Showing posts with label Greece. Show all posts
Showing posts with label Greece. Show all posts

Thursday, 16 February 2023

তুরস্ক ও সিরিয়ার ভূমিকম্পে ত্রাণ সহায়তার কূটনীতি

১৬ই ফেব্রুয়ারি ২০২৩

তুরস্ক ও সিরিয়ার ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিশ্বের বহু দেশ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকেরা সকলেই একমত যে, সহযোগিতার এই উদাহরণগুলি কতদিন এই দেশগুলির মাঝে সম্পর্ককে উষ্ণ রাখবে, তা বলা মুস্কিল। পশ্চিমা চিন্তার উপরে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সেকুলার বিশ্বব্যবস্থায় সকল রাষ্ট্রই জাতীয় স্বার্থকে সকলকিছুর উপরে স্থান দেয়; যেখানে মানবতার দিকগুলি সর্বদাই থাকে পিছনের সাড়িতে।

তুরস্ক ও সিরিয়ার ভয়াবহ ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ইতোমধ্যেই ৪২ হাজার ছাড়িয়েছে। তুরস্ক সরকারের হিসেবে ৮০ হাজার মানুষ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে, আর ১০ লক্ষের বেশি মানুষ অস্থায়ী তাঁবুতে বাস করছে। প্রচন্ড শীত ও বৃষ্টির মাঝে উদ্ধারকাজ যেমন কঠিন হয়েছে, তেমনি বেঁচে যাওয়া মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণও হয়েছে চ্যালেঞ্জিং। বিশ্বের বহু দেশ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে তুর্কি সরকারি মিডিয়া ‘টিআরটি’ জানাচ্ছে যে, ১৩ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বের মোট ১’শটা দেশ তুরস্ককে সহায়তা দিতে চেয়েছে। এই মুহুর্তে তুরস্কের মাটিতে ৮১টা দেশের ৯ হাজার ৪’শ ৫৬ জন উদ্ধার ও ত্রাণকর্মী কাজ করছে। এছাড়াও আরও ৭’শ ৪৭ জন ত্রাণকর্মী আসার পথে রয়েছে। এই সহায়তা কতটা মানবতার জন্যে, আর কতটা জাতীয় স্বার্থ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে, সেটা নিরূপণ করা না গেলেও এই সহায়তার সাথে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের কথাগুলি আলোচনায় আসা শুরু হয়েছে। একইসাথে রাজনৈতিক কারণেই আবার সিরিয়ার অভ্যন্তরে ক্ষয়ক্ষতি ও উদ্ধারকাজ নিয়ে আলোচনা প্রায় নেই বললেই চলে।

তুরস্কের ভূমিকম্পে জরুরি সহায়তা দিয়েছে সুইডেন ও ফিনল্যান্ড। উভয় দেশই ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ন্যাটোর সদস্যপদ পাবার চেষ্টা করছে। কিন্তু তাদের সদস্যপদ পাবার পথে বাধা হয়েছে তুরস্ক। তুরস্ক বলছে যে, এই দুই দেশ তুরস্কের অভ্যন্তরে বিচ্ছিন্নতাবাদী বামপন্থী সংগঠন ‘কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি’ বা ‘পিকেকে’কে বিভিন্নভাবে সমর্থন করে যাচ্ছে; যদিও ‘পিকেকে’কে শুধু তুরস্ক নয়, পশ্চিমা দেশগুলিও সন্ত্রাসী সংগঠন বলে আখ্যা দিয়েছে। কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থক অনেককেই নরডিক এই দেশগুলি আশ্রয় দিয়েছে এবং সেখান থেকে তারা রাজনৈতিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এদের মাঝে কেউ কেউ আবার সুইডেনের পার্লামেন্ট সদস্যও হয়েছে। তুরস্ক চাইছে যে, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থক ১’শ ৩০ জনকে এই দেশগুলি তুরস্কের কাছে হস্তান্তর করুক। এখন পর্যন্ত তুরস্কের দাবি ফিনল্যান্ড তুরস্কের শর্ত মানার ক্ষেত্রে অগ্রগামী হয়েছে; তবে সুইডেন পিছিয়ে রয়েছে।

‘ইউরোনিউজ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, তুরস্কের দুর্যোগে সহায়তাদানের পর আঙ্কারার পররাষ্ট্রনীতিতে এর প্রভাব কতটুকু পড়বে, তা নিয়ে সুইডেন ও ফিনল্যান্ডে মতবিরোধ রয়েছে। ফিনল্যান্ডের তুর্কি বংশোদ্ভূত রাজনীতিবিদ ওজান ইয়ানার ‘ইউরোনিউজ’কে বলছেন যে, ভূমিকম্পে তুরস্কের যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তাতে সামনের বেশ অনেকদিন তুরস্কে অন্য কোন ইস্যু নিয়ে কথা বলা যাবে না। অর্থাৎ এক্ষেত্রে ন্যাটোর সদস্যপদ পাওয়া থেকে সুইডেনকে বঞ্চিত করার তুর্কি যেকোন পরিকল্পনাকে তুর্কি জনগণ ভূমিকম্প থেকে জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে নেবার প্রয়াস হিসেবেই দেখবে। অপরদিকে সুইডেনের ‘স্টকহোম ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর পল লেভিন মনে করছেন যে, ভূমিকম্প তুর্কি নেতা রিচেপ তাইয়িপ এরদোগানের চিন্তাকে পরিবর্তন করাতে পারবে না। কারণ ভূমিকম্প পরবর্তী উদ্ধারকাজে ধীরগতিকে ঘিরে তুরস্কে যথেষ্ট পরিমাণে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এমতাবস্থায় জনগণের ক্রোধকে ক্ষমতাসীন দলের উপর থেকে সরাতে এরদোগান হয়তো আবারও সুইডেনের বিরুদ্ধাচরণে সোচ্চার হবেন। এমনকি খুব কঠিন পরিস্থিতিতে পতিত হলে তিনি নির্বাচনের দিনও পরিবর্তন করতে পারেন।

মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’ বা ‘সিএফআর’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সিরিয়ার অভ্যন্তরের রাজনীতিকে এই ভূমিকম্প যথেষ্ট প্রভাবিত করতে পারে। সিরিয়ায় ভূমিকম্পের সবচাইতে বড় আঘাতটা এসেছে ইদলিব অঞ্চলে; যার অনেকটাই যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এবং এখন তা বিদ্রোহী গ্রুপগুলির হাতে রয়েছে। এখানে আবার তুর্কি সেনারা সিরিয়ার বাশার আল-আসাদের সরকারি বাহিনী আর বিদ্রোহী গ্রুপগুলির মাঝে বাফার জোন তৈরি করেছে। এতকাল তুরস্কের সাথে শুধুমাত্র একটা সীমান্ত রাস্তার মাধ্যমে ইদলিবের লক্ষ লক্ষ বাস্তুহারা মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছাতে পারছিল। সিরিয় সরকার এই অঞ্চলে কার কাছে ত্রাণ পৌঁছাবে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। সিরিয়াতে তুরস্ক বাশার সরকারের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্ক সিরিয়ার সরকারের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা করছে। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, ত্রাণকর্মীদের হিসেবে সিরিয়ায় নিহত সাড়ে ৩ হাজার মানুষের মাঝে শুধু ইদলিবেই ১৩ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাড়ে ২২’শর বেশি মানুষের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গিয়েছে। জাতিসংঘের হিসেবে সিরিয়াতে ৫৩ লক্ষ মানুষ বর্তমানে গৃহহারা।

এদিকে কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ‘রয়টার্স’ বলছে যে, ১৩ই ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে সংস্থার ত্রাণ কর্মকান্ডের প্রধান মার্টিন গ্রিফিথস জানিয়েছেন যে, সিরিয়ার বিদ্রোহী গ্রুপগুলির নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চলে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেয়ার সুবিধার্থে সিরিয়ার বাশার সরকার তিন মাসের জন্যে তুরস্কের সাথে আরও দু’টা সীমান্ত সংযোগ চালু করার অনুমতি দিয়েছে। অর্থাৎ রাশিয়া এবং চীন ত্রাণ কর্মকান্ডকে বাধা দেয়নি; যদিও ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ বলছে যে, কিছুদিন আগ পর্যন্তও রাশিয়া বলেছে যে, ইদলিবে ত্রাণ পৌঁছাবার জন্যে একটা সীমান্ত রাস্তাই যথেষ্ট।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে পরিচালিত মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক মিডিয়া ‘দ্যা মিডিয়া লাইন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে ইইউএর সাথে তুরস্কের সম্পর্ক বেশ খানিকটাই শীতল যাচ্ছিলো। কিন্তু ভূমিকম্পের সহায়তা হিসেবে ইইউএর ২০টা দেশ ২৯টা উদ্ধারকারী দল এবং ৫টা মেডিক্যাল দল পাঠিয়েছে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুরস্কের সম্পর্কের মাঝেও টানাপোড়েন চলছিল। ওয়াশিংটন তুরস্কে দেড়’শ উদ্ধারকারী দল এবং ৭৭ টন যন্ত্রপাতি পাঠিয়েছে। ইস্রাইলের সাথেও তুরস্কের রাজনৈতিক সম্পর্ক বিভিন্ন চড়াই উৎরাই পার হয়েছে। তবে ইস্রাইল তুরস্কে ৪’শ সদস্যের বিশাল উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে। জেরুজালেমের ‘হিব্রু ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর ইয়োনাটান ফ্রীম্যান বলছেন যে, জরুরি সহায়তা দেয়ার ব্যাপারগুলি একটা রাষ্ট্রের সক্ষমতাকে যেমন তুলে ধরে, তেমনি আন্তর্জাতিকভাবে তার প্রভাবও বৃদ্ধি করে। এই সহায়তাগুলি নিঃশর্ত হলেও এর মাধ্যমে দু’টা রাষ্ট্রের জনগণের মাঝে সুসম্পর্ক গড়ার একটা সুযোগ তৈরি হয়। তবে বিশ্লেষকেরা সকলেই একমত যে, সহযোগিতার এই উদাহরণগুলি কতদিন এই দেশগুলির মাঝে সম্পর্ককে উষ্ণ রাখবে, তা বলা মুস্কিল। ১৯৯৯ সালে তুরস্কের ভূমিকম্পের পর গ্রিস সহায়তা দিয়েছিল; যার ফলশ্রুতিতে বেশ কয়েক বছর দুই দেশের মাঝে উত্তেজনা কমেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের সমস্যাগুলি আবারও সামনে চলে আসে। পশ্চিমা চিন্তার উপরে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সেকুলার বিশ্বব্যবস্থায় সকল রাষ্ট্রই জাতীয় স্বার্থকে সকলকিছুর উপরে স্থান দেয়; যেখানে মানবতার দিকগুলি সর্বদাই থাকে পিছনের সাড়িতে।

Thursday, 15 September 2022

তুরস্ক ও গ্রিসের মাঝে উত্তেজনা কোন দিকে যাচ্ছে?

১৫ই সেপ্টেম্বর ২০২২
 
ইজিয়ান সাগরের প্রায় সবগুলি দ্বীপই পশ্চিমারা গ্রিসকে বিভিন্ন সময়ে দিয়েছে। যেকারণে ইজিয়ান সাগরের প্রায় পুরোটাই গ্রিসের হাতে; যা নিয়ে তুরস্ক গ্রিসের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে। ঠান্ডা যুদ্ধের সময়ে তুরস্ক পশ্চিমাদের জন্যে যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আজকে ততটা নয়। যেকারণে যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপিয়রা তুরস্ককে সামরিক প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখতে পারছে এবং গ্রিসের পক্ষও নিতে পারছে।

‘রয়টার্স’এর এক খবরে বলা হচ্ছে যে, গত ১৩ই সেপ্টেম্বর তুরস্কের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্রে ৫ জন শিশু ও একজন মহিলাসহ মোট ৬ জন অভিবাসন প্রত্যাশী ডুবে মৃত্যুবরণ করে। তুর্কি কোস্ট গার্ড এক বিবৃতিতে বলে যে, এই মানুষগুলি লেবানন থেকে ইতালি যাবার চেষ্টা করছিল। মোট ৭৩ জনকে তুর্কিরা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। লেবানন থেকে রওয়ানা হয়ে তুরস্কের উপকূলের কাছে গ্রিক মালিকানায় থাকা রোডস দ্বীপের কাছে এসে তারা জ্বালানি নেবার চেষ্টা করে। তুর্কিরা বলছে যে, অভিবাসীদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে গ্রিক কোস্ট গার্ড তাদের কাছে যায় ঠিকই; কিন্তু তাদেরকে চারটা লাইফ বোটে তুলে দিয়ে তুর্কি উপকূলের কাছে ছেড়ে দেয়। তবে গ্রিক কোস্ট গার্ড এক বিবৃতিতে এই ঘটনাটা পুরোপুরিভাবে অস্বীকার করে। অভিবাসন প্রত্যাশীদের ব্যাপারে তুরস্ক ও গ্রিসের নীতি সাংঘর্ষিক অবস্থানে থাকায় তা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে চাপের মাঝে ফেলেছে।

এর মাত্র দুই দিন আগে গ্রিক কোস্ট গার্ড ইজিয়ান সাগরের তুর্কি দ্বীপ বজকাদাএর ২০ কিঃমিঃ দূরে আন্তর্জাতিক সমুদ্রে একটা তুর্কি পরিবহণ জাহাজকে লক্ষ্য করে গুলি করে। গ্রিক কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, তারা তুর্কি দ্বীপ বজকাদাএর প্রায় ৬০ কিঃমিঃ দক্ষিণে গ্রিক দ্বীপ লেসবসএর কাছাকাছি জাহাজটাকে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখে সাবধান করার জন্যে গুলি ছোঁড়ে। যেহেতু ইজিয়ান সাগর দিয়ে যাওয়া অনেক জাহাজেই ইউরোপ অভিমুখে যাওয়া অভিবাসন প্রত্যাশীরা থাকে, তাই তারা অনেক সময়েই সন্দেহজনক মনে হলে জাহাজগুলির উপর নজরদারি করে থাকে।

‘আল জাজিরা’র প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, তুরস্কের কথায়, গ্রিকরা ইজিয়ান সাগরের ক্রিট দ্বীপে রুশ নির্মিত ‘এস-৩০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করে তুর্কি যুদ্ধবিমানগুলিকে হুমকির মাঝে রাখছে; যা গ্রিকরা অস্বীকার করেছে। এছাড়াও গ্রিক যুদ্ধবিমানও ইজিয়ান সাগরে তুর্কি যুদ্ধবিমানকে হুমকি দিয়েছে। তুর্কিরা এও অভিযোগ করেছে যে, গ্রিকরা তুরস্কের কুর্দি বিদ্রোহী গ্রুপ ‘পিকেকে’র সদস্যদেরকে গোপনে সামরিক ট্রেনিং দিচ্ছে; যা তারা গ্রেপ্তার হওয়া ‘পিকেকে’ সদস্যদের কাছ থেকে জানতে পেরেছে। অপরদিকে গ্রিকরা বলছে যে, ইজিয়ান সাগরে গ্রিসের মালিকানায় থাকা রোডস এবং কস দ্বীপের মতো দ্বীপগুলি পর্যটন শিল্পের জন্যে গ্রীসের কাছে গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সেই দ্বীপগুলি যেখানে গ্রিক মূল ভূখন্ড থেকে অনেক দূরে, সেখানে সেগুলি তুরস্কের মূল ভূখন্ড থেকে মাত্র ৫ থেকে ১৫ কিঃমিঃ দূরে অবস্থিত। গ্রিকরা এই দ্বীপগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইছে।

গত ৩রা সেপ্টেম্বর তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান গ্রিক বিমানের তুর্কি আকাশসীমানা লঙ্ঘনের অভিযোগ করে বলেন যে, যদি গ্রিকরা ইজিয়ান সাগরে তুর্কি বিমানকে হুমকি প্রদান করে যেতে থাকে, তাহলে গ্রিকদেরকে ক্ষতির সন্মুখীন হতে হবে। অপরদিকে গ্রিক প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিতসোতাকিস বলেন যে, তুর্কি প্রেসিডেন্টের কথাগুলি মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে তিনি উত্তেজনা হ্রাসে তুর্কি নেতার সাথে আলোচনায় বসতে ইচ্ছুক। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, অক্টোবরে ইইউএর বৈঠকে হয়তো এরকম একটা সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সপ্তাহখানেক আগে গ্রিক সরকার ন্যাটো, ইইউ এবং জাতিসংঘের কাছে চিঠি দিয়ে তুর্কি আগ্রাসী মনোভাবের নিন্দা জানাতে অনুরোধ করে। চিঠিতে আশংকা প্রকাশ করা হয় যে, এহেন পরিস্থিতি সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। গ্রিকরা তাদের সমর্থন পাচ্ছে ফ্রান্সের কাছ থেকে। ‘গ্রিক সিটি টাইমস’এর এক খবরে বলা হচ্ছে যে, গ্রিক প্রধানমন্ত্রী মিতসোতাকিস প্যারিস সফর করার সময় ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর কাছ থেকে সমর্থন পান। ১২ই সেপ্টেম্বর এক যৌথ সংবাদ সন্মেলনে ম্যাক্রঁ বলেন যে, তুরস্কের বিবৃতি এবং কর্মকান্ড একবারেই অগ্রহণযোগ্য এবং তিনি একইসাথে গ্রিসের সাথে ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ব্যাপারে সন্তোষ প্রকাশ করেন। সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্স গ্রিকদেরকে ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমান সরবরাহ করেছে এবং নৌবাহিনীর জন্যে ফ্রিগেট দিচ্ছে; সাথে ঋণ সুবিধাও দেয়া হচ্ছে।

দুই ন্যাটো সদস্য দেশের মাঝে উত্তেজনা ন্যাটোর ঐক্যের মাঝেও প্রশ্ন তুলেছে। ন্যাটোর অফিশিয়াল টুইটার বার্তায় ১৯২২ সালে দখলদারি গ্রিক বাহিনীর বিরুদ্ধে জয়লাভের শততম বার্ষিকীতে তুরস্ককে অভিনন্দন জানাবার পর গ্রিকরা প্রতিবাদ করে। ফলস্বরূপ ন্যাটো সেই বার্তা মুছে ফেললে তুর্কিরা নাখোশ হয়। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, দুই ন্যাটো সদস্যের দ্বন্দ্ব মোটেই সুবিধা বয়ে আনবে না। আর ইজিয়ানের দ্বীপগুলির উপর গ্রিসের সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে কোন প্রশ্নই নেই।

প্রাক্তন মার্কিন সহকারী প্রতিরক্ষা সচিব জিম টাউনসেন্ড ‘ভয়েস অব আমেরিকা’কে বলছেন যে, যদিও এই মুহুর্তে দুই দেশের উত্তেজনা নিরসনে কারুর মধ্যস্ততা প্রয়োজন, তথাপি তিনি কাছাকাছি সময়ে তা দেখছেন না। দুই দেশের কেউ যদি নিজেদের পক্ষ সমর্থনে ন্যাটোকে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়, তাহলে ন্যাটোর ঐক্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। আর এই অনৈক্যকে মস্কো ব্যবহার করতে চাইবে। প্রাক্তন ন্যাটো সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা মার্কিন জেনারেল ফিলিপ ব্রীডলাভ বলছেন যে, যদিও দুই দেশের উত্তেজনা নতুন নয়, তথাপি তুরস্কের নেতৃত্ব দেশটাকে এমন একটা দিকে নিয়ে যেতে চাইছে, যা কিনা বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্ককে আবারও টানাপোড়েনের মাঝে ফেলেছে। তবে যেহেতু দুই দেশেরই সামনে নির্বাচন, তাই উত্তেজক কথাগুলি হয়তো কিছুটা হলেও অভ্যন্তরীণ জনগণকে টার্গেট করে বলা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলকে যেভাবে দেখতে চাইছে, সেক্ষেত্রে তুরস্কের চাইতে গ্রিস অপেক্ষাকৃতভাবে এগিয়ে আছে।

দুই দেশের সাম্প্রতিক নির্বাচন এই দ্বন্দ্বে ইন্ধন যোগালেও তুরস্ক ও গ্রিসের দ্বন্দ্ব তাদের জন্মকাল থেকেই। ইজিয়ান সাগরের প্রায় সবগুলি দ্বীপই পশ্চিমারা গ্রিসকে বিভিন্ন সময়ে দিয়েছে। যেকারণে ইজিয়ান সাগরের প্রায় পুরোটাই গ্রিসের হাতে; যা নিয়ে তুরস্ক গ্রিসের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে। ঠান্ডা যুদ্ধের সময়ে তুরস্ক পশ্চিমাদের জন্যে যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আজকে ততটা নয়। যেকারণে যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপিয়রা তুরস্ককে সামরিক প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখতে পারছে এবং গ্রিসের পক্ষও নিতে পারছে। ফ্রান্স ইতোমধ্যেই তুরস্ককে ব্যালান্স করতে গ্রিসকে সামরিক সহায়তাও দিচ্ছে। অপরদিকে রাশিয়ার উপর পশ্চিমা অবরোধের মাঝেও তুরস্ক রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক রেখে চলেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝেও ন্যাটোর সদস্যদেশগুলির সাংঘর্ষিক লক্ষ্য সংস্থার ঐক্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

Wednesday, 23 March 2022

ইউক্রেন যুদ্ধ… তুরস্ক আসলে কার পক্ষে?

