Showing posts with label World Order. Show all posts
Showing posts with label World Order. Show all posts

Tuesday, 1 September 2020

করোনা মন্দায় পুঁজিবাদের নিম্নগামীতাকে থামানো যাচ্ছে না কিছুতেই!

২রা সেপ্টেম্বর ২০২০

দুনিয়ার সবচাইতে ধনী ব্যক্তি ‘আমাজন’এর প্রতিষ্ঠাতা বেফ বেজস করোনাভাইরাসের মন্দার মাঝে রেকর্ড পরিমাণ আয় করে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। রাষ্ট্রীয় প্রণোদনার বেশিরভাগ অর্থ ব্যাংক এবং কর্পোরেটদের হাত ঘুরে গুটি কয়েক ধনীদের পকেটেই গিয়েছে। প্রণোদনার অর্থে শেয়ার বাজার চাঙ্গা হয়েছে ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির জন্যেই। অপরদিকে প্রণোদনার অর্থে উঠে দাঁড়ানো ধনীদের অফশোর ব্যাংক একাউন্টও ফুলে ফেঁপে উঠছে। পুঁজিবাদের করুণ অবস্থা করোনাভাইরাসের আগে থেকেই দৃশ্যমান ছিল; বিশেষ করে ব্যাপক আয় বৈষম্যের প্রতিবেদনে পত্রিকার পাতা ভরেছে সাম্প্রতিক সময়ে। করোনাভাইরাসের মাঝে এই করুণ দৃশ্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থায় আয় বৈষম্যের চিত্রটা এখন আর সমাধানের পর্যায়ে নেই। পুঁজিবাদের নিম্নগামীতাকে থামাতে পারছেন না কেউই।

‘বস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ’এর এক গবেষণা বলছে যে, ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার সময় যেখানে মানুষের পকেট থেকে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার উধাও হয়ে গিয়েছিল, এবছর করোনাভাইরাসের কারণে সেটা ১৬ ট্রিলিয়ন ডলার ছুঁয়ে যেতে পারে। তবে এই সম্পদহানি সকলের জন্যে সমানভাবে আসেনি। ‘বিজনেস ইনসাইডার’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, করোনাভাইরাসের লকডাউনের কারণে যেখন প্রায় ৪ কোটি মানুষ তাদের চাকুরি হারাবার পর সরকারের কাছে বেকার ভাতা চেয়েছে, সেখানে সেদেশের বিলিয়নায়াররা আরও বেশি করে অর্থ কামিয়ে নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিলিয়নায়াররা একত্রে প্রায় ৬’শ ৩৭ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত সম্পদ আয় করে নিয়েছেন। মার্চ থেকে জুনের মাঝে ‘আমাজন’এর প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজস তার সম্পদকে ৪৮ বিলিয়ন ডলার বাড়িয়ে নিয়েছেন। ভিডিও কনফারেন্সিং সফটওয়্যার ‘জুম’এর মালিকের সম্পদ বেড়েছে আড়াই বিলিয়ন ডলার। ‘মাইক্রোসফট’এর প্রধান নির্বাহী স্টিভ বলমারএর সম্পদ বেড়েছে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার। কেউ কেউ মনে করতে পারেন যে, অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে এই মানুষগুলি ঠিক সময়ে ঠিক ব্যবসায়ে থাকার ফলেই লাভবান হয়েছে। কিন্তু এর বাইরেও কিছু ঘটনা রয়েছে, যা এই যুক্তির বিরুদ্ধে যাবে। ক্যাসিনো মালিক শেলডন এডেলসন তার সম্পদ বাড়িয়ে নিয়েছেন ৫ বিলিয়ন ডলার। এলন মাস্কও তার সম্পদ বাড়িয়েছে ১৭ বিলিয়ন ডলার। প্রতিবেদনে মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, এর আগে ২০০৭ সালে হাউজিং কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক মন্দার মাঝেও এমনটাই ঘটেছিল। বাড়িঘরের মূল্য পড়ে গিয়েছিল ২১ শতাংশ; শেয়ার বাজারের মূল্য হয়ে গিয়েছিল অর্ধেক; ৮৮ লক্ষ আমেরিকান হয়েছিল বেকার। সেই মন্দার পরপর ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মাঝে নিচের ৯৯ শতাংশ মানুষের সম্পদ বেড়েছিল শূণ্য দশমিক ৪ শতাংশ; অপরদিকে উপরের ১ শতাংশ মানুষের সম্পদ বেড়েছিল ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ।

