Showing posts with label arms competition. Show all posts
Showing posts with label arms competition. Show all posts

Friday, 8 September 2023

ভারত মিয়ানমারকে শক্তিশালী করছে কেন?

০৮ই সেপ্টেম্বর ২০২৩

মিয়ানমারের প্রথম ফ্রিগেট 'অংজেয়া' ২০১৬ সালে ভারতের বিশাখাপত্নম সফরে। জাহাজের উপরে ভারতে তৈরি রাডার দৃশ্যমান। এই রাডার এবং এর সাথে সোনার ও এন্টি-সাবমেরিন টর্পেডো মিয়ানমারের এই জাহাজগুলিকে যথেষ্ট শক্তিশালী করেছে; যা কিনা চোরাচালান বা সন্ত্রাস দমনে নয়, বরং অন্য রাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সাথে যুদ্ধে ব্যবহৃত হবে।

মিয়ানমারকে কে অস্ত্র দিচ্ছে না? তবে এক্ষেত্রে ভারত যে একটা উদ্দেশ্য নিয়ে এগুচ্ছে, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। ভারত মূলতঃ অস্ত্র আমদানিকারক দেশ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তারা কিছু অস্ত্র রপ্তানি শুরু করেছে। ‘স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পীস রিসার্চ ইন্সটটিউট’ বা ‘সিপরি’র হিসেবে ভারত ২০০৮ থেকে ২০২২এর মাঝে ৫’শ ১৩ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র রপ্তানি করেছে। এর মাঝে সর্বোচ্চ ২’শ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩৯ শতাংশ তারা রপ্তানি করেছে মিয়ানমারে। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে শ্রীলংকা (১৮ শতাংশ) এবং মরিশাস (১৫ শতাংশ)। শুধুমাত্র ২০২০ সালেই ভারত মিয়ানমারের কাছে ১’শ ৪৮ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেছে। ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মাঝে মিয়ানমার ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি অস্ত্র আমদানি করেছে। এর মাঝে বেশিভাগটাই বা ৪৯ শতাংশ এসেছে চীন থেকে; যা অবাক কোন ব্যাপার নয়। কারণ চীন কয়েক যুগ ধরেই মিয়ানমারের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এসেছে রাশিয়া থেকে; ১৮ শতাংশ। তবে ২০০৮ থেকে ২০২২এর মাঝে হিসেব করলে তা ৩৫ শতাংশ। তৃতীয় সর্বোচ্চ এসেছে ভারত থেকে; যা ১৪ শতাংশ। ২০১৪ সাল পর্যন্তও ভারত মিয়ানমারের অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশগুলির মাঝে কোন অবস্থানেই ছিল না। ২০০৮ থেকে ২০১৪এর মাঝে মিয়ানমার মোট ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি অস্ত্র আমদানি করেছিল; যার মাঝে চীন থেকে এসেছিল ৫০ শতাংশ এবং রাশিয়া থেকে ৪২ শতাংশ। ভারত থেকে এসেছিল মাত্র ১ শতাংশ।

মিয়ানমারকে অস্ত্র সরবরাহ করা ভারতের কৌশলগত চিন্তার অংশ

২০১৪ সালে ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে মিয়ানমারের সাথে ভারতের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় ওঠে এবং মিয়ানমারে অস্ত্র রপ্তানি নতুন এক চেহারা পায়। একারণেই ২০১৬-১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে গণহত্যা চালাবার পর ১০ লক্ষ মুসলিম শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশের সময় ভারতের অবস্থান ছিল সরাসরিভাবে মিয়ানমারের পক্ষে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৫ সালে প্রথমবার এবং ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয়বার মিয়ানমার সফর করেন। দ্বিতীয় সফর উপলক্ষে ভারতের ‘ইকনমিক টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, রাখাইনে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর উপর সন্ত্রাসী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ভারত মিয়ানমারের সাথে নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বৃদ্ধি করতে চাইছে। মোদির মিয়ানমার সফরের অল্প কিছুদিন আগেই ২০১৭ সালের জুলাই মাসে মিয়ানমারের সামরিক শাসক জেনারেল মিন অং হিলাইং ৮ দিনের জন্যে ভারত সফর করেন। ‘দ্যা ইকনমিক টাইমস’ বলে যে, মিয়ানমার জেনারেলের এই ভারত সফরের আগেই ভারত মিয়ানমারকে যেসকল অস্ত্র সরবরাহ করছিল, তার মাঝে ছিল ১০৫মিঃমিঃ আর্টিলারি কামান, রকেট লঞ্চার, রাইফেল, রাডার, মর্টার, বেইলি ব্রিজ, কমিউনিকেশন যন্ত্রপাতি, নাইট ভিশন ডিভাইস, ওয়ার-গেমিং সফটওয়্যার, রাস্তা তৈরির যন্ত্রপাতি, নৌবাহিনীর গানবোট, সোনার, একুস্টিক ডোম, ডিরেক্টিং গিয়ার, ইত্যাদি। এবং সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ৩৮ মিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে মিয়ানমারকে সাবমেরিন ধ্বংসী টর্পেডো সরবরাহ করছে ভারত। দুই দেশের মাঝে উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক, সামরিক এবং বেসামরিক নেতৃবর্গের সফরের সংখ্যাও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের নৌবাহিনী নিয়মিতভাবে মিয়ানমার সফর করছে এবং একত্রে যৌথ মহড়ার আয়োজন করছে। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে জেনারেল হিলাইং আবারও দিল্লী সফর করেন এবং সেই সফরে দুই দেশের মাঝে সামরিক সহযোগিতার এক সহঝোতা সাক্ষরিত হয়।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর ২০২২এর ২৭শে অক্টোবর ভারতীয় সরকারি কোম্পানি ‘ইয়ানত্রা ইন্ডিয়া’র পশ্চিমবঙ্গের ইশাপুরের মেটাল এন্ড স্টীল ফ্যাক্টরিতে তৈরি ২০টা ১২২মিঃমিঃ কামানের ব্যারেলের প্রথম চালান মিয়ানমারে আনুষ্ঠানিকভাবে সরবরাহ করা হয়। ২০২২এর মে মাসে, অর্থাৎ অভ্যুত্থানের পরেই মিয়ানমারের সামরিক সরকারের কাছ থেকে এই অস্ত্রের অর্ডার নেয় ভারত, যার অংক ছিল প্রায় ৩ লক্ষ ৩০ হাজার ডলার। ২০২৩এর মে মাসে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ভারতের ২২টা আলাদা কোম্পানি মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। এই কোম্পানিগুলির মাঝে রয়েছে সরকারি কোম্পানি ‘ভারত ডাইনামিক্স’, ‘ভারত ইলেকট্রনিক্স’ এবং ‘ইয়ানত্রা ইন্ডিয়া’। বেসরকারি কোম্পানিগুলির মাঝে রয়েছে ‘সান্দীপ মেটালক্রাফট’ এবং ‘লারসেন এন্ড টুব্রো’। এই অস্ত্রগুলির মাঝে গুরুত্বপূর্ণগুলির মাঝে রয়েছে বিভিন্ন সার্ভেইল্যান্স যন্ত্র, আর্টিলারি এবং ক্ষেপণাস্ত্র বা এর যন্ত্রাংশ। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ভারতের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেবার কথা না বলে বরং ভারত সরকারকে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে চিন্তা করতে আহ্বান জানানো হয়। ভারত সরকার জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনের জবাবে বলে যে, ভারত মিয়ানমারের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র সরবরাহকারী নয়। আর মিয়ানমারকে বর্তমানে সরবরাহ করা অস্ত্রগুলি সামরিক অভ্যুত্থানের আগেই গণতান্ত্রিক সরকার থাকার সময়েই সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। আর এই অস্ত্র সরবরাহ ভারতের নিজস্ব নিরাপত্তা চিন্তার একটা অংশ।

 
মিয়ানমারের সামরিক কর্মকর্তারা ভারতের সোনার ফ্যাক্টরি ভিজিট করছেন। ভারত বলছে যে, মিয়ানমারকে সরবরাহ করা অস্ত্র ভারতের নিজস্ব নিরাপত্তা চিন্তার একটা অংশ।

