Showing posts with label Philippines. Show all posts
Showing posts with label Philippines. Show all posts

Wednesday, 17 November 2021

চীনারা কি গুলি না চালিয়েই যুদ্ধ জিতে যাচ্ছে?

১৭ই নভেম্বর ২০২১

চীনা মাছ ধরার জাহাজের বহর। চীনারা মিলিশিয়া জাহাজগুলিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক অঞ্চলে পাঠিয়ে অন্য দেশের জাহাজকে সমস্যায় ফেলে বলতে পারে যে, এরা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আবার মিলিশিয়াদের কেউ হতাহত হলে চীনা সরকার তাদের নাগরিকদের রক্ষা করতে জনমত তৈরি করতে পারবে। চীনাদের এই ‘হাইব্রিড যুদ্ধে’র কোন প্রত্যুত্তর এখনও মার্কিনীরা দিতে পারেনি। উল্টো মার্কিন সহায়তা না পেয়ে ছোট দেশগুলি মার্কিন নেতৃত্বের প্রতি হতাশাই ব্যক্ত করেছে।


ফিলিপাইনের থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ফিলিপাইন কাউন্সিল ফর ফরেন রিলেশন্স’এর অবসরপ্রাপ্ত লেঃ জেনারেল এডিলবার্তো আদান ‘দ্যা ম্যানিলা টাইমস’এর এক লেখায় বলছেন যে, চীনারা সাগরে কোন গোলাগুলি ছাড়াই যুদ্ধ জিতে চলেছে। চীনারা ফিলিপাইনের ‘এক্সক্লুসিভ ইকনমিক জোন’ বা ‘ইইজেড’এর মাঝেই ভয় দেখিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করছে; যাকে তিনি ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। চীনা হুমকি মোকাবিলায় তিনি ফিলিপাইনের জন্যে শুধু বন্ধু বা পার্টনারই চাইছেন না, এমন কোন মিত্র চাইছেন, যে কিনা চীনারা আক্রমণ করলে ফিলিপাইনকে রক্ষা করতে যুদ্ধ করবে এবং চীনাদের ‘গ্রে জোন’ কৌশল মোকাবিলায় ফিলিপিনোদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। ‘গ্রে জোন’ হলো এমন একটা কৌশল, যার মাধ্যমে যুদ্ধ আর শান্তির মাঝে পার্থক্য নিরূপণ করা কঠিন হয়ে যায়। অর্থনৈতিক আগ্রাসন থেকে শুরু করে তথ্য যুদ্ধ, বাণিজ্য যুদ্ধ, হাল্কা প্রকৃতির কিছু সহিংস কর্মকান্ড এতে থাকতে পারে। এছাড়াও নতুন প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং সাইবার হামলার মাধ্যমে একটা দেশকে অকার্যকর করে ফেলা সম্ভব। ফিলিপাইনের সামরিক বাহিনীর প্রাক্তন ভাইস চিফ অফ স্টাফ জেনারেল আদান ফিলিপাইনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ৭০ বছর আগে স্বাক্ষরিত ‘মিউচুয়াল ডিফেন্স ট্রিটি’ বা ‘এমডিটি’কে বর্তমান প্রেক্ষাপটে পরিবর্তন করার পক্ষপাতি। ‘এমডিটি’ চুক্তিকে আগ্রাসী রাষ্ট্রের অপ্রচলিত এবং ‘হাইব্রিড’ কৌশলের বিরুদ্ধে ডিটারেন্ট হিসেবে কাজ করতে হবে। ফিলিপাইনের উপর প্রচলিত সামরিক হামলা হলে চুক্তি মোতাবেক যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দেবে। কিন্তু ‘গ্রে জোন’ কৌশল অবলম্বণ করার ফলে চীনারা ‘এমডিটি’ চুক্তিকে বাইপাস করতে পারছে। এই ‘হাইব্রিড যুদ্ধে’ চীনারা তাদের ‘ম্যারিটাইম মিলিশিয়া’কে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে; যারা মূলতঃ সরকারি বাহিনী। ফিলিপাইনের জাহাজে ধাক্কা দেয়া এবং দল বেঁধে চীনা জাহাজের ইইজেডএর ভিতরে ঢুকে অবস্থান করার মতো ঘটনার ব্যাপারে ফিলিপাইন সরকার বেইজিংএর কাছে প্রতিবাদ করেছে; কিন্তু তাতে কোন কাজ হয়নি। জেনারেল আদান বলছেন যে, একারণেই ফিলিপাইনের উচিৎ ‘এমডিটি’র মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চাওয়া।

গত মার্চে ২’শ চীনা মাছ ধরার ট্রলার একত্রে দক্ষিণ চীন সাগরে ফিলিপাইনের কাছাকাছি এসে হাজির হয়। ফিলিপাইন বলছে যে, সেই জায়গা ফিলিপাইনের ইইজেডএর মাঝে পড়ে। তাদের কথায়, ট্রলারগুলি দেখে মনে হয় না যে, এগুলি মাছ ধরতে এসেছে। এগুলি বরং চীনের ‘ম্যারিটাইম মিলিশিয়া’ দ্বারা পরিচালিত। ‘বিবিসি’ বলছে যে, পাঁচ বছর আগে আন্তর্জাতিক আদালত দক্ষিণ চীন সাগরের ৯০ শতাংশ এলাকাকে চীনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে বলে রায় দেয়। তবে বেইজিং তাদের নিজেদের আঁকা ‘নাইন ড্যাশ লাইন’এর মাঝে সকল সমুদ্রাঞ্চলকে নিজেদের বলে দাবি করে। এই অঞ্চলের মাঝে চীনারা কৃত্রিমভাবে দ্বীপ উন্নয়ন করেছে এবং নিয়মিত সামরিক প্যাট্রোলের ব্যবস্থা করেছে। এর আগে ২০১৯এর ডিসেম্বরে ইন্দোনেশিয়ার কাছে নতুনা সাগরে চীনা মাছ ধরার ট্রলারের বড় একটা বহর কোস্ট গার্ডের জাহাজের পাহাড়ায় হানা দেয়। ইন্দোনেশিয়ার সরকার এই হুমকি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে নৌবাহিনীর জাহাজ প্রেরণ করে। কিন্তু উভয় পক্ষ সমুদ্রে বেশ কিছুদিন ধরে উত্তেজনাকর অবস্থানে থাকে। পরবর্তীতে ইন্দোনেশিয়া সেই অঞ্চলে নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় নিজেদের মাছ ধরার জাহাজের বহর মোতায়েনের পরিকল্পনা শুরু করে বলে দেশটার মিডিয়া ‘মঙ্গাবে’ জানায়।

শুধু কাছের সমুদ্রেই নয়, চীনারা পাড়ি জমিয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কিঃমিঃ দূরের দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে। ২০২০এর সেপ্টেম্বরে প্রায় ৩’শ চীনা মাছ ধরার জাহাজ হাজির হয় দক্ষিণ আমেরিকার পেরুর সমুদ্রসীমায়। ‘ভয়েস অব আমেরিকা’র এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, জাহাজগুলি গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের কাছে মাছ ধরার পর পেরুর উপকূলে হাজির হয়। ইকুয়েডরের নৌবাহিনীর অপারশনসএর কমান্ডার রিয়ার এডমিরাল ড্যানিয়েল গিনেজ বলেন যে, এভাবে মাছ ধরলে কিছু বিশেষ প্রজাতির মাছের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। চীনারা এখানে প্রতিবছরই মাছ ধরতে আসছে। একই বছরের জুন মাসে ৩’শ ৪০টা জাহাজ একত্রে গালাপাগোস এবং ইকুয়েডরের কাছে মাছ ধরতে এসেছিল। দক্ষিণ আমেরিকার পেরু এবং ইকুয়েডরের অর্থনীতি সামুদ্রিক মাছ ধরার উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। চীনাদের কর্মকান্ড এই দেশগুলির অর্থনীতিকে আঘাত করতে পারে। বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের হিসেবে এই দুই দেশ মিলে বছরে প্রায় ৪৫ লক্ষ টন মাছ ধরে; যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সমান। তবে চীনারা এক বছরে এরও চার গুণ মাছ ধরে। পুরো বিশ্বের মোট মৎস্য সম্পদের তিন ভাগের এক ভাগই চীনারা খাচ্ছে। লন্ডনের ‘ওভারসীজ ডেভেলপমেন্ট ইন্সটিটিউট’এর হিসেবে চীনাদের রয়েছে প্রায় ১৭ হাজার জাহাজের বিশাল মাছ ধরার বহর। তাদের জাহাজের আকৃতিও বড় হচ্ছে। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ লাইবেরিয়ার উপকূলে চীনারা ৬টা জাহাজ পাঠিয়েছে বলে ২০২০এর জুলাইএ আফ্রিকার মিডিয়াগুলি প্রতিবেদন করে। তারা বলে যে, এই জাহাজগুলি বছরে ১২ হাজার টন পর্যন্ত মাছ ধরতে সক্ষম, যা লাইবেরিয়ার স্বাভাবিক মাছ ধরার সক্ষমতার দুই গুণ!

সমুদ্র এখন চীনের অর্থনীতিতে অতি গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্র সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চীনাদের সাথে বাকিদের চলছে ব্যাপক দ্বন্দ্ব। প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলি চীনের কৌশলকে ‘গ্রে জোন’ বা ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ বলছে। সামরিক ম্যাগাজিন ‘মিলিটারি রিভিউ’এর এক লেখায় গবেষক শুজিয়ান লুও এবং জনাথন প্যানটার বলছেন যে, চীনারা তাদের ম্যারিটাইম মিলিশিয়া ব্যবহার করে ‘গ্রে জোন’ কর্মকান্ড চালাচ্ছে; কারণ পরিস্থিতি বুঝে বেইজিং বলতে পারে যে, এদের সাথে সরকারের কোন সম্পর্ক নেই। চীনারা মিলিশিয়া জাহাজগুলিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক অঞ্চলে পাঠিয়ে অন্য দেশের জাহাজকে সমস্যায় ফেলে বলতে পারে যে, এরা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আবার মিলিশিয়াদের কেউ হতাহত হলে চীনা সরকার তাদের নাগরিকদের রক্ষা করতে জনমত তৈরি করতে পারবে। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনারা ট্রলারের বহরের সাথে অনেক ক্ষেত্রেই কোস্ট গার্ডের জাহাজ পাঠায়। নৌবাহিনীর জাহাজ না পাঠিয়ে সাদা রঙএর কোস্ট গার্ডের জাহাজ পাঠানোটাও ‘গ্রে জোন’ কৌশলের অংশ। এই জাহাজগুলি স্বল্প অস্ত্রে সজ্জিত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি চীনা জাহাজগুলি অনেক নৌবাহিনীর ফ্রিগেটের চাইতেও বড়। প্রতিপক্ষের মাছ ধরার ট্রলার বা ছোট প্যাট্রোল বোটকে ধাক্কা দিয়ে ডুবিয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটছে। চীনাদের এই ‘হাইব্রিড যুদ্ধে’র কোন প্রত্যুত্তর এখনও মার্কিনীরা দিতে পারেনি। উল্টো মার্কিন সহায়তা না পেয়ে ছোট দেশগুলি মার্কিন নেতৃত্বের প্রতি হতাশাই ব্যক্ত করেছে।

