Sunday, 3 April 2022
ভারত কি যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু, নাকি রাশিয়ার বন্ধু?
ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে এখন পৃথিবীর অনেক দেশই তাদের শীর্ষ কূটনীতিকদেরকে ভারতের রাজধানী দিল্লীতে পাঠাচ্ছে। ৩১শে মার্চ রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ ভারত সফরে এসে যথেষ্ট সন্মানই পেয়েছেন। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বলছে যে, ল্যাভরভ দিল্লী সফরে শুধু ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকরএর সাথেই দেখা করেননি, তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথেও সাক্ষাৎ করতে পেরেছেন। ল্যাভরভকে এই সন্মান দেয়া হয়েছে যখন ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব লিজ স্ট্রস এবং চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ি সেটা পাননি। ল্যাভরভ জয়শংকরের সাথে সাক্ষাতে বলেছেন যে, ইউক্রেনের ব্যাপারটা শুধু ইউক্রেন নিয়ে নয়, বরং বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে। তিনি বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের সকল স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে ওয়াশিংটনের নীতি অনুসরণ করতে বাধ্য করেছে। আর পশ্চিমারা এখন সকল ইস্যুকে ইউক্রেন সমস্যার সাথে যুক্ত করে কথা বলতে চাইছে। তার কথায়, পশ্চিমারা যখন রাশিয়ার সাথে ইউক্রেনের যুদ্ধকে গণতন্ত্র আর একনায়কতন্ত্রের মাঝে লড়াই বলে আখ্যা দিচ্ছে, তখন তারা গোপন করে যাচ্ছে যে, পশ্চিমারাই যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্রে রেখে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। তিনি এও বলেন যে, ইউক্রেন এখন বুঝতে পারছে যে, ন্যাটোতে যোগদান করাটা কোন অপশন নয়। ল্যাভরভ তার কথাগুলিকে শক্ত ভিত দিতে সাংবাদিকদেরকে বলেন যে, অনেক বছর আগে রাশিয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যে ভারত, চীন এবং অন্যান্য দেশের সাথে লেনদেনের ক্ষেত্রে ডলার এবং ইউরোর বদলে নিজস্ব জাতীয় মুদ্রা ব্যবহার করার কথা বলা শুরু করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটা আরও গুরুত্ব পাবে বলে বলেন তিনি। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ল্যাভরভ দিল্লী সফর করার আগেই বেইজিং ঘুরে এসেছেন; যেখানে তিনি ‘বহু মেরুর গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা’র কথা বলেন, যেখানে সুবিচার নিশ্চিত হবে।
‘রয়টার্স’ বলছে যে, ২৪শে ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা করার পর থেকে ভারত রাশিয়া থেকে কমপক্ষে ১ কোটি ৩০ লক্ষ ব্যারেল তেল কিনেছে; যেখানে পুরো ২০২১ সালে ভারত রাশিয়া থেকে কিনেছিল ১ কোটি ৬০ লক্ষ ব্যারেল তেল। আন্তর্জাতিক বাজারে পশ্চিমা দেশগুলি যখন রুশ তেল কেনা থেকে বিরত থাকছে, তখন ভারত মূল্যছাড়ের সুযোগ নিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল কিনছে। ‘ব্লুমবার্গ’ বলছে যে, রাশিয়া ভারতকে যুদ্ধের আগের মূল্যে তেল সরবরাহ করছে। বিভিন্ন খবরে বলা হচ্ছে যে, ভারত এবং রাশিয়া পশ্চিমা অবরোধ এড়িয়ে নিজেদের মাঝে বাণিজ্য চালিয়ে নিতে ভারতীয় রূপির উপর ভিত্তি করে একটা ব্যবস্থা চালু করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ‘দ্যা হিন্দু’ পত্রিকা বলছে যে, রাশিয়া এবং ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা দুই দেশের মাঝে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে লেনদেনের সমস্যা দূরীকরণের জন্যে বৈঠক করেছে। তারা এমন কিছু ব্যাংকের কথা বলছেন, যেগুলি পশ্চিমা অবরোধে কোন সমস্যায় পতিত হবে না।
ল্যাভরভের দিল্লী সফরের মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে দিল্লী সফরের সময় মার্কিন উপ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা দালীপ সিং ভারতকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন যে, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার উপর দেয়া অর্থনৈতিক অবরোধকে কোন দেশ যদি এড়াতে চায়, তাহলে সেই দেশকে এর ফলাফল বহণ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে না যে কোন দেশ ডলার ভিত্তিক ব্যবস্থাকে বাইপাস করে রুবলকে শক্তিশালী করুক; বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু এবং সহযোগী দেশগুলির কাছ থেকে ওয়াশিংটন এটা আশা করে না। দালীপ সিং বলেন যে, চীনের সাথে জোটে রাশিয়া সর্বদাই দুর্বল সদস্য হিসেবে থাকবে। রাশিয়ার সাথে পার্টনারশিপে চীন যতটা এগিয়ে থাকবে, সেটা ভারতের জন্যে ততটাই সমস্যার কারণ হবে। চীনের সাথে ভারতের যদি কোন দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, সেক্ষেত্রে কেউই এটা আশা করতে পারে না যে রাশিয়া ভারতকে রক্ষা করার জন্যে এগিয়ে আসবে। তবে সিং কিছুদিন আগেই রাশিয়া থেকে ভারতের ‘এস-৪০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার সময় রুপি এবং রুবলের আদানপ্রদানের ব্যাপারে কিছু বলতে রাজি হননি। মার্কিন আইন অনুসারে যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু দেশের কাছ থেকে কেউ কিছু কিনলে যুক্তরাষ্ট্র সেই দেশের উপর অবরোধ আরোপ করতে পারে। সেই হিসেবে ‘এস-৪০০’ কেনার জন্যে যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের উপর অবরোধ দিলেও ভারতের উপর অবরোধ দেয়া থেকে বিরত থেকেছে। কারণ চীনকে নিয়ন্ত্রণে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সহযোগী। ‘নিউজউইক’এর এক প্রতিবেদনে মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, গত ২২শে মার্চ মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছিলেন যে, ইউক্রেন ইস্যুর কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ‘কোয়াড’ জোটে সহযোগী দেশ ভারতের অবস্থান দোদুল্যমান হয়ে গিয়েছে।
প্রায় একই সময়ে দিল্লী সফর করা ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব লিজ ট্রাস ইউক্রেনের ব্যাপারটাকে গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই বললেও তিনি ভারতের সাথে সুর মিলিয়েই কথা বলেছেন। দালীপ সিংএর কথার পুরো উল্টো ভাষায় তিনি সাংবাবিকদের বলেন যে, তিনি বলে দেবেন না যে ভারতের কি করতে হবে। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া সমস্যার পর ইউরোপ রাশিয়ার উপর অবরোধ দেয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি; এখন সকলে এর ফলাফল দেখতে পাচ্ছে। অপরদিকে জয়শংকর বলেন যে, ইউক্রেন যুদ্ধের ফলাফল এখনও অনেকটাই দেখতে বাকি রয়েছে। এখন পর্যন্ত জ্বালানি এবং খাদ্যশস্যের মূল্যের উপর এর প্রভাব পড়েছে। সামনের দিনগুলিতে আর্থিক লেনদেন এবং লজিস্টিকস যদি সমস্যায় পতিত হয়, তাহলে তা বাকি বিশ্বের জন্যে মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে।
