Saturday, 15 August 2020

বৈরুত বিস্ফোরণের পর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মাঝে লেবানন

১৫ই অগাস্ট ২০২০

লেবাননের উপকূলে ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর ছত্রছায়ায় পূর্ব ভূমধ্যসাগরে গ্রীসের সহায়তায় শক্তি বৃদ্ধি করার ফরাসী কৌশলই বলে দিচ্ছে যে, ফ্রান্স তুরস্কের হুমকিকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে। লেবাননের অর্থনৈতিক দৈন্যদশা এবং বৈরুত বিস্ফোরণ দেশের মানুষের জন্যে যতটা কঠিন সময় এনে দিয়েছে, ততটাই প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্ম দিয়েছে ভূমধ্যসাগরীয় শক্তিদের মাঝে।

গত ৯ই অগাস্ট ফরাসী নৌবাহিনীর হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার ‘টোনিয়েরে’ বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রী এবং জরুরি সহায়তা নিয়ে ফ্রান্স থেকে লেবাননের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। লেবাননের রাজধানী বৈরুতে এমোনিয়াম নাইট্রেটের গুদামে বিস্ফোরণের পর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে যাওয়া বৈরুতে বিভিন্ন দেশ থেকে সহায়তা আসছে। ফ্রান্সের যুদ্ধজাহাজ প্রেরণও এই সহায়তার অংশ। ফরাসী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, এই জাহাজে খাদ্য সামগ্রী ও মেডিক্যাল সরঞ্জাম ছাড়াও রয়েছে সাড়ে তিন’শ জনের ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ, বৈরুত বন্দরের সার্ভে কাজের জন্যে হাইড্রোগ্রাফিক সরঞ্জাম ও নৌবাহিনীর ডুবুরি দল, ল্যান্ডিং ক্রাফট, হেলিকপ্টার, অগ্নি নির্বাপক দল, কন্সট্রাকশন সরঞ্জাম, ইত্যাদি। লেবাননের পথে মানবিক সহায়তা নিয়ে রওয়ানা হলেও ২১ হাজার টনের বিশাল এই যুদ্ধজাহাজের সক্ষমতা রয়েছে সাড়ে ৪’শ থেকে ৯’শ সৈন্য, ৪০টা ভারি ট্যাঙ্ক, ৪টা ল্যান্ডিং ক্রাফট এবং ২০ থেকে ৩৫টা হেলিকপ্টার বহণ করার। ১২ই অগাস্ট ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ এক টুইটার বার্তায় ঘোষণা দেন যে, পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের বিরুদ্ধে গ্রীসকে সহায়তা দানের উদ্দেশ্যে ফ্রান্স তার সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করতে যাচ্ছে। আর এর মাঝে হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার ‘টোনিয়েরে’ও রয়েছে। এই ঘোষণার সাথেসাথে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। মোটকথা ফ্রান্স পূর্ব ভূমধ্যসাগরে নিজের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করতে লেবাননের ইস্যুটাকেই ব্যবহার করেছে, যা কিনা লেবাননে ফ্রান্স এবং অন্যান্য দেশের সহায়তা দেবার উদ্দেশ্যগুলিকে আলোচনায় নিয়ে আসে।

গত ৪ঠা অগাস্ট বৈরুতের বন্দর এলাকায় মারাত্মক বিস্ফোরণে দেশটার প্রধান খাদ্য গুদাম ধ্বংস হয়ে যাবার পর ‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে লেবাননের অর্থমন্ত্রী রাউল নেহমের বরাত দিয়ে বলা হয় যে, দেশটাতে এক মাসেরও কম সময়ের খাদ্যশস্যের মজুদ রয়েছে। তবে প্রতিবেদনে এও বলা হয় যে, এই গুদাম ধ্বংস হওয়াটাই প্রধান সমস্যা নয়। করোনা দুর্যোগের আগেই লেবাননের অর্থনীতি পুরোপুরি ধ্বসে পড়েছিল। আর একারণেই লেবাননের সরকারের পক্ষে খাদ্যদ্রব্য আমদানি করার জন্যে বৈদেশিক মুদ্রা যোগাড় করাই কঠিন হয়ে গেছে। লেবাননের আমদানিকারক সিন্ডিকেটের প্রধান হানি বোহসালি বলছেন যে, অন্যান্য দেশ সহায়তা না করলে দেশটা খাদ্যদ্রব্য সরবরাহের মারাত্মক ঝুঁকির মাঝে পড়বে। লেবাননের এই দুর্যোগকে আশেপাশের শক্তিশালী দেশগুলি লেবানন তথা পূর্ব ভূমধ্যসাগরে প্রভাব বৃদ্ধি করার সুযোগ হিসেবেই দেখেছে।

৬ই অগাস্ট ফরাসী প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ ছুটে যান বৈরুতে। ‘ডয়েচে ভেলে’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানি খিলাফতের পতনের পর ফরাসীরা লেবাননের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ১৯৪৩ সালে লেবাননকে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা দেবার পরেও ফ্রান্স তার সেই প্রভাবখানা ধরে রেখেছে। লেবাননের মারোনাইট খ্রিস্টানরা ফ্রান্সকে তাদের রক্ষাকারী হিসেবেই দেখে। লেবাননের ক্ষমতাবান লোকেরা ফ্রান্সে বাড়ি বানিয়েছে, ফরাসী ভাষা শিখেছে, নিজেদের স্কুলে ফরাসী ভাষাকে মূল ভাষা হিসেবে শিক্ষা দিয়েছে। বৈরুতে ম্যাক্রঁর সফরকে অনেকেই লেবাননে ফ্রান্সের হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক এলি আবুআউন বলছেন যে, ফ্রান্স একা নয়, লেবাননে ইরান এবং সৌদি আরবের প্রভাব যথেষ্ট। লেবাননের বিশ্বাসগত বিভাজনের উপরই দেশটার রাজনীতি পুরোপুরি নির্ভরশীল। খ্রিস্টানদের সমর্থনদাতা হলো ফ্রান্স; শিয়াদের পিছনে রয়েছে ইরান; সুন্নিদের সমর্থন দিচ্ছে সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্র এখানে ধীরে ধীরে তার প্রভাব বৃদ্ধি করছে। অপরদিকে রাশিয়া এবং তুরস্ক মোটে চেষ্টা শুরু করেছে। লেবাননের দীর্ঘ সময়ের গৃহযুদ্ধের শেষে ১৯৮৯ সালে তায়েফের সমঝোতার মাধ্যমে ঠিক করা হয় যে, লেবাননের পার্লামেন্টে ১’শ ২৮টা আসনের মাঝে ৪৩টা পাবে মারোনাইট খ্রিস্টানরা, ২৭টা পাবে সুন্নি মুসলিমরা, ২৭টা পাবে শিয়ারা, ২০টা পাবে ইস্টার্ন অর্থোডক্স খিস্টানরা, ৮টা পাবে দ্রুজরা, ২টা পাবে আলাওয়াতিরা এবং ১টা পাবে ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টানরা। ১৯৪৩ সালের নিয়ম অনুযায়ী দেশটার প্রেসিডেন্ট হবেন একজন মারোনাইট খ্রিস্টান এবং প্রধানমন্ত্রী হবেন একজন সুন্নি মুসলিম। এই ব্যবস্থায় মারোনাইট খ্রিস্টানরা ফ্রান্সের অধীনে যতটা সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল, তার পরিবর্তন করে মুসলিমদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়। তবে রাজনৈতিক বিভেদের এই ব্যবস্থায় লেবাননে কোনদিনই কোন শক্তিশালী সরকার গঠন করা সম্ভব হয়নি। আর বিদেশী শক্তিরা বিভিন্ন গ্রুপের পক্ষ নিয়ে লেবাননের রাজনীতিতে কলকাঠি নেড়েছে।

