Saturday, 13 November 2021

ইরান কি ইরাকের উপর প্রভাব ধরে রাখতে পারবে?

১৩ই নভেম্বর ২০২১

ছবিঃ ইরাকের 'পপুলার মোবিলাইজেশন ইউনিট' বা 'পিএমইউ'এর মিলিশিয়া সদস্যরা বসরায় প্যারেডে অংশ নিচ্ছে। ইরাকের জনগণের কাছে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়ারা যখন রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে ঠেকছে এবং মুকতাদা আল সদরের মতো ইরান বিরোধী নেতারা জনপ্রিয়তা পাচ্ছেন, তখন ইরানের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা ইরাকে প্রভাব বিস্তারে অগ্রগামী ভূমিকা নিতে চাইছে। একারণে যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তী ইরাকের রাজনীতিতে পূর্বের মতো প্রভাব ধরে রাখাটা ইরানের জন্যে কঠিন হয়ে যাচ্ছে; যা ইরানের জন্যে নতুন ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের জন্ম দেবে।

 
গত ৭ই নভেম্বর ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মুস্তফা আল কাধিমির প্রাণনাশের প্রচেষ্টার পর থেকে দেশটার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং সেখানে প্রতিবেশী দেশ ইরানের প্রভাবের ব্যাপারে ব্যাপক আলোচনা চলছে। ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনী বলছে যে, তিনটা ড্রোন ব্যবহার করে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে হামলা করা হয়; যেখানে দু’টা ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করলেও একটা হামলা করতে সক্ষম হয়। হামলায় প্রধানমন্ত্রীর কিছু না হলেও তার ছয়জন দেহরক্ষী আহত হয়। কেউ হামলার দায় স্বীকার না করলেও ইরাকের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বলছেন যে, হামলার জন্যে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়ারাই দায়ী। হামলার প্রযুক্তিগত জ্ঞান থাকা ছাড়াও ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াগুলির ঘোষণা দেয়া সহিংসতাকেও উল্লেখ করছেন তারা। গত অক্টোবরের নির্বাচনে ভরাডুবি হলে মিলিশিয়ারা কারচুপির অভিযোগ করে নির্বাচনের ফলাফল বয়কট করে।

‘আল জাজিরা’র এক প্রতিবেদনে ইরাকের মিলিশিয়াদের উপর ইরানের নিয়ন্ত্রণকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর উপর আক্রমণের পরপরই অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে ইরানও ঘটনার নিন্দা জানায়। এবং একইসাথে পরিস্থিতি সামাল দিতে ইরানের প্রভাবশালী ‘ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর’ বা ‘আইআরজিসি’র আন্তর্জাতিক উইং ‘কুদস ফোর্স’এর প্রধান এসমাঈল ঘানিকে বাগদাদে পাঠায় ইরান। এটা বলা যাচ্ছে না যে, ঘটনার ব্যাপারে ইরান আগে থেকে অবগত ছিল কিনা। তবে প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ঘটনার পর তেহরানের অবস্থান দেখে অনেকেই মনে করছেন যে, এই হামলা অন্ততঃপক্ষে ইরানের পুরোপুরি সম্মতি ছাড়াই ঘটেছে। ইরাকি বিশ্লেষকেরা বলছেন যে, এই মুহুর্তে ইরান চাইবে ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের নিয়ন্ত্রণে এনে শিয়াদের মাঝে দ্বন্দ্ব বন্ধ করা, যা না করতে পারলে ইরাকে ইরানের আকাংক্ষা বাস্তবায়ন কঠিন হবে।

হামলার আগে মিলিশিয়া গ্রুপগুলি যথেষ্টই ক্ষেপে ছিল। নির্বাচনে বিজয়ী শিয়া নেতা মুকতাদা আল সদর ইরান সমর্থিত ‘আল ফাতাহ’ গ্রুপকে বাইপাস করে বিভিন্ন আলোচনা করেছেন; যার ফলশ্রুতিতে পরবর্তী সরকারে ইরান সমর্থিত গ্রুপগুলি স্থান পাবে না। আল সদর পার্লামেন্টের ৩’শ ২৯টা আসনের মাঝে ৭৩টা পেয়ে সবচাইতে প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন। মোহাম্মদ আল হালবুসিএর ‘প্রগ্রেস পার্টি’ ৩৭টা, এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নূরি আল মালিকিএর ‘স্টেট অব ল’ পেয়েছে ৩৪টা আসন। সেই তুলনায় নির্বাচনে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াদের মাঝে ‘বদর অর্গানাইজেন’এর প্রধান হাদি আল আমেরিএর নেতৃত্বে ‘ফাতাহ এলায়েন্স’ কোয়ালিশন পেয়েছে সর্বোচ্চ ১৭টা আসন।

২০২০এর জানুয়ারিতে মার্কিন ড্রোন হামলায় ‘কুদস ফোর্স’এর প্রধান জেনারেল কাসেম সোলাইমানি এবং ইরাকের ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াদের প্রভাবশালী নেতা আবু মাহদি আল মুহান্দিস নিহত হন। ‘রয়টার্স’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এর পর থেকেই মিলিশিয়াদের নিয়ন্ত্রণে সমস্যায় রয়েছে ইরান। নতুন ব্যবস্থা হিসেবে ইরান ‘কাতাইব হিযবুল্লাহ’, ‘আসাঈব আহল আল হাক্ব’ বা ‘এএএইচ’ এবং ‘বদর অর্গানাইজেন’এর মতো বড় মিলিশিয়াগুলিকে বাইপাস করে গোপনে সবচাইতে নির্ভরযোগ্য কিছু ব্যক্তিকে নিয়ে ছোট গ্রুপ গঠন করছে। ইরাকি মিলিশিয়ারা বলছে যে, তারা এই গ্রুপের সদস্য এবং নেতা কাউকেই চেনে না। ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীও এদের উপর নজর রাখছে।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ওয়াশিংটন ইন্সটিটিউট’এর এসোসিয়েট ফেলো হামদি মালিক এক লেখায় বলছেন যে, মিলিশিয়াগুলি ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর এবং পরবর্তীতে আইসিসের আবির্ভাবের পর সামরিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে নিজেদেরকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। কিন্তু আইসিসের পতন এবং ইরাক থেকে সর্বশেষ মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহারের কথায় মিলিশিয়াগুলির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এমতাবস্থায় মিলিশিয়াগুলি সামরিক কর্মকান্ডের মাধ্যমেই নিজেদের জাহির করতে চাইছে। তারা বরং তেহরানের কাছ থেকে সামরিক মিশন বৃদ্ধি করার নির্দেশ পেতেই বেশি আগ্রহী। একসময় তাদের নেতারা নিজেদের অবস্থানকে গোপন রেখে কাজ করলেও এখন তারা টেলিভিশনে এসে যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দিচ্ছেন। ইরান সমর্থিত মিলিশিয়া ‘এএএইচ’এর প্রধান কাইস আল খাজালি ইরাকের ‘আল এতিজাহ’ টেলিভিশনের সাথে এক সাক্ষাতে বলেন যে, উত্তর ইরাকে তুর্কি সেনারা হামলা করলে ইরাকের জনগণের মাঝে মিলিশিয়াদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করা সহজ হবে; মিলিশিয়ারা চ্যালেঞ্জ পছন্দ করে।

ইরাকের রাজনৈতিক সমস্যাগুলি নতুন নয়। ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’এর ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে আশংকা প্রকাশ করা হয় যে, ইরান যদি ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মিলিশিয়াদেরকে ব্যবহার করে হস্তক্ষেপ করতে চায়, তাহলে সেদেশের পরিস্থিতি আরও বেসামাল হয়ে যেতে পারে। অপরদিকে যদি মিলিশিয়াগুলিকে নতুন করে সংগঠিত করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে সেটা হবে কঠিন এবং বিপজ্জনক। প্রতিবেদনে ভবিষ্যৎবাণী করা হয় যে, ইরাকের অভ্যন্তরে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াগুলির কর্মকান্ড জনগণ অপছন্দ করায় ইরাকের মাটিতে যুদ্ধ শেষ হবার পরেও ইরানের জন্যে মিলিশিয়া নির্ভর নীতি অনুসরণ করে যাওয়াটা হিতে বিপরীত হতে পারে। এখানে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হবে ইরাকের জনগণ দেশের রাজনীতিতে মিলিশিয়াদের ভূমিকাকে কিভাবে দেখবে।