পশ্চিমারাও মিয়ানমারে ভারতীয় অস্ত্র সরবরাহের সাথে জড়িত

‘দ্যা ওয়্যার’এর এক প্রতিবেদনে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গ্রুপগুলির বৈশ্বিক বাণিজ্য তথ্যের ভান্ডার ‘পাঞ্জিভা’র ডাটাবেসের উপর গবেষণার বরাত দিয়ে বলা হয় যে, ২০২২এর নভেম্বর থেকে ২০২৩এর এপ্রিল পর্যন্ত ৬ মাসে ভারতের সরকারি কোম্পানি ‘ভারত ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড’ বা ‘বিইএল’ মিয়ানমারে ৫ মিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি করেছে। এই সরঞ্জামগুলি মোট ৭টা শিপমেন্টে আলাদাভাবে পাঠানো হয়েছে; যার ৩টা মিয়ানমার সরকারকে সরাসরি পাঠানো হয়েছে; আর বাকিগুলির মাঝে ৩টা ‘মেগা হিল জেনারেল ট্রেডিং’এর এবং ১টা ‘এলায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস’এর হাত ঘুরে মিয়ানমার সারকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। ‘বিইএল’এর প্রধান শেয়ারহোল্ডার ভারত সরকার হলেও এতে মার্কিন এবং কানাডিয় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে; যার মাঝে রয়েছে মার্কিন কোম্পানি ‘গোল্ডমান সাক্স’, বিনিয়োগ জায়ান্ট ‘ভ্যানগার্ড’ ও ‘ব্ল্যাকরক’; রয়েছে ‘কানাডা পেনশন প্ল্যান’, ‘ক্যালিফোর্নিয়া পাবলিক এমপ্লয়িজ রিটায়ারমেন্ট সিস্টেম’ এবং ‘ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট টিচার্স রিটায়ারমেন্ট সিস্টেম’। অর্থাৎ শুধু ভারত সরকারই নয়, ভারতের সামরিক শিল্পে বিনিয়োগকারী পশ্চিমারাও মিয়ানমারে অস্ত্র সরবরাহের সাথে জড়িত। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে ২০২২এর ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারত মিয়ানমারকে কমপক্ষে ৫১ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সরবরাহ করেছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয় একই সময়ে বহু কোম্পানির নামে সিঙ্গাপুর থেকে ২’শ ৫৪ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে; থাইল্যান্ড থেকে সরবরাহ করা হয়েছে আরও ২৮ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র। এই সময়ে মিয়ানমারের মোট অস্ত্র আমদানি ছিল প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের। এই অস্ত্রের বাণিজ্য সম্ভব হচ্ছে, কারণ জাতিসংঘের কোন সদস্য রাষ্ট্র ‘মিয়ানমার ফরেন ট্রেড ব্যাংক’ বা ‘এমএফটিবি’র উপর অবরোধ দেয়নি। এই ব্যাংক ব্যবহার করেই মিয়ানমার খুব সহজেই অস্ত্র কেনার পেমেন্ট দিতে পারছে।

পশ্চিমারা কখনোই মিয়ানমারকে ভারতের সরবরাহকৃত অস্ত্রের সাথে নিজেদের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করতে পারে না। ভারত যেসকল অস্ত্র নিজেরা তৈরি করে, তার অনেকগুলিই পশ্চিমা কোম্পানিগুলির কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়ে তৈরি করা । অর্থাৎ এগুলি অন্য কারুর কাছে রপ্তানি করতে হলে সেই কোম্পানির কাছ থেকে অনুমতি লাগবে। আর সেই কোম্পানি যেই দেশে অবস্থিত, সেই দেশের রাজনৈতিক অনুমোদন ছাড়া তারা ভারতকে অস্ত্র রপ্তানির অনুমতি দেবে না। এটা পশ্চিমা দেশগুলির রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ভারত এই প্রক্রিয়ার অধীনে একটা দেশ মাত্র। মিয়ানমার সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের ওয়েবসাইট ‘জাস্টিস ফর মিয়ানমার’ তথ্য প্রকাশ করে যে, ২০১৯ সালে ভারতীয় কোম্পানি ‘সান্দীপ মেটালক্রাফট’ মিয়ানমারে সুইডিশ ৮৪মিঃমিঃ এন্টি-ট্যাঙ্ক অস্ত্র ‘এম৪ কার্ল গুস্তাফ’এর জন্যে ফিউজ সরবরাহ করেছে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পরেও খুব সম্ভবতঃ আরেকটা শিপমেন্ট গিয়েছে মিয়ানমারে। ২০২৩এর ২৯শে মার্চ সুইডিশ পার্লামেন্টে পররাষ্ট্রমন্ত্রী টোবিয়াস বিলিস্ট্রোমকে এব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন যে, সুইডেন ভারতের কাছে ‘এম৪ কার্ল গুস্তাফ’ এন্টি-ট্যাঙ্ক অস্ত্র রপ্তানি করেছিল এবং ২০২২ সালে সুইডিশ কোম্পানি ‘সাব’ ভারতে এই অস্ত্রের কারখানা স্থাপন করে। এর মাঝ থেকে কিছু অস্ত্র মিয়ানমারের কাছে যেতে থাকতে পারে। ২০১২ সালে এব্যাপারে একটা তদন্ত হয়েছিল এবং সেই তদন্তে উঠে এসেছিল যে, ভারত তাদের লাইসেন্সের শর্ত মেনে চলছে। তবে ২০১২ সালের পর আর কোন তদন্ত হয়নি। অর্থাৎ গত এক দশকে ভারত এই অস্ত্রগুলি মিয়ানমারের কাছে বিক্রি করেছে কিনা, সেব্যাপারে সুইডিশ সরকারের খুব বেশি একটা মাথাব্যাথা নেই।

 
মিয়ানমারের সাবমেরিন-চেজারের উপর ভারতে তৈরি 'শায়েনা' টর্পেডোর লঞ্চার। বাংলাদেশেও অনেকেই বিদেশী মিডিয়ার রিপোর্টিংএর সাথে তাল মিলিয়ে বলছেন যে, ভারত মিয়ানমারকে অস্ত্র দিচ্ছে চীনকে ব্যালান্স করার জন্যে। কিন্তু তারা পুরোপুরিভাবে এড়িয়ে যাচ্ছেন যে, এই অস্ত্র কাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে। মিয়ানমারকে ভারত চোরাচালান ও সন্ত্রাস দমনে অত্যাধুনিক রাডার, সোনার, টর্পেডো এবং সাবমেরিন সরবরাহ করছে - এই কথাগুলি বিশ্বাস করা উন্মাদীয়।

মিয়ানমারের জন্যে ভারতীয় অস্ত্রের ধরণ আলাদা

তবে মিয়ানমারে সরবরাহ করা ভারতীয় অস্ত্রের ধরণ বেশ কিছুটাই অন্যরকম। ২০১৩ সালে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘জেনস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, সেবছরের জানুয়ারি মাসে ভারতীয় কোম্পানি ‘বিইএল’ মিয়ানমার নৌবাহিনীর জন্যে রাডার এবং সোনার সরবরাহের চুক্তি করে। এর মাঝে রয়েছে ৩টা ‘আরএডব্লিউএল-০২ মার্ক৩’ এল-ব্যান্ডের টু-ডি লং-রেঞ্জ রাডার; যা কিনা ডাচ কোম্পানি ‘সিগনাল’এর ডিজাইন করা ‘এলডব্লিউ-০৮’ রাডারের লাইসেন্স কপি। এছাড়াও এই চুক্তির মাঝে রয়েছে ন্যাভিগেশন রাডার এবং সাবমেরিন খোঁজার সোনার। এই সোনার খুব সম্ভবতঃ ‘এইচইউএমএসএ’ বা ‘হুমসা’ সোনার সিস্টেম। এটাও পশ্চিমা টর্পেডোর আদলে ভারতীয় ডেভেলপমেন্ট। এগুলি মিয়ানমারের ফ্রিগেটগুলিতে লাগানো হবে। এই চুক্তির আগেই মিয়ানমারের প্রথম ফ্রিগেট ‘অংজেয়া’র উপর ভারতে তৈরি ‘আরএডব্লিউএল-০২’এর আগের ভার্সনের একটা রাডার লাগানো হয়েছে। দ্বিতীয় ফ্রিগেটটা ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে পানিতে ভাসানো হয়েছিল। আর তৃতীয় ফ্রিগেটটা ২০১০ সালে কাজ শুরু হয়ে ২০১২ সাল নাগাদ পানিতে ভাসানোর জন্যে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। ‘জেনস’এর ধারণা ছিল যে, হয়তো মিয়ানমার তিনটা নতুন ফ্রিগেট তৈরি করছে; যেগুলির জন্যে এই রাডারগুলি কিনেছে তারা। তবে পরবর্তীতে দেখা যায় যে, ২০১৬ সাল নাগাদ মিয়ানমারের তৃতীয় কর্ভেট ‘তাবিনশোয়েহতি’তে এই একই রাডার শোভা পায়। মিয়ানমারে এই রাডারের রপ্তানি বিষয়ে ডাচ কোম্পানি পর্যন্ত ব্যাপারটা গড়ালেও প্রকৃতপক্ষে তা ছিল সময়ক্ষেপণ মাত্র। পত্রিকায় সমালোচনা সত্ত্বেও ভারত রাডারগুলি মিয়ানমারকে ডেলিভারি দিয়ে যেতে থাকে এবং ইউরোপ থেকেও ভারতের উপরে কোনরূপ নিষেধাজ্ঞা আসেনি।

২০১৯এর ১২ই জুলাই ভারতীয় কোম্পানি ‘ভারত ডাইনামিক্স লিমিটেড’ বা ‘বিডিএল’ ঘোষণা দেয় তারা মিয়ানমারকে তাদের নিজস্ব ডেভেলপ করা ‘শায়েনা’ এন্টি-সাবমেরিন টর্পেডোর ডেলিভারি দিয়েছে। ভারতীয় বিশ্লেষণধর্মী ম্যাগাজিন ‘দ্যা ডিপ্লোম্যাট’ বলছে যে, এই ডেলিভারি ২০১৭ সালের ৩৮ মিলিয়ন ডলারের অর্ডারের অংশ। তবে ঘোষণার আগেই ২০১৯ সালের মে মাসে মিয়ানমার নৌবাহিনীর মহড়ায় তাদের ফ্রিগেট ‘কায়ান সিত্তার’ এবং ‘সিন ফায়ু শিন’এ উপর এই ভারতীয় টর্পেডো দেখা যেতে থাকে। এই একই টর্পেডো দেখা যায় মিয়ানমারের দু’টা সাবমেরিন চেজার জাহাজে; যেগুলি ২০২০এর ডিসেম্বরে কমিশনিং করা হয়। প্রতিপক্ষের সাবমেরিন ধ্বংসের জন্যে এগুলির একেকটাতে ৬টা করে টর্পেডো লঞ্চার যুক্ত করা হয়। তবে সেই দিনের সবচাইতে বড় আলোচ্য বিষয় ছিল মিয়ানরের প্রথম সাবমেরিনের কমিশনিং। রাশিয়ায় তৈরি ‘কিলো-ক্লাস’এর সাবমেরিন হলেও ভারতীয় নৌবাহিনী তাদের ব্যবহারের পর এই সাবমেরিন মিয়ানমারকে উপহার হিসেবে দেয়।

চোরাচালান এবং সন্ত্রাস দমনে রাডার, সোনার, টর্পেডো এবং সাবমেরিন?

