যুক্তরাষ্ট্র কেন ফকল্যান্ডসকে আলোচনায় আনছে?
গত এপ্রিল মাসে পেন্টাগনের এক অভ্যন্তরীণ ইমেইলের বরাত দিয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা ‘রয়টার্স’কে বলেন যে, হোয়াইট হাউজ ইউরোপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিভিন্ন অপশন খতিয়ে দেখছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বেশকিছু ইউরোপিয় দেশের সমর্থন না দেওয়া, তাদের সামরিক ঘাঁটিগুলিকে মার্কিন বাহিনীকে ব্যবহার করতে না দেয়া এবং তাদের আকাশসীমাকে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলিকে ব্যবহার করতে না দেয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে একাধিকবার উষ্মা প্রকাশ করেছেন। পেন্টাগনের অপশনগুলির একটা ছিল স্পেনকে সামরিক জোট ন্যাটো থেকে বের করে দেয়া। আরেকটা অপশন হলো, ইউরোপিয় দেশগুলির হাতে যেসকল ঔপনিবেশিক এলাকা এখনও রয়ে গেছে, সেগুলির পক্ষে সমর্থন সরিয়ে নেয়া; যার মাঝে রয়েছে ব্রিটিশ দখলে থাকা দক্ষিণ আটলান্টিকের ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জ এবং আশেপাশের কিছু দ্বীপ। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, এখনও পর্যন্ত ফকল্যান্ডসের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের অফিশিয়াল অবস্থান হলো, ১৯৮২ সালের দুই মাসের অবৈধ দখল বাদে ১৮৩৩ সাল থেকে ফকল্যান্ডস শান্তিপূর্ণভাবে ব্রিটেনের অধীনে রয়েছে। তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কথা হলো, ফকল্যান্ডস হলো ব্রিটেন এবং আর্জেন্টিনার দ্বিপাক্ষিক বিষয়। আর যুক্তরাষ্ট্র চায় উভয় দেশ কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে তাদের দ্বন্দ্ব মিটমাট করুক। যুক্তরাষ্ট্র মেনে নিচ্ছে যে এই মুহুর্তে ফকল্যান্ডস ব্রিটিশ সরকারের অধীনে রয়েছে; কিন্তু দ্বীপগুলির সার্বভৌমত্ব কার থাকা উচিৎ, সেব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কোন মতামত নেই। ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ডস যুদ্ধের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনকে সমর্থন দিয়েছে। আর যুদ্ধের পর থেকে আর্জেন্টিনা জাতিসংঘে বেশ কয়েকবার ফকল্যান্ডসের ইস্যুকে তুলতে চেয়েছিল; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেগুলিকে সমর্থন দেয়নি। ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ বলছে যে, যদি ফকল্যান্ডসের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র আর্জেন্টিনাকে সমর্থন দিতে শুরু করে, অথবা নতুন করে আলোচনা শুরু করতে ব্রিটেনের উপর চাপ প্রয়োগ করে, তাহলে ব্রিটেন অনেকটাই একা হয়ে যাবে। ব্রিটিশ রাজ তৃতীয় চার্লসের যুক্তরাষ্ট্র সফরের মাত্র তিন দিন আগে এই খবর বেরিয়ে আসে।
গত ২৫শে এপ্রিল পেন্টাগনের ইমেইলের খবর প্রচার হবার পর ডাউনিং স্ট্রীট থেকে বার্তা দেয়া হয় যে, ফকল্যান্ডসের সার্বভৌমত্ব শুধুমাত্র ব্রিটেনের। ব্রিটিশ মুখপাত্র বলেন যে, এর আগে ফকল্যান্ডসের জনগণ সর্বসম্মতিক্রমে ব্রিটেনের সাথে থাকার পক্ষে রায় দিয়েছে। এই ব্যাপারটা ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রকে বারংবার বলেছে এবং কোনকিছুই এটাকে পরিবর্তন করতে পারবে না। ‘বিবিসি’ বলছে যে, ২০১৩ সালের এক ভোটে দ্বীপের ১,৬৭২ জন ভোটারের মাঝে তিনজন বাদে সকলেই ব্রিটেনের সাথে থাকার পক্ষে রায় দিয়েছিল। ব্রিটিশ রাজনীতিবিদদের প্রায় সকলেই ফকল্যান্ডসের ব্যাপারে একমত। ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির প্রাক্তন নিরাপত্তা মন্ত্রী লর্ড ওয়েস্ট ‘বিবিসি’কে বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এই ব্যাপারটাকে বুঝতে পারছে না। তিনি মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথকে “স্থূল” বলে আখ্যা দেন এবং বলেন যে, হেগসেথ ন্যাটোর কিছুই বোঝেন না। হেগসেথ বলেছেন যে, ন্যাটো যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে কিছুই করেনি। অথচ একবার মাত্র ‘আর্টিকেল ৫’এর অধীনে ন্যাটো কাজ করেছিলে; আর সেটা ছিল ২০০১ সালে ১১ই সেপ্টেম্বরের পর যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যে। কনজারভেটিভ দলের নেতা কেমি বাডোনেক যুক্তরাষ্ট্রের এহেন চিন্তাকে অর্থহীন বলে আখ্যা দেন। রিফর্ম ইউকে-র নেতা নাইজেল ফারাজ বলছেন যে, ফকল্যান্ডসের ব্যাপারটা একেবারেই আলোচনার বিষয় নয়। এই দ্বীপগুলির সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে কোন বিতর্ক মেনে নেয়া হবে না। তিনি বলেন যে, এই বছরের শেষের দিকে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট জেভিয়ার মিলেইএর সাথে তার দেখা করার কথা রয়েছে। সেসময় তিনি এই ইস্যু নিয়ে কথা বলবেন। লিবারাল ডেমোক্র্যাট নেতা এড ড্যাভি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কটাক্ষ করে বলেন যে, এই প্রেসিডেন্ট ব্রিটেনকে অপমান না করে থাকতেই পারেন না।
আর্জেন্টিনা কেন ফকল্যান্ডসকে আবারও আলোচনায় আনতে চাইছে?
১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা নিজেদের উপকূল থেকে ৪৮৩কিঃমিঃ পূর্বে অবস্থিত ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জ ব্রিটেনের কাছ থেকে দখল করে নেয়। এরপর ব্রিটেন ১২ হাজার কিঃমিঃ সমুদ্র পাড়ি দিয়ে নৌবহর প্রেরণ করে ১০ সপ্তাহের যুদ্ধের মাধ্যমে ফকল্যান্ডস পুনর্দখল করে নেয়। যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন সামরিক সদস্য এবং ২৫৫ জন ব্রিটিশ সামরিক সদস্য নিহত হয়; ফকল্যান্ডসের তিনজন বেসামরিক নাগরিকও প্রাণ হারায়। ফকল্যান্ডসে আর্জেন্টিনার সেনারা আত্মসমর্পণ করেছিল ঠিকই; তবে আর্জেন্টিনা ফকল্যান্ডসের (যেটাকে আর্জেন্টিনা মালভিনাস বলে) উপর থেকে সার্বভৌমত্বের দাবি ছেড়ে দেয়নি কখনোই। পেন্টাগনের ইমেইলের খবর বের হবার পর আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাবলো কুয়ার্নো সোশাল মিডিয়া ‘এক্স’এ লেখেন যে, ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার এবং আর্জেন্টিনা প্রস্তুত রয়েছে ব্রিটেনের সাথে আলোচনার জন্যে। কুয়ার্নো তার সরকারের দীর্ঘমেয়াদী নীতিকেই তুলে ধরেছিলেন মাত্র। সাম্প্রতিক সময়ে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট জেভিয়ার মিলেই ফকল্যান্ডস নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদেরকে কটাক্ষ করে বলেন যে, তারা বুক চাপড়ে ফকল্যান্ডসের সার্বভৌমত্ব চাইলেও ফলাফল শূণ্য।