‘বিবিসি’র এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রের কূটনীতিকেরা ভারত সফরে এসে ভারতকে তাদের পক্ষে নেবার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত ভারত এক্ষেত্রে নিরপেক্ষ থাকতে চাইছে। ভারতের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক বেশ গভীর এবং ভারতের বেশিরভাগ অস্ত্র রাশিয়া থেকে কেনা। ভারতের এই অবস্থান দেশটাকে সমস্যা নিরসনে অপ্রত্যাশিতভাবে মধ্যস্ততাকারী হিসেবে সামনে নিয়ে আসতে পারে। ল্যাভরভ ইতোমধ্যেই বলেছেন যে, দিল্লীর মধ্যস্ততার ব্যাপারে মস্কোর কোন আপত্তি নেই। অপরদিকে দিল্লী থেকে বলা হয়েছে যে, ভারতও শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখতে প্রস্তুত।
ঠান্ডা যুদ্ধের সময় জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের সদস্য হিসেবে ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সম্পর্ক রেখে চলেছিল; যদিও ভারতের সেকুলার কংগ্রেস সরকারের সাথে পশ্চিমের, বিশেষ করে ব্রিটেনের সম্পর্ক ছিল গভীর। ভারতের বিমান এবং নৌবাহিনীর বহু যুদ্ধসরঞ্জামই ছিল ব্রিটেনে তৈরি। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ব্লকের বাইরে তৃতীয় একটা ব্লকে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছিল ভারত, যার উপর ব্রিটেনের প্রচ্ছন্ন প্রভাব ছিল যথেষ্ট। সেসময়েই ভারতে রুশ নির্মিত অস্ত্রের ভিত্তি তৈরি হয়েছে, যে বাস্তবতা থেকে ভারত আজ অবধি বের হতে পারছে না। তবে ঠান্ডা যুদ্ধের পর, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উগ্র ডানপন্থী বিজেপি সরকার ক্ষমতা নেবার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের সখ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিককালে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে ‘এপাচি’ এবং ‘শিনুক’ হেলিকপ্টার, ‘সি-১৭’ এবং ‘সি-১৩০জে’ পরিবহণ বিমান, ‘পি-৮আই’ ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান, ‘এমএইচ-৬০আর’ সাবমেরিন ধ্বংসী হেলিকপ্টার, ‘এম-৭৭৭’ আর্টিলারি হাউইটজারসহ আরও অনেক অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে; যেগুলি মূলতঃ হিমালয়ের পাদদেশে এবং ভারত মহাসাগরে চীনা প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হচ্ছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ‘কোয়াড’ সামরিক জোটের সদস্য হিসেবে ভারত আঞ্চলিকভাবে চীনের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা দিচ্ছে, তথাপি ঠান্ডা যুদ্ধের সময়কার ‘তৃতীয় ব্লক’এর সদস্য হিসেবে চিন্তা করা থেকে ভারত সরে আসছে না। ভারত চীনকে পছন্দ না করলেও চীনের বন্ধু দেশ রাশিয়াকে দূরে ঠেলে দিতে চাইছে না। এতে পরিষ্কার যে, নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের যত কাছের বন্ধুই হোক না কেন, ভারতের সেকুলার বাস্তবতাগুলি থেকে দিল্লীর নেতৃত্বের বের হয়ে আসাটা কঠিন। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়েই মোদির উগ্রবাদী সরকার যখন গণতান্ত্রিক আদর্শগুলিকে পদদলিত করেছে, তখন ইউক্রেনে গণতন্ত্র রক্ষায় ভারতের অংশ নেয়ার আশা করাটা অর্থহীন। অপরদিকে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব লিজ ট্রাস ইউরোপের সিদ্ধান্তহীনতাকে তুলে ধরে ভারতের সিদ্ধান্তকেই ন্যায্যতা দিয়ে এসেছেন। তিনি বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন যে, আগের মতোই ভারতের সেই ‘তৃতীয় ব্লক’এ থাকাটাই যুক্তিযুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুরো পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থাই যখন ধ্বসে পড়ছে, তখন 'গ্লোবাল ব্রিটেন'এর এই প্রচেষ্টা কতটুকু শক্ত ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত, তা প্রশ্ন করা যেতেই পারে।
Wednesday, 20 October 2021
বঙ্গোপসাগরে পশ্চিমা শক্তি প্রদর্শনের আসল উদ্দেশ্য কি?
কয়েক মাস ধরে পূর্ব এশিয়ার সমুদ্রগুলি দাপিয়ে বেড়ানোর পর শক্তিশালী দেশগুলির যুদ্ধজাহাজগুলি মোটামুটিভাবে অক্টোবরের শুরু থেকেই বঙ্গোপসাগরে জড়ো হতে থাকে। প্রথমে আসে জাপানি নৌবাহিনীর বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘কাগা’ এবং ডেস্ট্রয়ার ‘মুরাসামে’। শ্রীলংকার ‘দ্যা আইল্যান্ড’ পত্রিকা বলে যে, ২রা অক্টোবর জাহাজদু’টা তিন দিনের জন্যে কলম্বো বন্দরে ভিড়ে। ‘দ্যা হিন্দু’ পত্রিকা বলে যে, ৬ই অক্টোবর থেকে ৮ই অক্টোবর জাপানি জাহাজগুলি ভারতীয় নৌবাহিনীর সাথে আরব সাগরে মহড়া দেয়। ‘জিমেক্স’ নামে আখ্যায়িত এই মহড়ায় ভারতীয় নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার ‘কোচি’ ফ্রিগেট ‘তেগ’, একটা ‘পি ৮আই’ প্যাট্রোল বিমান এবং ‘মিগ ১৯কে’ ফাইটার বিমান অংশ নেয়। জাপানের পর বঙ্গোপসাগরে হাজির হয় মার্কিন নৌবাহিনীর দৈত্যাকায় বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘কার্ল ভিনসন’। এর সাথে ছিল ক্রুজার ‘লেক শ্যাম্পলেইন’ এবং ডেস্ট্রয়ার ‘স্টকডেইল’। প্রায় একইসাথে বঙ্গোপসাগরে ঢোকে অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর ফ্রিগেট ‘বালারাট’ এবং সাপ্লাই জাহাজ ‘সিরিয়াস’। জাপান, যুক্তরাষ্ট্র এবং আস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর এই জাহাজগুলির উদ্দেশ্য ছিল ‘এক্সারসাইজ মালাবার ২০২১’। মহড়ার আরেক অংশগ্রহণকারী হলো ভারত। এই মহড়ার প্রথম ধাপ এবছরের অগাস্টে প্রশান্ত মহাসাগরে হয়ে গেছে; অক্টোবর মাসের ১২ থকে ১৫ তারিখ ছিল মহড়ার দ্বিতীয় ধাপ। ভারতের পক্ষ থেকে অংশ নেয় ডেস্ট্রয়ার ‘রণবিজয়’, ফ্রিগেট ‘সাতপুরা’, ‘পি ৮আই’ প্যাট্রোল বিমান এবং একটা সাবমেরিন। এই চারটা দেশ হলো সাম্প্রতিক সময়ে গঠন করা ‘কোয়াড’ কৌশলগত জোটের অংশ। সরাসরি না বলা হলেও সব মিডিয়াতেই বলা হচ্ছে যে, এই জোটের উদ্দেশ্য হলো ইন্দোপ্যাসিফিকে চীনকে নিয়ন্ত্রণ করা।
অস্ট্রেলিয়ার ফ্লোটিলা কমান্ডার রিয়ার এডমিরাল মার্ক হ্যামন্ড বলেন যে, এই মহড়ার মাধ্যমে তাদের যৌথ সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে; যার মাধ্যমে তারা ইন্দোপ্যাসিফিককে মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং প্রাণবন্ত রাখবেন। মার্কিন নৌবাহিনীর চিফ অব নেভাল অপারেশন্স এডমিরাল মাইক গিলডে বলছেন যে, মুক্ত ইন্দোপ্যাসিফিকের শক্তিশালী ঘাঁটি হলো ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্ব। তিনি আরও বলেন যে, কেউ যেন ভুল না করে যে, ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সবচাইতে কাছের কৌশলগত বন্ধুদের একটা। ‘কোয়াড’এর কোন ঘোষণাতেই বলা হয়নি যে, এই জোট চীনকে মাথায় রেখে তৈরি হয়েছে। তবে ভারতীয় মিডিয়ায় এই মহড়ার লক্ষ্য কি, তা কোন রাখঢাক না রেখেই প্রচার করা হয়। মূলতঃ চীনকে টার্গেট করেই এই মহড়া দেয়া হয় বলে উল্লেখ করে ‘টাইমস নাউ নিউজ’। বেইজিং ‘কোয়াড’ জোটের কর্মকান্ডের খেয়াল রাখছে বলে বলা হয়। গত মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘কোয়াড’ শীর্ষ বৈঠকে যোগ দিলে চীনা সরকার ভারতকে পশ্চিমাদের চিন্তার ফাঁদে না পড়ার আহ্বান জানায়।
ব্রিটিশরা কেন ‘মালাবার’এর বাইরে?