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্যা আটলান্টিক কাউন্সিল’এর এক লেখায় ‘ইউনিভার্সিটি অব তেহরান’এর এসিসট্যান্ট প্রফেসর হাসান আহমাদিয়ান বলছেন যে, ইরাকের যুক্তরাষ্ট্র প্রবর্তিত রাজনৈতিক কাঠামোতে ইরানের আস্থা নেই। একারণেই ইরাকের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের ব্যাপারে ইরানের খুব একটা বক্তব্য ছিল না। বরং ইরাকি মিলিশিয়াদের উপরেই ইরানের আস্থা বেশি। তবে ইরান চায় তার প্রতিবেশী দেশের পরিস্থিতি যেন ইরানের জন্যে হুমকি না হয়। সেকারণেই ইরাকের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ইরানের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ। আহমাদিয়ানের কথাগুলি ইরাকের ব্যাপারে ইরানের প্রধান লক্ষ্যকে নির্দেশ করলেও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের অবস্থানকেও এক্ষেত্রে হিসেবে আনতে হবে। প্রধানমন্ত্রী আল কাধিমি ইরানের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলিকেও পাশে চাইছেন ইরানের প্রভাবকে ব্যালান্স করতে। তিনি গত এপ্রিলে সৌদি আরব ঘুরে এসেছেন; এবং বলেছেন যে, তিনি তার দেশকে সৌদি আরবের উপর হামলায় ব্যবহৃত হতে দেবেন না। গত অগাস্টে ইরাকের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জুমা ইনাদ ঘোষণা দেন যে, তার দেশ তুরস্ক থেকে ড্রোন, এটাক হেলিকপ্টার এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার অস্ত্র কিনতে চাইছে। এই ঘটনাগুলি ঘটছে যখন ইরাকের জনগণের কাছে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়ারা রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে ঠেকছে এবং মুকতাদা আল সদরের মতো ইরান বিরোধী নেতারা জনপ্রিয়তা পাচ্ছেন। একারণে যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তী ইরাকের রাজনীতিতে পূর্বের মতো প্রভাব ধরে রাখাটা ইরানের জন্যে কঠিন হয়ে যাচ্ছে; যা ইরানের জন্যে নতুন ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের জন্ম দেবে।

Tuesday, 2 November 2021

চীন কি আসলেই তাইওয়ান আক্রমণ করবে?

০২রা নভেম্বর ২০২১

অক্টোবর ২০২১। চীনা বেসামরিক রোরো জাহাজের ভিতরে সামরিক গাড়ির বহর। মার্কিন এডমিরাল ফিলিপ ডেভিডসনের ছয় থেকে দশ বছরের ‘উইন্ডো’ এখন মার্কিনীরা ব্যবহার করছে তাদের নৌবহর নতুন করে তৈরি করার জন্যে জনসমর্থন আদায়ে। তবে চুলচেরা বিশ্লেষণে চীনাদের সক্ষমতা এবং আকাংক্ষার মাঝে একটা ফারাক রয়েই যায়। এই ফারাকটাই এখন মার্কিন ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাবাচ্ছে। তারা যে ব্যাপারটাতে নিশ্চিত নন তা হলো তাইওয়ান আক্রমণ করার মতো একটা সিদ্ধান্ত যে চীনের অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করবে, সেটা জেনেও চীনারা এই মিশন বাস্তবায়ন করবে কিনা।

 
গত মার্চে মার্কিন নৌবাহিনীর ইন্দোপ্যাসিফিকের কমান্ডার এডমিরাল ফিলিপ ডেভিডসন মার্কিন সিনেটের সামরিক সার্ভিস কমিটির সামনে বলেন যে, চীনারা আগামী ছয় থেকে দশ বছরের মাঝেই তাইওয়ান দখলের আকাংক্ষা বাস্তবায়নের দিকে যেতে পারে। তিনি আরও আশংকা করেন যে, ২০৫০ সালের মাঝে চীন যুক্তরাষ্ট্রের আইনের শাসন এবং বৈশ্বিক নেতৃত্বকে প্রতিস্থাপন করতে পারে। তার কথায়, চীনারা সবসময়ই বলেছে যে, ২০৫০ সালের মাঝে তারা এটা করতে চায়। তার আংশকা হলো, চীনারা সেই টার্গেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন এডমিরালের সরাসরি জবাব না দিয়ে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান সাংবাদিকদের বলেন যে, তাইওয়ানের ব্যাপারে চীনের অবস্থান পরিষ্কার। দুনিয়ায় চীন একটাই এবং তাইওয়ান চীনের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। ‘এনবিসি’ ব্যাখ্যা দিয়ে বলছে যে, ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্টরা চীনের ক্ষমতা নিলে হেরে যাওয়া জাতীয়তাবাদীরা তাইওয়ানে গিয়ে একটা বিরোধী সরকার গঠন করে। অফিশিয়াল না হলেও তাইওয়ানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক যথেষ্ট গভীর। যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে নিয়মিত অস্ত্র সরবরাহ করে যাচ্ছে। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাইওয়ানে মার্কিন ক্যাবিনেট কর্মকর্তাদের পাঠিয়ে চীনের সাথে দ্বন্দ্ব বাড়িয়েছিলেন। জো বাইডেনের প্রশাসনও সেই পথেই রয়েছে। চীনারা তাইওয়ানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর সম্পর্কের ব্যাপারে সর্বদাই প্রতিবাদ করেছে। তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট সাই ইং ওয়েন সাম্প্রতিক নির্বাচনে জেতার পর চীনকে প্রতিরোধ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। চীনারাও তাইওয়ানের আশেপাশে তাদের সামরিক কর্মকান্ড বৃদ্ধি করে তাইওয়ানকে প্রতিনিয়ত চাপের মাঝে ফেলছে। একারণেই প্রশ্নের জন্ম হয়েছে যে, চীন কি আসলেই তাইওয়ান আক্রমণ করে বসতে পারে কিনা।

তাইওয়ানের উপকূলে যথেষ্ট সেনা মোতায়েনের সক্ষমতা চীনের রয়েছে কি?

‘ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস, অস্টিন’এর প্রতিরক্ষা বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘ওয়ার অন দ্যা রক্স’এর এক লেখায় প্রাক্তন মার্কিন নৌবাহিনী কর্মকর্তা এবং মার্কিং থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি’র সিনিয়র ফেলো থমাস শুগার্ট বলছেন যে, যারা মনে করছেন যে, চীনের পক্ষে খুব তাড়াতাড়িই তাইওয়ান আক্রমণ করা সম্ভব নয়, তারা একটা যুক্তি দিচ্ছেন যে, তাইওয়ান প্রণালি পেরিয়ে একটা বড় আকারের উভচর অভিযান চালাবার মতো যথেষ্ট সক্ষমতা চীনের নেই। তবে তারা এই হিসেব কষেছেন চীনা নৌবাহিনীর বিশেষায়িত উভচর জাহাজগুলির সক্ষমতার উপর ভিত্তি করে। এখানে তারা চীনের বেসামরিক জাহাজের বহরের সক্ষমতাকে আমলে নেননি; অন্ততঃ একটা সম্ভাব্য উভচর হামলার প্রাথমিক ধাপে তো নয়ই। শুগার্ট বলছেন যে, যদি চীনাদের বেসামরিক জাহাজগুলিকে এখানে হিসেবে নেয়া হয়, তাহলে এডমিরাল ডেভিডসনের কথাগুলি হালে পানি পায়।

তবে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে পেন্টাগনের করা এক গবেষণায় বলা হচ্ছে যে, আপাতদৃষ্টিতে চীনের উভচর নৌবহরের মূল লক্ষ্য হয়তো চীন থেকে দূরবর্তী অঞ্চলে মিশন পরিচালনা করা। তাইওয়ান প্রণালি পার হয়ে উভচর মিশন পরিচালনা করতে চীনের দরকার বিপুল সংখ্যায় ল্যান্ডিং শিপ এবং মিডিয়াম ল্যান্ডিং ক্রাফট; যেগুলি তাদের নেই এবং সেগুলি তৈরি করার উপর তারা কোন প্রাধান্যও দেয়নি। তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও মনে করছে যে, তাইওয়ান আক্রমণ করার মতো যথেষ্ট ল্যান্ডিং ভেহিকল এবং লজিস্টিক্যাল সক্ষমতা চীনের নেই। মার্কিন সরকারের ‘ইউএস চায়না ইকনমিক এন্ড সিকিউরিটি রিভিউ কমিশন’এর ২০২০ সালের প্রতিবেদনেও তাইওয়ানকে নিয়ন্ত্রণে নেবার জন্যে চীনের যথেষ্ট উভচর সক্ষমতা এবং বিমান পরিবহণ সক্ষমতা নেই বলে বলা হয়। তারা এই শূণ্যস্থান পূরণে বেসামরিক জাহাজ ব্যবহারের প্রশিক্ষণ নেয়া শুরু করেছে; যেগুলির মাধ্যমে তারা দ্বিতীয় ধাপে তাইওয়ানে সেনা পাঠাতে পারবে। প্রথম ধাপে তাইওয়ানের উপকূলে চীনা নৌবাহিনীর উভচর জাহাজগুলিকেই সেনা নামাতে হবে; যারা সমুদ্রবন্দরগুলি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বা অস্থায়ী জেটি তৈরি করে বেসামরিক জাহাজ ভেড়ার ব্যবস্থা করবে। তবে একই কমিশনের সামনে কথা বলতে গিয়ে প্রাক্তন মার্কিন ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তা লনি হেনলি বলেন যে, হয়তো ২০২০ সালের মাঝেই চীনারা তাদের উভচর সক্ষমতার টার্গেট ধরে ফেলেছে। তিনি বলেন যে, এটা তারা হয়তো করতে পেরেছে বেসামরিক জাহাজ ব্যবহারের মাধ্যমে; যেগুলির পরিবহণ সক্ষমতা সামরিক উভচর নৌবহরের চাইতে অনেক বেশি।

