Showing posts with label navy. Show all posts
Showing posts with label navy. Show all posts

Friday, 8 September 2023

ভারত মিয়ানমারকে শক্তিশালী করছে কেন?

০৮ই সেপ্টেম্বর ২০২৩

মিয়ানমারের প্রথম ফ্রিগেট 'অংজেয়া' ২০১৬ সালে ভারতের বিশাখাপত্নম সফরে। জাহাজের উপরে ভারতে তৈরি রাডার দৃশ্যমান। এই রাডার এবং এর সাথে সোনার ও এন্টি-সাবমেরিন টর্পেডো মিয়ানমারের এই জাহাজগুলিকে যথেষ্ট শক্তিশালী করেছে; যা কিনা চোরাচালান বা সন্ত্রাস দমনে নয়, বরং অন্য রাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সাথে যুদ্ধে ব্যবহৃত হবে।

মিয়ানমারকে কে অস্ত্র দিচ্ছে না? তবে এক্ষেত্রে ভারত যে একটা উদ্দেশ্য নিয়ে এগুচ্ছে, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। ভারত মূলতঃ অস্ত্র আমদানিকারক দেশ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তারা কিছু অস্ত্র রপ্তানি শুরু করেছে। ‘স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পীস রিসার্চ ইন্সটটিউট’ বা ‘সিপরি’র হিসেবে ভারত ২০০৮ থেকে ২০২২এর মাঝে ৫’শ ১৩ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র রপ্তানি করেছে। এর মাঝে সর্বোচ্চ ২’শ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩৯ শতাংশ তারা রপ্তানি করেছে মিয়ানমারে। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে শ্রীলংকা (১৮ শতাংশ) এবং মরিশাস (১৫ শতাংশ)। শুধুমাত্র ২০২০ সালেই ভারত মিয়ানমারের কাছে ১’শ ৪৮ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেছে। ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মাঝে মিয়ানমার ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি অস্ত্র আমদানি করেছে। এর মাঝে বেশিভাগটাই বা ৪৯ শতাংশ এসেছে চীন থেকে; যা অবাক কোন ব্যাপার নয়। কারণ চীন কয়েক যুগ ধরেই মিয়ানমারের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এসেছে রাশিয়া থেকে; ১৮ শতাংশ। তবে ২০০৮ থেকে ২০২২এর মাঝে হিসেব করলে তা ৩৫ শতাংশ। তৃতীয় সর্বোচ্চ এসেছে ভারত থেকে; যা ১৪ শতাংশ। ২০১৪ সাল পর্যন্তও ভারত মিয়ানমারের অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশগুলির মাঝে কোন অবস্থানেই ছিল না। ২০০৮ থেকে ২০১৪এর মাঝে মিয়ানমার মোট ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি অস্ত্র আমদানি করেছিল; যার মাঝে চীন থেকে এসেছিল ৫০ শতাংশ এবং রাশিয়া থেকে ৪২ শতাংশ। ভারত থেকে এসেছিল মাত্র ১ শতাংশ।

মিয়ানমারকে অস্ত্র সরবরাহ করা ভারতের কৌশলগত চিন্তার অংশ

২০১৪ সালে ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে মিয়ানমারের সাথে ভারতের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় ওঠে এবং মিয়ানমারে অস্ত্র রপ্তানি নতুন এক চেহারা পায়। একারণেই ২০১৬-১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে গণহত্যা চালাবার পর ১০ লক্ষ মুসলিম শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশের সময় ভারতের অবস্থান ছিল সরাসরিভাবে মিয়ানমারের পক্ষে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৫ সালে প্রথমবার এবং ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয়বার মিয়ানমার সফর করেন। দ্বিতীয় সফর উপলক্ষে ভারতের ‘ইকনমিক টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, রাখাইনে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর উপর সন্ত্রাসী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ভারত মিয়ানমারের সাথে নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বৃদ্ধি করতে চাইছে। মোদির মিয়ানমার সফরের অল্প কিছুদিন আগেই ২০১৭ সালের জুলাই মাসে মিয়ানমারের সামরিক শাসক জেনারেল মিন অং হিলাইং ৮ দিনের জন্যে ভারত সফর করেন। ‘দ্যা ইকনমিক টাইমস’ বলে যে, মিয়ানমার জেনারেলের এই ভারত সফরের আগেই ভারত মিয়ানমারকে যেসকল অস্ত্র সরবরাহ করছিল, তার মাঝে ছিল ১০৫মিঃমিঃ আর্টিলারি কামান, রকেট লঞ্চার, রাইফেল, রাডার, মর্টার, বেইলি ব্রিজ, কমিউনিকেশন যন্ত্রপাতি, নাইট ভিশন ডিভাইস, ওয়ার-গেমিং সফটওয়্যার, রাস্তা তৈরির যন্ত্রপাতি, নৌবাহিনীর গানবোট, সোনার, একুস্টিক ডোম, ডিরেক্টিং গিয়ার, ইত্যাদি। এবং সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ৩৮ মিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে মিয়ানমারকে সাবমেরিন ধ্বংসী টর্পেডো সরবরাহ করছে ভারত। দুই দেশের মাঝে উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক, সামরিক এবং বেসামরিক নেতৃবর্গের সফরের সংখ্যাও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের নৌবাহিনী নিয়মিতভাবে মিয়ানমার সফর করছে এবং একত্রে যৌথ মহড়ার আয়োজন করছে। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে জেনারেল হিলাইং আবারও দিল্লী সফর করেন এবং সেই সফরে দুই দেশের মাঝে সামরিক সহযোগিতার এক সহঝোতা সাক্ষরিত হয়।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর ২০২২এর ২৭শে অক্টোবর ভারতীয় সরকারি কোম্পানি ‘ইয়ানত্রা ইন্ডিয়া’র পশ্চিমবঙ্গের ইশাপুরের মেটাল এন্ড স্টীল ফ্যাক্টরিতে তৈরি ২০টা ১২২মিঃমিঃ কামানের ব্যারেলের প্রথম চালান মিয়ানমারে আনুষ্ঠানিকভাবে সরবরাহ করা হয়। ২০২২এর মে মাসে, অর্থাৎ অভ্যুত্থানের পরেই মিয়ানমারের সামরিক সরকারের কাছ থেকে এই অস্ত্রের অর্ডার নেয় ভারত, যার অংক ছিল প্রায় ৩ লক্ষ ৩০ হাজার ডলার। ২০২৩এর মে মাসে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ভারতের ২২টা আলাদা কোম্পানি মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। এই কোম্পানিগুলির মাঝে রয়েছে সরকারি কোম্পানি ‘ভারত ডাইনামিক্স’, ‘ভারত ইলেকট্রনিক্স’ এবং ‘ইয়ানত্রা ইন্ডিয়া’। বেসরকারি কোম্পানিগুলির মাঝে রয়েছে ‘সান্দীপ মেটালক্রাফট’ এবং ‘লারসেন এন্ড টুব্রো’। এই অস্ত্রগুলির মাঝে গুরুত্বপূর্ণগুলির মাঝে রয়েছে বিভিন্ন সার্ভেইল্যান্স যন্ত্র, আর্টিলারি এবং ক্ষেপণাস্ত্র বা এর যন্ত্রাংশ। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ভারতের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেবার কথা না বলে বরং ভারত সরকারকে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে চিন্তা করতে আহ্বান জানানো হয়। ভারত সরকার জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনের জবাবে বলে যে, ভারত মিয়ানমারের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র সরবরাহকারী নয়। আর মিয়ানমারকে বর্তমানে সরবরাহ করা অস্ত্রগুলি সামরিক অভ্যুত্থানের আগেই গণতান্ত্রিক সরকার থাকার সময়েই সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। আর এই অস্ত্র সরবরাহ ভারতের নিজস্ব নিরাপত্তা চিন্তার একটা অংশ।

 
মিয়ানমারের সামরিক কর্মকর্তারা ভারতের সোনার ফ্যাক্টরি ভিজিট করছেন। ভারত বলছে যে, মিয়ানমারকে সরবরাহ করা অস্ত্র ভারতের নিজস্ব নিরাপত্তা চিন্তার একটা অংশ।

পশ্চিমারাও মিয়ানমারে ভারতীয় অস্ত্র সরবরাহের সাথে জড়িত

‘দ্যা ওয়্যার’এর এক প্রতিবেদনে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গ্রুপগুলির বৈশ্বিক বাণিজ্য তথ্যের ভান্ডার ‘পাঞ্জিভা’র ডাটাবেসের উপর গবেষণার বরাত দিয়ে বলা হয় যে, ২০২২এর নভেম্বর থেকে ২০২৩এর এপ্রিল পর্যন্ত ৬ মাসে ভারতের সরকারি কোম্পানি ‘ভারত ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড’ বা ‘বিইএল’ মিয়ানমারে ৫ মিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি করেছে। এই সরঞ্জামগুলি মোট ৭টা শিপমেন্টে আলাদাভাবে পাঠানো হয়েছে; যার ৩টা মিয়ানমার সরকারকে সরাসরি পাঠানো হয়েছে; আর বাকিগুলির মাঝে ৩টা ‘মেগা হিল জেনারেল ট্রেডিং’এর এবং ১টা ‘এলায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস’এর হাত ঘুরে মিয়ানমার সারকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। ‘বিইএল’এর প্রধান শেয়ারহোল্ডার ভারত সরকার হলেও এতে মার্কিন এবং কানাডিয় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে; যার মাঝে রয়েছে মার্কিন কোম্পানি ‘গোল্ডমান সাক্স’, বিনিয়োগ জায়ান্ট ‘ভ্যানগার্ড’ ও ‘ব্ল্যাকরক’; রয়েছে ‘কানাডা পেনশন প্ল্যান’, ‘ক্যালিফোর্নিয়া পাবলিক এমপ্লয়িজ রিটায়ারমেন্ট সিস্টেম’ এবং ‘ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট টিচার্স রিটায়ারমেন্ট সিস্টেম’। অর্থাৎ শুধু ভারত সরকারই নয়, ভারতের সামরিক শিল্পে বিনিয়োগকারী পশ্চিমারাও মিয়ানমারে অস্ত্র সরবরাহের সাথে জড়িত। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে ২০২২এর ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারত মিয়ানমারকে কমপক্ষে ৫১ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সরবরাহ করেছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয় একই সময়ে বহু কোম্পানির নামে সিঙ্গাপুর থেকে ২’শ ৫৪ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে; থাইল্যান্ড থেকে সরবরাহ করা হয়েছে আরও ২৮ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র। এই সময়ে মিয়ানমারের মোট অস্ত্র আমদানি ছিল প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের। এই অস্ত্রের বাণিজ্য সম্ভব হচ্ছে, কারণ জাতিসংঘের কোন সদস্য রাষ্ট্র ‘মিয়ানমার ফরেন ট্রেড ব্যাংক’ বা ‘এমএফটিবি’র উপর অবরোধ দেয়নি। এই ব্যাংক ব্যবহার করেই মিয়ানমার খুব সহজেই অস্ত্র কেনার পেমেন্ট দিতে পারছে।

পশ্চিমারা কখনোই মিয়ানমারকে ভারতের সরবরাহকৃত অস্ত্রের সাথে নিজেদের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করতে পারে না। ভারত যেসকল অস্ত্র নিজেরা তৈরি করে, তার অনেকগুলিই পশ্চিমা কোম্পানিগুলির কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়ে তৈরি করা । অর্থাৎ এগুলি অন্য কারুর কাছে রপ্তানি করতে হলে সেই কোম্পানির কাছ থেকে অনুমতি লাগবে। আর সেই কোম্পানি যেই দেশে অবস্থিত, সেই দেশের রাজনৈতিক অনুমোদন ছাড়া তারা ভারতকে অস্ত্র রপ্তানির অনুমতি দেবে না। এটা পশ্চিমা দেশগুলির রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ভারত এই প্রক্রিয়ার অধীনে একটা দেশ মাত্র। মিয়ানমার সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের ওয়েবসাইট ‘জাস্টিস ফর মিয়ানমার’ তথ্য প্রকাশ করে যে, ২০১৯ সালে ভারতীয় কোম্পানি ‘সান্দীপ মেটালক্রাফট’ মিয়ানমারে সুইডিশ ৮৪মিঃমিঃ এন্টি-ট্যাঙ্ক অস্ত্র ‘এম৪ কার্ল গুস্তাফ’এর জন্যে ফিউজ সরবরাহ করেছে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পরেও খুব সম্ভবতঃ আরেকটা শিপমেন্ট গিয়েছে মিয়ানমারে। ২০২৩এর ২৯শে মার্চ সুইডিশ পার্লামেন্টে পররাষ্ট্রমন্ত্রী টোবিয়াস বিলিস্ট্রোমকে এব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন যে, সুইডেন ভারতের কাছে ‘এম৪ কার্ল গুস্তাফ’ এন্টি-ট্যাঙ্ক অস্ত্র রপ্তানি করেছিল এবং ২০২২ সালে সুইডিশ কোম্পানি ‘সাব’ ভারতে এই অস্ত্রের কারখানা স্থাপন করে। এর মাঝ থেকে কিছু অস্ত্র মিয়ানমারের কাছে যেতে থাকতে পারে। ২০১২ সালে এব্যাপারে একটা তদন্ত হয়েছিল এবং সেই তদন্তে উঠে এসেছিল যে, ভারত তাদের লাইসেন্সের শর্ত মেনে চলছে। তবে ২০১২ সালের পর আর কোন তদন্ত হয়নি। অর্থাৎ গত এক দশকে ভারত এই অস্ত্রগুলি মিয়ানমারের কাছে বিক্রি করেছে কিনা, সেব্যাপারে সুইডিশ সরকারের খুব বেশি একটা মাথাব্যাথা নেই।

 
মিয়ানমারের সাবমেরিন-চেজারের উপর ভারতে তৈরি 'শায়েনা' টর্পেডোর লঞ্চার। বাংলাদেশেও অনেকেই বিদেশী মিডিয়ার রিপোর্টিংএর সাথে তাল মিলিয়ে বলছেন যে, ভারত মিয়ানমারকে অস্ত্র দিচ্ছে চীনকে ব্যালান্স করার জন্যে। কিন্তু তারা পুরোপুরিভাবে এড়িয়ে যাচ্ছেন যে, এই অস্ত্র কাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে। মিয়ানমারকে ভারত চোরাচালান ও সন্ত্রাস দমনে অত্যাধুনিক রাডার, সোনার, টর্পেডো এবং সাবমেরিন সরবরাহ করছে - এই কথাগুলি বিশ্বাস করা উন্মাদীয়।

মিয়ানমারের জন্যে ভারতীয় অস্ত্রের ধরণ আলাদা

তবে মিয়ানমারে সরবরাহ করা ভারতীয় অস্ত্রের ধরণ বেশ কিছুটাই অন্যরকম। ২০১৩ সালে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘জেনস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, সেবছরের জানুয়ারি মাসে ভারতীয় কোম্পানি ‘বিইএল’ মিয়ানমার নৌবাহিনীর জন্যে রাডার এবং সোনার সরবরাহের চুক্তি করে। এর মাঝে রয়েছে ৩টা ‘আরএডব্লিউএল-০২ মার্ক৩’ এল-ব্যান্ডের টু-ডি লং-রেঞ্জ রাডার; যা কিনা ডাচ কোম্পানি ‘সিগনাল’এর ডিজাইন করা ‘এলডব্লিউ-০৮’ রাডারের লাইসেন্স কপি। এছাড়াও এই চুক্তির মাঝে রয়েছে ন্যাভিগেশন রাডার এবং সাবমেরিন খোঁজার সোনার। এই সোনার খুব সম্ভবতঃ ‘এইচইউএমএসএ’ বা ‘হুমসা’ সোনার সিস্টেম। এটাও পশ্চিমা টর্পেডোর আদলে ভারতীয় ডেভেলপমেন্ট। এগুলি মিয়ানমারের ফ্রিগেটগুলিতে লাগানো হবে। এই চুক্তির আগেই মিয়ানমারের প্রথম ফ্রিগেট ‘অংজেয়া’র উপর ভারতে তৈরি ‘আরএডব্লিউএল-০২’এর আগের ভার্সনের একটা রাডার লাগানো হয়েছে। দ্বিতীয় ফ্রিগেটটা ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে পানিতে ভাসানো হয়েছিল। আর তৃতীয় ফ্রিগেটটা ২০১০ সালে কাজ শুরু হয়ে ২০১২ সাল নাগাদ পানিতে ভাসানোর জন্যে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। ‘জেনস’এর ধারণা ছিল যে, হয়তো মিয়ানমার তিনটা নতুন ফ্রিগেট তৈরি করছে; যেগুলির জন্যে এই রাডারগুলি কিনেছে তারা। তবে পরবর্তীতে দেখা যায় যে, ২০১৬ সাল নাগাদ মিয়ানমারের তৃতীয় কর্ভেট ‘তাবিনশোয়েহতি’তে এই একই রাডার শোভা পায়। মিয়ানমারে এই রাডারের রপ্তানি বিষয়ে ডাচ কোম্পানি পর্যন্ত ব্যাপারটা গড়ালেও প্রকৃতপক্ষে তা ছিল সময়ক্ষেপণ মাত্র। পত্রিকায় সমালোচনা সত্ত্বেও ভারত রাডারগুলি মিয়ানমারকে ডেলিভারি দিয়ে যেতে থাকে এবং ইউরোপ থেকেও ভারতের উপরে কোনরূপ নিষেধাজ্ঞা আসেনি।

২০১৯এর ১২ই জুলাই ভারতীয় কোম্পানি ‘ভারত ডাইনামিক্স লিমিটেড’ বা ‘বিডিএল’ ঘোষণা দেয় তারা মিয়ানমারকে তাদের নিজস্ব ডেভেলপ করা ‘শায়েনা’ এন্টি-সাবমেরিন টর্পেডোর ডেলিভারি দিয়েছে। ভারতীয় বিশ্লেষণধর্মী ম্যাগাজিন ‘দ্যা ডিপ্লোম্যাট’ বলছে যে, এই ডেলিভারি ২০১৭ সালের ৩৮ মিলিয়ন ডলারের অর্ডারের অংশ। তবে ঘোষণার আগেই ২০১৯ সালের মে মাসে মিয়ানমার নৌবাহিনীর মহড়ায় তাদের ফ্রিগেট ‘কায়ান সিত্তার’ এবং ‘সিন ফায়ু শিন’এ উপর এই ভারতীয় টর্পেডো দেখা যেতে থাকে। এই একই টর্পেডো দেখা যায় মিয়ানমারের দু’টা সাবমেরিন চেজার জাহাজে; যেগুলি ২০২০এর ডিসেম্বরে কমিশনিং করা হয়। প্রতিপক্ষের সাবমেরিন ধ্বংসের জন্যে এগুলির একেকটাতে ৬টা করে টর্পেডো লঞ্চার যুক্ত করা হয়। তবে সেই দিনের সবচাইতে বড় আলোচ্য বিষয় ছিল মিয়ানরের প্রথম সাবমেরিনের কমিশনিং। রাশিয়ায় তৈরি ‘কিলো-ক্লাস’এর সাবমেরিন হলেও ভারতীয় নৌবাহিনী তাদের ব্যবহারের পর এই সাবমেরিন মিয়ানমারকে উপহার হিসেবে দেয়।

চোরাচালান এবং সন্ত্রাস দমনে রাডার, সোনার, টর্পেডো এবং সাবমেরিন?

