্গাপুরের সাথে আলাদা সম্পর্ক তৈরিতে আগ্রহী হয়েছে। এমতাবস্থায় মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া নিজস্ব কৌশলগত দিকনির্দেশনা খুঁজবে। একইসাথে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবার সাথেসাথে অত্র অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে নতুন খেলোয়াড় যোগ হবে এবং নতুন নতুন কৌশলগত জোট তৈরি হবে।
‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং আস্ট্রেলিয়ার মাঝে কৌশলগত চুক্তি ‘অকাস’ স্বাক্ষরিত হবার পর থেকে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক জোট ‘এসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনস’ বা ‘আসিয়ান’এর সদস্য দেশগুলির মাঝে সিদ্ধান্তহীনতা দেখা দিয়েছে। জোটের সদস্য মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া যখন বলছে যে, এই চুক্তির ফলে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছের রাষ্ট্র ফিলিপাইন এই চুক্তিকে সমর্থন দিয়েছে।
গত ১২ই অক্টোবর মালয়েশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসামুদ্দিন হুসেইন পার্লামেন্টকে বলেন যে, মালয়েশিয়ার মূল লক্ষ্য হলো চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে শক্তির ব্যালান্স যাই থাকুক না কেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে রক্ষা করা। ‘আসিয়ান’এর সদস্য রাষ্ট্রদের চিন্তার মাঝে একটা সমঝোতাই কেবল এই দুই শক্তিশালী দেশকে মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে। জাপানের মিডিয়া ‘এনএইচকে’ বলছে যে, গত ১৭ই সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ইসমাঈল সাবরি ইয়াকব অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনকে বলেন যে, ‘অকাস’ চুক্তি দক্ষিণ চীন সাগরে অন্যান্য শক্তিকে আরও আগ্রাসী ভূমিকা নিতে উস্কে দিতে পারে। একই দিনে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয় যে, অত্র অঞ্চলে অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিয়ে ইন্দোনেশিয়া ভীষণভাবে চিন্তিত। মার্কিন সামরিক পত্রিকা ‘স্ট্রারস এন্ড স্ট্রাইপস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ১৬ই সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লী সিয়েন লুং অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে বলেন যে, এই চুক্তি আঞ্চলিক শান্তি এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে সহায়তা করবে এবং আঞ্চলিক কাঠামোকে সমর্থন দেবে। পরদিন ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডেলফিন লরেনজানা অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিটার ডাটনকে ফোন করে বলেন যে, অস্ট্রেলিয়ার অধিকার রয়েছে তার সাবমেরিন প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার; ফিলিপাইনও তার নিজস্ব অঞ্চলকে রক্ষা করতে সক্ষমতা তৈরি করছে। ২৩শে সেপ্টেম্বর ভিয়েতনামের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লে থি থু হাং নির্দিষ্ট না করেই বলেন যে, সকল রাষ্ট্রই শান্তি, স্থিতিশীলতা, সহযোগিতা এবং উন্নয়ন চায়। অস্ট্রেলিয়ার পারমাণবিক প্রযুক্তি কেনা নিয়ে তিনি বলেন যে, পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার হতে হবে শান্তিপূর্ণ এবং তা আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাজে লাগতে হবে।
থাইল্যান্ডের ‘চুলালংকর্ন ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর থিতিনান পংসুধিরাক ‘ব্যাংকক পোস্ট’এর এক লেখায় মত দিচ্ছেন যে, ‘অকাস’ চুক্তি চীনকে যেমন উস্কে দেবে, তেমনি ‘আসিয়ান’কে আরও বিভক্ত করবে। একইসাথে এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র অস্ট্রেলিয়াকে পারমাণবিক সাবমেরিন সরবরাহ করলে ইইউ এবং জাপানসহ অন্যান্য শক্তিশালী দেশগুলিও চ্যালেঞ্জের মাঝে পড়ে যাবে। পংসুধিরাকের সাথে একমত নন থাইল্যান্ডের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কাভি চংকিত্তাভর্ন। একই পত্রিকার এক লেখায় তিনি বলছেন যে, একসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন অত্র অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে; এখন করছে চীন। তিনি বলেন যে, ‘আসিয়ান’ যদি সময়োচিত সিদ্ধান্ত নিতে না পারে, তবে সংস্থার আকাত্মতায় সমস্যা হবে। গত পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা বলছে যে, ‘আসিয়ান’এর সক্ষমতা রয়েছে টিকে থাকার। এর আগেও বিভিন্ন ইস্যুতে এর সদস্য দেশগুলির কেউ কেউ ভিন্ন পথে হাঁটার চেষ্টা করেছে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সংস্থায় ভাঙ্গন ধরাতে পারেনি।
নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে কাজ করা মার্কিন নিরাপত্তা বিশ্লেষক পল বিউকানান ‘স্টারস এন্ড স্ট্রাইপস’কে বলছেন যে, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি চিন্তিত যে, দক্ষিণ চীন সাগর, মালাক্কা প্রণালি, মালয় দ্বীপপুঞ্জ এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় পারমাণবিক শক্তির আনাগোনা আরও দেশকে পারমাণবিক শক্তির দিকে আকর্ষণ করতে পারে। বিশেষ করে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মত দেশগুলি, যেগুলি এই মুহুর্তে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে না, তারাও এব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। এই পুরো ব্যাপারটা সংঘাতের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ চীন তার আঞ্চলিক অবস্থানকে ধরে রাখতে চেষ্টা করবে এবং চাপের মুখে তার শক্তি বৃদ্ধি করতে বাধ্য হবে।
সিঙ্গাপুরের সরকারি গবেষণা সংস্থা ‘ইসেয়াস ইউসোফ ইসহাক ইন্সটিটিউট’এর সিনিয়র ফেলো উইলিয়াম চুং এবং শ্যারন সেয়া ‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় বলছেন যে, যখন ‘আসিয়ান’এর বাইরের দেশগুলি অত্র অঞ্চলের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিচ্ছে, তখন বোঝা যায় যে, চীনা আগ্রাসী তৎপরতাকে নিয়ন্ত্রণে ‘আসিয়ান’ ব্যর্থ হয়েছে। ‘আসিয়ান’ মনে করছে যে, ‘কোয়াড’এর মতো জোট তৈরি হওয়া মানেই চীনকে আরও খেপিয়ে তোলা। তারা ‘আসিয়ান’এর শক্ত নেতৃত্ব দাবি করেন এবং বর্তমান নেতৃত্বের সমালোচনা করেন। ‘আসিয়ান’এর বর্তমান চেয়ারম্যান ব্রুনাইএর কার্যকলাপকেও তারা বিবৃতিসর্বস্ব বলে আখ্যা দেন। একইসাথে সংস্থার মাঝে এখন অনেক বিষয়েই বিরোধ; যার ফলশ্রুতিতে শুধু ছাড় দিয়েই চলতে হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে শীর্ষ বৈঠকে আমন্ত্রণ না জানানো হলেও তার একজন প্রতিনিধিকে সন্মেলনে আসার অনুমতি দেয়া হয়। একারণেই বাইডেন প্রশাসন ‘আসিয়ান’এর সমঝোতার জন্যে অপেক্ষা না করে সিঙ্গাপুর এবং ভিয়েতনামের মতো সদস্যদেশগুলির সাথে আলাদাভাবে সম্পর্ক তৈরি করছে। লেখকেরা বলছেন যে, দিন শেষে ‘আসিয়ান’ হয়তো কোনমতে চালিয়ে নেবে; কিন্তু এটা পরিষ্কার যে, ‘আসিয়ান’এর বয়স হয়েছে।
‘অকাস’ চুক্তি ‘আসিয়ান’এর মতো একটা সংস্থার অস্তিত্বকেই চ্যালেঞ্জ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র তার চীনকে নিয়ন্ত্রণের নীতিতে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিকে বাধ্য করছে এক পক্ষ নিতে। কিন্তু এই দেশগুলি অর্থনৈতিকভাবে অনেকাংশেই চীনের উপর নির্ভরশীল। এছাড়াও আরেক বাস্তবতার মাঝে রয়েছে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া। পূর্ব এশিয়ার প্রায় সবগুলি কৌশলগত সমুদ্রপথই এই দেশগুলির মাঝ দিয়ে গিয়েছে। কাজেই যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মাঝে যে কোন সম্ভাব্য সংঘাতে এই দেশগুলির উঠানই হয়ে উঠবে যুদ্ধক্ষেত্র। চীনের বেশি কাছে অবস্থিত হওয়ায় ফিলিপাইন এবং ভিয়েতনামের কাছে যখন চীনের হাত থেকে সমুদ্রসীমা উদ্ধার মূল লক্ষ্য, তখন মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া তাদের আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমাকে সংঘাতমুক্ত দেখতেই বেশি আগ্রহী। অর্থাৎ সংস্থার সদস্যদেশগুলির জাতীয় লক্ষ্য এখন সংস্থার সাথে একাত্মতা প্রকাশকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। একারণেই যুক্তরাষ্ট্র অত্র অঞ্চলে ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম এবং সিঙ্গাপুরের সাথে আলাদা সম্পর্ক তৈরিতে আগ্রহী হয়েছে। এমতাবস্থায় মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া নিজস্ব কৌশলগত দিকনির্দেশনা খুঁজবে। একইসাথে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবার সাথেসাথে অত্র অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে নতুন খেলোয়াড় যোগ হবে এবং নতুন নতুন কৌশলগত জোট তৈরি হবে।
Labels:
ASEAN,
AUKUS,
Australia,
China,
Geopolitics,
Global Britain,
Indonesia,
Malaysia,
New World Order,
Philippines,
USA,
Vietnam
Wednesday, 20 October 2021
বঙ্গোপসাগরে পশ্চিমা শক্তি প্রদর্শনের আসল উদ্দেশ্য কি?