 
১৯৮২ সাল। ফকল্যান্ডস যুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে যাত্রীবাহী জাহাজ 'ক্যানবেরা'। জাহাজের ডেকের উপর একটা হেলিকপ্টারও দেখা যাবে। চীনারা বেসামরিক জাহাজ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্রিটিশদের উদাহরণ বিশেষভাবে বিবেচনা করছে। তারা ব্রিটিশদের ফকল্যান্ডস মিশনকে একটা শিক্ষা হিসেবেই নিয়েছে।

চীনারা ব্রিটিশদের ফকল্যান্ডস অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিচ্ছে

‘ইউনাইটেড স্টেটস নেভাল ওয়ার কলেজ’এর রিসার্চ প্রফেসর লাইল গোল্ডস্টাইন ‘দ্যা ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় বলছেন যে, চীনারা বেসামরিক জাহাজ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্রিটিশদের উদাহরণ বিশেষভাবে বিবেচনা করছে। ২০১৭ সালে চীনাদের সামরিক জার্নাল ‘মিলিটারি ইকনমিক রিসার্চ’এর এক লেখায় ‘চায়না ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটি’র দু’জন প্রফেসর ১৯৮২ সালে ব্রিটিশদের ফকল্যান্ডস অপারেশনের বিশদ ব্যাখ্যা দেন। সেখানকার বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে যে, ব্রিটিশরা ৬৭টা বেসামরিক জাহাজ ব্যবহার করেছিল সেই মিশনে; যা সংখ্যায় সামরিক জাহাজের প্রায় সমান হলেও পরিবহণ সক্ষমতা ছিল সামরিকের দ্বিগুণ। ব্রিটিশরা যুদ্ধ শুরুর মাত্র দুই দিনের মাথাতেই বেসামরিক জাহাজগুলিকে প্রস্তুত করতে থাকে। জাহাজের উপর হেলিকপ্টার ডেক তৈরি, লম্বা সমুদ্রপথে জাহাজ থেকে জাহাজে জ্বালানি নেবার ব্যবস্থা, উন্নততর যোগাযোগের ব্যবস্থা করা এবং সমুদ্রে উদ্ধার কর্মকান্ড চালনার দক্ষতা বৃদ্ধি করা হয়। তিন’শ বেসামরিক সংস্থাকে দিয়ে গড়ে মাত্র ৭২ ঘন্টার মাঝে এই পরিবর্তনগুলি বাস্তবায়ন করা হয়। সম্ভাব্য সকল সমস্যা মোকাবিলায় ব্রিটিশদের প্রস্তুতির ব্যাপকতাকে এই মিশনের সাফল্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ বলে উল্লেখ করে চীনারা। ব্রিটিশ লজিস্টিক্যাল কর্মকর্তারা, যাদেরকে রিটায়ারমেন্ট থেকে বা ঐচ্ছিক সার্ভিস দেয়ার জন্যে আনা হয়েছিল, তাদের ট্রেনিং এবং প্রেরণার ব্যাপারটা চীনাদের অবাক করে। চীনারা তাদের লেখায় জাহাজে খাবার পরিবেশন থেকে শুরু করে বেসামরিক কর্মকর্তাদেরকে কত ভাতা দেয়া হয়েছিল, তা নিয়েও আলোচনা করে। মোটকথা চীনারা ব্রিটিশদের ফকল্যান্ডস মিশনকে একটা শিক্ষা হিসেবেই নিয়েছে।

থমাস শুগার্ট বলছেন যে, চীনারা ইতোমধ্যেই তাদের সমস্যাগুলিকে এড়াতে বেসামরিক জাহাজ নির্মাণে কিছু নিয়ম বেঁধে দিয়েছে; যার মাধ্যমে সেই জাহাজগুলি জাতীয় প্রয়োজনে সামরিক বাহিনী ব্যবহার করতে পারবে। বেসামরিক নৌবহরকে তারা নৌবাহিনীর অক্সিলারি ইউনিটের অধীনে রাখতে চাইছে। উদাহরণস্বরূপ, ‘বোহাই ফেরি গ্রুপ’এর রোরো ফেরিগুলিকে কৌশলগত সাপোর্ট ফ্লিটের ৮ম ট্রান্সপোর্ট গ্রুপের মাঝে সংগঠিত করা হয়েছে। ‘হাইনান স্ট্রেইট শিপিং’কে দেয়া হয়েছে ৯ম গ্রুপের অধীনে। ‘সিএসসি রোরো লজিস্টিকস’ রয়েছে ৫ম ট্রান্সপোর্ট গ্রুপে। বেসামরিক ফেরি থেকে চীনারা ইতোমধ্যেই উভচর ক্রাফট পানিতে নামিয়ে সরাসরি উপকূলে সেনা নামাবার প্রশিক্ষণ নিয়েছে। অর্থাৎ প্রথম ধাপেই বেসামরিক জাহাজ থেকে সেনারা উপকূলে নামতে পারবে। চীনাদের জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতাকে এই হিসেবে নিয়ে আসলে আরেকটা চিত্র পাওয়া যাবে। ২০২০ সালে চীনারা ২ কোটি ৩০ লক্ষ টনের বেসামরিক জাহাজ তৈরি করেছে; যা মার্কিন গড়পড়তা জাহাজ নির্মাণের ১’শ ১৫ গুণ! শুগার্ট তার গবেষণায় বলছেন যে, চীনের বর্তমানের গাড়ির ফেরিগুলি ১১ লক্ষ টন সক্ষমতার; যেখানে চীনা নৌবাহিনীর উভচর এসল্ট জাহাজগুলির সক্ষমতা হলো ৩ লক্ষ ৭০ হাজার টন। এছাড়াও হংকংএর গাড়ির ফেরিগুলি এর সাথে আরও ৩ লক্ষ ৭০ হাজার টন যোগ করতে পারবে। সব মিলিয়ে চীনারা প্রায় ১৫ লক্ষ টনের সক্ষমতা জড়ো করতে পারবে। অপরদিকে মার্কিন নৌবাহিনীর উভচর নৌবহরের সক্ষমতা হলো ৮ লক্ষ ৪০ হাজার টন। আর যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ‘মিলিটারি সীলিফট কমান্ড’এর অধীনে সকল রোরো জাহাজ যোগ করলে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতাও প্রায় একই রকম হবে।

তবে কেউ কেউ মত দিচ্ছেন যে, যথাযথ সমন্বয় না থাকলে বেসামরিক জাহাজ ব্যবহার করে তাইওয়ান আক্রমণ করতে গেলে চীনাদের বিপদ হতে পারে। বেসামরিক জাহাজকে রক্ষা করতে হয় এবং আক্রান্ত হলে সহজেই ডুবে যেতে পারে। তবে শুগার্ট বলছেন যে, বেসামরিক জাহাজ কেন, সামরিক উভচর জাহাজের ক্ষেত্রেও সমস্যার ঘাটতি থাকে না। আর এই সকল জাহাজকে ডেস্ট্রয়ার, ফ্রিগেট এবং যুদ্ধবিমান দিয়ে রক্ষা করতেই হয়। বেসামরিক জাহাজগুলি আক্রান্ত হলে সেগুলির ভেসে থাকার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। চীনারা এক্ষেত্রে তাদের বর্তমান অবস্থাকে আরও উন্নত করতে কাজ করছে।

 

মার্কিনীরা কিভাবে তাইওয়ানকে রক্ষা করার কথা চিন্তা করছে?