ব্রিটিশ রয়াল নেভিও একই সময়ে একই এলাকায় শক্তিশালী অবস্থান নেয়। ১১ই অক্টোবর সিঙ্গাপুরে অবস্থান নেয় ব্রিটিশ রয়াল নেভির বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘কুইন এলিজাবেথ’। কিন্তু জাহাজটা আপাততঃ ভারত মহাসাগরে ঢোকা থেকে বিরত থাকে। তবে এই জাহাজের নেতৃত্বে ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ২১’ বা ‘সিএসজি২১’ ফ্লিটের অংশ ফ্রিগেট ‘কেন্ট’কে পাঠানো হয় বঙ্গোপসাগরে। ১৪ই অক্টোবর জাহাজটা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে ঢোকে। ভারতীয় মিডিয়া ব্রিটিশদের পরিকল্পনার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল না। ১২ই অক্টোবর ‘দ্যা হিন্দু’ পত্রিকা মার্কিন এডমিরাল গিলডের বরাত দিয়ে বলে যে, ‘মালাবার’ মহড়া আরও বড় হবে কিনা, তা নির্ভর করবে ‘কোয়াড’ সদস্যদের সিদ্ধান্তের উপর। এর আগে ৩০শে সেপ্টেম্বর ‘টাইমস নাউ নিউজ’ বলে যে, ব্রিটিশ রয়াল নেভি ‘মালাবার’ মহড়ায় যুক্ত হবার জন্যে প্রস্তাব দিয়েছে। যদি ব্রিটেন এর অংশ হয়, তবে এর নাম হবে ‘এক্সারসাইজ ম্যারিন প্যাট্রোল’। এটা বাস্তবে রূপ নিলে প্রকৃতপক্ষে তা হবে ‘অকাস প্লাস টু’। অর্থাৎ সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং অস্ট্রেলিয়ার মাঝে স্বাক্ষরিত ‘অকাস’ কৌশলগত চুক্তির দেশগুলির সাথে ভারত এবং জাপানকেও যুক্ত করা হবে। ভারতীয়রা চিন্তা করতে থাকে যে, যেহেতু অক্টোবর মাসেই ব্রিটিশ রয়াল নেভির সাথে ভারতীয়দের একটা বড় মহড়া রয়েছে; তদুপরি তাদের অপর বন্ধু দেশ ফ্রান্স এবং রাশিয়া এব্যাপারটাকে কিভাবে দেখবে? মোটকথা, রয়াল নেভির ‘মালাবার’ মহড়ায় অংশ নেয়ার প্রস্তাব ভারতীয়দের বিচলিতই করেছিল। ‘কোয়াড’এ ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তার অংশ অস্ট্রেলিয়া সদস্য হিসেবে রয়েছে। ব্রিটেন হয়তো এতেই খুশি থাকবে। কারণ এতে ব্রিটেন ‘কোয়াড’এর শক্তি প্রদর্শনের বাইরে গিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে পারবে। যেমনটা তারা করেছে ‘মালাবার’এর সময় চট্টগ্রামে তাদের ফ্রিগেট ‘কেন্ট’কে পাঠিয়ে।
‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’ জানাচ্ছে যে, ‘মালাবার’ শেষ হবার প্রায় সাথেসাথেই ব্রিটিশ বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘কুইন এলিজাবেথ’ বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করে। এই জাহাজের গ্রুপ ভারতীয় তিন বাহিনীর সাথে মহড়ায় অংশ নেবে। ভারতীয় তিন বাহিনীর সাথে মহড়া এর আগ পর্যন্ত শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার সাথে হয়েছে। ব্রিটেন এখানে নতুন করে নাম লেখাতে যাচ্ছে। এই মহড়া চলবে অক্টোবরের ২১ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত ভারতের পশ্চিম উপকূলে আরব সাগরে। ভারতে ব্রিটিশ হাই কমিশনার এলেক্স এলিস বলছেন যে, ইন্দোপ্যাসিফিককে মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং উন্নত রাখতে ভারত অতি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও বলেন যে, ভারতে ব্রিটিশ বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের সফর দুই দেশের প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা সম্পর্কের গভীরতা বৃদ্ধিকে দেখিয়ে দেয়। ব্রিটেনের ফার্স্ট সী লর্ড এডমিরাল টনি রাডাকিন বলছেন যে, দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মহড়া কৌশলগত বন্ধুত্বকে আরও গভীর করবে।
আসল টার্গেট কে?
এতসব মহড়ার আয়োজন যদি চীনকে টার্গেট করেই হয়ে থাকে, তবে কিছু প্রশ্ন এসেই যায়। বঙ্গোপসাগর বা আরব সাগরে এখন পর্যন্ত চীনের কোন নৌঘাঁটি হয়নি। জিবুতিতে চীনা ঘাঁটিতে স্থায়ীভাবে কোন যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন নেই। চীনের যুদ্ধজাহাজ ভারত মহাসাগরে আসছে ঠিকই, কিন্তু তারা মার্কিন বা ব্রিটিশদের মতো শক্তি প্রদর্শনের ধারেকাছেও আসতে পারেনি। চীনারা এখন পর্যন্ত ভারত মহাসাগরে কোন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ কেন, একটা বিমানও মোতায়েন করতে সক্ষম হয়নি। তাহলে প্রশ্ন হলো, বঙ্গোপসাগরে এতসব বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের মহড়া কাকে টার্গেট করে? ভারত মহাসাগরে মাঝে মাঝে সফরে আসা চীনা নৌবাহিনীর জাহাজগুলি কি মার্কিন, ব্রিটিশ বা ভারতীয় নৌবাহিনীর বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের বহরকে হুমকির মাঝে ফেলছে?
‘কোয়াড’ সদস্যরা চীনের হুমকির কথা বলছে। কিন্তু ইন্দোপ্যাসিফিককে ‘মুক্ত’ রাখার কথা বলে বিশাল সামরিক শক্তির প্রদর্শন তো ভীতি প্রদর্শন ছাড়া কিছুই নয়। আর ভারতকে অপরিহার্য কৌশলগত বন্ধু বলে আখ্যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন উগ্রবাদী মোদি সরকারের মুসলিম নির্যাতনের ব্যাপারে চুপ করে থাকছে। বিজেপি সরকারের আসামে লাখো বাঙ্গালী মুসলিমদের বাস্তুচ্যুত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ১১ লক্ষ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুকে স্থান দেয়া পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে কি অর্থ বহণ করে সেটা দিল্লীর হিন্দুত্ববাদী সরকার যেমন জানে, তেমনি জানে লন্ডন এবং ওয়াশিংটন। একইসাথে ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ইতিহাসের জন্মদাতা ব্রিটেন অবশ্যই জানে যে দিল্লী সরকারের উগ্রবাদী কর্মকান্ড পুরো দক্ষিণ এশিয়াকে অস্থির করতে পারে। তারপরেও কেন দিল্লীকে এতটা আলিঙ্গন? এটা কি শুধু চীনকে নিয়ন্ত্রণের জন্যেই? যে চীনের বঙ্গোপসাগরে একটা প্যাট্রোল বোটও নেই? নাকি দক্ষিণ এশিয়াকে অস্থিতিশীল দেখতে চাওয়াটা ইন্দোপ্যাসিফিককে নিয়ন্ত্রণে রাখার বড় কৌশলের মাঝেই একটা অপশন? চীনকে নিয়ন্ত্রণ, নাকি ইন্দোপ্যাসিফিককে নিয়ন্ত্রণ? পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থা এখন ক্রান্তিলগ্নে। তাই ভূরাজনৈতিক সমীকরণে শুধু চীন নয়, পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার সম্ভাব্য বিকল্পকেও রাখতে হবে। কারণ চীন নয়, বরং পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার প্রতি হুমকিটাই যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনকে ইন্দোপ্যাসিফিকে এতটা আগ্রাসী আচরণ করাচ্ছে।
Sunday, 27 December 2020
২০২১ সালে ইন্দোপ্যাসিফিকে উপস্থিতি বাড়াবে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’