২০শে অক্টোবর ২০২১
কয়েক মাস ধরে পূর্ব এশিয়ার সমুদ্রগুলি দাপিয়ে বেড়ানোর পর শক্তিশালী দেশগুলির যুদ্ধজাহাজগুলি মোটামুটিভাবে অক্টোবরের শুরু থেকেই বঙ্গোপসাগরে জড়ো হতে থাকে। প্রথমে আসে জাপানি নৌবাহিনীর বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘কাগা’ এবং ডেস্ট্রয়ার ‘মুরাসামে’। শ্রীলংকার ‘দ্যা আইল্যান্ড’ পত্রিকা বলে যে, ২রা অক্টোবর জাহাজদু’টা তিন দিনের জন্যে কলম্বো বন্দরে ভিড়ে। ‘দ্যা হিন্দু’ পত্রিকা বলে যে, ৬ই অক্টোবর থেকে ৮ই অক্টোবর জাপানি জাহাজগুলি ভারতীয় নৌবাহিনীর সাথে আরব সাগরে মহড়া দেয়। ‘জিমেক্স’ নামে আখ্যায়িত এই মহড়ায় ভারতীয় নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার ‘কোচি’ ফ্রিগেট ‘তেগ’, একটা ‘পি ৮আই’ প্যাট্রোল বিমান এবং ‘মিগ ১৯কে’ ফাইটার বিমান অংশ নেয়। জাপানের পর বঙ্গোপসাগরে হাজির হয় মার্কিন নৌবাহিনীর দৈত্যাকায় বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘কার্ল ভিনসন’। এর সাথে ছিল ক্রুজার ‘লেক শ্যাম্পলেইন’ এবং ডেস্ট্রয়ার ‘স্টকডেইল’। প্রায় একইসাথে বঙ্গোপসাগরে ঢোকে অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর ফ্রিগেট ‘বালারাট’ এবং সাপ্লাই জাহাজ ‘সিরিয়াস’। জাপান, যুক্তরাষ্ট্র এবং আস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর এই জাহাজগুলির উদ্দেশ্য ছিল ‘এক্সারসাইজ মালাবার ২০২১’। মহড়ার আরেক অংশগ্রহণকারী হলো ভারত। এই মহড়ার প্রথম ধাপ এবছরের অগাস্টে প্রশান্ত মহাসাগরে হয়ে গেছে; অক্টোবর মাসের ১২ থকে ১৫ তারিখ ছিল মহড়ার দ্বিতীয় ধাপ। ভারতের পক্ষ থেকে অংশ নেয় ডেস্ট্রয়ার ‘রণবিজয়’, ফ্রিগেট ‘সাতপুরা’, ‘পি ৮আই’ প্যাট্রোল বিমান এবং একটা সাবমেরিন। এই চারটা দেশ হলো সাম্প্রতিক সময়ে গঠন করা ‘কোয়াড’ কৌশলগত জোটের অংশ। সরাসরি না বলা হলেও সব মিডিয়াতেই বলা হচ্ছে যে, এই জোটের উদ্দেশ্য হলো ইন্দোপ্যাসিফিকে চীনকে নিয়ন্ত্রণ করা।
অস্ট্রেলিয়ার ফ্লোটিলা কমান্ডার রিয়ার এডমিরাল মার্ক হ্যামন্ড বলেন যে, এই মহড়ার মাধ্যমে তাদের যৌথ সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে; যার মাধ্যমে তারা ইন্দোপ্যাসিফিককে মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং প্রাণবন্ত রাখবেন। মার্কিন নৌবাহিনীর চিফ অব নেভাল অপারেশন্স এডমিরাল মাইক গিলডে বলছেন যে, মুক্ত ইন্দোপ্যাসিফিকের শক্তিশালী ঘাঁটি হলো ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্ব। তিনি আরও বলেন যে, কেউ যেন ভুল না করে যে, ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সবচাইতে কাছের কৌশলগত বন্ধুদের একটা। ‘কোয়াড’এর কোন ঘোষণাতেই বলা হয়নি যে, এই জোট চীনকে মাথায় রেখে তৈরি হয়েছে। তবে ভারতীয় মিডিয়ায় এই মহড়ার লক্ষ্য কি, তা কোন রাখঢাক না রেখেই প্রচার করা হয়। মূলতঃ চীনকে টার্গেট করেই এই মহড়া দেয়া হয় বলে উল্লেখ করে ‘টাইমস নাউ নিউজ’। বেইজিং ‘কোয়াড’ জোটের কর্মকান্ডের খেয়াল রাখছে বলে বলা হয়। গত মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘কোয়াড’ শীর্ষ বৈঠকে যোগ দিলে চীনা সরকার ভারতকে পশ্চিমাদের চিন্তার ফাঁদে না পড়ার আহ্বান জানায়।