ভারতীয় বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, মিয়ানমারের উপকূলে মৎস্য সম্পদ পাহাড়া দিতে, চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে এবং সন্ত্রাসী দমনে ভারত মিয়ানমার নৌবাহিনীকে সহায়তা দিচ্ছে। এবং একইসাথে তারা বলছেন যে, ভারত মিয়ানমারকে অস্ত্র সরবরাহ করার মাধ্যমে সেই দেশে চীনের প্রভাবকে ব্যালান্স করছে। কিন্তু সমস্যা হলো, তারা ব্যাখ্যা দিচ্ছেন না কিভাবে ভারতের এয়ার ডিফেন্স রাডার, সাবমেরিন খোঁজার সোনার এবং এন্টি-সাবমেরিন টর্পেডো মিয়ানমারের চোরাচালান ও সন্ত্রাসী দমনে সহায়তা করবে। তারা এ-ও ব্যাখ্যা করছেন না যে, মিয়ানমার নৌবাহিনীর জাহাজে অত্যাধুনিক রাডার, সোনার এবং টর্পেডো বসালে কোন পদ্ধতিতে মিয়ানমারের উপকূল থেকে চীন বিতাড়িত হবে। মিয়ানমারকে ভারত যে সাবমেরিন দিয়েছে, সেটাই বা কিভাবে মিয়ানমারের মৎস্য সম্পদ রক্ষা করবে এবং চীনের প্রভাবকে কমাবে, সেটাও তারা পরিষ্কার করেননি। যতোই উদ্ভট হোক না কেন, এই যুক্তিগুলিই ভারতীয়রা দিচ্ছেন এবং পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা এই যুক্তিগুলিই তুলে ধরছেন তাদের বিশ্লেষণে এবং একইসাথে পশ্চিমা মিডিয়াগুলিও এই কথাগুলিই কপি-পেস্ট করছে!

বাংলাদেশেও অনেকেই বিদেশী মিডিয়ার রিপোর্টিংএর সাথে তাল মিলিয়ে বলছেন যে, ভারত মিয়ানমারকে অস্ত্র দিচ্ছে চীনকে ব্যালান্স করার জন্যে। কিন্তু তারা পুরোপুরিভাবে এড়িয়ে যাচ্ছেন যে, এই অস্ত্র কাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে। মিয়ানমারকে ভারত চোরাচালান ও সন্ত্রাস দমনে অত্যাধুনিক রাডার, সোনার, টর্পেডো এবং সাবমেরিন সরবরাহ করছে - এই কথাগুলি বিশ্বাস করা উন্মাদীয়। একইসাথে যখন মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে অস্ত্র সরবরাহ করার জন্যে ভারতের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের কোন উচ্চবাচ্য নেই, তখন পশ্চিমারা বাংলাদেশের কক্সবাজারে অবস্থানরত মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত মুসলিম শরণার্থীদেরকে ফেরত পাঠাতে ‘বাংলাদেশের সাথে আছে’ - এই কথাগুলি শুধু হাস্যকরই নয়, বরং কপটতার স্বাক্ষর। ভারতের মতোই বঙ্গোপসাগরে পশ্চিমা প্রতিটা দেশের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। আর সেই স্বার্থের কেন্দ্রে রয়েছে বঙ্গোপসাগর তথা ভারত মহাসাগরে ভারত ব্যাতীত কোন সামরিক শক্তি, বিশেষ করে নৌশক্তির আবির্ভাবকে নিয়ন্ত্রণ করা। সেই লক্ষ্যে তারা একদিকে যেমন চীনা নৌবাহিনীর ভারত মহাসাগরে বিচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, ঠিক তেমনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ডেভেলপমেন্ট নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এই দুই লক্ষ্য একত্র হচ্ছে মিয়ানমারের রাখাইনে; যেখানে রয়েছে চীনা গভীর সমুদ্র বন্দর, মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং বাংলাদেশের সমুদ্রতট ও সমুদ্রবন্দরের নৈকট্য। বাংলাদেশকে মিয়ানমারের সাথে সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে বঙ্গোপসাগরে একটা নৌশক্তির উত্থান ঠেকাতে চাইছে ভারত এবং তার পেছনে থাকা পশ্চিমা শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলি। মিয়ানমারে বাংলাদেশ সংঘাতে জড়ালে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সাথে চীনের সম্পর্ক খারাপ হবে এবং চীন বাংলাদেশের শত্রু রাষ্ট্রে পরিণত হবে। এহেন পরিস্থিতিতে ভারত এবং পশ্চিমারা বাংলাদেশের কাছে অস্ত্র বিক্রিতে এগিয়ে আসবে, যাতে করে বাংলাদেশী সেনারা নিজেদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে ভারত মহাসাগরে চীনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণকে নিজেদের লক্ষ্য হিসেবে ঠিক করে নেয়। মিয়ানমারের তথাকথিত মানবাধিকারের ধোঁয়াশা ভেদ করে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলির এই ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্য বেরিয়ে আসছে; যা এখন এড়িয়ে যাবার কোন পদ্ধতিই নেই।




সূত্রঃ



‘India supplying fuzes to Myanmar military, deepening complicity in its atrocity crimes’ in Justice for Myanmar, 15 July 2022 (https://www.justiceformyanmar.org/stories/india-supplying-fuzes-to-myanmar-military-deepening-complicity-in-its-atrocity-crimes)

‘Swedish Arms Exported to Myanmar via India Despite EU Embargo: JFM’ in Irrawaddy, 21 June 2023

‘PM Narendra Modi's visit to expand strategic and economic footprint in Myanmar’ in The Economic Times, 31 August 2017

‘India rolls out the red carpet for Myanmar military chief, with an eye firmly on China’ in The Economic Times, 08 July 2017

‘India and Myanmar Sign Mou on Defence Co-Operation’ in Ministry of Defence, India, 29 July 2019 (https://pib.gov.in/PressReleasePage.aspx?PRID=1580637)

‘India supporting Myanmar junta atrocities through supply of gun barrels’ in Justice for Myanmar, 01 March 2023 (https://www.justiceformyanmar.org/stories/india-supporting-myanmar-junta-atrocities-through-supply-of-gun-barrels)

‘How India is supporting Myanmar's military with arms’ in DW, 25 May 2023

‘China, Russia arming Myanmar junta: UN rights expert’ in DW, 22 February 2022

‘Indian PSU Sold Arms, Equipment Worth Over $5 Million to Myanmar Junta in 6 Month Period: Report’ in The Wire, 21 June 2023

‘‘Death trade’. India supplied ₹422 crore worth arms to Myanmar junta: UN’ in The Hindu Business Line, 19 May 2023

‘Indian Torpedoes Delivered to Myanmar Navy’ in The Irrawaddy, 15 July 2019 (https://www.irrawaddy.com/news/burma/indian-torpedoes-delivered-myanmar.html)

‘India Delivers Initial Batch of Indigenously Built Torpedoes to Myanmar Navy’ in The Diplomat, 16 July 2019

‘India to Supply Torpedoes to Myanmar’ in The Diplomat, 31 March 2017

‘Indian manufacturer continues supplying vital technology to Myanmar junta, arms brokers’ in Myanmar Now, 22 June 2023 (https://myanmar-now.org/en/news/indian-manufacturer-continues-supplying-vital-technology-to-myanmar-junta-arms-brokers/)

‘India's BEL Signs Sensor Deal with Myanmar Navy’ by Janes quoted in Defense Studies, 14 March 2013 (http://defense-studies.blogspot.com/2013/03/indias-bel-signs-sensor-deal-with.html)

‘Myanmar Navy has commissioned seven new warships and one submarine’ in Navy Recognition, 26 December 2020

‘The Kilo impact’ by Commodore (ret) Mohammad Abdur Razzak, in New Age, 19 November 2020 (https://www.newagebd.net/article/121954/the-kilo-impact)

Wednesday, 23 June 2021

বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ছে কেন?