এডমিরাল ডেভিডসনের কথা ইতোমধ্যেই অনেকের মাঝে প্রতিফলিত হতে শুরু করেছে। তার ছয় থেকে দশ বছরের হিসেবকে অনেকেই ‘ডেভিডসন উইন্ডো’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। মার্কিন কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্য মাইকেল গ্যালাগার ‘নেভি লীগ’এর এক ভাষণে মত দিচ্ছেন যে, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধপ্রস্তুতি নেবার সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের উচিৎ এখনই চীনকে মোকাবিলা করার মতো নৌশক্তি তৈরি এবং প্রস্তুত করা। তার কথায়, সমুদ্রশক্তির ব্যাপারে যথেষ্ট শক্তভাবে নিজেদের অবস্থানকে তুলে না ধরে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখতে থাকলে তা ভূরাজনৈতিক বিপর্জয়ের দিকে ধাবিত করবে এবং একসময় তা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বকে অবান্তর করে ফেলবে। একমাত্র মার্কিন সমুদ্রশক্তিই তাইওয়ানকে চীনের দখলমুক্ত রাখতে পারবে। তিনি বলেন যে, চীনকে বাধা না দিলে তারা তাইওয়ানকে দখলে নিয়ে জাপানকে ঘিরে ফেলবে। তারা সারা বিশ্বের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে এবং সারা বিশ্বে বার্তা ছড়িয়ে দেবে যে, যুক্তরাষ্ট্র তার বন্ধুদের পাশে দাঁড়ায় না। গ্যালাগার শত বছর আগের মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টের নৌশক্তি তৈরির নীতিকে অনুরসরণের পক্ষপাতি। তিনি বলছেন যে, রুজভেল্টের নেতৃত্বই পরবর্তীতে বিংশ শতকে মার্কিন নৌশক্তির স্তম্ভ হয়েছিল।

চীনের একটা বড় সুবিধা হলো তাইওয়ান তাদের মূল ভূখন্ডের অনেক কাছে। শুগার্ট বলছেন যে, উত্তরের পীত সাগর বা দক্ষিণের হাইনান দ্বীপের কাছ থেকে চীনারা তাদের সেনাদের জাহাজে উঠিয়ে সরাসরিই তাইওয়ানের উপকূলে নিয়ে আসতে পারবে। এতে সময় খুবই কম লাগবে এবং মার্কিনীদের কাছে আক্রমণের পূর্বাভাস আসতে আসতে চীনারা সৈন্য পরিবহণের প্রাথমিক কাজ করে ফেলতে পারবে। শুগার্ট ‘ইউএস চায়না কমিশন’এর সামনে তার বক্তব্যে বলেছিলেন যে, তাইওয়ানের উপর সম্ভাব্য চীনা আক্রমণ ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের উচিৎ বিপুল সংখ্যক জাহাজধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে সেগুলি দিয়ে চীনা বেসামরিক ফেরিগুলিকে টার্গেট করা। এটা করতে পারার জন্যে মার্কিন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, সামরিক নেতৃত্বের অধীনে বেসামরিক জাহাজগুলিকে টার্গেটের জন্যে যেন কোন আইনী বাধা না থাকে।

মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকেরা যেব্যাপারে চিন্তিত, তা হলো চীনারা হয়তো সকলের চোখের সামনেই তাইওয়ান আক্রমণের পরিকল্পনা করে যাচ্ছে। মার্কিন এডমিরাল ফিলিপ ডেভিডসনের ছয় থেকে দশ বছরের ‘উইন্ডো’ এখন মার্কিনীরা ব্যবহার করছে তাদের নৌবহর নতুন করে তৈরি করার জন্যে জনসমর্থন আদায়ে। তবে চুলচেরা বিশ্লেষণে চীনাদের সক্ষমতা এবং আকাংক্ষার মাঝে একটা ফারাক রয়েই যায়। এই ফারাকটাই এখন মার্কিন ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাবাচ্ছে। তারা যে ব্যাপারটাতে নিশ্চিত নন তা হলো তাইওয়ান আক্রমণ করার মতো একটা সিদ্ধান্ত যে চীনের অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করবে, সেটা জেনেও চীনারা এই মিশন বাস্তবায়ন করবে কিনা। এবছরে এপ্রিলে ‘দ্যা ইকনমিস্ট’ তাইওয়ানের ভূখন্ডকে পৃথিবীর সবচাইতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বলে আখ্যা দেয়। তারা বলে যে, তাইওয়ান নিয়ে যুদ্ধ হলে তাইওয়নের ‘টিএসএমসি’ সেমিকন্ডাক্টর কারখানা বন্ধ হয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি ধ্বসে পড়বে। মার্কিন থিংকট্যাংক ‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’এর প্রতিষ্ঠাতা ইয়ান ব্রেমার বলছেন যে, ঠিক এই কারণেই চীনারা তাইওয়ান থেকে দূরে থাকবে। কারণ তারাও ‘টিএসএমসি’র সেমিকন্ডাক্টরের উপর নির্ভরশীল; ঠিক যেমনটা যুক্তরাষ্ট্র। ব্রেমার বেশি চিন্তিত তাইওয়ানের উপর চীনের হুমকির ফলাফলের ব্যাপারে। তিনি প্রশ্ন করছেন যে, চীনাদের হুমকির মুখে তাইওয়ানের জনগণ নিজেদের স্বাধীনতা ধরে রাখার ব্যাপারটাকে কিভাবে দেখবে? আর সেই জনমতের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের পশ্চিমা বন্ধুরাই বা কি করতে পারবে? ব্রেমারের কথায় এটা পরিষ্কার যে, পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় এখন কোন নিয়ম নেই। পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত এই ব্যবস্থায় অবশিষ্ট রয়েছে শুধুই অনিশ্চয়তা। পূর্ব এশিয়ায় স্থিতাবস্থা ব্যাহত হবার ব্যাপারে আলোচনাই বলে দিচ্ছে যে, সারা বিশ্ব এখন এই অনিশ্চয়তা কাটিয়ে বিকল্প বিশ্ব ব্যবস্থার আশাতেই রয়েছে।

Sunday, 31 October 2021

বেলারুশ কি ইইউএর বিরুদ্ধে ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ চালাচ্ছে?

৩১শে অক্টোবর ২০২১

পশ্চিমা চিন্তার স্তম্ভ মানবাধিকার ইইউএর সদস্য রাষ্ট্রগুলির শরণার্থী বিরোধী জাতীয়তাবাদী চিন্তার কাছে হার মেনেছে। পোল্যান্ডের পার্লামেন্টে গণতান্ত্রিকভাবেই শরণার্থীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। রাশিয়ার সমর্থনে বেলারুশ ইউরোপের দুর্বলতাকেই উস্কে দিচ্ছে; যাকে ইইউ বলছে ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ। ইউরোপের লিবারাল গণতান্ত্রিক আদর্শ দিনে দিনে দুর্বল হচ্ছে; আর এর স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে উগ্রবাদী জাতীয়তাবাদী চিন্তা। লিবারাল চিন্তার উৎসস্থলে এই দুর্যোগ ধ্বসে পড়া বিশ্বব্যবস্থারই প্রমাণ মাত্র।

 পূর্ব ইউরোপের দেশ বেলারুশের সাথে ইইউএর যখন উত্তপ্ত সম্পর্ক চলছে, তখন ইইউএর অনেকেই অভিযোগ করছেন যে, বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কো ইইউএর সাথে শরণার্থী ব্যবহার করে ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। আর এই যুদ্ধে লুকাশেঙ্কোর প্রধান সমর্থনকারী হলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। অপরদিকে ইইউএর পূর্ব সীমানার দেশ লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া এবং পোল্যান্ড শরণার্থীদের আটকাতে তাদের সীমানায় দেয়াল তৈরিতে উদ্যত হয়েছে; এবং এব্যাপারে তারা ইইউএর সহায়তা চাইছে।

‘ফিনানশিয়াল টাইমস’এর সাথে সাক্ষাতে ইইউএর স্বরাষ্ট্র কমিশনার ইয়ালভা জোহানসন বলেন যে, বেলারুশের প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কো মানুষকে আগ্রাসনের জন্যে ব্যবহার করছেন। তিনি দাবি করেন যে, বেলারুশের উপর ইইউএর অবরোধগুলি তাকে আঘাত করছে বলেই তিনি এখন মরিয়া হয়ে দ্বন্দ্বের দিকে ধাবিত হতে বাধ্য হচ্ছেন। ‘ইউরোনিউজ’ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ২০২০ সালে বেলারুশের নির্বাচনে জেতার পর থেকেই ইইউএর সাথে লুকাশেঙ্কো সরকারের সম্পর্ক খারাপের দিকে যেতে থাকে। ইইউ থেকে নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং এরপর থেকে বেলারুশের রাস্তায় প্রতিবাদ শুরু হয়। ইইউ লুকাশেঙ্কো সরকারের উপর অবরোধ আরোপ করে এবং দ্বন্দ্ব চলতেই থাকে। বেলারুশ সরকার ‘রায়ান এয়ার’এর একটা বিমানকে মিনস্ক বিমানবন্দরে নামতে বাধ্য করে এবং বিমানের অভ্যন্তর থেকে এক সাংবাদিককে বের করে এনে গ্রেপ্তার করে। গত অগাস্টে টোকিও অলিম্পিক থেকে পালানো বেলারুশ এথলেট ক্রিস্টসিনা সিমানুস্কায়াকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয় ইইউএর সদস্য দেশ পোল্যান্ড; যা বেলারুশের সাথে দেশটার সম্পর্ক খারাপ করে। তবে এক সংবাদ সন্মেলনে লুকাশেঙ্কো অস্বীকার করেন যে, তিনি শরণার্থীদেরকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। তিনি বলেন যে, বেলারুশ কাউকে ‘ব্ল্যাকমেইল’ করে না; তবে তারা যদি বেলারুশকে শর্তের মাঝে ফেলে, তাহলে বেলারুশ প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হবে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন যে, তার দেশের রাশিয়া, চীন বা ইইউএর মতো সম্পদ নেই।

