Showing posts with label South China Sea. Show all posts
Showing posts with label South China Sea. Show all posts

Wednesday, 17 November 2021

চীনারা কি গুলি না চালিয়েই যুদ্ধ জিতে যাচ্ছে?

১৭ই নভেম্বর ২০২১

চীনা মাছ ধরার জাহাজের বহর। চীনারা মিলিশিয়া জাহাজগুলিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক অঞ্চলে পাঠিয়ে অন্য দেশের জাহাজকে সমস্যায় ফেলে বলতে পারে যে, এরা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আবার মিলিশিয়াদের কেউ হতাহত হলে চীনা সরকার তাদের নাগরিকদের রক্ষা করতে জনমত তৈরি করতে পারবে। চীনাদের এই ‘হাইব্রিড যুদ্ধে’র কোন প্রত্যুত্তর এখনও মার্কিনীরা দিতে পারেনি। উল্টো মার্কিন সহায়তা না পেয়ে ছোট দেশগুলি মার্কিন নেতৃত্বের প্রতি হতাশাই ব্যক্ত করেছে।


ফিলিপাইনের থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ফিলিপাইন কাউন্সিল ফর ফরেন রিলেশন্স’এর অবসরপ্রাপ্ত লেঃ জেনারেল এডিলবার্তো আদান ‘দ্যা ম্যানিলা টাইমস’এর এক লেখায় বলছেন যে, চীনারা সাগরে কোন গোলাগুলি ছাড়াই যুদ্ধ জিতে চলেছে। চীনারা ফিলিপাইনের ‘এক্সক্লুসিভ ইকনমিক জোন’ বা ‘ইইজেড’এর মাঝেই ভয় দেখিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করছে; যাকে তিনি ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। চীনা হুমকি মোকাবিলায় তিনি ফিলিপাইনের জন্যে শুধু বন্ধু বা পার্টনারই চাইছেন না, এমন কোন মিত্র চাইছেন, যে কিনা চীনারা আক্রমণ করলে ফিলিপাইনকে রক্ষা করতে যুদ্ধ করবে এবং চীনাদের ‘গ্রে জোন’ কৌশল মোকাবিলায় ফিলিপিনোদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। ‘গ্রে জোন’ হলো এমন একটা কৌশল, যার মাধ্যমে যুদ্ধ আর শান্তির মাঝে পার্থক্য নিরূপণ করা কঠিন হয়ে যায়। অর্থনৈতিক আগ্রাসন থেকে শুরু করে তথ্য যুদ্ধ, বাণিজ্য যুদ্ধ, হাল্কা প্রকৃতির কিছু সহিংস কর্মকান্ড এতে থাকতে পারে। এছাড়াও নতুন প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং সাইবার হামলার মাধ্যমে একটা দেশকে অকার্যকর করে ফেলা সম্ভব। ফিলিপাইনের সামরিক বাহিনীর প্রাক্তন ভাইস চিফ অফ স্টাফ জেনারেল আদান ফিলিপাইনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ৭০ বছর আগে স্বাক্ষরিত ‘মিউচুয়াল ডিফেন্স ট্রিটি’ বা ‘এমডিটি’কে বর্তমান প্রেক্ষাপটে পরিবর্তন করার পক্ষপাতি। ‘এমডিটি’ চুক্তিকে আগ্রাসী রাষ্ট্রের অপ্রচলিত এবং ‘হাইব্রিড’ কৌশলের বিরুদ্ধে ডিটারেন্ট হিসেবে কাজ করতে হবে। ফিলিপাইনের উপর প্রচলিত সামরিক হামলা হলে চুক্তি মোতাবেক যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দেবে। কিন্তু ‘গ্রে জোন’ কৌশল অবলম্বণ করার ফলে চীনারা ‘এমডিটি’ চুক্তিকে বাইপাস করতে পারছে। এই ‘হাইব্রিড যুদ্ধে’ চীনারা তাদের ‘ম্যারিটাইম মিলিশিয়া’কে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে; যারা মূলতঃ সরকারি বাহিনী। ফিলিপাইনের জাহাজে ধাক্কা দেয়া এবং দল বেঁধে চীনা জাহাজের ইইজেডএর ভিতরে ঢুকে অবস্থান করার মতো ঘটনার ব্যাপারে ফিলিপাইন সরকার বেইজিংএর কাছে প্রতিবাদ করেছে; কিন্তু তাতে কোন কাজ হয়নি। জেনারেল আদান বলছেন যে, একারণেই ফিলিপাইনের উচিৎ ‘এমডিটি’র মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চাওয়া।

গত মার্চে ২’শ চীনা মাছ ধরার ট্রলার একত্রে দক্ষিণ চীন সাগরে ফিলিপাইনের কাছাকাছি এসে হাজির হয়। ফিলিপাইন বলছে যে, সেই জায়গা ফিলিপাইনের ইইজেডএর মাঝে পড়ে। তাদের কথায়, ট্রলারগুলি দেখে মনে হয় না যে, এগুলি মাছ ধরতে এসেছে। এগুলি বরং চীনের ‘ম্যারিটাইম মিলিশিয়া’ দ্বারা পরিচালিত। ‘বিবিসি’ বলছে যে, পাঁচ বছর আগে আন্তর্জাতিক আদালত দক্ষিণ চীন সাগরের ৯০ শতাংশ এলাকাকে চীনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে বলে রায় দেয়। তবে বেইজিং তাদের নিজেদের আঁকা ‘নাইন ড্যাশ লাইন’এর মাঝে সকল সমুদ্রাঞ্চলকে নিজেদের বলে দাবি করে। এই অঞ্চলের মাঝে চীনারা কৃত্রিমভাবে দ্বীপ উন্নয়ন করেছে এবং নিয়মিত সামরিক প্যাট্রোলের ব্যবস্থা করেছে। এর আগে ২০১৯এর ডিসেম্বরে ইন্দোনেশিয়ার কাছে নতুনা সাগরে চীনা মাছ ধরার ট্রলারের বড় একটা বহর কোস্ট গার্ডের জাহাজের পাহাড়ায় হানা দেয়। ইন্দোনেশিয়ার সরকার এই হুমকি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে নৌবাহিনীর জাহাজ প্রেরণ করে। কিন্তু উভয় পক্ষ সমুদ্রে বেশ কিছুদিন ধরে উত্তেজনাকর অবস্থানে থাকে। পরবর্তীতে ইন্দোনেশিয়া সেই অঞ্চলে নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় নিজেদের মাছ ধরার জাহাজের বহর মোতায়েনের পরিকল্পনা শুরু করে বলে দেশটার মিডিয়া ‘মঙ্গাবে’ জানায়।

শুধু কাছের সমুদ্রেই নয়, চীনারা পাড়ি জমিয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কিঃমিঃ দূরের দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে। ২০২০এর সেপ্টেম্বরে প্রায় ৩’শ চীনা মাছ ধরার জাহাজ হাজির হয় দক্ষিণ আমেরিকার পেরুর সমুদ্রসীমায়। ‘ভয়েস অব আমেরিকা’র এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, জাহাজগুলি গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের কাছে মাছ ধরার পর পেরুর উপকূলে হাজির হয়। ইকুয়েডরের নৌবাহিনীর অপারশনসএর কমান্ডার রিয়ার এডমিরাল ড্যানিয়েল গিনেজ বলেন যে, এভাবে মাছ ধরলে কিছু বিশেষ প্রজাতির মাছের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। চীনারা এখানে প্রতিবছরই মাছ ধরতে আসছে। একই বছরের জুন মাসে ৩’শ ৪০টা জাহাজ একত্রে গালাপাগোস এবং ইকুয়েডরের কাছে মাছ ধরতে এসেছিল। দক্ষিণ আমেরিকার পেরু এবং ইকুয়েডরের অর্থনীতি সামুদ্রিক মাছ ধরার উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। চীনাদের কর্মকান্ড এই দেশগুলির অর্থনীতিকে আঘাত করতে পারে। বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের হিসেবে এই দুই দেশ মিলে বছরে প্রায় ৪৫ লক্ষ টন মাছ ধরে; যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সমান। তবে চীনারা এক বছরে এরও চার গুণ মাছ ধরে। পুরো বিশ্বের মোট মৎস্য সম্পদের তিন ভাগের এক ভাগই চীনারা খাচ্ছে। লন্ডনের ‘ওভারসীজ ডেভেলপমেন্ট ইন্সটিটিউট’এর হিসেবে চীনাদের রয়েছে প্রায় ১৭ হাজার জাহাজের বিশাল মাছ ধরার বহর। তাদের জাহাজের আকৃতিও বড় হচ্ছে। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ লাইবেরিয়ার উপকূলে চীনারা ৬টা জাহাজ পাঠিয়েছে বলে ২০২০এর জুলাইএ আফ্রিকার মিডিয়াগুলি প্রতিবেদন করে। তারা বলে যে, এই জাহাজগুলি বছরে ১২ হাজার টন পর্যন্ত মাছ ধরতে সক্ষম, যা লাইবেরিয়ার স্বাভাবিক মাছ ধরার সক্ষমতার দুই গুণ!

