Showing posts with label Cuba. Show all posts
Showing posts with label Cuba. Show all posts

Tuesday, 4 November 2025

ক্যারিবিয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি বৃদ্ধি - পশ্চিম গোলার্ধে হারানো মার্কিন প্রভাব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা

০৫ই নভেম্বর ২০২৫
ক্যারিবিয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলি স্বল্পমেয়াদী হতে পারে; আবার লম্বা সময়ের জন্যে অত্র অঞ্চলে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অপারেশনেও ব্যবহৃত হতে পারে। ১৯৯৪ সালে হাইতিতে সামরিক অপারেশনের পর থেকে ক্যারিবিয়ানে এটা যুক্তরাষ্ট্রের সবচাইতে বড় সামরিক কর্মকান্ড।


মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি - তিন দশকে সর্বোচ্চ

‘রয়টার্স'এর এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবিয়ানে দীর্ঘ মেয়াদী সামরিক অবস্থানের জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেপ্টেম্বর নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের উপনিবেশ পুয়ের্তো রিকো দ্বীপে ২০০৪ সালে বন্ধ করে দেয়া রুজভেল্ট রোডস ঘাঁটিকে নতুন করে তৈরি করা শুরু হয়েছে। এছাড়াও পুয়ের্তো রিকো এবং ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসের বেসামরিক বিমানবন্দরগুলিতেও নতুন করে অবকাঠামো উন্নয়ন করা হচ্ছে। গত অগাস্ট মাস থেকে ক্যারিবিয়ানে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন, ফাইটার বিমান এবং গোয়েন্দা বিমান মোতায়েন শুরু হয়েছে। বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ 'জেরাল্ড ফোর্ড' বর্তমানে ক্যারিবিয়ানের পথে রয়েছে। এছাড়াও ইতোমধ্যেই অত্র এলাকায় মোতায়েন করা গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধজাহাজগুলির মাঝে রয়েছে উভচর এসল্ট শিপ 'আইও জিমা', স্পেশাল ফোর্সের মিশনের জাহাজ 'ওশান ট্রেডার', ক্রুজার 'লেক এরি', ডেস্ট্রয়ার 'গ্রেভলি', ‘স্টকডেল', 'জেসন ডানহ্যাম' এবং উভচর ডক ল্যান্ডিং প্ল্যাটফর্ম 'স্যান এন্টোনিও'। এর বাইরেও পুয়ের্তো রিকোতে বিমান বাহিনীর ১০টা 'এফ-৩৫' স্টেলথ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছে।

অক্টোবরে মার্কিন বিমান বাহিনীর 'বি-১' এবং 'বি-৫২' বোমারু বিমান ভেনিজুয়েলার উপকূল ঘেঁষে উড়ে যায়। 'রয়টার্স'এর ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায় যে, ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসের সেইন্ট ক্রোয়া-তে 'হেনরি ই রোহলসেন' বিমানবন্দরে দূরপাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা রাডার স্থাপন করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। পুয়ের্তো রিকোর রাফায়েল হেরনানডেজ বেসামরিক বিমানবন্দরে বিমান বাহিনীর 'এমকিউ-৯ রীপার' ড্রোন মোতায়েন করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে অত্র অঞ্চলে মার্কিন 'সি-১৭' সামরিক পরিবহণ বিমান এবং 'পি-৮' গোয়েন্দা বিমানের ফ্লাইটও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন থিঙ্কট্যাংক 'সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ' বা 'সিএসআইএস'এর সিনিয়র ফেলো ক্রিস্টোফার হেরনানডেজ-রয়-এর মতে, এগুলি সবই করা হচ্ছে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার সমর্থিত জেনারেলদেরকে ভয় দেখাবার জন্যে। প্রাক্তন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা মার্ক ক্যানসিয়ানের মতে, এই সামরিক স্থাপনাগুলি স্বল্পমেয়াদী হতে পারে; আবার লম্বা সময়ের জন্যে অত্র অঞ্চলে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অপারেশনেও ব্যবহৃত হতে পারে। ১৯৯৪ সালে হাইতিতে সামরিক অপারেশনের পর থেকে ক্যারিবিয়ানে এটা যুক্তরাষ্ট্রের সবচাইতে বড় সামরিক কর্মকান্ড। গত সেপ্টেম্বর মাস থেকে শুরু করে কমপক্ষে ১৪টা হামলায় যুক্তরাষ্ট্র তথাকথিত মাদক ব্যাবসায়ীদের ৬১ জনকে হত্যা করেছে। এই হত্যাকান্ডগুলিকে কেন্দ্র করে ভেনিজুয়েলা এবং কলম্বিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি হয়েছে।
 
নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভার পর কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট পেত্রো ফিলিস্তিনের পক্ষে মিছিলে নেতৃত্ব দেয়ার পর মার্কিন সরকার প্রেসিডেন্ট পেত্রোর ভিসা বাতিল করে। 'বিবিসি' বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, কলম্বিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও খারাপের দিকে যেতে পারে।


যুক্তরাষ্ট্র-কলম্বিয়া সম্পর্কের অবনতি

সকলেই শুধু ভেনিজুয়েলা নিয়ে কথা বললেও যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যা শুধু ভেনিজুয়েলাই নয়। অত্র অঞ্চলের বেশকিছু নেতৃত্বের সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি সংঘর্ষে নেমেছেন। কলম্বিয়ার বামপন্থী লিবারাল প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো 'বিবিসি'র সাথে সাক্ষাতে হামলাগুলিকে জুলুম বলে আখ্যা দেন এবং এই হত্যাকান্ডের জন্যে দায়ী মার্কিন কর্মকর্তাদের বিচার দাবি করেন। এর জবাবে ট্রাম্প কলম্বিয়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা বন্ধ ঘোষণা করেন এবং হুমকি দেন যে, পেত্রো যদি নিজে কলম্বিয়ার মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেন, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই সেটা করবে এবং সেটা সুখকর ভাবে করা হবে না। কলম্বিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে যে, ট্রাম্পের কথাগুলি মূলতঃ কলম্বিয়াতে যুক্তরাষ্ট্রের বেআইনী হস্তক্ষেপের হুমকি। বহু দশক ধরে কলম্বিয়ায় মার্কিন সহায়তায় বামপন্থীদের গ্রুপগুলি এবং মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলেছে। তবে ২০১৬ সালে বিদ্রোহীদের সাথে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হবার পর থেকে কলম্বিয়াতে মার্কিন সামরিক এবং আর্থিক সহায়তা কমতে থাকে; সেইসাথে কমতে থাকে রাজনৈতিক প্রভাবও। ট্রাম্প ক্ষমতায় আরোহণের পরপরই শেষ মুহুর্তে কোনক্রমে কলম্বিয়ার সাথে বাণিজ্য যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হয়েছিল। তবে জুন মাসে কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোটাতে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মিগেল উরিবে তুরবে হত্যাকান্ডের শিকার হবার পর মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মার্কো রুবিও সেই ঘটনার সাথে কলম্বিয়ার শীর্ষ নেতৃত্বের জড়িত থাকার অভিযোগ করেন। উভয় দেশের রাষ্ট্রদূতদেরকে নিজ দেশে ডেকে পাঠানো হয়। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভার পর প্রেসিডেন্ট পেত্রো ফিলিস্তিনের পক্ষে মিছিলে নেতৃত্ব দেয়ার পর মার্কিন সরকার প্রেসিডেন্ট পেত্রোর ভিসা বাতিল করে। 'বিবিসি' বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, কলম্বিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও খারাপের দিকে যেতে পারে।

কিউবার সাথে ভেনিজুয়েলা এবং নিকারাগুয়ার বন্ধুত্ব

মার্কিন মিডিয়া এবং প্রাইভেট সেক্টরের অর্থায়নে তৈরি 'প্রজেক্ট সিন্ডিকেট'এর ২০২৪এর অক্টোবরের এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, ২০০২ সালে ভেনিজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার পর থেকে কিউবা ভেনিজুয়েলাতে হাজার হাজার ডাক্তার, নার্স, খেলাধূলা প্রশিক্ষক, নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং ইন্টেলিজেন্স এজেন্ট পাঠিয়েছে। কিউবার এই সমর্থনই ভেনিজুয়েলার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারার মূল কারণ। নিকারাগুয়া থেকে পরিচালিত মিডিয়া 'হাভানা টাইমস'এর ২০২৪এর অগাস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, গত ১৫ বছর ধরে কিউবা ভেনিজুয়েলার সশস্ত্র বাহিনী এবং ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসকে নতুন করে তৈরি করতে সহায়তা দিয়েছে। 'রয়টার্স'এর ২০১৯ সালের এক তদন্তের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০০৮ সালে দুই দেশের মাঝে স্বাক্ষরিত চুক্তির বলে তৈরি 'জেনারেল ডিরেক্টরেট অব মিলিটারি কাউন্টারইন্টেলিজেন্স' বা 'ডিজিসিআইএম' নামের এক সংস্থার মাধ্যমে ভেনিজুয়েলার সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের উপর ব্যাপক নজরদারি শুরু হয়। একইসাথে কিউবা ভেনিজুয়েলার সামরিক সদস্যদেরকে ট্রেনিং দেয়, বাহিনীর কাঠামোতে পরিবর্তন আনে, হাভানাতে ভেনিজুয়েলার ইন্টেলিজেন্স সদস্যদেরকে ট্রেনিং দেয়, এবং ইন্টেলিজেন্সের মূল কাজকে অন্য দেশের উপর গোয়ান্দাগিরি থেকে সরিয়ে নিজ দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের উপর কেন্দ্রীভূত করে। ভেনিজুয়েলা থেকে পালিয়ে আসা প্রাক্তন জেনারেল এন্টোনিও রিভেরো বলেন যে, ২০০৮ সালে দুই দেশের মাঝে ১৫টা গোপন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মাধ্যমে ভেনিজুয়েলার সেনাবাহিনীকে কিউবার বাহিনীর ধাঁচে গড়ে তোলা হয়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে ভেনিজুয়েলার সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ উঠে এসেছে।

২০০২ সালে ভেনিজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার পর থেকে কিউবা ভেনিজুয়েলাতে হাজার হাজার ডাক্তার, নার্স, খেলাধূলা প্রশিক্ষক, নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং ইন্টেলিজেন্স এজেন্ট পাঠিয়েছে। কিউবার এই সমর্থনই ভেনিজুয়েলার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারার মূল কারণ।

 
মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মার্কো রুবিও গত ফেব্রুয়ারিতে কোস্টারিকা ভ্রমণে গিয়ে বলেন যে, কিউবা, ভেনিজুয়েলা এবং নিকারাগুয়ার সরকার হলো মানবতার শত্রু। তিনি আরও বলেন যে, এই তিন দেশের কারণে পশ্চিম গোলার্ধে শরণার্থী সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে; কারণ এই দেশগুলির ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করছে না। কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেল রুবিওর এই মন্তব্যকে নির্লজ্জ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন যে, কিউবার উপর অর্থনৈতিক অবরোধের কারণেই কিউবানরা দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। মার্কিন রাজনীতিবিদদের নব্য ফ্যাসিস্ট চিন্তার কারণে মানবিক বিপর্যয় হচ্ছে। অর্ধেক দুনিয়াতে অরাজকতা এবং দৈন্যতার জন্যে মার্কিন যুদ্ধবাজরাই দায়ী। আর ভেনিজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান গিল বলেন যে, রুবিও এই তিন দেশ নিয়ে করুণ এবং অসুস্থ্য চিন্তার মাঝে রয়েছেন।

কিউবা যে সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে, তার নিশ্চয়তা পাওয়া যায় গত ফেব্রুয়ারিতে; যখন নিকারাগুয়ার বামপন্থী সরকারের সেনাপ্রধান জেনারেল জুলিও আভিলেসের অভিষেক অনুষ্ঠানে কিউবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল আলভারো লোপেজ মিয়েরা উপস্থিত ছিলেন বলে বলছে 'কিউবান নিউজ এজেন্সি'। ১৯৭৯ সালে নিকারাগুয়াতে বামপন্থী স্যান্ডানিস্টা সরকারের উত্থানের সময় থেকে কিউবার সাথে নিকারাগুয়ার গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। ক্যারিবিয়ানে চলমান উত্তেজনার মাঝেই ৮ই অক্টোবর নিকারাগুয়ার সেনাপ্রধান জেনারেল আভিলেস কিউবার রাজধানী হাভানা ভ্রমণ করেন।
 

কিউবা ক্যারিবিয়ান সাগরে এমন অবস্থানে রয়েছে, যেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণে মেক্সিকো উপসাগরের উপকূলে সমুদ্রবন্দরগুলির সমুদ্র বাণিজ্যকে হুমকির মাঝে ফেলে দেয়া সম্ভব। কিউবা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা উপদ্বীপের মাঝে সমুদ্রপথ মাত্র ১৪৫কিঃমিঃ চওড়া। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় অর্ধেক বাণিজ্য হয় এই বন্দরগুলির মাধ্যমে। ১৯৬২ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবাতে ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছিল। আর পুরো ঠান্ডা যুদ্ধের সময় ল্যাটিন আমেরিকাতে মাদক ব্যবসায়ীদেরকে এবং বামপন্থী বিদ্রোহী গ্রুপ এবং সরকারগুলিকে সোভিয়েত ইন্টেলিজেন্স সহায়তা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সরকারগুলিকে সমস্যায় ফেলার জন্যে। আর এই পুরো অপারেশনের কেন্দ্র ছিল কিউবা। 


রাশিয়ার ভূমিকা এবং কিউবার কৌশলগত গুরুত্ব

তবে ভেনিজুয়েলা এবং কিউবার সামরিক সহযোগিতার খবরগুলি নতুন নয়। কাজেই হঠাত করেই বা কেন যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবিয়ানে তার সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকবে, তা অন্ততঃ এই দুই দেশের নিরাপত্তা চুক্তির মাঝে পাওয়া যায় না। মার্কিন ভূরাজনৈতিক চিন্তাবিদ জর্জ ফ্রীডম্যান 'জিওপলিটিক্যাল ফিউচার্স'এর এক লেখায় তার ধারণা প্রকাশ করছেন যে, ক্যারিবিয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি বৃদ্ধির পেছনে ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের 'টোমাহক' ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের হুমকির সম্পর্ক থাকতে পারে। হয়তো রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সেই হুমকি মোকাবিলায় কিউবার সাথে সামরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করেছে এবং ল্যাটিন আমেরিকার ড্রাগ ব্যাবসায়ীদের সাথে সম্পর্ক পুনর্নিমাণ করেছে। অক্টোবরের শুরুতেই রুশ পার্লামেন্টে কিউবার সাথে গত মার্চে স্বাক্ষরিত সামরিক চুক্তিকে অনুমোদন দেয়া হয়। এই চুক্তি মোতাবেক দুই দেশের মাঝে যৌথ সামরিক মহড়া, অস্ত্র সরবরাহ সহ কিউবাতে রুশ সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। ফ্রীডম্যান বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে এটা মোটেই সুখকর খবর নয়। কিউবা ক্যারিবিয়ান সাগরে এমন অবস্থানে রয়েছে, যেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণে মেক্সিকো উপসাগরের উপকূলে সমুদ্রবন্দরগুলির সমুদ্র বাণিজ্যকে হুমকির মাঝে ফেলে দেয়া সম্ভব। কিউবা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা উপদ্বীপের মাঝে সমুদ্রপথ মাত্র ১৪৫কিঃমিঃ চওড়া। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় অর্ধেক বাণিজ্য হয় এই বন্দরগুলির মাধ্যমে। ১৯৬২ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবাতে ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছিল। আর পুরো ঠান্ডা যুদ্ধের সময় ল্যাটিন আমেরিকাতে মাদক ব্যবসায়ীদেরকে এবং বামপন্থী বিদ্রোহী গ্রুপ এবং সরকারগুলিকে সোভিয়েত ইন্টেলিজেন্স সহায়তা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সরকারগুলিকে সমস্যায় ফেলার জন্যে। আর এই পুরো অপারেশনের কেন্দ্র ছিল কিউবা। ফ্রীডম্যানের কথাগুলি সপ্তাখানেক পরেই মস্কোতেও প্রতিফলিত হয়। ২৯শে অক্টোবর রুশ পার্লামেন্টের প্রতিরক্ষা কমিটির ডেপুটি চেয়ারপার্সন আলেক্সেই ঝুরাভলিয়ভ বলেন যে, রাশিয়া ভেনিজুয়েলা বা কিউবাতে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন করতে পারে; যা কিনা রাশিয়ার প্রধান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগী যুক্তরাষ্ট্রের খুব কাছে অবস্থিত। রাশিয়ার কাছে বহু ধরণের ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে; যেগুলি প্রয়োজনমাফিক ব্যবহার করা যেতে পারে। মার্কিন সামরিক থিঙ্কট্যাঙ্ক 'ইন্সটিটিউট ফর দ্যা স্টাডি অব ওয়ার' বা 'আইএসডব্লিউ' বলছে যে, ঝুরাভলিয়ভের এই হুমকি ১৯৬২ সালের কিউবান মিসাইল ক্রাইসিসের কথা মনে করিয়ে দেয়।