Thursday, 21 October 2021

‘আসিয়ান’এর অস্তিত্বকেই চ্যালেঞ্জ করছে ‘অকাস’ চুক্তি

২১শে অক্টোবর ২০২১


 

‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং আস্ট্রেলিয়ার মাঝে কৌশলগত চুক্তি ‘অকাস’ স্বাক্ষরিত হবার পর থেকে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক জোট ‘এসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনস’ বা ‘আসিয়ান’এর সদস্য দেশগুলির মাঝে সিদ্ধান্তহীনতা দেখা দিয়েছে। জোটের সদস্য মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া যখন বলছে যে, এই চুক্তির ফলে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছের রাষ্ট্র ফিলিপাইন এই চুক্তিকে সমর্থন দিয়েছে।

গত ১২ই অক্টোবর মালয়েশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসামুদ্দিন হুসেইন পার্লামেন্টকে বলেন যে, মালয়েশিয়ার মূল লক্ষ্য হলো চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে শক্তির ব্যালান্স যাই থাকুক না কেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে রক্ষা করা। ‘আসিয়ান’এর সদস্য রাষ্ট্রদের চিন্তার মাঝে একটা সমঝোতাই কেবল এই দুই শক্তিশালী দেশকে মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে। জাপানের মিডিয়া ‘এনএইচকে’ বলছে যে, গত ১৭ই সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ইসমাঈল সাবরি ইয়াকব অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনকে বলেন যে, ‘অকাস’ চুক্তি দক্ষিণ চীন সাগরে অন্যান্য শক্তিকে আরও আগ্রাসী ভূমিকা নিতে উস্কে দিতে পারে। একই দিনে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয় যে, অত্র অঞ্চলে অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিয়ে ইন্দোনেশিয়া ভীষণভাবে চিন্তিত। মার্কিন সামরিক পত্রিকা ‘স্ট্রারস এন্ড স্ট্রাইপস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ১৬ই সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লী সিয়েন লুং অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে বলেন যে, এই চুক্তি আঞ্চলিক শান্তি এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে সহায়তা করবে এবং আঞ্চলিক কাঠামোকে সমর্থন দেবে। পরদিন ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডেলফিন লরেনজানা অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিটার ডাটনকে ফোন করে বলেন যে, অস্ট্রেলিয়ার অধিকার রয়েছে তার সাবমেরিন প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার; ফিলিপাইনও তার নিজস্ব অঞ্চলকে রক্ষা করতে সক্ষমতা তৈরি করছে। ২৩শে সেপ্টেম্বর ভিয়েতনামের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লে থি থু হাং নির্দিষ্ট না করেই বলেন যে, সকল রাষ্ট্রই শান্তি, স্থিতিশীলতা, সহযোগিতা এবং উন্নয়ন চায়। অস্ট্রেলিয়ার পারমাণবিক প্রযুক্তি কেনা নিয়ে তিনি বলেন যে, পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার হতে হবে শান্তিপূর্ণ এবং তা আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাজে লাগতে হবে।

থাইল্যান্ডের ‘চুলালংকর্ন ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর থিতিনান পংসুধিরাক ‘ব্যাংকক পোস্ট’এর এক লেখায় মত দিচ্ছেন যে, ‘অকাস’ চুক্তি চীনকে যেমন উস্কে দেবে, তেমনি ‘আসিয়ান’কে আরও বিভক্ত করবে। একইসাথে এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র অস্ট্রেলিয়াকে পারমাণবিক সাবমেরিন সরবরাহ করলে ইইউ এবং জাপানসহ অন্যান্য শক্তিশালী দেশগুলিও চ্যালেঞ্জের মাঝে পড়ে যাবে। পংসুধিরাকের সাথে একমত নন থাইল্যান্ডের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কাভি চংকিত্তাভর্ন। একই পত্রিকার এক লেখায় তিনি বলছেন যে, একসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন অত্র অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে; এখন করছে চীন। তিনি বলেন যে, ‘আসিয়ান’ যদি সময়োচিত সিদ্ধান্ত নিতে না পারে, তবে সংস্থার আকাত্মতায় সমস্যা হবে। গত পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা বলছে যে, ‘আসিয়ান’এর সক্ষমতা রয়েছে টিকে থাকার। এর আগেও বিভিন্ন ইস্যুতে এর সদস্য দেশগুলির কেউ কেউ ভিন্ন পথে হাঁটার চেষ্টা করেছে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সংস্থায় ভাঙ্গন ধরাতে পারেনি।

নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে কাজ করা মার্কিন নিরাপত্তা বিশ্লেষক পল বিউকানান ‘স্টারস এন্ড স্ট্রাইপস’কে বলছেন যে, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি চিন্তিত যে, দক্ষিণ চীন সাগর, মালাক্কা প্রণালি, মালয় দ্বীপপুঞ্জ এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় পারমাণবিক শক্তির আনাগোনা আরও দেশকে পারমাণবিক শক্তির দিকে আকর্ষণ করতে পারে। বিশেষ করে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মত দেশগুলি, যেগুলি এই মুহুর্তে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে না, তারাও এব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। এই পুরো ব্যাপারটা সংঘাতের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ চীন তার আঞ্চলিক অবস্থানকে ধরে রাখতে চেষ্টা করবে এবং চাপের মুখে তার শক্তি বৃদ্ধি করতে বাধ্য হবে।

সিঙ্গাপুরের সরকারি গবেষণা সংস্থা ‘ইসেয়াস ইউসোফ ইসহাক ইন্সটিটিউট’এর সিনিয়র ফেলো উইলিয়াম চুং এবং শ্যারন সেয়া ‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় বলছেন যে, যখন ‘আসিয়ান’এর বাইরের দেশগুলি অত্র অঞ্চলের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিচ্ছে, তখন বোঝা যায় যে, চীনা আগ্রাসী তৎপরতাকে নিয়ন্ত্রণে ‘আসিয়ান’ ব্যর্থ হয়েছে। ‘আসিয়ান’ মনে করছে যে, ‘কোয়াড’এর মতো জোট তৈরি হওয়া মানেই চীনকে আরও খেপিয়ে তোলা। তারা ‘আসিয়ান’এর শক্ত নেতৃত্ব দাবি করেন এবং বর্তমান নেতৃত্বের সমালোচনা করেন। ‘আসিয়ান’এর বর্তমান চেয়ারম্যান ব্রুনাইএর কার্যকলাপকেও তারা বিবৃতিসর্বস্ব বলে আখ্যা দেন। একইসাথে সংস্থার মাঝে এখন অনেক বিষয়েই বিরোধ; যার ফলশ্রুতিতে শুধু ছাড় দিয়েই চলতে হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে শীর্ষ বৈঠকে আমন্ত্রণ না জানানো হলেও তার একজন প্রতিনিধিকে সন্মেলনে আসার অনুমতি দেয়া হয়। একারণেই বাইডেন প্রশাসন ‘আসিয়ান’এর সমঝোতার জন্যে অপেক্ষা না করে সিঙ্গাপুর এবং ভিয়েতনামের মতো সদস্যদেশগুলির সাথে আলাদাভাবে সম্পর্ক তৈরি করছে। লেখকেরা বলছেন যে, দিন শেষে ‘আসিয়ান’ হয়তো কোনমতে চালিয়ে নেবে; কিন্তু এটা পরিষ্কার যে, ‘আসিয়ান’এর বয়স হয়েছে।

‘অকাস’ চুক্তি ‘আসিয়ান’এর মতো একটা সংস্থার অস্তিত্বকেই চ্যালেঞ্জ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র তার চীনকে নিয়ন্ত্রণের নীতিতে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিকে বাধ্য করছে এক পক্ষ নিতে। কিন্তু এই দেশগুলি অর্থনৈতিকভাবে অনেকাংশেই চীনের উপর নির্ভরশীল। এছাড়াও আরেক বাস্তবতার মাঝে রয়েছে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া। পূর্ব এশিয়ার প্রায় সবগুলি কৌশলগত সমুদ্রপথই এই দেশগুলির মাঝ দিয়ে গিয়েছে। কাজেই যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মাঝে যে কোন সম্ভাব্য সংঘাতে এই দেশগুলির উঠানই হয়ে উঠবে যুদ্ধক্ষেত্র। চীনের বেশি কাছে অবস্থিত হওয়ায় ফিলিপাইন এবং ভিয়েতনামের কাছে যখন চীনের হাত থেকে সমুদ্রসীমা উদ্ধার মূল লক্ষ্য, তখন মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া তাদের আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমাকে সংঘাতমুক্ত দেখতেই বেশি আগ্রহী। অর্থাৎ সংস্থার সদস্যদেশগুলির জাতীয় লক্ষ্য এখন সংস্থার সাথে একাত্মতা প্রকাশকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। একারণেই যুক্তরাষ্ট্র অত্র অঞ্চলে ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম এবং সিঙ্গাপুরের সাথে আলাদা সম্পর্ক তৈরিতে আগ্রহী হয়েছে। এমতাবস্থায় মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া নিজস্ব কৌশলগত দিকনির্দেশনা খুঁজবে। একইসাথে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবার সাথেসাথে অত্র অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে নতুন খেলোয়াড় যোগ হবে এবং নতুন নতুন কৌশলগত জোট তৈরি হবে।

Sunday, 3 May 2020

করোনা পরিস্থিতিতেও অস্ট্রেলিয়ার শিপইয়ার্ডগুলি ব্যস্ত কেন?