সমুদ্র এখন চীনের অর্থনীতিতে অতি গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্র সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চীনাদের সাথে বাকিদের চলছে ব্যাপক দ্বন্দ্ব। প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলি চীনের কৌশলকে ‘গ্রে জোন’ বা ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ বলছে। সামরিক ম্যাগাজিন ‘মিলিটারি রিভিউ’এর এক লেখায় গবেষক শুজিয়ান লুও এবং জনাথন প্যানটার বলছেন যে, চীনারা তাদের ম্যারিটাইম মিলিশিয়া ব্যবহার করে ‘গ্রে জোন’ কর্মকান্ড চালাচ্ছে; কারণ পরিস্থিতি বুঝে বেইজিং বলতে পারে যে, এদের সাথে সরকারের কোন সম্পর্ক নেই। চীনারা মিলিশিয়া জাহাজগুলিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক অঞ্চলে পাঠিয়ে অন্য দেশের জাহাজকে সমস্যায় ফেলে বলতে পারে যে, এরা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আবার মিলিশিয়াদের কেউ হতাহত হলে চীনা সরকার তাদের নাগরিকদের রক্ষা করতে জনমত তৈরি করতে পারবে। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনারা ট্রলারের বহরের সাথে অনেক ক্ষেত্রেই কোস্ট গার্ডের জাহাজ পাঠায়। নৌবাহিনীর জাহাজ না পাঠিয়ে সাদা রঙএর কোস্ট গার্ডের জাহাজ পাঠানোটাও ‘গ্রে জোন’ কৌশলের অংশ। এই জাহাজগুলি স্বল্প অস্ত্রে সজ্জিত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি চীনা জাহাজগুলি অনেক নৌবাহিনীর ফ্রিগেটের চাইতেও বড়। প্রতিপক্ষের মাছ ধরার ট্রলার বা ছোট প্যাট্রোল বোটকে ধাক্কা দিয়ে ডুবিয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটছে। চীনাদের এই ‘হাইব্রিড যুদ্ধে’র কোন প্রত্যুত্তর এখনও মার্কিনীরা দিতে পারেনি। উল্টো মার্কিন সহায়তা না পেয়ে ছোট দেশগুলি মার্কিন নেতৃত্বের প্রতি হতাশাই ব্যক্ত করেছে।

Friday, 24 July 2020

ইন্দো-প্যাসিফিকে মার্কিন নৌশক্তির ফেরত আসার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব কতটুকু?

২৪শে জুলাই ২০২০

দক্ষিণ চীন সাগরে মহড়া দিচ্ছে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ 'নিমিতজ' এবং 'রোনাল্ড রেগ্যান'। চীনারা তাদের অপেক্ষাকৃত স্বল্পক্ষমতার নৌবহরকে মার্কিনীদের সক্ষমতার ফাঁকফোঁকড়ের মাঝে ব্যবহার করে মার্কিন নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে। আর এতে তারা বেশ সাফল্যও পেয়েছে। বিশ্বব্যাপী মার্কিনীদের বন্ধু এবং প্রতিযোগী সকলেই যুক্তরাষ্ট্রের এই সীমাবদ্ধতাগুলিকে অবলোকন করছে; যা কিনা তাদের নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অনুপ্রাণিত করছে।


করোনা মহামারির মাঝে ইন্দো-প্যাসিফিকে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি মোতায়েনের প্রতিযোগিতার খবর প্রতিনিয়তই পত্রিকাতে ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। পূর্ব এশিয়ার উপকূলে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের সবচাইতে দৃশ্যমান অস্ত্র হিসেবে দেখা যাচ্ছে বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজকে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজে করোনা সংক্রমণের মাঝে চীনারা এপ্রিলে প্রায় এক মাসের জন্যে তাদের একমাত্র বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘লিয়াওনিং’কে সমুদ্রে প্রেরণ করে। ৩০শে এপ্রিল জাহাজটা পূর্ব চীন সাগরে ‘ট্রেনিং’ মিশন শেষ করে চিংদাও বন্দরে ফিরে আসে। পূর্বের সমুদ্রে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের প্রায় ‘অনুপস্থিতি’র মাঝে চীনাদের এই ‘শক্তি প্রদর্শন’ মার্কিন শক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

৪ঠা মে জাপানের ইয়োকোসুকা বন্দর ছেড়ে যায় বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘রোনাল্ড রেগ্যান’। যুক্তরাষ্ট্রের ১১টা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের মাঝে ‘রেগ্যান’কেই রাখা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখন্ডের বাইরে। গত ২৭ মার্চে পূর্ব এশিয়ার উপকূলে মোতায়েনকৃত যুদ্ধজাহাজ ‘থিওডোর রুজভেল্ট’এ করোনাভাইরাসের মারাত্মক সংক্রমণ আবিষ্কারের পর ‘রোনাল্ড রেগ্যান’এও সংক্রমণ ধরা পরে। প্রায় দুই মাস মার্কিন প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপনিবেশ গুয়ামের নৌঘাঁটিতে বসে থাকার পর ‘থিওডোর রুজভেল্ট’ ১৯শে মে সমুদ্রে বের হয়। অপরদিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের আরেক যুদ্ধজাহাজ ‘নিমিতজ’ ২ বছরের মেইনটেন্যান্স শেষ করে ৮ই জুন যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়েগো থেকে যাত্রা করে। জটিল প্রযুক্তির কারণে এধরণের জাহাজকে মেইনটেন্যান্স থেকে অপারেশনে আনতে অনেক সময় লাগে। এর উপর আবার ‘রুজভেল্ট’এ করোনা সংক্রমণের কারণে অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে ক্রুদের টেস্ট করা এবং কোয়ার‍্যান্টিনে রাখার কারণে সমুদ্রে যেতে আরও দেরি হয়। ‘নিমিতজ’এর সমুদ্রে যাবার ৪ দিনের মাথায় ১২ই জুন ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ২০১৭ সালের পর প্রথমবারের মতো প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন নৌবাহিনী একসাথে ৩টা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে; বড় খবর বলে প্রচার পায় এটা। ২১শে জুন ‘নিমিতজ’ এবং ‘রুজভেল্ট’ যুদ্ধজাহাজের গ্রুপ একত্রে মহড়া দেয়া শুরু করে। ২৮শে জুন থেকে ‘নিমিতজ’ মহড়া দেয়া শুরু করে ‘রেগ্যান’এর সাথে। ‘নিমিতজ’এর ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ১১’এর কমান্ডার রিয়ার এডমিরাল জেমস ক্লার্ক এক বিবৃতিতে ঘোষণা দেন যে, বিশ্বে একমাত্র মার্কিন নৌবাহিনীরই এরকম শক্তি একত্রিত করার সক্ষমতা রাখে।

৬ই জুলাই মার্কিন মিডিয়া ‘সিএনএন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, দু’টা মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ একত্রে দক্ষিণ চীন সাগরে মহড়া দেয়া শুরু করেছে। জাহাজদু’টা হলো জাপান থেকে আসা ‘রেগ্যান’ এবং প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব প্রান্তে সান ডিয়েগো থেকে আসা ‘নিমিতজ’। বলা হয় যে, ২০১৪ সালের পর থেকে প্রথমবারের মতো দু’টা জাহাজ একত্রে মহড়া দেয়ার ঘটনা ঘটলো। ১৭ই জুলাই তারা আবারও ঘোষণা দেয় যে, জাহাজদু’টা একই মাসে দ্বিতীয়বারের মতো একত্রে মহড়া দেয়া শুরু করেছে। তবে প্রশান্ত মহাসাগরে তৃতীয় বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘থিওডোর রুজভেল্ট’ মিডিয়ার আলোচনার বাইরে থাকে। কারণ এরই মাঝে চুপিসারে ৯ই জুলাই জাহাজটা দেশে ফেরত যায়। ‘ইউএসএনআই নিউজ’ জানাচ্ছে যে, গত জানুয়ারিতে জাহাজটা সান ডিয়েগো ছেড়ে গিয়েছিল। মার্চ মাসে ভিয়েতনামে ভ্রমণ করার পরপরই জাহাজটাতে করোনার সংক্রমণ ধরা পরে। শেষ পর্যন্ত প্রায় ১২’শ সংক্রমণ ধরা পরেছিল। এই সংক্রমণের খবর বের হবার পর জাহাজের কমান্ডার ক্যাপ্টেন ব্রেট ক্রোজিয়ারকে চাকুরিচ্যুত করা হয়।