২৩শে মার্চ ২০২২

২৮শে ফেব্রুয়ারি তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু বলেন যে, তুরস্ক ১৯৩৬ সালের মনট্রিউ কনভেনশন মেনে চলছে। মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিংকেন কাভুসোগলুকে মনট্রিউ কনভেনশনকে সমুন্নত রাখার জন্যে এবং এর সপক্ষে বক্তব্য দেয়ার জন্যে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। কনভেনশন মেনে রুশ যুদ্ধজাহাজের জন্যে বসফরাস বন্ধ করে দেয়া ছাড়াও ইউক্রেন এবং রাশিয়ার মাঝে আলোচনায় মধ্যস্ততা করার আগে তুরস্ক মার্কিন সমর্থন এবং উপদেশ নিয়েছে; যদিওবা মাত্র কয়েক মাস আগেই রাশিয়া থেকে ‘এস-৪০০’ ক্রয়ের ‘অপরাধে’ যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের উপর অবরোধ দিয়েছে।

২৪শে ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক হামলা শুরু করার দিনই ইউক্রেন তুরস্ককে বসফরাস এবং দার্দানেলিস প্রণালি রুশ জাহাজের জন্যে বন্ধ করে দেয়ার আহ্বান জানায়। এর চারদিন পর ২৮শে ফেব্রুয়ারি তুরস্ক বসফরাস এবং দার্দানেলিস প্রণালিকে সকল রাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজের জন্যে বন্ধ ঘোষণা করে। তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু সাংবাদিকদের বলেন যে, তুরস্ক ১৯৩৬ সালের মনট্রিউ কনভেনশন মেনে চলছে। সেই অনুযায়ী তুরস্ক যখন কোন যুদ্ধে সরাসরি অংশ না নিচ্ছে, তখন তার অধিকার রয়েছে যুদ্ধে অংশ নেয়া পক্ষগুলির যুদ্ধজাহাজকে বসফরাস এবং দার্দানেলিস প্রণালি পার হতে বাধা দেয়ার। যদি কোন যুদ্ধজাহাজ কৃষ্ণ সাগরে নিজের ঘাঁটিতে ফেরত যায়, তবে সেক্ষেত্রে তুরস্ক কোন বাধা দেবে না। কাভুসোগলু বলেন যে, এর আগে রুশ সরকার তাদের কাছে জিজ্ঞেস করেছিল যে, তুরস্ক মনট্রিউ কনভেনশন মেনে চলবে কিনা। তুরস্কের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল যে, তুরস্ক সেই কনভেনশন কঠোরভাবে মেনে চলবে। ‘নেভাল নিউজ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, তুর্কি সরকার কনভেনশনের ‘আর্টিকেল ১৯’ অনুযায়ী যুদ্ধরত পক্ষগুলিকে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে নিষেধ করেছে। তবে সকল দেশের যুদ্ধজাহাজ যাওয়া বন্ধ করার জন্যে তারা খুব সম্ভবতঃ ‘আর্টিকেল ২১’এর সরণাপন্ন হয়েছে; যেখানে বলা হয়েছে যে, তুরস্ক যদি যুদ্ধের হুমকির মাঝে পড়ে, তাহলে তারা বসফরাস বন্ধ করে দিতে পারে। তুরস্কের এই সিদ্ধান্তের পরপরই মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব এন্টনি ব্লিংকেন কাভুসোগলুর সাথে ফোনালাপ করেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র নেড প্রাইস সাংবাদিকদের বলেন যে, ব্লিংকেন কাভুসোগলুকে মনট্রিউ কনভেনশনকে সমুন্নত রাখার জন্যে এবং এর সপক্ষে বক্তব্য দেয়ার জন্যে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। ইউক্রেনকে সহায়তা দানের জন্যেও ব্লিংকেন তুরস্ককে ধন্যবাদ দেন। ইউক্রেনে রুশ সামরিক হামলা শুরু হওয়ার পর থেকেই তুরস্কের গুরুত্ব বহুগুণে বেড়ে গেছে। যুদ্ধের আগে তুরস্কের সাথে যাদের দ্বন্দ্ব চলছিল, তাদের অনেকেই তুরস্ক সফর করেছেন; যা দেখিয়ে দেয় যে, যুদ্ধ অত্র অঞ্চলের বাস্তবতাকে কতটা পরিবর্তন করেছে।

৪ঠা মার্চ মার্কিন উপপররাষ্ট্র সচিব ওয়েন্ডি শেরমান তুরস্ক সফর করে তুর্কি প্রেসিডেন্টের প্রধান উপদেষ্টা ইব্রাহিম কালিনএর সাথে বৈঠক করেন। ‘আনাদোলু এজেন্সি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বৈঠকে উভয় পক্ষ যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার জন্যে যৌথ প্রচেষ্টা বৃদ্ধি করতে একমত হয়। কালিন বলেন যে, তুরস্ক যুদ্ধরত দুই দেশের মাঝে মধ্যস্ততা করতে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এছাড়াও দু’পক্ষ সিরিয়া, লিবিয়া এবং আফগানিস্তানের শান্তি এবং স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা করে; এবং ইস্রাইলের সাথে তুরস্কের ও তুরস্কের সাথে আর্মেনিয়ার সম্পর্কোন্নয়নের ব্যাপারেও আশা ব্যক্ত করা হয়।

 
৪ঠা মার্চ মার্কিন উপপররাষ্ট্র সচিব ওয়েন্ডি শেরমান তুরস্ক সফর করে তুর্কি প্রেসিডেন্টের প্রধান উপদেষ্টা ইব্রাহিম কালিনএর সাথে বৈঠক করেন। এটা পরিষ্কার যে মাত্র কিছুদিন আগেও যখন উসমানি খিলাফতের স্বপ্নে বিভোর তুর্কিদের আবেগের বাস্তবতাকে পুঁজি করে এরদোগান তুরস্ককে আঞ্চলিকভাবে বিভিন্ন সংঘাতে জড়িয়েছিলেন, ঠিক একইভাবে ইউক্রেনের যুদ্ধের বাস্তবতাকে পুঁজি করে তিনি তার অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনাকে লুকাবার চেষ্টা করে ২০২৩ সালের নির্বাচনের আগে নিজের অবস্থানকে কিছুটা হলেও শক্তিশালী করতে চাইছেন। যুক্তরাষ্ট্র, ইস্রাইল, জার্মানি, ন্যাটো এবং গ্রিস সেই পরিবর্তিত বাস্তবতাকে ব্যবহার করেই তুরুস্কের সাথে আলোচনা করছে।


ইউক্রেন ও রাশিয়ার মাঝে আলোচনায় মধ্যস্ততা করার প্রচেষ্টা চালানোর জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পাবার পর ১০ই মার্চ তুরস্কের আনতালিয়াতে ইউক্রেন এবং রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের প্রথম বৈঠকের পর তুরস্কের গুরুত্ব যেন আরও একধাপ বেড়ে যায়! ১১ই মার্চ ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল জেন্স স্টলটেনবার্গ তুরস্ক সফর করে আসেন। ন্যাটোর এক সংবাদ বার্তায় বলা হচ্ছে যে, স্টলটেনবার্গ সফরকালে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগানের সাথে সাক্ষাৎ করে ন্যাটোর মাঝে তুরস্কের বিশেষ ভূমিকার প্রশংসা করেন। একইসাথে তিনি ইউক্রেন এবং রাশিয়ার মাঝে আলোচনায় তুরস্কের মধ্যস্ততাকে এবং ইউক্রেনকে তুরস্কের সহায়তা দেয়াকে স্বাগত জানান।

স্টলটেনবার্গের তুরস্ক সফরের দুই দিনের মাথায় ১৩ই মার্চ আঙ্কারা যান গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিতসোতাকিস। তুর্কি থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর ইকনমিকস এন্ড ফরেন পলিসি স্টাডিজ’এর প্রেসিডেন্ট সিনান উলগেন ‘এএফপি’কে বলছেন যে, উভয় দেশের জন্যেই এই মুহুর্তে নিজেদের মাঝে নতুন করে কোন দ্বন্দ্ব একেবারেই অনভিপ্রেত। ‘ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর ফেলো আসলি আয়দিনতাসবাস বলছেন যে, উভয় দেশের নেতৃত্বই বুঝতে পারছে যে, তাদের আশেপাশের বাস্তবতা পরিবর্তন হয়ে গেছে। মাত্র তিন মাস আগেও ইউরোপিয় নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ এরকম ছিল না।

যদি মিতসোতাকিসের আঙ্কারা সফর নতুন কিছু ঠেকে, তাহলে আরও অবাক হবার কথা এর পরদিন ১৪ই মার্চ জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শোলজের তুরস্ক সফরের খবরে। এক যৌথ সংবাদ সন্মেলনে শোলজ বলেন যে, দুই দেশ ইউক্রেনে যুদ্ধ বন্ধ্বের ব্যাপারে একমত এবং উভয় দেশই ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দিয়েছে। তিনি বসফরাস প্রণালি সকল যুদ্ধজাহাজের জন্যে বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্যে তুরস্ককে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তবে একইসাথে তিনি তুরস্কের সাথে দ্বন্দ্বের দিকগুলি, যেমন, মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং জার্মান নাগরিকদের বিরুদ্ধে তুরস্কের বিভিন্ন পদক্ষেপের ব্যাপারেও কথা বলেন। অপরদিকে এরদোগান মনে করিয়ে দেন যে, রাশিয়ার সাথে তুরস্কের বর্তমানে ৩৮ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য রয়েছে, যা তারা ৫০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যেতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

 
৯ই মার্চ তুরস্ক সফরে আসেন ইস্রাইলের প্রেসিডেন্ট আইজাক হারজগ। তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান সংবাদ সন্মেলনে এই সফরকে ঐতিহাসিক এবং দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন মাত্র বলে আখ্যা দেন। তিনি বিশেষ করে দুই দেশের মাঝে জ্বালানির ব্যাপারে সমঝোতার উপর গুরুত্ব দেন।


ইউক্রেন এবং রাশিয়ার প্রথম আলোচনার আগের দিন ৯ই মার্চ তুরস্ক সফরে আসেন ইস্রাইলের প্রেসিডেন্ট আইজাক হারজগ। তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান সংবাদ সন্মেলনে এই সফরকে ঐতিহাসিক এবং দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন মাত্র বলে আখ্যা দেন। তিনি বিশেষ করে দুই দেশের মাঝে জ্বালানির ব্যাপারে সমঝোতার উপর গুরুত্ব দেন। সেই লক্ষ্যে সামনের দিনগুলিতে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রী ইস্রাইল সফর করবেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনে দুই দেশের গুরুত্ব দেয়ার উপর জোর দেন। এছাড়াও তিনি দুই দেশের মাঝে মতভেদের বিষয়গুলিকে পারস্পরিক সন্মান ও খোলা মনের মাধ্যমে সুরাহা করার আশা ব্যক্ত করেন।

‘আল মনিটর’ বলছে যে, তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের এহেন নীতি পরিবর্তনকারী সিদ্ধান্তগুলির পিছনে রয়েছে অর্থনৈতিক দুর্দশা, যা ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আরও মারাত্মক আকার ধারণ করছে। এছাড়াও ২০২৩ সালে রয়েছে তুরস্কের নির্বাচন, যেখানে ক্ষমতাসীন ‘একে পার্টি’ যথেষ্ট শক্তিশালী বিরোধী গ্রুপের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, তুরস্ক ইউক্রেন যুদ্ধে এমন একটা অবস্থানে আছে, যা কৌশলগতভাবে সমর্থন করা গেলেও নৈতিক দিক থেকে অসমর্থনযোগ্য। লেখায় আরও বলা হচ্ছে যে, তুরস্ক রাশিয়ার সাথে দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলতে চাইছে, যাতে প্রথমতঃ তুরস্কের গ্যাস সরবরাহ যেন ব্যাহত না হয়, এবং দ্বিতীয়তঃ সিরিয়াকে স্থিতিশীল রাখতে গিয়ে যেন রাশিয়াকে পাশে পাওয়া যায়। আবার ইউক্রেনকেও তুরস্ক সমর্থন দিয়ে গেছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে ‘বায়রাকতার টিবি-২’ ড্রোন সরবরাহ করেছে, যেগুলি রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে কিছু সাফল্যও পেয়েছে। এই কথাগুলিতে এটা পরিষ্কার যে, তুরস্ক কোন নীতি নয়, বরং স্বার্থকে বুঝে বাস্তবতার সাথে খাপ খাওয়াবার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। একারণেই ১৯৩৬ সালের মনট্রিউ কনভেনশন মেনে রুশ যুদ্ধজাহাজের জন্যে বসফরাস বন্ধ করে দেয়া ছাড়াও ইউক্রেন এবং রাশিয়ার মাঝে আলোচনায় মধ্যস্ততা করার আগে মার্কিন সমর্থন এবং উপদেশ নিয়েছে; যদিওবা মাত্র কয়েক মাস আগেই রাশিয়া থেকে ‘এস-৪০০’ ক্রয়ের ‘অপরাধে’ যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের উপর অবরোধ দিয়েছে। এটা পরিষ্কার যে মাত্র কিছুদিন আগেও যখন উসমানি খিলাফতের স্বপ্নে বিভোর তুর্কিদের আবেগের বাস্তবতাকে পুঁজি করে এরদোগান তুরস্ককে আঞ্চলিকভাবে বিভিন্ন সংঘাতে জড়িয়েছিলেন, ঠিক একইভাবে ইউক্রেনের যুদ্ধের বাস্তবতাকে পুঁজি করে তিনি তার অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনাকে লুকাবার চেষ্টা করে ২০২৩ সালের নির্বাচনের আগে নিজের অবস্থানকে কিছুটা হলেও শক্তিশালী করতে চাইছেন। যুক্তরাষ্ট্র, ইস্রাইল, জার্মানি, ন্যাটো এবং গ্রিস সেই পরিবর্তিত বাস্তবতাকে ব্যবহার করেই তুরুস্কের সাথে আলোচনা করছে।

Tuesday, 15 December 2020

তুরস্কের উপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা পশ্চিমাদের সাথে তুরস্কের গভীর বিশ্বাসগত পার্থক্যকেই তুলে ধরে

১৫ই ডিসেম্বর ২০২০


২০১৯এর জুলাই। ২০১৬ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের তিন বছরপূর্তিতে রুশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘এস ৪০০’এর তুরস্কে অবতরণ। বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, তুরস্ক এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনেছে ভবিষ্যতের অভ্যুত্থান ঠেকাতে। কিন্তু এই ব্যবস্থা ন্যাটোর অন্যান্য সদস্যরাষ্ট্রের বিমানও টার্গেট করতে সক্ষম; যা তুরস্কের অন্য কোন ক্ষেপণাস্ত্র পারে না।


মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজ ছাড়ার প্রায় শেষ মুহুর্তে এসে গত ১৪ই ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। নিষেধাজ্ঞার মাঝে পড়েছে তুরস্কের প্রতিরক্ষা ক্রয় দপ্তর ‘প্রেসিডেন্সি অব ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিজ’ এবং এর প্রধান ইসমাঈল দেমির সহ মোট চারজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। এর ফলে তুরস্কের এই দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রযুক্তি ক্রয়ের লাইসেন্স পাবে না। একইসাথে উল্লিখিত চারজন কর্মকর্তার যেসকল সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তা আটকে দেয়া ছাড়াও তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মাঝে সম্পর্কে যে টানাপোড়েন চলছিল, তার সর্বাগ্রে রয়েছে তুরস্কের রুশ ‘এস ৪০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয়। মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পেও এক বিবৃতিতে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র বহুবার সর্বোচ্চ পর্যায়ে তুরস্ককে জানিয়েছে যে, ‘এস ৪০০’ ক্রয়ের ফলে মার্কিন সামরিক প্রযুক্তি এবং জনবল হুমকির মাঝে পড়বে। একইসাথে তা রুশ প্রতিরক্ষা সেক্টরকে অর্থায়ন করবে এবং তুরস্কের সামরিক বাহিনী এবং সামরিক শিল্পে রাশিয়ার ঢোকার ব্যবস্থা করবে। তিনি বলেন যে, এরপরও তুরস্ক এই বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় এবং পরীক্ষা করা থেকে বিরত থাকেনি। অথচ ‘এস ৪০০’এর বিকল্প হিসেবে ন্যাটোর নিজস্ব বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল, যা তুরস্কের প্রতিরক্ষার প্রয়োজনীয়তা মেটাতে পারতো। তিনি তুরস্ককে যত দ্রুত সম্ভব এই সমস্যা সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথভাবে কাজ করায় ব্রতী হবার আহ্বান জানান। অপরপক্ষে তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই বিভিন্ন সময়ে স্বীকার করেছেন যে, তুরস্কের ‘এস ৪০০’ কেনার ব্যাপারটার যৌক্তিকতা রয়েছে। একইসাথে বিবৃতিতে বলা হয় যে, তুরস্ক তার সুবিধামত যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের জবাব দেবে। বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের আহ্বানও জানানো হয়। ‘আল জাজিরা’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ট্রাম্প প্রশাসনের শেষ সময়ে পররাষ্ট্রনীতির যে সিদ্ধান্তগুলি আসছে, সেগুলিকে কাঁধে নিয়েই পরবর্তী জো বাইডেন প্রশাসনকে কাজ শুরু করতে হবে।