৪ঠা মে ২০২০
   
এপ্রিল ২০২০; করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারির মাঝেও অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর জন্যে ‘আরাফুরা-ক্লাস’এর অফশোর প্যাট্রোল ভেসেলের কীল লেইং। এই জাহাজগুলি অস্ট্রেলিয়ার ৮০ বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধজাহাজ তৈরির পরিকল্পনার অংশ। জাহাজগুলি অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীকে নতুন ধরনের সক্ষমতা দেবে; যা কিনা দেশটার নিরাপত্তা চিন্তাকেই প্রতিফলিত করে। দক্ষিণ চীন সাগর এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনকে মোকাবিলায় এই জাহাজগুলি সমমনা দেশের জাহাজগুলির সাথে সমুদ্র নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করবে।

অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা দপ্তর ২৭শে মার্চ ঘোষণা দেয় যে, রয়াল অস্ট্রেলিয়ান নেভির জন্যে ১২টা অফশোর প্যাট্রোল ভেসেলের তৃতীয়টার কাজ শুরু হয়েছে। দ্বিতীয়টার কাজ শুরু হয় ৯ই এপ্রিল। অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিন্ডা রেইনল্ডস বলেন যে, ২০২২ সালে এই জাহাজগুলির প্রথমটা পাবার সাথে সাথে অস্ট্রেলিয়া নতুন ধরনের এক সক্ষমতা পেতে যাচ্ছে। প্রায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পে ৮০ মিটার লম্বা ১৬’শ টনের এই জাহাজগুলি জার্মান কোম্পানি ‘লুরসেন’এর ডিজাইনে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার ‘এএসসি’ শিপইয়ার্ড এবং পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার ‘সিভমেক’ শিপইয়ার্ডে তৈরি হচ্ছে। ‘লুরসেন’ শুধু জাহাজই তৈরি করছে না, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় শিপইয়ার্ডটাও তারা তৈরি করছে। প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘আইএইচএস জেনস’ বলছে যে, এই জাহাজগুলি বিভিন্ন মিশন প্যাকেজ বহন করার মাধ্যমে কয়েক ধরনের বিশেষায়িত কাজ করতে সক্ষম হবে। অস্ট্রেলিয়ার সরকার দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার ‘এএসসি’ শিপইয়ার্ডকে ব্রিটিশ কোম্পানি ‘ব্রিটিশ এরোস্পেস সিস্টেমস’এর কাছে বিক্রি করে দেয় আরেকটা বড় প্রকল্পের অংশ হিসেবে। এই শিপইয়ার্ডে তৈরি হতে যাচ্ছে ৯টা ‘হান্টার-ক্লাস’ ফ্রিগেট, যা ‘টাইপ-২৬’ নামে ব্রিটিশ রয়াল নেভির জন্যে ৮টা এবং ‘রয়াল কানাডিয়ান নেভি’র জন্যে ১৫টা তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে এই জাহাজের ডিজাইন এবং প্রোটোটাইপ তৈরির কাজ চলছে। প্রথম জাহাজটার কাজ শুরু হবে ২০২২ সালে। ২৬ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পে ৫ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে; যার মাঝে ১ হাজার গ্র্যাজুয়েট কর্মী থাকবে। এই দুই প্রকল্প ছাড়াও ৫০ বিলিয়ন ডলারের আরেক প্রকল্পের অধীনে তৈরি হচ্ছে ১২টা ‘এটাক-ক্লাস’ সাবমেরিন। ফরাসী কোম্পানি ‘নেভাল গ্রুপ’এর ডিজাইনে এই সাবমেরিনগুলিও তৈরি হবে অস্ট্রেলিয়াতে। বর্তমানে এর ডিজাইনের কাজ চলছে ফ্রান্সে। করোনাভাইরাসের লকডাউনের মাঝেও অস্ট্রেলিয়ার শিপইয়ার্ডগুলিতে কাজ চলছে সমানে। বাজেটেরও কোন ঘাটতি নেই। কেন এতগুলি জাহাজ তৈরি করছে তারা? কি ধরনের সক্ষমতার কথাইবা বলছিলেন অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী? একসাথে প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ প্রকল্পগুলির নেপথ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা নীতি।

অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা নীতি

২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার সরকার ‘ডিফেন্স হোয়াইট পেপার’ নামে একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করে; যেখানে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সামনের দিনগুলিতে প্রতিরক্ষা বাজেট ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করার কথা বলা হয়। এতে ২০২৫-২৬ সাল নাগাদ অস্ট্রেলিয়ার সামরিক বাজেট দাঁড়াবে প্রায় ৫৯ বিলিয়ন ডলার, যা ২০১৬-১৭ সালে ছিল ৩২ বিলিয়ন। জিডিপির ২ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করার প্রত্যয় ব্যক্ত করার সাথে সাথে নৌবাহিনীর শক্তিকে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করার কথা বলা হয়। অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল বলেন যে, যেহেতু অস্ট্রেলিয়া একটা দ্বীপ দেশ, তাই তার একটা শক্তিশালী নৌবাহিনী থাকা বাধ্যতামূলক। বর্তমানে নৌবাহিনীর ‘কলিন্স-ক্লাস’এর ৬টা সাবমেরিনকে প্রতিস্থাপন করে ‘এটাক-ক্লাস’এর ১২টা সাবমেরিন কেনার কথা বলা হয়, যাতে খরচ হবে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে ৮টা ‘এনজাক-ক্লাস’এর ফ্রিগেটকে প্রতিস্থাপন করতে ৯টা নতুন ফ্রিগেট তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়াও ১২টা নতুন অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল, ৭টা ‘পি-৮এ’ ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান, ৭২টা ‘এফ-৩৫এ’ স্টেলথ যুদ্ধবিমান এবং ১২টা ‘ইএ-১৮জি গ্রাউলার’ ইলেকট্রনিক এটাক বিমান ক্রয় করার কথা বলা হয়।

‘হোয়াইট পেপার’এ মূলতঃ যে চ্যালেঞ্জগুলির কথা বলা হয়, সেগুলি হলো, প্রথমতঃ চীন-মার্কিন দ্বন্দ্ব; দ্বিতীয়তঃ জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন দেশের মাঝে প্রতিযোগিতার কারণে আন্তর্জাতিক আইনের উপরে ভিত্তি করে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক ব্যবস্থার দুর্বল হওয়া; তৃতীয়তঃ সন্ত্রাসবাদ বৃদ্ধি; চতুর্থতঃ সম্পদের অসম বন্টন, সামাজিক অসঙ্গতি ও জলবায়ুগত কারণে অত্র অঞ্চলের কিছু দেশের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে; পঞ্চমতঃ অনেকগুলি দেশের সমরশক্তির সক্ষমতার ব্যাপক বৃদ্ধি; আর ষষ্ঠতঃ সাইবারস্পেসে হামলার আশংকা বৃদ্ধি। অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব ভূখন্ডে আরেকটা দেশের সামরিক হামলার আশংকা না থাকলেও অন্য কোন স্থানে অস্ট্রেলিয়ার স্বার্থ হুমকির মাঝে পড়লে সেখানে হস্তক্ষেপের কথা বলা হয়। বৈশ্বিক শক্তি অনেকগুলি দেশের হাতে ছড়িয়ে যাওয়ায় অনিশ্চয়তা বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। সমুদ্রসীমা এবং প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির মাঝে প্রতিযোগিতা উত্তেজনার কারণ হতে পারে; এবং সকলেই সমান্তরালে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির কারণে অত্র অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ব্যাহত করতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের মাঝে দ্বন্দ্ব সামনের দিনগুলিতে নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হবে বলে প্রতিবেদনটাতে বলা হয়। এতে আরও বলা হয় যে, দুই দশকের মাঝে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সারা দুনিয়ার অর্ধেক সাবমেরিন অপারেট করবে; আর এই অঞ্চলের দেশগুলির হাতে থাকবে দুনিয়ার অর্ধেক আধুনিক যুদ্ধবিমান। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের সরাসরি যুদ্ধের আশঙ্কা না থাকলেও পূর্ব চীন সাগর, দক্ষিণ চীন সাগর, সাইবারস্পেস এবং মহাকাশে এই দেশগুলির দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পাবে বলে বলা হয়।

‘হোয়াইট পেপার’এ লক্ষ্য হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমুদ্রের নিরাপত্তায় অংশ নেয়ার কথা বলা হয়। একইসাথে পপুয়া নিউ গিনি, তিমর-লেস্তে এবং প্রশান্ত মহাসাগরী দ্বীপ দেশগুলির নিজেদের নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে অস্ট্রেলিয়া তাদের প্রধান নিরাপত্তা সহযোগী হতে চায়। আরেকটা লক্ষ্য হিসেবে বলা হয় যে, আন্তর্জাতিক আইনের উপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক ব্যবস্থার প্রতি কোন হুমকি অস্ট্রেলিয়ার স্বার্থবিরুদ্ধ হলে যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশের সাথে অস্ট্রেলিয়া একত্রে হস্তক্ষেপ করবে।

ঠিক এই ব্যাপারটাই দেখা যায় ফিলিপাইনের নৌবাহিনীর জন্যে অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল ক্রয়ের প্রকল্পে। গত অগাস্টে ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষা সচিব ডেলফিন লরেনজানা ঘোষণা দেন যে, অস্ট্রেলিয় সরকারের অর্থায়নে ৬টা প্যাট্রোল ভেসেল ক্রয় করা হবে। অস্ট্রেলিয়ার ‘অস্টাল’ কোম্পানির ফিলিপাইন শিপইয়ার্ডে এই জাহাজগুলি তৈরি হবে বলে বলা হয়। প্রায় ৫’শ ৭১ মিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পে ফিলিপাইনের আপাততঃ কোন অর্থ বিনিয়োগ দরকার নেই। চীনকে মোকাবিলায় এই জাহাজগুলি নিঃসন্দেহে ভূমিকা রাখবে। দক্ষিণ চীন সাগরে অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর জাহাজগুলি যেসকল দেশের নৌবাহিনীর সাথে কাজ করবে বলে বলা হচ্ছে, তার একটা হলো ফিলিপাইন।
  
এপ্রিল ২০২০; দক্ষিণ চীন সাগরে টহল দিচ্ছে মার্কিন এম্ফিবিয়াস এসল্ট শিপ ‘আমেরিকা’, ক্রুজার ‘বাংকার হিল’ এবং ডেস্ট্রয়ার ‘ব্যারি’; সাথে অস্ট্রেলিয়ার ফ্রিগেট ‘পারামাত্তা’ (সর্ববামে)। প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজগুলিতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হওয়ায় দক্ষিণ চীন সাগরে টহল দেয়ার জন্যে মার্কিন সক্ষমতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে সর্বদাই কাছে পেলেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার ব্যাপারটা অস্ট্রেলিয়াকে ভাবাবে। এমনই একটা পরিস্থিতি পূর্ব এশিয়াতে ব্রিটেনের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে; যা কিনা অস্ট্রেলিয়া স্বাগত জানাবে।

অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে কে কি ভাবছে?