২০শে জুলাই ঘোষণা দেয়া হয় যে, ‘নিমিতজ’ যুদ্ধজাহাজ দক্ষিণ চীন সাগর থেকে বঙ্গোপসাগরে এসে হাজির হয়েছে। ভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে ভারত মহাসাগরে প্রায় পাঁচ মাস ভেসে থাকার পর যুদ্ধজাহাজ ‘আইজেনহাওয়ার’ দেশে ফেরার পর থেকে ভারত মহাসাগরে কোন মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ নেই। ‘নিমিতজ’কে দিয়ে এই শূণ্যস্থান পূরণ করানো হচ্ছে। অর্থাৎ জুনের মাঝামাঝি সময় থেকে প্রায় একমাস ধরে প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর দাপিয়ে বেড়ানোর পালা শেষ হয়েছে। এর পরবর্তীতে ‘রেগ্যান’এর সাথে প্রশান্ত মহাসাগরে আরেকটা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করতে বেশ কয়েকমাস লেগে যেতে পারে। ‘কিটসাপ সান’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘কার্ল ভিনসন’ ওয়াশিংটন রাজ্যের ব্রেমারটনে দেড় বছরের মেইনটেন্যান্স শেষ করে অগাস্টের শুরুতে সান ডিয়েগোতে ফেরত আসার কথা রয়েছে। এরপর এর সমুদ্রে যাবার প্রস্তুতি শুরু হবে। ‘জন সি স্টেনিস’, ‘জর্জ ওয়াশিংটন’ এবং ‘জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ’ লম্বা সময়ের জন্যে ড্রাইডকে রয়েছে। নতুন জাহাজ ‘জেরাল্ড আর ফোর্ড’এর নতুন প্রযুক্তির টেস্টিং এখনও শেষ হয়নি; তাই এখনই পুরোপুরি সার্ভিসে আসছে না। ১০ মাসের মিশন শেষ করে জানুয়ারিতে সান ডিয়েগোতে ফেরত যাওয়া ‘আব্রাহাম লিঙ্কন’ খুব শিগগিরই আবার সাগরে যাচ্ছে না। ৭ মাসের মিশন শেষ করে জুনের মাঝামাঝি নরফোক নৌঘাঁটিতে ফিরেছে ‘হ্যারি এস ট্রুম্যান’। টানা ১৬১ দিন কোন বন্দরে না ভিড়ে রেকর্ড করা ‘আইজেনহাওয়ার’এর নাবিকরা ভূমিতে পা ফেলার জন্যে উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছিল। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’এর সাথে সাক্ষাতে এই জাহাজের রক্ষার দায়িত্বে থাকা মার্কিন ক্রুজার ‘সান জেসিন্টো’র ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ড ক্রসম্যান বলেন যে, কিছু নাবিক তার কাছে জানতে চেয়েছে যে, কোন জাহাজটা আগে বন্দরে নোঙ্গর করবে।

বিশাল সমরশক্তি থাকার পরেও মানব বাস্তবতাগুলি থেকে মার্কিনীরা বের হতে পারেনি। ১ লক্ষ টনের দৈত্যাকৃতির মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজগুলি যতোটাই শক্তিশালী হোক না কেন, তা সমুদ্রে কতটা সময় কাটাতে পারবে, তা নির্ভর করছে নাবিকদের সক্ষমতার উপর। আর অতি জটিল এবং উচ্চমূল্যের এই প্রযুক্তিকে চালু রাখতে ব্যাপক খরচ ছাড়াও নৌবহরের একটা বড় অংশকে মেইনটেন্যান্সের মাঝে থাকতে হচ্ছে। ক’দিন আগেই উভচর এসল্ট শিপ ‘বনহোমি রিচার্ড’এ ভয়াবহ আগুন এবং ২০১৭ সালে দু’টা ডেস্ট্রয়ারের দুর্ঘটনার পর দুই বছর সার্ভিসের বাইরে থাকার ঘটনা নৌবাহিনীর অপারেশনাল দক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এপ্রিল মাসে দক্ষিণ চীন সাগরে ‘এফ-৩৫’ স্টেলথ ফাইটার বহণে সক্ষম এরকমই একটা এসল্ট শিপ ‘আমেরিকা’ মার্কিন উপস্থিতিকে জিইয়ে রেখেছিল। চীনারা তাদের অপেক্ষাকৃত স্বল্পক্ষমতার নৌবহরকে মার্কিনীদের সক্ষমতার ফাঁকফোঁকড়ের মাঝে ব্যবহার করে মার্কিন নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে। আর এতে তারা বেশ সাফল্যও পেয়েছে। বিশ্বব্যাপী মার্কিনীদের বন্ধু এবং প্রতিযোগী সকলেই যুক্তরাষ্ট্রের এই সীমাবদ্ধতাগুলিকে অবলোকন করছে; যা কিনা তাদের নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অনুপ্রাণিত করছে।

Thursday, 23 April 2020

করোনাভাইরাসকে পুঁজি করে দক্ষিণ চীন সাগরে আগ্রাসী চীন

২৩শে এপ্রিল ২০২০
   
চীনের জরিপ জাহাজ ‘হাই ইয়াং ডি ঝি ৮’। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি চীনের সাথে সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতাকে মেনেই নিয়েছে। একদিকে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ চলছে; অন্যদিকে বাণিজ্য এবং কূটনৈতিক সম্পর্কও চলছে। এমতাবস্থায় দক্ষিণ চীন সাগরের আশেপাশের দেশগুলি তাদের নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা ছাড়া কোন রাস্তা খোলা দেখছে না।
 আগ্রাসী চীন

গত ১৬ই এপ্রিল চীনের একটা জরিপ জাহাজ মালয়েশিয়ার উপকূলের কাছাকাছি এসে জরিপের কাজ শুরু করলে মালয়েশিয়া এবং চীনের মাঝে উত্তেজনা দেখা দেয়। ভেসেল ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ‘ম্যারিন ট্রাফিক’এর মাধ্যমে জানা যাচ্ছে যে, চীনের জরিপ জাহাজ ‘হাই ইয়াং ডি ঝি ৮’ ৯ই এপ্রিল চীনের হাইনান থেকে যাত্রা শুরু করে ১৪ই এপ্রিল ভিয়েতনামের কাছাকাছি আসে। এরপর ১৫ই এপ্রিল দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধপূর্ণ স্প্রাটলি দ্বীপপুঞ্জ পার হয়ে পরদিন মালয়েশিয়ার সারাওয়াক প্রদেশ থেকে ৩’শ ২৫ কিঃমিঃ দূরে অবস্থান নেয়। চীনা কোস্ট গার্ডের কমপক্ষে ৬টা জাহাজ এই জাহাজকে নিরাপত্তা দিচ্ছিলো। মালয়েশিয়ার নিরাপত্তা সূত্রের বরাত দিয়ে ‘রয়টার্স’ বলছে যে, চীনা জাহাজটা মালয়েশিয়ার হাইড্রোকার্বন কোম্পানি ‘পেট্রোনাজ’এর জন্যে কাজ করা ৬০ হাজার টনের ড্রিলিং জাহাজ ‘ওয়েস্ট কাপেলা’র কাছাকাছি চলে আসে। ব্রিটিশ কোম্পানি ‘সীড্রিল’এর মালিকানায় থাকা এই জাহাজটা ঐ একই স্থানে কয়েক মাস ধরে ড্রিলিংএর কাজ করছে এবং চীনা কোস্ট গার্ডের জাহাজগুলি নিয়মিতই পেট্রোনাজের জাহাজের ক্রুদের ভীতি প্রদর্শন করে আসছে । দক্ষিণ চীন সাগরের এই স্থানটা মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম এবং চীন সকলেই নিজের বলে মনে করে। মালয়েশিয়ার কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ‘রয়টার্স’ বলছে যে, ১৭ই এপ্রিলে এক পর্যায়ে চীনা সার্ভে জাহাজটার নিরাপত্তায় চীনা কোস্ট গার্ড এবং চীনা ম্যারিটাইম মিলিশিয়ার ১০টারও বেশি জাহাজ মোতায়েন করা হয়। এগুলির কাছাকাছি ভিয়েতনামের একটা জাহাজও ছিল। এই ঘটনার ব্যাপারে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর অফিস বা পেট্রোনাজ কেউই মুখ খুলতে রাজি হয়নি। মালয়েশিয়ার সমুদ্র নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান জুবিল মাত সম মালয়েশিয়ার পত্রিকা ‘হারিয়ান মেট্রো’র সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, জাহাজটা মালয়েশিয়ার সমুদ্রসীমানায় আসলেও তা কোন বেআইনী কাজ করছিলো না। তবে কেন জাহাজটা সেখানে অবস্থান করছিলো, তা সম্পর্কে তিনি জানেন না বলে জানান। চীনা সার্ভে জাহাজের এহেন কর্মকান্ড এমন সময়ে এলো, যখন নভেল করোনাভাইরাস মোকাবিলায় চীনারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিকে সহায়তা দিচ্ছে; যার মাঝে মালয়েশিয়াও রয়েছে।





