Showing posts with label Mediterranean. Show all posts
Showing posts with label Mediterranean. Show all posts

Wednesday, 9 June 2021

জিব্রালটার প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বের শুরু?

১০ই জুন ২০২১
১৯৭০এর দশকে স্পেন মরক্কো ছেড়ে আসলেও মরক্কোর উত্তর উপকূলে কয়েকটা বন্দরকে স্পেন ছিটমহল হিসেবে রেখে দেয়। ভবিষ্যতে জিব্রালটার প্রণালীর দক্ষিণ উপকূল নিয়ন্ত্রণে এই ছিটমহলগুলি ইউরোপের জন্যে কাজে দিতে পারে। ইস্রাইলের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের মতো জনবিরোধী সিদ্ধান্তও মরক্কোর সরকার নিয়েছে পশ্চিম সাহারায় মরক্কোর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি পাবার জন্যে। তবে এর ফলশ্রুতিতে ইউরোপের সাথে মরক্কোর সম্পর্ক টানাপোড়েনের মাঝে পড়েছে। যদিও মরক্কোর সাথে ইউরোপের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা কম, তথাপি মরক্কোর উত্তর উপকূলে স্পেনের ছিটমহলগুলি যখন হাজারো শরণার্থীর জোয়ারে ভেসে যাবার উপক্রম, তখন এই ছিটমহলগুলির সামনের দিনগুলিতে ইউরোপের ‘ব্রিজহেড’ হিসেবে থাকার সম্ভাবনা প্রশ্নের মুখে পড়ে।



মে এবং জুন মাসে হঠাত করেই উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কোর সাথে ইউরোপের, বিশেষ করে স্পেন এবং জার্মানির সম্পর্ক নিম্নমুখী হয়েছে। সংবাদ মাধ্যমগুলি এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে বিতর্কিত পশ্চিম সাহারার কথা বললেও এর ভূরাজনৈতিক গভীরতা যথেষ্ট। এই গভীরতার একটা ধারণা পাওয়া যাবে মরক্কোর সাথে ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ইতিহাস এবং বর্তমানে তাদের মাঝে সম্পর্কের দিকে তাকালে। তবে একইসাথে তাকাতে হবে মরক্কোর অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূকৌশলগত অবস্থানের দিকে। মরক্কোর ব্যাপারগুলিকে কোন অবস্থাতেই ভূরাজনৈতিকভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ জিব্রালটার প্রণালীকে বাদ দিয়ে চিন্তা করা যাবে না।

পশ্চিম সাহারার সমস্যা ঔপনিবেশিক সময়ের

সপ্তদশ শতক থেকে স্পেন মরক্কোর উপকূলে কয়েকটা ছিটমহল উপনিবেশ হিসেবে দখল করে নেয়। ঊনিশ শতকের শেষ দিক থেকে পশ্চিম আফ্রিকার পুরোটাই ইউরোপিয় ঔপনিবেশিকদের অধীনে চলে যায়। ১৯০৬ সালে মরক্কোর সরকারের দুর্বলতার কারণ দেখিয়ে মরক্কোর দখল নিয়ে জার্মানি এবং ফ্রান্সের মাঝে দ্বন্দ্ব বাধলে ব্রিটেনের মধ্যস্ততায় মরক্কোর নিয়ন্ত্রণ নেয় ইউরোপিয়রা। ১৯১২ সালে মরক্কোর নিয়ন্ত্রণ চলে যায় স্পেন এবং ফ্রান্সের কাছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আফ্রিকায় নিজেদের উপনিবেশ থাকা অঞ্চলগুলিকে ইউরোপিয়রা নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী বিভক্ত করে অনেকগুলি নতুন রাষ্ট্র তৈরি করে। পশ্চিম আফ্রিকায় একইভাবে তৈরি করা হয় মরক্কো, আলজেরিয়া, মৌরিতানিয়া এবং অন্যান্য দেশ। ফরাসিরা ১৯৫৬ সালে মরক্কো ছেড়ে যায়। মরক্কোর দক্ষিণ অঞ্চল ছিল স্পেনের অধিকারে; অন্যদিকে আলজেরিয়া, মৌরিতানিয়া এবং অন্যান্য অঞ্চলগুলি ছিল ফরাসিদের অধীনে। এই দেশগুলির সীমানাও ঔপনিবেশিকরা তৈরি করে; যা পরবর্তীতে বহু ধরনের সংঘাতের জন্ম দেয়। এরকমই একটা দ্বন্দ্ব হলো পশ্চিম সাহারার দ্বন্দ্ব। মরক্কোর দক্ষিণের পশ্চিম সাহারা অঞ্চলটা ছিল স্পেনের উপনিবেশ; যার নাম ছিল ‘রিও ডে অরো’। আঞ্চলিকভাবে অঞ্চলটা সাহরাউই নামে পরিচিত। ১৯৭৫ সালে স্পেন এই অঞ্চল ছেড়ে যাবার সময় রিও ডে অরো অঞ্চলকে দুই ভাগে ভাগ করে নতুন তৈরি করা দুই দেশ মরক্কো এবং মৌরিতানিয়ার মাঝে বিতরণ করে। এরপরই সাহরাউই অঞ্চলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেয়া পলিসারিও ফ্রন্টের সাথে মৌরিতানিয়া এবং মরক্কোর যুদ্ধ শুরু হয়। চার বছর যুদ্ধ করার পর ১৯৭৯ সালে মৌরিতানিয়া তাদের অংশ ছেড়ে দিয়ে পশ্চিম সাহারা ত্যাগ করে। কিন্তু মরক্কো যুদ্ধ চালিয়ে যায়। এই যুদ্ধে মরক্কোকে সামরিক সহায়তা দেয় যুক্তরাষ্ট্র; আর পলিসারিওকে সোভিয়েত অস্ত্র দিয়ে সহায়তা দেয় আলজেরিয়া এবং লিবিয়া। পলিসারিওর সকল অস্ত্রসস্ত্রই আলজেরিয়া হয়ে আসে এবং আলজেরিয়াকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেই পলিসারিও মরক্কোর সামরিক বাহিনীর উপর হামলা চালিয়ে যায়।। ১৯৮০এর দশকে মরক্কো পশ্চিম সাহারার মাঝ বরাবর উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত ২ হাজার ৭’শ কিঃমিঃ লম্বা বালুর দেয়াল তৈরি করে। এই দেয়ালের ফলে যুদ্ধ মরক্কো সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে; এবং পলিসারিওর সামরিক জয় পাবার আশা স্তিমিত হয়ে যায়। ১৯৯১ সালে ঠান্ডা যুদ্ধ শেষ হলে পশ্চিম সাহারার যুদ্ধও শেষ হয়ে যায়; এবং একটা যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। জাতিসংঘের একটা মিশনের মাধ্যমে এই যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ করা হয়; যেখানে মরক্কো সরকারের অধীনে রয়েছে পশ্চিমের অংশ; আর পলিসারিওর হাতে রয়েছে আলজেরিয়ার সীমানা ঘেঁষে পূর্বের অংশ। এই সমস্যার একটা মূল ভিত্তি হলো কে এই সংঘাতকে কিভাবে দেখছে।

পশ্চিম সাহারার যুদ্ধ মরক্কোর সাথে অনেক দেশের সম্পর্ক নির্ধারণ করেছে। আরব দেশগুলি মরক্কোর পক্ষে থেকেছে; অন্যদিকে আফ্রিকার বেশিরভাগ দেশই পলিসারিওর পক্ষ নিয়েছে। যুদ্ধের ফলে আলজেরিয়ার সাথে মরক্কোর সম্পর্ক বরাবরই খারাপ রয়েছে। আফ্রিকার দেশগুলি সাহরাউই রিপাবলিককে স্বীকৃতি দিলে ১৯৮৪ সালে মরক্কো আফ্রিকান ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যায়। তবে তিন দশক পর ২০১৭ সালে মরক্কো আবারও আফ্রিকান ইউনিয়নে প্রবেশ করে। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, আফ্রিকার দেশগুলি মূলতঃ অর্থনৈতিক কারণেই মরক্কোর আফ্রিকান ইউনিয়নে ঢোকাকে সমর্থন করেছে। মরক্কো সাম্প্রতিক সময়ে আফ্রিকার দেশগুলির সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন করেছে; যার উদ্দেশ্যই ছিল আফ্রিকান ইউনিয়নে ঢোকার পথ প্রসারিত করা। ৩৯টা দেশ মরক্কোর পক্ষে ভোট দেয়; তবে ৯টা বিপক্ষে থাকে। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ পত্রিকা বলছে যে, বিপক্ষে ভোট দেয়া দেশগুলি মূলতঃ আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলের দেশ। সাহরাউইএর ব্যাপারে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের অবস্থান দেখলে বোঝা যাবে যে, বিপক্ষে ভোট দেয়া দেশগুলির মাঝে খুব সম্ভবতঃ দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে, এঙ্গোলা থাকতে পারে। কারণ এই দেশগুলি মরক্কোর আফ্রিকান ইউনিয়নে যোগ দেয়ার সরাসরি বিরোধিতা করেছিল।
 
পশ্চিম সাহারায় মরক্কোর তৈরি করা বালির দেয়াল। ১৯৮০এর দশকে মরক্কো ২ হাজার ৭’শ কিঃমিঃ লম্বা বালুর দেয়াল তৈরি করে। এই দেয়ালের ফলে যুদ্ধ মরক্কো সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে; এবং পলিসারিওর সামরিক জয় পাবার আশা স্তিমিত হয়ে যায়। ১৯৯১ সালে ঠান্ডা যুদ্ধ শেষ হলে পশ্চিম সাহারার যুদ্ধও শেষ হয়ে যায়; এবং একটা যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তবে মরক্কোর প্রায় ২ লক্ষ সদস্যের সেনাবাহিনী পশ্চিম সাহারায় ব্যস্ত থেকে জিব্রালটার এবং স্প্যানিশ ছিটমহলগুলি থেকে যে দূরে থাকছে, সেব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র খুব বেশি চিন্তিত হবার কথা নয়। 


