Showing posts with label Novel Coronavirus. Show all posts
Showing posts with label Novel Coronavirus. Show all posts

Friday, 24 July 2020

ইন্দো-প্যাসিফিকে মার্কিন নৌশক্তির ফেরত আসার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব কতটুকু?

২৪শে জুলাই ২০২০

দক্ষিণ চীন সাগরে মহড়া দিচ্ছে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ 'নিমিতজ' এবং 'রোনাল্ড রেগ্যান'। চীনারা তাদের অপেক্ষাকৃত স্বল্পক্ষমতার নৌবহরকে মার্কিনীদের সক্ষমতার ফাঁকফোঁকড়ের মাঝে ব্যবহার করে মার্কিন নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে। আর এতে তারা বেশ সাফল্যও পেয়েছে। বিশ্বব্যাপী মার্কিনীদের বন্ধু এবং প্রতিযোগী সকলেই যুক্তরাষ্ট্রের এই সীমাবদ্ধতাগুলিকে অবলোকন করছে; যা কিনা তাদের নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অনুপ্রাণিত করছে।


করোনা মহামারির মাঝে ইন্দো-প্যাসিফিকে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি মোতায়েনের প্রতিযোগিতার খবর প্রতিনিয়তই পত্রিকাতে ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। পূর্ব এশিয়ার উপকূলে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের সবচাইতে দৃশ্যমান অস্ত্র হিসেবে দেখা যাচ্ছে বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজকে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজে করোনা সংক্রমণের মাঝে চীনারা এপ্রিলে প্রায় এক মাসের জন্যে তাদের একমাত্র বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘লিয়াওনিং’কে সমুদ্রে প্রেরণ করে। ৩০শে এপ্রিল জাহাজটা পূর্ব চীন সাগরে ‘ট্রেনিং’ মিশন শেষ করে চিংদাও বন্দরে ফিরে আসে। পূর্বের সমুদ্রে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের প্রায় ‘অনুপস্থিতি’র মাঝে চীনাদের এই ‘শক্তি প্রদর্শন’ মার্কিন শক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

৪ঠা মে জাপানের ইয়োকোসুকা বন্দর ছেড়ে যায় বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘রোনাল্ড রেগ্যান’। যুক্তরাষ্ট্রের ১১টা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের মাঝে ‘রেগ্যান’কেই রাখা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখন্ডের বাইরে। গত ২৭ মার্চে পূর্ব এশিয়ার উপকূলে মোতায়েনকৃত যুদ্ধজাহাজ ‘থিওডোর রুজভেল্ট’এ করোনাভাইরাসের মারাত্মক সংক্রমণ আবিষ্কারের পর ‘রোনাল্ড রেগ্যান’এও সংক্রমণ ধরা পরে। প্রায় দুই মাস মার্কিন প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপনিবেশ গুয়ামের নৌঘাঁটিতে বসে থাকার পর ‘থিওডোর রুজভেল্ট’ ১৯শে মে সমুদ্রে বের হয়। অপরদিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের আরেক যুদ্ধজাহাজ ‘নিমিতজ’ ২ বছরের মেইনটেন্যান্স শেষ করে ৮ই জুন যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়েগো থেকে যাত্রা করে। জটিল প্রযুক্তির কারণে এধরণের জাহাজকে মেইনটেন্যান্স থেকে অপারেশনে আনতে অনেক সময় লাগে। এর উপর আবার ‘রুজভেল্ট’এ করোনা সংক্রমণের কারণে অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে ক্রুদের টেস্ট করা এবং কোয়ার‍্যান্টিনে রাখার কারণে সমুদ্রে যেতে আরও দেরি হয়। ‘নিমিতজ’এর সমুদ্রে যাবার ৪ দিনের মাথায় ১২ই জুন ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ২০১৭ সালের পর প্রথমবারের মতো প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন নৌবাহিনী একসাথে ৩টা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে; বড় খবর বলে প্রচার পায় এটা। ২১শে জুন ‘নিমিতজ’ এবং ‘রুজভেল্ট’ যুদ্ধজাহাজের গ্রুপ একত্রে মহড়া দেয়া শুরু করে। ২৮শে জুন থেকে ‘নিমিতজ’ মহড়া দেয়া শুরু করে ‘রেগ্যান’এর সাথে। ‘নিমিতজ’এর ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ১১’এর কমান্ডার রিয়ার এডমিরাল জেমস ক্লার্ক এক বিবৃতিতে ঘোষণা দেন যে, বিশ্বে একমাত্র মার্কিন নৌবাহিনীরই এরকম শক্তি একত্রিত করার সক্ষমতা রাখে।

৬ই জুলাই মার্কিন মিডিয়া ‘সিএনএন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, দু’টা মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ একত্রে দক্ষিণ চীন সাগরে মহড়া দেয়া শুরু করেছে। জাহাজদু’টা হলো জাপান থেকে আসা ‘রেগ্যান’ এবং প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব প্রান্তে সান ডিয়েগো থেকে আসা ‘নিমিতজ’। বলা হয় যে, ২০১৪ সালের পর থেকে প্রথমবারের মতো দু’টা জাহাজ একত্রে মহড়া দেয়ার ঘটনা ঘটলো। ১৭ই জুলাই তারা আবারও ঘোষণা দেয় যে, জাহাজদু’টা একই মাসে দ্বিতীয়বারের মতো একত্রে মহড়া দেয়া শুরু করেছে। তবে প্রশান্ত মহাসাগরে তৃতীয় বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘থিওডোর রুজভেল্ট’ মিডিয়ার আলোচনার বাইরে থাকে। কারণ এরই মাঝে চুপিসারে ৯ই জুলাই জাহাজটা দেশে ফেরত যায়। ‘ইউএসএনআই নিউজ’ জানাচ্ছে যে, গত জানুয়ারিতে জাহাজটা সান ডিয়েগো ছেড়ে গিয়েছিল। মার্চ মাসে ভিয়েতনামে ভ্রমণ করার পরপরই জাহাজটাতে করোনার সংক্রমণ ধরা পরে। শেষ পর্যন্ত প্রায় ১২’শ সংক্রমণ ধরা পরেছিল। এই সংক্রমণের খবর বের হবার পর জাহাজের কমান্ডার ক্যাপ্টেন ব্রেট ক্রোজিয়ারকে চাকুরিচ্যুত করা হয়।

২০শে জুলাই ঘোষণা দেয়া হয় যে, ‘নিমিতজ’ যুদ্ধজাহাজ দক্ষিণ চীন সাগর থেকে বঙ্গোপসাগরে এসে হাজির হয়েছে। ভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে ভারত মহাসাগরে প্রায় পাঁচ মাস ভেসে থাকার পর যুদ্ধজাহাজ ‘আইজেনহাওয়ার’ দেশে ফেরার পর থেকে ভারত মহাসাগরে কোন মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ নেই। ‘নিমিতজ’কে দিয়ে এই শূণ্যস্থান পূরণ করানো হচ্ছে। অর্থাৎ জুনের মাঝামাঝি সময় থেকে প্রায় একমাস ধরে প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর দাপিয়ে বেড়ানোর পালা শেষ হয়েছে। এর পরবর্তীতে ‘রেগ্যান’এর সাথে প্রশান্ত মহাসাগরে আরেকটা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করতে বেশ কয়েকমাস লেগে যেতে পারে। ‘কিটসাপ সান’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘কার্ল ভিনসন’ ওয়াশিংটন রাজ্যের ব্রেমারটনে দেড় বছরের মেইনটেন্যান্স শেষ করে অগাস্টের শুরুতে সান ডিয়েগোতে ফেরত আসার কথা রয়েছে। এরপর এর সমুদ্রে যাবার প্রস্তুতি শুরু হবে। ‘জন সি স্টেনিস’, ‘জর্জ ওয়াশিংটন’ এবং ‘জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ’ লম্বা সময়ের জন্যে ড্রাইডকে রয়েছে। নতুন জাহাজ ‘জেরাল্ড আর ফোর্ড’এর নতুন প্রযুক্তির টেস্টিং এখনও শেষ হয়নি; তাই এখনই পুরোপুরি সার্ভিসে আসছে না। ১০ মাসের মিশন শেষ করে জানুয়ারিতে সান ডিয়েগোতে ফেরত যাওয়া ‘আব্রাহাম লিঙ্কন’ খুব শিগগিরই আবার সাগরে যাচ্ছে না। ৭ মাসের মিশন শেষ করে জুনের মাঝামাঝি নরফোক নৌঘাঁটিতে ফিরেছে ‘হ্যারি এস ট্রুম্যান’। টানা ১৬১ দিন কোন বন্দরে না ভিড়ে রেকর্ড করা ‘আইজেনহাওয়ার’এর নাবিকরা ভূমিতে পা ফেলার জন্যে উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছিল। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’এর সাথে সাক্ষাতে এই জাহাজের রক্ষার দায়িত্বে থাকা মার্কিন ক্রুজার ‘সান জেসিন্টো’র ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ড ক্রসম্যান বলেন যে, কিছু নাবিক তার কাছে জানতে চেয়েছে যে, কোন জাহাজটা আগে বন্দরে নোঙ্গর করবে।

বিশাল সমরশক্তি থাকার পরেও মানব বাস্তবতাগুলি থেকে মার্কিনীরা বের হতে পারেনি। ১ লক্ষ টনের দৈত্যাকৃতির মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজগুলি যতোটাই শক্তিশালী হোক না কেন, তা সমুদ্রে কতটা সময় কাটাতে পারবে, তা নির্ভর করছে নাবিকদের সক্ষমতার উপর। আর অতি জটিল এবং উচ্চমূল্যের এই প্রযুক্তিকে চালু রাখতে ব্যাপক খরচ ছাড়াও নৌবহরের একটা বড় অংশকে মেইনটেন্যান্সের মাঝে থাকতে হচ্ছে। ক’দিন আগেই উভচর এসল্ট শিপ ‘বনহোমি রিচার্ড’এ ভয়াবহ আগুন এবং ২০১৭ সালে দু’টা ডেস্ট্রয়ারের দুর্ঘটনার পর দুই বছর সার্ভিসের বাইরে থাকার ঘটনা নৌবাহিনীর অপারেশনাল দক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এপ্রিল মাসে দক্ষিণ চীন সাগরে ‘এফ-৩৫’ স্টেলথ ফাইটার বহণে সক্ষম এরকমই একটা এসল্ট শিপ ‘আমেরিকা’ মার্কিন উপস্থিতিকে জিইয়ে রেখেছিল। চীনারা তাদের অপেক্ষাকৃত স্বল্পক্ষমতার নৌবহরকে মার্কিনীদের সক্ষমতার ফাঁকফোঁকড়ের মাঝে ব্যবহার করে মার্কিন নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে। আর এতে তারা বেশ সাফল্যও পেয়েছে। বিশ্বব্যাপী মার্কিনীদের বন্ধু এবং প্রতিযোগী সকলেই যুক্তরাষ্ট্রের এই সীমাবদ্ধতাগুলিকে অবলোকন করছে; যা কিনা তাদের নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অনুপ্রাণিত করছে।

Saturday, 13 June 2020

করোনাভাইরাস রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক আকাংক্ষাকে কমাবে না বাড়াবে?

১৩ই জুন ২০২০
     
রাশিয়ার জাতীয় দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠান। করোনাভাইরাসের লকডাউন তুলে নেবার পর রাশিয়ায় এটাই প্রথম বড় অনুষ্ঠান।
১২ই জুন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মস্কোতে জাতীয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে পতাকা উত্তোলন করেন। ‘বিবিসি’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে গত ৯ই মের পর থেকে পুতিন প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে আসলেন। করোনাভাইরাসের কারণে রাশিয়ার ঐতিহ্যবাহী প্যারেড ২৪শে জুন পর্যন্ত স্থগিত করা হয়। রাশিয়াতে মহামারি ঠেকাতে বলবত করা লকডাউন এখন উঠিয়ে নেয়া হচ্ছে। ১লা জুলাই পুতিন রাশিয়ার সংবিধান পরিবর্তনের জন্যে গণভোট ডেকেছেন। অভিযোগ রয়েছে যে, গণভোটে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করার জন্যে জনগণকে শপিং ভাউচার দেবার পরিকল্পনা করা হয়েছে। করোনা পরিস্থিতির মাঝে রাশিয়া খুব খারাপ সময় পার করছে। ৫ লক্ষ ১১ হাজারেরও বেশি মানুষ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে; যার মাঝে কমপক্ষে ৬ হাজার ৭’শ ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। অনেকেরই অভিযোগ যে, রুশ সরকার মৃতের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ করছে না। জনগণের একটা বড় অংশ সরকারি সাহায্যের উপর বেঁচে আছে। বিভিন্ন সেচ্ছাসেবী সংগঠন রাস্তায় মানুষকে খাবার সরবরাহ করছে। ভ্লাদিমির পুতিনের জনপ্রিয়তা গত দুই দশকের মাঝে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এমন অবস্থাতেই পুতিন গণভোট ডেকেছেন। এই গণভোটে অনুমোদন পেলে ২০২৪ সালে পুতিনের বর্তমান ছয় বছরের ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হলে তিনি আরও দুই বার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। অর্থাৎ কাগজে কলমে হলেও ৬৭ বছর বয়স্ক পুতিন ২০৩৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতা ধরে রাখার সুযোগ পাবেন।

করোনাভাইরাসের লকডাউনও যেন যথেষ্ট ছিল না। মার্চ মাসে রাশিয়া এবং সৌদি আরব তেলের বাজারে অদ্ভুত এক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়, যার কারণে করোনা দুর্যোগে চাহিদা কমে যাওয়ার পরও ব্যাপকভাবে সরবরাহ বৃদ্ধি পায়। ফলস্বরূপ তেলের বাজারে রেকর্ড দরপতনের পর রুশ অর্থনীতি ব্যাপক ধাক্কা খেয়েছে। তেল বিক্রির উপর রাশিয়ার জিডিপির ৩০ শতাংশ নির্ভরশীল। অথচ তেলের বাজারের নিয়ন্ত্রণে নেই রাশিয়া। এই বাস্তবতাই রাশিয়াকে বিপদে ফেলেছে। ‘সিএনবিসি’র সাথে এক সাক্ষাতে কাতারের জ্বালানি মন্ত্রী সাদ আল-কাবি বলেন যে, রাশিয়া এবং সৌদি আরবের তেলের বাজারের প্রতিযোগিতা একটা বড় ভুল ছিল। আর একারণে এখন কেউ উৎপাদনেই যেতে পারছে না।

তবে এত দুর্যোগের মাঝেও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থেকে ঝরে পড়তে চাইছে না পুতিনের রাশিয়া। লিবিয়া এবং সিরিয়াতে রুশ ভূরাজনৈতিক আকাংক্ষা রয়েছে। ২৯শে মে মার্কিন সামরিক বাহিনীর আফ্রিকা কমান্ডের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গ্রগরি হ্যাডফিল্ড বলেন যে, তারা তথ্য পেয়েছেন যে রুশরা লিবিয়াতে ১৪টা ফাইটার বিমান মোতায়েন করেছে। মার্কিনীরা বলছে যে, লিবিয়াতে এই বিমানগুলি মোতায়েনের মাধ্যমে রাশিয়া ইউরোপের দক্ষিণ দিক থেকে ইউরোপকে হুমকিতে ফেলতে পারে। বিমানগুলি রাশিয়া থেকে সিরিয়া হয়ে লিবিয়া পৌঁছায়। তবে রাশিয়াকে চাপে রাখার জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে অনেকগুলি কার্ড রয়েছে। ১১ই জুন মার্কিন কংগ্রেসে ইউক্রেনের জন্যে আড়াই’শ মিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তার ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনা পাস করা হয়।

‘মিলিটারি টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, রাশিয়ার সীমানার কাছাকাছি বল্টিক সাগরে ন্যাটোর বার্ষিক নৌ মহড়া ‘ব্যালটপস ২০২০’তে নেতৃত্ব দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ১১ই জুন রুশ বল্টিক ফ্লিটের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, কয়েক ডজন রুশ ‘সুখোই ২৪’, ‘সুখোই ২৭’ এবং ‘সুখোই ৩০’ যুদ্ধবিমান একই সময়ে পাল্টা এক মহড়ায় অংশ নিচ্ছে। রাশিয়া বারংবারই তার সীমানার কাছাকাছি ন্যাটোর সামরিক মহড়াকে রাশিয়ার জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে দেখছে বলে বলছে। শুধু বল্টিকেই নয়; রাশিয়া চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মহড়ার জবাব সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সীমানায় দিতে। ১০ই জুন যুক্তরাষ্ট্রের ‘নর্থ আমেরিকান এরোস্পেস ডিফেন্স কমান্ড’ বা ‘নোরাড’এর এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, মার্কিন বিমান বাহিনীর বিমান আলাস্কা থেকে মাত্র ২০ নটিক্যাল মাইল দূরে রুশ বিমান বাহিনীর ৫টা বিমানকে বাধা দেয়। এরপর আরও তিনটা রুশ বিমান আলাস্কার ৩২ নটিক্যাল মাইলের মাঝে চলে আসে। তবে ‘নোরাড’ বলছে যে, রুশ বিমানগুলি আন্তর্জাতিক আকাশ সীমাতেই অবস্থান করছিলো। এছাড়াও বল্টিক সাগরে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি এবং রাশিয়ার ত্রিমুখী উত্তেজনা চলছে গ্যাস পাইপলাইন তৈরি নিয়ে। রাশিয়া আশেপাশের সকল দেশকে বাইপাস করে ‘নর্ড স্ট্রিম ২’ পাইপলাইন তৈরি করছে জার্মানি পর্যন্ত, যা রাশিয়ার অর্থনীতির জন্যে অতি জরুরি। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে না যে, রুশ গ্যাসের উপর জার্মানির নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পাক। এই লক্ষ্যে মার্কিন কংগ্রেস এই প্রকল্পে অংশ নেয়া কোম্পানিগুলির উপর অবরোধ দেয়ার জন্যে আইন পাস করছে। ১২ই জুন জার্মান অর্থ মন্ত্রণলায়রের এই প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জার্মান পত্রিকা ‘ফ্রাঙ্কফুরটার আলেমাইন জাইটুং’ বলে যে, মার্কিন অবরোধ জার্মান কোম্পানি ছাড়াও সরকারি সংস্থাগুলিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

বল্টিক সাগর ছাড়াও গত পহেলা মে মার্কিন এবং ব্রিটিশ নৌবাহিনী নরওয়ের উত্তরে আর্কটিকের কাছাকাছি নৌ মহড়ায় অংশ নেয়। এরও আগে মার্চের শুরুতে ব্রিটিশ নেতৃত্বে নরওয়েতে ১৬ হাজার সৈন্যের বড়সড় সামরিক মহড়া শুরু হয়। ‘দ্যা ব্যারেন্টস অবজারভার’ বলছে যে, শূণ্যের ২০ ডিগ্রি নিচের তাপমাত্রায় অনুষ্ঠিত দুই সপ্তাহের এই মহড়ার নাম ছিল ‘এক্সারসাইজ কোল্ড রেসপঞ্জ ২০২০’। এই মহড়া শেষ হতে না হতেই জবাব হিসেবে রাশিয়া তার সামরিক শক্তিকে ব্রিটেনের আশেপাশে মোতায়েন করে। একসাথে ৭টা রুশ যুদ্ধজাহাজ কয়েকদিন ধরে ইংলিশ চ্যানেলের আশেপাশে দিয়ে ঘোরাঘুরি করে। এর জবাবে ব্রিটিশ রয়াল নেভি একত্রে ৯টা যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করতে বাধ্য হয়। এছাড়াও ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ বলছে যে, রুশ বিমান বাহিনীর বোমারু বিমানগুলি শেটল্যান্ড আইল্যান্ডের উত্তরে এসে হাজির হয়। ব্রিটিশ রয়াল এয়ার ফোর্সের ‘টাইফুন’ ফাইটার বিমান রুশ বিমানগুলিকে বাধা দেয়।

‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় ব্যারেন্টস সাগর, বল্টিক সাগর, কৃষ্ণ সাগরে রাশিয়াকে ব্যাতিব্যস্ত রাখতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন। তবে পুতিনের রাশিয়াও এর জবাব দিতে চাইছে বিভিন্নভাবে। এবং একইসাথে লিবিয়া এবং সিরিয়াতেও সে তার অবস্থান ধরে রাখতে চাইছে। কিন্তু করোনা দুর্যোগ এবং তেলের বাজারে মন্দার মাঝে দুর্বল অর্থনীতি নিয়ে রাশিয়া এই প্রতিযোগিতাকে কতদূর এগিয়ে নিতে পারবে, তা প্রশ্নবিদ্ধ।

Monday, 8 June 2020

ক্যারিবিয়ানে কানাডার কি স্বার্থ রয়েছে?