ভারতীয় বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, মিয়ানমারের উপকূলে মৎস্য সম্পদ পাহাড়া দিতে, চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে এবং সন্ত্রাসী দমনে ভারত মিয়ানমার নৌবাহিনীকে সহায়তা দিচ্ছে। এবং একইসাথে তারা বলছেন যে, ভারত মিয়ানমারকে অস্ত্র সরবরাহ করার মাধ্যমে সেই দেশে চীনের প্রভাবকে ব্যালান্স করছে। কিন্তু সমস্যা হলো, তারা ব্যাখ্যা দিচ্ছেন না কিভাবে ভারতের এয়ার ডিফেন্স রাডার, সাবমেরিন খোঁজার সোনার এবং এন্টি-সাবমেরিন টর্পেডো মিয়ানমারের চোরাচালান ও সন্ত্রাসী দমনে সহায়তা করবে। তারা এ-ও ব্যাখ্যা করছেন না যে, মিয়ানমার নৌবাহিনীর জাহাজে অত্যাধুনিক রাডার, সোনার এবং টর্পেডো বসালে কোন পদ্ধতিতে মিয়ানমারের উপকূল থেকে চীন বিতাড়িত হবে। মিয়ানমারকে ভারত যে সাবমেরিন দিয়েছে, সেটাই বা কিভাবে মিয়ানমারের মৎস্য সম্পদ রক্ষা করবে এবং চীনের প্রভাবকে কমাবে, সেটাও তারা পরিষ্কার করেননি। যতোই উদ্ভট হোক না কেন, এই যুক্তিগুলিই ভারতীয়রা দিচ্ছেন এবং পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা এই যুক্তিগুলিই তুলে ধরছেন তাদের বিশ্লেষণে এবং একইসাথে পশ্চিমা মিডিয়াগুলিও এই কথাগুলিই কপি-পেস্ট করছে!

বাংলাদেশেও অনেকেই বিদেশী মিডিয়ার রিপোর্টিংএর সাথে তাল মিলিয়ে বলছেন যে, ভারত মিয়ানমারকে অস্ত্র দিচ্ছে চীনকে ব্যালান্স করার জন্যে। কিন্তু তারা পুরোপুরিভাবে এড়িয়ে যাচ্ছেন যে, এই অস্ত্র কাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে। মিয়ানমারকে ভারত চোরাচালান ও সন্ত্রাস দমনে অত্যাধুনিক রাডার, সোনার, টর্পেডো এবং সাবমেরিন সরবরাহ করছে - এই কথাগুলি বিশ্বাস করা উন্মাদীয়। একইসাথে যখন মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে অস্ত্র সরবরাহ করার জন্যে ভারতের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের কোন উচ্চবাচ্য নেই, তখন পশ্চিমারা বাংলাদেশের কক্সবাজারে অবস্থানরত মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত মুসলিম শরণার্থীদেরকে ফেরত পাঠাতে ‘বাংলাদেশের সাথে আছে’ - এই কথাগুলি শুধু হাস্যকরই নয়, বরং কপটতার স্বাক্ষর। ভারতের মতোই বঙ্গোপসাগরে পশ্চিমা প্রতিটা দেশের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। আর সেই স্বার্থের কেন্দ্রে রয়েছে বঙ্গোপসাগর তথা ভারত মহাসাগরে ভারত ব্যাতীত কোন সামরিক শক্তি, বিশেষ করে নৌশক্তির আবির্ভাবকে নিয়ন্ত্রণ করা। সেই লক্ষ্যে তারা একদিকে যেমন চীনা নৌবাহিনীর ভারত মহাসাগরে বিচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, ঠিক তেমনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ডেভেলপমেন্ট নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এই দুই লক্ষ্য একত্র হচ্ছে মিয়ানমারের রাখাইনে; যেখানে রয়েছে চীনা গভীর সমুদ্র বন্দর, মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং বাংলাদেশের সমুদ্রতট ও সমুদ্রবন্দরের নৈকট্য। বাংলাদেশকে মিয়ানমারের সাথে সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে বঙ্গোপসাগরে একটা নৌশক্তির উত্থান ঠেকাতে চাইছে ভারত এবং তার পেছনে থাকা পশ্চিমা শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলি। মিয়ানমারে বাংলাদেশ সংঘাতে জড়ালে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সাথে চীনের সম্পর্ক খারাপ হবে এবং চীন বাংলাদেশের শত্রু রাষ্ট্রে পরিণত হবে। এহেন পরিস্থিতিতে ভারত এবং পশ্চিমারা বাংলাদেশের কাছে অস্ত্র বিক্রিতে এগিয়ে আসবে, যাতে করে বাংলাদেশী সেনারা নিজেদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে ভারত মহাসাগরে চীনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণকে নিজেদের লক্ষ্য হিসেবে ঠিক করে নেয়। মিয়ানমারের তথাকথিত মানবাধিকারের ধোঁয়াশা ভেদ করে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলির এই ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্য বেরিয়ে আসছে; যা এখন এড়িয়ে যাবার কোন পদ্ধতিই নেই।




সূত্রঃ



‘India supplying fuzes to Myanmar military, deepening complicity in its atrocity crimes’ in Justice for Myanmar, 15 July 2022 (https://www.justiceformyanmar.org/stories/india-supplying-fuzes-to-myanmar-military-deepening-complicity-in-its-atrocity-crimes)

‘Swedish Arms Exported to Myanmar via India Despite EU Embargo: JFM’ in Irrawaddy, 21 June 2023

‘PM Narendra Modi's visit to expand strategic and economic footprint in Myanmar’ in The Economic Times, 31 August 2017

‘India rolls out the red carpet for Myanmar military chief, with an eye firmly on China’ in The Economic Times, 08 July 2017

‘India and Myanmar Sign Mou on Defence Co-Operation’ in Ministry of Defence, India, 29 July 2019 (https://pib.gov.in/PressReleasePage.aspx?PRID=1580637)

‘India supporting Myanmar junta atrocities through supply of gun barrels’ in Justice for Myanmar, 01 March 2023 (https://www.justiceformyanmar.org/stories/india-supporting-myanmar-junta-atrocities-through-supply-of-gun-barrels)

‘How India is supporting Myanmar's military with arms’ in DW, 25 May 2023

‘China, Russia arming Myanmar junta: UN rights expert’ in DW, 22 February 2022

‘Indian PSU Sold Arms, Equipment Worth Over $5 Million to Myanmar Junta in 6 Month Period: Report’ in The Wire, 21 June 2023

‘‘Death trade’. India supplied ₹422 crore worth arms to Myanmar junta: UN’ in The Hindu Business Line, 19 May 2023

‘Indian Torpedoes Delivered to Myanmar Navy’ in The Irrawaddy, 15 July 2019 (https://www.irrawaddy.com/news/burma/indian-torpedoes-delivered-myanmar.html)

‘India Delivers Initial Batch of Indigenously Built Torpedoes to Myanmar Navy’ in The Diplomat, 16 July 2019

‘India to Supply Torpedoes to Myanmar’ in The Diplomat, 31 March 2017

‘Indian manufacturer continues supplying vital technology to Myanmar junta, arms brokers’ in Myanmar Now, 22 June 2023 (https://myanmar-now.org/en/news/indian-manufacturer-continues-supplying-vital-technology-to-myanmar-junta-arms-brokers/)

‘India's BEL Signs Sensor Deal with Myanmar Navy’ by Janes quoted in Defense Studies, 14 March 2013 (http://defense-studies.blogspot.com/2013/03/indias-bel-signs-sensor-deal-with.html)

‘Myanmar Navy has commissioned seven new warships and one submarine’ in Navy Recognition, 26 December 2020

‘The Kilo impact’ by Commodore (ret) Mohammad Abdur Razzak, in New Age, 19 November 2020 (https://www.newagebd.net/article/121954/the-kilo-impact)

Friday, 6 November 2020

‘কোয়াড’ এবং ‘এক্সারসাইজ মালাবার ২০২০’ ... কার জন্যে কি বার্তা?

০৬ই নভেম্বর ২০২০
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্দোপ্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’ এবং ‘কোয়াড’এর মূল লক্ষ্য হলো ইন্দোপ্যাসিফিককে চীনা প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা। এই লক্ষ্যে বঙ্গোপসাগরে নৌমহড়া শুধু চীনের জন্যেই নয়, চীনকে বন্ধু ভাবা যেকোন রাষ্ট্রের জন্যেই বার্তা। ঘটনাপ্রবাহই বলে দিচ্ছে যে, বঙ্গোপসাগরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এখন আরও এক ধাপ এগুলো, যেখানে সামনের দিনগুলিতে অস্ত্রের ঝনঝনানি আরও বৃদ্ধি পাবে।


৩রা নভেম্বর থেকে বঙ্গোপসাগরে শুরু হয়েছে যৌথ নৌমহড়া ‘এক্সারসাইজ মালাবার ২০২০’; যেখানে অংশ নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং ভারতের নৌবাহিনী। ‘মালাবার’এর ২৪তম এই আয়োজনে এবার যোগ দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। আর করোনাভাইরাসের বাস্তবতাকে সামনে রেখে মহড়ার নিয়মকানুনে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। ২০২০এর এই মহড়ার এটা হলো প্রথম ধাপ। দ্বিতীয় ধাপ অনুষ্ঠিত হবে নভেম্বরের শেষে। এই মহড়ায় অংশ নিচ্ছে মার্কিন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার ‘জন এস ম্যাককেইন’, অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর ফ্রিগেট ‘বালারাট’, জাপানের নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার ‘ওনামি’, ভারতীয় নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার ‘রণবিজয়’, ফ্রিগেট ‘শিভালিক’, সাপ্লাই জাহাজ ‘শক্তি’, সাবমেরিন ‘সিন্ধুরাজ’ এবং একটা ‘পি৮আই’ এন্টিসাবমেরিন বিমান। মার্কিন সামরিক বাহিনীর পত্রিকা ‘নেভি টাইমস’ কোন রাখঢাক না রেখেই বলছে যে, এই মহড়ার আয়োজন করা হয়েছে চীনকে টার্গেট করে। চীনকে টার্গেট করা হয়েছে ইন্দোপ্যাসিফিকে চীনা প্রভাব মোকাবিলার উদ্দেশ্যে। বিশেষ করে ভারত মহাসাগরে চীনের প্রভাব বিস্তারে ভারত যখন বিচলিত, তখন এই চার দেশের মাঝে তৈরি হয়েছে ‘কোয়াড’ নামের এক কৌশলগত জোট।

‘জাপান টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে ‘এক্সারসাইজ মালাবার ২০২০’কে সরাসরি ‘কোয়াড’এর সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, কিছুদিন আগেই টোকিওতে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং ভারতের শীর্ষ কূটনীতিকেরা মিলিত হয়েছিলেন ‘কোয়াড’এর অংশ হিসেবে। যদিও সেই বৈঠক থেকে বিশেষ কোন ঘোষণা আসেনি, তথাপি এটা চীনের প্রতি একটা বার্তা হিসেবেই সকলে দেখেছেন। যদিও এই মহড়াকে অফিশিয়ালি ‘কোয়াড’এর অংশ বলে ঘোষণা দেয়া হয়নি, তবুও বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, এই মহড়া মূলতঃ ইন্দোপ্যাসিফিকে চীনের সামরিক এবং কূটনৈতিক প্রভাবকে মোকাবিলা করার উদ্দেশ্যেই আয়োজন করা হয়েছে। ধীরে ধীরে এই মহড়াকে হয়তো ‘কোয়াড’এর অংশ বলেই বলা হবে। এই মহড়ায় ১৩ বছরের মাঝে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়া অংশ নিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিন্ডা রেইনল্ডস এক বার্তায় বলেন যে, এই মহড়ার মাধ্যমে ভারতের সামরিক বাহিনীর সাথে অস্ট্রেলিয়ার আস্থা বৃদ্ধি পাবে। ভারতীয় পত্রিকা ‘ইকনমিক টাইমস’ও এই মহড়াকে ‘কোয়াড মালাবার’ বলে আখ্যা দিচ্ছে। ভারতের জন্যে এই মহড়া এমন এক সময়ে এলো, যখন চীনের সাথে হিমালয়ের পাদদেশে সংঘাতের পর ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলির একটাও ভারতকে সমর্থন দেয়া থেকে বিরত থেকেছে। উল্টো এই সময়ের মাঝে চীনের সাথে পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং নেপালের সম্পর্কোন্নয়ন হয়েছে।

ভারতীয় চিন্তাবিদেরা এহেন পরিস্থিতিতে ভারতের অসহায়ত্বকে আলোচনায় নিয়ে এসেছেন। ভারতের ‘দ্যা প্রিন্ট’ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক প্রবীণ সাংবাদিক শেখর গুপ্ত বলছেন যে, বহুদিন ধরেই ভারত তার প্রতিবেশী দেশগুলির সাথে সম্পর্কোন্নয়নে মনোযোগী হয়নি; আর সেই সুযোগেই চীন দক্ষিণ এশিয়াতে তার অবস্থান শক্ত করে নিয়েছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন যে, বাংলাদেশের ঐকান্তিক সহায়তায় ভারত তার উত্তরপূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহীদের দমনে বিরাট সাফল্য পেয়েছে; অথচ প্রতিদানে ভারত তার নাগরিকত্ব আইন পাস করার পর বিরাট এক মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ‘বাংলাদেশী’ আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবার কথা বলেছে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কোন্নয়ন কঠিন হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। একই সময়ে চীন বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্যের জন্যে শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা দিয়েছে। এছাড়াও চীনারা বাংলাদেশ, শ্রীলংকা এবং নেপালেও বিনিয়োগ করে তাদের প্রভাব বিস্তার করেছে। এরই মাঝে ‘আইএমএফ’এর হিসেবে ২০২০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়কে ভারতের চাইতে বেশি হবে বলে ঘোষণা করা হলে ভারতীয়দের মাঝে অনেকেই ব্যাপারটা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেননি। যদিও শ্রীলংকা এবং মালদ্বীপের মাথাপিছু আয় ভারতের কয়েক গুণ, তথাপি সেটা ভারতীয়দের চিন্তার কারণ ছিলোনা কখনোই। কিন্তু বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়ের খবরটা পত্রপত্রিকায় আসার সাথেসাথেই ভারতীয়রা চিন্তিত হয়ে গিয়েছেন। শেখর গুপ্তের কথায় বোঝা যায় যে, ভারত সরকার বাংলাদেশকে তাদের অতি কাছের বন্ধু বললেও বাস্তবতা অতটা সহজ নয়। বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ ছাড়াও চীন থেকে বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের ব্যাপারটাও ভারত ভালো চোখে দেখে না। বিশেষ করে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্যে সাবমেরিন কেনার ব্যাপারটা ভারতীয় চিন্তাবিদেরা একেবারেই মেনে নিতে পারেননি। এর উপরে আবার বাংলাদেশের কক্সবাজারে চীনা সহায়তায় তৈরি হচ্ছে স্থায়ী সাবমেরিন ঘাঁটি, যা ‘এশিয়া টাইমস’ বলছে যে, ভারতের সাথে চীনের উত্তেজনাকে আরও উস্কে দেবে।