‘ফোর্বস’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় করোনাভাইরাস পরবর্তী বিশ্বে আয় বৈষম্য আরও বাড়ার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়। বিভিন্ন গবেষণা বলছে যে, ধনীরা গত মার্চের পর থেকে অর্থ জমাতে সক্ষম হয়েছে; আর অন্যদিকে গরীব লোকেরা আয় না থাকার কারণে বাধ্য হয়েছে নিজেদের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে দিতে এবং নতুন করে ধারকর্য করতে। ব্রিটেনের ‘রেজোলিউশন ফাউন্ডেশন’এর এক গবেষণা বলছে যে, ব্রিটেনের নিম্ন আয়ের মানুষের বেশিরভাগই জুন মাসে ক্রেডিট কার্ডের উপর বেঁচে ছিল। লাক্সারি জিনিসপত্রের দোকান বন্ধ থাকায় এবং ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা থাকায় ধনী ব্যক্তিদের খরচ কমে গেছে। ‘নিউ পলিসি ইন্সটিটিউট’এর গবেষণা বলছে যে, ব্রিটেনের সমাজের উপরের ২০ শতাংশ মানুষের ব্যাংক একাউন্টে লকডাউনের মাঝে প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার জমে গেছে। হারভার্ডের একদল গবেষক বলছে যে, মার্কিন সমাজের উপরের ২৫ শতাংশ মানুষের খরচ ২০ শতাংশ কমেছে; অথচ নিচের ২৫ শতাংশের খরচ কমেছে মাত্র ৫ শতাংশ। ধনীদেরকে টার্গেট করা লাক্সারি গাড়ি তৈরির কারখানা, দামী জামাকাপড় বিক্রেতা, রেস্টুরেন্ট, হোটেলগুলি বিপদে পড়েছে; আর ব্যবসা মালিকরা খরচ কমাতে গিয়ে কম মজুরির কর্মচারীদেরকে ছাঁটাই করেছে। ধনীদের সম্পদ যারা দেখাশোনা করছেন, তারা আবার উপদেশ দিচ্ছে যে, আপাততঃ বিনিয়োগ এবং খরচ কম করাই ভালো হবে। প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হচ্ছে যে, একজন ধনী ব্যবসায়ী যদি বাড়ি থেকেই কাজ করেন, তাহলে নতুন স্যুট কিনে তিনি কি করবেন? আর তার স্ত্রী যেহেতু কোন পার্টিতে যাচ্ছেন না, তাই নতুন লাক্সারি জিনিসপত্র কিনে তিনি কাকে দেখাবেন? সাধারণ সময়ে বোঝা না গেলেও মহামারি এবং অর্থনৈতিক মন্দার মাঝেই বোঝা যাচ্ছে যে, শুধুমাত্র কিছু ধনী ব্যক্তির ইচ্ছেমত খরচের উপর পুরো অর্থনীতিটা কিভাবে চলছে।

