Showing posts with label Hybrid War. Show all posts
Showing posts with label Hybrid War. Show all posts

Saturday, 20 November 2021

পোল্যান্ড এবং বেলারুশের সীমানায় তুরস্কের স্বার্থ কি?

২০শে নভেম্বর ২০২১

পোল্যান্ড সীমান্তে সেনাদের জলকামান থেকে বাঁচতে চেষ্টা করছেন এক শরণার্থী। ঠান্ডা যুদ্ধ শেষেও একুশ শতকের ধ্বসে পরা বিশ্বব্যবস্থায় তুরস্ক পশ্চিমাদের কাছে তার মূল্য ধরে রাখতে চাইছে। অন্ততঃ ইইউএর সীমান্তে প্রচন্ড শীতের মাঝে শরণার্থীদের উপর জলকামানের ব্যবহার ইইউএর মানবাধিকারের স্তম্ভকে যতক্ষণ নাড়া দেবে, ততক্ষণ তুরস্ক ইইউএর সাথে কূটনৈতিক দরকষাকষির সুযোগ পাবে। আর তুরস্কের সাথে ইইউএর দ্বন্দ্বের তালিকা এখন বেশ বড়।

 
পোল্যান্ড এবং বেলারুশের সীমানায় মধ্যপ্রাচ্যের হাজার হাজার শরণার্থীদের উপর যখন পোলিশ সেনারা জলকামান, পেপার স্প্রে এবং অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহার করছে, তখন কেউ কেউ প্রশ্ন করছেন যে, এর সমস্যার পিছনে শুধুমাত্র বেলারুশের প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কো এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনই রয়েছেন কিনা। ব্রিটেনের ‘দ্যা স্পেকট্যাটর’ পত্রিকার এক লেখায় ‘বলকান ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিং নেটওয়ার্ক’এর ফেলো ইয়ানিস বাবুলিয়াস বলছেন যে, এই ভূরাজনৈতিক খেলায় তুরস্ককে বাদ দিয়ে ভুল হবে। কারণ বেলারুশের সীমানায় মধ্যপ্রাচ্যের শরণার্থীরা পৌঁছেছে তুরস্কের ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’এর মাধ্যমে।

তুর্কি কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ‘হুরিয়েত ডেইলি নিউজ’ জানাচ্ছে যে, ১০ই নভেম্বর তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু পোলিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিবিগনিউ রাউএর সাথে ফোনে কথা বলেন। এই কথোপকথনে কাভুসোগলু বলেন যে, তুরস্ক এই সমস্যার অংশ না হলেও কেউ কেউ তা বোঝাতে চাইছে। তিনি তুরস্ক এবং ‘টারকিশ এয়ারওয়েজ’এর বিরুদ্ধে অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে আখ্যা দেন। একইসাথে তিনি বলেন যে, জনগণকে এই অভিযোগের ব্যাপারে সত্যটা জানাতে হবে। তিনি পোল্যান্ডের টেকনিক্যাল তদন্ত দলকে তুরস্কে আমন্ত্রণ জানান। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এহেন কথোপকথন মাত্র একমাস আগের বৈঠকের সময়েও অন্যরকম ছিল। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহেই কাভুসোগলু পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ সফর করেন এবং পোল্যান্ডের সীমান্ত ইস্যুতে তুরস্কের সহায়তা দেয়ার আশ্বাস দেন। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা যৌথ ঘোষণায় বলেন যে, তাদের ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস একত্রে এধরণের হুমকি মোকাবিলায় এবং ইইউএর ভেতর ঢোকার উদ্দেশ্যে মানব পাচারের রুটগুলি খুঁজে বের করবে। জিবিগনিউ রাউ বলেন যে, তিনি কাভুসোগলুকে শরণার্থীদের বিমানে করে বেলারুশের রাজধানী মিনস্কে যাবার ব্যাপারে আরও মনোযোগ দেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন যে, শরণার্থীদের নিয়ে আসা ফ্লাইটগুলি অনেক ক্ষেত্রেই ইস্তাম্বুলকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে। কাভুসোগলু বলেন যে, নয় মাসে ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’ মিনস্কে ৬’শ ইরাকি নাগরিককে নিয়ে গিয়েছে; যাদের অর্ধেকই আবার ফিরে এসেছে। এই সফরের সময় পোলিশ মন্ত্রী রাউ বলেন যে, দুই দেশের বাণিজ্য এখন প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার; যা শীঘ্রই ৯ বিলিয়নে যাবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।

তুরস্কের প্রতি ইইউএর হুমকি

৮ই নভেম্বর ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইয়েন বলেন যে, ইইউ খতিয়ে দেখছে যে, তৃতীয় কোন দেশের এয়ারলাইন্স, যারা কিনা “মানব পাচারে জড়িত” রয়েছে, তাদের উপর অবরোধ দেয়া বা তাদেরকে কালো তালিকাভুক্ত করা যায় কিনা। ‘ইইউ অবজারভার’ বলছে যে, ভন ডার লেইয়েন যে তৃতীয় দেশের এয়ারলাইন্সের কথা বলেছে, তা হলো ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’। আর ‘পলিটিকো ইউরোপ’এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, মিনস্কে যাবার প্রধান বিমান রুটটাই হলো তুরস্ক থেকে। ১০ই নভেম্বর পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ম্যাটিউজ মোরাউইয়েকি পার্লামেন্টের এক জরুরি বৈঠকে অভিযোগ করে বলেন যে, পরিষ্কারভাবেই দেখা যাচ্ছে যে, তুরস্কের কর্মকান্ডগুলি বেলারুশ এবং রাশিয়ার সাথে সমন্বয় করা; যা পোলিশরা পছন্দ করছে না। তিনি আরও বলেন যে, মাত্র এক বা দুইমাস আগেই তুরস্ক পোল্যান্ডের সাথে একসাথে কাজ করতে চায় বলে মনে হয়েছিল। তুরস্কের দাবানল ঠেকাতে সহায়তা এবং তুর্কি পর্যটন শিল্পে সহায়তা দেয়াটা খুব সম্ভবতঃ একমুখী সহায়তা ছিল। এই ব্যাপারটা তুরস্ক সরকারকে জানানো হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

 
কেউ কেউ বলছেন যে, ইইউ এবং যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের মাঝে সমন্বয় করে তুরস্কের উপর চাপ সৃষ্টি করে বেলারুশে তুর্কি বিমানের ফ্লাইট বন্ধ করেছে। ইইউএর বিভাজনের সময়েই ইউরোপ এবং রাশিয়ার মাঝে যুক্তরাষ্ট্র ব্যালান্স দেখতে চায়। সেই জায়গাটাতেই তুরস্ক জড়িত থাকতে চাইছে, ঠিক যেখানে যুক্তরাষ্ট্র একটা শূন্যস্থান রেখে যাচ্ছে। যুদ্ধবিমান বা যুদ্ধজাহাজ বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে নয়, বরং নিজস্ব বেসামরিক এয়ারলাইন্স ব্যবহার করেই তুরস্ক এই কাজটা করেছে। একুশ শতকে যুদ্ধের নতুন সংজ্ঞায় শরণার্থীরা যেমন বেলারুশ এবং রাশিয়ার কাছে অস্ত্র, তেমনি ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’ হয়েছে তুরস্কের অস্ত্র।

একইদিন ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’এর এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, তারা সকল নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সংবেদনশীলতার সাথে সহযোগিতা করে আসছে। একইসাথে বিবৃতিতে বলা হয় যে, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন। ‘এএফপি’ জানাচ্ছে যে, বেলারুশের রাজধানীতে যাবার সবচাইতে বেশি ব্যবহৃত আকাশ নেটওয়ার্ক হলো ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’। এছাড়াও তুরস্কে রয়েছে বিভিন্ন দেশের প্রায় ৫০ লক্ষ শরণার্থী এবং অভিবাসী। এবং এখনও দেশটা ইউরোপ অভিমুখী শরণার্থীদের যাতায়াতের একটা গুরুত্বপূর্ণ রুট। ‘মিডলইস্ট আই’এর এক প্রতিবেদনে ফ্লাইটের তথ্য দিয়ে বলা হয় যে, গত ৩১শে অক্টোবর থেকে ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’ ইস্তাম্বুল থেকে মিনস্কে সাপ্তাহিক ফ্লাইটের সংখ্যা ১৪ থেকে ১০এ নামিয়ে আনে। ভিসা ফ্রি ট্রাভেল সুবিধা থাকার কারণে বেলারুশ তুর্কি পর্যটকদের জন্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য।