ভারতের ‘দ্যা হিন্দু’ পত্রিকা বলছে যে, গত অগাস্টে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে নীতিগতভাবে অস্ট্রেলিয়াকে ‘মালাবার’ মহড়ায় আমন্ত্রণ জানাবার ব্যাপারে ঐকমত্য হয়। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, হিমালয়ের পাদদেশে লাদাখে চীনের সাথে ভারতের সংঘাত এই সিদ্ধান্তের পিছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে অনেকেই ধারণা করছেন। ‘মালাবার’ এবং ‘কোয়াড’এর যোগসূত্র এখানেই। থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর সিকিউরিটি স্টাডিজ’ বা ‘আইআইএসএস’এর সিঙ্গাপুর অফিসের সিনিয়র ফেলো আলেক্সান্ডার নেইল ‘বিবিসি’কে বলছেন যে, ‘কোয়াড’এর কর্মকান্ড আটকে থাকার মূল কারণ ছিল ভারত; যারা ঐতিহাসিকভাবেই জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের অংশ ছিল। আর এখন এই জোটের সামনে চলে আসাটাও হয়েছে ভারতের জন্যেই, যারা এখন চীনের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত রয়েছে।
 

অক্টোবর মাসেই মার্কিন উপপররাষ্ট্র সচিব স্টিফেন বিগান এবং পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পেও দক্ষিণ এশিয়া ঘুরে মার্কিন ‘ইন্দোপ্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’তে যোগ দেয়ার জন্যে দক্ষিণ এশিয়ার নেতৃবৃন্দকে আহ্বান জানান। বাংলাদেশ থেকে সরাসরিই বলে দেয়া হয় যে, বাংলাদেশ কোন নিরাপত্তা জোটে যুক্ত হবে না। এর প্রায় দু’সপ্তাহ পরেই ‘এক্সারসাইজ মালাবার’এর তৃতীয় দিনে ৫ই নভেম্বর বাংলাদেশ নৌবাহিনীর পাঁচটা জাহাজ কমিশনিং করা হয়; যার মাঝে তিনটা ছিল চীনা নির্মিত। এর আগেও ১৮ই জুন হিমালয়ে ভারতের সাথে চীনের সংঘাতের চরম অবস্থায় বাংলাদেশ একটা চীনা নির্মিত কর্ভেট কমিশনিং করে।


অক্টোবর মাসেই মার্কিন উপপররাষ্ট্র সচিব স্টিফেন বিগান এবং পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পেও দক্ষিণ এশিয়া ঘুরে যান। সফরকালে তারা মার্কিন ‘ইন্দোপ্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’তে যোগ দেয়ার জন্যে দক্ষিণ এশিয়ার নেতৃবৃন্দকে আহ্বান জানান। বাংলাদেশ থেকে সরাসরিই বলে দেয়া হয় যে, বাংলাদেশ কোন নিরাপত্তা জোটে যুক্ত হবে না। আর মার্কিনীদের এই কৌশলের অধীনে বাংলাদেশ কোন অস্ত্র কিনতেও অগ্রহী নয় বলে জানিয়ে দেয়া হয়। এর প্রায় দু’সপ্তাহ পরেই ‘এক্সারসাইজ মালাবার’এর তৃতীয় দিনে ৫ই নভেম্বর বাংলাদেশ নৌবাহিনীর পাঁচটা জাহাজ কমিশনিং করা হয়; যার মাঝে তিনটা ছিল চীনা নির্মিত। এর আগেও ১৮ই জুন হিমালয়ে ভারতের সাথে চীনের সংঘাতের চরম অবস্থায় বাংলাদেশ একটা চীনা নির্মিত কর্ভেট কমিশনিং করে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্দোপ্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’ এবং ‘কোয়াড’এর মূল লক্ষ্য হলো ইন্দোপ্যাসিফিককে চীনা প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা। এই লক্ষ্যে বঙ্গোপসাগরে নৌমহড়া শুধু চীনের জন্যেই নয়, চীনকে বন্ধু ভাবা যেকোন রাষ্ট্রের জন্যেই বার্তা। ঘটনাপ্রবাহই বলে দিচ্ছে যে, বঙ্গোপসাগরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এখন আরও এক ধাপ এগুলো, যেখানে সামনের দিনগুলিতে অস্ত্রের ঝনঝনানি আরও বৃদ্ধি পাবে।

Friday, 24 July 2020

ইন্দো-প্যাসিফিকে মার্কিন নৌশক্তির ফেরত আসার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব কতটুকু?

২৪শে জুলাই ২০২০

দক্ষিণ চীন সাগরে মহড়া দিচ্ছে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ 'নিমিতজ' এবং 'রোনাল্ড রেগ্যান'। চীনারা তাদের অপেক্ষাকৃত স্বল্পক্ষমতার নৌবহরকে মার্কিনীদের সক্ষমতার ফাঁকফোঁকড়ের মাঝে ব্যবহার করে মার্কিন নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে। আর এতে তারা বেশ সাফল্যও পেয়েছে। বিশ্বব্যাপী মার্কিনীদের বন্ধু এবং প্রতিযোগী সকলেই যুক্তরাষ্ট্রের এই সীমাবদ্ধতাগুলিকে অবলোকন করছে; যা কিনা তাদের নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অনুপ্রাণিত করছে।


করোনা মহামারির মাঝে ইন্দো-প্যাসিফিকে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি মোতায়েনের প্রতিযোগিতার খবর প্রতিনিয়তই পত্রিকাতে ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। পূর্ব এশিয়ার উপকূলে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের সবচাইতে দৃশ্যমান অস্ত্র হিসেবে দেখা যাচ্ছে বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজকে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজে করোনা সংক্রমণের মাঝে চীনারা এপ্রিলে প্রায় এক মাসের জন্যে তাদের একমাত্র বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘লিয়াওনিং’কে সমুদ্রে প্রেরণ করে। ৩০শে এপ্রিল জাহাজটা পূর্ব চীন সাগরে ‘ট্রেনিং’ মিশন শেষ করে চিংদাও বন্দরে ফিরে আসে। পূর্বের সমুদ্রে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের প্রায় ‘অনুপস্থিতি’র মাঝে চীনাদের এই ‘শক্তি প্রদর্শন’ মার্কিন শক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

৪ঠা মে জাপানের ইয়োকোসুকা বন্দর ছেড়ে যায় বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘রোনাল্ড রেগ্যান’। যুক্তরাষ্ট্রের ১১টা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের মাঝে ‘রেগ্যান’কেই রাখা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখন্ডের বাইরে। গত ২৭ মার্চে পূর্ব এশিয়ার উপকূলে মোতায়েনকৃত যুদ্ধজাহাজ ‘থিওডোর রুজভেল্ট’এ করোনাভাইরাসের মারাত্মক সংক্রমণ আবিষ্কারের পর ‘রোনাল্ড রেগ্যান’এও সংক্রমণ ধরা পরে। প্রায় দুই মাস মার্কিন প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপনিবেশ গুয়ামের নৌঘাঁটিতে বসে থাকার পর ‘থিওডোর রুজভেল্ট’ ১৯শে মে সমুদ্রে বের হয়। অপরদিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের আরেক যুদ্ধজাহাজ ‘নিমিতজ’ ২ বছরের মেইনটেন্যান্স শেষ করে ৮ই জুন যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়েগো থেকে যাত্রা করে। জটিল প্রযুক্তির কারণে এধরণের জাহাজকে মেইনটেন্যান্স থেকে অপারেশনে আনতে অনেক সময় লাগে। এর উপর আবার ‘রুজভেল্ট’এ করোনা সংক্রমণের কারণে অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে ক্রুদের টেস্ট করা এবং কোয়ার‍্যান্টিনে রাখার কারণে সমুদ্রে যেতে আরও দেরি হয়। ‘নিমিতজ’এর সমুদ্রে যাবার ৪ দিনের মাথায় ১২ই জুন ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ২০১৭ সালের পর প্রথমবারের মতো প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন নৌবাহিনী একসাথে ৩টা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে; বড় খবর বলে প্রচার পায় এটা। ২১শে জুন ‘নিমিতজ’ এবং ‘রুজভেল্ট’ যুদ্ধজাহাজের গ্রুপ একত্রে মহড়া দেয়া শুরু করে। ২৮শে জুন থেকে ‘নিমিতজ’ মহড়া দেয়া শুরু করে ‘রেগ্যান’এর সাথে। ‘নিমিতজ’এর ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ১১’এর কমান্ডার রিয়ার এডমিরাল জেমস ক্লার্ক এক বিবৃতিতে ঘোষণা দেন যে, বিশ্বে একমাত্র মার্কিন নৌবাহিনীরই এরকম শক্তি একত্রিত করার সক্ষমতা রাখে।

৬ই জুলাই মার্কিন মিডিয়া ‘সিএনএন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, দু’টা মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ একত্রে দক্ষিণ চীন সাগরে মহড়া দেয়া শুরু করেছে। জাহাজদু’টা হলো জাপান থেকে আসা ‘রেগ্যান’ এবং প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব প্রান্তে সান ডিয়েগো থেকে আসা ‘নিমিতজ’। বলা হয় যে, ২০১৪ সালের পর থেকে প্রথমবারের মতো দু’টা জাহাজ একত্রে মহড়া দেয়ার ঘটনা ঘটলো। ১৭ই জুলাই তারা আবারও ঘোষণা দেয় যে, জাহাজদু’টা একই মাসে দ্বিতীয়বারের মতো একত্রে মহড়া দেয়া শুরু করেছে। তবে প্রশান্ত মহাসাগরে তৃতীয় বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘থিওডোর রুজভেল্ট’ মিডিয়ার আলোচনার বাইরে থাকে। কারণ এরই মাঝে চুপিসারে ৯ই জুলাই জাহাজটা দেশে ফেরত যায়। ‘ইউএসএনআই নিউজ’ জানাচ্ছে যে, গত জানুয়ারিতে জাহাজটা সান ডিয়েগো ছেড়ে গিয়েছিল। মার্চ মাসে ভিয়েতনামে ভ্রমণ করার পরপরই জাহাজটাতে করোনার সংক্রমণ ধরা পরে। শেষ পর্যন্ত প্রায় ১২’শ সংক্রমণ ধরা পরেছিল। এই সংক্রমণের খবর বের হবার পর জাহাজের কমান্ডার ক্যাপ্টেন ব্রেট ক্রোজিয়ারকে চাকুরিচ্যুত করা হয়।

২০শে জুলাই ঘোষণা দেয়া হয় যে, ‘নিমিতজ’ যুদ্ধজাহাজ দক্ষিণ চীন সাগর থেকে বঙ্গোপসাগরে এসে হাজির হয়েছে। ভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে ভারত মহাসাগরে প্রায় পাঁচ মাস ভেসে থাকার পর যুদ্ধজাহাজ ‘আইজেনহাওয়ার’ দেশে ফেরার পর থেকে ভারত মহাসাগরে কোন মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ নেই। ‘নিমিতজ’কে দিয়ে এই শূণ্যস্থান পূরণ করানো হচ্ছে। অর্থাৎ জুনের মাঝামাঝি সময় থেকে প্রায় একমাস ধরে প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর দাপিয়ে বেড়ানোর পালা শেষ হয়েছে। এর পরবর্তীতে ‘রেগ্যান’এর সাথে প্রশান্ত মহাসাগরে আরেকটা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করতে বেশ কয়েকমাস লেগে যেতে পারে। ‘কিটসাপ সান’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘কার্ল ভিনসন’ ওয়াশিংটন রাজ্যের ব্রেমারটনে দেড় বছরের মেইনটেন্যান্স শেষ করে অগাস্টের শুরুতে সান ডিয়েগোতে ফেরত আসার কথা রয়েছে। এরপর এর সমুদ্রে যাবার প্রস্তুতি শুরু হবে। ‘জন সি স্টেনিস’, ‘জর্জ ওয়াশিংটন’ এবং ‘জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ’ লম্বা সময়ের জন্যে ড্রাইডকে রয়েছে। নতুন জাহাজ ‘জেরাল্ড আর ফোর্ড’এর নতুন প্রযুক্তির টেস্টিং এখনও শেষ হয়নি; তাই এখনই পুরোপুরি সার্ভিসে আসছে না। ১০ মাসের মিশন শেষ করে জানুয়ারিতে সান ডিয়েগোতে ফেরত যাওয়া ‘আব্রাহাম লিঙ্কন’ খুব শিগগিরই আবার সাগরে যাচ্ছে না। ৭ মাসের মিশন শেষ করে জুনের মাঝামাঝি নরফোক নৌঘাঁটিতে ফিরেছে ‘হ্যারি এস ট্রুম্যান’। টানা ১৬১ দিন কোন বন্দরে না ভিড়ে রেকর্ড করা ‘আইজেনহাওয়ার’এর নাবিকরা ভূমিতে পা ফেলার জন্যে উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছিল। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’এর সাথে সাক্ষাতে এই জাহাজের রক্ষার দায়িত্বে থাকা মার্কিন ক্রুজার ‘সান জেসিন্টো’র ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ড ক্রসম্যান বলেন যে, কিছু নাবিক তার কাছে জানতে চেয়েছে যে, কোন জাহাজটা আগে বন্দরে নোঙ্গর করবে।

বিশাল সমরশক্তি থাকার পরেও মানব বাস্তবতাগুলি থেকে মার্কিনীরা বের হতে পারেনি। ১ লক্ষ টনের দৈত্যাকৃতির মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজগুলি যতোটাই শক্তিশালী হোক না কেন, তা সমুদ্রে কতটা সময় কাটাতে পারবে, তা নির্ভর করছে নাবিকদের সক্ষমতার উপর। আর অতি জটিল এবং উচ্চমূল্যের এই প্রযুক্তিকে চালু রাখতে ব্যাপক খরচ ছাড়াও নৌবহরের একটা বড় অংশকে মেইনটেন্যান্সের মাঝে থাকতে হচ্ছে। ক’দিন আগেই উভচর এসল্ট শিপ ‘বনহোমি রিচার্ড’এ ভয়াবহ আগুন এবং ২০১৭ সালে দু’টা ডেস্ট্রয়ারের দুর্ঘটনার পর দুই বছর সার্ভিসের বাইরে থাকার ঘটনা নৌবাহিনীর অপারেশনাল দক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এপ্রিল মাসে দক্ষিণ চীন সাগরে ‘এফ-৩৫’ স্টেলথ ফাইটার বহণে সক্ষম এরকমই একটা এসল্ট শিপ ‘আমেরিকা’ মার্কিন উপস্থিতিকে জিইয়ে রেখেছিল। চীনারা তাদের অপেক্ষাকৃত স্বল্পক্ষমতার নৌবহরকে মার্কিনীদের সক্ষমতার ফাঁকফোঁকড়ের মাঝে ব্যবহার করে মার্কিন নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে। আর এতে তারা বেশ সাফল্যও পেয়েছে। বিশ্বব্যাপী মার্কিনীদের বন্ধু এবং প্রতিযোগী সকলেই যুক্তরাষ্ট্রের এই সীমাবদ্ধতাগুলিকে অবলোকন করছে; যা কিনা তাদের নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অনুপ্রাণিত করছে।

Sunday, 3 May 2020

করোনা পরিস্থিতিতেও অস্ট্রেলিয়ার শিপইয়ার্ডগুলি ব্যস্ত কেন?