'ডিফেন্স নিউজ'এর খবরে বলা হচ্ছে যে, একটা রুশ 'ইলিউশিন-৭৬' পরিবহণ বিমান ২৬শে অক্টোবর ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে অবতরণ করে। এর দু'দিন পর বিমানটা কিউবার রাজধানী হাভানাতে যায়; সেখান থেকে নিকারাগুয়ার রাজধানী মানাগুয়াতে গিয়ে ২৯শে অক্টোবর নাগাদ আবারও কারাকাসে ফেরত আসে। পরদিন বিমানটা রাশিয়ার উদ্দেশ্যে কারাকাস ছেড়ে যায়। বিমানটা রুশ সরকারের না হলেও তা সরকারের সাথে সম্পর্ক রাখা বিমান সংস্থা 'এভিয়াকন জিটোট্রান্স'এর। যাবার পথে তা আফ্রিকার মৌরিতানিয়ার নুয়াকছোট এবং আলজেরিয়ার আলজিয়ার্সে অবতরণ করে। 'ডিফেন্স নিউজ' বলছে যে, বারবার অবতরণ করার একটা কারণ হতে পারে যে, বিমানটা অতিরিক্ত ভার বহণ করছিলো। অথবা রাশিয়ার উপর অবরোধের কারণে উদ্ভূত সমস্যাকে বাইপাস করার জন্যে বিমানটা কোথা থেকে এসেছে, সেটা ঘোলাটে করার কৌশল হতে পারে। যদিও বিমানটার মিশন সম্পর্কে কিছু জানা যায় না, তথাপি যেহেতু বিমানটার মালিক সংস্থার উপর যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সরঞ্জাম পরিবহণ করার কারণে অবরোধ আরোপ করেছে, তাই এর উদ্দেশ্য ধোঁয়াশার মাঝেই থাকবে।

কিউবাতে রাশিয়ার উপস্থিতি ছাড়াও চীনের উপস্থিতি নিয়েও কথা শুরু হয়েছে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক 'সিএসআইএস' ২০২৪এর ডিসেম্বরে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে; যেখানে বলা হয় যে, এতকাল নির্দিষ্ট কোন তথ্য না থাকলেও এখন প্রায় নিশ্চিত যে, কিউবার কমপক্ষে চার স্থানে চীনারা যুক্তরাষ্ট্রের উপর নজরদারি করার জন্যে গোয়ান্দা স্থাপনা বসিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক চাপে পড়ার কারণে কিউবা চীনের আরও কাছে গিয়েছে।

কিউবা-মেক্সিকো বন্ধুত্ব

কিউবা যে পুরো ক্যারিবিয়ান এবং ল্যাটিন আমেরিকাতে যুক্তরাষ্ট্রের চক্ষুশূল, তা নিশ্চিত। ‘মেক্সিকানস এগেইনস্ট করাপশন এন্ড ইমপিউনিটি' নামক থিঙ্কট্যাঙ্কের বরাত দিয়ে 'মায়ামি হেরাল্ড' বলছে যে, মেক্সিকোর বর্তমান বামপন্থী লিবারাল প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শাইনবাউম ক্ষমতায় আসার পর থেকে মেক্সিকো কিউবাতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ তিন গুণ করেছে। গত মে মাস থেকে অগাস্টের মাঝে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের তেল ভর্তুকি মূল্যে বিক্রি করেছে মেক্সিকো। আগের প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস ম্যানুয়েল ওব্রাদরের সরকার দুই বছরে ১ বিলিয়ন ডলারের তেল সরবরাহ করেছিল। শুধু তা-ই নয়, প্রেসিডেন্ট শাইনবাউম কিউবাকে রাজনৈতিকভাবেও জোরালো সমর্থন দিচ্ছেন। ১৩ই অক্টোবর তিনি ঘোষণা দেন যে, ডিসেম্বরে ডোমিনিকাতে অনুষ্ঠেয় আমেরিকা মহাদেশের দেশগুলির শীর্ষ সন্মেলন তিনি বয়কট করেছেন; কারণ সেই সন্মেলন থেকে কিউবা, ভেনিজুয়েলা এবং নিকারাগুয়াকে বাদ দেয়া হয়েছে। এর আগে ২০২২ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও লস এঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত সন্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের অপছন্দনীয় রাষ্ট্রপ্রধানদেরকে আমন্ত্রণ জানাননি।

ট্রাম্প প্রশাসনের উপ-পররাষ্ট্র সচিব ক্রিস্টোফার ল্যানডাউ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে কিউবাকে সমর্থন দেয়ার জন্যে মেক্সিকোর ব্যাপক সমালোচনা করেন। স্প্যানিশ ভাষার পত্রিকা 'এল পাইস'এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ১৯৯২ সাল থেকে প্রতি বছর জাতিসংঘে ভোটাভুটি হয়ে চলেছে কিউবার উপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধ উঠিয়ে দেয়ার জন্যে। মেক্সিকো এই প্রস্তাবে প্রতি বছর কিউবাকে সমর্থন দিয়ে গেছে। এবছরও মেক্সিকো কিউবাকে সমর্থন করায় ল্যানডাউ বলেন যে, মেক্সিকোর বন্ধু হিসেবে তিনি কষ্ট পেয়েছেন। কিউবার প্রতি মেক্সিকোর সমর্থন বিভিন্ন সরকারের আমলে অটুট থেকেছে। প্রেসিডেন্ট শাইনবাউমের আগে তার দলেরই প্রেসিডেন্ট ওব্রাদর কিউবাকে তেল সরবরাহের বিনিময়ে কিউবা থেকে ডাক্তার পেয়েছেন। করোনা মহামারির সময় মেক্সিকোকে ডাক্তার দিয়ে সহায়তার করার জন্যে ওব্রাদর ২০২৩ সালে কিউবার নেতা মিগেল দিয়াজ-কানেলকে মেক্সিকোর সর্বোচ্চ পুরষ্কার 'অর্ডার অব দ্যা আজটেক ঈগল'এ ভূষিত করেছিলেন। ওব্রাদরের আগে 'পিআরআই' পার্টির প্রেসিডেন্ট পেনা নিয়েতোর সময় মেক্সিকো কিউবার বড় অংকের ঋণ মওকুফ করে দেয়। 'ইবেরো আমেরিকান ইউনিভার্সিটি'র বিশ্লেষক পিয়া তারাসেনা 'এল পাইস'কে বলছেন যে, ঠান্ডা যুদ্ধকে মোকাবিলার সময় মেক্সিকো কিউবা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে সেতু হিসেবে কাজ করেছে। এর ফলে অত্র অঞ্চলে মেক্সিকোর অবস্থানও শক্তিশালী হয়েছে। জাতিসংঘে মেক্সিকোর দূত হেক্টর ভাসকনচেলস যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এখনও ঠান্ডা যুদ্ধের চিন্তাধারা পরিত্যাগ করতে পারেনি। কিউবার উপর অবরোধ বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিয়ত বেশিরভাগ জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক আবেলারডো রডরিগেজ 'এল পাইস'কে বলছেন যে, ট্রাম্প প্রশাসন এখন তাদের অপছন্দের কথা বলা কাউকেই সহ্য করতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে 'মনরো ডকট্রাইন'কে কাজে লাগিয়ে পশ্চিম গোলার্ধে হারিয়ে যাওয়া প্রভাবকে পুনরূদ্ধার করতে চাইছে। 'জিওপলিটিক্যাল ফিউচার্স'এর লেখায় জর্জ ফ্রীডম্যানও 'মনরো ডকট্রাইন'কে মার্কিন ভূরাজনৈতিক স্বার্থ এবং সাম্রাজ্যবাদী হাতিয়ার হিসেবেই উল্লেখ করেন। কারণ যুক্তরাষ্ট্র বাকি বিশ্বে জনসমর্থনের কথা বললেও পশ্চিম গোলার্ধ বা আমেরিকা মহাদেশে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে জনসমর্থনের কোন তোয়াক্কা করেনি কখনও।
 
১৯৭৯ সালে নিকারাগুয়াতে বামপন্থী স্যান্ডানিস্টা সরকারের উত্থানের সময় থেকে কিউবার সাথে নিকারাগুয়ার গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। ক্যারিবিয়ানে চলমান উত্তেজনার মাঝেই ৮ই অক্টোবর নিকারাগুয়ার সেনাপ্রধান জেনারেল আভিলেস কিউবার রাজধানী হাভানা ভ্রমণ করেন।


কিউবার অর্থনীতিতে মার্কিন অবরোধের প্রভাব

কিউবার অর্থনীতি অনেকটাই পর্যটনের উপর নির্ভরশীল। ‘হাভানা টাইমস'এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, কিউবাতে সবচাইতে বেশি পর্যটক আসে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, বিদেশে কিউবান সম্প্রদায় এবং রাশিয়া থেকে। ২০২৪ সালের পর্যটক সিজন জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে কিউবায় ২ লক্ষ ৬১ হাজারের বেশি কানাডিয় পর্যটক গিয়েছিল; বিদেশে থাকা কিউবানরা গিয়েছিল ৪৫ হাজার, মার্কিনীরা গিয়েছিল ২৮ হাজার এবং রুশরা গিয়েছিল ৪৩ হাজার। ২০২৫ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে কিউবাতে পর্যটকের সংখ্যা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ইউরোপিয়রাও কিউবাতে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। কিউবার সরকার বলছে যে, এর মূল কারণ হলো কিউবার উপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত ভিসা নিয়ন্ত্রণ। কারণ ইউরোপিয়রা কিউবাতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রে যাবার জন্যে আলাদাভাবে ভিসা নিতে হবে। ২০২৪ সালে কিউবাতে ২৭ লক্ষ পর্যটক গিয়েছিল। ২০২৫ সালে ২৬ লক্ষ টার্গেট থাকলেও অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে, এই টার্গেটও পুরণ হবে না।

কিউবা পশ্চিম গোলার্ধে একটা বড় রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সমর্থন পায় কানাডার কাছ থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের মাঝে কানাডা কিউবাকে অতি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিচ্ছে। কানাডার লিবারাল সরকার সর্বদাই কিউবার সমাজতান্ত্রিক সরকারের সাথে ভালো সম্পর্ক রেখে এসেছে। কানাডার সরকারি ওয়েবসাইটে বলা হচ্ছে যে, কানাডার সাথে কিউবা সরকারের রাজনৈতিক সম্পর্ক ভালো এবং কানাডা কিউবার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর পর কানাডিয় পর্যটকদের প্রিয় গন্তব্য হলো কিউবা। আর কিউবার জন্যে কানাডা হলো পর্যটকের সবচাইতে বড় উৎস। করোনা মহামারির আগ পর্যন্ত বছরে প্রায় ১০ লক্ষ কানাডিয় কিউবাতে যেতো। বর্তমানে কিউবাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিদেশী বিনিয়োগ কানাডার; যা মূলতঃ খনিজ, জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সেক্টরে। কিউবার নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, অবকাঠামো এবং নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে কানাডা উন্নয়ন সহায়তা দিয়ে থাকে। এছাড়াও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে কিউবাকে সহায়তা দিচ্ছে কানাডা।

কিউবার অর্থনীতি অনেকটাই নির্ভরশীল ছিল ভেনিজুয়েলার তেল-ভিত্তিক অর্থনীতির উপর। তবে 'ট্রেডিং ইকনমিকস'এর হিসেবে ২০১২ সাল থেকে ২০২০ সালের মাঝে ভেনিজুয়েলার জিডিপি প্রায় চার ভাগের এক ভাগ হয়ে যায়। এর প্রভাব কিউবার অর্থনীতিতেও পড়েছে। ভেনিজুয়েলার পর রাশিয়া এবং মেক্সিকো কিউবার তেলের উৎস হিসেবে দেখা দিয়েছে। ২০২৫ সালে রাশিয়া কিউবাতে প্রায় ১ লক্ষ টন তেল রপ্তানি করেছে। 'মায়ামি হেরাল্ড' বলছে যে, অর্থনৈতিক মন্দা কাটাতে কিউবা ইউক্রেনে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করার জন্যে যোদ্ধা পাঠিয়ে থাকতে পারে। অপরদিকে চীন কিউবার প্রধান রপ্তানি বাজার। ২০২১ সালে কিউবা চীনে প্রায় তিন'শ মিলিয়ন ডলারের নিকেল এবং অন্যান্য খনিজ দ্রব্য রপ্তানি করে। প্রায় ৪ লক্ষ চিনি একসময় চীনে রপ্তানি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে কিউবার চিনি উৎপাদনে ধ্বস নেমেছে।

ক্যারিবিয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব প্রশ্নের মুখে পড়েছে বহুদিন ধরেই। কিউবার বামপন্থী সরকারকে উৎখাত করতে না পেরে অর্থনৈতিক অবরোধের মাঝে রেখে যুক্তরাষ্ট্র প্রকৃপক্ষে কিউবার সমর্থন বৃদ্ধিই করেছে। বিশেষ করে কিউবায় সরকার পরিবর্তন না করতে পারা, অথবা পশ্চিম গোলার্ধে কিউবাকে পুরোপুরিভাবে একঘরে না করতে পারাটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে বড় ব্যার্থতা। মধ্য আমেরিকাতে বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে মেক্সিকো, কলম্বিয়া, নিকারাগুয়া এবং ভেনিজুয়েলাতে বামপন্থী এবং লিবারালরা ক্ষমতায় আসীন হওয়ার কারণে কিউবা রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সমর্থন পেয়েছে। অর্থনৈতিক ধ্বসের আগ পর্যন্ত ভেনিজুয়েলা কিউবার অর্থনীতিকে সবচাইতে বড় সহায়তা দিয়েছে। এখন সেই ভার বহণ করছে মেক্সিকো, কানাডা, রাশিয়া এবং অন্যান্যরা। তবে পশ্চিম গোলার্ধে কিউবার সবচাইতে বড় বন্ধু হলো কানাডা; যার সমর্থন না পেলে মার্কিন অবরোধের মাঝে কিউবার পক্ষে টিকে থাকাটাই দুষ্কর হতো। এই সম্পর্কের মাধ্যমে কানাডাও ক্যারিবিয়ানের মতো ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রভাব ধরে রাখছে। কানাডার এই প্রচেষ্টা 'গ্লোবাল ব্রিটেন'এর অংশ। ক্যারিবিয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাবার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলি, বিশেষ করে রাশিয়া এবং চীনের জন্যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে; যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে কৌশলগত হুমকি। নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রের টার্গেট ভেনিজুয়েলার সরকার উৎখাত নয়; বরং পুরো ক্যারিবিয়ান এবং ল্যাটিন আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা। তবে শুধুমাত্র সামরিক হুমকির মাধ্যমে এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

Monday, 8 June 2020

ক্যারিবিয়ানে কানাডার কি স্বার্থ রয়েছে?

