Showing posts with label fishing. Show all posts
Showing posts with label fishing. Show all posts

Wednesday, 17 November 2021

চীনারা কি গুলি না চালিয়েই যুদ্ধ জিতে যাচ্ছে?

১৭ই নভেম্বর ২০২১

চীনা মাছ ধরার জাহাজের বহর। চীনারা মিলিশিয়া জাহাজগুলিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক অঞ্চলে পাঠিয়ে অন্য দেশের জাহাজকে সমস্যায় ফেলে বলতে পারে যে, এরা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আবার মিলিশিয়াদের কেউ হতাহত হলে চীনা সরকার তাদের নাগরিকদের রক্ষা করতে জনমত তৈরি করতে পারবে। চীনাদের এই ‘হাইব্রিড যুদ্ধে’র কোন প্রত্যুত্তর এখনও মার্কিনীরা দিতে পারেনি। উল্টো মার্কিন সহায়তা না পেয়ে ছোট দেশগুলি মার্কিন নেতৃত্বের প্রতি হতাশাই ব্যক্ত করেছে।


ফিলিপাইনের থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ফিলিপাইন কাউন্সিল ফর ফরেন রিলেশন্স’এর অবসরপ্রাপ্ত লেঃ জেনারেল এডিলবার্তো আদান ‘দ্যা ম্যানিলা টাইমস’এর এক লেখায় বলছেন যে, চীনারা সাগরে কোন গোলাগুলি ছাড়াই যুদ্ধ জিতে চলেছে। চীনারা ফিলিপাইনের ‘এক্সক্লুসিভ ইকনমিক জোন’ বা ‘ইইজেড’এর মাঝেই ভয় দেখিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করছে; যাকে তিনি ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। চীনা হুমকি মোকাবিলায় তিনি ফিলিপাইনের জন্যে শুধু বন্ধু বা পার্টনারই চাইছেন না, এমন কোন মিত্র চাইছেন, যে কিনা চীনারা আক্রমণ করলে ফিলিপাইনকে রক্ষা করতে যুদ্ধ করবে এবং চীনাদের ‘গ্রে জোন’ কৌশল মোকাবিলায় ফিলিপিনোদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। ‘গ্রে জোন’ হলো এমন একটা কৌশল, যার মাধ্যমে যুদ্ধ আর শান্তির মাঝে পার্থক্য নিরূপণ করা কঠিন হয়ে যায়। অর্থনৈতিক আগ্রাসন থেকে শুরু করে তথ্য যুদ্ধ, বাণিজ্য যুদ্ধ, হাল্কা প্রকৃতির কিছু সহিংস কর্মকান্ড এতে থাকতে পারে। এছাড়াও নতুন প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং সাইবার হামলার মাধ্যমে একটা দেশকে অকার্যকর করে ফেলা সম্ভব। ফিলিপাইনের সামরিক বাহিনীর প্রাক্তন ভাইস চিফ অফ স্টাফ জেনারেল আদান ফিলিপাইনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ৭০ বছর আগে স্বাক্ষরিত ‘মিউচুয়াল ডিফেন্স ট্রিটি’ বা ‘এমডিটি’কে বর্তমান প্রেক্ষাপটে পরিবর্তন করার পক্ষপাতি। ‘এমডিটি’ চুক্তিকে আগ্রাসী রাষ্ট্রের অপ্রচলিত এবং ‘হাইব্রিড’ কৌশলের বিরুদ্ধে ডিটারেন্ট হিসেবে কাজ করতে হবে। ফিলিপাইনের উপর প্রচলিত সামরিক হামলা হলে চুক্তি মোতাবেক যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দেবে। কিন্তু ‘গ্রে জোন’ কৌশল অবলম্বণ করার ফলে চীনারা ‘এমডিটি’ চুক্তিকে বাইপাস করতে পারছে। এই ‘হাইব্রিড যুদ্ধে’ চীনারা তাদের ‘ম্যারিটাইম মিলিশিয়া’কে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে; যারা মূলতঃ সরকারি বাহিনী। ফিলিপাইনের জাহাজে ধাক্কা দেয়া এবং দল বেঁধে চীনা জাহাজের ইইজেডএর ভিতরে ঢুকে অবস্থান করার মতো ঘটনার ব্যাপারে ফিলিপাইন সরকার বেইজিংএর কাছে প্রতিবাদ করেছে; কিন্তু তাতে কোন কাজ হয়নি। জেনারেল আদান বলছেন যে, একারণেই ফিলিপাইনের উচিৎ ‘এমডিটি’র মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চাওয়া।