০৯ই জুন ২০২০
  
ভেনিজুয়েলাতে মাদুরোর বিরুদ্ধে মিশন যে ব্যর্থ হবে, তা যদি সকলেই আগে থেকেই জানে, তাহলে এই মিশন কেন বাস্তবায়িত হলো? এই মিশনের নেতা গুডরোর স্বার্থই বা কি ছিলো? আর এক্ষেত্রে তার যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার নাগরিকত্ত্বের মাঝে কোন দ্বন্দ্ব আছে কিনা?

মে মাসের শুরুতে ভেনিজুয়েলার সরকার বলে যে, তারা প্রেসিডেন্ট মাদুরোর বিরুদ্ধে একটা ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়েছে। তারা বলে যে, সমুদ্রপথে কলম্বিয়া থেকে আসা কিছু ভাড়াটে সেনাকে তারা হত্যা করেছে এবং কিছু সেনাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দু’জন মার্কিন নাগরিককে তাদের পাসপোর্ট এবং অন্যান্য পরিচয়পত্রসহ টেলিভিশনে দেখানো হয়। এরা হলেন ৪১ বছর বয়সী এইরান ব্যারি এবং ৩৪ বছর বয়সী লিউক ডেনমান। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, এরা উভয়েই মার্কিন সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্সের প্রাক্তন সদস্য ছিলেন বলে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে। এই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় অবস্থিত ‘সিলভার কর্প’ নামের একটা নিরাপত্তা কোম্পানির মালিক জরডান গুডরো দাবি করেন যে, এই মিশন তিনি পরিকল্পনা করেছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসা। তিনি আরও দাবি করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত ভেনিজুয়েলার নেতা হুয়ান গুয়াইদোর সাথে চুক্তি মোতাবেক তিনি এই অপারেশনে যান। তবে গুয়াইদো তাকে পারিশ্রমিক দেননি বলেও বলেন তিনি। ভেনিজুয়েলার টেলিভিশনে দেখানো মার্কিন সেনারা দাবি করেন যে, মিশনে যাবার সময় তারা তাদের সাথে গুয়াইদোর স্বাক্ষরিত চুক্তিপত্রও নিয়ে গিয়েছেন। মাদুরো দাবি করেন যে, মিশন চালানো ব্যক্তিরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিরাপত্তা বাহিনীর লোক। গুয়াইদো এবং ট্রাম্প প্রশাসন উভয়েই এই মিশনের সাথে জড়িত থাকার কথা পুরোপুরি অস্বীকার করে। ‘ভোক্স’ ম্যাগাজিনের সাথে কথা বলতে গিয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর প্রাক্তন স্পেশাল ফোর্সের সদস্য এফরাহিম মাত্তোস বলেন যে, পুরো বিষয়টা এতটাই হাস্যকর যে, এটা কখনোই কাজ করার কথা নয়। এটাকে তিনি বদ্ধ উন্মাদের কাজ বলে উল্লেখ করেন। ‘আল জাজিরা’র এক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রশ্ন করা হয় যে, এই মিশন যে ব্যর্থ হবে, তা যদি সকলেই আগে থেকেই জানে, তাহলে এই মিশন কেন বাস্তবায়িত হলো?

কে এই জরডান গুডরো? ১৯৭৬ সালে গুডরো কানাডার ক্যালগারিতে জন্ম নেন। কলেজ শেষ করে তিনি কানাডার সামরিক বাহিনীতে ঢোকেন। তবে পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এবং ২০০১ সালে মার্কিন সেনাবাহিনীতে নাম লেখান। তিনি সেখানে স্পেশাল ফোর্সের সদস্যও হয়ে যান। ‘১০ম স্পেশাল ফোর্সেস গ্রুপ’এর সার্জেন্ট ফার্স ক্লাস পদ পান তিনি। তিনি বিভিন্ন সামরিক মিশনে অংশ নেন এবং ২০১৪ সালের অগাস্টে একটা প্যারাসুট দুর্ঘটনার পর ২০১৬ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। অবসরের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নেন। ২০১৮ সালে তিনি ‘সিলভার কর্প’ নামের একটা নিরাপত্তা কোম্পানি চালু করেন। ২০১৮ সালের ২৬শে অক্টোবর নর্থ ক্যারোলিনার শারলোটসভিলে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের নিরাপত্তার কাজও করেন তিনি, যা ছবিতে দেখাও যায়। মাদুরো এই ব্যাপারটাকেই টার্গেট করেছেন।

এই অদ্ভূত ঘটনার পর প্রশ্ন আসছে যে, এই মিশনের উদ্দেশ্যই কি ছিলো ব্যর্থ হওয়া? গুয়াইদো যদি অর্থায়ন না করে থাকেন, তাহলে কেই বা অর্থায়নই করেছে? এখানে গুডরোর স্বার্থই বা কি ছিলো? কানাডার নাগরিক হওয়াতে ব্যাপারটা আরও ঘনীভূত হয়েছে। আর ভেনিজুয়েলার সাথে কিউবার ভালো সম্পর্ক থাকার কারণে এখানে কিউবার কোন ভূমিকা আছে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তবে সবচাইতে বড় প্রশ্ন হলো, গুডরো সরাসরি ব্যাপারটাকে স্বীকার করে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকেই আঘাত করেছেন কিনা? আর এক্ষেত্রে তার যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার নাগরিকত্ত্বের মাঝে কোন দ্বন্দ্ব আছে কিনা? মধ্য আমেরিকা, তথা ক্যারিবিয় অঞ্চলে কানাডার কর্মকান্ডের ইতিহাস দেখলে অনেক কিছুই হিসেব থেকে বাদ দেয়া সম্ভব নয়। ক্যারিবিয়ানে যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার আড়াই’শ বছরের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার ইতিহাসটাই এখন আলোচনায় চলে আসছে।
   
১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘সারাটোগা’ পানামা খাল পারি দিচ্ছে। এই খাল যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টিক এবং প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলকে যোগ করেছে। এই খাল তৈরি করার পর যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবিয়ানের নিরাপত্তা নিয়ে আরও গভীরভাবে চিন্তা করতে থাকে। ফলশ্রুতিতে ক্যারিবিয়ানে প্রভাব বিস্তার নিয়ে ব্রিটেনের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় তারা।

পানামা খাল ও এর নিরাপত্তা

১৭৭৬ সালে নতুন রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্মের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র আমেরিকা মহাদেশে ইউরোপিয় প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করতে থাকে। ঊনিশ শতকের শুরুতে দক্ষিণ আমেরিকায় অনেকগুলি দেশ ব্রিটিশ সহায়তায় স্পেন থেকে আলাদা হয়ে যায়। এই সময়েই ১৮২৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো ঘোষণা দেন যে, এখন থেকে ইউরোপিয় শক্তিরা যদি আমেরিকায় কোন স্বাধীন দেশের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রচেষ্টাকে নিজের স্বার্থবিরুদ্ধ মনে করবে। ১৮৫০ সাল নাগাদ জেমস মনরোর এই চিন্তাটা ‘মনরো ডকট্রাইন’ নামে পরিচিতি পায়। যুক্তরাষ্ট্রের জন্মের সময় শুধুমাত্র আটলান্টিক উপকূলের ১৩টা রাজ্য নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল। এরপর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম দিকে তার স্থলভাগ বৃদ্ধি করতে থাকে। ১৮৪৬ সাল নাগাদ ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত মার্কিন নিয়ন্ত্রণ পৌঁছে গেলে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃতি পূর্বে আটলান্টিকের উপকূল থেকে পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এর ফলশ্রুতিতে যুক্তরাষ্ট্রের দুই উপকূলকে সমুদ্রপথে যুক্ত করার চিন্তাটা শক্তিশালী হতে থাকে। এর আগেই ১৮২৬ সালে স্পেন থেকে নতুন আলাদা হয়ে যাওয়া ‘গ্র্যান কলম্বিয়া’র নেতৃবৃন্দের সাথে মার্কিন কর্মকর্তারা মধ্য আমেরিকায় একটা খাল তৈরির প্রকল্প নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন। এই খালের মাধ্যমে আটলান্টিক এবং প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করা যাবে। তবে গ্র্যান কলম্বিয়ার নেতা সিমন বলিভার এই প্রস্তাবে রাজি হননি। ১৮৪৬ সালে ‘গ্র্যান কলম্বিয়া’ থেকে আলাদা হয়ে তৈরি হওয়া ‘নিউ গ্রানাডা’র (পরবর্তী কলম্বিয়া) সাথে মার্কিনীরা এক চুক্তি করে। চুক্তি মোতাবেক যুক্তরাষ্ট্র পানামা যোযকের স্থানে আটলান্টিক উপকূল থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল পর্যন্ত ৭৭ কিঃমিল লম্বা একটা রেললাইন তৈরি করে। ১৮৫৫ সালে এই রেললাইন উন্মুক্ত হয়। এই সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টিক উপকূল থেকে জাহাজ পানামা পর্যন্ত যেত। এরপর রেললাইনের মাধ্যমে মানুষ প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল পর্যন্ত গিয়ে আরেকটা জাহাজে উঠে ক্যালিফোর্নিয়া যেত। ফরাসীরা এই রেললাইনের সমান্তরালে একটা খাল তৈরি করার চেষ্টা শুরু করে ১৮৮১ সালে। তবে ১৮৯৪ সাল নাগাদ তারা ব্যর্থ হবার পর যুক্তরাষ্ট্রের সামনে কোন ইউরোপিয় বাধা থাকে না। ১৯০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপে কলম্বিয়া থেকে পানামা আলাদা হয়ে যায় এবং পানামার সাথে খাল খননের জন্যে মার্কিন সরকার একটা চুক্তি করে। এই চুক্তি মোতাবেক ১৯০৪ থেকে ১৯১৪ সালের মাঝে পানামা খাল তৈরি করে। এখানকার নিরাপত্তার দায়িত্ব থাকে পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের উপর। এই খালের নিরাপত্তা দিতে খালের পূর্বদিকে ক্যাবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ভাবতে শুরু করে।

পানামা খাল তৈরি করার আগেই যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকো উপসাগর এবং ক্যারিবিয়ান সাগরে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা উপকূল থেকে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত। পশ্চিমে কিউবা থেকে শুরু করে এই পূর্বে ত্রিনিদাদ টোবাগোর মাধ্যমে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের সমাপ্তি। মেক্সিকো উপসাগর এবং ক্যারিবিয়ান সাগরকে খাঁচার মতো ঘিরে রেখেছে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ। এই ভৌগোলিক বাস্তবতায় পানামা খাল দিয়ে যাতায়াত করা জাহাজগুলিকে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল পৌঁছাতে হলে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের মাঝ দিয়ে যাওয়া প্রণালিগুলি পার হয়ে যেতে হবে। কিন্তু ঊনিশ শতকের শুরুতে এই দ্বীপগুলির সবগুলিই ছিল ইউরোপিয় শক্তিদের হাতে। ১৮৫৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণের মানুষেরা কিউবাকে কিনে নেবার প্রস্তাব দিলেও সেটা উত্তরের মার্কিনীদের বিরোধের কারণে সফল হয়নি। দ্বীপগুলির মাঝে সবচাইতে বড় দ্বীপ কিউবাতে স্প্যানিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের উস্কে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ১৮৯৪ সাল নাগাদ বাণিজ্যের জন্যে কিউবা স্পেনের চাইতে যুক্তরাষ্ট্রের উপরেই বেশি নির্ভরশীল ছিল। যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের স্বার্থ রক্ষায় ১৮৯৮ সালে স্পেনের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। চার মাসের এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র স্পেনের কাছ থেকে ক্যারিবিয়ানের দ্বীপ পুয়ের্তো রিকো দখল করে নেয়। কিউবাকে স্বাধীনতা দিতে বাধ্য হয় স্প্যানিশরা। একইসাথে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ফিলিপাইন এবং গুয়ামকে দখল করে নেয় যুক্তরাষ্ট্র।

এছাড়াও পুয়ের্তো রিকো এবং ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের মাঝে অবস্থিত ডেনমার্কের অধীনে থাকা ড্যানিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জকে যুক্তরাষ্ট্র নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছিল। ১৮৫০এর দশকেই মার্কিন কর্মকর্তারা ডেনমার্কের কাছ থেকে এই দ্বীপগুলি কিনে নিতে চাইছিল। তবে মার্কিন সিনেট একমত হতে না পারায় এই ক্রয় সম্ভব হয়নি। এরপর ১৮৯৯ থেকে ১৯০২ সালের মাঝে আরও একবার দীপগুলি কেনার কথা আসলে ড্যানিশ পার্লামেন্টের একমত না হতে পারার কারণে প্রকল্প ভেস্তে যায়। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাঝে ১৯১৬ সালে ডেনমার্কের যখন জার্মানির হাতে চলে যাবার সম্ভাবনা তৈরি হয়, তখন ২৫ মিলিয়ন ডলারে দ্বীপগুলি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রি করে দেয়ার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়ে যায়। এই চুক্তির অধীনে যুক্তরাষ্ট সেন্ট ক্রই, সেন্ট জন এবং সেন্ট থমাস দ্বীপ পেয়ে যায়। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো পুয়ের্তো রিকো এবং এই দ্বীপগুলির মাঝ দিয়ে প্রায় ৪০ কিঃমিঃ প্রস্থের সমুদ্র প্রণালী পুরোপুরিভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আসে।
  
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ত্রিনিদাদে ‘ওয়ালার’ বিমান ঘাঁটিতে মার্কিন ‘বি-২৪’ এন্টি-সাবমেরিন বোমারু বিমান। অস্ত্র সহায়তা দেয়ার বিনিময়ে মার্কিনীরা ক্যারিবিয়ানে ব্রিটিশ দ্বীপগুলিতে ৯৯ বছরের জন্যে ঘাঁটি লীজ পেয়ে যায়। ব্রিটেনের উপর জার্মানির চাপ যখন সর্বোচ্চ, তখনই যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনের কাছ থেকে ঘাঁটিগুলি আদায় করে নেয়।

ডেস্ট্রয়ারের বিনিময়ে ব্রিটিশ ঘাঁটি

ক্যারিবিয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরও দৃঢ় হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝে। ১৯৪০ সালে জার্মান সৈন্যরা যখন ফ্রান্সের মাঝ দিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তখন মার্কিন সরকার যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত ফিলিপ কারএর মাধ্যমে লন্ডনের কাছে প্রস্তাব পাঠায়, যাতে কানাডার আটলান্টিক উপকূলের নিউফাউন্ডল্যান্ড এবং ক্যারিবিয়ানে ত্রিনিদাদ এবং বার্মুডায় ব্রিটিশ বিমান ঘাঁটিগুলি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে লিজ দেয়ার করা বলা হয়। ২৭শে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সামরিক সহায়তার বিনিময়ে এই ঘাঁটি দিতে রাজি হন। ব্রিটিশরা আটলান্টকে জার্মান সাবমেরিনের হাত থেকে ব্রিটিশ সমুদ্র বাণিজ্য রক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নৌবাহিনীর কিছু পুরোনো ডেস্ট্রয়ার চায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র তাতে তৎক্ষণাৎ রাজি হয়নি। অবশেষে অগাস্টের শেষে যখন ব্রিটেন জার্মানির দ্বারা একেবারেই কোণঠাসা হয়ে যায়, তখন দুই দেশ সমঝোতায় পৌঁছায়। চুক্তি অনুযায়ী ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ৫০টা ডেস্ট্রয়ার লাভ করে। আর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ড উপকূলে ৪টা বিমান ঘাঁটি এবং ক্যারিবিয়ানে বার্মুডা, এন্টিগা, বাহামা, ব্রিটিশ গায়ানা, জামাইকা, সেন্ট লুসিয়া এবং ত্রিনিদাদে বিমান ও নৌঘাঁটি ৯৯ বছরের জন্যে লীজ পায়। আর এই লীজের জন্যে যুক্তরাষ্ট্রকে কোন অর্থ দিতে হবে না! এর মাধ্যমে এক শতকের জন্যে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবিয়ানে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করে ফেলে।

ক্যারিবিয়ানে ব্রিটিশ উপনিবেশগুলির মাঝে বাহামা, জামাইকা, এন্টিগা, সেন্ট কিটস এন্ড নেভিস, ডমিনিকা, সেন্ট লুসিয়া, ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগো এবং গায়ানাকে ব্রিটিশরা স্বাধীনতা দেয়। ১৯৬০এর দশক থেকে ১৯৮০এর দশকের মাঝে এই উপনিবেশগুলিকে স্বাধীনতা দেয়া হয়। তবে দ্বীপগুলি অনেকক্ষেত্রেই রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়াতে সক্ষম ছিল না। ব্রিটিশদের অধীনে থাকা এই অঞ্চলগুলিতে ইংরেজি ছিল অফিশিয়াল ভাষা। মূলতঃ এই ইংরেজি ভাষাভাষি অঞ্চলগুলিতে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ব্রিটিশ কমনওয়েলথের প্রতিযোগিতা চলছে। তবে বাকি দ্বীপগুলি নিয়েও চলছে প্রতিযোগিতা; যেমন একসময় স্প্যানিশদের অধীনে থাকা কিউবা ও ডমিনিকান রিপাবলিক; এবং ফরাসীদের অধীনে থাকা হাইতি। এই দ্বীপগুলিতে যথাক্রমে স্প্যানিশ ও ফরাসী ভাষা চলে। প্রভাব বিস্তারের খেলায় কোন দ্বীপই বাদ যাচ্ছে না।
   