ব্রিটিশরা কেন ‘মালাবার’এর বাইরে?
ব্রিটিশ রয়াল নেভিও একই সময়ে একই এলাকায় শক্তিশালী অবস্থান নেয়। ১১ই অক্টোবর সিঙ্গাপুরে অবস্থান নেয় ব্রিটিশ রয়াল নেভির বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘কুইন এলিজাবেথ’। কিন্তু জাহাজটা আপাততঃ ভারত মহাসাগরে ঢোকা থেকে বিরত থাকে। তবে এই জাহাজের নেতৃত্বে ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ২১’ বা ‘সিএসজি২১’ ফ্লিটের অংশ ফ্রিগেট ‘কেন্ট’কে পাঠানো হয় বঙ্গোপসাগরে। ১৪ই অক্টোবর জাহাজটা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে ঢোকে। ভারতীয় মিডিয়া ব্রিটিশদের পরিকল্পনার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল না। ১২ই অক্টোবর ‘দ্যা হিন্দু’ পত্রিকা মার্কিন এডমিরাল গিলডের বরাত দিয়ে বলে যে, ‘মালাবার’ মহড়া আরও বড় হবে কিনা, তা নির্ভর করবে ‘কোয়াড’ সদস্যদের সিদ্ধান্তের উপর। এর আগে ৩০শে সেপ্টেম্বর ‘টাইমস নাউ নিউজ’ বলে যে, ব্রিটিশ রয়াল নেভি ‘মালাবার’ মহড়ায় যুক্ত হবার জন্যে প্রস্তাব দিয়েছে। যদি ব্রিটেন এর অংশ হয়, তবে এর নাম হবে ‘এক্সারসাইজ ম্যারিন প্যাট্রোল’। এটা বাস্তবে রূপ নিলে প্রকৃতপক্ষে তা হবে ‘অকাস প্লাস টু’। অর্থাৎ সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং অস্ট্রেলিয়ার মাঝে স্বাক্ষরিত ‘অকাস’ কৌশলগত চুক্তির দেশগুলির সাথে ভারত এবং জাপানকেও যুক্ত করা হবে। ভারতীয়রা চিন্তা করতে থাকে যে, যেহেতু অক্টোবর মাসেই ব্রিটিশ রয়াল নেভির সাথে ভারতীয়দের একটা বড় মহড়া রয়েছে; তদুপরি তাদের অপর বন্ধু দেশ ফ্রান্স এবং রাশিয়া এব্যাপারটাকে কিভাবে দেখবে? মোটকথা, রয়াল নেভির ‘মালাবার’ মহড়ায় অংশ নেয়ার প্রস্তাব ভারতীয়দের বিচলিতই করেছিল। ‘কোয়াড’এ ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তার অংশ অস্ট্রেলিয়া সদস্য হিসেবে রয়েছে। ব্রিটেন হয়তো এতেই খুশি থাকবে। কারণ এতে ব্রিটেন ‘কোয়াড’এর শক্তি প্রদর্শনের বাইরে গিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে পারবে। যেমনটা তারা করেছে ‘মালাবার’এর সময় চট্টগ্রামে তাদের ফ্রিগেট ‘কেন্ট’কে পাঠিয়ে।
‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’ জানাচ্ছে যে, ‘মালাবার’ শেষ হবার প্রায় সাথেসাথেই ব্রিটিশ বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘কুইন এলিজাবেথ’ বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করে। এই জাহাজের গ্রুপ ভারতীয় তিন বাহিনীর সাথে মহড়ায় অংশ নেবে। ভারতীয় তিন বাহিনীর সাথে মহড়া এর আগ পর্যন্ত শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার সাথে হয়েছে। ব্রিটেন এখানে নতুন করে নাম লেখাতে যাচ্ছে। এই মহড়া চলবে অক্টোবরের ২১ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত ভারতের পশ্চিম উপকূলে আরব সাগরে। ভারতে ব্রিটিশ হাই কমিশনার এলেক্স এলিস বলছেন যে, ইন্দোপ্যাসিফিককে মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং উন্নত রাখতে ভারত অতি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও বলেন যে, ভারতে ব্রিটিশ বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের সফর দুই দেশের প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা সম্পর্কের গভীরতা বৃদ্ধিকে দেখিয়ে দেয়। ব্রিটেনের ফার্স্ট সী লর্ড এডমিরাল টনি রাডাকিন বলছেন যে, দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মহড়া কৌশলগত বন্ধুত্বকে আরও গভীর করবে।