 

তবে বেলারুশ থেকে আসা শরণার্থীর চাপে প্রতিবেশী দেশ লিথুয়ানিয়া এবং লাটভিয়া জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। পোল্যান্ডও তার সীমান্ত অঞ্চলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে এবং প্রায় ৬ হাজার সেনা সীমানায় মোতায়েন করে। লাটভিয়া এবং পোল্যান্ড উভয় দেশই তাদের সীমান্তরক্ষী এবং সামরিক বাহিনীকে শক্তি ব্যবহার করে শরণার্থীদের বেলারুশে ফিরিয়ে দেয়ার ক্ষমতা প্রদান করেছে। পোল্যান্ডের পার্লামেন্টে বিল পাশ করে সাড়ে তিন’শ মিলিয়ন ইউরো ব্যয়ে বেলারুশের সাথে ৪’শ কিঃমিঃ সীমানা বরাবর দেয়াল তোলার প্রকল্প নেয়া হয়েছে। পোলিশ সরকার বলছে যে, এবছরেই তারা বেলারুশ থেকে শরণার্থী ঢোকার চেষ্টার ২৩ হাজার প্রচেষ্টাকে তালিকাভুক্ত করেছে। লিথুয়ানিয়াও বেলারুশের সীমানায় কাঁটাতাদের বেড়া দেয়া শুরু করেছে। ইউরোপিয়ান কমিশনের এক বিবৃতিতে এই বেড়া দেয়াকে ‘ভালো চিন্তা’ বলে আখ্যা দেয়া হয়। তবে ইইউ এই প্রকল্পে কোন অর্থায়ন করবে না বলে বলা হয়। লিথুয়ানিয়া সরকার ইইউএর কাছ থেকে এব্যাপারে সহায়তা চেয়েছে।

‘ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, শরণার্থীদের মূল স্রোত আসছে ইরাকের উত্তরের কুর্দী অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে। ইরাক, সিরিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে শরণার্থীরা ১৪ থেকে ১৭ হাজার ডলার খরচ করে মানব পাচারকারীদের মাধ্যমে সেখানে পৌঁছাচ্ছে। প্রথমে এবছরের অগাস্টে বাগদাদ থেকে সরাসরি শরণার্থীরা বেলারুশে আসতে থাকে। এরপর ইইউএর চাপের মুখে ইরাক সরকার সরাসরি ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে ইরাক থেকে শরণার্থীরা দুবাই, লেবানন, সিরিয়া, জর্দান, তুরস্ক, ইত্যাদি দেশ হয়ে বেলারুশে আসতে থাকে। অনেকেই অভিযোগ করছেন যে, বেলারুশ সরকার মিনস্ক বিমানবন্দর থেকেই শরণার্থীদের সরাসরি পোল্যান্ডের সীমানায় পাঠিয়ে দিচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ইইউএর সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হবার পর থেকে বেলারুশ সরকার ভিসা ইস্যু করার দায়িত্ব বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সির হাতে দিয়ে দেয়। এই এজেন্সিগুলি বিভিন্ন উপায়ে শরণার্থীদের বেলারুশে পাঠাবার ব্যবস্থা করতে থাকে।

 

বেলারুশের সীমানার সমস্যার এক ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘চ্যাটহ্যাম হাউজ’এর এসোসিয়েট ফেলো সামানথা ডে বেনডার্ন। বেলারুশের বিতর্কিত নির্বাচনের এক বছরের মাথায় ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা বেলারুশের প্রধান রপ্তানি দ্রব্য পটাশ, অপরিশোধিত তেল, এবং আরও কিছু পণ্যের উপর অবরোধ দেয়। একইসাথে বেলারুশের উপর ব্রিটেনের অর্থবাজার থেকে অর্থ যোগানের উপরও অবরোধ দেয়া হয়। এর পাল্টা হিসেবে লুকাশেঙ্কো মধ্যপ্রাচ্য থেকে শরণার্থী ঢোকার পথ খুলে দেন। বেনডার্ন বলছেন যে, এটা হলো একধরনের ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ, যা শরণার্থীদেরকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ইইউ এবং ন্যাটোর পূর্ব সীমানায় উত্তেজনা সৃষ্টি করা ছাড়াও মিত্র দেশগুলির মাঝে বিরোধের জন্ম দিতে চাইছে। নতুন শরণার্থী সমস্যার কারণে পূর্ব ইউরোপে শরণার্থী বিরোধী মনোভাবকে আরও বেশি উস্কে দিতে পারে এবং অভিবাসন বিরোধী রাজনৈতিক গ্রুপগুলিকে শক্তিশালী করতে পারে। এই ব্যাপারটা ইতোমধ্যেই জার্মানি এবং সুইডেনে দেখা গেছে; যেখানে সমাজের সমস্যার জন্যে উগ্র ডানপন্থীরা শরণার্থীদের দায়ী করছে। একইসাথে তা উগ্র জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ইইউ বিরোধী চিন্তার জন্ম দিয়েছে। রাশিয়া বহুদিন ধরেই চাইছে ইউরোপে ডানপন্থীদের উত্থান হোক; যা ইইউ এবং ন্যাটোকে দুর্বল করবে। বেনডার্ন মনে করেন না যে, এই ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ বেলারুশের পক্ষে মস্কোর অনুমতি ছাড়া করা সম্ভব।

মানবাধিকার সংস্থাগুলি পোল্যান্ড এবং বেলারুশ উভয় দেশের বিরুদ্ধেই আশ্রয়প্রার্থীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগে মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গের অভিযোগ করেছে। ইতোমধ্যেই প্রচন্ড শীত এবং অন্যান্য সমস্যায় পড়ে কমপক্ষে আটজন শরণার্থীর মৃত্যু হয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়। পশ্চিমা চিন্তার স্তম্ভ মানবাধিকার ইইউএর সদস্য রাষ্ট্রগুলির শরণার্থী বিরোধী জাতীয়তাবাদী চিন্তার কাছে হার মেনেছে। পোল্যান্ডের পার্লামেন্টে গণতান্ত্রিকভাবেই শরণার্থীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। রাশিয়ার সমর্থনে বেলারুশ ইউরোপের দুর্বলতাকেই উস্কে দিচ্ছে; যাকে ইইউ বলছে ‘হাইব্রিড’ যুদ্ধ। লিবারাল গণতান্ত্রিক দেশগুলি যখন শরণার্থীর ঢল ঠেকাতে দেয়াল তুলছে এবং সামরিক বাহিনী ব্যবহার করছে, তখন বেলারুশে লিবারাল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার দাবি তুলে লুকাশেঙ্কো সরকারের উপর অবরোধ আরোপ পরস্পরবিরোধীই বটে। ইউরোপের লিবারাল গণতান্ত্রিক আদর্শ দিনে দিনে দুর্বল হচ্ছে; আর এর স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে উগ্রবাদী জাতীয়তাবাদী চিন্তা। লিবারাল চিন্তার উৎসস্থলে এই দুর্যোগ ধ্বসে পড়া বিশ্বব্যবস্থারই প্রমাণ মাত্র।

Saturday, 30 October 2021

মার্কিন নৌবাহিনী কেন চিংড়ি নিয়ে গবেষণা করছে?