সমাজের উপরের স্তরের মানুষের সাথে নিচের স্তরের মানুষের এই ক্রমবর্ধমান বিভেদ, যা কিনা অর্থনৈতিক মন্দার মাঝে বেড়েছে, এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ‘বিজনেস ইনসাইডার’ বলছে যে, এখানে দু’টা সমস্যার দিকে তাকাতে হবে। প্রথমতঃ সরকার বেশিরভাগ প্রণোদনা দেয় ব্যাংক এবং কর্পোরেটদেরকে। ২০০৮ সালের ‘ইমার্জেন্সি ইকনমিক স্ট্যাবিলাইজেশন এক্ট’এর অধীনে ৭’শ বিলিয়ন ডলার খরচে ব্যাংকগুলির কাছ থেকে মূল্য পড়ে যাওয়া সম্পদ কিনে নেয়া হয়। পরবর্তীতে বারাক ওবামা প্রশাসন ‘ট্রাবল্ড এসেট রিলিফ প্রোগ্রাম’ প্রকল্পের অধীনে বাড়ির মালিকদেরকে ৭৫ বিলিয়ন ডলার প্রণোদনা দিয়ে তাদের সুদ পরিশোধে সহায়তা দেয়। অর্থাৎ ৭’শ বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা থেকে ৭৫ বিলিয়ন বা ১০ শতাংশ গিয়েছে বাড়ির মালিকদের কাছে; বাকিটা গিয়েছে ব্যাংক এবং কর্পোরেটদের কাছে। দ্বিতীয়তঃ কর্পোরেটদের হাতে প্রণোদনার অর্থ যাওয়ায় তারা শেয়ার বাজারে নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করে নিতে পেরেছে। আর সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যারা প্রণোদনার অর্থ পায়নি, তারা ঝরে পড়েছে। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডেরাল রিজার্ভ ২০০৮ সালে স্বল্পমেয়াদী সুদের হার প্রায় শূণ্যের কোঠায় নামিয়ে নিয়ে আসে। আর এই সুযোগে ব্যবসায়ীয়া পরবর্তী এক দশকে শেয়ার বাজার গরম করে রাখে। ‘স্ট্যান্ডার্ড এন্ড পুওর্স ৫০০’ ইন্ডেক্স মূল্যসূচক ৪’শ ৬২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। এর অর্থ হলো, মন্দার সবচাইতে খারাপ সময়ে যে ব্যবসায়ী শেয়ার বাজারে ১’শ ডলার বিনিয়োগ করেছে, সে ৪’শ ৬২ ডলার পর্যন্ত কামিয়ে নিতে পেরেছে। আর ১ মিলিয়ন ডলার যে বিনিয়োগ করেছে, সে তুলে নিয়েছে ৪ দশমিক ৬২ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বিনিয়োগের সাড়ে চার গুণেরও বেশি সে তুলে নিতে পেরেছে। ২০০৯ সালের মাঝেই অতিধনী ব্যক্তিরা তাদের সম্পদ ১৯ শতাংশ বাড়িয়ে ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যায়; মন্দার কারণে তারা যা হারিয়েছিল, তার পুরোটাই তারা এক বছরের মাঝেই পুষিয়ে নেয়। ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মাঝে সকল মানুষের আয় মোট যত বৃদ্ধি পেয়েছে, তার ৯৫ ভাগই গিয়েছে ১ শতাংশ মানুষের হাতে; আর ৯৯ শতাংশ মানুষ পেয়েছে মাত্র ৫ ভাগ। আর যুক্তরাষ্ট্রে ২০২০ সালের মাঝে বিলিয়নায়ারদের সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে ৮০ শতাংশ।   
 

সারা দুনিয়ায় আয় বৈষম্য এখন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ২০০৮ সালের মতোই ২০২০ সালে করোনাভাইরাসের সময় যখন প্রণোদনা দেয়া হয়, তখনও বেশিরভাগ অর্থ চলে যায় কর্পোরেটদের হাতে। ধনীরা গত মার্চের পর থেকে অর্থ জমাতে সক্ষম হয়েছে; আর অন্যদিকে গরীব লোকেরা আয় না থাকার কারণে বাধ্য হয়েছে নিজেদের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে দিতে এবং নতুন করে ধারকর্য করতে।
 

২০০৮ সালের মতোই ২০২০ সালে করোনাভাইরাসের সময় যখন প্রণোদনা দেয়া হয়, তখনও বেশিরভাগ অর্থ চলে যায় কর্পোরেটদের হাতে। ‘স্মল বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন’এর মাধ্যমে ৩’শ ৪৯ বিলিয়ন ডলার বিতরণ করা হয়, যার মাঝে ২’শ ৪৩ বিলিয়ন ডলার পায় বড় কর্পোরেটরা; যাদের কোন কোনটা ১’শ মিলিয়ন ডলারের চাইতে বড় কোম্পানি। ১৬ই মার্চ ‘ডাউ জোন্স’ ইন্ডেক্স ইতিহাসে একদিনের সবচাইতে মারাত্মক ধ্বসের মাঝে পড়ে। অথচ ৪ঠা জুনের মাঝেই বিশ্বের সবচাইতে ধনী সাত ব্যক্তির সম্পদ ৫০ শতাংশ বেড়ে যায়! সরকারের প্রণোদনা ঘোষণার পরপরই শেয়ার বাজার চাঙ্গা হয়ে ওঠে এবং স্বাভাবিকভাবেই বড় শেয়ারহোল্ডার ব্যক্তিরা তাদের সম্পদ বাড়িয়ে ফেলে।