গত মার্চে ২’শ চীনা মাছ ধরার ট্রলার একত্রে দক্ষিণ চীন সাগরে ফিলিপাইনের কাছাকাছি এসে হাজির হয়। ফিলিপাইন বলছে যে, সেই জায়গা ফিলিপাইনের ইইজেডএর মাঝে পড়ে। তাদের কথায়, ট্রলারগুলি দেখে মনে হয় না যে, এগুলি মাছ ধরতে এসেছে। এগুলি বরং চীনের ‘ম্যারিটাইম মিলিশিয়া’ দ্বারা পরিচালিত। ‘বিবিসি’ বলছে যে, পাঁচ বছর আগে আন্তর্জাতিক আদালত দক্ষিণ চীন সাগরের ৯০ শতাংশ এলাকাকে চীনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে বলে রায় দেয়। তবে বেইজিং তাদের নিজেদের আঁকা ‘নাইন ড্যাশ লাইন’এর মাঝে সকল সমুদ্রাঞ্চলকে নিজেদের বলে দাবি করে। এই অঞ্চলের মাঝে চীনারা কৃত্রিমভাবে দ্বীপ উন্নয়ন করেছে এবং নিয়মিত সামরিক প্যাট্রোলের ব্যবস্থা করেছে। এর আগে ২০১৯এর ডিসেম্বরে ইন্দোনেশিয়ার কাছে নতুনা সাগরে চীনা মাছ ধরার ট্রলারের বড় একটা বহর কোস্ট গার্ডের জাহাজের পাহাড়ায় হানা দেয়। ইন্দোনেশিয়ার সরকার এই হুমকি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে নৌবাহিনীর জাহাজ প্রেরণ করে। কিন্তু উভয় পক্ষ সমুদ্রে বেশ কিছুদিন ধরে উত্তেজনাকর অবস্থানে থাকে। পরবর্তীতে ইন্দোনেশিয়া সেই অঞ্চলে নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় নিজেদের মাছ ধরার জাহাজের বহর মোতায়েনের পরিকল্পনা শুরু করে বলে দেশটার মিডিয়া ‘মঙ্গাবে’ জানায়।