০৯ই জুন ২০২০
  
ভেনিজুয়েলাতে মাদুরোর বিরুদ্ধে মিশন যে ব্যর্থ হবে, তা যদি সকলেই আগে থেকেই জানে, তাহলে এই মিশন কেন বাস্তবায়িত হলো? এই মিশনের নেতা গুডরোর স্বার্থই বা কি ছিলো? আর এক্ষেত্রে তার যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার নাগরিকত্ত্বের মাঝে কোন দ্বন্দ্ব আছে কিনা?

মে মাসের শুরুতে ভেনিজুয়েলার সরকার বলে যে, তারা প্রেসিডেন্ট মাদুরোর বিরুদ্ধে একটা ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়েছে। তারা বলে যে, সমুদ্রপথে কলম্বিয়া থেকে আসা কিছু ভাড়াটে সেনাকে তারা হত্যা করেছে এবং কিছু সেনাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দু’জন মার্কিন নাগরিককে তাদের পাসপোর্ট এবং অন্যান্য পরিচয়পত্রসহ টেলিভিশনে দেখানো হয়। এরা হলেন ৪১ বছর বয়সী এইরান ব্যারি এবং ৩৪ বছর বয়সী লিউক ডেনমান। ‘এসোসিয়েটেড প্রেস’ বলছে যে, এরা উভয়েই মার্কিন সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্সের প্রাক্তন সদস্য ছিলেন বলে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে। এই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় অবস্থিত ‘সিলভার কর্প’ নামের একটা নিরাপত্তা কোম্পানির মালিক জরডান গুডরো দাবি করেন যে, এই মিশন তিনি পরিকল্পনা করেছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসা। তিনি আরও দাবি করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত ভেনিজুয়েলার নেতা হুয়ান গুয়াইদোর সাথে চুক্তি মোতাবেক তিনি এই অপারেশনে যান। তবে গুয়াইদো তাকে পারিশ্রমিক দেননি বলেও বলেন তিনি। ভেনিজুয়েলার টেলিভিশনে দেখানো মার্কিন সেনারা দাবি করেন যে, মিশনে যাবার সময় তারা তাদের সাথে গুয়াইদোর স্বাক্ষরিত চুক্তিপত্রও নিয়ে গিয়েছেন। মাদুরো দাবি করেন যে, মিশন চালানো ব্যক্তিরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিরাপত্তা বাহিনীর লোক। গুয়াইদো এবং ট্রাম্প প্রশাসন উভয়েই এই মিশনের সাথে জড়িত থাকার কথা পুরোপুরি অস্বীকার করে। ‘ভোক্স’ ম্যাগাজিনের সাথে কথা বলতে গিয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর প্রাক্তন স্পেশাল ফোর্সের সদস্য এফরাহিম মাত্তোস বলেন যে, পুরো বিষয়টা এতটাই হাস্যকর যে, এটা কখনোই কাজ করার কথা নয়। এটাকে তিনি বদ্ধ উন্মাদের কাজ বলে উল্লেখ করেন। ‘আল জাজিরা’র এক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রশ্ন করা হয় যে, এই মিশন যে ব্যর্থ হবে, তা যদি সকলেই আগে থেকেই জানে, তাহলে এই মিশন কেন বাস্তবায়িত হলো?

কে এই জরডান গুডরো? ১৯৭৬ সালে গুডরো কানাডার ক্যালগারিতে জন্ম নেন। কলেজ শেষ করে তিনি কানাডার সামরিক বাহিনীতে ঢোকেন। তবে পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এবং ২০০১ সালে মার্কিন সেনাবাহিনীতে নাম লেখান। তিনি সেখানে স্পেশাল ফোর্সের সদস্যও হয়ে যান। ‘১০ম স্পেশাল ফোর্সেস গ্রুপ’এর সার্জেন্ট ফার্স ক্লাস পদ পান তিনি। তিনি বিভিন্ন সামরিক মিশনে অংশ নেন এবং ২০১৪ সালের অগাস্টে একটা প্যারাসুট দুর্ঘটনার পর ২০১৬ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। অবসরের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নেন। ২০১৮ সালে তিনি ‘সিলভার কর্প’ নামের একটা নিরাপত্তা কোম্পানি চালু করেন। ২০১৮ সালের ২৬শে অক্টোবর নর্থ ক্যারোলিনার শারলোটসভিলে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের নিরাপত্তার কাজও করেন তিনি, যা ছবিতে দেখাও যায়। মাদুরো এই ব্যাপারটাকেই টার্গেট করেছেন।

এই অদ্ভূত ঘটনার পর প্রশ্ন আসছে যে, এই মিশনের উদ্দেশ্যই কি ছিলো ব্যর্থ হওয়া? গুয়াইদো যদি অর্থায়ন না করে থাকেন, তাহলে কেই বা অর্থায়নই করেছে? এখানে গুডরোর স্বার্থই বা কি ছিলো? কানাডার নাগরিক হওয়াতে ব্যাপারটা আরও ঘনীভূত হয়েছে। আর ভেনিজুয়েলার সাথে কিউবার ভালো সম্পর্ক থাকার কারণে এখানে কিউবার কোন ভূমিকা আছে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তবে সবচাইতে বড় প্রশ্ন হলো, গুডরো সরাসরি ব্যাপারটাকে স্বীকার করে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকেই আঘাত করেছেন কিনা? আর এক্ষেত্রে তার যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার নাগরিকত্ত্বের মাঝে কোন দ্বন্দ্ব আছে কিনা? মধ্য আমেরিকা, তথা ক্যারিবিয় অঞ্চলে কানাডার কর্মকান্ডের ইতিহাস দেখলে অনেক কিছুই হিসেব থেকে বাদ দেয়া সম্ভব নয়। ক্যারিবিয়ানে যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার আড়াই’শ বছরের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার ইতিহাসটাই এখন আলোচনায় চলে আসছে।
   
১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘সারাটোগা’ পানামা খাল পারি দিচ্ছে। এই খাল যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টিক এবং প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলকে যোগ করেছে। এই খাল তৈরি করার পর যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবিয়ানের নিরাপত্তা নিয়ে আরও গভীরভাবে চিন্তা করতে থাকে। ফলশ্রুতিতে ক্যারিবিয়ানে প্রভাব বিস্তার নিয়ে ব্রিটেনের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় তারা।

পানামা খাল ও এর নিরাপত্তা

১৭৭৬ সালে নতুন রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্মের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র আমেরিকা মহাদেশে ইউরোপিয় প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করতে থাকে। ঊনিশ শতকের শুরুতে দক্ষিণ আমেরিকায় অনেকগুলি দেশ ব্রিটিশ সহায়তায় স্পেন থেকে আলাদা হয়ে যায়। এই সময়েই ১৮২৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো ঘোষণা দেন যে, এখন থেকে ইউরোপিয় শক্তিরা যদি আমেরিকায় কোন স্বাধীন দেশের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রচেষ্টাকে নিজের স্বার্থবিরুদ্ধ মনে করবে। ১৮৫০ সাল নাগাদ জেমস মনরোর এই চিন্তাটা ‘মনরো ডকট্রাইন’ নামে পরিচিতি পায়। যুক্তরাষ্ট্রের জন্মের সময় শুধুমাত্র আটলান্টিক উপকূলের ১৩টা রাজ্য নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল। এরপর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম দিকে তার স্থলভাগ বৃদ্ধি করতে থাকে। ১৮৪৬ সাল নাগাদ ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত মার্কিন নিয়ন্ত্রণ পৌঁছে গেলে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃতি পূর্বে আটলান্টিকের উপকূল থেকে পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এর ফলশ্রুতিতে যুক্তরাষ্ট্রের দুই উপকূলকে সমুদ্রপথে যুক্ত করার চিন্তাটা শক্তিশালী হতে থাকে। এর আগেই ১৮২৬ সালে স্পেন থেকে নতুন আলাদা হয়ে যাওয়া ‘গ্র্যান কলম্বিয়া’র নেতৃবৃন্দের সাথে মার্কিন কর্মকর্তারা মধ্য আমেরিকায় একটা খাল তৈরির প্রকল্প নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন। এই খালের মাধ্যমে আটলান্টিক এবং প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করা যাবে। তবে গ্র্যান কলম্বিয়ার নেতা সিমন বলিভার এই প্রস্তাবে রাজি হননি। ১৮৪৬ সালে ‘গ্র্যান কলম্বিয়া’ থেকে আলাদা হয়ে তৈরি হওয়া ‘নিউ গ্রানাডা’র (পরবর্তী কলম্বিয়া) সাথে মার্কিনীরা এক চুক্তি করে। চুক্তি মোতাবেক যুক্তরাষ্ট্র পানামা যোযকের স্থানে আটলান্টিক উপকূল থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল পর্যন্ত ৭৭ কিঃমিল লম্বা একটা রেললাইন তৈরি করে। ১৮৫৫ সালে এই রেললাইন উন্মুক্ত হয়। এই সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টিক উপকূল থেকে জাহাজ পানামা পর্যন্ত যেত। এরপর রেললাইনের মাধ্যমে মানুষ প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল পর্যন্ত গিয়ে আরেকটা জাহাজে উঠে ক্যালিফোর্নিয়া যেত। ফরাসীরা এই রেললাইনের সমান্তরালে একটা খাল তৈরি করার চেষ্টা শুরু করে ১৮৮১ সালে। তবে ১৮৯৪ সাল নাগাদ তারা ব্যর্থ হবার পর যুক্তরাষ্ট্রের সামনে কোন ইউরোপিয় বাধা থাকে না। ১৯০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপে কলম্বিয়া থেকে পানামা আলাদা হয়ে যায় এবং পানামার সাথে খাল খননের জন্যে মার্কিন সরকার একটা চুক্তি করে। এই চুক্তি মোতাবেক ১৯০৪ থেকে ১৯১৪ সালের মাঝে পানামা খাল তৈরি করে। এখানকার নিরাপত্তার দায়িত্ব থাকে পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের উপর। এই খালের নিরাপত্তা দিতে খালের পূর্বদিকে ক্যাবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ভাবতে শুরু করে।

পানামা খাল তৈরি করার আগেই যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকো উপসাগর এবং ক্যারিবিয়ান সাগরে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা উপকূল থেকে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত। পশ্চিমে কিউবা থেকে শুরু করে এই পূর্বে ত্রিনিদাদ টোবাগোর মাধ্যমে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের সমাপ্তি। মেক্সিকো উপসাগর এবং ক্যারিবিয়ান সাগরকে খাঁচার মতো ঘিরে রেখেছে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ। এই ভৌগোলিক বাস্তবতায় পানামা খাল দিয়ে যাতায়াত করা জাহাজগুলিকে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল পৌঁছাতে হলে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের মাঝ দিয়ে যাওয়া প্রণালিগুলি পার হয়ে যেতে হবে। কিন্তু ঊনিশ শতকের শুরুতে এই দ্বীপগুলির সবগুলিই ছিল ইউরোপিয় শক্তিদের হাতে। ১৮৫৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণের মানুষেরা কিউবাকে কিনে নেবার প্রস্তাব দিলেও সেটা উত্তরের মার্কিনীদের বিরোধের কারণে সফল হয়নি। দ্বীপগুলির মাঝে সবচাইতে বড় দ্বীপ কিউবাতে স্প্যানিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের উস্কে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ১৮৯৪ সাল নাগাদ বাণিজ্যের জন্যে কিউবা স্পেনের চাইতে যুক্তরাষ্ট্রের উপরেই বেশি নির্ভরশীল ছিল। যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের স্বার্থ রক্ষায় ১৮৯৮ সালে স্পেনের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। চার মাসের এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র স্পেনের কাছ থেকে ক্যারিবিয়ানের দ্বীপ পুয়ের্তো রিকো দখল করে নেয়। কিউবাকে স্বাধীনতা দিতে বাধ্য হয় স্প্যানিশরা। একইসাথে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ফিলিপাইন এবং গুয়ামকে দখল করে নেয় যুক্তরাষ্ট্র।

এছাড়াও পুয়ের্তো রিকো এবং ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের মাঝে অবস্থিত ডেনমার্কের অধীনে থাকা ড্যানিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জকে যুক্তরাষ্ট্র নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছিল। ১৮৫০এর দশকেই মার্কিন কর্মকর্তারা ডেনমার্কের কাছ থেকে এই দ্বীপগুলি কিনে নিতে চাইছিল। তবে মার্কিন সিনেট একমত হতে না পারায় এই ক্রয় সম্ভব হয়নি। এরপর ১৮৯৯ থেকে ১৯০২ সালের মাঝে আরও একবার দীপগুলি কেনার কথা আসলে ড্যানিশ পার্লামেন্টের একমত না হতে পারার কারণে প্রকল্প ভেস্তে যায়। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাঝে ১৯১৬ সালে ডেনমার্কের যখন জার্মানির হাতে চলে যাবার সম্ভাবনা তৈরি হয়, তখন ২৫ মিলিয়ন ডলারে দ্বীপগুলি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রি করে দেয়ার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়ে যায়। এই চুক্তির অধীনে যুক্তরাষ্ট সেন্ট ক্রই, সেন্ট জন এবং সেন্ট থমাস দ্বীপ পেয়ে যায়। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো পুয়ের্তো রিকো এবং এই দ্বীপগুলির মাঝ দিয়ে প্রায় ৪০ কিঃমিঃ প্রস্থের সমুদ্র প্রণালী পুরোপুরিভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আসে।
  
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ত্রিনিদাদে ‘ওয়ালার’ বিমান ঘাঁটিতে মার্কিন ‘বি-২৪’ এন্টি-সাবমেরিন বোমারু বিমান। অস্ত্র সহায়তা দেয়ার বিনিময়ে মার্কিনীরা ক্যারিবিয়ানে ব্রিটিশ দ্বীপগুলিতে ৯৯ বছরের জন্যে ঘাঁটি লীজ পেয়ে যায়। ব্রিটেনের উপর জার্মানির চাপ যখন সর্বোচ্চ, তখনই যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনের কাছ থেকে ঘাঁটিগুলি আদায় করে নেয়।

ডেস্ট্রয়ারের বিনিময়ে ব্রিটিশ ঘাঁটি

ক্যারিবিয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরও দৃঢ় হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝে। ১৯৪০ সালে জার্মান সৈন্যরা যখন ফ্রান্সের মাঝ দিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তখন মার্কিন সরকার যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত ফিলিপ কারএর মাধ্যমে লন্ডনের কাছে প্রস্তাব পাঠায়, যাতে কানাডার আটলান্টিক উপকূলের নিউফাউন্ডল্যান্ড এবং ক্যারিবিয়ানে ত্রিনিদাদ এবং বার্মুডায় ব্রিটিশ বিমান ঘাঁটিগুলি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে লিজ দেয়ার করা বলা হয়। ২৭শে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সামরিক সহায়তার বিনিময়ে এই ঘাঁটি দিতে রাজি হন। ব্রিটিশরা আটলান্টকে জার্মান সাবমেরিনের হাত থেকে ব্রিটিশ সমুদ্র বাণিজ্য রক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নৌবাহিনীর কিছু পুরোনো ডেস্ট্রয়ার চায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র তাতে তৎক্ষণাৎ রাজি হয়নি। অবশেষে অগাস্টের শেষে যখন ব্রিটেন জার্মানির দ্বারা একেবারেই কোণঠাসা হয়ে যায়, তখন দুই দেশ সমঝোতায় পৌঁছায়। চুক্তি অনুযায়ী ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ৫০টা ডেস্ট্রয়ার লাভ করে। আর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ড উপকূলে ৪টা বিমান ঘাঁটি এবং ক্যারিবিয়ানে বার্মুডা, এন্টিগা, বাহামা, ব্রিটিশ গায়ানা, জামাইকা, সেন্ট লুসিয়া এবং ত্রিনিদাদে বিমান ও নৌঘাঁটি ৯৯ বছরের জন্যে লীজ পায়। আর এই লীজের জন্যে যুক্তরাষ্ট্রকে কোন অর্থ দিতে হবে না! এর মাধ্যমে এক শতকের জন্যে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবিয়ানে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করে ফেলে।