দক্ষিণ চীন সাগরের ‘ফায়ারি ক্রস রীফ’এ চীনাদের নির্মিত কৃত্রিম দ্বীপ; এখানে রয়েছে প্রায় ১০ হাজার ফুট রানওয়ে, আর্লি ওয়ার্নিং রাডার সিস্টেম, বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এই দ্বীপগুলিকে ব্যবহার করে পুরো দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে চীন। এই সমুদ্র দিয়ে সারা দুনিয়ার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বাণিজ্য সম্পন্ন হয়।


চীনের জন্যে দক্ষিণ চীন সাগরে এহেন উত্তেজনা নতুন নয়। এই একই চীনা জাহাজ গত বছরের জুলাইএ ভিয়েতনামের উপকূলের কাছাকাছি বিরোধপূর্ণ ‘ভ্যানগার্ড ব্যাঙ্ক’এ জরিপের কাজ চালায়। এর ফলশ্রুতিতে ভিয়েতনামের নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে কয়েক মাস জুড়ে উত্তেজনা চলে। এরপর ডিসেম্বরের শেষের দিকে চীনা কোস্ট গার্ডের প্রহরায় চীনের ৬৩টা মাছ ধরার ট্রলার ইন্দোনেশিয়ার সমুদ্রসীমায় প্রবেশ করে দুই সপ্তাহের বেশি সময় মাছ ধরে নিয়ে যায়। আর এপ্রিলের শুরুতেই ভিয়েতনাম অভিযোগ করে যে, চীনা জরিপ জাহাজের ধাক্কায় ভিয়েতনামের একটা মাছ ধরার ট্রলার ডুবে যায়। দক্ষিণ চীন সাগরের স্প্রাটলি দ্বীপপুঞ্জে চীনারা কৃত্রিমভাবে দ্বীপ উন্নয়ন করে সেখানে বিমান ঘাঁটি, রাডার স্টেশন, বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র, সৈন্য ব্যারাকসহ শক্তিশালী সামরিক স্থাপনা বসিয়েছে। চীনারা দক্ষিণ চীন সাগরের প্রায় পুরোটাই নিজেদের বলে দাবি করে। অন্যদিকে এই সাগরের বেশকিছু অংশ ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তাইওয়ান এবং ব্রুনাই নিজেদের বলে দাবি করে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’এর ‘এশিয়া ম্যারিটাইম ট্রান্সপারেন্সি ইনিশিয়েটিভ’এর ডিরেক্টর গ্রেগোরি বি পোলিংএর মতে, চীনারা মালয়েশিয়ার সাথে সংঘাতে যেতে চাইছে না; শুধুই ভয় দেখাতে চাইছে। করোনাভাইরাস চীনকে থামাতে পারেনি।

দক্ষিণ চীন সাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ‘আমেরিকা। সাথে অস্ট্রেলিয়ার ফ্রিগেট ‘পারামাত্তা’, মার্কিন ডেস্ট্রয়ার ‘ব্যারি’ এবং ক্রুজার ‘বাংকার হিল’। জাহাজগুলি মালয়েশিয়া-চীন বিরোধে কোন অংশ নিতে পারেনি। ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সূত্র ধরে যুক্তরাষ্ট্র যখন করোনা মোকাবিলায় ব্যস্ত, তখন মার্কিন বন্ধুরা চীনাদের কর্মকান্ড পছন্দ না হলেও করোনা মোকাবিলায় চীনের সহায়তা গ্রহণ করছে।

যুক্তরাষ্ট্র কোথায়?

করোনাভাইরাসে যখন চীনের প্রতিবেশিরা ব্যাতিব্যস্ত, তখন মার্চের শেষে চীনারা দক্ষিণ চীন সাগরে বড় একটা সামরিক মহড়া দিয়েছে। চীনা রাষ্ট্রীয় মিডিয়া ‘গ্লোবাল টাইমস’ বলছে যে, ‘লাইভ ফায়ারিং’ এই মহড়ায় যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন এবং ফাইটার জেট অংশ নেয়। চীনা সমর বিশ্লেষক ওয়েই ডংশু বলছেন যে, এই মহড়ার মাধ্যমে চীনারা মাল্টিডিমেনশনাল সক্ষমতা প্রদর্শন করলো, যেখানে সকল ধরনের যুদ্ধাস্ত্র একত্রে কাজ করবে। মহড়ার উদ্দেশ্য ছিল অত্র অঞ্চলের সমুদ্র এবং দ্বীপগুলিকে রক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘থিওডোর রুজভেল্ট’ এবং এম্ফিবিয়াস এসল্ট শিপ ‘আমেরিকা’ ১৫ই মার্চেই দক্ষিণ চীন সাগরে মহড়া দিয়ে যায়। এরপর ‘রুজভেল্ট’ জাহাজে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পরার পর অত্র অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির ব্যাপক অভাব দেখা দেয়। শুধুমাত্র নৌবাহিনীর ‘পি-৩সি’ ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমানগুলি সাগরের উপর দিয়ে উড়ে গিয়ে মার্কিনীদের উপস্থিতির জানান দিচ্ছিলো। তবে চীনারা বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্র অত্র অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্যে হুমকি। ২৬শে মার্চ চীনা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রেন গুওচিয়াং বলেন যে, অত্র এলাকায় মার্কিন কর্মকান্ড দক্ষিণ চীন সাগরের আশেপাশে অবস্থিত দেশগুলির নিরাপত্তাকে হুমকির মাঝে ফেলছে। একারণেই চীনারা তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তার খাতিরে সবকিছু করবে।

মালয়েশিয়ার সাথে চীনের বিরোধকে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করতে চাইছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেন যে, একদিকে চীনারা বিভিন্ন দেশকে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সহায়তা দিচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশগুলির সমুদ্রসীমার দাবিকে উপেক্ষা করে দক্ষিণ চীন সাগরে নিজেদের অবস্থানকে সুসংহত করছে। মালয়েশিয়ার সাথে উত্তেজনা বাড়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র তার নৌবাহিনীর এম্ফিবিয়াস এসল্ট শিপ ‘আমেরিকা’, ক্রুজার ‘বাংকার হিল’ এবং ডেস্ট্রয়ার ‘ব্যারি’কে দক্ষিণ চীন সাগরে প্রেরণ করে। এগুলির সাথে যোগ দেয় অস্ট্রেলিয়ার ফ্রিগেট ‘পারামাত্তা’। তবে ২১ তারিখে এই জাহাজগুলি ঐ এলাকায় পৌঁছার পর চীনাদের কোন জাহাজ সেখানে ছিল না। অর্থাৎ মালয়েশিয়া এবং চীনের এই বিরোধের মাঝে যুক্তরাষ্ট্র কোন ভূমিকা রাখতে পারেনি।

গ্রেগোরি পোলিং বলছেন যে, ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সূত্র ধরে যুক্তরাষ্ট্র যখন করোনা মোকাবিলায় ব্যস্ত, তখন মার্কিন বন্ধুরা চীনাদের কর্মকান্ড পছন্দ না হলেও করোনা মোকাবিলায় চীনের সহায়তা গ্রহণ করছে। ‘লস এঞ্জেলেস টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, মার্চের ২০ তারিখে চীনারা ইতালি, ইথিওপিয়া এবং কোরিয়াসহ পৃথিবীর ডজনখানেক দেশে করোনা প্রতিরোধের সরঞ্জাম পাঠাবার খবর দেয়। আবার একই দিনে ‘নিউ চায়না নিউজ এজেন্সি’ বলছে যে, সমুদ্র গবেষণার জন্যে দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধপূর্ণ স্প্রাটলি দ্বীপপুঞ্জের ‘ফায়ারি ক্রস রীফ’ এবং ‘সুবি রীফ’এ তৈরি করা কৃত্রিম দ্বীপে দু’টা গবেষণাগার স্থাপন করা হয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগরের মাঝ দিয়ে পৃথিবীর প্রায় এক তৃতীয়াংশ বাণিজ্য সম্পাদিত হয়। আর এই এলাকায় রয়েছে প্রচুর খণিজ সম্পদ।
 
করোনা পরিস্থিতি চীনকে নিজের অবস্থান সুসংহত করার নতুন সুযোগ করে দিয়েছে, যা কিনা দক্ষিণ চীন সাগরের প্রতিবেশী দেশগুলিকে আরও ব্যাপক চাপের মাঝে ফেলবে। আর যুক্তরাষ্ট্রের অবর্তমানে অত্র অঞ্চলের দেশগুলিও চীনকে ব্যালান্স করতে অন্যান্য শক্তিশালী দেশের উপস্থিতি চাইবে।



দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি কি করবে?

