Showing posts with label Germany. Show all posts
Showing posts with label Germany. Show all posts

Saturday, 6 May 2023

ইউরোপজুড়ে মে দিবসের বিক্ষোভ শ্রমিকদের অপূর্ণ অধিকারকেই তুলে ধরে

০৬ মে ২০২৩

ফ্রান্সে মে দিবসে শ্রমিকদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ। ‘আইএলও’ প্রধান তার হতাশা ব্যক্ত করে বলেন যে, এখনও নীতির ঘুরপাকেই পড়ে থাকতে হচ্ছে; যেখানে বৈষম্য এবং অস্থিরতাই স্বাভাবিক। ‘আইএলও’ প্রধানের হতাশার কথাগুলি ইউরোপের লিবারাল পুঁজিবাদী দেশগুলির রাস্তায় শ্রমিক বিক্ষোভের মাঝেই প্রতিফলিত হচ্ছে। ন্যায্য বেতন, জীবনযাত্রার মান, ছুটি, ইত্যাদি ইস্যুতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ দেখিয়ে দেয় যে, ইউরোপের উন্নত দেশগুলি শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিতে যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা রক্ষা করতে মোটেই মনোযোগী হয়নি।

‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এবারের মে দিবসে পুরো ইউরোপজুড়ে শ্রমিক ইউনিয়নগুলি বহু বিক্ষোভের আয়োজন করেছে। বিশেষ করে ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতির কারণে যে মানুষগুলি অর্থনৈতিকভাবে বেশি চাপের মাঝে পড়েছে, তারাই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে। ‘জার্মান ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন’ বা ‘ডিজিবি’ বলছে যে, তাদের আয়োজিত ৩’শ ৯৮টা মিছিলে ২ লক্ষ ৮৮ হাজার মানুষ যোগ দিয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা, বিমান পরিবহণ, সড়ক পরিবহণ, রেলওয়ে, ডাকবিভাগ, পরিচ্ছন্নকর্মী ছাড়াও বিভিন্ন সেক্টরের শ্রমিকরা এবছরে জার্মানিতে ন্যায্য পারিশ্রমিক এবং কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন সুবিধা বৃদ্ধির দাবিতে ধর্মঘট পালন করেছে। বার্লিনে এক মিছিলে জার্মান শিল্পভিত্তিক ট্রেড ইউনিয়ন ‘আইজি মেটাল’এর নেতা জোর্গ হফমান ঘোষণা দেন যে, তারা ধর্মঘট করার অধিকারের উপর কোন প্রকারের নিয়ন্ত্রণ সহ্য করবেন না।

তবে ফ্রান্সের রাস্তাগুলি ছিল সবচাইতে উত্তপ্ত। পুরো ফ্রান্সজুড়ে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর নতুন পেনশন আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে। অবসরের বয়স ৬২ বছর থেকে বাড়িয়ে ৬৪ বছর করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ফরাসি শ্রমিক ইউনিয়নগুলি ৩’শর বেশি মিছিলের ডাক দিয়েছিল। দিন যত গড়িয়েছে, বিক্ষোভগুলি ক্রমেই সহিংস হয়েছে এবং পুলিশের সাথে শ্রমিকদের সংঘর্ষ হয়েছে। ফরাসি বার্তাসংস্থা ‘এএফপি’ বলছে যে, বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু ছুঁড়ে মেরেছে এবং রাস্তার পাশের বিভিন্ন দোকানপাট ও ব্যাংকের জানালার গ্লাস ভাংচুর করেছে। লিয়ঁ শহরে পুলিশ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেরাল্ড ডারমারিন এক সংবাদ সন্মেলনে বলেন যে, সহিংসতায় ১’শ ৮ জন পুলিশ আহত হয়েছে এবং দেশজুড়ে ২’শ ৯১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ৮ লক্ষাধিক মানুষ এই বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিল। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, একদিকে শ্রমিকরা যেখানে বলছে যে, সরকারের নতুন আইনে তাদের অধিকার খর্ব হচ্ছে, সেখানে সরকার বলছে যে, দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে এটা প্রয়োজন; কারণ ফ্রান্সের জনগণের গড় বয়স বেড়ে যাচ্ছে। এবারে বামপন্থীদের সাথে যোগ দিয়েছিল সাধারণ জনগণ; যারা অর্থনৈতিক সুবিচার চায় এবং প্রেসিডেন্টের ব্যবসায়ী-বান্ধব নীতির বিরোধী।

এদিকে ইতালিতে ডানপন্থী সরকার কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি হবে এই লক্ষ্য নিয়ে দরিদ্রদের জন্যে সামাজিক সুরক্ষা কমিয়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এক বিবৃতিতে ঘোষণা দেন যে, চার বছর আগে চালু করা দরিদ্রদের সুরক্ষা আইনে পরিবর্তন আনা হয়েছে; যাতে করে কারা কাজ করতে পারে, আর কারা কাজ করতে পারে না, তাদের মাঝে আলাদা করা যায়। অর্থাৎ যাদেরকে এই সুবিধা দেয়া হবে, তাদের সংখ্যা কমিয়ে আনা হচ্ছে। ইতালির বিরোধী দলগুলি ক্ষমতাসীনদের সামাজিক সুরক্ষা কমিয়ে ফেলার নীতির ব্যাপক সমালোচনা করছে। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, ইতালির উত্তরের তুরিন শহরে বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির পাপেট নিয়ে মিছিল করে, যেখানে মেলোনি ফ্যাসিস্ট স্যালুট দিচ্ছেন বলে দেখানো হয়।

এদিকে ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, স্পেনের শ্রমিক ইউনিয়নগুলি ৭০টার বেশি মিছিলের আয়োজন করে; যেখানে বলা হয় যে, মুদ্রাস্ফীতির সাথেসাথে শ্রমিকদের বেতন না বাড়লে সামাজিক দ্বন্দ্ব তৈরি হবে। মাদ্রিদের ‘ইলাসট্রিয়াস কলেজ অব ল’ইয়ার্স’এর আইনজীবিরাও রাস্তায় মিছিল করে। তাদের দাবি ছিল ছুটির। স্পেনের আইন অনুযায়ী একজন আইনজীবিকে বছরে ৩৬৫ দিনই কাজের জন্যে প্রস্তুত থাকতে হয়। এমনকি তাদের কাছের কোন ব্যক্তির যদি মৃত্যুও হয়, অথবা তারা নিজেরা যদি অসুস্থও হয়, তাহলেও তাদেরকে কাজের ডিউটি দিতে হয়। তারা বলছেন যে, করোনা মহামারির সময়ে আইনজীবিরা হাসপাতাল থেকে টুইটারে ছবি পোস্ট করেছিলেন, যেখানে তারা বলছিলেন যে, স্যালাইন দেওয়া অবস্থায় তারা কাজ করছিলেন।

‘আনাদোলু এজেন্সি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে হাজারো শ্রমিক রাস্তায় বিক্ষোভ করেছে। মূলতঃ বামপন্থী সংগঠনগুলির আয়োজন করা এই বিক্ষোভে ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতির মাঝে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান রক্ষা করার কষ্টটাকেই তুলে ধরা হয়। একই দিনে গ্রিসে রেল শ্রমিক, জাহাজ ও বন্দর শ্রমিকরা ধর্মঘট করে। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, মেসিডোনিয়ায় মন্ত্রীদের বেতন ৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি করার প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। সে দেশে শ্রমিকদের বেতন সাড়ে ৩’শ ডলার হলেও মন্ত্রীদের বর্তমান বেতন বাড়িয়ে ২ হাজার ৫’শ ৩০ ডলার করা হয়েছে।

ইউরোপের রাস্তায় বিক্ষোভগুলি যে বিশ্বব্যবস্থার সমস্যা, তা ‘আইএলও’ প্রধানের বক্তব্যতেই পরিষ্কার হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ‘আইএলও’এর ডিরেক্টর জেনারেল গিলবার্ট হুংবো মে দিবস উপলক্ষে এক বার্তায় বিশ্বব্যাপী শ্রমিকদের জন্যে সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। একইসাথে তিনি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও জলবায়ুগত নীতিতে পরিবর্তন আনার আহ্বান জানান; যাতে করে সকলের অধিকার নিশ্চিত করা যায়। তিনি তার হতাশা ব্যক্ত করে বলেন যে, করোনা মহামারির সময়ে শ্রমিকদেরকে যেসকল প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, সেগুলি বাস্তবায়িত হয়নি। বিশ্বব্যাপী শ্রমিকদের সত্যিকারের বেতন কমে গেছে, দারিদ্র্য বেড়ে যাচ্ছে, অর্থনৈতিক বৈষম্য আগের চাইতেও আরও মারাত্মকভাবে যেঁকে বসেছে। শ্রমিকরা মনে করছে যে, করোনা মহামারির সময় তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে কাজগুলি করেছে, সেগুলির পুরষ্কার কেন, স্বীকৃতিই দেয়া হয়নি। এগুলির কারণে শ্রমিকদের মাঝে মারাত্মক আকারের অবিশ্বাস দেখা দিয়েছে।

‘আইএলও’ প্রধান মনে করিয়ে দেন যে, ১৯৪৪ সালে ‘আইএলও’ প্রতিষ্ঠার সময়ে বলা হয়েছিল যে, বিশ্ব অর্থনীতি শুধুমাত্র প্রবৃদ্ধি এবং কিছু পরিসংখ্যান টার্গেটের পিছনেই ছুটবে না; বরং সেখানে মানুষের চাহিদা এবং ইচ্ছাকে প্রধান্য দেবে। অর্থাৎ বৈষম্য দূরীকরণ, দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং সামাজিক সুরক্ষা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল; বিশেষ করে জনগণের জন্যে এমন ধরণের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, যাতে করে মানুষ নিজেদের দায়িত্ব নিজেরাই নিতে পারে। কিন্তু তিনি তার হতাশা ব্যক্ত করে বলেন যে, এখনও নীতির ঘুরপাকেই পড়ে থাকতে হচ্ছে; যেখানে বৈষম্য এবং অস্থিরতাই স্বাভাবিক। ‘আইএলও’ প্রধানের হতাশার কথাগুলি ইউরোপের লিবারাল পুঁজিবাদী দেশগুলির রাস্তায় শ্রমিক বিক্ষোভের মাঝেই প্রতিফলিত হচ্ছে। ন্যায্য বেতন, জীবনযাত্রার মান, ছুটি, ইত্যাদি ইস্যুতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ দেখিয়ে দেয় যে, ইউরোপের উন্নত দেশগুলি শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিতে যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা রক্ষা করতে মোটেই মনোযোগী হয়নি।

Wednesday, 19 April 2023

ইউরোপ কি চীনের সাথে, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে?

১৯শে এপ্রিল ২০২৩

এপ্রিল ২০২৩। বেইজিংএ শি জিনপিংএর সাথে ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ। চীন বিষয়ে ম্যাক্রঁর বক্তব্য দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ইউরোপের চিন্তা যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে থাকবে কি থাকবে না, অথবা যুক্তরাষ্ট্রের উপরে কতটা নির্ভরশীল থাকবে, সেটাই যেন বিবেচ্য বিষয়। ম্যাক্রঁ যখন বলছেন যে, ইউরোপের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা থাকা উচিৎ, তখনও তিনি প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের কোলে বসে থাকা উচিৎ হবে কিনা, সেটা নিয়েই কথা বলছেন।

 বেইজিংএ যেনো বিশ্ব নেতাদের মেলা শেষ হচ্ছে না। সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিং সফরে গিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ, ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইয়েন, এবং জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক। এছাড়াও বেইজিং সফর করেছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ, সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লী সিয়েন লুং, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা। তবে যার সফর মিডিয়াতে সবচাইতে বেশি হাইলাইট হয়েছে তিনি হলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ। অনেকেই প্রশ্ন করা শুরু করেছেন যে, ম্যাক্রঁ কি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছেন কিনা।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ কি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন?

এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ এবং ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইয়েন বেইজিং সফর করে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংএর সাথে আলোচনা করেন। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ বলেন যে, তিনি নিশ্চিত যে, শি জিনপিংই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে এসে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করাতে পারবেন। ‘বিবিসি’ বলছে যে, সাংবাদিক সন্মেলনে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ বেশ অমায়িক ছিলেন এবং বারংবার শি জিনপিংএর দিকে তাকাচ্ছিলেন ও তাকে নাম ধরে সম্ভোধন করছিলেন। তবে ‘বিবিসি’র এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, ম্যাক্রঁর বেইজিং সফরের পর ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যাপারে শি জিনপিংএর চিন্তাতে বড় কোন পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা নেই। ম্যাক্রঁ মনে করছেন যে, পশ্চিমা জোটের অংশ হবার অর্থ এই নয় যে, ফ্রান্স চীনের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করতে পারবে না। সংবাদ সন্মেলনে ম্যাক্রঁ চীনের মানবাধিকার নিয়ে কথা বলেননি। বরং তিনি বলেছেন যে, মানবাধিকার ফ্রান্সের কাছে গুরুত্বপূর্ণ; তবে সন্মান দিয়ে কথা বলাটা ‘লেকচার দেওয়া’ থেকে ভালো। ম্যাক্রঁর সফরের মাঝে দুই দেশের মাঝে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

আরেকটা সংবাদ সন্মেলনে ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট ভন ডার লেইয়েন বলেন যে, তিনি মনে করছেন যে, চীন ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে সুষ্ঠু ভূমিকা নেবে। তবে তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলদিমির জেলেন্সকির শান্তি প্রস্তাবের পক্ষে বলেন; যেখানে ইউক্রেন থেকে রুশ সেনাদের সম্পূর্ণ সরে যাবার কথা বলা হয়েছে। একইসাথে তিনি বলেন যে, চীন যদি রাশিয়াকে অস্ত্র সরবরাহ করে, তাহলে ইউরোপের সাথে চীনের সম্পর্ক খারাপ হবে।

৯ই এপ্রিল ফরাসি পত্রিকা ‘লে একোস’এ প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ বলেন যে, সবচাইতে খারাপ ব্যাপার হবে যদি ইউরোপিয়রা চিন্তা করতে থাকে যে, তাদেরকে অন্য কাউকে অনুসরণ করতে হবে; নিজেদেরকে পরিবর্তন করে মার্কিন সুর এবং এর চীনা প্রতিক্রিয়ার সাথে তাল মেলাতে হবে। ১১ই এপ্রিল দি হেগএর ‘নেক্সাস ইন্সটিটিউট’এ এক বক্তব্যে ম্যাক্রঁ জার্মানির নাম উল্লেখ না করেই বলেন যে, ইউরোপের কেউ কেউ রাশিয়া থেকে জ্বালানি ক্রয় করা জন্যে তাদেরকে বন্ধু বানিয়েছিল। কারণ তারা মনে করেছিল যে, বাণিজ্যের মাধ্যমেই সহযোগিতা বৃদ্ধি করা এবং আগ্রাসনকে মোকাবিলা করা সম্ভব। এখন তারাই জ্বালানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে এবং ইউরোপকে মারাত্মক পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে। তিনি বলেন যে, করোনা মহামারি এবং ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপের চোখ খুলে দিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ দ্রব্যের সাপ্লাই স্বল্পতা এবং যুদ্ধের দামামাকে তুলে ধরে তিনি বলেন যে, ইউরোপের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা থাকতে হবে।

এপ্রিল ২০২৩। বেইজিংএ জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক। জার্মানরা ওয়াশিংটনের লাইন ধরেই তাইওয়ান বিষয়ে চীনকে শক্ত কথা শোনাচ্ছে। বেয়ারবক বলেন যে, তার সরকার ‘এক চীন’ নীতিতে বিশ্বাসী; তবে দ্বন্দ্বের সমাধান অবশই শান্তিপূর্ণভাবে হতে হবে। স্থিতাবস্থা পরিবর্তনের কোন চেষ্টা জার্মানি সমর্থন করবে না।


চীনের ব্যাপারে ইউরোপ বিভক্ত

ম্যাক্রঁর সাথে ইউরোপের সকলে যে একমত নয়, তা নিশ্চিত। ‘ডয়েচে ভেলে’কে ‘ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টি’র প্রধান মানফ্রেড ওয়েবার বলছেন যে, তাইওয়ানের সীমানায় সামরিক মহড়ার মাঝে ম্যাক্রঁ যখন চীনের পাশে দাঁড়াচ্ছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে কথা বলছেন, তখন এটা নিশ্চিত যে, তার কথাগুলি ইউরোপের স্বার্থের বিরুদ্ধ। আবার পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট মাতেউস মোরাভিয়েস্কি সাংবাদিকদের বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক পোল্যান্ডের নিরাপত্তার জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপের এই বিভেদকে তুলে ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান সিনেটর মার্কো রুবিও এক ভিডিও বার্তায় প্রশ্ন করছেন যে, ম্যাক্রঁ কি ইউরোপের হয়ে কথা বলছেন? এই মুহুর্তে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেন যুদ্ধে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। মার্কিনীরা তাদের করদাতাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ ইউরোপের যুদ্ধে খরচ করছে।

ফরাসি প্রেসিডেন্টের পরপরই জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক বেইজিং সফর করে এসেছেন। অনেকেই বলছেন যে, বেয়ারবক তার সফরের মাধ্যমে ম্যাক্রঁর সফরে পশ্চিমাদের যা ‘ক্ষতি’ হয়েছে, তা কিছুটা হলেও পুষিয়ে নিতে চেষ্টা করেছেন। বেইজিংএ ১৪ই এপ্রিল জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংবাদ সন্মেলনে বলেন যে, এটা একটা ভালো ব্যাপার যে, ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধানে চীন চেষ্টা করছে। কিন্তু তিনি অবাক হচ্ছেন যে, কেন এখন পর্যন্ত চীনারা রাশিয়াকে আগ্রাসী আখ্যা দিয়ে যুদ্ধ বন্ধ করতে আহ্বান করেনি। একইসাথে তিনি বলেন যে, তাইওয়ান প্রণালিতে উত্তেজনা বৃদ্ধিতে জার্মানি উদ্বিগ্ন। তার সরকার ‘এক চীন’ নীতিতে বিশ্বাসী; তবে দ্বন্দ্বের সমাধান অবশই শান্তিপূর্ণভাবে হতে হবে। স্থিতাবস্থা পরিবর্তনের কোন চেষ্টা জার্মানি সমর্থন করবে না। অপরদিকে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী চিন গাং বলেন যে, তাইওয়ান প্রণালি এবং পুরো অঞ্চলে কেউ যদি শান্তি দেখতে চায়, তাহলে তাকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার চেষ্টা এবং সেখানে বিদেশী প্রভাবের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।

ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইয়েন ইইউএর অর্থনৈতিক সমস্যার উপরেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন; এবং সেই সূত্রে চীনের সাথে সম্পর্ক চালিয়ে নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। ১৮ই এপ্রিল ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে ইউরোপিয় পার্লামেন্টে ভন ডার লেইয়েন বলেন যে, তিনি বিশ্বাস করেন যে, ইউরোপের উচিৎ এবং ইউরোপের দ্বারা সম্ভব নিজেদের আলাদা নীতি অনুসরণ করা; যাতে করে ইউরোপিয়রা অন্যান্য দেশের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তিনি বলেন যে, চীনের সাথে ইউরোপের সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ; যেকারণে চীনের সাথে সম্পর্ককে কেন্দ্র করেই ইউরোপের নীতি এবং কৌশল প্রণয়ন করা উচিৎ নয়। বেইজিংএ গিয়ে তিনি বার্তা দিয়েছেন যে, ইউরোপ চীনের সাথে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত সম্পর্ক কর্তন করতে চায় না। একইসাথে তিনি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে বলেন যে, চীনের ব্যাপারে ইউরোপের নীতির কেন্দ্রীয় অংশ হওয়া উচিৎ কিভাবে অর্থনৈতিক ঝুঁকি কমানো যায়।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা বিষয়ক প্রতিনিধি জোসিপ বোরেল আবার চীনের সাথে সম্পর্ক রাখার সাথেসাথে তাইওয়ান ইস্যুকেও সামনে এনে কিছুটা হুমকি দিয়েই কথা বলেছেন। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবার কারণে তিনি বেইজিং সফরে যাননি। তবে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন যে, ইইউ তার ‘এক চীন’ নীতিতে শক্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে। ইউরোপের উচিৎ উত্তেজনা প্রশমন করা; উত্তেজক বার্তা না দেয়া এবং অবিশ্বাস বৃদ্ধি পেতে পারে এমন কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকা। তবে চীনের পক্ষ থেকে বর্তমান স্থিতাবস্থা পরিবর্তন করার কোন চেষ্টা যদি করা হয়, তাহলে সেটা গ্রহনযোগ্য হবে না। ইইউ পার্লামেন্টে তিনি বলেন যে, চীন ইউরোপের প্রতিদ্বন্দ্বী; তবে চীনের সাথে অবশ্যই কথা চালিয়ে নিতে হবে।

ম্যাক্রঁর সমালোচকের অভাব নেই

ব্রিটিশ কনজারভেটিভ পার্টির সদস্য এবং কিছুদিন আগেই পদত্যাগ করা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস গত ১২ই এপ্রিল এক অনুষ্ঠানের প্রশ্নোত্তর পর্বে বলেন যে, ভ্লাদিমির পুতিন এবং শি জিনপিং বলেছেন যে, তারা পশ্চিমা পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে একে অপরের বন্ধু। একারণেই তিনি মনে করছেন যে, পশ্চিমা নেতাদের উচিৎ হয়নি বেইজিং গিয়ে শি জিনপিংএর সাথে দেখা করা; এবং একইসাথে তাকে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে সহায়তা করার জন্যে অনুরোধ করা। তিনি বলেন যে, ইউরোপিয় নেতাদের এই কর্মকান্ড তাদের দুর্বলতাকেই তুলে ধরে। এবং একই কারণে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁর উচিৎ হয়নি বলা যে, তাইওয়ানে ইউরোপের কোন স্বার্থ নেই। ট্রাস বলেন যে, পশ্চিমাদের সকলেরই উচিৎ তাইওয়ান যাতে নিজেকে রক্ষা করতে পারে, সেজন্য তাদেরকে সকল প্রকারের সহায়তা দেয়া। এছাড়াও তিনি বলেন যে, চীনারা যা বলছে, সেগুলিকে পশ্চিমাদের সন্দেহের চোখে দেখা উচিৎ।

জার্মান থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ডিজিএপি’র সিনিয়র ফেলো জ্যাকব রস ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, ম্যাক্রঁ সর্বদাই তার কথার ধরণের জন্যে আলোচিত। তিনি যেভাবে কথা বলেন অথবা সময়জ্ঞান না রেখেই যে বক্তব্য দেন, তা অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যার সৃষ্টি করে। তার কথাগুলি হয়তো অনেকেই বুঝতে পারেনি বা তাকে অনেকেই হয়তো ভুল বুঝেছে। অনেকেই মনে করেছেন যে, ম্যাক্রঁ চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে এক কাতারে ফেলেছেন; যা ভাবাটা অনুচিত। তিনি রাশিয়া, চীন বা যুক্তরাষ্ট্র-কেন্দ্রিক চিন্তা না করে ইউরোপের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার ব্যাপারে যে কথাগুলি বলছেন, তা ইউরোপের অন্যান্য দেশেও সমর্থিত। তবে সেই লক্ষ্যে পৌঁছাবার পদ্ধতির ক্ষেত্রে ইউরোপিয়দের হয়তো বিভেদ রয়েছে। তথাপি স্বল্প মেয়াদে হলেও তিনি যে আটলান্টিকের দুই পাড়ের মাঝে সম্পর্কের ক্ষেত্রে টানাপোড়েনের জন্ম দিয়েছেন, সেটা নিশ্চিত। যে ব্যাপারটা হয়তো ম্যাক্রঁকে উস্কে দিয়েছে তা হলো ২০২১ সালে অস্ট্রেলিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের ‘অকাস’ চুক্তি। ফরাসিরা অনেকেই সেই চুক্তিকে ফ্রান্সের পিঠে চাকু মারার সাথে তুলনা করেছিল। ম্যাক্রঁ হয়তো সেটাকে উল্টে দিতেই জোরেসোরে লেগেছেন।

ফেব্রুয়ারি ২০২৩। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। পোল্যান্ড এবং পূর্ব ইউরোপের দেশগুলি এখন তাদের নিরাপত্তার জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের উপরে পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমার সাথেসাথে ইউরোপের দেশগুলি নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করছে। বিশ্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা দূরে থাকুক, নিজেদের ভবিষ্যতের ব্যাপারেই তাদের অসহায়ত্ব দিবালোকের মত পরিষ্কার। ইউরোপিয়রা হয় যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়া চিন্তাই করতে পারছে না; অথবা অনিচ্ছা সত্ত্বেও তারা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মাঝে ব্যালান্স করতে হিসমিস খাচ্ছে; যা ইউরোপের লক্ষ্যহীন অবস্থাকেই তুলে ধরে।

ইউরোপ কেন বিভক্ত?

মার্কিন মিডিয়া ‘সিএনবিসি’র এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, ইউরোপিয় নেতারা বেইজিং সফর করে যেসব কথা বলছেন, তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পছন্দনীয় হবার কথা নয়। কারণ জো বাইডেনের মার্কিন প্রশাসন চীনের সাথে বিশেষ রকমের বৈরীতার নীতিতে এগুচ্ছে। ওয়াশিংটন চীনের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে চীনে উচ্চ প্রযুক্তি রপ্তানির উপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। একইসাথে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপিয় দেশগুলিকেও একই পথে হাঁটার আহ্বান করেছে। ইউরোপিয় নেতাদের বেইজিং সফরে যে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়েছে তা হলো, চীনের সাথে কেমন সম্পর্ক থাকা উচিৎ, সেব্যাপারে ইউরোপিয় দেশগুলি একমত নয়। কিছু দেশ নিরাপত্তাজনিক কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি থাকতে চাইছে। আর কিছু দেশ অর্থনৈতিক কারণে চীনকে ফেলে দিতে পারছে না। ‘ইউরোস্ট্যাট’এর হিসেবে ২০২২ সালে ইউরোপ সবচাইতে বেশি আমদানি করেছে চীন থেকে এবং চীনারা ছিল ইউরোপের পণ্যের তৃতীয় বৃহত্তম ক্রেতা। এই ব্যাপারটা অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে যখন ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউরোপের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইউরোপিয় নেতারা চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে অটুট রাখার কথা বলছেন এমন এক সময়ে, যখন মার্কিনীরা বেইজিংএর সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে অনেকটাই কর্তন করতে চাইছে। ইউরোপ চাইছে চীনের সাথে সম্পর্ক কর্তন না করে বরং নিজেদের অর্থনৈতিক ঝুঁকিকে কমাতে।

বার্লিনের ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি’র ডিরেক্টর মারিনা হেনকা ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, ইইউএর প্রতিনিধিরা যখন বলছেন যে, চীন ইউরোপের সহযোগী, প্রতিযোগী এবং পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার প্রতিদ্বন্দ্বী, তখন পরিষ্কার বোঝা যায় যে, ইউরোপের মাঝে বিভেদ রয়েছে। এই কথাগুলিকে পাশাপাশি রাখলে এটা পাগলের প্রলাপ বলেই মনে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইইউএর কিছু দেশ চীনকে সহযোগী মনে করছে, কিছু দেশ চীনকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করছে; আর কিছু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পথ অনুসরণ করে চীনকে পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার প্রতি হুমকি এবং বিকল্প বিশ্বব্যবস্থার প্রবক্তা হিসেবে দেখছে।

চীন বিষয়ে ম্যাক্রঁর বক্তব্য দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ইউরোপের চিন্তা যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে থাকবে কি থাকবে না, অথবা যুক্তরাষ্ট্রের উপরে কতটা নির্ভরশীল থাকবে, সেটাই যেন বিবেচ্য বিষয়। ম্যাক্রঁ যখন বলছেন যে, ইউরোপের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা থাকা উচিৎ, তখনও তিনি প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের কোলে বসে থাকা উচিৎ হবে কিনা, সেটা নিয়েই কথা বলছেন। অপরদিকে তিনি যখন জার্মানদের সমালোচনা করছেন রুশ গ্যাসের উপরে নির্ভরশীলতা বৃদ্ধির জন্যে, তখন জার্মানরা আবার ওয়াশিংটনের লাইন ধরেই তাইওয়ান বিষয়ে চীনকে শক্ত কথা শোনাচ্ছে। আর পোল্যান্ড এবং পূর্ব ইউরোপের দেশগুলি এখন তাদের নিরাপত্তার জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের উপরে পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল। চীনের বিষয়ে ইউরোপ যে একমত নয়, সেটা পরিষ্কার। তবে সবচাইতে হাস্যকর হলো, ম্যাক্রঁ এই কথাগুলি বলছেন; আবার যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশনা অনুসরণ করে ইউক্রেনকে অস্ত্র দিচ্ছেন; যা কিনা দেখিয়ে দেয় যে, ম্যাক্রঁ মুখে অনেক কিছু বললেও প্রকৃতপক্ষে তার যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে যাবার সক্ষমতা কতটুকু। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমার সাথেসাথে ইউরোপের দেশগুলি নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করছে। বিশ্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা দূরে থাকুক, নিজেদের ভবিষ্যতের ব্যাপারেই তাদের অসহায়ত্ব দিবালোকের মত পরিষ্কার। ইউরোপিয়রা হয় যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়া চিন্তাই করতে পারছে না; অথবা অনিচ্ছা সত্ত্বেও তারা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মাঝে ব্যালান্স করতে হিসমিস খাচ্ছে; যা ইউরোপের লক্ষ্যহীন অবস্থাকেই তুলে ধরে।

Tuesday, 10 January 2023

ইউক্রেনের জন্যে পশ্চিমা ট্যাংক … কত বড় ঘটনা এটা?

১০ই জানুয়ারি ২০২৩
 
ফরাসি সেনাবাহিনীর 'এএমএক্স-১০আরসি' 'হাল্কা ট্যাংক'। ইউক্রেনকে ফ্রান্সের ‘হাল্কা ট্যাংক’ এবং ব্রিটেনের সম্ভাব্য ‘চ্যালেঞ্জার-২’ ট্যাংক দেয়ার ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং জার্মানির উপরে চাপ সৃষ্টি করবে। ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাল মিলিয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্টের ইউক্রেনকে ট্যাংক দেয়ার পক্ষে সমর্থন জার্মানিকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলবে; কারণ এতে জার্মানি রাশিয়াকে তার নিরাপত্তার প্রতি প্রধানতম হুমকি হিসেবে ঘোষণা দিতে বাধ্য হবে।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ গত ৪ঠা জানুয়ারি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলদিমির জেলেন্সকির সাথে ঘন্টাখানেক ফোনালাপের পর ফরাসি প্রেসিডেন্টের অফিস থেকে বলা হয় যে, ফ্রান্স ইউক্রেনকে ‘হাল্কা ট্যাংক’ দিতে যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট জেলেন্সকি একই দিনে এক টুইটার বার্তায় ‘হাল্কা ট্যাংক’ দেয়ার প্রতিশ্রুতির বিপরীতে ফরাসি প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানান। পরদিন ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয় যে, ফ্রান্স ইউক্রেনকে ‘এএমএক্স-১০আরসি’ নামের সাঁজোয়া যান দিচ্ছে; যা ফরাসিরা ‘হাল্কা ট্যাংক’ নামে আখ্যা দিয়ে থাকে। ফ্রান্সের এই ঘোষণার পর থেকে একদিকে যেমন ট্যাংকের সংজ্ঞা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে, তেমনি পশ্চিমা আর কোন কোন দেশ ফ্রান্সের উদাহরণ অনুসরণ করতে পারে, তা নিয়েও শুরু হয়েছে জল্পনা কল্পনা।

ফরাসি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে ফ্রান্সের ‘লে মন্ড’ পত্রিকা বলছে যে, ‘এএমএক্স-১০আরসি’ সাঁজোয়া যানগুলি ১০৫মিঃমিঃ কামান দ্বারা সজ্জিত। এর বর্ম পদাতিক বাহিনীর হাল্কা অস্ত্রের আঘাত সহ্য করতে পারে। তবে ট্যাংকের ‘ট্র্যাক’এর পরিবর্তে এর রয়েছে ৬টা রাবারের চাকা। ১৯৮১ সাল থেকে সার্ভিসে আসা ২’শ ৪৫টা গাড়ি বর্তমানে ফরাসি সেনাবাহিনীতে ‘জাগুয়ার’ নামের আরেকটা সাঁজোয়া গাড়ি দ্বারা প্রতিস্থাপিত হচ্ছে। তবে গত চার দশকে এই গাড়িগুলিকে আরও উন্নত প্রযুক্তি দ্বারা সজ্জিত করা হয়েছে। ইউক্রেনের পক্ষ থেকে গত কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ‘এম-১ আব্রামস’ এবং জার্মানির ‘লেপার্ড-২’ ট্যাংক চাওয়া হচ্ছে। ফ্রান্স এখন পর্যন্ত ইউক্রেনকে ‘সীজার’ স্বয়ংচালিত আর্টিলারি, ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং ‘ক্রোটেইল’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়েছে। একইসাথে ফ্রান্স নিজ দেশে ২ হাজার ইউক্রেনিয় সেনাকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।

‘বিজনেস ইনসাইডার’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ফরাসি ‘এএমএক্স-১০আরসি’ সাঁজোয়া গাড়িগুলি ট্যাংকের মতো অতটা শক্তিশালী বর্ম দ্বারা সজ্জিত নয়। আর এর কামানও অন্যান্য ট্যাংকের ১২০মিঃমিঃ বা ১২৫মিঃমিঃ কামানের চাইতে অপেক্ষাকৃত স্বল্প ক্ষমতার। ১৬ টন ওজনের এই ‘হাল্কা ট্যাংক’ ভালো রাস্তায় প্রায় ৬০ কিঃমিঃ গতিতে চলতে সক্ষম। অপরদিকে মার্কিন ‘আব্রামস’ ট্যাংকগুলি প্রায় ৭০ টন ওজনের এবং সেগুলিকে যুদ্ধক্ষেত্রে সচল রাখার জন্যে বেশ জটিল সাপ্লাই চেইনের প্রয়োজন হয়। ‘এএমএক্স-১০আরসি’ গাড়িগুলি বিপক্ষের ট্যাংক ধ্বংস করার জন্যে তৈরি হয়নি। বরং শত্রুর ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করে দ্রুত সড়ে পড়ার জন্যে ডিজাইন করা হয়েছে। তবে অন্যান্য সাঁজোয়া যানের সাথে ‘এএমএক্স-১০আরসি’র পার্থক্য হলো, যেখানে অন্যান্য গাড়িগুলি ৩০ মিঃমিঃ বা ৪০ মিঃমিঃ কামান বহণ করে, ‘এএমএক্স-১০আরসি’ বহণ করে ১০৫ মিঃমিঃ কামান। এই কামান শত্রুর ট্যাংক এবং অন্যান্য সাঁজোয়া যান ধ্বংস করতে সক্ষম; আর এই কামানের জন্যেই ফরাসিরা হয়তো এগুলিকে ‘হাল্কা ট্যাংক’ বলছে।

১৯৭০এর দশকের প্রযুক্তির এই ‘হাল্কা ট্যাংক’গুলি ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে কতটা প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। তবে ফ্রান্স এবং ইউক্রেন উভয়েই এই গাড়িগুলিকে যে ‘হাল্কা ট্যাংক’ বলছে, তা বেশ গুরুত্ববহ। পশ্চিমা দেশগুলি এখনও ‘আব্রামস’এর মতো ট্যাংক ইউক্রেনকে দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। এর ফলে ইউক্রেনকে সোভিয়েত ডিজাইনের ট্যাংকের উপরেই নির্ভর করতে হচ্ছে; যার বেশগুলি আবার যুদ্ধের মাঝে রুশদের হাত থেকে দখল করা। ফ্রান্সের এই সিদ্ধান্তের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, পশ্চিমারা ইউক্রেনকে সাঁজোয়া যান দিতে রাজি হয়েছে। ফ্রান্সের ঘোষণার পরপরই ইউক্রেনকে যুক্তরাষ্ট্র ‘এম-২ ব্র্যাডলি’ এবং জার্মানি ‘মারডার’ সাঁজোয়া যান দেয়ার ঘোষণা দেয়। এই গাড়িগুলিতে চাকার স্থলে রয়েছে ‘ট্র্যাক’। এগুলি ফরাসি গাড়িগুলি থেকে আরও ভারি হলেও এগুলির কামান তত শক্তিশালী নয়। তবে এগুলি ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র বহণ করতে সক্ষম।

 
জার্মান সেনাবাহিনীর 'লেপার্ড-২' ট্যাংক। ইউরোপের ইতিহাস বলে যে, জার্মানি এবং রাশিয়ার পাল্টাপাল্টি সামরিক অবস্থান ইউরোপকে ধ্বংসযজ্ঞের মাঝে ফেলেছে। জার্মানির উপরে ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ফ্রান্সের এহেন চাপ সৃষ্টি ইইউএর অস্তিত্বকে যেমন প্রশ্নের মাঝে ফেলতে পারে, তেমনি ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তাকেও অনিশ্চয়তার মাঝে ফেলে দিতে পারে।