ক্যারিবিয়ানে ব্রিটিশ উপনিবেশগুলির মাঝে বাহামা, জামাইকা, এন্টিগা, সেন্ট কিটস এন্ড নেভিস, ডমিনিকা, সেন্ট লুসিয়া, ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগো এবং গায়ানাকে ব্রিটিশরা স্বাধীনতা দেয়। ১৯৬০এর দশক থেকে ১৯৮০এর দশকের মাঝে এই উপনিবেশগুলিকে স্বাধীনতা দেয়া হয়। তবে দ্বীপগুলি অনেকক্ষেত্রেই রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়াতে সক্ষম ছিল না। ব্রিটিশদের অধীনে থাকা এই অঞ্চলগুলিতে ইংরেজি ছিল অফিশিয়াল ভাষা। মূলতঃ এই ইংরেজি ভাষাভাষি অঞ্চলগুলিতে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ব্রিটিশ কমনওয়েলথের প্রতিযোগিতা চলছে। তবে বাকি দ্বীপগুলি নিয়েও চলছে প্রতিযোগিতা; যেমন একসময় স্প্যানিশদের অধীনে থাকা কিউবা ও ডমিনিকান রিপাবলিক; এবং ফরাসীদের অধীনে থাকা হাইতি। এই দ্বীপগুলিতে যথাক্রমে স্প্যানিশ ও ফরাসী ভাষা চলে। প্রভাব বিস্তারের খেলায় কোন দ্বীপই বাদ যাচ্ছে না।
   
অনেকেই মনে করছেন যে, হাইড্রোকার্বন এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে আবারও পরিবর্তন করবে। তবে চিনি, মদ, কফি, কলা, বক্সাইট, পর্যটন, ব্যাংকিং, টেক্সটাইল বা হাইড্রোকার্বন কোনটাই ক্যারিবিয়ানের সাথে কানাডার গভীর সম্পর্কের মূল কারণ নয়। ক্যারিবিয়ানে শক্ত অবস্থানে থাকার কারণেই কানাডা এখানকার ব্যবসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পেরেছে। আর এই শক্ত অবস্থানের ভিত্তি রাজনৈতিক। ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার মাঝেই কানাডার প্রভাব বিস্তারের বীজ নিহিত।

ক্যারিবিয়ানের অর্থনীতিতে কানাডা

ষোড়শ শতক থেকেই ক্যারিবিয়ানে ইউরোপিয় ঔপনিবেশিকেরা আখের চাষ শুরু করে চিনি উৎপাদন শুরু করে। সেখানকার বাসিন্দাদের নির্মূল করে ফেলার পর চিনি শিল্পে কাজ করাতে ইউরোপিয়রা আফ্রিকা থেকে লক্ষ লক্ষ ক্রীতদাস নিয়ে আসে। চিনি শিল্পের সাথে মদও উৎপাদিত হতো। কলা, কোকোয়া, কফি এবং তামাকও যুক্ত হয় অর্থকরী ফসল হিসেবে। তবে সকল খাদ্যশস্যই আমেরিকার মূল ভূখন্ড থেকে আসতে হতো। মোটামুটিভাবে ঊনিশ শতকের প্রথমভাগ পর্যন্ত চিনির ব্যবসা ভালোভাবে চললেও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে আখ এবং বীট চাষ শুরু হওয়ায় চিনির মূল্যে ধ্বস নামে এবং ক্যারিবিয়ানের ভাগ্যে ব্যাপক পরিবর্তন আসে।

অষ্টাদশ শতকের শুরুর দিকে উত্তর আমেরিকার ফরাসী উপনিবেশগুলির সাথে ক্যারিবিয়ানের ফরাসী উপনিবেশগুলির বেস বাণিজ্য চলছিল। বর্তমান কানাডার আটলান্টিক উপকূলে নোভা স্কোশিয়ার সাথেই মূলতঃ এই বাণিজ্য চলছিল। ১৭৫৬ থেকে ১৭৬৩ সালের মাঝে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের মাধ্যমে ব্রিটেন ফ্রান্সের কাছ থেকে পুরো উত্তর আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এর ফলশ্রুতিতে নোভা স্কোশিয়ার সাথে নয়, বরং বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টিক উপকূলের বন্দরগুলির সাথে ক্যারিবিয়ানের বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়। ১৭৭৬ সালে ব্রিটেন থেকে যুক্তরাষ্ট্র আলাদা হয়ে গেলেও ক্যারিবিয়ানের বাণিজ্য যুক্তরাষ্ট্রের সাথেই হতে থাকে। ১৮৬০এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত কানাডার বণিকেরা ক্যারিবিয়ানের সাথে বাণিজ্য বৃদ্ধির কিছুটা চেষ্টা করেন। তবে উৎপাদন বেশি এবং পণ্যের ভিন্নতার কারণে মার্কিনীরাই ক্যারিবিয়ানে এগিয়ে থাকে। শুল্ক বাধা উঠিয়ে দেবার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবিয়ানের দ্বীপগুলিতে তার প্রভাব বাড়াতে থাকে। ক্যারিবিয়ানের বাণিজ্যের উপর নির্ভর করে কানাডায় বিভিন্ন শিল্প গড়ে ওঠে।

১৯৫০এর দশক থেকে জাতিসংঘ এবং বিশ্বব্যাংকের উপদেশে ক্যারিবিয়ানে পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন শুরু হয়। ক্যারিবিয়ানের কিছু দ্বীপ দেশে জিডিপির ৫০ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পর্যটনের উপর নির্ভরশীল। ‘ক্যারিবিয়ান ট্যুরিজম অর্গানাইজেশন’এর বরাত দিয়ে ‘ক্যারিবিয়ান জার্নাল’ বলছে যে, ২০১৯ সালে ক্যারিবিয় দ্বীপপুঞ্জে ৩ কোটি ১৫ লক্ষ পর্যটক ভ্রমণ করে। এদের মাঝে প্রায় ৩ কোটি পর্যটকই লাক্সারি ক্রুজ লাইনারে চড়ে ক্যারিবিয়ানে আসে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে সর্বোচ্চ ১ কোটি ৫৫ লক্ষ পর্যটক আসলেও প্রায় ৩৪ লক্ষ পর্যটক নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কানাডা। নিজস্ব জনসংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি কানাডিয় নাগরিক ক্যারিবিয়ানে ভ্রমণ করে থাকে।

তবে এখানকার কিছু দেশের অর্থনীতি অন্য সেক্টরের উপর নির্ভরশীল। হাইতির অর্থনীতির বেশিরভাগটাই রেডিমেড গার্মেন্টস রপ্তানির উপর নির্ভরশীল। জামাইকার অর্থনীতিতে আবার এলুমিনিয়ামের কাঁচামাল বক্সাইট খনির গুরুত্ব অনেক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এলুমিনিয়ামের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবার পর ১৯৫০এর দশক থেকে জামাইকাতে বক্সাইট খনি উত্তোলন শুরু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনীর অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত সকল এলুমিনিয়ামের প্রায় ৪০ ভাগ উৎপাদন করেছিল কানাডা। তাই জামাইকার বক্সাইট খনিতে কানাডার আগ্রহ ছিল সবচাইতে বেশি। কানাডা বর্তমানে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম এলুমিনিয়ান উৎপাদনকারী দেশ। নিজেদের এরোস্পেস ইন্ডাস্ট্রি এবং যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির উপর ভিত্তি করে কানাডা এই অবস্থানে পৌঁছেছে। তবে নিজের দেশে বক্সাইটের খনি না থাকায় কানাডিয়রা একসময় ১৯৭০এর দশক পর্যন্ত জামাইকার উপরেই নির্ভরশীল ছিল। বর্তমানে কানাডা তার বেশিরভাগ বক্সাইট ব্রাজিল এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে আনে। তবে জামাইকা এখনও কানাডার সবচাইতে কাছের বক্সাইট খনি। তাই কানাডার কাছে এখানকার খনির কৌশলগত গুরুত্ব অনেক।

ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগোর অর্থনীতিতে পর্যটনের চাইতে তেল গ্যাস উত্তোলনের গুরুত্ব অনেক। সেখানে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন ছাড়াও পেট্রোকেমিক্যাল ইন্ড্রাস্ট্রিতে ব্যাপক বিনিয়োগ হয়েছে। একসময় এমোনিয়া এবং মিথানল রপ্তানিতে বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে চলে যায় তারা। তবে ত্রিনিদাদ ছাড়াও ক্যারিবিয়ানের অন্যত্রও শুরু হয়েছে তেল গ্যাস অনুসন্ধানের হিড়িক। পেট্রোলিয়াম জিওসায়েন্স বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘জিওএক্সপ্রো’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এই মুহুর্তে ক্যারিবিয়ান তেল গ্যাস অনুসন্ধানের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হয়ে উঠছে। কিউবা, ডমিনিকান রিপাবলিক, বাহামা, জামাইকা, নিকারাগুয়া, হন্ডুরাস, ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগো এই অঞ্চলের সমুদ্রে তেল গ্যাস অনুসন্ধানে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। কানাডার সরকারি ওয়েবসাইটে ত্রিনিদাদে যেসব খাতে কানাডিয়দের বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে, সেগুলির তালিকা দেয় হয়েছে; যার মাঝে প্রথমেই রয়েছে নিরাপত্তা; তারপর শিক্ষা, অবকাঠামো, এবং সবশেষে হাইড্রোকার্বন।

অল্প কিছুদিন আগ পর্যন্তও কানাডার ব্যাংকগুলি ক্যারিবিয়ানে খুবই শক্ত অবস্থানে ছিল। ১৮৮২ সালে কানাডার সাথে ক্যারিবিয়ানের বাণিজ্যের উপর ভর করে কানাডার ব্যাংকগুলি ক্যারিবিয়ানে তাদের সাবসিডিয়ারি খুলতে শুরু করে। বিংশ শতকে ব্রিটিশরা ক্যারিবিয়ান ছেড়ে যেতে থাকলে কানাডার কোম্পানিগুলি তাদের স্থান নিতে থাকে। আর কানাডার সরকার এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে ব্যালান্স করতে কানাডার কোম্পানিগুলিকে সহায়তা দিতে থাকে। ‘আইএমএফ’এর এক হিসেবে বলা হচ্ছে যে, ক্যারিবিয়ানের সকল ব্যাংকের সকল সম্পদের ৬০ শতাংশ কানাডার তিনটা ব্যাংকের হাতে। ‘ফিনানশিয়াল পোস্ট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০০৯ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে ধ্বসের পর ক্যারিবিয়ানের মূল ব্যবসা পর্যটনে যখন মন্দা দেখা দেয়, তখন ক্যারিবিয়ানের লোকাল ব্যাংকগুলি আর্থিক সমস্যায় পরে যায়। অথচ এর মাঝেও কানাডিয়ান ব্যাংকগুলি বিশাল অংকের মুনাফা করে। আর এই ব্যাংকগুলির বার্ষিক প্রতিবেদনে অঞ্চলভিত্তিক বিভাজন এমনভাবে করা হয়, যাতে ক্যারিবিয়ানে কোথায় কিভাবে এই মুনাফা করা হয়েছে, তা যেন বোঝা না যায়। এই ব্যাংকগুলির মুনাফার উৎস খুব সম্ভবতঃ অফশোর ব্যাংকিং। অর্থাৎ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি, যারা নিজেদের আয়ের উৎস লুকিয়ে রাখতে চান, তারাই ক্যারিবিয়ানে এসব ব্যাংকের অর্থ গচ্ছিত রাখেন। তবে ২০১৮ সাল থেকে কানাডিয়ান ব্যাংকগুলি এই অঞ্চল ছেড়ে যাচ্ছে, যার কারণ এখনও পরিষ্কার নয়।

অনেকেই মনে করছেন যে, হাইড্রোকার্বন এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে আবারও পরিবর্তন করবে। তবে চিনি, মদ, কফি, কলা, বক্সাইট, পর্যটন, ব্যাংকিং, টেক্সটাইল বা হাইড্রোকার্বন কোনটাই ক্যারিবিয়ানের সাথে কানাডার গভীর সম্পর্কের মূল কারণ নয়। কানাডার অর্থনীতির তুলনায় ক্যারিবিয়ানের অর্থনীতি খুবই ছোট। কানাডার জিডিপি যেখানে ১ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার বা ১৭’শ বিলিয়ন ডলার; সেখানে পুরো ক্যারিবিয়ানের সকল দেশ মিলে জিডিপি ৩’শ বিলিয়নেরও কম। ক্যারিবিয়ানে শক্ত অবস্থানে থাকার কারণেই কানাডা এখানকার ব্যবসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পেরেছে। আর এই শক্ত অবস্থানের ভিত্তি রাজনৈতিক। ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার মাঝেই কানাডার প্রভাব বিস্তারের বীজ নিহিত।
  
২০১৯ সালে ‘ক্যারিকম’এর সরকার প্রধানদের বৈঠক। ‘ক্যারিকম’এর সাথে সম্পর্ক গভীর করা মাধ্যমে কানাডা ক্যারিবিয়ানে, বিশেষ করে প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশগুলিতে তার রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রেখেছে।




ক্যারিবিয়ানের রাজনীতিতে কানাডা

১৮৬৭ সালে উত্তর আমেরিকায় ব্রিটিশ অঞ্চলগুলিকে কানাডিয়ান কনফেডারেশনের মাঝে নিয়ে আসা হয়। এরপর থেকে বেশকিছু ক্যারিবিয় দ্বীপ কানাডিয়ান কনফেডারেশনের অংশ হবার জন্যে চেষ্টা করেছে। এই প্রচেষ্টাগুলির কিছু বেশিদূর আগায়নি; আবার কিছু ক্ষেত্রে এগুলিকে অনেকে বাস্তবসম্মতই মনে করেছে। ১৮৮২ সালে জামাইকাকে কানাডার অংশ করার একটা প্রচেষ্টা হয়েছিল, যা খুব দ্রুতই ভেস্তে যায়। বারবাডোসও চেয়েছিল কানাডার অংশ হতে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেন তার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপনিবেশগুলিকে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের অধীনে ছেড়ে দেয়। একইসাথে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জের সরকার চাইছিল যে, নিউ ফাউন্ডল্যান্ড, ক্যারিবিয়ান এবং ফকল্যান্ডস আইল্যান্ডে ব্রিটিশ উপনিবেশগুলিকে কানাডার অধীনে দিয়ে দিতে। কানাডার ব্যবসায়ীরা এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলেন। ব্যবসায়ী হ্যারি ক্রো কানাডার সরকারে নিজের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে একটা প্রতিবেদন তৈরি করান, যেখানে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জকে কানাডার অংশ করলে কি কি সুবিধা পাওয়া যেতে পারে, তার একটা তালিকা তৈরি করা হয়। এতে বলা হয় যে, প্রায় ৩ লক্ষ বর্গ কিঃমিঃ এলাকার সাথে কানাডা প্রায় ২৩ লক্ষ জনসংখ্যা পাবে; যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবিয় অঞ্চল থেকে যে পণ্য সুবিধা পাচ্ছে, কানাডাও সেটা পেতে পারে; এতে কানাডার নৌশক্তি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে; ঐ অঞ্চলে কানাডায় তৈরি পণ্যের বাজার নিশ্চিত হবে; আর বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনের পক্ষে যুদ্ধ করার জন্যে একটা পুরষ্কার হতে পারে এই দ্বীপগুলি। কিন্তু কানাডাতে উপনিবেশের পুরো নিয়ন্ত্রণ নেবার জন্যে রাজনৈতিক সমর্থন আদায় করা সম্ভব না হওয়ায় এই প্রকল্প সফল হয়নি।