নিঃসন্দেহেই বলা যায় যে, আর্জেন্টিনা রাষ্ট্রীয়ভাবে ফকল্যান্ডস ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসতে চাইছে। তারা ফুটবল বিশ্বকাপকে এক্ষেত্রে কাজে লাগিয়েছে বাকি দুনিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে। বিশ্বকাপ ফুটবলের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ডের খেলা শেষ হবার পর আর্জেন্টাইন ফুটবলার জিওভানি লো সেলসো খেলা শেষে একটা ব্যানার মাঠে নিয়ে আসেন; যেটাতে স্প্যানিশ ভাষায় লেখা ছিল ‘লাস মালভিনাস সন আর্জেন্টিনাস’; বাংলা তরজমা করলে যা দাঁড়ায়, ‘মালভিনাস আর্জেন্টিনার’। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, লো সেলসো খুব সম্ভবতঃ ব্যানারটাকে গ্যালারিতে দর্শকদের কাছে থেকে নিয়ে আসেন। এরপরে আরেক খেলোয়াড় নিকোলাস ওতামেন্দি ব্যানারটাকে মাঠে শুইয়ে দেন। ‘বিবিসি’র সাথে এক সাক্ষাতে আর্জেন্টাইন খেলোয়াড় লিয়ান্দো পারেদেস বলেন যে, ফকল্যান্ডসের স্মৃতি ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে জেতার পিছনে অনেক বড় প্রেরণা যুগিয়েছিল। তবে আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের জানার কথা যে, ফিফার নিয়মে যেকোন প্রকারের রাজনৈতিক পতাকা, স্লোগান বা ইঙ্গিত বহন করা যাবে না। এই নিয়ম ভাঙলে খেলোয়াড় বা দলকে শাস্তি দেয়া হবে। তথাপি, আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের পেছনে যে সরকারি সমর্থন রয়েছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় যখন আর্জেন্টিনার ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিক্টোরিয়া ভিলারুয়েল এই ব্যানারের স্বপক্ষে বক্তব্য দেন। সোশাল মিডিয়া ‘এক্স’এ খেলোয়াড়দের ব্যানার বহণ করার ছবি পোস্ট করে তিনি বলেন যে, তারা স্টেডিয়ামে এই ব্যানার আনা নিষেধ করলেও তারা ভুলে যাচ্ছে যে, আর্জেন্টিনার জনগণ এটা বুকে বহণ করে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র এর জবাবে বলেন যে, ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ না পেলেও ফকল্যান্ডস ব্রিটেনেরই থাকবে। ব্রিটিশ লিবারাল পার্টির নেতা এড ডেভি বলেন যে, ২০২৪ সালে ইউরোপিয়ান লীগের খেলায় স্প্যানিশ খেলোয়াড় রোড্রি এবং আলভারো মোরাটাকে এক ম্যাচের জন্যে সাসপেন্ড করা হয়েছিল; কারণ তারা “জিব্রালটার স্পেনের” বলে গান গেয়েছিল। সেই হিসেবে তিনি দাবি করেন যে, দায়ী আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দেরকে যেন ফাইনালে খেলতে দেয়া না হয়। সেমিফাইনাল খেলা শেষ হবার কয়েক ঘন্টা পরেই আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্র দপ্তর অভিযোগ করে যে, ব্রিটিশ রয়াল নেভির প্যাট্রোল জাহাজ ‘মেডওয়ে’ আর্জেন্টিনার সমুদ্রসীমার ভেতরে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছিল। এর জবাবে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, তাদের জাহাজ ‘মেডওয়ে’ এন্টার্কটিকায় ব্রিটিশ সার্ভে মিশনের সহায়তায় কাজ করতে ফকল্যান্ডস থেকে চিলিতে গিয়েছিল। এই যাত্রায় জাহাজটা সেই রুটটাই নিয়েছিল, যা কিনা সেই আবহাওয়ার জন্য ছিল নিরাপদ।
সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটন থেকে আর্জেন্টিনার পক্ষে যে সমর্থনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, সেটা একপাক্ষিক নয়। কারণ জেভিয়ার মিলেইএর আর্জেন্টিনা সরকার যুক্তরাষ্ট্র ও ইস্রাইলের অতি কাছের বন্ধুরূপে আবির্ভূত হয়েছে। গত মার্চে পার্লামেন্টে এক বক্তব্যে মিলেই বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত বন্ধুত্বকে তিনি আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গেঁথে ফেলতে চাইছেন। তিনি ট্রাম্পকে প্রধান বন্ধুরূপে আখ্যা দেন এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইস্রাইলের যৌথ হামলাকে প্রথম দিন থেকেই সমর্থন দেন। তিনি পুরো আমেরিকা মহাদেশকে একত্রে শক্তিশালী করার কথা বলেন; এবং বলেন যে, পশ্চিমা বিশ্বের অতি প্রয়োজনীয় সকল খণিজই আমেরিকাতে রয়েছে। তিনি ট্রাম্পের স্লোগানের সাথে মিল রেখে “মেইক আমেরিকাস গ্রেট এগেইন” স্লোগান দেন। এছাড়াও তিনি বলেন যে, সামনের দশকগুলিতে দক্ষিণ আটলান্টিক হবে কৌশলগত যুদ্ধক্ষেত্র। মিলেইএর আর্জেন্টিনা একদিকে যেমন আর্জেন্টিনার সর্বদক্ষিণে ম্যাজেলান ও বীগল প্রণালিকে নিয়ন্ত্রণ করা উশুআইয়া বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি তৈরির অনুমতি দিয়েছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রও আর্জেন্টিনার অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে ২০ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। আর্জেন্টিনার সর্বদক্ষিণে টিয়েরা ডেল ফুয়েগো প্রদেশে ‘রেয়ার আর্থ’ খনিজ পাবার সম্ভাবনাও আর্জেন্টিনাকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ করেছে। তবে আটলান্টিক এবং প্রশান্ত মহাসাগরের সংযোগপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বই সবচাইতে বড় ইস্যু বলে আবির্ভূত হচ্ছে। কারণ এই সাগরপথের উপরেই রয়েছে ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জ। এছাড়াও, মিলেইএর কথায়, উশুআইয়া সামরিক ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্র ও আর্জেন্টিনাকে এন্টার্কটিকা মহাদেশের ‘গেইটকিপার’ বা প্রহরী হিসেবে তুলে ধরবে।
আর্জেন্টিনা কি ফকল্যান্ডস পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম?
আর্জেন্টিনা ফকল্যান্ডস পুনর্দখলের পরিকল্পনা করছে কিনা, সেটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে এটা নিশ্চিত যে, আর্জেন্টিনা তার বিমান বাহিনীকে বহুকাল পরে শক্তিশালী করতে পারছে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায়। এতকাল ব্রিটেনের বাধায় আর্জেন্টিনা নতুন যুদ্ধবিমান কিনতে সক্ষম হয়নি। ডেনমার্কের পুরোনো ২৪টা ‘এফ-১৬’ যুদ্ধবিমান ক্রয় করে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় এই বিমানগুলিকে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করছে আর্জেন্টিনা। ২০২৪ সালের অক্টোবরে পেন্টাগনের এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, এই ‘এফ-১৬’ যুদ্ধবিমানের সাথে যুক্ত হবে ৩৬টা অত্যাধুনিক ‘এআইএম-১২০ এএমআরএএএম’ বা ‘এমর্যাম’ দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, লেজার গাইডেড বোমা, ডাটালিঙ্ক সিস্টেম, ক্রিপ্টোগ্রাফিক যন্ত্রপাতি এবং মিশন প্ল্যানিং সিস্টেম। এই মুহুর্তে ফকল্যান্ডসের নিরাপত্তায় রয়েছে ব্রিটিশ রয়াল এয়ার ফোর্সের ৪টা অত্যাধুনিক ‘ইউরোফাইটার টাইফুন’ যুদ্ধবিমান। মার্কিন ‘এমর্যাম’ ক্ষেপণাস্ত্রগুলি আর্জেন্টিনার পুরোনো ‘এফ-১৬’গুলিকে নতুন সক্ষমতা দেবে; যা কিনা ব্রিটিশ বিমানগুলিকে কিছুটা হলেও হুমকির মাঝে ফেলতে পারে। এছাড়াও গত পহেলা মে সামরিক ম্যাগাজিন ‘জোনা মিলিটার’এর সাথে কথা বলতে গিয়ে আর্জেন্টাইন বিমান বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জেভিয়ার ভ্যালভের্দে বলেন যে, ‘এফ-১৬’ যুদ্ধবিমানের পাল্লা বৃদ্ধি করতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দু’টা ‘কেসি-১৩৫’ রিফুয়েলিং বিমান কেনা হচ্ছে। এই মুহুর্তে আর্জেন্টিনার নৌবাহিনী খুব বেশি শক্তিশালী না হলেও বিমান বাহিনীর সহায়তায় ফকল্যান্ডস পর্যন্ত গিয়ে সেনা মোতায়েন করতে সক্ষম হতেও পারে। ফ্রান্সে নির্মিত ৪টা ‘গোউইন্ড-ক্লাস’এর অত্যাধুনিক কর্ভেট তাদের নৌবাহিনীর মূল শক্তি। এগুলি ছাড়া নৌবাহিনীর বেশিরভাগ জাহাজই অকার্যকরা অবস্থায় রয়েছে; যার মাঝে রয়েছে দু’টা সাবমেরিন, চার দশকের পুরোনো তিনটা ফ্রিগেট এবং ৬টা পুরোনো কর্ভেট। তবে ব্রিটিশ বিমান বাহিনীকে ধ্বংস করতে পারলে আর্জেন্টাইনরা হয়তো ফকল্যান্ডস পর্যন্ত পৌঁছাতেও পারে। তদুপরি, এই মুহুর্তে ফকল্যান্ডসের নিরাপত্তায় রয়েছে প্রায় ১,৫০০ ব্রিটিশ সেনা। ফকল্যান্ডসের মাটিতে নামতে পারলেও ব্রিটিশ সেনাদেরকে দ্রুত পরাজিত করাটাও একটা চ্যালেঞ্জ হবে আর্জেন্টাইনদের জন্যে। এই মুহুর্তে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর সেই সক্ষমতা নেই যে, ১৯৮২ সালের মতো ১২ হাজার কিঃমিঃ পথ পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ আটলান্টিকের খারাপ আবহাওয়ায় বেঁচে থেকে ফকল্যান্ডসকে আর্জেন্টিনার হাত থেকে পুনরুদ্ধার করবে। তথাপি ব্রিটিশরা তাদের স্বপক্ষে যথেষ্ট কূটনৈতিক সমর্থন যোগাড় করার আগেই আর্জেন্টিনাকে যুদ্ধ শেষ করতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখল করে নেয়ার হুমকি ইউরোপিয়দেরকে একত্রিত করেছে। আবার ইরান যুদ্ধের সময়ে ইউরোপিয়দের সমর্থন না পেয়ে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউরোপিয় দেশগুলির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যায়, সেটাও ইউরোপিয়দেরকে একত্রিত করবে। আর ফকল্যান্ডসকে লক্ষ্য করে যেকোন আর্জেন্টাইন সামরিক মিশনকে ইউরোপিয়দের বিরূপ দৃষ্টিতে দেখার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক, নরওয়ে, পর্তুগাল এবং স্পেনের মতো দেশগুলি এখনও নিজেদের মূল ভূখন্ড থেকে বহু দূরে উপনিবেশ ধরে রেখেছে। তথাপি, ভেঙ্গে পড়া বিশ্বব্যবস্থার মাঝে প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরের সংযোগস্থলের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন উভয়ের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত লক্ষ্য। এছাড়াও দক্ষিণ আমেরিকার শেষ মাথায় একটা সামরিক ঘাঁটি খনিজ সমৃদ্ধ এন্টার্কটিকা মহাদেশে ঢোকার পথ। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইউরোপের দূরত্ব এমন সময়ে এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যের গাজা ও ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইস্রাইলকে শর্তহীন সমর্থন দিয়েছে আর্জেন্টিনা। যদি ইউরোপিয়রা ইরান যুদ্ধে সহায়তা না দেয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের শাস্তির মাঝে পড়ে, তাহলে ঠিক একই কারণে আর্জেন্টিনা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা পুরষ্কৃত হতেই পারে। তবে সেটা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ব্রিটেনের ভূরাজনৈতিক দরকষাকষির বাইরে যাবে না।



No comments:
Post a Comment