২০১০ সালে হাইতিতে ভূমিকম্পের পর ১’শ ৯৫ মিলিয়ন ডলারের যে সহায়তা দেয়া হয়, তার বেশিরভাগই চলে যায় মার্কিন কন্সট্রাকশন কোম্পানির কাছে; হাইতির কোম্পানিগুলি পায় মাত্র আড়াই শতাংশ ফান্ড। ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিয়ান্সএ হারিকেন ‘ক্যাটরিনা’ আঘাত করার পর মার্কিন কন্সট্রাকশন কোম্পানি ‘কেবিআর’ ৩১ বিলিয়ন ডলারের কাজ পায়। এই কোম্পানির মালিক ‘হ্যালিবারটন’এর প্রধান নির্বাহী ছিলেন প্রাক্তন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি। নিজেদের বিশাল সম্পদের উপরে সরকার থেকে আরও প্রণোদনা পাওয়ায় এই বিলিয়নায়াররা দুর্যোগের মুহুর্তগুলিকে কাজে লাগিয়ে আরও ধনী হয়েছে। আবার একইসাথে বিনিযোগের সুযোগ বাড়াবার নামে এই বিলিয়নায়ারদেরকে দেয়া হয়েছে কর সুবিধা এবং তাদের অতিরিক্ত মুনাফা করতে পারার জন্যে রেখে দেয়া হয়েছে নানা ফাঁকফোঁকড়। উদাহরণস্বরূপ, লিমিটেড কোম্পানিগুলির ক্ষেত্রে কোম্পানি মালিকেরা নির্দিষ্ট আকারের ঋণের বেশি কোন ঋণ ফেরত দেবার জন্যে দায়বদ্ধ থাকে না। বিভিন্ন ছুতো ধরে ‘আমাজন’ কোম্পানি দুই বছরে এক ডলারও কর দেয়নি; আর ২০১৯ সালে তারা আয়ের উপর মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ কর দেয়! ১৯৮০এর দশক থেকে বিলিয়নায়ারদের কর ৭৯ শতাংশ কমে গেছে! শুধু তাই নয়, এই অতিধনীদের বেশিরভাগ অর্থই অফশোর ব্যাংক একাউন্টে জমা হয়েছে। ২০১৭ সালে কিছু গবেষক বের করেন যে, পুরো দুনিয়ার জিডিপির ১০ শতাংশই এসব অফশোর ব্যাংক একাউন্টে চলে গেছে! ২০১২ সালে আরেক গবেষণায় উঠে আসে যে, প্রায় ৩২ ট্রিলিয়ন ডলার বা ৩২ হাজার বিলিয়ন ডলার অফশোর একাউন্টে জমা রয়েছে! এটা চীনের জিডিপির প্রায় তিন গুণ!

মন্দা থেকে উঠে দাঁড়াতে অনেকেই অনেক ফর্মূলা দিচ্ছেন। ট্রাম্প প্রশাসন জনগণকে নগদ অর্থ প্রদান করতে চাইলে অনেকেই বাধা দিয়েছেন। তবে এরপরেও প্রণোদনার বেশিরভাগ অর্থ ব্যাংক এবং কর্পোরেটদের হাত ঘুরে গুটি কয়েক ধনীদের পকেটেই গিয়েছে। প্রণোদনার অর্থে শেয়ার বাজার চাঙ্গা হয়েছে ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির জন্যেই। আবার ধনীদের খরচের খাতা থমকে যাওয়াতেও চাকুরি হারাতে হয়েছে খেটে খাওয়া মানুষগুলিকেই। ধনীরা কবে আবার খরচ শুরু করবে, সেদিনের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে গরীব মানুষগুলিকে। ধনীদের মতো অর্থ জমানো দূরে থাক, শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করে দিয়ে ক্রেডিট কার্ডের উপর বেঁচে থাকার পথ বেছে নিতে হয়েছে তাদের। অপরদিকে প্রণোদনার অর্থে উঠে দাঁড়ানো ধনীদের অফশোর ব্যাংক একাউন্টও ফুলে ফেঁপে উঠছে। পুঁজিবাদের করুণ অবস্থা করোনাভাইরাসের আগে থেকেই দৃশ্যমান ছিল; বিশেষ করে ব্যাপক আয় বৈষম্যের প্রতিবেদনে পত্রিকার পাতা ভরেছে সাম্প্রতিক সময়ে। করোনাভাইরাসের মাঝে এই করুণ দৃশ্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থায় আয় বৈষম্যের চিত্রটা এখন আর সমাধানের পর্যায়ে নেই। পুঁজিবাদের নিম্নগামীতাকে থামাতে পারছেন না কেউই।