২৪শে জুন ২০২১
ছবিঃ মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে সামরিক বাহিনীর গণহত্যা চালাবার ফলে ১১ লক্ষ মুসলিম রোহিঙ্গা শরণার্থী এখন বাংলাদেশে অবস্থান করছে। কাজেই স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের কাছে এই শরণার্থীদের ফেরত যাওয়া সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ; দেশটাতে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা নয়। রোহিঙ্গা ইস্যুতে পশ্চিমাদের নিষ্ক্রিয় অবস্থান মিয়ানমারকে শক্তিশালী করছে। তবে শুধু মিয়ানমার বিষয়ে জাতিসংঘের ভোটাভুটিই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক বেশকিছু ইস্যুতে বাংলাদেশের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে আলোচনায় এসেছে।


গত ১৮ই জুন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মিয়ানমার নিয়ে ভোটাভুটি হয়ে গেল। পরিষদ ভোটাভুটির মাধ্যমে মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে গণতান্ত্রিক নির্বাচন মেনে নিতে বলে এবং রাজবন্দীদের মুক্তি দিতে আহ্বান জানায়। ১’শ ১৯টা ভোট পড়ে পরিষদের রেজোলিউশনের পক্ষে; বিপক্ষে ভোট দেয় শুধুমাত্র বেলারুশ। তবে আরও ৩৬টা দেশ ভোটদান থেকে বিরত থাকে। বিরত থাকা দেশগুলির মাঝে গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে রয়েছে চীন, রাশিয়া, ভারত, পাকিস্তান, ইরান, মিশর, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, আলজেরিয়া। ভারতীয় পররাষ্ট্র দপ্তরের বরাত দিয়ে ‘ইকনমিক টাইমস’ জানাচ্ছে যে, ভারত সরকার মনে করছে যে, মিয়ানমারের প্রতিবেশীদের নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা উচিৎ। রেজোলিউশনে সেটা উঠে না আসার কারণেই ভারত ভোটদানে বিরত থাকে। ভারত এবং চীন ছাড়াও মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, নেপাল এবং ভুটানও ভোটদানে বিরত থাকে। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা হিসেবে বলা হয় যে, রেজোলিউশনে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যার বিষয়টা সঠিকভাবে প্রতিফলিত না হওয়ায় তারা ভোট দেয়নি। ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, যদিও সাধারণ পরিষদের রেজোলিউশন মানার কোন বাধ্যবাধকতা নেই, এবং সাধারণ পরিষদের ভোটাভুটির তুলনায় ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদের ক্ষমতা বেশি, তথাপি নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়া এবং চীনের ভেটো দেয়ার এখতিয়ার রয়েছে বিধায় সেখান থেকে মিয়ানমার ইস্যুতে কোন রেজোলিউশন পাস করানো কঠিন। ভোটাভুটিতে গণতন্ত্র রক্ষার মতো আদর্শিক ইস্যু মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশগুলির বাস্তবতার সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে সামরিক বাহিনীর গণহত্যা চালাবার ফলে ১১ লক্ষ মুসলিম রোহিঙ্গা শরণার্থী এখন বাংলাদেশে অবস্থান করছে। কাজেই স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের কাছে এই শরণার্থীদের ফেরত যাওয়া সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ; দেশটাতে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা নয়।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, রেজোলিউশনে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে কোন সুপারিশ বা কর্মকান্ডই ছিল না। এমনকি শরণার্থীদের নিরাপদে প্রত্যাবাসনের জন্যে উপযোগী পরিবেশ তৈরি করার বিষয়েও কোন কথাই সেখানে বলা হয়নি। জাতিসংঘে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা বলেন যে, রেজোলিউশনে বাংলাদেশ অসন্তুষ্ট এবং এর মাধ্যমে একটা ভুল বার্তা দেয়া হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোনকিছু না বলায় তা মিয়ানমারকে শক্তিশালী করছে। শুধু মিয়ানমার বিষয়ে ভোটাভুটিই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক বেশকিছু ইস্যুতে বাংলাদেশের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে আলোচনায় এসেছে।

মে মাসের শেষের দিকে বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কার সাথে ২’শ মিলিয়ন ডলারের মুদ্রা বিনিময়ের চুক্তি করে। এই চুক্তি মোতাবেক বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমপরিমাণ শ্রীলঙ্কার মুদ্রা নিজেদের কাছে রাখবে; বিনিময়ে শ্রীলঙ্কাকে ডলার দেবে। শ্রীলঙ্কা সরকারের ব্যাপক ডলার ঘাটতির এই সময়ে এটা প্রকৃতপক্ষে একটা বৈদেশিক মুদ্রার ঋণ। ভারতীয় পত্রিকা ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ বাংলাদেশের এই কর্মকান্ডকে দেশটার উঠতি অর্থনীতির ফলাফল হিসেবে উল্লেখ করে একটা প্রতিবেদন তৈরি করে। প্রতিবেদনে বলা হয় যে, বাংলাদেশের অর্থনীতি দুই দশক ধরে ৬ শতাংশের বেশি হারে বেড়েছে এবং এখন দেশটার মাথাপিছু আয় ভারতের চাইতে বেশি। মাথাপিছু আয় ভারতের যখন ১৯’শ ৪৭ ডলার, তখন বাংলাদেশের তা ২২’শ ২৭ ডলার। পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় আরও কম; ১৫’শ ৪৩ ডলার। ‘দ্যা হিন্দু’ পত্রিকা বলছে যে, করোনা মহামারির কারণে শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রার আয় এবং রিজার্ভ একেবারেই কমে গেছে। ফলশ্রুতিতে দেশটা তার বৈদেশিক ঋণ ফেরত দিতে হিমসিম খাচ্ছে। এবছরের এপ্রিল মাসে শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়ায় সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারে; যা এবছরের বৈদেশিক ঋণ শোধ করতেই চলে যাবার কথা। ২০২০ সালের মে মাসে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষে ভারতের কাছে ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের মুদ্রা বিনিময়ের অনুরোধ করেছিলেন; ভারত এক বছরেও সেটা নিশ্চিত করেনি। অপরপক্ষে বাংলাদেশ মাত্র দুই মাসের মাঝে এই অর্থের সংকুলানের ব্যবস্থা করেছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০১০ সালে ৯ বিলিয়ন থেকে ২০২১ সাল নাগাদ ৪৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

সকলেই বাংলাদেশকে পাশে চাইছে

অস্ট্রেলিয়ার প্রভাবশালী থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘লোয়ি ইন্সটিটিউট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বাংলাদেশ একটা অতি দরিদ্র দেশ থেকে আঞ্চলিক প্রভাবশালী দেশে পরিণত হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, নিজেদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি আঞ্চলিকভাবে বাংলাদেশকে কি ধরনের ভূমিকায় অবতীর্ণ করাবে, তা এখন আলোচ্য বিষয়। শক্তিশালী দেশগুলি বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কোন্নয়নে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ‘কোয়াড’এ যোগ দেয়ার সম্ভাবনার বিষয়ে বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যের জের ধরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিবাদকে তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয় যে, বাংলাদেশ আদৌ কখনোই ‘কোয়াড’এ যোগ দেবে বলে যেমন মনে হচ্ছে না, তেমনি চীনের হুমকির সামনেও বাংলাদেশ নত হবার সম্ভাবনা নেই; যদিও চীন বাংলাদেশের অতি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সহযোগী। শ্রীলঙ্কাকে ঋণ দেয়ার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এখনও পরিষ্কার নয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। তবে সেখানে ধারণা করা হয় যে, এর সাথে শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সরকারের সাথে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যুতে ঐকমত্যে পৌঁছাবার একটা প্রচেষ্টা থাকতে পারে।

‘লোয়ি ইন্সটিটিউট’ একইসাথে বলছে যে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির আরেকটা ফলফল হলো দেশটার সামরিক শক্তির বৃদ্ধি। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ চীনের বাইরেও পশ্চিমা দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কিনেছে। তুরস্কের কাছ থেকে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারে আর্মার্ড ভেহিকল এবং রকেট লঞ্চার কিনেছে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের দেশগুলি বাংলাদেশের কাছে উন্নত প্রযুক্তির ফাইটার বিমান বিক্রির জন্যে লবিং করছে। তবে চীন থেকে কেনা সাবমেরিনের পর ম্যারিটাইম অঙ্গনে আর কি ধরনের সক্ষমতা যুক্ত হতে পারে, সেব্যাপারটা এখনও বোঝা যাচ্ছে না। প্রতিবেদনে অস্ট্রেলিয়ার সরকারকে ভারত মহাসাগরে শুধুমাত্র পুরাতন সহযোগীদের উপর নির্ভর না করে বাংলাদেশের সাথে নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি করা ব্যাপারে সচেষ্ট হতে বলা হয়।
ছবিঃ ঢাকায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বিশেষ দূত জন কেরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে। বাংলাদেশ এখন এমন একটা অবস্থানে পৌঁছেছে যে, চীন ছাড়াও পশ্চিমা দেশগুলি দেশটার সাথে সম্পর্কোন্নয়নে তৎপর হচ্ছে। শুধু অর্থনৈতিক সম্পর্ক নয়, বাংলাদেশের সাথে কৌশলগত এবং সামরিক সম্পর্ক স্থাপনে ব্রতী হয়েছে পশ্চিমা দেশগুলি।