‘এস ৪০০’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ক্রয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে ‘এফ ৩৫’ স্টেলথ যুদ্ধবিমান প্রকল্প থেকে বের করে দেয়। তবে এর পরবর্তীতে আর কোন বড় পদক্ষেপ নেয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিরত থাকে। গত অক্টোবর মাস থেকে তুরস্ক ‘এস ৪০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরীক্ষা শুরু করে। মার্কিন কংগ্রেস থেকে এব্যাপারে আহ্বান করা হয় যে, ‘কাউন্টারিং আমেরিকাস এডভারসারিজ থ্রু স্যাংসন্স এক্ট’ বা সিএএটিএসএ’ বা ‘কাটসা’ আইনের অধীনে তুরস্কের উপরে অবরোধ আরোপ করা হোক। এই আইনের অধীনে মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় এমন কাজের জন্যে যেকোন রাষ্ট্রকে শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা রাখা হয়। যদিও বাইডেনের নির্বাচন জয়ী দল বলে এসেছে যে, তারাও তুরস্কের ‘এস ৪০০’ ক্রয়ের বিরোধী, তথাপি এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র এবং তুরস্কের সম্পর্কের মাঝে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা দেয়ালকে আরও উঁচু করলো।

 
২০১৩ সাল। ভূমধ্যসাগরের ক্রিট দ্বীপে গ্রিস রুশ নির্মিত ‘এস ৩০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরীক্ষা করছে। গ্রিস এবং বলকানের অন্যান্য দেশগুলি রুশ সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করলেও ন্যাটো তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। মূলতঃ তুরস্কের বিরুদ্ধে ব্যালান্স করে রাখার জন্যেই গ্রিস ‘এস ৩০০’ ক্রয় করেছে, এবং ন্যাটো তা সহ্য করেছে।


তুরস্ক বরাবরই বলে আসছে যে, যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে ‘প্যাট্রিয়ট’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানাবার ফলেই তুরস্ক রুশ ‘এস ৪০০’ ক্রয়ে বাধ্য হয়েছে। তুরস্ক আরও বলে আসছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রগুলির মাঝেই দ্বিমুখী নীতি নিয়েছে; গ্রিস রুশ নির্মিত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ব্যবহার করলেও তাকে কোন অবরোধের মাঝে পড়তে হয়নি। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, গ্রিক সাইপ্রাস ১৯৯৭ সালে রাশিয়া থেকে দূরপাল্লার ‘এস ৩০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় করে। পরে তুরস্কের প্রতিবাদের জেরে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাটাকে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপে মোতায়েন করা হয়। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে এই ব্যবস্থাকে গ্রিকরা প্রথমবারের মতো পরীক্ষা করে বলে বলছে ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’। ২০১৫ সালে গ্রিস রুশ সহায়তায় এই ব্যবস্থাটার প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সাধন করে এবং নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয় করে। এছাড়াও গ্রিকরা রাশিয়া থেকে ‘টর এম১’ এবং ‘অসা একেএম’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় করেছে। গত নভেম্বর মাসে তুরস্ক বলে যে, গ্রিস তার রুশ নির্মিত ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ক্রিট দ্বীপে ন্যাটোর মহড়ার মাঝে পরীক্ষা করেছে।

এর আগে গত ১৬ই অক্টোবর তুরস্ক ‘এস ৪০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রথমবারের মতো পরীক্ষা করে। তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান ব্যাপারটা নিশ্চিত করে বলেন যে, তুরস্ক এই পরীক্ষা চালিয়ে যাবে এবং এই পরীক্ষার জন্যে তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি চাইবে না। অক্টোবরের ‘এস ৪০০’ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পিছনে ক্রিট দ্বীপে ফ্রান্স এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের যুদ্ধবিমান মোতায়েনকে কারণ হিসেবে দেখায় তুরস্ক। তুরস্কের সেই পরীক্ষার প্রায় দু’মাস পর যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা গ্রহণ করলো। অক্টোবরে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের মুখপাত্র জনাথন হফম্যান বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তুরস্কের সম্ভাব্য এই পরীক্ষার খবর এসেছে। যদি এটা সত্যি হয়, তাহলে প্রতিরক্ষা দপ্তর এর কড়া প্রতিবাদ জানাবে।

 

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ বা ‘সিএসআইএস’এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, ২০১৬ সালের জুলাই মাসে তুরস্কে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার সময় ‘এফ ১৬’ যুদ্ধবিমান দ্বারা পার্লামেন্ট ভবন এবং প্রেসিডেন্টের বিমান আক্রান্ত হলেও তুর্কি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেই বিমানগুলিকে টার্গেট করতে পারেনি। এই ব্যবস্থাটা ন্যাটোর তৈরি করা; যার মাধ্যমে এটা নিশ্চিত হয় যে ন্যাটোর একটা সামরিক সরঞ্জাম অপরটার উপর হামলা করবে না। এরদোগান হয়তো ‘এস ৪০০’ ক্রয়ের মাধ্যমে আরেকটা অভ্যুত্থানই প্রতিরোধ করতে চাইছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, গ্রিস কেন ‘এস ৩০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনেছে রাশিয়ার কাছ থেকে? ‘সিএসআইএস’ অবশ্য এব্যাপারে কোন বিশ্লেষণ দেয়নি।

গ্রিস ছাড়াও পূর্ব ইউরোপের বেশ কিছু দেশ ব্যাপকভাবে রুশ অস্ত্র ব্যবহার করে থাকে। চেক রিপাবলিক, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া এবং স্লোভাকিয়া এখনও রুশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। গ্রিস এবং তুরস্কের রুশ সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহারের ক্ষেত্রে পশ্চিমাদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির উত্তর পাওয়া যাবে অত্র অঞ্চলের ইতিহাসের দিকে। পূর্ব ইউরোপের বলকান অঞ্চলের বেশিরভাগ দেশই একসময় ইস্তাম্বুলের উসমানি খিলাফতের অধীনে ছিল। রাশিয়া, অস্ট্রিয়া হাঙ্গেরি, ব্রিটেন, ফ্রান্স, এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশ চার শতক ধরে যুদ্ধ করে উসমানিদের কাছ থেকে বলকান অঞ্চল ছিনিয়ে নেয় এবং সেখানে অনেকগুলি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। ইউরোপ এবং রাশিয়ার মাঝে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা থাকলেও সকলেই ইসলামের ঝান্ডাবাহী উসমানি খিলাফতের বিরুদ্ধে কাজ করেছে। বলকানে তৈরি করা রাষ্ট্রগুলির মাঝে রয়েছে গ্রিস, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, হাঙ্গেরি, সার্বিয়া, বসনিয়া, আলবেনিয়া, স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, মেসিডোনিয়া, মন্টিনেগ্রো, কসোভো। এই দেশগুলির বেশিরভাগ জনগণ বিশ্বাসগত দিক থেকে ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চের অনুসারী হবার কারণে রাশিয়ার চার্চের সাথে তাদের গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। একারণেই পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলি বলকানে তাদের প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে সাবধানে এগিয়েছে; অনেক ক্ষেত্রে ছাড়ও দিয়েছে। রুশ অস্ত্র ব্যবহারে ছাড় দেয়াটাও এই দেশগুলিকে ন্যাটোর অংশ করে নেবার নীতির অংশ ছিল।

সাইপ্রাস নিয়ে ১৯৭০এর দশক থেকেই গ্রিস এবং তুরস্কের দ্বন্দ্ব চলছে। গ্রিস এবং তুরস্ক উভয়েই ন্যাটোর তৈরি সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে; যার একটা অপরটাকে টার্গেট করতে পারবে না। মূলতঃ ন্যাটোর তৈরি তুর্কি বিমানগুলিকে টার্গেট করার জন্যেই গ্রিস ‘এস ৩০০’ কিনেছে রাশিয়ার কাছ থেকে। অর্থাৎ রুশ ক্ষেপণাস্ত্রগুলি গ্রিসের জন্যে তুরস্কের বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ। আর একারণেই ন্যাটো গ্রিসের সাথে রাশিয়ার বহু বছরের সামরিক সম্পর্ককে সহ্য করে চলছে। গ্রিসের সামরিক বাহিনীতে রুশ নির্মিত ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে ন্যাটো হুমকি মনে না করলেও তুর্কি বাহিনীতে রুশ ক্ষেপণাস্ত্রকে ন্যাটো হুমকি হিসেবে দেখছে। এই দ্বিমুখী নীতি মূলতঃ কয়েক শতক ধরে চলে আসা চিন্তারই ফলাফল; যার মাঝ দিয়ে ইস্তাম্বুলকে রুশ এবং পশ্চিমারা কেউই বন্ধু হিসেবে নেয়নি। রুশ ‘এস ৪০০’ ক্রয়ের জন্যে তুরস্কের উপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা দেখিয়ে দেয় যে, আঙ্কারার সেকুলার নেতৃত্বের মাঝেও পশ্চিমারা উসমানি খিলাফতের ছায়াই দেখতে পাচ্ছে। তুরস্ক হয়তো নিজস্ব সামরিক শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তির উপর তার নির্ভরশীলতা বহুলাংশেই কমিয়ে ফেলতে পারবে; কিন্তু তুর্কিদের মুসলিম পরিচয়ের ব্যাপারে পশ্চিমাদের কয়েক’শ বছরের অস্বস্তি যে মুছে ফেলতে পারবে না, তা নিশ্চিত।

Saturday, 19 September 2020

গ্রীস ও তুরস্কের দ্বন্দ্ব ইউরোপিয়দের শক্তি প্রদর্শনেরই ফলাফল

১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২০
গ্রীকরা তাদের স্বাধীনতা পেতে ইউরোপিয়দের উপর নির্ভর করেছিল; তুরস্কের সাথে যেকোন সম্ভাব্য যুদ্ধে গ্রীস তাদের সহায়তাই চাইবে। ইউরোপিয় মধ্যস্ততায় তুর্কিদের সাথে গ্রীসের আলোচনা শক্তি ব্যবহারের পথে বাধাগুলিকেই দেখিয়ে দেয়। গ্রীস তৈরি হবার পর সীমানা নির্ধারণের যে আইনগুলিকে তুরস্ক মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল, সেই আইন অমান্য করাটাই এখন জাতিরাষ্ট্র তুরস্কের জন্যে সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ। 



১৮ই সেপ্টেম্বর তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান ঘোষণা দেন যে, তুরস্ক প্রস্তুত রয়েছে গ্রীসের নেতৃত্বের সাথে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তেল গ্যাস আহরণকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা প্রসমণে আলোচনা করতে। গত কয়েক মাস ধরেই ন্যাটোর দুই সদস্য প্রতিবেশী এই দেশগুলি দ্বন্দ্বের উপর ভরত করে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ঘনঘন সামরিক মহড়া চালিয়ে যাচ্ছে। সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে এরদোগান বলেন যে, বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো দুই পক্ষ কি নিয়ে আলোচনা করবে এবং কোন কাঠামোর মাঝে এই আলোচনা হবে। তিনি আরও বলেন যে, তিনি মধ্যস্ততাকারী দেশগুলিকে জানিয়েছেন যে, দুই দেশের মাঝে সুসম্পর্ক থাকলে আলোচনা হতে পারে। ভিডিওকনফারেন্সিংএর মাধ্যমে বা তৃতীয় কোন দেশে এই আলোচনা হতে পারে। ‘আল জাজিরা’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, দুই দেশের মাঝে গত মাস থেকে উত্তেজনা শুরু হয়, যখন তুরস্ক তার সার্ভে জাহাজ ‘ওরুচ রাইস’কে গ্রীক দ্বীপ কাস্তেলোরিতসোর কাছাকাছি সমুদ্রের বিরোধপূর্ণ অঞ্চলে নৌবাহিনীর প্রহরায় পাঠায়। এক মাস সমুদ্রে কাজ করার পর গত ১৩ই সেপ্টেম্বর জাহাজটা বন্দরে ফিরে যায় মেইনটেন্যান্স এবং জ্বালানির জন্যে। এরদোগান বলেন যে, যদি ‘ওরুচ রাইস’কে তুরস্ক বন্দরে ফেরত নিয়ে আসে, তাহলে নিশ্চয়ই এর একটা অর্থ রয়েছে। তুরস্ক চাইছে আলোচনাকে একটা সুযোগ দিতে। তবে জাহাজটার মিশন শেষ হয়ে গিয়েছে, এটা বলা যাবে না। এরদোগানের কথাগুলি এমন সময়ে এলো, যখন তুর্কি এবং গ্রীক সামরিক নেতৃবৃন্দ ন্যাটোর মধ্যস্ততায় ব্রাসেলসে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। চেক রাজধানী প্রাগে গ্রীসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিকোস দেনদিয়াস বলেন যে, তুরস্ক তার উস্কানিমূলক কর্মকান্ড থামালে গ্রীস অবশ্যই তুরস্কের সাথে আলোচনায় বসতে ইচ্ছুক। তবে তুরস্কের ড্রিলিং জাহাজ ‘ইয়াভুজ’ অক্টোবরের ১২ তারিখ পর্যন্ত সাইপ্রাসের অদূরে ড্রিলিংএর কাজ চালিয়ে যাবে, যদিও ইউরোপিয়রা এই কাজের ঘোর বিরোধী। তুরস্ক কেনই বা শক্তি প্রদর্শনের পথে এগুলো এবং কেনইবা আবার আলোচনার টেবিলে বসতে রাজি হলো?

তুরস্কের সাথে গ্রীসের এই দ্বন্দ্বে ফ্রান্স ইতোমধ্যেই গ্রীসের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধজাহাজ এবং যুদ্ধবিমান প্রেরণ করেছে। ইউরোপিয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলিও তুরস্কের বিরুদ্ধে অবরোধের হুমকি দিচ্ছে। গ্রীসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দেনদিয়াস বলছেন যে, গ্রীস চাইছে তাদের ইইউএর বন্ধুরা তুরস্কের বিরুদ্ধে কি কি ব্যবস্থা নেয়া হবে, সেটার একটা খসরা তৈরি করুক, যা কিনা তুরস্কের জন্যে একটা উদাহরণ হিসেবে থাকবে যে, বেআইনী কাজ করলে কি ধরনের অবরোধ আসতে পারে। তবে অপরদিকে এরদোগান বলছেন যে, তুরস্ককে ‘ব্ল্যাকমেইল’ করতে ব্যর্থ হবার পরই গ্রীস আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে। তুরস্কের উপর সকল হুমকি বিফল হয়েছে।

গ্রীস বলছে যে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী গ্রীসের প্রতিটা দ্বীপের চারিদিকে আঞ্চলিক সাগর এবং ‘এক্সক্লুসিভ ইকনমিক জোন’ গ্রীসের পাওনা। অপরদিকে তুরস্ক বলছে যে, গ্রীস ইউরোপিয় দেশগুলির চাপে তুরস্কের উপর চাপ সৃষ্টি করতেই তুরস্কের পাওনা সমুদ্রাঞ্চলকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র করতে চাইছে। গ্রীসের অনেকগুলি দ্বীপ তুরস্কের উপকূলের একেবারে কাছে থাকায় গ্রীসের দাবি অনুসারে তুরস্কের উপকূলের বেশিরভাগ অঞ্চলই তুরস্কের অধীনে থাকছে না। এতে তুরস্ক ইজিয়ান সাগর এবং ভূমধ্যসাগরে খনিজ আহরণ থেকেই শুধু বঞ্চিত হবে না, তুরস্কের নৌবাহিনী ইজিয়ান সাগরে অপারেট করার নূন্যতম অধিকারও হারাবে, যা কিনা কৌশলগত দিক থেকে তুরস্কের সক্ষমতাকে একবারেই সংকীর্ণ করে ফেলবে। এই পরিস্থিতি কি করে তৈরি হলো, তা বুঝতে হলে জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বর্তমান গ্রীসের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে।

১৮৩২ সালে ইউরোপিয়দের সামরিক সহায়তায় গ্রীস উসমানি খিলাফত থেকে আলাদা হয়ে নতুন দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়। সেই সীমানায় উত্তর গ্রীসের থেসালি, এপিরাস, মেসিডোনিয়া এবং থ্রেস অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ইজিয়ান সাগরের পূর্ব দিকের বেশিরভাগ দ্বীপও সেই সীমানার মাঝে পড়েনি। ক্রীট এবং সাইপ্রাসও ছিল না; দোদেকানিজ দ্বীপপুঞ্জও ছিল না। বর্তমান তুরস্কের উপকূলে অবস্থিত থাসস, লিমনস, সামোথরাকি, লেসবস, চিয়স, সারা, সামোস, আর্মেনিসটিস দ্বীপগুলিও গ্রীসের ছিল না। এই সবগুলি দ্বীপই বর্তমান গ্রীস-তুরস্কের সমুদ্রসীমা নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৮৯৭ সালে স্থলযুদ্ধে গ্রীসের পরাজয় হলেও ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং রাশিয়ার সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে ক্রীট দ্বীপ উসমানি খিলাফত থেকে আলাদা হয়ে গ্রীসের সাথে যুক্ত হয়। ১৯১১-১২ সালে ইতালি পূর্ব ভূমধ্যসাগরে দোদেকানিজ দ্বীপপুঞ্জ দখল করে নেয়। এই দ্বীপগুলির মাঝে রয়েছে রোডস, কস, পাতমোস, এবং আরও ১২টা প্রধান দ্বীপ। ১৯২৩ সালে এই দ্বীপগুলিকে গ্রীসের হাতে তুলে দেয়া হয়। ১৯১২ সালের ডিসেম্বরে ‘এলি’র যুদ্ধে ইউরোপিয় সমর্থনপুষ্ট গ্রীক নৌবাহিনী উসমানি নৌবাহিনীকে পরাজিত করে ইজিয়ান সাগরে লেসবস, চিয়স, লেমনস এবং সামোস দ্বীপ দখল করে ফেলে। ১৯১৫-১৬ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ-ফরাসী নৌবাহিনী কাস্তেলোরিতসো দ্বীপ দখল করে। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে পুরো দোদেকানিজ ব্রিটিশদের হাতে চলে যায়। ১৯৪৭ সালে ইতালির সাথে সাক্ষরিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শান্তি চুক্তি মোতাবেক দোদেকানিজ দ্বীপপুঞ্জ গ্রীসকে দিয়ে দেয়া হয়। এর মাঝে কাস্তেলোরিতসো দ্বীপও ছিল। ১৮৭৮ সালের রাশিয়ার সাথে যুদ্ধের পর উসমানিরা ইস্তাম্বুলকে মুক্ত রাখতে ব্রিটেনকে সাইপ্রাসে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে দেয়। তবে দ্বীপের মালিকানা তখনও উথমানিদের হাতেই থাকে। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানিরা জার্মানির পক্ষে যোগ দিলে ব্রিটেন অফিশিয়ালি সাইপ্রাস নিজের দখলে নিয়ে নেয়। ১৯৬০ সালে ব্রিটেন সাইপ্রাসকে স্বাধীন বলে স্বীকৃতি দেয়। তবে সেখানে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিগুলি থেকেই যায়।