Sunday, 24 May 2020

‘ওপেন স্কাইজ’ চুক্তিকে বিদায় দিল যুক্তরাষ্ট্র - বিশ্বব্যবস্থা পরিবর্তনের আরেকটা ধাপ সম্পন্ন হলো

২৪শে মে ২০২০
   
মার্কিন বিমান বাহিনীর ৬০ বছরের পুরোনো 'ওসি-১৩৫বি' গোয়েন্দা বিমান, যা 'ওপেন স্কাইজ' চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। মার্কিন চিন্তাবিদদের হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের মূল প্রতিদ্বন্দ্বীই এখন চীন। ‘ওপেন স্কাইজ’ চুক্তিতে ইউরোপ, রাশিয়া থাকলেও চীন নেই। যুক্তরাষ্ট্র এখন তার নিজের তৈরি করা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলি থেকেই বের হয়ে যাচ্ছে; যা বর্তমান পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থার স্থায়িত্বকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিচ্ছে। ইউরোপের ছোট দেশগুলির যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীলতার দিন যেমন ঘনিয়ে আসছে, তেমনি কৌশলগত দিক থেকে ইউরোপের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্বও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
 
গত ২১শে মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ওপেন স্কাইজ’ চুক্তি থেকে বের করে আনার ঘোষণা দেন। এই চুক্তির অধীনে পশ্চিমা দেশগুলির সাথে রাশিয়ার সমঝোতা হয় যে, তারা একে অপরের আকাশসীমায় গোয়েন্দা বিমান ওড়ার অনুমতি দেবে। হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন যে, রাশিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ ভালো সম্পর্ক রয়েছে। তবে রাশিয়া এই চুক্তি মানছে না। কাজেই যতদিন রাশিয়া এই চুক্তি অনুযায়ী না চলবে, ততদিন যুক্তরাষ্ট্র এর থেকে বাইরে থাকবে। ট্রাম্পের বক্তব্যের পরদিন ফরাসী পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয় যে, ফ্রান্সের সাথে জার্মানি, বেলজিয়াম, স্পেন, ফিনল্যান্ড, ইতালি, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস, চেক রিপাবলিক এবং সুইডেন এই চুক্তিকে সন্মান করে যাবে। ফরাসীরা বলছে যে, রাশিয়া যে চুক্তি পুরোপুরি মানছে না, এই ব্যাপারটাতে তার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একমত; তদুপরি তারা এই চুক্তিতে থাকবে। অপরদিকে রাশিয়ার উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভ বলেন যে, ‘ওপেন স্কাইজ’ চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বের হয়ে যাওয়াটা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্যে হুমকিস্বরূপ। আর রাশিয়া এই চুক্তি মানছে না বলে যুক্তরাষ্ট্র যে অভিযোগ করছে, সেব্যাপারে তিনি বলেন যে, ওয়াশিংটন এই অভিযোগের সমর্থনে কোন প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি।

‘আল জাজিরা’ বলছে যে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের ফলে ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার মাঝে স্বাক্ষরিত এবং ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়া ‘নিউ স্ট্র্যাটেজিক আর্মস রিডাকশন টকস’ বা ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির ব্যাপারেও সন্দেহ তৈরি হলো। এটা ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নবায়ন হবার কথা রয়েছে। ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া নিজেদের কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা সাড়ে ১৫’শএর মাঝে সীমাবদ্ধ্ব করতে সম্মত হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটো অংশীদাররা রাশিয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগগুলির ক্ষেত্রে একমত হলেও তারা চুক্তি থেকে মার্কিনীদের বের হয়ে যেতে মানা করেছিল। ন্যাটোর এক কর্মকর্তা ‘আল জাজিরা’কে বলেন যে, ২০১৮ সালে শীর্ষ বৈঠকে যখন কথা উঠেছিল যে রাশিয়া কিছু বিশেষ স্থানেই শুধু এই চুক্তির বাস্তবায়ন করছে, তখনই নিরাপত্তার অবমূল্যায়নের ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ থাকে না।