গত মার্চে লেবাননের সরকার ঘোষণা দেয় যে, দেশটা প্রথমবারের মতো ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণের কিস্তি ফেরত দিতে পারছে না। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হাসান দিয়াব বলেন যে, এই ঋণের উপর সুদ পরিশোধ করাটা লেবাননের সক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। ‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, লেবাননের ব্যাঙ্কগুলি দেশটার নিজস্ব মুদ্রা থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তরে বাধা দেয়ার ফলে দেশটার মুদ্রার মান মারাত্মক কমে যায়; যার ফলশ্রুতিতে লেবানিজ পাউন্ড প্রায় মূল্যহীন হয় পড়ে। একইসাথে দেশটাতে খাদ্যদ্রব্য আমদানি করা দুষ্কর হয়ে যায়। ঋণদাতাদের নেতৃত্ব দেয়া ফ্রান্স চাইছে দেশটাতে রাজনৈতিক সংস্কার হোক। ‘রয়টার্স’ বলছে, ম্যাক্রঁ চাইছেন যে, লেবাননের রাজনৈতিক দলগুলিকে একটা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যাপারে রাজি করানো। এর মাধ্যমে অতি ঋণগ্রস্ত এই দেশটাকে একটা টেকনোক্র্যাট সরকারের অধীনে নিয়ে আসলে দাতা দেশগুলি লেবাননের জন্যে আবারও কয়েক বিলিয়ন ডলারের ঋণের ব্যবস্থা করবে।

লেবাননের অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের কেন্দ্রে সিরিয়া বা আল-শামএর ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে হওয়ায় দেশটার আকারের তুলনায় এর ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বেশি। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ফ্রান্স তার হারানো প্রভাব ফিরে পেতে যেমন লেবাননে তার অবস্থানকে শক্ত করতে চাইছে, তেমনি ইরান এবং সৌদি আরবও চাইছে তাদের অবস্থান যাতে কিছুতেই দুর্বল না হয়। সৌদি আরব, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও আরও অনেক দেশ লেবাননে ত্রাণ সামগ্রী পাঠানো অব্যাহত রেখেছে। ব্রিটেন নৌবাহিনীর সার্ভে জাহাজ পাঠিয়েছে বৈরুত বন্দরকে চালু করায় সহায়তা দিতে। এর উপরে আবার তুরস্ক চাইছে বৈরুতের সমুদ্রবন্দরের উন্নয়ন করতে। অত্র অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের খেলায় সর্বশেষ খেলোয়াড় তুরস্ক। তবে লেবাননের উপকূলে ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর ছত্রছায়ায় পূর্ব ভূমধ্যসাগরে গ্রীসের সহায়তায় শক্তি বৃদ্ধি করার ফরাসী কৌশলই বলে দিচ্ছে যে, ফ্রান্স তুরস্কের হুমকিকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে। লেবাননের অর্থনৈতিক দৈন্যদশা এবং বৈরুত বিস্ফোরণ দেশের মানুষের জন্যে যতটা কঠিন সময় এনে দিয়েছে, ততটাই প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্ম দিয়েছে ভূমধ্যসাগরীয় শক্তিদের মাঝে।

Saturday, 8 August 2020

জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার ইউরোপের অনৈক্যকে দেখিয়ে দিচ্ছে

০৯ই অগাস্ট ২০২০
রুশ হুমকি মোকাবিলায় জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করে যখন পোল্যান্ডে মোতায়েন করা হচ্ছে, তখন জার্মানরা তাতে খুশি; আর অপরদিকে পোল্যান্ড মার্কিন সেনাদের খরচ পুরোটাই বহণ করতে চাইছে। অর্থাৎ ইউরোপের দেশগুলির কাছে জাতীয় নিরাপত্তার সংজ্ঞা এক নয়। ইউরোপের ভিন্ন ভিন্ন দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ভিন্ন ভিন্ন সম্পর্ক ইউরোপের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বকে যেমন সামনে নিয়ে আসছে, তেমনি ইউরোপের অভ্যন্তরীণ অনৈক্যকে চোখে আঙ্গুল দেখিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, যা কিনা যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া উভয়েই ব্যবহার করতে চাইবে।

 

গত ২৯শে জুলাই যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দেয় যে, তারা জার্মানি থেকে তাদের প্রায় ১২ হাজার সেনা সরিয়ে নিচ্ছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপার এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে, যাতে রাশিয়া এবং চীনের মতো শক্তিগুলিকে আরও ভালোভাবে মোকাবিলা করা যায়। তিনি আরও বলেন যে, এর মাধ্যমে ন্যাটো আরও শক্তিশালী হবে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ডিটারেন্স তৈরি হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলা করাটা আরও সহজ করবে। কিন্তু প্রায় একইসাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে কোন রাখঢাক না রেখেই বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে কারণ জার্মানি তাদের নিজেদের রক্ষার জন্যে কোন খরচ করছে না। ব্যাপারটা খুবই সহজ; তারা ‘অপরাধী’। তিনি আরও বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এখন আর বোকা বনতে চায় না। আন্যান্য ন্যাটো দেশগুলির জন্যে এটা একটা উদাহরণ হিসেবে থাকবে। ট্রাম্প মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, ২০১৯ সালে জার্মানি তার জিডিপির ১ দশমিক ৩৮ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করেছে, যা ন্যাটোর বেঁধে দেয়া টার্গেট ২ শতাংশ থেকে অনেক নিচে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তে সমালোচনা আসছে খোদ যুক্তরাষ্ট্র থেকেই। মার্কিন সিনেটর মিট রমনি এই টুইটার বার্তায় বলেন যে, এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের একটা বন্ধু রাষ্ট্রের মুখে চপেটাঘাত। ডেমোক্র্যাট সিনেটর বব মেনেনডেজ বলছেন যে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ইউরোপে ক্রেমলিনের আগ্রাসী কর্মকান্ডকে রুখে দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে আরও কঠিন হয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে জার্মানি থেকে সেনা সরিয়ে নিয়ে তাদেরকে বেলজিয়াম এবং ইতালিতে মোতায়েন করতে। কিন্তু ইতালিও ২০১৯ সালে তার জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ২২ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করেছে; বেলজিয়াম করেছে শূণ্য দশমিক ৯৩ শতাংশ! অর্থাৎ ব্যাপারটা শুধুমাত্র প্রতিরক্ষা বাজেটের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। জার্মানির সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অন্য দিকগুলিও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