স্পেনের সাথে দ্বন্দ্ব

মে মাসের মাঝামাঝি হঠাত করেই মরক্কো থেকে স্পেনের ছিটমহল সেউতাতে ৮ হাজার শরণার্থী ঢুকে পড়ে। স্পেন বলছে যে, মরক্কো তার সীমানা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে; যার ফলে হাজার হাজার শরণার্থী সেউতায় ঢুকেছে। সাধারণতঃ শরণার্থীদের নিয়ন্ত্রণে মরক্কো স্পেনকে যথেষ্ট সহায়তা করে থাকে। ‘বিবিসি’র এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, এপ্রিল মাসে স্পেন পশ্চিম সাহারার পলিসারিওর নেতা ব্রাহিম ঘালিকে স্পেনের এক হাসপাতালে করনোভাইরাসের চিকিৎসার জন্যে ভর্তি করে। মরক্কো বলছে যে, স্পেন মরক্কোকে না জানিয়ে পশ্চিম সাহারা পলিসারিওর নেতাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। অনেকেই বলছেন যে, এর প্রতিশোধ হিসেবেই মে মাসে মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনী কিছু সময়ের জন্যে শরণার্থীদের উপর থেকে তাদের নজরদারি সরিয়ে ফেলে; যার ফলশ্রুতিতে হাজারো শরণার্থী সেউতায় ঢুকে পড়ে। একই সময়ে স্পেনের পক্ষ থেকে পশ্চিম সাহারা নিয়ে বিবৃতি আসতে থাকে। স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঞ্চা গোঞ্জালেজ লায়া বলেন যে, স্পেন পশ্চিম সাহার ব্যাপারে জাতিসংঘের সিদ্ধান্তের উপরেই নির্ভর করবে। স্পেন চায় সকল পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমাধান।

৬ই জুন মরক্কোর সরকার ঘোষণা দেয় যে, মরক্কো স্পেনের সাথে সমুদ্রে যাত্রীবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, ইউরোপে বসবাসকারী প্রায় ৩০ লক্ষ মরক্কোর নাগরিকের বেশিরভাগই স্পেন হয়ে মরক্কো যেতো। তবে মরক্কো সরকার ফরাসি এবং ইতালিয় বন্দরগুলির সাথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখবে বলে বলেছে। কারণ হিসেবে মরক্কোর সরকার করোনাভাইরাসের কথা বললেও অনেকেই মনে করছেন যে, এর সাথে দুই দেশের মাঝে চলমান উত্তেজনার সম্পর্ক থাকতে পারে।

‘আল জাজিরা’ জানাচ্ছে যে, মে মাসের প্রথম সপ্তাহে ইউরোপিয় আদালতে মরক্কোর সাথে ইইউএর বাণিজ্য চুক্তির ব্যাপারে শুনানি হয়। পলিসারিওর পক্ষ থেকে এই চুক্তির বিরোধিতা করে ইইউএর কাছে আবেদন জানানো হয়েছিল। পলিসারিও বলছে যে, মরক্কো পশ্চিম সাহারার সম্পদ লুন্ঠন করছে; যার মাঝে রয়েছে রক ফসফেট, কৃষিদ্রব্য এবং পশ্চিম সাহারার উপকূলের মৎস্যসম্পদ। অনেকেই মনে করছেন যে, এই বছরের শেষের দিকে আদালয়ের যে রায় আসবে, তা পলিসারিওর পক্ষে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। ইইউ আদালতের রায় মরক্কোর বিপক্ষে গেলে মরক্কোর সাথে ইইউএর সম্পর্কে নতুন করে দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে।

জার্মানির সাথে দ্বন্দ্ব

মরক্কো ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার এবং যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম সাহারায় মরক্কোর সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়ার ১১ দিনের মাথায় ২০২০এর ২১শে ডিসেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে জার্মানির রাষ্ট্রদূত ক্রিসটফ হিউসগেন পশ্চিম সাহারা নিয়ে একটা রুদ্ধদ্বার বৈঠকের ডাক দেন। তার উপস্থাপনায় হিউসগেন বলেন যে, পশ্চিম সাহারার সমস্যার মূলে রয়েছে মরক্কো। হিউসগেন পলিসারিওর সামরিক দুর্বলতার অবস্থান উল্লেখ করেন। পলিসারিও যুদ্ধবিরতি ভাঙলেও তিনি এর জন্যে মরক্কোকে দায়ি করেন। আর পলিসারিও যদি আশাহত হয়, তবে তারা উগ্রবাদী হয়ে যেতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। ২০১৯ সালে জাতিসংঘ মহাসচিবের দূত হিসেবে প্রাক্তন জার্মান প্রেসিডেন্ট কোহলারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, কোহলার অসুস্থ হয়ে যাবার পর থেকে কথাবার্তা থেমে গেছে। জার্মানি চাইছে যে, পশ্চিম সাহারা নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হোক এবং রাজনৈতিকভাবে এর সমাধান হোক। জার্মান রাষ্ট্রদূত তার মার্কিন বন্ধুদেরকে শক্ত অবস্থান নেবার কথা বলেন।

পশ্চিম সাহারার বিষয়ে জাতিসংঘে জার্মানির বৈঠক ডাকার কারণ দেখিয়ে চার মাস পর ২০২১এর মে মাসের শুরুতে মরক্কো বার্লিনে তার রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে। ২০২০এর শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পশ্চিম সাহারাতে মরক্কোর সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেয়ার পরেও মরক্কোর বিরুদ্ধে জার্মানির অবস্থানের ব্যাপক সমালোচনা করে মরক্কো। মরক্কো ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সেই স্বীকৃতি পেয়েছিল। এক বিবৃতিতে মরক্কোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলে যে, জার্মানি গঠনমূলক সমাধানের পথে না হেঁটে ধংসাত্মক মনোভাব দেখাচ্ছে। একইসাথে মরক্কো বলে যে, জার্মানি মরক্কোর প্রভাব নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে সর্বদা; বিশেষ করে লিবিয়া ইস্যুর কথা উল্লেখ করা হয়। ২০২০এর জানুয়ারিতে বার্লিনে লিবিয়া নিয়ে আলোচনায় মরক্কোকে বাদ দেয়ার জন্যে জার্মান সরকারকে অভিযুক্ত করা হয়। ‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, গত মার্চে মরক্কো সরকার তাদের সরকারি দপ্তরগুলিকে জার্মান দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিতে নির্দেশ দেয়।

‘আল জাজিরা’র সাথে কথা বলতে গিয়ে স্প্যানিশ সাংবাদিক ইগনাসিও সেমব্রেরো বলছেন যে, মরক্কো চাইছে যে, ইইউ এবং প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তি স্পেনের উপর চাপ সৃষ্টি করে পশ্চিম সাহারার উপর মরক্কোর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি আদায় করে নেয়া। তবে আপাততঃ ইইউ এব্যাপারে মরক্কোকে স্বীকৃতি দেবে বলে মনে করছেন না সেমব্রেরো; অন্ততঃ প্রকাশ্যে নয়। মরক্কো এবং জার্মানির অর্থনৈতিক সম্পর্ক কিন্তু বেশ ভালো। মরক্কোর সপ্তম বৃহত্তম বাণিজ্য সহযোগী হলো জার্মানি। এছাড়াও ২০২০ সালেই জার্মানির কাছ থেকে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণ এবং অনুদান পেয়েছে মরক্কো।
 
২০১৮ সাল। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁর সাথে মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ। মরক্কোর নিরাপত্তা চিন্তায় ইউরোপ সবসময়ই রূঢ় বাস্তবতা; কারণ ইউরোপ মরক্কোকে ভূমধ্যসাগরে ঢোকার পশ্চিম দরজার দক্ষিণ পাল্লা হিসেবে দেখে। একারণেই বিংশ শতকে ইউরোপিয় উপনিবেশ হওয়া থেকে বাঁচতে পারেনি মরক্কো; যার ফলশ্রুতিতে বর্তমান মরক্কো অর্থনৈতিকভাবে ইউরোপের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। তবে নির্ভরশীলতা একমুখী নয় মোটেই; কারণ ইউরোপিয়রাও মরক্কোতে তাদের বিনিয়োগের সুরক্ষা চায়।  


ইউরোপের উপর মরক্কোর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা

মরক্কো হলো পৃথিবীর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ফসফেট উৎপাদক। রক ফসফেট খনিজ থেকে ফসফেট সার তৈরি হয়। পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথেসাথে ফসফেট সারের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টন রক ফসফেট উৎপাদন হয়; যার প্রায় এক তৃতীয়াংশই মরক্কোতে উৎপাদিত হয়। তবে পুরো দুনিয়ার প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টন রক ফসফেট রিজার্ভের মাঝে শুধু মরক্কো এবং পশ্চিম সাহারাতেই পাওয়া গেছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টন। মরক্কোর প্রায় সকল রক ফসফেট উৎপাদন করে সরকারি মালিকানার কোম্পানি ‘ওসিপি’। ১৯৭৬ সালে পশ্চিম সাহারা মরক্কো নিজের নিয়ন্ত্রণে নেবার পর থেকে সেখানকার ‘বৌ ক্রা’ এবং ‘লাইউনি’ খনি থেকে ফসফেট উত্তোলন শুরু হয়। বর্তমানে ‘ওসিপি’র প্রায় ৮ শতাংশ উৎপাদন পশ্চিম সাহারার এই খনি থেকে আসে।

‘আইএইচএস মার্কিট’এর হিসেবে বিশ্বের প্রায় অর্থেক রক ফসফেটের ব্যবহারকারী হলো চীন। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, আফ্রিকা এবং পূর্ব ইউরোপ মিলে প্রায় এক চতুর্থাংশ ব্যবহার করে। এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্য এবং আমেরিকা মহাদেশের অন্যান্য দেশ ফসফেটের গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা। যদিও অর্থের হিসেবে ফসফেট এবং আনুসাঙ্গিক পণ্য মরক্কোর সবচাইতে বড় রপ্তানি পণ্য নয়, তথাপি বিশ্বব্যাপী শস্য উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে ফসফেট মরক্কোকে গুরুত্বপূর্ণ করেছে।

‘ওইসি’র হিসেবে মরক্কোর সবচাইতে বড় রপ্তানি বাজার হলো স্পেন; যেখানে প্রায় ২৩ শতাংশ রপ্তানি হয়। এরপর প্রায় ২০ শতাংশ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ফ্রান্স; ৪ শতাংশ নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে ইতালি; সাড়ে ৩ শতাংশ নিয়ে চতুর্থ স্থানে জার্মানি। এছাড়াও ইউরোপের দেশগুলির মাঝে ব্রিটেন, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম এবং রাশিয়া মরক্কোর গুরুত্বপূর্ণ বাজার। ইউরোপের বাইরে রয়েছে ভারত, তুরস্ক, চীন এবং জাপান। পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলির সাথে মরক্কোর নির্ভরশীলতা ফসফেট নিয়ে নয়; গাড়ি, ইনসুলেটেড তার এবং গার্মেন্টস পণ্যের মতো তৈরি পণ্য ইউরোপে রপ্তানি করে মরক্কো; যা কিনা ইউরোপের উপর মরক্কোকে নির্ভরশীল করেছে। মরক্কোতে বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ফ্রান্স এবং স্পেন এগিয়ে আছে। মরক্কোর মাটিতে ফরাসি গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি ‘রেনো’ এবং ‘পোঁজো’ বিনিয়োগ করেছে।