বর্তমান গ্রীস তৈরিই হয়েছে ইউরোপিয়দের শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে। এখন পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুর্কিরা সেই পথেই এগুবার চেষ্টা করছে। কিন্তু নিজেদের কাছ থেকে দখল করা দ্বীপগুলিকে তুর্কিরা শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ফেরত পাবার সাহস দেখাতে পারবে কি? গ্রীকরা তাদের স্বাধীনতা পেতে ইউরোপিয়দের উপর নির্ভর করেছিল; তুরস্কের সাথে যেকোন সম্ভাব্য যুদ্ধে গ্রীস তাদের সহায়তাই চাইবে। ইউরোপিয় মধ্যস্ততায় তুর্কিদের সাথে গ্রীসের আলোচনা শক্তি ব্যবহারের পথে বাধাগুলিকেই দেখিয়ে দেয়। গ্রীস তৈরি হবার পর সীমানা নির্ধারণের যে আইনগুলিকে তুরস্ক মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল, সেই আইন অমান্য করাটাই এখন জাতিরাষ্ট্র তুরস্কের জন্যে সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ। 

Saturday, 15 August 2020

বৈরুত বিস্ফোরণের পর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মাঝে লেবানন

১৫ই অগাস্ট ২০২০

লেবাননের উপকূলে ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর ছত্রছায়ায় পূর্ব ভূমধ্যসাগরে গ্রীসের সহায়তায় শক্তি বৃদ্ধি করার ফরাসী কৌশলই বলে দিচ্ছে যে, ফ্রান্স তুরস্কের হুমকিকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে। লেবাননের অর্থনৈতিক দৈন্যদশা এবং বৈরুত বিস্ফোরণ দেশের মানুষের জন্যে যতটা কঠিন সময় এনে দিয়েছে, ততটাই প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্ম দিয়েছে ভূমধ্যসাগরীয় শক্তিদের মাঝে।

গত ৯ই অগাস্ট ফরাসী নৌবাহিনীর হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার ‘টোনিয়েরে’ বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রী এবং জরুরি সহায়তা নিয়ে ফ্রান্স থেকে লেবাননের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। লেবাননের রাজধানী বৈরুতে এমোনিয়াম নাইট্রেটের গুদামে বিস্ফোরণের পর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে যাওয়া বৈরুতে বিভিন্ন দেশ থেকে সহায়তা আসছে। ফ্রান্সের যুদ্ধজাহাজ প্রেরণও এই সহায়তার অংশ। ফরাসী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, এই জাহাজে খাদ্য সামগ্রী ও মেডিক্যাল সরঞ্জাম ছাড়াও রয়েছে সাড়ে তিন’শ জনের ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ, বৈরুত বন্দরের সার্ভে কাজের জন্যে হাইড্রোগ্রাফিক সরঞ্জাম ও নৌবাহিনীর ডুবুরি দল, ল্যান্ডিং ক্রাফট, হেলিকপ্টার, অগ্নি নির্বাপক দল, কন্সট্রাকশন সরঞ্জাম, ইত্যাদি। লেবাননের পথে মানবিক সহায়তা নিয়ে রওয়ানা হলেও ২১ হাজার টনের বিশাল এই যুদ্ধজাহাজের সক্ষমতা রয়েছে সাড়ে ৪’শ থেকে ৯’শ সৈন্য, ৪০টা ভারি ট্যাঙ্ক, ৪টা ল্যান্ডিং ক্রাফট এবং ২০ থেকে ৩৫টা হেলিকপ্টার বহণ করার। ১২ই অগাস্ট ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ এক টুইটার বার্তায় ঘোষণা দেন যে, পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের বিরুদ্ধে গ্রীসকে সহায়তা দানের উদ্দেশ্যে ফ্রান্স তার সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করতে যাচ্ছে। আর এর মাঝে হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার ‘টোনিয়েরে’ও রয়েছে। এই ঘোষণার সাথেসাথে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। মোটকথা ফ্রান্স পূর্ব ভূমধ্যসাগরে নিজের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করতে লেবাননের ইস্যুটাকেই ব্যবহার করেছে, যা কিনা লেবাননে ফ্রান্স এবং অন্যান্য দেশের সহায়তা দেবার উদ্দেশ্যগুলিকে আলোচনায় নিয়ে আসে।

গত ৪ঠা অগাস্ট বৈরুতের বন্দর এলাকায় মারাত্মক বিস্ফোরণে দেশটার প্রধান খাদ্য গুদাম ধ্বংস হয়ে যাবার পর ‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে লেবাননের অর্থমন্ত্রী রাউল নেহমের বরাত দিয়ে বলা হয় যে, দেশটাতে এক মাসেরও কম সময়ের খাদ্যশস্যের মজুদ রয়েছে। তবে প্রতিবেদনে এও বলা হয় যে, এই গুদাম ধ্বংস হওয়াটাই প্রধান সমস্যা নয়। করোনা দুর্যোগের আগেই লেবাননের অর্থনীতি পুরোপুরি ধ্বসে পড়েছিল। আর একারণেই লেবাননের সরকারের পক্ষে খাদ্যদ্রব্য আমদানি করার জন্যে বৈদেশিক মুদ্রা যোগাড় করাই কঠিন হয়ে গেছে। লেবাননের আমদানিকারক সিন্ডিকেটের প্রধান হানি বোহসালি বলছেন যে, অন্যান্য দেশ সহায়তা না করলে দেশটা খাদ্যদ্রব্য সরবরাহের মারাত্মক ঝুঁকির মাঝে পড়বে। লেবাননের এই দুর্যোগকে আশেপাশের শক্তিশালী দেশগুলি লেবানন তথা পূর্ব ভূমধ্যসাগরে প্রভাব বৃদ্ধি করার সুযোগ হিসেবেই দেখেছে।

৬ই অগাস্ট ফরাসী প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ ছুটে যান বৈরুতে। ‘ডয়েচে ভেলে’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানি খিলাফতের পতনের পর ফরাসীরা লেবাননের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ১৯৪৩ সালে লেবাননকে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা দেবার পরেও ফ্রান্স তার সেই প্রভাবখানা ধরে রেখেছে। লেবাননের মারোনাইট খ্রিস্টানরা ফ্রান্সকে তাদের রক্ষাকারী হিসেবেই দেখে। লেবাননের ক্ষমতাবান লোকেরা ফ্রান্সে বাড়ি বানিয়েছে, ফরাসী ভাষা শিখেছে, নিজেদের স্কুলে ফরাসী ভাষাকে মূল ভাষা হিসেবে শিক্ষা দিয়েছে। বৈরুতে ম্যাক্রঁর সফরকে অনেকেই লেবাননে ফ্রান্সের হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক এলি আবুআউন বলছেন যে, ফ্রান্স একা নয়, লেবাননে ইরান এবং সৌদি আরবের প্রভাব যথেষ্ট। লেবাননের বিশ্বাসগত বিভাজনের উপরই দেশটার রাজনীতি পুরোপুরি নির্ভরশীল। খ্রিস্টানদের সমর্থনদাতা হলো ফ্রান্স; শিয়াদের পিছনে রয়েছে ইরান; সুন্নিদের সমর্থন দিচ্ছে সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্র এখানে ধীরে ধীরে তার প্রভাব বৃদ্ধি করছে। অপরদিকে রাশিয়া এবং তুরস্ক মোটে চেষ্টা শুরু করেছে। লেবাননের দীর্ঘ সময়ের গৃহযুদ্ধের শেষে ১৯৮৯ সালে তায়েফের সমঝোতার মাধ্যমে ঠিক করা হয় যে, লেবাননের পার্লামেন্টে ১’শ ২৮টা আসনের মাঝে ৪৩টা পাবে মারোনাইট খ্রিস্টানরা, ২৭টা পাবে সুন্নি মুসলিমরা, ২৭টা পাবে শিয়ারা, ২০টা পাবে ইস্টার্ন অর্থোডক্স খিস্টানরা, ৮টা পাবে দ্রুজরা, ২টা পাবে আলাওয়াতিরা এবং ১টা পাবে ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টানরা। ১৯৪৩ সালের নিয়ম অনুযায়ী দেশটার প্রেসিডেন্ট হবেন একজন মারোনাইট খ্রিস্টান এবং প্রধানমন্ত্রী হবেন একজন সুন্নি মুসলিম। এই ব্যবস্থায় মারোনাইট খ্রিস্টানরা ফ্রান্সের অধীনে যতটা সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল, তার পরিবর্তন করে মুসলিমদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়। তবে রাজনৈতিক বিভেদের এই ব্যবস্থায় লেবাননে কোনদিনই কোন শক্তিশালী সরকার গঠন করা সম্ভব হয়নি। আর বিদেশী শক্তিরা বিভিন্ন গ্রুপের পক্ষ নিয়ে লেবাননের রাজনীতিতে কলকাঠি নেড়েছে।

গত মার্চে লেবাননের সরকার ঘোষণা দেয় যে, দেশটা প্রথমবারের মতো ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণের কিস্তি ফেরত দিতে পারছে না। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হাসান দিয়াব বলেন যে, এই ঋণের উপর সুদ পরিশোধ করাটা লেবাননের সক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। ‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, লেবাননের ব্যাঙ্কগুলি দেশটার নিজস্ব মুদ্রা থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তরে বাধা দেয়ার ফলে দেশটার মুদ্রার মান মারাত্মক কমে যায়; যার ফলশ্রুতিতে লেবানিজ পাউন্ড প্রায় মূল্যহীন হয় পড়ে। একইসাথে দেশটাতে খাদ্যদ্রব্য আমদানি করা দুষ্কর হয়ে যায়। ঋণদাতাদের নেতৃত্ব দেয়া ফ্রান্স চাইছে দেশটাতে রাজনৈতিক সংস্কার হোক। ‘রয়টার্স’ বলছে, ম্যাক্রঁ চাইছেন যে, লেবাননের রাজনৈতিক দলগুলিকে একটা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যাপারে রাজি করানো। এর মাধ্যমে অতি ঋণগ্রস্ত এই দেশটাকে একটা টেকনোক্র্যাট সরকারের অধীনে নিয়ে আসলে দাতা দেশগুলি লেবাননের জন্যে আবারও কয়েক বিলিয়ন ডলারের ঋণের ব্যবস্থা করবে।

লেবাননের অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের কেন্দ্রে সিরিয়া বা আল-শামএর ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে হওয়ায় দেশটার আকারের তুলনায় এর ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বেশি। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ফ্রান্স তার হারানো প্রভাব ফিরে পেতে যেমন লেবাননে তার অবস্থানকে শক্ত করতে চাইছে, তেমনি ইরান এবং সৌদি আরবও চাইছে তাদের অবস্থান যাতে কিছুতেই দুর্বল না হয়। সৌদি আরব, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও আরও অনেক দেশ লেবাননে ত্রাণ সামগ্রী পাঠানো অব্যাহত রেখেছে। ব্রিটেন নৌবাহিনীর সার্ভে জাহাজ পাঠিয়েছে বৈরুত বন্দরকে চালু করায় সহায়তা দিতে। এর উপরে আবার তুরস্ক চাইছে বৈরুতের সমুদ্রবন্দরের উন্নয়ন করতে। অত্র অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের খেলায় সর্বশেষ খেলোয়াড় তুরস্ক। তবে লেবাননের উপকূলে ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর ছত্রছায়ায় পূর্ব ভূমধ্যসাগরে গ্রীসের সহায়তায় শক্তি বৃদ্ধি করার ফরাসী কৌশলই বলে দিচ্ছে যে, ফ্রান্স তুরস্কের হুমকিকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে। লেবাননের অর্থনৈতিক দৈন্যদশা এবং বৈরুত বিস্ফোরণ দেশের মানুষের জন্যে যতটা কঠিন সময় এনে দিয়েছে, ততটাই প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্ম দিয়েছে ভূমধ্যসাগরীয় শক্তিদের মাঝে।

Saturday, 18 July 2020

হায়া সোফিয়ায় নামাজ আদায়ের সিদ্ধান্তের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব কতটুকু?

১৮ই জুলাই ২০২০

ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যে এটা পরিষ্কার যে, হায়া সোফিয়ার এই সিদ্ধান্তে তুরস্ক মুসলিম আবেগকে কাজে লাগিয়ে নিজ দেশে এবং বিশ্বব্যাপী বেশকিছু সমর্থন যুগিয়েছে; তবে আরব বিশ্বের নেতৃত্বের সমর্থন পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ক্যাথোলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্ট ভিতের পশ্চিমা সেকুলার দুনিয়া ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চ থেকে নিজেদের আলাদা করে কঠোর বার্তা দেয়া থেকে দূরে থেকেছে; যা চার্চের কয়েক শতকের দ্বন্দ্বের কথাকে ভুলিয়ে দেয়না। পশ্চিমাদের সাথে রুশদের চলমান টানপোড়েনের মাঝে এই ঘটনা জ্বালানি হিসেবে কাজ করবে; এরদোগানও তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কিছু ফসল ঘরে তুলে নেবেন। বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নতুন কোন বিভেদের জন্ম না দিলেও মুসলিম আবেগ জড়িত থাকার কারণে তা তুর্কি জনগণকে একত্রিত করা ছাড়াও বিশ্বব্যাপী তুরস্ককে আরও গুরুত্বপূর্ণ করেছে; ব্যাপারটা কারুর পছন্দ হোক বা না-ই হোক।


১৭ই জুলাই তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান সাংবাদিকদের বলেন যে, হায়া সোফিয়াকে আবারও মসজিদে রূপান্তরিত করার ব্যাপারটা তুরস্কের সার্বভৌমত্মের ব্যাপার। তুরস্ক মনে করে না যে, এব্যাপারে আন্তর্জাতিক মতামত তুরস্কের জন্যে কোন বাধ্যবাধকতা তৈরি করে। একই দিনে ‘সিএনএন’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র ইব্রাহিম কালিন বলেন যে, হায়া সোফিয়াতে যেকেউ ঢুকতে পারবে এবং এর অভ্যন্তরের ঐতিহাসিক মোজাইকগুলিকে গত ৫’শ বছরের মতোই রক্ষা করা হবে। তিনি বলেন যে, তুরস্ক সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে যাতে করে এই মোজাইকগুলিকে নামাজের সময় ঢেকে রাখা যায়। হায়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তর করার ব্যাপারটা নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া পুরোনো ধারণা থেকে এসেছে; বর্তমানে তুরস্কে ধর্মীয় স্বাধীনতা রয়েছে। তিনি আরও বলেন যে, তুরস্কে বসবাসরত ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা সমঅধিকার পাচ্ছে; যা কিনা ভিন্ন ধর্মালম্বী যেকোন মানুষকে জিজ্ঞেস করলেই বুঝতে পারা সম্ভব। তুরস্ক ইতোমধ্যেই ক্যাথোলিক চার্চের পোপসহ অনেককেই হায়া সোফিয়াতে আমন্ত্রণ জানিয়েছে বলে বলেন তিনি। গত ১০ই জুলাই হায়া সোফিয়াকে মসজিদ হিসেবে ব্যবহারের পক্ষে তুরস্কের সর্বোচ্চ আদালতের রায় পাবার পর থেকে প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরোনো এই স্থাপনাকে নিয়ে চলছে ব্যাপক বাকযুদ্ধ। হায়া সোফিয়ার ইতিহাস এবং এর সাথে বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে এর গুরুত্ব আসলে কতখানি?

৫৩৭ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কন্সটানটিনোপল শহরে হায়া সোফিয়া নির্মিত হয় ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চের উপাসনালয় হিসেবে। একাদশ শতকে ইস্টার্ন অর্থোডক্স থেকে ক্যাথোলিক চার্চ আলাদা হয়ে যাবার পর ১২০৪ সালে চতুর্থ ক্রুসেডের সময় পশ্চিম ইউরোপ থেকে আসা খ্রিস্টান ক্রুসেডাররা বাইজ্যান্টাইন রাজ্যের প্রায় পুরোটাই দখল করে নেয় এবং কন্সটানটিনোপল শহর লুট করে। ক্যাথোলিক ক্রুসেডারদের তৈরি করা ল্যাটিন সাম্রাজ্যের অধীনে ১২৬১ সাল পর্যন্ত এটা ক্যাথোলিক চার্চ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ল্যাটিন সাম্রাজ্যকে বাইজ্যান্টাইনরা ফ্রাঙ্কদের (বর্তমানে ফ্রান্স) সাম্রাজ্য বলতো। ক্যাথোলিকরা ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চকে পুরোপুরি নির্মূল করে দেবার চেষ্টা করলেও ১২৬১ সালে কন্সটানটিনোপল শহর আবারও বাইজ্যান্টাইনদের নিয়ন্ত্রণে আসে। সেসময় থেকে ১৪৫৩ সাল পর্যন্ত হায়া সোফিয়া ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৪৫৩ সালে উসমানি সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদের অধীন মুসলিম সেনাবাহিনী কন্সটানটিনোপল বিজয় করে নেয়। মেহমেদ ‘আল ফাতিহ’ হায়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তরিত করেন এবং সেখানে নামাজ আদায়ের প্রচলন করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানি খিলাফত ধ্বংসের পর মুস্তফা কেমাল আতাতুর্কের অধীনে সেকুলার তুরস্ক তৈরি হলে ১৯৩১ সালের পর থেকে হায়া সোফিয়াতে প্রথমবারের মতো সব ধরনের উপাসনা বাতিল করা হয়। ১৯৩৪ সালে এটাকে একটা জাদুঘরে রূপান্তরিত করে পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করা হয়। তুর্কি সংস্কৃতি এবং পর্যটন মন্ত্রণালয়ের হিসেবে ২০১৯ সালে ৩৭ লক্ষ পর্যটক হায়া সোফিয়া দেখতে এসেছিল।

অনেকেই বলছেন যে, হায়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তরের মাধ্যমে এরদোগান নিজ দেশের অর্থনৈতিক দৈন্যদশাকে ঢাকতে চাইছে। ‘নিকেই এশিয়ান রিভিউ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০১৯এর মার্চের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ‘একে পার্টি’ আঙ্কারা এবং ইস্তাম্বুলের নিয়ন্ত্রণ হারাবার পর এরদোগান এই প্রকল্পকে এগিয়ে নিতে জোর দিয়েছেন। ‘এরাব নিউজ’এর এক লেখায় ধর্মবিষয়ক কনসালট্যান্ট পিটার ওয়েলবি বলেন যে, বর্তমান তুরস্কের বহু ধরনের সমস্যা থাকলেও মসজিদের অভাব সেই সমস্যাগুলির মাঝে একটা নয়। তিনি বলছেন যে, এই ঘোষণার মাধ্যমে তুরস্ক মানুষের মাঝে বিভেদ তৈরি করতে চাইছে। জুনের প্রথম সপ্তাহে করা এক জনমত জরিপের বরাত দিয়ে তুর্কি পত্রিকা ‘ইয়েনি সাফাক’ বলছে যে, তুরস্কের ৭৩ শতাংশ জনগণ হায়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তরের পক্ষে; ২২ শতাংশ বিপক্ষে; ৪ শতাংশ কোন মতামত দেয়নি।