৭ই অগাস্ট জার্মান পত্রিকা ‘ডাই ওয়েল্ট’এর এক খবরে বলা হয়ে যে, রাশিয়ার সাথে ‘নর্ড স্ট্রিম ২’ গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প এগিয়ে নেয়ার ‘অপরাধে’ জার্মানির সাসনিতজ বন্দরের উপর ভীষণ রকমের আইনগত এবং অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করার হুমকি দিয়েছেন তিনজন মার্কিন সিনেটর টেড ক্রুজ, টম কটন এবং রন জনসন। বল্টিক সাগরের তলদেশ দিয়ে বসানো এই পাইপলাইনের কাজের অল্প কিছু অংশ বাকি রয়েছে; যা সমাপ্তির পিছনে সাসনিতজ বন্দরের অবকাঠামো খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সিনেটররা এই চিঠিতে বলছেন যে, এই প্রকল্পে সাসনিতজ বন্দর সহায়তা দিলে বন্দরের মালিক এবং ম্যানেজমেন্টের কর্তাব্যক্তিদেরকে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করতে দেয়া হবে না এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা তাদের সকল সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে। তারা বলছেন যে, এই পাইপলাইন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যে মারাত্মক হুমকি। তাদের কথায় মার্কিন কংগ্রেসের উভয় দলই রাশিয়ার সাথে জার্মানির এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে।

জার্মানরাও প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধী অবস্থান নিয়েছে। জার্মান পত্রিকা ‘তাগেস স্পাইজেল’কে জার্মান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিয়েলস আনেন বলেন যে, মার্কিন সিনেটরদের চিঠিটাকে জার্মান সরকার মোটেই স্বাভাবিকভাবে নেয়নি; এর ভাষা এবং শব্দচয়ন ছিল একেবারেই অনভিপ্রেত। তিনি বলেন যে, ইউরোপিয়রা যদি মার্কিনীদের এধরনের কর্মকান্ডের বিরুদ্ধাচরণ না করে, তবে তারা ‘ব্ল্যাকমেইল’এর শিকার হবে। জার্মান ম্যাগাজিন ‘উইয়ো’র সাথে এক সাক্ষাতে জার্মান ইস্টার্ন বিজনেস এসোসিয়েশনের প্রধান মাইকেল হার্মস বলেন যে, জার্মানরা মার্কিনীদের বিরুদ্ধে পাল্টা কোন ব্যবস্থা নিতে পারবে না, এটা যেন কেউ না বলে। ইউরোপিয় ইউনিয়নের কোম্পানিগুলির জন্যে একটা সুরক্ষা ব্যুহ থাকা উচিৎ, যেগুলি এধরনের অবরোধে কোম্পানিগুলিকে বাঁচাবে। তিনি বলেন যে, জার্মান সরকারের উচিৎ ইইউকে পাল্টা অবরোধ দিতে অনুপ্রাণিত করা।

৩১শে জুলাই থেকে ৩রা অগাস্টের মাঝে ‘ইউগভ’এর মাধ্যমে জার্মান প্রেস এজেন্সির করা এক মতামত জরিপে দেখা যাচ্ছে যে, ৪৭ শতাংশ জার্মান মনে করছে যে, জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা কমানো উচিৎ। আর ২৫ শতাংশের মতো মানুষ বলছে যে, মার্কিন সেনা জার্মানি থেকে একেবারেই সরিয়ে নেয়া উচিৎ। ৩২ শতাংশ মনে করছে যে, মার্কিন সেনা থাকা উচিৎ। আরেক প্রশ্নের উত্তরে ৬৬ শতাংশ জার্মান মতামত দেয় যে, জার্মানি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ২০টা পারমাণবিক বোমাই সরিয়ে ফেলা উচিৎ। মাত্র ১৯ শতাংশ চাইছে যে, বোমাগুলি জার্মানিতে থাকুক। ন্যাটোর প্রতিশ্রুতিকে আমলে না নিয়ে জার্মান প্রতিরক্ষা বাজেটের ব্যাপারে ৫৮ শতাংশ মানুষ বলছে যে, জার্মানি প্রতিরক্ষার পিছনে যথেষ্ট ব্যয় করে।

ন্যাটোর যে সদস্য রাষ্ট্রগুলি প্রতিশ্রুত ২ শতাংশের বেশি প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করছে, তার বেশিরভাগই রাশিয়ার সীমানায় অবস্থিত; যেমন লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া, এস্তোনিয়া, রোমানিয়া, পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া। এই দেশগুলির সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে ভাটা পড়েনি। ইতোমধ্যেই ২০১৯ সালে ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষণা দেয় যে, তারা পোল্যান্ডকে রক্ষা করতে সেখানে মার্কিন সেনার সংখ্যা আরও ১ হাজার বাড়িয়ে সাড়ে ৫ হাজার করবে। ‘মিলিটারি টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, অতিরিক্ত মার্কিন সেনাদের রাখার জন্যে অবকাঠামো তৈরি করা শুরু হয়েছে; আর এই খরচের প্রায় পুরোটাই বহণ করবে পোলিশ সরকার।

ইউরোপ আজ বেসুরে অর্কেস্ট্রার মতো কথা বলছে। রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি করতে জার্মানি ‘নর্ড স্ট্রিম ২’ গ্যাস পাইপলাইনের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইইউএর সমর্থন চাইছে। ইউরোপের সাথে রাশিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্ককে জার্মানরা স্বাভাবিকভাবে নিলেও যুক্তরাষ্ট্র ভালো চোখে দেখছে না। জাতীয় নিরাপত্তার হুমকির ব্যাপারে জার্মানদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক মতভেদ দৃশ্যমান। রুশ হুমকি মোকাবিলায় জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করে যখন পোল্যান্ডে মোতায়েন করা হচ্ছে, তখন জার্মানরা তাতে খুশি; আর অপরদিকে পোল্যান্ড মার্কিন সেনাদের খরচ পুরোটাই বহণ করতে চাইছে। অর্থাৎ ইউরোপের দেশগুলির কাছে জাতীয় নিরাপত্তার সংজ্ঞা এক নয়। ইউরোপের ভিন্ন ভিন্ন দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ভিন্ন ভিন্ন সম্পর্ক ইউরোপের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বকে যেমন সামনে নিয়ে আসছে, তেমনি ইউরোপের অভ্যন্তরীণ অনৈক্যকে চোখে আঙ্গুল দেখিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, যা কিনা যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া উভয়েই ব্যবহার করতে চাইবে।

Friday, 24 July 2020

ইন্দো-প্যাসিফিকে মার্কিন নৌশক্তির ফেরত আসার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব কতটুকু?