অন্যদিকে চীন অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা চিন্তাকে নিজেদের স্বার্থবিরুদ্ধ মনে করছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনয়িং সরাসরিই বলেন যে, দক্ষিণ চীন সাগর এবং চীনের সামরিক শক্তি নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাথা ঘামানোটা চীন ভালো চোখে দেখছে না। তিনি আশা করেন যে, বিভিন্ন দেশ অত্র এলাকায় সামরিক মহড়া এবং প্যাট্রোল দেয়া বন্ধ করবে এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করা বন্ধ করবে। অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা চিন্তার ব্যাপারে চীনের অসন্তোষ প্রকাশের উপর মন্তব্য করতে গিয়ে ‘অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি’র ‘স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ডিফেন্স স্টাডিজ সেন্টার’এর জন ব্ল্যাক্সল্যান্ড বলেন যে, চীন যে এধরণের কথাই বলবে, তা জানাই ছিল। বরং অত্র অঞ্চলের সব দেশই চীনের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে স্বাভাবিকভাবেই চিন্তিত।

যুক্তরাষ্ট্রের থিংকট্যাঙ্ক ‘হাডসন ইন্সটিটিউট’এর সিনিয়র ফেলো জন লী বলছেন যে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অস্ট্রেলিয়ার সাথে নিরাপত্তা সম্পর্কটাই যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। একই ধরনের আদর্শিক লক্ষ্য থাকার কারণে উভয় দেশই একত্রে কাজ করবে। অত্র অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়ার নৌশক্তি বেশ গুরুত্বপূর্ণ, যাকে যুক্তরাষ্ট্র নিজের পক্ষে রাখতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র চাইবে অস্ট্রেলিয়া এবং জাপানকে মার্কিন নেতৃত্বের অধীনে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়ার হিসেবে দেখতে। তিনি আরও বলছেন যে, যদি চীনের আগ্রাসী ভূমিকার কারণে জাপানের শক্তি বৃদ্ধি হয়, তাহলে চীনাদের এই কৌশলকে অনেকেই ভুল বলে গণ্য করতে পারেন। আর এই শক্তিগুলির সামষ্টিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলেই বেইজিংএর আগ্রাসী ভূমিকাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে। তবে জন লীর চিন্তায় বেইজিংকে চাপে ফেলে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার অধীনে নিয়ে আসার জন্যে যে চেষ্টার কথা বলা হয়েছে, সেটা চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধ, ‘ফাইভ-জি’ প্রযুক্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং সাম্প্রতিককালে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি নিয়ে কাদাছোঁড়াছুড়ির ফলে এখনও অসফল।

তবে চীনকে মোকাবিলায় অস্ট্রেলিয়া শুধু যুক্তরাষ্ট্রের উপরই নির্ভরশীল থাকতে চাইছে না। গত জুলাই মাসে লন্ডনে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ বা ‘আইআইএসএস’এর এক অনুষ্ঠানে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিন্ডা রেইনল্ডস বলেন যে, এশিয়া-প্যাসিফিক এলাকায় ব্রিটেনকে সামরিকভাবে আরও বেশি যুক্ত হতে হবে। তিনি বলেন যে, এটা সন্দেহাতীত যে, বর্তমানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে কৌশলগত পরিস্থিতিতে সবচাইতে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া বর্তমানে চীনের ব্যাপক সামরিকীকরণ এবং চীনের সাথে আশেপাশের দেশগুলির বিরোধ দেখতে পাচ্ছে। চীন এখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে এবং আন্তর্জাতিক আইনের উপর দাঁড়িয়ে থাকা বিশ্বব্যবস্থাকে দুর্বল করে ফেলছে। এমতাবস্থায় মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরের সাথে ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের ‘ফাইভ পাওয়ার ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’ বা ‘এফপিডিএ’ ব্যবহার করে চীনের সামরিক উত্থানের হুমকি মোকাবিলা করার কথা বলেন রেইনল্ডস। তিনি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ব্রিটিশ রয়াল নেভির জাহাজ মোতায়েনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান এবং সেখানে ব্রিটিশ সামরিক উপস্থিতিকে আরও বৃদ্ধি করার আহ্বান জানান। একইসাথে এব্যাপারে অস্ট্রেলিয়ার সহায়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। দুই দেশের সম্পর্কের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন যে, বিশ্বের খুব কম দু’টা দেশের মাঝেই ব্রিটেন এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো কাছাকাছি সম্পর্ক রয়েছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, ব্রিটেন এবং অস্ট্রেলিয়া একে অপরকে বিশ্বাস করে।

   
অস্ট্রেলিয়ার আশেপাশে প্রায় ১৪টার মতো ছোট দ্বীপ দেশকে অস্ট্রেলিয়া অর্থ এবং নিরাপত্তা সহায়তা দিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরিভাবে কৌশলগত; আর এর মূলে রয়েছে চীনের প্রভাব বিস্তারকে ঠেকানো। কার কতটুকু সহায়তা প্রয়োজন, সেই হিসেব করে কখনোই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।


প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বৈদেশিক সহায়তার কূটনীতি

সামরিক বাজেটের বাইরে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রনীতির আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো বৈদেশিক সহায়তা। গত বছরের জুনে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ ভ্রমণের সময় আড়াই’শ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দেবার প্রতিশ্রুতি দেন। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এই প্রতিশ্রুত অর্থ ১০ বছরে খরচ করা হবে। সাড়ে ছয় লক্ষ মানুষের এই দ্বীপপুঞ্জের জিডিপি প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার এবং মাথাপিছু গর আয় প্রায় ২ হাজার ৪’শ ডলার। ১০ বছরে আড়াই’শ মিলিয়ন ডলার দেশটার জন্যে খুব বেশি কিছু নয়। তবে গত ছয় বছরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল অস্ট্রেলিয়ার মোট বৈদেশিক সহায়তার ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৩৫ শতাংশ পাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার থিংকট্যাঙ্ক ‘লোয়ি ইন্সটিটিউট’এর জনাথন প্রাইক বলছেন যে, অস্ট্রেলিয়ার এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরিভাবে কৌশলগত; আর এর মূলে রয়েছে চীনের প্রভাব বিস্তারকে ঠেকানো। কার কতটুকু সহায়তা প্রয়োজন, সেই হিসেব করে কখনোই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। একারণেই দেখা যাবে যে, অস্ট্রেলিয়া তার বেশিরভাগ সহায়তা দিচ্ছে এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায়। এই এলাকাগুলিতেই অস্ট্রেলিয়ার প্রভাব এবং গুরুত্ব সবচাইতে বেশি।

২০১৭ সালে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ৪ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দানের ঘোষণার মাধ্যমে চীন অস্ট্রেলিয়ার নিজের উঠানেই অস্ট্রেলিয়াকে ছাড়িয়ে যেতে চাইছে। ঐ একই বছর অস্ট্রেলিয়া এই অঞ্চলের জন্যে মাত্র ৮’শ ১৫ মিলিয়ন ডলারের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অর্থাৎ চীন অস্ট্রেলিয়ার চার গুণ সহায়তা দিতে চাইছে। ২০১১ সাল থেকে ২০১৭ পর্যন্ত ছয় বছরে অস্ট্রেলিয়া এই অঞ্চলে সাড়ে ৬ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে; যেখানে চীন প্রায় সাত বছরে দিয়েছিল সোয়া ১ বিলিয়ন ডলার। ২০১১ থেকে ২০১৬এর মাঝে যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ এবং ফ্রান্স এখানে তাদের সহায়তা যথেষ্ট পরিমাণে কমিয়ে দিয়েছে।

মার্কিন মিডিয়া ‘সিএনএন’ বলছে যে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলিতে অস্ট্রেলিয়ার সহায়তা অর্থনৈতিক উন্নয়ন আনতে পারেনি। কারণ অস্ট্রেলিয়া সহায়তা দিয়েছে এমন সব সেক্টরে, যা অস্ট্রেলিয়রা মনে করছে দেয়া উচিৎ; যেমন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সুশাসন। অন্যদিকে চীনারা এই ছোট দেশগুলিকে জিজ্ঞেস করছে যে, তাদের কোন সেক্টরে বিনিয়োগ প্রয়োজন। এর ফলাফল হিসেবে খুব স্বাভাবিকভাবেই চীনারা এসব দেশে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন করছে। উদাহরণস্বরূপ, অস্ট্রেলিয়ার ঠিক উত্তরেই প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সবচাইতে বড় দ্বীপ পপুয়া নিউ গিনির কথা বলা যেতে পারে। ৮৬ লক্ষ মানুষের এই দেশের জিডিপি ২১ বিলিয়ন ডলার; মাথাপিছু গড় আয় আড়াই হাজার ডলার। তবে দেশটার জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করে। চীন মূলতঃ পপুয়া নিউ গিনিতেই সবচাইতে বড় বিনিয়োগ করছে। ২০১৭ সালে সেখানে চীনারা ৮৫ মিলিয়ন ডলার খরচে রাস্তা উন্নয়নের কাজ শেষ করেছে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া এ পর্যন্ত ২’শ ১৯ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে ভ্যাকসিন, স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং এইডসএর সংক্রমণ রোধে। অস্ট্রেলিয়ার বেশিরভাগ সহায়তা হলো অনুদান; চীনাদের বেশিরভাগ ঋণ। আইএমএফএর হিসেবে এই অঞ্চলের ১৪টা দেশের মাঝে ৬টাই ঋণের অর্থ ফেরত দেয়ার যোগ্যতা প্রায় হারিয়েছে; আরও ৩টা দেশ যোগ্যতা হারাবার পথে রয়েছে। সুতরাং এই দেশগুলিকে দেয়া চীনা ঋণের কি হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে শ্রীলংকা ঋণের অর্থ ফেরত দিতে না পারার পর চীনারা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নেয়ায় সেটা উদাহরণ হিসেবেই সামনে আসছে।    
জুন ২০১৭; চীনা নৌবাহিনীর কয়েকটা যুদ্ধজাহাজের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দ্বীপ দেশ ভানুয়াতু সফর। অস্ট্রেলিয়া তার আশেপাশের দ্বীপ দেশগুলিকে নিজের প্রভাবের অঞ্চল হিসেবে দেখে। একইসাথে অস্ট্রেলিয়ার সমুদ্র বাণিজ্য রুটগুলির কয়েকটা এই দ্বীপগুলির মাঝ দিয়ে যাবার কারণে অস্ট্রেলিয়ার কাছে এগুলির গুরুত্ব অপরিসীম। চীনারা এই দ্বীপগুলিতে প্রভাব বিস্তার শুরু করার অস্ট্রেলিয়ার সাথে চীনের দ্বন্দ্বও বৃদ্ধি পেয়েছে।

দ্বীপগুলির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব কেন?