আসল টার্গেট কে?
এতসব মহড়ার আয়োজন যদি চীনকে টার্গেট করেই হয়ে থাকে, তবে কিছু প্রশ্ন এসেই যায়। বঙ্গোপসাগর বা আরব সাগরে এখন পর্যন্ত চীনের কোন নৌঘাঁটি হয়নি। জিবুতিতে চীনা ঘাঁটিতে স্থায়ীভাবে কোন যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন নেই। চীনের যুদ্ধজাহাজ ভারত মহাসাগরে আসছে ঠিকই, কিন্তু তারা মার্কিন বা ব্রিটিশদের মতো শক্তি প্রদর্শনের ধারেকাছেও আসতে পারেনি। চীনারা এখন পর্যন্ত ভারত মহাসাগরে কোন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ কেন, একটা বিমানও মোতায়েন করতে সক্ষম হয়নি। তাহলে প্রশ্ন হলো, বঙ্গোপসাগরে এতসব বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের মহড়া কাকে টার্গেট করে? ভারত মহাসাগরে মাঝে মাঝে সফরে আসা চীনা নৌবাহিনীর জাহাজগুলি কি মার্কিন, ব্রিটিশ বা ভারতীয় নৌবাহিনীর বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের বহরকে হুমকির মাঝে ফেলছে?
‘কোয়াড’ সদস্যরা চীনের হুমকির কথা বলছে। কিন্তু ইন্দোপ্যাসিফিককে ‘মুক্ত’ রাখার কথা বলে বিশাল সামরিক শক্তির প্রদর্শন তো ভীতি প্রদর্শন ছাড়া কিছুই নয়। আর ভারতকে অপরিহার্য কৌশলগত বন্ধু বলে আখ্যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন উগ্রবাদী মোদি সরকারের মুসলিম নির্যাতনের ব্যাপারে চুপ করে থাকছে। বিজেপি সরকারের আসামে লাখো বাঙ্গালী মুসলিমদের বাস্তুচ্যুত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ১১ লক্ষ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুকে স্থান দেয়া পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে কি অর্থ বহণ করে সেটা দিল্লীর হিন্দুত্ববাদী সরকার যেমন জানে, তেমনি জানে লন্ডন এবং ওয়াশিংটন। একইসাথে ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ইতিহাসের জন্মদাতা ব্রিটেন অবশ্যই জানে যে দিল্লী সরকারের উগ্রবাদী কর্মকান্ড পুরো দক্ষিণ এশিয়াকে অস্থির করতে পারে। তারপরেও কেন দিল্লীকে এতটা আলিঙ্গন? এটা কি শুধু চীনকে নিয়ন্ত্রণের জন্যেই? যে চীনের বঙ্গোপসাগরে একটা প্যাট্রোল বোটও নেই? নাকি দক্ষিণ এশিয়াকে অস্থিতিশীল দেখতে চাওয়াটা ইন্দোপ্যাসিফিককে নিয়ন্ত্রণে রাখার বড় কৌশলের মাঝেই একটা অপশন? চীনকে নিয়ন্ত্রণ, নাকি ইন্দোপ্যাসিফিককে নিয়ন্ত্রণ? পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থা এখন ক্রান্তিলগ্নে। তাই ভূরাজনৈতিক সমীকরণে শুধু চীন নয়, পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার সম্ভাব্য বিকল্পকেও রাখতে হবে। কারণ চীন নয়, বরং পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার প্রতি হুমকিটাই যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনকে ইন্দোপ্যাসিফিকে এতটা আগ্রাসী আচরণ করাচ্ছে।