৪ঠা মে ২০২০
   
এপ্রিল ২০২০; করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারির মাঝেও অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর জন্যে ‘আরাফুরা-ক্লাস’এর অফশোর প্যাট্রোল ভেসেলের কীল লেইং। এই জাহাজগুলি অস্ট্রেলিয়ার ৮০ বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধজাহাজ তৈরির পরিকল্পনার অংশ। জাহাজগুলি অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীকে নতুন ধরনের সক্ষমতা দেবে; যা কিনা দেশটার নিরাপত্তা চিন্তাকেই প্রতিফলিত করে। দক্ষিণ চীন সাগর এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনকে মোকাবিলায় এই জাহাজগুলি সমমনা দেশের জাহাজগুলির সাথে সমুদ্র নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করবে।

অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা দপ্তর ২৭শে মার্চ ঘোষণা দেয় যে, রয়াল অস্ট্রেলিয়ান নেভির জন্যে ১২টা অফশোর প্যাট্রোল ভেসেলের তৃতীয়টার কাজ শুরু হয়েছে। দ্বিতীয়টার কাজ শুরু হয় ৯ই এপ্রিল। অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিন্ডা রেইনল্ডস বলেন যে, ২০২২ সালে এই জাহাজগুলির প্রথমটা পাবার সাথে সাথে অস্ট্রেলিয়া নতুন ধরনের এক সক্ষমতা পেতে যাচ্ছে। প্রায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পে ৮০ মিটার লম্বা ১৬’শ টনের এই জাহাজগুলি জার্মান কোম্পানি ‘লুরসেন’এর ডিজাইনে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার ‘এএসসি’ শিপইয়ার্ড এবং পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার ‘সিভমেক’ শিপইয়ার্ডে তৈরি হচ্ছে। ‘লুরসেন’ শুধু জাহাজই তৈরি করছে না, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় শিপইয়ার্ডটাও তারা তৈরি করছে। প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘আইএইচএস জেনস’ বলছে যে, এই জাহাজগুলি বিভিন্ন মিশন প্যাকেজ বহন করার মাধ্যমে কয়েক ধরনের বিশেষায়িত কাজ করতে সক্ষম হবে। অস্ট্রেলিয়ার সরকার দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার ‘এএসসি’ শিপইয়ার্ডকে ব্রিটিশ কোম্পানি ‘ব্রিটিশ এরোস্পেস সিস্টেমস’এর কাছে বিক্রি করে দেয় আরেকটা বড় প্রকল্পের অংশ হিসেবে। এই শিপইয়ার্ডে তৈরি হতে যাচ্ছে ৯টা ‘হান্টার-ক্লাস’ ফ্রিগেট, যা ‘টাইপ-২৬’ নামে ব্রিটিশ রয়াল নেভির জন্যে ৮টা এবং ‘রয়াল কানাডিয়ান নেভি’র জন্যে ১৫টা তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে এই জাহাজের ডিজাইন এবং প্রোটোটাইপ তৈরির কাজ চলছে। প্রথম জাহাজটার কাজ শুরু হবে ২০২২ সালে। ২৬ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পে ৫ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে; যার মাঝে ১ হাজার গ্র্যাজুয়েট কর্মী থাকবে। এই দুই প্রকল্প ছাড়াও ৫০ বিলিয়ন ডলারের আরেক প্রকল্পের অধীনে তৈরি হচ্ছে ১২টা ‘এটাক-ক্লাস’ সাবমেরিন। ফরাসী কোম্পানি ‘নেভাল গ্রুপ’এর ডিজাইনে এই সাবমেরিনগুলিও তৈরি হবে অস্ট্রেলিয়াতে। বর্তমানে এর ডিজাইনের কাজ চলছে ফ্রান্সে। করোনাভাইরাসের লকডাউনের মাঝেও অস্ট্রেলিয়ার শিপইয়ার্ডগুলিতে কাজ চলছে সমানে। বাজেটেরও কোন ঘাটতি নেই। কেন এতগুলি জাহাজ তৈরি করছে তারা? কি ধরনের সক্ষমতার কথাইবা বলছিলেন অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী? একসাথে প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ প্রকল্পগুলির নেপথ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা নীতি।

অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা নীতি

২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার সরকার ‘ডিফেন্স হোয়াইট পেপার’ নামে একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করে; যেখানে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সামনের দিনগুলিতে প্রতিরক্ষা বাজেট ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করার কথা বলা হয়। এতে ২০২৫-২৬ সাল নাগাদ অস্ট্রেলিয়ার সামরিক বাজেট দাঁড়াবে প্রায় ৫৯ বিলিয়ন ডলার, যা ২০১৬-১৭ সালে ছিল ৩২ বিলিয়ন। জিডিপির ২ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করার প্রত্যয় ব্যক্ত করার সাথে সাথে নৌবাহিনীর শক্তিকে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করার কথা বলা হয়। অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল বলেন যে, যেহেতু অস্ট্রেলিয়া একটা দ্বীপ দেশ, তাই তার একটা শক্তিশালী নৌবাহিনী থাকা বাধ্যতামূলক। বর্তমানে নৌবাহিনীর ‘কলিন্স-ক্লাস’এর ৬টা সাবমেরিনকে প্রতিস্থাপন করে ‘এটাক-ক্লাস’এর ১২টা সাবমেরিন কেনার কথা বলা হয়, যাতে খরচ হবে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে ৮টা ‘এনজাক-ক্লাস’এর ফ্রিগেটকে প্রতিস্থাপন করতে ৯টা নতুন ফ্রিগেট তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়াও ১২টা নতুন অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল, ৭টা ‘পি-৮এ’ ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান, ৭২টা ‘এফ-৩৫এ’ স্টেলথ যুদ্ধবিমান এবং ১২টা ‘ইএ-১৮জি গ্রাউলার’ ইলেকট্রনিক এটাক বিমান ক্রয় করার কথা বলা হয়।

‘হোয়াইট পেপার’এ মূলতঃ যে চ্যালেঞ্জগুলির কথা বলা হয়, সেগুলি হলো, প্রথমতঃ চীন-মার্কিন দ্বন্দ্ব; দ্বিতীয়তঃ জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন দেশের মাঝে প্রতিযোগিতার কারণে আন্তর্জাতিক আইনের উপরে ভিত্তি করে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক ব্যবস্থার দুর্বল হওয়া; তৃতীয়তঃ সন্ত্রাসবাদ বৃদ্ধি; চতুর্থতঃ সম্পদের অসম বন্টন, সামাজিক অসঙ্গতি ও জলবায়ুগত কারণে অত্র অঞ্চলের কিছু দেশের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে; পঞ্চমতঃ অনেকগুলি দেশের সমরশক্তির সক্ষমতার ব্যাপক বৃদ্ধি; আর ষষ্ঠতঃ সাইবারস্পেসে হামলার আশংকা বৃদ্ধি। অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব ভূখন্ডে আরেকটা দেশের সামরিক হামলার আশংকা না থাকলেও অন্য কোন স্থানে অস্ট্রেলিয়ার স্বার্থ হুমকির মাঝে পড়লে সেখানে হস্তক্ষেপের কথা বলা হয়। বৈশ্বিক শক্তি অনেকগুলি দেশের হাতে ছড়িয়ে যাওয়ায় অনিশ্চয়তা বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। সমুদ্রসীমা এবং প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির মাঝে প্রতিযোগিতা উত্তেজনার কারণ হতে পারে; এবং সকলেই সমান্তরালে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির কারণে অত্র অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ব্যাহত করতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের মাঝে দ্বন্দ্ব সামনের দিনগুলিতে নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হবে বলে প্রতিবেদনটাতে বলা হয়। এতে আরও বলা হয় যে, দুই দশকের মাঝে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সারা দুনিয়ার অর্ধেক সাবমেরিন অপারেট করবে; আর এই অঞ্চলের দেশগুলির হাতে থাকবে দুনিয়ার অর্ধেক আধুনিক যুদ্ধবিমান। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের সরাসরি যুদ্ধের আশঙ্কা না থাকলেও পূর্ব চীন সাগর, দক্ষিণ চীন সাগর, সাইবারস্পেস এবং মহাকাশে এই দেশগুলির দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পাবে বলে বলা হয়।

‘হোয়াইট পেপার’এ লক্ষ্য হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমুদ্রের নিরাপত্তায় অংশ নেয়ার কথা বলা হয়। একইসাথে পপুয়া নিউ গিনি, তিমর-লেস্তে এবং প্রশান্ত মহাসাগরী দ্বীপ দেশগুলির নিজেদের নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে অস্ট্রেলিয়া তাদের প্রধান নিরাপত্তা সহযোগী হতে চায়। আরেকটা লক্ষ্য হিসেবে বলা হয় যে, আন্তর্জাতিক আইনের উপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক ব্যবস্থার প্রতি কোন হুমকি অস্ট্রেলিয়ার স্বার্থবিরুদ্ধ হলে যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশের সাথে অস্ট্রেলিয়া একত্রে হস্তক্ষেপ করবে।

ঠিক এই ব্যাপারটাই দেখা যায় ফিলিপাইনের নৌবাহিনীর জন্যে অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল ক্রয়ের প্রকল্পে। গত অগাস্টে ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষা সচিব ডেলফিন লরেনজানা ঘোষণা দেন যে, অস্ট্রেলিয় সরকারের অর্থায়নে ৬টা প্যাট্রোল ভেসেল ক্রয় করা হবে। অস্ট্রেলিয়ার ‘অস্টাল’ কোম্পানির ফিলিপাইন শিপইয়ার্ডে এই জাহাজগুলি তৈরি হবে বলে বলা হয়। প্রায় ৫’শ ৭১ মিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পে ফিলিপাইনের আপাততঃ কোন অর্থ বিনিয়োগ দরকার নেই। চীনকে মোকাবিলায় এই জাহাজগুলি নিঃসন্দেহে ভূমিকা রাখবে। দক্ষিণ চীন সাগরে অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর জাহাজগুলি যেসকল দেশের নৌবাহিনীর সাথে কাজ করবে বলে বলা হচ্ছে, তার একটা হলো ফিলিপাইন।
  
এপ্রিল ২০২০; দক্ষিণ চীন সাগরে টহল দিচ্ছে মার্কিন এম্ফিবিয়াস এসল্ট শিপ ‘আমেরিকা’, ক্রুজার ‘বাংকার হিল’ এবং ডেস্ট্রয়ার ‘ব্যারি’; সাথে অস্ট্রেলিয়ার ফ্রিগেট ‘পারামাত্তা’ (সর্ববামে)। প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজগুলিতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হওয়ায় দক্ষিণ চীন সাগরে টহল দেয়ার জন্যে মার্কিন সক্ষমতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে সর্বদাই কাছে পেলেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার ব্যাপারটা অস্ট্রেলিয়াকে ভাবাবে। এমনই একটা পরিস্থিতি পূর্ব এশিয়াতে ব্রিটেনের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে; যা কিনা অস্ট্রেলিয়া স্বাগত জানাবে।

অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে কে কি ভাবছে?

অন্যদিকে চীন অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা চিন্তাকে নিজেদের স্বার্থবিরুদ্ধ মনে করছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনয়িং সরাসরিই বলেন যে, দক্ষিণ চীন সাগর এবং চীনের সামরিক শক্তি নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাথা ঘামানোটা চীন ভালো চোখে দেখছে না। তিনি আশা করেন যে, বিভিন্ন দেশ অত্র এলাকায় সামরিক মহড়া এবং প্যাট্রোল দেয়া বন্ধ করবে এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করা বন্ধ করবে। অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা চিন্তার ব্যাপারে চীনের অসন্তোষ প্রকাশের উপর মন্তব্য করতে গিয়ে ‘অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি’র ‘স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ডিফেন্স স্টাডিজ সেন্টার’এর জন ব্ল্যাক্সল্যান্ড বলেন যে, চীন যে এধরণের কথাই বলবে, তা জানাই ছিল। বরং অত্র অঞ্চলের সব দেশই চীনের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে স্বাভাবিকভাবেই চিন্তিত।

যুক্তরাষ্ট্রের থিংকট্যাঙ্ক ‘হাডসন ইন্সটিটিউট’এর সিনিয়র ফেলো জন লী বলছেন যে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অস্ট্রেলিয়ার সাথে নিরাপত্তা সম্পর্কটাই যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। একই ধরনের আদর্শিক লক্ষ্য থাকার কারণে উভয় দেশই একত্রে কাজ করবে। অত্র অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়ার নৌশক্তি বেশ গুরুত্বপূর্ণ, যাকে যুক্তরাষ্ট্র নিজের পক্ষে রাখতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র চাইবে অস্ট্রেলিয়া এবং জাপানকে মার্কিন নেতৃত্বের অধীনে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়ার হিসেবে দেখতে। তিনি আরও বলছেন যে, যদি চীনের আগ্রাসী ভূমিকার কারণে জাপানের শক্তি বৃদ্ধি হয়, তাহলে চীনাদের এই কৌশলকে অনেকেই ভুল বলে গণ্য করতে পারেন। আর এই শক্তিগুলির সামষ্টিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলেই বেইজিংএর আগ্রাসী ভূমিকাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে। তবে জন লীর চিন্তায় বেইজিংকে চাপে ফেলে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার অধীনে নিয়ে আসার জন্যে যে চেষ্টার কথা বলা হয়েছে, সেটা চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধ, ‘ফাইভ-জি’ প্রযুক্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং সাম্প্রতিককালে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি নিয়ে কাদাছোঁড়াছুড়ির ফলে এখনও অসফল।

তবে চীনকে মোকাবিলায় অস্ট্রেলিয়া শুধু যুক্তরাষ্ট্রের উপরই নির্ভরশীল থাকতে চাইছে না। গত জুলাই মাসে লন্ডনে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ বা ‘আইআইএসএস’এর এক অনুষ্ঠানে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিন্ডা রেইনল্ডস বলেন যে, এশিয়া-প্যাসিফিক এলাকায় ব্রিটেনকে সামরিকভাবে আরও বেশি যুক্ত হতে হবে। তিনি বলেন যে, এটা সন্দেহাতীত যে, বর্তমানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে কৌশলগত পরিস্থিতিতে সবচাইতে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া বর্তমানে চীনের ব্যাপক সামরিকীকরণ এবং চীনের সাথে আশেপাশের দেশগুলির বিরোধ দেখতে পাচ্ছে। চীন এখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে এবং আন্তর্জাতিক আইনের উপর দাঁড়িয়ে থাকা বিশ্বব্যবস্থাকে দুর্বল করে ফেলছে। এমতাবস্থায় মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরের সাথে ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের ‘ফাইভ পাওয়ার ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’ বা ‘এফপিডিএ’ ব্যবহার করে চীনের সামরিক উত্থানের হুমকি মোকাবিলা করার কথা বলেন রেইনল্ডস। তিনি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ব্রিটিশ রয়াল নেভির জাহাজ মোতায়েনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান এবং সেখানে ব্রিটিশ সামরিক উপস্থিতিকে আরও বৃদ্ধি করার আহ্বান জানান। একইসাথে এব্যাপারে অস্ট্রেলিয়ার সহায়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। দুই দেশের সম্পর্কের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন যে, বিশ্বের খুব কম দু’টা দেশের মাঝেই ব্রিটেন এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো কাছাকাছি সম্পর্ক রয়েছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, ব্রিটেন এবং অস্ট্রেলিয়া একে অপরকে বিশ্বাস করে।

   
অস্ট্রেলিয়ার আশেপাশে প্রায় ১৪টার মতো ছোট দ্বীপ দেশকে অস্ট্রেলিয়া অর্থ এবং নিরাপত্তা সহায়তা দিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরিভাবে কৌশলগত; আর এর মূলে রয়েছে চীনের প্রভাব বিস্তারকে ঠেকানো। কার কতটুকু সহায়তা প্রয়োজন, সেই হিসেব করে কখনোই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।


প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বৈদেশিক সহায়তার কূটনীতি

সামরিক বাজেটের বাইরে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রনীতির আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো বৈদেশিক সহায়তা। গত বছরের জুনে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ ভ্রমণের সময় আড়াই’শ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দেবার প্রতিশ্রুতি দেন। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এই প্রতিশ্রুত অর্থ ১০ বছরে খরচ করা হবে। সাড়ে ছয় লক্ষ মানুষের এই দ্বীপপুঞ্জের জিডিপি প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার এবং মাথাপিছু গর আয় প্রায় ২ হাজার ৪’শ ডলার। ১০ বছরে আড়াই’শ মিলিয়ন ডলার দেশটার জন্যে খুব বেশি কিছু নয়। তবে গত ছয় বছরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল অস্ট্রেলিয়ার মোট বৈদেশিক সহায়তার ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৩৫ শতাংশ পাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার থিংকট্যাঙ্ক ‘লোয়ি ইন্সটিটিউট’এর জনাথন প্রাইক বলছেন যে, অস্ট্রেলিয়ার এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরিভাবে কৌশলগত; আর এর মূলে রয়েছে চীনের প্রভাব বিস্তারকে ঠেকানো। কার কতটুকু সহায়তা প্রয়োজন, সেই হিসেব করে কখনোই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। একারণেই দেখা যাবে যে, অস্ট্রেলিয়া তার বেশিরভাগ সহায়তা দিচ্ছে এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায়। এই এলাকাগুলিতেই অস্ট্রেলিয়ার প্রভাব এবং গুরুত্ব সবচাইতে বেশি।

২০১৭ সালে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ৪ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দানের ঘোষণার মাধ্যমে চীন অস্ট্রেলিয়ার নিজের উঠানেই অস্ট্রেলিয়াকে ছাড়িয়ে যেতে চাইছে। ঐ একই বছর অস্ট্রেলিয়া এই অঞ্চলের জন্যে মাত্র ৮’শ ১৫ মিলিয়ন ডলারের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অর্থাৎ চীন অস্ট্রেলিয়ার চার গুণ সহায়তা দিতে চাইছে। ২০১১ সাল থেকে ২০১৭ পর্যন্ত ছয় বছরে অস্ট্রেলিয়া এই অঞ্চলে সাড়ে ৬ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে; যেখানে চীন প্রায় সাত বছরে দিয়েছিল সোয়া ১ বিলিয়ন ডলার। ২০১১ থেকে ২০১৬এর মাঝে যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ এবং ফ্রান্স এখানে তাদের সহায়তা যথেষ্ট পরিমাণে কমিয়ে দিয়েছে।

মার্কিন মিডিয়া ‘সিএনএন’ বলছে যে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলিতে অস্ট্রেলিয়ার সহায়তা অর্থনৈতিক উন্নয়ন আনতে পারেনি। কারণ অস্ট্রেলিয়া সহায়তা দিয়েছে এমন সব সেক্টরে, যা অস্ট্রেলিয়রা মনে করছে দেয়া উচিৎ; যেমন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সুশাসন। অন্যদিকে চীনারা এই ছোট দেশগুলিকে জিজ্ঞেস করছে যে, তাদের কোন সেক্টরে বিনিয়োগ প্রয়োজন। এর ফলাফল হিসেবে খুব স্বাভাবিকভাবেই চীনারা এসব দেশে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন করছে। উদাহরণস্বরূপ, অস্ট্রেলিয়ার ঠিক উত্তরেই প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সবচাইতে বড় দ্বীপ পপুয়া নিউ গিনির কথা বলা যেতে পারে। ৮৬ লক্ষ মানুষের এই দেশের জিডিপি ২১ বিলিয়ন ডলার; মাথাপিছু গড় আয় আড়াই হাজার ডলার। তবে দেশটার জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করে। চীন মূলতঃ পপুয়া নিউ গিনিতেই সবচাইতে বড় বিনিয়োগ করছে। ২০১৭ সালে সেখানে চীনারা ৮৫ মিলিয়ন ডলার খরচে রাস্তা উন্নয়নের কাজ শেষ করেছে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া এ পর্যন্ত ২’শ ১৯ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে ভ্যাকসিন, স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং এইডসএর সংক্রমণ রোধে। অস্ট্রেলিয়ার বেশিরভাগ সহায়তা হলো অনুদান; চীনাদের বেশিরভাগ ঋণ। আইএমএফএর হিসেবে এই অঞ্চলের ১৪টা দেশের মাঝে ৬টাই ঋণের অর্থ ফেরত দেয়ার যোগ্যতা প্রায় হারিয়েছে; আরও ৩টা দেশ যোগ্যতা হারাবার পথে রয়েছে। সুতরাং এই দেশগুলিকে দেয়া চীনা ঋণের কি হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে শ্রীলংকা ঋণের অর্থ ফেরত দিতে না পারার পর চীনারা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নেয়ায় সেটা উদাহরণ হিসেবেই সামনে আসছে।    
জুন ২০১৭; চীনা নৌবাহিনীর কয়েকটা যুদ্ধজাহাজের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দ্বীপ দেশ ভানুয়াতু সফর। অস্ট্রেলিয়া তার আশেপাশের দ্বীপ দেশগুলিকে নিজের প্রভাবের অঞ্চল হিসেবে দেখে। একইসাথে অস্ট্রেলিয়ার সমুদ্র বাণিজ্য রুটগুলির কয়েকটা এই দ্বীপগুলির মাঝ দিয়ে যাবার কারণে অস্ট্রেলিয়ার কাছে এগুলির গুরুত্ব অপরিসীম। চীনারা এই দ্বীপগুলিতে প্রভাব বিস্তার শুরু করার অস্ট্রেলিয়ার সাথে চীনের দ্বন্দ্বও বৃদ্ধি পেয়েছে।

দ্বীপগুলির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব কেন?