তুরস্কের ‘ইউ টার্ন’

১২ই নভেম্বর তুরস্কের বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা মধ্যপ্রাচ্যের তিনটা দেশ ইরাক, সিরিয়া এবং ইয়েমেনের নাগরিকদের তুরস্ক থেকে বেলারুশে যাওয়া বন্ধ ঘোষণা করে। এই খবর পাবার পর ইউরোপিয়ান কাউন্সিনের প্রেসিডেন্ট চার্লস মিশেল এক টুইটার বার্তায় তুর্কি সরকারকে ধন্যবাদ জানান। পরদিন বার্তাসংস্থা ‘এএফপি’র সাথে এক সাক্ষাতে তুর্কি প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা ইব্রাহিম কালিন বলেন যে, পোল্যান্ডের সীমান্তে মানবিক দুর্যোগের ব্যাপারে তুরস্ক বা ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’কে দোষারোপ করাটা সমীচিন নয়। ভ্রমণকারীরা বেলারুশ গিয়ে সেখান থেকে পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া বা অন্যান্য ইইউ দেশে যাচ্ছে। এর জন্যে তুরস্ক বা ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’কে দোষারোপ করাটা পুরোপুরি অবান্তর। তিনি আরও বলেন যে, তারা নিশ্চিত করতে চান যে, যারা তুরস্ক হয়ে বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করে, তারা যেন যাওয়া এবং ফেরত আসার টিকিট সাথে রাখে; অর্থাৎ তারা যেন ফেরত আসে। কিন্তু কেউ যদি বেলারুশে গিয়ে হারিয়ে যায়, তাহলে সেটা তুরস্কের দায় নয়। ‘আল মনিটর’এর সাথে এক সাক্ষাতে ‘পোলিশ ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার্স’এর মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা প্রোগ্রামের প্রধান ক্যারল ওয়াসিলেউস্কি বলেন যে, যদিও তুর্কিরা বলছে যে, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনকিছু করেনি, তথাপি পোলিশ সমাজের কাছে ব্যাপারটা সেভাবে ঠেকেনি। তিনি বলেন যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ। পোল্যান্ডের কৌশলগত সংস্কৃতিতে এর একটা প্রভাব থাকবে। পোলিশরা মনে রাখবে যে, পোল্যান্ডের দুর্যোগের সময় তুরস্ক পাশে থাকেনি। ওয়াসিলেউস্কি মনে করছেন যে, বর্তমানের এই বিরোধ স্বল্প সময়ই স্থায়ী হবে; কূটনীতির মাধ্যমে তা সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু পোল্যান্ডের কর্মকর্তাদের মাঝে যারা একসময় তুরস্কের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের পক্ষপাতি ছিলেন না, তারা এখন এই উদাহরণ টেনে বলতে পারবে যে, তুরস্ক প্রকৃতপক্ষে কোন নির্ভরযোগ্য বন্ধু নয়।

কেউ কেউ বলছেন যে, ইইউ এবং যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের মাঝে সমন্বয় করে তুরস্কের উপর চাপ সৃষ্টি করে বেলারুশে তুর্কি বিমানের ফ্লাইট বন্ধ করেছে। প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘ডিফেন্স নিউজ’এ মতামত দিতে গিয়ে তুর্কি পার্লামেন্টের প্রক্তন সদস্য এবং বর্তমানে ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্র্যাসিস’এর সিনিয়র ডিরেক্টর আইকান এরদেমির বলছেন যে, যদিও ওয়াশিংটন বা ব্রাসেলস কেউই সরাসরি ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’ নিয়ে কথা বলেনি, তথাপি আপাতঃদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে যে, হুমকি দিয়েই ফ্লাইটগুলি বন্ধ করা হয়েছে। কারণ ভন ডার লেইয়েনের হুমকির দু’দিনের মাথায় মেভলুত কাভুসোগলু যেমন দায় স্বীকার করেননি, তেমনি ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’ও বলেছে যে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ অবান্তর। অথচ এর দু’দিনের মাথাতেই ইস্তাম্বুল থেকে মিনস্কে মধ্যপ্রাচ্যের তিন দেশের নাগরিকদের যাওয়া বন্ধ করে দেয়া হয়।

তুরস্ক আসলে কি চাইছে?

কিন্তু প্রশ্ন হলো, গত মে মাসেই যেখানে পোল্যান্ডের সাথে তুরস্কের ২৪টা ‘বায়রাকতার টিবি২’ মনুষ্যবিহীন ড্রোন বিমান কেনার চুক্তি হয়েছে, সেখানে মাত্র কয়েক মাসের মাঝেই তুরস্কের সাথে পোল্যান্ডের সম্পর্ক এই পর্যায়ে কিভাবে আসতে পারে? আর পোল্যান্ডের সীমান্তে তুরস্কের স্বার্থই বা কি? কেনই বা আরেকটা ন্যাটো সদস্য দেশের সাথে তুরস্কের সমন্বয় এত কঠিন হবে? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক ফোকাসের দিকে তাকালেই। পোল্যান্ডের সীমান্ত সমস্যায় তুরস্কের প্রভাব খাটাবার চেষ্টার আলোচনাটা এমন সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ফোকাস হলো চীন। মার্কিনীরা ইউরোপ সহ দুনিয়ার সকল অঞ্চলে তাদের সামরিক অবস্থান কমিয়ে ইন্দোপ্যাসিফিকে চীনের বিরুদ্ধে মোতায়েন করছে। আর এমন একটা অবস্থায় পূর্ব ইউরোপে উত্তেজনা নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রকে বিচলিত করবে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র চাইবে যে, ইউরোপিয়রাই তাদের নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিক। তথাপি যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের সীমান্তে একটা দ্বন্দ্বে আটকে থাকলে তা অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নীতিকে প্রভাবিত করবে।

ঠান্ডা যুদ্ধের সময় তুরস্ক যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ইউরোপের ঢাল হিসেবে কাজ করেছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের কাছে তুরস্কের যে মূল্য ছিল, তা এখন নেই। কারণ বর্তমানে রুশ হুমকিকে ইউরোপের শক্তিধর দেশগুলি ততটা বড় হিসেবে দেখছে না। ইইউ এবং ন্যাটোর সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে জার্মানি এবং তার পার্শ্ববর্তী পোল্যান্ডের মাঝে চিন্তার ব্যাপক ফারাক রয়েছে। ইইউএর প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি জার্মানি তার বেশিরভাগ গ্যাস আমদানি করে থাকে রাশিয়া থেকে। অপরদিকে রাশিয়ার হুমকি মোকাবিলায় পোল্যান্ড চাইছে তাদের দেশে ন্যাটোর সেনা মোতায়েন থাকুক। ইইউএর এই বিভাজনের সময়েই ইউরোপ এবং রাশিয়ার মাঝে যুক্তরাষ্ট্র ব্যালান্স দেখতে চায়। ব্রেক্সিট পরবর্তী ব্রিটেনও সেটাই চায়; তাই তারাও পোল্যান্ডকে সীমান্ত শক্তিশালী করতে সহায়তা দিতে এগিয়ে এসেছে। সেই জায়গাটাতেই তুরস্ক জড়িত থাকতে চাইছে, ঠিক যেখানে যুক্তরাষ্ট্র একটা শূন্যস্থান রেখে যাচ্ছে। ঠান্ডা যুদ্ধ শেষেও একুশ শতকের ধ্বসে পরা বিশ্বব্যবস্থায় তুরস্ক পশ্চিমাদের কাছে তার মূল্য ধরে রাখতে চাইছে। অন্ততঃ ইইউএর সীমান্তে প্রচন্ড শীতের মাঝে শরণার্থীদের উপর জলকামানের ব্যবহার ইইউএর মানবাধিকারের স্তম্ভকে যতক্ষণ নাড়া দেবে, ততক্ষণ তুরস্ক ইইউএর সাথে কূটনৈতিক দরকষাকষির সুযোগ পাবে। আর তুরস্কের সাথে ইইউএর দ্বন্দ্বের তালিকা এখন বেশ বড়। তবে যুদ্ধবিমান বা যুদ্ধজাহাজ বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে নয়, বরং নিজস্ব বেসামরিক এয়ারলাইন্স ব্যবহার করেই তুরস্ক এই কাজটা করেছে। একুশ শতকে যুদ্ধের নতুন সংজ্ঞায় শরণার্থীরা যেমন বেলারুশ এবং রাশিয়ার কাছে অস্ত্র, তেমনি ‘টারকিশ এয়ারলাইন্স’ হয়েছে তুরস্কের অস্ত্র।