হায়া সোফিয়ার ব্যাপারে পশ্চিমা বিশ্ব খুব শক্ত কোন শব্দ ব্যবহার করা থেকে বিরত থেকেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর হায়া সোফিয়ার ঘোষণার ব্যাপারে ‘হতাশা’ ব্যক্ত করে। ক্যাথোলিক চার্চের পোপ ফ্রান্সিস এতে ‘খুবই ব্যাথিত’ হয়েছেন বলে বলেন। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান জোসেফ বোরেল সাংবাদিকদের বলেন যে, ইইউএর মাঝে হায়া সোফিয়াকে আগের অবস্থানে নিয়ে যাবার জন্যে যথেষ্ট সমর্থন রয়েছে; এবং তারা তুরস্ককে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের আহ্বান জানাবেন। তবে ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চের অনুসারীরা তাদের আবেগ প্রকাশ করেছেন। রুশ অর্থোডক্স চার্চের প্রধান প্যাট্রিয়ার্ক কিরিল বলেন যে, তিনি ‘গভীরভাবে চিন্তিত’ হয়েছেন এবং তিনি মনে করছেন যে, এটা ‘পুরো খ্রিস্টান সভ্যতার জন্যে হুমকিস্বরূপ’। গ্রীক সংস্কৃতি মন্ত্রী লিনা মেনডোনি বলেন যে, এই সিদ্ধান্ত তুরস্ককে ছয় শতক পিছনে নিয়ে গেছে; এবং এটা ‘সভ্য দুনিয়ার প্রতি সরাসরি হুমকি’। রুশ পার্লামেন্টের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির উপ-প্রধান ভ্লাদিমির জাভারভ বলেন যে, এতে মুসলিম দুনিয়ার কোন উপকার হবে না; বরং বিভিন্ন জাতিকে একে অপরের বিপক্ষে দাঁড় করাবে। হায়া সোফিয়ার ব্যাপারে মুসলিম বিশ্ব থেকে আসা বিভিন্ন সমর্থনের এক তালিকা তুর্কি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে প্রকাশ করে ‘নিকেই এশিয়ান রিভিউ’, যেখানে ওমান, ইরান, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার নাম রয়েছে; তবে আরব দেশগুলির নাম নেই। আরব আমিরাতের সংস্কৃতি মন্ত্রী নৌরা আল-কাবি এক টুইটার বার্তায় তুরস্কের এই সিদ্দ্বান্তের সমালোচনা করেন। ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যে এটা পরিষ্কার যে, হায়া সোফিয়ার এই সিদ্ধান্তে তুরস্ক মুসলিম আবেগকে কাজে লাগিয়ে নিজ দেশে এবং বিশ্বব্যাপী বেশকিছু সমর্থন যুগিয়েছে; তবে আরব বিশ্বের নেতৃত্বের সমর্থন পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ক্যাথোলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্ট ভিতের পশ্চিমা সেকুলার দুনিয়া ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চ থেকে নিজেদের আলাদা করে কঠোর বার্তা দেয়া থেকে দূরে থেকেছে; যা চার্চের কয়েক শতকের দ্বন্দ্বের কথাকে ভুলিয়ে দেয়না। পশ্চিমাদের সাথে রুশদের চলমান টানপোড়েনের মাঝে এই ঘটনা জ্বালানি হিসেবে কাজ করবে; এরদোগানও তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কিছু ফসল ঘরে তুলে নেবেন। বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নতুন কোন বিভেদের জন্ম না দিলেও মুসলিম আবেগ জড়িত থাকার কারণে তা তুর্কি জনগণকে একত্রিত করা ছাড়াও বিশ্বব্যাপী তুরস্ককে আরও গুরুত্বপূর্ণ করেছে; ব্যাপারটা কারুর পছন্দ হোক বা না-ই হোক।

Wednesday, 24 June 2020

তিউনিসিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফ্রান্স ও তুরস্কের মাঝে চলছে প্রতিযোগিতা

২৪শে জুন ২০২০

ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর সাথে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদ। দুই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলোচনা এমন সময়ে এলো, যখন তিউনিসিয়ার প্রতিবেশী দেশ লিবিয়ার যুদ্ধে তুরস্কের হস্তক্ষেপের পর যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেছে। লিবিয়াতে কোণঠাসা হয়ে যাবার পর ফ্রান্স লিবিয়ার প্রতিবেশী তিউনিসিয়াতে তার দুর্বল হয়ে যাওয়া অবস্থানকে আরও দৃঢ় করতে চাইছে।


ফ্রান্স লিবিয়ার যুদ্ধে তিউনিসিয়ার সমর্থন চাইছে

গত ২২শে জুন ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ করোনাভাইরাস মোকাবিলায় তিউনিসিয়ার জন্যে সাড়ে ৩’শ মিলিয়ন ইউরো সহায়তার ঘোষণা দেন। ইলাইসি প্যালেসে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদের সাথে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় ম্যাক্রঁ বলেন যে, তিউনিসিয়ার স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়া, সেদেশে হাসপাতাল তৈরি এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পুনরায় শুরু করার লক্ষ্যে সহায়তা দেবে ফ্রান্স। তিনি আরও বলেন যে, এই অর্থ ২০২২ সাল পর্যন্ত তিউনিসার স্বাস্থ্যখাত এবং যুব উন্নয়নের জন্যে ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ইউরো বরাদ্দের অংশ। দুই দেশ আঞ্চলিক ইস্যু নিয়েও কথা বলেছে। ম্যাক্রঁ বলেন যে, ফ্রান্স এবং তিউনিসিয়া একত্রে দাবি করছে যে, লিবিয়াতে যুদ্ধরত পক্ষগুলি যেন আলোচনার টেবিলে বসে সকলের জন্যে নিরাপত্তা এবং লিবিয়ার সংস্থাগুলির পুনএকত্রীকরণ নিশ্চিত করে। ফরাসী প্রেসিডেন্ট লিবিয়াতে বিদেশী হস্তক্ষেপ বন্ধের আহ্বান জানান। একইসাথে ম্যাক্রঁ লিবিয়াতে তুরস্কের ভূমিকাকে ‘বিপজ্জনক খেলা’ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন যে, এটা ঐ অঞ্চল এবং ইউরোপের জন্যে সরাসরি হুমকিস্বরূপ। তিনি বলেন যে, একই কথাগুলি ঐদিনই তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন করে বলেছেন। অপরদিকে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদ বলেন যে, তার দেশ ফ্রান্সের সাথে অতীতের ক্ষতচিহ্ন ভুলে গিয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে চাইছে। তিনি তিউনিসিয়ার উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত একটা রেলওয়ে লাইন তৈরির চিন্তায় ফ্রান্সের সহায়তা দেয়াকে স্বাগত জানান। দুই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলোচনা এমন সময়ে এলো, যখন তিউনিসিয়ার প্রতিবেশী দেশ লিবিয়ার যুদ্ধে তুরস্কের হস্তক্ষেপের পর যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে তিউনিসিয়ার সাথে ফ্রান্সের সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টার ব্যাপক ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।

লন্ডন থেকে প্রকাশিত পত্রিকা ‘আল এরাব উইকলি’র এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, লিবিয়াতে কোণঠাসা হয়ে যাবার পর ফ্রান্স লিবিয়ার প্রতিবেশী তিউনিসিয়াতে তার দুর্বল হয়ে যাওয়া অবস্থানকে আরও দৃঢ় করতে চাইছে। কিছুদিন ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মন্তব্য করেন যে, লিবিয়াতে আরেকটা সিরিয়া তৈরি হতে চলেছে; যা খুবই দুশ্চিন্তার ব্যাপার। ২৬শে মে তিউনিসিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইমেদ হাজগুই ফ্রান্সের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফ্লোরেন্স পার্লির সাথে ফোনে লিবিয়া নিয়ে কথা বলেন। তারা লিবিয়ায় বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপের ব্যাপারে একমত পোষণ করেন এবং লিবিয়ার সমস্যা লিবিয়ার মানুষদের মাঝেই সমাধান হওয়া উচিৎ বলে বলেন। দুই দেশের মাঝে সামরিক সহযোগিতা আরও বাড়ানো যায় কিভাবে, তা নিয়েও তারা আলোচনা করেন।

২০১৮ সালের নভেম্বরে তিউনিসিয়ার নৌবাহিনীর ৪র্থ অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল ‘সফোনিসবে’ ডেলিভারি দেয়া হয়। এই জাহাজগুলি তিউনিসিয়াকে ভূমধ্যসাগরে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। তিউনিসিয়ার সামরিক বাহিনীকে যুক্তরাষ্ট্র গড়ে দিলেও ২০১৬ সাল থেকে তিউনিসিয়া নিজস্ব নৌবাহিনী গঠন করা শুরু করে। তিউনিসিয়ার জনগণের সাথে সামরিক বাহিনীর সম্পর্ক বেশ মধুর। সামরিক বাহিনীর শক্তিশালী হওয়ার পিছনে জনগণের সমর্থন রয়েছে; কিন্তু রাজনীতিবিদদের মাঝে এব্যাপারে রয়েছে বিরোধ।


তিউনিসিয়ার সামরিক বাহিনী গড়ে দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক

ঐতিহাসিকভাবে তিউনিসিয়ার সাথে ফ্রান্সের সম্পর্ক বেশি গভীর থাকলেও সামরিক বাহিনীর ক্ষেত্রে বেশকিছু পরিবর্তন এসেছে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’ তিউনিসিয়া নিয়ে বেশ কয়েকটা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তারা বলছে যে, একনায়ক বেন আলি তিউনিসিয়ার সামরিক বাহিনীকে ছোট করে রেখেছিলেন, যাতে সামরিক বাহিনী দেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। তিউনিসিয়ার নিয়ন্ত্রণ ছিল মূলতঃ ন্যাশনাল গার্ডের হাতে, যা কিনা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালের অধীন, এবং যার মূল কাজ ছিল দেশের উপর শাসকের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। ব্যাপারটা পরিবর্তন হয়ে যায় ২০১১ সালে বেন আলির পতনের পর। যুক্তরাষ্ট্র তিউনিসিয়া নিয়ে চিন্তিত ছিল যে, ছোট হলেও তিউনিসিয়া থেকেই সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ ইরাক ও সিরিয়াতে বিভিন্ন জিহাদি গ্রুপে যোগ দিয়েছে। এছাড়াও তিউনিসিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভেদ এবং অস্থিরতা মানুষকে গণতন্ত্রবিমুখ করে ফেলেছে। উদাহরণস্বরূপ, তিউনিসিয়ার বর্তমান সরকারে ৬টা রাজনৈতিক দল থেকে ১৫ জন এমপি এবং আরও ১৭ জন স্বতন্ত্র এমপি মন্ত্রীত্ব পেয়েছেন। কোন দলই প্রতিশ্রুতি দিয়ে কথা রাখেনি; তাই কোন দলই বেশি সংখ্যক আসন পাচ্ছে না। ২০১৪ সালে ‘পিউ রিসার্চ’এর এক জরিপ বলছে যে, মাত্র ৪৮ শতাংশ তিউনিসিয়ান গণতন্ত্রকে সমর্থন করছে। ৫১ শতাংশ মানুষ মনে করছে যে গণতান্ত্রিক সময়ের চাইতে একনায়কের সময়েই দেশের অবস্থা ভালো ছিল। মুসলিম ব্রাদারহুডপন্থী ‘এননাহদা পার্টি’র সমর্থন দুই বছরের মাঝে ৬৫ শতাংশ থেকে ৩১ শতাংশে নেমে আসে। ৮৩ শতাংশ তিউনিসিয়ান মনে করে যে, দেশের রাজনীতিতে ইসলামের আদর্শগুলি বাস্তবায়িত থাকা উচিৎ; যাদের মাঝে ৩০ শতাংশ মনে করে যে, ইসলামকে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা উচিৎ। কিন্তু সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সামরিক বাহিনীর ব্যাপারে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। ৯৫ শতাংশ মানুষ সামরিক বাহিনীর প্রশংসা করে; যেখানে মিডিয়ার পক্ষে বলে ৬২ শতাংশ মানুষ; আদালতের পক্ষে ৪৪ শতাংশ; আর ধর্মীয় নেতাদের পক্ষে মাত্র ৩৩ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র এই ব্যাপারগুলিকে পুঁজি করেই তিউনিসিয়ার সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দেয়া শুরু করে এবং তাদের সাথে মহড়া এবং অপারেশনে অংশ নিয়ে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে থাকে।

লিবিয়া থেকে আসা জিহাদী গ্রুপগুলির সাথে তিউনিসিয়ার সেনাদের ব্যাপক সংঘর্ষে নিয়মিত প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে থাকে। মার্কিন সেনারাও সেখানে সরাসরি জড়িত থাকলেও তা পত্রিকার খবরে আসতে দেয়া হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসন হোয়াইট হাউজে আসার পর থেকে তিউনিসিয়ার জন্যে সামরিক সহায়তা কমে গেলেও তিউনিসিয়া নিজের নিরাপত্তায় বিনিয়োগ করতে থাকে। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে অংশ নিতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র মার্কিনীরা তিউনিসিয়াকে সরবরাহ করেছে। এর মাঝে রয়েছে ৮০টারও বেশি হেলিকপ্টার; যার মাঝে ২৪টা ‘ওএইচ-৫৮ডি কিওওয়া ওয়ারিয়র’, ৮টা ‘ইউএইচ-৬০এম ব্ল্যাক হক’, ৩৬টা ‘ইউএইচ-১’ রয়েছে। এছাড়াও ৯টা ‘সি-১৩০’ পরিবহণ বিমান দেয়া হয় তিউনিসিয়াকে; যার মাঝে ২০১৪ সালে দেয়া হয় সর্বশেষ মডেলের ‘সি-১৩০জে সুপার হারকিউলিস’। এবছরের এপ্রিল মাসে একটা ‘সি-১৩০জে’ বিমান করোনাভাইরাস মোকাবিলায় ২২ হাজার কিঃমিঃ উড়ে চীন থেকে মেডিক্যাল সাপ্লাই নিয়ে আসে। এই ফ্লাইটের মাঝে বিমানটা দু’বার কাজাখস্তানে রিফুয়েলিং করে। নিরাপত্তা বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘ওয়ার অন দ্যা রকস’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, করোনাভাইরাস মোকাবিলায় তিউনিসিয়ার রাস্তায় সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়; যা কিনা দেশের মানুষ ভালোভাবে দেখেছে। অন্যদিকে মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’ বলছে যে, তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক দলগুলি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্যে প্রতিযোগিতা করছে। একদিকে ‘নিদা তিউনেস’ এবং ‘এননাহদা পার্টি’ সামরিক বাহিনীর উপর তাদের প্রভাব বাড়াতে চাইছে; অন্যদিকে বিরোধীরা চাইছে এতে বাধা দিতে।

মার্কিনীরা তিউনিসিয়ার উপকূল সন্ত্রাসীমুক্ত রাখতে তিউনিসিয়ার নৌবাহিনীকে কমপক্ষে ২২টা ছোট বোট দেয়। তবে ২০১৬ সাল থেকে তিউনিসিয়া নিজস্ব নৌবাহিনী গঠন করা শুরু করে। প্রথমবারের মতো নেদারল্যান্ডসের ‘ডামেন’ শিপইয়ার্ড থেকে অত্যাধুনিক চারটা অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল অর্ডার করে তারা। ৭২ মিটার লম্বা এবং প্রায় ১৩’শ টনের হেলিকপ্টার ও ড্রোন বহনে সক্ষম এই জাহাজগুলি তিউনিসিয়াকে ভূমধ্যসাগরে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ২০১৮ সালের মাঝেই ‘ডামেন’ চারটা জাহাজই ডেলিভারি দিয়ে দেয়। এর আগ পর্যন্ত তিউনিসিয়ার ফরাসী ও জার্মান নির্মিত পুরোনো ফাস্ট এটাক ক্রাফটগুলি শুধুমাত্র তিউনিসিয়ার উপকূলের কাছাকাছি অঞ্চল পাহাড়া দিতে সক্ষম ছিল। শুধু তাই নয়, তিউনিসিয়া নিজেরাই ৩টা ছোট আকৃতির ২৬ মিটার লম্বা প্যাট্রোল বোট তৈরি করে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা জানান দেয়।

সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র এবং তুরস্ক তিউনিসিয়ার সাথে সামরিক সম্পর্ক গভীর করেছে। ২০১৪ সালে তিউনিসিয়ার সেনাবাহিনী তুরস্ক থেকে ১’শটা ‘কিরপি’ আর্মার্ড ভেহিকল অর্ডার করে। ২০১৬ সাল থেকে এর ডেলিভারি শুরু হয়। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের তিউনিসিয়া সফরের সময়ে দুই দেশের মাঝে কয়েকটা সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মাঝে আগের ৩’শ মিলিয়ন ডলার সহায়তার সাথে আরও ৩’শ মিলিয়ন ডলার সহায়তার আশ্বাস দেয়া হয়। তুরস্ক তিউনিসিয়ার সেনাবাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। ২০১১ সাল থেকে ২০১৭ সালের মাঝে তুরস্ক তিউনিসিয়াকে ২’শ মিলিয়ন ডলারের নিরাপত্তা সহায়তা দেয়।

গত মার্চেই ‘ডিফেন্স নিউজ’ জানায় যে, তুরস্কের প্রতিরক্ষা কোম্পানি ‘টিএআই’ তিউনিসিয়ার কাছে ২’শ ৪০ মিলিয়ন ডলারে ৬টা ‘আনকা-এস’ সার্ভেইল্যান্স ড্রোন এবং তিনটা কন্ট্রোল স্টেশন বিক্রির ক্রয়াদেশ নিশ্চিত করেছে। তুর্কি কর্মকর্তারা বলছেন যে, তারা এই ক্রয়াদেশের জন্যে এক বছরের বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করছিলেন। আর তারা তিউনিসিয়ার কাছে অস্ত্র বহণকারী ড্রোন বিক্রি করার চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছেন। ‘আনকা-এস’ ড্রোনের বৈশিষ্ট্য হলো এটা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়; যার ফলশ্রুতিতে এই ড্রোন নিয়ন্ত্রক স্টেশন থেকে বেশ দূরে গিয়েও কাজ করতে সক্ষম। অর্থাৎ এই ড্রোনগুলি তিউনিসিয়ার উপকূলের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলির উপর নজরদারি করতে সক্ষম হবে।

তিউনিসিয়ার মুসলিম ব্রাদারহুডপন্থী ‘এননাহদা পার্ট’র প্রধান রাচেদ ঘানুচির সাথে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান। আঙ্কারার সাথে ‘এননাহদা পার্টি’র সম্পর্ক যে বাস্তবতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তা জুন মাসে পার্লামেন্টে ফ্রান্সের কাছ থেকে ঔপনিবেশিক সময়ের অপরাধের ক্ষমা চাওয়ার বিলে ‘এননাহদা’র সমর্থন না দেয়াই প্রমাণ করে।



লিবিয়ার যুদ্ধে তুরস্কের আবির্ভাব তিউনিসিয়ার রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে

লিবিয়াতে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের ঠিক আগেআগে গত বছরের ডিসেম্বরের শেষে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান হঠাত করেই তিউনিসিয়ার রাজধানীতে আবির্ভূত হন। এরদোগানের সাথে বৈঠকের পর তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট সাইয়েদ সাংবাদিকদের বলেন যে, লিবিয়ার সাথে তুরস্কের সমুদ্রসীমা নিয়ে যে চুক্তি হয়েছে, তা ঐ দুই দেশের ব্যাপার এবং তাতে তিউসিয়ার কিছু বলার নেই। অপরদিকে এরদোগান বলেন যে, লিবিয়ার ব্যাপারে আলোচনায় আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া এবং কাতারকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিৎ ছিল, কারণ এই দেশগুলি লিবিয়া সমাজ এবং রাজনৈতিক কাঠামোকে ভালোভাবে বোঝে। এরদোগানের এই সফরের পর তুরস্ক শুধু কথায় নয়, কার্যত তিউনিসিয়াকে লিবিয়ার ব্যাপারে জড়িত হতে বাধ্য করেছে। ‘রয়টার্স’ খবর দিচ্ছে যে, গত ৮ই মে তুরস্কের একটা পরিবহণ বিমান ত্রিপোলির বিমানন্দর অনিরাপদ বলে তিউনিসিয়ার দক্ষিণে লিবিয়ার সীমানার কাছাকাছি জিয়েরবা বিমানবন্দরে অবতরণ করার অনুমতি চায়। তিউনিসিয়া বিমানটাকে নামতে দেয়। এই বিমানে লিবিয়ার জন্যে মেডিক্যাল সামগ্রী ছিল বলে বলা হয়; এবং এই সামগ্রীগুলি লিবিয়া পর্যন্ত পৌঁছে দেবার জন্যে তিউনিসিয়াকে অনুরোধ করা হয়। তিউনিসিয়ার বিরোধী দল ‘ফ্রি দেস্তুরিয়ান পার্টি’র নেতারা অভিযোগ করেন যে, তুরস্ক তিউনিসিয়াকে লিবিয়ার যুদ্ধের লজিস্টিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।

ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত আরেক পত্রিকা ‘আল মনিটর’ বলছে যে, লিবিয়ার যুদ্ধ তিউনিসিয়ার রাজনীতিকে ঘোলাটে করে ফেলেছে। কারণ তিউনিসিয়াতে সকলেই লিবিয়ার যুদ্ধে কোন না কোন পক্ষ নিয়ে কথা বলা শুরু করেছে। তিউনিসিয়ার পার্লামেন্টে বর্তমানে সবচাইতে বেশি আসন দখন করে আছে ‘এননাহদা পার্ট’, যারা মুসলিম ব্রাদারহুডের চিন্তার সাথে একমত পোষণ করে। ‘এননাহদা’ লিবিয়ার যুদ্ধে ত্রিপোলির ‘গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল একর্ড’ বা ‘জিএনএ’ সরকারকে সমর্থন করছে। একইসাথে তুরস্কের ক্ষমতাসীন ‘একে পার্ট’র সাথেও তাদের বেশ ভালো সম্পর্ক রয়েছে। অপরদিকে তিউনিসিয়ায় ২৪ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা এবং ২০১১ সালে ক্ষমতাচ্যুত প্রাক্তন একনায়ক জিনে এল আবিদিন বেন আলির সমর্থকদের থেকে গঠন করা ‘ফ্রি দেস্তুরিয়ান পার্টি’ বা ‘পিডিএল’ লিবিয়ার জেনারেল হাফতারের পক্ষ সমর্থন করছে। তিউনিসের ‘কলাম্বিয়া গ্লোবাল সেন্টার্স’এর প্রধান ইউসেফ শেরিফ বলছেন যে, সকলেই আসলে তিউনিসিয়াকে লিবিয়াতে যাবার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখে। লিবিয়া থেকে সন্ত্রাসীরা যাতে তিউনিসিয়ায় প্রবেশ করতে না পারে, এই অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র তিউনিসিয়ার সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করেছে। তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষক সেইফ এদ্দিন ত্রাবেলসির মতে, লিবিয়াতে ‘জিএনএ’এর সাম্প্রতিক সফলতা তিউনিসিয়ার নিরাপত্তাকে আরও সুসংহত করবে। তিনি বলেন যে, তিউনিসিয়া আর লিবিয়া একই সূত্রে গাঁথা। লিবিয়াতে যা কিছুই ঘটবে, সেটাই তিউনিসিয়াকে প্রভাবিত করবে। লিবিয়ার ঘটনার ব্যাপারে তিউনিসিয়ার জনগণ চিন্তিত থাকবে, এটাই তো স্বাভাবিক। হাফতারের বিরুদ্ধে লিবিয়াতে ‘জিএনএ’র বড় বিজয়ের পরপরই ‘এননাহদা পার্টি’র প্রধান এবং পার্লামেন্টের স্পিকার রাচেদ ঘানুচি ত্রিপোলি সরকারের প্রধান ফায়েজ আল-সারাজকে ফোন করে অভিনন্দন জানান। কিন্তু এই ব্যাপারটা তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদ একেবারেই পছন্দ করেননি। তিউনিসিয়ার সংবিধান অনুযায়ী পররাষ্ট্রনীতি প্রেসিডেন্টের হাতে। সাইয়েদ ঈদ উল-ফিতরের এক বার্তায় জোর গলায় বলেন যে, সকলেরই জানা উচিৎ যে তিউনিসিয়া একটাই এবং এর একজনই প্রেসিডেন্ট।

তিউনিসিয়ার প্রধানমন্ত্রী এলিয়েস ফাখফাখ। দেশের এলিট ক্লাসের বেশিরভাগ ব্যক্তিরই কোন না কোনভাবে ফ্রান্সের সাথে যোগসূত্র রয়েছে। ফাখফাখ ফ্রান্সের লিয়ঁ এবং প্যারিস থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ব্যবসায় বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। তিউনিসিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভেদ এবং অস্থিরতা মানুষকে গণতন্ত্রবিমুখ করে ফেলেছে। মাত্র ৪৮ শতাংশ তিউনিসিয়ান গণতন্ত্রকে সমর্থন করছে; অপরদিকে ৮৩ শতাংশ মনে করে দেশের রাজনীতিতে ইসলামের আদর্শগুলি বাস্তবায়িত থাকা উচিৎ। রাজনীতিবিদেরা জনগণের আস্থায় না থাকলেও সামরিক বাহিনীর উপর আস্থা ৯৫ শতাংশ মানুষের; যা তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক পরিমন্ডলে বিরাট পরিবর্তন এনেছে।



তিউনিসিয়ায় ঔপনিবেশিক শাসক ফ্রান্সের প্রভাব

তিউনিসিয়ার প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তি হওয়ায় সেখানকার রাজনীতিতে ফ্রান্সের প্রভাব ব্যাপক। দেশের এলিট ক্লাসের বেশিরভাগ ব্যক্তিরই কোন না কোনভাবে ফ্রান্সের সাথে যোগসূত্র রয়েছে। ‘পিডিএল’এর প্রতিষ্ঠাতা এবং বেন আলি সরকারের প্রধানমন্ত্রী হামেদ কারুয়ি ফ্রান্সে মেডিসিন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এলিয়েস ফাখফাখ ফ্রান্সের লিয়ঁ এবং প্যারিস থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ব্যবসায় বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইমেদ হাজগুই ফ্রান্সে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। ক্ষমতাসীন কোয়ালিশনের মাঝের দল ‘তাহিয়া তিউনেস’এর নেতা এবং গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইউসেফ চাহেদ ফ্রান্সে কৃষি বিষয়ে পড়াশোনা করেন। বিলিয়নায়ার ব্যবসায়ী, মিডিয়া টাইকুন এবং ২০১৯ সালের প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনে প্রার্থী নাবিল কারুয়ি ফ্রান্সের বিভিন্ন কোম্পানিতে চাকুরি করে ক্যারিয়ার শুরু করেন।

‘পিডিএল’এর নেতা আবির মুসি ৩রা জুন লিবিয়াতে বিদেশী হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে বিল উত্থাপন করেন। বিলটা শেষ পর্যন্ত পাস না হলেও তর্ক বিতর্কের সময় আবির মুসি ‘এননাহদা’র নেতা রাচেদ ঘানুচিকে তুরস্ক এবং কাতারের অনুগত বলে অভিযোগ করেন। এরপর এই বিলের পাল্টা জবাব হিসেবে পার্লামেন্টে ১৯ আসনের অধিকারী দল ‘কোয়ালিশন আল কারামা’ আরেকটা বিল উত্থাপন করে, যা পাস হলে প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শাসক ফ্রান্সের কাছ থেকে ঔপনিবেশিক সময়ের অপরাধের জন্যে ক্ষমা চাইবার দাবি জানানো হবে। ১৪ ঘন্টা তুমুল বাকযুদ্ধের পর সাংসদরা এই বিল রুখে দেয়। ৭৭ জন সাংসদ এই বিলের পক্ষে ভোট দেয়; মাত্র ৫ জন ভোট দেয় বিপক্ষে। কিন্তু ৪৬ জন ভোটদানে বিরত থাকার কারণে বিল পাসের জন্যে দরকার ১’শ ৯ ভোট পাওয়া যায়নি। তবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল যে, মুসলিম ব্রাদারহুডপন্থী ‘এননাহদা’ এই বিল পাসের বিপক্ষে কথা বলে। তারা বলে যে, এই বিল পাস হলে তা তিউনিসিয়ার অর্থনীতিকে আঘাত করবে এবং দেশটার গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপিয় বন্ধুদের দূরে ঠেলে দেবে। ১৮৮১ সাল থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ফ্রান্স তিউনিসিয়ার ঔপনিবেশিক শাসক ছিল। এই বিল পাস না হওয়ায় এখনও তিউনিসিয়ার উপর ফ্রান্সের প্রভাব টের পাওয়া যায়।

তিউনিসিয়াতে ফ্রান্সের কি স্বার্থ রয়েছে?

তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুস্তফা আব্দেলকাবির ‘দ্যা এরাব উইকলি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, তিউনিসিয়ার ভৌগোলিক অবস্থান ফ্রান্সের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একইসাথে দেশটার কৌশলগত অবস্থান লিবিয়াতে যুদ্ধরত সকল পক্ষের জন্যেই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন যে, লিবিয়াতে তুরস্কের স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের ব্যাপারে কিছু রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে লিবিয়াতে তুরস্কের অবস্থানকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দেয়ায় তা পশ্চিম লিবিয়া নিয়ে ফ্রান্সের পরিকল্পনাকে হুমকির মাঝে ফেলে দিয়েছে। লিবিয়ার সাথে তুরস্কের সমুদ্রসীমার চুক্তি ফ্রান্সের জন্যে সরাসরি হুমকি তৈরি না করার পরেও ফরাসীরা গ্রীস এবং গ্রীক সাইপ্রাসের সাথে ঐকমত্য প্রকাশ করে তুরস্কের বিরুদ্ধাচরণ করেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন লিবিয়ার সমুদ্রসীমায় অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা নিশ্চিত করতে গত ফেব্রুয়ারি মাসে ‘অপারেশন ইরিনি’ নামে এক মিশন শুরুর ঘোষণা দেয়। আমিরাতের ‘দ্যা ন্যাশনাল’ পত্রিকা বলছে যে, ইইউ সদস্য দেশগুলির মাঝে অনৈক্যের কারণে এই মিশন শুরু করাটা খুবই কঠিন হয়েছে। ‘ইরিনি’র অধীনে নৌ মিশনের নেতৃত্বে থাকা ইতালি এখনও ঠিক করতে পারেনি যে, তারা এই মিশনে কিভাবে অংশ নেবে। মে মাসে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী লুইজি ডি মাইও পার্লামেন্টে বলেন যে, ‘ইরিনি’র জন্যে পরিকল্পিত একটা নৌজাহাজ, ৩টা বিমান এবং ৫’শ সামরিক সদস্য মোতায়েনের ব্যাপারটা ইতালি সরকার খতিয়ে দেখছে। আর এই প্রস্তাব পার্লামেন্টের হাউজগুলিতেও অনুমোদন পেতে হবে। বর্তমানে শুধুমাত্র ফ্রান্স এবং গ্রীসই অপারেশন ‘ইরিনি’র অধীনে লিবিয়ার উপকূলে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে। উভয় দেশই লিবিয়াতে তুরস্কের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছে এবং লিবিয়ার সাথে তুরস্কের সমুদ্রসীমা বিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষরের বিরোধিতা করেছে।

গত ১৯শে জুন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু ইতালি ভ্রমণকালে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে ‘অপারেশন ইরিনি’র ব্যাপক সমালোচনা করেন। তিনি বলেন যে, এই মিশনের মাধ্যমে সিরিয়া থেকে লিবিয়ায় যুদ্ধবিমান উড়িয়ে আনাকে বাধা দেয়া হয়নি। আবুধাবি থেকে আকাশপথে অস্ত্র আসার ব্যাপারটাও এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন যে, ‘ইরিনি’ লিবিয়ার সমস্যার কোন সমাধান দেয় না এবং লিবিয়ার উপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞাও নিশ্চিত করেনা। ‘দ্যা এরাব উইকলি’ বলছে যে, ফরাসী এবং গ্রীকদের অবস্থানের কারণেই ন্যাটোকে এই মিশনের অংশ করার মার্কিন এবং তুর্কি চেষ্টা সফল হচ্ছে না। লিবিয়ার জেনারেল হাফতারের অধীন ‘লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’ বা ‘এলএনএ’কে ফ্রান্স সমর্থন দিয়ে চলেছে বলেই ইইউএর মাঝ থেকে হাফতারের বাহিনীর বিরোধিতা করার চেষ্টাকে ফ্রান্স বারংবার বাধাগ্রস্ত করেছে। আব্দেলকাবির বলছেন যে, ২০১১ সালে লিবিয়ার একনায়ক মুয়াম্মার গাদ্দাফির সরকারকে অপসারণের পিছনে ফ্রান্সের সমর্থনই ছিল সবচাইতে জোরালো। তারা মনে করেছিল যে, গাদ্দাফিকে সরানোর পর লিবিয়াতে ফ্রান্সের একটা শক্ত ভিত প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু লিবিয়ার যুদ্ধে অনেকগুলি রাষ্ট্র যুক্ত হওয়ায় ফ্রান্স তার কাংক্ষিত ফলাফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর আফ্রিকা কমান্ডের অপারেশনস ডিরেক্টর ব্র্যাডফোর্ড গেরিং বলছে যে, লিবিয়াতে রুশ সামরিক অবস্থান শক্তিশালী হবার সাথেসাথে তা ইউরোপের দক্ষিণ সীমানার জন্যে হুমকি সৃষ্টি করছে। তথাপি তুরস্কের জন্যে মার্কিন সমর্থন পরিষ্কার হতে থাকায় ফ্রান্স হয়তো লিবিয়াতে রুশ সামরিক অবস্থানের বিপক্ষে কথা নাও বলতে পারে।

তিউনিসিয়ার কৌশলগত অবস্থান ফ্রান্সের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ। তিউনিসিয়ার উত্তর উপকূল থেকে ইতালির দক্ষিণের সিসিলি দ্বীপের উপকূলের দূরত্ব মাত্র ১’শ ৬০ কিঃমিঃ। সিসিলি প্রণালী নামে পরিচিত এই সরু নৌপথের মাঝ দিয়েই ফ্রান্সের সাথে সুয়েজ খাল, তথা ভারত মহাসাগর এবং পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগ। একারণেই ফ্রান্স তিউনিসিয়াকে কাছে রাখতে চাইছে। লিবিয়ার যুদ্ধে তুর্কি সমর্থনে ‘জিএনএ’এর সাম্প্রতিক বিজয়ের পর কৌশলগত এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ তুরস্কের কাছে হারাবার ভয় পেয়ে বসেছে ফ্রান্সকে।



তিউনিসিয়ার ভূকৌশলগত অবস্থান ফ্রান্স ও তুরস্ককে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে


উসমানি খিলাফতের সময় ষোড়শ শতক থেকেই তিউনিসিয়ার সাথে ইস্তাম্বুলের গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। তুরস্ক সেই সম্পর্ককেই আবার জাগিয়ে তুলতে চাইছে। তবে আঙ্কারার সাথে তিউনিসিয়ার মুসলিম ব্রাদারহুডপন্থী ‘এননাহদা পার্টি’র সম্পর্ক যে বাস্তবতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তা জুন মাসে পার্লামেন্টে ফ্রান্সের কাছ থেকে ঔপনিবেশিক সময়ের অপরাধের ক্ষমা চাওয়ার বিলে ‘এননাহদা’র সমর্থন না দেয়াই প্রমাণ করে। তথাপি এই বিল তিউনিসিয়ার জনগণের ঔপনিবেশিক সময়ের প্রতি ঘৃণা এবং ঔপনিবেশিক সময় থেকে টেনে আনা সম্পর্কের ইতি টানার ইচ্ছেরই বহিঃপ্রকাশ; যা কিনা ফ্রান্সকে বিচলিত করেছে। তিউনিসিয়ার সামরিক বাহিনীর দ্রুত উন্নয়ন, জনগণের মাঝে তাদের জনপ্রিয়তা এবং তাদের সাথে তুরস্কের সম্পর্কের ব্যাপারটাও ফ্রান্সকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। কারণ এতে লিবিয়ায় তুরস্কের সামরিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

তিউনিসিয়ার কৌশলগত অবস্থান ফ্রান্সের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ। তিউনিসিয়ার উত্তর উপকূল থেকে ইতালির দক্ষিণের সিসিলি দ্বীপের উপকূলের দূরত্ব মাত্র ১’শ ৬০ কিঃমিঃ। সিসিলি প্রণালী নামে পরিচিত এই সরু নৌপথ ভূমধ্যসাগরের পূর্ব এবং পশ্চিম ভাগকে যুক্ত করেছে। আর এর মাঝ দিয়েই ফ্রান্সের সাথে সুয়েজ খাল, তথা ভারত মহাসাগর এবং পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগ। একারণেই ফ্রান্স তিউনিসিয়াকে কাছে রাখতে চাইছে। লিবিয়ার যুদ্ধে তুর্কি সমর্থনে ‘জিএনএ’এর সাম্প্রতিক বিজয়ের পর কৌশলগত এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ তুরস্কের কাছে হারাবার ভয় পেয়ে বসেছে ফ্রান্সকে। আর একইসাথে ইতালিকে পাশে না পাওয়ায় ফ্রান্সের হতাশা চরমে পৌঁছেছে। তুরস্কের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র গ্রীসকে সাথে করেই ফ্রান্স লিবিয়ার উপকূল পাহাড়া দেবার যে মিশনে মনোনিবেশ করেছে, তা ইতোমধ্যেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, যখন গত ১০ই জুন লিবিয়ার উপকূলে ফরাসী এবং তুর্কি যুদ্ধজাহাজের মাঝে অসৌজন্যমূলক পরিস্থিতির সূচনা হয়। তুরস্ক যদি লিবিয়াতে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনে মনোযোগী হয়, আর ফ্রান্স ও গ্রীস যদি তুরস্ককে একাজে বাধা দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকে, তাহলে সামনের দিনগুলিতে দুই পক্ষের মাঝে সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়তে থাকবে।



Sunday, 24 February 2019

পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ‘গানবোট ডিপ্লোম্যাসি’র নেপথ্যে...