অর্থনৈতিক সম্পর্ক থেকে কৌশলগত সম্পর্কের দিকে

শুধু অস্ট্রেলিয়া নয়। অনেক দেশের চিন্তাবিদেরাই বাংলাদেশকে কৌশলগতভাবে তাদের সাথে রাখার জন্যে আলোচনা শুরু করেছেন। কানাডার থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘জিওপলিটিক্যাল মনিটর’এর এক লেখায় বলা হয় যে, বাংলাদেশ এখন এমন একটা অবস্থানে পৌঁছেছে যে, চীন ছাড়াও পশ্চিমা দেশগুলি দেশটার সাথে সামরিক সম্পর্ক বৃদ্ধিতে তৎপর হচ্ছে। ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, বাংলাদেশের জন্যে মার্কিন নেতৃত্বে ‘ইন্দো প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’ বা ‘আইপিএস’এ যোগ দেয়া কঠিন হবে; কারণ তাতে চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক সমস্যায় পড়তে পারে। সেখানে আরও বলা হয় যে, বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা নির্ভরশীলতা থাকার কারণে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের দূরে থাকাটা সম্ভব নয়। তবে সামনের দিনগুলিতে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মাঝে দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশ কোন পথে যেতে পারে, সেব্যাপারে ‘ওআরএফ’ প্রতিবেদনে পুরোপুরি অজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। ‘ইউনিভার্সিট অব টেক্সাস, অস্টিন’এর নিরাপত্তা ম্যাগাজিন ‘ওয়ার অন দ্যা রক্স’এর এক লেখায় অনুমান করা হচ্ছে যে, বাংলাদেশের পরবর্তী ৫০ বছরের ইতিহাস নির্ধারিত হবে বাংলাদেশ কিভাবে ভারত এবং চীনের সাথে সম্পর্ককে ব্যালান্স করে, সেটার উপর।

২০২০এর মার্চে ফরাসি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফ্লোরেন্স পার্লি বাংলাদেশ সফর করেন। একই বছরের সেপ্টেম্বরে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব মার্ক এসপার ফোন করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে কথা বলে সামরিক সহযোগিতার বিষয়ে কথা বলেন। পরের মাসে, অক্টোবরে মার্কিন উপপররাষ্ট্র সচিব স্টিফেন বাইগান ঢাকা সফর করে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ‘আইপিএস’এর অংশ হবার আমন্ত্রণ দিয়ে যান। এরপর এবছরের এপ্রিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বিশেষ দূত হিসেবে প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব জন কেরি ঢাকা সফর করেন। একই মাসে চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েই ফেংহি ঢাকা সফর করেন। প্রায় একইসাথে বাংলাদেশ চীনের নেতৃত্বে দক্ষিণ এশিয়ার জন্যে ‘ইমারজেন্সি ভ্যাকসিন স্টোরেজ ফ্যাসিলিটি’তে যোগ দেয়। গত বছর অক্টোবরে বাংলাদেশ তুরস্কের ‘ষষ্ঠ ডিফেন্স পোর্ট টারকি’ নামের দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিরক্ষা মেলায় যোগ দেয়। এর মাধ্যমে তুরস্ক বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা চাহিদা বোঝার চেষ্টা করে। শুধু অর্থনৈতিক সম্পর্ক নয়, বাংলাদেশের সাথে কৌশলগত এবং সামরিক সম্পর্ক স্থাপনে ব্রতী হয়েছে পশ্চিমা দেশগুলি। বাংলাদেশ তার বেশিরভাগ অস্ত্র চীন এবং রাশিয়া থেকেই কিনে থাকে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমা অস্ত্রের দিকে ঝোঁকার একটা প্রবণতা লক্ষ্যণীয়। এক্ষেত্রে উন্নততর প্রযুক্তি যোগাড় এবং নতুন ধরনের সক্ষমতা যোগ করার দিকে আগ্রহী বাংলাদেশ। বেশিরভাগ অস্ত্রের সাথেই প্রযুক্তি কেনার চেষ্টা করা হচ্ছে। রাশিয়া থেকে কেনা বহুসংখ্যক ‘এমআই ১৭১’ হেলিকপ্টারের মেইনটেন্যান্সের জন্যে ওভারহলিং কারখানা তৈরি করা হয় ইউক্রেনের সহযোগিতায়। চীনের কাছ থেকে কেনা ‘এফ ৭’ ফাইটার বিমান এবং ‘পিটি ৬’ প্রশিক্ষণ বিমানের ওভারহলিং কারখানাও স্থাপন করা হয়েছে।
ছবিঃ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্যে কেনা তুরস্কের তৈরি ‘টি ৩০০ টাইগার’ মাল্টিপল রকেট লঞ্চার। রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশকে অন্ততঃ এটা বুঝিয়েছে যে, তার অর্থনৈতিক উন্নয়ন বহিঃশক্তির হাত থেকে নিরাপদ নয়। এই সমস্যাই বাংলাদেশকে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে অনুপ্রাণিত করেছে।


বাংলাদেশে পশ্চিমাদের অস্ত্র বাণিজ্য

এমনই এক পরিস্থিতিতে তুরস্ক যখন দক্ষিণ এশিয়াতে তার প্রভাব বৃদ্ধিতে ব্যস্ত, তখন বাংলাদেশের সাথে তুরস্কের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক দ্রুতই এগুচ্ছে। ২০শে জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তুরস্ক থেকে কেনা ‘টি৩০০ টাইগার’ মাল্টিপল রকেট লঞ্চারের ’৫১তম এমএলআরএস রেজিমেন্ট’এ অন্তর্ভুক্তির উদ্ভোধন করেন। তুরস্কের কাছ থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শতাধিক ‘অতোকার কোবরা’ আর্মার্ড ভেহিকল ক্রয় করেছে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জার্মান কোম্পানি ‘রেইনমেটাল’ থেকে অত্যাধুনিক ‘উরলিকন জিডিএফ০০৯ স্কাইগার্ড’ অটোম্যাটিক এয়ার ডিফেন্স কামান কিনে ’৪৮ এয়ার ডিফেন্স আর্টিলারি রেজিমেন্ট’এ অন্তর্ভুক্ত করে। একই বছর সেনাবাহিনী অস্ট্রিয়া থেকে ৪টা ‘ডায়ামন্ড ডিএ ৪০এনজি’ প্রশিক্ষণ বিমানের ডেলিভারি পায়। এর আগে ইউরোপের এয়ারবাস থেকে সেনাবাহিনী ‘সি ২৯৫ডব্লিউ’ পরিবহণ বিমান কেনে। সার্বিয়া থেকে সেনাবাহিনী ৩৬টা ‘নোরা বি৫২’ ১৫৫মিঃমিঃ সেলফ প্রপেল্ড আর্টিলারি এবং ৮টা ‘বিওভি এম১১’ আর্মার্ড ভেহিকল কেনে।

এছাড়াও ১০ই জুন বিদায়ী বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চীফ মার্শাল মশিহুজ্জামান সারনিয়াবাত এক বিদায়ী ভাষণে ঘোষণা দেন যে, বাংলাদেশ জার্মানির ‘গ্রোব এয়ারক্রাফট’ কোম্পানির কাছ থেকে প্রযুক্তি সহ ২৪টা ‘জি ১২০টিপি’ কম্পোজিট ম্যাটেরিয়ালে তৈরি প্রশিক্ষণ বিমান ক্রয় করার চুক্তি করেছে। তিনি একইসাথে সামনের দিনগুলিতে বিমান বাহিনীতে পশ্চিমা প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তির আভাস দেন। জার্মান বিমানগুলি চীনে তৈরি ‘পিটি ৬’ বিমানকে প্রতিস্থাপন করবে। বাংলাদেশ ব্রিটেনের রয়াল এয়ার ফোর্সের কাছ থেকে ৫টা ‘সি ১৩০জে সুপার হারকিউলিস’ পরিবহণ বিমান ক্রয় করেছে; যেগুলির ডেলিভারি এখনও চলছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদ বরিশালে বিমান বাহিনীর জন্যে ইতালির ‘লিওনার্ডো’ কোম্পানির তৈরি অত্যাধুনিক ‘ক্রনোজ’ ‘মাল্টি ফাংশন ৩ডি’ রাডার ইউনিট উদ্ভোধন করেন। এর আগে একই কোম্পানি থেকে একটা ‘আরএটি ৩১ডিএল’ দূরপাল্লার রাডারও কেনা হয়। অথচ ২০১৫ সালেই কক্সবাজারে বিমান ঘাঁটি প্রতিষ্ঠার সময় সেখানে চীনে তৈরি ‘ওয়াইএলসি ৬’ রাডার স্থাপন করা হয়েছিল। ‘লিওনার্ডো’ কোম্পানি ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ বিমান বাহিনী এবং নৌবাহিনীকে ‘এডব্লিউ ১৩৯’, ‘এডব্লিউ ১১৯’ এবং ‘এডব্লিউ ১০৯’ হেলিকপ্টার সরবরাহ করেছে। বহুকাল ধরে রাশিয়া ছিল বাংলাদেশের মূল হেলিকপ্টার সরবরাহকারী। কয়েক বছর আগে চেক রিপাবলিক থেকে বিমান বাহিনী ৩টা ‘এল ৪১০ টারবোলেট’ স্বল্পপাল্লার পরিবহণ বিমান কেনে।