মরক্কোর বিশাল সাড়ে তিন হাজার কিঃমিঃ লম্বা উপকূল সামুদ্রিক মাছের একটা বড় উৎস; অথচ মরক্কোর নিজের সক্ষমতা নেই গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ করার। জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ‘এফএও’এর হিসেবে মরক্কোর বাৎসরিক সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ এবং চাষ প্রায় ১৫ লক্ষ টন; যা আফ্রিকার বৃহত্তম এবং বিশ্বে ১৭তম। প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ মৎস্য আহরণ এবং চাষের উপর নির্ভরশীল। প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার আয় হয় মৎস্য রপ্তানি করে; যার বেশিরভাগটাই যায় ইউরোপে। ১৯৯৬ সালে ইইউএর সাথে চুক্তি অনুযায়ী মরক্কো তার দেশের উপকূলে ইইউএর, বিশেষ করে স্পেনের জাহাজগুলিকে মাছ ধরার অনুমতি দেয়। এর বিনিময়ে মরক্কো ইইউএর কাছ থেকে বাৎসরিক অর্থ সহায়তা পায়। ২০১৬ সালে মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ পশ্চিম সাহারার দাখলা উদ এদদাহাব উপকূল অঞ্চলে বিভিন্ন মৎস্যজাতীয় চাষের প্রকল্প উদ্ভোধন করেন। এই প্রকল্পগুলিতে ইউরোপিয় দেশগুলি ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। ২০১৯ সালে ইইউ মরক্কোর সাথে এক চুক্তি করে; যার মাধ্যমে পশ্চিম সাহারা উপকূলে ইইউ মাছ ধরার অনুমতি পায়। ‘এএফপি’র হিসেবে চার বছরের এই চুক্তির মাধ্যমে মরক্কো ইইউ থেকে ১’শ ৫৩ মিলিয়ন ইউরো পাবে। ইইউএর পার্লামেন্টে পাস হওয়া এই চুক্তির বিপক্ষে রয়েছে পশ্চিম সাহারার লবিং গ্রুপ। পলিসারিওর উপদেষ্টা নূর বকর ‘আরএফআই’কে বলছেন যে, ইউরোপের আদালতে তারা সকল প্রকারের চেষ্টা চালাবেন মরক্কোর সাথে এই চুক্তি বাতিল করতে। ইউরোপিয়ান কমিশনের হিসেবে ২০১৯ সালে মরক্কো পশ্চিম সাহারা থেকে ৫’শ ২৪ মিলিয়ন ডলার মূল্যের মৎস্য এবং কৃষিজ পণ্য ইউরোপে রপ্তানি করে।

পশ্চিম সাহারার ফসফেট ইউরোপের সাথে বাণিজ্যে বড় কোন ইস্যু না হলেও মরক্কো ইইউএর উপর অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্টই নির্ভরশীল। আর সেই হিসেবে ইউরোপের আদালতে পশ্চিম সাহারার অভিযোগ মরক্কোর জন্যে বিরক্তির ব্যাপার হতে পারে। তবে মরক্কো যেমন ইইউএর উপর নির্ভরশীল, তেমনি মরক্কোতে বড় বিনিয়োগও ইইউএর দেশগুলির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। মরক্কোর বিরুদ্ধে ইইউ আদালতের যেকোন সিদ্ধান্ত ইউরোপিয় কোম্পানিগুলিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। মরক্কোর ৩২ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির বিপরীতে আমদানি হলো প্রায় ৪৯ বিলিয়ন ডলার। আমদানি এবং রপ্তানির মাঝে বড় ব্যবধান দেশটার অর্থনীতিকে ব্যাতিব্যস্ত রেখেছে। এমতাবস্থায় মরক্কোও এমন কোন সিদ্ধান্ত নিতে যাবে না, যা কিনা দেশটার অর্থনীতিকে আরও চাপের মাঝে ফেলবে।

জিব্রালটার প্রণালী উত্তর ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার সাথে ভূমধ্যসাগর, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার সংযোগপথ। একসময় প্রাকৃতিক কারণে মরক্কোর উপকূলে বড় বন্দর নির্মাণ কঠিন হলেও প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথেসাথে মরক্কোর উপকূলে বড় বড় সমুদ্রবন্দর তৈরি হতে থাকে। এর ফলে জিব্রালটার প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ বহুকাল জিব্রালটার এবং স্পেনের উপর নির্ভরশীল হলেও এখন মরক্কোও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। একারণেই মরক্কোর নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী দেশগুলির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। 


ভূকৌশলগত দিক থেকে মরক্কোর অতি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান

মরক্কো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা ভৌগোলিক অবস্থান ধরে রেখেছে, যা কিনা ভূকৌশলগত দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মরক্কোর উত্তর উপকূল জিব্রালটার প্রণালির দক্ষিণ কূল নিয়ন্ত্রণ করে। ১৯০৬ সালে মরক্কোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী ইউরোপিয় দেশগুলি ব্রিটেনের একটা শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। ব্রিটেন বলেছিল যে, মরক্কোর নিয়ন্ত্রণ যার কাছেই যাক না কেন, জিব্রালটারের উল্টো পাসে মরক্কোর উত্তর উপকূলে কোন বন্দরে দুর্গ তৈরি করা যাবে না। ব্রিটেন বিশেষ করে খেয়াল রেখেছিল জার্মানি যেন মরক্কোর উপর প্রভাব বিস্তার করে সেখানে একটা নৌঘাঁটি করে ফেলতে না পারে। এটা জিব্রালটারের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্রিটেনের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৯৭০এর দশকে স্পেন মরক্কো ছেড়ে আসলেও মরক্কোর উত্তর উপকূলে কয়েকটা বন্দরকে স্পেন ছিটমহল হিসেবে রেখে দেয়। ভবিষ্যতে জিব্রালটার প্রণালীর দক্ষিণ উপকূল নিয়ন্ত্রণে এই ছিটমহলগুলি ইউরোপের জন্যে কাজে দিতে পারে। এগুলির মাঝে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেউতা এবং মেলিলা। সেউতার পাশেই মরক্কোর তাঞ্জিয়ার এবং তাঞ্জিয়ার মেড জিব্রালটারের উল্টো দিকে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর।

জিব্রালটার প্রণালী উত্তর ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার সাথে ভূমধ্যসাগর, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার সংযোগপথ। ব্রিটেন, নেদারল্যান্ডস, জার্মানিসহ পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলি এই প্রণালীর মধ্য দিয়ে যাওয়া বাণিজ্যপথের উপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল। ফ্রান্সের আটলান্টিক উপকূলের সাথে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের সংযোগও জিব্রালটারের মাধ্যমে। তাই এই সংযোগপথের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে ইউরোপিয়দের কাছে মরক্কোর গুরুত্ব সর্বদাই বেশি ছিল। একসময় প্রাকৃতিক কারণে মরক্কোর উপকূলে বড় বন্দর নির্মাণ কঠিন হলেও প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথেসাথে মরক্কোর উপকূলে বড় বড় সমুদ্রবন্দর তৈরি হতে থাকে। এর ফলে জিব্রালটার প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ বহুকাল জিব্রালটার এবং স্পেনের উপর নির্ভরশীল হলেও এখন মরক্কোও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। একারণেই মরক্কোর নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী দেশগুলির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও মরক্কো হলো যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের মাঝে অবস্থিত একটা দরজা। এর মাঝ দিয়ে মার্কিন সামরিক বিমানগুলি উড়ে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া আসা করে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলিও এই পথে ভূমধ্যসাগর এবং মধ্যপ্রাচ্যে যায়। কাজেই মার্কিনীরাও মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ রাখতে মরক্কোর নিয়ন্ত্রণ চায়।

মরক্কো নিজের অবস্থানকে ব্যবহার করে আফ্রিকার গ্যাস ইউরোপে রপ্তানি করতে চাইছে। আলজেরিয়া থেকে একটা পাইপলাইনের মাধ্যমে মরক্কো হয়ে গ্যাস রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপে। আরেকটা পাইপলাইনের মাধ্যমে নাইজেরিয়ার গ্যাস ইউরোপে রপ্তানি করতে চাইছে মরক্কো। এই পাইপলাইনগুলি নিয়ে মরক্কোর সাথে আলজেরিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে।

মরক্কোর সাথে পশ্চিম আফ্রিকার অন্যান্য দেশের সড়ক যোগাযোগের একমাত্র পথ হল পশ্চিম সাহারার মাঝ দিয়ে যাওয়া একটা মাত্র রাস্তা। ২০২০এর নভেম্বরে প্রায় দু’শ মালবাহী ট্রাক মৌরিতানিয়ার সীমানায় আটকে থেকে অভিযোগ করে যে, মিলিশিয়ারা রাস্তা অবরোধ করে রেখেছে। এরপরই মরক্কো এই রাস্তার নিরাপত্তা নিশ্চিতে পশ্চিম সাহারার দক্ষিণে মৌরিতানিয়ার সীমানায় গুরগেরাত বাফার জোনে সেনা মোতায়েন করে। ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’এর রিকার্ডো ফাবিয়ানি ‘আল জাজিরা’কে বলেন যে, নতুন করে শুরু হওয়া এই উত্তেজনার ফলাফল সুদূরপ্রসারী হতে পারে। আলজেরিয়ার পররাষ্ট্র দপ্তর মরক্কোর এই সামরিক মিশনের সমালোচনা করে বিবৃতি দেয়।
 
২০১৩ সাল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথে মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ। মরক্কোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বহুকালের। যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে ভূমধ্যসাগরে ঢোকার একটা পথ হলো জিব্রালটার। এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ধরে রাখতে মরক্কো একটা দরজার মতো। আরব দেশগুলিও সেকারণেই যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা পাবার জন্যে মরক্কোর এই ‘দরজা’ খোলা দেখতে চায়। ইউরোপের নিয়ন্ত্রণ থেকে বাঁচতেই মরক্কো যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকিয়েছিল।  