এদিকে পশ্চিমা সূত্রের বরাত দিয়ে গত ৯ই জানুয়ারি ব্রিটেনের ‘স্কাই নিউজ’ বলে যে, ব্রিটেন কয়েক সপ্তাহ ধরেই ইউক্রেনকে নিজেদের সেনাবাহিনীর ১০টার মতো ‘চ্যালেঞ্জার-২’ ট্যাংক দেয়ার কথা চিন্তা করছে। ১৯৯৪ সালে সার্ভিসে আসা এই ট্যাংকগুলি প্রায় ৬২ টন ওজনের এবং এর রয়েছে শক্তিশালী ১২০ মিঃমিঃ কামান। তবে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এখনও এব্যাপারে চুপ রয়েছে। এই ট্যাংকগুলি যুদ্ধক্ষেত্রে বড় কোন পরিবর্তন সাধন করতে পারবে না। তবে তা ট্যাংকের ব্যাপারে পশ্চিমা সিদ্ধান্তহীনতাকে পরিবর্তন করতে সহায়তা দেবে। এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য হলো অন্যান্য ন্যাটোভুক্ত দেশ, বিশেষ করে জার্মানিকে তার ‘লেপার্ড’ ট্যাংকগুলি এবং যুক্তরাষ্ট্রকে তার ‘আব্রামস’ ট্যাংকগুলি দিতে প্রভাবিত করা। জার্মানি ছাড়াও পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড এবং স্পেন জার্মান ‘লেপার্ড’ ট্যাংক ব্যবহার করে। পোল্যান্ড এবং ফিনল্যান্ড ইউক্রেনকে এই ট্যাংক দিতে ইচ্ছুক হলেও এগুলিকে পুনরায় রপ্তানি করতে গেলে জার্মানির অনুমতি প্রয়োজন। জার্মান সরকারের পক্ষ থেকে ৯ই জানুয়ারি বলা হয় যে, ইউক্রেনকে জার্মানি ট্যাংক দেয়ার কথা চিন্তা করছে না। গত বছর ব্রিটিশ সরকার পোল্যান্ডকে ১৪টা ‘চ্যালেঞ্জার-২’ ট্যাংক দেয়; যাতে করে পোল্যান্ড ইউক্রেনকে তাদের বহরে থাকা সোভিয়েত ডিজাইনের ‘টি-৭২’ ট্যাংকগুলি দিয়ে দিতে পারে। তবে প্রাক্তন ব্রিটিশ ট্যাংক কমান্ডার কর্নেল হেমিশ ডে ব্রেটন গর্ডনের মতে, ‘চ্যালেঞ্জার’, ‘লেপার্ড’ বা ‘আব্রামস’এর মতো ট্যাংকগুলি সোভিয়েত ডিজাইনের ট্যাংক থেকে অপেক্ষাকৃত ভালোভাবে সুরক্ষিত, নির্ভরযোগ্য এবং দ্রুতগামী। এগুলি ইউক্রেনকে দেয়ার অর্থ হলো, রুশদের কাছে বার্তা দেয়া যে, পশ্চিমারা ইউক্রেনকে যেকোনকিছুই দিতে প্রস্তুত।

ইউক্রেনকে ফ্রান্সের ‘হাল্কা ট্যাংক’ এবং ব্রিটেনের সম্ভাব্য ‘চ্যালেঞ্জার-২’ ট্যাংক দেয়ার ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং জার্মানির উপরে চাপ সৃষ্টি করবে। কারণ ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকেই জার্মানি রাশিয়ার সাথে সরাসরি সংঘাত এড়াতে ইউক্রেনকে বড় কোন সহায়তা দেয়া থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেছে। রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি বন্ধ করার ব্যাপারেও জার্মানি সিদ্ধান্তহীনতায় ছিল। ফ্রান্সও নীতিগতভাবে জার্মানির কাছাকাছিই থেকেছে। তবে ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাল মিলিয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্টের ইউক্রেনকে ট্যাংক দেয়ার পক্ষে সমর্থন জার্মানিকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলবে; কারণ এতে জার্মানি রাশিয়াকে তার নিরাপত্তার প্রতি প্রধানতম হুমকি হিসেবে ঘোষণা দিতে বাধ্য হবে। ইউরোপের ইতিহাস বলে যে, জার্মানি এবং রাশিয়ার পাল্টাপাল্টি সামরিক অবস্থান ইউরোপকে ধ্বংসযজ্ঞের মাঝে ফেলেছে। জার্মানির উপরে ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ফ্রান্সের এহেন চাপ সৃষ্টি ইইউএর অস্তিত্বকে যেমন প্রশ্নের মাঝে ফেলতে পারে, তেমনি ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তাকেও অনিশ্চয়তার মাঝে ফেলে দিতে পারে।

Saturday, 29 October 2022

ফ্রান্স ও জার্মানি… বন্ধু, না প্রতিযোগী?

২৯শে অক্টোবর ২০২২
 
যুক্তরাষ্ট্র জার্মানির সাথে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ফ্রান্সের সাথে জার্মানির দূরত্ব বৃদ্ধিতে ইন্ধন দিলেও, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মার্কিন নীতি প্যারিস ও বার্লিনকে এক করছে। তবে বাণিজ্য ইস্যুতে এক হলেও ইইউএর সমন্বিত নীতি সহজ নয়। কারণ ইউরোপের এই দুই বড় দেশের স্বার্থ যে ভিন্নমুখী, তা দুই দেশের জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা নীতিতে পরিষ্কার।

অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে প্যারিসে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ এবং জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শোলজের বৈঠকের দিকে তাকিয়ে ছিল পুরো ইউরোপ। ‘পলিটিকো’র এক প্রতিবেদনে আলোচনার ব্যাপারে ওয়াকিবহাল উৎসের বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে যে, দুই নেতা একমত হয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ইউরোপকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে ।তারা আলোচনা করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র তার ‘ইনফ্লেশন রিডাকশন এক্ট’এর মাধ্যমে কর্পোরেটদের উপর থেকে কর কমিয়ে দিয়ে এবং জ্বালানিতে ভর্তুকি দিয়ে নিজ দেশে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চাইছে। শুধু তাই নয়; এই আইনের মাধ্যমে মার্কিন ভোক্তাদেরকে বলা হচ্ছে যে, তারা যেন যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি করা ইলেকট্রিক গাড়ি কেনে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ইউরোপের গাড়ি বিক্রি করা অনেক কঠিন হয়ে যাবে।

২৬শে অক্টোবর ফরাসি টিভি চ্যানেল ‘ফ্রান্স ২’এর সাথে সাক্ষাতে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ বলেন যে, ইইউএর উচিৎ ইউরোপের ভোক্তারা যাতে ইউরোপে তৈরি জিনিস কেনে, সেটা অনুপ্রাণিত করে আইন প্রণয়ন করা এবং ইউরোপিয় কোম্পানিগুলির জন্যে ভর্তুকির ব্যবস্থা করা। তিনি প্রশ্ন করেন যে, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই যখন নিজেদের বাজারকে সুরক্ষা দিচ্ছে, তখন ইইউ কেন মুক্ত বাজার থাকবে? এক সপ্তাহ আগে জার্মান চ্যান্সেলরও বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের নতুন আইন নিয়ে ‘গভীরভাবে’ কথা বলতে হবে। তবে ‘পলিটিকো’ বলছে যে, ইইউ যদি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, তাহলে ইউরোপ এবং আমেরিকার মাঝে নতুন করে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে। একইদিনে জার্মান কেমিক্যাল কোম্পানি ‘বিএএসএফ’ জার্মানিতে তাদের কর্মকান্ড কমাবার এবং কর্মী ছাটাইয়ের ঘোষণা দেয়। এর কারণ হিসেবে বলা হয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় জার্মানিতে গ্যাসের মূল্য ছয় গুণ। তবে ইইউ কমিশনের এক কর্মকর্তা জানান যে, ইইউ যে পদক্ষেপই নিক না কেন, সেটা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা ‘ডব্লিউটিও’র আইনের সাথে যেতে হবে। ইইউ এবং যুক্তরাষ্ট্রের উচিৎ হবে না ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ের মতো আবারও বাণিজ্য যুদ্ধের মাঝে পতিত হওয়া।

তবে দুই দেশের এই আকাত্মতা সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যায়নি; বিশেষ করে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা নীতির বিষয়ে ফ্রান্স এবং জার্মানির বিরোধ এখন পরিষ্কার। অক্টোবরে অনুষ্ঠিতব্য ফ্রাঙ্কো-জার্মান মন্ত্রীপরিষদের বৈঠক হঠাৎ করেই আগামী বছরের জানুয়ারিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। নিজস্ব স্বার্থ নিয়ে যখন ফ্রান্স ও জার্মানি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দরকষাকষি করতে চাইছে, তখন সেই স্বার্থের দ্বন্দ্বই জার্মানি এবং ফ্রান্সের সম্পর্কের মাঝে দাগ টেনেছে। ফরাসি বার্তা সংস্থা ‘এএফপি’ বলছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি সংকটের মাঝে জার্মানি গ্যাসের উপরে ১’শ ৯৭ বিলিয়ন ডলারের ভর্তুকির ঘোষণা দিয়েছে। এবং একইসাথে ইইউএর সদস্য দেশগুলি যখন গ্যাসের মূল্যের উপরে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার কথা বলেছে, তখন জার্মানি তা এড়িয়ে গেছে। এছাড়াও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে সমঝোতা নিয়েও জার্মানির সাথে ফ্রান্সের টানাপোড়েন চলছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পটভূমিতে জার্মানি তার সামরিক বাজেট বৃদ্ধি করার ঘোষণা দিলেও তা ইউরোপিয় নেতাদের খুশি করতে পারেনি। কারণ এই বাজেট বৃদ্ধির সুবিধা পাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ইউরোপিয় বা ফরাসি অস্ত্র না কিনে জার্মানি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ‘এফ-৩৫’ স্টেলথ যুদ্ধবিমান এবং ‘প্যাট্রিয়ট’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনছে।

‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ইইউএর মূল চালিকাশক্তি হলো ফ্রান্স এবং জার্মানি। এই দুই দেশের মাঝে বিরোধ ইইউএর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। প্যারিসে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকও বিশ্লেষকদেরকে খুশি করতে পারেনি। জার্মান থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ফ্রাঙ্কো জার্মান ইন্সটিটিউট’ বা ‘ডিএফআই’এর ডেপুটি ডিরেক্টর স্টেফান সাইডেনডরফ ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, যদিও দুই দেশের মন্ত্রীসভার বৈঠকে খুব বড় কোন সিদ্ধান্ত হয় না, তথাপি এই বৈঠক ইইউএর কর্মকান্ড ঠিকভাবে চলার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬৩ সালে প্রথম বৈঠকের পর থেকে ২০২২ সাল ছাড়া আর কখনোই এই বৈঠক বাতিল করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র তার পররাষ্ট্রনীতিতে নিজের ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং মনে করতে পারে যে, বাকিরা তাকে অনুসরণ করবে। কিন্তু ইউরোপের ব্যাপারটা আলাদা। এখানে কেউই অপরের কথা চিন্তা না করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ইইউএর সবচাইতে বড় দুই দেশ ফ্রান্স ও জার্মানি আলোচনা করে একটা সমঝোতায় পৌঁছায়; যা বাকি ইউরোপিয় দেশগুলি অনুসরণ করে।

‘ডয়েচে ভেলে বলছে যে, জার্মানি জ্বালানির ব্যাপারে যে ভর্তুকির ঘোষণা দিয়েছে, তা ফ্রান্সকে জানানোটা ছিল একটা সাধারণ ভদ্রতা; কারণ এতে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হবে। অপরদিকে ফ্রান্স স্পেনের সাথে গ্যাস পাইপলাইনের একটা চুক্তি করেছে, যার মাধ্যমে বার্সিলোনা থেকে মার্সেই পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ হবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ফ্রান্স ও স্পেনের মাঝে আরেকটা প্রকল্প বাইপাস করা হলো, যা পীরেনিজ পর্বতের মাঝ দিয়ে ফ্রান্স হয়ে জার্মানি পর্যন্ত যেতো। এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে জার্মানিসহ ন্যাটোর ১৫টা দেশ ‘ইউরোপিয়ান স্কাই শিল্ড ইনিশিয়েটিভ’ বা ‘ইএসএসআই’ নামে একটা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপারে ঐকমতে পৌঁছায়। ফ্রান্সকে এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তবে ফ্রান্স ইতালির সাথে যৌথভাবে ‘মামবা’ নামে একটা যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ডেভেলপ করছে।

যুক্তরাষ্ট্র জার্মানির সাথে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ফ্রান্সের সাথে জার্মানির দূরত্ব বৃদ্ধিতে ইন্ধন দিলেও, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মার্কিন নীতি প্যারিস ও বার্লিনকে এক করছে। তবে বাণিজ্য ইস্যুতে এক হলেও ইইউএর সমন্বিত নীতি সহজ নয়। কারণ ইউরোপের এই দুই বড় দেশের স্বার্থ যে ভিন্নমুখী, তা দুই দেশের জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা নীতিতে পরিষ্কার। স্টেফান সাইডেনডরফ বলছেন যে, জার্মানি চাইছে ইউরোপের ছোট দেশগুলিকে নিজের পক্ষে এনে ফ্রান্সকে বাইপাস করতে। অপরদিকে ফ্রান্স চাইছে যে, জার্মানি ফ্রান্সের নীতির সাথে একমত পোষণ করে ইউরোপের মাঝে সহযোগিতা বৃদ্ধি করুক। ম্যাক্রঁ পুরো ইউরোপের একটা বাজেট, শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এবং কর ব্যবস্থার ব্যাপারে বলছেন। বার্লিনের থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘জার্মান ইন্সটিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল এন্ড সিকিউরিটি এফেয়ার্স’এর সিনিয়র ফেলো রনইয়া কেমপিন ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, ম্যাক্রঁ সর্বদাই ইইউএর বর্ধিতকরণের বিরোধিতা করেছেন। তিনি ইইউকে ফ্রান্সের প্রভাব বৃদ্ধির পদ্ধতি হিসেবে দেখেছেন। অপরদিকে জার্মানি মনে করেছে ইইউএর বর্ধিতকরণের মাধ্যমে ইউরোপে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।

Saturday, 1 October 2022

অর্থনৈতিক দৈন্যতা জার্মানদেরকে ইউক্রেনের শরণার্থীদের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করাচ্ছে

০২রা অক্টোবর ২০২২
 
২০১৬ সাল। জার্মানিতে ডানপন্থীদের মুসলিম শরণার্থী বিরোধী বিক্ষোভ। ইউরোপে মুসলিম এবং ইউক্রেনিয় খ্রিস্টান শরণার্থীদের ব্যাপারে জনমতে ব্যাপক পার্থক্য থাকলেও জ্বালানির ব্যাপক মূল্যস্ফীতির মাঝে এখন যেকোন শরণার্থীই বোঝা হয়ে যাচ্ছে। এমনকি মধ্যপন্থায় থাকা রাজনীতিবিদেরাও শরণার্থীদের আটকাতে বলছেন।

গত ২৭শে সেপ্টেম্বর জার্মান ‘ফেডেরাল স্ট্যাটিসটিক্যাল অফিস’ বলে যে, জার্মানির জনসংখ্যা ২০২২ সালে রেকর্ড সংখ্যক বেড়েছে। এর কারণ ছিল ইউক্রেন থেকে শরণার্থীর ঢল। বর্তমানে দেশটার জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ৪০ লক্ষের বেশি। শরণার্থীদের কারণে জার্মানির জনসংখ্যা ২০২২ সালের প্রথম ছয় মাসে ৮ লক্ষ ৪৩ হাজার বা ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২১ সালের পুরো বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল মাত্র ৮২ হাজার। যুদ্ধের আগে সরকারি হিসেবে জার্মানিতে ইউক্রেনিয়দের সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় লক্ষ। যুদ্ধ শুরুর পর প্রায় ৯ লক্ষ ৭১ হাজার নতুন শরণার্থীকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, এর আগে ১৯৯২ সালে সাবেক যুগোশ্লাভিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় শরণার্থীদের চাপে জার্মানির জনসংখ্যা ৭ লক্ষ বৃদ্ধি পেয়েছিল। আবার ২০১৫ সালে সিরিয় শরণার্থীর ঢলে দেশটার জনসংখ্যা আরও প্রায় ১০ লক্ষ বৃদ্ধি পায়। আর ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝে ইউক্রেন সরকার বেশিরভাগ পুরুষ মানুষকে দেশ ছাড়তে অনুমতি না দেয়ায় জার্মানিতে বেশিরভাগ ইউক্রেনিয় শরণার্থীই হলো নারী ও শিশু। তবে শরণার্থীদের ঢল আসার আগেই জার্মানি শুধু ইউরোপের সবচাইতে ধনীর দেশই ছিল না; সেখানে জন্মহার ছিল অত্যধিক কম এবং অল্প বয়সের মানুষের সংখ্যাও ছিল অপেক্ষাকৃত অনেক কম। তাই জার্মানির অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যে কর্মঠ অপেক্ষাকৃত অল্প বয়সের মানুষের চাহিদা তৈরি হয়েছিল।

জার্মানিতে শরণার্থীদের নিয়ে সমস্যা বাড়ছে

জার্মানির পশ্চিমের আখেন শহরের ২০ কিঃমিঃ দূরে ছোট একটা এলাকার চিত্র তুলে ধরে ‘ডয়েচে ভেলে’। ৫০ হাজার জনসংখ্যার এই ছোট্ট শহরে প্রতি বছর ৫০ থেকে ৬০ জন করে শরণার্থী গ্রহণ করা হয়। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কয়েক মাসের মাঝেই সেখানে ৫’শ ৩০ জন শরণার্থী হাজির হয়েছে। এর বাইরেও আরও ২০টা দেশের ৮’শ ৫০ জন শরণার্থীকে সেখানে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শহরের খেলাধূলার জিমনেসিয়াম এবং হল রুমে পার্টিশনের ব্যবস্থা করে শরণার্থীদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একসময় অনেকেই নিজেদের বাড়িতে শরণার্থীদের থাকতে দিলেও এখন কেউ অগ্রগামী হচ্ছে না। কারণ জ্বালানির মূল্য এতটাই বেড়ে গেছে যে, তারা মনে করছে যে, শরণার্থীদের নিলে তাদের দৈনন্দিন খরচ সক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। শরণার্থীদের মাঝে কেউ কেউ কাজ যোগাড় করতে পারলেও অনেকেই এখনও পারেনি। সাহায্যকারীরা খুবই ব্যস্ত সময় পার করছে। তারা শরণার্থীদের জন্যে ফর্ম পূরণের কাজ ছাড়াও তাদের জন্যে ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করছে; তাদের থাকার জন্যে জায়গা খুঁজে দিচ্ছে; এমনকি তাদের সন্তানদের দেখাশুনা এবং তাদেরকে রান্না করার শিক্ষাও দিচ্ছে।

আখেন শহরের মেয়রও ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন যে, তার শহরে এখন আর কোন শরণার্থী রাখার ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। সেখানে ৪ হাজার ইউক্রেনিয় শরণার্থী রাখার পর সকল যায়গা ফুরিয়ে গেছে; যার মাঝে ৮টা জিমনেসিয়াম হলও রয়েছে। আখেন শহরে যুদ্ধের আগেই ইউক্রেনিয়দের একটা বড়সড় গ্রুপ বসবাস করতো; এরা অনেকেই শরণার্থীদেরকে তাদের বাড়িতে থাকতে দিয়েছে। ২০১৬ সালে সিরিয়া এবং আফ্রিকা থেকে আসা ১’শ ২০ জন শরণার্থীর জন্যে শহরের খেলার মাঠে অস্থায়ী বাড়ি তৈরি করা হয়। এই বাড়িগুলি পুরোনো হলেও সেখানে একান্তভাবে বসবাসের সুযোগ থাকায় সকলেই তেমন বাড়ি চায়। শহরের খালি বাণিজ্যিক জায়গাগুলিকে ব্যবহার করে শরণার্থীদেরকে জিমনেসিয়াম থেকে সরিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। কারণ সকলেই এখন বুঝতে পারছে যে, যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হবে। শরণার্থীদের সন্তানদের জন্যে শিক্ষা এবং অন্যান্য সেবার ব্যবস্থাও করতে হবে। কিন্তু এই সেবা পেতে এখন শরণার্থীরা সাধারণ জার্মান নাগরিকদের সাথে প্রতিযোগিতা করছে। ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর জন্যে আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থা করা ছাড়া কোন গতি নেই; নাহলে শান্তিশৃংখলা ব্যাহত হতে পারে। সাহায্যকারীরা বলছেন যে, বেশিরভাগ বাড়িওয়ালাই শরণার্থীদের কাছে বাড়ি দেয়ার কথা শুনলে ফোন রেখে দিচ্ছে। মোটকথা শরণার্থীদের বাসস্থান যোগাড় করতে এখন অনেক বেশি কষ্ট করতে হচ্ছে।