পপুয়াতে রয়েছে স্বর্ণ, তামা, নিকেল, গ্যাস, ইত্যাদি খণিজ সম্পদ। একারণে সেখানে বিনিয়োগ করার যৌক্তিক কারণ রয়েছে চীনের জন্যে। আবার প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলিতে অনেক চীনারাও বসবাস করে; যারা বিভিন্ন সময়ে ব্যবসা করার জন্যে অথবা কাজের জন্যে সেখানে গিয়েছিল। তবে ‘সিএনএন’ বলছে যে, এই অঞ্চলে চীনের আনাগোণা বৃদ্ধির আরও বড় কারণ হতে পারে কূটনীতি। বিশ্বের মাত্র ১৬টা দেশ তাইওয়ানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে; এর মাঝে ৬টা দেশই হলো প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের। বহু বছর ধরেই চীনারা তাইওয়ানকে স্বীকৃতি দেয়া দেশগুলিকে নিজের পক্ষে নিয়ে আসার চেষ্টা চালাচ্ছে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পপুয়া নিউ গিনি তাদের দেশে তাইওয়ানের প্রতিনিধির বিভিন্ন কূটনৈতিক অধিকার কেড়ে নেবার পর তাইওয়ান অভিযোগ করে যে, চীনা সরকারের চাপের কারণেই পপুয়া এটা করেছে। গত সেপ্টেম্বরে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের সরকার তাইওয়ানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। চীন সলোমোনের সবচাইতে বড় বাণিজ্য সহযোগী; আর তারা চীনা বিনিয়োগ থেকেও বঞ্চিত হতে চায় না। ডিসেম্বরে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের রাজনীতিবিদদের বরাত দিয়ে ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ বলে যে, চীন এবং তাইওয়ান পাল্টাপাল্টি অবস্থানে থেকে তাদেরকে লক্ষ লক্ষ ডলার ঘুষ সেধেছে তাদের পক্ষে থাকার জন্যে।

তবে এই দ্বীপগুলি নিয়ে বিরোধের পিছনে আরেকটা কারণ হিসেবে ‘সিএনএন’ বলছে যে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় ১৪টা দেশের পুরো জনসংখ্যা একটা চীনা শহরের জনসংখ্যার সমান হলেও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে চীনের ভোট এবং এই দেশগুলির ভোট সমান ওজনের। সেই হিসেবে এই দেশগুলি তাদের আকৃতির তুলনায় চীন এবং অস্ট্রেলিয়ার কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর বাইরেও এই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়াবার পিছনেও চীনের আকাংক্ষা থাকতে পারে। ২০১৮ সালে ‘সিডনি মর্নিং হেরাল্ড’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্ব উপকূলের কাছে ভানুয়াতু দ্বীপের সাথে চীনের স্থায়ী সামরিক ঘাঁটির ব্যাপারে কথা হচ্ছে; যা উভয় দেশই অস্বীকার করে। ২০১৮ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইকনমিক এন্ড সিকিউরিটি রিভিউ কমিশন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনারা সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করতে পারলে পুরো এলাকায় চীনাদের নজরদারি করার সুযোগ সৃষ্টি হয়ে যাবে; আর তা অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের জন্যে হুমকি হওয়া ছাড়াও অত্র অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ঢোকা বা বের হওয়ায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার পাঁচটা গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের মাঝে তিনটাই প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল দিয়ে গিয়েছে। চীনারা এই বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি না করলেও ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই অস্ট্রেলিয়া হুমকির মাঝে পড়বে।

যা চিন্তা তা-ই কাজ। গত অগাস্টে অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিন্ডা রেইনল্ডস আনুষ্ঠানিকভাবে পপুয়া নিউ গিনির প্রায় ৩’শ কিঃমিঃ উত্তরে মানাস দ্বীপের ‘লোমব্রুম’এ নতুন নৌঘাঁটির প্রথম ধাপের উদ্ভোধন করেন। পপুয়ার সরকারের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী এই ঘাঁটি অস্ট্রেলিয় এবং মার্কিন নৌবাহিনী ব্যবহার করবে। লিন্ডা রেইনল্ডস বলেন যে, কৌশলগতভাবে এই ঘাঁটি সর্বদাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল; এখনও রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই দ্বীপে জাপানের বড় আকারের সামরিক ঘাঁটি ছিল। বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬ থেকে ১৯৭৪ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া এই ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণে ছিল। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয় সরকার ‘প্যাসিফিক ম্যারিটাইম সিকিউরিটি প্রোগ্রাম’এর আওতায় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৩টা দেশকে ২১টা ‘গার্ডিয়ান-ক্লাস’ প্যাট্রোল বোট অনুদান দিচ্ছে। এর আগে ১৯৮২ সালে জাতিসংঘের আইনে সকল দেশকে উপকূল থেকে ২’শ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সমুদ্রে ‘এক্সক্লুসিভ ইকনমিক জোন’এর অধিকার দেয়ার পর ১৯৮৫ এবং ১৯৯৭ সালের মাঝে অস্ট্রেলিয় সরকার ১২টা দেশকে ২২টা ‘প্যাসিফিক-ক্লাস’ প্যাট্রোল বোট তৈরি করে দান করেছিল। সেই বোটগুলিকে প্রতিস্থাপন করার লক্ষ্যেই ৩’শ ৩৫ মিলিয়ন ডলার খরচে ৪০ মিটার লম্বা এই বোটগুলি তৈরি করছে অস্ট্রেলিয়ার ‘অস্টাল’ শিপইয়ার্ড। এই দ্বীপ দেশগুলি থেকে যাতে ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান দিয়ে সমুদ্রে টহল বৃদ্ধি করা যায়, সেই প্রচেষ্টাও রয়েছে এই প্রকল্পের মাঝে।
   
নভেম্বর ২০১৮; পপুয়া নিউগিনির পোর্ট মোর্সবির উপকূলে ‘এপেক’ শীর্ষ বৈঠকের নিরাপত্তা দিচ্ছে রয়াল অস্ট্রেলিয়ান নেভির হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার ‘এডেলেইড’। পপুয়াতে এই বৈঠকের মাঝ দিয়ে অস্ট্রেলিয়া এবং চীনের দড়ি টানাটানির কিছুটা চিত্র পাওয়া যায়; যেখানে চীনারা চাইছিলো পোর্ট মোর্সবির উন্নয়নের চেহাড়া দেখাতে; আর অস্ট্রেলিয়া চাইছিলো দেখাতে যে, অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা সহায়তা ছাড়া অত্র অঞ্চলের দেশগুলি অসহায়।

২০১৮ সালের নভেম্বরে পপুয়া নিউ গিনির রাজধানী পোর্ট মোর্সবিতে ‘এশিয়া-প্যাসিফিক ইকনমিক কোঅপারেশন’ বা ‘এপেক’ ফোরামের শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স সহ ২১টা দেশের শীর্ষ নেতারা যোগ দেন। প্রায় ১৫ হাজার গেস্টের থাকার সংকুলান না হওয়ায় বন্দরে ৩টা ক্রুজ লাইনার জাহাজ ভিড়িয়ে রাখা হয়। এই বৈঠকের নিরাপত্তার খাতিরে যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান এবং স্পেশাল ফোর্সসহ প্রায় ৪ হাজার সেনা মোতায়েন করা হয়। ফিলিপাইনের মিডিয়া ‘র‍্যাপলার’ বলছে যে, এই বৈঠকের নিরাপত্তার দায়িত্বের পুরোটাই নেয় অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়া দেড় হাজার সেনাসহ রয়াল অস্ট্রেলিয়ান এয়ার ফোর্সের ‘এফএ-১৮ সুপার হর্নেট’ ফাইটার বিমান, ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান এবং নৌবাহিনীর হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার ‘এডেলেইড’কে মোতায়েন করে। অস্ট্রেলিয়ার সাথে নিউজিল্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রও এই নিরাপত্তা মিশনে অংশ নেয়। অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা থিংকট্যাঙ্ক ‘অস্ট্রেলিয়া ডিফেন্স এসোসিয়েশন’এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর নেইল জেমস বলেন যে, পপুয়া নিউ গিনির মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি যদি বিদেশী নিরাপত্তা বাহিনীকে নিজ দেশে আসতে দিতে না চায়, তাহলে তারা কখনোই ‘এপেক’এর মতো বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে সক্ষম হবে না। এটা কৌশলগত এবং রাজনৈতিক দিক থেকেও ভালো হবে না। তবে ‘এপেক’ বৈঠকের পিছনে অস্ট্রেলিয়া ছাড়াও চীনের অবদানও ছিল। বৈঠকের আগে চীনাদের অর্থায়নে পোর্ট মোর্সবির চেহাড়ার বেশ পরিবর্তন সাধিত হয়। চীনা অর্থে রাস্তা ও কনভেনশন সেন্টারের উন্নয়ন করা হয়; গেস্টদের আনা নেয়ার জন্যে কেনা হয় বাস। অনেকেই প্রশ্ন করেন যে, দেশের বহু মানুষের যখন মৌলিক চাহিদাই পূর্ণ হচ্ছে না, তখন পপুয়ার মানুষের কাছে এরকম জাঁকজমকের অর্থ কতটুকু? পপুয়াতে এই বৈঠকের মাঝ দিয়ে অস্ট্রেলিয়া এবং চীনের দড়ি টানাটানির কিছুটা চিত্র পাওয়া যায়; যেখানে চীনারা চাইছিলো পোর্ট মোর্সবির উন্নয়নের চেহাড়া দেখাতে; আর অস্ট্রেলিয়া চাইছিলো দেখাতে যে, অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা সহায়তা ছাড়া অত্র অঞ্চলের দেশগুলি অসহায়।

অস্ট্রেলিয়ার সবচাইতে বেশি বাণিজ্য এশিয়ার সাথে। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া থেকে পূর্ব এশিয়ায় যাবার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দু’টা নৌপথ পপুয়া নিউ গিনি এবং সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের মাঝ দিয়ে যায়। নিউ গিনি দ্বীপ ও নিউ ব্রিটেন দ্বীপের মাঝে দিয়ে দক্ষিণ রুটটা; আর নিউ ব্রিটেন ও সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত বোগেনভিল দ্বীপের মাঝ দিয়ে উত্তর রুটটা গিয়েছে। মানাস দ্বীপের নৌঘাঁটিটা এই দুই সমুদ্র বাণিজ্য রুটের ঠিক মাঝখানে হওয়ায় এর গুরুত্ব অপরিসীম। অন্যদিকে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার বন্দরগুলি থেকে জাহাজ মূলতঃ ইন্দোনেশিয়ার সুন্দা ও লম্বক প্রণালী এবং তিমর সাগর ও আরাফুরা সাগরের মাঝ দিয়ে যায়। এই পথগুলির উপর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া।

কিন্তু চীন থেকে অস্ট্রেলিয়া কতটুকু দূরে থাকবে?