শুধু কাছের সমুদ্রেই নয়, চীনারা পাড়ি জমিয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কিঃমিঃ দূরের দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে। ২০২০এর সেপ্টেম্বরে প্রায় ৩’শ চীনা মাছ ধরার জাহাজ হাজির হয় দক্ষিণ আমেরিকার পেরুর সমুদ্রসীমায়। ‘ভয়েস অব আমেরিকা’র এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, জাহাজগুলি গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের কাছে মাছ ধরার পর পেরুর উপকূলে হাজির হয়। ইকুয়েডরের নৌবাহিনীর অপারশনসএর কমান্ডার রিয়ার এডমিরাল ড্যানিয়েল গিনেজ বলেন যে, এভাবে মাছ ধরলে কিছু বিশেষ প্রজাতির মাছের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। চীনারা এখানে প্রতিবছরই মাছ ধরতে আসছে। একই বছরের জুন মাসে ৩’শ ৪০টা জাহাজ একত্রে গালাপাগোস এবং ইকুয়েডরের কাছে মাছ ধরতে এসেছিল। দক্ষিণ আমেরিকার পেরু এবং ইকুয়েডরের অর্থনীতি সামুদ্রিক মাছ ধরার উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। চীনাদের কর্মকান্ড এই দেশগুলির অর্থনীতিকে আঘাত করতে পারে। বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের হিসেবে এই দুই দেশ মিলে বছরে প্রায় ৪৫ লক্ষ টন মাছ ধরে; যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সমান। তবে চীনারা এক বছরে এরও চার গুণ মাছ ধরে। পুরো বিশ্বের মোট মৎস্য সম্পদের তিন ভাগের এক ভাগই চীনারা খাচ্ছে। লন্ডনের ‘ওভারসীজ ডেভেলপমেন্ট ইন্সটিটিউট’এর হিসেবে চীনাদের রয়েছে প্রায় ১৭ হাজার জাহাজের বিশাল মাছ ধরার বহর। তাদের জাহাজের আকৃতিও বড় হচ্ছে। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ লাইবেরিয়ার উপকূলে চীনারা ৬টা জাহাজ পাঠিয়েছে বলে ২০২০এর জুলাইএ আফ্রিকার মিডিয়াগুলি প্রতিবেদন করে। তারা বলে যে, এই জাহাজগুলি বছরে ১২ হাজার টন পর্যন্ত মাছ ধরতে সক্ষম, যা লাইবেরিয়ার স্বাভাবিক মাছ ধরার সক্ষমতার দুই গুণ!

সমুদ্র এখন চীনের অর্থনীতিতে অতি গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্র সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চীনাদের সাথে বাকিদের চলছে ব্যাপক দ্বন্দ্ব। প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলি চীনের কৌশলকে ‘গ্রে জোন’ বা ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ বলছে। সামরিক ম্যাগাজিন ‘মিলিটারি রিভিউ’এর এক লেখায় গবেষক শুজিয়ান লুও এবং জনাথন প্যানটার বলছেন যে, চীনারা তাদের ম্যারিটাইম মিলিশিয়া ব্যবহার করে ‘গ্রে জোন’ কর্মকান্ড চালাচ্ছে; কারণ পরিস্থিতি বুঝে বেইজিং বলতে পারে যে, এদের সাথে সরকারের কোন সম্পর্ক নেই। চীনারা মিলিশিয়া জাহাজগুলিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক অঞ্চলে পাঠিয়ে অন্য দেশের জাহাজকে সমস্যায় ফেলে বলতে পারে যে, এরা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আবার মিলিশিয়াদের কেউ হতাহত হলে চীনা সরকার তাদের নাগরিকদের রক্ষা করতে জনমত তৈরি করতে পারবে। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনারা ট্রলারের বহরের সাথে অনেক ক্ষেত্রেই কোস্ট গার্ডের জাহাজ পাঠায়। নৌবাহিনীর জাহাজ না পাঠিয়ে সাদা রঙএর কোস্ট গার্ডের জাহাজ পাঠানোটাও ‘গ্রে জোন’ কৌশলের অংশ। এই জাহাজগুলি স্বল্প অস্ত্রে সজ্জিত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি চীনা জাহাজগুলি অনেক নৌবাহিনীর ফ্রিগেটের চাইতেও বড়। প্রতিপক্ষের মাছ ধরার ট্রলার বা ছোট প্যাট্রোল বোটকে ধাক্কা দিয়ে ডুবিয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটছে। চীনাদের এই ‘হাইব্রিড যুদ্ধে’র কোন প্রত্যুত্তর এখনও মার্কিনীরা দিতে পারেনি। উল্টো মার্কিন সহায়তা না পেয়ে ছোট দেশগুলি মার্কিন নেতৃত্বের প্রতি হতাশাই ব্যক্ত করেছে।

Saturday, 18 January 2020

ইন্দোনেশিয়াকে ঘুম থেকে জাগালো চীন?