Wednesday, 17 November 2021

চীনারা কি গুলি না চালিয়েই যুদ্ধ জিতে যাচ্ছে?

১৭ই নভেম্বর ২০২১

চীনা মাছ ধরার জাহাজের বহর। চীনারা মিলিশিয়া জাহাজগুলিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক অঞ্চলে পাঠিয়ে অন্য দেশের জাহাজকে সমস্যায় ফেলে বলতে পারে যে, এরা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আবার মিলিশিয়াদের কেউ হতাহত হলে চীনা সরকার তাদের নাগরিকদের রক্ষা করতে জনমত তৈরি করতে পারবে। চীনাদের এই ‘হাইব্রিড যুদ্ধে’র কোন প্রত্যুত্তর এখনও মার্কিনীরা দিতে পারেনি। উল্টো মার্কিন সহায়তা না পেয়ে ছোট দেশগুলি মার্কিন নেতৃত্বের প্রতি হতাশাই ব্যক্ত করেছে।


ফিলিপাইনের থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ফিলিপাইন কাউন্সিল ফর ফরেন রিলেশন্স’এর অবসরপ্রাপ্ত লেঃ জেনারেল এডিলবার্তো আদান ‘দ্যা ম্যানিলা টাইমস’এর এক লেখায় বলছেন যে, চীনারা সাগরে কোন গোলাগুলি ছাড়াই যুদ্ধ জিতে চলেছে। চীনারা ফিলিপাইনের ‘এক্সক্লুসিভ ইকনমিক জোন’ বা ‘ইইজেড’এর মাঝেই ভয় দেখিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করছে; যাকে তিনি ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। চীনা হুমকি মোকাবিলায় তিনি ফিলিপাইনের জন্যে শুধু বন্ধু বা পার্টনারই চাইছেন না, এমন কোন মিত্র চাইছেন, যে কিনা চীনারা আক্রমণ করলে ফিলিপাইনকে রক্ষা করতে যুদ্ধ করবে এবং চীনাদের ‘গ্রে জোন’ কৌশল মোকাবিলায় ফিলিপিনোদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। ‘গ্রে জোন’ হলো এমন একটা কৌশল, যার মাধ্যমে যুদ্ধ আর শান্তির মাঝে পার্থক্য নিরূপণ করা কঠিন হয়ে যায়। অর্থনৈতিক আগ্রাসন থেকে শুরু করে তথ্য যুদ্ধ, বাণিজ্য যুদ্ধ, হাল্কা প্রকৃতির কিছু সহিংস কর্মকান্ড এতে থাকতে পারে। এছাড়াও নতুন প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং সাইবার হামলার মাধ্যমে একটা দেশকে অকার্যকর করে ফেলা সম্ভব। ফিলিপাইনের সামরিক বাহিনীর প্রাক্তন ভাইস চিফ অফ স্টাফ জেনারেল আদান ফিলিপাইনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ৭০ বছর আগে স্বাক্ষরিত ‘মিউচুয়াল ডিফেন্স ট্রিটি’ বা ‘এমডিটি’কে বর্তমান প্রেক্ষাপটে পরিবর্তন করার পক্ষপাতি। ‘এমডিটি’ চুক্তিকে আগ্রাসী রাষ্ট্রের অপ্রচলিত এবং ‘হাইব্রিড’ কৌশলের বিরুদ্ধে ডিটারেন্ট হিসেবে কাজ করতে হবে। ফিলিপাইনের উপর প্রচলিত সামরিক হামলা হলে চুক্তি মোতাবেক যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দেবে। কিন্তু ‘গ্রে জোন’ কৌশল অবলম্বণ করার ফলে চীনারা ‘এমডিটি’ চুক্তিকে বাইপাস করতে পারছে। এই ‘হাইব্রিড যুদ্ধে’ চীনারা তাদের ‘ম্যারিটাইম মিলিশিয়া’কে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে; যারা মূলতঃ সরকারি বাহিনী। ফিলিপাইনের জাহাজে ধাক্কা দেয়া এবং দল বেঁধে চীনা জাহাজের ইইজেডএর ভিতরে ঢুকে অবস্থান করার মতো ঘটনার ব্যাপারে ফিলিপাইন সরকার বেইজিংএর কাছে প্রতিবাদ করেছে; কিন্তু তাতে কোন কাজ হয়নি। জেনারেল আদান বলছেন যে, একারণেই ফিলিপাইনের উচিৎ ‘এমডিটি’র মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চাওয়া।

গত মার্চে ২’শ চীনা মাছ ধরার ট্রলার একত্রে দক্ষিণ চীন সাগরে ফিলিপাইনের কাছাকাছি এসে হাজির হয়। ফিলিপাইন বলছে যে, সেই জায়গা ফিলিপাইনের ইইজেডএর মাঝে পড়ে। তাদের কথায়, ট্রলারগুলি দেখে মনে হয় না যে, এগুলি মাছ ধরতে এসেছে। এগুলি বরং চীনের ‘ম্যারিটাইম মিলিশিয়া’ দ্বারা পরিচালিত। ‘বিবিসি’ বলছে যে, পাঁচ বছর আগে আন্তর্জাতিক আদালত দক্ষিণ চীন সাগরের ৯০ শতাংশ এলাকাকে চীনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে বলে রায় দেয়। তবে বেইজিং তাদের নিজেদের আঁকা ‘নাইন ড্যাশ লাইন’এর মাঝে সকল সমুদ্রাঞ্চলকে নিজেদের বলে দাবি করে। এই অঞ্চলের মাঝে চীনারা কৃত্রিমভাবে দ্বীপ উন্নয়ন করেছে এবং নিয়মিত সামরিক প্যাট্রোলের ব্যবস্থা করেছে। এর আগে ২০১৯এর ডিসেম্বরে ইন্দোনেশিয়ার কাছে নতুনা সাগরে চীনা মাছ ধরার ট্রলারের বড় একটা বহর কোস্ট গার্ডের জাহাজের পাহাড়ায় হানা দেয়। ইন্দোনেশিয়ার সরকার এই হুমকি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে নৌবাহিনীর জাহাজ প্রেরণ করে। কিন্তু উভয় পক্ষ সমুদ্রে বেশ কিছুদিন ধরে উত্তেজনাকর অবস্থানে থাকে। পরবর্তীতে ইন্দোনেশিয়া সেই অঞ্চলে নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় নিজেদের মাছ ধরার জাহাজের বহর মোতায়েনের পরিকল্পনা শুরু করে বলে দেশটার মিডিয়া ‘মঙ্গাবে’ জানায়।