অস্ট্রেলিয়ার ‘এসবিএস নিউজ’ জানাচ্ছে যে, চীন হলো অস্ট্রেলিয়ার সবচাইতে বড় বাণিজ্য সহযোগী। দুই দেশের মাঝে বাণিজ্য দেড়’শ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। অস্ট্রেলিয়ার মোট বাণিজ্যের ২৩ শতাংশই চীনের সাথে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র; যার সাথে বাণিজ্য ৬৪ বিলিয়ন ডলার; এরপর জাপানের সাথে ৬১ বিলিয়ন; দক্ষিণ কোরিয়া সাথে ৩২ বিলিয়ন; এবং ব্রিটেনের সাথে ২৯ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য। সিঙ্গাপুরের সাথেও বাণিজ্য যথেষ্ট। অস্ট্রেলিয়ার বেশিরভাগ বাণিজ্য পূর্ব এশিয়ার সাথেই। এখানকার বেশিরভাগ দেশের সাথেই অস্ট্রেলিয়ার রয়েছে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। ২০০৭ সালেই চীনারা অস্ট্রেলিয়ার সবচাইতে বড় বাণিজ্য সহযোগী হিসেবে জাপানকে অতিক্রম করে। অপরদিক থেকে অস্ট্রেলিয়া চীনের জন্যে সপ্তম বৃহত্তম বাণিজ্য সহযোগী। অস্ট্রেলিয়ার ‘মনাশ ইউনিভার্সিটি’র বাণিজ্য বিশ্লেষক জিওভানি ডে লিয়েতো বলছেন যে, অস্ট্রেলিয়ার সকল রপ্তানি পণ্যকে ‘পাথর এবং শস্য’এর মাঝে চিন্তা করা যায়। অর্থাৎ লৌহ আকরিক, কয়লা, স্বর্ণ এবং গ্যাস হলো খণিজ পণ্য; আর গরুর গোশত, পশম, তুলা, ছোলা, ডাল, গম, চিনি এবং মদ হলো কৃষিজ পণ্য। তবে অস্ট্রেলিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রার উৎস হলো শিক্ষা। লাখো শিক্ষার্থী অস্ট্রেলিয়াতে আসছে ইংরেজি শিখতে এবং উচ্চশিক্ষার্থে। পর্যটনেও বড় আয় রয়েছে আস্ট্রেলিয়ার। অন্যদিকে আমদানির কথা চিন্তা করলে অস্ট্রেলিয়রা বিদেশ ভ্রমণেই খরচ করে প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার; গাড়ি আমদানিতে যায় ২১ বিলিয়ন; পেট্রোলিয়াম পণ্যে ১৫ বিলিয়ন; টেলিকম যন্ত্রপাতিতে ১২ বিলিয়ন; আর পণ্য পরিবহণে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার।

গত বছরের জুনে চীনা নৌবাহিনীর তিনটা যুদ্ধজাহাজ অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বন্দর ঘুরে আসে। অস্ট্রেলিয়ার জনগণের কাছে ব্যাপারটা অদ্ভুত ঠেকলেও এটা নিশ্চিত যে চীনের সাথে কোনরূপ সহিংসতা অস্ট্রেলিয়ার বাস্তবতা নয়। তবে এটা পরিষ্কার যে, অস্ট্রেলিয়া অত্র অঞ্চলে তার নিরাপত্তাকে হাল্কাভাবে নিচ্ছে না। চীনকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনসহ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিকে সে পাশে চাইছে। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থানকে পাকাপোক্ত করতেই সে জাহাজ নির্মাণে বিনিয়োগ করছে। এই জাহাজ শুধু নিজের নৌবাহিনীর জন্যেই নয়; দক্ষিণ চীন সাগরের আশেপাশের দেশগুলির জন্যেও তৈরি করতে চাইছে তারা। একইসাথে অস্ট্রেলিয়া তার সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পপুয়া নিউগিনি এবং সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের মতো দেশগুলিকে আর্থিক এবং নিরাপত্তা সহায়তা দিয়ে নিজের সাথে রাখতে চাইছে। চীন অস্ট্রেলিয়ার সাথে সরাসরি সংঘাত না চাইলেও প্রভাব বিস্তারের খেলায় অস্ট্রেলিয়া যেমন তাইওয়ান ইস্যুতে চীনকে শান্তি দেবে না, তেমনি চীনও অস্ট্রেলিয়ার উঠানে ছোট দ্বীপদেশগুলিকে বিশাল বিনিয়োগের মাধ্যমে কিনে ফেলতে চাইবে। অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে সর্বদাই কাছে পেলেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার ব্যাপারটা অস্ট্রেলিয়াকে ভাবাবে। এমনই একটা পরিস্থিতি পূর্ব এশিয়াতে ব্রিটেনের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে; যা কিনা ব্রিটিশ কমোনওয়েলথের অন্তর্গত অস্ট্রেলিয়া স্বাগত জানাবে। ব্রিটেনের সাথে অস্ট্রেলিয়ার সম্পর্ক ঐতিহাসিক এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত। যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতার কারণে ব্রিটনের সাথে অস্ট্রেলিয়ার এই সম্পর্ক আরও গভীর হবে। এটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হবে যে, রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ অস্ট্রেলিয়ার নামমাত্র রানীই শুধু নন।

Sunday, 16 February 2020

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে ফিলিপাইন?

১৬ই ফেব্রুয়ারি ২০২০

   
ফিলিপাইন এখনই যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের উপর নির্ভরশীলতা কমলেও যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু রাষ্ট্রদের উপরে ফিলিপাইনের নির্ভরশীলতা যথেষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ফিলিপাইনের চুক্তি বাতিল হোক আর না হোক, ফিলিপাইন যে আগের মতো যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া নিরাপত্তার চাদরের মাঝে নিশ্চিন্ত থাকতে পারছে না, তা নিশ্চিত। 


গত ১১ই ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইন ঘোষণা দেয় যে, দুই দশক আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ফিলিপাইনের স্বাক্ষরিত একটা নিরাপত্তা চুক্তি তারা বাতিল করতে যাচ্ছে। ‘ভিজিটিং ফোর্সেস এগ্রিমেন্ট’ বা ‘ভিএফএ’ নামের এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপাইনে তাদের সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে পারতো। ফিলিপাইন যে এই চুক্তি বাতিল করবে, তার আভাস আগেই পাওয়া যাচ্ছিলো, যখন ২৩শে জানুয়ারি ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদরিগো দুতার্তে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন যে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপাইনের সিনেটর রোনাল্ড ডেলা রসার ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করে, তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ‘ভিএফএ’ চুক্তি বাতিল করবেন। ফিলিপাইনের অনলাইন মিডিয়া ‘র‍্যাপলার’ বলছে যে, সাংবাদিকদের সাথে এক টেলিকনফারেন্সে মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্র সচিব ক্লার্ক কুপার বলেন যে, এই চুক্তি বাতিল করা হলে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মাঝে প্রতি বছর যে ৩’শ যৌথ কর্মকান্ড চালিত হয়, তা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে তিনি আশা করেন যে, ফিলিপাইনের নীতিনির্ধারকদের মাঝে অনেকেই এসব যৌথ কর্মকান্ড বন্ধ করার বিপক্ষে থাকবেন। এই চুক্তি বাতিল করা হলে ২০১৪ সালে স্বাক্ষরিত ‘এনহান্সড ডিফেন্স কোঅপারেশন এগ্রিমেন্ট’ বা ‘ইডিসিএ’ চুক্তিও হুমকির মুখে পড়বে। ‘ইডিসিএ’এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপাইনে সৈন্য রাখা ছাড়াও কিছু সামরিক ঘাঁটিতে আগে থেকেই স্থাবর এবং অস্থাবর সম্পদ মজুত করে রাখে। তবে কুপার ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, ‘ভিএফএ’ চুক্তি বাতিল করা মানেই ‘ইডিসিএ’ বাতিল করা নয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিলিপাইন এখনও যথেষ্ট পরিমাণ অস্ত্র ক্রয় করছে। এমতাবস্থায় ১৯৫১ সালে দুই দেশের মাঝে স্বাক্ষরিত ‘মিউচুয়াল ডিফেন্স ট্রিটি’ হুমকির মাঝে পড়বে কিনা, এই প্রশ্নের জবাব কুপার এড়িয়ে যান।

দুতার্তে সিনেটর ডেলা রসার ভিসা নিয়ে যে হুমকি দিয়েছিলেন, তা ছিল ফিলিপাইনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েনের একটা অংশ। মার্কিন সিনেটে অনুমোদিত ‘গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি এক্ট’এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র দুতার্তের মাদকবিরোধী যুদ্ধের উপরে লাগাম টানতে চাইছিল। তবে মার্কিনীরা একইসাথে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার্থে সামরিক চুক্তিগুলিকে সমস্যায় ফেলতে চাইছিল না। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ বলছে যে, দুতার্তের সরকার চীনের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করে তাদের প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দূরত্ব তৈরি করছিল। ‘ভিএফএ’ চুক্তি বাতিল করে এই পথে আরও দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হচ্ছে ফিলিপাইন। এই ঘোষণা এমন সময়ে এলো, যখন দক্ষিণ চীন সাগরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা আরও গভীর হচ্ছে। ফিলিপাইন এক্ষেত্রে চীনের সাথে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলতে চাইছে।

    
ফিলিপাইনের নৌবাহিনীর দূরের সাগরে পাড়ি জমাবার আকাংক্ষা দেখিয়ে দেয় যে, দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সাথে সংঘাত তাদের উদ্দেশ্য নয়। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমার সাথেসাথে ফিলিপাইন তার নিজস্ব নিরাপত্তার জন্যে আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিকভাবে বন্ধু খুঁজছে; যেকারণে অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে তারা সাহস করছে। চীনকে নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ফিলিপাইনকে নিজের প্রভাব বলয়ে রাখতে ফিলিপিনোদের আরও সুযোগসুবিধা এবং ছাড় দিতে চাপের মাঝে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র।