কয়েক মাস ধরে পূর্ব এশিয়ার সমুদ্রগুলি দাপিয়ে বেড়ানোর পর শক্তিশালী দেশগুলির যুদ্ধজাহাজগুলি মোটামুটিভাবে অক্টোবরের শুরু থেকেই বঙ্গোপসাগরে জড়ো হতে থাকে। প্রথমে আসে জাপানি নৌবাহিনীর বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘কাগা’ এবং ডেস্ট্রয়ার ‘মুরাসামে’। শ্রীলংকার ‘দ্যা আইল্যান্ড’ পত্রিকা বলে যে, ২রা অক্টোবর জাহাজদু’টা তিন দিনের জন্যে কলম্বো বন্দরে ভিড়ে। ‘দ্যা হিন্দু’ পত্রিকা বলে যে, ৬ই অক্টোবর থেকে ৮ই অক্টোবর জাপানি জাহাজগুলি ভারতীয় নৌবাহিনীর সাথে আরব সাগরে মহড়া দেয়। ‘জিমেক্স’ নামে আখ্যায়িত এই মহড়ায় ভারতীয় নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার ‘কোচি’ ফ্রিগেট ‘তেগ’, একটা ‘পি ৮আই’ প্যাট্রোল বিমান এবং ‘মিগ ১৯কে’ ফাইটার বিমান অংশ নেয়। জাপানের পর বঙ্গোপসাগরে হাজির হয় মার্কিন নৌবাহিনীর দৈত্যাকায় বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘কার্ল ভিনসন’। এর সাথে ছিল ক্রুজার ‘লেক শ্যাম্পলেইন’ এবং ডেস্ট্রয়ার ‘স্টকডেইল’। প্রায় একইসাথে বঙ্গোপসাগরে ঢোকে অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর ফ্রিগেট ‘বালারাট’ এবং সাপ্লাই জাহাজ ‘সিরিয়াস’। জাপান, যুক্তরাষ্ট্র এবং আস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর এই জাহাজগুলির উদ্দেশ্য ছিল ‘এক্সারসাইজ মালাবার ২০২১’। মহড়ার আরেক অংশগ্রহণকারী হলো ভারত। এই মহড়ার প্রথম ধাপ এবছরের অগাস্টে প্রশান্ত মহাসাগরে হয়ে গেছে; অক্টোবর মাসের ১২ থকে ১৫ তারিখ ছিল মহড়ার দ্বিতীয় ধাপ। ভারতের পক্ষ থেকে অংশ নেয় ডেস্ট্রয়ার ‘রণবিজয়’, ফ্রিগেট ‘সাতপুরা’, ‘পি ৮আই’ প্যাট্রোল বিমান এবং একটা সাবমেরিন। এই চারটা দেশ হলো সাম্প্রতিক সময়ে গঠন করা ‘কোয়াড’ কৌশলগত জোটের অংশ। সরাসরি না বলা হলেও সব মিডিয়াতেই বলা হচ্ছে যে, এই জোটের উদ্দেশ্য হলো ইন্দোপ্যাসিফিকে চীনকে নিয়ন্ত্রণ করা।
অস্ট্রেলিয়ার ফ্লোটিলা কমান্ডার রিয়ার এডমিরাল মার্ক হ্যামন্ড বলেন যে, এই মহড়ার মাধ্যমে তাদের যৌথ সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে; যার মাধ্যমে তারা ইন্দোপ্যাসিফিককে মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং প্রাণবন্ত রাখবেন। মার্কিন নৌবাহিনীর চিফ অব নেভাল অপারেশন্স এডমিরাল মাইক গিলডে বলছেন যে, মুক্ত ইন্দোপ্যাসিফিকের শক্তিশালী ঘাঁটি হলো ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্ব। তিনি আরও বলেন যে, কেউ যেন ভুল না করে যে, ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সবচাইতে কাছের কৌশলগত বন্ধুদের একটা। ‘কোয়াড’এর কোন ঘোষণাতেই বলা হয়নি যে, এই জোট চীনকে মাথায় রেখে তৈরি হয়েছে। তবে ভারতীয় মিডিয়ায় এই মহড়ার লক্ষ্য কি, তা কোন রাখঢাক না রেখেই প্রচার করা হয়। মূলতঃ চীনকে টার্গেট করেই এই মহড়া দেয়া হয় বলে উল্লেখ করে ‘টাইমস নাউ নিউজ’। বেইজিং ‘কোয়াড’ জোটের কর্মকান্ডের খেয়াল রাখছে বলে বলা হয়। গত মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘কোয়াড’ শীর্ষ বৈঠকে যোগ দিলে চীনা সরকার ভারতকে পশ্চিমাদের চিন্তার ফাঁদে না পড়ার আহ্বান জানায়।
ব্রিটিশরা কেন ‘মালাবার’এর বাইরে?