২৪শে ফেব্রুয়ারি ২০১৯ 
ইজিয়ান সাগরে সমুদ্রসীমা নিয়ে গ্রীস এবং তুরস্কের যে বিরোধ রয়েছে, তা আসলে বহু বছরের ইতিহাসের ফলাফল। ইজিয়ানের দ্বীপগুলি গ্রীসের দখলে চলে যাবার কারণেই তুরস্ক সমুদ্রসীমা থেকে বঞ্চিত। দ্বীপ দখলের সেই খেলায় ইউরোপিয়রা সরাসরি অংশগ্রহণ করেছে; আর দেখিয়ে দিয়েছে যে, জোর যার, সম্পদ তার। 




পূর্ব ভূমধ্যসাগরে সাম্প্রতিককালে খণিজ সম্পদকে কেন্দ্র করে এক প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। সাগরের পানির নিচে প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল এক সম্ভার আবিষ্কৃত হবার পর থেকে অত্র এলাকার দেশগুলি- তুরস্ক, লেবানন, ইস্রাইল, মিশর, গ্রীস এবং সাইপ্রাসের মাঝে শুরু হয়েছে এক প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতার মাঝে অতি গুরুত্ব পাচ্ছে দেশগুলির সমুদ্রসীমা। সমুদ্রসীমা উপকূল থেকে কত কিঃমিঃ পর্যন্ত প্রসারিত হবে, সেটা আলোচনাতে প্রাধান্য পেলেও আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো উপকূলের মালিকানা নির্ধারণ। অর্থাৎ যে উপকূলের উপরে ভিত্তি করে সেই সমুদ্রসীমা আঁকা হবে, সেই উপকূলের মালিকানা নিয়েই এখনও বিরোধ শেষ হয়নি। এখানে মূল বিরোধের জায়গা হলো পূর্ব ভূমধ্যসাগরের দ্বীপগুলি। এই দ্বীপগুলির মালিকানা নিয়ে বিরোধ আছে বলেই সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধের সমাধান হচ্ছেনা। দ্বীপগুলির মালিকানা নিয়ে বিরোধ মূলতঃ তুরস্ক এবং গ্রীসের। নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে দেশগুলি অত্র অঞ্চলে নৌ-শক্তি বৃদ্ধি করছে এবং বিভিন্ন মিডিয়াতে সেখানকার ‘গানবোট ডিপ্লোম্যাসি’ প্রাধান্য পাচ্ছে। এই দ্বীপগুলির মালিকানার একটা ইতিহাসের দিকে যদি তাকানো যায়, তাহলে ধারণা করা যেতে পারে যে কেন আজকের এই বিরোধ চলছে।

ইউরোপিয়রা যেভাবে গ্রীসকে আলাদা দেশ হিসেবে তৈরি করলো...

আধুনিককালের গ্রীস একসময় তুর্কী উথমানি খিলাফতের অধীনে ছিল। পঞ্চদশ শতকের শেষ নাগাদ বর্তমান গ্রীসের মূল ভূখন্ড এবং ইজিয়ান সাগরের দ্বীপগুলির প্রায় পুরোটাই উথমানি শাসনের অধীনে চলে আসে। শুধুমাত্র ক্রীট এবং সাইপ্রাস দ্বীপ দু’টা ভেনিসের অধীনে রয়ে যায়। ভেনিস বর্তমানে ইতালির অধীনে হলেও ঊনিশ শতকে ইতালির একত্রীকরণের আগ পর্যন্ত ভেনিস আলাদা রাষ্ট্র ছিল। উথমানিরা ভেনিসের হাত থেকে সাইপ্রাস দখল করে নেয় ১৫৭১ সালে এবং ক্রীট দখল করে ১৬৭০ সালে। গ্রীকরা ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চের অনুসারী হবার কারণে রাশিয়ার একপ্রকার ধর্মীয় প্রভাব ছিল গ্রীসের উপর। রাশিয়া নিজের শক্তি বৃদ্ধিতে মনোযোগ দেবার সাথে সাথে উথমানি শাসনের অধীনে থাকা পূর্ব ইউরোপের অর্থোডক্স চার্চের অনুসারীদের নেতৃত্ব নেবার চেষ্টা করতে থাকে। এভাবে পূর্ব ইউরোপে বিভিন্ন যুদ্ধ এবং বিদ্রোহে রাশিয়া সরাসরি ইন্ধন যোগায়। ইউরোপের অন্যান্য শক্তিগুলি – ব্রিটেন, ফ্রান্স,আস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরী, এবং পরবর্তীতে ইতালি – সর্বদাই চেয়েছে ইউরোপে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটাতে। সেই হিসেবে সবগুলি শক্তিরই লক্ষ্য ছিল উথমানিদের থেকে অঞ্চল কেড়ে নেয়া। তবে এই কাড়াকাড়ির মাঝে ইউরোপের শক্তিরা নিজেদের মাঝেও প্রতিযোগিতা করেছে। যেমন পূর্ব ইউরোপে ভূমি দখলের জন্যে রাশিয়া প্রতিযোগিতা করেছে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সাথে। আবার ব্রিটেন ও ফ্রান্স চেয়েছে যেন রুশরা ভূমধ্যসাগরের উপকূলে চলে না আসে। রাশিয়াকে স্থলবেষ্টিত রাখাটা ব্রিটিশ-ফরাসীদের কৌশলের অংশ ছিল সর্বদাই; এখনও তা-ই।

উথমানিদের হাত থেকে ভূমি দখলের সেই প্রতিযোগিতায় ব্রিটেন-ফ্রান্স গ্রীসের নিয়ন্ত্রণ নেবার ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে অগ্রগামী ভূমিকা নিয়ে ফেলে। তবে তা সম্পূর্ণ হতে ঊনিশ শতক শেষ হয়ে যায়। ইউরোপের দেশগুলি গ্রীকদেরকে বহুবার ব্যবহার করেছে উথমানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে। যখনই উথমানিরা ইউরোপিয়ানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়েছে, তখনই গ্রীকরা বিদ্রোহ শুরু করেছে, অথবা ইউরোপিয়ানদের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেবার চেষ্টা করেছে।

- অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে রিগাস ফেরাইওস (১৭৫৭-১৭৯৮) নামের এক গ্রীকের হাত ধরেই উথমানিদের থেকে গ্রীসের আলাদা হবার কর্মকান্ড শুরু হয়। ফরাসী বিপ্লবের মতো কিছু একটা করে উথমানি রাজ্য ভেঙ্গে ফেলার উদ্দেশ্যে তিনি ১৭৯৩ সালে ফরাসী জেনারেল ন্যাপোলিয়ন বোনাপার্টের সহায়তা চান। তিনি চাইছিলেন বলকানের খ্রিষ্টানদেরকে উথমানি খিলাফত থেকে আলাদা করে ফেলা। পরবর্তীতে ঊনিশ শতকের শুরুর দিকে গ্রীসে যে বিদ্রোহ হয়েছিল, তা ফেরাইওস-এর চিন্তাকে উপজীব্য করেই।

- ১৮১৪ সালে ওডেসাতে (বর্তমান ইউক্রেনের অংশ; তৎকালীন রাশিয়ার অংশ) তিনজন গ্রীক মিলিত হয়ে ‘ফিলিকা এটেরিয়া’ বা ‘সোসাইটি অব ফ্রেন্ডস’ নামের একটা গোপন সংস্থা গঠন করে। এদের মাঝে নিকোলাস স্কুফাস আসেন বর্তমান গ্রীসের এপিরাস এলাকা থেকে; ইমানুইল জানথোস আসেন ইতালি থেকে; আথানাসিওস শাকালভ আসেন প্যারিস থেকে। পরে আন্তোনিওস কমিজোপাউলোস যোগ দেন মস্কো থেকে।

- ১৮১৪ থেকে ১৮১৭ পর্যন্ত এই সিক্রেট সোসাইটির সদস্যসংখ্যা সীমিত থাকলেও ১৮১৮ থেকে ১৮২১-এর মাঝে ‘ফিলিকা এটেরিয়া’র ব্যাপ্তি পুরো বলকানে ছড়িয়ে পড়ে। সদস্যদের মাঝে গ্রীক ছাড়াও সার্বরাও ছিল, যারা অর্থোডক্স চার্চের অনুসারী। রুশ সেনাবাহিনীর অফিসার আলেক্সান্দ্রোস ইপসিলান্তিস সামরিক বিদ্রোহের নেতৃত্ব নেন ১৮২০ সালে।

- ১৮২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে বলকানে বিদ্রোহ শুরু হলে উথমানি সেনাবাহিনীর বড় একটা অংশ সেখানে ব্যস্ত হয়ে যায়, যেই সুযোগে গ্রীসের দক্ষিণের পিলপনেসাস-এ বিদ্রোহ শুরু হয় মার্চে।

- ১৮২৬ সালের মাঝে উথমানি সেনাবাহিনী গ্রীকদের বিরুদ্ধে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেলে ইউরোপিয় দেশগুলি একত্রে সরাসরি যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে। ১৮২৭ সালের নভেম্বরে নাভারিনোর নৌযুদ্ধে উথমানি নৌবাহিনীকে পরাজিত করে ব্রিটিশ-ফরাসি-রুশ যৌথ নৌবাহিনী। একইসাথে ১৮২৮ সালের অগাস্টে ফরাসী সেনাবাহিনীর প্রায় ১৫ হাজার সৈন্য পিলপনেসাস-এ অবতরণ করে গ্রীকদের পক্ষে যুদ্ধ করার লক্ষ্যে।

- ১৮৩০ সালের ফেব্রুয়ারিতে লন্ডন প্রোটোকলের মাধ্যমে গ্রীসকে নতুন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আর ১৮৩২ সালের লন্ডন কনফারেন্সে (ইউরোপিয়রা ইস্তাম্বুল ডাকতো না) ইউরোপিয়ান শক্তিরা গ্রীসের সীমানা নির্ধারণ করে দেয়।

- সেই সীমানায় উত্তর গ্রীসের থেসালি, এপিরাস, মেসিডোনিয়া এবং থ্রেস অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ইজিয়ান সাগরের পূর্ব দিকের বেশিরভাগ দ্বীপও সেই সীমানার মাঝে পড়েনি। ক্রীট এবং সাইপ্রাসও ছিল না; দোদেকানিজ দ্বীপপুঞ্জও ছিল না। বর্তমান তুরস্কের উপকূলে অবস্থিত থাসস, লিমনস, সামোথরাকি, লেসবস, চিয়স, সারা, সামোস, আর্মেনিসটিস দ্বীপগুলিও গ্রীসের ছিল না। এই সবগুলি দ্বীপই বর্তমান গ্রীস-তুরস্কের সমুদ্রসীমা নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

  
১৮৩২ সালে ইউরোপিয় পরিকল্পনা মোতাবেক আধুনিক গ্রীসের জন্ম। ১৮৩২ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত গ্রীসের সীমানা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়েছে। অনেকগুলি যুদ্ধের ফলাফল হিসেবে গ্রীস ইজিয়ান সাগরের দ্বীপগুলিকে নিয়ন্ত্রণে নিতে পেরেছে। তবে আসল কথা হলো, ইউরোপিয় শক্তিরা চেয়েছিল ইউরোপের মাটি থেকে মুসলিম শাসনের শেষ অংশটুকু মুছে ফেলতে। 


গ্রীস যেভাবে বড় হতে থাকলো...

১৮৩২ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ভৌগোলিকভাবে গ্রীস বড় হয়েছে। এই পুরো সময়ের মাঝে গ্রীসের মানচিত্র অগুণিতবার পরিবর্তিত হয়েছে। মানচিত্র স্থলভাগে যেমন পরিবর্তিত হয়েছিল, তেমনি সমুদ্রেও হয়েছিল; বিশেষ করে ইজিয়ান সাগরের দ্বীপগুলিতে। এই দ্বীপ দখলের প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল গ্রীসের নৌবাহিনী।

- গ্রীক স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়েই ব্রিটিশরা গ্রীসের জন্যে নৌবাহিনী তৈরি করে দেয়। ১৮২৫ সালে ব্রিটিশরা দু’টা ফ্রিগেট অর্ডার করে আমেরিকা থেকে। ‘হোপ’ এবং ‘লিবারেটর’ নাম দিয়ে জাহাজদু’টা তৈরি করা হয়। ‘হোপ’ ১৮২৬ সালের শেষে গ্রীসে এসে পোঁছায়; এবং এর নামকরণ করা হয় ‘হেলাস’, যা কিনা উথমানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।

- স্বাধীনতার পর ১৮৫৫ সালে গ্রীকরা ব্রিটেন থেকে ৪টা লৌহ-নির্মিত বাষ্পীয় ইঞ্জিন-চালিত ‘স্টিমশিপ’ ক্রয় করে।

- ১৮৬৬ সালে ক্রীট দ্বিপকে উথমানি খিলাফত থেকে আলাদা করে গ্রীসের অংশ করার জন্যে সেখানে বিদ্রোহ শুরু হয়। কিন্তু গ্রীক নৌবাহিনী সেখানে তেমন কোন সহায়তা না করতে পারায় গ্রীকরা শক্তিশালী নৌবহরের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে শুরু করে।

- গ্রীক নৌবাহিনীর পোরস নৌঘাঁটিতে ফরাসীদের তত্ত্বাবধানে নতুন নৌবাহিনী গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৮৮৫ সালে ফ্রান্স থেকে ‘হাইড্রা-ক্লাস’এর ৩টা লৌহ-নির্মিত ‘আয়রনক্ল্যাড’ অর্ডার করা হয়। এর প্রতিটা জাহাজ ছিল ৪,৮০০ টনের এবং ২৬টা করে কামান ও ৩টা টর্পেডো টিউব ছিল। ১২-ইঞ্চি বর্ম দ্বারা আবৃত ছিল জাহাজগুলি।

- ১৮৯৭ সালে ক্রীট দ্বীপকে আবারও গ্রীসের সাথে একত্রীকরণের জন্যে যুদ্ধ শুরু হলে সেই যুদ্ধে এই জাহাজগুলি পুরো ইজিয়ান সাগরে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। তবে স্থলযুদ্ধে গ্রীসের পরাজয় হলেও ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং রাশিয়ার সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে ক্রীট দ্বীপ উথমানি খিলাফত থেকে আলাদা হয়ে যায়।

- ১৮৯৭ সালের যুদ্ধে পর ব্রিটিশ নেতৃত্বে গ্রীক নৌবাহিনীর আরেক দফা উন্নয়ন শুরু হয়। ১৯০৯ সালে ইতালি থেকে একটা ১০ হাজার টনের ক্রুজার কেনা হয়। ১৯১০ সাল থেকে গ্রীক নৌবাহিনী ব্রিটিশদের কৌশল অনুযায়ী প্রস্তুত হতে থাকে।

- অন্যদিকে ১৯১১-১২ সালে ইতালি আফ্রিকায় লিবিয়াকে উথমানিদের থেকে আলাদা করে ফেলার লক্ষ্যে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। সেই যুদ্ধের মাঝে ইতালি পূর্ব ভূমধ্যসাগরে দোদেকানিজ দ্বীপপুঞ্জ দখল করে নেয়। এই দ্বীপগুলির মাঝে রয়েছে রোডস (সবচাইতে বড়), কস, পাতমোস, এবং আরও ১২টা প্রধান দ্বীপ। এরপর এই দ্বীপগুলি আর উথমানিদের হাতে ফেরত আসেনি। ১৯২৩ সালে এই দ্বীপগুলিকে গ্রীসের হাতে তুলে দেয়া হয়। ইতালির সাথে যুদ্ধে উথমানিদের দুর্বল করা হয়।

- যেখানে ১৯১২ সালের ১৮ই অক্টোবর উথমানিদের সাথে ইতালির যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হয়, সেখানে প্রায় একইসাথে বলকানের সার্বিয়া, মন্টিনেগ্রো, বুলগেরিয়া এবং গ্রীস একত্রে ‘বলকান লীগ’ গঠন করে ৮ই অক্টোবর থেকে ১৭ই অক্টোবরের মাঝে উথমানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এই যুদ্ধ ঘোষণার পিছনে ইউরোপিয় শক্তিরা কলকাঠি নেড়েছে। অর্থাৎ কোন বিরতি ছাড়াই ইউরোপিয়রা পরপর দু’টা যুদ্ধে জড়াতে বাধ্য করে উথমানিদের।

- এই বলকান যুদ্ধে গ্রীক নৌবাহিনী উথমানি নৌবাহিনীকে দার্দানেলিস প্রণালীতে অবরুদ্ধ করে ফেলে। ১৯১২ সালের ডিসেম্বরে ‘এলি’-এর যুদ্ধে গ্রীক নৌবাহিনী উথমানি নৌবাহিনীকে পরাজিত করে। এই যুদ্ধের ফলশ্রুতিতে গ্রীকরা পূর্ব ইজিয়ান সাগরে (বর্তমান তুরস্কের উপকূল ঘেঁষে) লেসবস, চিয়স, লেমনস এবং সামোস দ্বীপ দখল করে ফেলে।

- ১৯১৩-এর জানুয়ারিতে আবারও উথমানি নৌবাহিনী দার্দানেলিস থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করে। এবার লেমনস-এর যুদ্ধে পরাজিত হয়ে উথমানিরা আবারও দার্দানেলিসে ফিরে যায়। ইজিয়ান সাগর রয়ে যায় গ্রীকদের নিয়ন্ত্রণে।

- ১৯১৫-১৬ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ-ফরাসী নৌবাহিনী দার্দানেলিস প্রণালীতে গ্যালিপোলি অপারেশনের সময় দোদেকানিজ দ্বীপপুঞ্জকে নোঙ্গরের জন্যে ব্যবহার করে। সেসময় ছোট আরেকটা দ্বীপ, ‘কাস্তেলোরিতসো’- যা কিনা ইতালিয়রা ১৯১২ সালের যুদ্ধে দখল করেনি- সেটাকে ফরাসীরা দখল করে। এই দ্বীপটা বর্তমান তুরস্কের উপকূল থেকে মাত্র ২ কিঃমিঃ দূরে! আবার দোদেকানিজ দ্বীপপুঞ্জের অংশ হলেও এই দ্বীপটা বাকি দ্বীপগুলি থেকে মোটামুটি দূরে। সবচাইতে বড় দ্বীপ রোডস থেকে ১২৫ কিঃমিঃ দূরে।

- প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯২০ সালে সিভরেসের চুক্তিতে কাস্তেলোরিতসো দ্বীপকে ফরাসীরা ইতালির কাছে হস্তান্তর করে।

- ১৯৪১ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা কাস্তেলোরিতসো দ্বীপ দখল করে। তবে কয়েক দিনের মাঝেই ইতালিয়রা পুনরায় এই দ্বীপ দখল করে নেয়। ঐ বছরেরই মে মাসে ক্রীট দ্বীপ দখল করার জন্যে জার্মান-ইতালিয় বাহিনী দোদেকানিজ দ্বীপপুঞ্জকে ব্যবহার করে।

- ১৯৪৩-এর সেপ্টেম্বরে ইতালি মিত্রপক্ষে যোগ দিলে ব্রিটিশরা কাস্তেলোরিতসো দ্বীপ আবারও দখল করে নেয়। তবে বাকি দোদেকানিজ দ্বীপপুঞ্জ জার্মানদের হাতেই থাকে।

- ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে পুরো দোদেকানিজ ব্রিটিশদের হাতে চলে যায়।

- ১৯৪৭ সালে ইতালির সাথে সাক্ষরিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শান্তি চুক্তি মোতাবেক দোদেকানিজ দ্বীপপুঞ্জ গ্রীসকে দিয়ে দেয়া হয়। এর মাঝে কাস্তেলোরিতসো দ্বীপও ছিল।
গ্রীসের ডানপন্থীরা পুরো ইজিয়ান সাগর, ইস্তাম্বুল, দার্দানেলিস প্রণালি, সাইপ্রাস এবং বর্তমান তুরস্কের পুরো পশ্চিম উপকূল জুড়ে 'গ্রেটার গ্রীস' স্থাপনের স্বপ্ন দেখে। এই চিন্তার পিছনে রয়েছে 'মেগালি আইডিয়া' নামের এক ধারণা। ইউরোপিয় শক্তিদের হাতে বর্তমান গ্রীসের জন্মের পর থেকে গ্রীসের পররাষ্ট্রনীতি এই চিন্তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। 



গ্রীসের ডানপন্থী উত্থানের নেপথ্যে...