সাম্প্রতিক সময়ে চীনের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন ছাড়াও ফিলিপাইন তার পররাষ্ট্রনীতিতে বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে। নীতির পরিবর্তনের অংশ হিসেবে গত এক দশকে ফিলিপাইন তার নৌশক্তিকে বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে। ২০১১ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ড থেকে ‘হ্যামিল্টন-ক্লাস’এর একটা পুরোনো জাহাজ পায় ফিলিপাইনের নৌবাহিনী। ৩ হাজার ২’শ টনের এই জাহাজখানা চার দশকের বেশি পুরোনো হলেও এটা ছিল ফিলিপাইনের প্রথম বড় আকারের যুদ্ধজাহাজ, যা ফিলিপাইনের নিজস্ব সমুদ্রসীমা পার হয়ে দূরের সমুদ্রে যেতে সক্ষম। এরকম মোট ৩টা জাহাজ তারা পায় যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ড থেকে। ২০১৪ সালে এমন একটা জাহাজ অস্ট্রেলিয়া যায় একটা নৌমহড়ায় অংশ নিতে। ২০১৩ সালে ইন্দোনেশিয়া থেকে ‘ম্যাকাসার-ক্লাস’এর ২টা বড় আকারের উভচর যুদ্ধজাহাজের ক্রয়াদেশ দেয় ফিলিপাইন। ২০১৭ সালের মাঝে ডেলিভারি পাওয়া সাড়ে ১১ হাজার টনের এই জাহাজগুলির একেকটা ৫’শ সৈন্য, তাদের অনেক যানবাহন এবং ২টি হেলিকপ্টার ১৩ হাজার কিঃমিঃ দূরের সমুদ্র উপকূলে নামিয়ে দিতে সক্ষম। ২০১৮ সালের অক্টোবরে এরকম একটা জাহাজ ’টারল্যাক’ রাশিয়ার ভ্লাডিভস্টক বন্দর এবং দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু আইল্যান্ড সফর করে; যা ছিল ফিলিপাইনের নৌবাহিনীর জন্যে দূরের সাগরে পাড়ি জমাবার নতুন এক অধ্যায়। ২০১৯এর জুলাই মাসে এরকম আরেকটা জাহাজ ‘দাভাও দেল সুর’ ৩’শ সেনা ও ক্রু এবং একটা হেলিকপ্টার নিয়ে রাশিয়ার ভ্লাডিভস্টক বন্দরে যায়। ২০১৮ সালের অগাস্টে ফিলিপাইন দু’টা জাহাজ হাওয়াই দ্বীপে পাঠায় একটা মহড়ায় অংশ নিতে। ২০১৩ সালে ডাকা টেন্ডার জেতার পর দক্ষিণ কোরিয়া ২ জাহাজ ৬’শ টনের ‘হোজে রিজাল-ক্লাস’এর ২টা অত্যাধুনিক ফ্রিগেট বানিয়ে দিচ্ছে; যার প্রথমটা এবছরের মার্চে ফিলিপাইনে পৌঁছাবার কথা রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার নৌবাহিনীর ‘পোহাং-ক্লাস’এর একটা এন্টিসাবমেরিন কর্ভেটও ফিলিপাইনের কাছে হস্তান্তর করেছে কোরিয় সরকার। ফিলিপাইনের কোস্ট গার্ডও ৪টা বড় অফশোর প্যাট্রোল জাহাজ কিনছে ফ্রান্স এবং জাপান থেকে। আরও ৬টা জাহাজ কেনার জন্যে অস্ট্রেলিয়া এবং থাইল্যান্ডের সাথে কথা চলছে।

এই জাহাজগুলির দূরের সাগরে যাবার অভিজ্ঞতা নতুন মোড় নেয় যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মাঝে উত্তেজনার ফলশ্রুতিতে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত ফিলিপিনোদের সরিয়ে নেবার লক্ষ্যে উভচর যুদ্ধজাহাজ ‘দাভাও দেল সুর’ এবং ‘হ্যামিল্টন-ক্লাস’ জাহাজ ‘রেমন এলকারাজ’ জানুয়ারির ১৪ তারিখে ফিলিপাইন থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে ১৫ দিন পর শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরে পৌঁছে। এটা ছিল ফিলিপাইনের নৌবাহিনীর ইতিহাসে কোন জাহাজের প্রথমবারের মতো শ্রীলঙ্কা ভ্রমণ। ৬ই ফেব্রুয়ারি জাহাজগুলি ওমান পৌঁছে।

তবে ফিলিপাইন এখনই যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে না; যা কিনা ক্লার্ক কুপারের কথায় বোঝা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের উপর নির্ভরশীলতা কমলেও যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু রাষ্ট্রদের উপরে ফিলিপাইনের নির্ভরশীলতা যথেষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ফিলিপাইনের চুক্তি বাতিল হোক আর না হোক, ফিলিপাইন যে আগের মতো যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া নিরাপত্তার চাদরের মাঝে নিশ্চিন্ত থাকতে পারছে না, তা নিশ্চিত। চীনের সাথে সম্পর্কোন্নয়নও সেকারণেই। ফিলিপাইনের নৌবাহিনীর দূরের সাগরে পাড়ি জমাবার আকাংক্ষা দেখিয়ে দেয় যে, দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সাথে সংঘাত তাদের উদ্দেশ্য নয়। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমার সাথেসাথে ফিলিপাইন তার নিজস্ব নিরাপত্তার জন্যে আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিকভাবে বন্ধু খুঁজছে; যেকারণে অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে তারা সাহস করছে। চীনকে নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ফিলিপাইনকে নিজের প্রভাব বলয়ে রাখতে ফিলিপিনোদের আরও সুযোগসুবিধা এবং ছাড় দিতে চাপের মাঝে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র।

Monday, 20 May 2019

ব্যাটল ফর দ্যা ইন্ডিয়ান ওশান – (পর্ব ১ - মুসলিম লেক)


পারস্য উপসাগরের বসরা থেকে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা পর্যন্ত ৭০ দিনে যাওয়া যেতো। ভুমধ্যসাগরে একটা জাহাজের গতি ছিল এর প্রায় অর্ধেক। দ্রুত এবং সহজ পরিবহণের কারণেই ভারত মহাসাগরে বাণিজ্যের প্রসার সহজ ছিল।

২০শে মে ২০১৯

ভূরাজনৈতিক চিন্তাবিদ রবার্ট ডি ক্যাপলান ভারত মহাসাগরকে বুঝতে গিয়ে অত্র অঞ্চলের অনেক দেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন; বুঝতে চেষ্টা করেছেন এখানকার ভূমি, মানুষ, জলবায়ু, কৃষি, ভাষা, সংস্কৃতি। তাঁর কাছে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে এই মহাসাগরের মৌসুমি বায়ু। এই মৌসুমী বায়ু অন্যান্য মহাসমুদ্রেও রয়েছে; তবে সেসব সাগরের মৌসুমী বায়ুর গতিপ্রকৃতি ভারত মহাসাগরের মতো পরিবর্তনশীল নয়। ভারত মহাসাগরে বছরের ছয় মাস এই বায়ু দক্ষিণ-পশ্চিম দিক হতে প্রবাহিত হয়; বাকি ছয় মাস পুরো ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে উত্তর-পূর্ব দিক হতে প্রবাহিত হয়। অন্যান্য সাগরে ঋতুর পরিবর্তনে বাতাসের গতি এবং কিছুটা ক্ষেত্রে দিক পরিবর্তিত হয়। কিন্তু ভারত মহাসাগরের মতো একেবারে উল্টো দিক প্রবাহিত হয় না। তা-ও আবার এই মৌসুমী বায়ুর ধরণ অতি নিয়মিত। এটা কোন দিন থেকে দিক পরিবর্তন করবে, সেটা মোটামুটিভাবে জানাই থাকে। একারণে অত্র এলাকার মানুষ তাদের জীবন-জীবিকাকে এই মৌসুমী বায়ুর সাথে খাপ খাইয়ে নেয়। ক্যাপলানের কাছে এই ব্যাপারটাই ভূরাজনৈতিক দিক থেকে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। এই মৌসুমী বায়ুকে কাজে লাগিয়েই ভারত মহাসাগরের আশেপাশে বাস করা মানুষেরা পাল তোলা জাহাজের ব্যবহার করে পরিবহণ এবং বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়েছে। সময় বুঝে জাহাজের পাল তুলে দিলেই হলো; মৌসুমী বায়ুই জাহাজকে একেবারে সাগরের ওপাড়ে নিয়ে যাবে – রেকর্ড সময়ে। পারস্য উপসাগরের বসরা থেকে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা পর্যন্ত ৭০ দিনে যাওয়া যেতো। ভুমধ্যসাগরে একটা জাহাজের গতি ছিল এর প্রায় অর্ধেক। দ্রুত এবং সহজ পরিবহণের কারণেই ভারত মহাসাগরে বাণিজ্যের প্রসার সহজ ছিল।

বাণিজ্যের সাথে ইসলাম...

বাণিজ্য করতো আরবের মানুষ। মরু এলাকায় শস্য হয় খুব কম। তাই বেঁচে থাকার তাগিদে অনেক কিছুই দূর দেশ থেকে কিনে আনতে হতো। ভারতীয় উপমহাদেশ এবং চীন ছিল বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদনকারী এবং একইসাথে বড় বাজার। আর অত্র অঞ্চলে ইসলামের আবির্ভাবের সাথে সাথে বাণিজ্যের প্রসার ঘরে আরও বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের প্রফেসর আন্দ্রে উইঙ্ক বলছেন যে, ভারত মহাসাগরের মধ্যবর্তী অবস্থানে ভারত এবং এর পূর্ব-পশ্চিমে চীন এবং আরব থাকার যে ভৌগোলিক সুবিধা তৈরি হয়েছিল, তা ইসলামের অধীনেই সবচাইতে বেশি কার্যক্ষমতা লাভ করে। ইসলামিক দাওয়া পৌঁছে দেবার চেষ্টা এতে আরও গতি সঞ্চার করে। আরবের মুসলিম বণিকেরা পুরো ভারত মহাসাগর চষে বেড়িয়েছেন। আফ্রিকার পূর্ব উপকূল থেকে শুরু করে ইন্দোনেশিয়া-ফিলিপাইন এবং চীন পর্যন্ত বাণিজ্যের সাথে সাথে ইসলামের দাওয়া পৌঁছে যায়। পুরো ভারত মহাসাগর জুড়ে মুসলিম বণিকেরা গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্রগুলির প্রসার ঘটান। প্রতিটা বাণিজ্য কেন্দ্রে ছিল মুসলিম জনগণ এবং এর সাথে ছিল মুসলিম সংস্কৃতির উদাহরণগুলি; যেমন মসজিদ। ভারতের কর্ণাটক উপকূল, বাংলার চট্টগ্রাম বন্দর, বার্মার উপকূল, আফ্রিকার দক্ষিণ-পূর্বের মোজাম্বিক, ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা, মালাক্কা, মালুকু দ্বীপপুঞ্জ, ব্রুণাই, ফিলিপাইনের মাইনিলা (বর্তমান ম্যানিলা) এবং মিন্দানাও – সকল স্থানেই মুসলিম সংস্কৃতি শক্ত ভিতের উপরে দাঁড়িয়ে যায়।