বিনিয়োগ এবং বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চীন এবং মালয়েশিয়ার সম্পর্ক বেশ কাছের। কিন্তু দক্ষিণ চীন সাগরের ব্যাপারে দুই দেশের মতবিরোধ রয়েছে। গত ১২ই ডিসেম্বর মালয়েশিয়া জাতিসংঘের ‘ইউএন কমিশন অন দ্যা লিমিটস অব দ্যা কন্টিনেন্টাল শেলফ’ বা ‘সিএলসিএস’এর কাছে নিজেদের দাবির ডকুমেন্ট পেশ করে। পরিকল্পনা মোতাবেক মালয়েশিয়া তার সমুদ্রতট থেকে ৩’শ ৭০ কিঃমিঃ দূরের সমুদ্র পর্যন্ত নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। টোকিওর ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রিশ্চিয়ান ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর স্টিফেন নাগি বলছেন যে, দক্ষিণ চীন সাগরের আশেপাশের অন্যান্য দেশগুলিও যেহেতু চীনা আধিপত্যবাদকে রুখতে চাইছে, তাই সেই সুযোগে মালয়েশিয়াও অন্যদের সাথে সাথে নিজের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হতে চাইছে। মালয়েশিয়া নিজেকে একা আলাদাভাবে চীনের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চাইছে না। অন্যদিকে সমুদ্রে চীনাদের আগ্রাসী ভূমিকা ঠেকাতে এই সাগরের আশেপাশের দেশগুলিকে মার্কিন সরকার এবং তার বন্ধু রাষ্ট্রগুলি সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। ‘ভয়েস অব আমেরিকা’র এই প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, দক্ষিণ চীন সাগরে মালয়েশিয়ার অধিকার আদায়ের চেষ্টা শেষ পর্যন্ত চীনাদেরকে মালয়েশিয়ার বিরুদ্ধে দাঁড় করাবে এবং চীন থেকে সহায়তা পাওয়াটা মালয়েশিয়ার জন্যে ধীরে ধীরে আরও কঠিন হয়ে যাবে। ২০১৮ সালে নির্বাচনে হেরে যাওয়া নজিব রাজাকের সরকার চীন থেকে অনেক প্রকল্পের জন্যে প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের আশ্বাস পেয়েছিল। মাহাথির মোহামেদ নির্বাচনে জেতার পর বিভিন্ন সময়ে চীনের সমালোচনা করলেও চীনের সাথে বন্ধুত্ব যাতে নষ্ট না হয়, সেদিকে খেয়াল রেখেছিলেন। ‘সিঙ্গাপুর ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার্স’এর সিনিয়র ফেলো ওহ এই সুন বলছেন যে, মালয়েশিয়া খুব সম্ভবতঃ চীনের সাথে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিবাদের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক আইনী পদক্ষেপের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবে। সিঙ্গাপুরের ‘এস রাজারাতনাম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’এর এসোসিয়েট প্রফেসর এলান চং মনে করছেন যে, আইনী পদক্ষেপ নেয়ার মাধ্যমে মালয়েশিয়রা চীনের কাছ থেকে উন্নয়ন সহায়তা পাবার ক্ষেত্রে আরও ভালো শর্ত পাবার আশা করছে।

তবে চীনের এহেন আগ্রাসী মনোভাব চীনের জন্যে ক্ষতিকরও হতে পারে। সিঙ্গাপুরের ‘নানইয়াং টেকনলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি’র ম্যারিটাইম সিকিউরিটি বিশ্লেষক কলিন কোহ মনে করছেন যে, চীনের আগ্রাসী কর্মকান্ড করোনা মোকাবিলায় অত্র অঞ্চলের দেশগুলিকে সহায়তা দিয়ে আয় করা বিশ্বাসটুকু নষ্ট করে দিতে পারে। মার্চ মাসে চীন থেকে মেডিক্যাল সরঞ্জাম পাবার পর মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেইজিংকে ধন্যবাদ দিয়ে বলেন যে, দুর্যোগের সময়েই সত্যিকারের বন্ধু চেনা যায়। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘লোয়ি ইস্টিটিউট’ বলছে যে, করোনাভাইরাসের কারণে যুক্তরাষ্ট্র স্বাস্থ্য এবং অর্থনীতির দিক থেকে ব্যাপক চাপের মাঝে পড়ায় অত্র অঞ্চলের দেশগুলি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা দেবার সক্ষমতা নিয়ে চিন্তিত। তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি নিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে যে, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেউই বন্ধু হিসেবে নির্ভরযোগ্য নয়। ‘আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইন্সটিটিউট’এর রিসার্চ ফেলো জ্যাক কুপার বলছেন যে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি চীনের এহেন বাস্তবতাকে মেনেই নিয়েছে। একদিকে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ চলছে; অন্যদিকে বাণিজ্য এবং কূটনৈতিক সম্পর্কও চলছে। এমতাবস্থায় দক্ষিণ চীন সাগরের আশেপাশের দেশগুলি তাদের নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা ছাড়া কোন রাস্তা খোলা দেখছে না। গত বেশ কয়েক বছর ধরেই ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া এবং ভিয়েতনাম নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে মনোনিবেশ করেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অবর্তমানে চীনের আগ্রাসী মনোভাবের কাছে কোন কিছুই যেন দাঁড়াতে পারছে না। করোনা পরিস্থিতি চীনকে নিজের অবস্থান সুসংহত করার নতুন সুযোগ করে দিয়েছে, যা কিনা দক্ষিণ চীন সাগরের প্রতিবেশী দেশগুলিকে আরও ব্যাপক চাপের মাঝে ফেলবে। আর যুক্তরাষ্ট্রের অবর্তমানে অত্র অঞ্চলের দেশগুলিও চীনকে ব্যালান্স করতে অন্যান্য শক্তিশালী দেশের উপস্থিতি চাইবে।

Saturday, 18 January 2020

ইন্দোনেশিয়াকে ঘুম থেকে জাগালো চীন?


১৮ই জানুয়ারি ২০২০
চীন যেমন এখানে তার প্রভাব বৃদ্ধিতে পিছপা হবে না, তেমনি ইন্দোনেশিয়াও নতুনা সাগরে চীনের ফিশিং ফ্লীটের হুমকি থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারবে না। নতুনার এই বিরোধ হয়তো ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রনীতির জন্যে ঘুম থেকে জেগে ওঠার কাজটাই করবে। পূর্বের সাগরের প্রায় সবগুলি কৌশলগত সমুদ্রপথের উপর নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থানে থাকা ইন্দোনেশিয়া তার পররাষ্ট্রনীতিকে পরিবর্তন করলে এর ভূকৌশলগত প্রভাব সারা বিশ্বে প্রতিফলিত হবে।

দক্ষিণ চীন সাগরে ইন্দোনেশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন নতুনা দ্বীপপুঞ্জের কাছে চীনের সাথে তিন সপ্তাহব্যাপী উত্তেজনার পর ৯ই জানুয়ারি ইন্দোনেশিয়ার সামরিক বাহিনী ঘোষণা দেয় যে, চীনের সকল জাহাজ ইন্দোনেশিয়ার সমুদ্রসীমা ত্যাগ করেছে। ইন্দোনেশিয়ার ‘ম্যারিটাইম সিকিউরিটি এজেন্সি’ বলছে যে, গত ১৯ থেকে ২৪শে ডিসেম্বরের মাঝে কমপক্ষে ৬৩টা চীনা মাছ ধরার জাহাজ চীনা কোস্ট গার্ডের প্রহরায় নতুনার আশেপাশের সমুদ্রে এসে পৌঁছায়, যে সমুদ্রাঞ্চলকে ইন্দোনেশিয়া নিজেদের অর্থনৈতিক অঞ্চল বলে দাবি করে। অন্যদিকে চীনারাও তাদের স্বঘোষিত ‘নাইন-ড্যাশ লাইন’এর আওতায় এই এলাকায় নিজেদের ‘ঐতিহাসিক অধিকার’ রয়েছে বলে মনে করে। হতচকিত হয়ে ইন্দোনেশিয়ার নেতৃবৃন্দ জানুয়ারির শুরুতে নতুনার দিকে নৌবাহিনীর দু’টা কর্ভেট প্রেরণ করে। প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘আইএইচএস জেনস’ বলছে যে, জানুয়ারির ৬ তারিখ নাগাদ ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনী সেখানে আরও ৪টা ফ্রিগেট, একটা সাবমেরিন এবং একটা উভচর পরিবহণ জাহাজ প্রেরণ করে। এছাড়াও ইন্দোনেশিয়ার বিমান বাহিনীর ১৬ নম্বর স্কোয়াড্রন থেকে ৪টা ‘এফ-১৬’ ফাইটার বিমান এবং সেনাবাহিনীর ৬’শ সদস্য সেখানে মোতায়েন করা হয়।