৩১শে অক্টোবর ২০২১

নতুন জেনারেশনের নিঃশব্দে চলা রুশ সাবমেরিনগুলিকে মোকাবিলা করা এখন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের গুরুদায়িত্ব। গত সেপ্টেম্বরে মার্কিন নৌবাহিনী আটলান্টিকে ‘টাস্ক গ্রুপ গ্রেহাউন্ড’ নামে রুশ সাবমেরিন খোঁজার মিশন শুরুর ঘোষণা দেয়। এই একই ধারাবাহিকতায় এখন মার্কিন নৌবাহিনীর গবেষকেরা সমুদ্রের নিচে আড়ি পেতে চিংড়ির ‘কট কট’ শব্দ শুনছেন।

 
সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন নৌবাহিনী সমুদ্রের নিচে চিংড়ির ব্যাপারে বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছে। কিছু চিংড়ি পানির নিচে ‘কট কট’ শব্দ তৈরি করে। একসময় সমুদ্রের নাবিকেরা মনে করতো যে, এই শব্দ হয়তো ঢেউয়ের তৈরি, অথবা পানির নিচের আগ্নেয়গিরির শব্দ, অথবা পানির তোড়ে নুড়ি পাথর নড়ার শব্দ। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন নৌবাহিনী যখন সোনার যন্ত্র দিয়ে জার্মান সাবমেরিন খুঁজতে গিয়ে এই শব্দের ঝড়ের মাঝে পড়ে, তখনই তারা নড়েচড়ে বসে। ‘ঊডস হোল ওশানোগ্রাফিক ইন্সটিটিউশন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ‘ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া’র ‘ডিভিশন অব ওয়ার রিসার্চ’এর গবেষকেরা এই শব্দের উৎসকে চিংড়ি পর্যন্ত নিতে সক্ষম হয়েছিল। এই গবেষণার ফলাফল হিসেবে নৌবাহিনীর সোনার অপারেটরদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল যাতে করে তারা বুঝতে পারে কোন শব্দটা চিংড়ির। একটা চিংড়ির একটা শব্দ প্রায় ২’শ ২০ ডেসিবল পর্যন্ত হতে পারে; যা একটা বন্দুকের গুলির শব্দের চাইতেও বেশি! মার্কিন সামরিক সদস্যদের ম্যাগাজিন ‘স্যান্ডবক্স’এর এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের একটা প্রকল্প ২০২০ সালে দ্বিতীয় ধাপে পৌঁছেছে; যার মাঝ দিয়ে তারা কিছু সেন্সর ডেভেলপ করা শুরু করছে। এই সেন্সরগুলি চিংড়ির তৈরি করা শব্দ রেকর্ড করে বিশ্লেষণ করবে। বিশ্লেষণে যদি বুঝতে পারা যায় যে, চিংড়িগুলির কাছাকাছি কোন সাবমেরিন রয়েছে, তাহলে উপকূল বা জাহাজে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্কবার্তা পৌঁছে যাবে।

বৈজ্ঞানিক ম্যাগাজিন ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’ চিংড়ির বিশেষ বৈশিষ্ট্যের ব্যাখ্যা দিচ্ছে। ‘স্ন্যাপিং শ্রিম্প’ বা ‘পিস্তল শ্রিম্প’ নামের এক প্রকারের ক্ষুদ্র সামুদ্রিক চিংড়ি রয়েছে, যেগুলির একটা থাবা থাকে অনেক বড় আকারের; প্রায় নিজেদের শরীরের অর্ধেক। এই থাবাগুলি যখন তারা বন্ধ করে, তখন বেশ জোরে শব্দ হয়। সমুদ্রে কিছু স্থানে এই চিংড়িগুলি তাদের বড় আকারের কলোনি তৈরি করে। সেসব কলোনিতে অনেক সময়েই চিংড়িগুলি সকলে একত্রে থাবা দিয়ে শব্দ করতে থাকে। এরকম সময় কেউ যদি সেখানে সমুদ্রের নিচে সোনার যন্ত্র ব্যবহার করে, তবে চিংড়ির শব্দ ছাড়া কোনকিছুই সে শুনতে পাবে না এবং তার সকল কাজই ব্যাহত হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অনেক সময়েই আটলান্টিকের তলদেশে চিংড়ির কলোনির বিকট শব্দের কারণে মিত্র বাহিনীর জাহাজগুলিকে জার্মান সাবমেরিন খুঁজে পেতে বেগ পেতে হতো। তবে মাত্র ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে ‘সায়েন্স’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় জার্মানির মিউনিখের ‘টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি’র প্রাণিবিদ্যা বিভাগের গবেষক বারবারা শ্মিতজ এই চিংড়িগুলি কিভাবে শব্দ তৈরি করে, সেটার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেন। চিংড়ির থাবা বন্ধ করার সময় সেখান থেকে অতি দ্রুত বের হওয়া পানির জেটের সাথে বুদবুদ বের হয়ে আসে এবং শব্দ উৎপন্ন করে। এই পানির জেটের গতি ব্যবহার করে চিংড়ি নিজের শিকারকে হত্যা করে। পুরো ব্যাপারটা পানির নিচে গুলি করার মতো কাজ করে! বিজ্ঞানীরা একইসাথে চিংড়ির এই বিচিত্র কর্মের কারণও ব্যাখ্যা করছেন। চিংড়িরা মূলতঃ এই শব্দের মাধ্যমে নিজেদের মাঝে যোগাযোগ করে। একইসাথে আক্রমণকারী কোন প্রাণীকে শব্দ করে ভয় দেখিয়ে তারা নিজেদের এলাকাকে রক্ষা করতে চেষ্টা করে। চিংড়ির এই কর্মকান্ডটাই মার্কিন নৌবাহিনীর গবেষকদের আকৃষ্ট করেছে। গতবছর ‘সেন্টার ফর ক্লাইমেট সিকিউরিটি’র এক লেখায় বলা হয় যে, ২০২০ সালের ‘ওশান সায়েন্স মিটিং’এ প্রকাশ করা একটা গবেষণায় বলা হয় যে, জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে সমুদ্রের পানির তাপমাত্র যখন বাড়ছে, তার সাথে এই চিংড়িগুলির শব্দ করার ঘটনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে মাছ ধরার জাহাজগুলি যেমন সোনার ব্যবহার করতে সমস্যা পড়বে, তেমনি মার্কিন নৌবাহিনীর সমুদ্রের নিচের মাইন এবং সাবমেরিন খোঁজার মতো কর্মকান্ডও সমস্যায় পড়বে।

সোনার যন্ত্র দিয়ে পানির নিচে ভূপৃষ্ঠের ত্রিমাত্রিক প্রতিচ্ছবি তৈরি করা যায়; আবার পানির নিচে চলমান যেকোন জিনিসকে খুঁজে পাওয়া যায়; যেমন মাছ বা সাবমেরিন বা মাইন বা অন্য যেকোন বস্তু। ‘একটিভ সোনার’ একটা শব্দ তরঙ্গকে পানির নিচে ছুঁড়ে দেয়; যা কোন জিনিস থেকে প্রতিফলিত হয়ে আবার ফিরে আসে। এই ফিরে আসা শব্দ শুনে তরঙ্গের পরিমাপ থেকে পানির নিচে যেকোন বস্তুর দূরত্ব পরিমাপ করা যায়। আরেক প্রকার সোনার হলো ‘প্যাসিভ সোনার’; যা শব্দ তৈরি না করে বরং কান পেতে শব্দ শোনে। পানির নিচে তৈরি হওয়া যেকোন শব্দকে সেই যন্ত্র শুনে বিশ্লেষণ করে বোঝার চেষ্টা করে সেটা কি জিনিস এবং কতটুকু দূরে বা গভীরে রয়েছে। সমুদ্র যুদ্ধে সাবমেরিনের ব্যবহার শুরু হবার পর থেকেই সোনার যন্ত্রের গুরুত্ব অপরিসীম হয়ে গেছে। কারণ একটা সাবমেরিন পানির নিচে ডুব দিলে তাকে পানির উপর থেকে আর দেখা যায় না এবং সোনার যন্ত্র ছাড়া তখন সেটাকে খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।

 
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর ‘পারসিসটেন্ট একুয়াটিক লিভিং সেন্সর’ বা ‘প্যালস’ নামের এক প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্পে গবেষকেরা বুঝতে চেষ্টা করছেন যে, সমুদ্রের নিচে ড্রোন সাবমেরিনের মতো মানুষের তৈরি কোন বস্তু কাছাকাছি দেখলে প্রাণীকূল সেটাকে কিভাবে দেখে? এছাড়াও বেশিরভাগ রীফ অঞ্চলেই এই চিংড়ি থাকে। শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্থানে হাইড্রোফোন বসিয়ে রাখলেই শব্দ রেকর্ড করা যাবে।

‘ডিসকভার’ ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, মার্কিন সামরিক গবেষণা সংস্থা ‘ডিফেন্স এডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সি’ বা ‘ডারপা’র গবেষকেরা মনে করছেন যে, এসকল চিংড়ির শব্দ শুনে সমুদ্রের নিচে শত্রুর নৌবাহিনীর মনুষ্যবিহীন ড্রোন সাবমেরিন খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। এধরনের ড্রোনগুলি প্রায় শব্দবিহীন হয় বলে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং চীন সকলেই ড্রোন সাবমেরিন ডেভেলপ করছে, যেগুলির কোন কোনটা আবার পারমাণবিক ওয়ারহেডও বহণ করতে সক্ষম। আর আটলান্টিকে রুশ সাবমেরিনের আনাগোণাও অনেক বেড়েছে। ২০১৮ সালে রুশ নৌবাহিনীর কর্মকর্তা সের্গেই স্টারশিনভ দাবি করেন যে, তাদের সাবমেরিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলের নৌঘাঁটির খুব কাছে গিয়ে ঘুরে এসেছে; কিন্তু কেউ তাদেরকে খুঁজে পায়নি।