পপুয়াতে রয়েছে স্বর্ণ, তামা, নিকেল, গ্যাস, ইত্যাদি খণিজ সম্পদ। একারণে সেখানে বিনিয়োগ করার যৌক্তিক কারণ রয়েছে চীনের জন্যে। আবার প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলিতে অনেক চীনারাও বসবাস করে; যারা বিভিন্ন সময়ে ব্যবসা করার জন্যে অথবা কাজের জন্যে সেখানে গিয়েছিল। তবে ‘সিএনএন’ বলছে যে, এই অঞ্চলে চীনের আনাগোণা বৃদ্ধির আরও বড় কারণ হতে পারে কূটনীতি। বিশ্বের মাত্র ১৬টা দেশ তাইওয়ানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে; এর মাঝে ৬টা দেশই হলো প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের। বহু বছর ধরেই চীনারা তাইওয়ানকে স্বীকৃতি দেয়া দেশগুলিকে নিজের পক্ষে নিয়ে আসার চেষ্টা চালাচ্ছে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পপুয়া নিউ গিনি তাদের দেশে তাইওয়ানের প্রতিনিধির বিভিন্ন কূটনৈতিক অধিকার কেড়ে নেবার পর তাইওয়ান অভিযোগ করে যে, চীনা সরকারের চাপের কারণেই পপুয়া এটা করেছে। গত সেপ্টেম্বরে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের সরকার তাইওয়ানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। চীন সলোমোনের সবচাইতে বড় বাণিজ্য সহযোগী; আর তারা চীনা বিনিয়োগ থেকেও বঞ্চিত হতে চায় না। ডিসেম্বরে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের রাজনীতিবিদদের বরাত দিয়ে ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ বলে যে, চীন এবং তাইওয়ান পাল্টাপাল্টি অবস্থানে থেকে তাদেরকে লক্ষ লক্ষ ডলার ঘুষ সেধেছে তাদের পক্ষে থাকার জন্যে।

তবে এই দ্বীপগুলি নিয়ে বিরোধের পিছনে আরেকটা কারণ হিসেবে ‘সিএনএন’ বলছে যে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় ১৪টা দেশের পুরো জনসংখ্যা একটা চীনা শহরের জনসংখ্যার সমান হলেও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে চীনের ভোট এবং এই দেশগুলির ভোট সমান ওজনের। সেই হিসেবে এই দেশগুলি তাদের আকৃতির তুলনায় চীন এবং অস্ট্রেলিয়ার কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর বাইরেও এই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়াবার পিছনেও চীনের আকাংক্ষা থাকতে পারে। ২০১৮ সালে ‘সিডনি মর্নিং হেরাল্ড’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্ব উপকূলের কাছে ভানুয়াতু দ্বীপের সাথে চীনের স্থায়ী সামরিক ঘাঁটির ব্যাপারে কথা হচ্ছে; যা উভয় দেশই অস্বীকার করে। ২০১৮ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইকনমিক এন্ড সিকিউরিটি রিভিউ কমিশন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনারা সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করতে পারলে পুরো এলাকায় চীনাদের নজরদারি করার সুযোগ সৃষ্টি হয়ে যাবে; আর তা অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের জন্যে হুমকি হওয়া ছাড়াও অত্র অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ঢোকা বা বের হওয়ায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার পাঁচটা গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের মাঝে তিনটাই প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল দিয়ে গিয়েছে। চীনারা এই বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি না করলেও ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই অস্ট্রেলিয়া হুমকির মাঝে পড়বে।

যা চিন্তা তা-ই কাজ। গত অগাস্টে অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিন্ডা রেইনল্ডস আনুষ্ঠানিকভাবে পপুয়া নিউ গিনির প্রায় ৩’শ কিঃমিঃ উত্তরে মানাস দ্বীপের ‘লোমব্রুম’এ নতুন নৌঘাঁটির প্রথম ধাপের উদ্ভোধন করেন। পপুয়ার সরকারের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী এই ঘাঁটি অস্ট্রেলিয় এবং মার্কিন নৌবাহিনী ব্যবহার করবে। লিন্ডা রেইনল্ডস বলেন যে, কৌশলগতভাবে এই ঘাঁটি সর্বদাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল; এখনও রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই দ্বীপে জাপানের বড় আকারের সামরিক ঘাঁটি ছিল। বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬ থেকে ১৯৭৪ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া এই ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণে ছিল। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয় সরকার ‘প্যাসিফিক ম্যারিটাইম সিকিউরিটি প্রোগ্রাম’এর আওতায় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৩টা দেশকে ২১টা ‘গার্ডিয়ান-ক্লাস’ প্যাট্রোল বোট অনুদান দিচ্ছে। এর আগে ১৯৮২ সালে জাতিসংঘের আইনে সকল দেশকে উপকূল থেকে ২’শ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সমুদ্রে ‘এক্সক্লুসিভ ইকনমিক জোন’এর অধিকার দেয়ার পর ১৯৮৫ এবং ১৯৯৭ সালের মাঝে অস্ট্রেলিয় সরকার ১২টা দেশকে ২২টা ‘প্যাসিফিক-ক্লাস’ প্যাট্রোল বোট তৈরি করে দান করেছিল। সেই বোটগুলিকে প্রতিস্থাপন করার লক্ষ্যেই ৩’শ ৩৫ মিলিয়ন ডলার খরচে ৪০ মিটার লম্বা এই বোটগুলি তৈরি করছে অস্ট্রেলিয়ার ‘অস্টাল’ শিপইয়ার্ড। এই দ্বীপ দেশগুলি থেকে যাতে ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান দিয়ে সমুদ্রে টহল বৃদ্ধি করা যায়, সেই প্রচেষ্টাও রয়েছে এই প্রকল্পের মাঝে।
   
নভেম্বর ২০১৮; পপুয়া নিউগিনির পোর্ট মোর্সবির উপকূলে ‘এপেক’ শীর্ষ বৈঠকের নিরাপত্তা দিচ্ছে রয়াল অস্ট্রেলিয়ান নেভির হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার ‘এডেলেইড’। পপুয়াতে এই বৈঠকের মাঝ দিয়ে অস্ট্রেলিয়া এবং চীনের দড়ি টানাটানির কিছুটা চিত্র পাওয়া যায়; যেখানে চীনারা চাইছিলো পোর্ট মোর্সবির উন্নয়নের চেহাড়া দেখাতে; আর অস্ট্রেলিয়া চাইছিলো দেখাতে যে, অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা সহায়তা ছাড়া অত্র অঞ্চলের দেশগুলি অসহায়।

২০১৮ সালের নভেম্বরে পপুয়া নিউ গিনির রাজধানী পোর্ট মোর্সবিতে ‘এশিয়া-প্যাসিফিক ইকনমিক কোঅপারেশন’ বা ‘এপেক’ ফোরামের শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স সহ ২১টা দেশের শীর্ষ নেতারা যোগ দেন। প্রায় ১৫ হাজার গেস্টের থাকার সংকুলান না হওয়ায় বন্দরে ৩টা ক্রুজ লাইনার জাহাজ ভিড়িয়ে রাখা হয়। এই বৈঠকের নিরাপত্তার খাতিরে যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান এবং স্পেশাল ফোর্সসহ প্রায় ৪ হাজার সেনা মোতায়েন করা হয়। ফিলিপাইনের মিডিয়া ‘র‍্যাপলার’ বলছে যে, এই বৈঠকের নিরাপত্তার দায়িত্বের পুরোটাই নেয় অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়া দেড় হাজার সেনাসহ রয়াল অস্ট্রেলিয়ান এয়ার ফোর্সের ‘এফএ-১৮ সুপার হর্নেট’ ফাইটার বিমান, ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান এবং নৌবাহিনীর হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার ‘এডেলেইড’কে মোতায়েন করে। অস্ট্রেলিয়ার সাথে নিউজিল্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রও এই নিরাপত্তা মিশনে অংশ নেয়। অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা থিংকট্যাঙ্ক ‘অস্ট্রেলিয়া ডিফেন্স এসোসিয়েশন’এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর নেইল জেমস বলেন যে, পপুয়া নিউ গিনির মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি যদি বিদেশী নিরাপত্তা বাহিনীকে নিজ দেশে আসতে দিতে না চায়, তাহলে তারা কখনোই ‘এপেক’এর মতো বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে সক্ষম হবে না। এটা কৌশলগত এবং রাজনৈতিক দিক থেকেও ভালো হবে না। তবে ‘এপেক’ বৈঠকের পিছনে অস্ট্রেলিয়া ছাড়াও চীনের অবদানও ছিল। বৈঠকের আগে চীনাদের অর্থায়নে পোর্ট মোর্সবির চেহাড়ার বেশ পরিবর্তন সাধিত হয়। চীনা অর্থে রাস্তা ও কনভেনশন সেন্টারের উন্নয়ন করা হয়; গেস্টদের আনা নেয়ার জন্যে কেনা হয় বাস। অনেকেই প্রশ্ন করেন যে, দেশের বহু মানুষের যখন মৌলিক চাহিদাই পূর্ণ হচ্ছে না, তখন পপুয়ার মানুষের কাছে এরকম জাঁকজমকের অর্থ কতটুকু? পপুয়াতে এই বৈঠকের মাঝ দিয়ে অস্ট্রেলিয়া এবং চীনের দড়ি টানাটানির কিছুটা চিত্র পাওয়া যায়; যেখানে চীনারা চাইছিলো পোর্ট মোর্সবির উন্নয়নের চেহাড়া দেখাতে; আর অস্ট্রেলিয়া চাইছিলো দেখাতে যে, অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা সহায়তা ছাড়া অত্র অঞ্চলের দেশগুলি অসহায়।

অস্ট্রেলিয়ার সবচাইতে বেশি বাণিজ্য এশিয়ার সাথে। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া থেকে পূর্ব এশিয়ায় যাবার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দু’টা নৌপথ পপুয়া নিউ গিনি এবং সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের মাঝ দিয়ে যায়। নিউ গিনি দ্বীপ ও নিউ ব্রিটেন দ্বীপের মাঝে দিয়ে দক্ষিণ রুটটা; আর নিউ ব্রিটেন ও সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত বোগেনভিল দ্বীপের মাঝ দিয়ে উত্তর রুটটা গিয়েছে। মানাস দ্বীপের নৌঘাঁটিটা এই দুই সমুদ্র বাণিজ্য রুটের ঠিক মাঝখানে হওয়ায় এর গুরুত্ব অপরিসীম। অন্যদিকে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার বন্দরগুলি থেকে জাহাজ মূলতঃ ইন্দোনেশিয়ার সুন্দা ও লম্বক প্রণালী এবং তিমর সাগর ও আরাফুরা সাগরের মাঝ দিয়ে যায়। এই পথগুলির উপর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া।

কিন্তু চীন থেকে অস্ট্রেলিয়া কতটুকু দূরে থাকবে?

অস্ট্রেলিয়ার ‘এসবিএস নিউজ’ জানাচ্ছে যে, চীন হলো অস্ট্রেলিয়ার সবচাইতে বড় বাণিজ্য সহযোগী। দুই দেশের মাঝে বাণিজ্য দেড়’শ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। অস্ট্রেলিয়ার মোট বাণিজ্যের ২৩ শতাংশই চীনের সাথে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র; যার সাথে বাণিজ্য ৬৪ বিলিয়ন ডলার; এরপর জাপানের সাথে ৬১ বিলিয়ন; দক্ষিণ কোরিয়া সাথে ৩২ বিলিয়ন; এবং ব্রিটেনের সাথে ২৯ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য। সিঙ্গাপুরের সাথেও বাণিজ্য যথেষ্ট। অস্ট্রেলিয়ার বেশিরভাগ বাণিজ্য পূর্ব এশিয়ার সাথেই। এখানকার বেশিরভাগ দেশের সাথেই অস্ট্রেলিয়ার রয়েছে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। ২০০৭ সালেই চীনারা অস্ট্রেলিয়ার সবচাইতে বড় বাণিজ্য সহযোগী হিসেবে জাপানকে অতিক্রম করে। অপরদিক থেকে অস্ট্রেলিয়া চীনের জন্যে সপ্তম বৃহত্তম বাণিজ্য সহযোগী। অস্ট্রেলিয়ার ‘মনাশ ইউনিভার্সিটি’র বাণিজ্য বিশ্লেষক জিওভানি ডে লিয়েতো বলছেন যে, অস্ট্রেলিয়ার সকল রপ্তানি পণ্যকে ‘পাথর এবং শস্য’এর মাঝে চিন্তা করা যায়। অর্থাৎ লৌহ আকরিক, কয়লা, স্বর্ণ এবং গ্যাস হলো খণিজ পণ্য; আর গরুর গোশত, পশম, তুলা, ছোলা, ডাল, গম, চিনি এবং মদ হলো কৃষিজ পণ্য। তবে অস্ট্রেলিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রার উৎস হলো শিক্ষা। লাখো শিক্ষার্থী অস্ট্রেলিয়াতে আসছে ইংরেজি শিখতে এবং উচ্চশিক্ষার্থে। পর্যটনেও বড় আয় রয়েছে আস্ট্রেলিয়ার। অন্যদিকে আমদানির কথা চিন্তা করলে অস্ট্রেলিয়রা বিদেশ ভ্রমণেই খরচ করে প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার; গাড়ি আমদানিতে যায় ২১ বিলিয়ন; পেট্রোলিয়াম পণ্যে ১৫ বিলিয়ন; টেলিকম যন্ত্রপাতিতে ১২ বিলিয়ন; আর পণ্য পরিবহণে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার।

গত বছরের জুনে চীনা নৌবাহিনীর তিনটা যুদ্ধজাহাজ অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বন্দর ঘুরে আসে। অস্ট্রেলিয়ার জনগণের কাছে ব্যাপারটা অদ্ভুত ঠেকলেও এটা নিশ্চিত যে চীনের সাথে কোনরূপ সহিংসতা অস্ট্রেলিয়ার বাস্তবতা নয়। তবে এটা পরিষ্কার যে, অস্ট্রেলিয়া অত্র অঞ্চলে তার নিরাপত্তাকে হাল্কাভাবে নিচ্ছে না। চীনকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনসহ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিকে সে পাশে চাইছে। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থানকে পাকাপোক্ত করতেই সে জাহাজ নির্মাণে বিনিয়োগ করছে। এই জাহাজ শুধু নিজের নৌবাহিনীর জন্যেই নয়; দক্ষিণ চীন সাগরের আশেপাশের দেশগুলির জন্যেও তৈরি করতে চাইছে তারা। একইসাথে অস্ট্রেলিয়া তার সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পপুয়া নিউগিনি এবং সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের মতো দেশগুলিকে আর্থিক এবং নিরাপত্তা সহায়তা দিয়ে নিজের সাথে রাখতে চাইছে। চীন অস্ট্রেলিয়ার সাথে সরাসরি সংঘাত না চাইলেও প্রভাব বিস্তারের খেলায় অস্ট্রেলিয়া যেমন তাইওয়ান ইস্যুতে চীনকে শান্তি দেবে না, তেমনি চীনও অস্ট্রেলিয়ার উঠানে ছোট দ্বীপদেশগুলিকে বিশাল বিনিয়োগের মাধ্যমে কিনে ফেলতে চাইবে। অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে সর্বদাই কাছে পেলেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার ব্যাপারটা অস্ট্রেলিয়াকে ভাবাবে। এমনই একটা পরিস্থিতি পূর্ব এশিয়াতে ব্রিটেনের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে; যা কিনা ব্রিটিশ কমোনওয়েলথের অন্তর্গত অস্ট্রেলিয়া স্বাগত জানাবে। ব্রিটেনের সাথে অস্ট্রেলিয়ার সম্পর্ক ঐতিহাসিক এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত। যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতার কারণে ব্রিটনের সাথে অস্ট্রেলিয়ার এই সম্পর্ক আরও গভীর হবে। এটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হবে যে, রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ অস্ট্রেলিয়ার নামমাত্র রানীই শুধু নন।