পূর্ব আফ্রিকার পুরো উপকূল মুসলিমদের অধীন ছিল। অষ্টম শতকেই মোজাম্বিক পর্যন্ত ইসলাম পৌঁছে যায়। আর ১০ম শতক নাগাদ ইসলাম ছিল পূর্ব আফ্রিকার একমাত্র শক্তি। ভারতের দক্ষিণের কর্ণাটকে ইসলাম পৌঁছে যায় সপ্তম শতকে। মুসলিম বণিকেরা আফ্রিকা থেকে কফি, ইন্দোনেশিয়া থেকে মসলা, আর চীন থেকে কাগজ নিয়ে আসে কর্ণাটকে। অষ্টম শতকে পশ্চিম ভারতের সিন্ধু অঞ্চল ইসলামের অধীনে আসে; আর তের শতক নাগাদ পুরো ভারতেই ইসলামের শাসন কায়েম হয়ে যায়। সপ্তম শতকেই ইন্দোনেশিয়া এবং চীন পর্যন্ত ইসলামের বাণী পৌঁছে যায়। ত্রয়োদশ শতকে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রার উত্তরের আচেহ এলাকায় ইসলামের শাসন কায়েম হয়। চতুর্দশ শতকে ইন্দোনেশিয়ার পূর্বের মালুকু দ্বীপপুঞ্জে ইসলাম পৌঁছায়। সেখানকার মসলা ছিল ভারত মহাসাগরের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসার মাঝে অন্যতম। একই সময়ে ফিলিপাইনের দক্ষিণে মিন্দানাও-এ ইসলাম প্রতিষ্ঠা পায় ১৩৯০ সাল নাগাদ। মালয়, ব্রুণাই এবং ফিলিপাইনের বাকি এলাকায় ইসলাম কায়েম হয় পঞ্চদশ শতক থেকে ষোড়শ শতকের মাঝে।
ইউরোপিয়দের আগমণের আগ পর্যন্ত ভারত মহাসাগর ছিল একটা “মুসলিম লেক”। এই বিশাল মহাসমুদ্রের চারিদিকে ছিল মুসলিম সভ্যতা। অমুসলিমরা যারা এই মহাসাগরে বাণিজ্য করেছে, তারা মুসলিমদের সাথে ভালো সম্পর্ক রেখেই বাণিজ্য করেছে। কোন যুদ্ধ ছিল না এই সাগরে; ছিল না যুদ্ধজাহাজ। বন্দর দখলের কোন প্রতিযোগিতাও ছিল না।

“মুসলিম লেক”?

পঞ্চদশ শতক নাগাদ ভারত মহাসাগর-সহ এর আশেপাশের লোহিত সাগর, পারস্য উপসাগর, মালয় দ্বীপপুঞ্জের সাগরসমূহ, দক্ষিণ চীন সাগর এমনকি ফিলিপাইনের আশেপাশের সাগরগুলিতেও মুসলিম বণিকরাই মূলতঃ বাণিজ্য করতো। আর এর বেশিরভাগ অঞ্চলে ইসলামিক শাসন কায়েম হয়ে যাওয়ায় এই বাণিজ্যের ভিত ছিল বেশ শক্ত। চীনের শাসকেরা ইসলাম না নিলেও তাদের কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় লোকেরা ছিলেন মুসলিম। আর মুসলিমদের সাথে চীনারা বাণিজ্য করে স্বচ্ছন্দ্য বোধ করায় চীনের উপকূলের বিভিন্ন বন্দরে মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকা ছিল; মসজিদও ছিল অনেক। ভারত মহাসাগর-জুড়ে বাণিজ্য জাহাজ চলতো শুধু মুসলিমদেরই। পূর্ব আফ্রিকার উপকূলে সেসময়ের এই ইতিহাসের নিদর্শন পাওয়া যায়। সেখানকার বাণিজের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলির মাঝে ছিল জানজিবার, মোম্বাসা, মোগাদিশু, মালিন্দি, কিলওয়া, পেমবা, ছাড়াও মোট প্রায় ৪০টার মতো বন্দর। এই বন্দরগুলিতে আজও পাওয়া যায় আরব, ভারতীয়, ইন্দোনেশিয়ার মুসলিমদের এবং তাদের নিয়ে আসা সংস্কৃতিকে।

ব্রিটিশ ভূগোলবিদ এবং ভূরাজনৈতিক চিন্তাবিদ হ্যালফোর্ড ম্যাকিন্ডার ‘ক্লোজড সী’-এর ব্যাপারে আলোচনা করেছেন। ‘ক্লোজড সী’ হলো এমন এক সাগর, যার চারিপাশের স্থলভাগ একটা শক্তির নিয়ন্ত্রণে। একসময় রোমান সাম্রাজ্য পুরো ভূমধ্যসাগর নিজেদের অধীনে নিয়ে নিয়েছিল। এর উত্তরের পুরো উপকূল (বর্তমান স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, গ্রীস, তুরস্ক) ছিল তাদের অধীন; পুর্বের সিরিয়া উপকূল এবং দক্ষিণে উত্তর আফ্রিকার পুরো উপকূলও (বর্তমান, মিশর, লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কো) চলে আসে তাদের দখলে। অর্থাৎ পুরো ভূমধ্যসাগরের উপকূল তাদের সাম্র্যাজের মাঝে চলে আসে। এমতাবস্থায় এই সমুদ্রে তাদের নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কেউই ছিল না। তাই এই সাগর ধরে রাখতে তাদের কোন নৌবাহিনীই দরকার ছিল না। উত্তর আফ্রিকার কার্থেজ সাম্রাজ্যের সাথে যুদ্ধের সময় রোমানদের বিরাট নৌবাহিনী তৈরি করতে হয়েছিল। তবে কার্থেজদের সাথে জিতে যাবার পর এই নৌবহরের আর দরকার ছিল না। রোমানদের মতো এরকম উদাহরণ আরও রয়েছে। যেমন সপ্তদশ শতক পর্যন্ত উথমানি খিলাফতের অধীনে ছিল পুরো কৃষ্ণ সাগর। অষ্টাদশ শতকে কৃষ্ণ সাগরের উত্তর উপকূলের ক্রিমিয়া উপদ্বীপ রাশিয়ার অধীনে চলে যাবার পর কৃষ্ণ সাগরের নিয়ন্ত্রণ হারায় উথমানিরা। এরপর থেকেই কৃষ্ণ সাগরে রুশদের মোকাবিলায় তাদেরকে নৌবহর রাখতে হয়েছে। 

‘ক্লোজড সী’ হলো এমন এক সাগর, যার চারিপাশের স্থলভাগ একটা শক্তির নিয়ন্ত্রণে। একসময় রোমান সাম্রাজ্য পুরো ভূমধ্যসাগর নিজেদের অধীনে নিয়ে নিয়েছিল। এর উত্তরের পুরো উপকূল (বর্তমান স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, গ্রীস, তুরস্ক) ছিল তাদের অধীন; পুর্বের সিরিয়া উপকূল এবং দক্ষিণে উত্তর আফ্রিকার পুরো উপকূল (বর্তমান, মিশর, লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কো) চলে আসে তাদের দখলে।

এরও আরও অনেক পর ব্রিটিশরা ভারত মহাসাগরের প্রায় পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছিল ঊনিশ শতকে। সেসময় ভারত মহাসাগর এবং তৎসংলগ্ন প্রশান্ত মহাসাগরে ফরাসী, জার্মান, ডাচ, পর্তুগিজ, স্প্যানিশ, এমনকি মার্কিনীরাও পরবর্তীতে যোগ দেয়। রুশ এবং জাপানিরাও একসময় নিজেদের নৌশক্তি প্রতিষ্ঠা করে। এরপরেও ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে ছিল ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করার দরজাগুলি। দক্ষিণ আফ্রিকা ছিল ব্রিটিশদের হাতে; আর সুয়েজ খাল তৈরি হবার আগ পর্যন্ত ইউরোপের যেকোন জাহাজকে দক্ষিণ আফ্রিকা ঘুরে আসতে হতো। ভারত মহাসাগরের পূর্ব আফ্রিকা উপকূল, ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ, বার্মা ছিল ব্রিটিশ অধীনে। তাই কারুর সাধ্যি ছিল না ব্রিটিশদের অনুমতি ছাড়া ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করতে। সিঙ্গাপুর ছিল ব্রিটিশ নৌবাহিনীর বিরাট ঘাঁটি; যা কিনা পূর্ব দিক থেকে ভারত মহাসাগরে ঢোকার পথ নিয়ন্ত্রণ করতো। সুয়েজ খাল খনন শেষ হয় ১৮৬৯ সালে। ব্রিটিশরা সেটারও নিয়ন্ত্রণ নেয়। এছাড়াও ভূমধ্যসাগরে জিব্রালটার, মাল্টা এবং সাইপ্রাস দ্বীপ তাদের অধীনে থাকায় সুয়েজ খাল দিয়ে ব্রিটিশদের অনুমতি ছাড়া কারুর পক্ষে ভারত মহাসাগরে ঢোকা সম্ভব ছিল না। অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে ঊনিশ শতকে সম্পূর্ণ ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে ছিল ভারত মহাসাগর। এই মহাসাগর হয়ে গিয়েছিল একটা “ব্রিটিশ লেক”!

তবে ইউরোপিয়দের আগমণের আগ পর্যন্ত ভারত মহাসাগর ছিল একটা “মুসলিম লেক”। এই বিশাল মহাসমুদ্রের চারিদিকে ছিল মুসলিম সভ্যতা। অমুসলিমরা যারা এই মহাসাগরে বাণিজ্য করেছে, তারা মুসলিমদের সাথে ভালো সম্পর্ক রেখেই বাণিজ্য করেছে। কোন যুদ্ধ ছিল না এই সাগরে; ছিল না যুদ্ধজাহাজ। বন্দর দখলের কোন প্রতিযোগিতাও ছিল না। ইসলামিক চিন্তাতে অর্থ তেমন গুরুত্ব বহণ করে না; যেকারণে বাণিজ্যের মাধ্যমে সম্পদশালী হলেও আট’শ বছরের মাঝে জোর করে নিজেদের একচেটিয়া বাণিজ্য ধরে রাখার চেষ্টা কেউ করেনি। অপরের গলা কেটে নিজে বিত্তবান হবার প্রবণতা ছিল না। বাণিজ্যের প্রসারে পুরো ভারত মহাসাগরের চারিদিকের মানুষ আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়েছিল। “মুসলিম লেক” পাল্টে যায় চতুর্দশ শতকের শেষে ভারত মহাসাগরে পর্তুগীজদের আবির্ভাবের পর থেকে। ভারত মহাসাগরের পরবর্তী ইতিহাস রক্তপাতের।


-------------------------------------------------------

‘Monsoon: The Indian Ocean and the Future of American Power’ by Robert D Kaplan, 2011

‘Al-Hind: The Making of the Indo-Islamic World’ by Andre Wink, 2002

‘Democratic Ideals and Reality: A Study in the Politics of Reconstruction’ by Sir Halford J Mackinder, 1919