২০১৯ সালে ইন্দোনেশিয়ার সহযোগিতায় নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা নারায়নগঞ্জ ডকইয়ার্ডে কম্পোজিট স্পিডবোট তৈরির কারখানা স্থাপন করা হয়। এই প্রযুক্তির মূল সরবরাহকারী হলো সুইডিশ কোম্পানি ‘নর্থ সী বোটস’এর ইন্দোনেশিয়ান সাবসিডিয়ারি ‘পিটি লুনডিন’। নৌবাহিনীর জন্যে ‘ডর্নিয়ার ২২৮এনজি’ ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান কেনা হয় জার্মানির ‘রুওয়াগ এভিয়েশন’এর কাছ থেকে। প্রথম দু’টা কেনার পর আরও দু’টা আর্ডার করা হয়। এছাড়াও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্যে ৬টা ফ্রিগেট তৈরির প্রকল্প নেয়া হয়েছে; যার জন্যে প্রযুক্তি সহযোগী এখনও নির্ধারিত হয়নি। হল্যান্ড, তুরস্ক, চীনসহ অনেক দেশই এই প্রকল্পে প্রযুক্তি সহযোগী হতে চাইছে। নৌবাহিনীর বর্তমান ফ্রিগেটগুলির বেশিরভাগই চীনে নির্মিত। বিমান বাহিনীর জন্যে অত্যাধুনিক মাল্টিরোল ফাইটার বিমান সরবরাহ করতে ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বেশ প্রতিযোগিতা চলেছে। এর বাইরেও সেনাবাহিনীর জন্যে ১৫৫মিঃমিঃ হাউইটজার, এটাক হেলিকপ্টার, বিমান বাহিনীর জন্যে মধ্যম পাল্লার এয়ার ডিফেন্স ক্ষেপণাস্ত্র, মনুষ্যবিহীন ড্রোন, নৌবাহিনীর এন্টি সাবমেরিন হেলিকপ্টার, লজিস্টিক জাহাজ, হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার, ইত্যাদি অনেক কিছুরই সরবরাহকারী হতে চাইছে পশ্চিমারা। তারা মূলতঃ চীন এবং রাশিয়ার অস্ত্রকেই প্রতিস্থাপিত করতে চাইছে। এখানে কৌশলগত উদ্দেশ্য ছাড়াও বিপুল অংকের অস্ত্র বাণিজ্যও জড়িত।

কি চাইছে বাংলাদেশ?

অর্থনৈতিক লক্ষ্যই যে একটা রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হতে পারে না, তা আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনাতে পরিষ্কার। কোন রাজনৈতিক লক্ষ্য ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন শক্তিশালী দেশগুলিকে প্রভাব বিস্তারে আগ্রহী করবে মাত্র। বাংলাদেশ তার রাজনৈতিক লক্ষ্যকে পরিষ্কারভাবে না বলার কারণে প্রতিটা শক্তিশালী দেশই চাইছে ঢাকায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে। আর যেহেতু প্রতিটা দেশের কৌশলগত চিন্তায় ইন্দোপ্যাসিফিক এখন শীর্ষে রয়েছে, তাই বাংলাদেশ কোন পক্ষে থাকবে, তা অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার হয়ে দেখা দিচ্ছে। বাংলাদেশ আপাত দৃষ্টিতে কোন পক্ষকেই সরাসরি সমর্থন দিতে চাইছে না। কিন্তু সমস্যা হলো, ভূরাজনীতিতে নিরপেক্ষ বলে কিছু নেই। নিরপেক্ষ অর্থ হলো কোন একটা পক্ষে না যাওয়া; এর ফলে যে পক্ষের সহায়তা দরকার বেশি সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর অপর পক্ষ হয় লাভবান। কাজেই এক পক্ষ বাংলাদেশকে পাশে চাইবে; অপর পক্ষ চাইবে বাংলাদেশ নিরপেক্ষ থাকুক। এই মুহুর্তে ভারত মহাসাগরে চীনের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাংলাদেশকে নিজের পাশে না পাওয়াটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে একটা বড় ক্ষতি এবং সুপারপাওয়ারের বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রাখার প্রতি চ্যালেঞ্জ।

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘ, বিশেষ করে পশ্চিমাদের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা বাংলাদেশকে হতাশ করেছে। সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে গিয়ে বাংলাদেশ বড় পশ্চিমা শক্তির, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির অধীনে যেতে চাইছে না। রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশকে অন্ততঃ এটা বুঝিয়েছে যে, তার অর্থনৈতিক উন্নয়ন বহিঃশক্তির হাত থেকে নিরাপদ নয়। এই সমস্যাই বাংলাদেশকে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে অনুপ্রাণিত করেছে। কিন্তু পশ্চিমাদের শর্তযুক্ত সামরিক সরঞ্জামের ফাঁদেও পড়তে চাইছে না বাংলাদেশ। ইন্দোপ্যাসিফিকের অতি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকার সুবিধা বাংলাদেশ কতটুকু নিতে পারবে, তা নির্ভর করবে না যে বাংলাদেশ কতটা সফলতার সাথে চীন এবং ভারতের মাঝে বা চীন এবং পশ্চিমাদের মাঝে ব্যালান্স করতে পারে; বরং পশ্চিমা আদর্শিক শক্তিগুলিকে একে অপরের সাথে ব্যালান্সে রাখতে পারবে। কাজটা অসম্ভব না হলেও আদর্শিক কোন অবস্থানে আসীন হওয়া ছাড়া তা অর্জন সম্ভব নয়।

Monday, 18 May 2020

হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র - নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার শুরু?

১৮ই মে ২০২০
       
২০১৩ সালের মে মাসে ‘এক্স-৫১’ নামের হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকলের টেস্ট করা হয় মার্কিন ‘বি-৫২’ বোমারু বিমান থেকে। এক দশকের বেশি সময় ধরে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে সাম্প্রতিককালে এই অস্ত্র ডেভেলপ করার পিছনে গুরুত্ব বাড়িয়েছে রাশিয়া এবং চীনের হাইপারসনিক প্রকল্পের সাফল্য, যদিও মার্কিনীরা এখনও এই অস্ত্র কোথায় কিভাবে ব্যবহৃত হবে, তা নিশ্চিত করতে পারেনি।
১৫ই মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র একটা ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করছে, যেটাকে তিনি ‘সুপার ডুপার মিসাইল’ বলে আখ্যা দিতে চান। হোয়াইট হাউজে নতুন গঠন করা ‘স্পেস ফোর্স’এর পতাকা উন্মোচন অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের এক্ষেত্রে কিছু করবার ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বীদের কারণেই যুক্তরাষ্ট্রকে এহেন ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করতে হচ্ছে। ট্রাম্প মূলতঃ মার্কিন সামরিক বাহিনীর গবেষণাধীন ‘হাইপারসনিক’ অস্ত্রের কথাই বলছিলেন। ‘পপুলার মেকানিকস’ এই অস্ত্রের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলছে যে, এটা এমন একটা অস্ত্র, যা কিনা শব্দের ৫ গুণ বা ‘মাক ৫’ থেকে শুরু করে ২০ গুণ বা ‘মাক ২০’ গতিতে চলতে পারে। ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতেই বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যে অস্ত্র ডেভেলপ করছে, তা প্রতিপক্ষের অস্ত্রের প্রায় তিনগুণ বেশি গতিতে চলতে পারবে। যেখানে রাশিয়ার হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের গতি ‘মাক ৫’ এবং চীনের ক্ষেপণাস্ত্রের গতি ‘মাক ৫’ থেকে ‘মাক ৬’, সেখানে মার্কিন অস্ত্রের গতি হবে ‘মাক ১৭’। ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিরক্ষা সচিব মার্ক এসপার ট্রাম্পের কথার সাথে সুর মিলিয়ে ট্রাম্পের দাবিকে সমর্থন দেন। তবে ট্রাম্পের এই দাবিগুলি হঠাত করেই আসেনি। যুক্তরাষ্ট্র এধরনের অস্ত্র ডেভেলপ করছে এক দশকের বেশি সময় ধরে। তবে প্রতিরক্ষানীতিতে প্রাধান্য না থাকার কারণে এর ডেভেলপমেন্ট রাশিয়া এবং চীনের থেকে পিছিয়ে পড়ছিল। এখন রাশিয়া এবং চীনের ছুঁড়ে দেয়া চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর নড়েচড়ে বসেছে।

হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র কেন দরকার?

এবছরের মার্চের প্রথম সপ্তাহে হাইপারসনিক অস্ত্রের উপর মার্কিন ‘কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিস’এর এক প্রতিবেদনে এই অস্ত্রের ডেভেলপমেন্টের পিছনে চিন্তাগুলিকে লিপিবদ্ধ করা হয়। ২০০০এর দশকের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র প্রচলিত অস্ত্রের অধীনে দ্রুত আঘাত হানার একটা কৌশল বের করতে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের ডেভেলপমেন্ট শুরু করেছিল। এই অস্ত্র দুই ধরনের। একটা হলো হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল। এটা একটা রকেটের সাথে সংযুক্ত থাকে। রকেট এটাকে অনেক উপরে উড়িয়ে নিয়ে একটা গতি ধরিয়ে দেয়; এরপর এটা রকেট থেকে আলাদা হয়ে গ্লাইড করে অতি দ্রুতগতিতে লক্ষ্যে আঘাত হানে। আর দ্বিতীয় ধরনের অস্ত্র হলো হাইপারসনিক ক্রুজ মিসাইল। এটা বর্তমানে ব্যবহৃত ক্রুজ মিসাইলের মতোই একটা জেট ইঞ্জিনের সহায়তায় চলে; তবে এটা সাধারণ জেট ইঞ্জিনের থেকে বেশ আলাদা; যেটাকে ‘স্ক্র্যামজেট’ ইঞ্জিন বলে। হাইপারসনিক অস্ত্রের উদ্দেশ্য নিয়ে মার্কিন স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডের জেনারেল জন হাইটেন বলেন যে, যেসব ক্ষেত্রে অন্যান্য অস্ত্র ঠিকমতো কাজ করবে না বা ব্যর্থ হবে বা হাতের কাছে থাকবে না, তখন অনেক দূরের অবস্থানে শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থার শত্রছায়ায় থাকা লক্ষ্যবস্তুকে একটা নির্দিষ্ট সময়ের সুযোগের ‘উইন্ডো’র মাঝে হাইপারসনিক অস্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সমালোচকেরা বলছেন যে, হাইপারসনিক অস্ত্রের নির্দিষ্ট কোন উদ্দেশ্য এখনও সংজ্ঞায়িত হয়নি; এটা মার্কিন সামরিক সক্ষমতায় নতুন কিছু যোগ করবে না; আর ডিটারেন্স তৈরি করার ক্ষেত্রেও এর কোন ভূমিকা থাকবে না।