ব্রিটিশ রয়াল নেভিও একই সময়ে একই এলাকায় শক্তিশালী অবস্থান নেয়। ১১ই অক্টোবর সিঙ্গাপুরে অবস্থান নেয় ব্রিটিশ রয়াল নেভির বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘কুইন এলিজাবেথ’। কিন্তু জাহাজটা আপাততঃ ভারত মহাসাগরে ঢোকা থেকে বিরত থাকে। তবে এই জাহাজের নেতৃত্বে ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ২১’ বা ‘সিএসজি২১’ ফ্লিটের অংশ ফ্রিগেট ‘কেন্ট’কে পাঠানো হয় বঙ্গোপসাগরে। ১৪ই অক্টোবর জাহাজটা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে ঢোকে। ভারতীয় মিডিয়া ব্রিটিশদের পরিকল্পনার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল না। ১২ই অক্টোবর ‘দ্যা হিন্দু’ পত্রিকা মার্কিন এডমিরাল গিলডের বরাত দিয়ে বলে যে, ‘মালাবার’ মহড়া আরও বড় হবে কিনা, তা নির্ভর করবে ‘কোয়াড’ সদস্যদের সিদ্ধান্তের উপর। এর আগে ৩০শে সেপ্টেম্বর ‘টাইমস নাউ নিউজ’ বলে যে, ব্রিটিশ রয়াল নেভি ‘মালাবার’ মহড়ায় যুক্ত হবার জন্যে প্রস্তাব দিয়েছে। যদি ব্রিটেন এর অংশ হয়, তবে এর নাম হবে ‘এক্সারসাইজ ম্যারিন প্যাট্রোল’। এটা বাস্তবে রূপ নিলে প্রকৃতপক্ষে তা হবে ‘অকাস প্লাস টু’। অর্থাৎ সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং অস্ট্রেলিয়ার মাঝে স্বাক্ষরিত ‘অকাস’ কৌশলগত চুক্তির দেশগুলির সাথে ভারত এবং জাপানকেও যুক্ত করা হবে। ভারতীয়রা চিন্তা করতে থাকে যে, যেহেতু অক্টোবর মাসেই ব্রিটিশ রয়াল নেভির সাথে ভারতীয়দের একটা বড় মহড়া রয়েছে; তদুপরি তাদের অপর বন্ধু দেশ ফ্রান্স এবং রাশিয়া এব্যাপারটাকে কিভাবে দেখবে? মোটকথা, রয়াল নেভির ‘মালাবার’ মহড়ায় অংশ নেয়ার প্রস্তাব ভারতীয়দের বিচলিতই করেছিল। ‘কোয়াড’এ ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তার অংশ অস্ট্রেলিয়া সদস্য হিসেবে রয়েছে। ব্রিটেন হয়তো এতেই খুশি থাকবে। কারণ এতে ব্রিটেন ‘কোয়াড’এর শক্তি প্রদর্শনের বাইরে গিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে পারবে। যেমনটা তারা করেছে ‘মালাবার’এর সময় চট্টগ্রামে তাদের ফ্রিগেট ‘কেন্ট’কে পাঠিয়ে।
‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’ জানাচ্ছে যে, ‘মালাবার’ শেষ হবার প্রায় সাথেসাথেই ব্রিটিশ বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘কুইন এলিজাবেথ’ বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করে। এই জাহাজের গ্রুপ ভারতীয় তিন বাহিনীর সাথে মহড়ায় অংশ নেবে। ভারতীয় তিন বাহিনীর সাথে মহড়া এর আগ পর্যন্ত শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার সাথে হয়েছে। ব্রিটেন এখানে নতুন করে নাম লেখাতে যাচ্ছে। এই মহড়া চলবে অক্টোবরের ২১ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত ভারতের পশ্চিম উপকূলে আরব সাগরে। ভারতে ব্রিটিশ হাই কমিশনার এলেক্স এলিস বলছেন যে, ইন্দোপ্যাসিফিককে মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং উন্নত রাখতে ভারত অতি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও বলেন যে, ভারতে ব্রিটিশ বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের সফর দুই দেশের প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা সম্পর্কের গভীরতা বৃদ্ধিকে দেখিয়ে দেয়। ব্রিটেনের ফার্স্ট সী লর্ড এডমিরাল টনি রাডাকিন বলছেন যে, দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মহড়া কৌশলগত বন্ধুত্বকে আরও গভীর করবে।
আসল টার্গেট কে?