২৪শে জুলাই ২০২০

দক্ষিণ চীন সাগরে মহড়া দিচ্ছে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ 'নিমিতজ' এবং 'রোনাল্ড রেগ্যান'। চীনারা তাদের অপেক্ষাকৃত স্বল্পক্ষমতার নৌবহরকে মার্কিনীদের সক্ষমতার ফাঁকফোঁকড়ের মাঝে ব্যবহার করে মার্কিন নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে। আর এতে তারা বেশ সাফল্যও পেয়েছে। বিশ্বব্যাপী মার্কিনীদের বন্ধু এবং প্রতিযোগী সকলেই যুক্তরাষ্ট্রের এই সীমাবদ্ধতাগুলিকে অবলোকন করছে; যা কিনা তাদের নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অনুপ্রাণিত করছে।


করোনা মহামারির মাঝে ইন্দো-প্যাসিফিকে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি মোতায়েনের প্রতিযোগিতার খবর প্রতিনিয়তই পত্রিকাতে ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। পূর্ব এশিয়ার উপকূলে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের সবচাইতে দৃশ্যমান অস্ত্র হিসেবে দেখা যাচ্ছে বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজকে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজে করোনা সংক্রমণের মাঝে চীনারা এপ্রিলে প্রায় এক মাসের জন্যে তাদের একমাত্র বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘লিয়াওনিং’কে সমুদ্রে প্রেরণ করে। ৩০শে এপ্রিল জাহাজটা পূর্ব চীন সাগরে ‘ট্রেনিং’ মিশন শেষ করে চিংদাও বন্দরে ফিরে আসে। পূর্বের সমুদ্রে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের প্রায় ‘অনুপস্থিতি’র মাঝে চীনাদের এই ‘শক্তি প্রদর্শন’ মার্কিন শক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

৪ঠা মে জাপানের ইয়োকোসুকা বন্দর ছেড়ে যায় বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘রোনাল্ড রেগ্যান’। যুক্তরাষ্ট্রের ১১টা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের মাঝে ‘রেগ্যান’কেই রাখা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখন্ডের বাইরে। গত ২৭ মার্চে পূর্ব এশিয়ার উপকূলে মোতায়েনকৃত যুদ্ধজাহাজ ‘থিওডোর রুজভেল্ট’এ করোনাভাইরাসের মারাত্মক সংক্রমণ আবিষ্কারের পর ‘রোনাল্ড রেগ্যান’এও সংক্রমণ ধরা পরে। প্রায় দুই মাস মার্কিন প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপনিবেশ গুয়ামের নৌঘাঁটিতে বসে থাকার পর ‘থিওডোর রুজভেল্ট’ ১৯শে মে সমুদ্রে বের হয়। অপরদিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের আরেক যুদ্ধজাহাজ ‘নিমিতজ’ ২ বছরের মেইনটেন্যান্স শেষ করে ৮ই জুন যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়েগো থেকে যাত্রা করে। জটিল প্রযুক্তির কারণে এধরণের জাহাজকে মেইনটেন্যান্স থেকে অপারেশনে আনতে অনেক সময় লাগে। এর উপর আবার ‘রুজভেল্ট’এ করোনা সংক্রমণের কারণে অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে ক্রুদের টেস্ট করা এবং কোয়ার‍্যান্টিনে রাখার কারণে সমুদ্রে যেতে আরও দেরি হয়। ‘নিমিতজ’এর সমুদ্রে যাবার ৪ দিনের মাথায় ১২ই জুন ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ২০১৭ সালের পর প্রথমবারের মতো প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন নৌবাহিনী একসাথে ৩টা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে; বড় খবর বলে প্রচার পায় এটা। ২১শে জুন ‘নিমিতজ’ এবং ‘রুজভেল্ট’ যুদ্ধজাহাজের গ্রুপ একত্রে মহড়া দেয়া শুরু করে। ২৮শে জুন থেকে ‘নিমিতজ’ মহড়া দেয়া শুরু করে ‘রেগ্যান’এর সাথে। ‘নিমিতজ’এর ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ১১’এর কমান্ডার রিয়ার এডমিরাল জেমস ক্লার্ক এক বিবৃতিতে ঘোষণা দেন যে, বিশ্বে একমাত্র মার্কিন নৌবাহিনীরই এরকম শক্তি একত্রিত করার সক্ষমতা রাখে।

৬ই জুলাই মার্কিন মিডিয়া ‘সিএনএন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, দু’টা মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ একত্রে দক্ষিণ চীন সাগরে মহড়া দেয়া শুরু করেছে। জাহাজদু’টা হলো জাপান থেকে আসা ‘রেগ্যান’ এবং প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব প্রান্তে সান ডিয়েগো থেকে আসা ‘নিমিতজ’। বলা হয় যে, ২০১৪ সালের পর থেকে প্রথমবারের মতো দু’টা জাহাজ একত্রে মহড়া দেয়ার ঘটনা ঘটলো। ১৭ই জুলাই তারা আবারও ঘোষণা দেয় যে, জাহাজদু’টা একই মাসে দ্বিতীয়বারের মতো একত্রে মহড়া দেয়া শুরু করেছে। তবে প্রশান্ত মহাসাগরে তৃতীয় বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘থিওডোর রুজভেল্ট’ মিডিয়ার আলোচনার বাইরে থাকে। কারণ এরই মাঝে চুপিসারে ৯ই জুলাই জাহাজটা দেশে ফেরত যায়। ‘ইউএসএনআই নিউজ’ জানাচ্ছে যে, গত জানুয়ারিতে জাহাজটা সান ডিয়েগো ছেড়ে গিয়েছিল। মার্চ মাসে ভিয়েতনামে ভ্রমণ করার পরপরই জাহাজটাতে করোনার সংক্রমণ ধরা পরে। শেষ পর্যন্ত প্রায় ১২’শ সংক্রমণ ধরা পরেছিল। এই সংক্রমণের খবর বের হবার পর জাহাজের কমান্ডার ক্যাপ্টেন ব্রেট ক্রোজিয়ারকে চাকুরিচ্যুত করা হয়।