১৯৫৫ সালে প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারের মার্কিন সরকার সোভিয়েত ইউনিয়নকে প্রস্তাব দেয় যে একে অপরের আকাশসীমায় গোয়েন্দা বিমান প্রেরণের মাধ্যমে উভয় পক্ষের সন্দেহ দূরীকরণ করা যেতে পারে। একে অপরের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে এটা নিশ্চিত হওয়া যাবে যে একজন অপরের উপর হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে না। সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ বলেন যে, সোভিয়েতরা মার্কিন কনসেপ্ট বা চিন্তার সাথে একমত নয়। তবে আইজেনহাওয়ারের এই প্রস্তাবের ৩৪ বছর পর আরেকজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ এধরনেরই আরেকটা প্রস্তাব নিয়ে আসেন, যার মাধ্যমে ন্যাটো এবং সোভিয়েত নেতৃত্বে থাকা ওয়ারস প্যাক্টের মাঝে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের খাতিরে নিজেদের আকাশসীমায় অপরের গোয়েন্দা বিমান ওড়ানোর কথা বলা হয়। এই আলোচনা চলার মাঝেই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়; তবে আলোচনা চলে। অবশেষে ১৯৯২ সালের মার্চে ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকিতে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়াসহ ২৪টা দেশ ‘ওপেন স্কাইজ ট্রিটি’ স্বাক্ষর করে। পরবর্তীতে সকল দেশের জনপ্রতিনিধিদের সমর্থন আদায় এবং সকল শর্ত চুড়ান্ত হবার পর ২০০২ সালের ২রা জানুয়ারি এই চুক্তি বাস্তবায়ন শুরু হয়। এই কর্মকান্ড বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র ‘ডিফেন্স থ্রেট রিডাকশন এজেন্সি’ বা ‘ডিটিআরএ’ নামের একটা সংস্থা গঠন করে। এই সংস্থার অধীনে দু’টা ‘ওসি-১৩৫বি’ গোয়েন্দা বিমান রয়েছে। রাশিয়া, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি, রোমানিয়া এবং ইউক্রেনের কিছু গোয়েন্দা বিমানকে এই চুক্তির অধীনে প্রতিপক্ষের দেশের আকাশসীমায় ছবি তোলার সার্টিফিকেট দেয়া হয়। পশ্চিমা দেশগুলিও এই কাজে নিজেদের বিমান নিয়োজিত করে। ক্যামেরাগুলি বাজারে পাওয়া বাণিজ্যিক ক্যামেরা হবার শর্ত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণা দেবার আগ পর্যন্ত এই চুক্তির স্বাক্ষরকারী দেশের সংখ্যা ছিল ৩৫।