Saturday, 25 April 2020

করোনা দুর্যোগের মাঝে চীনের সামনে এখন উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক

২৫শে এপ্রিল ২০২০   

ভারত মহাসাগরে রয়েছে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘আইজেনহাওয়ার’। এই জাহাজগুলি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে ভাসমান সার্বভৌমত্ব। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে করোনাভাইরাসের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির অবক্ষয় অত্র অঞ্চলের ব্যালান্সকে সমস্যায় ফেলবে। এতে মার্কিন ‘বিশ্ব ব্যবস্থা’ যেমন হুমকির মাঝে পড়বে, তেমনি ভারত মহাসাগরে ব্যালান্সিং শক্তি হিসেবে অন্য দেশের আসার পথ উন্মুক্ত হবে।

উন্মুক্ত মহাসাগরে চীনা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ

১৪ই এপ্রিল ভারতীয় নৌবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমনের মাঝেও তাদের ‘ইস্টার্ন নেভাল কমান্ড’এর অধীনে থাকা অন্ধ্র প্রদেশের ভিশাখাপত্নমে অবস্থিত ‘আইএনএস দেগা’ বিমান ঘাঁটি দিন রাত ২৪ ঘন্টা চালু রয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয় যে, তাদের ‘৩১১ নেভাল এয়ার স্কোয়াড্রন’এর ‘ডরনিয়ার ২২৮’ ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমানগুলি সর্বদা সমুদ্রের উপর দিয়ে টহল দিচ্ছে। আর একইসাথে নৌবাহিনীর অন্যান্য বিমানগুলিকেও যেকোন মিশনের জন্যে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এই বিবৃতি এমন সময়ে এলো, যখন ৮ই এপ্রিল থেকে চীনা নৌবাহিনীর বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘লিয়াওনিং’ পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অজানা মিশনে বের হয়েছে। করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারীর মাঝে যেখানে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় আর কোন দেশের বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজই অপারেট করছে না, তখন চীনা নৌবাহিনীর এই মিশন অনেককেই চিন্তিত করেছে। মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘থিওডোর রুজভেল্ট’এ ৮’শর বেশি নাবিক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবার পর জাহাজখানা এখন মার্কিন ঘাঁটি গুয়ামে বসে রয়েছে। আরেকটা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘রোনাল্ড রেগ্যান’ও করোনা সংক্রমণের কারণে জাপানের ইয়োকোসুকা নৌঘাঁটিতে বসে রয়েছে। এপ্রিলের শুরুতে পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন রাজ্যে অবস্থিত ব্রেমারটন নৌঘাঁটিতে বসে থাকা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘নিমিতজ’এও করোনা সংক্রমণ পাওয়া গেছে বলে মিডিয়াতে রিপোর্ট এসেছে।

১৩ই এপ্রিল ‘লিয়াওনিং’ জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপ এবং তাইওয়ানের মাঝে অবস্থিত ‘মিয়াকো প্রণালী’ অতিক্রম করে তাইওয়ানের পূর্ব উপকূল ঘেঁষে দক্ষিণ চীন সাগরের দিকে যাত্রা করে। কিন্তু ২২শে এপ্রিল জাহাজখানা দিক পরিবর্তন করে তাইওয়ান এবং ফিলিপাইনের মাঝে অবস্থিত বাশি চ্যানেল পার হয়ে পূর্বদিকে প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে যাত্রা করে বলে বলছে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। জাহাজটার মিশন সম্পর্কে কেউই কিছু বলতে পারছেন না। জাহাজটা প্রশান্ত মহাসাগরেই থাকবে, নাকি ইন্দোনেশিয়ার প্রণালীগুলি পার হয়ে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আসবে তা পরিষ্কার নয়। জাহাজটার সাথে রয়েছে দু’টা ডেস্ট্রয়ার, দু’টা ফ্রিগেট এবং একটা সাপ্লাই জাহাজ। ক’দিন আগেই দক্ষিণ চীন সাগরে মালয়েশিয়ার সাথে চীনের উত্তেজনার ঘটনা ঘটেছে। বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজগুলির অবর্তমানে অত্র এলাকায় মার্কিন শক্তিশালী ইউনিট হলো এম্ফিবিয়াস এসল্ট জাহাজ ‘আমেরিকা’, যা কিনা অত্যাধুনিক ‘এফ-৩৫বি লাইটনিং’ স্টেলথ যুদ্ধবিমান বহণ করছে। মালয়েশিয়ার সাথে উত্তেজনার সময় ‘আমেরিকা’ এবং এর সাথে মার্কিন ও অস্ট্রেলিয় মোট তিনটা যুদ্ধজাহাজ দক্ষিণ চীন সাগরে ছুটে যায়। এরপর ২৪শে এপ্রিল এই গ্রুপে থাকা ডেস্ট্রয়ার ‘ব্যারি’ একমাসে দ্বিতীয়বারের মতো চীন এবং তাইওয়ানের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত তাইওয়ান প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে। চীনকে উত্তক্ত্য করার এই পদ্ধতি এর আগে বহুবার অনুসরণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এবারে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজগুলির অনুপস্থিতিতে চীনা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের সমুদ্রে মিশন শুরু করাটা অন্য ধরনের উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে, যা এর আগে কখনোই ঘটেনি।
 
ড্রাইডকে বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘নিমিতজ’। মার্কিন নৌবাহিনীর ১১টা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ থাকলেও এই মুহুর্তে মাত্র ২টা পুরোপুরি কর্মক্ষম রয়েছে। ভারত মহাসাগরে রয়েছে ‘আইজেনহাওয়ার’ এবং পাঁচ মাসের মিশন থেকে ফিরে বন্দরে না ভিড়ে আটলান্টিকে ঘুরছে ‘হ্যারি ট্রুম্যান’।

চাপের মুখে মার্কিন নৌশক্তি


মধ্যপ্রাচ্য এবং ভূমধ্যসাগরে প্রায় পাঁচ মাসের মিশন শেষ করে দেশে ফেরত গেলেও বন্দরে না ভিড়ে বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘হ্যারি ট্রুম্যান’কে আপাততঃ আটলান্টিক মহাসাগরে থাকতে বলা হয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর দ্বিতীয় নৌবহরের প্রধান ভাইস এডমিরাল উডি লুইস বলেন যে, তারা এখনও জানেন না যে এই জাহাজের মিশন কি হতে পারে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের একজন প্রাক্তন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিন বলছে যে, এই জাহাজটাকে প্রশান্ত মহাসাগরে পাঠানো হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের এশিয়া-কেন্দ্রিক চিন্তার অংশ হিসেবে চীনা অধিপত্যবাদকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার কারণে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দু’টা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছিল। ‘হ্যারি ট্রুম্যান’ জাহাজটাকে সেখান থেকেই সরিয়ে আনা হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান জেনারেল কেনেথ ম্যাকেঞ্জি মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজগুলির গুরুত্ব তুলে ধরে সাংবাদিকদের বলেন যে, বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের রয়েছে বিশাল আক্রমণ এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা; এটাকে যেকোন স্থানে নিয়ে যাওয়া যায়। তিনি বলেন যে, এই জাহাজগুলি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে ভাসমান সার্বভৌমত্ব।

মার্কিন নৌবাহিনীর ১১টা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ রয়েছে। এর মাঝে ৩টা জাহাজ দীর্ঘ সময়ের জন্যে ড্রাইডকে থাকবে। ‘জর্জ ওয়াশিংটন’ এবং ‘জন সি স্টেনিস’ বর্তমানে ‘রিফুয়েলিং এন্ড কমপ্লেক্স ওভারহল’এর মাঝে রয়েছে, যা শেষ হতে কয়েক বছর লেগে যাবে। ‘জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ’ গত ফেব্রুয়ারিতে ২৮ মাসের জন্যে ‘ড্রাইডকিং প্ল্যান্ড ইনক্রিমেন্টাল এভেইল্যাবিলিটি’ নামের রক্ষণাবেক্ষণ কাজে ঢুকেছে। সম্পূর্ণ নতুন ডিজাইনের ‘জেরাল্ড আর ফোর্ড’ এখনও টেস্টিং পর্যায়ে রয়েছে; এর অপারেশনে আসতে আরও কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। পশ্চিম উপকূলে ‘কার্ল ভিনসন’ ১৪ মাসের রক্ষণাবেক্ষণের পর মাত্র পানিতে নেমেছে; পুরোপুরিভাবে সার্ভিসে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে এখন। ‘আব্রাহাম লিংকন’ গত জানুয়ারিতেই সান ডিয়েগোতে ফেরত এসেছে। অন্য বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের অভাব থাকায় ‘লিংকন’ জাহাজের ক্রুদের ১০ মাস মিশনে থাকতে হয়েছিল। করোনা ইস্যুতে জাপানে বসে রয়েছে ‘রোনাল্ড রেগ্যান’ এবং গুয়ামে বসে আছে ‘থিওডোর রুজভেল্ট’। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে মিশনের জন্যে প্রস্তুতি নিতে থাকা ‘নিমিতজ’এও করোনা সংক্রমণ পাওয়া গিয়েছে বলে মিডিয়ায় খবর আসে। তাই এখন ‘নিমিতজ’ এবং এর নিরাপত্তায় থাকা জাহাজগুলির মোট ৮ হাজার নাবিককে করোনাভাইরাসের টেস্ট এবং কোয়ার‍্যান্টিনের মাঝ দিয়ে যেতে হচ্ছে। সুতরাং এই মুহুর্তে ১১টা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের মাঝে মাত্র ২টা পুরোপুরি কর্মক্ষম রয়েছে। ভারত মহাসাগরে রয়েছে ‘আইজেনহাওয়ার’ এবং পাঁচ মাসের মিশন থেকে ফিরে বন্দরে না ভিড়ে আটলান্টিকে ঘুরছে ‘হ্যারি ট্রুম্যান’।
 
চীনা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ 'লিয়াওনিং'। ভারত এটা বুঝতে পারছে যে, চীন তার সমুদ্রপথের নিরাপত্তা দিতে ভারত মহাসাগরে পদার্পণ করবেই। আর একারণেই চীনা বিমানবাহী জাহাজ প্রশান্ত মহাসাগরে ঘুরে বেড়াচ্ছে খবর পাওয়া মাত্রই ভারতীয় বিমান বঙ্গোপসাগরের উপর মহড়া দেয়া শুরু করেছে। অন্যদিকে চীনও মেনে নিচ্ছে যে, ভারত মহাসাগরে ভারতের প্রভাব থাকবেই; তাই ভারতের সাথে তার প্রতিযোগিতা অনিবার্য।

চিন্তিত ভারত

জানুয়ারি মাসে ভারতের নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল কারামবির সিং বলেছিলেন যে, ভারত মহাসাগরে যেকোন সময়ে সাত থেকে আটটা চীনা যুদ্ধজাহাজ অপারেট করে। ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ আয়োজিত ভূরাজনীতি বিষয়ক কনফারেন্স ‘রাইসিনা ডায়ালগ’এ কথা বলতে গিয়ে এডমিরাল সিং আরও বলেন যে, কেউ যদি ভারতের এলাকায় অপারেট করতে চায়, তাহলে তাকে আগে ভারতকে জানাতে হবে। এডমিরাং সিংএর চিন্তার কারণ শুধু চীনা নৌবাহিনীর আনাগোণা নয়। ভারত মহাসাগরে চীনারা সবচাইতে বেশি সহায়তা পাচ্ছে পাকিস্তানের কাছ থেকে। ‘ফোর্বস’ ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে স্যাটেলাইট ইমেজের মাধ্যমে দেখানো হচ্ছে যে, গত জানুয়ারিতে পাকিস্তানের উপকূলে চীনাদের সাথে যৌথ সামরিক মহড়া ‘সী গার্ডিয়ান ২০২০’এর সময় চীনা যুদ্ধজাহাজগুলি পাকিস্তানের করাচি বন্দরেই অবস্থান নিয়েছিল। একটা ডেস্ট্রয়ার, একটা ফ্রিগেট, একটা সাপ্লাই জাহাজ এবং একটা সাবমেরিন রেসকিউ জাহাজসহ ৫টা চীনা জাহাজ এই মহড়ায় অংশ নেয়। আর এই মহড়াকে কাছে থেকে উপলব্ধি করার জন্যে ভারতীয় নৌবাহিনী তাদের বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘বিক্রমাদিত্য’কে আরব সাগরে মোতায়েন করে। চীনা নৌবাহিনীর এই জাহাজগুলি হলো ৩৪তম এসকর্ট টাস্ক ফোর্সের অংশ। জানুয়ারির ২০ তারিখের দিকে জাহাজগুলি কৌশলগত বাব-এল মান্ডেব প্রণালীর পাশে জিবুতিতে তাদের নৌঘাঁটিতে পৌঁছায়।

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় এশিয়া এবং আফ্রিকার দেশগুলিতে চীনারা মেডিক্যাল সহায়তা দেবার কারণে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজের প্রভাব ধরে রাখতে ব্যাপক চাপের মাঝে পড়েছে ভারত। এপ্রিলের ১৫ তারিখ থেকে ভারতের দক্ষিণের তামিলনাড়ুর থাঞ্জাভুর বিমান ঘাঁটি থেকে বঙ্গোপসাগরে মাসব্যাপী মহড়া শুরু করেছে ভারতীয় বিমান বাহিনী। বিমান থেকে বিমানে রিফুয়েলিং বা জ্বালানি সরবরাহে সক্ষম ‘ইলিউশিন ৭৮এমকেআই’ বিমান এই ঘাঁটিতে মোতায়েন করা হয়েছে বলে বলছে অনলাইন প্লেন স্পটাররা। নিরাপত্তা বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘আইএইচএস জেনস’ বলছে যে, ২০শে জানুয়ারি ভারতীয় বিমান বাহিনী এই ‘থাঞ্জাভুর’ ঘাঁটিতে ‘সুখোই-৩০এমকেআই’ বিমানের ‘২২২তম স্কোয়াড্রন’ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ভোধন করে। দক্ষিণ ভারতে সুখোই বিমানের একমাত্র এই স্কোয়াড্রন সুপারসনিক জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ‘ব্রাহমোস’ বহণে সক্ষম। রুশ নির্মিত ২৮ফুট লম্বা এবং আড়াই টন ওজনের প্রায় ৩’শ কিঃমিঃ পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রকে যেকোন জাহাজের জন্যেই ধ্বংস করাটা কঠিন। আর এর ২’শ কেজি ওয়ারহেডের পক্ষে বিশাল জাহাজও ঘায়েল করা সম্ভব। ২০২১ সালের মাঝে এই স্কোয়াড্রনে ১৮টা সুখোই মোতায়েন করার কথা রয়েছে; যার মাঝে ৮টা বিমান ব্রাহমোস বহণ করতে পারবে। করোনা পরিস্থিতিতে চীনা নৌবাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধিই খুব সম্ভবতঃ থাঞ্জাভুরে মহড়ার কারণ। বিমান থেকে বিমানে রিফুয়েলিং করতে পারলে থাঞ্জাভুরের সুখোই বিমানগুলি ভারত মহাসাগরের একটা বড় এলাকা টহল দিতে পারবে। ভারতীয় নৌবাহিনীর মার্কিন নির্মিত ম্যারিটাইম দূরপাল্লার প্যাট্রোল বিমান ‘পি-৮আই নেপচুন’ বিমানও নিয়মিত টহল দিচ্ছে বঙ্গোপসাগরের উপর দিয়ে। ১৪ই এপ্রিল ইন্দো-প্যাসিফিকে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারতের অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুততার সাথে এই বিমানগুলিতে ব্যবহারের জন্যে ভারতের কাছে ১০টা ‘হারপুন’ জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১৬টা সাবমেরিন-ধ্বংসী ‘মার্ক ৫৪’ লাইটওয়েট টর্পেডো বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে। ২৪শে এপ্রিল ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং ভারতের সামরিক নেতৃবৃন্দের সাথে জরুরি বৈঠক করেন। তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে, করোনাভাইরাস ঠেকাতে ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যস্ততার মাঝে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিরা যেন নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি না করতে পারে। বৈঠকে জম্মু-কাশ্মিরের বর্তমান অবস্থা আলোচনা করা ছাড়াও চীনের সাথে ভারতের সীমানা এবং ভারত মহাসাগরে চীনা নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনের আনাগোণা বৃদ্ধি নিয়ে কথা হয় বলে বলছে ভারতের গণমাধ্যম ‘পিটিআই’। বৈঠকে অভিযোগ করে বলা হয় যে, পাকিস্তান গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ‘লাইন অব কন্ট্রোল’ বরাবর যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে এবং ভারতী অধিকৃত কাশ্মিরে জঙ্গীদের ঢুকিয়ে দিচ্ছে। এর ক’দিন আগেই জম্মু-কাশ্মিরের পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল দিলবাগ সিং অভিযোগ করেন যে, পাকিস্তান করোনা আক্রান্ত জঙ্গীদের ভারত অধিকৃত কাশ্মিরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে যাতে এখানকার মানুষও করোনা আক্রান্ত হয়। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে দিলবাগ সিংকে সমর্থন করে একটা বিবৃতিও দেয়া হয়।
 