অনেকেই মনে করছেন যে, হাইড্রোকার্বন এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে আবারও পরিবর্তন করবে। তবে চিনি, মদ, কফি, কলা, বক্সাইট, পর্যটন, ব্যাংকিং, টেক্সটাইল বা হাইড্রোকার্বন কোনটাই ক্যারিবিয়ানের সাথে কানাডার গভীর সম্পর্কের মূল কারণ নয়। ক্যারিবিয়ানে শক্ত অবস্থানে থাকার কারণেই কানাডা এখানকার ব্যবসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পেরেছে। আর এই শক্ত অবস্থানের ভিত্তি রাজনৈতিক। ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার মাঝেই কানাডার প্রভাব বিস্তারের বীজ নিহিত।

ক্যারিবিয়ানের অর্থনীতিতে কানাডা

ষোড়শ শতক থেকেই ক্যারিবিয়ানে ইউরোপিয় ঔপনিবেশিকেরা আখের চাষ শুরু করে চিনি উৎপাদন শুরু করে। সেখানকার বাসিন্দাদের নির্মূল করে ফেলার পর চিনি শিল্পে কাজ করাতে ইউরোপিয়রা আফ্রিকা থেকে লক্ষ লক্ষ ক্রীতদাস নিয়ে আসে। চিনি শিল্পের সাথে মদও উৎপাদিত হতো। কলা, কোকোয়া, কফি এবং তামাকও যুক্ত হয় অর্থকরী ফসল হিসেবে। তবে সকল খাদ্যশস্যই আমেরিকার মূল ভূখন্ড থেকে আসতে হতো। মোটামুটিভাবে ঊনিশ শতকের প্রথমভাগ পর্যন্ত চিনির ব্যবসা ভালোভাবে চললেও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে আখ এবং বীট চাষ শুরু হওয়ায় চিনির মূল্যে ধ্বস নামে এবং ক্যারিবিয়ানের ভাগ্যে ব্যাপক পরিবর্তন আসে।

অষ্টাদশ শতকের শুরুর দিকে উত্তর আমেরিকার ফরাসী উপনিবেশগুলির সাথে ক্যারিবিয়ানের ফরাসী উপনিবেশগুলির বেস বাণিজ্য চলছিল। বর্তমান কানাডার আটলান্টিক উপকূলে নোভা স্কোশিয়ার সাথেই মূলতঃ এই বাণিজ্য চলছিল। ১৭৫৬ থেকে ১৭৬৩ সালের মাঝে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের মাধ্যমে ব্রিটেন ফ্রান্সের কাছ থেকে পুরো উত্তর আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এর ফলশ্রুতিতে নোভা স্কোশিয়ার সাথে নয়, বরং বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টিক উপকূলের বন্দরগুলির সাথে ক্যারিবিয়ানের বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়। ১৭৭৬ সালে ব্রিটেন থেকে যুক্তরাষ্ট্র আলাদা হয়ে গেলেও ক্যারিবিয়ানের বাণিজ্য যুক্তরাষ্ট্রের সাথেই হতে থাকে। ১৮৬০এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত কানাডার বণিকেরা ক্যারিবিয়ানের সাথে বাণিজ্য বৃদ্ধির কিছুটা চেষ্টা করেন। তবে উৎপাদন বেশি এবং পণ্যের ভিন্নতার কারণে মার্কিনীরাই ক্যারিবিয়ানে এগিয়ে থাকে। শুল্ক বাধা উঠিয়ে দেবার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবিয়ানের দ্বীপগুলিতে তার প্রভাব বাড়াতে থাকে। ক্যারিবিয়ানের বাণিজ্যের উপর নির্ভর করে কানাডায় বিভিন্ন শিল্প গড়ে ওঠে।

১৯৫০এর দশক থেকে জাতিসংঘ এবং বিশ্বব্যাংকের উপদেশে ক্যারিবিয়ানে পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন শুরু হয়। ক্যারিবিয়ানের কিছু দ্বীপ দেশে জিডিপির ৫০ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পর্যটনের উপর নির্ভরশীল। ‘ক্যারিবিয়ান ট্যুরিজম অর্গানাইজেশন’এর বরাত দিয়ে ‘ক্যারিবিয়ান জার্নাল’ বলছে যে, ২০১৯ সালে ক্যারিবিয় দ্বীপপুঞ্জে ৩ কোটি ১৫ লক্ষ পর্যটক ভ্রমণ করে। এদের মাঝে প্রায় ৩ কোটি পর্যটকই লাক্সারি ক্রুজ লাইনারে চড়ে ক্যারিবিয়ানে আসে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে সর্বোচ্চ ১ কোটি ৫৫ লক্ষ পর্যটক আসলেও প্রায় ৩৪ লক্ষ পর্যটক নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কানাডা। নিজস্ব জনসংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি কানাডিয় নাগরিক ক্যারিবিয়ানে ভ্রমণ করে থাকে।

তবে এখানকার কিছু দেশের অর্থনীতি অন্য সেক্টরের উপর নির্ভরশীল। হাইতির অর্থনীতির বেশিরভাগটাই রেডিমেড গার্মেন্টস রপ্তানির উপর নির্ভরশীল। জামাইকার অর্থনীতিতে আবার এলুমিনিয়ামের কাঁচামাল বক্সাইট খনির গুরুত্ব অনেক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এলুমিনিয়ামের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবার পর ১৯৫০এর দশক থেকে জামাইকাতে বক্সাইট খনি উত্তোলন শুরু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনীর অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত সকল এলুমিনিয়ামের প্রায় ৪০ ভাগ উৎপাদন করেছিল কানাডা। তাই জামাইকার বক্সাইট খনিতে কানাডার আগ্রহ ছিল সবচাইতে বেশি। কানাডা বর্তমানে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম এলুমিনিয়ান উৎপাদনকারী দেশ। নিজেদের এরোস্পেস ইন্ডাস্ট্রি এবং যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির উপর ভিত্তি করে কানাডা এই অবস্থানে পৌঁছেছে। তবে নিজের দেশে বক্সাইটের খনি না থাকায় কানাডিয়রা একসময় ১৯৭০এর দশক পর্যন্ত জামাইকার উপরেই নির্ভরশীল ছিল। বর্তমানে কানাডা তার বেশিরভাগ বক্সাইট ব্রাজিল এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে আনে। তবে জামাইকা এখনও কানাডার সবচাইতে কাছের বক্সাইট খনি। তাই কানাডার কাছে এখানকার খনির কৌশলগত গুরুত্ব অনেক।

ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগোর অর্থনীতিতে পর্যটনের চাইতে তেল গ্যাস উত্তোলনের গুরুত্ব অনেক। সেখানে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন ছাড়াও পেট্রোকেমিক্যাল ইন্ড্রাস্ট্রিতে ব্যাপক বিনিয়োগ হয়েছে। একসময় এমোনিয়া এবং মিথানল রপ্তানিতে বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে চলে যায় তারা। তবে ত্রিনিদাদ ছাড়াও ক্যারিবিয়ানের অন্যত্রও শুরু হয়েছে তেল গ্যাস অনুসন্ধানের হিড়িক। পেট্রোলিয়াম জিওসায়েন্স বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘জিওএক্সপ্রো’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এই মুহুর্তে ক্যারিবিয়ান তেল গ্যাস অনুসন্ধানের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হয়ে উঠছে। কিউবা, ডমিনিকান রিপাবলিক, বাহামা, জামাইকা, নিকারাগুয়া, হন্ডুরাস, ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগো এই অঞ্চলের সমুদ্রে তেল গ্যাস অনুসন্ধানে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। কানাডার সরকারি ওয়েবসাইটে ত্রিনিদাদে যেসব খাতে কানাডিয়দের বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে, সেগুলির তালিকা দেয় হয়েছে; যার মাঝে প্রথমেই রয়েছে নিরাপত্তা; তারপর শিক্ষা, অবকাঠামো, এবং সবশেষে হাইড্রোকার্বন।

অল্প কিছুদিন আগ পর্যন্তও কানাডার ব্যাংকগুলি ক্যারিবিয়ানে খুবই শক্ত অবস্থানে ছিল। ১৮৮২ সালে কানাডার সাথে ক্যারিবিয়ানের বাণিজ্যের উপর ভর করে কানাডার ব্যাংকগুলি ক্যারিবিয়ানে তাদের সাবসিডিয়ারি খুলতে শুরু করে। বিংশ শতকে ব্রিটিশরা ক্যারিবিয়ান ছেড়ে যেতে থাকলে কানাডার কোম্পানিগুলি তাদের স্থান নিতে থাকে। আর কানাডার সরকার এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে ব্যালান্স করতে কানাডার কোম্পানিগুলিকে সহায়তা দিতে থাকে। ‘আইএমএফ’এর এক হিসেবে বলা হচ্ছে যে, ক্যারিবিয়ানের সকল ব্যাংকের সকল সম্পদের ৬০ শতাংশ কানাডার তিনটা ব্যাংকের হাতে। ‘ফিনানশিয়াল পোস্ট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০০৯ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে ধ্বসের পর ক্যারিবিয়ানের মূল ব্যবসা পর্যটনে যখন মন্দা দেখা দেয়, তখন ক্যারিবিয়ানের লোকাল ব্যাংকগুলি আর্থিক সমস্যায় পরে যায়। অথচ এর মাঝেও কানাডিয়ান ব্যাংকগুলি বিশাল অংকের মুনাফা করে। আর এই ব্যাংকগুলির বার্ষিক প্রতিবেদনে অঞ্চলভিত্তিক বিভাজন এমনভাবে করা হয়, যাতে ক্যারিবিয়ানে কোথায় কিভাবে এই মুনাফা করা হয়েছে, তা যেন বোঝা না যায়। এই ব্যাংকগুলির মুনাফার উৎস খুব সম্ভবতঃ অফশোর ব্যাংকিং। অর্থাৎ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি, যারা নিজেদের আয়ের উৎস লুকিয়ে রাখতে চান, তারাই ক্যারিবিয়ানে এসব ব্যাংকের অর্থ গচ্ছিত রাখেন। তবে ২০১৮ সাল থেকে কানাডিয়ান ব্যাংকগুলি এই অঞ্চল ছেড়ে যাচ্ছে, যার কারণ এখনও পরিষ্কার নয়।

অনেকেই মনে করছেন যে, হাইড্রোকার্বন এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে আবারও পরিবর্তন করবে। তবে চিনি, মদ, কফি, কলা, বক্সাইট, পর্যটন, ব্যাংকিং, টেক্সটাইল বা হাইড্রোকার্বন কোনটাই ক্যারিবিয়ানের সাথে কানাডার গভীর সম্পর্কের মূল কারণ নয়। কানাডার অর্থনীতির তুলনায় ক্যারিবিয়ানের অর্থনীতি খুবই ছোট। কানাডার জিডিপি যেখানে ১ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার বা ১৭’শ বিলিয়ন ডলার; সেখানে পুরো ক্যারিবিয়ানের সকল দেশ মিলে জিডিপি ৩’শ বিলিয়নেরও কম। ক্যারিবিয়ানে শক্ত অবস্থানে থাকার কারণেই কানাডা এখানকার ব্যবসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পেরেছে। আর এই শক্ত অবস্থানের ভিত্তি রাজনৈতিক। ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার মাঝেই কানাডার প্রভাব বিস্তারের বীজ নিহিত।
  
২০১৯ সালে ‘ক্যারিকম’এর সরকার প্রধানদের বৈঠক। ‘ক্যারিকম’এর সাথে সম্পর্ক গভীর করা মাধ্যমে কানাডা ক্যারিবিয়ানে, বিশেষ করে প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশগুলিতে তার রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রেখেছে।




ক্যারিবিয়ানের রাজনীতিতে কানাডা

১৮৬৭ সালে উত্তর আমেরিকায় ব্রিটিশ অঞ্চলগুলিকে কানাডিয়ান কনফেডারেশনের মাঝে নিয়ে আসা হয়। এরপর থেকে বেশকিছু ক্যারিবিয় দ্বীপ কানাডিয়ান কনফেডারেশনের অংশ হবার জন্যে চেষ্টা করেছে। এই প্রচেষ্টাগুলির কিছু বেশিদূর আগায়নি; আবার কিছু ক্ষেত্রে এগুলিকে অনেকে বাস্তবসম্মতই মনে করেছে। ১৮৮২ সালে জামাইকাকে কানাডার অংশ করার একটা প্রচেষ্টা হয়েছিল, যা খুব দ্রুতই ভেস্তে যায়। বারবাডোসও চেয়েছিল কানাডার অংশ হতে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেন তার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপনিবেশগুলিকে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের অধীনে ছেড়ে দেয়। একইসাথে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জের সরকার চাইছিল যে, নিউ ফাউন্ডল্যান্ড, ক্যারিবিয়ান এবং ফকল্যান্ডস আইল্যান্ডে ব্রিটিশ উপনিবেশগুলিকে কানাডার অধীনে দিয়ে দিতে। কানাডার ব্যবসায়ীরা এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলেন। ব্যবসায়ী হ্যারি ক্রো কানাডার সরকারে নিজের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে একটা প্রতিবেদন তৈরি করান, যেখানে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জকে কানাডার অংশ করলে কি কি সুবিধা পাওয়া যেতে পারে, তার একটা তালিকা তৈরি করা হয়। এতে বলা হয় যে, প্রায় ৩ লক্ষ বর্গ কিঃমিঃ এলাকার সাথে কানাডা প্রায় ২৩ লক্ষ জনসংখ্যা পাবে; যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবিয় অঞ্চল থেকে যে পণ্য সুবিধা পাচ্ছে, কানাডাও সেটা পেতে পারে; এতে কানাডার নৌশক্তি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে; ঐ অঞ্চলে কানাডায় তৈরি পণ্যের বাজার নিশ্চিত হবে; আর বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনের পক্ষে যুদ্ধ করার জন্যে একটা পুরষ্কার হতে পারে এই দ্বীপগুলি। কিন্তু কানাডাতে উপনিবেশের পুরো নিয়ন্ত্রণ নেবার জন্যে রাজনৈতিক সমর্থন আদায় করা সম্ভব না হওয়ায় এই প্রকল্প সফল হয়নি।

১৯১১ সালে বাহামা দ্বীপপুঞ্জও কানাডার অংশ হতে চেয়েছিল, যা কানাডিয়রা বাতিল করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৫০এর দশকে ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ ফেডারেশন’ নামে একটা রাজনৈতিক সংগঠন তৈরির প্রচেষ্টা চালানো হয়। উদ্দেশ্য ছিল যে, দ্বীপগুলিকে একত্রিত করে একটা কাঠামোর অধীনে এনে এরপর ব্রিটেন বা কানাডার সাথে রাজনৈতিকভাবে একত্রীকরণের চেষ্টা করা। ১৯৬২ সালে এই প্রচেষ্টা ভেস্তে যায় যখন সবচাইতে বড় দ্বীপ জামাইকা এবং ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগো ফেডারেশন থেকে বের হয়ে যায়। ১৯৬০ এবং ১৯৭০এর দশকে বেশিরভাগ দ্বীপই আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে ব্রিটেন থেকে আলাদা হয়ে যায়। কানাডার সাথে যুক্ত হবার সর্বশেষ প্রচেষ্টা করে টুর্কস এন্ড কাইকোস দ্বীপপুঞ্জ। ১৯৭০এর দশকে তারা কানাডার সাথে যুক্ত হবার চেষ্টা শুরু করে। তবে ১৯৮৭ সাল নাগাদ তা ভেস্তে যায়। এরপর ২০০৩ সালে কানাডা থেকে নতুন আরেকটা প্রচেষ্টা চালানো শুরু হয়। ২০০৯ সালের মাঝে সেই প্রচেষ্টাও বানচাল হয়ে যায়। তবে যদিও কানাডা ক্যারিবিয়ানের দেশগুলিকে নিজের সাথে একত্রিত করতে চায়নি, তথাপি ক্যারিবিয়ানের সাথে কানাডার গভীর সম্পর্কের কারণে কানাডাকে ক্যারিবিয়ান থেকে আলাদা করা কঠিন। কানাডার জনগণকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক চিন্তা থেকে ‘পরিষ্কার’ রাখার জন্যেই হয়তো কানাডা ক্যারিবিয়ানের দেশগুলির সাথে আইনগত সম্পর্ক গড়েনি। তবে মুখে ক্যারিবিয়ান থেকে দূরে থাকার কথা বললেও কাজে কানাডা ক্যারিবিয়ানের অংশ হিসেবেই চিন্তা করেছে।

১৯৬৬ সালে কানাডায় ক্যারিবিয়ান দেশগুলির নেতাদের নিয়ে এক বৈঠক ডাকে কানাডা। এরপর ১৯৭৩ সালে ক্যারিবিয়ানের ইংরেজি ভাষাভাষি চারটা প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশ ‘ক্যারিবিয়ান কমিউনিটি’ বা ‘ক্যারিকম’ নামের একটা সংস্থা গঠন করে; এরা হলো জামাইকা, ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগো, গায়ানা এবং বার্বাডোস। ১৯৭০ এবং ১৯৮০এর দশকে স্বাধীনতা পাওয়া ক্যারিবিয়ানের সকল ইংরেজি ভাষাভাষি দ্বীপ দেশ এতে যোগ দেয়। ১৯৯৫ সালে ডাচ ভাষার সুরিনাম এবং ২০০২ সালে ফরাসী ভাষাভাষি হাইতিও এতে যোগ দেয়। বর্তমানে ১৫টা দেশ এর সম্পূর্ণ সদস্য; ৫টা ব্রিটিশ উপনিবেশ এসোসিয়েট সদস্য; আর ৮টা অবজারভার দেশের মাঝে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অধীন পুয়রতো রিকো, ৩টা ডাচ উনপিবেশ; আর মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশ মেক্সিকো, কলম্বিয়া ও ভেনিজুয়েলা। ক্যারিবিয়ানের একমাত্র দেশ হিসেবে ডমিনিকান রিপাবলিক এই সংস্থার অবজারভার দেশ। ১৯৭৯ সালে কানাডা এবং ‘ক্যারিকম’এর মাঝে বাণিজ্য এবং সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কানাডা এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক সহায়তা বৃদ্ধি করারও প্রতিশ্রুতি দেয়।

কানাডার সহায়তায় ১৯৬৯ সালে ‘ক্যারিবিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এখনও এই ব্যাঙ্কে প্রায় ৯ শতাংশ মালিকানা রয়েছে কানাডিয়দের; ৯ শতাংশ রয়েছে ব্রিটেনের; সাড়ে ৫ শতাংশ করে রয়েছে ইতালি, জার্মানি এবং চীনের; প্রায় ১০ শতাংশ রয়েছে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলির; আর বাকিটা রয়েছে ক্যারিবিয় দেশগুলির। এছাড়াও ক্যারিবিয়ানে কানাডার বিভিন্ন সংস্থা যথেষ্ট গভীর সম্পর্ক রেখে চলেছে; যার মাঝে রয়েছে ‘ক্যানাডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি’, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ‘কানাডিয়ান ট্রেড কমিশনার’, ‘আটলান্টিক কানাডা কোঅপারেশন এজেন্সি’, ‘ট্রান্সপোর্ট কানাডা’, ‘কানাডিয়ান রেডিও টেলিভিশন এন্ড টেলিকিউমিকেশন্স কমিশন’, ইত্যাদি। কানাডার ‘ভানটেজ এয়ারপোর্ট গ্রুপ’এর অধীনে ক্যারিবিয়ানে জামাইকা এবং বাহামা দ্বীপপুঞ্জে দু’টা বিমানবন্দর রয়েছে। এছাড়াও ‘অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটস’, ‘ইন্টার আমেরিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’, ‘প্যান আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশন’ এবং ‘প্যাসিফিক এলায়েন্স’এর মাধ্যমে কানাডা ক্যারিবিয়ানের সাথে সম্পর্ক রাখে।