গ্রীসের ডানপন্থী গ্রুপগুলি দেশটার স্বাধীনতার পর থেকেই ‘মেগালি আইডিয়া’ নামের এক চিন্তাকে লালন করতে থাকে। ১৮৪৪ সালে প্রথম এই চিন্তাটা আলোতে আসে বলে জানা যায়। এই চিন্তার মূলে রয়েছে প্রাচীন বাইজ্যানটাইন সাম্রাজ্যের পুনরুত্থান ঘটানো। সে অনুযায়ী তারা চাইছিলো যে, কন্সটান্টিনোপল (ইস্তাম্বুল), ইজিয়ান সাগরের সকল দ্বীপ, সাইপ্রাস দ্বীপ, বর্তমান তুরস্কের সম্পূর্ণ পশ্চিম উপকূল এবং দার্দানেলিস প্রণালি গ্রীসের হবে। এই চিন্তাখানাই ইউরোপিয় শক্তিগুলি ব্যবহার করেছে উথমানিদের বিরুদ্ধে গ্রীসকে লেলিয়ে দিতে। তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পরপর গ্রীকরা নতুন রাষ্ট্র তুরস্কের বেশকিছু অংশ দখল করে নিলেও পরে ১৯২৩ সালের লাউস্যান চুক্তি মোতাবেক সেগুলি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। এর মাঝে বর্তমান তুরস্কের মূল ভূখন্ডের ‘আইওনিয়া’ এবং ‘ইস্ট থ্রেস’ ছিল। এর মাঝে ইস্ট থ্রেস ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ; কারণ এটা দার্দানেলিস প্রণালির পশ্চিম পাড় পুরোটার নিয়ন্ত্রণে ছিল।

ব্রিটিশরা গ্রীকদের হাতে অনেক অঞ্চলই দেখতে চেয়েছে; তবে ইস্তাম্বুল এবং দার্দানেলিস প্রণালি তারা গ্রীকদের হাতে দিতে চায়নি। কারণ এটা তারা বুঝতে পেরেছিল যে, যদি রুশরা কখনও ইস্তাম্বুল এবং দার্দানেলিস-এর উপর হামলা করে বসে, তাহলে ছোট্ট রাষ্ট্র গ্রীসের পক্ষে কিছুই করা সম্ভব হবে না। আর তেমন কিছু ঘটলে ভূমধ্যসাগরে ব্রিটিশদের অবস্থান তো দুর্বল হবেই; একইসাথে সুয়েজ খালের উপরে ব্রিটিশ নজরদারিও বন্ধ হয়ে যাবে রুশ চাপে পড়ে। কাজেই গ্রীক ডানপন্থীদের নিয়ন্ত্রণ করাটা ব্রিটিশদের জন্যে জরুরি ছিল।

  
১৮৭৮ সালে ব্রিটিশরা রাশিয়ার ভয় দেখিয়ে সাইপ্রাসে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। এরপর ১৯৬০ সালে সাইপ্রাসকে স্বাধীনতা দিয়ে দেয়। কিন্তু ১৯৭৪ সালে মার্কিন-সমর্থিত গ্রীক ডানপন্থী সরকার দ্বীপটাকে নিয়ন্ত্রণে নিতে গেলে তুরস্ক সাইপ্রাসের উত্তর অংশ দখল করে ফেলে। তুরস্ক-গ্রীসের স্থিতাবস্থার মাঝেই দ্বীপটাতে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি রয়ে গেছে। 


সাইপ্রাস যেভাবে ভাগাভাগি হলো...

উথমানি খিলাফতকে ধ্বংস করতে চারিদিক থেকে আক্রমণ করছিল রাশিয়া, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরী, ব্রিটেন-ফ্রান্স, এবং শেষে ইতালি। রাশিয়ার সাথে উথমানিদের অনেকগুলি যুদ্ধের শেষ যুদ্ধটা ছিল ১৮৭৭-৭৮-এর। এই যুদ্ধের শেষে রুশ আগ্রাসনের ভয় দেখিয়ে ব্রিটেন উথমানিদের কাছ থেকে সুবিধা নেবার চেষ্টা করে।

- ১৮৭৮ সালের ৪ঠা জুন ব্রিটেন উথমানিদের সাথে গোপন এক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। ‘সাইপ্রাস কনভেনশন’ নামের এই চুক্তি মোতাবেক রাশিয়ার আগ্রাসন থেকে কৃষ্ণ সাগরের দক্ষিণের কৌশলগত দার্দানেলিস প্রণালী এবং ইস্তাম্বুলকে মুক্ত রাখতে ব্রিটেন সাইপ্রাসে সামরিক ঘাঁটি করে। তবে দ্বীপের মালিকানা তখনও উথমানিদের হাতেই থাকে।

- সেই সময় থেকে ব্রিটেনের পূর্ব ভূমধ্যসাগর নিয়ন্ত্রণের ফর্মুলা হলো সাইপ্রাস।

- ১৯১৪ সালের ২রা অগাস্ট প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পক্ষে যোগ দেয় উথমানিরা। এর ফলশ্রুতিতে ৫ই নভেম্বর ব্রিটেন অফিশিয়ালি সাইপ্রাস নিজের দখলে নিয়ে নেয়।

- ১৯৬০ সালে ব্রিটেন সাইপ্রাসকে স্বাধীন বলে স্বীকৃতি দেয়। তবে সেখানে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিগুলি থেকেই যায়।

- নতুন দেশ সাইপ্রাসের জনসংখ্যার ৭৭ শতাংশ গ্রীক এবং ১৮ শতাংশ তুর্কী; তাই নির্বাচনে গ্রীকরাই সরকার গঠন করে। তুর্কীরা সেসময় সাইপ্রাসের বিভাজন দাবি করতে থাকে।

- ১৯৬৭ সালে গ্রীসে মার্কিন-সমর্থিত সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। এতে ডানপন্থীরা ক্ষমতায় আসে এবং গ্রীসের পুনএকত্রীকরণের চিন্তাগুলিকে আবারও সামনে আনতে থাকে। ১৯৭৪ সালের ১৫ই জুলাই গ্রীক সরকার সাইপ্রাসে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটায় এবং ১০ হাজার সৈন্য পাঠায়।

- এর পাঁচ দিন পর ২০শে জুলাই তুরস্ক সাইপ্রাসের উত্তর অংশ আক্রমণ করে বসে। তবে এতকিছুর মাঝেও সেই দ্বীপে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিগুলি ঠিকই থেকে যায়। তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের কথার বিরুদ্ধে সাইপ্রাসে হামলা করায় ১৯৭৫ সালে মার্কিন কংগ্রেস তুরস্কের উপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

- সেই সময় থেকে সাইপ্রাস দুই ভাগে বিভক্ত – উত্তর সাইপ্রাস তুর্কীদের হাতে; দক্ষিণ সাইপ্রাস গ্রীকদের হাতে; আর মাঝে ব্রিটিশরা। গ্রীক-তুর্কী স্থিতাবস্থা সাইপ্রাসে ব্রিটিশদের সামরিক ঘাঁটি থাকার ব্যাপারে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মার্কিন-সমর্থিত ডানপন্থী গ্রীকদের হাতে চলে গেলে সাইপ্রাসে ব্রিটিশ ঘাঁটি রাখা নিঃসন্দেহে কঠিন হয়ে পড়তো।
তুরস্কের উপকূল থেকে মাত্র দুই কিঃমিঃ দূরে ছোট্ট দ্বীপ কাস্তেলোরিতসো গ্রীকরা কখনোই দখল করেনি। কিন্তু ইউরোপিয় শক্তিরা দ্বীপটাকে গ্রীসের অন্তর্ভুক্ত করে ১৯৪৭ সালে। এই দ্বীপের কারণে তুরস্কের সমুদ্রসীমা কতটুকু হবে, তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। 



তুরস্কের সমুদ্রসীমা আসলে কতটুকু?

মানচিত্র বলছে যে, বর্তমান তুরস্কের প্রায় ৮ হাজার কিঃমিঃ-এর বিশাল উপকূল রয়েছে। কৃষ্ণ সাগর, ইজিয়ান সাগর এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগর জুড়ে রয়েছে এই উপকূল। কিন্তু এই উপকূলের বেশিরভাগ অঞ্চলেই তুরস্ক সমুদ্রসীমার নিয়ন্ত্রণে নেই। গ্রীক নিয়ন্ত্রিত বেশিরভাগ দ্বীপেরই অবস্থান তুরস্কের উপকূলের ঠিক পাশে। ১৮৩২ সাল থেকে উসমানিরা ইজিয়ান সাগরের দ্বীপগুলি হারাতে থাকে, এবং এটা পরবর্তীতে সৃষ্ট রাষ্ট্র তুরস্কের সময়েও অব্যাহত থাকে। ১৯৪৭ সালে দোদেকানিজ দ্বীপপুঞ্জ দিয়ে দেয়া হয় গ্রীকদের হাতে। এরপর ১৯৭৪-এ সাইপ্রাসের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছিল গ্রীসের হাতে, যখন তুর্কীরা সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করে। কিন্তু সেই সামরিক হস্তক্ষেপ যে দ্বীপটাতে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিগুলি রক্ষা করা ছাড়া তেমন কিছু করেনি, তা এখন তুরস্কের সমুদ্রসীমা দেখলেই বোঝা যায়।

তুরস্কের সমুদ্রসীমা যে ঐতিহাসিক ঘটনাগুলি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, তা হলো –

- ১৮২১-৩২ সালের মাঝে ইউরোপিয় শক্তিদের সহায়তায় গ্রীসের জন্ম। ইউরোপিয় শক্তিগুলি পুরো বলকানে জাতীয়বাদ উস্কে দিয়ে উথমানিদের অধীনে থাকা পুরো বলকান অঞ্চলকে টুকরো টুকরো করে ছোট ছোট রাষ্ট্রে ভাগ করে ফেলে, যেগুলি ইউরোপিয় শক্তিগুলির প্রভাবে পরিচালিত হতে থাকে।

- ১৮৭৮ সালে রুশদের সাথে উথমানিরা যুদ্ধে পরাজিত হলে রুশদের জুজু দেখিয়ে ব্রিটিশরা সাইপ্রাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।

- ১৮৯৭ সালে গ্রীসের সাথে যুদ্ধে উথমানিরা জয়লাভ করলেও ইউরোপিয় শক্তিরা জোরপূর্বক ক্রীটকে উথমানি খিলাফত থেকে আলাদা করে গ্রীসের অধীন করে।

- ১৯১১-১২ সালে ইতালির সাথে যুদ্ধে উথমানিরা দোদেকানিজ দ্বীপপুঞ্জ হারায়।

- ১৯১২-১৩ সালের বলকান যুদ্ধের সময় ইউরোপিয়দের সহায়তায় গ্রীক নৌবাহিনী এতটাই শক্তিশালী হয়ে যায় যে, গ্রীক নৌবহর পরপর দু’টা নৌযুদ্ধে উথমানি নৌবহরকে পরাজিত করে দার্দানেলিসের মাঝে অবরোধ করে রাখে। এই সুযোগে গ্রীকরা পূর্ব ইজিয়ান সাগরে (বর্তমান তুরস্কের উপকূল ঘেঁষে) লেসবস, চিয়স, লেমনস এবং সামোস দ্বীপ দখল করে ফেলে।

- ১৯১৪-১৮ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদান এবং পরাজয়ের কারণে উথমানি শাসনের পতন হয় এবং ইউরোপিয় শক্তিরা উথমানি সাম্রাজ্য ভেঙ্গে টুকরা টুকরা করে অনেকগুলি দেশের জন্ম দেয়, যার মধ্যে রয়েছে বর্তমান তুরস্ক। ইউরোপিয়দের নিজ হাতে তৈরি বিধায় তুরস্ক ইউরোপিয়দের মেপে দেয়া মানচিত্রতে খুশি থাকতে বাধ্য হয়। পূর্ব ভূমধ্যসাগরের প্রায় সকল এলাকা তুর্কীদের হাতছাড়া হয়ে যায়।

- ১৯১৫ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ফরাসীরা দোদেকানিজ-এর অংশ ‘কাস্তেলোরিতসো’ দ্বীপ দখল করে নেয়।

- ১৯৪৭ সালে ‘কাস্তেলোরিতসো’ দ্বীপসহ দোদেকানিজ দ্বীপপুঞ্জ গ্রীসের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

- ১৯৬০ সালে সাইপ্রাসকে স্বাধীন দেশ ঘোষণা করা হয়। তবে ১৯৭৪ সালে মার্কিন-সমর্থিত গ্রীক ডানপন্থীদের সহায়তায় সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা করা হলে তুরস্ক সাইপ্রাসে সৈন্য পাঠায়। এই সুবাদে বর্তমান সাইপ্রাসের উত্তর অংশ তুরস্কের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।


গ্রীক নৌবাহিনীর 'আয়রনক্ল্যাড' হাইড্রা। ঊনিশ শতকের শেষের দিকে হাইড্রা-ক্লাসের তিনটা জাহাজ ফ্রান্স থেকে কেনে গ্রীস। এই জাহাজগুলি ইজিয়ান সাগর নিয়ন্ত্রণে এবং ইজিয়ানের দ্বীপগুলি দখলে অনেক বড় ভূমিকা রেখেছিল। সেই দখল করা দ্বীপগুলির কারণে এখন তুরস্ক সমুদ্রসীমা এবং সমুদ্র সম্পদ থেকে বঞ্চিত। এতেই প্রমাণ হয় যে জোর যার, সম্পদ তার। 


জোর যার, সম্পদ তার...

এই ঘটনাগুলির কারণে ইজিয়ান সাগরের বেশিরভাগ অঞ্চলই তুরস্কের নিয়ন্ত্রণের বাইরে পড়ে যাচ্ছে; সেটা যে পদ্ধতিতেই হিসেব করা হোক না কেন। এই দ্বীপগুলিতে সামরিক স্থাপনা না থাকলেও সমুদ্রসীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে দ্বীপগুলি গ্রীসের বিরাট সুবিধা করেছে; আর ইজিয়ান সাগরে নৌ-কর্তৃত্ব ধরে রাখতে দ্বীপগুলি গ্রীসকে সহায়তা করছে। কৌশলগত দার্দানেলিস প্রণালি তুরস্কের অধীনে থাকলেও এই দ্বীপগুলির কারণে দার্দানেলিসের পথের নিয়ন্ত্রণ গ্রীসের সাথে ভাগাভাগি করতে হয়েছে।

গ্রীসের নিয়ন্ত্রণ থেকে সবচাইতে দূরে রয়েছে দোদেকানিজ দ্বীপপুঞ্জ এবং সাইপ্রাস দ্বীপ। দোদেকানিজ দ্বীপগুলির নিয়ন্ত্রণ নেয়া গ্রীসের জন্যে কঠিন ছিল বিধায় ইউরোপিয় শক্তিরা নিজেরা এগুলির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গ্রীসের কাছে হস্তান্তর করে। আর কাছাকাছি হওয়ায় তুরস্কের জন্যে সাইপ্রাসের নিয়ন্ত্রণ নেয়া সহজ হলেও ইউরোপিয় এবং মার্কিন শক্তির কারণে তুরস্ক সাইপ্রাসের উত্তর অংশ নিয়েই খুশি থাকতে বাধ্য হয়েছে। আর দোদেকানিজ দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিতে গেলে পুরো পশ্চিমা বিশ্বই হয়তো তুরস্কের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে উঠে পড়ে লাগতো। তাই তুরস্কের কাছে পশ্চিমাদের কথা শোনা ছাড়া গতি নেই। এই দ্বীপগুলি নিজের অধীনে না থাকায় তুরস্ক পূর্ব ভূমধ্যসাগরের বেশিরভাগ অঞ্চলে অর্থনৈতিক সম্পদ আহরণ থেকে বঞ্চিত।

তুরস্ক এবং গ্রীস উভয়েই জানে যে এই এলাকার দ্বীপমালা এবং সমুদ্রসীমা কি করে নির্ধারিত হয়েছে। প্রথমতঃ পশ্চিমা শক্তিদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এখানে কিছুই করা যায়নি। দ্বিতীয়তঃ সামরিক শক্তির মাধ্যমেই সকল কিছুর সুরাহা হয়েছে। যার গায়ের জোর রয়েছে, সে-ই সেখানে জয়ী হয়েছে। আর সমুদ্রে জোর খাটানোর উপায় একটাই – নৌ-শক্তির বৃদ্ধি। তুরস্ক এবং গ্রীস উভয়েই তাদের নৌ-শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সমুদ্র সম্পদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছে। এক্ষেত্রে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্ক যতটা না শক্তি দেখাতে পারছে, গ্রীস ততটা পারছে না বলেই যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চাইছে। যুক্তরাষ্ট্র সর্বদা সেই সহায়তা দিতে না পারলেও ইস্রাইল এবং মিশর সেই সহায়তা দিচ্ছে গ্রীসকে। মিশর-সৌদি গ্রুপ এখন পূর্ব ভূমধ্যসাগরে মুখোমুখি হয়েছে তুরস্কের। গ্রীক গ্রুপগুলি তুরস্কের ‘গানবোট ডিপ্লোম্যাসি’এর সমালোচনা করলেও সেটা ছাড়া যে তুরস্কের সামনে কোন রাস্তা খোলা নেই, তা ইতিহাসই বলে দিচ্ছে। তুরস্ক নিয়মিতভাবেই গ্রীক নিয়ন্ত্রিত দ্বীপগুলির আশেপাশে, এমনকি সেগুলির উপর দিয়ে সামরিক বিমান উড়িয়ে বার্তা দিচ্ছে যে, গায়ের জোরে তৈরি করা নিয়মগুলি ভাঙতেও গায়ের জোরই যে লাগবে, সেটা তারা বুঝতে পারছেন।