১৮ই জানুয়ারি ২০২০
চীন যেমন এখানে তার প্রভাব বৃদ্ধিতে পিছপা হবে না, তেমনি ইন্দোনেশিয়াও নতুনা সাগরে চীনের ফিশিং ফ্লীটের হুমকি থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারবে না। নতুনার এই বিরোধ হয়তো ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রনীতির জন্যে ঘুম থেকে জেগে ওঠার কাজটাই করবে। পূর্বের সাগরের প্রায় সবগুলি কৌশলগত সমুদ্রপথের উপর নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থানে থাকা ইন্দোনেশিয়া তার পররাষ্ট্রনীতিকে পরিবর্তন করলে এর ভূকৌশলগত প্রভাব সারা বিশ্বে প্রতিফলিত হবে।

দক্ষিণ চীন সাগরে ইন্দোনেশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন নতুনা দ্বীপপুঞ্জের কাছে চীনের সাথে তিন সপ্তাহব্যাপী উত্তেজনার পর ৯ই জানুয়ারি ইন্দোনেশিয়ার সামরিক বাহিনী ঘোষণা দেয় যে, চীনের সকল জাহাজ ইন্দোনেশিয়ার সমুদ্রসীমা ত্যাগ করেছে। ইন্দোনেশিয়ার ‘ম্যারিটাইম সিকিউরিটি এজেন্সি’ বলছে যে, গত ১৯ থেকে ২৪শে ডিসেম্বরের মাঝে কমপক্ষে ৬৩টা চীনা মাছ ধরার জাহাজ চীনা কোস্ট গার্ডের প্রহরায় নতুনার আশেপাশের সমুদ্রে এসে পৌঁছায়, যে সমুদ্রাঞ্চলকে ইন্দোনেশিয়া নিজেদের অর্থনৈতিক অঞ্চল বলে দাবি করে। অন্যদিকে চীনারাও তাদের স্বঘোষিত ‘নাইন-ড্যাশ লাইন’এর আওতায় এই এলাকায় নিজেদের ‘ঐতিহাসিক অধিকার’ রয়েছে বলে মনে করে। হতচকিত হয়ে ইন্দোনেশিয়ার নেতৃবৃন্দ জানুয়ারির শুরুতে নতুনার দিকে নৌবাহিনীর দু’টা কর্ভেট প্রেরণ করে। প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘আইএইচএস জেনস’ বলছে যে, জানুয়ারির ৬ তারিখ নাগাদ ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনী সেখানে আরও ৪টা ফ্রিগেট, একটা সাবমেরিন এবং একটা উভচর পরিবহণ জাহাজ প্রেরণ করে। এছাড়াও ইন্দোনেশিয়ার বিমান বাহিনীর ১৬ নম্বর স্কোয়াড্রন থেকে ৪টা ‘এফ-১৬’ ফাইটার বিমান এবং সেনাবাহিনীর ৬’শ সদস্য সেখানে মোতায়েন করা হয়।

৬ই জানুয়ারি দক্ষিণ চীন সাগরের স্প্রাটলি দ্বীপপুঞ্জের ‘ফায়ারি ক্রস’ দ্বীপ হতে চীনা কোস্ট গার্ডের দু’টা জাহাজ নতুনার পথে যাত্রা করে বলে জানায় ‘ম্যারিন ট্রাফিক’ নামের শিপিং ইন্টেলিজেন্স সংস্থা। জাহাজগুলি খুব সম্ভবতঃ সেখান থেকে জ্বালানি নিয়ে যাত্রা করে। ‘ইউএস নেভাল ওয়ার কলেজ’এর ‘চায়না ম্যারিটাইম স্টাডিজ ইন্সটিটিউট’এর রায়ান মার্টিনসন বলছেন যে, দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের মূল ভূখন্ড থেকে দূরবর্তী এলাকাগুলিতে অপারেশন চালাবার জন্যে চীনের দখলে থাকা স্প্রাটলি দ্বীপপুঞ্জের এই ঘাঁটিগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ‘অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইন্সটিটিউট’এর গবেষক চার্লি লিয়ন্স জোন্সএর মতে, মনুষ্যনির্মিত এই দ্বীপগুলি চীনের নৌশক্তিকে মূল ভূখন্ড থেকে দূরের এলাকায় প্রভাব বিস্তারে সহায়তা করছে। ‘ফায়ারি ক্রস’এ চীনারা বিশাল রানওয়ে তৈরি করেছে, যেখানে ফাইটার জেট এবং বড় পরিবহণ বিমান অবতরণ করতে পারবে। তবে তিনি আরও বলছেন যে, চীনারা মূল ভূখন্ড থেকে অতটা দূরে এই ঘাঁটি ধরে রাখার লজিস্টিক্যাল চ্যালেঞ্জগুলি কতটা মোকাবিলা করতে পারবে, তা সময়ই বলে দেবে।