  
২০১৬ সালে ‘অপারেশন ক্যারিবে’তে অংশ নেয়া রয়াল কানাডিয়ান নেভির যুদ্ধজাহাজ ‘সাসকাচুয়ান’, ‘এডমন্টন’ এবং মার্কিন কোস্ট গার্ডের জাহাজ ‘হ্যাডক’। এই অপারেশনে মাদক বিরোধী অভিযানে অংশ নেবার মাধ্যমে কানাডা ক্যারিবিয়ানে তার সামরিক অবস্থানকে ধরে রাখছে। একইসাথে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় তারা যুক্তরাষ্ট্রকে একা ছেড়ে দেয়নি।

ক্যারিবিয়ানের সাথে কানাডার সামরিক সম্পর্ক

১৭৪৫ সাল থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত দু’শ বছরের বেশি সময় ধরে ব্রিটিশ রয়াল নেভি উত্তর আমেরিকায় তাদের অবস্থান অব্যাহত রাখে। এই অবস্থানের মূল ঘাঁটি ছিল কানাডার আটলান্টিক উপকূলের নোভা স্কোশিয়ার হ্যালিফ্যাক্স। হ্যালিফ্যাক্সে ঘাঁটি ছিল ১৯০৫ সাল পর্যন্ত। আরেকটা ঘাঁটি ছিল বার্মুডাতে; যা ১৯৫১ সাল পর্যন্ত সেখানে ছিল। তবে ১৮১৯ সালে উত্তর আমেরিকায় মূল ব্রিটিশ ঘাঁটি হ্যালিফ্যাক্স থেকে বার্মুডায় স্থানান্তর করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর হুমকিকে আরও ভালোভাবে মোকাবিলা করার জন্যে প্রস্তুতি নেয়া। ১৯১০ সালে রয়াল কানাডিয়ান নেভির জন্মের পর হ্যালিফ্যাক্সের নৌঘাঁটি কানাডার কাছে হস্তান্তর করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে কানাডার নৌবাহিনীর হাতে ছিল মাত্র ১১টা যুদ্ধজাহাজ এবং ১৮’শ নাবিক। বিশ্বযুদ্ধের মাঝে কানাডার কাছে ব্রিটিশরা পুরো উত্তর পশ্চিম আটলান্টিকের নিরাপত্তার দায়িত্ব দিয়ে দেয়। বিশ্বযুদ্ধ শেষে কানাডার হাতে ছিল ৪’শ ৩৪টা যুদ্ধজাহাজ এবং ৯৫ হাজার নাবিক।

বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই ক্যারিবিয়ানে কানাডার সামরিক উপস্থিতি বাড়তে থাকে। ১৯৫০এর দশক থেকে এখন পর্যন্ত এমন কোন বছর সম্ভবতঃ পাওয়া যাবে না, যখন ক্যারিবিয়ানে কানাডার সামরিক উপস্থিতি ছিল না। কানাডার সরকারি ওয়েবসাইটে ক্যারিবিয়ানে তাদের মিশনগুলির বিশদ বর্ণনা দেয়া হয়েছে।

১৯৫০ থেকে ১৯৭৪

- ১৯৫১ সালে ঘুর্নিঝড়ে আক্রান্ত জামাইকায় ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীকে ত্রাণসামগ্রী দিয়ে সহায়তা দেয় রয়াল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্স।

- রয়াল কানাডিয়ান নেভির জাহাজগুলি নিয়মিতই ক্যারিবিয়ান টহল দিচ্ছিল। এমনই এক সময়ে ১৯৫৭ সালের মার্চে কানাডার একটা ডেস্ট্রয়ারকে ব্রিটিশ উপনিবেশ সেন্ট লুসিয়ায় জরুরি ভিত্তিতে পাঠানো হয়। সেন্ট লুসিয়ায় চিনি এবং কলা চাষে ব্যবহৃত শ্রমিকরা ধর্মঘটের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কানাডার ডেস্ট্রয়ার ‘মিকম্যাক’এর ক্রুদেরকে শহরে মোতায়েন করা হয় এবং ফলশ্রুতিতে ধর্মঘট এড়ানো যায়।

- ১৯৬১ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ বেলিজে ঘুর্নিঝড়ের তান্ডবের পর রয়াল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্সের বিমানে করে ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়।

- ১৯৬৩ সালে হাইতিতে রাজনৈতিক গোলযোগের সময় সেখানে মাত্র ৩ ঘন্টার মাঝে রয়াল কানাডিয়ান নেভির ডেস্ট্রয়ার ‘সাসকাচুয়ান’কে প্রেরণ করে। সেখানে সর্বদা নিজেদের জাহাজ টহলে রাখার কারণেই এটা সম্ভব হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রও সেখানে নিজেদের জাহাজ প্রেরণ করে।

- ১৯৬৬ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ এন্টিগাতে রয়াল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্সের বিমানে করে স্কুলের সরঞ্জামাদি পাঠানো হয়।

- ১৯৭২ সালে গায়ানাতে বিমান বাহিনীর বিমানে করে স্কুল বাসও প্রেরণ করা হয়। ১৯৭৪এ টুর্কস এন্ড কাইকোসেও স্কুলের সরঞ্জাম পাঠানো হয়।

- ১৯৭২ সালে কানাডা ভেনিজুয়েলার কাছে ২০টা ‘এফ-৫’ যুদ্ধবিমান বিক্রি করে।

- সেবছর নিকারাগুয়াতে ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলে সেখানে কানাডা বিমান বাহিনীর বিমানে করে ত্রাণ পাঠায়। ১৯৭৩ এবং ১৯৭৪এ হাইতিতেও বিমান এবং যুদ্ধজাহাজে করে ত্রাণ সামগ্রী পাঠানো হয়।
  
হাইতিতে কানাডার সৈন্য। ১৯৯০এর পুরো দশক জুড়েই হাইতির রাজনৈতিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে সেখানে মার্কিন এবং জাতিসংঘের সেনা মোতায়েন থাকে। কানাডা সবসময় এই মিশনের সাথে ছিল। এই মিশনের বদৌলতে ক্যারিবিয়ানে কানাডার সামরিক উপস্থিতি স্থায়ী হয়ে গিয়েছিল। এই মিশনকে ব্যবহার করে আশেপাশের দেশগুলিতেও কানাডা প্রভাব বিস্তার করেছে।


১৯৭৪ থেকে ১৯৯৯
- ১৯৭৪ সালের জানুয়ারি মাসে ব্রিটেন গ্রেনাডাকে স্বাধীনতা দেয়ার পর সেখানে বিশৃংখলা শুরু হলে কানাডা সেখানে নৌবাহিনীর দু’টা ডেস্ট্রয়ার প্রেরণ করে। ১৯৭৪ সালে হন্ডুরাসে বিমানে করে ঘুর্নিঝড় পরবর্তী ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়।

- ১৯৭৬ সালে গুয়াতেমালায় ভূমিকম্পের পর বিমানে করে ত্রাণসামগ্রী পাঠায় কানাডা।

- ১৯৭৭ সালে গায়ানাতে কানাডার বিমান বাহিনীর বিমানে করে দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়।

- ১৯৭৯ সালে সেন্ট ভিনসেন্টএ আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের পর সেখানে কানাডা সামরিক মেডিক্যাল দল এবং বিমান বাহিনীর বিমান প্রেরণ করে। একই বছর নিকারাগুয়ায় গৃহযুদ্ধের মাঝে বিমানে করে ত্রাণসামগ্রী প্রেরণ করা হয়।

- ১৯৮৩ সালে গ্রেনাডাতে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের সময় কানাডাও সেখানে সামরিক পরিবহণ বিমান প্রেরণ করে।

- ১৯৮৮ সালের জানুয়ারিতে হাইতিতে নির্বাচনের আগে উত্তেজনা শুরু হলে সেখানে নৌ মহড়ার আড়ালে ৭টা হেলিকপ্টার সহ তিনটা যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হয়। বিমান বাহিনীর পরিবহণ বিমানও প্রস্তুত রাখা হয়। একই বছরের সেপ্টেম্বরে জামাইকাতে ঘুর্নিঝড় আঘাত করার পর সেখানে বিমান বাহিনীর বিমানে করে ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয় এবং সামরিক সদস্যদের মোতায়েন করা হয়।

- ১৯৮৯ সালে হাইতি, জামাইকা, ডমিনিকান রিপাবলিক এবং সেন্ট লুসিয়াতে বছরজুড়ে বিমান বাহিনীর বিমানে করে ত্রাণ সহায়তা পাঠানো হয়। সেবছরের সেপ্টেম্বরে মন্টসেরাতে ঘুর্নিঝড় আঘাত হানার পর কানাডার সামরিক সদস্যদের মোতায়েন করা হয়।

- ১৯৮৯ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত মধ্য আমেরিকার কোস্টারিকা, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস এবং নিকারাগুয়ায় জাতিসংঘের শান্তি মিশনে সেনা মোতায়েন রাখে কানাডা।

- ১৯৯০ সালে কানাডা হাইতির নির্বাচনের সময় সেখানে সেনা সদস্য মোতায়েন করে।

- ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত জাতিসংঘ মিশনে হন্ডুরাসে কানাডার সেনাসদস্যরা মোতায়েন থাকে।

- ১৯৯২ সালের শুরুতে হাইতির রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে সেখানে হস্তক্ষেপ করে মার্কিন এবং ফরাসীদের সহায়তায় সেখানকার বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার উদ্দেশ্যে চারটা যুদ্ধজাহাজ প্রস্তুত করে। পরে অবশ্য এই অপারেশন বাস্তবায়িত করা হয়নি।

- ১৯৯৪এর সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের অধীনে সামরিক হস্তক্ষেপের জন্যে কানাডার তিনটা যুদ্ধজাহাজ হাইতির উপকুলে মোতায়েন করা হয়। ১৯৯৫এর মার্চে সেখানে ৫’শ সেনা মোতায়েন করা হয়। ১৯৯৬এর মার্চে সেখানে সামরিক সদস্যের সংখ্যা সাড়ে ৭’শ করা হয়। ১৯৯৭এর নভেম্বর পর্যন্ত সেখানে কানাডার সামরিক বাহিনীর প্রায় ৭’শ সদস্য মোতায়েন থাকে। ২০০০এর মার্চ পর্যন্ত কানাডার সামরিক উপস্থিতি ছিল সেখানে। ১৯৯৩এর ডিসেম্বর থেকে ১৯৯৪এর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাইতির উপকূলে কানাডার নৌবাহিনী জাহাজ মোতায়েন থাকে। পুরো অপারেশনে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ব দিলেও কানাডা সেখান থেকে কখনোই সরে আসেনি।

- হাইতিতে কানাডার সেনাদের জন্যে সাপ্লাই দেয়ার সময়ে কানাডার সামরিক বিমানগুলি ১৯৯৫এর জুনে কোস্টা রিকাতেও ত্রাণসামগ্রী নিয়ে যায়। সেবছরের সেপ্টেম্বরে ত্রিনিদাদেও ত্রাণসামগ্রী পাঠায় তারা। সেবছরের সেপ্টেম্বরে এন্টিগা এন্ড বারবুডাতে ঘুর্নিঝড় আঘাত হানার পর সেখানে কানাডার কোস্ট গার্ডের জাহাজে করে সামরিক সহায়তা পাঠানো হয়।

- ১৯৯৪ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত গুয়াতেমালায় জাতিসংঘ মিশনের অধীনে কানাডা সেখানে সামরিক অফিসারদের মোতায়েন রাখে।

- ১৯৯৮ সালের নভেম্বরে হন্ডুরাসে ঘুর্নিঝড় আঘাত হানার পর সেখানে কানাডার সামরিক সদস্যদের মোতায়েন করা হয়।

- ১৯৯৯ সালে হাইতি এবং সেন্ট লুসিয়াতে বিমান বাহিনীর বিমানে করে ত্রাণসামগ্রী এবং এম্বুল্যান্স পাঠানো হয়।

২০০১ থেকে ২০০৮

- ২০০১ সালের জানুয়ারিতে এল সালভাদরে ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর কানাডার বিমান বাহিনীর বিমানে করে ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়।

- বেলিজে ঘুর্নিঝড় আঘান হানার পর ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিমান বাহিনীর বিমানে করে সেখানে ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়।

- ২০০৪এর ফেব্রুয়ারিতে হাইতিতে সহিংসতা বেড়ে গেলে কানাডার বিমানবাহিনীর বিমানে করে সেখান থেকে বিদেশী নাগরিকদের বের করে আনা হয়। এরপর সেখানে জাতিসংঘের অধীনে প্রায় ৫’শ কানাডিয়ান সামরিক সদস্যকে মোতায়েন করা হয়। এর বেশিরভাগ সেনাকেই ফেরত আনা হলেও সেখানে কিছু উচ্চপদস্থ কানাডিয়ান সামরিক কর্মকর্তাকে দীর্ঘ সময়ের জন্যে রেখে দেয়া হয়।

- ২০০৭ সালের অগাস্টে ঘুর্নিঝড় আঘাত হানার পর জামাইকাতে কানাডার সামরিক বিমানে করে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেয়া হয়।

- ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে হাইতিতে ঘুর্নিঝড়ে আঘাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলে ক্যারিবিয়ানে মাদক নির্মূল অভিযানে মোতায়েনকৃত কানাডার নৌবাহিনী ফ্রিগেট ‘সেন্ট জন’কে সেখানে ত্রাণ সহায়তা দেবার জন্যে পাঠানো হয়।

এই মিশনগুলির মাঝে ১৯৫০এর দশক থেকে ১৯৮০এর দশক পর্যন্ত কানাডার সামরিক মিশনগুলি সংখ্যায় ছিল কম এবং বেশিরভাগই ছিল ত্রাণসামগ্রী পাঠাবার বা ব্রিটিশ উপনিবেশে শান্তি রক্ষা করার মিশন। ১৯৯০এর দশকে সামরিক মিশনগুলির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায় হাইতি। দুর্যোগের কারণে ত্রাণসামগ্রী পাঠাবার মিশন এর মাঝেই চলেছে। বিভিন্ন দেশে নিজেদের নাগরিক সরিয়ে নেবার কথা বলে বহুবার সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। তবে প্রতিবারই যুক্তরাষ্ট্রের মিশনের সাথে কানাডা যুক্ত ছিল।

২০০৬ সালের নভেম্বর থেকে ক্যারিবিয়ানে নতুন মিশন শুরু করে কানাডা। ‘অপারেশন ক্যারিবে’ নামের মাদক চোরাকারবারি বন্ধের উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু করা এই মিশনে ২০১০ সাল থেকে যোগ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ২০১২ সাল থেকে মার্কিন ‘অপারেশন মারটিলো’র অধীনে ন্যাস্ত করা হয় কানাডার মিশনকে। চুক্তি অনুযায়ী কানাডার জাহাজে মার্কিন কোস্ট গার্ডের সদস্যারা থাকবে; তারাই সরাসরি মাদক চোরাকারবারিদেরকে ধরবে। কানাডা এক্ষেত্রে শুধু লজিস্টিক্যাল সুবিধা দেবে। এল সালভাদরের কমালাপা বিমান ঘাঁটিতে মার্কিন নেতৃত্বে কানাডা ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান মোতায়েন করে। মিশন শুধু ক্যারিবিয়ানেই সীমাবদ্ধ নয়; মিশনের অনেকটা টহল পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে মেক্সিকো এবং মধ্য আমেরিকার পশ্চিম উপকূলেও চলছে। এই মিশনের অধীনে কানাডা অত্র অঞ্চলে নিয়মিত তাদের যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রাখছে।
  
‘এক্সারসাইজ ট্রেইড উইন্ডস’ ২০১৯এ কানাডার সাথে অংশ নিচ্ছে ক্যারিবিয়ান সামরিক সদস্যারা। এই মহড়াকে ব্যবহার করে কানাডা জামাইকাতে ‘অপারেশনাল সাপোর্ট হাব’ বা ‘ওএসএইচ’ তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে অতি দ্রুততার সাথে কানাডা থেকে সৈন্য, রসদ, অস্ত্র এবং অন্যান্য সাপ্লাই নিয়ে যাবে; এবং সেখান থেকে পুরো ক্যারিবিয়ানের যেকোন স্থানে নিয়ে যাওয়া যাবে।

জামাইকায় সামরিক সহায়তা

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে প্রতিবছর কানাডা ‘এক্সারসাইজ ট্রেইড উইন্ডস’ নামের মহড়ায় অংশ নেয়। এই মহড়ার লক্ষ্য হিসেবে প্রথমেই বলা হচ্ছে অপরাধ দমন; এরপর রয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা। এই মহড়াকে কেন্দ্র করেই ২০১৬ সাল থেকে কানাডিয়ানরা জামাইকাতে একটা স্থায়ী ‘অপারেশনাল সাপোর্ট হাব’ বা ‘ওএসএইচ’ তৈরি শুরু করে। এই হাবের মাধ্যমে পুরো ক্যারিবিয়ানে কানাডিয়ানরা যেকোন সময় তাদের সামরিক কর্মকান্ড চালাতে পারবে। এর মাধ্যমে তারা অতি দ্রুততার সাথে কানাডা থেকে সৈন্য, রসদ, অস্ত্র এবং অন্যান্য সাপ্লাই নিয়ে আসতে পারবে; এবং সেখান থেকে পুরো ক্যারিবিয়ানের যেকোন স্থানে নিয়ে যেতে পারবে। ২০১৮ সালের অগাস্টে এই হাব অপারেশনে আসে। জামাইকার সাথে কানাডার সামরিক সম্পর্ক সবচাইতে গভীর। ১৯৬৫ সাল থেকে জামাইকার এক হাজার ৬’শ ৬০ জন সামরিক সদস্য কানাডায় প্রশিক্ষণ পেয়েছে। আর জামাইকাতে কানাডা বেশ কয়েকটা সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করেছে, যেখানে পুরো ক্যারিবিয়ানের সকল দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা প্রশিক্ষণ নেয়।

১৯৯৩ সাল থেকে জামাইকাতে চালু রয়েছে ‘ক্যারিবিয়ান জুনিয়র কমান্ড এন্ড স্টাফ কোর্স ফ্যাসিলিটি’। ২০০৬ সালে তৈরি করা হয় ‘ক্যারিবিয়ান মিলিতারই এভিয়েশন স্কুল’। ২০০৮ সালে তৈরি করা হয় টেকনিক্যাল ট্রেনিং স্কুল। ২০০৯ সালে তৈরি হয় ‘ক্যারিবিয়ান কাউন্টার টেররিজম ট্রেনিং সেন্টার’। ২০১২ সালে শুরু হয় ‘ক্যারিবিয়ান মিলিটারি ম্যারিটাইম ট্রেনিং সেন্টার’। ২০১৭ সালে তৈরি হয় ‘ডিরেক্টোরেট অব ট্রেনিং এন্ড ডকট্রাইন’। ২০১৮ সালে চালু হয় ‘ক্যারিবিয়ান স্পেশাল ট্যাকটিকস সেন্টার’।
  