২০শে জুলাই ঘোষণা দেয়া হয় যে, ‘নিমিতজ’ যুদ্ধজাহাজ দক্ষিণ চীন সাগর থেকে বঙ্গোপসাগরে এসে হাজির হয়েছে। ভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে ভারত মহাসাগরে প্রায় পাঁচ মাস ভেসে থাকার পর যুদ্ধজাহাজ ‘আইজেনহাওয়ার’ দেশে ফেরার পর থেকে ভারত মহাসাগরে কোন মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ নেই। ‘নিমিতজ’কে দিয়ে এই শূণ্যস্থান পূরণ করানো হচ্ছে। অর্থাৎ জুনের মাঝামাঝি সময় থেকে প্রায় একমাস ধরে প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর দাপিয়ে বেড়ানোর পালা শেষ হয়েছে। এর পরবর্তীতে ‘রেগ্যান’এর সাথে প্রশান্ত মহাসাগরে আরেকটা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করতে বেশ কয়েকমাস লেগে যেতে পারে। ‘কিটসাপ সান’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘কার্ল ভিনসন’ ওয়াশিংটন রাজ্যের ব্রেমারটনে দেড় বছরের মেইনটেন্যান্স শেষ করে অগাস্টের শুরুতে সান ডিয়েগোতে ফেরত আসার কথা রয়েছে। এরপর এর সমুদ্রে যাবার প্রস্তুতি শুরু হবে। ‘জন সি স্টেনিস’, ‘জর্জ ওয়াশিংটন’ এবং ‘জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ’ লম্বা সময়ের জন্যে ড্রাইডকে রয়েছে। নতুন জাহাজ ‘জেরাল্ড আর ফোর্ড’এর নতুন প্রযুক্তির টেস্টিং এখনও শেষ হয়নি; তাই এখনই পুরোপুরি সার্ভিসে আসছে না। ১০ মাসের মিশন শেষ করে জানুয়ারিতে সান ডিয়েগোতে ফেরত যাওয়া ‘আব্রাহাম লিঙ্কন’ খুব শিগগিরই আবার সাগরে যাচ্ছে না। ৭ মাসের মিশন শেষ করে জুনের মাঝামাঝি নরফোক নৌঘাঁটিতে ফিরেছে ‘হ্যারি এস ট্রুম্যান’। টানা ১৬১ দিন কোন বন্দরে না ভিড়ে রেকর্ড করা ‘আইজেনহাওয়ার’এর নাবিকরা ভূমিতে পা ফেলার জন্যে উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছিল। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’এর সাথে সাক্ষাতে এই জাহাজের রক্ষার দায়িত্বে থাকা মার্কিন ক্রুজার ‘সান জেসিন্টো’র ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ড ক্রসম্যান বলেন যে, কিছু নাবিক তার কাছে জানতে চেয়েছে যে, কোন জাহাজটা আগে বন্দরে নোঙ্গর করবে।

বিশাল সমরশক্তি থাকার পরেও মানব বাস্তবতাগুলি থেকে মার্কিনীরা বের হতে পারেনি। ১ লক্ষ টনের দৈত্যাকৃতির মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজগুলি যতোটাই শক্তিশালী হোক না কেন, তা সমুদ্রে কতটা সময় কাটাতে পারবে, তা নির্ভর করছে নাবিকদের সক্ষমতার উপর। আর অতি জটিল এবং উচ্চমূল্যের এই প্রযুক্তিকে চালু রাখতে ব্যাপক খরচ ছাড়াও নৌবহরের একটা বড় অংশকে মেইনটেন্যান্সের মাঝে থাকতে হচ্ছে। ক’দিন আগেই উভচর এসল্ট শিপ ‘বনহোমি রিচার্ড’এ ভয়াবহ আগুন এবং ২০১৭ সালে দু’টা ডেস্ট্রয়ারের দুর্ঘটনার পর দুই বছর সার্ভিসের বাইরে থাকার ঘটনা নৌবাহিনীর অপারেশনাল দক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এপ্রিল মাসে দক্ষিণ চীন সাগরে ‘এফ-৩৫’ স্টেলথ ফাইটার বহণে সক্ষম এরকমই একটা এসল্ট শিপ ‘আমেরিকা’ মার্কিন উপস্থিতিকে জিইয়ে রেখেছিল। চীনারা তাদের অপেক্ষাকৃত স্বল্পক্ষমতার নৌবহরকে মার্কিনীদের সক্ষমতার ফাঁকফোঁকড়ের মাঝে ব্যবহার করে মার্কিন নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে। আর এতে তারা বেশ সাফল্যও পেয়েছে। বিশ্বব্যাপী মার্কিনীদের বন্ধু এবং প্রতিযোগী সকলেই যুক্তরাষ্ট্রের এই সীমাবদ্ধতাগুলিকে অবলোকন করছে; যা কিনা তাদের নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অনুপ্রাণিত করছে।

Saturday, 18 July 2020

হায়া সোফিয়ায় নামাজ আদায়ের সিদ্ধান্তের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব কতটুকু?

১৮ই জুলাই ২০২০

ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যে এটা পরিষ্কার যে, হায়া সোফিয়ার এই সিদ্ধান্তে তুরস্ক মুসলিম আবেগকে কাজে লাগিয়ে নিজ দেশে এবং বিশ্বব্যাপী বেশকিছু সমর্থন যুগিয়েছে; তবে আরব বিশ্বের নেতৃত্বের সমর্থন পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ক্যাথোলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্ট ভিতের পশ্চিমা সেকুলার দুনিয়া ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চ থেকে নিজেদের আলাদা করে কঠোর বার্তা দেয়া থেকে দূরে থেকেছে; যা চার্চের কয়েক শতকের দ্বন্দ্বের কথাকে ভুলিয়ে দেয়না। পশ্চিমাদের সাথে রুশদের চলমান টানপোড়েনের মাঝে এই ঘটনা জ্বালানি হিসেবে কাজ করবে; এরদোগানও তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কিছু ফসল ঘরে তুলে নেবেন। বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নতুন কোন বিভেদের জন্ম না দিলেও মুসলিম আবেগ জড়িত থাকার কারণে তা তুর্কি জনগণকে একত্রিত করা ছাড়াও বিশ্বব্যাপী তুরস্ককে আরও গুরুত্বপূর্ণ করেছে; ব্যাপারটা কারুর পছন্দ হোক বা না-ই হোক।