শুধু কাছের সমুদ্রেই নয়, চীনারা পাড়ি জমিয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কিঃমিঃ দূরের দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে। ২০২০এর সেপ্টেম্বরে প্রায় ৩’শ চীনা মাছ ধরার জাহাজ হাজির হয় দক্ষিণ আমেরিকার পেরুর সমুদ্রসীমায়। ‘ভয়েস অব আমেরিকা’র এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, জাহাজগুলি গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের কাছে মাছ ধরার পর পেরুর উপকূলে হাজির হয়। ইকুয়েডরের নৌবাহিনীর অপারশনসএর কমান্ডার রিয়ার এডমিরাল ড্যানিয়েল গিনেজ বলেন যে, এভাবে মাছ ধরলে কিছু বিশেষ প্রজাতির মাছের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। চীনারা এখানে প্রতিবছরই মাছ ধরতে আসছে। একই বছরের জুন মাসে ৩’শ ৪০টা জাহাজ একত্রে গালাপাগোস এবং ইকুয়েডরের কাছে মাছ ধরতে এসেছিল। দক্ষিণ আমেরিকার পেরু এবং ইকুয়েডরের অর্থনীতি সামুদ্রিক মাছ ধরার উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। চীনাদের কর্মকান্ড এই দেশগুলির অর্থনীতিকে আঘাত করতে পারে। বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের হিসেবে এই দুই দেশ মিলে বছরে প্রায় ৪৫ লক্ষ টন মাছ ধরে; যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সমান। তবে চীনারা এক বছরে এরও চার গুণ মাছ ধরে। পুরো বিশ্বের মোট মৎস্য সম্পদের তিন ভাগের এক ভাগই চীনারা খাচ্ছে। লন্ডনের ‘ওভারসীজ ডেভেলপমেন্ট ইন্সটিটিউট’এর হিসেবে চীনাদের রয়েছে প্রায় ১৭ হাজার জাহাজের বিশাল মাছ ধরার বহর। তাদের জাহাজের আকৃতিও বড় হচ্ছে। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ লাইবেরিয়ার উপকূলে চীনারা ৬টা জাহাজ পাঠিয়েছে বলে ২০২০এর জুলাইএ আফ্রিকার মিডিয়াগুলি প্রতিবেদন করে। তারা বলে যে, এই জাহাজগুলি বছরে ১২ হাজার টন পর্যন্ত মাছ ধরতে সক্ষম, যা লাইবেরিয়ার স্বাভাবিক মাছ ধরার সক্ষমতার দুই গুণ!

সমুদ্র এখন চীনের অর্থনীতিতে অতি গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্র সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চীনাদের সাথে বাকিদের চলছে ব্যাপক দ্বন্দ্ব। প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলি চীনের কৌশলকে ‘গ্রে জোন’ বা ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ বলছে। সামরিক ম্যাগাজিন ‘মিলিটারি রিভিউ’এর এক লেখায় গবেষক শুজিয়ান লুও এবং জনাথন প্যানটার বলছেন যে, চীনারা তাদের ম্যারিটাইম মিলিশিয়া ব্যবহার করে ‘গ্রে জোন’ কর্মকান্ড চালাচ্ছে; কারণ পরিস্থিতি বুঝে বেইজিং বলতে পারে যে, এদের সাথে সরকারের কোন সম্পর্ক নেই। চীনারা মিলিশিয়া জাহাজগুলিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক অঞ্চলে পাঠিয়ে অন্য দেশের জাহাজকে সমস্যায় ফেলে বলতে পারে যে, এরা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আবার মিলিশিয়াদের কেউ হতাহত হলে চীনা সরকার তাদের নাগরিকদের রক্ষা করতে জনমত তৈরি করতে পারবে। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনারা ট্রলারের বহরের সাথে অনেক ক্ষেত্রেই কোস্ট গার্ডের জাহাজ পাঠায়। নৌবাহিনীর জাহাজ না পাঠিয়ে সাদা রঙএর কোস্ট গার্ডের জাহাজ পাঠানোটাও ‘গ্রে জোন’ কৌশলের অংশ। এই জাহাজগুলি স্বল্প অস্ত্রে সজ্জিত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি চীনা জাহাজগুলি অনেক নৌবাহিনীর ফ্রিগেটের চাইতেও বড়। প্রতিপক্ষের মাছ ধরার ট্রলার বা ছোট প্যাট্রোল বোটকে ধাক্কা দিয়ে ডুবিয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটছে। চীনাদের এই ‘হাইব্রিড যুদ্ধে’র কোন প্রত্যুত্তর এখনও মার্কিনীরা দিতে পারেনি। উল্টো মার্কিন সহায়তা না পেয়ে ছোট দেশগুলি মার্কিন নেতৃত্বের প্রতি হতাশাই ব্যক্ত করেছে।

Monday, 15 November 2021

ইরানের লক্ষ্য আসলে কি?

১৫ই নভেম্বর ২০২১

ইরানের 'আইআরজিসি'র ছোট ছোট বোটগুলি মহড়া দিচ্ছে। ইরানের কৌশলের মাঝে রয়েছে মাইন, জাহাজধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং শতশত ছোট বোট ব্যবহারের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে ফেলা; যাতে বিশ্বের জ্বালানি তেলের বাজারে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হয়। ইরানের ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’র উদ্দেশ্য হলো একটা ‘গ্রে জোন’ তৈরি করা; যা যুদ্ধ এবং শান্তির মাঝামাঝি থাকবে। এতে ভীতি প্রদর্শন এবং প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে অগ্রগামী অবস্থান নেয়া হবে; এবং একইসাথে দ্বন্দ্বকে পুরোপুরি যুদ্ধে রূপ নেয়া থেকে বিরত রাখা হবে। শুধু তাই নয়, নিশ্চিত করা হবে যাতে নিজেদের উপর বড় কোন প্রতিশোধমূলক হামলা না আসে।

 
ইরানের রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য অর্জনে ইরান কি কি কর্মকান্ড চালাচ্ছে, তা নিয়ে ভূরাজনৈতিক চিন্তাবিদদের মাঝে মোটামুটি ঐকমত্য থাকলেও লক্ষ্যটা আসলে কি, সেব্যাপারে ভিন্নমত রয়েছে। মার্কিন চিন্তাবিদেরা ইরানের লক্ষ্যকে আগ্রাসী মনে করলেও ব্রিটিশ চিন্তাবিদেরা সেটাকে ডিটারেন্ট হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ মার্কিনীরা যেখানে আলোচনা করছেন যে, ইরানের আগ্রাসী কর্মকান্ড কিভাবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাব ক্ষুন্ন করছে, সেখানে ব্রিটিশ চিন্তাবিদেরা বলছেন যে, মার্কিন প্রভাব থেকে মুক্ত হতে ইরান তার ডিটারেন্ট তৈরিতে বাধ্য হচ্ছে। মূলতঃ ব্রিটিশ চিন্তাবিদেরা মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের একচ্ছত্র আধিপত্য দেখতে ইচ্ছুক নয় বলেই দুই ঘরানার চিন্তাবিদদের মাঝে মতপার্থক্য থেকে যাচ্ছে।

ইরান ‘ফরওয়ার্ড ডিফেন্স’ কৌশল কি আগ্রাসী?