২০১৬ সালে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর কিউবা ভ্রমণ। কিউবার ব্যাপারে কানাডার নীতি সর্বদাই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নীতির উল্টো। ক্যারিবিয়ানে প্রভাব বিস্তারের খেলায় ব্রিটিশ সময় থেকেই কানাডা যুক্তরাষ্ট্রকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখেছে। সমাজতান্ত্রিক কিউবার সাথে সম্পর্ক ধরে রাখার ব্যাপারটাও সেই একই চিন্তার অংশ।


কিউবার সাথে সম্পর্ক

কিউবার সাথে কানাডার বাণিজ্য চলছে অষ্টাদশ শতক থেকেই। তবে রাষ্ট্র হিসেবে কানাডা এবং কিউবার মাঝে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় ১৯৪৫ সালে। পুরো ক্যারিবিয়ানে কিউবাতেই কানাডিয়ানরা প্রথম দূতাবাস খোলে। ১৯৫৯ সালে কিউবাতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর মাত্র দু’টা দেশ কিউবার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখে; এর একটা মেক্সিকো; অন্যটা কানাডা। কানাডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জন ডিফেনবেকার ঘোষণা দেন যে, আদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তিনি কিউবার সাথে সম্পর্ক রাখবেন। একই বছরের এপ্রিলে কিউবার নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো কানাডা সফরও করেন। ডিফেনবেকারের সরকার সকলকে বার্তা দেয় যে, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি হুবহু নকল করে চলবে না। ১৯৬৩ সালে ডিফেনবেকার নির্বাচনে হেরে যাবার পর নতুন প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে ট্রুডোও কানাডার পররাষ্ট্রনীতিকে মার্কিন প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার কথা বলেন। পিয়েরে ট্রুডো বর্তমান প্রধানন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর বাবা। ১৯৬০ এবং ১৯৭০এর দশকে কিউবার সাথে বাণিজ্যের ব্যাপারে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সাংঘর্ষিক নীতি অনুসরণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধে থাকা কিউবার অর্থনীতিতে কানাডার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। কিউবার ট্যুরিস্ট বোর্ডের বরাত দিয়ে ‘ট্রাভেল পালস কানাডা’ বলছে যে, ২০১৯ সালে কিউবাতে ১১ লক্ষের বেশি কানাডিয়ান ভ্রমণ করেছে। এই সংখ্যা কিউবায় ভ্রমণ করা সকল পর্যটকের প্রায় এক চতুর্থাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ১৯৯৬ সালে পাস করা ‘হেলমস বারটন এক্ট’ বাস্তবায়নের জন্যে যুক্তরাষ্ট্র কানাডার উপর চাপ সৃষ্টি করে। এই আইনের ‘টাইটেল ৩’এ বলা হয় যে, কিউবাতে মার্কিন নাগরিকদের সম্পদ কিউবার সরকার বাজেয়াপ্ত করে থাকলে মার্কিন নাগরিকেরা কিউবায় সেই সম্পদের বর্তমান ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে। এই আইনের প্রতিবাদে কানাডার হাইজ অব কমন্সে ‘গডফ্রে মিলিকেন বিল’ নিয়ে আসা হয়, যার মাধ্যমে বলা হয় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্মের সময় যেসকল ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার বিরোধী ছিলেন এবং কানাডায় পালিয়ে এসেছিলেন, তাদের বাজেয়াপ্ত সম্পদ তাদের উত্তরসুরীরা পাবার জন্যে চেষ্টা করতে পারবে। কানাডার প্রতিবাদের কারণে ‘হেলমস বারটন এক্ট’এর ‘টাইটেল ৩’ ২০১৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত স্থগিত করে দেয়া হয়। ২০১৯এর ২৭শে এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দেয় যে, ‘টাইটেল ৩’ এখন কার্যকর করা হবে। কানাডার প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে ৩রা মে বলা হয় যে, প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো কিউবার প্রধানমন্ত্রী মিগেল দিয়াজ কানেলের সাথে ফোনে কথা বলে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফাভাবে ‘টাইটেল ৩’ কার্যকর করার ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ট্রুডো কিউবাতে কানাডার জনগণের স্বার্থ রক্ষা করবেন বলে বলেন।

ব্রিটিশ কমনওয়েলথের কানাডা যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করেই যাবে

জরডান গুডরোর ব্যাপারটা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের বছরে ট্রাম্পের জন্যে সুখকর কোন খবর নয়। এর মাত্র ক’দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্র কিউবার ব্যাপারে ১৯৯৬ সালে কংগ্রেসে পাস করা আইন বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দেয়। এর কিছুদিন পরেই ২৫শে মে ইরান থেকে তেল নিয়ে আসা ট্যাঙ্কার ভেনিজুয়েলায় প্রবেশ করে। এই ঘটনাগুলি ট্রাম্প প্রশাসনকে নির্বাচনের বছরে হিস্প্যানিক ভোটারদের সামনে দুর্বল করতে পারে। গুডরোর কানাডার নাগরিকত্ব ক্যারিবিয়ানে প্রায় আড়াই’শ বছরের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময় থেকেই কানাডা ক্যারিবিয়ানে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। ব্রিটিশরা তাদের উপনিবেশগুলিকে ছেড়ে দেবার পর কানাডা ব্রিটিশ কমনওয়েলথের নীতিই ধরে রেখেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখেছে। প্রথমে অর্থনৈতিক দিক থেকে সম্পর্কের সূচনা হলেও বর্তমান কানাডা ক্যারিবিয়ানের উপর নির্ভরশীল নয়। বরং ক্যারিবিয়ানের ছোট দ্বীপ দেশগুলিই কানাডার উপর নির্ভরশীল। ব্রিটিশদের প্রাক্তন উপনিবেশে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলকভাবেই দেখেছে। একারণেই কানাডা ক্যারিবিয়ানে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক দিক থেকে সর্বদা ব্যস্ত থেকেছে। ঔপনিবেশিক শক্তি হবার তকমা নিতে না চাইলেও ক্যারিবিয়ানকে কানাডা নিজের মনে করেই দেখেছে। কানাডা আলাদা কোন জাতীয়তাবাদী শক্তি নয়। বিশ্বব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রবাহে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর কৌশলের মাঝে ব্রিটিশ কমনওয়েলথের কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডকেই ব্রিটেনের আত্মার অংশ হিসেবে চিন্তা করা হচ্ছে। আদর্শিক দিক থেকে একই সূত্রে গাঁথা এই দেশগুলি তো এক সুরেই কথা বলবে। প্রশান্ত মহাসাগরে যেমন অস্ট্রেলিয়াকে ব্রিটেনের হাত হিসেবে দেখতে চাইছেন তারা, তেমনি আমেরিকা মহাদেশে কানাডাকে তারা দেখতে চাইছেন অগ্রগামী অবস্থানে। ভেনিজুয়েলা এবং কিউবার সাম্প্রতিক ইতিহাস ক্যারিবিয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে দুর্বল করে। আর এই সুযোগটা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বীরা নিলে অবাক হবার কিছু নেই। ক্যারিবিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে নিজের উঠানেই চ্যালেঞ্জ নিতে হচ্ছে।

Sunday, 24 May 2020

‘ওপেন স্কাইজ’ চুক্তিকে বিদায় দিল যুক্তরাষ্ট্র - বিশ্বব্যবস্থা পরিবর্তনের আরেকটা ধাপ সম্পন্ন হলো

২৪শে মে ২০২০
   
মার্কিন বিমান বাহিনীর ৬০ বছরের পুরোনো 'ওসি-১৩৫বি' গোয়েন্দা বিমান, যা 'ওপেন স্কাইজ' চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। মার্কিন চিন্তাবিদদের হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের মূল প্রতিদ্বন্দ্বীই এখন চীন। ‘ওপেন স্কাইজ’ চুক্তিতে ইউরোপ, রাশিয়া থাকলেও চীন নেই। যুক্তরাষ্ট্র এখন তার নিজের তৈরি করা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলি থেকেই বের হয়ে যাচ্ছে; যা বর্তমান পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থার স্থায়িত্বকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিচ্ছে। ইউরোপের ছোট দেশগুলির যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীলতার দিন যেমন ঘনিয়ে আসছে, তেমনি কৌশলগত দিক থেকে ইউরোপের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্বও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
 
গত ২১শে মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ওপেন স্কাইজ’ চুক্তি থেকে বের করে আনার ঘোষণা দেন। এই চুক্তির অধীনে পশ্চিমা দেশগুলির সাথে রাশিয়ার সমঝোতা হয় যে, তারা একে অপরের আকাশসীমায় গোয়েন্দা বিমান ওড়ার অনুমতি দেবে। হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন যে, রাশিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ ভালো সম্পর্ক রয়েছে। তবে রাশিয়া এই চুক্তি মানছে না। কাজেই যতদিন রাশিয়া এই চুক্তি অনুযায়ী না চলবে, ততদিন যুক্তরাষ্ট্র এর থেকে বাইরে থাকবে। ট্রাম্পের বক্তব্যের পরদিন ফরাসী পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয় যে, ফ্রান্সের সাথে জার্মানি, বেলজিয়াম, স্পেন, ফিনল্যান্ড, ইতালি, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস, চেক রিপাবলিক এবং সুইডেন এই চুক্তিকে সন্মান করে যাবে। ফরাসীরা বলছে যে, রাশিয়া যে চুক্তি পুরোপুরি মানছে না, এই ব্যাপারটাতে তার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একমত; তদুপরি তারা এই চুক্তিতে থাকবে। অপরদিকে রাশিয়ার উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভ বলেন যে, ‘ওপেন স্কাইজ’ চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বের হয়ে যাওয়াটা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্যে হুমকিস্বরূপ। আর রাশিয়া এই চুক্তি মানছে না বলে যুক্তরাষ্ট্র যে অভিযোগ করছে, সেব্যাপারে তিনি বলেন যে, ওয়াশিংটন এই অভিযোগের সমর্থনে কোন প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি।

‘আল জাজিরা’ বলছে যে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের ফলে ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার মাঝে স্বাক্ষরিত এবং ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়া ‘নিউ স্ট্র্যাটেজিক আর্মস রিডাকশন টকস’ বা ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির ব্যাপারেও সন্দেহ তৈরি হলো। এটা ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নবায়ন হবার কথা রয়েছে। ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া নিজেদের কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা সাড়ে ১৫’শএর মাঝে সীমাবদ্ধ্ব করতে সম্মত হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটো অংশীদাররা রাশিয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগগুলির ক্ষেত্রে একমত হলেও তারা চুক্তি থেকে মার্কিনীদের বের হয়ে যেতে মানা করেছিল। ন্যাটোর এক কর্মকর্তা ‘আল জাজিরা’কে বলেন যে, ২০১৮ সালে শীর্ষ বৈঠকে যখন কথা উঠেছিল যে রাশিয়া কিছু বিশেষ স্থানেই শুধু এই চুক্তির বাস্তবায়ন করছে, তখনই নিরাপত্তার অবমূল্যায়নের ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ থাকে না।

১৯৫৫ সালে প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারের মার্কিন সরকার সোভিয়েত ইউনিয়নকে প্রস্তাব দেয় যে একে অপরের আকাশসীমায় গোয়েন্দা বিমান প্রেরণের মাধ্যমে উভয় পক্ষের সন্দেহ দূরীকরণ করা যেতে পারে। একে অপরের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে এটা নিশ্চিত হওয়া যাবে যে একজন অপরের উপর হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে না। সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ বলেন যে, সোভিয়েতরা মার্কিন কনসেপ্ট বা চিন্তার সাথে একমত নয়। তবে আইজেনহাওয়ারের এই প্রস্তাবের ৩৪ বছর পর আরেকজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ এধরনেরই আরেকটা প্রস্তাব নিয়ে আসেন, যার মাধ্যমে ন্যাটো এবং সোভিয়েত নেতৃত্বে থাকা ওয়ারস প্যাক্টের মাঝে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের খাতিরে নিজেদের আকাশসীমায় অপরের গোয়েন্দা বিমান ওড়ানোর কথা বলা হয়। এই আলোচনা চলার মাঝেই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়; তবে আলোচনা চলে। অবশেষে ১৯৯২ সালের মার্চে ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকিতে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়াসহ ২৪টা দেশ ‘ওপেন স্কাইজ ট্রিটি’ স্বাক্ষর করে। পরবর্তীতে সকল দেশের জনপ্রতিনিধিদের সমর্থন আদায় এবং সকল শর্ত চুড়ান্ত হবার পর ২০০২ সালের ২রা জানুয়ারি এই চুক্তি বাস্তবায়ন শুরু হয়। এই কর্মকান্ড বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র ‘ডিফেন্স থ্রেট রিডাকশন এজেন্সি’ বা ‘ডিটিআরএ’ নামের একটা সংস্থা গঠন করে। এই সংস্থার অধীনে দু’টা ‘ওসি-১৩৫বি’ গোয়েন্দা বিমান রয়েছে। রাশিয়া, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি, রোমানিয়া এবং ইউক্রেনের কিছু গোয়েন্দা বিমানকে এই চুক্তির অধীনে প্রতিপক্ষের দেশের আকাশসীমায় ছবি তোলার সার্টিফিকেট দেয়া হয়। পশ্চিমা দেশগুলিও এই কাজে নিজেদের বিমান নিয়োজিত করে। ক্যামেরাগুলি বাজারে পাওয়া বাণিজ্যিক ক্যামেরা হবার শর্ত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণা দেবার আগ পর্যন্ত এই চুক্তির স্বাক্ষরকারী দেশের সংখ্যা ছিল ৩৫।

চুক্তি থেকে বের হয়ে যাবার কথা অনেক আগ থেকেই চলছিল। চুক্তির অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত বিমানগুলি প্রায় ৬০ বছরের পুরোনো, এবং এগুলির রক্ষণাবেক্ষণের পিছনে অনেক খরচ করতে হয়। গত অক্টোবরে মার্কিন রিপাবলিকান সিনেটর টম কটন এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, প্রেসিডেন্টের উচিৎ ‘ওপেন স্কাইজ’ চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেয়া এবং এই কাজ থেকে বেঁচে যাওয়া কয়েক’শ মিলিয়ন ডলারকে অন্য গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে ব্যবহার করে মার্কিন সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। তবে যারা চুক্তির পক্ষে রয়েছেন, তাদের পক্ষেও রয়েছে যুক্তি। কানাডিয়ান সামরিক বিশ্লেষক স্টেফান ওয়াটকিন্স চুক্তির সুফলগুলি নিয়ে বলেন যে, এই চুক্তির কারণে পশ্চিমা দেশের প্রতিনিধিরা রুশ প্রতিনিধিদের সাথে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই আলোচনা করতে পারছেন। এর মাধ্যমে তারা ওপাড়ের অবস্থার একটা ধারণা পান। ওপাড়ে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে কিনা, অথবা সেখানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে কিনা, সেব্যাপারে তারা তথ্য পেয়ে থাকেন। নিজেদের মাঝে যোগাযোগের ফলে পারস্পরিক বিশ্বাসের দিক থেকে উন্নয়ন হয়। অপরদিকে ‘সেন্টার ফর স্ট্যাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’এর এরোস্পেস বিশেষজ্ঞ টড হ্যারিসন বলছেন যে, এই চুক্তির অধীনে ৩০ সেন্টিমিটার রেজোলিউশনের ছবি তোলা যায়, যা বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তোলা ছবির চাইতে আলাদা কিছু নয়। স্যাটেলাইট ব্যবহারের যুক্তির সমালোচনা করে মার্কিন ‘কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিস’এর পারমাণবিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞ এমি উলফ বলছেন যে, স্যাটেলাইটের ছবিগুলি বহুদূর থেকে তোলা হয় বিধায় বায়ুমন্ডলের ধূলাবালির কারণে ছবির মান ভালো হয়না; অন্যদিকে বিমানগুলি ভূমির অনেক কাছ দিয়ে ওড়ে বিধায় সেগুলি অনেক ভালো মানের ছবি দেয়। তাছাড়া বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটের ছবি কেউ পরিবর্তন বা বিকৃত করেও সরবরাহ করতে পারে। যেসব দেশের স্যাটেলাইট থেকে ছবি তোলার সক্ষমতা নেই, সেসব দেশ বিমান থেকে তোলা ছবির উপর নির্ভর করতে পারে। এভাবে পুরো ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হয়। টড হ্যারিসন বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র তার পুরোনো ‘ওসি-১৩৫বি’ বিমানগুলি অবসরে পাঠিয়ে দিলেও নিজেরা চুক্তির মাঝে থাকতে পারে। এতে অন্য দেশগুলি এই চুক্তির সুবিধাগুলি পাবে। আর যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের বিমান ব্যবহার করেও এই কাজ সম্পাদন করতে পারে।

করোনাভাইরাসের মহামারির মাঝে অর্থনৈতিক ধ্বসের পরেও প্রতিরক্ষা বাজেটের কতটা আগের মতোই রাখা সম্ভব হবে, তা নিয়ে অনেকেই কথা বলছেন। আর তন্মধ্যে রুশ সহযোগিতার ব্যাপারে সন্দেহ থাকা সত্ত্বেও ‘ওপেন স্কাইজ’ চুক্তির পিছনে কয়েক’শ মিলিয়ন ডলার খরচ করাটা ট্রাম্প সরকারের কাছে সমর্থনযোগ্য নয়। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অর্থ খরচে ইউরোপের দেশগুলির নিরাপত্তা দেবার ব্যাপারটাও এখন প্রশ্নবিদ্ধ; কারণ এই দেশগুলির অনেকগুলিই এখন যুক্তরাষ্ট্রের নীতির পক্ষে থাকছে না। ন্যাটোর সদস্য হিসেবে ইউরোপের দেশগুলি নিজেদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রতিরক্ষা খাতে খরচ করছে না; যা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ন্যাটো দেশগুলির টানাপোড়েন চলছে বেশকিছুদিন ধরেই। আর করোনাভাইরাস মোকাবিলায় ইউরোপের অনেক দেশই চীনের কাছ থেকে সহায়তা নিয়েছে; যা ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে দুর্বল করেছে। অথচ মার্কিন চিন্তাবিদদের হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের মূল প্রতিদ্বন্দ্বীই এখন চীন। ‘ওপেন স্কাইজ’ চুক্তিতে ইউরোপ, রাশিয়া থাকলেও চীন নেই। যুক্তরাষ্ট্র এখন তার নিজের তৈরি করা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলি থেকেই বের হয়ে যাচ্ছে; যা বর্তমান পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থার স্থায়িত্বকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিচ্ছে। ইউরোপের ছোট দেশগুলির যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীলতার দিন যেমন ঘনিয়ে আসছে, তেমনি কৌশলগত দিক থেকে ইউরোপের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্বও বৃদ্ধি পাচ্ছে।


Friday, 22 May 2020

মালদ্বীপে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ঘনীভূত হচ্ছে

২৩শে মে ২০২০
   
মে মাসের স্যাটেলাইট ছবি। ‘ফেইধু ফিনোলহু’ দ্বীপে রেজর্ট তৈরির কাজ করতে গিয়ে দ্বীপকে বড় করছে চীনা কোম্পানি। রেজর্ট তৈরির জন্যে আরও অনেকেই মালদ্বীপে দ্বীপ লীজ নিলেও চীনাদের এই লীজ নেয়া এবং দ্বীপ উন্নয়নের কাজের ব্যাপারে ভারতীয় চিন্তাবিদেরা বিশেষভাবে চিন্তিত।