১৭ই জুলাই তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান সাংবাদিকদের বলেন যে, হায়া সোফিয়াকে আবারও মসজিদে রূপান্তরিত করার ব্যাপারটা তুরস্কের সার্বভৌমত্মের ব্যাপার। তুরস্ক মনে করে না যে, এব্যাপারে আন্তর্জাতিক মতামত তুরস্কের জন্যে কোন বাধ্যবাধকতা তৈরি করে। একই দিনে ‘সিএনএন’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র ইব্রাহিম কালিন বলেন যে, হায়া সোফিয়াতে যেকেউ ঢুকতে পারবে এবং এর অভ্যন্তরের ঐতিহাসিক মোজাইকগুলিকে গত ৫’শ বছরের মতোই রক্ষা করা হবে। তিনি বলেন যে, তুরস্ক সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে যাতে করে এই মোজাইকগুলিকে নামাজের সময় ঢেকে রাখা যায়। হায়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তর করার ব্যাপারটা নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া পুরোনো ধারণা থেকে এসেছে; বর্তমানে তুরস্কে ধর্মীয় স্বাধীনতা রয়েছে। তিনি আরও বলেন যে, তুরস্কে বসবাসরত ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা সমঅধিকার পাচ্ছে; যা কিনা ভিন্ন ধর্মালম্বী যেকোন মানুষকে জিজ্ঞেস করলেই বুঝতে পারা সম্ভব। তুরস্ক ইতোমধ্যেই ক্যাথোলিক চার্চের পোপসহ অনেককেই হায়া সোফিয়াতে আমন্ত্রণ জানিয়েছে বলে বলেন তিনি। গত ১০ই জুলাই হায়া সোফিয়াকে মসজিদ হিসেবে ব্যবহারের পক্ষে তুরস্কের সর্বোচ্চ আদালতের রায় পাবার পর থেকে প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরোনো এই স্থাপনাকে নিয়ে চলছে ব্যাপক বাকযুদ্ধ। হায়া সোফিয়ার ইতিহাস এবং এর সাথে বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে এর গুরুত্ব আসলে কতখানি?

৫৩৭ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কন্সটানটিনোপল শহরে হায়া সোফিয়া নির্মিত হয় ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চের উপাসনালয় হিসেবে। একাদশ শতকে ইস্টার্ন অর্থোডক্স থেকে ক্যাথোলিক চার্চ আলাদা হয়ে যাবার পর ১২০৪ সালে চতুর্থ ক্রুসেডের সময় পশ্চিম ইউরোপ থেকে আসা খ্রিস্টান ক্রুসেডাররা বাইজ্যান্টাইন রাজ্যের প্রায় পুরোটাই দখল করে নেয় এবং কন্সটানটিনোপল শহর লুট করে। ক্যাথোলিক ক্রুসেডারদের তৈরি করা ল্যাটিন সাম্রাজ্যের অধীনে ১২৬১ সাল পর্যন্ত এটা ক্যাথোলিক চার্চ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ল্যাটিন সাম্রাজ্যকে বাইজ্যান্টাইনরা ফ্রাঙ্কদের (বর্তমানে ফ্রান্স) সাম্রাজ্য বলতো। ক্যাথোলিকরা ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চকে পুরোপুরি নির্মূল করে দেবার চেষ্টা করলেও ১২৬১ সালে কন্সটানটিনোপল শহর আবারও বাইজ্যান্টাইনদের নিয়ন্ত্রণে আসে। সেসময় থেকে ১৪৫৩ সাল পর্যন্ত হায়া সোফিয়া ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৪৫৩ সালে উসমানি সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদের অধীন মুসলিম সেনাবাহিনী কন্সটানটিনোপল বিজয় করে নেয়। মেহমেদ ‘আল ফাতিহ’ হায়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তরিত করেন এবং সেখানে নামাজ আদায়ের প্রচলন করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানি খিলাফত ধ্বংসের পর মুস্তফা কেমাল আতাতুর্কের অধীনে সেকুলার তুরস্ক তৈরি হলে ১৯৩১ সালের পর থেকে হায়া সোফিয়াতে প্রথমবারের মতো সব ধরনের উপাসনা বাতিল করা হয়। ১৯৩৪ সালে এটাকে একটা জাদুঘরে রূপান্তরিত করে পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করা হয়। তুর্কি সংস্কৃতি এবং পর্যটন মন্ত্রণালয়ের হিসেবে ২০১৯ সালে ৩৭ লক্ষ পর্যটক হায়া সোফিয়া দেখতে এসেছিল।

অনেকেই বলছেন যে, হায়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তরের মাধ্যমে এরদোগান নিজ দেশের অর্থনৈতিক দৈন্যদশাকে ঢাকতে চাইছে। ‘নিকেই এশিয়ান রিভিউ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০১৯এর মার্চের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ‘একে পার্টি’ আঙ্কারা এবং ইস্তাম্বুলের নিয়ন্ত্রণ হারাবার পর এরদোগান এই প্রকল্পকে এগিয়ে নিতে জোর দিয়েছেন। ‘এরাব নিউজ’এর এক লেখায় ধর্মবিষয়ক কনসালট্যান্ট পিটার ওয়েলবি বলেন যে, বর্তমান তুরস্কের বহু ধরনের সমস্যা থাকলেও মসজিদের অভাব সেই সমস্যাগুলির মাঝে একটা নয়। তিনি বলছেন যে, এই ঘোষণার মাধ্যমে তুরস্ক মানুষের মাঝে বিভেদ তৈরি করতে চাইছে। জুনের প্রথম সপ্তাহে করা এক জনমত জরিপের বরাত দিয়ে তুর্কি পত্রিকা ‘ইয়েনি সাফাক’ বলছে যে, তুরস্কের ৭৩ শতাংশ জনগণ হায়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তরের পক্ষে; ২২ শতাংশ বিপক্ষে; ৪ শতাংশ কোন মতামত দেয়নি।