ভারতীয় নৌবাহিনীর মার্কিন নির্মিত ‘পি-৮আই’ ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান। ইন্দো-প্যাসিফিকে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারতের অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুততার সাথে এই বিমানগুলিতে ব্যবহারের জন্যে ভারতের কাছে ‘হারপুন’ জাহাজ-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং সাবমেরিন-ধ্বংসী ‘মার্ক ৫৪’ লাইটওয়েট টর্পেডো বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে।

গত বছরের মে মাসেই ভারতীয় নৌবাহিনী ফ্রান্সের বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘শার্ল দ্য গল’এর সাথে যৌথ মহড়ায় অংশ নেয়। প্রায় একইসাথে ভারতীয়রা জাপানের বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘ইজুমো’ এবং অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজের সাথে যৌথ মহড়ায় অংশ নেয়। কিন্তু সেই সময়গুলি ছিল ভারতের জন্যে অপেক্ষাকৃত ভালো সময়; শক্তিশালী বন্ধুরা ছিল ভারতকে সহায়তা দেবার জন্যে। এখন করোনা দুর্যোগের কারণে ১১টা মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের মাঝে মাত্র ২টা সমুদ্রে অপারেশনে রয়েছে; আর তন্মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণভাবে ভারত মহাসাগরে রয়েছে একটা। আরব সাগরের কাছাকাছি রয়েছে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘আইজেনহাওয়ার’। এছাড়াও জানুয়ারি থেকে এই অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে এম্ফিবিয়াস এসল্ট জাহাজ ‘বাটান’। চীনা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ভারত মহাসাগরে ঢুকুক বা না ঢুকুক, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে ইতোমধ্যেই তা রাজত্ব করে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। বিশাল মার্কিন নৌবহরের এই অসহায়ত্ব ভারতকেও বিচলিত করেছে। একারণেই ভারত চাইছে চীনের পথ অনুসরণ করে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় নিজের আঞ্চলিক প্রভাবকে দ্রুত ঝালাই করে নিতে।

চীনের ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটি’র এসোসিয়েট প্রফেসর ঝাও ইয়ি বেইজিংএ ভারতীয় সাংবাদিকদেরকে সরাসরিই বলেন যে, চীন ভারত মহাসাগরকে নিরাপদ রাখতে ভারতের বিশেষ ভূমিকাকে মেনে নেয়। তবে ভারত মহাসাগরের মতো উন্মুক্ত এক মহাসাগরকে ভারতের ‘উঠান’ বলাটা একেবারেই সমীচিন নয়। সুইডিশ সাংবাদিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক বার্টিল লিন্টনার ‘এশিয়া টাইমস’এর এক লেখায় বলছেন যে, চীন চাইছে না যে কোন একটা শক্তি ভারত মহাসাগরকে নিয়ন্ত্রণ করুক। চীনের জ্বালানি, খনিজ এবং রপ্তানি পণ্যের মূল সমুদ্রপথ এখন ভারত মহাসাগর। আর তাই এই সমুদ্রপথের নিরাপত্তা দেয়ার চেষ্টা না করাটাই বরং বেইজিংএর জন্যে হ্রস্বদৃষ্টির পরিচায়ক হবে। করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারির মাঝে চীনের এই প্রচেষ্টা শুধু চলছেই না, বাড়তেও পারে। লিন্টনারের কথা ধরেই বলা যায় যে, ভারত এটা বুঝতে পারছে যে, চীন তার সমুদ্রপথের নিরাপত্তা দিতে ভারত মহাসাগরে পদার্পণ করবেই। আর একারণেই চীনা বিমানবাহী জাহাজ প্রশান্ত মহাসাগরে ঘুরে বেড়াচ্ছে খবর পাওয়া মাত্রই ভারতীয় বিমান বঙ্গোপসাগরের উপর মহড়া দেয়া শুরু করেছে। অন্যদিকে চীনও মেনে নিচ্ছে যে, ভারত মহাসাগরে ভারতের প্রভাব থাকবেই; তাই ভারতের সাথে তার প্রতিযোগিতা অনিবার্য। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আলাদা। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী সামরিক অবস্থান মানেই হলো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ‘ব্যবস্থা’ বজায় থাকা। ভারত-চীনের প্রতিযোগিতার মাঝে অত্র অঞ্চলের ছোট দেশগুলি ব্যালান্সিং পাওয়ার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই চেয়ে থাকবে। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির অবক্ষয় এই ব্যালান্সকে সমস্যায় ফেলবে। এতে মার্কিন ‘বিশ্ব ব্যবস্থা’ যেমন হুমকির মাঝে পড়বে, তেমনি ভারত মহাসাগরে ব্যালান্সিং শক্তি হিসেবে অন্য দেশের আসার পথ উন্মুক্ত হবে। তবে এই অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পেতেই অত্র অঞ্চলের দেশগুলি নিজেদের শক্তি বৃদ্ধিতে মনোনিবেশ করতে পারে। এতে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির সাথেসাথে সরাসরি সংঘাতের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পাবে।

Sunday, 16 February 2020

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে ফিলিপাইন?

১৬ই ফেব্রুয়ারি ২০২০

   
ফিলিপাইন এখনই যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের উপর নির্ভরশীলতা কমলেও যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু রাষ্ট্রদের উপরে ফিলিপাইনের নির্ভরশীলতা যথেষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ফিলিপাইনের চুক্তি বাতিল হোক আর না হোক, ফিলিপাইন যে আগের মতো যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া নিরাপত্তার চাদরের মাঝে নিশ্চিন্ত থাকতে পারছে না, তা নিশ্চিত। 


গত ১১ই ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইন ঘোষণা দেয় যে, দুই দশক আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ফিলিপাইনের স্বাক্ষরিত একটা নিরাপত্তা চুক্তি তারা বাতিল করতে যাচ্ছে। ‘ভিজিটিং ফোর্সেস এগ্রিমেন্ট’ বা ‘ভিএফএ’ নামের এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপাইনে তাদের সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে পারতো। ফিলিপাইন যে এই চুক্তি বাতিল করবে, তার আভাস আগেই পাওয়া যাচ্ছিলো, যখন ২৩শে জানুয়ারি ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদরিগো দুতার্তে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন যে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপাইনের সিনেটর রোনাল্ড ডেলা রসার ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করে, তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ‘ভিএফএ’ চুক্তি বাতিল করবেন। ফিলিপাইনের অনলাইন মিডিয়া ‘র‍্যাপলার’ বলছে যে, সাংবাদিকদের সাথে এক টেলিকনফারেন্সে মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্র সচিব ক্লার্ক কুপার বলেন যে, এই চুক্তি বাতিল করা হলে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মাঝে প্রতি বছর যে ৩’শ যৌথ কর্মকান্ড চালিত হয়, তা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে তিনি আশা করেন যে, ফিলিপাইনের নীতিনির্ধারকদের মাঝে অনেকেই এসব যৌথ কর্মকান্ড বন্ধ করার বিপক্ষে থাকবেন। এই চুক্তি বাতিল করা হলে ২০১৪ সালে স্বাক্ষরিত ‘এনহান্সড ডিফেন্স কোঅপারেশন এগ্রিমেন্ট’ বা ‘ইডিসিএ’ চুক্তিও হুমকির মুখে পড়বে। ‘ইডিসিএ’এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপাইনে সৈন্য রাখা ছাড়াও কিছু সামরিক ঘাঁটিতে আগে থেকেই স্থাবর এবং অস্থাবর সম্পদ মজুত করে রাখে। তবে কুপার ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, ‘ভিএফএ’ চুক্তি বাতিল করা মানেই ‘ইডিসিএ’ বাতিল করা নয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিলিপাইন এখনও যথেষ্ট পরিমাণ অস্ত্র ক্রয় করছে। এমতাবস্থায় ১৯৫১ সালে দুই দেশের মাঝে স্বাক্ষরিত ‘মিউচুয়াল ডিফেন্স ট্রিটি’ হুমকির মাঝে পড়বে কিনা, এই প্রশ্নের জবাব কুপার এড়িয়ে যান।

দুতার্তে সিনেটর ডেলা রসার ভিসা নিয়ে যে হুমকি দিয়েছিলেন, তা ছিল ফিলিপাইনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েনের একটা অংশ। মার্কিন সিনেটে অনুমোদিত ‘গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি এক্ট’এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র দুতার্তের মাদকবিরোধী যুদ্ধের উপরে লাগাম টানতে চাইছিল। তবে মার্কিনীরা একইসাথে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার্থে সামরিক চুক্তিগুলিকে সমস্যায় ফেলতে চাইছিল না। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ বলছে যে, দুতার্তের সরকার চীনের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করে তাদের প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দূরত্ব তৈরি করছিল। ‘ভিএফএ’ চুক্তি বাতিল করে এই পথে আরও দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হচ্ছে ফিলিপাইন। এই ঘোষণা এমন সময়ে এলো, যখন দক্ষিণ চীন সাগরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা আরও গভীর হচ্ছে। ফিলিপাইন এক্ষেত্রে চীনের সাথে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলতে চাইছে।

    
ফিলিপাইনের নৌবাহিনীর দূরের সাগরে পাড়ি জমাবার আকাংক্ষা দেখিয়ে দেয় যে, দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সাথে সংঘাত তাদের উদ্দেশ্য নয়। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমার সাথেসাথে ফিলিপাইন তার নিজস্ব নিরাপত্তার জন্যে আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিকভাবে বন্ধু খুঁজছে; যেকারণে অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে তারা সাহস করছে। চীনকে নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ফিলিপাইনকে নিজের প্রভাব বলয়ে রাখতে ফিলিপিনোদের আরও সুযোগসুবিধা এবং ছাড় দিতে চাপের মাঝে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র।


সাম্প্রতিক সময়ে চীনের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন ছাড়াও ফিলিপাইন তার পররাষ্ট্রনীতিতে বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে। নীতির পরিবর্তনের অংশ হিসেবে গত এক দশকে ফিলিপাইন তার নৌশক্তিকে বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে। ২০১১ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ড থেকে ‘হ্যামিল্টন-ক্লাস’এর একটা পুরোনো জাহাজ পায় ফিলিপাইনের নৌবাহিনী। ৩ হাজার ২’শ টনের এই জাহাজখানা চার দশকের বেশি পুরোনো হলেও এটা ছিল ফিলিপাইনের প্রথম বড় আকারের যুদ্ধজাহাজ, যা ফিলিপাইনের নিজস্ব সমুদ্রসীমা পার হয়ে দূরের সমুদ্রে যেতে সক্ষম। এরকম মোট ৩টা জাহাজ তারা পায় যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ড থেকে। ২০১৪ সালে এমন একটা জাহাজ অস্ট্রেলিয়া যায় একটা নৌমহড়ায় অংশ নিতে। ২০১৩ সালে ইন্দোনেশিয়া থেকে ‘ম্যাকাসার-ক্লাস’এর ২টা বড় আকারের উভচর যুদ্ধজাহাজের ক্রয়াদেশ দেয় ফিলিপাইন। ২০১৭ সালের মাঝে ডেলিভারি পাওয়া সাড়ে ১১ হাজার টনের এই জাহাজগুলির একেকটা ৫’শ সৈন্য, তাদের অনেক যানবাহন এবং ২টি হেলিকপ্টার ১৩ হাজার কিঃমিঃ দূরের সমুদ্র উপকূলে নামিয়ে দিতে সক্ষম। ২০১৮ সালের অক্টোবরে এরকম একটা জাহাজ ’টারল্যাক’ রাশিয়ার ভ্লাডিভস্টক বন্দর এবং দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু আইল্যান্ড সফর করে; যা ছিল ফিলিপাইনের নৌবাহিনীর জন্যে দূরের সাগরে পাড়ি জমাবার নতুন এক অধ্যায়। ২০১৯এর জুলাই মাসে এরকম আরেকটা জাহাজ ‘দাভাও দেল সুর’ ৩’শ সেনা ও ক্রু এবং একটা হেলিকপ্টার নিয়ে রাশিয়ার ভ্লাডিভস্টক বন্দরে যায়। ২০১৮ সালের অগাস্টে ফিলিপাইন দু’টা জাহাজ হাওয়াই দ্বীপে পাঠায় একটা মহড়ায় অংশ নিতে। ২০১৩ সালে ডাকা টেন্ডার জেতার পর দক্ষিণ কোরিয়া ২ জাহাজ ৬’শ টনের ‘হোজে রিজাল-ক্লাস’এর ২টা অত্যাধুনিক ফ্রিগেট বানিয়ে দিচ্ছে; যার প্রথমটা এবছরের মার্চে ফিলিপাইনে পৌঁছাবার কথা রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার নৌবাহিনীর ‘পোহাং-ক্লাস’এর একটা এন্টিসাবমেরিন কর্ভেটও ফিলিপাইনের কাছে হস্তান্তর করেছে কোরিয় সরকার। ফিলিপাইনের কোস্ট গার্ডও ৪টা বড় অফশোর প্যাট্রোল জাহাজ কিনছে ফ্রান্স এবং জাপান থেকে। আরও ৬টা জাহাজ কেনার জন্যে অস্ট্রেলিয়া এবং থাইল্যান্ডের সাথে কথা চলছে।

এই জাহাজগুলির দূরের সাগরে যাবার অভিজ্ঞতা নতুন মোড় নেয় যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মাঝে উত্তেজনার ফলশ্রুতিতে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত ফিলিপিনোদের সরিয়ে নেবার লক্ষ্যে উভচর যুদ্ধজাহাজ ‘দাভাও দেল সুর’ এবং ‘হ্যামিল্টন-ক্লাস’ জাহাজ ‘রেমন এলকারাজ’ জানুয়ারির ১৪ তারিখে ফিলিপাইন থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে ১৫ দিন পর শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরে পৌঁছে। এটা ছিল ফিলিপাইনের নৌবাহিনীর ইতিহাসে কোন জাহাজের প্রথমবারের মতো শ্রীলঙ্কা ভ্রমণ। ৬ই ফেব্রুয়ারি জাহাজগুলি ওমান পৌঁছে।

তবে ফিলিপাইন এখনই যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে না; যা কিনা ক্লার্ক কুপারের কথায় বোঝা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের উপর নির্ভরশীলতা কমলেও যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু রাষ্ট্রদের উপরে ফিলিপাইনের নির্ভরশীলতা যথেষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ফিলিপাইনের চুক্তি বাতিল হোক আর না হোক, ফিলিপাইন যে আগের মতো যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া নিরাপত্তার চাদরের মাঝে নিশ্চিন্ত থাকতে পারছে না, তা নিশ্চিত। চীনের সাথে সম্পর্কোন্নয়নও সেকারণেই। ফিলিপাইনের নৌবাহিনীর দূরের সাগরে পাড়ি জমাবার আকাংক্ষা দেখিয়ে দেয় যে, দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সাথে সংঘাত তাদের উদ্দেশ্য নয়। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমার সাথেসাথে ফিলিপাইন তার নিজস্ব নিরাপত্তার জন্যে আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিকভাবে বন্ধু খুঁজছে; যেকারণে অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে তারা সাহস করছে। চীনকে নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ফিলিপাইনকে নিজের প্রভাব বলয়ে রাখতে ফিলিপিনোদের আরও সুযোগসুবিধা এবং ছাড় দিতে চাপের মাঝে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র।

Friday, 10 May 2019

“ব্লু হোমল্যান্ড” নৌ-মহড়া তুরস্কের ভূ-রাজনৈতিক আকাংক্ষাকেই তুলে ধরে

১০ই মে, ২০১৯

গত ফেব্রুয়ারি-মার্চে তুরস্কে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল নৌ-মহড়া ‘ব্লু হোমল্যান্ড’। তুর্কী নৌবাহিনী বলছে যে, এটা ছিল ১৯২৩ সালে তুরস্কের জন্মের পর থেকে সবচাইতে বড় নৌ-মহড়া; যাতে কিনা ১’শ ৩ খানা যুদ্ধজাহাজ অংশ নিয়েছে। ‘ব্লু হোমল্যান্ড’ নৌ-মহড়া দেখিয়ে দিচ্ছে যে, তুরস্ক একটা নৌ-শক্তি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।


গত ফেব্রুয়ারি-মার্চে তুরস্কে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল নৌ-মহড়া ‘ব্লু হোমল্যান্ড’। তুর্কী নৌবাহিনী বলছে যে, এটা ছিল ১৯২৩ সালে তুরস্কের জন্মের পর থেকে সবচাইতে বড় নৌ-মহড়া; যাতে কিনা ১’শ ৩ খানা যুদ্ধজাহাজ অংশ নিয়েছে। একইসাথে তুর্কী বিমান বাহিনী এবং সেনাবাহিনীও এই মহড়ায় অংশ নেয়। মহড়ায় ১৩টা ফ্রিগেট, ৬টা কর্ভেট, ১৬টা এসল্ট বোট, ৭টা সাবমেরিন, ৭টা মাইন-হান্টার, ১৪টা প্যাট্রোল বোট-সহ আরও অন্যান্য জাহাজ অংশ নেয়। তুর্কী প্রতিরক্ষামন্ত্রী হুলুসি আকার বলেন যে, তুরস্ক তার শক্তিকে অন্যান্য দেশের সামনে তুলে ধরার লক্ষ্যে পুরোপুরি সফল হয়েছে। ২৭শে ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ই মার্চের মাঝে পরিচালিত এই মহড়া ছয় মাস আগ থেকে পরিকল্পনা করা হয়েছিল; এবং মহড়ার ব্যাপারে গ্রীসকে আগে থেকেই জানানো হয়েছিল, যাতে করে গ্রীকদের সাথে কোনরূপ বিরোধের সূত্রপাত না হয়। তুরস্কের নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার এডমিরাল চেম গুরদেনিজ-এর মতে, ‘ব্লু হোমল্যান্ড’ নৌ-মহড়া দেখিয়ে দিচ্ছে যে, তুরস্ক একটা নৌ-শক্তি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। তুরস্কের নৌশক্তির মুলে রয়েছে তুরস্কের সামরিক শিল্প; বাহিনীর সংখ্যা বা আকার নয়। মহড়াতে অংশ নেয়া বেশিরভাগ সমরশক্তিই তুরস্কের নিজস্ব কারখানা থেকে তৈরি।