  
চীনকে না চটানোর নীতিটাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়ায় চীনাদের নিয়মিত হুমকিগুলি ইন্দোনেশিয়দের জন্যে প্রায় গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে। আর অন্যদিকে চীন নিজের বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দক্ষিণ চীন সাগরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করছে। নতুনা দ্বীপপুঞ্জ চীনের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ মালাক্কা প্রণালীর নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থানে। কাজেই চীন যেমন এখানে তার প্রভাব বৃদ্ধিতে পিছপা হবে না, তেমনি ইন্দোনেশিয়াও নতুনা সাগরে চীনের ফিশিং ফ্লীটের হুমকি থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারবে না। 


প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চলা এই উত্তেজনার মাঝে ইন্দোনেশিয়া ৩০শে ডিসেম্বর জাকার্তাতে চীনা রাষ্ট্রদূতকে ডেকে প্রতিবাদলিপি পেশ করে। ‘ভোয়া নিউজ’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, চীনের সাথে ইন্দোনেশিয়ার মৎস্য শিকার নিয়ে বিভেদ নতুন নয়। আর ইন্দোনেশিয়াও সাম্প্রতিক সময়ে নতুনা দ্বীপ এলাকায় সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে। অর্থাৎ ইন্দোনেশিয়ার এহেন সামরিক পদক্ষেপ দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আগ্রাসী কর্মকান্ড ঠেকাতে যথেষ্ট ছিল না। মোটকথা ইন্দোনেশিয়া একেবারেই অপ্রস্তুত ছিল। ৮ই জানুয়ারি নতুনা দ্বীপে ছুটে যান ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো। তিনি নতুনার লাম্পা স্ট্রেইট ফিশিং পোর্টে ঘোষণা দেন যে, তিনি সেখানে গিয়েছেন উত্তর নতুনা সাগরের সম্পদের উপর ইন্দোনেশিয়ার সার্বভৌম ক্ষমতা বলবত করতে।

চীনের হুমকি মোকাবিলায় সামরিক বাহিনীকে প্রস্তুত করতে ইন্দোনেশিয়া জরুরি পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে। ‘আইএইচএস জেনস’ জানাচ্ছে যে, ইন্দোনেশিয়া তার নৌবাহিনীর ফ্রান্স থেকে কেনা ১১টা ‘প্যান্থার’ হেলিকপ্টারকে সাবমেরিন ধ্বংসী এবং জাহাজ ধ্বংসী অস্ত্রে সজ্জিত করতে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই হেলিকপ্টারগুলি ক্রয়ের সময়ে শত্রুর জাহাজের উপর সরাসরি হামলার জন্যে উপযোগী অবস্থায় ক্রয় করা হয়নি। একইসাথে নৌবাহিনী ৪টা অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল ক্রয়ের জন্যে টেন্ডার ডেকেছে। চীনা কোস্ট গার্ডের বিরাট প্যাট্রোল ভেসেলগুলির প্রতিদ্বন্দ্বী ইন্দোনেশিয়ার কোস্ট গার্ডের বেশিরভাগ জাহাজই অপেক্ষাকৃত ছোট। তাই নৌবাহিনীর কর্ভেট এবং ফ্রিগেটগুলিকে ডেকে পাঠাতে হয়েছে চীনা কোস্ট গার্ডের জাহাজগুলিকে মোকাবিলার জন্যে। এছাড়াও পূর্ব জাভার পাইতন নৌঘাঁটিতে ৭৬ মিঃমিঃএর একটা কামান বসানো হয়েছে কামান চালনায় নৌবাহিনীর দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে। অর্থাৎ এতকাল কামান চালনাকে বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের অংশই মনে করা হয়নি।