১৯১১ সালে বাহামা দ্বীপপুঞ্জও কানাডার অংশ হতে চেয়েছিল, যা কানাডিয়রা বাতিল করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৫০এর দশকে ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ ফেডারেশন’ নামে একটা রাজনৈতিক সংগঠন তৈরির প্রচেষ্টা চালানো হয়। উদ্দেশ্য ছিল যে, দ্বীপগুলিকে একত্রিত করে একটা কাঠামোর অধীনে এনে এরপর ব্রিটেন বা কানাডার সাথে রাজনৈতিকভাবে একত্রীকরণের চেষ্টা করা। ১৯৬২ সালে এই প্রচেষ্টা ভেস্তে যায় যখন সবচাইতে বড় দ্বীপ জামাইকা এবং ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগো ফেডারেশন থেকে বের হয়ে যায়। ১৯৬০ এবং ১৯৭০এর দশকে বেশিরভাগ দ্বীপই আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে ব্রিটেন থেকে আলাদা হয়ে যায়। কানাডার সাথে যুক্ত হবার সর্বশেষ প্রচেষ্টা করে টুর্কস এন্ড কাইকোস দ্বীপপুঞ্জ। ১৯৭০এর দশকে তারা কানাডার সাথে যুক্ত হবার চেষ্টা শুরু করে। তবে ১৯৮৭ সাল নাগাদ তা ভেস্তে যায়। এরপর ২০০৩ সালে কানাডা থেকে নতুন আরেকটা প্রচেষ্টা চালানো শুরু হয়। ২০০৯ সালের মাঝে সেই প্রচেষ্টাও বানচাল হয়ে যায়। তবে যদিও কানাডা ক্যারিবিয়ানের দেশগুলিকে নিজের সাথে একত্রিত করতে চায়নি, তথাপি ক্যারিবিয়ানের সাথে কানাডার গভীর সম্পর্কের কারণে কানাডাকে ক্যারিবিয়ান থেকে আলাদা করা কঠিন। কানাডার জনগণকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক চিন্তা থেকে ‘পরিষ্কার’ রাখার জন্যেই হয়তো কানাডা ক্যারিবিয়ানের দেশগুলির সাথে আইনগত সম্পর্ক গড়েনি। তবে মুখে ক্যারিবিয়ান থেকে দূরে থাকার কথা বললেও কাজে কানাডা ক্যারিবিয়ানের অংশ হিসেবেই চিন্তা করেছে।

১৯৬৬ সালে কানাডায় ক্যারিবিয়ান দেশগুলির নেতাদের নিয়ে এক বৈঠক ডাকে কানাডা। এরপর ১৯৭৩ সালে ক্যারিবিয়ানের ইংরেজি ভাষাভাষি চারটা প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশ ‘ক্যারিবিয়ান কমিউনিটি’ বা ‘ক্যারিকম’ নামের একটা সংস্থা গঠন করে; এরা হলো জামাইকা, ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগো, গায়ানা এবং বার্বাডোস। ১৯৭০ এবং ১৯৮০এর দশকে স্বাধীনতা পাওয়া ক্যারিবিয়ানের সকল ইংরেজি ভাষাভাষি দ্বীপ দেশ এতে যোগ দেয়। ১৯৯৫ সালে ডাচ ভাষার সুরিনাম এবং ২০০২ সালে ফরাসী ভাষাভাষি হাইতিও এতে যোগ দেয়। বর্তমানে ১৫টা দেশ এর সম্পূর্ণ সদস্য; ৫টা ব্রিটিশ উপনিবেশ এসোসিয়েট সদস্য; আর ৮টা অবজারভার দেশের মাঝে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অধীন পুয়রতো রিকো, ৩টা ডাচ উনপিবেশ; আর মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশ মেক্সিকো, কলম্বিয়া ও ভেনিজুয়েলা। ক্যারিবিয়ানের একমাত্র দেশ হিসেবে ডমিনিকান রিপাবলিক এই সংস্থার অবজারভার দেশ। ১৯৭৯ সালে কানাডা এবং ‘ক্যারিকম’এর মাঝে বাণিজ্য এবং সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কানাডা এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক সহায়তা বৃদ্ধি করারও প্রতিশ্রুতি দেয়।

কানাডার সহায়তায় ১৯৬৯ সালে ‘ক্যারিবিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এখনও এই ব্যাঙ্কে প্রায় ৯ শতাংশ মালিকানা রয়েছে কানাডিয়দের; ৯ শতাংশ রয়েছে ব্রিটেনের; সাড়ে ৫ শতাংশ করে রয়েছে ইতালি, জার্মানি এবং চীনের; প্রায় ১০ শতাংশ রয়েছে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলির; আর বাকিটা রয়েছে ক্যারিবিয় দেশগুলির। এছাড়াও ক্যারিবিয়ানে কানাডার বিভিন্ন সংস্থা যথেষ্ট গভীর সম্পর্ক রেখে চলেছে; যার মাঝে রয়েছে ‘ক্যানাডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি’, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ‘কানাডিয়ান ট্রেড কমিশনার’, ‘আটলান্টিক কানাডা কোঅপারেশন এজেন্সি’, ‘ট্রান্সপোর্ট কানাডা’, ‘কানাডিয়ান রেডিও টেলিভিশন এন্ড টেলিকিউমিকেশন্স কমিশন’, ইত্যাদি। কানাডার ‘ভানটেজ এয়ারপোর্ট গ্রুপ’এর অধীনে ক্যারিবিয়ানে জামাইকা এবং বাহামা দ্বীপপুঞ্জে দু’টা বিমানবন্দর রয়েছে। এছাড়াও ‘অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটস’, ‘ইন্টার আমেরিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’, ‘প্যান আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশন’ এবং ‘প্যাসিফিক এলায়েন্স’এর মাধ্যমে কানাডা ক্যারিবিয়ানের সাথে সম্পর্ক রাখে।


  
২০১৬ সালে ‘অপারেশন ক্যারিবে’তে অংশ নেয়া রয়াল কানাডিয়ান নেভির যুদ্ধজাহাজ ‘সাসকাচুয়ান’, ‘এডমন্টন’ এবং মার্কিন কোস্ট গার্ডের জাহাজ ‘হ্যাডক’। এই অপারেশনে মাদক বিরোধী অভিযানে অংশ নেবার মাধ্যমে কানাডা ক্যারিবিয়ানে তার সামরিক অবস্থানকে ধরে রাখছে। একইসাথে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় তারা যুক্তরাষ্ট্রকে একা ছেড়ে দেয়নি।

ক্যারিবিয়ানের সাথে কানাডার সামরিক সম্পর্ক

১৭৪৫ সাল থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত দু’শ বছরের বেশি সময় ধরে ব্রিটিশ রয়াল নেভি উত্তর আমেরিকায় তাদের অবস্থান অব্যাহত রাখে। এই অবস্থানের মূল ঘাঁটি ছিল কানাডার আটলান্টিক উপকূলের নোভা স্কোশিয়ার হ্যালিফ্যাক্স। হ্যালিফ্যাক্সে ঘাঁটি ছিল ১৯০৫ সাল পর্যন্ত। আরেকটা ঘাঁটি ছিল বার্মুডাতে; যা ১৯৫১ সাল পর্যন্ত সেখানে ছিল। তবে ১৮১৯ সালে উত্তর আমেরিকায় মূল ব্রিটিশ ঘাঁটি হ্যালিফ্যাক্স থেকে বার্মুডায় স্থানান্তর করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর হুমকিকে আরও ভালোভাবে মোকাবিলা করার জন্যে প্রস্তুতি নেয়া। ১৯১০ সালে রয়াল কানাডিয়ান নেভির জন্মের পর হ্যালিফ্যাক্সের নৌঘাঁটি কানাডার কাছে হস্তান্তর করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে কানাডার নৌবাহিনীর হাতে ছিল মাত্র ১১টা যুদ্ধজাহাজ এবং ১৮’শ নাবিক। বিশ্বযুদ্ধের মাঝে কানাডার কাছে ব্রিটিশরা পুরো উত্তর পশ্চিম আটলান্টিকের নিরাপত্তার দায়িত্ব দিয়ে দেয়। বিশ্বযুদ্ধ শেষে কানাডার হাতে ছিল ৪’শ ৩৪টা যুদ্ধজাহাজ এবং ৯৫ হাজার নাবিক।

বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই ক্যারিবিয়ানে কানাডার সামরিক উপস্থিতি বাড়তে থাকে। ১৯৫০এর দশক থেকে এখন পর্যন্ত এমন কোন বছর সম্ভবতঃ পাওয়া যাবে না, যখন ক্যারিবিয়ানে কানাডার সামরিক উপস্থিতি ছিল না। কানাডার সরকারি ওয়েবসাইটে ক্যারিবিয়ানে তাদের মিশনগুলির বিশদ বর্ণনা দেয়া হয়েছে।

১৯৫০ থেকে ১৯৭৪

- ১৯৫১ সালে ঘুর্নিঝড়ে আক্রান্ত জামাইকায় ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীকে ত্রাণসামগ্রী দিয়ে সহায়তা দেয় রয়াল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্স।

- রয়াল কানাডিয়ান নেভির জাহাজগুলি নিয়মিতই ক্যারিবিয়ান টহল দিচ্ছিল। এমনই এক সময়ে ১৯৫৭ সালের মার্চে কানাডার একটা ডেস্ট্রয়ারকে ব্রিটিশ উপনিবেশ সেন্ট লুসিয়ায় জরুরি ভিত্তিতে পাঠানো হয়। সেন্ট লুসিয়ায় চিনি এবং কলা চাষে ব্যবহৃত শ্রমিকরা ধর্মঘটের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কানাডার ডেস্ট্রয়ার ‘মিকম্যাক’এর ক্রুদেরকে শহরে মোতায়েন করা হয় এবং ফলশ্রুতিতে ধর্মঘট এড়ানো যায়।

- ১৯৬১ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ বেলিজে ঘুর্নিঝড়ের তান্ডবের পর রয়াল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্সের বিমানে করে ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়।

- ১৯৬৩ সালে হাইতিতে রাজনৈতিক গোলযোগের সময় সেখানে মাত্র ৩ ঘন্টার মাঝে রয়াল কানাডিয়ান নেভির ডেস্ট্রয়ার ‘সাসকাচুয়ান’কে প্রেরণ করে। সেখানে সর্বদা নিজেদের জাহাজ টহলে রাখার কারণেই এটা সম্ভব হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রও সেখানে নিজেদের জাহাজ প্রেরণ করে।

- ১৯৬৬ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ এন্টিগাতে রয়াল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্সের বিমানে করে স্কুলের সরঞ্জামাদি পাঠানো হয়।

- ১৯৭২ সালে গায়ানাতে বিমান বাহিনীর বিমানে করে স্কুল বাসও প্রেরণ করা হয়। ১৯৭৪এ টুর্কস এন্ড কাইকোসেও স্কুলের সরঞ্জাম পাঠানো হয়।

- ১৯৭২ সালে কানাডা ভেনিজুয়েলার কাছে ২০টা ‘এফ-৫’ যুদ্ধবিমান বিক্রি করে।

- সেবছর নিকারাগুয়াতে ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলে সেখানে কানাডা বিমান বাহিনীর বিমানে করে ত্রাণ পাঠায়। ১৯৭৩ এবং ১৯৭৪এ হাইতিতেও বিমান এবং যুদ্ধজাহাজে করে ত্রাণ সামগ্রী পাঠানো হয়।
  
হাইতিতে কানাডার সৈন্য। ১৯৯০এর পুরো দশক জুড়েই হাইতির রাজনৈতিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে সেখানে মার্কিন এবং জাতিসংঘের সেনা মোতায়েন থাকে। কানাডা সবসময় এই মিশনের সাথে ছিল। এই মিশনের বদৌলতে ক্যারিবিয়ানে কানাডার সামরিক উপস্থিতি স্থায়ী হয়ে গিয়েছিল। এই মিশনকে ব্যবহার করে আশেপাশের দেশগুলিতেও কানাডা প্রভাব বিস্তার করেছে।


১৯৭৪ থেকে ১৯৯৯
- ১৯৭৪ সালের জানুয়ারি মাসে ব্রিটেন গ্রেনাডাকে স্বাধীনতা দেয়ার পর সেখানে বিশৃংখলা শুরু হলে কানাডা সেখানে নৌবাহিনীর দু’টা ডেস্ট্রয়ার প্রেরণ করে। ১৯৭৪ সালে হন্ডুরাসে বিমানে করে ঘুর্নিঝড় পরবর্তী ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়।

- ১৯৭৬ সালে গুয়াতেমালায় ভূমিকম্পের পর বিমানে করে ত্রাণসামগ্রী পাঠায় কানাডা।

- ১৯৭৭ সালে গায়ানাতে কানাডার বিমান বাহিনীর বিমানে করে দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়।

- ১৯৭৯ সালে সেন্ট ভিনসেন্টএ আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের পর সেখানে কানাডা সামরিক মেডিক্যাল দল এবং বিমান বাহিনীর বিমান প্রেরণ করে। একই বছর নিকারাগুয়ায় গৃহযুদ্ধের মাঝে বিমানে করে ত্রাণসামগ্রী প্রেরণ করা হয়।

- ১৯৮৩ সালে গ্রেনাডাতে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের সময় কানাডাও সেখানে সামরিক পরিবহণ বিমান প্রেরণ করে।

- ১৯৮৮ সালের জানুয়ারিতে হাইতিতে নির্বাচনের আগে উত্তেজনা শুরু হলে সেখানে নৌ মহড়ার আড়ালে ৭টা হেলিকপ্টার সহ তিনটা যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হয়। বিমান বাহিনীর পরিবহণ বিমানও প্রস্তুত রাখা হয়। একই বছরের সেপ্টেম্বরে জামাইকাতে ঘুর্নিঝড় আঘাত করার পর সেখানে বিমান বাহিনীর বিমানে করে ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয় এবং সামরিক সদস্যদের মোতায়েন করা হয়।

- ১৯৮৯ সালে হাইতি, জামাইকা, ডমিনিকান রিপাবলিক এবং সেন্ট লুসিয়াতে বছরজুড়ে বিমান বাহিনীর বিমানে করে ত্রাণ সহায়তা পাঠানো হয়। সেবছরের সেপ্টেম্বরে মন্টসেরাতে ঘুর্নিঝড় আঘাত হানার পর কানাডার সামরিক সদস্যদের মোতায়েন করা হয়।

- ১৯৮৯ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত মধ্য আমেরিকার কোস্টারিকা, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস এবং নিকারাগুয়ায় জাতিসংঘের শান্তি মিশনে সেনা মোতায়েন রাখে কানাডা।

- ১৯৯০ সালে কানাডা হাইতির নির্বাচনের সময় সেখানে সেনা সদস্য মোতায়েন করে।

- ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত জাতিসংঘ মিশনে হন্ডুরাসে কানাডার সেনাসদস্যরা মোতায়েন থাকে।

- ১৯৯২ সালের শুরুতে হাইতির রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে সেখানে হস্তক্ষেপ করে মার্কিন এবং ফরাসীদের সহায়তায় সেখানকার বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার উদ্দেশ্যে চারটা যুদ্ধজাহাজ প্রস্তুত করে। পরে অবশ্য এই অপারেশন বাস্তবায়িত করা হয়নি।

- ১৯৯৪এর সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের অধীনে সামরিক হস্তক্ষেপের জন্যে কানাডার তিনটা যুদ্ধজাহাজ হাইতির উপকুলে মোতায়েন করা হয়। ১৯৯৫এর মার্চে সেখানে ৫’শ সেনা মোতায়েন করা হয়। ১৯৯৬এর মার্চে সেখানে সামরিক সদস্যের সংখ্যা সাড়ে ৭’শ করা হয়। ১৯৯৭এর নভেম্বর পর্যন্ত সেখানে কানাডার সামরিক বাহিনীর প্রায় ৭’শ সদস্য মোতায়েন থাকে। ২০০০এর মার্চ পর্যন্ত কানাডার সামরিক উপস্থিতি ছিল সেখানে। ১৯৯৩এর ডিসেম্বর থেকে ১৯৯৪এর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাইতির উপকূলে কানাডার নৌবাহিনী জাহাজ মোতায়েন থাকে। পুরো অপারেশনে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ব দিলেও কানাডা সেখান থেকে কখনোই সরে আসেনি।