ইরানের আঞ্চলিক কৌশল নির্ধারণের পিছনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিকে নিয়ে ‘মিডলইস্ট স্টাডিজ এসোসিয়েসন’এর এক আলোচনায় কথা বলেছেন মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘মিডলইস্ট ইন্সটিটিউট’এর আমর ইয়োসেফ। তিনি বলছেন যে, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধির চেষ্টাটা আঞ্চলিক সুযোগের কারণে যতটা হয়েছে, তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণেও ততটা হয়েছে। তিনি ইরানের রাজনীতিতে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নিয়ন্ত্রণে থাকা ‘ইসলামিক রিপাবলিকান গার্ড কোর’ বা ‘আইআরজিসি’র সাথে পুনর্গঠনকামী রাজনৈতিক গ্রুপের দ্বন্দ্বকে তুলে ধরেন। তিনি বলছেন যে, ২০০৫ সাল থেকে মার্কিন হুমকি মোকাবিলায় ইরান ‘মোজাইক ডিফেন্স’এর কৌশল অবলম্বন করেছে। এই কৌশলের লক্ষ্য ছিল প্রচলিত এবং অপ্রচলিত বাহিনী ব্যবহারের মাধ্যমে ইরানের মূল ভূখন্ডে হামলা করাটা কঠিন করে ফেলা। তবে আরব বসন্ত শুরুর পর ২০১২ সাল থেকে ইরান তার কৌশলের মাঝে আক্রমণাত্মক অংশটা যুক্ত করেছে। ‘ফরওয়ার্ড ডিফেন্স’ নামে পরিচিত এই কৌশলে বলা হয় যে, ইরানের উচিৎ ইরানের সীমানার বাইরে যুদ্ধ করা, যাতে ইরানের অভ্যন্তর নিরাপদ থাকে। ‘হাইব্রিড’ ধরনের এই কৌশলে যুক্ত হয়েছে আঞ্চলিক প্রক্সি গ্রুপ, ড্রোন, নৌ গেরিলা এবং সাইবার যুদ্ধ। এই কৌশলের মূলে প্রথমতঃ রয়েছে গেরিলা, সন্ত্রাস এবং স্পেশাল অপারেশনের মাধ্যমে চালিত অপ্রচলিত যুদ্ধ এবং সাথে রয়েছে ইন্টেলিজেন্স অপারেশন, তথ্য ও সাইবার যুদ্ধ। আর দ্বিতীয়তঃ এতে রয়েছে আক্রমণাত্মক অংশ, যার স্তম্ভ হলো নিজেদের দুর্বলতা। এভাবে চালিত ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’র উদ্দেশ্য হলো একটা ‘গ্রে জোন’ তৈরি করা; যা যুদ্ধ এবং শান্তির মাঝামাঝি থাকবে। এতে ভীতি প্রদর্শন এবং প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে অগ্রগামী অবস্থান নেয়া হবে; এবং একইসাথে দ্বন্দ্বকে পুরোপুরি যুদ্ধে রূপ নেয়া থেকে বিরত রাখা হবে। শুধু তাই নয়, নিশ্চিত করা হবে যাতে নিজেদের উপর বড় কোন প্রতিশোধমূলক হামলা না আসে। এই কৌশল বাস্তবায়নে সবচাইতে বড় ভূমিকা হলো ‘আইআরজিসি’র। ইরানের জন্যে সিরিয়া এবং ইরাকে আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হবার সমান্তরালেই ইরানের রাজনীতিতে ‘আইআরজিসি’র ক্ষমতা বেড়েছে। ২০১৯ সালের অক্টোবরে আয়াতুল্লাহ খামেনি ‘আইআরজিসি’র নেতাদের উদ্দেশ্যে এক ভাষণে বলেন যে, নিজেদের সীমানার মাঝে সীমাবদ্ধ থেকে সীমানার প্রতি হুমকিকে অবহেলা করা যাবে না। ‘আইআরজিসি’র দায়িত্ব হলো সুদূরপ্রসারী আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তবায়ন; যা হলো অতি গুরুত্বপূর্ণ ‘স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ’।

 
ইরানের প্রযুক্তি সহায়তায় হিযবুল্লাহর নিজস্ব নির্মিত রকেট। এই রকেটগুলি কি ইরানের আগ্রাসী নীতির অংশ, বাকি ডিটারেন্স, তা নিয়ে পশ্চিমাদের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। ব্রিটিশরা বলছে যে, শত্রুদেরকে মোকাবিলায় ইরান শক্তিশালী ডিটারেন্স তৈরি করেছে। এই ডিটারেন্সের অংশ হলো ইরান এবং লেবাননে অবস্থিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং রকেট; যেগুলি যুদ্ধের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা, আরব দেশগুলির অর্থনৈতিক অবকাঠামো এবং ইস্রাইলের শহর এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে।

ইরানের কৌশল কি শুধুই ডিটারেন্ট?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের জাতিরাষ্ট্রগুলির সৃষ্টি যেহেতু ব্রিটেনের হাতেই হয়েছে, তাই ব্রিটিশ চিন্তাবিদদের মধ্যপ্রাচ্যের ধারণা বাকিদের থেকে আলাদা। ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউট’ বা ‘রুসি’র এক লেখায় রিসার্চ ফেলো জ্যাক ওয়াটলিং বলছেন যে, ইরানের কৌশল মূলতঃ ডিটারেন্স। ইরানের অভ্যন্তরে দু’টা গ্রুপ রয়েছে, যার একপক্ষ মূলতঃ জাতীয়তাবাদী; যাদের লক্ষ্য হলো ইরানকে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে দেখা। অপরপক্ষ হলো বিপ্লবী; যারা চাইছে ইরানকে শিয়া মুসলিমদের নেতৃত্বে দেখতে। এই দু'টা লক্ষ্যই বহিঃশত্রুর হুমকির মাঝে রয়েছে; কারণ ইরান মনে করে যে, এই হুমকির মাধ্যমে ইরানের স্বাধীনভাবে কাজ করাকে বাধা দেয়া হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ইরানের মূল লক্ষ্য হলো বিপ্লব পরবর্তী ইরানের সংবিধান এবং তার স্বাধীনতাকে রক্ষা করা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ইরানের সামনে প্রধান বাধা হলো যুক্তরাষ্ট্র এবং ইস্রাইল। এই শত্রুদেরকে মোকাবিলায় ইরান শক্তিশালী ডিটারেন্স তৈরি করেছে। এই ডিটারেন্সের অংশ হলো ইরান এবং লেবাননে অবস্থিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং রকেট; যেগুলি যুদ্ধের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা, আরব দেশগুলির অর্থনৈতিক অবকাঠামো এবং ইস্রাইলের শহর এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে। এছাড়াও ইরাকে অবস্থিত ইরানের মিলিশিয়ারা ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির উপর হামলা করবে; এবং ‘আইআরজিসি’র নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন নৌশক্তির অবাধে চলাচলকে বিঘ্নিত করবে। এর ফলশ্রুতিতে মার্কিনীরা আঞ্চলিকভাবে নিজেদের সামরিক কর্মকান্ডকে চালিয়ে নিতে পারবে না। ইরান মোটামুটি নিশ্চিত যে, এই কৌশলের ফলে ইরানের মূল ভূখন্ডে স্থলসেনার হামলার সম্ভাবনা তেমন নেই। তবে সম্ভাবনা রয়েছে বড় ধরনের বিমান হামলার; কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্থাপনা বা ভৌগোলিক অঞ্চল দখল করার সম্ভাবনাও রয়েছে; এছাড়াও ইরানের অভ্যন্তরে জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা হতে পারে। ইরান সরকার মনে করে যে, সে অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা সামাল দিতে সক্ষম। একইসময়ের মাঝে তারা আঞ্চলিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বীদের উপর যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি আরোপ করে জয়পরাজয় অনিশ্চিত করে ফেলতে পারবে। ফলশ্রুতিতে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য হবে প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্র এবং তার বন্ধুরা। এই শক্তিশালী ডিটারেন্ট সক্ষমতা রেখেই ইরান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইস্রাইল, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লেবানন এবং ইয়েমেনের মতো আঞ্চলিক দ্বন্দ্বে ব্যস্ত রেখে তাদের অর্থনৈতিক, সামরিক এবং রাজনৈতিক প্রভাবকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তবে সিরিয়া এবং ইরাকে প্রভাব ধরে রাখাটা ইরান নিজস্ব নিরাপত্তার একটা বাধ্যবাধকতা হিসেবে দেখে; যেখানে অবস্থান ধরে রাখতে ইরানকে নিজস্ব সম্পদ খরচ করতে হচ্ছে।

আক্রমণাত্মক, নাকি প্রতিরক্ষামূলক কৌশল?