চুক্তি থেকে বের হয়ে যাবার কথা অনেক আগ থেকেই চলছিল। চুক্তির অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত বিমানগুলি প্রায় ৬০ বছরের পুরোনো, এবং এগুলির রক্ষণাবেক্ষণের পিছনে অনেক খরচ করতে হয়। গত অক্টোবরে মার্কিন রিপাবলিকান সিনেটর টম কটন এক টুইটার বার্তায় বলেন যে, প্রেসিডেন্টের উচিৎ ‘ওপেন স্কাইজ’ চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেয়া এবং এই কাজ থেকে বেঁচে যাওয়া কয়েক’শ মিলিয়ন ডলারকে অন্য গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে ব্যবহার করে মার্কিন সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। তবে যারা চুক্তির পক্ষে রয়েছেন, তাদের পক্ষেও রয়েছে যুক্তি। কানাডিয়ান সামরিক বিশ্লেষক স্টেফান ওয়াটকিন্স চুক্তির সুফলগুলি নিয়ে বলেন যে, এই চুক্তির কারণে পশ্চিমা দেশের প্রতিনিধিরা রুশ প্রতিনিধিদের সাথে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই আলোচনা করতে পারছেন। এর মাধ্যমে তারা ওপাড়ের অবস্থার একটা ধারণা পান। ওপাড়ে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে কিনা, অথবা সেখানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে কিনা, সেব্যাপারে তারা তথ্য পেয়ে থাকেন। নিজেদের মাঝে যোগাযোগের ফলে পারস্পরিক বিশ্বাসের দিক থেকে উন্নয়ন হয়। অপরদিকে ‘সেন্টার ফর স্ট্যাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’এর এরোস্পেস বিশেষজ্ঞ টড হ্যারিসন বলছেন যে, এই চুক্তির অধীনে ৩০ সেন্টিমিটার রেজোলিউশনের ছবি তোলা যায়, যা বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তোলা ছবির চাইতে আলাদা কিছু নয়। স্যাটেলাইট ব্যবহারের যুক্তির সমালোচনা করে মার্কিন ‘কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিস’এর পারমাণবিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞ এমি উলফ বলছেন যে, স্যাটেলাইটের ছবিগুলি বহুদূর থেকে তোলা হয় বিধায় বায়ুমন্ডলের ধূলাবালির কারণে ছবির মান ভালো হয়না; অন্যদিকে বিমানগুলি ভূমির অনেক কাছ দিয়ে ওড়ে বিধায় সেগুলি অনেক ভালো মানের ছবি দেয়। তাছাড়া বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটের ছবি কেউ পরিবর্তন বা বিকৃত করেও সরবরাহ করতে পারে। যেসব দেশের স্যাটেলাইট থেকে ছবি তোলার সক্ষমতা নেই, সেসব দেশ বিমান থেকে তোলা ছবির উপর নির্ভর করতে পারে। এভাবে পুরো ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হয়। টড হ্যারিসন বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র তার পুরোনো ‘ওসি-১৩৫বি’ বিমানগুলি অবসরে পাঠিয়ে দিলেও নিজেরা চুক্তির মাঝে থাকতে পারে। এতে অন্য দেশগুলি এই চুক্তির সুবিধাগুলি পাবে। আর যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের বিমান ব্যবহার করেও এই কাজ সম্পাদন করতে পারে।

করোনাভাইরাসের মহামারির মাঝে অর্থনৈতিক ধ্বসের পরেও প্রতিরক্ষা বাজেটের কতটা আগের মতোই রাখা সম্ভব হবে, তা নিয়ে অনেকেই কথা বলছেন। আর তন্মধ্যে রুশ সহযোগিতার ব্যাপারে সন্দেহ থাকা সত্ত্বেও ‘ওপেন স্কাইজ’ চুক্তির পিছনে কয়েক’শ মিলিয়ন ডলার খরচ করাটা ট্রাম্প সরকারের কাছে সমর্থনযোগ্য নয়। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অর্থ খরচে ইউরোপের দেশগুলির নিরাপত্তা দেবার ব্যাপারটাও এখন প্রশ্নবিদ্ধ; কারণ এই দেশগুলির অনেকগুলিই এখন যুক্তরাষ্ট্রের নীতির পক্ষে থাকছে না। ন্যাটোর সদস্য হিসেবে ইউরোপের দেশগুলি নিজেদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রতিরক্ষা খাতে খরচ করছে না; যা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ন্যাটো দেশগুলির টানাপোড়েন চলছে বেশকিছুদিন ধরেই। আর করোনাভাইরাস মোকাবিলায় ইউরোপের অনেক দেশই চীনের কাছ থেকে সহায়তা নিয়েছে; যা ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে দুর্বল করেছে। অথচ মার্কিন চিন্তাবিদদের হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের মূল প্রতিদ্বন্দ্বীই এখন চীন। ‘ওপেন স্কাইজ’ চুক্তিতে ইউরোপ, রাশিয়া থাকলেও চীন নেই। যুক্তরাষ্ট্র এখন তার নিজের তৈরি করা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলি থেকেই বের হয়ে যাচ্ছে; যা বর্তমান পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থার স্থায়িত্বকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিচ্ছে। ইউরোপের ছোট দেশগুলির যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীলতার দিন যেমন ঘনিয়ে আসছে, তেমনি কৌশলগত দিক থেকে ইউরোপের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্বও বৃদ্ধি পাচ্ছে।