হায়া সোফিয়ার ব্যাপারে পশ্চিমা বিশ্ব খুব শক্ত কোন শব্দ ব্যবহার করা থেকে বিরত থেকেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর হায়া সোফিয়ার ঘোষণার ব্যাপারে ‘হতাশা’ ব্যক্ত করে। ক্যাথোলিক চার্চের পোপ ফ্রান্সিস এতে ‘খুবই ব্যাথিত’ হয়েছেন বলে বলেন। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান জোসেফ বোরেল সাংবাদিকদের বলেন যে, ইইউএর মাঝে হায়া সোফিয়াকে আগের অবস্থানে নিয়ে যাবার জন্যে যথেষ্ট সমর্থন রয়েছে; এবং তারা তুরস্ককে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের আহ্বান জানাবেন। তবে ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চের অনুসারীরা তাদের আবেগ প্রকাশ করেছেন। রুশ অর্থোডক্স চার্চের প্রধান প্যাট্রিয়ার্ক কিরিল বলেন যে, তিনি ‘গভীরভাবে চিন্তিত’ হয়েছেন এবং তিনি মনে করছেন যে, এটা ‘পুরো খ্রিস্টান সভ্যতার জন্যে হুমকিস্বরূপ’। গ্রীক সংস্কৃতি মন্ত্রী লিনা মেনডোনি বলেন যে, এই সিদ্ধান্ত তুরস্ককে ছয় শতক পিছনে নিয়ে গেছে; এবং এটা ‘সভ্য দুনিয়ার প্রতি সরাসরি হুমকি’। রুশ পার্লামেন্টের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির উপ-প্রধান ভ্লাদিমির জাভারভ বলেন যে, এতে মুসলিম দুনিয়ার কোন উপকার হবে না; বরং বিভিন্ন জাতিকে একে অপরের বিপক্ষে দাঁড় করাবে। হায়া সোফিয়ার ব্যাপারে মুসলিম বিশ্ব থেকে আসা বিভিন্ন সমর্থনের এক তালিকা তুর্কি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে প্রকাশ করে ‘নিকেই এশিয়ান রিভিউ’, যেখানে ওমান, ইরান, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার নাম রয়েছে; তবে আরব দেশগুলির নাম নেই। আরব আমিরাতের সংস্কৃতি মন্ত্রী নৌরা আল-কাবি এক টুইটার বার্তায় তুরস্কের এই সিদ্দ্বান্তের সমালোচনা করেন। ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যে এটা পরিষ্কার যে, হায়া সোফিয়ার এই সিদ্ধান্তে তুরস্ক মুসলিম আবেগকে কাজে লাগিয়ে নিজ দেশে এবং বিশ্বব্যাপী বেশকিছু সমর্থন যুগিয়েছে; তবে আরব বিশ্বের নেতৃত্বের সমর্থন পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ক্যাথোলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্ট ভিতের পশ্চিমা সেকুলার দুনিয়া ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চ থেকে নিজেদের আলাদা করে কঠোর বার্তা দেয়া থেকে দূরে থেকেছে; যা চার্চের কয়েক শতকের দ্বন্দ্বের কথাকে ভুলিয়ে দেয়না। পশ্চিমাদের সাথে রুশদের চলমান টানপোড়েনের মাঝে এই ঘটনা জ্বালানি হিসেবে কাজ করবে; এরদোগানও তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কিছু ফসল ঘরে তুলে নেবেন। বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নতুন কোন বিভেদের জন্ম না দিলেও মুসলিম আবেগ জড়িত থাকার কারণে তা তুর্কি জনগণকে একত্রিত করা ছাড়াও বিশ্বব্যাপী তুরস্ককে আরও গুরুত্বপূর্ণ করেছে; ব্যাপারটা কারুর পছন্দ হোক বা না-ই হোক।

Friday, 10 July 2020

ফ্রান্স কেন ১৭০ বছর পর আলজেরিয়ার বিদ্রোহীদের মস্তক ফেরত দিলো?

১০ই জুলাই ২০২০

ফ্রান্স আলজেরিয়াকে আর যা-ই হোক, তুরস্কের পক্ষে দেখতে চাইছে না। এই ব্যাপারটাই ফ্রান্সের সাথে দরকষাকষিতে আলজেরিয়াকে শক্তিশালী করেছে। অপরদিকে আলজেরিয়া তুরস্ককে সরাসরি সমর্থন না দিলেও নিজের অবস্থানকে জানান দিতে তার সীমানার বাইরে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করলে তা উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকায় ফ্রান্সের অবস্থানকে হুমকির মাঝে ফেলবে। ফ্রান্সের ক্ষমা চাওয়ার ব্যাপারটা তখন লোক দেখানোই মনে হতে পারে।

গত ৩রা জুলাই ফ্রান্স আলজেরিয়ায় ঔপনিবেশিক সময়ে হত্যা করা ২৪ জন বিদ্রোহীর মস্তক ফেরত দিয়েছে। ১৮৩০ সাল থেকে ১৯৬২ সালের মাঝে ফরাসীরা ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ব্যক্তিদের হত্যা করে তাদের মস্তক ফ্রান্সে নিয়ে যায় এবং সেগুলিকে প্যারিসের ‘ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রি’তে সাজিয়ে রাখে। আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আব্দেলমাজিদ তেবুনে এক ভাষণে বলেন যে, ১৭০ বছর ধরে এই বিদ্রোহীদেরকে কবর পাওয়া থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। পরদিন ৪ঠা জুলাই ‘ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর’এর সাথে এক সাক্ষাতে তেবুনে বলেন যে, ঔপনিবেশিক সময়ের অপরাধের জন্যে আলজেরিয়ার কাছে ফ্রান্সের পুরো ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিৎ; এখন পর্যন্ত অর্ধেকের মতো ক্ষমা প্রার্থনা পাওয়া গিয়েছে। তিনি বলেন যে, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ বর্তমান অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে আরও অগ্রগামী হতে পারেন। কিন্তু এতো বছর পরে কেন ঔপনিবেশিক সময়ের অত্যাচারের কাহিনীগুলি গুরুত্ব পাচ্ছে? ‘সিএনএন’ বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের হত্যার পর পশ্চিমা দেশগুলিতে ঔপনিবেশিক সময়ের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। এতকাল পর ফ্রান্সের এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সাথে এই আন্দোলনের সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে ‘সিএনএন’এর বিশ্লেষণের বাইরেও আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণ পাওয়া যাবে উত্তর এবং পশ্চিম আফ্রিকার সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন থেকে। এর মাঝে আলজেরিয়ায় সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন উল্লেখযোগ্য।