ইরানি চিন্তাবিদেরাও প্রায় একইভাবে চিন্তা করছেন। তেহরানের ‘আলামেহ তাবাতাবাঈ ইউনিভার্সিটি’র এসিসট্যান্ট প্রফেসর হাদি আযিলি এবং ব্রিটিশ থিংকট্যাঙ্ক ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ বা ‘আইআইএসএস’এর রিসার্স ফেলো মাহসা রুহি ‘আইআইএসএস’এর এক লেখায় বলছেন যে, পশ্চিমারা কেউ কেউ মনে করেন যে, ইরানের কৌশল মূলতঃ আক্রমণাত্মক; বাকিরা মনে করেন যে, আসলে তা প্রতিরক্ষামূলক। তারা বলেন যে, নিজস্ব শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যে ইরানের পারসিক সাম্রাজ্যে রূপান্তরিত হবার কথা পশ্চিমারা যখন বলেন, সেটা যেমন ঠিক নয়, তেমনি ইরানের কৌশল পুরোপুরি প্রতিরক্ষামূলক, সেটাও পুরোপুরি সঠিক নয়। তাদের কথায়, ইরানের কৌশলের মাঝে রয়েছে ‘ফরওয়ার্ড ডিফেন্স’, তথাপি এটা মূলতঃ ডিটারেন্ট ভিত্তিক বা প্রতিরক্ষামূলক। নিজেদের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতার মারাত্মক ঘাটতি মোকাবিলা করতে গিয়েই ইরান অপ্রচলিত পদ্ধতির দিকে ধাবিত হয়েছে; যার মাঝে রয়েছে রাষ্ট্রের বাইরেও বিভিন্ন আঞ্চলিক গ্রুপের সাথে জোট বাঁধা। এই পদ্ধতিগুলিকেই ইরান নিজেদের রক্ষায় ডিটারেন্ট হিসেবে দেখেছে। মূল উদ্দেশ্য হলো ইরানের উপর কেউ হামলা করার চিন্তা করলে হামলাকারীর খরচ অত্যধিক বৃদ্ধি করে দেয়া; যার ফলশ্রুতিতে হামলার পরিকল্পনাকারী সহজে হামলা করবে না। এধরনের চিন্তার জন্ম হয়েছে ১৯৭৯এর বিপ্লবের পর থেকে। বিপ্লবের আগ পর্যন্ত ইরানের শাহএর সরকার যুক্তরাষ্ট্রের খুব কাছের বন্ধু রাষ্ট্র ছিল। কিন্তু বিপ্লবের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শত্রু রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ১৯৮০ সালে ইরাকের সাথে যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র এবং আরব দেশগুলি ইরাকের পক্ষ নেয়। কারণ ইরানের আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি সরকারের বিপ্লবের মাধ্যমে শিয়া ধর্মীয় চিন্তাগুলি আঞ্চলিকভাবে ছড়িয়ে দেয়ার কথাগুলি আরব সরকারগুলির জন্যে হুমকি হিসেবে দেখা দেয়। যুদ্ধের মাঝে সোভিয়েত ইউনিয়ন ইরাককে ‘স্কাড বি’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করে; যা সাদ্দাম হোসেনের সরকার ইরানের শহরগুলির উপর ব্যবহার করে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের দ্বারা আক্রান্ত হবার এই বিভীষিকাই পরবর্তীতে ইরানকে একইধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপ করতে উৎসাহিত করে। তবে ইরানের উপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে ইরান পরবর্তীতে নিজস্ব সামরিক শিল্প তৈরির দিকে মনোযোগী হয়। তবে নতুন সামরিক প্রযুক্তি ডেভেলপ করতে গিয়ে অর্থনৈতিক চাপে ইরানকে সেসব অস্ত্রই ডেভেলপ করতে হয়েছে, যেগুলি স্বল্প খরচে বেশি কৌশলগত সুবিধা দেবে। ইরানের মূল সামরিক লক্ষ্য হলো ‘এন্টি একসেস, এরিয়া ডিনাইয়াল’ বা ‘এটুএডি’ কৌশল বাস্তবায়ন করা। এই কৌশলের মাধ্যমে ইরান আঞ্চলিকভাবে কোন আগ্রাসী শক্তির সামরিক অবস্থান নেয়া কঠিন করে ফেলবে; যাতে করে সেই শক্তির পক্ষে ইরানের মূল ভূখন্ডে হামলা করাটা কঠিন হয়ে যায়। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলি এই কৌশলের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এছাড়াও কৌশলের মাঝে রয়েছে মাইন, জাহাজধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং শতশত ছোট বোট ব্যবহারের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে ফেলা; যাতে বিশ্বের জ্বালানি তেলের বাজারে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হয়। তবে আযিলি এবং রুহি বলছেন যে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলি পারমাণবিক অস্ত্র বহণ করার জন্যে তৈরি করা হয়নি কখনোই; এবং তারা মনে করেন না যে, এই কৌশল পরিবর্তিত হবার আদৌ কোন সম্ভাবনা রয়েছে। তারা বলছেন যে, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব কমিয়ে আনলেই যে তার প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলি ইরানের সরকারকে দুর্বল করা বা সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করবে না, তার কোন গ্যারান্টি নেই। অপরদিকে আঞ্চলিক অবস্থান ধরে রাখতে পারলে তা ইরানের ডিটারেন্টকে শক্তিশালী করছে। সিরিয়া, লেবানন, ইরাক এবং ইয়েমেনে প্রক্সি মিলিশিয়া তৈরি করার মাধ্যমে ইরান তার ‘স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ’ বৃদ্ধি করেছে; যা কিনা ইরানের মূল ভূখন্ডের উপর হুমকি কমিয়েছে।

 
ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার মানচিত্র। ইরানের মূল সামরিক লক্ষ্য হলো ‘এন্টি একসেস, এরিয়া ডিনাইয়াল’ বা ‘এটুএডি’ কৌশল বাস্তবায়ন করা। এই কৌশলের মাধ্যমে ইরান আঞ্চলিকভাবে কোন আগ্রাসী শক্তির সামরিক অবস্থান নেয়া কঠিন করে ফেলবে; যাতে করে সেই শক্তির পক্ষে ইরানের মূল ভূখন্ডে হামলা করাটা কঠিন হয়ে যায়। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলি এই কৌশলের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

‘আলসার স্ট্র্যাটেজি’

‘দ্যা ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় মার্কিন ‘নেভাল ওয়ার কলেজ’এর ‘জে সি উইলি চেয়ার অব ম্যারিটাইম স্ট্র্যাটেজি’ জেমস হমস বলছেন যে, ইরানের কৌশল হলো ‘আলসার’এর মতো। স্বল্প সক্ষমতার কারণেই ইরান ‘ওয়ার বাই কনটিনজেন্ট’ কৌশল অবলম্বণ করছে; যা দু’শ বছর আগে ব্রিটেন করেছিল ন্যাপোলিয়নের অধীনে পুরো ইউরোপের বিরুদ্ধে। এই কৌশলের মাধ্যমে ব্রিটেন তার প্রধানতম লক্ষ্যগুলি অর্জন করার পর তার হাতে যতটুকু সম্পদ রয়েছে, সেই সম্পদটুকুই ব্যয় করেছে ন্যাপোলিয়নের বাহিনীর সাথে সরাসরি স্থলযুদ্ধে। এই যুদ্ধটা ব্রিটেন করেছিল ফ্রান্সের অধীনে থাকা স্পেনের মাটিতে। স্বল্প সম্পদ ব্যবহার করেই ব্রিটেন স্প্যানিশ জনগণের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ন্যাপোলিয়নের কয়েক লাখ সেনার বিশাল সেনাবাহিনীকে ১৮০৮ সাল থেকে ১৮১৪ সাল পর্যন্ত ছয় বছরের জন্যে স্পেনে আটকে রেখেছিল। এই বাহিনী বাকি ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে অংশ নেয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছিল; যা পরবর্তীতে ন্যাপোলিয়নের পক্ষে ইউরোপের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা কঠিন করে ফেলেছিল। ন্যাপোলিয়ন নিজেই স্পেনের অবস্থাকে “স্প্যানিশ আলসার” বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। হমস বলছেন যে, ইরানও ব্রিটিশদের কৌশল অবলম্বণ করে মার্কিন নৌবাহিনীর একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশকে মধ্যপ্রাচ্য টহল দিতে বাধ্য করছে; যখন যুক্তরাষ্ট্র চাইছে এই জাহাজগুলিকে বিশ্বের অন্য স্থানগুলিতে মোতায়েন রাখতে। তিনি হিসেব করে দেখাচ্ছেন যে, মার্কিন নৌবাহিনীর মোট ১১টা বড় বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ রয়েছে। খুব ভালো কোন দিনে হয়তো এগুলির চারটাকে সমুদ্রে পাওয়া যাবে অপারেশনের জন্যে; বাকিগুলি হয় মেইনটেন্যাস, বা ওভারহলিংএ রয়েছে, অথবা মিশনের জন্যে রেডি হচ্ছে, অথবা সবেমাত্র লম্বা মিশন শেষ করে বিশ্রামে যাচ্ছে। এছাড়াও ছোট আকারের উভচর বিমানবাহী জাহাজ রয়েছে ৮টা; যার মাঝে সর্বোচ্চ ৩টা অপারেশনে থাকে। এর মাঝে একটা জাহাজ আবার কিছুদিন আগেই আগুনে ধ্বংস হয়ে গেছে। দুই ধরনের মিলিয়ে মোট সাতটা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ যেকোন সময়ে অপারেশনের জন্যে পাওয়া যাবে; যার দু’টা মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের। অর্থাৎ মার্কিন নৌবাহিনীর শক্তির মূলে থাকা ৭টা জাহাজের মাঝে ২টা মোতায়েন থাকছে মধ্যপ্রাচ্যে; বাকি ৫টা দিয়ে বাকি বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের। এই সমীকরণটা বর্তমানে শুধুমাত্র ইরানের কারণেই বাস্তবতা হয়ে রয়েছে মার্কিনীদের জন্যে।