৬ই জানুয়ারি দক্ষিণ চীন সাগরের স্প্রাটলি দ্বীপপুঞ্জের ‘ফায়ারি ক্রস’ দ্বীপ হতে চীনা কোস্ট গার্ডের দু’টা জাহাজ নতুনার পথে যাত্রা করে বলে জানায় ‘ম্যারিন ট্রাফিক’ নামের শিপিং ইন্টেলিজেন্স সংস্থা। জাহাজগুলি খুব সম্ভবতঃ সেখান থেকে জ্বালানি নিয়ে যাত্রা করে। ‘ইউএস নেভাল ওয়ার কলেজ’এর ‘চায়না ম্যারিটাইম স্টাডিজ ইন্সটিটিউট’এর রায়ান মার্টিনসন বলছেন যে, দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের মূল ভূখন্ড থেকে দূরবর্তী এলাকাগুলিতে অপারেশন চালাবার জন্যে চীনের দখলে থাকা স্প্রাটলি দ্বীপপুঞ্জের এই ঘাঁটিগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ‘অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইন্সটিটিউট’এর গবেষক চার্লি লিয়ন্স জোন্সএর মতে, মনুষ্যনির্মিত এই দ্বীপগুলি চীনের নৌশক্তিকে মূল ভূখন্ড থেকে দূরের এলাকায় প্রভাব বিস্তারে সহায়তা করছে। ‘ফায়ারি ক্রস’এ চীনারা বিশাল রানওয়ে তৈরি করেছে, যেখানে ফাইটার জেট এবং বড় পরিবহণ বিমান অবতরণ করতে পারবে। তবে তিনি আরও বলছেন যে, চীনারা মূল ভূখন্ড থেকে অতটা দূরে এই ঘাঁটি ধরে রাখার লজিস্টিক্যাল চ্যালেঞ্জগুলি কতটা মোকাবিলা করতে পারবে, তা সময়ই বলে দেবে।


  
চীনকে না চটানোর নীতিটাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়ায় চীনাদের নিয়মিত হুমকিগুলি ইন্দোনেশিয়দের জন্যে প্রায় গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে। আর অন্যদিকে চীন নিজের বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দক্ষিণ চীন সাগরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করছে। নতুনা দ্বীপপুঞ্জ চীনের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ মালাক্কা প্রণালীর নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থানে। কাজেই চীন যেমন এখানে তার প্রভাব বৃদ্ধিতে পিছপা হবে না, তেমনি ইন্দোনেশিয়াও নতুনা সাগরে চীনের ফিশিং ফ্লীটের হুমকি থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারবে না। 


প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চলা এই উত্তেজনার মাঝে ইন্দোনেশিয়া ৩০শে ডিসেম্বর জাকার্তাতে চীনা রাষ্ট্রদূতকে ডেকে প্রতিবাদলিপি পেশ করে। ‘ভোয়া নিউজ’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, চীনের সাথে ইন্দোনেশিয়ার মৎস্য শিকার নিয়ে বিভেদ নতুন নয়। আর ইন্দোনেশিয়াও সাম্প্রতিক সময়ে নতুনা দ্বীপ এলাকায় সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে। অর্থাৎ ইন্দোনেশিয়ার এহেন সামরিক পদক্ষেপ দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আগ্রাসী কর্মকান্ড ঠেকাতে যথেষ্ট ছিল না। মোটকথা ইন্দোনেশিয়া একেবারেই অপ্রস্তুত ছিল। ৮ই জানুয়ারি নতুনা দ্বীপে ছুটে যান ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো। তিনি নতুনার লাম্পা স্ট্রেইট ফিশিং পোর্টে ঘোষণা দেন যে, তিনি সেখানে গিয়েছেন উত্তর নতুনা সাগরের সম্পদের উপর ইন্দোনেশিয়ার সার্বভৌম ক্ষমতা বলবত করতে।

চীনের হুমকি মোকাবিলায় সামরিক বাহিনীকে প্রস্তুত করতে ইন্দোনেশিয়া জরুরি পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে। ‘আইএইচএস জেনস’ জানাচ্ছে যে, ইন্দোনেশিয়া তার নৌবাহিনীর ফ্রান্স থেকে কেনা ১১টা ‘প্যান্থার’ হেলিকপ্টারকে সাবমেরিন ধ্বংসী এবং জাহাজ ধ্বংসী অস্ত্রে সজ্জিত করতে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই হেলিকপ্টারগুলি ক্রয়ের সময়ে শত্রুর জাহাজের উপর সরাসরি হামলার জন্যে উপযোগী অবস্থায় ক্রয় করা হয়নি। একইসাথে নৌবাহিনী ৪টা অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল ক্রয়ের জন্যে টেন্ডার ডেকেছে। চীনা কোস্ট গার্ডের বিরাট প্যাট্রোল ভেসেলগুলির প্রতিদ্বন্দ্বী ইন্দোনেশিয়ার কোস্ট গার্ডের বেশিরভাগ জাহাজই অপেক্ষাকৃত ছোট। তাই নৌবাহিনীর কর্ভেট এবং ফ্রিগেটগুলিকে ডেকে পাঠাতে হয়েছে চীনা কোস্ট গার্ডের জাহাজগুলিকে মোকাবিলার জন্যে। এছাড়াও পূর্ব জাভার পাইতন নৌঘাঁটিতে ৭৬ মিঃমিঃএর একটা কামান বসানো হয়েছে কামান চালনায় নৌবাহিনীর দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে। অর্থাৎ এতকাল কামান চালনাকে বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের অংশই মনে করা হয়নি।

১৫ই জানুয়ারি দক্ষিণ চীন সাগরে অবস্থিত নতুনা দ্বীপে সরেজমিন পরিদর্শন করে ইন্দোনেশিয়ার রাজনৈতিক, আইনী এবং নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী মাহফুদ এমডি বলেন যে, নতুনা দ্বীপে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বাড়াবার লক্ষ্যে ইন্দোনেশিয়ার সরকার সেখানে মৎস্য আহরণ বৃদ্ধি করতে যাচ্ছে। ‘জাকার্তা পোস্ট’এর এক খবরে বলা হচ্ছে যে, ১ হাজার কিঃমিঃএর বেশি দূরত্বে অবস্থিত জাভা থেকে ৩৫টা মাছ ধরার জাহাজ নিয়ে আসা হচ্ছে এই অঞ্চলে। এই জাহাজগুলির প্রতিটার ধারণক্ষমতা ৭৫টনের বেশি। সরকার বলছে যে, নতুনার জেলেদের জাহাজগুলি একেবারেই ছোট, যেগুলি চীনাদের সাথে প্রতিযোগিতা করে এই অঞ্চলের সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে একেবারেই অপ্রতুল। একই দিনে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসুদি ভিয়েতনামের হো চিন-মিন সিটিতে এক ঝটিকা সফরে ভিয়েতনামের ‘হাই নাম’ নামের একটা সীফুড কোম্পানির সাথে বৈঠক করে ইন্দোনেশিয়া থেকে বেশি করে মাছ আমদানি করার আহ্বান জানান। উদ্দেশ্য নতুনা সাগরে মাছ আহরণ বৃদ্ধি করে সেই মাছের জন্যে বাজার ধরা। ১৭ই জানুয়ারি জাকার্তায় ম্যারিটাইম এফেয়ার্স এন্ড ইনভেস্টমেন্ট মন্ত্রী লুহুত পাঞ্জাইতান সাংবাদিকদের সামনে ঘোষণা দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া নতুনা দ্বীপে ফিশ প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি করতে ইচ্ছুক।

২০১৭ সালে নতুনা দ্বীপের আশেপাশের অঞ্চলকে নিজের অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করলেও প্রকৃতপক্ষে ইন্দোনেশিয়া তার স্বার্থকে সমুন্নত করতে নির্দিষ্ট কোন পরিকল্পনা ছাড়াই এগুচ্ছিল। চীনকে না চটানোর নীতিটাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়ায় চীনাদের নিয়মিত হুমকিগুলি ইন্দোনেশিয়দের জন্যে প্রায় গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে। আর অন্যদিকে চীন নিজের বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দক্ষিণ চীন সাগরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করছে। নতুনা দ্বীপপুঞ্জ চীনের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ মালাক্কা প্রণালীর নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থানে। কাজেই চীন যেমন এখানে তার প্রভাব বৃদ্ধিতে পিছপা হবে না, তেমনি ইন্দোনেশিয়াও নতুনা সাগরে চীনের ফিশিং ফ্লীটের হুমকি থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারবে না। নতুনার এই বিরোধ হয়তো ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রনীতির জন্যে ঘুম থেকে জেগে ওঠার কাজটাই করবে। পূর্বের সাগরের প্রায় সবগুলি কৌশলগত সমুদ্রপথের উপর নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থানে থাকা ইন্দোনেশিয়া তার পররাষ্ট্রনীতিকে পরিবর্তন করলে এর ভূকৌশলগত প্রভাব সারা বিশ্বে প্রতিফলিত হবে।

Saturday, 4 May 2019

ইন্দোনেশিয়া-ভিয়েতনাম নৌ-বিরোধ পূর্ব এশিয়ায় নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে

৫ই মে ২০১৯

২৭শে এপ্রিল ভিয়েতনামের কোস্ট গার্ডের জাহাজ ‘কেএন-২১৩’ ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীর জাহাজ ‘তিপতাদি’কে সজোরে ধাক্কা দেয়।