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর ‘পারসিসটেন্ট একুয়াটিক লিভিং সেন্সর’ বা ‘প্যালস’ নামের এক প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্পে গবেষকেরা বুঝতে চেষ্টা করছেন যে, সমুদ্রের নিচে ড্রোন সাবমেরিনের মতো মানুষের তৈরি কোন বস্তু কাছাকাছি দেখলে প্রাণীকূল সেটাকে কিভাবে দেখে? তারা কি কোন বিশেষ শব্দ করে, অথবা আলোকছটা তৈরি করে কিনা, অথবা ভিন্নভাবে চলাচল করে কিনা। প্রকল্পে কাজ করা মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানি ‘রেথিয়ন’এর গবেষক এলিসন লাফারিয়ের বলছেন যে, এই চিংড়িগুলিকে কাছে থেকে শুনলে প্রায় ১’শ ৯০ ডেসিবল শব্দ পাওয়া যাবে। অথচ এসব শব্দ উৎপাদন করতে কোন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হবে না। এছাড়াও বেশিরভাগ রীফ অঞ্চলেই এই চিংড়ি থাকে। শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্থানে হাইড্রোফোন বসিয়ে রাখলেই শব্দ রেকর্ড করা যাবে। লাফারিয়ের বলছেন যে, তারা সমুদ্রের নিচের ‘বায়োলজিক্যাল সাউন্ডস্কেপ’ বা সকল প্রাণীকূলের একত্রে তৈরি করা শব্দ নিয়ে গবেষণা করছেন। তারা দেখছেন যে, সাধারণ সময়ে শব্দ কিরকম হয়; আর পানির নিচে কোন সাবমেরিন জাতীয় জিনিস চলাচল করলে শব্দ কি ধরনের হয়।

 
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে রাশিয়ার ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাওয়ায় আটলান্টিক আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। এটাও অবশ্য মার্কিন নীতিরই ফলাফল। রুশ আন্তমহাদেশীয় পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলি এখন মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা প্রতিহত করা সম্ভব। তাই রাশিয়া তার সাবমেরিন প্রযুক্তিকে আরও এগিয়ে নিয়ে নতুন নতুন অস্ত্র ডেভেলপ করায় মনোনিবেশ করেছে; যেগুলি বর্তমান মার্কিন প্রযুক্তিকে বাইপাস করে যুক্তরাষ্ট্রের উপর পুনরায় হুমকি সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে।

‘প্যালস’ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক লোরি এডোরনাটো বলছেন যে, সামুদ্রিক প্রাণীগুলিকে ব্যবহার করতে পারলে সেটা বেশ বিচক্ষণতার কাজ হবে; কারণে এতে খুব কম খরচেই এবং তেমন একটা লজিস্টিক্যাল সমস্যায় না পড়েই সার্বক্ষণিকভাবে পানির নিচে সার্ভেইল্যান্স চালনা করা সম্ভব হবে। ‘ডারপা’ বলছে যে, ‘রেথিয়ন’ কোম্পানি ছাড়াও ‘নর্থরোপ গ্রুমান’ কোম্পানির অধীনে আরেকটা গ্রুপ চিংড়ির শব্দ ব্যবহার করে ত্রিমাত্রিক ইমেজ তৈরি করা নিয়ে কাজ করছে। তৃতীয় আরেকটা গ্রুপ ‘ফ্লোরিডা আটলান্টিক ইউনিভার্সিটি’তে ‘গোলিয়াথ গ্রুপার’ নামে একটা বায়োলজিক্যাল সেন্সর ব্যবহার করছে। ‘স্যান্ডবক্স’এর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে রুশ এবং চীনা সাবমেরিনগুলি অনেক বেশি শব্দহীন করে তৈরি করা হচ্ছে। আর মহাসমুদ্রে এই সাবমেরিনগুলিকে খুঁজে বের করাও খুব কঠিন হয়ে গেছে। কিছুদিন আগেই পেন্টাগন একটা মানচিত্র প্রকাশ করে। সেখানে দেখানো হয় যে, সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে যাওয়া ফাইবার অপটিক কেবলের লাইনগুলির কাছাকাছি দিয়েই রুশ এবং চীনা যুদ্ধজাহাজগুলির আনাগোণা বেশি। মার্কিন নৌবাহিনীর ‘দ্বিতীয় নৌবহর’এর কমান্ডার ভাইস এডমিরাল এন্ড্রু ঊডি লুইস বলছেন যে, নতুন বাস্তবতা হলো যে, মার্কিন উপকূল ছাড়লেই তাদের নাবিকেরা এখন প্রতিযোগিতাপূর্ণ এলাকায় অপারেট করবে। যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজগুলি এখন আর নিরাপদে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে ঘুরতে পারবে না বা অত সহজেই আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে যেকোন স্থানে যেতে পারবে না।

রুশ সাবমেরিনের আনাগোণা প্রতিহত করার লক্ষ্যেই ২০১৮ সালের অগাস্ট মাসে মার্কিন নৌবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল এবং উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে তাদের ‘দ্বিতীয় নৌবহর’ কার্যকর করে। ২০১১ সালে রুশ হুমকি কমে যাবার হিসেবে এই নৌবহরের কর্মকান্ড বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে রাশিয়ার ‘গ্রেট পাওয়ার’ প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাওয়ায় আটলান্টিক আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। এটাও অবশ্য মার্কিন নীতিরই ফলাফল। যুক্তরাষ্ট্র চীনকে মূল ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে রাশিয়ার সাথে কৌশলগত আলোচনা বন্ধ করে দেয়। আর ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। এসব কারণে দুর্বল অবস্থানে পড়ে যাওয়া রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করতে মরিয়া হয়ে উঠে। রুশ আন্তমহাদেশীয় পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলি এখন মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা প্রতিহত করা সম্ভব। তাই রাশিয়া তার সাবমেরিন প্রযুক্তিকে আরও এগিয়ে নিয়ে নতুন নতুন অস্ত্র ডেভেলপ করায় মনোনিবেশ করেছে; যেগুলি বর্তমান মার্কিন প্রযুক্তিকে বাইপাস করে যুক্তরাষ্ট্রের উপর পুনরায় হুমকি সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে। নতুন জেনারেশনের নিঃশব্দে চলা রুশ সাবমেরিনগুলিকে মোকাবিলা করা এখন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের গুরুদায়িত্ব। গত সেপ্টেম্বরে মার্কিন নৌবাহিনী আটলান্টিকে ‘টাস্ক গ্রুপ গ্রেহাউন্ড’ নামে রুশ সাবমেরিন খোঁজার মিশন শুরুর ঘোষণা দেয়। এই একই ধারাবাহিকতায় এখন মার্কিন নৌবাহিনীর গবেষকেরা সমুদ্রের নিচে আড়ি পেতে চিংড়ির ‘কট কট’ শব্দ শুনছেন।

সুদানে অভ্যুত্থান মূলতঃ পশ্চিমা হস্তক্ষেপেরই ফলাফল

৩০শে অক্টবর ২০২১

ওয়াশিংটন আপাততঃ সুদানের অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধাচরণ করলেও সুদানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দেখিয়ে দেয় যে, মার্কিনীরা সুদানের সামরিক বাহিনীর সাথে সম্পর্ক কখনোই কর্তন করেনি। ওমর আল বশির ক্ষমতায় থাকার সময়েই যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদের সমর্থনকারী দেশের তালিকা থেকে সুদানের নাম সরিয়ে নেয়। বিনিময়ে সুদান মানবাধিকার বিষয়ে সুদানের কিছু আইন পরিবর্তন করে। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনেই সৌদি আরব সুদানকে তেল সরবরাহসহ আর্থিক সহায়তা দিতে থাকে।

 
গত ২৫শে অক্টোবর আফ্রিকার দেশ সুদানে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর থেকে দেশটার চরমভাবে বিভক্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব অর্থহীন হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সুদানের মারাত্মক অর্থনৈতিক বিপর্জয় ২০১৯ সালে একনায়ক ওমর আল বশিরের সরকারের পতনের পিছনে নেতৃত্ব দেয়া জোট ‘ফোর্সেস অব ফ্রিডম এন্ড চেইঞ্জ’ বা ‘এফএফসি’কে মানুষের কাছে হেয় করেছে। ২০১৯ সালের অগাস্টে দেশ পরিচালনার জন্যে ‘এফএফসি’এর মনোনীত পাঁচজন এবং সেনাবাহিনীর মনোনীত পাঁচজন সদস্য মিলে ‘সভেরেইন কাউন্সিল’ গঠন করেছিল। তবে দুই বছরের মাঝে ‘এফএফসি’র নেতৃবৃন্দ দেশটাকে কোনরূপ দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের সম্ভাবনার কথা বেশ কিছুদিন আগ থেকেই শোনা যাচ্ছিল। ২০২২ সালের নভেম্বরে প্রতিশ্রুত গণতান্ত্রিক নির্বাচনের আগেই এই অভ্যুত্থানকে শুধু সুদানের অভ্যন্তরীণ আঙ্গিক থেকে নয়, বরং দেশটা আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে।