২০২০ সাল যখন শেষের দিকে চলে আসছিল, তখন থেকেই ২০২১ সালের শুরুতে ব্রিটিশ রয়াল নেভির নতুন নির্মিত দৈত্যাকৃতির বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘কুইন এলিজাবেথ’এর ভারত মহাসাগরে মোতায়েন নিয়ে কথা শুরু হয়েছে। ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তার অংশ হিসেবে এই সামরিক কর্মকান্ড ভারত মহাসাগরের ভূরাজনীতিতে পরিবর্তন আনবে। ‘নিকেই এশিয়া’র এক প্রতিবেদনে ব্রিটেনকে ‘কোয়াড’ জোটের পঞ্চম সদস্য হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। ‘কোয়াড’ হলো এক কৌশলগত জোট, যার মাঝে রয়েছে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া। ২০২০ সালে ‘কোয়াড’ তার সত্যিকারের আকার নিতে শুরু করে, যখন ভারত অবশেষে বঙ্গোপসাগরে অনুষ্ঠিত ‘এক্সারসাইজ মালাবার’ নৌমহড়াতে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর অংশ অস্ট্রেলিয়াকে আমন্ত্রণ জানায়। ‘নিকেই এশিয়া’ বলছে যে, আপাততঃ ব্রিটিশ নৌবাহিনী হয়তো মার্কিন নৌবাহিনীর সহায়ক হিসেবেই কাজ করবে। করোনা সংক্রমণের কারণে যখন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘থিওডোর রুজভেল্ট’ অকার্যকর হয়ে পড়ে, তখন পূর্ব এশিয়াতে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। এর সমান্তরালে জুলাই মাসে মার্কিন নৌবাহিনীর আরেক উভচর বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘বনহোমি রিচার্ড’ মারাত্মক অগ্নিকান্ডে ধ্বংস হয়ে যায়। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, একটা রাষ্ট্র একটা অঞ্চলে কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারবে, তার একাংশ নির্ধারিত হবে সেখানে তার সামরিক শক্তি মোতায়েনের সক্ষমতার উপর। ব্রিটিশরা চাইছে ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এশিয়াতে তার অবস্থানকে শক্তিশালী করতে।
জাপানের ‘কিওদো নিউজ’ বলছে যে, এশিয়াতে ব্রিটেনের বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের পিছনে জাপানের একটা বড় ভূমিকা রয়েছে। তারা বলছে যে, ‘কুইন এলিজাবেথ’ ২০২১ সালে জাপানি এবং মার্কিন নৌবাহিনীর সাথে মহড়া দেবে। আর জাপান সফরের সময় এর ‘এফ ৩৫বি’ স্টেলথ যুদ্ধবিমানগুলিকে রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে আইচি প্রিফেকচারে অবস্থিত ‘মিতসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ’এর কারখানায় পাঠানো হবে। অর্থাৎ জাহাজটার ইন্দোপ্যাসিফিকে স্থায়িভাবে মোতায়েনের পিছনে জাপানের একটা বড় ভূমিকা থাকবে। এছাড়াও জাহাজটার মূল রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে ওমানের দুকমে বিশাল ড্রাইডক তৈরি করা হয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশ সরকার দুকমের লজিস্টিকস ঘাঁটি তিনগুণ করার লক্ষ্যে ৩০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। এর মাধ্যমে ওমানে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ট্রেনিং কর্মকান্ডও বৃদ্ধি পাবে।
ব্রিটেনের যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের সাথে চীনের ব্যাপারে ব্রিটিশ নীতির যোগাযোগ রয়েছে। হংকংএ চীনা দমনপীড়নের ব্যাপারে ব্রিটিশ রাজনৈতিক অবস্থান চীনের বিরক্তির উদ্রেক করেছে। একইসাথে তাইওয়ান এবং দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতেও ব্রিটেন চীনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তবে তা একইসাথে ব্রিটেনকে পূর্ব এশিয়াতে নিজের অবস্থান জানান দিতে সহায়তা করেছে। চীনারা এশিয়াতে রয়াল নেভির যুদ্ধজাহাজের আবির্ভাবকে ‘সামরিকভাবে অগুরুত্বপূর্ণ’ বলে আখ্যা দিচ্ছে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা ‘গ্লোবাল টাইমস’এর লেখায় সামরিক বিশ্লেষক সং ঝংপিং বলছেন যে, ‘কুইন এলিজাবেথ’ যুদ্ধজাহাজ এবং এর বিমানগুলি এখনও পুরো যুদ্ধ সক্ষমতা অর্জন করেনি। তিনি বলেন যে, এমতাবস্থায় জাহাজটাকে ইন্দোপ্যাসিফিকে পাঠালে এর দুর্বলতাগুলিই প্রকাশ পাবে। তবে চীনারা ব্রিটিশদের এই সিদ্ধান্তকে পছন্দ করেনি মোটেই। গত জুলাই মাসে ব্রিটেনের ‘দ্যা সানডে টাইমস’ পত্রিকার সাথে কথা বলতে গিয়ে লন্ডনে চীনা রাষ্ট্রদূত লিউ শিয়াওমিং পূর্ব এশিয়াতে ব্রিটেনের যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের পরিকল্পনা বাতিল করার অনুরোধ করেন। তিনি বলেন যে, চীনকে ভয় দেখাতে এটা করা হলে তা হবে অনেক বড় ভুল। ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেন বিশ্বে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চাচ্ছে; তবে এটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পথ নয়। এছাড়াও তিনি লন্ডনকে উপদেশ দিয়ে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের বিরুদ্ধে ‘দল বাঁধা’ ব্রিটেনের ঠিক হচ্ছে না।
২০০৯ সালে কাজ শুরু হয়ে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ‘কুইন এলিজাবেথ’এর কমিশনিং করা হয়। এরপর থেকে জাহাজটা অপারেশনে যাবার জন্যে বিভিন্ন ট্রেনিংএ অংশ নিচ্ছে। ২০২০ সালে করোনা মহামারির মাঝেই এই ট্রেনিং অব্যাহত রাখা হয়; যা কিনা ব্রিটেনের ইন্দোপ্যাসিফিক কৌশলের গুরুত্বের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। ২০২১ সালের ইন্দোপ্যাসিফিক মিশন হবে জাহাজটার জন্যে প্রথম অপারেশনাল মিশন। এটা ৬৫ হাজার টনের জাহাজ একই রকমের দু’টা জাহাজের একটা। অপর জাহাজটা হলো ‘প্রিন্স অব ওয়েলস’; যা ২০২৩ সালের আগে অপারেশনাল হবে না। ২০২১ সালে ‘কুইন এলিজাবেথ’এর সাথে কোন কোন জাহাজ থাকবে, সেটা এখনই বলা না গেলেও সাধারণভাবে জাহাজটার ব্যাটল গ্রুপের মাঝে একটা ‘টাইপ ২৩’ ফ্রিগেট, একটা ‘টাইপ ৪৫’ ডেস্ট্রয়ার, একটা সাবমেরিন এবং একটা সাপ্লাই জাহাজ থাকার কথা রয়েছে বলে বলছে ‘নেভি রেকগনিশন’। তবে ২০২০ সালে প্রথমবারের মতো ব্যাটল গ্রুপ তৈরি করা হলে সেখানে মার্কিন এবং ডাচ নৌবাহিনীর জাহাজও ছিল। অর্থাৎ ‘কুইন এলিজাবেথ’এর নিরাপত্তা শুধু ব্রিটিশ জাহাজের হাতেই থাকছে না। মিশনের সময় জাহাজটা মোট ১৪টা ব্রিটিশ বিমান বাহিনী এবং মার্কিন ম্যারিন কোরের ‘এফ ৩৫’ বহণ করবে। এছাড়াও জাহাজটা ৯টা হেলিকপ্টার বহণ করবে; যার মাঝে ৬টা ‘মারলিন এইচএম২’ সাবমেরিন ধ্বংসী হেলিকপ্টার; আর ৩টা ‘ক্রোসনেস্ট’ আর্লি ওয়ার্নিং হেলিকপ্টার। এছাড়াও দরকার বিশেষে জাহাজটা স্পেশাল ফোর্সের ‘মারলিন এইচসি৪’ ও ‘ওয়াইল্ডক্যাট এএইচ১’ হেলিকপ্টার, বিমান বাহিনীর ‘শিনুক’ পরিবহণ হেলিকপ্টার এবং সেনাবাহিনীর ‘এপাচি’ এটাক হেলিকপ্টার বহণ করতে পারে। জাহাজটা সর্বোচ্চ ২৪টা এবং জরুরি ভিত্তিতে ৩৬টা ‘এফ ৩৫বি’ বহণ করতে সক্ষম।
১৯৫৬ সালে সুয়েজ যুদ্ধের পর থেকে ব্রিটেন সুয়েজ খালের পূর্বে তার বেশিরভাগ অঞ্চল ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হয়। ঠান্ডা যুদ্ধের মাঝে ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রের উপর তার নিরাপত্তার জন্যে নির্ভরশীল থাকলেও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকেই ব্রিটেন বিশ্বব্যাপী তার ভূমিকাকে নতুন করে দেখতে থাকে। এটাই সেই ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তা, যার ফসল হিসেবেই ১৯৯০এর দশকের শেষে দু’টা বড় বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয় ব্রিটিশ সরকার। কিন্তু অর্থনৈতিক বাস্তবতার চাপে ব্রিটেন এই জাহাজগুলির নিরাপত্তার জন্যে আদর্শিক দিক থেকে একই চিন্তার দেশগুলির উপর নির্ভর করার সিদ্ধান্ত নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমার সাথেসাথে গুরুত্বপূর্ণ ইন্দোপ্যাসিফিকে ব্রিটেন প্রভাব বিস্তারের সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইছে না। তথাপি অপরের শক্তির উপর ভিত্তি করে প্রভাব বিস্তারের পরিকল্পনা বিপজ্জনক হলেও ব্রিটেনের চোখে এটা শতবছরের মাঝে সবচাইতে বড় সুযোগ।
Friday, 6 November 2020
‘কোয়াড’ এবং ‘এক্সারসাইজ মালাবার ২০২০’ ... কার জন্যে কি বার্তা?