‘ইউরোনিউজ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জার্মানিতে ইউক্রেনিয় এবং রুশদের মাঝে চলছে সংঘর্ষ; যা জার্মানির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছে। একদিকে ইউক্রেনিয়রা বার্লিনের রাস্তায় জার্মানির রুশ গ্যাস আমদানি করার নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে। অপরদিকে রুশরা ইউক্রেনিয়দেরকে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। এখানেই শেষ নয়, জার্মানিতে রুশদের মালিকানায় থাকা ব্যবসা বাণিজ্যেও ভূতুড়ে ফোন আসছে হুমকিসহ। জার্মানিতে রুশদের একটা স্কুলে আগ্নিসন্ত্রাসও হয়েছে বলে বলছে ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’। জার্মান পুলিশ বলছে যে, এপ্রিল মাসে জার্মানিতে ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রুশ, ইউক্রেনিয় এবং বেলারুশদের মাঝে ১৭’শ অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে ইউক্রেনিয়দের সংখ্যা ১১ লক্ষ ছাড়িয়ে গেলেও জার্মানিতে ১৯৯০এর দশক থেকেই প্রায় ৩০ লক্ষ রুশ ভাষাভাষী মানুষ বাস করে।

 
২৮শে সেপ্টেম্বর ২০২২। চেক রিপাবলিকের রাজধানী প্রাগে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ইস্যুতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ। ইউরোপজুড়ে ডানপন্থী রাজনীতির জয়জয়কার দৃশ্যমান হওয়ায় জার্মানির ডানপন্থীরাও এতে আনুপ্রাণিত হয়েছে। নিজেদের দলের কর্মকান্ডের সফলতার চাইতে লিবারাল রাজনৈতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতাই ডানপন্থীদের বেশি সহায়তা দিয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে যে, আসন্ন শীতকাল ইউরোপে, তথা জার্মানিতে, পশ্চিমা লিবারাল আদর্শের জন্যে অতি শীতল পরীক্ষা নিয়ে আসতে যাচ্ছে।

শরণার্থীদের ব্যাপারে রাজনীতিবিদেরা তাদের মতামত পাল্টাচ্ছেন

জার্মানির বৃহত্তম বিরোধী দল এঙ্গেলা মার্কেলের মধ্য-ডানপন্থী ‘ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট’ বা ‘সিডিইউ’ দলের প্রধান ফ্রেডরিক মার্জ জার্মান টেলিভিশন ‘বিল্ড টিভি’র সাথে এক সাক্ষাতে বলেন যে, ইউক্রেন থেকে আসা শরণার্থীরা জার্মান সরকারের সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থা থেকে সুবিধা ভোগ করতে পর্যটকের মতো আচরণ করছে। ১১ লক্ষের বেশি ইউক্রেনিয় শরণার্থীদের জন্যে শীতকালে ঘর উষ্ণ করার সুবিধা দিলে সেটা জার্মান নাগরিকদের জন্যে অন্যায্য হয়ে যাচ্ছে। কারণ অনেক খেটে খাওয়া জার্মান তাদের জ্বালানি খরচ বহণ করতে পারছে না। ‘পলিটিকো’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জার্মানির অর্ধেক বাড়িঘরই শীতকালে উষ্ণ রাখার জন্যে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করে থাকে। এই বাড়িগুলির জন্যে জ্বালানি খরচ কমপক্ষে দ্বিগুণ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। ফ্রেডরিক মার্জের কথাগুলির পর দেশজুড়ে সমালোচনা শুরু হলে তিনি এক টুইটার বার্তায় তার মন্তব্যের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। মার্জ ক্ষমতাসীন সোশালিস্ট সরকারের শরণার্থী নীতির সমালোচনা করে বলছেন যে, সরকারের কোন সুনির্দিষ্ট নীতি নেই। যে-ই জার্মানিতে আসতে চাইছে, তাকেই সরকার দেশে ঢুকতে দিচ্ছে। সরকারের উচিৎ কঠোরভাবে নির্দিষ্ট করে দেয়া যে, কত শরণার্থী দেশে ঢুকতে পারবে। ‘পলিটিকো’ বলছে যে, মার্জের কথাগুলি বেশ খানিকটা পপুলিস্ট ঘরানার, যা কিনা ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী ‘অলটারনেটিভ ফর জার্মানি’ বা ‘এএফডি’ দলের কথার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে যে, ‘সিডিইউ’এর চিন্তায় বেশ খানিকটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এতদিন ‘সিডিইউ’ ইউক্রেনিয় শরণার্থীদের ব্যাপারে জার্মান সরকারের নীতিকে সমর্থন করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সরকারের ব্যর্থতাকে কাজে লাগাতে ‘সিডিইউ’ হয়তো এই সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইছে না।

‘ইউরোনিউজ’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জার্মানির পূর্ব দিকের ছোট দেশগুলিতেও শরণার্থীদের চাপ অনুভূত হচ্ছে। চেক রিপাবলিক ৪ লক্ষ ৩৯ হাজারের বেশি ইউক্রেনিয় শরণার্থী নিয়েছে; পাশের স্লোভাকিয়া নিয়েছে আরও প্রায় ১ লক্ষ। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসে সিরিয়া থেকে শরণার্থী আসা বেড়ে যাওয়ায় তারা তাদের সীমান্তে পাহাড়া বসিয়েছে; যদিও ইইউএর নিয়ম অনুসারে একদেশ থেকে অন্যদেশে যাতায়াতে কোন বাধা থাকার কথা নয়। সমস্যা হলো, যেখানে চেক রিপাবলিকের ৭৫ শতাংশ জনগণ ইউক্রেনের শরণার্থীদের দেশে ঢোকার পক্ষে, সেখানে ২০১৫ সালে সিরিয়া এবং আফ্রিকার মুসলিম শরণার্থীদের দেশে ঢোকার বিরুদ্ধে ছিল ৭০ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ ইউক্রেনের শরণার্থীদেরকে তারা ভাইয়ের মতো দেখলেও মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার মুসলিমদেরকে তারা ভিন্ন চোখে দেখেছে। কিন্তু এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে চলেছে। কারণ জীবনযাত্রার খরচ মারাত্মকভাবে বেড়ে যাওয়ায় চেক রিপাবলিকের কট্টর বামপন্থী এবং কট্টর ডানপন্থী দলগুলি রাজধানী প্রাগের রাস্তায় সরকার বিরোধী বিক্ষোভ করেছে। অনেকেই বলা শুরু করেছে যে, সরকার শরণার্থীদেরকে চেক নাগরিকদের তুলনায় বেশি সুবিধা দিচ্ছে। স্লোভাকিয়াতেও অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধিতে চেক রিপাবলিকে মূদ্রাস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১৭ শতাংশ; আর স্লোভাকিয়াতে ১৪ শতাংশ; যা কিনা ইউরোপের সর্বোচ্চগুলির মাঝে।

জার্মানিতে ডানপন্থীদের জনসমর্থন বাড়ছে

জার্মানির ‘ডের স্পাইগেল’ পত্রিকা বলছে যে, জার্মানির ১৬টা রাজ্যের মাঝে ১২টা রাজ্য ইতোমধ্যেই বলে দিয়েছে যে তারা ইউক্রেন থেকে আর কোন শরণার্থী নিতে পারবে না। জার্মান স্বারাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলছেন যে, খুব শীঘ্রই সবগুলি রাজ্যই তাদের সক্ষমতার সীমানা অতিক্রম করবে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে ৮শ’ ৭৫ জন শরণার্থী জার্মানিতে প্রবেশ করেছে। অর্থনৈতিক চাপের মাঝে শরণার্থীদের ভার নিতে হিমসিম খাচ্ছে ইউরোপ; বিশেষ করে জার্মানি। এই সুযোগটাই নিচ্ছে জার্মানির কট্টর ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী দল ‘অলটারনেটিভ ফর জার্মানি’ বা ‘এএফডি’। তবে জার্মানির প্রাক্তন চ্যালেন্সর গেরহার্ড শ্রোডার মনে করছেন যে, ‘এএফডি’র নিজেদের মাঝেই বিভেদ রয়েছে। তিনি ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, দেশের পূর্বাঞ্চলে এই দলের সমর্থকেরা রাশিয়াকে সমর্থন করলেও পশ্চিমাঞ্চলের সমর্থকেরা রাশিয়ার পক্ষে নয়। এমতাবস্থায় তারা সরকারের বিরুদ্ধে শক্ত কোন আন্দোলন করতে পারবে না। তথাপি জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধির ইস্যুতে ‘এএফডি’র সরকার বিরোধী বিক্ষোভে হাজারো মানুষ যোগ দিচ্ছে। গবেষণা সংস্থা ‘আইএনএসএ’র এক জরিপে বলা হচ্ছে যে, ক্ষমতাসীন চ্যান্সেলর ওলাফ শোলজএর বামপন্থী সোশালিস্ট দলের পক্ষে জনমত ২৬ শতাংশ থেকে কমে ১৮ শতাংশে নেমে এসেছে; শরীক দল ‘এফডিপি’র অর্ধেক কমে গিয়ে হয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ। অপর শরীক দল ‘গ্রিন পার্টি’ও জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। অপরদিকে ‘এএফডি’র সমর্থন ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশে উঠে গেছে; যা কিনা ইতিহাসের সর্বোচ্চ। অক্টোবর থেকে রাস্তায় বিক্ষোভে ‘এএফডি’র এজেন্ডা হবে ‘আমাদের দেশ আগে’; যা প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’এর সাথে মিলে যায়।

ইউরোপে মুসলিম এবং ইউক্রেনিয় খ্রিস্টান শরণার্থীদের ব্যাপারে জনমতে ব্যাপক পার্থক্য থাকলেও জ্বালানির ব্যাপক মূল্যস্ফীতির মাঝে এখন যেকোন শরণার্থীই বোঝা হয়ে যাচ্ছে। এমনকি মধ্যপন্থায় থাকা রাজনীতিবিদেরাও শরণার্থীদের আটকাতে বলছেন। জার্মানির বামপন্থী সোশালিস্ট কোয়ালিশন সরকার জনগণকে আশ্বাস দিতে ব্যার্থ হয়েছে যে জার্মানির নীতি সঠিক পথে রয়েছে। অন্ততঃ সিদ্ধান্তগত দিক থেকে অনিশ্চয়তা এবং নীতিগত দিক থেকে স্বাধীনভাবে চলতে না পারাটা জার্মানির জাতীয় গর্বকে আঘাত করছে। এই সুযোগটাই নিতে চাইছে ডানপন্থী গ্রুপগুলি। মধ্যপন্থী বিরোধী দলগুলিও ডানপন্থীদের শ্লোগানকে পুঁজি করাটাকেই সঠিক বলে মনে করছে। ইউরোপজুড়ে ডানপন্থী রাজনীতির জয়জয়কার দৃশ্যমান হওয়ায় জার্মানির ডানপন্থীরাও এতে আনুপ্রাণিত হয়েছে। নিজেদের দলের কর্মকান্ডের সফলতার চাইতে লিবারাল রাজনৈতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতাই ডানপন্থীদের বেশি সহায়তা দিয়েছে। ২০২০ সালে কট্টর ডানপন্থী দল ‘এএফডি’র মুখপাত্র ক্রিশ্চিয়ান লুথ বলেছিলেন যে, জার্মানির অবস্থা যত খারাপ হবে, ‘এএফডি’র অবস্থান তত শক্ত হবে। বোঝাই যাচ্ছে যে, আসন্ন শীতকাল ইউরোপে, তথা জার্মানিতে, পশ্চিমা লিবারাল আদর্শের জন্যে অতি শীতল পরীক্ষা নিয়ে আসতে যাচ্ছে।

Friday, 30 September 2022

ইতালির ডানে মোড়… ইউরোপের জন্যে এটা কেমন বার্তা?

৩০শে সেপ্টেম্বর ২০২২
 
ইতালির নির্বাচনে জেতার পর কট্টর ডানপন্থী কোয়ালিশনের তিন নেতা মাত্তেও সালভিনি, সিলভিও বারলুসকোনি এবং জর্জিয়া মেলোনি। ইতালিতে ফ্যাসিস্ট রাজনীতি কোন না কোন ফর্ম্যাটে চলেছে। নব্য-ফ্যাসিস্টরা তাদের কথাগুলি পরিবর্তন করেছে। কিন্তু তাদের কথার কেন্দ্রে ছিল অভিবাসী নীতি; যেটাকে তারা ইতালির অর্থনৈতিক দৈন্যতার মাঝে সকল সমস্যার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। মেলোনির সরকার কতদিন টিকবে সেটা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও অশ্বেতাঙ্গ অভিবাসীদের উপর এর বিরূপ প্রভাব যে বাড়বে, তা নিশ্চিত।

সেপ্টেম্বরের ইতালির নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী জাতীয়তাবাদীরা বিশাল বিজয় পেয়েছে। নির্বাচনের সর্বশেষ হিসেবে বলা হচ্ছে যে, জর্জিয়া মেলোনির ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’, মাত্তেও সালভিনির ‘লেগা নর্ড’ এবং সিলভিও বারলুসকোনির ‘ফোর্তসা ইতালিয়া’ দলের ডানপন্থী কোয়ালিশন প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এর মাঝে মেলোনির দল পেয়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ ভোট। ইতালির সকল পত্রিকাই মেলোনির দলের বিজয়ের ব্যবধান নিয়ে হেডলাইন করে। কেউ কেউ বলে যে, মেলোনি ইতালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন। তবে মাত্র ৬৪ শতাংশ ভোটার ভোট দেয়ার কারণে অনেকেই এই ভোটের গুরুত্বকে কিছুটা হলেও কম হিসেবে দেখছেন বলে বলছে ‘ডয়েচে ভেলে’। যারা ডানপন্থী দলের পক্ষে ভোট দেয়নি, তারা আশা করছেন দেশের বাকি জনগণকে সাথে নিয়েই যেন সরকার কাজ করে। তবে এই মুহুর্তে জীবনযাত্রার খরচ মারাত্মক বেড়ে যাওয়ায় এবং ইউক্রেনে যুদ্ধ চলমান থাকায় প্রথম দিন থেকেই মেলোনির সরকার চ্যালেঞ্জের মাঝে পড়বে। নির্বাচিত হবার পর জর্জিয়া মেলোনি তার প্রথম ভাষণে বলেন যে, তিনি ইতালিকে একত্রিত করার চেষ্টা করবেন।

ইতালিতে ডানপন্থী রাজনীতির ইতিহাস

৪৫ বছর বয়স্ক মেলোনির দল ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’ ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠা পেলেও আগের কিছু ইতিহাসের সাথে দলটার সম্পর্ক রয়েছে বলে বলছেন অনেকে। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, ১৯২২ সালে ইতালিতে বেনিতো মুসোলিনির নেতৃত্বে ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী ‘ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টি’ ক্ষমতা দখল করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইতালি প্রথমে নাজি জার্মানির পক্ষে থাকলেও মুসোলিনির পতনের পর তারা মিত্রপক্ষে যোগ দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬ সালে মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট সরকারের চিফ অব স্টাফ গিওরগিও আলমিরান্তের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয় নব্য-ফ্যাসিস্ট দল ‘ইতালিয়ান সোশাল মুভমেন্ট’ বা ‘এমএসআই’। বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ফ্যাসিস্ট সমর্থকরা এই দলে যোগদান করতে থাকে। প্রায় তিন দশক ধরে চলা এর রাজনীতিতে তারা ১০ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি। তবে ইতিহাসবিদ পল জিনসবর্গ মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, এই দল যে এতকাল টিকে থেকেছিল, সেটাই বড় বিষয়। ইতালির দক্ষিণের জনগণ, শহরাঞ্চলের গরীব মানুষেরা এবং নিম্ন মধ্যবিত্তরা অনেকেই এদের পক্ষে ভোট দিয়েছে। জিয়ানফ্রাঙ্কো ফিনির অধীনে ১৯৯০এর দশকে এই দলে পরিবর্তন আসে। তিনি দলের বক্তব্যগুলিকে পরিবর্তন করেন এবং ১৯৯৩ সালে রোমের মেয়র নির্বাচনে ৪৭ শতাংশ ভোট পেয়ে সকলকে অবাক করে দেন। পরের বছরেই তিনি তার দলের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘ন্যাশনাল এলায়েন্স’। এই সময়টাতেই রোমের খেটে খাওয়া একজন মহিলার সন্তান জর্জিয়া মেলোনি ‘এমএসআই’তে যোগদান করেন এবং পরে ‘ন্যাশনাল এলায়েন্স’এর যুব দলের নেতা হয়ে যান।

একসময় মুসোলিনিকে বিংশ শতকের সেরা রাজনীতিবিদ বলে আখ্যা দিলেও জিয়ানফ্রাঙ্কো ফিনি তার মতামতকে পরিবর্তন করেন এবং ২০০৩ সালে ইস্রাইল সফর করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গণহত্যার শিকার ইহুদিদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সেখানে গিয়ে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ইতালির ইহুদী বিদ্বেষী আইনের সমালোচনা করেন। জর্জিয়া মেলোনিও ২০০৯ সালে সিলভিও বারলুসকোনির সরকারের মন্ত্রী থাকার সময় ইস্রাইল সফর করে একই স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ২০১১ সালে ইইউএর প্রভাবে ইতালিতে গঠিত সরকারে মেলোনি যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। এবং ২০১২ সালে ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি তার দলকে ‘পুরোনো ঐতিহ্যের জন্যে নতুন দল’ হিসেবে পরিচিত করান। তবে ২০২২ সালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত তার দল ১০ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি।

মেলোনির ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’র লোগো হলো ইতালির জাতীয় পতাকার তিন রঙের আগুন। এর আগের ‘এমএসআই’ এবং ‘ন্যাশনাল এলায়েন্স’এর লোগোও সেটাই ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ‘রুটগার্স ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর কোরি ব্রেনান ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’কে বলছেন যে, রাজনীতিতে লোগোটা ব্র্যান্ডিংএর মতো গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ এটাকে খোঁজে এবং অনুসরণ করে। ইতালিতে মুসোলিনির তৈরি করা অনেক কিছুই এখনও টিকে আছে। বড় বড় স্থাপত্য ছাড়াও রোমের ম্যানহোলের ডাকনার এক-চতুর্থাংশের উপরে লেখা রয়েছে ‘এসপিকিউআর’। যার অর্থ হলো, ‘রোমের সিনেট এবং জনগণ’। মুসোলিনি তার সাম্রাজ্যকে প্রাচীন রোমের সাথে তুলনা দিতে এটা ব্যবহার করতেন। অনেক ম্যানহোলে ফ্যাসিট লোগোটাও রয়েছে। যদিও ইতালিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ফ্যাসিস্ট দল নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তথাপি ডানপন্থীরা এখনও ফ্যাসিস্ট স্যালুট ব্যবহার করে।

বড় বড় স্থাপত্য ছাড়াও রোমের ম্যানহোলের ডাকনার এক-চতুর্থাংশের উপরে লেখা রয়েছে ‘এসপিকিউআর’। যার অর্থ হলো, ‘রোমের সিনেট এবং জনগণ’। মুসোলিনি তার সাম্রাজ্যকে প্রাচীন রোমের সাথে তুলনা দিতে এটা ব্যবহার করতেন। অনেক ম্যানহোলে ফ্যাসিট লোগোটাও রয়েছে। ইউরোপে ডানপন্থী রাজনীতি কখনোই বন্ধ করা হয়নি। উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকেরা লিবারাল রাজনৈতিক ব্যবস্থার মাঝেই তাদের কর্মকান্ড চালিয়ে গেছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে অভিবাসী সংকটের পর থেকে ইউরোপজুড়ে ডানপন্থীদের উত্থান হয়েছে। যেকারণে ইতালির এই নির্বাচন পুরো ইউরোপের জন্যেই গুরুত্বপূর্ণ।

 ডানপন্থীরা কিভাবে ইতালির নির্বাচনে জিততে পারলো?