এতসব মহড়ার আয়োজন যদি চীনকে টার্গেট করেই হয়ে থাকে, তবে কিছু প্রশ্ন এসেই যায়। বঙ্গোপসাগর বা আরব সাগরে এখন পর্যন্ত চীনের কোন নৌঘাঁটি হয়নি। জিবুতিতে চীনা ঘাঁটিতে স্থায়ীভাবে কোন যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন নেই। চীনের যুদ্ধজাহাজ ভারত মহাসাগরে আসছে ঠিকই, কিন্তু তারা মার্কিন বা ব্রিটিশদের মতো শক্তি প্রদর্শনের ধারেকাছেও আসতে পারেনি। চীনারা এখন পর্যন্ত ভারত মহাসাগরে কোন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ কেন, একটা বিমানও মোতায়েন করতে সক্ষম হয়নি। তাহলে প্রশ্ন হলো, বঙ্গোপসাগরে এতসব বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের মহড়া কাকে টার্গেট করে? ভারত মহাসাগরে মাঝে মাঝে সফরে আসা চীনা নৌবাহিনীর জাহাজগুলি কি মার্কিন, ব্রিটিশ বা ভারতীয় নৌবাহিনীর বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের বহরকে হুমকির মাঝে ফেলছে?
‘কোয়াড’ সদস্যরা চীনের হুমকির কথা বলছে। কিন্তু ইন্দোপ্যাসিফিককে ‘মুক্ত’ রাখার কথা বলে বিশাল সামরিক শক্তির প্রদর্শন তো ভীতি প্রদর্শন ছাড়া কিছুই নয়। আর ভারতকে অপরিহার্য কৌশলগত বন্ধু বলে আখ্যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন উগ্রবাদী মোদি সরকারের মুসলিম নির্যাতনের ব্যাপারে চুপ করে থাকছে। বিজেপি সরকারের আসামে লাখো বাঙ্গালী মুসলিমদের বাস্তুচ্যুত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ১১ লক্ষ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুকে স্থান দেয়া পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে কি অর্থ বহণ করে সেটা দিল্লীর হিন্দুত্ববাদী সরকার যেমন জানে, তেমনি জানে লন্ডন এবং ওয়াশিংটন। একইসাথে ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ইতিহাসের জন্মদাতা ব্রিটেন অবশ্যই জানে যে দিল্লী সরকারের উগ্রবাদী কর্মকান্ড পুরো দক্ষিণ এশিয়াকে অস্থির করতে পারে। তারপরেও কেন দিল্লীকে এতটা আলিঙ্গন? এটা কি শুধু চীনকে নিয়ন্ত্রণের জন্যেই? যে চীনের বঙ্গোপসাগরে একটা প্যাট্রোল বোটও নেই? নাকি দক্ষিণ এশিয়াকে অস্থিতিশীল দেখতে চাওয়াটা ইন্দোপ্যাসিফিককে নিয়ন্ত্রণে রাখার বড় কৌশলের মাঝেই একটা অপশন? চীনকে নিয়ন্ত্রণ, নাকি ইন্দোপ্যাসিফিককে নিয়ন্ত্রণ? পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থা এখন ক্রান্তিলগ্নে। তাই ভূরাজনৈতিক সমীকরণে শুধু চীন নয়, পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার সম্ভাব্য বিকল্পকেও রাখতে হবে। কারণ চীন নয়, বরং পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার প্রতি হুমকিটাই যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনকে ইন্দোপ্যাসিফিকে এতটা আগ্রাসী আচরণ করাচ্ছে।
Labels:
Australia,
China,
Exercise Malabar,
Global Britain,
Ideological War,
India,
Japan,
New World Order,
Quad,
USA,
Western Civilization
Subscribe to:
Posts (Atom)