মে মাসে স্যাটেলাইট ছবির মাধ্যমে ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স বিশ্লেষকরা বলেন যে, মালদ্বীপে চীনারা একটা দ্বীপের উন্নয়ন কাজ বেশ এগিয়ে নিয়েছে। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে যেখানে এই দ্বীপের আকৃতি ছিল মাত্র ৩৮ হাজার বর্গ মিটার, সেখানে ২০২০এর ফেব্রুয়ারিতে তা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লক্ষ বর্গ মিটার। ‘ফেইধু ফিনোলহু’ নামে রাজধানী মালের কাছাকাছি অবস্থিত এই দ্বীপটা একসময় ছিল একটা জনমানবশূণ্য দ্বীপ। মালদ্বীপের পুলিশ ওয়েলফেয়ার কোম্পানির অধীনে থাকা এই দ্বীপটাকে ২০১৭ সালে একটা চীনা কোম্পানির কাছে রেজর্ট তৈরির জন্যে ৪ মিলিয়ন ডলারে ৫০ বছরের জন্যে লীজ দেয়া হয়। এই সময়ের মাঝে পুলিশ ওয়েলফেয়ার সেই কোম্পানির কাছ থেকে ৮৫ মিলিয়ন ডলার পাবে। মালদ্বীপে দ্বীপ লীজ দেয়াটা নতুন নয়। এই লীজের আগে পাঁচ বছরের মাঝে কয়েক ডজন মানবশূণ্য দ্বীপ রেজর্ট তৈরির উদ্দেশ্যে দেশী এবং বিদেশী কোম্পানির কাছে লীজ দেয়া হয়। তবে ২০১৬ সালে লীজ দেয়ার নিয়মকানুনে কিছু পরিবর্তন এনে ‘ক্লোজড’ বিডিংএর অনুমোদন দেয়া হয়। রেজর্ট তৈরির জন্যে আরও অনেকেই মালদ্বীপে দ্বীপ লীজ নিলেও চীনাদের এই লীজ নেয়া এবং দ্বীপ উন্নয়নের কাজের ব্যাপারে ভারতীয় চিন্তাবিদেরা বিশেষভাবে চিন্তিত। মালদ্বীপে চীনা বিনিয়োগ ভারতীয়দের দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। ‘ইন্ডিয়া টুডে’র এক প্রতিবেদনে চীনা এই প্রকল্পকে ভারত মহাসাগরে চীনাদের প্রভাব বৃদ্ধির প্রচেষ্টা বলে অভিহিত করা হয়। তবে মালদ্বীপে ভারত এবং চীনের এই দ্বন্দ্বকে বুঝতে হলে আরও অনেকগুলি ক্ষেত্রের দিকে তাকাতে হবে।

মালদ্বীপে চীনাদের প্রভাব বৃদ্ধির শুরু ২০০৯ সালের পর থেকে; যখন প্রেসিডেন্ট মামুন আব্দুল গাইয়ুমের ৩০ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। গাইয়ুমের উত্তরসুরী মোহামেদ নাশীদ ভারত-ঘেঁষা বলেই পরিচিত ছিলেন। কিন্তু ২০১২ সালে মোহাম্মেদ ওয়াহিদ হাসান প্রেসিডেন্ট হবার পর পরিস্থিতি বেশ কিছুটাই পাল্টে যায়। মোহামেদ নাশীদের সমর্থকেরা ওয়াহিদের সরকারকে কাজ করতে না দিলেও কিছু ব্যাপারে ওয়াহিদ সরকারের সিদ্ধান্ত মালদ্বীপের রাজনীতিতে পরিবর্তনের আভাস দেয়। ‘দ্যা ইকনমিক টাইমস’ বলছে যে, ২০১০ সালের জুনে মালদ্বীপের মূল বিমানবন্দরের উন্নয়ন কাজ দেয়া হয় ভারতীয় কোম্পানি ‘জিএমআর গ্রুপ’কে। ৫’শ মিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্প ভারতকে দেয়ার জন্যে সেসময় প্রেসিডেন্ট মোহামেদ নাশীদের সরকারকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। তবে মোহাম্মেদ ওয়াহিদ হাসানের সরকার ২০১২ সালের নভেম্বরে এই প্রকল্প বাতিল করলে ভারতীয় কোম্পানি সিঙ্গাপুরের আদালতে মামলা করে। তবে বিমানবন্দরের কাজ ভারতীয়দের না পাওয়াটা ভূরাজনীতিতে মালদ্বীপের অবস্থান পরিবর্তিত হবার লক্ষণ হিসেবে আবির্ভূত হয়। যা সবসময় ভারত তার নিজের প্রভাবের জায়গা মনে করতো, তার ব্যাপারে এখন অতটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
   
মালদ্বীপের মতো ছোট্ট দেশে পর্যটন শিল্পের বিকাশ না হলে এখানে সাড়ে তিন কিঃমিঃ লম্বা বিশাল রানওয়ের আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর তৈরির প্রশ্নই উঠতো না। রয়াল নিয়জিল্যান্ড এয়ার ফোর্সের পরিবহণ বিমান এবং এয়ার সিলনের বাণিজ্যিক ফ্লাইটই বলে দিচ্ছে যে, এই বিমানবন্দরের বেসামরিক এবং সামরিক কোন বিভেদ নেই। এখন বেসরকারি বিমানবন্দর হওয়া সত্ত্বেও কৌশলগত দিক থেকে অতি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় এই বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলছে টানাপোড়েন।

মালদ্বীপে বিমানবন্দরের ভূরাজনীতি

মালদ্বীপে বিমানবন্দর তৈরির ইতিহাসটা আলোচনায় আনা যেতে পারে। মালদ্বীপের এই বিমানবন্দর শুধু বেসামরিক বিমানবন্দরই নয়; একমাত্র বড় বিমানবন্দর। ভারত মহাসাগরে গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক ঘাঁটি দিয়েগো গার্সিয়া থেকে এই মালে বিমানবন্দরের দূরত্ব প্রায় ১৩’শ কিঃমিঃ। ভারতের দক্ষিণ উপকূল থেকে মালের দূরত্ব প্রায় ৫’শ কিঃমিঃ; আর শ্রীলংকার কলম্বো থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৭’শ কিঃমিঃ। শ্রীলংকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের মাঝ দিয়ে যাওয়া পৃথিবীর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র বাণিজ্য রুটগুলির একটা মালে থেকে মাত্র ৪’শ কিঃমিঃএর দূরত্বে মালদ্বীপের উত্তরের দীপগুলি এবং ভারত নিয়ন্ত্রিত লাক্ষাদ্বীপ দ্বীপপুঞ্জের মাঝ দিয়ে যায়। লাক্ষাদ্বীপের আগাত্তিতে ভারতের একটা বিমানবন্দর থাকলেও সেখানে লজিস্টিক্যাল কারণে নিয়মিত বিমান ওঠানামা করানো কঠিন। অন্যদিকে মালে বিমানবন্দর ২০১৯ সালে ৫৪ হাজার ফ্লাইটে ৪৮ লক্ষ যাত্রী এবং প্রায় ৬৫ হাজার টন মালামাল হ্যান্ডলিং করেছে। মালদ্বীপের সর্বউত্তরে হানিমাধুতে আরেকটা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থাকলেও সেটা লজিস্টিক্যাল দিক থেকে মালে বিমানবন্দরের ধারেকাছেও নয়। মালদ্বীপের দক্ষিণে কাধধুতে একটা এবং হুলুওয়ারোলুতে আরেকটা ছোট বিমানবন্দর রয়েছে।

মালদ্বীপের মূল দ্বীপ মালের সাথে লাগোয়া মালে এটলএর একটা অংশ হুলহুলে দ্বীপে ১৯৬০ সালের অক্টোবরে একটা বিমানবন্দর তৈরি করা হয়। প্রায় ৩ হাজার ফুট লম্বা এই রানওয়েতে ১৯শে অক্টোবর রয়াল নিউজিল্যান্ড এয়ার ফোর্সের একটা পরিবহণ বিমান অবতরণ করে। প্রথম বাণিজ্যিক ফ্লাইট ছিল এয়ার সিলনের; ১৯৬২ সালের এপ্রিলে। মালদ্বীপের শেষ সুলতান মোহাম্মদ ফরীদ দিদিএর অধীনে প্রধানমন্ত্রী ইব্রাহিম নাসিরের তত্বাবধানে ১৯৬৬ সালে এই বিমানবন্দরের রানওয়ে উন্নয়নের কাজ করা হয়। ১৯৭২ সালের দিকে মালদ্বীপে পর্যটকদের ঢল আসতে থাকলে নতুন একটা আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর তৈরির গুরুত্ব বোঝা যেতে শুরু করে। ১৯৮১ সালে মালে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু করা হয়। ২০১০ সালের জুলাই মাসে নাশীদ সরকার বিশ্বব্যাংকের অধীন ‘ইন্টারন্যাশনাল ফাইনান্স কর্পোরেশন’ বা ‘আইএফসি’র উপদেশে বিমানবন্দরটাকে বেসরকারি হাতে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এই কাজ যৌথভাবে পায় মালয়েশিয়া এয়ারপোর্টস এবং ভারতের জিএমআর গ্রুপ। ভারতীয়দের হাতে থাকে ৭৭ শতাংশ মালিকানা; মালয়েশিয়ার হাতে ২৩ শতাংশ। ২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট নাশীদ এই বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ইব্রাহিম নাসির বিমানবন্দর। মালদ্বীপের মতো ছোট্ট দেশে পর্যটন শিল্পের বিকাশ না হলে এখানে সাড়ে তিন কিঃমিঃ লম্বা বিশাল রানওয়ের আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর তৈরির প্রশ্নই উঠতো না। পর্যটন খাতের উন্নয়নের জন্যেই এই বিমানবন্দরের উন্নয়নের কথা বলা হয়েছিল। রয়াল নিয়জিল্যান্ড এয়ার ফোর্সের পরিবহণ বিমান এবং এয়ার সিলনের বাণিজ্যিক ফ্লাইটই বলে দিচ্ছে যে, এই বিমানবন্দরের বেসামরিক এবং সামরিক কোন বিভেদ নেই। এখন বেসরকারি বিমানবন্দর হওয়া সত্ত্বেও কৌশলগত দিক থেকে অতি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় এই বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলছে টানাপোড়েন।

২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট আবদুল্লা ইয়ামিন আব্দুল গাইয়ুম সিঙ্গাপুরের সরকারি কোম্পানি ‘সুবর্ন জুরং’এর কাছে বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প ব্যবস্থাপনার কাজ দেয়। ২০১৮ সালের অক্টোবরে সৌদি আরব বিমানবন্দরের উন্নয়নে ১’শ মিলিয়ন ডলার দেবার প্রতিশ্রুতি দেয়। ওপেক ফান্ড দেয় ৫০ মিলিয়ন ডলার। একইসাথে আবুধাবি এবং কুয়েতও এই প্রকল্পে অর্থায়ন করে। নতুন টার্মিনালের ডিজাইন এবং কন্সট্রাকশনের কাজ পায় সৌদি বিল্লাদিন গ্রুপ। রানওয়ের উন্নয়ন এবং পানি থেকে ওঠানামা করতে পারা ৮৫টা বিমানের ধারণক্ষমতার সীপ্লেন টার্মিনালের কনসালট্যান্সির কাজ পায় মার্কিন কোম্পানি ‘ল্যানড্রাম এন্ড ব্রাউন’; ৩৪’শ মিটার লম্বা রানওয়ে তৈরির কাজ পায় চীনা কোম্পানি ‘বেইজিং আরবান কন্সট্রাকশন গ্রুপ’। ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন বিমানবন্দরের নাম আবারও পরিবর্তন করে দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম নাসিরের পরিবারের নামানুসারে রাখেন ভেলানা বিমানবন্দর। ২০১৯ সালে বিমানবন্দরের নতুন রানওয়েতে বিমান ওঠানামা শুরু হয়। মালদ্বীপে বিমানবন্দরের মূল উন্নয়নের কাজ ভারতীয়রা না পেলেও তা কিন্তু চীনারাও পায়নি। বরং সেটা গিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার বন্ধু দেশ সৌদি আরব, আমিরাত এবং সিঙ্গাপুরের কাছে। চীনারা রানওয়ে উন্নয়নের কাজে থাকলেও নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় ছিল না তারা।
  
মালদ্বীপের রাজধানী মালে শহর। মালদ্বীপের পর্যটন শিল্পে চীনারা গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে। বেশি সংখ্যক পর্যটকের উৎস হওয়ায় চীনারা মালদ্বীপের অর্থনীতিতে বড় অবদানের অংশীদার হয়ে গিয়েছে। তবে করোনাভাইরাসের প্রভাবে পর্যটন শিল্পে ধ্বস নামার কারণে মালদ্বীপের অর্থনীতি ২০২০ সালে সাড়ে ৮ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।

মালদ্বীপের পর্যটন শিল্পের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?

বিশ্বব্যাঙ্কের হিসেবে মালদ্বীপের জনসংখ্যা মাত্র ৫ লক্ষ ১৫ হাজারের মতো। অথচ দেশটাতে একবছরে পর্যটকের সংখ্যা দেশটার মোট জনসংখ্যার তিন গুণেরও বেশি! মালদ্বীপের ৩০ শতাংশ লোকের বাসবাস রাজধানী মালেতে; বাকিরা প্রায় ২’শ দ্বীপে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। পুরো দেশের ভূমি ৩’শ বর্গকিঃমিঃএরও কম! মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ১২ হাজার ডলার। মালদ্বীপের অর্থনীতি পুরোপুরি নির্ভরশীল পর্যটনের উপর। দেশটার জিডিপির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে এই সেক্টরের উপর নির্ভরশীল। প্রায় ৪৫ হাজার লোকের সরাসরি কর্মসংস্থান এই সেক্টরে। মালদ্বীপের ৪০ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান হয় এই সেক্টরের মাধ্যমে। গত প্রায় এক দশক ধরেই মালদ্বীপে পর্যটকের সংখ্যা প্রতিবছরই গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ হারে বেড়েছে। মালদ্বীপের মিডিয়া ‘এডিশন’ বলছে যে, দেশটায় মোট হোটেল শয্যার সংখ্যা প্রায় ৪২ হাজারের মতো। ২০১৯ সাল জুড়ে প্রায় ৬০ শতাংশের মতো হোটেল রুম ভর্তি ছিল। কাজেই মালদ্বীপের অর্থনীতির চাবি এই পর্যটন শিল্পের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

মালদ্বীপের পর্যটন শিল্পে চীনারা গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে। মালদ্বীপের সরকারের বরাত দিয়ে ‘রয়টার্স’ জানাচ্ছে যে, ২০১৯ সালে ২ লক্ষ ৮০ হাজারের বেশি চীনা পর্যটক মালদ্বীপে ভ্রমণ করেছে। একই বছরে মালদ্বীপে রেকর্ড ১৭ লক্ষেরও বেশি পর্যটক এসেছিল। এর মাঝে ৮ লক্ষ ৩৩ হাজার বা ৪৯ শতাংশ এসেছিল ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে। মালদ্বীপের মিডিয়া ‘আভাস’ বলছে যে, একটা দেশ থেকে সবচাইতে বেশি পর্যটক আসার কথা বলা হলে সেটা চীন; মোট পর্যটকের প্রায় ১৭ শতাংশ। ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মাঝে মালদ্বীপে চীনা পর্যটকের সংখ্যা ৬৭ শতাংশ বেড়ে গিয়ে ২ লক্ষ থেকে ৩ লক্ষ ৩২ হাজার হয়ে যায়; যদিও এরপর থেকে চীনা পর্যটকের সংখ্যা মোটামুটিভাবে ৩ লক্ষ থেকে সাড়ে ৩ লক্ষের কাছাকাছিই ছিল। তবে ভারত মালদ্বীপে চীনা পর্যটকদের দৌরাত্মকে ব্যালান্স করতে সেখানে ভারতীয় পর্যটকদের যাতায়াত সহজ করেছে। এর ফলে ২০১৯ সালে মালদ্বীপে ভারতীয় পর্যটকের সংখ্যা আগের বছরের চাইতে ৮৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ লক্ষ ৬৬ হাজার হয়। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৯০ হাজারের মতো। আর ২০১১ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৩১ হাজারের মতো। অর্থাৎ ২০১১ থেকে ২০১৯এর মাঝে মালদ্বীপে ভারতীয় পর্যটকের সংখ্যা পাঁচ গুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। তার পরেও এখনও তা মোট পর্যটকের ১০ শতাংশ; অর্থাৎ চীনের চাইতে কম। বেশি সংখ্যক পর্যটকের উৎস হওয়ায় চীনারা মালদ্বীপের অর্থনীতিতে বড় অবদানের অংশীদার হয়ে গিয়েছে। তবে করোনাভাইরাসের প্রভাবে পর্যটন শিল্পে ধ্বস নামার কারণে মালদ্বীপের অর্থনীতি ২০২০ সালে সাড়ে ৮ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
  
মালদ্বীপের উন্নয়ন কাজে বাংলাদেশী কর্মীদের অবদান অনস্বীকার্য। খুব কম পারিশ্রমিকে এবং অপ্রতুল আবাসস্থলে থাকার পরেও তারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তৈরি করছে হুলহুমালে দ্বীপ। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হবার পর এই শ্রমিকেরাই সবচাইতে বেশি বিপদে রয়েছে। ভারত যেখানে তার নৌবাহিনীর জাহাজ পাঠিয়েছে নিজেদের নাগরিকদের সেখান থেকে সরিয়ে আনার লক্ষ্যে, বাংলাদেশ সেখানে নিজেদের সামরিক বিমান এবং সামরিক জাহাজ পাঠিয়েছে নিজেদের মেডিক্যাল কর্মী এবং ত্রাণ সামগ্রী দিতে; যা কিনা ভারতকে আরও বিচলিত করেছে।