মরক্কোর যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রিক রাজনীতি

মরক্কো যুক্তরাষ্ট্রের অনেক পুরোনো বন্ধু। যুক্তরাষ্ট্র তৈরি হবার সময়েই মরক্কোর সুলতান মোহাম্মদ বেন আব্দেল্লাহ ১৭৭৭ সালে ব্রিটেনের চোখ রাঙ্গানো উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ১৭৮৬ সালে মরক্কোর করা বন্ধুত্বের চুক্তি এখনও বলবত রয়েছে। ১৯০৬ সালে ইউরোপিয় শক্তিরা মরক্কোর দখল নেবার সময় যুক্তরাষ্ট্র এর বিরোধিতা করেছিল। ১৯৫৬ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাবার পরের বছরেই মরক্কোর রাজা পঞ্চম মোহাম্মদ ওয়াশিংটন সফর করেন। পরবর্তী রাজা দ্বিতীয় হাসানও কয়েকবার ওয়াশিংটন সফর করেন। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় মরক্কো যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবেই থাকে। ১৯৯৯ সাল থেকে পরবর্তী রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে তার পূর্ববর্তীদের নীতি অনুসরণ করেন। ১৯৮৭ সালে মরক্কোর সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের দেশের বিমান ঘাঁটিগুলি ব্যবহার করার অনুমতি দেয়। মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকায় মার্কিন সামরিক অপারেশন চালাতে মরক্কোর বিমান ঘাঁটিগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পলিসারিওর বিরুদ্ধে যুদ্ধে মরক্কোকে সামরিক সহায়তা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এই সামরিক সহায়তার পিছনে অর্থায়ন সৌদি আরব করে বলেই মনে করেন বিশ্লেষকেরা। ওয়াশিংটনে মরক্কোর পক্ষে শক্তিশালী লবিং গ্রুপ থাকায় পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে মার্কিন সরকার মরক্কোকে সরাসরি সমর্থন না করলেও যুক্তরাষ্ট্র মূলতঃ মরক্কোর পক্ষেই থাকে। মার্কিনীরা পশ্চিম সাহার জন্যে মরক্কোর অধীনে স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে লবিং করতে থাকে।

২০১৯ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র মরক্কোর কাছে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যে ২৫টা ‘এফ ১৬ ব্লক ৭২’ ফাইটার বিমান বিক্রয়ের অনুমোদন দেয়; এবং আরও প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারে বর্তমানে মরক্কোর বিমান বাহিনীতে থাকা ২৩টা ‘এফ ১৬’ বিমানকে আপগ্রেড করার কথা বলে। একই বছরের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর মরক্কোর কাছে আরও ১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাবের অনুমোদন দেয়। ‘ডিফেন্স নিউজ’ বলছে যে, এর মাঝে ছিল ‘এফ ১৬’ যুদ্ধবিমানে ব্যবহারের জন্যে ৫ হাজার ৮’শ ‘মার্ক ৮২’ বোমা, ৩’শ ‘মার্ক ৮৪’ বোমা, ১’শ ৫টা ‘জেডিএএম’ বোমার কিট, ১’শ ৮০টা ‘জিবিইউ ১০’ বোমার কিট, ৪ হাজার ১’শ ২৫টা ‘জিবিইউ ১২’ বোমার কিট। এছাড়াও ৪’শ টা লঞ্চার সহ ২ হাজার ৪’শটা ‘টিওডব্লিউ’ ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। এক বছরের মাঝে মরক্কো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের অস্ত্র কেনার অনুমোদন পায়।

২০২০এর ১০ই ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে, ইস্রাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম সাহারায় মরক্কোর সার্বভোমত্ব স্বীকার করে নিয়েছে। পরদিনই যুক্তরাষ্ট্র মরক্কোর কাছে আরও ১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির ঘোষণা দেয়। ‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, এই অস্ত্রের মাঝে রয়েছে চারটা ‘এমকিউ ৯বি সী গার্ডিয়ান’ ড্রোন এবং ‘হেলফায়ার’ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ‘পেইভওয়ে’ ও ‘জেডিএএম’ বোমা। এই অস্ত্রগুলি পশ্চিম সাহারা নিয়ে পুনরায় সংঘাত শুরু হলে মরক্কোকে নিশ্চিতভাবে এগিয়ে রাখবে।

জিব্রালটার প্রণালী নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র বনাম ইউরোপ

মরক্কোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বহুকালের। যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে ভূমধ্যসাগরে ঢোকার একটা পথ হলো জিব্রালটার। এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ধরে রাখতে মরক্কো একটা দরজার মতো। আরব দেশগুলিও সেকারণেই যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা পাবার জন্যে মরক্কোর এই ‘দরজা’ খোলা দেখতে চায়। ইউরোপের নিয়ন্ত্রণ থেকে বাঁচতেই মরক্কো যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকিয়েছিল। মরক্কোর নিরাপত্তা চিন্তায় ইউরোপ সবসময়ই রূঢ় বাস্তবতা; কারণ ইউরোপ মরক্কোকে ভূমধ্যসাগরে ঢোকার পশ্চিম দরজার দক্ষিণ পাল্লা হিসেবে দেখে। একারণেই বিংশ শতকে ইউরোপিয় উপনিবেশ হওয়া থেকে বাঁচতে পারেনি মরক্কো; যার ফলশ্রুতিতে বর্তমান মরক্কো অর্থনৈতিকভাবে ইউরোপের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। তবে নির্ভরশীলতা একমুখী নয় মোটেই; কারণ ইউরোপিয়রাও মরক্কোতে তাদের বিনিয়োগের সুরক্ষা চায়।

অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্ব ইউরোপের সাথে দরকষাকষিতে মরক্কোকে শক্ত ভিত্তি দেয়। একারণেই ১৯৭০এর দশক থেকে সামরিক শক্তি দিয়ে পশ্চিম সাহারাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করলেও মরক্কোর উপর কোন অবরোধ কেউ দিতে পারেনি। উল্টো পলিসারিওর সাথে যুদ্ধে মরক্কো যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা অস্ত্র পেয়েছে। তবে মরক্কোর প্রায় ২ লক্ষ সদস্যের সেনাবাহিনী পশ্চিম সাহারায় ব্যস্ত থেকে জিব্রালটার এবং স্প্যানিশ ছিটমহলগুলি থেকে যে দূরে থাকছে, সেব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র খুব বেশি চিন্তিত হবার কথা নয়। পশ্চিম সাহারার ফ্রন্টলাইন অনেকদিন ঠান্ডা থাকার পর আবারও উত্তপ্ত হচ্ছে; যা মূলতঃ পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থারই ফলাফল। সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতা মরক্কোর উপর ইউরোপের চাপ বৃদ্ধির পিছনে বড় কারণ। ইস্রাইলের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের মতো জনবিরোধী সিদ্ধান্তও মরক্কোর সরকার নিয়েছে পশ্চিম সাহারায় মরক্কোর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি পাবার জন্যে। তবে এর ফলশ্রুতিতে ইউরোপের সাথে মরক্কোর সম্পর্ক টানাপোড়েনের মাঝে পড়েছে। যদিও মরক্কোর সাথে ইউরোপের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা কম, তথাপি মরক্কোর উত্তর উপকূলে স্পেনের ছিটমহলগুলি যখন হাজারো শরণার্থীর জোয়ারে ভেসে যাবার উপক্রম, তখন এই ছিটমহলগুলির সামনের দিনগুলিতে ইউরোপের ‘ব্রিজহেড’ হিসেবে থাকার সম্ভাবনা প্রশ্নের মুখে পড়ে। জিব্রালটার প্রণালীর উভয় উপকূল নিয়ন্ত্রণে রাখা ইউরোপের জন্যে ততক্ষণই কঠিন, যতক্ষণ যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী হাতে মরক্কোর নিরাপত্তার দায়ভার নিতে পারবে। সাম্প্রতিক সময়ে মরক্কোর জন্যে বিপুল সামরিক সহায়তা ইউরোপের জন্যে সেই বার্তা বহণ করে।

Saturday, 15 August 2020

বৈরুত বিস্ফোরণের পর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মাঝে লেবানন

১৫ই অগাস্ট ২০২০

লেবাননের উপকূলে ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর ছত্রছায়ায় পূর্ব ভূমধ্যসাগরে গ্রীসের সহায়তায় শক্তি বৃদ্ধি করার ফরাসী কৌশলই বলে দিচ্ছে যে, ফ্রান্স তুরস্কের হুমকিকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে। লেবাননের অর্থনৈতিক দৈন্যদশা এবং বৈরুত বিস্ফোরণ দেশের মানুষের জন্যে যতটা কঠিন সময় এনে দিয়েছে, ততটাই প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্ম দিয়েছে ভূমধ্যসাগরীয় শক্তিদের মাঝে।

গত ৯ই অগাস্ট ফরাসী নৌবাহিনীর হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার ‘টোনিয়েরে’ বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রী এবং জরুরি সহায়তা নিয়ে ফ্রান্স থেকে লেবাননের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। লেবাননের রাজধানী বৈরুতে এমোনিয়াম নাইট্রেটের গুদামে বিস্ফোরণের পর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে যাওয়া বৈরুতে বিভিন্ন দেশ থেকে সহায়তা আসছে। ফ্রান্সের যুদ্ধজাহাজ প্রেরণও এই সহায়তার অংশ। ফরাসী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, এই জাহাজে খাদ্য সামগ্রী ও মেডিক্যাল সরঞ্জাম ছাড়াও রয়েছে সাড়ে তিন’শ জনের ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ, বৈরুত বন্দরের সার্ভে কাজের জন্যে হাইড্রোগ্রাফিক সরঞ্জাম ও নৌবাহিনীর ডুবুরি দল, ল্যান্ডিং ক্রাফট, হেলিকপ্টার, অগ্নি নির্বাপক দল, কন্সট্রাকশন সরঞ্জাম, ইত্যাদি। লেবাননের পথে মানবিক সহায়তা নিয়ে রওয়ানা হলেও ২১ হাজার টনের বিশাল এই যুদ্ধজাহাজের সক্ষমতা রয়েছে সাড়ে ৪’শ থেকে ৯’শ সৈন্য, ৪০টা ভারি ট্যাঙ্ক, ৪টা ল্যান্ডিং ক্রাফট এবং ২০ থেকে ৩৫টা হেলিকপ্টার বহণ করার। ১২ই অগাস্ট ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ এক টুইটার বার্তায় ঘোষণা দেন যে, পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের বিরুদ্ধে গ্রীসকে সহায়তা দানের উদ্দেশ্যে ফ্রান্স তার সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করতে যাচ্ছে। আর এর মাঝে হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার ‘টোনিয়েরে’ও রয়েছে। এই ঘোষণার সাথেসাথে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। মোটকথা ফ্রান্স পূর্ব ভূমধ্যসাগরে নিজের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করতে লেবাননের ইস্যুটাকেই ব্যবহার করেছে, যা কিনা লেবাননে ফ্রান্স এবং অন্যান্য দেশের সহায়তা দেবার উদ্দেশ্যগুলিকে আলোচনায় নিয়ে আসে।