রোমে ‘ইইউ’এর পররাষ্ট্র বিষয়ক কাউন্সিলের প্রকল্প ব্যবস্থাপক টেরেসা কোরাটেলা ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, মেলোনির এই অবস্থানে আসার সবচাইতে বড় কারণ হলো, ২০১৮ সাল থেকে ইতালিতে যতগুলি অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়েছে, তিনি সেগুলির কোনটারই অংশ ছিলেন না। আর দ্বিতীয়তঃ তার কোয়ালিশন সহযোগী মাত্তেও সালভিনি এবং সিলভিও বারলুসকোনি এই মুহুর্তে তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে সবচাইতে খারাপ সময় পার করছেন। ইতালির আগের সরকার প্রধানদের অনেকেই প্যারিস এবং বার্লিনের নেতৃত্বের সাথে যেমন সমঝোতা করে চলতে বাধ্য হয়েছেন, তিনি হয়তো সেই পথে নাও হাঁটতে পারেন। অন্ততঃ ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত তিনি হাঙ্গেরি এবং পোল্যান্ডের ডানপন্থী নেতৃত্বের সাথে বেশি কাছের সম্পর্ক রেখেছিলেন।

‘এসোসিয়েটেড প্রেস’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে রোমের ‘ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার্স’এর ডিরেক্টর নাথালি টচ্চি ডানপন্থীদের জয়কে ইতালির রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতার সাথে যুক্ত করেন। ডানপন্থীরা জিতেছে, এর অর্থ এই নয় যে, ইতালিয়রা ফ্যাসিস্ট হয়ে গেছে। এদের জয়ের মূল কারণ হলো, জনগণ ইতালির রাজনীতির ব্যাপারে যারপরনাই ক্ষুব্ধ; তারা পরিবর্তন চাইছে। তারা ভিন্ন একটা দলকে ভোট দিতে চাইছিল।

তবে ‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ডানপন্থীরা ভোট পাবার জন্যে এমন কিছু ইস্যুকে বেছে নিয়েছে, তা চিন্তা করার মতো। মাত্তিও সালভিনির নির্বাচনী এলাকা ফেরারা কিভাবে বামপন্থী থেকে ডানপন্থী হয়ে গেলো তার উত্তর খুঁজতে ‘বিবিসি’ বলছে যে, সেখানকার জনগণ মনে করছে যে, অভিবাসীদের কারণে তাদের শহরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে এবং সাধারণ ইতালিয়রা অর্থনৈতিক সমস্যা পড়েছে। অথচ প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এই অঞ্চলটা ইতালির অনেক অঞ্চলের চাইতে অধিকতর সমৃদ্বশালী। এখানকার সমস্যা হলো এখানকার স্থবির জনসংখ্যা; যেটার কারণে এখানকার মানুষের অর্থনৈতিক জীবনে পরিবর্তন আসছে না; তাদের ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নতি হচ্ছে না। ডানপন্থীরা বলছে যে, এখানকার অর্থনৈতিক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে অভিবাসীদের কারণেই; আর সেটাই অনেক মানুষ সমর্থন করছে। অথচ একসময় এই শহরে ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অপরাধে অনেক মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে; যাদের মাঝে কেউ কেউ এখনও বেঁচে আছেন। তাদের জীবদ্দশাতেই তারা দেখতে পাচ্ছেন যে, ইতালি আবারও উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির দিকে ধাবিত হচ্ছে।

অনেকেই ডানপন্থীদের জয়ের পিছনে কিছু ষড়যন্ত্র থিউরির কথা বলছেন; যা মানুষ বিশ্বাস করছে। ‘ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলি’র প্রফেসর লরেন্স রোজেনথাল ‘আল জাজিরা’কে বলছেন যে, মেলোনি বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে মানুষকে জাগিয়ে তুলেছেন; যার মাঝে রয়েছে নারীবাদী ইস্যুগুলি। তিনি ইতালির পরিবারগুলির স্বার্থ নিয়ে কথা বলেছেন; শরণার্থী থামাতে সীমানা পাহাড়া দেবার কথা বলেছেন। তিনি সেই থিউরির কথা বলে জনগণকে ক্ষেপিয়েছেন, যেখানে বলা হচ্ছে যে, ‘গ্লোবাল এলিট’রা পশ্চিমা দেশগুলির আদিবাসীদেরকে অশ্বেতাঙ্গ অভিবাসী দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে চাইছে। এই থিউরিটাই জনগণের ক্রোধের কেন্দ্রে রয়েছে; যা তিনি ব্যবহার করেছেন। সবগুলি পশ্চিমা দেশেই এই চিন্তাটা ঘনীভূত হচ্ছে এবং এরা সকলেই অশ্বেতাঙ্গদেরকে তাদের সমস্যার কারণ হিসেবে দেখছে।

মেলোনি কিছুদিন আগেই এক বক্তব্যে বলেছেন যে, বামপন্থীরা রক্ষণশীলদের সকল বিশ্বাসের উপরে হামলা করেছে। তিনি সিসিলির উপকূলে আফ্রিকা থেকে আসা অভিবাসীদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ও মেক্সিকোর সীমানার তুলনা করেন। তিনি বলেন যে, হাজারো অভিবাসী শহরের বস্তিগুলি ভরে ফেলছে; এবং তাদের কারণে ইতালির জনগণের পারিশ্রমিক কমে গেছে; এই অভিবাসীরা অনেকেই বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত। মেলোনি ইউরোপের অন্যান্য দেশের জনগণের উদ্দেশ্যে যখন কথা বলছেন, তখন তার কথাগুলি বেশ স্পস্ট। স্পেনের কট্টর ডানপন্থী ‘ভোক্স’ পার্টির এক র‍্যালিতে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন যে, তিনি স্বাভাবিক পরিবারের পক্ষে; সমকামি লবির পক্ষে নন। মানুষের লিঙ্গ পরিচয়ের ব্যাপারে তিনি একাত্মতা প্রকাশ করলেও লিঙ্গ নিয়ে আদর্শের বিরোধী।

 
জর্জিয়া মেলোনির পিছনে 'ব্রাদার্স অব ইতালি'র লোগো; যেখানে রয়েছে ইতালির পতাকার তিন রঙের আগুন। এর আগের নব্য-ফ্যাসিস্ট দল ‘ইতালিয়ান সোশাল মুভমেন্ট’ বা ‘এমএসআই’ এবং ‘ন্যাশনাল এলায়েন্স’এর লোগোও ছিল এটাই। রাজনীতিতে লোগোটা ব্র্যান্ডিংএর মতো গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ এটাকে খোঁজে এবং অনুসরণ করে।

ডানপন্থীদের নীতি কি ইইউএর সাথে সাংঘর্ষিক হবে?

ইইউ পার্লামেন্টে জার্মানির ক্ষমতাসীন সোশালিস্ট দলের প্রতিনিধি এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্যাটারিনা বারলি ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, মেলোনি ক্ষমতায় যাবার পরে তার পূর্বের নীতির মতোই চলবেন, নাকি পরিবর্তিত হবেন, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে এটা নিশ্চিত যে, অর্থনৈতিক এবং আর্থিক নীতির ক্ষেত্রে তিনি রক্ষণশীল ভূমিকা নেবেন; আর মানবাধিকার, নারীর অধিকার, এবং সংখ্যালঘুদের অধিকারের মতো আদর্শিক বিষয়ের ক্ষেত্রে খুবই কঠোরভাবে জনমতের উপরে চলবেন। ইউরোপের খারাপ সময়ে তার জাতীয়তাবাদী এজেন্ডাগুলি ইউরোপকে একত্রিত করবে না। ক্যাটারিনা বারলি বলছেন যে, তাদের অভিজ্ঞতায় এধরনের সরকারগুলির ইইউএর মাঝে ছাড় দেয়ার প্রবণতা থাকে না। অথচ ইইউএর নীতি তখনই তৈরি করা সম্ভব, যখন সেখানে একেকটা দেশের ছাড় দেয়ার প্রবণতা থাকে। যদি একেকটা দেশ মাঝে মাঝে নিজের স্বার্থ দেখে, তাহলে সেটা মেনে নেয়া যায়। কিন্তু সেটা যদি চলতেই থাকে, তাহলে ইইউ আর ইইউ থাকবে না; তা হয়ে যাবে কিছু স্বার্থপর মানুষের ক্লাব। বারলি বলছেন যে, এখন পর্যন্ত মেলোনি ইউক্রেন যুদ্ধে ইউক্রেনের পক্ষে কথা বললেও তার কোয়ালিশন সহযোগী মাত্তেও সালভিনি এবং সিলভিও বারলুসকোনি ভ্লাদিমির পুতিনের সমর্থক বলে পরিচিত। কাজেই এখনই বলা যাচ্ছে না যে, ইউক্রেন যুদ্ধে ইতালির অবস্থান কি হবে। তবে ইইউএর জ্বালানি সংকটের মাঝে ইতালি খুব সম্ভবতঃ রুশ জ্বালানির উপরে নির্ভরশীল দেশগুলির জন্যে কোন ছাড় দিতে রাজি হবে না।

মেলোনির ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’ দলের সংসদ সদস্য ইলেনিয়া লুকাসেলি ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, ইতালির জনগণ রক্ষণশীল; তাদের দলও সেইরকমই। অভিবাসী, সমকামিদের অধিকার, গর্ভপাতের অধিকার ইত্যাদি আদর্শিক বিষয় এই মুহুর্তে তাদের দলের কাছে অর্থনৈতিক সমস্যার চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইতালির রক্ষণশীল জনগণ প্রকৃতপক্ষে শরণার্থীদের জন্যে জীবন দিতে প্রস্তুত নয়। লুকাসেলি বলছেন যে, তাদের দলের সাথে মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট দলের কোন সম্পর্ক নেই। এই দলের সাথে সম্পর্কিত কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে সোশাল মিডিয়াতে কোন উগ্রপন্থী কথা বলে থাকে, সেটা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন; কারণ এই দলটা অনেক বড়। প্রতিটা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে দলের কোন নীতির মাঝে উগ্রতা নেই।

ডানপন্থীদের বিজয়কে কে কিভাবে দেখছে?

‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, জার্মানির ক্ষমতাসীন বামপন্থী সোশালিস্ট সরকার ইতালির নির্বাচনের ব্যাপারে রয়েসয়ে বক্তব্য দিচ্ছে। তবে উগ্র ডানপন্থী ‘অলটারনেটিভ ফর জার্মানি’ বা ‘এএফডি’ দল ইতালির নির্বাচনে খুশি। তারা বলছে যে, সুইডেন এবং ইতালিতে ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলির বিজয় প্রমাণ করছে যে, বামপন্থী রাজনীতি এখন অতীতের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফ্রান্স এবং স্পেনের ডানপন্থী বিরোধী দলগুলিই মেলোনির বিজয়ে প্রথম অভিনন্দন জানিয়েছে। এছাড়াও ইইউএর মাঝে ‘ইউরোস্কেপটিক’ পোল্যান্ড এবং হাঙ্গেরির সরকারও তাদের উৎফুল্লতা প্রকাশ করেছে। তবে ইইউএর বাকি দেশগুলি মেলোনির ব্যাপারে একেবারেই আশাবাদী নয়; কারণ তিনি এতদিন তার নীতিতে ইতালির স্বার্থকেই প্রাধান্য দেবার কথা বলেছেন। যদিও ইইউএর পক্ষ থেকে নীতিগত কারণে ইতালির নির্বাচন নিয়ে কোন মন্তব্য করা হয়নি, তথাপি ইইউ কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইয়েন বলেছেন যে, যেসব দেশ ইইউএর আদর্শকে সন্মান করবে না, সেসব দেশকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো পদ্ধতি ইইউএর জানা রয়েছে।

জার্মানির ‘গ্রিন পার্টি’র সংসদ সদস্য টোবিয়াস বাখেরলে ‘ডয়েচে ভেলে’কে বলছেন যে, এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না যে, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে সহায়তা দেয়া এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবরোধ চালিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে ইতালির ডানপন্থী দলের নীতি কি হবে। তবে এটা নিশ্চিত যে, বিভিন্ন ইস্যুতে ইইউএর অন্যান্য দেশের ডানপন্থী সরকারগুলির সাথে ইতালির এই সরকার তাল মেলাবে। বাখেরলে পুরো ইউরোপ জুড়ে ডানপন্থী দলগুলির জয়জয়কারে যথেষ্ট চিন্তিত। তিনি মনে করছেন না যে, ডানপন্থীদের উত্থানের ব্যাপারে শুধুমাত্র তার দলের মতো বামপন্থী দলগুলিরই চিন্তা করতে হবে। তিনি বিশেষ করে উগ্র ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী চিন্তার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়াটা সকলের কর্তব্য বলে মনে করেন; কারণ এই চিন্তাগুলি গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে কাজ করছে।

‘আল জাজিরা’ বলছে যে, পশ্চিমা দেশগুলিতে ডানপন্থী জাতীয়তাবাদীরা কিছু ইস্যুতে একমত হচ্ছে; যার মাঝে রয়েছে অভিবাসী ইস্যু, গর্ভপাতের অধিকার, সমকামিদের অধিকার; এবং এর সাথে কিছু ইস্যু, যেগুলিকে ডানপন্থীরা ‘গ্লোবালিস্ট’ ইস্যু বলে আখ্যা দিচ্ছে; অর্থাৎ তারা বলছে যে, সেগুলি দুনিয়ার সমস্যা হলেও তাদের দেশের সেখানে মাথা ঘামাবার দরকার নেই। এই চিন্তগুলি যুক্তরাষ্ট্রেও অনেকেই সমর্থন করেন; যারা মূলতঃ রিপাবলিকান দলের সমর্থক। রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ এবং টম কটন; কংগ্রেস সদস্য মারজোরি টেইলর গ্রিন, এবং প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পেও সকলেই ইতালির ডানপন্থী নেতাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। কংগ্রেস সদস্য লরেন বুবার্ট এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, বামপন্থীরা শুধু ধ্বংসই করেছে; যা সারা দুনিয়ার মানুষ বুঝতে পারছে। রিপাবলিকানপন্থী মিডিয়া ‘ফক্স নিউজ’এর প্রভাবশালী সাংবাদিক টাকার কার্লসন ইতালিতে ডানপন্থীদের বিজয়কে একটা বিপ্লব হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

 
ফ্যাসিস্ট স্যালুট দিচ্ছে ইতালির ফুটবল ক্লাব 'লাতসিও'র সমর্থকেরা। ইতালিতে মেলোনির জয় বাকি ইউরোপে এবং যুক্তরাষ্ট্রে চরম ডানপন্থীদের শক্তিশালী করবে। বিশেষ করে জার্মানির উগ্র ডানপন্থী গ্রুপগুলি এই নির্বাচনের ফলাফলে আরও অনুপ্রাণিত হবে। এমতাবস্থায় সবচাইতে বড় প্রশ্নের মুখে পড়বে জার্মানির রাজনৈতিক লক্ষ্য; যা কিনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উগ্র ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে মিত্রশক্তিই নির্ধারণ করে দিয়েছিল।

ইউরোপে উগ্রপন্থীদের পুনরুত্থান

ফিলিস্তিন বংশোদ্ভূত ইতালিয় সাংবাদিক এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অব মায়ামি’র প্রফেসর রুলা জেব্রীল ‘আল জাজিরা’কে বলছেন যে, ইতালিতে মেলোনির জয় বাকি ইউরোপে এবং যুক্তরাষ্ট্রে চরম ডানপন্থীদের শক্তিশালী করবে। ডানপন্থী এই কর্মকান্ডগুলি যথেষ্ট সংগঠিত এবং এদের বিচরণ এখন বিশ্বব্যাপী। একসময় মেলোনিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার ফলে তিনি ডানপন্থীদের ক্রোধের শিকার হন। ইতালিতে নির্বাচনের পর থেকে তার এবং তার মতো ডানপন্থীদের সমালোচকদের বিরুদ্ধে প্রাণনাশের হুমকি আসতে শুরু করেছে।

২০১৯এর এপ্রিলে ইতালির ফুটবল ক্লাব ‘লাতসিও’র কিছু সমর্থক মিলানে একটা খেলা শুরুর আগে রাস্তায় ‘বেনিতো মুসোলিনির প্রতি সন্মান’ লেখা একটা ব্যানার তুলে ধরে। প্রায় ৭০ জনের মতো সমর্থক ফ্যাসিস্ট সঙ্গীত গায় এবং ফ্যাসিস্ট স্যালুট দেখায়। ‘সিএনএন’ বলছে যে, ব্যানারটা যে যায়গায় দেখানো হয়, তার কাছেই ১৯৪৫ সালে মুসোলিনি, তার স্ত্রী এবং উচ্চপদস্থ ফ্যাসিস্ট নেতাদের হত্যা করে তাদের মৃতদেহ উল্টো করে ঝুলিয়া রাখা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, দিনটাও ছিল ‘লিবারেশন ডে’র আগের দিন; যে দিনটা ইতালিতে ফ্যাসিস্টদের হাত থেকে ইতালির মুক্ত হওয়ার দিন হিসেবে পালন করা হয়। অবশ্য ইতালিতে ফুটবল মাঠে ডানপন্থীদের স্যালুট এবং অন্যান্য প্রতীকের দৃশ্যমান হওয়াটা নতুন নয়। বহুবার এ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলেও তা চলছে। তৎকালীন ডানপন্থী উপপ্রধানমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনি ফুটবল মাঠে ফ্যাসিস্ট স্যালুটের সমালোচনা করলেও এর বাইরে তিনি তেমন কিছু করেননি।

ডানপন্থীরা কতদিন ক্ষমতায় থাকতে পারবে?

‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে প্রশ্ন করা হচ্ছে যে, ইতালিতে যখন ১৯৪৮ সালের পর থেকে একেকটা সরকারের গড় আয়ু মাত্র ১৪ মাস, সেখানে ডানপন্থী কোয়ালিশনের প্রতিশ্রুত ৫ বছর উচ্চাকাংক্ষাই বটে। আর দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সমস্যা নিরসনে নীতি নিয়ে কোয়ালিশনের সদস্য দলগুলির মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। মূল্যস্ফীতির প্রভাব কমাতে আগের সরকার ৪০ বিলিয়ন ইউরোর প্রণোদনা দিয়েছে। এখন মেলোনির শরীক দলের প্রধান বারলুসকোনি চাইছেন আরও ৩১ বিলিয়ন ইউরো ঋণ করে প্রতি মাসে ১ হাজার ইউরো পেনসনের ব্যবস্থা করতে। কিন্তু ইতালির বর্তমান রাষ্ট্রীয় ঋণ ২ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ইউরো, যা কিনা দেশটার জিডিপির দেড় গুণ! এমতাবস্থায় উচ্চ সুদে ইতালি কতটা অর্থ ঋণ করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অপরদিকে মেলোনির উপদেষ্টারা বলছেন যে, তারা হয়তো দারিদ্র্য বিমোচনে অর্থায়ন কমিয়ে দিয়ে কর কমাবার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু মেলোনির শরীক দলগুলি যদি তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বেশি আগ্রহী হয়, তাহলে তার নীতি বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির সমস্যাকে কাটিয়ে উঠতে না পারলে ১ লক্ষ ২০ হাজার কোম্পানি এবং ৩ লক্ষ ৭০ হাজার কর্মসংস্থান ঝুঁকির মাঝে পড়বে।

ইউরোপে ডানপন্থী রাজনীতি কখনোই বন্ধ করা হয়নি। উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকেরা লিবারাল রাজনৈতিক ব্যবস্থার মাঝেই তাদের কর্মকান্ড চালিয়ে গেছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে অভিবাসী সংকটের পর থেকে ইউরোপজুড়ে ডানপন্থীদের উত্থান হয়েছে। যেকারণে ইতালির এই নির্বাচন পুরো ইউরোপের জন্যেই গুরুত্বপূর্ণ। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে জার্মানিতে নাজি পার্টির সকল স্তম্ভ দূরীকরণের যে প্রচেষ্টা চলেছে, তা ইতালিতে হয়নি। কিন্তু তারা বলছে না যে, জার্মানিতে এতকিছু করার পরেও নব্য-নাজিরা এখনও সক্রিয় এবং উগ্র ডানপন্থী দল ‘এএফডি’ আইনগতভাবেই রাজনীতিতে রয়েছে। অপরদিকে ইতালিতে নব্য-ফ্যাসিস্ট দলের রাজনীতি করার ব্যাপারটা অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলি যতটা মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করেছে, ইতালিতে সেটা তেমন বড় কোন বিষয় ছিল না কখনোই। মোটকথা ইতালিতে ফ্যাসিস্ট রাজনীতি কোন না কোন ফর্ম্যাটে চলেছে। নব্য-ফ্যাসিস্টরা তাদের কথাগুলি পরিবর্তন করেছে। কিন্তু তাদের কথার কেন্দ্রে ছিল অভিবাসী নীতি; যেটাকে তারা ইতালির অর্থনৈতিক দৈন্যতার মাঝে সকল সমস্যার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। মেলোনির সরকার কতদিন টিকবে সেটা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও অশ্বেতাঙ্গ অভিবাসীদের উপর এর বিরূপ প্রভাব যে বাড়বে, তা নিশ্চিত। আর ইউরোপের অন্যান্য দেশ, বিশেষ করে জার্মানির উগ্র ডানপন্থী গ্রুপগুলি এই নির্বাচনের ফলাফলে আরও অনুপ্রাণিত হবে। ইউরোপজুড়ে ডানপন্থীদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি ইইউএর কর্মসম্পাদনকে আরও চ্যালেঞ্জের মাঝে ফেলে দেবে। একেকটা দেশ যখন জাতীয় স্বার্থকে ইউরোপের উপরে স্থান দিচ্ছে, তখন ইইউএর অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় সবচাইতে বড় প্রশ্নের মুখে পড়বে জার্মানির রাজনৈতিক লক্ষ্য; যা কিনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উগ্র ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে মিত্রশক্তিই নির্ধারণ করে দিয়েছিল।



সূত্রঃ
‘Why Republicans are elated by ‘triumph’ of Italy’s Giorgia Meloni’ in Al-Jazeera, 27 September 2022
‘Italy’s right-wing winners inherit poison chalice’ in Reuters, 26 September 2022
‘How a party of neo-fascist roots won big in Italy’ in Associated Press, 26 September 2022
‘Lazio fans hang pro-Mussolini banner, make fascist salutes ahead of Liberation day’ in CNN, 24 April 2019
‘Why is Italy swinging to the far right?’ in BBC News, (https://www.youtube.com/watch?v=BNRQTSfAR1o)
‘How extremist is Italy's designated far-right government?’ in DW News, 27 September 2022 (https://www.youtube.com/watch?v=4S89Iuz1I7E)

Sunday, 4 September 2022

দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের সামরিকীকরণে চীনের ভীতিকে ব্যবহার করছে পশ্চিমারা

০৪ঠা সেপ্টেম্বর ২০২২
 
নভেম্বর ২০২০। প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ দেশ পালাউএ মার্কিন সর্বাধুনিক 'এফ-২২ র‍্যাপটর' যুদ্ধবিমান। প্রশান্ত মহাসাগরের ক্ষুদ্র দ্বীপ দেশগুলিকে ঘনঘন সামরিক মহড়ায় ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র যখন অত্র অঞ্চলকে সামরিকীকরণের দিকে এগুচ্ছে, তখন সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ ভিড়তে না দেয়ার ধৃষ্টতা সত্যিকার অর্থেই অবাক করার মতো। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে চীনাদের প্রভাব এখনও প্রধানতঃ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে থাকলেও পশ্চিমারা তা ব্যবহার করছে অত্র অঞ্চলকে সামরিকীকরণের ছুতো হিসেবে।


গত ২৬শে অগাস্ট মার্কিন কোস্ট গার্ড বিবৃতি দেয় যে, তাদের একটা প্যাট্রোল বোট ‘অলিভার হেনরি’ দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের বন্দরে ঢোকার অনুমতি পায়নি। জাহাজটা চলমান মহড়া ‘অপারেশন আইল্যান্ড চিফ’এর অংশ হিসেবে অত্র অঞ্চলের বিভিন্ন দ্বীপ দেশগুলি সফর করছিলো। জাহাজটাকে বন্দরে ঢোকার কূটনৈতিক ছাড়পত্র দেয়া হয়নি। এর ফলশ্রুতিতে জাহাজটা কাছাকাছি পপুয়া নিউ গিনির এক বন্দরে চলে যায়। মার্কিন মিডিয়া ‘ফক্স নিউজ’ বলছে যে, এই মহড়ার সময় যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আকাশ ও সমুদ্রে টহল দেয়ার জন্যে বিভিন্ন ধরণের সামরিক শক্তি মোতায়েন করে; যে অঞ্চলের মাঝে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জও ছিল। প্রতিবেদনে আরও মনে করিয়ে দেয়া হয় যে, সাম্প্রতিক সময়ে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের প্রধানমন্ত্রী মানাসেহ সোগাভারে চীনের সাথে একটা নিরাপত্তা চুক্তিতে সই করে পশ্চিমা দেশগুলিকে দুশ্চিন্তার মাঝে ফেলেছেন। অনেকেই ভয় পাচ্ছেন যে, এই চুক্তির মাধ্যমে সলোমোনে চীনা সামরিক ঘাঁটি স্থাপিত হবে। এর ফলে অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখন্ডের ২ হাজার কিঃমিঃএর মাঝে চীনারা সামরিক উপস্থিতি তৈরি করতে সক্ষম হবে। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ছাড়াও তা মার্কিন ঘাঁটি গুয়ামএর কাছাকাছি চীনা সামরিক উপস্থিতি তৈরি করতে সক্ষম হতে পারে। মার্কিনীরা অনেকেই সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের উপর চীনাদের প্রভাব মেনে নিতে পারছেন না। মার্কিন লেখক গর্ডন চ্যাং এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, চীন এই মুহুর্তে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জকে চালাচ্ছে।

তবে আপাততঃ দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে যে পশ্চিমা দেশগুলিই প্রভাব বিস্তার করছে, তা পরিষ্কার। ‘সী পাওয়ার ম্যাগাজিন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, মার্কিন কোস্ট গার্ডের জাহাজ ‘অলিভার হেনরি’ যে ‘অপারেশন আইল্যান্ড চিফ’এর অংশ হিসেবে টহল দিচ্ছিলো, সেই মহড়া প্রতিবছরের চারটা মহড়ার একটা। এই মহড়ায় প্রশান্ত মহাসাগরের ১১টা দ্বীপ দেশ অংশ নেয়; যারা হলো, ফিজি, ফেডারেটেড স্টেটস অব মাইক্রোনেশিয়া, কিরিবাতি, পালাউ, পপুয়া নিউ গিনি, নাউরু, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ, সামোয়া, সলোমোন দ্বীপপুঞ্জ, তুভালু এবং ভানুয়াটু। এই দ্বীপ দেশগুলির বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর এবং সমুদ্রসীমাকে এই মহড়ায় ব্যবহার করা হয়। ‘অলিভার হেনরি’র কমান্ডিং অফিসার ফ্রেডি হফস্নাইডার বলছেন যে, জাহাজের ক্রুদের কাজ হলো আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই দেশগুলির সাথে সম্পর্কোন্নয়ন এবং তথ্য আদানপ্রদান করা। ‘অলিভার হেনরি’, ‘মার্টল হ্যাজার্ড’ এবং ‘ফ্রেডারিক হ্যাচ’ নামের কোস্ট গার্ডের তিনটা জাহাজ ২০২১এর জুলাই মাসে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি গুয়ামএ কমিশনিং করা হয় এবং সেখান থেকেই অপারেট করার ব্যবস্থা করা হয়। গুয়ামএর মার্কিন কোস্ট গার্ডের কমান্ডার ক্যাপ্টেন নিক সিমন্সএর কথায়, গুয়ামে তিনটা জাহাজের একত্রে কমিশনিংএর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অত্র অঞ্চলের গুরুত্ব বেড়ে যাওয়া দেখিয়ে দিচ্ছে।
 

মার্কিন ‘ইন্দপ্যাসিফিক কমান্ড’এর এক খবরে বলা হয় যে, গত ১০ই জুন মার্কিন বিমান বাহিনীর ৩টা ‘এফ-৩৫এ’ স্টেলথ যুদ্ধবিমানকে প্রথমবারের মতো ‘ভ্যালিয়্যান্ট শিল্ড ২০২২’ নামের এক মহড়ার অংশ হিসেবে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ পালাউএ মোতায়েন করা হয়। খবরে বলা হয় যে, ইন্দোপ্যাসিফিকে সামরিক শক্তি মোতায়েনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের দেশকে রক্ষা করা ছাড়াও বিশ্বব্যাপী শক্তি প্রদর্শনেও যে সক্ষম, সেটা প্রমাণ করছে। এর আগে ২০২০এর নভেম্বরে ২টা ‘এফ-২২’ যুদ্ধবিমানও পালাউএ মোতায়েন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু রাষ্ট্রগুলিও অত্র অঞ্চলে শক্তি প্রদর্শন করছে। পালাউ দ্বীপে জাপানের দূতাবাসের ওয়েবসাইট জানাচ্ছে যে, গত ১৯শে জুলাই তৃতীয়বারের মতো জাপানি নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার ‘কিরিসামে’ পালাউ সফর করে; যার সাথে ছিল মার্কিন কোস্ট গার্ডের প্যাট্রোল বোট ‘মার্টল হ্যাজার্ড’ এবং ব্রিটিশ রয়াল নেভির প্যাট্রোল জাহাজ ‘তামার’। রয়াল নেভির আরেক জাহাজ ‘স্পে’ গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে টোঙ্গা, পিটকেয়ার্ন দ্বীপ, ফিজি ও পপুয়া নিউ গিনি সফর করে বলে বলছে ব্রিটিশ সরকারের ওয়েবসাইট। এর আগে ২০২১এর সেপ্টেম্বরে জাপানি নৌবাহিনীর ২০ হাজার টনের বিশাল হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার ‘কাগা’ ডেস্ট্রয়ার ‘মুরাসামে’ ও ‘শিরানুই’এর সাথে পালাউ সফর করে। এই জাহাজগুলি পালাউএর ক্ষুদ্র দু’টা প্যাট্রোল বোটের সাথে যৌথ মহড়া সম্পন্ন করে।

এছাড়াও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্স গত ১০ থেকে ১২ই অগাস্টের মাঝে ফ্রান্সের মূল ভূখন্ড থেকে ৭২ ঘন্টার মাঝে প্রশান্ত মহাসাগরে ফরাসি উপনিবেশ নিউ ক্যালিডোনিয়াতে ৭টা যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে। ফরাসি সামরিক বাহিনী বলছে যে, এই বিমানগুলির মাঝে ছিল ৩টা ‘রাফাল’ ফাইটার বিমান, দু’টা ‘এ৩৩০’ রিফুয়েলিং ট্যাঙ্কার বিমান এবং দু’টা ‘এ৪০০এম’ পরিবহণ বিমান। এই বিমানগুলির অস্ট্রেলিয়াতে ‘পিচ ব্ল্যাক ২০২২’ নামের সামরিক মহড়ায় অংশ নেয়ার কথা বলা হলেও অঞ্চলিকভাবে শক্তি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যটা দৃষ্টি এড়িয়ে যায় না। এর আগেও ফ্রান্স প্রশান্ত মহাসাগরে এভাবে যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছে। ব্রিটিশরাও আগে এভাবেই তাদের বিমান বাহিনীর বিমান ইন্দোপ্যাসিফিকে মোতায়েন করেছে। ফ্রান্স ও ব্রিটেনকে অনুসরণ করেছে জার্মানি। ‘ডিফেন্স নিউজ’ বলছে যে, জার্মান বিমান বাহিনীর ৬টা ‘ইউরোফাইটার টাইফুন’ যুদ্ধবিমান ৩টা ‘এ৩৩০’ রিফুয়েলিং বিমান এবং ৪টা ‘এ৪০০এম’ পরিবহণ বিমানের সাথে করে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়াতে অবতরণ করে। জার্মান বিমান বাহিনীর প্রধান লেঃ জেনারেল ইনগো গেরহার্টজ বলছেন যে, জার্মানি দেখাতে চায় যে এক দিনের মাঝে তারা এশিয়াতে যুদ্ধবিমান মোতায়েন করতে সক্ষম।

তবে পশ্চিমা দেশগুলি, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড সকলেই যুক্তরাষ্ট্রকে অনুসরণ করছে। ২০২১এর জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্র গুয়াম দ্বীপে ২৫টা সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ‘এফ-২২ র‍্যাপটর’ স্টেলথ ফাইটার বিমান মোতায়েন করে। ‘অপারেশন প্যাসিফিক আয়রন ২০২১’ নামের এক মহড়ার অংশ হিসেবে এই বিমানগুলিকে সাময়িকভাবে মোতায়েন করা হলেও জাপানের ভূমিতে ‘এফ-২২’ বিমান স্থায়ীভাবে মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হবার পথে। ‘সিএনএন’ বলছে যে, বিমান মোতায়েন করা হয়েছিল মূলতঃ চীনকে টার্গেট করেই। প্রশান্ত মহাসাগরের ক্ষুদ্র দ্বীপ দেশগুলিকে ঘনঘন সামরিক মহড়ায় ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র যখন অত্র অঞ্চলকে সামরিকীকরণের দিকে এগুচ্ছে, তখন সলোমোন দ্বীপপুঞ্জে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ ভিড়তে না দেয়ার ধৃষ্টতা সত্যিকার অর্থেই অবাক করার মতো। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে চীনাদের প্রভাব এখনও প্রধানতঃ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে থাকলেও পশ্চিমারা তা ব্যবহার করছে অত্র অঞ্চলকে সামরিকীকরণের ছুতো হিসেবে।

Wednesday, 31 August 2022

ইউক্রেন যুদ্ধের ছয় মাস… বৈশ্বিক প্রভাব, যুদ্ধের বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ

০১লা সেপ্টেম্বর ২০২২
 
জুন ২০২২। ডনবাসে ইউক্রেনিয় সেনারা ফরাসি নির্মিত 'সীজার' আর্টিলারি থেকে গোলাবর্ষণ করছে। যুদ্ধ শুরুর ছয় মাসের মাঝে যুদ্ধটা একে অপরের ক্ষতি বাড়ানোর যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। উভয় পক্ষেরই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক; কিন্তু কেউই বড় রকমের কোন বিজয় ছিনিয়ে নেবার মতো অবস্থানে নেই।

২৪শে ফেব্রুয়ারি ২০২২ রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করে। যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পর এই যুদ্ধের প্রভাব এখন বিশ্বব্যাপী প্রতিফলিত হচ্ছে। ‘দ্যা ইকনমিস্ট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যুদ্ধ শুরুর ছয় মাসের মাঝে যুদ্ধটা একে অপরের ক্ষতি বাড়ানোর যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। উভয় পক্ষেরই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক; কিন্তু কেউই বড় রকমের কোন বিজয় ছিনিয়ে নেবার মতো অবস্থানে নেই। ইউক্রেনিয়ান জেনারেল দিমিত্রো মারচেঙ্কোর মতে, বছর শেষ হবার আগেই ইউক্রেনের দক্ষিণের খেরসন শহর তাদের দখলে চলে আসবে। কিন্তু এহেন উচ্চাকাংক্ষা বাস্তবায়ন যে কঠিন হবে, তা সহজেই অনুমেয়। অপরদিকে যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির মূল্য ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে; যদিও ইউক্রেনের গম রপ্তানি শুরু হবার কারণে যুদ্ধের শুরুতে ইউরোপে খাবারের মূল্য যতটা বেড়ে গিয়েছিল, সেই অবস্থা থেকে তা ধীরে ধীরে কমে আসছে। তথাপি যুদ্ধ দীর্ঘ হবার সম্ভাবনাটাই বেশি।

সামরিক পরিস্থিতির ছয় মাস

ছয় মাসের যুদ্ধ থেকে পাঁচটা সামরিক শিক্ষা নিয়েছে ‘আল জাজিরা’। প্রথমতঃ যুদ্ধের আগে পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা রুশ সামরিক বাহিনীকে যেভাবে দেখতেন, এখন বোঝা যাচ্ছে যে, তাদের সেই বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ ভুল ছিল। যুদ্ধের প্রথম দিকে রুশ বিমান বাহিনী আকাশের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি। এর ফলশ্রুতিতে রুশ সেনাবাহিনীর গাড়ির সাড়িগুলি ইউক্রেনের বিমান ও ড্রোনের আক্রমণের শিকার হয়েছে। বাহিনীগুলির মাঝে সমন্বয়হীনতা ছিল চোখে পড়ার মতো। সেনাদের রসদ এবং খাবার ফুরিয়ে যাবার পর দীর্ঘ গাড়ির সাড়িগুলির উপর ইউক্রেনিয়দের হামলা মনে করিয়ে দেয় যে, প্রথম দিনেই ইউক্রেনিয়দের যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে যাবার যে আশা রুশরা করেছিল, তা কতটা ভুল ছিল। বাহিনীগুলির কর্মকান্ডকে বশে আনতে গিয়ে উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসাররা ফ্রন্টলাইনের একেবারে কাছে গিয়ে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছিলেন। আর একইসাথে রুশ যোগাযোগ ব্যবস্থার অত্যন্ত খারাপ অবস্থার কারণে ইউক্রেনের ইন্টেলিজেন্স খুব সহজেই রুশ জেনারেলদের অবস্থানের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ অফিসারকে ইউক্রেনিয়রা টার্গেট করে হত্যা করতে সক্ষম হয়। কয়েক মাস যুদ্ধের পর রুশরা তেমন সফলতা না পেয়ে কৌশল পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। নতুন টার্গেট হয় ইউক্রেনের পূর্বের ডোনেতস্ক অঞ্চল; যেখানে পরিকল্পনামাফিক যুদ্ধ করে তারা যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতির বিনিময়ে সেভেরোডোনেতস্ক শহরের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়। তবে দক্ষিণের বন্দর শহর ওডেসার দিকে রুশ আক্রমণ ইউক্রেনিয়দের প্রতিরোধের মুখে সফল হয়নি। তারা ধীরে ধীরে পিছু হটে গিয়ে নীপার নদীর উপরে খেরসন শহরে অবস্থান নিতে বাধ্য হয়।