বিদেশী কর্মীর উৎসে উত্থান পতন

অন্যদিকে মালদ্বীপের পর্যটন শিল্প, তথা পুরো অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে বিপুল সংখ্যক বিদেশী কর্মীর উপর। মালদ্বীপের মিডিয়া ‘এডিশন’ বলছে যে, মালদ্বীপে বৈধভাবে কর্মরত রয়েছে ১ লক্ষ ৪৪ হাজার ৬’শ বিদেশী কর্মী। এর বাইরেও অবৈধভাবে কাজ করছে ৬৩ হাজারেরও বেশি মানুষ। এই বিদেশী কর্মীদের মাঝে বেশিরভাগই হলো বাংলাদেশী। প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম সলিহর সরকার ২০১৯এর সেপ্টেম্বরে যে কোন একটা দেশ থেকে দেড় লক্ষের বেশি কর্মী না নেবার কথা ঘোষণা করে। তবে প্রকৃতপক্ষে এই ঘোষণাটা ছিল বাংলাদেশীদের টার্গেট করে। মালদ্বীপের অর্থমন্ত্রী আহমেদ ফাইয়াজ বলেন যে, দেড় লক্ষের এই কোটা পার হয়ে যাবার কারণে মালদ্বীপ বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। মালদ্বীপে বাংলাদেশের দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি এটিএম মোশফিকুর রহমান বলেন যে, মালদ্বীপ সরকার বাংলাদেশের দূতাবাসকে এব্যাপারে কিছুই বলেনি। আর যেহেতু মালদ্বীপে বাংলাদেশীদের সংখ্যা এক লক্ষের বেশি নয়, তাই দেড় লক্ষের এই কোটা বাস্তব নয়। আর প্রায় ৪০ হাজার বাংলাদেশী কর্মী এই মুহুর্তে মালদ্বীপে ‘অবৈধ’ভাবে রয়েছে। তিনি বলেন যে, অনেক সময় চাকুরিদাতা কোম্পানি বেতন ঠিকমতো দেয়না। তখন কর্মীরা চাকুরি পরিবর্তন করে; এবং ‘অবৈধ’ আখ্যা পায়। বাংলাদেশ দূতাবাস মালদ্বীপকে অনেকদিন থেকেই এই ৪০ হাজার কর্মীকে ‘বৈধতা’ দেবার কথা বলে আসছে। মালদ্বীপের বর্তমান সরকার বাংলাদেশী কর্মীদের ব্যাপারে যেকথাই বলুক না কেন, মালদ্বীপের উন্নয়ন কাজে বাংলাদেশী কর্মীদের অবদান অনস্বীকার্য। খুব কম পারিশ্রমিকে এবং অপ্রতুল আবাসস্থলে থাকার পরেও তারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তৈরি করছে হুলহুমালে দ্বীপ। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হবার পর এই শ্রমিকেরাই সবচাইতে বেশি বিপদে রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে মালদ্বীপের জনগণ এবং এই শ্রমিকদের জন্যে ত্রাণ সামগ্রী পাঠানো হয়। এটা সম্ভব হয়েছে দুই দেশের মানুষের মাঝে দীর্ঘমেয়াদী বন্ধুত্বের কারণে। ভারত যেখানে তার নৌবাহিনীর জাহাজ পাঠিয়েছে নিজেদের নাগরিকদের সেখান থেকে সরিয়ে আনার লক্ষ্যে, বাংলাদেশ সেখানে নিজেদের সামরিক বিমান এবং সামরিক জাহাজ পাঠিয়েছে নিজেদের মেডিক্যাল কর্মী এবং ত্রাণ সামগ্রী দিতে; যা কিনা ভারতকে আরও বিচলিত করেছে। এর আগে ২০০৪ সালে এশিয়ান সুনামির সময় এবং ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে মালদ্বীপের ডিস্যালাইনেশন প্ল্যান্ট অচল হয়ে গেলে বাংলাদেশ মালদ্বীপকে বিমান বাহিনীর পরিবহণ বিমান এবং নৌবাহিনীর জাহাজে করে ত্রাণ পাঠিয়েছিল। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান মালদ্বীপ সফর করে মালদ্বীপের প্রতিরক্ষা দপ্তরের জন্যে ৭টা সামরিক ট্রাক উপহার হিসেবে দিয়ে আসেন।

মালদ্বীপের স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইয়ারবুকের তথ্য অনুসারে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত মালদ্বীপে বৈধ বিদেশী কর্মীদের মাঝে সবচাইতে বেশি প্রায় ৬ থেকে ৯ হাজার ছিল শ্রীলঙ্কান। ১৯৯৮ সাল থেকে ভারতীয় কর্মী বাড়তে থাকে; ১৯৯৭ সালে ৫ হাজার থেকে ২০০৭ সালে তা প্রায় ২৩ হাজারে পৌঁছে যায়। অন্যদিকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশী কর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৬ হাজার। ২০০৪ থেকে তা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে এবং ২০০৮ সাল নাগাদ প্রায় ৪০ হাজার হয়ে যায়। সেসময় ভারতীয় কর্মী ছিল প্রায় ২২ হাজার এবং শ্রীলঙ্কান প্রায় ১০ হাজার। বাংলাদেশী কর্মীদের এই সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ হলো মালদ্বীপের কন্সট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রি। পর্যটন সেক্টরে ২০০৩ সালে ১০ হাজার বিদেশী কর্মী কাজ করছিল; যা ২০১১ সাল নাগাদ বেড়ে ১৪ হাজারের মতো হয়। অন্যান্য সার্ভিসে বিদেশী কর্মী ৪ বা ৫ হাজার থেকে বেড়ে ৬ থেকে ১০ হাজার হয়। কিন্তু কন্সট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রিতে বিদেশী কর্মী ২০০২ সালে ৫ হাজার থেকে বেড়ে ২০০৮ সাল নাগাদ প্রায় ৩৫ হাজার হয়ে যায়। মালদ্বীপে কন্সট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রি এতটা বড় হলো কি করে? এই উত্তর পেতে তাকাতে হবে মালদ্বীপে বিনিয়োগের উৎসের দিকে।
  
হুলহুলের সাথে রাজধানী মালের যোগাযোগ স্থাপন করে দিয়েছে চীনের নির্মিত ‘সিনামালে’ সেতু। ২’শ ১০ মিলিয়ন ডলারে নির্মিত এই সেতুর খরচের ১’শ ২৬ মিলিয়ন চীনারা অনুদান হিসেবে দিয়েছে; আর ৭২ মিলিয়ন দিয়েছে ঋণ হিসেবে। এই সেতু তৈরির মাঝে তিনটা সরকার ক্ষমতায় ছিল; কিন্তু প্রকল্প বন্ধ হয়নি। চীনারা মালদ্বীপে নতুন করে কিছু করেনি; তারা শুধু মালদ্বীপের দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা রাষ্ট্রীয় দ্বীপ উন্নয়নের কাজে যোগ দিয়েছে মাত্র।

চীনা ঋণের ফাঁদে?

২০১৮ সালের নভেম্বরে মোহামেদ সলিহর নতুন সরকার ক্ষমতা নেবার পর পত্রপত্রিকায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় যে, চীনা ঋণে জর্জরিত মালদ্বীপকে চীনারা ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের বিল ধরিয়ে দিয়েছে। এই কথাগুলি বলেন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট মোহামেদ নাশীদ, যিনি বর্তমান প্রেসিডেন্ট সলিহর উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। ‘রয়টার্স’ নাশীদের কথার উপর ভিত্তি করেই বলে যে, মালদ্বীপে চীনা রাষ্ট্রদূত ঝাং লীঝং লিখিতভাবে এই অর্থ ফেরত চান। মালদ্বীপের কর্মকর্তারা বলছেন যে, মালদ্বীপের মতো অর্থনীতির পক্ষে চীনা ঋণ ফেরত দেয়া কঠিন হবে। চীনা রাষ্ট্রদূত মালদ্বীপের মিডিয়া ’আভাস’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে নাশীদের এই দাবিকে পুরোপুরি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন যে, এধরনের কোনকিছুই মালদ্বীপের কাছে দাবি করা হয়নি; আর মালদ্বীপের কাছে চীনের পাওনা রয়েছে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলারের মতো; নাশীদ যা বলছেন তা নয়। এর মাঝে সমুদ্রের মাঝ দিয়ে ‘সিনামালে’ সেতু তৈরি, বিমানবন্দরের উন্নয়ন কাজ, এবং সমুদ্র থেকে ভূমি মুক্ত করে সেখানে দু’টা রেসিডেনশিয়াল টাওয়ার ব্লক তৈরিতে চীন ঋণ দিয়েছে ৬’শ মিলিয়ন ডলার; আর বাকি ৯’শ মিলিয়ন ডলার বাণিজ্যিক ঋণ হিসেবে মালদ্বীপের সরকারি কোম্পানিগুলিকে দেয়া হয়েছে, যে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ থেকে শুরু করে বাসস্থান তৈরিতে। মালদ্বীপের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মালদ্বীপ মনেটারি অথরিটির গভর্নর আহমেদ নাসিরও চীনা ঋণের ব্যাপারে এই অংকই বলেছেন। কিন্তু চীনাদের ঋণেই কি মালদ্বীপ জর্জরিত? মালদ্বীপের সকল প্রকল্পই কি চীনাদের প্রকল্প?

২০০০ সালের দিকে মালদ্বীপের জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ ছিল সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ; এটা ২০০৮ সালে প্রায় ৭ শতাংশ হয়ে যায়। আর ২০১১ সাল নাগাদ তা জিডিপির ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। কন্সট্রাকশন সেক্টরে বিদেশী কর্মীদের সংখ্যাটাও এর সাথেই যায়; ২০০২ সালে ৫ হাজার কর্মী থেকে ২০০৮ সালে তা হয়ে যায় ৩৫ হাজার। চীনারা তখনও কিন্তু মালদ্বীপে বিনিয়োগ শুরু করেনি। ২০০৭ সালে বেইজিংএ মালদ্বীপের দূতাবাস খোলা হলেও মালদ্বীপে চীনের দূতাবাস খোলা হয় মাত্র ২০১১ সালে। অর্থাৎ মালদ্বীপে বিনিয়োগ এবং কন্সট্রাকশন সেক্টরের ব্যাপক প্রবৃদ্ধি খুঁজতে বেইজিং নয়, অন্য কোথাও খুঁজতে হবে।
   


হুলহুমালে প্রকল্পই হচ্ছে সেই প্রকল্প, যা মালদ্বীপে নতুন করে বিদেশী কর্মীদের ঢল এনেছে। এই প্রকল্প মহাসাগরের জলরাশির মাঝে শুধু একটা নতুন দ্বীপ তৈরিই নয়; এটা মালদ্বীপের রাষ্ট্রীয় প্রকল্প; সেদেশের মানুষের আশা। তাই দুই দশকের বেশি সময় ধরে হুলহুমালে শহরের কাজ চলছে। মাঝে পাঁচটা সরকার এবং বহু রাজনৈতিক টানাপোড়েন গিয়েছে; গিয়েছে বহু ভূরাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা। প্রকল্পে পরিবর্তন এসেছে; কনট্রাক্টর পরিবর্তন হয়েছে; অর্থায়নকারী পরিবর্তন হয়েছে; কিন্তু প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়নি। বিমানবন্দর নিয়ে রাজনীতি হয়েছে; ভারতীয়রা বাদ পড়েছে; কিন্তু প্রকল্প বাতিল হয়নি।

হুলহুমালে - মালদ্বীপের আশা

১৯৯০এর দশকের মাঝামাঝি মালে বিমানবন্দরের উত্তরে সমুদ্র থেকে ভূমি মুক্ত করে নতুন একটা দ্বীপ তৈরির পরিকল্পনা শুরু করা হয়। উদ্দেশ্য, নতুন একটা শহর তৈরি করা এবং মালে দ্বীপের মাত্র ৫ দশমিক ৮ বর্গকিঃমিঃ জায়গায় গাদাগাদি করে থাকা ১ লক্ষ ৩০ হাজার মানুষের জন্যে স্থান সঙ্কুলানের ব্যবস্থা করা। প্রায় দু’শ দ্বীপে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষগুলিকেও এখানে নিয়ে এসে নাগরিক সুবিধা দেয়ার কথা বলা হয়। প্রথম ফেইজে মাটি ফেলে ১’শ ৮৮ হেক্টর ভূমি সমুদ্রের নিচ থেকে মুক্ত করে আনার কাজ শুরু হয় ১৯৯৭ সালে। ২১ মিলিয়ন ডলার খরচে বেলজিয়ামের ‘ড্রেজিং ইন্টারন্যাশনাল’ ড্রেজিং করে বালু ভরাটের কাজ করে। এই কাজ শেষ হয় ২০০২ সালে। ২০০১ সালের মাঝে সিঙ্গাপুরের একটা কোম্পানির তত্বাবধানে প্রথম মাস্টার প্ল্যান তৈরি করা হয়। ২০০৪ সালের মাঝামাঝি কিছু নতুন বাসস্থানের উদ্বোধনের মাধ্যমে নতুন শহর ‘হুলহুমালে’র জন্ম দেয়া হয়। প্রথমদিকে এখানে শুধু থাকার ব্যবস্থার কথা বলা হলেও পরবর্তীতে এখানে পর্যটন, তথ্যপ্রযুক্তি, টেলিকমিউনিকেশন, ফিনান্স, ইন্ডাস্ট্রি, হাসপাতাল এবং শিক্ষার অবকাঠামো যোগ করার পরিকল্পনা করা হয়। এখানে বিজনেস পার্ক, আইটি পার্ক, ক্রুজ টার্মিনাল, মারিনা, পর্যটন জোন, থিম পার্ক, হোটেল, শপিং মল, অফিস বিল্ডিং, ইত্যাদি তৈরির জন্যে বিনিয়োগের পথ উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। এই শহরে প্রায় ৮৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়। পরিবেশগত দিক থেকেও হুলহুমালেকে এমন ভাবে তৈরি করা হচ্ছে, যাতে তা দীর্ঘমেয়াদে মানুষের কল্যাণ বয়ে আনে।

প্রথম ফেইজের কাজ শেষ হতে দশ বছর লেগে যায়। এই ফেইজে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে এই প্রকল্পের দ্বিতীয় ফেইজের জমি ভরাটের কাজ শুরু হয়। মাত্র ৭৭ দিনের মাঝে ২’শ ৪৪ হেক্টর জমি সমুদ্র থেকে মুক্ত করা হয়। সমুদ্রের প্রায় ৬০ মিটার নিচ থেকে সাকশন ড্রেজারের মাধ্যমে ৬০ লক্ষ কিউবিক মিটার বালু তুলে এখানে ফেলা হয়। বেলজিয়ামের কোম্পানি ‘ডিইএমই’এর অধীন ‘ড্রেজিং ইন্টারন্যাশনাল’ ৫০ মিলিয়ন ডলার খরচে এই কাজ করে। এই ফেইজে পরবর্তীতে মাস্টার প্ল্যানে কিছু পরিবর্তন আনা হয়। বেশিরভাগ জনগণের জন্যে যাতে গুরুত্বপূর্ণ সার্ভিসগুলি দেয়া সম্ভব হয়, সেজন্য এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে বলে বলেন ‘হাউজিং ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন’এর তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহামেদ সায়মন। দ্বিতীয় ফেইজে প্রায় ২ লক্ষ মানুষের স্থান সঙ্কুলানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সরকারি অফিসগুলিও হুলহুমালেতে স্থানান্তর করার কথা রয়েছে। আগে পরিকল্পনা না থাকলেও এখন হুলহুমালেতে উঁচু দালান তৈরি করা হচ্ছে। ‘ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর’এর হেং চিয়ে কিয়াং এন্ড লো বুন ইয়াংএর উপদেশ, তত্ত্বাবধান এবং ডিজাইনে এই কাজগুলি সম্পাদন করা হচ্ছে। দ্বিতীয় ফেইজে প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে তিন লেনের রাস্তা তৈরির কাজ করছে ভারতীয় কোম্পানি ‘মোহন মুথা এক্সপোর্টস’ এবং ‘অশোকা বিল্ডকন’।
  
৪’শ ৩৪ মিলিয়ন ডলার খরচে ১৬টা ২৫ তলা রেসিডেনশিয়াল বিল্ডিংএর প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়না’র ঋণে। নতুন প্রেসিডেন্ট মোহামেদ সলিহর সরকার ২০১৯এর শুরুর দিকে রেসিডেশিয়াল প্রকল্পগুলিতে পরিবর্তন এনে দুই রুমের এপার্টমেন্টের পরিবর্তে ৩ রুমের এপার্টমেন্ট তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয়। শুধু তা-ই নয়, চীনা প্রকল্পে তৈরি হয়ে যাওয়া বিল্ডিংগুলিতে এপার্টমেন্টের ডিজাইনে পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়।

বর্তমানে হুলহুমালেতে মালদ্বীপের সর্বোচ্চ ২৫ তলা অফিস বিল্ডিং তৈরি করা হচ্ছে। আর ৬২টা ২৫ তলা রেসিডেনশিয়াল বিল্ডিং তৈরি করা হচ্ছে। দ্বিতীয় ফেইজের অধীনে ৩৫ হাজার হাউজিং ইউনিট তৈরির টার্গেট রয়েছে। ৪’শ ৩৪ মিলিয়ন ডলার খরচে ১৬টা ২৫ তলা রেসিডেনশিয়াল বিল্ডিংএর প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়না’র ঋণে। ২০১৭ সাল থেকে শুরু হওয়া এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ‘চায়না স্টেট ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড কন্সট্রাকশন কোম্পানি’। এখানে সাড়ে ৫’শ বর্গফুট আয়তনের এবং দুই বেড ও দুই বাথরুমের ছোট ফ্ল্যাটে ৭ হাজার পরিবারের থাকার ব্যবস্থা হবে। এছাড়াও মালদ্বীপ পোর্টস লিমিটেড তৈরি করছে ৩টা ১৪ তলা রেসিডেনশিয়াল বিল্ডিং, যেখানে ৫’শ ৩৪টা এপার্টমেন্ট থাকবে। নতুন প্রেসিডেন্ট মোহামেদ সলিহর সরকার ২০১৯এর শুরুর দিকে রেসিডেশিয়াল প্রকল্পগুলিতে পরিবর্তন এনে দুই রুমের এপার্টমেন্টের পরিবর্তে ৩ রুমের এপার্টমেন্ট তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয়। শুধু তা-ই নয়, চীনা প্রকল্পে তৈরি হয়ে যাওয়া বিল্ডিংগুলিতে এপার্টমেন্টের ডিজাইনে পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়। ‘এইচডিসি’র নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুহাইল আহমেদ বলেন যে, তৈরি করা এই এপার্টমেন্টগুলি মালদ্বীপের মানুষের লাইফস্টাইলের সাথে যায় না বিধায় এগুলিকে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। মালদ্বীপের একটা সাধারণ পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর সাথে দু’টা শিশু থাকে। এর বাইরে রাজধানী থেকে তাদের বাবা-মা অনেক সময়েই ভিজিট করেন; কাজেই তিন রুমের এপার্টমেন্টই মালদ্বীপের জন্যে বেশি চলনসই। সাড়ে ৫’শ বর্গফুটের এপার্টমেন্টগুলি খুবই সংকীর্ণ এবং এখানে লিফটের সংখ্যাও কম। তবে সুহাইল এটাও বলেন যে, বর্তমান সরকার এই প্রকল্পকে থামিয়ে দিতে চায় না। আর এপার্টগুলিকে ২৫ তলা উঁচু না করেই হুলহুমালেতে ১ লক্ষ ৬০ হাজার মানূষের বসবাসের ব্যবস্থা করা সম্ভব।