৩রা নভেম্বর থেকে বঙ্গোপসাগরে শুরু হয়েছে যৌথ নৌমহড়া ‘এক্সারসাইজ মালাবার ২০২০’; যেখানে অংশ নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং ভারতের নৌবাহিনী। ‘মালাবার’এর ২৪তম এই আয়োজনে এবার যোগ দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। আর করোনাভাইরাসের বাস্তবতাকে সামনে রেখে মহড়ার নিয়মকানুনে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। ২০২০এর এই মহড়ার এটা হলো প্রথম ধাপ। দ্বিতীয় ধাপ অনুষ্ঠিত হবে নভেম্বরের শেষে। এই মহড়ায় অংশ নিচ্ছে মার্কিন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার ‘জন এস ম্যাককেইন’, অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর ফ্রিগেট ‘বালারাট’, জাপানের নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার ‘ওনামি’, ভারতীয় নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার ‘রণবিজয়’, ফ্রিগেট ‘শিভালিক’, সাপ্লাই জাহাজ ‘শক্তি’, সাবমেরিন ‘সিন্ধুরাজ’ এবং একটা ‘পি৮আই’ এন্টিসাবমেরিন বিমান। মার্কিন সামরিক বাহিনীর পত্রিকা ‘নেভি টাইমস’ কোন রাখঢাক না রেখেই বলছে যে, এই মহড়ার আয়োজন করা হয়েছে চীনকে টার্গেট করে। চীনকে টার্গেট করা হয়েছে ইন্দোপ্যাসিফিকে চীনা প্রভাব মোকাবিলার উদ্দেশ্যে। বিশেষ করে ভারত মহাসাগরে চীনের প্রভাব বিস্তারে ভারত যখন বিচলিত, তখন এই চার দেশের মাঝে তৈরি হয়েছে ‘কোয়াড’ নামের এক কৌশলগত জোট।
‘জাপান টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে ‘এক্সারসাইজ মালাবার ২০২০’কে সরাসরি ‘কোয়াড’এর সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, কিছুদিন আগেই টোকিওতে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং ভারতের শীর্ষ কূটনীতিকেরা মিলিত হয়েছিলেন ‘কোয়াড’এর অংশ হিসেবে। যদিও সেই বৈঠক থেকে বিশেষ কোন ঘোষণা আসেনি, তথাপি এটা চীনের প্রতি একটা বার্তা হিসেবেই সকলে দেখেছেন। যদিও এই মহড়াকে অফিশিয়ালি ‘কোয়াড’এর অংশ বলে ঘোষণা দেয়া হয়নি, তবুও বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, এই মহড়া মূলতঃ ইন্দোপ্যাসিফিকে চীনের সামরিক এবং কূটনৈতিক প্রভাবকে মোকাবিলা করার উদ্দেশ্যেই আয়োজন করা হয়েছে। ধীরে ধীরে এই মহড়াকে হয়তো ‘কোয়াড’এর অংশ বলেই বলা হবে। এই মহড়ায় ১৩ বছরের মাঝে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়া অংশ নিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিন্ডা রেইনল্ডস এক বার্তায় বলেন যে, এই মহড়ার মাধ্যমে ভারতের সামরিক বাহিনীর সাথে অস্ট্রেলিয়ার আস্থা বৃদ্ধি পাবে। ভারতীয় পত্রিকা ‘ইকনমিক টাইমস’ও এই মহড়াকে ‘কোয়াড মালাবার’ বলে আখ্যা দিচ্ছে। ভারতের জন্যে এই মহড়া এমন এক সময়ে এলো, যখন চীনের সাথে হিমালয়ের পাদদেশে সংঘাতের পর ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলির একটাও ভারতকে সমর্থন দেয়া থেকে বিরত থেকেছে। উল্টো এই সময়ের মাঝে চীনের সাথে পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং নেপালের সম্পর্কোন্নয়ন হয়েছে।
ভারতীয় চিন্তাবিদেরা এহেন পরিস্থিতিতে ভারতের অসহায়ত্বকে আলোচনায় নিয়ে এসেছেন। ভারতের ‘দ্যা প্রিন্ট’ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক প্রবীণ সাংবাদিক শেখর গুপ্ত বলছেন যে, বহুদিন ধরেই ভারত তার প্রতিবেশী দেশগুলির সাথে সম্পর্কোন্নয়নে মনোযোগী হয়নি; আর সেই সুযোগেই চীন দক্ষিণ এশিয়াতে তার অবস্থান শক্ত করে নিয়েছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন যে, বাংলাদেশের ঐকান্তিক সহায়তায় ভারত তার উত্তরপূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহীদের দমনে বিরাট সাফল্য পেয়েছে; অথচ প্রতিদানে ভারত তার নাগরিকত্ব আইন পাস করার পর বিরাট এক মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ‘বাংলাদেশী’ আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবার কথা বলেছে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কোন্নয়ন কঠিন হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। একই সময়ে চীন বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্যের জন্যে শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা দিয়েছে। এছাড়াও চীনারা বাংলাদেশ, শ্রীলংকা এবং নেপালেও বিনিয়োগ করে তাদের প্রভাব বিস্তার করেছে। এরই মাঝে ‘আইএমএফ’এর হিসেবে ২০২০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়কে ভারতের চাইতে বেশি হবে বলে ঘোষণা করা হলে ভারতীয়দের মাঝে অনেকেই ব্যাপারটা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেননি। যদিও শ্রীলংকা এবং মালদ্বীপের মাথাপিছু আয় ভারতের কয়েক গুণ, তথাপি সেটা ভারতীয়দের চিন্তার কারণ ছিলোনা কখনোই। কিন্তু বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়ের খবরটা পত্রপত্রিকায় আসার সাথেসাথেই ভারতীয়রা চিন্তিত হয়ে গিয়েছেন। শেখর গুপ্তের কথায় বোঝা যায় যে, ভারত সরকার বাংলাদেশকে তাদের অতি কাছের বন্ধু বললেও বাস্তবতা অতটা সহজ নয়। বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ ছাড়াও চীন থেকে বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের ব্যাপারটাও ভারত ভালো চোখে দেখে না। বিশেষ করে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্যে সাবমেরিন কেনার ব্যাপারটা ভারতীয় চিন্তাবিদেরা একেবারেই মেনে নিতে পারেননি। এর উপরে আবার বাংলাদেশের কক্সবাজারে চীনা সহায়তায় তৈরি হচ্ছে স্থায়ী সাবমেরিন ঘাঁটি, যা ‘এশিয়া টাইমস’ বলছে যে, ভারতের সাথে চীনের উত্তেজনাকে আরও উস্কে দেবে।
ভারতের ‘দ্যা হিন্দু’ পত্রিকা বলছে যে, গত অগাস্টে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে নীতিগতভাবে অস্ট্রেলিয়াকে ‘মালাবার’ মহড়ায় আমন্ত্রণ জানাবার ব্যাপারে ঐকমত্য হয়। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, হিমালয়ের পাদদেশে লাদাখে চীনের সাথে ভারতের সংঘাত এই সিদ্ধান্তের পিছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে অনেকেই ধারণা করছেন। ‘মালাবার’ এবং ‘কোয়াড’এর যোগসূত্র এখানেই। থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর সিকিউরিটি স্টাডিজ’ বা ‘আইআইএসএস’এর সিঙ্গাপুর অফিসের সিনিয়র ফেলো আলেক্সান্ডার নেইল ‘বিবিসি’কে বলছেন যে, ‘কোয়াড’এর কর্মকান্ড আটকে থাকার মূল কারণ ছিল ভারত; যারা ঐতিহাসিকভাবেই জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের অংশ ছিল। আর এখন এই জোটের সামনে চলে আসাটাও হয়েছে ভারতের জন্যেই, যারা এখন চীনের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত রয়েছে।
অক্টোবর মাসেই মার্কিন উপপররাষ্ট্র সচিব স্টিফেন বিগান এবং পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পেও দক্ষিণ এশিয়া ঘুরে যান। সফরকালে তারা মার্কিন ‘ইন্দোপ্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’তে যোগ দেয়ার জন্যে দক্ষিণ এশিয়ার নেতৃবৃন্দকে আহ্বান জানান। বাংলাদেশ থেকে সরাসরিই বলে দেয়া হয় যে, বাংলাদেশ কোন নিরাপত্তা জোটে যুক্ত হবে না। আর মার্কিনীদের এই কৌশলের অধীনে বাংলাদেশ কোন অস্ত্র কিনতেও অগ্রহী নয় বলে জানিয়ে দেয়া হয়। এর প্রায় দু’সপ্তাহ পরেই ‘এক্সারসাইজ মালাবার’এর তৃতীয় দিনে ৫ই নভেম্বর বাংলাদেশ নৌবাহিনীর পাঁচটা জাহাজ কমিশনিং করা হয়; যার মাঝে তিনটা ছিল চীনা নির্মিত। এর আগেও ১৮ই জুন হিমালয়ে ভারতের সাথে চীনের সংঘাতের চরম অবস্থায় বাংলাদেশ একটা চীনা নির্মিত কর্ভেট কমিশনিং করে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্দোপ্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’ এবং ‘কোয়াড’এর মূল লক্ষ্য হলো ইন্দোপ্যাসিফিককে চীনা প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা। এই লক্ষ্যে বঙ্গোপসাগরে নৌমহড়া শুধু চীনের জন্যেই নয়, চীনকে বন্ধু ভাবা যেকোন রাষ্ট্রের জন্যেই বার্তা। ঘটনাপ্রবাহই বলে দিচ্ছে যে, বঙ্গোপসাগরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এখন আরও এক ধাপ এগুলো, যেখানে সামনের দিনগুলিতে অস্ত্রের ঝনঝনানি আরও বৃদ্ধি পাবে।