মার্কিন বনাম ব্রিটিশ চিন্তার পার্থক্য

ইরানের রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য সম্পর্কে একটা সম্যক ধারণা থাকলেও দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতার কারণেই পশ্চিমা চিন্তাবিদদের মাঝে মত পার্থক্য রয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বে মার্কিনীরা ব্রিটিশ প্রভাবের জায়গাগুলিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবার যে চেষ্টাটা করেছে, তা আটলান্টিকের দুই পাড়ের দুই শক্তির মাঝে টানাপোড়েন তৈরি করেছে। যদিও ঠান্ডা যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন একপক্ষে থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নকে মোকাবিলা করেছে, তথাপি দু’শ বছর ধরে নিজের শাসনে থাকা বিশ্বব্যবস্থাকে মার্কিনীদের হাতে ছেড়ে দিতে ব্রিটেন প্রস্তুত ছিল না। ব্রিটেন নিশ্চিত করেছে যে, বিশ্বব্যাপী অনেকগুলি দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণে থাকা ‘ওয়ারশ’ জোটে যেমন যোগ দেবে না, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা জোটেরও বাইরে থাকবে। ‘নিরপেক্ষ’ এই দেশগুলির নিয়ন্ত্রণের জন্যে ঠান্ডা যুদ্ধের দুই মেরুর জোটের মাঝে ব্যাপক প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলেছে। এখানেই ছিল ব্রিটেনের প্রভাব ধরে রাখার রাজনৈতিক সক্ষমতা। এই দেশগুলিকে সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণে যাওয়া থেকে বিরত রাখার বিনিময়ে ব্রিটেন বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ থেকেছে। এখন একুশ শতকে বিশ্বের জাতিরাষ্ট্রগুলির সামনে যখন মার্কিন এবং চীনা ক্যাম্পে যোগদান করার অপশন দেয়া হচ্ছে, তখন ব্রিটেন নিশ্চিত করতে চাইছে যে কিছু দেশ কোন পক্ষেই থাকবে না। অর্থাৎ ঠান্ডা যুদ্ধের মতোই কিছু দেশ কোন জোটেই যোগ দেবে না। এই দেশগুলির ‘নিরপেক্ষতা’ একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত সম্পদকে বিভাজিত করে ওয়াশিংটনের জন্যে বিরক্তির কারণ হবে, অন্যদিকে তা লন্ডনের জন্যে ভূরাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখার হাতিয়ার হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত মার্কিনীদের মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান ধরে রাখার বাধ্যবাধকতা থাকবে, ততদিন ব্রিটেন মার্কিন নীতিকে প্রভাবিত করার সুযোগ পাবে। ‘রুসি’র জ্যাক ওয়াটলিং যখন বলছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে একটা আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে মেনে নিয়ে আলোচনায় এগুনোই পশ্চিমাদের জন্যে শ্রেয়, তখন তা বহুদিনের ব্রিটিশ চিন্তাটাকেই প্রতিফলিত করে। জেমস হমস ইরানের কৌশলকে যথার্থই ‘আলসার স্ট্র্যাটেজি’ বলেছেন। আর ব্রিটিশরা চায় পরিবর্তিত বিশ্ব ভূরাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের এই ‘আলসার’ যেন মার্কিনীদের বৈশ্বিক নীতিকে প্রভাবিত করে যেতে থাকে।

Sunday, 31 October 2021

বেলারুশ কি ইইউএর বিরুদ্ধে ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ চালাচ্ছে?

৩১শে অক্টোবর ২০২১

পশ্চিমা চিন্তার স্তম্ভ মানবাধিকার ইইউএর সদস্য রাষ্ট্রগুলির শরণার্থী বিরোধী জাতীয়তাবাদী চিন্তার কাছে হার মেনেছে। পোল্যান্ডের পার্লামেন্টে গণতান্ত্রিকভাবেই শরণার্থীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। রাশিয়ার সমর্থনে বেলারুশ ইউরোপের দুর্বলতাকেই উস্কে দিচ্ছে; যাকে ইইউ বলছে ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ। ইউরোপের লিবারাল গণতান্ত্রিক আদর্শ দিনে দিনে দুর্বল হচ্ছে; আর এর স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে উগ্রবাদী জাতীয়তাবাদী চিন্তা। লিবারাল চিন্তার উৎসস্থলে এই দুর্যোগ ধ্বসে পড়া বিশ্বব্যবস্থারই প্রমাণ মাত্র।

 পূর্ব ইউরোপের দেশ বেলারুশের সাথে ইইউএর যখন উত্তপ্ত সম্পর্ক চলছে, তখন ইইউএর অনেকেই অভিযোগ করছেন যে, বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কো ইইউএর সাথে শরণার্থী ব্যবহার করে ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। আর এই যুদ্ধে লুকাশেঙ্কোর প্রধান সমর্থনকারী হলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। অপরদিকে ইইউএর পূর্ব সীমানার দেশ লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া এবং পোল্যান্ড শরণার্থীদের আটকাতে তাদের সীমানায় দেয়াল তৈরিতে উদ্যত হয়েছে; এবং এব্যাপারে তারা ইইউএর সহায়তা চাইছে।

‘ফিনানশিয়াল টাইমস’এর সাথে সাক্ষাতে ইইউএর স্বরাষ্ট্র কমিশনার ইয়ালভা জোহানসন বলেন যে, বেলারুশের প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কো মানুষকে আগ্রাসনের জন্যে ব্যবহার করছেন। তিনি দাবি করেন যে, বেলারুশের উপর ইইউএর অবরোধগুলি তাকে আঘাত করছে বলেই তিনি এখন মরিয়া হয়ে দ্বন্দ্বের দিকে ধাবিত হতে বাধ্য হচ্ছেন। ‘ইউরোনিউজ’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০২০ সালে বেলারুশের নির্বাচনে জেতার পর থেকেই ইইউএর সাথে লুকাশেঙ্কো সরকারের সম্পর্ক খারাপের দিকে যেতে থাকে। ইইউ থেকে নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং এরপর থেকে বেলারুশের রাস্তায় প্রতিবাদ শুরু হয়। ইইউ লুকাশেঙ্কো সরকারের উপর অবরোধ আরোপ করে এবং দ্বন্দ্ব চলতেই থাকে। বেলারুশ সরকার ‘রায়ান এয়ার’এর একটা বিমানকে মিনস্ক বিমানবন্দরে নামতে বাধ্য করে এবং বিমানের অভ্যন্তর থেকে এক সাংবাদিককে বের করে এনে গ্রেপ্তার করে। গত অগাস্টে টোকিও অলিম্পিক থেকে পালানো বেলারুশ এথলেট ক্রিস্টসিনা সিমানুস্কায়াকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয় ইইউএর সদস্য দেশ পোল্যান্ড; যা বেলারুশের সাথে দেশটার সম্পর্ক খারাপ করে। তবে এক সংবাদ সন্মেলনে লুকাশেঙ্কো অস্বীকার করেন যে, তিনি শরণার্থীদেরকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। তিনি বলেন যে, বেলারুশ কাউকে ‘ব্ল্যাকমেইল’ করে না; তবে তারা যদি বেলারুশকে শর্তের মাঝে ফেলে, তাহলে বেলারুশ প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হবে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন যে, তার দেশের রাশিয়া, চীন বা ইইউএর মতো সম্পদ নেই।