এতকাল হাইপারসনিক অস্ত্রের ডেভেলপমেন্টের জন্যে তেমন একটা বাজেট না পাওয়া গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া এবং চীনের এহেন অস্ত্রের ক্ষেত্রে এগিয়ে যাবার পর পেন্টাগন এবং কংগ্রেস উভয়েই বেশ নড়েচড়ে বসেছে। রাশিয়া এবং চীন ২০২০ সালের মাঝেই অপারেশনাল হাইপাসনিক অস্ত্র মোতায়েন করে ফেলতে পারে; যার মাঝে পারমাণবিক অস্ত্র বহণে সক্ষম ক্ষেপ্ণাস্ত্রও থাকতে পারে। মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘র‍্যান্ড কর্পোরেশন’এর সিনিয়ন ইঞ্জিনিয়ার জর্জ নাকুজি বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু পারমাণবিক অস্ত্রের ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করছে না, তাই মার্কিন অস্ত্রগুলির টার্গেটিং আরও নিখুঁত হতে হবে। অন্যদিকে রুশ এবং চীনাদের অস্ত্রগুলি পারমাণবিক সক্ষমতার হবার কারণে সেগুলির টার্গেটিং অতটা নিখুঁত না হলেও চলবে। ‘ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ইন্সটিটিউট অব সিকিউরিটি স্টাডিজ’এর প্রাক্তন সদস্য জো স্ট্যানলি লকম্যান বলছেন যে, মার্কিন অস্ত্রগুলি প্রচলিত ওয়ারহেড বহণ করবে বিধায় এর টার্গেটিংএর পিছনে মার্কিন গবেষকদের আরও বেশি পরিশ্রম করতে হবে। কারণ প্রচলিত অস্ত্রের টার্গেট হয় অনেক ছোট। তবে কেউ কেউ মনে করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এধরনের অস্ত্রের ডেভেলপমেন্টে পিছিয়ে নেই; বরং যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য এক্ষেত্রে আলাদা। থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’এর জেমস একটন বলছেন যে, রাশিয়া এবং চীনের লক্ষ্য হাইপারসনিক মিসাইলকে পারমাণবিক অস্ত্র বহণে নিযুক্ত করা; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে এধরনের মিসাইলকে প্রচলিত অস্ত্র বহণের জন্যে প্রস্তুত করা। রাশিয়া ও চীনের লক্ষ্যের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য সরাসরি তুলনা করা যায় না। তিনি আরও বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র বহুদিন থেকেই প্রচলিত অস্ত্রের উপর পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে; যা যুক্তরাষ্ট্রকে এক্ষেত্রে এগিয়ে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র তার হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকলকে ৪ হাজার কিঃমিঃ পাল্লায় পরীক্ষা করেছে; যেটা চীন মাত্র ২ হাজার কিঃমিঃএর কম পাল্লায় পরীক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে।
  
মার্কিন হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘এজিএম-১৮৩এ’ ‘এআরআরডব্লিউ’। এই প্রকল্পটাকেই বিমান বাহিনী এগিয়ে নিতে চাইছে, কারণ এটাতে খরচ কম হবে এবং এধরণের ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ‘বি-৫২’ বোমারু বিমান এবং ‘এফ-১৫’ ফাইটার বিমানে বেশি সংখ্যায় বহণ করা সম্ভব হবে।
 প্রযুক্তিগত দিক থেকে হাইপারসনিকের সম্ভাবনা কতটুকু?

তবে ক্ষেপণাস্ত্রের উদ্দেশ্য যা-ই হোক, হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের জন্যে পেন্টাগনের বাজেট বৃদ্ধি পাবার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ২০২০ সালের সামরিক বাজেটে সকল ধরনের হাইপারসনিক অস্ত্রের ডেভেলপমেন্টের জন্যে ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ চাওয়া হলেও ২০২১ সালের বাজেটে এই অর্থ বাড়িয়ে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার চাওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত পেন্টাগন হাইপারসনিক অস্ত্রের জন্যে নির্দিষ্ট কোন প্রকল্প নেয়নি; এর অর্থ হলো, হয় তারা এই অস্ত্রের ব্যবহার কোথায় হবে সেটার ব্যাপারে নিশ্চিত নয়; অথবা এর দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নের ব্যাপারে এখনও দোটানায় রয়েছে। কংগ্রেস যে ব্যাপারগুলি নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে, তার প্রথমটা হলো, এই ক্ষেপণাস্ত্র কি ধরনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করবে? হাইপারসনিক অস্ত্র কি এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচাইতে সহজ পদ্ধতি? মার্কিন কৌশলগত চিন্তার মাঝেই বা এই অস্ত্রকে কিভাবে দেখা হবে? দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, নির্দিষ্ট সংজ্ঞায়িত মিশন না থাকলে এই অস্ত্রের বাজেটকে অন্যান্য বাজেটের সাথে কিভাবে তুলনা করা হবে? কোন প্রকল্পকে কোন প্রকল্পের উপর বা নিচে স্থান দেয়া হবে? এর ডেভেলপমেন্টের পিছনে প্রযুক্তিই বা কতটুকু বাস্তবসম্মত? আর তৃতীয়ত, এরূপ অস্ত্রের ডেভেলপমেন্টের ফলে কৌশলগত স্থিতিশীলতা কিভাবে প্রভাবিত হবে? আর চতুর্থত, অন্যান্য দেশের সাথে উত্তেজনা যাতে না বাড়ে, সেই উদ্দেশ্যে নতুন কোন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির দিকে যাবার প্রয়োজন রয়েছে কিনা, যা একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে করা হয়েছিল?

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রকল্পগুলির ব্যাখ্যা দিয়েছে প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবন বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘পপুলার মেকানিকস’। মার্কিন সেনাবাহিনী এবং নৌবাহিনী একত্রে ডেভেলপ করছে একটা হাইপারসনিক অস্ত্র, যা গত ১৯শে মার্চ হাওয়াইএর কাউয়াই দ্বীপের ‘প্যাসিফিক মিসাইল রেঞ্জ ফ্যাসিলিটি বারকিং স্যান্ডস’এ পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষা করা ‘কমন হাইপারসনিক গ্লাইড বডি’ নামে পরিচিত এই অস্ত্রটা মূল ক্ষেপণাস্ত্রের একটা অংশ। রকেটের সাথে জুড়ে দিয়ে এটাকে উৎক্ষেপণ করা হয়। তবে এই পরীক্ষার ফলাফলের ব্যাপারে মার্কিনীরা কোন কথাই বলছে না। এই হাইপারসনিক অস্ত্র বর্তমানে ব্যবহৃত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থেকে আলাদা। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ওয়ারহেড প্রায় মহাকাশের কক্ষপথে চলে যায়; এরপর সেখান থেকে ‘মাক ২৪’ পর্যন্ত গতিতে লক্ষ্যের দিকে ধেয়ে আসে। অন্যদিকে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র মূলতঃ বায়ুমন্ডলে অবস্থান করেই ওড়ে। সেনা এবং নৌবাহিনী একত্রে এই ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করলেও সেনাবাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র সম্ভবতঃ বহণ করা হবে বড় আকৃতির ট্রাকের উপর; আর নৌবাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ‘আরলেই বুর্ক-ক্লাস’ ডেস্ট্রয়ার, ‘টিকনডেরোগা-ক্লাস’ ক্রুজার, ‘জুমওয়াল্ট-ক্লাস’ ডেস্ট্রয়ার এবং ‘ভার্জিনিয়া-ক্লাস’ সাবমেরিনে বহণ করা হতে পারে। এই ক্ষেপণাস্ত্র টেস্টিংএর পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকলকে বুস্টার রকেটের সাথে জুড়ে দিয়ে সম্পূর্ণ অস্ত্র হিসেবে টেস্ট করা হতে পারে। তবে সেটার খবর পেতে হয়তো আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