Wednesday, 28 October 2020
‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর অস্ট্রেলিয়া ইন্দো-প্যাসিফিকে প্রভাব বাড়াচ্ছে
করোনা মহামারির মাঝেই অস্ট্রেলিয়া ইন্দো-প্যাসিফিকে তার কৌশলগত অবস্থানকে আরও দৃঢ় করতে সচেষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে গত কয়েক মাসে অস্ট্রেলিয়া পুরো ইন্দো-প্যাসিফিকে তার প্রভাব বৃদ্ধির পিছনে যথেষ্ট বিনিয়োগ করেছে। মাত্র আড়াই কোটি জনসংখ্যার দেশ অস্ট্রেলিয়া অত্র অঞ্চলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ও ১’শ ৪০ কোটি জনসংখ্যার দেশ চীনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে সচেষ্ট হয়েছে, যখন সকলের দৃষ্টি মূলতঃ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের দ্বন্দ্বের দিকে। অস্ট্রেলিয়ার এই প্রচেষ্টাকে যতটাই ঔদ্ধত্যপূর্ণ মনে হোক না কেন, অস্ট্রেলিয়াকে যদি ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ চিন্তার একটা অংশ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে ব্যাপারটাকে স্বাভাবিকই মনে হবে। আদর্শিক শক্তি ব্রিটেনের অংশ হিসেবে বিশ্বব্যাপী পশ্চিমা চিন্তার ঝান্ডাবাহক হবার কারণেই অস্ট্রেলিয়া এই প্রভাব বিস্তারের খেলায় বিচলিত খেলোয়াড় নয়।
অস্ট্রেলিয়ার ইন্দো-প্যাসিফিক কূটনীতি
গত জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অস্ট্রেলিয়ার ৩০তম ‘অস্ট্রেলিয়া ইউনাইটেড স্টেটস মিনিস্টেরিয়াল কনসালটেশন্স’ বা ‘অসমিন’ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ‘টু প্লাস টু’ এই বৈঠকে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা অংশ নেন। আলোচনায় মূল বিষয়বস্তুই ছিল চীনকে নিয়ন্ত্রণ। আলোচনা শেষে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিজ পেইন বলেন যে, তারা ইন্দো-প্যাসিফিকের বিভিন্ন বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগাবেন; যার মাঝে রয়েছে ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ; ‘এসোসিয়েশন অব সাইথ ইস্ট এশিয়ান নেশন্স’ বা ‘আসিয়ান’ অর্থনৈতিক ফোরাম; যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে তৈরি করা নিরাপত্তা সংগঠন ‘কোয়াড্রিল্যাটেরাল স্ট্র্যাটেজিক ডায়ালগ’ বা ‘কোয়াড’; ইন্দো-প্যাসিফিকের ১৮টা দেশ নিয়ে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হওয়া ‘ইস্ট এশিয়া সামিট’; অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অর্থলগ্নী উন্নয়ন সংস্থা মিলে তৈরি করা অবকাঠামো উন্নয়ন সংস্থা ‘ট্রাইল্যাটেরাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার পার্টনারশিপ’। তবে তিনি ইন্দো-প্যাসিফিকে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থানকে আরও সুসংহত করতে আরও নতুন কিছু গ্রুপ তৈরি করার ইচ্ছাও ব্যক্ত করেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিন্ডা রেইনল্ডস বলেন যে, প্রতিরক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং শিল্পের ক্ষেত্রে দুই দেশ সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে সম্মত হয়েছে; বিশেষ করে হাইপারসনিক অস্ত্র, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ও মহাকাশ সক্ষমতার ব্যাপারে সমঝোতা হয়েছে। ‘নিকেই এশিয়া’ ব্যাখ্যা দিয়ে বলছে যে, এই সমঝোতাগুলি চীনের ‘এন্টি একসেস / এরিয়া ডিনাইয়াল’ বা ‘এটু/এডি’ কৌশলকে মোকাবিলার টার্গেট করেই করা হয়েছে। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেইন এটাও বলেন যে, চিনের সাথে অস্ট্রেলিয়ার যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে, তা অস্ট্রেলিয়ার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং অস্ট্রেলিয়া সেই সম্পর্ককে আঘাত করতে চায় না।
অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা কূটনীতি চলছে জোর গতিতে
অক্টোবরে ইন্দো-প্যাসিফিকের দেশগুলিতে ভ্রমণ শুরু করার আগে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিন্ডা রেইনল্ডস বলেন যে, তিনি দেশগুলির সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন করতে যাচ্ছেন। প্রতিরক্ষা কূটনীতি ও সহযোগিতা এবং সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তিনি এই সম্পর্কোন্নয়নের কথা বলেন। তিনি বলেন যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইন্দো-প্যাসিফিকে সবচাইতে বড় কৌশলগত পরিবর্তন হতে চলেছে। ২৬শে অক্টোবর রেইনল্ডস তার এশিয়া-প্যাসিফিক ভ্রমণের শেষ দেশ হিসেবে ফিলিপাইন গিয়ে ফিলিপাইনের সামরিক বাহিনীর করোনা মোকাবিলায় সহায়তা দেবার উদ্দেশ্যে ২ মিলিয়ন ডলারের মেডিক্যাল সরঞ্জাম দেবার ঘোষণা দেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘ডিফেন্স কানেক্ট’ বলছে যে, এই বছরের শুরুর দিকে অস্ট্রেলিয়া আরও ১ মিলিয়ন ডলারের মেডিক্যাল সহায়তা দেয় ফিলিপাইনের সামরিক বাহিনীকে। ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষা সচিব ডেলফিন লরেনজানার সাথে বৈঠকে তারা দক্ষিণ চীন সাগরে অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার ব্যাপারে কথা বলেন; যা মূলতঃ অত্র অঞ্চলে চীনের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করাকেই বোঝায়। অস্ট্রেলিয়া ফিলিপাইনকে আরও আগে থেকেই প্রতিরক্ষা সহায়তা দিয়ে আসছে। ২০১৭ থেকে ২০১৯এর মাঝে অস্ট্রেলিয়া ‘অপারেশন অগারি ফিলিপিন্স’এর অধীনে ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিপিনো সামরিক সদস্যকে সন্ত্রাস দমনের ট্রেনিং দেয়। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে দুই দেশের মাঝে ‘এনহান্সড ডিফেন্স কোঅপারেশন প্রোগ্রাম’ নামের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার অধীনে অস্ট্রেলিয়া ফিলিপাইনকে আরও সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। ফিলিপাইন আসার তিন দিন আগে লিন্ডা রেইনল্ডস ব্রুনাই সফরের সময় বলেন যে, সেদেশের সরকার একজন অস্ট্রেলিয় সামরিক অফিসারকে স্থায়িভাবে সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে রাখার ব্যাপারে একমত হয়েছে। এছাড়াও আলোচনার সময় বলা হয় যে, ব্রুনাইএর সাথে সামরিক সম্পর্কের অগ্রগতির অংশ হিসেবে গত মার্চে অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর একটা সামবমেরিন ব্রুনাই সফর করে। অগাস্ট মাসে দুই দেশের নৌবাহিনী পাসেক্স মহড়া দেয়।
এশিয়া-প্যাসিফিক ভ্রমণের অংশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ২২শে অক্টোবর সিঙ্গাপুর সফর করেন। সফরকালে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সিঙ্গাপুরের সামরিক বাহিনীর ট্রেনিং নেবার ৩০ বছর উদযাপন করা হয়। সিঙ্গাপুরে স্থানের অভাবে সামরিক ট্রেনিং নেয়া সম্ভব হয়না বলেই অন্য দেশের মাটিতে ট্রেনিং নিতে হয়; অস্ট্রেলিয়া এক্ষেত্রে অর্থিকভাবে লাভবান হওয়া ছাড়াও সিঙ্গাপুরের সাথে সামরিক সম্পর্ক গভীর করে। অস্ট্রেলিয়ার দাবানলের সময় সিঙ্গাপুরের ‘শিনুক’ হেলিকপ্টারগুলি জরুরি কাজে ব্যবহৃত হতে দেয়ায় রেইনল্ডস সিঙ্গাপুর সরকারকে ধন্যবাদ দেন। প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘আইএইচএস জেন্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সিঙ্গাপুরের ‘শিনুক’ হেলিকপ্টারগুলি এখন অস্ট্রেলিয়ার বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ থেকে অপারেট করার লাইসেন্স পেয়েছে ক’দিন আগেই। এর মাধ্যমে দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা অন্য এক উচ্চতায় পৌঁছাতে যাচ্ছে।