বাসস্থান তৈরি ছাড়াও আরও অনেক প্রকল্প রয়েছে হুলহুমালেতে। ২০০৯ সালে মার্কিন কোম্পানি ‘জেনারেল ইলেকট্রিক’এর সাথে ২’শ মিলিয়ন ডলারের ‘গাফারু’ বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যাপারে আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু ২০১১ সালে আলোচনা ভেস্তে গেলে প্ল্যান্টের কাজ পায় চীনা কোম্পানি ‘এক্সইএমসি’। ২০ মেগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ ছাড়াও ৩০ মেগাওয়াট এলএনজি চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করছে তারা। তবে চীনারা একা নয়; অন্যরাও হুলহুমালেতে বেশকিছু কাজ পেয়েছে। ২০১৬ সালে ভারতীয় কোম্পানি ‘আরপিপি গ্রুপ’এর অধীন ‘রেনাটাস প্রজেক্ট’ ৭২টা লাক্সারি এপার্টমেন্ট তৈরির কাজ পায়। মালদ্বীপের নিজস্ব কোম্পানি ‘ব্যাচ কন্সট্রাকশন’কে দেয়া হয় ৬৯টা মিক্সড এপার্টমেন্ট তৈরির কাজ; ‘দামাস কোম্পানি’ পায় ৯৫টা মিক্সড এপার্টমেন্ট তৈরির কাজ; ‘এপোলো হোল্ডিংস’ পায় ৯৭টা এপার্টমেন্ট তৈরির কাজ। হুলহুমালে ছাড়াও অন্য দ্বীপগুলিতেও অনেক বিনিয়োগ হচ্ছে। ২০১৯ সালে আমিরাতের ৬ মিলিয়ন ডলার সহায়তায় মালের দেড়’শ কিঃমিঃ উত্তরে রা এটলের ভান্ধু দ্বীপে আবর্জনা থেকে বিদ্যুৎ তৈরির একটা কেন্দ্র তৈরি করা হয়। পুরো মালদ্বীপ জুড়ে হাইব্রিড পাওয়ার জেনারেশনের জন্যে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং জাপান সরকার ৫৫ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দিচ্ছে।

হুলহুমালে প্রকল্পই হচ্ছে সেই প্রকল্প, যা মালদ্বীপে নতুন করে বিদেশী কর্মীদের ঢল এনেছে। এই প্রকল্প মহাসাগরের জলরাশির মাঝে শুধু একটা নতুন দ্বীপ তৈরিই নয়; এটা মালদ্বীপের রাষ্ট্রীয় প্রকল্প; সেদেশের মানুষের আশা। তাই দুই দশকের বেশি সময় ধরে হুলহুমালে শহরের কাজ চলছে। মাঝে পাঁচটা সরকার এবং বহু রাজনৈতিক টানাপোড়েন গিয়েছে; গিয়েছে বহু ভূরাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা। প্রকল্পে পরিবর্তন এসেছে; কনট্রাক্টর পরিবর্তন হয়েছে; অর্থায়নকারী পরিবর্তন হয়েছে; কিন্তু প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়নি। বিমানবন্দর নিয়ে রাজনীতি হয়েছে; ভারতীয়রা বাদ পড়েছে; কিন্তু প্রকল্প বাতিল হয়নি। এই শহরের সাথে হুলহুলে দ্বীপে অবস্থিত মালে বিমানবন্দরের সড়কপথে যোগাযোগ রয়েছে। আর হুলহুলের সাথে রাজধানী মালের যোগাযোগ স্থাপন করে দিয়েছে চীনের নির্মিত ‘সিনামালে’ সেতু। ২’শ ১০ মিলিয়ন ডলারে নির্মিত এই সেতুর খরচের ১’শ ২৬ মিলিয়ন চীনারা অনুদান হিসেবে দিয়েছে; আর ৭২ মিলিয়ন দিয়েছে ঋণ হিসেবে। এই সেতু তৈরির মাঝে তিনটা সরকার ক্ষমতায় ছিল; কিন্তু প্রকল্প বন্ধ হয়নি। চীনারা মালদ্বীপে নতুন করে কিছু করেনি; তারা শুধু মালদ্বীপের দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা রাষ্ট্রীয় দ্বীপ উন্নয়নের কাজে যোগ দিয়েছে মাত্র। এখানে চীনারা ছাড়াও সিঙ্গাপুর, ভারত, সৌদি আরব, আমিরাত, কুয়েত, যুক্তরাষ্ট্র, বেলজিয়াম এবং আরও অনেকেই রয়েছে। আর এই পুরো কর্মযজ্ঞ সফল করতে হাজারো কর্মী পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু ভারতীয়দের কাছে চীন এবং সৌদি গ্রুপ কারুর বিনিয়োগই পছন্দনীয় হয়নি। ‘আল জাজিরা’র সাথে কথা বলতে গিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির বিশ্লেষক ব্রহ্ম চেলানি বলেন যে, চীন এবং সৌদি আরব মালদ্বীপে একটা বাজে ভূমিকা নিয়েছে, যার মাধ্যমে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যাহত হচ্ছে। চেলানির চিন্তাগুলি ভারতের রাষ্ট্রচিন্তারই প্রতিফলক। শুধু চীনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিনিয়োগই নয়, মালদ্বীপে বাংলাদেশী কর্মীদের সংখ্যাবৃদ্ধি এবং সেখানে চীনা পর্যটকদের আনাগোণাকেও ভারত হুমকি হিসেবে দেখছে। মুসলিম অধ্যুষিত হওয়ায় মালদ্বীপকে ভারত তার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যে আরও বড় হুমকি হিসেবে দেখেছে। একইভাবে মালদ্বীপের ব্যাপারে পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের অবস্থানকেও ভারত সবসময় সন্দেহের চোখে দেখেছে।
  
মালদ্বীপের ব্যাপারে সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের হিসেব ভিন্ন। বিশ্বের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র বাণিজ্যপথগুলির একটা মালদ্বীপের উত্তর সীমানা ঘেঁষে গিয়েছে; আর ভারত মহাসাগরের ব্রিটিশ অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি দিয়েগো গার্সিয়াও মালদ্বীপ থেকে খুব বেশি দূরে নয়। মালদ্বীপে চীনা বিনিয়োগের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র যে খেয়াল রাখছে, তা ছোট্ট দেশটার অপেক্ষাকৃত বৃহৎ বিমানবন্দরের কাজের ভাগবাটোয়ারা দেখলেই বোঝা যায়। চীনের প্রভাবকে কমাতে ভারতকে অখুশি করাতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ খুব কমই খুন্ন হয়েছে। ভারতের নিরাপত্তাহীনতা বরং ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি টেনেছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র চীনকে ব্যালান্স করতে মালদ্বীপে সৌদি আরব এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলির বিনিয়োগ টেনে এনেছে।



সমুদ্র বাণিজ্য পথের নিয়ন্ত্রকের অবস্থানে মালদ্বীপ

মালদ্বীপের অর্থনীতিতে অন্য যেকোন দেশের বিনিয়োগকে ভারত নিজের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে দেখছে। ভারত মালদ্বীপের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়নি কখনোই; বরং দেশটাকে নিরাপত্তার দিক থেকে নিজের প্রভাবে রাখাতেই তার আগ্রহ ছিল সর্বোচ্চ। ২০১৯ সালের জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মালদ্বীপ সফর করেন। দ্বিতীয়বার নির্বাচন জেতার পর এটা ছিল মোদির প্রথম বৈদেশিক সফর। ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, মালদ্বীপের এর আগের প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লা ইয়ামিনের সময়ে ২০১৭এর ফেব্রুয়ারিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার পর ভারতের সাথে সম্পর্কের ব্যাপক অবণতি ঘটে। ইয়ামিন ভারতীয় নাগরিকদের চাকুরির ভিসা নিয়ন্ত্রণ করার সিদ্ধান্ত নেন এবং চীনের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির দিকে এগিয়ে যান; যেগুলি ভারত ভালো চোখে দেখেনি। মালদ্বীপের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম সলিহ নির্বাচনে চীন বিরোধী একটা অবস্থান নেয়ায় ভারত স্বস্তিতে আছে। সলিহ ক্ষমতায় গিয়েই প্রথম ভারত সফর করেছিলেন।

গত জুনের মালদ্বীপ সফরের সময় মোদি মালদ্বীপে ভারতের রাডার স্টেশন উদ্বোধন করেন। এ পর্যন্ত মালদ্বীপে ভারত ইলেকট্রনিক্সের তৈরি ১০টা রাডার বসানো হয়েছে। মালের কাছাকাছি ভিলিংগিলি দ্বীপে ‘মালদ্বীপ ম্যারিটাইম রেসকিউ কোঅরডিনেশন সেন্টার’এর কন্ট্রোল সেন্টারের সাথে এই রাডারগুলি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যুক্ত। মোদির সফরের আগে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখালে সাংবাদিকদের বলেন যে, এই রাডারগুলি মালদ্বীপের সমুদ্রসীমা পাহাড়া দেয়ার কাজে ব্যবহৃত হবে। ভারতীয় কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ‘ডেকান হেরাল্ড’ বলছে যে, এই রাডারগুলি একইসাথে ভারতের কৌশলগত সম্পদ। কারণ এগুলি ভারতীয় নৌবাহিনীকে অত্র এলাকা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা দিয়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তাকে সুসংহত করবে। আগের প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লা ইয়ামিন এই রাডার প্রকল্পকে থামিয়ে দিয়েছিলেন। ভারতীয় পত্রিকা ‘দ্যা ট্রিবিউন’ বলছে যে, ২০১৭ সালের নভেম্বরে ইব্রাহিম সলিহ ক্ষমতা নেবার ছয় মাস পর ২০১৮এর এপ্রিল থেকে এই প্রকল্প আবারও এগিয়ে যায়। দ্বিতীয় ফেইজের কাজের মাঝে ছিল ৭টা নতুন রাডার বসানো এবং প্রথম ফেইজের পুরাতন ৩টা রাডার আপগ্রেড করা। এই ১০টা রাডার ভারতের উপকূলের ৪৬টা রাডারের সাথে একত্রে সমুদ্র নিয়ন্ত্রণে কাজ করবে। একই প্রকল্পের অধীনে ভারত সেইশেলে ১টা, মরিশাসে ৮টা এবং শ্রীলঙ্কাতে ৬টা রাডার স্থাপন করছে। মোদি তার মালদ্বীপ সফরের সময় মালদ্বীপের নিরাপত্তা বাহিনীর জন্যে একটা প্রশিক্ষণ ঘাঁটিরও উদ্বোধন করেন। একইসাথে দুই দেশ ‘হোয়াইট শিপিং’ নিয়ে একটা সমঝোতা স্বাক্ষর করে। এর মাধ্যমে মালদ্বীপের সীমায় যেকোন বেসামরিক জাহাজের তথ্য মালদ্বীপ ভারতীয় নৌবাহিনীকে সরবরাহ করবে। ভারতের ৪৬টা রাডার প্রথম ফেইজে বসানো হয়েছে; যার মাঝে ৩৬টা বসানো হয়েছে ভারতের মূল ভুখন্ডে; ৬টা লাক্ষাদ্বীপ দ্বীপপুঞ্জে এবং ৪টা আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে। এর সাথে ১৬টা কমান্ড এন্ড কন্ট্রোল সেন্টারও রয়েছে। দ্বিতীয় ফেইজে আরও ৩৮টা রাডার এবং ৫টা কমান্ড এন্ড কন্ট্রোল সেন্টার বসাবার কাজ চলমান রয়েছে। ভারতের এই ‘কোস্টাল সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম’ বা ‘সিএসএস’এর মাঝে রয়েছে উপকূলীয় রাডার সিস্টেম; ‘অটোম্যাটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম’ বা ‘এআইএস’; ‘ইলেক্ট্রো অপটিক সিস্টেম’; আবহাওয়ার তথ্য নেবার সিস্টেম; এবং কমান্ড এন্ড কন্ট্রোল সেন্টারের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের জন্যে ভিএইচএফ রেডিও কমিউনিকেশন সিস্টেম। রাডার ছাড়াও মালদ্বীপের নৌসীমা পাহাড়া দেয়ার জন্যে ভারত মালদ্বীপকে প্যাট্রোল বোটও সরবরাহ করেছে। ২০০৮ সালে মুম্বাইএ সন্ত্রাসী হামলায় অংশ নেয়া সন্ত্রাসীদের সমুদ্রপথে ছোট নৌকার মাধ্যমে ভারতে প্রবেশ করার খবর প্রকাশ পাবার পর থেকে ভারত তার পুরো উপকূলব্যাপী সারভেইল্যান্স রাডার বসানো শুরু করে, যাতে উপকূলের কাছাকাছি ছোটছোট নৌকাও যেন বাদ না যায়। সেই সময় থেকে পুরো ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল জুড়ে ভারত রাডার বসানো ছাড়াও হোয়াইট শিপিংএর ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহের চুক্তি করছে এবং ছোট দেশগুলিকে প্যাট্রোল বোট সরবরাহ করছে। ভারতীয় রাষ্ট্রীয় চিন্তাবিদদের নিরাপত্তাহীনতার চিন্তার ব্যাপারটা মালদ্বীপের ভূরাজনীতিকে জটিল করেছে।
  
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবিলায় ত্রাণ নিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজের মালদ্বীপ সফর। ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে ভারত এবং চীনকে; এমনকি সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্র এখান থেকে বের হয়ে যেতে পারেনি। আর এই বাস্তবতাই অঞ্চলিকভাবে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানকে মালদ্বীপের ভূরাজনৈতিক হিসেবের মাঝে রাখবে। পাকিস্তানের সহায়তা ছাড়া চীনের পক্ষে আরব সাগর এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ কোন মিশন বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে ভারত সর্বদাই পাকিস্তানকে ব্যালান্স করতে গিয়ে বাংলাদেশকে ছাড় দিতে বাধ্য হবে। আর একইসাথে চীনকে ব্যালান্স করতে গিয়ে সৌদি আরব এবং আমিরাতকে মেনে নিতে বাধ্য হবে।



এই রাডার নেটওয়ার্ক থেকে পাওয়া তথ্য ভারতীয় নৌবাহিনীর ‘ইনফরমেশন ফিউশন সেন্টার, ইন্ডিয়ান ওশান রিজিয়ন’ বা ‘আইএফসি, আইওআর’এ সরাসরি সরবরাহ করা হবে। এই অঞ্চলে ‘হোয়াইট শিপিং’এর সমঝোতা হয়েছে যে দেশগুলির সাথে, তারা ‘আইএফসি, আইওআর’কে তথ্য দেবে। ভারতীয় নৌবাহিনীর বরাত দিয়ে ‘দ্যা নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ বলছে যে, ‘আইএফসি, আইওআর’এ নিজেদের নৌবাহিনীর লোক পোস্টিং দেয়ার জন্যে ৫টা বড় নৌবাহিনী এগিয়ে এসেছে। এই দেশগুলি হলো যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ভারতের গুরগাঁওতে ‘আইএফসি, আইওআর’এর চালু করা এই সেন্টারে ২০১৯এর সেপ্টেম্বরে প্রথম বিদেশী লিয়াঁজো অফিসার হিসেবে একজন ফরাসী সামরিক অফিসারকে পোস্টিং দেয়া হয়। এই কর্মকান্ডকে বাস্তবায়ন করতে ভারত ২২টা দেশের সাথে তথ্য সরবরাহ করার সমঝোতা স্বাক্ষর করেছে; একইসাথে ৩০টা দেশের সাথে একটা ভার্চুয়াল নেটওয়ার্ক তৈরি করতে চাইছে তারা, যাতে পুরো ভারত মহাসাগরের সকল জাহাজের তথ্য সাথেসাথেই পাওয়া যায়। তবে বেশ কয়েক বছর ধরে ভারত এই নেটওয়ার্কের কাজ করলেও শক্তিশালী দেশগুলি এর সাথে যুক্ত হতে যে খুব বেশি আগ্রহ দেখায়নি তা মোটামুটিভাবে পরিষ্কার। সবাই এটা বুঝতে পারছে যে, এ নেটওয়ার্ক আঞ্চলিক নয়, বরং ভারতের নিজস্ব নিরাপত্তার চিন্তার উপর ভিত্তি করেই তৈরি হচ্ছে। এটার বেশি প্রয়োজন ভারতের; অন্য দেশগুলির নয়।

তবে মালদ্বীপের ব্যাপারে সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের হিসেব ভিন্ন। বিশ্বের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র বাণিজ্যপথগুলির একটা মালদ্বীপের উত্তর সীমানা ঘেঁষে গিয়েছে; আর ভারত মহাসাগরের ব্রিটিশ অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি দিয়েগো গার্সিয়াও মালদ্বীপ থেকে খুব বেশি দূরে নয়। মালদ্বীপে চীনা বিনিয়োগের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র যে খেয়াল রাখছে, তা ছোট্ট দেশটার অপেক্ষাকৃত বৃহৎ বিমানবন্দরের কাজের ভাগবাটোয়ারা দেখলেই বোঝা যায়। চীনের প্রভাবকে কমাতে ভারতকে অখুশি করাতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ খুব কমই খুন্ন হয়েছে। ভারতের নিরাপত্তাহীনতা বরং ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি টেনেছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র চীনকে ব্যালান্স করতে মালদ্বীপে সৌদি আরব এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলির বিনিয়োগ টেনে এনেছে। আর হুলহুমালে দ্বীপে মালদ্বীপের রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন প্রকল্পগুলি ভূরাজনৈতিকভাবে এতটাই শক্ত ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত যে, তা বন্ধ করার কোন পদ্ধতি কেউ নিয়ে আসেনি; বরং এই প্রকল্পে অংশ নিতে একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করেছে। আর এত গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রকল্পে বিদেশী কর্মী, বিশেষ করে বাংলাদেশীদের অংশগ্রহণ ঠেকাবার পদ্ধতিও খুব একটা নেই। মালদ্বীপের অবস্থানই মালদ্বীপের গুরুত্ব পাবার কারণ। কিন্তু পর্যটন শিল্প বৃদ্ধি না পেলে মালদ্বীপের অবকাঠামো উন্নয়নের কোন প্রশ্নই আসতো না। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সময় মালদ্বীপের পর্যটন শিল্পের উপর নির্ভরশীল অর্থনীতি ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মাঝে পড়লেও দেশটাকে নিয়ে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কমেনি; বরং বেড়েছে। চীনের অর্থনৈতিক উত্থান এবং ভারত মহাসাগরে চীনা নৌবাহিনীর আনাগোণা মালদ্বীপের গুরুত্বকে আরও বৃদ্ধি করেছে। এতদিন মালদ্বীপে ভারতের প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টাকে কেউ চ্যালেঞ্জ না করলেও এখন সেই সমীকরণ পাল্টে গেছে। ছোট্ট এই দ্বীপ দেশে নিজ প্রভাব ধরে রাখতে ভারতকে চীন ছাড়াও সৌদি আরব, আমিরাত, বাংলাদেশকে নিয়ে চিন্তা করতে হচ্ছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে চীন এবং বাংলাদেশ মালদ্বীপকে মেডিক্যাল সহায়তা প্রদান করেছে; যা ভারতকে আরও বেশি বিচলিত করেছে। ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে ভারত এবং চীনকে; এমনকি সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্র এখান থেকে বের হয়ে যেতে পারেনি। আর এই বাস্তবতাই অঞ্চলিকভাবে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানকে মালদ্বীপের ভূরাজনৈতিক হিসেবের মাঝে রাখবে। পাকিস্তানের সহায়তা ছাড়া চীনের পক্ষে আরব সাগর এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ কোন মিশন বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে ভারত সর্বদাই পাকিস্তানকে ব্যালান্স করতে গিয়ে বাংলাদেশকে ছাড় দিতে বাধ্য হবে। আর একইসাথে চীনকে ব্যালান্স করতে গিয়ে সৌদি আরব এবং আমিরাতকে মেনে নিতে বাধ্য হবে।