গত ২৭শে এপ্রিল দক্ষিণ চীন সাগরে ইন্দোনেশিয়ার নতুনা দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি দেশটার নৌবাহিনীর জাহাজ ‘তিপতাদি’কে ভিয়েতনামের কোস্ট গার্ডের একটা জাহাজ ধাক্কা দেয়। ইন্দোনেশিয়ার জাহাজখানা ভিয়েতনামের একটা ফিশিং ট্রলারকে আটক করে এবং এর ১২ জন নাবিককে গ্রেপ্তার করে। জাহাজের দু’জন ক্রুকে অবশ্য ভিয়েতনামের কোস্ট গার্ডের জাহাজ তুলে নেয়। ভিয়েতনাম সরকার দাবি করে যে, ইন্দোনেশিয়া সমুদ্রের যে স্থানে ভিয়েতনামের ফিশিং ট্রলারটা আটক করে, তা ভিয়েতনামের ‘এক্সক্লুসিভ ইকনমিক জোন’ বা ‘ইইজেড’এর অংশ। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়া দাবি করে যে, ফিশিং ট্রলারটা বেআইনীভাবে ইন্দোনেশিয়ার ‘ইইজেড’এ মাছ ধরছিলো। ইন্দোনেশিয়া সরকার তাদের নৌবাহিনীর জাহাজ থেকে ধারণ করা একটা ভিডিও প্রকাশ করে, যা-তে দেখা যায় যে, ভিয়েতনামের কোস্ট গার্ডের জাহাজ ‘কেএন-২১৩’ ইন্দোনেশিয়ার জাহাজটাকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ঘটনার পর ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র দপ্তর জাকার্তাতে ভিয়েতনামের রাষ্টদূতকে ডেকে প্রতিবাদ করে। ‘দ্যা ডিপ্লোম্যাট’ ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এই ঘটনা ইন্দোনেশিয়া-ভিয়েতনামের সম্পর্ককে আরও জটিল করছে। তবে এই ঘটনার সূত্র ধরে অত্র অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক সমীকরণও নতুন করে দেখার সময় এসেছে।

গত ফেব্রুয়ারিতেও ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনী ভিয়েতনামের ৪টা ফিশিং ট্রলার আটক করে। ইন্দোনেশিয়ার মৎস্য মন্ত্রী সুসি পুজিয়াস্তুতি তখন বলেন যে, ভিয়েতনামের কোস্ট গার্ডের দু’টা জাহাজ এই আটক কর্মকান্ডে বাধা দিতে এসেছিল। আর এই ঘটনার পুরোটাই সংঘটিত হয় ইন্দোনেশিয়ার ‘ইইজেড’এর ভেতরে। শুধু তা-ই নয়, ইন্দোনেশিয়ার মন্ত্রী বলেন যে, এরকম ঘটনা অহরহই ঘটছে। ঐ ঘটনার কিছুদিন আগেই ভিয়েতনামের কোস্ট গার্ডের জাহাজ একই রকম এক আটক কাজে ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীকে বাধা দিতে এসেছিল। এপ্রিলের ঘটনার পর ইন্দোনেশিয়ার মন্ত্রী ঘোষণা দেন যে, ইন্দোনেশিয়া আটক করা বিদেশী ট্রলার একত্রে জনসম্মুখে ডুবানোর রীতি পুনরায় চালু করছে। এর আগে চীন, ভিয়েতনাম এবং অন্যান্য দেশের বিরূপ প্রতিক্রিয়াতে বিদেশী ট্রলার ডুবানোর এই অনুষ্ঠান ইন্দোনেশিয়া স্থগিত করেছিল। এখন এই অনুষ্ঠান আবারও শুরু করার ঘোষণায় ইন্দোনেশিয়ার সাথে চীন এবং ভিয়েতনামের সম্পর্ক নতুন করে চাপের মাঝে পড়বে। ঘোষণা অনুযায়ী ৪ঠা মে ইন্দোনেশিয়া ৫১টা ফিশিং ট্রলার ডুবানোর কাজ শুরু করে, যা কিনা দুই সপ্তাহ ধরে চলার কথা রয়েছে।

২০১৭ সালের জুলাই মাসে ইন্দোনেশিয়া দক্ষিণ চীন সাগরের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তের সমুদ্রের নতুন করে নামকরণ করে। দক্ষিণ চীন সাগরে ইন্দোনেশিয়ার অধীনে থাকা নতুনা দ্বীপপুঞ্জের আশেপাশের এলাকাকে ইন্দোনেশিয়ার সরকার ‘নর্থ নতুনা সী’ বা উত্তর নতুনা সাগর নামকরণ করে। ইন্দোনেশিয় সরকার বলে যে, তারা শুধুমাত্র ঐ এলাকায় নিজেদের ‘ইইজেড’এর অংশটা নতুন করে নামকরণ করেছে। তবে সমস্যা দাঁড়ায় ইন্দনেশিয়ার অধীন ‘ইইজেড’এর সীমানা নিয়ে। চীনারা দক্ষিণ চীন সাগরের প্রায় পুরোটাই নিজেদের বলে দাবি করে, এবং নিজেদের সজ্ঞায়িত ‘নাইন-ড্যাস লাইন’এর অধীনে সকল দ্বীপ এবং সমুদ্রাঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবার জন্যে আশেপাশের দেশগুলির সাথে বিবাদেও জড়িয়েছে। চীনারা নতুনা সাগরে ইন্দোনেশিয়ার দাবি করা ‘ইইজেড’কে স্বীকৃতি দেয় না। তবে ইন্দোনেশিয়া তার দাবি করা ‘ইইজেড’এর মাঝে বিদেশী ফিশিং ট্রলার গ্রেপ্তার করতে থাকে। চীনা ফিশিং ট্রলারগুলিকে গ্রেপ্তার করার সময় চীনা নৌবাহিনী এবং কোস্ট গার্ডের জাহাজগুলি বাধা দিতে আসে। এভাবে দুই দেশের নৌবাহিনীর মাঝে সংঘাতের সম্ভাবনা বেড়েই চলেছে প্রতিদিন। তবে মিডিয়া চীনকে এতটাই বেশি গুরুত্ব দেয় যে, ভিয়েতনামের সাথে ইন্দোনেশিয়ার সমুদ্র নিয়ে বিরোধের ব্যাপারটা একেবারেই চাপা পড়ে যায়।

ইন্দোনেশিয়ার সাথে ভিয়েতনামের সমুদ্র-বিরোধ নতুন নয়। ২০০৭ সাল থেকে ২০১৫-এর মাঝে ইন্দোনেশিয়া সর্বমোট ৬’শ ৯২টা বিদেশী ফিশিং ট্রলার গ্রেপ্তার করে। এর মাঝে ৬৫ শতাংশ ফিশিং ট্রলার ভিয়েতনামের হবার পরেও মিডিয়াতে চীনের ব্যাপারটাই হাইলাইট হয়েছে। চীন-ইন্দোনেশিয়া বিরোধই ছিল মিডিয়ার উপজীব্য। তবে এবারে ভিয়েতনামের সাথে ইন্দোনেশিয়ার নৌ-বিরোধ দুই দেশের সরকারি বাহিনীর মাঝে হবার কারণে তা নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ইন্দোনেশিয়ার সাথে ভিয়েতনামের সমুদ্র-বিরোধ নতুন নয়। ২০০৭ সাল থেকে ২০১৫-এর মাঝে ইন্দোনেশিয়া সর্বমোট ৬’শ ৯২টা বিদেশী ফিশিং ট্রলার গ্রেপ্তার করে। এর মাঝে ৪’শ ৫৪টাই ছিল ভিয়েতনামের। ১’শ ১৬টা থাইল্যান্ডের, ৯১টা মালয়েশিয়ার এবং ৩১টা মাত্র চীনের। অর্থাৎ ৬৫ শতাংশ ফিশিং ট্রলার ভিয়েতনামের হবার পরেও মিডিয়াতে চীনের ব্যাপারটাই হাইলাইট হয়েছে। চীন-ইন্দোনেশিয়া বিরোধই ছিল মিডিয়ার উপজীব্য। তবে এবারে ভিয়েতনামের সাথে ইন্দোনেশিয়ার নৌ-বিরোধ দুই দেশের সরকারি বাহিনীর মাঝে হবার কারণে তা নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