এর আগে ১৯শে অক্টোবর রেইনল্ডস তার ভ্রমণের প্রথম দেশ হিসেবে জাপান সফর করেন। জাপানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী কিশি নোবুওএর সাথে সাক্ষাতে তারা পূর্ব চীন সাগর এবং দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন এবং একত্রে চীনের আগ্রাসী মনোভাবকে প্রতিরোধ করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। তারা উত্তর কোরিয়া বিষয়েও আলাপ করেন এবং দেশটার পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করার প্রয়োজনের ব্যাপারে একাত্মতা প্রকাশ করেন। একইসাথে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মাঝে সমন্বয় বৃদ্ধির ব্যাপারে তারা একমত হন। জাপানের সেনাবাহিনীর সাথে একজন অস্ট্রেলিয় লিয়াঁজো অফিসার রাখার ব্যাপারে এবং দুই দেশের যৌথ সামরিক মহড়াকে আরও এগিয়ে নেবার ব্যাপারেও একমত হন তারা। দুই দেশের মহাকাশ ও সাইবার নিরাপত্তা, সামরিক প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের মাঝে সহযোগিতার ব্যাপারেও ঔকমত্য হয়।
‘জাপান টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, রেইনল্ডসএর জাপান সফরের সময় জাপানি প্রতিরক্ষামন্ত্রী নোবুও ঘোষণা দেন যে, যুদ্ধবস্থা না থাকলে জাপান অস্ট্রেলিয়ার সামরিক শক্তিকে রক্ষা করবে। এই সিদ্ধান্ত সম্ভব হয়েছে ২০১৫ সালে পাস করা এক আইনের কারণে; যেখানে বলা হয়েছে যে, কোন দেশ যদি জাপানের নিরাপত্তায় সহায়তা দেয়, তবে জাপানি সামরিক বাহিনী সেই দেশের সেনা ও সরঞ্জামকে সুরক্ষা দেবে। অর্থাৎ ইন্দো-প্যাসিফিকের কোথাও অস্ট্রেলিয়ার সামরিক শক্তির উপর কোন হুমকি আসলে জাপান সেখানে অস্ট্রেলিয়াকে সামরিক সহায়তা দেবে। যুক্তরাষ্ট্রের পর অস্ট্রেলিয়া মাত্র দ্বিতীয় দেশ হিসেবে জাপানের কাছ থেকে এই সহায়তার নিশ্চয়তা পেলো।
‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্কের কর্মকান্ড সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে
অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিন্ডা রেইনল্ডসএর ব্যস্ত ইন্দো-প্যাসিফিক ভ্রমণের আগেই তিনি ‘ফাইভ আইজ’ ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্কের এক অনলাইন ভিডিওকনফারেন্সে যোগ দেন। কানাডার প্রতিরক্ষামন্ত্রী হারজিত সাজ্জান এই কনফারেন্সের আয়োজন করেন। ‘ফাইভ আইজ’ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং নিউজিল্যান্ডের এক ইন্টেলিজেন্স চুক্তি। এর মাধ্যমে এই দেশগুলি সারা বিশ্বে গোয়েন্দা তৎপরতা চালায় এবং অতি গোপনীয় তথ্যসহ সকল ইন্টেলিজেন্স নিজেদের মাঝে চালাচালি করে। এই নেটওয়ার্কের কর্মকান্ড তেমন একটা ফলাও করে প্রচার না পেলেও এবারের কনফারেন্সের খবর মিডিয়াতে প্রচার করা হয়। লিন্ডা রেইনল্ডস ‘ডিফেন্স কানেক্ট’কে বলেন যে, কনফারেন্সে আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জগুলি মোকাবিলায় সদস্য দেশগুলি নিজেদের মাঝে সহযোগিতা আরও বৃদ্ধি করার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। তবে কনফারেন্সে আলোচিত কোন বিষয় নিয়ে বিশেষভাবে কোনকিছু বলতে তিনি ছিলেন নারাজ। গত জুন মাসে অস্ট্রেলিয়ার অনুরোধে ‘ফাইভ আইজ’এর আরেকটা কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। সেই কনফারেন্সেই প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা নিয়মিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিয়মিত আলোচনায় বসার ব্যাপারে একমত হন।
এছাড়াও ১১ই অক্টোবর ‘ফাইভ আইজ’এর আরেক আলোচনায় জাপান এবং ভারতকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেই আলোচনায় সদস্যরা একটা ‘ব্যাকডোর’ রেখে মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপ করার জন্যে কোম্পানিগুলির প্রতি আহ্বান জানান, যাতে ইন্টেলিজেন্সের সদস্যরা সেগুলি ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যবহারকারীর মোবাইল ফোনে ঢুকতে পারে।
‘কোয়াড’ এবং ‘এক্সারসাইজ মালাবার’
গত জুলাই মাসে ফিলিপাইন সাগরে যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপানের সাথে নৌমহড়ায় অংশ নেয় অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়ার বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘ক্যানবেরা’সহ পাঁচটা যুদ্ধজাহাজ এতে অংশ নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘রনাল্ড রেগ্যান’সহ তিনটা যুদ্ধজাহাজ ও জাপানের একটা যুদ্ধজাহাজ এই মহড়ায় যোগ দেয়। তবে এই তিন দেশের সাথে ভারতের নামও যুক্ত করা হচ্ছে ইন্দো-প্যাসিফিকে চীনকে ব্যালান্স করতে। ‘নিকেই এশিয়া’ বলছে যে, সামনের দিনগুলিতে ইন্দো-প্যাসিফিকে গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে ‘কোয়াড’। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার মাঝে এই গ্রুপটা এতদিন পর্যন্ত অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের গ্রুপ হিসেবে থাকলেও নভেম্বরের শেষে নৌমহড়া ‘এক্সারসাইজ মালাবার’এ অস্ট্রেলিয়ার অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ‘কোয়াড’ একটা প্রতিরক্ষা গ্রুপে রূপ নিতে যাচ্ছে। ১৯শে অক্টোবর ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে অস্ট্রেলিয়ার অন্তর্ভুক্তির কথা জানানো হয়। প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হওয়া ‘এক্সারসাইজ মালাবার’ মূলতঃ বঙ্গোপসাগরে অনুষ্ঠিত হয়; শুধুমাত্র এক বছর এটা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ফিলিপাইন সাগরে। তিন বছর আগে অস্ট্রেলিয়া এই মহড়ায় অংশ নেবার ইচ্ছা ব্যক্ত করলেও ভারতের অনিচ্ছায় অস্ট্রেলিয়রা অংশ নিতে পারেনি। তবে অস্ট্রেলিয়া তাদের চেষ্টা চালিয়ে গেছে এবং শেষ পর্যন্ত মহড়ার অংশ হতে পেরেছে। ভারতের ‘দ্যা হিন্দু’ পত্রিকা বলছে যে, গত অগাস্টে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে নীতিগতভাবে অস্ট্রেলিয়াকে এই মহড়ায় আমন্ত্রণ জানাবার ব্যাপারে ঐকমত্য হয়। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, এই মহড়ার মূল লক্ষ্যই হলো চীনের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করা। আর হিমালয়ের পাদদেশে লাদাখে চীনের সাথে ভারতের সংঘাত এই সিদ্ধান্তের পিছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে অনেকেই ধারণা করছেন।
অক্টোবরের শুরুতে জাপানের রাজধানী টোকিওতে ‘কোয়াড’এর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ‘বিবিসি’ তাদের বিশ্লেষণে বলছে যে, ২০০৭ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের মাধ্যমে এই গ্রুপের শুরু হলেও চীনের কাছ থেকে প্রতিবাদ আসার পর এই গ্রুপটার চীন বিরোধী চিন্তাটাকে সদস্য রাষ্ট্রগুলি আড়াল করে রাখার ক্ষীণ একটা প্রয়াস চালিয়ে যায়। তবে গত কয়েক বছরের মাঝে গ্রুপের সবগুলি দেশের সাথেই চীনের সম্পর্কের অবনতি ঘটার পর ‘কোয়াড’এর কৌশলগত জোটের চিন্তাটা সামনে আসতে থাকে। থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর সিকিউরিটি স্টাডিজ’ বা ‘আইআইএসএস’এর সিঙ্গাপুর অফিসের সিনিয়র ফেলো আলেক্সান্ডার নেইল বলছেন যে, ‘কোয়াড’এর কর্মকান্ড আটকে থাকার মূল কারণ ছিল ভারত; যারা ঐতিহাসিকভাবেই জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের অংশ ছিল। আর এখন এই জোটের সামনে চলে আসাটাও হয়েছে ভারতের জন্যেই, যারা এখন চীনের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত রয়েছে।