১৫ই জানুয়ারি দক্ষিণ চীন সাগরে অবস্থিত নতুনা দ্বীপে সরেজমিন পরিদর্শন করে ইন্দোনেশিয়ার রাজনৈতিক, আইনী এবং নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী মাহফুদ এমডি বলেন যে, নতুনা দ্বীপে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বাড়াবার লক্ষ্যে ইন্দোনেশিয়ার সরকার সেখানে মৎস্য আহরণ বৃদ্ধি করতে যাচ্ছে। ‘জাকার্তা পোস্ট’এর এক খবরে বলা হচ্ছে যে, ১ হাজার কিঃমিঃএর বেশি দূরত্বে অবস্থিত জাভা থেকে ৩৫টা মাছ ধরার জাহাজ নিয়ে আসা হচ্ছে এই অঞ্চলে। এই জাহাজগুলির প্রতিটার ধারণক্ষমতা ৭৫টনের বেশি। সরকার বলছে যে, নতুনার জেলেদের জাহাজগুলি একেবারেই ছোট, যেগুলি চীনাদের সাথে প্রতিযোগিতা করে এই অঞ্চলের সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে একেবারেই অপ্রতুল। একই দিনে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসুদি ভিয়েতনামের হো চিন-মিন সিটিতে এক ঝটিকা সফরে ভিয়েতনামের ‘হাই নাম’ নামের একটা সীফুড কোম্পানির সাথে বৈঠক করে ইন্দোনেশিয়া থেকে বেশি করে মাছ আমদানি করার আহ্বান জানান। উদ্দেশ্য নতুনা সাগরে মাছ আহরণ বৃদ্ধি করে সেই মাছের জন্যে বাজার ধরা। ১৭ই জানুয়ারি জাকার্তায় ম্যারিটাইম এফেয়ার্স এন্ড ইনভেস্টমেন্ট মন্ত্রী লুহুত পাঞ্জাইতান সাংবাদিকদের সামনে ঘোষণা দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া নতুনা দ্বীপে ফিশ প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি করতে ইচ্ছুক।

২০১৭ সালে নতুনা দ্বীপের আশেপাশের অঞ্চলকে নিজের অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করলেও প্রকৃতপক্ষে ইন্দোনেশিয়া তার স্বার্থকে সমুন্নত করতে নির্দিষ্ট কোন পরিকল্পনা ছাড়াই এগুচ্ছিল। চীনকে না চটানোর নীতিটাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়ায় চীনাদের নিয়মিত হুমকিগুলি ইন্দোনেশিয়দের জন্যে প্রায় গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে। আর অন্যদিকে চীন নিজের বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দক্ষিণ চীন সাগরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করছে। নতুনা দ্বীপপুঞ্জ চীনের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ মালাক্কা প্রণালীর নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থানে। কাজেই চীন যেমন এখানে তার প্রভাব বৃদ্ধিতে পিছপা হবে না, তেমনি ইন্দোনেশিয়াও নতুনা সাগরে চীনের ফিশিং ফ্লীটের হুমকি থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারবে না। নতুনার এই বিরোধ হয়তো ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রনীতির জন্যে ঘুম থেকে জেগে ওঠার কাজটাই করবে। পূর্বের সাগরের প্রায় সবগুলি কৌশলগত সমুদ্রপথের উপর নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থানে থাকা ইন্দোনেশিয়া তার পররাষ্ট্রনীতিকে পরিবর্তন করলে এর ভূকৌশলগত প্রভাব সারা বিশ্বে প্রতিফলিত হবে।