অন্যদিকে মার্কিন বিমান বাহিনীও বেশ হাঁকডাক দিচ্ছে। ২৭শে এপ্রিল বিমান বাহিনী এক বার্তায় হাইপারসনিক স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিনের ব্যাপারে তথ্য চেয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলির কাছ থেকে। এই তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে বিমান বাহিনীর ক্রয় বিভাগের দায়িত্বে থাকা সহকারি সচিব উইল রোপার বলেন যে, এর মাধ্যমে তারা বুঝতে পারবেন যে, কতটা দ্রুত তারা এধরনের একটা ক্রুজ মিসাইল ডেভেলপ করতে পারবেন। তবে তিনি এ-ও বলেন যে, স্ক্র্যামজেট প্রযুক্তি এখন এতটাই এগিয়েছে যে, এধনের ক্ষেপণাস্ত্র এখন বেশ দ্রুতই ডেভেলপ করা সম্ভব। রোপারের কথায় এটা পরিষ্কার যে, বিমান বাহিনী এখন এমন একটা প্রযুক্তির দিকে যাচ্ছে, যা কিনা এখন পর্যন্ত ডেভেলপ করা রকেট বুস্টারের মাধ্যমে চলা হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকলএর একটা বিকল্প। রোপার এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, রকেট বুস্টার ব্যাবহার করা গ্লাইড মিসাইলগুলি বায়ুমন্ডলের একেবারে সর্বশেষ প্রান্ত দিয়ে ওড়ে, যেখানে বাতাসের ঘনত্ব থাকে খুব কম। অন্যদিকে স্ক্র্যামজেটে চলা ক্রুজ মিসাইল ওড়ে বায়ুমন্ডলের এমন স্থান দিয়ে, যেখানে বাতাসের ঘনত্ব থাকে অনেক বেশি। একারণে দুই ধরণের ক্ষেপণাস্ত্র দুই প্রকারের টার্গেট এবং মিশন নিতে সক্ষম। রোপার বলেন যে, বিমান বাহিনী চাইছে না প্রযুক্তিগত এই প্রতিযোগিতার মাঝে কোন একটা স্থানে পিছিয়ে পড়তে। একইসাথে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর চাইছে যে, আরও কিছু কোম্পানি এই প্রযুক্তি ডেভেলপমেন্টে এগিয়ে আসুক। হাতে গোণা কিছু কোম্পানি গ্লাইড ভেহিকলের প্রযুক্তি ডেভেলপ করেছে বিধায় তারাই সেগুলি তৈরি করছে; অন্য কেউ এখানে ঢুকতেই পারছে না। উইল রোপার বলেন যে, ক্রুজ মিসাইল ডেভেলপ করতে গিয়ে আরও কিছু কোম্পানি এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে পারবে। রোপার বলেন যে, তিনি মনে করেছিলেন যে, গ্লাইড ভেহিকলের প্রযুক্তি থেকে স্ক্র্যামজেটের প্রযুক্তি পিছিয়ে রয়েছে; কিন্তু সেটা আসলে সত্যি নয়। এই প্রযুক্তিটা এখন বেশ অগ্রসর হয়েছে এবং এটা এখন ব্যাবহারের জন্যে প্রস্তুত।
  
রুশ ‘মিগ-৩১’ ফাইটার বিমান বহণ করছে ‘কিনঝাল’ নামের স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিনের ক্রুজ মিসাইল। ‘কিনঝাল’ ইতোমধ্যেই কমপক্ষে ১২ বার ‘মিগ-৩১’ ফাইটার বিমান থেকে নিক্ষেপ করা হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন যে, চীনাদের এই প্রকল্প রুশদের প্রকল্পগুলির চাইতে চিন্তাগত দিক থেকে এগিয়ে; কারণ চীনাদের দূরপাল্লার হাইপারসনিক অস্ত্রগুলি চীনের আশেপাশে মার্কিন সামরিক অবস্থানগুলির জন্যে হুমকি তৈরি করছে; যার ফলে মার্কিনীরা এর প্রত্যুত্তর দিতে বাধ্য হচ্ছে।

মার্কিন, চীনা এবং রুশ হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পগুলি কতদুর এগুলো?

মার্কিন ‘ডিফেন্স এডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সি’ বা ‘ডারপা’ এবং ‘এয়ার ফোর্স রিসার্চ ল্যাবরেটরি’ এই প্রকল্পে সহায়তা দেবে বলছে। ‘ডারপা’র ‘হাইপারসনিক এয়ার ব্রিদিং ওয়েপন কনসেপ্ট’এর উপর ভিত্তি করে প্রাইভেট কোম্পানির দু’টা দল স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিনের ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করছে। একদলে রয়েছে রেইথেয়ন এবং নর্থরোপ-গ্রুমান; আর অন্য দলে রয়েছে লকহীড মার্টিন ও এরোজেট রকেটডাইন। বর্তমানে মার্কিন বাহিনী ‘এয়ার লঞ্চড র‍্যাপিড রেসপঞ্জ ওয়েপন’ বা ‘এআরআরডব্লিউ’ নামে একটা প্রকল্পকে এগিয়ে নিচ্ছে। কিছুদিন আগেই তারা ‘হাইপারসনিক কনভেনশনাল স্ট্রাইক ওয়েপন’ বা ‘এইচসিএসডব্লিউ’ নামের আরেকটা প্রকল্প বাতিল করে বাজেটের সমন্বয় আনার লক্ষ্যে। ‘এআরআরডব্লিউ’ প্রকল্পটাকেই বিমান বাহিনী এগিয়ে নিতে চাইছে, কারণ এটাতে খরচ কম হবে এবং এধরণের ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ‘বি-৫২’ বোমারু বিমান এবং ‘এফ-১৫’ ফাইটার বিমানে বেশি সংখ্যায় বহণ করা সম্ভব হবে। ‘এআরআরডব্লিউ’ এবং বাতিল করা ‘এইচসিএসডব্লিউ’, দু’টাই একই কোম্পানি লকহীড মার্টিন ডেভেলপ করেছে।

২০১৯এর জুন মাসে বিমান বাহিনী ‘বি-৫২’ বোমারু বিমান থেকে ‘এআরআরডব্লিউ’এর সফল পরীক্ষা চালাবার কথা ঘোষণা করে। ২০১৮ সালের অগাস্টে লকহীড মার্টিন ৪’শ ৮০ মিলিয়ন ডলারের এই কাজ পায় প্রতিরক্ষা দপ্তরের কাছ থেকে। এর আগে একই বছরের এপ্রিল মাসে ‘এইচসিএসডব্লিউ’ প্রকল্পের অধীনে ৯’শ ২৮ মিলিয়ন ডলারের কাজ পেয়েছিল লকহীড মার্টিন; যা পরবর্তীতে বাতিল হয়ে যায়। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের বরাত দিয়ে ‘সিএনবিসি’ বলছে যে, ‘এআরআরডব্লিউ’এর পরীক্ষা এখনও চলমান রয়েছে; এবং আরও কয়েক বছর এই পরীক্ষা চলবে। এই মুহুর্তে রুশ এবং চীনাদের ডেভেলপ করা হাইপারসনিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কোন প্রতিরক্ষা নেই। অথচ রাশিয়ার দু’টা ক্ষেপণাস্ত্র ২০২০ সালের মাঝেই সার্ভিসে আসতে পারে বলে মনে করছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। এর মাঝে একটা হলো ‘এভানগার্ড’ নামের হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল; আরেকটা আকাশ থেকে নিক্ষেপণযোগ্য ‘কিনঝাল’ নামের স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিনের ক্রুজ মিসাইল। ‘কিনঝাল’ ইতোমধ্যেই কমপক্ষে ১২ বার ‘মিগ-৩১’ ফাইটার বিমান থেকে নিক্ষেপ করা হয়েছে। অপরদিকে ২০১৮ সালের অগাস্টে চীন তাদের প্রথম হাইপারসনিক পরীক্ষা চালিয়েছে। পেন্টাগনের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ‘সিএনবিসি’ বলছে যে, চীনাদের এই প্রকল্প রুশদের প্রকল্পগুলির চাইতে চিন্তাগত দিক থেকে এগিয়ে। ‘নাসা’র প্রাক্তন কর্মকর্তা মাইকেল গ্রিফিন মনে করছেন যে, চীনাদের দূরপাল্লার হাইপারসনিক অস্ত্রগুলি চীনের আশেপাশে মার্কিন সামরিক অবস্থানগুলির জন্যে হুমকি তৈরি করছে; যার ফলে মার্কিনীরা এর প্রত্যুত্তর দিতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদিকে রাশিয়ার আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রগুলিই বরং যুকরাষ্ট্রের জন্যে বড় হুমকি; হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র নয়।

যুক্তরাষ্ট্র হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করছে বহুদিন ধরেই। তবে সেটা তারা কি কাজে লাগাবে, সেব্যাপারে প্রতিরক্ষা দপ্তর একটা নিশ্চিত সংজ্ঞা দাঁড় করাতে পারেনি। কিন্তু উদ্দেশ্য থাকুক আর না থাকুক, ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতাতে টিকে থাকতেই যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হচ্ছে চীন এবং রাশিয়ার হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রত্যুত্তর দিতে। হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপমেন্টের উদ্দেশ্য রাশিয়া, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে পুরোপুরি আলাদা। তদুপরি, এই অস্ত্র না থাকলে একটা রাষ্ট্র যেন শক্তিশালীই হতে পারবে না। এই অস্ত্রের সামরিক উদ্দেশ্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ, এর রাজনৈতিক গুরুত্ব সেটার চাইতে কম নয়। অন্ততঃ ট্রাম্পের কাছে তার ‘সুপার ডুপার মিসাইল’এর রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক। তদুপরি এই ক্ষেপণাস্ত্র ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় নতুন অস্ত্র হিসেবে দেখা দিতে পারে। আর এই প্রতিযোগায় এগিয়ে থাকার অদম্য বাসনা কৌশলগত উদ্দেশ্যকে ছাপিয়ে যেতে পারে। এতে উদ্দেশ্যবিহীন একটা অস্ত্র প্রতিযগিতায় পতিত হতে পারে বৈশ্বিক ব্যবস্থা; যা কিনা করোনা দুর্যোগের মাঝে আরও দুর্বল হয়েছে।