দ্বিতীয়তঃ যুদ্ধের প্রথম দিকে ইউক্রেনিয়রা বিরাট সুবিধা পায় পশ্চিমাদের সরবরাহ করা বড় সংখ্যক শক্তিশালী ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহে। একইসাথে তুর্কি ‘বায়রাকতার টিবি২’ ড্রোনগুলি ইউক্রেনের আর্টিলারির জন্যে নিখুঁতভাবে টার্গেট খুজে দেয়। এর ফলে রুশ সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ রাডার, কমান্ড ও কন্ট্রোল ইউনিটগুলিকে ধ্বংস করে ফেলা সম্ভব হয়। এতে রুশ সেনাবাহিনীর সমস্যা আরও ঘনীভূত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক যুদ্ধ করতে ইউক্রেনে আবির্ভূত হয়। এরা ইউক্রেনের বাহিনীকে যথেষ্ট সহায়তা দিলেও ভাষার ভিন্নতা এদের সফলতা কিছুটা হলেও কমিয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ থেকে বিপুল পরিমাণে অস্ত্র আসতে থাকে, যা ইউক্রেনকে যুদ্ধ চালিয়ে নিতে সহায়তা দেয়। এগুলির মাঝে ছিল বিপুল পরিমাণে গোলাবারুদ, নিখুঁতভাবে আঘাত করার মতো আর্টিলারি, আর্টিলারি রকেট, এবং রুশ নির্মিত ট্যাংক ও যুদ্ধবিমান, যেগুলি ইউক্রেনিয়রা খুব স্বল্প ট্রেনিংএর মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়। তবে পশ্চিমারা ইউক্রেনকে সেই অস্ত্রগুলিই দিয়েছে, যেগুলি দিয়ে ইউক্রেনিয়রা তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূমিগুলিকে রক্ষা করতে পারবে; দূরপাল্লার রকেট সরবরাহ করা থেকে তারা বিরত থাকে। পশ্চিমারা যুক্তি দেয় যে, তারা রুশদের সহ্যের সীমাকে অতিক্রম করতে চায় না; যে পরিস্থিতিতে তারা হয়তো পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারে আগ্রহী হতে পারে। আর ছয় মাসে যদিও ইউক্রেনিয়রা রুশ আক্রমণের দ্রুতিকে একেবারেই থামিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছে, তথাপি নিজেদের সামরিক ক্ষতিকে ইউক্রেনের পক্ষে পুষিয়ে নেয়া দুষ্কর। বিশেষ করে হারানো মানবসম্পদ ইউক্রেনের পক্ষে প্রতিস্থাপন করা একেবারেই সম্ভব নয়। নিজেদের রসদ যখন একেবারেই শেষের পথে, তখন ইউক্রেন পশ্চিমা সহায়তার উপরে পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল।

যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত 'হিমারস' আর্টিলারি রকেট। ব্যবহার করে ইউক্রেনিয়রা নিখুঁতভাবে দূরবর্তী টার্গেটগুলিকে ধ্বংস করতে পারছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কে কার কতো বেশি ক্ষতিসাধন করতে পারছে সেটার উপরেই যখন এগিয়ে থাকা নির্ভর করতে শুরু করেছে, তখন ‘হিমারস’ প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ সাপ্লাই ব্যবস্থার উপর দূর থেকে হামলা করতে পারছে। এর ফলশ্রুতিতে রুশরা বড় কোন আক্রমণে যাবার উদ্দেশ্যে কোন একটা স্থানে যথেষ্ট পরিমাণে রসদ জমা করতে সক্ষম হচ্ছে না। একারণেই রসদের অভাবে রুশদের একটার পর একটা আক্রমণ বারংবার থেমে যাচ্ছে।


তৃতীয়তঃ বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা ‘হিমারস’ আর্টিলারি রকেট যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনিয়দেরকে এগিয়ে দিয়েছে। ‘এম-১৪২’ ‘হাই মোবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম’ বা ‘হিমারস’ নামে পরিচিত অস্ত্রটা হলো ট্রাকের উপর বহণ করা ছয়টা রকেট আর্টিলারি লঞ্চার। একেকটা রকেটের পাল্লা প্রায় ১৫ থেকে ৯২ কিঃমিঃ পর্যন্ত; যেখানে বেশিরভাগ আর্টিলারির পাল্লা সাধারণতঃ ৪০ কিঃমিঃএর ভেতর থাকে। তবে বিশেষ ধরণের রকেট ব্যবহার করে ‘হিমারস’এর পাল্লা প্রায় ১’শ ৫০ কিঃমিঃ পর্যন্ত নেয়া যায়। ‘হিমারস’ ব্যবহার করে ইউক্রেনিয়রা নিখুঁতভাবে দূরবর্তী টার্গেটগুলিকে ধ্বংস করতে পারছে। যুদ্ধক্ষেত্রে কে কার কতো বেশি ক্ষতিসাধন করতে পারছে সেটার উপরেই যখন এগিয়ে থাকা নির্ভর করতে শুরু করেছে, তখন ‘হিমারস’ প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ সাপ্লাই ব্যবস্থার উপর দূর থেকে হামলা করতে পারছে। এর ফলশ্রুতিতে রুশরা বড় কোন আক্রমণে যাবার উদ্দেশ্যে কোন একটা স্থানে যথেষ্ট পরিমাণে রসদ জমা করতে সক্ষম হচ্ছে না। একারণেই রসদের অভাবে রুশদের একটার পর একটা আক্রমণ বারংবার থেমে যাচ্ছে। ‘হিমারস’এর লঞ্চার গাড়ি ব্যবহার করে বড় আকারের একটা ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া যায়, যেটাকে বলা হয় ‘এডভান্সড ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম’ বা ‘এটাকমস’। এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ৩’শ কিঃমিঃ পর্যন্ত। যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত এই ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনকে সরবরাহ করতে রাজি হয়নি।

চতুর্থতঃ উভয় পক্ষই গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ও গোলাবারুদের ক্ষেত্রে সরবরাহ ঘাটতিতে রয়েছে। রুশরা পুরোনো আর্টিলারি ব্যবহার করছে, যেগুলির নিখুঁতভাবে টার্গেটে আঘাত করার সক্ষমতা বেশ খানিকটা কম। আবার এমন কিছু ক্ষেপণাস্ত্র তারা ভূমির টার্গেটের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে, যেগুলি সেই কাজের জন্যে ডিজাইন করা হয়নি। এগুলি বলে দিচ্ছে যে, রুশরা গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ ঘাটতির মাঝে পড়েছে। অপরদিকে সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনিয়রা বাণিজ্যিক ড্রোন ব্যবহার করে আকাশ থেকে গোলাবারুদ ফেলেছে। এটা ইউক্রেনিয়দের উদ্ভাবনী শক্তিকে দেখালেও বলে দিচ্ছে যে, যুদ্ধবিমান ও অস্ত্রসজ্জিত ড্রোনের ঘাটতিতে রয়েছে তারা। তবে পশ্চিমারা চিন্তায় রয়েছে যে, ইউক্রেনকে সরবরাহ করতে গিয়ে তাদের নিজেদের কিছু বিশেষ অস্ত্রের স্টকে টান পড়ে যাচ্ছে। কারণ উৎপাদন ও সরবরাহের মাঝে দেখা দিয়েছে ঘাটতি। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমারা কোন যুদ্ধে জড়ালে সেই অস্ত্রগুলির ঘাটতি তাদেরকে মারাত্মকভাবে ভোগাবে। একইসাথে যুক্তরাষ্ট্রে মারাত্মক মুদ্রাস্ফীতি ও আসন্ন অর্থনৈতিক মন্দার মাঝে অনেকেই বলা শুরু করেছেন যে, বাইডেন প্রশাসনের উচিৎ বিদেশে যুদ্ধের দিকে মনোযোগ না দিয়ে দেশের মানুষের সেবায় মনোনিবেশ করা। অপরদিকে রুশরা প্রশিক্ষিত সেনার অভাবের মাঝে থাকলেও ইউক্রেনের যুদ্ধকে ‘যুদ্ধ’ বা বলে ‘বিশেষ সামরিক অপারেশন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে যাচ্ছে। ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা দিলে হয়তো আরও মানুষকে সামরিক বাহিনীতে যোগদান করানো সম্ভব হবে; কিন্তু তা হবে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্যে রাজনৈতিক আত্মহননের শামিল। এমতাবস্থায় হাঁপিয়ে ওঠা উভয় পক্ষই তাদের ফোকাসকে ইউক্রেনের দক্ষিণে খেরসন শহরের দিকে নিয়ে এসেছে।

 
খেরসন শহর এখন যুদ্ধের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে। ইউক্রেনিয়রা নীপার নদী থেকে যে খালের মাধ্যমে রুশ অধিকৃত ক্রিমিয়া উপদ্বীপে পানি সরবরাহ করা হয়, সেই খালের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে। ২০১৪ সালে রুশরা ক্রিমিয়া দখল করে নিলে ইউক্রেনিয়রা এই খালের পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল; যা কিনা ক্রিমিয়ার কৃষি ও শিল্পের মোট পানির ৮৫ শতাংশের যোগান দিতো। এখন এই খালের উভয় পাড় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবার পর রুশরা আবারও ক্রিমিয়ায় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে। এই খালের নিয়ন্ত্রণ রাশিয়ার জন্যে যুদ্ধের একটা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।

পঞ্চমতঃ খেরসন শহর এখন যুদ্ধের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে। শহরটা একইসাথে সমুদ্র ও নদীবন্দর; যা রুশরা গত মার্চ মাসে দখলে নেয়। নীপার নদীর পশ্চিমে অবস্থিত শহরটা ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের সাথে দু’টা সেতু দিয়ে সংযুক্ত। সাম্প্রতিক সময়ে এই নদীর উপর দিয়ে নোভা কাখোভকা শহরে অবস্থিত সেতু ইউক্রেনিয়রা ধ্বংস করে ফেলার পর খেরসন শহরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে রুশদেরকে এই দু’টা সেতুর উপরেই নির্ভর করতে হচ্ছে। ইউক্রেনিয়রা খেরসনের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নীপার নদী দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌরুট চালু করতে চাইছে। আর একইসাথে ইউক্রেনিয়রা নীপার নদী থেকে যে খালের মাধ্যমে রুশ অধিকৃত ক্রিমিয়া উপদ্বীপে পানি সরবরাহ করা হয়, সেই খালের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে। ২০১৪ সালে রুশরা ক্রিমিয়া দখল করে নিলে ইউক্রেনিয়রা এই খালের পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল; যা কিনা ক্রিমিয়ার কৃষি ও শিল্পের মোট পানির ৮৫ শতাংশের যোগান দিতো। এখন এই খালের উভয় পাড় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবার পর রুশরা আবারও ক্রিমিয়ায় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে। এই খালের নিয়ন্ত্রণ রাশিয়ার জন্যে যুদ্ধের একটা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। এছাড়াও খেরসনের নিয়ন্ত্রণের উপর নির্ভর করছে রুশরা ইউক্রেনের ওডেসা বন্দরের দিকে এগুতে পারবে কিনা। ওডেসা বন্দরের উপর সমুদ্রের দিক থেকে একটা উভচর হামলার পরিকল্পনা রুশরা আপাততঃ স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। কারণ এই বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিতে হলে স্থলের দিক থেকে ঘিরে ফেলা ছাড়া গতি নেই। কিন্তু রুশরা স্থলের দিক থেকে ওডেসা থেকে বেশ কিছুটা দূরে রয়েছে।

‘আল জাজিরা’র বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, এই মুহুর্তে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের ডোনেতস্ক এবং লুহানস্ক অঞ্চল ছাড়াও দক্ষিণের বেশকিছু অঞ্চল রুশদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এমতাবস্থায় রুশদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, কতটুকু পেলে তারা এই যুদ্ধে ‘বিজয়’ হয়েছে বলে ঘোষণা দেবে। পশ্চিমাদের এক হিসেবে বলা হচ্ছে যে, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এক দশকে আফগানিস্তানে যত সেনা হারিয়েছিল, রুশরা তার চাইতে বেশি সেনা ইউক্রেনে হারিয়েছে মাত্র ছয় মাসে! রুশদের রেলওয়ে লাইন এবং গাড়ির বহরের উপর চোরাগুপ্তা হামলা হচ্ছে; যা কিনা সময়ের সাথে সাথে আরও বাড়বে। ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে এখন সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সামনের ছয় মাস…

অস্ট্রেলিয়ার সেনাবাহিনীর প্রাক্তন মেজর জেনারেল মিক রায়ান ‘এবিসি নিউজ’এর এক লেখায় আগামী ছয় মাসে ইউক্রেনের যুদ্ধ কোন দিকে যেতে পারে, সেব্যাপারে কয়েকটা সম্ভাবনাকে তুলে ধরেছেন। প্রথম সম্ভাবনা হলো, যুদ্ধক্ষেত্রে এবং রাজনৈতিক দিক থেকে উভয় পক্ষই থমকে থাকতে পারে; যেখানে কোন পক্ষই হয়তো বড় কোন বিজয় পাবে না। একে অপরকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে দুর্বল করার চেষ্টা চালাতে থাকবে এবং বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরির চেষ্টা করবে। তবে এই স্থিতাবস্থা রুশদের পক্ষে যাবে; কারণ তুলনামূলকভাবে ইউক্রেনের চাইতে রাশিয়ার মানবসম্পদ বেশি ও অর্থনীতির আকার বড়। অর্থনৈতিক অবরোধ সত্ত্বেও রুশরা তাদের জ্বালানি বিভিন্ন দেশের কাছে বিক্রি করে আয় করতে পারছে। কিন্তু ইউক্রেনের অর্থনীতি ছোট হয়ে আসছে এবং এই অর্থনীতি নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কঠিন। অপরদিকে রুশরা মনে করছে যে, ইউরোপের সরকারগুলি জনগণের চাপের মাঝে পড়বে। এর মাঝে তারা হয়তো ইউক্রেনকে চাপের মাঝে ফেলে যুদ্ধের একটা উপসংহার টানতে চাইবে। তবে রুশদের সাথে ছাড় দিয়ে শান্তিচুক্তি করাটা ইউক্রেনের সরকারের জন্যে যথেষ্ট কঠিন হবে।

দ্বিতীয় সম্ভাবনা হলো, দুই পক্ষের মাঝে কোন একজন এগিয়ে যেতে পারে। আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে, রুশরা তাদের আক্রমণে যাবার শক্তি অনেকটাই হারিয়েছে। আর গত কয়েক সপ্তাহের মাঝে ‘হিমারস’ রকেট ব্যবহার করে ইউক্রেন কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। যদি ইউক্রেন সামনের দিনগুলিতে বড় কোন এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়, তাহলে পশ্চিমাদের মাঝে ইউক্রেনকে সমর্থনের প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে। কারণ এতে পশ্চিমারা মনে করতে পারবে যে, ইউক্রেনকে সহায়তা দেয়ায় ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে। তবে এমতাবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া বর্তমানের অস্ত্রের ঘাটতি পূরণে সামরিক উৎপাদন বৃদ্ধি করতে বাধ্য হবে; যদিও সেটা পুরোপুরিভাবে নির্ভর করবে যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী কতটা এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিতে পারছে বা কত বড় রুশ বাহিনীকে ধ্বংস করতে পারছে তার উপর।

তৃতীয় সম্ভাবনা হলো, কোন একটা পক্ষ হঠাৎ করেই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামরিক দিক দিয়ে বড় কোন বিজয় পেয়ে যেতে পারে; যেটার উপর ভর করে সে এরপর থেকে শুধু এগিয়েই যাবে। উদাহরণ হিসেবে, যুদ্ধরত দেশগুলির মাঝে কোন দেশের জাতীয় নেতার যদি মৃত্যু হয় অথবা তাকে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়; অথবা হঠাৎ করেই যদি তাদের সেনাদের মনোবল পুরোপুরিভাবে ভেঙ্গে পড়ে; অথবা অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেক বড় কোন ঘটনা সংঘটিত হলো। যদি এহেন কোন ঘটনা ইউক্রেনের ভাগ্যে ঘটে, তাহলে ইউক্রেনের মাটিতে পশ্চিমা সেনা মোতায়েন না করে রুশদের অগ্রযাত্রা থামানো যাবে না। এতে ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যাহত হবে এবং চীনের নিজস্ব বিশ্বাসকে শক্তিশালী করবে যে, পশ্চিমারা নিম্নগামী। এরকম পরিস্থিতিতে অনেক পশ্চিমা সরকার মারাত্মক চাপের মাঝে পড়বে।

জেনারেল মিক রায়ান বলছেন যে, যদি এমন কোন ঘটনা রাশিয়ার ভাগ্যে ঘটে, তাহলে এতে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের বিজয়ই হবে না, রুশরা মনে করতে শুরু করবে যে, এতদিন পশ্চিমাদের হুমকির যে ব্যাপারটা রুশ সরকার তাদের জনগণকে বলেছে, তা প্রকৃতপক্ষে সত্যি। এতে রুশদের মাঝে বিরক্তির উদ্রেক হতে পারে এবং আরও ভয়ংকর একটা রাশিয়া সামনে আসতে পারে।

 
রাশিয়া এখন ইউক্রেনের ১০ থেকে ২০ শতাংশ ভূমি দখলে রেখেছে। কিন্তু সমস্যা হলো, এখানেই রয়েছে ইউক্রেনের ৯০ শতাংশ জ্বালানি এবং বেশিরভাগ সমুদ্রবন্দর। কাজেই ইউক্রেনের জন্যে কোন ভূমি হারানোটাই সমীচিন নয়। এই অঞ্চলগুলি হারালে ইউক্রেন পশ্চিমাদের উপর পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়বে এবং স্বাধীন দেশ হিসেবে ইউক্রেনের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন থাকবে।

যুদ্ধ কতটা দীর্ঘ হতে পারে?