- হাইতিতে কানাডার সেনাদের জন্যে সাপ্লাই দেয়ার সময়ে কানাডার সামরিক বিমানগুলি ১৯৯৫এর জুনে কোস্টা রিকাতেও ত্রাণসামগ্রী নিয়ে যায়। সেবছরের সেপ্টেম্বরে ত্রিনিদাদেও ত্রাণসামগ্রী পাঠায় তারা। সেবছরের সেপ্টেম্বরে এন্টিগা এন্ড বারবুডাতে ঘুর্নিঝড় আঘাত হানার পর সেখানে কানাডার কোস্ট গার্ডের জাহাজে করে সামরিক সহায়তা পাঠানো হয়।

- ১৯৯৪ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত গুয়াতেমালায় জাতিসংঘ মিশনের অধীনে কানাডা সেখানে সামরিক অফিসারদের মোতায়েন রাখে।

- ১৯৯৮ সালের নভেম্বরে হন্ডুরাসে ঘুর্নিঝড় আঘাত হানার পর সেখানে কানাডার সামরিক সদস্যদের মোতায়েন করা হয়।

- ১৯৯৯ সালে হাইতি এবং সেন্ট লুসিয়াতে বিমান বাহিনীর বিমানে করে ত্রাণসামগ্রী এবং এম্বুল্যান্স পাঠানো হয়।

২০০১ থেকে ২০০৮

- ২০০১ সালের জানুয়ারিতে এল সালভাদরে ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর কানাডার বিমান বাহিনীর বিমানে করে ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়।

- বেলিজে ঘুর্নিঝড় আঘান হানার পর ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিমান বাহিনীর বিমানে করে সেখানে ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়।

- ২০০৪এর ফেব্রুয়ারিতে হাইতিতে সহিংসতা বেড়ে গেলে কানাডার বিমানবাহিনীর বিমানে করে সেখান থেকে বিদেশী নাগরিকদের বের করে আনা হয়। এরপর সেখানে জাতিসংঘের অধীনে প্রায় ৫’শ কানাডিয়ান সামরিক সদস্যকে মোতায়েন করা হয়। এর বেশিরভাগ সেনাকেই ফেরত আনা হলেও সেখানে কিছু উচ্চপদস্থ কানাডিয়ান সামরিক কর্মকর্তাকে দীর্ঘ সময়ের জন্যে রেখে দেয়া হয়।

- ২০০৭ সালের অগাস্টে ঘুর্নিঝড় আঘাত হানার পর জামাইকাতে কানাডার সামরিক বিমানে করে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেয়া হয়।

- ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে হাইতিতে ঘুর্নিঝড়ে আঘাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলে ক্যারিবিয়ানে মাদক নির্মূল অভিযানে মোতায়েনকৃত কানাডার নৌবাহিনী ফ্রিগেট ‘সেন্ট জন’কে সেখানে ত্রাণ সহায়তা দেবার জন্যে পাঠানো হয়।

এই মিশনগুলির মাঝে ১৯৫০এর দশক থেকে ১৯৮০এর দশক পর্যন্ত কানাডার সামরিক মিশনগুলি সংখ্যায় ছিল কম এবং বেশিরভাগই ছিল ত্রাণসামগ্রী পাঠাবার বা ব্রিটিশ উপনিবেশে শান্তি রক্ষা করার মিশন। ১৯৯০এর দশকে সামরিক মিশনগুলির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায় হাইতি। দুর্যোগের কারণে ত্রাণসামগ্রী পাঠাবার মিশন এর মাঝেই চলেছে। বিভিন্ন দেশে নিজেদের নাগরিক সরিয়ে নেবার কথা বলে বহুবার সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। তবে প্রতিবারই যুক্তরাষ্ট্রের মিশনের সাথে কানাডা যুক্ত ছিল।

২০০৬ সালের নভেম্বর থেকে ক্যারিবিয়ানে নতুন মিশন শুরু করে কানাডা। ‘অপারেশন ক্যারিবে’ নামের মাদক চোরাকারবারি বন্ধের উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু করা এই মিশনে ২০১০ সাল থেকে যোগ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ২০১২ সাল থেকে মার্কিন ‘অপারেশন মারটিলো’র অধীনে ন্যাস্ত করা হয় কানাডার মিশনকে। চুক্তি অনুযায়ী কানাডার জাহাজে মার্কিন কোস্ট গার্ডের সদস্যারা থাকবে; তারাই সরাসরি মাদক চোরাকারবারিদেরকে ধরবে। কানাডা এক্ষেত্রে শুধু লজিস্টিক্যাল সুবিধা দেবে। এল সালভাদরের কমালাপা বিমান ঘাঁটিতে মার্কিন নেতৃত্বে কানাডা ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান মোতায়েন করে। মিশন শুধু ক্যারিবিয়ানেই সীমাবদ্ধ নয়; মিশনের অনেকটা টহল পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে মেক্সিকো এবং মধ্য আমেরিকার পশ্চিম উপকূলেও চলছে। এই মিশনের অধীনে কানাডা অত্র অঞ্চলে নিয়মিত তাদের যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রাখছে।
  
‘এক্সারসাইজ ট্রেইড উইন্ডস’ ২০১৯এ কানাডার সাথে অংশ নিচ্ছে ক্যারিবিয়ান সামরিক সদস্যারা। এই মহড়াকে ব্যবহার করে কানাডা জামাইকাতে ‘অপারেশনাল সাপোর্ট হাব’ বা ‘ওএসএইচ’ তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে অতি দ্রুততার সাথে কানাডা থেকে সৈন্য, রসদ, অস্ত্র এবং অন্যান্য সাপ্লাই নিয়ে যাবে; এবং সেখান থেকে পুরো ক্যারিবিয়ানের যেকোন স্থানে নিয়ে যাওয়া যাবে।

জামাইকায় সামরিক সহায়তা

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে প্রতিবছর কানাডা ‘এক্সারসাইজ ট্রেইড উইন্ডস’ নামের মহড়ায় অংশ নেয়। এই মহড়ার লক্ষ্য হিসেবে প্রথমেই বলা হচ্ছে অপরাধ দমন; এরপর রয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা। এই মহড়াকে কেন্দ্র করেই ২০১৬ সাল থেকে কানাডিয়ানরা জামাইকাতে একটা স্থায়ী ‘অপারেশনাল সাপোর্ট হাব’ বা ‘ওএসএইচ’ তৈরি শুরু করে। এই হাবের মাধ্যমে পুরো ক্যারিবিয়ানে কানাডিয়ানরা যেকোন সময় তাদের সামরিক কর্মকান্ড চালাতে পারবে। এর মাধ্যমে তারা অতি দ্রুততার সাথে কানাডা থেকে সৈন্য, রসদ, অস্ত্র এবং অন্যান্য সাপ্লাই নিয়ে আসতে পারবে; এবং সেখান থেকে পুরো ক্যারিবিয়ানের যেকোন স্থানে নিয়ে যেতে পারবে। ২০১৮ সালের অগাস্টে এই হাব অপারেশনে আসে। জামাইকার সাথে কানাডার সামরিক সম্পর্ক সবচাইতে গভীর। ১৯৬৫ সাল থেকে জামাইকার এক হাজার ৬’শ ৬০ জন সামরিক সদস্য কানাডায় প্রশিক্ষণ পেয়েছে। আর জামাইকাতে কানাডা বেশ কয়েকটা সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করেছে, যেখানে পুরো ক্যারিবিয়ানের সকল দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা প্রশিক্ষণ নেয়।

১৯৯৩ সাল থেকে জামাইকাতে চালু রয়েছে ‘ক্যারিবিয়ান জুনিয়র কমান্ড এন্ড স্টাফ কোর্স ফ্যাসিলিটি’। ২০০৬ সালে তৈরি করা হয় ‘ক্যারিবিয়ান মিলিতারই এভিয়েশন স্কুল’। ২০০৮ সালে তৈরি করা হয় টেকনিক্যাল ট্রেনিং স্কুল। ২০০৯ সালে তৈরি হয় ‘ক্যারিবিয়ান কাউন্টার টেররিজম ট্রেনিং সেন্টার’। ২০১২ সালে শুরু হয় ‘ক্যারিবিয়ান মিলিটারি ম্যারিটাইম ট্রেনিং সেন্টার’। ২০১৭ সালে তৈরি হয় ‘ডিরেক্টোরেট অব ট্রেনিং এন্ড ডকট্রাইন’। ২০১৮ সালে চালু হয় ‘ক্যারিবিয়ান স্পেশাল ট্যাকটিকস সেন্টার’।
  
২০১৬ সালে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর কিউবা ভ্রমণ। কিউবার ব্যাপারে কানাডার নীতি সর্বদাই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নীতির উল্টো। ক্যারিবিয়ানে প্রভাব বিস্তারের খেলায় ব্রিটিশ সময় থেকেই কানাডা যুক্তরাষ্ট্রকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখেছে। সমাজতান্ত্রিক কিউবার সাথে সম্পর্ক ধরে রাখার ব্যাপারটাও সেই একই চিন্তার অংশ।


কিউবার সাথে সম্পর্ক

কিউবার সাথে কানাডার বাণিজ্য চলছে অষ্টাদশ শতক থেকেই। তবে রাষ্ট্র হিসেবে কানাডা এবং কিউবার মাঝে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় ১৯৪৫ সালে। পুরো ক্যারিবিয়ানে কিউবাতেই কানাডিয়ানরা প্রথম দূতাবাস খোলে। ১৯৫৯ সালে কিউবাতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর মাত্র দু’টা দেশ কিউবার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখে; এর একটা মেক্সিকো; অন্যটা কানাডা। কানাডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জন ডিফেনবেকার ঘোষণা দেন যে, আদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তিনি কিউবার সাথে সম্পর্ক রাখবেন। একই বছরের এপ্রিলে কিউবার নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো কানাডা সফরও করেন। ডিফেনবেকারের সরকার সকলকে বার্তা দেয় যে, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি হুবহু নকল করে চলবে না। ১৯৬৩ সালে ডিফেনবেকার নির্বাচনে হেরে যাবার পর নতুন প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে ট্রুডোও কানাডার পররাষ্ট্রনীতিকে মার্কিন প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার কথা বলেন। পিয়েরে ট্রুডো বর্তমান প্রধানন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর বাবা। ১৯৬০ এবং ১৯৭০এর দশকে কিউবার সাথে বাণিজ্যের ব্যাপারে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সাংঘর্ষিক নীতি অনুসরণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধে থাকা কিউবার অর্থনীতিতে কানাডার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। কিউবার ট্যুরিস্ট বোর্ডের বরাত দিয়ে ‘ট্রাভেল পালস কানাডা’ বলছে যে, ২০১৯ সালে কিউবাতে ১১ লক্ষের বেশি কানাডিয়ান ভ্রমণ করেছে। এই সংখ্যা কিউবায় ভ্রমণ করা সকল পর্যটকের প্রায় এক চতুর্থাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ১৯৯৬ সালে পাস করা ‘হেলমস বারটন এক্ট’ বাস্তবায়নের জন্যে যুক্তরাষ্ট্র কানাডার উপর চাপ সৃষ্টি করে। এই আইনের ‘টাইটেল ৩’এ বলা হয় যে, কিউবাতে মার্কিন নাগরিকদের সম্পদ কিউবার সরকার বাজেয়াপ্ত করে থাকলে মার্কিন নাগরিকেরা কিউবায় সেই সম্পদের বর্তমান ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে। এই আইনের প্রতিবাদে কানাডার হাইজ অব কমন্সে ‘গডফ্রে মিলিকেন বিল’ নিয়ে আসা হয়, যার মাধ্যমে বলা হয় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্মের সময় যেসকল ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার বিরোধী ছিলেন এবং কানাডায় পালিয়ে এসেছিলেন, তাদের বাজেয়াপ্ত সম্পদ তাদের উত্তরসুরীরা পাবার জন্যে চেষ্টা করতে পারবে। কানাডার প্রতিবাদের কারণে ‘হেলমস বারটন এক্ট’এর ‘টাইটেল ৩’ ২০১৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত স্থগিত করে দেয়া হয়। ২০১৯এর ২৭শে এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দেয় যে, ‘টাইটেল ৩’ এখন কার্যকর করা হবে। কানাডার প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে ৩রা মে বলা হয় যে, প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো কিউবার প্রধানমন্ত্রী মিগেল দিয়াজ কানেলের সাথে ফোনে কথা বলে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফাভাবে ‘টাইটেল ৩’ কার্যকর করার ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ট্রুডো কিউবাতে কানাডার জনগণের স্বার্থ রক্ষা করবেন বলে বলেন।

ব্রিটিশ কমনওয়েলথের কানাডা যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করেই যাবে

জরডান গুডরোর ব্যাপারটা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের বছরে ট্রাম্পের জন্যে সুখকর কোন খবর নয়। এর মাত্র ক’দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্র কিউবার ব্যাপারে ১৯৯৬ সালে কংগ্রেসে পাস করা আইন বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দেয়। এর কিছুদিন পরেই ২৫শে মে ইরান থেকে তেল নিয়ে আসা ট্যাঙ্কার ভেনিজুয়েলায় প্রবেশ করে। এই ঘটনাগুলি ট্রাম্প প্রশাসনকে নির্বাচনের বছরে হিস্প্যানিক ভোটারদের সামনে দুর্বল করতে পারে। গুডরোর কানাডার নাগরিকত্ব ক্যারিবিয়ানে প্রায় আড়াই’শ বছরের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময় থেকেই কানাডা ক্যারিবিয়ানে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। ব্রিটিশরা তাদের উপনিবেশগুলিকে ছেড়ে দেবার পর কানাডা ব্রিটিশ কমনওয়েলথের নীতিই ধরে রেখেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখেছে। প্রথমে অর্থনৈতিক দিক থেকে সম্পর্কের সূচনা হলেও বর্তমান কানাডা ক্যারিবিয়ানের উপর নির্ভরশীল নয়। বরং ক্যারিবিয়ানের ছোট দ্বীপ দেশগুলিই কানাডার উপর নির্ভরশীল। ব্রিটিশদের প্রাক্তন উপনিবেশে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলকভাবেই দেখেছে। একারণেই কানাডা ক্যারিবিয়ানে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক দিক থেকে সর্বদা ব্যস্ত থেকেছে। ঔপনিবেশিক শক্তি হবার তকমা নিতে না চাইলেও ক্যারিবিয়ানকে কানাডা নিজের মনে করেই দেখেছে। কানাডা আলাদা কোন জাতীয়তাবাদী শক্তি নয়। বিশ্বব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রবাহে ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’এর কৌশলের মাঝে ব্রিটিশ কমনওয়েলথের কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডকেই ব্রিটেনের আত্মার অংশ হিসেবে চিন্তা করা হচ্ছে। আদর্শিক দিক থেকে একই সূত্রে গাঁথা এই দেশগুলি তো এক সুরেই কথা বলবে। প্রশান্ত মহাসাগরে যেমন অস্ট্রেলিয়াকে ব্রিটেনের হাত হিসেবে দেখতে চাইছেন তারা, তেমনি আমেরিকা মহাদেশে কানাডাকে তারা দেখতে চাইছেন অগ্রগামী অবস্থানে। ভেনিজুয়েলা এবং কিউবার সাম্প্রতিক ইতিহাস ক্যারিবিয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে দুর্বল করে। আর এই সুযোগটা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বীরা নিলে অবাক হবার কিছু নেই। ক্যারিবিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে নিজের উঠানেই চ্যালেঞ্জ নিতে হচ্ছে।

Saturday, 24 August 2019

ভেনিজুয়েলার সরকারকে টিকিয়ে রেখেছে কিউবার ইন্টেলিজেন্স?