সুদানের দুই রাজনৈতিক দল গত ২রা অক্টোবর একটা নতুন জোট গঠন করে। মিনি মিনাউইএর নেতৃত্বে ‘সুদান লিবারেশন মুভমেন্ট’ এবং জিবরিল ইব্রাহিমের নেতৃত্বে ‘জাস্টিস এন্ড ইকুয়ালিটি মুভমেন্ট’ এই জোট গঠন করে। এই দলগুলি ২০২০এর অক্টোবরে সুদান সরকারের সাথে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। এরপর থেকে উভয় নেতাই এতদিন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন। মিনাউই বলেন যে, তারা চান যে, ‘এফএফসি’র নেতারা তাদের কথা শুনবেন। ‘আল জাজিরা’ বলছে যে, এর ফলে ‘এফএফসি’এর বিভাজন আরও গভীর হয়। এই দুই রাজনৈতিক দল মূলতঃ দারফুর অঞ্চলের সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠন; যারা বশির সরকারের সময় আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের জন্যে যুদ্ধ করেছে। ‘এফএফসি’র মাঝে আরও রয়েছে দক্ষিণ সুদানের সীমানায় অবস্থিত কুরদুফান অঞ্চলের বিদ্রোহী দল ‘সুদান পিপলস লিবারেশন মুভমেন্ট নর্থ’। এছাড়াও রয়েছে দারফুরের ওয়াহিদ আল নূরএর নেতৃত্বে ‘সুদান লিবারেশন মুভমেন্ট’এর আরেক অংশ। অস্ত্র নিয়ে সংগ্রাম করা এই দলগুলি একত্রে ‘সুদান রেভোলিউশনারি ফ্রন্ট’ নামে ‘এফএফসি’র মাঝে ছিল। এই আঞ্চলিক বিদ্রোহী গ্রুপগুলি সুদানের ভৌগোলিক অখন্ডতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই গ্রুপগুলিকে আঞ্চলিক এবং পশ্চিমা শক্তিরা সরাসরি বা প্রচ্ছন্ন সমর্থন দিয়েছে। সবচাইতে বড় উদাহরণ ছিল দক্ষিণ সুদান, যা সুদান থেকে আলাদা হয়ে যায় পশ্চিমা মদদে।

‘এফএফসি’র আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ‘ন্যাশনাল কনসেনসাস ফোর্সেস’; যাদের মূল নেতৃত্ব ছিল জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক দলগুলির হাতে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী সাদিক আল মাহদির প্রতিষ্ঠা করা ‘ন্যাশনাল উম্মা পার্টি’র সাথে কোয়ালিশনে ছিল বামপন্থী ‘সুদানিজ বাথ পার্টি’, ‘সুদানিজ কমিউনিস্ট পার্টি’ এবং হাসান আল তুরাবির প্রতিষ্ঠা করা ‘পপুলার কংগ্রেস পার্টি’। এই দলগুলি বরাবরই পশ্চিমা, বিশেষ করে ইউরোপের কাছ থেকে সমর্থন পেয়েছে। ১৯৮৯ সালে সাদিক আল মাহদির সরকারকে উৎখাত করেই ওমর আল বশির ক্ষমতা দখল করেছিলেন। এরপর থেকে মাহদি বশির সরকারের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। ‘এফএফসি’তে আরও অংশীদার ছিল বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের সমন্বয়ে গঠিত ‘সুদানিজ প্রফেশনালস এসোসিয়েশন’ এবং আরও কিছু নারীবাদী সংগঠন; যেগুলি গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের মাপকাঠিতে ইউরোপ থেকে সরাসরি সমর্থন পেয়েছে।

সুদানের অর্থনৈতিক দৈন্যতাকে পশ্চিমা নীতি থেকে আলাদা করে দেখা যাবে না। এবছরের ২৯শে জুন ‘ইন্টারন্যাশনাল মনেটারি ফান্ড বা ‘আইএমএফ’এর প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা এবং বিশ্বব্যাংকের প্রধান ডেভিড ম্যালপাসের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, সংস্থাগুলির শর্ত হিসেবে সুদান তার নিজস্ব মুদ্রার মূল্যমান পুনর্নিধারণ করার পর বিশ্বব্যংকের ঋণ শোধ করে। এতে তিন দশক পর বিশ্বব্যংকের সাথে সুদানের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। বিশ্বব্যংকের শর্ত মানার পুরষ্কার হিসেবে ‘আইএমএফ’ দেশটার ২৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণ মওকুফ করে। এই মওকুফ সামনের দিনগুলিতে ৫০ বিলিয়ন ডলার বা দেশটার মোট বৈদেশিক ঋণের ৯০ শতাংশ ছাপিয়ে যাবে। তবে ঋণ মাফের শর্ত হিসেবে মুদ্রামান কমিয়ে ফেলায় সুদানে মুদ্রাস্ফীতি মারাত্মক আকার ধারণ করে। দ্রব্যমূল্যের ব্যাপক ঊর্ধগতির সাথে যুক্ত হয় চরম বেকারত্ব; যা কিনা জনগণকে দেশটার রাস্তায় নামায়। সুদানের বিরোধী রাজনীতিবিদেরা এই অসন্তোষের সুযোগ নিয়ে বশিরের সরকারকে উৎখাতে সফলতা পেলেও সেই একই অসন্তোষ বেসামরিক ও সামরিক যৌথ নেতৃত্বকে অর্থহীন করেছে।

ওমর আল বশির ক্ষমতায় থাকার সময়েই যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদের সমর্থনকারী দেশের তালিকা থেকে সুদানের নাম সরিয়ে নেয়। বিনিময়ে সুদান মানবাধিকার বিষয়ে সুদানের কিছু আইন পরিবর্তন করে। দক্ষিণ সুদানের তেলখনিগুলি সুদান থেকে আলাদা হয়ে যাবার পর থেকেই সুদানের অর্থনীতি বিপদে পড়ে। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনেই সৌদি আরব সুদানকে তেল সরবরাহসহ আর্থিক সহায়তা দিতে থাকে। ইয়েমেনের যুদ্ধে সুদান সৌদিদের পক্ষে সৈন্যও প্রেরণ করে। গত এপ্রিলে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ঘোষণা দেয় যে, কৃষিখাতে তারা এবছর সুদানকে ৪’শ মিলিয়ন ডলার দেবে। এই সহায়তা মূলতঃ ৩ বিলিয়ন ডলারের মূল সহায়তার অংশ। সুদান সরকারের বরাত দিয়ে ‘ভয়েস অব আমেরিকা’ বলে যে, এর মাঝে সাড়ে ৭’শ মিলিয়ন ডলার ইতোমধ্যেই সুদান পেয়ে গেছে; যার মাঝে ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্যে ৫’শ মিলিয়ন ডলারের পুঁজি। দুই বছর আগের আরও দেড় বিলিয়ন ডলারের অনুদানও নিশ্চিত করা হয়। ‘আরব নিউজ’ বলছে যে, অভ্যুত্থানে সৌদিরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং তারা সকল পক্ষকে আলোচনার টেবিলে দেখতে চায়।

ওয়াশিংটন আপাততঃ সুদানের অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধাচরণ করলেও সুদানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দেখিয়ে দেয় যে, মার্কিনীরা সুদানের সামরিক বাহিনীর সাথে সম্পর্ক কখনোই কর্তন করেনি। মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক ‘দ্যা আটলান্টিক কাউন্সিল’এর সিনিয়র ফেলো ক্যামেরন হাডসন এক লেখায় সুদানের সমস্যার জন্যে সামরিক বাহিনীকে পুরোপুরি দায়ী করেন। তার কথায়, সুদানের সেনাবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বোকা বানিয়েছে’; যা বারংবার হতে দেয়া যায় না। তিনি অবশ্য সুদানের অর্থনীতিতে ‘আইএমএফ’ এবং বিশ্বব্যাংকের চাপিয়ে দেয়া শর্তের ফলাফলগুলি ঠিকই এড়িয়ে যান। তবে আরবের মার্কিন বন্ধু দেশগুলির সুদানের সাথে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, সুদানের অভ্যুত্থানে মিশর, সৌদি বা আমিরাত যেন সরাসরি সমর্থন না দেয়, সেজন্য ওয়াশিংটন যথেষ্ট কূটনৈতিক তৎপরতা চালায়। সুদানের রাজনীতিতে ইউরোপের প্রভাবের কথাও তিনি আলোচনায় আনেননি; যা বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে পরিপূর্ণতা দেয় না।