এডমিরাল গুরদেনিজ এ-ও বলছেন যে, এই মহড়া দেখিয়ে দিচ্ছে যে, পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্ককে নিয়ন্ত্রণের জন্যে অন্য দেশগুলি একত্রিত হচ্ছে। প্রভাবশালী এই এডমিরালই ২০০৬ সালে ‘ব্লু হোমল্যান্ড’ নামের জন্ম দেন, এবং একই নামে ২০১৩ সালে তিনি ‘আইদিনলিক’ পত্রিকায় কলাম লেখা শুরু করেন। তুরস্কের ‘হুরিয়েত’ পত্রিকার সাথে এক সাক্ষাতে তিনি বলেন যে, তিনি তখনই চিন্তা করেছিলেন যে, ২১-শতকে তুরস্কের জন্যে ‘ব্লু হোমল্যান্ড’ মহড়া হতে যাচ্ছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই মহড়ার মাঝে কৃষ্ণ সাগর, ইজিয়ান সাগর এবং ভূমধ্যসাগর অন্তর্ভূক্ত; আর সামনের দিনগুলিতে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের সাথে অন্যান্য দেশের বিভেদ বাড়তেই থাকবে। আর তুরস্কের সামনে ভূরাজনৈতিক যে চ্যালেঞ্জগুলি রয়েছে, তার মাঝে রয়েছে সমুদ্র-তলদেশের সম্পদ আহরণ, সমুদ্র-বন্দরসহ একটা কূর্দী রাষ্ট্রের জন্ম এবং উত্তর সাইপ্রাসের ভবিষ্যৎ। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ‘এক্সক্লুসিভ ইকনমিক জোন’ বা ‘ইইজেড’এর আকার-আকৃতি নির্ধারিত হয়নি, যা কিনা তুরস্ককে ব্যতিব্যস্ত রেখেছে। ইউরোপিয়রা তুরস্কের এই ব্যাপারটাকে সমাধান করার ক্ষেত্রে খুব একটা আগ্রহী নয়। মার্কিন এবং ইউরোপিয় কোম্পানিগুলি গ্রীক-নিয়ন্ত্রিত সাইপ্রাসে খণিজ সম্পদ আহরণে চেষ্টা করছে। গ্রীকরা বহুকাল ধরেই চিন্তা করছিল যে, তুর্কীরা স্থলভাগের শক্তি; ম্যারিটাইম শক্তি নয়। কিন্তু কয়েক’শ বছরের মাঝে প্রথমবারের মতো তুর্কীরা ঘোষণা দিচ্ছে যে, তুরস্ক একটা ম্যারিটাইম শক্তি। গুরদেনিজ বলছেন যে, পশ্চিমা দেশগুলি নিজেদের গ্রুপের বাইরের কোন দেশকে ম্যারিটাইম শক্তি হিসেবে দেখতে চায় না। তারা চায় যে, এই গ্রুপে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জাপান-সহ কয়েকটা দেশই থাকুক। সেই দেশগুলি তাই তুরস্কের নৌ-শক্তিকে আটকাতে বিভিন্ন সময়ে ষড়যন্ত্র করেছে। এসব ষড়যন্ত্র বানচাল করার পরই ২০০৮ সাল থেকে তুরস্ক ভূমধ্যসাগর এবং কৃষ্ণসাগরের বাইরে ভারত মহাসাগরেও স্থায়ীভাবে পদার্পণ করেছে। সোমালিয়ার উপকূলে তুর্কী বাণিজ্য জাহাজ হাইজ্যাক হচ্ছিল; যা কিনা সেখানে তুরস্কের নৌ-শক্তি মোতায়েনের সিদ্ধান্তকে প্রেরণা যুগিয়েছে।
 

অবসরপ্রাপ্ত এডমিরাল গুরদেনিজ বলছেন যে, তুরস্ক এখন পৃথিবীর ১৭তম বৃহৎ অর্থনীতি; এবং পৃথিবীর সকল আনাচে-কানাচে তুর্কীরা বসবাস করে এবং সেখানে তুরস্কের ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে। দেশটার ৯০ শতাংশ বাণিজ্য হয় সমুদ্রপথে। এই সমুদ্র-বাণিজ্যের পথগুলিকে রক্ষা করার জন্যেই শক্তিশালী নৌবাহিনীর প্রয়োজন। যেখানেই তুর্কী বাণিজ্য জাহাজ যাচ্ছে, সেখানেই তুর্কী নৌবাহিনীর জাহাজকে নিরাপত্তা দেবার জন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে। গুরদেনিজের বক্তব্যগুলি তুরস্কের সামরিক নীতিরই প্রতিফলন।


তবে এডমিরাল গুরদেনিজের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য সম্ভবতঃ তুরস্কের ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সাথে সম্পর্কিত। তিনি বলছেন যে, তুরস্ক এখন পৃথিবীর ১৭তম বৃহৎ অর্থনীতি; এবং পৃথিবীর সকল আনাচে-কানাচে তুর্কীরা বসবাস করে এবং সেখানে তুরস্কের ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে। দেশটার ৯০ শতাংশ বাণিজ্য হয় সমুদ্রপথে। এই সমুদ্র-বাণিজ্যের পথগুলিকে রক্ষা করার জন্যেই শক্তিশালী নৌবাহিনীর প্রয়োজন। যেখানেই তুর্কী বাণিজ্য জাহাজ যাচ্ছে, সেখানেই তুর্কী নৌবাহিনীর জাহাজকে নিরাপত্তা দেবার জন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে। গুরদেনিজের বক্তব্যগুলি তুরস্কের সামরিক নীতিরই প্রতিফলন। ইস্তাম্বুলে এখন তৈরি হচ্ছে তুরস্কের প্রথম হাল্কা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘আনাদোলু’। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, ২০২০-এ এই জাহাজ কমিশনিং-এর পর থেকে তা তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে।     



‘ব্রুকিংস ইন্সটিটিউট’এর ‘সেন্টার অন দ্যা ইউনাইটেড স্টেটস এন্ড ইউরোপ’এর এক লেখায় সিনিয়র ফেলো ওমার তাসপিনার তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তনশীলতার ব্যাপারগুলিকে তুলে ধরেন। ঠান্ডা যুদ্ধের শেষে ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত তুরস্ক চলেছে মুস্তফা কেমাল-এর অনুসারীদের কথায়, যাদেরকে চিন্তাগত দিক থেকে ‘কেমালিস্ট’ বলা হয়। ‘কেমালিস্ট’রা ছিলেন ইউরোপ-ঘেঁষা এবং কট্টর সেকুলার। উথমানি সময়ের কোন কিছুই তারা ফিরিয়ে আনতে রাজি ছিলেন না, মূলতঃ ইসলামের ফিরে আসার ভয়ে। সেনাবাহিনীর বেশিরভাগ অফিসারই একসময় কেমালিস্ট ছিলেন। উথমানি সময়ের বৈশ্বিক চিন্তাধারাকে তারা পুরোপুরি বিসর্জন দিয়ে ইউরোপের সাথে মিলিত হবার চেষ্টা করছিলেন। তবে ২০০২ সালে রিচেপ তাইয়িপ এরদোগানের ‘একে’ পার্টি ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্র যখন তুরস্কের নতুন ‘মডারেট ইসলামিক’ ধারাকে সমর্থন দিতে শুরু করলো, তখন ‘কেমালিস্ট’রা ‘একে’ পার্টির সকল নীতিরই বিরোধিতা শুরু করলো। ‘একে’ পার্টি ‘ইইউ’এর সাথে একত্রিত হবার জন্যে যখন যারপরনাই চেষ্টা শুরু করলো, তখন ‘কেমালিস্ট’রা ‘ইইউ’এ অন্তর্ভূক্তির বিরোধিতা শুরু করলো। তারা বরং তখন ইউরোপ থেকে মুখ ঘুরিয়ে রাশিয়া, চীন, মধ্যপ্রাচ্য,এবং অন্যান্য দেশের সাথে কৌশলগত বন্ধুত্ব খোঁজার পরামর্শ দিতে লাগলো। ইতোমধ্যে ‘একে’ পার্টি উথমানি সময়ের গৌরবকে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে উথমানি প্রভাবে থাকা এলাকাগুলিকে তুরস্কের প্রভাবে আনার চেষ্টা করা শুরু করে। এই চিন্তাধারাকে তুরস্কে ‘নিও-অটোমান’ বলা হতে থাকে। তবে ‘একে’ পার্টিই এই চিন্তার আবিষ্কারক নয়। তুর্কী প্রেসিডেন্ট তুরগুত ওজাল-ই তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিকে পরিবর্তনের চেষ্টা শুরু করেন। ১৯৯৩ সালে এই চিন্তাকে ‘নিও-অটোমানিজম’ বলে আখ্যা দেন তুর্কী লেখক চেঙ্গিজ চান্দার। চান্দার বলা শুরু করেন যে, তুরস্কের ‘কেমালিস্ট’ চিন্তা বর্জন করা উচিৎ। তুরগুত ওজালের ‘মাদারল্যান্ড’ পার্টির চিন্তাই ‘একে’ পার্টি’র জন্ম দিয়েছিল। পরবর্তীতে ২০০২ সালে ‘একে’ পার্টি ক্ষমতায় আসার পর এরদোগান তার পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আহমেত দাভুতোগলুর নেতৃত্বে তুরস্কের বঞ্চিত পররাষ্ট্র দপ্তরকে বড় করেন এবং এই দপ্তরের কর্মকান্ডকে নতুন রূপ দেন। দাভুতোগলু একজন চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ এবং কূটনীতিবিদ, যিনি তার “স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ” বই-এর মাধ্যমে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিকে ‘নিও-অটোমান’এর দিকে ধাবিত করেন। “স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ” বলতে তিনি ভৌগোলিক এবং ঐতিহাসিক – উভয় দিক থেকেই তুরস্কের কৌশলগত প্রভাবের কথা বলেন, যেক্ষেত্রে উথমানি সময়ের গৌরবোজ্জ্বল দিনগুলিকে পুঁজি করেই সামনে এগুতে হবে বলেন তিনি। দাভুতোগলুর নীতি অনুসরণ করেই তুরস্ক আশেপাশের দেশগুলির সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধি করে। কুর্দী বিদ্রোহীদের ব্যাপারটাকে কেন্দ্র করে তুরস্ক একাধারে ইরান, ইরাক এবং সিরিয়ার সাথে আলোচনা শুরু করে। এরপর ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন তুরস্কের ভূখন্ড ব্যবহার করে ইরাক আক্রমণের চিন্তা করে, তখন দাভুতোগলুর নীতি অনুসরণ করেই তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রকে ‘না’ বলে। এরপর সিরিয়া যুদ্ধের সময় তুর্কীরা সিরিয়া এবং ইরাকে পুরোপুরি জড়িয়ে যায়। সোমালিয়ায় শান্তি ফিরিয়ে আনতে সেখানে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে তুরস্ক। সৌদি গ্রুপের সাথে উত্তেজনার জের ধরে কাতারেও সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে তুরস্ক। ২০১৮-এর সেপ্টেম্বরে এরদোগান ঘোষণা দেন যে, আফ্রিকাতে তুরস্কের দূতাবাসের সংখ্যা ১২ থেকে বাড়িয়ে বর্তমানে ৪১ করা হলেও, সেই সংখ্যাকে বর্তমানে ৫৪-তে উন্নীত করার চেষ্টা চলছে। সুদানেও নৌঘাঁটি তৈরির চেষ্টায় রয়েছে তুর্কীরা। ইউরোপে বসবাসরত তুর্কীদেরকেও তুরস্ক ব্যবহার করছে সেসব দেশে তুর্কী প্রভাব বাড়াতে। মধ্য এশিয়ার দেশগুলিতেও তুরস্ক তার প্রভাব বাড়াচ্ছে কাজাখস্তান, জর্জিয়া এবং আজেরবাইজানের মাধ্যমে।

একইসাথে দাভুতোগলু পুরো মুসলিম দুনিয়াকে 'এক উম্মা' হিসেবে চিন্তা করতে চাইছেন। এবং জাতিরাষ্ট্রের ভিতকেও তিনি প্রশ্ন করছেন তার লেখায়। তিনি আরও বলছেন যে, দুনিয়ার ১৬টা গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের আটটাই মুসলিম দুনিয়ার নিয়ন্ত্রণে, যা কিনা মুসলিম দুনিয়াকে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করাচ্ছে। তবে তিনি তুর্কী জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করেই মুসলিম উম্মাকে এক বলে চিন্তা করেছেন। বর্তমান তুরস্ক জাতিরাষ্ট্র কনসেম্পট-এরই অংশ, যা নিয়ে প্রশ্ন করে তিনি তুর্কী জাতীয়তাবাদীদের ক্ষেপিয়ে তুলতে চাননি।  
  
আহমেত দাভুতোগলু একজন চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ এবং কূটনীতিবিদ, যিনি তার “স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ” বই-এর মাধ্যমে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিকে ‘নিও-অটোমান’এর দিকে ধাবিত করেন। “স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ” বলতে তিনি ভৌগোলিক এবং ঐতিহাসিক – উভয় দিক থেকেই তুরস্কের কৌশলগত প্রভাবের কথা বলেন, যেক্ষেত্রে উথমানি সময়ের গৌরবোজ্জ্বল দিনগুলিকে পুঁজি করেই সামনে এগুতে হবে বলেন তিনি।



তবে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, এই ‘নিও-অটোমান’ এবং ‘কেমালিস্ট’ উভয় দলই বর্তমানে তুরস্কের বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক প্রভাবকে পুনরুদ্ধ্বার করার চেষ্টায় মনোযোগী হয়েছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুরস্কের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মাঝে উভয় পক্ষই তুরস্ককে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে দেখার চেষ্টা করছে; উভয় পক্ষই তুরস্কের সামরিক শক্তিকে উন্নত করে আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক ক্ষেত্রে এর উপযোগী ব্যবহার খুঁজতে চাইছে। এই দুই গ্রুপের এক গ্রুপ উথমানি খিলাফতের সময়কার ইসলামিক ভাবধারাকে যেমন বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারে ব্যবহার করতে চাইছে, তেমনি আরেক গ্রুপ কট্টর সেকুলার চিন্তাকে লালন করেই তুরস্ককে পশ্চিমা চাপের মাঝ থেকে বের করে আনতে চাইছে। উভয় পক্ষই মূলতঃ জাতীয়তাবাদী চিন্তা দ্বারা ধাবিত। তবে এই চিন্তা ক্রমশঃ তুরস্ককে পশ্চিমাদের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে।

অনলাইন নিরাপত্তা ম্যাগাজিন ‘ওয়ার অন দ্যা রকস’এর এক লেখায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার নেভাল পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট স্কুলের জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগের প্রফেসর রায়ান জিনগেরাস বলছেন যে, যদিও বর্তমানে তুরস্ক ন্যাটো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এক জটিল সম্পর্কের মাঝে আটকে আছে, তদুপরি তুর্কী জনগণের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রকে টেক্কা দিয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন এখন প্রবল। আর এই স্বপ্নের প্রমাণ তুরস্কের রাজনৈতিক ক্যানভাসের সর্বকোণেই দৃশ্যমান হচ্ছে। রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, মিডিয়ার লোকজন, সামরিক অফিসার, ব্যবসায়ী, ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষ এখন তুরস্কের বৈশ্বিক প্রভাব নিয়ে কথা বলছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগের উথমানি খিলাফতের সময়ের স্মৃতিকেই তুরস্কের জনগণ এখন আঁকড়ে ধরে সামনে এগুতে চাইছে। তুরস্কের বিভিন্ন মহলে এখন মুস্তফা কেমাল আতাতুর্কের সময়কার ক্ষুদ্র পরিসরের পররাষ্ট্রনীতিকে সমালোচনা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে যে, উথমানি সময়ে তুরস্কের যেমনি একটা বৈশ্বিক চিন্তা ছিল, সেটা আতাতুর্কের সময় অব্যহত না রাখার কারণে জন্মের পর থেকেই তুরস্ক উথমানি সময়ের গৌরবোজ্জ্বল অবস্থানের কিছুই ধরে রাখতে পারেনি। বিশেষ করে উথমানি সময়ে ইস্তাম্বুলের সরাসরি শাসনের অধীনে থাকা পুর্ব ইউরোপের বলকান অঞ্চল, সিরিয়া, মিশর, উত্তর আফ্রিকা, পূর্ব আফ্রিকা, এবং পারস্যে (ইরাক) ১৯২৩-পরবর্তী তুরস্কের কোন প্রভাব ছিল না বললেই চলে। প্রফেসর জিনগেরাসের মতে, তুরস্কের জনগণের আকাংক্ষা তুরস্ককে এমন এক দিকে ধাবিত করছে, যা কিনা দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুরস্কের ভবিষ্যৎ বিভেদের গল্পটা লিখে দিচ্ছে।