‘দ্যা গার্ডিয়ান’এর প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সম্পাদক ডন সাবাগ মনে করছেন যে, যুদ্ধ আরও কমপক্ষে এক বছর স্থায়ী হতে পারে; কারণ কোন পক্ষই বড় কোন বিজয় ছিনিয়ে নেবার সক্ষমতা দেখাতে পারছে না। ইউক্রেন চাইছে খেরসনের নিয়ন্ত্রণ নিতে, কিন্তু একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গোপনে স্বীকার করে নিয়েছেন যে, ইউক্রেনিয়দের প্রকৃতপক্ষে সেই সক্ষমতা নেই। ইউক্রেনিয়রা আপাততঃ দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং শত্রুর ফ্রন্টলাইনের পিছনে স্পেশাল ফোর্সের সদস্যদের ব্যবহার করে হামলার উপর নির্ভর করতে চাইছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা মিখাইলো পডোলিয়াক বলছেন যে, এতে রুশদের মাঝে সমন্বয়হীনতার সৃষ্টি হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, এর ফলে রুশরা তো খেরসন ছেড়ে চলে যাবে না। আর বর্তমানে রুশরা তাদের দখল করা এলাকার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাতেই বেশি ব্যস্ত থাকছে। সামনের শীতকাল নিয়ে সকলেই চিন্তা করছে। ইউক্রেনিয়রা মনে করছে যে, শীতকালে রুশরা ইউক্রেনের উপর চাপ বাড়াতে দেশটার জ্বালানি নেটওয়ার্কের উপর হামলা করতে পারে। তবে এর পরের বসন্তকালটাকে উভয় পক্ষই আক্রমণে যাবার সময় হিসেবে দেখবে। তাই সেসময়ের আগে উভয় পক্ষই তাদের রসদের সরবরাহ বৃদ্ধি করতে চাইবে। অপরদিকে পশ্চিমাদেরকে নিশ্চিত হতে হবে যে, তারা ইউক্রেন যুদ্ধে কি দেখতে চায়। তারা কি ইউক্রেনকে বিজয়ী দেখতে চায়, নাকি শুধু রুশদেরকে ঠেকিয়ে রাখা দেখতে চায়? তারা এতকাল ইউক্রেনকে অনেক সমরাস্ত্র দিলেও রুশদেরকে ঠেলে দেশ থেকে বের করে দিতে পারার মতো অস্ত্র কখনোই দেয়নি।

‘ভোক্স’ ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যুদ্ধের দীর্ঘতা মাসের সংখ্যায় মাপা সম্ভব নাও হতে পারে; অর্থাৎ তা হতে পারে কয়েক বছরব্যাপী। উভয় পক্ষই এখনও মনে করছে যে, তারা যুদ্ধের ফলাফল নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসতে সক্ষম। একারণে কেউই এখনও শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ছাড় দিতে ইচ্ছুক নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয় কারুর লক্ষ্য থাকে না; যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয় হলো রাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের একটা পদ্ধতি। ‘দ্যা আটলান্টিক কাউন্সিল’এর সিনিয়র ফেলো এনা এশফোর্ড বলছেন যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যেমন দেখা গেছে যে, এক পক্ষ যুদ্ধক্ষেত্রে পুরোপুরিভাবে জিতে গেছে এবং সেই অনুযায়ী রাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়েছে – এমন ঘটনা ইতিহাসে খুব বেশি নেই। ইউক্রেন যুদ্ধও ইতিহাসের বেশিরভাগ সময়ের ব্যতিক্রম হবে না। ইউক্রেনকে যুদ্ধক্ষেত্রে পুরোপুরিভাবে হারিয়ে দেয়াটা এখন রাশিয়ার সক্ষমতার বাইরে। কাজেই এটা মোটামুটিভাবে ধরেই নেয়া যায় যে, যুদ্ধের শেষটা হবে আলোচনার টেবিলে; যেখানে কোন পক্ষই প্রথমে যা চেয়েছিল তা পুরোপুরিভাবে পাবে না। তবে কিছু ব্যাপার নির্ধারণ করবে এই যুদ্ধের স্থায়িত্ব; যেমন – ইউক্রেন এবং রাশিয়াতে জনমত; উভয় দেশের অর্থনীতির উপরে চাপ; এবং ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দিয়ে যাবার পিছনে পশ্চিমা দেশগুলির সক্ষমতা। এটা পরিষ্কার যে, রাশিয়া প্রথমে যে লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তা অর্জনে সে পুরোপুরিভাবে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, ইউক্রেন জিতে গেছে। ইউক্রেনের শহরগুলির ধ্বংস হওয়া, তার শিল্পগুলিতে ধ্বস, কৃষিজমি ভস্ম হয়ে যাওয়া, বিরাট জনসংখ্যার মৃত্যু ও বাস্তুচ্যুতি – এগুলি ইউক্রেনকে মারাত্মক ক্ষতির মাঝে ফেলেছে। ইউক্রেনকে আবারও নিজের পায়ে দাঁড়াতে গেলে একদিকে যেমন রাশিয়াকে ব্যাপক ছাড় দিতে হবে, তেমনি পশ্চিমা দেশগুলিকেও ইউক্রেনের পূনর্গঠনের জন্যে বড় রকমের দায়িত্ব নিতে হবে।

যুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাব

‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যুদ্ধের আগে ইউক্রেনের জনগণের অনেকেই পশ্চিমা-ঘেঁষা হবার পক্ষেই ছিল। কিন্তু পশ্চিমারা এব্যাপারে খুব একটা নিশ্চিত ছিল না। যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমারা ইউক্রেনের ব্যাপারে তাদের চিন্তাধারা পরিবর্তন করতে যাচ্ছে। যেমন ইউক্রেনকে ইইউএর অংশ করে নেবার পদ্ধতি শুরু হয়েছে; যা কিনা ইউক্রেন অনেকদিন ধরে অনুরোধ করলেও ইইউ মানতে চায়নি। যুদ্ধ ইউক্রেনকে পশ্চিমাদের আরও নিকটে নিয়ে গেছে। অপরদিকে রাশিয়ার সাথে পশ্চিমাদের দূরত্ব বহু বছরের জন্যে বেড়ে গেছে। এর ফলশ্রুতিতে রাশিয়া বাকি বিশ্বে নতুন বন্ধু খুঁজছে; যেমন চীনের কাছে জ্বালানি বিক্রি করা, অথবা ইরানের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা। ইরান যেহেতু কয়েক দশক ধরেই পশ্চিমা অবরোধের মাঝে রয়েছে এবং অবরোধকে কিভাবে বাইপাস করা যায়, সেটা শিখেছে; তাই রাশিয়া ইরানের কাছ থেকে সেটা শিখতে চাইছে।

খাদ্যসংকট - প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে আফ্রিকায় খাদ্যসংকটের ইস্যুটাকে নিয়ে আসা হয়েছে। আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়ায় মোট খাদ্যের অর্ধেক গম থেকে উৎপন্ন হয়। অথচ দেশটা তার চাহিদার ৮০ শতাংশ গম আমদানি করে। খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি পুরো নাইজেরিয়াতে মানুষের নিরাপত্তাহীনতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০২৩ সালে নাইজেরিয়াতে সাধারণ নির্বাচনের আগে সরকার যদি অবস্থার উন্নয়ন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে প্রেসিডেন্টকে মারাত্মক সমস্যায় পড়তে হতে পারে। আর আফ্রিকার সবচাইতে জনবহুল দেশে রাজনৈতিক কলহ সৃষ্টি হলে সেটার প্রভাব পুরো পশ্চিম আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ভারত, রাশিয়া ও চীন - ভারতের সাথে রাশিয়ার গভীর সম্পর্ক বহুকাল ধরেই। আর যুক্তরাষ্ট্রও ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে দেখতে চায় বলে ভারতের উপর চাপ সৃষ্টি করেনি। এতে ভারতের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়েছে। এর মাঝে অনেকেই ভারতের নিজস্ব স্বার্থকে সমুন্নত রাখার কথা বলতে থাকে এবং পশ্চিমা দ্বিমুখী নীতিকেও আলোচনায় নিয়ে আসে। তারা রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানির ফলশ্রুতিতে পশ্চিমাদের সমালোচনাকে ভালো চোখে দেখেনি। কিন্তু সমস্যা হলো, রাশিয়া যদি চীনের আরও কাছে যেতে শুরু করে, সেটা ভারতের স্বার্থের বিপক্ষে চলে যেতে পারে। এবং এতে ভারত কূটনৈতিক দিক থেকে সমস্যার মাঝে পড়ে যেতে পারে। তবে ভারত যেহেতু বহু স্বার্থের যোগফল, তাই ইউক্রেন যুদ্ধ ভারতের সামনে নতুন সুযোগও তৈরি করেছে। উল্টোদিকে মার্কিন কংগ্রেসের স্পীকার ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফরের পর উত্তেজনা শুরু হলে তাইওয়ানও চীনের সাথে সম্ভাব্য যুদ্ধের ব্যাপারে কিভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে, সেটা নিয়ে চিন্তা শুরু করেছে।

তুরস্ক, ইউক্রেন ও রাশিয়া - ‘ডয়েচে ভেলে’ বলছে যে, অদ্ভুত একটা পরিস্থিতিতে রয়েছে তুরস্ক। ন্যাটোর সদস্য তুরস্ক একদিকে যেমন ইউক্রেনকে সমর্থন দিচ্ছে, তেমনি তারা চেষ্টা করছে রাশিয়াকে না ক্ষেপাতে। তারা কিয়েভের কাছে ড্রোন বিক্রি করেছে; কিন্তু রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবরোধে যোগ দেয়নি। উভয় পক্ষের সাথে সম্পর্ক রাখার এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রেসিডেন্ট এরদোগান ইউক্রেনের গম রপ্তানির জন্যে কাজ করেছেন এবং তার এই অবস্থানকে বিরাট কূটনৈতিক সাফল্য বলে জাহির করেছেন। তবে ২০২৩ সালের নির্বাচন যখন কাছে চলে এসেছে, তখন অনেকেই প্রশ্ন করছেন যে, তিনি তার এই অবস্থানকে কতটা ধরে রাখতে পারবেন।

 
চীনা কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা 'গ্লোবাল টাইমস'এ প্রকাশিত মার্কিনীদের সমালোচনামূলক কার্টুন। যে ব্যাপারটা মার্কিনীদেরকে ভাবাচ্ছে তা হলো, তাদের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়া এবং চীন এখন আরও কাছাকাছি চলে এসেছে। এমতাবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইউরোপের সাথে আরও শক্তিশালী বন্ধুত্ব তৈরি করতে।

যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন - আটলান্টিকের ওপাড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বৈরিতা যখন চীনের দিকে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ায় অনেকেই মার্কিনীদের ফোকাস রাশিয়ার দিকে নিয়ে গিয়েছে; যদিও চীনকে কেউই হিসেব থেকে বাদ দেয়নি। যে ব্যাপারটাতে সকলেই নিশ্চিত হয়েছেন তা হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখনোও ইউরোপের নিরাপত্তার কেন্দ্রে রয়েছে। ইউরোপের কৌশলগত স্বাতন্ত্রের যে কথাগুলি শুরু হয়েছিল, তা বর্তমান বাস্তবতায় যৌক্তিকতা পাচ্ছে না। তবে যে ব্যাপারটা মার্কিনীদেরকে ভাবাচ্ছে তা হলো, তাদের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়া এবং চীন এখন আরও কাছাকাছি চলে এসেছে। এমতাবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইউরোপের সাথে আরও শক্তিশালী বন্ধুত্ব তৈরি করতে।

ইউরোপ ও জ্বালানি সংকট - যুদ্ধের কারণে ইউরোপ সবচাইতে চাপের মাঝে পড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যুদ্ধের আগে যেখানে রাশিয়া ছিল ইউরোপের সবচাইতে বড় জ্বালানি সরবরাহকারী, এখন তারা হঠাত করেই রুশ জ্বালানির উপর নির্ভরশীলতা কমাতে উঠেপড়ে লেগেছে। ইউক্রেনের যুদ্ধ ইউরোপের একাত্মতাকে প্রশ্নের মাঝে ফেলেছে। ইইউএর মাঝে যখন সকলকেই জ্বালানি খরচ কমাতে বলা হচ্ছে, তখন সদস্যদেশগুলির মাঝেই কেউ কেউ বলছে যে, এটা তাদের উপর জুলুম হচ্ছে। কারণ সকলে রুশ গ্যাসের উপর সমানভাবে নির্ভরশীল নয়। যুদ্ধের কারণে সুইডেন ও ফিনল্যান্ড ন্যাটোতে যোগ দিতে যাচ্ছে। আর ন্যাটো তার পূর্ব সীমানায় সৈন্যের সংখ্যাও বৃদ্ধি করছে।

মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দা - ‘ডয়েচে ভেলে’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি ইউক্রেন যুদ্ধের আগেই সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছিল। করোনা লকডাউনের পর আন্তর্জাতিক সরবরাহে জটলা সৃষ্টি হওয়ায় যেমন মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে, তেমনি করোনা লকডাউনের মাঝে জ্বালানির ব্যবহার শূণ্যের কোঠায় চলে যাবার পর হঠাত করেই চাহিদা আকাশচুম্বী হয়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়। আর যেহেতু ইউক্রেন ও রাশিয়া মিলে আন্তর্জাতিক বাজারে এক চতুর্থাংশ গমের সরবরাহ করতো, তাই যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলি মূল্যস্ফীতি কমাতে সুদের হার বাড়াতে শুরু করেছে। মূল চিন্তাটা হলো, যদি অর্থ ঋণ নেয়া কঠিন হয়ে যায়, তাহলে মানুষ কম খরচ করবে। এতে করে চাহিদা কমবে এবং পণ্যের মূল্যও কমে আসবে। তবে এর আরেকটা অর্থ হলো ধীরে চলা অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দেয়া। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলি যুদ্ধ বন্ধ করতে পারবে না; তারা গম বা জ্বালানি উৎপাদনও করতে পারবে না। তাই তারা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে মন্দা থেকেও বাঁচাতে পারবে না।

পশ্চিমাদের বিভক্তি - ‘ডয়েচে ভেলে’র প্রতিবেদনে যে ব্যাপারটা পরিষ্কার তা হলো, রাশিয়ার উপর পশ্চিমা অবরোধকে অনেকেই পশ্চিমাদের একাত্মতা হিসেবে দেখলেও বিশ্লেষণে সেখানে বিভেদ ফুটে ওঠে। রাশিয়ার উপর সকল অবরোধেই পশ্চিমারা একত্রে ছিল; শুধুমাত্র জ্বালানির ক্ষেত্রে অবরোধ আরোপ করতে গিয়েই পশ্চিমাদের মাঝে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। কারণ জার্মানিসহ ইউরোপের কিছু দেশ রুশ গ্যাসের উপর বেশি নির্ভরশীল ছিল। যুদ্ধের প্রথম ছয় মাসে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কারণে রাশিয়ার গ্যাস রপ্তানির আয় কমেনি; বরং বেড়েছে। জার্মানি এবং ফ্রান্স যুদ্ধের আগ থেকেই রাশিয়ার উপর অবরোধ আরোপে আগ্রহী ছিল না। বিশেষ করে শীতকালে রুশ গ্যাসের উপর নির্ভরশীলতা জার্মানির নীতিকে বাকি ইউরোপের সাথে সাংঘর্ষিক অবস্থানে রেখেছিল।

অবরোধ অকার্যকর - রাশিয়ার উপর অবরোধ অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকারিতা হারিয়েছে; কারণ চীন এবং ভারতের মতো কিছু বড় দেশ রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি বৃদ্ধি করেছে। একইসাথে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত তেলের উৎপাদন বৃদ্ধি করে পশ্চিমা দেশগুলির মূল্যস্ফীতি কমাবার ব্যাপারে আগ্রহী হয়নি। ফলশ্রুতিতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির মূল্য মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কাজেই রাশিয়ার উপর অবরোধ রাশিয়াকে যতটা না বিপদে ফেলেছে, তার চাইতে সামনের শীতকালে রুশ গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় ইউরোপকে, বিশেষ করে জার্মানিকে বেশি ত্রাসের মাঝে ফেলেছে।

 
মার্চ ২০২২। মার্কিন কংগ্রেসের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিচ্ছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলদিমির জেলেন্সকি। ইউক্রেনের সামনে এখন অস্ত্র, অর্থ এবং অন্যান্য সহায়তার জন্যে পশ্চিমাদের উপর নির্ভরশীল হওয়া ছাড়া কোন পথই খোলা নেই। এখন উভয় পক্ষই আলোচনায় বসার আগে নিজেদের অবস্থানকে আরও সুসংহত করতে চাইছে। তবে আলোচনা অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভর করছে যুদ্ধের ব্যাপারে পশ্চিমারা কি ভাবছে সেটার উপর। যদি পশ্চিমা দেশগুলিতে জনমত যুদ্ধের বিপক্ষে চলে যায়, তাহলে পশ্চিমা নেতারা আলোচনায় বসার জন্যে ইউক্রেনের উপর চাপ সৃষ্টি করবে।

যুদ্ধ শেষ হতে পারে কিভাবে?

ইউক্রেন যুদ্ধের প্রথম মাসে রাশিয়ার লক্ষ্য ছিল পুরো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণ নেয়া এবং কিয়েভে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটানো। রুশরা ভেবেছিল তারা কয়েক দিনের মাঝেই যুদ্ধ শেষ করে ফেলবে; মাসের পর মাস যুদ্ধ করার কথা তারা চিন্তাও করেনি। সৈন্যদের মাঝে অনেকেই যুদ্ধের বিজয়ের পরে প্যারেড করার জন্যে পোষাকও সাথে নিয়েছিল! কিন্তু রাশিয়ার দ্রুত বিজয় পাবার চিন্তাটা প্রথম মাসেই ধূলায় মিশে যায়।

ইউক্রেনের কাছে বিজয় বলতে কি বোঝায়? ইউক্রেনিয়রা কি মনে করছে যে, তারা পূর্বাঞ্চলের ডনবাস এবং দক্ষিণের ক্রিমিয়া উপদ্বীপ পূনর্দখল করতে পারবে? রাশিয়া এখন ইউক্রেনের ১০ থেকে ২০ শতাংশ ভূমি দখলে রেখেছে। কিন্তু সমস্যা হলো, এখানেই রয়েছে ইউক্রেনের ৯০ শতাংশ জ্বালানি এবং বেশিরভাগ সমুদ্রবন্দর। কাজেই ইউক্রেনের জন্যে কোন ভূমি হারানোটাই সমীচিন নয়। এই অঞ্চলগুলি হারালে ইউক্রেন পশ্চিমাদের উপর পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়বে এবং স্বাধীন দেশ হিসেবে ইউক্রেনের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন থাকবে। ইউক্রেন এখনও বলছে যে তারা রাশিয়ার সাথে আলোচনায় আগ্রহী নয়। কিন্তু ইউক্রেনের সমস্যা বাড়ছেই। যুদ্ধের শুরুতে ইউরোপের দেশগুলি ইউক্রেনের শরণার্থী নিতে যতটা আগ্রহী ছিল, এখন ব্যাপক মূল্যস্ফীতির পর তারা আর ততটা আগ্রহী নয়।

ইউক্রেনের সামনে এখন অস্ত্র, অর্থ এবং অন্যান্য সহায়তার জন্যে পশ্চিমাদের উপর নির্ভরশীল হওয়া ছাড়া কোন পথই খোলা নেই। এবং সেই আঙ্গিকেই তারা শুধুমাত্র রাশিয়ার ক্ষতি বৃদ্ধি করাতেই মনোনিবেশ করেছে। তারা হয়তো আশা করছে যে, রাশিয়ার জন্যে যুদ্ধের ব্যয় বহণ করা খুব কঠিন হয়ে গেলে একসময় রাশিয়া নিজেই যুদ্ধ বন্ধ করতে চাইবে। এখন উভয় পক্ষই আলোচনায় বসার আগে নিজেদের অবস্থানকে আরও সুসংহত করতে চাইছে। তবে আলোচনা অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভর করছে যুদ্ধের ব্যাপারে পশ্চিমারা কি ভাবছে সেটার উপর। যদি পশ্চিমা দেশগুলিতে জনমত যুদ্ধের বিপক্ষে চলে যায়, তাহলে পশ্চিমা নেতারা আলোচনায় বসার জন্যে ইউক্রেনের উপর চাপ সৃষ্টি করবে। অপরদিকে রাশিয়া হয়তো নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থার উপর নির্ভর করে আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মাঝে যুদ্ধ শেষ করার ব্যাপারে আগ্রহী হতে পারে। এর মাঝে তারা তাদের দখলীকৃত এলাকার পরিধি বৃদ্ধি করতে এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলির উপর নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করতে চাইবে।