উভয় দেশই নিজেদের সম্পর্ককে এগিয়ে নিচ্ছে ২০০৩ সাল থেকে। ২০১৩ সালে দুই দেশের মাঝে কৌশলগত পার্টনারশিপের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। উভয় দেশই অত্র অঞ্চলে বেআইনীভাবে মাছ ধরা এবং চোরাচালান প্রতিরোধে নিজেদের নৌবাহিনীর মাঝে সমন্বয় সাধনে অগ্রসর হবার চেষ্টা করে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে, দুই দেশের সম্পর্ক এখনও কন্টকমুক্ত নয়। ইন্দোনেশিয়ার ভাইস-প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ জুসুফ কাল্লা বলেন যে, উভয় দেশ এই মুহুর্তে আন্তর্জাতিক সীমানা নির্ধারণে আলোচনা চালাচ্ছে। এর আগে ‘নর্থ নতুনা সী’ ঘোষণা যে চীনের সাথে ভিয়েতনামের স্বার্থেও আঘাত করেছে, তা এখন সকলের সামনে চলে আসলো। সমুদ্রসীমা নির্ধারণ দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারে। তবে আঞ্চলিকভাবে ইন্দোনেশিয়ার ভূকৌশলগত অবস্থান এবং সেই অবস্থানকে ঘিরে ইন্দোনেশিয়ার নীতি এখন আলোচনায় চলে আসছে। আঞ্চলিক শক্তি, বিশেষ করে চীনের চাপে, ইন্দোনেশিয়া তার সামরিক শক্তিকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। একসময় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনী সামরিক বাজেটের বেশিরভাগটা পেলেও এখন নৌ-সীমানার নিরাপত্তা নিশ্চিতে নৌবাহিনী এবং বিমান বাহিনী বাজেটের একটা বড় অংশ পাচ্ছে। নিরাপত্তা-বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘ওয়ার অন দ্যা রকস’এ এক লেখায় মার্কিন বিমান বাহিনীর অফিসার মেজর ক্যালেব স্লেইটন ইন্দোনেশিয়ার বিমান বাহিনীর এয়ার কমান্ড এন্ড স্টাফ কলেজের প্রশিক্ষণের লক্ষ্যের ব্যাপারে আলোচনা করেন। ঐ কোর্সে অংশ নেয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন যে, সেখানে বছরব্যাপী একটা প্রশিক্ষণ মহড়া চালানো হয়, যেখানে শত্রু হিসেবে ধরা হয় আঞ্চলিক শক্তিধর একটা দেশকে, যার কিনা রয়েছে শক্তিশালী নৌবাহিনী। এই প্রশিক্ষণ মহড়া ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকিগুলিকে সামনে রেখেই আয়োজন করা হচ্ছে। এতে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, দ্বীপ দেশ ইন্দোনেশিয়ার সামরিক শক্তির বর্তমান ফোকাস সমুদ্রের দিকে। আর দেশটার উত্তরে অবস্থিত শক্তিশালী রাষ্ট্র চীনকেই এক্ষেত্রে সবচাইতে বড় হুমকি হিসেবে মনে করা হচ্ছে। তবে স্লেইটনের লেখায় ভিয়েতনামের উল্লেখ নেই। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সাথে রেষারেষিতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামের পক্ষ নিয়েছে। তাই ইন্দোনেশিয়া কেন চীন এবং ভিয়েতনাম উভয়ের ব্যাপারেই কড়া নীতি নিয়ে এগুচ্ছে, তা বুঝতে হলে সাম্প্রতিককালে ইন্দোনেশিয়ার সামরিক ঘাঁটি উন্নয়ের ধারার দিকে তাকাতে হবে।


ইন্দোনেশিয়ার স্বঘোষিত ‘নর্থ নতুনা সী’তে নতুনা দ্বীপপুঞ্জের অবস্থান কৌশলগত দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলের সকল স্থলভাগের ঠিক মাঝখানে এই দ্বীপ। কৌশলগত মালাক্কা প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করা বেশিরভাগ জাহাজকেই এই দ্বীপের পাশ দিয়ে যেতে হয়। এই দ্বীপপুঞ্জের নতুনা বা রিয়াউ দ্বীপে সেনা, নৌ এবং বিমান বাহিনীর সমন্বিত ঘাঁটি উন্নয়নের কাজ করছে ইন্দোনেশিয়া।


ইন্দোনেশিয়ার স্বঘোষিত ‘নর্থ নতুনা সী’তে নতুনা দ্বীপপুঞ্জের অবস্থান কৌশলগত দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই দ্বীপের ৬’শ ৫৫ কিঃমিঃ উত্তর-পূর্বে রয়েছে স্প্রাটলি দ্বীপপুঞ্জের চীনা সামরিক ঘাঁটি। সিঙ্গাপুর থেকে এর দূরত্ব ৫’শ ৬৫ কিঃমিঃ; ব্রুনাই থেকে ৭’শ ৭০ কিঃমিঃ; ভিয়েতনাম থেকে ৫’শ ৬০ কিঃমিঃ। অর্থাৎ এই অঞ্চলের সকল স্থলভাগের ঠিক মাঝখানে এই দ্বীপ। কৌশলগত মালাক্কা প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করা বেশিরভাগ জাহাজকেই এই দ্বীপের পাশ দিয়ে যেতে হয়। এই দ্বীপপুঞ্জের নতুনা বা রিয়াউ দ্বীপে সেনা, নৌ এবং বিমান বাহিনীর সমন্বিত ঘাঁটি উন্নয়নের কাজ করছে ইন্দোনেশিয়া। ২০১৮-এর ১৮ই ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার সামরিক বাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল হাদি তিয়াহিয়ান্তো নতুনা দ্বীপে ঘাঁটির উদ্বোধন করেন। তিয়াহিয়ান্তো বলেন যে, এই ঘাঁটির কাজ হলো ইন্দোনেশিয়ার সীমানায় আগ্রাসী শক্রির বিরুদ্ধে একটা “ডিটারেন্ট” তৈরি করা।

তিয়াহিয়ান্তোর আগের প্রাক্তন প্রধান জেনারেল নুরমানতায়ো বলেছিলেন যে, ইন্দোনেশিয়ার চারিদিকে মোট পাঁচটা দূরবর্তী দ্বীপকে ‘বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ দ্বীপ’ হিসেবে উন্নয়ন করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর মাঝে নতুনা দ্বীপ হলো এরূপ প্রথম ঘাঁটি। বাকি ঘাঁটিগুলির সবগুলিই পূর্ব দিকে আস্ট্রেলিয়া এবং ফিলিপাইনের কাছাকাছি; এগুলি হলো –মালুকু দ্বীপপুঞ্জের সাউমলাকি (পূর্ব তিমরের কাছে), উত্তর মালুকুর মরোতাই (ফিলিপাইনের দক্ষিণে), এবং পপুয়ার বিয়াক ও মেরাউকে (অস্ট্রেলিয়ার উত্তরে)। জাকার্তার ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’এর ম্যাগাজিনের এক লেখায় এভান লাক্সমানা বলছেন যে, নতুনা দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করাটা ইন্দোনেশিয়ার জন্যে চীনকে নিয়ন্ত্রণের অংশ নয়, বরং এটা পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের নীতির অংশ। ১৯৪৬ সাল থেকে এই অঞ্চলের বেসামরিক বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রিত হয় সিঙ্গাপুর থেকে। ইন্দোনেশিয়া চাইছে যে, নতুনা দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি পূর্ণাঙ্গরূপে চালু হলে অত্র অঞ্চলের বিমান চলাচলের নিয়ন্ত্রণ থাকবে নতুনা দ্বীপে।

ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাথে পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যের প্রায় পুরোটাই যায় ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপগুলির মাঝ দিয়ে প্রবাহিত মালাক্কা, সুন্দা এবং লম্বক প্রণালী দিয়ে। তবে এই প্রণালীগুলি পার হতে হলে জাহাজগুলিকে হয় নতুনা সাগর, কিংবা পূর্বে ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপ এবং ইন্দোনেশিয়ার পপুয়া দ্বীপের মাঝ দিয়ে যেতে হবে। নতুনা সাগরের মাঝে ইন্দোনেশিয়া নতুনা দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করছে। আর মিন্দানাও এবং পপুয়ার মাঝের সমুদ্রপথ পাহাড়া দিতে ইন্দোনেশিয়া মরোতাই এবং বিয়াক ছাড়াও আরও কয়েকটা সামরিক ঘাঁটির উন্নয়ন করছে। মোটকথা অত্র অঞ্চলের সবগুলি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে ইন্দোনেশিয়া পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে, যা কিনা পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র সিঙ্গাপুরে নৌ-ঘাঁটি করেছে; গুয়ামের ঘাঁটিতেও শক্তি বৃদ্ধি করছে। আর গত ডিসেম্বরে ব্রিটেন ঘোষণা দিয়েছে যে, তারাও হয় সিঙ্গাপুর, নতুবা ব্রুনাই-এ সামরিক ঘাঁটি করতে যাচ্ছে। ফ্রান্সেরও প্রশান্ত মহাসাগরে রয়েছে কয়েকটা দ্বীপ উপনিবেশ। ইন্দোনেশিয়া-ভিয়েতনাম নৌ-বিরোধ দেখিয়ে দিচ্ছে যে, এই জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণে ইন্দোনেশিয়া একটা অংশ হতে চলেছে। বহুকাল ধরেই ইন্দোনেশিয়া শুধুমাত্র তার দ্বীপগুলির স্থলভাগের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও এখন কৌশলগত সমুদ্রপথগুলির নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। ইন্দোনেশিয়ার এহেন চিন্তা শুধু চীন নয়, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জাপান, কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলিকেও ভাবাবে।