গত ৪ঠা অগাস্ট বৈরুতের বন্দর এলাকায় মারাত্মক বিস্ফোরণে দেশটার প্রধান খাদ্য গুদাম ধ্বংস হয়ে যাবার পর ‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে লেবাননের অর্থমন্ত্রী রাউল নেহমের বরাত দিয়ে বলা হয় যে, দেশটাতে এক মাসেরও কম সময়ের খাদ্যশস্যের মজুদ রয়েছে। তবে প্রতিবেদনে এও বলা হয় যে, এই গুদাম ধ্বংস হওয়াটাই প্রধান সমস্যা নয়। করোনা দুর্যোগের আগেই লেবাননের অর্থনীতি পুরোপুরি ধ্বসে পড়েছিল। আর একারণেই লেবাননের সরকারের পক্ষে খাদ্যদ্রব্য আমদানি করার জন্যে বৈদেশিক মুদ্রা যোগাড় করাই কঠিন হয়ে গেছে। লেবাননের আমদানিকারক সিন্ডিকেটের প্রধান হানি বোহসালি বলছেন যে, অন্যান্য দেশ সহায়তা না করলে দেশটা খাদ্যদ্রব্য সরবরাহের মারাত্মক ঝুঁকির মাঝে পড়বে। লেবাননের এই দুর্যোগকে আশেপাশের শক্তিশালী দেশগুলি লেবানন তথা পূর্ব ভূমধ্যসাগরে প্রভাব বৃদ্ধি করার সুযোগ হিসেবেই দেখেছে।

৬ই অগাস্ট ফরাসী প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ ছুটে যান বৈরুতে। ‘ডয়েচে ভেলে’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানি খিলাফতের পতনের পর ফরাসীরা লেবাননের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ১৯৪৩ সালে লেবাননকে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা দেবার পরেও ফ্রান্স তার সেই প্রভাবখানা ধরে রেখেছে। লেবাননের মারোনাইট খ্রিস্টানরা ফ্রান্সকে তাদের রক্ষাকারী হিসেবেই দেখে। লেবাননের ক্ষমতাবান লোকেরা ফ্রান্সে বাড়ি বানিয়েছে, ফরাসী ভাষা শিখেছে, নিজেদের স্কুলে ফরাসী ভাষাকে মূল ভাষা হিসেবে শিক্ষা দিয়েছে। বৈরুতে ম্যাক্রঁর সফরকে অনেকেই লেবাননে ফ্রান্সের হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক এলি আবুআউন বলছেন যে, ফ্রান্স একা নয়, লেবাননে ইরান এবং সৌদি আরবের প্রভাব যথেষ্ট। লেবাননের বিশ্বাসগত বিভাজনের উপরই দেশটার রাজনীতি পুরোপুরি নির্ভরশীল। খ্রিস্টানদের সমর্থনদাতা হলো ফ্রান্স; শিয়াদের পিছনে রয়েছে ইরান; সুন্নিদের সমর্থন দিচ্ছে সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্র এখানে ধীরে ধীরে তার প্রভাব বৃদ্ধি করছে। অপরদিকে রাশিয়া এবং তুরস্ক মোটে চেষ্টা শুরু করেছে। লেবাননের দীর্ঘ সময়ের গৃহযুদ্ধের শেষে ১৯৮৯ সালে তায়েফের সমঝোতার মাধ্যমে ঠিক করা হয় যে, লেবাননের পার্লামেন্টে ১’শ ২৮টা আসনের মাঝে ৪৩টা পাবে মারোনাইট খ্রিস্টানরা, ২৭টা পাবে সুন্নি মুসলিমরা, ২৭টা পাবে শিয়ারা, ২০টা পাবে ইস্টার্ন অর্থোডক্স খিস্টানরা, ৮টা পাবে দ্রুজরা, ২টা পাবে আলাওয়াতিরা এবং ১টা পাবে ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টানরা। ১৯৪৩ সালের নিয়ম অনুযায়ী দেশটার প্রেসিডেন্ট হবেন একজন মারোনাইট খ্রিস্টান এবং প্রধানমন্ত্রী হবেন একজন সুন্নি মুসলিম। এই ব্যবস্থায় মারোনাইট খ্রিস্টানরা ফ্রান্সের অধীনে যতটা সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল, তার পরিবর্তন করে মুসলিমদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়। তবে রাজনৈতিক বিভেদের এই ব্যবস্থায় লেবাননে কোনদিনই কোন শক্তিশালী সরকার গঠন করা সম্ভব হয়নি। আর বিদেশী শক্তিরা বিভিন্ন গ্রুপের পক্ষ নিয়ে লেবাননের রাজনীতিতে কলকাঠি নেড়েছে।

গত মার্চে লেবাননের সরকার ঘোষণা দেয় যে, দেশটা প্রথমবারের মতো ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণের কিস্তি ফেরত দিতে পারছে না। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হাসান দিয়াব বলেন যে, এই ঋণের উপর সুদ পরিশোধ করাটা লেবাননের সক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। ‘বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, লেবাননের ব্যাঙ্কগুলি দেশটার নিজস্ব মুদ্রা থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তরে বাধা দেয়ার ফলে দেশটার মুদ্রার মান মারাত্মক কমে যায়; যার ফলশ্রুতিতে লেবানিজ পাউন্ড প্রায় মূল্যহীন হয় পড়ে। একইসাথে দেশটাতে খাদ্যদ্রব্য আমদানি করা দুষ্কর হয়ে যায়। ঋণদাতাদের নেতৃত্ব দেয়া ফ্রান্স চাইছে দেশটাতে রাজনৈতিক সংস্কার হোক। ‘রয়টার্স’ বলছে, ম্যাক্রঁ চাইছেন যে, লেবাননের রাজনৈতিক দলগুলিকে একটা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যাপারে রাজি করানো। এর মাধ্যমে অতি ঋণগ্রস্ত এই দেশটাকে একটা টেকনোক্র্যাট সরকারের অধীনে নিয়ে আসলে দাতা দেশগুলি লেবাননের জন্যে আবারও কয়েক বিলিয়ন ডলারের ঋণের ব্যবস্থা করবে।

লেবাননের অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের কেন্দ্রে সিরিয়া বা আল-শামএর ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে হওয়ায় দেশটার আকারের তুলনায় এর ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বেশি। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ফ্রান্স তার হারানো প্রভাব ফিরে পেতে যেমন লেবাননে তার অবস্থানকে শক্ত করতে চাইছে, তেমনি ইরান এবং সৌদি আরবও চাইছে তাদের অবস্থান যাতে কিছুতেই দুর্বল না হয়। সৌদি আরব, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও আরও অনেক দেশ লেবাননে ত্রাণ সামগ্রী পাঠানো অব্যাহত রেখেছে। ব্রিটেন নৌবাহিনীর সার্ভে জাহাজ পাঠিয়েছে বৈরুত বন্দরকে চালু করায় সহায়তা দিতে। এর উপরে আবার তুরস্ক চাইছে বৈরুতের সমুদ্রবন্দরের উন্নয়ন করতে। অত্র অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের খেলায় সর্বশেষ খেলোয়াড় তুরস্ক। তবে লেবাননের উপকূলে ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর ছত্রছায়ায় পূর্ব ভূমধ্যসাগরে গ্রীসের সহায়তায় শক্তি বৃদ্ধি করার ফরাসী কৌশলই বলে দিচ্ছে যে, ফ্রান্স তুরস্কের হুমকিকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে। লেবাননের অর্থনৈতিক দৈন্যদশা এবং বৈরুত বিস্ফোরণ দেশের মানুষের জন্যে যতটা কঠিন সময় এনে দিয়েছে, ততটাই প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্ম দিয়েছে ভূমধ্যসাগরীয় শক্তিদের মাঝে।

Wednesday, 24 June 2020

তিউনিসিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফ্রান্স ও তুরস্কের মাঝে চলছে প্রতিযোগিতা

২৪শে জুন ২০২০

ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর সাথে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদ। দুই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলোচনা এমন সময়ে এলো, যখন তিউনিসিয়ার প্রতিবেশী দেশ লিবিয়ার যুদ্ধে তুরস্কের হস্তক্ষেপের পর যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেছে। লিবিয়াতে কোণঠাসা হয়ে যাবার পর ফ্রান্স লিবিয়ার প্রতিবেশী তিউনিসিয়াতে তার দুর্বল হয়ে যাওয়া অবস্থানকে আরও দৃঢ় করতে চাইছে।


ফ্রান্স লিবিয়ার যুদ্ধে তিউনিসিয়ার সমর্থন চাইছে

গত ২২শে জুন ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ করোনাভাইরাস মোকাবিলায় তিউনিসিয়ার জন্যে সাড়ে ৩’শ মিলিয়ন ইউরো সহায়তার ঘোষণা দেন। ইলাইসি প্যালেসে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদের সাথে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় ম্যাক্রঁ বলেন যে, তিউনিসিয়ার স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়া, সেদেশে হাসপাতাল তৈরি এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পুনরায় শুরু করার লক্ষ্যে সহায়তা দেবে ফ্রান্স। তিনি আরও বলেন যে, এই অর্থ ২০২২ সাল পর্যন্ত তিউনিসার স্বাস্থ্যখাত এবং যুব উন্নয়নের জন্যে ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ইউরো বরাদ্দের অংশ। দুই দেশ আঞ্চলিক ইস্যু নিয়েও কথা বলেছে। ম্যাক্রঁ বলেন যে, ফ্রান্স এবং তিউনিসিয়া একত্রে দাবি করছে যে, লিবিয়াতে যুদ্ধরত পক্ষগুলি যেন আলোচনার টেবিলে বসে সকলের জন্যে নিরাপত্তা এবং লিবিয়ার সংস্থাগুলির পুনএকত্রীকরণ নিশ্চিত করে। ফরাসী প্রেসিডেন্ট লিবিয়াতে বিদেশী হস্তক্ষেপ বন্ধের আহ্বান জানান। একইসাথে ম্যাক্রঁ লিবিয়াতে তুরস্কের ভূমিকাকে ‘বিপজ্জনক খেলা’ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন যে, এটা ঐ অঞ্চল এবং ইউরোপের জন্যে সরাসরি হুমকিস্বরূপ। তিনি বলেন যে, একই কথাগুলি ঐদিনই তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন করে বলেছেন। অপরদিকে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদ বলেন যে, তার দেশ ফ্রান্সের সাথে অতীতের ক্ষতচিহ্ন ভুলে গিয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে চাইছে। তিনি তিউনিসিয়ার উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত একটা রেলওয়ে লাইন তৈরির চিন্তায় ফ্রান্সের সহায়তা দেয়াকে স্বাগত জানান। দুই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলোচনা এমন সময়ে এলো, যখন তিউনিসিয়ার প্রতিবেশী দেশ লিবিয়ার যুদ্ধে তুরস্কের হস্তক্ষেপের পর যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে তিউনিসিয়ার সাথে ফ্রান্সের সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টার ব্যাপক ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।