২৪শে অগাস্ট ২০১৯
অর্থনৈতিক সমস্যায় পতিত হবার পর ভেনিজুয়েলার অর্থনীতি এখন মধ্য আমেরিকার ছোট দেশগুলির আকারে এসে পৌঁছেছে, যদিও দেশটা বিশ্বে বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলির একটা; এবং পৃথিবীর সবচাইতে বড় তেলের রিজার্ভ (প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ব্যারেল) রয়েছে সেখানে। মার্কিন অবরোধ এবং ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে প্রতি মাসে ভেনিজুয়েলার তেল বিক্রির আয় ১৫ শতাংশ করে কমছে। ভেনিজুয়েলা সরকারের ক্ষমতায় টিকে থাকার পিছনে সবচাইতে বড় স্তম্ভ হলো এর সেনাবাহিনী, যা এখনও প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সমর্থন করে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে যে, মাদুরোকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছে কিউবা।



যুক্তরাষ্ট্র বনাম ভেনিজুয়েলা-কিউবা

গত ২৪শে জুলাই ভেনিজুয়েলায় মার্কিন বিশেষ প্রতিনিধি এলিয়ট এব্রামস এক অনুষ্ঠানে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে টিকিয়ে রাখতে বাইরের দেশের হস্তক্ষেপের ব্যাপারে কথা বলেন। তিনি বলেন যে, ভেনিজুয়েলার অর্থনৈতিক অচলাবস্থার মাঝে মাদুরো সরকার ৩৮ মিলিয়ন ডলার খরচ করে সামরিক ইউনিফর্ম কিনেছে। মে মাসে ২’শ ৯ মিলিয়ন ডলার খরচে ভেনিজুয়েলা সরকার রাশিয়ার সহায়তায় তার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ঠিকঠাক করেছে। একইসাথে ৯টা রুশ ‘সুখোই-৩০’ যুদ্ধবিমান আর ৮টা পরিবহণ হেলিকপ্টার ক্রয়ের কথাও হয়েছে রুশদের সাথে। তবে রাশিয়ার ব্যাপারে এব্রামসের কথাগুলিতে নতুন কিছু না থাকলেও তিনি কিউবা নিয়ে যে কথাগুলি বলেছেন, তা অনেককেই অবাক করেছে। তিনি বলেন যে, ভেনিজুয়েলাতে আড়াই হাজার কিউবান ইন্টেলিজেন্স এজেন্ট কাজ করছে। আর এই সুযোগে কিউবা ভেনিজুয়েলা থেকে বিনা খরচে তেলের সরবরাহ পাচ্ছে। এব্রামসের কথার একদিন পরই আরেকজন উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের সাথে টেলিকনফারেন্সের সময় একই ধরনের কথা বলেন। তিনি বলেন যে, কিউবার আর্থিক নেটওয়ার্ক, আয়ের উৎস, তেলের বাণিজ্য – এসকল কিছুর বিরুদ্ধেই মার্কিন সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে। এই ব্যবস্থা আরও কঠোর হবে যদি কিউবানরা ভেনিজুয়েলার সরকারকে সমর্থন দেয়া বন্ধ না করে। আসলেই কি ভেনিজুয়েলায় কিউবার ততটা প্রভাব রয়েছে? মার্কিন চেষ্টার বিরুদ্ধে ভেনিজুয়েলার সরকারকে টিকিয়ে রাখতে কিউবার ভূমিকাই বা কতটুকু?

মার্কিন কর্মকর্তাদের হুমকির পরদিনই কিউবার ‘হাভানা টাইমস’ পত্রিকার এক খবরে বলা হয় যে, কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেল কিউবা ভেনিজুয়েলাকে তার সমর্থন দেয়া অব্যাহত রাখবে। কিউবান বিপ্লবের ৬৬তম বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে দিয়াজ-কানেল বলেন যে, ওয়াশিংটন কিউবার বিদ্যুৎ, পানি, এমনকি বাতাস আটকে দিতে চাইছে যাতে কিউবা ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে সহায়তা দিতে না পারে। মার্কিনীরা কিউবার বন্দরে তেলের জাহাজ ভিড়তে বাধা দিচ্ছে, জাহাজ কোম্পানিগুলিকে ভীতি প্রদর্শন করছে। ভেনিজুয়েলা থেকে কিউবায় তেল নিয়ে যাওয়া কয়েকটা কোম্পানির উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। মার্কিন অবরোধের কারণে জুলাই মাসে কিউবায় পর্যটকের আগমন প্রায় ২৪ শতাংশ কমে গেছে। তবে একইসাথে কিউবার প্রেসিডেন্ট এ-ও বলেন যে, কিউবা ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায়; পারস্পরিক সন্মান প্রদর্শনের ভিত্তিতে নিজেদের বিরোধগুলিকে দেখতে চাচ্ছে কিউবা। তবে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ে মার্কিনীরা যখন কিউবার সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে দেশটাকে নিজেদের প্রভাব বলয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই ট্রাম্প প্রশাসন সেখান থেকে পুরোপুরি উল্টো পথে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। কিউবার সাথে মার্কিনীদের বহু বছরের বিরোধের সূত্রে কিউবা তাদের নিরাপত্তাকে সর্বদাই গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে; বিশেষতঃ তাদের ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের সক্ষমতাকে গড়ে তুলেছে।

‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’এর ফেলো মইজেস নাইম ১৯৯০-এর দশকে ভেনিজুয়েলার সরকারে ছিলেন। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘জি’-জিরো মিডিয়া’র সাথে এক সাক্ষাতে তিনি বলেন যে, অর্থনৈতিক সমস্যায় পতিত হবার পর ভেনিজুয়েলার অর্থনীতি এখন মধ্য আমেরিকার ছোট দেশগুলির আকারে এসে পৌঁছেছে, যদিও দেশটা বিশ্বে বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলির একটা; এবং পৃথিবীর সবচাইতে বড় তেলের রিজার্ভ (প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ব্যারেল) রয়েছে সেখানে। মার্কিন অবরোধ এবং ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে প্রতি মাসে ভেনিজুয়েলার তেল বিক্রির আয় ১৫ শতাংশ করে কমছে। ভেনিজুয়েলা সরকারের ক্ষমতায় টিকে থাকার পিছনে সবচাইতে বড় স্তম্ভ হলো এর সেনাবাহিনী, যা এখনও প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সমর্থন করে যাচ্ছে। এর কারণ হিসেবে মইজেস নাইম বলছেন যে, সেনাবাহিনীর হাতে আর কোন অপশন নেই। এবং একইসাথে মাদুরোকে সমর্থন দিয়ে চলছে কিউবার ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস। ভেনিজুয়েলার অর্থনীতি, রাজনীতি, কূটনীতি – বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিউবার ইন্টেলিজেন্সের প্রভাব এখন ব্যাপক।

গত মে মাসে ‘অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটস’এ এক ভাষণে কিউবা গবেষক মারিয়া সি ওয়েরলাউ বলেন যে, দুর্বল অর্থনীতি এবং ছোট জনসংখ্যা সত্ত্বেও কিউবা বস্তুতঃ ভেনিজুয়েলার দখল নিয়ে নিয়েছে। কোন গুলি খরচ না করেই কিউবা তার চাইতে অনেক বড় এবং অনেক বেশি বিত্তশালী একটা দেশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। ওয়েরলাউ-এর কথাগুলি যে ভিত্তিহীন নয়, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ভেনিজুয়েলার ব্যাপারে কানাডার কূটনৈতিক চেষ্টা দেখে। ‘রয়টার্স’ বলছে যে, কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড ২২শে অগাস্ট ঘোষণা দেন যে, তিনি কিউবা যাচ্ছেন সেদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদরিগেজের সাথে ভেনিজুয়েলা বিষয়ে কথা বলতে। মে মাস থেকে এটা হবে রদরিগেজের সাথে তার তৃতীয় বৈঠক।

 
ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সাথে ভালো বন্ধুত্ব থাকার কারণে ১৯৯৯ সালে হুগো শাভেজ ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হবার পর ‘জি-২’এর জন্যে নতুন করে দুয়ার খুলে যায়। কিউবা থেকে আসা ডাক্তার, ক্রীড়া প্রশিক্ষক, টেকনিশিয়ান, ইঞ্জিনিয়ারদের মাঝ দিয়েই ‘জি-২’ ভেনিজুয়েলায় তাদের উপস্থিতি গড়ে তোলে। ২০০৭ সালে হুগো শাভেজ বলেন যে, ভেনিজুয়েলাতে ২০ হাজারের বেশি কিউবান ডাক্তার, নার্স এবং টেকনিশিয়ান কাজ করছে। ২০০২ সালে হুগো শাভেজকে ক্ষমতাচ্যুত করার ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টাটাই ছিল দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে টার্নিং পয়েন্ট।



হুগো শাভেজ এবং ফিদেল ক্যাস্ট্রো

‘জিওপলিটিক্যাল মনিটর’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, ‘কিউবান ইন্টেলিজেন্স ডিরেকটরেট’ বা ‘জি-২’-এর শক্তির উৎস হচ্ছে ঠান্ডা যুদ্ধের সময় ১৯৬০-৭০-এর দশকে সোভিয়েত এবং পূর্ব-জার্মানির ইন্টেলিজেন্সের দ্বারা প্রশিক্ষণের ভিত। টানা ছয় দশক যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি অবস্থিত হয়েও সমাজতান্ত্রিক সরকারকে রক্ষা করতে পারার সাথে সাথে ‘জি-২’-এর ভিত আরও শক্ত হয়েছে। ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে হত্যা করার বেশ কয়েকটা চেষ্টাকেও তারা প্রতিহত করেছে বলে শোনা যায়। মধ্য এবং দক্ষিণ আমেরিকার বেশকিছু সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী গ্রুপকে ‘জি-২’ প্রশিক্ষণ দিয়েছে। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং ভিয়েতনামেও তাদের জড়িত থাকার কথা জানা যায়। ১৯৫৯ সালে কিউবায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর থেকেই ‘জি-২’ ভেনিজুয়েলায় প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট হয়েছিল। কিউবা ভেনিজুয়েলার বামপন্থী বিপ্লবীদের সহায়তা করছিল। অন্যদিকে ভেনিজুয়েলার সরকার ছিল বামপন্থা-বিরোধী। তাই এসময়ে দুই দেশের সম্পর্ক সহজ ছিল না। ঠান্ডা যুদ্ধ শেষের পর থেকে কিউবার জ্বালানি নিরাপত্তা শঙ্কার মাঝে পড়ে গেলে ভেনিজুয়েলা কিউবার কাছে আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সাথে ভালো বন্ধুত্ব থাকার কারণে ১৯৯৯ সালে হুগো শাভেজ ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হবার পর ‘জি-২’এর জন্যে নতুন করে দুয়ার খুলে যায়। কিউবা থেকে আসা ডাক্তার, ক্রীড়া প্রশিক্ষক, টেকনিশিয়ান, ইঞ্জিনিয়ারদের মাঝ দিয়েই ‘জি-২’ ভেনিজুয়েলায় তাদের উপস্থিতি গড়ে তোলে। ২০০৭ সালে হুগো শাভেজ বলেন যে, ভেনিজুয়েলাতে ২০ হাজারের বেশি কিউবান ডাক্তার, নার্স এবং টেকনিশিয়ান কাজ করছে। বেসরকারি হিসেবে অনেকে এই সংখ্যাকে ৪০ হাজার বলছেন।

অভিজ্ঞতার দিক থেকে ‘জি-২’ ভেনিজুয়েলার ইন্টেলিজেন্স থেকে অনেক এগিয়ে থাকার কারণেই কিউবা তার নেতৃত্ব ধরে রাখতে পেরেছে। তবে ভেনিজুয়েলার ইন্টেলিজেন্সের মাঝে অনেকেই বামপন্থী-বিরোধী থাকায় তারা ‘জি-২’এর প্রভাবকে পছন্দ করেনি। ২০০২ সালে হুগো শাভেজকে ক্ষমতাচ্যুত করার ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টায় মার্কিনীদের জড়িত থাকার খবর দেয় ব্রিটেনের ‘দ্যা অবজার্ভার’ পত্রিকা। জার্মান মিডিয়া ‘ডিডব্লিউ’ বলছে যে, শাভেজের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানচেষ্টাটাই ছিল দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে টার্নিং পয়েন্ট। ‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ক্যাস্ট্রো এবং শাভেজ ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিতে চুক্তি করেন। চুক্তি মোতাবেক কিউবা ভেনিজুয়েলার সেনাবাহিনী এবং ইন্টেলিজেন্সকে প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করে। প্রথম উদ্দেশ্যই থাকে ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরে শত্রু দেশের ইন্টেলিজেন্সের কর্মকান্ডকে খুঁজে বের করে দমন করা। এই কাজে ভেনিজুয়েলার ইন্টেলিজেন্স ব্যাপক ধরপাকরড় চালায়।

নিরাপত্তা-বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সিএনএ’-এর সিনিয়র এনালিস্ট উইলিয়াম রোজনাউ এবং রালফ এসপাচ ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় বলছেন যে, ছোট দেশ হয়েও কিউবা তার ইন্টেলিজেন্সের বদৌলতে নিজের ওজন বাড়িয়ে নিয়েছে। প্রাক্তন মার্কিন ইন্টেলিজেন্স সদস্য এডওয়ার্ড স্নোডেন-কে ল্যাটিন আমেরিকায় রাজনৈতিক আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দেবার জন্যে কিউবার ইন্টেলিজেন্স মধ্যস্ততা করে। সোভিয়েতদের সাথে কিউবানরাও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর এবং ইন্টেলিজেন্সের ভেতরে ঢুকে পড়ে। স্পেন এবং ল্যাটিন আমেরিকায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলিতেও কিউবানরা কাজ চালিয়ে যায়। ১৯৮০-এর দশকে মধ্য আমেরিকার এল-সালভাদর এবং গুয়াতেমালাতে মার্কিন সমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে গেরিলাদের সহায়তা দেয় ‘জি-২’। ঠান্ডা যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রে ‘জি-২’এর কর্মকান্ড বৃদ্ধি পায়; বিশেষ করে ফ্লোরিডায় ক্যাস্ট্রো-বিরোধী গ্রুপগুলির ব্যাপারে ‘জি-২’ বেশি সক্রিয় ছিল। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ‘এফবিআই’ ১৯৯০ থেকে ২০১০ পর্যন্ত মার্কিন নিরাপত্তা স্থাপনায় বহুদিন ধরে কাজ করা বেশকিছু কিউবার ইন্টেলিজেন্স সদস্যকে গ্রেপ্তার করে এবং আদালতে বিচারও করে। ২০১০ সালে ‘উইকিলিকস’এর ফাঁস করা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তারবার্তার বরাত দিয়ে ‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ কিউবান ইন্টেলিজেন্সের উপদেশেই চলছেন। মার্কিন তারবার্তায় বলা হয় যে, ভেনিজুয়েলার ইন্টেলিজেন্স কিউবার ইন্টেলিজেন্সের মতো সক্ষম নয়; তাই কিউবানরা ভেনিজুয়েলার ইন্টেলিজেন্সকে প্রশিক্ষণও দেয়। স্পেনের পত্রিকা ‘এবিসি’ এক প্রতিবেদনে বলে যে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠকে যোগ দেবার জন্যে মাদুরো যখন নিউ ইয়র্ক যাচ্ছিলেন, তখন তার বিমানে থাকা কিউবানদেরকে মার্কিন সরকার যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি না দেয়ায় মাদুরোর বিমান ভেনিজুয়েলায় ফিরে যায়। ভেনিজুয়েলাকে ব্যবহার করে ‘জি-২’ ল্যাটিন আমেরিকার অন্যান্য দেশ, যেমন ব্রাজিল এবং কলম্বিয়াতে ইন্টেলিজেন্স অপারেশন চালাচ্ছে কিউবা।