গত বছরের ২৩শে ডিসেম্বর আলজেরিয়ার সেনাপ্রধান জেনারেল আহমেদ গাইদ সালাহ ৭৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। অনেকেই মনে করেন যে, গত দুই দশক ধরে প্রেসিডেন্ট আব্দেলআজিজ বুতাফ্লিকার হাতে দেশের ক্ষমতা থাকার পিছনে জেনারেল গাইদ সালাহর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ২০০৪ সালে বুতাফ্লিকা তাকে সেনাপ্রধান নিয়োগ করেন। ২০১৩ সালে তিনি উপ প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিযুক্ত হন। ‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, গত বছরের এপ্রিল মাসে বুতাফ্লিকা ক্ষমতা ছেড়ে দিলেও আন্দোলনকারীরা ক্ষমতায় থাকা সকলের পদত্যাগ দাবি করছিল। কারণ বুতাফ্লিকা ক্ষমতাচ্যুত হবার পর আলজেরিয়ার নিয়ন্ত্রণ মূলতঃ জেনারেল গাইদ সালাহর হাতেই ছিল। সালাহ ১৭ বছর বয়সে আলজেরিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দিয়ে ফরাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। ১৯৫৪ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেয়া নেতৃবৃন্দের হাতেই আলজেরিয়ার ক্ষমতা ছিল এতকাল। বুতাফ্লিকা এবং গাইদ সালাহ ছিলেন সেই জেনারেশনের শেষ নেতৃবৃন্দ। সালাহর মৃত্যুর মাত্র চারদিন আগে বুতাফ্লিকার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী আব্দেলমাজিদ তেবুনে আলজেরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আরোহন করেন। সালাহর স্থলাভিষিক্ত হন ৭৪ বছর বয়সী জেনারেল সাঈদ চেংরিহা। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে সেনাবাহিনীর কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। তেবুনে এবং চেংরিহা উভয়েই আলজেরিয়ার এতকালের ক্ষমতাধর নেতৃত্বের অংশ হলেও তাদের অধীনে দেশটার রাষ্ট্রীয় নীতিতে বেশকিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্টের অফিসের এক বার্তায় বলা হয় যে, গত ২৬শে ডিসেম্বর দেশটার শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত হয় যে, বিশ্বে আলজেরিয়ার অবস্থানকে পুনর্জাগরিত করতে লিবিয়া, মালি, সাহারা মরুভূমির সাহেল অঞ্চল এবং আফ্রিকাতে আলজেরিয়ার ভূমিকাকে পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। গত পহেলা জুন আলজেরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রেসিডেন্ট তেবুনের পরিদর্শনের সময় জেনারেল চেংরিহা তার ভাষণে বলেন যে, আলজেরিয়ার সংবিধান পরিবর্তনের যে প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে, সেটাকে সেনাবাহিনী যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি নতুন সংবিধানে আলজেরিয়ার সীমানার বাইরে সেনাবাহিনীর অংশ নেয়ার ব্যাপারটাকে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। লন্ডনকেন্দ্রিক মিডিয়া ‘মিডলইস্ট মনিটর’ বলছে যে, আলজেরিয়ার সংবিধান পরিবর্তনের পিছনে সেনাবাহিনীর সমর্থন দেশটার সামরিক বাহিনীর চিন্তায় ব্যাপক পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে। ‘দ্যা এরাব উইকলি’র এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, সংবিধানের নতুন পরিবর্তনে আলজেরিয়ার নিরাপত্তা চিন্তাকেই পরিবর্তন করে ফেলা হচ্ছে। নিজ সীমানার ভেতর থেকেই বাইরের হুমকি মোকাবিলা করার এতকালের চিন্তাটাকে এখন পরিবর্তন করা হচ্ছে। অর্থাৎ নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আলজেরিয়া এখন তার পূর্বে অবস্থিত লিবিয়া এবং দক্ষিণের মালিতে সহিংসতাকে নিষ্ক্রিয় অবস্থান থেকে না-ও দেখতে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হচ্ছে যে, একারণেই সংবিধান পরিবর্তনে আলজেরিয়ার সেনাবাহিনীর সমর্থন শক্তিশালী দেশগুলির কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে।

৬ই জানুয়ারি লিবিয়ার ত্রিপোলি-কেন্দ্রিক ‘গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল একর্ড’ বা ‘জিএনএ’এর প্রধানমন্ত্রী ফায়েজ আল-সারাজ এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু আলজেরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এই সাক্ষাতের পরপরই তুরস্ক লিবিয়াতে সামরিক হস্তক্ষেপ করে সেখানকার যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ফ্রান্স লিবিয়াতে জেনারেল হাফতারের অধীনে ‘লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’ বা ‘এলএনএ’কে সমর্থন দিচ্ছে; এবং তারা লিবিয়াতে তুরস্কের সামরিক হস্তক্ষেপের যারপরনাই বিরোধী। ফ্রান্স এবং তুরস্ক উভয় পক্ষই লিবিয়ার যুদ্ধে আলজেরিয়ার সমর্থন চাইছে। উত্তর এবং পশ্চিম আফ্রিকায় আলজেরিয়ার রয়েছে সবচাইতে শক্তিধর সামরিক বাহিনী। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে আলজেরিয়ার শাসকরা আলজেরিয়ার সীমানার বাইরে প্রভাব বিস্তারকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। ইউরোপ, বিশেষ করে ফ্রান্সের সাথে বড় ধরণের বাণিজ্য সম্পর্ককে ঝুঁকিতে ফেলতে চাননি তারা। বুতাফ্লিকা এবং জেনারেল গাইদ সালাহর প্রস্থানের পর অনেক কিছুই নতুন করে হিসেব কষতে হচ্ছে। লিবিয়াতে তুরস্কের অবস্থান শক্ত হতে শুরু করায় ফ্রান্স শুধু উত্তর আফ্রিকা নয়, ভূমধ্যসাগরেও তার প্রভাবকে হুমকির মুখে দেখতে পাচ্ছে। ‘মিডলইস্ট মনিটর’এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, তিউনিসিয়ার পার্লামেন্টে ফ্রান্সের কাছ থেকে ঔপনিবেশিক অত্যাচারের জন্যে ক্ষমা চাইবার আইন পাস করা না গেলেও আলজেরিয়া কিন্তু সেই পথে হাঁটছে না। আলজেরিয়ার দক্ষিণে মালিতে ফ্রান্স সাত বছর ধরে এক ‘শেষ না হওয়া’ যুদ্ধে আটকে রয়েছে। এমতাবস্থায় এই অঞ্চলে নতুন শক্তি হিসেবে আলজেরিয়ার আবির্ভাব ফ্রান্সকে বিচলিত করেছে। ফ্রান্স আলজেরিয়াকে আর যা-ই হোক, তুরস্কের পক্ষে দেখতে চাইছে না। এই ব্যাপারটাই ফ্রান্সের সাথে দরকষাকষিতে আলজেরিয়াকে শক্তিশালী করেছে। অপরদিকে আলজেরিয়া তুরস্ককে সরাসরি সমর্থন না দিলেও নিজের অবস্থানকে জানান দিতে তার সীমানার বাইরে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করলে তা উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকায় ফ্রান্সের অবস্থানকে হুমকির মাঝে ফেলবে। ফ্রান্সের ক্ষমা চাওয়ার ব্যাপারটা তখন লোক দেখানোই মনে হতে পারে।