লন্ডন থেকে প্রকাশিত পত্রিকা ‘আল এরাব উইকলি’র এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, লিবিয়াতে কোণঠাসা হয়ে যাবার পর ফ্রান্স লিবিয়ার প্রতিবেশী তিউনিসিয়াতে তার দুর্বল হয়ে যাওয়া অবস্থানকে আরও দৃঢ় করতে চাইছে। কিছুদিন ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মন্তব্য করেন যে, লিবিয়াতে আরেকটা সিরিয়া তৈরি হতে চলেছে; যা খুবই দুশ্চিন্তার ব্যাপার। ২৬শে মে তিউনিসিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইমেদ হাজগুই ফ্রান্সের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফ্লোরেন্স পার্লির সাথে ফোনে লিবিয়া নিয়ে কথা বলেন। তারা লিবিয়ায় বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপের ব্যাপারে একমত পোষণ করেন এবং লিবিয়ার সমস্যা লিবিয়ার মানুষদের মাঝেই সমাধান হওয়া উচিৎ বলে বলেন। দুই দেশের মাঝে সামরিক সহযোগিতা আরও বাড়ানো যায় কিভাবে, তা নিয়েও তারা আলোচনা করেন।

২০১৮ সালের নভেম্বরে তিউনিসিয়ার নৌবাহিনীর ৪র্থ অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল ‘সফোনিসবে’ ডেলিভারি দেয়া হয়। এই জাহাজগুলি তিউনিসিয়াকে ভূমধ্যসাগরে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। তিউনিসিয়ার সামরিক বাহিনীকে যুক্তরাষ্ট্র গড়ে দিলেও ২০১৬ সাল থেকে তিউনিসিয়া নিজস্ব নৌবাহিনী গঠন করা শুরু করে। তিউনিসিয়ার জনগণের সাথে সামরিক বাহিনীর সম্পর্ক বেশ মধুর। সামরিক বাহিনীর শক্তিশালী হওয়ার পিছনে জনগণের সমর্থন রয়েছে; কিন্তু রাজনীতিবিদদের মাঝে এব্যাপারে রয়েছে বিরোধ।


তিউনিসিয়ার সামরিক বাহিনী গড়ে দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক

ঐতিহাসিকভাবে তিউনিসিয়ার সাথে ফ্রান্সের সম্পর্ক বেশি গভীর থাকলেও সামরিক বাহিনীর ক্ষেত্রে বেশকিছু পরিবর্তন এসেছে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’ তিউনিসিয়া নিয়ে বেশ কয়েকটা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তারা বলছে যে, একনায়ক বেন আলি তিউনিসিয়ার সামরিক বাহিনীকে ছোট করে রেখেছিলেন, যাতে সামরিক বাহিনী দেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। তিউনিসিয়ার নিয়ন্ত্রণ ছিল মূলতঃ ন্যাশনাল গার্ডের হাতে, যা কিনা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালের অধীন, এবং যার মূল কাজ ছিল দেশের উপর শাসকের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। ব্যাপারটা পরিবর্তন হয়ে যায় ২০১১ সালে বেন আলির পতনের পর। যুক্তরাষ্ট্র তিউনিসিয়া নিয়ে চিন্তিত ছিল যে, ছোট হলেও তিউনিসিয়া থেকেই সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ ইরাক ও সিরিয়াতে বিভিন্ন জিহাদি গ্রুপে যোগ দিয়েছে। এছাড়াও তিউনিসিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভেদ এবং অস্থিরতা মানুষকে গণতন্ত্রবিমুখ করে ফেলেছে। উদাহরণস্বরূপ, তিউনিসিয়ার বর্তমান সরকারে ৬টা রাজনৈতিক দল থেকে ১৫ জন এমপি এবং আরও ১৭ জন স্বতন্ত্র এমপি মন্ত্রীত্ব পেয়েছেন। কোন দলই প্রতিশ্রুতি দিয়ে কথা রাখেনি; তাই কোন দলই বেশি সংখ্যক আসন পাচ্ছে না। ২০১৪ সালে ‘পিউ রিসার্চ’এর এক জরিপ বলছে যে, মাত্র ৪৮ শতাংশ তিউনিসিয়ান গণতন্ত্রকে সমর্থন করছে। ৫১ শতাংশ মানুষ মনে করছে যে গণতান্ত্রিক সময়ের চাইতে একনায়কের সময়েই দেশের অবস্থা ভালো ছিল। মুসলিম ব্রাদারহুডপন্থী ‘এননাহদা পার্টি’র সমর্থন দুই বছরের মাঝে ৬৫ শতাংশ থেকে ৩১ শতাংশে নেমে আসে। ৮৩ শতাংশ তিউনিসিয়ান মনে করে যে, দেশের রাজনীতিতে ইসলামের আদর্শগুলি বাস্তবায়িত থাকা উচিৎ; যাদের মাঝে ৩০ শতাংশ মনে করে যে, ইসলামকে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা উচিৎ। কিন্তু সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সামরিক বাহিনীর ব্যাপারে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। ৯৫ শতাংশ মানুষ সামরিক বাহিনীর প্রশংসা করে; যেখানে মিডিয়ার পক্ষে বলে ৬২ শতাংশ মানুষ; আদালতের পক্ষে ৪৪ শতাংশ; আর ধর্মীয় নেতাদের পক্ষে মাত্র ৩৩ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র এই ব্যাপারগুলিকে পুঁজি করেই তিউনিসিয়ার সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দেয়া শুরু করে এবং তাদের সাথে মহড়া এবং অপারেশনে অংশ নিয়ে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে থাকে।

লিবিয়া থেকে আসা জিহাদী গ্রুপগুলির সাথে তিউনিসিয়ার সেনাদের ব্যাপক সংঘর্ষে নিয়মিত প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে থাকে। মার্কিন সেনারাও সেখানে সরাসরি জড়িত থাকলেও তা পত্রিকার খবরে আসতে দেয়া হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসন হোয়াইট হাউজে আসার পর থেকে তিউনিসিয়ার জন্যে সামরিক সহায়তা কমে গেলেও তিউনিসিয়া নিজের নিরাপত্তায় বিনিয়োগ করতে থাকে। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে অংশ নিতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র মার্কিনীরা তিউনিসিয়াকে সরবরাহ করেছে। এর মাঝে রয়েছে ৮০টারও বেশি হেলিকপ্টার; যার মাঝে ২৪টা ‘ওএইচ-৫৮ডি কিওওয়া ওয়ারিয়র’, ৮টা ‘ইউএইচ-৬০এম ব্ল্যাক হক’, ৩৬টা ‘ইউএইচ-১’ রয়েছে। এছাড়াও ৯টা ‘সি-১৩০’ পরিবহণ বিমান দেয়া হয় তিউনিসিয়াকে; যার মাঝে ২০১৪ সালে দেয়া হয় সর্বশেষ মডেলের ‘সি-১৩০জে সুপার হারকিউলিস’। এবছরের এপ্রিল মাসে একটা ‘সি-১৩০জে’ বিমান করোনাভাইরাস মোকাবিলায় ২২ হাজার কিঃমিঃ উড়ে চীন থেকে মেডিক্যাল সাপ্লাই নিয়ে আসে। এই ফ্লাইটের মাঝে বিমানটা দু’বার কাজাখস্তানে রিফুয়েলিং করে। নিরাপত্তা বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘ওয়ার অন দ্যা রকস’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, করোনাভাইরাস মোকাবিলায় তিউনিসিয়ার রাস্তায় সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়; যা কিনা দেশের মানুষ ভালোভাবে দেখেছে। অন্যদিকে মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’ বলছে যে, তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক দলগুলি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্যে প্রতিযোগিতা করছে। একদিকে ‘নিদা তিউনেস’ এবং ‘এননাহদা পার্টি’ সামরিক বাহিনীর উপর তাদের প্রভাব বাড়াতে চাইছে; অন্যদিকে বিরোধীরা চাইছে এতে বাধা দিতে।

মার্কিনীরা তিউনিসিয়ার উপকূল সন্ত্রাসীমুক্ত রাখতে তিউনিসিয়ার নৌবাহিনীকে কমপক্ষে ২২টা ছোট বোট দেয়। তবে ২০১৬ সাল থেকে তিউনিসিয়া নিজস্ব নৌবাহিনী গঠন করা শুরু করে। প্রথমবারের মতো নেদারল্যান্ডসের ‘ডামেন’ শিপইয়ার্ড থেকে অত্যাধুনিক চারটা অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল অর্ডার করে তারা। ৭২ মিটার লম্বা এবং প্রায় ১৩’শ টনের হেলিকপ্টার ও ড্রোন বহনে সক্ষম এই জাহাজগুলি তিউনিসিয়াকে ভূমধ্যসাগরে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ২০১৮ সালের মাঝেই ‘ডামেন’ চারটা জাহাজই ডেলিভারি দিয়ে দেয়। এর আগ পর্যন্ত তিউনিসিয়ার ফরাসী ও জার্মান নির্মিত পুরোনো ফাস্ট এটাক ক্রাফটগুলি শুধুমাত্র তিউনিসিয়ার উপকূলের কাছাকাছি অঞ্চল পাহাড়া দিতে সক্ষম ছিল। শুধু তাই নয়, তিউনিসিয়া নিজেরাই ৩টা ছোট আকৃতির ২৬ মিটার লম্বা প্যাট্রোল বোট তৈরি করে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা জানান দেয়।

সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র এবং তুরস্ক তিউনিসিয়ার সাথে সামরিক সম্পর্ক গভীর করেছে। ২০১৪ সালে তিউনিসিয়ার সেনাবাহিনী তুরস্ক থেকে ১’শটা ‘কিরপি’ আর্মার্ড ভেহিকল অর্ডার করে। ২০১৬ সাল থেকে এর ডেলিভারি শুরু হয়। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের তিউনিসিয়া সফরের সময়ে দুই দেশের মাঝে কয়েকটা সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মাঝে আগের ৩’শ মিলিয়ন ডলার সহায়তার সাথে আরও ৩’শ মিলিয়ন ডলার সহায়তার আশ্বাস দেয়া হয়। তুরস্ক তিউনিসিয়ার সেনাবাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। ২০১১ সাল থেকে ২০১৭ সালের মাঝে তুরস্ক তিউনিসিয়াকে ২’শ মিলিয়ন ডলারের নিরাপত্তা সহায়তা দেয়।