তেলের বিনিময়ে নিরাপত্তা

কিউবা ভেনিজুয়েলার কাছ থেকে অর্থনৈতিক সহায়তা পাচ্ছে; আর ভেনিজুয়েলা কিউবা থেকে পাচ্ছে নিরাপত্তা, রাজনৈতিক, কৌশলগত এবং ইন্টেলিজেন্স সহায়তা। ‘ব্রুকিংস ইন্সটিটিউট’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ২০১২ সাল নাগাদ দুই দেশের বাণিজ্য কিউবার জিডিপির ২১ শতাংশে দাঁড়ায়। অথচ সেই তুলনায় এই বাণিজ্য ভেনিজুয়েলার অর্থনীতির মাত্র ৪ শতাংশ ছিল। ভেনিজুয়েলা থেকে কিউবা ১ লক্ষ ৪ হাজার ব্যারেল তেল আমদানি করে ঐ বছরে, যা ছিল ভেনিজুয়েলার মোট জ্বালানি তেলের চাহিদার ৬১ শতাংশ। অথচ কিউবায় রপ্তানি করা তেল ছিল ভেনিজুয়েলার মোট তেল রপ্তানির ৫ শতাংশ। এই তেল ভেনিজুয়েলা কিউবাকে দেয় অতি সুলভ মূল্যে। মাত্র ৬০ শতাংশ মূল্য ৯০ দিনের মাঝে পরিশোধ করতে হয়; বাকিটা ২৫ বছরে ১ শতাংশ সুদে পরিশোধযোগ্য। অন্যদিকে কিউবা থেকে আসা ডাক্তার-প্রশিক্ষক-টেকনিশিয়ানরা ভেনিজুয়েলার সামাজিক উন্নয়নের দায়িত্ব নিয়েছে। ভেনিজুয়েলার মানুষ উচ্চতর চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে কিউবাতে। আবার হাজার হাজার ভেনিজুয়েলান ছাত্র মেডিক্যাল বিষয়ে পড়াশোনা করছে কিউবাতে।

এর বিনিময়ে কিউবাকে ভেনিজুয়েলা কতটা আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে, তা সঠিক মূল্যায়ন করা কঠিন। তবে তেলের বিনিময়ে ভেনিজুয়েলাকে নিরাপত্তা সহায়তা দিচ্ছে কিউবা। ভেনিজুয়েলার জনগণের বায়োমেট্রিক ডাটাবেস তৈরি করে দিচ্ছে কিউবান সরকারি কোম্পানি। হুগো শাভেজের ক্যান্সার ধরা পড়ার পর তার চিকিৎসাও হয়েছে কিউবাতে – ব্যাপক নিরাপত্তার মাঝে। ২০১৩ সালে শাভেজ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার মন্ত্রীসভার বৈঠকগুলি কিউবাতেই করতেন। ‘রয়টার্স’এর প্রতিবেদন বলছে যে, কিউবার ইন্টেলিজেন্সের সহায়তার কারণেই মাদুরো ক্ষমতায় টিকে গেছেন। ব্যাপক অর্থনৈতিক ধ্বস এবং ৪০ লক্ষ মানুষের দেশত্যাগের পরেও কিউবানদের প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী মাদুরোর বিরুদ্ধে যায়নি। ভেনিজুয়েলার ইন্টেলিজেন্সের একসময় দায়িত্ব ছিল গণতন্ত্র রক্ষা। কিউবানদের প্রশিক্ষণের পর নতুন দায়িত্ব দাঁড়ায় সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা। এবছরের শুরুতে ভেনিজুয়েলার বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদো নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন এবং সেনাবাহিনীকে মাদুরোর বিরুদ্ধে যাবার জন্যে অনুরোধ করেন। যুক্তরাষ্ট্র গুয়াইদোর কথায় সমর্থন দিলেও ভেনিজুয়েলার সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে কোন সাড়াই মেলেনি।
মধ্য আমেরিকায় ভেনিজুয়েলার তেলের বিনিময়ে কিউবা প্রভাব বিস্তারের একটা সুযোগ পেয়েছে। বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্থার মাঝেও কিউবা তার স্থান করে নিচ্ছে। মার্কিন প্রভাবে থাকা সংস্থাগুলিকে কিউবা অকার্যকর করে দিচ্ছে। ২০০১ সালে বিশ্বব্যাপী তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ কারণে ল্যাটিন আমেরিকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টি সড়ে যাবার পরই যুক্তরাষ্ট্রকে বাইপাস করে বিভিন্ন সংগঠন তৈরি হতে থাকে। কিউবা-ভেনিজুয়েলার একত্রে কাজ করার কারণে পুরো আমেরিকাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমছে প্রতি নিয়ত। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমার সাথে এটা সাংঘর্ষিক নয়। 



আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াচ্ছে কিউবা

‘ব্রুকিংস ইন্সটিটিউট’এর প্রতিবেদন বলছে যে, কিউবা এবং ভেনিজুয়েলার মাঝে ‘বলিভারিয়ান’ সহযোগিতাকে পুরো ল্যাটিন আমেরিকা এবং মধ্য আমেরিকায় ছড়িয়ে দিতে চাইছে কিউবা। ২০০৫ সালের ‘পেট্রোক্যারিব’ প্রকল্পের মাধ্যমে ভেনিজুয়েলার তেল শুধু কিউবা নয়, ক্যারিবিয়ানের দ্বীপ দেশগুলি এবং মধ্য আমেরিকার দেশগুলির বেশিরভাগের কাছেই যাওয়া শুরু করেছিল। মোট ১৫টা দেশ এই চুক্তির অধীনে সাশ্রয়ী মূল্যে ভেনিজুয়েলার তেল পাচ্ছিলো। এভাবে মধ্য আমেরিকায় ভেনিজুয়েলার তেলের বিনিময়ে কিউবা প্রভাব বিস্তারের একটা সুযোগ পেয়েছে। বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্থার মাঝেও কিউবা তার স্থান করে নিচ্ছে। যেমন ‘অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটস’এর মতো মার্কিন প্রভাবে থাকা সংস্থাগুলিকে কিউবা অকার্যকর করে দিচ্ছে। এধরনের সংস্থাগুলির প্রধান এজেন্ডা হচ্ছে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার, যেগুলি ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশই এড়িয়ে যেতে চায়। ২০০১ সালে বিশ্বব্যাপী তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ কারণে ল্যাটিন আমেরিকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টি সড়ে যাবার পরই যুক্তরাষ্ট্রকে বাইপাস করে বিভিন্ন সংগঠন তৈরি হতে থাকে। কিউবা সরাসরি জড়িত থেকে অথবা ভেনিজুয়েলার মাধ্যমে এসব ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ভেনিজুয়েলার হুগো শাভেজের চেষ্টায় ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা বাদে পুরো আমেরিকার বাকি ৩৩টা দেশকে নিয়ে ‘কমিউনিটি অব ল্যাটিন আমেরিকান এন্ড ক্যারিবিয়ান স্টেটস’ গঠন করা হয়। ২০০৮ সালে গঠন করা হয় ‘ইউনিয়ন অব সাউথ আমেরিকান নেশনস’ (যদিও কিউব এর সদস্য নয়), যেটাকে আবার ‘বামপন্থী’ আখ্যা দিয়ে মার্কিন প্রভাবে থাকা বেশ কয়েকটা দেশ ২০১৮-১৯ সালে সেখান থেকে বের হয়ে যায়।

রোজনাউ এবং এসপাচ তাদের প্রতিবেদনে লিখছেন যে, কিউবা নিশ্চিতভাবেই তার ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্ককে কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ে ব্যবহার করছে। কোন রাষ্ট্রই বিনা কারণে ইন্টেলিজেন্স তথ্য যোগাড় করে না। আর গোপন তথ্য যোগাড় করার খরচও তো যোগাতে হবে। কিউবা মার্কিনীদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলির সাথে ইন্টেলিজেন্সের তথ্য আদান-প্রদান করে তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন সুবিধা আদায় করতে পারে। কিউবানরা মার্কিন নিরাপত্তা, ইন্ডাস্ট্রি, বাণিজ্য এবং প্রযুক্তি সম্পর্কে তথ্য যোগাড় করে সেগুলি মার্কিনীদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ, যেমন - রাশিয়া, চীন এবং অন্যান্য দেশের সাথে বাণিজ্য করতে পারে।

ভেনিজুয়েলা বন্ধু খুঁজছে

কিছুদিন আগেই মাদুরো সরকারকে উৎখাত করার জন্যে মার্কিনীরা ভেনিজুয়েলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্তাব্যক্তিদের সাথে কথা চালিয়ে যায়। পরবর্তীতে এই অভ্যুত্থান চেষ্টা ভেস্তে গেলেও মাদুরো অভ্যুত্থান চেষ্টার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের কিছু করেননি অথবা করতে পারেননি। এর স্বপক্ষে যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে যে, অভ্যুত্থানের চেষ্টাকারীরা ভেনিজুয়েলার সমাজে এতটাই প্রভাশালী যে, মাদুরো তাদেরকে আটক করা বা তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেবার চেষ্টাই করতে পারেননি। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলছেন যে, মাদুরোর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানচেষ্টা ভেস্তে যাবার একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো মোক্ষম সময়ে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ। রাশিয়ার পাঠানো সেনারা ভেনিজুয়েলার ক্ষমতার সমীকরণে অনিশ্চয়তা জুড়ে দিলে অভ্যুত্থান ভেস্তে যায়। রুশ সরকার দরকারমতো সহায়তা দিলেও কিউবানরা মাদুরোর সাথে আঠার মতোই লেগে আছে।

২১শে অগাস্ট ভেনিজুয়েলা উত্তর কোরিয়াতে তার দূতাবাস খুলেছে। উত্তর কোরিয়ার উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সাথে ভেনিজুয়েলা সরকার নিজেদের অবস্থানের অভিন্নতা খুঁজছে; উদ্দেশ্য – বহিঃবিশ্বে সমর্থন খোঁজা। এর কয়েকদিন আগেই ১৫ই অগাস্ট ভেনিজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ মস্কো সফর করেন। রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু ভেনিজুয়েলার সরকারের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি এবং মার্কিন চাপের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার জন্যে রুশ সমর্থনের কথা মনে করিয়ে দেন। এই বছরেই রুশ প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তারা কমপক্ষে দু’বার ভেনিজুয়েলা সফর করেন। তবে ভেনিজুয়েলাকে সমর্থন দেবার ক্ষেত্রে পুরোনো বন্ধুরাও শক্ত অবস্থানে থাকতে পারছে না। ১৯শে অগাস্ট ‘রয়টার্স’ বলছে যে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপে চীনা তেল কোম্পানি ‘চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন’ বা ‘সিএনপিসি’ অগাস্ট মাসে ভেনিজুয়েলার তেল আমদানি স্থগিত করেছে। ভেনিজুয়েলা তেল সরবরাহের বিনিময়ে চীনাদের কাছ থেকে বড় অংকের ঋণ পেয়েছে। ভেনিজুয়েলার বেশিরভাগ তেলের ক্রেতাই চীন। সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিং-এ মার্কিন দূতাবাসের সাথে ‘সিএনপিসি’র আলোচনার পরই এই সিদ্ধান্ত এলো। অথচ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিকোলাস মাদুরোর বন্ধুর প্রয়োজনীয়তা এখন সর্বোচ্চ।

ভেনিজুয়েলায় প্রভাব বিস্তার কিউবার জন্যে সবচাইতে বড় ভূকৌশলগত সাফল্য। যুক্তরাষ্ট্রের উঠানে ছয় দশক ধরে সমাজতান্ত্রিক সরকারকে টিকিয়ে রাখার পর ভেনিজুয়েলার সরকারকেও টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব নিয়েছে কিউবা। ছোট্ট কিউবার পক্ষে পশ্চিম গোলার্ধে শক্তিধর দেশগুলিকে ব্যালান্সে রাখাটা নয়া বিশ্ব ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হবার ইঙ্গিত। 


কিউবার সাফল্য যা ইঙ্গিত দিচ্ছে

ভেনিজুয়েলার জনস্যংখ্যা কিউবার প্রায় তিন গুণ; ৩ কোটি ২০ লাখ বনাম ১ কোটি ১৫ লাখ। অর্থনৈতিক দিক থেকেও একইরকম গল্প। ভেনিজুয়েলার জিডিপি ২০১৪ সালে ছিল ৪’শ ৮২ বিলিয়ন ডলার; আর কিউবার ছিল ৮১ বিলিয়ন ডলার; অর্থাৎ প্রায় ৬ গুণ। (এখন অবশ্য ভেনিজুয়েলার অর্থনীতি পঙ্গু।) ‘জিওপলিটিক্যাল মনিটর’এর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ভেনিজুয়েলায় প্রভাব বিস্তার কিউবার জন্যে সবচাইতে বড় ভূকৌশলগত সাফল্য। যুক্তরাষ্ট্রের উঠানে ছয় দশক ধরে সমাজতান্ত্রিক সরকারকে টিকিয়ে রাখার পর ভেনিজুয়েলার সরকারকেও টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব নিয়েছে কিউবা। কিউবার ‘জি-২’এর সাফল্য বলছে যে, শুধু বড় রাষ্ট্রগুলিই নয়, ছোট রাষ্ট্রও শক্তিশালী ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস তৈরি করতে সক্ষম, যদি তার জনগোষ্ঠির সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশটা চিন্তার দিক থেকে অন্যদের তুলনায় এগিয়ে থাকে। ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহারের মাধ্যমে যে আন্তর্জাতিক ব্যালান্স অব পাওয়ার পরিবর্তন সম্ভব, তা কিউবার কর্মকান্ডই প্রমাণ দেয়। পশ্চিম গোলার্ধে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, এবং অন্যান্য শক্তিধর দেশগুলিকে ব্যালান্সে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে কিউবা।

কিউবার সাফল্য প্রথমতঃ দেখিয়ে দিচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি অবস্থান করেও ঐতিহ্যগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের মাঝে থাকা দেশগুলিতে কিউবা প্রভাব বিস্তার করছে। ভেনিজুয়েলার মাদুরো সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোটা যুক্তরাষ্ট্রের অত্র অঞ্চলে প্রভাব ধরে রাখার জন্যে অতি জরুরি। কিউবা-ভেনিজুয়েলার একত্রে কাজ করার কারণে পুরো আমেরিকাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমছে প্রতি নিয়ত। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমার সাথে এটা সাংঘর্ষিক নয়। 
দ্বিতীয়তঃ চিন্তাগত দিক থেকে এগিয়ে থাকার কারণে শুধু ভেনিজুয়েলা নয়, পুরো এলাকায় কিউবা প্রাধান্য বিস্তার করে চলেছে। আকারে ছোট হলেও একটা আদর্শিক ভিতের উপর দাঁড়িয়ে থাকার কারণে কিউবা এটা করতে পারছে। বাকি বিশ্বের জন্যে এটা একটা উদাহরণ বটে – চিন্তাগত উতকর্ষতা থাকলে ছোট দেশও সুপারপাওয়ারের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম। 
তৃতীয়তঃ কিউবা পশ্চিম গোলার্ধে ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতাকে আরও উস্কে দিচ্ছে। কিউবার ইন্টেলিজেন্স যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগী রাশিয়া, চীন এবং অন্যান্য দেশকে ইন্টেলিজেন্স সহায়তা দিয়ে এই প্রতিযোগিতাকে আরও ঘনীভূত করতে যাচ্ছে। 
চতুর্থতঃ ছোট্ট কিউবার পক্ষে পশ্চিম গোলার্ধে শক্তিধর দেশগুলিকে ব্যালান্সে রাখাটা নয়া বিশ্ব ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হবার ইঙ্গিত।