 

তবে বেলারুশ থেকে আসা শরণার্থীর চাপে প্রতিবেশী দেশ লিথুয়ানিয়া এবং লাটভিয়া জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। পোল্যান্ডও তার সীমান্ত অঞ্চলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে এবং প্রায় ৬ হাজার সেনা সীমানায় মোতায়েন করে। লাটভিয়া এবং পোল্যান্ড উভয় দেশই তাদের সীমান্তরক্ষী এবং সামরিক বাহিনীকে শক্তি ব্যবহার করে শরণার্থীদের বেলারুশে ফিরিয়ে দেয়ার ক্ষমতা প্রদান করেছে। পোল্যান্ডের পার্লামেন্টে বিল পাশ করে সাড়ে তিন’শ মিলিয়ন ইউরো ব্যয়ে বেলারুশের সাথে ৪’শ কিঃমিঃ সীমানা বরাবর দেয়াল তোলার প্রকল্প নেয়া হয়েছে। পোলিশ সরকার বলছে যে, এবছরেই তারা বেলারুশ থেকে শরণার্থী ঢোকার চেষ্টার ২৩ হাজার প্রচেষ্টাকে তালিকাভুক্ত করেছে। লিথুয়ানিয়াও বেলারুশের সীমানায় কাঁটাতাদের বেড়া দেয়া শুরু করেছে। ইউরোপিয়ান কমিশনের এক বিবৃতিতে এই বেড়া দেয়াকে ‘ভালো চিন্তা’ বলে আখ্যা দেয়া হয়। তবে ইইউ এই প্রকল্পে কোন অর্থায়ন করবে না বলে বলা হয়। লিথুয়ানিয়া সরকার ইইউএর কাছ থেকে এব্যাপারে সহায়তা চেয়েছে।

‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, শরণার্থীদের মূল স্রোত আসছে ইরাকের উত্তরের কুর্দী অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে। ইরাক, সিরিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে শরণার্থীরা ১৪ থেকে ১৭ হাজার ডলার খরচ করে মানব পাচারকারীদের মাধ্যমে সেখানে পৌঁছাচ্ছে। প্রথমে এবছরের অগাস্টে বাগদাদ থেকে সরাসরি শরণার্থীরা বেলারুশে আসতে থাকে। এরপর ইইউএর চাপের মুখে ইরাক সরকার সরাসরি ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে ইরাক থেকে শরণার্থীরা দুবাই, লেবানন, সিরিয়া, জর্দান, তুরস্ক, ইত্যাদি দেশ হয়ে বেলারুশে আসতে থাকে। অনেকেই অভিযোগ করছেন যে, বেলারুশ সরকার মিনস্ক বিমানবন্দর থেকেই শরণার্থীদের সরাসরি পোল্যান্ডের সীমানায় পাঠিয়ে দিচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ইইউএর সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হবার পর থেকে বেলারুশ সরকার ভিসা ইস্যু করার দায়িত্ব বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সির হাতে দিয়ে দেয়। এই এজেন্সিগুলি বিভিন্ন উপায়ে শরণার্থীদের বেলারুশে পাঠাবার ব্যবস্থা করতে থাকে।

 

বেলারুশের সীমানার সমস্যার এক ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘চ্যাটহ্যাম হাউজ’এর এসোসিয়েট ফেলো সামানথা ডে বেনডার্ন। বেলারুশের বিতর্কিত নির্বাচনের এক বছরের মাথায় ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা বেলারুশের প্রধান রপ্তানি দ্রব্য পটাশ, অপরিশোধিত তেল, এবং আরও কিছু পণ্যের উপর অবরোধ দেয়। একইসাথে বেলারুশের উপর ব্রিটেনের অর্থবাজার থেকে অর্থ যোগানের উপরও অবরোধ দেয়া হয়। এর পাল্টা হিসেবে লুকাশেঙ্কো মধ্যপ্রাচ্য থেকে শরণার্থী ঢোকার পথ খুলে দেন। বেনডার্ন বলছেন যে, এটা হলো একধরনের ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ, যা শরণার্থীদেরকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ইইউ এবং ন্যাটোর পূর্ব সীমানায় উত্তেজনা সৃষ্টি করা ছাড়াও মিত্র দেশগুলির মাঝে বিরোধের জন্ম দিতে চাইছে। নতুন শরণার্থী সমস্যার কারণে পূর্ব ইউরোপে শরণার্থী বিরোধী মনোভাবকে আরও বেশি উস্কে দিতে পারে এবং অভিবাসন বিরোধী রাজনৈতিক গ্রুপগুলিকে শক্তিশালী করতে পারে। এই ব্যাপারটা ইতোমধ্যেই জার্মানি এবং সুইডেনে দেখা গেছে; যেখানে সমাজের সমস্যার জন্যে উগ্র ডানপন্থীরা শরণার্থীদের দায়ী করছে। একইসাথে তা উগ্র জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ইইউ বিরোধী চিন্তার জন্ম দিয়েছে। রাশিয়া বহুদিন ধরেই চাইছে ইউরোপে ডানপন্থীদের উত্থান হোক; যা ইইউ এবং ন্যাটোকে দুর্বল করবে। বেনডার্ন মনে করেন না যে, এই ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ বেলারুশের পক্ষে মস্কোর অনুমতি ছাড়া করা সম্ভব।

মানবাধিকার সংস্থাগুলি পোল্যান্ড এবং বেলারুশ উভয় দেশের বিরুদ্ধেই আশ্রয়প্রার্থীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগে মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গের অভিযোগ করেছে। ইতোমধ্যেই প্রচন্ড শীত এবং অন্যান্য সমস্যায় পড়ে কমপক্ষে আটজন শরণার্থীর মৃত্যু হয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়। পশ্চিমা চিন্তার স্তম্ভ মানবাধিকার ইইউএর সদস্য রাষ্ট্রগুলির শরণার্থী বিরোধী জাতীয়তাবাদী চিন্তার কাছে হার মেনেছে। পোল্যান্ডের পার্লামেন্টে গণতান্ত্রিকভাবেই শরণার্থীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। রাশিয়ার সমর্থনে বেলারুশ ইউরোপের দুর্বলতাকেই উস্কে দিচ্ছে; যাকে ইইউ বলছে ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ। লিবারাল গণতান্ত্রিক দেশগুলি যখন শরণার্থীর ঢল ঠেকাতে দেয়াল তুলছে এবং সামরিক বাহিনী ব্যবহার করছে, তখন বেলারুশে লিবারাল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার দাবি তুলে লুকাশেঙ্কো সরকারের উপর অবরোধ আরোপ পরস্পরবিরোধীই বটে। ইউরোপের লিবারাল গণতান্ত্রিক আদর্শ দিনে দিনে দুর্বল হচ্ছে; আর এর স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে উগ্রবাদী জাতীয়তাবাদী চিন্তা। লিবারাল চিন্তার উৎসস্থলে এই দুর্যোগ ধ্বসে পড়া বিশ্বব্যবস্থারই প্রমাণ মাত্র।