গত মার্চেই ‘ডিফেন্স নিউজ’ জানায় যে, তুরস্কের প্রতিরক্ষা কোম্পানি ‘টিএআই’ তিউনিসিয়ার কাছে ২’শ ৪০ মিলিয়ন ডলারে ৬টা ‘আনকা-এস’ সার্ভেইল্যান্স ড্রোন এবং তিনটা কন্ট্রোল স্টেশন বিক্রির ক্রয়াদেশ নিশ্চিত করেছে। তুর্কি কর্মকর্তারা বলছেন যে, তারা এই ক্রয়াদেশের জন্যে এক বছরের বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করছিলেন। আর তারা তিউনিসিয়ার কাছে অস্ত্র বহণকারী ড্রোন বিক্রি করার চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছেন। ‘আনকা-এস’ ড্রোনের বৈশিষ্ট্য হলো এটা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়; যার ফলশ্রুতিতে এই ড্রোন নিয়ন্ত্রক স্টেশন থেকে বেশ দূরে গিয়েও কাজ করতে সক্ষম। অর্থাৎ এই ড্রোনগুলি তিউনিসিয়ার উপকূলের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলির উপর নজরদারি করতে সক্ষম হবে।

তিউনিসিয়ার মুসলিম ব্রাদারহুডপন্থী ‘এননাহদা পার্ট’র প্রধান রাচেদ ঘানুচির সাথে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান। আঙ্কারার সাথে ‘এননাহদা পার্টি’র সম্পর্ক যে বাস্তবতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তা জুন মাসে পার্লামেন্টে ফ্রান্সের কাছ থেকে ঔপনিবেশিক সময়ের অপরাধের ক্ষমা চাওয়ার বিলে ‘এননাহদা’র সমর্থন না দেয়াই প্রমাণ করে।



লিবিয়ার যুদ্ধে তুরস্কের আবির্ভাব তিউনিসিয়ার রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে

লিবিয়াতে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের ঠিক আগেআগে গত বছরের ডিসেম্বরের শেষে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়িপ এরদোগান হঠাত করেই তিউনিসিয়ার রাজধানীতে আবির্ভূত হন। এরদোগানের সাথে বৈঠকের পর তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট সাইয়েদ সাংবাদিকদের বলেন যে, লিবিয়ার সাথে তুরস্কের সমুদ্রসীমা নিয়ে যে চুক্তি হয়েছে, তা ঐ দুই দেশের ব্যাপার এবং তাতে তিউসিয়ার কিছু বলার নেই। অপরদিকে এরদোগান বলেন যে, লিবিয়ার ব্যাপারে আলোচনায় আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া এবং কাতারকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিৎ ছিল, কারণ এই দেশগুলি লিবিয়া সমাজ এবং রাজনৈতিক কাঠামোকে ভালোভাবে বোঝে। এরদোগানের এই সফরের পর তুরস্ক শুধু কথায় নয়, কার্যত তিউনিসিয়াকে লিবিয়ার ব্যাপারে জড়িত হতে বাধ্য করেছে। ‘রয়টার্স’ খবর দিচ্ছে যে, গত ৮ই মে তুরস্কের একটা পরিবহণ বিমান ত্রিপোলির বিমানন্দর অনিরাপদ বলে তিউনিসিয়ার দক্ষিণে লিবিয়ার সীমানার কাছাকাছি জিয়েরবা বিমানবন্দরে অবতরণ করার অনুমতি চায়। তিউনিসিয়া বিমানটাকে নামতে দেয়। এই বিমানে লিবিয়ার জন্যে মেডিক্যাল সামগ্রী ছিল বলে বলা হয়; এবং এই সামগ্রীগুলি লিবিয়া পর্যন্ত পৌঁছে দেবার জন্যে তিউনিসিয়াকে অনুরোধ করা হয়। তিউনিসিয়ার বিরোধী দল ‘ফ্রি দেস্তুরিয়ান পার্টি’র নেতারা অভিযোগ করেন যে, তুরস্ক তিউনিসিয়াকে লিবিয়ার যুদ্ধের লজিস্টিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।

ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত আরেক পত্রিকা ‘আল মনিটর’ বলছে যে, লিবিয়ার যুদ্ধ তিউনিসিয়ার রাজনীতিকে ঘোলাটে করে ফেলেছে। কারণ তিউনিসিয়াতে সকলেই লিবিয়ার যুদ্ধে কোন না কোন পক্ষ নিয়ে কথা বলা শুরু করেছে। তিউনিসিয়ার পার্লামেন্টে বর্তমানে সবচাইতে বেশি আসন দখন করে আছে ‘এননাহদা পার্ট’, যারা মুসলিম ব্রাদারহুডের চিন্তার সাথে একমত পোষণ করে। ‘এননাহদা’ লিবিয়ার যুদ্ধে ত্রিপোলির ‘গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল একর্ড’ বা ‘জিএনএ’ সরকারকে সমর্থন করছে। একইসাথে তুরস্কের ক্ষমতাসীন ‘একে পার্ট’র সাথেও তাদের বেশ ভালো সম্পর্ক রয়েছে। অপরদিকে তিউনিসিয়ায় ২৪ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা এবং ২০১১ সালে ক্ষমতাচ্যুত প্রাক্তন একনায়ক জিনে এল আবিদিন বেন আলির সমর্থকদের থেকে গঠন করা ‘ফ্রি দেস্তুরিয়ান পার্টি’ বা ‘পিডিএল’ লিবিয়ার জেনারেল হাফতারের পক্ষ সমর্থন করছে। তিউনিসের ‘কলাম্বিয়া গ্লোবাল সেন্টার্স’এর প্রধান ইউসেফ শেরিফ বলছেন যে, সকলেই আসলে তিউনিসিয়াকে লিবিয়াতে যাবার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখে। লিবিয়া থেকে সন্ত্রাসীরা যাতে তিউনিসিয়ায় প্রবেশ করতে না পারে, এই অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র তিউনিসিয়ার সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করেছে। তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষক সেইফ এদ্দিন ত্রাবেলসির মতে, লিবিয়াতে ‘জিএনএ’এর সাম্প্রতিক সফলতা তিউনিসিয়ার নিরাপত্তাকে আরও সুসংহত করবে। তিনি বলেন যে, তিউনিসিয়া আর লিবিয়া একই সূত্রে গাঁথা। লিবিয়াতে যা কিছুই ঘটবে, সেটাই তিউনিসিয়াকে প্রভাবিত করবে। লিবিয়ার ঘটনার ব্যাপারে তিউনিসিয়ার জনগণ চিন্তিত থাকবে, এটাই তো স্বাভাবিক। হাফতারের বিরুদ্ধে লিবিয়াতে ‘জিএনএ’র বড় বিজয়ের পরপরই ‘এননাহদা পার্টি’র প্রধান এবং পার্লামেন্টের স্পিকার রাচেদ ঘানুচি ত্রিপোলি সরকারের প্রধান ফায়েজ আল-সারাজকে ফোন করে অভিনন্দন জানান। কিন্তু এই ব্যাপারটা তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদ একেবারেই পছন্দ করেননি। তিউনিসিয়ার সংবিধান অনুযায়ী পররাষ্ট্রনীতি প্রেসিডেন্টের হাতে। সাইয়েদ ঈদ উল-ফিতরের এক বার্তায় জোর গলায় বলেন যে, সকলেরই জানা উচিৎ যে তিউনিসিয়া একটাই এবং এর একজনই প্রেসিডেন্ট।

তিউনিসিয়ার প্রধানমন্ত্রী এলিয়েস ফাখফাখ। দেশের এলিট ক্লাসের বেশিরভাগ ব্যক্তিরই কোন না কোনভাবে ফ্রান্সের সাথে যোগসূত্র রয়েছে। ফাখফাখ ফ্রান্সের লিয়ঁ এবং প্যারিস থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ব্যবসায় বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। তিউনিসিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভেদ এবং অস্থিরতা মানুষকে গণতন্ত্রবিমুখ করে ফেলেছে। মাত্র ৪৮ শতাংশ তিউনিসিয়ান গণতন্ত্রকে সমর্থন করছে; অপরদিকে ৮৩ শতাংশ মনে করে দেশের রাজনীতিতে ইসলামের আদর্শগুলি বাস্তবায়িত থাকা উচিৎ। রাজনীতিবিদেরা জনগণের আস্থায় না থাকলেও সামরিক বাহিনীর উপর আস্থা ৯৫ শতাংশ মানুষের; যা তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক পরিমন্ডলে বিরাট পরিবর্তন এনেছে।



তিউনিসিয়ায় ঔপনিবেশিক শাসক ফ্রান্সের প্রভাব

তিউনিসিয়ার প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শক্তি হওয়ায় সেখানকার রাজনীতিতে ফ্রান্সের প্রভাব ব্যাপক। দেশের এলিট ক্লাসের বেশিরভাগ ব্যক্তিরই কোন না কোনভাবে ফ্রান্সের সাথে যোগসূত্র রয়েছে। ‘পিডিএল’এর প্রতিষ্ঠাতা এবং বেন আলি সরকারের প্রধানমন্ত্রী হামেদ কারুয়ি ফ্রান্সে মেডিসিন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এলিয়েস ফাখফাখ ফ্রান্সের লিয়ঁ এবং প্যারিস থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ব্যবসায় বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইমেদ হাজগুই ফ্রান্সে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। ক্ষমতাসীন কোয়ালিশনের মাঝের দল ‘তাহিয়া তিউনেস’এর নেতা এবং গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইউসেফ চাহেদ ফ্রান্সে কৃষি বিষয়ে পড়াশোনা করেন। বিলিয়নায়ার ব্যবসায়ী, মিডিয়া টাইকুন এবং ২০১৯ সালের প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনে প্রার্থী নাবিল কারুয়ি ফ্রান্সের বিভিন্ন কোম্পানিতে চাকুরি করে ক্যারিয়ার শুরু করেন।

‘পিডিএল’এর নেতা আবির মুসি ৩রা জুন লিবিয়াতে বিদেশী হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে বিল উত্থাপন করেন। বিলটা শেষ পর্যন্ত পাস না হলেও তর্ক বিতর্কের সময় আবির মুসি ‘এননাহদা’র নেতা রাচেদ ঘানুচিকে তুরস্ক এবং কাতারের অনুগত বলে অভিযোগ করেন। এরপর এই বিলের পাল্টা জবাব হিসেবে পার্লামেন্টে ১৯ আসনের অধিকারী দল ‘কোয়ালিশন আল কারামা’ আরেকটা বিল উত্থাপন করে, যা পাস হলে প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শাসক ফ্রান্সের কাছ থেকে ঔপনিবেশিক সময়ের অপরাধের জন্যে ক্ষমা চাইবার দাবি জানানো হবে। ১৪ ঘন্টা তুমুল বাকযুদ্ধের পর সাংসদরা এই বিল রুখে দেয়। ৭৭ জন সাংসদ এই বিলের পক্ষে ভোট দেয়; মাত্র ৫ জন ভোট দেয় বিপক্ষে। কিন্তু ৪৬ জন ভোটদানে বিরত থাকার কারণে বিল পাসের জন্যে দরকার ১’শ ৯ ভোট পাওয়া যায়নি। তবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল যে, মুসলিম ব্রাদারহুডপন্থী ‘এননাহদা’ এই বিল পাসের বিপক্ষে কথা বলে। তারা বলে যে, এই বিল পাস হলে তা তিউনিসিয়ার অর্থনীতিকে আঘাত করবে এবং দেশটার গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপিয় বন্ধুদের দূরে ঠেলে দেবে। ১৮৮১ সাল থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ফ্রান্স তিউনিসিয়ার ঔপনিবেশিক শাসক ছিল। এই বিল পাস না হওয়ায় এখনও তিউনিসিয়ার উপর ফ্রান্সের প্রভাব টের পাওয়া যায়।

তিউনিসিয়াতে ফ্রান্সের কি স্বার্থ রয়েছে?

তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুস্তফা আব্দেলকাবির ‘দ্যা এরাব উইকলি’র সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেন যে, তিউনিসিয়ার ভৌগোলিক অবস্থান ফ্রান্সের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একইসাথে দেশটার কৌশলগত অবস্থান লিবিয়াতে যুদ্ধরত সকল পক্ষের জন্যেই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন যে, লিবিয়াতে তুরস্কের স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের ব্যাপারে কিছু রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে লিবিয়াতে তুরস্কের অবস্থানকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দেয়ায় তা পশ্চিম লিবিয়া নিয়ে ফ্রান্সের পরিকল্পনাকে হুমকির মাঝে ফেলে দিয়েছে। লিবিয়ার সাথে তুরস্কের সমুদ্রসীমার চুক্তি ফ্রান্সের জন্যে সরাসরি হুমকি তৈরি না করার পরেও ফরাসীরা গ্রীস এবং গ্রীক সাইপ্রাসের সাথে ঐকমত্য প্রকাশ করে তুরস্কের বিরুদ্ধাচরণ করেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন লিবিয়ার সমুদ্রসীমায় অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা নিশ্চিত করতে গত ফেব্রুয়ারি মাসে ‘অপারেশন ইরিনি’ নামে এক মিশন শুরুর ঘোষণা দেয়। আমিরাতের ‘দ্যা ন্যাশনাল’ পত্রিকা বলছে যে, ইইউ সদস্য দেশগুলির মাঝে অনৈক্যের কারণে এই মিশন শুরু করাটা খুবই কঠিন হয়েছে। ‘ইরিনি’র অধীনে নৌ মিশনের নেতৃত্বে থাকা ইতালি এখনও ঠিক করতে পারেনি যে, তারা এই মিশনে কিভাবে অংশ নেবে। মে মাসে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী লুইজি ডি মাইও পার্লামেন্টে বলেন যে, ‘ইরিনি’র জন্যে পরিকল্পিত একটা নৌজাহাজ, ৩টা বিমান এবং ৫’শ সামরিক সদস্য মোতায়েনের ব্যাপারটা ইতালি সরকার খতিয়ে দেখছে। আর এই প্রস্তাব পার্লামেন্টের হাউজগুলিতেও অনুমোদন পেতে হবে। বর্তমানে শুধুমাত্র ফ্রান্স এবং গ্রীসই অপারেশন ‘ইরিনি’র অধীনে লিবিয়ার উপকূলে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে। উভয় দেশই লিবিয়াতে তুরস্কের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছে এবং লিবিয়ার সাথে তুরস্কের সমুদ্রসীমা বিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষরের বিরোধিতা করেছে।

গত ১৯শে জুন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু ইতালি ভ্রমণকালে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে ‘অপারেশন ইরিনি’র ব্যাপক সমালোচনা করেন। তিনি বলেন যে, এই মিশনের মাধ্যমে সিরিয়া থেকে লিবিয়ায় যুদ্ধবিমান উড়িয়ে আনাকে বাধা দেয়া হয়নি। আবুধাবি থেকে আকাশপথে অস্ত্র আসার ব্যাপারটাও এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন যে, ‘ইরিনি’ লিবিয়ার সমস্যার কোন সমাধান দেয় না এবং লিবিয়ার উপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞাও নিশ্চিত করেনা। ‘দ্যা এরাব উইকলি’ বলছে যে, ফরাসী এবং গ্রীকদের অবস্থানের কারণেই ন্যাটোকে এই মিশনের অংশ করার মার্কিন এবং তুর্কি চেষ্টা সফল হচ্ছে না। লিবিয়ার জেনারেল হাফতারের অধীন ‘লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’ বা ‘এলএনএ’কে ফ্রান্স সমর্থন দিয়ে চলেছে বলেই ইইউএর মাঝ থেকে হাফতারের বাহিনীর বিরোধিতা করার চেষ্টাকে ফ্রান্স বারংবার বাধাগ্রস্ত করেছে। আব্দেলকাবির বলছেন যে, ২০১১ সালে লিবিয়ার একনায়ক মুয়াম্মার গাদ্দাফির সরকারকে অপসারণের পিছনে ফ্রান্সের সমর্থনই ছিল সবচাইতে জোরালো। তারা মনে করেছিল যে, গাদ্দাফিকে সরানোর পর লিবিয়াতে ফ্রান্সের একটা শক্ত ভিত প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু লিবিয়ার যুদ্ধে অনেকগুলি রাষ্ট্র যুক্ত হওয়ায় ফ্রান্স তার কাংক্ষিত ফলাফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর আফ্রিকা কমান্ডের অপারেশনস ডিরেক্টর ব্র্যাডফোর্ড গেরিং বলছে যে, লিবিয়াতে রুশ সামরিক অবস্থান শক্তিশালী হবার সাথেসাথে তা ইউরোপের দক্ষিণ সীমানার জন্যে হুমকি সৃষ্টি করছে। তথাপি তুরস্কের জন্যে মার্কিন সমর্থন পরিষ্কার হতে থাকায় ফ্রান্স হয়তো লিবিয়াতে রুশ সামরিক অবস্থানের বিপক্ষে কথা নাও বলতে পারে।

তিউনিসিয়ার কৌশলগত অবস্থান ফ্রান্সের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ। তিউনিসিয়ার উত্তর উপকূল থেকে ইতালির দক্ষিণের সিসিলি দ্বীপের উপকূলের দূরত্ব মাত্র ১’শ ৬০ কিঃমিঃ। সিসিলি প্রণালী নামে পরিচিত এই সরু নৌপথের মাঝ দিয়েই ফ্রান্সের সাথে সুয়েজ খাল, তথা ভারত মহাসাগর এবং পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগ। একারণেই ফ্রান্স তিউনিসিয়াকে কাছে রাখতে চাইছে। লিবিয়ার যুদ্ধে তুর্কি সমর্থনে ‘জিএনএ’এর সাম্প্রতিক বিজয়ের পর কৌশলগত এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ তুরস্কের কাছে হারাবার ভয় পেয়ে বসেছে ফ্রান্সকে।



তিউনিসিয়ার ভূকৌশলগত অবস্থান ফ্রান্স ও তুরস্ককে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে


উসমানি খিলাফতের সময় ষোড়শ শতক থেকেই তিউনিসিয়ার সাথে ইস্তাম্বুলের গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। তুরস্ক সেই সম্পর্ককেই আবার জাগিয়ে তুলতে চাইছে। তবে আঙ্কারার সাথে তিউনিসিয়ার মুসলিম ব্রাদারহুডপন্থী ‘এননাহদা পার্টি’র সম্পর্ক যে বাস্তবতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তা জুন মাসে পার্লামেন্টে ফ্রান্সের কাছ থেকে ঔপনিবেশিক সময়ের অপরাধের ক্ষমা চাওয়ার বিলে ‘এননাহদা’র সমর্থন না দেয়াই প্রমাণ করে। তথাপি এই বিল তিউনিসিয়ার জনগণের ঔপনিবেশিক সময়ের প্রতি ঘৃণা এবং ঔপনিবেশিক সময় থেকে টেনে আনা সম্পর্কের ইতি টানার ইচ্ছেরই বহিঃপ্রকাশ; যা কিনা ফ্রান্সকে বিচলিত করেছে। তিউনিসিয়ার সামরিক বাহিনীর দ্রুত উন্নয়ন, জনগণের মাঝে তাদের জনপ্রিয়তা এবং তাদের সাথে তুরস্কের সম্পর্কের ব্যাপারটাও ফ্রান্সকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। কারণ এতে লিবিয়ায় তুরস্কের সামরিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

তিউনিসিয়ার কৌশলগত অবস্থান ফ্রান্সের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ। তিউনিসিয়ার উত্তর উপকূল থেকে ইতালির দক্ষিণের সিসিলি দ্বীপের উপকূলের দূরত্ব মাত্র ১’শ ৬০ কিঃমিঃ। সিসিলি প্রণালী নামে পরিচিত এই সরু নৌপথ ভূমধ্যসাগরের পূর্ব এবং পশ্চিম ভাগকে যুক্ত করেছে। আর এর মাঝ দিয়েই ফ্রান্সের সাথে সুয়েজ খাল, তথা ভারত মহাসাগর এবং পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগ। একারণেই ফ্রান্স তিউনিসিয়াকে কাছে রাখতে চাইছে। লিবিয়ার যুদ্ধে তুর্কি সমর্থনে ‘জিএনএ’এর সাম্প্রতিক বিজয়ের পর কৌশলগত এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ তুরস্কের কাছে হারাবার ভয় পেয়ে বসেছে ফ্রান্সকে। আর একইসাথে ইতালিকে পাশে না পাওয়ায় ফ্রান্সের হতাশা চরমে পৌঁছেছে। তুরস্কের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র গ্রীসকে সাথে করেই ফ্রান্স লিবিয়ার উপকূল পাহাড়া দেবার যে মিশনে মনোনিবেশ করেছে, তা ইতোমধ্যেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, যখন গত ১০ই জুন লিবিয়ার উপকূলে ফরাসী এবং তুর্কি যুদ্ধজাহাজের মাঝে অসৌজন্যমূলক পরিস্থিতির সূচনা হয়। তুরস্ক যদি লিবিয়াতে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনে মনোযোগী হয়, আর ফ্রান্স ও গ্রীস যদি তুরস্ককে একাজে বাধা দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকে, তাহলে সামনের দিনগুলিতে দুই পক্ষের মাঝে সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়তে থাকবে।