করোনা মহামারির মাঝে ইন্দো-প্যাসিফিকের শক্তির মাপকাঠিতে এগিয়েছে অস্ট্রেলিয়া
১৮ই অক্টোবর অস্ট্রেলিয়ার থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘লোয়ি ইন্সটিটিউট’ ‘এশিয়া পাওয়ার ইনডেক্স কি ফাইন্ডিংস ২০২০’ নামে একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর মাঝে মূল বিষয় ছিল ‘এশিয়া পাওয়ার ইনডেক্স ২০২০’ নামে একটা সূচক; যেখানে ভূরাজনৈতিক শক্তির হিসেবে ইন্দো-প্যাসিফিকে প্রভাব বিস্তার করা ২৬টা দেশের মাঝে একটা তুলনামূলক চিত্র দেখানো হয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে প্রকাশ করে আসা এই ইনডেক্সে এশিয়ার রাষ্ট্রগুলির সম্পদ এবং প্রভাবের একটা সমন্বয় করা হয়। পশ্চিমে পাকিস্তান থেকে পূর্বে নিউজিল্যান্ড এবং উত্তরে রাশিয়া পর্যন্ত এই অঞ্চলকে সংজ্ঞায়িত করে এর মাঝের দেশগুলির আশেপাশের অঞ্চলকে প্রভাবিত করার সক্ষমতাকে মাপা হয়। প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে বলা হয় যে, করোনাভাইরের কারণে কোন দেশের কার চাইতে বেশি অধোগতি হয়েছে, সেটাই হয়ে গিয়েছে মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র তার প্রভাব অনেকটা হারালেও ৮২ পয়েন্ট নিয়ে এখনও সে শীর্ষে অবস্থান করছে; তার ঠিক পিছনে রয়েছে চীন; যার পয়েন্ট ৭৬। প্রায় ৪০ পয়েন্টের কাছাকাছি রয়েছে জাপান ও ভারত। ৩২ থেকে ৩৩ পয়েন্টের মাঝে রয়েছে রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়া; ২৭ পয়েন্ট নিয়ে ৭ম স্থানে রয়েছে ছোট্ট দেশ সিঙ্গাপুর। ১৯ থেকে ২১ পয়েন্টের মাঝে রয়েছে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম এবং নিউজিল্যান্ড। ১৫ থেকে ১৭ পয়েন্টের মাঝে রয়েছে তাইওয়ান ও পাকিস্তান। ১২ থেকে ১৩ পয়েন্টের মাঝে রয়েছে ফিলিপাইন এবং উত্তর কোরিয়া; ৯ পয়েন্ট নিয়ে ১৮ এবং ১৯তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ এবং ব্রুনাই। ৭০ পয়েন্টের উপর দেশগুলিকে ‘সুপারপাওয়ার’, ৪০ পয়েন্টের দেশগুলিকে ‘মেজর পাওয়ার’ এবং ১০ পয়েন্টের বেশির পাওয়া দেশগুলিকে ‘মিডল পাওয়ার বলে’ আখ্যা দেয়া হয়।
২০২০ সালের এই ইনডেক্সের গুরুত্ব আগেরগুলির চাইতে বেশি, কেননা এখানে করোনাভাইরাসের কারণে এই দেশগুলির ভূরাজনৈতিক সক্ষমতার কতটুকু পরিবর্তন হয়েছে, তার তুলনা করা হয়। আটটা ক্ষেত্রের মাঝে মোট ১’শ ২৮টা বিষয়ের উপর দেশগুলির সক্ষমতা পরিমাপ করা হয়; যার মাঝে রয়েছে সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক; অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও নেটওয়ার্ক; কূটনৈতিক ও সাংকৃতিক প্রভাব; এবং দৃঢ়তা ও ভবিষ্যৎ সম্পদ। এবছরের হিসেবে তিনটা নতুন বিষয় যোগ করা হয়; যেগুলি হলো, প্রধান জলবায়ুগত হুমকি; দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক প্রতিরক্ষা আলোচনা; এবং দেশে ও দেশের বাইরে করোনা মহামারি ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে মানুষের ধারণা। এবছরে ২৬তম দেশ হিসেবে পপুয়া নিউ গিনিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, চীন তার অবস্থানকে বহু প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে ভারতকে একসময় চীনের ভবিষ্যৎ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে যারা চিন্তা করছিলেন, তাদেরকে সেটা ভুলে যেতে বলা হয়। তিনটা দেশের কথা বলা হয়, যারা ২০২০ সালে নিজেদের অবস্থানকে বেশ খানিকটা এগিয়ে নিয়েছে; যারা হলো ভিয়েতনাম, অস্ট্রেলিয়া এবং তাইওয়ান। আরেক হিসেবে দেখানো হয় যে, শক্তির সূচকে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় থাকা সত্ত্বেও কোন দেশ করোনা পরিস্থিতিকে কাটিয়ে উঠতে কত সময় নিতে পারে। এক্ষেত্রে জাপানের কথা বলা হয় যে, ২০২৭ সাল পর্যন্ত লেগে যাবে তাদের পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে; যুক্তরাষ্ট্রের লাগবে ২০২৪ সাল; রাশিয়া ও নিউজিল্যান্ডের লাগবে ২০২৩ সাল। অস্ট্রেলিয়া, ভারত, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডের লেগে যাবে ২০২২ সাল। অপরদিকে ২০২০ সালের মাঝেই পুষিয়ে উঠতে পারবে যে দেশগুলি, তার মাঝে রয়েছে চীন, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার এবং আরও কয়েকটা দেশ। \
অস্ট্রেলিয়ার বাস্তবতা এবং ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর আদর্শিক লক্ষ্য
তবে অস্ট্রেলিয়া কতটা স্বাধীনভাবে তাদের পররাষ্ট্রনীতিকে এগিয়ে নিতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে চীনকে নিয়ন্ত্রণের যে নীতি নিয়ে তারা এগুতে চাইছে, তা সকল ক্ষেত্রে বাস্তবায়নযোগ্য নাও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাঙ্ক ‘র্যান্ড কর্পোরেশন’এর জেষ্ঠ্য বিশ্লেষক ডেরেক গ্রসম্যান বলছেন যে, চীন অস্ট্রেলিয়ার সবচাইতে বড় বাণিজ্য সহযোগী। এমতাবস্থায় অস্ট্রেলিয়া অত সহজে বেইজিং থেকে আলাদা হতে চাইবে না। ব্রিটেনের ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, অস্ট্রেলিয়া চীনের ব্যাপারে কঠোর রাজনৈতিক অবস্থানে যাবার কারণে চীন অস্ট্রেলিয়ার পণ্য এবং সেবার উপর বাধা সৃষ্টি করছে। অস্ট্রেলিয়ার পর্যটন, শিক্ষা, কয়লা, গোমাংস, মদ, তুলা এবং বার্লি চীনারা টার্গেট করেছে। বেইজিং অস্ট্রেলিয়ার গোমাংসের উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে; চীনা শিক্ষার্থীরা অস্ট্রেলিয়ায় জাতিগত হামলার হুমকিতে থাকতে পারে বলে সতর্কতা জারি করা হয়েছে; অস্ট্রেলিয়ার কয়লা আমদানিও আপাততঃ স্থগিত রাখা হয়েছে; বার্লির উপর দেয়া হয়েছে ৮০ শতাংশ শুল্ক। তবে একদিকে অস্ট্রেলিয়া যেমন অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি চীনের পক্ষেও অস্ট্রেলিয়ার বিকল্প খুঁজে পাওয়া দুষ্কর; বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার কয়লার বিকল্প চীনারা অত সহজে পাবে না। কাজেই আঞ্চলিকভাবে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা থাকলেও দুই দেশের মাঝে বাণিজ্য অত সহজে স্থবির হচ্ছে না।
‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর অংশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া নিজেকে একা হিসেবে দেখে না। বিশাল ইন্দো-প্যাসিফিকে ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ব্রুনাই, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান এমনকি জাপান এবং ভারতকে নিয়েও জোট বাধার চেষ্টায় রয়েছে অস্ট্রেলিয়া। এই ‘মিডল পাওয়ার’ রাষ্ট্রগুলির সক্ষমতাকে বাড়িয়ে তা নিজের পক্ষে ব্যবহার করতে চাইছে অস্ট্রেলিয়া। করোনা মহামারিতে বেশিরভাগ দেশের সক্ষমতাই কমেছে; তথাপি ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতামূলক কর্মকান্ড আরও জোরালো হয়েছে। তবে অত্র অঞ্চলের সবচাইতে বড় শক্তি যুক্তরাষ্ট্রকেও অস্ট্রেলিয়া সাথে রাখতে চাইছে শক্তিধর চীনকে ব্যালান্স করতে। তথাপি অস্ট্রেলিয়া তার এই কৌশলগত চিন্তায় যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল থাকতে চাইছে না। জাপানের সাথে আলাদা করে কৌশলগত সমঝোতা এবং ব্যাপক চেষ্টার পর ভারতকে রাজি করিয়ে ‘কোয়াড’এর মতো জোটকে সামরিক জোটে রূপান্তর করার মতো কাজগুলি অস্ট্রেলিয়ার আদর্শিক চিন্তার প্রভাবেরই ফলাফল। এই চিন্তাই অস্ট্রেলিয়াকে ইন্দো-প্যাসিফিকে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর প্রতিনিধিত্ব করাচ্ছে।











